বরুণ চন্দ

অনেকদিন পর অবিনাশ রায় ট্রেনে চড়ছে৷ কাজের চাপে এমনিতে ছুটি নেওয়াই হয় না৷ এটা অবিনাশ আর ওর স্ত্রী শর্মির মধ্যে মনোমালিন্যের একটা বড় কারণ৷ কিন্তু, ১৫ই আগস্ট, একটা সোমবার পড়ে যাওয়ায় হঠাৎ করেই অবিনাশ এক্সটেনডেড উইক এন্ডটা শান্তিনিকেতনে কাঁটাবে বলে স্থির করে৷
কারণটা শুধু শর্মিকে খুশি করার জন্য নয়৷ ইদানিং অবিনাশ নিজের মধ্যেও একটা ক্লান্তি বোধ করছে৷
শান্তিনিকেতন থেকে একটু দূরে খোওয়াই পার হয়ে আরও প্রায় দশ মাইল মত যেতে হয়৷ এইখানে ‘রামধনু’ বলে একটা নতুন হলিডে রিসর্ট তৈরি হয়েছে৷ তাতে খাবার দাবার নাকি সবই অ৮৷ এমনকি এখানকার মাছ ও নাকি নিজেদের পুকুরে থেকে তোলা৷
এর সবটাই অবশ্য ওর বন্ধু নিলাদ্রির কাছ থেকে শোনা৷ ‘রামধনু’র মালিক নিলাদ্রির চেনাশোন৷ তিন দিন ওখানে থাকার জন্য একটা স্পেশাল প্যাকেজ ডীল করে দিয়েছে৷
পুরীতে না গিয়ে (কমদিনের ছুটিতে বঙ্গ সন্তান কোথায়ই বা আর যেতে পারে?) শান্তিনিকেতনে যাওয়া স্থির করায় শর্মি খুশি৷ সমুদ্রের নোনা হাওয়ার থেকে শর্মির স্কিনে একরকম র্যাশ হয়৷ তাছাড়া, শর্মির পড়াশুনো শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে৷ ওর ছোটকালের অনেক সুখ স্মৃতি নাকি জড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতন ঘিরে৷ অবিনাশ অবশ্য জেভিয়ার্স থেকে সুকল পাশ করেছে৷ শর্মির সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় প্রেসিডেন্সি কলেজে৷ অবিনাশের ইংলিশ অনার্স, শর্মির পল সায়েন্স৷
গালে হাত বোলাতে গিয়ে অবিনাশ মনে মনে হাসে৷ ভোরবেলার ট্রেন ধরতে গিয়ে আজ আর শেভ করা হয়ে ওঠে নি৷ শেভ করা না থাকলে শর্মির গালে লাগে৷ দেখা যাক, শান্তিনিকেতনে গিয়ে ও শেভ করে নিতে পারে কিনা৷
ট্রেন চলার কিছুক্ষণের মধ্যেই শর্মি নীলরংয়ের ব্যাগ থেকে ফয়েলে মোড়া চিকেন আর চীন স্যান্ডউইচ বার করে৷ স্টিলের ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢালা হয় প্লাস্টিকের কাপে৷ সাত সকালে কখন যে শর্মি এসব তৈরি করার সময় পায়, সে একমাত্র ভগবানই জানেন৷ স্যান্ডউইচটা অবিনাশ বেশ তৃপ্তি করে খায়৷ শর্মির রান্নার হাত ভাল৷ ওর হাতের তৈরি সামান্য স্যান্ডউইচও উপাদেয় লাগে৷ মনে হয় মেয়োনিজের মধ্যে কোথাও একটু মাস্টাড-এর ছোঁয়া আছে৷
খাওয়া শেষ হতে শর্মি চট্পট্ ফয়েলের প্লেট, পেপার ন্যাপকিন, প্লাস্টিকের কাপ সব কিছু একটা ডিসপোজেবল ব্যাগের মধ্যে ভরে বাইরে দরজার পাশে টিনের মধ্যে ফেলতে চলে যায়৷ অবিনাশ তখন সবে মাত্র বাংলাদেশী লেখিকা ফারাহ গজনভি‘র ছোট গল্পের কালেকশন পড়া শুরু করেছে, এমন সময় শর্মি বেশ উত্তেজিত হয়ে সীটে ফিরে আসে৷
—শোন...পাশের কামরায় কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে৷
—কীসের গন্ডগোল? বইয়ের পাতা থেকে চোখ না তুলে অবিনাশ জিজ্ঞেস করে৷
—ব্যাপারটা খুব সুবিধের লাগছে না৷ একজন ভদ্রলোক হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন৷ সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আর মেয়ে...কান্নাকাটি করছে৷
অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বে ও অবিনাশ বই থেকে মুখ তুলে শর্মির দিকে তাকায়৷
—এবার দেখে আসতে হবে বলছো?
উত্তরে শর্মি শুধু স্থির দৃষ্টিতে একবার অবিনাশের দিকে তাকায়৷ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফিক্সিং ওয়ান উইথ এ স্টেয়ার’৷
—আচ্ছা বাবা...যাচ্ছি৷
নির্দ্দিষ্ট পাতায় একটা পেজমার্ক গুঁজে অবিনাশ উঠে দাড়ায়৷ বয়েসে অবিনাশের শরীর কিছুটা ভারি হয়েছে৷ চোখে চশমা৷ তবু, এখনও ওর দিকে তাকালে শর্মির ভেতরটা কিরকম করে ওঠে৷
সার্টের পেছনটা প্যান্টে গুঁজতে গুঁজতে অবিনাশ বেরিয়ে যায়৷ পাশের কামরায় ইতিমধ্যে বেশ হুলুস্থুল কান্ড শুরু হয়ে গেছে ৷ অবিনাশ গিয়ে দেখে একজন, ভদ্রলোক আধশোয়া অবস্থায় বেঁহুশ হয়ে সীটে পড়ে আছে৷ এক মহিলা, খুব সম্ভবতঃ তার স্ত্রী, হাতের খবরের কাগজ ভাঁজ করে হাত পাখার মত ব্যবহার করে ভদ্রলোকের মাথায় হাওয়া করছে৷ ভদ্রলোকের অন্য পাশে বসা এক যুবতি ভদ্রলোকের মাথায় মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে ওর জ্ঞান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে৷ আর, এক বখাটে ছোক্রা এই মওকায় মেয়েটির কাছে ঘনিষ্ট হয়ে দাড়ানোর ফন্দি আঁটছে৷ অবিনাশের তেরি চোখ একবার চারপাশে দেখে নেয় আর কাউকে লক্ষ্য করার মত আছে কিনা৷
—দেখি...একটু জায়গা দিন৷
ছোক্রাকে সরিয়ে দিয়ে অবিনাশ ঘটনা স্থলে এসে দাড়ায়৷
—কী হয়েছে আমাকে কেউ বলবেন?
শান্ত হলেও অবিনাশের গলায় একটা অথরিটির ছাপ আছে৷ চোখ মুছতে মুছতে মেয়েটি একটু স্বাভাবিক হয়ে ওর দিকে তাকায়৷
—ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারলাম না...বাবা একটু কামরার বাইরে বেরিয়েছিলেন৷ ভাবলাম টয়লেটে গেছেন৷ বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে বাবা আর ফিরে আসছেন না৷ হঠাৎ দেখি দুর্জন সহৃদয় যুবক বাবাকে ধরাধরি করে আমাদের কামরায় নিয়ে আসছে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ওরা বাবাকে সীটটায় বসিয়ে দিলে৷ বললে, ‘বাথরুম থেকে উনি যখন বেরুলেন দেখে মনে হল কাকাবাবু কিরকম টলছেন৷ যে কোন মুহূর্ত্তেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে পারেন৷ তাই ওঁকে ধরাধরি করে আমরা নিয়ে আসি৷ উনি তখন আর কথা বলতে পারছেন না৷ শুধু চোখ দিয়ে আপনাদের দিকে দেখিয়ে দিলেন৷
—আচ্ছা, ওঁর কী হার্ট অ্যাটাকের কোন হিস্ট্রি আছে? কিম্বা, হাইপ্রেশার? অবিনাশ জিজ্ঞেস করে৷
—না তো! আমার বাবা খুব হেলথ কনশাস৷ রোজ ভোরবেলায় হাঁটতে বেরোন৷ স্মোক করেন না, ড্রিঙ্কও না৷
—তাহলে ডায়াবিটিস? ইনসুলিনের লেভেল হঠাৎ ফল করলেও এরকম মাথা ঘুরে যেতে পারে৷
—না না৷ বাবার ওরকম কোন হিস্ট্রিই নেই৷
হাতের চার আঙুল একসঙ্গে জড় করে অবিনাশ ভদ্রলোকের পালস বীট দেখে৷ ওর মনে হল পালসটা একটু ক্ষীণ হলেও মোটামুটি স্টেবল অতএব হাট অ্যাটাকটাকে রুল আউট করা যেতে পারে৷
—আপনি কী ডাগুার?
মেয়েটি উৎসুক হয়ে অবিনাশকে জিজ্ঞেস করে৷ উত্তরে অবিনাশ সংক্ষেপে মাথা নাড়ে৷
ভদ্রলোকের দিকে ঝুঁকে পড়ে অবিনাশ নাক কুঁচকে গন্ধ শোঁকে৷
নাঃ! ক্লোরোফর্মও নয়৷
তাহলে কী? থুঁতনিতে হাত বোলাতে বোলাতে অবিনাশ চিন্তা করে৷ মানুষকে অজ্ঞা করার কোন নতুন ওষুধ?
হঠাৎ অবিনাশের কী মনে হতে ও মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে৷
—সার্টের আস্তিন গুটিয়ে একবার দেখুন তো...আপনার বাবার হাতে কোথাও ছুঁচ ফোটানোর মত কোন দাগ আছে কিনা৷ দাগটা কিন্তু তেমন বড় হবে না৷
অবিনাশের কথা মত মেয়েটি বাবার সার্টের হাতা গুটিয়ে ভাল করে দেখে৷ কিন্তু কোথাও সেরকম দাগ খুঁজে পায় না৷
—তাহলেও ওর আঙুলের ডগা...?
খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত মেয়েটি ওর বাবার ডানহাতের তর্জনীতে আঙুলের ডগায়, একটা ছোট্ট দাগ দেখতে পায়৷ ঠিক ছুঁচ ফোটাল যেরকম হয়৷
—পেয়েছি৷ মেয়েটি বিস্ময়ে অবিনাশের দিকে তাকায়৷
—কিন্তু, আপনি সেটা জানলেন কী করে?
—এ মুহূর্তে সেটা আন ইমপরটেন্ট৷
অবিনাশ মেয়েটির প্রশ্ন এড়িয়ে যায়৷
—এই যে ছুঁচ ফোটানোর দাগ দেখছেন...এটা খুব সম্ভবতঃ হাইড্রোনিয়াস ব্রোমাইড নামে একটা কেমিক্যাল যা আপনার বাবার বডিতে ইনজেক্ট করা হয়েছে৷ না না...ভয় পাবার মত কিছু নয়৷ কেমিকালটা পয়জনাস হলেও সেরকম মারাত্মক নয়৷ আপনার বাবা আগামী কয়েক ঘণ্টা গভীর ঘুমে অচৈতন্য হয়ে থাকবেন, এই আর কী৷
অবিনাশের কথা শুনে ভদ্রলোকের কন্যা এবং স্ত্রী কিছুটা যেন আশ্বস্ত হয়৷
—আরেকটা কথা...অবিনাশ মেয়েটিকে সম্বোধন করে বলে৷ —-আপনি যে দুজন সহৃদয় ব্যগুির কথা বলছেন, তাঁরা আসলে অতটা সহৃদয় নাও হতে পারেন৷
—এ কথা কেন বলছেন? মেয়েটিকে যেন একটু বিরগুই শোনায়৷
—আপনার বাবার পকেটটা একটু ভাল করে দেখবেন? ওঁহ টাকা পয়সা...পাস, সব ঠিক ঠিক আছে কিনা৷
বাবার প্যান্টের হিপ পকেট থেকে মেয়েটি একটা কাল রংয়ের মানিব্যাগ বার করে৷
—এই তো মানিব্যাগ৷ আপনি মিছামিছি দুটি ইয়াং ছেলের সম্বন্ধে...
—মানিব্যাগটা একটা খুলে দেখুন তো? টাকা-পয়সা সব আছে তো? মানি ব্যাগটা খুলতে গিয়ে মেয়েটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ ভেতরটা এক্কেবারে ফাঁকা৷ টাকা তো দূরের কথা, ভেতরে একটা পয়সা পর্যন্ত নেই৷
—এখন কী হবে?
এতক্ষণে পুরো ঘটনাটা যেন মেয়েরি বোধগম্য হয়৷
—ছেলে দু তোকে চিনতে পারবেন?
—বোধহয় না৷ মেয়েটি অনিশ্চিত ভাবে মাথা নাড়ে৷ —আসলে পুরো ব্যাপারটাই এত আচম্কা ঘটে গেল! আর বাবাকে ওরকম অবস্থায় দেখে কী বলবো...আই ওয়াজ রিয়েলি ইন এ স্টেট অফ শক৷
—হুঁ৷ একটু চিন্তায় ফেললেন৷
—আপনি যদি চান তাহলে একবার ট্রেনের কাম্রায় কাম্রায় গিয়ে...
—খুব একটা লাভ হবে কী? আপনিতো সেরকম সারটেনও নন৷ আর, আপনাকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে তারা টয়লেটে লুকিয়ে পড়তে পারে৷ আপনি জানতেও পারবেন না৷
—তাহলে...এখন কী করা যায়! মেয়েটির মুখে আতঙ্কের ছাপ৷
—বাবার কাছে অনেক টাকা ছিল৷
—ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখতে হয়৷
কোন কিছু চিন্তা করতে গেলে থুঁতনিতে হাত বোলানো অবিনাশের পুরোনো অভ্যেস৷
একটুক্ষণ পর হঠাৎ অবিনাশ মেয়েটির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায়৷
—এ ট্রেনের নেকসট স্টপেজ কোথায়?
—বর্ধমান?
—বর্ধমান আসতে আর কতক্ষণ বাকি?
—তা...বিশ-পঁচিশ মিনিট হবে৷
ঘড়ি দেখে মেয়েটি উত্তর দেয়!
—গুড৷ অবিনাশ কাছেই দাড়ানো বকাটে ছোক্রাটার দিকে তাকায়৷
—ভায়া...তুমি একবার এ ট্রেনের গার্ড সাহেবকে ডেকে আনবে? মেয়েটির সামনে কিছু একটা করার সুযোগ পেয়ে ছেলেটি অত্যন্ত তৎপর গতিতে গার্ড-এর সন্ধানে বেরিয়ে যায়৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই গার্ডকে সঙ্গে নিয়ে ছেলেটি হাজির হয়৷
—আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন? গার্ডের গলায় রীতিমত বিরগুি৷
—হ্যাঁ৷ অন্যমনস্ক ভাবে অবিনাশ নিজের আই ডি কার্ডটা বার করে দেখায়৷
সেটা দেখেতো গার্ড সাংঘাতিক রকম নার্ভাস৷ ডি আই জি অফ পুলিশ কলকাতা এ ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের মত যাচ্ছে, এটা সে কল্পনাও করতে পারে না৷
—বলুন স্যর...আপনার জন্য কী করতে পারি স্যর৷ যাস্ট হুকুম করুন স্যর৷
—এতক্ষণ ধরে একটা বিরগুিভাবে ভগুিমূলক গান শোনা যাচ্ছিল৷
গার্ড একটু অপ্রস্তুত হয়ে চারপাশে তাকায়৷
—ওটা আসলে রেলওয়ে মিনিস্ট্রির হাতে স্যর৷ ও বিষয়ে আমরা কিছু...
—না না ভগুিমূলক গান শোনানোর জন্য আপনার ওপর দোষারোপ করছি না৷ আমি শুধু জানতে চাইছিলাম...এই অডিও সিস্টেমের মধ্য দিয়ে চাইলে কোন অ্যানাউনসমেন্টও করা যেতে পারে?
—অবশ্যই যার স্য৷ গার্ডের মুখ খুশিতে গদগদ৷
—তাহলে এখনই একটা অ্যানাউনসমেন্ট করে দিন৷ ট্রেন বর্ধমান স্টেশনে এলে কাউকে...
—এক সেকেন্ড স্যর...আমি একটু লিখে নি৷
গার্ডসাহেব তাড়াতাড়ি পকেট থেকে একটা ছোট নোটবই আর বলপেন বার করে৷
—এবার বলুন স্যর...
—ট্রেন বর্ধমান স্টেশনে এলে... ফুল ডিসার্ট না হওয়া পর্যন্ত কাউকে স্টেশনে নাবতে দেওয়া হবে না৷
—ব্যস! এইটুকু মাত্র?
গার্ডসাহেব একটু নিরাশই দেখায়৷
—হ্যাঁ...এতেই কাজ হবে বলে মনে হয়৷
আরেকবার অ্যালউট করে গার্ডসাহেব বলে যাচ্ছিল৷
—ওহ্ হ্যাঁ...অরেকটা কথা৷ ট্রেনে রেলওয়ে পুলিশ আছে?
—কাছে স্যর...দুজন৷
—ওদের একটু তৎপর থাকতে বলবেন৷ দরকার হতে পারে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনের সব কটা কমপার্টমেন্টে গার্ড সাহেবের গলায় অবিনাশের দেণ্য়া অ্যানাউশমেন্ট শোনা যায়৷ একবার নয়, দুবার৷
এবং তার মিনিট খানেকের মধ্যেই হঠাৎ ঝাঁকানি নেবে ট্রেনটা স্লো ডাউন করে৷ তারপর, অসম্ভব জোরে কিঁচকিঁচ আওয়াজ করতে করতে থেমে যায়৷ বোঝা যায়৷ কেউ ট্রেনের টেন টেনেছে৷
ট্রেন স্লোডাউন করা মাত্র দুজন লোককে ট্রেন থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে দূরে আমবনের দিকে ছুটে যেতে দেখা যায়৷ বেকায়দায় পড়ে ওদের মধ্যে একজনের পা মচ্কে গেছে বলে মনে হয়৷ কেননা, ছুটতে গিয়ে সে ল্যাংচাতে থাকে৷ রেলওয়ে পুলিশের তৎপরতায় লোক দুটো বেশি দূর পালাতে পারে না৷ অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরা পড়ে যায়৷
—এই যে স্যর...হাঁপাতে হাঁপাতে পুলিশের মধ্যে একজন অবিনাশের সামনে এসে দাড়ায়৷ —রাবার ব্যান্ডে মোড়া এই টাকার বান্ডিলটা৷ আর এ দুটো জিনিস৷ খুব সম্ভবতঃ ক্রেডিট কার্ড৷ অবিনাশ টাকা এবং ক্রেডিট কার্ড মেয়েটির হাতে তুলে দেয়৷
—একবার দেখে নিন, সব ঠিক ঠাক আছে কিনা৷ আনন্দে মেয়েটি যে কী করবে ভেবে পায় না৷
—আপনি আমাদের জন্য যা করলেন...
ভাষায় প্রকাশ করা যায় না৷ মেয়েটি হাত জোর করে অবিনাশকে নমস্কার জানায়৷ —অন্ততঃ আপনার নামটা যদি জানতে পারতাম৷
বাধ্য হয়েই অবিনাশকে পকেট থেকে নিজের একটা কার্ড বার করে মেয়েটির হাতে দিতে হয়৷
পরের দিন ভোরবেলায় অবিনাশের মোবাইলটা যখন বেজে ওঠে ও তখন শেভ করতে ব্যস্ত৷ গতকাল ওর আর শেভ করা হয়ে ওঠে নি৷
—দেখ না, কে ফোন করছে?
অবিনাশ শর্মিকে ফোনটা ধরতে বলে৷ দু-একটা কথাজ্ঝর পরেই শর্মি মোবাইলটা অবিনাশের হাতে ধরিয়ে দেয়৷
—কে? অবিনাশ জিজ্ঞেস করে৷
—তোমার কোন গুণগ্রাহী মহিলা৷
এই বলে শর্মি গম্ভীর মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়৷
—গুড মর্নিং৷ আমি শুক্লা৷ গতকাল ট্রেনে দেখা হয়েছিল৷ তখন নিজেদের পরিচয় পর্যন্ত জানানো হয়নি৷ যা বলছিলেন আগামীকাল...
—আপনার বাবা কেমন আছেন? অবিনাশ মেয়েটির কথা আর শেষ হতে দেয় না৷ ও জানে আগামীকাল কী হতে পারে৷
—একদম ফিট৷ ভুবনডাঙ্গার বাজারে চলে গেছেন মাছ আনতে৷
—একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনও-হেঁয়ালি রয়ে গেল৷ আপনার বাবার আঙুলে কেমিকালটা ইনজেক্ট করা হল কী করে৷
—সে ব্যাপারে আমি আলোকপাত করতেই পারি৷ টেলিফোনে মেয়েটির হাসি খুবই মিষ্টি শোনায়৷ —বাবার হাত দেখবে এই অছিলায়৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন