বেরঙিন রঙ

পল্লবী সেনগুপ্ত

বৃষ্টিটা বেশ বাড়ছে বাইরে।

— “শুভ দিনে বৃষ্টি হয় দিদিভাই...” ঠাকুমার মুখে অনেকবার শোনা কথাটা আজ আবার এখন মনে পড়ল পরমার। এই কথাটা চরম উলটো ভাবে বারবার সত্যি হয়েছে পরমার জীবনে। তবে আজ? আজ কী দিন? ছত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে হবার দিনটাকে কি শুভ দিন বলে? হ্যাঁ, আজ বিয়ে পরমার। আর কয়েক ঘণ্টা পর। কিন্তু বাড়িতে বিয়ে বাড়ি সুলভ কোনো জৌলুশ নেই। কারণ আর সবার মতো করে এই বিয়েটা হচ্ছে না। কিছু কাছের লোকজন এসেছেন বাড়িতে, তাদের উপস্থিতিতে রেজিস্ট্রি হবে। এর বেশি কিছু না পরমা চেয়েছিল, না ওর হবু বর। ওদের বাড়ির লোকরাও মেনে নিয়েছিল ওদের ইচ্ছেটা।

— “দিদিভাই, তোমায় একটু সাজিয়ে দিতে বলল মামি, তিনটে বেজে গেল তো। পাঁচটার মধ্যেই তো এসে যাবে বর আর বরযাত্রী, আর তারপর ম্যারেজ রেজিস্টারও” — একটু সঙ্কুচিত হয়েই কথাগুলো বলল রিয়া।

মনটা ভারাক্রান্ত থাকলেও হাসি পেল পরমার কথাগুলো শুনে। বর, বরযাত্রী শব্দগুলো কি কোনোভাবেই মানানসই আজকের এই বিয়েটার জন্য? আর মা কেন পাঠাল ওকে? মা কি ভাবছে পরমা সেজেগুজে মাথায় মালা লাগিয়ে বরের দিকে লজ্জা লজ্জা করে তাকিয়ে পোজ দেবে ছবির জন্য?

— “তুই চলে যা, আমি তৈরি হয়ে যাব ঠিক সময়ে।”

— “কিন্তু মামি বলছিল—”

— “দরকার হবে না বললাম তো” — পরমার কঠিন স্বরে এবার চলে গেল রিয়া।

একটু খারাপ লাগল পরমার। বেচারির তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু কিই বা করবে পরমা? আর কত আপস করবে ও? বিয়ে নিয়ে তো ওরও অনেক স্বপ্ন ছিল আর সব মেয়ের মতোই। কিন্তু সেগুলো তো দশ বছর আগেই সব ছাই হয়ে গেছিল রোহিতের চিতার সঙ্গে। এই দশ বছর তো শুধু নিজের স্কুলের চাকরি আর বাড়ি এই নিয়েই ডুবে ছিল পরমা। এভাবেই বাকি জীবনটাও কাটানোর তো কথাই ছিল ওর। কিন্তু বাবা মায়ের জন্যই নিজের সিদ্ধান্ত বদলে আজ ওকে মেনে নিতে হয়েছে আজকের দিনটা।

কী লাভ এই বিয়েটা করে? ও তো আর ভালোবাসতে পারবে না রোহিত ছাড়া কাউকে এ জীবনে। আর ওর হবু বরও যে ভালোবাসা শব্দটাকে ঘৃণা করে সেটা তো জানিয়েই দিয়েছিল দেখা করার সময়।

রোহিত মারা যাবার পরের এই দশ বছরে ওকে আরও বেশি করে ভালোবেসে ফেলেছে পরমা। রোহিত সেই মানুষ যে পরমাকে শিখিয়েছিল ভালোবাসার মানে কী। জীবনের ভালো খারাপ সবরকম সময়ে পাশে থাকা, শক্ত করে হাত ধরে রাখা আর নিজের সবটুকু দিয়ে কাছের মানুষটার খেয়াল রাখার নামই যে ভালোবাসা সেটা রোহিতই বুঝিয়েছিল ওকে। আর পরমাও যে কখন রোহিতকে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশিয়ে ফেলেছিল তা ও নিজেই বোধহয় বুঝতে পারেনি। শুধু পরমা একা নয়, ওর মা-বাবা-দাদা সকলেই জানত রোহিত ছাড়া পরমা একদম অসম্পূর্ণ। অথচ ভাবা যায়, প্রথম দিকে দাদাভাইয়ের এই বেস্টফ্রেন্ডটাকে কোনোদিনই আলাদাভাবে দেখেনি ও। ও বরাবরই খুব সহজ সরল। বাকি বন্ধুদের মতো প্রেম, বয়ফ্রেন্ড কোনোদিনই সেভাবে টানত না ওকে। পড়াশুনা, গান-বাজনা এসবই ছিল ওর জীবন। রোহিত ওর প্রতি একটু দুর্বল এটা বুঝলেও সে নিয়ে খুব একটা কোনোদিনই মাথা ঘামায়নি পরমা।

বাবা-মায়ের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করবে, এটাই ছিল ওর ইচ্ছা। কিন্তু মন যে কখন কোথায় হারায় তা আর কে জানে! ঢং ঢং করে বেজে উঠল দেওয়াল ঘড়িটা। চারটে বেজে গেল। ঘোর কাটিয়ে শরীরটাকে দাঁড় করালো পরমা। যা হোক একটু তৈরি তো হতেই হবে এবার।

হি হি করে হাসছিল দীপা নিজেরই বলা একটা জোকস্‌-এ। আর তার সঙ্গে সুনয়না আর শম্পাও। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আর তাই আরও বেশি ভিড় হয়ে গেছে কফি হাউসের ভিতরটা। সিগারেটের ধোঁয়া, কফির উগ্র গন্ধ সবকিছু মিলিয়ে কেমন যেন একটা ঘোর লাগা পরিবেশ তৈরি হয়ে রয়েছে। তিন-চার মাস হল পরমার কলেজ জীবন শুরু হয়েছে। শহর তথা রাজ্যের অন্যতম সেরা কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে ও। তবে এখানকার বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ওর মতো নয়। ও এদের অনুপাতে একটু বেশিই সাদামাটা। তবে ওর ডিপার্টমেন্টের এই কয়েকটা মেয়ে তাও একটু ভালো। তাই ওদের সঙ্গে পরমার বন্ধুত্ব হয়েছে খানিকটা।

— “কিরে তুই ভ্যাবলার মতো কী দেখছিস ওদিকে?” — এক খোঁচা মারল দীপা পরমাকে।

— “না মানে ওই ছেলেটাকে দেখ, যার কথা বলেছিলাম...” বোকার মতো বলে ফেলল পরমা।

— “কে সুগতদা? হ্যাঁ, দেখেছি তো। ও তো আমাদের কলেজেই পড়ে। ইংরেজি বিভাগে। মিস্টার গুরুগম্ভীর। কখনও ক্যান্টিনে যায় না বা বাইরে বসে আড্ডাও মারে না। শুধু ক্লাস করে আর আর্টস লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনা করে” — কথাগুলো প্রায় এক দমে বলে গেল সুনয়না।

— “তুই এত কথা জানলি কীভাবে?” — অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল পরমা।

— “আরে আমার এই মিষ্টি বন্ধুটা যার প্রতি মন হারিয়েছে তার একটু খবর নিতে হবে বই কি!” — হেসে পরমার গাল টিপে দিল সুনয়না।

— “ধ্যাত! তুই না...” লজ্জা পেয়ে হাসল ও। সুগত বসে রয়েছে ওদের একটু দূরেই। সঙ্গে কয়েকটা ছেলে। আজও ওর পরনে সেই হাল্কা হলুদ পাঞ্জাবি আর নেভি ব্লু জিন্স, সেই প্রথম দিনের মতোই। আর চোখের দৃষ্টিতেও সেই পাগল করা মায়াবী নিষ্পাপ চাহনি। সুগতকে এর আগে কলেজ চত্বরে চার-পাঁচ বার মোটে দেখেছে পরমা। কিন্তু এত কিছু জানত না। বোধহয় খুব একটা সবার সঙ্গে মেশে না ছেলেটা। তাই ওকে দেখাও যায় কম। প্রথম যেদিন ওকে পরমা দেখে সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল বেশ। হাল্কা হলুদ পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা রাস্তা পার হচ্ছিল ছাতা নিয়ে ধীর পায়ে। হঠাৎ ওর চোখে চোখ পড়েছিল পরমার। কি অদ্ভুত মায়াবি আর নিষ্পাপ একটা দৃষ্টি ছেলেটার চোখে। হাল্কা দাড়ি আর নীল চোখের ছেলেটার চাহনিটা ভীষণ অন্যরকম, এরকম আগে কক্ষনও দেখেনি পরমা। চুম্বকের মতো আটকে গেছিল ওর মন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওর শরীরের সঙ্গে মনকেও। ছেলেটা চোখের সামনে থেকে সরে যাবার পরও দেখতে ইচ্ছা করছিল ওকে। মনে হচ্ছিল সারা জীবন ওকে দেখতে থাকলেও বোধহয় ক্লান্ত হবে না পরমার চোখ দুটো।

তিন মাস পর

সুনয়না একদম ঠিক খবর দিয়েছিল। সুগতদা রোজ দুপুরে আর্টস লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করে। তাই পরমারও এখন রোজ দুপুরের ঠিকানা আর্টস লাইব্রেরি। ক্লাস থাক বা না থাক এই সময়টা ও অন্য কোথাও থাকতে পারবে না। আজ তিন-চার মাস হল এটাই চলছে। সুগতদার সঙ্গে আলাপও হয়েছে। তবে কথা খুব কম বলে ছেলেটা। পড়াশুনাতে ও বেশ ভালো, সেটা জেনেছে পরমা। ওকে যত দেখছে তত পরমা বুঝতে পারছে যে ও আর সবার থেকে সত্যি খুব আলাদা। ভালোবাসা, বিশ্বাস, সততা এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে হৃদয় নিঙড়ে শ্রদ্ধা করে ও। পরমাকে পাগল করে দিয়েছে ওর চোখ দুটো। কি ভীষণ মায়াবী আর নিষ্পাপ দৃষ্টি! অদ্ভুত একটা প্রশান্তি আছে ওর মধ্যে। দেখলেই যেন মন ভালো হয়ে যায়। তবে ভীষণ ভয় পায় পরমা। সুগতদা ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। কলেজের মেয়াদ শেষ হতে আর খুব বেশি বাকি নেই ওর। কী হবে এর পর? কীভাবে দেখা হবে? হ্যাঁ ফোন নম্বর হয়তো আছে ঠিকই, কিন্তু আপাত গম্ভীর এই ছেলেটার সঙ্গে পরমা তো অতটাও গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারেনি এর মধ্যে যাতে নিয়মিত ফোন করে কথা বলা যেতে পারে। সুনয়না, দীপারা ওকে বহুবার বলেছে সুগতদাকে বলে দিতে মনের কথাটা। কিন্তু পারছে না পরমা। পরমা বাকি মেয়েদের মতো অত বলিয়ে কইয়ে আর স্মার্ট নয়, তাই তো মোবাইল নম্বর থাকলেও এতদিনে একবারও সাহস করে ফোন করে উঠতেই পারেনি ওকে। কে জানে যদি রেগে যায় সুগতদা! যদি আর কথা না বলে পরমার সঙ্গে! তাহলে ও যে কেঁদে কেঁদে পাগল হয়ে যাবে। পরমা ভীষণভাবে প্রেমে পড়েছে সুগতর। যে মেয়েটা প্রেম নিয়ে কোনোদিন ভাবেইনি সেই আজ একটা ছেলের প্রেমে পাগল হয়ে গেছে। সত্যি মানুষের মনের মতো খামখেয়ালি জিনিস বোধহয় আর কিছুই নেই।

‘তবু গভীর রাতের অগভীর সিনেমায়, যদি প্রেম চায় নাটুকে বিদায়,

আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি আবার দেখি, চোখ ভিজে যায় কান্নায়...’

রূপমদা’র ব্যান্ডের এই রক গানটা পাড়া কাঁপিয়ে গুমগুম করে বাজছিল পরমার অন্ধকার ঘরটায়। আসলে কান্নার শব্দ লুকাতে এই ব্যবস্থা। হ্যাঁ, কাঁদছে পরমা। অন্ধকার ঘরটায় বালিশে মুখ গুঁজে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে ও। কোনোভাবেই সামলাতে পারছে না নিজেকে। অথচ আজকে সকালেও কিন্তু পরমা জানত না যে কী হতে চলেছে ওর সঙ্গে। আর সব দিনগুলোর মতো করেই শুরু হয়েছিল আজকের দিনটা। একটা মেঘলা মেঘলা দিন। বৃষ্টিও পড়ছিল মাঝে মাঝে টুপটাপ। রোজকার মতোই কলেজ গেছিল পরমা। কিন্তু গিয়ে দেখে কোনো ক্লাস হবে না আজ। কীসব রাজনৈতিক ঝামেলার কারণে আজ ইউনিয়ন থেকে ফতোয়া জারি হয়েছে সব ক্লাস বন্ধ রাখার। অবশ্য এটা এখানকার খুব কমন ব্যাপার। প্রায়ই এমনটা হয়ে থাকে। এমন দিনগুলোতে বেশ মজাই লাগে পরমার। সারাদিনটা কমন রুম বা ক্যান্টিনে বসে আড্ডায়-মজায় দিব্যি কেটে যায়। আজও সেরকমই কিছু একটা ভাবছিল ও। কিন্তু বাধ সাধল দীপা। ও বলল, “ধুর! কমন রুম বা ক্যান্টিনের আড্ডা একদম বোরিং হয়ে গেছে। চল আজ বরং কোথাও থেকে একটু বেড়িয়ে আসি। খুব মজা হবে। ক্লাস তো আর হবে না। চল আজ ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল ঘুরে আসি।” পরমার প্রস্তাবটা তেমন পছন্দ না হলেও সুনয়না, শম্পা, কঙ্কনারা হৈ হৈ করে উঠল এটা শুনে। আর যেমন ভাবা তেমন কাজ। সবাই মিলে ওরা পৌঁছে গেল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

নিজেদের মধ্যে নানারকম ঠাট্টা তামাশা করতে করতে ভিক্টোরিয়ার সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর দিয়ে হাঁটছিল ওরা। আর মাঝে মাঝে ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর শিরশিরে হাওয়া ছুঁয়ে দিচ্ছিল ওদের। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি। অনেকেই আবার ঝোপঝাড়ের আড়ালে বেশ ঘনিষ্ঠ পোজে। সেই নিয়েই বিভিন্ন ইয়ার্কি করে চলেছে দীপা, আর বাকিরাও হেসে চলেছে অবিরাম। পরমাও হাসছিল। কিন্তু মন লাগছিল না ওর। আসলে ইদানিং মনটা একদম ভালো নেই। সুগতরা কলেজ আসছে না বেশ কিছু দিন হল। আসলে ওদের তো টেস্ট পরীক্ষাও হয়ে গেছে। তাই নিয়মিত এখন যে আর আসবে না সেটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু পরমা যে আর পারছে না। প্রায় দু-সপ্তাহ হয়ে গেল দেখা হয়নি। কেমন একটা ঘোর লাগা ভাব নিয়ে হাঁটছিল পরমা। হঠাৎই চমক ভাঙল একটা কর্কশ শব্দে। খুব বিচ্ছিরি শব্দ করে একটা প্লেন যাচ্ছে একটু নীচু আকাশ দিয়েই। চমক ভাঙতেই পা দুটো কেমন অবশ হয়ে এল ওর। শিরদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেল একটা হিমেল স্রোত। একটু দূরের ঝোপের পাশের ছেলেটা সুগত না? হ্যাঁ, ও-ই তো। খুব ঘনিষ্ঠভাবে বসে রয়েছে একটা মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটার মাথা সুগতর কাঁধে। আর মেয়েটার একটা হাত শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে সুগত। দৃশ্যটা বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল মারল ওর চোখে। মাথা ঘুরে গেল পরমার, চোখের সামনে দুলে উঠল গোটা পৃথিবীটা। পড়েই যেত ও সেই মুহূর্তে, কিন্তু ঠিক তখনই ওকে ধরে নিল সুনয়না। ততক্ষণে দৃশ্যটার সাক্ষী হয়েছে ওরাও।

কোনোরকমে বাড়ি ফিরে এসেছে ও। কিন্তু পারছে না, কোনোভাবেই সামলাতে পারছে না নিজেকে। খট করে অন্ধকার ঘরটায় আলো জ্বালল কেউ। বন্ধ হল মিউজিক সিস্টেমের গান।

— “কি,রে এভাবে অসময়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছিস কেন? শরীর খারাপ নাকি? দেখ রোহিত আজ জোর করে ড্রাই চিলি চিকেন কিনে আনল, তুই ভালোবাসিস বলে। নতুন যে ছেলেটাকে পড়ানো শুরু করেছে ও, আজ সেখান থেকে প্রথম মাইনে পেয়েছে কিনা!...” দাদাভাই আলতো করে হাত রাখল ওর মাথায়। প্রশান্ত ওর দাদা কম আর বন্ধু অনেক বেশি সেই ছোটবেলা থেকেই। তাই বাড়ির আর কাউকে না বললেও দাদাভাইকে নিজের ভালো লাগার ব্যাপার সবটা বলেছিল পরমা। দাদাভাইয়ের এই স্নেহ স্পর্শটা আরও বেশি ভেঙে দিল যেন ওকে সেই মুহূর্তটায়। এবার জোরে ডুকরে কেঁদে উঠল ও। অনেক কিছু বলতে চাইল। কিন্তু পারল না। কেমন একটা বাষ্পের দলা জট পাকিয়ে রয়েছে গলার কাছে। ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে বা কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কোনোরকমে অস্ফুটে বলল, “দাদাভাই জানিস, সুগত... সুগত...” জড়িয়ে গেল সব শব্দগুলো।

এবার পরমার পাশে এসে বসল প্রশান্ত। শক্ত করে ওর হাতটা ধরে বলল, “আমি সব জানি রে বোন, সব জানি। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।”

দাদা-বোনের এই নির্মল মুহূর্তটার সাক্ষী রইল একটা বাদলা বিকেল আর তার সঙ্গে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে, যার হাতে তখন একটা ড্রাই চিলি চিকেনের প্যাকেট আর চোখের কোণে চিকচিকে মুক্ত।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে তাই সিসিডিতে বেশ ভিড়। একটা কোণার সীটে বসে আনমনে কফিটা নাড়াচাড়া করছিল পরমা। স্কুল থেকে সোজা আসছে তাই খিদেও পাচ্ছে অল্প অল্প, কিন্তু খেতে একদম ইচ্ছা করছে না ওর।

হবু বর কিছু কথা জানাতে চায় বিয়ের আগে, তাই জরুরি তলব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আসতে হল পরমাকে। আসলে এবার থেকে তো আগামী দিনগুলোতে শুধু আপস করেই বেঁচে থাকতে হবে ওকে। পরমা আর রোহিতের যে তিথিতে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার ঠিক দেড় মাস আগে বাইক এক্সিডেন্টে মারা যায় রোহিত।

খুব খারাপভাবে এক্সিডেন্ট হয়েছিল রোহিতের। হেলমেট থাকা সত্ত্বেও থেঁতলে গেছিল ও। উফফ! কি বীভৎস অভিশপ্ত মুহূর্ত ছিল সেটা! রোহিতের মৃত্যু পরমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে পৃথিবীতে যে মানুষগুলোর কপালে সুখ লেখা থাকে না, পরমা তাদের দলেই পড়ে। তাই সুখের আশা ত্যাগ করে শুধু একটু শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাতে চেয়েছিল ও।

কিন্তু সেটাও বোধহয় পাবার যোগ্য নয় ও। মায়ের আচমকা সেরিব্রাল অ্যাটাক পুরো এলোমেলো করে দিল আবার পরমার জীবন। স্কুলের চাকরি, রোহিতের স্মৃতি আর পরিবার এই নিয়েই চলে যাচ্ছিল পরমার। বিয়ে নিয়ে মা ঘ্যানঘ্যান করত বটে কিন্তু পরমা সেটাকে টিকতে দিত না। কিন্তু আচমকা সেরিব্রাল অ্যাটাকটা মাকে হুইল চেয়ারে বন্দি করে দিল পুরোপুরি। বাবা বরাবরই রুগ্ন আর দুর্বল প্রকৃতির। মনের জোরটাও ওঁর চিরকালই কম। ছাত্র পড়িয়ে, স্কুল মাস্টারি, আর সংসার নিয়ে ভাবার অবকাশ কোনোদিনই ছিল না বাবার। বাড়ির স্তম্ভ হয়ে চিরকাল মা-ই হাল ধরে এসেছেন। কিন্তু মায়ের এ হেন পরিণতিতে বাবা এখন আরও যেন গুটিয়ে গেছেন। এখন সব কিছুর হর্তা কর্তা তাই দাদাভাই। আর তাই দাদাভাইয়ের আমেরিকায় অন-সাইট প্রোজেক্টে যাবার খবরটা ছিল ওদের পরিবারে বজ্রপাতের মতো। হ্যাঁ, প্রশান্তকে ওর কোম্পানি চব্বিশ মাসের একটা প্রোজেক্টে টেক্সাস পাঠাচ্ছে, আর সঙ্গে যাচ্ছে রিয়া বউদি। এই বিষয়টা সামনে আসার পর থেকেই দাদাভাই খুব জোর করতে শুরু করেছিল সুদীপ্ত মজুমদারের ব্যাপারটা নিয়ে। আসলে প্রায় মাস ছয়েক আগে প্রথম কথাটা তোলে দাদাভাই। ওর অফিসের একজন সিনিয়র কলিগ সুদীপ্ত মজুমদারের খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে পরমার বিয়ের একটা সম্বন্ধ আনে প্রশান্ত। পরমার বিয়ে আর না করতে চাওয়ার সিদ্ধান্তটা বরাবরই সম্মান করত দাদাভাই। কিন্তু রিয়ার সঙ্গে বিয়ে হবার পর থেকেই অনেক বদলে গেছে ছেলেটা।

— “আমি তো চলে যাচ্ছি, মানে যেতেই হচ্ছে আর কি... তাই বলছিলাম পরমার কী হবে? মানছি ও স্বাবলম্বী, কিন্তু তোমাদেরও তো বয়স হচ্ছে। দিনকাল খারাপ। একটা কম বয়সি মেয়ে এভাবে একা...”

— “হ্যাঁ, মা আপনার ছেলে তো ঠিকই বলছে। জানেন, চিন্তায় ওর ঘুম হচ্ছে না। আর এতদূরের ব্যাপার, তাই আমরাও তো আর হুটহাট আসতে পারব না কোনো বিপদ-আপদ হলে। তাই বলছিলাম, সুদীপ্তদার ভাইয়ের সঙ্গে দিদিভাইয়ের বিয়েটা হয়ে গেলে আপনাদেরও একটা বলভরসা হয়, আর দিদিভাইয়ের জীবনটাও সুখের হয়। ছেলেটা কিন্তু সত্যি খুব ভালো। নেহাৎ কপাল দোষে বিপর্যয়ের স্বীকার হয়েছে। নইলে কি আর ষোলো বছর ধরে প্রেম করা প্রেমিকা বউ হবার এক বছরের মধ্যে অন্য ছেলের প্রেমে পড়ে স্বামীর ঘর ছাড়ে...”

— “চুপ করবি তোরা? কে ভাবতে বলেছে তোদের আমায় নিয়ে? তোরা নিজেদের নিয়ে ভাব” — তীব্র চিৎকার করে উঠেছিল পরমা। আর সহ্য করতে পারেনি। এই আলোচনাটাও না, আর ওদের এই ব্যবহারটাও না। তখন ওর চিৎকারে সেদিনের মতো আলোচনাটা থামলেও ব্যাপারটা যে মেটেনি সেটা পরমা বুঝেছিল তিন দিন পর।

— “পরি মা, একটা কথা বলব?” — স্কুল থেকে ফেরার পর হঠাৎ মা এসেছিল হুইল চেয়ারটা টেনে টেনে পরমার ঘরে।

— “বলো। তুমি কেন এলে? আমায় ডাকবে তো!”

হঠাৎ পরমা খেয়াল করল মায়ের চোখে জল। ওর হাতটা আচমকা জড়িয়ে ধরে মা বলল, “মা, আর অমত করিস না রে তুই। বাবলুর বন্ধুর ভাইকে বিয়েটা করে নে মা। ওরা তোর ব্যাপার সব জানে। ছেলেও জানে। সে তোকে বুঝবে মা দেখিস তুই। ঘা খাওয়া তো তারও মন।”

— “এসব কী বলছ তুমি!” — মায়ের আচমকা এমন ব্যবহারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল পরমা।

— “আমায় একটু শান্তিতে মরতে দিবি না মা? জানিস সবসময় তোর জন্য ভয় হয়। ঘুমাতেও পারি না। আমায় শেষ কটা দিন একটু শান্তি ভিক্ষা দে না মা।” — এবার মা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। ইতিমধ্যে বাবাও এসে দাঁড়িয়েছিল দরজার পাশে। এবার মুখ খুলল বাবাও, “আমরা না থাকলে তোর কী হবে এই ভেবে ভেবে আজকাল বুকটা বেশি ব্যথা করে রে। দেখবি একদিন এই টেনশনেই মরে যাব। তোর দাদাও ভাবল না আমাদের কথা, চলে যাচ্ছে। তুই একটুও দয়া করবি না রে মা?” — বাবার মুখটা কি ভীষণ করুণ দেখাচ্ছিল, চোখদুটোও ভরে গেছিল জলে। আর পারেনি পরমা। সত্যি এই মানুষ দুটো তো কোনোদিন কিছু চায়নি তাদের মেয়ের কাছ থেকে, শুধু দিয়েই গেছে নিঃস্বার্থভাবে আজীবন। এদের একটু শান্তি দেওয়া কি পরমার কর্তব্য নয় সন্তান হিসাবে? পরমা বিয়েতে মত দেবার পর একদিন এসেছিল সুদীপ্ত মজুমদার আর তার স্ত্রী। পাত্র আসেনি। তার শুধু একটা ছবি দেখেছে পরমা। যদিও একটুও ইচ্ছা ছিল না, ঐ আর একটা আপস আর কি।

— “সরি ফর দি লেট...” একটা কর্কশ আর রুক্ষ গলার স্বরে মুখ তুলে তাকাল পরমা। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওর আপস করা ভবিষ্যৎ। লোকটার চেহারাটাও ওর গলার স্বরের মতোই রুক্ষ। বিশেষ করে ওর দৃষ্টি। কেমন যেন জ্বলন্ত আর ঘৃণা ভরা। তাকানোই যায় না ওদিকে। একটু মাথা নেড়ে চোখ সরিয়ে নিল পরমা।

— “আপনি, মানে তুমি তো শুনেছ আশা করি আমার সব কথাই। আমি এ বিয়ে করছি কারণ আমার বাবা মৃত্যুশয্যায়। আর তাকে এই অবস্থায় পাঠিয়েছি আমিই। বাড়ির বউয়ের পালিয়ে যাবার মতো নক্কারজনক ঘটনার অপমান উনি নিতে পারেননি। আমার মা নেই, তাই বাবাই সব। শেষ মুহূর্তে ওঁর ইচ্ছে আমার সংসার দেখে যাবার। আর আমি সেটা ওঁকে দেখাতে চাই। বড়দার কাছে শুনেছি তোমার সব কথা। তাই মনে হল যে তোমায় বিয়ে করে খেলাঘরের সংসার সাজানোর অভিনয় করাটা হয়তো হলেও হতে পারে। কারণ তুমিও ভালোবাসা হারানো এক নিঃস্ব মানুষ আজ আমারই মতো। তাই কারোর সঙ্গে সুখনীড় গড়ে তোলার মতো স্বপ্ন আর জীবন থেকে কিছু নতুন করে পাবার প্রত্যাশা নিশ্চয় তোমারও আজ আর অবশিষ্ট নেই সেভাবে। হ্যাঁ, এই বিয়েটা আমার কাছে শুধুই একটা আপস, অনেকটা নাটকের মতোই বলতে পারো, আমার বাবাকে দেখানোর জন্য। প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে এই শব্দগুলোকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। আশা করি বোঝাতে পারলাম। তাই এই বিয়ে থেকে আমিও কিছু আশা করব না, আশা করি তোমারও কিছু প্রত্যাশা থাকবে না।”

ছোট করে মাথা নাড়ল পরমা। হুট করে যেমন এসেছিল তেমনি আবার হুট করেই চলে গেল লোকটা। পরমার জবাবের অপেক্ষাও করল না। পরমার বুক ঠেলে বেড়িয়ে এল শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস।

বৃষ্টিটা বোধহয় কমেই এসেছে বাইরে। ছপছপ শব্দটা মৃদু লাগছে এখন। আসলে অসময়ের বৃষ্টি আর কতই বা হবে। দূরে কোথায় যেন একটা সানাই বাজছে। আজ আসলে অনেক বিয়ে আছে। আজ ফাল্গুনের শেষ দিন। কাল পয়লা চৈত্র, কাল দোল। রোহিত চলে যাবার পর থেকে কোনোদিনই রং মাখেনি পরমা। অথচ কলেজে কি ভীষণ দোল খেলত ও। আচ্ছা কলেজে কি আজও ওভাবেই দোল খেলা হয়? নাকি কলেজটা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যেমন ক্যান্টিন, বড় মেনগেট সব বদলে ভোল পালটেছে, তেমনি বদলে ফেলেছে দোল খেলার সেই উন্মাদনাও? সবই তো বদলে যায়। দাদাভাই বদলেছে, পরমা নিজে বদলেছে আর সেও তো বদলে হয়ে গেছে অন্য মানুষ। তার মায়াবি চোখ হারিয়ে এখন সে জায়গায় শুধুই ঘৃণা। দাদাভাইয়ের আনা পাত্রের ছবিটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেখতে হয়েছিল পরমাকে। আর দেখতেই একটা হাই ভোল্টেজ শক খেয়েছিল ও। চেহারার প্রায় নব্বই শতাংশ পরিবর্তন হলেও চিনতে অসুবিধা হয়নি সুগত মজুমদারকে। পলকে ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল পরমার মুখ। আর সেই মুহূর্তে দাদাভাই এসে মাথায় হাত রেখেছিল ঠিক ছোটবেলার মতো। নীচু স্বরে বলেছিল, “আমি সব জানি রে বোন। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।”

— “পরি, তৈরি হলি তুই? মিঃ মজুমদার ফোন করেছিলেন। ওরা আসছেন। পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যাবেন।”

— “আসছি...” বন্ধ দরজার ভিতর থেকে সাড়া দিল ও।

খুট করে দরজা খুলে চৌকাঠের বাইরে পা রাখল পরমা। এগিয়ে গেল সামনে। গেটের বাইরে হালকা উলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ চোখ পড়ল সোফার ওপর বসে একমনে খেলতে থাকা ছোট্ট জবার দিকে। পিসিমণির ছোট্ট নাতনিটার হাতে কী ওটা? আরে ওটা পিচকারি না? আর সাথে কি রংয়ের প্যাকেট? ছোটবেলায় এগুলো মা এনে দিত ওকেও। কি সুন্দর রঙিন পিচকারি! কিন্তু জবার পিচকারিটা তো অত রঙিন লাগছে না পরমার যেমনটা হতো আগে? কেন ফ্যাকাশে লাগছে প্যাকেটে ভরা আবিরটাও? রংও কি তবে বদলে গিয়ে বেরঙিন হয়ে যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে? পরমার মতো, সুগতর মতো আরও অনেক স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়া মানুষের মতো, আর কিছু অসমাপ্ত বসন্তের গল্পের মতো? বুক ঠেলে একটা তিতকুটে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল পরমার।

অধ্যায় ১ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%