বৃষ্টিভেজা

পল্লবী সেনগুপ্ত

কে জি স্যারের লেকচারটায় মন নিবিষ্ট করতে চেষ্টা করল ধীমান। স্যার যথারীতি বিষয়টার একদম গভীরে ঢুকে, বিষয়টার সঙ্গে আত্মস্থ হয়ে লেকচার দিচ্ছেন। কিন্তু ধীমান ঠিক মতো মন দিতে পারছে না। কঠিন ন্যায়দর্শন বোঝাচ্ছেন স্যার। ওঁর মত ন্যায়শাস্ত্রে পণ্ডিত খুব কম লোকই আছে এই বাংলায়। সবাই একমনে শুনছে ওঁর পড়ানো আর জলদি হাতে নোট লিখছে ঝটপট। কিন্তু ধীমান পারছে না। কিছুতেই পারছে না মনঃসংযোগ করে পড়া শুনতে বা নোট নিতে। বার বার ওর ঘাড় ঘুরে যাচ্ছে। বারবার ওর চোখ চলে যাচ্ছে পিছনের দিকের বেঞ্চে বসে থাকা ওই মেয়েটার দিকে। এবার নিজেই নিজেকে ধমক লাগাল ধীমান। কী হচ্ছে কী এটা? এখন এই কঠিন পড়া শুনে বা বুঝে না নিলে কি ওর চলবে? ওর কি ক্ষমতা আছে আলাদা করে প্রাইভেট টিউশনি পড়ার? পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ আজ পেয়েছে ও কিছুটা ভাগ্যের জোরে আর বাকিটা নিজের চেষ্টায়। নিজের লক্ষ্য আর অধ্যাবসায়ের সবটুকু আজ ও কিছুতেই তো আর মাটি হতে দিতে পারে না শুধু এই প্রেম ভালোবাসার ভূতকে প্রশ্রয় দিয়ে!

ধীমান খুব গরিব ঘরের ছেলে। ক্যানিং স্টেশনের কাছাকাছি একটা ছোট গ্রামে থাকে ওরা। ওর বাবা খুব ছোট একটা ব্যবসা করতেন। সে ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে তা প্রায় বছর পাঁচেক হল। একটা বিচ্ছিরি দুর্ঘটনায় আজ থেকে পাঁচ বছর আগে বাবা দুই পা হারান। তারপর থেকেই ধীমান বুঝতে পেরেছিল অভাবের থাবা ঠিক কতটা ভয়ানক হয়। কিন্তু নিজের পড়াশুনা তবুও বন্ধ হতে দেয়নি ও। মাধ্যমিকের পর সায়েন্স নেবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু হল না। প্রাইভেট টিউশন ছাড়া সায়েন্স নিয়ে কতটা ভালো উতরাতে পারবে সে নিয়ে খুব একটা নিশ্চয়তা ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আর্টস। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট আশানুরূপ হল না। তাই বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ার স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেল। তখন ও বেছে নিল ফিলজফি অনার্স। এই বিষয়টাও ভালোই লাগত ধীমানের। টিউশন না পড়েও যথেষ্ট ভালো ভাবে পাস করেছে গ্র্যাজুয়েশনে। ফার্স্ট ক্লাস। নিজে নোট বানিয়ে পড়াশুনা করে এই সাফল্যটা পেয়েছে ও। কলেজের স্যাররা বেশ পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। তারপর এই ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন পেয়েছে ও। এখানেও নিজের গুণে স্যারদের বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে আস্তে আস্তে। ধীমান পড়াশুনায় ভালো ছেলে, এই কথাটা এখন এম এ ফার্স্ট ইয়ারের সবাই জানে। আর ও বেশ গর্বের সঙ্গে অনুভব করে এই বাহবাটা। কলকাতা সহ আরও অন্যান্য কত জায়গার তাবড় তাবড় কলেজের খুকুমণি আর খোকাবাবুরা বড় বড় ঝোলায় নম্বরের ডালি সাজিয়ে ভর্তি হয়েছে এখানে। সেসব কিছুর মাঝেও যে ধীমানের মতো সাধারণ আর অজগ্রাম থেকে উঠে আসা একটা ছেলে আলাদাভাবে নজর কেড়েছে সবার, সেটা গর্বের বৈকি! আজকাল নিজের লক্ষ্যটা যেন অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ও। অনেকটা বড় হতে হবে ওকে, পাশে দাঁড়াতে হবে নিজের জরাজির্ণ পরিবারটার। হাসতে ভুলে যাওয়া বাবা-মার মুখে হাসি ফোটাতে হবে। ও যে বাবা-মার একমাত্র সন্তান, একমাত্র অবলম্বন। যদিও নিন্দুকেরা বলছে ফিলজফি নাকি একটা মৃতপ্রায় সাবজেক্ট। না আছে স্কুলে চাকরি বেশি, না আছে অন্য কিছু। কিন্তু এসব কথায় কান দেয় না ধীমান। ও জানে নিজের লক্ষ্যে স্থির থেকে ওকে এগিয়ে যেতে হবে। কে জি স্যারের নোটগুলো লিখছিল একমনে ও। হঠাৎ আবার নাকে ঝাপটা মারল সেই গন্ধটা। কি মিষ্টি নাম না জানা ফুলের গন্ধ যেন এটা। আবার মনটা নিজের মুঠো থেকে ফস্কে গেল ধীমানের। ও দেখল নোট লেখার ডায়েরির পাতায় আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে একটা ছবি। একটা শ্যামলা মুখ, দুটো ভাসা ভাসা চোখ আর ঠোঁটের কোণে রহস্যঘেরা একটা পাতলা হাসি। চকিতে ঘাড়টা ঘুরে গেল আবার ধীমানের পিছনের বেঞ্চের দিকে। অবাক হয়ে গেল ও, এই প্রথমবার… এই প্রথমবার ধীমানের ডায়েরির পাতায় জেগে থাকা, থুড়ি মনের পাতায় জেগে থাকা চোখ দুটোকেও ওরই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখল ও। বুকের মধ্যে এক লক্ষ খরগোশ লাফিয়ে উঠল যেন। ওর ওই মেয়েকে ভালো লাগার হাজার কারণ থাকতে পারে, কিন্তু কলকাতার বড় কলেজ থেকে আসা বড়লোক বাপের আধুনিকা ওই মেয়ের কি ধীমানের মতো সাধারণ ছেলেকে ভালো লাগার কিছু মাত্র কারণও থাকতে পারে? ভুল দেখছে না তো ধীমান? চোখ রগড়ে আবার তাকাল ও। না, সে তো এখনও তাকিয়ে আছে ধীমানের দিকে। এবার ঠোঁটের কোণে পাতলা হাসি ফুটে উঠল ওই শ্যামলা মুখের মেয়েটার। নিজেকে আলতো একটা চিমটি কাটল এবার ধীমান। না, এটা স্বপ্ন নয় সত্যি।

— “প্লিজ রিনি, প্লিজ আমার সমস্যার গুরুত্বটা তুই একটু বোঝার চেষ্টা কর। তোকে তো আমি সবটাই খুলে বললাম। আর তুই আগেও তো জানতিস। আর তুই না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড! তুই আমার জন্য এই ছোট্ট হেল্পটা করতে পারবি না? আমি সত্যি নাহলে বড় বিপদে পড়ে যাব রে” — আকুতি ঝরা স্বরে কথাগুলো বৃষ্টি বলল ওর বেস্টফ্রেন্ডকে মানে রিনিকাকে।

রিনিকার মুখটা এখনও বেশ গম্ভীর। হ্যাঁ, বৃষ্টির সমস্যা পুরোটাই জানে ও, বুঝতেও পারছে, কিন্তু মন তবুও সায় দিচ্ছে না ওর কথা মানতে। তাই মুখটা গম্ভীর রেখেই বলল, “দেখ, বুঝতে সবই পারছি, কিন্তু এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজে নেওয়া যায় না। এটা কি উচিৎ?”

— “এত উচিৎ অনুচিত আমি জানি না রে। আমার সমস্যা থেকে রেহাই পাবার যে সবচেয়ে সহজ উপায়টা আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি সেটাই বলছি। না হলে তোকে তো বললামই, তুই দে আমায়” — এবার বেশ ঝাঁঝিয়ে বলল বৃষ্টি।

— “ঠিক আছে, ঠিক আছে বাবা। তুই যা বলছিস তাই করব আমি” — রিনিকা আশ্বস্ত করল বৃষ্টিকে।

বৃষ্টি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল একটা। যাক অবশেষে রাজি হল রিনি। কিন্তু তবুও পুরো নিশ্চয়তা কোথায়? ও কি পারবে সবটা ঠিকঠাক করতে? বৃষ্টির ভাবনা মতো সবটা কি আদৌ হবে? মনের মধ্যে কাঁটাটা রয়েই গেল। দেখা যাক কী হয়…

ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে বসে মন দিয়ে নোট তৈরি করছিল ধীমান। এম এ ফার্স্ট ইয়ারের শেষ প্রায় হয়েই এল দেখতে দেখতে। ফাইনাল পরীক্ষার আর মাত্র সাড়ে চার মাস বাকি। এই সময়টা খুব জরুরি। এখন এক একটা মুহূর্তও দামি। এমনিতেই আজকাল নিজের মনকে একদম ভরসা করতে পারে না ধীমান। মনটা বিগত কয়েক মাসে এত বেয়াড়াপনা করছে যে নিজের প্রতি নিজেরই ভরসা হারিয়ে গেছে। বারবার শুধু মন ছুটে যেতে চায় তারই দিকে। শেষ কয়েকমাসে এই কারণে পড়াশুনায় গাফিলতিও হয়েছে প্রচুর। কিন্তু আর না। ধীমান শক্ত যুক্তির শেকলে এবার বেঁধেছে মনকে। না, এটা হয় না। ধীমানের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জীবনে কখনও রূপকথার রাজকুমারীরা আসতে পারে না। অমন একটা মেয়েকে ভালোবাসার কল্পনা ধীমানদের জন্য অলীক রূপকথা ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। অমন সুন্দর মুখের, গাড়ি করে যাতায়াত করা উর্বশীরা মাঝে মাঝে রহস্যময় দৃষ্টি আর হাসির টুকরো বড় জোড় ধীমানদের দিকে ছুঁড়ে দিতে পারে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

তবে এটা ঠিক যে ইদানিং রিনিকা আর বৃষ্টির রহস্যটা আরও জটিল লাগছে যেন, কিন্তু তবুও ওদিকে আর মন দেবে না কিছুতেই ধীমান।

ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরুর প্রথম দিন থেকেই ভীষণ অদ্ভুত ছিল এই মেয়ে দুটো। খুব বড় কলেজ থেকে পাস করে এসেছে এরা। দুজনেই বেশ সুন্দরী, দুজনেই বড়লোক বাপের মেয়ে সেটা বোঝাই যায় কিন্তু তবুও ভীষণ রহস্যজনক ছিল ওরা। দুজনেই কারোর সঙ্গে বিশেষ মিশত না। দুজনে দুজনের মতো থাকত, ক্লাস শুরু হবার ঠিক আগে ঢুকত, আর পিছনের দিকে কোণার সীটে বসত। আবার ক্লাস শেষ হলেই উবে যেত যেন। এমনকি অফ পিরিয়ডেও ওরা কোথায় থাকত কে জানে! দেখা যেত না ওদের। কেউ নিজে থেকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেও ওরা বিরক্ত হতো। নিজেদের কলেজ থেকে আসা ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেও ওদের মিশতে দেখা যেত না তেমন। প্রথম প্রথম কয়েকটা মাস এভাবেই চলেছিল। ক্লাসের সবারই তখন ওদের নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল। কেন এমন এরা? এরা কি অসভ্য, অভদ্র, অহংকারি, নাকি অন্য কোনো রহস্যময় ব্যাপার আছে? সবার মতোই ধীমানের কৌতূহলটাও প্রথম দিকে নিছক সাধারণই ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে ছবিটা বদলাতে থাকল। কেন কে জানে ওদের মধ্যে একজনের মুখটা ধীমানের মনে যেন গেঁথে যেতে থাকল একটু একটু করে। অনেক চেষ্টাতেও সরানো যায় না সে মুখের ছবি। ইদানিং অবশ্য একটু বদলেছে ওই মেয়ে দুটোও, বা বলা ভালো একজন। রিনিকা ইদানিং অন্যদের সঙ্গেও গল্প গুজব করে টুকটাক। কিন্তু বৃষ্টির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আজও নিজের মতোই থাকে সে। কিন্তু কেন কে জানে ধীমানের দিকে মাঝেমাঝে কেমন পাগল করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা, ঠোঁটের কোণে খেলে যায় ওর রহস্যঘেরা একটা অদ্ভুত হাসি। কী যেন বলতে চায় ওই হাসির ভাষা। ধীমানের কেমন ঘোর লাগা ভাব লাগে তখন। কেন করে এমন মেয়েটা? তবে কি ও বুঝতে পেরে গেছে যে ধীমান ওর প্রতি খুব দুর্বল? আজকাল রিনিকা মাঝে মাঝে এসে ধীমানের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে টুকটাক নিজে থেকেই। কেন কে জানে! এমনিতে তো রিনিকা কোনো ছেলের সঙ্গেই বেশি কথা বলে না। তাহলে ধীমান কেন? কী চায় এরা?

না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে না ধীমান। শুধু পড়াশুনা ছাড়া আর কোনো দিকেই আর মন দেবে না ও।

— “কিরে খুব মন দিয়ে পড়ছিস?” — আচমকা মেয়েলি গলার স্বরে চমকে উঠল ধীমান। কখন যেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রিনিকা।

— “হ্যাঁ মানে ওই আর কি…” একটু থতমত খেয়ে গেল যেন ধীমান।

— “তোর সঙ্গে একটু কথা ছিল ধীমান। একটু দরকারি” — রিনিকার গলাটা কেমন যেন অন্যরকম শোনাল। ধীমানের সামনের চেয়ারটা টেনে বসল মেয়েটা।

— “হ্যাঁ বল” — একরাশ প্রশ্ন ধীমানের চোখে। বুকের ভিতর অজানা কী একটা কারণে যেন ঢিপ ঢিপ হচ্ছে।

চোখ নীচু করল রিনিকা। গলার স্বরও টেনে নামাল খাদে, “ধীমান… ধীমান, তোকে একজন ভালোবাসে রে। খুব ভালোবাসে। জানি না তুই বাসিস কিনা। তবুও তোকে জানাতে চাই তাই…”

— “এসব কী বলছিস? পাগল হয়ে গেছিস না তামাশা করছিস?” — চরম হতভম্ব হয়ে গেছে ধীমান।

— “না আমি একদম সিরিয়াস। যদি তুই রাজি থাকিস তাহলে আজ ছুটির পর ক্যান্টিনের পিছনের বড় মাঠটায় অপেক্ষা করিস” — দৌড়ে বেরিয়ে গেল রিনিকা।

যুক্তির শেকলটাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে বেয়াড়া মনটা দৌড় লাগাচ্ছে তেপান্তের মাঠে বুঝতে পারছে ধীমান। না পারছে না, ও আর পারছে না মনটাকে শক্ত শেকলে বাঁধতে। সে হারিয়ে যাচ্ছে… হারিয়ে যাচ্ছে অজানা দেশে ধীমানের মন।

মেয়েকে ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারলেন না সহেলি চৌধুরী। ইশশ! মেয়েটা কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। যদিও ঘড়িতে এখন বেলা দশটা। তবুও, থাক না। ও ঘুমাক একটু। এই তো দু-বছর এম এ নিয়ে কত খাটল। তারপর আবার রেজাল্ট নিয়েও তো কম টেনশন করল না গত কয়েকটা দিন। শেষমেশ তিন-চার দিন আগে রেজাল্ট হাতে পেয়ে একটু শান্তি পেয়েছে মেয়েটা। আবার তো ক’দিনের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে পরবর্তী পর্যায়ের পড়াশুনা নিয়ে। নাঃ, মেয়েটাকে না জাগিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন সহেলী দেবী। মেয়ের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, সে ঘুমিয়েই যাচ্ছে অকাতরে।

কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারল না রিনিকা। হঠাৎ ঝিনঝিন করে ফোন বেজে উঠল ওর। ধুর! কে এত সকালে? অচেনা নম্বর ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে। ঘুম চোখেই ফোনটা ধরল ও। জড়ানো গলায় বলল, “হ্যালো…”

— “হ্যালো রিনিকা, আমি ধীমান বলছি রে। প্লিজ ফোন কাটিস না তুই। শোন আমার কথা…”

তড়াক করে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বসল রিনি। নিমেষে চোখ থেকে উড়ে গেল ঘুম। ধীমান! কিন্তু এটা তো ওর নম্বর না। ওর নম্বরটা তো ব্লক করা আছে। ইশশ! ফোনটা রিসিভ করা হয়ে গেল। এবার তো সহ্য করতে হবে এই জঘন্য ছেলেটার ঘ্যানঘ্যনানি।

— “বল” — গম্ভীর স্বরে বলল রিনিকা।

— “রিনিকা, এসব কী হচ্ছে বল তো? বৃষ্টি কেন এমন করছে আমার সঙ্গে? ইউনিভার্সিটি শেষ হবার পর থেকেই আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিল ও। তারপর দুম করে আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। হঠাৎ একদিন বলল আমার সঙ্গে আর কোনো কথা বলতে চায় না ও। আমি যেন ওকে ভুলে যাই। এমন কেন করছে রে ও? আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি…”

— “এই ধীমান, একদম বাজে বকে বোর করবি না আমায়। তোকে তো বৃষ্টি বলেই দিয়েছে যে ও আর তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে না। তাও কেন পিছনে পড়ে রয়েছিস? লজ্জা নেই তোর?” — রুক্ষ স্বরে বলে উঠল রিনিকা।

এবার গলা চড়ে গেল ধীমানেরও। “আমার ইমোশান নিয়ে কি ইয়ার্কি মারছিস তোরা? তুই-ই তো প্রথম আমায় ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে এসে বলেছিলি যে বৃষ্টি নাকি আমায় খুব ভালোবাসে। আর সেই দিনই ছুটির পর বড় মাঠে তোর সামনেই তো বৃষ্টি শুনিয়েছিল আমাকে নিজের ভালোবাসার কথা। বল অস্বীকার করতে পারবি?”

— “হ্যাঁ তো কি?” — এবার একটু ঢোঁক গিলে বলল রিনিকা।

— “ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে তুই তো দেখেছিস রিনিকা, আমি কীভাবে ভালোবেসেছি বৃষ্টিকে। সব ভুলে শুধু ওকে ভালোবেসে গেছি। নোট বানিয়ে দেওয়া, পড়া বুঝিয়ে দেওয়া যখন যেভাবে ও বলেছে ওর পাশে থেকেছি। নিজের রেজাল্ট আজ আমার খারাপ হয়ে গেছে শুধু ওর কথা ভাবতে ভাবতে...”

— “ইডিয়ট নাকি তুই? প্রেমে পড়ে রেজাল্ট খারাপ করেছিস এই গোছের বাচ্চা বাচ্চা কথা তোর মতো ধাড়ি ছেলের মুখে মানায় না বুঝলি।”

— “আমি শুনলাম বৃষ্টির নাকি বিয়ে খুব শিগগির। ও নাকি বিয়ে করে আমেরিকা চলে যাবে, এটা কি সত্যি রিনি? প্লিজ আমায় বল। এটা আমি মেনে নিতে পারব না যে” — ভেঙ্গে পড়েছে এবার ধীমান।

— “বৃষ্টির মতো মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর কোনো যোগ্যতা আছে নাকি তোর? বৃষ্টি তোর জীবনের একটা রূপকথা ছিল এটা ভেবেই খুশি হয়ে যা বুঝলি। আর একদম বিরক্ত করবি না আমায়।”

কট করে ফোনটা কেটে দিল রিনিকা। ঝুম দিয়ে তারপর বিছানায় বসে রইল ও। উফফ! আচ্ছা ঝামেলা হল তো এই বৃষ্টিটার জন্য। অবশ্য এই দিনটা যে একদিন আসারই ছিল সেকি আর জানা ছিল না রিনিকার?

ধাঁ করে রিনিকার মনটা পৌঁছে গেল বেশ কিছু দিন আগের একটা দিনে। বৃষ্টি খুব মন খারাপ করে ছিল সেদিন। তাই রিনিকা বারবার জিজ্ঞাসা করছিল ওকে কেন ওর এত মন খারাপ?

— “রিনি আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি রে, আমি যে ম্যাডামের কাছে প্রাইভেট টিউশনি পড়ি তিনি কাল হঠাৎ মারা গেছেন।”

— “অ্যাঁ! সে কী রে? তাহলে তো তুই বেশ বড় ঝামেলায় পড়লি!”

— “হ্যাঁ সে আর বলতে। সিলেবাস অনেকটাই বাকি। গত একমাস উনিও ভালো করে পড়াতে পারেননি অসুস্থতার জন্য, তাই নোটস পাওয়াও অনেক বাকি। এদিকে ফাইনাল পরীক্ষার আর মাত্র সাড়ে চার মাস আছে। এই সময়ে, পরীক্ষা যখন প্রায় এসেই গেছে আমায় কোনো নতুন টিচার ভর্তিও নেবে না। আমি কী করি বল তো? কে দেবে আমায় বাকি সব নোটস? ক্লাসগুলোও সব করিনি ঠিক মতো। আমি যে ফেল করে যাব রে। তুই আমায় দিবি রে নোটস?”

পলকে মুখ ফ্যাকাশে রিনিকার। ওর বাবা ফিলজফির প্রফেসর। বাবাই পড়ান ওকে। নিজে প্রচুর খেটেখুটে একদম আলাদা ধরণের নোট বানান বাবা মেয়ের জন্য। সেগুলো এভাবে কাউকে কি দিয়ে নিজেকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেওয়া যায় নাকি! তাই প্রিয় বন্ধুকেও এই নোটগুলো দেওয়া যায় না।

বৃষ্টি বুঝতে পেরেছিল বোধ হয় ওর মনের কথা। তাই নিজেই বলে উঠেছিল, “না না ছাড়, তোকে দিতে হবে না। আমি অন্য একটা উপায় পেয়েছি সব সমাধানের। তুই শুধু তাতে আমায় সাহায্য কর। সে উপায়টা হল ধীমান।”

— “মানে? কী বলছিস রে?”

— “হ্যাঁ শোন, ধীমান ক্লাসের ভালো ছেলে। ভালো নোট বানায়। স্যাররাও এক কথায় স্বীকার করেন এটা। এই ধীমানকেই কাজে লাগাতে হবে এবার। ওর থেকেই নিতে হবে প্রয়োজনীয় সব নোট। আমি জানি ঐ হাঁদা গঙ্গারাম পড়াকু ছেলেটার আমার প্রতি অনেকটা দুর্বলতা আছে। আমি বুঝতে পারি। ও ঝাড়ি মারে আমায়। হাবলার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে প্রায়ই। তাই আমিও মাঝে মাঝে একটু চিলতে হাসি আর ন্যাকা চাহনি ছুঁড়ে দিয়ে হাতে রেখেছি ওকে। এবার তোকে বাকি কাজটা উদ্ধারের জন্য হেল্প করতে হবে। তুই হবি ওর আমার প্রেম প্রেম সিনেমার ডিরেক্টর। তুই ওকে গিয়ে বলবি আমি ওকে খুব ভালোবাসি। ব্যস! তারপর সব দায়িত্ব আমার।”

— “মানে? তুই ধীমানের সঙ্গে প্রেম করবি?”

— “ধুর! প্রেম কেন করব? টাইম পাস করব আর নিজের কাজটা সিদ্ধি করব। আর তারপর ইউনিভার্সিটি শেষ হবার পর ঐ ক্যাবলা মানিককে ভাগিয়ে দিতে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না।”

— “কিন্তু এটা তো ঠিক হবে না রে বৃষ্টি…”

হ্যাঁ বৃষ্টির সেই অদ্ভুত প্রস্তাবে সঙ্গ দিতে প্রথমে সেদিন রাজি ছিল না রিনিকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজি ওকে করিয়েছিল ওর বান্ধবী। আর রিনিকাও পুরো নাটকটায় বৃষ্টির কথামতো সব কাজ করেছিল। প্রথমে বৃষ্টির ভালোবাসার কথা শুনিয়ে ওকে বৃষ্টির কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল তো রিনিকাই। তারপর আস্তে আস্তে নিজের মায়া দিয়ে ধীমানকে নিজের প্রেমের জালে পুরো পাগল করে তুলেছিল বৃষ্টি। একে একে জোগাড় করেছে নানারকম নোটস। কত রকম সুবিধা যে নিয়েছে বৃষ্টি ওর থেকে তা রিনিকা বেশ ভালোই জানে। কিন্তু এই ধীমান ছেলেটা তো বড্ড বেয়াড়া। পুরো ব্যাপারটা এত সিরিয়াসলি নিয়েছিল যে এখন আর ওকে সামলানোই যাচ্ছে না। এখন ওর জন্য রিনিকাকে না কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়!

হাতে মোবাইলটা তুলে নিয়ে ঝটপট অর্জুনের নম্বরটা ডায়াল করল ও। ওকে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে রাখা দরকার। অর্জুন তো আর শুধু ওর প্রেমিক নয়, ফ্রেন্ড-ফিলজফার-গাইড সব কিছু। তাছাড়া কাকু, মানে অর্জুনের বাবা বড় পুলিশ অফিসার। অনেক ক্ষমতা ওঁর। পলিটিকাল চেনা জানাও বিস্তর। তাই গোলমাল কিছু বাধলে কাকুর হেল্প তো লাগবেই। ধীমানের মতো চুনো পুঁটিদের দরকার পড়লে একদম মুছে দেবার ক্ষমতা কাকুর আছে সেটা জানে রিনিকা। তাই কীসের আর চিন্তা ওর!

শহর জুড়ে আজ ঝমঝমে বৃষ্টি। বারিধারায় যেন ধুয়ে যাচ্ছে চারিধার। তারই মাঝে মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ডক্টর বিমল বসুর একমাত্র মেয়ে বৃষ্টির বিবাহ অনুষ্ঠান। বিয়েটা মিটলে দু-চার দিনের মধ্যেই আই আই টিয়ান ইঞ্জিনিয়ার বরের হাত ধরে আমেরিকা উড়ে যাবে বৃষ্টি। তাই রিনিকারও মনটা খারাপ একটু। কিন্তু আজকের আনন্দে কোনো ঘাটতি নেই তার জন্য। রিনিকাও দারুণ সেজেছে আজ। খুব আনন্দ করছে সে বেস্টফ্রেন্ডের বিয়েতে। অর্জুনও এসেছে রিনিকার সঙ্গে। উফফ! আজ রিনিকাকে এত সুন্দর লাগছে যে অর্জুন চোখ ফেরাতে পারছে না যেন। ওদেরও তো চার হাত এক হবার ঘণ্টা বেজেই গেছে। সবাই তো বলছেই ঠাট্টা করে, “দুই বন্ধু একসঙ্গে বসে গেলেই পারত!”

*********

আকাশভাঙা বৃষ্টি হচ্ছে আজ গ্রামটায়। আর সেই ছেলেটা সকাল থেকে বসে রয়েছে নদীর ধারটায়। কী করবে আর ফিরে! বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে, চিকিৎসার পয়সা নেই। ছেলেটা এম এ-তে খুব বাজে রেজাল্ট করেছে। মনই তো দিতে পারেনি পড়ায়। প্রেম করছিল যে। ভালোবাসা। এই চারটে শব্দই আজ ওকে নিঃস্ব করে দিয়েছে পুরোপুরি। চাকরির সব পরীক্ষাগুলোতেও ফেল! মা আজকাল চোখে দেখছে না। তাই মায়ের সেলাইয়ের কাজও পুরোপুরি বন্ধ। নাঃ, আর ভাবতে পারছে না ধীমান। সবটুকু চিন্তা শক্তি শেষ বোধহয়। কেমন যেন পাগলের মতো বিড়বিড় করে চলেছে উন্মাদের মতো নিজের মনেই অনবরত।

কড়কড় করাত করে বাজ পড়ল একটা, খুব কাছেই কোথাও। চোখধাঁধানো আলো, কান ফাটানো শব্দে চিরে গেল যেন পৃথিবী। হ্যাঁ, বাজটা ওই দিকের ওই নারকেল গাছটার মাথায় পড়েছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে গাছটা। আবার নিভেও গেল বৃষ্টির বারিধারায়।

— “বৃষ্টির, মানে খালি প্রেমের কবিতা লিখবে সব কবিরা তাই না? কেন হে কেন? বৃষ্টিতে বাজ পড়ে যে সব ঝলসে গেল সে কবিতা কে লিখবে? অ্যাঁ কে লিখবে শুনি?” — নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করছে ধীমান। অমন বিড়বিড় করতে করতেই উঠে এগিয়ে গেল ধীর পায়ে। এগিয়ে গেল নাকি পিছিয়ে গেল? কে জানে! নাকি হারিয়ে গেল অন্য কোনো অজানা ঠিকানায় নাকি ফিরে গেল জীবন সংগ্রামের অচেনা গন্তব্যে? কেউ হয়তো জানবেই না। কেই বা কার খবর রাখে এই কঠিন দুনিয়ায়! সবাই তো শুধু ছুটছে যে যার মতো এগিয়ে যাবার স্রোতে। অন্যকে হারিয়ে দিয়ে জিতে যাবার প্রতিযোগিতায় ছুটতে ব্যস্ত সবাই। এই প্রতিযোগিতাময় পৃথিবীতে ধীমানের মতো ভালোবাসার ‘ভুল’ করা, বিশ্বাস করে ‘ভুল’ করা সাধারণ ছেলেরা যে বড্ড বেমানান। তাই তো বারবার হারিয়ে যায় ধীমানরা, আর বার বার ফিরেও আসে বিশ্বাস, সরলতা, প্রেম এই শব্দগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। বৃষ্টিভেজা ঘুটঘুটে সন্ধ্যাটায় মিলেমিশে ক্রমে ক্রমে এক হয়ে যাচ্ছে এলোমেলো ধীর পায়ে চলতে থাকা ধীমানের অস্পষ্ট অবয়বটাও। অন্ধকারেই মিশে যাচ্ছে ধীরে ধীরে ওর রোগা শরীরটা। না, আর দেখা যাচ্ছে না ওকে। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে ধীমান বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার অন্ধকারের আড়ালে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%