ঘোলাটে জল

বরুণ চন্দ

আপার সার্কুলার রোডে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোসের বাড়ি পার হলেই একটা পেট্রল পাম্প পরে৷ তার পাশ দিয়ে চলে গেছে বিদ্যাসাগর স্ট্রিট৷ এই রাস্তা ধরে কিছুটা গেলেই ডান হাতে উত্তর কলকাতার নাম করা পুরোনো পাড়া, বাদুর বাগান লেন এবং পার্ক৷ বাদুর বাগান লেনের ১৩-৩ নম্বর একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি৷ ওপরের তলায় বাড়িওয়ালা বসাক’রা থাকে৷ একতলায় ভাড়াটে হিসেবে আছে তুলসী চরণ তালুকদার৷

তুলসী বাবুর ফ্ল্যাট আয়তনে বাড়িওয়ালার ফ্ল্যাটের থেকে ছোট৷ কেননা একতলায় ওদের ফ্ল্যাট ছাড়া একটা গ্যাজে আছে৷ বাড়িটা তৈরি হওয়ার সময় বাড়িওয়ালার বোধহয় গাড়ি কেনার বাসনা ছিল৷ যেটা কোন কারণে আর চরিতার্থ হয়নি৷

তাই বলে, অরিন্দম বসাকের (বাড়িওয়ালার নাম) খুব যে একটা ক্ষতি হয়েছে এরকম বলা যায় না৷ বরং, আর্থিক দিক থেকে লাভজনকই হয়েছে৷ গাড়ি কিনলে ওঁর পেছনে পেট্রল, ড্রাইভার, মেইনটেনান্স—নানা রকম খরচ হোত৷ কিন্তু, গ্যারেজটা ভাড়া দিয়ে যা এখন একটা স্টেশনারি দোকানে পরিণত হয়েছে, অরিন্দমবাবু মোটামুটি মোটা অংকের টাকা সেলামি হিসেবে পেয়েছেন বলে শোনা যায়৷

এ ছাড়াও একতলায় একটা সরু প্যাসেজ আছে, যার ওপরে টিনের চালা লাগিয়ে একজন ধোপাকে বসানো হয়েছে৷ ধোপা জামাকাপড় কোথায় কাচে বলা মুশকিল, কেননা কাছেপিঠে সেরকম কোন দীঘি বা জলাশয় নেই কিন্তু, ইস্ত্রির কাজটা সে এখানে বসেই পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে৷ তাই, রিটায়ার করা সত্ত্বেও অরিন্দম বসাকের রোজগার খারাপ হয় না৷

একতলার ফ্ল্যাট দুটি মাঝারি সাইজের ঘর৷ বাইরের ঘরটায় আসবাবপত্র বলতে বিশেষ কিছুই নেই৷ একটা খাওয়ার টেবিল ও চারটে চেয়ার৷ আর রান্নাঘরের ঠিক বাইরে, একটা মিটসেফ, আর তারপাশে ছোট্ট একটা রেফ্রিজারেটার, যেটা তুলসীবাবু বড় সেহাজ করে স্ত্রী চুনিকলা দেবীর পঞ্চাশ বছর পুর্তির সময় কিনে দিয়েছিল৷

তুলসীবাবু রিটায়ারড৷ বাইরের লোকজন খুব একটা কেউ আসে না৷ আর, এলে তাকে খাওয়ার টেবিলেই বসানো হয়৷ দেওয়ালে একটা পুরোনো আসলের চাবি দেওয়া ঘড়ি, যাতে রোমান হরফে এক দুই তিন চার লেখা৷ এই মুহূর্তে সেই ঘড়িটার থেকে ঢং করে একটা আওয়াজ হয়৷ খাওয়া শেষ করে তুলসীবাবু ঘড়িটার দিকে তাকায়৷ এখন বেলা দেড়টা৷ গিন্নি দেরি করে খেলেও খাওয়ার ব্যাপারে তুলসীবাবু অত্যন্ত পাংকচুয়াল৷

এর পেছনে অবশ্য একটা কারণ আছে৷ তুলসীবাবু খাওয়া দাওয়া সাবধানে করে৷

চারা পোনা মাছ (ভদ্রলোক রিটায়ার করেছে বলে কম খরচে সংসার চালাতে হয়), কম তেলে ভেজে, তাতে কয়েক চিল্‌তে কাঁচা পেঁপে দিয়ে ট্যাল ট্যালে ঝোল, শীতকালে বড়জোর এর সঙ্গে কয়েকটা ধনে পাতা যোগ করা যেতে পারে৷ এই খেয়েই তুলসীবাবু বার মাস চালিয়ে যাচ্ছে৷ আজ অবশ্য গিন্নি চুনিবালা দেবী তার কর্তার জন্য বিশেষ পছন্দের আলু-পোস্ত (উচ্চরণে যেটা ‘আলু-পোস্ত’তে পরিণত হয়) আর বিউলির ডাল বানিয়েছে৷ এই ‘স্পেশাল ডিশ’ তুলসীবাবু পরম তৃপ্তির সঙ্গে হাপুস-হুপুস আওয়াজ করে সমাপন করেছে৷

এই খাওয়া-দাওয়ার পেছনে সাবধানতার কারণটা এবার বলে ফেলা দরকার৷ কেননা, এক দিক থেকে দেখতে গেলে পুরো গল্পটাই দাঁড়িয়ে আছে এই কারণটার উপর৷ তুলসীবাবু গত কুড়ি বছরেরও বেশি ডিসপেপশিয়ায় ভুগুভোগী৷ সাদামাটা বাংলায় যাকে বলে অম্লরোগ৷ খাওয়ার পর চোঁয়া ঢেকুড় তোলা, বুক জ্বালা করা—এসব তার জীবনের নিত্য সঙ্গী৷ ‘চিকিৎসা বিভ্রাট’ গল্পের মত তুলসী াবু হেন ডাগুার নেই যাকে দেখায় নি৷ তাদের বিধিমত সে অ্যালোপেথি, কবরেজি, ইউন৮ নানাবিধ ওষুধও খেয়ে দেখেছে৷ তার নিজের কথায় ‘কোন ওষুধই কিসু ফল হয়নি৷ শুধু, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জলে গিয়েছে৷’

শেষ পর্যন্ত পাড়ার বুড়ো হোমিওপেথির ডাগুার সুধীর মল্লিকের ওষুধ খেয়ে তুলসীবাবু অনেকটা ভাল আছে৷ ওষুধটা কিনতে গিয়ে ভদ্রলোক একটু মুষড়েই পড়েছিল৷ দু মাসের ওষুধের দাম মাত্র ৪২ টাকা ৫০ পয়সা৷ এত দামী দামী ওষুধ খেয়ে কোন ফল হল না, আর এই কারবো ভেজ খা খেয়ে সেটা ঠিক হয়ে যাবে?

তুলসীবাবুর কথা শুনে ডাগুার সুধীর মল্লিক ফোক্‌লা দাঁত বার করে একগাল হেসেছিল৷ বলেছিল—খান না...এতে না হলে অন্য ওষুধ দেব৷ কিন্তু তুলসীবাবুকে অন্য ওষুধ আর খেতে হয়নি৷ ঐ কারবো ভেজ ঙ্গ...চার ফোঁটা ওষুধ স্বল্প জলে মিশিয়ে খাওয়ার পর খেয়ে নেওয়া দিনে তিনবার৷ এই খেয়েই তুলসীবাবু এখন অনেকটা ভাল আছে৷

খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে, বেসিনের ট্যাপটা খুলতেই যত সব গন্ডগোলের সূত্রপাত হয়৷ পরিষ্কার জলের বদলে ভক্‌ করে একরাশ ঘোলাটে জল বেরিয়ে আসে৷ আর যার কোথায়, তুলসীবাবুর তৎক্ষণাৎ মাথায় রগু চড়ে যায়৷

—দ্যাখ গিন্নি...এটা কিন্তু বড্ড বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে৷ এরপর একটা তুলকালাম কান্ড বেধে গেলে আমায় যেন আবার কিছু বলতে এসো না৷

—ওফ্‌...এই বুড়োটাকে নিয়ে আর পারি-না৷ সবসময় খিঁচ খিঁচ লেগেই আছে৷

কথাটা অবশ্য চুনিবালা গলা খাটো করেই বলে৷ একথাটাই যদি একবার তুলসীবাবুর কানে যায়, তাহলে সেটা নিয়েই রীতিমত একটা কুরুক্ষেত্র কান্ড বেঁধে যেতে পারে৷

—কই...কী হয়েছে দেখি?

আঁচলে হাত মুছতে মুছতে চুনিবালা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷

—তোমার তো আবার সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি৷ তিলকে তাল না করলে চলে না৷ পেটরোগা মানুষ বলে এমনিতেই তুলসীবাবুর খিঁটখিঁটে স্বভাব৷ তারপর ইদানীং ওর প্রেশারটা আবার বেড়ে যাওয়াতে চুনিবালার সবর্বদাই সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে৷ বুড়ো মানুষ, বলা যায় না রাগ করতে গিয়ে হয়তো হঠা২ হার্ট অ্যাটাকই হয়ে গেল৷ কথাটা মনে আসতেই ভয়ে চুনিবালার শিরদাঁড়া শিরশির করে ওঠে৷

—ওমা, তাইতো!

বেসিনের দিকে তাকিয়ে সত্যি সত্যি মহিলার চক্ষুস্থির হয়ে যায়৷ কল দিয়ে বাস্তবিকই কাল্‌চে লাল রংয়ের জল বেরুচ্ছে৷

—দ্যাখ...ভাল করে দ্যাখ! কী রকম জল আসছে৷ ওপরের ট্যাঙ্ক থেকে৷

তুলসীবাবু কট মট করে চুনিবালার দিকে তাকায়৷ যেন, কল দিয়ে এরকম ভাবে ঘোলা জল বেরুনোর জন্য পরোক্ষভাবে ওর স্ত্রীই দায়ী৷

—ওমা! আমি আবার কী করলাম? অবাক হয়ে চুনিবালা স্বামীর দিকে তাকায়৷

—হঠাৎ আমার ওপর চোখ রাঙ্গাচ্ছো কেন?

—কেন...যাও আরও বাড়িওয়ালার হয়ে সাফাই গাইতে৷

বাড়িওয়ালার সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই তুলসীবাবুর বচসা চলছে৷ যাতে ব্যাপারটা চরমে উঠতে না পারে, সেইজন্য চুনিবালা অনেক সময়ই ওর স্বামীকে স্বভাবটাকে একটু ঠান্ডা রাখতে বলে৷ এর ফলে অবশ্য হিতে বিপরীতই হয়৷ তুলসীবাবুর ধারণা হয় ওর স্ত্রী বাড়িওয়ালার হয়েই বুঝি ওর কাছে ওকালতি করতে আসছে৷

—আচ্ছা...সত্যি করে বলো দেখি...বাড়িওয়ালার আসলে মতলবটা কী?

এসব পচা, মরচে ধরা জল খাইয়ে কী আমাদের মেরে ফেলার প্ল্যান করছে নাকি?

—না না...এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না বাড়িওয়ালার৷

গলা নরম করে চুনিবালা স্বামীকে শান্ত করার চেষ্টা করে৷

—এর একটা বিহিত করতেই হয়৷ আমিই বিকেলে গিয়ে না হয়...

—বিকেলর জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না৷ এই মুহূর্তে আমি এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো৷

—এই ভরদুপুরে তুমি কী করবে শুনি?

চুনিবালা রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে বলে৷

—কেন? এই এঁটো হাতে আমি ওপরে গিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করে আসবো৷

এঁটো হাতটা তুলে দেখাতে গিয়ে তুলসীবাবুর নিজের তর্জনী আর মধ্যম আঙুলটার মাঝখানে নজর পড়ে৷ যেখানে বেশ কিছুটা পোস্ত এখনও লেগে রয়েছে৷ তুলসীবাবুর অদম্য একটা ইচ্ছে হয় এই মুহূর্তে জিভ বার করে সেটা চেটে খেতে৷ কিন্তু, পুরো ব্যাপারটার গ্র্যাভিটি নষ্ট হয়ে যাবে বলে ভদ্রলোক আর সেটা করতে পারে না৷

—বলি...ওরা পেয়েছে’টা কী?

—আর যাই করো বাপু...ওগরে গিয়ে হাতাহতি বাঁধিয়ে এসো না৷

বাড়িওয়ালার ছেলেটাকে কেন যেন আমার সুবিধের লাগে না৷

স্বামীর জন্যে চুনিবলার আজকাল অনেক সময়েই ভয় হয়৷ আগে যেটা হোত না৷

—কেন...কী করবে শুনি?

তুলসীবাবু তার একুত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি ফুলিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত গর্জে ওঠে৷

—আই তুলসীচরণ তালুকদার...নেভার অ্যাফ্রেড এনি ওয়ান৷

কোনদিন কাউকে ভয় করিনি...এখনও করবো না৷

হু! যত লম্ফ ঝম্ফ সব নিজের বাড়ির মধ্যে! চুনিবালা দেবী নিজের মনে হাসে৷

তুলসীবাবু কিন্তু সত্যি সত্যি সেদিন তর তর করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় বাড়িওয়ালার ফ্ল্যাটে গিয়ে রীতিমত হম্বি তম্বি করে এসেছিল৷ বাড়িওয়ালা বসাক বাড়িতে নেই৷ তুলসীবাবু ইদানীং তাকে দেখতে পাচ্ছে না, তাই ভদ্রলোক গিয়ে মিসেস বসাকের ওপরই এক হাত নিয়ে আসে৷

—একতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের কল দিয়ে কী রকম জল আসছে একবার দেখে আসবেন চলুন৷ আপনারা ভেবেছেন’টা কী? বাড়ি ভাড়া বাড়াতে রাজী হইনি বলে আমাদের বিষাগু জল খাইয়ে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র বলছে বুঝি?

তুলসীবাবু বাড়ি ভাড়া নেওয়ার তিন বছরের মধ্যেই বাড়িওয়ালা বসাক ভাড়া বাড়ানোর জন্য ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দেয়৷ তুলসীবাবু সবে মাত্র তখন রিটায়ার কোরেছে৷ এখন থেকে পেনশনের টাকায় সংসার চালাতে হবে৷ তাই, এখন বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷

তুলসীবাবুকে টাইট দেবার জন্য বাড়িওয়ালা একবার জলের সাপ্লাই বন্ধ করা মাত্র ভদ্রলোক লিগাল নোটিস দিয়ে বাড়ি ভাড়া রেন্ট কন্ট্রোলে দেওয়া শুরু করে৷ তাতে, বাড়িওয়ালার ঝামেলা বাড়ে ছাড়া কমে না৷

ওপর থেকে আসার আগে তুলসীবাবু মিসেস বসাকে শাসিয়ে দিয়ে আসে৷

—এরকম করে আমাদের বাড়ি থেকে তাড়াতে পারবেন না৷

আর এ জল খেয়ে যদি আমাদের কিছু হয় তাহলে বলে দিচ্ছি আপনাদের বিরুদ্ধে অ্যাটেমটেড হোমিসাইডের মামলা আনবো জীবনে কখনও প্র্যাকটিস না করলেও তুলসীবাবু ল পাশ৷ মিসেস বসাকের উত্তর তুলসীবাবুকে রীতিমত অবাক করে দেয়৷

—ছিঃ ছিঃ...সত্যিইতো! এটা কী অন্যায় কথা৷ পাইপে নিশ্চয়ই মর্চে ধরেছে৷ আপনি বয়স্ক মানুষ...এ নিয়ে আর আপনাকে চিন্তা করতে হবে না৷ ছেলে অফিস থেকে ফিরে এলে আজই কলের মিস্ত্রি ডেকে জলের পাইপ বদলানোর ব্যবস্থা করছি৷

বাড়িওয়ালি এমনিতে সব সময় খুব কট্‌ কট্‌ করে কথার জবাব দেয়৷ তাই, তুলসীবাবু কল্পনাও করতে পারে নি যে মিসেস বসাক আজ এত নরম সুরে ওর সঙ্গে কথা বলবে৷ তাই নীচে নেবে এসে তুলসীবাবু যার পর নাই উৎফুল্ল হয়ে চুনিবালাকে জানায়ঃ

—বুঝলে গিন্নি...কথায় আছে না শগুের ভগু, নরমের যম?

আজ ওপরে গিয়ে ঠিক তাই হল৷

—কেন...কী হল শুনি?

উৎসুক হয়ে চুনিবালা স্বামীকে জিজ্ঞেস করে৷

—খুব দিয়েছি আজকে...ভদ্রমহিলাকে বাক্যবানে একেবারে জর্জরিত করে এসেছি৷

—কেন, বাড়িওয়ালা কোথায়?

—ভগবান জানে সে কোথায়৷

—তা...মিসেস বসাক কী জবাব দিলে?

চুনিবালার ঔসুকের আর সীমা নেই৷

—জবাব? নাক দিয়ে তুলসীবাবু একটা অদ্ভুত ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ করে৷

—ভদ্রমহিলা জবাব দেবে কী? আমার কথা শুনে এক্কেবারে কেঁচো৷

সেদিনই বিকেল বেলায় তুলসীবাবুদের কলের জল পরিষ্কার হয়ে গেল৷ পরের দিন সকালের মধ্যে কর্তা-গিন্নি উভয়েই ভুলে গেল যে তাদের বেসিনের ট্যাপ দিয়ে কোন দিন ঘোলাটে জল বেরিয়েছিল৷

সকালবেলায় লালবাজার৷ যেন গেট দিয়ে ঢুকল দেখা যাবে সিমেন্টে বাঁধানো একটা বড়কোর্ট ইয়ার্ড৷ তাতে লাইন করে কলকাতা পুলিশের নীল রংয়ের ভ্যান আর জীপ৷ ভ্যানগুলোকে যে কেন ‘ব্ল্যাক মারিয়া’ বলা হয় সেটা বলা মুশকিল৷ হয়তো ব্রিটিশ আমলে ভ্যানগুলোর রং কাল ছিল৷ সারাটা জায়গা কনস্টেবল আর সার্জেন্ট-এ গিজ গিজ করছে৷ ডানপাশে বড় লাল রংয়ের বিল্ডিং৷ এরই দোতলার একটা ঘরে বসে এক মনে কাজ করে চলেছে সিনিয়ার ডিটেকটিভ অফিসার অবিনাশ রায়৷

—ভেতরে আসতে পারি?

—অবশ্যই৷ অবিনাশ রায় মুচকি হেসে বলে৷

—তোমার জন্য সবসময় অবারিত দ্বার৷

পর্দা সরিয়ে প্রদ্যোৎ ঘরে প্রবেশ করে৷ প্রদ্যোৎ গত তিন বছর অবিনাশ রায়ের অধীনে কাজ করছে৷ কাজে খুব উৎসাহ৷ চোখে কোন কিছু অস্বাভাবিক পড়লে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সমাধান করার চেষ্টা করে৷ অবিনাশ রায় প্রদ্যোৎ-এর উৎসাহে বাধা দেয় না, বরং তাকে আরও এনকারেজ করে৷

অবিনাশ রায় এবং তার অ্যাসিসটেন্ট প্রদ্যোৎ মিত্র-এদের দুজনের ব্যাকগ্রাউন্ড একেবারেই আলাদা৷ ইংরেজিতে যাকে বলে— ‘পোলস অ্যাপার্চ’৷

অবিনাশ রায়ের সম্ভ্রান্ত ঘরে জন্ম৷ বাবা স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক৷ পড়ানোতে তাঁর এত নাম যশ ছিল যে এমন কী অন্যান্য কলেজের ছাত্র পর্যন্ত স্পেশাল পারমিশন নিয়ে ওঁর ক্লাস অ্যাটেন্ড করতে আসতো৷ পড়াশুনোয় ভাল বলে সবাই অবাক করে দিয়ে, বিশেষ করে ওর অধ্যাপকদের হতাশ করে৷ অবিনাশ প্রেসিডেন্সি থেকে ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস অনার্স পেয়েও হায়ার স্টাডিজে না গিয়ে হঠাৎ আই পি এস পরীক্ষা দিয়ে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করলো৷

সেই তুলনায় প্রদ্যোৎ-এর জন্ম অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে৷ শৈশবে মা-বাবাকে হারিয়ে মামাবাড়িতে মানুষ৷ ঠিক মত দেখাশুনোর অভাবে ছেলেটা একেবারেই গোল্লায় যাচ্ছিল৷ সুকল কেঁটে সে রেগুলার সিনেমায় যেত৷ ক্রিকেট ব্যাটের বদলে হকি স্টিক আর সাইকেলের চেনের ব্যবহারটাই রপ্ত হচ্ছিল বেশি৷ ঠিক সেই সময়ে ওর মামা ওকে নরেন্দ্রপুরের রামকৃষশু মিশনে ভর্তি করিয়ে না দিলে ছেলেটিা নির্ঘাত রাস্তায় মারামারি করে অকালে মারা যেত৷

—স্যর...একটা উড়ো চিঠি এসেছে৷

অবিনাশ রায়ের ঘরটা আয়তনে বেশ বড়৷ পুরোনো দিনের উঁচু সিলিং৷ সেখান থেকে লম্বা রডে ঝোলানো সিলিং ফ্যান ঘটাং ঘটাং আওয়াজ করে ঘুরছে৷ বলা বাহুল্য, এই ফ্যানে হাওয়ার চেয়ে আওয়াজ হয় বেশি৷

—স্যার, প্রদ্যোৎ ঠিক বুঝতে পারে না অবিনাশ স্যর ওর কথা ঠিক শুনতে পেয়েছে কিনা৷

—চিঠিটা খুব ইনট্রিগিং?

—বলতে পারেন৷ পাজলিংও...

—তাহলে পড়ে ফেল৷

অবিনাশ রায় থেকে মুখ না তুলে জবাব দেয়৷

—চোখটা ফাইলের ওপর থাকলেও কানটা তোমার দিকেই আছে৷

একটুক্ষণ ইতস্তত করে প্রদ্যোৎ হাতে ধরা ইনল্যান্ড লেটারটার থেকে পড়ে শোনায়৷

—পুলিশ স্যর...গত তিন মাস ধরে অরিন্দম বসাক তার বাড়ি থেকে নিখোঁজ৷ ওঁর বাড়ির ঠিকানা ১৩-৩ বাদুর বাগান লেন৷ কলিকাতা—৭০০০০৯৷ আপনিরা খোঁজ নিলে কীতগ্য হবো৷ ইতি...

চিঠির নীচে কোন নাম লেখা নেই, স্যর৷

—ব্যস? ফাইলে অবিনাশ রায়ের কলমটা থেমে যায়৷

—ব্যস৷ প্রদ্যোৎ মাথা নাড়ে৷

—ইনটারেস্টিং...

অবিনাশ রায় এতক্ষণে ফাইল থেকে মুখ তুলে তাকায়৷ কৌতূহলে ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে৷

—কই দেখি...

প্রদ্যোৎ-এর কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে অবিনাশ স্যর বেশ ভাল করে উল্টোপাল্টে দেখে৷ এরকম উড়ো চিঠি লালবাজারে প্রায় প্রতিদিনই আসে৷ এবং সব সময় যে তার বিহিত করার জন্য লালবাজারের পুলিশ বাহিনী খুব তৎপর হয়ে ওঠে তাও নয়৷

লালবাজারের বগুব্য, এরকম সব চিঠির যথার্থ খোঁজ নিতে গেলে, পুলিশবাহিনীর অন্য কোন কিছুর করার সময় থাকবে না৷

—কী? কেসটা ইনভেস্টিগেট করতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি?

—ইয়েস স্যর৷ প্রদ্যোৎ উদগ্রীব হয়ে মাথা নাড়ে৷ অবিনাশ স্যর আজকাল মাঝে মাঝেই প্রদ্যোৎকে ইনডিপেনডেন্টলি কাজ করার সুযোগ করে দেয় বলে সে যার পর নাই প্রীত৷

—হাতে কোন কাজ পেন্ডিং নেইতো?

—নাথিং ইমপরটেন্ট স্যর৷

—তারফলে...আনইমপরটেন্ট কাজ কিছু আছে’

—না স্যর...সেরকম কিছু নয়৷ সেরকম হলে সন্ধেবেলায় থেকে আমি সেগুলো কমপ্লিট করে দেব৷

—ঠিক হ্যায়...তাহলে হয়ে এসো!

প্রদ্যোৎ চলে গেলে অবিনাশ চিঠিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে৷ লেখার হরফটা গোটা গোটা৷ অবভিয়াসলি মেয়েলি৷ এবং লেখার ধরণ দেখে মনে হয় এই চিঠিটা লিখতে গিয়ে লেখক বা লেখিকার যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে৷ কাকে উদ্দেশ্য করে চিঠিটা লিখতে হবে সেটা বুঝতে না পেরে লেখা হয়েছে ‘পুলিশ স্যর’৷ ঠিক আছে৷ এরপর লেখা হয়েছে৷ গতদিন মাস ধরে অরিন্দম বসাক নিখোঁজ৷ তা, এই অরিন্দম বসাক লোকটি কে?

অবিনাশ অন্যমনস্ক ভাবে নিজের থুঁতনি চুলকায়৷ সেটা অবশ্য প্রদ্যোৎ ফিরে এলেই জানা যাবে৷ কিন্তু, আসল প্রশ্নটা হল, অরিন্দম বসাক নিখোঁজ বলে লেখক বা লেখিকার এত মাথা ব্যথা কেন? এবং অরিন্দম বসাকের সঙ্গে তাহলে তার কীই বা সম্পর্ক? দ্যাট ইজ দ্য আসল প্রশ্ন৷

আচ্ছা...এমনও তো হতে পারে, অবিনাশের মাথায় হঠাৎ একটা নতুন চিন্তার উদয় হয়৷ চিঠিতে এই যে ইচ্ছে করে ‘আপনির’ বা ‘কীতগ্য’ বলে ভুল ভাল বানান লেখা হয়েছে, সেটা দেখে স্বভাবতঃই মনে হবে চিঠির লেখকের বিদ্যা-বুদ্ধি খুব একটা বেশী নয়৷ এমন নয়তো , আসলে যে চিঠিটা লিখেছে সে ইচ্ছে করেই গোটা গোটা হরফে মেয়েলি ধরণে লিখে এবং ভুলভাল বানান বসিয়ে আসলে আমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে৷ আসলে লোকটি ওস্তাদ এবং সফিসটিকেটেড৷

অবিনাশ আবার থুঁতনি চুলকায়৷ অবশ্য, এরকম চিঠি পাঠিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করেই বা লেখক বা লেখিকার কী লাভ? সেটাও একটা প্রশ্ন৷

হঠাৎ কী মনে করে অবিনাশ চিঠিটা আলোর দিকে তুলে ধরে একটা কথা বিশেষ করে পড়ার চেষ্টা করে৷ একটুক্ষণ পর অবিনাশের মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে৷ চিঠির একটা জায়গায় লেখা হয়েছে ওঁর বাড়ির ঠিকানা৷ এই ওঁর কথাটার আগে একটা কথা বা শব্দ লেখা হয়েছিল, যা পরে কালি দিয়ে বার বার করে আঁচড় কেটে ঢেকে ফেলার চেষ্টা হয়েছে৷ সেই কথাটা কী ‘বাবু’?

এই ‘বাবু’ কথাটা কী কনটেকসটে লেখা হয়েছে? এবং লেখার পর সেটা কেনই বা এত করে ঢাকার প্রচেষ্টা?বিকেল চারটে নাগাদ প্রদ্যোৎ মুখ ব্যাজার করে অবিনাশ রায়ের অফিসে ফিরে আসে ওর মুখ দেখলেই বোঝা যায় ও যে আশা নিয়ে বেরিয়েছিল সেটা চরিতার্থ হয়নি৷

—গিয়ে দেখলাম ব্যাপারটা খুবই ডিজাপয়েন্টিং, স্যর৷ ঐ যে অরিন্দম বসাক বলে ভদ্রলোক...তিনি নিখোঁজ ফিকোঁজ মোটেই হননি৷ কলকাতায় ওনাকে গত তিন মাস দেখা যাচ্ছে না, কেননা তিনি এখানে নেই৷

—তাহলে কোথায় তিনি?

—বলছি৷ মাস তিন চারেক আগে হঠাৎ করে রাস্তায় ওঁর এক সুকলের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়৷ সে বন্ধু গত কুড়ি বছর বেনারসে আছেন৷ ব্যস! সেই বন্ধু মিস্টার বসাককে বলেন, ‘তুই তো এখন রিটায়ার করেছিস, আমার কাছে এসে কিছুদিন থাক না৷’ তারপর আর কী...মিস্টার বসাক এখন বেনারসে...বহাল তবিয়তে বন্ধুর সঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন৷

—কিন্তু, উনি সত্যি সত্যিই ওখানে আছেন কিনা সেটা...

—সে কথাতেই আসছি, স্যর৷ আমি যখন ১৩-৩ বাদুর বাগান লেন-এ খোঁজ নিতে যাই, তখন মিসেস বসাক একা বাড়িতে৷ খোঁজ নিয়ে জানলাম ওর ছেলে অফিসে৷ মহিলার কাছ থেকে অফিসের ঠিকানা নিয়ে আমি ছেলেটির সঙ্গে দেখা করি৷ ঠিক হয়েছে আগামি শনিবার আমি ওদের বাড়িতে আরেকবার যাব৷ শনিবার ছেলেটির অফিস ছুটি৷ তখন ও আমাকে বেনারসে ওর বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে৷

—হুঁ...তাহলে তো পুরো ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হয়েই গেল৷

এতে মন খারাপ করার কী আছে?

—না...মানে...আমি ভেবেছিলাম...

প্রদ্যোৎ আর কথা শেষ করে না৷ মুখ গোমরা করে অবিনাশের সামনে বসে থাকে৷

—কেন...তুমি কী ভেবেছিলে মার্ডার...মিস্টরি...এরকম কিছু একটা হবে?

—ফ্র্যাঙ্কলি তাই৷ প্রদ্যোৎ স্বীকার করতে বাধ্য হয়৷

—জানেন স্যর...মিসেস বসাক দরজা খুলতে প্রথমেই যেটা চোখে পড়লো সেটা মহিলার কপালে আর সিঁথিতে জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর৷ আর সেই মুহূর্তেই না আমার ভেতরটা কে রকম চুপ্‌সে গেল৷

—কী আর করবে বলো...সব জিনিস তো আর মনের মতন হয় না৷

অবিনাশ রায় শান্তনা দিয়ে বলে৷

—এবার উড়ো চিঠির ব্যাপারটা মন থেকে ঝেঁড়ে ফেলে দিয়ে কাজে লেগে পড়ো৷ তোমার জন্য নতুন অ্যাসাইনমেন্ট আছে৷ নতুন অ্যাসাইনমেন্ট-এর কথা হুনেও প্রদ্যোৎ-এর মুখে খুশি ফুটে ওঠে না৷

—স্যর...এক প্লেট অমলেট আর টোস্ট-এর অর্ডার দেওয়া যাবে?

—অবশ্যই৷

অবিনাশ নিজের মনেই একটু হাসে৷ মন খারাপ হলে মানুষের অনেক সময় খেতে ইচ্ছে করে বেশি৷

বিকেল তখন সাড়ে চারটে বাজে৷ তুলসীবাবু খাওয়া দাওয়ার পরে দিবানিদ্রার কোন ব্যাপার নেই৷ শোবার ঘরে গিয়ে দিবা নিদ্রা দেওয়াটা ওর বউ চুনিবালা দেবীর অভ্যেস৷ এই সময়টায তুলসীবাবু বাইরের ঘরে জানলার পাশে একটা ক্যানভাসের ইজিচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ে৷ ঐ সময়টাই তখন ওর প্রাইভেট স্পেস৷

কিন্তু, আজ বিকেল হতে না হতেই তুলসীবাবু তার স্ত্রীকে একটা বিশেষ খবর জানাবার জন্য ছটফট করছে৷ অথচ, স্ত্রী চুনিবালা তখনও ঘুমে ব্যাঘোর৷ একবার শোবার ঘর ঘুরে এসে তুলসীবাবু আবার ক্যানভাসের ইজিচেয়ারে বসে৷ হাতে খবরের কাগজ নিয়ে তাতে মনঃসংযোগ করা চেষ্টা করে৷

শেষে, আর চুপ করে থাকতে না পেরে তুলসীবাবু শোবার ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে ডাকতে শুরু করে৷ ঘরে স্বল্প আলো৷ দুবার ডাকে সাড়া না পেয়ে এবার তুলসীবাবু একটু ঘাবড়িয়ে যায়৷ গিন্নির আবার কিছু হল নাকি? মোটা মানুষদের অনেক সময় ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয়৷ বিছানায় মাথা কাত করে রেখে ভদ্রলোক দেখার চেষ্টা করে পত্নী চুনিবালার শরীর ওঠা নামা করছে কিনা৷

তারপর, স্ত্রীর প্রসস্থ বক্ষযুগল আন্দোলিত হতে দেখে অস্বস্ত হয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসে৷

—ওগো...শুনছো?

কথাটা বলেই তুলসীবাবুর মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চের ভাব আসে৷

কত ভচর চারে ও ওর স্ত্রীকে এরকম সম্বোধন করে ডাকছে৷ এই ডাকটার মধ্যে একটা রোমান্টির ব্যাপার রয়েছে না? তুলসীবাবু নিজের মনেই ভাবে৷ লাল ব্লাউজে ছাকা ভরাট বুকের দিকে তাকিয়ে নিজের মধ্যে একটা চিত্ত চাঞ্চল্যর ভাব অনুভব করে৷ শেষে, একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তুলসীবাবু বউয়ের গায়ে হাত রাখে৷

—হ্যাঁ গা...পাঁচটা বাজে...উঠবে না?

বিকেল পাঁচটায় তুলসীবাবুর চা খাওয়ার অভ্যেস৷ হালকা করে লাল চা৷ দুধ চিনি দিলে তুলসীবাবুর অম্বল হয়৷

হাত দিয়ে ঘন ঘন নাড়া দিতে চুনিবালা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে৷

—কী হয়েছে? বাড়িতে চোর পড়েছে?

—বালাই ষাট৷ এই ভর দুপুরে বাড়িতে চোর আসতে যাবে কেন?

পাঁচটা বাজে৷ ওঠো, চা খাবে৷

তুলসীবাবুর কী মনে হয় কে জানে? আজ নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাস জ্বালিয়ে, সসপ্যানে জল বসিয়ে দুজনের জন্য চা বানিয়ে আনে৷

—আজ এত সোহাগ...ব্যাপার কী?

চা খেতে খেতে চুনিবালা একবার চপল দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকায়৷ সেই দৃষ্টির বানে তুলসীবাবু এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যায় ও এতক্ষণ ধরে স্ত্রীকে কী বলতে চাইছিল৷

তারপর থিন অ্যারারুট বিসুকটটা চায়ে ডোবাতেই তুলসীবাবুর সব মনে পড়ে যায়৷

—যা এতক্ষণ ধরে তোমায় বলতে চাইছিলাম৷ আজ দুপুরে ঠিক ক’টা বাজে খেয়াল নেই বাইরের ঘরে বসে খবরের কাজগটা পড়ছি, এমন সময় মনে হল আমাদের বাড়ির বাইরে একটা ট্যাক্সি এসে থামল৷ এরকম অবেলায় কে আসতে পারে ভেবে আমি জানলার পর্দাটা ফাঁক করে রাস্তার দিকে তাকাই৷ দেখি...

ঘটনা বলার ফাঁকে তুলসীবাবু চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে দেয়৷

—বলো, তারপর কী হল?

—দেখলাম...বেশ লম্বা ছিপছিপে শরীর এক ইয়ং ম্যান ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে আমাদের বাড়িতেই ঢুকলো৷ ছেলেটার চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা, মুখে গোঁফ, দৃপ্ত হাঁটার ভঙ্গি৷ দেখেই কেমন মনে হল মিলিটারি কিম্বা গুলিশে কাজ করে৷ দরজার ছিট্‌কানি আলতো করে খুলে দরজার পাল্লাটা আমি এক চিলতে ফাঁক করি৷ ঠিক যতটা খুললে একটা চোখ দিয়ে দেখা যায়৷ দেখি, লোকটা হন্‌ হন্‌ করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল৷

বেল বাজানোর একটুক্ষণ পর বাড়িওয়ালি দরজা খুলে দিল, তারপর ইয়ং ছেলেটি পকেট থেকে কী একটা জিনিস বার করে দেখাতে৷ ভদ্রমহিলা ওকে ভেতরে ডেকে নিল৷

—তারপর? চুনিবালা উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করে৷

—ঘরে ঢোকার আগে ইয়ং ছেলেটা হঠাৎ সোজা নীচে আমার দরজাটার দিকে তাকাল৷ এমন ভাবে, যেন সে আমায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে৷ ঐ দৃষ্টি দেখেই তো আমার কম্পিত বক্ষ৷ তাড়াতাড়ি আমি দরজাটা বন্ধ করে দিই৷

—তুমি দরজা বন্ধ করলে...আওয়াজ হল না?

—না না...ঐ ভুল তুমি আমার মধ্যে পাবে না৷ দরজাটা বন্ধ করেছি একদম আস্তে৷

তুলসীবাবু হাত দিয়ে দেখায় কি রকম করে৷

—একেবারে নো সাউন্ড৷

—তারপর কী হল?

—তারপর, আমি যেটা করলাম সেটা শুনলে তুমি ভয়ে শিউরে উঠবে৷ ওপরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি পা টিপে টিপে দোতলায় উটে গেলাম...সিঁড়ি দিয়ে৷

—্যাঁ! কী বলছো? তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছিল নাকি?

ওরকম একটা ঝুক্কি নিতে গেলে...

—আঃ! আমায় জানতে হবে না বাড়িওয়ালির সঙ্গে লোকটির কী কথা হল?

—তারপর...বল...বল৷

উৎসাহিত হয়ে চুনিবালাদেবী স্বামীর কথা শোনে৷

—ওপরে উঠে দরজায় কান পেতে আমি শুনবার চেষ্টা করি ভেতরে কী কথাবার্তা হচ্ছে৷ পুরোটা শুনতে পাইনি৷ মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো কথা৷ লোকটা, আমি যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই, পুলিশের লোক৷ যতদূর মনে হল বাড়িওয়ালার খোঁজ করছিল৷ তারপর, একটা সময় ঘরের ভেতর চেয়ার টানার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম ছেলেটি এবার বেরিয়ে আসবে৷ আমি তখন কী করি...কোথায় পালাই?

—তুমি...সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে?

চুনিবালাদেবীর গলা উৎীংকণ্ঠায় ভরে ওঠে৷

—না গোনা...সিঁড়ি দিয়ে নাবলে আমি নির্ঘাৎ ধরা পড়ে যেতাম৷ আমি তখন টুক্‌ করে ছাতে ওঠার সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম৷ ছাতের দরজাটা দেখলাম বন্ধ৷ কী আর করি, দরজার নীচে কুঁকড়ে, ছোট্ট হয়ে বসে রইলাম, যতক্ষণ না লোকটা চলে গেল, আমার সে মুহূর্তে কী মনে হল জান?

—কী?

—বুকের ভেতর এত জোরে ধড়াস ধড়াস করে আওয়াজ হচ্ছিল, যে মনে হল তমাম দুনিয়ার লোক শুনতে পাচ্ছে৷

—তুমি যে আজকাল কী সব কান্ড করছো না? শুনে তো আমি ভয়ে শিঁটিয়ে যাচ্ছি৷

—তুমি শুনেই শিঁটিয়ে যাচ্ছ? এসে দেখ আমার বুকের ভেতরটা এখনও কেমন ধুকধুক করছে!

এগিয়ে এসে চুনিবালা তুলসীবাবুর বুকে মুখ রেখে শোনার চেষ্টা করে৷

—ওমা...সত্যিই তো! তুলসীবাবুর বুকের আওয়াজ শুনতে শুনতে চুনিবালার চোখ৷ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে৷

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বহুদিন পর তুলসীবাবু অনুভব করে তার শরীরের ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা৷

—ওমা...এটা কী করছো?

কিন্তু, তখন চুনিবালাদেবীর কথাকে শোনে? তুলসীবাবু তখন চুনিবালাকে প্রায় হেঁচড়ে ধরে শোবার ঘরে নিয়ে যেতে ব্যস্ত৷ তুলসীবাবুর বুকে মুখ লুকিয়ে চুনিবালার ভাবে মাঝেমাঝে বুড়োর মধ্যে এরকম উত্তেজনা এলে মোটেই খারাপ হয় না৷

পরের শনিবার নির্ধারিত সময়ে প্রদ্যোৎ ১৩-৩ বাদুর বাগান লেনে গিয়ে হাজির হয়৷ বাড়িওয়ালার ছেলেটির নাম অপ্রতিম৷ সিঁড়ি দিয়ে ওটার আগে প্রদ্যোৎ ডানদিকের দরজাটার দিকে একবার তাকায়৷ এই বাড়ির একতলায় যেই থাকুক না কেন, সে বাড়িওয়ালার ব্যাপারে অত্যন্ত কৌতূহলী, অবিনাশ স্যরের ভাষায় ‘কিউরিয়াস অ্যাজ এ ক্যাট’, ও জানে, এই মুহূর্তে দরজার ঠিক ওপাশে একজন লোক

‘ম্যাজিক আই’ দিয়ে ওরই দিকে তাকিয়ে আছে৷ খুব দেখতে ইচ্ছে হয় লোকটিকে৷ মনে মনে লোকটির একটা প্রোফাইল তৈরী করতে চেষ্টা করে ও৷ ভদ্রলোক অবশ্যই রিটায়ারড, হাতে কাজ কম্ম বিশেষ নেই৷ কেননা, থাকলে এরকম চবিবশ ঘণ্টা দরজার ফাঁক দিয়ে অন্যদের গতিবিধি নিয়ে ‘স্পাই’ করতেন না৷ ভদ্রলোক কী বিবাহিত? আচ্ছা, এটাই বা ও কী করে ধরে নিচ্ছে যে দরজার ওপাশের ব্যগুিটি একজন পুরুষ মানুষ, কোন মহিলা নয়? কৌতূহল জিনিসটা তো ছেলেদের থেকে মেয়েদের মধ্যেই বেশি, তাই নয় কী?

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্রদ্যোৎ ভাবে, হয়তো একদিন এই ভদ্রলোকের সঙ্গে ওর আকস্মিক দেখা হয়ে যেতে পারে৷ কে জানে...হয়তো এ কেস-এরই ব্যাপারে? প্রদ্যোৎ নিজের মনে এ ঘটনাটার নাম দিয়েছে—‘দ্য কেস অফ দি মিসিং ল্যান্ডলর্ড’৷ আজকাল যে কোন ঘটনার ও মনে মনে একটা নামকরণ করে৷ কিন্তু, সে এই নামকরণের ব্যাপারটা অবিনাশ স্যরের সঙ্গে আলোচনা করতে লজ্জা পায়৷

অথচ, পুরো ব্যাপারটাই কিন্তু ওর অবিনাশ স্যরের কাছ থেকে পাওয়া৷ অবিনাশ স্যরই ওকে শিখিয়েছে, শুধু অফিসের কাজ করলেই যথেষ্ট নয়৷ তোমার নিজের মনের প্রশার দরকার৷ এর জন্য বই পড়া দরকার, আর কিছু পড়তে ইচ্ছে না হয়৷ অন্ততঃ ডিটেকটিভ বই পড়ো৷ কত নামকরা লেখক ইংরেজিতে ডিটেকটিভ বই লিখে গেছেন৷ আর্থার কোনান ডয়েল, অ্যাগাথা ক্রিস্টি, ডরোথি সেয়ারস, জি কে চেষ্টারটন৷ আর তাদের কী এক একটা অবিস্মরণীয় সৃষ্টি৷ শার্লক হোমস, মিস মারপলস, হারকিউল পয়রো, ফাদার ব্রাউন৷ এদের পড়ো, পড়লে তোমার মনের প্রসার হবে৷ নতুন ভাবে তুমি চিন্তা করতে শিখবে৷

অবিনাশ স্যরের কথায় উৎসাহিত হয়েই প্রদ্যোৎ পাড়ার একটা লেন্ডিং লাইব্রেরীর মেমবার হয়েছে৷ এই দোকানটাতে মেইনলি ইংরেজি বই থাকে৷ এই দোকানটাতেই পুরোনো বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওর পরিচয় হয়েছে পেবি মেসন-এর সঙ্গে৷ কত যে লিগাল ঘটনা নিয়ে লিখেছেন ভদ্রলোক৷ ‘কোর্টরুম ড্রামা’ ওর পড়তে খুব ভাল লাগে৷

প্রদ্যোৎ-এর জন্য অরিন্দম বসাকের ছেলে অপ্রতিম আগে থেকেই প্রস্তুত চিল৷ ও যাওয়া মাত্র একটা ডায়েরি থেকে বেনারসের নাম্বার বার করে ল্যান্ড লাইন থেকে ডায়েল করে৷

—হ্যালো...কে বলছেন...শিবু কাকু? আমি অপ্রতিম বলছি...একবার বাবাকে দেবেন?

টেলিফোন কানে নিয়ে অপ্রতিম একটুক্ষণ অপেক্ষা করে৷

—হ্যাঁ বাবা? শোন, তোমার সঙ্গে এক ভদ্রলোক কথা বলতে চান৷ উনি পুলিশ থেকে এসেছেন৷

—কী বললি? পুলিশ থেকে? মরণ আমার...পুলিশ আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় কেন?

টেলিফোনে অরিন্দম বসাকের গলা প্রদ্যোৎ স্পষ্ট শুনতে পায়৷

—আমি আবার কী অপরাধ করলাম শুনি?

—বাবা...বাবা প্লিজ...অত চেঁচিয়ে কথা বোলো না৷

অপ্রতিম গলা নীচু করে টেলিফোনে কথা বলে৷

—ভদ্রলোক সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন৷

—সামনে দাঁড়াব...পেছনে দাঁড়াব৷ তাই দিয়ে আমার কী এসে গেল!তার জন্য আমায় ফিস্‌ ফিস্‌ করে কথা বলতে হবে?

—বাবা, তুমি একটু...

—তুই চুপ কর্‌... দেখি কার সঙ্গে কথা বলতে হবে৷ তাকে লাইনটা দে৷

—প্লিজ কিছু মনে করবেন না৷

টেলিফোনের মুখটা হাত দিয়ে চেপে অস্বস্তির সঙ্গে অপ্রতিম কথাটা বলে৷

—আমার বাবা একটু একসেনট্রিক গোছের মানুষ৷ যাকে যখন খুশি দুমদাম চারটে কথা শুনিয়ে দিতে পারেন৷ ওটা আসলে কিন্তু উনি মীন করে বলেন না৷

প্রদ্যোৎ-এর বুঝতে অসুবিধে হয় না অরিন্দম বসাক লোকটি খুব সহস প্রকৃতির নয়৷ এবং এর সঙ্গে ওকে একটু সামঝে কথা বলতে হবে৷

—হ্যালো...কে কথা বলছেন?

টেলিফোন অরিন্দম বসাকের চড়া গলা ভেসে আসে৷ ভদ্রলোক কানে খাটো নয়তো? প্রদ্যোৎ লক্ষ্য করে দেখেছে, যারা কানে কম শোনে, তাদের মধ্যেই চেঁচিয়ে কথা বলার প্রবৃত্তিটা বেশি৷

—প্রদ্যোৎ মিত্র বলছি৷ আমি কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করি৷

গম্ভীর গলায় প্রদ্যোৎ উত্তর দেয়৷

—খুব ভাল কথা৷ তা...আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন সেটা জানতে পারি? কোন কেস আছে নাকি আমার এগেনস্টে?

—আমিতো তা বলিনি৷

—তাহলে কী বলতে চাইছেন, সেটা চটপট বলবেন কী?

—না...আমি যাস্ট আপনার খোঁজ নিচ্ছিলাম৷ মানে...আপনি ঠিক ঠাক আছেন তো.

প্রদ্যোৎ হঠাৎ করে ভেবে পায় না ভদ্রলোককে ও কী প্রশ্ন করবে৷

—তার মানে? আমি আবার বেঠিক থাকতে যাব কেন?

—না...আমাদের কাছে খবর আছে আপনি গত তিন মাস যাবত নিখোঁজ৷

—অ...কলকাতায় না থাকলেই বুঝি মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়?

—সরি...আমাদের কাছে তাহলে ভুল ইনফরমেশন এসেছে৷

—যাক৷ এবার আমার খোঁজটা পেয়েছেন তো? তাহলে দয়া করে ফোনটা আমার ছেলেকে দিন৷ ওর সঙ্গে কিছু দরকারি কথা আছে৷

—দিচ্ছি, তবে তার আগে আমার একটা প্রশ্ন আছে৷

অদূর ভবিষ্যতে আপনি কী কলকাতায় আসছেন?

প্রদ্যোৎ-এর মনে হল, টেলিফোনে কথাবার্তা সবই হল, তবু একবার চাক্ষুস দেখা হয়ে গেলে সব সন্দেহের অবসান হয়ে যেত৷

—নাঃ! সেরকম কোন অভিপ্রায় আমার নেই৷ এখানে দিব্যি আছি৷ রোজ সন্ধেয় ঘাটে গিয়ে আরতি দেখি, তারপর বন্ধুর ট্যাঁক ভেঙে বাবা বিশ্বনাথের গলিতে গিয়ে রাবড়ি খেয়ে তারপর বাড়ি ফিরি৷ আর, তাছাড়া কলকাতায় গেলেই তো আবার বউ আর ছেলের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধবে৷

যা ছিটিয়াল স্বভাব ভদ্রলোকের, প্রদ্যোৎ ভাবে৷ শুধু বউ আর ছেলে কেন...যে কোন লোকের সঙ্গেই ওর ঝগড়া বাঁধবে৷

প্রদ্যোৎ ভদ্রলোকের বেনারসের ঠিকানা জানতে চাইলে মিস্টার বসাক জানায় যে ওখানকার ঠিকানা জানানোর আপাততঃ কোন প্রয়োজন উনি দেখছেন না৷ ফোনটা ছেলের হাতে দেবার আগে অরিন্দমবাবুর কাছ থেকে আর এক প্রস্থ বিশুদ্ধ জ্ঞান ওকে শুনতে হয়৷

—শুনুন...পুলিশদের কী আর অন্য কোন কাজ নেই নাকি যে ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াতে বেরিয়েছেন? প্রত্যোক দিন খবরের কাগজে এই যে জাল, জুয়াচুরি, খুন, রাহাজানি, তহবিল ও দৃরূপ আর বলাৎকারের যে সব কেস বেরোচ্ছে, সেগুলোর দিকে আগে নজর দিন, সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করুন৷ নাঃ...তা না করে কোন রিটায়ারড লোক খোঁজ না নিখোঁজ সেই নিয়ে আপনারা পড়ে আছেন৷ যাকগে, আপনার সঙ্গে অনেক বক বক করা হয়ে গেছে৷ আপনি এখন আমার খোঁজ পেয়ে গেছেন তো৷ এরপর, দয়া করে এখানে ফোন করে আর জ্বালাতন করবেন না৷

লাইনটা অপ্রতিমকে দিতে ভদ্রলোক কর্পোরেশন ট্যাক্স দেওয়ার কী বাকি আছে না আছে, সে নিয়ে পুত্রের সঙ্গে আলোচনা করতে থাকে৷ বাবাঃ! টেলিফোনটা দিয়ে প্রদ্যোৎ যেন মুগুি পায়৷ এতক্ষণ লেকচার শুনে ওর কান ঝাঁ ঝাঁ করছে৷

কলটা শেষ হলে অপ্রতিম একটু লজ্জিত ভাবেই প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷

—সরি, আসলে আমার বাবা ঐ রকমই লোক৷ কিছু মনে করলেন না তো?

প্রদ্যোৎ মাথা নেড়ে না জানায়৷

—যাক্‌৷ আমার বাবাকে দিয়ে এখন আর কোন সংশয় নেই তো?

প্রদ্যোৎ আবার মাথা নেড়ে না জানায়৷

প্রদ্যোৎ ওখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় অপ্রতিম শুধু একটাই কথা বলে৷

—গুজবে অত কান দিতে নেই৷

কথাটায় প্রদ্যোৎ-এর খুব মনে লাগে৷ নিজের ওপরে ভীষণ রাগ হয়৷ সত্যিই তো, কার না কার পাঠানো উড়ো চিঠি...তার উপর ভিত্তি করে ও একটা ইনভেস্টিগেশন শুরু করে দিল? আসলে চিঠিটা পড়ে ও মনে মনে অনেক কিছু কল্পনা করে ফেলেছিল৷ হয়তো বা ঐ অন্তর্ধানের পেছনে কোন গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে, যার দ্বার উৎঘাটন একমাত্র প্রদ্যোৎই করতে পারে৷

ওর চিন্তাটা যে একদমই ভুল সেটা আজ হাতে নাতে প্রমাণ হয়ে গেল৷ ভদ্রলোক বহাল তবিয়তে বেনারসে তার বন্ধুর সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে৷ আর, ও কলকাতায় বসে শুধু শুধু লোকটির সম্বন্ধে নানারকম চিন্তা করে যাচ্ছে৷ ব্যস, আর না৷ এখানেই ‘দ্য কেস অফ দি মিসিং ল্যান্ড লর্ড’—এর যবনিকা পাত৷ অবিনাশ স্যরের ভাষায়—‘এন্ড অফ দি স্টোরি৷’

মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক৷ প্রদ্যোৎ হয়তো আর কয়েকদিনের মধ্যেই অরিন্দম বসাকের কথা ভুলে যেত, যদি না লালবাজারে শত শত চিঠির মধ্যে আবার একটা উড়ো চিঠি এসে না পড়তো৷ আর পড়বিতো পড় সেটা ঠিক প্রদ্যোৎ-এরই হাতে এসে পড়ে৷

এখানে বলে রাখা ভাল যে লালবাজারে প্রত্যেকদিন এত চিঠি আসে যে তার সটিং করা কোন একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়৷ এবং যদিও এটা প্রদ্যোৎ-এর কাজ নয়, তবু অনেক সময় ও যেচে এই চিঠি সটিং-রে কাজটা নিজের ঘাড়ে চাপায়৷ কারণ আর কিছুই নয়, সব ব্যাপারে ওর অদম্য উৎসাহ এবং ঔৎসুক্য৷ কোন চিঠির মধ্যে যদি ভুল করেও কোন মার্ডার বা মিস্টারির গন্ধ পাওয়া যায়৷

চিঠিটা দেখে প্রদ্যোৎ-এর চিনতে ভুল হয় না৷ সেই একই রকম গোটা গোটা অক্ষরে হাতের লেখা৷ এবারও চিঠির শেষে পত্র লেখক কিম্বা লেখিকার কোন নাম নেই৷

চিঠিটা হাতে নিয়ে প্রদ্যোৎ একটুক্ষণ ভাবে৷ চিঠিটা হাতের মুঠোয় মুষড়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে টিপ করে ছুঁড়ে মারলেই সব অশান্তির শেষ হয়ে যায়৷

কিন্তু, একজন অনেস্ট পুলিশ অফিসার হিসেবে (প্রদ্যোৎ এখনও পর্যন্ত নিজেকে অনেস্টইভাবে) সেটা কী ওর করা উচিত? কী মনে করে শেষপর্যন্ত প্রদ্যোৎ চিঠিটা আর ফেলে না৷ কেন যেন ওর মনে হয় স্যরকে চিঠিটা দেখানো উচিত৷ ওর মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা ক্ষীণ আশা হঠাৎ ঝিলিক মেরে যায়৷ হয়তো তাহলে ‘দ্য কেস অফ দি মিসিং ল্যান্ডলর্ড’ এখনও শেষ হয়ে যায় নি৷

—স্যর...আবার সেই উড়ো চিঠি৷ এবারেরটা বলতে পারেন, মোর স্পেসিফিক৷

অবিনাশ স্যরের সঙ্গে কাজ করতে করতে আজকাল প্রদ্যোৎ-এর মধ্যেও অনেক সময় ইংরেজি কথার ব্যবহার চলে আসছে৷

—কই দেখি৷

হাত বাড়িয়ে স্যর ওর কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়া শুরু করে৷ চিঠিটা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই স্যর টেবিলে রাখা ব্রাউন কফি মাগটার থেকে চুমুক দেয়৷ প্রদ্যোৎ জানে কফি মাগটাতে কফি নেই, আছে হরলিকস্‌৷

দু‘বছর আগে স্যরের পেটে আলসার হয়েছিল৷ বেশ ভাল রকমের গন্ডগোল৷ প্রায় কেমাস নার্সিং হোমে থাকতে হয়েছিল৷ ও একদিন গিয়েছিল স্যরের সঙ্গে দেখা করতে৷ এই কফি মাগটাই দেখেছিল ওখানে৷

—বুঝলে মাস্টার...এখন থেকে বিকেলবেলায় এটাই আমার বরাদ্য৷ হরলিকস৷ সঙ্গে দুটো থিন অ্যারারুট কিম্বা ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কিট৷

প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকিয়ে স্যর একটু বিষন্ন ভাবে হাসে৷

—আমার ‘ম্যাচো’ ইমেজটা বোধহয় আর রইল না, বুঝলে৷ গত দু’বছর ধরে প্রত্যেকদিন বিকেলে স্যর এই একটা জিনিসই খেয়ে আসছে৷ হরলিকস, আর ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কিট৷ কিন্তু খায় ব্রাউন কফি মাগটার থেকে৷ ওটার মধ্যেই যেটুকু আনন্দ৷

—পুলিশ স্যর...অবিনাশ স্যর চিঠিটা জোরে জোরে পড়ে ৷

—আপনিরা বোধহয় গরিবের কথাটা বিশ্বাস করলেন না৷ একবার তার বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলেই আপনাদের কাজ সারা হয় না৷ দেখুন ও নিখোঁজ না শেষ পর্যন্ত গুম হয়েছে৷ অরিন্দম বসাক লোকটা ভাল ছিল গো৷ ইতি...

এবারেও চিঠির শেষে কোন নাম নেই৷

—বুঝলে প্রদ্যোৎ...

অবিনাশ স্যর একটুক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷

—লোকটি কিন্তু আমরা কী করছি না করছি, তার পুরো ট্র্যাক রাখছে৷

—স্যর...৷ কথা বলার আগে প্রদ্যোৎ একটু ইতস্তত করে৷

—লোকটি? না, মহিলাটি?

—কোয়াইট রাইট৷ অবিনাশ এই ব্যাপারে প্রদ্যোৎ-এর সঙ্গে একমত৷ —হাতের লেখা তাই সাজেস্ট করছে৷ এবং ‘লোকটা ভালছিল গো, যাকে বলা যায় টিপিকালি মেয়েলি সম্বোধন৷ অবিনাশ রায় যে এই মহিলার সম্বন্ধে আরেকটা সাংঘাতিক ধারণা পোষণ করে আছে, সেটা সে আর প্রদ্যোৎকে মুখ ফুটে বলে না৷

—এবং, খুব সম্ভবতঃ ওয়ার্কিং ক্লাস৷

কথাটা শুনে অবিনাশ প্রদ্যোৎ-এর দিকে মুখ তুলে তাকায়৷

—সরি স্যর...হয়তো একটু বেশি বলা হয়ে গেল৷

অর্ধেক খাওয়া চশমার ওপর দিয়ে অবিনাশ স্যর এমন করে তোমার দিকে তাকাবে, যে তাতে মনে হবে সে তোমার অন্তরাত্মা পর্যন্ত ভেদ করে সব কিছু দেখতে পাচ্ছে৷

—অন দি কনট্র্যারি...তোমার অবজারভেশন অত্যন্ত কারেক্ট৷

—স্যর...একটা কথা বলবো? প্রদ্যোৎ একটু মাথা চুলকে বলে৷

—অবশ্যই৷ সরি, তোমায় আগে জিজ্ঞেস করা হয়নি৷

একটু হরলিকস্‌ চলবে নাকি?

অবিনাশ স্যর হাতে ধরা ব্রাউন মাগ’টা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে৷

—না স্যর...

হরলিকসের প্রতি প্রদ্যোৎ-এর ছোটকাল থেকে অনীহা৷ দেখলেই মনে হয় রুগীর পথ্য৷

—আমি বরং একটু চা খাই৷

লালবাজারের দুধে ফোটানো চিনি দেওয়া চা৷ সেটা আবার প্রদ্যোৎ-এর জন্য গ্লাসে করে আসে৷ ক্যান্টিনের ছোট কাপে নাকি ওর তৃপ্তি হয় না৷

—গত শনিবার যখন আমি অরিন্দম বসাকের বাড়িতে যাই...৷

আমি সিঁড়ি দিয়ে যখন ওপরে যাচ্ছি মনে হল একতলার ফ্ল্যাটের দরজাটা যেন একটু ফাঁক করা৷ সেদিকে আমার চোখ যেতেই চট্‌ করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল৷

—সো?

—একতলায় যারা থাকে তাদের মধ্যে একজন খুবই কিউরিয়াস৷

বিশেষ করে দোতলায় কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে৷

—অতএব তুমি একতলায় গিয়ে বাড়িওয়ালার ব্যাপারে একটু অনুসন্ধান করে আসতে চাও, তাইতো?

—আপনার অবজারভেশন পাওয়ার...খুব কম লোকের মধ্যেই এটা আছে৷ আমাদের ডিপার্টমেন্টে থাকলে আপনি নির্ঘাত শাইন করতেন৷

তুলসীবাবুর ফ্ল্যাটে প্রদ্যোৎ অল্পক্ষণ মাত্র এসেছে৷ কিন্তু, এরই মধ্যে সে তুলসীবাবুকে হাত করে ফেলেছে৷

প্রদ্যোৎ-এর কথা শুনে তুলসী বাবুর বুক গরবে ভরে ওঠে৷ কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের একজন উদীয়মান অফিসার তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ এটা সত্যি সত্যি ভাবা যায় না৷

—দাঁড়িয়ে কেন...বসুন না? খুশি হয়ে তুলসীবাবু ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার প্রদ্যোৎ-এর দিকে এগিয়ে দেয়৷

—ওগো শুনছো? ভদ্রলোক এয়েচেন...ওর জন্য একটু চা বানিয়ে দাও না৷ তুলসীবাবু শোবার ঘরের দিকে তাকিয়ে অনুরোধ করে৷ চুনিবালাদেবী মাথায় ঘোমটা টেনে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করে৷

—তাহলে...এবার আমরা কাজের কথায় আসি?

প্রদ্যোৎ চেয়ারটা ভদ্রলোকর দিকে এগিয়ে আনে৷ তারপর, একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে ভদ্রলোকের কানের কাছে মুখ এনে ফিস্‌ ফিস্‌ করে বলে৷

—কিন্তু...একটা কনডিশন আছে৷ আমার সঙ্গে আপনার কী কথাবার্তা হচ্ছে সেটা যেন কেউ জানতে না পারে৷ প্রদ্যোৎ চোখের মনি ওপরের দিকে রোল করে বলে৷ —বিশেষ করে দোতলার কেউ তো একেবারেই না৷

—এই দিব্যি দিয়ে বলছি...কাউকে বলবো না৷ কেন...বাড়িওয়ালার কিছু হয়েছে নাকি?

—সে কথাতেই তো আসছি৷ আচ্ছা...বাড়িওয়ালাকে লাস্ট আপনি কবে দেখেছেন?

—তা বেশ কিছুদিন...দু’তিন মাসতো হবেই৷ কেন বলুন তো?

—সে কথায় পরে আসছি৷ প্রদ্যোৎ ভদ্রলোকের প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যায়৷

—এই যে দু‘তিন মাস ধরে ক্ষনি এখানে নেই...সেটা আপনার আনইউজুয়াল...মানে সন্দেহজনক লাগছে না? উনি কী এর আগেও এরকম কলকাতার বাইরে অনেকদিন কাটিয়ে এসেছেন?

—নাঃ! তুলসীবাবু বেশ কনফিডেন্টলি মাথা নাড়ে৷

—আমরা এ বাড়িতে এসেছি বার বছর হল৷ এর মধ্যে কখনও ওকে কলকাতার বাইরে যেতে দেখিনি৷

—গুড৷ প্রদ্যোৎ আবার নিজের গলা খাটো করে বলে৷

—আমাদের কাছে খবর আছে...ওপর তলার ভদ্রলোক গত তিন মাস যাবত নিখোঁজ৷ এমন কী তাকে গুমও করা হয়ে থাকতে পারে৷

—্যাঁ৷ বলেন কী! ভয়ে এবং বিস্ময়ে তুলসীরবাবুর চোখ গোলগোল হয়ে ওঠে৷

—এ বিষয়ে আপনার কী মত?

—দেখুন...৷ গলা পরিস্কার করে তুলসীবাবু শুরু করে৷

—ওরা থাকেন দোতলায়, আর আমরা একতলায়৷ তাই, সব সময় ওপরে কী ঘটছে না ঘটছে সেটা আমাদের ফ্ল্যাট থেকে জানা সম্ভব নয়৷

—তবু...আপনার তো অসাধারণ অনুসন্ধানী দৃষ্টি৷ বলা যায় না আপনার কানেরও হয়তো অসাধারণ শ্রবণ শগুি আছে৷ কথাটা শুনে তুলসীবাবু বেশ খুশি৷ প্রদ্যোৎ ভাবে লোকদের কাছ থেকে ইনফরমেশন বার করে নেওয়ার পদ্ধতিটা ও কেমন নিজে নিজেই আয়ত্ত করে ফেলেছে৷

—ওহ্‌, হ্যাঁ...একটা ঘটনা মনে পড়েছে৷ তবে, সেটা আপনাদের কাজে আসবে কিনা...

—আহা...সেটা আমি বুঝবো৷ আপনি বলুন না...

—বেশ কিছুদিন আগে একদিন ওপরের তলায় খুব ঝগড়া হচ্ছিল৷ সে প্রায় হাতাহাতি হওয়ার যোগাড়৷

—বলেন কী? কার সঙ্গে কার?

—এইতো আপনি মুশকিলে ফেললেন৷ ভদ্রলোক আম্‌তা আম্‌তা করে৷

—তবে মনে হচ্ছিল একদিকে ভদ্রমহিলা আর ছেলে, আর অন্যদিকে ভদ্রলোক৷

এমন সময় চুনিবালাদেবী মাথায় ঘোম্‌টা দিয়ে চায়ের কাপ হাতে বসার ঘরে আসে৷ ট্রে থেকে চায়ের কাপ নাবাবার সময় চুনিবালা একবার আড়চোখে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকিয়ে নেয়৷ এই তবে সেই ডিটেকটিভ! বাঃ...কী সুন্দর চেহারা৷ চওড়া কাঁধ, চৌকো চোয়াল৷ হঠাৎ চুনিবালা অনুভব করে বুকের ভেতর খুব জোরে, দুক্‌ দুক্‌ করে আওয়াজ হচ্ছে৷

—সাদা চা’টা আপনার...লাল চা’টা ওঁর৷

রান্নাঘরে ফিরে এসে ট্রে’টা হাতে নিয়ে চুনিবালা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে৷ তারপর, কোন একটা জিনিস মনে করে চুনিবালার মুখ টক্‌টকে লাল হয়ে যায়৷

—হ্যাঁ...আপনি বলছিলেন ওপরের তলায় খুব ঝগড়া হচ্ছিল৷ চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে প্রদ্যোৎ আবার কাজের কথায় আসে৷

—হ্যাঁ হ্যাঁ...মনে হয় মা আর ছেলে মিলে কোন একটা বিষয় নিয়ে ভদ্রলোকের ওপর খুব রাগ করছিল৷

—আর ভদ্রলোক?

—না...ভদ্রলোকের গলা একেবারেই শোনা যাচ্ছিল না৷

—গুড়..ভেরি গুড৷

প্রদ্যোৎ এবার একটা সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্নতে চলে আস৷

—আচ্ছা, ধরুন ওপরের বাড়িওয়ালা বেশ কিছুদিনের জন্য বেড়াতে গেলেন৷ সেক্ষেত্রে নিজের জামা-কাপড়, ইত্যাদি নেজার জন্য সুটকেস, হোল্ডল-একটা কিছুতো নিশ্চয়ই সঙ্গে নিয়ে যাবেন, তাই না?

—অবশ্যই৷ তুলসীবাবু মাথা নেড়ে বলে৷

প্রদ্যোৎ লক্ষ্য করে ভদ্রলোক ওর কথা অধীর আগ্রহে নিয়ে শুনছে৷

—তা...আপনি এই গত কয়েক মাসের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে কোন সুটকেস বা বড় ট্র্যাভেল ব্যগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন?

—নাঃ৷

—অবশ্য, এমনতো হতেই পারে যে বাড়িওয়ালা এমন সময় বেরিয়ে গেছেন যখন আপনি বাড়িতে ছিলেন না?

—হতে পারে৷ তবে তার চান্স খুব কম৷

—কেন?

—কেননা, আমার স্ত্রীও আমার মতনই অনুসন্ধানী৷ আমি বাড়ি না থাকলে উনি কড়া নজর রাখেন বাড়িতে কে আসছে যাচ্ছে তার উপর৷ বুঝতেই তো পারেন, আমরা বয়স্ক লোক একতলায় থাকি৷ নিজেদের সেফটির জন্য হলেও এটা আমাদের করতে হয়৷ উনি নজর রাখলে একটা কাকপক্ষী পর্যন্ত ওঁর আগোচরে বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না৷

—ব্রিলিয়ান্ট! প্রদ্যোৎ-এর চোখ একবার রান্নাঘরের দিকে গিয়ে আবার তুলসীবাবুর মুখে ফিরে আসে৷ —অসাধারণ!

চায়ের কাপ শেষ করে প্রদ্যোৎ তুলসীবাবুর হাত নিজের হাতে জড়িয়ে ধরে৷

—আমাকে যে ইনফরমেশন আজ আপনি দিলেন, তার জন্য অজস্র অজস্র ধন্যবাদ৷ তারপর গলা তুলে বলে ঃ —চা’টাও কিন্তু খুব ভাল হয়েছে৷

কথাটা শুনে চুনিবালাদেবী রান্নাঘরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়৷

যাবার অগে প্রদ্যোৎ নিজের একটা কার্ড তুলসীবাবুর কাছে রেখে যায়৷

—বাড়িওয়ালার ব্যাপারে কোন ঘটনা, কোন কিছু যদি নতুন করে মনে পড়ে আমাকে কিন্তু জানাতে ভুলবেন না...প্লিজ৷

সে আপনার কাছে যত সামান্যই মনে হোক না কেন৷

কার্ডটা হাতে নিয়ে তুলসীবাবু নাড়াচাড়া করে৷ মুখে অদ্ভুত একটা হাসি৷ প্রদ্যোৎ মিত্রঃ সি আই ডি কলকাতা পুলিশ৷

ছেলেটি বলেছে ওদের লাইনে থাকলে নাকি তুলসীবাবু নির্ঘাৎ শাইন করতেন৷ তখন তাহলে ওঁর কার্ডে কী নাম লেখা থাকতো?

তুলসীচরণ তালুকদার ঃ সিনিয়র অফিসার, সি আই ডি, কলকাতা পুলিশ৷

—আমি আসি তাহলে?

৮ বেরিয়ে যাওয়ার আগে প্রদ্যোৎ লক্ষ্য করে তুলসীবাবুর স্ত্রী তখনও রান্নাঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে৷

—এবার আমাদের কী করা উচিত, স্যর? পরের দিন সকালে প্রদ্যোৎ অবিনাশ রায়ের কামরায় বসে প্রশ্ন করে৷ গতকালের ইতিবৃত্ত এরই মধ্যে অবিনাশ স্যরকে রিপোর্ট করা হয়ে গেছে৷

—হঁ...ব্যাপারটা একটা বেশ ইনটারেস্টিং স্টেজে এসে পৌঁছেছে৷ কী বলো...

অবিনাশ স্যর অন্যমনস্ক ভাবে নিজের থুঁতনিতে হাত বোলায়৷ কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করতে গেলে এই জিনিসটা করা অবিনাশ স্যরের অভ্যেস৷ যেন পরখ করে দেখছে দাড়িটা ঠিক মত শেভ করা হয়েছে কিনা৷

—আপনিতো স্যর এ কেসটা ক্লোজ করে দিতে চেয়েছিলেন৷ প্রদ্যোৎ অনুরোগের সুরে বলে৷

—ভুল...গর্হিত ভুল হয়ে গেছে আমার, স্যর হেসে বলে৷

—এবার তাহলে আমাদের ইংরেজিতে যাকে বলে—লেটস পু অন আওয়ার থিং কিং ক্যাপস৷

প্রদ্যোৎ উৎসাহিত হয়ে পকেট থেকে নোট প্যাড আর পেনসিল বার করে৷

—ওগুলো আবার কিসের জন্য?

হাফ চশমার ওপর দিয়ে স্যর নোটবইটার দিকে আড়চোখে তাকায়৷

—চিন্তা করাটাতো মগজের কাজ৷

প্রদ্যোৎ নোটবইটা আবার পকেটে ভরে রাখে৷

—আচ্ছা প্রদ্যোৎ...আমাদের ইনভেস্টিগেশনের বিষয় বস্তুটা কী?

—স্যর...বাড়িওয়ালা অরিন্দম বসাক সত্যি সত্যি নিখোঁজ কিনা সেটা জানা৷

—গুড৷ এখন, উড়ো চিঠিটার যদি আদৌ কোন যর্র্থথ থেকে থাকে, তাহলে অরিন্দম বসাক হয়তো আদৌ বেনারসে যায়নি৷ হয়তো, কলকাতাতেই কোথাও লুকিয়ে আছে, যেটা তার ছেলে এবং স্ত্রী অন্য কাউকে বলতে চায় না৷ এমতাবস্থায় আমাদের সবচেয়ে প্রথমে কী করা উচিত?

—স্যর, বেনারসে যোগাযোগ করা৷ আমাদের আগে শিয়োর হওয়ার দরকার অরিন্দম বসাক আদৌ বেনারসে যায়নি৷

—একসেলেন্ট৷ তাহলে, আগে ছেলের কাছ থেকে বাবার বেনারসের অ্যাড্রেস জেনে নাও, তারপরে বেনারসের এখন কে পুলিশ কমিশনার সেটা খবর নিয়ে দেখ৷ আমি তাকে একটা অফিশিয়াল চিঠি পাঠাচ্ছি৷

—তার বোধহয় দরকার হবে না, স্যর৷ প্রদ্যোৎ-এর মুখে হালকা হাসি৷

—গত শনিবার ছেলেটি যখন বেনারসে ওর বাবাকে ফোন করছিল, তখন ঘাড় কাত করে আমি ডায়েল করা নাম্বারটা দেখে নিয়েছিলাম৷ ওখান থেকে বেরিয়েই আমি নাম্বারটা নোটবুকে লিখে রাখি৷

—গ্রেট! অবিনাশ সপ্রশংস দৃষ্টিতে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷

—বুঝলে প্রদ্যোৎ, যেই হোক না কেন একজন কেউ বেনারসে অরিন্দম বসাক সেজে বসে আছে৷ চান্সেজ আর...সে’তো আর সবসময় টেলিফোন আগলে বসে থাকবে না৷ বিশেষ করে একবার যখন টেলিফোনে তার সঙ্গে অলরেডি একবার কথা হয়ে গেছে৷ এখন বাজে...

অবিনাশ স্যর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে নেয়৷

—বেলা বারটা৷ হোয়াই নট কল নাও? যে ভদ্রলোক সেদিন বেনারসে ফোন ধরেছিল এখন সে খুব সম্ভবতঃ অফিসে৷ যেই কারণে অরিন্দমের ছেলে ইনসিস্ট করছিল যে ওর বাবার সঙ্গে বিশেষ করে শনিবারই কথা হোক৷ বেনারসের ভদ্রলোকের শনিবার মোস্ট প্রবেব্লি অফিস ছুটি৷ পকেট থেকে নোটবই বার করে প্রদ্যোৎ তখনই বেনারসে ফোন করে ৷ মোবাইলটা ও লাউড মোড-এ রাখে যাতে অবিনাশ স্যর ওদিকের কথা শুনতে পায়৷

—হ্যালো...কে কথা বলছো?

টেলিফোনে একজন মহিলার গলা৷

—আমি হরনাথ বলছি৷ টেলিফোনে প্রদ্যোৎ ইচ্ছে করেই অন্য একজনের নাম বলে৷ —কাকুকে একটু দাও না...

—কাকু?

—কেন, অরিন্দম কাকু?

—অরিন্দম কাকু? টেলিফোনে মহিলার গলা বিরগু শোনায়৷

—এখন আমি বলে চানে যাব আর উনি চান অরিন্দম কাকুকে৷ ও নামে এখানে কেউ থাকে না...যতসব ফালতু কল...

প্রদ্যোৎ কিছু বলার আগেই ওদিক থেকে লাইনটা কেটে দেওয়া হয়৷

—ফোন নাম্বার...আর ইউ শিয়োর ওটা ভুল লেখোনি৷ চশমার ওপর দিয়ে অবিনাশ স্যর ওর দিকে তাকায়৷

—না স্যর৷ নাম্বারটা আমি তখনই মনে মনে লিখে রেখেছিলাম৷ ঠিক এময় সময় টেবিলের ল্যান্ডলাইনটা বেজে উঠতে ওরা দু জনেই চম্‌কে ওঠে৷ দু’বার বাজার পর অবিনাশ প্রদ্যোৎকে রিসিভারটা তুলতে বলে৷

—হ্যালো...কী বললেন? নীচে একজন ভিজিটার এসেছেন...আমার সঙ্গে দেখা করতে চান? আমার সঙ্গে মানে...অবিনাশ রায়? না, প্রদ্যোৎ মিত্র? আচ্ছা...প্রদ্যোৎ মিত্র৷

টেলিফোনের মুখ চেপে প্রদ্যোৎ একবার অবিনাশ স্যরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে৷

—আমার সঙ্গে আবার কে দেখা করতে এল?

—আগে কলটা রিসিভ করো, তাহলেই জানতে পারবে৷ প্রদ্যোৎ টেলিফোনটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে কানে নেয়৷

—হ্যালো...কী নাম বললেন? তুলসী চরণ তালুকদার...ও হ্যাঁ হ্যাঁ৷

মনে পড়েছে৷ আপনাকে মনে থাকবে না...কী যে বলেন! তারপর, হঠাৎ এখানে? না না...আমাদের অসুবিধে হবে কেন? এক সেকেন্ড...প্রদ্যোৎ টেলিফোনের মুখ চেপে অবিনাশ স্যরের দিকে তাকায়৷

—তুলসীচরণ তালুকদার...‘মিস্টার অনুসন্ধানী দৃষ্টি’৷ ওপরে আসতে বলি? অবিনাশ মাথা নত করে৷

—অবশ্যই৷

একটুক্ষণ পরেই ঘরের পর্দা ফাঁক করে একজন কনস্টেবল তুলসীবাবুকে নিয়ে আসে৷

—আসুন...আসুন৷

প্রদ্যোৎ তুলসীবাবুকে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়৷

—তারপর...

চেয়ারে বসে তুলসীবাবু অত্যন্ত কৌতূহলের সঙ্গে ঘরের চারপাশে তাকায়৷ শেল্ফে রাখা ফাইল, দেয়ালে টাঙানো রবি ঠাকুরের ছবি, টেবিলে স্তপীকৃত কাগজ৷

—চা...কফি...কোল্ডড্রিঙ্কস...কী খাবেন বলল৷

তুলসীবাবুর তখনও অবিনাশ রায়ের চেম্বার দেখা শেষ হয়নি৷ সে প্রদ্যোৎ-এর প্রশ্নর কোন উত্তর দেয় না৷

—এটাই তাহলে লালবাজার!

তালুকদারের গলায় একটা কৃত্রিম, শিশুসুলভ বিস্ময়৷ চোখ বিস্ফারিত৷ ওর দৃষ্টি সারা ঘর ঘুরে আবার অবিনাশ রায়ের মুখে ফিরে আসে৷ প্রদ্যোৎ মনে মনে হাসে৷ স্যরের এমনই ব্যগুিত্ব যে ঘরে অনেক লোকজন থাকলেও তোমার চোখ ওর দিকেই যাবে৷

—আসলে...টেলিফোনেই কাজটা সারা যেত৷ কিন্তু, লালবাজারে আসাটর লোভটা সামলাতে পারলাম না৷ আগে কখনও আসিনিতো৷ আপনাকে...প্রদ্যোৎ স্যরের সঙ্গে তুলসীবাবুর ফরমালি পরিচয় করিয়ে দেয়৷

—এসেছেন...বেশ ভাল করেছেন৷

হাফ চশমার ওপর দিয়ে অবিনাশ রায় তুলসীবাবুর দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসি হাসে৷ ভাঁজ পরা, তোবরানো মুখের মধ্যে কোটরে বসানো জ্বলজ্বল করছে চোখ৷ এক মুহুর্ত্তর জন্যও স্থির নেই৷ সারাটা সময় ঘরের সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে৷

—অরিন্দম বসাকের ব্যাপারে আপনি অলরেডি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন৷ অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক সাহায্যে আসবেন৷

এখন বলুন কী ব্যাপারে...

অবিনাশ রায় ইচ্ছে করেই কথাটা অসমাপ্ত রাখে৷ তুলসীবাবু পকেট থেকে প্রদ্যোৎ-এর দেওয়া ভিজিটিং কার্ডটা বার করে৷

—আসলে প্রদ্যোৎবাবু বলেছিলেন অরিন্দম বসাকের ব্যাপারে নতুন কিছু মনে পড়লে জানাতে৷ হঠাৎ চলে এসে বোধহয় আপনাদের অসুবিধেয় ফেললাম৷

—না না...তা কেন ভাবছেন? তা...নতুন কিছু তথ্য মনে পড়েছে?

—হ্যাঁ, ব্যাপারটা একটু...গন্ডগোলের ঠেকছিল৷ ভরদুপুরে আমি ও বাড়ির ঠিকে কাজের মেয়েটিকে ওপরের তলায় যেতে দেখেছি৷ বেশ কয়েকবার৷

—তাতে কী প্রমাণ হল? কাজের মেয়েকী কখনও কারও বাড়িতে দুপুরবেলায় কাজে যায় না? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷

—অবশ্যই যায়৷ কিন্তু, তাই বলে সকালে একবার কাজ সেরে সেই বাড়িতেই নিশ্চয়ই দুপুরবেলায় আবার যায় না? তাও আবার চুপি সারে৷

—চুপি সারে?

অবিনাশ রায় ভুরু কুঁচকে তুলসীবাবুর দিকে তাকায়৷

—হ্যাঁ তাই৷ তুলসীবাবু শাঁসালো গলায় জবাব দেয়৷

—দুপুরবেলায় পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাওয়া৷ তারপর কলিংবেল না টিপে আস্তে করে দরজায় টোকা মারা...এসব চুপি সারে নয়তো কী?

—কিন্তু, আপনি এতো সব জানলেন কী করে? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷

—ঐ তো...আমার অনুসন্ধানী দৃষ্টি৷ দুপুরবেলায় এমনিতেই আমার ঘুম আসে না৷ তখন খবরের কাগজ পড়ি৷ আর চোখ-কান খোলা রাখি৷ —মানে...দরজা একটু ফাঁক করে সববার গতিবিধি লক্ষ্য করেন?

—তা বলতে পারেন৷ তাছাড়া কাজের মেয়েটির বেশ আঁটো সাঁটো শরীর তো, সহজেই চোখে পড়ে৷ সরি...

কথাটা বলেই তুলসীবাবু জিভ কাটে৷

—কথাটা আসলে বলতে চাইনি...হঠাৎ মুখ ফস্‌কে বেরিয়ে গেল৷

প্রদ্যোৎ আর অবিনাশের মধ্যে আড়চোখে একবার দৃষ্টি বিনিময় হয়৷ অবিনাশ স্যরের মুখে চাপা হাসি৷

—আরেকটা জিনিস...জানিনা এ ঘটনার সঙ্গে বাড়িওয়ালার নিখোঁজ হওয়ার কোন সম্পর্ক আছে কিনা৷

—তবু বলুন না...

—অল্প কিছুদিন আগে, আমাদের ফ্ল্যাটের বেসিনে হঠাৎ কাল্‌চে লাল জল পড়ছিল৷ পাইপে মরচে ধরলে যেরকম হয়৷ আমি ওপরে গিয়ে খুব রাগারাগি করতে বিকেলবেলায় আবার জলটা ঠিক হয়ে যায়৷

—দুপুরে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজের মেয়ের দোতলায় যাওয়া...তার কিছুদিনের মধ্যেই বাড়িওয়ালা মিসিং...আর তারপর ট্যাপ দিয়ে মরচে ধরা জল বেরোনো...হাউ রিমারকেবল!

থুঁত্‌নিতে হাত বোলাতে বোলাতে অবিনাশ রায় স্বগতোগুি করে৷

—আচ্ছা তুলসীবাবু, মনে করার চেষ্টা করুন তো মাস তিনেক আগেআপাদের বাড়ির ছাতে কোন কনষ্ট্রাকশনের কাজ হয়েছিল কিনা৷ ধরুন চুন সুড়কি সিমেন্ট এসব বস্তা করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কী?

—তিন মাস আগে...দাঁড়ান ভেবে দেখি৷ সিমেন্ট? হ্যাঁ মনে পড়েছে৷ একজন রাজমিস্ত্রি তার সঙ্গে পাঙ্গ ছাতে কয়েকদিন কাজ করেছিল বটে৷ জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল জল ছাত হচ্ছে৷ কিন্তু সেটা...তুলসীবাবু হঠাৎ কথা বন্ধ করে অবিনাশ রায়ের দিকে তাকায়৷

—আপনি এখানে বসে জানলেন কী করে?

তুলসীবাবুর মত প্রদ্যোৎও হতবাক হয়ে অবিনাশ স্যরের দিকে তাকিয়ে থাকে৷

—আরেকটা কথা...৷ অবিনাশ রায় তুলসীবাবুর প্রশ্ন উপেক্ষা করে আবার জিজ্ঞেস করে৷ —আপনার ট্যাপে সো কলড মর্‌চে ধরা জল পড়ার দুয়েকদিন আগে আপনাদের ওখানে কী বৃষ্টি পড়েছিল? বেশ দু এক পশ্‌লা?

—বৃষ্টি? তুলসীবাবু কী একটা কথা বলতে গিয়ে আর বলতে পারে না৷ মুখ হাঁ করে শুধু অবিনাশ রায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে৷

—আপনি কে মশাই...সত্যি করে বলুন তো?

—বলুন না...বৃষ্টি পড়েছিল কি না?

অবিনাশ রায় তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তুলসীবাবুর দিকে তাকিয়ে আছে৷

—হ্যাঁ, পড়েছিল৷ তুলসীবাবু ফ্যাল ফ্যালে দৃষ্টিতে একবার অবিনাশ রায় আরেকবার প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷

—এ ভদ্রলোক অন্তর্যামী নাকি?

—থ্যাঙ্ক ইউ তুলসীবাবু...৷ অবিনাশ স্যর চেয়ার ছেড়ে উঠে তুলসীবাবুর সঙ্গে করমর্দন করে৷ —আপনার স্মরণ শগুি এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ৷ তা...আপনি এখন বাড়িতেই ফিরে যাবেন তো?

তুলসীবাবু এখনও কথা বলার শগুি ফিরে পায়নি৷ শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়৷

—চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি৷ আমরা ওদিকেই যাচ্ছিতো৷

অবিনাশ এবং প্রদ্যোৎ যখন অরিন্দম বসাকের বাড়ি গিয়ে পৌঁছয়, তখন বেলা একটা বাজে৷ দরজায় কলিং বেল টিপতে অরিন্দমের ছেলে অপ্রতিম দরজাটা খুলে দেয়৷ এ সময়ে ওর অফিসে থাকার কথা৷ কিন্তু, প্রদ্যোৎ-এর কাছ থেকে একটা রহস্যজনক ফোন কল পেয়ে সে অফিস থেকে চলে এসেছে৷

—আপনার সঙ্গে একটা অত্যন্ত জরুরী কথা আছে৷ সব কাজ ফেলে...

—মানে? আমি এখন অফিসে৷ আমার পক্ষে এখন যাওয়া...

—বললাম যে...সব কাজ ফেলে বাড়ি চলে আসুন৷

টেলিফোনে অপ্রতিমের সঙ্গে শুধু এইটুকুই কথা হয়েছিল৷

—কী ব্যাপার বলুনতো?

দরজা খুলেই অপ্রতিম বেশ ঝাঁজালো গলায় জিজ্ঞেস করে৷

—কোন কথা নেই, বার্তা নেই...হুট করে অফিসের সব কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে বললেন৷ আপনাদের কথা যেন সত্যি সত্যি জরুরী হয়৷

—ট্রাস্ট মি৷ উত্তরে অবিনাশ বলে৷—আমাদের ‘জরুরী’ কথায় আপনি ডিজ্যাপয়েন্টেড হবেন না৷

—আপনাকে তো...ঠিক চিনতে পারলাম না৷

অপ্রতিম অবিনাশ রায়ের দিকে ভুরু তুলে তাকায়৷

—উনি অবিনাশ রায়...লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের বস৷ অপ্রতিমের মা’কে দেখা গেল ভেতরের দরজার সামনে ঘুর ঘুর করছে৷

—আপনিই বোধহয় অরিন্দম বসাকের স্ত্রী...৷ অবিনাশ রায় মহিলাকে সম্বোধন করে বলে৷—তা...ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? আপনি ও আমাদের কাছে এসে বসুন৷ ‘জরুরী’ কথাটা খুব সম্ভবতঃ আপনার বেলায়ও প্রযোজ্য৷ কোন কথা না বলে ভদ্রমহিলা বসার ঘরে এসে বসে৷

—অপ্রতিমবাবু...৷ দুহাতের আঙুল জড় করে অবিনাশ থুঁতনির নীচে রাখে৷ —এবার বলুনতো, সত্যি সত্যি আপনার বাবা অরিন্দম বসাক এখন কোথায়?

কথাটার উত্তর দিতে গিয়ে অপ্রতিম বেশ বিরগুই হয়৷

—আপনাদের তো বলেইছি, উনি এখন বেনারসে ওঁর বন্ধুর কাছে আছেন৷

এমন কী, গত শনিবার আমি প্রদ্যোৎবাবুর সঙ্গে ওনার সঙ্গে কথাও বলিয়ে দিয়েছি৷

অপ্রতিম প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷

—চুপ করে আছেন কেন প্রদ্যোৎবাবু...আপনার ‘বস’কে বলে দিন৷ উত্তরে প্রদ্যোৎ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, হাত তুলে অবিনাশ ওকে বারণ করে৷

—প্রদ্যোৎবাবু অ্যাকচুয়ালি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন তার প্রমাণ কোথায়?

—মানে...আপনি বলতে চান এখন আমি বেনারসে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করি? এবার কী আপনাকে কনভিনস করার জন্য?

অপ্রতিম ইচ্ছে করেই ‘আপনাকে’ কথাটার ওপর বিশেষ করে জোর দিয়ে বলে৷

—প্লিজ গো অ্যাহেড়..আপনার বন্ধুটি যিনি বেনারসে আপনার বাবা সেজে বসে আছেন...তিনি অভিনয়টা করেন খুবই ভাল...কিন্তু তার ফল স্বরূপ এখন ওঁকে জেল খাঁটতে হবে...অ্যাজ এ অ্যাকসেসরি টু মার্ডার...

—আমার বন্ধু বেনারসে বাবা সেজে...আপনি এসব কী আজে বাজে কথা বলছেন?

—ফোনটা করুন না...আমি চাই আপনি জানুন আপনার বন্ধুর এখন কী অবস্থা!

—মানে আপনি কী বলতে চাইছেন?

টেলিফোনটা করতে গিয়েও অপ্রতিম থেমে যায়৷

—আমি বলতে চাইছি যে আপনার বাবা খুব সম্ভবতঃ কখনই বেনারসে যান নি৷ উনি গত তিন মাস যাবত এ বাড়িতেই আছেন৷

—এ বাড়িতে...আর ইউ ম্যাড?

পরের কথাটা অপ্রতিম বেশ শ্লেষ দিয়ে বলে৷

—বেশ তো...উনি যদি এখানেই লুকিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের বাড়ি সার্চ করে দেখুন৷

—বাড়ি সার্চ করলে কী ওঁকে পাওয়া যাবে? নাকি, আমাদের ছাতে যেতে হবে?

এবার কিন্তু অপ্রতিমের সঙ্গে সঙ্গে প্রদ্যোৎও অবাক হয়ে অবিনাশের দিকে তাকায়৷

—ছাতে থাকতে যাবেন কেন উনি? এসব হেঁয়ালির কী অর্থ জানতে পারি?

উত্তর দিতে গিয়ে রাগে ফেটে পড়ে অপ্রতিম৷

—অবশ্যই৷ তবে তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন৷ মাস তিনেক আগে আপনি ছাতে ঢালাইয়ের করিয়েছিলেন, তাই না?

—হ্যাঁ করিয়েছিলাম...কেননা ছাতের জল সীপ করে ঘরে আসছিল৷ কিন্তু, তার সঙ্গে আমার বাবার কী সম্পর্ক?

—আছে বৈকি৷ বলুনতো এ ছাড়া আর কোন কাজ করানো হয়েছিল কী?

—হয়েছিল৷ জলের ট্যাঙ্কটাকে ইঁট গেঁথে একটু তোলা হয়েছে৷ যাতে রুফ’টা ড্যামেজ না হয়৷

—যাদের দিয়ে এ কাজ করানো হয়েছিল সেই রাজমিস্ত্রিকে একবার ডাকা যায়?

—কেন?

—কেননা জলের ট্যাঙ্কটায়, যেখানে সিমেন্ট আর ইঁট দিয়ে উঁচু করা হয়েছে সে জায়গাতা ভাঙতে হবে৷

—ভাঙতে হবে...কোন দুঃখে বলুনতো?

—কেননা আপনার বাবা শ্রী অবিরন্দম বসাক সেখানেই লুকিয়ে আছেন৷ অবশ্য জীবন্ত অবস্থায় নয়৷ আপনারা...আপনি এবং আপনার মা ধারাল কোন অস্ত্র দিয়ে ওঁকে কেটে, সমরে ফেলে সমাধিস্থ করেছেন৷

—হাউ ডেয়ার ইউ টক টু মি লাইক দ্যাট৷ আপনি যা যা বলেছেন এভরিথিং ইজ এ লাই৷ এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান৷ গেট আউট অফ মাই হাউস৷

—আচ্ছা...৷ অবিনাশ রায় হেসে উত্তর দেয়৷—এটা কেন হয় বলুনতো? বাঙালি মাত্রই চটে গেলে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করে দেয়৷

—ইউ আর গোয়িং বিয়ন্ড ইয়োর লিমিট!

—হাতটা নামিয়ে অপ্রতিমবাবু৷ প্রদ্যোৎ লাফ দিয়ে এগিয়ে আসে৷

—আপনার সময় হয়ে গেছে৷ শান্ত ভাবে অবিনাশ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায়৷

—আপনাকে এবং আপনার মা’কে অরিন্দম বসাকের হত্যার জন্য অ্যারেস্ট করা হচ্ছে৷

—তখন থেকে কী সব ফালতু কথা বলে যাচ্ছেন...আপনারা এখান থেকে কেটে পড়ুনতো, যান৷

—নীচে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ কনস্টেবল ডেকে দুজনকে হাত কড়া পরিয়ে নিয়ে যাব, না আপনারা স্ব ইচ্ছায় যাবেন?

অবিনাশ রায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অপ্রতিমের দিকে তাকায়৷

—আপনার বাবা’র বেনারসে যাওয়ার চাল’টা ভালই খেলেছিলেন৷ এমন কী আপনার কথা আমরা বিশ্বাসও করে নিয়েছিলাম৷ সবটায় বাগড়া দিল একটা দ্বিতীয় উড়ো চিঠি এসে৷ চিঠিটা একজন কাজের মেয়ের লেখা৷ এনি গেসেজ অপ্রতিম বাবু, চিঠিটা কার লেখা হতে পারে?

—মা...আমি তোমাকে তখনই বলেছিলাম ঐ বেশ্যা মাগিটাকেও শেষ করে ফেলা দরকার৷ নইলে, পরে আমাদের মুসকিলে পড়তে হবে৷ অপ্রতিম ক্ষোভের সঙ্গে ওর মা’র দিকে তাকায়৷

—কিন্তু, তুমি সেটা আমায় করতে দিলে না৷

—গুড...থানায় গিয়ে আপনাদের এই স্বীকারোগুিটা করতে হবে৷ প্রদ্যোৎ চলো, আমাদের এখানকার কাজ শেষ৷

—আসলে...৷ বিষণ্ণ্ দৃষ্টিতে অপ্রতিম নিজের হাতের দিকে তাকায়৷

—এছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় ছিল না৷ আমার বাবা বাড়ির ঠিকে ঝি জয়ার সঙ্গে এমন একটা বিচ্ছিরি কান্ড শুরু করেছিলেন যা বলা’র নয়৷ লিটারেলি, বুড়ো বয়সে ভীমরতি৷ এমন কী ভিটামিন খাওয়ানোর অছিলায় ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মা’কে বাবা দুপুরবেলায় ঘুম পারিয়ে রাখতেন৷ এবং তারপর চুপি চুপি জয়াকে বাইরের ঘরে এনে যাচ্ছেতাই কান্ড করতেন৷

অপ্রতিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে৷

—জানি এসব কথা বলে কোন লাভ নেই, তবু বলছি৷ একদিন কী কারণে যেন মা’র ঘুম ভেঙে যায়৷ বাইরের ঘরে এসে দেখেন ওর স্বামী বাইরের ঘরে আমাদেরই কেঙ্গ জয়ার সঙ্গে ...৷ অপ্রতিম আর বলতে পারে না৷ —আমরা বাবাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম৷ এমন কী ভয়ও দেখিয়েছিলাম৷ কিন্তু, কিছুতেই বাবাকে শোধরাতে পারি নি৷ শেষে জানতে পারলাম বাবা অন্য একটা পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে জয়ার সঙ্গে দেখা করছেন৷ এরজন্য উনি আলমাািরর ভেতর থেকে মা’র একটা সোনার বালা বার করে বাজারে বেচে দিয়েছিলেন৷

অপ্রতিম যখন এসব কথা বলছে, তখন ও’র মা কাঠের মত চেয়ারে চুপ করে বসে আছে৷

—এর পর উই হ্যাড নো চয়েস৷ হোয়াইল হি ওয়াজ স্লীপিং উই...অপ্রতিম আবার নিজের হাতের দিকে তাকায়৷

—ডেড বডিটা ছালায় ভরে ছাতে নিয়ে যাই৷ জলের ট্যাঙ্কের কাজ কয়েকদিন আগেই হয়েছিল৷ সেখান থেকে কিছু ইঁট সরিয়ে বাবা’র বডিটা ট্যাঙ্কের তলায় ঢুকিয়ে ইঁটগুলো চুন সুরকি দিয়ে আবার গেঁথে দিই৷ ভয় হয়েছিল, বডিটার গন্ধ হয়তো আশেপাশের বাড়ি থেকেও পাওয়া যাবে৷ আশ্চর্য, সেরকম কিছুই হয়নি৷

—রাজমিস্ত্রির কাজ সববাইকে দিয়ে হয় না৷

অবিনাশ রায় মৃদু হেসে বলে৷ —ইঁটগুলোর নতুন করে পুঁতবার সময় ট্যাঙ্কের পাইপটা ড্যামেজ হয়ে যায়৷ আর তাই দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে কালচে রগু পাইপটার ভেতর চলে আসে৷ যেটা আপনাদের একতলার ভাড়াটে মরচে ধরা জল বলে ভুল করেছিলেন৷

—তা হবে৷ শান্ত গলায় অপ্রতিম জবাব দেয়৷

পরের দিন ভোরবেলা৷ লালবাজারে অবিনাশ রায় নিজের ঘরে বসে একমনে কাজ করে যাচ্ছে৷ সামনের টেবিলটায় স্তপীকৃত ফাইল আর কাগজপত্র জমে আছে৷ এমন সময় পর্দা সরিয়ে প্রদ্যোৎ ঘরে ঢোকে৷ এক মুহুর্তর জন্য চোখ তুলে অবিনাশ স্যর আবার কাজ করতে থাকে৷

—বোসো৷

প্রদ্যোৎ বসে৷ অবিনাশ স্যরের টেবিল দেখে ওর হাত নিশপিশ করে সব কাগজপত্র গুছিয়ে রাখার জন্য৷ কিন্তু, উপায় নেই৷ স্যরের অর্ডার হয়েছে কেউ যেন ওর টেবিলে হাত না দেয়৷ কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে যখন যে কাগজটা দরকার হয় স্যর সেটা নিজে ঠিক খুঁজে বার করে নিতে পারে৷

—স্যর, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

প্রদ্যোৎ আর কিছুতেই প্রশ্নটা না করে পারে না৷

—আপনি কী করে বুঝলেন যে মরচে ধরা জল আসলে শুকিয়ে যাওয়া কাল্‌চে রগু?

—বলতে পার ইনটুইশন৷ ফাইল থেকে মুখ না তুলে অবিনাশ স্যর বলে৷

—উড়ো চিঠিটার থেকে আগেই অনুমান করেছিলাম কাজের মেয়েটির সঙ্গে ভদ্রলোকের কোন শারীরিক সম্পর্ক আছে৷ তোমাকে আর সেটা বলা হয়নি৷ তারপর, জানা গেল ভদ্রলোক বেনারসে নেই৷ হয়তো আদৌ ওখানে যান নি৷ তাহলে তিনি কোথায়? আর ঠিক সেই সময়ে একতলার ভাড়াটে কল দিয়ে মর্‌চে ধরা জল পড়ার কথা বললেন৷ হঠাৎ স্ট্রাইক করলো, মর্‌চে ধরা জলটা আসলে শুকিয়ে যাওয়া রগু জলের সঙ্গে মিশে হয়নিতো?

—আর কয়েকদিন আগে বৃষ্টি পড়ার ব্যাপারটা?

সেটা আপনি কী করে অনুমান করলেন?

—ভেবে দেখলাম...গত দিন মাসে একদিনও ট্যাপ দিয়ে ঘোলাটে জল পড়ে নি৷ হঠাৎ, এখন কেন এল? মনে হল, বৃষ্টির জল থেকে হতে পারে৷ এক পশ্‌লা ঝম ঝম করে বৃষ্টি হলে গলে যাওয়া মাংস আর শুকনো রগু ফেটে যাওয়া পাইপ দিয়ে জলের সঙ্গে মিশে যেতেই পারে৷ যেটা তুলসীবাবু মরচে ধরা জল ভেবেছিলেন৷

প্রদ্যোৎ সপ্রশংস দৃষ্টিতে স্যরের দিকে তাকিয়ে থাকে৷

—আরেকটা জিনিস স্যর...যেটা এখনও আমার কাছে খুব পরিস্কার নয়৷ জয়া হঠাৎ পুলিশকে এরকম উড়ো চিঠি দিতে গেল কেন? ও কী সত্যি সত্যি অরিন্দম বসাকের প্রেমে পড়েছিল?

অবিনাশ রায় হরলিকস-এর কাপ থেকে মুখ তুলে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷ তারপর একটা ছোট শোল্ডার শ্রাগ করে৷

—ইয়েস গেস ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ মাইন৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%