ভালোবাসব বলে

পল্লবী সেনগুপ্ত

পর পর তিনবার বেলটা বাজানোর পরেও যখন দরজাটা খুলল না তখন একটু অধৈর্য লাগল তরুণের। মনে উদ্রেক হল হাল্কা বিরক্তির। তবে কি আজ দরজাই খুলবে না অনু? কিন্তু বিরক্ত হলে তো চলবে না। নিজেকে আপ্রাণ বোঝালো তরুণ। যে কাজ আজ থেকে সাত বছর আগে ও করেছিল তার প্রায়শ্চিত্ত যে ওকে করতেই হবে। ও যে সত্যি খুব অনুতপ্ত, সেটা যেভাবেই হোক বোঝাতেই হবে অনুকে। আর সেই কাজটা যে বড় সহজ হবে না সেটা জেনেই তো ও নেমেছিল এই কঠিন তপস্যায় দেশে ফেরার পর থেকেই।

বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ্দুর। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ জ্বালিয়ে দিচ্ছে যেন পৃথিবীর আনাচকানাচ। উত্তর কলকাতার সরু গলিতে অনুর একতলা ছোট বাড়িটার ফালি বারান্দায় প্রায় মিনিট দশেক হল দাঁড়িয়ে রয়েছে তরুণ তীর্থের কাকের মতো এক টুকরো আশা নিয়ে, যদি এইবার অন্তত অনু একটু সময় দেয় ওকে নিজের অনুতাপটা জানানোর জন্য। যদি অনু মাত্র মিনিট দশেক সময় দিয়েও শোনে ওর কথা। তপ্ত রোদ ঝলসানো খোলা বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে আসছে ওর। মনে হচ্ছে মেঝেতেই বসে পড়বে এবার।

চতুর্থ বার বেলটা যেই টিপতে যাবে তরুণ ঠিক তখনই খুলে গেল বাইরের দরজাটা। দরজার ওপারে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে অনু। মাথায় তোয়ালে জড়ানো। চোখে-মুখে সামান্য ভেজা ছাপ। শরীর থেকে ভেসে আসছে সাধারণ সাবানের অসাধারণ একটা মাদকতা মেশানো সুগন্ধ। চোখ দুটো বরাবরের মতোই ভীষণ আত্মবিশ্বাসী আর দৃঢ়চেতা। এই চোখের মোহতেই একদিন পাগল হয়েছিল তরুণ, আবার এই চোখের জেদি দৃপ্তভাবকেই একদিন ভেঙে খান খান করে দিতে ইচ্ছে করেছিল ওর।

— “কী ব্যাপার তরুণ? কেন এসেছ তুমি আবার? তোমার সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে বলো তো? আমি কি ঠিক বোঝাতে পারছি না তোমায়? কেন তুমি বুঝতে পারছ না যে আমি তোমার কোনো কথা শুনতেই বিন্দুমাত্র উৎসাহী নই। আমি মানুষটা খুব নগণ্য হলেও তোমায় দেবার মতো আধ মিনিটও নেই আমার হাতে” — ভীষণ দৃঢ় অথচ ঠান্ডা স্বরে বলল অনুরাধা।

— “প্লিজ অনু, প্লিজ তুমি একটু সুযোগ দাও আমায়। একবার শোনো আমার কথা, লক্ষ্মীটি। প্লিজ আমাকে একবার ক্ষমা করার কথা একটু ভেবে দেখো।”

— “ক্ষমা! আমার ক্ষমায় কি সত্যি কিছু যায় আসে? তবু যদি সত্যি এক ফোঁটাও দাম থাকে আমার ক্ষমার তাহলে বলছি আমি অনেক আগেই তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি। কোনো রাগ নেই আর আজ আমার তোমার প্রতি। কিন্তু আমি সত্যি তোমার সঙ্গে কথা বাড়াতে চাই না। তুমি প্লিজ চলে যাও। আর দয়া করে এখানে আর কোনোদিন ফিরে এসো না। বাড়ি বয়ে আসা অতিথিকে এভাবে দরজা থেকে প্রতিবার বিদায় করতে আমার ভালো লাগে না, আবার তোমায় অন্দরে ডেকে নিয়ে গিয়ে গল্প করারও কোনো ইচ্ছা, প্রয়োজন বা সময় কোনোটাই আমার নেই।”

— “না অনু, আমি আবার আসব। আমি বারবার আসব ফিরে তোমার কাছে যতদিন না তুমি আমার সব কথা শুনবে।”

— “না তরুণ, তুমি আসবে না, আমি তোমায় এটা শেষবারের মতো বলছি। আমি এই পাড়ায় বহু বছর আছি। এই বাড়িতে একা থাকি। তাই পাড়ার কাকু, দাদা বা ভাইরা আমার যথেষ্ট খোঁজ খবর রাখেন। তাই আমি যদি একবার তাদের জানাই যে তুমি ক্রমাগতভাবে আমায় বিরক্ত করে চলেছ আমার একা থাকার সুযোগ নিয়ে তাহলে ফলটা বোধহয় খুব একটা ভালো হবে না তোমার জন্য” — ইস্পাত কঠিন স্বর এবার অনুর।

— “অনুরাধা! এসব কী বলছ তুমি!”

— “না, এসব কিছু আমিও করতে চাই না। তাই শেষবারের মতো তোমায় সাবধান করে দিলাম। এখন এসো। আমার যথেষ্ট তাড়া আছে। স্কুলে বেরোতে হবে এবার।”

দড়াম করে তরুণের মুখের উপরেই বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। তেঁতো মন নিয়ে ধীর পায়ে ও বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল তরুণ। ফিরে এল নিজের বিলাসবহুল গাড়িতে।

“চলো ড্রাইভার” — বলল শুকনো গলায়।

মনটা দুমড়ে যাচ্ছে ওর অপমানে। অনু আজ এভাবে অপমান করল! কলকাতায় পাঁচ মাস হল ফিরেছে তরুণ। তারপর থেকে কম করে সাত-আট বার গেছে অনুরাধার দরজায়। প্রতিবারই একই ব্যবহার জুটেছে। এত জেদ কীসের অনুর? কথাটা মনে আসতেই ঝপ করে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল অনেকগুলো বছর আগের একটা দৃশ্য।
দক্ষিণ কলকাতার ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের দামি সোফায় গা এলিয়ে বসে রয়েছেন সুহাসিনী দেবী। চোখমুখ দিয়ে উপচে পড়ছে তার অহংকার। তার ঠিক উল্টো দিকের কাউচে বসে সাধারণ অথচ আত্মপ্রত্যয় ভরপুর অনুরাধা।

— “শোনো অনুরাধা আমি তোমাদের সম্পর্কের কথা জেনেছি আমার ছেলের থেকে। যদিও তুমি আমাদের পালটি ঘরের মেয়ে নও, তবুও আমি আপত্তি করছি না কারণ আমার ছেলের এই বিয়েতে অনেকটা বেশি আগ্রহ। তবে আমারও কিছু বলার আছে। কিছু শর্ত আছে। তুমি বাপ-মা মরা মেয়ে। তাই তোমার কিছু পিছুটান নেই আমি ধরে নিচ্ছি তাই তো?” দম্ভ ভরা গলা সুহাসিনীর।

— “দোলার কথা আপনার ছেলে তো নিশ্চয়ই আপনাকে বলছে মা।”

মুখ কুঁচকে গেল সুহাসিনী দেবীর। রুক্ষ স্বরে বললেন, “হ্যাঁ বলেছে। কিন্তু মা, আমি তো তোমার জীবনের ঐ বাড়তি বোঝাকে মেনে নিতে পারব না। ওই অপয়া বোবা কালা মেয়েকে আমি তো আমার ছেলের ঘাড়ে চেপে বসতে দেব না। অশুভ ছায়া তো ঐ মেয়ে। এই বাড়ির বউ হতে গেলে ঐ মেয়েকে তোমায় ছাড়তে হবে অনুরাধা। অমন বাচ্চাদের জন্য হাজার গণ্ডা আশ্রম আছে। সেখানে পাঠিয়ে দাও ওকে। যা টাকা পয়সা লাগবে সে না হয় দিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু ওই অলক্ষ্মীকে তুলে এনে আমি আমার ছেলের জীবনের বা আমার সংসারের কোনো ক্ষতি হতে দেব না, তুমি ভালো করে সেটা বুঝে নাও। এইগুলো বলতেই আজ আমি তোমায় ডেকেছিলাম।”

— “আমায় ক্ষমা করবেন মা…” এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে অনু, “মা আপনি এতক্ষণ যার সম্বন্ধে খারাপ খারাপ কথাগুলো বললেন সে আমার একান্ত নিজের। আমার মেয়ে। তাই তার সম্বন্ধে আর একটা কটু কথাও আমি শুনব না। আপনি যেমন আপনার সন্তানের ভালো মন্দ নিয়ে খুব চিন্তিত, তেমনি আমিও আমার সন্তানকে নিয়ে যথেষ্ট সাবধানী। আপনার ছেলে কিন্তু দোলার দায়িত্ব নেবার প্রতিশ্রুতি আমায় দিয়েছিল মা। সেইজন্যই এতদিন টিকেছিল এই সম্পর্কটা। কিন্তু এখন যখন বুঝতে পারছি দোলাকে নিয়ে আপনাদের অনেক সমস্যা তাই আমিও আর এই সম্পর্কটা নিয়ে এগোতে চাই না। কারণ আমার কাছে আমার মেয়েই ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তারপরে সব কিছু। কাজেই…” কথাগুলো শেষ করেই সেদিন অনেকগুলো জিজ্ঞাসা আর প্রত্যাশা নিয়ে তরুণের দিকে তাকিয়েছিল অনু।
তরুন ওকে দেবার মতো কোনো আশ্বাসের ভাষা খুঁজে পায়নি সেই মুহূর্তে। শুধু চোখ নামিয়ে নিয়েছিল কাপুরুষের মতো।

— “ঠিক আছে আমি আসি তরুণ। ভালো থেকো” — বেরিয়ে গেছিল অনুরাধা।

“অনু… অনু…” — পিছনে ছুটেছিল তরুণ।

— “শুনে যা খোকা। অনেক হয়েছে আর না। এত জেদ ওই মেয়ের! আমার মুখের ওপর কথা বলে! একটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের এত কীসের জেদ রে? ওকে আমি কোনোভাবেই মেনে নেব না আমার একমাত্র ছেলের বউ হিসাবে। তবুও যদি তুই ওর কাছে যাস আমায় উপেক্ষা করে তবে আমি অন্ন জল ত্যাগ করে প্রাণ দেব বলে রাখলাম। আমার জেদ তুই জানিস কিন্তু” — থমকে গেছিল সেদিন তরুণ মায়ের হুংকারের কাছে পরাভূত হয়ে। মায়ের জেদ যে কতখানি প্রবল তা সত্যি তো অজানা ছিল না ওর।

কিন্তু তবুও বাধা কি সহজে মানে অবাধ্য হৃদয়টা! তাই এই ঘটনার পরেও একবার দেখা করেছিল ও অনুর সঙ্গে। বোঝাবার চেষ্টা করেছিল ওকে নানাভাবে। কিন্তু সে মানেনি। তরুণের নিদারুণ অভিমান হয়েছিল সেদিন। রাগও হয়েছিল খুব। তবে কি অনুর কাছে ওর ভালোবাসার কোনো দাম নেই? সব কিছু ওর কাছে শুধু ওই দোলা? নিজের জেদ এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল ওর কাছে যে তরুণকে হারাতে ওর কোনো দ্বিধা হল না?

সেই প্রবল অভিমান থেকেই সেদিন জীবনের অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তরুণ। আসলে তখন বয়স কম, রক্তও গরম, রাগ, জেদ সবই প্রবল। হয়তো সেইজন্যই রাগ, জেদের মতো নেতিবাচক আবেগগুলোই বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল যুক্তি বা বুদ্ধির থেকে।

আজ বড্ড আফশোশ হয় সেই দিনটার জন্য! ইশশ! যদি একটিবার তরুণ নিজের রাগ, জেদকে উপেক্ষা করতে পারত তাহলে যে আজ সবটুকু একদম অন্যরকম হতো। এইভাবে প্রতিদিন নরক যন্ত্রণা আর পাপের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে হতো না ওকে।

— “কী ব্যাপার বুবলি সোনা তুমি নাকি খাওয়া দাওয়া করছ না শুনলাম। কী হয়েছে তোমার?” ছোট্ট বুবলির চুল ঘেঁটে দিয়ে বলল অনু।

— “হ্যাঁ মিস। তুমি কাল আসোনি কেন? আমার সেই জন্যই তো খুব মন খারাপ করছিল। তাই খেতে একদম ইচ্ছা করছিল না।”

— “কাল তো আমার জ্বর হয়েছিল সোনা। ঠিক আছে, আজ আমি তোমায় নিজের হাতে খাইয়ে দেব” — বুবলির মুখে খাবার গুঁজে দিচ্ছে এবার অনু।

আসলে এই ‘অন্য সকাল’- এর বাচ্চারাই তো এখন অনুর জীবনের সবটুকু ঘিরে। এদের ও যেমন ভালোবাসে তেমনই এরাও ওকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে নিজেদের বুক উজাড় করে।

খুব কম বয়স থেকেই ছোট বাচ্চাদের সান্নিধ্য বড্ড ভালো লাগে অনুরাধার। আর বাচ্চারাও ওকে পছন্দ করে খুব। সেই জন্যই তো দোলা পৃথিবীতে আসার পর থেকেই ওই আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছিল অনুর সব কিছু। কিন্তু অনু এত অযোগ্য মা যে সেই দোলাকেও ধরে রাখতে পারল না। সকলকে ফাঁকি দিয়ে সাত দিনের ডেঙ্গু জ্বরে চলে গেল ও।

দোলার মৃত্যুর পর আস্তে আস্তে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছিল ও। ঠিক সেই সময়েই পাড়ার কাকলি বউদির উদ্যোগে ‘অন্য সকাল’ জয়েন করেছিল ও। এটা সেই সব বাচ্চাদের স্কুল যারা অনেকটা অন্যরকম, মানে দোলা যেমন ছিল আর কি! এক কথায় বলতে গেলে এটা স্প্যাসটিক স্কুল বা প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের স্কুল।

এখানে কেউ বুবলির মতো দৃষ্টিহীন, তো কেউ সোনাই-এর মতো বোবা তো কেউ আবার অস্মির মতো পঙ্গু। এই বাচ্চাদের পেয়ে এদের মাঝেই আস্তে আস্তে দোলাকে যেন খুঁজে পেয়েছে ও। তারপর গত পাঁচ বছরে এরাই অনুর সবটুকু জুড়ে।

আজ সকাল থেকে বারবার দোলার কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। সে তো পড়বেই, আজকেই তো সেই অভিশপ্ত দিন, যে দিন মেয়েটা ছেড়ে চলে গেছিল ওকে। দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর পেরিয়ে গেল ওর চলে যাবার। অথচ মনে হয় এই যেন সেদিনকার কথা যেদিন প্রথমবার কয়েক ঘণ্টার দোলাকে হাসপাতালের বেবি কটে শুয়ে খেলা করতে দেখেছিল ও।

না, দোলাকে জন্ম দেয়নি অনুরাধা। ওকে জন্ম দিয়েছিল শ্রীরাধা মানে অনুর দিদি। দিদির বিয়ে হয়েছিল সুকান্ত দার সঙ্গে, ভালোবেসেই। সুকান্তদার তিনকুলে তেমন কেউ ছিল না, তার মধ্যে মানুষটার সেলস-এর চাকরি। বেশিরভাগ সময়েই বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়। তাই দোলা হবার পর থেকে শ্রীরাধা বেশিরভাগ সময়েই মায়ের বাড়িতে থাকত বাচ্চাকে নিয়ে মা আর ছোট বোনের সঙ্গে। শ্রীরাধা বরাবরই একটু ঢিলে ঢালা গোছের। তাই দোলার বেশির ভাগ দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল অনু। ওকে নাওয়ানো খাওয়ানো সবকিছু। দোলাকে পেয়ে যে কি ভীষণ খুশি হয়েছিল অনু তা ও কোনোদিন কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। ঠিক যেন একটা ছোট্ট পুতুল পেয়েছে ও। পাড়ার অনেকেই তো মজা করে বলতেন, “আমাদের দোলা মামনি তো কপাল করে এসেছে। একসঙ্গে দু-দুটো মা পেয়ে গেছে।”

হাসি মজায় বেশ কাটছিল ওদের দিনগুলো। কিন্তু তাতে বোধহয় সত্যি কারোর নজর লেগে গেছিল। তাই দোলার বছর দুয়েক বয়স হতে না হতেই ওদের সংসারের ওপর আছড়ে পড়েছিল নির্মম আঘাতটা। দোলা দু-বছরের হল তবু মুখে কোনো কথা ফুটছে না কেন! কোনো শব্দ শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না কেন ওর? ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বললেন এক অদ্ভুত অসুস্থতা নিয়েই নাকি জন্মেছিল দোলা। ওর বাকশক্তি আর শ্রবণশক্তি নেই। আর এর চিকিৎসাও বড় সহজ নয়, অন্তত ওদের মতো অতি মধ্যবিত্তদের সাধ্যের মধ্যে তো নয়ই। খবরটা পেয়ে শ্রীরাধা কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে গেল, থম মেরে গেল সুকান্তও।

মেয়ে জামাইয়ের এই অবস্থা দেখে কোথা থেকে যেন এক অদ্ভুত খবর আনলেন অনুর মা। বেনারসে নাকি একজন অতি অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন সাধু আছেন, তিনি নাকি এমন অনেক বাচ্চাকে ভালো করেছেন।
খবরটা পেয়ে সেখানে যাবার জন্য পাগল হয়ে গেল শ্রীরাধা। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ যেমন এক টুকরো খড়কেও আঁকড়ে ধরতে চায় শ্রীরাধাও তেমন করতে শুরু করল।

অবশেষে যাওয়া স্থির হল। শ্রীরাধা আর সুকান্তকে নিয়ে যাবেন ওদের মা। আর দোলা থাকবে অনুর কাছে। কিন্তু অনু তো তখনও জানত না আর কি কি ভয়ংকর বাস্তব অপেক্ষা করছে ওর জন্য। না, শেষ পর্যন্ত আর বেনারস যাওয়া হয় নি ওদের। যাবার পথে এক ভয়ানক ট্রেন দুর্ঘটনা একসঙ্গেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল অনেকের সঙ্গে ওই তিনটে প্রাণ আর অনুর পৃথিবীটাও।

শোকে বুক ফেটে গেলেও সে সময় নিজেকে সামলে রেখেছিল অনু শুধু দু-বছরের ওই অসহায় প্রাণটার কথা ভেবে যাকে ও জন্ম না দিলেও যে ওর সন্তান ছাড়া আর কিচ্ছু না। ওর যে অনু ছাড়া আর কেউ রইল না। জীবনের প্রতিটা দিন তখন তীব্র সংগ্রাম করে পার করতে হয়েছিল ওকে। ওর সবটুকু সেরে পাড়ার বউদি, কাকিমাদের কাছে ওর দায়িত্ব দিয়ে কাজে যাওয়া আবার ফিরে আসা। একটা একটা করে তখন পয়সা জমাচ্ছিল অনু শুধু ওর চিকিৎসার জন্য।

এইভাবেই লড়তে লড়তে চলছিল ওর জীবন কিন্তু সেখানে আচমকাই একদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছিল তরুণ। অনু যে অ্যাড এজেন্সির সাধারণ গ্রাফিক্স ডিজাইনার, সেখানকারই ক্লায়েন্ট তরুণ। মস্ত বড়লোকের ছেলে, কিন্তু একদম অন্যরকম। ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার। বড্ড আন্তরিক আর মিশুকে, অহংকারের লেশমাত্র নেই। প্রথমে কাজের সূত্রে পরিচয় হলেও কীভাবে যেন অনুর সঙ্গে এই মানুষটার একটা অসম বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। অনুর নিস্তরঙ্গ, ধূসর জীবনে এই মানুষটাই প্রথম সবুজ রঙের স্বপ্ন বয়ে এনেছিল। না চাইতেই অনেকটা ভালোবাসা আর ভরসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওকে। কিন্তু না। সেই প্রতিশ্রুতি ছিল ভিত্তিহীন, সেটা অনেকটা পরে বুঝেছিল ও। প্রথম সেদিন বুঝেছিল যেদিন তরুণের মা ওকে অপমান করেছিলেন, জানিয়েছিলেন দোলাকে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না ওদের পক্ষে। দোলা অনুর কতখানি সেটা জেনেও সেদিন চুপ ছিল তরুন। উল্টে পরে ওকে বলেছিল,
“কেন এত জেদ করছ তুমি অনু? আপাতত দোলাকে কোনো আশ্রমে রেখে দাও না প্লিজ। তারপরে তো আমরা বিদেশ চলে যাব, তখন ওকে আমরা না হয় সঙ্গে নিয়ে যাব। আর তত দিনে মাও হয়তো মেনে নেবেন ওকে”।

শিউরে উঠেছিল সেদিন অনুরাধা ওর কথাগুলো শুনে। “কী বলছ তরুণ! তুমি কি আমাকে বাচ্চা পেয়েছ যে যা হোক কিছু বুঝিয়ে দেবে! তুমি তো জানো দোলা আমার কাছে কতখানি। তুমি তারপরেও কী করে বলছ এসব? আমি ভাবতেই পারছি না”।

— “ও, শুধু ওই দোলাই সবকিছু তোমার জন্য? আমি কিচ্ছু না? আমাদের স্বপ্ন, ভালোবাসা এগুলোর কোনো দাম নেই তোমার কাছে? আমাদের ভালোবাসার কথা ভেবেও একটু কম্প্রোমাইজ করতে পারবে না তুমি? কেন অনু? দোলা তো তোমার নিজের মেয়েও নয়”।

— “দোলা আমারই মেয়ে তরুণ। মাতৃত্ব একটা অনুভূতি, এটা একটা এমন সম্পর্ক যেটা শুধু রক্তের আর নাড়ির বন্ধনে আবদ্ধ থাকে না ; মাতৃত্ব জড়িয়ে থাকে আবেগ আর বিশ্বাসের মাঝে। যে আবেগ আর বিশ্বাসটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুভব আর সেটাতেই বেঁধে আছি আমি আর দোলা। হয়তো তুমি সেটা কোনোদিন বুঝবে না।”

“বেশ, তবে তুমি তোমার দোলাকে নিয়েই থাকো। আর কোনোদিন আসব না আমি তোমার কাছে” — চলে গেছিল তরুণ। আর সত্যি আসেনি কোনোদিন। বিদেশ চলে গেছিল মাস খানেকের মধ্যেই। অনু খবর পেয়েছিল বিদেশ গিয়ে বিয়েও করেছিল তরুণ।

না অনুও আর কোনোদিন খবর নেবার চেষ্টা করেনি ওই মানুষটার। শুধু ওর সঙ্গে কাটানো সময় আর স্বপ্নগুলোর স্মৃতি যে রক্তক্ষরণ ঘটাত ওর বুকের মধ্যে সেটা সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল ও। তারপর পেরিয়ে গেছে সাত সাতটা বছর। বদলে গেছে কত কিছু আমূলে। এমনকি দোলাও তো চলে গেছে ফাঁকি দিয়ে। অনেকেই ইতিমধ্যে ওকে বলেছেন একা একা এভাবে জীবন না কাটিয়ে একজন জীবনসঙ্গীকে বেছে নিতে। কিন্তু অনু পারেনি। হয়তো পারবেও না। কারণ আজও ওর হৃদয়ের আয়নার প্রতিফলনে যে জেগে থাকে সেই একটাই মুখ, যে আসলে কোনোদিন বিন্দুমাত্র বুঝতেই পারেনি ওকে।

কিন্তু ইদানীং কেন তরুণ বারবার আসছে ওর কাছে? কী চায় ও? ক্ষমা? কীসের ক্ষমা? ও কি আদৌ মনে করে সাত বছর আগে কোনো অন্যায় করেছিল ও? অবশ্য মনে করলেই বা কী? সব তো শেষ হয়েই গেছে। নাকি নিজের বউকে নিয়ে ও কত সুখী সেই ছবি ওকে দেখিয়ে কোনো আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে চায়?

“সুইটি আন্টি…” রিনরিনে গলার স্বরটায় এবার একটু চমকে উঠল অনু। ঘাড় ফেরাতেই দেখল হুইল চেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসছে ঐশ্বর্য। এই মেয়েটাকে দেখলেই বারবার চমকে ওঠে অনু। এর মুখের আদলের সঙ্গে অদ্ভুত মিল দোলার। এমনকি হাসিটারও। আর এর নামটাও ভারি অদ্ভুত।

অনেক বছর আগে একটা মায়াবী বিকালে একবার অনু বলেছিল তরুণকে, “জানো তো আমাদের যদি কোনোদিন মেয়ে হয়, দোলার যদি বোন আসে তবে তার নাম দেব ঐশ্বর্য। আমার প্রিয় নায়িকার নাম।”

“একদম তাই। আমাদের মেয়ের নাম শুধু ঐশ্বর্যই হবে ব্যস। কোনো মাধুরীও নয়, করিনাও নয় বা কাজলও নয়”, বলেই হেসে সেদিন অনুর গাল টিপে দিয়েছিল তরুণ।

এই ঐশ্বর্য নামের বাচ্চাটা মাস চারেক হল জয়েন করেছে ‘নতুন সকাল’ -এ। প্রথম দিন থেকেই এই বাচ্চাটার প্রতি কি এক অদ্ভুত মায়ায় যেন জড়িয়ে গেছে অনু। মেয়েটাও যেন বড্ড বেশি আঁকড়ায় ওকে। ওকে দেখে মাঝেমাঝে অনুর মনে হয় যেন দোলাই আবার ফিরে এসেছে ওর কাছে, একটু অন্যভাবে। মেয়েটা পঙ্গু। জন্ম থেকে দুটো পা-ই অকেজো ওর। হুইল চেয়ারে বন্দি এই ফুটফুটে মেয়েটা।

— “সুইটি আন্টি জানো তো, কাল আমার হ্যাপি বার্থ ডে। তুমি আসবে তো?”

— “না সোনা, কাল তো আমার একটা কাজ আছে” — অনেকে বাচ্চার জন্মদিনেই নিমন্ত্রণ পায় অনু। কিন্তু ও কোথাও যায় না। ভিড়, আনন্দ এগুলো থেকে সব সময়ই পালাতে চায় ও।

— “আন্টি কাল আমার ফাইভ ইয়ার্স হবে। আমি বিগ গার্ল হয়ে যাব, তাও তুমি আসবে না?” — নিমেষে চোখ ছলছলে হয়ে গেল বাচ্চা মেয়েটার।

এইবার বুকের মধ্যে কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল অনুর। ঐশ্বর্যর কাল পাঁচ বছরের জন্মদিন। তার মানে ঠিক পাঁচ বছর আগে যেদিন দোলা চলে গেছিল, একদম তারপরের দিনেই পৃথিবীতে এসেছিল ও। অজান্তেই গায়ে কেমন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল অনুর। অনেক ছোটবেলায় ও কার কাছে যেন শুনেছিল শরীর যখন আত্মা ছাড়ে, পৃথিবীর মায়া কাটাতে না পারলে তখন সে প্রবেশ করার জন্য অন্য শরীর খোঁজে। তাই তার দু-এক দিন পর জন্ম হচ্ছে এমন শরীরে ঢুকে যেতে চায় সে। তবে কি দোলাই?…

নিজের ভাবনার জন্য এবার নিজেকেই ধমকাল অনু। আরে! এসব কী ভাবছে ও। কিন্তু ওদের এই আশ্চর্য মিলটাও যে বিগত চার মাসে তিষ্ঠোতে দেয়নি ওকে বহু রাত।

“তুমি প্লিজ এসো আন্টি, আমি ওয়েট করব” — বলেই অনুর হাতে একটা কার্ড ঠুসে দিল বাচ্চা মেয়েটা।
নিমন্ত্রণ পত্র। সুন্দর রংচং দিয়ে সাজানো।

— “আচ্ছা আমি আসব” — নিজের অজান্তেই কেমন যেন বলে ফেলল অনু। কেন আজ বারবার মনে হচ্ছে ওর দোলাই আবার ঐশ্বর্য হয়ে ফিরে এসেছে যেন ওর সামনে।

নাঃ। ও কেন দোলা হতে যাবে! নিজের মনকে আবার বোঝালো অনু। কিন্তু কেন যেন আজ কোনো যুক্তিই মানতে চাইছে না মন। ভীষণ অস্থির লাগছে অনুর। মোবাইলের ওয়াল পেপারে সেভ করা দোলার ছবিটা একবার চোখের সামনে মেলে ধরল অনু। না সত্যি বড্ড মিল। হাসি, চোখ, মুখের আদল সব কিছু মিলিয়ে অনেকটা বেশি মিল।

ভাড়া করা ক্যাব থেকে নামার পরেও মনের দ্বিধাটা যেন পুরোপুরি কাটছে না অনুর। আবেগতাড়িত হয়ে হয়ে এখানে চলে আসাটা কি ঠিক হল! অচেনা লোকজনের মাঝে আজকাল যেতে একদম স্বচ্ছন্দ বোধ করে না ও।
সল্টলেক এরিয়ার ঝাঁ চকচকে পার্টি হল ভাড়া নিয়ে জন্মদিন পালন হচ্ছে ঐশ্বর্যর। একটু সংকুচিত পায়েই ভিতরে ঢুকল অনু। আলো আর ফুল-বেলুনের আতিশয্য মেখে থইথই করছে পুরো জায়গাটা।

এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল অনু। হঠাৎ কানে এল ঐশ্বর্য এর খুশি মাখা গলা, “সুইটি আন্টি তুমি এসে গেছো!” একজন মহিলা ঠেলে ঠেলে নিয়ে আসছে ওকে হুইল চেয়ারে। সাদা একটা ফোলা ফোলা ফ্রক পরেছে ও। দোলারও ঠিক এরকম একটা জামা ছিল। ওকেও সেটা পরলে এরকমই লাগত ঠিক।

— “হ্যাঁ সোনা, তুমি ডাকলে আমি কি না এসে পারি!” — ওর হাতে উপহার তুলে দিয়ে ওর গাল টিপে দিল অনু, “তোমার মা কোথায় সোনা? একবার দেখি আমার সোনার মাম্মামকে...”

— “আমার মাম্মাম নেই আন্টি” — পলকে বিষাদের ছায়া মেয়েটার মুখে।

— “ইশ! এইটুকু অসহায় বাচ্চাটার মা নেই!” — নিজের মনেই বলল অনু।

— “মিমি… মিমি… ও তুমি ওদিকে” — গলাটা পেয়েই চমকে উঠল অনু। এটা কার গলা? হ্যাঁ সেই তো। পাঁচ ফিট নয় ইঞ্চির লোকটা এগিয়ে আসছে এই দিকেই, ঐশ্বর্যের হুইল চেয়ার লক্ষ্য করে। এবার লোকটা এসে থামল তার মিমির চেয়ারের সামনে।

— “সুইটি আন্টি এটাই আমার বাবাই…” — হেসে হেসে বলল ঐশ্বর্য।

— “তরুণ! তুমি এখানে?” — গলা শুকিয়ে আসছে এবার অনুর, “তুমি মানে… ঐশ্বর্য!” সব কথা যেন হারিয়ে ফেলেছে অনু।

— “ঐশ্বর্য আমার মেয়ে অনু। তোমার প্রতি অভিমান আর রাগ থেকে আমি বিদেশ গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছিলাম জেনিফারকে মাত্র এক মাসের আলাপেই। বিয়ের এক বছরের মাথাতেই মিমি এল আমাদের জীবনে। কিন্তু ভগবান তো সব হিসেব মিলিয়ে দেন সব সময়তেই। আর সেই জন্যই বোধহয় জন্ম থেকেই পঙ্গু অবস্থায় পৃথিবীতে এসেছিল আমাদের মেয়ে। কিন্তু জেনিফার মানতে নারাজ হল মিমির এই শারীরিক ত্রুটি। ওর বক্তব্য ছিল সারাজিবন এই পঙ্গু মেয়ের বোঝা বইতে পারবে না ও। ও চেয়েছিল মিমিকে কোনো হোমে দিয়ে দিতে। আর ওর এই সাংঘাতিক কথা শুনে সেদিন আঁতকে উঠেছিলাম আমি। কী করে এটা বলতে পারল ও! আর সেইদিনই আমি প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলাম কতখানি অন্যায় কথা বলা হয়েছিল সেদিন তোমাকে। আস্তে আস্তে একরাশ অনুশোচনা ছেয়ে গেছিল আমার বুকের মধ্যে।

এক বছরের মধ্যেই জেনিফার চলে গেল আমায় ছেড়ে। আমায় সেই সময় অনেকে বলেছিল দেশে ফিরে আসতে। কিন্তু আমি ফিরিনি। অদ্ভুত এক অপরাধবোধ আর কষ্ট ফিরতে দেয়নি আমায়। আর সবচেয়ে বড় কথা আমার মা। তার প্রতি ভয়ানক রাগ ছিল আমার। আমার মনে হয়েছিল শুধু তার জেদের জন্যই বোধহয় এভাবে এলোমেলো হয়ে গেল আমার জীবন।

প্রায় চার বছর পঙ্গু মেয়েকে নিয়ে একা লড়াই চালাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু আর পারলাম না। ফিরেই এলাম অবশেষে। আর ফিরে আসার পর থেকেই বারবার ছুটে গেছি তোমার কাছে তোমার ক্ষমা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। তোমার ক্ষমা না পেলে যে আমি বা আমার মেয়ে কেউই ভালো থাকতে পারবে না কোনোদিন।”

“অনু মা…” তরুণের কথা শেষ হতে না হতেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সুহাসিনী দেবী। সেই দুঁদে ভাব আর তার নেই। তার জায়গায় কেমন যেন নুয়ে পড়া ভাব।

— “অনু মা, সেদিন বড় অন্যায় হয়েছিল তোমার সঙ্গে। আমিই করেছিলাম কিছু ভ্রান্ত জেদের বশে। তার ফলেই বোধহয় ভগবান আমার নাতনিটাকে… তাছাড়া আমার ছেলেও আমার থেকে মানসিকভাবে অনেক দূরে চলে গেছে মা। আমি একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। সন্তান জন্ম না দিয়েও তুমি মা হয়ে উঠতে পেরেছ। একদিন নিজের সবটুকু সুখ এক কথায় ছেড়েছিলে তার জন্য। কিন্তু আমি সন্তান জন্ম দিয়েও তার মন পড়তে চাইনি। নিজের জেদে আলাদা করে দিয়েছিলাম তাকে তার ভালোবাসার থেকে। কিন্তু আজ এই মা আর এক মায়ের কাছে আঁচল পেতে দাঁড়িয়েছে। তুমিই পারো মা আবার আমার ছেলেটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে।”

— “আমি, মানে? কী করব আমি?” — সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে অনুর।

— “আমার ঘরের লক্ষ্মী হয়ে এসো মা তুমি। সব আঁধার যে তুমিই একমাত্র ঘোচাতে পারবে এই সংসারে!”

— “না। সেটা সম্ভব নয়। আমি কোনোভাবেই নিজেকে জড়াতে পারব না এই সবের মাঝে” — বলেই ছুটে বেরিয়ে যেতে গেল অনু। কিন্তু পারল না। পিছন থেকে আঁচলে টান পড়েছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ও। ঘাড় ফেরাল আস্তে আস্তে। ঐশ্বর্য টেনে ধরেছে ওর আঁচল।

— “সুইটি আন্টি তুমি চলে যাচ্ছ! তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?” — কি ভীষণ মায়াবী লাগছে ওর চোখ দুটো। হৃদয়টা মমতায় দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে অনুর। দোলাও ঠিক এইভাবেই ওর আঁচল টেনে ধরতে। ঐশ্বর্যকে জড়িয়ে ধরল এবার অনু। দুজনেরই চোখ দিয়ে ঝরছে নোনতা বৃষ্টির ধারা।

— “একটা কথা বলব আন্টি?”

— “বলো মা”।

— “বাবাই যেমন ঠামকে মামনি বলে ডাকে আমারও খুব ইচ্ছা করে কাউকে মামনি বলে ডাকতে। আমি তোমায় মামনি বলে ডাকব আনটি?”

মনের মধ্যে ঝমঝম বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে অনুর। মা ডাক! কতবার ওর ইচ্ছা হতো দোলার মুখ থেকে মা ডাক শুনতে। কিন্তু দোলা তো বলতে পারত না।

— “আর তুই মানা করিস না অনু মা” — অনুরাধার মাথায় এবার হাত রাখলেন সুহাসিনী দেবী।

— “কিন্তু সেটা আমি পারব না। ‘অন্য সকাল’ আর তার বাচ্চারা যে আমার কাছে অনেকখানি। ‘অন্য সকাল’- এর বাচ্চাদের মাঝেই যে আমি প্রতিদিন নানাভাবে খুঁজে পাই আমার দোলাকে।”

— “আমার আর মিমির জীবনে তোমার থাকার সঙ্গে তো ‘অন্য সকাল’-এর কোনো বিরোধ নেই অনু। আর ‘অন্য সকাল’ তো আর শুধু তোমার একার নয়। ঐ জায়গাটা আমারও, মিমিরও। আর দোলাও মিমির দিদি। তাই ‘অন্য সকাল’-এর সকলের মাধ্যমেই নিজের দিদিকে চিনবে আমাদের মিমি।”

— “প্লিজ মামনি, প্লিজ আমার কাছে থাকো। প্লিজ আমায় ছেড়ে যেও না” — অনুকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে ঐশ্বর্য।

— “নারে সোনা আমিও হয়তো আর তোর ডাক উপেক্ষা করতে পারব না। আমি একবার সন্তানহারা হয়েছি কিন্তু আর হতে পারব না” — মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছে অনু।

— “মিস্টার বক্সী একবার এদিকে আসুন তো” — পুরোনো ভারিক্কী চালে একজনকে ডাকলেন সুহাসিনী দেবী।

— “মিমির মা এসে গেছেন। ওদের তিনজনের একটা সুন্দর ছবি তুলে দিন তো। বড় করে এটা বাঁধিয়ে রাখব আমি।”

— “স্মাইল প্লিজ…” খচ করে ক্যামেরা বন্দি করে নিলেন ক্যামেরাম্যান বক্সী বাবু ছোট্ট পরিবারের হাসিমাখা একটা ছোট্ট টুকরোর ঝলক।

অধ্যায় ৯ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%