প্রণব রায়
শাল—পাইন—হরীতকী জঙ্গলই বেশি, ঝাউয়ের সংখ্যা নগণ্য। তবু স্টেশনটার নাম ঝাউবনী। ছোট পাহাড়ি স্টেশন। দিনে—রাতে মাত্র তিনখানা ট্রেন ঝাউবনীতে দেড়'—দু মিনিটের জন্যে ছোঁয়, বাকি ট্রেনগুলো প্রচণ্ড দেমাকে কাঁকর—ঢালা প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে অবজ্ঞাভরে চলে যায়। তবু ঝাউবনীর মর্যাদা কিছু কম নয়। অনেক জংশন স্টেশনের চেয়েও এই ছোট পাহাড়ি স্টেশনের গুরুত্ব—যাকে বালে ইম্পর্টান্স, বেশি। বিশেষ করে শিল্প—বাণিজ্য মহলে। এখানে তামার খনি আছে, অভ্রের খনি আছে। লোকে বলে পাপের খনিও এখানে আছে, সেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ঝাউবনীর সঙ্গে বেশ কিছুদিন মিতালি করলে তবে জানা যায়।
এই ঝাউবনী অঞ্চলটাই হল আমার গল্পের পটভূমি। কিন্তু গল্পের মধ্যে ঢুকতে হলে আপনাকে একদিন ঝাউবনী স্টেশনে এসে কাঁকর—ঢালা প্ল্যাটফর্মে নামতে হবে। ধরুন,আপনি এসে একদিন এখানে নামলেন। এই ট্রেনে নতুন প্যাসেঞ্জার আজ আর কেউ আসেনি, আপনাকে নেহাত একাই নামতে হল। আপনাকে নামিয়ে দিয়েই ট্রেন চলে গেল উত্তরপ্রদেশের দিকে। কালো গোলটুপি মাথায় ভদ্রলোকটি—তিনিই স্টেশন মাস্টার, তিনিই টিকিট কালেক্টর—আপনার টিকিটখানা নিয়ে তাঁর ঘরে ঢুকে গেলেন। যে লোকটি ট্রেন ছাড়বার ঘণ্টা বাজাল, সেই এগিয়ে এল আপনার কাছে।
কুলি চাই?
কুলি কি হবে? মাল তো নেই।
আপনি জানতে চাইবেন, এখানে গাড়ি পাওয়া যায় কিনা।
লোকটি ঘাড় নেড়ে বললে, যায়। স্টেশনের বাইরে 'পুশপুশ' আছে।
তাকে অনুসরণ করে আপনি এগোবেন। প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্ত ঢালু হয়ে নেমে গেছে। সেই ঢালুর মুখে আপনি এসে দেখলেন, নিচের সড়কের মুখে দুই—তিন পুশপুশ হাজির রয়েছে। এই অদ্ভুত যানের সঙ্গে আপনি হয়তো পরিচিত নন। দুই চাকাওয়ালা পাল্কির মতো গাড়ি, সামনে দুটো লম্বা ডান্ডা, মানুষে টেনে নিয়ে যায়। এক কথায় পাল্কি কাম রিকশা।
পুশপুশওয়ালা জিজ্ঞেস করলে, কোথায় যেতে হবে?
আপনি বললেন, 'আইভি লজ'।
আপনার দিকে তাকিয়ে পুশপুশওয়ালার চোখে এবার সম্ভ্রম দেখা দিল। বোঝা গেল আইভি লজ বোধ করি কোন রাজা—বাদশার প্রাসাদ বা কোন মন্ত্রীমহোদয়ের আস্তানা।
বকশিস নিয়ে কুলি বিদায় নিল এবং মালসমেত পুশপুশওয়ালা আপনাকে নিয়ে রওনা দিল। খোলা দরজার বাইরে চোখ রেখে, আপনি নিসর্গের শোভা দেখতে দেখতে চললেন। কিন্তু মন আপনার বারবার প্রশ্ন করতে লাগল, এই কি শোভা!
অপরাহ্নের ট্রেনে আপনি এসেছেন, এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। লাল পাথুরে মাটির এবড়ো—খেবড়ো সড়ক সাপের মতো এঁকেবেঁকে দূরবর্তী জঙ্গলের মধ্যে সেঁধিয়েছে। দু—পাশে ফাঁকা রুক্ষ প্রান্তর। আরও বহুদূরে আকাশের গা ঘেঁষে ছোট—বড় কয়েকটা ছাই রঙের পাহাড়। আসন্ন সন্ধ্যার বিষণ্ণ ছায়া নেমেছে। কেমন একটা বিশ্রী নির্জনতা। এমন বিশাল ফাঁকার মধ্যে মনটা যেন হু—হু করে ওঠে।
ভাল আপনার লাগছে না জানি, তবুও এগিয়ে চলুন। এই বৈরাগিনী চেহারাটাই ঝাউবনীর একমাত্র রূপ নয়, আরও একটা রূপ আছে। সে—রূপটা দেখতে হলে পাইন—দেওদারের জঙ্গল পেরিয়ে আরও মাইলটাক এগিয়ে যেতে হবে। জঙ্গলের মধ্যে ঢাকের ডুমডুম আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন একটা পাহাড়ি বাঁশি কাঁদছে।
কাঁদুক। ঝাউবনীতে শুধু কান্নাই নয়, উল্লাসও আছে প্রচুর। শুধু আসন্ন অন্ধকারের ছায়া নয়, আলোর অহঙ্কারও আছে চোখ ধাঁধানো।
আরও এগিয়ে চলুন, দেখতে পাবেন।
জঙ্গল যেখানে ফুরিয়ে গেছে, সেখানে এসে পৌঁছতে দৃশ্যপট বদলে গেল আপনার চোখে। দেহাত ছাড়িয়ে একটা শহরে এসে পড়লেন। মেটাল রোডের দু—ধারে ইলেকট্রিকের আলোর সারি এরই মধ্যে জ্বলে উঠেছে। হালফ্যাশানের বাংলা প্যাটার্নের বাড়ি কিছু দেখতে পাওয়া গেল। রাস্তা ধরে আরও এগোলে দেখতে পাবেন কিছু দোকান পাট, হাসপাতাল, লম্বা লম্বা কয়েকটা ব্যারাক আর ক্লাব হাউস।
জায়গাটার নাম 'কপার টাউন' স্থানীয় লোকেরা বলে 'তামানগরী'।
মেটাল রোড যেখানে দু—ভাগ হয়ে দু—দিকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে আপনি বাঁয়ে দৃষ্টিপাত করলে জায়গাটার নামকরণের হেতু বুঝতে পারবেন। মাইলখানেক দূরে ওই ধলাই পাহাড়ের কোলে উঁচু উঁচু প্রকাণ্ড প্ল্যান্টগুলো সন্ধ্যার ঝুপসি অন্ধকারেও আপনার চোখে পড়বে। ওখানে তামার খনি আছে।
না, বাঁ—দিকের রাস্তায় আপনাকে যেতে হবে না। আপনি চলুন ডাউনে—যেখানে আছে আইভি লজ। তিন ফার্লং এগোতেই আপনি সত্যিই ইন্দ্রপুরীর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। আধুনিক ইন্দ্রপুরী। সামনে লন আর তিনপাশে প্রশস্ত বাগানের মধ্যে আমেরিকান ধাঁচের চমৎকার দোতলা বাড়ি। গাছে গাছে রঙিন আলোর ফানুস, বাড়িটার গায়েও রঙিন ফ্লাড লাইটের ঢেউ খেলছে। গেটের বাইরে এবং ভেতরে দামি মোটরের ভিড়। এই হল আইভি লজ। কপার টাউন বা তামানগরীর প্রাণকেন্দ্র!
ফটক পেরিয়ে চলুন ভেতরে। কেউ আপনাকে বাধা দেবে না। কেউ প্রশ্ন করবে না আপনি আমন্ত্রিত, না রবাহূত। আপনি রোমাঞ্চগল্পের পাঠক, স্বয়ং লেখকের ছাড়পত্র আপনার হাতে, সর্বত্র আপনার অবাধ গতি।
অতএব আইভি লজের অন্দরে চলুন।
মেহগনি রঙের বর্মা—সেগুনের চওড়া কাঠের সিঁড়িতে কার্পেট পাতা। তারই ওপর পা ফেলে ফেলে চলে আসুন দোতলার হলঘরে।
নীলাদ্রি গুপ্ত আজ পার্টি থ্রো করেছে নিজের বাড়িতে। আসুন, নীলাদ্রি গুপ্তকে চিনিয়ে দিই। বছর পঁয়ত্রিশ—ছত্রিশের ওই যে যুবাপুরুষটি এ—টেবিল থেকে ও—টেবিলে ব্যস্তভাবে আনাগোনা করছে, কখনো বা দরজা থেকে বিশিষ্ট অতিথিদের অভ্যর্থনা করে ডেকে আনছে, ওই হল নীলাদ্রি গুপ্ত। চোস্ত ইভনিং সুট পরনে, গলায় বো টাই, উগ্র রকমের ফর্সা, কটা চোখ আর ছোট করে ছাঁটা বাদমি চুল। কপার টাউন প্রতিষ্ঠানের এক নম্বর সাহেব। যাকে, বলে ম্যানেজিং ডিরেক্টর। আজ নীলাদ্রির বিয়ের স্মৃতিবার্ষিকী উৎসব। তার বিবাহিত জীবন তিন বছর পূর্ণ হল। সেই উপলক্ষে কপার টাউনের বাছা বাছা অভিজাতদের সমাবেশ হয়েছে নীলাদ্রির ড্রইংরুমে। অধিকাংশই তার প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মী। কিছু অবশ্য এসেছেন ঝাউবনীর বাইরে থেকেও—বড় বড় কারবারী।
ছোট ছোট টেবিল পড়েছে হলে, চারখানা করে ফ্যান্সি চেয়ার। কেউ বসেছে, কেউ কেউ দাঁড়িয়ে জটলা করছে। পুরুষ যত, মহিলা তার চেয়ে কম নয়। মৃদু হাসি, উচ্চচ হাসি, ফিসফিস কথা, কলকণ্ঠের আলাপ—সব মিলিয়ে হলঘরখানা যেন মানুষের মৌচাক।
আজ নীলাদ্রি গুপ্তর বিবাহ—বার্ষিকী। এমন রমণীর সন্ধ্যা কপার টাউনে বছরে একবারই আসে, এমন লোভনীয় পার্টি একবারই হয়। কয়েকটা চেয়ার এখনো খালি পড়ে আছে, একটাতে আপনিও বসে পড়ুন। সঙ্কোচের কারণ নেই। কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না, টের পাবে না আপনার শারীরিক উপস্থিতি। অথচ আপনি দেখতে পাবেন সবই এবং সবাইকে। আসলে নীলাদ্রির পার্টিতে আপনি নিজে তো আসেননি, এসেছে আপনার পাঠক—মনের কৌতূহল।
দোরগোড়ায় হাঁসের মতো হাঁসফাঁস করতে করতে এসে দাঁড়ালেন মোটাসোটা খর্বকায় এক বয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁর শেরওয়ানী থেকে মাথার চুল অবধি ধবধবে সাদা। সঙ্গে চড়া হলুদ রঙের রেশমি শাড়ি পরা ততোধিক মোটা এক ভদ্রমহিলা। হাতে গোলাপের তোড়া। দেখে ছুটে গেল নীলাদ্রি। দু—হাত বাড়িয়ে উচ্ছ্বসিত সৌজন্যের সঙ্গে হংস—দম্পতিকে স্বাগত জানালে, আসুন, আসুন! মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সাহানীর অভাবে আমাদের পার্টির জৌলুসই ছিল না এতক্ষণ! কান্তা!
ইয়েস বস!
সাতাশ—আঠাশ বছরের একটি যুবতী এসে দাঁড়াল। জরিদার জমির ওপর কালো ডোরাকাটা শাড়ি লম্বাটে দেহটাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উদ্ধত যৌবনের বাঁকাচোরা রেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। খাটো রুখু চুলের গোড়ায় রুপোলি জরির ফিতে বাঁধা। অত্যন্ত কালো আর অত্যন্ত ঝকঝকে দুই চোখ। কান্তা কালেলকর সুশিক্ষিতা মারাঠি মেয়ে। নীলাদ্রির স্টেনো।
নীলাদ্রি বললে, এদের বসতে দাও কান্তা।
বিনম্র গলায় কান্তা শুধু বললে, ইয়েস বস।
মিসেস সাহানী এদিক—ওদিক তাকিয়ে বললেন, নীল তোমার বউকে দেখছি না কেন? মিসেস গুপ্তা কই?
হাসলে নীলাদ্রির পাতলা ঠোঁটের ডান দিকটা ঈষৎ উঠে যায়। একটা প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গের ভঙ্গি বলে ভুল হতে পারে। এ হাসিটা নীলাদ্রির পেটেন্ট। তেমনি পেটেন্ট হাসি হেসে সে বললে, বাংলায় একটা মজার ছড়া আছে মিসেস সাহানী:
যার বিয়ে তার হুঁস নেই।
পাড়া—পড়শির ঘুম নেই।।
দেখো তো কান্তা, লালীর আসতে কত দেরি।... না থাক, অয়ন কোথায় গেল?
এদিক—ওদিক তাকালে নীলাদ্রি।
এই যে স্যার!
অয়ন বোস কাছে এল। বছর ত্রিশের মধ্যে বয়স। টগবগে যৌবন। তামানগরীতে কাজ করে করেই বোধ হয় গায়ের রংটাও তামাটে। চোখা, নাক, পুরু ঠোঁট, চওড়া কপালের ওপর ঝাঁপিয়ে—পড়া চুল চিরুনির তোয়াক্কা রাখে না। দেহটা পরিণত বয়সের স্বাক্ষর বহন করলেও চোখ দুটো বালকের মতো চঞ্চল। এই অয়ন বোস, কেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস, নীলাদ্রির পি—এ।
নীলাদ্রি একবার অয়নের আপাদমস্তক তাকিয়ে ঈষৎ অপ্রসন্ন মুখে বললে, তোমায় কতবার মানা করেছি, পার্টিতে কখনো এই বেশে আসবে না!
চট করে একবার নিজের দিকে তাকিয়ে নিল অয়ন। নস্যি রঙের একটা সাধারণ টেরিকটনের পাতলুন—তাও ওয়ার্কিং প্যান্ট, আর হাল্কা ক্রিম রঙের পপলিনের বুশ—শার্ট। কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে অয়ন বললে, মাছ ধরতে গিয়েছিলাম স্যার, সেখান থেকে স্ট্রেট এখানে। চেঞ্জ করার সময় পেলাম কই বলুন?
চওড়া কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে নীলাদ্রি বললে, নাঃ, তোমায় নিয়ে আর পারা যায় না! যাও, জেনে এসো লালীর দেরি হচ্ছে কেন?
প্রায় ছুটেই চলে গেল অয়ন। শুধু পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যোন্ট নয়, নীলাদ্রি গুপ্তর ঘরের লোকও হয়ে গেছে সে।
সেদিকে চেয়ে কান্তা ভুরু কুঁচকে বললে, অয়নকে এতখানি আশকারা দেওয়ার কোনো মানেই হয় না।
মিসেস সাহানী হেসে বললেন, তোমার পি—এ রীতিমতো পাগলাটে দেখছি!
নীলাদ্রি বললে, একটু অদ্ভুতপ্রকৃতি বটে, তবে ছোকরা ভারি কাজের।
অয়ন সম্পর্কে যখন হলঘরে নানা মন্তব্য শোনা যাচ্ছে, যে তখন ভেতর—বাড়িতে। আয়া বললে, মেমসাহেব সাজ—পোশাক করছে।
লালীর ঘরের পর্দার সামনে গিয়ে দাঁড়াল অয়ন। ব্যস্ত গলায় বললে, গুপ্তসাহেব দারুণ তাড়া দিচ্ছেন। গেস্টরা সব হাজির। সাজ—পোশাক টয়লেট যেটুকু বাকি আছে,সেটুকু আসছে বছর একুশে জুলাইয়ের জন্যে থাক।
আজ একুশে জুলাই, নীলাদ্রি—লালির বিয়ের তারিখ।
পর্দার ওপাশ থেকে মেয়ে—গলার আওয়াজ এল, ভেতরে এসো।
পর্দা সরিয়ে ভেতরে পা দিল অয়ন। চারপাশে একগাদা শাড়ি, ব্লাউজ, অলঙ্কার ছড়িয়ে চুপ করে বসে আছে লালী গুপ্তা।
একি, এখনো কিছুই হয়নি যে!—অয়ন অবাক।
নিস্পৃহ গলায় লালী বললে, আচ্ছা অয়ন, পার্টিতে আমি যদি না যাই? তোমাদের গুপ্তসাহেবকে বলে—কয়ে ছুটি দাও না আমায়!
তার মানে?
ভাল লাগছে না। বসো, গল্প করি।
আরে বা, আজ এত বড় উৎসব!
উৎসব—একটুকরো মেঘলা হাসি দেখা দিল লালির মুখে। বললে, আরেকটা উৎসবের কথা মনে পড়ছে। পনেরো বছর আগে মুর্শিদাবাদে। এগারো বছরের একটি ছোট্ট মেয়ের জন্মতিথি উৎসব। তাও সত্যিকারের জন্মতিথি নয়, মিছিমিছি মন—গড়া তিথি। তাদের প্রকাণ্ড বাগানের এককোণে একটা দোফলা আমগাছের নিচে সেই মনগড়া জন্মতিথির উৎসব হয়েছিল। নেমন্তন্ন খেতে এসেছিল পাড়ারএ একপাল ছেলেমেয়ে। কেউ উপহার দিয়েছিল ছেঁড়া বেনারসীর টুকরো, কেউ আধখানা রং—পেনসিল, কেউ বা পেড়ে—আনা ফলসা একমুঠো। সবার চেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল একটি ছেলে—জিয়াগঞ্জের মেলা থেকে কেনা একছড়া লাল পুঁতির মালা উপহার গিয়ে।
অয়নের মুখে একবার ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। বললে, পুরোনো দিনের জের টেনে লাভ নেই। অন্য কথা বলো।
এবার আমার স্বামী আময়ি কি উপহার দিয়েছেন জানো?
একটা মখমলের কেস খুলে লালী আয়নের সামনে ধরলে। সরু সোনার চেনে গাঁথা মস্তবড় একখণ্ড চুনি—তাজা রক্তের মতো টকটকে লাল।
সারা এশিয়ায় এতবড় রুবি আর আছে কিনা সন্দেহ।—লালী বললে।
অয়নের বালকসুলভ চঞ্চল চোখ শান্ত হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে বললে, এই দামি উপহারটা দেখাবে বলেই কি সেই পুঁতির মালার কথাটা পাড়লে? আজকের মিসেস গুপ্তাকে সেদিন সাড়ে ছ' আনার উপহার দিয়েছিল বলে সেই ছেলেটার লজ্জার শেষ নেই আজো।
হাসি মুখে লালী বললে, তুমি ভারি ছেলেমানুষ অয়ন! উপহারের দাম না জেনেই দিয়ে ফেল আর অনর্থক লজ্জা পাও। সেদিন ছেলেটি জানতেই পারেনি মেয়েটির কাছে কত দামি ছিল সেই পুঁতির মালা। অনেক আনন্দের হীরে দিয়ে গাঁথা ছিল সেটা! কিন্তু এই রুবির লকেটটা কেন দেখ লাম জানো?
কেন?
লালীর মুখের হাসি নিভে এল। বললে, স্বামীর দেওয়া উপহার। কত আনন্দই হওয়া উচিত। কিন্তু এই লকেটটা আমার কাছে কোনো আনন্দ বয়ে আনেনি, বরং কেমন যেন একটা ভয় জাগিয়েছে।
ভয়?
হ্যাঁ। দেখছ না, লাল রুবি পাথরটা লাল আলোর মতো অজানা বিপদের সঙ্কেত দেখাচ্ছে! জানো অয়ন, আজই সকালে আমার হাতে একখানা আরশি ভেঙে গেছে—বিকেলে বারান্দায় যেতে গিয়ে পায়ে হোঁচট লেগেছে—কেবলই মনে হচ্ছে, কোথায় কোনো বিপদ যেন আমারি জন্যে ওত পেতে রয়েছে!
লালীর সাদা মুখখানা আরও সাদা হয়ে উঠল। অয়ন হালকা গলায় বলে উঠল, কী সব আজেবাজে বলছ!
কেমন যেন ক্লান্ত গলায় লালী বললে, আজেবাজে! হয়তো তাই। কিন্তু মন থেকে ভয়টাকে তবু তাড়াতে পারছি না। তাই পার্টিতে গিয়ে বসতেও মন চাইছে না।
তেমনি হালকা গলায় অয়ন বললে, আজকাল খুব রহস্য উপন্যাস পড়ছ বুঝি? তাই তোমার নার্ভগুলো উইক হয়ে পড়েছে। গুপ্ত সাহেবকে বলে একটা নার্ভ—টনিক আনিয়ে দিতে হবে দেখছি!
ঠাট্টা কোরো না অয়ন।
লালীর গলার আওয়াজ অত্যন্ত বিষণ্ণ শোনাল। এবার গম্ভীর হয়ে গেল অয়ন। গলায় আশ্বাস মিশিয়ে বললে, এ বাড়ি তোমার নিজের, এখানে তোমার ভয় কিসের' শুধু এ—বাড়ি নয়, সারা কপার টাউনের কোথাও তোমার ভয় নেই।
লালীর মুখ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অয়নের একখানা হাত ধরে বললে, সত্যি বলছ?
আরও হালকা সুরে অয়ন বললে, বড় বেশি সুখে থাকলেই মেয়েরা ভয় পায়। কেবলই ভাবে এত সুখ কি সইবে?
লালী বললে, আমার বড় বেশি সুখ কোথায় দেখলে তুমি?
অয়ন বললে, ধনী—ঘরের মেয়ে তুমি, অগাধ ঐশ্বর্যের মধ্যে বসে আছ। রূপবান গুণবান স্বামী পেয়েছ—তোমার মত এত সুখ কে পায়?
আমাকে তুমি হিংসে করছ অয়ন?
আমি গরীব ঘরের ছেলে, হিংসে করাই তো স্বাভাবিক।
হাসি মুখে লালী বললে, মিছে কথা! হিংসে তুমি আমাকে করতে পার না। একদিন তুমি আমায় ভালোবাসতে।
এক মুহূর্তের জন্যে অয়নের চোয়াল দুটো যেন শক্ত হয়ে উঠল। কেমন যেন তেতো গলায় বললে, তোমাকে তো বলছি, পুরোন দিনের জের টেনে লাভ নেই। পুরোন জিনিস ফেলে দিতে হয়!
তারপর আবার সেই হালকা গলায় বললে, গুপ্তসাহেব এবার আমাদের দুজনকে ডাকতে লোক না পাঠান। নাও, চটপট রেডি হয়ে নাও।
যেতেই হবে?
হবে বৈকি। আজকের পার্টিতে তুমি না গেলে কি চলে? গুপ্তসাহেবের প্রেস্টিজ ঢিলে হয়ে যাবে না?
দু—আঙুলে কপালের রগদুটো টিপে লালী বললে, বেশ, যাব। কিন্তু বিকেল থেকে মাথাটা ধরে আছে, কি করি বল তো?
এতক্ষণ বল নি কেন? দাঁড়াও—
প্যান্টের পকেট হাতড়ে কাগজের একটা ছোট্ট পুরিয়া বার করলে অয়ন। বললে, এটা খেয়ে নাও, পাঁচ মিনিটে আরাম। দোহাই তোমার, এখুনি তৈরি হয়ে চলে এস, নইলে আমার চাকরি নির্ঘাৎ নট হয়ে যাবে।
বলতে বলতে পর্দার বাইরে চলে গেল অয়ন।
মৌচাকের গুনগুন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। অনেক জোড়া চোখ আটকে রইল হলঘরের দরজায়।
আজকের মধুচক্রের মক্ষিরাণী এসে দাঁড়িয়েছে।
দেহ জড়িয়ে টকটকে লাল রঙের সিল্কের শাড়ি, জরি বর্ডার—দেওয়া তেমনি লাল শ্লিভলেস ব্লাউজ—সুডৌল কাঁধ থেকে আইভরির মতো হরিদ্রাভ সাদা হাত দুখানি নেমে এসেছে, আইভরি—রং বুকের মাঝখানে রক্তবর্ণ রুবির লকেট, ঘন কালো রেশমি এলো খোঁপা ঘিরে পলাশ কুঁড়ির সারি। লালের আগুনে ছাব্বিশ বছরের যৌবন জ্বলছে।
এই লালী গুপ্তা। কপার টাউনের প্রধান নীলাদ্রি গুপ্তর স্ত্রী।
লাল ঠোঁটে স্মিত হাসির রেখা ফুটিয়ে, হাত দুটি বুকের কাছে জোড় করে লালী এগিয়ে এল হলের ভেতরে। দাঁড়াল একেবারে স্বামীর পাশে। খুশিতে ঝলমল করে উঠল নীলাদ্রির ফর্সা মুখ আর কটা রঙের চোখ।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ।
তারপরেই মানুষের মৌচাক আবার গুঞ্জন করে উঠল। শুরু হয়ে গেল উপহার দেওয়ার পালা। কানাকানি হতে লাগল নানা মন্তব্য :
লালী গুপ্তা একখানা বিউটি বটে!
লাকি ডগ ওই নীলাদ্রি, কি বলো?
অত রূপ কিন্তু ভালো নয়।
যা বলেছ, হেলেনের জন্যেই ট্রয়—নগর পুড়েছিল।
ইস, কী খুশি দেখাচ্ছে নীলাদ্রি গুপ্তকে!
বউকে দারুণ ভালবাসে যে!
অমন বউ পেলে সবাই ভালোবাসে।
হাসতে হাসতে এগিয়ে গেলেন হংস—দম্পতি। রক্তগোলাপের তোড়া লালীর হাতে দিয়ে মিসেস সাহানী বললেন, নামটা তোমার আজ সার্থক হয়েছে লালী।
মিঃ সাহানী গদগদ গলায় বললেন, তোমাদের মতো এত সুন্দর জুটি আমি আর দেখিনি নীল!
অনেকে অনেক কিছুই বললে, শুধু চুপ করে রইল দুটি মানুষ। অয়ন আর কান্তা। অয়নের তামাটে মুখের ওপর দিয়ে একখানা ছায়া ভেসে গেল। আর কান্তার ঝকঝকে কালো চোখ আরো উগ্র রকমের ঝকঝকে হয়ে উঠল।
নীলাদ্রির মুখে সেই পেটেন্ট হাসিটি। ঠোঁটের ডান দিকের কোণ ঈষৎ তুলে সে বো—টাইটা একবার ঠিক করে নিল, তারপর এদিক—ওদিক চেয়ে বললে, আমাদের এই উৎসবকে সুন্দর করে তোলার জন্য আমার আর আমার স্ত্রীর তরফ থেকে প্রত্যেক বন্ধু—অতিথিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি বলতে গর্ব অনুভব করছি যে, লালী আমার জীবন—বাগানের সুন্দরতম ফুল—আমার প্রতিদিনের সুখ, শান্তি, আনন্দ।
লালী স্বপ্নময় চোখে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভুলে গেছে কিছুক্ষণ আগের অনির্দেশ্য ভয় আর মাথা ধরার কথা।
হল—এ মৃদু হাততালির শব্দ। সেই শব্দ ছাপিয়ে নীলাদ্রির গম্ভীর আওয়াজ শোনা গেল, ডন!
হলঘরের একপাশে বারের কাছ থেকে সাড়া দিল ডন রিভাস, ইয়েস বস!
ছ' ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা মজবুত শরীর, ঘাড়ের চামড়া ঘেঁষে ছাঁটা চুল মাথার সামনের দিকে এসে আধ ইঞ্জিটাকে দাঁড়িয়েছে। খাঁড়ার মতো নাক, ধূসর রঙের চোখ সদা—সতর্ক। ডন রিভাস জাতে জার্মান, কপার টাউনের ফ্যাক্টরি—ম্যানেজার।
নীলাদ্রি, বললে, ড্রিঙ্কস প্লিজ!
ও—কে বস।— ডন ডাকলে, জাফর! গিলাস লাগাও।
ঔরঙ্গজেব—মার্কা দাড়িওয়ালা এক বয় ট্রে—ভর্তি সরু ডাঁটি লাগানো কাচের পানপাত্র টেবিলে টেবিলে বিলি করতে শুরু করলে। ডন রিভাস আলাদা দুটো পানপাত্র নিয়ে, মনিব ও মনিবানীর সামনে নিজে খাতির করে সাজিয়ে রাখলে। তারপর এল চাকালাগানো টেবিলে চড়ে স্টেনলেশ স্টিলের বালতির মধ্যে বরফের গুঁড়োয় ডোবানো লম্বা একটা বোতল। ফরাসি দেশের দ্রাক্ষাসব, যার নাম শ্যাম্পেন।
অদ্ভুত কায়দায় ছিপি খুলে ফেললে ডন, তারপর মনিবের দিকে তাকালে।
নীলাদ্রি বললে, ঢালো।
ডন ঢাললে না। ঈষৎ মাথা নুইয়ে সসম্ভ্রমে বোতলটা এগিয়ে ধরলে মনিবের দিকে। বললে, আগে উৎসবের রানিকে। নীলাদ্রি লালীর কাপ ভরে দিতেই বোতলটা ফিরিয়ে নিল ডন রিভাস। তারপর পরিবেশন শুরু করলে প্রভু এবং অতিথিদের পাত্রে।
একবার কেশে নিয়ে মিঃ সাহানী আবেগভরে বললেন, নীলাদ্রি ও লালী গুপ্তার বিবাহিত জীবন চিরদিন সুন্দর ও সার্থক হয়ে থাক। চিয়ার্স!
সকলে পানপাত্র তুলে ধরে প্রতিধ্বনি করলে, চিয়ার্স!
নীলাদ্রি আর লালী প্রথমে শ্যাম্পেনে চুমুক দিলে। দেখাদেখি অন্য সবাই। ভরা পড়ে রইল শুধু কান্তার পাত্র। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে সে বসেছিল—সবার থেকে একটু তফাতে। আস্তে আস্তে অয়ন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
তুমি কি শ্যাম্পেন পছন্দ করো না কান্তা।
হুঁ।
অয়ন বললে, তবে ছোঁওনি? তুমি কি চাও না ওদের বিবাহিত জীবন সুখের আর সুন্দর হোক?
চমকে উঠে কান্তা বললে, কে বললে চাই না?
কেউ বলেনি। আমি জানি।
কি জানো?—ঝকঝকে কালো চোখের দৃষ্টি যেন তলোয়ারের ফলা।
হা হা করে হেসে উঠে অয়ন বললে, আঙুর ফল টক! তবে আঙুর থেকে যে শ্যাম্পেন তৈরি হয়, সেটা কিন্তু মিষ্টি! খেয়েই দেখো না।
দাঁতে দাঁত পিষে কান্তা বললে, ইচ্ছে হয়, তুমি খাও।
কান্তার পাত্রটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে অয়ন খালি করে ফেললে। তারপর বললে, ধন্যবাদ কান্তা। গরিবের ছেলে, দামি জিনিস ফেলে দেওয়া অভ্যেস নেই—ওকি !
সমস্ত হলঘর তখন হঠাৎ অস্ফুট চিৎকার করে উঠেছে। আর, নীলাদ্রি ব্যাকুল হয়ে টেবিলে মুখ গুঁজে—থাকা লালীর পিঠে নাড়া দিয়ে ডাকছে, লালী! কি হল? লালী।
কোনো সাড়া নেই। চেতনার কোনো চিহ্নও নেই লালী গুপ্তার দেহে।
নীলাদ্রি উদভ্রান্তের মতো ডাকলে, ডক্টর দাস!
আধাবয়সী ডাক্তার ধীরাজ দাস ছুটে এলেন। কাঁচাপাকা চুল, ঘন ভুরু, পাকানো গোঁফ আর ফরাসি ধাঁচের অল্প দাড়ি। কপার টাউন হসপিটালের চিফ মেডিক্যাল অফিসার।
ছুটে এল অয়ন। ছুটে এল কান্তা।
লালীর মুখ দেখা যাচ্ছে না, ঝুলে—পড়া একখানা হাত তুলে নিয়ে ধীরাজ দাস পালস দেখলেন। একবার—দু'বার। ডাক্তার ঘন ভুরুর ওপর কপালে রেখা পড়ল। নীলাদ্রিকে বললেন, ঘরে নিয়ে চলুন।
লালীর নরম হালকা দেহটাকে নীলাদ্রি বলিষ্ঠ দু—হাতে বুকে তুলে নিল। শুধু এক সেকেন্ডের জন্যে লালীর মুখখানা দেখতে পেল অয়ন, পরক্ষণেই নীলাদ্রির চওড়া বুকের ওপর দেখা যেতে লাগল তার মাথার পিছনটা। কালো রেশমী এলোখোঁপায় পলাশ—কুঁড়ির সারি। ভেতর—বাড়িতে যেতে যেতে ডাক্তার একবার ফিরে তাকিয়ে বললেন, আশা করি রুগির ঘরে কেউ ভিড় করবেন না।
সবাই যখন স্তব্ধ হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, তখন সবার অলক্ষে একখানা হাত লালীর আধ—খাওয়া শ্যাম্পেনের পাত্রটা সরিয়ে নিল।
এত আনন্দের মধ্যে যার শুরু, এমন বিষাদে তার শেষ হবে কে ভেবেছিল!
আপনি—রোমাঞ্চ—গল্পের পাঠক, আপনিও হয়তো ঠিক এ হেন পরিস্থিতির জন্যে মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু এমনিই হয়। জীবনটা মানুষের ভাবনার বাইরেই ঘুরছে অনবরত। তাই আপনার জন্যে আরও একটা চমক অপেক্ষা করছিল।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই সারা কপার টাউনে শোকের খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। হার্টফেল করে লালী গুপ্তা মারা গেছে! অনেক চেষ্টা করেও ডা. ধীরাজ দাস বাঁচাতে পারলেন না।
আইভি লজে অনেকেই এলেন লালী গুপ্তাকে শেষ দেখা দেখতে, আর নীলাদ্রির শোকে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু হলঘরে দাঁড়িয়ে কান্তা বিষণ্ণ গলায় বললে, মিস্টার গুপ্ত অসম্ভব রকম ভেঙে পড়েছেন, মিসেস গুপ্তাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেমানুষের মতো কাঁদছেন! এসময় তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা উচিত হবে কি? ওঁকে এখন একা থাকতে দেওয়াই ভাল। আপনারা বরং দু'—একদিন বাদে—
কথাটা যুক্তিসঙ্গত। তাই আপাতত কান্তাকেই সমবেদনা জানিয়ে একে একে সমব্যথীর দল ফিরে গেলেন। অনেকেই এল, গেল, এল না শুধু অয়ন—যে অয়ন একসময় লালীর ছেলেবেলার সাথী, আর কিশোরদিনের বন্ধু ছিল।
অয়নের অনুপস্থিতি আশ্চর্যের ব্যাপার বটে।
একমাত্র পুরোনো খানসামা জাফর আলি ছাড়া লালীর বাপের বাড়ির কেউ বর্তমান নেই। নীলাদ্রির বিধবা মা পাকিস্তানে। সুতরাং কাউকে খবর দেওয়ারও ঝামেলা নেই। কারো আসারও অপেক্ষা নেই।
তবু, সৎকারের জন্যে অপেক্ষা করতেই হল।
ঘরে যখন লালীর মৃতদেহ জড়িয়ে নীলাদ্রি অজস্র চোখের জল ফেলছে, বাইরে তখন একুশে জুলাইয়ের রাতও কাঁদছে। পার্টি যখন অকালে ভাঙল, জাফর আলি এক এক করে হলঘরের বাতিগুলো যখন নিভিয়ে দিতে লাগল, ঝাউবনীর আকাশেও তখন কোনও এক অদৃশ্য খানসামা এক এক করে তারা আর চাঁদের ফানুসগুলো নিভিয়ে দিল। কেউ খেয়াল করেনি কখন ধলাই পাহাড়ের মাথায় মেঘের কুণ্ডলী জমছে আর হাওয়া উঠেছে চনমন করে। দেখতে দেখতে ঝড় এসে পড়ল। নেমে এল মুষলধারে বৃষ্টি।
সেই ঝড়—বৃষ্টি ফোঁসফোঁসানি শান্ত হতে রাত তিন প্রহরে পৌঁছল। ফুলে ফুলে সাজানো হল লালীর শেষ বাসর—শয্যা। যে ফুলগুলি সে কিছুক্ষণ আগে উপহার পেয়েছিল, সেই ফুল দিয়েই।
জাফর আলি দু—একবার মাথা নেড়ে বললে, রাত কাবার না হতেই এত তাড়া কেন? আসমানে এখনো দ্যাওয়া ডাকছে!
ধীরাজ দাস নীরস গলায় বললেন, অনর্থক দেরি করে লাভ নেই। বৃষ্টি তো ধরে গেছে। মিস্টার গুপ্ত, এবার উঠুন—শেষ কাজটুকু আমাদের করতে দিন।
লালীর পাশ থেকে আস্তে আস্তে সরে দাঁড়াল নীলাদ্রি। তাকে দেখাচ্ছে ঝড়ে হাল—ভাঙা পাল—ছেঁড়া একটা জাহাজের মত। গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, যা করবার আপনারাই গিয়ে করুন—কেবল আমাকে যেতে বলবেন না, প্লিজ—
নীলাদ্রির গলার আওয়াজ বুজে এল।
শিলাই নদীর ধারেই ঝাউবনীর শ্মশানঘাট। একটা জঙ্গলের গায়ে। সেখানে লালীর দেহ বয়ে নিয়ে এল অল্প কয়েকজন লোক। ধীরাজ দাস, ডন রিভাস আর দু—চারজন ফ্যাক্টরির কর্মী। এই দুর্যোগে শেষ রাতে আর কেই বা আসবে? পিছন পিছন এল শুধু পুরোনো খানসামা জাফর আলি, আর ওয়ার্কার্স ব্যারাক থেকে নীলাদ্রির দূর সম্পর্কের এক ভাইপো—মুখাগ্নির জন্যে।
ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে দু'চারটে তারা, ঝিমঝিমে চাঁদের আলো দেখা দিয়েছে। টর্চ হাতে কুড়ুল নিয়ে দুজন কাঠ কাঠতে জঙ্গলে ঢুকল। কান পেতে কি যেন শুনল ডন রিভাস, তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল নদীর কোল ঘেঁষে। শিলাই নদীর কাচের মতো স্বচ্ছ জলে কে যেন গেরুয়া রং গুলে দিয়েছে। পাহাড়ি নদী শিলাই গরমকালে ভারি শান্ত, রোগা মেয়েটির মতো। বর্ষা নামলে তার চেহারা যায় পালটে, গেরুয়া ঘাগরা ফুলিয়ে দুলিয়ে পাক খেতে খেতে নাচতে থাকে।
কপালে হাত রেখে ঝিমঝিমে জ্যোৎস্নায় দূরে কি যেন দেখার চেষ্টা করলে ডন। তারপর মুখ ফিরিয়ে বললে, জলদি করো! হারি আপ!
কিন্তু জলদি করো বললেই জলদি করা যায় না। একটা পুরো চিতার জন্যে জ্বালানি কাঠ নেহাত কম লাগে না। অর্ধেক কাঠ কেটে আনতে না আনতেই ডন আবার হাঁকলে, হারি আপ মেন! আওর জলদি করো!
এবার ডনের গলায় স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
ধীরাজ ডাক্তার স্বভাবনীরস গলায় বললেন, ব্যাপার কি?
নদীর উজানে চোখ রেখে ডন বললে, শিলাইয়ের মেজাজ ভাল মনে হচ্ছে না। ওদের হাত চালাতে বলুন। আধ ঘণ্টার মধ্যে কাজ সারতে হবে।
কিন্তু ডনের হিসেবে একটু ভুল হয়ে গেল। যথাসাধ্য দ্রুত হাত চালিয়ে চিতা সাজাতে অবশ্য মিনিট পনেরোর বেশি লাগল না, তারপর লালীকে যেই শোয়ানো হল, আগুন দেওয়াটা মাত্র বাকি, ঠিক তখনই—
নদীর ধার থেকে তাড়া—খাওয়া জানোয়ারের মতো ছুটে আসতে আসতে ডন শুধু বললে, আসছে।
আতঙ্কিত চোখ মেলে সবাই তাকাল। আসছে নয়, এসে পড়েছে।
শেষ রাতের ঘোলাটে জ্যোৎস্নায় দেখতে পাওয়া গেল, গেরিমাটি—গোলা ফেনিল জলস্রোত বুনো গোখরোর মতো হাজার ফণা তুলে ছুটে আসছে বাতাসের আগে। মাতাল মেয়ের মতো বেসামাল কৌতুকে খলখল করে হাসছে শিলাই।
ঝাউবনীতে যাদের বাস, তাদের জানতে বাকি নেই পাহাড়ি নদীর বান কী মারাত্মক! তার মুখে হাতি পড়লে কুটোর মতো ভেসে যায়।
কর্তব্যের চেয়ে বড় প্রাণের ভয়। দেখতে দেখতে ঝাউবনীর শ্মশানঘাট ফাঁকা হয়ে গেল। শিলাইয়ের তীরে কাঠের বাসরশয্যায় একা শুয়ে রইল লালী।
নীলাদ্রি জানল যে, শিলাই নদীর বানে লালী ভেসে গেছে।
ব্যাপারটা অভাবিত। হয়তো নিয়তির নির্দেশেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু লালী যখন তাকে ছেড়েই যেতে পারল, তখন তার দেহটা আগুনে ছাই হোক, অথবা স্রোতে ভেসে যাক—নীলাদ্রির কাছে একই। হিন্দু শাস্ত্রমতে সদগতি না হলেও মৃতের একটা গতি তো হয়েছে।
কিন্তু একদিন বাদেই যে ব্যাপারটা ঘটল, নীলাদ্রির কাছে সেটা আরও অভাবিত। সকাল থেকে পরিচিত বন্ধু—বান্ধবীদের মুখে সান্ত্বনার বাঁধা বুলি শুনে শুনে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। দুপুরে লাঞ্চের পর এল তার স্টেনো কান্তা কালেলকর। অফিসে কিছু জরুরি চিঠি এসে পড়ে আছে, সেগুলোর জবাব দেওয়া দরকার। ডিকটেশন দিতে দিতে নীলাদ্রির তন্দ্রা আসছিল, সেই সময় বেয়ারা এসে জানালে, এক আদমি সাহেবের দেখা চায়।
বিরক্ত হল নীলাদ্রি। বললে, পরে দেখা হবে।
বেয়ারা চলে গিয়েই আবার ফিরে এল। লোকটি নাকি বলছে, জরুরি কথা আছে।
উঠতেই হল নীলাদ্রিকে। নিভে—যাওয়া পাইপটা আবার ধরিয়ে ড্রয়িংরুমে গেল। ঘরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল নীলাদ্রি।
আগন্তুক দাঁড়িয়ে উঠে বললে, আমি ইন্সপেক্টর হীরা সিং।
ঝাউবনী পুলিশ—স্টেশন থেকে আসছি।
নীলাদ্রির কটা রঙের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথরের হয়ে গেল। তারপরেই সহজভাবে হাত বাড়িয়ে দিলে করমর্দনের জন্য।
বসুন। ইন্সপেক্টর মালহোত্রা কি বদলি হয়েছেন?
হ্যাঁ, হঠাৎ বদলি হয়েছেন। তাঁর জায়গায় আমি মাত্র দিন তিনেক হল এসেছি।
জেনে সুখী হলাম। কিন্তু আমার কাছে কেন এসেছেন ইন্সপেক্টর?
হীরা সিং নম্র ভদ্রতার সঙ্গে বললে, একটা বিষয় জানতে। আপনার এই মনের অবস্থায় কোনো প্রশ্ন করা যদিও আমার উচিত নয়, তবু—
একটু পোশাকী হাসি মুখে এনে নীলাদ্রি বললে, ঠিক আছে। বলুন, কি জানতে চান?
গত পরশু দিন সন্ধেবেলা মিসেস গুপ্তা হঠাৎ মারা গেছেন শুনলাম—
ঠিকই শুনেছেন।
ভারি দুঃখের বিষয়! কি করে মারা গেলেন?
হার্টফেল করে।—নীলাদ্রির মুখে বিষণ্ণ গাম্ভীর্য নেমে এল।
হীরা সিং কোলের ওপর টুপিটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললে, মিস্টার গুপ্ত, আপনি কি নিশ্চয় করে বলতে পারেন যে অন্য কোন কারণ ছিল না?
হতবাক হয়ে গেল নীলাদ্রি। সে কিছু বলার আগেই দরজার কাছ থেকে একটা নীরস গলার জবাব শোনা গেল : নিশ্চয় বলতে পারেন।
ধীরাজ ডাক্তার কখন ঘরে ঢুকেছেন, কেউ লক্ষ করেনি।
ডাক্তার বললেন, মিসেস গুপ্তার হার্ট উইক ছিল। দুর্ঘটনার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম, নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি হার্ট ফেলিওর ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না।
নীলাদ্রি পরিচয় করিয়ে দিলে, ডক্টর ধীরাজ দাস—কপার টাউন হসপিটালের চিফ মেডিকেল অফিসার। আর, ইন্সপেক্টর হীরা সিং—ঝাউবনী থানার নতুন অফিসার।
টুপি থেকে চোখ তুলে হীরা সিং বললে, আমি কিন্তু অন্য রিপোর্ট পেয়েছি।
কি রিপোর্ট?
মিসেস গুপ্তাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল।
ঘরের মধ্যে নিরেট স্তব্ধতা। হঠাৎ সেই স্তব্ধতা খানখান করে দিল ধীরাজ ডাক্তারের কর্কশ হাসি। হাসতে হাসতেই ডাক্তার বললেন, এমন আজগুবি গল্প কোথায় পেলেন ইন্সপেক্টর? আমি ডাক্তার, বিষ দেওয়া হলে আমি জানতে পারতাম না!
নীলাদ্রির ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। তবু নিজেকে যথাসাধ্য সংযত রেখে বললে, একটা সম্ভ্রান্ত পরিবার সম্পর্কে এমন একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা আপনার কাছ থেকে আশা করিনি ইন্সপেক্টর। এ রিপোর্ট আপনি কোথায় পেলেন? কে দিয়েছে?
শান্ত স্পষ্ট গলায় হীরা সিং বললে, আপনারই বাড়ির পুরোন খানসামা জাফর আলি।
দারুণ অবাক হয়ে নীলাদ্রি বললে, জাফর আলি! অসম্ভব।
বেশ তো, তাকে ডেকে আপনি নিজেই জিজ্ঞেস করুন। ঘণ্টা দুই আগে সে থানায় গিয়েছিল কিনা।
চুপ হয়ে রইল নীলাদ্রি।
হীরা সিং আবার বললে, ডাকুন তাকে।
নীলাদ্রি চিন্তিত মুখে বললে, কাকে ডাকব? গত পরশু রাত থেকে জাফর বাড়িতেই নেই।
সেকি! কোথায় গেল সে?
বলে যায়নি। কিন্তু জাফর যে সত্যি কথাই বলেছে, তার কোন প্রমাণ পেয়েছেন?
মৃদু হেসে হীরা সিং বললে, প্রমাণ পেলে এখানে তদন্ত করতে আসতাম না, সোজা আসামিকে গ্রেফতার করতাম।
নীলাদ্রির ঠোঁটে সেই পেটেন্ট হাসিটি দেখা গেল—হঠাৎ দেখলে যেটাকে চাপা ঠাট্টা বলে মনে হয়। বললে, তাই বলুন, শুধু সন্দেহ—শুধু ধোঁয়া!
নীলাদ্রির কটা রঙের চোখের ওপর চোখ রেখে হীরা সিং বললে, সন্দেহটা ধোঁয়া নয় গুপ্তসাহেব। অপরাধের অন্ধকারে সন্দেহ হচ্ছে প্রথম দেশলাই—কাঠি। সন্দেহ ছাড়া তদন্ত হয় না।
স্বভাব—নীরস গলায় ধীরাজ ডাক্তার রসিকতা করলেন, ভাল, ভাল! কিন্তু ডাক্তারি শাস্ত্রে বলে, সন্দেহ একটা বদ ব্যায়রাম। আর, নতুন পুলিশ ইন্সপেক্টরদের মধ্যেই এ ব্যায়রামটা উৎকটভাবে দেখা দেয়।
বয়সে নবীন হলেও হীরা সিং ধীরস্থির প্রকৃতির। ধীরাজ ডাক্তারের কথার কোনো জবাব দিলে না। শুধু দাঁড়িয়ে উঠে বললে, আপনাকে আরেকটু কষ্ট দেব গুপ্তসাহেব। মিসেস গুপ্তার ঘরখানা একবার দেখতে চাই।
বেশ, চলুন—হীরা সিংকে সঙ্গে নিয়ে নীলাদ্রি এগোল
লালীর ঘরটা চাবি দেওয়া ছিল। চাবি খুলে দুজনে ঢুকল। হীরা সিং ঘরের এধার থেকে ওধার অবধি চোখ বুলিয়ে নিলে। বোঝা গেল, লালী গুপ্তা মারা যাবার সময় যা ছিল, ঘরখানা তেমনি অবস্থায় রয়েছে। বিছানায় কিছু শুকনো ফুল—পাতা, আলমারির একটা পাল্লা খোলা, দোলা—চেয়ারের ওপর খানকয়েক দামি শাড়ি—ব্লাউজ তখনো ডাঁই করা।
এটা ওটা দেখতে দেখতে ড্রেসিং টেবিলের ওপর হীরা সিংহের নজর পড়ল। অনেক দামের আরশিখানা আড়াআড়ি ভাবে ফাটা। পাউডার কেসটা খোলা, টেবিলের পায়ের কাছে জার্মান সিলভারের একটা হেয়ার—ব্রাশ পড়ে। হেঁট হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিতে গিয়ে, হীরা সিং আরেকটা কি যেন জিনিস মুঠোর মধ্যে লুকিয়ে ফেললে। তারপর প্রশ্ন করলে, আচ্ছা, আপনাদের পার্টি কখন শুরু হয়েছিল?
নীলাদ্রি বলল, সন্ধে সাতটায়।
মিসেস গুপ্তা শুরু থেকেই পার্টিতে হাজির ছিলেন?
না, আমরা সবাই ওর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
উনি কখন এসেছিলেন?
পৌনে আটটা নাগাদ।
এই সময়টা উনি কোথায় ছিলেন?
ওর ঘরে—মানে এই ঘরে।
একা?
হ্যাঁ।...ও, না, না, সাড়ে সাতটার সময় আমি অয়নকে বলি লালীকে ডেকে আনতে।
হীরা সিংয়ের চোখের দৃষ্টি ছোট হয়ে এল। প্রশ্ন করলে, তিনি কে?
নীলাদ্রি বললে, অয়ন বোস—আমার পি—এ।
তিনি তো আপনার কর্মচারী। ঘরের বয়—বেয়ারা থাকতে তাঁকে পাঠালেন কেন মিস্টার গুপ্ত?
কর্মচারী হলেও অয়ন আমার ঘরের লোক হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় সে লালীর খেলার সাথী ছিল। তাছাড়া—
নীলাদ্রি থেমে গেল হঠাৎ।
তাছাড়া? প্রশ্ন করলে হীরা সিং।
নীলাদ্রি বললে, শুনেছি, এক সময় লালীর প্রতি অয়নের দুর্বলতা ছিল। অবশ্য এখানে যতদিন আছে, তার কোনো প্রকাশ দেখিনি। খুবই ভদ্র, সংযত ছেলে, বন্ধুর মতোই ব্যবহার।
টুপিটা মাথায় দিয়ে হীরা সিং বললে, ধন্যবাদ মিস্টার গুপ্ত। আমি এবার চলি।
বারান্দা দিয়ে চলতে চলতে নীলাদ্রি বিষণ্ণ গলায় বললে, একটা প্রশ্ন ইন্সপেক্টর। আমার যা ক্ষতি হবার সে তো হয়ে গেল, এই ব্যাপার নিয়ে আর এগোনো কি দরকার মনে করেন?
হীরা সিং থেমে গিয়ে বললে, আপনি কি চান না, আপনার স্ত্রীর মৃত্যু সম্পর্কে যদি কোনো অস্পষ্টতা থাকে, সেটা পরিষ্কার হয়ে যাক?
চাই।—নীলাদ্রি বললে, কিন্তু অনর্থক এই পরিবারের সম্মানে কাদার ছিটে লাগবে—সেটা চাই না।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন গুপ্তসাহেব, কাদা না থাকলে ছিটে লাগবে না।
হীর সিং চলে গেল।
আইভি লজ থেকে চলুন এবার কপার টাউনের অফিসারদের কোয়ার্টার্সে।
সন্ধ্যার পর অফিস থেকে অয়ন বিছানায় চিৎপাত হয়ে ভাবছে। ভাবছে, এবার চাকরি ছেড়ে চলে গেলেই তো হয়। ঝাউবনীর ওপর আর কিসের মোহ? কী আকর্ষণ আছে এই তামা—নগরীর? না, কিছু নেই। তবু আরও কিছুদিন তাকে থাকতে হবে এখানে।
আশ্চর্য, লালী আগেই টের পেয়েছিল তার শেষ ঘনিয়ে আসছে। তার পরম সুখের চরম শেষ! সত্যিই হয়তো টের পেয়েছিল। তা নইলে সে ভয় পাবে কেন? কেন ভেঙে ফেলল আরশি, কেন পায়ে লাগল হোঁচট, কেনই বা টকটকে লাল রুবির লকেটটাকে মনে হল বিপদের সঙ্কেত?
বোকা মেয়ে! বিপদের গন্ধ পেলেও বন্ধুর পোশাক পরা শত্রুকে সে চিনতে পারেনি। বুঝতেই পারেনি সে সংসার—অরণ্যের ঝোপে—ঝাড়ে লোভ, ঈর্ষা, কপটতা সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে! সভ্যতার সোনার খাঁচা ভেঙে মানুষের ভেতরকার আদিম জন্তুটা মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে। এই তো স্বাভাবিক। মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ কি? অয়ন তো বলেইছিল, বড় বেশি সুখ ভাল নয়, তবু কেন হুঁসিয়ার হয়নি লালী? অয়ন কী করতে পারে?
কিন্তু কিছুই কি করবার নেই—এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া? না, কপার টাউন ছেড়ে তার যাওয়া চলবে না। আরও কিছুদিন—
ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল টকটক আওয়াজে। ভেজানো ছিল দরজা। অয়ন শুয়ে শুয়েই বললে, কে? ভেতরে আসা হোক—
দরজা ঠেলে সাধারণ সুটপরা যে লোকটি ঘরে ঢুকল, তাকে দেখে ধড়মড় করে দু' সেকেন্ডে বিছানায় উঠে বসল অয়ন। অপলকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল, হীরা সিং না?
মৃদু হেসে হীরা সিং শুধু ঘাড় নাড়লে।
খুশিতে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল অয়ন, আরে বোস, বোস; ওঃ, কতকাল বাদে দেখা! আমরা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ ছেড়েছি প্রায় দশ বছর হল—তাই না?
হীরা সিং আবার ঘাড় নাড়লে।
একসঙ্গে তিনটে প্রশ্ন ছুড়ে দিলে অয়ন, এখানে কবে এসেছিস?
কোথায় এসেছিল? কেন এসেছিস?
এক কথায় জবাব দিলে হীরা সিং, ঝাউবনী থানার ইন্সপেক্টর হয়ে এসেছি।
তাই নাকি! আমার পাত্তা পেলি কি করে?
ধীরে ধীরে হীরা সিং বললে, মিসেস লালী গুপ্তার মৃত্যুর খেই ধরে তোমার কাছে পৌঁছলাম অয়ন।
অয়নের কথা হারিয়ে গেল। পুরোনো কলেজ—বন্ধুকে দেখে যে খুশির উচ্ছ্বাস জেগেছিল, পলকে তা নিভে গেল। একটু চুপ থেকে বললে, অরেকটু পরিষ্কার করে বলো হীরা সিং।
মিসেস গুপ্তার মৃত্যু সম্পর্কে তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে এসেছি।
ও! কিন্তু তার মৃত্যুতে হঠাৎ পুলিশের টনক নড়ল কেন হীরা সিং?
পুলিশের সন্দেহ যে মিসেস গুপ্তাকে বিষ দিয়ে খুন করা হয়েছে।
অয়ন বললে, আশ্চর্য! লালী মারা যাবার পর পুলিশ আসেনি, পোস্টমর্টেম হয়নি—হবার উপায়ও নেই; কেননা, তার মরা দেহ বানের জলে ভেসে ভেসে এতক্ষণ সমুদ্রে পৌঁছে গেছে! তবু পুলিশের সন্দেহ হল কেমন করে?
হীরা সিং বললে, গুপ্ত—পরিবারেরই ঘনিষ্ঠ একজন রিপোর্ট করেছে।
তার নাম বলতে আপত্তি আছে?
তার নাম জাফর আলি।
খানসামা জাফর আলি! (হীরা সিং সায় দিলে) তাহলে তাকেই প্রশ্ন করো, আমাকে কেন?
হীরা সিং বললে, প্রথম কারণ, জাফর আলিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ঘটনার আগে একমাত্র তুমিই লালী গুপ্তার সঙ্গে কিছুক্ষণ ছিলে। ঠিক কিনা?
ঠিক।
আশা করি, এবার আমার প্রশ্নের জবাবে সত্যি কথাই বলবে।
বলব। কিন্তু,—অয়নের মুখে একটু তেতো হাসি দেখা দিল : অবিশ্বাস হচ্ছে পুলিশের ধর্ম। ইন্সপেক্টর হীরা সিং আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?
মৃদু হাসলে হীরা সিং। বললে, আজকের পুলিশ ইন্সপেক্টর এক সময় অয়ন বোসের দোস্ত ছিল, আর সেদিন দোস্ত দোস্তকে বিশ্বাস করত। আজ যদি অয়ন বোস পাল্টে গিয়ে না থাকে, তবে হীরা সিংও পাল্টায়নি জেনো।
অয়ন বললে, বেশ, তাহলে প্রশ্ন করো।
পকেট থেকে ছোট্ট একটা কাগজের মোড়ক বার করলে হীরা সিং। বললে, লালী গুপ্তার ঘর থেকে এই পুরিয়ার কাগজটা পাওয়া গেছে। বোঝা যাচ্ছে, পার্টিতে যাবার আগে এই পুরিয়ার জিনিস তিনি খেয়েছিলেন। আচ্ছা, বলতে পারো এটা তিনি পেলেন কোথা থেকে? কে দিয়েছিল?
মেঝের দিকে চেয়ে অয়ন চুপ করে রইল একটুক্ষণ। তারপর মুখ তুলে স্পষ্ট গলায় বললে, আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর মধ্যে বিষ ছিল না, ছিল মাথা ধরার ওষুধ।
মাথার বালিশের তলা থেকে গোটা কতক একই ধরনের পুরিয়া বার করলে অয়ন। বললে, মাথা আমার প্রায়ই ধরে বলে এগুলো সঙ্গে রাখি।
হীরা সিং অয়নের মুখ লক্ষ্য করছিল। বললে, তোমার কৈফিয়ত দোস্ত বিশ্বাস করবে, কিন্তু পুলিশ যদি বিশ্বাস না করে?
শুকনো মুখে অয়ন বললে, তাহলে আর কী করতে পারি। কিন্তু লালীকে আমি খুন করতে যাব কেন?
হীরা সিং বললে, তুমি লালী গুপ্তার ব্যর্থ প্রেমিক, তাই। তাঁকে তুমি ভালোবাসতে, অথচ জীবনে পাওনি।
কথাটা সত্যি।—অয়ন বলতে লাগল, কিন্তু তাকে আমি চাইনি কোনোদিন। গরিব—ঘরের ছেলে আমি, বড়লোকের মেয়েকে সুখে রাখতে পারব না জানতাম। তাছাড়া লালীও আমার ভালোবাসেনি কখনো। হীরা সিং, আমি পুলিশও নই, ক্রিমিনোলজিস্টও নই, তবু প্রত্যেক খুনের একটা না একটা মোটিভ থাকে, এটা জানি। বলতো পারো, এ ক্ষেত্রে আমার মোটিভ কী হতে পারে? কী লাভ আমার তাকে মেরে? আমি তো তার ঐশ্বর্যের কানাকড়িও পাব না! আর, ব্যর্থ প্রেমের জ্বালা যদি বলো, তবে লালীর বদলে নীলাদ্রি গুপ্তকেই আমি খুন করতে পারতাম।
চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল হীরা সিং।
অয়ন আবার বললে, একটা কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, পার্টিতে যাবার আগে লালী বিষ খায়নি।
হীরা সিং প্রশ্ন করলে, তাহলে তুমি বলছ, হঠাৎ হার্টফেল করেই মিসেস গুপ্তা মারা গেছেন?
না। জাফরের সঙ্গে আমি একমত। লালীকে বিষ দিয়েই খুন করা হয়েছে, আর সেটা পার্টিতে যাবার পরে।
তোমার এ ধারণা হল কেন?
প্রমাণ পেয়েছি বলে।
সোজা হয়ে বসল হীরা সিং। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে বললে, প্রমাণ! কি প্রমাণ?
বিছানা থেকে উঠে গিয়ে অয়ন তার কাবার্ড খুললে। সাবধানে বার করে আনল সরু ডাঁটিওয়ালা কাচের একটা পানপাত্র। তার মধ্যে এখনো টলটল করছে সামান্য একটু সাদা পানীয়। সেটা ইন্সপেক্টরের সামনে রেখে বললে, এই প্রমাণ।
এ তুমি কোথায় পেলে অয়ন?
পার্টিতে লালীর টেবিল থেকে। নীলাদ্রি আর লালী গুপ্তাকে শুভেচ্ছা জানাবার সময় সবাইকে শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হয়েছিল। এই কাপে প্রথম চুমুক দেবার পরেই লালী মুখ গুঁজে পড়ে যায়।
পানপাত্রটা লক্ষ করে হীরা সিং বললে, হুঁ। মিসেস গুপ্তার ড্রেসিং টেবিলে যে বিশেষ রঙের লিপস্টিক দেখেছি, এই কাপের কিনারে সেই রঙেরই ছোপ লেগে আছে দেখছি। কিন্তু এটা তোমার ঘরে এল কেমন করে?
তাও বলছি। অসুস্থ লালী টেবিলের মুখ গুঁজে পড়েছিল, তার মুখ দেখতে পাইনি। তাকে ঘরে নিয়ে যাবার জন্যে নীলাদ্রি গুপ্ত যেই তাকে বুকের কাছে তুলে নিল, এক পলকের জন্যে দেখতে পেলাম তার মুখ। সে—মুখ নীলচে, দুই কসে অল্প অল্প ফেনা! একটা ভয়ানক সন্দেহে আমার মনটা কেমন করে উঠল—সবার চোখ এড়িয়ে লালীর কাপটা আমি সরিয়ে ফেললাম।
এই শ্যাম্পেনে বিষ মেশানো কি করে বুঝলে?—হীরা সিং জিজ্ঞেস করলে।
অয়ন বললে, একটা বেড়ালকে কয়েক ফোঁটা খাইয়েছিলাম, পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেটা মরে গেল। কাপে যেটুকু তলানি রয়েছে, তুমি ফরেনসিক ল্যাবরেটারিতে পরীক্ষা করাতে পারো।
কোনো কথা না বলে হীরা সিং মিনিট দুই পায়চারি করলে ঘরে। তারপর থেমে বললে, তোমার যদি সন্দেহ হয়ে থাকে, তবে এই কাপটা নিয়ে সোজা পুলিশ—স্টেশনে যাওনি কেন? তোমার তো তাই করা উচিত ছিল।
মানছি উচিত ছিল।—অয়ন বললে, কিন্তু পুলিশ মানেই লাখো। ঝামেলা! তাই ভেবেছিলাম, নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে অন্ধকারে যদি আলো দেখতে পাই, তখন পুলিশকে জানাব। কিন্তু ঝাউবনীতে তুমি যখন এসেছ, তখন তদন্তের ভার তোমার হাতে দিয়ে আমি সরে যেতে চাই।
না।—অয়নের একখানা হাত ধরে হীরা সিং বললে, এ কেসটায় তোমার সাহায্য আমার বিশেষ দরকার অয়ন। আমি এখানে একেবারে নতুন, আর তোমার মেলামেশা সকলের সঙ্গে। সুতরাং তোমার পক্ষে যা সহজ, আমার পক্ষে তা নয়। তদন্তের ভার আমাদের দুজনকেই নিতে হবে—আমি বাইরে, তুমি ঘরে। রাজি?
বেশ, আমি রাজি।—অয়ন বললে।
দরজার দিকে এগোতে এগোতে আবার বললে, পারতপক্ষে তুমি কখনো থানার দিকে যেও না, লোকের নজর পড়তে পারে। আমিই আসব তোমার এখানে—একটু বেশি রাতে। কপার টাউনকে আমি জানিয়ে দিতে চাই যে, লালী গুপ্তার মৃত্যু নিয়ে পুলিশ আর মাথা ঘামাচ্ছে না।
দিন চারেক বাদে হীরা সিং আবার এল। বললে, ফরেনসিক থেকে রিপোর্ট এসেছে।
উৎসুক হয়ে উঠল অয়ন।
রিপোর্টটা পড়ে শোনাল ইন্সপেক্টর। শ্যাম্পেনের মধ্যে তীব্র বিষ পাওয়া গেছে। এ জিনিস ভাইপার সাপে বিষ থেকে তৈরি। উৎকট যন্ত্রণাদায়ক রোগে যন্ত্রণা উপশমের জন্য এই বিষ থেকে ইঞ্জেকশন তৈরি হয়। দেখতে সাদা পাউডারের মতো। তবে এদেশে মেলে না, পাওয়া যায় ইউরোপের কোনো কোনো দেশে। এ বিষের কাজ হচ্ছে অতি দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে দেয়া, কিন্তু ডোজ সামান্য একটু বেশি হয়ে গেলে মুখ দিয়ে ফেনা ওঠে, হাত—পায়ের আঙুলের ডগা, ঠোঁট নীলচে হয়, তারপর ধীরে—অতি ধীরে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া থেমে আসতে থাকে।
রিপোর্ট পড়া শেষ করে হীরা সিং বললে, যাক, একটা বিষয় নিঃসন্দেহ হওয়া গেল যে, বিষ খাইয়েই লালী গুপ্তাকে খুন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ বিষ এল কোথা থেকে? এই জিনিসের ইমপোর্ট লাইসেন্স ভারতবর্ষের কোনো ফার্মাকোলজিস্টকে দেওয়া হয়নি, সে খবরও আমি নিয়েছি। তাহলে এই বিদেশি বিষ জোগাড় করল কে?
অয়ন বললে, যা সোজা পথে আসতে পারে না, তা চোরা—পথে আসে।
পুলিশের তা অজানা নয়। কিন্তু কার চোরা—হাতে আমদানি হয়েছে, সেটা জানতে পারলেই শ্যাম্পেন বিষ কে মিশিয়েছিল জানা সহজ হবে।
সমস্ত ব্যাপারটাই কিন্তু রীতিমতো মাথা খাটিয়ে প্ল্যান করা।
অর্থাৎ?
অর্থাৎ লোকের চোখে ধুলো দেওয়ার আশ্চর্য ফন্দি। নীলাদ্রি গুপ্ত নিজের হাতে শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে লালীর কাপে ঢেলে দিয়েছিলেন। সেই একই বোতলের শ্যাম্পেন খেয়ে পার্টির কারো কিছু হল না, মরল কেবল লালী। ব্যাপারটা ম্যাজিক মনে হয় না?
হীরা সিংয়ের কপালে কে যেন লাঙল চালিয়ে দিল। বললে, তুমি বলতে চাও বোতলের শ্যাম্পেনে বিষ মেশানো ছিল না—কেবলে, মিসেস গুপ্তার কাপে শ্যাম্পেন ঢালার পর তাইতে বিষ মেশানে হয়। কিন্তু পার্টির সকলের চোখের সামনেই শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হয়েছিল এবং তারপরেই লালী গুপ্তা চুমুক দিয়েছিলেন। তাহলে বিষ মেশানো হল কখন?
অয়ন বললে, কাল রাতে ভেবে ভেবে আমি এর একটা উত্তর খুঁজে পেয়েছি।
কি রকম? হীরা সিং জিজ্ঞেস করলে।
অয়ন বললে, এমনও হতে পারে যে, শ্যাম্পেন ঢালার আগেই লালীর কাপে বিষ ছিল। সাদা কাচের পাত্রের গায়ে যদি অল্প সাদা গুঁড়ো লাগানো থাকে, হাজার চোখের সামনেও সেটা ধরা পড়তে পারে কি?
হীরা সিং প্রায় লাফিয়ে উঠে অয়নের হাত ধরে ঝাঁকানি দিল : শাবাশ। রহস্যের পয়লা দরোয়াজা খুলে গেছে অয়ন। আচ্ছা বলো তো, শ্যাম্পেনের কাপগুলো টেবিলে টেবিলে কে রেখেছিল?
জাফর আলি। শুধু নীলাদ্রি গুপ্ত আর লালীর জন্যে দুটো কাপ এনে দিয়েছিল ডন রিভাস।
কে সে?
কপার টাউনের ফ্যাক্টরি—ম্যানেজার। পার্টিতে সে—ই ছিল বারম্যান।
কোন দেশের লোক?
শুনেছি ওয়েস্ট জার্মানি।
কেমন টাইপের মানুষ?
ফ্যাক্টরি ম্যানেজারেরা সাধারণত যেমন টাইপের হয়। সারাদিন ফ্যাক্টরিতে খাটে, আর সন্ধের পর ক্লাবে গিয়ে মদ আর তাসের জুয়ায় মেতে থাকে অনেক রাত অবধি। বিশেষত্বের মধ্যে খুব আমুদে স্বভাব।
লোকটার আগের জীবন সম্বন্ধে কিছু জানো?
না। কিন্তু ডনকে সন্দেহ করার কোন কিছু যুক্তি আছে কি? ও কপার টাউনের নেহাতই একজন ওয়ার্কার, বস—এর বউকে খুন করার পেছনে কী স্বার্থ?
কোথায় কার স্বার্থ কে জানে। এ ধরনের খুনের প্ল্যানিং একজনে হয় না অয়ন—একাধিক লোকের সাহায্য দরকার। সুতরাং অপরাধের যে নেটওয়ার্ক—যে জাল বিছানো হয়, তার একগাছা সুতো ধরে টান দিলে বাকি সুতোগুলোতেও টান পড়ে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ পায়চারি করে হীরা সিং আবার বললে, আচ্ছা, গুপ্ত ফ্যামিলির সঙ্গে যারা খুব ঘনিষ্ঠ, তাদের মধ্যে কার ওপর তোমার সন্দেহ হয়?
অয়ন বললে, এক, ডাক্তার ধীরাজ দাস। আইভি লজে প্রায়ই আসা যাওয়া। গুপ্ত পরিবারের বন্ধু ও ডাক্তার। ডন রিভাসকে এক নম্বর যদি বলো, ধীরাজ ডাক্তার হল দু—নম্বর সন্দেহভাজন ব্যক্তি। কেননা, লালীর মৃত্যুর কারণটাকে তিনি হার্টফেলিওর বলে উড়িয়ে দিতে চাইছেন। বিনা স্বার্থে এত বড় অন্যায় কেউ করে না।
আচ্ছা, আর কে?
কান্তা কালেলকর। নীলাদ্রি গুপ্তর রূপবতী স্টেনো। ভয়ানক দেমাকী আর চালিয়াত মেয়ে।
মিসেস গুপ্তার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল তার?
সখীর মতো। কিন্তু আমার মনে হয় লালীকে সে হিংসে করত।
কিসের জন্য? বেশি রূপসী বলে, না মনিবানী বলে?
নীলাদ্রির মতো পুরুষকে লালী স্বামী হিসেবে পেয়েছে বলে। ওর হাবভাবে আমি বুঝতে পারি যে নীলাদ্রির ওপর ওর লোভ আছে—যদিও মনিবের কাছে ওকে বিশেষ প্রশ্রয় পেতে দেখিনি।
তাহলে কান্তা কালেলকরকে তিন নম্বর সন্দেহভাজন বলা যেতে পারে। আর কে?
অয়ন বললে, চার নম্বর জাফর আলি। লালী মারা যাবার পরে তার ডুব মারাটাই সন্দেহজনক। জাফর যখন খবর দিতে গিয়েছিল, তুমি কেন তাকে থানায় আটকে রাখোনি হীরা?
হীরা সিং বললে, আটকাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু জাফর আলি বললে, 'হুজুর, আমি মুসলমান, আমি কোরান ছুঁয়ে বলতে পারি দিদিকে বিষ দেওয়া হয়েছে। এইটুকুই কেবল জানি—আর কিছুই জানি নে! আমায় কেটে ফেললেও গলা দিয়ে খুন ছাড়া আর কোনো কথা বেরোবে না।' এরপর তাকে আটকে রেখে কি হবে?
একটু স্তব্ধ হয়ে থেকে অয়ন বললে, এই ক'জনকে বাদ দিলে থাকে শুধু নীলাদ্রি গুপ্ত। কিন্তু তার সম্পর্কে সন্দেহের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। নীলাদ্রি লালীকে অত্যন্ত ভালোবাসত—একথা লালী নিজেই আমাকে বহুবার বলেছে।
হীরা সিং বললে, তাহলে কি দাঁড়াল?
চিন্তিত মুখে অয়ন বললে, আমরা যে তিমিরে, সেই তিমিরে।
অয়নের কাঁধ চাপড়ে হীরা সিং বললে, তবু সহজে হাল ছাড়লে চলবে না। চোখ—কান সজাগ করে রাখো অয়ন, আজ যা দেখা যাচ্ছে না, কাল তা দেখা যেতে পারে। আচ্ছা, আজ এই পর্যন্ত।
কপার টাউনের ক্লাক হাউস এখনও দেখা হয়নি আপনার। চলুন, আজ সন্ধ্যাবেলা যাই।
ধলাই পাহাড়ের কোলে ঘেঁষে অনেকখানি জমির ওপর এই ক্লাব হাউস। চারপাশে বাগান, টেনিস কোর্ট, সাঁতারের বাঁধানো চৌবাচ্চচা। ভেতরে বিলিয়ার্ড রুম আছে—আছে বার, ডান্স—ফ্লোর। কপার টাউনের মানুষগুলো দেশি, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা বিদেশি। দিনে তারা এই যন্ত্র—নগরীর যন্ত্র, আর রাতে রক্তমাংসের মানুষ। সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে এ জায়গাটা ক্রমশ সরগরম হয়ে ওঠে। রাত বারাটো—একটা অবধি।
কপার টাউনের ক্লাব হাউস কিন্তু সবার জন্যে নয়। মোটা মাইনের কৌলীন্য যাদের আছে, শুধু তাদেরই জন্য—তারাই মেম্বার হতে পারে। নিচু মহলের লোক যারা—অর্থাৎ মজদুর, তাদের জন্যও আমাদের ব্যবস্থা আছে। লেবার—ব্যারাকের কাছাকাছি একটা মহুয়ার দোকানে তারা রোজ ছুটির পর আমোদ কিনতে যায়। আসলে কিন্তু ক্লাব আর মহুয়ার দোকানে কোনো তফাত নেই—তফাত কেবল পোশাকের, ভাষার আর বোতলের লেবেলের।
আজকের রাতটা বেশ ঝরঝরে। আকাশও পরিষ্কার। অয়ন বোসকে ক্লাবের ফটকে দেখা গেল। মেম্বারশিপের চাঁদা নিয়মিত দেওয়া সত্ত্বেও অয়ন নিয়মিত ক্লাবে আসত না। আসত মাঝে মাঝে খেয়াল হলে। তার মদ্যপানের শখ আছে—অভ্যাস নেই, তাই নিয়মিত আসার দরকারও হত না। ইদানীং নিত্য আসে। আসার একটা গোপন উদ্দেশ্যও আছে। এই ক্লাবের মধ্যে কপার টাউনের উঁচু মহলকে একসঙ্গে পাওয়া যায়, নেশার ঝোঁকে মনের কথার লেনদেন হয়, নকল সভ্যতার মুখোশগুলো মুখ থেকে মাঝে মাঝে খসে পড়ে। অন্যের অসতর্ক মুহূর্তের অপেক্ষায় অয়ন সতর্ক হয়ে থাকে।
অয়নের সঙ্গে আপনিও ভেতরে চলে যান।
ডান্স হল থেকে মিউজিকের আওয়াজ আসছে। বার থেকে উচ্চচকণ্ঠের হাসি—কলরব, বিলিয়ার্ড রুম থেকে টুকরো টুকরো কথাবার্তা। কোন ঘরে যাবেন আপনি? অয়নের সঙ্গে যখন এসেছেন তখন তার পিছু পিছু 'বারে'ই ঢুকে পড়ুন।
আজকের আসর জমজমাট। কোণের একটা টেবিলে তাসের জুয়া চলছে—ডন রিভাস সঙ্গীদের সঙ্গে 'পোকার' খেলছে। এক পেগ জিন ফরমাস করে অয়ন এসে জুটল সেই টেবিলে।
হ্যালো ডন।
হ্যালো বোস!
আজ তোমার 'লাক' কেমন?
ডন মুখ বিকৃত করে বললে, বুড়ি স্ত্রীর মতো—একদম ঠান্ডা।
ডনের রসিকতাগুলো প্রায়ই আদি রসাত্মক। হাত পেতে সে আবার বললে, কিছু ক্যাশ ধার দাও না। দেখি, তোমার মতো নওজোয়ানের পয়ে আমার বুড়ি স্ত্রী গরম হয় কিনা।
হল ফাটিয়ে হেসে উঠল ডন। পকেট থেকে দশ টাকার একখানা নোট বের করে অয়ন বললে, সবে মাসের চোদ্দ তারিখ, মাইনেটা এরই মধ্যে ফুঁকে দিলে?
ডন তাস খেলতে খেলতে বললে, কি করি বলো? আমার হাতে এলেই টাকাগুলোর পাখা গজায়।
বয় জিন দিয়ে গেল। ডন বললে, আওর এক পেগ—বোস সাবকা অর্ডার।
গ্লাসটা ডনের দিকে এগিয়ে দিয়ে অয়ন বললে, ক্লাবের চাঁদা তোমার ছ' মাস বাকি, 'বারে'র বিল একগাদা পড়ে আছে, তোমার দর্জি তাগাদ করে করে হায়রান! তোমার মত এমন বেহিসেবী মানুষ আর দেখি না।
এক চুমুকে গ্লাস খালি করে ডন বললে, দুনিয়ায় বোকারাই হিসেব করে। আরে, জীবনটা এক পেগ জিনের মতো। ডেসটিনি—নিয়তি কখন এক চুমুকে সাবাড় করে দেবে কে জানে। দেখলে তো, মিসেস গুপ্তার কী হল। বিয়ের রাতেই খতম। হিসেব মিলল কি?
অয়ন ডনের মুখের পানে লক্ষ করলে। কিন্তু লক্ষ করার মতো কোনো চিহ্ন নেই। অয়ন বললে, জীবন সম্পর্কে তোমার ফিলজফি শুনতে ভালো, কিন্তু এতে বদনাম হয় যে! তুমি একটা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার, অথচ চারদিকে তোমার দেনা! লোকে বলবে কি বলো তো?
ডন বললে, নেভার মাইন্ড বোস। দু—চার দিনের মধ্যেই একটা ফালতু মোটা টাকা পেয়ে যাচ্ছি, সব দেনা এবার মিটিয়ে দেব—পাই টু পাই।
বাই জোভ। মোটা টাকা ফালতু পেয়ে যাচ্ছ। কোত্থেকে? উৎসুক গলায় অয়ন বললে।
ডন গম্ভীর হয়ে বললে, টাকা দুনিয়ায় ছড়ানো রয়েছে, কুড়িয়ে নিতে পারলেই হল। আমি যখন হংকং—এ ছিলাম, চার হাতে টাকা কামিয়েছি, বুঝলে বোস?
তাই নাকি! হংকং—এ ছিলে তুমি। কি কাজ করতে?
মুচকে হেসে ডন জবাব দিলে, ধর্মযাজকের কাজ!—হ্যালো কান্তা!
দেখা গেল, বারে কান্তা এসেছে। টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলে, ডক্টর দাসকে দেখেছ?
বিলিয়ার্ড রুমে।
কান্তা আর দাঁড়াল না। ব্যস্তভাবেই চলে গেল।
অয়ন বললে, এক হাত টেবল—টেনিস খেলে আসি।
কিন্তু টেবল—টেনিসের ঘরের পথ মাড়াল না অয়ন। কান্তার পিছু পিছু গিয়ে ঢুকল বিলিয়ার্ড—ঘরে।
ধীরাজ দাস আর সাহানী 'স্কিটল' খেলছে। কান্তাকে দেখে ডাক্তার বললে, এক্সকিউজ মি মিস্টার সাহানী, কান্তার সঙ্গে একটা জরুরি কথা সেরেই আসছি। এই যে অয়ন, মিস্টার সাহানীর সঙ্গে আমার হয়ে খেলো তো।
বেরিয়ে গেল কান্তার সঙ্গে ধীরাজ ডাক্তার। কিন্তু কী কথা থাকতে পারে কান্তার সঙ্গে ডাক্তারের, যা প্রকাশ্যে বলা যায় না?
একবার 'কিউ' চালিয়েই অয়ন 'উঃ' বলে উঠল।
কি হল? সাহানী প্রশ্ন করলেন।
ডান হাতের কব্জিটা মচকে গেছে কিনা—
বটে। তবে থাক।
ধন্যবাদ দিয়ে অয়ন পায়ে পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল। কোথায় গেল ওরা? এদিক—ওদিক তাকাল সে। বাগানে গেছে নাকি?
বারান্দা থেকে নেমে এক—পা এক—পা করে এগোতে লাগল অয়ন। ঝিলমিল রাত, শুক্লপক্ষ শুরু হয়েছে। ঘাস—জমির ওপর হাঁটতে হাঁটতে বাগানের এধার—ওধার লক্ষ করলে সে। মরশুমী ফুলের বেডে পাশে, মার্বেল মূর্তির ধারে, লতাকুঞ্জের তলায়। কোথাও নেই।
হাঁটতে হাঁটতে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এল অয়ন। এদিকে শুধু ধলাই পাহাড়। ফেরা যাক তাহলে।
কিন্তু ফিরে আসতে আসতে একটা জায়গায় অয়নের পা আটকে গেল। কান সজাগ করে শুনতে লাগল সে। আওয়াজ আসছে একটা প্রকাণ্ড ঝাউয়ের আড়াল থেকে।
আজকাল আমার কোয়ার্টারে আর যাও না কেন?
ধীরাজ ডাক্তারের স্বভাব—নীরস গলা।
সময় পাই না।
কান্তার গলা চিনতে অয়নের ভুল হল না।
বাজে কথা রাখো। সময় পাও না, না আমাকে এড়িয়ে যেতে চাও?
কান্তার গলার স্বর একটু তীব্র হল : যদি তাই চাই, দোষ কি? ভুলে যাচ্ছ কেন তুমি পঞ্চাশের কাছে, আর আমি এখনও তিরিশ পার হইনি। তুমি কি আশা করো জীবনভর আমি তোমায় নিয়ে থাকব?
হ্যাঁ, তাই থাকবে। তোমায়—আমায় এই শর্তই ছিল।—ধীরাজ ডাক্তারের নীরস গলা আরও বিশ্রী শোনাল। বলতে লাগল, সাত বছর আগে বম্বে শহরে কলবা দেবীর এক বস্তিতে তুমি পচে মরছিলে। লেখাপড়া কিছু শিখেছিলে, কিন্তু কাজ ছিল না। দু'—বেলা পেট ভরে খাওয়া জুটত না। সেই নর্দমা থেকে তুলে এনে তোমাকে আমি খাইয়ে পরিয়ে নতুন করে গড়লাম, সমাজের উঁচু তলায় ঠাঁই দিলাম। আর, তুমি এমনি বেইমান যে আজ আমাকেই পুরোনো জুতোর মত ছুড়ে ফেলে দিতে চাও।
কে বললে এসব কথা?
তুমি কি মনে করো কান্তা, আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? লুকিয়ে লুকিয়ে তুমি কার সঙ্গে ভিড়েছ আমি জানি না ভেবেছ?
তোমাদের লুকোচুরি খেলা আমি সব জানি।
কি জানো তুমি?
তোমার ভালবাসার নতুন খদ্দের জুটেছে—চড়া দাম হেঁকেছে সে। তাই যৌবনের দেমাকে তুমি আমাকে আর পাত্তা দিচ্ছ না।
ধীরাজ ডাক্তারের গলায় যেন করাতের ধার।
তার সঙ্গে তুমিই তো মিশতে বলেছিলে। বলোনি?
স্বার্থের জন্য বলেছিলাম, কিন্তু সেই সুযোগ নিয়ে তলে তলে তুমি নিজের আখের গুছিয়ে নেবে, সেটা কি ভেবেছিলাম? আমি জানতে পেরেছি, পাসপোর্টের দরখাস্ত করেছ তোমরা—শিগগিরই তোমরা দুজনে বিদেশে পালাচ্ছ। তোমায় আমি সাবধান করে দিচ্ছি কান্তা, এতটা বাড়াবাড়ি কোরো না! জেনে রাখো, তোমার তাসের ঘর আমি এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে পারি। লালী গুপ্তা বেশি দিন মরেনি, আর ঝাউবনী থানাও বেশি দূরে নয়, তোমার ভালোবাসার লোককে এক মুহূর্তে ফাঁসিয়ে দেব!
কান্তার গলা শোনা গেল না। বেশ কয়েক সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ হেসে বললে, আচ্ছা পাগল তুমি দাস! বাড়াবাড়ি না হয় একটু করেইছি, কিন্তু সে তো তোমার—আমার স্বার্থের জন্যে। সুখে থাকতে হলে টাকার দরকার হয় না? আর, তুমি আমাকে কি না বললে!
অভিমানে কান্তার গলা বুজে এল।
আমাকে ভাঁওতা দেবার চেষ্টা কোরো না কান্তা।
ধীরাজ ডাক্তারের গলা একটু নরম শোনাল।
কান্তার গলা শোনা গেল, তোমাকে আমি ভাঁওতা দেব। একথা তুমি বলতে পারলে। বেশ, কাল থেকে দেখো আমি তার সঙ্গে মেলামেশাই ছেড়ে দেব।
ঠিক?
উত্তরে মৃদু একটা চুম্বনের শব্দ শোনা গেল। কান্তা বললে, রাগ পড়েছে তো? চলো ক্লাবে যাই, কেউ হয়তো এসে পড়বে।
ধীরাজ দাস আর কান্তা ঝাউয়ের আড়াল থেকে বেরোতেই, অয়ন চট করে ঝাউয়ের আড়ালে সরে গেল। আকাশ—পাতাল ভাবতে লাগল সে অনেকক্ষণ। এইমাত্র সে যা শুনল, হীরা সিংকে জানানো বিশেষ দরকার। তার ঘরে হীরা সিংয়ের আসার অপেক্ষায় বসে না থেকে থানায় যাওয়াই ভাল।
দ্রুত পায়ে বাগান পার হয়ে অয়ন গেটের দিকে চলল। কিছু দূর থেকেই সে দেখতে পেল, চেনা স্টুডিবেকার গাড়িখানা সাঁ করে গেটের মধ্যে ঢুকল। লালী মারা যাওয়ার পর নীলাদ্রি গুপ্ত এই প্রথম ক্লাবে এল। লালীর শোকটা নীলাদ্রির মনে গভীরভাবে লেগেছিল নিশ্চয়, লোকজন বন্ধু—বান্ধবের সঙ্গ তাই এড়িয়ে চলত। কিন্তু শিলাই নদীর বন্যাবেগ যেমন আস্তে আস্তে থিতিয়ে আসে, মানুষের শোকের বেগও তাই।
নিজের ছোট্ট মরিসখানাতে উঠে বসে স্টার্ট দিলে অয়ন।
হীরা সিং বললে, রহস্যের অন্ধকারে একটু যেন আলোর ইসারা দেখতে পাচ্ছি অয়ন। তুমি যা বললে, তা থেকে এইটুকু স্পষ্ট হয়েছে যে, মিসেস লালী গুপ্তার খুনির সঙ্গে ধীরাজ ডাক্তার আর কান্তা দুজনেই রীতিমতো জড়িত। আর, এও বোঝা যাচ্ছে যে, কান্তার নতুন প্রণয়ী যে, সেই হচ্ছে খুনি। নইলে ধীরাজ ডাক্তার কান্তাকে ভয় দেখাতো না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কার সঙ্গে কান্তার গোপন প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে? কে সে?
অয়ন বললে, ডন রিভাস হতে পারে। কেননা, সে হচ্ছে আমাদের পয়লা নম্বর সন্দেহভাজন ব্যক্তি। কান্তার মতলব বিদেশে পালাবে প্রেমিকের সঙ্গে—হয়তো ঘর বাঁধবে সেখানে। বিদেশি লোক, জোয়ান বয়স, মোটামুটি সুপুরুষ—ভগবান জানেন, কি করে তার হাতে ফালতু মোটা টাকা আসে—কান্তার মতো নোংরা চরিত্রের মেয়ের কাছে ডন আদর্শ নাগর নয় কি?
কিন্তু তুমি বলেছিলে না, নীলাদ্রি গুপ্তের ওপর কান্তার দুর্বলতা আছে?
সেখানে সুবিধে নেই দেখে কান্তার মত বদলাতে কতক্ষণ? বুড়ো ধীরাজ ডাক্তারের পায়ে জীবন—যৌবন সঁপে দেওয়ার চেয়ে হয়তো ডনকেই সে মন্দের ভালো হিসেবে বেছে নিয়েছে। আচ্ছা, হীরা সিং, ওরা তো পাসপোর্টের চেষ্টা করছে। তুমি পাসপোর্ট অফিস থেকে খবর নিতে পারো না?
হীরা সিং বললে, পারি। কিন্তু যদি নাম ভাঁড়িয়ে থাকে? এই ধরনের লোকেরা তাই করে। একমাত্র ধীরাজ ডাক্তারের কাছ থেকেই খুনির নামটা আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু আদায় করতে হলে ডাক্তারকে অ্যারেস্ট করতে হয়।
অয়ন সাগ্রহে বললে, তাই করো হীরা সিং—দেরি না করে দু'নম্বর সাসপেক্ট ধীরাজ দাসকেই গ্রেফতার করো। কান্তা অত্যন্ত চতুর মেয়ে, বুড়োর চোখে ধুলো দিয়ে, কবে বিদেশে পালিয়ে যাবে কে জানে—খুনিকে ধরার কোনও আশাই আর—
অয়নের কথা চাপা দিয়ে টেলিফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। হীরা সিং রিসিভার তুলে নিলে, ইয়েস, ঝাউবনী পুলিশ—স্টেশন—ইন্সপেক্টর হীরা সিং বলছি—
তারপরেই ইন্সপেক্টরের মুখ মেঘলা থমথমে হয়ে উঠল। রিসিভার নামিয়ে রাখতেই অয়ন বললে, কি হল?
আসামি ফাঁকি দিয়েছে।—হীরা সিং জবাব দিলে।
তার মানে?
ধীরাজ ডাক্তার এইমাত্র মোটর—অ্যাক্সিডেন্টে চোট পেয়েছে।
বাঁচবে কিনা সন্দেহ!
না, ধীরাজ দাস বাঁচল না। পরদিনই মারা গেল।
ভোরের দিকে অল্পক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরে এসেছিল। হীরা সিংহের প্রশ্নের জবাবে ডাক্তার শুধু বললে, গাড়ির টাই—রডটা খোলা ছিল—জানতে পারিনি। রাস্তার বাঁকের মুখে—
আর কিছু বলতে পারেনি সে। এইটুকুই তার শেষ জবাববন্দি।
হীরা সিং অয়নকে বললে, স্টিয়ারিং হুইলের সঙ্গে চাকার সরাসরি যে যোগ থাকে, তা টাই—রডের সাহায্যে। এ—কথা যারা মোটর চালায়, তারা সবাই জানে। টাই—রড খোলা। এর মানে কি বলতে পারো?
অয়ন বললে, চুপিসারে কেউ খুলে রেখেছিল। এছাড়া অন্য মানে হয় না।
রাইট।—ডাক্তার কিছু না জেনে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে চালিয়েছিল। কিন্তু রাস্তায় বাঁকের মুখে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেখে চাকা ঘুরছে না। তখন আর সামলাবার উপায় নেই। ঢালু পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি ডাইনে না বেঁকে সোজা গিয়ে পড়ল পাশের খাদে। সুতরাং, একে অ্যাক্সিডেন্ট বলবে, না খুন বলবে?
অয়ন বললে, কিন্তু আমি ভাবছি, এই খুনের মধ্যেও কী অদ্ভুত বুদ্ধির পরিচয়! ধীরাজ ডাক্তারের মুখে টাই—রডের কথা না শুনলে সকলেই ভাবত এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা—পরিকল্পিত খুন বলে কেউ সন্দেহই করত না। খুনি অসাধারণ বুদ্ধিমান!
হীরা সিং বললে, তা তো বুঝলাম। কিন্তু সেই যে তোমাদের বাংলায় ছড়া আছে—হারাধনের ছেলেদের মধ্যে এখন তাহলে রইল বাকি দুই! ডন রিভাস আর কান্তা। এই দুজনের ওপর এখন আরও সজাগ চোখ রাখতে হবে।
অয়ন বললে, আচ্ছা, কান্তাকে জেরা করলে হয় না?
হীরা সিং মাথা নেড়ে বললে, তাতে ফল কিছু হবে বলে মনে হয় না অয়ন। খুনিই যদি কান্তার নাগর হয়, তবে প্রণয়ীর সঙ্গে বেইমানি সে করবে না। মাঝখান থেকে খুনি হুঁশিয়ার হয়ে যাবে। তার চেয়ে নজর রাখা যাক, সমস্ত এয়ারপোর্টে খবর দিয়ে রাখি, ওরা ভাগবার চেষ্টা করলে একসঙ্গে দুজনকেই ধরা যাবে।
কিন্তু দিন দুই বাদে এমন একটা ব্যাপার ঘটল, যা অয়নের ধারণার বাইরে। শুধু অয়ন নয়, আমার—আপনার—সমস্ত কপার টাউনের ধারণার বাইরে।
খোলা চিঠিখানা হতে নিয়ে নীলাদ্রি গুপ্ত হল—এ পায়চারি করছে, আর দেয়াল—ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। ঠোঁটের কিনারে ওক কাঠের পাইপটা নিভে গেছে অনেকক্ষণ, দাঁতে কামড়াচ্ছে শুধু। বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে ভেতরে অসীম চাঞ্চল্য।
সকালের ডাকে এসেছে চিঠিখানা। কলকাতা থেকে, তারই নামে। প্রথমবার চিঠিখানা পড়ে চমকে উঠেই পাথর হয়ে গিয়েছিল নীলাদ্রি। দ্বিতীয়বার পড়তেই বুকের রক্ত আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। পায়চারি থামিয়ে নীলাদ্রি চিঠিখানা তৃতীয়বার পড়লে:
শ্রীচরণেষু,
আমি মরিনি, মরণের দোরগোড়া থেকে ফিরে
এসেছি। নেহাত পরমায়ু ছিল বলেই বোধ হয়।
আমায় চোখে দেখলেও তুমি প্রথমে বিশ্বাস করতে
পারবে না জানি। বিশ্বাস আমি নিজেই করতে পারিনি
যে, চিতায় শুয়েও বেঁচে উঠব। তবু বলছি, ব্যাপারটা
অলৌকিক নয়। কেমন করে বেঁচে উঠলাম, সে অনেক
কথা। চিঠিতে জানানো সম্ভব নয়, দেখা হলে জানাব।
এখন আমি অনেকটা সুস্থ। কাল সন্ধের ট্রেনে
ঝাউবনী পৌঁছুব। স্টেশনে গাড়িটা পাঠিও। ইতি—
লালী
এও কি সম্ভব? লালী বেঁচে উঠেছে—বেঁচে আছে। এ যদি অলৌকিক ঘটনা না হয় তো অলৌকিক কাকে বলে? কিন্তু এমন ঘটনা জগতে এই প্রথম নয়। ভাওয়ালের রাজকুমার মৃত বলে ঘোষিত হবার পর ঠিক এমনি অলৌকিক ভাবেই বেঁচে উঠেছিলেন। বাঁচিয়েছিল এক সন্ন্যাসী। গল্পকথা নয়, বাস্তব সত্য! কে বাঁচাল মরা লালীকে? জড়বাদীরা বলবে, প্রকৃতির খেয়াল। ধর্মবিশ্বাসীরা বলবে, ঈশ্বরের অনুগ্রহ। আর নীলাদ্রি? সে কি বলবে? সে বলবে নিয়তির খেলা!
কিন্তু এ চিঠি যদি সত্যিই লালীর না হয়? যদি আর কারো লেখা হয়?
নীলাদ্রি আবার তাকাল চিঠিখানার দিকে। দ্রুততর হল পায়চারি। না, এ হাতের লেখা নীলাদ্রির চেনা। হুবহু লালীর লেখা মনে হচ্ছে। এ কি জাল হতে পারে? যদিও বা হয়, নীলাদ্রির চোখের দৃষ্টি আর হাতের স্পর্শ ঠিক চিনে নেবে তার লালীকে।
দেয়াল—ঘড়ির দিকে তাকাল নীলাদ্রি। প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে সে মোটর পাঠিয়েছে স্টেশনে। আর, এই একঘণ্টা ধরে অসহ্য ক্লান্তিকর প্রতীক্ষায় ছটফট করছে নীলাদ্রি। প্রতি মিনিট গুনছে—প্রতি সেকেন্ড গুনছে।
নিচের ড্রাইভে মোটরের আওয়াজ শোনা গেল। থামল পোর্টিকোতে এসে।
কার্পেট—পাতা কাঠের সিঁড়িতে মৃদু পায়ের শব্দ।
নীলাদ্রির স্নায়ু—শিরাগুলো টানটান হয়ে উঠল। হলঘরে সব ক'টা ঝাড়বাতি একে একে জ্বেলে দিলে। যেমন জ্বালিয়েছিল সেই পার্টির রাতে। তারপর কটা রঙের দুই চোখের তারায় সমস্ত চেতনা কেন্দ্রীভূত করে চেয়ে রইল দরজার দিকে।
হ্যাঁ, যে এল সে লালীই বটে। একটু রোগা দেখাচ্ছে শুধু, আর আইভরির মতো পীতাভ সাদা রঙটা খানিক ময়লা হয়েছে মাত্র। আর কোনও তফাত নেই।
কিন্তু লালীর পিছন পিছন যে লোকটি এসে সেলাম করে দাঁড়াল, তাকে দেখে নীলাদ্রির আরও চমক লাগল। সে আর কেউ নয়, হঠাৎ—ফেরারী জাফর আলি খানসামা।
বেশ কিছুক্ষণ কথা বললে না কেউ। নীলাদ্রি চেয়ে রইল লালীর দিকে, আর ঘরের আশেপাশে তাকিয়ে হঠাৎ এক সময় লালীর আইভরি—গাল বেয়ে টসটস করে নেমে এল জল। তারপর আস্তে আস্তে বললে, এ জন্মে আবার এই ঘরে—এই সংসারে ফিরে আসব, তা কি ভেবেছিলাম? লোকে জানল আমি মরে গেছি, অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে আমারও মনে হল অন্ধকারের অতলে আমি ডুবে যাচ্ছি! কিন্তু আসলে কি হয়েছিল জানো?
নীলাদ্রি এগিয়ে এল। লালীকে বুকে জড়িয়ে বললে, এখনও তোমাকে দুর্বল মনে হচ্ছে। ও—কথা থাক, পরে শুনব।
বলতে শুরু করল জাফর আলি। শুরু করল সেই একুশে জুলাইয়ের দুর্যোগ—রাত থেকে। শিলাই নদীর ধারে সেই শ্মশানঘাট থেকে।
জাফর বললে, লালদিদির লাশ শোয়ানো হল কাঠের বিছনেয়। আগুন দেয়—দেয়, ঠিক তখুনি ডন সাহেব চিল্লিয়ে উঠল, বান আসছে। ব্যাস, দেখতে দেখতে শ্মশানঘাট ভোঁ—ভাঁ। শিলাইয়ের বান তো নয়, যেন সাক্ষাৎ যমদূত। জানের ভয় বড় ভয়, মিছে কথা বলব না হুজুর, আমারও মনটা চেয়েছিল পালাতে। কিন্তু পালাতে গিয়ে পা দু'খান আটকে গেল। চোখ গিয়ে পড়ল কাঠের বিছনেয় লালদিদির ওপর। কলজেটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ছোট্ট বয়েস থেকে ওই লালদিদি আমারই কোলে—পিঠে মানুষ, আর আজ এই নিশুতি শ্মশানঘাটে ওকে একা ফেলে যাব? অমন সোনার দেহ বানের জলে ভেসে যাবে! না, না, তা হবে না, ওর বাপের নিমক খেয়েছি যে!
তিন কুড়ি উমর হলে কি হয়, শরীলে আমার তাকত আছে হুজুর। এক ঝটকায় লালদিদির লাশ তুলে নিলেম কাঁধে, তুলে নিয়েই ছুট! ডাইনী শিলাইয়ের বান তখন পিছনে তাড়া করেছে! ছুট—ছুট—ছুট! ঝিমঝিমে জ্যোচ্ছনায় জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা দূর এগিয়ে তবে হাঁপ ছাড়লেম। কিন্তু কী তাজ্জব! লালদিদির গা'টা গরম—গরম ঠেকছে কেন? মরা মানষের গা কি গরম হয়? সাপে—কাটা লাশ যেমন ছ্যাঁকছেঁকে হয়, ঠিক তেমনতর!
অথচ দাস ডাক্তার বলেছে, লালদিদি খতম! কেমন সন্দ হল। সাত—পাঁচ ভেবে লালদিদিকে কাঁধে ফেলে আবার ছুট। একদম সেই পাহাড়ি বস্তিতে বুড়ো নেপালি হেকিমের ডেরায়।
চ্যাটাইয়ের ওপর লালদিদির লাশ রেখে, নেপালি বুড়ো মিটমিটে আলোয় অনেকক্ষণ ধরে দেখলে আর বিড় বিড় করে কি সব আওড়ালে। তারপর ঘাড় নেড়ে বললে, হবে। সারারাত ধরে বুড়ো লালদিদিকে কত কি জড়িবুটি খাওয়ালে, শোঁকালে, মাখালে। আমি ঠায় বসে রইলেম হুজুর। বুকের মধ্যে 'কি হয়, কি হয়' ভাব। পরদিন বেলা যখন দুপুর, তখন—ইয়া আল্লা—লালদিদি ঘোলা ঘোলা চোখ মেলে তাকাল।
একটু থামল জাফর আলি। তারপর বললে, এবার তুমি বলো লালদিদি।
চলে গেল জাফর। নীলাদ্রি স্থির হয়ে শুনছে। লালীকে প্রশ্ন করলে, কি হয়েছিল তোমার?
সেই নেপালি বুড়ো বললে, আমাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। বিষটা পাহাড়ি সাপের বিষ জাতীয়। এই বিষে হৃদযন্ত্রের কাজ আস্তে আস্তে থেমে আসে, কিন্তু সেটা মৃত্যু নয়! আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে বিষ কাটাতে পারলে হৃদযন্ত্রের কাজ আবার স্বাভাবিক হতে পারে। ভগবান বুদ্ধকে নমস্কার যে ঠিক সময়ে তিনি শিলাই নদীতে বান এনেছিলেন। সামান্য কিছু দেরি হলেই আমার দেহটার ছাই ঝাউবনীর বাতাসে—
নীলাদ্রি কেমন যেন অসহিষ্ণু গলায় বলে উঠল, তারপর—তারপর কি হল বলো।
লালী বললে, আমার পুরো চেতনা ফিরে আসতে—চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার হতে আরও দুটো দিন গেল। তারপর নেপালি বুড়ো জাফরকে বললে, এইবার রুগিকে নিয়ে যেতে পারো।
নীলাদ্রি ক্ষোভের সঙ্গে বললে, আশ্চর্য! এত কাণ্ড হয়ে গেল, অথচ আমাকে একটা খবরও দিলে না—বাড়িতেও ফিরে এলে না!
লালী বললে, প্রথমে বাড়িতে ফিরে যেতেই মন চেয়েছিল, পরে ভেবে দেখলাম, মরবার পর এত শিগগির বাড়িতে না ফেরাই ভালো। কপার টাউন চমকে উঠবে—অনেক সন্দেহ, অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতূহলের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে তোমায়। সে এক বিশ্রী ব্যাপার হবে। তার চেয়ে বরং আমার মরার কথাটা লোকের মনে থিতিয়ে আসুক, আমিও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠি, তখন ফেরা যাবে।
তারপর?
তারপর ঝাউবনীতে থাকা আর সম্ভব হল না। কখন কে জেনে ফেলবে কে জানে। তাছাড়া আরও চিকিৎসার দরকার—শরীর তখনো ভীষণ দুর্বল। মনে পড়ল অর্ধেন্দুকাকার কথা—বাবার অ্যাটর্নি বন্ধু। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে কলকাতায় চলে গেলাম—জাফরকে সঙ্গে নিয়ে। অর্ধেন্দুকাকা যতট আশ্চর্য হলেন, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত হলেন আমার জন্যে। একটা ভালো নার্সিং হোমে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। মাস দেড়েক সেখানে থাকার ফলে আমি অনেকটা সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। তখন আবার মন টানতে লাগল ঘরের দিকে। হাজার হলেও স্ত্রীলোকের মন তো! মরে গিয়েও নিজের হাতে—গড়া ঘর—সংসারের ওপর মায়া—মমতা যায় না। তাই যে ঝাউবনী একদিন চিরকালের মতো আমাকে বিদায় করে দিয়েছিল, সেইখানেই আবার ফিরে এলাম।
লালীর চোখে জল এসে গেল। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, কিন্তু কেন এমন হল বলতে পারো? আমি তো কখনও কারো সুখের অন্তরায় হইনি—কারো ক্ষতি করিনি! তবে আমায় বাঁচতে দিতে কার এত অনিচ্ছা?
পাইপের ধোঁয়ায় নীলাদ্রির মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধ সে লালীকে বুকের কাছে টেনে নিলে। বললে, যা হবার হয়ে গেছে। তার জের টেনে আর লাভ কি লালী? এই ব্যাপার নিয়ে পুলিশকে ঘাঁটাঘাঁটি করতে দিলেই শত্রু ধরা পড়বে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। মাঝখান থেকে সারা কপার টাউন কানাকানি করবে—আমাদের পারিবারিক সম্ভ্রম নষ্ট হবে। তবে তুমি যদি চাও—
না, থাক।—একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লালী বললে, যা অজানা, তা অজানাই থাক।
স্বামীর বাহুবেষ্টন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে লালী যাবার জন্যে এগোল।
নীলাদ্রি হঠাৎ ডাকলে, একটা কথা লালী—
বলো।—লালী ফিরে তাকাল।
কাকে সন্দেহ হয় তোমার?
জ্যান্ত লালীর মুখে মরা হাসি দেখা দিল। নিষ্প্রাণ নির্জীব অদ্ভুত সে হাসি। একটু চুপ করে থেকে সে বললে, আমার ভাগ্যকে।
তারপর চলে গেল।
অয়ন বললে, লালী গুপ্তার বেঁচে ওঠাকে তুমি কি বলতে চাও হীরা সিং? অলৌকিক ব্যাপার, না বিজ্ঞানের মারপ্যাঁচ?
হীরা সিং মৃদু হেসে বললে, কোনোটাই না। আমি বলি মিসেস গুপ্তার মৃত্যুটাই একটা ধাপ্পা!
অর্থাৎ?
মিসেস গুপ্তাকে মারবার চেষ্টা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু বিষমেশানো শ্যাম্পেন তিনি এত কম খেয়েছিলেন যে মরলেন না—চেতনা হারালেন মাত্র। আততায়ী তবু সুযোগ নিতে ছাড়ল না। তার হাতের লোক ধীরাজ ডাক্তারকে দিয়ে হার্টফেলিওর ঘোষণা করে রাতারাতি লাশ জ্বালিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করল। কিন্তু আততায়ীর নিতান্ত দুর্ভাগ্য, শিলাই নদীর বান তার প্ল্যানটাই বানচাল করে দিল। মিসেস গুপ্তা ফিরে আসায় এটাই প্রমাণ হল যে তিনি মারা গেছেন বলে তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়নি—তাঁকে মারবার উদ্দেশ্যেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাই নয় কি?
অয়ন ঘাড় নেড়ে বললে, আমারও ধারণা তাই। যাই হোক, মরতে মরতে লালী বেঁচে ওঠায় আমরাও বেঁচে গেলাম। খুনিকে খুঁজে বেড়ানোর আর দরকার কি? আমাদের ছুটি।
না, অয়ন।—গম্ভীর হয়ে হীরা সিং বললে, আমাদের কাজ আরও বাড়ল।
কি রকম?
আমার পুলিশি অভিজ্ঞতায় কপার টাউনের বাতাসে ক্রাইমের গন্ধ আরও উগ্রভাবে পাচ্ছি।
খুলে বলো।
পাপ থেকেই পাপের জন্ম। একটা অপরাধ আরেকটা অপরাধকে টেনে আনে। খুনি হাল ছেড়ে বসে থাকবে ভেবো না। তোমাকে আরও সজাগ হতে হবে অয়ন, আরও সতর্ক।
অনেক ভাবনার মেঘ এসে জড়ো হল অয়নের মুখে।
হীরা সিং পুনরায় বললে, মিসেস গুপ্তা ফিরে আসার পর ডন রিভাসের ভাবগতিক লক্ষ করেছ?
অয়ন বললে, নজর রেখেছি, তবে ভাবগতিক আগের মতোই—তফাত কিছু দেখিনি।
কান্তা কালেলকর?
হঠাৎ বেশি গম্ভীর হয়ে পড়েছে। কথাও কম বলে।
আচ্ছা, লালী গুপ্তার ফিরে আসাটা নীলাদ্রি গুপ্ত কিভাবে নিয়েছেন?
একজন ভালোমানুষ পত্নীপ্রেমিক স্বামীর পক্ষে যেভাবে নেওয়া উচিত। অয়ন বললে, গুপ্তসাহেব চাপা স্বভাবের মানুষ—বাইরে উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। তবে লালী মারা যাবার পর তিনি সামাজিক মেলামেশা ছেড়েই দিয়েছিলেন, এখন সেটা আবার শুরু হয়েছে—ক্লাবেও তাঁকে আগের মতো দেখা যাচ্ছে।
নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালে অয়ন। ন'টা বাজে। উঠে পড়ে বললে, চলি হীরা সিং, ক্লাবে যাব।
'বারে' ঢুকে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলে অয়ন।
কোণের টেবিলে তাসের জুয়ার আসর জমেছে। কিন্তু সেরা জুয়াড়ি আজ নেই। তাহলে কি ডন রিভাস আজ ক্লাবে আসেনি? খুবই অস্বাভাববিক ব্যাপার। অয়ন ভালো করেই জানে যে, দিনান্তে একবার জুয়ার টেবিলে না বসলে ডনের ডিনার হজম হয় না। আর, এও জানে যে ক্লাব—হাউসের বার—রুম ছাড়া অন্য ঘরের প্রতি তার কোনো টান নেই। তবে আজ গরহাজির কেন? কোথায় গেল সে? কোথায় যেতে পারে? রাতের ছায়ায় গা ঢাকা দিয়ে কপার টাউন থেকে ভাগল নাকি? না, সে উপায় নেই, হীরা সিং কড়া পাহারা রেখেছে।
অয়ন এবার হলের মাঝামাঝি তাকালে। সাহানী নামক হংস—দম্পতির সঙ্গে এক টেবিলে নীলাদ্রি বসেছে। মিঃ সাহানী বলছেন, কপার টাউনের লোকেরা নাকি কানাঘুষো করছে, কিন্তু মিসেস গুপ্তা বেঁচে ওঠায় আমরা যে কী খুশি হয়েছি নীল, বলে বোঝাতে পারব না। দেখা যাচ্ছে, আজকের এই ভেজালের যুগে মৃত্যুও ভেজাল!
নিজের রসিকতায় সাহানী নিজেই হেসে উঠলেন। মিসেস সাহানী বললেন, থামো! লালী ভাগ্যবতী, নীলাদ্রির ভালোবাসার টানেই সে বেঁচে উঠেছে। আমি মরলে কি আর বেঁচে উঠতাম?
হংসের প্রতি হংসী নিদারুণ কটাক্ষ হানলেন।
বিব্রতভাবে মিঃ সাহানী বলে উঠলেন, কী মুশকিল! তুমি যে এখনও বেঁচে আছ, আমার ভালোবাসার টান কেমন করে প্রমাণ করব ডিয়ার?
নীলাদ্রির ঠোঁটে সেই পেটেন্ট হাসিটি দেখা দিল। হুইস্কির পাত্রটা তুলে ধরে বললে, লালীর দীর্ঘ জীবন!
তাদের টেবিলের পাশ কাটিয়ে অয়ন এগিয়ে যাচ্ছিল, নীলাদ্রি দেখতে পেয়ে ডাকলে, এই যে অয়ন!
বলুন স্যার।—থেমে গেল অয়ন।
লালীর বেঁচে ওঠা নিয়ে কপার টাউন নাকি কানাঘুষো করছে?
তাই নাকি?
সাহানীর দিকে একবার তাকিয়ে নীলাদ্রি অয়নকে বললে, যারা কানাকানি করছে, তাদের জানিয়ে দিও, আমার পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে অপরের মাথা ঘামানো আমি পছন্দ করি না।
সুযোগ পেলে জানিয়ে দেব।
হ্যাঁ, আরেকটা খবর জানিয়ে দিও। লালী ফিরে আসায় এবার পুজোর সময় কপার টাউনের ওয়াকার্স আর অফিসারদের তিন মাসের মাইনে বাড়তি বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে।
গদগদ গলায় চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট সাহানী বললেন, খুবই আনন্দের কথা!
ওটা অবশ্য দেওয়া হবে আমার পার্সোন্যাল অ্যাকাউন্ট থেকে। নীলাদ্রি বললে।
অবাক হবার ভঙ্গিতে অয়ন বললে, আপনার নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে! কেন?
গভীর স্বরে নীলাদ্রি বললে, লালীকে ফিরে পেয়ে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী লোক। আমি চাই, সকলেই আমার সুখের ভাগ নিক।
ঈষৎ মাথা নুইয়ে সেখান অয়ন থেকে সরে গেল। একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগল। তিন মাসের মাইনে একস্ট্রা বোনাস? টাকার অঙ্কটা কম হবে না, আর সেটা যাবে নীলাদ্রি গুপ্তের নিজের পকেট থেকে! হঠাৎ গুপ্তসাহেব এতটা দিলদরিয়া হয়ে পড়লেন কেন? স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে সত্যিই কি তিনি সবাইকে তাঁর সুখের ভাগ দিতে চান? না, লালীর হঠাৎ মরা আর হঠাৎ বাঁচা নিয়ে কপার টাউনের আবহাওয়ায় যে সন্দেহের কানাকানি ছড়িয়ে পড়ছে, বকশিস দিয়ে সেটা বন্ধ করতে চান? যদি তাই হয়, নীলাদ্রি গুপ্তর মতো পদস্থ ব্যক্তির পক্ষে সেটাই তো স্বাভাবিক। কে চায় ঘরের কথা নিয়ে বাইরে আলোচনা হোক?
তবু একটা 'কিন্তু' থেকে যায়। সে কিন্তুটা যে কি, অয়ন তা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন না। লালীর সঙ্গে দেখা হলে হয়তো বুঝতে পারা যাবে।
ভাবতে ভাবতে বার—কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াল অয়ন।
হেল্লো বোস! কি দেব?—বার—ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলে।
অয়ন বললে, জিন অ্যান্ড লাইম। তোমার সবচেয়ে রেগুলার খদ্দের ডন রিভাসের খবর কি?
ম্যানেজার বললে, ওর কথা আর বোলো না। অনেক টাকা বাকি ফেলেছে জন, ধারে ড্রিঙ্কস দেওয়া তাই বন্ধ করে দিয়েছি।
তাই বুঝি আজকাল আর আসে না?
ক'দিন আসেনি। আজ হঠাৎ একটু আগে এসেছিল, কান্তা কালেলকরের খোঁজ করে আবার চলে গেল।
জিন—লাইমের দাম মিটিয়ে অয়ন আর দাঁড়াল না। কান্তার খোঁজ করছে ডন! তাহলে আগে কান্তা কোথায় দেখা যাক।
বল—রুমে গিয়ে অয়ন উঁকি দিল। ভালো নাচিয়ে বলে কান্তার নাম আছে, নাচের পার্টনার হিসেবে তার চাহিদাও আছে। তাই নাচের মজলিশে রোজই তাকে দেখা যায়। কিন্তু ডান্স ফ্লোরে আজ সে নেই। ডনের মতো কান্তাও আজ ক্লাবে গরহাজির! সবার আগোচরে কোথাও না কোথাও দুজনের দেখা হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু কে জানে কোথায়!
হতাশ হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল অয়ন। বৃথাই আজ ক্লাবে আসা। কোনও নতুন সূত্র সংগ্রহ করা গেল না।
শ্লথ পায়ে অন্যমনস্কের মতো হাঁটতে লাগল অয়ন। কিন্তু বারান্দার বাঁকের মুখে এসেই দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যাঁ, তার অনুমানে ভুল হয়নি। সবার আগোচরেই দুজনের দেখা হয়েছে, কিন্তু এত কাছে অয়ন আশা করেনি।
বারান্দাটা বাঁক নিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে ক্লাবের পুরোনো ভাঙা কিছু আসবাব জড়ো করা। এদিকটা একেবারে নির্জন। অল্প পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে। অয়ন দেখল, জড়ো—করা আসবাবের পাশে দাঁড়িয়ে কথা কইছে ডন আর কান্তা। পা টিপে টিপে ভাঙা আসবাবের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল সে।
উত্তেজিত গলায় ডন বলছিল, টাকা—টাকা চাই আমার!
কান্তা বললে, চুক্তি অনুসারে তোমার পাওনা তো মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কি হিসেবে চাও?
হিসেব—টিসেব বুঝি না। অনেক দেনা হয়েছে আমার, তাই টাকার দরকার।
তোমার পাওনা ছাড়া আরও দু—দফা টাকা তোমাকে পাইয়ে দি!য়েছি। আর পারব না। এবার তুমি নিজে চাও গে।
নিজেই চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার লোক দিতে রাজি হচ্ছে না।
কান্তা বললে, রাজি হচ্ছে না তো আমি কি করব?
ভালো চাও তো রাজি করাও তাকে।—ডন অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে।
কান্তা তেতো গলায় বললে, কে ভেবেছিল ডাইনিটা মরেও বেঁচে উঠবে! আমাদের ব্যাড লাক—অগাধ টাকা হাতে এসেও এল না!
কান্তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ডন বলে উঠল, আমার কাজ আমি করেছি, ও জিনিস এই ডন রিভাস ছাড়া কেউ জোগাড় করতে পারত না। তোমাদের কাজ হাসিল হয়নি বলে আমি দায়ী নই। টাকা আমার চাই।
অল্প আলোতেও বুঝতে পারা গেল, কান্তার ঝকঝকে চোখ দুটো আরও ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। তবু নরম গলায় বললে, তুমি কি আমাদের ব্ল্যাকমেল করতে চাও ডন?
সোজা রাস্তায় টাকা আদায় না হলে তাই করতে হবে। পুলিশের কাছে তোমার লোককে ফাঁসিয়ে দিতে এক মিনিটও লাগবে না।
সাপের মতো হিসহিস করে উঠল কান্তা : তাহলে তুমিও কি বাঁচবে?
হা হা করে হেসে উঠল ডন। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে হাত চাপা দিয়ে কান্তা বললে, চুপ।
মুখ থেকে হাতখানা সরিয়ে ডন বললে, আমার ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না সুন্দরী! হংকং সাংহাই ফেরত ডন পুলিশের পরোয়া করে না। তোমার ডার্লিংকে কি করে বাঁচাবে, সেটা তুমি ভাবো। বেশি কিছু বলতে চাই না।
ডন চলে যাচ্ছিল, অদ্ভুত রকম ঠান্ডা গলায় কান্তা বললে, শোনো ডন, কত টাকা চাই তোমার?
আপাতত হাজার পাঁচেক।
কাল সন্ধেবেলা পাবে।
এই তো ভালো মেয়ের মতো কথা! কোথায় দেখা পাব তোমার? এখানে?
না, না, ক্লাবে নয়। নিরিবিলি জায়গায়—ধরো, শিলাইয়ের ধারে।
ও—কে! গুডনাইট কান্তা!
ডন চলে গেল শিস দিতে দিতে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কান্তাও এগিয়ে গেল। বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে অয়ন তার পিছু নিলে।
বল—রুমে গিয়ে ঢুকল কান্তা। অয়নও। সাহানী—দম্পতি আর নীলাদ্রি তখন বার ছেড়ে সেখানে এসে জুটেছে। ওয়ালজের তালে তালে শুরু হয়েছে নাচ—জোড়ায় জোড়ায়।
কান্তাকে দেখে নীলাদ্রি এগিয়ে এল। বললে, এসো কান্তা, আমি নাচের পার্টনার খুঁজছি।
মুখে মৃদু হাসি এনে সৌজন্যের সঙ্গে কান্তা বললে, আমার সৌভাগ্য।
দুজনে ডান্স—ফ্লোরে চলে গেল। সেই দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অয়ন হঠাৎ মিসেস সাহানীকে বললে, যদি কিছু মনে না করেন—আপনাকে পার্টনার পেতে পারি?
হাসিমুখে হংসী বললেন, নিশ্চয়—যদি চল্লিশ পার—হওয়া পার্টনার তোমার পছন্দ হয়।
অয়ন দূর থেকে লক্ষ করলে, নীলাদ্রির বুকের সন্নিকটে থেকে কান্তা কি যেন বলছে। নাচতে নাচতে সে চেষ্টা করতে লাগল নীলাদ্রি আর কান্তার কাছে কাছে থাকতে। কিন্তু যতবারই ওদের কাছাকাছি আসে, ততই ওরা সরে সরে যায়। খানিক পরে অয়ন দেখলে নীলাদ্রি—কান্তা নাচতে নাচতে বল—রুম থেকে বারান্দায় বেরিয়ে যাচ্ছে।
নাচের শেষে নীলাদ্রি একা ফিরে এল। বললে, কান্তার শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগছে, তাই চলে গেল।
কোয়ার্টার্সে ফিরে অনেক রাত অবধি অয়নের ঘুম এল না। সিগারেটের পর সিগারেট পুড়ল। ভর্তি হয়ে গেল অ্যাশ—পট। তবু রহস্যের জট খুলল না।
তার সমস্ত হিসেব গোলমাল হয়ে গেছে আজ। ভুল হয়ে গেছে অঙ্কে।
ডন আর কান্তার সম্পর্ক নিয়ে এতদিন সে যা ভেবেছিল, আজ ক্লাবে গিয়ে বোঝা গেল যে, তার সবাটাই মিথ্যে। কান্তাকে ডন শাসিয়েছে, 'টাকা না পেলে তোমার লোককে পুলিশের কাছে ফাঁসিয়ে দিতে আমার এক মিনিটও লাগবে না!' এই কথা থেকে স্পষ্টই কি প্রমাণ হয়ে যায় না যে ডন রিভাস আর যাই হোক, কান্তার প্রণয়ী নয়? প্রণয়ী হলে সে কান্তাকেই ব্ল্যাকমেল করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করতে না। আর, কান্তার সঙ্গে তার প্রণয়—সম্পর্ক যখন নেই, তখন খুনির দলের একজন হলেও খুনি সে নয়।
ডন বারবার কান্তাকে বলেছে 'তোমার লোক'। বলেছে, 'আমার ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না, তোমার ডার্লিংকে কি করে বাঁচাবে তাই ভাবো!' সুতরাং আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল যে কান্তার প্রেমিকই লালী গুপ্তার খুনি। সে ধীরাজ ডাক্তার নয়, ডন রিভাস নয়, কোনো তৃতীয় ব্যক্তি।
কিন্তু কে সে—লালী বেঁচে ওঠার যার স্বার্থে ঘা লাগল, অগাধ টাকা যার হাতে এসেও এল না?
কে সেই নেপথ্য নায়ক তৃতীয় ব্যক্তি?
হঠাৎ বিছানায় উঠে বসল অয়ন। মাথার গোড়ায় টেলিফোন। রিসিভার তুলে ডায়াল করলে হীরা সিংকে।
হ্যালো, আমি অয়ন বলছি। যত তাড়াতাড়ি পারো কলকাতায় অর্ধেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে তোমায়—প্রবীণ অ্যাটর্নি অর্ধেন্দু রায়চৌধুরি, লালীর বাবার পুরোনো বন্ধু।...কেন? মনে হচ্ছে, রহস্যের ধোঁয়া কেটে গিয়ে এইবার একটা স্পষ্ট ক্লু দেখতে পাব! কাল সব বলব— এখন বড় ঘুম পাচ্ছে।
রিসিভার রেখে, আলো নিভিয়ে, নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল অয়ন।
ধলাই পাহাড়ের কোলে পাইনের জঙ্গল, ওপাশ দিয়ে পাহাড়ের পা ছুঁয়ে বয়ে চলেছে শিলাই।
আকাশে সূর্যাস্ত হচ্ছে।
পাইনের ঠান্ডা ছায়ায় ঝরা পাতার পুরু গদির ওপর বসেছে অয়ন আর লালী। আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে চুপ করে বসে আছে লালী। নিজের ভেতরে নিজে ডুবে আছে যেন।
অয়ন তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, কপার টাউনে ফিরে আসার পর তুমি কেমন যেন বদলে গেছ লালী।
চোখ ফিরিয়ে বললে, কপার টাউনে ফিরে আসার পর নয়, বলো মরে যাবার পর বদলে গেছি। আমার জীবনটাই যে বদলে গেছে অয়ন!
কিন্তু আমি দেখছি, তুমি ছাড়া তোমার জীবনের কিছুই বদলায়নি। তোমার বাড়ি, তোমার ঐশ্বর্য, তোমার প্রতিদিনের সংসার—যাত্রা, তোমার স্বামীর যত্ন—ভালোবাসা আগেও যা ছিল, এখনও তাই। বদলে গেছ শুধু তুমি।
নিরাসক্ত গলায় লালী বললে, কি করে বুঝলে? কই, আর কেউ তো একথা বলে না!
একটু শান্ত হেসে অয়ন বললে, তোমাকে আমার মতো আর কেউ বোধ হয় জানে না। তাই তফাতটা কেউ টের পায়নি। একটা প্রশ্ন করব লালী? নিজেকে তুমি এমন করে গুটিয়ে নিয়েছ কেন? সেই একুশে জুলাইয়ের রাতটাকে তুমি কি এখনও ভুলতে পারোনি? তোমার মনে কি সেই ভয়ের ছায়া রয়েছে?
কয়েক মুহূর্ত লালী জবাব দিলে না। তারপর আস্তে আস্তে বললে, তুমি ঠিকই ধরেছ অয়ন। একটা অজানা ভয় এখনও আমাকে ভয় দেখায়। আমার কেবলই মনে হয়, কি যেন বিপদ আমার পায়ে পায়ে ঘুরছে।
কেন এমন মনে হয় লালী?
কেন জানো? মরবার আগে আমি জীবনের সুন্দর দিকটাই শুধু দেখেছিলাম। এখান থেকে আমরা যেমন চাঁদের উজ্জ্বল পিঠটাই দেখি! কিন্তু বেঁচে ওঠার পর জীবনের যে চেহারা দেখতে পোলাম, তা বড় কুৎসিত—চাঁদের অপর পিঠের মতো অন্ধকার! এখানে মানুষ মানুষকে বিষ দেয়—মানুষই মানুষের শত্রু।
অয়নের মুখখানা গম্ভীর হয়ে এল। জীবনের খারাপ দিকটাও জেনে রাখা ভালো। খারাপ অভিজ্ঞতা মানুষকে সাবধান হতে শেখায়।
লালী বললে, কিন্তু সাবধান হতে শেখা মানেই তো মানুষকে অবিশ্বাস করতে শেখা! তাহলে সংসারে স্নেহ মায়া ভালোবাসা—সবই কি নকল? তাহলে কি বুঝব কেউ আমার আপন নয়—কেউ আমাকে চায় না!
পুরোনো আইভরির মতো লালীর মুখের রঙ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। ঠোঁট দু'খানা কাঁপছে থরথর করে।
মমতায় ভরে উঠল অয়নের বুক। সেই লালী। মুর্শিদাবাদে তার কৈশোর—সঙ্গিনী, তার প্রথম যৌবনের মনোনীতা! লালীর একখানা হাত নিজের মুঠির মধ্যে নিয়ে অত্যন্ত সহজ ভাবে সে বললে, না লালী, সংসারে অন্তত একজন আছে যে তোমাকে চায়। আর কিছুই সে চায় না—শুধু চায় তুমি থাকো। কেননা, তুমি থাকলেই তার থাকার আনন্দ, তুমি না থাকলে তার সবটাই ফাঁকা!
অয়নের মুখের দিকে চেয়ে লালীর দুই চোখ স্নিগ্ধ হয়ে এল। বললে, আমি জানি অয়ন, তোমার চেয়ে বড় বন্ধু আমার আর নেই। তাই তোমার কাছে যা বলি, সবার কাছে তা বলতে পারি না।
তোমার এই ভয়ের কথা গুপ্তসাহেবকে বলেছ?
বলেছি। নীল বলে, সেই একুশে জুলাইয়ের ভয়টা আমার মনের বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওটাকে আমল দিতে নেই।
ঠিকই বলেন।—অয়ন প্রসঙ্গ পাল্টালে : আচ্ছা, নীলাদ্রি গুপ্তকে তুমি তো পছন্দ করে বিয়ে করেছিলে?
না, পছন্দ করেছিলেন আমার বাবা।
জানাশোনা হল কি করে?
পূর্ব বাংলার এক জমিদার ফ্যামিলির ছেলে ও। বাংলা ভাগ হবার পর কলকাতায় আসে। ছাত্র হিসেবে ব্রিলিয়ান্ট, জিওলজিতে অনার্স। বাবার কাছে এসেছিল জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টায়। বাবা তখন কপার টাউনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, নীলকে নিজের পি. এ. করে নিলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই ও ডিরেক্টর হয়ে গেল। বাবা তখন ওর সঙ্গে আমার বিয়ে দিলেন।
একটা কথা খোলাখুলি জিজ্ঞেস করতে চাই লালী। বিয়ে করে তুমি সুখী হয়েছ তো?
হয়েছিলাম বইকি! নীলাদ্রি রূপে—গুণে অসাধারণ, এমন স্বামী পেলে কোন মেয়ে না সুখী হয়? শুধু স্বামী—ভাগ্য নয়, বাবা মায়া যাবার আগে সতেরো লাখ টাকা আমার নামে রেখে গেলেন। তবু তোমার কথাটাই মনে পড়ে আয়ন—'বড় বেশি সুখ ভাল নয়!' মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি গরিব ঘরের মেয়ে হতাম, সাধারণ স্বামী নিয়ে সাধারণ জীবন কাটিয়েই হয়তো সত্যিকার সুখ পেতাম! আমার ভাগ্যকে কেউ হিংসে করত না!
কে তোমায় হিংসে করে বলে মনে হয়?
এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে লালী বললে, কান্তা কালেলকর।
অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেছে। শিলাইয়ের ওপারে আকাশের পৃষ্ঠায় লাল পেন্সিলের রেখাগুলো কে যেন রবার দিয়ে ঘষে মুছে দিচ্ছে। অয়ন উঠে পড়ে বললে, চলো, ফেরা যাক।
পাইন—জঙ্গলের রাস্তায় মোটর রেখে ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল। গাড়ির কাছে এসে অয়ন বললে, তুমি যাও। আমার ফিরতে দেরি হবে।
গাড়িতে উঠে বসল লালী। তার দিকে একটু ঝুঁকে অয়ন পুনরায় বললে, এই কথাটা মনে রেখো যে, তোমার বিপদ—আপদে একটা মানুষ সব সময় জেগে আছে। যখনই দরকার বুঝবে, আমাকে ডেকে পাঠিও।
স্নিগ্ধ হেসে লালী ঘাড় নাড়লে। গাড়ি চলে গেল।
অয়ন উল্টো দিকে পা চালালে। তার চোখ দুটো শিলাইয়ের দিকে।
কান্তা বলেছিল ডন রিভাসকে 'কাল সন্ধেবেলা টাকা পাবে।' ক্লাবে নয়, শিলাইয়ের ধারে। সন্ধ্যা নেমেছে, ওদেরও আসার সময় হয়েছে।
আশেপাশে সতর্ক চোখ রেখে অয়ন শিলাইয়ের ধার দিয়ে এগোতে লাগল। তার মাথার মধ্যে একটা নামই ঘুরছে—কান্তা! কান্তা। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ব্ল্যাকমেলার ডনের মুখ বন্ধ করতে আসছে কান্তা। হীরা সিংকে দিয়ে তাকে অনায়াসেই অ্যারেস্ট করানো যেত। কিন্তু না, অন্য রাস্তা ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্ল্যাকমেলারের নীতির বালাই থাকে না। তবে যে—মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ হয়, সে—মুখ আবার টাকা দিয়েই খোলা যায়? তাহলে কি রহস্যের চাবিকাঠি অয়নের হাতে চলে আসবে না? পুলিশকে না বলুক, অয়নকে ডন নিশ্চয়ই বলে দেবে খুনি কে। কান্তা চলে গেলে আজই ডনের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে হবে।
ভাবতে ভাবতে অয়ন শিলাইয়ের তীরে একটা বড় পাথরখণ্ডের কাছে পৌঁছতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাথরটার পাশে কে একজন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে আছে। এমন বেয়াড়া সময় কে এখানে? ঝুপসি অন্ধকারে চেনা যায় না।
পকেট থেকে টর্চ বার করে জ্বালতেই অয়ন দারুণ চমকে উঠল।
নির্জন নদীর ধারে শুয়ে রয়েছে ডন রিভাস। হাতের শিথিল আঙুলের ফাঁকে একটা কর্ক—টিপড সিগারেট। দেহের কোথাও কোনও আঘাতে চিহ্ন নেই।
তবু অয়নের বুঝতে দেরি হল না যে ডনও ধীরাজ ডাক্তারের সঙ্গী হয়েছে।
হীরা সিং বললে, আমি তো বলেছিলাম, কপার টাউনের বাতাসে ক্রাইমের গন্ধ আরও উগ্রভাবে পাওয়া যাচ্ছে। দেখলে তো?
অয়ন বললে, হুঁ, ব্ল্যাকমেল করার পরিণাম একই দেখছি। ধীরাজ ডাক্তারও একই কারণে মরেছে। কিন্তু হংকং সাংহাই ফেরত দুর্দান্ত বেপরোয়া ডন রিভাস যে একটা মেয়ের হাতে মরবে ভাবতে পারিনি।
হীরা সিং বললে, না, কান্তা কালেলকরের হাতে ডন খুন হয়নি।
তবে মরল কিসে?
বিষে?
বিষে!—
বিষে!—অয়ন অবাক হয়ে বললে, নদীর ধারে বিষ এল কোথা থেকে?
হীরা সিং বললে, সিগারেটে ছিল। মার্শ টেস্ট করে ডনের হাতের সিগারেটে আর্সেনিয়াম অক্সাইড পাওয়া গেছে।
স্তম্ভিত হয়ে গেল অয়ন।
হীরা সিং বললে, তুমি কেমিস্ট্রির ভাল ছাত্র ছিলে, তুমি নিশ্চয় জানো কী মারাত্মক বিষ ওটা—
জানি।—অয়ন বললে, একটা সুস্থ সবল মানুষকে মারবার জন্যে আর্সেনিয়াম অক্সাইডের ০.১ গ্রামই যথেষ্ট। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, টাকা দেবার ছল করে এসে কেউ ডনকে ওই বিষাক্ত সিগারেট অফার করেছিল, আর সেই সিগারেট খেয়ে ডনের ব্ল্যাকমেল করার সাধ জন্মের মতো মিটে গেছে! তাই না?
ঠিক তাই।
একটু ভেবে অয়ন বললে, কিন্তু ওই সিগারেট কান্তাও তো অফার করতে পারে—
হীরা সিং প্রশ্ন করলে, কান্তা কালেলকর কি স্মোক করে?
না, কখনো দেখিনি।
তাহলে? যে সিগারেটর খায় না, সে হঠাৎ সিগারেট বার করে আমায় অফার করলে আমি কি করব? আমার সন্দেহ হবে—আমি সিগারেট নেব না। সুতরাং পাছে ডনের সন্দেহ হয়, এই ভেবে কান্তা নিশ্চয় তাকে সিগারেট অফার করতে শিলাইয়ের ধারে যায়নি। আমার ধারণা, খুনি নায়ক কান্তার বদলে অন্য লোককে পাঠিয়েছিল।
না হীরা সিং—অয়ন বললে, দলের দু—দুটো লোক বিশ্বাস ভঙ্গ করার পর সে আর কাউকে ব্ল্যাকমেল করার সুযোগ দেবে বলে মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, কোনো লোককে না পাঠিয়ে সে নিজেই গিয়েছিল চিরকালের মতো ডনের মুখ বন্ধ করে দিতে। ধীরাজ ডাক্তারের মোটরের টাই—রড সে নিজেই খুলে রেখেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই চতুর নায়ক, যে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আজও কপার টাউনে অবাধে—
জুতোর আওয়াজে অয়ন আর হীরা সিং থানা—ঘরের দরজার দিকে তাকাল।
একজন কনস্টেবলের সঙ্গে স্বয়ং নীলাদ্রি আসছে।
অবাক হয়ে উভয়ে উঠে দাঁড়াল। হীরা সিং বললে, মিস্টার গুপ্ত, আপনি থানায়।
থমথমে মুখ আর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর নিয়ে নীলাদ্রি বললে, না এসে আর উপায় কি ইন্সপেক্টর? কপার টাউনে একটার পর একটা যা ঘটছে, তা দেখে—শুনে আর স্থির থাকা সম্ভব নয়। এই কপার টাউন—আমার শ্বশুরের হাতে—গড়া এই তামা—নগরী বড় শান্তির জায়গা ছিল। আজ এটা 'প্যানিক টাউন'—আতঙ্ক—নগরী হয়ে দাঁড়িয়েছে! ডন খুব হওয়ার পর লোকে আর এখানে থাকতে চাইছে না। তাই বাধ্য হয়েই আপনার কাছে আসতে হল।
হীরা সিং সংযত গলায় বললে, পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে মিস্টার গুপ্ত।
নীলাদ্রির মুখে সেই পেটেন্ট হাসিটি দেখা গেল—লোকে যেটাকে শ্লেষ বলে ভুল করে। ঠোঁটের ডান দিকের প্রান্ত ঈষৎ উঁচু করে বললে, মানলাম পুলিশ চেষ্টা করছে। কিন্তু আজ অবধি চেষ্টার ফলটা কী দাঁড়াল? না, না ইন্সপেক্টর, কপার টাউন থেকে এসব ক্রাইম বন্ধ করতেই হবে—খুঁজে বার করতেই হবে অপরাধীকে—প্লিজ ইন্সপেক্টর, আপনারা আরও তৎপর হোন! পুলিশের যোগ্যতায় আমাকে বিশ্বাস করতে দিন।
দরজা অবধি ফিরে গিয়ে নীলাদ্রি ঘুরে দাঁড়াল। তার মুখের সেই পেটেন্ট হাসিটুকু অন্তর্হিত হয়েছে। সুগম্ভীর স্বরে বললে, দিন তিনেকের জন্যে আমাকে দিল্লি যেতে হচ্ছে। আমার হয়ে তুমিই পুলিশকে সাহায্য করো অয়ন।
তাই হবে স্যার।
যত শিগগির পারেন খুনীকে ধরে দিন ইন্সপেক্টর—কপার টাউনের শান্তি ফিরিয়ে আনুন। এর জন্যে মোটা রিওয়ার্ড দিতেও আমি প্রস্তুত। কে জানে, দেরি হলে হয়তো আরও কিছু ঘটে যাবে।
নীলাদ্রির দীর্ঘ দেহ দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নিঃশব্দে বসে রইল অয়ন। নীলাদ্রি গুপ্তকে এতখানি বিচলিত আগে সে কখনো দেখেনি। তার কানে বাজতে লাগল : 'দেরি হলে হয়তো আরও কিছু ঘটে যেতে পারে।'
কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হীরা সিং জিজ্ঞেস করলে, আচ্ছা, কপার টাউনে 'ক্রেভেন এ' সিগারেট কে খায় অয়ন?
একমাত্র আমি। আমার ফেরেঞ্জাইটিস আছে, ওই ব্র্যান্ডের সিগারেট খেলে কাশি হয় না।
তুমি ছাড়া এখানে আর কেউ খায় না?
না। এর কারণ ওটা বিলিতি বলে খুব কমই আমদানি হয়, দামও বেশি। কিন্তু কেন বলো তো?
অয়নের মুখের ওপর স্থির দৃষ্টি রেখে হীরা সিং জবাব দিলে, ডনের আঙুলের ফাঁকে যে সিগারেট পাওয়া গেছে, সেটা ক্রেভেন এ।
অয়নের মুখ দিয়ে কথা সরল না।
চিন্তিত মুখে হীরা সিং বললে, খুনি কেমন ধোঁকা দিয়েছে দেখেছ! আমার বদলে অন্য পুলিশ অফিসার থাকলে আজ তোমার বাঁচার রাস্তা থাকত না। আমি ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছি অয়ন! এমন অসাধারণ বুদ্ধিমান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া মুশকিল।
মুখ নিচু করে নিজের চিন্তায় ডুবে ছিল অয়ন। হঠাৎ মুখ তুলে বললে, বুদ্ধিমানেরাই কিন্তু মারাত্মক ভুল করে বসে।—আজ চলি হীরা সিং।
থানা থেকে বেরিয়ে অয়নের মনে পড়ল তার সিগারেট ফুরিয়েছে।
বিচিত্রা স্টোর্সের সামনে এসে তার মরিসখানা থেমে গেল। টাউনের সবচেয়ে বড় দোকানা, একমাত্র এরাই বিলিতি সিগারেট রাখে। গাড়ি থেকে নেমে গেল অয়ন।
মিনিট কয়েক বাদে সিগারেট কিনে যখন ফিরে এল, অয়নের মুখ—চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে নিজের মনেই সে আরেকবার বললে, বুদ্ধিমানেরাই মারাত্মক ভুল করে!
লালী টেলিফোন করেছে : 'তুমি বলেছিলে দরকার হলেই তোমাকে ডাকতে। আজ সন্ধেবেলা আসতে পারবে? বড় দরকার।'
অফিস থেকে বেরিয়ে অয়ন সোজা চলে গেল আইভি লজে। বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে লালী অপেক্ষা করছিল। অয়ন বললে, কি খবর? ডেকেছ কেন?
লালী বললে, বসো, বলছি। নীল বিজনেস ব্যাপারে দিল্লি চলে গেছে জানো বোধ হয়?
জানি। সবাইকে বলেই গেছেন।
একা একা আমি থাকতে পারছি না!
তাহলে মাথুর পালা গেয়ে শোনাই এসো। ব্রজের রাধার বিরহকথা শুনলে কপার টাউনের রাধার বিরহ—যন্ত্রণা হালকা হতে পারে।
অয়নের পরিহাসে লালীর মুখে কিন্তু হাসি এল না। বিমর্ষ গলায় বললে, ঠাট্টা কোরো না অয়ন। বিরহ—টিরহ নয়। কাল রাতে একটা কাণ্ড হয়েছে—
কি হয়েছে শুনি?
আজকাল ঘুমটা আমার আগের মতো গাঢ় হয় না, অল্পেই ভেঙে যায়। রাত তখন কত জানি না, কি একটা মৃদু শব্দে জেগে উঠলাম। মনে হল, ঘরের বন্ধ দরজাটা কেউ ঠেলছে। তার একটু পরেই হঠাৎ চোখে পড়ল জানলার সার্শিতে একটা কালো ছায়া—মানুষের! ধড়মড় করে উঠে বসে বেড ল্যাম্পটা জ্বালতেই ছায়াটা সরে গেল। বাকি রাতটুকু আর ঘুমোতে পারলাম না।
অয়ন গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেল। তার মসৃণ কপালে ভাঁজ পড়েছে।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে লালী বললে, কাল রাত থেকে ভয়টা আমাকে পেয়ে বসেছে। আজ রাতেও যদি সেই ছায়াটা আসে?
হেসে উঠে অয়ন বললে, ভালই তো, এলে চেনা—পরিচয় হয়ে যাবে। তারপর হাসি থামিয়ে বললে, ভয় পেও না। আজ রাতে আমি এখানে থাকব ভাবছি।
রাতে খাওয়া—দাওয়ার পর অয়ন ঘড়ি দেখলে। পৌনে এগারোটা। বললে, এবার শুতে যাও লালী।...হ্যাঁ, ভাল কথা, তুমি কি বরাবর দরজা বন্ধ করে শোও?
লালী বললে, না। নীল বাড়িতে থাকলে ভেজিয়ে রাখি, না থাকলে বন্ধ করে দিই।
আজও দরজা ভেজিয়ে শুয়ো। কোনো ভয় নেই, আমি পাহারায় থাকব। গুড নাইট!
গুড নাইট অয়ন!
লালী শুতে চলে গেল। শিস দিতে দিতে অয়ন গেল লাইব্রেরি ঘরে। টেলিফোন সেখানেই থাকে। ডায়াল করে রিসিভার কানে তুলে বললে, আমি অয়ন বোস বলছি—আমার অঙ্কের উত্তর মিলে গেছে হীরা সিং।
হ্যাঁ, আশা করছি আজই রাতে কপার টাউনের নেপথ্য—নায়কের সঙ্গে আমার চার চোখের মিলন ঘটবে এবং কাল সকালের মধ্যেই তাকে তোমার হেফাজতে তুলে দিতে পারব। তৈরি থেকো।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে অয়ন গেল একতলায় বাবুর্চিখানায়। খাওয়া—দাওয়ার পাট চুকিয়ে জাফর আলি ডিশ ধুয়ে রাখছিল।
অয়ন জিজ্ঞেস করলে, এ বাড়িতে সদর দরজা ছাড়া আর কোনো ঢোকার রাস্তা আছে নাকি জাফর?
জাফর বললে, আছে কর্তা। গারাজ—ঘর দে' বাড়িতে ঢোকা যায়। আজ এক তাজ্জ্বব কারবার হয়েছে কর্তা! ভোরে উঠে দেখি গারাজ—ঘরের তালা খোলা!
তাই নাকি!
হাঁ কর্তা। কাল রাতে লালদিঘির জানলায় নাকি চোর উকি দিয়েছিল।
চোর—টোর নয়, ও চোখের ভুল। গারাজের চাবি কার কাছে থাকে?
আমারই কাছে। আজ ভাবতেছি তালা পাল্টে দেব।
অয়ন হাল্কা ভাবে বললে, না, না, তার দরকার নেই। কাল হয়তো ঠিকমতো তালা বন্ধ করা হয়নি। আজ দেখেশুনে বন্ধ করে দিও।
আচ্ছা কর্তা।
অয়ন দোতলার বারান্দায় চলে এল। বাগানের একটা দীর্ঘ ঝাউ বারান্দার একধারে ছায়া ফেলেছে। অন্ধকার এখানটায় আরও ঘন। লালীর ঘরের দরজা এখান থেকে সোজা দেখা যায়। অয়ন সিগারেট ধরিয়ে বেতের চোয়ার টেনে বসল অন্ধকারে।
শরৎকালের মাঝামাঝি। বাইরেটা জ্যোৎস্না আর কুয়াশায় মাখামাখি। সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে বসে রইল অয়ন। হরিণের মতো সতর্ক হয়ে।
সে আসছে! অন্ধকার রহস্য—নাটকের সেই নেপথ্য—নায়ক, লালী গুপ্তার জীবনের অদৃশ্য রাহু, কপার টাউনের অজানা আতঙ্ক। কাল সে বিফল হয়ে ফিরে গেছে, অয়নের হিসেব যদি নির্ভুল হয়, আজ সে আবার আসবেই!
ঘুমিয়ে পড়েছে শহরের মানুষ। ঘুমিয়ে পড়েছে রাতচরা পশু—পাখি। নিজের হৃদযন্ত্রের ধুক ধুক আওয়াজ শুনতে শুনতে জেগে আছে শুধু অয়ন। চোখ সজাগ আর কান খাড়া করে। কিন্তু জেগে থাকতে থাকতে কখন যে দু—চোখের পাতা এক হয়ে গেল টের পায়নি সে।
হঠাৎ ঘুমের চটকা ভেঙে গেল। কি যেন একটা অস্পষ্ট শব্দ। ছিলা—ছেঁড়া ধনুকের মতো খাড়া হয়ে বসল অয়ন। ঘুম—জড়ানো দুই চোখের দৃষ্টি ধারালো করে তাকাল লালীর ঘরের দিকে। দেখলে—
কুয়াশা—মাখা এক টুকরো পানসে জ্যোৎস্না পড়েছে দরজায়। দরজার কপাট দু'খানা আস্তে আস্তে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। নিঃসাড়ে বেরিয়ে এল এক ছায়ামূর্তি—লালীর ঘর থেকে। কপাট দু'খানা আবার ভেজিয়ে দিয়ে ছায়ামূর্তি এগিয়ে গেল করিডরে।
যার অপেক্ষায় বসে বসে অয়ন প্রতিটি মুহূর্ত গুনছিল, সে কখন এল জানতেও পারেনি। এত সতর্কতা সত্ত্বেও!
নিজেকে অভিশাপ দিতে দিতে অয়ন দ্রুত এসে দাঁড়াল লালীর ঘরের দরজায়। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে ঢোকা হল না। ছায়ামূর্তি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে! নিঃশব্দে বেরাল—পায়ে পিছু নিলে অয়ন।
লম্বা করিডর। অন্ধকার। দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে অয়নও এগোতে লাগল ছায়ামূর্তির পিছনে। অন্ধকারটা খানিক সয়ে এসেছে চোখে। কিন্তু নেহাতই কপাল খারাপ অয়নের। একটা পাম—টবের স্ট্যান্ডের সঙ্গে বেমক্কা ধাক্কা লেগে গেল তার।
চকিতে ঘুরে দাঁড়াল ছায়ামূর্তি। প্যান্টের পকেটে একবার হাত ঢোকাল। পরক্ষণেই অয়ন দেখতে পেল অন্ধকারেও কি একটা জিনিস চকচক করছে তার হাতে।
অয়ন চট করে ঢুকে গেল লাইব্রেরি ঘরে, তারপর দরজার পাশে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাত বাড়িয়ে সুইচটা খুঁজতে গিয়ে হাতে ঠেকল পাশের র্যাকে একটা ব্রোঞ্জের ভেনাস।
মৃত্যুর মতো ঠান্ডা স্তব্ধতা। নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। শুধু লাইব্রেরির দেয়াল—ঘড়িটা সময়ের হৃৎপিন্ডে একটানা ঘা দিয়ে চলেছে।
একটু পরেই লাইব্রেরিতে নিঃশব্দে ঢুকে এল ছায়ামূর্তি। হাতের মুঠোয় সেই চকচকে জিনিসটা। সতর্কভাবে এদিক ওদিক চাইতে লাগল।
আর ভাববার সময় নেই। আচমকা হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে দিল অয়ন, আর চোখের নিমেষে ব্রোঞ্জের ভেনাসটা তুলে নিয়ে সজোরে আঘাত করলে ছায়ামূর্তির ডান হাতের কব্জিতে। প্রচণ্ড শব্দে রিভলভারটা ছিটকে পড়ল। চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটা কুড়িয়ে নিলে অয়ন। তারপর সেটা নাচাতে নাচাতে চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, গুড মর্নিং স্যার!
অয়ন, তুমি!
আজ্ঞে হ্যা, আপনি আসবেন জানতাম। তাই অভ্যর্থনার জন্যে অয়ন বোস হাজির।
বাঁ হাতের ডান কব্জি চেপে ধরে নীলাদ্রি গুপ্ত তখন সোফায় বসে পড়েছে।
রিভলভারের মুখ তার দিকে রেখে অয়ন পিছু হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বললে, খেলা আপনার শেষ গুপ্তসাহেব। হীরা সিং আসা অবধি এইখানেই বিশ্রাম করুন।
লাইব্রেরি ঘরের দরজার হুড়কোটা বাইরে থেকে টেনে দিলে অয়ন। করিডরে আলো জ্বলছে। জাফর আলি, বাবুর্চি, আয়া ভীত মুখে দাঁড়িয়ে। অয়ন আর দাঁড়াল না, লালীর ঘরের দিকে ছুটল।
ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকতেই অয়নের দম আটকে এল। তাড়াতাড়ি বাজি জ্বালতেই দেখা গেল, বিছানায় লালী চোখ বুজে শুয়ে, আর খাটের ঠিক নিজেই স্টপ কক লাগানো একটা বড় কাচের জার। তারই মুখ দিয়ে হালকা সবুজ ধোঁয়ার কুণ্ডলী বদ্ধ ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
কেমিস্ট্রি—পড়া অয়নের বুঝতে বাকি রইল না যে, এ হচ্ছে বিষাক্ত ফ্লোরিন গ্যাস। তৎক্ষণাৎ সে কাচের পাত্রটার স্টপ কক বন্ধ করে দিলে, খুলে দিলে বন্ধ জানলাগুলো। তারপর লালীর গায়ে ধাক্কা দিয়ে উদভ্রান্তের মতো ডাকলে, লালী। লালী। ওঠো।
লালী আচ্ছন্নের মতো চোখ মেলে হাঁপাতে হাঁপাতে সাড়া দিলে, কি—কি হয়েছে অয়ন?
কিছু না বলে অয়ন শক্ত দুই হাতে লালীকে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
থানায় বসে হীরা সিং বললে, কমিশনার অফ পুলিশ তোমাকে কনগ্র্যাচুলেশন্স জানিয়েছেন।
হাসি মুখে অয়ন বললে, সেটা আমার একার পাওনা নয়, অর্ধেক ভাগ তোমারও আছে হীরা সিং। আমি পেশাদার গোয়েন্দাও নই, শখের গোয়েন্দাও নই। যা করেছি, আমার ইন্সপেক্টর বন্ধুর জন্যেই।
শুধুই কি বন্ধুর জন্যে। বন্ধুর চেয়েও যে আপন, তার জন্যেও কি নয়?
অয়নের চঞ্চল চোখ শান্ত হয়ে এল। বললে, একথা অস্বীকার করব না। লালীকে বাঁচানোই আমার একমাত্র পণ ছিল।
আচ্ছা অয়ন, তুমি কি করে জানলে যে, নীলাদ্রি গুপ্ত গত রাতে আবার আসবে লালী গুপ্তাকে খুন করতে?
তা হলে গোড়া থেকে বলতে হয়!—অয়ন শুরু করলে, কপার টাউনের নীলাদ্রি গুপ্ত খুবই পপুলার ফিগার ছিল। আমি তার কাছে এতদিন কাজ করেছি—মেলামেশা করেছি, আমিও বুঝতে পারিনি অমন সুন্দর দেহের আড়ালে একটা নোংরা ক্রিমিন্যাল মন লুকিয়ে থাকতে পারে! লালীর বাবাও তাকে বুঝতে পারেননি, তাই অসঙ্কোচে তার হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর নীলাদ্রি হয়তো লালীকে ভালোবাসতে পারত, কিন্তু গোল বাধাল কান্তা কালেলকর চাকরিতে এসে। কান্তা কি টাইপের মেয়ে, ধীরাজ ডাক্তারের মুখে আমরা শুনেছি। যৌন আবেদনের কাছে স্ত্রীর অনুরাগ আকর্ষণ ভেসে গেল। খেলাটা অবশ্য চলছিল খুবই গোপনে। কিন্তু সারা জীবনে তো লুকোচুরি চলতে পারে না। তাই নীলাদ্রি প্ল্যান করলে পথের কাঁটা লালীকে সরিয়ে ফেলতে। সেই চেষ্টাই সে করল একুশে জুলাইয়ের রাতে। ডন রিভাস পাকা স্মাগলার, বিষটা যে সে—ই আনিয়ে দিয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু নীলাদ্রির ব্যাড লাক—আশ্চর্যভাবে লালী বেঁচে উঠল। ভেস্তে গেল নীলাদ্রি—কান্তার সুখের প্ল্যান। ওদিকে নতুন বিপদ দেখা দিল দুই ব্ল্যাকমেলারকে নিয়ে—ধীরাজ ডাক্তার আর ডন রিভাস। অতএব বাঁচবার জন্যে নীলাদ্রি দুজনকেই খতম করে দিলে। ধীরাজ দাসের মোটর গাড়ির টাই—রড খুলে দিয়ে আর ডনকে আর্সেনিক মেশানো সিগারেট খাইয়ে। কিন্তু দু'দুটো খুনের পরেও নীলাদ্রি নিজে রইল পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমরা যখন 'খুনি কে' ভেবে মাথা ঘামিয়ে মরছি, সে তখন সকলের সন্দেহের বাইরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে! এমনই অসাধারণ চতুর সে।
একটা সিগারেট ধরালে অয়ন। তারপর আবার বলতে লাগল, কিন্তু সব চাতুরির সীমা আছে—সব অপরাধের শেষ আছে। কান্তার একটা কথা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল—ডনকে সে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিল, 'কে জানত, ডাইনিটা মরেও বেঁচে উঠবে। অগাধ টাকা হাতে এসেও এল না?' হ্যাঁ, টাকার অঙ্কটা সত্যিই অগাধ, লালীর বাবা মেয়ের নামে সতেরো লাখ টাকা রেখে গেছেন। লালী মরলে সে—টাকায় কার অধিকার? একমাত্র নীলাদ্রি গুপ্তের। তবু স্পষ্ট সন্দেহ করতে পারলাম না। কেননা, তখনও নীলাদ্রির বাইরের খোলসটা নিখুঁত। স্ত্রী হয়ে লালী পর্যন্ত সন্দেহ করতে পারেনি। ভেবে—চিন্তে তোমাকে পাঠালাম কলকাতায় লালীর অ্যাটর্নি—কাকা অর্ধেন্দু রায়চৌধুরির কাছে। তুমি ফিরে এসে বললে, একুশে জুলাইয়ের দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ বাদেই নীলাদ্রি অর্ধেন্দুবাবুর কাছে গিয়েছিল সাকসেশন সার্টিফিকেট সম্পর্কে।
অর্ধেন্দুবাবু সন্দেহবশত লালীর বিষয় কিছু না জানিয়েই ব্যাপারটা চেপে রাখেন। এই খবরটা পেয়ে আমার মনে এই প্রথম সন্দেহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কোন স্বামী স্ত্রী মারা যাবার সাত দিনের মধ্যেই টাকার জন্যে এত ব্যস্ত হয়ে ওঠে? সন্দেহ হলেও নীলাদ্রিকে তখনও খুনি বলে ভাবতে পারিনি। কিন্তু—
অয়নের মুখে যেন ঘনঘটা করে এল। একটু থেমে বললে, কিন্তু ডন রিভাসের খুন আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল খুনিকে। বিচিত্রা স্টোর্সে খোঁজ করে আমি জানতে পারলাম, খুনের দিন সকালে নীলাদ্রি গুপ্তর ড্রাইভার 'ক্রেভেন এ' সিগারেট কিনে নিয়ে গেছে। তোমাকে বলেছিলাম হীরা সিং 'বেশি বুদ্ধিমান লোকেরাই মারাত্মক ভুল করে বসে'। নীলাদ্রি ভেবেছিল, ডনকে আমার ব্যান্ডের সিগারেট খাইয়ে খুনের সন্দেহটা আমারই ওপর ফেলবে, কিন্তু এইখানেই ভুল হত তার। 'ক্রেভেন এ'র বদলে কোনো সস্তা দামের চালু সিগারেট কিনলে নীলাদ্রির ড্রাইভারের কথা দোকানির মনে থাকেত না। কত লোকেই তো কেনে। নিঃসন্দেহ হলামা নীলাদ্রিই ডন রিভাসকে শেষ করেছে। এ—কথা তোমাকে বলে নীলাদ্রিকে তখনই অ্যারেস্ট করাতে পারতাম, কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তাকে হাতে—হাতে ধরতে। একটা কথা স্পষ্টই বোঝা গেল হীরা সিং, লালী গুপ্তা বেঁচে উঠলেও খুনি সহজে হাল ছাড়বে না। সতেরো লাখ টাকার লোভ সামলানো কি সহজ কথা? বুঝলাম, ডন রিভাসের পরে আবার লালীর পালা। হলও তাই। লালীর কাছে যখন শুনলাম, রাতের অন্ধকারে কে একজন এসে তার শোবার ঘরের দরজা ঠেলেছে—জানলার সার্শিতে ছায়া ফেলেছে, আমার ধারণা হল সে নীলাদ্রি ছাড়া কেউ নয়। তার দিল্লি যাওয়ার কথাটা ভুয়ো—একটা জোরালো অ্যালিবাই খাড়া করার মতলব। আমার নিশ্চিত ধারণা হল, কাল সে ফিরে গেছে, আজ আবার সে আসবে। আগামী কাল দিল্লী থেকে তার বাড়ি ফেরার দিন—আজই রাতে তাকে আসতে হবে শেষ চেষ্টা করতে। লালী তার শেষ শিকার! জাফরের সঙ্গে কথা কয়ে বুঝতে পারা গেল, গারাজ ঘরের তালার ডুপ্লিকেট চাবি নিশ্চয় নীলাদ্রির কাছে আছে। তাই তার আসাকে সহজ করার জন্যে জাফরকে গারাজ ঘরের দরজায় অন্য তালা লাগাতে মানা করলাম আর লালীকে বললাম, ঘরের দরজা ভেজিয়ে রাখতে। তারপর—তারপর লাল—নীলের খেলা কি করে শেষ হল আগেই বলেছি।
একটা নতুন সিগারেট ধরালে অয়ন। জিজ্ঞেস করলে, কান্তা কোথায়?
লক—আপে।
হীরা সিং প্রশ্ন করলে, লালী গুপ্তা কেমন আছেন?
ভাল। ফ্লোরিন গ্যাস বড় বিষাক্ত। আরেকটু দেরি হলে বড্ড বিপদ হয়ে যেত।
ঝাউবনী বেড়াতে এসে কপার টাউনের রহস্য—নাটক আপনি তো নিজেই দেখলেন। দেখলেন কপার টাউনের বাইরে যত আলো, ভেতরে তত কালো। দেখলেন মানুষের সভ্যতা কোন পথে চলেছে।
ঝাউবনী থেকে ফিরে যাবার আগে চলুন শেষবারের মতো একবার শিলাই নদীর ধারে যাই। যেখানে পাইন জঙ্গলের ঠান্ডা ছায়ায় শুকতো পাতার নরম পুরু গদির ওপর চুপচাপ বসে আছে অয়ন আর লালী। আকাশ আজ বড় বেশি নীল, শরতের রোদ বড় বেশি সোনালি।
অনেকক্ষণ ওরা পাশিপাশি বসে আছে। অনেকক্ষণ চুপচাপ। একমুঠো শুকনো পাতা কুড়িয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে লালী। তারপর বললে, ওই পাতাগুলোর মতো জীবনের গতি তিন বছর উড়িয়ে দেওয়া যায় না অয়ন? মুর্শিদাবাদের সেই দিনগুলোতে আবার ফিরে যাওয়া যায় না?
অয়ন বললে, কি হবে ফিরে গিয়ে?
জীবনটাকে নতুন করে শুরু করা যেত। সেদিন তোমাকে যা দেওয়া হয়নি, আমার মনের সেই ঋণ শোধ করতাম।
অয়ন হাসলে। মুর্শিদাবাদের সেই কিশোরের হাসি। বললে, তোমার কাছে আমার তো কোনো চাহিদা নেই লালী। কোনোদিন ছিলও না। তবে আজ একটা জিনিস চাইবার আছে।
কি অয়ন?
ছুটি।
ছুটি। কেন চাইছ?
অয়ন হাসি মুখে বললে, আমার মধ্যে একটা চিরকালের বেদে আছে। পাছে নিজের কামনায় নিজেই জড়িয়ে পড়ে, সেই ভয়ে সে পালাতে চায়। একদিন মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়েছিল, আজ আবার পালাতে চাইছে।
স্তব্ধ হয়ে লালী চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। আইভরি—গাল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল নামল। তারপর বললে, না অয়ন, ছুটি তোমাকে দিতে পারব না। জীবনের কতটা পথ আমার বাকি কে জানে! একা একা চলতে আর সাহস হয় না। আমার প্রাণটা যখন বাঁচিয়েছ, তখন কথা দাও আমার পাশে তুমি থাকবে?
চুপ করে রইল অয়ন।
হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে লালী বললে, কথা দাও।
একখানা বলিষ্ঠ হাতের মুঠিতে আরেকটি দুর্বল হাত আশ্রয় খুঁজে পেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন