বরুণ চন্দ

তেতলার ভাঙা জানলা দিয়ে রায় নীচের দিকে তাকায়৷ একতলায় বাঁধানো উঠোন সেখানে একটা ছেলের দেহ হাত পা ছড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে৷
—আপনার কী মনে হয় স্যর...এটা অ্যাক্সিডেন্ট?
উত্তরের আশায় প্রদ্যোৎ কিছুক্ষণ স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ কিন্তু, রায় কোন জবাব দেয় না৷ তার মুখ দেখে সে আদৌ প্রশ্নটা শুনেছে কি না তাও বোঝা যায় না৷
—আমার তো মনে হয় এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয় স্যর...মার্ডার৷
—বাট মেড টু লুক লাইক অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট, তাই তো?
রায় অন্যমনস্ক ভাবে জবাব দেয়৷
—একজ্যাকটলি৷
স্যর তাহলে কথাটা ঠিকই শুনেছে৷ কিন্তু কোন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি৷
অবিনাশ রায় ভাঙা জানলার পাটটা একবার খুলে আবার বন্ধ করে৷
—তুমি যখন এখানে এলে এটা বন্ধই ছিল?
প্রদ্যোৎ স্যরের অনেক আগেই ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছিয়েছে৷ প্রদ্যোৎ-এর পুরো নাম প্রদ্যোৎ কুমার মিত্র৷ কিন্তু কুমার নামটা সে সবসময় উহ্য রাখে৷
—হ্যাঁ স্যর, জানলাটা বন্ধই ছিল৷
—তা...এটা তোমার মার্ডার কেন মনে হল শুনি?
মাইনাস পাওয়ারের চশমার মধ্য দিয়ে স্যরের চোখদুটো কেমন তীক্ষ্ণ দেখায়৷
—স্যর দেখুন...একটু সময় নিয়ে প্রদ্যোৎ উত্তর দেয়া—জানলার পোজিশনটা কোমরেরও ওপরে৷ অতএব অ্যাক্সিডেন্টালি জানলায় লীন করে পড়ে যাওয়াটা আনলাইকলি৷ আর বন্ধ ঘরটা যদি কারও সাফোকেটিং লাগে, তাহলে তো সে জানলা খুলে বাইরের দিকে ঝুঁকবে, তাই না? জানলা বন্ধ অবস্থায় থাকলে নিশ্চয়ই না৷
রায় ছোট করে একবার ৮ করে৷ তারপর ঘরের চারপাশে ভাল করে চোখ বুলিয়ে নেয়৷ ইতস্ততঃ কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার ছড়ানো৷ তার মধ্যে একটা ৮ মাটিতে উল্টোনো অবস্থায় পড়ে আছে৷
কেউ কী ড্রাংক অবস্থায় চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়? রায়ের মুখে একটা বাঁকা হাসি দেখা দেয়৷
একখানা বড় টেবিল দেয়ালের গায়ে লাগানো৷ তাতে সফ্ট ড্রিঙ্কস-এর দুটো বড় বোতল৷ পাশে রাম, ভদকা এবং হুইস্কির বোতলও রয়েছে৷ সব কটাই খালি৷ মাটিতে বেশ কিছু বিয়ারের ক্যান গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ থুঁতনিতে আঙুল বুলিয়ে রায় চিন্তা করে৷
—গতকাল রাত্রে বেশ ভালোই মদ্য পান হয়েছে৷ স্যরের এই হঠাৎ হঠাৎ সাধু বাংলা বলাটা প্রদ্যোৎ-এর খুব মজা লাগে৷
টেবিলের পাশে একটা নীল রংয়ের বড় প্লাস্টিকের টাব৷ তাতে খাবারের খালি প্যাকেট৷ প্ল্যাস্টিকের চামুচ৷
একটু দূরে একটা টেবিল টেনিশের বোর্ড পাতা রয়েছে৷ তার ওপরে জমা ধুলোর পরত থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে ইদানিং ওটাতে কেউ খেলে নি৷
অবিনাশ রায়ের দৃষ্টি আকর খালি মদের বোতলের দিকে ফিরে আসে৷ আড়চোখে প্রদ্যোৎ স্যরের দৃষ্টি লক্ষ্য করে৷
—গতকাল কলেজের সোশাল ছিল স্যর৷ অনেক রাত অবধি এখানে গানবাজনা হয়েছে৷
—হুঁ৷ সংক্ষিপ্ত ভাবে রায় মাথা নাড়ে৷ এখানে আসার সময় কলেজের দেওয়ালে চন্দ্রবিন্দুর পোস্টারটা ওর চোখে পড়েছে৷
—প্রিন্সিপালকে খবর দেওয়া হয়েছে?
—হ্যাঁ স্যর৷ ঘড়ির দিকে প্রদ্যোৎ একবার তাকিয়ে বলে৷—মনে হয় আর কিছুক্ষণের মধ্যে এসে যাবেন৷
—আর বাড়ির লোকদের?
—সেটাতো স্যর প্রিন্সিপাল এলেই জানানো হবে৷ ছেলেটির কী নাম, কোন ইয়ার এসব তারাই ভাল বলতে পারবেন৷
—বডিটা সবচেয়ে আগে কে স্পষ্ট করেছে?
—এখানকার একজন সেনট্রি৷ জানল ভাঙার আওয়াজ পেয়ে সে এই বিল্ডিংটার দিকে ছুটে আসে৷
—লোকটির সঙ্গে একবার কথা বলা যায়?
—নিশ্চয়ই স্যর৷
একটুক্ষণের মধ্যেই সেনট্রি এসে ওদের সামনে হাজির হয়৷ ওরা তখন—একতলায় ডেড বডিটার সামনে দাঁড়িয়ে৷ বডিটার চারপাশে ইতস্তত ভাঙা কাঁচ ছড়ানো৷ ভোরের আলোয় হিরের মত চিক্চিক্ করে ওঠে৷
—তোমার নাম কী? রায় জিজ্ঞেস করে৷
—মাধব চন্দ্র দাস স্যর৷
সাধারণ পোশাক পরা থাকলেও রায় যে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার সেটা মাধবের বুঝতে অসুবিধে হয় নি৷
—এখানে কতদিন কাজ করছো?
—দু’বছর স্যর৷
—এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের তুমি চেনো?
—ঐ...অনেকের মুখ চিনি স্যর৷ সকালে এত ইটুডেষ্ট! সবইকে মনে রাখা... ইনি নয়৷
—এই ছেলেটি...রায় উঠোনে পড়ে থাকা বডিটা দেখিয়ে বলে৷ একে চেনো?
—না স্যর৷ ঘাড় বেঁকিয়ে মাধব ছেলেটির মুখ দেখার চেষ্টা করে৷
—মনে হয় না আগে দেখেছি স্যর৷ তবুও, মিশটেক হতে পারে৷ আসলে অক্ষরে কাজতো সিকিউরিটির৷ মেনলি গেটে থাকি৷ রাত্রে পুরো কমপাউন্ডে টহল দিই৷
—আচ্ছা মাধব...গতকাল ঠিক ক’টার সময় এ ঘটনাটা ঘটে?
—একজ্যাকস্ট সময় তো বলতে পারবো না স্যর৷ আওয়াজে ছুটে এসেছিলাম৷ প্রথমে ঝন্ ঝন্ করে কাঁচ ভাঙার আওয়াজ৷ তারপর মনে হল ‘ধুপ’ করে ভারি কিছু এক পড়লো৷ তা...ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ হবে৷
—তখনও ফাংকশান চলছিল?
—না স্যর...ফাংশান শেষ হয়ে গেছিল৷ তবে ছেলেমেয়েরা মজা করে মাইকে গান গাইছিল, ইয়ার্কি ফাজলামো করছিল...এই আর কি৷
—তুমি যখনএখানে এসে তখন জায়গাটা কী একবারে ফাঁকা ছিল, নাকি অন্য কোন স্টুডেন্টদের দেখতে পেয়েছিলে?
মাধব চুপ করে থাকে৷
—ভাল করে মনে করে দেখ...আশেপাশে আর কেউ ছিল না?
—স্যর...বডিটা দেখেই আমি ওপরের দিকে তাকাই৷ কেননা, আমার মনে হয়েছে ছেলেটা নিশ্চয়ই ওপর থেকে পড়েছে৷ তা না হলে ওরকম জোরে আওয়াজ হবে কেন?
—একদম ঠিক ভেবেছো৷ মাধবকে রায় উৎসাহ দিয়ে বলে৷ তা...ওপরের দিকে তাকিয়ে কী দেখলে?
—একটা ছেলের মুখ৷ ভাঙা কাঁচের মধ্য দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে৷ কথা বলতে বলতে মাধব একবার ঢোক গেলে৷
—আমাকে দেখতে পেয়েই জানলা থেকে মুখটা সরে গেল৷
—ছেলেটার মুখ দেখতে পেয়েছিলে?
না স্যর৷ মাধব মাথা চুলকে বলে৷ —আসলে তেতলায় ঘরের আলোটা পেছন থেকে আসছিল৷ তাই অন্ধকারে মুখটা ঠিক দেখতে পাইনি৷
—রাত্রে এদিকটায় কোন আলো জ্বলে না?
—না স্যর৷
—তারপর কী হল?
—তারপর...সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ পাায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম৷ নীচে নেবে আসছে৷ মাধব কী একটু ভাবে৷ —বেশ কয়েকটা পায়ের আওয়াজ৷
—হুঁ৷ তারপর
—দড়াম করে হঠাৎ সিঁড়ির দরজা খুলে তিন চারটে ছেলে ছুটে বেরিয়ে এল
—কে কে বলে আমি হাতের টর্চটা জ্বালতে গেলাম৷ আর তখনই একটা ছেলে ছুটে এসে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল৷৷ হাতের টর্চটা দূরে গিয়ে ছিট্কে পড়ল৷ এই দেখুন না স্যর...
সার্টের হাতা সরিয়ে মাধব বাঁ কনুই ওদের দিকে তুলে দেখায়৷
—অনেকটা ছড়ে গেছে৷
—তার মানে ছেলেগুলোর কোনটারই মুখ তুমি দেখতে পাও নি?
—ইয়ে...মাধব মাথা চুলকে বলে৷ আমি ৮ নই স্যর৷ টর্চটা জ্বালতে গেলাম৷ কিন্তু...
মাধবের দিকে রায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে৷
—এ বিল্ডিংটায় কোন কোন ডিপার্টমেন্ট আছে?
—স্যর, একতলায় লাইব্রেরি, দোতলায় কেমিষ্টির ল্যাব, আর তেতলায় ইস্টুডেন্টদের কমন রুম৷
—ঠিক আছে, তুমি এখন আসতে পার৷
একটা বড় মাপের সেলাম ঠুকে মাধব গেটের দিকে ফিরে যায়৷
—ছেলেটার পকেট সার্চ করে দেখেছো? মানিব্যাগ, কার্ড...এমন কিছু যার থেকে ছেলেটিকে আইডেনটিফাই করা যায়?
—না স্যর৷ প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে বলে৷ —বডিটা আমি ইচ্ছে করেই টাচ করিনি৷ ভাবলাম করোনারের অফিস থেকে লোক আসুক৷ ছবি টবি তুলুক, তারপর করবো৷
রায় একবার চারপাশে তাকিয়ে নেয়৷ এখন কাছে পিঠে আর কেউ নেই৷ পকেট থেকে রাবারের পাতলা গ্লাভজ বার করে রায় নিজের হাতে পড়ে নেয় তারপর, অত্যন্ত সর্ন্তপনে ছেলেটির সার্ট আর জিনসের প্যান্ট থেকে সব জিনিসপত্র বার করে৷ বুক পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার হয়৷ দামী আমেরিকান ব্র্যান্ড৷ সাইড পকেট থেকে অবশ্য কোন লাইটার বা দেশলাই পাওয়া গেল না৷ হয়তো বা কোন বন্ধুবান্ধব ওর কাছ থেকে নিয়েছিল৷ আর ফেরত দেয়নি৷
—প্যাকেটে চারটে সিগারেট বাকি৷ প্রদ্যোৎকে রায় টোয়েন্টিজ-এর প্যাকেটটা খুলে দেখায়৷
—তার মানে কাল রাতে ছেলেটি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েছিল৷
—তাইতো মনে হচ্ছে স্যর৷ তবে যাস্ট চার পাঁচজন ছেলে মিলে ভদকা, হুইস্কি আররাম-এর বড় বোতল সাবাড় করতে পারে বলে মনে হয় না৷
—কোয়াইট রাইট৷ প্রদ্যোৎ-এর কথায় রায় সায় দেয়৷ —এর দুটো মনে হতে পারে এক, ওরা ওখানে অনেকক্ষণ ধরে ড্রিঙ্ক করেছে৷ আর দুই, গতকাল স্টুডেন্টস কমনরুমটা মোটামুটি সুঁড়ি খানায় পরিণত হয়েছিল, যার যখন ইচ্ছে, ওখানে গিয়ে মদ্যপান করে আসছিল৷
—ঠিক বলেছেন স্যর৷ তা নাহলে এতরকম ড্রিঙ্কস-এর বোতল থাকতো না৷ আচ্ছা স্যর...প্রদ্যোৎ উৎসাহিত হয়ে প্রশ্ন করে৷ এমন হতে পারে না? আপনি যেমন বলছেন...এই ছেলেটি ওর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে মদ খাচ্ছিল৷ তারপর, এরকম বয়েসের ছেলেদের যেটা অনেকসময়ই হয়৷ মদ খেতে খেতে ওদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল৷ ঝগড়া থেকে হাতাহাতি৷ মাথা গরম হয়ে ওদের মধ্যেই হয়তো কেউ ছেলেটিকে সজোরে ধাক্কা মেরে দেয়৷ যার ফলে ছেলেটি জানলার কাঁচ ভেঙে এক্কেবারে একতলায় গিয়ে পড়ে এবং ইনসট্যানটলি মারা যায়৷
—হতে পারে৷ অন্যমনস্ক ভাবে রায় ভাঙা জানলাটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷
—তুমি বলছো পুরো ঘটনাটাই অন দি স্পার হ্যাক দি মোমেন্ট হয়েছে৷ অকস্মাদ এটা কোন প্ল্যানড মার্ডার নয়?
—আমারতো তাই মনে হচ্ছে স্যর৷ আজকাল বন্ধুদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া ঝাটি হলেই পকেট থেকে চুরি-চাকু বার হয়ে যায়৷
রায় একেবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷ কিন্তু, কোন জবাব দেয় না৷ ও তখন ছেলেটির পকেট খুঁজতে ব্যস্ত৷ জিনন্স-এর পকেট থেকে একটা পাট করা রুমাল বার হয়৷ আর কিছু ে৮৷ আঙুল দিয়ে হিপ পকেট থেকে ছেলেটির মানি ব্যাগ উদ্ধার হল, এবং অন্য পকেট থেকে চিরুনি৷
ছেলেটির মুখের কাছে মুখ নিয়ে রায় গন্ধ শোঁকে৷
—ইনটারেস্টিং৷ প্রথমে বিয়ার, পরে খুব সম্ভবতঃ রাম৷
রায়ের দিকে প্রদ্যোৎ একবার আড়চোখে তাকায়৷ কারও পক্ষে কী মদ খাওয়ার ডিটেল শুধু গন্ধ শুঁকে বলা যায়? আর, তাছাড়া স্যর তো আজকাল মদই খায় না৷ আমাকে অনাড় ব্যগুি পেয়ে যাস্ট শোয়িং অফ!
—আরও পাচ্ছি...এক্সপেনসিভ আফটার শেভ-এর গন্ধ...খুব সম্ভবতঃ পাকরাবঁ৷
প্রদ্যাৎ-এর মুখে ব্ল্যাঙ্ক লুক দেখে রায় এক্সপ্লেন করে৷ —ফ্রেঞ্চ পারফিউম ফর মেন৷
ছেলেটির মানিব্যাগ ঘেঁটে দুটো পাঁচশো টাকা আর বেশ কয়েকটা একশো টাকা নোট বের হয়৷ এর সঙ্গে কিছু ভিজিটিং কার্ড৷ এবং ফ্লুরি রেটুরেন্ট-এর একটা বিল৷
—দুটো ফুল ব্রেকফাস্ট, গতকালের৷ বিলটায় রায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়৷ —হইচ মিনস...গতকাল সকালে ছেলেটি ফ্লুরিতে খেতে গিয়েছিল৷ প্রশ্ন হচ্ছে...দ্বিতীয় ব্যগুিটি কে? গার্লফ্রেন্ড?
রায় নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে৷ তারপর কী একটা জিনিস দেখে ওর ভুঁরু কুঁচকে ওঠে৷
—বড়লোকের যতসব স্ক্রয়েলড ছেলে৷
—একথা কেন বলছেন স্যর!
—তা নাহলে পার্স থেকে দু’দুটো ক্রেডিট কার্ড বেরোয়? অ্যান্ড হোয়াট ইজ হি? যাস্ট এ কলেজ স্টুডেন্ট! কাম অন প্রদ্যোৎ...এ সব ছেলেদের স্ময়েলট ব্র্যাট ছাড়া আর কী বলা যায়?
কার্ড দুটো রায় বার করে দেখায়৷ একটা স্ট্যানচার্ট, আরেকটা সিটি ব্যাঙ্ক৷
—এ ছাড়া আরেকটা জিনিস আমার কাছে খুব স্পষ্ট৷ খুনটা যেই করে থাক অন্ততঃ টাকার জন্য করেনি৷
—ঠিক বলেছেন স্যর৷ যে এই কাজটা করেছে চাইলে সে এতক্ষণে কার্ড সোয়াইপ করে ছেলেটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁক করে দিতে পারতো৷
—তবে...কার্ডটার থেকে একটা বিশেষ ইফের মেশন পাওয়া গেল৷
—কী?
—ছেলেটির নাম৷ দেবব্রত ব্যানার্জি৷
—ওহ! ক্রেডিট কার্ড-এ নাম লেখা থাকে?
রায়ের মুখে একটা ফেন্ট হাসি৷ প্রদ্যোৎ-এর এখনও ক্রেডিট হয় নি সেটা সে জানে৷
—তবে ছেলেটির পকেট থেকে খুব ইমপরটেন্ট একটা আইটেম মিসিং৷
—ক্রেডিট কার্ড-এর থেকেও?
—এ ক্ষেত্রে তাই৷
—মিসিং...প্রদ্যোৎ ভুরু কুঁচকে ভাববার চেষ্টা করে কী আইটেম মিসিং হতে পারে৷
—মোবাইল৷ যে ছেলের কাছে দুটো ক্রেডিট কার্ড আছে, তার পকেটে মোবাইল ফোন থাকবে না, এটা আনথিংকেবল৷ হুইচ মিনস...রায় থুঁতনি চুলকে বলে৷
—মোবাইল এমন কিছু নাম ধাম রয়েছে যা একেবারেই কাউকে জানানো যায় না ইনি৮ এভিডেন্স৷ বিশেষ করে যে তিন চারটে ছেলে কাল রাতে ওর সঙ্গে মদ্যপান করছিল তাদের নাম এবং নাম্বার৷
পকেটে হাত গুঁজে রায় পায়চারি করতে থাকে৷ মাঝে একবার ও হাতঘড়িটার দিকেও তাকিয়ে নেয়৷
—তার মানে কী বলতো? রায় হাঁটা বন্ধ করে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
প্রদ্যোৎ জবাব দেবার কোন চেষ্টা করে না৷ ও জানে স্যর নিজেই মানেটা কী বলবেন৷
—তোমার ঐ অন দ্য স্পার অফ দি মোমেন্ট থিয়োরিটা বোধহয় এ ক্ষেত্রে কাটলো না৷ যতই চিন্তা করছি ততই মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা প্রিমেডিটেড৷ আগের থেকে প্ল্যান করে মার্ডারটা করা হয়েছে৷
—তাইতো দেখছি স্যর৷ ইস্! মোবাইলটা পাওয়া গেলে কী ভালই না হোত!
—যে জিনিসটা নেই সে নিয়ে অপেক্ষা কোরো না৷ লেটস মী হোয়াট উই হ্যাভ৷
আমাদের কাছে ছেলেটির মোবাইলটা নেই, সিম কার্ডও নেই৷ কিন্তু, সিম কার্ড সম্বন্ধে আমরা খবর অবশ্যই পেতে পারি৷ প্রদ্যোৎ৷ আমরা যখন ‘দেবব্রত’র বাড়িতে যাব, তখন একবার মনে করিয়ে দিও তো ওর মোবাইলের সার্ভিস প্রোভাইডার কে সে ব্যাপারে একটু খবর নেওয়া৷
—তাহলে সেই সার্ভিস প্রোভাইডারকে জিজ্ঞেস করে খবর নিতেন ওর মোবাইল কলের হিস্ট্রি ট্রেস কর যায় কিনা?
—ঠিক তাই!
এমন সময় একজন ফর্সা টাকওয়ালা চশমাধারি মাঝবয়েসি ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে ভুঁড়ি দুলিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসে৷ সঙ্গে গেট-এর সেনট্রি মাধব, এবং আরও দুজন লোক৷ মনে হয় এখানকারই কর্মচারি৷
—কী কান্ড বলুন তো! আমাদের কলেজে কখনও এরকম...একী!
কলেজের প্রিন্সিপাল জয়রাম মজুমদার বডিটার দিকে তাকিয়ে রীতিমত চমকে ওঠে৷
এতো দেখছি আমাদের কালেজেরই ছেলে৷ কী যেন নামটা বলো তো ঘোষাল৷ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে৷ সায়েন্স সেকশন৷
জয়রাজ পাশের একটি কর্মচারিকে জিজ্ঞেস করে৷
—ছেলেটির নাম খুব সম্ভবতঃ দেবব্রত ব্যানার্জি৷ কর্মচারিটি উত্তর দেয়৷
—আপনার অনুমানটা ঠিক৷ ছেলেটি সায়েন্স সেকশনের৷ তবে, সেকেন্ড ইয়ারনয়, ছেলেটি ফাইনাল ইয়ারের৷
—সারনেমটা বোধহয় ভুল হল৷ দেবব্রত চ্যাটারি নয়, ছেলেটির নাম খুব সম্ভবতঃ দেবব্রত ব্যানাজি৷
মৃদু গলায় রায় ঘোষালের ভুল সংশোধন করে দেয়৷
—তা...আপনি কী করে ওর নামটা জানলেন? ওকে আগের থেকে চিনতেন? প্রিন্সিপাল রায়কে জিজ্ঞেস করে৷
—উঁহু৷ রায়ের মুখে স্মিত হাসি৷ —ক্রেডিট কার্ড৷
—ক্রেডিট কার্ড? এক মুহূর্ত্তের জন্য ভদ্রালোকের মুখ ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায়৷ —ওহো ছেলেটির পকেট থেকে পেলেন বুঝি? তাহলে, আপনিই নিশ্চয় মিস্টার রায় ক্যালকাটা পুলিশ?
উত্তরে রায় এড করে৷
—সিনিয়র ডিটেকটিভ অফিসার, অবিনাশ রায়৷ প্রদ্যোৎ পরিচয় করিয়ে দেয়?
—আর আমি ওঁর অ্যাসিসটেন্ট, প্রদ্যোৎ মিত্র৷
মজুমদার ওদের দুজনকে নমস্কার জানায়৷
—আসলে বোঝেন তো...আমাদের কলেজে এত স্টুডেন্ট...ওয়ান অফ দি সারজেন্ট ইন কলকাতা...কর্র্মস ডিপার্টমেন্ট ইনফ্লড করলে প্রায় চার হাজার... সববার নাম মনে রাখা সম্ভব নয়৷
ভদ্রলোক কৈফিয়তের সুরে জানায়৷
—কোয়াইট আনডারস্ট্যানডেবল৷ রায়ের সংক্ষিপ্ত জবাব৷
—তা...আপনারা কতক্ষণ এসেছেন?
—আমি ভোর সাড়ে চারটায়৷ লোকাল থানার থেকে খবর পেয়েই চলে আসি আর, স্যরও এসেছেন বেশ কিছুক্ষণ হল৷
—এই বিল্ডিং-এর তেতলায় ছাত্রদের কমনরুম? রায় জিজ্ঞেস করে৷
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেন বলুনতো?
—ছেলেটি ওখান থেকেই পড়েছে৷
—তাইতো! প্রিন্সিপাল ওপরের দিকে তাকিয়ে রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে ওঠে৷
—জানলার কাঁচ ভেঙে পড়ে গেল! তাহলে কী এটা সুইসাইড?
—ঠিক এই মুহূর্তে বলা মুসকিল৷ ছেলেটির সারা গায়ে মদের গন্ধ৷ এমন হতে পারে নেশার ঘোরে টাল সামলাতে না পেরে ছেলেটির ওপর থেকে পড়ে যায়৷ কিন্তু, আমাদের ধারণা এটা অ্যাকসিডেন্টল ডেথ নয়, সুইসাইডও নয়...মার্ডার৷
—মার্ডার...মানে খুন? প্রিন্সিপালের চোখ কপালে ওঠে৷
—এতা একেবারে অবিশ্বাস্য কান্ড!
ওপরে গেলে দেখতে পাবেন৷ ঘরের মেঝেতে মদের বোতল আর বিয়ারের ক্যান গড়াগড়ি খাচ্ছে৷
—ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আজকাল ছাত্রদের মধ্যে ক্যারেকটার বলে আর কিছু রইল না৷ মরাল ৮ বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটাই এখন মিসিং৷ তবে আমাদের কলেজ বলে নয়...এটা কিন্তু সব জায়গাতেই হচ্ছে এখন৷
ঘনঘন মাথা নেড়ে ভদ্রলোক দুঃখ প্রকাশ করে৷
—আচ্ছা বলুন তো...মদখেয়ে বিবাদ বচসা হল নাকি?
—হতে পারে৷
ভদ্রলোক বোধহয় ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক অধঃপতন নিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, রায় থামিয়ে দেয়৷
—আমার তো মনে হয় আর সময় নষ্ট না করে ছেলেটির বাড়িতে খবর দেওয়া উচিত৷
—হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন৷ ঘোষাল তোমার কাছে অফিসের চাবি আছে, তো, যাও চট্ করে দেবব্রত’র ফোন নাম্বার আর বাড়ির অ্যাডড্রেস বার করো, আমরা আসছি৷
ঘোষাল তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলে যেতে মজুমদার নার্ভাস দৃষ্টিতে রায় আর প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—ছেলেটির বাড়ির লোকরা না আসা পর্যন্ত আপনারা থাকছেন তো? মানে...আপনারা থাকলে একটু মনোবল পাই৷ আফটার অল, আমাদের কলেজে এরকম ঘটনাতো এর আগে কখনও ঘটে নি৷
রায় সাইডওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—ছেলেটির বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নাম্বার নিয়েই আমরা এখনকার মত আসছি৷ ওদিকে অনেক কাজ৷ করোনারের অফিস থেকে লোকজন পাঠাতে হবে, তারা এসে ছবি তুলবে, তারপর বডিটা নিয়ে যাবে৷ তারপর পোস্টমর্টেম৷
—ওহ! প্রিন্সিপালের মুখ ছোট হয়ে আসে৷
ছেলেটির বাড়িতে যখন রায় আর প্রদ্যোৎ গিয়ে পৌঁছয় তখন দুপুর৷ দেবব্রত’র বাড়ির লোকেরা কলেজে আসার সময় ইচ্ছে করে ওখানে থাকে নি৷ ও চায়নি যখন ছেলেটির মা বাবা গভীর শোকে আচ্ছন্ন তখন ওদের জেরা কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক৷
ল্যান্সডাউন রোডের ওপর বিরাট দোতলা বাড়ি৷ যদিও এনট্রান্সটা পাশের গলি দিয়ে সামনে ছোট লন৷ দেয়ালের ধার দিয়ে সারি সারি দেবদারু গাছ, যাতে রাস্তার থেকে বাড়ির ভেতর দেখা না যায়৷ সামনে মারবেল-এ মোড়া কয়েক ধাপ সিঁড়ি পার হলে সাবেকি আমলের বড় ঘড়ি দেওয়া দরজা৷ ঘন সবুজ রং করা৷ আজকাল যা সচরাচর চোখে পড়ে না৷ দরজাটা খুললে সামনে চওড়া বারান্দা তাতে সাদা কাল চৌকো মারবেল পাথর ডায়গোনালি বসানো৷ ডান পাশের প্রথম দরজা খুললেই বসার ঘর৷
রায় আর প্রদ্যোৎকে ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে দারোয়ান আবার গেট-এ ফিরে যা আগেকার দিনের উঁচু সিলিং দেওয়া হলঘর৷ জানলায় হালকা রংয়ের পর্দা৷ যাতে রোদ ব্যাহত হবে, আলো না৷ ফার্নিচারের সঙ্গে ম্যাচ করে মেঝেতে পুরু কার্পেট৷ ঘরের কোথাও চন্দনের ধুপ কাঠি জ্বলছে৷ যার সৌগন্ধ ফ্যানের হাওয়ায় সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে৷
একটুক্ষণ পর এক প্রৌড়া মহিলা ঘরে প্রবেশ করে৷
—আপনারা চা বা কফি...?
রায় মাথা নেড়ে না জানায়৷
একটুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে মহিলা বসে৷ ওর চোখমুখ ফোলা ফোলা৷ মনে হয় আজ চুলে চিরুনি পড়ে নি৷ কিছুক্ষণ কেউই কোন কথা বলে না৷ ঘরে পুরোনো আমলের গ্র্যান্ডফায়ার ক্লক-এর টিক্ টিক্ শব্দ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ শোনা যায় না৷
কথা বলার আগে রায় মুখে হাত দিয়ে স্বল্প কেসে নেয়৷
—আমি জানি এই মুহূর্তে আপনাদের ছেলের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করাটা অনুচিত বলতে পারেন, অন্যায়৷ কিন্তু, আমরা নিরুপায়৷ প্রশ্ন করাটা আমাদের ডিউটি ভেরি সরি অ্যাবাউট দ্যাট৷
—আপনাদের যা যা প্রশ্ন আছে করতে পারেন৷
মহিলার গলা শান্ত, কিন্তু থম্ থমে৷
—কাল রাতে আপনাদের ছেলে দেবব্রত কলেজের স্টুডেন্টস কমনরুম থেকে পড়ে মারা যায়৷ আপাততঃ দৃষ্টিতে এটাকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু আমাদের অনুমান এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়৷ মার্ডার৷ দেবব্রতকে প্ল্যান করে, মাদ খাই, ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ব্রটালি মার্ডার করা হয়েছে৷ ভদ্রমহিলার মুখ থেকে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলার আওয়াজ শোনা যায়৷
—যে বা যারা এটা করেছে তারা খুব সম্ভবতঃ ওর কলেজেরই স্টুডেন্টস৷ ওর বন্ধুবান্ধব, হয়তো বা ক্লাসমেট৷ এখন, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি, তর্কবিতর্কসব সময়ই হয়৷ তা আবার মিটমাটও হয়ে যায়৷ কিন্তু সাধারণ ঝগড়াঝাটির থেকে মানুষ খুন হয় না৷ অতএব, আমরা ধরে নিতে পারি যে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এক বা একাধিকজনের ওর প্রতি বিশেষ বিরূপ মনোভাব ছিল৷ সে গোলযোগ ব্যগুিগত সম্পর্ক নিয়ে হতে পারে৷ ওদের মধ্যে এমন কিছু হয়েছিল যার ফলে ওর বন্ধুরা পরম শত্রুতে পরিণত হয়৷
রায় একটু সময় চুপ করেথাকে৷ হয়তো আশা করেছিল মহিলা কিছু বলবে৷ কিন্তু, মহিলা কিছু বলে না৷
—আপনারা নিশ্চয়ই চাইবেন যে বা যারা ওর খুনের জন্য দায়ী, তারা যেন কোনমতেই আইনের চোখে ফাঁকি দিতে না পরে—৷
মহিলা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়৷
—বেশ, তাহলে—ওর বন্ধুবান্ধব সম্বন্ধে একটু জানতে চাই৷
—দেখুন দেবু যখন সুকলে পড়তো তখন সব সময়ই বন্ধুরা বাড়িতে আসতো৷ খাওয়া দাওয়া করতো৷ হই হুল্লোড় করতো৷ কিন্তু...
—কোন সুকল?
—লামারটস৷ কিন্তু পরবর্তীকালে সুকল ফাইনালের রেজাল্ট তেমন ভাল না হওয়ায় ওকে এই কলেজে ভর্তি হতে হয়৷ তাতে, ওর আগেকার বন্ধুরা...
—তারা সব অন্য কলেজে ভর্তি হয়ে যায়?
—হ্যাঁ৷ ওদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বাইরেও চলে যায়৷ তাই...কলেজে ওদের সঙ্গে সঙ্গে আর তেমন যোগাযোগ ছিল না৷
—হোয়াট অ্যাবাউট হিজ কলেজ ফ্রেন্ডস?
—ওর কলেজের বন্ধুরা কখনও বাড়িতে এসেছে বলে মনে পড়ছে না৷
—বান্ধবী? দেবব্রত’র মা মনে করার চেষ্টদ্ধা করে৷ —হ্যাঁ, একজন মেয়ে ওর সঙ্গে আসতো বটে৷ তবে সে একদম ফার্স্ট ইয়ারে৷ কী যেন নাম মেয়েটির? ...মনেও থাকে না আজকাল৷
—আপনার ছেলে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতো?
—হ্যাঁ৷ প্রথম প্রথম মেয়েটি আমাদের সঙ্গে বসে চা-জলখাবার খেত৷ গল্পগুজব করতো৷ সুন্দর স্বভাব ছিল মেয়েটির, কিন্তু, পরের দিকে দেবু মেয়েটিকে নিয়ে সোজা ওর শোবার ঘরে চলে যেত৷ বলতো , ওরা দুজনে একসঙ্গে বসে পড়াশুনো করবে৷
—তাই পরের দিকে আপনাদের সঙ্গে আর বিশেষ দেখা-সাক্ষাৎ হোত না, তাই কি?
—হ্যাঁ৷ মিসেস ব্যানার্জি এরপর হঠাৎই চুপ করে যায়৷
—তারপর?
—এরপর...আমি জানিনা ওদের মধ্যে একজ্যাক্টলি কী হয়েছিল...মেয়েটি আমাদের বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়৷
—আপনার ছেলেকে আপনি কখনও মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করেন নি?
—করেছিলাম৷ বেশ পছন্দ ছিল আমার মেয়েটিকে৷
—আপনার ছেলে উত্তরে কী বললো?
—বললো, এখন আর ওর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই৷ তাই আর আমাদের বাড়িতে আসে না৷
—যাস্ট দ্যাট? আর কিছু বলেনি?
ভদ্রমহিলা সাইডওয়াইন মাথা নাড়ে৷
—আপনি তো মেয়েটির নাম মনে করতে পারছেন না...
—স্ট্রেঞ্জ...মেয়েটির নাম কিছুতেই মনে পড়ছে না৷
—মেয়েটি কী ওদের সাথেই পড়তো?...সেম কলেজ?
—হ্যাঁ...খুব সম্ভবতঃ ওর ক্লাসমেট ছিল৷
—গুড৷ রায় অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়ে৷ —দেবব্রত কী আপনাদের ওনলি চাইন্ড?
—না৷ আমাদের একটি মেয়েও আছে৷ ওর দিদি৷
—উনি কী বিবাহিত৷ না এখনও পড়াশুনো করছেন?
—নানা, বিয়ে করেনি৷ ওর দিদি পলা দেবুর থেকে তিন বছরের বড়৷
এম এ পাশ করে কলকাতা ইউনিভারসিটিতে রিসার্চ করছে৷
—এখন...মানে এ মুহূর্ত্তে উনি বাড়ি আছেন?
—হ্যাঁ৷
—আমরা তাহলে ওর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাইব৷ তবে, সবার সামনে নয়, আলাদা করে৷
—মানে...সেটা এখন...একটু প্রবলেম...মিসেস ব্যানার্জির গলা অনিশ্চিত শোনায়৷ —এই মুহূর্ত্তে ও খুব আপসেট৷ সকাল থেকে খাওয়া দাওয়া করেনি৷ কারও সঙ্গে কথাও বলছে না৷ যাস্ট চুপ করে ঘরে বসে আছে৷
—ভাই বোন কী খুব ঘনিষ্ট ছিল?
—ভেরি মাচ৷
—তাইলে তো আরও বেশি করে ওর সঙ্গে কথা হওয়া দরকার৷ পিঠো-পিঠি ভাইবোন অনেক সময় নিজেদের মধ্যে এমন অনেক কিছু শেয়ার করে, যা বড়দের সঙ্গে করা যায় না৷
—আমি কী ওকে এখন৷
মিসেস ব্যানার্জি উঠতে যাচ্ছিল, রায় তাকে রিরত করে৷
—পরে ডাকলেও হবে৷ ওরা কী একই রুম শেয়ার করে? নাকি ওদের আলাদা৷
—আলাদা৷ এখনতো ওরা বড় হয়েছে৷ দুজনেরই প্রাইভসি দরকার৷
—আমরা একবার দেবব্রত’র ঘরে যেতে চাই৷ আপত্তি নেই তো?
—নানা, আপত্তি থাকবে কেন? তবে ওর ঘরদোর বড় অপরিচ্ছন্ন৷ একটু পরিষ্কার করে না দিলে...মিসেস ব্যানার্জি অস্বস্তির সঙ্গে বলে৷
—প্লিজ ও কাজটি করবেন না৷ অ্যাজ এ স্যাটার অফ ফ্যাক্ট, আমাদের এনকোয়ারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও ঘরের কিছু টাচ না করাই ভাল৷
ছেলেটির ঘর সত্যিই খুব অগুছালো৷ খাটের ওপর আগেকার পরা জামা কাপড় স্তুপীকৃত করে জমানো৷ কার্পেটের ওপর একটা লাল রংয়ের টি শার্ট পড়ে আছে আর বকসার শর্টস৷ মনে হয় আগের দিন রাতের জামাকাপড় তোলার ফরসত হয়নি৷ কলেজের কয়েকটা বই আধখোলা অবস্থায় টেবিলে পড়ে আছে৷ ঘরের নিশ্চয়ই সব সময় এসি চলতো৷ তাই ঘাম আর ডিওডোরেন্ট মিশ্রিত একটা অস্বস্তিকর গন্ধ৷
রায় একবার চারপাশে তারা ঘরের দেওয়ালে রূপম ইসলাম, পিংক স্পয়েড আর চে গুয়েভারার পোস্টার শান্তিপূর্ণভাবে সহবস্থান করছে৷ খুবই ক্যাথলিক টেস্ট বলতে হবে৷ নিজের মনে রায় হাসে৷
ঘরের এককোণে একটা স্প্যানিশ গীটার পড়ে আছে৷ তারপর আবার একটা স্ট্রিং ছেঁড়া৷
—আপনার ছেলের গান বাজনার শখ ছিল বুঝি?
—ঐ...সুকলে থাকতে ওদের একটা ব্যান্ড ছিল৷ তাতেও কী যেন বলে...হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে...তাতে ও ছিল ‘লীড’ গীটারিস্ট৷ তখন বাড়িতে বন্ধুরা মিলে প্র্যাকটিস চলতো৷
আগেকার সুখ স্মৃতি মনে করে মিসেস ব্যানার্জির মুখে একটা ম্লান হাসি দেখা দেয়৷
—আর কলেজে?
—কলেজেও বাজাতো৷ ফেস্ট-টেস্ট হলে৷ তবে, বন্ধুবান্ধবের অভাবে সেটা আর বেশী দিন চলে নি৷
—আমরা একবার ওর ওয়ার্ডরোবটা খুলে দেখতে চাই৷ চাবি আছে?
—মনে হয় না লক করা বলে...একবার খুলে দেখুন তো৷
ওয়ার্ডরোবের কপাট ধরে টান মারতেই ভেতর একরাশ বান্ডিল করা জামাকাপড় হুড়মুড় করে রায়ের গায়ে এসে পড়ে৷
—ফলে রায় বেশ অপ্রস্তুত হয়৷ তবে, মিসেস ব্যানার্জি আরও বেশি৷
—বলেছিলাম না ঘরটা একটু পরিষ্কার করে দিই, নইলে আপনারা...
—ইটস পারফেকটলি অলরাইট৷ রায় ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে৷ ঘরের জিনিসপত্র টাইডি আপ না করে ভাল করেছেন৷ আচ্ছা... আপনার ছেলে মোবাইল ব্যবহার করতো নিশ্চয়ই?
—হ্যাঁ...কেন?
—কেননা ওর মোবাইলটা আমরা কোথাও দেখতে পাই নি৷ মানে...কলেজে যখন ওর বডিটা পাই, তখন মোবাইলটা ওর সঙ্গে ছিল না৷ তাই ভাবছি...বাই এনি চান্স ও সেটা বাড়িতে ফেলে গেছে কিনা৷ ঘরটা আমরা একবার সার্চ করতে পারি?
—ভদ্রমহিলার মুখে বেশ অস্বস্তি৷ রায়ের সেটা চোখে পড়ে৷
—আপনি কিন্তু ঘরে না থাকলেও চলবে৷ আমাদের দিক থেকে কোন অসুবিধে নেই৷ মিসেস ব্যানার্জি চলে গেলে, রায় প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—লেট স স্ট্যার্ট৷
কিন্তু ওয়ার্ডরোব৷ টেবিলের দেরাজ, খাট-সব তোলপাড় করে খুঁজেও দেবব্রত’র মোবাইলের কোন হদিশ পাওয়া গেল না৷ তবে, ওয়ার্ডরোবে রাখা দলা পাকানো জামাকাপড়ের ভেতর থেকে কাগজের একটা চিরকুট আবিষ্কার করা গেল, চিরকূটটা দুভাঁজে ভাঁজ করা৷ ভাঁজ খুলে রায় লেখাটা পড়ে৷ তারপর নিশব্দে সেটা প্রদ্যোৎ-এর দিকে এগিয়ে দেয়৷
কাগজটায় বলপেন দিয়ে মাত্র একটি লাইন লেখা৷ বেশি বাড় বেড়ো না...সমূলে মুড়াবে৷’
লেখাটা প্রদ্যোৎ দুবার পড়ে৷ এটার মানে কী দাড়ালো স্যর...ধম্কি?
—বলতে পার৷ রায়ের মুখ গম্ভীর৷
—এবং ধম্কিটা বোধহয় দেবব্রত সিরিয়াসলিই নিয়েছিল৷ খেয়াল করে দেখ...
কাগজটার ভাঁজগুলো কেমন ব্রেক করে গেছে৷
ভাঁজ খুলে প্রদ্যোৎ তাই মনে হয়েছিল৷ তবে, কাগজ পুরোনো হলে হলদেটে হয়ে যায় এ ক্ষেত্রে সেটা হয়নি৷ অর্থাৎ লেখাটা দেবব্রত বাবার পড়েছে৷
—শোনাও উই হ্যাভ এ থ্রেট লেটার৷
রায়ের সঙ্গে থেকে থেকে ইদানীং প্রদ্যোৎও প্রায়শঃই ইংরেজিতে কথা বলছে৷
—এখন দেখতে হবে হাতের লেখাটা কার৷ রায় থুঁত্নি চুল্কে বলে৷
—কাজটা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না, স্যর৷ ওদের কলেজেতো শুনলাম প্রায় চার হাজার স্টুডেন্টস৷
ইয়াঃ৷ মোর লাইক ফাইডিং এ নিডল ইন আ হে স্ট্যাক৷
প্রদ্যোৎ বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছেলে৷ রায়ের কথার অর্থ ঠিক ধরতে পারে না৷
দেবব্রত’র দিদি’র সঙ্গে রায়দের দেখা করাটা খুব সহজে হয় না৷ পলার ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করা৷ কত ধাক্কাধাক্কি করেও ভেতর থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায় না৷
—পলা...পলা দরজা খোল৷
মিসেস ব্যানার্জি বার বার ওর দরজায় নক করে৷ কিন্তু পলা দরজা খোলে না৷
ভেতর থেকে একটা টু শব্দ পর্যন্ত নেই৷
—ও হঠাৎ কিছু করে বসলো নাতো? মিসেস ব্যানার্জি আশঙ্কিত হয়ে ওদের দিকে তাকায়৷
—আশা করি না৷ রায় মহিলাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে৷
—বলুন পুলিশ থেকে লোক এসেছে, কিছু জরুরি প্রশ্ন আছে৷ এবং ওর বয়ান ভাইয়ের খুনিকে ধরতে সাহায্য করবে৷
এত কিছু বলা সত্ত্বেও মেয়েটি দরজা খোলে না৷
প্রদ্যোৎ দরজা ভেঙে ফেলার হুম্কি দিতে শেষ পর্যন্ত পলা বেরিয়ে আসে৷
মাথার চুল উস্কো খুস্কো৷ চশমাটা বেঁকা তেড়া হয়ে পরা৷ চোখের সাদা অংশটা টকটকে লাল৷ পরণের জামাকাপড় আলু-থালু৷
রায় মেয়েটিকে দেখে বিস্মিত হয়৷ মুখটা বসানো দেবব্রত’র মত৷ ও যদি এত ে৮ না হোত, তাহলে ওকে রীতিমত সুন্দরী বলা যেত৷
—বলুন...কী প্রশ্ন করার আছে? গলা ভাঙা গলায় বলে৷
গলায় অ্যাগ্রেশন, রাগ, দুঃখ, পুঞ্জিভূত অভিমান—অনেক কিছু৷
—আমরা এখানেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে কথা বলবো, নাকি কোথাও গিয়ে বসা যায়?
পলার ঘরের দিকে রায় ইঙ্গিত করে দেখায়৷
—নাঃ আমার ঘরে না৷ দরজা আগলে পলা দাড়িয়ে থাকে৷
এ ঘরেও কী সবকিছু জিনিস অগুছালো? রায় অনুমান করার চেষ্টা করে৷ শেষ পর্যন্ত বাইরের ঘরে গিয়ে বসা সাব্যস্ত হয়৷
নিউট্রাল টেরিটরি৷
—গতকাল রাতে তোমার ভাইয়ের কলেজে ফেস্ট ছিল...ও তোমাকে ইনভাইট করে নি?
—করেছিল৷ আমি যাইনি৷
—কেন জানতে পারি?
—ভাল লাগে না তাই৷ পলার উত্তর বেশ কাটাকাটা৷
—ওদের কলেজের ফেস্ট তুমি কখনই অ্যাটেন্ড করো নি?
—করেছিলাম৷ ওদের ফার্স্ট ইয়ারে৷ গিয়ে পছন্দ হয়নি৷
—পছন্দ হয়নি?
—সেই মাঠে বসে মদ আর গাঁজা খাওয়া৷ আর অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের সঙ্গে ফস্টি নস্টি করা৷ নট মাই স্টাইল৷
—তোমার স্টাইলটা তাহলে কী? আই অ্যাম কিউরিয়াস৷
এক মুহুর্তের জন্য পলা রায়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়৷ বুঝবার চেষ্টা করে ওকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা হল কি না৷ রায় অরনেস্টলি ওর দিকে তারিয়ে থাকে৷
—আমি বই পড়তে ভালবাসি৷ আর্ট গ্যালারিতে যাই৷ ভাল সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে ভাল লাগে৷
—আর তোমার ভাইয়ের?
—পলা একটু চুপ করে থাকে৷
—একসময় ভাইয়ার ও এসবে ইনটারেস্ট ছিল৷ একসঙ্গে বসে ডিভিডিতে ছবি দেখতাম৷ ইদানীং সে সব জলাঞ্জলি গিয়েছিল৷
—বুঝলাম৷ রায় মাথা নাড়ে৷ —এই যে বদলে যাবার কথা বলছো...আগে কী দেবব্রত ওর পারসোনাল লাইফ নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করতো?
—এভরিথিং৷ আমার কাছ থেকে ও কোন কিছুই লুকোতো না৷
—ইদানিং সেটা আর হয় না?
পলা নিশব্দে মাথা নাড়ে৷
—একটা অন্য কথায় আসি৷ ওর কোন গার্লফ্রেন্ড আছে বা ছিল বলে তুমি জানো?
—কোন জনের কথা বলছেন?
রায় একটু অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকায়৷
—তার মানে...ওর একাধিক গার্ল ফ্রেন্ড ছিল?
উত্তরে পলার মুখে একটা ব্যঙ্গ হাসি ফুটে ওঠে৷
—একটু আগের দিকে যাওয়া যাক, ফার্স্ট ইয়ারে কী ওর সঙ্গে কারও অ্যাফেয়ার হয়েছিল? সামথিং সিরিয়াস?
পলা একটু চমকে তাকায়৷—কে বলেছে এ কথা?
—তোমার মা৷ কিন্তু উনি মেয়েটির নাম মনে করতে পারলেন না৷
—সুদীপ্তা৷ পলা একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ —ভাল মেয়ে৷ কিন্তু ভাইয়ার সেটা বেশি দিন ভাল লাগে নি৷
—একজ্যাকটলি কী হয়েছিল ওদের মধ্যে? মেয়েটিতো একসময় রেগুলারি ল তোমাদের বাড়িতে আসতো৷
রােেয়র দিকে একবার তাকিয়ে পলা মুখ সরিয়ে নেয়৷
—ঠিক জানিনা৷
—জানি না? না, বলবে না?
উত্তরে পলা শোল্ডার শ্রাগ করে৷
—তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কলেজে কারও শত্রুতা ছিল বলে জান?
—আমার ভাইয়ের সঙ্গে শত্রুতা? ভুরু কুঁচ্কে পলা রায়ের দিকে তাকায়৷
—হঠাৎ এ প্রশ্ন?
—কেননা তোমার ভাইয়ের মৃত্যু স্বাভাবিক কারনে হয়নি—আমাদের বিশ্বাস তাকে খুন করা হয়েছে৷ এবং সেটা ঠান্ডা মাথায়, প্ল্যান করে৷ শত্রুতা না থাকলে সেটা হোত না৷
—আমাকে এ প্রশ্ন করা কেন? পলার মুখে আবার ব্যঙ্গ হাসি৷ এটা বার করাতো আপনাদের কাজ, তাই না?
পলার ব্যঙ্গোগুি রায় গায়ে মাখে না৷ এগুলো অকুপেশনাল হ্যাজারড৷ ও অনেকদিন আগেই মেনে নিয়েছে৷
রায় একবার ভাবে দেবব্রত’র পকেট থেকে খুঁজে পাওয়া কাগজের চিরকূটটা একবার পলাকে দেখাবে নাকি৷ কিন্তু, তারপর মনে হয় ওকে দেখিয়ে বিশেষ লাভ হবে না৷ পলা হয় ওর ভাইয়ের এখনকার গতিবিধি সম্বন্ধে কিছু জানে না কিম্বা সে কিছু বলবে না বলে স্থির করে ফেলেছে৷
—তোমার বাবা বাড়ি নেই? উনিতো আজ সকালে কলেজে গিয়েছিলেন দেবব্রত বডি সনাগু করতে৷
—ঠিক বলতে পারছি না৷ বাড়িতে থাকলে দেখা করবেন?
—হ্যাঁ৷ তবে তার আগে একটা শেষ প্রশ্ন...দেবব্রত’র গার্লফ্রেন্ড-এর পুরো নামটা কী?
—যতদূর মনে আছে সুদীিপ্তা চৌধুরী৷
সোমবার সকাল দশটা৷ রায় আর প্রদ্যোৎ ছেলেটির কলেজে গিয়ে হাজির৷
কলেজরে অফিসে ওরা ঘোষালের সামনে বসে জিজ্ঞাসাবাদ করে৷ ঘোষালের সঙ্গে আগেই ওদের পরিচয় হয়েছে৷
—সুদীপ্তা চৌধুরী বলে আপনাদের কোন স্টুডেন্ট আছে?
—কোন ইয়ার বলুনতো? সায়েন্স আর্স কমার্স-কোন সেকশন যদি বলতে পারেন তাহলে আরও ভাল হয়৷
—সেটাই তো বলা মুসকিল...রায় চিন্তিত ভাবে থুঁত্নিতে হাত বোলায়৷—দেখুনতো থার্ডওয়ার বায়োলজি অনার্স-এ পাওয়া যায় কিনা?
গতকাল দেবব্রত’র বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে ওরা ওর বাবার সঙ্গে দেখা করেছিল৷ কিন্তু, নতুন কোন তথ্য ওরা পায়নি৷ মিস্টার ব্যানার্জি এমনিতেই গম্ভীর মানুষ, কম কথা বলেন৷ এই ঘটনার পরে মনে হয় আরও চুপচাপ হয়ে গেছেন কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলে একটা জিনিস ওর পরিস্কার৷ এই পরিস্থিতির জন্য ভদ্রলোক ওর মাকেই দায়ী করছে৷
স্পয়েলট ব্র্যাট...বাংলায় ‘আদরে বাঁদর বললে হয়তো খারাপ শোনায়...কিন্তু এই ধারণাটা তাহলে রায়ের ভুল হয়নি৷
—তার মনে সায়েন্স সেকশন? দাড়ান... দেখছি৷
ঘোষাল রস্টারের পাতা উল্টোতে থাকে৷
—উঁহু৷ এ নামের কোন মেয়ে থার্ডইয়ারে সায়েন্স-এ নেই৷
—তাই? রায় একটু অবাক হয়ে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷ কিন্তু, মিসেস ব্যানার্জি বলেছিল ওর ছেলে আর সুদীপ্তা একই সঙ্গে পড়তো৷ সে ক্ষেত্রে ওদের ক্লাসমেটই হওয়া উচিত৷
তাহলে কী মেয়েটি দেবব্রত’র এক ইয়ার জুনিয়ার ছিল? রায়ের মাথায় হঠাৎ একটা ব্রেন ওয়েড খেলে যায়৷ এমনও তো হতে পারে৷ যে মেয়েটি ফার্স্ট ইয়ারের পর ওদের কলেজ ছেড়ে অন্য কোনও কলেজে ট্রানসফার নেয়৷ হয়তো ওদের দুজনের মধ্যে মনোমালিন্যের পর মেয়েটি আর সেম কলেজে থাকতে চায় নি৷
—আচ্ছা দেখুনতো...দু’বছর আগে মেয়েটি এ কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ছিল কিনা৷ এবার রায়ের অনুমান ঠিক৷
—হ্যাঁ...পাওয়া গেছে৷ সুদীপ্তা চৌধুরী, বায়োলজি অনার্স৷ সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার এক মাসের মধ্যে মেয়েটি কলেজ ছেড়ে দেয়৷
—কোন কলেজে ট্রানসফার নিয়েছিল মেয়েটি?
—ট্রানসফার? নাঃ, এখানেতো কোন ট্রানসফার শো করছে না৷
—যাস্ট ড্রপট আউট? বিস্মিত হয়ে রায় জিজ্ঞেস করে৷
—তাই তো দেখাচ্ছে স্যর৷
—মেয়েটির অ্যাড্রেস পাওয়া যাবে?
—যাবে৷ ছোট একটা প্যাডে ঘোষাল মেয়েটির বাড়ির ঠিকানা লিখে দেয়৷
—টেলিফোনটা তো দিলেন না৷ কাগজ হাতে নিয়ে রায় জিজ্ঞেস করে৷
—উঁহু৷ বাড়ির টেলিফোন নাম্বার দেওয়া হয়নি৷
—ভবানীপুর৷ চিরকূটটা রায় প্রদ্যোৎ-এর দিকে এগিয়ে দেয়৷ তোমার পাড়া৷ একবার খোঁজ নিয়ে দেখবে?
—এখখুনি? প্রদ্যোৎ-এর গলায় কোথায় যেন একটু অনিচ্ছা৷
—হ্যাঁ...শুভস্য শীঘ্রম৷ গাড়িটা নিয়ে তুমি ওখানে চলে যাও৷ ততক্ষণে আমি না হয় ক্লাসের ছেলেমেয়েদের একটা জিজ্ঞাসাবাদ করবো৷
—ঠিক আছে৷ নিমরাজী হয়ে প্রদ্যোৎকে বেরিয়ে যেতে হয়৷ প্রদ্যোৎ-এর অনিচ্ছার পেছনে একটাই কারণ৷ স্যরের ইনটারোগেশন ও কখনও মিস করতে চায় না৷
থার্ড ইয়ার বায়োলজির ক্লাস যখন চলছে, তখন মোটামুটি জোর করে কলেজের প্রিন্সিপাল জয়রাজ মজুমদার রায়ের সঙ্গে স্টুডেন্টদের আলাপ করিয়ে দেয়৷ রায়ের ইচ্ছে ছিল শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার৷ কিন্তু সেটা আবার জয়রাজের একেবারেই মনঃপুত নয়৷
—বলেন কী! মার্ডার মোস্ট ফাউল...এরকম পরিস্থিতিতে এক মুহূর্তেও দেরী করা যায় না৷ জয়রাজ অত্যন্ত সিরিয়াসলি বলে ৷ —আমাদের দিক থেকে যে ডেরিলিকশন অফ ডিউটি হয়ে যাবে যে?
ওকে দেখলেই সবার মধ্যে হঠাৎ করে এমন ইংরেজিতে কথা বলার প্রবৃত্তি—যে কেন প্রবল হয়ে ওঠে, সেটা রায় আজও উদ্ধার করতে উঠতে পারে নি৷
—ভেরি ভেরি সরি! এরকমভাবে আপনার ক্লাস ইনটেরাপট করার জন্য৷ এটা আমার একেবারেই ইচ্ছের বিরুদ্ধে৷
রায় প্রথমেই ক্লাসের প্রোফেসরের কাছে এঙ্গলজি চেয়ে নেয়৷
—বলতে পারেন এটা বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে৷
এরপর রায় ক্লাসের ছেলেমেয়েদের অ্যাড্রেস করে বলা শুরু করে৷
—আশাকরি তোমরা সবাই জান যে পরশুদিন তোমাদের কালেজের ফেস্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর, আর্লি ইন দ্য মর্নিং, তোমামাদের ক্লাসমেট দেবব্রত কলেজের কমনরুম থেকে নীচে পড়ে মারা যায়৷ বিশ্বাস এটা দুর্ঘটনা নয়, খুন খুব ঠান্ডা মাথায়, প্ল্যান করে এটা করা হয়েছে৷
সমস্ত ক্লাস নিস্তদ্ধ হয়ে যায়৷
—আমি আশা করবো যে তোমরা এই খুনের সমাধান করতে পুলিশকে যথাসম্ভব সাহায্য করবে৷ আমি জানতে চাইবো তোমাদের মধ্যে ওর বন্ধু কারা? শেষের কয়েকদিন কাদের নিয়ে কথা হয়েছিল তোমাদের মধ্যে৷ আর জানতে চাইবো এই ক্লাসে কিম্বা কলেজে ওর সঙ্গে ঝগড়া বা শত্রুতা ছিল কি না৷ এসব কথা তোমরা আমাকে অকপটে বলতে পার৷
ক্লাসের মধ্যে একজনও হাত তোলে না, বা উত্তর দিতে এগিয়ে আসে না৷ রায় বলার ধরণ পাল্টায়৷
—অবশ্য তোমাদের মধ্যে যদি কারও এখানে বলতে অস্বস্তি থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে ক্লাসে? পরেও এসে দেখা করতে পার৷ আমি কলেজের অফিসে অপেক্ষা করে আছি৷ তোমরা যা কিছু বলবে সেটা একেবারেই কনফিডেনশিয়াল৷ অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা হবে না৷ আর আমার টেলিফোন নাম্বারটাও দিয়ে রাখছি৷ রায় শান্ত গলায় জানায়৷
—তোমাদের মধ্যে যে কেউ আমাকে পারসোনালি ফোন করতে পার৷ ওটা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে৷
রায় নিজের ফোন নাম্বারটা জানায়৷ ওর চোখ অনুসরণ করে ক্লাসের কেউ নাম্বারটা লিখলো কিনা৷ কিন্তু, ওর মনে হল না কেউ লিখেছে বলে৷
ক্লাস থেকে বেরিয়ে রায় কলেজের অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করে৷ কিন্তু ক্লাস হয়ে যাওয়ার পর কেউ এসে ওর সঙ্গে দেখা করে না৷ দেখতে দেখতে বিশেষ সময় হয়ে যায়৷ আধঘণ্টা টিফিনের ব্রেক৷
রায় ভাবে, তাহলে কী সারা ক্লাসে দেবব্রত’র বন্ধু বলতে কেউ নেই? নাকি, এগিয়ে আসছে না ভয়ে?
বেশ কিছুক্ষণ পর প্রদ্যোৎ ফিরে আসে৷
—না স্যর...সুদীপ্তার ফ্যামিলি ভবানীপুরের ঐ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে৷ প্রায় দু বছর আগে৷ বাড়িওয়ালা ওখানে থাকে না৷ আশে পাশের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে ছিলাম৷ কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলো না৷
উদগ্রীব হয়ে প্রদ্যোৎ রায়ের দিকে তাকায়৷
—আর আপনার স্যর? স্টুটেন্ডরা কেউ কিছু বললো?
রায় গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ে৷ তারপর কী যেন একটা ভেবে ওর মুখ একটু প্রফুল্ল হয়৷
—চলো, এখানে বসে থেকে লাভ নেই৷
—কোথায় যাবেন?
—যে জায়গাটাকে কলেজের নার্ভ সেন্টার বলা যায়...ক্যান্টিন৷
—ক্যান্টিনে?
প্রদ্যোৎ একটু অবাক হয়ে তাকায়৷ তারপরই অবশ্য ওর মুখের এক্সপ্রেশন পাল্টে যায়৷
—ও হ্যাঁ...ওখানেই কলেজের সব ছেলেমেয়েকে বসে আড্ডা মারে, সময় কাটায়৷
—একজ্যাকটলি৷ ওটাই আমাদের লাস্ট ট্রাই৷ দেখা যাক ওখানে গিয়ে কোন খবর পাওয়া যায় কিনা৷
ওরা যখন ক্যান্টিন গিয়ে পৌঁছয় তখন ওখানে প্রচুর ভীড়৷ দু’কাপ ব্ল্যাক কফি নিয়ে ওরা একটা কর্নারে গিয়ে দাড়ায়৷
আমাদের একটা অপেক্ষা করতে হবে বুঝলে৷ ভীড়ই একটু না কমলে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলা যাবে না৷
কিছুক্ষণ পর অবশ্য ক্যান্টিনের ভীড় কমে আসে৷ টিফিনের বিরগুি শেষ৷
—পিট ভরবে এরকম কী আইটেম আছে আপনাদের?
দেয়ালে টাঙানো ‘মেনু বোর্ড’-এর দিকে তাকিয়ে রায় ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে ডিমের ডেভিল...মাছের ফ্রাই—চিকেন কাটলেট...মটন স্টু...সব কটাই ভাল হবে৷
—টাট্কা?
—বাসি জিনিস রাখি না৷ ম্যানেজার একগাল হেসে জবাব দেয়৷ ৷ —নো ফ্রিজ৷ প্রদ্যোৎ খেতে ভালবাসে, এটা রায় জানে৷ আর, এত ঘোরাঘুরির পর নিশ্চয়ই ওর খুবই খিদে পেয়েছে, তাই ওর জন্য রায় এক প্লেট ডিমের ডেভিল, ফিস ফ্রাই আর মাটন স্টু’র অর্ডার দেয়৷ সঙ্গে মাখন দিয়ে চারটে টোস্ট৷ আর, নিজের জন্য রায় অর্ডার-দেয় অমলেট আর টোস্ট৷
—বসুন না...আপনারা দাড়িয়ে কেন? কাছের একটা টেবিল পরিস্কার করে ম্যানেজার ওদের বসায়৷ তা...আপনারা গার্জিয়াল?
—বলতে পারেন৷ হালকাভাবে রায় ম্যানেজারের কথা এড়িয়ে যায়৷—আসলে ওর ছোট ভাই এখানে ভর্তি হতে চায়৷ এখানের ক্রীকেট টীম নাকি খুব ভাল ছেলেটি স্পোর্টস ম্যান বুঝি?
প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়৷
—দেখি...আপনাদের খাবারটা তৈরি হল কি না৷ তাড়া না দিলে আজকাল কেউ কাজ করে না৷
গজ্ গজ্ করতে করতে ম্যানেজার ক্যান্টিনের ভেতরে চলে যায়৷
—একটা প্রশ্ন করবো স্যর?
—অবশ্যই৷
—ম্যানেজারকে আমাদের আসল পরিচয় দিলেন না কেন?
—কি জানি? পুলিশের লোক বলে পরিচয় দেওয়াতেই বোধহয় ক্লাসের ছেলেমেয়েরা একটাও মুখ খুললো না৷ তাই এবার অন্য পরিচয় দিয়ে দেখছি বেটার রেজাল্ট হয় কিনা৷
—তাই বলুন...প্রদ্যোৎ-এর মুখে স্বল্প হাসি৷ —আমার যে কোন ছোট ভাই আছে সেটা আজই প্রথম জানলাম৷
বলতে না বলতেই ম্যানেজার দু’হাতে তিন প্লেট খাবার অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে ব্যালেন্স করে ওদের টেবিলে এনে রাখে৷
—হেঁ হেঁ...রায়ের অবাক হয়ে যাওয়া দৃষ্টি নোটিশ করে ম্যানেজার হাসে৷
—ছোটকালের অভ্যেস৷ সাত বছর বয়েসে রাস্তার দোকানে বেয়ারার কাজ দিয়ে আমার প্রফেশনাল লাইফ শুরু৷
—আর ওনারটা? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷
—আসছে৷ ওঁর মামলেটটা পেঁয়াজ, ধঁনেপাতা, ক্যাপসিকাম দিয়ে ভাল করে বানাতে বললাম৷ তার সঙ্গে ফাইন করে কাঁটা কিছু কাঁটা লঙ্কার কুচি, বিচি ছাড়ানো৷ যাতে জিভে ঝাল লাগবে, কিন্তু চোখে জল আসবে না৷
—বাহ! আপনি তো শুধু রান্নায় নয়, কথা বলতেও পারদর্শী দেখছি৷
স্যরের অমলেট আর টোস্ট আসা মাত্র প্রদ্যোৎ আর কোন বাক্য ব্যয় না করে খাবারের দিকে মনঃসংযোগ করে৷
খাওয়া দাওয়া চলাকালীন খুব ক্যাজুয়ালি রায় দেবব্রত’র কথা তোলে৷
—আচ্ছা...এখানকার এক ছাত্র...একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, না কী যেন নাম ছেলেটার?
—অ্যাকসিডেন্ট না, মার্ডার৷ ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল ছেলেটাকে৷
তা...আপনারা জানলেন কী করে?
—গতকালের ইভনিং-নিউজে দেখলাম মনে হচ্ছে৷
—ছেলেটির নাম দেবব্রত ব্যানার্জি৷ বড়লোকের বকে যাওয়া ছেলে৷
—তাই? অমলেটটা কিন্তু খাসা বানিয়েছে৷ গুড কুক৷
দেবব্রত’র ব্যাপারে রায় আর কোন ইনটারেস্ট দেখায় না৷ কিছুক্ষণ পর ম্যানেজার আর চুপ করে থাকতে পারে না৷
—বুঝলেন তো...ঐ ছেলেটা...পড়াশুনোর সঙ্গে কোন পাটই ছিল না ৷ দিন রাততো এখানে বসেই আড্ডা মারতো৷ আর ঝ্যং ঝ্যাং করে গীটার বাজাতো৷
ওদের খাওয়া শেষ হতে কফি আসে৷ কাপের ওপরটা ফ্যানা হয়ে আছে৷ —বা বাঃ! একসপ্রেসো কফি নাকি?
—না না, হাতেই বানানো৷ আপনাদের জন্য স্পেশালি করা৷ তা যা বলছিলাম...গলা খাটো করে ম্যানেজার রায়ের দিকে মুখ এগিয়ে আনে৷
—শোনা যায় কেসটা বেশ গন্ডগোলের৷ ওর ক্লাসের ছেলেরা বলাবলি করছিল৷
—গন্ডগোলের? কফিতে একটা চুমুক দিয়ে রায় জিজ্ঞেস করে৷
—বুঝলেন না? একটা চোখ টিপে ম্যানেজার বলে৷—নারীঘটিত ব্যাপার৷
—তা হবে৷ ম্যানেজারের কথায় রায় বিশেষ আগ্রহ দেখায় না৷
—ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা করতে দিলে এমনটাই হয়৷
—শোনা যায়...ম্যানেজার একবার চারদিকে তাকিয়ে নেয় কেউ ওর কথা শুনতে পেল কিনা৷ —একটি মেয়ের নাকি পেট করে দিয়েছিল দেবু৷
—তাই বুঝি? রুমাল দিয়ে ঠোঁট মুহূর্তে মুছতে রায় জিজ্ঞেস করে৷
—তা...মেয়েটি কী এই কলেজেরই?
—সে রকমই তো শুনছি৷ তবে, কোনটা সত্যি আর কোনটা গুজব বলা মুসকিল৷
খাবারের পয়সা দিয়ে রায় প্রদ্যোৎকে নিয়ে বেরিয়ে আসে৷
—তাহলে ব্যাপারটা কী দাড়ালো?
—সবইতো বুঝলাম স্যর৷ প্রদ্যোৎ হেসে জবাব দেয়৷ —কিন্তু, কলেজের এত মেয়ের মধ্যে বিশেষ করে কোন মেয়েটি প্রেগনেন্ট আপনি বুঝবেন কী করে? আর তাছাড়া প্রেগনেন্সি টারমিনেট করা আজকাল খুবই সোজা৷
রায় আড়চোখে একবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷ এই সব ব্যাপারে ওর অ্যাসিসটেন্ট-এর যে এরকম টন্টনে জ্ঞান, সেটা ওর জানা ছিল না৷
হাঁটতে হাঁটতে যেখানে ওদের গাড়ি পার্কিং করা আছে সেই দিকে ওরা এগিয়ে যায়৷
—আমার মনে হচ্ছে দেবব্রত হ্যাড এ লট অফ এনিথিং হিয়ার৷ নইলে, একটা ছেলেমেয়েও ইনফেরমেশন দিতে এগিয়ে এল না কেন?
সেদিন গভীর রাতে রায়ের মোবাইলে একটা ফোন কল আসে৷ এমনিতে রায়ের মোবাইল চবিবশ ঘণ্টা অন থাকে৷ কখন কার কাছ থেকে ফোন আসতে পারে বলা যায় না৷ তবে, শর্মির ঘুমের অসুবিধে হয় বলে রাতে সে ফোনটাকে ভাইব্রেশন মোডে রাখে৷
দীর্ঘদিনের অভ্যাসে রায়ের ঘুম পাতলা৷ ফোনটা ভাইব্রেট করতে সম্ভাবতঃই ওর হাত বালিশের নীচে চলে যায়৷ চশমা পরে ও নাম্বারটা চেক করে৷ অচেনা৷ পা টিপে টিপে বাথরুমে গিয়ে চাপা গলায় কথা বলে
—হ্যালো?
অন্যদিক থেকে কোন উত্তর আসে না৷ রায় ভাবে ওর লাইটনা ধরতে দেরী হওয়ার জন্য হয়তো যেই ফোন করে থাক, ছেড়ে দিয়েছে৷ কিন্তু না! লাইনটাতো এখনও চালু রয়েছে৷
—হ্যালো? রায় আবার জিজ্ঞেস করে৷
এবার মনে হল টেলিফোনে কারও যেন নিশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া গেল৷
—হ্যালো...
—আপনি অবিনাশ রায়? গলাটা একটি মেয়ের৷
—বলছি...বাথরুমের দরজা অল্প ফাঁক করে রায় একবার দেখে নেয় শর্মি জেগে গেল কিনা৷
—আপনি আজ আমাদের কলেজে এসেছিলেন...
—হ্যাঁ৷ মেয়েটি এবার কিছু বলবে বলে রায় অপেক্ষা করে থাকে৷ কিন্তু, মেয়েটি কিছু বে না৷
—এত রাতে যখন ফোন করছেন...কোন বিশেষ কারনে নিশ্চয়ই৷
টেলিফোনে৷ কোন উত্তর আসে না৷
—দেখুন...রায় বিরগু হয়ে বলে৷—আপনি নিশ্চয়ই আমাকে প্রেম নিবেদন করার জন্য ফোন করেন নি৷ অতএব যা বলবার চট্ পট্ বলে ফেলুন আমার ঘুম পেয়েছে৷
—মিস্টার রায়, আপনি এ কেসটা প৮ করবেন না৷ ছেড়ে দিন৷
—মানে? রায় এবার বেশ ইরিটেটেড হয়ে যায়৷ —আমি কোন কেস ধরবো বা ছাড়বো, সেটা না হয় আমিই ডিসাইড করি৷ হ্যালো হ্যালো? কিন্তু ততক্ষণে অপর দিক থেকে লাইনটা কেটে দেওয়া হয়েছে৷
বিরগু হয়ে রায় কিছুক্ষণ হাতে ধরা মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ এতরাতে যদি ফোনই করলো তাহলে কোন ইনফরমেশন দিল না কেন? নাকি...পরোক্ষ ভাবে এটাই জানিয়ে দেওয়া হল যে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোন কোপারেশন পাওয়া যাবে না৷ এটাই ইনফরমেশন৷
ফোন শেষ হতে রায় আবার বউয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে৷ ভোর বেলায় সাধারণতঃ শর্মি রায়ের আগে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে৷ শর্মির বলা আছে গাড়ি ধোওয়ার লোক যেন সাত সকালে কলিংবেল না টেপে৷
দরজায় আস্তে করে নক করলেই হবে৷ তারপরই ঠিকে কাজের মেয়ে আসবে৷
কিন্তু, আজ শর্মি ঘুম ভেঙে দেখে অবিনাশ ওর পাশে নেই৷ লোকটা গেল কোথায়? বাথরুমের দরজাতো আধখোলা৷ হন্তদন্ত হয়ে শর্মি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে৷ জরুরী কোন কাজে কী ও বেরিয়ে গেল নাকি? খাওয়ার ঘরে এসে শর্মি রিলীভড হয়৷ রায় বাড়িতেই আছে৷ খাবার টেবিলে রাজ্যের ভিজিটিং কার্ড ছড়ানো৷ তার মধ্যে মুখ গুঁজে রায় কী যেন একটা খুঁজছে৷ পাশে লাল রংয়ের কফি মাগ, পিকাশোর সিগনেচার দেওয়া৷ বহু বছর আগে পিকাশোর একটা এগজিবিশন কলকাতায় এসেছিল৷ সেখান থেকে শখ করে শর্মি রায়ের জন্য একটা কফি মগ কিনে এনেছিল৷
—তোমার ব্যাপারটা কী বল দেখি? চুলে হাত খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে শর্মি জিজ্ঞেস করে৷ —মাঝরাতে চুপি চুপি বাথরুমে গিয়ে ভগবান জানে কাকে পোন করছো৷ তারপর আবার ফ্লাশ টেনে দিয়ে ঘরে ফিরে আসছো, যাতে আমি সন্দেহ না করি৷ আর এখন ভোরবেলায় তুমি ভিজিটিং কার্ড খুঁজছো৷ বুড়ো বয়সে অ্যাফেয়ার?
—একটা কেস...হাতের লেখা...অন্যমনস্ক ভাবে রায় জবাব দেয়৷ ওর চোখ তখনও ভিজিটিং কার্ড দেখে যাচ্ছে৷ —আরেক কাপ কফি হবে?
—উঁহু...আর কফি না৷ শর্মি দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ে৷ —বড় জোর গ্রীনটি চলতে পারে৷
পেটে আলসার ধরা পড়ার পর তেকে রায়ের কফি খাওয়া বারণ৷ চা খেতে খেতে রায় হঠাৎ উল্লসিত হয়ে ওঠে৷
—ইউরেকা ইউরেকা! পাওয়া গেছে৷
—তোমার এই হেয়ালিপানা আর আমার সহ্য হচ্ছে না৷
রাগ করে শর্মিলা টেবিল ছেড়ে উঠে যায়৷
ছড়ানো অজস্র ভিজিটিং কার্ডের মধ্য থেকে খুঁজতে খুঁজতে রায় একটা বিশেষ কার্ড বার করে৷ কার্ডটা ডক্টর আদিনাথা গোস্বামীর৷ নীচে লেখা গ্রাফোলজিস্ট৷ তার নীচে ফোন নাম্বার ও ঠিকানা৷
উল্লসিত হয়ে রায় ভদ্রলোকের মোবাইল নাম্বারে ফোন করে৷
ডক্টর আদিনাথ গোস্বামীর সঙ্গে রায়ের আলাপ হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে, একটা সেমিনারে৷ যেখানে ডক্টর গোস্বামী গ্রাফোলজি নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন৷ তার মধ্যে একটা লাইন বিশেষ করে রায়ের মনে এখনও গেঁথে আছে ‘যে কোন মানুষের হাতের লেখা থেকে সে মানুষটির চারিত্রিক গঠন সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে দেওয়া যায়৷’
সেমিনারের পর ডক্টর ঘোষালের কার্ডটা ও ফেলে দিতে পারেনি ওর কেন যেন মনে হয়েছিল ক্রাইম সলভ করার জন্য ওনাকে কখনও প্রয়োজন হতে পারে৷
—কাগজটা একবার দেখাতে পারেন? জেরক্স কপি হলে কিন্তু হবে না৷ অরিজিনাল লেখাটা চাই৷
—অবশ্যই৷
রায় দেবব্রত’র ঘরে পাওয়া চিরকূটটা উক্টর ঘোষালের দিকে এগিয়ে দেয়৷
—বেশি বাড় বেড়োনা
অমূলে মুড়োবে৷
ব্যস! আর কিছু লেখে নি?
—নাঃ! আমরা অন্ততঃ আর কিছু পাইনি৷
—হোয়াট এ চিঠি...লেখাটা এ‘আরেকটু বেশি হলে আমাদের দিক থেকে সুবিধে হোত৷ তবু...
টেবিলের দেরাজ থেকে একটা এনলারজিং গ্লাস বার করে ডক্টর ঘোষাল কিছুক্ষণ খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখাটা নিরীক্ষণ করে৷
—হুঁ...ইনটারেস্টিং৷
রায় আর প্রদ্যোৎ একবার পরস্পরের মধ্যে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে৷ কিন্তু, চিরকূটের মধ্যে ঠিক কোন জিনিসটা যে ভদ্রলোকের কাছে ইনটারেনিস্টং লাগলো সেটা জানা গেল না৷ আরও কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর ঘোষাল ওদের দিকে মুখ তুলে তাকায়৷
—বলুন কী জানতে চান৷
—জানতে চাই মানে...রায় ইতস্তত করে৷—আমরা জেনেরালি যে এই চিরকূটটা লিখেছে তার সম্বন্ধে জানতে চাই৷ লেখাটা পড়ে আমাদের অন্ততঃ মনে হয়েছিল এটা একটা সিরিয়াস ওয়ার্নিং৷
—হ্যাঁ হ্যাঁ...সেটা ঠিক৷ কিন্তু আপনারা ঠিক কি জানতে চান...ইউ হ্যাভ টু বি মোর স্পেসিফিক৷
—যে এটা লিখেছে তার চারিত্রিক বা শারীরিক কোন পিকিউলিয়ারিটি পাওয়া যায় কি না৷ কেননা যাকে এই চিঠিটা দেওয়া হয়েছে সে মাত্র কয়েকদিন আগে খুন হয়েছে৷
—আহ! নাটকীয় ভাবে ঘোষালের ভুরু কপালে ওঠে৷ —দ্যাট চেঞ্জেস এভরিথিং৷
—কীভাবে?
ঘোষাল তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দেয় না৷ এনলারজিং গ্লাসটা দিয়ে লেখাটাকে আবার বেশ ভালভাবে দেখে৷
—ইয়েস৷ লেখাটার মধ্যে প্ল্যানিং...ইমপ্লায়েড থ্রেট, অ্যাঙ্গার, হেট্রেড— অনেক কিছুই আছে৷ আর...আমি খুব ভুল করে না থাকি.. . তাহলে সে একজন লেফটি৷
রায় খুব শিয়োর নয় ও ঠিক শুনেছে বলে৷
—কী বললেন?...লেফটিস্ট?
—লেফটিস্ট না, লেফটি৷ ঘোষাল বাঁ হাত দিয়ে লেখার ভঙ্গি করে দেখায়৷
—বাহ্! রায়ের মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আনন্দের আওয়াজ বেরিয়ে আসে৷
প্রদ্যোৎ একটু অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকায়৷
—আরে...তুম এটা বুঝতে পারছ না? রায়ের মুখ খুশিতে ঝলমল করে ওঠে৷
—দেবব্রতর কলেজের যদি বার সাড়ে বার হাজার ছাত্র-ছাত্রী থেকে থাকে, তার মধ্যে বাঁ হাত দিয়ে লেখে ক’জন?
—খুব বেশি হলে দশ পনেরো জন৷
—একজ্যাকটলি৷ দ্যাট ৯ ডাউন আওয়ার লিস্ট অফ আসপেক্টেস টু জাস্ট দশ পনেরো জন৷
—ওহ্! হাউ কুড আই মিন দ্যাট৷ প্রদ্যোৎ লজ্জিত ভাবে মাথা নাড়ে৷
—থ্যঙ্ক ইউ ডক্টর ঘোষাল! রায় বারবার ওর সঙ্গে করমর্দন করে৷ —আজ আপনি আমাদের যে ভাবে সাহায্য করলেন, সে বলে বোঝানো যায় না৷ পরের দিন প্রদ্যোৎ আর রায় আবার দেবব্রত’র কলেজে গিয়ে হাজির৷ ঐ কলেজের যে ক’জন স্টুডেন্ট বাঁ হাতে লেখে, তাদের সববাইকে একটা ক্লাস ঘরে একত্রিত করা হয়৷
—তোমাদের সামনে কাগজ এবং কলম দেওয়া আছে৷ ঐ কাগজের ওপরে সবচেয়ে আগে নিজের নাম লেখো, তারপর আমি যা লিখতে বলবো সেটা বারবার এই কাগজে লিখবে৷ যতক্ষণ না পাতাটা ভর্তি হচ্ছে৷
ডক্টর ঘোষাল রায়কে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিল৷ এক বা দু’লাইন লিখলে সব সময় লেখার বিশেষত্ব ধরা নাও পড়তে পারে৷ কিন্তু এক নাগাড়ে যদি কেউ এক পৃষ্টা লেখে, তখন তার হাতের লেখার বিশেষত্ব বেরিয়ে আসতে বাধ্য৷
—তোমাদের যাস্ট একটা লাইন লিখতে হবে বেশী নয়৷ কিন্তু, টিল দ্য এন্ড অফ দা পেজ৷ লেখো...বেশী বাড় বেড়ো না, সমূলে মুড়োবে৷
ঘরে ন’টি ছেলে আর দু’জন মেয়ে৷ দেওয়া কাগজে সববাই লিখতে শুরু করে শুধু একটি ছেলে লিখতে গিয়ে হাত কেঁপে যায়৷ বলা বাহুল্য, সেটা রায় বা প্রদ্যোৎ-এর দৃষ্টি এড়ায় না৷ তৃতীয় বার লিখতে গিয়ে ছেলেটির লেখা বন্ধ হয়ে যায়৷
—এরকম অদ্ভুত বোকা বোকা লাইন লেখার আমি কোন যুগুিসংগত কারণ দেখছি না৷ দিস ইজ এ ফারস৷ আমি চললাম৷
আধলেখা কাগজটাকে কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে ফেলে ছেলেটি উদ্ধতভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়৷ সবাই অবাক হয়ে তাকালেও কেউ কিছু বলে না৷
শুধু রায়ের মুখে একটা স্তিত হাসি৷
প্রায় ন’ঘণ্টা এক নাগাদ জেরা করার পর ছেলেটি স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে সে এবং তার দুই বন্ধু মিলে কলেজের অ্যানুয়াল ফাংশানের রাত্রে দেবব্রতকে সেকেন্ড ফ্লোরের স্টুডেন্টস কমনরুমে নিয়ে যায়৷ এবং সেখানে তাকে প্রভূত বিয়ার এবং রাম খাওয়ানোর পর ওপর থেকে ধাক্কা মেরে জানলা দিয়ে নীচে ঢেলে দেয়৷
পরে এই নিয়ে প্রদ্যোৎ রায়কে জিজ্ঞেস না করে পারেনি৷
—স্যর আপনি দেবব্রত’র ডেড বডির কাছে গিয়ে ওর মুখের কাছে গন্ধ শুঁকে বলেছিলেন—ছেলেটি প্রথমে বিয়ার তারপর রাম খেয়েছে৷ সেটা কী করে সম্ভব হল?
স্যর ওটা কোন ব্যাপার না বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল৷ বলেছিল, বিয়ার আর রাম দুটোই নাকি অত্যন্ত স্ট্রং স্মেলিং ড্রিঙ্ক৷ তাই ও সেটা গেস করতে পেরেছিল৷
যাই হোক পরের দিন প্রদ্যোৎ রায়ের কামরায় গিয়ে দেখে স্যর থুঁতনির তলায় দু’হাতের আঙুল জড় করে গভীরভাবে কী যেন চিন্তা করছে৷ সাধারণতঃ এই রকম কেস নিস্পত্তি হওয়ার পর স্যরকে বেশ উৎফুল্ল দেখায়৷ এমন কী অনেক সময় স্যর ওকে বাইরে খাওয়াতেও নিয়ে যায়
—এনি প্রবলেম স্যর?
গম্ভীর ভাবে রায় সাইড ওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—তাহলে?
ঠিক তখনই রায় প্রদ্যোৎ-এর কথার জবাব দেয় না৷ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ওর মুখ থেকে শুধু একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরোয়৷
—আসলে...আমি একটা খুব মরাল ডিলেমায় পড়ে গেছি৷
—এই কেসটার ব্যাপারে স্যর? প্রদ্যোৎ অবাক হয়ে তাকায়৷
মাথা নেড়ে রায় ‘হ্যাঁ’ জানায়৷
—তুমি বোধহয় অমলেন্দুর পুরো কনফেশনটা শোনো নি...
—পুরো কনপেশন মানে...আপনি যখন ছেলেটিকে জেরা করছিলেন, তখন আমি মোটামুটি আপনার সঙ্গেই...ও না! মাঝে একবার আমি বেরিয়ে গিয়েছিলাম বটে৷
—কলেজে দেবব্রত’র প্রথম গার্ল ফ্রেন্ড সুদীপ্তার সঙ্গে সম্পর্ক কাট অন হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি যে শুধু ওদের কলেজই ছেড়ে দেয় তাই নয়, শেষ পর্যন্ত সুইসাইডও করে৷ অবশ্য হয়তো তখন ওর সুইসাইড করা ছাড়া অন্য কোন গতিও ছিল না৷ মারা যাবার সময় মেয়েটি চার মাসের প্রেগনেন্ট ছিল৷
—ও গড৷ প্রদ্যোৎ-এর মুখ দিয়ে কথাটা স্বতস্ফূর্ত ভাবে বেরিয়ে আসে৷
—এ বছরও কলেজে ওরকম কিছুই একটা হতে যাচ্ছিল৷ মেয়েটি অমলেন্দুর এক্স-গার্ল ফ্রেন্ড৷
—অমলেন্দু মানে...যে ছেলেটি দেবব্রত’র মার্ডার প্ল্যান করেছিল?
—হুঁ৷ রায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে৷
—এবারও সুইসাই৬ অ্যাটেমুটে৷ শেষে একটা প্রাইভেট নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে অনেক কষ্টে বাঁচানো হয়৷ এবারও মেয়েটি প্রেগনেন্ট ছিল৷
—দু’টোই কী দেবব্রত’র কাজ?
—হুঁ৷
—আর বেবিটার কী হল?
—অ্যাবরশন৷
প্রদ্যোৎ চুপ করে থাকে৷ স্যরের এরকম বিষণ্ণ্ মুখ ও এর আগে কখনও দেখে নি৷
—তাই ভাবছি...ছেলেটিকে ধরিয়ে দেব, না ছেড়ে দেব?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন