বরুণ চন্দ

শুক্রবার সন্ধে৷ আজ অফিসে অবিনাশ রায়ের সেরকম কাজ-কম্ম ছিল না৷ দুপুরে বড়সাহেব-অর্থাৎ ডি সি-র ঘরে একবার ডাক পড়েছিল৷ তারপর নিজের কামরায় ফিরে এসে মোটামুটি ‘ফাইল’ পুশিং’এ দিনটা কেটে যায়৷ অফিসার কাগজপত্র গুছিয়ে অবিনাশ যখন বেরুতে যাবে ঠিক তখনই ল্যান্ড লাইনে একটা কল আসে৷ টেলিফোনে একজন অপরিচিত মহিলা’র কণ্ঠস্বর৷
অবিনাশ রায় কলকাতা পুলিশের একজন সিনিয়র ডিটেকটিভ অফিসার৷ ক্রাইম ডিটেকশনে তিরিশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা৷ খোদ লালবাজারের অফিস, তেতলায় পেছনের দিকে৷ পুলিশ মহলে ওর অত্যন্ত সুনাম৷ অনেকের মতে কলকাতা পুলিশের ডিসি‘ণ পদটা ওর অনেক দিন আগেই প্রাপ্য ছিল৷ হয়নি সিরিফ নিজের দোষে৷ আজকাল নিজের কাজে শুধু ব্রিলিয়ান্ট হলেই চলে না৷ তুমি যে ক্রিলিয়ান্ট সেটা লোকমুখে বহুল ভাবে প্রচার করতে হবে৷ নিজের ঢাক পিটোনো’র ব্যাপারে অবিনাশ রায়ের চিরকালের অনিহা৷
আরেকটা কথা৷ কিন্তু-এ ক্রাইম ডিটেকশনের কাজ অবিনাশের পছন্দের৷ ডিসি’র পদে উন্নত হলে তাকে অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাজ করতে হয়, যেটা ওর একেবারেই পছন্দ নয়৷
—অবিনাশ রায় কথা বলছেন? মহিলা’র কণ্ঠে অনিশ্চয়তার ছাপ৷
—বলছি৷
—আপনার সঙ্গে একটা ব্যাপারে কথা ছিল৷ কথাটা...একটু কনফিডেনশিয়াল৷
—বলুন, শুনছি৷
—আমার স্বামী একটা বিদেশী আইটি কোম্পানিতে অফিসার৷ কাজের ব্যাপারে ওঁকে প্রায়ই বম্বে যেতে হয়৷ গতকাল উনি...মানে ওনার লেট ইভনিং ফ্লাইটে বম্বে যাওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু, বম্বে গিয়ে উনি বাড়িতে কল ব্যাক করেন নি৷
—বগুবটা আরেকটু সংক্ষিপ্ত করা যায়?
হাতঘড়ি’র দিকে তাকিয়ে াবিনাশ নিজের বিরগুি সম্বরণ করে৷
এখন পোনে ছ’টা বাজে৷ আজ ঠিক সাড়ে ছ’টার সময় শর্মিলা কোয়েস্ট-এ সিনেমা হলের বাইরে ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে৷ শর্মি আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছে৷
—মানে...আমার স্বামী...উনি গতকাল ইভনিং থেকে মিসিং৷
—ওঁর বম্বে অফিসে ফোন করে দেখেছেন?
—হ্যাঁ৷ এবং নর্মালি উনি যে হোটেলে গিয়ে ওঠেন...সেখানেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে৷ হি ইজ জাস্ট আনট্রেসেবল৷
টেলিফোনের মুখ চেপে অবিনাশ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে৷ হায় ভগবান! তার মানে আজকেও শর্মি’র সঙ্গে ওর ইভনিং শো’টা ক্যানসেলড৷ একেক সময় াবিনাশের ক্লান্ত লাগে৷ এমনিতে ওদের ন’টা-ছ’টা অফিস হলে কী হবে, হাতে কেস থাকলে সেটা ২৪ ইনটু ৭ গিয়েও দাড়াতে পারে৷
এ সময় প্রদ্যোৎটা থাকলে কাজে দিত৷ তাহলে, ও অন্ততঃ প্রিলিমিনারি এনকোয়ারিটা সেরে আসতে পারতো৷ কিন্তু, বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই প্রদ্যোৎ আজ আর আমি কালের জন্য ছুটি চেয়ে রেখেছে৷ ওর নাকি কিছু পারসোনাল কাজ রয়েছে৷
প্রদ্যোৎ-এর পুরো নাম প্রদ্যোৎ কুমার মিত্র৷ গত চার বছর অবিনাশের অ্যাসিসটেন্ট হয়ে কাজ করছে৷ অত্যন্ত বিশ্বস্ত, এবং সাধারণ বাঙালির ক্ষেত্রে যেটা খুবই বিরল৷ প্রদ্যোৎ কর্মবিমুখ নয়৷ বরং ওর সম্বন্ধে উল্টোটাই প্রবেশ প্রযোজ্য৷ হাতে কোন কাজ এলেই ও একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷
কিন্তু, ইদানীং অবিনাশ লক্ষ্য করেছে বিকেল সাড়ে পাঁচটা ছ’টা হলেই প্রদ্যোৎ উশখুশ করা শুরু করে৷ আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকায়৷ রায় মনে মনে হাসে৷ ছেলেটা মনে হয় প্রেমে পড়েছে৷ যেটা প্রদ্যোৎ-এর দিক থেকে খুবই অপ্রত্যাশিত৷ কেননা, প্রদ্যোৎ পোড় খাওয়া ছেলে৷ শৈশবে অ্যাক্সিডেন্টে ওর বাবা-মা একসঙ্গে মারা যায়৷ মামা বাড়িতে মানুষ৷ সুকল লাইফে ক্লাস কেটে সিনেমা দেখতে যাওয়া, পাড়ায় গুন্ডা-গর্জি করা এগুলো সব লেগেই ছিল৷ ওর কপালের বড় কাটা দাগটা সেই ডানপিটে জীবনের লক্ষ্য হয়ে রয়েছে৷
—হ্যালো, কোন কথা বলছেন না...লাইনটা ছেড়ে দিলেন নাকি?
—না, ছাড়িনি৷
বাধ্য হয়েই রায় টেবিল থেকে প্যাড আর পেন তুলে নেয়৷
—আপনি কোথায় থাকেন?
—টালিগঞ্জ৷
—এফ আই আর করেছেন?
—মানে...ঠিক বুঝতে পারলাম না৷
—লোকাল থানায় আপনার স্বামী মিসিং বলে ডায়েরি করেছেন?
—করেছি৷ কিন্তু তাতে খুব একটা ফল হবে বলে মনে হয় না৷
—একথা কেন বলছেন? রায়ের গলা গম্ভীর হয়ে যায়৷
—আজ বিকেলে থানায় গিয়েছিলাম৷ কিন্তু, ওরা খুব একটা আশা দিতে পারলেন না৷ বললেন, ছবি সব লোকল থানায় সারকুলেট করা হয়েছে৷ আমার স্বামী সম্বন্ধে কোন খবর পেলেই ওরা জানাবেন৷
—দেখুন...৷ রায় থুঁত্নি চুলকে বলে৷
—আপনার স্বামী হয়তো বা অন্য কোথাও গেছেন৷ দুয়েকদিনের মধ্যেই ফিরে...
—টালিগঞ্জ থানার ওসি’ও ঠিক এই কথাই বললেন৷ মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—আমি জানি আপনারা কী বলতে চাইছেন... ওনার অন্য কোথাও কারও সঙ্গে...
গলা ধরে যাওয়ার জন্যই বোধহয় মেয়েটি আর কথা শেষ করতে পারে না৷
—আই অ্যাম সরি৷
রায়ের হঠাৎ নিজেকে গিল্টি মনে হয়৷ মেয়েটির স্বামী’র সম্বন্ধে ওরকম কটাক্ষপাত করাটা ওর উচিত হয়নি৷
—হ্যাঁলো...
—হ্যাঁ শুনছি৷
মেয়েটি মনে হল চোখের জল মুছছে৷
—অ্যাড্রেসটা বলুন...আমি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার ওখানে পৌঁছচ্ছি৷
মেয়েটির ঠিকানা রায় লিখে নেয়৷
—ও হ্যাঁ...আপনার নামটাই এখনও জানা হয়নি৷
—করবী৷ করবী মুখার্জী৷
—নমস্কার৷
রায়ের সামনে যে মহিলা দরজা খুলে দাড়ায় তার বয়েস তিরিশের বেশি নয়৷ লম্বা, টানটান চেহারা৷ নীচু করে শাড়ি পড়ার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও রায়ের চোখ মেয়েটির কোমরের দিকে চলে যায়৷ রায় সেখানে কোন মেদ-এর চিহ্ণ দেখতে পায় না৷ কোন দাগও না৷
মহিলা মনে হয় নিস্বন্তান
—আমিই করবী৷ মহিলার মুখে ম্লান হাসি৷
—অ্যাড্রেস সপতে কোন অসুবিধে হয় নি তো?
—সেরকম না৷ আসলে প্রথম গলিটা মিস করে গিয়েছিলাম৷
—তাই আবার ব্যাক করতে হল৷
বসার ঘরে আর দু’জন ভদ্রলোক৷ তার মধ্যে একজন রিটায়ার্ড বলে মনে হল৷ বয়স্ক চেহারা৷ মাথায় একরাশ অগুছালো কাঁচা-পাকা চুল৷ পরণে পাঞ্জাবী-পায়জামা? যা খুব একটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন নয়৷
—পরিচয় করিয়ে দিই...আমার বাবা...মানে নন্দনের...
—প্রফুল্ল মুখার্জি৷ বয়স্ক ভদ্রলোক রায়কে নমস্কার জানায়৷
—আমি করবীর শ্বশুরমশাই৷
রায় অনিসন্ধিংসু দৃষ্টিতে ভদ্রলোকের দিকে তাকায়৷ অগুছালো চেহারা৷ বাড়িতে স্ত্রী নেই৷ থাকলে অবশ্যই বাইরের ঘরে, সবার সঙ্গে থাকতো৷ ভদ্রলোক কী তাহলে বিপত্নীক?
—আর ইনি কমলাক্ষ...আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড৷ বসার ঘরে অন্য লোকটির দেখিয়ে করবী বলে৷
—কমলাক্ষ আমার স্বামীর কলেজের বন্ধু৷
কালোর মধ্যে সুশ্রী চেহারা কমলাক্ষ’র বয়েস চল্লিশের বেশি নয়৷ কানের পাশে অল্প পাকা চুলের জন্য বেশ অ্যাট্রাকটিভ দেখায় ভদ্রলোককে৷
—আসলে নন্দনের খবর না পেয়ে আমরা সকলেই বিশেষ চিন্তিত৷ কমলাক্ষ চেয়ার ছেড়ে উঠে রায়কে নমস্কদ্ধার জানায়৷
—আপনারা সবাই বসুন৷
শাড়ির আঁচল দিয়ে করবী কোমর ঢাকে৷
—আমি আপনাদের জন্য চা করে আনি৷
—আমার জন্য না৷ রায় মাথা নেড়ে জানায়৷
—তাহলে ঠান্ডা কিছু?
—নো থ্যাঙ্কস৷
করবী ভেতরে চলে যেতে রায় একবার ঘরের আসবাবপত্র’র দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়৷ অফ হোয়াইট ফানিশিং৷ সিল্কের দামী কুশান কাভারস৷ দেয়ালে লেটেস্ট এসি৷
—গরম লাগছে...এসি’টা চালিয়ে দিই?
বোঝা যায় প্রফুল্লবাবু রায়ের দৃষ্টিকে ফলো করছে৷
—না না৷ আই অ্যাম ফাইন৷ কলেজে আপনারা কী পড়তেন? রায় কমলাক্ষকে জিজ্ঞেস করে৷
—কমপিউটার সায়েন্স...যাদবপুর কলেজ৷
—আপনার বন্ধু...উনি কী তাহলে সল্টলেক-এ কাজ করেন? সেকটার ফোর?
—ঠিক ধরেছেন৷ নন্দন সফটওয়েয়ার ডিজাইনার৷ ভেরি গুড পে৷ ঘরের আসবাবপত্র দেখে রায়েরও সেরকম ধারণাই হয়েছিল৷ টিপিকাল নুডো রিশ স্টেষ্ট৷ এমন কী জানলার পর্দা পর্যন্ত লেটেস্ট ফ্যাশান ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপন থেকে কপি করা৷ রায় ভাবে, এরা আরোহী৷ নতুন প্রজন্মের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷
—আর আপনি...আপনি কী করেন?
—আমি...রায়ের প্রশ্নে কমলাক্ষ একটু চমকে ওঠে৷
—আমার বিজনেস৷ কলকাতায় যতসব বড় বড় কোম্পানি আছে, আমি তাদের কম্পিউটার মেনটেন্যান্স-এর কাজ করি৷
—তাহলে প্রোফেশনালি আপনি ও খুব একটা খারাপ করছেন না, কী বলেন!
উত্তরে কমলাক্ষ একটু সলজ্জ হাসি হাসে৷ এমন সময় দরজায় কলিং বেল বাজে৷
—কমল...একটু দেখো না কে এসেছেন৷
ভেতর থেকে করবী’র গলা শোনা যায়৷ কমলাক্ষ থেকে কমল৷ যথেষ্টই ফ্যামিলিয়ারিটি রয়েছে তাহলে এদের দুজনের মধ্যে৷ সেটা কী শুধু স্বামীর বন্ধু হিসাবে?
প্রফুল্লবাবু উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছিল৷ কমলাক্ষ ওকে বাধা দেয়৷
—কাকু আপনি বসুন৷ আমি খুলে দিচ্ছি৷
—খুব সম্ভবতঃ টালিগঞ্জ থানার ওসি, মিস্টার তরফদার৷ রায় কমলাক্ষকে জানায়৷
—আমি ওনাকেও আসতে বলেছি৷
রায়ের ধারণাটাই ঠিক৷ দরজা খুলতে দেখা যায় থানার ওসি মিস্টার তরফদার৷ ঘরে ঢুকেই সে রায়কে বড় করে সেলাম ঠোকে৷
—স্যর...আপনার কল পাওয়া মাত্র হাতের সব কাজ ফেলে চলে এসেছি৷ বলুন কী করতে হবে স্যর৷
এই সময় ট্রে হাতে করবী ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷
—মিস্টার তরফদার আপনার নামে কমপ্লেন্ট আছে৷ করবীকে দেখেই তরফদার বুঝতে পারে ওকে কেন তলব করা হয়েছে৷
—স্যর...ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলছি৷
—যাস্ট ওয়ান মিনিট...তরফদারকে রায় হাত তুলে থামতে বলে৷
—আপনি এই ভদ্রমহিলাকে চেনেন?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই চিনি৷ উনিই তো কাল রাতে থানায় এসেছিলেন—ওঁর স্বামী মিসিং বলে ডায়েরি করতে৷ তখন অনেক রাত৷ সাড়ে বারটা একটা হবে৷ বলুন ঠিক বলছি কি না...
করবী’র দিকে তাকিয়ে মিস্টার তরফদার নিজের সাফাই গায়৷
—আমিইতো ওঁকে বললাম এফ আই আর করতে৷ আরে...আপনিওতো তখন ওঁর সঙ্গে ছিলেন৷
ঘরের মধ্যে উপবিষ্ট কমলাক্ষকে তরফদার চিনতে পারে৷
—ওর হাজবেন্দ-এর ছবি ফোটো কপি করে গতকাল রাত্রেই আমি কলকাতার সব থানাতে মেল করে দিয়েছি৷
—গুড, তারপর?
—তারপর উনি আজ সকালে থানায় খোঁজ নিতে এসেছিলেন৷ আমি কিন্তু অলরেডি সব হাঁসপাতাল, নার্সিংহোক এমন কী মর্গ-এ ও খবর নেওয়া শুরু করে দিয়েছি৷ গত ফরবিড়..ভদ্রলোকের যদি কোন অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গিয়ে থাকে৷
—তা...খবর নিয়ে কী জানতে পারলেন?
—এখনও পর্যন্ত কোন খবর নেই স্যর৷
হাত তুলে তরফদার রায়কে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে৷
—কিন্তু, আমি বলবো এক্ষেত্রে নো নিউজ ইজ গুড নিউজ৷ অন্ততঃ ধরে নেওয়া যেতে পারে ভদ্রলোকের কোন অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি৷
—মিস্টার তরফদার...
রায়ের মুখে হাসি থাকলেও ওর স্থির দৃষ্টি তরফদারের ওপর নিবদ্ধ৷
—এক্ষেত্রে যেটা সব চেয়ে আগে করা উচিত...আপনি কোন এনকোয়ারি ইনিশিয়েট করেছেন?
—এনকোয়ারি...ঠিক বুঝলাম না স্যর৷
—নন্দনবাবুর অফিসে গিয়ে খোজ নেওয়া হয়েছে?
—অফিসে...না৷ কেন বলুন তো?
—বাঃ! একজন ভদ্রলোক অফিসের কাজে বম্বে যেতে গিয়ে ভ্যানিশ করে গেলেন...আর আপনি তার অফিসে গিয়ে খবর নেবেন না?
—আসলে স্যর...আমরা হেভিলি আনডারস্টাফ... তরফদার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে৷
—তারপর...আমার অ্যাসিসটেন্ট ভৌমিক গেছে আবার বিয়ে করতে৷ কী যে করি...
—আমি বলছি আপনি কী করবেন...
রায় নিজেকে অনেক কষ্ট করে সংযত রাখে৷
—কাল ফার্স্ট থিং ইন দ্য মরনিং আপনি ওদের অফিসে গিয়ে খোঁজ নেবেন৷ ওঁর ম্যানেজমেন্ট, কলিগজ......সববাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, ওঁর ফ্রেন্ডজ কারা, ওঁর ক্লায়েন্ট লিস্ট, ওঁর কোন শত্রু আছে কিনা...সব কিছু জানা দরকার৷
—ইয়েস স্যর...
তরফদার একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—আমি আসলে ভেবেছিলাম ভদ্রলোকের নিখোঁজ হওয়া পেছনে অন্য কোন কারণ থেকে থাকতে পারে৷
—অবশ্যই থাকতে পারে৷ রায় ভুরু কুঁচকে জবাব দেয়৷
—কিন্তু তাই বলে আপনি আপনার দিক থেকে কোন এনকোয়ারি শুরু করবেন না?
—সরি স্যর৷
—মিস্টার তরফদার...আপনি এবার আসতে পারেন৷
—ইয়েস স্যর৷ নন্দনবাবুর অফিসের দিকটা আপনি দেখছেন৷ কাল সন্ধে’র মধ্যে আমি ফুল রিপোর্ট চাই৷
—স্যর আমি আজকে তাহলে...
তরফদার তৎপরভাবে উঠে দরজার দিকে পা বাড়ায়৷
—আর তরফদার...রায় করবীকে দেখিয়ে বলে৷
—কীপ হার ইনফরমড়..আমাদের নাগরিকদের জানা’র অধিকার রয়েছে৷
—ইয়েস স্যর৷
এই বলে টালিগঞ্জের ওসি তালুকদার তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়৷ এইসব সময়ে রায় প্রদ্যোৎকে খুব মিস করে৷ ও থাকলে একাই এসব এনকোয়ারিগুলো ম্যানেজ করে নিত৷
তরফদার চলে যাওয়ার পর কমলাক্ষও উঠে দাড়ায়৷
—আমিও তাহলে আজ উঠি...
—না না...চা’টা খেয়ে যাও৷ করবী কমলাক্ষকে বাধা দেয়৷
—তাছাড়া... আপনার সঙ্গেও কিছু কথা ছিল৷
রায়ের কথা শুনে কমলাক্ষ আমার বসে পড়ে৷
চা খাওয়ার পর প্রফুল্লবাবু উঠে দাড়ায়৷
—আমি একটু ভেতর থেকে আসছি৷
করবীও চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে ভেতরে চলে যায়৷
—এগুলো রেখে আসি...আপনারা কথা বলুন৷ বোঝাই যায় যে রায় যাতে একাকি কমলাক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে করবী তার পথটা করে দিল৷
—আপনার পুরো নাম?
—কমলাক্ষ মজুমদার৷
পকেট থেকে কমলাক্ষ নিজের ভিজিটিং কার্ড বার করে দেয়৷
—এর মধ্যে আমার বিজনেস ডিটেলস আছে৷ বাকি যা কিছু জানতে চান আমাকে স্বচ্ছন্দে প্রশ্ন করতে পারেন৷
কার্ডের উল্টোদিকে কমলাক্ষ বাড়ির ঠিকানা ও পারসোনাল ফোন নাম্বার লিখে দেয়৷
—আশা করি এ দিয়ে আপনার কাজ চলে যাবে৷
—থ্যাঙ্ক ইউ৷
কার্ডটা উল্টেপাল্টে দেখে রায় পকেটে গোঁজে৷
—কমলাক্ষবাবু...আপনি তো নন্দনকে কলেজ ডেজ থেকে চেনেন৷ ওর ব্যগুিত্ব সম্বন্ধে একটু বলতে পারেন?
—ব্যগুিত্ব...মানে?
—উনি কেমন মানুষ ছিলেন...খুব ফুর্তিবাজ৷ হই চই করতে ভালবাসে৷ নাকি, উইথড্রন...ইনট্রোভারট৷
—ইনট্রোভারটের দিকেই বলবো৷ তবে, খুবই বন্ধু বৎসল ছিল৷ তারপর কী মনে হতে কমলাক্ষ আবার অ্যাড করে৷
—এখনও তাই৷ বন্ধুদের জন্য সব কিছু করতে পারে৷
—যাদবপুর তো কো-এডুকেশনাল কলেজ, তাই না? কমলাক্ষ মাথা নত করে৷
—কলেজের সময় ওর কোন বান্ধবী ছিল...যার সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রয়েছে...এনি অ্যাফেয়ার্স?
—না...মেয়েদের বাপারে ও বরাবরই একটু লাজুক৷ বেশীর ভাগ সময় ও আমাদের সঙ্গেই কাটাতো৷
—হুঁ...৷ রায় থুঁত্নিতে হাত বোলায়৷ —করবী’র সঙ্গে তাহলে কবে আলাপ হয়? নাকি, ওটা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ?
কমলাক্ষ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—মনে হয় এ প্রশ্নের সদুত্তর করবীই দিতে পারবে৷
—কমলাক্ষবাবু...আপনি বিয়ে করেছেন...না অকৃতদার?
—না না...আমি অ্যাম ম্যারেড৷ হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
—যাস্ট লাইক দ্যাট৷
—এবার কী আমি আসতে পারি?
—যাস্ট একটা প্রশ্ন...রায় নিজের তর্জনী তুলে দেখায়৷
—কাল সন্ধে থেকে রাত অবধি আপনি কোথায় ছিলেন?
রায়ের প্রশ্ন শুনে কমলাক্ষ একটু বিস্মিত হয়৷
—আমি? বাড়িতেই ছিলাম৷
—এনি উইটনেস...আপনার স্ত্রী...কাজের লোক...এনিওয়ান?
—আমার স্ত্রী কাল বাড়ি ছিলেন না৷ আমার শ্বশুরমশায় অসুস্থ৷ তাই সোমা কাল বাবার কাছেই ছিল৷
আর কাজের লোকটি খাবার গরম করে চলে যায়৷
রাতে থাকে না৷
—তার মানে...আপনার অ্যাকচুয়ালি কোন উইটনেস নেই৷ কমলাক্ষ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—তা বলতে পারেন৷ কেন...আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন নাকি?
—না না ...রায়ের মুখে একটা তৈরি হাসি৷
—যাস্ট রুটিন প্রশ্ন৷
সিনেমা দেখতে আসবো বলে রায় এর আগে শর্মিলাকে কখনও ডিচ করে নি তা নয়৷ প্রথমের দিকে অবিনাশের ওপর খুব অভিমান হোত শর্মির৷ বিশেষ করে নতুন নতুন বিয়ের পর৷ আর ওর অভিমানটা প্রকাশ পেত মৌন ব্রত দিয়ে৷ শর্মি রান্নাবাইড় ঘরের সব কাজ করে যাচ্ছে, শুধু মুখে কোন কথা নেই৷ এরকমটা একেক সময় এক সপ্তাহেরও বেশী চলেছে৷
কিন্তু, পরে শর্মি দেখেছে এসব করে কোন লাভ নেই৷ অবিনাশকে পাল্টানো যাবে না৷ তাই, আজকাল ও মনে করা ছেড়ে দিয়েছে৷
কোয়েস্ট গিয়ে হঠাৎ ওর মনে হয়, আচ্ছা আমি কেন এমন করছি? অবিনাশ আসে নিতো কী হয়েছে? আই কান স্টিল এনজয় মাই টাইম৷ একা একা৷
প্রথমে তো বেশ কিছুক্ষণ ও শুধু একটা ফ্লোর থেকে আরেকটা ফ্লোর ঘুরে বেড়ালো—কিচ্ছুনা, শুধু উইনডো হপিং করে৷ মেয়েদের শোরুমগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ম্যানেকুইনরা পরে আছে কত সুন্দর সুন্দর ড্রেস৷ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শর্মি দেখে৷ আর, ভাববার চেষ্টা করে ওগুলো পরলে ওকে কিরকম দেখাবে৷
তারপর ওর মুখটা হঠাৎ ভেংচিকেটে ওঠে৷ একটা হাতির মত দেখাবে, আর কি৷ মোটা না হলেও শর্মির এখন ভরাট চেহারা৷ আর ড্রেসগুলো সব জিরো সাইজ ফিগারের মেয়েদের জন্য৷ সেটা ভেবে কিন্তু শর্মির মোটেই মন খারাপ হয় না৷ বরং সে একটা গানের কলি গুনগুন করে গাইতে গাইতে এসকেলেটারে চেপে গ্রাউন্ডফ্লোরে নেবে আসে, যেখানে বুক স্টোরটা আছে৷ অনেকক্ষণ পর ওর খেয়াল হয় যে গানটা ও গুনগুন করে গাইছে সে হল ‘‘মায়াবন বিহারিণী...’’ অবচেতন মনে কী তাহলে ও এখনও নিজেকে হরিণী ভাবে?
হঠাৎ কোন কারণ নেই ওর মন আনচান করে ওঠে! অনেকদিন হল ওর জীবনটা একটা নিস্তরঙ্গ দিঘীর রূপ নিয়েছে৷ কোন তাপ উত্তাপ নেই, কোন তরঙ্গ নেই৷ আচ্ছা, এখন যদি কোন সুন্দর দেখতে পুরুষ-টল ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম-ওর সঙ্গে যেচে আলাপ করতে চায়, তাহলে ও কী করবে? লোকটির সঙ্গে গল্প করতে করতে চলে যাবে ফুড কোর্টে? সেখানে একটা কর্নার টেবিলে বসে ওরা কফি খাবে ক্রয়সঁর সাথে? তারপর...যাবার সময় যদি লোকটি ওর ফোন নাম্বার চেয়ে বসে, তখন ও কী করবে? নিজের মোবাইল নাম্বারটা ও দিয়ে দেবে?
এসব দিবা স্বপ্ণ দেখতে দেখতে শর্মি নিউ অ্যারাইভাল-এর র্যাকটার সামনে এসে দাড়ায়৷ বাঃ! অমিতাভ ঘোষের নতুন বই বেরিয়েছে দেখছি৷ পাশে আবার কুনাল বাসুও রয়েছে৷ পেছনের পেজ-এ ও যখন ব্লাবর পড়তে ব্যস্ত তখন পেছন থেকে হঠা২ কে যেন ওর পিঠে ট্যাপ করে৷ শর্মি চম্কে পেছন ফিরে তাকায়৷
করবী যখন ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তখন কমলাক্ষ চলে গেছে৷
—আপনার শ্বশুরমশাইকে একবার ডাকা যায়? কথা বলতাম৷
—অবশ্যই৷ করবী একবার এদিক ওদিক তাকায়৷
—কমলাক্ষ চলে গেল বুঝি?
—‘কমল’...কমলাক্ষ’ কোন নামে ডাকতে করবী বেশী অভ্যস্ত?
—আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন?
প্রফুল্লবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷
—হ্যাঁ...বসুন৷
প্রফুল্লবাবু একটা চেয়ার টেনে বসে৷
—আপনার স্ত্রী...উনি কী আউট অফ টাউন?
—না...উনি তিন বছর আগে গত হয়েছেন৷
—সরি টু হিয়ার দ্যাট৷ ছেলে মেয়ে?
—নন্দন আমাদের একমাত্র সন্তান৷
—আই সি৷ আপনার পুত্রর বিয়ে হয়েছে কবে?
—চার বছর৷
—হ্যাপি ম্যারেজ৷
প্রফুল্লবাবু একবার আড়চোখে দেখে নেয় ঘরে করবী আছে কিনা৷
—মোটামুটি৷
রায় একটুক্ষণ প্রফুল্লবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে৷
—মোটামুটি...আর একটু খুলে বলা যায়?
—প্রথমের দিকে তো ওরা ভালই ছিল৷ কিন্তু...
প্রফুল্লবাবুর অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে৷
—ইদানীং কেমন একটা মনে হচ্ছিল স্ট্রেনড রিলেশনশিপ...
—লাভ ম্যারেজ?
—তা বলা যায়৷
রায় প্রফুল্লবাবুর দিকে প্রশ্নবোধক চিহ্ণ নিয়ে তাকায়৷
—আমরা এই পাড়ায় অনেক দিনের বাসিন্দা৷ কিন্তু করবী’র ফ্যামিলি এ পাড়ায় যাস্ট পাঁচ-ছ বছর আগে ভাড়াটে হয়ে আসে৷ তারপর ওদের মধ্যে আলাপ পরিচয় হয়৷
—রাতে এক টেবিলে বসে খা’ন?
—মানে...ঠিক বুঝতে পারলাম না৷
—রাতে একসঙ্গে সবাই ডিনার করেন?
—দেখুন...আমার ছেলে আই টি ইনডাস্ট্রিতে কাজ করে৷ এমনিতেই ওদের ইররেগুলার এবং লং ওয়ার্কিং আওয়ারস৷ তাই, ফিরতে দেরি হলে খোকা অনেক সময়ই আজকাল একা খেয়ে নেয়৷
—কেন...আপনার বউমা ওর জন্য অপেক্ষা করে না?
রায় তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে প্রফুল্লবাবুর দিকে তাকায়৷
—করত...কিন্তু নন্দনই ওকে বারণ করেছে৷ আচ্ছা...হঠাৎ একসঙ্গে ডিনার করার প্রশ্নটা কেন করলেন?
—আসলে ইংরেজিতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে৷ দোজ হ ইট টুগেদার, লিভ হ্যাপিলি টুগেদার৷ একটা অন্য প্রশ্নে আসি৷—আপনার সঙ্গে আপনার ছেলের সম্পর্ক কিরকম?
—ওই...ছেলেরা একবার বড় হয়ে গেলে যা হয়৷ তারা দূরে চলে যায়৷
—কিন্তু, আপনারা তো একসঙ্গে থাকেন...
—তাহলেও৷
ভদ্রলোক কথাটা ঠিকই বলেছে, রায় চিন্তা করে দেখে৷ ওর ছেলে সানফ্রানসিসকোর কাছে মিল পিটারস বলে একটা ছোট্ট শহরে থাকে৷ যেখানে ওর স্ত্রী শর্মি একাধিক বার গেছে৷ কিন্তু, রায় নিজে কখনও যায়নি৷ ছেলের সঙ্গে রায়ের ই-মেল এই যা যোগাযোগ, তার বেশি কিছু নয়৷
—আর কিছু জিগ্যেস করার আছে?
—না না...৷ রায় বর্তমানে ফিরে আসে৷
প্রফুল্লবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়৷ কিন্তু, যেতে গিয়েও সে যায় না৷
—একটা কথা আমাকে সত্যি করে বলবেন?
—বলুন...
—আমার ছেলের কী হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?
রায় এর কোন সোজাসুজি উত্তর দেয় না৷
—খোকা...ঠিক আছে তো?
কথাটা বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের গলা কেঁপে যায়৷
—বড় শগু প্রশ্ন৷ আমি যাই বলব সেটা গেস ওয়ার্ক হবে৷
আর...এই মুহূর্তে তার ওপর ভিত্তি করে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না৷
মুখে ম্লান হাসি নিয়ে প্রফুল্লবাবু উঠে যায়৷
এক মুহূর্তের জন্য শর্মির মনে হয়েছিল হয়তো অবিনাশ৷ ওকে একটা প্লের্ণ্ণাজান্ট সারপ্রাইজ দিচ্ছে৷ কিন্তু, লোকটাতো অবিনাশ নয়৷
—হাই লিনা৷
কথাটা বলেই ভদ্রলোক অত্যন্ত লজ্জিত হয়৷
—সো সরি! আই টুক ইউ ফর সামওয়ান এলস৷
লোকটি মাঝবয়েসি৷ মাথায় ছোট করে কাটা, কাঁচা পাকা চুল৷ আর চোখের পাশে ভাঁজ ফেলা একটা দারুণ হাসি৷
ভদ্রলোকের অস্বস্তি ও শর্মিলা হেসে ফেলে৷ ও ভেবেছিল—‘গুড ট্রাই, বাট নট গুড এনাফ’ এরকম কোন একটা চোখা উগুি দিয়ে লোকটাকে কাটিয়ে দেবে৷ কিন্তু, ভদ্রলোকের মুখ দেখে ওর মনে হল না সে গায়ে পড়ে ওর সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে৷
—আপনি এখানকার নন, তাই না?
শর্মি ওকে ইংরেজিতে জিগ্যেস করে৷
—ঠিক বলেছেন৷ লোকটি আর্ধেক হিন্দি আর আর্ধেক ইংরেজিতে বলে৷
—আমি এমনিতে ইন্দোরে থাকি৷ কলকাতায় একটা ম্যারেজ অ্যাটেন্ড করতে এসেছি৷
—ও...তাহলে আপনি এখানে কোন গিফট কিনতে এসেছেন?
—তাও না৷ আমি আসলে একটা শেভিং সেট ইন্দোর থেকে আসার সময় তাড়াহুড়োয় প্যাক করা হয়নি৷
—নো প্রবলেম৷ শেভিং সেট কোথায় পাবেন দেখিয়ে দিচ্ছি৷ এটা কী হচ্ছে শমি! ভেতর থেকে একটা ভয়েস ওকে ওয়ান করে৷ স্পেনসারের দোকানটাতো পাশেই রয়েছে, লোকটাকে দেখিয়ে দিলেই হয়৷ কিন্তু, শর্মির পদযুগল কেন জানি ভদ্রলোকের সাথে স্পেনসারের দিকেই এগিয়ে যায়৷
একটুক্ষণ পর ভদ্রলোকের শেভিং সেট কেনা হয়ে গেছে৷ এখন ওরা ফুড কোর্টে বসে কফি খাচ্ছে৷ এবং অবিশ্বাস্যভাবে, কফির সঙ্গে ক্রয়সও৷
একটা কথা ভেবে শর্মির বুক কেঁপে ওঠে৷ একতলায় বুক স্টোরে দাঁড়িয়ে ও যা যা জিনিস কল্পনা করেছিল তার প্রায় সবইতো ঘটে গেল৷ এক মাত্র তফাত পুরুষটি টল, ডার্ক এবং হ্যান্ডসাম না হয়ে হয়েছে টল, ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম৷
—আপনি কী কাজ করেন?
—হ্যাঁ৷ শর্মির মুখে হালকা হাসি৷—হলটাইম৷
—সেটা কী জানতে পারি?
—আপনারা যাকে বলেন—হোম মেকার৷
—থ্যাঙ্ক গড৷ ভদ্রলোক নিশ্চিন্ত হওয়ার হাসি হাসে৷
—কেননা আপনি যেখানে কাজ করতেন সেখানে পুরুষ মানুষরা সব কাজ করা বন্ধ করে দিত৷
মুহূর্তের মধ্যে শর্মির মুখ লাল হয়ে আসে৷ ভদ্রলোক দেখছি খুব সুন্দর করে মহিলাদের ফ্ল্যাটার করতে পারেন৷
কোন এক সময় কফি এবং ক্রয়সঁ দুটোই শেষ হয়ে যায়৷
—কেয়ার ফর অ্যানাদার কাপ? ভদ্রলোক জিগ্যেস করে৷
—নো থ্যাঙ্কস৷ শর্মি উঠে দাড়ায়৷
—থ্যাঙ্কস মাচ মাচ ফর ইয়োর কমপ্যানি৷
—ক্যান আই ড্রপ ইউ সামহোয়ার?
—আমার নিজের গাড়ি আছে৷
শর্মি উঠে চলে যাচ্ছে৷ এমন সময় ভদ্রলোক জিগ্যেস করে—যদি আবার কখনও কলকাতায় আসি হাউ ডু আই কনট্র্যাক্ট ইউ!
মৃদু হেসে শর্মিলা নিজের মোবাইল নাম্বারটা জানায়৷ নাম্বারের শেষ দুটো অঙ্ক অবশ্য ইচ্ছে করেই ভুল দেওয়া৷
—মিসেস মুখার্জি...আমি জানি ঠিক এই মুহূর্তে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো আপনার মানসিক পরিস্থিতি নয়৷
তবু...প্লিজ কেয়াপারেট উইথ মি৷
রায়ের সামনের চেয়ারে বসে আছে করবী মুখার্জি৷ কোলে হাত জড় করে রাখা৷ চোখের দৃষ্টি নত৷
—মিসেস মুখার্জি, আপনাদের বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে, তাইতো?
করবী মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়৷
—এবং সেটা লাভ ম্যারেজ?
করবী এ প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোন জবাব দেয় না৷
—আপনাদের মধ্যে আলাপ-পরিচয় কী করে হয় বলবেন?
—পাড়ারই একটা অনুষ্ঠানে৷ আমি সেখানে গান গেয়েছিলাম৷ অনুষ্ঠানের শেষে নন্দন ব্যাকস্টেজে এসে আমার প্রশংসা করে৷
—তারপর?
—এর পর মাঝে-মাঝেই দেখা হত৷ তার থেকেও বেশি৷ মোবাইলে কথা হোত৷ এরপর আমরা...
করবী একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ —একবার দিঘায় বেড়াতে যাই৷
—যাস্ট আপনার দুজন?
—হ্যাঁ৷ ছোট করে করবী মাথা নত করে৷
—বাড়ির কেউ জানত না?
করবী সাইডওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—বাবা মা জানত আমরা কলেজের অনেক মেয়ে একসঙ্গে বেড়াতে গেছি৷
—এবং সেখানে আপনাদের মধ্যে একটা শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে?
করবী এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না৷
—তারপর?
—আমরা কলকাতায় ফিরে আসি৷ এর কিছুদিন পর নন্দন আমাদের বাড়িতে এসে বাবা মা’র সঙ্গে দেখা করে৷
—হাউ উড ইউ ডেসক্রাইব ইয়োর ম্যারেজ? হ্যাপি...সো সো আন হ্যাপির?
বেশ কিছুক্ষণ করবী মাথা নীচু করে বসে থাকে৷
—জানি না৷
—একটু খুলে বলে যায়?
—তাহলে তো অনেক কিছুই বলতে হয়৷
—বলুন তো...৷ রায়ের গলা সমবেদনা মিশ্রিত৷
—আমার কাছে সময় আছে৷
—আমাদের কোর্টশিপটা বেশি দিনের নয়৷ বরং বিয়ের পরেই বোধহয় আমরা পরস্পরকে অনেক ভালো করে চিনতে পারি৷ ফর এ টাইম উই ওয়েয়ার ভেরি ভেরি হ্যাপি৷ ও-অফিস থেকে প্রায়শই ফোন করতো৷ শোন...আজ না আমরা সিনেমা দেখতে যাব, তুমি তৈরি থেকো৷ এরকমভাবে আমাদের দিন গুলো স্বপ্ণের মতো কেটে যাচ্ছিল৷ আজ ফাংশান, কাল সিনেমা, পরশুদিন পার্টি এরকম রোজই লেগেছিল৷ অনেক সময়ই দেরি হয়ে গেলে আমরা ডিনার করে ফিরতাম৷
—দেন সামথিং চেঞ্জড?
করবী কোন উত্তর দেয় না৷
—আমাকে এ কথা কথা সত্যি করে বলবেন? আপনার স্বামীর কী অন্য কারও সঙ্গে কোন সম্পর্ক...
রায় ইচ্ছে করেই প্রশ্নটা অসমাপ্ত রাখে৷ করবী অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—বলতে পারবো না৷
—এটা কী সত্যভাষণ হল? রায় গলা খুব নরম করে বলে৷
—স্ত্রী হিসেবে তো আপনার বুঝতে পারা উচিত৷ কারণে অকারণে দেরি করে বাড়ি ফেরা বিশেষ কোন টেলিফোন এলে হঠাৎ করে গলা নাবিয়ে ফেলা...কিম্বা ডিসকানেক্ট করে দেওয়া...পেন্ট টেল মি আপনার কখনও কোন সন্দেহ হয়নি৷
করবী নীরবে মাথা নাড়ে৷
—আমি সত্যি জানি না...আমাদের রিলেশনশিপটা এখন কোথায়৷
—সত্যিই জানেন না?
গলা নাবিয়ে কথা বললেও রায়ের প্রশ্ন করার ভঙ্গি তীক্ষ্ণ৷
—বেশ৷ দেন আনসার দিস...ডু ইউ হ্যাভ সেক্স রেগুলারলি? করবী হঠাৎ রাগে জ্বলে ওঠে৷
—এটা কিন্তু একান্তই ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে৷ আর...মনে হয় না আমাকে আপনার এরকম প্রশ্ন করার অধিকার আছে৷
—সরি...ইফ হ্যাভ হার্ট ইয়োর ফিলিংস৷ রায় হাত তুলে ক্ষমা চেয়ে নেয়৷
—তাছাড়া...এ প্রশ্নের সঙ্গে আমার স্বামীর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার কী রেলিভেন্স আছে সেটাও আমি বুঝতে পারছি না৷
—আপনাকে হার্ট করার এতটুকু ইচ্ছে আমার নেই৷ বিশ্বাস করুন৷ রায় একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ ওর মুখে একটা স্থির হাসি৷
—কিন্তু, রেলিভেন্স-এর প্রশ্ন করছিলেন না? রেলি ভেন্স আছে৷
আপনার স্বামীর যদি আপনার সঙ্গে এখন কোনও শারীরিক সম্পর্ক না থেকে থাকে, তাহলে এরকমতো একটা সন্দেহ করা যেতেই পারে যে হি ইজ ক্যারিং অন উইথ সামবডি এলস৷
কথাটা শুনে করবী চেয়ারে একেবারে স্থির হয়ে বসে থাকে৷ মনে হয় খুব চেষ্টা করছে নিজের অশ্রু সম্বরণ করতে৷
রায় অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়৷ একটুক্ষণ দুজনেই চুপ৷ ওয়াল ক্লক ঠিক টক আওয়াজ৷
—মিসেস মুখার্জি৷...যদি চান এ সব প্রশ্ন না হয় পরে করব... মে বি টুমরো৷
—না...৷ শাড়ির আঁচল দিয়ে করবী চোখ মোছে৷
—ইটস অলরাইট...আপনার যা প্রশ্ন করার আছে করুন৷
—আপনার স্বামী কাল এয়ারপোর্টে কীভাবে যান? নিজের গাড়ি...না ট্যাক্সি করে?
—ট্যাক্সি...আমরা ড্রাইভার রাখি না৷
—মনে করার চেষ্টা করুন তো উনি সাধারণ ট্যাক্সি নিয়েছিলেন,
না...আজকাল যে সব ক্যাব সার্ভিসেন হয়েছে—যেমন মেগা, মেরু, ওলা ইত্যাদি—তাদের কনট্যাক্ট করেছিলেন?
—সরি...ও বেরুনোর সময় আমি নীচে যাইনি৷
—মিসেস মুখার্জি...এটা জানা কিন্তু আমার ভীষণ ভাবে দরকার৷ রায় অন্যমনস্ক ভাবে নিজের গালে হাত বোলায়৷ যেন শেভটা ঠিক হয়েছে কিনা পরখ করে দেখছে৷
—মিস্টার মুখার্জি যদি আদৌ এয়ারপোর্ট না গিয়ে থাকেন, স্টোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে উনি অ্যাকচুয়ালি কোথায় গিয়েছেন, সেটা ট্রেস করা যাবে৷
করবী সাইড—ওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—এ ব্যাপারে আমি আপনাকে হেল্প করতে পারলাম না৷
—আরেকটা জিনিস...
—কী বলুন?
এতক্ষণে করবী রায়ের দিকে মুখ তুলে তাকায়৷
—মিস্টার মুখার্জির লাখ ছ’মাসের ব্যঙ্ক স্টেটমেন্টটা দরকার৷
—হঠাৎ ওর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট...তার থেকে কী জানা যাবে?
—সেটা...এখখুনি বলা যাচ্ছে না৷ তবে বিশ্বাস করুন...আই অ্যাম নট বিয়িং ইনকুইজিটিভ৷
—দেখছি...খুঁজে পাওয়া যায় কিনা৷
করবী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়৷
—আসলে ওর পারসোনাল পেপারস সম্বন্ধে আমি খুব একটা কিছু জানি না৷
করবী ভেতরের ঘরে চলে যায়৷ রায় চিন্তায় মগ্ণ৷ এমন সময় রায়ের মোবাইলটা বেজে ওঠে৷ ও আশা করেছিল হয়তো শর্মির ফোন৷ আজ সন্ধেবেলায় যেতে পারেনি বলে রায়ের মধ্যে কোথায় একটা গিল্টি ফিলিং রয়ে গেছে৷ কলারের নাম্বারটা দেখে অবহ্য রায় একটু অবাক হয়ে যায়৷ কলটা প্রদ্যোৎ-এর৷
—হ্যালো...প্রদ্যোৎ? হঠাৎ কী ব্যাপার? হাউজ ইয়োর হলিডেজ?
কী? কাল থেকে তুমি অফিস জয়েন করতে চাও? কেন?
তুমি না দু’দিনের ছুটি...হ্যাঁ...তার আর দরকার নেই? ওকে৷ হ্যাঁ...কাল তাহলে দেখা হচ্ছে৷
কাল তাহলে দেখা হচ্ছে৷
কাল থেকে প্রদ্যোৎ ফিরে আসছে জেনে রায় খুশিই হয়৷ ও জানে যে এরকম চিন্তা ধারাটা একেবারেই ঠিক নয়, তবু টালিগঞ্জের ওসি’র ৷ ওপরে ওর খুব একটা আস্থা নেই৷ প্রদ্যোৎ এলে রায় ওকে ওসি’র কাজটা ধরিয়ে দেবে৷
কিন্তু, অন্য একটা কথা ভেবে রায়ের প্রদ্যোৎ-এর জন্য চিন্তা হয়৷ ওর যদি বিশেষ ভুল না হয়ে থাকে তাহলে প্রদ্যোৎ দুুদিনের ছুটি নিয়েছিল ওর গার্লফ্রেন্ড-এর সঙ্গে কোথাও বেরিয়ে আসার জন্য৷ দীঘা কিম্বা শান্তিনিকেতন৷ নিশ্চয়ই ওদের দুজনের মধ্যে কোন গন্ডগোল হয়েছে, নইলে হঠাৎ করে প্রদ্যোৎ ডিউটিও ফিরে আসতে চাইবে কেন?
এমন সময় হাতে কয়েকটা সবুজ ফাইল নিয়ে করবী ফিরে আসে৷
—দেখুন তো...এগুলোর মধ্যে আপনি যা চাইছেন সেটা আছে কিনা৷
রায় ভাল করে ফাইলগুলো উল্টেপাল্টে দেখে৷ কিন্তু, তার কোনটাতেই নন্দন মুখার্জি ব্যঙ্ক স্টেটমেন্ট নেই৷
—কাল সকালে আপনি একবার মিস্টার মুখার্জির ব্যাঙ্কে যেতে পারবেন?
করবী ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ জানায়৷
—কিন্তু, আপনি সঙ্গে এলে খুব ভালো হয়৷
—আমি...? রায় একটু অবাক হয়ে করবীর দিকে তাকায়৷
—কেন বলুনতো?
—কিছু না...তাহলে মনে সাহস পাব৷
রায় কী যেন একটা কথা ভেবে রাজি হয়ে যায়৷
—ঠিক আছে আসব৷
রাতে খাবার টেবিলে রায় আর শর্মির মধ্যে বিশেষ কথাবার্তা হয় না৷ বিকেলে করবীর কাছ থেকে ফোন আসার পরেই রায় শর্মিকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল যে ওর আর আজকে ছবি দেখতে আসা হচ্ছে না৷
এমনিতে শর্মি এসব ব্যাপারে খুব আনডারস্ট্যান্ডিং৷ কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন যদি কখনও রায় আসতে না পারে, তাহলে সে নিয়ে শর্মি মন খারাপ করে না৷ কিন্তু আজকে ওর অন্য কিছু একটা হয়েছে৷ খেতে খেতে রায় একবার আড়চোখে শর্মির দিকে তাকায়৷ শর্মির মুখ গম্ভীর৷ ইচ্ছে করেই বোধহয় সে রায়ের সঙ্গে আই কনট্যাক্ট অ্যাভয়েড করছে৷
রায় বুঝতে পারে, এটা ওদের মধ্যে ‘কোল্ড ওয়ার’-এর সময়৷ মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই৷ এরকম সময় ‘পীস’ ঘোষণা করার জন্য ও সাধারণতঃ ফ্লুরিতে থেমে শর্মির জন্য পেসট্রি কিম্বা অ্যাসরটেড চকোলেট নিয়ে বাড়ি ফেরে৷ আজ ওর এমনই পোড়া কপাল যে দেরি করে আসার দরুণ ফ্লুরি বন্ধ হয়ে গেছে৷
—তারপর...! রায় জল নিতে নিতে কথা শুরু করে৷
—কোয়েস্টে আজ কী করলে?
শর্মি একথা’র কোন উত্তর দেয় না৷
—আমাকে মাংসটা একটু পাস করবে?
নীরবে শর্মি ওর দিকে মাংস’র পাত্রটা এগিয়ে দেয়৷ রায় তার থেকে কয়েক টুকরো মাংস আর ঝোল নেয়৷
খাওয়ার টেবিলে আবার সব চুপ৷
—মাংসটা বেশ ভালো হয়েছে৷ রায় খেতে খেতে বলে৷ শর্মি নিরুত্তর৷
—ওটা তুমি রান্না করেছ, না দীপু’র মা?
দীপুর মা ওদের হল টাইম কুক৷ দশ বছরের বেশি ওদের কাছে আছে৷
—কোয়েস্ট-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে খুব সম্ভবত স্টার মার্ক-এর বুক স্টোরটা আছে৷ ওখানে নতুন কোন বই চোখে পড়ল?
—অবিনাশ প্লিজ...তোমার কথা শুনতে আমার এখন ভালো লাগছে না ৷
—সরি...আর কথা বলছি না৷
—হ্যাঁ, কথা না বলতে হলে তো তুমি খুশিই হবে! খেয়ে দেয়ে বিছানায় একটা বই নিয়ে বসবে৷ তারপর একটুক্ষণ পড়ার পর ঘুমে তোমার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে৷ তখন টেবিল ল্যাম্পটা নিবিয়ে দিয়ে তুমি, চট করে ঘুমিয়ে পড়বে৷ হোয়াট এ ফ্যানটাসটিক লাইফ!
রায় একথা’র কোন উত্তর দেয় না৷ তাছাড়া, ওর বলা আছেই বা কী?
—তুমি জিগ্যেস করছিলে না...কোয়েস্ট-এ গিয়ে আমি কী করলাম...একা ফ্যা ফ্যা করে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ালাম...তাছাড়া আর কী করব?
—না না...আমি সেভাবে মীন করে কিছু বলিনি৷
—কী ভাবে মীন করে বলেছ সেটা জানতে পারি?
শর্মি হটাৎ ঝাঁঝালো কণ্ঠে জবাব দেয়৷
—সরি৷ খাওয়া বন্ধ করে রায় টেবিল থেকে উঠে যায়৷
—কাজে আটকে পড়লে কী করব বলো?
রাতে শোবার আগে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বই পড়ার অভ্যেস রায়ের অনেকদিনের৷ খাটের মাথার দিকে বালিশ তুলে তাতে হেলান দিয়ে বসে রায় আজও বই পড়ছে৷
—এখনও রাগ করে আছো?
শর্মি ওপাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে৷ রায়ের কথার কোন জবাব দেয় না৷ বেশ কিছুক্ষণ পর রায়ের যখন ধারণা হয় শর্মি ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন শর্মি ওপাশে মুখ ফিরিয়েই বলে ওঠে৷
—আজ বাড়ি আসতে দেরি হয়েছে কেননা কোয়েস্ট-এ এক ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে আলাপ করে৷ তার সঙ্গে বসে আমি গল্প করেছি৷ কফি খেয়েছি৷ এটা তোমায় আমি জানিয়ে রাখলাম৷
আলোটা নেবানোর পরও রায় অনেকক্ষণ শর্মির দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে৷
লালবাজারের ভেতরে একটা বড় বাঁধানো চত্ত্বর আছে৷ এখানে রোজ সকালে একটা দর্শনীয় জিনিস ঘটে৷ চত্ত্বরটাতে সারি সারি অনেকগুলো মোটর সাইকেলে দাড় করানো থাকে৷ তারপর, একের পর এক সার্জেন্টরা আসে৷ তাদের পরণে সদ্য পাট ভাঙা সাদা ইউনিফরম৷ কোমরে মোটা বেল্ট৷ তাতে হলস্টারে ভরা রিভলভার৷ পায়ে হাঁটু অবধি তোলা চিক্চিক্ করছে লেদারের বুটস৷
একসঙ্গে যখন ওরা মোটর সাইকেলগুলো স্টার্ট দেয় তখন পুরো জায়গাটা রয়েল এনফিল্ড বুলেট-এর আওয়াজে গম গম করতে থাকে৷
প্রদ্যোৎ আজ আগে ভাগে চলে এসেছে৷ ওর ধারণা স্যর একটা ইনস্টারেস্টিং অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েছে৷ প্রদ্যোৎ আদৌ চায় না, তাতে রঞ্জন স্যরকে অ্যাসিস্ট করুক৷ রঞ্জন স্যরের আন্ডারে নতুন জয়েন করেছে৷ বলা যায়, প্রদ্যোৎ-এর রাইভাল৷
ওপরে এলে প্রদ্যোৎ দেখে স্যর অলরেডি এসে গেছে৷ ঘরে রঞ্জনকে দেখতে না পেয়ে প্রদ্যোৎ রিলীভড বোধ করে৷
—মর্নিং স্যর...
—মর্নিং৷ মাথা না তুলেই স্যর সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দেয়৷
—বোসো...তোমার জন্য কাজ আছে৷
প্রদ্যোৎ চেয়ারটা টেনে বসে৷
—চা চলবে? হাতে ধরা ছোট্ট একটা নোটবইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে স্যর জিজ্ঞেস করে৷
—হ্যাঁ...চলতে পারে স্যর৷
স্যরে টেবিলের নীচে একটা ইলেকট্রিক বাটন ফিক্স করা আছে৷ ওটা চিনাতে ঘরে আরদালি আসে৷ স্যর তাকে দুজনের জন্য চা নিয়ে আসতে বলে৷ প্রদ্যোৎ-এর জন্য গাড় লিকারওয়ালা আ৮ চা, আর স্যরের নিজের জন্য ফিকে রং দার্জিলিং গ্রীনটি৷
চা আসতে দেরাজ থেকে স্যর একটা টাপারওয়েযারের কৌটো বার করে৷ তারপর, কৌটোর ঢাকনি খুলে প্রদ্যোৎ-এর দিকে বাড়িয়ে দেয়৷
—নাও...ওটস-এর তৈরি কুকিজ৷ স্বাস্থের পক্ষে খুব ভালো৷ স্যরের ইদানীং কোলেস্টেবলটা একটু বেড়েছে৷
চা খেতে খেতে রায় সংক্ষিপ্ত ভাবে এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে তার একটা বিবরণ প্রদ্যোৎকে দেয়৷ পুরো বিবরণটা শোনার পর প্রদ্যোৎ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—এনি কমেন্টস?
—হ্যাঁ স্যর...এই কমলাক্ষবাবুর ব্যাপারটা একটু ঘোলাটে লাগছে৷ একটু বিস্মিত হয়ে রায় প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—ভাবছিলাম...উনি যাস্ট ফ্যামিলি ফ্রেন্ড, নাকি ওঁর অন্য কোন ব্যগুি গত ইনটারেস্টও আছে?
উত্তরে রায়ের মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে ওঠে৷
—হ্যাঁ, কমলাক্ষবাবুর দিকটা আমরা মনে রাখবো...
চিন্তা করতে গেলে স্যর অনেক সময় ঘন ঘন চোয়ালে হাত বুলোয়৷
—কিন্তু...আমার কেন যেন মনে হচ্ছে অন্য কিছু একটা রহস্য আছে৷ যেটা এখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়৷ যাক্গে, তোমার অ্যাসাইনমেন্টটা হল একেবারে ফার্স্ট আওয়ারে নন্দন মুখার্জির অফিসে পৌঁছে যাওয়া৷ ওখানে গিয়ে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করো৷ ইউনো হোয়াট টু আসক৷ ও হ্যাঁ...াবার সময় টালিগঞ্জের ওসিকেও নিয়ে যেও৷ ফলো আপের জন্য কাজে লাগতে পারে৷
প্রদ্যোৎ চট্পট্ চেয়ার ছেড়ে দাড়ায়৷
—স্যর...একবার ছোট করে বলেনি, আমার কী কী করা দরকার৷
—বলো শুনছি...স্যর কিন্তু প্যাড থেকে মুখ তোলে না৷
—আমার জানা দরকার...অফিসে ভদ্রলোকের বন্ধুবান্ধব কারা৷ কাদের সঙ্গেও ও সাধারণতঃ ঘোরা ফেরা করে৷ সন্ধেবেলা কাজের পরে রেটুরেন্টে কিম্বা অন্য কোথাও যাওয়া হয় কিনা৷ মোদ্যা কথা, বাড়ির বাইরে নন্দনবাবুর জীবনধারা কিরকম৷ এবং ...বিশেষ করে ওর জীবনে অন্য কোন নারীর উপস্থিতি আছে কি না...এই তো?
—একসেলেন্ট! প্রদ্যোৎ-এর বিশ্লেষণে রায় খুশি হয়৷
—কিন্তু, যা কিছু জিজ্ঞেস করবে, অত্যন্ত ডিসক্রিটলি৷ কেউ যেন কিছু সন্দেহ না করতে পারে৷
প্রদ্যোৎ ঘর থেকে চলে যাচ্ছিল, এমন সময় রায় ওকে পেছন থেকে ডাকে৷
—আরেকটা জিনিস..এয়ারপোর্ট ডিউটির জন্য ওদের অফিসের সঙ্গে কোন ক্যাব সার্ভিসের পারমানেন্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে কি না সেটা জানাও আমাদের প্রয়োজন৷
নন্দন মুখার্জির অ্যাকাউন্ট চৌরঙ্গীর এক বিলিতি ব্যঙ্কের ব্রাঞ্চে৷ সকাল সাড়ে দশটায় রায় যখন ব্যাঙ্কে গিয়ে পৌঁছয়, দেখে করবী ইতিমধ্যেই ওখানে হাজির৷
— ভেতরে গিয়ে বসলেই পারবেন...বাইরে দাড়িয়ে কেন? করবীর মুখে অস্বস্তির হাসি৷
—ভাবলাম একসঙ্গেই ভেতরে যাব৷
ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে কার্ড দেখাতেই মিস্টার স্যাকসেনা অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে
—কী কী ইনফরমেশন দরকার বলুন...আমরা এখখুনি লাইন আপ করার বন্দোবস্ত করছি৷
—গত ছ’মাসের অল ব্যঙ্কিং ট্র্যানজ্যাকশনস দরকার৷ কী ভেবে রায় মত পাল্টায়৷
—নো, মেক ইট ফর দ্য লাস্ট ওয়ান ইয়ার৷
—হোয়াট এলস?
—এ ছাড়া...কোন ওভার ড্রাফট নেওয়া আছে কি না৷ আর নন্দন মুখার্জির ক্রেডিট কার্ডের মানহাঙ্গি স্টেটমেন্ট, গত এক বছরের৷
—হয়ে যাবে৷ স্যাকসেনা দুহাতের তালু একত্রিত করে থুঁতনির নীচে রাখে৷ —ইন দ্য মীন টাইম আপনারা কী খাবেন বলুন? লেমনটি, কফি—হোয়াট এভার৷
—লেমন টি বলতে পারে৷ রায় বলে৷
—আর, আপনার ম্যাডাম?
—কিছু না৷ করবী মাথা নেড়ে জানায়৷
স্যাকসেনা চলে যেতে রায় ম্যানেজারের কিউবিকলটা ভাল করে দেখে৷ আজকের দিনের ফ্যাশনেবল ডেকোর৷ ঘরে একটাই মাত্র দেওয়াল৷ তাতে চিত্রভানু মজুমদারের পেন্টিং শোভা পাচ্ছে৷ বাকি তিনটে দিক ফ্রসটেড গ্লাসের তৈরি৷ এমন কী কিউবিকলের দরজাটা পর্যন্ত ভারি কাঁচের স্যাকসেনা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলার মত আওয়াজ করে দরজাটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়৷ কে বলবে এটা ব্যাঙ্ক? অবশ্য, এ সব কিছুই অ্যাকাউন্ট হলডারদের টাকায় তৈরি৷ রায় মনে মনে হাসে৷
—আপনার স্বামীর অন্য কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেইতো? রায় করবীকে জিজ্ঞেস করে৷
—যতদূর জানি...না৷
একটুক্ষণ পর একজন সাবস্টাফ এসে রায়ের জন্য চা, আর করবীর জন্য একগ্লাস জল দিয়ে যায়৷
স্যাকসেনা ফিরে আসে৷ হাতে বেশ কিছু প্রিন্টআউট৷
—এগুলো দেখতে থাকুন...গত ছ’মাসের ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট৷ তার আগের ইনফরমশন ব্যাক অফিসে স্টোরড আছে, আর আধ ঘণ্টার মধ্যে আশাকরি জেনারেট করা যাবে৷ আনফরচুনেটলি মিস্টার মুখার্জির ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট এখান থেকে জেনারেট করা যাবে না৷ চেন্নাই-এর অফিস থেকে আসতে হবে৷ একটুতো সময় লাগবে৷
—তবু... একটা টাইম ফ্রেম?
—তা...দিন দু’তিনেক তো লাগবে৷
—টু লেট৷ রায় মাথা নাড়ে৷ —দিস ইজ ভেরি আরজেন্ট৷ পকেট থেকে মোবাইল বার করে স্যাকসেনা একটা নাম্বার ডায়াল করে৷ তারপর, ফিস্ফিস্ করে কী যেন সব কথা বলে৷
—ডান! হয়ে যাবে৷ স্যাকসেনা মোবাইলটা কাল কভার দিয়ে ঢাকে৷
—আজ বিকেলের মধ্যেই পেয়ে যাবেন৷ নরমালি এগুলো বাই পোস্ট আসে৷ আমি বিশেষ ভাবে রিকোয়েস্ট করলাম, যাতে মেল-এ পাঠিয়ে দেয়৷
—থ্যাঙ্কস৷ হাতে ধরা ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট-রে ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে রায়ের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে৷
—এনি প্রবলেম? পাশ থেকে নীচু গলায় করবী জিজ্ঞেস করে৷
—না...যাস্ট টেল মি দিস ফ্যামিলির খরচ বাবদ মাঝে আপনাদের সাধারণতঃ কত উইথড্রয়াল হয়?
—১৫ থেকে কুড়ি হাজার৷ কেন? করবী জিজ্ঞেস করে৷
—হুঁ...কিন্তু এখানে দেড় মাস আগে একটা ৬৫০০০্ টাকার উইথড্রয়াল দেখতে পাচ্ছি৷ চেকে নয়, ক্যাশ উইথড্রয়াল৷ এটা কী কারণে হয়েছে বলে মনে হয়?
করবী মাথা নাড়ে৷
—বলতে পারবো না মিস্টার রায়৷ আমার স্বামী টাকাকড়ির ব্যাপার সব সময় খুলে বলেন না৷
—এক্সকিউজ মি...স্যাকসেনা বায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে৷
—আপনি জানতে চেয়েছিলেন মিস্টার মুখার্জির কোন ওভারড্রাফট আছে কিনা৷ দ্য আনসার ইজ নো৷
এমন সময় একটি ইয়ং মেয়ে এসে স্যাকসেনার হাতে কিছু কাগজ দিয়ে যায়৷
—এই যে আপনার ব্যালেন্স ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট৷
রায় কাগজগুলো উল্টে পাল্টে দেখে উঠে দাড়ায়৷
—থ্যাঙ্ক ইউ ফর অল দি ট্রাবল৷
করমর্দনের জন্য রায় হাত বাড়ায়৷
—ক্রেডিট কার্ড-এর স্টেটমেন্ট-এর জন্য বিকেলে কাউকে পাঠিয়ে দিই?
ইয়েস, অফকোর্স!
রায়ের সঙ্গে উৎসাহিত ভাবে স্যাকসেনা করমর্দন করে৷ যেন কতকালের চেনা৷
সন্ধে নেবে আসার আগে একটা বিশেষ মুহূর্ত আছে যখন সূর্যের পড়ন্ত আলো জানলার কাঁচে বিচ্ছুরিত হয়ে অবিনাশ রায়ের আলুফালু চুলে এসে পড়ে৷ হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে ওর চুল ঝল্সে গেছে৷
রায়ের সামনে উপবিষ্ট রঞ্জন৷ ওকে ব্রিফ করা সবে মাত্র শেষ হয়েছে৷ কমলাক্ষ মজুমদারকে স্যাডো করার দায়িত্ব এখন রঞ্জনের ওপর৷
রায় কমলাক্ষকে এখনও পর্যন্ত ডিরেক্টলি সন্দেহ করছে না৷ কিন্তু, করবীর প্রতি যে কমলাক্ষর একটা লুকোনো ইনটারেস্ট আছে সে বিষয়ে রায় নিঃসন্দেহ৷ প্রশ্নটা হচ্ছে করবীকে নিয়ে৷ সে কী কমলাক্ষর প্রতি ইনটারেটেড? এখন মিয়া বিবি যদি রাজি হয় তাহলে থার্ড পার্টিকে সরানোর একটা মোটিভ থাকতেই পারে৷
সেজন্যই কমলাক্ষকে ফলো করা৷
এমন সময় প্রদ্যোৎ ঘর্র্মগু কলেবরে ঘরে প্রবেশ করে৷
—কী হল...তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন?
—কিছু না স্যর...যাস্ট হ্যাড এ টায়ারিং ডে৷
রায় প্রদ্যোৎ-এর দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে৷
—ইউ লুক হাংরি৷ খাবার অর্ডার দিই?
—হ্যাঙ্কস স্যর৷ আজ খাওয়ার সময় হয়নি৷
লালবাজারের ক্যান্টিন দিবারাত্র খোলা থাকে৷ সেখানে তৎক্ষণাৎ খাবার অর্ডার দেওয়া হয়ে একটু পরেই খাবার আসে৷ প্রদ্যোৎ-এর জন্য মাটন স্টু আর চারটে বাটার টোস্ট আর সবার জন্য চা৷ খেতে খেতে কাজের কথা চলে৷
—নন্দন মুখার্জির অফিসে গিয়ে কিছু জানতে পারলে?
—খুব একটা সুবিধে হল না স্যর৷ যা জানা গেল নন্দনবাবু মোটামুটি নিজের মধ্যেই থাকতেন৷ অফিসে বন্ধুবান্ধব বিশেষ নেই৷ ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক সময়ে আসতেন, যেতেন৷ দ্যাটস ইট৷ নার্থিং স্পেশাল৷
স্যরের দেখাদেখি প্রদ্যোৎ ও আজকাল ইংরেজি’র ব্যবহার শুরু করেছে৷
—হেঁ ব্যাপারটা তাহলে একটু চিন্তার হয়ে দাড়ালো...রায় অন্যমনস্থভাবে থুঁত্নিতে হাত বোলায়৷
—স্যর...ওনার অফিসে থেকে আসার সময় আমি ব্যাঙ্কটাও কাভার করে এসেছি৷
—গুড৷
রঞ্জন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়৷
—আমি তাহলে আসি স্যর৷
—এসো৷ গুডলাক ফর ইয়োর অ্যাসাইনমেন্ট৷
রঞ্জন চলে যায়৷ প্রদ্যোৎ-এর খাওয়া দাওয়া শেষ৷ রুমালে হাত মুছে সে চায়ের কাপে সশব্দে চুমুক দেয়৷
—স্যর...প্রদ্যোৎ ব্যাগ থেকে বেশ কয়েকখানা প্রিন্ট আউট বার করে৷ —এই হল নন্দনবাবুর গত ছ’মাসের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট৷
—কই দেখি? কাগজগুলোর জন্য রায় হাত বাড়ায়৷
—কোন ইনটারেস্টিং ইনফরমেশন?
—আছে স্যর...আপনি তো সবক’টা পেজই পড়বেন...তবু লাস্ট পেজটা যদি আগে পড়েন স্যর৷ এ মাসের কারেন্ট স্টেটমেন্ট৷
রায়ের চোখ প্রিন্ট আউটের একটা জায়গায় এসে থেমে যায়৷
—স্যর...পরশুদিন৷ নন্দনবাবু ওনার মোবাইল থেকে অন লাইনগুলো ক্যাব সার্ভিসের ট্যাক্সি বুক করেছিলেন৷
—ফ্যানটাসটিক! এই ব্রেকটাই চাইছিলাম...এখখুনি ‘ওলা’তে ফোন করো৷ আমাদের ওই ড্রাইভার আর ওই গারটিকুলার ক্যাবটাই চাই৷
রাজারহাট-এর মেন রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ যাবার পর ট্যাক্সি ডানদিকে টার্ন নেয়৷ এখন রাত আটটাও বাজেনি৷ কিন্তু, এর মধ্যেই রাস্তাটা নিকশ কাল অন্ধকার৷ যেন কেউ দোয়াত থেকে কালি ঢেকে দিয়েছে৷
‘ওলা’ ক্যাব সার্ভিস-এর ড্রাইভারের নাম ভিক্রম সিং৷ গাড়ির পেছনের সিটে বসে আছে রায় আর প্রদ্যোৎ৷
ট্যাক্সিটা এবার বড় রাস্তা ছেড়ে একটা সরু গলিতে ঢোকে৷ সেই গলি দিয়ে বেশ কয়েকবার ডাইনে বাঁয়ে বাঁক নেবার পর হঠাৎ করে রাস্তাটা অন্ধকার হয়ে যায়৷ ওরা প্রথমে ভেবেছিল পাওয়াার কাট হয়েছে বুঝি৷ কিন্তু, তারপর দেখা গেল ঘটনাটা তা নয়৷ এরপরে আর কোন স্ট্রিট ল্যাম্পই নেই৷ তাই রাস্তা অন্ধকার৷
—সিং জি...তুমি আমাদের ঠিক রাস্তায় নিয়ে এসেছো তো? রায় আর জিজ্ঞেস না করে পারে না৷
—স্যর, হমলোগ গাড়ি চলাতে হেঁ...ভিক্রম সিং হেসে উত্তর দেয়৷ —সড়ক কভি ভুল নহি হোগি৷
এখন রাস্তায় শুধু ওদের গাড়ির হেডলাইটের দুটো আলো অন্ধকারকে ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে৷ একটা জায়গায় এসে গাড়িটা থেমে যায়৷
—কী হল সিং জি? প্রদ্যোৎ জিগ্যেস করে৷
—হমলোগ আগয়ে হেঁ৷
—মতলব?
—পরশুদিন সামকো সাহাব য়হিঁ উত্তর গয়ে থে৷
—তুমি শিয়োর? রায় জিগ্যেস করে৷
—জি হুজুর৷
সিংজি গাড়ির ইগনিশন অফ করতে হেডলাইট দুটো আস্তে করে নিভে যায়৷ রায় আর প্রদ্যোৎ গাড়ির থেকে বেরিয়ে আসে৷ চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার৷
—এটা কোথায় নিয়ে এলো আমাদের এখানে তো জনমানব বসতি কিছুই নেই৷
—তাইতো দেখছি স্যর৷ প্রদ্যোৎ উত্তর দেয়৷
—এখানে নন্দন মুখার্জি৷ নেবে গেছে...এটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না৷
—এটা কোন ট্র্যাপ নয়তো?
প্রদ্যোৎ-এর সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে৷ দুজনেই ওরা একসঙ্গে পেছন ফিরে তাকায়৷ গাড়িটা ওদের ফেলে হাওয়া হয়ে যায়নি তো? না৷ গাড়িটা একই জায়গাতে দাঁড় করানো আছে৷
—তোমার কাচে টর্চ আছে তো?
—প্রদ্যোৎ মাথা নেহে হ্যাঁ জানায়৷ অন্ধকারে এগোনোর আগে রায় একবার ঘুরে দাড়ায়৷
—সিংজি...আপনি কোথাও যাবেন না৷ আমাদের জন্য এখানেই অপেক্ষা করে থাকবেন৷ ওয়েটিং চার্জ যা ওঠে, আমরা পুরো পে করে দেব৷
—সওয়ালই নহি উঠতো সাহব৷ হমরো বাবুজিনে বোলত কি গাড়ি যিত্না ভি টাইম রাখিয়ে...এক পয়সা চার্জ নহি হোগা৷ কোথ্বাও কোন বাড়ি ঘরদোরের চিহ্ণ মাত্র নেই৷ থাকলেও সব অন্ধকার৷ টর্চের আলো মাটির দিকে ফেলে প্রদ্যোৎ আর রায় সাবধানে এগোতে থাকে৷
—কেয়ারফুল স্যর...রাস্তায় সাপখোপ থাকতে পারে৷
—ইয়েস ইয়েস! রায় একটু ইরিটেটেড হয়ে বলে৷
—আমি খালি ভাবছি মিস্টার মুখার্জি এরকম জায়গায় নেমে কোথায় যেতে পারে৷ প্রদ্যোৎ...টর্চটা একবার একটু দূরে দিকে ফেলতো৷
এন ই ডি টর্চের আলোটা খুবই জোরালো৷ টর্চ মারতে একশো গজ দূরের জিনিসও স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ে৷ একটু যেতেই লাল সুর্কির রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে৷ বাঁ দিকে টর্চের আলোয় দূরে একটা ভাঙা বাড়ি ওদের চোখে পড়ে৷
...ওদিকটাতেই যাওয়া যাক কী বলো?
প্রদ্যোৎ টর্চটা একবার অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেখে নেয়৷
—নাঃ...এদিকে শুধু আগাছা আর জঙ্গল৷
কাছে এগোতে ওরা দেখে বাড়িটা আসলে আধভাঁঙা নয়, অর্ধেক তৈরি হয়ে কনট্রাকশন বন্ধ হয়ে গেছে৷
—মালিক নিশ্চয়ই লেট-এ বুঝতে পেরেছে এখানে বাড়ি বানিয়ে কোন লাভ নেই৷
টর্চের আলোয় দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে কাঁটাতারের ফেনসিং৷ সামনে একটা কাঠের গেট৷ তাতে তালা লাগানো৷
রায় আর প্রদ্যোৎ একবার পরস্পরের দিকে তাকায়৷
—কী স্যর...পারবেন? প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷
—কাঠের গেটটা টপ্কাতে? রায়ের মুখে হালকা হাসি৷
—চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?
প্রদ্যোৎ-এর সাহায্যে রায় কোনক্রমে কাঠের গেট টপ্কে ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়৷ প্রদ্যোৎ অবশ্য অনায়াসেই গেটের ওপর হাতের ভর দিয়ে নিজের শরীরটাকে ওপাশে ডিঙিয়ে নিয়ে যায়৷
গেট থেকে একতলার বারান্দা পর্যন্ত ইঁট পেতে কোনরকমে একটা ইমপ্রোভাইসড রাস্তা বসানো হয়েছে৷ বোঝা যায় বর্ষায় এখানে চারপাশে জল জমে৷ এই রাস্তা ধরে ওরা এগিয়ে যায়৷ চারপাশে আগাছা, হাঁটু অবধি উঁচু ঘাস৷ মনে হয় না গত ছ’মাসের মধ্যে কেউ এ বাড়িতে প্রবেশ করেছে বলে৷ ইঁটের রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে তিন ধাপ পেরিয়ে একটা রেলিং দেওয়া বারান্দা৷ বারান্দার মাঝখানে বাড়িতে ঢোকার মেন দরজা৷ সেটাতেও তালা মারা৷
এবার দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকার আর কোন প্রশ্ন নেই৷ টর্চের আলো ফেলে প্রদ্যোৎ খোঁজে ধারে কাছে কোথাও ভাঙা ইঁট পাওয়া যায় কিনা৷ কিন্তু, বাড়ির চারপাশে এমন আগাছা যে তার ভেতর থেকে ইঁট খুঁজে পাওয়া দুষ্কর৷ বিশেষ করে এরকম অন্ধকারে৷
টর্চটা মুখে ধরে প্রদ্যোৎ তালা নিয়ে টানাটানি করে, যদি কোন মতে খুলে আসে৷ কিন্তু তালা পুরোনো হলে কী হবে সহজে খোলার পাত্র নয়৷
—স্যর...টর্চটা প্রদ্যোৎ রায়ের হাতে ধরিয়ে দেয়৷
—এবার যেটা করবো সেটা কিন্তু একটু বেয়াইনি কাজ৷
প্লিজ কিছু মনে করবেন না৷ চাইলে আপনি অন্য দিকেও তাকিয়ে থাকতে পারেন৷
ব্যাগ থেকে প্রদ্যোৎ একটা সরু তার বার করে৷
—স্যর...উগুিটি একটু তালার ওপর ফোকাস করতে হবে৷ রায় জানতো যে পুলিশে জয়েন করার আগে থেকে প্রদ্যোৎ-এর একটা কালারফুল স্পষ্ট আছে৷ কিন্তু, সেটা যে এরকম, তা ওর জানা ছিল না৷ তার নিয়ে প্রদ্যোৎ কিছুক্ষণ খুটখাট করার পর সত্যিই ‘ক্যাঁচ’ আওয়াজ করে তালাটা খুলে আসে৷
এরকম বিদঘুটে আওয়াজের জন্যই কিনা জানি না পাশের জানলাটা হঠাৎ ফটাস করে খুলে যায়৷ রায় আর প্রদ্যোৎ দুজনেইতো হতভম্ব৷ এটা ভুতুরে বাড়ি নাকি? টর্চটা ওদিকে ফোকাস করতে দেখা গেল একটা বড় মত কাল বেড়াল৷ জানলার গরাদ দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রয়েছে৷ বেড়ালটা ওদের দিকে তাকিয়ে বিশ্রি রকমের ‘ফ্যাঁস’ করে একটা আওয়াজ করে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ওঠে৷ তারপর, ওরা কিছু বোঝার আগেই এক লাফ দিয়ে বারান্দা পার হয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়৷
—বাপরে বাপ...একী কান্ড!
নিজের দম ফিরে পেতে রায়ের পুরো এক মিনিট লাগে৷ কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গে নিজের দম ফিরে পেতে রায়ের পুরো এক মিনিট লাগে৷ কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গে ওর মাথায় একটা নতুন চিন্তা খেলে যায়৷
—আচ্ছা প্রদ্যোৎ...বেড়ালরা তো সাধারণত যেখানে মানুষের বসতি সেখানেই আনাগোনা করে, আনলেন যদি এটা বনবেড়াল হয়ে থাকে, তাহলে এই বেড়ালটা একটা পরিত্যগু, ভুতুরে বাড়িতে কেন আসতে যাবে? কী কারণে? থিঙ্ক...
—থিঙ্ক করছি স্যর...
—বেড়ালদের মধ্যে সবচেয়ে পাওয়ারফুল ইন্দ্রিয় কী?
—ওদের দৃষ্টি শগুি৷ অন্ধকারেও ওরা দেখতে পায়৷
—গুড়..এ ছাড়া?
—এ ছাড়া...? প্রদ্যোৎ ভাবতে থাকে৷
—ওদের ঘ্রাণশগুি?
—ইয়েস! রায় উত্তেজিত ভাবে বলে ওঠে৷
—প্রদ্যোৎ, আমাদের ভেতরে যেতে হবে৷
—স্যর...প্রদ্যোৎ রায়ের দিকে হাত বাড়ায়৷
—টর্চটা আমাকে দেবেন? আলোটা বড্ড ওদিক ওদিক চলে যাচ্ছে৷
—ও...তাই বুঝি?
বাড়ির ভেতরটা যে শুধু অন্ধকার তা নয়, অত্যন্ত নোংরাও৷ পুরো মেঝেটা ভুলোয় তুসরিত৷ তার মধ্যে পায়রার বিষ্টার ছোপ ছোপ দাগ৷ ওরা ঢুকতেই পায়রাগুলো অন্ধকারের মধ্যে ফর্ফর্ করে উড়তে শুরু করে৷ তার মধ্যে একটা তো রায়ের মুখে ডানার ঝাপ্টা মেরে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়৷
—স্যর...একটু সাবধানে৷
টর্চ ঘুরিয়ে প্রদ্যোৎ একবার ঘরের চারপাশটা ভাল করে দেখে নেয়৷ দেওয়াল ভর্তি ঝুল, মাকড়সার জাল, কাল হয়ে যাওয়া পানের পিক৷ টর্চের আলোয় ওরা ভেতরের ঘরে ঢোকার এনট্রান্স দেখতে পায়৷ এক এক করে এক তলার সব কটা ঘরই ওদের দেখা হয়ে যায়৷ কিন্তু, কোন কিছু পাওয়া যায় না, একটা ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা নড়বড়ে বাঁশের মই ছাড়া৷
—আর যাবেন স্যর? প্রদ্যোৎ-এর গলায় কোথায় একটু অনিচ্ছা৷
—না না...এতদূর যখন এসেছি...ঐ তো ওপরে ওঠার সিঁড়ি৷
সিঁড়ি দিয়ে যখন ওরা দোতলায় পৌঁছয় তখন রায়ের মনে হল কোথা থেকে যেন একটা পচা গন্ধ আসছে৷ ইঁদুর বা বেড়াল মরে পড়ে থাকলে যেরকম হয়৷ কিন্তু, দোতলাতেও ওরা কোন কিছু খুঁজে পায় না৷ বাকি রইলো একমাত্র তেতলা, যার সিঁড়ি একেবারে খোলা৷ ধারে কোন রেলিং নেই৷ একবার স্লিপ করলেই সোজা একতলায় পতন৷
—স্যর...প্রদ্যোৎ রায়ের হাত ধরতে যায়৷
—আমি ঠিক আছি৷ রায় প্রদ্যোৎ-এর হাত বিরগু হয়ে সরিয়ে দেয়৷
—আর সাবধান করতে হবে না৷
তেতলার সিঁড়িতে পচা গন্ধ এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে রায়কে নাকে রুমাল গুঁজতে হয়৷ টর্চটা অত্যন্ত সাবধানে ফোকাস করে ওরা তেতলায় ওঠে৷ এবং এখানেই ওা নন্দন মুখার্জিকে খুঁজে পায়—
সাতসকালে কলকাতা মর্গ পরিদর্শন করা যে খুব একটা সুখপ্রদ অভিজ্ঞতা নয় সেটা রায় আর প্রদ্যোৎ পরের দিন হাড়ে হাড়ে বুঝলো, কিন্তু, ওখানকার লোকদের কাছে এটা দৈনন্দিন পাপক্ষয়৷ কার লাশ সনাগু করা গেল, কোন লাশ আনআইডেনটিফায়েড হয়ে পড়ে রইলো, তা দিয়ে তাদের কিছু এসে যায় না৷
রায় শুনেছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোন বডি অসনাগু থেকে যায়, তাহলে তখন তাকে ডোমদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুড়িয়ে ফেলার জন্য৷ তোমরা অবশ্য অধিকাংশ সময়েই তা করে না৷ ডেড বডি নিয়ে কেনা বেচা হয়৷
মর্গের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জায়গা হল একটা বড় হলঘর যেখানে সিমেন্টের স্ল্যাব-এর ওপর সারি সারি মৃতদেহ নগ্ণ অবস্থায় ফেলে রাখা সনাগু করার জন্য৷
আজ সকালে রায়, প্রদ্যোৎ আর চীফ করোনার ডক চৌধুরী এই হলঘরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশেষ মৃতদেহ’র সামনে৷
রায় জীবনে অনেক রকম বডি দেখেছে৷ অনেক রকম মিউটিলেশন৷ কিন্তু, ঠিক এরকমটা এর আগে ও দেখেনি৷ নন্দন মুখার্জির শরীর নিপুণভাবে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে৷ মাথা, ধড় থেকে আলাদা করা৷ তারপর শরীরের ওপরে দিক, যাকে ইংরেজিতে ‘টরসো’ বলা হয়৷ আর, কোমর থেকে লোয়ার লিম্বস৷ এই ত্রিখণ্ডিত শরীরটাকে জুটের ছালা ভরা অবস্থায় রায় আর প্রদ্যোৎ সেই পরিত্যগু বাড়ির থেকে উদ্ধার করেছে৷
কাটার ধরণ দেখলেই বোঝা যায় যে বডিটা সাধারণ করাত দিয়ে কাটা নয়৷ মেশিনের-স ব্যবহার হয়েছে৷ তার মানে নন্দনের বডিটা কাটা হয়েছে অন্যত্র৷ যেখানে পাওয়ার বা ইলেকট্রিসিটি আছে৷
এখন অবভিয়াস প্রশ্ন হল, কে বা কারা এই কাজ করতে থাকতে পারে৷ সল্টলেক-এ ল্যান্ড রেভিনিউ অফিসে গিয়ে কোন সুরাহা হয়নি৷ হাফ কনস্ট্রাকটেড বাড়ির ডিজাইনার অ্যাপ্রুভ করানোর পর কাজ শুরু হয়েছিল ঠিকই৷ কিন্তু, তারপর জমি’র ওনার শিপ নিয়ে ডিসপিউট দেখা দেওয়ায়, দু’বছর আগে কাজ বন্ধ হয়ে যায় তারপর থেকে বাড়িটা ঐরকমভাবেই পড়ে আছে৷
এখন কথাটা হচ্ছে, এই পরিত্যগু বাড়িতে যে কেউই রাতের অন্ধকারে ছালায় ভর অবস্থায় ঙ্গ করে যেতে পারে৷ অতএব, এটা এখানকার লোকাল লোকেরই কাজ এরকমভাবার পেছনে কোন বিশেষ যুগুি নেই৷
এসব নিয়ে ওরা আলোচনা করছে, এমন সময় করবী মুখার্জি মর্গে উপস্থিত হয়৷ রায়ই ওকে ফোন করে জানিয়েছিল সে আর তার শ্বশুরমশায় একবার যদি মর্গে আসেন, নন্দন মুখার্জির মৃতদেহ সনাগু করতে৷
জানা গেল প্রফুল্লবাবু আসছেন না৷ এই বয়সে একমাত্র ছেলের মৃতদেহ সনাগু করার মত মনোবল তার নেই৷ রায় ভেবেছিল স্বামীর এরকমভাবে মিউটিলেটেড বডি দেখে করবী হয়তো ফেন্ট করে যাবে৷ কিন্তু, মানতে হবে মিসেস মুখার্জির মধ্যে মানসিক বল আছে৷ চাদর সরিয়ে ডেড বডিটা যখন তাকে দেখানো হল, তখন সে কান্নাকাটি করা বা দুঃখ প্রকাশ কিছুই করলো না৷ শুধু মনে হল মহিলার সমস্ত শরীরটা পাথর হয়ে গেছে৷ ফ্রোজন৷
—আমি ওর সঙ্গে কয়েক মিনিট থাকতে পারি?
করবী রায়কে জিগ্যেস করে৷ রায় একবার ডক-এর দিকে তাকায়৷ ডক শোল্ডার শ্রাগ করে৷
—আমাদের ফোন প্রবলেম নেই৷
—থ্যাঙ্কস৷ অস্ফুট গলায় করবী জানায়৷
চলে যাওয়ার সময় রায় একবার পেছন ফিরে দেখতে পায় করবী ডেড বডিটার পাশে চুপ করে দাড়িয়ে আছে৷ ওর হাত বডিটার ডান হাতে রাখা৷
রায় অফিসে বসে কাজ করছে এমন সময় ওর ফোন আসে৷
—স্যর...আমি রঞ্জন বলছি৷
—বলো৷ ফাইলটা দেখতে দেখতে রায় বলে৷
—একটা অঘটন ঘটে গেছে স্যর...
টেলিফোনে রঞ্জনের গলাটা ভালো শোনায় না৷
—কী হয়েছে? অতঃপর রায় ফাইলে লেখা বন্ধ করে৷
—স্যর...এতে আমার কোন ভুলচুক হয়নি...প্লিজ বিশ্বাস করুন৷
—আরে, আগে বলবে তো কী হয়েছে?
রায় একটু অসহিষ্ণু হয়ে বলে৷
—স্যর...কমলাক্ষ বাবু নিঁখোজ!
—মানে?
—মানে...আমি ওকে সারা ইভনিং স্যাডো করে আসিছ...
হঠাৎ করেই দেখলাম ওনাকে আর কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না৷
—কী যাতা বকছো রঞ্জন? টেলিফোনেই রায় ধম্কে ওঠে৷
—আমাকে আদ্যোপান্ত খুলে বলোতো৷
—বলছি স্যর...বিকেলবেলায় করবীদেবী’র বাড়ি থেকে বেরিয়ে কমলাক্ষবাবু একটা ট্যাক্সি নেয়৷
ও বাবাঃ! এ দেখি আবার দেবী-টেবী বলে দেখছি৷ রঞ্জনের কথা শুনে রায় ভুরু কুঁচকোয়৷
—আমি ওকে পেছন পেছন ফলো করি৷ পার্কস্ট্রিটে এসে কমলাক্ষবাবু ট্যাক্সি ছেড়ে দেয়৷
—বেশ...তারপর?
—তারপর কমলাক্ষবাবু কর্নারের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে রেস্টুরেন্ট-এ ঢুকে যায়৷
—কোন রেস্টুরেন্ট?
—অলি পাব স্যর...ওটাই আগে অলিম্পিয়া৷
—ওফ্! অলি পাব আমাকে চেনাতে হবে তোমার...রায় বিরগু হয়৷
—তারপর কী হল সেটা বল...
—আমি অলিপাব-এর সামনে দাড়িয়ে আছি৷ বইয়ের দোকানগুলো আছে না...সেখানে বই ঘাঁটাঘাঁটি করছি...তারপর কী মনে হল আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম কমলাক্ষবাবু কী করছেন দেখতে৷
—ভেতরে গিয়ে তাকে আর দেখতে পেলে না তো?
—হ্যাঁ স্যর...বিশ্বাস করুন আমার চোখ কিন্তু সব সময় মেন দরজার ওপর ছিল...কমলাক্ষবাবু সেখান দিয়ে৷
—আরে...অলি পাব-এর পেছন দিয়ে একটি বেরুবার প্যাসেজ আছে সেটাও জানো না? রান্নাঘরের পাশ দিয়ে...
—স্যর...সেটাতো পরে জানতে পারলাম৷
—আচ্ছা...তুমি ওখানে অপেক্ষা করো৷ প্রদ্যোৎ তোমাকে ডিউটি থেকে রিলিভ করছে৷
রায় ফোনটা ছেড়ে দেয়৷
—প্রদ্যোৎ তুমি একবার পার্কস্ট্রিটে যাওতো৷ দেখ কী করতে পার৷
কমলাক্ষবাবুর বাড়ির সামনে প্লেন ক্লোদজ মোতায়েন করো৷ আর, ওর অফিসের সামনেও, একজন৷
—স্যর...করবী মুখার্জির বাড়ির সামনে একজন লোক রাখা উচিত না?
—আপাততঃ না৷ হি নোজ ইট ইজ আনডার অবজারভেশন প্রদ্যোৎ রায়ের অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে৷
—মিস্টার রায়...টেলিফোনে করবীর গলা চিনতে পারে রায়৷
—আপনার সঙ্গে একবার দেখা করা যায়? জরুরি কথা আছে৷
—রায় একবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে নেয়৷
—ঠিক আছে...আধঘণ্টা পঁয়চতাল্লিশ মিনিট পর আপনার কাছে চলে আসছি৷
—বাড়িতে দেখা হোক আমি চাই না৷ শ্বশুরমশাই আছেন...যদি ওভারহিয়ার করেন?
—তাহলে কী করতে চান?
—অন্য কোথাও গিয়ে একটু বসা যায়?
—শিয়োর৷
গঙ্গারধারে কয়েক বছর হল একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে যেটা এক নোঙ্গর ফেলা জাহাজের টপ ফ্লোরে অবস্থিত৷ রেস্টুরেন্ট-এর যে দিকটা গঙ্গার দিকে ফেসিং সেদিকের কর্ণারের টেবিলে গিয়ে ওরা বসে৷
—কী খাবেন?
—কিছু না৷ করবী সাইডওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—ঠান্ডা কিছু...কোল্ড কফি?
—আচ্ছা বলুন৷
নিজের জন্য রায় এক পট চায়ের অর্ডার দেয়৷ আর এক প্লেট ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ৷ যদি মিসেস মুখার্জি আদৌ খেতে রাজি হন, তাহলে কোন ননভেজ খাবার অর্ডার দেওয়াটা ঠিক হবে না৷
বেয়ারা অর্ডার নিয়ে চলে যেতে ওরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে৷ ওদের পাশেই গঙ্গার জলে সেকেন্ড হাওড়া ব্রিজ-এর সারি সারি আলো প্রতিফলিত হয়ে আছে৷ একটু পরেই একটা স্টিমার ডায়াগোনালি গঙ্গার বুক দিয়ে চলে যেতে ব্রিজের প্রতিচ্ছবি ঢেউয়ে একেবারে তোলপাড় হয়ে যায়৷
—কী দিয়ে শুরু করি বলুন তো? করবী জরেণ্ডল দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে৷
—আপনার স্বামীর প্রাইভেট লাইফ৷ গতকাল সকালে মিস্টার মুখার্জির ব্যঙ্ক স্টেটমেন্ট দেখাকালীন একটা ফিগার নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম৷ ৬৫০০০্ টাকার উইথড্রওয়াল৷ ক্যাশে৷ গতকাল বিকেলে আগেকার স্টেটমেন্ট ঘেঁটে এরকম বড় অঙ্কের আর চারটে ব্যাপ উইথড্রওয়াল৷ আবিষ্কার করলাম৷ যাস্ট এক বছরের মধ্যে আড়াই লাখ-এরও বেশি৷
রায় এবার সরাসরি করবীর দিকে তাকায়৷
—এটার একটাই অর্থ হয়৷ আপনার স্বামীকে কেউ বা কারা সিসটেম্যাটিকালি ব্ল্যাকমেল করছিল৷ গত এক বছর ধরে করবী চুপ করে শোনে৷
—আর আপনি বলতে চান এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন না৷
এটা কী বিশ্বাসযোগ্য?
এতক্ষণে করবী রায়ের দিকে তাকায়৷
—বলছি... করবী সময় নিয়ে কথা বলে৷ ওর গলার স্বর এত নীচু যে রায়কে কাছে এগিয়ে বসতে হয়৷
—প্রায় দেড় বছর আগে নন্দন একটা কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে বম্বে যায়৷ তিন দিনের কনফারেন্স৷ ফিরে আসার পর থেকেই ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম৷ মনে হল ও আমার সঙ্গে ফিজিকাল রিলেশনশিপ অ্যাভয়েড করতে চাইছে৷
—যাস্ট লাইক দ্যাট? পট থেকে চা ঢালতে ঢালতে রায় জিজ্ঞেস করে৷ করবী মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়৷
—প্রথম প্রথম আমি ভাবতাম সারাদিন কাজ করার পর হয়তো ও টায়ারড হয়ে যায়...তাই৷ কিন্তু কয়েকদিন পর বুঝলাম আসলে তা নয়৷ ও আমাকে সিমপ্লি এড়িয়ে যাচ্ছে৷ রাত্রে খাওয়ার পর বিছানায় শুতে আসতো না৷ ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকতো৷ বলতো, তুমি শুয়ে পড়৷ আমার দেরী হবে, কাজ আছে৷
—তারপর?
করবী চুপ করে আছে দেখে রায় জিজ্ঞেস করে৷
—তারপর? আমার স্বামীর মন ভোলানোর জন্য আমি দামী দামী৷ নেগলিজে কিনলাম৷ লেস দেওয়া, শিফনের তৈরি, যতটা রিভিলিং করা যায়৷ ভাবতে পারেন...আই ওয়াজ ট্রাইং টু সিডিউস মাই ওন হাজবেন্ড৷ কিন্তু...
নিজেকে কনট্রোল করার জন্য করবী তলার ঠোঁট কামড়ায়৷
—নাথিং ওয়ার্কড৷
রায় একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷
—স্যান্ডউইচ? রায় স্যান্ডউইচের প্লেট করবীর দিকে এগিয়ে দেয়৷
—আমার মনে হয় আপনি সকাল থেকে কিছু খান নি৷
করবী একটু অবাক হয়ে রায়ের দিকে তাকায়, তারপর প্লেট থেকে একটা স্যান্ডউইচ তুলে নেয়৷
—শেষ পর্যন্ত জানতে পারলেন মহিলাটি কে?
করবী রায়ের দিকে মুখ তুলে তাকায়৷ ওর চোখ জলে ভরা৷
—দিস ইজ দ্য থিং...মহিলা নয়...পুরুষ৷ এক কিম্বা একাধিক৷
—হোয়াট? রায় এই উত্তরটা আশা করে নি৷
—আর ইউ শিয়োর?
করবী মাথা নত করে৷
—একদিন নন্দন চানে গেছে৷ এমন সময় ওর মোবালিটা বেজে ওঠে৷ এটাও একটা সন্দেহ’র ব্যাপার জানেন...ও বাথরুমে গেলেও মোবাইল সঙ্গে নিয়ে যেত৷ সেদিন ও কোন কারণে ভুলে গিয়েছিল৷ তা মোবাইলটা কানে তুললাম৷ আমার কানে যা কথা এল সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ ‘হাই নানডান মাই সুইটহার্ট... আর উই মিটিং দিস ইভনিং?
—আমরা পুরুষরা অনেক সময়ই বন্ধুদের এরকম ভাবে সম্বোধন করি৷
আপনি হয়তো...
—মিস্টার রায়...করবী রায়ের কথা শেষ হতে দেয় না৷
টেলিফোনে সেদিন ভদ্রলোক যে কথাগুলো বলেছিল তাতে ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই৷ সরি...কথাগুলো আমি মুখে আনতে পারছি না৷
—মোবাইলে ভদ্রলোকের নাম সেভ করছিল?
—হ্যাঁ...রাহুল৷ বলার ধরণ থেকে মনে হয়েছিল, হয়তো নন-বেঙ্গলি৷
—সারনেম?
—সরি৷ পদবী সেভ করা ছিল না৷ যা বলছিলাম...পরের দিনই নন্দন আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে তুমি আমার ফোন রিসিভ করেছিলে কে তোমাকে সে অধিকার দিয়েছে শুনি? দেখলাম আমার স্বামীর মুখ রাগে ফেটে পড়ছে৷
ফ্লোটিং রেস্টুরেন্টের পাশ দিয়ে আলোয় ঝলমলে একটা স্টীমার চলে যাচ্ছে৷ তার ডেক-এ ইয়ং ছেলেমেয়েরা হই হই করছে, নাচছে৷ সেই দিকে করবী উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷
—এরপর ক্ষই হ্যাভনট মেড লাভ ইভন এ সিংগল টাইম৷ কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ৷
—সবইতো বুঝলাম মিসেস মুখার্জি৷ কিন্তু...আপনি যে আমাদের মহা মুশকিলে ফেললেন৷
—কী করে? করবী জিজ্ঞেস করে৷
—যাস্ট রাহুল না থেকে আমরা কীভাবে এগুই বলুন তো?
ওর ল্যাপটপ বাড়িতে?
করবী সাইডওয়াইজ মাথা নাড়ে৷
—ল্যাপটপ সব সময় ওর সঙ্গে থাকে৷
—হুঁ৷ চিন্তিত ভাবে রায় থুঁতনিতে হাত বোলায়৷
—ডেডবডি’র সঙ্গে ল্যাপটপ, মোবাইল, মানি ব্যাগ—কিছু ছিল না৷
আচ্ছা মিসেস মুখার্জি...বাই এনিচান্স রাহুলের নাম্বারটা মনে আছে কী?
—না...করবীর মুখে ম্লান হাসি৷
—মনে থাকলে অনেক আগেই জানতাম৷
—একবার কিছুই মনে পড়ছে না?
রায় করবীর কাছে মুখ নিয়ে আসে৷
—লেট মি হেল্প ইউ৷ আপনি যখন মোবাইল ফোনটা ধরলেন তখন সেটা কোথায় ছিল?
করবী একটুক্ষণ চিন্তা করে৷
—টেবিলে৷
—গুড৷ আপনি যখন টেলিফোনটা হাতে নিলেন, তখন ফার্স্ট আপনার চোখে কী পড়লো?
—রাহুল নামটা৷
—ভেরি গুড৷ তার ঠিক নীচে একটা নাম্বার ফ্ল্যাম্প করছিল৷
মনে পড়ছে?
—ভগলি৷
—এবার নাম্বারটা পড়ার চেষ্টা করুন৷ আপনা-আপনি করবীর চোখ বন্ধ হয়ে আসে৷
—কী দেখতে পাচ্ছেন বসুন?
—নাইন...হ্যাঁ নাইন নাইন...জিরো ফোর...
—একসেলেন্ট! আর মাত্র কয়েকটা ডিজিট বাকি...দেখুন
বাকি নাম্বারগুলো চোখে পড়ে কিনা৷
—চেষ্টা করছি৷ কিন্তু অন্য নাম্বার ঠিক পরিষ্কার নয়৷
ফাইভ সেভেন? তারপর...আর পারছি না৷
করবী চোখ খুলে রায়ের দিকে তাকায়৷
—আর অ্যাম নট টু শিয়োর এ বাউট ফাইভ সেভেন...
—কিন্তু, প্রথম চারটে নাম্বার?
করবী মাথা নত করে৷
—ইয়েস৷ মোর অর লেস শিয়োর৷
—থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ৷
নিজের অজান্তেই করবীর মুখে একটু হালকা হাসি দেখা দেয়৷
—চলুন মিসেস মুখার্জি...রায় একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকায়৷
—আপনাকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি৷
করবীকে ড্রপ করার পর রায় পার্কস্ট্রিটের ফ্লুরিতে এসেছিল কিছু পেসট্রি কিনতে মনে ক্ষীণ আশা, যদি এ দিয়ে শর্মির মানভঞ্জন করা যায়৷ ফ্লুরি’র পেসট্রি শর্মির বিশেষ পছন্দ৷
ফ্লুরি’র থেকে রায় বেরিয়ে আসেছে৷ এমন সময় প্রদ্যোৎ-এর যোগ আসে৷
—তুমি এখন কোথায়?
রায়ের মুখে তখনও আধখাওয়া পেসট্রি৷
—কী বললেন স্যর?
—বলছি...এক মিনিট৷ বাকিটা পেসট্রি রায় জোর করে গলাধ্যকরণ৷
—তুমি কী এখনও পার্কস্ট্রিটে?
—ইয়েস স্যর৷ অলি পাব আর বাইরের পানওয়ালার দোকানে জিজ্ঞাসাবাদ করে খুব একটা ফল হয়নি৷ কমলাক্ষবাবু এখনও আনট্রেসেবল৷
—রাস্তা ক্রস করে তুমি ফ্লুরি’র দিকে চলে এসো৷ আমি ওখানেই আছি৷
পার্কস্ট্রিট ক্রস করার সময় প্রদ্যোৎ দূর থেকেই রায়ের গাড়ি মাথার লাল আলো দেখে চিনতে পাে৷ রায় পেছনের দরজা খুলে দেয়৷
—ভেতরে এসো...কথা আছে৷
প্রদ্যোৎ এসে বসতে রায় ওকে বাক্স খুলে পেসট্রি অফার করে৷ প্রদ্যোৎ বুদ্ধিমান ছেলে৷ গত চার বছর রায়ের সঙ্গে কাজ করে ও বুঝতে পেরে গেছে কখন স্যরের মানভঞ্জনের পালা চলে৷
—না স্যর...আজ পেট ভরা৷ ওপাশের দোকান থেকে এখখুনি একটা মাটন রোল খেয়ে এলাম৷
রায়ের কথা মত আনসারি গাড়ি চােিয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পার হয়ে রেস কোর্সের চার পাশে ঘুরপাক খেতে থাকে, যতক্ষণ না রায়ের কথা শেষ হয়৷
—স্যর...আপনি যা বলছেন তার থেকে এই রাহুল লোকটিকে খুঁজে বার করাতো নেক্সষ্ট টু ইমপসিবল৷
আজকাল নিজের অজান্তেই প্রদ্যোৎ রায়ের মত কথা বলতে শুরু করেছে৷
—এমনিতেই উত্তর ভারতে রাহুল নামে ষাট লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার চারশো বাহান্ন’টা লোক রয়েছে৷ তারপর, রাহুল ড্রাভিড বিখ্যাত হওয়ার পর এখন বাংলার ঘরে ঘরেও প্রতিদিন রাহুলের সংখ্যা বাড়ছে৷
এর মধ্যে থেকে আমাদের রাহুলকে খুঁজে বার করবেন কী ভাবে?
—পেশেন্স মাইফ্রেন্ড৷
এক মুহূর্তের জন্য রায়ের মুখে একটা হালকা হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়৷
—যতটা খারাপ ভাবছো...আমাদের পরিস্থিতি ততটা খারাপ নাও হতে পারে৷ লেটস ফার্স্ট অ্যানালাইন৷ আমাদের কাছে কী কী ইনফরমেশন আছে?
—রাহুল নামটা ছাড়া আর কী আছে বলুন?
—আছে৷ করবী’র মতে নন্দন মুখার্জির সেক্স লাইফে প্রথম পরিবর্তন দেখা দেয় প্রায় দেড় বছর আগে৷ ভদ্রলোক বম্বেতে একটা কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করার ইমিডিয়েটলি পর থেকে৷ অতএব, এরকম একটা অনুমান করা যেতেই পারে যে বম্বের কনফারেন্সেই মিস্টার মুখার্জির সঙ্গে রাহুলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়৷
প্রদ্যোৎ একটুক্ষণ চিন্দা করে৷
—পয়েন্ট স্যর৷
—এ ছাড়া, টেলিফোনে রাহুল নন্দনকে সম্বোধন করেছিল অ্যাজ ‘নানডান মাই ডাহলিং’৷ যেটা খুবই অ্যাঢেকটেড ইংলিশ৷ অতএব, তার থেকে এও অনুমান করা যেতে পারে যে রাহুল নামক এই ব্যগুিটি করপোরেট ওয়ালড-এর মানুষ৷
—ঠিক কথা স্যর৷
—এছাড়া, করবী আরও বলেছে লোকটির ফোন নাম্বার খুব সম্ভবতঃ ১৯০৪ দিয়ে শুরু৷ ওটাও একটা লাভ বইকি৷
—রাইট স্যর৷
—তবে...রায় প্রদ্যোৎকে ধৈর্য ধরতে বলে৷
—এতেই কিন্তু আমরা খান্ত হবো না৷ উই হ্যাভ টু কাষ্ট ওয়ার নেট ওয়াইপর৷
—কীভাবে?
—নন্দনবাবুর কলকাতার অফিসে খোঁজ নাও, রাহুল নামে কোন ব্যগুি আছে কিনা, বা গত দেড় বছরের মধ্যে ছিল কিনা৷ ওর যারা যারা ক্লায়েন্ট, তাদের অফিসেও খোঁজ নাও৷
রায়ের মুখে একটা মৃদু হাসি দেখা দেয়৷
—আমার ধারণা...এই রাহুল বাবুটি ঠিক আমাদের জালে ধরা পড়বেন৷
—আনসারি...ভবানীপুর চলো৷ রায় ড্রাইভারকে বলে৷ প্রদ্যোৎ-এর মুখে একটা দারুণ খুশি খুশি ভাব৷ আড়চোখে সে রায়ের দিকেপ্রশংষ দৃষ্টি তাকায়৷
—হোয়াট? রায়ের মনে হয় প্রদ্যোৎ ওর দিকে তাকিয়ে৷
—নাথিং স্যর৷
প্রদ্যোৎকে ভবানীপুরে ভারতি সিনেমার কাছে ড্রপ করে দেওয়া হয়৷ ও কাছেই একটা গলির ভেতর থাকে৷
—স্যর...একটা কথা বলবো? ফুটপাথ থেকে ঝুঁকে প্রদ্যোৎ জিজ্ঞেস করে৷
—আমরা কী কমলাক্ষবাবুকে সাসপেক্ট করছি না?
—কমলাক্ষবাবুরও গলদ নেই তা নয়৷
চশমার ওপর দিয়ে রায় তেরছা করে প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—তবে, আপাততঃ সেটা বন্ধু পত্নী’র প্রতি আকৃষ্ট াওয়াতেই সীমিত৷ বন্ধুকে খুন করার পর্যায়ে এখনও পৌঁছয় নি৷
—কিন্তু, উনি যদি আদৌ দোষী হয়ে না থাকেন, তাহলে হঠা২ করে বেপাত্তা হয়ে গেলেন কেন?
—স্রেফ ভয় পেয়ে৷ বোঝাইতো বাঙালি ভিতু সম্প্রদায়ের লোক৷ আর তাছাড়া ভেতর ভেতরেতো একটা গিল্টি ফিলিং কাজ করছেই৷
—গুডনাইট স্যর৷
পরের দিন সকাল থেকেই করবীর মোবাইলে কনডোলেন্স জানিয়ে ফোন কল আসতে শুরু করে৷ প্রথমে ফোন করেন ওর মা, বেহালা থেকে৷ করবী’র বাবা গত বছর মারা গেছেন৷ তারপর গোয়ালিয়র থেকে ফোন করে দিদি৷ আর, ওর দাদা, বারসিংহাম থেকে৷
—টুশকি...পাসপোর্ট করানো আছে তো? তাহলে আর কী?
আমার কাছে চলে আয়৷ এসব গন্ডগোল না সেটা পর্যন্ত তুই এখানে থাক৷ আমি জানি মিডিয়া তোকে কী ভাবে হাউন্ড করবে৷
—না দাদা...আমি ঠিক আছি৷ তোমরা ভেবো না৷
করবীর দাদা কথাটা কিন্তু ভুল বলে নি৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরের কাগজ আর টেলিভিশনের নানান নিউজ চ্যানেল ওদের বাড়িতে এসে হানা দেয়৷ কাজের মেয়েটিকে দিয়ে করবী বলে পাঠায় ও বাড়ি নেই৷ জিজ্ঞেস করলে বলতে, উনি কোথায় গেছেন কেউ জানে না৷
শ্বশুরমশাইকে দিয়ে বলাতে গিয়ে হীতে বিপরীত হয়েছিল৷ সববাই মিলে প্রফুল্লবাবুকেই ছেঁকে ধরেছিল৷ ‘বাইট’ নেবার জন্য৷ দুপুর দু’টো নাগাদ বাইরের দরজায় কলিং বেল বাজতে করবী মেয়েটিকে পাঠায় কে এসেছে দেখতে৷ কাজের মেয়েটি ফিরে এসে জানায় বাইরে কমলাক্ষবাবু অপেক্ষা করছে৷ করবীর কথা মত কমলাক্ষকে ভেতরে েেনই বাইরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়৷
বেশ কিছুক্ষণ পর করবী বাইরের ঘরে বেরিয়ে আসে৷ চাপা গলায় কমলাক্ষকে বলে—তোমায় আসতে বারণ করেছিলাম না...তবে কেন এসেছো?
কমলাক্ষ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে৷
—তোমার মোবাইলে বার বার ফোন করেও পাইনি৷ আর, ল্যান্ড লাইন পারমানেন্টলি এনগেজড৷ আর পারছিলাম না এভাবে৷
—কে এলো করবী? প্রফুল্লবাবু ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷
—ও তুমি?
প্রফুল্লবাবু একটুক্ষণ ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আবার ভেতরের ঘরে চলে যান৷
—তুমি বুঝতে পার না...তুমি এখানে আসো সেটা শ্বশুরমশাই একেবারেই পছন্দ করেন না?
কমলাক্ষ চুপ করে থাকে৷
—হোয়াট মেড ইউ ডু ইট?
ভেতরের ঘরের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে কমলাক্ষ করবী’র কাছে ঘনিষ্ট হয়ে দাড়ায়৷
—প্লীজ লীভ...করবী ফিসফিস করে বলে৷—রাইট নাও৷ নইলে আমি শ্বশুরমশাইকে ডাকতে বাধ্য হবো৷
সকালে রায় লালবাজারে পৌঁছনর পরই ডিসি’র অফিস থেকে ডাক পরে৷ ডিপার্টমেন্টালি মিটিং৷ মাসে একবার করে হয়৷ রায় ফাইলপত্র নিয়ে গোমরা মুখে বড় সাহেবের ঘদ্দের প্রবেশ করে৷ এই মিটিং কতক্ষণ ধরে চলবে কেউ বলতে পারে না৷ লাঞ্চের আগে শেষ হলে ওদের কপাল ভাল৷ নইলে দিনের শেষ অবধিও চলতে পারে৷ নিজের অজান্তেই রায়ের মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে৷
—কী ব্যাপার? সকাল থেকেই বিরস বদন?
ডিসি ট্রাফিক রায়কে দেখতে পেয়ে জেভিয়ালি জিজ্ঞেস করে নির্মল বাসুর বয়েস ষাটের কাছাকাছি৷ কিন্তু, এখনও খুব হ্যান্ডসাম চেহারা৷ পরণের পোশাক সদ্য পাটভাঙা৷ বুক পকেট থেকে রে ব্যান-এর একটা ডাঁটি উঁকি মারছে৷
স্যর নাকি সদ্য সদ্য স্ত্রীকে নিয়ে ব্যাংকক-পাতায়া-ফুকেট ঘুরে এসেছে৷ রায় নিজের কথা ভাবে৷ বিদেশে বেড়াতে যাওয়া দূরের কথা, নিজের স্ত্রীকে নিয়ে রায় কবে কলকাতার বাইরে গেছে সেটাই মনে করতে পারে না৷
—তা রায় কাজ-কম্ম কেমন চলছে?
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই অবশ্য বাসু সাহেব তার সদ্য সমাপ্ত বিদেশ যাত্রার বর্ণনা দিতে শুরু করে৷
—ব্যাংককটা অত্যন্ত ক্রাউডেড বুঝলে...তবে শহরটায় লাইফ আছে৷ রাত দু’টোর সময় রাস্তায় বেরোও, মনে হবে আমাদের পার্কস্ট্রিটের সন্ধে৷ তবে, বুঝলে ভায়া...
বাসু সাহেব এখানে নাটকীয় ভাবে গলা খাটো করে৷
—পাতায়ায় গিন্নিকে নিয়ে যাওয়ার কোন মানে হয় না৷ ওয়েস্ট অফ টাইম অ্যান্ড মানি৷ বলো তো..৷ বডি ম্যাসাজ পার্লারে যাবো...সঙ্গে বউ৷ এটা কখনও হয়?
নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে ওঠে বাসু৷ বাধ্য হয়ে রায়কেও এঁটো হাসি হাসতে হয়৷
এমন সময় রায়ের পকেটে মোবাইল বিপ বিপ করে ওঠে৷ পকেট থেকে বার করে ও দেখে প্রদ্যোৎ-এর কল৷
—স্যর...এক্সকিউজ মি অ্যা মিনিট৷ দরকারি কল৷ বড় সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে রায় কলটা নেয়৷
—হ্যাঁ প্রদ্যোৎ বল...
—খবর আছে স্যর৷
—কী...রাহুল সম্পর্কিত?
—ইয়েস স্যর৷ আপনি এখন কোথায়?
—ডিসি সাহেবের ঘরে আমাদের মানথলি মিটিং৷
তবে চিন্তা কোরো না...ম্যানেজ করে বেরিয়ে আসছি৷
...একটা নয়...দু’দুটো রাহুলের সন্ধান পাওয়া গেছে৷ এর মধ্যে একজন রাহুল খান্না, দিল্লিতে থাকে৷ গারমেন্ট এক্সপোর্টের বিজনেস৷ ফোন করেছিলাম৷ অবশ্য...একটু নামের হেরফের করে৷
—নামের হেরফের?
রায়ের অফিসে প্রদ্যোৎ আর রায়৷ প্রদ্যোৎ কথা বলে যাচ্ছে৷ আর রায় থুঁতনিতে হাত রেখে তন্ময় হয়ে শুনছে৷
—মানে...আমি নিজেকে নন্দন মুখার্জি বলে ইনট্রোডিউস করলাম৷ বুঝতেই পারছেন...দেড় বছর আগেকার কথা৷
—তা...রাহুল খান্না কী বললো তোমাকে?
—ওতো প্রথমে মনেই করতে পারছিল না৷ তখন আমি বললাম বম্বের কনফারেন্সে আমরা দুজনেই একসঙ্গে অ্যাটেন্ড করেছিলাম৷ খান্ডালায়৷ তখন ওর মনে পড়লো৷ হ্যাঁ...হ্যাঁ তা দেড় বছর পর হঠাৎ কী মনে করে বুঝলেন স্যর...ওর কথাবার্তার থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল...হি ইজ নট আওয়ার ম্যান৷
—বুঝলাম৷
রায় যখন কোন কিছু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে তখন অন্যমনস্ক ভাবে গালে হাত বোলানোটা তার অভ্যেস৷
—আর অন্যটি?
—অন্যটি কলকাতার৷ রাহুল সেন৷ এও বম্বের কনফারেন্সে ছিল৷
নন্দনবাবুর এক্স-কলিগ৷
—এক্স কলিগ?
—বছরখানেক হল উনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেছেন৷
—আই সি৷ ক্যান উই মিট হিম?
—হ্যাঁ স্যর৷ ওর সঙ্গে মিটিং আপনাকে না জিজ্ঞেস করেই আমি ফিক্স করে ফেলেছি৷ সরি...
—সরি কেন? ইউ হ্যাভ ডান রাইট৷ আমি হলেও তাই করতাম৷ কথাটা শুনে প্রদ্যোৎ খুশি হয়৷
—স্যর, মিটিংটা একঘণ্টা পর৷ আপনি থাকবেন তো? রায় মাথা নত করে৷
বিকেল চারটে৷ বালিশ মাথার দিকে তুলে বিছানায় হ্যালান দিয়ে করবী চুপ করে বসে আছে চোখের দৃষ্টি শুন্য৷ তিনবার রিং টোন হওয়ার পর করবীর খেয়াল হয়, ওর মোবাইলটা বাজছে৷ একবার ও মোবাইলটার দিকে তাকায়৷ ইচ্ছে হয় না তুলতে৷
গতকাল বেশির ভাগ সময় ও নিজের মোবাইল সুইচ অফ করে রেখেছিল৷ আর ল্যান্ড লাইনের টেলিফোন রিসিভার থেকে নামিয়ে রাখা হয়েছিল৷ মিডিয়ার লোকরা কী করে যে ওদের নাম্বার পেল ভগবান জানে৷
অনেকক্ষণ বেজে টেলিফোনের রিং টোন অফ হয়ে যায়৷ বাঁচা গেল৷ শান্তি৷ করবী হাঁটু বুকের কাছে জড় করে তাতে থুঁতনি রাখে৷ মাথার চুল এলোমেলো৷ চোখের তলায় এক পোঁচ কালি৷ পর পর দুরাত ঘুম হয়নি৷ কী মনে হতে ও দু’হাত দিয়ে নিজের হাঁটু জড়িয়ে ধরে৷
ওর মোবালটা আবার বাজতে শুরু করেছে৷ করবী মোবাইলটার দিকে তাকায়৷ অপরিচিত নাম্বার৷
কী মনে করে করবী হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা তোলে৷ কিন্তু কোন কথা বলে না৷
—মিসেস মুখার্জি? টেলিফোনে একজন অপরিচিত পুরুষের গলা৷ করবী কোন উত্তর দেয় না৷
—করবী মুখার্জি বলছেন? হ্যালো...হ্যালো
—আপনি কে? আর...এই নাম্বারটাই বা পেলেন কোথার থেকে? করবী তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে৷
—মিসেস মুখার্জি...আমি জানি আপনি এখন কিরকম সাংঘাতিক মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন...টেলিফোন লোকটির গলা অত্যন্ত সহানুভূতিশীল শোনায়৷
—আমি আপনারে সাহায্য করতে চাই৷
—আগে বলুন আপনি কে...নইলে আমি এই মুহূর্তে...
—না না...প্লিজ! টেলিফোনটা ছেড়ে দেবেন না (একটুক্ষণ পর —আমি...আপনি আমাকে চিনবেন না৷ আমি আপনার স্বামীর বন্ধু বলতে পারেন৷ হিতাকাঙ্ক্ষী৷
—ওরকম হিতাকাঙ্ক্ষী অনেক দেখা আছে৷
—আপনি নিশ্চয়ই জানতে চান আপনার স্বামীকে কে বা কারা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে, চান না?
—করবী চুপ করে থাকে৷
—আমি আপনারে আপনার স্বামীর কাছে নিয়ে যেতে পারি৷ তবে, একটা শর্তে৷
—বলুন৷
তার মানে...ওরা কী জানে না আমরা নন্দনের ডেড বডি অলরেডি খুঁজে পেয়েছি? হতে পারে৷ পুলিশ মিডিয়াকে জানিয়েছে নন্দন মুখার্জি দুদিন ধরে নিখোঁজ তার বেশী কেউ জানে না৷
—আজ রাত নটায় আপনি বিড়লা প্ল্যানেটারিয়ামের সামনে থাকবেন৷ কিন্তু একা...
—অসম্ভব৷ করবী দৃঢ় গলায় জবাব দেয়৷
—তার মানে...আপনি আপনার স্বামীকে দেখতে চান না?
টেলিফোনে এখন লোকটির গলা, আর অতটা সহানুভূতিশীল শোনায় না৷
—অবশ্যই চাই৷ তবে...আমি একা যাব না৷
—ধরুন...টেলিফোনের মুখ হাত দিয়ে চেপে মনে হয় লোকটি অন্য কারও সঙ্গে কথা বলছে৷
—বেশ৷ একটুক্ষণ পর টেলিফোনে জবাব মেলে৷
—কিন্তু যাস্ট একজনই লোক আসবে৷ তার বেশি নয়৷
—ঠিক আছে৷
—আরেকটা কথা৷ পুলিশকে ভুলেও যেন জানাবেন না৷ এতে হিতে বিপরীত হবে৷ করবী টেলিফোনটা কাটতে যাচ্ছিল৷
—আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি৷ রাত ন’টা৷ বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়াম৷ দেরী হলেও আসবো৷
ভয়েসটা ডেড হয়ে যায়৷
সেকটার ফাইভে সি সিডি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বার করতে প্রদ্যোৎ-এর সময় লাগে৷ ঐ এলাকায় যে একাধিক সিসিডি রেস্টুরেন্ট আছে সেটা ওর জানা ছিল না৷ শেষ পর্যন্ত রাহুলকে ফোন করে ওর জানতে হয় কোনটাতে সে রয়েছে৷ এই মিটিং-এ প্রদ্যোৎ-এর সঙ্গে রায়েরও আবার কথা ছিল৷ কিন্তু লাস্ট মিনিটে স্যরের কাছে একটা ফোন কল আসে, আর স্যর থেকে যায়৷
রেস্টুরেন্টে ঢুকতে এক ভদ্রলোক কর্নারের টেবিল থেকে উঠে আসে৷
—লেটমি গেস...ইউ আর প্রদ্যোট মিটার?
মৃদু হেসে প্রদ্যোৎ নিজের নামটা সংশোধন করে দেয়৷
—মিত্র...অথচ নাম প্রদ্যোৎ মিত্র৷ ভবানীপুরের একটা গলিতে থাকি৷
‘মিটার ’ হতে গেলে বেলভেডিয়ার-এ জন্মাতে হোত৷
-কাম কাম...ভদ্রলোক ওকে নিজের টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসায়৷
—মাই সেল্ফ...রাহুল সেন৷
হ্যান্ডশেক করার জন্য রাহুল হাত বাড়িয়ে দেয়৷ সীটে বসতে গিয়ে প্রদ্যোৎ-এর চার বছর আগেকার কথা মনে পড়ে পযায়৷ ও যখন অবিনাশ রায়ের কাছে ইনটারভিউ দিতে আসে, তখন ও নিজের পরিচয় এরকম ভাবেই দিয়েছিল৷ ‘মাই সেল্ফ প্রদ্যোৎ মিত্র৷’
চাকরিটা ওর হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু কয়েকদিন পর স্যর চা খেতে খেতে ওর ভুলটা সংশোধন করে দিয়েছিল৷ প্রদ্যোৎ নিজেকে ইনট্রোডিউস করতে গেলে বলা উচিত ‘আই অ্যাম প্রদ্যোৎ মিত্র’৷ মাই সেল্ফ’টা ভুল৷ সেই কথাটা মনে পড়ে যেতে প্রদ্যোৎ মনে মনে হাসে৷
—বলুন কী খাবেন...চা, কফি...সামথিং কোল্ড?
—মোকা কফি৷
প্রদ্যোৎ সাবধানে বলে৷ একবার বুল করে ও ‘মোচা কফি বলেছিল৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের টেবিলে কফি আসে৷
—হাউ ক্যান ঙ্গে হেল্প ইউ? রাহুল প্রদ্যোৎ-এর দিকে তাকায়৷
—আমার ফাস্ট কয়েকটা প্রশ্ন ছিল৷
—শুট৷
—নন্দনবাবুকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?
—তা প্রায় তিন বছর৷ একটু ভেবে রাহুল বলে৷
—আপনারা তো একসময় একই সঙ্গে কাজ করতেন?
—হ্যাঁ..রাহুল হাসিমুখে জবাব দেয়৷ —তবে ও ছিল সফটওয়েয়ার ডিজাইনিং-এ, আর আমি, সেলস-এ৷
—বছর দেড়েক আগে বম্বেতে আপনাদের একটা ওয়ার্কশপ হয়েছিল...খুব সম্ভবত খান্ডালায়?
—হ্যাঁ...তবে ওয়ার্কশপ নয়, কনফারেন্স৷
—কলকাতা থেকে যাস্ট আপনারা দুজনই গিয়েছিলেন অ্যাটেন্ড করতে?
—না না...দেয়ার ওয়েয়ার আদারস৷ সব মিলিয়ে দশ বারজন হবে৷
—নন্দনের সঙ্গে ওখানেই আপনার বন্ধুত্ব হয়? প্রদ্যোৎ কফিতে চুমুক দেয়৷
—হ্যাঁ...তা বলতে পারেন৷ অলাপ কলকাতাতেই হয়েছিল৷
তবে এসব কনফারেন্সে সববাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হয়তো...তাতে একটা...
—ইনটিমেসি গড়ে ওঠে? প্রদ্যোৎ ছোট করে কথাটা জোড়ে৷
—ইনটিমেসি বলবো না...রাহুল একটু বিব্রত বোধ করে৷
—তবে বন্ধুত্ব বলা যায়৷
—এবং কলকাতায় ফিরে আসার পরও বন্ধুত্বটা থেকে যায়?
—ইয়েস৷
—এমনিতে...অফিসের পরেও আপনাদের প্রায়ই দেখা হোত?
—প্রায়ই বলবো না৷ তবে সপ্তাহে এক দু’দিন হোত বইকি৷
—ক্লাবে...রেস্টুরেন্টে...কোথায়?
—মেনলি ক্লাবে৷ আমি অরডিনান্স ক্লাবের মেম্বার৷ ওকে ওখানে মেম্বারশিপ পেতেও সাহায্য করি৷ আচ্ছা, কিছু যদি মনে না করেন নন্দনকে নিয়ে তে প্রশ্ন করা হচ্ছে কেন জানতে পারি?
—ওহ? তাহলে আপনি জানেন না? আপনার বন্ধু ইজ মিসিং ফর দ্য লাস্ট থ্রী ডেজ৷
—হোয়াট! কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না রাহুলের৷
—তিন দিন আগে সন্ধেবেলায় ফ্লাইটে ওর বম্বে যাওয়ার কথা ছিল৷ হি নেভার রীবভ দ্য এয়ারপোর্ট৷
—মাই গড! দু’হাত দিয়ে রাহুল নিজের মুখ ঢাকে৷
—এটা...আমি...যাস্ট বিশ্বাস হচ্ছে না...নন্দন মিসিং!
প্রদ্যোৎ রাহুলকে রিকাভার করতে সময় দেয়৷
—ওর সঙ্গে লাস্টম কবে দেখা হয়েছিল?
—লেট মি সী...সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রাহুল মনে করার চেষ্টা করে৷
—আই থিঙ্ক থ্রী ডেজ...মেবি ফোর ডেজ এগো৷
—এবং তখন ওকে কোন ব্যাপার নিয়ে ওয়ারিড বা এরকম কিছু মনে হয়নি আপনার?
—নাঃ! রাহুল শোল্ডার শ্রাগ করে৷ —সেরকম কিছু না৷
—আপনারা যাস্ট দুজনই ছিলেন...নাকি বন্ধুবান্ধব আরও...
—যাস্ট দু’জন৷
—গুড৷ আপনাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা কিরকম ছিল?
—ভাল! রাহুল উত্তর দিতে গিয়ে হাসে৷—ফ্রেন্ডস৷
—মিস্টার সেন...যাস্ট ফ্রেন্সড?
—হ্যাঁ৷ একটু বিস্ময় প্রকাশ করে রাহুল৷—কেন? আপনি কী...
—বয়ফ্রেন্ডস না তো?
—হোয়াট ডু ইউ মীন? রাহুল বেশ উত্তপ্ত হয়ে বলে৷
প্রদ্যোৎ জানে, স্যর থাকলে হয়তো পুরো প্রশ্নই অন্যভাবে ট্যাকল করতো৷ কিন্তু, প্রদ্যোৎ ডিরেক্ট অ্যাটাক-এ বিশ্বাসী৷ ও দেখতে চাইছিল রাহুলকে সরাসরি অ্যাকুউজ করলে সে কীভাবে ব্যাপারটা নেয়৷ দেখলো, ওর ধারণাই ঠিক৷ রাগে কিম্বা লজ্জায়, রাহুলের ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে৷
—মানেটা সোজা...আর উি লাভারস?
—হোয়াট! রাহুল আর ারগে ফেটে পড়ে৷
—হোয়াট এ স্টুপিড কোয়েশ্চন৷
—স্টুপিড স্মার্টের প্রশ্ন নয়৷ হ্যাঁ...না না?
—নো! অফকোর্স নট!
প্রদ্যোৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়৷
—দ্যাটস অল ফর নাও৷
রায় আর করবী মুখার্জি বিড়লা প্ল্যানেটারিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ ময়দানের রং-চং-এ ফিটন গাড়িগুলো সব এক এক করে বাড়ি চলে গেছে৷ রাস্তার লোকজন কমে এসেছে৷
এখন মুকে রংচং মাখা, ফিন্ফিনে শাড়ি পরা মেয়েদের ঘোরা ফেরা করতে দেখা যাবে৷ আর তাদের কনট্যাক্ট করার জন্য শেডি দেখতে লোকেদের আবির্ভাব হবে৷ রায় একবার ঘড়ির দিকে তাকায়৷ রাত সাড়ে ন’টা৷
—আপনাকে কী সময় বলেছিল? রায় জিজ্ঞেস করে৷
—ন’টা৷
ওদের সামনে দিয়ে গাড়িগুলো হুস্ হুস্ করে চলে যাচ্ছে৷ করবী সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে৷—বলেছিলো দেরি হলে অপেক্ষা করতে৷
—হুঁ৷ গম্ভীর মুখে রায় সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ পাঁচ মিনিট...দশ মিনিট কেটে যায়৷ ওরা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে৷ কোন লোক ওদের কাছে আসে না৷ কোন লোক ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় কানের কাছে ফিস্ ফিস্ করে বলে না—ফলো মি৷
রায় মনে মনে হাসে৷ এগুলো হচ্ছে ফিয়ার সাইকোন্সিস আনার ক্লাসিক ট্যাকটিকস৷ সময় দিয়ে সময়মত না আশা৷ অন্যকে অপেক্ষা করতে বাধ্য করা৷ যত সময় যাবে, ভিকটিমের অ্যাংগজাইটি লেভেল জাল দেওয়া দুধের মত ততই উথলে উঠবে৷ এমন সময় উল্টো দিক থেকে একটা কাল এস ইউ ভি সমস্ত আইন কানুন ভঙ্গ করে ইউ টার্ন নিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়৷
—করবী মুখার্জি? গাড়ির সামনের সীট থেকে সানগ্লাস পরা একজন লোক জিজ্ঞেস করে৷
করবী মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানায়৷
—গাড়িতে উঠে পড়ুন৷
লোকটি মাঝের সীটগুলো দেখিয়ে বলে৷ রায় গাড়ির দরজা খুলে দাড়ায়৷ করবীকে প্রবেশ করতে দিয়ে, তবে নিজে ঢোকে৷ ওরা ঢোকা মাত্র গাড়ির জাল নম্বর কাঁচগুলো সব উঠে যায়৷ ব্ল্যাক টিনটেড গ্লা৷ ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যাবে, কিন্তু বাইরের থেকে ভেতরের কাউকে দেখা যাবে না৷
গাড়ি চলার পরেই ক্লিক করে একটা আওয়াজ হয়৷ রায় বুঝতে পারে সব কটা দরজা অটোমেটিকালি লকড হয়ে গেল৷
—আমাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে পারি? রায় জিজ্ঞেস করে৷
—সময় হলেই জানতে পারবে৷
উত্তর দেওয়া সময় লোকটি পেছন ফিরে তাকায় না৷
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে বাঁ দিকে রেখে ওদের গাড়ি পার্কসার্কাসের ফ্লাই ওভার নেয়৷ সেখান থেকে চারনম্বর লোহার পুল দিয়ে সায়ন্সসিটি৷ তারপর বাঁ দিক দিয়ে নিকো পার্ক৷ সেখান থেকে সোজা রাজারহাটের মেন রাস্তা৷ বাঁ দিকে সিটি সেন্টার টু রেখে গাড়ি সোজা এগিয়ে চলে৷ টাটা মেডিকাল সেন্টার পার হওয়ার পর রাস্তার ট্র্যাফিক অনেক কমে আসে৷ আরও কয়েক কিলো মিটার যাওয়ার পর গাড়িটা বড় রাস্তার থেকে নেমে বাঁ দিকে একটা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়ে৷ ঐখানে রাস্তায় কোন আলো নেই৷ গাড়ির হেডলাইট যতটুকু দেখা যায়৷
রায়ের মনে হয় রাস্তার দুপাশে আনডার কনসট্রাকশন উঁচু উঁচু বাড়ি অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মত আকাশ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে৷ ক্রেনগুলোর মাথায় অল্প আলো থাকলেও নীচের দিকটা একেবারে অন্ধকার৷
হঠাৎ করেই গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কসে৷ সামনেই রাস্তার মাঝে একটা গাছের গুঁড়ি৷ আড়াআড়ি করে পাতা রয়েছে যাতে কোন গাড়ি পাশ কাটিয়ে না যেতে পারে৷ চকিতের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন ষন্ডামার্কা লোক গাড়িটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে৷
—মিস্টার রায়...এটা কী হল?
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে করবী রায়ের দিকে তাকায়৷ অবিনাশ রায়ের মুখ কিন্তু ভাবলেশ শূন্য৷
—ভয় পাবেন না মিসেস মুখার্জি... রায় চাপা গলায় বলে৷ কিন্তু ওর কথায় করবী যে খুব একটা আশ্বস্ত হয়েছে বলে মনে হয় না৷ বড় বড় চোখ করে সে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে৷
—গাড়ি থেকে নেবে পড় দেখি...চট্ পট্৷
গুন্ডাদের মধ্যে একজন মাঝের সীটের দরজা খুলে দাঁড়ায়৷ রায় প্রথমে নাবে, তারপর ওর পেছনে করবী৷ রায়কে সামনে ঢেলে দিয়ে হঠাৎ করেই ওর হাত পেছনে টেনে নিয়ে কেটা দড়ি দিয়ে করে বেঁধে ফেলা হয়৷ পর মুহূর্তেই একটা কাল কাপড় দিয়ে ওর মুখ শগু করে বাঁধা হয়৷
উঁ...উুঁ
পেছনে চাপা আওয়াজ থেকে রায় বুঝতে পারে করবীকেও ওর মতন করে বাঁধ হয়েছে৷
—এখানে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পাবে না৷ সামনের সীটের সানগ্লাস পড়া লোকটি বলে৷
—তবু হোয়াই টেক এ চান্স?
গতির হেডলাইটটা নিবে যায়৷ যে লোকটি রায়কে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তার হাতে একটা পাওয়ারফুল টর্চ৷ সেই আলো সামনে ফেলে ওদের একটা অন্ধকার বিল্ডিং-এর ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়৷ শেষ পর্যন্ত ওরা এ‘খন একটা ঘরে গিয়ে পৌঁছয় যেখানে কোন জানলা নেই৷ চারিদিকে টানা পুরু দেওয়াল৷ ঘরে একটা মাত্র দরজা, সেটাও খুব ভারি৷
—এই যে ঘরটা দেখছো এটা আসলে একটা ব্যাঙ্কের সেফ বিডিপোজিট ভল্ট৷ আনডার কনসট্রাকশন৷ এ ঘরের দরজা একবার বন্ধ করে দিলে ভেতরের আওয়াজ বাইরের কেউ শুনতে পাবে না৷ তা সে যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক না কেন৷
লোকটি হাসি মুখে ওদের দিকে ফিরে তাকায়৷
—তোমরা দুজন ভেতরে থাকবে, আর আমরা বাইরে৷ মাঝখানে থাকবে বন্ধ দরজা৷ তোমাদের গলা বাইরের কেউ শুনতে পাবে না৷ ওহ্ হ্যাঁ! আরেকটা জিনিস তোমাদের বলা হয় নি...
লোকটির যেন হঠাৎ কবে এ কটা জরুরী কথা মনে পড়ে যায়৷
—আনডার কনসট্রাকশন বলে এই ঘরটায় এখনও এয়ারডাকটস বসানো হয়নি৷ অর্থাৎ, অত্যন্ত লিমিটেড অক্সিজেন৷ ঘণ্টা খানেক খণ্টা দেহেকের মধ্যেই তোমাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হবে৷ তারপর...ডেথ ডিউ টু ল্যাক অফ অক্সিজেন৷
লোকটির গলা অত্যন্ত হীম হিমশীতল৷ কোন ডিলেনাস অট্টহাসি নেই৷ কোন তাপ-উত্তাপ নেই৷ যাস্ট ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট৷
—জন...এদের ওদের বাঁধন খুলে দিতে পার৷ জন বলে লোকটি এসে ওদের বাঁধন খুলে দেয়৷
—জীবনের শেষ মুহূর্তে তোমরা পরস্পরের মধ্যে কোন কথা বলবে না, এটা ঠিক নয় বলো৷
—আপনারা কেন এমনটা করছেন আমাকে বলবেন? করবী কাঁদ কাঁদ গলায় বলে৷
—এটা করে আপনাদের কী লাভ? আর টেলিফোনে আপনাদের মধ্যে একজন কেউ আমাকে কথা দিয়েছিলেন আমাকে নন্দনের সঙ্গে মীট করাবেনা
—হ্যাঁ...আমিই বলেছিলাম৷ লোকটি মৃদু হাসে৷
কিন্তু৷ তাতে কী হয়েছে? আমি কী কদ্দের জানবো যে বোকা মুর্খর মত আমার সব কথা বিশ্বাস করে নেবে? আর তুমি...
লোকটি এবার রায়ের দিকে তাকায়৷
—তুমি তো বাবা জীবন একটিও কথা বলছো না৷ বোবা নাকি? রায় ওদের বিদ্রূপ গায়ে মাখে না৷ খুব শান্ত গলায় উত্তর দেয়৷
—আমি...আপনার কথা শুনছি৷
—বাববাঃ! এ যে দেখছি স্ট্রং সাইলেন্ট টাইপ৷ যাই হোক...লোকটি হাত ঘড়ির দিকে তাকায়৷
—তোমাদের আর সময় নষ্ট করবো না৷ বাই বাই৷ তবে তার আগে আমাদের একটা কাজ করে যেতে হবে৷ না...চিন্তিত হয়ো না৷
লোকটি করবীর দিকে গোল গোল চোখ করে তাকায়৷
—কাজটা...তোমাদেরই চিত্ত বিনোদনের জন্য৷ অনেকক্ষণ একা একা থাকবে তো...তাই৷ জন...টেপ!
জন কাঁধের ব্যাগ থেকে দুটো চওড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেপ-এর রোল বার করে৷
—সবচেয়ে আগে ওদের কাছ থেকে মোবাইলগুলো নেওয়া হোক৷ জন এসে প্রথমে রায়ের প্যান্টের পকেট থেকে ওর মোবাইলটা নিয়ে নেয়৷ এটা একটা হাই এন্ড স্মার্ট ফোন৷ অনেক দদ্ধাম দিয়ে ওর পুত্র আমেরিকার থেকে কিনে দিয়েছিল৷
—দেখি তোমারটা...
জন করবীর হাত থেকে ওর ব্যাগটা ছিনিয়ে নেয়৷ জিপ খুলে ব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইলটা বার করা হয়৷
—ব্যাগটার কী করবো? জন করবীর ব্যাগটা আঙুলে দোলায়৷
—ওটাতো আর ওর কাজে লাগবে না...ওটা আমার কাছেই থাক৷
—হ্যাঁ...এবার তোমাদের চিত্ত বিনোদনের পালা৷ জন, টেপটা দিয়ে এদের দুজনকে জড়িয়ে ফেল...একসঙ্গে....ফেস টু ফেস৷
রায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাতে জল-এর লোকেরা সেটা করতে না পারে৷ করবীতো ভয়ে কাঠ হয়ে আছে৷ কিন্তু অতগুলো লোকের সঙ্গে রায় কী করেই বা পারবে৷ মোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেপ দিয়ে রায় আর করবীকে আেেষ্ট পৃেেষ্ট বেঁধে ফেলা হয়৷ মুখোমুখি অবস্থায়৷
—ছিঃ ছিঃ এটা আপনারা কী করছেন? রায় বলতে বাধ্য হয়৷
—ঐ যে বললাম...সানগ্লাস পরা লোকটির মুখে ঠান্ডা হাসি৷
—তোমাদের চিত্ত বিনোদনের জন্য৷
থিয়েটার রোড আর চৌরঙ্গীর মুখটায় ডানদিকে একটা পাঁচতলা বিল্ডিং আছে৷ তারই দোতলার একটা ঘরে জানলার ধারে প্রদ্যোৎ শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে৷ ওর চোখে পাওয়ারফুল বাইনোকিউলার৷ এখান থেকে বিড়লা প্ল্যানেটারিয়াম-এর সামনেটা খুব ভাল করে দেখা যায়৷
বাইনোকিউলার দিয়ে প্রদ্যোৎ রায় আর করবীর ওপর ফোকাস রেখেছে৷ মাঝে মাঝে ও বাইনোকিউলারটা সরিয়ে আশেপাশের লোকদেরও ওপর নজর রাখছে৷ কে যে কখন কী ভাবে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে সেটা ওর জানা নেই৷
থিয়েটার রোডের মোড় থেকে একটু পিছিয়ে একটা কাল গাড়ি অনেকক্ষণ ধরে পার্ক করা রয়েছে৷ গাড়ির সব কাচ তোলা৷ ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হয় না৷ ঠিক এমনি একটা গাড়ি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনেও পার্ক করা রয়েছে৷ এটাতে অবশ্য এক যুবক আর যুবতী বসে আছে৷ মনের সুখে আইসক্রীম খাচ্ছে, আর গল্প করছে৷ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে একটা খালি ট্যাক্সি দাড়িয়ে৷ তার মিটার লাল শালুর কাপড় দিয়ে মোড়া৷ কেউ এসে জিজ্ঞেস করলে সর্দারজি ড্রাইভারের একটাি স্ট্যান্ডার্ড উত্তর৷
—যেতে পারবে না স্যর...ব্যাটারি ডাউন৷
প্রদ্যোৎ লক্ষ্য করে স্যর একবার নিজের হাতঘড়িটায় সময় দেখে নিল৷ স্যরের দেখাদেখি প্রদ্যোৎও একবার নিজের হাতঘড়িটা দেখে নেয়৷ রাত ন’টা৷
এর একটু পর হঠাৎ প্রদ্যোৎ-এর সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে৷ উল্টোদিক থেকে ট্রাফিক রুল ব্রেক করে একটা কাল এস ইউ ভি থিয়েটার রোড-চৌরঙ্গীর ক্রসিং-এর দিকে এগিয়ে আসছে৷ গাড়িটা হঠাৎ ইউ টার্ন নিয়ে স্যর আর করবীর সামনে এসে দাঁড়ায়৷ ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটা মিসেস মুখার্জির সঙ্গে কী যেন কথা বলছে৷ এরপর, স্যর ও মিসেস মুখার্জির গাড়িটার চড়ে বসলো, মাঝখানের সীটে৷ প্রদ্যোৎ তাড়াতাড়ি গাড়ির নাম্বার প্লেট-এর ওপর ফোকাস করে৷ ডাবলিউ বি জিরো টু এসি ৫৪৪৮৷
মোবাইলে টেক্সট করে গাড়ির নাম্বার সব কটা অপেক্ষমান গাড়িকে জানিয়ে দেওয়া হয়৷ হাতের বাইনোকিউলারটা শোল্ডার ব্যাগে ভরে প্রনদ্যোৎ তর্ তর্ করে নীচে নেবে আসে৷ রাস্তা ক্রস করে থিয়েটার রোডে অপেক্ষমান কাল গাড়িটার ভেতরে জাম্প করে ঢোকে৷
—হামিদ...সামনের কাল এস ইউ ভিটাকে ফলো করো৷
ঘরের মধ্যে নিশ্চিদ্র অন্ধকার৷ কিছুক্ষণ আগেই জন-এর লোকেরা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে৷ ঘরে ঢোকার সময়ই রায় লক্ষ্য করেছিল৷ দরজার মুখে হাতলের বদলে ছোট্ট স্টিয়ারিং হুইলের মত লকিং ডিভাইস৷ ওটা বাঁ দিকে ঘোরালে দরজা খুলে যাবে, আর ডানদিকে ঘোরালে লক৷ ভেতর থেকে খোলার আর কোন উপায় থাকবে না৷
ঘরের ভেতরটা শুধু যে ঘন অন্ধকার তাই নয়৷ একদম শুনশান৷ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পিনড্রপ সাইলেন্স’৷ রায়ের পক্ষে পরিস্থিতিটা খুবই অস্বস্তিকর৷ ওরা দুজনে মুখোমুখি থাকার জন্য করবীর নিশ্বাস প্রশ্বাস সোজা ওর মুখে এসে পড়ছে৷ রায়ের ধারণা, ওর নিজের শ্বাসও নিশ্চয়ই ঠিক ওভাবেই করবীর মুখে গিয়ে পড়ছে৷
রায় বুঝতে পারে যে এখন ওদের যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে কথা বলা উচিত৷ যাতে নিজেদের মধ্যে অস্বস্তিটা কম হয়৷ কিন্তু, এই মুহূর্তে করবীর সঙ্গে ও ঠিক কী নিয়ে আলোচনা করবে ভেবে পায় না৷
কিছু বলার না থাকলে রায় শুনেছে ইংরেজরা ওয়েদার নিয়ে আলোচনা করে৷ কিন্তু, এই মুহূর্তে ওর আর করবীর মধ্যে ওয়েদার নিয়ে আলোচনা করা খুব একটা প্রাসঙ্গিক হবে কী?
—মিস্টার রায়...এখন আমরা কী করবো?
রায় চুপ করে থাকে৷ করবীকে ও ঠিক কী ভাবে আশ্বাস দেবে বুঝতে পারে না৷
—কী হল? চুপ করে আছেন কেন মিস্টার রায়? কিছু একটা বলুন...
—এখন আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই৷
—অপেক্ষা? কীসের অপেক্ষা? করবী আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে৷ এগিয়ে আসার করবীর ঠোঁট রায়ের ঠোঁট স্পর্শ করে৷ ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মত করবী নিজের মুখ যতটা পারে পিছিয়ে নেয়৷ কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ৷
—আমার না...ভীষণ ভয় করছে৷ আপনি একটা কিছু করতে পারেন না?
কোনভাবে কারও সঙ্গে কমিউনিকেট করা...
কথা বলতে গিয়ে করবী নিজেই চুপ করে যায়৷ বুঝতে পারে এসব কথা বলার কোন মানে হয় না৷
—আচ্ছা মিস্টার রায়...আপনি ডেথ নিয়ে ভাবেন কখনও? এবং লাইফ আফটার ডেথ?
—না৷ এখনও পর্যন্ত সেরকম ভাবনা মনে আসেনি৷
—আমরা যদি এরকম ভাবে নিশ্বাস আটকে মারা যাই...তাহলে বাইরের কেউ আদৌ জানতে পারবে?
আশাকরি আমরা এ ভাবে মারা যাব না৷ শুনুন...আপনি ভাবছেন আমরা একা...আমরা কিন্তু একা নই৷ যে গাড়িটা কে আমাদের এখানে আনা হয়েছে সে গাড়িটাকে আমাদের গাড়িও ফলো করছে৷
—আমাদের গাড়ি মানে?
—পুলিশের গাড়ি৷
কথাটা শুনে করবী বোধহয় একটু আশ্বস্ত হয়৷ কেন না ওর প্রশ্ন করাটা বন্ধ হয়৷
—আচ্ছা...এসব কথা...আমাকে স্বান্তনা দেবার জন্য বলছেন না তো?
মিস্টার রায়...
অন্ধকারে করবীর মুখ আবার এগিয়ে আসে৷ ওর ঠোঁট আবার রায়ের ঠোঁটে স্পর্শ করে৷
—মিস্টার রায়...
—না না... এটা ঠিক হচ্ছে না৷ এটা আপনি কী...কর...
রায়ের কথা আর শেষ হয় না৷ ও শগু করে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে রাখে৷
কিন্তু করবীর মধ্যে তখন সর্ব গ্রাসি ক্ষুধা৷ রায়ের গালে, কপালে, চোখে, ঠোঁটে—সব জায়গায় সে পাগলের মত আদ করে যাচ্ছে৷ রায়ের কপালে করবীর ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে৷ ক্রমশঃ করবীর সমস্ত শরীর যেন সাপের মত ওকে পেঁচিয়ে ধরছে৷ তারপর, একটা সময় করবীর শরীর থর্ থর্ করে কাঁপতে থাকে৷ তার স্পন্দন রায় নিজের শরীরে স্পষ্ট অনুভব করে৷ কোন একটা সময় করবীর সমস্ত শরীর শীথিল হয়ে আসে৷ রায়ের কাঁধে মুখ রেখে সে হাঁপাতে থাকে৷
—প্লীজ ফরগিভ মি মিস্টার রায়...আমি এটা চাইনি৷ রায়ের কানে মুখ রেখে করবী ফিসফিস করে বলে৷
—কিন্তু হঠাৎ কী যে একটা হয়ে গেল...নিজেকে আর কনট্রোল করতে পারলাম না৷
কিছুক্ষণ করবী চুপ করে থাকে৷ তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কেঁদে ওঠে৷
—দেড় বছর পর...আজকে...এই প্রথম৷
কাল এস ইউ ভি-টা ফলো করার জন্য প্রদ্যোৎ-এর কাছে তিনখানা গাড়ি মজুদ৷ বুদ্ধি করে প্রদ্যোৎ এই তিনটে গাড়ি দিয়ে অলটারনেটলি এস ইউ ভি-টাকে ফলো করায়৷ যাতে ঐ গাড়িতে কারও সন্দেহ না হয় ওদের ফলো করা হচ্ছে৷
টাটা মেডিকাল সেন্টার পার হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রদ্যোৎ ইয়ং কাপলটাকে দিয়ে এস ইউ ভি কে ফলো করায়৷ যাতে, ওদের চোখে পড়লেও কারও সন্দেহের উদ্রেক না হয়৷ এ দিকটায় ট্র্যাফিক অঙ্গ ফাঁকা হয়ে এসেছে৷
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর সামনের গাড়িটা হঠাৎ স্লোডাউন করে৷ ইয়ং কাপল-এর ছেলেটির নাম অরিজিৎ৷ ওর কাছ থেকে একটা ফ্র্যানটিক কল আসে৷
—উই হ্যাভ মিসড দা এস ইউ ভি৷
—মানে? কী বলছো তুমি?
প্রদ্যোৎ-এর হঠাৎ সাংঘাতিক নার্ভাস লাগে৷ ওর ওপরে এখন স্যর আর করবীর জীবন্ত ডিপেন্ড করছে৷ যদি একটু ভুল হয়ে যায় ও নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না৷
—জ্বলজ্যান্ত অত বড় একটা গাড়ি...তোমাদের চোখের সামনে ভ্যানিশ করে গেল৷
—আপনিই তো বলেছিলেন ওদের গাড়িটার সঙ্গে ব্যবধান রাখতে...অরিজিৎ ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে৷
—ধ্যাৎ! এটা কী হচ্ছে? প্রদ্যোৎ মোবাইলে ধম্কে ওঠে৷
—এখন আমাদের নার্ভাস হলে চলবে? গাড়িটা দাড় করাও৷
এবার গাড়িটাকে ঘোরাও...একেবারে ইউ টার্ন৷ এবার দেখ বাঁ দিকে কোন গলি দেখতে পাও কিনা৷ ফুল অ্যালার্ট অরিজিৎ! উই উইল ফাইন্ড দেম৷
প্রদ্যোৎ-এর কথা মত অরিজিৎ নিজের গাড়িটাকে ঘোরায়৷
—যদি কোন গলি দেখতে পাও তাহলে তাতে ঢুকবে৷ কিন্তু, অত্যন্ত সন্তর্পনে...হেড লাইট, টেল লাইট সব অফ৷
প্রদ্যোৎ নিজের গাড়িটাকেও দাড় করায়৷ কাল এস ইউ ভি-টা এখানেই কোথাও ঢুকেছে৷ হয় বাঁ দিকে, নয় ডানদিকে৷ ভ্যানিশতো আর করে যেতে পারে না পেছনে যে ট্যাক্সিটা আসছিল তাকেও প্রদ্যোৎ দাড়াতে বলে৷
—হকুমৎ সিং...আপ মেন রোড সেঁ রহিয়ে৷ অগর উয়ো কালা গাড়ি কঁহি সেভি নিক্লা জো উসে ফলো কর্না...অওর মুছে ফরণ, খবর দে দেনা৷ ঠিক হয়?
—ঠিক হয়জি৷
প্রদ্যোৎ যে গাড়িটাতে রয়েছে তাতে ড্রাইভার ছাড়া আরও দুজন লোক৷ সবাই কাল পোশাক পরা৷ প্রদ্যোৎ গাড়ির সমস্ত লাইট অফ করে দিতে বলে৷ আর তীক্ষ্ণ নজর রাখে বাঁ দিকে কোন গলি পড়ে কিনা৷
প্রথম গলিটা একদম ফাঁকা৷ গাড়ি-টাড়ি কিছু নেই৷ তবু প্রদ্যোৎ এক মিনিট নিজেদের গাড়ি দাড় করিয়ে রাখে, যদি কোন মুভমেন্ট ওদের চোখে পড়ে৷
নাথিং৷ দ্বিতীয় গালিটা পার হয়ে যাবার পর প্রদ্যোৎ চাপা গলায় গাড়ি দাড় করাতে বলে৷
—হামিদ... গাড়ি রিভারস করো৷
ওর কেন যেন মনে হয়৷ দ্বিতীয় গলিটার ভেতর একটা লাইটের মুভমেন্ট ওর চোখে পড়েছে৷ সেটা টর্চ-এর আলো হতে পারে৷ রিভার্স করে হামিদ গাড়িটা গলির মুখে দাড় করায়৷ ইয়েস! গলির বেশ কিছুটা ভেতরে দু’টো ছোট আলো যেন নিভে গেল৷ গাড়ির টেল লাইট অফ করলে যেমন হয়৷
—গাড়িটা ভেতরে ঢোকাও হামিদ...কিন্তু খুব আস্তে...এতটুকু যেন আওয়াজ না হয়৷
গলিতে ঢোকার একটু পরেই প্রদ্যোৎ গাড়িটাকে বাঁ দিকে, রাস্তার গা ঘেঁষে দাড় করায়৷
—হামিদ...তুমি গাড়িতে থাকবে৷ আর, বাকি দুজন আমার সঙ্গে এসো৷
গাড়ি থেকে নেমে একদম রাস্তার কিনারা ধরে ওরা তিনজন নীচু হয়ে এগোতে থাকে৷ যাতে ওদের সিল হয়েট পর্যন্ত কারও চোখে না পড়ে৷
—রিভলভার আউট...অন্য হাতে টর্চ রাখো৷ কিন্তু, আমি জী বলা পর্যন্ত কেউ জ্বালাবে না৷
কিছুটা পথ যাওয়ার পর ওরা সত্যি সত্যি কাল এস ইউ ভি-টার সন্ধান পায়৷ প্রদ্যোৎ-এর ধরে যেন প্রাণ ফিরে এলো৷
পেছন থেকে এসে ওরা অল্প মাথা তুলে এস ইউভি-টায় উঁকি মারে৷ দেখে, গাড়িতে একমাত্র ড্রাইভার বসে৷ অন্যমনস্ক ভাবে বিড়ি খাচ্ছে৷ জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে প্রদ্যোৎ রিভলভারের নল ড্রাইভারের ঠিক কানের পাশে ঠেকায়৷
—একটা টুঁ শব্দ নয়...প্রদ্যোৎ ওর কানে ফিস ফিস করে বলে৷
—এটা রিভলভারের নল...একটু কিছু করেছো কী গুলি চালাবো৷ ড্রাইভারটা মুখে বিড়ি আনতে গিয়ে ঙ্গ করে যায়৷
—লক্ষ্মী ছেলে...এবার আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নেবে এসো৷
একটা আওয়াজ নয়৷
প্রদ্যোৎ-এর কথামত ড্রাইভার নিশব্দে গাড়ি থেকে নেবে আসে৷ পর মুহূর্তেই একটা রিভলভারের বাঁট ওর মাথায় এসে পড়ে৷ অচৈতন্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই রঞ্জন ড্রাইভারের বডিটা ধরে ফেলে৷ তারপর হাত পা বেঁধে, গাড়ি মোছার লাল শালু কাপড় ওর মুখে গুঁজে পেছনের সীটে লম্বা করে শুঁইয়ে দেওয়া হয়৷ এর পর, প্রদ্যোৎ-এর নির্দেশে এক এক করে গাড়ির সব কটা চাকার হাওয়া বার করে দেওয়া হয়৷
এখানে আসার আগে ফোনে এমারজেন্সি বেসিস-এ প্রদ্যোৎ সল্টলেক থানার ওসিকে রিকোয়েস্ট করে আরও পাঁচ ছ’জন কনস্টেবল জোগাড় করেছে৷ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়ে থানার ওসি রঞ্জনবাবুও স্বয়ং উপস্থিত৷
প্রদ্যোৎ-এর কোন আইডিয়া নেই যারা স্যর আর করবীকে তুলে নিয়ে গেছে তারা সংখ্যায় ক’জন৷ ডান দিকের বড় বাড়িটার ভেতর ঢোকার আগে প্রদ্যোৎ সল্টলেক থানার ও সি রতনবাবুর সঙ্গে বসে একটা প্ল্যান ছকে ফেলে৷ কার কী দায়িত্ব সব ঠিক করা হয়৷
ঠিক হয় সল্টলেক থাকার ছ সাত জন কনস্টেবল বাড়িটাকে বাইরে থেকে ঘিরে অপেক্ষা করবে, যাতে ভেতর থেকে একটা লোকও পালিয়ে যেতে না পারে৷ পুলিশের বাকি লোক রতন বাবুর আন্ডারে প্রদ্যোৎ-এর পেছন পেছন বাড়িটায় ঢুকবে৷
ওরা সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির একতলায় উঠে আসে৷ প্রথম ঘরটায় ওরা প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় প্রদ্যোৎ ওদের হাত তুলে থামতে বলে৷
—ভেতর থেকে কেউ আসছে মনে হয়৷ প্রদ্যোৎ ফিসফিস করে বলে
—তোমরা দুদিকে সরে যাও৷
একটু পরেই একটা লোক ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে৷ ওর হাতে টর্চ৷ বেরিয়ে লোকটা এদিক ওদিক তাকায়৷
—ফিল্ড ক্লিয়ার স্যর...
প্রদ্যোৎ আর তার দলবল তখন বাড়ির দেওয়ালের সঙ্গে একেবারে সেঁটে আছে৷ গ্রীন সিগনাল পাওয়ার পর একে একে আরও পাঁচ ছ’জন লোক বেরিয়ে আসে৷
—না ও...প্রদ্যোৎ ফিস ফিস করে বলে৷
হঠাৎ করে একসঙ্গে আটখানা টর্চের আলো জ্বলে ওঠে৷ অন্ধকার থেকে ওরকম জোরালো আলোয় দুর্বিত্তদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়৷ ওরা কিছু করার আগেই প্রদ্যোৎ-এর থেকে কম্যান্ড আসে৷
—হ্যান্ডস আপ! কেউ চালাকি মারার চেষ্টা কোরো না৷
অকালে মারা যাবে৷
এক মুহূর্তের জন্য প্রদ্যোৎ টর্চের আলো হাতে ধরা রিভলভারটার ওপর ফোকস করে৷ ওর কথা মতো আস্তে আস্তে দুর্বিত্তদের সবাই মাথার ওপর হাত তোলে৷
—রঞ্জন...ওদের কাছে যা অস্ত্র সস্ত্র আছে বার করে নাও৷ প্রদ্যোৎ-এর কথা মতো রঞ্জন এগিয়ে গিয়ে এক এক করে ওদের নিরস্ত্র করতে থাকে৷ ঠিক এই সময়ে অতর্কিতে ওদের মধ্যে একজন রঞ্জনকে ধাক্কা মেরে ফেলে ছুটে বেরিয়ে যায়৷ লোকটা মাথা নীচু করে আঁকা বাঁকা ভাবে ছুটছে৷ হাতের রিভলভার তুলে প্রদ্যোৎ লোকটার দিকে তাগ করে গুলি ছোঁড়ে৷ প্রথম গুলিটা টারগেট মিস করলেও দ্বিতীয় গুলিতে লোকটা ছিট্কে মাটিতে পড়ে যায়৷
—আর কেউ আছে যে পালাতে চায়?
প্রদ্যোৎ গলা তুলে বলে৷—চাইলে ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম৷ দুর্বিত্তদের মধ্যে পিনড্রপ সাইলেন্স৷ সববাই পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে থাকে৷
—রতনবাবু...সববাইকে হাত কড়া পরিয়ে দিন৷ তারপর থানায় ফোন করুন৷ একটা ব্ল্যাক মারিয়া এসে এদের তুে নিয়ে যাক গুলি খেয়ে যে লোকটা আহত হয়ে পড়ে আছে প্রদ্যোৎ তার দিকে এগিয়ে যায়৷
—একি! রাহুলবাবু যে...তা আপনি এখানে এত রাতে কী করছেন?
—প্লিজ...আই ম্যান ব্লীডিং টু ডেথ...
রাহুল সেন সিঁড়িতে জমা রগুর দিকে দেখিয়ে কাতরাতে থাকে৷
—আমাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলুন৷
—বাওয়াল কোরো না তো৷ গুলিটা লেগেছে তো পায়ে...সে নিয়ে এত নাটক করার কী আছে? আগে তোমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর জেরা করার হবে...তারপর হাসপাতাল৷ সময় লাগবে৷
—প্লীজ আপনার পায়ে পড়ি...আমাকে এরকম ভাবে মেরে ফেলবেন না৷ রাহুল কাকুতি মিনতি করে৷
—কেন? নন্দনবাবুকে মারার সময় একথা মনে হয়নি?
ব্যাঙ্কের স্ট্রং রুম থেকে যখন রায় আর করবীকে বার করা হয় তখন ওরা দুজনেই অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে আছে৷ ওদের এরকম ইনটিমেটলি বাঁধা অবস্থায় দেখে প্রদ্যোৎ-এর বেশ অস্বস্তি হয়৷ পকেট থেকে ছুরি বার করে ও ওদের বাঁধনের টেপ নানান জায়গায় কেটে ফেলে, যাতে তাড়াতাড়ি করে খোলা যায়৷
ওদের চোখে মুখে অনেকক্ষণ জলের ঝাপটা দিতে আস্তে আস্তে ওদের জ্ঞান ফেরে৷
—তোমার আসতে এত দেরি হল যে?
একটু প্রকৃতিস্থ হওয়ার পর রায় প্রদ্যোৎকে জিগ্যেস করে৷
—আমি তো একসময় ভাবলাম...এ যাত্রায় আর হল না...বোধহয় টসেই গেলাম৷
করবী ওদের কথায় যোগ দেয় না৷ একটু দূরে মাথা নীচু করে বসে থাকে৷ প্রদ্যোৎ-এর মনে হল করবী যেন একবার আড়চোখে রায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি অবনত করল৷
—কী করব স্যর...অপারেশন চালু করার আগে আমাদের প্রেপারেশন করতে সময় লেগে গেল৷ এক সময় মনে হল আমাদের অ্যাডেইলেভল ম্যান পাওয়ার বোধহয় যথেষ্ট নয়৷ তাই সল্টলেক থানার থেকে লাস্ট মিনিটে হেল্প নিলাম৷ এ ব্যাপারে রতনবাবু আমাদের খুবই হেল্প করেছেন এটা আমি বলতে বাধ্য৷ গায়ের আড়ষ্টতা কোন রকমে কাটিয়ে উঠে রায় রতনবাবুকে থ্যাঙ্কস জানায়৷ তারপর প্রদ্যোৎকে জিগ্যেস করে ঃ
—ওদের গ্যাং-এর মধ্যে কাউকে চিনতে পারলে?
—ইয়েস স্যর...প্রদ্যোৎ-এর মুখে ছোট হাসি৷—রাহুল সেন৷
পরের দিন খবরে কাগজের ক্রাইম পেজ-এ ছোট্ট করে একটা নিউজ বেরোয়৷ কয়েক দিন আগে নন্দন মুখার্জি বলে এক তরুণ যুবকের মৃতদেহ রহস্যজনক ভাবে সল্টলেকের একটা পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল৷ খুনের তল্লাশি করতে গিয়ে পুলিশ এক অভিনব ব্ল্যাকমেল করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে৷ এবং অত্যন্ত তৎপরতার সাথে সেই ব্ল্যাকমেলিং—গ্যাংকে অ্যারেস্ট করতে সক্ষম হয়েছে৷
কী নিয়ে ব্ল্যাকমেল? এতে কারা কারা ইনভলভড? এবং কেনই বা খুনটা করা হয় তার কোন উল্লেখই কাগজে নেই৷ নিউজটা পড়ে প্রফুল্ল বাবু ও করবী স্বস্তি’র নিশ্বাস ফেলে৷ সত্যিই, অবিনাশ রায় না থাকলে হয়তো আসল ঘটনাটা চাপা যেত না৷ এবং এই কেলেঙ্কারির পুরো জের ওদের পোহাতে হোত৷
দু-একদিন পর বিকেল বেলায় রায় আর প্রদ্যোৎ প্রফুল্লবাবুর সঙ্গে নিয়ে দেখা করে৷ ডোর বেল টিপতে করবী এসে দরজা খুলে দেয়৷ ওর চোখে মুখে লজ্জার ভাব৷ কিন্তু তার মধ্যে কোথায় একটা চাপা খুশিও লুকিয়ে আছে৷
—আসুন...করবী ওদের ভেতরে এনে বসায়৷
—বাবাকে ডেকে দেবো?
—হ্যাঁ...একটু পরে প্রফুলবাবু বেরিয়ে আসে৷ মুখ শোকাচ্ছন্ন৷
—বউমা...ওদের জন্য চা করবে না?
—হ্যাঁ বাবা৷
করবী চলে গেলে প্রফুল্লবাবু রায়ের দিকে তাকায়৷
—আমি জানি এসব প্রশ্ন করার কোন মানে হয় না৷ তবু একটা কথা জিজ্ঞেসা না করে পারছি না৷ আমার ছেলে আর বউমা...দেওয়েয়ার সো হ্যাপি! হঠাৎ কী করে আমার ছেলে পাল্টে গেল? এটা কী আমাদেরই কোন আপবৃংইং-এর দোষ?
—প্রফুল্লবাবু...মিছামিছি নিজেদের দোষী করবেন না৷
রায় ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করার জন্য বলে৷
—হোমোসেওশুয়ালিটি আপবৃংইং থেকে হয় না৷ সাম অফ আস আর বর্ণ ডিফারেন্ট৷
—কিন্তু, তাহলে সে কী করে বউমার’র—সঙ্গে হ্যাপি ছিল?
—ওটাই মিস্ট্রি৷
রায় বুঝতে পারে এই একটা প্রশ্ন প্রফুল্লবাবুকে কুরে কুরে খাচ্ছে৷
—কিছু কিছু লোকের মধ্যে হোমোসেকশুয়ালিটি লেটেন্ট বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে৷ তাই রেগুলার স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক থাকার পরেও কোন পুরুষ হঠাৎ করে হোমোসেকশুয়াল হয়ে যেতে পারে৷ যাস্ট একটা ট্রিগারের প্রয়োজন৷ আপনার পুত্রর বেলায় ওর একটা কলিগ রাহুল সেন সেই ট্রিগারের কাজটা করে৷ রাহুলদের একটা বড় গ্যাং রয়েছে৷ এ পর্যন্ত যা খবর পেয়েছি, এরা শুধু কলকাতা নয় অন্যান্য বড় বড় শহরেও অপারেট করে৷ প্রত্যোকটা শহরেই এদের মধ্যে রাহুলের মত দু এক ট্র্যাপার আছে৷ যারা পোটেনশিয়াল ভিকটিমদের ট্র্যাগ করে৷ তারপর...একটা সময় ব্ল্যাক মেলিং শুরু হয়৷
—হায় ভগবান...আজকাল দেশে এরকম গ্যাংও অপরেট করছে!
—আপনার ছেলের ব্যাঙ্ক ডকুমেন্টস থেকে যতদূর জানা গেছে গত এক বছরের মধ্যে ওরা আপনার ছেলের কাছ থেকে আড়াই লাখ মত টাকা নিয়েছে৷
—আর...আমার ছেলের মৃত্যু?
প্রফুল্লবাবুর চোখ ছল্ছল্ করে ওঠে৷ ওটা কেন হল?
—আমার ধারণা আপনার ছেলের ওপর টাকার চাহিদাটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল৷ তাই কোন একটা সময় ও বেঁকে বসে৷ হয়তো, সে এসব কিছুর থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল৷
এমন সময় চায়ের ট্রে নিয়ে প্রবেশ করে৷ রায় ওকে দেখে চুপ করে যায়৷
—আপনি স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন...করবী শান্ত গলায় বলে৷
—আমার কাছ থেকে লুকোবার কোন দরকার নেই৷
—যা বলছিলাম...রায় একবার করবীর দিকে তাকায়৷
—আপনার সবামী খুব সম্ভবত এই র্যাকেট থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন৷ এবং তখনই তাকে শেষ করে দেওয়া হয়৷
—যাস্ট লাইক দ্যাট? করবী জিগ্যেস না করে পারে না৷
উত্তরে রায় মাথা নত করে৷
—অনেক লোক, অনেক টাকা ইনভলভড৷ আমার ধারণা রাহুল ওয়াজ যাস্ট এ ফ্রন্টম্যান৷ এই র্যাকেটে কোন একটা প্রোমোটার গ্রুপও ইনভলভড৷ যার জন্য একটা অর্ধেক তৈরি হাইরাইজ বিল্ডিংকে ওরা নিজেদের ইচ্ছে মত ব্যবহার করতে পেরেছিল৷
রায় চায়ের কাপে চুমুক দেয়৷
—বেশ ভাল...চা’টা৷ রায় করবীর দিকে তাকায়৷
—মিসেস মুখার্জি...আপনাকে এতটুকু অন্তত অ্যাশিয়োর করতে পারি য়ে দুর্বিত্তরা কেউ পার পাবেন না৷ রাহুলকে জেরা করা সবে মাত্র শুরু হয়েছে, এই র্যাকেটে যারা যারা ইনভলভড তাদের সববাইকে ধরা হবে৷ এবং শাস্তি দেওয়া হবে৷
কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকে৷
—স্যর...আমার কিন্তু একটা প্রশ্ন রয়ে গেছে৷ প্রদ্যোৎ বলে৷
—কী বলো...
হঠাৎ—ওরা মিসেস মুখার্জিকে ফোন করতে গেল কেন?
—মনে হয় একটু প্যানিকি হয়ে গিয়েছিল৷ বিশেষ করে রাহুলকে জেরা করার পর৷ তাই, ওরা হয়তো ভেবেছিল স্ত্রীকেও শেষ করে দেওয়া যাক৷ চট্ পট্ ওরা একটা কনটিনজেন প্ল্যান করে ফেলে৷ আর...তুমি যদি ভেবে দেখ, ওদের প্ল্যানটা মোটেই খারাপ ছিল না৷ দুটো ডেড বডি...অথচ কোন আঘাতের চিহ্ণ নেই৷
—আর আপনি বলেছিলেন রাহুলের সঙ্গে মিটিং-এ আপনি থাকবেন৷ শেষ মুহূর্তে এলেন না কেন?
রায় একবার করবীর দিকে তাকায়৷
—মিসেস মুখার্জি ঠিক তার আগেই ফোন করেছিলেন৷ এবং উনিই সাজেস্ট করেন আমি যেন ওর সঙ্গে থাকি৷ আমি তোমার সঙ্গে গেলে আমাদের হ্যান্ড এক্সপোজড হয়ে যেত৷ ওরা জেনে যেত আমি পুলিশের লোক৷
রায় একটুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ ওর মুখে এক মুহূর্তের জন্য একটা হালকা হাসি দেখা দেয়৷
—করবীকে ট্র্যাপ করাটা ওদের প্ল্যান ছিল৷ ওরা ভাবতেও পারেনি যে সেটা করতে গিয়ে দে উড রান ইন টু আওয়ার ট্র্যাপ৷
ওহ...দেরি হয়ে গেছে!
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে রায় উঠে পড়ে৷
—আজ চলি৷ প্রদ্যোৎ লেটস গো৷
রায়ের পকেট কোয়েস্টের সিনেমা হলের দুটো টিকিট৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন