কে তুমি

প্রণব রায়

শেষ ইঞ্জেকশনটা দিয়ে ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর তাঁর থাকার প্রয়োজন নেই। নেহাত দিতে হয় বলেই ইঞ্জেকশনটা দেওয়া।

হয়তো ইঞ্জেকশনের জোরেই আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালেন যতিশঙ্কর। শ্বাস টানবার চেষ্টা করে ডাকলেন, নরেন!

নরেন দাঁড়িয়েছিল মাথার শিয়রে, উঠে এল যতিশঙ্করের সামনে। বলিষ্ঠ একহারা চেহারা, আন্দাজ করা যায় বয়েস তিরিশ পার হয়ে গেছে। বাঁ—দিকের ভুরুর কাছে একটা কাটা দাগ ছাড়া মুখের চেহারায় দ্রষ্টব্য আর কিছুই নেই। তবে বোঝা যায়, নরেন শক্ত প্রকৃতির ছেলে। নইলে মৃত্যুপথযাত্রীর সামনে বসে তার মুখের একটিও পেশী কাঁপল না কেন?

যতিশঙ্কর আবার ডাকলেন, নরেন!

নরেন শুধু বললে, বলুন!

শ্বাস টেনে টেনে যতিশঙ্কর বলতে লাগলেন, আমার জন্যে তুমি অনেক করেছ নরেন। তুমি না থাকলে—শেষ দিনগুলো আমার—তোমার কাছে অনেক দেনা রয়ে গেল—

একটু থেমে যতিশঙ্কর দম নিলেন: ভেবেছিলাম হিসেব—নিকেশ করে যাব—

শান্ত গলায় নরেন বললে, করলে দেনাটাই থেকে যাবে।

যতিশঙ্কর কেমন অস্থির হয়ে উঠলেন: না, না, দেনা রেখে আমি যাব না। শান্তি পাব না তাহলে। যতিশঙ্কর সোম কারও দেনা রাখে না।

তেমনি নিরুত্তাপ গলায় নরেন বলে উঠল, বেশ, আপনার ড্রয়ারের মধ্যে লুকোনো সেই চিঠির তাড়াটা আমাকে দিয়ে যান। দেনাটা তাতেই শোধ হয়ে যাবে।

মৃত্যুপথযাত্রীর ঘোলাটে দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্যে। যতিশঙ্কর বললেন, তুমি কেমন করে জানলে?

নেশার খেয়ালে আপনিই বলেছিলেন একদিন। আপনার যৌবনের ভুলের কাহিনি।

টেনে টেনে যতিশঙ্কর বললেন, ভুল নয়, পাপ। কিন্তু সুনন্দার চিঠি—তুমি কেন চাও?

গলা এতটুকু কাঁপল না নরেনের: আমার মায়ের কলঙ্ক আমারই কাছে গচ্ছিত রাখব বলে।

ঘোলাটে চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এল। হাপরের মতো ওঠা—নামা করতে লাগল মৃত্যুপথযাত্রীর বুকখানা। যতিশঙ্কর বিকৃত আওয়াজে চেঁচিয়ে উঠলেন, তুমি—সুনন্দার ছেলে!

হ্যাঁ।

দেখতে দেখতে বুজে এল উদভ্রান্ত ঘোলাটে দৃষ্টি। শান্ত হয়ে এল তোলপাড় করা বুক। ক্ষীণ গলায় যতিশঙ্কর বললেন, বালিশের তলায় ড্রয়ারের চাবি।

নিঃশব্দে হাত চালিয়ে চাবিটা বের করে নিলে নরেন। তারপর ড্রয়ারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

নিভে—আসা দৃষ্টি মেলে কি যেন খুঁজতে লাগলেন যতিশঙ্কর। পায়ের ওপর ঢেউ খেলানো একরাশ কালো এলো চুল ছাড়া আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া—ছায়া আলোয় আর কিছুই নজরে পড়ে না।

যতিশঙ্কর ডাকলেন, সুধা!

ঢেউ—খেলানো এলো চুলের স্তূপ নড়ে উঠল।

কাছে আয় সুধা, তোকে—

যতিশঙ্করের কথা জড়িয়ে গেল।

এবার কালো চুলের অন্ধকার পটভূমিকায় সন্ধ্যার প্রথম তারার মতো সকরুণ একটি অশ্রুভেজা মুখ দেখা গেল। সুধা।

লুটানো আঁচলটা কাঁধে তুলে দিয়ে সুধা এসে বসল বাপের ওপাশে।

যতিশঙ্করের দৃষ্টিতে তখন বিকারের ঘোর দেখা দিয়েছে। সভয়ে বলে উঠলেন, কে? কে এল?

বাপের মুখের ওপর ঝুঁকে সুধা বলল, আমি বাবা, আমি সুধা।

যতিশঙ্কর যেন অনেকটা শান্ত হলেন। কিন্তু বাইরে কাল—বৈশাখীর আকাশ অশান্ত হয়ে উঠল। হু হু করে এল বাতাস। কাঁপতে লাগল জানলার পর্দা। উড়ে গেল যতিশঙ্করের জ্বরের চার্ট।

সুধা ব্যাকুল হয়ে ডাকলে, বাবা!

ড্রয়ারের পাশ থেকে এগিয়ে এল নরেন।

দুর্বল হাতখানা তুলে যতিশঙ্কর সুধার মুখখানা অনুভব করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, আমার সবচেয়ে দামি জিনিস সুধা—তোমায় দিয়ে গেলাম নরেন। সুধাকে দেখো—

যতিশঙ্করের চোখে ফের বিকার দেখা দিল। জড়ানো বিকৃত আওয়াজে চিৎকার করে উঠলেন, দেনা শোধ! তারপরই মুখখানা হেলে পড়ল একপাশে।

সুধা চমকে তাকাল নরেনের দিকে।

নরেনের মুখের একটি পেশীও কাঁপল না। বহুদিনের অভ্যস্ত পাকা নার্সের মতো যতিশঙ্করের একখানা হাত তুলে নিয়ে আবার আস্তে আস্তে রেখে দিলে।

তীর—বেঁধা পাখির মতো লুটিয়ে পড়ল সুধা যতিশঙ্করের বুকের ওপর। হু হু করে হাওয়া এল জানলা দিয়ে। আর সেই হাওয়ায় সুধার একরাশ ঢেউ খেলানো কালো চুল ঢেকে দিল যতিশঙ্করের মুখ।

নরেন উঠে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল, সুধা কাঁদছে। ওকে এখন কাঁদতে দেওয়াই ভালো। নরেন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

মরাটাই মানুষের শেষ নয়। মরার পরেও অনেক কাজ নাকি থাকে।

সময় আর স্রোত। দুই—ই সমান। সমধর্মী। আজকের দাগ কাল মুছে দিয়ে যায়।

যতিশঙ্করের মৃত্যুর তিন সপ্তাহ পরে সুধাও তাই আজ চুল বেঁধেছে, পাটভাঙা শাড়ি পরেছে, বসেছে একখানা বই নিয়ে জানলার পাশে। খেয়াল করেনি কখন নরেন ঘরে এল।

ঘরে পা দিয়ে নরেন এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল তেইশ বছরের মেয়ে সুধার দিকে। দেখল ফিকে হলদে বিকেলের আলো সোনার গুঁড়োর মতো ঝরে ঝরে পড়ছে সুধার বাঁ—দিকের গালে, চিবুকে আর শাঁখের মতো শাদা গলার নিচে। কিন্তু ওই এক মুহূর্তই। রাস্তার লোকে যেমন করে পোস্টার দেখে, তেমনি করেই তাকাল নরেন। তারপর সোজা এসে দাঁড়াল সুধার কাছে।

ভালো আছো আজ?

আছি।

একা একা অসুবিধে হচ্ছে না তো?

এমন কিছু না।

দিন কতক বাইরে ঘুরে এলে হয়। শরীর মন দুই—ই ভালো হবে তোমার। যাবে?

সুধা বইটাকে মুড়ে রাখলে। বললে, না। ভাবছি কলেজ ছেড়ে দিয়ে একটা চাকরি—বাকরির চেষ্টা করব।

হঠাৎ এ ভাবনা কেন?

বাবা নেই, খাওয়া—পরা চালাতে হবে তো!

পকেট থেকে নরেন সিগারেট বার করলে। মুখে দেওয়ার আগে বললে, সে ভাবনা তোমার নয়, আমার।

এক মুহূর্ত নরেনের দিকে তাকিয়ে সুধা উঠে দাঁড়াল। বললে, আমার ভাবনা আমারই। তোমার আর কিছু বলার আছে? আমি একটু বেরোব। একটা টিউশানি ধরেছি।

এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে নরেন বললে, আমায় তুমি পছন্দ করো না তা জানি। কিন্তু তোমার ইচ্ছেয় কিছুই আর হবে না।

সুধা চলে যাচ্ছিল, ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে, কার ইচ্ছেয় হবে?

নিস্পৃহ কণ্ঠে নরেন বললে, আমার। কারণ যতিশঙ্কর সোমের মৃত্যুর পরদিন থেকেই তুমি আমার সম্পত্তি। অনেক টাকা দিয়ে তোমার বাবার কাছ থেকে তোমাকে আমি কিনেছি সুধা।

সুধার দু—চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। সেই জ্বলন্ত চোখ তুলে তাকিয়ে বললে, তোমার এ—কথার মানে?

তেমনি ঠান্ডা গলায় নরেন বললে, উত্তেজিত হয়ো না। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। বোসো।

সুধা বসলে না। বললে, যা বলবার বলতে পার। আমার সময় কম।

সময় খানিকটা দিতেই হবে সুধা। টিউশানিটা আজ থাক।

ঘরের মাঝখানে নরেন পায়চারি শুরু করল। তারপর এক সময় শান্ত নিরুত্তাপ গলায় বলতে শুরু করল, তোমার বাবার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয় রেসের মাঠে। তাঁর এক বন্ধুকে পাঁচ হাজার টাকার একটা মিথ্যে চেক দিয়ে, সেই টাকা নিয়ে তিনি শেষবারের মতো ভাগ্য পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে দয়া করেনি। সে টাকা শোধ দিয়েছিলুম আমি। আর সেই থেকে আজ তিন বছর তোমার বাবাকে আমি নিয়মিত টাকা জুগিয়ে এসেছি। রেস খেলার জন্যে, মদ খাবার জন্যে, কখনও বা সংসার চালাবার জন্যে। একথা তুমিও জানো।

পায়চারি করতে করতে হঠাৎ সুধার সামনে এসে নরেন থেমে গেল। অত টাকা কোনোদিনই ফেরত পাব না, এ আমি জানতাম। তবু কেন দিয়েছিলাম, আন্দাজ করতে পার?

একটা বিশ্রী স্বাদে সুধার মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে গিয়েছিল। তিক্ত গলাতেই বললে, পারি। টাকা দিয়েছিলে আমার লোভে। আমাকে বিয়ে করবে বলে।

নরেন এবার হাসল। আওয়াজ হল কি হল না। গত তিন বছরের মধ্যে সুধা এই প্রথম নরেনকে হাসতে দেখলে। কিন্তু হাসি যে এমন যান্ত্রিক হয়, সুধা তা জানত না।

হাসিটা নরেনের মুখে ফুটে উঠতে না উঠতে মিলিয়ে গেল। স্থির হয়ে গেল মুখের পেশীগুলো। তেমনি নিরুত্তাপ গলায় নরেন বললে, খুবই স্বাভাবিক কথা বলেছে সুধা। হিসেবে একটু কিন্তু ভুল হয়ে গেছে তোমার। দেখতে তুমি ভালোই। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার ওপর আমার একটুও লোভ নেই, বিয়ে তো দূরের কথা। তুমি আমাকে যতটা অপছন্দ করো, তোমাদের আমি তার চেয়ে কম করি না।

কয়েক মুহূর্ত পুতুলের মতো চোখ মেলে তাকিয়ে রইল সুধা। তারপর তার মুখ দিয়ে বেরোল, তবে কি জন্যে টাকা দিয়েছিলে বাবাকে?

নরেন আবার পায়চারি শুরু করলে। বললে, তোমাকে আমার দরকার, তাই! তোমাকে আমি আমার কাজে লাগাব।

একটা ভয়ঙ্কর সন্দেহে সুধার মাথাটা ঘুরে উঠল। টেবিলের কোণটা শক্ত মুঠিতে চেপে ধরে প্রশ্ন করলে, কি কাজ?

সিগারেটটা অনেকক্ষণ নিভে গিয়েছিল। জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়ে নরেন প্রশ্ন করল, এত টাকা আমি কোত্থেকে পাই জানো?

সুধা বললে, ঠিক জানি না। তবে বুঝতে পারি, তোমার টাকা আসে চোরা পথে।

ঠিকই ধরেছ! তুমি বুদ্ধিমতী সুধা।—নরেন আর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে লাগল, আমার টাকা আসে বাঁকাচোরা পথে। আজকের দুনিয়ায় এত টাকা সোজা রাস্তায় আসে না। টাকা আমার নেশা। দু—হাতে কুড়িয়ে নিই, চার হাতে উড়িয়ে দিই। তোমাকে আমার এই কাজে লাগাব সুধা। তাই তোমাকে দরকার। আর তোমারও দরকার টাকার।

ঘাড় ফিরিয়ে নরেন একবার দেখে নিল সুধাকে। সুধার শরীরটা তেমনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের একটা প্রান্ত কামড়ে আছে দাঁত দিয়ে। সেটা তিক্ত ঘৃণায়, না অবরুদ্ধ রাগে, বোঝা মুশকিল।

একটু যেন দুঃখিত ভাবেই নরেন বলতে লাগল, ইদানীং টাকার আমদানীতে বড় টান পড়েছে। পুলিশও পেছনে লেগেছে ফেউয়ের মতন। কলকাতা থেকে কারবার গুটোতে হবে। ভাবছি বাইরে কোথাও চলে যাব। পাটনা, এলাহাবাদ, দিল্লি—যেখানে কারবারের সুবিধে। আর যেতেই যখন হবে, তখন দেরি করে লাভ কি? কালকের ট্রেনেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।

এতক্ষণে সুধার মুখ দিয়ে কথা বেরোল: আমরা মানে?

নরেন বললে, তুমি আর আমি। জিনিসপত্র আজই গুছিয়ে নিও।

আমাকেও যেতে হবে?

হবে বইকি। তুমি আমার কারবারের নতুন মূলধন। তোমাকে ছেড়ে যাবার কোনো মানে হয় না।

সুধার মনে হল কপালের রগ দুটো এখুনি ফেটে পড়বে বুঝি। সোজা পা ফেলে সে এগিয়ে এল নরেনের সামনে। ঘন নিশ্বাসে তার বুক ঢেউয়ের মতো উঠছে নামছে। স্পষ্ট গলায় বললে, তোমার সঙ্গে যদি না যাই?

যেতে তোমাকে হবেই সুধা। যেতে তুমি বাধ্য।

অবরুদ্ধ রাগ আর ঘৃণা উথলে উঠল সুধার দুই চোখ দিয়ে। ঘরের বাতাস যেন খান খান হয়ে গেল তার তীক্ষ্ন গলার চিৎকারে, চুপ করো স্কাউন্ড্রেল! যাব না—কিছুতেই যাব না আমি। কি করতে পার তুমি?

সেকেন্ড দুই—তিন নরেন চেয়ে রইল সুধার মুখের দিকে, তারপর দ্বিতীয়বার হাসল। তেমনি অদ্ভুত যান্ত্রিক হাসি। হেসে বললে, তাহলে সংক্ষেপেই বলি শোনো—না গেলে প্রমাণ করে দেব যে যতিশঙ্কর সোমের ঔরসে বিধবা সুনন্দা দাশের গর্ভে তোমার জন্ম।

মাথাটা টলে গেল সুধার। গলা থেকে বুক অবধি হঠাৎ যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তবু প্রাণপণ শক্তিতে সে বলে উঠল, মিথ্যে কথা!

মিথ্যে বইকি। মিথ্যে তো বটেই। নরেন বলতে লাগল, কিন্তু দুনিয়ায় মিথ্যেও ভয়ঙ্কর সত্যি হয়ে উঠতে পারে, দৈব যখন সহায় হয়।

পকেট থেকে একতাড়া চিঠি টেনে বার করলে নরেন। বললে, এগুলোর মধ্যে কি আছে জানো? যতিশঙ্কর আর বিধবা সুনন্দার অবৈধ প্রণয়—কাহিনি। যার ফলে বাইশ বছর আগে সুনন্দার একটি মেয়ে হয়। মেয়েটি সুনন্দার দুঃখ—বিষ মন্থন করে এসেছিল বলে তার নাম রাখা হয় সুধা। সে—মেয়ে অবশ্য ছ'মাসের বেশি বাঁচেনি। কিন্তু আজ সমাজের কাছে সেই সুধাকে এই সুধা বলে চালিয়ে দেওয়াটা জলের মতোই সহজ। নয় কি?

চিঠির তাড়াটা অতি যত্ন করে নরেন আবার পকেটে ভরলে। তারপর বললে, তাই বলছি, আমার কথায় রাজি না হয়ে তোমার উপায় নেই সুধা। আচ্ছা, চলি। কাল সন্ধেবেলায় ট্রেন।

নরেন দরজার দিকে এগোল। আর সুধার মনে হল ঘরের মেঝেটা দুলছে।

নরেন চৌকাঠে পৌঁছেছে, হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এল, শোনো!

ঘুরে দাঁড়াল নরেন। এক—পা এক—পা করে এগিয়ে এল সুধা। কি যেন বলতে গিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল ঠোঁট দুটো, কোনো আওয়াজ বেরোল না।

নরেন বললে, ডাকলে কেন বলো? কিছু টাকা চাই?

হঠাৎ এক আশ্চর্য কাণ্ড করে বসল সুধা। তরঙ্গায়িত বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলখানা সরিয়ে দিয়ে এক বিচিত্র হাসি হেসে সে বলতে লাগল, আমার দিকে ভালো করে চাও নরেনদা, সত্যিই কি আমার ওপর কোনো লাভ নেই তোমার? ক'টা মেয়ে দেখেছ তুমি আমার মতো? আমি বলি কি, আমার এই দেহটাকে তুমি ভোগ করো, যতদিন খুশি, যেমন খুশি ভোগ করে নাও। বাবার দেনা তাতেই শোধ হবে। কিন্তু ভদ্রঘরের মেয়ে আমি, তোমার পাপের পথে সঙ্গিনী হতে আমাকে বলো না। আমায় শুধু এইটুকু দয়া করো নরেনদা—এইটুকু দয়া করো—

ঝড়ে ছিঁড়ে—পড়া এক গোছা ফুলের মতো সুধা উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ল নরেনের পায়ের ওপর।

নরেনের মুখের একটি পেশীও কাঁপল না। পা সরিয়ে নিয়ে ঠান্ডা গলায় শুধু বললে, ছেলেমানুষী করো না সুধা! এখন যেটা শক্ত মনে হচ্ছে, দুদিন বাদে সেটা সহজ হয়ে আসবে। আর এমন কিছু ভয়ানক কাজ তোমাকে করতে হবে না, একটু চুরি, একটু জালিয়াতি, একটু ধাপ্পাবাজি—শুধু এই। তুমি আই—এ পড়া বুদ্ধিমতী মেয়ে, সহজেই পারবে।

চলে যেতে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল নরেন। বললে, হ্যাঁ, আর একটা কথা। তুমি অবশ্য সে চেষ্টা করবে না জানি, তবু বলছি, কোথাও পালাবার চেষ্টা করাটা মিছে। কারণ এই মুহূর্ত থেকে তুমি তোমার চাকর মণিলালের নজরবন্দি—যতক্ষণ না কাল সন্ধেবেলা বম্বে মেল ছাড়ে।

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নরেন। আর ঘরের মেঝের ওপর পাথর হয়ে বসে রইল সুধা। ঘন সন্ধ্যার অন্ধকারে তার মাথার মধ্যে বিকট ঝঞ্ঝনা তুলে বাজতে লাগল বম্বে মেলের চাকার শব্দ।

রাতের কালো ভেলভেটের পর্দা ফুঁড়ে একটা তীক্ষ্ন আলোর বর্শা কে যেন ছুড়ে দিয়েছে। ছুটে চলেছে বম্বে মেল সার্চ লাইট জ্বালিয়ে।

একটা ফার্স্ট ক্লাস কামরায় তিনজন যাত্রী। একটা বার্থে আড় হয়ে শুয়ে নরেন। চোখের পাতা বন্ধ। হয়তো তন্দ্রা এসেছে ট্রেনের দোলায়। মাঝের বার্থে সুধা। কোলের ওপর একখানা বই খুলে বসে আছে। পড়ছে, না আকাশ—পাতাল ভাবছে, ভালো করে লক্ষ না করলে বোঝা যায় না। হয়তো কিছুই ভাবছে না। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে, দয়াহীন নিয়তিকে মেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছে জীবনের অন্ধকার পথে। নরেন যে নিয়তির মতোই অনিবার্য, একথা সুধার চেয়ে বেশি কে জানে? ওপাশের বার্থে তৃতীয় যাত্রী। একটি মহিলা। সুধার চেয়ে বছর দুই—তিনের বড়ই মনে হয়। সুগঠিত দেহ, মাজা—মাজা রং। মুখশ্রীতে আভিজাত্যের ছাপ। রূপালি জরির পাড় বসানো সাদা মলমলের শাড়ি পরনে। জানলার ধারে পা মুড়ে বসে ভদ্রমহিলা চুপ করে অন্ধকারের দিকে চেয়েছিলেন। বার্থের অপর প্রান্তে মাঝারি একটি সুটকেশ। ডালাটার ওপর সাদা হরফে লেখা 'জয়ন্তী সান্যাল'।

হঠাৎ একটা অস্ফুট কাতরোক্তি শুনে সুধা ফিরে তাকাল। জয়ন্তী সান্যাল তখন হাতের ছোট রুমাল দিয়ে একটা চোখ চেপে ধরেছেন।

কি হল? কয়লার গুঁড়ো পড়ল বুঝি?

ভদ্রমহিলা শুধু ঘাড় নেড়ে জানালেন, হ্যাঁ।

চোখটা রগড়াবেন না। বই রেখে সুধা বার্থ থেকে নেমে এল। স্ট্যান্ডে কাচের গ্লাস চাপা দেওয়া সোরাই ছিল। এক গ্লাস জল গড়িয়ে সুধা বললে, নিন—চোখে জলের ঝাপটা দিন।

বার দুই—তিন জলের ঝাপটা দেওয়ার পর সুধা জিজ্ঞেস করলে, গেছে?

অপ্রস্তুতের হাসি হেসে জয়ন্তী বললেন, গেছে।

জানলার শার্সিটা নামিয়ে দিন। বলে সুধা নিজের জায়গায় ফিরে গেল।

জয়ন্তী সান্যাল আলাপ শুরু করলেন, ট্রেনে বুঝি আপনার ঘুম আসে না?

মৃদু হেসে সুধা বললে, না।

আমারও। একজন সঙ্গী না থাকলে ট্রেন জার্নিটা যেন শাস্তি। ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে আলাপ হল!

একটু চুপচাপ। সুধা বইখানা খুললে।

জয়ন্তীই আবার কথা পাড়লেন, কি বই পড়ছেন?

একটানা নাটক।

জয়ন্তী বললেন, নাটক পড়তে আমিও ভালোবাসি। দেখে কিন্তু ততটা মন ভরে না।

সুধা বললে, সময় কাটানোর জন্যেই পড়ি। নইলে নাটক আমি তেমন পছন্দ করি না। বেশির ভাগই কল্পনার রং ফলানো অবাস্তব মনে হয়।

জয়ন্তী হাসলেন। বললেন, জীবনটাই বা নাটকের চেয়ে কম কিসে? অনেক সময় অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যা আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ভাবা যায় না। তবু তো ঘটে! আমার জীবনেও ঘটেছে, আপনার জীবনেও ঘটতে পারে। হয়তো এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটবে, যা আপনার কল্পনারও বাইরে। এই যে আমাদের ট্রেনের আলাপ, এও খানিকটা নাটকীয় নয় কি? কিন্তু আলাপটাই শুধু হল, নামটা জানা হয়নি।

সুধা সোম।

ভারি মিষ্টি নাম।

আপনারটাই বা কম কিসে?—হাসি মুখে সুধা সুটকেশের ওপরের লেখাটা দেখিয়ে দিল।

জয়ন্তী কি একটা বলতে গেলেন, পাতাল থেকে উঠে আসা গুমগুম আওয়াজে বোঝা গেল না।

অন্ধকারে একটা ব্রিজ পার হয়ে গেল বম্বে মেল।

চুপ করে বসে থাকবার মেয়ে নয় জয়ন্তী। গল্প ছাড়া ট্রেন জার্নি করা তাঁর পোষায় না। নাম জানা হল, এবার গন্তব্য।

কোথায় যাবেন আপনারা?

সুধা বললে, বম্বে।

বেড়াতে, না কাজে?

একটু চুপ করে থেকে সুধা জবাব দিল, বেড়াতে।

জয়ন্তী বললেন, আমি যাচ্ছি এলাহাবাদে। শ্বশুরবাড়ি। এই প্রথম যাওয়া।

একটু অবাক হয়ে সুধা বললে, একা যে?

একটু করুণ হাসির আভাস দেখা দিল জয়ন্তীর মুখে। বললেন, আমার সঙ্গে যাঁর যাবার কথা, তিনি সম্প্রতি চলে গেছেন এমন জায়গায়, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না।

সুধা চুপ করে তাকিয়ে রইল জয়ন্তীর সাদা সিঁথির দিকে। জয়ন্তী বললেন, শিকারের বাতিক ছিল আমার স্বামীর। ছোটনাগপুরের জঙ্গলে হাতির পিঠ থেকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। আর তাঁর জ্ঞান ফিরে আসেনি।

সুধা প্রশ্ন করলে, কতদিন বিয়ে হয়েছিল আপনাদের?

