পল্লবী সেনগুপ্ত
ছেলেটা যে একদৃষ্টে অদ্ভুত ভাবে ওকে দেখছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারল প্রমিলা। গলার কাছটা কেমন যেন শুকিয়ে আসছে। হাঁটু দুটো অল্প অল্প কাঁপছে যেন। বেশ নার্ভাস লাগছে। অবশ্য সে তো হবারই কথা। জীবনে প্রথমবার আজ পাত্রপক্ষের সামনে বসেছে ও। তাও আবার এমন হোমরাচোমরা পাত্র।
ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার। খুব বড় চাকরি করে। তেমনই ঝকঝকে স্মার্ট আর সুদর্শন। আর সেখানে প্রমিলা কী? খুবই সাধারণ ঘরের সাধারণ একটা মেয়ে। বি এ পাশ করেছে সবে।
কলেজ পর্ব শেষ হতে না হতেই মা প্রমিলার বিয়ে নিয়ে যেন একেবারে উঠে পড়ে লাগলেন। বেশ কয়েকটা ছবিও এসেছিল। কিন্তু কোনোটাই মায়ের তেমন মনোমতো হয়নি। তাই সে সব ছবি প্রমিলা অবধি আর পৌঁছায়ইনি। এই পাত্রের ছবিই প্রথম বেশ মনে ধরেছিল মায়ের। না, সেটা শুধু ছেলেটা দারুণ শিক্ষিত বা সুচাকুরে বলে নয় ; ছেলেটা ওদের পূর্বপরিচিত বলেও। সকল বাবা-মা-ই বোধহয় চান মেয়ে বিয়ের পরে চেনা কোনো ঘর পাক।
অরিন্দম আগে ওদের পাড়াতেই থাকত। প্রমিলাদের স্কুলের সুপ্রিয়াদির সঙ্গে ছেলেটার একটা ভাব ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল সেটাও বেশ ভালোই জানে প্রমিলা। কতবার স্কুলের বড় গেটের বাইরে অরিন্দমদাকে দেখেছে ও সুপ্রিয়ার সঙ্গে। প্রমিলার সঙ্গে অরিন্দমের চোখাচোখিও হয়েছে বেশ কয়েকবার। আর প্রতিবারই প্রমিলাকে দেখে কেমন যেন অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠত ওদের পাড়ার সেরা ছেলেটার। আসলে পাড়ার সকলের কাছে নিদারুণ সিরিয়াস আর মেধাবী ছেলের তকমা পাওয়া ছেলেটা বোধহয় চাইত না কোনোভাবেই তার সেই ইমেজটা ক্ষুণ্ণ হোক প্রতিবেশি কাকিমার অতি সাধারণ মেয়েটার চোখেও। ছেলেটা কলেজ পাশ করার পর পর পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছিল ওরা। তারপর থেকে আর ওর কোনো খবর জানে না প্রমিলা।
কিন্তু অরিন্দম তাহলে আজ এভাবে এখানে কেন? কেনই বা সম্বন্ধ করে পাত্রী নির্বাচন চলছে ওর? সুপ্রিয়ার সঙ্গে তাহলে কি ওর সম্পর্কটা টেকেনি?
— “মেয়ে আর আলাদা করে দেখার কী আছে দিদি? ঘটকের কাছে ছবি দেখেই তো আমি চিনতে পেরেছি। বুঝতেই পেরেছিলাম এটাই তো আমাদের সেই প্রমিলা। আমি তো চাই-ই প্রমিলা মাকে আমার ঘরের বউ করে নিয়ে যেতে যদি আপনাদের সকলের মত থাকে।”
— “এ তো খুব আনন্দের কথা। আমাদের মেয়ে যদি অরিন্দমের মতো স্বামী পায় সে তো তারপরম সৌভাগ্য। আমাদের অমতের তো কোনো প্রশ্নই নেই। তা বাবা অরিন্দম তুমি কি প্রমিলার সঙ্গে আলাদা করে কিছু কথা বলে নিতে চাও? তোমার আপত্তি নেই তো এই বিয়েতে?” — কান অবধি হেসে অমায়িক স্বরে প্রশ্ন করলেন প্রমিলার মা।
— “না, আমার কিছু প্রশ্ন করার নেই। আর বিয়ে নিয়ে আমার কিছু বলারও নেই আলাদা করে। এই ব্যাপারে মায়ের কথাই শেষ কথা। তবে হ্যাঁ আমার একটাই বক্তব্য আছে, আমি চাই প্রমিলা বিয়ের পরেও পড়াশুনা চালাক। আমার স্ত্রীকে আমি উচ্চ শিক্ষিত হিসাবেই পাশে পেতে চাই। তাই এম এ পাসটা ওকে করতে হবে।”
বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল এবার প্রমিলার। অরিন্দমের গলাটা এমন গম্ভীর শোনাচ্ছে কেন? ওর সত্যি সত্যি প্রমিলাকে পছন্দ হয়েছে তো? ওর পুরানো প্রেমিকা সুপ্রিয়াদি স্কুলের নাম করা মেধাবী ছাত্রী ছিল, কিন্তু সেখানে প্রমিলা যে বড় সাধারণ। ও কি আদৌ পারবে অরিন্দমের প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে!
চিঠিটা হাতে ধরে খাটে পিঠ হেলিয়ে বসে এক লাফে অনেকগুলো বছর পিছিয়ে গেছিলেন মেয়েদের স্কুলের বড়দি প্রমিলা সরকার। মধ্য পঞ্চাশের এই রাশভারী মহিলাকে এলাকার সকলে বেশ সমীহ করেই চলেন।
রোজকার মতোই আজও বিকালে ক্লান্ত শরীরেই বাড়ি ফিরেছিলেন প্রমিলা। আর ফিরতেই হাতে এই চিঠিটা ধরিয়ে দিল মোহন, মানে প্রমিলার রাত দিনের কাজের ছেলেটা। আজকাল এই ইমেল আর মেসেজের যুগে চিঠি জিনিসটা তো প্রায় অবলুপ্তই হয়ে গেছে, সেখানে হঠাৎ এমন একটা রংচটা বিকেলে নিজের নামে একখানা চিঠি পেয়ে যে কোনো মানুষেরই অবাক হবারই কথা।
চিঠিটা খুলতেই অনেকটা বিস্ময় আছড়ে পড়ল প্রমিলাকে ঘিরে। হুহু করে ও পৌঁছে গেল স্মৃতির সরণী বেয়ে অনেকগুলো বছর আগে।
অরিন্দমের সঙ্গে বেশ জাঁকজমক করেই বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছিল প্রমিলার। নতুন মানুষের সঙ্গে চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে নতুন সংসারে পা রেখেছিল ও। ছোট সংসার স্বামী আর শাশুড়িকে নিয়ে। আর অরিন্দমের মায়ের মতো অমন নিপাট ভালোমানুষ বোধহয় লাখে একটাই মেলে।
অনুভা দেবী বউমাকে মেয়ের মতোই ভালোবেসেছিলেন। ছেলের ইচ্ছায় বউমাকে এম এ পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তিও করে দিয়েছিলেন। আর প্রমিলাও তখন নিজের সমস্ত প্রাণ মন ডুবিয়ে দিয়েছিল পড়াশুনার মধ্যে। অদ্ভুত একটা জেদ কাজ করত ওর মনে। বারবার সেদিন ওর মনে হয়েছিল, “আমাকে অরিন্দমের যোগ্য হতেই হবে। আমাকে সুপ্রিয়ার মতো পড়াশুনায় তুখোড় হতেই হবে” — আসলে সেই সময় অরিন্দমের মন পাওয়াই ছিল প্রমিলার মূল লক্ষ্য।
বিয়েটা হয়ে গেলেও অরিন্দমের মনের গভীরে কিছুতেই প্রবেশ করতে পারছিল না প্রমিলা। রাতের অন্ধকারে বন্ধ ঘরের বিছানায় দুটো শরীর একাধিকবার মিলিত হলেও মনের মিলন হয়নি যে কোনোদিনই সেটা বেশ বুঝতে পারত প্রমিলা।
অরিন্দম বড় বেশি কাজ পাগল। বেশিরভাগ সময়ই যেন সে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায় নিজের পড়াশুনা আর কাজের মধ্যে। প্রমিলার প্রতি নিজের দায়িত্ব কর্তব্য নিয়ে কোনো গাফিলতি না থাকলেও সে যে বউয়ের মনের খবর নিয়ে বেশি ভাবিত নয় সেটা যেন প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে একবার করে বুঝতে পারত প্রমিলা। কষ্টে বুকটা ফেটে যেত ওর, মনে হতো দু-চোখের কোল উপচে এখুনি বুঝি আছড়ে পড়বে বাঁধ ভাঙা প্লাবন। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ভগবানকে বলতে ইচ্ছা করত, “ভগবান, আমি কী এমন অন্যায় করেছি যে আমার কপালেই এমন একজন মানুষকে লিখেছিলে তুমি? যে আমার মন বোঝে না, বুঝতে চায়ও না। আমি তো এত যান্ত্রিকভাবে কর্তব্যপরায়ণ মানুষ চাইনি। আমি তো একজন বন্ধুর মতো মানুষকে চেয়েছিলাম যাকে নিজের সবটুকু সঁপে দিয়ে নিশ্চিত আর নির্ভার হওয়া যায়। আমি খুব মেধাবী বা দুরন্ত নম্বর পাওয়া ছাত্রী নই, সেইজন্যই কি আমি যোগ্য স্ত্রী হয়ে উঠতে পারছি না তার চোখে? শুধু এটাই কি আমার দোষ? তবে কেন সে করল এই বিয়ে?”
না, নিজের হাহাকারের শব্দ কোনোদিন ভুলেও সামনে আসতে দেয়নি প্রমিলা। উল্টে আরও বদ্ধ পরিকর হয়েছে বারবার নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। অরিন্দমকে দেখিয়ে যে দিতেই হতো চাইলে প্রমিলাও সুপ্রিয়ার মতো ঝোলা ভর্তি নম্বর পেতেই পারে। সেইজন্য আস্তে আস্তে নিজের মনের সব অনুভূতিগুলোকে সুচারুভাবে সেদিন মেরে ফেলেছিল ও একে একে। নিজেকে শুধু নিবিষ্ট করেছিল পড়াশোনার মধ্যে। শাশুড়ি প্রায়ই বলতেন, “হ্যাঁরে মা, তোকে পারতেই হবে। দাঁড়াতেই হবে নিজের পায়ে।”
হ্যাঁ, সত্যি আজ প্রমিলা পেরেছে। আজ একটা বড় স্কুলের অধ্যক্ষা ও। সবার কাছে ভীষণ সম্মানের। কিন্তু তবুও অন্তঃসারশূন্য ভীষণভাবে। বড্ড একা।
এম এ পাশ করতে না করতেই পরপর অনেকগুলো বিপর্যয় আছড়ে পড়েছিল প্রমিলার জীবনে। প্রথমে চলে গেলেন শাশুড়ি মা, আর তার এক মাসের মধ্যেই ক্যান্সার ধরা পড়ল ওর নিজের মায়ের। আর ঠিক সেই সময়েই তৃতীয় বিপর্যয়টাও ওঁত পেতেছিল প্রমিলার জন্যই।
একদিন সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে নিজের স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর চালে অরিন্দম বলেছিল, “প্রমিলা আমি একটা খুব বড় সুযোগ পেয়েছি। একটা খুব ভালো অফার নিয়ে আমাকে যেতে হবে লন্ডনে। চাকরির পাশাপাশি সেখানে রিসার্চেরও সুযোগ পাব আমি। মা তো চলেই গেছেন তাই আমার আর কোনো পিছুটানও নেই। তাই পরের মাসেই চলে যাব আমরা। তাই খুব তাড়াতাড়ির মধ্যে তোমার পাসপোর্ট তৈরি করে নিতে হবে। তারপর চলে যাব আমরা।”
অরিন্দমের কথা শুনে সেদিন নিমেষে চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠেছিল প্রমিলার। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠেছিল একটা কষ্ট। উফফ! কি নিষ্ঠুর এই মানুষটা। তবে কি বিগত আড়াই বছরেও সে এতটুকু ভালোবাসতে পারেনি প্রমিলাকে? নিশ্চয়ই পারেনি। যদি পারত তাহলে নিশ্চয়ই আজ নিজের স্ত্রীয়ের মতামতের এতটুকুও গুরুত্ব দিত সে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেবার আগে। একবার সে কথা পর্যন্ত বলল না প্রমিলার সঙ্গে? একা একাই ঠিক করে নিল সবটা! এত তুচ্ছ প্রমিলা অরিন্দমের চোখে?
— “না, আমার পাসপোর্ট লাগবে না। কারণ আমি বিদেশ যাব না” — দৃঢ় গলায় সেদিন বলেছিল প্রমিলা।
— “তার মানে? কী বলছ তুমি? এই কথার মানে জানো?”
— “হ্যাঁ, আমি জেনে বুঝেই বলেছি। তুমি বিদেশ চলে যাও। আমি যেতে পারব না। আমাকে এখন আমার মায়ের কাছে থাকতে হবে। তাছাড়া এমনিতেও আমাদের মধ্যে মানসিক কোনো বন্ধন হয়তো সেভাবে গড়েই ওঠেনি। তাই আমার মনে হয় অযথা এই সম্পর্কটাকে আর বয়ে না বেড়ানোই ভালো” — বুকে ভারী পাথর চাপা দিয়ে সেদিন কথাগুলো বলেছিল প্রমিলা। একটু হলেও আশা ছিল হয়তো অরিন্দম বলবে, “এসব কী বলছ তুমি? এমন কি হয় নাকি? কোথাও আমি যেতে দেব না তোমাকে আমায় ছেড়ে।”
কিন্তু না, অরিন্দম কিচ্ছু বলেনি সেদিন প্রমিলার কথার পর। কয়েক মুহূর্ত চুপ ছিল শুধু। তারপর অল্প ঘাড় কাত করে মৃদু গলায় বলেছিল, “বেশ, তবে তাই হোক।”
হ্যাঁ, তাই হয়েওছিল। ঠিক সময়ে বিদেশ চলে গেছিল অরিন্দম। আর হ্যাঁ, নিয়ম মেনেই হয়ে গেছিল ওদের আইনি বিচ্ছেদটাও।
তারপর পেরিয়ে গেছে গোটা ত্রিশ বছর। এর মাঝে কোনোদিন অরিন্দমের কোনো খবর পায়নি প্রমিলা। হয়তো পেতেও চায়নি। ডিভোর্স হওয়া সত্ত্বেও অরিন্দম শুধু বেঁচেছিল ওর সিঁথির ভাঁজের এক চিলতে সিঁদুরের রেখায়, আর ওর স্মৃতিপটে।
কিন্তু হঠাৎ একি! অরিন্দম চিঠি পাঠিয়েছে ওকে!
সবে মাস চারেক হল সে নাকি দেশে ফিরেছে। একবার সে দেখা করতে চায় প্রমিলার সঙ্গে। তার কিছু বলার আছে নিজের প্রাক্তন স্ত্রীকে। এত বছর পর কী বলতে চায় অরিন্দম? বিগত ত্রিশ বছরে সে তো কোনোদিন মনে করেনি প্রমিলাকে। হয়তো দেশেও ফেরেনি। তাহলে আজ কী দরকার?
মনের মধ্যে অসম্ভব একটা দড়ি টানাটানি যুদ্ধ চলছে প্রমিলার। মস্তিষ্ক বলছে না, একদম না। ভুলেও যেও না ওই দাম্ভিক লোকটার সামনে। আর মন বলছে, গিয়েই একবার দেখো না কী বলতে চায় সে। সত্যি কি কোনোদিনও তাকে ভালোবাসোনি? একদিন তো নিজের সবটুকু দিয়েও জিতে নিতে চাইতে তাকে। সেই পুরোনো অনুভূতিটাকে সম্মান দিতেই না হয় যাও আজ একবার।
না, সত্যি প্রমিলা বুঝতে পারছে না কী করবে ও? ও নিজেই আজ জানে না মন আর মস্তিষ্কের লড়াইতে কে জিতবে শেষমেশ।
অনেকদিন পর পড়ন্ত বিকেলের নরম গোলাপি আলো গায়ে মেখে সন্ধ্যে নামার প্রস্তুতি দেখছিল অরিন্দম বসাক, নিজের পুরোনো শহরের নতুন কেনা ফ্ল্যাটের একফালি বারন্দায় বসে। মনটা কেমন যেন হুহু করছে। স্রোতের মতো আছড়ে পড়ছে ফেলে আসা জীবনের সাদা কালো নানারকম টুকরো টুকরো স্মৃতি।
জীবনে প্রথমবার ভালোবাসা ডানা মেলেছিল অরিন্দমের বুকে সুপ্রিয়ার দেখানো রঙিন স্বপ্নকে ভর করে। নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি তখন সুপ্রিয়াকেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিত অরিন্দম। কিন্তু কোনোদিন বুঝতেও পারেনি সুপ্রিয়া আসলে এক মায়াবিনী। দীর্ঘ সাত বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক উপেক্ষা করে যেদিন প্রথম সে এসে জানিয়েছিল যে অরিন্দম নয় সে নিজের জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছে তার বাবার বন্ধুর ছেলে সোহমকে, সেদিন যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল অরিন্দমের মাথায়। না, হাজার অনুনয় বিনয়, অভিমান কোনো কিছুই সেদিন আর ফেরাতে পারেনি সুপ্রিয়াকে। সে চলে গেছিল। বিদেশ যাবার রঙিন হাতছানি তাকে নিমেষে ভুলিয়ে দিয়েছিল সাত বছরের ভালোবাসা।
ভালোবাসা শব্দটার ওপরেই কেমন যেন বিতৃষ্ণা জন্মে গেছিল অরিন্দমের। আর কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করেনি। বিয়ে করতে তো নয়ই। শুধু নিজেকে তৈরি করার জেদ সেদিন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল ওকে। বারবার মনে হতো, সুপ্রিয়াকে দেখিয়ে দিতে হবে সোহমের থেকে এক কণাও কম যায় না ও।
সেই মতোই এগোচ্ছিল অরিন্দমের জীবন। কিন্তু বাধ সাধলেন মা। ছেলের বিয়ে দিয়েই ছাড়বেন তিনি। না, সেদিন মায়ের কথাকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি অরিন্দম। মা তো এক কথায় মেনে নিয়েছিলেন সুপ্রিয়াকে। অনেকটা স্নেহ, ভালোবাসা নির্দ্বিধায় দিয়েছিলেন মেয়েটাকে। সেই মেয়ের বিশ্বাসঘাতকতা যে মাকেও ভীষণ যন্ত্রণা দিয়েছিল সেটা বেশ বুঝত অরিন্দম।
মায়ের ইচ্ছা মেনেই মায়ের পছন্দের মেয়েকে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেছিল সেদিন ও। মেয়েটা নেহাত অপরিচিতও ছিল না। ওদের পুরোনো পাড়ার মেয়ে। খুব মধ্যবিত্ত ঘরের, খুব সাধারণ একটা মেয়ে। প্রমিলা, সুপ্রিয়াদের স্কুলেরই ছাত্রী ছিল। হয়তো সুপ্রিয়ার মতো অত পড়াকু নয়, তবে খারাপও নয়। তাই অরিন্দম চেয়েছিল ওকে আরও পড়াশুনা করিয়ে সুপ্রিয়ার সমকক্ষ করে তুলতে।
অরিন্দম বরাবরই একটু গম্ভীর, রাশভারী স্বভাবের। বিয়ের পর দেখা গেল প্রমিলাও যেন বড় চুপচাপ। অরিন্দম আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিল ও নিজে যেমন এই বিয়েটা ঠিক ভালোবেসে করেনি, প্রমিলাও বোধহয় তাই। সব সময় কেমন যেন গুটিয়ে থাকে ও। কিন্তু কেন? অনেকবার ভেবেছে অরিন্দম। তবে কি প্রমিলার জীবনেও অতীতে অন্য কেউ ছিল? নাকি বেশ কয়েকবার সুপ্রিয়ার সঙ্গে অরিন্দমকে প্রমিলা দেখেছিল স্কুলের বাইরে, তাই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না অরিন্দমকে!
অরিন্দম বেশ বুঝত প্রমিলা প্রথমদিকে অরিন্দমকে নিয়ে একটু কেয়ারিং থাকলেও আস্তে আস্তে কেমন যেন নির্লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? অরিন্দম চেতন বা অবচেতনে প্রমিলাকে সুপ্রিয়া বানিয়ে তুলতে চাইছিল সেটাই কি তবে টের পেয়ে গেল মেয়েটা? তাই কি অভিমানে ছিটকে গেল দূরে? নাকি মেয়ে মাত্রই এমন হয়? স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক।
অরিন্দম যাই ভাবুক তাতে অবস্থার উন্নতি হয়নি। আস্তে আস্তে আরও যেন দূরে সরতে থেকেছে প্রমিলা। আর অরিন্দমও আরও বেশি ডুবেছে নিজের পৃথিবীতে। হয়তো এভাবেই আরও কিছুদিন চলত। কিন্তু হঠাৎ সব হিসাব এলোমেলো করে চলে গেছিলেন অরিন্দমের মা। আর তার কয়েকদিন পরেই ভীষণ অপ্রত্যাশিতভাবে ওর কাছে চলে এসেছিল বিদেশে পাকাপাকিভাবে সেটল হবার একটা নিদারুণ সুযোগ। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছিল সেদিন ও। ঠিক এইটাই তো এতদিন ধরে চেয়ে এসেছিল। প্রমাণ করতে চেয়েছিল ও সুপ্রিয়ার স্বামীর থেকে কোনো অংশে কম নয়।
কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে সেদিন অরিন্দম হারিয়েছিল নিজের দাম্পত্য জীবনটাকে। হ্যাঁ, কষ্ট তো হয়েইছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়েছিল প্রমিলাকে নিয়ে কষ্ট পেয়ে বোধহয় সত্যি কোনো লাভ নেই। সে তো কোনোদিন ভালোইবাসেনি স্বামীকে। কোনোদিন তো দাম্পত্য সুখ খুঁজেই পায়নি অরিন্দম প্রমিলাকে নিয়ে। তার চেয়ে এই বোধহয় ভালো। থাক যে যার মতো।
বিদেশে থাকতে থাকতে অনেক ভালোলাগাই তৈরি হয়েছিল অরিন্দমের গত ত্রিশ বছরে। কিন্তু কোনোদিন বাঁধা পড়তে ইচ্ছে করেনি নতুন করে। যতবারই পরিস্থিতি এসেছে অন্য কাউকে নিজের জীবনে সামিল করার, ততবারই চোখের সামনে ভেসে উঠেছে অন্য একটা মুখ, যে মুখটা হাজার চেষ্টা করেও সরিয়ে দিতে পারেনি ও।
কিন্তু আজ জীবনের গোধূলি প্রান্তে এসে বারবার মনে হয় বন্ধনকে সারাজিবন এড়িয়ে চললেও, বোধহয় বাঁধা পড়ে থাকার মধ্যেও একটা আলাদা আনন্দ আছে। দিনের শেষে বাড়ি ফেরার পরে কেউ একজন অপেক্ষা করছে আমার জন্য এই অনুভবটায় লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। অরিন্দম বসাক আজ তাই শেষবেলাতেই ছুঁয়ে দেখতে চাইছে এক টুকরো ভালোবাসার সুখ।
নিজের মনের মধ্যেই নানা দোলাচল হচ্ছে প্রতিনয়ত। তাকে এভাবে চিঠি পাঠানোটা কি আদৌ ঠিক হল? সে ভীষণ বিরক্ত হবে না তো অরিন্দমের এই ছেলেমানুষি দেখে? সে হয়তো আজ চরম ঘৃণা করে অরিন্দমকে। কিন্তু এসব ভাবনার মাঝেও একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে বারবার। তাহলে কেন এত বছরেও নিজের জন্য কোনো জীবনসাথী খুঁজে নিল না সে? কেন শুধু ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই বয়ে বেড়াচ্ছে নিঃসঙ্গ একটা জীবন? তবে কি তার মনের কোনায় কোথাও একটা অরিন্দম আজও…?
না না। এসব কিছুতেই ভাববে না ও। ভীষণ ভয় করে কিছু প্রত্যাশা করতে। কিন্তু তবুও প্রমিলার একা থাকাটা কিছুতেই যেন মন থেকে সরাতে পারছে না অরিন্দম। ও আজও একা এটা জানতে পেরেই তো চিঠি পাঠানোর ভাবনাটা কার্যকর করল ও।
আচ্ছা প্রমিলা কি সত্যি আসবে আদৌ? জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অন্তত একটিবার কি ও মুখোমুখি হতে পারবে কয়েকটা না মেটা চাওয়া পাওয়ার সঙ্গে?
ঝোড়ো হাওয়ার হুটোপুটি এলোমেলো করে দিচ্ছে সব কিছু। হঠাৎই যেন ধূমকেতুর মতো আছড়ে পড়ল দুপুরের কালবৈশাখীর ঝড়টা। সহসা ছুটে আসা ঠান্ডা হাওয়ার শিরশিরানিটা সারা গায়ে মেখে নিতে বেশ লাগছে প্রমিলার।
আজ দিন সাতেক হল নিজের পুরোনো স্বামীর বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছে ও। মাঝে মাঝেই আসে। তবে থাকে না। এখনও যেন মন থেকে বিশ্বাস করতেই পারছে না প্রমিলা যে অরিন্দম ক্যান্সারের মতো একটা কঠিন অসুখের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে।
অনেক মানসিক যুদ্ধের পর প্রথম যেদিন অরিন্দমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল প্রমিলা সেদিন চমকে গেছিল ও। ত্রিশ বছর আগের মানুষটার সঙ্গে এর তো কোনো মিলই নেই। কোথায় সেই ঋজু মেরুদণ্ডের গাম্ভীর্য ঢাকা পুরুষ! এ তো অসুস্থতা আর নিঃসঙ্গতার ভারে নুয়ে পড়া একটা মানুষ।
— “প্রমিলা জানি আমাদের মধ্যে হয়তো কোনোদিন প্রেম আসেনি দাম্পত্যের সময়টাতে, কিন্তু পাশাপাশি অনেকগুলো দিন তো কাটিয়েছি আমরা। সেই জোরটুকু থেকেই বলছি, আমার হাতে হয়তো আর বেশি সময় নেই। তাই আমার একান্ত অনুরোধ জীবনের শেষের এই কটা দিন যদি আমার সঙ্গে তুমি একটু সময় কাটাও… না মানে তোমার আপত্তি না থাকলে তবেই। আসলে প্রেমহীন নিঃসঙ্গ জীবনটা নিয়ে আমি যেন হাঁপিয়ে উঠেছি। ঐ একাকীত্বকেই আমার সবথেকে বেশি ভয় করে। বিদেশের মোহময় জীবন এক সময় আমাকে বড় টানত, হয়তো অনেককেই টানে একটা বয়সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ মেকি উচ্ছলতা আর খুশি কোনো শান্তি যে খুঁজে দিতে পারে না তা আজ মর্মে মর্মে বুঝি। তাই তো ফিরে এলাম আবার নিজের মাটির কাছাকাছি এক টুকরো মনের আরামের লোভে।”
— “বিয়ে করলে না কেন আর একবার?” — ছোট করে জিজ্ঞাসা করেছিল প্রমিলা।
— “কী জানি কেন করলাম না। আসলে আমি হয়তো কাউকে ভালো রাখার মতো যথেষ্ট যোগ্য নই সেটা বুঝতে পেরে গেছিলাম, তাই আর জটিলতা বাড়াতে চাই নি” — চোখ নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলেছিল অরিন্দম।
মানুষটার জীবনের শেষবেলার ইচ্ছাটাকে অমর্যাদা করতে পারেনি প্রমিলা। মাঝেমাঝেই চলে আসছে আজকাল এই বাড়িতে। সাধ্য মতো যত্ন করার চেষ্টা করছে তাকে। অরিন্দমের চিকিৎসা চলছে। প্রমিলাও রাতদিন প্রার্থনা করে চলেছে ঈশ্বরের কাছে।
হ্যাঁ ভালোবাসা কী বস্তু প্রমিলা তা জানে না। ও অরিন্দমকে আজও ভালোবাসে কিনা সেটাও ও ভেবে দেখেনি কখনও। কিন্তু এটা তো ঠিক গত ত্রিশ বছরেও এই মানুষটাকে কোনোদিন ভুলতে পারেনি ও। ঘৃণাতেই হোক, আক্ষেপেই হোক বা পুরোনো স্মৃতিতেই হোক সে প্রতিনিয়ত ছিল প্রমিলার সঙ্গে। সিঁথির ভাঁজের এক চিলতে সিঁদুরেই তার অস্তিত্ব প্রমিলা অনুভব করেছে প্রতিদিন। সেই অনুভবটুকু হারিয়ে একেবারে শূন্য হতে যে প্রমিলা কিছুতেই পারবে না। অরিন্দম ওকে কোনোদিন ভালোবাসেনি, ভালোবাসলে হয়তো সব কিছু অন্যরকম হতো। কিন্তু তা বলে প্রমিলা তো কিছুতেই অস্বীকার করতে পারে না যে সেই ওর জীবনের প্রথম পুরুষ যাকে নিজের শরীরের সঙ্গে সঙ্গে আবেগী মনটাও একদিন দিয়ে বসেছিল কুড়ি বছরের প্রমিলা।
দুমদাম করে একটা বিচ্ছিরি শব্দে ভাবনার ঘোরটা যেন ছিঁড়ল প্রমিলার। কোথা থেকে আসছে এমন আওয়াজ? অরিন্দমের ঘর থেকে না? সে এখন বাড়িতে নেই। অল্প সময়ের জন্যই কোথায় যেন গেছে একটা। দুদ্দাড় করে দ্রুত পায়ে চলে এল প্রমিলা অরিন্দমের ঘরে। হ্যাঁ, ঠিক ও যা ভেবছে তাই। ঝড়ের দাপটে খুলে গেছে ঘরের একটা জানালা। আর ছুটে আসা ঝোড়ো বাতাসের চাবুকে নিমেষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লণ্ডভণ্ড হয়েছে ঘরের একাধিক জিনিস।
জানালা শক্ত করে বন্ধ করে জিনিসগুলো গুছাতে শুরু করল প্রমিলা। অনেক পুরোনো জিনিস আজও সঙ্গে করে রেখেছে অরিন্দম। এলোমেলো হয়ে যাওয়া জিনিসগুলো সুচারু হাতে ও গুছাচ্ছে একে একে।
হঠাৎই কী যেন একটা পড়ল ফস করে প্রমিলার পায়ের কাছে, অরিন্দমের পুরোনো একটা ডাইরির ফাঁক গলে। নীচু হয়ে সেটা তুলে নিতেই কেমন যেন চমকে গেল ও। জিনিসটা আর কিছুই নয়, সেটা প্রমিলার একটা কম বয়সের ছবি। বিয়ের পরপর একবার শাশুড়ি মায়ের উৎসাহে স্টুডিওতে গিয়ে বেশ খান কতক ছবি তুলে এসেছিল প্রমিলা। এটা তারই একটা। সাদা কালো পুরোনো রঙচটা ছবিতে রোগা রোগা শ্যামলা মেয়েটার ঝিকঝিকে হাসি আজও অমলিন। এটার কথা তো ভুলেই গেছিল প্রমিলা। কিন্তু এটা অরিন্দমের ডায়েরির ভাঁজে কী করছে?
কী একটা মনে হতে ডায়েরিটার পাতা উলটাতে শুরু করল প্রমিলা। এক একটা পাতায় টুকরো টুকরো মনের নানা অনুভুতুতি লিখে রেখেছে অরিন্দম। তবে সে সব বেশিরভাগই পুরোনো দিনের কথা। অরিন্দম ডায়েরি লিখত! ভীষণ অবাক লাগছে প্রমিলার। পাশাপাশি আড়াই বছর ঘর করেও কোনোদিন জানতেই পারেনি ও।
একটা পাতায় সুপ্রিয়ার ভালোবাসার টুকরো কবিতা, আবার কোনো পাতায় সুপ্রিয়া চলে যাবার পরে তার বিচ্ছদের ব্যথার কথা। আবার কোনো পাতায় নিজের জেদের কথা লিখেছিল অরিন্দম। নিজের অজান্তেই কখন যেন চোখ ভিজে এল প্রমিলার। এত ভালোবাসা শুধু সুপ্রিয়ার জন্যই জমিয়ে রেখেছি সে!
আনমনা হাতে একের পর এক পাতা উল্টেই যাচ্ছে প্রমিলা। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা পাতায়। সেই পাতায় বড় করে শুধু একটাই শব্দ লেখা ‘প্রমিলা’।
বুকের ভেতর এই বয়সেও কেমন যেন ধুকপুক করে উঠল প্রমিলার। কাঁপা হাতে আবার উলটালো ও পাতা। পরের পাতায় আবার লিখেছে অরিন্দম,
“সুপ্রিয়া চলে যাবার পর থেকে নিজের মনকে শক্ত পাথরের মতো করে নিয়েছিলাম আমি। ভাবতেই পারনি আবার কোনোদিন সেখানে রঙের আনাগোনা শুরু হতে পারে। কিন্তু আজকাল বোধহয় সেরকমই কিছু হচ্ছে আবার। প্রমিলা, আমার স্ত্রী। কিন্তু তাকে নিয়েই আজকাল নানারকম স্বপ্ন দেখতে বড্ড ভালো লাগে। আচ্ছা আমি কি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি?”
অন্য একটা পাতায় আবার লেখা,
“প্রমিলাকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু জানি না কেন বলতে পারি না। ওকে বোঝাতেও পারি না। আমার মনে হচ্ছে ও আজকাল আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। আমি বড্ড কষ্ট পাচ্ছি এতে। কিন্তু সে কষ্ট আমি কাউকে দেখাতে চাই না। হয়তো প্রমিলা আমাকে ভালোবাসেনা। হতেও পারে। বাড়ির পছন্দে হঠাৎ কাউকে বিয়ে করে নিলেই কি আর প্রেম জন্ম নিয়ে নেয়? না, নেয় না। হয়তো প্রমিলা একেবারেই আপস করে করেছিল বিয়েটা। হয়তো ওর মনে অন্য কেউ… তবে যাই হোক আমি ওর সামনে দুর্বল হব না। ও নিজে থেকে ধরা দিলে তবেই আমি নিজের হৃদয় পড়তে দেব ওকে”।
এবার আস্তে আস্তে চোখের জলে সব অক্ষর ঝাপসা হয়ে আসছে প্রমিলার। এসব কী দেখছে ও? ওর জন্য অরিন্দম এত ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিল নিজের বুকের মধ্যে? তাহলে কেন বুঝতে পারল না ও? কেন সেই বা একবারও বলল না সেদিন? কেন এভাবে নষ্ট হয়ে গেল ওদের জীবনের এতখানি সময়?
আবার পাতা উলটাচ্ছে ও। পৌঁছে গেল এবার ডায়েরির শেষ লেখাটায়,
“আজ আমার আর প্রমিলার আইনি বিচ্ছেদ হয়ে গেল। আবার একবার ভালোবাসা হারালাম আমি। না, এই শেষ। আর কোনোদিন প্রমিলাকে নিয়ে কিচ্ছু লিখব না আমি। চেষ্টা করব ওকে ভুলে যাবার। ভালো থেকো প্রমিলা।”
হাউহাউ করে কাঁদছে মহাবিদ্যা হাই স্কুলের রাশভারী বড়দি। এসব আজ কী দেখল ও? যে মানুষটাকে ও মন উজাড় করে ভালোবেসেছিল, অথচ নানা অভিমানে সেই ভালোবাসা মুখ ফুটে দেখাতে চায়নি সে এত আবেগ জমিয়ে রেখেছিল ওর জন্য? কেন এত ভুল বুঝেছিল ও অরিন্দমকে? কেন এত খারাপ প্রমিলা? নিজের ওপরই হঠাৎ ভীষণ ঘেন্না হচ্ছে ওর।
“প্রমিলা, কী হয়েছে তোমার? কেন এভাবে কাঁদছ তুমি?” — কখন যেন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অরিন্দম।
এক ছুটে গিয়ে ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রমিলা ষোড়শী আবেগি কিশোরীর মতো। বয়সের সীমা ভুলে মুখ ঘষছে অরিন্দমের বুকে।
— “কেন? কেন আমায় তুমি বলোনি আমাকে এত ভালোবাসো? কেন গম্ভীর সেজে দূরে দূরে সরে থাকতে? আমি যে তোমায় প্রথম দিন থেকেই বড্ড ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বারবার আমার মনে হতো তুমি বুঝি আমায় নিয়ে খুশি নও। তুমি হয়তো আমার মাঝে সুপ্রিয়াকেই খুঁজে পেতে চাও। কিন্তু আমি তো আমিই। তাই তো অভিমান করে আমিও আস্তে আস্তে সরে গেছিলাম। কেন? কেন এমন করলে তুমি? আর আমি যে বড্ড খারাপ। বড্ড স্বার্থপর। নিজেকেই হয়তো আর ক্ষমা করতে পারব না আমি” — পাগলের মতো বলেই চলেছে প্রমিলা।
ওর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বোলাচ্ছে অরিন্দম। নীচু স্বরে বলল, “মনের কথা মুখে বলতে পারিনি। বোঝাতেও পারিনি। সেই দোষেই হয়তো তোমায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবে হ্যাঁ, আমিও তো তোমার অভিমানের কারণ বুঝতে চাইনি। তোমার অভিমানের আড়ালে লুকানো ভালোবাসাটা দেখতেও পাইনি। বারবার ভেবেছি তোমায় পড়াশুনা করিয়ে এমন তুখোড় বানাব যে আমার ভালোবাসাকে দেখে সুপ্রিয়ার দম্ভও মুখ নীচু করে নেবে। কিন্তু বুঝতে পারিনি আমার ভাবনা আর তোমার ইচ্ছা নাও মিলতে পারে। বিদেশে যাবার সিদ্ধান্তে তুমি খুশি নাও হতে পারো সেদিন কেন যে বুঝতে পারিনি! নিজের মিথ্যা জেদের জন্যই আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম তোমায়। তাই তোমার কিছু দোষ থাকলেও আসল অপরাধী আমিই প্রমি। তবে আজ আর আমার কোনো আক্ষেপ নেই। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তুমি আমার পাশে থাকবে। ব্যস! আর কী চাই। মরার সময় এটা জেনে মরব যে আমি চলে গেলেও আমার ভালোবাসা তো রয়েছে এই পৃথিবীতেই। তার হৃদয়েই তো মরেও বেঁচে থাকব আমি।”
— “না না আমি কোথাও যেতে দেব না তোমায়। তুমি ভালো হবেই। আজকাল ক্যান্সার এমন কিছু কঠিন ব্যাপার না। আমার আগে আমি তোমায় যেতে দেব না কিছুতেই।”
— “না প্রমিলা। বিশ্বাস করো বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আমায় ছেড়ে একেবারে চলে গেছে। তাই যতখানি চিকিৎসা করাতে পারতাম তা আমি করাব না বলেই ঠিক করেছি। তবে আজ আবার বড্ড ইচ্ছে করছে তোমায় সঙ্গে নিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকতে। তাই…”
— “আমার কিছু বলার আছে তোমায়…” অরিন্দমের কথা হঠাৎ থামিয়ে দিল প্রমিলা।
“আসলে আমার হাতেও খুব কম সময় আছে গো। আমার একটা কিডনি ব্লাড সুগারে আগেই খারাপ হয়ে গেছিল। দ্বিতীয়টারও অবস্থা খুব খারাপ। ডাক্তাররা খুব একটা আশাবাদী নন। তাই আমিও জানি না আর কতদিন আমি…”
— “চুপ একদম চুপ। কিচ্ছু হবে না তোমার। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হবে তোমার। আমি করাব। যত টাকা লাগে, যেখানে যেতে হয় সব করাব আমি” — প্রমিলার হাত চেপে ধরেছে অরিন্দম। তারও চোখে জল।
অরিন্দমের স্পর্শটায় সত্যি আবার নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা যেন ফিরে পাচ্ছে প্রমিলা। ছলছল চোখে বলল, “সব কথা শুনব তোমার। তবে তার আগে কথা দাও তুমিও লক্ষ্মী ছেলের মতো ভালো করে ট্রিটমেন্ট করাবে। একেবারে ভালো হয়ে উঠবে। কথা দাও আমার মাথা ছুঁয়ে।”
প্রমিলার মাথায় হাত রাখল অরিন্দম। চোখ বুজে ধীরে ধীরে বলল, “আমি সব রকম ট্রিটমেন্ট করাব। ভালো হয়ে উঠবই। তোমার সঙ্গে অনেকগুলো বছর বাঁচতে হবে যে। সব না পাওয়ার হিসাবটুকু মিটিয়ে নিতেই হবে। বাকি রয়ে যাওয়া ভালোবাসার হিসেবনিকেশগুলো মিলিয়ে দিতেই তো হবে বলো!”
— “হ্যাঁ তাই। আমি তোমায় ছেড়ে আর কোথাও যাব না। তোমাকেও কোথাও যেতে দেব না বুঝলে” — অরিন্দমের গলায় আলতো চুমু খেল প্রমিলা। ওর মনে হচ্ছে যেন ফিরে গেছে সেই কুড়ি বছর বয়সের ফেলে আসা সময়টায়, যখন ওর দু-চোখ জুড়ে ছিল ভালোবাসার রঙিন স্বপ্ন।
— “প্রমি আমার সঙ্গে একবার ছাদে যাবে? ঝড় তো থেমে গেছে। মেঘও কেটে গেছে। একবার সূর্যাস্ত দেখবে আমার হাতে হাত রেখে? জানো, সেই দিনগুলোতে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কত সকালে আমি ভেবেছি যদি তোমার হাত ছুঁয়ে একবার সূর্যোদয় দেখতে পারতাম!”
— “চলো। আমিও দেখতে চাই। সূর্যোদয় দেখা হয়নি একসঙ্গে তো কী হয়েছে, সূর্যাস্ত দেখব। সূর্যাস্তেও তো আকাশ একইরকম লাল হয়ে আবীর ছড়ায় দিগন্তে।”
********
লিফটে করে ছাদে চলে এসেছে ওরা। হাতে হাত ছুঁয়ে সূর্যাস্ত দেখছে, চোখে নতুন স্বপ্ন সাজানো এক পঞ্চাশ পেরোনো যুগল, এক বুক ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও যারা একদিন আলাদা হয়ে গেছিল বহু বছরের জন্য শুধু নিজেরা নিজেদের কথা মন খুলে বলতে পারেনি বলে।
— “এভাবেই কত সম্পর্ক, কত ভালোবাসা ভেঙে যায় বলো শুধু দুটো কথা বলতে না পারার কারণে” — অরিন্দমের কাঁধে মাথা প্রমিলার।
— “হ্যাঁ, তাই যায় হয়তো। কিন্তু আজ আর কোনো বিচ্ছদের কথা নয়, আজ শুধু ভালোবাসার কথা হোক না প্রমি” — অরিন্দম যেন আজ বাইশের তরুণ প্রেমিক।
— “ইশশ ! বুড়ো বয়সে আদিখ্যেতা” — হাসতে হাসতে বলল প্রমিলা।
— “ভালোবাসার তো কখনও কোনো বয়স হয় না প্রমি। প্রেম তো চিরকালই নবীন আর সবুজ। আর সেই প্রেমের অনুভূতিতে ভেসে গিয়ে আমিও যে আজ একদম তরুণ হয়ে গিয়েছি। আমারও যে আজ বড্ড ইচ্ছা করছে মন খুলে দামাল হয়ে তোমায় ভালোবাসতে” — প্রমিলার হাতে অল্প চাপ দিল অরিন্দম, তারপর আবার বলল, “বুঝলে প্রমি এবার একটা রেজিস্ট্রি বিয়ে করব আমরা। তারপর গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়াব।”
আনন্দে হৃদয়টা উপচে যাচ্ছে প্রমিলার। অসুখ-বিসুখ, বিচ্ছেদ-বিরহ, মান-অভিমান সব ভুলে শুধু ভালোবাসায় ভেসে যেতে ইচ্ছে করছে আজ। সূর্যাস্তের পরে আকাশে ছড়ানো লাল রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে ওদের হৃদয়েও।
“জানো তো এভাবে আলাদা করে কোনোদিন সূর্যাস্ত দেখিনি আমি। আজ প্রথমবার দেখলাম। সূর্যাস্তও যে এত সুন্দর রঙ ছড়ায় আমি জানতামই না” — পুরোনো বর তথা নতুন প্রেমিকের হাতে হাত রেখে বলল প্রমিলা।
— “একদম ঠিক বলেছ। আমিও যেন নতুন করে চিনলাম আজ সূর্যাস্তের রঙ। একটা গান করো না প্রমি।”
“আলোকে মোর চক্ষু দুটি / মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি / এই জনমে ঘটালে মোর জন্ম জন্মান্তর / সুন্দর হে সুন্দর …”
গোধূলির বাতাসের কণা গুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে প্রমিলার গান। বহুদিন পর আবার যে নিজেদের সুর খুঁজে পেয়েছে বেসুরো হয়ে যাওয়া ক্লান্ত বিধ্বস্ত দুটো মানুষ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন