লোভ

বরুণ চন্দ

তখন রাত সাড়ে এগারোটা মতো হবে৷ চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিক সিগনালটায় এখন আর লাল-সবুজ বাতির ব্যাপার নেই৷ শুধু হলদে আলোটা একটু পরেই জ্বলছে আর নিভছে৷ ক্রসিং থেকে অল্প একটু পিছিয়ে, রাস্তার ধারে একটা কালো গাড়ি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ এরকম ক্ষেত্রে সাধারণত গাড়ির টেল লাইট জ্বালিয়ে রাখার কথা, সেটা করা হয় নি৷ এর ফলে অনেক সময়ই পেছনের গাড়ি এসে হর্ন বাজাচ্চে৷ এবং তাতেও কাজ না হওয়ায় রাগ করে গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে, ড্রাইভারকে সাপান্ত করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে৷

এই পুরো ব্যাপারটা দূর থেকে একটি লোক অনেকক্ষণ ধরে ওয়াচ করে যাচ্ছে৷ লোকটার নাম জগা৷ পেশায় ছিঁচকে চোর৷ রোতের অন্ধকারে ও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়৷ খোঁজে একা পড়ে ফাঁদে এমন কোনো গাড়ির সন্ধান পাওয়া যায় কি না৷ ধারে কাছে লোকজন না থাকলে সে অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে, গাড়ির পার্টস খুলে নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়৷ একবার তো সে মত্তকা পেয়ে গাড়ির চার-চারটে টায়ারই ঝেঁপে দিয়েছিল৷ গাড়ির মালিক সকালে এসে দেখে গাড়িটা চাকা নয়, সারি করা ইটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে৷

এ গাড়িটার ক্ষেত্রে জগা সেটা করতে সাহস পাচ্ছে না৷ একে তো গাড়িটা বড় রাস্তার ক্রসিং-এর কাছে দাঁড় করানো৷ তার ওপর পেছন থেকে আসা একটা গাড়ির হেডলাইটেও স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে ভেতরে স্টিয়ারিং হুইল ধরে একটা লোক গ্যাঁট হয়ে বসে আছে৷

দেশলাই জ্বালিয়ে জগা একটা বিড়ি ধরায়৷ ওর হাতঘড়িতে রাত প্রায় বারোটা৷ ঘড়িটা অবশ্য পরস্মৈপদী৷ একটা লোকাল ট্রেনের ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জারের থেকে ঝাঁড়া৷

কাজ শুরুর আগে ও চারপাশটা একবার ভাল করে দেখে নেয়৷ অদূরেই যে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংটা-ওটা এখন ঘুট ঘুটে অন্ধকার, শুধু সিঁড়ির আলোগুলো ছাড়া৷ গত পাঁচ মিনিটে এ রাস্তা দিয়ে একটা গাড়িও যাতায়াত করেনি, লোক তো দূরের কথা৷ এবার তাহলে নিরাপদে কাজ শুরু করতে পারে৷

গাছের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে জগা দেয়াল ঘেঁষে সন্তর্পণে এগোয়৷

গাড়িটার আড়াআড়ি এসে ও তামে৷ স্টিয়ারিং হুইল ধরে গাড়ির ভেতরে যে লোকটা—মনে হয় বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কাঁধ থেকে যন্ত্রপাতির ঝোলা নামিয়ে ও চট্‌ করে গাড়ির চাকার পাশে এসে বসে পড়ে৷ টায়ারের হাব ক্যাপ হাপিস করাটা সবচেয়ে সহজ কাজ৷ ওটা শেষ হয়ে গেলে না হয় টেল লাইটের কথা চিন্তা করা যেতে পারে৷ ঝোলা থেকে লোকার খুরপির মতো জিনিসটা বার করে ও হাব ক্যাপের তলায় ঢুকিয়ে চাড় মারে৷ ওর পাকা হাতের প্রেশারে প্রায় নিঃশব্দে সামনের চাকার হাব ক্যাপ ওর হাতে খুলে আসে৷ হামাগুড়ি দিয়ে জগা এবার পিছনের চাকায় চলে যায়৷ খুরপির মতো জিনিসটা হাক কাপের তলায় দিয়ে চাপ দেয় ও৷

কী মুশকিল...শালা খুলছে না কেন? হাব ক্যাপটাকে একটা কাঁচা খিস্তি মারে জগা৷ তারপর খুপরিটাকে আরও ভেতরে ঢুকিয়ে জোর চাপ দেয় ও৷ এবার ঘড়াং করে হাব ক্যাপটা টায়ার থেকে বেরিয়ে আসে, এবং সেটাকে ধরার আগেই মনের আনন্দে ঠং ঠং আওয়াজ করতে করতে গড়িয়ে গড়িয়ে সোজা রাস্তার নালার দিকে চলে যায়৷ একে তো হাব ক্যাপ গড়ানোর মেটালিক আওয়াজ, তারপর জগার ধস্তাধস্তির ফলে গাড়িটায় নিশ্চয়ই বেশ ঝাঁকানি লেগেছিল৷ কেননা পর মুহূর্তেই রাতের নিস্তদ্ধধতা খান খান করে গাড়ির হর্ন প্রচণ্ড জোরে বাজতে শুরু করে৷

এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে সেটা জগা স্বপ্ণেও ভাবেনি৷ পড়ি কী মরি করে সে সব কিছু ফেলে ঊধর্বশ্বাসে বড় রাস্তার দিকে ছোটে৷ আর হবি তো হ’ বড় রাস্তায় পড়েই একটা ব্ল্যাক মারিয়ার মুখোমুখি৷ তৎক্ষণাৎ ডিরেকশন চেঞ্জ করে সে আবার উল্টোদিকে ছোটা শুরু করে৷ ওর চিন্তাটা খুব পরিষ্কার৷ পুলিশের ভ্যান আগে ব্রেক কষবে, রিভার্স করবে, তারপর ওকে তাড়া করবে৷ অত ঝামেলার মধ্যে তারা নাও যেতে পারে৷

বস্তুত হয়তো তাই৷ ব্ল্যাক মারিয়াটা জগাকে ছুটতে দেখে স্লো ডাউন করে, কিন্তু দাঁড়ায় না৷ সাধারণ একটা ছিঁচকে চোরের পেছনে পুলিশের পেট্রোল খরচ করার কোনো মানে হয় না৷

এদিকে গাড়ির হর্ন পঁ-অ-অ-অ-ক করে বেজেই চলেছে৷ দেখতে দেখতে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং-এর নানান ফ্লোরে আলো জ্বলে ওঠে৷

বারান্দায় বেরিয়ে এসে সদ্য ঘুম ভাঙা বাবুরা চেঁচাতে শুরু করে৷

—এই রাত-দুপুরে হচ্ছেটা কী! হর্ন বাজানো বন্ধ করো৷

—কী হল...এখনও থামছে না কেন? দ্বিতীয় ব্যগুি-চেঁচিয়ে ওঠে৷

—সেনট্রি! তৃতীয় আরেক ব্যগুি ওপর থেকে হাঁক পাড়ে৷ গেটে হাঁ করে কী দেখছ? গতরটা নাড়িয়ে যাও গাড়িটার হর্ন বাজানো গন্ধ করো৷

এদের মধ্যে এক উৎযোগী পুরুষ ইতিমধ্যে লালবাজারে ফোনও করে দিয়েছে৷ রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় রাত দুপুরে এরকম ভাবে ঘুমের ব্যাঘাত করা...এগুলো শীঘ্র বন্ধ করা হোক৷ নইলে লোকাল কাউন্সিলরের কাছে অফিসিয়াল কমপ্লেন যাবে৷

ব্ল্যাক মারিয়াটাকে দেখে জগা সেই যে ছুট দিয়েছিল আর থামেনি৷ বড় রাস্তার থেকে যত শীগ্‌গির পারা যায় গলির মধ্যে, সেখান থেকে ছুটতে ছুটতে আরও সরু গলির ভেতর, যেখানে ব্ল্যাক মারিয়া কোনোমতেই ঢুকতে পারবে না৷

শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে থামল সেটা একটা ডেড লেন৷ ওর বিড়ি খাওয়া হাড় জিরজিরে বুক তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে৷ গলা দিয়ে সাঁইসাঁই আওয়াজ৷

তারপরই ওর খেয়াল হল তাড়াহুড়োয় সে ওর যন্ত্রপাতির ঝোলাটা ফেলে এসেছে৷ নিজেকেই নিজে সেই নিয়ে বাপ-মা তুলে মুখ খারাপ করল৷ তারপর ওর বুকের ধড়ফড়ানিটা যখন কমে এসেছে, তখন পাশের রকে বসে সে একটা বিড়ি ধরায়৷ গাড়িটাকে দেখে ওর প্রথম থেকেই একটু ‘পাজল’ লাগছিল৷ ভেতরে কোথায় একটা অস্বস্তির ভাব৷

চিন্তা করতে করতে এখন ওর মনে পড়ে৷ তখন রাত সাড়ে দশটা মতো হবে৷ গাড়িটাকে এসে ও রাস্তার সাইডে দাঁড়াতে দেখে৷ কিছুক্ষণ পর ড্রাইভারের সিট থেকে বেরিয়ে একটা লোক দরজা লক করে চলে যায়৷ তখন তখনই জগা কাজে লাগতে পারছে না, পাছে লোকটা আবার ফিরে আসে৷ এরপর বেশ কিছু সময় কেটে গেছে৷ ও অন্য একটা গাড়ির হেডলাইটে দেখতে পেল ড্রাইভারের সিটে একটা লোক বসে আছে৷

এখন, সেটা কী করে হয়? ড্রাইভারটাকে তো ও বেরিয়ে আসতে দেখেছে৷ সে ব্যাপারে ও হানড্রেড পারসেন্ট ডেফিনিট৷ পুরো ব্যাপারটাই ঘোলাটে লাগে ওর৷

যাই হোক বাবা এখন কয়েকদিন ও সম্পূর্ণ গায়ে ঢাকা দিয়ে থাকবে৷ রাতে বেরনোর কোনো সিন নেই৷

বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মধ্যে ধরে জ্বলন্ত বিড়িটার সে এক্সপার্টলি ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলে৷

—আচ্ছা...ব্যাপারটা কী হয়েছে বলো তো? ফাইল থেকে চোখ না সরিয়ে আর জিজ্ঞেস করে৷

লালবাজারে সিনিয়র ডিটেকটিভ অফিসার অবিনাশ রায়ের অফিস ঘর৷ সামনে ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রদ্যোৎ বসে আছে৷

—বড় সাহেবের কাছে সাউথ ক্যালকাটা সিটিজেন্স ফোরাম নাকি একটা কমপ্লেন পাঠিয়েছে যে ওদের এলাকায় রাত দুপুরে কেউ বা কারা গাড়ির হর্ন বাজিয়ে লোকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে ইত্যাদি, ইত্যাদি৷

—স্যার, মাথা চুলকে প্রদ্যোৎ বলে—ব্যাপারটা বোধহয় অত হালকা নয়৷

ল্যান্সডাউন একটা ট্রাফিক সিগনালের কাছে ঘটনাটা ঘটে৷ রাস্তার ধারে একটা গাড়ি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল৷ তার স্টিয়ারিং হুইলে আবার একজন লোক বসে৷ কোন এক ছিঁচকে চোর গাড়িটার হাব ক্যাপ চুরি করতে গেলে লোকটির মাথা স্টিয়ারিং হুইলে গিয়ে ঠেকে৷ এবং তার ফলেই গাড়ির হর্ন একটানা বেজে যায়৷

—আশ্চর্য তো! চোর গাড়ির হাব ক্যাপ খুলে নিয়ে যাচ্ছে, আর লোকটা কিছু বলল না?

—না স্যার৷ অবশ্য লোকটির বলার কথাও নয়৷ হি ওয়াজ কোয়াইট ডেড দেন!

—বলো কী! গাড়ির চালাতে চালাতে হার্ট অ্যাটাক?

—উঁহ৷ প্রদ্যোৎ মাথা নাড়ে৷ পুরো ব্যাপারটাই একটা ফ্লেশ আপ বলে মনে হচ্ছে৷ এবং অত্যন্ত প্রফেশনালি করা৷ গাড়ির ভেতরের লোকটা বোধহয় আগেই মারা গিয়েছিল৷ কেননা, বডিতে রাইগার মরটিস হ্যাড সেট ইন৷

রায়ের সঙ্গে থেকে থেকে প্রদ্যোৎও আজকাল ঘনঘন ইংরেজি শব্দর ব্যবহার করে৷ চেয়ার টেনে রায় টানটান হয়ে বসে৷

—গাড়ির ওনার কে সেটা জানা গেছে?

—না স্যার৷ তবে, গাড়িটা এখানকার নয়৷ ওড়িশার নেম প্লেট৷ আমি অবশ্য খবর পাঠিয়ে দিয়েছি নাম্বারটা ট্রেস করার জন্য৷

—গুড৷ আর, ডেডবডিটা? ওটা আইডেনটিফাই করা গেল?

—এখনও না স্যার৷

—জানো...ছুট কুড বি আ ক্লেভার বয়৷ থুঁতনির তলায় রায় দু’হাতের আঙলি জড়ো করে৷ গাড়িটায় যেহেতু বাইরের নাম্বার প্লেট, স্বভাবতই—হতে পারে যে তাহলে ডেডবডিটাও নিশ্চয়ই বাইরেরই হবে৷

—আপনি বলছেন ওটা ‘রেড হেরিং’?

—একজ্যাক্টলি৷

রেড হেরিং-এর মানে কী সেটা রায় প্রদ্যোৎকে অনেকদিন আগেই এক্সপ্লেন করেছে৷

—এনি আইডিয়া লোকটাকে কীভাবে মারা হয়েছে? এনি ইনজুরি মার্কস?

—হ্যাঁ স্যার৷ বুলেট মার্ক...একটাই৷ কপালের ঠিক মাঝখানে৷ ক্লোজ রেঞ্জ থেকে গুলিটা করা হয়েছে বলে মনে হয়৷ বারুদের ছাপ রয়েছে স্কিনে৷

—ইন্টারেস্টিং৷ পেপারওয়েট হাতে নিয়ে রায় অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করে৷

—বডিটায় স্ট্রাগলিংয়ের কোনো চিহ্ণ আছে? শরীরে কোথাও স্ক্র্যাব মার্কস?

—না...চোখে পড়েনি স্যার৷

—তার মানে...হয় তাকে হাতে পায়ে বেঁধে সামনের থেকে গুলি করা হয়েছে৷ কিংবা, তাকে ড্রাগ করে তারপর চেয়ারে বা কিছুতে বসিয়ে মারা হয়েছে৷ ইনসিডেনটানিল, গাড়ির ভেতরে কোনো খালি কারট্রিজ পাওয়া গেছে?

—না স্যার৷ ওটা সবচেয়ে আগে ঠিক করেছিলাম৷ আর, তাছাড়া গাড়ির ভেতরে গুলি করা হলে কোথাও না কোথাও রগুের দাগ থাকত৷

—ঠিক কথা৷ তার মানে লোকটিকে ধরে বেঁধে, তারপর মারা হয়েছে৷ সেক্ষেত্রে লোকটির বাড়িতে ফিজিক্যাল এভিডেন্স থাকবে৷

—যেমন?

—যেমন, পেছনে হাত নিয়ে যদি শগু করে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়, তাহলে লোকটির রিস্টে বাঁধনের দাগ থাকার কথা৷ কিংবা স্কিনে অ্যাব্রেশন৷

—অ্যাব্রেশন?

—মানে...চামড়া ছড়ে যাওয়া৷

—না...ওটা তো দেখা হয়নি স্যার৷

—আরও আছে৷ মারার আগে লোকটিকে ড্রাগ করা হয়ে থাকলে তার পেটে ড্রাগের রেসিউড পাওয়া যাবে৷

—রাইট স্যার৷

স্যারের ইনস্ট্রাকশন নোট করে প্রদ্যোৎ বেরিয়ে যায়৷

বিকেলবেলায় রায়ের কাছে প্রদ্যোতের কল আছে৷

—স্যার কি খুব ব্যস্ত?

—না...নট পারটিকুলারলি৷ কেন বলো তো?

—একবার মর্গে আসতে পারবেন?

—মর্গে... কেন ওই লোকটির পোস্টমরর্টেম হচ্ছে?

—হ্যাঁ স্যার, আপনি এলে একবার ভাল হয়৷

—আচ্ছা আসছি৷ ডক আছে?

—আছেন স্যার৷

ডাগুার সৌমেন চৌধুরি৷ সংক্ষিপ্তভাবে ডক৷ ডিপার্টমেন্ট-এর অফিসিয়াল করোনার৷ কাজ খুব ভাল বোঝে৷ এবং মগজটা একদম পরিষ্কার৷ যার জন্য ডক-এর কুৎসিত স্ববাব সত্ত্বেও রায় ওকে পছন্দ করে৷

ডক্‌-এর অবশ্য অন্যান্য গুণাবলিও আছে৷ পিপের মতো মদ খেতে পারে৷ কিন্তু কখনও মাতাল হয় না৷ মাথায় আয়নার মতো চকচকে টাক৷ আর সেটাকে অক সেট করার জন্য বেশ ঘন একটা ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি৷ নিজের সম্বন্ধে ডক-এর একটা স্ট্যান্ডার্ড লাইন আছে৷ ভগবান যেটা মাথার ওপরে দেননি, সেটা মাথার ভেতরে বেশি করে দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন৷

—হ্যালো ডক৷

রায় সোজাসুজি করোনারের চেম্বারে পৌঁছে গেছে৷

—চ্যালাটা ভালই জুটিয়েছ৷ প্রদ্যোতের দিকে ডক্‌ ইঙ্গিত করে দেখায়৷

—কাজটা চট্‌পট পিক আপ করে নিয়েছে৷ ভেতরে চলো৷

রায়কে ডক মর্গের ভেতরে নিয়ে যায়৷ লম্বা ঘরে পর পর ডেডবডি টেবিলের ওপরে শোয়ানো৷ প্রত্যোকটা বডিই সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা৷

—দিস ওয়ান৷ ডক একটা বিশেষ টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়৷ কাপড় সরিয়ে রায় একবার ডেডবডিটার দিকে তাকায়৷

—হুঁ...নন এরিয়ান ফিচারস৷ পুরু ঠোঁট, চওড়া নাক, কোঁকড়া চুল, স্মাইলিং রিসিডিং ফোরহেড৷

—বুলেটটা ক্লোজ রেঞ্জ থেকে মারা হয়েছে৷ মাথার পেছনে ক্লিয়ার ইনমিশন রয়েছে৷

আলগোছে শবদেহর হাত তুলে রায় রিস্টের ভেতরটা স্টাডি করে৷ তারপর রেখে দেয়৷

—হাত বাঁধা হয়নি দেখছি৷ পেটে রেসিউড?

—আপনার কথাটা প্রায় ঠিক৷ লোকটিকে ড্রাগ করে মারা হয়েছে ঠিকই, তবে ওষুধ খাইয়ে নয়, ইনজেক্ট করে৷ হাতে ইনজেকশনের চিহ্ণ পাওয়া গেছে৷

—চলো৷ বডিটা রায় আবার ঢেকে দেয়৷ এখানে ঠান্ডায় জমে লাভ নেই৷ ফিলে গিয়ে ওরা আবার ডকের চেম্বারে বসে৷

—কফি চলবে? ডক্‌ জিজ্ঞেস করে৷

চেম্বারের কোনায় ডক একটা ইমপ্রোভাইজড প্যানট্রি তৈরি করে নিয়েছে৷ তাতে ইলেকট্রিক কেটল, ডেয়ারি হোয়াইটনার, কফি পাউডার, টি ব্যাগ—সব কিছু আছে৷

ইলেকট্রিক কেটলে জল ভরে ডক্‌ গরম হতে দেয়৷ সেলফের নীচের তাক থেকে মোটা মোটা সাদা সেরামিকের মাগ বার করে, তাতে চামচ ভরে কফি পাউডার ঢালতে থাকে৷

—আমারটা হালকা লিকার৷ রায় মনে করিয়ে দেয়৷

বছর দুয়েক আগে রায়ের পেটে আলসার ধরা পড়ে৷ তারপর থেকেই রায় চা-কফি খাওয়ার ব্যাপারে একটু সাবধানে৷

—মালও খেল না...এদিকে পেটে আলসার৷ ডক ভুরু তুলে অতি নাটকীয় ভাবে ভগুি করে৷

—প্রদ্যোৎ...রায় ডকের কথায় কান দেয় না৷ ল্যান্সডাউন ক্রসিং-এ খুব সম্ভবত সিসি টিভি ইনস্টল করা হয়েছে৷ একবার চেক করো তো৷

ওয়েস স্যার৷

ফোন করার জন্য প্রদ্যোৎ ঘরের বাইরে চলে যায়৷ যে কোনো কারণেই হোক ডকের চেম্বারে ফোন লাগতে চায় না৷ একটু পরেই ও ফিরে আসে৷

—আছে স্যার৷

—গতকাল রাতের ফুটেজটা দরকার৷ অ্যারেঞ্জ করতে পারবে?

—অবশ্যই স্যার৷

কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে রায় ডকের দিকে তাকায়৷

—এনিথিং স্পেশাল অ্যাবাউট দ্য বডি?

—নাথীি অ্যাজ মাচ৷ ডক শোলডার শ্রাগ করে৷

—বাট দেয়ার ইজ সামথিং৷ তোমার মুখ সেটা বলছে৷

—ফাস্ট একটা জিনিস ইনট্রিগিং লাগছে৷ লোকটাকে মারা হয়েছে অনেক আগে৷ তাহলে ওকে ওরকম করে গাড়িতে বসানো হল কীভাবে? বডিটা তো অনেক আগেই স্টিফ হয়ে যাওয়ার কথা৷

ঠোঁটে আঙুল রেখে রায় একটুক্ষণ চিন্তা করে৷

—দুটো পসিবিলিটি৷ এক, লোকটিকে গাড়ির মধ্যেই গুলি করা হয়েছে৷ সেটা খুবই আনলাইকলি৷ আর দুই—লোকটিকে মারার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসানো হয়৷

—গাড়ি চালানোর ভঙ্গিতে? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷

—একদম তাই৷ কিন্তু...তাহলে আরেকটা প্রবলেম দেখা দিচ্ছে৷ রায় চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়ে৷ রাস্তা দিয়ে লোকটিকে নিয়ে আনা হল কীভাবে৷ বুলেট হল টাতো সবারই চোখে পড়বে৷

—ওহ স্যার...একটা জিনিস আপনাকে বলা হয়নি৷ গাড়ির বুট-এ একটা টুপি পাওয়া গিয়েছে৷ ফেল্ট হ্যাট৷

—আহ্‌! দ্যাট এক্সপ্লেনস৷ টুপিটা একবার দেখতে পাওয়া যাবে?

—ওটা এখানেই আছে স্যার৷ ফরেনসিক টেস্ট করতে আনা হয়েছে৷

ইনটারকমে ডক ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট-এ ফোন করে৷

—ইফ আই অ্যাম নট সিমটেকন...টুপিটার ভেতরে রগুের দাগ থাকার কথা৷

—মানে...আপনি বলছেন বুলেট হলটা ঢাকার জন্য মৃত লোকটিকে টুপি পরানো হয়? প্রদ্যোৎ বিস্মিত হয়ে মাথা নাড়ে৷ এটা কেন খেয়াল হয়নি আমার৷

টুপিটা আসার পর দেখা গেল সত্যি সত্যি ওর ভেতরের লাইনিং-এ শুকনো রগুের দাগ৷

—তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আড়মোড়া ভেঙে রায় উঠে দাঁড়ায়৷

—লং ড্রাইভ?

ওরা যখন বেরিয়ে আসতে তখন ডক পেছন থেকে বলে ওঠে, আজ সন্ধেবেলায় একবার বৃদ্ধাশ্রমে যাবে নাকি?

ডকের দিকে রায় ফিরে তাকায়৷

—বেশি না...জাস্ট দু’টো৷

গাড়িতে চড়ার সময় প্রদ্যোৎ আর জিজ্ঞেস না করে পারে না৷

—স্যার...বৃদ্ধাশ্রমটা কী মিন করে?

—ওহ দ্যাট! রায়ের মুখে মুচকি হাসি৷—ক্যালকাটা ক্লাব৷

পরের দিন সকালে রায়ের কামরায় প্রদ্যোৎ হন্তদন্ত হয়ে হাজির৷

—গুড নিউজ স্যার৷

—সাতসকালে গুড নিউজ...অতি উত্তম!

ফাইল সরিয়ে রায় প্রদ্যোতের কথায় মন দেয়৷

—প্রথম সুখবর, ওড়িশা থেকে কার গাড়ি চুরি গেছে তার খোঁজ আমরা পেয়েছি৷ এমনকী ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাও হয়েছে৷ নাম পীযূষ রাউথ৷ ভুবনেশ্বরের কাছাকাছি জমিদারি এসটেট৷ গতবার ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয়ে ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিল৷ তবে, জিততে পারেনি৷

এমন সময় রায়ের ল্যান্ডলাইন বেজে ওঠে৷ ‘মিটিং-এ রয়েছি’ বলে রায় ফোন কেটে দেয়৷

—এখন ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হল ভদ্রলোকের গাড়ি চুরি গেছে দুসপ্তাহের ওপর৷ এতদিন হয়ে গেছে বলে গাড়ি পাওয়ার আশা ওরা মোটামুটি ছেড়ে দিয়েছিল৷ কলকাতায় তার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তার গাড়ি এখনও অটুট আছে শুনে রাউথ খুবই খুশি৷ কিন্তু তার ভেতর আবার এক মৃতদেহ পাওয়া গেছে জানতে পেরে সে অত্যন্ত বিচলিত৷ জানতে চাইছিল মার্ডারড লোকটি কে৷ তার কোনো পরিচয় গেছে কিনা না৷

—অর্থাৎ, মিস্টার রাউথের গাড়ি পার্টস হিসেবে বিক্রির জন্য চুরি করা হয়নি সেটা আমি নিশ্চিত হলাম৷ আর...দ্বিতীয় সুখবরটা কী?

—ল্যান্সডাউন রোড ক্রসিংয়ের সিসি ফুটেজ পাওয়া গেছে৷ চাইলে আপনি দেখতে পারেন৷

—এক সেকেন্ড৷ তার জন্য আমাদের কোথায় যেতে হবে?

—কোথাও না স্যার৷ এই লালবাজারে বসে দেখতে পাবেন৷ মনিটর রুমে৷

—স্টপ!

স্ক্রিনে সিসি টিভির ফুটেজ দেখতে দেখতে রায় হঠাৎ এক জায়গায় হাত তোলে৷

—গো ব্যাগ এ লিটল৷

অপারেটর পিকচার রোল ব্যাক করতে থাকে৷

—বেশি না...ব্যস! ওই যে লোকটা ছুটে বেরিয়ে আসছে ওর ওপরে ফ্রিজ!

অপারেটর একটা বিশেষ ফ্রেম-এ পিকচার ফ্রিজ করে৷

—লোকটার ক্লোজ আপ চাইছিলাম...হ্যাঁ...এবার মুখটা ম্যাগনিফাই করা যায়?

—কি প্যাডের একটা বিশেষ অংশে ট্যাপ করতে মুখটা বড় হয়ে দেখা দেয়৷

—একী! মুখটাতো ফার্জি হয়ে গেল৷ আর শার্পনেস আনা যাবে না?

—না স্যার৷ এমনিতেই খুব লোক লাইট, তার ওপর লোকটা ছুটে আসছে, তাই কোনো ফ্রেমই শার্প ফোকাসে নেই৷

—বুঝলে...রায় স্ক্রিনের ফার্জি ইমেজের দিকে পয়েন্ট আউট করে৷—এই খুব সম্ববত আমাদের ছিঁটকে চোর৷ ওকে আইডেনটিফাই করতে পারলে সুবিধে হত৷

-মনিটর রুমের অপারেটর আমতা আমতা করে৷

—স্যার, এ মেশিনে এর বেশি শার্পনেস আনা মুশকিল৷

—বুঝলাম৷ রায়ের গলায় হতাশার রেশ৷

—স্যার...আমি একবার আমার সোর্সে চেষ্টা করব?

প্রদ্যোতের অতীত সম্বন্ধে রায় মোটামুটি অবহিত৷ এক কালের সুকল ড্রপ আউট৷ রাস্তায় চেন এবং হকিস্টিক নিয়ে মারামারির ইতিহাস৷ যার প্রমাণস্বরূপ এখনও কপালে তিনটে স্টিচের চিহ্ণ রয়েছে৷ পুলিশে জয়েন করার পর আন্ডারওয়ার্ল্ড-এ ওর অনেক ইনফরমার৷

কয়েক বছর আগেকার কথা মনে পড়ে ওর৷ একটা কিডন্যাপিং কেস-এর সমাধানের জন্য প্রদ্যোৎ পার্কসার্কাসের এক অত্যন্ত খারাপ সি গ্রেড সিনেমা হলে, ‘শো’ চলাকালীন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ডনের সঙ্গে মিটিং করে দিয়েছিল ওর৷

—ঠিক আছে৷ দেখো কী করতে পারো৷

প্রদ্যোৎ মনিটর রুম থেকে বেরিয়ে যায়৷ মাথার পেছনে হাত তুলে রায় চুপ করে বসে থাকে৷

—আচ্ছা...এতক্ষণ যে ফুটেজটা দেখালেন সেটা কোন সময়ের বলা যাবে?

—হ্যাঁ...পুরো ফুটেজের টাইমার রয়েছে৷

অপারেটর কমপিউটার থেকে রিড করে বলে৷

—রাত এগারোটা পঞ্চাশ৷

—এর আগের ফুটেজও দেখতে পাওয়া যাবে?

—অবশ্যই৷

—তাহলে আমাকে দেখান৷

স্ক্রিনে ছবি দেখতে দেখতে একসময় একটা লোককে ক্যামেরার দিকে হেঁটে আসতে দেখা যায়৷ তার মুখ কিন্তু বেশ স্পষ্ট দেখা যাবে৷

—স্টপ৷

পার্ক স্ট্রিট আর লোয়ার সার্কুলার রোডের ক্রসিং-এর কাছেই মল্লিক বাজার৷ গাড়ি সংক্রান্ত যা কিছু চোরদ্ধাই মাল, তা শেষ পর্যন্ত মল্লিক বাজারে এসে হাজির হয়৷

এখানেই একটা মুসলমান কাবাবের দোকানে বসে প্রদ্যোৎ ‘বড়া’ কাবাব আর পরোটা অর্ডার দেয়৷ একটু পরেই চোখে সুরমা পরা এক মাঝবয়সি লোক ওর পাশের টেবিলে এসে বসে৷ কপেক থেকে কালো সিল্কের রুমাল বার করে সে মুখের ঘাম মোছে৷ তারপর, একটা স্পেশাল চা অর্ডার দেয়৷ পিরিচে চা ঢেলে সশব্দে চা খায় এবং নিজের মনেই কী যেন বিড় বিড় করে কথা বলে৷

আপাতদৃষ্টিতে এটা স্বগতোগুি মনে হলেও আসলে তা নয়৷ খুব খেয়াল করলে দেখা যাবে সাথে সাথে প্রদ্যোতেরও ঠোঁট নড়ছে৷ চাপা গলায় সেও যেন কিছু বলছে৷

চা খাওয়া শেষ করে সুরমা পরা লোকটা উঠে চলে যায়৷ টেবিলে দোকানের মালিককে পয়সা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না৷ পরোটা মাংস খাওয়া হয়ে গেলে প্রদ্যোৎ ও উঠে পড়ে৷ বেরবার সময় মালিকের টেবিলে নিজের খাবারের সঙ্গে স্পেশাল চাঁর দামটাও চুকিয়ে দেয়৷

ও জগা...তুই রাত ক’টার থেকে এই গাড়িটাকে ওয়াচ করে যাচ্ছিস? জগা ভাববার চেষ্টা করে ক’টা বললে দারোগা বাবু খুশি হবে৷ জগাকে প্রদ্যোৎ পার্ক স্ট্রিট থানায় নিয়ে এসেছে৷ জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ওর চোখে অবশ্য প্রদ্যোৎ দারোগা বাবুই৷ ও এখনও বুঝতে পারছে না৷ পুলিশ গতকাল রাত্তিরের ঘটনা থেকে কী করে ওকে থানায় ধরে নিয়ে এল৷ ও যখন গাড়ির হাব ক্যাপ চুরি করছিল তখন ও হলপ করে বলতে পারে রাস্তায় একটাও লোক ছিল না৷

—স্যার সময়টা তো ঠিক বলতে পারব না৷ আমি কি আর...

কথাটা বলেই ও মনে মনে জিভ কাটে৷ কেননা দারোগা বাবুর চোখ ততক্ষণে ওর হাত ঘড়িতে নেমে এসেছে৷ আর যখন দারোগা বাবুর তাতে চোখ পড়েছে তখন গড়িটা খুলে দেওয়াই ভাল৷ রাতে দাওয়াইটা পিঠে কম পড়তে পারে৷ কাঁচুমাচু মুখ করে জগা হাত ঘড়িটা খুলে টেবিলে রাখে৷

চোখ অর্ধেক বন্ধ করে প্রদ্যোৎ মাথা নাড়ে৷

—চোরাই মাল পরি না, তুই স্বচ্ছন্দে ওটা পরে থাকতে পারিস৷

অবাক বিস্ময়ে জগা প্রদ্যোতের দিকে তাকায়৷ ও কল্পনা করতে পারে না কোনো পুলিশের লোক এ কথা বলছে৷

—আচ্ছা, সময়টা না হয় না বলতে পারলি৷ কিন্তু কাল গাড়িটা যখন এসে দাঁড়াল সেটা দেখেছিস?

—হ্যাঁ৷ ঘাড় কাত করে জগা জানায়৷

—তারপর কী হল সেটা বল...

—পেছনের লাল বাতি জ্বালিয়ে গাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইল৷ আমি ভাবলাম ইঞ্জিনের কোনো গন্ডগোল হল কি না৷ গিয়ে ঠেললেও তো দশ-বিশ টাকা পাওয়া যাবে৷

—তারপর?

—তারপর একটা সময় একজন লোক ড্রাইভারের সিট থেকে বেরিয়ে এল৷ চারদিকে একবার ভাল করে তাকাল, তারপর গাড়ির চাবিটা লাগিয়ে চলে গেল৷ আমি ভাবলাম হাগু-টাগু পেয়েছে বোধহয়৷ চাপতে না পেরে করে আসতে গেছে৷ আমি দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়ে আছি, লোকটা আর আসেই না৷ তখন আমি যন্তরপাতি নিয়ে এগোচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে একটা গাড়ির হেডলাইটে স্পষ্ট দেখলাম একটা লোক ড্রাইভ সিটে বসে আছে৷ একদম ‘পাজল’ হয়ে গেলাম৷

—পাজল হয়ে গেলি?

—হ্যাঁ...জগা বুঝতে পারে না ‘যে এ সাধারণ ব্যাপারটা দারাগো বাবু কেন বুঝতে পারছে না৷ ড্রাইবারটা তো চলে গেছে, তাহলে সিটে লোকটা বসে থাকবে কী করে?

প্রদ্যোৎ এবার মাথা নাড়ে৷

—লোকটা কোনদিকে গেল দেখেছিলি?

জগা মাথা নেড় ‘হ্যাঁ’ জানায়৷

—বড় রাস্তার দিকে৷

—তুই শিওর?

—আমি ভাবলাম...এদিকে গাছের তলায় করতে আসবে...আসেনি৷

—নে জগা...এবার তুই আসতে পারিস৷

--প্রদ্যোৎ ঘাড় নাড়িয়ে দরজা দেখায়৷

চোখ ফ্যাল ফ্যাল করে জগা দাঁড়িয়ে থাকে৷ ওর ধারণা ছিল এরপর পেটাই পর্ব শুরু হবে৷

—আর শোন ঘড়িটা লুকোতে হবে না৷ নেওয়ার হলে আগেই নিতাম৷ জগা একবারে অভিভূত৷ কী করবে ভেবে না পেয়ে সোজা প্রদ্যোতের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়৷

—আরে...কী করিস! প্রদ্যোৎএক লাফে পিছিয়ে যায়৷

—নে উঠে পড়...আর ঢং করতে হবে না৷

মাটি থেকে উঠে জগা হাত দিয়ে বার বার প্রদ্যোৎকে পেন্নাম ঠোকে৷ তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়৷

প্রদ্যোৎ যখন ফিরে আসে স্যার তখন নিজের কামরায় চলে এসেছে৷ টেবিলের ওপর খোলা ফাইল পড়ে আছে৷ কিন্তু, স্যারের দৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরে৷ প্রদ্যোৎকে দেখে রায় খুশি হয়৷

—লোকটির কোনো খবর পাওয়া গেল?

প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়৷

—লোকটার নাম জগা৷ উল্টোডাঙার এক বস্তিতে থাকে৷ চাইলে আপনি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারেন৷

—এখুনি হয়তো তার দরকার হবে না৷ তবে, লোকটি কী বলল শুনি? কাল গাড়িটা রাস্তায় দাঁড়ানোর পর থেকে যা কিছু ঘটেছিল প্রদ্যোৎ তার বিবরণ দেয়৷

শুনে রায়কে প্রসন্ন দেখায়৷ একবার যেন নিজের মনে নডও করল মনে হয়৷ কিন্তু এনিয়ে স্যারের সঙ্গে ওর কোনো কথা হয় না৷

—আচ্ছা...গাড়িটাতো ওড়িশার?

—হ্যাঁ স্যার৷

—আর যার গাড়িটা চুরি গেছে, ফোনে তোমার সঙ্গে তার কথাও হয়েছে?

—ইয়েস স্যার৷

—হুঁ৷ মাথার পেছনে দু’হাত রেখে রায় কী যেন ভাবে৷

—মৃত লোকটিকে এখনও আইডিনটিফাই করা যায়নি?

—না স্যার৷

—প্রদ্যোৎ...আমাদের একবার ওড়িশার যেতে হবে মনে হচ্ছে৷

প্লেন থেকে নেমে রায় আর প্রদ্যোৎ লাগেজ আসার জন্য অপেক্ষা করছে, এমন সময় রায়ের নাম মাইকে ঘোষণা করা হয়৷ বাইরে ওঁর জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে৷ রায় একটু অবাক হয়ে প্রদ্যোতের দিকে তাকায়৷ ডিপার্টমেন্ট থেকে গাড়ি পাঠাল? কিন্তু আমরা যে আসছি সেটাতো ওদের জানার কথা নয়৷ তুমি কি ওদের কোন ব্যবস্থা করতে বলেছ?

—না স্যার৷ আমি তো জাস্ট গাড়িটার ওড়িশার নাম্বার প্লেট জানিয়ে ওনারের খোঁজ নিয়েছিলাম৷ আমাদের এখানে আসার কথা ওদের জানানো হয়নি৷ প্রদ্যোতের দিকে তাকিয়ে রায় হাসে৷

—আমার মনে হয় এটা মিস্টার রাউথের বদান্যতা৷ ওকে তো জানানো হয়েছিল আমরা ওর সঙ্গে সদখা করতে আসছি৷

কার্যত হয়ও তাই৷ বাইরে বেরিয়ে ওরা দেখে সাদা উর্দি পরা ড্রাইবার রায়ের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছে৷

ইচ্ছে করেই রায় ওই গাড়িটায় চড়ে না৷

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে রায় একটা নাম্বারে ফোন করে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা গাড়ি ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়৷

ভুবনেশ্বরে গাড়ি এবং হোটেলের ব্যবস্থা রায় কলকাতা থেকেই করে এনেছে৷

পীযূষ রাউথের বাড়ি শহর থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে৷ বাড়ি না বলে প্রাসাদই বলা চলে৷ ওরা যখন সেখানে পৌঁছায় মিস্টার রাউথ তখনও নীচে নামেনি৷ ওদের একটা ড্রইংরুমে গিয়ে বসানো হয়৷ বিরাট হলঘর৷ মেঝেতে দামি ফরাস পাতা৷ সিলিং-এ ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে৷ দেয়ালে ফ্যামিলি ফটোগ্রাফ সোনালি ফ্রেম দিয়ে বাঁধানো৷ কৌতূহলী হয়ে রায় ছবিগুলো দেখে৷

—ওহ...আপনারা এসে গেছেন৷ রাউথের হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে তোলা৷ কিন্তু গলায় অনুযোগের সুর৷ এটা কিন্তু আপনারা ঠিক করলেন না স্যার৷

—কোনটা বলুন তো?

—এই যে...আপনাদের জন্য গাড়ি পাঠালাম, আপনারা নোলেন না৷ আপনাদের এখানে থাকার সব বন্দোবস্ত করা হয়েছে৷ আপনারা সেটাও গ্রহণ করলেন না৷

—প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড৷ অন ডিউটি রয়েছি তো, কারও কাছ থেকে ফেভার নেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ হয়ে যাবে৷

—যাকগে রাতের ডিনারটা কিন্তু আমাদের সঙ্গে করে যেতেই হবে৷ অন্তত এটুকু আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন নিশ্চয়ই৷

—সে দেখা যাবেখন৷ হাসিমুখে রায় অফারটা এড়িয়ে যায়৷ আগে কাজের কথা সেরে নিই৷

—উঁহূ...কাজের কথা পরে হবে, আগে চা-জলখাবার৷

অল্পক্ষণের মধ্যেই চা আসে, এবং তার সাথে বিবিধ প্লেটে চপ, কাটলেট, মিষ্টি ইত্যাদি৷

—ও বাবা! এ যে একেবারে রাজকীয় ব্যাপার!

—এককালে তো তাই ছিলাম৷ এখন তার আর কিছুই নেই৷ যা পেরেছি যৎসামান্য আয়োজন করেছি মাত্র৷ —প্রদ্যোৎকে বাধ্য হয়েই কিছু খেতে হয়৷

—আর কিছু না খান, মিষ্টির মধ্যে রসগোল্লাটা খান৷ আপনাদের মতে অবশ্য রসগোল্লা কলকাতার আবিষ্কার৷ কিন্তু, আমাদেরটা খেলেই বুঝতে পারবেন সত্যিটা কী?

—আচ্ছা...আপনার গাড়িটা কী করে চুরি হল বলুন তো?

—সেটাই আশ্চর্যের কথা বুঝলেন৷ আমি শহরে গেছি ব্যাঙ্কের একটা কাজে৷ বেরিয়ে এসে দেখি গাড়ি মিসিং৷

—কেন...আপনার ড্রাইভার গাড়িতে ছিল না?

—তা না...এটা শখের গাড়ি...আমিই চালাই৷ ড্রাইভারের হাতে দিই না৷ তা, আমার গাড়িটা কবে ফেরত পাওয়া যাবে?

—এই কেসটা নিষ্পত্তি হয়ে গেলেই রিলিজ করে দেব৷ আর বেশি সময় লাগার কথা নয়৷

—দ্যাটস গুড৷ কারা এ জঘন্য কাজটার পেছনে জানতে পারলেন?

রায় নড করে৷ কিছু প্রশ্ন ছিল...এখানে এসে তার সমাধান হয়ে গেছে৷

—তাই নাকি? বলুন না প্লিজ...আই অ্যাম ডাইং টু নো৷

—আপনি বলেছেন যে এ গাড়িটা আপনার বড় শখের৷ আপনি নিজে চালান৷ অন্য কারও হাতে দেন না৷

—হ্যাঁ...যেটা সত্যি সেটাই...

—আর আমি যদি বলি ব্যাঙ্কের বাইরে থেকে গাড়িটা চুরি হওয়াটা সম্পূর্ণ সাজানো? ওটা আপনার ড্রাইভারই চালিয়ে নিয়ে গেছে?

—এ আপনি কী বলছেন? রাউথ একদম স্তম্ভিত৷ আমি থানায় গিয়ে এফ. আই. আর করলাম আর আপনি বলছেন...

—পুরোটাই স্টেজড৷ এই কিছুক্ষণ আগে বাইরে দাঁড়িয়েছিল, আপনারই ড্রাইভার না?

—হ্যাঁ...সো?

—আমি যদি বলি আপনার ‘শখের’ গাড়ি আপনারই ড্রাইভার চালিয়ে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছয় এবং একটা অন্ধকার গলি মত দেখে গাড়িটাকে ডাম্প করে?

—অ্যাবসার্ড কথা৷ রাউথ হো হো করে হেসে ওঠে৷ —বাট মাইনড হোয়াট ইউ আর সেয়িং মিস্টার রায়...আমি কিন্তু আপনাকে ডিফ্যামেশনের জন্য ‘সু’করতে পারি৷

রায়ের মুখে মৃদু হাসি৷

—আমার কাছে কিন্তু ডকুমেনটারি এভিডেন্স আছে৷

বড় লেদার ব্যাগ থেকে রায় তার ল্যাপটপটা বার করে চালায়৷

—এই জায়গাটা...দেখুন তো চিনতে পারেন কি না৷

ল্যাপটপে তখন ল্যান্সডাউন রোড ক্রসিংয়ের সিসি টিভি’র ছবি চলছে৷ রাউথের ড্রাইভারকে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়৷

—একটু দূরে পার্ক করা...ওটা আপনারই গাড়ি৷ দেখুন...চিনতে পারেন কি না৷

—আ...আ...আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না৷ এটা কী করে সম...

—নাটকের প্রয়োজন নেই মিস্টার রাউথ৷

—না না...উত্তেজিত হয়ে রাউথ উঠে দাঁড়ায়৷ আমার নিজের ড্রাইভার...আমার সঙ্গে এইভাবে বেইমানি করল...এটা আমাকে অবশ্যই দেখতে হবে৷ বিশ্বাস করুন...রাউথ রায়ের দিকে হাত জোড় করে বলে—ও আমার কাছে দেশে যাবে বলে এ ঘটনাটার একদিন আগে ছুটি নিয়েছিল৷ ফর দিস? ওর মনিবের গাড়ি চুরি করার জন্য?

—অত উত্তেজনা ভাল না মিস্টার রাউথ...হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে৷ তার চেয়ে বেটার হয় আপনি বসে আমার কথাটা শুনুন৷

—কী বলছেন আপনি...রাউথের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে৷ —মনতোষ ড্রাইভারকে ডেকে আনো৷ রাউথ গলা উঁচু করে বলে৷—আজ ওর কী হয় আমি দেখছি৷ কার না কার ডেড বডি গাড়িতে তুলে আমাকে ইমপ্লিকেট করা৷ আর...আমি ওকে ছেড়ে দেব?

—ডেড বডিটা কার? আপনার ভাই, না দাদার?

—মানে? আপনি এসব কী অদ্ভুত কথা বলছেন! আমি...আই জাস্ট ডোন্ট আনডারস্ট্যান্ড ইউ!

—তাই কী?

পকেট থেকে রায় একটা ছবি বার করে দেখায়৷ ছবিটা গাড়িতে বসে থাকা গুলিবিদ্ধ মৃতদেহর মুখের ক্লোজ আপ৷

—আপনি...একে চিনতে পারছেন না?

এক নিমেষে রাউথের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ —না...

চেয়ার থেকে উঠে রায় দেয়ালে টাঙানো একটা গ্রুপফোটোর সামনে এসে দাঁড়ায়৷ —আসুন মিস্টার রাউথ৷ আপনাকে মনে করিয়ে দিই গ্রুপ ফোটোতে আপনার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে...উনি আপনার কে হন? দাদা...?’

রাউথের মুখ লজ্জায় বিবর্ণ৷ দু’হাত দিয়ে সে মুখ ঢাকে৷

—আমার কাকা৷ দেশের বাড়িতে এখনও বেশ কিছু জমিজমা আছে৷ ধান চাষ হয়৷ আমি ওখানে একটা টুরিস্ট রিসর্ট তৈরি করতে চেয়েছিলাম৷ অত্যন্ত ভাল প্ল্যান৷ ব্যাঙ্ক লেন, ট্র্যাভেল এজেন্সির সঙ্গে ডিল-সব কিছু রেডি৷ বাগড়া দিলেন আমার কাকা৷

—কেন, দেশের বাড়ি জয়েন্ট প্রপার্টি বুঝি?

—বাড়ি...জমিজমা...সব কিছু৷

—সো ইয়েস আনকল হ্যাড টু গো?

এবার রাউথের মুখ থেকে কোনা কথা নয়, অস্ফুট কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে আসে৷

—আপনারা পুরো প্ল্যানটাই পারফেক্ট ছিল৷ জাস্ট দুটো মাইনর মিসটেক৷ এক, আপনি কল্পনাও করতে পারেননি যে আপনার ড্রাইভারের মুখ কলকাতার রাস্তায় ইনস্টল করা সিসি টিভিতে ধরা পড়বে৷ আর দুই, দেওয়ালে টাঙানো গ্রুপ ফোটোটা৷ ওটার জায়গায় যদি অন্য কোনো ছবি থাকত তাহলে এই মার্ডার কেসটা সলভ করা অনেক বেশি দুরূহ হয়ে উঠত৷ কিছুক্ষণ ঘরটা চুপচাপ৷ শুধু রাউথের শুকনো কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়৷

—আমার এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ৷

রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়৷ ওর দেখাদেখি প্রদ্যোৎও৷

—বাকি যা করণীয় এখানকার পুলিশ করবে৷

রাত সাড়ে আটটার ফ্লাইট টেক অফ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রদ্যোৎ দেখে পাশের সিটে রায় শিশুর মতো মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%