পল্লবী সেনগুপ্ত
নতুন শাড়ি আর ফুলের গয়নায় সেজে খাটের ওপর বসেছিল কুহু। প্রতীক্ষা করছে বরের, নিজের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে সাজানো ফুলশয্যার রাতের। কিন্তু তার তো দেখাই নেই। বুকের মধ্যে হাজারো উত্তেজনা ধড়ফড় করছে ওর। একটু বড় হবার পর থেকেই মেয়েদের মনে কত স্বপ্ন তৈরি হয় নিজের বিয়ে নিয়ে, জীবনভর পাশে থাকার, অঙ্গীকার করার মানুষটাকে নিয়ে। কুহুও তো তার ব্যাতিক্রম নয়। পরস্পরকে চিনে নেওয়া, কাছে পাওয়ার আজই তো প্রথম রাত।
প্রীতমের সঙ্গে সম্বন্ধ করে বিয়েটা হয়েছে কুহুর। বিয়ের আগে একবার দেখা করেছিল ওরা। প্রীতম খুব চুপচাপ ধরণের। দেখা হবার সময়েও কথা বলেনি বেশি। আর কুহু তো পুরো কলকল করা উচ্ছল ঝরনা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ভালোই। কুহুর মতো মেয়ের সঙ্গে ভালো বক্তার থেকে ভালো শ্রোতাই মানিয়ে চলতে পারবে বেশি। সেদিন কুহু একটানা অনেক কথা বলে গেছিল। রমেনের কথা, রমেনের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার কথা। সবটুকু প্রীতমকে শুরুতেই বলে নিতে চেয়েছিল কুহু। সবটা শুনে প্রীতম শুধু বলেছিল, “বিশ্বাস করুন, আমার আপনার অতীত নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের সকলেরই হয়তো কোনো অতীত থাকে। সেই অতীতকে সম্মান করতে হয়, কিন্তু তাকে বয়ে নিয়ে বেড়ানোটা বোকামি।” সেদিনই কুহু প্রীতমের সঙ্গে নিজের ফোন নম্বর আদান-প্রদানও করেছিল। বিয়ের আগে দু-একবার কথাও হয়েছিল ফোনে। কিন্তু প্রীতম যেন সর্বদাই নিস্তরঙ্গ নদী।
প্রীতমের এই চুপচাপ থাকাটা ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসাবেই মেনে নিয়েছিল কুহু। এই নিয়ে বেশি কিছু ভেবে ব্যাপারটাকে জটিল করতে চায়নি। কিন্তু গত পরশু দিন বিয়েটা মিটে যাবার পর থেকেই বুকের মধ্যে কেমন অদ্ভুত একটা আতঙ্ক যেন ওর পাক খাচ্ছে বারবার। প্রীতম এত বেশি চুপচাপ কেন? ও এই বিয়েতে খুশি তো? বাড়ির লোকের কথায় বা অন্য কোনো কারণে নেহাত দায়ে পড়েই ও কুহুকে বিয়ে করেছে এমন নয় তো? প্রীতমের মনে অন্য কোনো মানুষের বাস নয় তো?
ভাবনাগুলো মাথায় আবার আসতেই কেঁপে উঠল ফের কুহু আর ঠিক তখনই ঘরে এসে সশব্দে দরজা বন্ধ করল প্রীতম। হাল্কা হলুদ পাঞ্জাবিতে আজ কেমন রাজপুত্র টাইপ লাগছে যেন ওকে। ছেলেটাকে দেখলেই বারবার প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করবে যে কোনো মেয়ের। আর এমন সুদর্শন ছেলের কোনো প্রেমিকা ছিল না এ তো হতেই পারে না।
ধীরে ধীরে ফুল সাজানো খাটে এসে বসল প্রীতম। মুখটা কি ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছে। কুহুর বুকের মধ্যে তোলপাড় চলছে অবাধ্য সুনামির। তবুও সেই তোলপাড় আড়াল করেই প্রীতমের মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসার চেষ্টা করল ও। প্রীতমও চোয়াল ফাঁক করল সামান্য। তারপর মুখ নামিয়ে নিয়ে বলতে চাইল কিছু কুহুকে।
— “কুহু, আজ থেকে শুরু হল আমাদের নতুন জীবনে পথ চলা। আমি জানি তোমার চোখে আমায় নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে। তাই আমি বেশি দেরি না করে আজ রাতেই তোমায় কয়েকটা কথা বলে নিতে চাই। জানি, হয়তো আগেই তোমায় এই কথাগুলো আমার বলা উচিত ছিল। কিন্তু…”
— “কী বলবে তুমি? আমায় তোমার পছন্দ হয়নি তাই না?” — প্রীতমকে মাঝ পথে থামিয়েই বলে উঠল কুহু। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ও কান্না চাপছে এবার। কিন্তু ভরসা পাচ্ছে না। বাঁধ ভেঙ্গে যে কোনো মুহূর্তেই আছড়ে পড়তে পারে কূল ভাঙ্গা প্লাবন।
— “আসলে আমি মানে… আমি অন্য একজনকে ভালোবাসতাম কুহু। খুব ভালোবাসতাম। কোনোদিন ভাবিনি তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার করব আমি। কিন্তু আমাদের ভাবনার সঙ্গে তো সবসময় ওই ওপরে থাকা লোকটার ইচ্ছাটা মেলে না। তাই সেদিন আমার সব ভালোবাসা, আকুতি আর স্বপ্ন নস্যাৎ হয়ে গেছিল। সে হঠাৎ ফিনিক্স পাখির মতো হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে। আমি পড়ে রইলাম একা, শুধু তার স্মৃতি আঁকড়ে। কিন্তু আজ…”
— “ব্যস, প্রীতম ব্যস। আমি বুঝতে পেরেছি গো। সেই তোমার আসল ভালোবাসা আমি বুঝতে পেরেছি। না, প্রীতম তুমি চিন্তা কোরো না। আমি এতটাও নির্লজ্জ নই যে জোর করে নিজের স্ত্রীয়ের অধিকার খাটিয়ে বিব্রত করব তোমাকে। তুমি তার স্মৃতি নিয়ে যেমন আছ তেমনই থাকবে। শুধু তোমায় একটাই অনুরোধ। এসব কথা তুমি আর কাউকে বোলো না। আমার বাবা সবে স্ট্রোক থেকে উঠেছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যদি জানতে পারেন তার মেয়ে একটা মিথ্যা বিয়ে নিয়ে বেঁচে আছে তাহলে উনি মরে যাবেন। প্লিজ আমার বাবাকে মরতে দিও না। আমি শুধু দূর থেকেই তোমায় ভালোবাসব, তোমার ভালো চাইব” — কুহুর দু-চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ নোনতা ধারা। লাল হয়ে গেছে ওর নাক।
প্রীতম হাঁ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছে না ঠিক কী বলবে এবার ও নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে।
হা হা হি হি করতে করতে রোজকার মতোই এগোচ্ছিল অস্মি। স্কুল ছুটির পর বান্ধবীদের সঙ্গে বাড়ি ফেরার এই রাস্তাটুকু যেন এক মুঠো অক্সিজেন ওদের সকলেরই জন্য।
ক্রিং ক্রিং শব্দ করে ছুটে এল প্রায় সাইকেলটা। তারপর হঠাৎ স্পিড কমিয়ে দিল। ওদের একদম ধার ঘেঁষে প্রায় চলে গেল সে সাইকেল। আর অস্মির ঠোঁটের কোণায় ফুটে উঠল সলজ্জ একটা মৃদু হাসি। সাইকেল আরোহীর মুগ্ধ দৃষ্টি রোজকার মতোই ভিজিয়ে দিচ্ছে অস্মিকে। উফফ! পারেও ছেলেটা। রোজ অস্মিকে শুধু একটিবার চোখের দেখা দেখার জন্য নিজের স্কুল ছুটি হলেই অস্মিদের স্কুলের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকে ও।
— “উফফ! অস্মি তোর কি ভাগ্য রে। এমন সুন্দর একটা ছেলে কিনা এভাবে তোর দিওয়ানা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তুই? এখনও ঘ্যাম দেখিয়ে যাচ্ছিস। দূর! আমি যদি পেতাম না…”
— “কী করতিস পেলে?” — একটা চরম ভালোলাগায় ধুয়ে যাচ্ছে অস্মি। সেই ভালোলাগাটুকু না লুকিয়েই প্রশ্নটা করল নূপুরকে।
— “কী আবার করব! শক্ত করে আঁচলে বেঁধে রেখে দিতাম” — গাল ফুলিয়ে বলল নূপুর।
— “বাজে বকিস না। ও মোটেই আমার জন্য আসে না। ও তো পাবলোদা। আমাদের পাড়ারই ছেলে। আমাকে ছোটবেলা থেকেই তো চেনে। তাহলে হুট করে আমার প্রেমে পড়ে গেল এমন হয় নাকি!” একটু ন্যাকা ন্যাকা করেই কথাগুলো বলল অস্মি।
আসলে ও জানে ছোটবেলা থেকেই পাবলোদা বেশ পছন্দ করে ওকে। প্রতি বছর অষ্টমীর সকালে শাড়ি পরে মণ্ডপে দাঁড়ালেই সেটা আরও ভালো করে টের পেয়ে যায় অস্মি। পাবলো ওর থেকে এক বছরের বড়। ও এখন ইলেভেন আর পাবলো টুয়েলভ। এখন একই ফিজিক্স আর অঙ্ক কোচিংয়ে পড়তে যায় ওরা, যদিও আলাদা ব্যাচ। তবুও দেখা হয়েই যায় নিয়মিত। আর তারপর থেকেই বেড়েছে পাবলোর মুগ্ধতা আরও শতগুণ যেন। হ্যাঁ, অস্মিও ওকে চোখে চোখে প্রশ্রয় দেয় বইকি।
— “শোন অস্মি, এভাবে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলিস না। অনেক হয়েছে চোখের ইশারায় প্রেম। এবার প্রেমকে বাস্তবের মাটিতে নিয়ে আয়।”
— “ইশশ!” বলেই আবার সলজ্জ হাসল অস্মি। পশ্চিম আকাশের সবটুকু লাল আবির যেন ছড়িয়ে গেল ওর দুই গালে।
পাবলোর নতুন ফেসবুক প্রোফাইলটা দেখতে দেখতে পুরোনো স্মৃতির ভিড়ে পুরোপুরি ডুবে গেছে অস্মি। কতদিনের পুরোনো কথা সব। তবুও মনে হয় এই যেন সেদিন!
অস্মির আবার মনে পড়ল সেই সরস্বতী পুজোর দিনের বিকালটা, যেদিন পাড়ার বড় জামরুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ডুবন্ত সূর্য আর গোধূলিকে সাক্ষী রেখে পাবলো ওকে বলেছিল নিজের ভালোবাসার কথা। এখনও যেন কানে স্পন্দিত হয় শব্দগুলো।
— “অস্মি জানিস তোকে না বড্ড ভালোবাসি রে। কবে থেকে বাসি জানি না। কিন্তু বিশ্বাস কর তোকে ছাড়া আর কাউকে কোনোদিন এভাবে ভালোবাসতেই পারব না।”
— “তাই? তা এতদিন তোমার ভালোবাসা দেখতে পাইনি তো? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে শুনি?” — হাসি চেপে খুব কষ্ট করে সেদিন বলেছিল অস্মি।
— “ভালোবাসা বড় দামি জিনিস রে। তাই তাকে যত্ন করে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হয়। সেটা তো সবাইকে দেখানোর বিষয় নয়। শুধু নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে তার সবটুকু উজাড় করে দিতে হয়। অস্মি, আমার সবটুকু প্রেম আমি তোর আঁচলে বেঁধে দেব বিশ্বাস কর। জানিস, আজকাল তোকে একটা দিন দেখতে না পেলেই খুব অস্থির লাগে। মনে হয় হাসি কান্না, রাগ, দুঃখ সবকটা অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে এলোপাথাড়ি ছুটছে বুকের মধ্যে।”
— “হুম। বুঝলাম।”
— “কী বুঝলি?” — অস্মির গম্ভীর মুখটা দেখে সেদিন কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছিল ছেলেটা। আর তারপর হাসি চেপে রাখতে পারেনি অস্মি। হাসতে হাসতে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। ও প্রায়ই বলত ও নাকি অস্মি ছাড়া আর কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেই পারবে না এ জীবনে? আচ্ছা, আজও কি ওর মনে আছে সেসব? পাঁচ বছর! পাঁচ বছর পর আবার আজ ফেসবুকের মাধ্যমে হলেও ওকে দেখছে অস্মি।
বিয়ের পর প্রথম তিন বছর তো ইউ এস এ-তেই ছিল ও। তখন তো অস্মির জীবন আচ্ছন্ন ছিল মিথ্যা ঘোরের নেশায়। তারপর যখন দেশে ফিরে পাকাপাকিভাবে মুম্বাইবাসী হল ওরা, ঘোর কাটতে তো শুরু করল তখন। পাগলের মতো তখন বারবার ওর ডিজিটাল প্রেজেন্স খুঁজেছে অস্মি। কিন্তু পায়নি। এমনকি লজ্জার মাথা খেয়ে ওর ফোন নম্বরও ডায়াল করেছিল। কিন্তু সে নম্বরও বদলে গেছে। মায়ের মুখে শুনেছিল ওরা নাকি ছেড়ে দিয়েছিল পুরোনো পাড়াটাও।
আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আবার ওকে খুঁজে পেয়েছে ও। না, আর ওকে কিছুতেই হারানো যাবে না। ওকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েই দিল অস্মি। দ্রুত হাতে মুঠো ফোনের স্ক্রিন ঠেলে ঠেলে ঘুরছে ওর প্রোফাইলে। হঠাৎ থমকে গেল এবার। বিয়ে! ওর বিয়ে হয়ে গেছে! এই তো একটা সিঁদুরদানের ছবি। কুহু সরকার ট্যাগ করেছে ওকে ছবিটায়। তাই দেখাচ্ছে। বুকটা মুচড়ে উঠল অস্মির। আরও খানিকক্ষণ ঘুরল ওর প্রোফাইলে। না বিয়ের বা বউয়ের সঙ্গে আর কোনো ছবি নেই। তার মানে? আদৌ কি ভালো সম্পর্ক ওর বউয়ের সঙ্গে? মনে তো হচ্ছে না। তাহলে কি আর কোনো ছবি থাকত না? ওর অন্য কত ছবি তো রয়েছে। শুধু বউয়ের সঙ্গেই কোনো ছবি নেই। অথচ আগে অস্মির সঙ্গে ছবি দিয়ে দিয়ে তো ভরিয়ে ফেলত নিজের পুরোনো ফেসবুক প্রোফাইল। আর সেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টটাও সেদিন ও ডিলিট করেছিল অস্মিরই কথায়। এক বুক কান্না চেপে সেদিন অস্মির সব কথা মেনে নিয়েছিল ছেলেটা। কিন্তু না। এবার অস্মি এসে গেছে, এবার ও সব কষ্ট মুছিয়ে দেবে পাবলোর।
না, অস্মি ভালোই বুঝতে পারছে বউয়ের সঙ্গে মোটেই এমন কিছু ভালো সম্পর্ক নেই ওর। ইশ! বউটা দেখতেও ভালো হয়নি। টিং করে নতুন নোটিফিকেশন এল একটা। ফেসবুক জানাচ্ছে প্রীতম সরকার মঞ্জুর করেছে ওর বন্ধুত্বের আবেদন মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই। মিষ্টি ভালো লাগার স্রোত কুলকুল করছে অস্মির হৃদয়ে। নাঃ, প্রীতম এখনও তার মানে দুর্বল ওর প্রতি একইভাবে। হ্যাঁ, একবার নয়, বারবার তো বলত পাবলো ওর জীবনে অস্মি হচ্ছে এক ধ্রুবতারা যার জায়গা কেউ কোনোদিন কোনোভাবেই নিতে পারবে না।
মনের মধ্যে বিচিত্র একটা দোলাচল চলছে প্রীতমের। অস্মি! এত বছর পর! তাও আবার সে কিনা নিজে থেকেই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। কিন্তু কেন? মনের মধ্যে হু হু করে করে ঢুকে পড়ছে লক্ষ লক্ষ পুরোনো স্মৃতির কোলাজ। তবে স্মৃতি পটে বেশি চকচক করা স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটা যেন আজও দুলিয়ে দিচ্ছে প্রীতমের হৃদয়।
বড় জামরুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে আছে প্রীতম। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অস্মি। গোধূলির সোঁদা বাতাসে উড়ছে ওর সাদা ওড়না।
— “তুই কী বলছিস কী অস্মি? তুই… বিয়ে… মানে?”
— “আমার সত্যি কিছু করার নেই পাবলোদা। এটা বাড়ির সকলের সিদ্ধান্ত। ছেলে বিদেশে থাকে। খুবই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কীভাবে এই সম্বন্ধটা আমি এড়াই বলো তো?”
— “শুধুই কি বাড়ির লোক? নাকি তুই নিজেও চাস? উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর বিদেশযাত্রার লোভে তুই পড়ে যাসনি তো? সেই মোহেই কি আজ আমাদের চার বছরের সমস্ত স্বপ্ন আর ভালোবাসাকে পায়ে দলে শেষ করে দিতে রাজি হয়ে গেলি?”
— “এমন স্বার্থপরের মতো কথা কী করে বলছ তুমি? আজ আমার সামনে আঁচল ভরা সুখ আর একরাশ রঙিন স্বপ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। তাও আমায় এভাবে বিভ্রান্ত করে আটকাতে চাইছ তুমি? এই তোমার ভালোবাসা? তোমার কি আছে পাবলোদা? ম্যাথ নিয়ে অনার্স পাশ করে কী এমন দিগবিজয় করে ফেলবে তুমি? বড়জোর স্কুল মাস্টারি করবে। পারবে কি তুমি আমায় বিদেশ নিয়ে যেতে? পারবে আমায় সবচেয়ে দামি গাড়িটা কিনে দিতে? কিন্তু অতুল সেটা পারবে। তাই আমার ভালো চাইলে তুমি প্লিজ আমায় আর আটকিও না। তুমি সারাজীবন আমার মনের মধ্যে থাকবে। কিন্ত বাস্তবে সুখী হতে গেলে যেটা দরকার সেটা তোমার নেই। শুধু ভালোবাসায় জীবনে সুখ আসে না।”
— “প্লিজ অস্মি, প্লিজ এভাবে আমায় নিঃস্ব করে দিয়ে চলে যাস না। আমায় কটা দিন সময় দে। আমি কথা দিচ্ছি আমি তোর জন্য দিনরাত এক করে খাটব। তোকে খুব সুখে রাখব। আমি যে তোকে বড্ড ভালোবাসি রে” — সেদিন অস্মির হাত জড়িয়ে বলেছিল প্রীতম।
সেই মুহূর্তে দু-চোখ ছলছল করেছিল অস্মিরও। তবুও নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল সে, “তুমি ভালো থেকো পাবলোদা। আর পারলে আমায় ভুলে যেও। তোমার কাছে একটাই অনুরোধ। রিসেন্টলি যে ফেসবুক প্রোফাইলটা বানিয়েছ সেখান থেকে আমার ছবিগুলো সরিয়ে দিও। নয়তো ওই প্রোফাইলটাই মুছে দিও। আমার এই শেষ চাওয়াটুকু প্লিজ রেখো” — বলেই সেদিন একছুটে চলে গেছিল অস্মি।
প্রীতম অস্মির শেষ চাওয়াটা মিটিয়েছিল আর দূর থেকেই দেখেছিল ঝলমলে আলোতে সেজে ওঠা অস্মিদের বাড়িটা। ওর বিয়ের সানাইয়ের সুরের প্রতিটা বিন্দু প্রীতমের হৃৎপিণ্ডটাকে রক্তাক্ত করেছিল সেদিন। তবুও অস্মি চলে গেছিল। নতুন বরের হাত ধরে পাড়ি দিয়েছিল বিদেশ।
কেটে গেছে পাঁচটা বছর। অনেক কিছুই বদলে গেছে আহ্নিক আর বার্ষিক গতি মেনে এগিয়ে চলা পৃথিবীটার বুকে। কিন্তু প্রীতমের মনে আজও বেঁচে আছে অস্মির স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিকেই আজ উসকে দিল ভীষণভাবে এই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট। এই ক’বছর প্রীতমের কোনো ডিজিটাল উপস্থিতি প্রায় ছিলই না। ইদানিং এই নতুন ফেসবুক বানানো কয়েকটা বন্ধুর কথাতেই। কিন্তু তা বলে এভাবে অস্মি আছড়ে পড়বে আবার, এমনটা তো স্বপ্নেও ভাবেনি প্রীতম। এত বছরে অস্মির কোনো খবরই তো পায়নি ও। বা হয়তো পেতেও চায়নি।
মনটা হু হু করে দুলছে প্রীতমের। এত বছর পর অস্মি কেন খুঁজল ওকে? কী চায় ও? কোথায় আছে এখন ও? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই রিকুয়েস্টটা নিয়ে নিল প্রীতম। অদ্ভুত একটা অনুভুতি হচ্ছে ওর মনে। না, ও জানে না কী নাম এই হঠাৎ মনে জেগে ওঠা অচেনা অনুভূতিটার।
মনের মধ্যে সত্যি সাত রঙের রামধনু আজ খেলছে অস্মির। আবার ও ফিরে পেয়েছে প্রীতমকে, নিজের হারানো প্রেমিককে। পরপর তিন দিন চ্যাট হয়েছে প্রীতমের সঙ্গে। ও এখন একটা নাম করা স্কুলে পড়ায়। তবে আগের থেকে বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে। আজকাল ও বলে কম শোনে বেশি। তবে ও অস্মিকে বিশেষ কিছু প্রশ্নই করেনি ব্যক্তিগত ব্যাপারে। অস্মিও বলেনি। অবশ্য কীই বা বলত।
বিয়ের পরপর তো বিদেশে দারুণ কাটছিল ওর জীবন। কিন্তু সেই সুখটা যে আসলে বেবাক একটা ধোঁকা সেটা কি আর ও জানত! বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যেই অস্মি আবিষ্কার করল অতুল একজন চরিত্রহীন পুরুষ। একাধিক নারীসঙ্গ করে সে। আস্তে আস্তে অস্মি ওর জীবনে একটা আসবাবে পরিণত হল। এমনকি বিদেশ ছেড়ে দেশে ফেরার পরও বদলাল না কিছুই। দিন দিন অতুল যেন আরও বেশি নোংরা মানুষে পরিণত হচ্ছে। অস্মির সঙ্গে আজকাল ওর সারা সপ্তাহে দশটার বেশি কথাও হয় না। অস্মিও আগে অনেক চেষ্টা করেছে অতুলকে সৎ পথে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। ও বুঝে গেছে সত্যি কিছু হবার নেই আর ওদের মাঝে।
অস্মি এখন অতুলের জীবনে শুধুই স্ত্রী নামের একটা রাবার ষ্ট্যাম্প। আর অতুল অস্মির কাছে নিজের বিলাসপূর্ণ জীবনটা চালিয়ে যাবার মেশিন। না, সত্যি জানা নেই কী এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। হয়তো ভেঙেই যাবে এই বিয়ে। না, আর ওসব নিয়ে ভাবে না অস্মি। ভালোবাসাশূন্য এই নিঃস্ব জীবনটায় হাঁপিয়ে উঠেছে ও। তাই গত এক বছর ধরে পাগলের মতো ও খুঁজেছিল প্রীতমকে। ওর যে ভীষণ প্রয়োজন প্রীতমের সেই পাগলপারা ভালোবাসা, যেটা কোটি টাকা দিলেও কেনা যায় না। না, আজ আর চ্যাট নয়। আজ ও ফোনই করবে প্রীতমকে। ফোনেই জানাবে কেন এত বছর পর আবার প্রীতমকে খুঁজে নিয়েছে ও। আগেরদিনই চ্যাটের সময় ও চেয়েছিল নম্বরটা।
জলদি হাতে নম্বরটা ডায়াল করল অস্মি। আজ রবিবার। তার মানে নিশ্চয় ওর স্কুল ছুটি। রিং হচ্ছে ওপারে। আর দামামা বাজছে অস্মির বুকের ভেতর।
— “হ্যালো” — ওপারে সরব প্রীতমের গলা। বুকের মধ্যে যেন জলতরঙ্গ বাজছে অস্মির। এত বছর পর আবার আজ ও শুনছে সেই গলা!
— “পাবলোদা, আমি অস্মি।”
দু-সেকেন্ড নীরব হল ও প্রান্ত। তারপর এল একটা শব্দ।
— “বল।”
না, কোনো ভণিতা করতে ইচ্ছে করছে না অস্মির।
— “পাবলোদা লাস্ট কয়দিনে আমাদের চ্যাটে বেশ কিছু কথা হয়েছে। কিন্তু তুমি জানতে চাওনি আমি কেমন আছি? তাই আমি আজ নিজে থেকেই তোমায় জানাতে চাই পাবলোদা। আমি ভালো নেই। আমি খুব খারাপ আছি। এই অতুল লোকটা একজন স্বার্থপর আর নোংরা মানুষ। ভালোবাসা কাকে বলে ও জানেই না। তাই…”
— “ভালোবাসা কাকে বলে তুই জানিস?” — ওকে মাঝপথে থামিয়েই বলল প্রীতম।
— “না আমিও বুঝতাম না সত্যিকারের ভালোবাসা কী? কিন্তু তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি। তাই তো তোমায় বড্ড মিস করি আজকাল। আমি সত্যি তোমাকে আবার ফিরে পেতে চাই আর তোমাকেও ফিরিয়ে দিতে চাই সেই ভালোবাসা যা একান্তভাবেই শুধু তোমার। আমি জানি তুমিও আমায় ভুলতে পারোনি। তাই না?” — গলায় প্রায় এক বালতি আবেগ মিশিয়ে দিল অস্মি।
— “আমি বিবাহিত অস্মি। কুহু আমার স্ত্রী। তাকে বিনা দোষে আমি ছেড়ে দেব? এটাই কি তুই বলছিস?”
— “না পাবলো দা। ও থাক না। অতুল যেমন আছে আমার জীবনে তেমনি সেও থাক। আমি আর তুমি শুধু আমাদের মতো করে খুঁজে নেব আমাদের পুরোনো ভালোবাসার গন্ধটা।”
— “না অস্মি। সেটা হয় না। এটা তোর বিদেশ নয়।”
— “বিদেশ নয় তো কী? ভারতবর্ষও অনেক আধুনিক হয়েছে এখন। সমাজ পালটেছে, দিনকাল বদলেছে। তাই এখন প্রতিটা মানুষের অধিকার আছে নিজের মতো করে বাঁচার। নিজের ইচ্ছেতে বাঁচার। তাছাড়া কুহুর সঙ্গে তোমার সম্পর্কও যে তেমন ভালো নয় সে আমি জানি পাবলোদা।”
— “কে বলেছে তোকে এসব?”
— “আমি জানি। সেইজন্যই তো তোমার ফেসবুকে ওর কোনো ছবিই নেই। আর…”
— “অস্মি তুই হয়তো ভুলে গেছিস যে আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসাটা খুবই ব্যক্তিগত। সেটা সবার সামনে জাহির করার বিষয় নয়। ঠিক এই কারণেই আমার আর কুহুর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর ছবি আমি পাবলিক করি না। কুহু আমার স্ত্রী অস্মি। ও আমার বর্তমান। তুই আমার অতীত। তুই চিরকাল খুব সুন্দর স্মৃতি হয়ে আমার মনে থেকে যাবি। কিন্তু বাস্তব জীবনে সুখে বেঁচে থাকতে গেলে একজন এমন মানুষকে দরকার হয়, যে সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে। কুহু আমার জীবনে তেমনই একজন রে” — ইস্পাত কঠিন স্বর এবার প্রীতমের।
— “পাবলোদা!” — গলা কাঁপছে এবার অস্মির, “আমারই বলা কথাগুলো আজ অন্যভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছ আমায়? এত নিষ্ঠুর তুমি? কুহুর মতো একটা অতি সাধারণ মেয়ের জন্য তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ? তুমি না বলতে তুমি আমায় ভালোবাসো? সবসময় আমার ভালো চাও?”
— “আমি আজও তোর ভালো চাই। তুই ভালো থাকিস অস্মি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোর জীবনের সব সমস্যা দূর হোক। শুধু তোকে একটাই অনুরোধ। আমায় আর কোনোদিন ফোন করিস না। আর পারলে আমায় ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে মুছে দিস। নাহলে বাধ্য হয়ে এই অপ্রিয় কাজটা আমাকেই করতে হবে” — কট করে ফোন কেটে দিল প্রীতম। ভাগ্যিস কুহু দর্জির দোকান থেকে ফেরেনি এখনও। অস্মির সঙ্গে কথা বলাটা দেখতে পেলে নিশ্চয় ভালো লাগত না ওর। নিজেকে খুব হালকা লাগছে প্রীতমের। হঠাৎ করে অস্মির ফিরে আসাটা কেমন যেন টলোমলো করে দিয়েছিল ওর মনের দুষ্টু শেকড়গুলোকে। কিন্তু ফাইনালি ও পেরেছে। নিজের বেয়াড়া গতিতে চলতে চাওয়া মনটাকে শক্ত হাতে দমন করে নিজের মান আর হুঁশকে কাজে লাগিয়ে ঠিক পথে মনকে চালিত করতে পেরেছে। অস্মির মতো অতীতের মোহময় দমকা হাওয়ারা শুধু এলোমেলো করতে জানে, ঘর বাঁধতে জানে না। নিজের হাতে তুলে নিয়ে একদৃষ্টে অপলক দেখছে প্রীতম টিভি সেটের ওপর রাখা ওর আর কুহুর বাঁধানো ছবিটা। হানিমুনের সময় পুরীতে তোলা হয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝেও শক্ত করে ওর হাত ধরে আছে কুহু।
বিছানার ওপর ধপ করে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে অস্মি। প্রীতম ওকে ফিরিয়ে দিল! তার মানে আর পাবলোদা ভালোবাসে না ওকে। আজ যে অস্মি সত্যি কাঙাল হয়ে গেল। অনেক টাকাপয়সা হয়তো আছে ওর আজ, কিন্তু তবুও যে আজ ও নিঃস্ব। অথচ কুহু বলে ওই বোকা বোকা মুখশ্রীর মেয়েটা! স্কুলমাস্টার বর আর অতি ছাপোষা জীবন নিয়েও আজ ও সম্পূর্ণ। ওর জীবনে যে ভালোবাসার অমূল্য ছোঁয়া আছে, যে ছোঁয়া অস্মি নিজে হাতে একদিন ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল শুধু অর্থ আর প্রাচুর্যের লোভে। নাঃ বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আজ শূন্য দু-হাত ছাড়া সঞ্চয়ের ঝুলিতে আর কিছুই নেই অস্মির।
আজ দুপুরটায় সবকিছু অনেকটা বেশি সুন্দর লাগছে যেন কুহুর চোখে। দুপুরের রোদ্দুরটা যেন আরও বেশি সোনালি লাগছে, বাতাসের একটা অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ যেন আছড়ে পড়ছে ওর নাকে। এমনকি জানলার পাশের কার্নিশে বসে গলা সাধতে থাকা কাকটার কা কা রবটাও যেন অন্যদিনের মতো বিরক্তিকর লাগছে না।
গুনগুন করে গান ভাঁজতে ভাঁজতেই রান্নায় মন দিল কুহু। ভাগ্যিস দর্জির দোকান থেকে ব্লাউজ ডেলিভারি নিয়ে একটু আগেই ফিরে এসেছিল ও। ঘরে ঢোকার মুখেই আজ থমকে গেছিল ও। না, প্রীতম দেখতেই পায়নি ওকে। ফোনে কথা বলতেই ব্যস্ত ছিল ও। অস্মি! হ্যাঁ কথার ধরণ শুনেই বুঝে গেছিল কুহু যে প্রীতম অস্মির সঙ্গেই কথা বলছে। বুকের মধ্যে রক্ত ঝরতে শুরু করেছিল কুহুর। কবে প্রীতমের জীবনে ফিরে এল অস্মি? ও কিছু টের পায়নি তো। অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে পুরো কথোপকথনটাই শুনেছিল কুহু। আর সবটা শোনার পর থেকেই বুকের মধ্যে যেন লক্ষ প্রজাপতির ডানার স্পর্শ অনুভব করছে ও।
বছর দেড়েক আগে নিজের ফুলশয্যার রাতে যেদিন প্রথম প্রীতমের মুখে অস্মির কথা শুনেছিল কুহু, সেদিন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল ও সদ্য পরিচিত মানুষটার সামনেই। প্রীতম সেদিন শক্ত হাতে মুছিয়ে দিয়েছিল ওর চোখের জল। বলেছিল, “অস্মি আমার অতীত কুহু আর তুমি আমার ভবিষ্যৎ। অতীত আর ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই একত্রে মিলেমিশে না যায় তাই আজ এই কথাগুলো তোমায় বলে নিলাম। তুমি অস্মিকে নিয়ে কোনোদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগো না। আমি খুব ভালো করে জানি অতীতকে বর্তমান আর ভবিষ্যতের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলতে” — প্রীতমের ভরসার হাত চেপে সেদিন শুরু হয়েছিল ওদের দাম্পত্য জীবন। খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছিল সব কিছু। কিন্তু তবুও কুহুর মনে সর্বদাই খচখচ করত একটা কাঁটা। সত্যি কি ওকে মন থেকে পুরোপুরি মেনেছে প্রীতম? সত্যি কি অস্মিকে ভুলতে পেরেছে ও? আচ্ছা যদি অস্মি কোনোদিন আবার ফিরে আসে? কী হবে তাহলে? মুহূর্তের মাঝেই কি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে ওর সাজানো সংসারটা? নিমেষেই কি পর হয়ে যাবে সেই মানুষটা যাকে হৃদয় নিংড়ে দেড় বছর ধরে ভালোবেসেছে ও? ধীরে ধীরে এই ভয়টাই গ্রাস করে ফেলছিল ওকে। রাতের ঘুম, দিনের শান্তি সব কেড়ে নিচ্ছিল। ফেসবুকে অস্মিকে লুকিয়ে লুকিয়ে একদিন দেখেছিল কুহু। ঝকঝকে স্মার্ট, সেক্সি আর প্রকৃত আধুনিকা সুন্দরী অস্মি। কুহুর সঙ্গে একেবারেই কোনো তুলনা হয় না। ওকে দেখে আরও মনটা ভেঙে গেছিল কুহুর। না, এ হেন মায়াবিনী যদি আবার ফিরে আসে তাহলে হয়তো সত্যি কুহু আর পারবে না নিজের মানুষটাকে বেঁধে রাখতে। ভালোবাসতে পারা ছাড়া আর যে কুহুর কোনো যোগ্যতাই নেই।
কিন্তু আজ কুহু পেরেছে। শুধু নিজের ভালোবাসার জোরেই নিজের মানুষটাকে বেঁধে নিতে পেরেছে ও সংসারের বাঁধনে। নোবেল জয়ের থেকে এ পাওনা কোনো অংশে যে কম নয়। আজ আবার একবার প্রমাণ করে দিয়েছেন ঈশ্বর সমাজ যতই আধুনিক হয়ে যাক না কেন ভালোবাসার বন্ধন চিরন্তন। শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট বাঁচিয়ে রাখতে নারী-পুরুষের চিরন্তন দাম্পত্য সেতু।
— “কী হল কুহু, রবিবারের দুপুরের চা দিলে না? বেলা দেড়টা বেজে গেল তো!” — বাথরুমে যাবার আগে প্রতি রবিবারের মতোই হাঁক দিল প্রীতম।
— “হ্যাঁ গো দিচ্ছি। আর সঙ্গে বেগুনিও পাবে আজ বুঝলে…”
— “উফফ! কী ব্যাপার গিন্নী আজ এত সদয় যে?” — রান্নাঘরে এসে এবার জোরে বউয়ের নাক নেড়ে দিল প্রীতম।
— “তবে রে পাজি…” খিলখিল হেসে বরের বুকে মুখ গুঁজে দিল কুহু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন