নিশীথ নগরী

প্রণব রায়

এই যে কবি, ভারি খুশি হলুম তোমায় দেখে।

ঝলমলে কালো গাউন—পরা বছর সাতাশ—আটাশ বয়সের একটি মেয়ে এসে আমাদের টেবিলের সুমুখে দাঁড়িয়েছে—সঙ্গে সামরিক পোশাকে একটি জোয়ান পুরুষ।

কবি টুপি খুলে তাদের অভিবাদন জানালে: চমৎকার সন্ধ্যা, না মিস হেনরিয়েটা?

হেনরিয়েটা পুরুষটির বাহু জড়িয়ে ধরে কবির পানে চেয়ে বললে, আলাপ করিয়ে দিই এসো—আমার নতুন স্বামী রবিনসন আলিস, আর কবি অ্যাডলফ।

কবি আরেকবার মাথা নুইয়ে বললে, আমার আগেকার সম্বোধন সংশোধন করে নিচ্ছি মিসেস আর্লিস। আপনার তৃতীয় দাম্পত্য জীবন সুখের হোক।

হেনরিয়েটা মৃদু হেসে মিঃ আর্লিসের বাহুলগ্না হয়ে সরে গেল। বিস্মিত হয়ে কবিকে শুধোলুম, তৃতীয় দাম্পত্য জীবন মানে?

কবি বললে, তৃতীয়বারের দাম্পত্য জীবন। হেনরিয়েটা রেনোর নাম করা সোসাইটি গার্ল। আজই সকালে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে ওর বিবাহ—বিচ্ছেদ ঘটেছে জানতুম, কিন্তু ওর তৃতীয় বিয়ের খবর পাইনি।

বললুম, এখনো চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি যে!

কবি জবাব দিলে, এখানে অমন হয়েই থাকে। আদালতে রোজ অন্তত দশটা ডাইভোর্স কেস চলেছে এবং বিয়ে হচ্ছে কমপক্ষে ন'টা। ক্যালিফোর্নিয়াতে একটা hygienic law আছে যে, তিনদিনের নোটিশ না দিয়ে বিয়ে হতে পারবে না। কিন্তু যারা সময় নষ্ট করতে চায় না, তারা ছুটে আসে রেনোতে। এখানে চারজনের সঙ্গে কথাবার্তা কইতে গিয়ে তিনজনের মুখে শুনতে পাবে, 'আমার আগেকার স্বামী, অথবা 'অমুক তারিখের স্ত্রী'। বিবাহ—বিচ্ছেদ এখানে অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার, এতে অবাক হবার কিছুই নেই। ভালো না লাগলে এরা ভালোলাগার অভিনয় করে না।

এতক্ষণে বুঝলুম রেনো সত্যিই মজার শহর। কিন্তু বুঝলুম না, অভিনয় কোনটা—বিবাহ, না বিচ্ছেদ? কোরাস গান ততক্ষণে থেমে গেছে, পিয়ানোর কর্ড আর বেহালার সুরের সঙ্গে শুরু হয়েছে জোড়ায় জোড়ায় নাচ। কবি তার গ্লাস চতুর্থবার পূর্ণ করতে করতে গান ধরলে:

চাঁদের হাসিটি পড়েছে আমার ছোট্ট ঘরে,

বাতায়নতলে ফুটছে মদির ক্রিসেন্থিমাম,

ওগো ও কুমারী কানে কানে বলো তোমার কি নাম,

এসো আজ মেয়ে ভালোবাসি মোরা পরস্পরে।।

তোমায় এত খুঁজছি অ্যাডলফ—

এবার দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একজনের গায়ে সবুজ রেশমি ফ্রক, মাথায় কালো আর হলদে ডোরা—কাটা রুমাল বাঁধা। তার সঙ্গিনীর পরনে সাদা ঘাঘরা—সাবানের ফেনার মতো, আইসক্রিমের মতো ধবধবে! গুচ্ছ গুচ্ছ আঙুরের মতো সোনালি চুল।

অ্যাডলফ গান থামিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বসলে, হুকুম কারো। সবুজ মেয়েটি ভুরু বাঁকিয়ে বললে, নটি। আমরা নাচের পার্টনার খুঁজছি। কবি বললে, আমরাও। তারপর সামনের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, বার্থাকে আমি নিলাম, তুমি ন্যান্সিকে নাও জয়।

বললুম, ভারি দুঃখিত। নাচ আমি তো জানিনে।

ও। আচ্ছা, তুমি বিশ্রাম করো। ওরা তিনজনে চলে গেল! কবি আর বার্থা নাচ শুরু করেছে, ন্যান্সিও পার্টনার পেয়েছে দেখছি। ভালো নাচিয়ে বলে কবির নিশ্চয় নাম আছে, ওর একখানা হাত বার্থার কটিদেশ ঘিরে জড়ানো, আর একটা হাতে ও বার্থার দক্ষিণ হাতখানি ধরেছে। পরস্পরকে পার্টনার পেয়ে ওরা বোধ করি খুশি হয়েছে। ...কিন্তু ন্যান্সি ঘনঘন আমার দিকে তাকাচ্ছে কেন—সোনালি চুল ওই মেয়েটি? নাচের ছন্দে ন্যান্সির শরীরে জাগছে ঢেউ। ন্যান্সি তন্বী, ন্যান্সি সুন্দরী! চোখে চোখ পড়তেই ওর চোখে ফুটল ইসারা, ঠোঁটে হাসি, আর গালে টোল। ওর মনের ভাষা হয়তো বুঝব না, কিন্তু ওর চোখের ভাষা বুঝেছি। মন্ত্র—চালিতের মতো উঠে ধীরে ধীরে হল থেকে বেরিয়ে পাশের নিরিবিলি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম।

চাঁদ ডুবে যাচ্ছে। বারান্দাটি আবছায়া—চুপি চুপি কথা কইবার লগ্ন। ন্যান্সি এসেছে। চারখানি হাতে নিঃশব্দে পরিচয় হয়ে গেল। সাদা একটি কপোতী আমার বুকের কাছে এগিয়ে আসছে—আরো কাছে, আরো—সাদা একটা সমুদ্রের ঢেউ আমার গায়ে ভেঙে পড়েছে—

ন্যান্সির চুমার স্বাদ মদের চেয়েও মদির!

হঠাৎ চমকে ভাঙতেই দেখি, নান্সি নেই। যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনি অগোচরে চলে গেছে। শুধু ক্ষীণ একটি সৌরভ আমাকে ঘিরে রয়েছে। আকাশে চাঁদের পাত্তা নেই, দূরে গিরিশ্রেণী আর বুনো গাছের ছায়া ঘনতর। রাত বুঝি শেষ হয়ে এল!

আবার হলের মধ্যে এলুম। নাচ—গান থেমে গেছে, ভাঙন ধরেছে আজকের উৎসবে। সবার হাতে শেষ পান—পাত্র। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখি, সেই কোণের টেবিলে কবি আর বার্থা মুখোমুখি বসে একই মদের গ্লাসে দুটো স্ট্র—পাইপ লাগিয়ে খাচ্ছে। থেকে থেকে বার্থার সে কী চটুল হাসি। এগিয়ে গেলুম। স্ট্র—পাইপ থেকে মুখ তুলে কবি শুধোলে, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

বললুম, খোলা বারান্দায়, খোলা হাওয়ায়।

কবি বার্থার দিকে চেয়ে বললে, বার্থা, এই আমার নতুন—পাওয়া বিদেশি বন্ধু জয়। ইন্ডিয়া থেকে আসছে। চমৎকার নাম নয়? ...জয়! আনন্দ!

বললুম, আমাদের বাংলা ভাষায় জয় মানে কিন্তু অন্য—Victory।

খুশি হয়ে কবি বলে উঠল, দুটো মানেই চমৎকার। জয় তো যৌবনেরই।

বার্থা আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে একটু হাসলে শুধু।

বিদায়ের পালা শুরু হয়েছে: 'গুড নাইট কবি' 'অ রিভোয়া' 'ডার্লিং অ্যাডলফ, বাই বাই'—এমনি বহুতর বিদায় সম্ভাষণ। অ্যাডলফ এখানে সত্যিই লোকপ্রিয়। ভিড় ক্রমশ পাতলা হয়ে এল। উৎসব ক্লান্ত, সেই নরনারীর জনতার মাঝে আমার চোখ উৎসুক হয়ে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কই? কোথায় সেই সাদা ঘাঘরা, সেই সোনালি চুল?

বার্থার বাহুতে বাহু জড়িয়ে কবি এবার উঠল। যেতে হবে। হোটেলের বিল চুকিয়ে দিলুম। অ্যাডলফের একখানা হাত ধরে বললুম, শুভরাত্রি বন্ধু। অ্যাডলফ আমার হাত ছাড়ল না, প্রশ্ন করলে, রাত কাটাবে কোথায়? হোটেলের সব ঘর তো আজ ভর্তি।

উত্তরে বললুম, একটা পার্ক বেছে নেব'খন বা রাস্তার ধারে একখানা বেঞ্চ। রাত পোহাতে কতক্ষণই বা বাকি!

আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে কবি বললে, সে হবে না, তুমি আমার অতিথি।

তিনজনে হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ালুম। সদর দরজার ওপর রঙিন লন্ঠনগুলো রাতের হাওয়ায় এখনো তেমনি দুলছে। একটু পরেই হয়তো নিভে যাবে। পিছন ফিরে আরেকবার তাকালুম—হলটা ফাঁকা, শুধু শূন্য কয়েকটা পানপাত্র, ছড়ানো ছিন্নফুলের গুচ্ছ আর রঙিন কাগজের কুচি! ন্যান্সি নিশ্চয় আগেই চলে গেছে।

বার্থা গায়ে দিলে তার ফার—এর ক্লোক, ধীরে এগিয়ে গিয়ে অ্যাডলফের দিকে মুখ তুলে ধরলে। ক্ষণজীবী একটি মুহূর্ত। তারপর ফটক পার হয়ে বার্থা রাস্তায় নেমে পড়ল। কবি নিঃশব্দে সেই দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আপন মনে টুপি খুলে বিদায় অভিনন্দন জানালে—বোধ করি বার্থারই উদ্দেশে, কিংবা দীপ নিভে আসা এই উৎসব রাত্রিকে। তারপর আমায় ডাকলে, এসো।

ঘুমন্ত পথ। আমার কাঁধে ভর দিয়ে কবি মন্থর পদে চলতে শুরু করলে। এতক্ষণ লক্ষ করিনি যে কবি টলছে। যেতে যেতে প্রশ্ন করলুম, আচ্ছা অ্যাডলফ, ন্যান্সি কে?

কে আবার? সুন্দরী একটি মেয়ে। জড়ানো গলায় থেমে থেমে কবি বলতে লাগল, এছাড়া আর কি ওদের পরিচয় থাকতে পারে? ওদের সবাই এক, তোমার ওই ন্যান্সি, বার্থা, হেনরিয়েটা—সব্বাই। ওরা ভালোবাসে, ভালোবাসা চায়। এছাড়া মেয়েদের আর কোনো সংজ্ঞা নেই। কি হবে ওদের বেশি পরিচয় জেনে? ভালো যদি লাগে কাউকে, ভালোবাস,—কবি চলতে চলতে থেমে একটা সিগারেট ধরাল: তারপর ভুলে যাও।

বললুম, ভালোই যদি বাসি, তবে ভুলে যাব কেন?

বাঃ, নইলে নতুন মুখ তোমায় মুগ্ধ করবে কেমন করে? নতুন প্রেমের আগুন জ্বলে উঠবে কি করে তোমার মনে?...শেরির স্বাদ না ভুললে মুখে রুচবে কেন ভারমুথ, ভালো লাগবে কেন নতুন কবির রচনা, পুরোনো কবিতার পৃষ্ঠা অস্পষ্ট না হয়ে এলে? মেয়েদের বেলায়ও তাই। একজনকে ভুলতে হয়, আরেকজনকে ভালোবাসবার জন্য।

সেই ঘুমন্ত স্তব্ধতার মাঝে মাঝে ভাঙা ভাঙা গলায় কবির কথাগুলো কেমন অদ্ভুত শোনাতে লাগল।

বললুম, বার্থাকে তাহলে তুমি ভুলে যাবে? কবি শুধু জবাব দিলে, বার্থা আমার একাদশ প্রণয়িনী।

বড় রাস্তা ছেড়ে এইবার ও একটা গলির মধ্যে এল। ছোট পাড়া, ডাইনের নিচু ধরনের দ্বিতীয় বাড়িটার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বললে, আমার আস্তানা এই। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ওর পিছন পিছন ঘরে ঢুকলুম। কবি একটা মোমবাতি জ্বাললে। স্তিমিতালোকে ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম—একধারে হালকা একখানা আর্মচেয়ার আর পুরোনো একটা কাঠের টেবিল, এছাড়া আর কোনো আসবাব নেই। যেন দু'দিনের জন্য বাসা বাঁধা। অ্যাডলফ টুপিটাকে ঘরের এক কোণে ছুড়ে ফেলে দিলে, খুলে ফেললে স্কার্ফটা, তারপর জানলার পর্দা সরিয়ে দিয়ে বললে, তুমি নিশ্চয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ জয়, শুয়ে পড়ো। আজকে আমার ঘুম আসবে না।

অ্যাডলাফ আর্মচেয়ারে গা মেলে দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরাল। শুয়ে শুয়ে আজকের উৎসবটিকে স্মরণ করলুম।—মদির ও মুখর সেই উৎসব, সাদা সেই ঘাঘরা, ফেনার মতো ধবধবে। ফেনার মতো নরম, আর গুচ্ছ গুচ্ছ আঙুরের মতো সোনালি চুল। ...স্মরণ করলুম তাকে, দূর বিদেশে যে আমায় তার যৌবনের রাঙা কয়েকটি মুহূর্ত উপহার দিয়েছে, যে আমার যৌবনকে প্রথম সম্মানিত করল।

দুই

ক'দিন কবির ঘরে বেশ নির্ঝঞ্ঝাটে কাটিয়ে দেওয়া গেল।

নিশ্চিন্ত অবকাশ, নিরুদ্বিগ্ন দিন। জীবনের পুরোনো পৃষ্ঠাগুলি উলটে ফেলেছি, পার হয়ে এসেছি সমুদ্রের নতুন উপকূলে। কলকাতা থেকে আসছি রেনোয়। মোটর মুখরিত সেই সভ্যতা, জন—জটিল সেই আবর্ত থেকে এসে পড়েছি বিস্তীর্ণ অবকাশের মধ্যে, নিবাবরণ আকাশের তলায়। এখানে এই পাহাড়ি নগরী সোনালি রৌদ্রে গা মেলে সারাবেলা ঝিমোয়। এখানে দিনের আকাশের চোখে আধো তন্দ্রা আর রাত্রির চোখে হালকা নেশা। অথচ এখানে আছে সবই: রাজনীতিক, পুলিশ, ব্যবসাদার, ফ্যাক্টরি, মেশিন, শ্রমিক। রেনো গরিব শহর নয়। কিন্তু এখানকার পথে ভিড় নেই, কারণ এখানে আছে ভিড় ঠেলে চলবার আগ্রহ, এখানেও আছে জীবন সংগ্রাম, কিন্তু নেই প্রাণ—ধারণের জন্য উন্মত্ত প্রতিযোগিতা।

কবি একদিন শুধোল, কেমন লাগছে রেনোকে?

বললুম, মন্দ কী? তবে, আমেরিকার সম্বন্ধে ধারণা আমার বদলে যেতে বসেছে।

কবি বললে, আমার কিন্তু ভালো লাগছে না।

কেন? বিস্মিত হলাম একটু।

কবি বললে, রেনো আমার কাছে পুরোনো হয়ে গেছে, আর কোনো মোহ নেই—এখানকার মেয়েরা বড় বেশি চেনা, এখানকার মদে আর নতুন করে নেশা লাগছে না।

হেসে বললুম, কিন্তু একদিন তুমিই তো রেনোর রূপে মুগ্ধ হয়ে ভালোবেসে ফেলেছিলে।

কারণ রেনো বড় বেশি ভালো।—কবি একখানা কাগজ খুঁজে এনে আমার সামনে মেলে ধরলে।

দেখলুম, একখানা সরকারি ইস্তাহার। শহরের মেয়র মিঃ ই. ই. রবার্টস জারি করেছেন। কয়েকটা লাইন কবি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে :

‘builded upon the principle that all men are created equal and have certain in alienable rights, among which are, lifes liberty and the pursuit of happiness, Everyone has right to do just what his conscience dictates he should do, provided he does not interfere with the rights of others...’

সাম্যবাদের যুগে এর চেয়ে ভালো কথা আর কি হতে পারে? দুনিয়ায় আনন্দ কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়, সবারই সমান অধিকার। সুখ চাও? স্বচ্ছন্দে তা বেছে নিতে পার, তোমার খুশিতে কেউ বাধা দেবে না—যদি তুমি অপরের খুশিতে বাধা না দাও। এমন জায়গা আমার ভালো লাগছে না কবি?

এবার কবি কোনো জবাব দিলে না। আর্মচেয়ারে শুয়ে গুনগুনিয়ে গান ধরলে:

সাগর পাখিরা ডানা ঝাপটায়,

শুনতে পাও?

নব উপকূলে জীবনের ঢেউ

কী অস্থির!

নগরের পথে যেথা জনগণ

করেছে ভিড়—

মনের বিহগ, সেখানে কি পাখা

মেলতে চাও?

কাল দুপুরে সে এসেছিল—বাড়িওলীর সেই মেয়েটি। নিরালা প্রহর, খোলা জানলার ধারে কবির আর্মচেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসেছিলুম, পেছন থেকে কে যেন মেয়েলি গলায় বলে উঠল: কিটি—আমার কিটি এসেছে এখানে?

ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই মেয়েটি। তাকালে সবার আগে চোখে পড়ে ওর লাল আপেলের মতো ফুলো ফুলো গাল আর উদ্ধত বুক। ওর যৌবনে সৌষ্ঠব নেই, কিন্তু বাহুল্য আছে প্রচুর। তবু মোটাসোটা দেহে ও আঁটসাঁট জ্যাকেট পরতে ভোলেনি আর খয়েরি—লালে মেশানো রঙিন ছিটের ফুলে ওঠা ঘাঘরা। মেয়েটিকে এর আগে দু'—একবার দেখেছি, দেখা হয়েছে সিঁড়িতে ওঠবার মুখে, ঝুড়ি ভরে বাজার করে ফিরছে।

মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল আমাদের ঘরের চৌকাঠের ওপর। এবারে দু'পা এগিয়ে এসে, একটু দম নিয়ে ফের বললে, কিটি বুঝি পালিয়ে এসেছে?

কিটিকে চিনতে পারলুম না। আশ্চর্য হয়ে বললুম, কই না! কেউ তো আসেনি এখানে।

মেয়েটি ঘরের মাঝখানেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল: কী দুষ্টু! কোথায় পালাল, কে জানে, আমায় এমন করে হয়রান করছে!

দাঁড়িয়ে উঠে বললুম, অনুমতি দাও তো, তোমার কিটির খোঁজ করতে পারি।

না, না, নিজেই সে ফিরে আসবে। এমন লক্ষ্মীছাড়া বেড়াল—ছানা দুনিয়ায় নেই।

কিটি তবে প্রতিবেশিনীর পোষা বেড়াল ছানা! যাক, আশ্বস্ত হওয়া গেল। মেয়েটি এখনো ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেন? আর কিছু বলবার আছে নাকি ওর?

একখানা চেয়ার দেখিয়ে বললুম, দাঁড়িয়ে কেন? বোসো না মিস—

ম্যাগি।—হাসি হাসি মুখে ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমার নাম ম্যাগি। তুমি কিন্তু যা খুশি বলে ডাকতে পার।

আমার ওপর ওই অকারণ পক্ষপাতের মানে বুঝতে পারলুম না। বললুম, এবার থেকে তোমায় তাহলে মাতঙ্গিনী বলেই ডাকবে, কেমন?

ওর মানে কি? ম্যাগি শুধোল।

বলে ফেললুম, মাতঙ্গিনী আমাদের দেশের সৌন্দর্যের দেবী।

ম্যাগিচট করে চেয়ার ছেড়ে জানলার ধারে গিয়ে আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁনাল। কানের কাছে দু'পাশের বাদামি রঙের চুলের গোছা সাজিয়ে নিলে, জ্যাকেটের বন্ধনী আর একটু আঁট করে বাঁধলে, আর একটু ফুলিয়ে তুললে ঘাঘরার ঘের। তারপর কাঁধের ওপর দিয়ে তেরছা চোখে চেয়ে বললে, বয়সের তুলনায় আমায় অনেক বড় দেখায়, আমার বয়স কিন্তু সত্যিই অত বেশি নয়, সবে ছাব্বিশে পা দিয়েছি।

সব দেশেরই মেয়েদের দেখছি বয়স সম্বন্ধে দুর্বলতা আছে। বয়েসের কথায় ওদের চরিত্রের একটি বিশেষ রূপ ধরা পড়ে।

কিন্তু প্রতিবেশিনীর বয়স সম্বন্ধে ভুলে কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলেছি বলে মনে হচ্ছে না তো! এমন অযাচিত বিজ্ঞাপনের দরকার কি? হাসি চেপে তবু বললাম, সৌন্দর্যের বয়স নেই মিস মাতঙ্গিনী।

ম্যাগি এবার মুখ না ফিরিয়ে থাকতে পারল না। সে এক অপরূপ ভঙ্গি! আনন্দে ওর ছোট চোখ দুটো ফুলো ফুলো গালের আড়ালে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে, সারা মুখখানা হয়ে উঠেছে টসটসে। কাঁধ দুলিয়ে ও বলে উঠল, তুমি ভারি চমৎকার কথা বলতে পার তো!

একটু থেমে ম্যাগি ফের প্রশ্ন করলে, তুমি বুঝি তুর্কিরাজ্য থেকে এসেছ?

বললুম, না ইন্ডিয়া থেকে।

ও, ইন্ডিয়া! (ম্যাগি অবাক হয়ে গেছে) শুনেছিলাম, ইন্ডিয়া অসভ্য নিগ্রোদের রাজ্য, কিন্তু তুমি—

ম্যাগি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলতে লাগল, গুড হেভেন্স! ইন্ডিয়ার পুরুষরা যে এত লাভলি, আগে জানতুম না। জানো, কালো চোখ আর কালো চুল আমি এত ভালোবাসি!

ম্যাগি যেমন হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল, থেমে গেল তেমনি হঠাৎ। মিনিট কয়েক চুপচাপ। ম্যাগি তেমনি দাঁড়িয়ে মুখ নামিয়ে জ্যাকেটের ঝালরের একটা কোণ খুঁটছে। কেন দাঁড়িয়ে এখানে, তা ওই জানে।

একটু পরে মুখ তুলে ম্যাগি বললে, তোমার বিছানাটা কি অগোছালো, গুছিয়ে রাখতে পার না? সারাদিন বসে বসে কি কর?

হেসে বললুম, কুঁড়েমি। চমৎকার কাজ নয়?

ম্যাগিও হেসে উঠল। তারপর নিজেই গেল বিছানা গুছোতে। আবার চুপচাপ। ম্যাগি বিছানা গুছোয় আর আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকায়। বালিশ দুটো রাখলে যথাস্থানে, চাদরটা ঝাড়লে, কিন্তু ফের না পেতে, ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলে, আচ্ছা, দুপুরবেলা তোমার একা একা লাগে না? আমার কিন্তু একা থাকতে ভারি বিশ্রী লাগে।

ইচ্ছে হল বলি, ভাষা তোমাদের নতুন হলেও কথা তোমাদের পুরোনো। তুমি কি বলতে চাও, তা আমি জানি ম্যাগি। সব কথা কি না বললে বোঝা যায় না? কিন্তু কিছুই বলা হল না। আজকের খবরের কাগজখানা টেনে নিলুম শুধু। বিছানা পাতা শেষ করে ম্যাগি চলে গেল না, জানলার ধারে এসে দাঁড়াল। কতক্ষণ নিঃশব্দে কেটে গেল, খেয়াল করিনি!

চেয়ে দেখি, দরজার কপাটের আড়ালে খয়েরি—লালে মেশানো ঘাঘরা সরে যাচ্ছে। ছাব্বিশ বছরের যৌবনপীড়িত দেহভার নিয়ে ম্যাগি ফিরে গেল।

ফিরতে রাত হয়েছিল। হোটেল থেকে প্রায়ই মধ্যরাত্রির আগে ঘরে ফেরা হয়ে ওঠে না। আজকে একাই ফিরছি। সিঁড়ির মুখটা অন্ধকার, কোথা থেকে সরু একটি আলো—রেখা বাঁকা ভাবে এসে পড়েছে। মনে হল, সেই আবছায়ায় একটি নারীমূর্তি চাপা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললে, দুপুরবেলায় আমায় তাড়িয়ে দিলে কেন?

এবার চিনলুম ওকে। অবাক হয়ে বললুম, তাড়িয়ে দিয়েছি? তোমায়?

তাড়িয়ে দিলে না তো কি!...ওর মানেই তাড়িয়ে দেওয়া! আমি কি সত্যিই কিটিতে খুঁজতে গিয়েছিলুম?

ম্যাগির কণ্ঠ বুজে এল। আশ্চর্য মেয়ে! আমাকে এই কথা শোনাতেই ও কি এত রাত অবধি পথের পাশে জেগে রয়েছে! ওর কপালের ওপর থেকে কয়েকটি অগোছালো চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বললুম, ঘরে যাও ম্যাগি। অনেক রাত হল।

এছাড়া কী—ই বা বলবার আছে? শুনতে পেলুম অন্ধকারে চলে যেতে যেতে ও অস্ফুট স্বরে বলছে: আমি যে এমন, সে জন্যে কি আমি দায়ী? আমি কি করব?...

ভেবেছিলুম, আজ দুপুরে ম্যাগির আবির্ভাব নিয়ে কবির হাসির খোরাক জোগাব। কিন্তু নাঃ, থাক।

তিন

জুয়ার আড্ডায়।

এখানকার এক বইয়ের দোকানে অ্যাডলফ আমায় একটা কাজ খুঁজে দিয়েছে। দিনকতক সেই কাজেই লেগেছি, যা হোক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। এখানে হপ্তায় হপ্তায় মাইনে চুকিয়ে দেওয়ার নিয়ম। কাল ছিল শনিবার, দোকানের পে—ডে। টাকার পরিমাণ এমন কিছু বেশি নয়, তবু আপাতত এতেই চলবে। গত কয়েকদিন জঠরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিতান্ত উদাসীন হয়ে থাকতে হয়েছিল। আর্মচেয়ারে শুয়ে আর স্রেফ সিগারেট টেনে টেনে জীবন সম্বন্ধে প্রায় দার্শনিক হয়ে উঠেছিলুম আর কি! যাক, আবার কিছুদিন চলবে, অন্তত ঘরভাড়ার তাগাদা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে তো!

সন্ধ্যার পর ঘরে আজ বাতি জ্বালিনি। পরিপূর্ণ ভাবে আলস্য উপভোগ করছি। সুকোমল একটি আবছায়া ঘনিয়ে এসেছে—বিস্মৃত স্মৃতির মতো। বসে বসে ম্যাগির কথা ভাবছি—সেই নিষ্ফলযৌবনা, সেই একা মেয়েটির কথা। আজকে আবার কার ঘরে কিটিকে খুঁজতে গেছে, কে জানে!

সিঁড়িতে কার শিস দেওয়ার আওয়াজ পাচ্ছি, তারপর গুনগুনিয়ে গান:

অনেক দূরের দ্বীপে যেখানে ফুটছে ফুল

রাতের হাওয়ায়—

নতুন দ্বীপের মেয়ে, সেখানে কী মোর

গান পৌঁছায়?

কবি আসছে। কাল থেকে ওর পাত্তাই পাইনি। ঘরে ঢুকেই কবি তাড়া দিলে: ওঠো, ওঠো জয়। কী বুড়োর মতো শুয়ে আছ! চলো শিগগির।

ব্যস্ত হলুম না, কারণ কবিকে আমি জানি। ও কথা কয় এক নিশ্বাসে, হাসে ঘর মুখ করে। কাজেই ব্যস্ত না হয়েই প্রশ্ন করলুম, ব্যাপার কি? যেতে হবে কোথায়?

বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে কবি জবাব দিলে, পথে। দেখছ না, কী চমৎকার আজকের এই সন্ধ্যাটা! বাইরে ঝিরঝিরে তুষার, আর পকেটে—, কবি একবার ট্রাউজারের পকেট চাপড়ালে: শুনেছ?

হেসে বললুম, আমার অবস্থাও আজ সচ্ছল। কিন্তু তুমি কি হঠাৎ আলাদিনের প্রদীপ কুড়িয়ে পেলে?

কাল সারারাত 'গ্রিন অর্চাড' থিয়েটারের ক্যাবারে মেয়েদের নতুন একটা নাচ শিখিয়ে দিয়েছি। আজ সকালে ক্যাশ পেমেন্ট!...কিন্তু আর শুয়ে থাকলে চলবে না, ওঠো।

উঠতে হল এবার। ওভারকোটের উঁচু কলারে কান ঢেকে, দুটো সিগারেট ধরিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়লুম।

এ বছর রেনোতে এই প্রথম তুষারপাত। সাদা তুষারের গুঁড়োগুলো যেন সিন্ধু—শকুনের সাদা সাদা পালকের টুকরো! বাংলাদেশে নতুন বৃষ্টির মতো এদেশেও প্রথম তুষারের একটা মাদকতা আছে। দলে দলে স্ত্রী—পুরুষ তাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে এই ঝিরিঝিরি তুষারে।

রবিবার ছুটির দিন। শহর গমগম করছে—হাসিতে, কোলাহলে, গানে আর নাচের বাজনায়। ছুটির দিন বটে, অনেক দোকানে তবু কেনা—বেচা চলছে। থিয়েটার, সিনেমা, রেস্তোরাঁ আর সেলুন থেকে তীব্র আলো এসে ছিটিয়ে পড়েছে বড় রাস্তার ওপর। রাতের রেনোর এই রূপ!

কবিকে শুধোলুম, আজকের প্রোগ্রাম কি?

অ্যাডলফ জবাব দিলে, নতুন মদ, নতুন গান, আর নতুন—

হেসে বললুম, বুঝেছি।

সামনেই বড় বড় হরফে লেখা: Primrose Path. লাল অক্ষরগুলো ক্রমাগত জ্বলছে নিভছে। 'প্রিমরোজ পাথ' রেনোর অভিজাত হোটেলেগুলির মধ্যে একটি। কাচের ঘোরানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলুম। জ্যাজ নাচের রেকর্ড বাজছে। ফারকোট, ক্লোক আর মাফলারের ভিড়। ঝলমলে গাউন আর কালো সান্ধ্য—পোশাকের মাঝখান দিয়ে পথ করে ওয়েটার একধারের একটা টেবিলে আমাদের বসিয়ে দিয়ে গেল। কবি দুটো ককটেল—এর অর্ডার দিলে। হলের বাঁ দিকটায় অনেক লোক জমেছে, মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে উঁচু গলার দু'—একটা উত্তেজিত কথা।

কবিকে প্রশ্ন করলুম, ওদিকটায় কি ব্যাপারে?

সেদিকে না তাকিয়েই কবি বললে, হাউসি—হাউসি খেলা চলেছে, কেউ কেউ বলে কেনো। তাসের জুয়া আর কি!

অবাক হয়ে বলে উঠলুম, এমনি খোলা জায়গায় জুয়া চলছে! পুলিশ—

পুলিশ কি করবে?—অ্যাডলফ ঠোঁট কুঁচকে বললে, তিন মাস অন্তর স্টেটকে পনেরো ডলার আর লাভের শতকরা সাড়ে সাত ভাগ শহরের কর্তাদের দিলেই এখানে যে কেউ কেনোয় আড্ডা খুলতে পারে। তবে, তাস ছাড়া অন্য ধরনের জুয়া—খেলায় স্টেটকে দিতে হয় তিরিশ ডলার আর লাভের শতকরা দশ ভাগ শহরের কর্তাদের। আর...' কবি গ্লাসে একটা চুমুক দিলে: রেনোতে একটা পানশালা খুলতে কত খরচ জানো? বছরে দুশো ডলার আগাম, ব্যস! তারপর বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন তুমি দোকানের দরজা খুলে রাখ, কেউ আপত্তি করবে না!

জুয়ার নেশা একরকম ভুলে গেছলুম। অথচ কবির যেমন মদ, আমার তেমনি ছিল জুয়া। মনে পড়ে, কলকাতায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে নেবুতলার বস্তিতে রাতের পর রাত তাস নিয়ে খেলেছি 'লাল কালো', আর পটলডাঙায় কোনো এক মেসের চিল—কোঠায় ভদ্রযুবকের সঙ্গে 'ফ্ল্যাস'। জীবনে যত না জিতেছি, হেরেছি তার ঢের বেশি। তবু তাতেই পেয়েছি বেশি উত্তেজনা, পেয়েছি ভাগ্য—পরীক্ষার নতুনতর উৎসাহ! ...যে উৎসাহ আমার আজও মরেনি।

কবিকে বললুম, চলো না, ভাগ্যের সঙ্গে একবার আলাপ করে আসি।

গ্লাসটা নিঃশেষ করে কবি জবাব দিলে, তার চেয়ে কোনো নতুন মুখের সঙ্গে আলাপ করা ঢের ভালো।

বললুম, তাহলে আমিই ঘুরে আসি।

গুড লাক!—বাঁ হাতখানা নেড়ে কবি শুভেচ্ছা জানালে।

বড় একটা টেবিলে খেলা চলেছে। ধারে সারি সারি চেয়ার পাতা, নানা বয়সী স্ত্রী—পুরুষে ভর্তি। ভিড় এখানেই বেশি। টেবিলের ওপর তাস আর নোটের তাড়া ছড়ানো। চোখে চোখে উৎসুক দৃষ্টি, মুখে মুখে আলো আর ছায়া। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম। শুনেছি, হাউসি—হাউসি বা কেনো এখানে ভারি প্রিয়। প্রত্যেক কেনো—কার্ডের দাম দশ সেন্ট, জিতলে প্রত্যেক দানে পাঁচ ডলার লাভ।

একটা বৃদ্ধা বিড়বিড় করে বকতে বকতে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। ফ্যাকাশে মুখ, নিভে—যাওয়া চাউনি। এর শেষ বয়সেও অদৃষ্ট ওকে ঠাট্টা করতে ছাড়েনি হয়তো! ওদিকে তখন একটি ছোকরা নোটের তাড়া পকেটে গুঁজছে, তার গা ঘেঁষে অল্পবয়সী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।

বুড়ির খালি চেয়ারটা আবার ভর্তি হয়ে গেছে। এবার এসে বসেছে একটি যুবতী। লাল স্কার্টটা তীব্র আলোয় আগুনের আভার মতো জ্বলছে। পেন্ট করা ভুরু, রুজ মাখা গাল, আর ঠোঁটে লম্বা সিগারেট। তার চেয়ারের পেছনে ডিনার—জ্যাকেট পরা অতিরিক্ত মোটা এবং বেঁটে লোক দাঁড়িয়ে। কিন্তু মেয়েটি যেন আমার চেনা! ...কে ও? ন্যান্সি না? ন্যান্সিই তো! গুচ্ছ গুচ্ছ আঙুরের মতো সেই সোনালি চুল। এক মুহূর্তে আমার শরীরের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। ভিড় ঠেলে এগিয়ে, ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলুম। কিন্তু ন্যান্সি কি আমাকে চিনতে পারেনি? ইচ্ছে হল বলি: তোমায় আমি কত খুঁজেছি ন্যান্সি—সেই হোটেলে, রেনোর পথে পথে, আমার নিশীথ স্বপ্নে! মুখ ফিরিয়ে ন্যান্সি তখন তাসের দান ধরেছে। আমাকে ও চিনতে পারেনি। চিনতে পারবেও না। ...আচ্ছা, এবার নতুন এক্সপেরিমেন্টই করব ন্যান্সি!

পকেট থেকে একমুঠো নোট বের করে বলে উঠলুম, এক ডজন কার্ড কিনতে চাই।

টেবিলশুদ্ধ লোক একবার আমার দিকে তাকাল। তাকাল না শুধু ন্যান্সি। খেলা শুরু হয়েছে। ন্যান্সি দান ধরেছে ছ'খানা তাসের, আমি ধরলুম বারোখানার। হেরে যাব, তা জানতুম, জীবনে কোনোদিনই প্রথমবার জিততে পারিনি। তা হোক, আরও বারোখানা কার্ড কেনবার পয়সা পকেটে এখনো রয়েছে। এবারেও ন্যান্সি ধরলে ছ'খানার দান, আমি তার ডবল। কিন্তু এবারেও হার হল আমার। পর পর এত বেশি আজ কেউ হারেনি। সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে; ন্যান্সির ঠোঁটের কিনারে বাঁকা হাসি!

সেই মোটা বেঁটে লোকটা খুশিতে বেলুনের মতো ফেটে পড়বার উপক্রম। সেলুনের মালিক আমার পিঠ চাপড়ে বলে উঠল: Try your luck again, Kid!

কথাটা ব্যঙ্গের মতো শোনাল, তবু পকেটে হাত দিলুম। যা বাকি আছে, তাতে আর বারোখানা কার্ডের দাম কুলোবে। কিন্তু তারপর? ...তারপর ভাববার অবকাশ নেই। ভাগ্যকে আজ আমার শেষ চ্যালেঞ্জ!

চার

হ্যাঁ, ভাগ্যকে আমার এই চ্যালেঞ্জ! ব্যর্থ যদি হতে হয়, তবে তার আগে বড় রকমের একটা এক্সপেরিমেন্ট করাই ভালো। ব্যর্থতার উত্তেজনা আমার শিরায়, স্নায়ুতে তীব্র মদের নেশার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এবারেও যদি হেরে যাই, তবে আমি জানি, ন্যান্সি, আমার ব্যর্থতাই তোমাকে আমার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে অনেকদিন। জীবনে এত বড় জয়ের সুযোগ তোমাকে নিশ্চয়ই খুব কম লোকই দিয়েছে, হয়তো আর কেউই দেয়নি।

তৃতীয়বার খেলা শুরু হয়েছে। টেবিলের চারপাশে গুঞ্জন গেছে থেমে। স্তব্ধ কয়েকটি মুহূর্ত। হঠাৎ সেলুনের মালিক অস্ফুট আনন্দধ্বনি করে উঠল; এবার জিত আমার।

আশেপাশে আবার শোনা যাচ্ছে কথার কলগুঞ্জন। ন্যান্সি একটু চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বেলুনাকৃতি লোকটার পকেট থেকে এবার বেরিয়েছে নোটের তাড়া। শুরু হল চতুর্থবারের খেলা। কিন্তু ভাগ্য এখন আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে, এবারে হারবার পালা ন্যান্সির।

পঞ্চমবার ও দান ধরলে বারোখানা তাসের, আমি চব্বিশখানার। কিন্তু এবারেও ভাগ্য ওকে ঠাট্টা করে গেল। আশেপাশে কলরব বেড়ে উঠেছে, কেউ কেউ আমায় জানাচ্ছে কনগ্র্যাচুলেশনস। এরই মধ্যে আমার নতুন নামকরণ হয়ে গেছে: Lucky stranger—সৌভাগ্যবান আগন্তুক।

আবার খেলা হল। আরো একবার। বিদ্রোহী অদৃষ্টকে ঘুষ দিয়ে বশ করবে বলে ন্যান্সি আরো বড় দান ধরল। কিন্তু ওর হাত কাঁপছে! তুষার—তীক্ষ্ন এই ঠান্ডা রাতেও কপালে ওর বিন্দু বিন্দু ঘাম! তবু হল না। একরোখা পুলিশ অফিসারের মতো অদৃষ্ট ঘুষ নিল না। আবার ন্যান্সি হেরে গেছে। ভাগ্য ন্যান্সির মতোই পূর্বপরিচিতকে ভুলে যায়! মোটা বেঁটে লোকটার নোটের তাড়া শীর্ণ হয়ে এসেছে।

সাতবারের পর আমিই প্রথম দান ধরলুম—একসঙ্গে আটচল্লিশখানা তাসের। আবার টেবিলের চারপাশে রুদ্ধশ্বাস স্তব্ধতা। ন্যান্সির পিছন ফিরে তার সঙ্গীর মুখের পানে চাইলে। সে—মুখ চিমনির মতো অন্ধকার। লোকটা নিঃশব্দে বারকয়েক মাথা নাড়লে শুধু। তার মানে, বিশ্বাসঘাতক অদৃষ্টকে সে আর ঘুষ দিতে রাজি নয়। ন্যান্সির মুখে কিন্তু এতটুকু চাঞ্চল্য দেখা গেল না, হঠাৎ সে আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সে আরেকটা সিগারেট ধরালে, তারপর অত্যন্ত সহজভাবে উঠে ভিড় ঠেলে চলে গেল। যখন সে এসেছিল, তখনও সে আমায় দেখতে পায়নি, চলে গেল যখন তখনও ফিরে তাকাল না।

ন্যান্সি আমায় দিয়ে গেছে কতকগুলো পাউন্ড আর ডলার, কিন্তু তার বদলে হরণ করে নিয়ে গেল আমার উৎসাহ, নিভিয়ে দিয়ে গেল আমার উত্তেজনা। চলে গেছে, যাক; কিন্তু আজকের এই জুয়াখেলার মোহ, কেনো—খেলার এই নেশা কেড়ে নিয়ে গেল কেন? এতবার জিতেও শেষ পর্যন্ত ন্যান্সির কাছে আমারই হার হল!

Hurry up lucky guy ! সুযোগ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। ভাবনা কিসের?—সেলুনের মালিক তাড়া দিলে।

চেয়ে দেখি ন্যান্সির চেয়ারে এবার এসে বসেছে এক বুড়ো ইহুদি। শকুনের মতো শুকনো শীর্ণ চেহারা। পকেট থেকে একখানা মাত্র নোট বের করে, সেই একখানা বারবার গুনছে। তাসগুলো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ফেলে বললুম, আর খেলব না।

সেলুনের মালিক অবাক হয়ে গেল: বলো কি! আজ তোমার বরাত খুলে গেছে, এ সুযোগ কি কেউ হারায়? এতগুলো কার্ড কিনলে?

উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, এই আটচল্লিশখানা কার্ডের দাম তোমায় ফেরত দিতে হবে না, কিন্তু আজ আর খেলব না আমি।

ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলুম। ছুটির সন্ধ্যায় 'প্রিমরোজ পাথ' গমগম করছে, জ্যাজ—ব্যান্ডের রেকর্ড এখনো থামেনি। অনেক ঘাঘরার রং, অনেক হাসির ঝিকিমিকি, অনেক চোখের আলাপ। কিন্তু সে নেই—আগুনের শিখার মতো সেই লাল স্কার্ট, গুচ্ছ গুচ্ছ আঙুরের মতো সেই সোনালি চুল, পাথরের মূর্তির মতো সেই আশ্চর্যসুন্দর অথচ আশ্চর্য—কঠিন ভঙ্গিমা। নাই বা রইল, তাতে আমার কি আসে যায়?

কবির খোঁজ করা দরকার। আমাদের টেবিলের কাছে ফিরে গিয়ে দেখি...বাঃ! রেনোতে কোনো সন্ধ্যাই কবিকে একলা কাটাতে দেখলুম না। জলপাই রঙের গাউন পরা ছিপছিপে গড়ন একটি অচেনা মেয়ের মুখোমুখি বসে কবি গল্প করছে। এর ডান হাতের আঙুলগুলির সঙ্গে ওর বাঁ হাতের আঙুলের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা।

বার্থা নয়—কবির দ্বাদশ প্রণয়িনী বোধ করি। মেয়েটির প্রায় নিরাবরণ বুক দেখে, ইয়াঙ্কি সভ্যতার মূল কথাটি বুঝতে পারলুম। আমাদের দেশ চাইছে মনের মুক্তি, আর আমেরিকা চাইছে দেহের মুক্তি।

আমার দেখে কবি বলে উঠল, এই যে জয়! ভাগ্যের সঙ্গে আলাপ হল? হার, না জিত?

একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বললুম, গোটাকতক পাউন্ড জিতেছি বটে, কিন্তু শেষ অবধি আমায়ই হারতে হল।

তার মানে? ভুরু কুঁচকে কবি শুধোলে।

ওকে ন্যান্সির কথা বললুম। শুনে কবির ঠোঁটে হাসি টলটল করে উঠল, তারপর সেই হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল ওর নীল চোখে। আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বললে, ভারমুথ এখন তোমার মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর। আচ্ছা জয়, তুমি কি ভাব মানুষের মন ছবির ফ্রেম? যে ফোটো বাঁধিয়ে রেখে দেবে, বরাবর তাই থাকবে! মেয়েদের মন হচ্ছে আয়নার মতো, যতক্ষণ সামনে থাকবে, তোমারই ছায়া পড়বে—যেই সরে যাবে, অমনি সে আয়নায় পড়বে নতুন মুখের ছায়া। সে রাতে তোমাকে ন্যান্সির ভালো লেগেছিল বলে আজ রাতে ভালো নাও লাগতে পারে। এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? কাল তুমি খেয়েছিলে নেভিকাট সিগারেট, আজ লাকিস্ট্রাইক খাচ্ছ কেন?

গ্লাসটা (বলতে পারি না, এটা দ্বিতীয় না সপ্তম গ্লাস) কবি আরেক বার মুখে তুললে। তারপর শুরু করলে: বার্থার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কেন জানো? বিয়াল্লিশ ঘণ্টার বেশি তাকে ভালো লাগেনি বলে। বার্থাকে আর ভালো লাগে না বলেই তো নতুন মুখ ভালো লাগল। পেলুম নতুনতর ভালোবাসার স্বাদ, পেলুম এই ক্লডেটকে।

ক্লডেট বাঁকা চোখে চেয়ে বললে, Naughty Adolf ! Pretty Adolf!

কবি বলে চলেছে: পুরোনো মুখ যত ভুলে যাবে, নতুন মুখ তত ভালো লাগবে। জীবনে যদি শুধু একজনকেই ভালো লাগে, তবে বুঝতে হবে মনের হয়েছে অপমৃত্যু! ন্যান্সিকে তোমার এখনো ভালো লাগে জেনে আমি দুঃখিত।...একটু ভারমুথ খাবে?

বললুম, না। তার চেয়ে করিডরে একটু বেড়াই।

কেনোর টেবিলের পাশেই লম্বা বারান্দা। টেবিলের চারপাশে এখনো ভিড়, রাতের সঙ্গে সঙ্গে খেলাও উঠেছে জমে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলুম। কত লোক চলে যাচ্ছে, কত লোক আসছে। ভাগ্যের চাকা ঘুরে চলেছে। হঠাৎ চোখে পড়ে গেল...দেখি, সাদা একখানা হাত সাপের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে আমার বুক পকেটের দিকে, সরু দুটি আঙুলের টানে পকেট থেকে নোটের তাড়া বেরিয়ে এল। এখুনি ভিড়ের মাঝে চকিতে অদৃশ্য হয়ে যাবে...কিন্তু তার আগেই সাদা হাতখানা আমার মুঠোর মধ্যে ধরা পড়েছে!

ন্যান্সি!...তুমি?

ন্যান্সির সারা মুখখানা তার গালের রুজের মতোই টকটকে লাল হয়ে উঠল, দেখতে দেখতে আবার কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল।

তার হাতে এখনো নোটের তাড়া। ন্যান্সি তাহলে চলে যায়নি, আমার জন্যে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল! এখন সে আমাকে চিনতে পেরেছে নিশ্চয়। কিন্তু আমি এই ন্যান্সিকে চিনি না, চিনতে পারব না। আমি চিনতুম তাকে—আলোর শিখার মতো শ্বেতবসনা, আলোর শিখার মতো পবিত্র সেই মেয়েটি, বিদেশে যে আমার যৌবনকে প্রথম সম্মান দিয়েছিল।

আমাদের ঘিরে জন—জটলা কলরব, আর বহু কণ্ঠের প্রশ্ন: ব্যাপার কি? চুরি? ...পুলিশে ফোন করা হয়েছে?

ন্যান্সির হাতখানা আস্তে আস্তে ছেড়ে ছিলুম। তারপর স্পষ্ট গলায় বললুম, আপনারা অকারণে ব্যস্ত হবেন না, নোটগুলো ওকে আমিই দিয়েছি।

সবাই একবার পরস্পরের মুখের পানে তাকালে, তারপর সরে গেল। একটা রোমাঞ্চকর ঘটনার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ায় অনেকেই ক্ষুণ্ণ হল হয়তো, কেউ কেউ হয়তো আরো রোমাঞ্চকর কিছু ভাবলে।

এতক্ষণ ন্যান্সি মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েছিল, এইবার মুখ তুললে। পাথরের মতো কঠিন মুখ, পাথরের মতো কঠিন চোখ। হাতের নোটগুলো ছড়িয়ে ফেলে দিয়ে আমার দিকে চেয়ে স্পষ্ট গলায় বললে, তুমি মিথ্যেবাদী! তোমার নোটগুলো আমি চুরি—চুরি করেছি। আমায় পুলিশে ধরিয়ে দিতে পার।

বলতে পারতুম, তোমায় পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারি না, তা তুমি জানো ন্যান্সি, আমার চেয়ে ভালো করেই জানো!—কিন্তু কিছুই বলতে পারলুম না। ন্যান্সি আরেকটা সিগারেট ধরালে, ফারফোট গায়ে দিলে, তারপর দরজার দিকে এগোল। কানের কাছে কারা বলাবলি করছিল: ও, ওই মেয়েটা! নাচের আসরে আর জুয়ার আড্ডায় ঘুরে ঘুরে পকেট মারাই তো ওর পেশা!

চিৎকার করে ডাকতে গেলুম, ন্যান্সি—! গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। শুধু দেখলুম, কাচের দরজাটা একবার ঘুরে গেল।

পাঁচ

এখানকার আস্তানা আমার উঠল, এবার আমায় যেতে হবে, শুনছ অ্যাডলফ? রেনো আর ভালো লাগছে না!

পায়চারি করতে করতে কবি আমার সামনে এসে থেমে গেল। ওর ঠোঁটের কিনারে সেই তরল হাসিটি ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাউজারের দুই পকেটে দুই হাত পুরে বললে, কেন? কাল রাতে ন্যান্সি তোমায় প্রেম নিবেদন করেনি বলে?

তারপর আবার পায়চারি করতে করতে গেয়ে উঠল:

‘Love them and love them...’

বললুম, না, ভবিষ্যতে তার সঙ্গে দেখা হতে পারে, তাই—।

অর্থাৎ ভবিষ্যতে দেখা হলে পাছে সে আবার প্রেম নিবেদন করতে আসে, সেই ভরেয়? কিন্তু এবার থেকে নোটগুলো বুক পকেটে না রেখে মোজার ভেতরে রাখতে পারো। অত্যন্ত নিরাপদ জায়গা!

তোমার এই পরিহাসপটুতাই তোমার আকর্ষণ, তা জানি কবি, কিন্তু নোটগুলো বাঁচানো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। অতগুলো লোকের অপমান থেকে ন্যান্সিকেই আমি বাঁচাতে চেয়েছিলুম শুধু।

তার মানে, অতগুলো লোকের অপমান থেকে তাকে বাঁচিয়েছিলে নিজে অপমান করতে! তোমার দান—করা নোট সে নিতে যাবে কেন? পকেটমারা তার পেশা বটে, ভিক্ষে করা তো নয়!...ন্যান্সির কাছে তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত জয়, নোটগুলো ফেরত দিয়ে গিয়েছিল বলে নয়—দাতা বলে অহঙ্কার করবার সুযোগ তোমায় দেয়নি বলে!

বললুম, শেষের কথাগুলি বোধ করি 'মথি—লিখিত সুসমাচার' থেকে উদ্ধৃত। কিন্তু সোজাকে বাঁকাভাবে দেখলে বুঝতে হবে, দৃষ্টিই গেছে বাঁকা হয়ে।...জীবনের এক—একটি মুহূর্ত নিয়ে মানুষ নিজস্ব এক—একটি ধারণা গড়ে তোলে, সেই ধারণাই তো তার জীবনের সঞ্চয়! সেই ধারণা ভেঙে গেলে তার আর রইল কি? আদিম বর্বরতা বরং সহ্য করা চলে, কিন্তু গিলটি—করা সভ্যতা বারবণিতার মতোই অসহ্য।

কবি হঠাৎ হাততালি দিয়ে বলে উঠল ব্রাভো! তোমার বাকপটুতা, আমার পরিহাস—পটুতার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয় দেখছি!...কালকের উত্তেজনা তোমার এখনও কাটেনি বোধ হয়, ভারমুথের গুণ একবার পরীক্ষা করে দেখলে পারতে! কিন্তু জয়..., কবি এবার বিছানার ওপর আমার মুখোমুখি হয়ে বসল: ইয়াঙ্কি সভ্যতার তুমি যত খুশি নিন্দা কর ক্ষতি নেই;—আজকের মানুষের এই সভ্যতা যে গিল্টি—করা, তা আমিও জানি বইকি! তা বলে মানুষকে ছোট করে দেখো না, এই নকল সভ্যতার চেয়ে মানুষ ঢের বড়—ঢের ভালো। কাল রাতে যে—ন্যান্সি তোমার পানে ফিরে তাকায়নি, যে—ন্যান্সি তোমার পকেট থেকে নোট চুরি করতে গিয়েছিল, তাকেই তুমি আজ সত্যি বলে ভাবছ! আর, সেই চাঁদের রাতে—যে রাতে সেই হোটেলের নাচের আসরে তোমাদের প্রথম আলাপ—সে রাতে ন্যান্সি তোমায় তার যৌবনের কয়েকটি যে মুহূর্ত উপহার দিয়েছিল, সেই মুহূর্তগুলি হয়ে গেল মিথ্যে! কালকের ন্যান্সির পানে তাকিয়ে তুমি সে রাতের ন্যান্সিকে নাই বা অবিশ্বাস করলে, জয়? কে সত্যি আর কে মিথ্যে, সে ধারণায় তোমার ভুল থেকে যেতে পারে।

বললুম, তর্ক আজ আর আমি করব না অ্যাডলফ। আমি কেবল বলছিলুম যে, আমার যাবার সময় হয়েছে। আমার কাছে রেনোর আর কোনো মোহ নেই।

আমার কাঁধে একখানি হাত রেখে কবি বললে, যাবে কোথায়?

কিছুই ঠিক করিনি। যেদিন এখানে এসেছিলুম, সেদিনও কিছু ঠিক ছিল না। পথই আমার পথ চিনিয়ে দেবে।

তবে তোমায় আটকাব না। —আমি আছি তোমার পাশে। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় বল দিকি?—মিনিটখানেক ভেবে কবি আবার বললে, পরশু খবরের কাগজে দেখেছিলুম, 'গ্রিনউইচ ভিলেজ'—এ একটা কার্নিভ্যাল পার্টি এসেছে, তারা লোক খুঁজছে। চলো না, তাদেরই দলে ভিড়ে যাওয়া যাক।

বললুম, বেশ, সেখানেই চলো। কবে যাবে, কখন?

ওভারকোটটা গায়ে দিতে দিতে কবি জবাব দিলে, আজই—এখুনি। ছেড়ে যেতেই যদি হয়, তবে আর দেরি কেন?

ন্যান্সির ফেরত দেওয়া নোটগুলো কাল কুড়িয়ে আনিনি। ককটেল—এর বিল চুকিয়ে কবির পকেটে যা আছে, তাও যৎসামান্য। তবু, দুজনের পকেট হাতড়ে যা মিলেছে, গ্রিনউইচের ভাড়া তাতেই কুলোবে।

দুজনে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। তুষার—ঝরা থেমে গেছে, তার বদলে সকাল থেকেই নেমেছে ঘন কুয়াশা। কুয়াশা—ধূসর বিষণ্ণ রেনোকে আজ বৃদ্ধা গণিকার মতোই কুৎসিত লাগছে। বিদেশে রেনোই আমায় প্রথম আতিথ্য দিয়েছিল, রেনোই আমায় ফের পথে বের করেছে। তবু, দীপ নেভা কয়েকটি উৎসব—রাত্রির কথা স্মরণ করে টুপি খুলে, মনে মনে বললুম, গুড বাই!

কবি কিন্তু একটিবারও পেছন ফিরে তাকায়নি। যাকে ও ছেড়ে যায়, তাকে এমনি করেই ছাড়ে। রেনোকে ও ভুলে গেছে, ভুলে গেছে বার্থাকে, হয়তো ক্লডেটকে পর্যন্ত! এগিয়ে চলতে চলতে গুনগুনিয়ে গান ধরেছে:

দূর থেকে ফের হাতছানি দিল

নতুন তীর,

বনহংসী গো, কোথায় আবার

বাঁধবে নীড়?

ছয়

গ্রিনউইচ ভিলেজ।

গ্রিনউইচ ভিলেজ—এ যখন পৌঁছলুম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ছোট মফঃস্বল শহর। স্টেশনের ধার ঘেঁষে কার্নিভ্যালের তাঁবু পড়েছে। প্ল্যাটফর্ম থেকেই দেখা যাচ্ছে আলোর জৌলুস। কানে আসছে বিচিত্র কলরব। কার্নিভ্যালের দর্শনী কিন্তু সস্তা—দু' সেন্ট মাত্র। দুজনে ঢুকে পড়লুম। ভেতরে রং—বেরঙের বেলুন, টিনের ভেঁপুর আওয়াজ, 'মেরি গো রাউন্ড'—এর কনসার্ট, গ্রাম্য নরনারীর ভিড়। প্রকাণ্ড এই গোলঘরের মধ্যে সারা শহরের জনতা যেন আবর্তিত হচ্ছে।

ফটকের ভেতরে পা দিয়ে কবি বললে, তুমি যাও ডান দিকে, আমি বাঁয়ে। দেখা যাক, কার সঙ্গে ভাগ্যের দেখা হয়!

ফেরবার সময় আবার এই ফটকের কাছেই দুজনের দেখা হয় যেন।—বলে ভিড়ে গা ভাসিয়ে দিলুম।

দু'ধার থেকে শুরু হয়েছে খাবারের দোকান, কফিখানা, শৌখিন খেলনার স্টল, তারপর সারি সারি খাকি রঙের মোটা চটের পর্দা ঘেরা ছোট ছোট ঘর। তারই মধ্যে বিচিত্র অনুষ্ঠান: ম্যাজিক, নাচ, আরো অনেক কিছু। জনসাধারণের জন্য নয়, বিশেষ দর্শনী যারা দিতে পারে, কেবল তাদেরই জন্য। দেখে, আমাদের গাঁয়ে চণ্ডীতলায় মেলার কথা মনে পড়ল।

ভেসে ভেসে চলেছি। মাঠের মাঝখানে ঘুরছে, 'মেরি গো রাউন্ড'—এর রং করা কাঠের ঘোড়া আর দুলছে নাগরদোলা। এপাশে চলেছে 'হেল্টার—স্কেল্টারে'র খেলা, অনেকে বলে, Joy Ride। উঁচু ঢালু একটা মসৃণ কাঠের তক্তা বেয়ে লোকেরা পিছলে এসে পড়ছে নিচেকার নরম খড়ের গদির ওপর—একসঙ্গে অনেকে ঠাসাঠাসি করে। ভঙ্গিটা নীতিবাগীশদের দৃষ্টিপীড়ার কারণ হতে পারে। অল্পবয়স্কা যুবতীদের ভিড়, দেখলুম, এইখানেই বেশি, সঙ্গে অবশ্য দু'একটি করে 'বয়—ফ্রেন্ড' আছেই।

আরো খানিকটা এগোতেই খানিকটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লুম। পর্দা—ঘেরা একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে জিপসি পোশাক পরা একটি বুড়ি মোটা ভাঙা গলায় বলছিল: অন্ধকারে কোথায় ছুটে চলেছ একলা? পাশে তোমার বন্ধু রয়েছে, তাকে চেন? চেন না? জীবনে তুমি সুখ খুঁজে পাওনি, অথচ সে তোমায় কালই সোনার খনির সন্ধান দিতে পারে, এনে দিতে পারে তোমার হারানো প্রেমিকাকে। ...এসো, এসো, আমার কাছে এসো, সেই বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই...

দাঁড়িয়ে পড়লুম, কথাগুলো অদ্ভুত শোনাল। বুড়ি হঠাৎ আমার সুমুখে এগিয়ে এসে বললে, পাবে, যাকে খুঁজছ, তাকে পাবে তুমি।

অবাক হয়ে শুধোলুম, কাকে খুঁজছি বলো তো?

হেসে বুড়ি বললে, কাকে আবার! তোমার সেই বন্ধুকে—ভাগ্যকে।

পাব! কোথায়?

পাবে বইকি। সন্ধান বলে দেব, এসো, এসো।—বলে, বুড়ি আমায় টেনে নিয়ে গেল তার পর্দা—ঘেরা ঘরের ভেতর। বিশেষ কিছু নেই, একটা টেবিলের ওপর শুধু একটা মড়ার খুলি, আর মুখোমুখি দু'খানা চেয়ার। আমায় বসতে বলে বুড়ি মড়ার মাথাটা দেখিয়ে বললে, জীবনের স্পষ্ট সত্য এই! ..ভারি অদ্ভুত লাগছে, না? এইমাত্র বাইরে দেখে এলে হাসি, আমোদ, রূপ, যৌবন—দেখে এলে কত নতুন মুখ, অথচ সবারই তলায় রয়েছে এই কঙ্কাল!

বহু পুরাতন সেই মড়ার খুলিটার শূন্য অক্ষিকোটরের পানে চেয়ে চেয়ে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলুম। বললুম, ভাগ্যের দেখা পাব কেমন করে, তা তো বললে না!

বুড়ি আমার সামনে বসে বললে, তিনটি প্রশ্ন আমার করতে পার—যে কোনো প্রশ্ন। তবে, আমার ফী দিতে হবে বারো সেন্ট।

পকেট হাতড়ে দেখি, সামান্য কিছু খুচরো পড়ে রয়েছে। বললুম, অত নেই, মাত্র পাঁচ সেন্ট আছে। আমি তাহলে যাই—

উঠতে যাচ্ছিলুম, বুড়ি আমার হাত ধরে বসিয়ে বললে, আচ্ছা, পয়সা না হয় নাই দিলে, খানিকক্ষণ গল্প করে যাও না। দেখো, আজ তিনদিন কার্নিভ্যাল খেলা হয়েছে, কিন্তু এদিকে কেউ আসে না। সবাই ভিড় করে ওদিকে, যেখানে নাচ, গান, হাসি হুল্লোড়! আমি এখানে শুধু মড়ার খুলি আগলে বসে থাকি—একা, একা। হ্যাঁ, কি জানতে চাও বলো?

আমার ভবিষ্যতের কথা জানতে চাই—বললুম।

বুড়ি আমার ডান হাতখানা তার চোখের সামনে টেনে নিয়ে রেখাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তারপর বললে, তোমার হাতে দুটো রেখা দেখতে পাচ্ছি, একটা উজ্জ্বল, আরেকটা অন্ধকার। উজ্জ্বল রেখাটি তোমার সুখ, আনন্দ—আর অন্ধকার রেখাটি তোমার দুঃখ, ব্যর্থতা!

হাসি পেল, এ আর এমন নতুন কথা কি? আনন্দ আর দুঃখ তো সবারই জীবনে আছে। আবার, প্রশ্ন করলুম, জীবনে আমি কি চাই বলো তো?

ঠিক এই প্রশ্নই তুমি করবে ভেবেছিলুম।—বুড়ি বলতে লাগল: তোমার বয়সী অনেক ছেলেই জানতে চেয়েছে, তারা কি চায়? আমি তাদের কাউকে বলেছি, টাকা, কাউকে বলেছি খ্যাতি, কাউকে বা সুন্দরী মেয়ে। তুমি?...তুমি চাও প্রেম। কেমন ঠিক নয়?

বুড়ির কথা শুনে যে কোনো যুবকের খুশি হওয়া উচিত। কিন্তু আপাতত একটা চাকরি জুটলেই খুশি হই। তবু বুড়ির কথায় সায় দিয়ে বললুম, ঠিক বইকি!

বুড়ি উৎফুল্ল হয়ে উঠল। বললে, আমার গণনা মিথ্যে হয় না। দেখ, সবাই চায় সুন্দরী মেয়ে, প্রেম চায় না কেউ। তুমি অবিশ্যি তাদের দলে নও। ...আমি জানি, কিসের খোঁজে তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছ। কিন্তু পাবে তুমি, পাবে। তোমার হাতে এই যে কালো রেখা দেখছ—এই রেখাটি যখন একেবারে মুছে যাবে, তখন হবে তোমার জীবনে সূর্যোদয়। সেদিন আসবে মেয়ে অনেক ভালোবাসা নিয়ে, ভারি ভাগ্যবান ছেলে তুমি!

এবার বুড়িকে আমার পাঁচ সেন্টই পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল। জীবনে বহু নারীর ভালোবাসা পেতে পারি বলে নয়—আমরা—বিংশ শতাব্দীর ছেলেমেয়েরা—বস্তু—তন্ত্রবাদের যুগে বাস করেও মনে মনে যে আজও স্বপ্নবিলাসী, বুড়ি তা ধরে ফেলেছে বলে। কিন্তু এই পাঁচ সেন্টে রাতের খাওয়াটা আজকে চালাতে হবে। মনোবিলাসের চেয়ে শরীর—ধর্ম যে বড়, আধুনিক সাহিত্যের এই সত্য মাঝে মাঝে স্বীকার না করে উপায় নেই!

বুড়ি বলছিল, যেদিন ভাগ্যকে খুঁজে পাবে, সেদিন আমার স্মরণ কোরো। আমার নাম মারিয়া—মারিয়া পত্রোভিচ।

বললুম, নিশ্চয় মারিয়া, সেদিন তোমায় নিশ্চয় স্মরণ করব। এখন উঠি।—আচ্ছা, এই কার্নিভ্যালের মালিক কে বলতে পার?

মারিয়া বললে, চেনো না? বুড়ো পপ। সেই মালিক।

ও! ধন্যবাদ।

বাইরে বেরিয়ে এলুম। রাতের সঙ্গে সঙ্গে কার্নিভ্যাল জমে উঠেছে। ওদিকে ভিড়, হাসি, কলরব। এদিকটা তেমনি ফাঁকা। কয়েক পা এগোতেই শুনতে পেলুম, একা—একা দাঁড়িয়ে মোটা ভাঙা গলায় বুড়ি মারিয়া আবার ডাকছে: অন্ধকারে কোথায় ছুটে চলেছ?...

ফাঁকা জায়গাটুকু পার হতেই দেখি, একটা ঘরের কাছে লোক জমে উঠেছে অনেক। পর্দার গায়ে বড় বড় লাল হরফে লেখ:

HAWAIIAN ENTERTAIN-MENT

ঘরের সুমুখে একটা উঁচু মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে একটি অল্পবয়সী মেয়ে। নিরাবরণ বললে ভুল হয় না। পরনে রূপালি সার্টিনের ফুলে—ওঠা খাটো ঘাঘরা, আর বুকে শুধু জরির নকশা কাটা সার্টিনের একটা টুকরো বাঁধা, সংস্কৃত কাব্যের নায়িকার মতো। মেয়েটির গলায় পলার মালা, কানে রঙিন কড়ির দুল। ফর্সা মুখের চারপাশে ঘনকালো রুখু চুলের গুচ্ছ অন্ধকারের মতো ছড়ানো। আমরা যে সত্যিই আদমের বংশধর, নগ্নপ্রায় নারীদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তা উপলব্ধি করতে দেরি হল না। খুঁজলে হয়তো এই ভিড়ের মধ্যে দু'চারজন পাদ্রিসাহেবকে পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে!

মেয়েটির পেছনে ম্যান্ডোলা হাতে নিয়ে সাদা পালক লাগানো পোশাকে তিনটি লোক দাঁড়িয়ে। আর দর্শকের সুমুখে এগিয়ে এসে আধাবয়সী একজন জোয়ান পুরুষ মাথার স্ট্র—হ্যাটটা খুলে বিনীত ভঙ্গিতে বলছিল: ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রব্যক্তিগণ! মিস লু—নিসেন'—এর সঙ্গে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে গৌরবান্বিত বোধ করছি। মিস লু এসেছে সুদূর হাওয়াই দ্বীপ থেকে—যে হাওয়াই দ্বীপের মেয়েদের গানে বুনো পশুরা ঘুমিয়ে পড়ে, যে হাওয়াই দ্বীপের মেয়েদের নাচে পরীদের ঘুম ভেঙে যায়! ইউরোপের শহরে শহরে মিস লু—র খ্যাতির সীমা নেই, ইন্ডিয়া তার নামে পাগল, এবার আমরা তাকে ডেকে এনেছি আমেরিকার। হাওয়াই দ্বীপের অপূর্ব নাচ দেখবার সুযোগ পেয়েছে এই গ্রিনউইচ ভিলেজ—মাত্র কুড়ি সেন্টের বিনিময়ে এই সুযোগ কি আপনারা হারাবেন?

কুড়ি সেন্ট! লোকেরা একবার পরস্পরের মুখের পানে তাকালে। টিকিটের দাম শুনে তারা বিশেষ খুশি হয়েছে বলে মনে হল না। দরজার পাশে বসে টিকিট বিক্রেতা বৃথাই চিৎকার করছিল: Come on gentlemen! Hurry up!...

আধাবয়সী সেই লোকটি এবার স্ট্র—হ্যাট দোলাতে দোলাতে সুর করে শুরু করলে:

যেথা      বনভূমি ছেয়ে যায় এলাচি ফুলে,

আর      সাগরের গানে হাওয়া পড়ে গো ঢুলে,

সেথা      গেয়েছিলে গান তুমি প্রথম প্রেমের—

সেই      হাওয়াই দ্বীপের বনে সাগর—কূলে!

অমনি ম্যান্ডোলায় জাগল সুর আর মেয়েটির দেহে ঢেউ। ভিড়ে এবার চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। সুন্দরী মেয়ের নাচের কাছে কুড়ি সেন্ট যে নিতান্তই তুচ্ছ, এতক্ষণে ওরা বুঝতে পেরেছে! হঠাৎ দেখি, নাচের ফাঁকে মেয়েটি ঘরের ভেতর কখন সরে পড়েছে—ম্যান্ডোলা বাদকের দলও! টিকিট—বিক্রেতা চিৎকার করছে: Hurry up gentlemen, the show beging Jas’ Now !

সঙ্গে সঙ্গে টিকিট কেনবার জন্য দর্শকদের সে কী প্রাণান্তকর আগ্রহ। দেখতে দেখতে সবাই গেল ভেতরে চলে। আধাবয়সী লোকটি তখন মৃদু হেসে চুরুট ধরাচ্ছে।

সাত

খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছিলুম।—আধাবয়সী লোকটা কাঠের প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে এসে সেই টিকিট—বিক্রেতাকে প্রশ্ন করলে, কত বিক্রি হল?

টিকিট—বিক্রেতা খুচরো পয়সাকড়ির হিসেব করছিল, টিকিটের শূন্য রিলটা দেখালে শুধু। আধাবয়সী লোকটা খুশি হয়ে একবার শিস দিয়ে উঠল, তারপর বললে, ব্যস, আজকের মতো এই শেষ শো।

স্ট্র—হ্যাটখানা মাথায় দিয়ে লোকটা চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ ফিরে এসে টিকিট—বিক্রেতার গা ঘেঁষে শুধোলে, Hello old donkey! Go tha any tips?

টিপস মানে উপরি রোজগার জানতুম। টিকিট—বিক্রেতা বারকয়েক ঘাড় নেড়ে বললে, নাঃ, আজ কিছু সুবিধে হয়নি।

কাঁধ দুটো একবার নেড়ে লোকটা আবার পা বাড়াল।

এমনি সময় অদ্ভুত একটি মূর্তি নাচ—ঘরের দরজার পর্দা ঠেলে প্রায় গড়াতে গড়াতে বেরিয়ে এল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে চেচিয়ে উঠল, সর্বনাশ! সর্বনাশ!

আধাবয়সী লোকটা চকিতে ফিরে দাঁড়িয়ে শুধোলে, What’s up?

হায়, হায়, আমি মারা গেছি—একেবারে মারা গেছি—

ঘনঘন শ্বাসপ্রশ্বাসে বাকি কথাগুলো গেল আটকে। এখনো পাঁচ মিনিট কাটেনি। ভেতরে হাওয়াই দ্বীপের নাচ শুরু হয়েছে—ম্যান্ডোলার সুরের ছন্দে শুরু হয়েছে নগ্ন নারীদেহের লীলা—ভঙ্গী, এরই মধ্যে এমন কি সর্বনাশ ঘটল! ব্যাপারটা কিন্তু সুন্দরী যুবতীর নাচের চেয়েও মারাত্মক বলে মনে হচ্ছে। এগিয়ে গেলুম। সেই অদ্ভুত মূর্তিটি দৈর্ঘ্যে বোধ করি, পৌনে চার ফিটের বেশি হবে না। প্রস্থেও ঠিক সমান সমান। লোকটার ঘাড় বলে কিছু নেই, কাঁধের ওপরেই মাথাটা বসানো। গায়ে সেকেলে ধরনের লম্বা ঝুলের কোট, মাথায় গোল টুপি, আর প্রকাণ্ড গ্লোবের মতো প্রকাণ্ড ভুঁড়ির সঙ্কোচন—প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দুলছে মীনে করা ছোট একটি ক্রশ।

ক্ষুদে ক্ষুদে হাত দু'খানা টিকিট বিক্রেতার সামনে নেড়ে লোকটা বলছিল, ঈশ্বরের দোহাই, আমায় ঠকিও না! আমার নোটখানা ফেরত দাও—পাঁচ ডলারের সেই নোট—

এই অবধি বলেই সে হাঁপিয়ে পড়ল। উত্তেজনায় আর ঘন ঘন নিশ্বাসে তার ভুঁড়িতে যেন ভূমিকম্প হচ্ছে!

আধাবয়সী লোকটা কাছে এসে ফের শুধোলে, অত গোলমাল কিসের? নাচ দেখলে না?

চুলোয় যাক, তোমার নাচ! আমার এদিকে সর্বনাশ হয়ে গেল!...ওঃ, আমি মারা গেছি!—লোকটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠেছে। ক্ষুদে ক্ষুদে হাত দু'খানা এবার ঊর্ধ্বে তুলে সে বললে, আমায় ঠকালে তোমার ভালো হবে না, ঈশ্বরের কাছে তোমায় পাপী হতে হবে!

আধাবয়সী লোকটা প্রশ্ন করলে, কি হয়েছে, বলো না শুনি।

অতি কষ্টে দম নিয়ে গ্লোবসদৃশ, খর্বাকৃতি লোকটা বললে, নাচ আমার ভারি প্রিয়, বুঝলে? আমি আড়াই সপ্তাহ 'ট্যাঙ্গো' নাচ অভ্যেস করেছিলুম।...মিস ব্লু যখন নাচতে শুরু করেছিল...

ব্লু নয়, মিস লু!—আধাবয়সী লোকটা বললে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, মিস লু!—খর্বাকৃতি লোকটা বলতে লাগল: মিস লু'র নাচ যখন শুরু হয়েছিল, তখন আমি কেমন আত্মহারা হয়ে পড়েছিলুম, বুঝলে? তারপর পকেট থেকে একখানা পাঁচ ডলারের নোট বের করে টিকিট কিনে ঢুকে পড়লুম—তাড়াতাড়িতে নোটের ভাঙানি নেওয়ার কথা মনেই ছিল না! তা আমার না হয় খেয়াল ছিল না, তাই বলে তোমার এই টিকেট বিক্রেতা নোটখানা গাপ করবে!...কী অন্যায়, কী অন্যায়!

টিকিট—বিক্রেতা আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো বিস্ফারিত করে বললে, পাঁচ ডলারের নোট দিয়েছিলেন! কই, না! আপনার ভুল হয়েছে মশায়।

ভুল!—শিবের তাণ্ডব—নৃত্যে পৃথিবীর মতোই ভুঁড়ি এবার ভয়ানক কাঁপছে। বলল, পয়সা—কড়ির বিষয় হল মার্ক—এর কখনো ভুল হয় না। নতুন কড়কড়ে নোটখানা বের করে দিলুম, আর তুমি বলছ, ভুল হয়েছে!...দাও ভাই, দাও, আমার নোটের ভাঙানি দাও...

আপনি তো বড় মজার লোক মশায়!—টিকিট—বিক্রেতার বিস্ময়ের সীমা নেই: কোথায় নোট, তার ঠিক নেই, আর আপনাকে ভাঙানি দিতে হবে।...গোলমাল করবেন না—যান, শো এদিকে শেষ হয়ে এল!

তাহলে পাওয়া যাবে না! পাঁচ—পাঁচটা ডলার তাহলে সত্যি—সত্যি মারা গেল!...ওঃ!

পাঁচ ডলারের শোকে হল মার্ক—এর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। আধাবয়সী লোকটা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল, মনটা তার ভিজে উঠেছিল বোধ করি। হল মার্ক—এর কাঁধে একখানা হাত রেখে, নরম গলায় সে বললে, আচ্ছা, আচ্ছা, নোট যদি তুমি সত্যিই খুইয়ে থাক, তবে সে—ক্ষতি, এসো আমরা ভাগাভাগি করে নিই। এই নাও—, পয়সার বাক্স থেকে এক ডলারের একখানা নোট নিয়ে সে হল মার্ক—এর হাতে গুঁজে দিল: কেমন খুশি তো?

হল মার্ক—এর মুখে এবার হাসি দেখা দিল। পাঁচ ডলার থেকে কুড়ি সেন্ট বাদ দিলে যদিচ চার ডলারের বেশি বাকি থাকে, তবু এক ডলারেই সে খুশি। গদগদ কণ্ঠে 'ধন্যবাদ, মিস্টার ধন্যবাদ' বলতে বলতে সে তেমনি গড়াতে গড়াতে আবার নাচঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।

আধাবয়সী লোকটা তখন একটি চোখ ঈষৎ কুঞ্চিত করে, টিকিট—বিক্রেতার সুমুখে হাত পেতে বললে, Gee Jim, come on with the tips.

টিকিট বিক্রেতা আস্তে আস্তে তার কোটের আস্তিনের ভেতর থেকে একখানা নোট বের করে সেই প্রসারিত হাতের ওপর রেখে দিলে। নোটখানা পাঁচ ডলারেরই বটে! হল মার্ক সেখানা দেখলে নিশ্চয়ই চিনতে পারত! আধাবয়সী লোকটা নোটখানা নিঃশব্দে ট্রাউজারের পকেটে পুরে ফেলল। টিকিট—বিক্রেতা শুধোল, আমার ভাগ?

লোকটি তেমনি ঈষৎ—কুঞ্চিত চোখে তার পানে চেয়ে বললে, একাই দাও মারবার চেষ্টায় ছিলে, না?...এ নোট আমার। (তারপর আমার দিকে তাকিয়ে) এখানে দাঁড়িয়ে কেন? কি চাও?

বললুম, বিশেষ কিছু না। পপ—এর ঘরখানা দেখিয়ে দিতে পার?

পারি বইকি। কি দরকার?

কাগজে দেখছিলুম, কার্নিভ্যালের জন্যে লোক চাই—

ও, কাজের সন্ধানে এসেছ।—লোকটা একবার আমার আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে নিল: জাতে কি? মেক্সিকান?

আমার সরু নাক আর তামাটে রং দেখে আমার মেক্সিকান বলে ঠাওরানো কিছু বিচিত্র নয়। বললুম, না, ইন্ডিয়ায় আমার বাড়ি।

ইন্ডিয়া! সে যে অনেক দূর! বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ বুঝি?...দেখো, এই কার্নিভ্যাল বড় সুবিধের জায়গা নয়, টিঁকে থাকতে পারবে তো? আজ এখানে, কাল সেখানে—

বললুম, ভবঘুরে—জীবন আমার নেশা।

হুঁ। আচ্ছা, চল পপ—এর কাছে যাই।

আট

প্রকাণ্ড মাঠের একেবারে শেষপ্রান্তে ছোটখাটো একটা আলাদা তাঁবু। কার্নিভ্যালের কলরব থেকে দূরে বুড়ো পপ সেখানে একলা থাকে। আধাবয়সী লোকটা আমায় সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। দেখি, টেবিলের সামনে ক্যাম্বিসের চেয়ারে বসে ছোটখাটো একটি মানুষ আরেকজনের সঙ্গে নিবিষ্ট মনে দাবা খেলছে। চওড়া কিনারাওয়ালা প্রকাণ্ড টুপির ছায়ায় তার মুখ চোখে পড়ে না, লম্বা পাইপের আগাটুকু শুধু দেখা যাচ্ছে। কাঁচা তামাকের কড়া গন্ধে ঘরটার যেন দম আটকে গেছে।

আমরা যে ঘরে ঢুকেছি, তারা বোধ করি টের পায়নি। আধাবয়সী লোকটা এগিয়ে গিয়ে বললে, এই ছোকরাটি এসেছে—

চওড়া টুপি এবার কপালের ওপর উঁচু হয়ে উঠল। ছোটখাটো সেই মানুষটির চেহারা এবার স্পষ্ট দেখতে পেলুম। বয়স হয়েছে বিস্তর, কপালের রেখায় রেখায় সুদীর্ঘ জীবন—যুদ্ধের ইতিহাস লেখা। ছোট করে ছাঁটা পাকা দাড়ি, ঠোঁটের দু'পাশ দিয়ে জমকালো একজোড়া গোঁফ চিনেদের বেণীর মতো ঝুলে পড়েছে—কাঁচা তামাকের ধোঁয়ায় তার অনেকখানি হয়ে গেছে কটা রঙের। লোকটির ছোটখাটো শরীরের সঙ্গে এই জমকালো গোঁফ জোড়াটি ঠিক ব্যালান্স রাখতে পারেনি। ঘন সাদা ভুরুতে চোখদুটো প্রায় আচ্ছন্ন। মুখে ওক—কাঠের বহু পুরাতন একটা লম্বা পাইপ।

বুঝলুম, এই বুড়ো পপ।

বুড়ো মুখে তুলে আধাবয়সী লোকটাকে শুধোলে, খবর কি জো? কাজ ঠিক চলছে তো?

জো ঘাড় নেড়ে বললে, হ্যাঁ, ওল্ড পপ। এই ছেলেটি এসেছে—

ও!—বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল: দাবা খেলায় ওস্তাদ বুঝি? তা বেশ, বেশ। বসো হে ছোকরা, বসো—এই দানটা শেষ হলেই তোমার সঙ্গে খেলব।—তারপর তার প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশে: উঁহু, হল না, ঠিক চাল হয়নি। গজ ও ঘরে দিলে এদিকে কিস্তি পড়ে যাবে যে!

বুড়ো আবার খেলায় ডুবে গেল। আচ্ছা খেয়ালি লোক তো! জো আরেকটু কাছে সরে গিয়ে বললে, একটা দরকারি কথা বলতে এসেছি, ওল্ড পপ, শুনতে পাচ্ছ?

বুড়ো হঠাৎ চটে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, আঃ জো, আমায় কি এক মিনিটও বিশ্রাম করতে দেবে না! কেবল দরকার আর দরকার!

ধমক খেয়ে জো কিন্তু দমল না। বললে, এই ছোকরাটি দাবা খেলতে আসেনি। তবে এখানে কেন?

এসেছে কাজের সন্ধানে। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, আমাদের ক্যার্নিভ্যালের জন্য লোক দরকার, তাই—

জো, তুমি আমায় পাগল করবে দেখছি।—রাগে ঘনঘন পাইপে টান দিয়ে বুড়ো তামাকে ধোঁয়ায় ঘরটা অন্ধকার করে ফেললে: সকাল থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশজন এসে চাকরির জন্যে আমার খেলা মাটি করে দিয়ে গেছে, আবার—লোক আমি রাখব না, যাও!—বুড়ো আবার দাবার ছকের ওপর ঝুঁকে পড়ল: আহা—হা ঘোড়া মারা পড়বে যে!

জো একবার কাঁধ দুটো নেড়ে, আমার পানে তাকাল। তার মানে, হল না! তোমার বরাত খারাপ। ...কথাটা নতুন নয়, ভাগ্যের সঙ্গে আমার বরাবরই আড়ি। কিন্তু চাকরিটা এত সহজে ফসকালে তো চলবে না। আমেরিকার ভিখিরিদের পকেটেও পাঁচ সেন্টের বেশি থাকে। কাজ একটা জোগাড় করতেই হবে, নইলে কাল থেকে প্রায়োপবেশন।

জো—র ভরসা ছেড়ে দিলুম। বুড়োর সুমুখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললুম, আঙ্কল পপ, আমায় তুমি চিনতে পারছ না?

ঘন ভুরুর আড়াল থেকে বুড়ো আমার মুখের পানে চেয়ে রইল। চোখে তার তীক্ষ্ন সন্দেহ। খানিকক্ষণ পরে ঘাড় নেড়ে বললে, না বাপু, চিনতে পারছি না। কে তুমি?

আমি? তোমার যে ছোট বোন ছিল—স্টেলা, আমি তারই ছেলে।

বুড়ো ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল, আমার বোন! আমরা তিন ভাই শুধু। বোন—টোন কেউ নেই তো!

বললুম, তোমার সহোদরা নয়, খুড়তুতো বোন, মনে পড়ছে না?

উঁহু।—ঘাড় নেড়ে বুড়ো বললে, মনে পড়ছে না। তোমার মতলব ভালো নয় দেখছি।

গম্ভীর হয়ে বললুম, তুমি সত্যিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছ আঙ্কল পপ। নইলে তোমার অত আদরের বোন স্টেলা, তার কথা তোমার মনে নেই!

বার্ধক্যের প্রতি কটাক্ষ করায় বুড়ো বোধ হয় মনে মনে অপ্রতিভ হয়ে উঠল। বললে, এবার মনে পড়ছে বটে। তবে, তার নাম তো স্টেলা নয়, ক্যাথরিন।

আরেকটুকু হলেই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলুম, এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেল। যাক, নাম না মিলুক, বোন তো মিলেছে! বললুম, তুমি আদর করে ডাকতে ক্যাথরিন বলে।

ও! তাই বলো। আমাদের ক্যাথরিন? ছোটবেলায় যার ঘাড়ে একটা ফোড়া অপারেশন করা হয়েছিল?

অ্যাপেন্ডিসাইটিসও হতে পারে, কে জানে! তবু সায় দিয়ে বললুম, হ্যাঁ।

লিপজিগের এক সার্জেন্টকে সে বিয়ে করেছিল, না?

তোমার স্মরণশক্তি কী ধারালো, আঙ্কল পপ!

বুড়োর চোখ থেকে সন্দেহের ছায়া গেল মিলিয়ে। নরম গলায় বললে, ক্যাথরিনের ছেলে তুমি! বটে, বটে! কি নাম তোমার?

কবির দেওয়া নামই ব্যবহার করলুম। বললুম, জয়। আমায় তুমি খুব ছোটবেলায় দেখেছিলে কিনা, চিনতে পারোনি।

ওঃ, কতদিনের কথা সে!—বুড়োর চোখে স্মৃতির স্বপ্ন ঘনিয়ে এল: আমি তখন তোমার চেয়েও ছোট, জয়, ক্যাথি আর আমি রোজ সকালে যেতুম ইস্কুলে, আর দুপুরবেলা মাঠে মাঠে প্রজাপতি ধরে বেড়াতুম।—বুড়ো খামোকা চটে উঠল: তুমি তো আচ্ছা লোক জো! ক্যাথির ছেলে এসেছে, আমায় এতক্ষণ বলোনি? জানো, ওর শরীরে রয়েছে আমার বংশের রক্ত—পবিত্র জার্মান রক্ত।

বললুম, জো কি করে তা জানবে বলো?

ব্যাপার দেখে জো অবাক হয়ে গিয়েছিল। আমায় বললে, তবে যে একটু আগে বললে, তুমি ইন্ডিয়ান!

বিপদ বাধালে দেখছি! তাড়াতাড়ি বললুম, ইন্ডিয়ায় আমি বহুদিন কাটিয়েছি যে। বলি শোনো, ১৯০৮ সালে আমরা লিপজিগ থেকে মাদ্রিদ যাচ্ছিলুম। সেই সময় ভীষণ টাইফুনে আমাদের জাহাজ—ডুবি হল—খবরের কাগজে পড়েছিলে নিশ্চয়! (ঝড়টা কাল্পনিক হলেও বুড়ো ঘাড় নেড়ে সায় দিলে) জাহাজ ডুবির ফলে আমার বাপ—মা, আরো অনেক যাত্রী মারা পড়ল। দৈবাৎ বেঁচে গেছলুম আমি। তখন নিতান্ত শিশু! একটা পিপের মধ্যে আটকে গিয়ে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে চলেছি, এমন সময় আরেকটা জাহাজের একজন মাল্লা আমায় তুলে নেয়, তারপর নিয়ে যায় ইন্ডিয়ায়।

আমার গল্প শুনে পপ আর জো দুজনেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বলতে লাগলুম, বাপ—মা হারিয়ে আমি তখন একা, অসহায়! মানুষ হলুম ইন্ডিয়ার এক মিশনারি বোর্ডিং—এ। বড় হয়ে ভাবলুম, লিপজিগ—এ ফিরে যাই, কিন্তু সেখানে আমার কে—ই বা আছে! ছোটবেলায় মা'র মুখে আঙ্কল পপ—এর কথা শুনেছিলুম, কিন্তু কোথায় সে আছে, তাও জানতুম না। তারপর গ্রিনউইচ ভিলেজ—এর এই কার্নিভ্যালে কাজ খুঁজতে এসে দেখা!

বুড়োর চোখ দুটো ছলছল করছিল, ভেজা গলায় বললে, তুমি আজ থেকে এইখানেই থাকো জয়। আমার কাছে।

বেশ, তোমার কাছেই থাকব, আঙ্কল পপ।...আমায় দাবা খেলা শিখিয়ে দেবে? দাবা—খেলার ভারি ঝোঁক আমার।

বুড়ো অত্যন্ত খুশি হয়ে উঠল। বললে, নিশ্চয় ডার্লিং! তোমায় আমি চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় তৈরি করে দেব।

সোডার বোতলের মতো পেটের মধ্যে হাসি ঘুলিয়ে উঠছিল। তাড়াতাড়ি বললুম, আচ্ছা, আমি এখন কার্নিভ্যাল থেকে বেড়িয়ে আসি, তারপর খেলা শিখব।

বাইরে এলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম। যাক, ফাঁড়া কেটে গেছে। কিন্তু মনে মনে কোথায় যেন একটা কাঁটা বিঁধছিল। বুড়োর স্নেহপ্রবণতার সুযোগ নিয়ে এমন প্রতারণা নাই বা করলুম।

আমার তো একটা হিল্লে হল, এইবার কবির খোঁজ নিতে হবে। এত বড় কার্নিভ্যালের জনতায় মিশে কোথায় সে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কে জানে! পকেটে তার পাঁচ সেন্টও নেই জানি, তবু হয়তো কোনো নতুন বার্থা বা নতুন ক্লডেটকে সে এখন কবিতা শোনাচ্ছে!

আমার সঙ্গে সঙ্গে জো বেরিয়ে এসেছিল। চলতে চলতে আমার কানের কাছে মুখ এনে বললে, দেখো, হল—মার্কা এর সেই নোটের কথা পপ—এর কানে না তোলাই ভালো। নোটখানা তাকে ফিরিয়ে দেব বলেই নিয়েছি।

এখন আমি পপ—এর ভাগ্নে, সুতরাং. . . মনে মনে হেসে বললুম, কিছু ভেবো না, ও—সব আমার জানা।

পপ—এর তাঁবু থেকে খানিকটা এগোতেই দুটি লোকের সঙ্গে দেখা। একজন বয়স্ক; হাত বাড়িয়ে বোধ করি গ্যাসের আলোয় সিগারেট ধরাতে পারে—এমনি ঢ্যাঙা। তার গলার সঙ্গে অনায়াসে রিজাফের তুলনা দেওয়া যায়। এর পাশে হল মার্ক—এর চেহারা মনে পড়ল। বিধাতার আঁকা দুখানি কার্টুন! বয়স্ক লোকটির সঙ্গে সতেরো—আঠারো বছরের একটি ছোকরা।

জিরাফ—গলা লোকটি শুধোল, এই কার্নিভালের ম্যানেজার কে?

জবাব দিলে জো। বললে, জো ক্র্যাবি।

কোথায় সে?

আপনার সামনে দাঁড়িয়ে।

জিরাফ গলা লোকটি মিনিটখানেক চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বোমার মত ফেটে উঠল : জোচ্চচুরির আর জায়গা পাও নি, ঠগ কোথাকার! ভাল মানুষদের এমনি করে ঠকিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছ। কার্নিভ্যালের নামে ছেলে ধরা ফাঁদ পেতে রেখেছ!

ব্যাপার কি?—অকস্মাৎ এই আক্রমণে জো হতভম্ব হয়ে পড়েছে।

জিরাফ—গলা লোকটি তখন কথার তুবড়ি ফোটাচ্ছে : জানো, আমি আমি কে? উইলিয়াম ফ্র্যাঙ্ক মগ্যান—টোরোণ্টোর সবচেয়ে নামজাদা বাসিন্দা। জানো, আসছে বছর আমি শহরের শেরিফ হতে পারি? আর আমার ছেলেকে তোমরা ঠকাতে চাও!. . . কী দুঃসাহস তোমাদের। জানো—

ভারতবর্ষের খেয়াল—গায়কদের মতই মিঃ মর্গ্যানের দম যেন অফুরন্ত। জো এবার বাধা দিলে। বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বললে, জানি বইকি, ভাবি শেরিফ মশায়! কিন্তু কি হয়েছে, অনুগ্রহ করে, এইবার খুলে বলুন।

মিঃ মর্গ্যান অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে বলে উঠল, চালাকি করছে কেন? এই কার্নিভ্যালে কাল আমার ছেলের একটা ওপেনের আংটি খোয়া গেছে, জানো না? ভালো চাও তো আংটিটা ফেরত দাও শিগগির—

বাই জোভ! আমি কিচ্ছু জানি না। কে নিয়েছে?

তোমাদের এক নাচওয়ালি মেয়ে। কি নামটা তার, জিমি?

ছেলেটা উত্তর দিলে: লু নিসেন।

জো ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে বললে, লুনয়েছে! অসম্ভব! লু তেমন মেয়েই নয়। হয়তো ভিড়ের মধ্যে আংটিটা কেউ আঙুল থেকে খুলে নিয়েছে...আপনি মিছে আমাদের ওপর চটছেন মিস্টার মর্গ্যান!

মিঃ মর্গ্যানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি দেখা দিল। গলা একেবারে খাদে নামিয়ে বললে, তবে আদালতের রাস্তাই ধরতে হল। কিন্তু আমার জিনিস হজম করা কঠিন। আমি হচ্ছি উইলিয়াম ফ্র্যাঙ্ক মর্গ্যান—টোরোন্টোর সবচেয়ে নামজাদা বাসিন্দা।

ছেলেকে নিয়ে উইলিয়াম ফ্র্যাঙ্ক মর্গ্যান চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে জো ডাকলে, শুনুন, শুনুন মিস্টার মর্গ্যান! আংটি যদি সত্যিই লু নিয়ে থাকে, তবে এখুনি আদায় করে দিচ্ছি।—যাও তো জয়, লু—কে ডেকে নিয়ে এসো তো। বোধ হয় এতক্ষণে তার শো শেষ হয়ে গেছে। ওই লাল রঙের তাঁবুটা লু—র। বলো গে, জো ডাকছে, এখুনি এসো।—তারপর কানের কাছে মুখে এনে: আংটিটাও নিয়ে আসতে বোলো।

বুঝলুম, এবার পাঁচ ডলার নয়, জো এবার বড় গোছের টিপস মারবার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু লু—হাওয়াই দ্বীপের সেই সুন্দরী মেয়েটি, সে—ও তাহলে—

নয়

বুড়ো পপ—এর আস্তানা থেকে প্রায় একশো গজ দূরে সেই লাল রঙের তাঁবু। ভেতর থেকে গানের আওয়াজ আসছিল। মেয়েলি গলার সুর। ঢুকব কি ঢুকব না, ভাবতে ভাবতে পর্দা ঠেলে ভেতরে পা বাড়ালুম।

দেখি, উঁচু একটা প্যাকিং বাক্সের ওপর লু পা ঝুলিয়ে বসে—গান গাইছে সে—ই। শো এইমাত্র শেষ হয়েছে, এখনো সে নাচের পোশাক ছাড়েনি। পরনে সেই রূপালি সার্টিনের ফুলে—ওঠা খাটো ঘাঘরা, শরৎকালের মেঘস্তূপের মতো ধবধবে বুকে সাদা বিদ্যুৎ—রেখার মতো জরির কাজ করা সাদা সার্টিনেরই সরু একটা টুকরো বাঁধা। গলায় তেমনি দুলছে পলার মালা আর কানে কড়ির দুল। ঘন কালো রুখু চুলগুলি আরো এলোমেলো। তার দু'পাশে প্যাকিং বাক্সে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই ম্যান্ডোলা—বাদকদেরই দুজন, তৃতীয় লোকটি মেঝের ওপর পা ছড়িয়ে বসে ম্যান্ডোলার তারে টুংটাং শব্দ তুলছে। লু'র একহাতে রঙিন একখানা রুমাল, আরেক হাতে সস্তা দামের জিন—এর একটা বোতল। পা দুলিয়ে দুলিয়ে লু গাইছিল:

এসেছিল পরে' ছেঁড়া ঢিলে ট্রাউজার,

(চিনতে পারোনি? সে যে মস্ত প্রেমিক)

জমকালো গোঁফজোড়া—যেন কাইজার,

(কার্নিভ্যালের রাজা। ঠিক বটে, ঠিক!)

গানের শেষ লাইনে পুরুষেরাও ধুয়ো ধরেছে। পর্দা ঠেলে ঘরে পা দিয়েছি, লু বোধ করি প্রথমে তা টের পায়নি। হঠাৎ গান গেল থেমে। আমার দিকে হাতের রুমালখানা নেড়ে লু বলে উঠল, এই যে কার্নিভ্যালের রাজা এসেছে— কার্নিভ্যালের রাজা!

তারপর খিলখিল করে হাসি। একরাশ ঠুনকো কাচের বাসন ভেঙে পড়ল যেন। মাতালগুলোও সে হাসির কোরাসে যোগ দিলে। কাঠের মূর্তির মতো আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। বেশ বুঝতে পারছিলুম, শরীরের সমস্ত রক্ত উঠে আসছে আমার মুখে, কানদুটো অসহ্য তেতে উঠেছে।...এ কোথায় এসে পড়েছি আমি?

লু হাসি থামিয়ে আমার পানে চেয়ে আবার বলে উঠল: এসো, এসো, কার্নিভ্যালের রাজা! তুমি নাকি মস্ত প্রেমিক? সত্যি? কিন্তু তোমার গোঁফ কই—কাইজারের মতো জমকালো সেই গোঁফ?

মাতালগুলো আবার হাসির শব্দে তাঁবু কাঁপিয়ে তুললে। লু'র এই অপূর্ব রসিকতার সমঝদার শুধু ওরাই বটে! প্যাকিং বাক্স থেকে লু এবার নেমে আমার দিকে এগিয়ে এল। এল আমার বুকের কাছ ঘেঁষে। আমার শরীর একতাল সীসার মতো ভারি, পা দুটো যেন কে পেরেক দিয়ে মাটিতে এঁটে দিয়েছে। আমার ঠোঁটের কাছে জিন—এর বোতলটা তুলে ধরে মেয়েটা বললে, কোনটা চাও কার্নিভ্যালের রাজা? এই জিন, না—

রুখু চুলের গুচ্ছ একবার দুলিয়ে সে তার মুখখানা আমার মুখের কাছে তুলে ধরলে।

এক সেকেন্ডে কি যে হয়ে গেল, জানি না। চেয়ে দেখি, লু'র হাত থেকে বোতলটা মেঝেয় পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তুষারের মতো ধবধবে, তুষারের মতো নরম ওর গালে টকটকে রাঙা পাঁচটা আঙুলের দাগ—হ্যাঁ, আমারই আঙুলের দাগ! আমারই কলঙ্ক ওর গালে রাঙা হয়ে ফুটে উঠেছে।

লু প্রথমটায় হতচকিত হয়ে গেছল, পরমুহূর্তেই কিন্তু সে হেসে উঠল খিলখিল করে। নিশীথ—রাত্রে ট্রেনের হুইসল—এর মতো তীক্ষ্ন সেই হাসি। ব্যাপার দেখে মাতালগুলোর নেশা বোধ করি কেটে গেছল তৎক্ষণাৎ। কুৎসিত গালাগাল দিয়ে, জামার আস্তিন গুটোতে গুটোতে দুজন তেড়ে এল আমার দিকে।

শুয়োরের বাচ্চচা—

এক ঘুষিতে তোকে গ্রিনউইচ পার করে দেব—

ঘুষিটা আমি আটকাবার আগেই লু মাতালটার হাত ধরে ফেললে। ওর চোখের দৃষ্টি কঠিন, সারা শরীর কঠিন। তীক্ষ্ন কণ্ঠে বলে উঠল, সরে যাও বলছি, জ্যাপ!...চলে যাও এক্ষুনি আমার তাঁবু ছেড়ে...

ওদের আগেই আমি যাচ্ছিলুম বেরিয়ে। পর্দার বাইরে পা দিতেই কানে এল: শোনো, শোনো—

ফিরতে হল। লু অত্যন্ত সহজ গলায় শুধোলে, চলে যাচ্ছ যে! এসেছিলে কেন?

বললুম, জো তোমায় ডাকতে পাঠিয়েছে, তাই এসেছিলুম।

কে? জো ডাকতে পাঠিয়েছে?...আঃ, জ্বালাতন।—লু বিরক্ত হয়ে উঠেছে: কি চায় সে?

এক ভদ্রলোক এসে জোকে বলেছে, তার ছেলের একটা ওপেলের আংটি চুরি গেছে।

তা আমি কি জানি? আমার সঙ্গে আংটির কি সম্পর্ক?...আমি যেতে পারব না, বলগে যাও—

লু তার বাঁ হাতখানি পিঠের দিকে লুকিয়েছিল, কিন্তু আমার চোখ এড়ায়নি। বাঁ হাতের অনামিকায় সোনার একটা আংটি—ওপেল বসানো। লু'র মুখে কি হঠাৎ বিমর্ষ ছায়া নেমেছে?

বললুম, তা হলে জো—কে বলি গে যাই, তুমি আসতে পারবে না।

দাঁড়াও, দাঁড়াও।—তাঁবুর গায়ে হুকে ঝোলানো ডোরাকাটা ছিটের একটা আঙরাখা টেনে নিয়ে লু গায়ে চাপালে, তারপর বললে, চলো—

টোরোন্টোর সবচেয়ে নামজাদা বাসিন্দা মিঃ উইলিয়াম ফ্রাঙ্ক মর্গ্যান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তখনো ল্যুইস গান চালাচ্ছে। আমাদের আসতে দেখে তাঁর মুখ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল! জিমি চুপি চুপি তার বাপকে বললে, এই যে সেই মেয়েটা।

কিন্তু কাউকে কিছু বলবার অবকাশ না দিয়েই হাসিমুখে লু সটান ছেলেটার দিকে এগিয়ে গেল: হেল্পো জিমি! কখন এলে? আজকে তুমি আমার নাচ দেখলে না? আমি রাগ করেছি কিন্তু!—মিঃ মর্গ্যানের দিকে তাকিয়ে: তোমার ড্যাড বুঝি? হাউ ডু ইউ ডু?

জিমি বাপের কাছ ঘেঁষে বোকার মতো দাঁড়িয়েছিল। মিঃ মর্গ্যানও এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার গর্জন করে উঠল, তুমি আমার ছেলের আংটি চুরি করেছ? জানো, আমি কেস—

লু দু'পা পিছিয়ে এল। গভীর বিস্ময়ে চোখদুটো। বড় বড় করে বললে, কোন আংটি?—লু তার বাঁ হাতখানা সবার সামনে তুলে ধরলে। অনামিকায় দামি ওপেলের টুকরোটা রাতের আলোয় ঝিকমিক করছে: এই আংটির কথা বলছ?

মিঃ মর্গ্যানের মুখে বাঁকা হাসি দেখা দিল। জোর দিকে কটাক্ষ করে বলে উঠল, এ ব্যবসা কতদিন ধরে চালাচ্ছ ম্যানেজার?

জো গম্ভীর মুখে শুধোলে, এই আংটিটা তুমি চুরি করেছিলে লু?

চু—রি!...চুরি করেছি!—লু'র গলা কেঁপে গেল: তোমার মনে নেই জিমি, কাল সন্ধেবেলা আমরা দুজন যখন কার্নিভ্যালের দোকানে বসে চকোলেট খাচ্ছিলুম, তুমি এই আংটিটা আমার আঙুলে পরিয়ে দিলে, তারপর আমার হাতখানা তুলে তোমার ঠোঁটে—এখন বলছ চুরি—

লু'র বড় বড় চোখদুটি জলে ছাপিয়ে উঠল। আংটিটা আস্তে আস্তে খুলে সে জিমির সামনে ধরলে। জিমি বেচারি মুখ কাঁচমাচু করে কি যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগে জো বলে উঠল, ও! ছেলেবয়েসের সেন্টিমেন্টাল ব্যাপার!..নিন মিস্টার মর্গ্যান, আপনার আংটি ফেরত নিন, আংটির সঙ্গে আপনার চুরির চার্জও ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন, কিন্তু নইলে...

মিঃ মর্গ্যান লু'র ভিজে চোখদুটির পানে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। আংটিটা নিয়ে বলল, যাকগে, যা হবার হয়েছে। —চল জিমি!

মিঃ মর্গ্যানের গলার স্বর আশ্চর্য রকম মোলায়েম হয়ে গেছে। যাবার সময় আরেকবার আত্মপরিচয় দিয়ে যেতেও ভুলে গেল দেখছি। লু'র গাল বেয়ে তখনো জল গড়িয়ে পড়ছে, জো তাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলতে লাগল, ছি ছি কেঁদো না। ...কেন তুমি যার—তার সঙ্গে ভাব করতে যাও লু?

লু এখনো খুকির মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। কিন্তু টোরোন্টোর সবচেয়ে নামজাদা বাসিন্দার দীর্ঘ দেহ দূরে কার্নিভ্যালের জনতায় মিশে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই পট—পরিবর্তন হয়ে গেল।

জো লু'র কাঁধদুটো ধরে এক ঝাঁকানি দিয়ে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল, এখুনি হাতে হাতকড়া পড়েছিল, শয়তানি কোথাকার! ফের যদি এমন বেয়েক্কেলে কাজ করিস তো দূর করে দেব—

লু একটা বিকৃত মুখভঙ্গি করে বলে উঠল, ইস! ...সেলাম ফাদার আব্রাহাম! আংটিটা হাতছাড়া না হলে আধ—বখরা চাইত কে?

জো রুখে উঠল, চুপ, চুপ কর শয়তানি...একি! গালে তোর দাগ কিসের?

চেয়ে দেখি, আমারই কলঙ্ক এখনো লু'র গালে রাঙা রয়েছে। আমার সমস্ত শরীর আবার আড়ষ্ট হয়ে গেল। লু কিন্তু অত্যন্ত সহজভাবে জবাব দিলে, গালের নিচে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, তাই আঙুলের দাগ রয়েছে।

তারপর তাঁবুর দিকে পা চালিয়ে দিলে।

দশ

রাত ক্রমে বাড়ছে। কার্নিভ্যালের ভিড়ে ধরেছে ভাঙন, কলরব এসেছে স্তিমিত হয়ে। 'মেরি—গো—রাউন্ড'—এর কন্সার্ট বাজনা গেছে থেমে, হেল্টার স্কেল্টারও ফাঁকা। অল্পবয়স্কা যে—সব মেয়ে বয়—ফ্রেন্ডদের সঙ্গে এসেছিল, এইবার তারা অভিভাবকদের সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছে বোধ করি। এখনও তবু ছোট ছোট দল এখানে—ওখানে ছড়ানো। একে একে আলো নিভেতে শুরু হয়েছে, গ্রিনউইচ ভিলেজের এই প্রকাণ্ড মাঠে অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে নেমে এসেছে মন্থর একটি আলস্য।

কিন্তু কবির দেখা পেলুম না এখনো। কথা ছিল, কার্নিভ্যাল ভাঙলে ফটকের কাছে ফের দুজনের দেখা হবে। কিন্তু কই, কোথায় সেই কাউবয়—এর মতো গোল টুপি আর হলদে কালো ডোরা—কাটা স্কার্ট? ফটক পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালুম। গোটাকতক ট্যাক্সিওয়ালা এখনো সোয়ারির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।

Hel-lo guy ! একা একা দাঁড়িয়ে যে!

ফিরে দেখি, অচেনা একটা লোক। লোকটার বাঁ পা—টা হাঁটু অবধি কাটা, 'ক্র্যাচে' ভর দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে খাকি মিলিটারি পোশাক, বহু পুরাতন, তালি লাগানো। কণ্টকিত মুখখানা ক্ষুরের সঙ্গে অসহযোগ করেছে।

বললুম, চিনতে পারছি নে তো তোমায়!

তা তো পারবেই না। শুধু তুমি কেন, তুমি তো সেদিনের ছেলে হে, সারা বেলজিয়ামই আজ আর আমায় চিনতে পারবে না! ফাঁকা টোটা ঘরে কে আর জমিয়ে রাখে বলো? ভাঙা পেয়ালা দেয় বাতিল করে।

হা হা করে লোকটা হেসে উঠল। সামনের দাঁত দুটো নেই। হাসলে মানুষকে এত কুৎসিত দেখায়, আগে ধারণাই ছিল না।

হঠাৎ হাসি থামিয়ে লোকটা আবার শুরু করলে : অথচ একসময়, হ্যাঁ, ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে, খবরের কাগজে বড় বড় হেডলাইনে আমার নাম ছাপা হয়েছিল জানো? শত্রুসৈন্য তখন ব্রাসেলস শহর ঘেরাও করেছে, আশেপাশে ফাটছে বিষাক্ত গ্যাসের সেল, সেই সময় লুইস—গান হাতে নিয়ে যে এগিয়ে গিয়েছিল, সে হচ্ছে কার্পোরোল অগাস্টিন।...

বললুম, ও, তুমিই কার্পোরাল অগাস্টিন?

পাগল! সে কবে মরে গেছে! আমি তার প্রেতাত্মা, বুঝলে?—লোকটা একটা চোখ কুঁচকে বিশ্রী একটা ইঙ্গিত করলে: Any Pretty on naughty bridie?

কার কথা বলছ? অবাক হয়ে শুধোলুম।

সুন্দরী মেয়ে হে, সুন্দরী মেয়ে। জোয়ান বয়সে সব মেয়েই অবিশ্যি সুন্দরী। তা আজ আর সে আসেনি বুঝি? হুঁঃ, এই বয়েসে অনেকেরই আসবার কথা থাকে, কিন্তু আসে না। ...তবে বলি শোন: মিলিটারি ব্যারাক থেকে পালিয়ে একদিন সমুদ্রতীরে বেড়াতে গেছি, সেইখানে তার সঙ্গে আলাপ। সেই হাঙ্গেরিয়ান মেয়েটি, নামটা আজ আর মনে নেই। কথা কইতে কইতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমি চুমু দেওয়ার পর সে অন্ধকারে আমার কানে কানে বললে, আমার জীবনে পুরুষের এই প্রথম চুম্বন!...শুনে শিউরে উঠলুম। ভার্জিন! আসবার সময় মেয়েটি বললে, কাল আবার দেখা কোরো। দেখা ফের হয়েছিল বটে, তবে কাল নয়, হপ্তাখানেক বাদে, শহরের এক কাফেয়। দেখি, আরেকটি ছেলের মুখে মুখ রেখে সে তেমনি মিষ্টি গলায় বলছে: আমার জীবনে এই প্রথম চুম্বন।...ওই কথাটা বোধ হয় ওর মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।

শুকনো গলায় লোকটা আবার চিৎকার করে হেসে উঠল। তারপর বললে, দাঁড়িয়ে থেকে আর কি হবে? ঘরে যাও। কাল থেকে নগদ কারবার কোরো ভাই, ধার রেখে না, বুঝলে?

বললুম, তুমি ভুল করেছ অগাস্টিন, আমি অপেক্ষা করছি আমার এক কবি—বন্ধুর জন্য—কিন্তু আজ আর বোধ করি দেখা হবে না।

চলে আসছিলুম, পেছন থেকে অগাস্টিন ডাকলে, শোনো, শোনো।—

ফিরতে হল। একটা চোখ কুঁচকে ও হঠাৎ চাপা গলায় শুধোলে, কিছু আছে নাকি? দিতে পারো?

প্রথমে বুঝতে পারিনি, টুপিটা খুলে আমার সুমুখে ধরতেই বুঝলুম, অগাস্টিন কিছু ভিক্ষে চায়। বললুম, এই করেই তোমার চলে নাকি? কেন, স্টেট থেকে তো অক্ষম সৈন্যদের খোরপোশ দেওয়ার নিয়ম আছে শুনেছি।

রাস্তার ওপর খানিকটা থুথু ফেলে অগাস্টিন বলে উঠল, চুলোয় যাক স্টেট! উচ্ছন্নে যাক!

পকেটে যে ক'টা সেন্ট পড়েছিল, ওর টুপিতে ফেলে দিলুম।

অদ্ভুত লোক। টুপিটা ফের মাথায় দিয়ে বললে, ধন্যবাদ আমি কাউকে দিই না। কেড়ে নেবার ক্ষমতা নেই, নইলে—

ক্রাচের খটখট আওয়াজ করতে করতে ও চলে গেল। বহু সম্মানিত কার্পোরাল অগাস্টিনের প্রেতাত্মা!

এগারো

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। নিশীথ—হাওয়ায় তাঁবুর পর্দাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঘরে কে এসেছিল না? এইমাত্র যেন কার অস্পষ্ট পদধ্বনি মিলিয়ে গেল। অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হয় না, পাশে বুড়ো পপ ঘুমের ঘোরে নাক ডাকাচ্ছে।

স্বপ্ন দেখছিলুম হয়তো! কিন্তু ঘুম আমার আর আসবে না। আস্তে আস্তে উঠে তাঁবুর বাইরে গিয়ে দাঁড়ালুম। মৃত্যুর মতো অন্ধকার স্তব্ধতা, মৃত্যু হয়েছে সেই উৎসব—সন্ধ্যার! প্রকাণ্ড ফাঁকা মাঠ নিঃসঙ্গ বার্ধক্য দিনের মতো পড়ে আছে। এই নির্জন কার্নিভ্যাল যেন বিগত যৌবনের ট্র্যাজেডির প্রতীক।

রহস্যময় এই নিশীথ—রাত্রি ভারি অদ্ভুত লাগছিল। তাঁবুর সামনে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলুম। দিনের আলোয় নিজেদের আমরা চিনতে পারি না, নগর সভ্যতার একটা পালিশ থাকে আমাদের মুখে, কিন্তু রাত্রির এই অন্ধকার গভীরতায় নিজেদের সঙ্গে আমাদের হয় মুখোমুখি পরিচয়।

হঠাৎ পিঠে কে হাত রাখলে। ফিরে দেখি আরেকটি মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। ভালো করে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, তবু চিনতে পারলুম—বুড়ি মারিয়া। হাতে সেই মড়ার খুলি। শুধোলে, এত রাতে বাইরে যে?

বললুম, ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। স্বপ্ন দেখছিলুম বোধ করি। কিন্তু এই রাতে তুমি একা—একা ঘুরে বেড়াচ্ছ যে মারিয়া?

ঘুম আমার আসে না।—মারিয়া বলতে লাগল, আজ পঁচিশ বছর এমনি করেই কাটছে। স্বপ্ন আমিও দেখি, জানো? রোজ মাঝ—রাতে জেগে উঠি, মনে হয় কে যেন ডাকছে! আর ঘুম আসে না চোখে। যদি সে এসে ফিরে যায়...

মারিয়া নিজের মনে একবার হাসলে: ও আমারই মনের ভুল! সে আর আসবে না জানি, তবু—এখনও স্বপ্ন দেখি —

শুধোলুম, কার কথা বলছ মারিয়া? কে সে?

কে আবার! কেউ না!...আচ্ছা, বলি শোন। আলেক্সি ম্যাক্সিভিচ—এর নাম শোনোনি বোধ হয়? কেই বা জানে তার নাম! পের্ট্রোগার্ডের একজন 'ম্যুজিক' ছিল সে। লম্বা—চওড়া চমৎকার চেহারা। বড় বড় কালো চোখ মেলে তাকালে নেশা লাগত, রাশিয়ার মেয়েরা ভয় করত তাকে।

আলেক্সিকে তুমি ভালোবাসতে বুঝি?

ভালোবাসতুম বললে তোমরা—অল্পবয়সী ছেলেরা খুশি হবে, তা জানি। কিন্তু আলেক্সিকে দেখলে আমার বুকের ভেতর কাঁপত। কাস্তে হাতে ছেলেরা যেত মাঠে, আর আমরা যেতুম আঁটি—বাঁধা ফসল মাথায় করে গাড়ি বোঝাই করতে। খালি গায়ে চওড়া বুক ফুলিয়ে আলেক্সি ফসল কাটত আর গাইত—কি গান গাইত জানো?

ভাঙা ভাঙা গলায় মারিয়া গুনগুন করে গাইলে—

ওগো ও চাঁদ? রূপালি চাঁদ!

ফসলে ছেয়েছে ভলগা—কূল,

ফুটেছে কি জানো বন্ধু গো

কুমারী—মনের রূপালী ফুল!

মারিয়ার গলায় সুর নেই, তবু ওই লাইন ক'টা ও গুনগুন করে গাইলে অনেকক্ষণ পর্যন্ত।

বললুম, আলেক্সি আজো কি তোমায় মনে করে রেখেছে?

মারিয়া জবাব দিলে, যত সহজে ও ভালোবাসে, ভুলে যায় তত সহজে। সত্যিকার পুরুষের ভালোবাসাই এমনি।

আলেক্সি তা হলে তোমায় ছেড়ে গেছে? তবে তুমি আজো তার জন্যে রাত জেগে অপেক্ষা কর কেন?

কেন জানো?—মারিয়া বলতে লাগল: পের্ট্রোগার্ডে তখন শুরু হয়েছে বিপ্লব, জার'কে খুন করবার জন্যে বলশেভিকদের ষড়যন্ত্র চলেছে। ধরা পড়ে আলেক্সি একদিন জেলে গেল। শুনলুম, তাকে সাইবেরিয়ায় পাঠানো হবে। সেই সময় অন্ধকার রাত্রে আমি চুপি চুপি যেতুম তার সঙ্গে দেখা করতে, দলের চিঠিপত্র, খাবার লুকিয়ে দিয়ে আসতুম তার হাতে।...জেলখানায় সেই সেল—এর মধ্যে আমার সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। বললে, সাইবেরিয়া থেকে আমি ফিরে আসব নিশ্চয়—তোমার কাছেই ফিরে আসব মারিয়া!—তার চোখের পানে চেয়ে আমার চোখ বুজে এল, পালিয়ে এলুম তার সুমুখ থেকে।

আলেক্সি ফিরে এসেছিল?

তেমনি ভাঙা গলায় মারিয়া হেসে উঠল: বোকা ছেলে, যে যায়, সে কি আর ফেরে?

মনে পড়ল, খোঁড়া কার্পোরাল অগাস্টিনও এই কথাই বলেছিল। ফেরে না নদীর স্রোত, আর ফেরেনা প্রথম প্রেম! দার্শনিক মতে, এই হল জীবন। অন্য সময় এই নাটকীয় কথাটা নিয়ে একটা সস্তা ঠাট্টা করা যেত, কিন্তু মধ্যরাত্রির এই গভীরতায় মারিয়ার কণ্ঠে কথাগুলো কেমন অদ্ভুত শোনাল।

বললুম, পের্ট্রোগার্ড ছেড়ে তুমি চলে এলে কেন?

কারণ—, মারিয়া বলতে লাগল: আলেক্সি আর ফিরে আসেনি। পনেরো বছর বাদে পের্ট্রোগার্ড—এ আবার একদিন যে ফিরে এল, সে পাগল। মিছে দিন গুনে গুনে আমার তখন চুলে পাকা ধরেছে।

তুমি বিয়ে করনি মারিয়া?

করেছিলুম বইকি। চওড়া একটা বুকে মাথা রাখতে না পেলে মেয়েদের চলে না। তা স্বামীও গেল, একটা ছেলে ছিল—নাম রেখেছিলুম আলেক্সি—সেও গেল। দিন আমার তখন কি নিয়ে কাটে বলো? চলে এলুম তাই পের্ট্রোগার্ড ছেড়ে, ভিড়ে গেলুম বুড়ো পপ—এর কার্নিভ্যালের দলে, তারপর—

বললুম, দিন তোমার কাটে তো পরের হাতগুণে, কত লোককে বলে দাও সৌভাগ্যের সন্ধান, কিন্তু নিজের সৌভাগ্যকে আজো খুঁজে নিতে পারলে না। ভাগ্যের সঙ্গে তোমার এত রেষারেষি কেন বলো তো?

মারিয়া তার মুখখানা আমার কাছে এগিয়ে নিয়ে এল। বললে, অন্ধকার যে, নইলে দেখতে পেতে কপালে আমার কতগুলো রেখা পড়েছে, মুখের চামড়া গেছে কতখানি কুঁচকে। ভালো করে লক্ষ করলে আরো দেখতে পেতে, এটার সঙ্গে..., মারিয়া পড়ার খুলিটা দেখালে: আমার মুখের বিশেষ তফাত নেই।

মারিয়া তার ভাঙা গলায় এবার জোরে হেসে উঠল। তারপর ফের বললে, বয়েস যার ষাট পার হয়েছে, তাকে কেউ পছন্দ করে না—আলেক্সিও না, ভাগ্যও না!

আচ্ছা, হাত দেখা তুমি শিখলে কোথায়?

শিখেছিলুম, এক জিপসির কাছ থেকে।...কিন্তু সত্যিই কি কিছু জানি আমি? সব ফাঁকি, সব ভুয়ো!—রাত বুঝি ভোর হয়ে এল, যাই।

মড়ার খুলিটা হাতে নিয়ে মারিয়া আবার মাঠের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

আমি বুঝেছি, আলেক্সি ম্যাক্সিভিচ ওর প্রণয়ী নয়, সে হচ্ছে বুড়ি মারিয়ার প্রথম যৌবন স্বপ্ন। আলেক্সি আর আসবে না তা ও জানে, কিন্তু যার সন্ধানে নিশীথ—রাত্রে ও ঘুরে বেড়ায়, সে তার পলাতক যৌবন।

আস্তে আস্তে তাঁবুর দিকে পা চালিয়ে দিলুম। পর্দা সরিয়ে ঢুকতে গিয়ে দেখি, একটা ছায়ামূর্তি—আমারই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে! তা হলে স্বপ্ন নয়, সত্যিই ঘরে কেউ এসেছে! গলা চড়িয়ে শুধোলুম, কে?

অন্ধকার যেন কথা কয়ে উঠল, আমি—লু।

কী আশ্চর্য! লু এত রাতে—এখানে?

বারো

কী আশ্চর্য, লু এত রাতে—এখানে—? নিশীথ—রাত্রির এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে আর যাকেই আমার স্মরণ হোক না কেন, সে লু নয় নিশ্চয়ই। নিঃশব্দ অন্ধকারে গা ঢেকে চোরের মতো চুপি চুপি আমার এই তাঁবুর মধ্যে কি করতে এসেছে সে? কি চায়?

চেঁচিয়ে কি বলতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু তার আগেই লু আমার মুখে হাত চাপা দিলে। বুড়ো পপ মড়ার মতো ঘুমুচ্ছে, ঘুমুলে ওর নাকের মধ্য দিয়ে অদ্ভুত একরকম শব্দ হয়।

আমার কানের কাছে মুখ এনে লু চাপা গলায় বললে, আস্তে—বাইরে এসো—

কলের পুতুলের মতো ওর সঙ্গে আবার বাইরে এসে দাঁড়ালুম। অন্ধকার আকাশের নিচে বুড়ি মারিয়া সেই মড়ার খুলিটা আগলে নিয়ে এখনো হয়তো নিশি—পাওয়ার মতো একা—একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিগতযৌবনা বিফল—স্বপ্ন মারিয়া! কিন্তু লু—ফেনিল—যৌবনা সুন্দরী নর্তকী লু—তার চোখে আজ ঘুম নেই কেন?

তেমনি ফিসফিস করে লু বললে, এসো, ওই বেঞ্চিটায় খানিক বসি।

মেরি—গো—রাউন্ড'—এর পাশে লোহার একটা বেঞ্চি, দুজনে সেখানে পাশাপাশি বসলুম। লু এতক্ষণে সহজ গলায় বললে, ভয়ানক অবাক হয়ে গেছ, না?

সত্যিই বিস্ময়ে আমার মুখের কথা গিয়েছিল হারিয়ে। এবার যেন জেগে উঠে বললুম, শুধু আমি নয়, এত রাতে তাঁবুর মধ্যে নর্তকী লু—কে দেখলে, যে কেউ অবাক হতে পারে। তোমার এই আসার মানে কি? কি চাও তুমি?

লু বললে, যদি বলি গল্প করতে এসেছি?

যদি বলতে, প্রেম নিবেদন করতে এসেছ, তা হলেও বিশ্বাস করতুম না।

অস্পষ্ট একটু হাসির আওয়াজ শোনা গেল। ক্ষীণ একটি জলধারা তটরেখা ছুঁয়ে গেল যেন।

হেসে লু বললে, তাই নাকি? কোনো মেয়ে তোমায় প্রেম নিবেদন করতে পারে, এ বিশ্বাসই বা তোমার হল কেন?

মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, কারণ, আমি জানি প্রেম নিবেদন করাটা কোনো কোনো মেয়ের পেশা।

কণ্ঠে আমার কি শ্লেষ ছিল? লু চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বললে, তুমি তাহলে রাত জেগে ঝগড়া করতেই এসেছ?

বললুম, ভুল করছ লু, তুমিই আমায় ডেকে এনেছ। ব্যাপারটাকে কিন্তু বেশ নাটকীয় করে তুলেছ দেখছি! এখন যেতে পারি বোধ হয়?

এলেই বা কেন? পেশাদারী প্রেম নিবেদন শোনবার লোভটা সামলাতে পারলে না বুঝি?

আবছায়া অন্ধকারে কেবল লু'র মুখের সীমারেখা দেখা যাচ্ছিল—শিল্যুট—এর মতো। কিন্তু মনে হল, কথার শেষদিকে তার গলা কেঁপে উঠল যেন। হেসে বললুম, তুমি যে সেই মধ্যযুগের নায়িকাদের মতো অভিমান শুরু করলে দেখছি। এরপর নিশ্চয় আমার বলা উচিত: অপরূপ তোমার চোখের তারার রং!...যাকগে, ভোর হতে আর দেরি নেই, আসল কথাটা কি, বলে ফেলো তো?

কয়েক মিনিট চুপচাপ। তারপর লু বললে—যেন নিজের মনেই: আজ সন্ধেবেলার সেই বিশ্রী ব্যাপারটার জন্যে কিছু মনে কোরো না। আমি দুঃখিত।

এই কথা বলতেই তুমি এত রাতে এসেছ? তা কাল সকালে বললেও পারতে। আশা করি, কাল সকালে তোমার গালে আমার আঙুলের দাগ মিলিয়ে যাবে। ...ও আমারই কলঙ্ক লু! তোমার শেষ কথাটা আমারই বলা উচিত...

তাকিয়ে দেখি, আমার পাশের জায়গাটা ফাঁকা। হঠাৎ যেমন এসেছিল তেমনি নিঃশব্দে কখন যে চলে গেছে, জানতে পারিনি। আশ্চর্য মেয়ে! রহস্যময় এই নিশীথাকাশের তলায় একাকিনী সে যে কথাটি বলতে এসেছিল, তা আর বলা হল না, কিন্তু কি যে তুমি বলতে চেয়েছিলে, আমি তা বুঝেছি লু! চিরকালের সেই পুরোনো কথাটিই তুমি নতুন করে বলতে এসেছিলে! কুরূপা মোটা ম্যাগিও একদিন সেই কথাই বলতে চেয়েছিল।

না, ঘুম আজ আর আমার চোখে আসবে না। তার চেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে এই অন্ধকার মাঠে একা একা পায়চারি করে বেড়ানো ভালো।

আজকের এই রাতটি অবাস্তব একটি রূপ নিয়ে এসেছে। একটু আগেকার ঘটনাটা ভুলতে পারছি না কিছুতেই, মাথার মধ্যে যেন শিকড় গেড়ে বসেছে! আগাগোড়া ব্যাপারটাই যেন রোমান্টিক নভেলের টুকরো একটা পৃষ্ঠা।...কিন্তু লু মনে মনে আহত হয়ে ফিরে গেছে? কি জানি! এত রাতে আমার সঙ্গে একলা দেখা করাটা আমার হয়তো সহজভাবেই নেওয়া উচিত ছিল।

রাতের শেষ—প্রহরও ফুরিয়ে এল, কোথায় দূরে একটা গ্রাম্য গির্জার পেটা ঘড়ি ঢং ঢং করে বাজছে। ক্লান্ত মন্থর শব্দ! অবাস্তব এই অপরূপ রাত্রির মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি যেন। সমস্ত মাঠে ভরে এখন ফিকে—নীল ঘন কুয়াশা।

বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ নজর পড়ল, খানিকটা দূরে ঘাসের ওপর কি যেন পড়ে! কাছে গিয়ে দেখি...কে, লু না? ভিজে ঘাসের ওপর লু অমন করে উপুড় হয়ে পড়ে আছে কেন—সাদা একমুঠো পপিফুলের মতো? ওর দেহের ভঙ্গিটা এমন অসহায় ও করুণ!

হাঁটু গেড়ে ওর পাশে বসে আস্তে আস্তে ডাকলুম, শুনছ লু—

সাড়া নেই। আবার ওর এলোমেলো চুলের ওপর আলগোছে একখানা হাত রেখে বললুম, এখনো তুমি শুতে যাওনি লু? এখানে এমনি করে পড়ে রয়েছ কেন?

তীরবেগে লু সোজা হয়ে উঠে বসল। চাপা উত্তেজনায় ওর সারাদেহ থরথর করে কাঁপছে। প্রায় অবরুদ্ধ কণ্ঠে বললে, কেন তুমি এখানে এসেছ শুনি? আমায় একটু একা থাকতে দেবে না! যাও—চলে যাও—

কি হল ওর আজ, কে জানে! বললুম, তা যাচ্ছি, কিন্তু তুমি তোমার তাঁবুতে যাও।

উঠে চলে যাচ্ছিলুম, লু আবার ডাকলে, শোনো—

আমার কানের কাছে মুখ এনে বললে, এসব কথা জো—কে বোলো না।

কিছু বলবার আগেই ও তাড়াতাড়ি চলে গেল।

আবার তাঁবুর দিকে পা চালিয়ে দিলুম। তিরিশ গজও এগিয়ে যাইনি, অস্ফুট একটা চিৎকার কানে এল। মেয়েলি গলার চিৎকার।

দৌড়লুম। যেখানে ভিজে ঘাসের ওপর লু উপুড় হয়ে পড়েছিল, সেখানে ফিরে এসে দেখি, দীর্ঘাকৃতি জোয়ান একটা পুরুষ দুই থাবা দিয়ে লু'র দুই কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নীলচে অন্ধকারে চোখদুটো তার প্যান্থারের চোখের মতো জ্বলছে। এই তো জো। ও কি নিঃশব্দে লু'র পেছনে পেছনে এসেছিল? আমার শরীর একতাল মাটির মতো ভারি হয়ে গেল।

জো গর্জন করে উঠছিল: কোথায় ছিলি এতক্ষণ বল—নোংরা ইঁদুরখানা কোথাকার—

শুকনো গলায় লু বললে, ওই তো ওকেই জিজ্ঞেস কর না।

এতক্ষণ জো বোধ করি আমায় লক্ষ করেনি, এবার আমাকে দেখে তার হাতদুটো লু'র কাঁধ থেকে খসে পড়ল। দেখলুম, প্যান্থারের মতো তার দপদপে চোখদুটো আস্তে আস্তে এল নিভে।

তুমি! ওজয়!

হ্যাঁ, আমি অজয়।—তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্পষ্ট গলায় বললুম, লু এতক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করছিল। কিন্তু তুমি কোন অধিকারে কৈফিয়ত চাও?

অধিকার! হাঃ হাঃ!—কর্কশ গলায় জো হাসবার চেষ্টা করলে, তারপর আমার পিঠ চাপড়ে বলে উঠল: এখনো তুমি ছেলেমানুষ ওজয়, নিতান্ত ছেলেমানুষ। লু আমার স্ত্রী, জানো? হাঃ, হাঃ! এসো আমরা যাই...

জো তার তাঁবুর দিকে এগোল, পেছনে পেছনে লু।

তেরো

হার্লেম।

বুড়ো পপ—এর হুকুম জারি হয়ে গেছে: জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, যেতে হবে এবার হার্লেমের দিকে।

হার্লেম, শুনেছি, নিগ্রোদের ছোটখাটো একটা উপনিবেশ—আধা শহর, আধা গ্রাম, যেতে হবে আমাদের কাল ভোরের গাড়িতে। গ্রিনউইচ ভিলেজে কার্নিভ্যাল চলেছে এক হপ্তা, আর নয়, এবার নতুন ডেরা। কার্নিভ্যাল আজ বন্ধ। কাজ আমাদের অনেক, তাঁবু গুটানো, জিনিসপত্র বাঁধা, গাড়ি বোঝাই করা—অনেক কাজ।

নতুন ডেরার মোহ যাযাবর মনকে আবার টানছে, আবার পাখা মেলেছে চিরকালের সেই বন—হংস! বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দিন—রাত্রি, ভাঙা স্বপ্ন, মুখের আর চোখের আলাপ, স্মৃতি আর বিস্মৃতি: জীবনকে বিশ্লেষণ করলে এছাড়া আর কি বা খুঁজে পাওয়া যায়?

সমস্ত মাঠ ভরে জিনিসপত্রগুলো এখানে—সেখানে ছড়ানো—ছিটানো, হাতুড়ির খটাখট আওয়াজ, গাড়োয়ানদের হল্লা। রংচঙে সাজানো স্টলগুলো এখন একেবারে ফাঁকা—বিধবার সিঁথির মতো। আজ সকালে মাঠের এই দৃশ্যটার সঙ্গে নষ্টনীড় জীবনের কোথায় যেন মিল আছে। নতুন পথযাত্রার কথা ভাবলেই কবিকে আমার মনে পড়ে যায়, পান্থশালার সেই কবি অ্যাডলফ! সময়ের স্রোতে ও পরমানন্দে গা—ভাসান দিয়েছে। কল্পনায় লঘু পাখায় ভর করে উড়ে উড়ে চলেছে সূর্যাস্ত থেকে নবসূর্যোদয়ের কূলে। সেই যে একত্রে এসেছিলুম এই কার্নিভ্যালে, তারপর আজ অবধি আর দেখা নেই। গ্রিনউইচ ছেড়ে ও যে আমার আগেই চলে যায়নি, তাই বা কে বলতে পারে? পথে যে বন্ধুকে পেয়েছিলুম, পথের জনতায় আবার সে হারিয়ে যাবে, এ আমি জানতুম বটে—কিন্তু জানতে পারলুম না, বার্থা আর ক্লডেট—এর পর কবির জীবনে এবার কোন নারীর প্রবেশ?

প্রকাণ্ড একটা প্যাকিং বাক্সের মধ্যে ডিক খুচরো মাল বোঝাই করছিল। আমায় ডেকে বললে, একটু হাত লাগাও তো, চটপট সেরে ফেলি কাজটা।

বাক্সের মধ্যে বিচালি বিছোতে বিছোতে ডিক শুধোলে, হ্যাঁ হে ছোকরা, কাল রাতে একটা গোলমাল শুনছিলুম যেন—কিসের বলো তো?

বললুম, কি জানি কে চেঁচামেচি করছিল।

ডিক এবার আমার মুখের পানে চেয়ে মুচকে হেসে বললে, লুকোচ্ছ কেন, বলেই ফেলো না। এই তো পাঁচ মিনিট আগে জো—র সঙ্গে দেখা হল। বললে, কাল রাতে তুমি নাকি লু'কে নিয়ে—

মিথ্যে কথা!

ডিক দুঃখিত হওয়ার ভান করে বললে, ও, ভুল হয়েছে! তুমি লু'কে ডেকে নিয়ে যাওনি বটে, লু'ই তোমার তাঁবুতে গিয়েছিল। তা কথা একই!

ডিক আবার হেঁট হয়ে বিচালি বিছোতে লাগল। বুঝলুম, কাল রাতের সেই অদ্ভুত ঘটনাটা সকাল না হতেই কানাকানি হয়ে পড়েছে। আরো বুঝলুম যে, অতিরঞ্জনের ফলে ব্যাপারটার চেহারাই গেছে বদলে! জো তাহলে সত্যিই কাল রাতে লু'র অনুসরণ করেছিল।

বললুম, কোনো ঘটনাকে তোমরা এমন বিশ্রীভাবে নাও কেন? লু যদি কাল আমার তাঁবুতে গিয়েই থাকে, তাতে হয়েছে কি?

কিছুই না—, ডিক কাঁচা তামাক পাতা চিবোচ্ছিল, খানিকটা থুথু ফেলে বলে উঠল, তোমার সৌভাগ্যকে হিংসে করতে ইচ্ছে হয় শুধু! Ah, the gal’s hot stuff!...কিন্তু একটু সাবধানে প্রেম কোরো হে ছোকরা!

কি যা—তা বকছ ডিক! জানো, লু জো'র স্ত্রী?

স্ত্রী! জো'র স্ত্রী হল লু!—ডিক সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল, প্রচণ্ড হাসির বেগে তার মুখের ফাঁক দিয়ে তামাক পাতা ছিটিয়ে পড়তে লাগল। হাসতে হাসতে মোটর—টায়ারের মতো ও ফেটে পড়ল যেন।

খামোখা ওর এই উচ্ছ্বসিত হাসির মানে বুঝতে পারলুম না। খানিকটা অপ্রস্তুত, খানিকটা বিরক্ত হয়ে শুধোলুম, হাসছ কেন?

ডিক তখন অনেকটা সামলে নিয়েছে, পেন্টুলুনের বেল্ট শক্ত করে আঁটতে আঁটতে বললে, হাসছি তোমার মজার কথা শুনে। লু হল জো'র বউ। কোন গির্জেয় বিয়ে হয়েছে শুনি!

কেন, লু কি জো'র স্ত্রী নয়?

আলবত একশোবার। শুধু জো কেন, লু আরো অনেকেরই স্ত্রী।

তার মানে? কি বলতে চাও তুমি?

তুমি দেখছি, নেহাত বোকা! এই সাদা কথাটা আর বুঝতে পারছ না? তার মানে, লু হচ্ছে ভাড়াটে স্ত্রী—একটা বেশ্যা, জো'র রক্ষিতা।

আশ্চর্য হলুম, কিন্তু অবিশ্বাস করা চলল না। ইয়াঙ্কি সভ্যতার মানে এতদিনে আমি কিছু কিছু শিখেছি বই কি। অভিধানের নতুন সংস্করণে এবার আশা করি দেখতে পাব, ডেমোক্র্যাসি মানে বহুচারিতা।

বাক্সের ডালার ওপর ডিক পেরেক দিয়ে টিনের পাত আঁটছিল। বললে, তাই বলছিলুম হে ছোকরা, একটু সাবধানে প্রেম কোরো। জো বড় সহজ নয়!

জিজ্ঞাসু চোখে তাকালুম।

ডিক বলতে লাগল, জো আগে ছিল গ্যাংস্টার—দুর্দান্ত গুন্ডা! এখন অবিশ্যি মন গেছে ভেঙে, কিন্তু গ্যাংস্টার জো এখনো মরেনি।...আড়াই বছর আগে, পপ—এর কার্নিভ্যালে তখন সবে কাজে লেগেছি, একটি মেয়ে একদিন আমার কাছে এল। বললে, তোমার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগে, তাই এলুম। মেয়েটি সুন্দরী, নাম ধরো, লু মিসেস। গল্প করছিলুম দুজনে, লু'র মাথা আমার কাঁধে ঠেকেছে, আমার হাত ঘিরেছে ওর কোমর, হঠাৎ পেছন থেকে—

হাতুড়িটা আমার হাতে দিয়ে, ডিক শার্টের বোতাম খুলে ফেললে। বাঁ দিকের পাঁজরার কাছাকাছি গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন। নিজেরই অজান্তে বলে উঠলুম, জো তোমায় খুন করতে চেয়েছিল!

তাই কি আমি বলেছি? —হাতুড়িটা নিয়ে শিস দিতে দিতে ডিক চলে গেল।

মালবোঝাই ওয়াগনগুলো ঢিকোতে ঢিকোতে চলেছে হার্লেমের রাস্তায়। আকাশের গায়ে আর উইলো—বনের ঝোপে ঝোপে এখনো নীলচে কুয়াশা জড়িয়ে আছে—ফিকে অন্ধকারের মতো। গ্রিনউইচের সেই মাঠ ছেড়ে এসেছি রাত থাকতেই, নইলে সন্ধ্যার আগে হার্লেমে পৌঁছনো যাবে না। একে উঁচু পাহাড়ি রাস্তা, তার ওপর চড়াইয়ের মুখে মাইল তিরিশের গাড়ি টেনে টেনে ঘোড়াগুলোর দম এসেছে ফুরিয়ে। আবছায়া নিরালা বন—পথে ঘোড়ার গলার মৃদুমন্থর ঘণ্টাধ্বনি ঘুমপাড়ানি গানের মতো শোনাচ্ছে।

যে ওয়াগনটায় দামি জিনিসপত্র বোঝাই করা হয়েছে, পপ—এর কথামতো সেটায় চেপেছি আমি। তাঁবু, কাঠ—কাটরা, লোহা—লক্কড়ে বোঝাই বড় বড় মালগাড়িগুলো অনেকটা এগিয়ে গেছে, তারপর চলেছে বুড়ো পপ—এর ছোট্ট টমটম, তার পিছনে আমার ওয়াগন, আর সব শেষে আসছে জো আর লুর গাড়ি।

গাড়ির দোলানিতে বোধ করি তন্দ্রা এসেছিল, খুট করে একটা আওয়াজ হতেই চমক ভাঙল, চোখ মেলবার আগেই নাকে এসে লাগল সস্তা জিন—এর উগ্র গন্ধ। বুঝলুম, জীবনে আরেকটি বিস্ময়ের মুহূর্ত এসেছে। কিন্তু চোখ না—মেলেও আমি বলে দিতে পারতুম, রাত্রি—শেষের এই নীল অন্ধকারে এসেছে কে? এসেছে—লু, সুন্দরী গণিকা লু, মোমের মতো নরম, মোমের মতো সাদা তার শরীর নিয়ে, মদের মতো মদির, মদের মতো মধুর তার কামনা নিয়ে। এসেছে ইভ—এসেছে যৌবনের অভিশাপ!

সাপের মতো দু'খানা হাত অন্ধকারে আমার গলা জড়িয়ে ধরল, আমার হৃদকম্পনের সঙ্গে সঙ্গে কাঁপছে আরেকটি নিরাবরণ বুক, ভ্রমর গুঞ্জনের মতো আমার কানের কাছে ধ্বনিত হচ্ছে: তোমায় আমি ভালোবাসি জয়—ভালোবাসি! আমায় বিশ্বাস করো—

রক্তে আমার লেগেছে নেশা, নিজের নিশ্বাসের তাপে নিজেরই ঠোঁট যাচ্ছে পুড়ে। ভুলে গেছি, লু গণিকা—ভুলে গেছি, লুকে আমি ঘৃণা করি! তবু একবার বাঁচবার চেষ্টা করলুম। রুদ্ধশ্বাসে বললুম, তুমি চলে যাও লু, চলে যাও—এখুনি জো জেগে উঠবে, এখুনি সে এসে পড়বে এখানে—

ফিসফিস করে লু বললে, জো আর নেই।

জো নেই! তার মানে?

সাপের হিসহিস শব্দের মতো লু বলে উঠল, জো নেই, আমার জীবনে জো আর আসবে না। আমি বেঁচেছি!....ঘুমিয়েছিল সে, আস্তে আস্তে আমি তার গাড়ি থেকে ঘোড়া খুলে দিয়ে চলে এসেছি। এতক্ষণে...

এতক্ষণে ঘুমন্ত জোকে নিয়ে গাড়িখানা ঢালু পথে গড়াতে গড়াতে নিশ্চয় অতল খাদের মধ্যে পড়ে চুরমার হয়ে গেছে। সারাদেহ আমার বরফের স্তূপের মতো ঠান্ডা কঠিন হয়ে উঠল। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলুম, তার আগেই পপির মতো নরম, তরল সীসের মতো উষ্ণ দু'খানা ঠোঁট আমার ঠোঁটদুটোকে চেপে ধরল।

চোদ্দো

একটি মুহূর্ত! যে মুহূর্তে গ্রহে—গ্রহে লাগতে পারে সংঘাত, পৃথিবী হতে পারে কক্ষচ্যুত। যে মুহূর্তে অরণ্যে আসে ফুলের বন্যা, দেহ আর দেহের সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে আশ্চর্য অগ্নিশিখা। নারী সম্বন্ধে মানুষের ধারণাই বদলে যায় যে মুহূর্তে! সেই মুহূর্ত—সেই সর্বনাশা লগ্ন এসেছে আমার জীবনে। পপির মতো নরম, তরল সীসের মতো উষ্ণ সেই দুখানা ঠোঁটের নিপীড়নে আমার সমস্ত চেতনা যেন এক মিনিটের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল। লু'র চুম্বন—সুন্দরী নারীর চুম্বন!

একটি মুহূর্তের জন্য আমার আত্মার হল মৃত্যু!

কিন্তু ঘুমন্ত অসহায় জোকে নিয়ে সেই ওয়াগনখানা এতক্ষণ ঢালু পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ক্রমশ গড়িয়ে চলেছে! হয়তো এখনো খাদের নিচে পৌঁছয়নি। এখনো কিন্তু চেষ্টা করলে তাকে বাঁচানো যেতে পারে!...পারে বাঁচানো যেতে? হঠাৎ জেগে উঠলুম যেন: শোনো অজয়, জোকে তুমি বাঁচাও। পরম নিশ্চিন্ত হয়ে এখনো হয়তো সে ঘুমুচ্ছে, জানতেও পারেনি যে, জীবনে তার মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠেছে!...কেন বাঁচাবে না শুনি? কোনো ক্ষতিই তো জো তোমার করেনি, ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতাই তো নেই তার সঙ্গে? চিরকালের সেই ইভ—এর জন্য একটা ঘুমন্ত জীবন এমনি করে তুমি নষ্ট হতে দেবে?...চেষ্টা করলে জো'কে এখনো বাঁচাতে পার কিন্তু!

সারাদেহ আমার কখন কঠিন হয়ে উঠেছে জানতে পারেনি। গা—ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই লু একপাশে ছিটকে পড়ল। তার আর্তনাদ শোনবার অবসর ছিল না, একলাফে ওয়াগন থেকে নেমে আবছায়া কুয়াশা ভেদ করে ছুটলুম সেই চালু পাহাড়ি রাস্তায়। একশো গজ যেতে না যেতেই দেখতে পাওয়া গেল, জো'র ওয়াগনখানা মাতালের মতো টলতে টলতে গড়িয়ে চলেছে—চলেছে অতল খাদের সেই অন্ধকার কবরের দিকে। চাকাগুলো একবার যদি পিছলে যায়, তবে—

কে থামাবে অনিবার্য সর্বনাশের মতো প্রকাণ্ড ওই ভারি ওয়াগনের গতি? আমি? অসম্ভব! কিন্তু জোকে বাঁচাতেই হবে। মাথার চুলগুলো মুঠি করে ধরে ভাবতে লাগলুম, কি করা যায়? কি করা যায়?

জো'র ওয়াগনখানাকে পেছনে ফেলে রেখে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলুম। রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে মস্ত একটুকরো পাথর, কোনোরকমে পাথরের টুকরোটাকে যদি হাতখানেক সরিয়ে রাস্তায় এনে ফেলা যায় তো জো এ—যাত্রা রক্ষা পেয়ে যেতে পারে। দু—হাত দিয়ে পাথরটাকে সরাবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু না, মৃত্যুর মতো নিষ্ঠুর, মৃত্যুর মতো অটল সেই ভারি পাথরখানা একচুলও টলল না। এদিকে ওয়াগনখানা আমার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে, ঢালুর মুখে গতিবেগ ক্রমশ বাড়ছে, গাড়িখানা এমন ভয়ানকভাবে দুলছে যে, যে—কোনো মুহূর্তে চাকা পিছলে যেতে পারে!

আরেকবার চেষ্টা করলুম পাথরখানাকে সরাতে, পেশীগুলো উঠল ফুলে, স্নায়ু—শিরা যেন এখুনি ছিঁড়ে পড়বে, সমস্ত শরীরের জোর দিয়ে প্রাণপণে দিলুম এক ধাক্কা। পাথরের টুকরোটা এবার আধ—হাতটাকে সরে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ওয়াগনের পেছনের একখানা চাকা এসে ঠেকল তাতে। প্রচণ্ড ঝাঁকানি দিয়ে গাড়িখানাকে কে যেন হঠাৎ ব্রেক কষে থামিয়ে দিলে। চিৎকার করে ডাকলুম: শিগগির উঠে পড়ো জো, শিগগির—ওয়াগন থেকে লাফিয়ে পড়ো এখুনি—

প্রচণ্ড ঝাঁকানি না লাগলে, আমার চিৎকার জো'র কানে পৌঁছত কিনা সন্দেহ। দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঘুমে জড়ানো ভারি গলায় বললে, আঃ, জ্বালালে দেখছি শুয়োরের ছানা! কেন, এত চিৎকার কিসের হে ছোকরা?

বললুম, নেমে এসে গালাগালি দিও'খন, আগে নিজের প্রাণটা তো বাঁচাও—নেমে পড়ো শিগগির—

হতচকিত হয়ে জো এবার একলাফে ওয়াগন থেকে নেমে এল। আমার দিকে বিমূঢ় চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে শুধোলে, কি ব্যাপার ওজয়? আমি কিছু বুঝতে পারছি না, জিন খেয়ে শেষ—রাতে মাতাল হয়ে পড়েছিলুম কিনা—হার্লেমে আমরা কি পৌঁছে গেছি?

বললুম, না, কিন্তু তার আগেই তুমি খাদের অন্ধকার ঠান্ডা কবরে পৌঁছে যেতে! তোমার ভাগ্যকে ধন্যবাদ দাও জো, ভয়ানক একটা অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে তুমি বেঁচে গেলে আজ!

অ্যাক্সিডেন্ট! কেমন করে?—বিস্মিত জো প্রশ্ন করল।

উত্তরে (মিথ্যে কথা বলা ছাড়া উপায় কি?) বললুম, তোমার ওয়াগনের ঘোড়াটা হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে রাশ ছিঁড়ে ফেলে, তুমি তো ঘুমুচ্ছিলে, এদিকে ঢালু রাস্তায় তোমাকে নিয়ে গাড়িখানা পিছু হটে গড়াতে শুরু করেছিল। যে কোনো মুহূর্তে চাকা পিছলে গাড়িখানা খাদে পড়তে পারত—ভাগ্যিস এই পাথরখানা ঠেলে সরিয়ে চাকা আটকানো গেল—

আমরা গলা শুনে জো'র মগজ থেকে ঘুমের আর নেশার জড়িমা কেটে গিয়েছিল বোধ করি। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সে হাত দিয়ে বুকের ওপর নিঃশব্দে ক্রশ—চিহ্ন আঁকলে। তারপর হঠাৎ আবার ওয়াগনের মধ্যে উঠতে গেল, তার হাতখানা ধরে ফেলে শুধোলুম, কোথা যাচ্ছ?

লু এখনো ওর মধ্যে রয়েছে যে!

জোর কথায় আমার হেসে ওঠা উচিত ছিল, বলা উচিত ছিল: তোমার মৃত্যুর দাম দিয়ে লু আমার প্রেম কিনতে গিয়েছিল—কিনতে গিয়েছিল কামনা—কলঙ্কিত এই রাত্রির কয়েকটি মুহূর্ত।...কিন্তু আমার মুখ দিয়ে বেরোল: লু আগেই লাফিয়ে পড়েছিল গাড়ি থেকে—সেই তো আমায় এই অ্যাক্সিডেন্টের খবর দিলে!

কুয়াশার আড়াল থেকে তখন ভোরবেলাকার হলদে আলো দেখা দিয়েছে। সেই অস্পষ্ট আলোয় জো'র মুখখানা অত্যন্ত শুকনো ক্লান্ত মনে হল। আশ্চর্য, কবরের ধার থেকে ফিরে এসেও ওর মুখে আনন্দের এতটুকু চিহ্ন নেই! যেন নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়েই জো বলতে লাগল, বেঁচে আর লাভ নেই, বুঝলে ওজয়। ধরো যদি মরেই যেতুম আজকে, তাতে কার কি ক্ষতি হত? কার চোখেই বা জল আসত বলো? ...সব ভুয়ো ওজয়, সব বাজে...

জীবন সম্বন্ধে এই সস্তা দার্শনিকতায় হাসি পাবার কথা, বিশেষত গ্যাংস্টার জো'র মুখে এমন নাটুকে কথা শুনে। কিন্তু কোনো অসতর্ক ক্ষণে মানুষের ভেতরকার চেহারা বদলে যায়, কে বলতে পারে? আজ এই বিমর্ষ ভোরবেলার জো'কে—নিজের প্রতি বিগতমোহ এই লোকটিকে কেই বা চিনত আগে?

প্রসঙ্গটাকে চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললুম, নেশা বুঝি তোমার এখনো কাটেনি জো? ওসব দার্শনিকতা এখন থাক—আগে এই ওয়াগনখানার ব্যবস্থা করতে হবে, ওদিকে দুর্ভাবনায় লু একা একা নিশ্চয়ই ছটফট করছে!

হ্যাঁ, চলো যাই। পপকেও একটা খবর দিতে হবে।—বলে জো এগোল।

বুড়ো পপকে খবর দিয়ে, আগের মালগাড়ি থেকে জনকয়েক লোক সঙ্গে নিয়ে আমার ওয়াগনের কাছে ফের ফিরে আসতে খানিকটা দেরি হল। ঘোলাটে হলদে আলো তখন অনেকটা সাদা হয়ে এসেছে।

লু'কে ডাকলুম। দরজা খুলে নিচে আসতেই জো'র সঙ্গে ওর মুখোমুখি দেখা। স্পষ্ট দেখলুম, লু'র মুখ 'মমি'র মুখের মতো বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, চোখ দুটো বুঝি ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়—ভূত দেখেছে যেন! জো মরেনি, লু'র জীবনে মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের মতো জো তাহলে আবার এল!

কিন্তু চোখের পলকে পট—পরিবর্তন! নিজেকে সামলে নিতে লু'র এক সেকেন্ডও লাগেনি। দুই হাত দিয়ে জো'র কণ্ঠ বেষ্টন করে সে যেন সমুদ্রের ফেনার মতো ভেঙে পড়ল, মুখের কাছে মুখ নিয়ে অপূর্ব কোমল গলায় বলতে লাগল : তুমি ফিরে এলে জো—আঃ বাঁচলুম—

আদরের বন্যায় জো নিজেও বোধ করি অবাক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু লুর এই অদ্ভুত অভিনয় দেখে আমি হাততালি দেব কিনা, ভাবছিলুম!

কোথায় যেন পড়েছিলুম: নারী হচ্ছে কাচের গ্লাসের জল, নিজস্ব কোনো সত্তা নেই, যখন যে রঙের গেলাসে রাখ, তখনকার মতো সেই রংই তার। 'রাশিকৃত চুম্বনের ফেনা!' কথাটা একটু অশ্লীল শোনায় বটে, কিন্তু আরো সহজ করে বলা যায়, মেয়েরা হচ্ছে ভাড়াটে ট্যাক্সি। অন্তত আজকের এই নাটকীয় মুহূর্তে জো'র কণ্ঠলগ্না লু'র দিকে তাকিয়ে একথা বললে ভুল হবে না নিশ্চয়। মোমের মতো সাদা, পপির মতো ধবধবে লু'র শরীর, লোভনীয় রমণীয় শরীর, কিন্তু লু'র সঙ্গে কার তুলনা দেব? বরফে ডোবানো আঙুর, ঠান্ডা, বিস্বাদ! কিংবা রংকরা কাগজের ফুল, বিংশ শতাব্দীর মতো মেকি।

যাই হোক, চমৎকার অভিনয় করেছে লু, আজকের এই নাটকীয় ব্যাপারটাকে আশ্চর্য কৌশলে ও মানিয়ে নিয়েছে। টমটম ফিরিয়ে বুড়ো পপ তখন এসে পড়েছে সেখানে। লু'র হাত দু'খানা গলা থেকে খুলে জো বললে, এসো ওজয়, ঘোড়াটাকে ওয়াগনে ফের জুড়ে দিই, নইলে হার্লেমে সময় মতো পেঁছনো যাবে না।

বুড়ো পপও আমাদের সঙ্গে এগোল, তার পেছনে আর সবাই। ঘোড়াটা যথাস্থানেই দাঁড়িয়েছিল, তাকে ধরে নিয়ে জো রাশটা পরীক্ষা করে দেখলে। তারপর অবাক হয়ে বললে, কই, রাশ তো ছিঁড়ে যায়নি?

বললুম, না, ঠিক ছিঁড়ে যায়নি বটে, তবে খুলে গিয়েছিল হঠাৎ।

জো একবার আমার পানে তাকালে: এত শক্ত বাঁধন আপনা থেকেই খুলে গেল?

হ্যাঁ, বাঁধন যখন খুলে যায়, তখন আপনা থেকেই—কেউ টের পায় না—

কথাগুলি বলবার সময় মুখে কি আমার সঙ্কেতের ভাষা ফুটে উঠছিল? কণ্ঠে ব্যঙ্গের আভাষ? লু একবার আমার পানে মুখ তুলে তাকাল সে—মুখে বিবর্ণ একটি ছায়া নেমে এসেছিল ক্ষণেকের জন্য।

কথাটা জো কিন্তু ধরতে পারেনি, বললে তুমি তো টের পেয়েছিলে, নইলে ওয়াগনটা থামাতে পারতে না, হার্লেম—এ পৌঁছবার আগে খাদের ওই অন্ধকার কবরে পৌঁছে যেতুম বটে।

পপ আমায় জড়িয়ে ধরল: মাই বয়, ঈশ্বর তোমার ভালো করবেন!...দেখছ জো, ছেলেটার কী দুরন্ত সাহস! হাজার হোক, ক্যাথির ছেলে—আমার ভাগ্নে তো। ছোটবেলায় আমিও অমন দুরন্ত ছিলুম কিনা।

আবেগ আনন্দে ঝাঁঝালো ভুরুর নিচে পপ—এর চোখের পাতা ঘনঘন কাঁপতে লাগল। তার চোখের পাতা বোধকরি ভিজে এসেছে।

অন্যান্য ওয়াগন থেকে ইতিমধ্যে আরো জনকয়েক নেমে এসে জড়ো হয়েছিল, ব্যাপারটা শুনে ভিড়ে চাঞ্চল্য জাগল, শোনা গেল নানা কণ্ঠের গঞ্জন, 'শাবাশ, বাহাদুর ছেলে!' 'ওই তো আজ জোকে বাঁচালে।' 'হ্যাঁ, সাহস বটে, অতবড় পাথরটাকে একাই সরিয়ে দিলে!' 'ঈশ্বর ওকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন...ও যেন দেবদূত হয়ে নেমে এসেছিল পৃথিবীতে।'

ভারি অপ্রস্তুত বোধ করছিলুম, প্রশংসা ক্রমেই মাত্রা ছাড়িয়ে চলেছে। হঠাৎ গভীর রাতে ট্রেনের হুইসল—এর মতো তীক্ষ্ন একটা গলার আওয়াজ শোনা গেল ভিড়ের সেই মৃদু কলরব ছাপিয়ে: থামো, থামো, কেন মিথ্যে ওর প্রশংসা করছ শুনি?...জানো, ও কতবড় শয়তান! জানো তোমরা?

এক সেকেন্ডের জন্য সকলের কথা গেল হারিয়ে। লু'র চিৎকার কুয়াশার পর্দায় লেগে তখনো কাঁপছে। পপ এগিয়ে এল, চোখের পাতা পিটপিট করতে করতে শুধোলে, কি বলছ তুমি লু? শয়তান—শয়তান কে?

তেমনি স্পষ্ট গলায় লু উচ্চচারণ করলে, শয়তান তোমাদের ওই ওজয়—যাকে তোমরা বলছ এঞ্জেল! জানো, রাত্রে লুকিয়ে জোকে খুন করতে গিয়েছিল কে? ঘুমন্ত অবস্থায় আমায় কে অপমান করতে চেয়েছিল—শুনবে তোমরা?

বিস্ময়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল—লু'র কথা শুনে, লু'র দিকে তাকিয়ে। ওর মুখ হয়ে উঠেছে রাঙা, এলোমেলো চুলে একটা চোখ আর মুখের একটা পাশ ঢাকা, আরেকটা চোখ জ্বলছে পাহাড়ি সাপের চোখের মতো। সারা দেহ ওর কাঁপছে থরথর করে। ধারালো কণ্ঠে ভোরবেলাকার কুয়াশার পর্দা ছিন্নভিন্ন করে লু বলে চলেছে: চোরের মতো চুপি চুপি ও এসেছিল আমাদের ওয়াগনে, রাত তখন শেষ হয়ে এসেছে, আমরা ঘুমোচ্ছিলুম। অন্ধকারে ও আমাকে নিয়ে গেল নিজের গাড়িতে, যাবার সময় দিয়ে গেল ঘোড়ার রাশ খুলে—জো তখন ঘুমোচ্ছে, কিছুই টের পায়নি। চিৎকার করতে গেলুম, দেখি, মুখ বাঁধা! তারপর বুনো জানোয়ারের মতো ওর সে কি...জোর করে আমায় ও চুমু খেল, করতে চাইল অপমান! (কান্নায় লু'র গলা বুজে এল) ধস্তাধস্তি করতে করতে আমার মুখের বাঁধন গিয়েছিল খুলে, চিৎকার করে উঠতেই ও ভয় পেয়ে ছুটল জোকে বাঁচাতে! এতবড় শয়তান ও, আর ওকেই তোমরা বলছ দেবদূত—বাঃ, চমৎকার! তাড়িয়ে দাও, এখুনি তাড়িয়ে দাও ওকে—

লু বোধ করি এবার হাঁফিয়ে উঠেছিল, রাস্তায় বসে পড়ে ও দু'হাতে মুখ ঢাকলে।

হ্যাঁ, বিস্মিত সবাই হয়েছিল, বিস্মিত হওয়ার কথা বইকি! শুধু অভিনয় নয়, লু যে মুখে মুখে এত চমৎকার গল্প রচনা করতে পারে, আমিই কি তা জানতুম? এ যেন রোমাঞ্চকর সিরিয়াল ফিল্মের খানিকটা! ভিড়ে ফের চাঞ্চল্য জেগেছে, কানে আসছে নানা কণ্ঠের মন্তব্য, কিন্তু ভাষা এবার বদলে গেছে: 'ছোঁড়াটা শয়তানই বটে।' 'শুয়োরের বাচ্চচা কোথাকার, পেটে পেটে ওর এত বদমাইসি!' 'জো তাহলে নেহাত বরাত জোরে বেঁচে গেছে বলো?'

হাসি পাচ্ছিল, প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে ওরা যেন গালাগালির ভাষাও মুখস্থ করে এসেছিল, নইলে এত তাড়াতাড়ি মুখে জোগাল কেমন করে? পপ আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আমার হাত দু'খানা ধরলে, তারপর একবার কেশে গলাটা সাফ করে নিয়ে বললে, জয় তুমি একবার বলো, লু যা বললে সব মিথ্যে!—বলো, অমন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না, বলো—

বলতে পারতুম, লু'কেই আরেকবার জিজ্ঞেস করে দেখো পপ, আরেকটা রোমাঞ্চকর গল্প শুনতে পাবে নিশ্চয়! কিন্তু আড়ষ্ট ঠোঁট দু'খানা আমার কে যেন আঁঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে।

আস্তে আস্তে পপ আমার হাতদুটো ছেড়ে দিলে, বললে, শেষটা তোমাকেও অবিশ্বাস—নাঃ, কার্নিভ্যাল আমি তুলেই দেব জয়...

কথাটা আর শেষ হল না, অতি পুরাতন সেই ওক কাঠের পাইপটায় বুড়ো ঘনঘন টান দিতে লাগল।

আর চুপ করে থাকা আমার চলল না, স্নেহ—দুর্বল সেই বুড়োর একখানা হাত টেনে নিয়ে বললুম, পাগল হয়েছে আঙ্কল পপ! কার্নিভ্যাল তুলে দিতে যাবে কেন? মানুষের মুখের কথা থেকে কি সত্যি—মিথ্যে চিনে নেওয়া যায়?...তার চেয়ে এক কাজ করো, আমায় ছেড়ে দাও। তাড়িয়ে দিতে হবে না, আমি নিজেই চলে যাচ্ছি...

বুড়ো খামোকা রেগে অস্থির! হাতখানা সজোরে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠল, অনায়াসে, অনায়াসে! যাও না চলে, কে তোমায় ধরে রাখছে? তোমার মতো বজ্জাত ছোকরাকে তাড়িয়ে দেওয়াই তো উচিত! কেবল ক্যাথির ছেলে বলেই না তোমায় থাকতে দিয়েছিলুম, নইলে—নইলে তুমি আমার কে?

ঘনঘন পাইপে টান দিয়ে পপ ধোঁয়ায় মুখখানা অন্ধকার করে ফেলল। এবার আমারই চোখের পাতা এল ভিজে। ভারি অভিমান করেছে বুড়ো। ভেবেছিলুম চলে যাবার আগে বলে যাব : সত্যিই আমি তোমার কেউ নই পপ, তোমাদের আদরের বোন ক্যাথরিনকে আমি চোখেও দেখিনি! এতদিন তোমার স্নেহ আমি চুরি করেছি। ...কিন্তু না, থাক! রাতে ঘুমের ঘোরে হয়তো বুড়ো স্বপ্ন দেখবে, পলাতক জয় আবার ফিরে এসেছে, হয়তো ভুল করে পাশের কম্বলখানা টেনে দেবে—পাছে জয়ের ঠান্ডা লাগে!

টুপি খুলে সবাইকে অভিনন্দন জানালুম—জো'কেও। কিন্তু আশ্চর্য, যাকে কেন্দ্র করে আজকের এই নাটকীয় ব্যাপারের সূচনা, সেই জো এতক্ষণ একটি কথাও কয়নি, একবার আমার দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। ঘোড়ার পিঠে একখানা হাত রেখে নিঃশব্দ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে—গ্যাংস্টার জো! যার ছোরার চিহ্ন এখনো ডিক—এর পাঁজরে আঁকা! এতবড় অভাবনীয় ঘটনা যেন ও ধারণা করতে পারছে না, কিংবা ওর পক্ষে এ যেন নিতান্ত অসাধারণ ব্যাপার!

সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে পা বাড়ালুম, হঠাৎ পিঠে কে হাত রাখলে। চেয়ে দেখি, ডিক। কানের কাছে মুখ এনে বললে, এ আমি জানতুম—ব্যর্থ কামনার প্রতিশোধ এমনিই ভয়ানক হয়ে ওঠে। যাক, আর এমন বোকামি কোরো না, অবহেলা কোরো না সুন্দরী মেয়ের চুমুকে—বাই—বাই কিড?

আশ্চর্য লোক এই ডিক। ও কি সব জানতে পেরেছে?...ফিরে চললুম সেই পাহাড়ি রাস্তা ধরে। আবার একলা। দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে, লু এখনো দু'হাতে মুখ ঢেকে পথের ধুলোয় বসে। মনে মনে বললুম: আমায় তুমি বাঁচিয়ে দিয়েছ লু! মনে মনে তোমায় এতখানি ঘৃণা করবার সুযোগ না দিলে, তোমার কামনা থেকে আমার মুক্তি ছিল না। কিন্তু আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে তুমি এত বড় শান্তি নাই—বা দিতে!

পনেরো

উডস্টক।

ঘুরতে ঘুরতে যেখানে এসে পড়েছি, সে—জায়গাটার নাম উডস্টক। নিউইয়র্ক শহর থেকে শ'খানেক মাইলের মধ্যে। শহরতলীর এই জায়গাটাকে আর্টিস্টদের উপনিবেশ বলা যেতে পারে। উইলো বনের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটা ক্লাব হাউস, রেস্তোরাঁ আর দোকানপাট—এই নিয়েই উডস্টক। মস্ত একটা মেলা যেন।

হার্লেমের সেই পাহাড়ি রাস্তাকে অনেক দূরে ফেলে এসেছি, ফেলে এসেছি সেই রোমাঞ্চিত রাত্রিকে, সুন্দরী লু'র চুম্বনকে। জীবনের নতুন একটি অধ্যায় শুরু হল। কূল থেকে কূলে ভেসে—চলা এছাড়া জীবনের আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে? প্রথমতর মানুষ যেদিন সৃষ্টি হল, সেই দিনই তার পায়ের তলায় রচনা করা হল পথ। অনন্ত এই পথযাত্রার ইতিহাস দিন—রাত্রির পৃষ্ঠায় কেবলই লেখা আর মোছা চলেছে। নারী হল সেই পথের বিপদ, আর বিশ্রাম, আর প্রেম যেন পথের ধারের পান্থাশালায় এক—একটি উৎসব সন্ধ্যা। আসলে, মনে মনে আমরা সবাই একা; উৎসবের বাতি যখন নিভে আসে, যখন ফুরিয়ে যায় প্যাশনের পানপাত্র, তখন চিরকালের সেই পথ দেয় ডাক। পেছনে পড়ে থাকে শুধু নিভে—যাওয়া বাতির ধূমশিখা, ছিন্নফুলের টুকরো, আর অস্পষ্ট কতগুলি পদচিহ্ন! সঞ্চয়? কিছুই না? আত্মার গহন নির্জনতায় নিজেদের আমরা ফিরে পাই শুধু।

পকেটে যখন পয়সা থাকে না, থাকে না আশ্রয়, তখন দার্শনিক হওয়া ছাড়া উপায় কি? এ—কথাটা ইতিপূর্বে বুঝেছিলুম একটিবার, আজো বুঝেছি। কিন্তু সারারাত পার্কের বেঞ্চে শুয়েই কাটাতে দেবে, আমেরিকার পুলিশ এতখানি উদার নয়। অতএব আজকের রাতটার মতো আস্তানা একটা চাই এবং তার সঙ্গে কিছু টাটকা খাবার। কেননা, আমার পাকস্থলী পকেটের মতোই খালি। অতি আধুনিক সাহিত্যিকরা আর যাই হোক, মিথ্যাবাদী নয়—মনের ক্ষুধার চেয়ে দেহের দুক্ষা যে ঢের বড়, চোদ্দ ঘণ্টা প্রায়োপবশনের পর তাতে আর সন্দেহ থাকে না।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, কুয়াশা আর অন্ধকার পথ—ঘাট মাখামাখি। যাওয়াই বা যায় কোথায়? ক্লাব—হাউস আর রেস্তোরাঁ থেকে তীব্র আলো ছিটিয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর, কানে আসছে অর্কেস্ট্রার সুর। কিন্তু ওদিকে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নেই, পার্কের বেঞ্চে বসে আরো খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া ভালো। পকেট খালি হলেও সিগারেটের প্যাকেটটা এখনো খালি হয়নি। কবি এখন থাকলে, অন্তত মুখরোচক একটা প্রেমের গল্প শুনে সময় কেটে যেত বেশ।

ঠান্ডা হাওয়ায় তন্দ্রা এসেছিল, ভারি বুটের আওয়াজ কানে যেতেই ওভারকোটের কলার উলটে কান ঢেকে বসলুম, সিগারেটটা দিলুম নিভিয়ে, হ্যাঁ, কনস্টেবলটা এই দিকেই আসছে। কিন্তু না, বরাতটা আমার ভালো বলতে হবে, অন্ধকারে আমার কালো ওভারকোট তার নজরে পড়েনি নিশ্চয়, ভারি বুটের শব্দ করতে করতে পুলিশম্যান আমায় পার হয়ে গেল।

নতুন করে সিগারেটটা ধরালুম। রাত ক'টা বাজল, কে জানে। হিমে কখন যে ওভারকোটটা ভিজে উঠেছে টের পাইনি, ঠান্ডা এই বুনো হাওয়ায় এবার নাক—চোখ জ্বালা করতে শুরু হয়েছে। বিগতযৌবনা স্ত্রীর মতো ঠান্ডা হাওয়া! কিন্তু যাওয়াই বা যায় কোথায়?

Hey–who’s that guy?

নাঃ, জ্বালালে দেখছি! আবার সেই খটখট আওয়াজ! বললুম, এসো, থানায় যাবার জন্য আমি তৈরি হয়ে আছি। এই ফাঁকা পার্কের চেয়ে হাজতঘর গরম নিশ্চয়?

হাজত—ঘর সম্বন্ধে বেশ অভিজ্ঞতা আছে দেখছি যে!

মোটা কর্কশ গলায় হেসে উঠে লোকটা আমার সামনে এগিয়ে এল। বুট নয়, খটখট আওয়াজ ক্রাচের। সেই ঝলমলে মিলিটারি কোট—দাড়ি কণ্টকিত মুখ! আরে, এ যে খোঁড়া কার্পোরাল অগাস্টিন, গ্রিনউইচের মাঠে কানিভ্যালের ফটকের সুমুখে টুপি পেতে আমার কাছে একদিন যে ভিক্ষে চেয়েছিল। অন্ধকারে আমায় ঠাহর করে দেখে কার্পোরাল অবাক হয়ে গেছে: কিহে ছোকরা, চিনতে পারছ?

বললুম, তুমি এই রাতে এখানে যে?

আমার আবার এখানে—ওখানে কি?—অগাস্টিন বলতে লাগল: পৃথিবী জুড়ে রয়েছি আমরা যেখানে পাপ আর অত্যেচার, নগর যেখানে হয়ে গেল গোরস্থান, মানুষ হল জানোয়ার, সেইখানেই আমরা—শয়তানের দূত! যাক, তুমি এখানে একা—একা বসে কেন, তাই আগে বল শুনি? স্মাগলিং শুরু করেছ নাকি আজকাল?

বললুম, সুযোগ পাইনি, নইলে বেকার বসে থাকতুম না।

কেন, তুমি তো পপ—এর কার্নিভ্যালে ছিলে?

হ্যাঁ, ছিলুম বটে, তবে এখন আর নেই। হার্লেম থেকে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছি এই উডস্টকে। দেখা যাক, আবার কোথায় গেলে আস্তানা মেলে!

হুঁ, রাতটা কাটাবে কোথায়?

ভেবেছিলুম, পার্কের এই বেঞ্চেই কাটিয়ে দেব—কিন্তু আমেরিকান পুলিশরা এমন অতিথি—বিমুখ কেন বলো তো?

পার্কে রাত কাটাবে? (অগাস্টিন এবার বেঞ্চে আমার পাশে বসে পড়ল) খাওয়া—দাওয়াও হয়নি তাহলে বলো? তোমরা—আজকালকার ছেলেরা—জীবন সম্বন্ধে এমন উদাসীন কেন? নিজেকে ঠকিয়ে এই যে সস্তা দার্শনিকতা—এর কোনো মানে হয়? Life immense with pulse and passion! সেই তো জীবন!...এসো, আমার সঙ্গে এসো...

অগাস্টিন আমার হাত ধরে টানলে। শুধোলুম, যাব কোথায়? তুমি তো আমার চেয়ে ভ্যাগাবন্ড!

এসো না, দেখি দু'টুকরো কালো রুটি আর এক মগ মদ জোটে কিনা—

হাতখানা টেনে নিয়ে বললুম, ভিক্ষে—

আঃ..., অগাস্টিন প্রায় ধমক দিয়ে উঠল: ওই তো তোমাদের ভ্যানিটি—মিথ্যে অহঙ্কার! যার বেশি আছে, সে আমাদের দেখে—এ ভিক্ষে নয়, দাবি। এসো, উঠে এসো।

উঠলুম। পার্কে চুপচাপ বসে হিমে ভেজার চেয়ে রাস্তায় রাস্তায় খানিকটা ঘুরে বেড়ানো বরং ভালো।

ওয়ে—সাইড গ্রোভ, উডস্টকের সবচেয়ে গরিব ক্লাব হাউস যেটা, আমায় নিয়ে অগাস্টিন সেইখানেই ঢুকল। বাংলো প্যাটার্নের নিচু একতলা বাড়ি, বাইরে তেমন আলোর বাহার নেই। শোনা গেল, নিউ ইয়র্কের যত ফ্যাক্টরি—ম্যানদের আড্ডা এখানে। ফি শনিবার রাত্রে তারা এই ক্লাবে জড়ো হয়, মদ খায়, হল্লা করে, তারপর সোমবার ভোরে আবার ক্লাব হয়ে যায় ফাঁকা। সস্তা মদ আর সস্তা খাবারের জন্য ওয়ে—সাইড গ্রোভ ফ্যাক্টরিম্যানদের ভারি প্রিয়।

বাইরে একটি মাত্র বাতি জ্বলছে—কুয়াশায় ঝাপসা চোখের মতো। গরিব এই ক্লাব—হাউসটা গরিব ঘরের মেয়ের মতো কেমন যেন বিষণ্ণ—উৎসবের এতটুকু স্পন্দন নেই। শ্রমিকের আড্ডা অথচ শোনা যাচ্ছে না গান, না হল্লা। কিন্তু বাইরে থেকে ভুল করেছিলুম, ভারি কাঠের দরজা ঠেলতেই ভেতর থেকে এক আলোর বন্যা, সুরের ঝড়, আর হাসির হল্লা! এক সেকেন্ডে যেন আশ্চর্য—দ্বীপের একটা গুহায় পৌঁছে গেছি।

মাঝারিগোছের একটা হল, তারই একধারে চলেছে নাচ—গান। তিনজন নিগ্রো জাইলোকন, শেলো আর কেটসড্রাম নিয়ে অদ্ভুত সুরতরঙ্গ সৃষ্টি করেছে, আর জন দশ—পনেরো সুন্দরী মেয়ে ধরেছে গান। মাঝখানে একটি পুরুষ আর একটি মেয়ে শুরু করেছে নাচ—আমেরিকার সবচেয়ে প্রিয় নাচ বোলেরো। সিগারেটের নীল ধোঁয়া, নারীদেহের প্রসাধন সুগন্ধ, অর্কেস্ট্রার সুর, রঙিন প্রজাপতির মতো সুন্দরী মেয়েদের লীলা—বিলাস—সব মিলিয়ে হলটার মধ্যে এক আশ্চর্য মায়া—জগৎ রচনা হয়েছে! ফেনিল সুরা আর ফেনিল যৌবনের উৎসব, অগাস্টিনের ভাষায়: Life immense with pulse and passion!

এধারে নিরিবিলি একটা টেবিল বেছে নিয়ে আমরা বসে পড়লুম। কার্পোরাল তার ঠেঙ্গোদুটো টেবিলের ধারে ঠেকিয়ে রেখে বললে, আজ আবার জকি এসেছে দেখছি!

শুধোলুম, জকি কে?

ওই যে লোকটি নাচছে—ওর ভালো নাম কেউ জানে না, সবাই চেনে জকি বলে—নিউইয়র্ক শহরের এক বিখ্যাত থিয়েটারের অ্যাসিস্টেন্ট—স্টেজ—ডিরেক্টর। মাঝে মাঝে জকিকে উডস্টকে দেখা যায় বটে, কিন্তু অদ্ভুত ওর খেয়াল, কখনো ও বড় বড় ক্লাব হাউসের দরজা মাড়ায় না, এখানে এসে ওঠে এই ওয়ে—সাইড গ্রোভে। হঠাৎ এসে শনি, রবি এই দুটো দিন হই—হই করে কাটিয়ে চলে যায়, তারপর হয়তো দু'মাস আর পাত্তা নেই! কিন্তু লোক ভালো..., অগাস্টিন পাইপ ধরিয়ে বলতে লাগল: বুকের ছাতি যেমন চওড়া, মনটাও তেমনি। এত মিশুকে আর এত আমুদে—ফুর্তি যখন করে, তখন চেনা—অচেনা সবাইকে নেয় দলে জুটিয়ে। জকি যেদিন আসে, ওয়েসাইড গ্রোফ—এর চেহারাই সেদিন যায় বদলে।

তখনো অর্কেস্ট্রা বেজে চলেছে, নাচে এবার সবাই যোগ দিয়েছে। মেয়েরা গাইছিল:

বনে—বনে আর মনে—মনে আজ ফুটছে গো

গানের ফুল,

চোখে—চোখে আর রাঙা ঠোঁটে—ঠোঁটে ঘটছে গো

মধুর ভুল!

চেয়ে দেখি, অগাস্টিনের ঘোলাটে চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, গানের ছন্দের সঙ্গে সেও একপায়ে তাল দিয়ে চলেছে। টেবিলের ওপর খাবার আর বিয়ার এসে পৌঁছেছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই।

ষোলো

শ্যাম্পেন?

ফিরে তাকালুম। দেখি, অপরিচিত একটি পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছে। বয়স বছর চল্লিশের কম হবে না, দীর্ঘ সুগঠন দেহ, পরিষ্কার করে কামানো মুখে লাল আভা, পরনে সাদা ট্রাউজারের ওপর মাখন—রঙের সিল্কের হাতকাটা শার্ট। বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে লোকটি বলছে, শ্যাম্পেন? একটু শ্যাম্পেন দিই তোমাদের?

এই তো জকি—ওয়ে—সাইড গ্রোভ—এর এই উৎসব রাত্রির হৃৎপিণ্ড! অগাস্টিন মুখ ফিরিয়ে তাকাতে জকি এবার উৎফুল্ল স্বরে বলে উঠল, হেল্লো! কার্পোরাল কতক্ষণ এসেছ?

কার্পোরাল বললে, এই কিছুক্ষণ। আমার এই ভ্যাগাবন্ড বন্ধু, নামটা কি হে?

বললুম, অজয়। অথবা শুধু জয় বলতে পার।

হাঁ, এই ভ্যাগাবন্ড বন্ধু জয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল পার্কের একটা বেঞ্চে, পুলিশের তাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে এই ক্লাব—হাউসে।

ও, তোমার বন্ধু? Quite a bright kid!

জকি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে। গাঢ় আন্তরিকতায় ওর হাতের আঙুলগুলি যেন কথা কয়ে উঠল।

কার্পোরাল বলতে লাগল, যুদ্ধের সেই ট্রেঞ্চ থেকে ফিরে তোমার সঙ্গে বোধ করি এই প্রথম দেখা হল জকি, কিন্তু আজকে তোমার এই উৎসব দেখে আমার আবার সেই আগেকার অগাস্টিন হতে ইচ্ছে হচ্ছে। নিউইয়র্কের সমস্ত সুন্দরী ইভদের জুটিয়ে এনেছ দেখছি, বেশ, বেশ।

তেমনি মোটা কর্কশ গলায় কার্পোরাল হেসে উঠল। কিন্তু হাসলে যে কুৎসিত মুখও সুন্দর দেখায়, তা এই প্রথম জানলুম। জকিও হাসলে। হেসে বললে, কি জানো কার্পোরাল, বয়স যত বাড়ছে, আমার বিশ্বাস, আমার যৌবনও তত বেড়ে যাচ্ছে! তাই তো সুন্দর মুখের আয়নার নিজের সুন্দর যৌবনকে মাঝে মাঝে দেখে নিই।

বিয়ারের মগটা নাড়াচাড়া করতে করতে কার্পোরাল শুধোলে, হ্যাঁ, শ্যাম্পেনের কথা কি বলছিলে?

জকি বললে, তোমরা আজ আমার অতিথি। কি খাবে বলো—শ্যাম্পেন না পিচ ব্যান্ডি?

There’s nothin like champagne in champagne-colored lips! কার্পোরাল হেসে জবাব দিলে।

জকি এবার ব্যস্ত হয়ে ডাক দিলে: মিমি শ্যাম্পেন!

সুন্দর একটি মেয়ে মদের ট্রে হাতে নিয়ে এতক্ষণ এ—টেবিল ও—টেবিলে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল—প্রাচীন ইরানের পানশালায় সাকির মতো। জকির ডাক শুনে মেয়েটি এদিকে এগিয়ে এল। পরনে অদ্ভুত পোশাক—সাদায়—কালোয় লালে— নীলে মেশানো আলখাল্লা। মাথায় রূপালি ধূসর চুলের ওপর কালো রঙের হালকা ক্রমশ—সরু টুপি—অনেকটা গাধার টুপির মতো। গাঢ়—নীল চঞ্চল চোখের তারার হাসির প্রদীপ—আলোর সঙ্কেত! মেয়েটি যেন একটি কৌতুক কবিতা!

অর্কেস্ট্রা তখন থেমেছে। শ্যাম্পেনের ট্রে হাতে নিয়ে মিমি এগিয়ে আসছে—হালকা নাচের ছন্দে। লীলায়িত শরীর থেকে লাবণ্যের বন্যা ঝরে ঝরে পড়ছে। বনচারিণী ভ্রমরীর মতো ও গুনগুনিয়ে গাইছে:

রাতের গানের মতো      লাজুক কথার মতো

সুর বাজে দূর বেহালায়,

মধুর প্রেমের মতো      মদির চুমার মতো

রাঙা নেশা মোর পেয়ালায়!

কার্পোরালের দিকে তাকিয়ে দেখি, মিলিটারি কোটের আস্তিন থেকে রুমাল বের করে মুখের ওপর একবার বুলিয়ে নিচ্ছে। প্রথম যৌবনের এই অপরূপ সমারোহে ওর মৃত যৌবন হঠাৎ আবার বেঁচে উঠল নাকি?

জকি বললে, শ্যাম্পেন পরিবেশন করো মিমি, এরা আমার অতিথি।

নীলাভ কাচের দুটি গেলাস এগিয়ে এল আমাদের হাতের কাছে। টলটলে আঙুরের রস—মিমির যৌবনের মতো, যৌবনের কামনার মতো। জকি নিজেই তুলে নিলে তৃতীয় গেলাসটি, তারপর বাঁ হাতখানা ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ডান হাতে গেলাসটি উঁচু করে ধরে বললে, আজ কাকে স্মরণ করে আমরা পান করব বন্ধু?

মিমি তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। অপূর্ব ওর হাসি! অপরূপ ওর ঠোঁট! ইতালির আঙুরের মতো নরম, শ্যাম্পেনের মতো রাঙা! আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কার্পোরালের কথার প্রতিধ্বনি: Nothin like champagne in champagne-colored lips!

ঠিক এই সময় আবার বেজে উঠল অর্কেস্ট্রা, এবার মৃদু প্রথম দক্ষিণ হাওয়ায় বনমর্মের মতো, প্রেমিকের প্রথম কথার মতো মৃদু সুরে। আনন্দে জকি প্রায় চিৎকার করে উঠল, হুররে—

প্রথম গেলাস আমাদের নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। মিমি এল আরেকটুকু এগিয়ে, ওর চোখে তেমনি আলোর সঙ্কেত, ঠোঁটে রাঙা হাসির মদিরা! আমার গেলাস দ্বিতীয়বার পূর্ণ করবার সময় যেন কানে কানে বললে, There are no stars like those in those dark eyes!

তারপর ট্রেখানা তুলে নিয়ে গুনগুনিয়ে গাইতে গাইতে চলে গেল :

মধুর প্রেমের মতো      মদির চুমার মতো

রাঙা নেশা মোর পেয়ালায়!

চমৎকার মেয়েটি, না? কার্পোরাল শুধোলে।

কে, মিমির কথা বলছ? হ্যাঁ, মেয়েটি মন্দ নয়, তবে সব সুন্দরী মেয়েই তো এক! সেই একঘেয়ে পুরোনো কাব্য, রকমফের শুধু রঙচঙে মলাটের! বললুম।

কার্পোরাল এবার চট করে চটে উঠল, বললে, মেয়েদের সম্বন্ধে লিনিক হওয়া দেখছি আজকালকার ছোকরাদের মুদ্রাদোষ। কিন্তু জানো, পুরুষের জীবনে এমন এক একটি মুহূর্ত আসে, যখন নারী সুন্দরী কি কুৎসিত, সে কথা মনেই ওঠে না, জীবনে একটি মেয়ে এল, এই কথাটিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।—বিয়ারের মগটাও প্রায় খালি হয়ে এসেছিল, শেষ চুমুক দিয়ে অগাস্টিন ফের শুরু করলে: বলি শোনো, আমার জীবনের সেরা দশটা বছর, লোকে যাকে বলে ফসল কাটার সময়—আমি অপব্যয় করেছি সুন্দরী মেয়েদের জন্যে। হ্যাঁ, বাজে খরচই বলতে হবে! ভালোবেসেছি, ভালোবাসার ভান করেছি, নিজেও ঠকেছি। মনে মনে আজ মেয়েদের আমার চেয়ে কেউ বেশি ঘৃণা করে কিনা জানিনে, তবু আজও সুন্দরী মেয়েরা সামনে এসে দাঁড়ালে—আচ্ছা, আমার এই কোটটা খুব পুরোনো হয়ে গেছে, না?

অদ্ভুত এই খাপছাড়া প্রশ্ন শুনে কার্পোরালের দিকে তাকিয়ে দেখি, অতিজীর্ণ সেই মিলিটারি কোটের আস্তিনের লম্বা লম্বা সুতোগুলো সে লুকোবার চেষ্টা করছে। বুঝলুম, বহুদিন বাদে তার হতশ্রী চেহারাটা হঠাৎ তাকে লজ্জা দিয়েছে।

সে কথায় কান না দিয়ে কার্পোরাল বললে, তোমায় কিন্তু মিমির ভালো লেগেছে হে ছোকরা।

তাই নাকি? কি করে বুঝলে?

শুনলে না, কানে কানে বলে গেল, তোমার কালো চোখে যে তারা জ্বলছে, সে তারা আকাশে নেই!—তারপর খামোকা বিশ্রী মোটা গলায় হেসে উঠে কার্পোরাল ফের বললে, কী মুশকিল, বুড়ো বয়সে তোমায় কি শেষে হিংসে করতে বসলুম নাকি।...তোমার মগে আর বীয়ার আছে?

কার্পোরালের আজ নেশা ধরেছে—পুরোনো দিনের নেশা, পুরোনো যৌবনের নেশা— পুরোনো মদের চেয়ে যা গাঢ়, তীব্র!

সতেরো

রাত কত হয়েছে, বোঝবার উপায় নেই। বাইরে এখন রাত্রি হয়তো গরিব মেয়ের মতো শীতে কাঁপছে, কিন্তু এই ক্লাব—ঘরের ভেতর উৎসব এখনো ফেনিয়ে উঠছে শ্যাম্পেনের ফেণার মতো। উষ্ণ স্পর্শ, উষ্ণ নিশ্বাস আর উষ্ণ নেশা! অর্কেস্ট্রা আবার থেমেছে, টুকরো টুকরো কথা, হাসি আর আলাপে প্রকাণ্ড হলটা গুঞ্জরিত হচ্ছে মস্ত একটা মৌচাকের মতো। এদিকে—ওদিকে ছড়ানো টেবিলগুলি ঘিরে ছোটদল। নানা কণ্ঠ থেকে নানা মন্তব্য ছিটকে ছিটকে পড়ছে।

ডান দিকের টেবিলে মজুরশ্রেণীর একজন আধাবয়সী লোক নাচওয়ালি একটি মেয়েকে কোলে বসিয়ে তারস্বরে প্রেম নিবেদন করছে। তার বক্তব্য মোটের ওপর এই: 'রুথ হচ্ছে তার সপ্তদশ প্রিয়তমা, সুন্দরী রুথকে সে তার সাঁইত্রিশ বছরের পুরোনো ওয়ার্কশপ—এর চেয়ে ভালোবাসে। রুথ—এর অত্যন্ত সৌভাগ্য বলতে হবে যে, আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ওয়ার্কম্যান টমাস কুক তার চুমু চাইছে। কিন্তু রুথ যদি চুমু দিতে রাজি না হয়, তবে টমাস তাকে স্যান্ডউইচ করে খেয়ে ফেলতে পারে অনায়াসেই।

দুঃসাহসিকা রুথ প্রেমের সেই মহাক্ষুধাকে উপেক্ষা করে মাঝে মাঝে মাতাল টমাসের কান মুলে দিচ্ছে, আর দমকা হাসিতে ফেটে পড়ছে তুবড়ির মতো। ওপাশ থেকে কে একটা লোক জড়িত স্বরে গাইছে:

Green grass mows well,

A lovely girl loves well.

জীবনে বোধকরি ও এই দুটি লাইনই শিখেছে, কেননা দেড় ঘণ্টা পরেও গানের তৃতীয় লাইনে পৌঁছতে পারল না।

কার্পোরাল এতক্ষণ ঝিমিয়ে পড়েছে নেশার ঝোঁকে। চোখ বুজে টেবিলের ওপর মাথা রেখে পড়ে আছে। হয়তো ঘুমুচ্ছে, হয়তো বা স্বপ্ন দেখছে এমনই এক বিগত উৎসব—রাত্রির। যাক, ওকে আর নাই জাগালুম।

বসে বসে ভাবছি, কোথা থেকে কোথায় এসে পড়লুম! অন্ধকারে সেই পার্কের বেঞ্চে বসে আত্মসংযমের চেষ্টা করছিলুম—চেষ্টা করছিলুম খেলো কমিউনিস্ট—এর মতো জেলে গিয়ে 'মার্টার' হওয়ার, কিন্তু এক মিনিটে পট—পরিবর্তন। অন্ধকারে হঠাৎ আরব্যোপন্যাসের ছেঁড়া একটা পৃষ্ঠা উড়ে এল যেন। যাই বলো, ভাগ্য কিন্তু আমেরিকান পুলিশের চেয়ে ঢের ভদ্র আর অতিথি পরায়ণ।

কিন্তু যেখানেই যাই না কেন, নারী আছেই। নারী আছে সেই সেদিন থেকে, যেদিন প্রথমতম পুরুষের বুকের পাঁজরা থেকে হল ইভ—এর সৃষ্টি। আসলে, মেয়েরা হল পুরুষেরই কামনার প্রতিবিম্ব, যে কামনা চলে এসেছে পিতামহ থেকে পিতায়, পিতা থেকে সন্তানে—বংশানুক্রমে—শরীরের রক্ত—ধারায়, প্রতি অণু— পরমাণুতে।

একা—একা বসে কেন?

মুখ তুলে দেখি, সেই সাদা—কালোয়—লাল—নীলে মেশানো আলখাল্লা আর চুড়োর মতো হালকা টুপি! মিমি—এই পান্থশালার সাকি।

হেসে বললুম, বসো। দোসর কোথা পাবি?

মিমি বললে, দোসর খুঁজে নিতে হয়।

বললুম, খুঁজলেই কি সব কিছু পাওয়া যায়? আর যা পাওয়া যাবে, তা যদি আমার পছন্দ না হয়?

বলি শোনো: সোনালি চুল—আঙুরলতার মতো, গাঢ় নীল চোখ, জুন মাসের আকাশ যেন।

চামচে দিয়ে শ্যাম্পেনের ফাঁকা গেলাসে টুং—টাং আওয়াজ করতে করতে মিমি শুধোলে, আর? আমার দিকে না তাকিয়ে বলে যাও।

আর দু'খানি ঠোঁট—Champagne-colored lips!

চেয়ে দেখি, মিমির চোখে—মুখে চাপা হাসি উছলে পড়ছে।

আর?

হ্যাঁ, একে—একে বলছি। শ্বেত—হংসের মতো গলা—ধবধবে নিটোল, মসৃণ! আর...

থামো, বন্ধু থামো!—হঠাৎ দেখি কার্পোরাল চোখ মেলে উঠে বসেছে। আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে সে বলে উঠল, তোমার বর্ণনাটা চমৎকার, কিন্তু ঈশ্বরের দোহাই, গলা থেকে আর নিচে নেমো না...

মোটা গলায় কার্পেরোল হা—হা করে হাসতে লাগল।

You drunken fool !

চট করে কার্পোরোলের মাথায় গাধার টুপিটা পরিয়ে দিয়ে, সারা শরীরে একটা ঘূর্ণী তুলে মিমি ছুটে পালাল।

খানিকবাদে মিমি ফের ফিরে এল, সঙ্গে ফ্যাকাশে রঙের রোগাটে আরেকটি মেয়ে। আমার দিকে চেয়ে শুধোলে, তাস খেলতে জানো?

জানি বইকি একটু—আধটু। কি খেলা?

যা হয়! নাচতে আমার ভালো লাগছে না, তার চেয়ে তাস খেলি এসো।

হাত ধরে মিমি একটা টান দিলে।

বললুম, কিন্তু কার্পোরাল যে একলা থাকবে!

কিছু না, কিছু না, একলা থাকা আমার অভ্যেস আছে।—তারপর মিমির দিকে চেয়ে কার্পোরাল বললে, এক মগ বিয়ার আমার জন্যে পাঠিয়ে দিতে পারবে কি ডার্লিং?

নিশ্চয় মিস্টার গুড ডঙ্কি! বলে সে এগোল।

পেছন থেকে শুনতে পেলুম, হাসতে হাসতে কার্পোরাল বলছে: It is better to be sneered at than yawned at!

মিমি হলের একেবারে ওপ্রান্তে নিয়ে এল আমাদের। বললে, কি খেলা যায়? স্ট্রিপ পোকার? ব্রিজ?...ব্রিজই ভালো, কি বলো? আমি আর লোনা পার্টনার, তোমার পার্টনার বেছে নাও।

এদিক—ওদিক তাকিয়ে দেখি, চেনা মুখ একটিও নেই। কাকেই বা পার্টনার করা যায়? কিছুদূরে একটা টেবিলের সামনে একা—একা বসে একটি ছোকরা জড়িত গলায় তখনো চিৎকার করছিল:

Green grass mows well

A lovely girl loves well

ছোকরাটির চেহারাখানা দেখবার মতো বটে! লম্বায় সাড়ে সাত ফুটের কম হবে না, গলা—খোলা শার্টের ফাঁকে লোহার কপাটের মতো শক্ত চওড়া বুক দেখা যাচ্ছে, ওর কব্জির বেড় বোধ করি আমার উরুর সমান। মদ খেয়ে মুখখানা টকটকে লাল। লোকটি যেন লিলিপুট—রাজ্যে গালিভার।

উঠে গিয়ে ওকেই ডাকলুম, হেল্লো! তাস খেলবে?

ছোকরাটি গর্জন করে উঠল: ugh! রেখে দাও তোমার তাস, আমি এখন গান গাইছি—বিরক্ত কোরো না।

তারপর আবার জড়িত কণ্ঠে শুরু করলে: Green grass...

এবার ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললুম, শুনছ, ওই যে মেয়েটি—তোমায় ও ডাকছে, তোমার সঙ্গে ভাব করতে চায়।

আশ্চর্য, তৎক্ষণাৎ ওর গান গেল থেমে। মিমির পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর চোখ হয়ে উঠল উজ্জ্বল, মুখে ছড়িয়ে পড়ল হাসি। অত্যন্ত মোলায়েম গলায় শুধোলে, সত্যি? সত্যি বলছ?

আঠারো

সত্যি বলছ? সত্যি?—খুশিতে ছোকরাটির সারা মুখখানা ঝলমল করে উঠল। সোজা হয়ে বসে সে বলতে লাগল, ওই মেয়েটির কথা বলছ না—রামধনু রঙের পোশাক—পরা ওই সুন্দরী মেয়েটি? Ah, adorable, she’s my May-Oueen!

বললুম, হ্যাঁ, ওই তো! তোমার সঙ্গে ভাব করতে চায়, দেখছ না বারবার তাকাচ্ছে তোমার দিকে। এসো না, তাস খেলবার ছল করে ওর সঙ্গে আলাপ করা যাক। ব্রিজ জানো তো?

ব্রিজ! ফুঃ!—নিতান্ত তাচ্ছিল্যভরে ছোকরাটির ঠোঁটের প্রান্ত কুঁচকে গেল: ও—খেলা পাঁচ বছরের ছেলেও জানে! তার চেয়ে বক্সিং লড়তে বলো, লোহার রড বেঁকাতে বলো—আচ্ছা, আতলান্তিক পার হতে বলো না, হাসতে হাসতে দেখিয়ে দিচ্ছি পারি কিনা। অটো ক্রুগার—ক্যালিফোর্নিয়ার বেস্ট স্পোর্টসম্যান—পারে না, এমন কাজ দুনিয়ায় নেই, বুঝলে?

প্রচণ্ড উৎসাহে অটো ক্রুগার টেবিলের ওপর তার বক্সি—এর নমুনা দেখালে। সঙ্গে সঙ্গে বিয়ারের মগটা মেঝেয় পড়ে চুরমার হয়ে গেল। ওর পেশীতে পেশীতে জেগেছে শক্তির জোয়ার, দ্রুত নিশ্বাসে চওড়া বুক উঠছে ফুলে ফুলে। ভারি মজা লাগছিল অটোর কথা শুনতে, কিন্তু কথাগুলো সত্যি বইকি। বাস্তবিক, সুন্দরী নারীর জন্য পুরুষ কী না করতে পারে? কী না করেছে? পৃথিবী জয় করতে পারে, যুদ্ধে প্রাণ দিতে পারে—পারে হেলেনের জন্য ট্রয় ধ্বংস করে ফেলতে।

অটোর কাঁধে একখানা হাত রেখে বললুম, সে তো বটেই! অটো ক্রুগারকে আমি কি চিনি নে? কিন্তু মিমি যে ব্রিজ খেলতে ভারি ভালোবাসে, তাই তোমায় বলছিলুম...

নিশ্চয়, নিশ্চয়! ব্রিজের মতো ইন্টারেস্টিং খেলা কি আর আছে? চলো, খেলি গে—

মেঝের ওপর ওর নাইট—ক্যাপ পড়েছিল, সেটা কুড়িয়ে নিয়ে অটো উঠে দাঁড়াল।

পরিচয় করিয়ে দিলুম, অটো ক্রুগার—ক্যালিফোর্নিয়ার সেরা খেলোয়াড়, আর মিমি—Miss New york 1931! And–and beauty-Queen of Way Side Grove.

মিমির দক্ষিণ হাতখানি নিয়ে, অটো সেই মধ্যযুগের নাইটদের অনুকরণে চুম্বন করলে। আশ্চর্য, ওর টকটকে লাল রূঢ় মুখে কেমন যেন লাবণ্য দেখা দিয়েছে, বিশাল একটা এঞ্জিনের মতো সমস্ত শরীর ওর খরতর প্রাণধারায় স্পন্দিত হচ্ছে। ওর কথা হয়েছে সংযত, গলার স্বর হয়েছে নরম।

লোনা—সেই রোগাটে ফ্যাকাশে মেয়েটি বলে উঠল, খোসামোদ পুরুষদের মুদ্রাদোষ।

অটো হয়তো মনে মনে জবাব খুঁজছিল, তার আগেই বললুম, হ্যাঁ, বিনয় প্রকাশ করা যেমন মেয়েদের স্বভাব। আসল কথা কি জানো, নিজের সম্বন্ধে মেয়েদের ধারণা এত অল্প যে, পুরুষদের প্রশংসার আয়নায় নিজেদের না দেখলে তারা খুশি হয় না, সত্যি কিনা বলো তো?

সত্যি বইকি! মেয়েদের ছায়া বুকে ধরে থাকা ছাড়া পুরুষদের আর কী—ই বা কাজ আছে?—মিমির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি উঁকি দিল।

বললুম, ভেবে দেখো তাহলে, মেয়েদের নিজস্ব কোনো সত্তা নেই! আমি তোমায় সুন্দর করে দেখেছি বলেই তুমি হয়েছ সুন্দর, নইলে তোমার দাম কতটুকু?...ভুলে যেও না, ঈশ্বর ইভকে সৃষ্টি করেছিলেন আমাদের বুকের পাঁজরা থেকে!

মিমি এবার ফরাসি কায়দায় কাঁধ দুটো একবার নেড়ে বললে, তাই নাকি, অহঙ্কারী পুরুষ!

Simply charming! —হঠাৎ অটো প্রায় চিৎকার করে উঠল, সুন্দরী মেয়েরা রাগ করলে কী লোভনীয় হয়ে ওঠে! ঠিক—ঠিক যেন ভিনিগার দেওয়া চাটনির মতো লোভনীয়।

সবাই উঠল হেসে, অটো কেমন একটু থতমত খেয়ে গেল। হেসে বললুম, তোমার উপমা বাস্তবিক মৌলিক, অটো—সুন্দরী মেয়েদের অনুরাগের চেয়ে রাগটাই বেশি বিপজ্জনক! আর, সেই জন্যই তো হেরে গেলে ওরা পুরুষের ওপর রাগ করে বসে।

চুলের গুচ্ছ দুলিয়ে মিমি বলে উঠল, কক্ষণো না, আমেরিকান মেয়েরা পুরুষদের কাছে হারে না কখনো। এ—যুগে মেয়েদেরই জিৎ সব বিষয়ে—তর্কে, খেলায়, অভিনয়ে, মোটর রেসে—

প্রেমে?—শুধোলুম।

প্রেমে তো চিরকালই আমরা জিতে এসেছি!—মিমির দুষ্টু চোখের তারায় হাসির আলো ঝিকমিকিয়ে উঠছে।

আর, তাস খেলায়?

তাসের গোছা ভাঁজতে ভাঁজতে মিমি জবাব দিলে, এখুনি প্রমাণ হয়ে যাবে।

চ্যালেঞ্জ?

নিশ্চয়।—মিমি তাস দিতে শুরু করেছে।

ইতিমধ্যে অটো মোটা একটা চুরুট ধরিয়েছিল। দাঁতে চেপে প্রশ্ন করে বসল, What do ye stake my little buttercup?

তাই তো, কি দিয়ে বাজি ধরা যায়? নিচেকার ঠোঁট কামড়ে মিমি ভাবতে লাগল। চিনে মাটির পুতুলের মতো তুলি দিয়ে আঁকা গাঢ় লাল পরিপুষ্ট ঠোঁট! কামনার মতো কমনীয়, মৃত্যুর মতো মোহময়!

মিমি বলল, আচ্ছা ধরো, এক গেলাস শ্যাম্পেন বাজি। Not those champagne-colored lips?

কথাটার মানে বুঝতে অটোর বোধ করি মিনিট দুই—তিন সময় লেগেছিল। তারপর হঠাৎ আমার ডান হাতখানা ওর প্রকাণ্ড থাবার মধ্যে প্রায় পিষে ফেলতে ফেলতে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, The idea! The idea!

স্থির চোখে আমার পানে তাকিয়ে মিমি স্পষ্ট গলায় বললে, বেশ, তাই। I stake my kiss.

খেলা শুরু হয়ে গেল।

মিমি ডেকেছে একটা হার্ট। যদিচ আমার হাতে হরতনেরই অভাব, তবু ওকে ঘাবড়ে দেবার জন্যই গলা চড়িয়ে ডাক দিলুম: টু হার্টস! —চেয়ে দেখি, চাপা হাসিতে মিমির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ও কি আমার ডাকের কোনো মধুর অর্থ খুঁজে পেয়েছে—ধরতে পেরেছে অস্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত?

লোনা দিলে পাশ। এবার অটোর পালা, একবার সে আমার আর মিমির পানে তাকাল, তারপর যেন আমার ডাকের প্রতিবাদ করেই বলে উঠল থ্রি হার্টস!

সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিলুম, লাইটার না জ্বেলে লোনাকে বললুম, এবার কিন্তু তোমার ফোর হার্টস ডাকা উচিত।

উত্তরে লোনা দিলে ডবল এবং মৃদু হেসে বললে, It’s Heart’s game and not a game of hearts!

প্রথম দানে আমাদের দেড়শো' ডাউন গেল,—যেতই। অন্য রঙের ডাক দেবার উপায়ও আমার ছিল না। মিমির চোখের তারায় সেই দুষ্টু হাসি! এবার কিন্তু সাবধান হতে হবে, মিমি আমায় চ্যালেঞ্জ করেছে, বাজি রেখেছে তার চুম্বন—ফ্রান্সের সবচেয়ে দামি শ্যাম্পেনের চেয়ে মধুরতর মদিরতর! অটোকে বললুম, হুঁশিয়ার!

এবারে ওদের খেলা—চারটে স্পেডের ডাক।

উনিশ

এবারে ওদের খেলা—চারটে স্পেডের ডাক। বঙ্কিমচন্দ্রের কথাটা পুরোনো হলেও সত্যি: সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র! শুধু পুরুষ জাত নয়—সুন্দরী নারীর প্রতি ভাগ্যেরও স্বাভাবিক পক্ষপাত আছে দেখছি! তা নইলে বেছে বেছে অনার্স কার্ডগুলি মিমির হাতেই বা পৌঁছবে কেন? যে অরণ্যে আসে চৈত্রমাস, সেইখানেই দক্ষিণ হাওয়ার পক্ষপাত, ফুলের প্রাচুর্যও সেইখানেই। নারীর যৌবন হল সেই চৈত্রমাস।

চারটের বদলে ওদের খেলা হল পাঁচটা স্পেডের। গেম ওদের হতই, সেজন্য মাথা খাটাবার কোনো দরকার ছিল না। স্কোর—সিটটা মিমির দুষ্টু চোখের মতোই ঠাট্টা করছে। একটা পার্ট গেম পর্যন্ত আমাদের হয়নি এখনো,‘They’ লেখা ঘরটা একেবারে ফাঁকা, কুমারীর মতো নিষ্কলঙ্ক! তবু দেখা যাক, আমাদের ধূসর প্রান্তরে একটিবারও জাগে কিনা বসন্তশ্রী। ভাগ্যেরও তো ভুল হতে পারে! কবি থাকলে হয়তো হাসত,—আমি কিন্তু অদৃষ্টবাদী লোক।

আবার তাস দেওয়া শুরু হয়েছে। ওদিকে আবার শুরু হয়েছে জাইলোফোনের টুংটাং—এর সঙ্গে মেয়েদের গান:

সাদা চেরি আর নীল ভায়োলেট ফুটছে গো,

জানো কোথায়?

চেরিফুল ফোটে সাদা গালে, আর ভায়োলেট ফোটে ওই চোখের

নীল তারায়!

আর জানি এক গোলাপ ফুটেছে চুপি চুপি আজ নিশীথে গো

তুলনা নেই;

জানি প্রিয়, জানি অনুরাগ—রাঙা তোমার মন—

গোলাপ সে—ই!

বাইরে অন্ধকার রাত্রির চোখে নেমেছে, কুয়াশার তন্দ্র, কিন্তু ওয়েসাইড গ্রোভ—এর চোখে আজ ঘুম নেই। গানে এদের নেই বিরাম, নাচে এল না ক্লান্তি। লীলায়, লাস্যে, উজ্জ্বলতায়, উচ্ছলতায় ক্লাব—হাউসের এই রাত্রি এখনো যেন কিশোরী! আর আশ্চর্য লোক ওই জকি। দু'দণ্ড স্থির হয়ে কোথাও বসতে দেখলুম না ওকে। এইমাত্র দেখা গেল রূপালি জরির পাড়ওয়ালা কালো ভেলভেটের একটা টুকরো কোমরে জড়িয়ে, 'বোলেরো' নাচে ও মেতে উঠেছে, পাঁচ মিনিট বাদে দেখো, ওই কোণে গিয়ে কাউকে ডেকে বলছে: 'শ্যাম্পেন? শ্যাম্পেন দিই আরেকটু?'...আবার খানিক পরেই হয়তো শুনতে পাবে হলের ও—কোণ থেকে জকির হাসি আর হল্লা। অগ্নিকুণ্ডের মতো উষ্ণতায় আর উল্লাসে ঘরের সবাইকে ও বাঁচিয়ে রেখেছে, ও মাতিয়ে রেখেছে।

মনে মনে মিমিকে বললুম, আজকের খেলায় শেষ পর্যন্ত যদি হার মানতেই হয়, তবু আজকের এই উৎসব—রাত্রি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তোমার কপালে আজ যে সাদা চেরিফুল ফুটেছে আর চোখের তারায় ফুটেছে যে নীল ভায়োলেট, অনেক দিন পরে হঠাৎ কোনো এক ঘুম ভাঙা রাতে তারই অস্পষ্ট সুগন্ধ আমায় করে তুলবে উন্মনা! আর মনে মনে যদি ভাবি, সেই গোলাপ—তোমার অনুরাগী হৃদয়ের মতো রাঙা সেই গোলাপ আমারই জন্য আজ ফুটল, তবে তুমি না—ই বা আপত্তি করলে মিমি।—Ugh! এমন রাবিশ বরাত দেখেছ কখনো?

অটো একটি একটি করে তাস তুলে নিয়ে দেখছিল। বেছে বেছে দুরি থেকে নওলা পর্যন্ত তাসগুলোই বোধ করি ওর কাছে পৌঁছেছে। এবারেও নিশ্চয় ভাগ্যের ভুল হয়নি। নিজেরই ওপর রাগে ওর স্বাভাবিক লাল মুখ আরো লাল হয়ে উঠেছে, প্রকাণ্ড এঞ্জিনের মতো ওর বিশাল দেহটা উঠেছে অধৈর্য চঞ্চল হয়ে। বারবার এঞ্জিনের মতো ওর বিশাল দেহটা উঠেছে অধৈর্য চঞ্চল হয়ে। বারবার ও মিমির পানে তাকাচ্ছে, আর অসহিষ্ণু হাতে নাড়াচাড়া করছে তাসগুলো নিয়ে।

অটোকে বললুম, আমি যে তোমার পার্টনার, তা ভুলে যাচ্ছ কেন? চেহারার দিক থেকে না হোক, বরাতের দিক থেকে দুজনের চমৎকার মিল।

এখন যদি ভাগ্যের সঙ্গে দেখা হত মুখোমুখি, তাহলে—তাহলে...(অটোর মুঠি আবার কঠিন হয়ে উঠেছে দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠলুম) অটো ক্রুগারকে ঠাট্টা করার মজা সে হাতে হাতে টের পেত! ...এই যে ওয়েটার...

ওয়েটার এসে দাঁড়াতেই সে ট্রে থেকে বিয়ারের ভর্তি মগটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে নিঃশেষ করে ফেললে।

কল দেওয়া শুরু হল। মিমি গোড়ায় দিলে পাশ, আমার তাস আমি দেখিনি—না দেখেও অবশ্য বলে দিতে পারি, হাতে কি এসেছে। তবু ডাকলুম, নো—ট্রাম্প। লোনা ডাক দিলে—টু ডায়মন্ডস। অটোর বিরক্ত মুখ থেকে বেরোল: নো বিড।

ঘুরে এল মিমির পালা, গলা চড়িয়ে এবার ডাকলে, গেম ইন ডায়মন্ডস! ওর ঠোঁটে আর চোখের তারায় সেই তরল দুষ্টু হাসি উপচে পড়ছে! এবারে 'রাবার' নিশ্চয়!

চেয়ে দেখি, মুখের চুরুটটা অটো দাঁত দিয়ে অস্থিরভাবে চিবোচ্ছে। সত্যিই তাহলে হেরে যেতে হল। মাথার মধ্যে কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল। ক্যাবারে—মেয়েদের নাচ গান এখনো চলছে।

সমস্তই মনে হল নিরর্থক—এই গান, নাচ, এই উৎসব রাত্রি, ফেনোচ্ছল এই সুরের পেয়ালা! ফ্রান্সের সমস্ত দ্রাক্ষাবনের চেয়ে—পৃথিবীর সমস্ত দ্রাক্ষাবনের চেয়ে দু'খানি ওষ্ঠাধর ঢের বেশি মদিরতর, মধুরতর। গ্রীষ্মের রাত্রির নিশ্বাসের মতো উষ্ণ উজ্জ্বল সেই স্পর্শের তাপে রোমাঞ্চকর যে—মুহূর্তটির মৃত্যু হয়, তার কাছে চঞ্চল ঝলমল এই উৎসব রাত্রির দাম আর কতটুকু? আমি তো চেয়েছিলুম সেই মুহূর্তের মৃত্যু। যে—মৃত্যু সুন্দরতর জীবনের রূপ ধরে ফুটে ওঠে সূর্য—চুম্বিত ফুলের মতো।

কিন্তু হল না—এবারকার মতো তোমার চুম্বন নিয়ে তুমি ফিরেই যেও মিমি।

শুনেছ, আমি ডেকেছি পাঁচটা ডায়মন্ডস। এবার আমাদের রাবার!—মিমি আমায় ডেকে বললে।

পাশ দেওয়া ছাড়া উপায় কি। কিন্তু পাশ দেওয়ার আগে হাতের তাসগুলো একবার দেখে নেওয়া দরকার। তবু যদি...এ কী অদ্ভুত তাস এসেছে আমার হাতে, রুইতন পাঁচখানা অথচ ইস্কাবন নেই একখানাও। এই তো সুযোগ, এইবার ডবল দেওয়ার পালা আমার।

তাই হল, স্পেডের পিঠ তুরুপের ফলে ওদের বেশ কিছু ডাউন গেল—তিনশো। যাক, আমাদের দেড়শোর দেনা শোধ হয়ে কিছু সঞ্চয় রইল। এবারকার মতো রাবার ঠেকানো গেছে। একটা সিগারেট ধরানো যেতে পারে এখন। লাইটার জ্বালবার আগে মিমিকে বললুম, তোমার বাজির কথা আরেকবার স্মরণ করবার সময় এসেছে মিমি!

মিমি তাস ভাঁজছিল, আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলে, Yea, still I stake a kiss.

ওর কণ্ঠের সেই তরলতা আর নেই, কেমন যেন কঠিন। আবার তাস দেওয়া হল, কিন্তু কার্ড—লাক আমাদের ঘুরে গেছে। ডাক দিয়েছিলুম আমরাই, তিনটে নো—ট্রাম্পের খেলা—কিন্তু 'লিটল—শ্লাম' হবে ভাবিনি। অটোর কটা রঙের চোখ খুশিতে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, গুনগুন করে আবার ধরেছে সেই পুরোনো গানের লাইন:

‘Green grass mows well...’

আশ্চর্য, মিমির মুখে কিন্তু এতটুকু ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না। ঠোঁটে তেমনি হাসির ইসারা, চোখে তেমনি দুষ্টুমির ঝিকিমিকি! সবচেয়ে আশ্চর্য যে, তাস দিতে দিতে হঠাৎ সে আমার দিকে ঝুঁকে, চাপা গলায় বললে, am happy naughty boy, that you win!

পঞ্চমবারের খেলা শুরু হল। ভাগ্য এতক্ষণ আমাদের চিনতে ভুল করেছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ দেখা পুরোনো বন্ধুর মতো এবার সে আমাদের ওপর সত্যিই খুশি হয়ে উঠেছে দেখছি। এবারেও আমাদের গেম এবং 'রাব'। খুশিতে অটোর কণ্ঠস্বরের পর্দা হঠাৎ অনেকখানি চড়ে গেছে।

খেলা শেষ হতেই লোনা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলে। মিমি বসে বসে স্কোর—সিট—এর পাতায় পেন্সিল দিয়ে হিজিবিজি দাগ কাটছিল। অটো খামোকা গান থামিয়ে শুধোলে, And now my little buttercup?

চুলের গুচ্ছ দুলিয়ে মিমি মুখ তুললে, তারপর একবার আমার দিকে, আরেকবার অটোর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সহজ গলায় বললে, কিন্তু আমি বাজি রেখেছিলুম একটি চুমু, মাত্র একটি—কে নেবে বলো?

কুড়ি

গুচ্ছ গুচ্ছ চুলে ঢেউ তুলে, অত্যন্ত সহজ গলায় মিমি বললে, হ্যাঁ, মনে আছে বইকি। কিন্তু আমি বাজি রেখেছিলুম একটি চুমু—মাত্র একটি! কে নেবে বলো?

Surely me!

আশ্চর্য, অটোর আর আমার মুখ দিয়ে একসঙ্গে একই মুহূর্তে কথাটা বেরিয়ে এল। এই কথাটা বলবার জন্য দুজনেই যেন মনে মনে অপেক্ষা করছিলুম এতক্ষণ। কোথায় যেন জমে উঠেছিল কামনার উষ্ণ বাষ্প, এতক্ষণে একই মুহূর্তে গেল তা বিদীর্ণ হয়ে।

মিমি উঠল হেসে। সরু ইস্পাতের টুকরোয় ঘা দিলে যেমন তীক্ষ্ন ধাতব আওয়াজ বেরোয়, তেমনি সেই হাসি। হাসতে হাসতেই বললে, বাঃ, পুরুষ জাতটা তো ভারি উদার আর নিঃস্বার্থ।

অটো আর মিমির পরস্পরের মুখের দিকে একবার তাকালুম। মিনিট দুই দুজনের মুখের কথা গেল হারিয়ে। সেই এক পলকের দৃষ্টির ভেতর দিয়ে পরস্পরকে আমরা স্পষ্ট চিনে নিয়েছিলুম—চিনে নিয়েছিলুম বিংশ শতাব্দীর সমস্ত সভ্যতা আর সংস্কারের ছদ্মবেশের আড়াল থেকে নারীলোভী দুটি আদিম বর্বরকে।

ওদিকে ক্যাবারে—মেয়েদের নাচ—গান চলেছে সমানে, যৌবনের কামনার মতো শ্যাম্পেন উঠছে এখনো ফেনিয়ে। কিন্তু আমাদের চারপাশের এই আবহাওয়া হঠাৎ এমন গুমোট করে উঠল কেন? কিছু বলতে যাচ্ছিলুম, তার আগেই অটো বললে, যাই বলো, বাজির পুরস্কারটা আমারই পাওনা—হ্যাঁ, আমারই তো পাওনা! Otto for–

কথাটা আমিই শেষ করে দিলুম: Otto for champagne and O’joy for champagne-colored lips.

দমকা হাসির হাওয়ায় মিমি এবার আইভিলতার মতো ভেঙে পড়বে যেন।

তারপর হাসি থামিয়ে, ফাঁকা বিয়ারের মগে পেন্সিলটা দিয়ে টুং—টাং আওয়াজ করতে করতে হালকা সুরে গেয়ে উঠল:

Naughty boy and pretty boy,

Otto Kruger and O’joy!

কথাটা আমি হঠাৎ রসিকতাচ্ছলেই বলেছিলুম, কিন্তু অটো কথাটা নিলে অন্যভাবে। বলে বসল, মেয়েদের ব্যাপারে অটো ক্রুগার লিমিটেড কারবার করে না।

কথাটা কানে বিশ্রী শোনাল। বললুম, অন্তত আজ রাতে আমি যে তোমার পার্টনার, তা ভুলে যেও না অটো!

Ugh!—অটোর মুখে সেই বিরক্তিসূচক শব্দটা আবার শোনা গেল : পার্টনার তো মিমিরও ছিল, তুমি লোনার কাছে চেষ্টা করে দেখলে না কেন? বাইবেলের দিব্যি দিয়ে কেউ তো তোমায় মানা করেনি!

আমি তোমারই কথার প্রতিধ্বনি করতে পারি, অটো, কি জবাব দেবে তখন বলো?—শুধোলুম।

জবাব এই যে, আমি আমার দাবি ছাড়ব না! অটো গর্জন করে উঠল।

দাবি! তুমি হাসালে অটো। সুন্দরী মেয়ের চুমু যদি দাবি করে নিতে হয়, তবে শ্বেত—পাথরের অনেক সুন্দরী নারী—মূর্তি তো আছে—আছে অনেক আড়ষ্ট কঠিন ঠান্ডা ঠোঁট!...আর দাবির কথাই যখন তুললে, তখন জেনে রেখো, তোমার চেয়ে দাবি আমারও কম নয় কিন্তু...

অটো একটা কিছু জবাব দিতে যাচ্ছিল, লাইটার জ্বেলে তাড়াতাড়ি তার নিভে যাওয়া চুরুটের সামনে ধরলুম। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললুম, কিন্তু বাজে তর্ক করে লাভ কি? আর কতক্ষণই বা ওই উৎসব রাত্রির পরমায়ু বন্ধু! তার চেয়ে মীমাংসার ভার দেওয়া যাক মিমির হাতেই, কি বলো?

অটোর জবাবের অপেক্ষা না করেই মিমির পানে তাকিয়ে প্রশ্ন করলুম: তোমার বাজির পুরস্কার তুমি কাকে দিতে চাও, মিমি? যাকে ইচ্ছে দিতে পারো কিন্তু—আমরা আপত্তি করব না।

তাই নাকি!—দুই চোখে তরল কৌতুক ভরে মিমি আমার দিকে চেয়ে বলে উঠল: মনে মনে তোমার নিশ্চয় ধারণা যে, পুরস্কারটা তুমিই পাবে!

মিমির কণ্ঠে কি প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ ছিল? হয়তো আমারই মনের ভুল, তবু হঠাৎ সমস্ত মনটা গেল বিস্বাদ হয়ে! বললুম, ভুল করছ তুমি, দাবিও আমি করি না, দামও নিই না।...আচ্ছা, গুডবাই।

মাত্র আট দশ পা এগিয়েছি, হঠাৎ পেছন থেকে আমার ওভারকোটে টান পড়ল। ফিরে দেখি মিমি।

চলে যাচ্ছ যে বড়?

বললুম, কার্পোরাল অনেকক্ষণ একলা বসে আছে, তাই...

তুমি তো ছেলেমানুষ!—মিমি আমার বুকের কাছে ঘেঁষে এল, টলটলে চোখ দুটি আমার মুখের পানে তুলে ছোট খুকির মতো আবদারের সুরে বললে, না, তুমি যেতে পাবে না। এসো।

আশ্চর্য মেয়ে! কতক্ষণেরই বা আলাপ, অথচ পুরোনো বন্ধুর মতো জোর করতে ওর বাধল না একটুও!...ককেট? হয়তো তাই হবে। নারী হচ্ছে তোমারই ছায়া, তার পেছনে ছুটে চলো, সে পালাবে, কিন্তু সরে এসো তার কাছ থেকে, ছায়া তোমার অনুসরণ করবে। একটা শক্ত জবাব এসেছিল মুখে, কিন্তু মুখের কথা আমার গেল হারিয়ে—হারিয়ে গেল গাঢ়—নীল সেই চোখের আকাশে, চঞ্চল হাসির সেই মায়াকাননে।

তেমনি করেই হেসে মিমি চুপি চুপি বললে, দাম না হয় না—ই নিলে—যদি কেউ উপহার দেয়?

বললুম, তাহলে মনে করে রাখব অনেকদিন।—ফের ফিরে এসে বসতে হল চেয়ারে!

মিমি বললে, আচ্ছা, এক কাজ করা যাক, লটারি করে যার নাম উঠবে, সেই পাবে বাজির পুরস্কার, কেমন?

রাইট ও!—অটো উৎফুল্ল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর কি হতে পারে? কি বলো ওজয়? হা—হা—হা—

হল কাঁপিয়ে অটো হেসে উঠল। এক মুহূর্তে ওর গলার সুর পর্যন্ত বদলে গেছে দেখছি। টকটকে লাল রূঢ় মুখখানা এসেছে কোমল হয়ে। সুন্দরী মেয়ের সুমুখে এলে, গরিলার মতো বন্য বিশালকায় অটো ক্রুগার কখন যে সুন্দর, ভদ্র হয়ে ওঠে, তা কি ও নিজেই জানতে পারে?

স্কোর—শিট থেকে দু'টুকরো কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে মিমি একটাতে লিখলে: 'অটো' আরেকটাতে লিখলে: 'ওজয়'। তারপর কাগজের টুকরো দুটো গোল গোল করে পাকিয়ে অটোর হাতে দিলে। পাকানো কাগজ দুটো অটো তার প্রকাণ্ড থাবার মধ্যে কয়েক সেকেন্ড নাড়াচাড়া করে জুয়ার ঘুঁটির মতো টেবিলে ছড়িয়ে ফেলে, মিমিকে বললে, একটা তুলে নাও।

একটা টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে মিমি কাগজটা খুলে দেখলে, তারপর তাকাল অটোর দিকে। ঠোঁটের কিনারে আর চোখের তারায় তার সেই দুষ্টু হাসি। অটোর চোখদুটো ঝকমক করে উঠল—আগ্রহে, আনন্দে, নেশায়। অটোর নামই উঠেছে নিশ্চয়। তা উঠুক, কিন্তু আমার মুখে কি অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল তখন?

রুদ্ধশ্বাসে অটো শুধোলে, কে—কার নাম উঠল?

নিঃশব্দে মিমি কাগজের টুকরোটা টেবিলের ওপর মেলে ধরলে। তাতে লেখা—আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলুম না। তাতে লেখা: 'ওজয়'।

অটোর সারা দেহ পাথরের মূর্তির মতো আড়ষ্ট কঠিন হয়ে উঠেছে। চলন্ত একটা ডায়নামো যেন হঠাৎ গেছে থেমে।

একুশ

খানিকক্ষণ বিশ্রী গুমোট। তারপর অস্বাভাবিক শান্ত গলায় অটো বলে উঠল, আরেকবার লটারি করতে বললে, তুমি বোধ করি আপত্তি করবে না মিমি?

মিমি এতক্ষণ কাগজের টুকরোটার দিকে চুপ করে তাকিয়েছিল, মুখ তুলে বললে, কেন?

যদি বলি, আমার ধারণা, এর মধ্যে কোনো কারসাজি আছে!

এবার মিমি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল, বললে, ভারি দুঃখিত আমি অটো।

মনে মনে কোথায় যেন অস্বস্তি বোধ করছিলাম। বললুম, আমি কিন্তু রাজি, আরেকবার লটারি হোক।

বেশ। বলে মিমি কাগজের টুকরো দুটো ছিঁড়ে ফেলে দিলে। এবার নতুন কাগজে নতুন করে নাম লিখলে অটো নিজে, তারপর পাকানো টুকরো দুটো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে মিমিকে বললে, কুড়িয়ে নাও একটা।

কিন্তু হল না, এবারেও হল না। ভাগ্য এবারেও অটোকে ঠকিয়েছে। কাগজের টুকরোটার ওপর পেন্সিলে লেখা ‘Ojoy’ কথাটা ওর দিকে চেয়ে যেন মৃদু মৃদু হাসছে। এবার অটো কাগজ দুটো নিজেই ছিঁড়ে ফেললে। নিভে যাওয়া ফার্নেসের মতো ওর মুখ চোখ ঠান্ডা—ফ্যাকাশে।

বাজির পুরস্কারটা তাহলে আমারই পাওনা। মনে মনে তবু কেমন যেন অপ্রস্তুত আর অস্বস্তি বোধ করছিলুম। মিমির দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে গেল। দেখি, মুখ থেকে ওর গলা অবধি একটি লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে...

কিন্তু ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে, ভাবিনি। ভাবতে পারিনি যে, সভ্যতা আর সংস্কারের খোলস থেকে অতর্কিত ফণা তুলে দাঁড়াবে বর্বর বন্য কামনা। ভাবতে পারিনি যে, এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাবে ট্রয়!

মিমি এসে আমার বুকের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল, মস্ত একটা ক্রিসেন্থিমামের মতো মুখখানা তুলে ধরলে আমার দিকে, চোখের পাতা দুটি ধীরে ধীরে বুজে এল রাত্রিবেলার ফুলের মতো। মিমির মুখে ছড়িয়ে পড়েছে আলো—সোনালি আলোর সোনালি রেণু। রাঙা ঠোঁটে রাঙা নেশা টলমল করছে, ফ্রান্সের সমস্ত দ্রাক্ষাবনের চেয়ে মধুর, মৃত্যুর চেয়েও মোহময়।

ধীরে ধীরে আমার মুখ নুয়ে এল সোনালি সেই ক্রিসেন্থিমামের ওপর। পাতলা দু'খানি ভীরু ঠোঁট প্রজাপতির পাখার মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে।

হঠাৎ...এক সেকেন্ডের জন্য আমার দম আটকে এল, লোহার মতো শক্ত থাবায় কে যেন পেছন থেকে আমার ওভারকোটের কলার চেপে ধরেছে।

ফিরে দেখি, হ্যাঁ, অটোই বটে। কিন্তু এ অটোকে এতক্ষণ আমি চিনতুম না। বয়লারের মতো টকটকে লাল মুখের রেখাগুলি কেমন ক্রুর, কঠিন, একগোছা চুলে ডান দিকের চোখটা প্রায় ঢেকে গেছে, বাঁ—চোখে অন্ধকার রাত্রে মোটরের হেডলাইটের মতো সে কী তীব্রতা! উত্তেজনায় আর ঘন ঘন নিশ্বাস—প্রশ্বাসে ওর বুকখানা প্রচণ্ড হাপরের মতো ফুলে ফুলে উঠছে।

আমার পেছনে যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের বন্য বর্বর একটা অতিকায় গরিলা! সুসভ্য পোশাকে দাঁড়িয়ে পুরাণ—বর্ণিত স্যামসন যেন। বিংশ শতাব্দীর মানুষের এই আদিম অরণ্য স্বাভাবিকতাকে আমি চিনতুম না—চিনতুম না অচরিতার্থ কামনার এই ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসাকে।

শক্ত থাবার চাপে গলায় আমার লাগছিল, তবু শান্তস্বরে বললুম, ছেড়ে দাও, নেশার ঝোঁকে সহজ ভদ্রতাটুকু অন্তত ভুলে যেও না।

Ugh!—জড়িত স্বরে অটো গর্জন করে উঠল: তোর বুড়ো—ঠাকুরদার নেশা হোক, শুয়োরের নাতি! চুমু চোর!

প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে ফের বললুম, ছেড়ে দাও বলছি অটো, এটা মাতলামি করবার জায়গা নয়।

উত্তরে অটো আমার গলায় সজোরে একটা ঝাঁকানি দিলে, নিমেষের জন্য আমার দম বন্ধ হয়ে এল। তেমনি জড়িত কর্কশকণ্ঠে অটো বলে উঠল, থাম, থাম, ছেলে—মুখো মেয়ে কোথাকার! চুমু চোর!...বেশি কথা বলবি তো রাগবি বলের মতো ছুঁড়ে ফেলে দেব রাস্তায়...

মাথার চুল থেকে আমার পায়ের নখ পর্যন্ত আগুনের একটা হলকা নেমে গেল। ভাববার অবকাশ ছিল না, ছিল না স্থানকালপাত্র বিবেচনার সময়। দেহের সমস্ত শক্তি যেন আমার ডান হাতের মুঠিতে এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

পলকের মধ্যে কি যে ঘটে গেল, বুঝতে পারিনি! শুধু দেখলুম, আমার ওভারকোটের কলার ছেড়ে দিয়ে, অটো দু'হাতে নাক—মুখ ঢেকে অস্পষ্ট আর্তনাদ করে উঠল, তারপর সেই বিশাল দেহটা টলতে টলতে পেছনে ফাঁকা টেবিলটার ওপর হুড়মুড় করে গেল পড়ে।

অটো এতটা আশা করেনি নিশ্চয়। আমার প্রথম আক্রমণের জন্যে সে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু এখন সে নিজেকে নিয়েছে প্রস্তুত করে, টলমলে বিশাল দেহটাকে খাড়া করে আবার সে উঠে দাঁড়িয়েছে। আহত নাকের কাঁচা রক্তে ওর সাদা শার্ট যে কমিউনিস্টদের পতাকার মতো রাঙা হয়ে উঠেছে, সেদিকে ওর খেয়াল নেই। আমার দিকে লক্ষ্য রেখে, যন্ত্রণা—কাতর স্বরে বলতে বলতে ও এগিয়ে আসছে: এক ঘুসিতে তোকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দিচ্ছি...দাঁড়া, ইঁদুর বাচ্চচা...

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে, মিমি এতক্ষণ কাঠের মূর্তির মতো আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল, চোখের সামনে যেন অবাস্তব একটা কিছু ঘটছে! আতঙ্কে তার মুখ ব্লটিং—কাগজের মতো সাদা! রক্তাক্ত বিকৃত মুখে অটোকে ফের এগিয়ে আসতে দেখে, হঠাৎ ও যেন শিউরে উঠল—আমার বুকের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মিনতি করে বারংবার বলতে লাগল: এখান থেকে তুমি চলে যাও ওজয়, চলে যাও...লক্ষ্মীটি...

কিন্তু সংযমের বাঁধ তখন গেছে ভেসে, রক্তে ধরে গেছে আগুন। উগ্র উদ্ধত একটি মূঢ় স্পর্ধায় অপরিণামদর্শী যৌবন তখন হয়ে উঠেছে উন্মাদ!

ভীতিবিহ্বল মিমিকে টেনে সরিয়ে দিলুম, গা থেকে ওভারকোট খুলে ফেলে দিলুম ছুড়ে, হাতের আস্তিন গুটিয়ে দাঁড়ালুম সোজা হয়ে। লোহার মতো শক্ত, পাথরের মতো ভারি থাবা নিয়ে অটো তখন আমার প্রায় কাছে এসে পড়েছে। বুনো মহিষের মতো নাক মুখ দিয়ে তার অদ্ভুত একটা গর্জন বেরোচ্ছে: দাঁড়া! এক ঘুসিতে তোকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দিচ্ছি।

কথাটা কিন্তু অতিরঞ্জিত নয় মোটেই। কলকাতার দুর্দান্ত ছোকরাদের মধ্যে শক্তিমান বলে আমার যতই সুনাম থাক, যতই জোর থাক আমার কবজিতে, সাড়ে 'ছ' ফিট লম্বা বিশাল এই 'আয়রন—ম্যান'—এর তুলনায় আমি শিশু বইকি। মনে মনে জানতুম, চ্যাম্পিয়ন মুষ্টিযোদ্ধা অটোর নিয়তির মতো অনিবার্য থাবার আঘাতে সত্যিই আমি সান্ডউইচ হয়ে যেতে পারি, কিন্তু দুরন্ত দুঃসাহস তখন আমার মতো মধ্যে মাথা তুলে রুখে দাঁড়িয়েছে আহত সাপের মতোই।

চকিতে আমার সামনে এক হাত দূরে হিংস্র একটা মুঠি উদ্যত হয়ে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে আমার গলার হাড় যেত চূর্ণ হয়ে...কিন্তু এ কী!

অরণ্যে যেন হঠাৎ আগুন লেগেছে! মারামারির অন্ধ উত্তেজনায় ওয়ে—সাইড গ্রোভ—এর এই মাতাল মজুরের দলকে তুলেছে খেপিয়ে! আমাদের এ দ্বন্দ্বযুদ্ধের কারণ কি, কেউ তা জানতে চায় না, বুঝতে চায় না, দোষী কে! পৃথিবীতে নীতি নেই, ন্যায় নেই—নেই সভ্যতা আর সহজ বুদ্ধি। আছে শুধু বন্য বর্বর বীভৎস কতকগুলি পশু!

হ্যাঁ, আগুন লেগেছে এই জন—অরণ্যে। হই—চই চিৎকার, ভীত ক্যাবারে— মেয়েদের আর্তনাদ! টেবিল—চেয়ারগুলো টুকরো—টুকরো হয়ে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে পড়ছে, ঝমঝম শব্দে ভাঙছে কাচের বাসন। হঠাৎ বড় একটা প্লেট লেগে বাতির ঝাড়টা গেল গুঁড়িয়ে!

অন্ধকার! কালো পাথরের মতো জমাট, মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর! অন্ধকার এই উৎসব রাত্রি হঠাৎ যেন আতঙ্কে অস্থির, উন্মাদিনী হয়ে উঠেছে। প্রকাণ্ড একটা যুদ্ধের জাহাজ যেন সমুদ্রের অন্ধকার অতলে যাচ্ছে তলিয়ে।

সেই অন্ধকারে অটোর মুষ্টি হল লক্ষ্যভ্রষ্ট। কিন্তু উন্মত্ত জনতার ঠেলাঠেলিতে শরীরের ভার আমি রাখতে পারলুম না, পড়ে গেলুম জনতার পায়ের তলায়। ভারি একটা বুট আমার বাঁ দিকের পাঁজরা চেপে ধরেছে, মনে হল ফুসফুস এখুনি ফেটে যাবে—কানে এল, মিমির তীক্ষ্ন ব্যাকুল চিৎকার: জকি, এদিকে. . . শিগগির. . .

তারপর আর কিছু মনে নেই।

বাইশ

চোখ মেলতেই মাথার ভেতর কেমন যেন গোলমাল বেধে গেল। চোখ মেলেছি বটে, কিন্তু আমার ধারণাশক্তি এখনো জাগেনি। অন্ধকার বিস্মৃতির কোলে ঘুমিয়েছিলুম এতক্ষণ—গাঢ় নিশ্চেতনার দেশে! রিপভ্যান উইঙ্কল—এর মতো হয়তো কত দীর্ঘ বছর পার হয়ে এসেছি, পার হয়ে এসেছি কত সমুদ্র, কত প্রান্তর, কে জানে! কে জানে, এ কোথায় এসে পড়লুম আমি?

চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখি অ্যাসবেস্টস দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটা কুঠুরী—রেস্তোরাঁয় নিরিবিলি কামরার মতো। স্প্রিং—এর মতো একখানা খাটে আমি শুয়ে, পাশে একটা টেবিলের ওপর ওষুধের কয়েকটা শিশি আর কিছু ফুল। সবুজ ঘেরা—টোপ—ঢাকা স্তিমিত বাতি জ্বলছে।

বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়েছিলুম, কিন্তু তৎক্ষণাৎ ফের শুয়ে পড়তে হল। তীক্ষ্ন নখ দিয়ে কে যেন আমার বাঁ দিকের ফুসফুসটা চেপে ধরেছে। যন্ত্রণায় আবার চোখ বুজে এল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই কে যেন আমার বুকে একখানি হাত রাখল—মোমের মতো নরম, পাথরের মতো ঠান্ডা একখানি হাত। মিষ্টি মেয়েলি গলায় কে যেন আমার কানে কানে বললে, চুপ করে শুয়ে থাকো লক্ষ্মীটি—নড়াচড়া কোরো না।

আবার চোখ মেলে তাকালুম। শিয়র থেকে একখানি মুখ নুয়ে পড়ছে আমার মুখের ওপর।

চিনতে পারছ আমায়?

চিনতে—কই না! তবে, ভারি চেনা—চেনা লাগছে কিন্তু ওই মুখ। হয়তো ভোরবেলাকার স্বপ্নে দেখেছি, হয়তো দেখেছি শহরের পথে আবছায়া কুয়াশায়। কোথায় যে দেখেছি, তা ঠিক স্মরণ করতে পারছিলুম না, তবু ফিকে সবুজ সেই কোমল আলোয় মুখখানি বড় চেনা—চেনা লাগছিল।...হ্যাঁ, চিনি বইকি, সেই গাঢ় নীল চোখ, ঠোঁটের কিনারে সেই তরল সঙ্কেত...

মিমি! তুমি মিমি!

হ্যাঁ, আমি। কেমন আছ ওজয়?

কেন, কি হয়েছে আমার?

কোনো জবাব না দিয়ে মিমি আস্তে আস্তে আমার বুকের ব্যান্ডেজের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির কুয়াশা গেল কেটে, মনে পড়ল সেই ওয়ে—সাইড গ্রোভ, বর্বর কামনার সেই বন্য প্রতিযোগিতা, উন্মাদিনী সেই উৎসব রাত্রি, তারপর অন্ধকার—মৃত্যুর মতো গাঢ় সেই অন্ধকার!

আমি এখন কোথায় আছি মিমি?

নিউইয়র্কে।—মিমি বললে, নিউইয়র্কে লাইম লাইট থিয়েটারে। জকি তোমায় এখানে এনে রেখেছে।

সবই শুনলুম মিমির মুখে। সেই ভয়ঙ্কর রাত্রে মাতালদের দাঙ্গা থামাবার জন্য শেষ পর্যন্ত পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। পুলিশ এসে যখন ফের আলো জ্বালল, তখন সেই ক্লাব হাউসটির চেহারা বিধ্বস্ত বিক্ষত জীবনের মতো ভয়াবহ। চতুর্দিকে ভাঙা টেবিল চেয়ার আর কাচের বাসনের টুকরো ছড়ানো, তারই মাঝে মাঝে আহত মাতাল মজুরের দল পড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে। এমনি করেই চিরকাল ধ্বংস হয়ে যায় ট্রয়—সুন্দরী হেলেনের জন্য—হেলেনের সেই মধুরতর বিষাক্ত চুম্বনের জন্য। এমনি করেই বনমানুষের আদিম কামনার কাছে বিংশ শতাব্দীর সভ্যতা ও সংযম এক মুহূর্তে হয়ে যায় মিথ্যে।

হার্লেম—এর নাইট—ক্লাবে এরকম দাঙ্গা অবিশ্যি এই প্রথম নয়, পুলিশও যথারীতি দাঙ্গাকারীদের নাম লিখে নিল এবং কাউকে পাঠাল হাসপাতালে, কাউকে বা হাজতে। সেই রাত্রেই জকি আহত অবস্থায় আমায় নিয়ে চলে আসে নিউইয়র্কে; তারপর লাইম লাইট থিয়েটারের কুঠুরিতে এনে রেখেছে তার নিজের তদারকে। শুনলুম, প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছি এখানে, সেই ভারি বুটের চাপে বাঁ দিকের পাঁজরা আমার দস্তুরমতো জখম হয়েছে।

বললুম, জকির কাছে আমি ঋণী হয়ে রইলুম। জকি উদার, রাস্তার বিপন্ন লোককে আশ্রয় দেওয়া তার পক্ষে স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু মিমি, এত বড় নিউইয়র্ক শহরে এতগুলো বল—রুম আর থিয়েটার ছেড়ে এই সন্ধেবেলা তুমি রুগির পাশে বসে রয়েছ কেন?

আমার খুশি।—সারাদেহে একটা ঢেউ তুলে মিমি উঠে দাঁড়াল: যাই, জকিকে খবর দিয়ে আসি, তুমি জেগেছ।

খবর আর দিতে হল না, দরজা ঠেলে জকি নিজেই ঘরে ঢুকল।

হেল্লো বয়! কেমন আছ? বুকের ব্যথাটা কমেছে একটু? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো এখানে?

একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্নের ভিড়ে জবাব দেওয়ার অবকাশ পাচ্ছিলুম না। জকি একটু থামতে হেসে বললুম, ফুটপাথে পড়ে থাকলেও আমার অসুবিধে হত না, তার চেয়ে এখানে অনেক আরামে আছি। বুকের ব্যথাটাও যেন একটু কম হচ্ছে।

জকি আমার পাশে বসে বললে, ক্রমে ক্রমে একেবারে সেরে যাবে, ডাক্তার বলেছে, ভরের বিশেষ কিছু নেই।

কোন মুহূর্তে কেমন করে মানুষের সত্যকার পরিচয় পাওয়া যায়, তাই ভাবছিলুম। পৃথিবীতে যেমন নীচতা আর বর্বরতা আছে, আছে হিংসা আর স্বার্থ, তেমনি স্নেহ আর সান্ত্বনাও তো আছে! আর আছে নিঃস্বার্থ বন্ধুতা! বললুম, তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ জকি—

জকি হো হো করে হেসে উঠল, থাক, থাক, এটা স্টেজ নয় হে সেন্টিমেন্টাল ছোকরা! জীবনটাকে সব সময় কতগুলো উচ্ছ্বাস দিয়ে স্যাম্পেনের ফেনার মতো ফুলিয়ে—ফাঁপিয়ে রাখ কেন বল দিকি? জীবনের আরেকটা দিক আছে জানো? গ্র্যানাইটের মতো শক্ত, কাজ দিয়ে ভরাট!...যাকগে, কাজের কথাই বলি শোনো: সেরে উঠে তুমি কি করবে ঠিক করেছ?

বললুম, আগামী কালের ভাবনা ভাবতে শিখিনি।

হ্যাঁ, আজকালকার ইয়ং—ম্যানদের মধ্যে একজন শৌখিন বোহিমিয়ান থাকে জানি! কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে শুধু স্বপ্ন—বিলাসের কোনো মানে হয় না। শোনো, তোমার মতো একটি টাটকা তরুণ ছোকরা আমার দরকার, যাকে আমি নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চাই। তুমি বোধ হয় জানো, এই লাইম লাইট থিয়েটারের আমি একজন ম্যানেজার। এখানে হপ্তায় দু'দিন করে ক্লাস বসে অভিনয় আর প্রযোজনা সম্বন্ধে—তুমি সেই ক্লাসে ভর্তি হও, তাছাড়া খুচরো কাজও কিছু কিছু আমি জুটিয়ে দেব। কি বলো, রাজি?

জকির কথা শুনতে শুনতে আমার দুর্বল শরীরেও যেন রক্তের জোয়ার এসেছিল। পৃথিবী বিখ্যাত লাইম লাইট থিয়েটার, তারই ম্যানেজারের প্রিয় ছাত্র হয়ে কাজ শেখা—এ আমি কল্পনাও করতে পারিনি কোনোদিন। এক মুহূর্তে আমার সমস্ত অন্ধকার ভবিষ্যৎ যেন অনুরঞ্জিত হয়ে উঠল।

বললুম, নিশ্চয় রাজি। এত বড় সৌভাগ্যকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।

বেশ।—আমার একখানা হাত ধরে মৃদু ঝাঁকানি দিয়ে জকি বললে, তাহলে তুমি সেরে উঠলেই তোমায় আমার সহকারী করে নেব।—তারপর হাতের ঘড়িটার পানে তাকিয়ে: সময় হয়ে এসেছে মিমি, তোমার মেকআপ এখনো বাকি, যাও তৈরি হও গে—

মিমি বেরিয়ে গেল। জকি উঠে বললে, আটটা বাজে, থিয়েটার এইবার শুরু হবে, আমিও যাই ওজয়। আর কাউকে পাঠিয়ে দেব?

বললুম, খানিকক্ষণ একলা থাকলেই আমি খুশি হব।

বাতিটা নিভিয়ে দিলুম। এখন চোখে আর ঘুম আসবে না। অন্তরঙ্গ এই অন্ধকার ভারি ভালো লাগছে! একা একা শুয়ে ভাবতে লাগলুম, কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি!

আবার শুরু হল জীবনের নতুন একটি অধ্যায়!

অর্কেস্ট্রার শব্দ ক্ষীণ হয়ে কানে আসছে। প্লে বোধ করি শুরু হয়ে গেছে। শরীরে শক্তি থাকলে, উঠে গিয়ে সেই বিরাট প্রেক্ষাগারের অনেক দূরে একটি কোণে নিঃশব্দে বসতুম, দু'দিনের চেনা একটি মেয়েকে পাদপ্রদীপের আলোয় নতুন করে চেনবার চেষ্টা করতুম।

হঠাৎ রাশি রাশি পপি ফুলের সুগন্ধে অন্ধকার যেন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল—পোশাকের খসখস শব্দও শোনা যাচ্ছে না?...পরমুহূর্তেই হালকা নরম প্রজাপতির দু'খানি ডানা যেন চকিতে আমার ঠোঁট দু'খানা ছুঁয়ে গেল।

তেইশ

সকালের দিকে মিমি আজ এসেছিল। পরনে রূপালি—ধূসর সার্টিনের একটা চিনে ক্লোক শুধু, নিরাভরণ ও নিরাড়ম্বর চেহারা। দিনের বেলায় ওকে আজ অত্যন্ত কাছাকাছি স্পষ্ট করে দেখতে পেলুম। ওকে প্রথম দেখেছিলুম হার্লেমের সেই ক্লাব হাউসে, উৎসব রাত্রির আলোয়, নাচ গান হাসি হল্লা আর নারীদেহের সুগন্ধ দিয়ে তৈরি সেই স্বপ্ন—সুন্দর আবহাওয়ার মাঝখানে—দেখেছিলুম দুই চোখে শ্যাম্পেনের নকল মোহ নিয়ে! কিন্তু আমার এই ছোট্ট কুঠুরির জানলা দিয়ে তুষার—ভেজা দিনের যেটুকু ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে, সেই আলোয় মিমিকে আজ নতুন করে দেখলুম। দেহে নেই সেই রমণীয় বঙ্কিমা, ঠোঁটের কিনারে আর গাঢ়—নীল চোখের তারায় নেই হাসির সঙ্কেত। যৌবনের কামনার মতো রাঙা সেই ঠোঁট এখন বাসি করবীর পাপড়ির মতো বিবর্ণ! মুখেও কয়েকটা রেখা পড়েছে না? ও কি বার্ধক্যের পদচিহ্ন? মিমির বয়স নির্ণয় করা এখন মুশকিল।

নিশীথ—রাত্রির আশ্চর্য একটা মায়া আছে জানো? রাতের মিমি সেই মায়া জানে। তা নইলে কে বিশ্বাস করবে বল যে, অতিসাধারণ এই মেয়েটির একটি চুম্বনের জন্যে সেদিনের সেই উৎসব—রাত্রি কতকগুলি মানুষের রক্তে ও হিংসায় কলঙ্কিত হয়ে উঠেছিল!

সুপ্রভাত ওজয়! কেমন আছ আজ?

বললুম, অনেকটা ভালো। ডাক্তার বলছে, আর দু'—তিনদিন বাদেই ব্যান্ডেজ খুলে দেবে।

তুমি এমন অসময়ে যে?

ঘরের কোণে ছোট একটা বেতের দোলা—চেয়ার ছিল, মিনি তাকে বসে পড়ে বললে, সকালের দিকে থিয়েটারে প্রায়ই আমায় আসতে হয়...মহলা দেবার জন্য। দুপুরে বসে ক্লাস, আইভানো পেত্রোভিচ—মস্কো থিয়েটারের আর্ট ডিরেক্টর ছিল—সে—ই পড়ায়। দুপুরেও মাঝে মাঝে আসি।...থিয়েটারে শিগগির একটা নতুন নাটক প্লে হবে জানো?

তাই নাকি?

প্যাশন—ফ্লাওয়ার।

প্যাশন—ফ্লাওয়ার! কামনার ফুল! পাঁক আর পাপের ঊর্ধ্বে মাটির যে কামনা সূর্যমুখীর মতো ফুটে ওঠে। কিন্তু কোথায় সে ফুল? ক্রমবিবর্তনের বহু স্তর পার হয়ে, সভ্যতার ধারাবাহিক ভাঙা—গড়ার পরেও চিরকালের বন—মানুষের সেই মজ্জাগত কলঙ্কিত কামনা সত্যিই কি ফুটেছে? প্যাশন—ফ্লাওয়ার ফোটে আমাদের কল্পনায়—নিশীথ স্বপ্নে—রঙ্গমঞ্চে! আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কোথায় পাবে সে—ফুল?

বললুম, চমৎকার নাম তো! গল্পটা বলো না, শুনি।

মিমি বললে, এই নাটকের নায়িকা হল মাদাম ফ্যানি, প্যারিসের এক হোটেলওয়ালি। শহরের সমস্ত অভিজাত সম্প্রদায়—বিশেষ করে আর্টিস্ট শ্রেণী এক সময় ফ্যানির নামে পাগল হয়ে উঠেছিল। অনেকের সঙ্গে সে প্রেমের ভান করেছে, তার সর্বনাশা রূপের মোহে অনেক ধনী লোক বসেছে পথে। তবু রাতের পর রাত হোটেলের সেই উন্মত্ত উৎসবের মাঝেও ফ্যানি মনে—মনে স্বপ্ন দেখত প্যাশনের নয়—প্যাশন—ফ্লাওয়ারের!

তারপর?

তারপর—, টেবিলের ওপর থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে মিমি ধরালে: তারপর হঠাৎ একদিন ফ্যানির জীবনে এল ক্লান্তি। তখন তার চোখের কোলে নেমেছে ছায়া, আর কালো চুলে লেগেছে ধূসর রং। একদিন গভীর রাতে হোটেলের সেই নাচ—গান আর উৎসবের মাঝে হঠাৎ তার মনে হল, কই, সে ফুল তো আজও ফোটেনি! পাগলের মতো ফ্যানি সেই প্যাশন—ফ্লাওয়ার খুঁজতে বেরোল। প্যারিসের রাস্তায় তখন তুষার পড়ছে, সমস্ত শহর শীতে আড়ষ্ট। আবছায়া অন্ধকারে সেই তুয়ারের মধ্যে ফ্যানি রাস্তায় রাস্তায় প্যাশন—ফ্লাওয়ার খুঁজে বেড়াতে লাগল। আর তাকে ফিরতে দেখা যায়নি।

অতি সাধারণ, মোহহীনা এই মেয়েটির মুখে সেই অতি সাধারণ ট্র্যাজেডির কাহিনি কেমন অদ্ভুত করুণ শোনাল। গল্প শেষ করে মিমি নিঃশব্দে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ বললে, তুমি কবে সেরে উঠবে ওজয়? আসছে হপ্তায় লাইম লাইট থিয়েটারের নতুন নাটকখানা খোলা হবে—প্রথম অভিনয় দেখতে আসবে তো?

বললুম, দেখব বইকি। ততদিনে আমি সেরে উঠব নিশ্চয়। ফ্যানির ভূমিকায় তোমাকেই দেখতে পাওয়া যাবে বোধ করি?

হ্যাঁ, ফ্যানি আমার খুব প্রিয়। অনেক দিন আগে ব্রডওয়ে স্টেজে ফ্যানির ভূমিকায় আমি প্রথম নেমেছিলুম। সেটা ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাস। তখন লোকে আমায় চিনত মাদাম ফ্যানি বলে—এখনো অনেক আলাপি লোক আমায় ডাকে ওই নামে।

হেসে বললুম, তোমায় কিন্তু অন্য নামে ডাকা উচিত। যে নামে অটো আমায় মিথ্যে করে ডেকেছিল।

অবাক হয়ে মিমি শুধোলে, কোন নামে?

চুমু—চোর!

মিমির মুখ থেকে গলা অবধি চকিতে একটি লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল—কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তে অরুণোদয়ের মতো। অত্যন্ত বিস্মিত হওয়ার চেষ্টা করে শুধোলে, তার মানে?

মানে, সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমার অন্ধকার ঘরে চুপি চুপি যে এসেছিল, আমি জানি, সে কে! তুমিও জান মিমি। কিন্তু হঠাৎ কেন সে একটি চুমু দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তা এখনো জানি না।

অন্যদিকে তাকিয়ে মিমি চুপচাপ বসেছিল। একটু পরে বললে, তোমার পাওনা ছিল, সে রাতের লটারি তো তুমিই জিতেছিলে।

বাজে কথা! চুমু তো নোটের ভাঙানি নয় যে, তিনদিন বাদেও তা পাওনা থাকবে। পাওনা—চুমুর ওপর আমার কোনো লাভ নেই, তুমি সে—চুমু তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলো।

এবার আমি যাই।—বাই বাই!

চেয়ার ছেড়ে মিমি উঠে দাঁড়াল।

বললুম, তুমি তাহলে বলে গেলে না, সেদিন আমার ঘরে সে এসেছিল কেন?

দরজার কাছে গিয়ে মিমি ফিরে তাকাল। আশ্চর্য, হঠাৎ তার ঠোঁটে আর চোখের তারায় ফিরে এসেছে সেই তরল হাসির সঙ্কেত। ফিরে এসেছে গ্রীবায় সেই রমণীয় বঙ্কিমা, মুখে সেই মায়া—লাবণ্য!

ফিরে তাকিয়ে মিমি শুধোলে, যে এসেছিল সেদিন সন্ধেবেলা, জানো সে কে?

কে?

ফ্যানি।

ফ্যানি! ফ্যানি এসেছিল! কেন?

মিমি তখন বাইরে চলে গেছে। দরজার ওপাশ থেকে শোনা গেল: অন্ধকারে প্যাশন—ফ্লাওয়ার খুঁজতে।

চব্বিশ

পাঁজরার ব্যথাটা এখন অনেক কম। ডাক্তার ব্যান্ডেজ খুলে দিয়েছে। আজ থেকেই চলা—ফেরা করতে পারতুম, কিন্তু জকি আপত্তি করছে। আরো দু'—তিনদিন বিশ্রাম না করলে আমায় সে কাজে লাগতে দেবে না—শরীর আমার এখনো দুর্বল।

প্রযোজনা সম্বন্ধে আইভানো পেত্রোভিচ—এর লেখা একখানা বই জকি আমায় পড়তে দিয়ে গেছে। গোটা দুই অধ্যায়ের পর আর এগোতে পারছি না। প্রায় দিন পনেরো হল এই ছোট্ট কুঠুরির মধ্যে বন্দি হয়ে রয়েছি—আর পারা যাচ্ছে না। অতি সঙ্কীর্ণ এই ঘরখানা যেন আমার যাযাবর—মনের কবর! এই মুহূর্তে বাইরে জনতার সঙ্গে মিশে শহরের রাস্তায় রাস্তায় খানিকক্ষণ ঘুরে এলে নতুন করে বেঁচে উঠতুম। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থিয়েটারের গ্রিনরুমের অ্যাসবেস্টস—ঘেরা এই অপরিসর অংশটুকুকে সত্যিই মনে হয় কবর—মৃত আত্মার অন্ধকার ঠান্ডা কবর! একা যখন থাকি, আলো জ্বালি না, অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হয়, জন—কলরব, ট্যাক্সির হর্ন, আর রাতের হোটেলের জাজ—ব্যান্ডের বিচিত্র ভাষায় সমস্ত নিউইয়র্ক আমায় ডাকছে—ডাকছে বর্তমান শতাব্দী!

কিন্তু রাত যখন গভীর হয়ে আসে, চোখে নামে অন্ধকারের মতো তন্দ্রা, তখন সেই স্তিমিত চেতনায় দেখতে পাই: ঘুমন্ত শহরের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় একা—একা একটি মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খুঁজে বেড়াচ্ছে অপরূপ অবাস্তব সেই প্যাশন—ফ্লাওয়ার! তার চুলে, তার পোশাকে জমেছে তুষার, চোখে নেমেছে ক্লান্তি, কুয়াশায় আর তুষারে তার মুখের নকল প্রসাধন মুছে গিয়ে ফুটে উঠেছে প্রথম বার্ধক্যের নিষ্ঠুর সত্য। হ্যাঁ, সে মুখ ফ্যানির, কিন্তু আশ্চর্য, ফ্যানির মুখ মনে করতে গেলেই আমার কেবল মনে পড়ে মিমির মুখ! যে মিমি এসেছিল সেদিন সকালে, এসেছিল সেই সন্ধ্যার নিঃশব্দ অন্ধকারে প্যাশন—ফ্লাওয়ার খুঁজতে।

আসলে, আমরা সবাই খুঁজে বেড়াই সেই কামনার ফুল। খুঁজে বেড়াই নিশীথ রাত্রির জাগ্রত তন্দ্রায় আমাদের স্বপ্নাতুর অবচেতনায়!

পৃথিবীতে যেদিন কামনার জন্ম হল—জন্ম হল প্রথমতম মানুষের শরীরে, মজ্জায়, রক্তে, কামনার ফুলের সন্ধানও শুরু হয়েছে সেইদিন থেকেই। মাটির কামনা হল আমাদের মাটির ঘরের প্রদীপ, আর কামনার ফুল হল সুদূর নিশীথাকাশের তারা। বহু শতাব্দী, বহু যুগ পরেও মাটির প্রদীপ আজো সেই আকাশের তারার স্বপ্ন দেখছি।

সে স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি, ফ্যানিও দেখেছিল। সে স্বপ্ন নিয়ে যে মেয়েটি একদিন আমার অন্ধকার ঘরে এসেছিল, সেও হয়তো ফ্যানি, কিন্তু ফ্যানির কথা ভাবলেই মিমিকে আমার মনে পড়ে যায়। যে মিমির চোখে সেদিন মায়া ছিল না, ঠোঁটে ছিল না হাসির সঙ্কেত, সকালের রূঢ় আলোয় যার ক্লান্ত মুখে দেখেছিলুম বার্ধক্যের প্রথম পদচিহ্ন! সেই মিমিই তো ফ্যানি!

প্রযোজনা সম্বন্ধে সেই বইটা আজ শেষ করব বলে বসেছি। একটা খাতা আর একটা নীল পেন্সিল দিয়ে জকি বলেছে, দরকারি কথাগুলো নোট করে রাখতে। বইখানা কিন্তু রীতিমতো কৌতূহল জাগিয়ে রাখে, বিশেষত পেত্রোভিচের লেখবার ভঙ্গিটি চমৎকার—গল্পের মতো।

শিয়রে সবুজ শেড—ঢাকা বাতিটা জ্বালিয়ে, বুকের তলায় বালিশ রেখে খাতায় নোট লিখে চলেছি। রাত হয়েছে অনেক, বোধ করি বারোটা। শনিবার, আজকে থিয়েটারে প্লে আছে—অবশ্য সেই পুরোনো নাটকই। একাদিক্রমে প্রায় আড়াইশো রাত্রি ধরে এই নাটকই চলেছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, নিউইয়ক কলকাতা নয়, এখানকার থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ পাঁচরাত্রি অভিনয়ের পর দর্শকদের জন্য হা—প্রত্যাশী হয়ে বসে থাকে না, নিউইয়র্কের যে—কোনো থিয়েটারে যে—কোনো নাটক একাদিক্রমে দুশো—তিনশো রাত্রি চলে যায়। লাইম লাইট থিয়েটারে তো দূরের কথা।

হ্যাঁ, রাত হয়েছে অনেক। প্লে বোধ করি শেষ হয়ে এল। দিনের অরণ্যের মতো গ্রিনরুম প্রায় স্তব্ধ হয়ে এসেছে। বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লুম, বইখানার বাকি অধ্যায় দুটো কাল সকালে শেষ করা যাবে।

কিন্তু অন্ধকার কি কথা কয়? মৃদু চাপা কণ্ঠে কে যেন কথা কইছে না? এ আমার নিদ্রাহীন নিঃসঙ্গ মনের স্বপ্ন—প্রলাপ নয়! চাপা মেয়েলি গলার আওয়াজে গ্রিনরুমের এই অন্ধকার যেন মর্মরিত হয়ে উঠেছে:

'ফের আজকে এসেছ তুমি? কেন এলে?'

না, এ আমার জাগ্রত তন্দ্রার স্বপ্ন—প্রলাপ নয়। এ কণ্ঠস্বর আমি চিনি, হার্লেমের সেই উৎসব—রাত্রি যে কণ্ঠস্বরে গান হয়ে বেজে উঠেছিল।

'হ্যাঁ, আজো আমি এলুম ফ্যানি, কিন্তু আজ আর আমি ফিরব না।' মোটা ভরাট গলার আওয়াজ।

মিমি তাহলে ঘরে একা নয়! রাতের মিমি কখনো একা থাকে না, ফ্যানিও থাকত না। কিন্তু এই নিশীথ রাত্রে যে লোকটি মিমির দীপহীন সাজঘরে এসেছে, অভিনয়ের প্রশংসা ছাড়াও তার আরো কিছু বক্তব্য আছে নিশ্চয়! সমস্ত চেতনা আমার উৎকর্ণ হয়ে শুনতে লাগল:

'তোমার কী দুঃসাহস ডিউক!'

'তুমিই তো আমার দুঃসাহসী করেছ ফ্যানি! জানো, গত সাতদিন ধরে এই লাইম লাইট থিয়েটারে সেই একই বক্স আমি রিজার্ভ করে রেখেছি? কেন জানো? কেবল তোমাকে দেখবার জন্যে।'

'১৯১৬ সালে ব্রডওয়েতে ঠিক এ কথাই তুমি আমায় বলেছিলে না ডিউক?'—দ্রুত জলতরঙ্গ বাজনার মতো সরু গলার তীক্ষ্ন হাসি শোনা গেল: ‘What about your new mistress–that platinum blonde?’

'তুমি আমার প্রতি অবিচার করছ ফ্যানি, ওসব বাজে গুজব।...এখনো আমি তোমায় চাই, বিশ্বাস করো...সমস্ত নিউইয়র্ক আমি তোমার পায়ের তলায় লুটিয়ে দিতে পারি...'

'ওসব কথা বড় পুরোনো হয়ে গেছে, নতুন কিছু বলবার থাকে তো বলো। নইলে, আমায় যেতে দাও, আমি ক্লান্ত!'

পাশের ঘরে আলো জ্বলে উঠল। অ্যাসবেস্টসের পার্টিশান পার হয়ে সে—আলো আমার ঘরের দেয়ালে এসে পড়েছে। খানিকক্ষণ চুপচাপ।

আবার সেই মোটা ভরাট গলার আওয়াজ, 'আজো ফিরে যাচ্ছি ফ্যানি...কিন্তু এখনো আমি তোমায় চাই।'

মিমির স্বর, 'গুড নাইট! শোনো, শোনো ডিউক, আমায় একটু সাহায্য করো না, জ্যাকেটের বোতামগুলো খুলে দেবে?'

ডিউক নিশ্চয় এই ডাকের অপেক্ষা করছিল। নির্জন নিশীথ রাত্রে যখন সেই অতিপুরাতন নাটকের অভিনয় শুরু হয়, তখন শেষ পর্যন্ত পুরুষের সাহায্য নারীর পক্ষে দরকার হবেই, ডিউক তা জানত বইকি।

‘Ah, how charming you are!’

ডিউকের কণ্ঠ গদগদ হয়ে এসেছে। চিরকালের পুরুষের সেই কামনা অতুর কণ্ঠ! অন্ধ প্রবৃত্তির সেই অর্থহীন ভাষা।

‘Don’t be silly darling ! You naughty !’ (আবার সেই চাপা হাসির কলরোল) ‘Oh, no, no...don’t don’t...’

হঠাৎ আলো নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার মদির করে উন্মত্ত চুম্বনের শব্দ! মিমির কণ্ঠস্বর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে নিঃশব্দতায় ডুবে গেছে।

নিশি—পাওয়া অনিদ্রাগ্রস্ত রোগী দেখেছ? তেমনি করে সেই অন্ধকারে বিছানা ছেড়ে উঠে কখন যে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলুম, জানি না। আমার ঘরের পাশের বন্ধ দরজায় আঘাতও করেছিলুম বোধ হয়।

মিমি যখন দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়াল, তখন ফের আলো জ্বলেছে। ওর চুল এলোমেলো, গায়ে কালো রেশমের একটা চাদর জড়ানো, ঘন ঘন নিশ্বাস—প্রশ্বাসে ওর সর্বাঙ্গ তখন কাঁপছে।

ও, তুমি ওজয়! ঘুমোওনি এখনো?—মিমির মুখে শুকনো একটু হাসি দেখা দিল।

আমার মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল: অন্ধকারে তুমি প্যাশন—ফ্লাওয়ার খুঁজে পেয়েছ কিনা, দেখতে এসেছিলুম।

পঁচিশ

প্যাশন—ফ্লাওয়ার নিয়ে ক'দিন থেকে জকি খুব খাটছে। ব্রডওয়ে স্টেজে একসময় এই নাটক অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। লাইম লাইট থিয়েটারে সাধারণত পুরোনো নাটকের অভিনয় হয় না, এই থিয়েটার আমেরিকার আধুনিকতম রুচিতে, নাটকে এবং প্রয়োজনায়। আসলে লাইম লাইট থিয়েটার হল নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্টের জায়গা। কিন্তু 'প্যাশন—ফ্লাওয়ার' পুরোনো নাটক হলেও সাধারণ নয়, এতে এমন একটি চিরন্তন সুর আছে, যা কোনোকালে পুরোনো হতে পারে না।

আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে দুটি সত্তা: একটির জন্ম বর্তমান শতাব্দীর বস্তুতান্ত্রিকতার যুগে, আরেকটি আত্মার পরম কামনার সৃষ্টি। এই দুটি বভিন্ন সত্তার বিরোধ, বাস্তবতা আর স্বপ্নজগতের এই সংঘাতকে আমরা বলি জীবন। 'প্যাশন—ফ্লাওয়ার' সেই সংঘাতের ইতিহাস, জীবনের একটি রূপক। আর, মাদাম ফ্যানির চরিত্র হল সেই রূপকের রূপ। প্রত্যেক নারীর জীবনেই একদিন না একদিন মাদাম ফ্যানি আসে, আসে উৎসব—রাত্রির মাঝখানে হঠাৎ একটি ক্লান্ত মুহূর্তে, আসে সেই অলক্ষ্য কামনা—কুসুমের জন্য পরম পিপাসা নিয়ে।

মূল নাটকটি ছিল তিন অঙ্ক, পেত্রোভিচ সেটাকে দাঁড় করিয়েছে একাঙ্কে, প্লে হতে সময় লাগে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু মহলা চলেছে রোজ অন্তত পাঁচ ঘণ্টা করে। এই পাঁচ ঘণ্টা ছাড়াও দিনে আরো চার—পাঁচ ঘণ্টা জকির সঙ্গে সঙ্গে আমাকে থাকতে হয়। কাজের যে তীব্র নেশা আছে, জকিকে দেখে তা বুঝেছি। ওয়ে সাইড গ্রোভের সেই নিশীথ উৎসবে ওর যতখানি উৎসাহ দেখেছি, কাজের বেলায়ও ঠিক ততখানি, বরং বেশিই।

সে—রাত্রির পর মিমিকে আর আমার ঘরে দেখিনি। আমার ঘর মানে নিরিবিলি অবকাশে। কেননা, সুস্থ হয়ে ওঠার পর গ্রিনরুমের সেই অ্যাসবেস্টস—ঘেরা কুঠুরি আমি ছেড়ে দিয়েছি, আমার নতুন আস্তানা এখন সিক্সটি সেকেন্ড স্ট্রিটের ছোট একটা ঘরে। থিয়েটারের কাজ ছাড়াও খুচরো একটা কাজ জোগাড় করে নিতে হয়েছে, এক খাবারের দোকানে বাসন ধোয়ার কাজ। ভোর সাড়ে ছ'টা থেকে সাড়ে আটটা অবধি তারপর আসি থিয়েটারে।

কিন্তু সে—রাত্রির পর মিমির সঙ্গে নিরালায় আর দেখা হয়নি, দেখা সে করেনি। মহলার সময় অবশ্য রোজই সকালে দেখা হয়, কিন্তু লক্ষ করেছি, ক'দিন থেকে আমায় সে এড়িয়ে চলেছে। এ তার সঙ্কোচ, না ঔদাসীন্য, বোঝা মুশকিল।

মিমির সম্বন্ধে ধীরে ধীরে আমার মনে একটি কৌতূহল জমে উঠেছে, এ আমি অস্বীকার করতে পারি না। মহলার সময় যখন সে মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকায়, আমি সে—চাহনির গভীরতর অর্থ খুঁজে বের করবার চেষ্টা করি, যে—অর্থ মাদাম ফ্যানির চোখে সমস্ত প্যারিস খুঁজে পায়নি।

আগেই বলেছি, দিনের আলোয় মিমি অতি সাধারণ, সকালবেলায় রঙ্গালয়ের মতোই নির্মোহ, যে পানপাত্র নিঃশেষ হয়ে আসছে, অনেকটা তারই মতো। হ্যাঁ, দিনের আলোয় মিমির চেহারার পট পরিবর্তন হয়তো নারী—পুরুষের মনে কৌতূহল জাগতে পারে বইকি। লক্ষ করলে বোঝা যায়, অতি সাধারণ এই মেয়েটির মধ্যে কোথায় যেন প্রচ্ছন্ন একটি আকর্ষণ রয়েছে। তা রূপও নয়, যৌবনও নয়, অন্য কিছু। সে যে কি, তার যথার্থ সংজ্ঞা আমি দিতে পারব না।

'প্যাশন—ফ্লাওয়ার' নাটকের প্রথম অভিনয় রাত্রি। আটটায় প্লে আরম্ভ!

সকাল থেকে আর ফুরসৎ নেই। ব্যস্ততা, ছুটোছুটি, চাপা কলরব। গ্রিনরুমের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা কাজের চাকা যেন আজ সকাল থেকে অনবরত ঘুরে চলেছে। সমস্ত তোড়জোড় করে জকি যখন গ্রিনরুমের ওপরতলায় সুইচ—ঘরের সেই ছোট টুলটিতে গিয়ে বসল, তখন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুরু হয়েছে। জকি আজ নিজেই স্টেজে আলোক—সম্পাতের ভার নিয়েছে।

আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট। কপালের ঘাম মুছে, এইবার অডিটোরিয়ামে গিয়ে বসব ভাবছি। প্যাশন ফ্লাওয়ার—এর প্রথম অভিনয় আমায় দেখতেই হবে। দরজার কাছে কল—বয়, রাস্তা আটকাল। বললে, আপনাকে খুঁজছিলাম।

আমাকে? কেন?

ছোকরাটি মুখে কোনো জবাব না দিয়ে, একটুকরো পাকানো কাগজ আমার হাতে দিল। কাগজটা খুলতেই বেরোল ছোট একটি ভায়োলেট ফুল—গাঢ় নীল চোখের সঙ্কেতের মতো, আর দ্রুতহাতে পেন্সিলে লেখা দুটি লাইন :

'প্লে ভাঙলে আমার সঙ্গে দেখা কোরো—নিশ্চয়। থিয়েটারের ফটকে নয়, গ্রিনরুমের পেছনের দরজায় আমি অপেক্ষা করব।

বিস্মিত হওয়ার কথা বইকি! কল—বয়কে শুধোলুম, তোমার ভুল হয়নি তো?

ঘাড় নেড়ে সে বললে, না, ভুল আমার হয়নি। চিঠি আপনাকেই দিতে বলা হয়েছে।

অর্কেস্ট্রা তখনো বেজে চলেছে, যবনিকা উঠতে আর দেরি নেই। ফুল আর চিঠি ট্রাউজারের পকেটে পুরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লুম।

সমস্ত নিউইয়র্ক স্টেজের পানে তাকিয়ে যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। সেই বিশাল প্রেক্ষাগারের দূরতম কোণে কোনো রকমে ঠাঁই করে নিয়ে যখন বসলুম, তখন কালো ভেলভেটের যবনিকা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক থেকে অনেক—অনেক মাইল দূরে প্যারিসে এসে পড়েছি, এসে পড়েছি প্যারিসের সেই বহুনিন্দিত বহু প্রশংসিত Cafe de Lnxe-এর একাংশে, নিশীথ—নগরীর সেই পরম রমণীয় নরকে। ছোট ছোট টেবিল ঘিরে অভিজাত প্যারিসের ভিড়, আলাপ—গুঞ্জন, সিগারেটের ধোঁয়া, শ্যাম্পেনের ফেনা। এপাশে বড় বড় কাচের শার্সি দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্যারিসের রাজপথ—কুয়াশায় আবছায়া।

কিন্তু সে কই? এই মধুচক্রের মক্ষিরানি, নিশীথোৎসবের সেই দাহমতী দীপশিখা?

হঠাৎ গুঞ্জন গেল থেমে, শোনা গেল ম্যান্ডোলিন আর স্যাক্সোফোনের অস্পষ্ট সঙ্গত আর সরু গলার অস্ফুট সঙ্গীত:

ওগো ও প্রেমিক প্রজাপতি, তুমি

শুনেছ কি মোরে গান,

জান কি নিরালা বনতলে কাঁপে

নিশিগন্ধার প্রাণ?

ক্রমশ সঙ্গত হল স্পষ্টতর, সঙ্গীত হল ঊর্ধ্বায়িত বাতির শিখার মতো উজ্জ্বলতর, উচ্ছ্বলতর। দেখা গেল, দূরে প্রত্যেক টেবিলের পাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে একটি নারীমূর্তি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। হাতে একটা বেতের টুকরিতে একরাশ ভায়োলেট। পরনে ঝলমলে নীল গাউন পায়ের কাছে নীল ঢেউয়ের মতো লুটোচ্ছে, অনাবৃত কাঁধ আর অর্ধ—অনাবৃত বুক শাঁখের মতো সাদা, দেহে লীলা, চোখে সঙ্কেত, ঠোঁটে কামনা আর মুখে গান:

এপ্রিল—রাতে জেগে আছে শুধু

নিশিগন্ধার প্রাণ,

ওগো ও প্রেমিক প্রজাপতি, তুমি

শুনে যেও মোর গান।

এই তো সে! মাদাম ফ্যানি—হোটেলওয়ালি ফ্যানি।—প্যারিসের বহুবাঞ্ছিত মৃত্যু! কিন্তু একে আমি চিনি, একেই তো দেখেছিলুম ওয়ে—সাইড গ্রোভের সেই উৎসবে, নিশীথ—রাত্রির সেই আশ্চর্য মায়ালোকে। একে ফ্যানিই বলো, আর মিমিই বলো, এ শুধু সে—ই, পুরুষের কামনায় প্যারিস যার জন্যে চিরকাল উন্মত্ত হয়ে উঠেছে!

ফুলওয়ানি ফ্যানি গান গেয়ে আলাপ করছে আর 'মনামি'দের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে তার তনুর স্তব, রাত্রির কণ্ঠে উঠছে সেই স্তবের প্রতিধ্বনি।

ব্যালকনিতে—যেখানে দুলছে কয়েকটি রঙিন চিনা লন্ঠন, আর আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি পতঙ্গ—সেখানে এসে দাঁড়াল ফ্যানি। শুরু হল সেখানে একটির পর একটি পুরুষের আনাগোনা—তরুণ, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ। প্যারিসের মায়াবিনী তাদের পরিবেশন করে চলেছে চিরকালের সেই মধুর বিষ। কাউকে ক্ষণিক স্পর্শ, কাউকে একটি প্রেমের কথা, কাউকে বা চুম্বন। সমস্ত প্যারিসে যেন আগুন লেগে গেছে, আগুন লেগেছে দর্শকদের মনে—রক্তে—কামনায়—

মুহূর্তের পর মুহূর্ত যাচ্ছে মরে। সমস্ত চেতনা আমার চোখে আর কানে এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

ধূসর—কেশ একটি পুরুষকে চুম্বন দিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে, ফ্যানি তাকে প্রশ্ন করছে: প্যাশন ফ্লাওয়ার কোথায় পাওয়া যায় জানো? জানো তুমি?...আমায় বলে দেবে তার সন্ধান?

বাটন—হল থেকে গোলাপটি খুলে পুরুষটি হেসে, What sort of flower it is? I know the rose and those rosy lips! ...kiss me...

পুরুষটি যখন চলে গেল, ফ্যানি তখন ব্যালকনিতে একা। মুখে ক্লান্তির রেখা, চোখে অদ্ভুত চাহনি।—না, গোলাপ সে চায়নি, সে চেয়েছে কামনার ফুল, পাপ আর পাঁকের ঊর্ধ্বে যে কামনা ফুল হয়ে ফোটে—সেই স্বপ্ন—কুসুম!

ভেতরের হলে তখনও মাদাম ফ্যানির নাম—গান। সবার অলক্ষ্যে ফ্যানি তখন চোরের মতো চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছে—পালিয়ে যাচ্ছে কামনার এই শ্মশানভূমি ছেড়ে। প্যারিসের রাজপথ কুয়াশা আর তুষারে একাকার, কাচের শার্সি দিয়ে দেখা গেল আবছায়া অন্ধকারে একা—একা ফ্যানি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রেতিনীর মতো। প্যাশন ফ্লাওয়ার তাকে পেতেই হবে।

আড়াই ঘণ্টা কোথা দিয়ে কেটে গেল, জানতে পারিনি। হুঁস হল যখন, তখন অডিটোরিয়ামে আলো জ্বলে উঠেছে। সমগ্র নিউইয়র্কের মুখে নাটকের নায়িকার প্রশংসা।

ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই হাতে ঠেকল চিঠি আর ভায়োলেট। হ্যাঁ, সে অপেক্ষা করছে। আমারই জন্যে কি?

ঘুরে এসে গ্রিনরুমের পেছনের দরজায় দাঁড়াতেই দেখি কালো পুরুষালি ওভারকোটে পা ঢেকে মিমি অপেক্ষা করছে। নিঃশব্দে রাস্তায় নেমে এসে আমার কানে কানে বললে, একটা ব্যাচ নাও।

গাড়িতে যখন উঠছি, তখন চোখে পড়ল, প্রকাণ্ড একটা ফুলের তোড়া নিয়ে আধাবয়সী একটি লোক গ্রিনরুমের দরজায় এসে পৌঁছেছে। তার বুকের ওপর ঘড়ির চেনের হীরের লকেটটা আবছায়া অন্ধকারেও সাপের চোখের মতো জ্বলছে।

বললুম, ডিউক, তোমায় অভিনন্দন জানাতে এসেছে মিমি!

মিমির মুখে অদ্ভুত একটু হাসি দেখা দিল। আমাদের গাড়ি তখন চলতে শুরু করেছে। সমস্ত ব্যাপারটা কেমন আজগুবি স্বপ্নের মতো লাগছিল। শুধোলুম, কোথায় যাচ্ছি আমরা?

সিটে হেলান দিয়ে গভীর শ্রান্তিতে মিমি চোখ বুজে ছিল। চোখ না মেলেই জবাব দিলে, আমার বাড়িতে।

ছাব্বিশ

ট্যাক্সিটা এসে থামল ৪০৪ হাই স্ট্রিটে। পাড়াটা নিরালা, বাস—ট্রাম—ট্যাক্সির চিৎকার আর জনতার কলরব থেকে অনেকটা দূরে। রাস্তার দু'ধারে দেওদার জাতীয় গাছের সারি, বাতাসে মেঠো—ফুলের নিশ্বাস। শহর এখানে এসে হঠাৎ যেন রাখালের ছদ্মবেশ ধরেছে।

ল্যাম্প পোস্টের সুমুখেই সাদা একখানা বাড়ি, ক্যাব এসে থামল তারই ফটকে। ভাড়া চুকিয়ে মিমি নেমে পড়ল। তারপর গাড়ির দরজায় একটা হাত রেখে শুধোলে, আসবে না তুমি?

আমি? না, আজকে থাক। আরেক দিন বরং—

কিন্তু আমায় পৌঁছে দেবে না বাড়ির ভেতরে? উঁচু সিঁড়িতে উঠতে যদি একটু সাহায্য করতে...

নিশ্চয়! —গাড়ি থেকে নেমে বললুম, চলো।

ফটকে ঢুকতেই একখানা বাগান, ম্যাগনোলিয়ার ঝাড়! বাগান পার হয়েই উঁচু র্সিড়ির ধাপ—প্রাচীন ফরাসি 'শ্যাটো' ধরনের। মাটি থেকে দশটা করে ধাপ, তারপর ছোট্ট একটু চাতাল, তারপর আবার সিঁড়ির সারি। ওপরের শেষ ধাপের মাথায় চৌকো একটি ঘষা কাচের বাতি, তারই অস্পষ্ট আলোয় বাগানের অন্ধকার ঘোলাটে হয়ে উঠেছে মাত্র।

সেই দীর্ঘ সোপানশ্রেণীর নিচে মিমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চোখ দুটি বুজে হঠাৎ বলে উঠল, আমায় জড়িয়ে ধরো তো ওজয়—খুব শক্ত করে? উঃ, কী ক্লান্ত লাগছে।

সেই মুহূর্তে আমি তাকে ধরে না ফেললে, মিমি বোধ করি টলে পড়ে যেত। শার্টের অস্তিন গুটিয়ে দুটি হাতে তাকে বুকের কাছে তুলে নিলুম—ছোট মেয়ের মতো, ছোট পাখির মতো। মিমির চোখ দুটি মুদিত, দু'হাত দিয়ে বেষ্টন করেছে আমার গলা। ম্যাগনোলিয়া ফুলেরা যেমন রাতের বাতাসে কানে কানে কথা কয়, তেমনি চুপি চুপি মিমি বললে, এমনি করে আমায় ধরে রাখো ওজয়, আমায় নিয়ে চলে ঘরে।

সেই আবছায়া অন্ধকারে কালো ওভারকোট—ঢাকা একটি নারীদেহ তুলে নিতেই মনে অদ্ভুত আবহাওয়া ঘনিয়ে এল: ভাবলুম, আমি যেন মধ্যযুগের দুঃসাহসী এক নাইট, দুই হাতে কোনো কাউন্টের মেয়েকে নিঃশব্দে হরণ করে নিয়ে পালাচ্ছি। মনে মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে সিঁড়িতে পা দিলুম।

প্রথম দশটা ধাপ পার হয়ে গেলুম। অনায়াসে। আলো—ছায়াময় সেই সোপানশ্রেণী, শহরতলীর সেই সুগভীর নির্জনতা, নারীদেহের ঘনতর সংস্পর্শ—সব মিলিয়ে একটি মায়া—জগৎ রচনা করেছে। এ যেন প্রত্যেকের জীবন পার হয়ে অপরিচিত এক রহস্যলোকে যাত্রা।

এক এক করে আরো দশটা ধাপ পার হয়ে গেলুম। হাতে আমার সামর্থ্য কম নেই, তবু দ্বিতীয় চাতালে পৌঁছে মনে হল, মিমির দেহটা যতটা লঘুভার ভেবেছিলুম, ততটা নয়। কয়েক মিনিট আগে নিচে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, কণ্ঠলগ্না মুদিতাক্ষি এমনি একটি নারীদেহ নিয়ে পৃথিবীর পার থেকে সুদূর মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত চলে যেতে পারি অনায়াসেই, কিন্তু নিজের ওপর এখন আমার সন্দেহ এসেছে। তবু আরো দশটা ধাপ এখনো আমায় পার হতে হবে।

একে একে দশটা ধাপ পার হয়ে তৃতীয় চাতালে ঘরের সুমুখে যখন পৌঁছলুম, তখন হাতের পেশীগুলো আমার ফুলে ফুলে উঠছে, ঠান্ডা রাতেও কপালে দেখা দিয়েছে ঘাম। অদ্ভুত সেই রোমান্টিক আবহাওয়া গেছে মিলিয়ে। ননীর মতো নরম, ফেনার মতো নরম এই দেহটাকে এখন ক্লান্তিকর একটা বোঝা ছাড়া আর কি বলা যায়? এই মুহূর্তে যদি এই মাংসস্তূপ ছুড়ে ফেলে দিতে পারতুম!

কিন্তু কেন? কেন সেই মধুর উত্তেজনা, সেই মদির উন্মাদনার বদলে এল বিরক্তি—তিক্ত এই ক্লান্তি? পরম রমণীয় নারীদেহও হঠাৎ অসহ্য ভার বোধ হয় কেন?

এই প্রশ্নের জবাব পেয়েছিলুম সেই রাতেই—

আস্তে আস্তে ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলুম। নিচু ছাদওয়ালা একটা হল—সিলিং থেকে মেঝে অবধি দুধের মতো ধবধবে। মিমিকে নিয়ে এরপর কোনদিকে যাব, তাই ভাবছি, এমনি সময়ে পাশের কামরা থেকে বেরিয়ে এল আধাবয়সী মোটাসোটা একটি স্ত্রীলোক। মাথায় নার্সদের মতো সাদা একটা রুমাল বাঁধা। তার বিস্ফারিত দুই চোখে যে জিজ্ঞাসা ফুটে উঠেছিল, তা বুঝতে আমার দেরি হয়নি। বললুম, একে কোথায় শুইয়ে দেব? বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

কাঁদো কাঁদো গলায় স্ত্রীলোকটি রীতিমতো হইচই বাধিয়ে তুলল: কি বললে? মিমি অজ্ঞান হয়ে গেছে? কি করে ওমন হল? ...হায়, হায়, কি হবে এখন? হায় প্রভু, এ কী সর্বনাশ করলে...

বলতে বলতে তার গাল বেয়ে টসটস করে জল পড়তে লাগল। বললুম, ব্যস্ত হয়ো না, ভয়ের কিছু নেই—

গোলমাল শুনে মিমি চোখ মেলেছিল। আস্তে আস্তে আমার গলা থেকে হাত খুলে দিয়ে বললে, আমায় নামিয়ে দাও।

স্ত্রীলোকটি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, উঁহু, এখানে নয়, এখানে নয়, ঘরে চলো।

হল পার হয়ে যে ঘরে এলুম, সে ঘর ভরে ফিকে নীল আলো। সমুদ্রপারের আকাশে যেন জ্যোৎস্না উঠেছে! এককোণে অগ্নিকুণ্ড, মাঝখানে মুখোমুখি দুটি সোফা, ওপাশে নিচু একখানা খাট, দেওয়ালে কয়েকখানা ছবি। সোফা দুটোর মাঝে একটা টেবিলের ওপর ড্রাগন আঁকা ব্রোঞ্জের একটা ফুলদানি। তাতে ফুল নেই, শুধু সুগন্ধ কয়েকটি চিনে ধূপ পুড়ছে। একটা সোফার ওপর মিমিকে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিলুম। গা থেকে ওভারকোট খুলতে খুলতে স্ত্রীলোকটিকে মিমি বললে, ড্রিঙ্ক, নাটাশা।

তারপর আমার দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললে, দাঁড়িয়ে কেন? বোসো। কিছু মনে কোরো না, নাটাশা অমনিই। অনেক দিনের পুরোনো চাকরানি কিনা, বলতে গেলে, ও—ই আমার অভিভাবক। ভারি ভালোবাসে আমায়...আচ্ছা ওজয়, বড় কষ্ট দিলুম তোমায়, না?

বললুম, ও কিছু না। কষ্ট আর কি! এবার তুমি অনেকটা সুস্থ হয়েছ বোধ করি?

সোফাতে শরীর এলিয়ে দিয়ে মিমি বললে, হ্যাঁ, আমি এখন বেশ সুস্থ। অনেকদিন পরে আজ নতুন নাটকে প্লে করলুম, শরীরের চেয়ে মনটাই আজ বেশি ক্লান্ত।...কী আশ্চর্য ওজয়, ফ্যানির কথা ভাবতে গেলেই আমার নিজের কথাই মনে পড়ে যায়!

এ হচ্ছে বড় অভিনেত্রীর লক্ষণ।—হেসে বললুম: নাটকের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে একেবারে মিশিয়ে দিতে না পারলে, ভালো অভিনয় করা যায় না।—আচ্ছা, এখন আমি যেতে পারি বোধ হয়? গুড নাইট মিমি।

কি যেন বলতে গিয়ে মিমি হঠাৎ থেমে গেল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে এল আমার কাছে, সমুদ্রপারের আকাশের মতো গাঢ়—নীল দুটি চোখ আমার মুখের পানে তুলে ধরে বললে, তোমায় অনেক কথা বলবার আছে ওজয়। আজকের রাতটা—শুধু আজকের রাতটা এখানে থাকতে পারবে না?...আজ একা একা থাকলে হয়তো পাগল হয়ে যাব আমি!

কিন্তু তোমার কথা শোনবার জন্যে তো অনেক লোক আছে মিমি। সমস্ত নিউইয়র্ক আজ তোমার জন্যে ফুল আর অভিনন্দন নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমায় তুমি ডাকলে কেন?

মিমি টেবিল ঘেঁষে আমার আরেকটু কাছে সরে এল, যে কথা আমি বলতে চাই, সেকথা যে শুধু তোমাকেই বলা যায়, তা তুমি বিশ্বাস করতে পারো না?

গ্রীবায় একটি রমণীয় ভঙ্গিমা এনে মিমি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার পানে তুলে ধরেছে তার মুখ—ম্যাগনোলিয়া ফুল যেমন করে আকাশের দিকে আত্মনিবেদন করে। মিমির শরীর ঘিরে লতিয়ে লতিয়ে উঠছে ধূপের ধূসর একটি ধূমরেখা—পুরুষের দগ্ধ কামনার মতো।

'সেকথা শুধু তোমাকেই বলা যায়'—হয়তো বহুপুরুষের কানে কানে মিমি ঠিক এই কথাই শুনিয়েছে এমনিতর বহুরাতে। কিন্তু জ্যোৎস্নার মতো নীলাভ, জ্যোৎস্নার মতো নরম এই নীল আলোর তলায় দাঁড়িয়ে নাই—বা স্মরণ করলুম! মনে মনে যদি বিশ্বাসই করি, সেই কথাটি মিমি শুধু আমাকে বলতে চেয়েছে, ক্ষতি কি?...হ্যাঁ, এমন রাতে চিরকালের সেই মধুর মিথ্যা আমি আরেকবার বিশ্বাস করবার চেষ্টা করব।

বললুম, বেশ, তোমার কথা শোনবার জন্যে আমি আজ রইলুম মিমি।

মিমির চোখের তারায় হাসি উঠল ঝিকমিকিয়ে। হাত ধরে টেনে আমায় সোফায় বসিয়ে বললে, Naughty Darling ! আমি জানতুম, তুমি আজ চলে যেতে পারো না।

সাতাশ

একখানা ট্রে'তে ড্রিঙ্ক সাজিয়ে নাটাশা ঘরে ঢুকল। মিমি নিজেই দুটি পানপাত্র পূর্ণ করে একটি আমার দিকে এগিয়ে দিলে, তারপর নিজের পাত্রটি তুলে ধরে বললে, কাকে স্মরণ করে আমরা পান করব?

বললুম, সমস্ত নিউইয়র্ক আজ তোমায় যে জয়মাল্য দিয়েছে, সেই মালা—

না,—গেলাসটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে মিমি বলে উঠল: না, মাদাম ফ্যানির সেই নিষ্ঠুর মৃত্যু স্মরণ করে।

মৃত্যু! আজ রাতে মৃত্যুকে নাই—বা স্মরণ করলে মিমি!

জানো, মৃত্যুও কোনো কোনো জীবনের পরম সুন্দর উৎসব হয়ে উঠতে পারে? ফ্যানির সমস্ত জীবনের চেয়ে তার মৃত্যু ঢের উজ্জ্বল! আজই তো সেই মৃত্যুকে স্মরণ করে পান করবার রাত!—মিমি পানপাত্রে চুমুক দিলে: কিন্তু সেই মৃত্যুর মানে কি জানো?

মানে, আত্মার মুক্তি, এই তো বলবে? কিন্তু ধোঁয়াটে আধ্যাত্মিকতায় আমার বিশ্বাস নেই মিমি, এই জীবনই আমার কাছে সবচেয়ে সত্য—অনেক রঙে বিচিত্র এই জীবন।

জীবনকে কে না সবচেয়ে ভালোবাসে ওজয়? কিন্তু আমি তা বলতে চাইনি, আমি বলতে চেয়েছিলুম, ফ্যানির মৃত্যুর মানে শরীরের কামনার মৃত্যু—এই সাদা, সুন্দর শরীরের কামনা? ধূপগুলো দেখেছ ওজয়? এই ধূপ হল ফ্যানির প্যাশন, আর এই প্যাশন পুড়ে পুড়ে যে সুগন্ধ উঠছে তা হল ফ্যানির মৃত্যু!...তোমার ড্রিঙ্ক যে পড়ে রইল ডার্লিং!

গেলাসটা নিঃশেষ করে বললুম, রূপক হিসেবে তোমার কথাটা চমৎকার মিমি, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্যে ফ্যানি নিবেদন করেছিল, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে সে—স্বপ্ন প্রতিমুহূর্তে চুরমার হয়ে যায়, সে—কথা ফ্যানিও জানত বইকি। কোথায় খুঁজে পাবে সেই প্যাশন—ফ্লাওয়ার?

কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না? এত বড় পৃথিবীর কোথাও না? কিন্তু স্বপ্ন যদি বারবার ভেঙে যায়, লোকে তাহলে কি করে বাঁচে বলো তো?

বলতে বলতে ওর কণ্ঠ কেমন যেন কঠিন হয়ে উঠল। সারা দেহে ওর অস্থিরতা জেগেছে। সোফা থেকে হঠাৎ উঠে ও জানলার শার্সির দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে অন্ধকার রাত্রি কান পেতে আছে জানলার পাশে, বাগানে ম্যাগনোলিয়া ফুলেরা হয়তো আত্মনিবেদনের ভাষা খুঁজছে। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিমি, নীল আলো পড়েছে ওর ধবধবে দুধালি নিরাবরণ পিঠে আর কাঁধে। দাঁড়িয়ে আছে যেন নিঃশব্দ কথাপুঞ্জ, অনুচ্চচারিত একটি 'লিরিক' যেন। এখনো কি ও ফ্যানির মৃত্যুর কথাই ভাবছে?

না, মৃত্যু নয়, আজ জীবনকে স্মরণ করে পান করবার রাত। এমন রাত জীবনে বহুবার আসে না মিমি। তোমার এই উষ্ণ ঘরের ধূপ সুরভিত নীলাভ—আবহাওয়ায় তুমি আজ সেই কথাই বলো, যে—কথা শুনে চিরকাল পুরুষের রক্তে জাগে নতুন জীবনের স্পন্দন!

মুহূর্তের পর মুহূর্ত যাচ্ছে পালিয়ে। বললুম, এতক্ষণ ফ্যানির কথাই তুমি বললে মিমি, কিন্তু তোমার কথাই আমি শুনতে এসেছিলুম আজ।

জানলার কাছে মিমি ফিরে এল, শুধোলে সিগারেট?

সিগারেট বের করে ওকে একটা দিয়ে নিজেও একটা নিলুম। তারপর নিজের সিগারেটটা ধরিয়ে ওর দিকে লাইটার দিলুম এগিয়ে। মিমি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলে, তারপর হেঁট হয়ে আমার সিগারেটে ওর সিগারেট ঠেকিয়ে ধরিয়ে নিলে।

একে কি বলে জানো?—মিমি শুধোলে।

কি?

মিমির চোখ দুটি হেসে উঠল, একে বলে, Touch of love !

ওর একখানা হাত ধরে ফেলেছিলুম, মিমি হয়তো বুঝেছিল আমার হাতের সঙ্কেত। বুঝেছিল বলেই কি ঠিক সেই মুহূর্তে তার মুখে নেমে এসেছিল একটি পাণ্ডুর ছায়া? না, সে আমার চোখের ভুল? আমার মুঠি শিথিল হয়ে আসছিল, মিমি সে—হাতখানা তুলে ধরে তার ঠোঁটে একবার ছোঁয়াল। তারপর দরজার কাছে দৌড়ে গিয়ে ছোট মেয়ের মতো চিৎকার করে ডাকলে, নাটাশা, আজ আমাদের খেতে দেবে না বুঝি—

ব্যস্ত হয়ে নাটাশা ছুটে এল: সেই কখন থেকে আমি খাবার সাজিয়ে বসে আছি, তোমাদেরই তো গল্প ফুরোয় না।

খাবার ঘরে যেতে হল। মুখোমুখি খেতে বসে, হাসতে হাসতে মিমি বললে, রান্নায় নাটাশার যা চমৎকার হাত! সেই জন্যেই তো ওই মোটা শশা—ওই বুড়ি ভল্লুকটাকে তাড়াতে পারি নে।

নাটাশশ চটেই আগুন! ছোট ছোট চোখ দুটো পিটপিটে করতে করতে বললে, বেশ, বেশ, আমি মোটা শশা, আমি বুড়ি ভল্লুক, তাতে কার কি আসে যায়? ঈশ্বর তো আর সবাইকে তোমার এত এঞ্জেল সৃষ্টি করেননি!...হুঁ, কালিলিনের চোখ যদি তোমাদের থাকত...

হাসি চেপে মিমি শুধোলে, কালিলিন তোমাকে ভয়ানক ভালোবাসত নাটাশা, না?

নাটাশার কুঁচকানো লাল মুখে এবার খুশির একটি আভা ছড়িয়ে পড়ল। দু'—চারবার ঢোক গিলে বুড়ি বললে, সে আমায় কি বলে ডাকত, জানো? সে বলত—নাঃ, সে কথা আমি কিছুতেই বলতে পারব না—যাই, তোমাদের জন্যে খরগোশের রোস্ট নিয়ে আসি গে—

বোঝা গেল, নাটাশার লজ্জা হয়েছে। এই লজ্জা ওর ভীরু প্রেম। বুড়ি নাটাশার মধ্যে বিগত দিনের একটি গ্রাম্য কিশোরী আজো রয়েছে আত্মগোপন করে।

আঠাশ

এক চামচ সুপ মুখে দিয়ে মিমি তেমনি তরল কণ্ঠে শুধোলে, কালিলিন নাটাশাকে কি বলে ডাকত জানো?

কি বলে?

সরে এসো বলছি—

মুখটা সামনের দিকে খানিক এগিয়ে নিয়ে যেতেই, মিমি আমার কানে কানে রাত্রির বন—মর্মরের মতো চুপি চুপি উচ্চচারণ করলে, My harvest moon !

চমৎকার সম্বোধন! 'ম্যুজিক' কালিলিনের কাছে এর চেয়ে মধুরতর ডাক আর কি হতে পারে? জীবনে যখন আসে চৈত্রমাস, মনের নির্জন শূন্যতায় যখন জাগে ফুল—ফসলের সময়, তখন আকাশে আলো করে যে চাঁদ ওঠে, সে চাঁদ কি জানো? সেই চাঁদই তো প্রেম? আমাদের দেহসীমার বাইরে সুদূর স্পর্শাতীত যে প্রেম, তারই উজ্জ্বলতম প্রতীক! আসলে, সে চাঁদ আমাদের মানসিক যৌবনের রূপালি স্বপ্ন।

আমার মুখের কাছে মুখ এনে মিমি তেমনি নরম গলায় ফের বললে, My harvest moon !

ও কি কালিলিনের ডাকের প্রতিধ্বনি, না এ ডাক আমারই উদ্দেশে? মিমির উষ্ণ নিশ্বাস লাগছে আমার গালে, ওর হাতখানা ভীরু পাখির মতো এগিয়ে আসছে আমার হাতের কুলায়। ওর মাথার চুলে, ওর নিশ্বাসে, ওর সর্বাঙ্গে কি যেন অদ্ভুত সুগন্ধ, আশ্চর্য নেশা।

আমার হাতের মধ্যে মিমির সাদা হাত দুখানা সাদা পায়রার মতো থরথর করে কাঁপছে। ওর কি হল কে জানে? আমার কাঁধে মুখ গুঁজে তেমনি মৃদু মর্মরিত কণ্ঠে বারংবার ডাকছে: My harvest moon ! My harvest moon !

রাত্রির বনানীর মতো মিমির সর্বাঙ্গে আশ্চর্য সুগন্ধ, ওর ডাকে অদ্ভুত নেশা! দু—হাত দিয়ে ওর মুখখানা তুলে ধরে এগিয়ে আনলুম আমার মুখের কাছে—

ঠিক সেই সময়! ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে নাটাশার গলা শুনতে পাওয়া গেল: রোস্ট এনেছি মিমি, তোমাদের দিয়ে আসব কি?

স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো দুজনে দুদিকে সরে বসলুম। নাটাশা আমাদের টেবিলের ওপর মাংসের ডিশ দুটো নামিয়ে রেখে, ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে পা দিয়ে শুধু বললে, আজ আর রাত জেগো না মিমি, উপরি উপরি ক'রাত জেগে যদি অসুখে পড়, আমি তাহলে ভুগতে পারব না কিন্তু—

মিনিট কয়েক চুপচাপ। নিঃশব্দে টেবিলের দিকে তাকিয়েছিলুম, মুখ তুলতেই মিমির চোখে চোখ পড়ে গেল। ওর মুখখানা হঠাৎ টকটকে লাল হয়ে উঠে, দেখতে দেখতে ফের কাগজের মতো বিবর্ণ হয়ে গেল।

আস্তে আস্তে মিমি বললে, আমি...আমি ভারি দুঃখিত।

বললুম, দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, এ হচ্ছে মুহূর্তের ষড়যন্ত্র।

চামচে দিয়ে প্লেটের সুপ নাড়াচাড়া করতে করতে মিমি বললে, নাটাশাকে আমার হিংসে হয়।

নাটাশাকে! কেন?

এত বয়সে অবধি জীবনে ওর ক্লান্তি এল না। ছোট আশা আর ছোট আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কী সহজভাবেই না দিন কাটিয়ে যাচ্ছে। জীবনে নাটাশা বোধ করি কখনো স্বপ্ন দেখেনি, তাই ওর সমস্ত জীবন হয়ে উঠেছে স্বপ্নের মতো সুন্দর!...ওকি, তুমি যে কিছুই খাচ্ছ না ওজয়?

খাওয়া শেষ করে ফের শোবার ঘরে এসে বসলুম। সেই নীল আলো আর ধূপ—সৌরভ। নিশীথ—রাত্রির সেই অবাস্তব আবহাওয়া।

সামনে দুটি পানপাত্র—পরিপূর্ণ। ধবধবে টেবিল—ক্লথের ওপর গাঢ় সবুজ সাঁৎরুজের বোতলের একটুকরো আভা পড়েছে নিটোল একটি পান্নার মতো। একটি গেলাস তুলে নিয়ে বললুম, কই, তোমার কথা তো কিছুই বললে না মিমি!

সিগারেটের নীল সর্পিল ধূম—রেখার পানে তাকিয়ে মিমি চুপ করে বসেছিল। অন্যমনস্কের মতো বলল, হ্যাঁ, এইবার বলব।

বুঝতে পারলুম, কথাটা মিমি সহজভাবে শুরু করতে পারছে না। সোফায় হেলান দিয়ে, নিঃশব্দে ও শুধু সিগারেট টেনেই যাচ্ছে। হঠাৎ সোজা হয়ে উঠে বসে বললে, থিয়েটার আমি ছেড়ে দিচ্ছি জানো?

সে কী!

হ্যাঁ, থিয়েটার আমি ছেড়েই দেব ঠিক করেছি।

এমন গম্ভীরভাবে তুমি তামাশা করছ মিমি, যে, কথাটা সত্যি বলে ভুল হতে পারে।

সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে মিমি বললে, কিন্তু তামাশা আমি করিনি ওজয়, থিয়েটার আমি সত্যিই ছেড়ে দেব। কাল থেকেই।

কথাটা এবার নিছক তামাশা বলে মনে হল না, মিমির চিবুকের ভঙ্গিমায় আর ঠোঁটের বঙ্কিমায় দৃঢ়তার আভাস দেখতে পেলুম।

বললুম, পাগল হয়েছ মিমি! আজই রাতে নতুন নাটকের প্রথম অভিনয় হল, আর কাল থেকে তুমি দেবে থিয়েটার ছেড়ে। তোমার এই খেয়াল—খুশির জন্যে জকিকে কতখানি বিপন্ন হতে হবে, ভেবে দেখেছ? আর, তুমি ছেড়ে দিলেও নিউইয়র্ক তোমায় ছাড়বে কেন? আজকের মতো কাল রাত্রেও সমস্ত নিউইয়র্ক এসে ভিড় করবে লাইম লাইট থিয়েটারের দরজায়—রাশি রাশি ফুল নিয়ে আর প্রশংসা নিয়ে—

সোফা ছেড়ে মিমি হঠাৎ ঘরে পায়চারি শুরু করলে। অতর্কিতে ওর শরীরে যেন কাঁটা ফুটছে। ওর শরীরের রেখায় রেখায় নির্বাক অস্থিরতা। আমার কথাকে চাপা দিয়ে অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠল, উপায় নেই! উপায় নেই! কাল সকালেই!...তুমি জানো না ওজয়, আমি কত অসহায় হয়ে পড়েছি—ভয়ানক অসহায়! নিজেকে নিয়ে আমি আর পারি নে...

শেষ দিকে মিমির স্বর কাঁপতে কাঁপতে অতল হতাশায় ডুবে গেল। কি হয়েছে ওর আজ, কে জানে! উষ্ণ আগুনের তাপে ছোট এই ঘরটিতে যখন ঘনিয়ে এসেছে নিভৃত একটি অবসর, নীল বাতি আর ধূপ মিলে যখন রচনা করেছে রঙের আর গন্ধের অপূর্ব একটি কবিতা, তখন ওই মেয়েটির কি হল? গোড়া থেকেই লক্ষ করেছি, থেকে থেকে মিমির আজ ছন্দ যাচ্ছে কেটে, থেকে থেকে অভাব ঘটছে সঙ্গতির। নিজের সঙ্গে ওর কোথায় যেন বিরোধ বেঁধেছে।

এ সময় কি বলা যায়, ভাবছিলুম। আমার সুমুখ থেকে, মিমি কণ্ঠে প্রগাঢ় মিনতি ঢেলে বললে, কিছু মনে কোরো না ওজয়, আমায় তুমি ক্ষমা করো। সন্ধে থেকে আমি সহজ হওয়ার চেষ্টা করছি, তবু পারছি না কিছুতেই। আমি কি করব, বলতে পার? এমন করে পারি নে—আর পারি নে—

সোফায় ফের বসে পড়ে মিমি দু'হাতে মুখ ঢাকলে। অস্ফুট চিৎকারের মতো ওর শেষ কথাগুলো কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে গেল।

ঘরের আহাওয়াটা পাথরের মতো ভারি হয়ে এসেছে, মনটাও। আস্তে আস্তে মিমির মাথায় একখানি হাত রেখে বললুম, তোমার কি হল আজ মিমি? এমন অস্থিরতা তো আগে কখনো দেখিনি! আমায় বন্ধু বলে ভাবতে পারো না?

মুখ তুলে মিমি একটু শুকনো হাসলে: বন্ধু বলে না ভাবলে কি তোমায় আজ ডেকে আনতুম? ফিরিয়ে দিতুম ডিউককে, সমস্ত নিউইয়র্ককে?...আমার কিছু হয়নি বন্ধু, বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি কিনা—

ওর এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললুম, তোমায় আমি কোনো প্রশ্নই করব না মিমি, কিন্তু মনে হচ্ছে, আমার কাছ থেকে তুমি যেন কিছু লুকোবার চেষ্টা করছ?

সাঁৎরুজের অপর পাত্রটি নিঃশেষ করে মিমি আরেকটা সিগারেট ধরালে, তারপর সহজ ভাবে বললে, একটা গল্প শোনো ডার্লিং—

উনত্রিশ

আটাশ বছর আগে সানফ্রান্সিসকোয় একটি মেয়ে জন্মেছিল। গরিব ঘরের মেয়ে, তার নাম ধরো..., মিমি এক মুহূর্ত ভাবলে, তারপর ফের বলতে শুরু করলে: মেয়েটির নাম ধরো মিমি। এমনি কত মিমিই তো আছে পৃথিবীতে। তার বাপ ছিল মিস্ত্রি, প্যাকিং বাক্সের কারখানায় কাজ করত। রোজগার সামান্য, শহরের বস্তি—অঞ্চলে দোতলায় দু'খানা ঘর নিয়ে থাকত সেই গরিব পরিবারটি—মিমি, তার বাপ—মা, আর ছোট দুই ভাই। মিমির সমস্ত শৈশব কেটেছে সংসারের বাজার করে, আর মাটির নিচে মদ রাখবার কুঠুরির মতো অন্ধকার সেই ছোট দুটো ঘরের মেঝে ঘষে ঘষে সাফ করে। ঋতুতে ঋতুতে আমাদের যে রং বদলায়, মাঠে মাঠে ফোটে ডেজি আর ড্যাফোডিল, সে মেয়েটি তা জানত না, জানত না বাইরের জীবন কত বড়, কত বিচিত্র!...আশ্চর্য হচ্ছ? কিন্তু সত্যিই মিমি ছিল এমনিতর! অন্ধকার গুহার মতো ছোট ছোট দুটি ঘরে তার নিজস্ব একটি সম্পূর্ণ জগৎ গড়ে উঠেছিল। আর সে ছিল ঘরেরই আসবাবপত্রের শামিল! আসলে, মিমি নিজেকে তখন চিনত না, চিনতে শেখেনি। শুধু রবিবার দিনগুলো ছিল তার জীবনের বখশিস! রবিবারের সকালবেলায় মিমি ফর্সা পোশাক পরত, মাথা আঁচড়ে চুলে বাঁধত রিবন, গির্জে যাবার রাস্তায় সেই বোকা মেয়েটি দু'চোখে বিস্ময়ভরে বড়লোকদের মেয়েদের পানে তাকিয়ে থাকত—রং—বেরঙের ঝলমলে পোশাকের বাহার, গা বেয়ে আনন্দ পড়ছে উপচে, তারা যেন পরি—রাজ্যের মেয়ে! বাড়ি ফিরে মিমি ভাবত, চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখে এল। স্বপ্নই তো! নইলে, পৃথিবী কি এত ভালো, এত সুন্দর হতে পারে কখনো! কিন্তু কেন হতে পারে না? নিজেদের সেই ঘুপসি নোংরা ঘরের পানে তাকিয়ে তাকিয়ে মিমির দম আটকে আসত! তুমি শুনছ ওজয়?

শুনছি বইকি! বলে যাও।

সিগারেটের অর্ধেকটা মিমির আঙুলের ফাঁকেই পুড়ে গিয়েছিল, ফেলে দিয়ে আবার সে শুরু করলে: এক—একদিন মিমির বাপ আসত মদ খেয়ে, হল্লা করত, কুৎসিত গালাগালি দিত, আর তার মা পাড়ার ছোকরাদের সঙ্গে সস্তা খেলো রসিকতা করত, আর কারণে অকারণে মিমির চুলের ঝুঁটি ধরে নাড়া দিত। মার খেয়ে যে কাঁদতে হয়, বিদ্রোহ করতে হয়, তাও সেই বোকা মেয়ে জানত না। সতেরোটা বছর এমনি করে কেটে গিয়েছিল সেই বিশ্রী আবহাওয়ার মধ্যে, প্রতিদিন নিজেকে অপমান করে করে। সতেরো বছর পরে মেয়েটি বিদ্রোহ করতে শিখল। কেমন করে তা বলি। ক্রিসমাস ইভ, সন্ধে হয়ে এসেছে, অনেক দিনের পুরোনো সেই ফর্সা পোশাক পরে আর চুলে রিবন বেঁধে মিমি বাইরে বেরোবার জন্যে তৈরি, লাল একটি মোমবাতি সে সংগ্রহ করেছে, গির্জেয় গিয়ে আলো জ্বালাবে। ঘরের বাইরে পা দিতে গিয়ে মিমি থমকে দাঁড়াল—দরজার ওপারে তার বাপ দাঁড়িয়ে টলছে, পুরু পুরু ঠোঁট দু'খানা লালায় মাখামাখি চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো টকটকে, বিশ্রী বীভৎস মুখ! মিমির সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল। জড়ানো গলায় তার বাপ শুধোলে, 'তোর মা কোথায়? কোথায় সেই শুয়োরের মাসি?' ভয়ে ভয়ে মিমি জবাব দিলে, 'ফ্রাঙ্কের ঘরে।' বিড়বিড় করে বকতে বকতে তার মাতাল বাপ পাশের কামরার দিকে এগোল, কিন্তু যেতে পারলে না, দু'পা এগিয়েই আছাড় খেয়ে পড়ল, কাঠের বারান্দার ভাঙা রেলিঙের খোঁচায় কপালের খানিকটা গেল চিরে। কাঁচা রক্ত দেখে, মিমি কয়েক মিনিট আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হুঁস ফিরে আসতেই দ্রুতপায়ে নিচে দৌড়ল—ডাক্তার চাই! কাঠের সিঁড়ি দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মিমি নিচে নামছিল, সিঁড়ির মুখে একটা ল্যাম্পের ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে। তাড়াতাড়িতে হঠাৎ আরেকটি দেহের সঙ্গে মিমির ধাক্কা লেগে গেল—সঙ্গে অনেক ফুলের গন্ধে মিমির চেতনা এল ঝিমিয়ে—

দম নেওয়ার জন্য মিমি এবার থামলে, ওর চোখ দুটি বুজে এসেছে, ক্লান্ত একটি নিশ্বাসে বুক উঠছে কেঁপে কেঁপে। অনেক বছর আগেকার সেই ক্রিসমাস ইভ—এর কথা হয়তো মনে মনে ও আরেকবার স্মরণ করে নিচ্ছে!

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলুম, তারপর? তার আগেই মিমি চোখ মেলে বলতে লাগল, হ্যাঁ, সেই গুমোট আবছায়া সিঁড়িতে মাতালের গোঙানির মাঝখানে হঠাৎ অনেক ফুলের গন্ধ কয়েক মুহূর্তের জন্য মিমিকে যেন ঘুম পাড়িয়ে দিল! সেই মধুর ঘুম থেকে মিমি যখন জেগে উঠল, তখন দেখলে, তার সুমুখে এক ধাপ নিচে দাঁড়িয়ে একটি পুরুষমূর্তি! আবছা আলোতেও সে চিনতে পারলে—ডন! লম্বা—চওড়া চেহারা, ছোকরাটি লরি চালায়। যাকে একতলার ঘরে, বাজার করতে যাবার সময় কখনো কখনো দেখা হত, দোতলা থেকেও মিমি মাঝে মাঝে শুনতে পেত দমকা হাওয়ার মতো তার হাসির আওয়াজ। ডনের হাতে লিল্যাক ফুলের মস্তবড় একটি তোড়া। তোড়াটি নিবেদনের ভঙ্গিতে মাথা তুলে ধরে ডন বললে, 'তোমায় দেব বলেই তোড়াটা নিয়ে যাচ্ছিলুম মিমি। নেবে?'

ভীরু হাত বাড়িয়ে মিমি লিল্যাক ফুলের সেই তোড়াটা আস্তে আস্তে বুকের কাছে তুলে নিল।

হেসে ডন বললে, 'ঠিক মে—কুইন'—এর মতো দেখাচ্ছে তোমায়! বেড়াতে যাবে মিমি? চলো না, এমন চমৎকার সন্ধ্যা, আর বাইরে—'

কথা ফুরোবার আগেই সিঁড়ির ওপর থেকে গোঙানি শোনা গেল। তাড়াতাড়ি মিমি বলে উঠল, না, না, আমি এখন ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছি। আমার বাবা মদ খেয়ে—পড়ে গিয়ে কপাল কেটে ফেলেছে—'

ডন কিন্তু নড়ল না, পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, 'ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছ? কিন্তু আধো—জানোয়ার একটা মাতালকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ কি শুনি? কপালের ঘা শুকোবার আগেই তো সে ফের মদ খাবে, হল্লা করবে? বাপকে বাঁচাতে গিয়ে, নিজেকেই তুমি যে মেরে ফেলতে বসেছ মিমি! তুমি কি বাঁচতে চাও না? এত বড় পৃথিবীতে তুমি নাই—বা মরলে মিমি? চলে এসো, বেরিয়ে এসো এই অন্ধকার কবর থেকে—বাইরে অনেক আলো, অনেক ফুল—'

ডনের বাদামি রঙের চোখে আলো পড়ে চকচক করছিল। মিমির মাথার মধ্যে কেমন গোলমাল হয়ে গেল। এতদিন তো একথা সে ভাবেনি! সতেরো বছরের এই নোংরা গুমোট আবহাওয়ায় সত্যিই তার দম আটকে এসেছে! কিন্তু কেন—কেন সে মরবে? সে বাঁচতে চায়! থাক পড়ে রক্তাক্ত কপাল নিয়ে মাতাল বাপ, প্রতিবেশী ফ্রাঙ্কের ঘরে বিগত যৌবনা মা মরুক সস্তা রসিকতা করে, কী আসে যায় তার? সে বাঁচতে চায়! বাইরে অনেক আলো, অনেক ফুল—বাইরে ক্রিসমাস সন্ধ্যা!

রুদ্ধশ্বাসে মিমি ডনকে বললে, 'চলো যাই—এক্ষুণি—'

ত্রিশ

ডন তাহলে তোমার প্রথম প্রেম?—শুধোলুম।

ডন!—মিমি হাসল কিনা, ঠিক বোঝা গেল না: ডন হচ্ছে আমার সেই অন্ধকার ছোট ঘরের বাতায়ন, যেখান দিয়ে আমি প্রথম আলো দেখেছিলুম! এগারো বছর আগেকার সেই ক্রিসমাস—সন্ধ্যার দূত হল ডন! কিন্তু ডনকে ভালোবাসতে পারলে আমি সত্যি সুখী হতুম ওজয়! তার মতো সাদাসিধে সোজা ছেলে এখনকার দিনে খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। ডন আমায় লিল্যাক—এর যে তোড়া দিয়েছিল সে—ই হল আমার জীবনের প্রথম ফুল, কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ কি জানো ওজয়? সে—ফুলের বদলে তাকে আমি কিছুই দিতে পারিনি।

জীবনে কাকে তুমি প্রথমে ভালোবেসেছিলে মিমি?

নিজের পানপাত্রে মিমি আরেকটু স্যাঁৎরুজ ঢাললে। কিন্তু মুখে না তুলে বললে, ঠিক এই প্রশ্নই নিজেকে আমি মাঝে মাঝে করি, জানো ওজয়? অনেক রাতে হঠাৎ যখন ঘুম ভেঙে যায়, যখন শুনতে পাই তুষার বিছানো অন্ধকার রাস্তায় দমকা হাওয়ায় পাগলের মতো কাকে যেন ডেকে ডেকে ফিরছে, তখন নিজেকে আমি শুধাই: 'কে তোমার প্রথম প্রেম মিমি?'...জবাব পাই না! জীবনে আমার অনেক লোকের আনাগোনা, সেই ভিড়ে আমি আমার প্রথম প্রেম খুঁজে পাই না।

স্যাঁৎরুজের গেলাসটি মিমি মুখে তুললে। বললুম, যাক, তার পরের ঘটনা বলো—বাড়ি থেকে মিমি পালাল?

পালাল বইকি—সানফ্রান্সিসকো থেকে শিকাগোতে। রক্তাক্ত কপাল নিয়ে মাতাল বাপ পড়ে পড়ে গোঙাতে লাগল, প্রতিবেশীর ঘরের আড্ডায় মায়ের নির্বোধ খেলো রসিকতা তখনো শেষ হয়নি, কিন্তু ক্রিসমাস ইভ—এর সন্ধ্যা তখন মিমিকে ডাকছে! বাইরে যে অনেক আলো, অনেক ফুল! ডন—এর হাত ধরে মিমি রাস্তায় পা দিল, বুক ভরে নিল নিশ্বাস। মিথ্যে নীতির বিরুদ্ধে সেই তার প্রথম বিদ্রোহ—নিজের স্বেচ্ছা—মৃত্যুর বিরুদ্ধেও বলতে পারো...হ্যাঁ, শিকাগোতে এসে তারা সস্তা একটা সরাইখানায় আস্তানা পাতল। ডন—এর পকেটে সামান্য যা পুঁজি ছিল, দু'দিনেই তা গেল ফুরিয়ে, তবু আরেকটা দিন কাটল ধারে। তারপর আর চলে না। মিমিকে মুক্তি দিয়েছিল ডন, এবার ডনকে মুক্তি দিল মিমি। চার দিনের দিন রাত্রে সরাইখানা তখন নিঝুম—নিঃশব্দে মিমি বিছানা ছেড়ে উঠল। গভীর ঘুমে ডন ডুবে গেছে, মিমির চোখে কিন্তু ঘুম নেই। মোমবাতির ফিকে আলোয় মিমি একবার ঘরের দিকে তাকাল, এক কোণে লিল্যাকের সেই তোড়াটা রয়েছে পড়ে—এই চারদিনেই ফুলগুলো শুকিয়ে হলদে হয়ে উঠেছে! ডনের মুখে ক্লান্তির রেখা! নিচু হয়ে মিমি ঘুমন্ত ডনের কপালে আলগোছে একটি চুমু দিলে, তারপর বিছানার চাদরে সর্বাঙ্গ ঢেকে ছায়ামূর্তির মতো বেরিয়ে গেল। আবার পথ, অন্ধকারে ঝিরিঝিরি তুষারবৃষ্টি। পুলিশের নজর এড়িয়ে শিকাগোর নির্জন রাস্তায় একা সেই মেয়েটি ঘুরে বেড়াতে লাগল সারারাত। বাইরে যখন পা বাড়িয়েছে, তখন পথ সে পাবেই!

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে মিমি ফের শুরু করলে: সারারাত কখনো রাস্তায়, কখনো পার্কে কাটিয়ে, ভোরের দিকে মিমি এসে দাঁড়াল এক হোটেলের সুমুখে! হোটেলের দরজা সবে খুলেছে, এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে মিমি সটান ভেতরে ঢুকে গেল। প্রকাণ্ড মোটা চেহারার এক বুড়ি তখন চাকরদের সঙ্গে বকাবকি লাগিয়েছে, মিমি, আস্তে আস্তে জানালে, এই হোটেলের মালিকের সঙ্গে সে দেখা করতে চায়। মুখ না ফিরিয়েই বুড়ি চিৎকার করে উঠল, 'কেন, কেন? সুয্যি না উঠতেই জ্বালাতে এলে কেন শুনি?' ভাঙা একটা ঘণ্টা যেন বেজে উঠল হঠাৎ। চেঁচিয়ে কথা কইলে বুড়ির মুখের মাংসপেশীগুলো কুৎসিতভাবে নড়ে ওঠে। মিমি ভয়ে—ভয়ে বললে, যা হোক একটা কাজ পেলে সে বেঁচে যায়। গলা তার কাঁপছিল। ভাঙা ঘণ্টা ফের বেজে উঠল, 'এটা অনাথ আশ্রম নয় বাপু, সরে পড়ো।' চাকরদের হো হো করে সে কি বিশ্রী হাসি। মিমির পায়ের নিচে মেঝে হঠাৎ দুলে উঠল, হাত বাড়িয়ে একটা কিছু ধরতে যাচ্ছিল, তার আগেই মোটা একখানা হাত তাকে ধরে ফেলল। মিমির সর্বাঙ্গে তুষার জমে উঠেছে, ঠান্ডায় তার মুখ হয়ে উঠেছে নীল। সেই দিকে তাকিয়ে বুড়ি মিনিটখানেক চুপ করে রইল, তারপর বললে, 'জোসেফ, একে ফায়ার প্লেসের ধারে নিয়ে যাও—'

একটু থেমে মিমি বলতে লাগল, গল্প আমার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ওজয়।...তারপর সেই হোটেলে মিমি একটা কাজ পেয়ে গেল। ছোটখাটো কাজ—দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আগন্তুকের টুপি আর ছড়ি নিয়ে ব্র্যাকেটে সাজিয়ে রাখা। খুশি হয়ে কেউ দু—এক সেন্ট বকশিশ দিত, কেউবা মুখ ফিরিয়ে তাকাতও না। দু'হপ্তা এমনি করে কেটে গেল। মিমির জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা এইখান থেকেই। বলছি শোনো, সেদিন কি একটা বিশেষ উৎসব, দুপুরে রঙিন কাগজের ঝুরি দিয়ে মিমি হলটাকে সাজাচ্ছিল, বুড়ি হোটেলওয়ালি ডেকে শুধোলে, 'নাচ জানিস মেয়ে?' নাচের ক—খ'ও মিমি জানত না, তবু বুড়িকে খুশি করবার জন্যে উৎসাহে ঘাড় নেড়ে বললে, জানি বইকি! খুশি হয়ে বুড়ি বললে, 'বেশ বেশ!' কিন্তু ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে, মিমি তা বুঝতে পারেনি। সন্ধের পর বুড়ি তাকে ডেকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে, রংচঙে একটা পোশাক পরতে দিয়ে জানালে, আজকের এই উৎসবে তাকেই নাচতে হবে। শুনে ভয়ে ভাবনায় মিমির সারাদেহ হিম হয়ে গেল, জীবনে সে যে নাচেনি কখনো। কিন্তু তখন আর উপায় নেই। ওদিকে তখন অর্কেষ্ট্রা শুরু হয়ে গেছে। যেন স্বপ্নের ঘোরে মিমি এসে দাঁড়াল হলে।—ঝকঝকে সাদা আলোয়—অনেক, অনেক চোখের দৃষ্টির সামনে। তার রূপালি পোশাকে সাদা আলো অভ্রের কুচির মতো পড়েছে ছিটিয়ে, কোমর থেকে লুটানো রামধনু রঙের সাতটা সরু সিল্কের টুকরো সাত—রঙা আগুনের শিখার মতো কাঁপছে। হলের গুঞ্জন এক নিমেষে থেমে গেল। অর্কেস্ট্রায় তখন বাজছে ‘Blue Donube’ সুর, সে সুর মিমি জানত না, তবু আশ্চর্য, আপনা থেকেই তার শরীরে জাগল ঢেউ, শè#রের রেখায় রেখায় জাগল ছন্দ। নিজেরই অজান্তে মিমি শুরু করে দিল এক অদ্ভুত নাচ। যে নাচের নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি হয়তো ছিল না, তবু তার দেহ—লীলায় যে ছন্দ জেগে ছিল, সুরের সঙ্গে তা আশ্চর্যভাবে খাপ খেয়ে গেল। মিনিট পনেরো বাদে অতিথিদের অভিবাদন জানিয়ে মিমি যখন বিদায় নিলে, সমস্ত হল তখন সেই অচেনা মেয়েটির প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠেছে। পোশাক বদলে মিমি আবার এসে দাঁড়াল দরজায় পাশে তার সেই পুরোনো জায়গায়। আধাবয়সী লম্বাটে একটি পুরুষ টুপি আর ছড়ি ফেরত নিতে গিয়ে থমকে দাড়াল। মিমির কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলে, 'এ নাচ তুমি শিখলে কোথায়? মিমি বাধো বাধো স্বরে জবাব দিলে, 'কেউ শেখায়নি, এ নাচ আমার নিজের তৈরি।' লোকটির দুই চোখ ঝকঝক করে উঠল, 'তোমার নিজের তৈরি। বাঃ, বেশ তো। তা তুমি এই হোটেলে পড়ে আছ কেন? জানো, ভাল করে নাচ শিখলে দেশে দেশে তোমার নাম ছড়িয়ে পড়তে পারে? আমি মার্টিন অগাস্ট, আমার একটা অপেরা পার্টি আছে, যাবে আমার সঙ্গে? তোমায় অভিনয় করতে শেখাব। শুনতে শুনতে মিমির মুখ হয়ে উঠল উজ্জ্বল, সারা দেহে কেঁপে উঠল উত্তেজনার নেশা। সে—রাতে উৎসব শেষে বুড়ি হোটেলওয়ালি যখন মিমির খোঁজ করল, মিমি তখন অগাস্টের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার পথে—

একত্রিশ

মিমির কথায় পড়ল বাধা, দরজার বাইরে থেকে নাটাশার গলা শুনতে পাওয়া গেল। রাত যে কাবার হয়ে এল মিমি, গল্প তোমাদের আর ফুরোয় না।

সত্যিই রাত কত হল, কে জানে। মধ্যরাত্রি পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। যে—দেশের আকাশ মিমির চোখের মত গাঢ়—নীল, সেখানে হয়তো তারা নেভবার সময় হয়ে এসেছে। আর এই কুয়াশার দেশে সময় হয়েছে উষ্ণ আগুনের তালে আর পার্শ্ববর্তী উষ্ণ শরীরের তাপে নিশীথ—কামনার স্বপ্ন দেখবার। প্রহরের পর প্রহর কখন যে পার হয়ে গেছে, উপন্যাসের চেয়ে রোমান্টিক মিমির জীবন—কথা শুনতে শুনতে সেদিকে আমারও খেয়াল ছিল না। নাটাশার গলায় আওয়াজে চমক ভাঙল, একটু অপ্রস্তুত বোধ করলুম।

দরজার দিকে তাকিয়ে মিমি জবাব দিলে, বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে থাকার চেয়ে বসে বসে গল্প করা ভালো নয় কি নাটাশা?

নাটাশা বকবক করতে লাগল: একে দিনভর খাটুনি গেছে, তার ওপর ঠায় বসে রাত জাগা! শরীরের ওপর মায়া নেই এতটুকু! ...না বাছা, তোমায় নিয়ে আমি আর পারি নে...

মিমি এবার হাসলে। বললে, আজকের রাতটা আমার অবাধ্য হতে দাও নাটাশা, কাল থেকে ঠিক লক্ষ্মী মেয়ে হব দেখো! কিন্তু আমার সঙ্গে সঙ্গে তুমিও জেগে আছ কেন, শুনি? যাও, শুয়ে পড়োগ—নইলে এবার তোমায় আমি বকুনি দেব বলছি—

নিজের মনে বকবক করতে করতে বুড়ি চলে গেল।

বললুম, আজ না হয় এই অবধি থাক, গল্পের বাকিটুকু আরেকদিন শোনা যাবে। তুমি আজ সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছ মিমি!

কিন্তু আজকের রাত যদি আর ফিরে না আসে!—মিমির কণ্ঠ অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, না, ওজয়, বাকিটুকু তুমি শুনে যাও, গল্প আমার শেষ হয়েই এসেছে।...আরেকটু স্যাঁৎরুজ?

আমার পানপাত্র ভরে দিয়ে মিমি ফের শুরু করলে, হ্যাঁ, সেই রাতে, হল যখন ফাঁকা হয়ে এসেছে, অগ্নিকুণ্ডু এসেছে নিভে তখন বুড়ি হোটেলওয়ালি নিশ্চয়ই মিমির খোঁজ করেছিল। কিন্তু কোথায় মিমি? মার্টিন অগাস্টের সঙ্গে সে তখন ক্যালিফোর্নিয়ার পথে অনেক দূরে চলে গেছে! যেমন করে চলে গিয়েছিল সানফ্রান্সিসকোর মজুর—পাড়ার সেই ব্যারাক থেকে, শিকাগোর সেই ঘুমন্ত সরাইখানা থেকে। পথে যখন মিমি পা দেয়, তখন ফিরে তাকাবার অবকাশ তার থাকে না। নিজেকে নিয়ে তখন তার নতুন এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়েছে, জীবন নিয়ে এই এক্সপেরিমেন্টের নেশা মদের চেয়েও তীব্র ওজয়। ...যাক, গল্পটা শেষ করি। ক্যালিফোর্নিয়ায় মিনি রইল মাস দেড়েক। মার্টিন অগাস্ট তাকে প্রথমে নাচ শেখাতে লাগল—গ্রাম্য—নাচ 'মে—পোল' থেকে শুরু করে শহুরে নাচ 'ইয়েল ব্লু', 'ভ্যালেটা' পর্যন্ত। নাচের পা যেন মিমির তৈরি হয়েই ছিল, দেড় মাসেই তার আশ্চর্য উন্নতি দেখা গেল। দেড় মাস বাদে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মার্টিন অগাস্টের জাহাজ ছাড়ল—এবার পাড়ি আরো দূরে, মাদ্রিদের পথে। মাদ্রিদ শহরের একটি স্টেজ ভাড়া নিয়ে মার্টিনের 'টুরিং অপেরা পার্টি' রোজ সন্ধেয় শো দিতে লাগল। ছোট একখানা অপেরা—In gay Evening। তাতে ফলওয়ালি নিগ্রো মেয়ে সেজে মিমিকে প্রথম স্টেজে নামাতে হল। হাতে ফলের টুকরি, মাথায় রঙিন পালকের টুপি আর মুখে গান: ello oos your lady-friend Johnny ? দু'চার দিনের মধ্যেই মাদ্রিদের কাফে আর রেস্তোরাঁয় প্রতিধ্বনি শোনা যেতে লাগল: Hello, who’s your lady-friend Johnny?’ নর্তকী মিমিকে প্রথমে চিনলে মাদ্রিদ! মাদ্রিদই তার জীবনে এনে দিল প্রথম খ্যাতির স্বাদ।

একটু থেমে মিমি বললে লাগল: মার্টিন অগাস্ট এতদিন তাকে শুধু নাচের 'লেসন'ই দিয়ে এসেছিল, অভিনয় করতে মিমি তখনো জানত না, চিনতা না পেন্ট আর গ্রিজ, পারত না ওজন করে হাসতে আর কথা কইতে! তখনো মিমি কানের দু'পাশে দুটি বেণী দুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, অপেরা পার্টির লোকেরা গেঁয়ো বলে ঠাট্টা করে, তখনো পর্যন্ত সতেরো বছরের সেই মেয়েটির স্বভাব যেন বনভূমির কাঁচা সুগন্ধে ভরপুর!...কিন্তু গ্রাম্য প্রকৃতি শহরের ছোঁয়াচ লেগে কেমন করে বিষাক্ত হয়ে ওঠে, জানো ওজয়? সেই কথাই বলি শোনো—কেমন করে সতেরো বছরের সেই গেঁয়ো মেয়েটি গেল মরে।—বলতে বলতে মিমির গলা কেঁপে গেল, দুই চোখে নিরশ্রু রোদন উঠল ছলছলিয়ে: একদিন সকালে অপরিচিত একটি বৃদ্ধ মিমির সঙ্গে দেখা করতে এল—অনেক বয়স, চুল ভ্রূ সব তুষারের মতো সাদা। লোকটির নাম গ্যাব্রিয়েল সামারা, প্যারিসের এক বিখ্যাত থিয়েটারের ডিরেক্টর! বুড়ো বললে, মিমিকে তার থিয়েটারের জন্য চায়, তাকে নিয়ে যাবে প্যারিসে। মাইনে হিসেবে হপ্তায় হপ্তায় মিমি যা পারে, তা মিমির ধারণার বাইরে। সে যদি রাজি হয়, তাহলে...

এক্ষুনি..., বলতে গিয়ে মিমি হঠাৎ থেমে গেল। মার্টিনের সঙ্গে তার দু'বছরের চুক্তি, ছ'মাসও কাটেনি এখনো। কিন্তু মার্টিন তার রাস্তা আটকাল না, নিজে মিমিকে গ্যাব্রিয়েল সামরার গাড়িতে তুলে দিয়ে হাসিমুখে বলল, Cheer you, my girl !

তারপর?

তারপর প্যারিস! প্যাশন আর ফ্যাশানের রাজ্য প্যারিস! বুড়ো গ্যাব্রিয়েল সামরা নিজে মিমিকে শেখাতে লাগল অভিনয়। মিমি যখন অভিনয়ের মহলা দিত, সাদা ভুরুর নিচে বুড়ো স্তিমিত চোখ দুটো তখন হঠাৎ জ্বলে উঠত। কিছুদিন বাদে থিয়েটারে একটি নতুন নাটক খোলা হল—'প্যাশন—ফ্লাওয়ার'। মাদাম ফ্যানির ভূমিকায় মিমি প্যারিসকে প্রথম অভিনন্দন জানালে, তুমি তা শুনেছ ওজয়। সমস্ত প্যারিস হয়ে উঠল কৌতূহলী, মাদাম ফ্যানির প্রশংসায় মুখর! ফ্যানির নাম, ফ্যানির গান যেন হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল সারা শহরে! সঙ্গে সঙ্গে মিমির জীবনে হল পট—পরিবর্তন! এল খ্যাতি, এল রাশি রাশি ফুল আর উপহার, এল সমস্ত অভিজাত প্যারিস তার দরজায় ভিড় করে। মিমি তখন অভিনয় করতে শিখেছে, জেনেছে পেন্ট আর গ্রিজের ব্যবহার, তার চোখে জেগেছে সঙ্কেত, হাসিতে মোহ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেকআপ করতে করতে মিমি নিজেকে চিনতে পারত না। চিনবে কেমন করে? সতেরো বছরের সেই গেঁয়ো মেয়েটি তখন যে মরে গেছে। অভিনেত্রী মিমির প্রশংসার গানে তার মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি গেছে চাপা পড়ে! এখন রোজ রাতে ক্যাসিনোতে মিমির নামে শ্যাম্পেন ওঠে ফেনিয়ে, আর মিমির প্রেমিকের নামে চলে তর্ক আর শপথ। প্যারিসের প্যাশন মিমি। মিমির নামে সমস্ত প্যারিস উন্মাদ!

হেসে বললুম, প্যারিসের সত্যকার সৌন্দর্যবোধ আছে, বোঝা যাচ্ছে! ট্রয় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল হেলেনের জন্য, পুরাণের ট্রয় এ যুগে নিশ্চয় প্যারিস হয়ে গড়ে উঠেছে!

তাই ট্রয় নগরের সেই আগুনের শিখায়—, মিমি জবাব দিল: ফরাসি সভ্যতা আজো পুড়ে পুড়ে মরছে!—কিন্তু একথা থাক! সেদিন অভিনয় শেষে গ্রিনরুমে এসে মিমি সবে পেন্ট তুলতে বসেছে, এমনি সময় তার হাতে এসে পৌঁছল মস্তবড় একটা ফুলের তোড়া, তার মধ্যে লুকানো একছড়া হীরের নেকলেস আর একটুকরো চিঠি। চিঠিতে লেখা: 'অমুক ক্যাসিনোতে তোমায় পৌঁছে দেবার জন্যে আমার ব্রুহাম গাড়ি অপেক্ষা করছে।' চিঠি যে লিখেছিল, তাকে তুমি জানো ওজয়। সে ডিউক, প্যারিসের নামকরা লেডিস—ম্যান।

একটা প্রশ্ন আমার ঠোঁটে এসে পৌঁছেছিল, তার আগেই মিমি অদ্ভুত হেসে বলে উঠল, তুমি যা জানতে চাইছ, আমি তা বুঝেছি। খুব সোজা ভাষায় জবাব দিতে গেলে বলতে হয়, মিমির কয়েক রাত্রির প্রেমের জন্য সবচেয়ে চড়া দাম দিয়েছিল ডিউক। মিথ্যে বলব না ওজয়, ডিউক মন দেওয়া—নেওয়ার খেলার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী বটে! কিন্তু সেই হীরের নেকলেস—সর্বনাশা সেই হীরের নেকলেস কেমন করে বার্ধক্যকে পর্যন্ত হিংসায় হিংস্র আর কামনায় কুৎসিত করে তুলেছিল, এ শুনলে বোধ করি তোমার বিশ্বাস হবে না ওজয়। একদিন রাত্রে হঠাৎ মিমির ঘুম ভেঙে গেল, কার উষ্ণ নিশ্বাসে তার মুখ যেন ঝলসে যাচ্ছে! চোখ মেলে দেখে, তীব্র আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে, বিছানার পাশে তার মুখের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে—গ্যাব্রিয়েল সামারা! নিজের গলা থেকে হীরের নেকলেসটা কেমন করে যে বুড়োর কঠিন মুঠোর মধ্যে এসেছে, ঘুমন্ত মিমি তা টের পায়নি। স্পষ্ট আলোয় মিমি দেখলে, তার সামনে কঠিন লোমশ মুঠোর ফাঁকে বড় বড় হীরের টুকরোগুলি বড় বড় আগুনের ফুলকির মতোই জ্বলছে, আর কপালের লোল চামড়া আর সাদা চুলের নিচেও ঠিক তেমনি দৃষ্টি!—অন্য কোনো মেয়ে হলে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠত নিশ্চয়, কিন্তু মিমি জানত, বুড়ো নেকলেস চুরি করতে আসেনি—এসেছে সেই নেকলেসের অক্ষম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে! ধীরে—সুস্থে মিমি বিছানার উঠে বসল। তারপর মিষ্টি একটু হেসে বললে, 'আমার চুমু তো তোমার দেবই গ্যাব্রিয়েল, কিন্তু তার আগে আমার গলায় ওটা তুমিই পরিয়ে দাও।' দেখতে দেখতে বুড়োর চোখ দুটো নিভে এল, শিথিল মুঠি থেকে নেকলেসটা খসে পড়ে গেল মেঝেয়, দু'হাতে মুখ ঢেকে বুড়ো ঘর থেকে ছুটে পালাল। সেই রাতে মিমি আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল বহুক্ষণ। সত্যিই সে সুন্দরী! সাপের মতো ধবধবে মসৃণ, শ্যাম্পেনের ফেনার মতো নরম এই আশ্চর্য সুন্দর শরীর নিয়ে সে কী না করতে পারে? পরদিন সকালেই গ্যাব্রিয়েল সামারার থিয়েটার সে ছেড়ে দিল, প্যারিসকে বললে, গুডবাই!

তারপর?

গ্যাব্রিয়েলের থিয়েটার ছেড়ে দিলে তার কি আসে যায়? মিমি জানত তার জন্য রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে! তারপর লন্ডন, বার্লিন, আমাস্টার্ডম—শেষকালে আবার নিউইয়র্ক। প্যারিস ছেড়ে সে চলে এল, তবু সঙ্গে সঙ্গে এল খ্যাতির বন্যা, রাশি রাশি ফুল আর উপহার, এল আরো অনেক ডিউক। ক্লাবে আর হোটেলে তেমনি করে ফেনিয়ে উঠতে লাগল মদ। বাতাসে বাতাসে গান হয়ে বাজতে লাগল তার শরীরের—সাপের মতো সাদা আর ফেনার মতো নরম এই শরীরের স্তুতি। ভাষা আলাদা হলেও ওজয়, সে স্তুতির মানে সব দেশেই এক!

কিন্তু রাতের পর রাত ধরে সে—ফুল আর উপহার, সেই স্তুতিই কি মিমি কামনা করেনি?—শুধোলুম।

হ্যাঁ, কামনা করেছিল বইকি। যতদিন সেই স্তুতির মানে সে বোঝেনি, ততদিন। কিন্তু তারপর—আফ্রিকার অসভ্যেরা নরমাংস নিয়ে কেমন আনন্দ করে, জানো ওজয়? কোনো কোনো রাতে ক্লান্ত হয়ে মিমি যখন একা ঘরে ফিরত, তখন অন্ধকারে মনে হত, মুগ্ধ আর লুব্ধ অসংখ্য পুরুষ তার শরীরটাকে ঘিরে তেমনি বন্য উল্লাসে চিৎকার করছে! উঃ, কী অসহ্য সেই একঘেয়ে চিৎকার করছে, তুমি বুঝবে না ওজয়। ঘরের সমস্ত দরজা আর শর্সি এঁটে পাগলের মতো মিমি দুই হাতে তার কান চেপে ধরত। একদিন আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মিমির মনে হয়েছিল, আশ্চর্য সুন্দর তার শরীর। কিন্তু আজ যদি সে আয়নায় তার ছায়া দেখে, কি মনে হবে জানো? মনে হবে, সুন্দর শরীরের চেয়ে কুৎসিত পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

মিমির ঠোঁটে শুকনো একটু হাসি দেখা দিল: নিজের ওপর যার ঘৃণা এসেছে, কি নিয়ে সে বাঁচবে বলো তো?

বললুম, কিন্তু তুমি কি মনে কর, দেশে—দেশে এতখানি খ্যাতি, এত স্তুতির কোনো দামই নেই?

কিছুই না ওজয়, কিছুই না। সবাই চিনেছে অভিনেত্রী মিমিকে, চিনেছে সুন্দরী মিমিকে, কিন্তু সানফ্রান্সিসকোর সেই অতিসাধারণ মেয়েটিকে চিনল কে? কে বুঝল তার স্বপ্ন? কেউ বোঝেনি, বুঝতে চায়নি! তাই তো আটাশ বছর ধরে অনেক লোকের ভিড়েও মিমি রয়ে গেল একা, তাই কামনার তীরে তীরে পিপাসার শূন্যপাত্র নিয়ে বৃথাই সে এতদিন ঘুরে বেড়াল।

সারা দেহে অস্থিরতা নিয়ে, সোফা ছেড়ে মিমি উঠে দাঁড়াল, তারপর জানলার কাছে গিয়ে শার্সি দিলে খুলে। অন্ধকার রাত, তুষার পড়ছে বাইরে। মিমির উত্তপ্ত কপালে নিশীথ—হাওয়ার স্নিগ্ধ সান্ত্বনা এসে স্পর্শ করুক। আর একবার সে তারই মতো একাকিনী এই অন্ধকার নিশীথিনীর মুখোমুখি দাঁড়াক। দুই চোখ ভরে তার ঘনিয়ে আসুক সেই স্বপ্ন—সান—ফ্রান্সিসকোর সেই সতেরো বছরের মেয়েটি যে স্বপ্ন দেখেছিল। কামনার নয়—কামনার ফুলের স্বপ্ন!

মিমিই আবার স্তব্ধতা ভাঙলে। ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, গল্প শেষ হয়ে গেছে ওজয়, কিন্তু আমার কথা এখনো শুরু হল না।

বললুম, তোমার কথাই তো আমি শুনতে এসেছে মিমি।

মিমি এসে আমার পাশে দাঁড়াল। বললে, আমেরিকার কুয়াশা—ঢাকা আকাশে তারা ফোটে না, কিন্তু আটাশ বছর পরে আমি প্রথম তারা দেখলুম।

তারা দেখলে, কোথায়?

মিমির মুখ নত হয়ে এল, আমার দুই চোখে দুটি চুমু দিয়ে বললে, এইখানে দেখতে পেলুম আমার প্রথম তারা! My harvest moon !

আবেগে মিমির কণ্ঠ কাঁপতে লাগল। গাঢ়—নীল ওর চোখের তারায় ঘরের নীল আলোর মতোই ঘনিয়ে এসেছে স্বপ্নাতুর বিহ্বলতা! মুখে লেগেছে এখন বসন্তের সুষমা! আটাশ বছরের ক্লান্ত—যৌবন মিমি হঠাৎ এ রূপ কোথায় পেল?

আমার পাশে বসে তেমনি গলায় বলতে লাগল: হার্লেমের সেই উৎসব—রাত্রির কথা তোমার মনে পড়ে ওজয়? সে—রাতে তুমি দেখেছিলে শ্যাম্পেনের রং, আর আমি দেখেছিলুম প্রথম তারা। এগারো বছর বাদে হঠাৎ সেদিন সতেরো বছরের সেই মেয়েটি আমার মধ্যে আবার বেঁচে উঠল!...কী আশ্চর্য মানুষের জীবন ওজয়! সেদিন কিন্তু আমি সত্যিই ভয় পেয়েছিলুম!

শাঁখের মতো সাদা ওর গলায় চুমু দিয়ে বললুম, ভয় কেন মিমি?

হ্যাঁ, ভয়! সতেরো বছরের মিমি যদি আবার মরে যায়। নিজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সেদিন এই ভয়ই হয়েছিল! তাই তো অত কাছে থেকেও দিনের আলোয় তোমায় ছুঁতে পারিনি। এবার—এবার কিন্তু সতেরো বছরের মেয়েটিকে আর মরতে দেব না, কিছুতেই না। আজ আমি সুখী—সত্যি সুখী! ...রাত ভোর হয়ে আসছে, গুড নাইট ডার্লিং!

দীর্ঘ একটি চুম্বন শেষে মিমি দরজার কাছে আমার এগিয়ে দিতে এল, তখন গাল বেয়ে তার নেমেছে অশ্রুধারা, অথচ স্ফুরিত ঠোঁটে হাসি। কুয়াশার দেশে সূর্য উঠেছে যেন।

নিজের ঘরে যখন ফিরলুম, তখন রাত্রির শেষ প্রহর। অন্ধকার ঘরে মিমির সত্তা মৃদু সুগন্ধের মতো আমায় আচ্ছন্ন করে রইল সারা রাত!

কখন তন্দ্রা এসেছিল, টের পাইনি। ঘুম যখন ভাঙল, ঘরে তখন সকালের হলদে আলো এসে পড়েছে। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল গাঢ় নীল চোখ একটি মেয়েকে—আমার চোখে যে দেখেছিল প্রথম তারা! রাস্তায় বেরিয়ে একটা ক্যাব নিয়ে বললুম, হাই স্ট্রিট!

মিমি হয়তো এখনো ঘুমুচ্ছে। হয়তো স্বপ্ন দেখছে প্রথম কিশোর দিনের প্রথম প্রেমের।

গাড়ি এসে থামল হাই স্ট্রিটে—সেই বাড়ি, সেই দীর্ঘ সোপানশ্রেণী! সারারাত তুষারবর্ষণে ম্যাগনোলিয়া ফুলগুলি ম্লান। দরজার গোড়ায় ভ্যালে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তার মুখ অমন বিবর্ণ কেন?

শুধোলুম, মাদাম ঘুম থেকে উঠেছেন

আস্তে আস্তে সে জবাব দিলে, নেই!

নেই! কোথাও বেরিয়েছেন?

লোকটা এবার দুই হাত দিয়ে নিজের বুকে ক্রস করে বললে, না, তিনি আত্মহত্যা করেছেন!

মুহূর্তে মনে হল, বরফের সমুদ্রের মধ্যে আমি যেন তলিয়ে যাচ্ছি! সর্বাঙ্গ হিম কঠিন হয়ে উঠছে! মাথার মধ্যে অসংখ্য পোকার অদ্ভুত গুঞ্জন! চেতনা ফিরে আসতে প্রশ্ন করলুম, কেমন করে?

লোকটি তেমনি বিবর্ণ মুখে বললে, কাল রাতে আমি চলে যাওয়ার পর মিমি নিঃশব্দে পাশের ঘরে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে কি যেন বের করে আনে। নাটাশা সেই ঘরে ঘুমুচ্ছিল, পায়ের শব্দে ঘুম ভেঙে যেতেই তার কেমন সন্দেহ হয়, টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখে, রিভলভার নেই! চিৎকার করতে করতে বুড়ি মিমির ঘরে ঢুকল, তখন দেরি হয়ে গেছে।

নিশি—পাওয়ার মতো আস্তে আস্তে মিমির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলুম।

অধ্যায় ১ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%