ফ্রেসবুক ফ্রেন্ড

বরুণ চন্দ

অবিনাশ রায় সবেমাত্র বড়সাহেবের (ডি সি) ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের কামরায় ফিরে এসেছে, এমন সময় টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল৷

—হ্যালো৷ রায় ফোনটা তুলে নেয়৷

—স্যর...একবার আসতে পারবেন? টেলিফোনে ওর অ্যাসিসটেন্ট প্রদ্যোৎ-এর গলা৷

—কেন, আবার কী হল? গলায় বিরক্তি চাপার কোনও চেষ্টা করে না রায়৷

—আই থট এটা একটা সিম্পল কেস৷

ঘণ্টা দেড়েক আগে সল্টলেক থেকে হঠাৎ একটা ফোন আসে৷ একজন ভদ্রলোক করেছে৷তার মতে পাশের বাড়ির এক তলায় একটু আগেই নাকি উঁচু গলায় ঝগড়া ঝাটি এবং জিনিসপত্র ভাঙচুরের আওয়াজ পাওয়া গেছে৷ একজন পুরুষ এবং নারীর কণ্ঠ৷ পুলিশ এসে যেন পুরো ব্যাপারটা ইনভেসটিগেট করে যায়৷

পৃথিবীতে যত দাম্পত্য কলহ হয় তার সবগুলো যদি পুলিশ ইভেসটিগেট করতে যায় তাহলে তাদের অন্য কিছু করার আর সময় থাকবে না৷ তবু, ভদ্রলোক যখন ফোন করেছে একবার বোধহয় গিয়ে চেক করে আসা উচিত৷ গিয়ে হয়তো দেখা গেল ব্যাপারটা সেরকম কিছুই না৷ পুরোটাই ভদ্রলোকের উবর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত৷ এরকম কিছু লোক থাকে, পাশের বাড়িতে কী হচ্ছে না হচ্ছে সে নিয়ে তাদের অহেতুক কৌতূহল৷ বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি কিছু হয়ে থাকে৷

রিডিং চশমা’র ওপর দিয়ে রায় প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷

—একবার যাবে নাকি?

খুব সংক্ষেপে রায় ঘটনাটা বলে৷

—মনে হয় ডোমেস্টিক ভয়োলেন্স...অহরহ হচ্ছে৷ তবু ফোনটা যখন এসেছে একবার ইনভেসটিগেট করে আসা উচিত৷

প্রদ্যোৎকে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বলতে হয় না৷ একা, নিজের মতো করে ও পুরো ব্যাপারটা ইভভেসটিগেট করবে, এ সুযোগ কেউ ছাড়ে?

—কী হয় গিয়ে আপনাকে রিপোর্ট করব৷

রায়ের কাছ থেকে প্রশংসা বা স্বীকৃতি পাওয়া, এটা হল প্রদ্যোৎ-এর কাছে সবচেয়ে বড় রিওয়ার্ড৷

—স্যর...প্রদ্যেৎ-এর গলা আবার ল্যান্ডলাইনে ভেসে আসে৷

—ব্যাপারটাকে স্যর সিমপল ডোমেস্ট্রিক ভায়োলেন্স বোধহয় বলা যায় না৷ বাড়িতে একজন মহিলার বডি পাওয়া গেছে৷ কোয়াইট ডেড৷

—হোয়াট! কার বডি? রায়ের শিরদাঁড়া টান টান হয়ে ওঠে৷—ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে?

—নিশ্চয়ই স্যর৷ প্রদ্যেৎ-এর গলা উদগ্রীব শোনায়৷

—যিনি আপনাকে ফোন করেছিলেন...পাশের বাড়ির ভদ্রলোক৷ আমি আগে তাঁর কাছে যাই৷ গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি৷ ভদ্রলোকের নাম তুষার মজুমদার৷ রিটায়ার্ড৷ সারাদিন বাড়িতেই থাকেন৷ অম্লরোগ৷ দুপুরে খাওয়ার পর ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন৷ এমন সময় ওঁর মনে হল পাশের বাড়ি থেকে বেশ জোরে জোরে গলার আওয়াজ আসছে৷ জানলার কাছে এসে ভদ্রলোক থমকে দাঁড়ান৷ দুপুরের দিকে পাশের ফ্ল্যাটেই মহিলা একা থাকেন৷ এইসময়, ওঁর স্বামীর তো অফিসে থাকার কথা৷ তাহলে কী ভদ্রলোক ফিরে এসেছেন?

—কেন? ভদ্রলোক কী কোনও পুরুষের গলা শুনতে পেয়েছেন?

—ইয়েস স্যর৷ এই ব্যপারে উনি ডেফিনিট৷ ঝগড়াটা একজন মহিলা ও পুরুষের মধ্যে৷

—হুঁ...হোয়াট অ্যাবাউট টেলিভিশন? হয়তো মহিলার টেলিভিশন সেটটা লাউড করা ছিল৷ আজকালকার সিরিয়ালগুলোতে সব সময়ই সবার গলা সপ্তমে চড়ানো থাকে৷ তাতে টি আর এস না টি আর পি কী যেন বলে তাই দিয়ে নাকি সিরিয়ালের পপুলারিটির রেটিং বাড়ে কমে৷

—স্যর...তাহলে তো এটা প্রত্যেকদিনই হতে পারত৷ শুধু আজ হবে কেন?

—সেটাও তো একটা কথা৷ তারপর কী হল?

—পাশের বাড়ি গিয়ে কলিং বেল টেপার পর সামনের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কালাম, তাতেও কিছু হল না৷ অগত্যা আমাকেই দরজাটা খুলতে হল৷

—তুমি...দরজাটা ভেঙে ফেললে?

—না স্যর, দরজা খুলতে গেলে সবসময় দরজা ভাঙার প্রয়োজন হয় না৷

—ওহ্‌...বুঝলাম৷

কলকাতার আন্ডারওয়ারলড-এর সঙ্গে প্রদ্যোৎ-এর বিস্তর জানাশোনা৷ বোঝা গেল এই গুণটা ওখান থেকেই ওর পাওয়া৷

—তা তুমি...কৌশল করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলে? তারপর?

স্যারের গলা শুনেই বোঝা গেল উনি এ জিনিসটা একেবারে অ্যাপ্রুভ করেননি৷ কিন্তু, কী করা যাবে...ওঁর মতো ** হয়ে থাকলে তো আর চলবে না৷

—তারপর...ঘরে ঢুকে দেখলাম ফার্নিচার তছনছ্ করা৷ একটা টেবিল ল্যাম্প উল্টে পড়ে আছে৷ ঘরের সারা মেঝেতে ভাঙা বালব-এর কাচ৷ মনে হল বেশ ধস্তাধস্তি হয়েছে৷

—তারপর?

—তারপর আমি বেডরুম গেলাম৷ সেখানেও দেখলাম যথেষ্ট ধস্তাধস্তি হয়েছে৷ মনে হল জোর করে কেউ মহিলাকে বাইরের ঘর থেকে বেড রুমে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছে৷ দরজার পর্দার তিনটে হুক খোলা৷ বিছানা এলোমেলো হয়ে রয়েছে৷ বেড কভার মাটিতে দলা করে রাখা৷ আর বিছানার অন্য প্রান্তে ভদ্রমহিলা বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছেন৷

—অ্যাটেমপটেড রেপ?

—অ্যাটেমপটেড নয় স্যর...পুরোপুরি বলেই মনে হচ্ছে৷ ভদ্রমহিলার শায়াতে শুকনো রক্তের দাগ৷

—স্বামীকে খবর দেওয়া হয়েছে?

—হয়েছে স্যর, একটু সময় লাগল৷ ওঁর স্বামীর ফোন নাম্বার কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না৷ শেষ পর্যন্ত বেডরুমের একটা ড্রয়ারের মধ্যে ভদ্রলোকের ভিজিটিং কার্ডের বক্স খুঁজে পাওয়া গেল৷

—উনি কি এসে গেছেন?

—না স্যর! এখনও আসেননি৷ বাট অন দি ওয়ে৷

স্যরের সঙ্গে থেকে থেকে প্রদ্যোৎ আজকাল দিব্যি ইংরেজি বলতে শিখে গেছে৷

—তুমি ওখানেই থাকো৷ আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আসছি৷ কোন কিছু টাচ করোনি তো?

—স্যর?...শাড়িটা শুধু একটু নীচের দিকে নামিয়ে এনেছি৷ নইলে বড্ড বিসদৃশ দেখাচ্ছিল৷

গাড়ি করে সল্টলেকের বি ই সেকটার ওয়ান-এ যেতে যেতে রায় চোখ বন্ধ করে ভাবে প্রদ্যোৎ যখন পুলিশের চাকরি নেয়, তখন কি সে ঘূর্ণাক্ষরেও ভেবেছিল তাকে এরকম কাজ করতে হবে? প্রদ্যোৎ-এর জন্য হঠাৎ ওর অনুকম্পা হয়৷

১০২ ই এ’র বাড়িটা খুঁজে বার করতে রায়ের খুব একটা সময় লাগে না৷ ওর ড্রাইভার আবদুল নিজের ফোনে জি পি এস ট্র্যাকিং ডিভাইস ইনসটল করে নিয়েছে৷ ফোনটা অবশ্য রায়েরই দেওয়া৷ আবদুল কোথা থেকে স্মার্ট ফোন কেনার টাকা পাবে?

সুসজ্জিত দোতলা বাড়ি৷ সামনে ছোট ফুলের বাগান৷ তিন ধাপ উঠে গ্রে টাইলস দেওয়া বারান্দা৷ তারপরেই ধবধবে সাদা রং করা দরজা৷ বেল টেপা মাত্র ভেতর থেকে প্রদ্যোৎ দরজা খুলে দেয়৷

—সল্টলেক পুলিশ স্টেশনে খবর দেওয়া হয়েছে?

রায় প্রোটোকলে বিশ্বাসী৷ প্রদ্যোৎ অবশ্য অতটা নয়৷

—স্যর...এতক্ষণ তো এটা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম৷ এইবার করছি৷

শুধু একবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে দৃষ্টি দিয়ে রায় ভেতরে চলে যায়৷ বসার ঘরের টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম সাজানো৷ দুটো কাপ৷ দুটো কাপের কোনওটাতেই চা খাওয়া হয়নি৷ ঘরের আসবার পত্র এলোমেলো৷ সে দিকে একবার চোখ বুলিয়ে রায় শোবার ঘরে প্রবেশ করে৷

হাল্কা রংয়ের সেডার উড ফার্নিচার৷ শুধু বেড কাভারটাই যে মাটিতে ফেলা হয়েছে তা নয়, বিছানার চাদরটাও কুঁচকানো৷ বিধবস্ত অবস্থায় মহিলার দেহটা খাটের কোনায় পড়ে আছে৷ মাথার দিক থেকে একটা বালিশ টেনে আনা হয়েছে৷ মহিলার পা দুটো দুদিকে ফাঁক করা৷ মনে হয় কেউ ধাক্কা মেরে মহিলাকে বিছানায় এনে ফেলেছে৷ তারপর বলপ্রয়োগ করে তাকে রেপ করেছে৷ তাহলে কি বালিশটা মহিলার মুখ চেপে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে রেপ করার সময় সে চেঁচাতে না পারে?

এগিয়ে গিয়ে রায় খাটের পাশে ঝুঁকে দাঁড়ায়৷ ভদ্রমহিলার ব্লাউজটা খুব সম্ভবত ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল, কেননা ব্লাউজের কয়েকটকা হুক মিসিং৷ চুলে মুখ অর্ধেকটা ঢাকা৷ পকেট থেকে পেন বার করে ও চুল সরিয়ে মহিলার মুখ আর গলা খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্ করে৷ গালে ও কপালে কালশিরের দাগ৷ গলার একটা জায়গা ফুলে গেছে৷

—প্রদ্যোৎ...তোমার কী মনে হয়; নিশ্বাস আটকে মহিলা মারা গেছেন? রায়ের পাশে এসে প্রদ্যোৎও বডিটার ওপর ঝুঁকে দাঁড়ায়৷

—বলা মুশকিল স্যর৷ হতে পারে হাত বা কনুই দিয়ে ভদ্রমহিলার গলা চেপে ধরা হয়েছিল৷ এবং তার থেকেই সে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়৷ কিন্তু, পোস্ট মরটেম না হওয়া পর্যন্ত শিয়োর হয়ে বলা যাচ্ছে না৷

—কোয়াইট রাইট৷ দ্যাখো তো কোথাও একটা চাদর পাও কি না৷ মহিলার বডিটা ঢেকে রাখা দরকার৷ নইলে ইট লুকস.... টেরিবল৷

বডিটায় হাত না দিয়ে রায় যতটা সম্ভব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্ করে মহিলা’র গায় কোথাও লুকোনো আঘাতের চিহ্ণ আছে কি না৷ কিন্তু দেখতে পায় না৷ প্রদ্যোৎ ইতিমধ্যে একটা চাদর জোগাড় করে এনে মহিলা’র শরীর ঢেকে দেয়৷

অন্যমনস্ক ভাবে রায় থুঁতনিতে হাত বোলাতে থাকে৷ তারপর নিজের হাতঘড়িটা একবার দেখে নেয়৷

—ভদ্রলোকের নাম কী? কোথায় কাজ করেন?

বুক পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বার করে প্রদ্যোৎ সেটা রায়কে দেয়৷ কার্ডে একবার চোখ বুলিয়ে রায় সেটা ফেরত দিয়ে দেয়৷

—মলয় ভট্টাচার্য৷ ডালহৌসিতে অফিস৷ সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং৷ ভদ্রলোক এখনও এলেন না কেন?

—যখন ওঁকে ফোন করি তখন একটা ক্লায়েন্ট ভিজিটে গিয়েছিলেন৷

—তার মানে কি উনি অফিস হয়ে আসবেন? ফোনে তুমি ওঁকে কতদূর বলেছ? রেপ...ডেথ...এগুলো?

—না স্যর, এসব কিছুই বলিনি৷ জাস্ট বলেছি সিরিয়াস মিসহ্যাপ৷

—ঠিক করেছ৷ কেন না, মলয়বাবু যখন বাড়িতে ঢুকবেন উই নিড টু সারপ্রাইজ হিম৷

—কেন, আপনি কি ওঁকেও সাসপেক্ট করছেন?

—শোন প্রদ্যোৎ...রায় ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকায়৷—নো বডি ইজ অ্যাবাভ সাসপিশন৷ যতক্ষণ না তার ইনোসেন্স প্রমাণিত হচ্ছে৷

রায়ের কথা শেষ হতে না হতেই ফ্ল্যাটের কলিং বেলটা বেজে ওঠে৷

—দেখ, মলয় ভট্টাচার্যই বোধহয়৷

এগিয়ে গিয়ে প্রদ্যোৎ দরজা খুলে দেয়৷ ব্রিফকেস হাতে বাইরে একজন লোক দাঁড়িয়ে৷—আপনিই মলয় ভট্টাচার্য?

ভদ্রলোকের মুখ থেকে কোনও কথা বেরোয় না৷ শুধু সে সম্মতি সূচক একবার মাথা নাড়ে৷

—ভেতরে আসুন৷

ঠিক এমনি সময়ে বাড়ির বাইরে একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়৷ সল্টলেক থানার ওসি এবং দুজন পুলিশের লোক গাড়িটার থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ঢোকে৷ সেদিকে একবার মলয় প্রদ্যোৎ এবং অবিনাশের দিকে ফিরে তাকায়৷ তার চোখের দৃষ্টি ভয়ার্ত৷

—রাধার কী হয়েছে? আমার বাড়িতে পুলিশের লোক...আপনারা কারা? আমার স্ত্রী...আপনারা কিছু বলছেন না কেন?

—আগে ভেতরে আসুন, রায় বলে৷—তারপর সব কথা হবে৷

কথাটা শুনে ভদ্রলোকের মুখ একদম ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ মলয় ঘরে ঢোকার পরেই সল্টলেক থানার ওসি, বিকাশ মাইতিও ভেতরে আসে৷ রায়কে চিনতে পেরে সে স্মার্টলি সেলাম ঠোকে৷ আর পুলিশের দুজন লোককে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে৷

বসবার ঘরে ঢুকে মলয় একেবারে হতভম্ব৷

—এ সব...কী ভাবে...বলার মতো সে আর কথা খুঁজে পায় না৷

—মিস্টার ভট্টাচার্য, রায়ের গলা খুবই গম্ভীর শোনায়৷ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আপনাকে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনার স্ত্রী মারা গেছেন৷ একচুয়ালি মারা গেছেন বললে ভুল হবে৷ তাঁকে মার্ডার করা হয়েছে৷ খুবই নৃশংস ভাবে৷

মলয় ওদের দিকে এমন ভাবে তাকায় যেন ওকে হঠাৎ কেউ সজোরে চড় মেরেছে৷

—এ সব কী কথা বলছেন আপনারা....আমি...মানে...ও কোথায়?

—বেডরুমে৷

যন্ত্রচালিত’র মতো মলয় বেডরুমে প্রবেশ করে৷ সঙ্গে রায় ও প্রদ্যোৎ৷ পেছনে সল্টলেক থানার ওসি৷

—কেয়ারফুল নাও৷ রায় মলয়ের পিঠে হাত রাখে৷ —ইটস নট এ ভেরি প্লেজেন্ট সাইট৷

মলয় একবার রায়ের দিকে তাকায়, আরেকবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে৷ চোখের দৃষ্টি ফ্যালফ্যালে৷ যেন কোনও কিছুই তার হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে না৷

বেডরুমে ঢুকে মলয় একেবারে পাথরের মতো হয়ে যায়৷ বিছানার কোনায় অসহায়ভাবে ওর স্ত্রীর দেহটা পড়ে আছে৷ তার শরীর একটা চাদর দিয়ে ঢাকা৷

—কী হয়েছে ওর? কী করে ও মারা...

এগিয়ে গিয়ে মলয় গায়ের চাদরটা সরিয়ে ও’র স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয়৷ তারপর ধপাস করে মাটিতে বসে সে ডুকরে কাঁদতে থাকে৷ বাধ্য হয়েই প্রদ্যোৎকে গিয়ে আবার মহিলার গায়ে চাদরটা ঢেকে আসতে হয়৷

ঘরের মেঝেতে বসে ভদ্রলোক অনেকক্ষণ কেঁদে চলে৷ চোখ দিয়ে রায় প্রদ্যোৎকে ইশারা করে ও যেন ভদ্রলোককে তুলে একটা চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসায়৷ প্রদ্যোৎ তাই করে৷

—ওকে একটু জল খাওয়াও৷ দ্যাখ...কিচেনে নিশ্চয়ই জলের গ্লাস আছে৷

জল খেয়ে মলয় যেন একটু প্রকৃতিস্থ হয়৷ একটা দীর্ঘশ্বাসে ওর সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে৷

—কে...কার করা? মলয়ের গলা অস্ফুট হয়ে বেরোয়৷

উত্তরে রায় ধীর ভাবে মাথা নাড়ে৷—সেটাই আমাদের জানাতে হবে৷

এরপর বেশ কিছুটা সময় কেটে গেছে৷ এরই মধ্যেই পুলিশের ফটোগ্রাফার এসে ছবি তুলে গেছে এবং তারপর করোনারের লোক এসে বডিটাও নিয়ে চলে গেছে৷ ওদের মতে এস্টিমেটেড টাইম অফ্‌ ডেথ দু’ থেকে আড়াই ঘণ্টা আগে৷ সময়টা পাশের বাড়ির ফোনকলের সঙ্গে মোটামুটি মিলে যাচ্ছে৷ রায়ের কাছে তুষার মজুমদারের ফোনটা আসে বারোটা নাগাদ৷ কীভাবে মৃত্যু হয়েছে এখনও তারা ডেফিনিট নয়৷ তবে দম বন্ধ করেই মহিলাকে মারা হয়েছে বলে ওদের সন্দেহ৷ পোস্ট মরটেম না হওয়া পর্যন্ত একেবারে শিয়োর হয়ে বলা যাচ্ছে না৷

—কফিটা খেয়ে নিন...ইউ উইল ফীল বেটার৷

রায়ের নির্দেশ মতো প্রদ্যোৎ কখন রান্না ঘরে গিয়ে ইলেকট্রিক কেটলে জল গরম করে এক কাপ কফি নিয়ে এসেছে৷ এখন ওরা আর বেডরুমে নেই, ফ্ল্যাটের ড্রইংরুমে বসে আছে৷ কফিটা বোধহয় খুবই গরম ছিল৷ চুমুক দিতে গিয়ে মলয় বিষম খায়৷

ভদ্রলোকের স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত রায় অপেক্ষা করে৷

—মিষ্টার ভট্টাচার্য, আপনাকে কিছু প্রশ্ন করার আছে৷ প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড৷

উত্তরে মলয় শুধু একবার রায়ের দিকে তাকায়৷

—আপনাদের বিয়ে কতদিন আগে হয়েছিল?

—তা...বছর চারেক হল৷

—লাভ ম্যারেজ, না অ্যারেঞ্জড?

—অ্যারেঞ্জড৷

—আপনাদের বিবাহিত জীবন কেমন ছিল?

—মানে...ঠিক কী জানতে চাইছেন যদি...

—আমি জানতে চাইছিলাম, আপনাদের দুজনের মধ্যে রিলেশনশিপ কেমন ছিল?

—ওহ্‌...মোটামুটি ঠিকই৷

—মোটামুটিটা আরেকটু খুলে বলা যায়?

মলয় একটুক্ষণ চুপ করে কথা বলে৷—দেখুন...আমাদের তো অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ...দুজনের মধ্যে বোঝাবুঝি বা আন্ডারস্ট্যানডিংটা তৈরি হতে সময় লেগেছে৷

—অন দি হোল কী বলবেন, আপনাদের ম্যারেজটা হ্যাপি ছিল?

—বলতে পারেন৷ মলয়ের কথার মধ্যে কোথায় একটু দ্বিধা বোধ রয়ে যায়৷

—নাকি...রিলেশনশিপ ইন প্রোগ্রেস?

উত্তরে মলয়ের মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটে ওঠে৷

—আচ্ছা...বিয়ের আগে আপনার স্ত্রীর অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে আপনি জানেন?

প্রশ্নটাতে মলয় বেশ চমকে ওঠে৷

—যে ঘনিষ্ঠতা বিয়ের পরও থেকে যায়?

—হঠাৎ এ প্রশ্নটা কেন? মলয়ের ভুরু বেশ কুঁচকে ওঠে৷

—না..জাস্ট জিগ্যেস করছি৷ এই গত চার বছরে আপনার কখনও এরকম মনে হয়নি যে শি মাইট বি ক্যারিং অন উইথ সামবডি এলস?

—মনে হয় না৷

—যেমন ধরুন আপনি ঘরে ঢুকলেন আপনার স্ত্রী মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন, আপনাকে দেখেই লাইনটা ডিসকানেকট করে দিলেন...এমন কোনও ইনসিডেন্ট কখনও ঘটেনি?

—না, আমার স্ত্রীর বিহেভিয়ার কখনও সন্দেহজনক বলে মনে হয়নি৷ আর, এই প্রশ্নটা একেবারেই অবাঞ্ছিত বলে মনে করছি৷

—প্লিজ...ভুল বুঝবেন না৷ আপনার স্ত্রীকে অসম্মান করার কোনও উদ্দেশ্যই নেই৷ আমার কাছে শুধু একটা জিনিস পরিষ্কার নয়৷

কঠিন দৃষ্টিতে মলয় রায়ের দিকে তাকায়৷—সেটা কী জানতে পারি?

—আপনাদের বসার ঘরে দুজনের জন্য চায়ের সরঞ্জাম সাজানো রয়েছে৷ তার মানে, আপনার স্ত্রী অবভিয়াসলি কাউকে এক্সপেক্ট করছিলেন, তাই না? সেটা আপনি? না, অন্য কেউ?

কলিং বেল টিপতেই ভদ্রলোক দরজা খুলে দেয়৷

—সরি...অসময়ে এসে ডিসটার্ব করলাম৷ আপনি নিশ্চয়ই একটু আরাম করছিলেন৷

—না না...৷ সহাস্য বদনে তুষার মজুমদার প্রদ্যোৎ, রায় আর মাইতিকে বসার ঘরে নিয়ে আসে৷—আমি এ ব্যাপারে একেবারে গান্ধিজির বিশ্বাসী৷ আরাম হারাম হ্যায়৷ আসলে কী বলুন তো, দুপুরে ঘুমোলেই আমার পেট ফেঁপে ঢোল হয়ে যায়৷ তাই পায়চারি করি৷ এ ঘর থেকে ও ঘর৷

আঙুল দিয়ে তুষারবাবু ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজের হাঁটার পরিধিটা দেখায়৷

—তা...এখনতো চারটে বজে৷ চা চলতে পারে নিশ্চয়ই৷ আগ্রহের সঙ্গে তুষারবাবু ওদের দিকে তাকায়৷

—ওসব ঝামেলা করবেন না৷ আপনার সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে চলে যাব৷

—ও...৷ তুষারবাবু যেন একটু দমে যায়৷—ভাবলাম আপনাদের মতো স্বনামধন্য মানুষদের সঙ্গ পাওয়াটা তো একটা বিরাট সৌভাগ্য৷ সেটার থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন...

ভদ্রলোক এতই জোরজবস্তি করে যে রায় চা খাওয়ার ব্যাপারে না করতে পারে না৷

কথায় কথায় জানা যায় ভদ্রলোকের স্ত্রী কয়েকদিন হল বাপের বাড়ি গেছে৷

—তার মানে? আপনি নিজে কষ্ট করে আমাদের সবার জন্য চা বানাবেন? কী দরকার...

—কষ্ট আবার কোথায়? এক্ষুনি চা রেডি হয়ে যাবে৷

কয়েক মিনিটের মধ্যে তুষারবাবু ট্রে-তে করে চা আর বিস্কিট নিয়ে আসে৷

—ইলেকট্রিক কেটল আর টি ব্যাগ-এর দৌলতে চা বানানো আজকাল খুবই সোজা৷

চায়ে চুমুক দিয়ে রায় জিগ্যেস করে৷—আচ্ছা...আপনি যখন লালবাজারে ফোনটা করলেন সেটা কী ভেবে? একটা কিছু তো আপনার কাছে সাসপিশাস লেগেছিল৷

—একদম ঠিক কথা৷ দেখুন...টেলিভিশনের আওয়াজ তো হতে পারত৷ আমার সেটা প্রথমেই স্ট্রাইক করেছিল৷ কিন্তু, সেটা মনে হয়নি তার কারণ দুপুরবেলায় এর আগে পাশের বাড়ি থেকে আমি টেলিভিশনের আওয়াজ শুনেছি বলে মনে পড়ে না৷ আর...এই যে পুরুষ আর নারীর মধ্যে কলহ, তার সাউন্ডটা মনে হয়েছিল বসবার ঘর থেকেশোবার ঘরে চলে এল৷ টিভিতে তো সেটা হতে পারে না৷ কথাটা ঠিক বোঝাতে পারলাম?

রায় সংক্ষিপ্ত ভাবে নড করে৷—আপনার চা-টা বেশ ভালো৷

—বলছেন...৷ তুষারবাবু খুশি হয়৷—এছাড়াও পাশের বাড়ির ভদ্রলোক তো সকালবেলাতেই কাজে বেরিয়ে যান৷ হঠাৎ দুপুরবেলায় ফিরে আসবেন? সব মিলিয়ে ব্যাপারটা আমার একটু ফিশি লাগছিল৷

—এর আগে পাশের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি হতে শুনেছেন?

—উঁহু৷ তুষারবাবু মাথা নেড়ে বলে৷—মনে পড়ে না৷

—আমি জানি এটা আপনার কাছ থেকে খুব বেশি আশা করা হবে...তবু জিগ্যেস করছি৷ এই ঘটনাটার পরে ও বাড়ি থেকে কাউকে বেরোতে দেখেছেন?

উত্তরে তুষারবাবু একগাল হাসেন৷

—ব্যাপারটা কী হল বলুন তো...এত চেঁচামেচি, ঝগড়া-ঝাটি, জিনিস ভাঙচুর হচ্ছে তারপর, একটা সময় হঠাৎ দেখলাম সব চুপ হয়ে গেল৷ একদম সাইলেন্ট! আমার তখনই মনে কেমন সন্দেহ হল৷ চুপি চুপি বাইরের বারান্দায় গিয়ে মোড়ায় ঘাপটি মেরে বসে রইলাম৷ নিচ থেকে যাতে আমায় কেউ দেখতে না পায়৷ বসে আছি তো বসেই আছি৷ কিচ্ছু হচ্ছে না৷ তারপর প্রায় দশ মিনিট পর সানগ্লাস পরা এক ভদ্রলোক পাশের বাড়ি থেকে গট্‌ গট্‌ করে হেঁটে বেরিয়ে এল৷ ও মা! সে বেরুনো মাত্রই কোথা থেকে জানি একটা সাদা গাড়ি চলে এল৷ ভদ্রলোক চট্‌ করে সেই গাড়িটা চড়ে চলে গেলেন৷

—বাঃ! আপনার মতো উইটনেস পাওয়াটাও একটা সৌভাগ্যের কথা৷ কথাটা শুনে তুষারবাবু যারপরনাই প্রীত৷

—বাই এনি চান্স গাড়ির নাম্বারটা কী নোট করতে পেরেছিলেন?

—ইস! তুষারবাবু লম্বা করে জিভ কাটে৷—মিসটেক...বিগ মিসটেক!

রায়কে দেখলেই সবাই যে কেন হঠাৎ ইংরেজি বলতে শুরু করে, তার মর্ম এতদিনেও সে উদ্ধার করতে পারেনি৷

—না না...আপনি যা বলেছেন এতেই আমাদের কাজ হাসিল হয়ে যাবে৷

পকেট থেকে রায় স্মার্টফোন বার করে দুটো অ্যাপস্এর আইকন দেখায়৷ তার মধ্যে একটা ওলা অন্যটা উবের৷—দেখুন তো, এই দুটোর মধ্যে সাদা গাড়ির কাচে কোনটা লাগানো ছিল!

—হ্যাঁ হ্যাঁ....এই তো! এই ডিজাইনটাই ওই গাড়ির কাচে লাগানো ছিল৷

রায় আর প্রদ্যোৎ পরস্পরের দিকে তাকায়৷ গাড়িটা ওলা৷

—এই যে সাদা গাড়িটা চড়ে ভদ্রলোক চলে গেল...রায় আবার প্রশ্ন করে৷

—সেটা আনুমানিক কতক্ষণ আগে মনে হয়?

—দেখুন...একেবারে ঘড়ি ধরে তো সময়ে বলতে পারব না৷ তবে, আমার খাওয়া হয়ে গেছে দেড়টায়৷ তারপর ধরুন আধঘণ্টা মতন পায়চারি করেছি৷ তারপর...এই ঘটনাটা ঘটল...দু’টো আড়াইটে৷ হ্যাঁ, আড়াইটে নাগাদ বলতে পারেন!

—প্রদ্যোৎ...এক্ষুনি একটা ফোন লাগাও৷ উই হ্যাভ টু ফাইন্ড আউট ওলা’র কোন ড্রাইভার সে সময় এখানে ডিউটি করতে এসেছিল৷

ফোন করার জন্য প্রদ্যোৎ বারান্দার দিকে চলে যায়৷

—এ ব্যাপারে আর কিছু মনে পড়ছে আপনার? রায় তুষারবাবুকে জিগ্যেস করে৷

—না...এখুনি তো আর কিছু...তবে হ্যাঁ, মনে পড়লে আপনার সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করব৷ ও হো! আপনার ফোন নাম্বারটাই তো জানি না৷

পকেট থেকে রায় নিজের কার্ড বার করে দেয়৷

—স্যর৷ প্রদ্যোৎ ইতিমধ্যে বারান্দা থেকে ফিরে এসেছে৷—কথা হয়ে গেছে৷ ওরা চেষ্টা করছে যত তাড়াতাড়ি ওই ড্রাইভারকে ট্রেস করা যায়৷ করলেই আমাদের জানাবে৷

তুষারবাবুকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে রায়, প্রদ্যোৎ আর মাইতি আবার মলয়ের কাছে ফিরে আসে৷ এ বার রায় মাইতিকে ছেড়ে দেয়৷ বলে, কোনও কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হলে ও যোগাযোগ করে নেবে৷

মলয় ভট্টাচার্য-এর ফ্ল্যাটে এসে ওরা দেখে ভদ্রলোক বাইরের ঘরে চুপ করে বসে আছে৷

—জানতে পারলেন বাড়ির কোনও ভ্যালুয়েবলস মিসিং কি না? আলমারি বা যেখানেই টাকা কড়ি এসব রাখা হয়, একবার চেক করে দেখলেন?

মাথা নেড়ে মলয় ‘হ্যাঁ’ জানায়৷

—কোন কিছু মিসিং বলে তো মনে হচ্ছে না৷

—স্ত্রী’র গয়নাগাটি?

—বেশির ভাগই ব্যাঙ্ক-এর সেভ ডিপোজিট ভল্ট-এ রাখা৷ বাড়ির ওয়ারড্রোবে যা কিছু ছিল সবই তো ইনট্যাক্ট বলে মনে হচ্ছে৷

—মলয়বাবু, আজ সকালে আপনি কখন অফিস যান?

—বাড়ির থেকে বেরিয়েছি ন’টায়৷

—তখন পর্যন্ত বাড়িতে এভরিথিং ওয়াজ নরম্যাল?

—হ্যাঁ৷

—সোজা অফিস গেলেন, না অন্য কোথাও?

—ডিরেক্ট অফিসে৷

—এরপর ক্লায়েন্ট ভিজিট থেকে শুরু করে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত যেখানে যেখানে গেছেন, এবং সেটা কখন, তার একটা লিস্ট করে দিতে পারবেন?

—হ্যাঁ৷ একটু অবাক হয়ে মলয় জবাব দেয়৷—আমাকে আপনারা সন্দেহ করছেন না তো?

—রুটিন প্রশ্ন৷ চিন্তার কোনও কারণ নেই৷

ভেবে ভেবে একটা কাগজে মলয় আজকের ভিজিটের তালিকা লিখে দেয়৷ কাগজটা হাতে নিয়ে রায় তাতে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়৷

—এর মানে...লাঞ্চ-এর থেকেই আপনি অফিসের বাইরে৷ কোথায় গিয়েছিলেন?

—ক্লায়েন্ট নিয়ে লাঞ্চ করতে৷ এই এন্টারটেনমেন্টটা পার্ট অফ দি জব৷

—কোন ক্লায়েন্ট...নাম আর ফোন নম্বরটা যদি একটু লিখে দেন৷ আমাদের কাজ...একবার ভেরিফাই করে দেখতে হবে৷

ক্লায়েন্টের নাম লিখতে গিয়ে মলয় ইতস্তত করে৷

—কী হল? এনি প্রবলেম?

—আসলে ক্লায়েন্ট মানে...একজন মহিলা৷

—বেশ তো৷ সেই মহিলা ক্লায়েন্টেরই নাম আর ফোন নাম্বারটা লিখে দিন৷

—না...মানে উনি ঠিক ক্লায়েন্ট নন, ক্লায়েন্টের সেক্রেটারি৷

ক্লায়েন্টকে না করে হঠাৎ তার সেক্রেটরিকে এন্টারটেন করা...এটাও কি পার্ট অফ দি জব?

মলয় চুপ৷

—একটু খুলে বলবেন...রায় স্থির দৃষ্টিতে মলয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে৷—ইজ ইট অ্যান অ্যাফেয়ার?

—ঠিক তা নয়৷ মলয়ের মুখে আবার সেই ইতস্তত ভাব৷—আপনাদের বলতে পারি৷ তবে, সেটা পাবলিক হয়ে গেলে আমাদের অফিসের দিক থেকে মুশকিল৷

—রিয়েলি? কী এমন কনফিডেনশিয়াল ইনফরমেশন? সেটা আমাকে নিশ্চয়ই বলতে আপত্তি নেই৷

—আসলে ব্যাপারটা একটা টেন্ডার নিয়ে৷ অনেকেই তো কোটেশন সাবমিট করে৷ কার কোটেশন কতটা...সেটাই একটু ওঁর কাছ থেকে খোঁজ নিচ্ছিলাম৷

—তার মানে, পুরো ব্যাপারটাই আনডার দ্য টেবিল! ক্লায়েন্টের সেক্রেটারির তো এরকম কনফিডেনশিয়াল ইনফরমেশন কাউকে পাস অন করার কথা নয়৷ তাহলে তার দিক থেকে ইনসেনটিভটা কী? মানি, ওয়ানিং-ডাইনিং...নাকি আরও কিছু?

মলয় এ প্রশ্নের জবাব দেয় না৷

—ক্লায়েন্টের সেক্রেটারি হঠাৎ লুকিয়ে লুকিয়ে আপনাকে হেল্প করতে যাবে কেন? সত্যি করে বলুন দেখি, হ্যাভ ইউ এভার মেট হার আফটার অফিস আওয়ারস৷

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলয় খুব ছোট করে একবার মাথা নাড়ে৷

—হুঁ...মিকসিং বিজনেস উইথ প্লেজার৷ তার মানে আপনার স্ত্রী যখন খুন হচ্ছিলেন তখন আপনি একজন অন্য নারীর সঙ্গে ফ্লারটিং-এ লিপ্ত৷

কুঁকড়ে মলয়ের শরীরটা ছোট হয়ে যায়৷

ঠিক এরকম সময় প্রদ্যোৎ-এর টেলিফোনটা বেজে ওঠে৷

—হ্যালো....কে বলছেন....হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন৷ প্রদ্যোৎ ইশারায় রায়কে জানায় যে কলটা ওলার কাছ থেকে৷—কী বলছেন? ড্রাইভার দিলীপ...দিলীপ শর্মা? ঠিক আছে৷ দিলীপকে বলুন এক্ষুনি যেন আজ দুপুরে সল্টলেকে যেখানে পিক আপ ডিউটি করতে এসেছিল, সেখানে চলে আসে৷

ফোন কল শেষ হতে রায় উৎসুক হয়ে ওর অ্যাসিসটেন্ট-এর দিকে তাকায়৷

—ড্রাইভার দিলীপ এখানেই চলে আসছে স্যর৷ তবে আসতে একটু সময় লাগবে৷ একটা ড্রপ ডিউটি সেরে আসছে৷

—গুড৷ আমরা ততক্ষণ না হয় এখানেই অপেক্ষা করি৷ আচ্ছা...রায় আবার মলয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে৷—আপনার স্ত্রীর নিশ্চয়ই একটা মোবাইল ফোন আছে৷

—আছে৷

—কই—কাছাকাছি তো কোথাও দেখতে পেলাম না৷ আপনি একটু চেক করবেন? এটা হতেই পারে যে আততায়ীর সঙ্গে আপনার স্ত্রীর আজকে কিংবা গত দুয়েক দিনের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে৷

নিঃশব্দে উঠে মলয় ভেতরের ঘরে খোঁজ করতে যায়৷

—প্রদ্যোৎ...বাইরের ঘরটাও একবার ভালো করে চেক করো৷ ফোনটা এখানেও থাকতে পারে৷

পরের দশ পনেরো মিনিট রায় আর প্রদ্যোৎ তন্নতন্ন করে বাইরের ঘরটা খোঁজে৷ কিন্তু, মিসেস ভট্টাচার্য-এর মোবাইল ফোন কোথাও পাওয়া যায় না৷

—আততায়ী নিশ্চয়ই সঙ্গে নিয়ে গেছে৷ হতেই পারে এদের দুজনের মধ্যে অনেক ফোন কলের নজির রয়েছে৷ হোয়াটস অ্যাপ-এও চ্যাট থাকতে পারে৷

ভদ্রমহিলার মোবাইল ফোনটা না পাওয়া গেলেও খবরের কাগজের র‌্যাক থেকে একটা ল্যাপটপ উদ্ধার হয়৷

—এটা কার...আপনার? রায় প্রশ্ন করে৷

—ওটা এখানে ছিল বুঝি? না...ওটা আমার না৷ গত বছর রাধার জন্মদিনে উপহার হিসেবে কিনে দিয়েছিলাম৷

ডালাটা খুলে রায় ল্যাপটপটা খোলার চেষ্টা করে৷—এটার পাসওয়ার্ড জানা আছে?

—না...৷ মলয়ের মুখে ম্লান হাসি৷—পাসওয়ার্ডটা ওর পারসোনাল৷ আমার সঙ্গে কখনও শেয়ার করেনি৷ আমিও নিজের থেকে কখনও জানতে চাইনি৷—ও...তাহলে তো...৷ থুঁতনিতে হাত বুলিয়ে রায় চিন্তা করে৷

—নো প্রবেলম স্যর, প্রদ্যোৎ রায়কে বলে৷—সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গেলে ওরা ঠিক খুলে দেবে৷

—গুড আইডিয়া৷ এই ল্যাপটপটা আমরা নিয়ে যেতে পারি? মলয়কে রায় জিগ্যেস করে৷—ইন দ্য অ্যাবসেন্স অফ দি মোবাইল এটা আমাদের খুবই কাজে দেবে বলে আমাদের ধারণা৷

মাথা নেড়ে মলয় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে৷—আমার আর আপত্তি কী থাকবে? এটা দিয়ে যদি আততায়ীকে ধরতে সাহায্য হয় তাহলে নিয়ে যান৷

ব্যস্ত ভাবে রায় একবার নিজের হাত ঘড়িটার দিকে তাকায়৷

—এখন ওলার ড্রাইভারটি এলেই হয়৷

ঠিক সেই সময় বাইরে গাড়ির একটা হর্ন বেজে ওঠে৷ প্রদ্যোৎ উৎফুল্ল হয়ে রায়ের দিকে তাকায়৷—মনে হয় আপনার ওলার ড্রাইভার এসে গেছে৷ রাইট অন কিউ৷

বাইরে গিয়ে প্রদ্যোৎ পরেই ফিরে আসে৷—ওলার ড্রাইভার এসে গেছে স্যর৷ ওকে ভেতরে নিয়ে আসব?

—দরকার নেই৷ আমরাও এবার উঠব৷ চলো, বাইরে গিয়েই ড্রাইভারের সঙ্গে কথা সেরে নিচ্ছি৷

রায় চেয়ার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়৷—এই কার্ডটা আপনার কাছে রাখনু৷ যদি কোনও কিছু মনে পড়ে আমাকে অবশ্যই ফোন করে জানাবেন৷

ঘাড় নেড়ে মলয় ‘হ্যাঁ’ জানায়৷

—আর, ল্যাপটপটা সঙ্গে নিলাম৷ আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেলে ফেরত পাবেন৷ বাইরে বেরিয়ে ওরা ওলা’র ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে৷ দেখা গেল দিলীপ শর্মা ইউ পি’র লোক হলেও বেশ ভালো বাংলা বলে৷

—দুপুর বেলায় আপনি যাকে এ বাড়ির থেকে পিক আপ করলেন, তার চেহারা মনে আছে?

—হ্যাঁ...মোটামুটি মনে আছে৷

—লোকটি ফর্সা, না কালো?

—যত দূর মনে পড়ছে, কালো৷

—মনে করে দেখুন তো...ভদ্রলোকের মুখে কি গোঁফ দাড়ি কিছু ছিল?

—গোঁফ ছিল৷ কিন্তু, দাড়ি না৷

—চোখে চশমা?

—না স্যর, কিন্তু সানগ্লাস পরেছিল৷

—এ ছাড়া ভদ্রলোকের মুখে এমন কোনও রিডিমিং ফিচার...

কথাটা বলেই রায় নিজের ভুল সংশোধন করে৷ দিলীপ শর্মা বাংলা ভালো জানতে পারে, ইংরেজিও সেরকম জানবে এমন কোন কথা নেই৷

—ভদ্রলোকের মুখে কোনও কাটা দাগ বা জড়ুল...এমন কিছু, যা দিয়ে সহজেই লোকটিকে চেনা যায়, এমন কিছু মনে পড়ছে আপনার?

ভুরু কুঁচকে দিলীপ মনে করার চেষ্টা করে৷

—এমন কিছু তো ওর মুখে ছিল না স্যর৷ তবে হ্যাঁ...মনে হচ্ছে লোকটার একটা চোখ ছোট ছিল৷ চোখের পাতা ভারী হলে যেরকম হয়৷

—এই না বললেন লোকটি সানগ্লাস পরেছিল৷ তাহলে ওর একটা চোখ ছোট সেটা দেখতে পেলেন কী করে?

—টাকা দেওয়ার সময় বাবু সানগ্লাসটা কপালে তুলেছিল৷

—ভেরি গুড৷ জামা কাপড় কী পরেছিল লোকটি?

দিলীপ আবার একটু ভাবে৷—যতদূর মনে পড়ছে লোকটা ছাই রংয়ের একটা জামা পরেছিল৷ আর কালচে প্যান্ট৷

—এবার তুমি বলো তো, লোকটিকে কোথায় নিয়ে গেলে?

—শিয়ালদা স্টেশনে স্যর৷

কথাটা শুনে রায় একেবারে দমে যায়৷—তার মানে লোকটি শিয়ালদার কাছাকাছি, সে হ্যারিসন রোডও হতে পারে, কিংবা বউবাজার স্ট্রিট এমন কোন জায়গাতে থাকতে পারে৷ আবার ট্রেনে করে সে বজবজ, ক্যানিং, সোনারপুর, বারুইপুর এমন যে কোনও জায়গাতে থেকেই আসতে পারে৷

—স্যর, শিয়ালদা স্টেশনে তো সিসিটিভি ইনস্টল করা আছে৷

—আছে তো জানি, কিন্তু এতগুলো সিসিটিভির থেকে এই লোকটিকে খুঁজে বার করা উড বি ইমপসিবল৷ দিলীপের ডেসক্রিপশন ইজ নট এনাফ৷ আমাদের একমাত্র ভিজুয়াল কিউ হচ্ছে লোকটির পরনের জামাকাপড়৷ একটা ছাই রংয়ের সার্ট...আর কালচে প্যান্ট৷ এই রকম জামা কাপড় পরা লোক তুমি শ’য়ে শ’য়ে পাবে৷

ওলা গাড়ির ড্রাইভার দিলীপকে ধন্যবাদ জানিয়ে, আর ওর পকেটে দুটো একশো টাকার নোট গুঁজে রায় ওকে বিদায় দেয়৷

—বুঝলে প্রদ্যোৎ...ব্যাপারটা মনে হচ্ছে একটু কমপ্লিকেটেডে হয়ে দাঁড়াল৷

—চিন্তা নেই স্যর৷ হাসি মুখে প্রদ্যোৎ জবাব দেয়৷—আমাদের হাতে এখনও একটা মোক্ষম অস্ত্র আছে৷

—কী...মিসেস ভট্টাচার্য-এর ল্যাপটপ?

লালবাজারে ফিরে এসে নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও রায়ের মন ওই কেসটাতেই পড়ে থাকে৷ সন্ধেবেলায় প্রদ্যোৎ-এর ফোন আসে৷

—স্যর...পাসওয়ার্ডের প্রবলেম সলভড৷ আপনি এবার চলে আসতে পারেন৷ কাগজপত্র গুছিয়ে বেরোতে রায়ের সময় লাগে৷ সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট-এ যখন রায় গিয়ে পৌঁছয়, তখন রাত আটটা৷ গাড়িতে বসেই রায় শর্মিকে ফোন করে দেয় যে ওর ফিরতে দেরি হতে পারে৷ ও যেন খেয়ে নেয়৷

একটা হল ঘরে ছোট ছোট কিউবিকল৷ তার মধ্যে একটাতে প্রদ্যোৎ রায়কে নিয়ে আসে৷ ল্যাপটপটার সামনে পাওয়ারফুল চশমা পরা একটি ইয়ং ছেলে বসে আছে৷

প্রদ্যোৎ ওর সঙ্গে রায়ের আলাপ করিয়ে দেয়৷

—কল মি স্যাম৷ পৈতৃক নামটা ছিল সমীর মিত্র৷ তবে এভরি ওয়ান হিয়ার কলস মি বাই দ্যাট নেম...৷

ছেলেটি অ্যামেরিকান অ্যাকসেন্ট-এ কথা বলে৷ হয়তো অ্যামেরিকার থেকে কিছু একটা পাশ করে এসেছে৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে রায় লক্ষ্ করে এই ডিপার্টমেন্ট-এর বেশির ভাগ টেকনিশিয়ানই ছেলে-ছোকরা৷ কিছু যুবতিও আছে৷

—স্যর...আপনার অনুপস্থিতিতে উই টুক দ্য লিবারটি অফ ওপেনিং হার ল্যাপটপ৷ এবং আমরা ভদ্রমহিলার সম্বন্ধে বেশ কিছু ইনফরমেশনও ওর ল্যাপটপ মারফত জানতে পেরেছি৷

—ভেরি গুড৷

—ইন্টারনেট মারফত এখন নানান ভাবে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়া সম্ভব৷ সেটা ইমেল মারফতও হতে পারে, আবার ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ দিয়েও৷

—আমার তো মনে হয় উই কুড এক্সপ্লোর অল দি পসিবলিটিজ৷

—উই হ্যাভ ডান দ্যাট...মোর অর লেস৷

—দ্যাখ, স্যাম, ব্যাপারটা এরকম৷ ধরে নেওয়া যাক মহিলা’র বয়েস ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে৷ এবং সে কোনও চাকরি-বাকরি করে না৷ যাকে বলা যায় হোল টাইম হোম মেকার৷ বাড়িতে কোনও ছেলে-পুলেও নেই যাদের নিয়ে মহিলা ব্যস্ত থাকবে৷ অতএব স্বামী অফিসে চলে যাওয়ার পর হাতে অফুরন্ত সময়৷ এখন প্রবলেম হচ্ছে এই সময়টা ও কী করে কাটাবে? ঠিক তখনই তার হাতে আসে একটা এন্টারটেনমেন্ট টয়৷ যার নাম ল্যাপটপ৷ এখন ফেসবুকে প্রতিদিন আখছার অগুনতি ফ্রেন্ডস রিকোয়েস্ট আসে৷ আমরা জানাশুনোর মধ্যে না হলে সেগুলো সব রিফিউজ করে দিই, তাই তো?

মাথা নেড়ে স্যাম হ্যাঁ জানায়৷

—এই মেয়েটির সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছে৷ আজকালকার মেয়ে৷ আগেকার দিনের মতো পতিব্রতা নারী সে নাও হতে পারে৷ সো শি গেটস কিউরিয়াস৷ একবার ফেসবুকের মধ্যে কারও সঙ্গে আলাপ করলে কেমন হয়?

স্যাম-এর মুখে একটা হালকা হাসি দেখা দেয়৷

—কী...আমি কিছু ভুল বললাম? একটু বিস্মিত হয়ে রায় স্যাম-এর দিকে তাকায়৷

—না না...একেবারেই তা নয়৷ আপনি যেটা বলছেন সেটা পুরোপুরি সত্যি৷ অ্যাজ এ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট এই মহিলা ফেসবুকে তিন চারজন লোকের সঙ্গে একই সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছিল৷

—হোয়াট? কী বলছ কী তুমি?

স্যাম প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷—তুমিই বলো না কেন?

—হ্যাঁ স্যর, গত ছ’মাসের মধ্যে ফেসবুকে এই মহিলার অন্য পুরুষদের সঙ্গে রেগুলারলি চ্যাট করার প্রমাণ পাচ্ছি৷ এর মধ্যে দুজন পুরুষের সঙ্গে মিসেস ভট্টাচার্য অন্তত পাঁচবার চ্যাট করেছে, এর নজির আমরা পেয়েছি৷

—গুড লর্ড! রায়ের মুখ থেকে অস্ফুট স্বগতোক্তি বেরিয়ে আসে৷— এর কোনটার সম্বন্ধেই মহিলার স্বামী অবগত নন ৷

—তাই মনে হচ্ছে স্যর৷

—এদের মধ্যে এমন কেউ আছে যার সঙ্গে গত দশ দিনের মধ্যে মহিলা একাধিকবার চ্যাট করেছে৷

—আছে৷ ফেসবুক স্ক্যান করতে করতে একটা জায়গায় এসে স্যাম থেমে যায়৷

—এই ভদ্রলোকটি৷

ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে রায় স্ক্রিন থেকে পড়তে শুরু করে৷

—উৎপল লাহিড়ী৷ কলকাতা থেকে ইংরেজি নিয়ে এম এ পাশ করেছে৷ ফ্রিলান্স রাইটার৷ খবরের কাগজে ও ম্যাগাজিনে প্রায়শই লেখা বেরোয়৷ মোট ৪৮ জন ফেসবুক ফ্রেন্ডস আছে৷ রায় একটুক্ষণ কী যেন চিন্তা করে,—লোকটির ছবি একটু এনলারজ করা যায়?

—অবশ্যই৷

উৎপল লাহিড়ীর মুখ ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্যাম বড় করে তুলে ধরে৷

—হুঁ...দেখতে শুনতে তো লোকটিকে বেশ ভালোই লাগছে৷ রায় বেশ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷

আড় চোখে স্যাম একবার রায়ের দিকে তাকায়৷—আমাকে কিছু জিগ্যেস করবেন?

রায় নড করে৷—সাপোজিং ফেসবুকে আমি নিজেকে গৌতম হালদার বলে পরিচয় দিলাম, এবং অন্য কারও ছবি নিজের বলে পোষ্ট করলাম৷ এরকম ক্ষেত্রে হাউ ডাজ ওয়ান ট্রেস ব্যাক দ্য রিয়েল পারসন?

—আরেকটু খুলে বলবেন?

—এই উৎপল লাহিড়ীর কথাই ধরা যাক না৷ রিয়েল লাইফে এর নাম উৎপল লাহিড়ী নাও হতে পারে৷ এবং তার চেয়েও বড় ধোঁকা...ব্যক্তিগত জীবনে লোকটি এরকম হ্যান্ডসাম নাও হতে পারে৷ এখন, ফলস নাম এবং ফলস আইডেনটিটি নিয়ে যে কোনও লোক মিসেস ভট্টাচার্য-এর সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ‘ক্লোজ ফ্রেন্ড’ হতে পারে৷

—পারে৷

—এই ফলস আইডেনটিটির পেছনে যে আসল লোকটি লুকিয়ে আছে, তার সন্ধান কী করে পাওয়া যাবে?

—কতক্ষণ?

—কাল সকালে৷ জিয়োর অফিসে যোগাযোগ করে আমরা উৎপল লাহিড়ীর অ্যাড্রেসটা পিনপয়েন্ট করতে পারব৷

—ঠিক আছে৷ থ্যাংকস সো মাচ, স্যাম৷ রায় করমর্দনের জন্য হাত বাড়ায়৷

—হোয়াট ফর? স্যাম হাসতে হাসতে বলে৷—দিস ইজ হোয়াট আই ডু এভরি ডে৷

প্রদ্যোৎকে ড্রপ করে রায় যখন বাড়ি পৌঁছয় তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা৷

—একি...তুমি এখনও খাওনি?

টেবিলে দুটো প্লেট পাতা রয়েছে৷

—আসলে...শর্মি রায়ের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলে৷—মোবাইলে একটা ইন্টারেস্টিং প্রোগ্রাম হচ্ছিল, দেখতে দেখতে দেরি হয়ে গেল৷ জামা কাপড় ছেড়ে নাও৷ এক মিনিটে আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি৷

খেতে বসে রায় ভালো ভাবে খায় না৷

—কী হল? কোথাও খেয়ে এসেছ নাকি?

—না...জাষ্ট...নট ফিলিং...৷ কথাটা শেষ করে না রায়৷

নিজের মনেই শর্মি মাথা নাড়ে৷ রায়ের এই মুড সুইংটা ও জানে৷ খুব আনপ্লেজেট কোনও কেস হাতে এলে ওর এরকম হয়৷

পরের দিন অফিসে গিয়ে রায় আর প্রদ্যোৎ উদগ্রীব হয়ে স্যাম-এর ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে৷ বারোটার পর স্যাম-এর ফোন আসে৷ লোকটি সন্তোষপুরে থাকে৷ উৎপল লাহিড়ী আসল নাম নয়৷ আসলে সে তারকনাথ পাল৷

—স্যর...প্রদ্যোৎ আর স্থির হয়ে থাকতে পারে না৷—এবার চলুন, লোকটাকে অ্যারেস্ট করি৷

রায় মাথা নাড়ে৷—এখনও না৷ আগে প্লেন ক্লোদজ পাঠিয়ে ওর অ্যাড্রেসটা খুব ডিসক্রিটলি দেখে আসতে হবে৷ মার্ডার করার পর সে কয়েকদিনের জন্য অন্য কোথাও ঘাপটি মেরে থাকতে পারে৷

—স্যর, আমি যাই? প্রদ্যোৎ রায়কে অনুরোধ করে৷

রায় একটুক্ষণ চিন্তা করে বলে—বেস্ট হয় তুমি যদি লোকাল পোস্ট অফিস থেকে লোক নিয়ে যাও৷ তাহলে পাড়ার কেউ সাসপেক্ট করবে না৷

—থ্যাংক ইউ স্যর৷

প্রদ্যোৎ বেরিয়ে যায়৷

বিকেল বেলায় প্রদ্যোৎ-এর ফোন আসে৷—আপনি ঠিকই বলেছেন স্যর...লোকটা এই মুহূর্তে বেপাত্তা৷ বাড়িতে বিধবা মা আর বোন আছে৷ ওরা কেউই বলতে পারল না তারক কোথায় গেছে বা কবে ফিরবে৷

—তোমার কথাবার্তায় কিছু সন্দেহ করেনি তো?

—মনে হয় না স্যর৷ আমি বাড়ির ভেতর যাইনি৷ যা কিছু কথাবার্তা সব পোস্ট অফিসের ভদ্রলোক করেছে৷ হ্যাটস অফ টু হিম স্যর৷

—কেন...ও গিয়ে কী বলেছে?

—পোস্ট অফিসে তারকের নামে একটা বড় পারসেল এসেছে৷ এর আগে পোস্ট অফিসের পিয়ন মালটা নিয়ে এসে ফিরে গেছে৷ বাড়িতে নাকি কেউ ছিল না৷ এখন ওটা কালেক্ট করতে গেলে তারককে গিয়ে নিজের আই ডি দেখিয়ে পোস্ট মাস্টার সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে আসতে হবে৷

—এরকম হয় বুঝি?

—পোস্ট অফিসের ডেলিভারি ম্যান সুবিমলবাবু তাই বললে৷

তিনদিন পর প্লেন ক্লোদজ-এর কাছ থেকে টিপ অফ পাওয়ার পর ভোর রাত্রে তারককে বাড়ি থেকেই অ্যারেস্ট করা হয়৷ তারক তখন ঘুমোচ্ছিল৷ লাল বাজারে নিয়ে আসার পর তারক সব কিছু ফ্ল্যাটলি ডিনাই করে৷ কিন্তু ওলার ড্রাইভার দিলীপ শর্মা ওকে আইডেনটিফাই করার পর ও একটু দমে যায়৷ এবং যখন তাকে বলা হয় যে মহিলার পেটিকোটে ড্রায়েড সিমেন পাওয়া গেছে এবং ওর সিমেন-এর সঙ্গে সেটা ম্যাচ করা হবে তখন সে পুরো ব্যাপারটা কনফেস করে৷

হাজতে থাকাকালীন তিনদিন কনটিনিউয়াস জেরা করার পর তারক স্বীকার করে যে এটাই ওর প্রথম বার নয়, এর আগেও সে এরকম ভাবে ফেসবুকে মেয়েদের সঙ্গে ভাব করে রেপ করেছে৷ তারকের কাছ থেকে ব্ল্যাকমেল-এর ভয়ে তারা পুরো ব্যাপারটা এতদিন গোপন রাখে৷

—স্যর, একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার নয়৷ তারক না হয় একটা প্রতারক, জালি লোক৷ কিন্তু, মলয়বাবুর স্ত্রী রাধা, সে তো দিব্যি একটা সুস্থ জীবন যাপন করছিল, তার এমন কী হল যে সে ফেসবুকে অজানা, সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেল? শুধু তাই নয়, তাকে দুপুরবেলায় নিভৃতে নিজের বাড়িতে ইনভাইট পর্যন্ত করল?

—বলা মুশকিল৷ থুঁতনিতে হাত বোলাতে বোলাতে রায় বলে৷—একটা জিনিস তো হতেই পারে...বোরডম৷ মহিলার কাছে সারাদিন অফুরন্ত সময় পড়ে আছে৷ এবং ঠিক তখনই ওর স্বামী ওকে একটা ল্যাপটপ গিফট করল৷ এইসব ইলেকট্রিক যন্ত্র সাবধানে ব্যবহার করা উচিত৷ এগুলো যেরকম মানুষের নানা কাজে আসে, এর মধ্যে লুকোনো বেশ কিছু প্রলোভনও আছে...যা মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে৷ রাধার ক্ষেত্রে হয়তো তাই হয়েছিল৷

প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে সায় দেয়৷

—আর জানোই তো...নিষিদ্ধ কোনও কিছুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরকালের৷ রাধা তার ব্যতিক্রম নয়৷ তবে, আমার ধারণা তারককে দেখা মাত্রই মহিলা বুঝতে পেরেছিল যে লোকটা একটা ধাপ্পাবাজ৷

—কী করে বুঝলেন?

—ফেসবুকে উৎপল গাঙ্গুলির ছবিটা দেখেছ? কী হ্যান্ডসম চেহারা৷ রিয়েল লাইফে সে একেবারেই তা নয়৷ আর সেটা বোঝা মাত্র রাধা তাকে কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করে৷ কিন্তু...সেটা আর সম্ভব হয়নি৷

—স্যর...আগে আপনাকে বলা হয়নি৷ তারকের কাছ থেকে রাধার মোবাইল ফোনটা পাওয়া গেছে৷ ওর ফোন থেকে শেষ কল করা হয়েছিল ওর স্বামী মলয়কে৷ মনে হয় ফেসবুক ফ্রেন্ডকে দেখার পরেই৷ কিন্তু, মলয়ের লাইনটা তখন এনগেজড ছিল৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%