জয়ন্তী বললেন, চার বছর। নাটকের মতো সেও এক অদ্ভুত ঘটনা। প্রফেসর অলোক সান্যাল তখন কলকাতার নাম—করা ইংরেজির অধ্যাপক, আমার বিয়ের সভায় তিনি এসেছিলেন কাকার বন্ধু হিসেবে নিমন্ত্রিত হয়ে। বরের মুখে মদের গন্ধ পেয়ে তিনি একরকম অপমান করেই তাঁদের তাড়িয়ে দেন। তারপর কাকাকে ডেকে বলেন, আমি বিয়ে করতে পারি জয়ন্তীকে—যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে। কাকা বললেন, কিন্তু তোমরা ব্রাহ্মণ আর আমরা বদ্যি। তিনি বললেন, তা হোক। সেই রাতেই বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু পাওয়া গেল না আমার শাশুড়ির আশীর্বাদ। আমার শ্বশুরবাড়ি গোঁড়া হিন্দু। এলাহাবাদ থেকে চিঠি এল, সে বাড়িতে বদ্যির মেয়ের প্রবেশ নিষেধ। আমার স্বামীও আর কোনোদিন যাননি। কিন্তু হাওয়া ঘুরে গেল আমার স্বামীর মৃত্যুর পর। সপ্তাহখানেক আগে শাশুড়ি আমাকে লিখে পাঠিয়েছেন, আমার ছেলের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন তুমিই। সান্যাল বাড়ির একমাত্র বউ। তুমি চলে এসো। তাই যাচ্ছি।

সুধা বললে, এলাহাবাদে আর কখনও যাননি?

জয়ন্তী বললেন, যাবার সুযোগ পেলুম কই? সীতার মতো চোদ্দ বছর না হোক, চারটে বছর স্বামীর সঙ্গে তো বনবাসেই কাটল।

মাপ করবেন, এলাহাবাদ আমার জানা শহর। আপনাকে সাহায্য করতে পারি কী?

নরেন কখন তার বার্থে উঠে বসেছে, কেউই এতক্ষণ তা খেয়াল করেনি।

স্মিত মুখে জয়ন্তী বললেন, ধন্যবাদ। আপনাকে কষ্ট দেওয়ার দরকার হবে না। এলগিন রোড শুনেছি এলাহাবাদের নামকরা রাস্তা। সেখানে জাস্টিস অমরনাথ সান্যালের বাড়ি খুঁজে নিতে অসুবিধে হবে না।

সুধা বললে, আপনাকে তাঁরা চিনতে পারবেন তো? কখনও তো দেখা হয়নি?

জয়ন্তী বললেন, চিনতে না পারলে এই চিহ্নটুকু দেখাব।

সুধার সামনে বাঁ—হাতখানি বাড়িয়ে দিলেন জয়ন্তী। অনামিকায় একটা বড় পাথর বসানো আংটি জ্বলজ্বল করছে। ফিরোজা—রঙের বড় পাথরটির মাঝখানে খোদাই—করা একটি ইংরেজি ‘A’ অক্ষর।

জয়ন্তী বললেন, এটি আমার স্বামীকে তাঁর মায়ের—দেওয়া উপহার। এই অভিজ্ঞান—অঙ্গুরী নিয়ে শকুন্তলার মতো যাত্রা করেছি শ্বশুরবাড়ি। আর আছে আমাদের বিয়ের একখানা ফোটো, এই সুটকেশটার মধ্যে।—কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন! জীবনে আজ সবচেয়ে আপনার যাঁরা, তাঁরাই আমার সবচেয়ে অচেনা। এও একটা অদ্ভুত নাটক নয় কি? কে জানে, এই নাটকের পরিণতি কোথায়? কে বলতে পারে কোন নাটকে কার কি অংশ—

হঠাৎ জয়ন্তীর মুখের কথা হারিয়ে গেল।

কোথায় যেন গর্জে উঠল হাজারটা বাজ। আর তারই প্রচণ্ড শব্দের আঘাতে ছিন্ন—ভিন্ন হয়ে গেল এই অন্ধকার রাত্রির হৃৎপিণ্ড।

পৃথিবীর ঝুঁটি ধরে কে যেন সজোরে নাড়া দিচ্ছে।

চিৎকার করে উঠল সুধা।

নরেন তাকে দু—হাতে আঁকড়ে ধরতেই মনে হল, গাড়ির কামরাটা নাগরদোলার মতো উলটে গিয়ে কোন অন্ধ পাতালে তলিয়ে যাচ্ছে।

কলিশনটা হল ধানবাদ আর গয়ার মাঝামাঝি। একটা মালগাড়ির সঙ্গে বম্বে মেলের ধাক্কা। তারই ফলে গোটাকয়েক বগি উলটে পড়েছে লাইনের পাশে নিচু ঢালু জমিটাতে।

নরেনের যখন চৈতন্য হল, তখন আহতদের গোঙানি, কখনও বা চিৎকার আর থেকে থেকে ছিটকে—পড়া আত্মীয়—স্বজনের নাম ধরে শোকার্ত যাত্রীদের দীর্ঘ ডাক স্তব্ধ রাত্রির বুকটাকে যেন নখ দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলছে। এক হাত দিয়ে নরেন মুখের ওপর থেকে নরম নরম পেঁজা তুলোর মতো কি যেন সরিয়ে ফেললে। পেঁজা—তুলো নয়, ঢেউ—খেলানো একরাশ এলো চুল। নরেনের আর এক হাতের বন্ধনে নরম পিণ্ডাকার বস্তু।

সুধা!

একহাতে ভর দিয়ে উঠে বসল নরেন। কোলের কাছে সুধার অচৈতন্য দেহ। বেঁচে আছে কিনা কে জানে! আন্দাজে ঠাহর করে নরেন নিজের হাত সুধার নাকের কাছে ধরলে। নিশ্বাস এখনও পড়ছে।

দু'হাত দিয়ে ভাঙা কাঠের টুকরো সরিয়ে নরেন টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। তারপর কুড়িয়ে নিলে সুধার অজ্ঞান দেহটা। ঢালু জমিটা যেখানে সমতল হয়ে এসেছে, সেইখানে এসে দাঁড়াল নরেন। শুইয়ে দিল সুধাকে। জল চাই, জল। সুধাকে বাঁচাতেই হবে। সুধা মরলে তার চলবে না। অন্ধকারে পাথরের টুকরো আর আগাছার ঝোপে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলল নরেন।

কিন্তু জল কোথায়? জল নেই। আশেপাশে আছে শুধু জলের জন্যে শুকনো কাতর অন্তিম প্রার্থনা। তবু দেখা যাক না খুঁজে। এই ধ্বংস—স্তূপের মাঝে হঠাৎ যদি মিলে যায় জলের একটা ফ্লাস্ক, কিংবা ভাঙা সোরাইয়ের টুকরোয় জলের তলানি।

ট্রাউজারের পকেটে তাড়াতাড়ি হাত ঢুকিয়ে নরেন বের করলে একটা টর্চ। এক সেকেন্ড পরেই ছুড়ে ফেলে দিল সেটাকে। টর্চটাও গেছে চুরমার হয়ে।

তবে আর কি হবে এই শ্মশানে দাঁড়িয়ে থেকে? ফিরল নরেন। ফিরতে গিয়ে কিসে যেন পা বেধে একটা বড় রকমের হোঁচট খাচ্ছিল, সামলে নিলে কোনোরকমে। জিনিসটা আর কিছুই নয়, রূপালি পাড়—বসানো সাদা মলমলের শাড়ির খানিকটা।

নরেনের সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। এ শাড়ি সে চেনে। জয়ন্তী সান্যালের শাড়ি। কিন্তু জয়ন্তী কই?

হঠাৎ হেঁট হয়ে, দু'হাত দিয়ে পাগলের মতো ভাঙা জিনিসপত্র সরাতে লাগল নরেন। আছে—জয়ন্তী সান্যাল আছে। একটা ভারি কেবিন—ট্রাঙ্কের তলায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে জয়ন্তী। ট্রাঙ্কের তলা থেকে বেরিয়ে আছে বাঁ—হাতখানা।

কেবিন—ট্রাঙ্কটাকে কোনোমতে সরিয়ে ফেলল নরেন। জয়ন্তীর নাকে হাত দিয়ে বুকে হাত দিয়ে দেখল বারকয়েক। জয়ন্তীর ঘুম এ জীবনে আর ভাঙবে না।

নাই ভাঙুক, জয়ন্তী সান্যালের প্রাণ তার কোনো কাজে লাগবে না। যা কাজে লাগবে, তা সে পেয়েছে।

হাঁটু গেড়ে বসে জয়ন্তীর বাঁ—হাতের অনামিকা থেকে ফিরোজা রঙের পাথর বসানো আংটিটা ধীরে ধীরে খুলে নিল নরেন। তারপর টাউজারের পকেটে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে টর্চের তীব্র আলো ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল তার মুখের ওপর।

সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ এল: কে ওখানে? দাঁড়াও।

নরেনের মুখের একটি পেশীও কাঁপল না। সাবধানে পা ফেলে সে এগিয়ে গেল আলোর দিকে। রেস্কিউ পার্টির লোক এসে গেছে তাহলে!

রেলওয়ে পুলিশ আর স্ট্রেচার বাহিনী সঙ্গে নিয়ে রেস্কিউ পার্টির লোক তখন আহতদের উদ্ধার শুরু করেছে। মরা লাশ টেনে বের করে বোঝাই করছে একটা গাড়িতে। নরেন কাছে এসে দাঁড়াতেই রেস্কিউ—অফিসার প্রশ্ন করলেন, প্যাসেঞ্জার?

নরেন ঘাড় নাড়ল।

ইস! কপালে আপনার বেশ চোট লেগেছে দেখছি, আসুন।

নরেন বললে, তার আগে আপনি আসুন, আমার এক আত্মীয় অজ্ঞান হয়ে আছেন। তাঁকে ওখানে সরিয়ে রেখেছি।

স্ট্রেচার সমেত অফিসার নরেনের পিছু পিছু নেমে গেলেন ঢালু জমি যেখানে সমতল হয়ে এসেছে।

অন্য একটি ট্রেনে করে আহত যাত্রীদের নিয়ে রেস্কিউ পার্টি যখন গয়ার হাসপাতালে এসে পৌঁছল, তখন পুব দিক ফরসা হচ্ছে।

ভর্তি করবার সময় অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, নাম?

নরেন্দ্রনাথ দাশ।

আপনার আত্মীয়ার নাম?

নরেন একবার তাকালে সুধার দিকে। তখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি সুধার।

একটু থেমে নরেন বললে, মিসেস জয়ন্তী সান্যাল।

দুই

একটা লাঠিতে ভয় দিয়ে এগিয়ে এল নরেন। কপালটা ঘিরে একটা ব্যান্ডেজ। ডান পায়ে একটা নি—ক্যাপ। পায়ের চোটটা কাল টের পাওয়া যায়নি। আজ বেশ খানিকটা ফুলেছে। বাঁ—দিকের কপালটাও ইঞ্চি দেড়েক ফাঁক হয়েছে। ভয়ের কিছু নেই, ডাক্তার বলেছে। পুরোনো দাগটার পাশে আর একটা নতুন দাগ পড়বে মাত্র।

লাঠির খট খট আওয়াজ করে নরেন এগিয়ে এল সুধার বেডের পাশে। মুখ ফিরিয়ে একবার দেখে, সুধা সামনের খোলা দরজার বাইরে আবার তাকিয়ে রইল। অনেক দূরে জমাট—বাঁধা ধোঁয়ার মতো নীলচে পাহাড়ের গায়ে তখন সূর্য ডুবছে।

বেলা দুপুর থেকে সুধার জ্ঞান ফিরেছে। শুধু নার্ভাস শক লাগা ছাড়া মারাত্মক আর কিছুই হয়নি তার। শরীরের কয়েকটা জায়গায় সামান্য কাটাকুটি মাত্র। ডাক্তার বলেছে, মিরাকুলাস এস্কেপ। দৈব তার সহায়।

ঠান্ডা গলায় নরেন বললে, কেমন আছো এখন?

ভালো।

এখনও দুর্বল মনে হচ্ছে?

সুধা চুপ।

সেরে যাবে শিগগিরই।

চুপ করে রইল সুধা। চুপ করে শুনতে লাগল, কোথায় একটা সাঁওতালী বাঁশী বাজছে।

নরেন আবার বললে, তোমাকে যে ফিরে পাব ভাবিনি। এমন অ্যাক্সিডেন্ট কেউ বড় একটা বাঁচে না।

মুখ না ফিরিয়ে সুধা জবাব দিলে, আমি না বাঁচলে বাবার দেনা শোধ হবে কি করে?

নরেন বললে, ডাক্তার বলেছে, দৈব তোমার সহায়।

মাঝের কথাটায় জোর দিয়ে সুধা বললে, দৈব তোমার সহায়।

সুধার বেডের একপাশে নরেন বসল। লাঠিটা দু—হাঁটুর ওপর রেখে বলল, তা বলতে পারো, কথাটা মিথ্যে নয়। দৈব আমারও সহায়। নইলে ট্রেনের কামরায় জয়ন্তী সান্যালের সঙ্গে আমাদের আলাপ হবে কেন?

সুধা চমকে মুখ ফেরাল।

জয়ন্তী কোথায়?

তার স্বামীর কাছে গেছে।

ডান হাতের মুঠি দিয়ে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে সুধা বসে রইল কাঠ হয়ে। সুধাকে একটু সময় দিয়ে নরেন আস্তে আস্তে বললে, তোমাকে একটা জিনিস দিয়ে গেছে জয়ন্তী।

পকেট থেকে নরেন ফিরোজা রঙের পাথর বসানো আংটিটা বের করলে। তারপর টেনে নিল সুধার ডান হাতখানা। অনামিকায় আংটিটা ঢিলে হল, দেখা গেল মধ্যমায় মানানসই হয়েছে।

নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল সুধা আংটির দিকে। ফিরোজা রঙের পাথরটির মাঝখানে জ্বল জ্বল করছে ইংরেজি ‘A’ অক্ষরটা।

নরেন বললে, এ আংটি এখন থেকে তোমারই।

সুধার মুখ দিয়ে বেরোল, কিন্তু এ আংটি জয়ন্তী আমায় দিল কেন?

নরেন বললে, জয়ন্তীর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া দৈবের ইচ্ছে নয়। তার বদলে তুমি যাবে, তাই।

মাথাটা ঝিমঝিম করছিল সুধার। বিহ্বলের মতো তাকিয়ে বললে, কি বলছ তুমি? কোথায় যাব?

ঠান্ডা গলায় নরেন জবাব দিলে, এলাহাবাদে, তোমার শ্বশুরবাড়ি?

আমার শ্বশুরবাড়ি?

বার দুয়েক ঘাড় নেড়ে বললে, তোমারই তো। মনে করো, কাল রাতের ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে সুধা সোম আর বেঁচে নেই। তুমিই এখন জয়ন্তী সান্যাল। এলাহাবাদের জাস্টিস অমরনাথ সান্যাল তোমার শ্বশুর। মাস ছয়েক আগে তুমি স্বামীকে হারিয়েছ। সেও এক দৈব—দুর্ঘটনা। ছোটনাগপুর জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে হাতির পিঠ থেকে পড়ে...অমন করে তাকিয়ে থেকো না সুধা, শোনো. . . তোমার সেই পরলোকগত স্বামী প্রফেসর অলোক সান্যালের শেষ স্মৃতিচিহ্ন এখনও তোমার আঙুলে জ্বলজ্বল করছে। আর এই স্মৃতিচিহ্নটুকু নিয়েই তোমায় যেতে হবে এলাহাবাদে শ্বশুরঘর করতে।

হিস্টিরিয়া রুগির মতো গলা চিরে চিৎকার করে উঠল সুধা: না, না, না!

ছুটে এল নার্স। সচকিত হল রোগীরা।

নরেনের মুখ যেন পাথরের। চোখ দুটো ফসফরাসের মতো জ্বলছে। সেইদিকে তাকিয়ে সুধার চিৎকার আপনি থেমে গেল।

নার্সকে নরেন বললে, নার্ভগুলো এখনও দুর্বল। ভয় পেয়েছিল হঠাৎ।

সুধার একখানা হাত তুলে নিয়ে নার্স পালস দেখলে একবার। তারপর বললে, একে বেশি কথা বলতে দেবেন না।

চলে গেল নার্স।

আমিও এখন উঠি। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল নরেন। বললে, অল্পেই উতলা হয়ে ওঠা মেয়েদের একটা দোষ। সব কিছু সহজ ভাবে নিতে পারাই ভালো। একটা বিশেষ ভদ্র পরিবার—একটা জাস্টিসের ফ্যামিলিতে যাবে তুমি, তাতে ভয় পাবার কি আছে সুধা! সেখানে তুমি সুখে থাকবে, আদরে থাকবে, আরামে থাকবে।

ক্লান্তিতে চোখ বুজে বসেছিল সুধা। চোখ খুলে বললে, তাতে তোমার লাভ?

সে কথা এখনই কেন? সেটা পরে। ধরো, তুমি সুখে থাকবে, সেটাই আমার লাভ! আচ্ছা, তুমি বিশ্রাম নাও।

দু'পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এল নরেন। বললে, হ্যাঁ, একটা কথা বলে রাখি। এলাহাবাদে আমি টেলিগ্রাম করে দিয়েছি। এলগিন রোডে। জাস্টিস অমরনাথ সান্যালের বাড়ি। সম্ভবত কালই তাঁরা এসে পড়বেন তোমাকে নিয়ে যেতে। তুমি তৈরি থেকো জয়ন্তী।

লাঠির খট খট আওয়াজ তুলে চলে গেল নরেন। আর সুধার দুই কান ভরে একশোটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো বাজতে লাগল নরেনের শেষ কথাটা। সে আর সুধা নয়, আজ থেকে সে জয়ন্তী।

এলাহাবাদ থেকে লোক এল সত্যিই। পরের দিনই।

প্রথমে দেখা হল নরেনের সঙ্গে। প্রিয়দর্শন একটি যুবা। বয়স সাতাশ—আঠাশের বেশি হবে না। পশ্চিমের লোক বলে গায়ের ফর্সা রংটা রোদে পুড়ে তামাটে। পরনে পায়জামা, পাঞ্জাবি, জহরকোট। একমাথা রুক্ষ চুল, মুখে—চোখে সরল উৎকণ্ঠা আর কৌতূহল। বললে, আমি সুজিত সান্যাল। পরলোকগত অলোক সান্যাল আমার দাদা। আপনি?

নরেন বললে, আমি জয়ন্তীর দাদা, নরেন। আমই টেলিগ্রাম করেছিলাম।

পকেট থেকে টেলিগ্রামখানা বের করে সুজিত বললে, ও, নমস্কার! আপনার তার পেয়েই আমি ছুটে এসেছি। আমাদের বাড়ির অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। বউদি কোথায়? কেমন আছেন এখন?

জয়ন্তী পাশের ঘরে।

লাঠিতে ভর দিয়ে নরেন এগোল।

সুধা তার বেডে ছিল না। বারান্দায় রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়টার দিকে চুপ করে তাকিয়েছিল।

সুজিতকে একটু তফাতে দাঁড়াতে বলে নরেন এগিয়ে গেল সুধার কাছে। বললে, জয়ন্তী, তোমার শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক এসেছেন।

জয়ন্তী ফিরে তাকাতেই নরেন বললে, উনি তোমার দেওর, সুজিত সান্যাল।

তারপর মুখ ফিরিয়ে ডাকলে, আসুন সুজিতবাবু।

মুখ ফেরাতেই যেন পাথর হয়ে গেল সুধা। দূর থেকে সুজিত দেখছিল তাকে। সুধার মনে হল, এই মুহূর্তে যদি ভূমিকম্প হয়, সে আর নরেন যদি তলিয়ে যায় পাতালে!

কিন্তু হল না কিছুই। সুজিত সোজা এগিয়ে এসে হেঁট হয়ে সুধার পা ছুঁতে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেল সুধা। অস্ফুট স্বরে কি যে বলে উঠল বোঝা গেল না।

অপ্রতিভ হয়ে মাথা তুলতেই সুজিতের চোখ দুটো আটকে গেল বুকের কাছে জড়ো করে রাখা সুধার হাতের আঙুলে। এ আংটি তার অনেক দিনের চেনা—তার দাদার শেষ স্মৃতিচিহ্ন।

নরেন বললে, কিছু মনে করবেন না। চেনা—জানা তো ছিল না, তাই সহজ হতে পারছে না জয়ন্তী।

একটু মিষ্টি হাসি দেখা দিল সুজিতের মুখে। বললে, আমার কিন্তু অনেক দিনের চেনা মনে হচ্ছে বউদিকে। সংসারে ওঁর চেয়ে আপনজন আমাদের আর কে আছে!

নরেন বললে, আপনারা ছাড়া জয়ন্তীরও আর কেউ নেই।

সুজিত বললে, একে দাদা নেই, তার ওপর ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে মা বিছানা নিয়েছেন কাল থেকে। ভাবছি আজ রাতের ট্রেনেই ওঁকে নিয়ে যাব।

তারপর সুধার মুখের পানে সোজা তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, যেতে পারবেন তো বউদি?

তাকাতে গিয়ে সুধার চোখ পড়ে গেল সুজিতের চোখে। ভারি হয়ে নেমে এল পাতা দুটো।

নরেন বললে, পারবে বইকি। হাসপাতালে পড়ে থাকার চেয়ে আপনাদের ওখানে যাওয়াই ভালো। হাজার হোক নিজের ঘর তো!

সুজিত বললে, আমি তাহলে হোটেলে ফিরে যাই। রাত্রে এসে বউদিকে নিয়ে যাব।

ছোট একটা নমস্কার করে সুজিত চলে গেল। স্তব্ধ হয়ে সুধা চেয়ে রইল সেই দিকে। আর নরেন চেয়ে রইল সুধার মুখের পানে।

পশ্চিমের আপ ট্রেন প্রায়ই লেট করে।

বারো মিনিট পরে গাড়ি এল। রাত্রিকাল হলেও ফার্স্ট ক্লাস কামরা খালিই পাওয়া গেল। সুধাকে তুলে দিয়ে নরেন বললে, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আমাকে যেন ভুলে যেও না জয়ন্তী। দরকার হলে কলকাতার ঠিকানায় চিঠি দিও।

সুজিত আত্মীয়তার সুরে বললে, আপনিও আমাদের সঙ্গে গেলে ভালো হত নরেনবাবু। মাও যেতে বলেছেন।

নরেন বললে, আপনার মায়ের কথা রাখতে পারলে খুশিই হতাম। কিন্তু কলকাতায় আমার কাজ পড়ে আছে। জয়ন্তীকে আপনার হাতে তুলে দিলাম, এবার আমার ছুটি।

সুজিত বললে, এমন অদ্ভুত জায়গায়, এমন অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে বউদিকে যে পাব, এ আমরা ভাবতেই পারিনি।

ফার্স্ট ক্লাস কামরায় জানলার ধারে স্থির হয়ে বসেছিল সুধা। সেই দিকে ক'বার তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় নরেন বললে, সংসারে বড়—গোছের পাওয়া হিসেবের বাইরেই ঘটে থাকে সুজিতবাবু। জয়ন্তীই কি আগে ভেবেছিল, আপনাদের কোনোদিন পাবে?

উত্তরে সুজিত কি যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ঢং ঢং করে বাজল ঘণ্টা। স্টপেজ এখানে অল্পক্ষণই।

নরেন বললে, নিন, উঠে পড়ুন সুজিতবাবু। আপনার মাকে আমার নমস্কার জানাবেন, তাঁর নিমন্ত্রণ আমার মনে থাকবে।

ছোট একটি নমস্কার করে সুজিত উঠে পড়ল গাড়িতে। বাজল গার্ডের হুইশল! দুলে উঠল সবুজ আলো। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এলাহাবাদগামী ট্রেন মিলিয়ে গেল দূরের অন্ধকারে। শুধু জ্বলজ্বল করতে লাগল ট্রেনের পেছনের লাল আলোটা।

লাঠিতে ভর দিয়ে নরেন দাঁড়িয়ে রইল সেই দিকে তাকিয়ে। তৃতীয়বার তার মুখে ফুটে উঠল সেই বিচিত্র যান্ত্রিক হাসি।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে চলন্ত ট্রেনের জানলার ধারে চুপ করে বসে বসে জয়ন্তীর মতোই সুধা ভাবছিল, জীবনে যারা সবচেয়ে পর, তারাই আজ সবচেয়ে আপনার হতে চলেছে। এও একটা অদ্ভুত নাটক নয় কি? কে জানে, এ নাটকের পরিণতি কোথায়?

তবু এই ভালো। নরেনের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া।

তিন

এলাহাবাদ স্টেশনে বাড়ির মোটর গিয়েছিল আনতে।

হাডসন গাড়িটা লোহার ফটকে ঢোকবার আগে সুধার চোখে পড়ল, গেটের পাশে শ্বেতপাথরের টুকরোয় লেখা 'সান্যাল—বাড়ি'। ফটক ছাড়িয়ে কাঠা পাঁচ—ছয় জমির ফুল—বাগান। বেশির ভাগ মরশুমী ফুলের বেড়। কিছু চন্দ্রমল্লিকার ঝাড়। মাঝখানে রাঙানো সিঁথির মতো লাল সুরকির পথ। পথটা গিয়ে পৌঁছেছে রীতিমতো বড় একটা দোতলা বাড়ির পায়ের গোড়ায়। বাড়ির গড়ন অনেকটা সেকেলে দুর্গের মতো।

এই হল জাস্টিস অমরনাথ সান্যালের বাড়ি।

গাড়িটা ভালো করে থামবার আগেই নেমে পড়ল সুজিত। তারপর দরজাটা ভালো করে খুলে দিয়ে বললে, আসুন বউদি।

শাড়ির আঁচলটা মাথায় তুলে দিয়ে নামল সুধা। তারপর সুজিতের পিছু পিছু জড়িত পদে যেখানটায় এসে দাঁড়াল, সেটা একতলার হলঘর। উলটো দিকে খোলা দরজা দিয়ে দোতলায় ওঠবার সিঁড়ি নজরে পড়ে। হলের দু'পাশে দু'খানা দু'খানা চারখানা ছোট ঘর। চারটে দরজাই বন্ধ।

হলের মাঝখানে এসে সুজিত ফিরে তাকালে সুধার দিকে। বললে, এত বড় বাড়িটা কেমন ভূতুড়ে হয়ে আছে দেখছেন?

সুধা জিজ্ঞাসু চোখ তুলে তাকাল।

তেমনি মিষ্টি হাসি দেখা দিল সুজিতের মুখে। বললে, ভূত—টুত অবিশ্যি নেই এখানে। তবু বাড়িটা এত চুপচাপ যে ভূতুড়ে বলেই মনে হয়। থাকবার মধ্যে কেবল মা আর আমি। আমাদের দুটো ঘর ছাড়া গোটা বাড়িটায় আর আলো জ্বলে না। আপনি এলেন, এবার যদি এই ভূতুড়ে আবহাওয়াটা পালায়!

পশ্চিমের ছেলে বলেই বোধ হয় সুজিতের কথায় অন্তরঙ্গতার সহজ সুর। হয়তো তারই দরুণ সুধার আড়ষ্টতা ট্রেনেই খানিকটা কেটে গিয়েছিল। মনে মনে খানিকটা তৈরি করে নিতে পেরেছিল সে নিজেকে।

সুজিতের কথায় কি বলবে ভেবে পেল না সুধা। তার মনে হল, ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট থেকে এখনও যা ঘটছে, তার সবটাই তো ভূতুড়ে। কিছু না বলে মৃদু একটু হাসল শুধু।

সুজিত বললে, চলুন, আগে মার কাছে যাই। তারপর দোতলার সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে ডাকতে লাগল, মা! মা!

কিন্তু ডাকবার দরকার ছিল না। দেখা গেল, সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন স্বর্ণময়ী। দোতলার বারান্দা থেকে হাডসন গাড়িটা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।

নিচের শেষ ধাপে পৌঁছে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন স্বর্ণময়ী।

মাকে দেখে সুজিত একেবারে শোরগোল করে উঠল, বউদিকে একেবারে নিয়েই এলাম মা। ওঁর দাদা কিন্তু আসতে পারলেন না। ভাগ্যিস তোমার আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়েছিলাম, তাই তো আস্ত গোটা বউদিকে ফিরিয়ে আনতে পারলাম। এবার তুমি বুঝে—পড়ে নাও মা!

কথা শেষ করার আগেই তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে গেল সুজিত। হলঘরের মাঝখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সুধা।

আর সিঁড়ির নিচের শেষ ধাপে স্বর্ণময়ী।

দুজনে দুজনকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল শুধু। আর বড় দেওয়াল—ঘড়িটা মুহূর্ত গুনতে লাগল টক টক করে।

স্বর্ণময়ী দেখলেন, ক্লান্ত পাখির মতো আশ্রয়মুখী একটি মেয়ে। সুশ্রী ম্লান বিষণ্ণবদনা। সলজ্জতা ও সঙ্কোচে হতবাক। এই তাঁর পুত্রবধূ। সান্যাল বাড়ির বউ।

সুধা দেখছিল, জগদ্ধাত্রীর মতো রূপ, থানপরা মাতৃমূর্তি, মাথায় কাঁচা—পাকা চুলগুলি ছোট করে ছাঁটা। দুই চোখ দয়া আর ক্ষমায় উপচে পড়ছে।

অনেকক্ষণ কাটল। গেল অনেকগুলি মুহূর্ত।

তারপর একসময় দু—হাত বাড়িয়ে স্বর্ণময়ী ডাকলেন, এসো!

এক—পা এক—পা করে এগিয়ে গিয়ে তাঁর পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল সুধা।

সুধার হাত দুটি ধরে টেনে তুললেন স্বর্ণময়ী। আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখে পড়ল, সুধার ডান হাতের মধ্যমায় বড় ফিরোজা রঙের পাথরটার মাঝখানে জ্বলজ্বলে ‘A’ অক্ষরটা।

দরদর করে জলের ধারা নেমে এল স্বর্ণময়ীর দু'গাল বেয়ে। দু'হাত দিয়ে টেনে নিলেন সুধাকে তাঁর বুকের ওপর।

সুধা অভিনেত্রী নয়। তবু স্বর্ণময়ীর বুকে মুখ রেখে সেও কাঁদল। অনেকক্ষণ ধরে। এত কান্না তার বুকের মধ্যে কোথায় লুকিয়েছিল, সুধা নিজেও জানতে পারেনি।

একজন কাঁদল হারিয়ে পাওয়ার আনন্দে, আর একজন কাঁদল জীবনের প্রথম অপরাধ—বোধের বেদনায়।

কথা হচ্ছিল রাতের খাওয়া—দাওয়ার পর। দোতলার দক্ষিণমুখী ঘরখানায় সুধার থাকবার ব্যবস্থা করেছেন স্বর্ণময়ী। কথা হচ্ছিল সেই ঘরে বসে।

স্বর্ণময়ী বলছিলেন, সান্যাল বাড়িতে প্রথম বউ এল, অথচ শাঁখ বাজল না, আলো জ্বলল না, উৎসব হল না। এ আমারই কপাল! অলোক যে আমায় এমনি করে ফেলে পালাবে, ভাবতেও পারিনি আমি। শেষ হবার আগে একটা খবরও কি দিতে পারোনি বউমা?

স্বর্ণময়ীর শেষের ডাকটি শুনে তেইশ বছরের কুমারী মেয়ের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। মুখ নিচু করে সুধা বললে, সময় ছিল না। ছোটনাগপুর থেকে বাড়িতে আনার পর তিনি মাত্র একটা রাত বেঁচেছিলেন।

জানলার ধারে একখানা চেয়ার টেনে চুপ করে বসেছিল সুজিত। বলে উঠল, বাড়িতে! কিন্তু আপনার চিঠিতে লেখা ছিল দাদা হাসপাতালেই মারা গিয়েছিলেন।

সুধার গলার কাছটা শুকিয়ে উঠল। বললে, প্রথমে বাড়িতেই আনা হয়েছিল। তারপর ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে হাসপাতালে।

কোন হাসপাতালে?

সুধার বুকের ধুক—ধুক দ্রুত হয়ে উঠল। অত বড় শহর কলকাতার অসংখ্য রুগির মধ্যে অ—দেখা অজানা অলোক সান্যাল কোন হাসপাতালের কোন বেডে মরেছে, সুধা তা জানবে কেমন করে? তবু অন্ধকারে ঢিল ছুড়লো সুধা। বললে, শম্ভুনাথ হসপিটালে।

সুজিতের চোখে কিসের যেন ছায়া পড়ল। বললে, কাগজে কিন্তু বেরিয়েছিল, পি—জি'তেই দাদাকে দেওয়া হয়।

সুধার গলার কাছে কি যেন আটকে গেছে। একটা ঢোক গিলে বললে, হ্যাঁ, সেটা পরে অপারেশনের জন্যে। তারপর স্বর্ণময়ীর মুখের পানে চেয়ে কেমন যেন অসহায় কণ্ঠে বললে, ওসব কথা থাক মা।

ও প্রসঙ্গ স্বর্ণময়ীরও ভালো লাগছিল না। একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, থাক সুজিত, যে যাবার সে তো গেছেই, জয়ন্তীর মনে নতুন করে ঘা দিয়ে আর লাভ কি!

সুজিতের মুখের ভাব বদলে গেল। অনুতপ্ত গলায় শুধু বললে, মাপ করবেন।

তারপর আস্তে আস্তে উঠে চলে গেল।

স্বর্ণময়ী সুধার পিঠে একখানি হাত রেখে বলতে লাগলেন, তোমার মধ্যেই আমার অলোককে আবার ফিরে পেয়েছি বউমা। এত দুঃখের মধ্যে এইটুকুই আমার সান্ত্বনা। এ বাড়িতে আমার পরেই তোমার স্থান। এতকাল সংসারের জোয়াল বয়ে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। শেষ দিন ক'টা আমায় ছুটি দাও বউমা।

আঁচল থেকে চাবির গোছা খুলে সুধার আঁচলে বেঁধে দিলেন স্বর্ণময়ী। তারপর বললেন, রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো মা!

ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন স্বর্ণময়ী।

চাবির গোছাটা হাতের মুঠোয় নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল সুধা। তারপর একসময় উঠে দরজাটা বন্ধ করে বাতিটা নিভিয়ে দিলে। ঘুম কি আজ আসবে সুধার? মাথার কাপড়টা নামিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল জানলার ধারে। বাইরে ফিকে ফিকে জ্যোৎস্না মোমের মতো গলে গলে পড়ছে এলাহাবাদ শহরের ওপর। কৃষ্ণপক্ষ কেটে গিয়ে শুরু হয়েছে শুক্লপক্ষ। কিন্তু সুধার মনের কৃষ্ণপক্ষ কাটল কই? এত ঐশ্বর্য, এত আদর, এতখানি বিশ্বাস—এর কিছুই তো তার পাওনা নয়। আর একজনের কাছ থেকে চুরি করে নেওয়া। সারাটা জীবনই চোর হয়েই কি কাটাতে হবে তাকে? ধরা পড়ার ভয়ে প্রতি মুহূর্তে মরমে মরে গিয়ে! যে অলোক সান্যাল মরে গেছে ছ'মাস আগে, জগৎ—সংসারের কাছে আজ সে তার স্ত্রী। মরা মানুষের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে সুধা। এই মিথ্যা পরিচয়ের ফাঁদ থেকে এ জীবনে বুঝি তার আর মুক্তি নেই!

না, আজ আর ঘুম আসবে না সুধার চোখে।

গৃহস্থালী করার অভ্যাস সুধার আঠারো বছর বয়েস থেকে। যখন যতিশঙ্করের আর্থিক অবস্থা পড়তির শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে। বাবুর্চি গেল, খানসামা গেল, চাকর গেল, এল আট টাকা মাইনের ঠিকে ঝি আর পনেরো টাকার রান্নার লোক। গৃহস্থালীতে সুধার হাতেখড়ি হয়েছে সেইদিন থেকেই।

স্বর্ণময়ীর চাবির গোছা হাতে পেয়ে সুধার তাই কোনো কিছুই আটকায়নি। সান্যাল বাড়ির সংসারের ভার অনায়াসে তুলে নিয়েছে হাতে। তাকে বাদ দিলে লোকের সংখ্যা মোটে দুটি। কিন্তু কাজের সংখ্যা অনেক। ভোরবেলায় উঠে স্নান সেরে সবার আগে স্বর্ণময়ীর পুজোর জোগাড় করে দেওয়া। তারপর সুজিতের চা—পর্বের আয়োজন করে দিয়ে রঘুয়াকে বাজারে পাঠানো। বাজার মানে শুধু আলু—পটল—কুমড়োর সওদা নয়। স্বর্ণময়ীর জন্যে বিশেষ বিশেষ ফলমূল, সুজিতের জন্যে একটু টাটকা মাংস, চাকর—বাকরদের জন্যে আলাদা জাতের বাজার। তাছাড়া, স্বর্ণময়ীর হরলিকস ফুরোল কিনা, সুজিতের কফির টিন কতটা ভর্তি, সে খোঁজও রাখতে হয়।

পুজো সারতে স্বর্ণময়ীর প্রায় ঘণ্টা দুয়েক লাগে। তার আগেই এক ফাঁকে সরবতটুকু করে রাখে সুধা। শরীর খারাপ বলে স্বর্ণময়ীকে বেলা এগারোটার মধ্যেই একরকম জোর করে খাইয়ে দেয় সে। পারে না শুধু সুজিতকে বাগ মানাতে। সুজিতের ঘড়ি প্রায়ই গ্রিনউইচ টাইমে চলে। দুপুরে খাওয়া—দাওয়ার পাট চুকতে তাই বেলা দেড়টা—দুটো বাজে। তারপর দক্ষিণের বারান্দায় বসে স্বর্ণময়ীকে খানিকটা রামায়ণ পড়ে শোনানো। আবার বিকেল পাঁচটা থেকে ও—বেলার পাট শুরু। মিটতে সেই রাত এগারোটা।

ছোট সংসার, কিন্তু কাজ অনেক। খাটুনি একটু বেশিই হয়। তা হোক, তবু বেঁচে গেছে সুধা। সংসারের চাকার সঙ্গে সঙ্গে তার মনটাও অনবরত ঘুরতে থাকে। ভোর থেকে রাত এগারোটা অবধি সে সান্যাল বাড়ির বউ জয়ন্তী সান্যাল। সুধা সোম তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। আর পারে না বলেই সে শান্তি পায়। তাই এতটুকু কাজকে ফুলিয়ে—ফাঁপিয়ে অনেকখানি করে তোলে সুধা। কোথাও যেন ফাঁক না থাকে।

এমনি করে দিন গড়িয়ে চলে।

সেদিন দুপুরে একরাশ আধময়লা কাপড়ের ডাঁই নিয়ে বসে বসে ধোপার হিসেব লিখছিল সুধা। কাপড়—চোপড়ের বারো আনাই সুজিতের। পোশাক বদলানোর কোনো নিয়ম নেই তার। আর কাপড়—চোপড় ময়লা হলে যে ময়লা কাপড়ের বাক্সে রাখতে হয়, তাও জানা নেই তার। সেগুলি আবিষ্কার করতে হয় খাটের তলা থেকে, কিংবা টেবিলের পাশ থেকে, নয়তো আলমারির নিচের তাক থেকে। সুধাই করে।

বুধনি এসে জানালে, ছোটদাদাবাবু বউমাকে ডাকছেন।

ধোপাকে বিদায় করে দিয়ে সুধা উঠে দাঁড়াল। শাড়িখানা একটু গুছিয়ে নিলে, তারপর ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে মনে হল, বুধনিকে তো জিজ্ঞাসা করা হয়নি সুজিত কোথায়? বারান্দা দিয়ে এগিয়ে সুজিতের শোবার ঘরে একবার উঁকি দিলে সুধা। সুজিত নেই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল একতলায়। হলের দরজা পার হয়ে আস্তে আস্তে ঢুকল লাইব্রেরি ঘরে। এটা সুজিতের বাবা অমরনাথের লাইব্রেরি ছিল। মোটা মোটা আইনের কেতাবে চারপাশের আলমারি ঠাসা। কিন্তু কোথায় সুজিত? আশ্চর্য ছেলে! ডেকে পাঠিয়ে কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেল, কে জানে!

খানিক দাঁড়িয়ে থেকে সুধা ফিরল। হঠাৎ শোনা গেল, চলে যাচ্ছেন যে?

চমকে তাকাল সুধা। দেখলে, লাইব্রেরির অপরপ্রান্তে পিঠ উঁচু বড় একটা চেয়ারের পাশ থেকে সুজিতের হাসিমুখ উঁকি দিচ্ছে।

মৃদু গলায় সুধা বললে, ডেকে পাঠিয়েছেন?

সুজিত বললে, হ্যাঁ, বসুন।

সুধা বসলে না। টেবিলের উলটো দিকে একখানা চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

খাওয়া হয়েছে?

সুধা ঘাড় নাড়লে।

এখন তাড়া নেই তো?

ছোট্ট করে সুধা জবাব দিলে, না।

তাহলে দাঁড়িয়ে না থেকে চেয়ারটায় বসুন। না বসলে কথা হয় না।

সুধাকে অগত্যা বসতে হল।

একখানা মোটা আইনের বই সুজিতের সামনে খোলা ছিল। তার ওপর কনুইয়ের ভর রেখে প্রশ্ন করলে, কেমন লাগছে এ বাড়িতে?

ভালোই।

কাজের পাঁচিল তুলে নিজেকে এমন আড়াল করে রেখেছেন যে আপনাকে দেখতেই পাওয়া যায় না।

অল্প হেসে সুধা বললে, সময় পাই না।

সুজিত বলতে লাগল, এ বাড়ির হাওয়ায় হাওয়ায় প্রত্যেক জায়গায় আপনার উপস্থিতি টের পাই। আপনি আসার পর এ বাড়ির হাওয়াই বদলে গেছে। তবু মনে হয়, কাজের আড়ালে আপনি যেন অনেক দূরে সরে যাচ্ছেন। এ বাড়িতে আপনি যেন থেকেও নেই। কেন বলুন তো বউদি?

সুধার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। একথার কি জবাব দেবে সে? জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললে, আমি স্বভাবতই একটু চুপচাপ। তাছাড়া কাজ ভালোবাসি।

সুজিত আচমকা একটা প্রশ্ন করলে, মানুষের চেয়েও?

একটুখানি রক্তের আভাস খেলে গেল সুধার মুখে। আঁচলের প্রান্তটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে কি বলবে ভেবে পেল না।

তরল কণ্ঠে সুজিত হেসে উঠল হঠাৎ, আপনি খুব কাজের লোক জানি। একটা সার্টিফিকেট লিখে দেব'খন। কিন্তু কাজ ছাড়াও মানুষের জীবনে আরও কিছু করবার আছে। এসে অবধি তো বাড়ি থেকে বেরোননি। এলাহাবাদ শহরটা কেমন, দেখতেও ইচ্ছে করে না? চলুন আজ বিকেলে বেড়াতে বেরোই।

সুধার দুই চোখে ভয়ের ছায়া ঘনিয়ে এল। অনুনয়ের সুরে বলে উঠল, আজ থাক, আর একদিন বরং যাব। কাজ আছে।

চমৎকার ছেলে সুজিত। আলাপে, অমায়িকতায়, অন্তরঙ্গ ব্যবহারে অতি ভদ্র। তবু কেন যে তাকে এড়িয়ে চলতে চায়, সুধা নিজেই জানে না।

মাথার কাপড়টা একটু সরে গিয়েছিল। টেনে নিয়ে সুধা উঠে দাঁড়াল। বললে, মার বোধ হয় ঘুম ভাঙল। আমি যাই।

ব্যস্ত হয়ে সুজিত বললে, আরে বসুন, বসুন। কাজের কথাটাই বলা হয়নি এখনও।

টেবিলে একখানা হাত রেখে সুধা দাঁড়িয়ে রইল।

সুজিত বললে, বিয়ের আগে দাদা একটা লাইফ ইনসিওর করিয়েছিলেন, আপনি জানেন নিশ্চয়?

প্রশ্নটা যেন ধাক্কা মারল সুধাকে। এ খবর তার জানবার কথা নয়। আলোক সান্যালের কথা কতটুকুই বা জানে সে? তবু নিজেকে সামলে নিল সুধা। এ বাড়িতে আসার পর থেকে এমনি বেকায়দা প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে খানিকটা শিখেছে সে। তাই 'হ্যাঁ' 'না' কিছু না বলে পালটা প্রশ্ন করল, একথা কেন?

পকেট থেকে একখানা চিঠি বার করতে করতে সুজিত বললে, একখানা চিঠি এসেছে ইনসিওর কোম্পানি থেকে, কলকাতা থেকে রি—ডাইরেক্টেড হয়ে।

কি লিখেছে?

হাফ ইয়ার্লি প্রিমিয়াম বাকি পড়েছে বলে জানিয়েছে। আচ্ছা, ওরা কি দাদার মৃত্যুর খবর পায়নি?

বোধ হয় পায়নি।

তাহলে তো খবরটা জানাতে হয়। আর টাকাটা আদায়ের চেষ্টাও করতে হয়। পলিসিখানা আপনার কাছেই আছে তো?

না, ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে হারিয়ে গেছে।

সুজিতের কপালে রেখা দেখা দিল। চিন্তিত মুখে বললে, ও। তবু দেখি চেষ্টা করে, আপনার পাওনা টাকাগুলো আদায় করা যায় কিনা।

মুহূর্তের জন্যে কাঠ হয়ে গেল সুধা। 'আপনার পাওনা টাকা'! কার পাওনা টাকা? সুধা সোমের, না জয়ন্তী সান্যালের?

একটু চুপ করে থেকে সুধা বললে, আমার মনে হয়, ও—ব্যাপারে কিছু না করাই ভালো।

তারপর আর দাঁড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

এলাহাবাদে সুধা এসেছিল বৈশাখের শেষাশেষি। দেখতে দেখতে এসে গেল শ্রাবণ মাস। ধুলোয় ভরা রুক্ষ এলাহাবাদের চেহারাটাই বদলে যেতে লাগল। ইস্পাতের মতো চকচকে আকাশ যমুনার জলের মতো স্নিগ্ধ হয়ে এল। গাছে গাছে লাগল সবুজ রং। মৌসুমি হাওয়ায় মিষ্টি আমেজ।

সেদিন দুপুর থেকেই মেঘ করে এসেছে। দক্ষিণের বারান্দায় বসে যথারীতি রামায়ণ শোনানোর পর স্বর্ণময়ীর জন্য হরলিকস তৈরি করছিল সুধা। সুজিত এসে হাজির। ব্যস্ত হয়ে সুধা মাথায় কাপড় তুলে দিতে যাচ্ছিল, স্বর্ণময়ী বললেন, ওকে দেখে আর ঘোমটা দিতে হবে না। ও আবার একটা মানুষ!

সুজিত বলে উঠল, বা! মানুষ নই তো কি আমি? চিড়িয়াখানার বাসিন্দা? আপনারও ওই মত নাকি বউদি?

সুধা মুখ নামিয়ে হাসি গোপন করল। স্বর্ণময়ীও না হেসে পারলেন না। বললেন, তা বটে! সারাদিন কোথায় ঘুরে বেড়াস বল তো? বাজে কাজগুলো ছেড়ে বউমাকে নিয়ে খানিক বেড়িয়ে এলেই তো পারিস! এ বাড়িতে এসে অবধি খাঁচার পাখি হয়ে আছে বেচারি।

সুজিত বললে, কেউ যদি শখ করে খাঁচার পাখি হয়, তাহলে আমি কি করব বলো? জিজ্ঞেস করো তো, কতদিন বলেছি বেড়াতে যাবার কথা? তোমার কুনো বউ সে—কথা কানেই তোলেন না।

স্বর্ণময়ী ধমকের সুরে বললেন, তুই থাম! আমার বউয়ের নিন্দে করিসনি। অনেক ভাগ্যে এমন বউ পায় লোকে।

দুই কানে দুই হাত চাপা দিয়ে সুজিত চেঁচিয়ে উঠল, উঃ, আর শুনতে পারছি না! হিংসেয় আমার প্রাণ ফেটে যাচ্ছে।

হেসে ফেলে স্বর্ণময়ী বললেন, তুই যা দিকিন এখান থেকে, গাড়িটা বের করগে।

হার ম্যাজেস্টির জন্যে গাড়ি নিচে অপেক্ষা করছে। সুজিত আস্তে আস্তে উঠে গেল।

স্বর্ণময়ী সুধাকে বললেন, মাঝে মাঝে বেড়াতে যাও না কেন মা? বাইরে বেড়ালে মনটাও তো ভালো থাকবে। যাও, একটু ঘুরে এসো আজ।

মনে মনে প্রমাদ গুনলে সুধা। আস্তে আস্তে বললে, কিন্তু ও—বেলার রান্নাবান্নাগুলো দেখিয়ে না দিলে মহাদেও হয়তো ঠিক পারবে না।

না পারে আমি দেখিয়ে দেব'খন! স্বর্ণময়ী বললেন, আমি তো আছি, তুমি খানিক ঘুরে এসো।

নিরুপায় সুধা উঠে দাঁড়াল।

স্বর্ণময়ী বললেন, ভালো করে চুল আঁচড়াবারও সময় হয় না তোমার? একটা কাজ করো তো, চিরুণিখানা নিয়ে এসো, জটগুলো ছাড়িয়ে দিই।

তারপর আবার বললেন, একটু দাঁড়াও। স্বর্ণময়ী এবার নিজেও উঠলেন। ঘরে ঢুকে দেরাজ থেকে মরচে—পড়া একটা চাবি বের করে আলমারি খুললেন। বের করলেন মকরমুখো দু'গাছা রুলি। তারপর ফিরে এলেন বারান্দায়। সুধার হাতে রুলি জোড়া পরিয়ে দিতে দিতে স্বর্ণময়ীর চোখ দুটি মমতায় গাঢ় হয়ে এল। ধরা ধরা হয়ে এল গলার স্বর। বললেন, আমি যতদিন বেঁচে আছি, হাত থেকে এ দু'গাছা খুলো না বউমা।

অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুধা।

নিচ থেকে মোটরের হর্ন শোনা গেল। সুজিত তাড়া দিচ্ছে।

হাডসনখানা এসে থামল ফোর্টের খানিক তফাতে। সুজিত নেমে পড়ে দরজা খুলে দিলে। উঁচু—নিচু অসমান জমির ওপর দিয়ে সুধা চলতে লাগল সুজিতের পিছু পিছু। কেল্লার পিছনে নদী। ঢালু পাড় নেমে গেছে নদীগর্ভে।

সুজিত বললে, এখানে একটু বসলে মন্দ কি!

একটা ঢিবির ওপর বসল দুজনে।

সুজিত বললে, কেমন লাগছে জায়গাটা?

জায়গাটা সত্যিই ভালো। ওদের পিছনে মেঘলা আকাশের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে এলাহাবাদের প্রাচীন দুর্গ। সামনে নদী, ওপাশে ব্রিজ! চারপাশে দিগন্তজোড়া মুক্তির মাঝে শহুরে মেয়ে সুধা নতুন একটা স্বাদ পেল যেন। হু—হু হাওয়ায় অনেক দিন পরে বুক ভরে নিশ্বাস নিল সে।

এটা কোন নদী জানেন? প্রশ্ন করলে সুজিত।

সুধা তাকাল জিজ্ঞাসু চোখে।

সুজিত বললে, যে নদীর নাম শুনলে কবিদের জিভে জল আসে, মানে কলমে কালি আসে! বুঝতে পারলেন না? যে নদীর ধারে আপনাদের ফেমাস কেষ্টঠাকুর বাঁশি প্র্যাকটিস করতেন, এ হল সেই যমুনা।

সুজিতের বলার ধরনে সুধা হাসি চাপতে পারল না। সুজিত বললে, কিন্তু শুধু—মুখে গল্প জমে না! তারপর পকেট থেকে এক ঠোঙা বাদাম বের করে বললে, নিন বউদি। আমি আবার বেশি সাধতে পারি না।

সুধা গোটাকতক বাদাম তুলে নিল, কিন্তু মুখে দিল না।

বাদাম চিবোতে চিবোতে সুজিত বললে, একটা কাজ করা যাক। এসো, দুজনে মিলে 'আপনি'টাকে এই নদীর জলে ছুড়ে ফেলে দিই। সম্পর্কে বড় হলে কি হয়, বয়সে তুমি আমার চেয়ে ঢের ছোট। আপত্তি নেই তো?

একটু রক্তের আভাস খেলে গেল সুধার মুখে। ঘাড় নেড়ে জানাল, না।

সুজিত বললে, থ্যাঙ্ক ইউ। তোমাকে একটা সুখবর দিই। যে কোম্পানিতে দাদা ইন্সিওর করিয়েছিলেন, এলাহাবাদে তাদের একটা ব্রাঞ্চ অফিস আছে। তারা বলেছে, পলিসি খোয়া গেলেও টাকাও পাওয়া যাবে।

সুধার মুখ থেকে রক্তের আভাসটুকু মিলিয়ে গেল। মৃদু গলায় বললে, ওটা ছেড়ে দিলেই ভালো হত।

সুজিত বললে, ও টাকা তুমি দান করে দাও, বিলিয়ে দাও, যা খুশি করো, কিন্তু ইনসিওরেন্স কোম্পানিকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। টাকাটা দিন পনেরোর মধ্যেই পাওয়া যাবে। পেলে এখানকার ব্যাঙ্কে তোমার নামে জমা করে দেব ভাবছি।

সুধা চুপ করে রইল। জয়ন্তী সান্যালের মুখখানা অস্পষ্টভাবে মনে পড়তে লাগল তার। আর বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠল সেই পুরোনো যন্ত্রণাটা। ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে তার বিবেক বলতে লাগল, সুধা, তুমি চোর, তুমি জালিয়াত! এ যে কত বড় শাস্তি তার জীবনে, সুধা ছাড়া আর কে বুঝবে দুনিয়ায়? মনে মনে অস্থির হয়ে উঠে সুধা বললে, ওকথা থাক।

থেমে গেল সুজিত। একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সুধার দিকে। যমুনার দিকে দৃষ্টি রেখে বসে আছে। ক্লান্ত—করুণ মুখের ভাব। মাঝে মাঝে এই মেয়েটিকে ঠিক বুঝতে পারে না সুজিত। কি যেন চাপা আছে এর মনের মধ্যে। কি সে জিনিস? দুঃখ, বিরহ, না অন্য কোনো রহস্য?

উতল হাওয়ায় সুধার ঘোমটা গেছে খসে। হাঁটুর ওপর কনুইয়ের ভর রেখে, হাতের তালুতে চিবুক ঠেকিয়ে বসে আছে। যেমন করে মডেল বসে থাকে শিল্পীর সামনে। মেঘের ফাঁকে একটু মরা আলো চিকচিক করছে ওর মুখে। পাণ্ডুর দেখাচ্ছে মুখখানা।

সুজিত মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করে, কোনো শিল্পী এই ছবি আঁকলে কি নাম দিত? রিক্তা?

দেখতে দেখতে কেমন একটা অদ্ভুত মমতায় ভরে উঠল সুজিতের মন। তার মনে হল, একটা শূন্যতা ঘিরে রয়েছে এই মেয়েটিকে। আর সেই শূন্যতার মাঝে সে যেন একেবারে একা! আস্তে আস্তে সুজিত ডাকলে, শোনো!

সুধা ফিরে তাকাল। অত্যন্ত কোমল গলায় সুজিত বললে, আমি শুধু তোমার আপনজন নই, আমাকে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু বলে মনে কোরো তুমি। তারপর একটু থেমে আবার বললে, তোমার জীবনে কতটুকু সুখ কতখানি দুঃখ, তা আমি ঠিক জানিনে। তবু বিশ্বাস করো, তার ভাগ নেবার লোক পৃথিবীতে আছে।

এ—কথা শোনার জন্যে সুধা তৈরি ছিল না। তার তেইশ বছরের কুমারী জীবনে পরিচিত—অপরিচিত কোনো পুরুষের মুখেই সে এ—কথা শোনেনি। সুধার অনভ্যস্ত মন কথাগুলোকে তাই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলে না। অস্বস্তিভরা মন নিয়ে চোখ তুলতেই মিলে গেল সুজিতের চোখে। নারীর চোখ পুরুষের চোখের ভাষা চেনে এক নিমেষে। সুজিতের বড় বড় দুই সরল চোখে স্নিগ্ধ আন্তরিকতা ছাড়া সুধা আর কিছুই খুঁজে পেল না। আর, কি আশ্চর্য, সুধার আতপ্ত মন যেন এক মধুর শীতলতায় ধীরে ধীরে জুড়িয়ে আসতে লাগল। ভারি হয়ে নেমে এল চোখের দীর্ঘ পল্লবগুলি যেন ঘুমের আবেশে।

সুধার জীবনে সুখ—দুঃখের ভার নেবার লোক পৃথিবীতে আছে। একথা সত্য, না মিথ্যা, সুধা আজ তা ভাববে না। সে শুধু শুনবে—শুনবে কান ভরে, প্রাণ ভরে।

অনেকগুলি মুহূর্ত কেটে গেল। বয়ে গেল যমুনার অনেক জল।

হঠাৎ বিদেশি গলার আওয়াজে চমক ভাঙল দুজনের।

ক্ষমা করবেন!

দুজনে তাকিয়ে দেখল, প্রৌঢ় এক বিদেশি ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে ক্যামেরা, পাশে একটি প্রৌঢ়া মহিলা।

পরিষ্কার ইংরাজিতে বিদেশি বললেন, আমরা টুরিস্ট, পোল্যান্ড থেকে ইন্ডিয়া দেখতে এসেছি। এলাহাবাদের কিছু কিছু ফোটো আমরা নিয়েছি। আপনাদের একখানা ছবি নিতে পারি কি?

হাসিমুখে সুজিত বললে স্বচ্ছন্দে। আমাদের দেশে আপনারা অতিথি। অতিথিকে খুশি করাই আমাদের উচিত।

প্রসন্ন মুখে পোলিশ ভদ্রলোক বললেন, ধন্যবাদ। দয়া করে যেমন বসেছিলেন, তেমনি বসুন আপনারা।

সুধা কিছু বলবার আগেই সুজিত বললে, আমরা রেডি।

ক্লিক করে একটা শব্দ।

পোলিশ ভদ্রলোক বললেন, আর আপনাদের কষ্ট দেব না। এই নদীর ধারে এমন সুন্দর কম্পোজিশনে আপনারা বসে আছেন যে, দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না।

সুজিত বললে, কিন্তু আমি একটু কষ্ট দেব আপনাকে। এই ছবির একখানা কপি যদি পাঠিয়ে দেন আমার ঠিকানায়, খুব খুশি হব।

নিশ্চয়! আনন্দের সঙ্গে।

পকেট থেকে নোটবই বের করে বিদেশি প্রৌঢ় সুজিতের ঠিকানা লিখে নিলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, গুডবাই!

সুজিত সুধাকে কি একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ কানে এল, প্রৌঢ় ভদ্রলোক তার সঙ্গিনীকে বলছেন, ওরা নিশ্চয় খুব সুখী দম্পতি, নয় জেনি?

প্রৌঢ়া বললেন, হ্যাঁ, ওরা যেন আমাদের হারানো যৌবন।

অজান্তে দুজনে তাকাল একবার দুজনের দিকে। সুধা আর সুজিত।

পরমুহূর্তেই মুখ ঘুরিয়ে নিল সুধা নদীর দিকে। আর সুজিত কেল্লার দিকে। এক মুহূর্তেই দুজনের মাঝখানে যেন পাঁচিল উঠে গেল।

বিকেল গড়িয়ে গেল সন্ধ্যার দিকে। মেঘলা আকাশ চিরে চিরে বিদ্যুতের চোরা হাসি ইশারা জানাতে লাগল আসন্ন বর্ষণের!

সুজিত একসময় দাঁড়িয়ে উঠে বললে, চলো, ফেরা যাক।

নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে বসেছিল সুধা। এবার উঠল।

অন্ধকার হয়ে এসেছিল নদীতীর। উঁচু—নিচু অসমান পথে চলতে চলতে সুধা একটা হোঁচট খেল।

সুজিত ফিরে দাঁড়িয়ে একটা হাত বাড়িয়ে দিলে। বললে, হাতটা ধরে এসো, রাস্তাটা ভালো নয়।

সত্যিই তাই, জীবনের যে পথে সুধা চলেছে, সেখানে পদে পদে হোঁচট খাওয়ার ভয়। বন্ধুর পথে চলতে গেলে বন্ধু চাই বইকি!

আবছা অন্ধকারে নরম একখানা হাত সুজিতের হাতের মধ্যে আশ্রয় নিলে।

পথ চলতে চলতে সুজিত বুঝতে পারলে, তার মুঠোর মধ্যে ঘামে ভেজা ভীরু হাতখানি মৃদু মৃদু কাঁপছে।

মাঝরাতে আবার বৃষ্টি এল। খোলা জানলা দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো জলের ঝাপটা আসতেই ঘুম ভেঙে গেল সুধার। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। জানলাটাও খোলা, বাতিও জ্বলছে।

উঠে পড়ল সুধা। জানলাটা বন্ধ করতে হবে। দু'পা এগোতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উজ্জ্বল আলোয় ড্রেসিং আলমারির আয়নায় ছায়া পড়েছে তার। মাথা থেকে পা অবধি সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছায়া। এক সুধা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল আর এক সুধাকে। সেই নির্জন নিশীথরাত্রে মনে হল, সুধার আত্মা যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তার সামনে।

তখন দুই সুধার মধ্যে সেই নিরালা প্রহরে নিঃশব্দ ভাষায় যা কথাবার্তা হল, তা এই:

আর্শির ছায়া।। কে তুমি?

সুধা।। আমি জয়ন্তী সান্যাল।

ছায়া।। মিথ্যে কথা!

সুধা।। এ মিথ্যে পৃথিবীতে একজন ছাড়া আর কেউ জানে না।

ছায়া।। কেউ না জানুক, আমি জানি। তুমি সুধা সোম। এ বাড়িতে কেন এসেছ?

সুধা।। ভাগ্য আমাকে এনেছে।

ছায়া।। তুমি ভাগ্য বিশ্বাস কর?

সুধা।। করি বইকি।

ছায়া।। ভাগ্য যদি তোমাকে আর কোথাও নিয়ে যায়, যেতে পারবে?

সুধা।। কেন পারব না? এ বাড়ি থেকে যেতে পারলেই তো বাঁচি। প্রতি মুহূর্তেই মিথ্যা অভিনয় অসহ্য হয়ে উঠেছে আমার।

ছায়া।। তাই যদি হয়ে থাকে তো পালিয়ে যাও না কেন?

সুধা।। ভাগ্য যদি কোনোদিন সুযোগ দেয়, পালাব বইকি?

ছায়া।। না, তা পারবে না। এ বাড়ি থেকে পালাবার পথ তুমি নিজেই বন্ধ করেছ।

সুধা।। কেমন করে?

ছায়া।। তাও বলতে হবে? মিথ্যে অভিনয় করতে করতে সান্যাল বাড়িকে তুমি ভালোবেসে ফেলেছ। ভালোবেসেছ স্বর্ণময়ীকে, হয়তো সুজিতকেও।

সুধা।। ছি, ছি, সুজিতের সঙ্গে আমার অন্য সম্পর্ক।

ছায়া।। আবার মিথ্যে বলছ! তুমি তো সত্যিই অলোক সান্যালের স্ত্রী নও। কিসের সম্পর্ক তোমার সুজিতের সঙ্গে? কিসের বাধা সুজিতকে ভালোবাসতে! সাবধান সুধা সোম, মাকড়সার মতো নিজের জালেই জড়িয়ে পড়ছ তুমি।

সুধা।। চুপ করো! ও কথা আমি শুনব না। ও কথা শুনতে চাই না।

ছায়া।। এখনও সময় আছে সুধা। পালিয়ে যাও এ—বাড়ি থেকে—পালিয়ে যাও—

বিদ্যুদ্বেগে বাতিটা নিভিয়ে দিলে সুধা। তারপর লুটিয়ে পড়ল বিছানায়। জানলাটা আর বন্ধ করা হল না। খোলা জানলা দিয়ে তেমনি আসতে লাগল ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ছাট। বালিশে মুখ গুঁজে মনে মনে বলতে লাগল সুধা, কেন, কেন পালাব এ বাড়ি ছেড়ে? অনেক দুঃখ সয়ে, অনেক কষ্টের পথ হেঁটে পেয়েছি এই শান্তির বাসা—পেয়েছি স্বর্ণময়ীর স্নেহ আর সুজিতের বন্ধুতা। কেন দেব ছেড়ে? কে বললে এসব আমার পাওনা নয়? ভাগ্য যাকে যা দেয় সেটা তো তারই পাওনা। বাকি জীবনটা যদি জয়ন্তী সান্যাল হয়েই বেঁচে থাকি, তাতে কার কি ক্ষতি? কেউ তো জানবে না কোনোদিন।

কিন্তু নরেন? সুধার বুকের ধুক ধুক যেন এক নিমেষের জন্যে থেমে গেল। জীবনে যদি কোনোদিন দেখা হয় নরেনের সঙ্গে? কিন্তু দেখা যে হবেই, তারই বা ঠিক কি? এই তো চার মাস কেটে গেল, আসেনি তো সে! কে জানে, কেন! হয়তো নতুন কারবার ফেঁদেছে, কিংবা পুলিশে ধরা পড়াও আশ্চর্য নয়!

সুধা একটা আশ্বাস খুঁজে পেল। আর সেই আশ্বাসকেই সবলে আঁকড়ে মনে মনে সে বারবার বলতে লাগল, না, নরেন আর আসবে না। সুধার জীবনে নরেনের ছায়া পড়বে না কোনোদিন।

খোলা জানলা দিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ছাটের সঙ্গে ঠান্ডা ঘুম এসে লাগল সুধার চোখে।

চার

কিন্তু নরেন সত্যিই এল। আরও মাসখানেক পরে। এলাহাবাদের আকাশে যখন বর্ষা যাই—যাই করছে।

রান্নাঘরে জলখাবারের তদারক করছিল সুধা। বিকেল তখন পাঁচটা। সুজিত একাই বেরিয়েছে। বৃষ্টির জন্যে সুধা যায়নি। রঘুয়া এসে জানালে, আপনার দাদা এসেছেন বউদি।

কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো চেয়ে রইল সে। তারপরই সমস্ত শরীরের রক্তস্রোত হঠাৎ যেন থমকে থেমে গেল।

রঘুয়া খবরটা আবার জানালে।

সুধার রক্ত চলাচল আবার শুরু হল। শুরু হল আগের চেয়ে দ্রুতবেগে। রঘুয়াকে বললে, বসতে বলগে—আসছি।

নিজেকে সামলাতে সুধার বেশ কিছু সময় লাগল। তারপর আস্তে আস্তে এসে দাঁড়াল একতলার হলঘরে।

নরেন তখন গা থেকে রেনকোট খুলছিল। সুধাকে দেখে আগের মতোই ঠান্ডা গলায় বললে, এসো। তোমার দেরি দেখে ভাবলাম, বুঝি বা ভেতরেই যেতে হবে।

আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুধা। তেমনি আড়ষ্ট গলায় বললে, এ বাড়ির ভেতরে যাবার অধিকার তোমার নেই।

সে অধিকার তোমারই কি আছে?

রেনকোটটা সোফার হাতলে রেখে নরেন বসতে যাচ্ছিল, সুধা বললে, এখানে নয়, ও—ঘরে চলো।

লাইব্রেরি ঘরের ভারি পর্দাটা সুধা হাত দিয়ে তুলে ধরলে। রেনকোটটা কাঁধে ফেলে নরেন ঢুকল। পিছনে সুধা।

পকেট থেকে সিগারেটটা বের করতে করতে নরেন বললে, খুব অবাক হয়ে গেছ মনে হচ্ছে!

চাপা গলায় সুধা প্রশ্ন করলে, এলাহাবাদে কবে এসেছ?

আজই সকালে।

উঠেছ কোথায়?

ভবঘুরেরা যেখানে থাকে! হোটেলে।

এখানে এলে কেন?

বড় টেবিলটার এককোণে নরেন বসল কাগজপত্র সরিয়ে। তারপর বললে, আমাকে ভুলে গেছ কিনা দেখতে। সেই যে শ্বশুরবাড়ি এলে, তারপর এই চার মাস একদম চুপচাপ—না একটা চিঠি, না একটা খবর। মন কেমন করতে লাগল, তাই ছুটে এলাম।

দুই চোখে গভীর বিতৃষ্ণা নিয়ে চুপ করে রইল সুধা।

নরেন সিগারেটটা ধরাল। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললে, তারপর আছ কেমন? দেখে তো দিব্য মনে হচ্ছে। এলাহাবাদের জলহাওয়ায় ওজন বেড়েছে নিশ্চয়? অথচ এখানে আসতে বলেছিলাম বলে কতই রাগ করেছিলে আমার ওপর!

চাপা গলাকে একটু তীক্ষ্ন করে সুধা বলে উঠল, বাজে কথা থাক। এখানে কেন এসেছ, বলো!

নরেন বললে, অনেক আগেই আসতাম। তবে নতুন জায়গায় থিতিয়ে বসতে তোমার সময় লাগবে, তাই দেরি করেই এলাম। তোমার বোধ হয় মনে আছে সুধা, এই সান্যাল বাড়িতে তোমায় যখন আসতে বলেছিলাম, তখন তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে, তাতে আমার লাভ? লাভের কথাটা সেদিন হয়নি, সময়ও ছিল না।

তুমি কি আজ লাভের হিসেব করতেই এসেছ এখানে? সুধা বললে।

সিগারেটের মুখে খানিকটা ছাই জমেছিল। ঝেড়ে ফেলে নরেন বললে, তাছাড়া আর কি করতে আসব বলো? সত্যিই তো আর এটা আমার কুটুম্ব বাড়ি নয়! তুমি আমি মিলে জালিয়াতির যে কারবার ফেঁদেছি, আজ তার হালখাতা খুলব বলেই আমার আসা।

চকিতে উঠে গিয়ে সুধা একবার পর্দার বাইরেটা দেখে নিল। তারপর ফিরে এসে চাপা গলায় বললে, কি চাও বলো!

অত্যন্ত উদাসীনের মতো নরেন বললে, লাভের কড়ির আধাআধি বখরা।

একটু তিক্ত হাসি দেখা দিল সুধার ঠোঁটে। বললে, লাভ? প্রতি পদে লোকসানের ভয় ছাড়া এ বাড়িতে লাভ আমার কানাকড়িও নেই। তবু বলো, কি পেলে তুমি বিদেয় হবে—শিগগির বলো!

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে নরেন বললে, কিছু টাকা। কিংবা ভারিভুরি একখানা গয়না হলেও চলবে। ক'টা মাস বড় টানাটানি যাচ্ছে। পুলিশও পেছনে লেগেছে যেন আঠার মতো।

কয়েক সেকেন্ড কি যেন ভাবলে সুধা। তারপর বললে, একটু বসো, আসছি আমি।

সুধা চলে গেল নিজের ঘরে। ফিরে আসতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগল না। হাতে হাজার টাকার একখানা বেয়ারার চেক। চেকখানা নরেনের হাতে দিতে দিতে সুধার মনে হল, সুজিতের কাছে সে সত্যিই কৃতজ্ঞ। অলোক সান্যালের ইনসিওরেন্সের টাকাটা জয়ন্তী সান্যালের নামে ব্যাঙ্কে জমা করে চেকবইখানা তার হাতে না দিলে সুধা আজ বাঁচত না।

চেকখানা উলটে—পালটে দেখে নরেন বললে, বাঃ! এরই মধ্যে নিজের নামে অ্যাকাউন্টও খুলেছ দেখছি! ভালো, ভালো, কারবারে তোমার উন্নতি হবে সুধা। কিন্তু মাত্র এক হাজার? যতিশঙ্কর সোমকে আমি অনেক হাজার দিয়েছিলাম যে!

সুধার দুই চোখ থেকে ঘৃণা উপছে পড়ছে। সেই চোখ নিয়ে নরেনের দিকে তাকিয়ে সে বললে, আমার বাবাকে তুমি কত টাকা দিয়েছিলে, আমার তা জানবার কথা নয়। কিন্তু যে পাপ করতে তুমি আমাকে বাধ্য করেছ, তাতে তোমার সমস্ত পাওনা শোধ হয়ে গেছে। এই হাজার টাকা তোমার উপরি পাওনা। যাও, আর দাঁড়িয়ে থেকো না।

চেকখানা ভাঁজ করে নরেন পকেটে রাখলে। তারপর বললে, এই কারবারের সবটাই উপরি পাওনা। ন্যায্য পাওনা বলে কিছু নেই। কোথাকার কে সুধা সোম এ বাড়িতে এসে যা পেয়েছে, সেটাও কি তার উপরি পাওনা নয়? আমি তারই ভাগ চেয়েছি মাত্র। যেহেতু তুমি আর আমি একই কারবারের পার্টনার।

সুধা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, চুপ করো! তারপর চাপা গলায় আবার বললে, টাকা তো পেয়েছ, আর কেন দাঁড়িয়ে এখানে? যাও তুমি!

রেনকোটটা কাঁধে ফেলে ধীরে—সুস্থে উঠে দাঁড়াল নরেন। বললে, এত তাড়া কিসের? তোমার শ্বাশুড়ি আমাকে নেমন্তন্ন করেছিলেন, একবার দেখা করে যাওয়া উচিত নয় কি?

দুই হাত জোড় করে সুধা অস্থির হয়ে বলে উঠল, তোমায় মিনতি করছি নরেনদা, আর দেরি করো না। এখুনি কেউ এসে পড়বে। যাও—তুমি যাও!

দরজার দিকে এগোতে এগোতে নরেন বললে, বেশ যাচ্ছি।

তেমনি অস্থির হয়ে সুধা বললে, হ্যাঁ, যাও—আর কখনও এসো না—

পর্দার কাছে গিয়ে ফিরে দাঁড়াল নরেন। অনেকদিন পরে ও মুখে দেখা দিল সেই যান্ত্রিক হাসি। বললে, তা কি বলা যায় সুধা! তোমার জন্যে মন—কেমন করলে আসতেই হবে আবার। তারপর হাত দিয়ে পর্দাটা সরাতেই থমকে থেমে গেল নরেন।

পর্দার বাইরে সুজিত দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ সুধার ইচ্ছে হল, গলা চিরে চিৎকার করে সুজিতকে বলে, এখানে দাঁড়িয়ে কেন? কি শুনেছ তুমি?

কিন্তু নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল সুধার।

চমৎকার মিষ্টি হাসিতে ভরে গেল সুজিতের মুখ। বললে, একি, নরেনবাবু যে! এখানে দেখতে পাব আশাই করিনি।

নিরুত্তাপ গলায় নরেন বললে, আমিও আশা করিনি, আপনার সঙ্গে দেখা হবে।

হঠাৎ এলাহাবাদে যে?

সুধার মরা মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে নরেন বললে, জয়ন্তীকে দেখতে।

সুজিত বললে, ও। তা খাওয়া—দাওয়া না করেই যাচ্ছেন কেন? মা'র সঙ্গে দেখা হয়েছে?

নরেন বললে, আজ থাক সুজিতবাবু। আবার যদি আসি, সেদিন হবে। এলাহাবাদে একটা জরুরি কাজ আছে। সেটা সেরেই আমায় পরের ট্রেনে ফিরতে হবে। নমস্কার। তারপর সুধার দিকে তাকিয়ে বললে, আমায় যেন ভুলে থেকো না জয়ন্তী!

হলঘর দিয়ে অল্প খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেল নরেন। সুজিত তাকিয়ে রইল সেই দিকে। একটু পরে যখন মুখ ফেরালে, সুধাও সেখানে তখন নেই।

সুজিতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সুধা! এ বাড়িতে সুধার নাম কেন? কে সে?

* * *

রাতে সুজিত খাবার টেবিলে বসবার পর সুধা যখন মাংসের স্টু গরম করে নিয়ে এল, একখানা চাদর গায়ে জড়িয়ে স্বর্ণময়ীও এসে দাঁড়ালেন সেখানে। বললেন, হ্যাঁ বউমা, শুনলাম তোমার দাদা এসেছিলেন বিকেলে?

সুধা ছোট করে জবাব দিলে, হ্যাঁ।

আমরা কিন্তু অলোকের চিঠি মারফত জেনেছিলুম, তোমার কোনো ভাই নেই।

নরেনদা আমার আপন ভাই নয়।

চামচে করে সুধা সুজিতের বাটিতে স্টু তুলে দিতে লাগল।

স্বর্ণময়ী বললেন, আচ্ছা, তোমার ছোট বোন এখন কোথায়?

স্টু ঢালা বন্ধ হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে সুধা বললে, ঠিক জানি না। তার স্বামীর রেলের চাকরি। কখন যে কোথায় থাকে—

অত্যন্ত অবাক হলেন স্বর্ণময়ী। বিয়ে হয়ে গেছে তার? তোমার বিয়ের সময় তার মোটে ন' বছর বয়েস ছিল শুনেছিলুম!

হঠাৎ যেন আগুনের আভা লাগল সুধার মুখে। ঝাঁ ঝাঁ করছে কান দুটো। কিন্তু সামলে নিতে শিখেছে সুধা। অল্প হেসে বললে, মাথায় খাটো বলে তাকে খুব অল্পবয়সী বলে মনে হয়। তাছাড়া হঠাৎ একটি ভালো পাত্র পাওয়ায় বাবা—

বাবা! এবার সুজিত মুখ তুলে তাকাল।

স্বর্ণময়ী বলে উঠলেন, সেকি! বিয়ের পর অলোক চিঠিতে জানিয়েছিল, ছোটবেলা থেকেই তোমরা কাকা—জ্যাঠার কাছে মানুষ। মানে তোমার মা আমারই মতো অল্প বয়সেই—

স্বর্ণময়ী চুপ করে গেলেন। আর সুধার মনে হল খাবার ঘরটা দুলছে। জয়ন্তী সান্যালের আত্মা হাসছে। তার দুর্দাশা দেখে।

কিন্তু সুধার স্নায়ু আগের চেয়ে অনেকটা শক্ত হয়েছে। এক নিশ্বাসে বলে উঠল, ছোটবেলায় জ্যাঠামশাইকে আমরা বাবা বলেই ডাকতুম কিনা। তারপর সুজিতের পাতের দিকে তাকিয়ে বললে, আর দু'খানা লুচি এনে দি—

দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সুধা। কিন্তু মিনিট কয়েক পরে লুচি যে আনল, সে সুধা নয়—মহাদেও।

বউদি কোথায়? সুজিত প্রশ্ন করলে।

মহাদেও বললে, ওপরে গেলেন। মাথায় দরদ হচ্ছে।

ঠাকুর—চাকর থাকলেও স্বর্ণময়ী আর সুজিতকে সুধা খাওয়ায় নিজের হাতে। চার মাসের মধ্যে একটা দিনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আজ হল।

স্বর্ণময়ী একবার ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর উঠে পড়লেন আস্তে আস্তে। সুজিতও উঠল হাত ধোয়ার জন্যে।

সিঁড়ি পার হয়ে স্বর্ণময়ী এসে দাঁড়ালেন সুধার ঘরের দোরগোড়ায়। অন্ধকার ঘর।

স্বর্ণময়ী মৃদু গলায় ডাকলেন, বউমা!

অন্ধকার থেকে সাড়া এল না। কিন্তু জ্বলে উঠল বাতিটা।

চৌকাঠ পার হয়ে স্বর্ণময়ী বললেন, আগুনতাতে মাথাটা ধরেছে বুঝি? তা তো ধরবেই মা! কতবার বলেছি, বিকেলের রান্নাটা মহাদেওয়ের হাতেই ছেড়ে দাও, শুনবে না তো কথা! তোমায় কি শুধু হেঁসেল ঠেলবার জন্যেই ঘরে এনেছি মা!

স্বর্ণময়ীর গলায় স্নেহসিক্ত সুর। হঠাৎ একটা কান্না সুধার বুক থেকে গলা অবধি উঠে আটকে গেল। স্বর্ণময়ী আবার বললেন, আমার ঘরে মেন্থলের শিশি আছে, পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি উঠো না মা, চুপ করে শুয়ে থাকো। বুধনি তোমার খাবার দিয়ে যাবে'খন।

বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে স্বর্ণময়ী আস্তে আস্তে চলে গেলেন।

কিন্তু সুধার শোয়া হল না। সুজিতকে মশলা দিয়ে আসতে হবে। তার ভয় সুজিতকেই বেশি। আর কারো হাতে দিয়ে পাঠালে যদি সে কিছু মনে করে! যদি মনে করে খাবার টেবিলে উলটো—পালটা কথা বলে ফেলে ধরা পড়ার ভয়েই সুধা আসছে না!

না, সুধা নিজেই যাবে। হয়তো স্বর্ণময়ীর মতো সুজিতও কোনো সন্দেহ করেনি তাকে। এ শুধু তার নিজের মনের সন্দেহ। তবু সাবধান হওয়া ভালো।

নকশা—কাটা মোরাদাবাদী রেকাবিতে চাট্টি মশলা সাজিয়ে ঘর থেকে বেরোল সুধা। কিন্তু না, সুজিত তার ঘরে নেই, নিশ্চয়ই গেছে লাইব্রেরি ঘরে। রাত জেগে পড়াশুনো করে সে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল সুধা। অন্ধকার হলটা পেরিয়ে, পর্দা ঠেলে ঢুকল লাইব্রেরি ঘরে। মোটা মোটা আইনের বইয়ের মধ্যে ডুবে গেছে সুজিত। ভালোই হয়েছে। মশলার রেকাবিটা টেবিলের ওপর রেখে নিঃশব্দে সুধা চলে যাচ্ছিল, সুজিত বললে, পালাচ্ছ কেন? বসো!

সুধার চলে যাওয়া হল না।

বইখানা রেখে সুজিত বললে, তোমার সঙ্গে একটা পরামর্শ আছে বউদি। আসছে সপ্তাহে আমার এক বন্ধুর বউভাত, কি দেওয়া যায় বলো তো?

সুধা বললে, দেওয়ার কত জিনিসই তো আছে—যেটা পছন্দ।

সুজিত বললে, ভাবছি তোমার গলার হারের মতো একটা হার দিয়ে আসব। প্যাটার্নটা ভারি সুন্দর!

বেশ তো।—বলে সুধা বাঁ—হাত দিয়ে ডান হাতের রুলিটা ঘোরাতে লাগল।

হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল সুজিত, আচ্ছা, তোমার নাম তো জয়ন্তী। তোমার হারের লকেটে 'এস', লেখা কেন?

সুধার মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আজ পাঁচ মাস ধরে কত বড় ভুলই না সে করে এসেছে! সুধা সোমকে শনাক্ত করার মারাত্মক চিহ্ন যে তার বুকের ওপরই দুলছে, এতদিন সে খেয়াল হয়নি তার!

নিতান্ত ছেলেমানুষের মতো সুজিত আবার প্রশ্ন করলে, তোমার বুঝি দুটো নাম?

টেবিলের কোণটা শক্ত করে চেপে ধরলে সুধা, কেমন যেন নিস্তেজ গলায় বললে, দুটো নাম থাকতে যাবে কেন?

সুজিত বললে, অনেকের তো থাকে। একটা পোশাকি নাম, একটা ডাকনাম। 'এস' অক্ষর দিয়ে তোমারও বুঝি কোনো ডাকনাম আছে? বলো না, কি নাম?

বাতির দিকে পিছন ফিরে সুধা হঠাৎ এলোমেলো বইগুলো গুচ্ছোতে শুরু করলে।

একটু হেসে সুজিত আবার বললে, লজ্জা করছে বুঝি বলতে? আচ্ছা, আমি বলব? হয় শান্তা, নয় সেবা, নয় তো সুধা।

সুধার মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করে উঠল। প্রাণপণে নিজেকে সামলে নিয়ে বললে, না। শুক্তি।

সুজিত বলে উঠল, বাঃ! ফাইন নাম তো! লুকিয়ে রেখেছিলে কেন এতদিন?

তেমনি পিছন ফিরে সুধা বললে, লুকিয়ে রাখতে পারলাম কই! তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলে, কফি আনব?

সুজিত বললে, না, থাক। আজকের ডাকে চমৎকার একটা জিনিস এসেছে। এই দেখো—

বইয়ের ভেতর থেকে চৌকো একখানা খাম বার করলে সুজিত। সুধার হাতে দিয়ে বললে, মিস্টার কোলম্যান—সেই পোলিশ ভদ্রলোকটি পাঠিয়েছেন।

খামের ভেতর থেকে বেরোল একখান পোস্টকার্ড সাইজের ফটো। সুধা আর সুজিত পাশাপাশি বসে। পিছনে যমুনা। মাথার ওপর বর্ষার মেঘের জটা।

হঠাৎ সুধার চোখ পড়ল ছবির একটা কোণে। ইংরিজিতে দুই লাইন লেখা। প্রথম লাইনটা কিন্তু কলমের আঁকাবাঁকা আঁচড় দিয়ে কাটা, সুধা তবু পড়তে পারল। আর পড়তে পারার সঙ্গে সঙ্গেই তার ফ্যাকাশে মুখে সমস্ত রক্ত এসে জমা হল। ছবির কোণায় লেখা রয়েছে, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সান্যালকে উপহার। আর্থার কোলম্যান।

সুজিত বললে, ফোটোগ্রাফিতে আর্থার সাহেবের হাত সত্যিই ভালো। কি বলো?

আঁচল দিয়ে সুধা অকারণেই মুখটা একবার মুছে নিলে। তারপর মনে মনে আর্থার সাহেবের মুণ্ডপাত করে বললে, ফোটোগ্রাফির আমি কি বুঝি?

সুজিত বললে, ভাবছি এখানা এনলার্জ করে বাঁধিয়ে রেখে দেব।

সুধা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, ওসব করতে হবে না। তারপর দরজার দিকে এগোল।

কিন্তু অন্ধকার হলঘর পার হয়ে সিঁড়িতে পা দিতে আশ্চর্য একটা কাণ্ড ঘটে গেল। হলের অন্ধকার আবছা গলায় হঠাৎ ডেকে উঠল, সুধা!

সঙ্গে সঙ্গে সুধার অন্যমনস্ক চেতনা সাড়া দিয়ে উঠল, কি?

পরমুহূর্তেই চমকে উঠে সুধা দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। আর অন্ধকার হলঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুজিত ভাবতে লাগল, সুধা বলে ডাকলে যে সাড়া দিয়ে ওঠে, সে কি সত্যিই জয়ন্তী, না শুক্তি, না সুধা? সান্যাল বাড়িতে এ কোন রহস্যচারিনি বাসা বেঁধেছে?

ঝড়ের বেগে সুধা ঢুকল নিজের ঘরে। তারপর বিছানার ওপর বসে হাঁফাতে লাগল। আলো জ্বাললে না। সুধা সোম তার সত্যকার পরিচয় নিয়ে যেন অন্ধকারেই লুকিয়ে থাকে। তবু সেই অন্ধকারেই কে যেন তার কানের পাশে ফিসফিস করে বলতে লাগল, পাপ কখনও চাপা থাকে সুধা! তোমার ছদ্ম পরিচয়ের খোলস ছিঁড়ে সত্য পরিচয় একটু একটু করে বেরিয়ে পড়ছে। ধরা পড়তে আর বেশি দেরি নেই। এখনও সময় আছে, দুই জীবনের খেলা তোমার এই বেলা শেষ করে দাও। পালাও—পালাও তুমি সুধা।

কে বলছে একথা? জয়ন্তী সান্যালের আত্মা, না সুধার অপরাধী মন?

যে—ই বলুক, সুধা তবু পালাতে পারবে না এ বাড়ি থেকে। মিথ্যা পরিচয়ের আড়াল দিয়ে এ বাড়িতে এসে জীবনে যে মধুরসের সন্ধান পেয়েছে সে, সুধার মিথ্যা জগতে সেই তো একমাত্র সত্য বস্তু। তার মোহ কেমন করে কাটাবে সে? পারবে না, কিছুতেই পারবে না সুধা এ বাড়ি ছাড়তে। এ বাড়ি ছাড়া মানে সুজিতকে ছাড়া।

মরতেই যদি হয়, এই সান্যাল বাড়িতেই মরবে সুধা।

আশ্চর্য নারীর ভালোবাসা! বিপদের সঙ্কেত শুনেও অন্ধের মতো অন্ধকারে সে এগিয়ে যেতে চায়।

চাপা কান্নার আবেগে সুধা ভেঙে পড়ল বালিশের ওপর।

পাঁচ

দেখাটা এমন হঠাৎ হয়ে যাবে, দুজনের কেউই আশা করেনি।

দেখা হল লিন্ডসে স্ট্রিটের ওপর। নিউ মার্কেটের বড় ফটকের সামনে। সন্ধ্যা তখন হয়—হয়। নরেন এসেছিল সিগারেট কিনতে। আর, পলি কিছু সিল্ক! প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে একখানা ট্যাক্সি খালি হতেই দু'পাশ থেকে এগিয়ে এল দুজনে। পলি আর নরেন।

পলিই প্রথমে কথা কইলে: তুমি!

আশ্চর্য হয়ে গেছ?—নরেন বললে।

পলি কেমন আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সহজ হবার চেষ্টা করে বললে, না, আশ্চর্য হব কেন! ভালো তো?

তুমি কেমন?—নরেন পালটা প্রশ্ন করল।

ভালো। ট্যাক্সিটা তুমিই নিয়ে যাও। চৌরঙ্গীর মোড়ে গেলে আমি আর একখানা পেয়ে যাব।

ট্যাক্সির ওপাশ থেকে নরেন ঘুরে এপাশে এল। তারপর বললে, কি হবে অন্য ট্যাক্সি নিয়ে? চলো, তোমায় পৌঁছে দিই।

পলি বলতে চাইল, আমি একাই যাব; কিন্তু বলবার আগেই পিছনের দরজাটা খুলে দিয়ে নরেন বললে, উঠে পড়ো।

গাড়িতে উঠতেই হল পলিকে। নরেন উঠে দরজা বন্ধ করে দিলে। প্রশ্ন করলে, কোথায় যাবে?

বাড়ি।

ড্রাইভারকে নরেন বললে, পার্ক সার্কাস।

গাড়ি স্টার্ট নিতেই নরেন আবার বললে, তোমাদের ওখানেই যাব ভাবছিলাম।

পলি ওদিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিল। ফিরে তাকিয়ে বললে, হঠাৎ?

এমনি। দেখা করার ইচ্ছে হল বলে।

পলি অস্ফুটে বললে, আশ্চর্য!

সিগারেটের টিনটা খুলতে খুলতে নরেন বললে, কি আশ্চর্য? তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা, না তোমাকে দেখার ইচ্ছেটা?

মৃদু স্বরে পলি বললে, দুটোই।

লাইটার জ্বেলে নরেন একটা সিগারেট ধরালে। বললে, তা তুমি বলতে পার পলি। এই ক'বছর অনেক জায়গায় ঘুরতে হয়েছে আমাকে। নইলে মাঝে মাঝে দেখা হত।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে পলি বললে, হলে লাভ কি হত?

জীবনে লাভটাই তো সব নয়! নরেন বললে।

হঠাৎ সমস্ত শরীরে একটা ঝাঁকানি দিয়ে পলি তাকালে নরেনের দিকে। বললে, জীবনে লাভ ছাড়া আর কিছু বোঝ তুমি?

অন্তত লোকসানটা বুঝি। নরেন জবাব দিলে।

সে লোকসান তো অপরের।

পলির দিকে একটু ঝুঁকে নরেন বললে, নিজেরও কম নয়।

পলি আবার মুখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। নরেন দেখতে পেল না, পলির দুই চোখ আগুনের মতো দপ করে জ্বলে উঠেই ধীরে ধীরে কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে এল।

সৈয়দ আমির আলি অ্যাভিনিউ দিয়ে যেতে যেতে ট্যাক্সিটা বাঁ দিকে ঝাউতলা রোডে ঢুকল। কিছু দেশি খ্রিস্টান আর কিছু মুসলমানের বাস এখানে। এই পাড়াতেই ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন মিসেস নীরজা নস্কর। নীরজা নস্কর, পাসকরা ধাত্রী। পলি তাঁর একমাত্র কন্যা।

ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে নরেন ঢুকল পলিদের ফ্ল্যাটে। এখানে তার আসা নতুন নয়। তবু এখানকার আসবাবের পরিবর্তনটুকু তার চোখ এড়াল না। নতুন পুরু গালিচার ওপর দামি সোফাসেটটি সাজানো। ড্রয়িংরুমের দেওয়ালগুলো পর্যন্ত দামি বাহারি কাগজ দিয়ে মোড়া। তিন বছর আগে ছিল না এসব। এ তিন বছরে নীরজা নস্করের পশার বেড়েছে নিশ্চয়।

নরেনকে পলি বলল, বসো, আসছি।

শুধু শাড়িটা বদলে ফিরে এল পলি। সাধারণ সৌজন্যের সঙ্গে প্রশ্ন করল, চা খাবে?

এতক্ষণে নরেন ভালো করে দেখার সুযোগ পেল পলিকে। রংটা আগের চেয়ে আরও মাজা—মাজা হয়েছে। মাথায় চুলগুলি তেমনি বব করা। সাধারণ মেয়েদের চেয়ে বেশি লম্বা বলে পলিকে একটু ছিপছিপে মনে হতো। এখন চর্বির একটা পাতলা আস্তরণ লেগেছে গায়ে। সুখ আর সচ্ছলতার চিহ্ন পলির সর্বাঙ্গে।

নরেন বললে, ঠিক চা খেতে আসিনি। তোমার সঙ্গে কথা আছে পলি।

কথা! আমার সঙ্গে! পলির সরু করে কামানো ভ্রূ দুটো ধনুক হয়ে উঠল। একটা সোফার হাতলে বসে বললে, কথা তো আমরা একদিন শেষ করে দিয়েছিলাম। আদালতের সামনে।

আর একটা সিগারেট ধরালে নরেন। বললে, কথা কখন ফুরোয়, কখন আবার শুরু হয়, কেউ জানে না। আদালতের সামনে তিন বছর আগে যা বলেছিলাম, সেটাই আমার শেষ কথা নয় পলি।

সোফার গায়ে হেলান দিয়ে বললে, বেশ বলো শুনি।

নরেন উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের এদিক থেকে ওদিক একবার পায়চারি করল। ঘরের ছবিগুলো একবার দেখল, ফুলদানি থেকে একটা ফুল ছিঁড়ল অকারণে। তারপর আবার ফিরে এল সোফার কাছে। ঠান্ডা গলায় যতটা সম্ভব আবেগ দিয়ে বললে, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি পলি। আর সে ভুলের জন্যে এই তিন বছরে কম শাস্তি পাইনি।

কি বলতে চাও? পলির গলাটা কেঁপে উঠল।

নরেন পলির কাছে আরও এক—পা এগিয়ে এল। বললে, তোমায় ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় পলি। বার বার তোমায় ভুলতে চেষ্টা করেছি, পারিনি। ভুলতে পারিনি শিশু টুটুলের মুখখানা। আমার ভালোবাসা আজও মরেনি পলি। আমায় তুমি আরেকটি বার সুযোগ দাও। সুযোগ দাও তোমাকে আর টুটুলকে নিয়ে জীবনটাকে নতুন করে গড়ে তোলার।

হাত বাড়িয়ে নরেন পলির একখানা হাত ধরলে। ঘা—খাওয়া সেতারের তারের মতো সে—হাতখানা কাঁপছে।

এক ঝটকায় হাতখানা ছাড়িয়ে নিল পলি। তারপর কয়েক পা সরে গিয়ে বললে, আর তা হয় না।

কেন হয় না পলি?

মুখ ফিরিয়ে পলি বললে, তোমার আমার ভালোবাসার মীমাংসা আদালতেই হয়ে গেছে। তার জের টানা আর চলে না।

নরেন এসে দাঁড়াল পলির ঠিক পিছনে। তার কাঁধে একখানা হাত রেখে বললে, ভুল করলে কি ক্ষমা নেই?

ক্ষমা?

চকিতে ফিরে দাঁড়াল পলি। দুই চোখে জল আর বিদ্যুতের আগুন নিয়ে বলতে লাগল, শয়তানেরও লজ্জা থাকে, তোমার তাও নেই নরেন। বিয়ের পর দুটো বছর যেতে না যেতেই আদালতের সামনে যাকে ত্যাগ করতে পেরেছিল, ভালোবাসার ছল করে যার যথাসর্বস্ব চুরি করে পালাতে তোমার বাধেনি, আজ এসেছ তারই কাছ থেকে ক্ষমা চাইতে! ভেবেছ আগের মতোই তোমার সব দোষ মেনে নেব আমি? ভুল করেছ নরেন, পলি আর ততটা বোকা নয়।

শক্ত স্নায়ুর লোক নরেন। নইলে এত বড় অপমানের পরেও তার মুখের একটি পেশী কাঁপল না কেন? স্বাভাবিক ঠান্ডা গলায় সে বললে, আমি দুঃখিত পলি। তুমি অমন উত্তেজিত হবে জানলে একথা তুলতাম না। যাকগে, পুরোনো বন্ধু হিসেবে কিছু সাহায্য চাইতে পারি কি তোমার কাছে?

কি সাহায্য চাও?

ভেবেছিলাম বলব না, কিন্তু না বলে আমার উপায় নেই। কিছু টাকার বড় দরকার।

ভুরু দুটো তুলে পলি বললে, টাকার দরকার? তোমার?

নরেন বললে, হ্যাঁ, আমারই দরকার। একদিন তুমি আমায় সত্যিই ভালোবেসেছিলে, তাই আজ—

বাধা দিয়ে পলি বললে, ওকথা থাক। মেয়েদের সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গায় ঘা দিয়ে টাকা আদায় করাই যে তোমার পেশা, সেটা জানতে আমার বাকি নেই। কিন্তু আমি দুঃখিত নরেন, টাকা আজকাল আমার মায়ের হাতেই থাকে।

নরেনের চোখ দুটো পাথরের চোখের মতো কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল পলির দিকে। তারপর সহজ ঠান্ডা গলায় বললে, ও, তাহলে তোমায় আর বিরক্ত করব না। টুটুল কোথায়? একবার দেখে যেতাম। আশা করি এতে তোমার আপত্তি হবে না।

ঘাড় বেঁকিয়ে পলি তাকাল নরেনের দিকে। তিন মাস বয়সে যাকে ফেলে তুমি চলে গিয়েছিলে, আজ আবার তাকে দেখতে চাও কেন?

নরেন বললে, ত্যাগ করলেও সে আমারই ছেলে। ছেলেকে দেখার অধিকার কি বাপের নেই?

সে অধিকারের মান তুমি কতটুকু রেখেছ? তবু ডাকছি টুটুলকে। দেখে যাও, যে ফুলের কুঁড়িকে তুমি তোমার নিষ্ঠুর খেয়ালে ফেলে চলে গিয়েছিলে, আমি কেমন করে তাকে আগলে রেখেছি।

বলতে বলতে গলা ধরে এল পলির। ছাপিয়ে উঠল জলভরা চোখের কোল।

হাতের রুমালে ভিজে চোখ দুটো বেশ মুছে পলি ডাক দিলে, আয়া, বেবিকো লাও।

মায়ের আওয়াজ পেয়ে টুটুল নিজেই এল। ছোট্ট ট্রাইসাইকেল চালিয়ে। তারপর একলাফে নেমে একদৌড়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল পলির হাঁটু দুটো। হাসি—হাসি কচি মুখখানা তুলে বললে, মামি, চকোলেট এনেছ?

মাতৃত্বের মহিমায় পলির মুখ আলোকিত হয়ে উঠল। টুটুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললে, এনেছি টুটুল! কিন্তু এখন নয়, কাল সকালে।

নরেন স্থির দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। এই টুটুল! একমাথা কোঁকড়ানো চুল। হৃষ্টপুষ্ট নধর দেহ। ভাসা ভাসা ডাগর চোখ। দেখলে যে কোন বাপ—মায়ের বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু আশ্চর্য, টুটুলকে দেখতে দেখতে নরেনের মনে পড়ে গেল, সপ্তাহ দুয়েক আগে খবরের কাগজে দেখা একটা বিজ্ঞাপন।

হঠাৎ নরেনের দিকে চোখ পড়তেই টুটুল কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল।

দু'হাত বাড়িয়ে নরেন ডাকলে, এসো টুটুল!

টুটুল কিন্তু এল না। পলির হাঁটু দুটো তেমনি আঁকড়ে ধরে শুধু বললে, না।

নরেন আবার ডাকলে, খেলনা দোব, এসো।

কিন্তু এত বড় প্রলোভনও টুটুলকে টলাতে পারল না। মাকে ছেড়ে সে একরকম ছুটেই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। পড়ে রইল ট্রাইসাইকেলটা।

পলির মুখে একটু শ্লেষের হাসি দেখা গেল। বললে, এমনিই হয় নরেন। বাপ যদি ছেলেকে না চায়, ছেলেও বাপকে চায় না। এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ।

স্থির দৃষ্টিতে ভেতরের দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল নরেন। হঠাৎ যেন চমক ভেঙে যাওয়াতে পলির দিকে তাকিয়ে বললে, আচ্ছা, গুড নাইট। তারপর বাইরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু যাওয়ায় পড়ল বাধা। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকল নরেনের অচেনা একটি ভদ্রলোক। পরনে সিল্কের হাফ শার্ট আর ট্রাউজার। মজবুত জোয়ান চেহারা। বয়সে নরেনের চেয়ে দু—এক বছর কমই হবে।

লোকটিও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল নরেনকে দেখে। চঞ্চল হয়ে উঠল পলি। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, এসো বিজয়। তারপর নরেনের দিকে তাকিয়ে বললে, বিজয় বিশ্বাস—আমার বন্ধু।

হাসিমুখে বিজয় বিশ্বাস পলিকে প্রশ্ন করলে, আর ইনি?

নরেন দাশ, মানে—

পলির গলা হঠাৎ আটকে গেল।

অদ্ভুত সেই যান্ত্রিক হাসি হেসে নরেন পাদপূরণ করলে, পলির শত্রু।

তারপর আর দাঁড়াল না।

পরদিন একটা লোকাল ট্রেন থেকে নরেনকে নামতে দেখা গেল উত্তরপাড়া স্টেশনে। পকেট থেকে খবরের কাগজ থেকে কাটা একটা বিজ্ঞাপন বের করে নিজের মনেই সে পড়লে। তারপর শহরের দিকে এগিয়ে গেল বিজ্ঞাপনদাতার সন্ধানে।

ঠিকানা বের করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না নরেনকে। কেননা বিজ্ঞাপনদাতা উমেশ মজুমদার উত্তরপাড়া মিউনিসিপ্যালিটির ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান। তাঁর দু—মহলা বাড়ি দেখে তাঁর ব্যাঙ্ক—ব্যালেন্সটা আন্দাজ করা যায় সহজেই।

বিজ্ঞাপনের টুকরোটা দেখিয়ে নরেন প্রশ্ন করলে, এ বিজ্ঞাপন কি আপনি দিয়েছেন?

উমেশবাবু বললেন, হ্যাঁ।

নরেন বললে, আমি এই জন্যই এসেছি।

আপনার নাম? উমেশবাবু প্রশ্ন করলেন।

নরেন্দ্রনাথ দাশ। আপনি যা চাইছেন, তার জন্যে কত টাকা দিতে পারেন, জানতে পারি কি?

উমেশবাবু বললেন, পছন্দ হলে দশ হাজার পর্যন্ত পারি। তবে মুশকিল হয়েছে কি নরেনবাবু, যিনি পছন্দ করবেন, তিনি উপস্থিত এখানে নেই। মানে আমার স্ত্রী মিহিজামে গেছেন চেঞ্জে। মাসখানেক বাদেই তিনি ফিরবেন। তিনি ফিরে আসা অবধি আপনি যদি অপেক্ষা করতে পারেন—

বেশ, তাই হবে। মাসখানেক পরেই আসব। নমস্কার।

নরেন উঠে পড়ল।

আরও হপ্তাখানেক পরে তাকে দেখা গেল এলাহাবাদ স্টেশনে নামতে।

মুখে—চোখে প্রবল বিতৃষ্ণা নিয়ে সুধা বললে, আবার এসেছ কেন?

সিগারেটের টিনটার গায়ে আঙুলের মৃদু মৃদু টোকা দিতে দিতে নরেন বললে, আমি কেন আসি, তোমার তো অজানা নয় সুধা। তবে আশ্চর্য হবার ভান করছ কেন?

প্রত্যেকটি কথা যেন কেটে কেটে উচ্চচারণ করলে সুধা: টাকা আমি আর দোব না।

তা বললে কি চলে সুধা? হাজার টাকায় কতদিন আর চলে? আমি আবার অল্প খরচে কষ্ট করে থাকতে পারি না। দু'হাত ভরে খরচ করতে না পারলে বাঁচার কোনো মানেই হয় না আমার কাছে। এবার কিছু বেশিই দিও সুধা!

তেমনি কেটে কেটে উচ্চচারণ করলে সুধা : একটি পয়সাও দেব না আমি। দিতে পারব না।

একটা সিগারেট ধরালে নরেন। তারপর লাইটারটাকে লুফতে লুফতে বললে, দেখো, চোরদের মধ্যেও একটা সততা থাকে, আর তুমি কিনা আমার কারবারের পার্টনার হয়ে বলছ লাভের অংশ দোব না? এই কি তোমার উচিত হল সুধাময়ী?

সুধা জবাব দিলে, তোমার পাপের কারবারের পার্টনার হতে চাই না আমি। তুমি যাও।

জিব আর তালুর সংযোগে চুক চুক করে আক্ষেপসূচক শব্দ করলে নরেন। বললে, পাপের কারবার! পাপ তুমি কাকে বলছ সুধা? বুদ্ধি খাটিয়ে রোজগার করা পাপ! রীতিমতো প্ল্যান করে বুদ্ধি খাটিয়ে এ কারবারে নেমেছি আমরা। পাপ কোথায় এর মধ্যে? আর নেহাতই সংস্কারের বশে একে যদি পাপ বলো, তবে এ বাড়িতে এসে তুমিই বা কোন পুণ্যটা করেছ শুনি?

সুধা বললে, পাপ যদি করে থাকি, তবে একটা পাপেরই অপরাধ আমার থাক। যখন—তখন তোমাকে টাকা দিয়ে পাপ আর বাড়াব না।

নরেন বললে, বাংলা ছেড়ে এলাহাবাদে এসে তোমার বুদ্ধি গুলিয়ে গেছে দেখছি। নইলে এমন কথা বলতে পারলে কি করে! যখন—তখন তুমি টাকা দেবে বলেই তো তোমাকে এখানে পাঠানো। নইলে কি তুমি একা একা সুখী থাকবে বলে তোমায় জয়ন্তী সাজিয়ে পাঠিয়েছি? যাও টাকা নিয়ে এসো, আমার তাড়া আছে।

মরিয়া হয়ে সুধা বললে, টাকা যদি না দিই, তুমি কি করতে পার?

চেয়ার ছেড়ে উঠে এল নরেন সুধার সামনে। তারপর তার সেই ভয়ঙ্কর ঠান্ডা গলায় বললে, টাকা না দিলে জাল জয়ন্তী সান্যালের মুখোশ খুলে দোব। আর বেরিয়ে পড়বে জালিয়াত সুধাময়ী সোম। তখন আদালতের সামনে থেকে, সমাজের সামনে থেকে, দুনিয়ার সামনে থেকে কোথায় মুখ লুকোবে তুমি, মাথা ঠান্ডা করে সেটা আগে ভেবে দেখো সুধাময়ী। তাছাড়া সেই চিঠির তাড়া এখনো আছে।

বিবর্ণ মুখে সুধা বললে, আমি ধরা পড়লে তুমিও কি রেহাই পাবে ভেবেছ?

নরেন ফিরে গিয়ে আবার চেয়ারে বসল। বললে, সে—চিন্তা আমার, তুমি তোমার চিন্তা করো।

চুপ করে রইল সুধা। আর সিগারেট টেনে যেতে লাগল নরেন।

বড় দেওয়াল ঘড়িটা একটানা আওয়াজ করতে লাগল টক টক টক। সুধার মনে হল, আওয়াজটা উঠছে তার হৃৎপিণ্ড থেকে।

সিগারেটের টুকরোটা পায়ের তলায় পিষে ফেলে নরেন এক সময় বললে, দিতে যদি তোমার নিতান্তই অসুবিধা হয়, তাহলে টাকাটা সুজিতের কাছ থেকেই নিতে হবে! বাড়িতে আছে নাকি সে? না অপেক্ষা করব?

নিষ্প্রাণ গলায় সুধা বললে, কত টাকা পেলে তুমি আমাকে রেহাই দেবে?

পাঁচ হাজার দিলেই ভালো হয়। অভাব তো নেই তোমার!

পাঁচ হাজার!

বেশ, উপস্থিত হাজার তিনেক হলেও চলবে।

উপস্থিতের কথা নয়, ভবিষ্যতের কথা বলছি।

ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে বলো? তবে আমার কারবার যদি ভালোই চলে, তাহলে অবশ্য তোমাকে ঘন ঘন বিরক্ত করার দরকার হবে না। এই ধরো, আসছে মাসে হাজার দশেক টাকার একটা বিজনেস হবার কথা আছে। সেটা হয়ে গেলে কিছুকাল দিব্যি নিশ্চিন্ত।

লাইব্রেরি ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সুধা। ফিরে এল সবুজ রঙের একখানা চেক হাতে নিয়ে। নরেনকে দিয়ে বললে, তিন হাজারই দিলাম।

চেকখানা ভাঁজ করতে করতে নরেন বললে, আমি জানতাম টাকা তুমি দেবেই। আচ্ছা, আসি।

সমস্ত শরীরটাকে শক্ত ঋজু করে সুধা বললে, হ্যাঁ, এসো। তোমার এই যাওয়াই যেন শেষ যাওয়া হয়। জীবনে আর কোনোদিন এখানে আসার চেষ্টা করো না। এলে তুমিও বাঁচবে না, আমিও না।

সুধার আগুনবরণ মুখের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই অদ্ভুত যান্ত্রিক হাসি দেখা দিল নরেনের মুখে। বললে, আমায় ভয় দেখাচ্ছ তুমি? তারপর ধীরে—সুস্থে ভাঁজ করা চেকখানা পকেটে পুরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

দুলতে লাগল লাইব্রেরি ঘরের পর্দাটা।

স্বর্ণময়ী প্রশ্ন করলেন, তুই কিছু জানিস বাবা?

সুজিত বললে, কি বিষয় মা?

চিন্তার ছায়া পড়ল স্বর্ণময়ীর মুখে। বললেন, বউমার কথা জিজ্ঞেস করছি বাবা। দিন দিন ও যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। কথা কম বলে, না ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না, সদাই কেমন অন্যমনস্ক ভাব। বউমার কি হয়েছে, আন্দাজ করতে পারিস কিছু?

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সুজিত বললে, মা হয়ে তুমি যদি আন্দাজ করতে না পারো, আমি কি পারব?

স্বর্ণময়ী বললেন, কি জানি বাবা! এক এক সময় মনে হয়, ও নিশ্চয় লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। কি যে ওর দুঃখ—বলেও না, বুঝিও না। মেয়েটাকে ভালোবেসেছি বলেই তো এত ভাবনা আমার।

চুপ করে রইল সুজিত। স্বর্ণময়ীও যেন ডুবে গেলেন নিজের চিন্তায়।

হঠাৎ এক সময় সুজিত বললে, আচ্ছা মা, বউদি যদি তোমার পুত্রবধূ না হয়ে আর কেউ হত, তুমি তাকে এতখানি ভালোবাসতে?

অবাক হয়ে স্বর্ণময়ী বললেন, সেকি রে! বউমা আর কেউ হতে যাবে কেন?

ধরো যদি কোনো পরের মেয়ের হত—সান্যাল বাড়ির সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই নেই—

অপূর্ব মমতার আভা ছড়িয়ে পড়ল স্বর্ণময়ীর সারা মুখখানিতে। ক্ষীণ হেসে ধীরে ধীরে বললেন, স্নেহ ভালোবাসা কি আপন—পর বাছে রে পাগল? জয়ন্তী যেদিন এ বাড়িতে প্রথম এল, আমার অলোকের বউ না হলে সেদিন কি হত জানি না, কিন্তু আজ আর তাকে পর বলে ভাববার ক্ষমতা আমার নেই বাবা। কিন্তু এ—কথা কেন সুজিত?

সুজিতের কপালেও চিন্তার রেখা দেখা দিল। কতকটা যেন নিজের মনেই বললে, বউদির মধ্যে কি যেন একটা রহস্য লুকোনো আছে।

উদ্বিগ্ন মুখে স্বর্ণময়ী বলে উঠলেন, কি রহস্য?

সেটা যে কি, তা আমিও জানি না মা। তবে সে রহস্য চাপা থাকবে না, একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই।

কফির পেয়ালাটা শেষ করে সুজিত চলে গেল। আর স্বর্ণময়ীর বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় করে উঠল।

কলিংবেলটা প্রথমবার যখন বাজল, পলি তখন খেয়াল করেনি। দ্বিতীয়বার বাজতেই সচকিত হয়ে উঠল সে। দুধের গ্লাসটা টুটুলের হাতে দিয়ে বললে, নিজে নিজে খেয়ে ফেলো তো মণি, আমি আসছি এখুনি।

সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নামতে নামতে পলির মুখে দুষ্টু হাসির আভাস দেখা দিল। যে এসেছে, সে বিজয় ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। নিশ্চয় সিগারেট কেস ফেলে গেছে। নয়তো রিস্টওয়াচ। সত্যি এমন ভুলো লোক এই বিজয়! এমন কি কাজে বেরোবার সময় পলিকে যা দিয়ে যাবার কথা, এক একদিন তাও সে ভুলে যায়। আর ফিরে আসতে হয় মাঝ রাস্তা থেকে।

দরজা খুলতে খুলতে পলি বললে, হঠাৎ ফিরে এলে যে বিজয়? তুমি বুঝি—

মুখের কথা হারিয়ে গেল পলির। আগন্তুক ঠান্ডা গলায় বললে, ফিরে আসাটা হঠাৎই হল বটে। তবে বিজয় নয়, আমি।

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল পলি।

নরেন বললে, ভেতরে গিয়ে বসতে বলবে না?

পলি শুধু বললে, এসো।

ড্রইংরুমে গিয়ে একটা বড় কাগজের বাক্স সোফার ওপর নামিয়ে রাখল নরেন। তারপর সোফার হাতলের ওপর বসে বললে, ভয় নেই, কোন আর্জি নিয়ে আসিনি আজ। কোনো পুরোনো কথাও তুলব না।

হঠাৎ এদিকে এলে যে? পলি প্রশ্ন করল।

নরেন জবাব দিলে, হঠাৎ আসা আর হঠাৎ চলে যাওয়াই তো আমার স্বভাব পলি!

একটু অসহিষ্ণু হয়ে পলি বললে, আমি এখুনি বেরোব ভাবছিলাম—

বেরোবে? কোথায়?

কাছাকাছি একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল হয়েছে, টুটুলকে পৌঁছতে যাব।

মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে পারি।

যথেষ্ট। তার আগেই চলে যাব আমি।

পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা ধরাল নরেন। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বললে, তোমায় অভিনন্দন জানাতে এলাম পলি।

পলির ভ্রূ দুটো অল্প বাঁকা হয়ে উঠল। বললে, অভিনন্দন! কিসের জন্যে?

আর্মি অফিসার বিজয় বিশ্বাসের সঙ্গে তোমার শুভ বিবাহের জন্যে। প্রার্থনা করি, তোমার দ্বিতীয় দাম্পত্য জীবন সুখের হোক।

এক মুহূর্তের জন্যে পলির মুখের সমস্ত রং হারিয়ে গেল। পরক্ষণেই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বললে, এ খবর কোত্থেকে শুনলে?

হালকা গলায় নরেন বললে, হঠাৎ দৈববাণী হল আকাশ থেকে।

হসপিটালে মার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বোধ হয়?

তোমার অনুমান সত্যি। সুখবরটা মিসেস নস্করের মুখ থেকেই পেলাম। শুনলুম, ক্যাথলিক মতে তোমাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু খবরটা আগের বার আমায় জানালেই পারতে। লুকোচুরির দরকার কি ছিল? তোমাদের প্রেমের পর্বে আমি বাধা দিতাম না নিশ্চয়ই!

পলির মুখখানা লাল হয়ে উঠল হঠাৎ। বললে, খবরটা তোমাকে জানাতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি?

সিগারেটে একটা টান দিয়ে নরেন বললে, তুমি আবার আমাকে ভুল বুঝছ পলি। বিশ্বাস করো, তোমার দ্বিতীয় বিবাহে আমি সুখীই হয়েছি।

উদ্দীপ্ত গলায় পলি বলে উঠল, তুমি সুখী হও না হও, আমি জানতে চাই না। আমি নিজে সুখী হয়েছি—এইটুকুই জানি। আমার যে নারীত্বকে তুমি দু'পায়ে দলে চলে গিয়েছিলে, বিজয় তাকেই মর্যাদা দিয়েছে, ভালোবেসেছে।

বাঁকা চোখে পলির দিকে তাকিয়ে নরেন প্রশ্ন করলে, আর তুমি?

কি জানতে চাও আমার সম্বন্ধে? বিজয়কে ভালোবাসি কিনা? বাসি বইকি! যে আমার সমস্ত শূন্যতা পূর্ণ করেছে, তাকে ভালোবাসব না? আমি তো ইট কাঠ পাথর নই!

সোফা ছেড়ে নরেন একবার ঘরের ওধার অবধি পায়চারি করে এল নীরবে। তারপর বললে, লেফটেন্যান্ট বিজয় বিশ্বাসকে ধন্যবাদ। তোমাকে সুখী করতে পেরেছেন বলে। প্রার্থনা করি, প্রথম প্রেমের সমাধির ওপর তোমার নতুন সুখের ঘরকন্না চিরস্থায়ী হোক।

হাতের ছোট্ট রিস্টওয়াচের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পলি বললে, সেটা তো আগেই ঘটা করে জানিয়েছ। আর কিছু বলার আছে কি? টুটুলের স্কুলের সময় হয়ে এসেছে।

কাগজের বাক্সটা নরেন খুলল। বেরোল দম—দেওয়া খেলার এঞ্জিন একটা। বললে, টুটুলের কথা মনে পড়ল বলেই এলাম। একবার পাঠিয়ে দাও। তাকে এটা দিয়েই চলে যাব।

পলি ডাক দিতেই টুটুল ছুটে এল। নরেন ততক্ষণে দম দিয়ে এঞ্জিনটাকে ছেড়ে দিয়েছে মেঝের ওপর। শিস দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়িটা।

বড় বড় চোখে লোভ আর সরলতা নিয়ে দেখতে লাগল টুটুল।

নরেন বললে, তুমি চালাবে টুটুল? চালাও না!

আগের বার মাকে ছেড়ে টুটুল এগোয়নি নরেনের কাছে। আজ কিন্তু এগিয়ে এল নির্ভয়ে। পলিকে নরেন বললে, বিয়ের খাওয়াটা তো ফাঁকি দিলে, আজ অন্তত এক কাপ চা দিয়ে নেমন্তন্ন রক্ষে করো!

আর একবার রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে পলি ভেতরে চলে গেল। মুখ ফিরিয়ে নরেন তাকাল টুটুলের দিকে। মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসে টুটুল খেলনা—এঞ্জিনে দম দিচ্ছে উৎসাহের সঙ্গে।

এই তো সুযোগ!

হিটারে চা করতে তিন—চার মিনিটের বেশি লাগল না।

চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে পলি যখন আবার ড্রইংরুমে এল, সেখানে তখন কেউ নেই। নরেনও নেই, টুটুলও নেই।

পড়ে আছে শুধু খেলনা—এঞ্জিনটা। আর টেবিলের ওপর খোলা চিঠি একখানা।

চায়ের পেয়ালাটা রেখে কাঁপা হাতে পলি চিঠিখানা তুলে নিল:

টুটুলকে নিয়ে চললাম। কোন নিঃসন্তান দম্পতির হাতে তাকে দিলে হাজার দশেক টাকা লাভের আশা আছে। চিন্তা করো না, টুটুল সেখানে সুখেই থাকবে।

মিছে পুলিশে খবর দিও না। আইনের সাহায্য নিয়ে লাভ নেই। কেননা, দ্বিতীয় বিবাহের পর টুটুলের ওপর তোমার আইনগত অধিকার তুমি হারিয়েছ। আর হারিয়েছ বলেই টুটুলকে আমি নিশ্চিন্তে নিয়ে যেতে পারলাম। তোমার দ্বিতীয় বিবাহের জন্যে আরেকবার ধন্যবাদ।

নতুন জায়গায় গিয়ে তোমাকে ভুলে যেতে, আশা করি টুটুলের বেশি দিন লাগবে না।

চিঠিখানা হাতে ধরে পলি দাঁড়িয়ে রইল কাঠ হয়ে। টুটুল বলে একবার চিৎকার করতে গেল, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। তারপর হঠাৎ চারদিক ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে একাকার হয়ে গেল।

ছয়

টুটুল নেই।

গোটা পৃথিবীটাই ফাঁকা হয়ে গেছে পলির কাছে। শূন্য হয়ে গেছে সারা জীবনটা। শ্মশানের ওপর নতুন করে খেলাঘর গড়েছিল পলি। সেখানে একটি মাত্র গৃহপ্রদীপ জ্বলছিল টুটুল। সেই টুটুল নেই!

টুটুল নেই, এ—কথা ভাবতেও পারে না পলি। এত বড় মর্মান্তিক সত্যকে না পারে ভাবতে, না পারে সে ভুলতে। জীবনটা তার শ্মশান করে চলে গিয়েছিল নরেন—তার প্রথম স্বামী। তবু সেই শ্মশানের বুকেই ধরল কুঁড়ি, ফুটল ফুল। সেই ফুলটি বুকে নিয়েই দিন কাটাচ্ছিল পলি। মুছে গিয়েছিল তার সব দুঃখ, সব বেদনা। তার সমস্ত শূন্যতা ভরে উঠেছিল টুটুলকে পেয়ে। তার চোখের আলো, তার বুকের নিশ্বাস টুটুল। সাত রাজার ধন একটি মাণিক।

সেই টুটুল নেই, অথচ পলি আছে। কেমন করে দিন কাটবে তার?

তবু দিন কাটছে বইকি! টুটুলের জামা, টুটুলের ছোট ছোট মোজা, ভাঙা পুতুল—এই সব বুকে করেই দিন কাটছে পলির।

কখনও হাসে, কখনও কাঁদে। কখনও বা মোজা—জামা—পুতুলকে চুমু খায় আর বিড়বিড় করে বকে।

একদিন মাঝরাতে 'টুটুল এলি' বলে চিৎকার করে দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়েছিল পলি। ফিরিয়ে এনেছিল বিজয় বিশ্বাস। নইলে কোথায় চলে যেত কে জানে!

আড়ালে চোখ মোছেন মিসেস নস্কর। বিজয় সান্ত্বনা দিয়ে বলে, তুমি অত ভেবো না পলি। টুটুলকে আমি খুঁজে বার করবই—ফিরিয়ে আনব তোমার কাছে।

ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে পলি। কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না।

বিজয় বললে, টুটুলের ছবি দিয়ে কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিই, কি বলো? দেখি সন্ধান পাওয়া যায় কিনা! তারপর আদালত আছে।

শিউরে ওঠে পলি। বলে, না, না, না, নরেনকে তুমি জানো না, জোর করে নিতে গেলে টুটুলকে সে হয়তো মেরেই ফেলবে। টুটুলের সন্ধান চাই না, তুমি নরেনের সন্ধান এনে দাও।

উমেশ মজুমদার বললেন, হ্যাঁ, আমার স্ত্রী ফিরে এসেছেন। হপ্তাখানেক আগে। ডেকে পাঠাচ্ছি।

টুটুলের মাথায় হাত রেখে নরেন বললে, এই ছেলেটির কথাই বলেছিলাম।

ডান হাতের দুই আঙুল দিয়ে চশমাটা কপালের ওপর তুলে ধরলেন উমেশবাবু। এটি তাঁর অভ্যাস। বললেন, ও! এই ছেলেটি! তা এটি—

আমারই ছেলে। নরেন বললে।

চশমাটা আবার নাকের ওপর নামিয়ে রাখলেন উমেশবাবু। তারপর প্রশ্ন করলেন, নিজের ছেলেকে পরের হাতে দিতে চাইছেন কেন?

এ প্রশ্নের জবাব ভেবেই এসেছে নরেন। বললে, ভালোভাবে মানুষ হবে বলে। সামর্থ্য থাক আর নাই থাক, দুনিয়ার সকল বাপই তা আশা করে।

মনে হল জবাবটা মনঃপূত হয়েছে উমেশবাবুর। বললেন, তা বটে। ছেলেটির মা আছেন?

এক মুহূর্ত থেমে নরেন বললে, না।

দার্শনিকের মতো মুখ করে উমেশবাবু বললেন, বিচিত্র ব্যাপার সংসারে! আপনার ঘরে ছেলে আছে, মা নেই, আর আমার ঘরে দেখুন, মা হবার লোক মজুত, কিন্তু ছেলে নেই। অথচ ছেলের জন্যেই একবার নয়, দু—দুবার সংসারী হওয়া। শাস্ত্রেই তো বলেছে, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা। কিন্তু এমন কপাল যে কিছুতেই কিছু হল না! তাই আমার দ্বিতীয়া স্ত্রীর মুখ চেয়ে স্থির করলাম একটি পোষ্য—

হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে গেল উমেশবাবুর। মাথায় আধ—ঘোমটা টেনে ঘরে এসে দাঁড়ালেন একটি মহিলা। শান্ত সুশ্রী চেহারা। উমেশবাবুর দ্বিতীয়া স্ত্রী অনুভা। বয়সে উমেশবাবুর চেয়ে অনেকখানি ছোট।

উমেশবাবু বললেন, আমাদের বিজ্ঞাপন দেখে এই ভদ্রলোকটি এসেছেন অনু। ইনিই ছেলেটির বাবা। মা নেই, ছেলেটিকে দেখেশুনে নাও। তুমি মত দিলে এঁর সঙ্গে ব্যবস্থা করব।

একদৃষ্টিতে টুটুলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনুভা। একরাশ কোঁকড়ানো কালো চুলের নিচে ডাগর দুটি চোখ আর ফুলের মতো কচি মুখখানা দুর্নিবার আকর্ষণে তাঁকে টানছিল। দু—হাত বাড়িয়ে মিষ্টি গলায় তিনি ডাকলেন, এসো।

টুটুলের কিন্তু যাবার লক্ষণ দেখা গেল না। নরেনের হাঁটু ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে শুধু বললে, বাড়ি যাব।

নরেন বললে, যাও না—ডাকছেন!

অনুভা আবার ডাকলেন, এসো না খোকা! কত ছবি দেখাব তোমায়, পাখি দেখাব! লক্ষ্মী ছেলে, এসো!

এ প্রলোভনেও কোনো ফল হল না। টুটুল তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। নরেনের হাঁটু ঘেঁষে। নরেন তার কানে কানে বললে, যাও না টুটুল! তোমায় কত ভালোবাসেন, কত খেলনা দেবেন! কত লজেন্স, কত চকোলেট—

টুটুল প্রশ্ন করলে, আর দম—দেওয়া মোটরগাড়ি?

নরেন বললে, নিশ্চয়, নিশ্চয়! তোমাকে কিনে দেবেন বইকি! যাও না ওঁর সঙ্গে।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল টুটুলের চোখ দুটো। অনুভার দিকে এবারে এগোতে লাগল এক—পা এক—পা করে। সে পৌঁছবার আগেই অনুভা তাকে টপ করে কোলে তুলে নিলেন।

উমেশবাবু বললেন, তোমার মত আছে তো অনু? নরেনবাবুর সঙ্গে তাহলে পাকা কথা বলব?

বলো।—বলে টুটুলকে বুকে জড়িয়ে অনুভা ভেতরে চলে গেলেন।

সেই দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন উমেশবাবু। তারপর নরেনের দিকে ফিরে দার্শনিকের মুখভাব নিয়ে বললেন, মুনি—ঋষিরা এই জন্যেই সংসারটাকে বলেছেন, মায়া প্রপঞ্চ। একরত্তি একটা ছেলে কোথা থেকে এসে এক নিমিষে বেঁধে ফেলল। এও তো মায়ার খেলা।

কিন্তু নরেন দার্শনিক নয়, বস্তুতান্ত্রিক। তবু একজন বড় খদ্দেরের মন রাখার জন্যে তাকেও দার্শনিক সাজতে হল, বললে, বটেই তো! সংসার মানেই মায়া!

সাড়া দিলেন না উমেশবাবু। বোধ করি ডুবে রইলেন দর্শন তত্ত্বের চিন্তায়। কিন্তু নরেনের মনে তখন অর্থনীতির চিন্তা। হাতের রিস্টওয়াচটার দিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ বলে উঠল, ওহো, অনেক বেলা হয়ে গেছে দেখছি! মাপ করবেন উমেশবাবু, কাজের কথাটা তাহলে হয়ে যাক। ছেলে যদি আপনাদের পছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে বিজনেসটা এবারে মিটিয়ে ফেলাই ভালো।

হঠাৎ যেন ধ্যান থেকে জেগে উঠলেন উমেশবাবু। বললেন, ছেলে অবশ্যই পছন্দ হয়েছে অনুর। কিন্তু শুধু ছেলে পছন্দ হলেই নেওয়া চলে না নরেনবাবু।

কেন?

ছেলে যে আপনার, তার প্রমাণ কি? প্রমাণ না পেলে টাকাটাও দেওয়া যায় না!

দার্শনিকের খোলসের মধ্যে এতখানি কড়া পাটোয়ারী বুদ্ধি চাপা আছে, তা কে জানে! নরেন কিন্তু জানে। তাই তৈরি হয়েই এসেছে সে। বললে, কি প্রমাণ চান বলুন?

উমেশবাবু বললেন, যে কোনো সঙ্গত প্রমাণ হলেই চলবে। কিছু মনে করবেন না নরেনবাবু, প্রমাণের কথাটা তোলা এই কারণে যে, পরের হাতে ছেলে দেওয়াও যেমন গুরুদায়িত্ব আছে, পরের ছেলে নেওয়াতেও তেমনি গুরুদায়িত্ব। ধরুন এই ছেলে যদি আপনার না হয়ে অপরের হয়, তাহলে কি ফ্যাসাদেই আমায় পড়তে হবে ভাবুন দিকি!

নরেন সায় দিয়ে বললে, বটেই তো!

কাগজে তো দেখেছেন, ছেলেচুরির কারবার আজকাল কিরকম চলেছে!

ঠান্ডা গলায় নরেন বললে, দেখেছি বইকি! তারপর পকেট থেকে একখানা খাম বের করে উমেশবাবুর হাতে দিলে।

খাম থেকে বেরোল একখানা ফোটো।

উমেশবাবু বলে উঠলেন, এ তো ওই ছেলেটির ছবি! কিন্তু আপনিই যে এর বাপ, তার প্রমাণ কোথায়?

নরেন বললে, আছে। ফোটোর উলটো দিকটা দেখুন—

টুটুলের ফোটোর উলটো দিকটা দেখতে দেখতে উমেশবাবুর মুখের চেহারাই গেল বদলে। উলটো দিকে ইংরাজিতে লেখা রয়েছে:

'প্রিয় নরেন, তোমার ছেলের জন্মদিনে আমার আন্তরিক আশীর্বাদ রইল।' নিচে সই করা, জি. টমাস। সেন্টপলস চার্চ।

উমেশবাবু প্রশ্ন করলেন, টমাস সাহেবের সঙ্গে আপনার আলাপ কি সূত্রে?

নরেন বললে, ফাদার টমাস টুটুলের মায়ের সঙ্গে আমার বিবাহ দিয়েছিলেন।

উমেশবাবু যেন সাপ দেখলেন। বললেন, আপনি খ্রিস্টান?

মনে মনে নরেন বললে, এই সেরেছে! মুখের খাতিরে হয়েছিলাম। বিয়ের পর প্রায়শ্চিত্ত করে আবার হিন্দু হই।

তাই বলুন। উমেশবাবুর নিশ্বাস আবার সহজ হয়ে এল।

আর কোন প্রমাণ দরকার? প্রশ্ন করলে নরেন।

উমেশবাবু বললেন, না।

বেশ, তবে ফটোখানা আপনিই রেখে দিন। আর আমার প্রাপ্যটা—

উমেশবাবু বললেন, নিশ্চয় পাবেন। তার আগে একটি দানপত্র লিখে দিন, স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে—

পকেট থেকে একখানা ভাঁজ করা কাগজ বের করে নরেন বললে, আমি তৈরি হয়েই এসেছি।

কাগজখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে উমেশবাবু বললেন, ঠিক আছে। বসুন। আপনার চেকটা লিখে দিই।

টেবিলের ড্রয়ার খুলে চেকবই বার করলেন উমেশবাবু। আর নরেন ভাবতে লাগল, দশ হাজার টাকায় রেসের বুকী মিত্তিরের দেনার গর্তটা অনেকখানি বুজিয়ে দেওয়া যাবে। ইদানীং লাক মোটেই ফেভার করছে না নরেনকে।

কিন্তু সাধে বাদ সাধল টুটুল। তীর বেগে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল নরেনের কোলে। তারপর দুই হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, বাড়ি যাব—মামির কাছে যাব। বাড়ি চলো বাপি!

কোঁকড়ানো কালো চুল কপালের ওপর ঝেঁপে আছে। ডাগর দুই চোখ ছাপিয়ে গোলাপি মুখখানা একাকার হয়ে গেছে চোখের জলে। টুটুল শুধু ফুঁপিয়ে ওঠে আর পাতলা ঠোঁট কাঁপিয়ে বলে, মামি যাব—বাড়ি চলো বাপি!

বাপি! কে শেখালে এই ডাক টুটুলকে? প্রকৃতি, না রক্তের টান? আবিষ্টের মতো বসে রইল নরেন। আর মুখের ওপর জলে ভেজা কচি মুখের ছোঁয়া পেয়ে থেকে থেকে শিউরে উঠতে লাগল।

থেমে গেল উমেশবাবুর হাতের কলম। ভেতর থেকে ব্যস্ত হয়ে এলেন অনুভা। এক হাতে রঙিন ছবির বই, আরেক হাতে পোষা একটা পায়রা নিয়ে অনুভা বলতে লাগলেন, ছি, কাঁদে না খোকন, এই নাও, ছবি নাও, পায়রা নাও! আমার কাছে এসো মাণিক। আরও কত জিনিস দোব তোমাকে—কত আদর করব। এসো খোকন!

কিন্তু ফিরেও চায় না টুটুল। ছোট্ট বুকখানার মধ্যে কি যে দুরন্ত অভিমান ফুলে ফুলে উঠছে তা সে—ই জানে। আরও শক্ত করে নেরনের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে শুধু বলে, বাড়ি চলো বাপি—মামি যাব।

শক্ত দুটো হাতে টুটুলের কচি হাত দু'খানা মুঠো করে ধরলে নরেন। সামান্য এটু টান দিলেই নরম হাত দু'খানা খুলে আসবে নিজের গলার চারপাশ থেকে। তারপর অনুভার হাতে টুটুলকে দিয়ে উমেশবাবুর চেকখানা পকেটে পুরে চলে যেতেই বা কতক্ষণ!

কিন্তু একি আশ্চর্য কাণ্ড! নরেনের শক্ত সবল হাত দুটোতে জোর নেই একটুও। শুধু জোর নেই তা নয়, পুরু চামড়াওয়ালা হাত দুটো মোমের মতো নরম হাত দুটিকে আদর করছে আলতো ভাবে। যেমন করে ফুল ছোঁয় লোকে।

অনুভবা বললেন, বেশ খেলা করছিল, হঠাৎ কি যে হল—

স্থির হয়ে তাকিয়েছিলেন উমেশবাবু। ধীর গম্ভীর স্বরে বললেন, আমার মনে হয় নরেনবাবু, একদিনে হবে না। বেশ কিছুদিন আসা—যাওয়া করলে তবে যদি এ বাড়িতে খোকার মন বসে! রক্তের টান কি একদিনেই যায়?

কোনো জবাব দিল না নরেন। দিতে পারলে না। টুটুলের কচি দেহটা বুকে জড়িয়ে, উঠে চলে গেল আস্তে আস্তে। উমেশবাবু আর অনুভাকে একটা নমস্কার জানাতেও ভুলে গেল।

দশ হাজার টাকা মুঠোর মধ্যে এসেও ফসকে গেল। আফশোসের সীমা নেই নরেনের। ফসকে গেল শুধু ওই একফোঁটা টুটুলের জন্যে।

তবু হাল ছাড়েনি নরেন। পুরোনো হোটেল ছেড়ে বরানগর অঞ্চলে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করতে হয়েছে টুটুলের জন্যে। সেইখান থেকেই চলেছে টুটুলকে নিয়ে উত্তরপাড়ায় যাতায়াত।

অনুভার ঘরে ঢুকলে মনে হয় একটা খেলনার দোকানে এসেছি। রবারের হাঁস, প্ল্যাস্টিকের জাহাজ, লাইনপাতা রেলগাড়ি, দম—দেওয়া মোটর, ঘাড়—নড়া বুড়ো, চাকা—লাগানো কাঠের ঘোড়া, আরও কত। টুটুল—পাখিকে ফাঁকে ফেলবার কতশত আয়োজন।

ফাঁদে অনেকখানি পাও দিয়েছে টুটুল। আগের মতো আজকাল আর ছুটে পালিয়ে আসে না অনুভার কোল থেকে। বেশ থাকে সারাদিন। শুধু সন্ধে হয়ে এলেই আর রাখা যায় না তাকে। আজকাল আর 'মামি যাব' বলে না, বলে, 'বাপি যাব'। সন্ধেবেলা নরেন তাকে নিয়ে না আসা পর্যন্ত ছটফট করে। তারপর বরানগরে সেই ফ্ল্যাটে নরেনের বিছানায় শুয়ে বাপের গায়ে একটি পা তুলে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। আর সারারাত ছটফট করে না।

কিন্তু ছটফট করে নরেন। এ জীবন তার নয়। এ জীবনের জন্যে সে তৈরি হয়নি। তার জীবনের ফরমুলা আলাদ, ছাঁচ আলাদা। সোজা সরল রাজপথ ছেড়ে বাঁকাচোরা গলিপথেই সে চলে এসেছে এতদিন। যে পথে সে চলেছে, সেটা হচ্ছে একমুখী রাস্তা। ওয়ান ওয়ে স্ট্রিট। এগিয়ে চলা যায়, ফেরা যায় না। এই বাঁকা—চোরা পথেই সে চলবে। যতদিন না তার জীবন—গাড়ি শেষ স্টপেজে থামে।

কিন্তু একি হল! সে কি বদলে যাচ্ছে?

শক্ত ধাতুর মানুষ সে। তার জীবনে দয়া মায়া স্নেহ প্রেম রাগ অনুরাগের বালাই নেই। সে জানে শুধু টাকা। টাকা ছাড়া আর কিছু জানতেও চায় না। অনেক টাকা এসেছে তার হাতে, উড়ে গেছে অনেক টাকা। আরো অনেক টাকা তার চাই। এই টাকার নেশাতেই আবার একদিন সে এলাহাবাদের ট্রেনে উঠে বসল সান্যাল বাড়ির উদ্দেশে।

টুটুল রইল অনুভার কাছে দিন দুয়েকের জন্যে।

মোগলসরাইয়ে ট্রেন থামল বেলা সাড়ে আটটায়।

হেমন্তের মাঝামাঝি। তবু পশ্চিমের শীত এরই মধ্যে কনকনে হয়ে উঠেছে। ওভারকোটের কলার তুলে দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ল নরেন। ভালো সিগারেট এক টিন চাই। সঙ্গে যা আছে, তাতে কুলোবে না। কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে নরেন এগোল স্টেশনের স্টলের দিকে।

উলটো দিকের প্ল্যাটফর্মে তখন থেমেছে একখানা ডাউন ট্রেন। তারই একখানা ফার্স্ট ক্লাস কামরার জানলা থেকে মিলিটারি ক্যাপের নিচে দুটি তীক্ষ্ন—উজ্জ্বল চোখ হঠাৎ সজাগ হয়ে অনুসরণ করতে লাগল নরেনকে।

সিগারেট কিনে নরেন যখন নিজের কামরায় ফিরে এল, তখন গার্ডের হাতে সবুজ নিশান দুলছে, বাজছে হুইসল। নরেন দেখতে পেল না, উলটো দিকের প্ল্যাটফর্ম থেকে সেই মিলিটারি ক্যাপ—পরা মূর্তিটি ছুটে এসে এদিকের চলতি ট্রেনে উঠে পড়ল। উঠল ঠিক নরেনের পাশের কামরায়।

বর্ষার পর শরৎ, তারপর হেমন্ত। বেলা অনেক ছোট হয়ে এসেছে। যমুনার জল অনেক স্বচ্ছ। এলাহাবাদ ফোর্টের পিছন দিকে পাশাপাশি বসে আছে সুজিত আর সুধা। যমুনার ঢালু পাড়ের ঠিক উপরে।

কথা নেই দুজনের। ছোট ছোট মাটির ঢেলা কুড়িয়ে টুপটাপ করে জলে ফেলছে সুজিত। আর, সাদা একখানা শাল মুড়ি দিয়ে সুধা চেয়ে আছে জলের দিকে।

ঢিল ছোড়া থামিয়ে সুজিত একসময় প্রশ্ন করল, সান্যালবাড়িতে কি তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে?

চোখ তুলে তাকাল সুধা। বললে, একথা কেন?

সুজিত বললে, আগের চেয়ে তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছ। সর্বদা কেমন ক্লান্ত দেখায় আজকাল। আগের চেয়ে অনেক চুপচাপ। মনে হয়, অহরহ কি যেন নিগ্রহ চলেছে তোমার ওপর। মা'তে আমাতে এই নিয়ে প্রায়ই কথা হয়।

চমকে উঠে সুধা বললে, কি কথা হয়?

আমাদের বাড়িতে তোমার বোধ হয় কোন কষ্ট হচ্ছে।

ফিকে একটুখানি হাসি দেখা দিল সুধার মুখে। বললে, কষ্ট! এ যদি কষ্ট হয়, তাহলে সুখ কি আমি তা জানি না। ভিখারিণী মণি কুড়িয়ে পেলে কি কষ্ট হয়? তোমাদের সংসারে এসে যে সুখ পেয়েছি, তার চেয়ে বড় সুখ আমি কল্পনাও করতে পারি না।

সুজিত বললে, হয়তো সুখী হয়েছ, কিন্তু সান্যাল বাড়ির সঙ্গে তুমি ঠিক মিশে যেতে পারোনি। দেহটা তোমার সান্যাল বাড়িতে থাকলেও তোমার মনটা যেন সান্যাল বাড়িতে নেই।

সুধার মুখে ফিকে হাসিটি ঠিক তেমনি লেগে রইল। বললে, এটাও তোমাদের ভুল। সান্যাল বাড়ি ছেড়ে আমার মন একটা মুহূর্তও আর কোথাও থাকে না।

সুজিত বললে, তাই যদি হয়, তবু বলব, তোমার মন আজও ধরা দেয়নি আমাদের কাছে। তোমার আর আমাদের মাঝখানে একটা রেখা যেন টানা হয়েছে। সেটা ডিঙিয়ে তোমার মন আসতে পারছে না। তুমি কি বলতে চাও, এও আমাদের ভুল?

মুখের হাসি নিভে গেল সুধার। যেমন করে এক ফুঁয়ে নিভে যায় মোমের বাতি। আহত পাখির ডানার মতো কৃষ্ণপক্ষ চোখের পাতা দুটি নেমে এল ধীরে ধীরে। যমুনার দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বসে রইল সুধা। দিগন্তের পটে আঁকা ছবির মতো।

সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সুজিত অত্যন্ত কোমল গলায় বলতে লাগল, তুমি নিশ্চিন্ত থেকো, তোমার মধ্যে কি রহস্য আছে, আমি কোনোদিন জানতে চাইব না। জানতে চাওয়াও আমার উচিত নয়। তবে কোনোদিন যদি বলার সময় আসে, অসঙ্কোচে বোলো। আত্মীয়তা ছাড়াও তোমার সঙ্গে আমার যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, কোনো মতেই তা ক্ষুণ্ণ হবে না জেনো।

জলের দিকে মুখ ফিরিয়ে সুধা তেমনি বাসে। সুজিত দেখতে পেল না, তার দুই গাল জলে ভেসে গেছে।

হেমন্তের ছোট বেলা পড়ে এল। যমুনার ওপর কুয়াশা আর অন্ধকার নামছে ভারি হয়ে। সুজিত উঠে দাঁড়িয়ে বললে, চলো, বাড়ি ফিরি। তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আমি ল' ক্লাসে যাব।

নিজেকে সামলে নিয়ে সুধা উঠে দাঁড়াল। তারপর সুজিতের পিছু পিছু এগোল, দূরে যেখানে হাডসনখানা দাঁড়িয়ে।

যেতে যেতে সুজিত একবার মুখ ফিরিয়ে বললে, সাবধানে এসো, পথটা ভালো নয়।

সুধার বুকের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, নাই ভালো হোক, তুমি তো আছো!

নারীর কাছে এই 'তুমি' বড় বিচিত্র। তার আধখানা মুখ দেবতার, আধখানা মুখ প্রিয়ের। নিজের কাছে নিজেই হার মেনে সুধা বুঝি আজ তারই শরণ নিল।

সান্যাল বাড়ির ফটকে সুধাকে নামিয়ে দিয়ে হাডসনখানা বেরিয়ে গেল। সুধার সমস্ত মন জুড়ে এক অপূর্ব মধুরতার রেশ রয়েছে তখনও।

আলো জ্বলছে বাইরের হলঘরে। ফটক ঠেলে বাগান পার হয়ে ভেতরে ঢুকল সুধা। হলে পা দিতেই যেন সাপ দেখল। একটা কৌচে বসে কালো ওভারকোট গায়ে একজন সিগারেট টানছে। পেছন থেকেও তাকে চিনতে ভুল হল না সুধার। নরেন দাশ! তার জীবনের শনিগ্রহ!

নিমেষে পাথর হয়ে গেল সুধা। মনে হল, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন মাথায় উঠে যাচ্ছে।

সুধাকে দেখে কৌচ থেকে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাছে এল নরেন। তারপর বললে, কোথায় গিয়েছিলে? বেড়াতে? আমি অনেকক্ষণ বসে আছি।

নরেনের চেয়েও ঠান্ডা গলায় সুধা বললে, কতক্ষণ এসেছ?

আধ ঘণ্টা হবে। আবার আমাকে আসতে হল সুধা। দশ হাজার টাকার সেই কারবারটা হয়েও হল না।

টাকার বড় দরকার, না?—অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রশ্ন করলে সুধা।

ভয়ানক দরকার। তুমি তো জানো, টাকা ছাড়া আমি থাকতে পারি না, বাঁচতে পারি না।

আর আমার কাছে এলেই আমি টাকা দোব, এও তুমি জানো। তাই না?

ঠিক তাই। তুমি সত্যিই বুদ্ধিমতী সুধা।

একটু বসো।

দ্রুতপায়ে সুধা ওপরে চলে গেল।

নরেন বসলে না। ওভারকোটের পকেট থেকে সিগারেটের টিন বার করে একটা ধরাতে লাগল। এবার সুধার এই সুমতি দেখে খুশি হয়েছে সে।

দোতলায় উঠে নিজের ঘরে গেল না সুধা। সোজা ঢুকল সুজিতের ঘরে। বালিশের তলা থেকে চাবিটা নিয়ে খুলে ফেলল টেবিলের ড্রয়ার। প্রথম ডালাটা টানতেই বেরোল, সুধা আর সুজিতের সেই ফোটোখানা। সেই পোলিশ ভদ্রলোকের তোলা। স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল সুধা। তারপর প্রথম ডালাটা বন্ধ করে টানল দ্বিতীয় ডালা। ডান হাতে কি একটা জিনিস তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলল শালের নিচে। তারপর বাঁ হাতে ড্রয়ারটা বন্ধ করে চাবিটা যথাস্থানে রেখে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে।

নিচের হলে সুধা যখন ফিরে এল, তখন সিগারেট টানতে টানতে পায়চারি করছে নরেন। সুধাকে দেখে উৎসুক গলায় বললে, কত এনেছ?

তেমনি ঠান্ডা আর শান্ত গলায় সুধা প্রশ্ন করলে, কত পেলে খুশি হও?

সিগারেটটা ঠোঁটের কোণে চেপে নরেন জবাব দিল, দশ হাজারের যে কারবারটা ফসকে গেল, সেটার ক্ষতিপূরণ হলেই খুশি হই।

তিক্ত হাসিতে সুধার চোখের প্রান্ত দুটো কুঁচকে গেল। দুই চোখের লক্ষ্য নরেনের মুখের দিকে রেখে সাপের নিশ্বাসের মতো চাপা আওয়াজে বলতে লাগল, প্রথমবারে এক হাজার, তারপর তিন হাজার, তারপর দশ হাজার। মানুষের লোভ এমনিই বটে! তুমি ভেবেছ, চিরকাল জুলুম চালিয়ে যাবে, আর ব্ল্যাকমেলের ভয়ে আমি সহ্য করে যাব চিরকাল! কিন্তু আর তা হবে না। মানুষের লোভের সীমা আছে, পাপের সীমা আছে, জুলুমেরও সীমা আছে। বেরিয়ে যাও—এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও এখান থেকে—নইলে জ্যান্ত ফিরতে পারবে না—

পলকে সুধার ডান হাতখানা বেরিয়ে এল শালের আড়াল থেকে। আর তার ডান হাতের দিকে তাকিয়ে নরেনের মুখ থেকে খসে পড়ল সিগারেটটা। কিন্তু শক্ত স্নায়ুর মানুষ নরেন। ভয়ঙ্কর ঠান্ডা গলায় শুধু বললে, পিস্তল নিয়ে তামাশা করতে নেই সুধা, ওটা রেখে দাও।

পিস্তলটা নরেনের দিকে উঁচু করে এগোতে এগোতে সুধা বলতে লাগল, আর একটা কথা নয়, বেরিয়ে যাও, এখুনি বেরিয়ে যাও—

আঃ, সুধা! ওটা রেখে দাও বলছি—

নরেন দাশ পিছু হাঁটছে।

চুপ করো, নইলে কুকুরের মতো—

সুধা!

আরও কয়েক পা পিছিয়ে গেল নরেন।

শেষবার বলছি, বেরিয়ে যাও!

উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে সুধার ডান হাতে।

চকিতের মধ্যে সেই যান্ত্রিক হাসি দেখা দিল নরেনের মুখে। আরও এক—পা পিছিয়ে গিয়ে বললে, আমিও শেষবার বলছি, পরিণামটা ভেবে দেখো—

উত্তরে দুম করে শুধু একটা আওয়াজ হল সুধার ডান হাত থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা চক্কর খেয়ে দরজার বাইরে অন্ধকারে ছিটকে পড়ল নরেন দাশ।

দোতলার সিঁড়ি থেকে শোনা গেল স্বর্ণময়ীর তীব্র ব্যাকুল গলার স্বর: কি হল? কিসের আওয়াজ হল? রঘুয়া—মহাদেও—বুধনি!

কাঁপতে কাঁপতে সুধা সুইচ টেনে হলের ভেতরটা দিলে অন্ধকার করে।

রাত ন'টা নাগাদ হাডসনখানা সান্যাল বাড়ির পোর্টিকোয় এসে থামতেই ছুটে এল রঘুয়া। জানালে, হাসপাতাল থেকে দু'বার টেলিফোন এসেছিল সুজিতের জন্যে। ব্যাপারটা ভয়ানক জরুরী। বলেছে, বাবু বাড়িতে আসামাত্র হসপিটালে যেন টেলিফোন করেন।

গাড়ি থেকে একরকম লাফিয়েই পড়ল সুজিত। প্রশ্ন করলে, কেন? কি হয়েছে? মা আর বউদি কোথায়?

রঘুয়া জানালে, তাঁরা তো বাড়িতেই!

তবে? ব্যস্ত হয়ে ছুটল সুজিত লাইব্রেরি—ঘরের দিকে। রিসিভারটা তুলে নিয়ে হসপিটালের কানেকশন চাইল সুজিত।

হ্যালো! হসপিটাল? আমি সুজিত সান্যাল কথা বলছি। আপনারা কি এর আগে আমায়...হ্যাঁ, হ্যাঁ, নরেন দাশকে চিনি বইকি। মাই গড—পিস্তলের গুলিতে জখম হয়েছেন? বাঁচবার আশা নেই?...হ্যাঁ, নরেনবাবুকে বলুন, তাঁর বোনকে নিয়ে আমি এখুনিই যাচ্ছি—একা দেখা করতে বলেছেন? বেশ, একাই যাচ্ছি।

রিসিভারটা নামিয়ে রাখল সুজিত। তারপর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই হাডসনখানা বেরিয়ে গেল সান্যাল বাড়ির ফটক থেকে।

শেষ জবানবন্দি লিখে নিচ্ছিলেন পুলিশ অফিসার। রুগির মুখের ওপর ঝুঁকে প্রশ্ন করলেন, আপনাকে গুলি করেছে কে?

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল নরেনের। সমস্ত বুকটা ব্যান্ডেজে বাঁধা। কোনো জবাব দিলে না।

অফিসার আবার বললেন, ঠিক মনে করে বলুন তো, কে গুলি করেছে আপনাকে?

আস্তে আস্তে নরেন বললে, আমার নিয়তি।

কিন্তু নিয়তি তো পিস্তল দিয়ে গুলি করে না, গুলি করেছে নিশ্চয় কোনো মানুষ। কে সে?

আবার শ্বাস টানতে লাগল নরেন। বাঁ—দিকের পাঁজরার মধ্যে যেন একটা আগুনের পিণ্ড।

একটু অপেক্ষা করে পুলিশ অফিসার বললেন, কে সে বলুন তো? কাকে গুলি করতে দেখেছেন আপনি?

নরেনের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল শুধু। আর কেঁপে উঠল তার মাথার গোড়ায় দাঁড়ানো মিলিটারি পোশাক পরা একটি মূর্তি। সে মূর্তি বিজয় বিশ্বাসের।

লোহার খাটের রেলিংটা দু'হাতে শক্ত করে চেপে ধরলে বিজয় বিশ্বাস। তার মাথার চুল থেকে পায়ের গোড়া অবধি শীতার্তের মতো কাঁপছে থরথর করে।

অফিসার আবার বললেন, বেশ করে মনে করুন তো, কে আপনাকে গুলি করেছে?

আর একবার শ্বাস নিয়ে নরেন বললে, কেউ নয়, আমি নিজে।

হঠাৎ কি যেন বলবার চেষ্টা করলে বিজয়। একটা বিকৃত আওয়াজ বেরোল শুধু। আর ঠিক সেই মুহূর্তে নরেন তার দিকে চোখ ফেরাতেই বোবা হয়ে গেল সে।

কয়েকটি রেখা পড়ল অফিসারের কপালে। তীক্ষ্ন চোখে নরেনের মুখের পানে চেয়ে বললেন, আপনি তাহলে আত্মহত্যা করেছেন?

হ্যাঁ।

ভুল হচ্ছে না তো আপনার?

না।

আপনার কি নিজের রিভলভার আছে?

না।

তবে অস্ত্র পেলেন কোথা থেকে?

থেমে থেমে নরেন জবাব দিলে, আমার বন্ধু মিস্টার বিশ্বাসের রিভলভার লুকিয়ে নিয়েছিলাম।

ও। এই তাহলে আপনার শেষ কথা?

এই শেষ কথা।

কিন্তু আত্মহত্যা করলেন কেন?

জবাব এল না। যন্ত্রণার মুখ বিকৃত করলে নরেন।

নরেনের শেষ জবানবন্দি নিয়ে চলে গেলেন পুলিশ অফিসার। আর মাথার গোড়া থেকে এক—পা এক—পা করে নরেনের দিকে এগিয়ে এল বিজয় বিশ্বাস। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল খাটের পাশে। বলতে লাগল, এ কি করলেন আপনি? কেন মিথ্যে এজাহার দিলেন পুলিশের কাছে? কেন বললেন না, ট্রেন থেকে এলাহাবাদের হোটেল পর্যন্ত আপনার পিছু নিয়েছিলাম আমি। তারপর টুটুলকে ফিরিয়ে দিতে আপনি রাজি হননি বলে রাগের মাথায় আপনাকে আমি গুলি—

না, না, তুমি নও। অনেক কষ্টে নরেন বললে, ধস্তাধস্তির সময় আমি তোমার হাতে মুচড়ে—পিস্তল কেড়ে নিতে গিয়ে—হঠাৎ ফায়ার—

নরেনের ডান হাতখানা কাঁপতে কাঁপতে বিজয় বিশ্বাসের একখানা হাত স্পর্শ করলে। তারপর থেমে থেকে নরেন বললে, পলি আর টুটুলকে দেখার কেউ নেই। তুমি দেখো। কই, ওরা তো এখনও—

নরেনের মুখের ওপর ঝুঁকে বিজয় বললে, উত্তরপাড়ার ঠিকানা দিয়ে পলিকে আর্জেন্ট টেলিগ্রাম করেছি। ওরা নিশ্চয় এতক্ষণ ট্রেনে।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল নরেনের মুখ—চোখ।

একটু চুপ করে থেকে নরেন বললে, আমায় একটা জিনিস এনে দেবেন বিজয়বাবু?

কি, বলুন!

একটা ভাল খেলনা—রেলগাড়ি।

উঠে চলে গেল বিজয় বিশ্বাস। গভীর অবসাদে ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল নরেনের। ভাবতে লাগল, রাত এখন কত। ভোর হতে কত দেরি। কত দূরে এসে এসে পৌঁছেছে পলি আর টুটুল।

নরেনবাবু!

আবার ধীরে ধীরে চোখ মেললে নরেন। সুজিত সান্যাল দাঁড়িয়ে।

সুজিত বললে, বাইরে পুলিশ অফিসারের মুখে সব শুনলাম। আমি ভাবতেও পারিনি যে আপনার মতো লোক অবুঝের মতন নিজের জীবনটাকে—

নরেন বললে, ও—কথা থাক। জরুরী কথা আছে।

জরুরী কথা! আমার সঙ্গে?

হ্যাঁ, আপনারই সঙ্গে। কাছে বসুন।

ছোট্ট টুলটা সুজিত টেনে নিলে বিছানার পাশে। বললে, বলুন।

শ্বাস টেনে টেনে নরেন বলতে লাগল, আপনারা যাকে জয়ন্তী সান্যাল বলে জানেন, সে জয়ন্তী নয়।

কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে গেল সুজিত। যেন অনেকদিনের প্রত্যাশিত একটা আঘাত এসে লাগল তার বুকে। তবু বিস্ময়, আঘাত আর বেদনাবোধকে ছাপিয়ে একটা গভীর স্বস্তির আভাস ছড়িয়ে পড়ল তার সারা মনে। নরেনের মুখের ওপর ঝুঁকে সে বলে উঠল, জয়ন্তী নয়? তবে কে? বলুন, কে সে?

একটা বড় শ্বাস টেনে নরেন বললে, ভদ্র বংশের একটি কুমারী মেয়ে। নাম সুধা সোম। আট মাস আগে এমনি এক অন্ধকার রাতে আমি আর সুধা চলেছিলাম বম্বে মেলে। সেই কামরায় ছিলেন আপনার বউদি জয়ন্তী—

নিচের ঠোঁটটা হঠাৎ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলে নরেন। একটা আগুনের রেখা এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে পড়ছে সারা বুকটায়। ছুটে এল নার্স। বললে, আর কথা বলবেন না। কথা বললে আপনার ব্লিডিং বাড়বে যে!

প্রাণপণে নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে নরেন বললে, বাড়ুক। তবু আমাকে বলতেই হবে।

সুজিত বললে, এত কষ্ট হচ্ছে যখন, তখন না—ই বললেন নরেনবাবু।

অস্থির হয়ে উঠল নরেন। বললে, না, না, বাকিটুকু শুনে যান। নইলে আর বলা হবে না।

ধোঁয়ার সঙ্গে আগুনের ফুলকি উড়িয়ে ছুটে চলেছে মেল ট্রেন। দেড় মিনিট অন্তর পার হয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল। তবু পথ যেন আর ফুরোয় না। ফুরোয় না এই অন্ধ ত্রিযামা রাত্রির শেষ যাম।

একটা সেকেন্ড ক্লাস কামরায় আচ্ছন্নের মতো বসে আছে পলি। পলক নেই দুই চোখে। আর তারই বুকের কাছে র্যাপার মুড়ি দিয়ে বসে মাঝে মাঝে টুটুল বলছে, গাড়ি কেন থামছে না মামি? কখন যাব বাপির কাছে?

শ্বাস টেনে টেনে নরেন তখনও বলছে, এই হল জাল জয়ন্তী সান্যালের সমস্ত ইতিহাস। এর একটি কথাও মিথ্যে নয়। অপরাধ যা কিছু, সব আমার। বিশ্বাস করুন, সুধার কোনো অপরাধ নেই সুজিতবাবু। কতখানি নিরুপায় হয়ে সে আমাকে গুলি করেছিল, সে একমাত্র আমিই জানি। অনভ্যস্ত হাত, তাই বেঁচে গেলাম। কিন্তু নিয়তির হাত থেকে বাঁচতে পারলাম কই!

স্তব্ধ হয়ে বসে শুনছিল সুজিত। হাসপাতালের এই পরিবেশ যেন সে ভুলে গেছে।

নরেন আবার বললে, সুধার মতো নিষ্পাপ মেয়ে সংসারে খুব কমই দেখা যায় সুজিতবাবু। বিনা দোষে তাকে শাস্তি দেবেন না, এই আমার শেষ অনুরোধে। আর আমার বলবার কিছু নেই।

একটিও কথা বললে না সুজিত। জড়ের মতো বসে রইল কিছুক্ষণ! তারপর আস্তে আস্তে উঠে চলে গেল।

হাডসনখানা আবার যখন সান্যাল বাড়ির পোর্টিকোয় ফিরে এল, তখন রাত অনেক। অন্ধকার হলঘর পার হয়ে সুজিত সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল দোতলায়। স্বর্ণময়ীর ঘরের দরজা বন্ধ। সুজিত একবার থমকে দাঁড়াল। হয়তো শুয়ে পড়েছেন স্বর্ণময়ী। হয়তো জেগে আছেন বিনিদ্র চোখ মেলে। কি বলবে তাঁকে সুজিত? কেমন করে তাঁর বিশ্বাসের ভিত্তি এক আঘাতে ভেঙে চুরমার করে দেবে? কেমন করে জানাবে যে এ বাড়ির জয়ন্তী সান্যাল একটা চোর জালিয়াত মেয়ে ছাড়া আর কিছুই নয়? তার চেয়ে বরং যে অপরাধী, তার সঙ্গেই আগে বোঝাপড়া করা যাক।

সুধার ঘরের দিকে এগোল সুজিত। দরজা ভেজানো। সরু ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। সুধা তাহলে ঘুমোয়নি এখনও।

সুজিত দরজায় আওয়াজ করলে।

কোনো সাড়া এল না।

আবার আওয়াজ করলে সুজিত। আরো একটু জোরে।

তবু সাড়া এল না।

অধৈর্য হয়ে দরজার কপাট দুটো খুলে দিলে সুজিত। শূন্য ঘর। সুধা নেই।

অস্থির হয়ে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল সুজিত। এপাশ—ওপাশ তাকাতে তাকাতে হঠাৎ টেবিলের ওপর তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ভাঁজকরা একখানি কাগজ রয়েছে। স্বর্ণময়ীর দেওয়া রুলি দু'গাছা চাপা দেওয়া। তারই পাশে পড়ে আছে সেই পোলিশ ভদ্রলোকের তোলা ফোটোর আধখানা। সুধার অংশটা নেই।

দম দেওয়া পুতুলের মতো হাত বাড়িয়ে সুজিত তুলে নিল ভাঁজ করা কাগজখানা। একখানা চিঠি:

শ্রীচরণেষু,

তোমাকে সব কথা নরেনদা জানাবার আগে আমিই জানিয়ে যাই। আমি জয়ন্তী নই। আমি তোমাদের কেউ নই। এতদিন আমি তোমাদের শুধু ঠকিয়েছি। তবু বিশ্বাস করো, তার চেয়ে বেশি ঠকিয়েছি নিজেকে। জয়ন্তী হয়ে পাবার উপায় নেই তোমাকে, সুধা হয়েও পাব না এ—জন্মে। আমার দুই জীবনই ব্যর্থ। তাই আজ শেষ করে দিয়ে যাচ্ছি এ মিথ্যে খেলা।

যাবার আগে মায়ের দরজার গোড়ায় প্রণাম করে গেলাম। বড় ইচ্ছে ছিল তোমাকেও একটা প্রণাম করে যাই। কিন্তু ভাগ্য আমাকে সে—ভিক্ষেটুকুও দিল না।

আমার অপরাধ ক্ষমা করতে পারবে না জানি। ভুলে যাবার চেষ্টা করো। হয়তো পারবে একদিন। আমার জন্যে ভেবো না। গঙ্গা—যমুনায় অনেক জল আছে। ইতি—

সুধা

চিঠি পড়া শেষ করে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুজিত। দেওয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম আর তার বুকের স্পন্দন বাজতে লাগল একই তালে। চলে গেল অনেকগুলি মুহূর্ত। হঠাৎ কে যেন ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিলে সুজিতকে। চিঠিখানা হাতে নিয়ে সে ছুটে বেরিয়ে এল বারান্দায়। চিৎকার দিয়ে উঠল, মা! মা! রঘুয়া!

দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন স্বর্ণময়ী। উৎকণ্ঠায় শুকনো মুখে বললেন, কি—কি হয়েছে সুজিত?

সুধা কোথায় জানো মা?

সুধা!

জয়ন্তী—জয়ন্তী কোথায়?

কেন, ঘরে নেই? সন্ধে থেকে তো ঘরেই ছিল দোর বন্ধ করে!

রুদ্ধশ্বাসে সুজিত বললে, সে নেই।

স্বর্ণময়ীর চোখে জল এসে পড়ল। উৎকণ্ঠায় বলে উঠলেন, নেই! তবে গেল কোথায়? সন্ধে থেকে আজ এসব কী কাণ্ড হচ্ছে বাড়িতে!

তাঁর পায়ের কাছে চিঠিখানা ছুড়ে দিয়ে সুজিত একরকম ছুটেই নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ির গোড়ায় রঘুয়া দাঁড়িয়ে।

বহুজী কোথায়, জানিস?

রঘুয়া বললে, তিনি তো খানিক আগে বেরিয়ে গেলেন।

কতক্ষণ আগে? সুজিতের নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে।

আধা ঘণ্টা হবে। আমি পুছলুম, কোথায় যাচ্ছেন? বহুজী বললেন, শিউ মন্দিরমে।

সুজিত আর দাঁড়াল না। একটু পরেই প্রচণ্ড গর্জন তুলে শিকারী কুকুরের মতোই বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে গেল হাড়সনখানা।

ফোর্টের কিছু দূরে এসেই ব্রেক কষলে সুজিত। তারপর গাড়ি থেকে নেমে এগোতে লাগল দ্রুত পায়ে। চোখের দৃষ্টি যথা সম্ভব তীক্ষ্ন করে তাকাতে লাগল চারপাশে।

অনেক রাতে একফালি চাঁদ উঠেছে আকাশে। ঝিমঝিমে জ্যোৎস্নায় কুয়াশা যেন গলে পড়ছে। ভালো করে ঠাহর হয় না কিছু। সব যেন আবছা।

এগিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে থেমে গেল সুজিত। যমুনার পাড় ঘেঁষে একটা ঢিবির ওপর কে যেন বসে না? গায়ে সাদা শাল মুড়ি দেওয়া।

লোকে যেমন করে প্রদীপ উস্কে দেয়, দৃষ্টিকে তেমনি আরও উজ্জ্বল করে তাকালে সুজিত। তারপর চিৎকার করে উঠল, সুধা!

মূর্তিটি কেঁপে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে এগোতে লাগল গঙ্গার দিকে।

গলা চিরে ডাকতে ডাকতে সুজিত ছুটল, সুধা! সুধা! সুধা!

মূর্তি আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে!

আরও জোরে ছুটল সুজিত।

সুধা—দাঁড়াও—সুধা!

হু—হু বাতাস আর জল—কলরোলে ভেসে গেল সুজিতের ডাক। হঠাৎ দিগদিগন্ত অনুরণিত করে অতি—পরিচিত একটা জলোচ্ছ্বাসের শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। এক সেকেন্ডের জন্যে হিম হয়ে গেল সুজিতের শরীরের রক্ত। তারপর চিৎকার করতে করতে তীরবেগে ছুটল সুজিত, আর এগিও না সুধা—দাঁড়াও! গঙ্গার পাড় ভাঙছে।

মূর্তি তবু এগিয়ে চলেছে।

আবার সেই জলোচ্ছ্বাসের শব্দ! সুজিত আর একবার চিৎকার করল, সুধা—এগিয়ো না—

সাদা মূর্তিটি ততক্ষণে গঙ্গার প্রায় তীরে এসে পৌঁছেছে। আর এক—পা এগোবার আগেই সুজিতের দু'খানা সবল বাহু তাকে তুলে নিয়ে পিছিয়ে গেল দশ—পনেরো হাত। আর সঙ্গে সঙ্গে নিশীথ—রাত্রির স্তব্ধতাকে খণ্ড খণ্ড করে প্রচণ্ড শব্দে ধসে পড়ল গঙ্গার খানিকটা পাড়।

সুধাকে নিয়ে যমুনার ধারে সেই ঢিবির কাছে সুজিত যখন এসে পৌঁছল, তখন সমস্ত শরীর তার ভিজে গেছে ঘামে। আর ভীরু পাখির মতন সুধার দেহটা নিশ্চেতন হয়ে আছে তার দুই সবল বাহুর মধ্যে। আস্তে আস্তে সুধাকে সে শুইয়ে দিলে ঢিবির ওপর। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে সেই নির্জন নদীতীরে খোলা আকাশের নিচে শেষ রাত্রির মরা জ্যোৎস্নার আলোয় সুধার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।

না, কোনো কালিমা নেই এ—মুখে। আলগোছে সুধার কপালে হাত রেখে মৃদু গলায় সুজিত ডাকলে, সুধা!

অতি ধীরে চোখ মেলে চাইলে সুধা। যেন অনেক ঘুমের পর জেগেছে।

সুজিত আবার ডাকলে, সুধা!

উঠে বসতে গিয়ে টলে পড়ছিল সুধা। সুজিত ধরে ফেললে দুই বাহু দিয়ে। বড় ক্লান্ত গলায় সুধা বললে, কেন মরতে দিলে না আমায়?

সুজিত বললে, তোমার মনকে এ প্রশ্ন কোরো, উত্তর পাবে। এখন বাড়ি চলো।

ক্লান্ত বিষণ্ণ চোখ দুটি তুলে তাকাল সুধা। বললে, বাড়ি? কেমন করে যাব? কোন পরিচয়ে?

তুমি সান্যাল বাড়ির বউ—এই পরিচয়ে। যে পরিচয় একদিন মিথ্যে ছিল, আজ তা সত্য হোক।

কিন্তু মা? মা আমার অপরাধ ক্ষমা করতে পারবেন?

সুন্দর একটু হাসি দেখা দিল সুজিতের মুখে। বললে, আমার মাকে তুমি ভালো করে জানো না সুধা, তাঁর ক্ষমায় তোমার সমস্ত অপরাধ ধুয়ে যাবে।

কোনো সাড়া দিলে না সুধা। সুজিতের দুই বাহুর আবেষ্টনে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল।

সেই মহাকাশের নিচে চুপ করে বসে রইল সুজিত। সুধা কাঁদুক। তার সমস্ত দুঃখ আর সমস্ত আনন্দ কান্নার জলে ধুয়ে নির্মল হয়ে উঠুক।

সকালের প্রথম রোদ এসে পড়েছে হাসপাতালের বারান্দায়।

অপারেশন থিয়েটার থেকে তোয়ালেয় হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন সার্জন। বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল বিজয় বিশ্বাস। তাড়াতাড়ি সার্জনের কাছে এসে দাঁড়াল। কোনো কথা বলতে পারলে না। দুই চোখে শঙ্কিত প্রশ্ন নিয়ে তাকালে শুধু।

সার্জন বললেন, বাঁ—দিকের দুটো পাঁজরই কেটে বাদ দিতে হল। গুলিটা আর আধ ইঞ্চিটাক সরে লাগলেই ফুসফুস ফুটো হয়ে যেত।

কাঁপা গলায় বিজয় বিশ্বাস বললে, বাঁচার আশা আছে তো?

তোয়ালেখানা নার্সের হাতে দিয়ে সার্জন বললেন, পেশেন্টের শরীর থেকে যে পরিমাণ রক্ত বেরিয়ে গেছে, তাতে বাঁচার কথা অবশ্য নয়। তবু ডাক্তারেরা শেষ অবধি আশা ছাড়ে না। তারপর কতকটা যেন নিজের মনেই বললেন, আশ্চর্য! মনে হয়, পেশেন্ট বেঁচে আছে শুধু অসাধারণ মনের জোরে।

বিজয় বিশ্বাস হঠাৎ পাগলের মতো বলে উঠল, ওঁকে বাঁচিয়ে রাখুন সার্জন। অন্তত আজ বিকেল অবধি বাঁচিয়ে রাখুন। ওঁর বাঁচা দরকার। ওঁর ছেলে আসছে।

আকাশের দিকে হাত দেখিয়ে সার্জন বললেন, আর্জিটা বড় ডাক্তারের কাছে জানান, হয়তো ফল হতে পারে।

নরেনের জ্ঞান ফিরেছে বিকেল পাঁচটা নাগাদ। তারপর থেকেই কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করছিল বুকের মধ্যে। মাঝে মাঝে কে যেন সজোরে চেপে ধরছে হৃৎপিণ্ডটা। অ্যানেস্থেটিকের মৃদু ঘোরে আর গভীর অবসাদে চোখ বুজে পড়েছিল সে। আধো ঘুমন্ত আধো জাগ্রত চেতনার মাঝে হঠাৎ সে শুনতে পেল, বড় চেনা বড় মিষ্টি গলায় কে যেন ডাকছে, বাপি!

চোখ মেলল না নরেন। আবার ডাক এল, বাপি! ও বাপি!

এবার যেন আরও কাছে, আরও স্পষ্টভাবে।

ভারি চোখের পাতা দুটো জোর করে খুলে তাকাল নরেন। আর সঙ্গে সঙ্গে রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখখানা তার আনন্দের আভায় ঝলমল করে উঠল। পলি আর টুটুল দাঁড়িয়ে! তার একান্ত কাছে, তার চোখের সামনে। ওরা সত্যিই এসেছে!

টুটুল বললে, শুয়ে আছো কেন বাপি, অসুখ করেছে?

নরেনের ফ্যাকাশে মুখে একটুকরো হাসি দেখা দিল। তার এতদিনের অভ্যস্ত যান্ত্রিক হাসি নয়। এ হাসি যেন সকালের প্রথম রোদের আভা। মায়া মমতা আর ভালোবাসায় উজ্জ্বল।

হেসে নরেন বললে, অসুখ করেছিল। এখন ভালো হয়ে গেছে।

খুশি হয়ে টুটুল বললে, ভালো হয়ে গেছে? তবে আমার সঙ্গে বাড়ি যাবে?

হাসি মুখে নরেন বললে, যাব।

আর পালিয়ে যাবে না?

না।

অত্যন্ত খুশি হয়ে টুটুল তার কচি মুখখানা নরেনের গালে ঠেকিয়ে বলে উঠল, তুমি খুব ভালো ছেলে বাপি। একটুও দুষ্টু না।

থেমে থেমে নরেন বললে, তোমার জন্যে কি এনেছি জানো টুটুল?

লাফিয়ে উঠল টুটুল: কি? কি এনেছ? দেখি—

নরেনের বেডের পাশে মিট—সেফের ওপর একটা বড় বাক্স রাখা ছিল। চোখের ইসারায় পলিকে সেটা দেখিয়ে নরেন বললে, ওটা ওকে দাও।

বাক্স থেকে বেরোল দম—দেওয়া একটা রঙিন রেলগাড়ি। লাইন সমেত।

ত্বর সইল না টুটুলের। মেঝের ওপর গোল লাইন পেতে দম দিয়ে সে ছেড়ে দিল রেলগাড়ি। তারপরে খুশিতে চিৎকার করে উঠল, কি সুন্দর চলেছে দেখো বাপি!

নার্স ছুটে এল বাধা দিতে। নরেন বললে, প্লিজ সিস্টার, ওকে দেখতে দাও।

এবার পলির দিকে তাকিয়ে নরেন বললে, বসো।

ছোট টুলটার ওপর বসল পলি। ঠোঁট দুটো থরথর করছে। দুই চোখ জলভরা মেঘের মতো থমথমে।

নরেন বললে, তোমাকে ডেকেছি টুটুলকে একবার দেখব বলে। তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি, কিন্তু টুটুলকে ভালোবেসেছি। তাই ওকে ফিরিয়ে দিলাম তোমার কাছে।

ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল পলির দু'গাল বেয়ে।

নরেন আবার বললে, তিন বছর আগে যদি টুটুলকে পেতাম, আমার জীবনটা বদলে যেত। টুটুলের মা বলে তোমাকেও হয়তো ভালোবাসতে পারতাম! ছেলে এমন জিনিস পলি যে মরতে বসেও বাঁচবার সাধ হয়।

নরেনের বেডে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠল পলি। কি যেন বলতে গিয়ে বলতে পারল না নরেন। ধীরে ধীরে চোখ বুজলে। বুকের ভেতর সেই অস্বস্তিটা ক্রমেই বাড়ছে।

ঘুরতে ঘুরতে রেলগাড়িটা থেমে গিয়েছিল। মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে টুটুল ইঞ্জিনে দম দিতে শুরু করলে। চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে কট করে একটা শব্দ হল। লাইনের ওপর ইঞ্জিনটাকে রেখে দিয়ে টুটুল বলে উঠল, ওই যা! রেলগাড়িটা আর চলছে না বাপি!

কোনো উত্তর এল না নরেনের কাছ থেকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%