বরুণ চন্দ

ক্রিং ক্রিং...
অফিস ঘরে টেলিফোন বাজছে৷ তৃতীয়বার রিং করার পর প্রদ্যোৎ টেলিফোন তোলে৷
—হ্যালো...প্রদ্যোৎ?
—বলছি৷ কিন্তু আপনাকে ঠিক...
—আমার গলা এত সহজেই ভুলে গেলে?
—ওঃ৷ না না স্যার...বলুন৷ অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে প্রদ্যোৎ উত্তর দেয়৷
টেলিফোনের গলাটা ওর বস্ অবিনাশ রায়ের৷
—আপনি ছুটিতে গেছেন তো...হঠাৎ ঠিক বুঝতে পারি নি৷
—এটা জগতের নীতি৷ আউট অফ সাইড, আউট অফ মাইন্ড৷ আর...
রায়ের গলায় প্রচ্ছন্ন বিরগুি৷—আমি ছুটিতে নয়...ঠ্যাং ভেঙে হাঁটু অবধি প্লাস্টার করে বাড়িতে বসে আছি৷ আউট অফ কমপালশন৷
—স্যার...হঠাৎ ফোন করলেন...এনিথিং স্পেশাল?
—না, সেরকম কিছু নয়৷ ঘরে বসে থেকে ভীষণভাবে বোরড৷ ভাবলাম, একবার ফোন করি৷
—থ্যাঙ্কস্ স্যার...প্রদ্যোৎ লাইনে অপেক্ষা করে থাকে৷ গত পাঁচ বছর অবিনাশ রায়ের সঙ্গে কাজ করে ও অন্ততঃ এটুকু বুঝতে পেরেছে যে স্যার বিশেষ কারণ ছাড়া কাউকে ফোন করে না৷
—আজকের কাগজে একটা নিউজ বেরিয়েছে, দেখেছো?
প্রদ্যোৎ মাথা চুলকোয়৷ খবরের কাগজে তো রোজই হাজার হাজার খবর বেরোয়৷ তার মধ্যে স্যার বিশেষ করে কোন খবরের কথা বলছেন সেটা ও কী করে বুঝবে?
—কোন কাগজে স্যার?
—আনন্দবাজার৷ ডিস্ট্রকট নিউজ বা আইন-আদালতের পাতায়৷ পেজ ফাইভ৷
—স্যার, আজকের আনন্দবাজার পড়ার সময় পাই নি৷ আপনার হাতের কাছে কী কাগজটা আছে? যদি একবার পড়ে শোনান৷
—হেড লাইনটা হচ্ছে অপঘাতে বালকের মৃত্যু৷ গতকাল উত্তরপাড়ায় একটা পুকুর থেকে দশ বছরের একটি ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার করা গেছে৷ ছেলেটিকে আগেরদিন সন্ধ্যাবেলা থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, বলে ওর মা বাবা জানিয়েছেন৷ এবং স্থানীয় পুলিশে খবরও দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে৷ পুলিশ এই মৃত্যুকে অপঘাত কিম্বা দুর্ঘটনাজনিত বলেই মনে করছে৷ বিকেল বেলায় ছেলেটি মাঠে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে খেলার পর পুকুরের ঘাটে হাত-পা ধুতে গিয়েছিল৷ এবং ওখানেই কোনওভাবে পা স্লিপ করে ও জলে পড়ে গিয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে৷ ছেলেটি নাকি সাঁতার কাটতে জানতো না৷
একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর প্রদ্যোৎ উসখুস করে৷
—স্যার...নিউজটা তো সেরকম কিছু...মানে সেরকম অ্যাবনরমাল লাগল না৷ কেন...আপনি কিছু সন্দেহ করছেন?
—ওঃ...আসল খবরটাই তোমায় বলা হয়নি৷ টেলিফোনে স্যারের হাল্কা হাসির আওয়াজ৷
প্রদ্যোৎ জানে, স্যার ইচ্ছে করেই আসল খবরটা এতক্ষণ গোপন করে রেখেছে৷ ক্রমশঃ প্রকাশ্য৷
—ছেলেটির বুক পকেটে আধ খাওয়া একটা চকোলেটের বার পাওয়া গেছে৷
—চকোলেটের বার...দ্যাটস্ অল? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞাসা না করে পারে না৷
—দ্যাটস্ অল৷ স্যার একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷—কেন...নিউজটা বুঝি সেরকম ইন্টারেস্টিং লাগল না?
—না...মানে প্রদ্যোৎ ইতস্তত করে৷
—একটা ইয়ং ছেলে চকোলেটের বার অর্ধেক খেয়ে বাকিটা পকেটে ভরে রাখবে এরকম কথা কেউ কখনও শুনেছে? আর, ধরে নেওয়া যাক খেলাধুলার পর ছেলেটি যদি সত্যিই পুকুরে হাত-পা ধুতে গিয়ে থাকে, তাহলে সে সময় বাকি ছেলেগুলো কী করছিল? ওরা ওর সঙ্গে হাত-পা ধুতে যায়নি? ও জাস্ট একাই গিয়েছিল? বিশেষ করে যখন ছেলেটি সাঁতার জানে না৷ এটা তোমার গন্ডগোলের লাগছে না? এ বয়সের ছেলেরা...দে ট্রেন্ড টু স্টিক টুগেদার৷ এ ক্ষেত্রে কিন্তু সেটা হয়নি৷
—পয়েন্ট স্যার...প্রদ্যোৎ স্বীকার করে৷
—পারলে একটু খবর নেবে? আই ফাইন্ড ইট রাদার ইনট্রিগিং৷
বসের চোখও বটে৷ সারা রাজ্যের এত খবর থাকতে ঠিক এই নিউজটাই ওঁর চোখে পড়লো!
—আনন্দবাজার?
—বলছি৷
—নিউজ সেকশনে একবার প্রলয়বাবুকে দেওয়া যাবে?
—ধরুন...এসেছেন কিনা, দেখছি৷ সাধারণতঃ সাড়ে এগারোটার পর আসেন৷
প্রদ্যোৎ লাইনটা ধরে রাখে৷ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করার পর প্রদ্যোৎ খুব তাড়াতাড়ি বুঝে গিয়েছিল যে ক্রাইম সলভ করতে গেলে নানান জনের সাহায্য প্রয়োজন৷ মিডিয়া তার মধ্যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে৷
—ধরুন দিচ্ছি...আপনি লাকি৷ প্রলয়বাবু আজ তাড়াতাড়ি ইন করে গেছেন৷
লাইনে স্ট্যাটিকের আওয়াজ৷
—প্রলয় বলছি৷
—আমি প্রদ্যোৎ...লালবাজার থেকে৷ একমুহূর্তের জন্য লাইনটা চুপ মেরে যায়৷ তারপর হো হো করে হাসির আওয়াজ৷
—ওহ্ তুমি! সাতসকালে লালবাজার থেকে ফোন এসেছে শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম৷ তা...বলো কী ব্যাপার?
বলার আগে প্রদ্যোৎ একটু ইতস্তত করে৷ একটা সাহায্যের প্রয়োজন৷
—সেটা তো বলাই বাহুল্য৷ পুলিশ কনও এমনি এমনি ফোন করে?
—সরি—জনসাধারণের পুলিশ সম্বন্ধে এরকম ধারণা জানতাম না৷
কথাটা যে মিথ্যে নয় সেটা প্রদ্যোৎ জানে৷ কিছুক্ষণ আগে ও স্যার সম্বন্দে ঠিক একই ধারণা পোষণ করেছিল৷
—তা কী জানতে চাও শুনি?
—আজকের আনন্দবাজারে একটা খবর বেরিয়েছে৷ পেজ ফাইভ-এ৷ বালকের অপঘাতে মৃত্যু৷ সে বিষয়েই একটু...
—দাঁড়াও বাপু, আগে কাগজটা যোগাড় করি৷ পেজ বাই পেজ নিউজ কারও মনে থাকে নাকি?
—প্রদ্যোৎ লাইনটা ধরে থাকে৷
—হ্যাঁ পেয়েছি৷ পেজ ফাইভ বললে তো?
—হ্যাঁ...কাগজের নীচের দিকটায়৷
—হ্যাঁ...৷প্রলয় চট্ করে একবার নিউজটায় চোখ বুলিয়ে নেয়৷
—এটা তো প্লেন অ্যান্ড সিম্পল অ্যাকসিডেন্টাল ডেথ৷
—এটা নিউজ যে ফাইল করেছে তার সঙ্গে একবার কথা বলা যায়?
—দেখতে হবে৷ কেন, এর মধ্যে কোনও রহস্যের গন্ধ পেলে নাকি?
—না না৷ সেরকম কিছু নয়৷ জাস্ট একটু কথা বলার ছিল৷
প্রদ্যোৎ প্রলয়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যায়৷
—ছেলেটা খুব সম্ভবত ফ্রিলানস্ রিপোর্টার৷ ডিস্ট্রিকের বেশিরভাগ নিউজই ওরকম৷ কিছুক্ষণ পরে তোমাকে তার নাম-ফোন নাম্বার জানাচ্ছি, তবে একটা শর্ত আছে৷ এ ঘটনার মধ্যে যদি কোনও ফাউল প্লে পাও, তাহলে কিন্তু এই স্টোরিতে আমাদের এক্সক্লুসিভ রাইট রইল৷
—ঠিক আছে৷
প্রদ্যোৎ মনে মনে হাসে৷ পেতে গেলে কিছু দিতেও হয়৷
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রলয়ের কাছ থেকে ফোন আসে৷ ছেলেটির নাম অরূপ তালুকদার৷ তার ফোন নাম্বারটাও প্রলয় টেকস্ট করে পাঠায়৷
জিটি রোড দিয়ে ঢুকলে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উত্তরপাড়া থানা৷ থানার ওসি বিকাশরঞ্জন সমাদ্দার নতুন ট্রান্সফার হয়ে এসেছে৷ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে এখানকার হালচাল রপ্ত করে নিয়েছে৷ সকালে থানায় এসেই বিকাশবাবু চৌকিদার মন্ডলকে দিয়ে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম কচুরি আর এক কেটলি চা আনতে পাঠায়৷ কচুরিটা নিজের জন্য৷ চা’টা অবশ্য বাকি সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়ে থাকে৷
বিকাশবাবুর সকালের জলখাবার থানায় এসে খাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ আছে৷ ওর স্ত্রী নয়নতারা অত্যন্ত মুখরা প্রকৃতির মহিলা৷ বাড়িতে জল খাবার চাইতে গেলে তার পরিবর্তে মুখ-ঝামটা খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ তাই, গৃহে যত কম সময় থাকা যায় ততই মঙ্গল৷
অন্য কারণটা হল ময়রার দোকানের কচুরি ও ছোলার ডাল অতীব সুস্বাদু৷ একদিনেই বিকাশবাবুর মনে ধরে গেছে৷ বিশেষ করে যখন তার জন্য কোনও পয়সা দিতে হয় না৷
কিছুক্ষণ পর মন্ডল কচুরি আর চা নিয়ে আসে৷ কিন্তু, তার মুখ একদম হাঁড়িপানা হয়ে আছে৷
—কীরে...মুখ বেজার করে আছিস কেন?
—স্যার, গত সপ্তাহের টাকাটা...
—বলিস কীরে...পয়সা চাইছে? থানার ওসির কাছ থেকে?
—হ্যাঁ স্যার...বলছে প্রতিদিন এরকম বাকিতে খাবার খাওয়াতে গেলে ওর দোকান নাকি দু’দিনেই লাটে উঠে যাবে৷
—আচ্ছা...এরকম কথা! দেখাচ্ছি মজা৷ থানার ওসি’র কাছ থেকে এরকম ঘন ঘন টাকার জন্য তাগাদা করা...এটা তো ওর সমীচীন হচ্ছে না৷ নাঃ! এর একটা বিহিত করতেই হয়৷ উত্তেজনায় বিকাশ রঞ্জনের গোঁফ খাড়া হয়ে ওঠে৷—তবে, তার আগে তুই প্লেটে করে চট্পট্ কচুরিটা দিয়ে যা ঠান্ডা হয়ে গেলে ওটা আর খাওয়া যায় না৷ মন্ডল কচুরি আর আলুর তরকারি প্লেটে করে দিয়ে যায়৷
—ওঃ! আজ বুঝি কচুরির সঙ্গে আলুর তরকারি করেছে? ভাবা যায় না৷ একটা গোটা কচুরি আলুর তরকারি সহযোগে বিকাশরঞ্জন নিজের মুখে পুরে দেয়৷ আনন্দে তার চোখ বুজে আসে৷
—বনবেড়াল না কী যেন নাম তার?
মন্ডল বিকাশবাবুর কচুরি খাওয়াটা লোলুপ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে৷
—ময়রাটার কথা বলছেন স্যার? ওর নাম বন বেড়াল নয়...বনওয়ারি লাল৷
—ওই হল৷ যা বলছি শোন, লোকটাকে থানায় আসতে বল৷ বলবি, ওসি সাহেব তলব করেছে৷
—ঠিক আছে, তুলে নিয়ে আসব স্যার৷ মন্ডল খুশি হয়ে মাথা নাড়ে৷ বনওয়ারি লালকে টাইট দিতে পারলে খুব ভাল হয়৷ এর মধ্যে একদিন ও ফ্রি জিলিপি টেস্ট করতে চেয়েছিল৷ কত্তবড় উদ্ধত লোকটা...ওকে দিল না!
—দাস...একটু খবর নাও তো বনবেড়ালের কর্মচারীরা কোথায় টয়লেট করে৷
—টয়লেট...ঠিক বুঝলাম না৷
—আরে বাবা...বাথরুম...পেচ্ছাপ৷ ওগুলো তারা কোথায় গিয়ে করে?
সারাদিন তো আর পেটে জমিয়ে রাখতে পারে না!
—দেখছি স্যার!
—রাস্তায় কিম্বা দোকানের পিচনে গিয়ে করলে...কমিটিং নুইস্যান্স ইন এ পাবলিক প্লেস, দণ্ডনীয় অপরাধ৷ আর গিয়ে দেখ ণ্েদর রসুই ঘরে কীভাবে রান্না হচ্ছে৷ কোথা থেকে খাবার জল আসছে৷ এতটুকু নোংরা পেলে...কুকিং ইন অ্যান আনহাইজেটিক কনডিশন...এনডেনজারিং পাবলিক হেলথ৷ ওটাও দণ্ডনীয় অপরাধ৷ আপাতত, এই দুটো কারণ দেখিয়েই ওকে হাজতে পোরা যায়৷
এতক্ষণ ওসি’র মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে ওঠে৷
—তারপর দেখছি আমাদের বনবেড়াল পোষ মানে কিনা৷
এমন সময় ল্যান্ড লাইনটা বেজে ওঠে৷ চোখ দিয়ে ওসি সাহেব সাব-ইন্সপেকটার দাসকে রিসিভারটা তুলতে ইশারা করে৷
—হ্যাঁ...উত্তরপাড়া থানা৷ সাব-ইন্সপেক্টার দাস বলছি৷ কোথা থেকে...লালবাজার?
রিসিভারের মুখ হাত দিয়ে চেপে দাস বিকাশরঞ্জনের দিকে তাকায়৷
—লালবাজার থেকে ফোন করেছে না হাতি৷ যত সব উট্কো ফোন কল...লাইন কেটে দাও৷
বিকাশবাবুর কথা মতো দাস টেলিফোন নামিয়ে রাখে৷
—খাওয়ার সময় ডিসটারব করা আমার একদম ভাল লাগে না৷
কচুরির বাকি অংশ দিয়ে প্লেট পুঁছে বিকাশ সেটা মুখে পোরে৷
এক মিনিটের মধ্যে টেলিফোনটা আবার বেজে ওঠে৷
—নাঃ! এরা আমাকে একটু স্বস্তিতে খেতেও দেবে না৷
অত্যন্ত বিরগু হয়ে বিকাশ টেলিফোনটা দিকে তাকায়৷
—ধরবো? দাস জিজ্ঞেস করে৷
—ধরবে না তো কী করবে? হাত পকেটের মধ্যে পুরে রাখবে?
ওসি সাহেব মুখ ভেংচে বলে৷
—হ্যালো...সাব-ইন্সপেকটার দাস বলচি৷ কী বললেন? না না...ফোনটা জাস্ট কেটে গেল৷ কী যে বলেন স্যার...আমরা ফোনটা কেটে দিতে যাব কেন? এক সেকেন্ড ধরুন...আমি আমাদের ওসি বিকাশরঞ্জন বাবুকে লানটা দিচ্ছি৷
টেলিফোনের মুখ চেপে দাস বিকাশরঞ্জনের দিকে তাকায়৷
—উটকো কল নয় স্যার...ডিটেকটিভ অফিসার প্রদ্যোৎ মিত্র ফ্রম লালবাজার৷ আপনার সঙ্গে বিশেষভাবে কথা বলতে চান৷
—দাও...চেয়ারের পিঠে ঝোলানো হলুদ তোয়ালেতে আঙুল মুছে বিকাশ রঞ্জন টেলিফোন ধরে৷
—ওসি বিকাশরঞ্জন সমাদ্দার বলছি৷
নিজের গলা যতটা সম্ভব হেঁড়ে করে সমাদ্দার কথা বলে৷ আগে বলা হয় নি, সমাদ্দারকে দেখতে শুনতে সেরকম ইমপ্রেসিভ নয়৷
—কে? আচ্ছা বলুন৷ হ্যাঁ হ্যাঁ...কোন কেসটা বলুন তো? ও...ওই বাচ্চা ছেলেটির পুকুরে ডুবে যাওয়ার ইনসিডেন্টটা? ওটা তো স্ট্রেট ফরওয়ার্ড অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ৷ অপঘাতে মৃত্যু৷ না না...অন্য কিছু ভাবতে যাব কেন? কী বললেন...ছেলেটির বন্ধুবান্ধবদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কিনা...না, কর হয়নি৷ কেননা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নিঙ৷
এরপর সমাদ্দার চুপ করে কিছুক্ষণ কথা শোনে৷
—হ্যাঁ হ্যাঁ প্রিলিমিনারি ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বইকি৷ নইলে জানতে পারবো কী করে যে ছেলেটি সাঁতার কাটতে জানতো না৷ কী বললেন? আপনারা আসতে চান...কেন বলুন তো? কোনও ফাউল প্লে সন্দেহ করছেন?
এরপর সমাদ্দারের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়৷
—না না...আপত্তি থাকবে কেন? আপনারা আসতে চান আসুন৷ তবে দেখবেন...সমাদ্দার একটু ব্যঙ্গ করেই কথা বলে৷—মশা মারতে যেন কামান দাগা না হয়৷
কল শেষে হয়ে গেলে সমাদ্দার সশব্দে টেলিফানের রিসিভারটা নামিয়ে রাখে৷
—এ প্রশ্ন করেছি কিনা...সে প্রশ্ন করেছি কিনা৷ আমাকে এখন ইনটাররোগেশন শেখাতে এসেছেন৷ যতসব!
—আসতে পারি স্যার?
বিকেলে প্রদ্যোৎ অবিনাশ রায়ের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়৷
—এসো এসো...৷ প্রদ্যোৎকে দেখে রায় যারপর নাই খুশি৷ —বুঝলে প্রদ্যোৎ...সারাদিন বিছানায় শুয়ে একেক সময় মাথা খারাপ লাগে৷
স্যারের কাছে চেয়ার টেনে প্রদ্যোৎ বসে৷
—এত বড় প্লাস্টার লাগিয়েছে! প্রদ্যোৎ চোখ গোল করে বলে৷—আজকাল তো এরকম সাধারণত...
—আর বলো না৷ বুড়ো হাড়, তায় আবার কমপাউন্ড ফ্র্যাকচার৷ ডাগুার কিছুতেই হালকা প্লাস্টার দিতে রাজী হল না৷ কই গো...রায় ভেতরের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে—প্রদ্যোৎ এসেছে...ওর ফিসফ্রাইটা আনে৷
প্রদ্যোৎ যে খেতে ভালবাসে তা রায় জানে৷ তাই আগের থেকেই বিজলী গ্রিল থেকে ওর জন্য ফিসফ্রাই আনিয়ে রেখেছে৷
ফিসফ্রাই শেষ হলে চা আর বিসুকট আসে৷
—কাজ কিছু এগুলো?
রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে প্রদ্যোৎ সায় দিয়ে মাথা নাড়ে৷
—হয়েছে স্যার৷ আনন্দবাজারের নিজস্ব সংবাদদাতার সঙ্গে দেখা করে খবর নিয়েছি৷ ও যা বলছে তা মোটামুটি এরকম৷ ছেলেটির নাম তাপস, তাপস রায়৷ বয়েস দশ এগারো হবে৷ উত্তরপাড়া অমরেন্দ্র উচ্চ বিদ্যাপীঠ-এর ছাত্র৷ ক্লাস ফাইভে পড়তো৷ পড়াশুনোর ভাল ছিল৷
—ওর মা বাবা?
—দু’জনেই এডুকেশন লাইনের মা’র নাম মীরা, দেবেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান৷ আর বাবা কলকাতার সিটি কলেজে ইভনিং সেকশনে অ্যাকাউনটেন্সি পড়ান৷
—তার মানে...দিনের বেলায় বাবা বাড়িতে থাকেন৷ আর মা সুকলে?
—হ্যাঁ৷
—ছেলেটির সুকল কখন ছুটি হয়?
—সাড়ে তিনটে৷ সুকল শেষ হলে ছেলেটি সাধারণত বাড়ি চলে আসে৷ মানে আসতো৷
—কিন্তু সেদিন আসে নি?
—না৷ ওর বাবা তখন বাড়িতেই টিউশানি করছিলেন৷
—হুঁ৷ অন্যমনস্কভাবে রায় থুতনি চুলকায়৷ আর পুলিশ...পুলিশ কী বলছে?
—পুলিশ? ওদের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভাল৷ ওখানকার ওসি’র মতে এটা একটা প্লেন অ্যান্ড সিম্পল অ্যাকসিডেন্টাল ডেথ৷ ওপেন অ্যান্ড শার্ট কেস৷
স্যারের দেখাদেখি প্রদ্যোৎ-এর কথাতেও ইদানীং ইংরেজি কথার আধিক্য দেখা দিয়েছে৷
—ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম ছেলেটির সুকলে গিয়ে কোনও খোঁজখবর নেণ্য়া হয়েছে কিনা৷ তাতে উনি জবাবে বললেন, তার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করেন নি তিনি৷
—ও গড! ছেলেটির সুকলে অবশ্যই খোঁজখবর নেওয়া উচিত৷ ছাত্রদের মধ্যে অনেক সময়ই রেষারেষি থাকে৷ শত্রুতা থাকে৷ আর, তাছাড়া খেলার পর যাদের সঙ্গে ছেলেটি পুকুরে হাত-পা ধুতে গিয়েছিল তাদেরও তো জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার৷
ঠোঁটে আঙুল রেখে যায় কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করে৷
—প্রদ্যোৎ আমার মনে হচ্ছে তোমার একবার ওখানে যাওয়া দরকার৷ অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না৷ টু মেনি লুজ এন্ডস্ যাবে?
স্যারের কথায় উৎসাহে প্রদ্যোৎ-এর চোখ চিক্চিক্ করে ওঠে৷ এরকম ইনডিপেনডেন্ট অ্যাসাইনমেন্ট তো আর সচরাচর পাওয়া যাবেন না৷
—কিন্তু, অফিসে কী বলবো স্যার? বিশেষ করে যখন আপনি অনুপস্থিত৷
—ও নিয়ে তুমি ভেবো না৷ ডিসি সাহেবকে বলে আমি পারমিশন করিয়ে নিচ্ছি৷ তোমার লীভ ইনট্যাক্ট থাকবে, সে বিষয়ে রেষ্ট অ্যাসিওরড৷ আর, যাবার সময় একটা গাড়ি নিয়ে নিও৷ উত্তরপাড়ায় পৌঁছে অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরি কতে হতে পারে৷ সময় বাঁচবে৷
পরের দিন বেলা বারোটা বাজে৷ অবিনাশের হাতে এখন অফুরন্ত সময়৷ ছেলের দেওয়া আই পড কানে লাগিয়ে ও মোৎসার্ট শুনছিল৷ এমন সময় শর্মি এসে ওর হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দেয়৷
—দয়া করে কান থেকে ওটা সরাও৷ তোমার ফোন...
—কার? কান থেকে হেডফোন না সরিয়েই অবিনাশ জিজ্ঞেস করে৷
—আর কার...তোমার অ্যাসিসটেন্ট প্রদ্যোৎ-এর৷
তাড়াতাড়ি কান থেকে আই পড সরিয়ে অবিনাশ প্রদ্যোৎ-এর কল নেয়৷
—কী খবর বলো৷
—খুব ভোরে বেরিয়ে পড়েছিলাম স্যার৷ আপনার কথা মত গাড়ি নিয়েছি৷ উত্তরপাড়ায় পৌঁছতে একদম সময় লাগে নি৷ সবচেয়ে আগে তাপসদের বাড়িতে গেলাম৷ যাতে ওর মা-বাবাকে কোনও মতেই মিস না করি৷
—দেরি হলেও তুমি ওদের পেতে৷ ঠিক এই মুহূর্তে ওঁরা সুকল-কলেজ যাচ্ছেন না নিশ্চয়ই৷
—তবু...আই ডিডন্ট ওয়ান্ট টু টেক এনি চান্স৷
—ঠিক আছে৷ ওদের সঙ্গে কী কথাবার্তা হল?
—হ্যাঁ স্যার৷ ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হল ছেলেটি বোধহয় সেদিন সুকল থেকে বাড়ি ফেরেনি৷
—সেটা উনি জানলেন কী করে?
—ওদের একতলায় ফ্ল্যাটটা ছোট৷ বাইরের ঘরের দরজায় কেউ নক করলে খাওয়ার ঘরে সহজেই শোনা যায়৷
—তার মানে...ভদ্রলোক খাওয়ার ঘরে পড়াচ্ছিলেন?
—হ্যাঁ স্যার৷ সুকল শেষ করে তাপস সাধারণত পৌনে চারটে-চরটের মধ্যে চলে আসে৷ সেদিন ওর বাবা ওই সময় দরজায় কোনও নক শুনতে পান নি৷
—কলিং বেলটা নাকি বেশ কিছুদিন ধরে খারাপ৷ সারাই করবো করবো করেও আর সারাই করা হয়ে ওঠে নি৷
—বুঝলাম৷
—তাপসের বাবা চারটে বাজার পর বাইরের ঘরের দরজা খুলে নাকি একবার দেখেও এসেছিলেন৷ তাপসকে কোথাও দেখতে পাননি৷
—তাপসের ক্লাসমেটর কী বলছে?
—তারও খবর নিয়েছি স্যার৷ নিরঞ্জন বলে একটি ছেলে ওদের বাড়ির কাছে থাকে৷ একসঙ্গে সুকলে যায়, একসঙ্গে ফিরে আসে৷
—তা নিরঞ্জন কী বলছে? সেদিন তাপস ওর সঙ্গে ফেরে নি?
—স্যার, নিরঞ্জন আজ সুকলে অসে নি৷
—তুমি এক কাজ করো, সুকল থেকে নিরঞ্জনের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করো৷ তাপস সেদিন ওর বাড়ি এসেছিল কিনা জানা দরকার৷ আরেকটা জিনিস...
অবিনাশ থুতনিতে হাত বুলিয়ে চিন্তা করে৷
—তাপসের বাবা-মা কী ওকে রেগুলার পকেটমানি দিত?
—স্যার...এই প্রশ্নটা আমি অলরেডি করেছি৷ ওর বাবা-মা বললেন এমনিতে ওরা ছেলের হাতে পকেট মানি দেন না৷ আমার ধারণা এসব মফঃস্বল শহরে পকেট মানির অতটা চল নেই যতটা বড় বড় শহর রয়েছে৷
—তার মানে ওরা তাপসকে চকোলেট কেনার জন্য পয়সা দেন নি৷ তাহলে তাপস চকোলেট কেনার টাকা পেল কোথা থেকে? ওকে কী কেউ কিনে দিল? প্রদ্যোৎ সুকলে গিয়ে আবার ভাল করে খোঁজ নাও৷ নিরঞ্জন ছাড়া কারা কারা ওর বন্ধু-বান্ধব? কাদের সঙ্গে ও ফুটবল খেলতে যেত? তাদের মধ্যে কেউ ওকে চকোলেট কিনে দিয়েছে কি না? দাঁড়াও প্রদ্যোৎ৷
অবিনাশ আবার থুতনি চুলকায়৷
—এমনও তো হতে পারে যে ক্লাসেরই কেউ ওকে প্রলোভন দেখিয়ে সঙ্গে নিয়ে যায়, আর ওকে চকোলেটটা কিনে দেয়৷ তারপর পুকুরের কাছে নিয়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দেয়৷ এমন কেউ...যে জানতো তাপস সাঁতার কাটতে জানে না৷
—আপনি ভাবছেন ক্লাসে তাপসের সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল কি না!
—আই অ্যাম নট্ সারটেন৷ তবে ছাত্রদের মধ্যে অনেক সময় রেষারেষি থাকে৷ তার থেকে যদি...
—কিন্তু তাপসকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হল, আর সেটা কেউ দেখতে পেল না?
—সেটাও একটা কথা৷ তাহলে কী সন্ধেবেলায় গিয়ে ওকে কেউ ফেলল? যখন লোকে সেটা দেখতে পাবে না?
—ওহ্ প্রদ্যোৎ...অরেকটা জিনিস খবর নেবে? তাপস যে পুকুরটায় ডুবে মারা যায়, তার কাছাকাছি কোনও স্টেশনারি দোকান আছে কি না যেখানে চকোলেট কিনতে পাওয়া যায়?
—দেখছি স্যার৷ প্রদ্যোৎ লাইনটা কেটে দেয়৷
আইপডটা কানে তুলে নিতে গিয়েও অবিনাশ ওটা আবার নামিয়ে রাখে৷ কেন যেন ঠিক এই মুহূর্তে আর ওর মিউজিক শুনতে ইচ্ছে করে না৷
দুপুর তিনটের প্রদ্যোৎ-এর ফোন আসে৷
—স্যার, ডিসটারব করলাম না তো?
—না না...বলো৷
—প্রথমে নিরঞ্জনের কথায় আসি৷ সুকল থেকে অ্যাড্রেস যোগাড় করে আমি ওর বাড়ি গিয়েছিলাম৷ ও বলছে সেদিন সুকল ফেরত ওরা দু’জনে একই সঙ্গে বাড়ি ফিরেছে৷
—সেটা কী করে হয়?
—বলছি স্যার৷ তাপসের বাড়ি পৌঁছনোর একটু আগে নিরঞ্জনদের বাড়ির গলি৷ সেখান পর্যন্ত ওরা দু’জন একসাথে এসেছে৷ এখন, নিরঞ্জন বলতে পারছে না যে শেষ পর্যন্ত তাপস বাড়ি না গিয়ে অন্য কোথাও গেছে কি না৷
—ব্যাপারটা খুবই ইনটারেস্টিং৷ অর্থাৎ নিরঞ্জনদের গলি, আর তাপসদের বাড়ি...এরই মধ্যে কেউ তাপসকে ধরে৷
—মানে...‘ছেলে ধরা’ বলছেন স্যার?
—না না...এমন কেউ যে ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যায়৷ অবভিয়াসলি ওর থেকে কেক্ষ৷ যাকগে ও কতায় পরে আসছি, সুকলের খবর কী? ওর ক্লাসমেটরা কী বলছে?
—সুকলের বন্ধুরা বলছে সেদিন ও ও মাঠে এসেছিল বটে, কিন্তু খেলে নি৷ চুপচাপ নাকি মাঠের ধারে বসেছিল৷
—আচ্ছা! শরীর খারাপ লাগছিল?
—সেরকম কিছু বলতে পারলো না৷ বললো, জাস্ট চুপ করে ওদের খেলা দেখছিল৷ ওরা বলেছিল তুই না খেলিস...অন্তত রেফারি হ’৷ ও সেটাতেও রাজী হয় নি৷
—হুঁ...শরীর খারাপ, কিম্বা মন খারাপ৷
—সুকলে গিয়ে আমি আরও খবর নিয়েছি৷ ওর বন্ধু-বান্ধব কারা, কারও সঙ্গে ওর শত্রুতা আছে কিনা৷
—খুব ভাল কথা৷ কী শুনলে?
—নিরঞ্জন ছাড়াও ওর ক্লাসের কয়েকজন বন্ধু আছে৷ তাদের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেল৷ তাপস ছেলেটি একটু নিরীহ, ভাল মানুষ টাইপের৷ সাতেও নেই, পাঁচেও নেই৷
—ছেলেটি তো পড়াশুনোয় ভাল ছিল৷ সেই নিয়ে কোনও রেষারেষি?
—মনে হয় না স্যার৷ তাপস পড়াশুনোয় ভাল ছিল বটে, তবে ক্লাসে কোনওদিন ফার্স্ট সেকেন্ড হয় নি৷ অতএব সুকলে কারও সঙ্গে এমন শত্রুতা ছিল বলে মনে হয় না, যার থেকে ওর জীবন নিয়ে সংশয় উঠতে পারে৷
—ঠিক আছে, ছেলেটির কোন ছবি যোগাড় করতে পেরেছো?
—ইয়েস স্যার৷ নইলে আমি স্টেশনারি দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসবাদ করব কী করে? আগে ছেলেটির আইডেনটিফাই করাতে হবে তো৷
—গুড৷
—তাপসের ছবি নিয়ে আমি ওর সুকল, বাড়ি আর পুকুরের কাছাকাছি যে ক’টা স্টেশনারি দোকান আছে, সবকটাতেই গিয়ে দেখা করি৷ তাপসের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি কয়েকদিন আগে এই ছেলেটিকে ওরা ওদের দোকানে আসতে দেখেছে কিনা৷ আমি এও বলি যে ছেলেটির সঙ্গে অন্য কোনও কেউ থাকতে পারে, যে ওকে চকোলেট কিনে দিয়েছে৷
—কিছু জানতে পারলে?
—হ্যাঁ স্যার৷ প্রদ্যোৎ খুব উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দেয়৷ ওই পুকুরের ধারে যে স্টেশনারি দোকানটা, সেখানকার একজন কর্মচারি বললো, যে সে তাপসকে ওদের দোকান আসতে দেখেছে৷ তবে, ও যেটা বললো সেটা একটু অদ্ভুত৷ ওর সঙ্গে নাকি খুব সম্ভবত একটি মেয়ে এসেছিল৷ সুকল ইউনিফর্ম ওরা৷ ছেলেটির থেকে বয়েসে কয়েক বছর বড়৷
—রিয়েলি!
—তবে, দিন তিনেক আগেকার ঘটনা তো...সে খুব শিয়োর নয়৷
—সুকল ইউনিফর্মের রং বলতে পারলো?
—হ্যাঁ৷ হোয়াইট অ্যান্ড স্কাই ব্লু৷ হোয়াইট ব্লাউজ, ব্লু স্কার্ট৷
—গ্রেট৷ আমাদের এখন জানতে হবে উত্তরপাড়ায় কোন গার্লস সুকলের ইউনিফর্ম হোয়াইট অ্যান্ড ব্লু৷ খুব একটা ডিফিকাল্ট কাজ নয়৷ উত্তরপাড়ায় তো আর অনেকগুলো গার্লস সুকল থাকতে পারে না৷ আইডিয়া! শোন...তুমি তাপসদের বাড়িতে ফিরে যাও৷ ওর মা’তো ওখানকারই কোন গার্লস সুকলের টিচার৷ উনিই তোমায় বলে দিতে পারবেন৷
—থ্যাংক ইউ স্যার৷ উইল ডু৷
সন্ধেবেলায় প্রদ্যোৎ যখন আবার ফোন করে তখন রায় ফোনের পাশেই পা ছড়িয়ে বসে আছে৷ একটু আগেই শর্মিলা এসে চা আর এক কাঁসার বাটিতে মুড়ি বাদাম দিয়ে গেছে৷ কয়েক বছর আগে রায়ের পেটে আলসার ধরা পড়েছিল৷ এখন সেটা সেরে গেছে৷ তবু ডাগুার বলেছেন যে তেল ছাড়া মুড়ি নাকি অ্যাসিডিটি অ্যাবসরব করতে সাহায্য করে, তাই৷ বিকেলে বাড়ি থাকলে এই জলখাবারই ওর বরাদ্দ৷
রায়ের অবশ্য মনে হয় এটা শর্মির একটু বাড়াবাড়ি৷
—হ্যাঁ বলো৷
একবার রিং করতেই রায় রিসিভার তোলে৷ বাড়িতে থাকলে রায় আরেকটা জিনিসও অ্যাভয়েড করে৷ মোবাইল ফোন ব্যবহারে করা৷
—স্যার...তাপসদের বাড়ি ফিরে গিয়ে ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে৷ অ্যাজ এ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট, প্রদ্যোৎ গলা নামিয়ে কথা বলে৷ এই মুহূর্তে আমি ওই বাড়ি থেকেই কথা বলছি৷
—গুড৷ আমার কোনও প্রশ্ন থাকলে এখন এখনই জবাব পাওয়া যাবে৷
—একজ্যাক্টলি স্যার৷ সাদা ব্লাউজ আর স্কাই ব্লু স্কার্ট নাকি দেবেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়েরই ইউনিফর্ম৷
—মানে, ভদ্রমহিলা যেখানে ইংরেজি পড়ান, সেই সুকল?
—ইয়েস স্যার৷
—ইন্টারেস্টিং৷ টেলিফোন হাতে নিয়ে রায় কী একটা গভীরভাবে চিন্তা করে৷
—কই গো...তোমার মুড়ি’তো এবার মিইয়ে যাবে৷
শর্মি একবার রায়ের পাশে রাখা অভুগু চা আর মুড়ির বাটিটার ওপর চোখ বুলিয়ে চলে যায়৷
—স্যার...আপনিতো
—সরি প্রদ্যোৎ...একটা জিনিস ভাবছিলাম৷ ইট মাইট বি আ লং শট কিন্তু ট্রাই করতে দোষ কী? তুমি একবার জিজ্ঞেস করো তো ভদ্রলোক সেদিন দুপুরে কাদের পড়াচ্ছিলেন৷
—স্যার...জেনে নিয়ে এক্ষুনি কল ব্যাক করছি৷
কাপে মুখ দিয়ে রায় দেখে চা’টা ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ কিন্তু, নতুন করে চা বানানোর জন্য শর্মিলাকে ওর বলতে ইচ্ছে করে না৷ এমনিতেই সারাদিন অবিনাশের সব কিছু করে দিতে হয় ওকে৷
এমন সময় রায়ের টেলিফোন বেজে ওঠে৷
—প্রদ্যোৎ বলো৷
—স্যার তাপসের বাবা একসঙ্গে তিনজনকে পড়ান৷ তার মধ্যে একটি ছেলে, নাম সৌমিত্র৷ অন্য দু’জন ছাত্রী, দু’জনেই দেবেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ে৷
—একটা জিনিসের তো হিসেব মিলছে না প্রদ্যোৎ৷
—কী স্যার?
—এরা তিনজনই তো সুকলে পড়ে, তাই না?
—হ্যাঁ, সেরকমই তো বললেন ওর বাবা৷
—তাহলে উইক ডে-তে ওরা দুপুরবেলায় কী করে টিউশনি পরতে এল? ওদের তো ওই সময় সুকলে থাকার কথা৷
—স্যার, এটা আমার মাথায়ও স্ট্রাইক করেছিল৷ আসলে, ওরা তিনজনেই ক্লাস টুয়েলভ-এ পড়ে৷ উচ্চমাধ্যমিক ফাইনাল ইয়ার৷ ওদের টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে৷ এখন আর অ্যাটেন্ড করতে হয় না৷
—আচ্ছা৷ ছাত্রী দু’জনকে ট্রেস করতে পারলে?
—হ্যাঁ৷ একজনের নাম পারমিতা, আর অন্যজনের নাম তনুশ্রী৷ দু’জনেই উত্তরপাড়ার মেয়ে৷ তাপসের বাবাকে প্রশ্ন করে জানলাম যে পরশুদিন ‘তনুশ্রী’র শরীর খারাপ ছিল বলে টিউশনিতে আসতে পারে নি৷
—আর, ছেলেটি?
—কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গেছে৷
—তার মানে...সেদিন একমাত্র পারমিতাই ভদ্রলোকের কাছে পড়তে এসেছিল?
—হ্যাঁ স্যার৷
—মেয়ে দু’জনকে আজকের মধ্যেই লোকেট করো৷ ওদের দু’জনকে যে দোকান থেকে চকোলেট কেনা হয়েছিল, সেখানে নিয়ে যাও, দেখ, এদের মধ্যে কাউকে দোকানের কর্মচারি আইডেনটিফাই করতে পারে কি না৷
—মানে, তাপসের সঙ্গে যে মেয়েটিকে চকোলেট কিনতে দেখা গিয়েছিল, এদের দু’জনের মধ্যে কেউ কি না?
—একজ্যাক্টলি৷ খোঁজ নিয়ে আমার জানাও৷ দেরী হয়ে গেলে দোকানের লোকেরা আর নাও মনে রাখতে পারে৷
—ঠিক আছে স্যার৷ তাপসের মা-বাবাকে আর কিছু প্রশ্ন করার আছে৷
—আপাতত নয়৷ প্রয়োজন পড়লে পরে একবার দেখা কোরো গাড়িটা ছেড়ে দাওনি তো?
—না স্যার৷
সারাটা সন্ধে রায় টেলিফোনের সামনে চুপ করে বসে থাকে৷ এর মধ্যে ওর আরও দু’কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে৷ কিন্তু, প্রদ্যোৎ-এর ফোন আর আসে না৷ শেষ পর্যন্ত আটটার সময় টেলিফোন বেজে ওঠে৷ একবার বাজতেই রায় রিসিভারটা তোলে৷
—হ্যাঁ প্রদ্যোৎ বলো৷
—প্রদ্যোৎ কে রে? আমি তো তোদের মীরু পিসি বলছি৷
—ও মীরু পিসি? তা কী খবর বলো? রায় বিরগুিচেপে বলে৷
শর্মির সঙ্গে কথা বলবে? তোমার নাম্বরটা বলো, আমি শর্মিকে ফোন করতে বলছি৷
—নারে শর্মির সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই না, কথাটা তোর সঙ্গে৷ রায় রিসিভারটা কান থেকে একটু দূরে সরায়৷ কানে খাটো বলে এই পিসি একটু জোরে কথা বলেন৷
—শোন,...পরশু আমি কলকাতায় আসছি, ট্রেনে৷ তুই তো পুলিশের বড় অফিসার৷ স্টেশনের আমার জন্য গাড়ি পাঠাতে পারবি?
মীরু পিসি পাটনায় থাকেন৷ চুরাশি বছর বয়েস৷ এখনও একা চলাফেরা করেন৷ পিসেমশাই গতবছর গত হয়েছেন৷ অতএব, এই বিধবা পিসি কলকাতায় এলে তার দেখাশোনা করার নৈতিক দায়িত্ব এখন রায়ের ওপর এসে পড়েছে৷ অবিনাশ ছাড়াও মীরু পিসির ঢের আত্মীয়-আত্মীয়া আছে কলকাতায়৷ কিন্তু...ভদ্রমহিলার বিশেষ করে এই ভাইপোকেই পছন্দ৷
—তোকে আমি বলতাম না, জানিস...কিন্তু কী হল বল দেখিনি? পরশু চান করতে গিয়ে আমি বাথরুমে ধপাস করে পড়ে গেলাম৷
—সেকি! ফ্র্যাকচার-ট্যাকচার হয়নি তো?
—না না, সেরকম কিছু না৷ বাঁ দিকের হাঁটুটা ফুলে একটু লাউয়ের মতো হয়ে গেছে...এই আর কি৷ অবশ্য, তাতে আমার কিছু যায় আসে না৷ নীরদকে বলে আমি একটা ওয়াকিং স্টিক যোগাড় করে ফেলেছি৷ ওই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি৷
—আচ্ছা পিসি...কোন ট্রেনে কখন আসছো সেটা তুমি পরে ফোন করে জানিয়ে দিও, আমি স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করছি৷ আমার না এখুনি একটা জরুরী কল আসবে, তাই ফোনটা...
—এই সবসময় তোর তাড়া...তুই আমায় নিতে আসবি তো?
—সে গুড়ে বালি৷ আমি নিজেই পা ভেঙে প্লাস্টার লাগিয়ে বাড়িতে পড়ে আছি৷
পাক্কা পনেরো মিনিট কথা বলার পর মীরু পিসি শেষ পর্যন্ত ফোন ছাড়েন৷ এর মধ্যে রায় দু’বার ইনকামিং কলের বিপ্ বিপ্ আওয়াজ শুনতে পেয়েছে৷ অবভিয়াসলি প্রদ্যোৎ-এর কল৷ কিন্তু, মীরু পিসি ফোন ছাড়লে তো?
প্রদ্যোৎকে ফোন করতেই ও বলে ওঠে—‘স্যার আপনাকে কতক্ষণ ধরে ট্রাই করে যাচ্ছি, খালি এনগেজড আসছে৷ আপনি কী...
—আর বোলো না...আমার এক বিধবা পিসি কলকাতায় আসবেন৷ যাকগে কাজের কথায় আসা যাক...বলো কী হল?
—এখানে একটু প্রবলেম হয়ে গেছে স্যার...
—প্রবলেম?
—মেয়ে দু’টি আমার সাথে আসতে চাইছে না স্যার৷ মনে হয়, খুব ভয় পেয়েছে৷ তাপসের পুকুরে ডুবে মারা যাওয়ার ব্যাপারটা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে তো৷ এই নিয়ে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে সেটাতে ওদের বাড়ির লোকদেরও বেশ আপত্তি৷
—হ্যাঁ৷ এরকম কিছুরই একটা আশঙ্কা করেছিলাম আমি৷
—তাহলে এখন কী করা যায় স্যার?
—তুমি এখন কোথায় আছ?
—আমি এখন পথে৷
—পারমিতার’র বাড়িতে ফিরে যাও৷ ওখানে পৌঁছে আমাকে ফোন করো৷ আরেকটা কাজ খুব জরুরি৷ পুকুরের কাছে যে স্টেশনারি দোকান, যেখান থেকে চকোলেটটা কেনা হয়েছিল, সেটাকে খোলা রাখতে বলো৷ রাত সাড়ে আটটা বাজে, এরপর বন্ধ হয়ে যাবে৷
অল্পক্ষণ পরেই প্রদ্যোৎ-এর কল আসে৷
—স্যার, দোকানটা এমনিতে ন’টা পর্যন্ত খোলা থাকে৷ তাও, আমি যতক্ষণ না ফিরে যাচ্ছি ততক্ষণ ওদের খোলা রাখতে বলেছি৷ আর...এই মুহূর্তে আমি পারমিতা’র বাড়িতে ঢুকেছি৷ এখন কী করবো বলুন৷
—পারমিতার বাবাকে ফোনটা দাও৷ ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই৷
—ধরুন স্যার৷
প্রদ্যোৎ পারমিতার বাবাকে ফোনটা ধরিয়ে দেয়৷
—হ্যালো...৷ গলাটার মধ্যে দ্বিধা, আশঙ্কা, সন্দেহ—অনেক কিছু মেশানো৷
—আপনিই পারমিতার বাবা?
—হ্যাঁ, তকন কান্তি ঘোষ৷
—তপনবাবু...আমি কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছি...অবিনাশ রায়৷
—হ্যাঁ বলুন৷
—উত্তরপাড়ায় দিন দু’য়েক আগে তাপস বলে একটি ছেলের পুকুরে ডুবে মারা যাওয়ার খবরটা বোধহয় আপনার জানা৷ আমাদের কাছে কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ সরল বলে মনে হচ্ছে না৷ এ ব্যাপারে আপনাদের কো-অপারেশন পেলে ভাল হয়৷
—কীভাবে বলুন?
—আপনার মেয়েকে একবার কষ্ট করে আমার অ্যাসিসটেন্ট প্রদ্যোৎ-এর সঙ্গে একটা দোকানে যেতে হবে৷ বেশিক্ষণ লাগবে না৷ রুটিন এনকোয়ারি৷ বড়জোর দশ-পনেরো মিনিট৷
—অনেক রাত হয়ে গেছে...আজ থাক না৷
—তপনবাবু, এটা যত তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হয়ে যায় ততই ভাল৷ আপনিও শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন, আমরাও৷
—মিস্টার রায়, এই দুর্ঘটনা নিয়ে আমরা সবাই শোকগ্রস্ত, এবং ক্লান্তও৷ থাক না ব্যাপারটা৷ কেন শুধু শুধু জল ঘোলা করছেন?
—দেখুন তপনবাবু...রায় মৃদু হেসে বলে৷—আমরা পুলিশ৷ কোনও মৃত্যু আমাদের চোখে সন্দেহজনক মনে হলে, আমরা সেটা ইনভেস্টিগেট করতে বাধ্য৷ এটায় বাধা দিলে অবস্ট্রাকশন অফ জাস্টিস হবে৷ সেটা কিন্তু দণ্ডনীয় অপরাধ৷
—তবু...
—চাইলে আপনিও সঙ্গে থাকতে পারেন৷ আরেকটা কথা, আপনার মেয়ে যেন সুকল ইউনিফর্ম পরে যায়৷
—সুকল ইউনিফর্ম...এত রাত্রে? কেন জানতে পারি?
—কারণ আছে৷ আর লাইনটা ছাড়বেন না, আমার অ্যাসিসটেন্টকে দিন৷
প্রদ্যোৎ লাইনে আসে৷ —হ্যাঁ স্যার...
—সব ঠিক আছে প্রদ্যোৎ৷ পারমিতার বাবা রাজী হয়েছেন মেয়েকে ছাড়তে৷ শুধু একটা জিনিস, পারমিতা আর...অন্য মেয়েটির নাম যেন কী?
—তনুশ্রী৷
—হ্যাঁ, তনুশ্রী৷ ওদের দু’জনকে একসঙ্গে দোকানে নিয়ে যেও না৷ কনফিউশন হতে পারে৷ আলাদা আলাদা নিয়ে যেও৷ দেখ কেউ আইডেনটিফাই হয় কি না৷
—ঠিক আছে স্যার৷
—আর তনুশ্রীও যেন সুকল ইউনিফর্ম পরেই যায়৷
—তাই বলছি স্যার৷
কিছুক্ষণ পরই প্রদ্যোৎ-এর কাছ থেকে আবার ফোন আসে৷
—মেয়ে দু’জনকে নিয়ে এসেছি স্যার৷ এখন ওরা গাড়িতে বসে আছে৷
—বেশ৷ আগে তনুশ্রীকে নিয়ে যাও৷ দেখ ওকে চিনতে পারে কি না৷
—আমি লাইনটা অনই রাখছি স্যার৷ তনুশ্রীকে নিয়ে দোকানে এসেছি৷ দোকানদারকে আগেই বলে রেখেছি ওদের কী করতে হবে৷ এই মুহূর্তে দোকানের কর্মচারি তনুশ্রীকে ভাল করে দেখলো৷ আমি তনুশ্রীকে গাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি৷ দোকানদার মাথা নেড়ে ইশারা করেছে৷ এ মেয়েটি নয়৷ এবার টেলিফোনে একটুক্ষণের গ্যাপ৷
—হঁ্য স্যার...এবার আমি পারমিতাকে সঙ্গে করে দোকানে নিয়ে এসেছি৷ দোকানদার খুব ভাল করে মেয়েটিকে দেখল৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে মাথা নত করলো৷
—পারমিতা...এটা প্রদ্যোৎ-এর গলা৷ তিন দিন আগে সন্ধেবেলায় তুমি তাপসকে নিয়ে এই দোকানে চকোলেট কিনতে এসেছিলে?
—কই না তো! এটা নিশ্চয়ই পারমিতা’র গলা৷ —আমি এই দোকানে কখনও এসেছি বলে মনে পড়ে না৷
—এই মেয়ে৷ তুমিই পরশু আমাদের দোকানে চকোলেট কিনতে এসেছিলে না? সঙ্গে তাপস বলে ছেলেটি ছিল৷
প্রদ্যোৎ নিজের মোবাইল দোকানদারের কাছে এনে ধরে যাতে সব কথাবার্তা স্যার শুনতে পায়৷
—কই না তো? পারমিতা সোজাসুজি অস্বীকার করে৷
—সেকী! অস্বীকার করলে চলবে? অবিনাশ দোকানী’র গলা স্পস্ট শুনতে পায়৷
—তুমি আমাকে ৫০ টাকার নোট দিয়েছিলে চকোলেট কেনার জন্য৷ আমি তার থেকে আবার পাঁচ টাকা ফেরত দিলাম৷
—না না...এবার মেয়েটির গলা শোনা যায়৷ —আপনি ভুল করছেন৷ সুকল ইউনিফর্ম পরা অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন৷ আপনি আপনি বিশ্বাস করুন৷ মেয়েটি এবার অন্য কারও দিকে তাকিয়ে বলছে৷ প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকিয়ে নিশ্চয়ই৷
—এই দোকান থেকে কেনার কোনও প্রশ্নই ওঠে না৷ আমি এই দোকানে এর আগে আসিই নি কখনও৷ এরা ভুল দেখেছেন, কিম্বা আমার নামে বানিয়ে কথা বলছেন৷
—এই! বাজে বোকো না...এবার অন্য কোনও লোক ধমক দিয়ে ওঠে৷
—এতটুকু বয়েস...আর পট্পট্ করে মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছো?
এটা বোধহয় দোকানের মালিক হবে৷ এমনিতে আমি নজর করতাম না৷ কিন্তু পাঁচ টাকার কয়েন ফেরত দেবার সময় আমি মুখ তেলে তাকিয়েছিলাম৷ মেয়েটি তুমিই...অন্য কেউ নয়৷
এরপর মেয়েটির হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলার আওয়াজ৷ রায় ভাবে, মেয়েটি হয় ইনোসেন্ট ৷ কিন্বা অত্যন্ত ভাল অভিনেত্রী৷
—প্রদ্যোৎ মেয়েটিকে টেলিফোনটা দাও তো৷
—দিচ্ছি স্যার, একটা ইনকামিং কল আছে৷ আপনাকে এক মিনিট পরে ফোন করি?
টেলিফোনের কাছে বসে রায় উসখুস করে৷ প্রদ্যোৎ-এর কল আসতে বেশ কিছুক্ষণ লেগে যায়৷
—এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলে? রায় বিরগু হয়ে জিজ্ঞেস করে৷
—স্যার...নিরঞ্জনের ফোন এসেছিল৷
—নিরঞ্জন?
—তাপসের সুকস মেট আর বিশেষ বন্ধু স্যার৷
—সে এত রাত্রে, তোমাকে ফোন...
—নিরঞ্জনকে আমার নম্বরটা দিয়ে রেখেছিলাম৷ এই কেস সংক্রান্ত যদি কোনও ঘটনা ওর মনে পড়ে, তাহলে যেন আমাকে জানতে দ্বিধা না করে৷
—আচ্ছা? রায়ের প্রশ্নে কৌতূহল৷
—ওই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে কেন যেন আমার মনে হয়েছিল সে কিছু একটা জানে যেটা আমায় বলছে না৷
—তা, টেলিফোনে সে কী বললো সেটা আমায় বলো৷
—স্যার, নিরঞ্জন যেটা আমাকে বললো সেটা একেবারে সাংঘাতিক৷ সুকল থেকে ফেরত আসার পরও ওর তাপসের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল, খেলার মাঠে৷ নিরঞ্জনের মতে তাপস যে জাস্ট চুপ করে বসেছিল তা নয়৷ ওকে খুবই উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছিল, যেন ভয়ের একটা কিছু দেখেছে সে৷ অনেক জোরাজোরি করতে তাপস শেষ পর্যন্ত বিকেল বেলায় বাড়ি আসার পথে কী হয়েছিল সেটা নিরঞ্জনকে বলে৷ কিন্তু ওকে প্রমিস করায়, একথাটা যেন ঘুণাক্ষরেও ও কখনও কাউকে না বলে৷
—ওকে কী কেউ বাড়ির সামনে ধরেছিল?
—না স্যার...ব্যাপারটা একদম অন্য৷ তাপস বাড়িতে এসে প্রথমে বাইরের দরজায় কড়া নাড়ে৷ বেশ কিছুক্ষণ পরেও যখন কেউ দরজা খোলে না, তখনও ভাবে হয়তো ওর বাবা কোনও কাজে বাইরে গেছে৷ কিন্তু, তাও নয়৷ কেননা তাহলে তো বাইরের দরজায় তালা লাগানো থাকবে৷ সেটা তো করা হয়নি৷ তাহলে? নিরঞ্জনের ভাষায় তাপস এরপর বাড়ির পেছনের দিকে যায়৷ সেখানে খাওয়ার ঘরের জানলা সাধারণত খোলা থাকে৷ কিন্তু, ছেলেটি দেখে খাওয়ার ঘরের জানলাও বন্ধ৷ কৌতূহল হতে ও জানলার খড়খড়ি ফাঁক করে ঘরের ভেতর তাকায়৷ এবং হবি তো হ’তাপসের নাকি পারমিতার সঙ্গে একেবারে সোজা চোখাচোখি হয়ে যায়৷
—কেন, তাপস কী দেখেছিল? ওর বাবা আর পারমিতা...দে ওয়েয়ার মেকিং লাভ?
—হ্যাঁ৷ এবং মেয়েটি খুব সম্ভবত ওপরে ছিল, যার জনয খড়খড়ি নড়ার আওয়াজ তার দৃষ্টি সোজা তাপসের দিকে চলে যায়৷ পুরো জিনিসটা দেখে তাপস এতটাই হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে সে ওখান থেকে তখখুনি ছুটে পালিয়ে সারাটা বিকেল দিশাহীনভাবে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে৷ শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে সে এক সময় খেলার মাঠে গিয়ে চুপ করে বসে থাকে৷ তখনই নিরঞ্জনের সঙেগ ওর শেষবার দেখা হয়৷ এবং সে নিরঞ্জনকে পুরো ঘটনাটা বলে ফেলে৷
—তা, নিরঞ্জন তোমাকে আগে এ ঘটনা জানায় নি কেন?
—ভয়ে স্যার৷ প্লাস ও তাপসকে প্রমিস করেছিল একথা ও কাউকে জানাবে না৷
—মেয়েটিকে লাইনটা দাও৷ আমাদের কাজ এখনও বাকি৷
—হ্যালো? মোবাইলে মেয়েটির গলা ভেসে আসে৷
—পারমিতা?
—বলছি৷
—স্যারের কাছে শেষ কবে টিউশন করতে গিয়েছিলে?
—মেয়েটি একটু চিন্তা করে৷ পরশু...না না তরুশু৷
—তাপসের মৃত্যু সম্বন্ধে তুমি কী জানো?
—তাপসের মৃত্যু? ওই যে ও পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছে৷ অ্যাকসিডেন্ট খুবই মর্মান্তিক ঘটনা৷
—অ্যাকসিডেন্ট নয়, খুন৷ এবং খুনটা তুমিই করেছো৷
—এ আপনি কী বলছেন? তাপসকে আমি খুন...? আপনার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? আপনি আমাকে এরকম করে...
—সময় নষ্ট কোরো না৷ সেদিন বিকেলে তুমি স্যারের বাড়িতে একাই পড়তে যাও৷
—হ্যাঁ...তাতে?
—এবং টিউশানি করার নাম করে, বাড়ির সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ করে, খাবার টেবিলে তোমরা কী করছিলে?
—মানে...এসব আপনি কী অশ্লীল কথা বলছেন?
—ও...৷ রায়ের মুখে বিদ্রূপের হাসি৷ —অশ্লীল কাজ করলে কোনও দোষ নেই৷ বললেই সেটা অশ্লীলতা?
—আমি কিন্তু ফোনটা রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছি৷
—লাইনটা ছেড়ো না৷ সেদিন বিকেল বেলায় সুকল ছুটির পর বাড়ি এসে তাপস দেখে বাইরের দরজা বন্ধ৷ কড়া নেড়ে কোনও উত্তর না পাওয়ায় ও কৌতূহল বশতঃ খাওয়ার ঘরের জানলার খড়খড়ি ফাঁক করে ভেতরের দিকে তাকায়৷ এবং তখন ও যা যা দেখেছিল, আদ্যোপান্ত ওর বন্ধুকে সব জানিয়ে গেছে, এখন বলো, তোমরা একসঙ্গে বয়ান দেবে, নাকি আলাদা আলাদা?
এর কিছুদিনের মধ্যেই কেসটা কোর্টে ওঠে৷ কিন্তু বিচারকের ভাষায় ‘বিকজ অফ দ্য ডেলিকেট নেচার অফ দ্য কেস’ এর অধিবেশন কোর্টের জনসমক্ষে না হয়ে ‘ইন ক্যামেরা’, অর্থাৎ সববার আড়ালে করা হয়৷ সেই ক্লোজড অধিবেশনে রায় যেতে না পারলেও প্রদ্যোৎ হাজির ছিল৷ এবং পুরো ঘটনা ও নিজের মোবাইলে রেকর্ড করে আনে৷ এবং একটা রবিবার রায়কে শোনানোর জন্য দেয়৷
প্রদ্যোৎ রেকর্ডিং-এর একটা জায়গায় এসে মোবাইলটা চালু করে৷
—স্যার আমাকে প্রথম থেকেই খুব স্নেহ করতেন৷ টিউশনি হয়ে গেলে অনেক সময় মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন৷ বলতেন, ভাল করে পড়াশুনো করো৷ অনেক দূর এগোতে পারবে৷ কিছুদিন পর মনে হল স্যারের হাতটা শরীরের বিশেষ কোনও জায়গায় এসে একটুক্ষণ যেন বেশি স্টে করছে৷ জিনিসটা খারাপ লাগতেই পারতো৷ কিন্তু, আমার তা লাগে নি৷ হঠাৎ করে শরীরটা চনমন করে উঠত৷ স্পষ্ট বুঝতে পারতাম ভেতরে যেন কী হচ্ছে টিউশন শেষ হয়ে গেলে সাধারণত আমি আর তনুশ্রী একসঙ্গেই স্যারের ওখান থেকে বেরুতাম৷ কিন্তু, এরপর মাঝে মাঝেই কোনও না কোনও অছিলায় আমি স্যারের টিউশনির পরেও থেকে যেতাম৷ আমাদের সঙ্গে যে ছেলেটি পড়তো, সৌমিত্র সে খেলা পাগল৷ টিউশনি শেষ হলেই পালিয়ে যেত৷
—তার মানে, তখন আমি স্যারের কাছে একদম একা৷ বেশিক্ষণ থাকতে পারতাম না ভয় ছিল কখন তাপস সুকল থেকে ফিরে আসবে৷ কিন্তু, ঐ অল্প সময়টুকু স্যার আমাকে এমন জোরে চেপে ধরতেন, যে নিশ্বাস নিতে পারতাম না৷
—এরপর একদিন একটা দারুণ সুযোগ এসে গেল৷ সৌমিত্র ছেলেটি কয়েকদিনের জন্য বাইরে বেড়াতে গেছে৷ আর তনুশ্রীর শরীর খারাপ৷
—আমরা কিন্তু খাবারের টেবিলেই বসেছিলাম৷ অন্য কোথাও যাইনি৷ শোবার ঘরের খাটে নিয়ে যেতে স্যারের আপত্তি ছিল৷ (অল্প হাসি) হয়তো তাঁর অপরাধ বোধ৷ অন্যান্য দিনের মতো আমি ঠিকই খাতা বই বার করে টেবিলে পড়তে বসি৷ কিন্তু স্যারের আর তর সয় না৷ বাড়ির দরজা জানলা বন্ধ করে আমাকে টেবিলে ফেলে, আমার স্কার্ট সরিয়ে তিনি...কিন্তু, আমার কী যেন মনে হল৷ স্যারকে বললাম, আজ আমি আপনাকে আদর করবো৷ এই লুকিয়ে লুকিয়ে নিষিদ্ধ কিছু করার যে একসাইটমেন্ট, এটাই যেন স্যারকে একেবারে পাগল করে তুণ্ডলতো৷ স্যার টেবিলে আধশুয়ে আছেন৷ আর আমি ওকে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে আদর করছি৷ ঠিক এমনি সময় জানলার খড়খড়ি নড়ে ওঠার আওয়াজ পেলাম৷ মুখ তুলে তাকাতেই দেখি, জানলার ফাঁক দিয়ে তাপসের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে৷
—আমাদের দু’জনেরই তখন শোচনীয় অবস্থা৷ তাপস জেনে ফেলেছে মানেই স্যারের স্ত্রী পুরো ব্যাপারটা জানতে পারবেন৷ এখন কী করা যায়? দেখলাম, স্যার অত্যন্ত মুষড়ে পড়েছেন৷
—আমি তখন ওনাকে আশ্বাস দিলাম৷ বললাম, ভয় পাবেন না, তাপসকে আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব৷
—তাপসকে যখন আমি খুঁজে পাই ও তখন খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসছে৷ একা৷ ওকে নিয়ে অনেক ভোলাবার চেষ্টা করি৷ সন্ধে হলে ওকে আমি দোকান থেকে একটা চকোলেট কিনে দিই৷ তারপর, যখন ও চকোলেটটা খাচ্ছে ওকে পুকুরের ধারে নিয়ে যাই৷ বাকি চকোলেট পরে খেও, বলে সেটা ওর বুক পকেটে রেখে দিই৷ তারপর ওকে আচমকা পেছন থেকে ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিই৷ মুখভরা চকোলেট ছিল বলে তাপস ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চেঁচিয়েও উঠতে পারে নি৷
—দ্যাটস এনাফ৷ আর শোনাতে হবে না৷
প্রদ্যোৎ রেকর্ডিং বন্ধ করে দেওয়ার পর স্যার অনেকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল৷ নরম্যালি এরকম ক্ষেত্রে স্যার প্রদ্যোৎ-এর ভুয়সি প্রশংসা করে থাকে৷ আফটার অল, প্রদ্যোৎ বলতে গেলে একাই পুরো কেসটা সলভ করলো৷
কিন্তু আজ স্যার একদম চুপ৷
—আচ্ছা স্যার, আমার একটা প্রশ্ন ছিল৷
—রায় গম্ভীরভাবে একবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—তাপসকে মেরে ফেলার এই যে প্ল্যান, এটাতে তাপসের বাবার কতটা মদত ছিল?
স্যার বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে, বেনিফিট অফ ডাউট হয়তো দেওয়া যেতেও পারে৷ বাট দ্যাট ডাজ নট অ্যাবজলভ হিম৷
—আর স্যার একটা প্রশ্ন, এটাই শেষ৷ কয়েকদিন আগে আমি যখন আপনাকে উত্তরপাড়ার থেকে ফোন করেছিলাম, তখন আপনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ইট মাইট বি এ লং শট’ কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? এবং তারপর আপনি তাপসের বাবার কাছে যে মেয়ে দুটি পড়তো তারা সেদিন কোথায় ছিল জানতে চান৷ সে প্রশ্নটা আপনার মাথায় এল কী করে?
স্যার আবার চুপ৷
—বলতে পার, আমার ইনটুইশন৷ অর, মেরি আই হ্যাভ এ ক্রিমিনাল মাইন্ড৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন