রেস্টুরেন্টে রক্তপাত

বরুণ চন্দ

রেস্টুরেন্টের ভেতরটা বাইরের থেকে অনেকটাই অন্ধকার৷ চোখ সয়ে গেলে অবিনাশ রায় সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে একবার চারদিকে তাকায়৷ এখানে কোন নেফারিয়াস কাজকম্ম চলে না তো?

—প্রদ্যোৎ...পাশে দাড়ানো লম্বা ছিপছিপে লোকটির দিকে তাকিয়ে রায় বলে, ভেতরের দিকের দেওয়ালটায় একবার ভালো করে ট্যাপ করে দেখোতো—কোনো চোরা দরজা আছে কি না?

—একজ্যাকটলি৷

কয়েক বছর একসঙ্গে কাজ করে প্রদ্যোৎ অনেক সময়ই বুঝতে পারে স্যর কখন কীভাবে ভাবছে৷ এগিয়ে গিয়ে প্রদ্যোৎ দেওয়ালে হাত মুঠো করে ট্যাপ করতে থাকে৷ কোথাও ফাঁপা আওয়াজ পাওয়া যায় কি না৷

—না স্যর... দেওয়ালটা সলিড৷

—রেস্টুরেন্টের ওনার কী ক্যাশ ওই কাউন্টারটাতেই বোসত? রায় বড় গদি আঁটা সিটটার দিকে তাকিয়ে বলে৷

—মনে তো হয়...তবু একবার ভেতরে জিগ্যেস করে আসি৷

‘প্রাইভেট’ লেখা একটা দরজা ঠেলে প্রদ্যোৎ ভেতরে চলে যায়৷

—কে আছেন এখানে?

কিছুটা দূরে বেশ কয়েকজন সাদা পোশাক পরা লোক জট্‌লা করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে৷ প্রদ্যোৎকে দেখতে পেয়ে সবাই চুপ করে যায়৷

ক্যাশ কাউন্টারের কাছে এসে রায় দাঁড়ায়৷ ঠোঁটে তর্জনী৷ তীক্ষ্ম চোখ এদিক ওদিক ঘুরছে, কোনও কিছুই যেন তার দৃষ্টি না এড়ায়৷ রেস্টুরেন্টের মালিক যদি এই কাউন্টারের পেছনে বসে থাকে তাহলে আততায়ীরা ওর ওপর গুলি চালাল কী করে? কাউন্টারের চারপাশটা তো পুরু কাচ দিয়ে মোড়া৷ সেটা অটুট রয়েছে, কোনো ভাঙচুর হয়নি৷ তার মানে, কি কাচের পারটিশান পার হয়ে তবে ওকে গুলি করা হয়েছে? চেয়ারটার পেছনের দেওয়ালে পানের পিকের মতো লাল রং ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে৷ রক্তের দাগ৷ সিটেও কাল্‌চে ছাপ৷ রক্ত শুকিয়ে গেলে যেরকম হয়৷

কপালে যদি গুলিটা মারা হয়, সেটা পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে খুবই সহজ, তাহলে এত রক্ত ছিটকাতে পারে না৷ একমাত্র বুকে মারলেই এরকম ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে পারে৷ রেস্টুরেন্টের মালিক কি শেষ মুহূর্তে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল? এবং তখনই ওর বুকে গুলি করা হয়? হতে পারে৷

যাকগে, অত কিছু চিন্তা করার দরকার নেই৷ করোনারের অফিসে গিয়ে ডেড বডিটা দেখলেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ এরপর রায় মোবাইলের টর্চ জালিয়ে নিচু হয়ে মাটিতে যেন কি একটা খুঁজতে থাকে৷ এমন সময় প্রদ্যোৎ ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে৷

—স্যর...৷ প্রদ্যোৎ-এর সঙ্গে দুজন লোক৷

—ইনি রেস্টুরেন্টের শেফ...রনি রে৷ কিচেনের সমস্ত দায়-দায়িত্ব এনার ওপর, আর ইনি, প্রদ্যোৎ অন্যজনকে দেখিয়ে বলে৷—ইনি ওই বিশেষ টেবিলটাতে সারভ করছিলেন৷ নাম তরুণ, না?

—ইয়েস স্যর৷

—ক’জন বসেছিল ওই টেবিলে? এ প্রশ্নটা রায়ের৷

—তিনজন স্যর৷

—আপনি ওদের দেখলে চিনতে পারবেন?

—একদম শিয়োর না স্যর৷ আমাদের রেস্টুরেন্টের আলোটা তো একটু লো করা থাকে৷ তাই মুখ খুব ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না৷ তবে...

কী একটা কথা বলতে গিয়ে তরুণ আর বলে না৷

—তবে কী?

—আসলে ওদের মধ্যে একজন সিগারেট ধরাচ্ছিল, তখন ওই লোকটির মুখ স্পষ্ট দেখতে পাই৷

—কিন্তু, আপনাদের রেস্টুরেন্টে কী স্মোকিং অ্যালউড?

—একেবারেই না৷ আমি সেটাই ওই ভদ্রলোককে বলতে গিয়েছিলাম৷ তা লোকটা আমার দিকে এমন করে তাকাল যে ভয় পেয়ে চলে এলাম৷

—ভয় পেয়ে?

—হ্যাঁ, লোকটার কপালে একটা বড় কাটা দাগ৷ আর চোখের দৃষ্টিতে মনে হবে যে এ যে কোনো মুহূর্তে মানুষকে খুন করতে পারে৷

—রিয়েলি৷ রায় একটু বিদ্রূপের হাসি হাসে৷

—স্যর, আপনি হাসলেন৷ কিন্তু ওর চোখ দেখলে আপনারও বুক ভয়ে কেঁপে উঠত৷

—তার মানে কপালে কাটা দাগওয়ালা লোকটিকে আপনি ভালো ভাবেই দেখতে পেয়েছেন৷ এবং চিনতেও পারবেন৷

তরুণ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়৷ এরপর রায় আর প্রদ্যোৎ-এর মধ্যে খাটো গলায় কী সব আলোচনা হয়, যার শেষে প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে বলে—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই স্যর৷

—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই স্যর৷

—স্যর...আমি কী তাহলে এখন আসতে পারি? ছাড়া পেলে যেন তরুণ বেঁচে যায়৷

—কেন...কোথায় যাবেন?

—ভাবছিলাম বাড়িই চলে যাই৷ আজ রেষ্টুরেন্ট আর খোলা থাকবে বলে তো মনে হয় না৷ অবশ্য সেটা...তরুণ একবার শেফের দিকে তাকায়৷

—উনি যা বলবেন৷

বোঝা গেল মালিকের অনুপস্থিতিতে এই ভদ্রলোকই সেকেন্ড ইন কম্যান্ড৷

—ঠিক আছে তরুণ, আপনি ভেতরে অপেক্ষা করুন৷ আপনাকে প্রয়োজন হতে পারে৷

কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হয়েই তরুণ ‘প্রাইভেট’ লেখা দরজা দিয়ে ভেতরে চলে যায়৷

—হ্যাঁ...আপনার নামটা যেন কী? রায় এবার শেফের দিকে তাকায়৷

—প্রদ্যোৎ বলেছিল, কিন্তু খেয়াল নেই৷

প্রদ্যোৎ খুব মনে মনে হাসে, কেননা ও জানে স্যর কখনও কিছু ভোলেন না৷

—রণি রে৷

—রণি রে...নিজের মনেই রায় নামটা একবার উচ্চারণ করে৷

--খ্রিস্টান?

—না৷

—ওহ! তাহলে পিতৃদত্ত নামটা খুব সম্ভবতঃ রণেন...এবং পদবিটা রায়৷

—হ্যাঁ স্যর৷ রনেন একটু লজ্জিত হয়ে জবাব দেয়৷ আসলে স্যর এই প্রোফেশনে একটু চটক্‌দার নাম না থাকলে...

—চটক্‌দার, অর্থাৎ অ্যালিসাইজড, তাই তো?

রণেন একবার নড করে৷

এবং সেটা না হলে কেউ আপনাকে কদর করবে না৷

—রণেন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে৷ এবার আর কোনো উত্তর দেয় না৷

—দাঁড়িয়ে কেন বসুন না৷ নিজের অস্বস্তিটা কাটাতেই বোধহয় রণেন তাড়াতাড়ি একটা টেবিল থেকে দুটো চেয়ার টেনে এনে রায় আর প্রদ্যোৎ-কে বসতে দেয়৷—স্যর, একটু কফি চলবে? অন্য কোনোদিন হলে আপনাদের ভালোভাবে আপ্যায়ন করতাম৷

—থাক থাক...ওসবের দরকার নেই৷ তবে কফিটা চলতে পারে৷

—সাদা, না কালো স্যর?

—আমারটা কালো, চিনি ছাড়া৷ কাফে আমেরিকানো৷ বেশ কড়া৷

প্রদ্যোৎ একবার আড় চোখে স্যরের দিকে তাকায়৷ ও খুব ভালো করে জানে স্যরের কফি খাওয়া উচিত নয়৷ কয়েক বছর আগেই পেটে আলসার ধরা পড়েছিল৷ তবে ও এটাও জানে যে স্যর বাড়ির বাইরে মাঝে মাঝেই সে নিয়ম ভঙ্গ করে৷

—আমারটা কফি না...৷ রণেন প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকানো মাত্র সে উত্তর দেয়৷

ভালো করে দুধ চিনি দিয়ে চা৷

—ঠিক আছে৷

অল্প সময়ের জন্য ভেতরে গিয়ে রণেন আবার ফিরে আসে৷

—এবার বলুন স্যর...রণেন রায় অ্যাট ইয়োর সার্ভিস৷

রায়ের মুখে এক মুহূর্তের জন্য হাসি দেখা দিয়ে মিলিয়ে যায়৷

লোক দেখানো নামটা তাহলে সে অন্ততঃ রায়ের জন্য পরিত্যাগ করেছে৷

—এই রেস্টুরেন্টের নাম ‘মুনলাইট সোনাটা’ তো?

—ইয়েস স্যর৷

—এখানে ক’বছর হল?

—সার্ভিস? ছ’বছর৷

—এর আগে কোথায় কাজ করা হয়েছে?

—বম্বেতে এখন অবশ্য মুম্বাই৷ ভারসোভার একটা হোটেলে৷ ওখানে ভালোই ছিলাম বুঝলেন৷ কিন্তু, হঠাৎ করে মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় কলকাতায় ফিরে আসতে বাধ্য হলাম৷ ওনলি সান হলে যা হয়৷

—ওখানে ভালো চলছিল...আর এখানে? এখানে কেমন চলছে?

—খারাপ বলতে পারি না৷ রণেন এবার বেশ উৎসাহের সঙ্গে জবাব দেয়৷

—আমি আসার পর এখানে মেনুর ভ্যারাইটি অনেক বাড়ানো হয়েছে৷ আগে শুধু ইন্ডিয়ান ফুড পাওয়া যেত৷ এখন চাইনিজ, ইটালিয়ান, মালয়েশিয়ান অনেক রকম খাবার পাওয়া যাচ্ছে৷ এবং সব ক’টাই অথেনটিক৷ স্ট্রিট ফুডের মতন নয়৷

—তাতে রেস্টুরেন্টের সেল-এর কোনো হেরফের হয়েছে?

—ডেফিনিটলি৷ বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে রণেন জবাব দেয়৷ তবে ঠিক কত পারসেন্ট বেড়েছে সেটা বলতে পারব না৷ তবে ফ্যাকটস অ্যান্ড ফিগারস আমার কাছে নেই৷

—মালিকের সঙ্গে আপনার কী রকম সম্পর্ক ছিল?

—কে রাতুলবাবু? ভালো৷ উনি আমার বিজনেস অ্যাকুেমেনের প্রতি বোধহয় ওর যথেষ্ট বিশ্বাস ছিল৷ কেননা, আমি যখন দেজীর থেকে মালটি কুইজিনে এক্সপ্যান্ড করি উনি কখনও আমাকে বাধা দেননি৷

—গুড৷ রায় এবার প্রশ্নের ধরন পাল্টায়৷—ওঁর প্রাইভেট লাইফ সম্বন্ধে আপনি কী জানেন?

—দেখুন মিস্টার রায়, উনি ওর ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে কখনও আমার সঙ্গে আলোচনা করেননি৷

—সরি...ওর আত্মীয়স্বজন...বাড়িতে কে থাকেন না থাকেন সেটার সম্বন্ধে আপনি বিছু বলতে পারবেন? নাকি সেটাও আপনি কিছু জানেন না৷

—আমি একবার মাত্র ওর বাড়িতে গেছি৷ উনি আমায় কোনো কারণে ডেকেছিলেন তাই৷ সেদিন কিন্তু একজন সারভেন্ট ছাড়া আর কাউকে ওঁর বাড়িতে দেখতে পাইনি৷

—হয়তো ওঁর স্ত্রী তখন বাড়িতে ছিলেন না তাও তো হতে পারে৷

—পারে৷ তবে...রণেন আর কিছু বলে না৷

—রনেনবাবু...আপনার মনে যা আছে সব খোলাখুলি বলতে পারেন৷ অন্য কেউ কখনও জানতে পারবে না৷

একটু ইতস্তত করে রণেন আবার বলা শুরু করে৷

—আসলে বাড়িতে মহিলারা থাকলে তার চেহারা একটু আলাদা হয়৷

—বুঝলাম৷ রায় মৃদু হেসে বলে৷—বাড়িতে শ্রী-র অভাব?

—ঠিক বলেছেন স্যর৷

—লালবাজারে ফোনটা কে করেছিলেন? আপনি?

—লালবাজারে ফোন? একটু অবাক হয়ে রণেন বলে৷—আমরা তো এখানকার লোকাল থানায় খবর দিয়েছিলাম৷ কিন্তু, লালবাজারে...দাঁড়ান একটু জিগ্যেস করে আসি এখান থেকে আর কেউ ফোন করেছে কিনা৷ অল্পক্ষণ পরেই রনেন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে৷

—না...আমাদের এখান থেকে তো কেউ ফোন করেনি!

—ইনটারেস্টিং! এখান থেকে কেউ ফোন করেনি তো করলটা কে?

রায় একবার প্রদ্যোৎ-এর সঙ্গে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে৷

রায় আর প্রদ্যোৎ দুজনে টেবিলের দুপাশে বসে কাজ করছে৷ তখন বেলা প্রায় চারটে এমন সময় লালবাজারের টেলিফোন অপারেটার ওদের টেবিলে একটা লাইন ট্রান্সফার করে৷

—হ্যালো লালবাজার?

—হ্যাঁ...অবিনাশ রায় কথা বলছি৷

উল্টো দিকে একটুক্ষণ চুপ৷ তারপর কথা ভেসে এল৷

—যাক..তাহলে ঠিক লোককেই পাওয়া গেছে৷ ল্যান্সডাউন রোডে ‘মুনলাইট সোনাটা’ বলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে৷ ওখানে কিছুক্ষণ আগেই একটা মার্ডার হয়েছে৷ পিস্তল থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেনজ থেকে৷

—হ্যালো...আপনি কে কথা বলছেন? হ্যালো...হ্যালো?

উল্টোদিক থেকে কট করে একটা আওয়াজ হয়৷ বোঝা যায় লাইনটা কেটে দেওয়া হল৷

—প্রদ্যোৎ....৷ রিসিভারটা রেখে রায় বলে৷—ল্যান্সডাউন রোডের একটা রেস্টুরেন্টে নাকি মার্ডার হয়েছে৷ মনে হয় উট্‌কো খবর, তবু গিয়ে একবার ইনভেস্টিগেট করতে হয়৷

‘মুনলাইট সোনাটা’ রেস্টুরেন্ট গিয়ে অবশ্য জানা গেল যে ঘটনাটা ফেক নয়, সত্যি৷ কিন্তু ওদের খবরটা কে দিল সেটা মিসট্রিই থেকে গেল৷

—প্রদ্যোৎ, তুমি একবার লোকাল থানায় ফোন করো তো৷ দেখো, ওরা কী বলছে৷ করোনারের অফিস থেকে লোক এসেছিল কি না সেটাও জেনে নাও৷

—ইয়েস স্যর...৷ মোবাইল হাতে প্রদ্যোৎ রেস্টুরেন্টের যে দিকটায় লোকজন নেই সেদিকটায় চলে যায়৷

—রণেনবাবু....কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে রায় জিগ্যেস করে৷ গত কয়েকদিনে এরকম কোনো ঘটনা আপনার মনে পড়ে যেটা সন্দেহজনক বলা যায়৷ কোনো অচেনা মানুষের সঙ্গে রাতুলবাবুর কথা কাটাকাটি...এনিথিং৷ আর একটা পয়েন্ট, রাতুলবাবুর কোনো শত্রু ছিল বলে আপনি জানেন?

রণেন মনে করার চেষ্টা করে৷

—নাঃ...সেরকম কোন ইনসিডেন্ট তো মনে পড়ছে না৷ এমনিতেই রাতুলবাবু ঠান্ডা মেজাজের লোক ছিলেন৷ আর শত্রুর কথা বলছেন...সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না৷ আপনি অন্ততঃ কারও সঙ্গে ওর শত্রুতা ছিল এরকম শুনিনি৷

—এই রেস্টুরেন্টটা তো কমপ্যারাটিভলি নতুন৷ আশেপাশের রেস্টুরেন্টের সঙ্গে কমপিটিশন...রেষারেষি...শত্রুতা, হতেই পারে, তাই না?

—হ্যাঁ...আপনি যেরকম ভাবে বলছেন তাতে হয়তো হতে পারতো৷ কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি বলেই মনে হয়৷ অন্ততঃ, আমার তা কখনই মনে হয়নি৷

—অলরাইট...মার্ডারটা কখন হয়?

—দুপুরে৷ এই দেড়টা-দুটো হবে৷ লাঞ্চ আওয়ারস৷

—এরপর কী কী ঘটনা ঘটেছিল আমায় বলে যান৷ অপ্রয়োজনীয় বলে কোনো কিছু বাদ দেবেন না৷

—আজকাল দুপুরবেলায় মোটামুুটি ভালোই কাস্টমার আসে৷ এরজন্য অন্ততঃ কিছুটা ক্রেডিট আমার৷ কিছুদিন আগে আমি লাঞ্চ আওয়ারে দুটো ফিক্সট মেনু করে দিয়েছি৷ একটা চাইনিজ, আরেকটা ইন্ডিয়ান৷ দামটা কম রেখেছি যাতে দুপুরবেলায় অফিস ক্রাউডটা পাওয়া যায়৷

—এদের কথা বলুন৷

—হ্যাঁ...ওটাতেই আসছিলাম৷ আমি কিচেনে ফিকস্ট লাঞ্চ-এর তদারকি করছি, এমন সময় তরুণ এসে বলল সাত নম্বর টেবিলে তিনজন কাস্টমার এসেছে৷ এরা একটু চুজি৷ প্রথমে চিকেন টিকা কাবাব চাইল৷ যখন বলা হল যে দুপুরবেলায় আমরা কাবাব করি না তখন বলল গ্রিল চিকেন৷

—বেশ, তারপর?

—ওদের একটা নন-অ্যালকাহলিক মকটেল ড্রিঙ্ক সার্ভ করে আমি চিকেনটা সবেমাত্র গ্রিল-এ বসিয়েছি, এমন সময় মনে হল বাইরে, মানে মেন রেস্টুরেন্টে একটু সোরগোল হচ্ছে৷ তারপরই একটা গান শটের আওয়াজ৷ পরমুহূর্তে তরুণ ছুটতে ছুটতে ভেতরে আসে৷ সাত নম্বর টেবিলের লোকেরা বাবুর ওপরে গুলি চালিয়েছে৷ পর পর দুটো৷ মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল৷ রনি স্যার, প্লিজ একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন, নইলে বাবু বোধহয় আর বাঁচবে না৷ আমি ছুটে বাইরে গেলাম৷ দেখি, রাতুলবাবু চেয়ারে কাত হয়ে পড়ে আছে, রক্তাক্ত অবস্থা৷

—তারপর?

—আমি পরপর দুটো ফোন করি৷ একটা বেলভিউতে, আরেকটা পি.জি হাসপাতালে৷ পিজি’র থেকেই ভ্যান আগে এল৷ রাতুলবাবুকে ওরা ডেড ডিক্লেয়ার করে চলে গেল৷ বলল, ওরা করোনারের অফিসকে জানিয়ে দিচ্ছে৷ ডেড বডি ওরা হাসপাতালে নিয়ে যাবে না৷

—স্যর...৷ প্রদ্যোৎ রায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়৷ এক সেকেন্ড একটু আলাদা করে কথা বলা যাবে?

—থ্যাঙ্ক ইউ রণেন, আপনার সঙ্গে পরে কথা বলছি৷

রায়কে নিয়ে প্রদ্যোৎ একটু দূরে চলে যায়৷ গলা নিচু করে বলে—স্যর...একটা ইনটারেস্টিং লিড পাওয়া গেছে৷ এই দেখুন৷ হাতে লেখা, ‘ধুমকেতু কী কারও ছদ্মনাম?’

কাগজটা উল্টে রায় দেখে৷ আর কোথাও কিছু লেখা নেই৷

এটা তুমি কোথায় পেলে?

—মাটির থেকে কুড়িয়ে৷ ওই টেবিলেটার তলায় পড়েছিল৷

খুব সম্ভবতঃ ওটাই সাত নম্বর টেবিল৷ যেখানে আততায়ীরা বসেছিল৷

করোনারের অফিসে গিয়ে ওরা যখন পৌঁছোয় তখন সন্ধে হয়ে গেছে৷ প্রদ্যোৎকে রায় ছেড়ে দেয়৷ ডক চৌধুরীর অফিসে গেলে সময় লাগবে, তাছাড়া ডক আজেবাজে কথাও বলতে পারে, যেসব প্রদ্যোৎ-এর শুনে কাজ নেই৷ এবং ফলতঃ গিয়ে হয়ও তাই৷

—আচ্ছা...তুমি শকুনি না গৃধিণী?

রায়কে দেখামাত্র ডক চৌধুরী উক্তি করে৷

—আমি তো জানতাম কথা দু’টোর মানে একই৷ শকুনের স্ত্রীলিঙ্গ৷ কিন্তু, হঠাৎ আমাকে এরকম নামে সম্বোধন করা...?

—কেননা দেখেছি তুমি মরা মানুষের গন্ধ পেলেই এখানে এসে উপস্থিতি হও৷

—ভুল বলছ, ডক৷ এখানে এক বৃদ্ধ শকুন থাকতে আমাদের কোনো চান্স নেই৷

—ওকে টূুনো৷ এখন চট্‌পট্‌ বলে ফেলে তো এখানে কী কারণে আসা?

—রাতুল গাঙ্গুলীর ডেড বডিটা দেখতে চাই৷

—দেখতে পারো, তবে খরচা আছে৷ এখান থেকে ক্লাবে যাবে বলো...

—ঠিক আছে, যাব৷ তবে একটা কথা আছে৷ তুমি না আজকাল বাঙ্গালি ট্রাক ড্রাইভারের মতো কথা বলছ৷

—মানে?

—তোমার উক্তিটা ট্রাকের পেছনে লেখার থেকে চুরি করা, তাও ভুল৷ কথাটা হল—দেখলে হবে খরচা আছে৷

ডক এরপর একদম চুপ৷ কোনও কথা না বলে রায়কে ঠান্ডা ঘরে নিয়ে যায়৷ যেখানে সারি সারি সব ডেড বডি টেবিলের ওপর সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা রয়েছে৷ এর মধ্যে থেকে একটার সামনে এসে ডক দাঁড়ায়৷—এইটা৷

ওর পাশে এসে রায় একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷

—একটা গান শট না দুটো?

—দুটো৷

—বুকে তো?

—হ্যাঁ...কিন্তু তুমি সেটা কী করে জানলে?

সন্দিগ্দ দৃষ্টিতে রায় একবার সাদা চাদরে মোড়া ডেড বডিটার দিকে আরেকবার রায়ের দিকে তাকায়৷

—ও তুমি বুঝবে না...ওটা সুপিরিয়ার ইনটেলেক্ট থাকলে হয়৷

—ওহ্‌...৷ নিজের অজান্তেই ডক একবার টাক মাথায় হাত বুলিয়ে নেয়৷

—বুলেট দুটো এখনও শরীরের ভেতরই আটকে আছে, তাই তো?

—নো, দিস ইজ টু মাচ! তোমাকে এগুলো কে জানিয়েছে?&&

—হোমস-এর ভাষায়; এলিমেনটারি ডক৷ ঘটনার জায়গায় আমরা কোনও বুলেট খুঁজে পাইনি৷

—ও হো...ডক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে হাসে৷ বিগ ডিল দেন৷ তুমি যদি সবই জানো তাহলে আমার কাছে কী জানতে এসেছ?

—ভদ্রলোকের টাইম অফ ডেথ, যতটা অ্যাকুরেটলি বলা সম্ভব৷ তার বুলেট দুটো৷ ওটা পেলে ফরেনসিক অ্যানালিসিস করে আমরা জানতে পারব আততায়ী কোনও রিভলভার ব্যবহার করেছে৷

—আই সি৷ চোখ কপালে তুলে ডক ইমপ্রেসট হওয়ার ভান করে৷

—তুমি কত কিছু জানো রায়৷ কিন্তু, এখখুনি তো বুলেট দুটো তুমি পাবে না৷ কাল ডেড বডিতে কাটা ছেঁড়া শুরু হবে, তারপর৷

—আর টাইম অফ ডেথ?

—মোটামুটি দুপুর দেড়টা থেকে দুটো দশ-এর মধ্যে৷

—থ্যাঙ্ক ইউ৷ এবার কোথায় যেতে চাও বলো৷

—নাঃ, আজ কোত্থাও যাব না৷ আমার চেম্বারে চলো৷

—ডক...ইউ ডোন্ট মিন৷

—অফ কোর্স আই ডু৷ অফিস বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ৷ এখন আমরা প্রাইভেট চেম্বারে বসে যা খুশি তাই করতে পারি৷

—লোকটার মুখের আকৃতি কেমন ছিল? গোল, চৌকো না লম্বাটে?

—মোটামুটি চৌকোই বলতে পারেন৷

—গুড৷ পাশের লোকটি একটা প্যাডে এঁকে দেখায়৷—এরকম?

—হ্যাঁ...অনেকটা৷ তবে, মনে হয় চোয়ালটা যেন আরও একটু চৌকো ছিল৷

—মাথার আকৃতি?

—কীভাবে বলব?

—মাথার শেপটা কেমন ছিল? ওপরের দিকটা গোল না ফ্ল্যাট? কপাল বড়, না ছোট? চুল ঘন না পাতলা? অনেক ভাবে দেখা যায়৷

—চুল ঘনই ছিল৷ বেশ লম্বা, পেছন দিকে টেনে আঁচড়ানো৷

—ব্যাক ব্রাশ?

—হ্যাঁ...হ্যাঁ৷ মাথার শেপটা ওভাল বলতে পারেন৷ ওহ্‌ হ্যাঁ...চুলের লাইনটা কপালের দুপাশে পিছিয়ে গেছে৷ অনেকটা ভারতবর্ষের ম্যাপ-এর মতন৷

—এরকম?

লালবাজারের একতলায় একটা ঘর৷ সেখানে তরুণের বর্ণনা মতো আততায়ীর মুখ আঁকা হচ্ছে৷ অবাক হয়ে তরুণ পাশে বসা লোকটির আঁকা দেখে৷ ওর হাতে একটা স্পেশাল প্যাড৷ সেটাতে যা আঁকা হচ্ছে তৎক্ষণাৎ সেটা এক কমপিউটার স্ক্রিনে বড় হয়ে দেখা যাচ্ছে৷

—হ্যাঁ হ্যাঁ...অনেকটা এরকম৷

—গুড৷ কপালে কাটা দাগ ছিল বলেছিলেন না?

—হ্যাঁ...সেটা কপালের সেন্টার থেকে ত্যারছা হয়ে প্রায় ভুঁরু পর্যন্ত নেমে এসেছে৷

—কোন ভুঁরু?

—মনে হচ্ছে বাঁ দিকের৷

পুলিশের আর্টিস্ট চট্‌পট্‌ কপালের দাগটা এঁকে দেখায়৷

—হ্যাঁ...অনেকটা এরকম দেখতে৷

—চোখ আর ভুঁরু বলুন৷

—চোখ যতদূর মনে পড়ছে একটু কটা ছিল, কিন্তু ভেতরের দিকে ঢোকানো৷ আর ভুরু বেশ মোটা৷

তরুণ বিশ্বাস করতে পারে না এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনো মানুষের মুখ এরকম জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে৷

—হ্যাঁ...এবার কিন্তু সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে ওই লোকটা৷

লেকের ধারে মেনকা সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যে রাস্তা ভেতরে চলে গেছে সেটা দিয়ে একটু গেলেই ডান পাশে একটা গলি পড়ে৷ সেই গলিরই একটা পুরোনো বাড়ির সামনে প্রদ্যোৎ আর রায় দাঁড়িয়ে৷ কলিং বেল টিপে ঠিক বোঝা গেল না ভেতরে আওয়াজ হল কি না৷

—এ বাড়িতেই তো মনে হচ্ছে৷ হাতের চিরকুটের সঙ্গে প্রদ্যোৎ একবার বাড়ির নাম্বারটা মেলায়৷

প্রদ্যোৎ আর রায় একবার পরস্পরের প্রতি মুখ চাওয়াচাওয়ি করে৷ দরজায় বেশ কিছুক্ষণ কড়া নাড়ার পর ভেতরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়৷ দরজা খুলে ওদের সামনে এক মাঝবয়েসি ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ায়৷

—কাকে চাই?

রায় একটু অপ্রস্তুত ভাবে জিগ্যেস করে—এটা কী রাতুলবাবুর বাড়ি?

মুনলাইট সোনাটার শেফ যে বলেছিল রাতুলবাবু একা থাকে৷ সঙ্গে একজন কাজের লোক, তাও হোলটাইম কিনা ও শিয়োর ছিল না৷ তাহলে এ ভদ্রমহিলা কে?

—হ্যাঁ...কেন বলুন তো? আপনারা কোথার থেকে...ঠিক...৷

রায় আর প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলার কথা অসমাপ্ত থেকে যায়৷

পকেট থেকে আই ডিটা বার করে দেখায়৷—আমরা লালবাজার থেকে এসেছি৷

—কেন...রাতুলের কিছু হয়েছে নাকি? ভদ্রমহিলার মুখে আশঙ্কার ছাপ৷

রায় একটুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলে—খবরটা খুবই আনফরচুনেট৷ রাতুলবাবু ইজ ডেড৷ সেটা অ্যাকসিডেন্ট না মার্ডার এই মুহূর্তে ঠিক করে বলা যাচ্ছে না৷

কথাটা শুনে ভদ্রমহিলার মুখ থেকে অস্ফুট এক আর্তনাদ বেরিয়ে আসে৷ টাল সামলাতে না পেরে মহিলা পড়েই যাচ্ছিল৷ কিন্তু তৎপর ভাবে রায় ওকে ধরে ফেলায় সেটা আর হয় না৷ ধরাধরি করে রায় ওকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে একটা সোফায় বসায়৷ বাইরের ঘরে আওয়াজ পেয়ে ভেতর থেকে একজন কাজের লোক বেরিয়ে আসে৷ মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল৷

—একী দিদিমণির কী হল?

—আগে ওঁর জন্যে এক গ্লাস জল নিয়ে আসুন৷ একটা দুঃসংবাদ শুনে হঠাৎ ওঁর শরীরটা খারাপ লাগছে৷

মহিলার হাত ধরে তাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়৷ একটু পরেই কাজের লোকটি ফিরে আসে৷

—আপনারা চা নেবেন? দিদিমণি একটু সুস্থ হলেই আপনাদের কাছে আসবেন৷

রায় আর প্রদ্যোৎ না বলে না৷ কাজটা একেবারে সেরে নিতে পারলেই ভালো৷ লোকটি ভেতরে চলে গেলে রায় সিট ছেড়ে উঠে দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখে৷ তারপর বইয়ের শেল্ফ৷

রাতুলবাবুর মনে হয় বাংলা সাহিত্যের প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ ছিল৷ শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, শরৎচন্দ্র, বিভুতিভূষণ—আগেকার লেখকদের অনেক বই সুন্দর করে সাজানো৷ শেল্ফ থেকে বঙ্কিমবাবুর কপালকুণ্ডলা বার করে রায় পাতা ওল্টাতে থাকে৷ বইগুলো যে শুধু শেল্ফ-এ সাজিয়ে রাখার জন্য নয় তার চাক্ষুষ প্রমাণ রায় পেয়ে যায় পরের বইটায়৷ বেশ কয়েকটা পাতার কোনায় পেনসিল দিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে৷ সেটা রাতুলবাবুর ছাড়া আর কারই বা হতে পারে?

পরের শেল্ফ-এর বইগুলো দেখতে দেখতে বিশেষ একটা জায়গায় এসে রায়ের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়৷ পাশাপাশি তিনটে বই রাখা৷ সবকটাই একজনের লেখা৷ ধুমকেতু অবশ্যই ছদ্মনাম৷ কোনও বাবা-মা সাধ করে ছেলের নাম ধুমকেতু রাখবে না৷ প্রথম দিকের কয়েকটা পাতা ঘেঁটে লেখকের আসল পরিচিতি পাওয়া যায় না৷ নিরাশ হয়ে রায় বই তিনটে বন্ধ করে রাখে৷

একটু পরেই ভদ্রমহিলা বাইরের ঘরে বেরিয়ে আসে৷ সঙ্গে চায়ের ট্রে হাতে কাজের লোকটি৷—এ বইগুলো আপনি কোথায় পেলেন? বিস্মিত হয়ে ভদ্রমহিলা রায়ের হাতে ধরা বই তিনটের দিকে তাকায়৷—এগুলো আমার দাদার লেখা৷

—আপনার দাদা? বই হাতে উঠে দাঁড়ায়৷

—আমার দাদা...রাতুল৷ অবসর সময়ে গল্প লিখত৷ ক্রাইম স্টোরিজ৷ কিন্তু ও কখনও চায়নি যে সেটা ওর পরিচিত মহলে জানাজানি হোক৷

—হাউ ইনটারেস্টিং৷ নিজের অজান্তেই রায়ের মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে আসে৷

—দু-একদিনের জন্য বইগুলো আমার কাছে রাখতে পারি? ক্রাইম স্টোরিজ আমারও খুব ভালো লাগে৷

হাসি মুখে প্রদ্যোৎ একবার রায়ের দিকে তাকায়৷ স্যর লিখলে ওঁর হাত দিয়ে যে কত অসাধারণ গল্প বেরুত সে একমাত্র ওই জানে৷

—রাখুন না...আরও কপি আছে বাড়িতে৷

—ওঁর লেখা বেশ পপুলার হয়েছিল বলে মনে হয়৷ বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে রায় উক্তি করে৷—এর মধ্যে একটা সেকেন্ড এডিশনও বেরিয়েছে দেখছি৷

—হ্যাঁ, ইদানীং দাদার লেখা বেশ সেল হয়েছিল বলে শুনেছি৷ অনেকেই নাকি জানতে চাইত ‘ধুমকেতু’ নামের লোকটি আসলে কে?

—খুবই স্বাভাবিক সেটা! রায় মৃদু হেসে বলে৷—আপনার নামটা এখনও জানা হয়নি৷

—মৃদুলা৷ আমি রাতুলদার পিসতুতো বোন৷

—আপনি কী ওনার সঙ্গেই থাকেন?

—না, না...কয়েকদিন হল দাদার কাছে এসেছি৷ হাঁটুতে একটা ব্যথা হচ্ছিল৷ দাদা বলল,— ‘এখানে চলে আয়৷ আমার ভালো অর্থপেডিস্ট চেনা আছে, দেখিয়ে যা৷

—আপনি থাকেন কোথায়?

—মালদায়৷

—মৃদুলা...আপনাকে কিছু প্রশ্ন করার ছিল৷ আমি জানি ইট ইজ নট দ্য রাইট টাইম, কিন্তু কী করা যাবে৷

আঁচল দিয়ে মুখ মুছে মৃদুলা রায়ের দিকে তাকায়৷—বলুন...

—রাতুল বাবুর নেকস্ট অফ কিন কে?

—ঠিক বুঝলাম না৷

—মানে...ওঁর অবর্তমানে ওঁর স্বাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কে পাবে?

—দেখুন...রাতুলদা একমাত্র সন্তান৷ ওর বাবা-মা অনেক দিন আগেই মারা গেছেন৷

—উনি কী অকৃতদার?

—না...রাতুলদা বিয়ে করেছিলেন৷ তবে সেটা অনেক বছর আগেই ভেঙে গেছে৷

—সেটা ডির্ভোস, না সেপারেশন?

—যতদূর জানি মিউচুয়াল সেপারেশন৷

—ভদ্রমহিলার নাম, বর্তমানে কোথায় থাকেন—এগুলো জানা যায়?

—ঠিক বলতে পারব না৷ রাতুলদার আগেকার স্ত্রীর নাম সুপ্রিয়া তালুকদার৷ তবে এখন তার কী নাম বলা মুশকিল৷

—আপনার সঙ্গে কখনোই ওঁর সেরকম যোগাযোগ ছিল না?

মৃদুলা মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়৷

—কোনও ছেলেমেয়ে?

—ভাগ্যিস হয়নি৷

—এ কথা কেন বলছেন৷

—থাকলে মা-বাবা ছাড়া অভাগা হয়ে থাকত, তাই না?

—কিন্তু সুপ্রিয়া তো মারা যাননি৷

—ঠিক কথা, তবে তার খোঁজ পাওয়া এখন দুষ্কর ব্যাপার হবে৷

—সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন না৷ ওঁকে খুঁজে বার করার উপায় আছে৷

গাড়িতে যেতে যেতে বেশ কিছুক্ষণ পরে প্রদ্যোৎ রায়কে জিগ্যেস করে৷—আপনার কী মৃদুলা দেবীকে সন্দেহ হয়?

—ওই ‘দেবী’টা আবার কোথায় থেকে এল? ওগুলো ব্যাকডেটেড৷

লজ্জিত হয়ে প্রদ্যোৎ চুপ করে যায়৷

—তা....তোমার হঠাৎ মৃদুলাকে সন্দেহ হল কেন?

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রদ্যোৎ বলে৷

—রাতুলবাবুর স্ত্রীর খোঁজ না পাওয়া গেলে ওঁর সমস্ত সম্পত্তি ওঁর বোন মৃদুলাই পাবে, তাই না?

বইগুলো পড়তে পড়তে অনেক রাত হয়ে যায়৷ বেড সাইড টেবিলে রিডিং গ্লাসটা খুলে রায় একটা হাই তোলে৷ ওর পাশে শর্মি অকাতরে ঘুমোচ্ছে৷ একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ও৷ মনে করার চেষ্টা করে আগেকার কথা৷ তখন ওকে এরকম ভাবে শুয়ে থাকতে দেখলে ভালোবাসতে ইচ্ছে করত৷ আজ ওর মায়া হয়৷ স্বল্প আলোয় কপালের চুল একটু চিক্‌ চিক্‌ করছে৷ চুলে পাক ধরেছে৷

একটা সময় ছিল যখন রায় বাড়ি ফিরে না আসা পর্যন্ত শর্মি ডিনার করত না, যত রাতই হোক না কেন৷ বলত, একটা বেলা অন্ততঃ আমরা দুজন একসঙ্গে খাই৷ রাত্তিরে শোবার আগে রায়ের বই পড়ার অভ্যেস অনেক দিনের৷ প্রথম প্রথম শর্মিও ওরা দেখাদেখি বিছানায় বই নিয়ে শুতো৷ কিন্তু, শর্মীর বডি ক্লক অন্যরকম৷ রাতে খাওয়ার পর একটুক্ষণের মধ্যেই ওর প্রচণ্ড ঘুম পেয়ে যায়৷ এবং বেচারা নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়ে৷ আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ রায়ের জন্য অপেক্ষা করে করে ওর দিকের বেড ল্যাম্প জালিয়েই ও কখন ঘুমিয়ে পড়েছে৷

খুব সন্তর্পনে, যাতে কোনও মতেই শর্মির ঘুম না ভাঙে, ওর ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে রায় ওদিকের বেডল্যাম্পটা নিবিয়ে দেয়৷ তারপর, নিজের দিকের বেড ল্যাম্পটাও নিবিয়ে শুয়ে পড়ে৷ ক্লান্ত থাকলেও ওর মনে একটা খুশি খুশি ভাব৷ এতক্ষণ জেগে থাকাটা ওর সার্থক হয়েছে৷ ও শোবার একটুক্ষণের মধ্যে কোনও এক অমোঘ, অলিখিত নিয়মে শর্মির ঘুমন্ত হাত ওর শরীরের দিকে এগিয়ে আসে৷ এবং নিজের মুখটা রায়ের বুকে গুৃঁজে পরম স্বস্তির সঙ্গে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে৷

—আটিস্ট স্কেচটা হয়ে গেছে?

—এই হয়ে এসেছে স্যর...জাষ্ট টুমিনিটস৷ এখন শুধু প্রিন্ট আউটের অপেক্ষায়৷

প্রিন্ট আউট বার হতে রায় আর প্রদ্যোৎ দুজনেই ছবিটা ভালো ভাবে দেখে৷

—কপালে বেশ প্রমিনেন্ট কাটা দাগ৷ চিনতে অসুবিধে হওয়া উচিত নয়৷

—কোয়াইট রাইট৷ রায় ছোট্ট করে নড করে৷—কমপিউটারে ফেলে দেখে এই ফেসের এগেনসটে কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড পাওয়া যায় কি না৷

—আর কিছু, স্যর? প্রদ্যোৎ জিগ্যেস করে৷

—আছে৷ তবে এটা অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো হবে৷ গত ছ’মাস থেকে শুরু করে দু’বছরের মধ্যে কলকাতা বা শহরতলিতে যে ক’টা ব্যাঙ্ক রবারি হয়েছে তার খবর নাও৷

—ব্যাঙ্ক রবারি? প্রদ্যোৎ একেবারে হতবাক৷

—হ্যাঁ...কারণটা ক্রমশঃ প্রকাশ্য৷

প্রদ্যোৎ আর কথা বাড়ায় না৷ স্যর যদি ঠিক করে থাকে যে এখন বলবে না, তাহলে আর প্রশ্ন করে লাভ নেই৷ স্যরের কথা মতো ইনভেসটিগেট করে সেদিন বিকেলের মধ্যেই প্রদ্যোৎ ব্যাঙ্ক রবারির খবর নিয়ে আসে৷ কলিকাতা আর শহরতলিতে গত দু’বছরে তিনটে ব্যাঙ্ক রবারি হয়৷ তার মধ্যে একটা ধরা পড়েছে৷ বাকি দু’টো এখনও কোনও সুরাহা হয়নি৷ তার মধ্যে একটা এস বি আই-এর নিউ আলিপুর ব্রাঞ্চে, আরেকটা ঘটে ব্যাঙ্ক অফ বরোদার ব্যারাকপুর ব্রাঞ্চে৷

—গুড৷ এই ব্যাঙ্ক দুটোতে আমাদের যেতে হবে৷ আজ তো বেশি দেরি হয়ে গেল৷ কাল ফাস্ট আওয়ারে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করো, অন্যটা সেকেন্ড হাফে৷

—ঠিক আছে স্যর৷

কিন্তু, হঠাৎ করেই পরের দিন খুব ভোরে রায়ের কাছে প্রদ্যোৎ-এর ফোন কল আসে৷ স্যরের মোবাইল যে রাতেও সুইচ অফ হয় না, ভাইব্রেশন মোড-এ থাকে সেটা প্রদ্যোৎ-এর জানা৷

—হ্যাঁ বলো...বালিশের তলা থেকে মোবাইল বার করে রায় অতি সন্তর্পণে বাথরুমে গিয়ে জবাব দেয়৷ শর্মির ঘুমটা সাতসকালে ভেঙে যায় সেটা রায় চায় না৷

—স্যর, একটা গুড নিউজ আছে৷

—ইট বেটার বি গুড৷ কিছুটা বিরক্তি হয়েই রায় বলে৷

—রাতুলবাবুর আততায়ীরা যে গাড়ি করে পালিয়েছিল তার নাম্বার পাওয়া গেছে৷

—হোয়াট? মুহূর্তের মধ্যে রায়ের সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে৷

—কোত্থেকে পেলে?

—তরুণ বলে যে ছেলেটি কাল আততায়ীদের টেবিলে সার্ভ করছিল সে আমাকে কাল গভীর রাতে ফোন করে৷

—রিয়েলি? রায় একটু অবাক হয়েই বলে৷—আমরা গতকাল যখন রেষ্টুরেন্টে গিয়ে ওর সঙ্গে কথা কথা বললাম তখন তো ও কিছু বলল না!

—ভয় পেয়ে স্যর৷ সবার সামনে ও মুখ খুলতে চায়নি৷

—ঠিক আছে, আমি আসছি, তুমিও লালবাজারে চলে এসো৷

—আমি অলরেডি পৌঁছে গেছি, স্যর৷ আপনার জন্য কাজটা এগিয়ে রাখা দরকার৷ মুনলাইট সোনাটার সব চেয়ে কাছাকাছি যে দুটো ক্রসিং, সেটা হল এলগিন রোড আর ল্যান্সডাউন রোডের, আর ল্যান্সডাউন রোড-লোয়ার সার্কুলার রেডের ক্রসিং, এ দুটোরই সিসিটিভির ফুটেজের জন্য আমি রেকুইজিশন করে দিয়েছি, স্যর৷ গতকালের দুপুর একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত৷ ইজ দ্যাট অলরাইট, স্যর?

—অলরাইট মানে...একসেলেন্ট! এরপর তো আমাকে দরকার হবে না মনে হচ্ছে৷

—কী যে বলেন স্যর!

কিন্তু স্যরের কাছ থেকে কমপ্লিমেন্ট পেয়ে গর্বে প্রদ্যোৎ-এর বুক ফুলে ওঠে৷ ভোরবেলায় বাথরুমে শাওয়ারের আওয়াজ পেয়ে শর্মির ঘুম ভেঙে যায়৷ টাওয়েল জড়িয়ে রায় বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই একেবারে শর্মির সঙ্গে মুখোমুখি৷

—কী ব্যাপার! এত ভোরবেলায় কোথায় চললে?

প্যান্ট পরতে পরতে রায় বলে,-- ‘তাড়াতাড়ি ব্রেকফার্স্টটা করে দাও, প্লিজ৷’

—খুব তাড়াতাড়ি?

—ইয়েস৷

—দুধ কর্নফ্লেকস, মুসলি দিয়ে?

—চলবে৷

রায়ের ড্রাইভার ইদানীং বাড়ির কমপাউন্ডে সারভেন্টস কোয়ার্টারে থাকে৷ আগে ফোন করে রাখায় যখন রায় নীচে পৌঁছয় তখন আবদুল গাড়ি বার করে রেডি৷

লালবাজারে পৌঁছে রায় দেখে প্রদ্যোৎ একতলায় ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে৷

—চলুন স্যর...সিসিটিভির ফুটেজ রেডি৷

তিন ঘণ্টা ধরে চেক করার পরও তরুণ যে গাড়ির নাম্বার দিয়েছিল সেটা সিসি টিভিতে ধরা পড়ে না৷

—একটা কোথাও আমাদের গন্ডগোল হচ্ছে৷ গালে হাত বোলাতে বোলাতে রায় চিন্তা করে৷—এক হতে পারে তরুণ যে নাম্বারটা দিয়েছে সেটা ভুল৷ তখন যখন গাড়ির নাম্বারটা দেখে তখন তো ওর হাতে নোট প্যাড আর পেন নিয়ে ঘুরছিল না যে নাম্বারটা দেখামাত্র প্যাডে লিখে নেবে৷

গাড়ির রং কী ছিল বলেছে?

—কালো৷

—গুড৷ এবার আমরা আরেকবার সিসি টিভির ফুটেজ দেখব৷ তরুণের ভুল হলে শেষের দিকের নাম্বারগুলো ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ অতএব আমরা কনসেনট্রেট করব প্রথম চারটে ডিজিট কোনও গাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করছে কিনা৷

দ্বিতীয়বার ফুটেজ ঘেঁটে প্রথম চারটে ডিজিট এক এরকম সাতটা গাড়ি পাওয়া গেল৷ তার মধ্যে কালো রংয়ের গাড়ি তিনটে৷

—এ তিনটে গাড়ির মালিকানার আগে খোঁজ নেওয়া যাক৷ কপাল ভালো থাকলে এ তিনটের মধ্যে একজন আমাদের কালপ্রিট৷

প্রদ্যোৎ এসব ব্যাপারে অত্যন্ত চট্‌পটে৷ বিকেলের মধ্যেই ও গাড়ি তিনটের মালিকের খোঁজ পেয়ে যায়৷

—স্যর উই আর গুড টু গো৷ সঙ্গে একটা জিপ আর পাঁচজন শক্ত সমর্থ কনস্টেবলও নিয়ে নিয়েছি৷

উত্তরে রায় একবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায় মাত্র৷

—কেন স্যর...কিছু ভুল হল?

—না, না, সবই ঠিক আছে৷ জাষ্ট বেরুনোর আগে একটা কাজ করবে? ব্রিফকেস খুলে রায় একটা আই প্যাড বার করে প্রদ্যোৎকে দেয়৷—যে তিনটে গাড়ি আমরা শর্ট লিস্ট করেছিলাম তার সিসিটিভির ফুটেজ এর মধ্যে ট্রানফার করে নাও৷ কাজে লাগতে পারে৷

কাজটা সারতে প্রদ্যোতের সময় লাগে না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই সে রায়ের আই প্যাড-সহ ফিরে আসে৷

—চলুন যাওয়া যাক৷

কিছুক্ষণ চলার পর ওদের গাড়ি এক পেল্লাই মালটি স্টোরিড বিল্ডিং-এর সামনে এসে দাঁড়ায়৷

—এ কোথায় নিয়ে এলে? বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রায় প্রদ্যোৎকে জিগ্যেস করে৷

—এটাই ম্যাড্রস স্যর৷ ফিফর্থ টাওয়ার৷ ফ্ল্যাট নাম্বার হান্ড্রেড অ্যান্ড টু৷

রায়ের গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকলে গেলে একজন উনিফর্ম পরা সেনট্রি ওদের দিকে এগিয়ে আসে৷

—কার সঙ্গে দেখা করতে চান? সেনট্রির হাতে একটা বাঁধানো খাতা৷

গাড়ির কাছে আসতে রায় পকেট থেকে নিজের আইডি বার করে দেখায়৷

—টাওয়ার ফাইভ৷ কেউ যেন জানতে না পারে...মুখে একদম লাগাম৷

—ইয়েস স্যর৷ সসম্ভ্রমে সেনট্রি ওদের সেলাম ঠোকে৷

গেট পার হয়ে রায়ের গাড়ি টাওয়ার ফাইভের সামনে এসে দাড়ায়৷ লিফটে করে রায় আর প্রদ্যোৎ টেনথ ফ্লোরে পৌঁছোয়৷ ১০২ নম্বর ফ্ল্যাটের সামনে এসে ডোর বেল টেপে৷ একটু পরেই একজন লোক এসে দরজা খোলে৷—আপনারা কে? গেট থেকে তো কোনও মেসেজ আসেনি৷

উত্তরে রায় পকেট থেকে নিজের আইডি বার করে দেখায়৷

—মিস্টার মেহতা আছেন? তাহলে তাঁকে একবার আসতে বলুন, ফাস্ট কারটসি কল৷

রায়ের কথা বলার ধরনে এমন একটা মার্জিত অথরিটি আছে যে লোকে সচরাচর সেটা না বলতে পারে না৷

—ভেতরে আসুন...সাহেবকে ডেকে দিচ্ছি৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই মিষ্টার মেহতা বেরিয়ে আসেন৷ পরনে নাইট সুট, তার ওপর ড্রেসিং গাউন৷ ঠিক যেন আগেকার দিনের হিন্দি সিনেমার চরিত্র৷

—বলুন কী করতে পারি আপনার জন্য, মিস্টার রায়? আপনি তো স্বনামধন্য ব্যক্তি৷ সেদিন কোন একটা ইংলিশ নিউজ চ্যানেলে দেখলাম৷

—তা হবে৷ রায়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর৷

—ক্রাইম অ্যান্ড দ্য ক্রিমিনাল মাইন্ড এই নিয়ে বলছিলেন৷ একেবারে ফ্যাসিনেটিং৷ মেহতা উচ্ছাসিত ভাবে বলে৷

রায় কোনও উত্তর দেয় না৷

—তা বলুন আমার কাছে কী ব্যাপারে? কোনও ক্রামই করলাম নাকি?

—না না...রায় একগাল হেসে বলে৷—আমি জানি আপনার সময় নষ্ট করছি৷

—জাষ্ট একটা জিনিস জানার ছিল৷ আপনারWB 04AF9999 নাম্বার দেওয়া গাড়িটা...ওটা কী ইমপোরটেড?

—নো...আজকাল বি এম ডবলিউ, জাগুয়ার এসব গাড়িই এখানে পাওয়া যায়৷

—আমারটা হ্যাচ ব্যাক, হাইটটা একটু বেশি৷ আজকাল মিসেসের নিচু গাড়িতে বসতে অসুবিধে হয়৷

—ওহ! হাসি মুখে রায় উঠে পড়ে৷—আজ আসি৷

—আরে! আমার বাড়িতে প্রথম এসেছেন একটু চা অন্ততঃ খেতে যান৷

—সে আরেকদিন হবে৷

নমস্কার জানিয়ে রায় আর প্রদ্যোৎ প্রায় জোর করেই ওখান থেকে বিদায় নেয়৷

এরপরের অ্যান্ড্রেস হাওড়ায়৷ স্টেশন পার হয়ে ডানদিকের রাস্তাটা ধরে একটু গেলেই একটা পুরোনো চল্‌টা ওঠা বাড়ি৷ কিন্তু ভেতরে গিয়ে ওরা একেবারে অবাক৷ মিনের কাজ করা ফ্লোর৷ রায় যা কখনও কারও বাড়িতে দেখেনি৷ ওদের বসার ঘরে বসে কাজের লোকটি ভেতরে চলে যায়৷

কিছুক্ষণ পর যে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তাকে দেখে তো রায় আর প্রদ্যোৎ একেবারে ফ্রিজ হয়ে যায়৷ একজন মাঝারি গড়নের লোক৷ গায়ের রং একদা ফর্সা ছিল, এখন তামাটে৷ পেটানো চেহারা৷ কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কপালের কাটা দাগটা৷ তামাটে কপালে সাদা হয়ে চিক্‌ চিক করছে৷

—সেলসের লোক হলে আপনাদের আগে থেকেই না বলে দিচ্ছি৷

একটুক্ষণ লোকটির দিকে তাকিয়ে প্রদ্যোৎ নিজের আইডি বার করে দেখায়৷

—পুলিশ থেকে এসেছেন? লোকটির চোখ ছোট হয়ে আসে৷ চোয়ালটা কঠিন৷ বলুন কী ব্যাপার?

—তেমন কিছুই নয়৷ ব্যাগ থেকে আই প্যাডটা বার করতে করতে রায় বলে৷

—আমাদের সিসি টিভির কিছু ফুটেজ এনেছি৷ এর মধ্যে থেকে আপনাদের গাড়িটা থাকলে সেটাকে আইডেনটিফাই করে দেওয়া৷ নাথিং মোর৷

—বেশ দেখান৷

সিট ছেড়ে উঠে লোকটি রায়ের সোফার পেছনে এসে দাঁড়ায়৷

আই প্যাড খুলে রায় সিসি টিভির ফুটেজ দেখতে থাকে৷

—আপনি বললে আমি পিকচার ফ্রিজ করব৷

—ওকে৷

নির্দিষ্ট দিনের ল্যান্সডাউন রোডের সিসি টিভির ফুটেজ রায়ের আই প্যাডে দেখতে পাওয়া যায়৷ হঠাৎ, একটা জায়গায় লোকটি বলে এখানে ফ্রিজ করুন৷ পরমুহূর্তে নিজের মাথার পেছনে রায় একটা ঠান্ডা লোহার নল অনুভব করে৷

—একদম নড়বে না৷ যে কোনও মুহূর্তে এই রিভলভারের গুলি তোর মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে৷

নিজের সিটে রায় একদম স্থির হয়ে বসে থাকে৷

—এই তো গুড বয়৷ আলি?

চকিতের মধ্যে ভেতর ঘর থেকে আরেকজন লোক বেরিয়ে আসে৷ তার হাতে দড়ি আর একটা কালো কাপড়৷

—এনার হাত পেছন থেকে ভালো করে বেঁধে ফেল৷ আর মুখ কাল কাপড়টা দিয়ে৷ যাতে মুখ দিয়ে একটু টুঁ শব্দ পর্যন্ত না বেরোয়৷

—ইয়েস বস৷ অন্য লোকটি রায়ের দিকে এগিয়ে আসে৷

হঠাৎ রায় বুঝতে পারে প্রদ্যোৎ ওকে বার বার সিলিং-এর দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন বোঝাতে চাইছে৷ রায় সিলিং এর দিকে তাকায়৷ একটু দূরে একটা ফ্যান চলছে আর তার পাশেই, প্রায় রায়র মাথার ওপর একটা সেকেলে বড় সড় স্যান্ডেলিয়ার৷ রায় বুঝতে পারে না প্রদ্যোৎ ওকে ইশারা করে কী জানাচ্ছে৷

এরপর যে ঘটনাটা ঘটে সেটা কল্পনাতেও করতে পারেনি৷ চোখের পলকে প্রদ্যোৎ কোমরের পেছনে থেকে রিভলভার বার করে রায়ের মাথার ওপর ঝুলছে স্যান্ডেলিয়ারটাকে তাগ করে গুলি ছোঁড়ে৷ একেবারে শেষ মুহূর্তে রায় প্রদ্যোৎ কি ইশারা করছিল বুঝতে পেরে সোফা থেকে ছিট্‌কে অন্য দিকে চলে যায়৷ আর ভারি স্যান্ডেলিয়ারটা সোজা কপালে কাটা দাগ লোকটার মাথায় এসে পড়ে৷ লোকটার হাত থেকে রিভলভার খসে পড়ে যায়৷ মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড৷ কেউ কিছু করার আগেই রায় মাটিতে পড়ে যাওয়া রিভলভারটা নিজের হাতে তুলে নেয়৷ এরপর আসামী ও তার সাগরেদদের অ্যারেস্ট করতে রায়ের অসুবিধে হয় না৷ প্রদ্যোৎ-এর বাছাই করা কনস্টেবলরা ওদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়৷ রায়ের ফোন কল মাফিক একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে কাটা দাগ লোকটার মাথার ড্রেসিং করে দেয়৷

ওরা যখন গাড়ি করে লালবাজারে ফিরে আসছে তখন প্রদ্যোৎ আর জিগ্যেস না করে পারে না৷

—স্যর...একটা জিনিস আমার কাছে এখনও হেঁয়ালি হয়ে রয়েছে৷

প্রদ্যোৎ-এর দিকে রায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়৷

—ব্যাঙ্ক রবারি দুটো...রাতুলবাবুর ডিটেকটিভ গল্পের বই...আর তার খুন হয়ে যাওয়া...এ তিনটের মধ্যে যোগ সূত্রটা কোথায়?

—গুড কোয়েশ্চেন৷ আততায়ীর নামটা যেন কী?

—দেব নাথ মণ্ডল৷

—ব্যাঙ্ক রবারির ফাইলে একটা ঘটনার বিশেষ করে উল্লেখ রয়েছে৷

—কোনটা স্যর?

—দ্বিতীয় রবারি করতে যাবার সময় মণ্ডল আর তার সাকরেদরা ধরা পড়তে পড়তে কোনওরকম ভাবে পালিয়ে যায়৷

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷

—‘ধুমকেতু’ ছদ্মনামে লেখা গল্পের বইয়েও ঠিক ওই রকমই একটা ঘটনার উল্লেখ রয়েছে৷ আর ওই বইটা পড়ে মন্ডলের ধারণা দৃঢ়বদ্ধ হয় যে রাতুলবাবু কোনওভাবে ওদের সিক্রেট প্ল্যান সব জানতে পেরে গেছে৷ সেই জন্য সে আর কোনও চান্স নেয়নি৷ সোজা ওর রেস্টুরেন্টে হানা দিয়ে রাতুলবাবুকে গুলি করে মেরে ফেলে৷

—হাউ স্যাড৷ প্রদ্যোৎ দুঃখ প্রকাশ করে বলে৷—তারমানে উনি যদি ওই গল্পটা না লিখতেন তাহলে আজও উনি দিব্যি বেঁচে থাকতে পারতেন৷ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রায় ছোট করে মাথা নাড়ে৷

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%