প্রণব রায়
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এসে যেখানে পার্ক স্ট্রিটে মিশেছে, ঘটনাটা ঘটল সেইখানেই।
চৌরঙ্গির মোড়ে গোল্ড ফ্লেকের ঘড়িতে তখন দুটো কাঁটাই বারোটার ঘরে। শীতের রাত। শহরের এদিকটা ফাঁকা বলে ধোঁয়ার উৎপাত নেই। শুধু হিমে ভেজা কুয়াশার পার্ক স্ট্রিটের ছবিটা ঝাপসা ফোটোগ্রাফের মতো অস্পষ্ট। লোক নেই পথে। থাকবার কথাও নয়, হোটেল—'বার' আজকাল বন্ধ হয় দশটায়। জনহীন রাস্তায় শুধু ফিরিঙ্গি পাড়ার এক আধটা মুসলমান দালাল পথভোলা মাতাল শিকারের জন্যে ওত পেতে জেগে আছে। আর জেগে আছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ের কাছাকাছি একটা গাড়ি—বারান্দার থামে হেলান দিয়ে কালো ওভারকোট ঢাকা বিটের পুলিশ। জেগে আছে বলাটা অবশ্য ঠিক হবে না, গাড়ি—বারান্দার থামে ঠেস দিয়ে ঝিমুচ্ছে।
ঘটনাটা ঘটল ঠিক তখনই। চৌরঙ্গির মোড়ে গোল্ড ফ্লেকের ঘড়িতে কাঁটা দুটো যখন বারোটার ঘরে। চমকে উঠে বিটের পুলিশ তাকাল। না, ভুল শোনেনি সে। পার্ক স্ট্রিটের নিশুতি নির্জনতা চিরে দিয়ে একটা মেয়ে—গলার চিৎকার উঠেই থেমে গেল হঠাৎ। অমানুষিক ভয় আর যন্ত্রণার আওয়াজ। কিন্তু থেমে গেল কেন? চমকে উঠে তাকাল বিটের পুলিশ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুখ তুলল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ে চারতলা ম্যানসনটার দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে চারতলার একটা খোলা জানলা—পথে টুক করে আলো নিভে গেল।
হুইসল বের করে বিটের পুলিশ তাতে ফুঁ দিলে। চৌরঙ্গির মোড় থেকে তার জবাব শোনা গেল। আর, শোনা গেল পিচের রাস্তায় আর একজোড়া ভারী বুটের আওয়াজ। জুড়িদার কনস্টেবল ছুটে আসছে।
ফট ফট করে খুলে গেল আশপাশের বাড়ির জানালা দরজাগুলো। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠল বাতি। আর খোলা জানলা—দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ত্রস্ত উদ্বিগ্ন কতকগুলো মুখ।
কি, কি হয়েছে? কি হল?
কার চিৎকার?
পুলিশের বাঁশি বাজে কেন?
কি হয়েছে সেপাই?
খোলা দরজা—জানলাপথে মুখগুলো পরস্পরকে টুকরো টুকরো প্রশ্ন ছুড়ে মারে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে কেউ কেউ শীতের রাতের আরামকে অগ্রাহ্য করে নেমে আসে ফুটপাথের ওপর। জনতার শোরগোল ওঠে রাস্তায়। চৌরঙ্গি থেকে জুড়িদার পুলিশ ততক্ষণে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মোড়ে এসে পড়েছে। ম্যানসন বাড়িটা লক্ষ্য করে দুই পুলিশ ছুটল। পেছনে জনতা।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের উল্টো দিকের ফুটপাথ ঘেঁষে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিল কালো রঙের একখানা ট্যাক্সি। সামনের সিটে গুটিসুটি মেরে আরামে ঘুম দিচ্ছিল ড্রাইভার। পুলিশের বাঁশি আর জনতার শোরগোলে সেও জেগে উঠল ধড়মড় করে'। স্টার্ট দিয়ে বসল ইঞ্জিনে। কে জানে কি হয়েছে! ঝামেলার জায়গা থেকে সরে পড়াই ভাল।
কিন্তু ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়েও সে যায় না কেন? দু'চোখে সজাগ দৃষ্টি নিয়ে কেন তাকিয়ে থাকে ম্যানসন—বাড়িটার দিকে?
ম্যানসনের চারতলায় দুটো ফ্ল্যাট। সিঁড়ির বাঁ দিকের ফ্ল্যাটের একটা ঘরে যমুনা লালা তখন তাড়াতাড়ি গরম কোটটা গায়ে চাপাচ্ছে। আওয়াজটা সেও শুনেছে। অমানুষিক ভয় আর যন্ত্রণার চিৎকার। সিঁড়ির ডান দিক থেকে, শোভা ইম্যানুয়েলের ঘর থেকেই আওয়াজটা আসছে মনে হল। আধো ঘুমন্ত আধো জাগা চেতনার মাঝে চিৎকারটা শুনে যমুনা কিছুক্ষণ কাঠ হয়ে পড়েছিল বিছানায়। তারপর স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে কাঁপা হাতে গরম কোটটা গায়ে চাপিয়ে দরজা খুলে বারান্দার বেরিয়ে এল সে। কি হল শোভা ইম্যানুয়েলের? মাঝরাতে এমন চিৎকার করে উঠে হঠাৎ থেমেই বা গেল কেন?
বারান্দায় বেরিয়ে এক সেকেন্ডের জন্যে থতিয়ে গেল যমুনা। সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ। খুট করে টিপে দিলে সিঁড়ির বাতির সুইচ। তারপর দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল যমুনা। জুতোর আওয়াজটা ততক্ষণে চারতলা আর তিনতলার মাঝামাঝি নেমে গেছে। সিঁড়ির মাথা থেকে মুখ বাড়িয়ে যমুনা শুধু দেখতে পেল সবুজ চেক টুইডের কোন পরা চওড়া পিঠ আর উড়ন্ত লাল টাই। মুখ নিচু করে লোকটা দ্রুতবেগে নিচে নেমে যাচ্ছে। দোতলা পর্যন্ত দেখা গেল লোকটাকে। সবুজ টুইডের কোট আর উড়ন্ত লাল টাই। তারপর একতলার অন্ধকারে চকিতে মিলিয়ে গেল লোকটা।
ওপরে দাঁড়িয়ে যমুনা যখন কি করবে ভাবছে, লোকটা তখন একতলায় নেমে এসেছে। মাত্র দশ গজ দূরে সদর—দরজা। হুড়মুড় করে খুলে গেল। ঢুকে এল দুজন কনস্টেবল, তার পেছনে কৌতূহলী জনতা। অন্ধকারে ছায়ার মতো সরে গেল লোকটা সিঁড়ির তলায়। তারই মাথার ওপর দিয়ে অনেকগুলো ব্যস্ত পায়ের শব্দ ক্রমশ উঠে গেল ওপরে।
আস্তে আস্তে মুখ বাড়াল লোকটা। তারপর খোলা সদরপথে সাঁ করে বেরিয়ে গেল রাস্তায়। সেই চওড়া পিঠ, সবুজ চেক টুইডের কোট আর লাল টাই। ফাঁকা রাস্তা। কালো রঙের ট্যাক্সিখানা ও—ফুটপাথে তখনও দাঁড়িয়ে। মৃদু হৃদকম্পনের মতো ধকধক শব্দে ইঞ্জিন চলছে তখনও।
পেছনের দরজা খুলে উঠে বসল সবুজ টুইডের কোট, লাল টাই। আওয়াজ হল গিয়ার টানার। ঝাপসা ফোটোগ্রাফের মতো কুয়াশায় অস্পষ্ট পার্ক স্ট্রিটের বুকে আরও অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল কালো রঙের ট্যাক্সি।
অনেকগুলো ব্যস্ত পায়ের শব্দ উঠে এল ওপরে, চারতলায়। সিঁড়ির মাথায় যমুনা তখনও দাঁড়িয়ে। রুদ্ধশ্বাসে বললে, ওই দিকে। বলে, ডান দিকে আঙুল দেখালে: শিগগির চলুন।
যমুনা নিজেই এগোল। সিঁড়ির ওপাশেও দু'কামরার আর একটা ফ্ল্যাট। প্রথম ঘরখানা বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ঘরখানার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল যমুনা। ঘরখানা একেবারে রাস্তার ওপরে। শোভা ইম্যানুয়েলের শোবার ঘরও বটে, ড্রয়িংরুমও বটে। অন্ধকার। দরজার কপাট দুটো হাটখোলা। ঘরের মধ্যে সমমাত্রিক ছন্দে একটা চাপা আওয়াজ ক্রমাগত উঠছে—ঘস— ঘস—ঘস—
ওই অন্ধকারের ভেতর গুহাবাসী শ্বাপদের মতো কি ভয়ঙ্কর রহস্য অপেক্ষা করছে কে জানে! ঘস ঘস চাপা আওয়াজটা কি তারই থাবা আস্ফালন?
মুখ ফিরিয়ে যমুনা একবার তাকাল কনস্টেবলদের মুখের দিকে। তারপর খানিক সাহস সঞ্চয় করে ঢুকে গেল তারা ঘরে। স্তম্ভিত জনতা দাঁড়িয়ে রইল দোরগোড়ায়। দরজার পাশেই সুইচ বোর্ড। আন্দাজে হাত বাড়ালে যমুনা। জ্বলে উঠল জোরালো বাতি। আর সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ন শিসের মতো একটা চিৎকার দিয়ে বুড়ো হ্যারি সাহেবের গায়ের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল যমুনা।
খাটের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটি মেয়ের দেহ। মাথাটা ঝুলে পড়েছে খাটের বাইরে। হ্যাঁ—করা মুখের কষ বেয়ে সরু একটু রক্তের ধারা। খোলা চোখে আতঙ্ক আর বিভীষিকা। ঠোঁটের লাল রঙ আর বাঁ দিকের আঁকা ভ্রূর খানিকটার মুছে গেছে। মেয়েটির বয়েস পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে। শরীরের বাঁকাচোরা রেখায় রেখায় বন্য যৌবনের প্রকাশ।
কিন্তু ঘস ঘস আওয়াজটা সত্যিই কোনো গুহাবাসী শ্বাপদের নয়।
ঘরের কোণে একটা গ্রামোফোন মেশিন থেকে তখনও সেই আওয়াজটা উঠছে। বিলিতি অর্কেস্ট্রার একখানা রেকর্ড চাপানো হয়েছিল। বাজনা ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু মেশিনের দম ফুরোয়নি তখনও। সাউন্ড বক্সের নিডলটা লেবেলের কাছে সরে এসে একঘেয়ে একটানা আওয়াজ তুলছে।
খবর গেল পার্ক স্ট্রিট থানায়। আধ ঘণ্টার ভেতরেই এল পুলিশ অফিসার। দেখা গেল মেয়েটির গলা ঘিরে সরু কালশিটে দাগ। আর, পাওয়া গেল একটা সোফার পায়ের কাছে গোল্ড ফ্লেকের খালি প্যাকেট আর গোল করে ফাঁস বাঁধা তার সোনালি রিবনটা।
মেয়েটি কে? পুলিশ অফিসার প্রশ্ন করলেন।
দোতলার বাসিন্দা বুড়ো হ্যারি সাহেব বললেন, শোভা ইম্যানুয়েল।
পেশা।
নাচওয়ালী। শোভা ইম্যানুয়েল কি—
ঠান্ডা গলায় ইন্সপেক্টর বললেন, হ্যাঁ, মারা গেছেন।
গ্রামোফোন মেশিন থেকে ঘস ঘস আওয়াজটা আর শোনা যাচ্ছে না। দম ফুরিয়ে গেছে মেশিনটার।
পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করল প্রতিবেশী জনতা। বুড়ো হ্যারি সাহেবের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল যমুনা। মারা গেছে, শোভা ইম্যানুয়েল মারা গেছে। খুন হয়েছে সে। এ ধরনের মেয়েদের শেষ অবধি যা হয়।
ইন্সপেক্টর এগিয়ে এলেন জনতার সামনে : এ ঘরে কাউকে দেখেছেন আপনারা? আসতে বা বেরিয়ে যেতে?
নিজেকে তখন অনেকটা সামলেছে যমুনা। মুখ তুলে বললে, আমি দেখেছি।
আপনি কে?
যমুনা লালা। বাঁ দিকের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা।
পেশা?
ইন্ডিয়া ব্যাঙ্কের স্টেনো।
কি দেখেছেন?
চারতলা থেকে একজনকে নেমে যেতে দেখেছি।
কখন?
আধঘণ্টা আগে। গরম কোটের আস্তিন দিয়ে চোখের জলটা মুছে নিলে যমুনা। তারপর বললে, শোভার ঘর থেকে একটা চিৎকার শুনে আচমকা আমার তন্দ্রা ভেঙে যায়। গরম কোটটা গায়ে চাপিয়ে তাড়াতাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে পড়ি। শোভার ঘরের দিকে এগোতে গিয়ে সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পাই। আলো জ্বেলে দেখলাম একটা লোক সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।
চেনা লোক?
না, আমার চেনা নয়। যদিও শোভার অনেক বন্ধুকেই আমি দেখেছি।
চেহারা কেমন?
তাও বলতে পারি না। মুখখানা দেখতেই পাইনি। পেছন ফিরে দ্রুত পায়ে নেমে যাচ্ছিল সে। চোখে পড়ল শুধু একখানা চওড়া পিঠ, সবুজ চেক টুইডের কোট আর উড়ন্ত লাল টাই...দরজাটা ভেজিয়ে দেবেন ইন্সপেক্টর?
দরজার কপাট দুটো টেনে দিল ইন্সপেক্টর। চোখের আড়াল হয়ে গেল শোভা ইম্যানুয়েলের মৃতদেহ।
গোল্ড ফ্লেকের ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা।
ঠিক রাত দেড়টায় একখানা ট্যক্সি ঢুকল টালিগঞ্জের রূপালি স্টুডিয়োর ফটকের মধ্যে। থামল এসে দু—নম্বর স্টেজের সামনে। ভাল করে থামবার আগেই দরজা খুলে নেমে পড়ল প্যাসেঞ্জার। গায়ে সবুজরঙ টুইডের কোট আর লাল টাই।
ক্যাপস্টানের টিন হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল এক ছোকরা।
কি ব্যাপার কুন্তলদা? এত দেরি যে?
ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিতে দিতে লোকটি জবাব দেয়, হয়ে গেল একটু দেরি। সাউন্ড রেডি?
রেডি। ক্যাপস্টানের টিন খুলে লোকটার সামনে ধরল ছোকরাটি। একটা তুলে নিয়ে লোকটি বললে, দু' প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক আনিয়ে দাও বিপিন।
ফ্লোরের মধ্যে ঢুকে গেল লোকটি। বাইরে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়েছিল সাউন্ড ভ্যান। ব্যবস্থাপক বিপিন হন্তদন্ত হয়ে সেখানে গিয়ে দেখে রেকর্ডিস্ট আলোয়ান মুড়ি দিয়ে আরামে নিদ্রামগ্ন।
উঠুন সত্যেনদা, কুন্তলদা এসে গেছেন। উঠুন।
আড়ামোড়া ভেঙে রেকর্ডিস্ট প্রশ্ন করেন, কে এসেছেন?
কুন্তল চ্যাটার্জি। মিউজিক ডাইরেক্টর।
রেকর্ডিস্ট সত্যেনের মুখে বিরক্তি দেখা দিল : এসেছেন? রাতটা কাবার করে এলেই তো পারতেন!
তাই বটে। রাত কাবার হতে ক'ঘণ্টাই বা বাকি? কুন্তল চ্যাটার্জি আজ ভীষণ লেট করে ফেলেছে। অথচ লেট তার কখনও হয় না। ঠিক সময়ের আগে পৌঁছনোই তার অভ্যাস। রাত এগারোটায় ছিল আজকের প্রোগ্রাম। কে জানত দু'ঘণ্টারও বেশি দেরি হয়ে যাবে।
ফ্লোরের মধ্যে ঢুকল কুন্তল চ্যাটার্জি। ঝলমল আলোয় ভেতরটা দিন হয়ে গেছে। মাইক্রোফোনের সামনে অর্ধচন্দ্রাকারে বাজিয়ের দল বসে আছে। একধারে এই শীতের রাতেও সঙ্গীত পরিচালক কুন্তল চ্যাটার্জির অনুরাগিণী আর অনুরাগীদের ভিড়। অনেক স্যুট আর শাড়ির রঙের ছটায়, অনেক অলঙ্কারের ঘটায় আর প্রসাধনের চটকে সে জায়গাটা মরশুমি ফুলের প্রকাণ্ড একটা স্তবকের মতো দেখাচ্ছে।
মৌচাকের মতো সারা ফ্লোরটা গুঞ্জরিত হচ্ছিল। কুন্তল ঢুকতেই চুপচাপ। নড়েচড়ে বসল বাজিয়েরা। মাইক্রোফোনের ওপাশে অল্প উঁচু একটা ফ্ল্যাটফর্ম। দৃঢ় পা ফেলে ফেলে কুন্তল সোজা এসে দাঁড়াল তার ওপর। কে একটু হাসল, কে বিনীত অভিবাদন জানাল, অন্তরঙ্গতার ভঙ্গিতে কে একটু এগিয়ে এল, আজ আর লক্ষ করল না। আজ সে কেমন যেন অন্যমনস্ক। হয়তো বা ডুবে আছে নিজের মধ্যে। নিজের কম্পোজিশনে, নিজের সুর—বিন্যাসের মাদকতায় বিভোর হয়ে আছে মনে মনে। তাই বোধ করি খেয়াল নেই কোনো দিকে।
অল্প উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াল কুন্তল। বাজিয়েদের মুখোমুখি। আশপাশের আলোগুলো এক এক করে নিভে এল। জ্বালা রইল শুধু দু'পাশে এক কিলো ওয়াটের দুটো ল্যাম্প। বাজিয়েরা যাতে নিজের নিজের নোটেশন খাতা দেখতে পায়। আর রইল কুন্তলের ওপর পাঁচশো পাওয়ারের একটা বাতি। অনেকটা থিয়েটারের স্টেজের ওপর আলোর ফোকাশের মতন।
নাটকের কোনো চরিত্রের মতোই দেখাচ্ছে কুন্তলকে। দীর্ঘ সরল দেহ। নামকরা দর্জির তৈরি কোটের গুণে কাঁধ দুটোকে দেখাচ্ছে পুষ্ট আর চওড়া। রঙ ফর্সা নয় কুন্তলের, তবে মাজাঘষার দরুন কালো বলাও চলে না। তীক্ষ্ন নাক আর চাপা ঠোঁটে এমন একটা বৈশিষ্ট্যের ছাপ যা পথে—ঘাটে সচরাচর। নজরে পড়ে না। চোখ দুটো একটু ছোটই বলতে হবে, কিন্তু মিশমিশে কালো আর উজ্জ্বল। বুদ্ধির দীপ্তি মাখানো। কুন্তলকে যারা প্রায়ই দেখে তারা জানে, সর্বদাই সে টিপটপ থাকে। আজ কিন্তু মুখের অন্যমনস্কভাবে, লালরঙের টাই—এর শিথিল ফাঁসে আর তার মাথার পিছনে ঠেলে দেওয়া এলোমেলো চুলে কেমন একটা ঝোড়ো—ঝোড়ো ভাব।
আধপোড়া সিগারেটটা প্ল্যাটফর্মের ওপর ফেলে দিয়ে জুতোর আগা দিয়ে পিষে ফেলল কুন্তল। তারপর স্বভাব—গম্ভীরস্বরে হাঁকলে, রেডি এভরিবডি?
যন্ত্রীদের কাছ থেকে জবাব এল, ইয়েস স্যার।
মনিটার!
বাইরে সাউন্ড ট্র্যাকে ফেডারে হাত রেখে সত্যেনবাবু ধড়মড় করে বলে উঠলেন, ইয়েস! সঙ্গে সঙ্গে অ্যামপ্লিফায়ার থেকে শোনা গেল সুন্দর একটা অর্কেস্ট্রা। সত্যেনবাবুর রোগাটে মুখে বিরক্তির চিহ্নটুকু মুছে যেতে লাগল। হাসি—হাসি মুখে তাঁর অ্যাসিসটান্টকে লক্ষ করে বলে উঠলেন, দেরি করে এলে কি হবে, কুন্তল চ্যাটার্জি মিউজিক যা কম্পোজ করেছে—জবাব নেই।
ফ্লোরের ভেতরে সেই অল্প উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে দুই বাহু আন্দোলিত করে কুন্তল তখন মিউজিক কনডাক্ট করছে। চারপাশের আবছা অন্ধকারের মধ্যে পাঁচশো পাওয়ার ল্যাম্পের একঝলক আলোয় জ্বলজ্বল করছে সবুজ রঙের চেক টুইডের একটা কোট আর লাল টাই।
অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল কুন্তলের।
অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেলা বলতে হবে বইকি! সাধারণত সে ঘুম থেকে ওঠে ছ'টা থেকে সাড়ে ছ'টার মধ্যে। আজ ঘড়ির কাঁটা ন'টার ঘর পার হয়ে গেছে। দোষ নেই কুন্তলের। গতকাল স্টুডিয়ো থেকে রেকর্ডিং সেরে ফিরতে ভোরই হয়ে গিয়েছিল। একটা ছবির সাত হাজার ফিট ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। নেহাত কুন্তল চ্যাটার্জি বলেই চার ঘণ্টায় সাত হাজার ফিট মিউজিক দিতে পেরেছে।
তোয়ালে হাতে কুন্তল বাথরুম থেকে বেরিয়ে যখন এল, দুধের ফেনার মতো সাদা রোদে বারান্দা ভরে গেছে। রোদ উজ্জ্বল অথচ নরম। সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই হাতে নিয়ে কুন্তল বারান্দায় বেরিয়ে এসে একটা বেতের চেয়ার দখল করলে, তারপর সিগারেট ধরালে একটা। এটা কুন্তলের সাম্প্রতিক অভ্যাস। কিন্তু ভালো করে একটা টান দেবার আগেই সিগারেটটার যেন পাখা গজাল হঠাৎ। এক নিমিষে উধাও হয়ে গেল মুখ থেকে।
কুন্তল মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে মিতালি। তার ডান হাতে চা, বাঁ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। কুন্তল হাসিমুখে বলল, হাতের কাছে ক্যামেরা থাকলে তোমার একটা স্ন্যাপ নিয়ে নিতাম। গোল্ড ফ্লেক সিগারেটের খুব চমৎকার একটা বিজ্ঞাপন হত। 'সঙ্গীত পরিচালক কুন্তল চ্যাটার্জির স্ত্রী শ্রীমতী মিতালি দেবী গোল্ড ফ্লেকই পান করেন।'
অল্প হাসিতে মিতালির পাতলা ঠোঁট দুটো কুঁড়ির দুটি পাপড়ির মতো খুলে গেল। বললে, আমি তো সিনেমার হিরোইন নই যে আমার নামে বিজ্ঞাপন বেরোবে। তারপরই ভুরু দুটো জোড়া ধনুকের মতো করে বললে, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই মুখে সিগারেট। ভয়ানক বাড়াবাড়ি শুরু করেছ তুমি!
জ্বলন্ত সিগারেটটা মিতালি অ্যাসট্রের মধ্যে গুঁজে দিল।
দু'চোখে একটি ইঙ্গিত নিয়ে গম্ভীর মুখে কুন্তল জবাব দিল, মুখে দেবার মতো আর কিছু তো হাতের কাছে পাই না, অগত্যা সিগারেটই মুখে দিই।
তেমনি ভুরু কুটিল করে মিতালি বলে উঠল, মিথ্যুক! বদনাম দেওয়া পুরুষের স্বভাব। তারপর বেতের টেবিলটার ওপর চায়ের পেয়ালা রাখতে রাখতে বললে, সত্যিই, গত কয়েক মাস ধরে সিগারেট খাওয়া তুমি ভীষণ রকম বাড়িয়েছ কিন্তু।
চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিয়ে কুন্তল সহজভাবে বললে একসঙ্গে অনেকগুলো ছবির কাজ পড়েছে কিনা, তাই নেশাটাও বেড়েছে। আবার কমিয়ে দেব, ভেব না। হ্যাঁ, আমার কোটের ভেতর পকেটে একখানা খাম আছে। বাণী চিত্রমের বাকি আড়াই হাজার টাকা। বের করে নাওগে।
মিতালি বললে, বের করে আর কি হবে। তুমি বরং দীপুর নামে ওই আড়াই হাজার টাকার সেভিং সার্টিফিকেট কিনে রাখো।
বেশ, তাই হবে। আমি তাহলে স্নানটা সেরে বেরিয়ে পড়ি।
চায়ের পেয়ালাটা শেষ করে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে কুন্তল বাথরুমে ঢুকল। ঢোকবার আগে নতুন সিগারেটটা স্ত্রীকে দেখিয়ে বলে গেল, রাগ কোরো না, এটা নেশা নয়, পারগেটিভ।
পুরো চল্লিশ মিনিট বাদে বাথরুম থেকে বেরোল কুন্তল, একেবারে দাড়ি কামানো, স্নান সেরে। বারান্দায় বেতের টেবিলে দু'জনের মতো ব্রেকফাস্ট সাজানো। সেদিকে তাকিয়ে কুন্তল বললে, একি! তুমিও এখন খাওনি?
রুটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে মিতালি তরলস্বরে বললে, আজ্ঞে না। মশাই খেতে না বসলে—
দু'মিনিটে আসছি। বলে কুন্তল ঘরে ঢুকে গেল।
ঠিক দু'মিনিট না হলেও কুন্তল তাড়াতাড়িই ফিরে এল বারান্দায় ব্রেকফাস্টের টেবিলে। তার দিকে একঝলক তাকিয়ে মিতালি বলে উঠল, এ রাম! এটা আবার পরলে কেন? এই সবুজ টুইডের কোট ছাড়া কি আর কোনো জামা নেই তোমার?
একটুকরো অমলেট মুখে ফেলে কুন্তল বললে, ঠিক আছে। এ বেলাটা এতেই কেটে যাবে। ক'দিন ধরে স্টুডিয়োর ধুলো খেয়েছে কোটটা। ও—বেলা কাচতে পাঠাব।
মিতালি বললে, ও—বেলা তুমি কিন্তু কোথাও বেরোতে পাবে না।
কেন বল দিকি? কোথায় যাবে? সিনেমা?
না।
দক্ষিণেশ্বর?
উঁহু!
তাহলে গীতাঞ্জলিদের বাড়ি নিশ্চয়ই?
তাও নয়।
কুন্তল একটু অবাক হয়ে বললে, তাও নয়? তবে?
অত্যন্ত নিরীহের মতো শান্ত গলায় মিতালি বললে, কোথাও যাব না তো!
হরি বল! তবে আমাকে থাকতে বলছ কেন?
তোমার সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে, তাই থাকতে বলছি।
হেসে কুন্তল বললে, যথা আজ্ঞা দেবী।
কখন ফিরবে তুমি?
পাঁচটার মধ্যেই আশা করছি।
আসবার পথে একটা জিনিস আনবে কিন্তু।
কি?
দুষ্টু—দুষ্টু মুখ করে মিতালি বললে, বলো তো কি?
ঘাড় নেড়ে কুন্তল বললে, আর ঠকতে রাজি নই। তুমি বলো।
চোখ নামিয়ে মিতালি বললে, বিশেষ কিছু নয়, ডজন দুয়েক গোলাপ ফুল।
গোলাপ ফুল? কেন, কি হবে?
মুখ নিচু করে কফির পেয়ালায় মিতালি তখন চিনি গুলছে। জবাব দিল না—মুখে মিটি মিটি হাসি।
হঠাৎ কুন্তলের চোখ—মুখ যেন রোদ লেগে ঝলমল করে উঠল : আজকে সাতাশে মাঘ, না মিতা?
মিতালি আস্তে আস্তে চোখ তুলল স্বামীর মুখের দিকে। চোখের তারায় আর ঠোঁটের কোণায় মিটিমিটি হাসি নিয়ে ঘাড় নাড়ল শুধু।
সাতাশে মাঘ কুন্তল—মিতালির বিয়ের তারিখ। মনে মনে হিসেব করলে কুন্তল, এই বছরেই সাত বছর পূর্ণ হবে তাদের বিবাহোৎসব। প্রতি বছর এই তারিখে তারা তিথি উদযাপন করে। এই উৎসব তাদের দুজনের, শুধু কুন্তল আর মিতালির। এই দিনটিতে তাদের দুজনের পৃথিবীতে আর কারও নিমন্ত্রণ নেই। নানান কাজের ঝামেলায় কুন্তলের মনে ছিল না, কিন্তু মিতালি ঠিক মনে রাখে। সারা বছর ধরে একটি একটি করে দিন গোনে বোধ হয় সাতাশে মাঘের জন্যে। উৎসবে কোনো বাহুল্য থাকে না। কুন্তলের প্রিয় দু—একটা রান্না আর মিতালির প্রিয় একগোছা গোলাপ ফুল। এই নিয়েই দুজনের উৎসব। আর তার সঙ্গে প্রথম বাসর রাত্রির কিছু পুরনো স্মৃতিকথা। সাতাশে মাঘ দুজনে অনেক রাত অবধি জেগে থাকে। তারপর পাশাপাশি এক বালিশে মাথা দিয়ে ফিস ফিস তন্দ্রাজড়ানো সুরে কথা বলতে বলতে এক সময় কথা যায় হারিয়ে। সাতাশে মাঘের রাত ভোর হয়ে যায়। ভোর হয়ে যায় নতুন বছরের আলোয়, যুগল—জীবনের সুখের মধ্যে।
সেই প্রথম বিয়ের রাত কুন্তলের মনে পড়ে বইকি! একুশ বছরের মিতালির কনে—চন্দন পরা সেই অপরূপ রূপসজ্জা। চোখে—মুখে সেই দুষ্টু হাসি আর লজ্জা। পরিচিত বরের কাছে সপ্রতিভ হবার চেষ্টা, অথচ কাছে এসেই চোখ বুজে ফেলা। কুন্তলের সব মনে পড়ে। মনে পড়ে আর হাসে সেদিনকার মিতালির কথা ভেবে। গোলাপ বরাবরই মিতালির প্রিয় ফুল। প্রিয় হবার কারণও আছে। ফুলশয্যার দিনে মিতালির মাসতুতো ভগ্নিপতি পাঠিয়েছিলেন একঝুড়ি গোলাপ। বাজার থেকে তাই আর কোনও ফুল কিনতেই হয়নি। সেই এক ঝুড়ি গোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছিল যুগলশয্যা। রাতে শুতে এসে কুন্তল বলেছিল, তুমি কোথায় মিতা।
পাঁচ পাওয়ারের মৃদু নীল বাতিটা ঘরে জ্বলছিল। মিতালি একটু অবাক হয়ে বলেছিল, এই তো আমি, খাটের ওপরে। দেখতে পাচ্ছ না?
কুন্তল বলেছিল, ও, হ্যাঁ, তুমিই বটে! ঘরে ঢুকেই কি দেখলাম জানো? অনেক গোলাপের মাঝখানে আর একটা মস্তবড় গোলাপ। ভাবলাম এও বুঝি মধুপুর থেকে এসেছে।
লজ্জায়—সুখে—আনন্দে মুখ রাঙা করে মিতালি বললে, এ গোলাপ শুধু তোমার বাগানেই ফুটেছে।
সেই থেকে মিতালীর প্রিয় ফুল হলো গোলাপ। বছরে শুধু একবার, একটা দিনই কুন্তলকে সে ফরমাস করে গোলাপ আনতে। সে তারিখটা হল সাতাশে মাঘ।
পরিপূর্ণ চোখে তাকাল কুন্তল মিতালি দিকে। শীতের রোদ পড়েছে মিতালির কমলা রঙের শাড়ির ওপর। তারই আভায় চিকচিক করছে মুখের বাঁ—দিকটা। আর বাঁ—চোখের বড় বড় পালকগুলি ছায়া ফেলেছে সুগৌর গালের ওপর। ধবধবে ছোট কপালে ছোট্ট একটি সিঁদুরের টিপ আর ফুরফুরে কয়েকগাছি রুখখু চুল। বিয়ের সাত বছর কেটে গেছে। একুশ বছরের মিতালি আজ আটাশ বছরের বধূ! মা হয়েছে মিতালি, কোলে এসেছে দীপু। তবু তেমনিই আছে সে। লম্বাটে সুগৌর মুখে তেমনি সুষমা, ছিপছিপে দেহলতায় তেমনি লাবণ্য। কুন্তলের বুক ভরে উঠল, মিতালি তেমনিই আছে। না ভুল হল। মিতালি আর আগের মতো নেই, আগের চেয়েও সুন্দর, আগের চেয়েও মধুর হয়েছে।
কিন্তু চোখ দিয়ে দেখেছে কুন্তল, মন দিয়ে দেখেনি। মনের ভেতরটা খুঁজে দেখলে ও বুঝতে পারত, আসলে সুন্দরতর হয়েছে মধুরতর হয়েছে মিতালির প্রতি ওর ভালোবাসা।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে কুন্তল উঠে পড়তেই মিতালি বললে, কোটের পকেটে টাকার খামটা রইল সাবধানে যেও কিন্তু। আর সকাল সকাল ফিরে এসো।
ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে কুন্তল বললে, তাই হবে। আমিও মনে করিয়ে দিয়ে যাই, বিকেলে আলতা পরো।
বারান্দার শেষে ফ্ল্যাটের প্রধান দরজা। কুন্তল সেদিকে এগোতেই ঘর থেকে ছুটে এল ছ' বছরের দীপু। এসে হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরল বাপের। কুন্তল নিচু হয়ে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললে, দাও।
বাপের গালে কচি কচি ঠোঁট দু'খানা ঠেকিয়ে দীপু প্রশ্ন করলে, কোথায় যাচ্ছ বাবু?
কুন্তল তার মাথার কোঁকড়া চুলগুলো আস্তে করে নেড়ে দিয়ে হালকা গলায় বললে, বড় হয়ে তুমি যাতে ইচ্ছেমতো টাকা ওড়াতে পার, সেই ব্যবস্থাই করতে যাচ্ছি বাবা।
কুন্তল আর দাঁড়াল না, আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে একবার ফিরে দেখলে, বারান্দার দরজার গোড়ায় দীপুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিতালি। অন্যদিন মিতালি একাই দাঁড়িয়ে থাকে। দীপু যায় ক্রিশ্চান স্কুলে বাসে চেপে। স্কুলের ছুটি বলে আজ দাঁড়িয়ে আছে মা—ছেলেতে একসঙ্গে। দেখতে ভারি সুন্দর লাগল কুন্তলের।
ছবিটা মনে মনে এঁকে নিয়ে সে নেমে গেল।
কত টাকার কিনবেন?
আড়াই হাজার!
ন্যাশনাল প্ল্যানিং সেভিং সার্টিফিটেক?
হ্যাঁ।
ইন্ডিয়া ব্যাঙ্কের গুজরাটি ম্যানেজার শঙ্করলাল হাসিমুখে বললেন, আপনাদের ফিল্ম লাইনে শুনতে পাই অপচয় আছে সঞ্চয় নেই। আপনাকে দেখে ধারণাটা বদলে গেছে মিস্টার চ্যাটার্জি।
হেসে কুন্তল বললে, কি জানেন শঙ্করলালজি, দশ বছরের বেশি কোনো আর্টিস্টই ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। তাই আমার মতো আরও অনেকেই দশ বছর পরের ভাবনাটা এখনই ভেবে রাখেন।
পেন্সিলটা হাতে নিয়ে শঙ্করলাল বললেন, সার্টিফিকেট কার নামে কেনা হবে? আপনার?
না, আমার ছেলে দীপেন চ্যাটার্জির নামে। যা জানবার আছে লিখে নিন।
খসখস করে চলল শঙ্করলালের হাতের পেন্সিল। তারপর লেখা থামিয়ে ঘণ্টা টিপতেই এল চাপরাশি। স্লিপটা তার দিকে এগিয়ে বললেন, মিস লালা।
হাতঘড়িটা একবার দেখলেন শঙ্করলাল। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, একটু বসুন মিস্টার চ্যাটার্জি, আসছি। ততক্ষণে আমার স্টেনো ফর্ম ভর্তি করে দিক।
কতক্ষণ বসতে হবে?—কুন্তল প্রশ্ন করল।
খুব বেশি হলে মিনিট দশেক।
আর একবার হেসে শঙ্করলাল বেরিয়ে গেলেন। ম্যানেজারের ঘরে একা বসে রইল কুন্তল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ সকালের সেই ছবিটা। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে মিতালি। হাসিভরা চোখ দুটি বলছে, শিগগির করে ফিরো কিন্তু। আর তারই কোলের কাছে একমাথা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীপু! আশ্চর্য! আজ সকালে এই ছবিটা দেখার পর থেকে সে মিতালিকে কিছুতেই আলাদা করে ভাবতে পারছে না। কোলের কাছে দীপু নইলে ছবিটা যেন কিছুতেই সম্পূর্ণ হয় না।
হাত আড়াল দিয়ে ছোট্ট একটা হাই তুলল কুন্তল। বেলা অবধি ঘুমোলেও রাত জাগার অবসাদটা এখনও যেন কাটেনি। চুপচাপ বসে থাকলেই সেই বিরক্তিকর অবসাদটা যেন চেপে ধরে। দশ মিনিট কি হয়নি এখনও? দশ মিনিট হতে কি দশটা মিনিটেরও বেশি সময় লাগে? একটা সিগারেট খাওয়া যাক। পকেট থেকে বেরোল গোল্ড ফ্লেকের আনকোরা প্যাকেট। অভ্যাসের বশে সোনালি বিরনটা খুলে নিল কুন্তল। তারপর অভ্যস্ত আঙুলে রিং তৈরি করে যখন বাঁধছে, ঠিক সেই সময়েই খুট খুট করে হাই হিল জুতোর মৃদু আওয়াজ হল।
ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাল কুন্তল। সুইংডোর ঠেলে ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে স্কার্ট পরা একটি মেয়ে। সাধারণ দোহারা চেহারা। কাঁধ অবধি খাটো ফাঁপানো চুল, হাতের নখে লাল রঙ। হাতে সার্টিফিকেটের ফর্ম। ব্যাঙ্কের কোনো কর্মচারী। স্টেনোও হতে পারে।
প্রায় পনেরো সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটি নিঃশব্দে। টকটকে লাল পুরু ঠোঁট দু'খানা কিছু বলার জন্যে ফাঁক হয়েই রইল। চোখের তারা দুটো একবার ঝিলিক দিয়ে উঠেই স্থির হয়ে গেল। পলক পর্যন্ত পড়ল না পনেরো সেকেন্ড ধরে। জ্যান্ত মানুষ হঠাৎ পুতুল হয়ে গেলে যেমন হয়।
শঙ্করলালজিকে খুঁজছেন?
অস্বস্তিকর নীরবতা কুন্তলই ভাঙলে প্রশ্ন করে।
হঠাৎ আবার নড়ে উঠল স্কার্ট পরা পুতুলটা। চোখে পড়ল পলক। অত্যুগ্র লাল ঠোঁট দু'খানা আরও একটু ফাঁক হয়ে প্রথমে ক্ষীণ আওয়াজ বেরোল 'হ্যাঁ'। তারপরে 'না'।
সোনালি রিঙটার মধ্যে তর্জনি ঢুকিয়ে ঘোরাচ্ছিল কুন্তল। আবার প্রশ্ন করলে, শঙ্করলালজি কখন ফিরবেন মনে হয়?
মেয়েটির কণ্ঠস্বরে কেমন যেন উৎসাহ প্রকাশ পেল, শঙ্করলালজি? এখনই আসবেন—এই এলেন বলে—আপনি যাবেন না যেন, বসুন—
বলতে বলতে সুইংডোর ঠেলে অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটি। আর সেইদিকে তাকিয়ে কুন্তল ভাবতে লাগল, দু'একটা 'স্ক্রু' ঢিলে আছে নাকি মেয়েটির মাথায়? কথাগুলো কেমন যেন এলোমেলো।
সোনালি রিবনের রিঙটাকে দু'আঙুলের টোকা দিয়ে কুন্তল ছুড়ে দিলে মাথার ওপর ঘুরন্ত পাখার দিকে। পাখার ব্লেডে লেগে রিঙটা ফিরে এল শঙ্করলালের টেবিলের ওপর। একটা সিগারেট ধরিয়ে আরাম করে টানল কুন্তল। আরও কতক্ষণ বসতে হবে কে জানে! ব্যাঙ্কের দশ মিনিট যে দশটা মিনিটে হয় না, এটা তার আগেই বোঝা উচিত ছিল। বেলা হলেও মিতালি আজ অন্তত কিছুতেই একা খাবে না। আশ্চর্য! সিঁড়ির মাথায় সেই ছবিটা আবার মনে পড়ে গেল কুন্তলের। মিতালির কোলের কাছে দীপু দাঁড়িয়ে। একমাথা ঝাঁকড়া চুলের নিচে কচি পাতার মতো টুলটুলে মুখখানি।
সহসা একটা সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল কুন্তল। কাকে সে বেশি ভালবাসে? মিতালি না দীপুকে? কখনও মনে হয়, তার মনের সবটাই দখল করে বসে আছে মিতালি; আবার কখনো মনে হয়, না, মিতালি তো নয়, দীপু। একটি মুখ ভাবতে গেলে আর একটি মুখ এসে আড়াল করে দাঁড়ায়। দীপু আসার পর থেকে মিতালির প্রতি তার ভালোবাসা কি কমে গেছে? মনে মনে কুন্তল অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগল। মিতালিকে কোনোদিন কম ভালোবাসবে কুন্তল, এটা যেন একটা চোরা অপরাধ। অথচ নিজের ছেলেকে—বিশেষ করে দীপুর মতো ছেলেকে না ভালোবেসেই বা উপায় কি! বড় কঠিন সমস্যায় পড়া গেল।
কিন্তু সিগারেটে টান দিতেই বুদ্ধি খুলে গেল। আরে দূর, দীপুকে ভালোবাসা মানেই তো মিতালিকে ভালোবাসা। দীপু আর মিতালি কি তফাত? দীপু তো মিতালিরই অংশ। সুতরাং তার ভালোবাসায় কম পড়েছে কোথায়?
অত্যন্ত সহজে অত্যন্ত কঠিন একটা সমস্যার সমাধান করে খুশি হয়ে উঠল কুন্তল। ধরাল আর একটা সিগারেট। আজকে কি কি জিনিস সওদা করতে হবে, মনে মনে একটা লিস্ট করে ফেলল। মিতালির জন্যে ডজন দুই গোলাপ ফুল। আর ঝাল দেওয়া কাজুবাদাম। দীপুর জন্যে 'ক্যাডবেরি' চকোলোট। আর তার নিজের জন্যে ভাল একটিন সিগারেট। ওহো, তার নিজের জন্যে আরও একটা জিনিস বিশেষ দরকার। কিছু মিউজিক পেপার। গোয়ানিজ বাজিয়েদের জন্যে নতুন ছবির একটা গানের সুর ইংরাজিমতে লিখে দিতে হবে। আচ্ছা, কেমন দাঁড়াল নতুন গানটার সুর? দু'হাত দিয়ে শঙ্করলালের টেবিলে মৃদু মৃদু তাল দিতে দিতে কুন্তল গুনগুন করতে লাগল গানের মুখড়াটা। মন্দ কি, ভালোই তো হয়েছে। কিন্তু অন্তরা? কোন পথে উঠবে?
পুড়তেই লাগল অ্যাশট্রেতে—রাখা গোটা সিগারেট। ডুবে গেল কুন্তলের মধ্যেকার শিল্পী সুরের নেশায়। বিচিত্র ছন্দে টোকা পড়তে লাগল শঙ্করলালের টেবিলে। আর দেয়ালের গায়ে ঘড়ির ডায়ালের বুকে মুহূর্তরা মরে যেতে লাগল এক—এক করে।
অন্তরাটা মনে মনে শেষ করে সঞ্চারীতে এসে পৌঁছেছে কুন্তল, এমন সময় তার পেছনে জুতোর আওয়াজ হল। একটি নয়, অনেকগুলি। ফিরে তাকিয়েই কুন্তল যেন পাথর হয়ে গেল। সুইংডোর ঠেলে স্কার্ট পরা মেয়েটি এবার একা আসেনি। সঙ্গে এসেছে একজন পুলিশ অফিসার, দুজন সার্জেন্ট। আর জনকয়েক কনস্টেবল।
কুন্তলকে দেখিয়ে পুলিশ—অফিসার বললেন, এই লোক?
স্কার্ট পরা মেয়েটি ভয় আর ঘৃণা মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল কুন্তলের দিকে। মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিলে, হ্যাঁ, এই লোক—একেই দেখেছিলাম গত রাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে! এই সবুজ—চেক কোট আর লাল টাই।
আপনার নাম?
যমুনা লালা, ইন্ডিয়া ব্যাঙ্কের স্টেনো।
কুন্তলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অফিসার বললেন, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে নর্তকী শোভা ইম্যানুয়েলকে হত্যা করার দায়ে আপনাকে আমি গ্রেফতার করলাম।
আশ্চর্য, একটিও জবাব দিলে না কুন্তল। শুধু চেয়ে রইল।
* * *
কুন্তলকে যখন কয়েদি—গাড়িতে তোলা হল, তখন বেলা প্রায় চারটে। ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক থেকে থানা, থানা থেকে পুলিশ হেড কোয়ার্টাস, তারপর সেখান থেকে ব্যাঙ্কশাল কোর্ট। পুলিশ তদন্তের সুবিধের জন্যে কুন্তলকে জামিন দেওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠল না। অতএব কোর্ট থেকে এখন চলেছে আলিপুর প্রেসিডেন্সি জেল।
শীতের ছোট দিন। এরই মধ্যে পড়ে আসছে। কালচে হয়ে আসছে শুকনো সূর্যমুখীর পাপড়ির মতো। কয়েদি—গাড়ি এসে থামল প্রেসিডেন্সি জেলের ফটকের সামনে। আরও ছ'জন কয়েদির সঙ্গে নামল কুন্তল। সহযাত্রী কয়েদিদের দুজন এসেছে চুরির দায়ে, দুজন দাঙ্গা আর ডাকাতির অভিযোগে। একজন নারীহরণ, আর একজন খুনের অপরাধে। এদের মধ্যে কুন্তল এতই বেমানান যে ফটকের বুলডগ—মুখো সার্জেন্টটি পর্যন্ত কয়েক মহূর্ত তাকিয়ে রইল তার দিকে। চার্জশিটের কাগজখানা আর একবার ভাল করে দেখল, লেখা রয়েছে ৩.২ আই পি সি। অর্থাৎ নিছক নরহত্যা। বুলডগ—মুখো সার্জেন্ট নাক দিয়ে ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করল শুধু। তার মানে সার্জেন্ট প্রকৃতই বিস্মিত হয়েছে।
কয়েদিদের দেহ একে একে তল্লাশি করে ভেতরে চালান করে দেওয়া হল। এই পড়ন্ত বেলার আবছা অন্ধকারে মনে হল, প্রকাণ্ড জেলখানাটা একটা প্রাগৈতিহাসিক অতিকায় জন্তুর মতো মুহূর্তের জন্যে হাঁ করেই একসঙ্গে সাতটা প্রাণীকে গ্রাস করে নিলে। ভেতরে যেতে যেতে কুন্তল শুনতে পেল লোহার গেট বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। ক্ষণকালের জন্যে কুন্তলের সমস্ত শরীর হিম হয়ে এল। ওই লৌহ—কপাটের বাইরে পড়ে রইল আলো—হাসি—গানের জগৎ। সে চলে এল অন্ধ কারার গর্ভে। তার জীবনে ওই লৌহকপাট আর কোনোদিন খুলবে কি? পেছন থেকে মৃদু ধাক্কার সঙ্গে একটা কথা কানে এল, চলেন বাবু!
কয়েদিদের লাইনে কুন্তল আবার এগোয়।
ডেপুটি—জেলারদের অফিস—ঘর পার হয়ে একটা বাঁধানো সড়ক। সেই সড়কের বাঁ দিকে 'চুয়াল্লিশ ডিগ্রি'। ইংরাজিতে যাকে বলে কনডেমড সেল। অর্থাৎ ফাঁসির আসামিদের ঘরে। সেগুলো ছাড়িয়ে সড়কটা ডান দিকে ঘুরে যেখানে গেছে, সেইখানেই 'বড় হাজত'। বড় হাজত মানে একদিকে ইটের দেয়াল, আর তিন দিকে মোটা মোটা লোহার শিক দিয়ে ঘেরা লম্বা—চওড়া একটা খাঁচা—মানুষ—জন্তুদের পুরে রাখার জন্যে। সেই বিচিত্র খাঁচার মধ্যে কুন্তলদের পুরে ওয়ার্ডার চাবি দিয়ে চলে গেল। খাঁচার মধ্যে আরও জন—পঁচিশ—তিরিশ মানুষ—জন্তু পোরা রয়েছে। বিচিত্র খাঁচার মধ্যে এক বিচিত্রতর জগতে এসে পড়ল কুন্তল। এরা ঠিক কয়েদি নয়, বিচারাধীন কয়েদি।
ডোরাকাটা হাফ প্যান্ট, খাটো কুর্তা আর কাপড়ের টুপি মাথায় ষণ্ডামার্ক চেহারার একজন কয়েদি মুরুব্বির মতো ভঙ্গিতে বললে, কি রে মতিলাল, আবার এয়েচিস? এই তো তিন মাস হয়নি, গেলি।
মতিলাল আজকের চালান। চুরির আসামি। মাড়ি শুদ্ধ দাঁত বার করে বললে, কি করি মেট, কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে জেলখানার ওপর।
মেট ফতেলাল আবার বললে, এই যে, গঙ্গাও এসেছ দেখছি! আরে বা! রঙ্গুও যে! আজ দেখছি সব পুরোনো ইয়ারদের আমদানি।
গঙ্গা নারীহরণ আর রঙ্গু দাঙ্গা—ডাকাতির আসামি। দুজনেই দাগি। ফতেলালকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলবে, বড় হাজতে 'দাগির' আমদানিই বেশি।
কুন্তলের দিকে নজর পড়তেই ফতেলাল দু'পা এগিয়ে এল তার কাছে। তার আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলিয়ে বললে, স্বদেশি তো? বোমা না পিস্তল?
কুন্তল শুধু বললে, না। তারপর সরে গিয়ে এক কোণে ক্লান্তভাবে বসল। আশেপাশে তখন কম্বল বিছানো শুরু হয়ে গেছে। রাতের আস্তানা। বাড়ি নয়, ঘর নয় জেলখানা। তবু তিন হাত জায়গা নিয়ে কাড়াকাড়ি। সমস্ত খাঁচাটা কয়েদির কলরবে একটা বড় ভীমরুলের চাকের মতো ভনভন করছে।
এগিয়ে এল মতিলাল। মাড়ি শুদ্ধ দাঁতগুলি বার করে বললে, বসে বসেই রাত কাটাবেন নাকি? নেন, কম্বলখানা বিছিয়ে ফেলুন। বলে নিজেই বিছিয়ে দিলে কোণ ঘেঁষে।
নোংরা কম্বলে বসতে কুন্তলের গা ঘিনঘিন করছিল। তবু একধারে বসল দেয়ালে হেলান দিয়ে। ক্লান্ত, অমানুষিক ক্লান্তি লাগছে তার।
মতিলাল বললে, পেথমবার আমারও অমন হয়েছিল বাবু। বড় হাজতে ঢুকে মনটা হু—হু করে উঠেছিল! কান্না পেয়ে গেছিল বউটোর জন্যে। নতুন আসামি হলে অমন ধারা হয়। তারপর দু'একবার এখানে আসা—যাওয়া করলে সব ঠিক হয়ে যায়।
অতি সহজেই অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে উঠল মতিলাল। বোধ হয় দাগি আসামি চরিত্রের এও একটা লক্ষণ।
খান বাবু।
চোখ বুজে কুন্তল আচ্ছন্নের মতো বসেছিল। চোখ মেলে দেখলে, মতিলালের হাতে সাদা কাগজে পাকানো সরু লম্বা একটা সিগারেটের মতো বস্তু।
টানুন, মৌজ হবে। মনে কোনো দুঃখু থাকবে না।
কি এটা? কুন্তল প্রশ্ন করলে।
আর একবার মাড়ি শুদ্ধ দাঁত দেখিয়ে মতিলাল বললে, আজ্ঞে চরস!
ও আমি খাই না মতিলাল।
তবে বিড়ি খাবেন? বিড়ি?
না।
দেশলাই বার করে মতিলাল অগত্যা নিজেই ধরিয়ে ফেললে চরসের বিড়িটা।
কুন্তল এদিক—ওদিক চেয়ে দেখলে, শুধু মতি নয়, যে যার কম্বলে বসে আরও অনেকেই মৌতাত শুরু করে দিয়েছে। চরসের কটু গন্ধ লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে সান্ত্রীদের নামে পৌঁছলেও তাদের বিন্দুমাত্র বিচলিত দেখা গেল না।
লাল কটাচুলো একটা জোয়ান এসে বসল কুন্তলের কম্বলে। পরনে ময়লা হাফ শার্ট আর কার্ডের ট্রাউজার। তামাটে ফর্সা মুখে অজস্র তিল। দু'হাতের কব্জির ওপর উল্কি দিয়ে নগ্ন মেয়ের ছবি আঁকা। এও আজকের চালান কুন্তলের সঙ্গে। আদালতে নাম শুনেছে পল জ্যাকসন, জাতে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, খুনের মামলার আসামি।
পল এসে বললে, গট ম্যাচিস বাবু?
উত্তরে কুন্তল শুধু ঘাড় নাড়লে।
মতি তার ট্যাঁক থেকে দেশলাইটা বের করে দিলে, এই লাও!
বিড়ি—সিগ্রেট কুছ হ্যায়?
মতির মাড়ি শুদ্ধ দাঁত আবার বেরিয়ে পড়ল। বললে, বা সাহেব, বেড়ে মজার লোক তো তুমি! দেশলাই নেই, বিড়ি—সিগ্রেট নেই, শুধু নেশার অভ্যেসটি নিয়ে খাতির জমাতে এসেছ? লাও, এটাতে দু'টান দিয়ে কেটে পড়ো।
আধ—খাওয়া চরসের বিড়িটা এগিয়ে দিলে মতিলাল। পল সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে বললে, থ্যাঙ্ক ইউ ইয়ার।
চুপচাপ বসে আছে কুন্তল। দুই চোখের দৃষ্টিতে গভীর অবসাদ। পল আর মতির এত কাছে বসেও সে যেন বহু দূরে।
চরসে টান দিয়ে পল বললে, হোয়াই মোরোজ বাবু? ঘাবড়া গিয়া কাহে?
কুন্তল পলের দিকে তাকাল। যেন কিছুই বুঝতে পারেনি, এমনি ভোঁতা নির্বাক সে দৃষ্টি।
মতি বললে, নতুন আসামি কিনা, তাই।
কিসের চার্জ? জালিয়াতি? অ্যাডাকসন?
তিনশো দুইধারা।
পল যেন খুশি হয়ে উঠল। বলল, ব্র্যাভো! এতে ঘাবড়াবার কি আছে? আমারও তো ওই চার্জ।
কুন্তল হঠাৎ অসহায়ের মতো বলে ফেললে, কোথা দিয়ে কি যে হয়ে গেল—ভাবতেও পারছি না!
পল বললে, নেভার মাইন্ড! মানুষ হয়ে জন্মালে দু'চারটে মানুষ খুন করতেই হয়। দিস ইজ দি ল অফ গড। কিছু ভেবো না ম্যান। ইট ড্রিঙ্ক অ্যান্ড রি মেরি।
চরসের প্রসাদে পলের মেজাজটা বোধ হয় খুবই খুলে গেল। হঠাৎ গলা ছেড়ে সে গান ধরলে :
লাভ মি, অর লিভ মি—
বাইরে থেকে সান্ত্রীর কড়া ধমক এল। প্রত্যুত্তরে অ্যাংলো ভাষায় একটা কুৎসিত গালাগালি দিয়ে উঠল পল। আর মাড়ি শুদ্ধ দাঁত বের করে হাসতে লাগল মতি।
আচ্ছন্নের মতো আবার চোখ বুঝলে কুন্তল। এখন, ঠিক এই মুহূর্তে পল আর মতির পাশে তাকে দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে কি সে কুন্তল চ্যাটার্জি, ভদ্রবংশের সন্তান, একজন নামকরা সুরকার, মিতালির স্বামী, দীপুর বাবা?
* * * *
তারপর একসময় নিশুতি হয়ে এল জেলখানার রাত্রি। নিস্তব্ধ হয়ে এল বড় হাজত। কয়েদিরা যে—যার কম্বলে শুয়ে চোখ বুজল! জেগে রইল কুন্তল। দেয়ালে তেমনি ঠেস দিয়ে, ক্লান্ত অবসন্ন ভঙ্গিতে বসে। ভাবতে চেষ্টা করল মিতালি এখন কি ভাবছে। খবরটা কি পেয়েছে সে? কে জানে! প্রতি বছরের মতো আজও কি সে জীবনের পুষ্পিত সাতাশে মাঘের রাত্রিকে মনে মনে স্বাগত জানাচ্ছে? না, ব্যর্থতায়, বেদনায়, লজ্জায়, ধিক্কারে অভিশাপ দিচ্ছে সাতাশে মাঘকে?
পাশের কম্বলে শুয়েছিল মতিলাল। কুন্তল হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে ডাকলে, মতি, ও মতি!
ঘুম চোখে উঠে বসল মতিলাল।
কুন্তল বললে, শুনতে পাচ্ছ, কিসের আওয়াজ বলো তো? নিশুতি রাত্রির বুকের ওপর দিয়ে একটা ভারী চলমান আওয়াজ যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে : ঝমর—ঝম, ঝমর—ঝম, ঝমর—ঝম—
হাই তুলে মতি বললে, ও 'দায়মলি'দের ডান্ডা—বেড়ির আওয়াজ! শালারা কালাপানি যাবে কিনা, তাই ঘুমোতে পারে না—সারারাত পায়চারি করে।
কালাপানি যাবে? কেন মতি? প্রশ্ন করতে গিয়ে কুন্তলের গলাটা যেন শুকিয়ে এল।
খুনি আসামি যে! সাজা হয়ে গেছে।
মতি আবার ধুপ করে শুয়ে পড়ে চোখ বুজল। আর আড়ষ্ট হয়ে রইল কুন্তল। তার মনে হতে লাগল, নিশুতি রাত্রির বুকের ওপর ওই চলমান ঝমর—ঝম—শব্দটা যেন ক্রমশ বাড়ছে। কয়েদখানার দেয়ালে দেয়ালে ঘা খেয়ে লৌহশৃঙ্খলের ওই বিশ্রী নিষ্ঠুর আওয়াজটা একটা রক্তপায়ী হিংস্র জন্তুর মতো গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে তার দিকে। যেন ঝাঁপিয়ে পড়বে তারই বুকের ওপর।
প্রাণপণে দুই কান চেপে ধরল কুন্তল।
* * * *
অতি বড় বেদনায় যেমন হাসি পায়, অতি বড় উৎকণ্ঠায় তেমনি ঘুমও আসে।
দীপুর পাশে জেগে থাকতে থাকতে মিতালির চোখের পাতা বুজে এল। আর সেই ফাঁকে কখন ভোর হয়ে গেল সাতাশে মাঘের ব্যর্থ বিড়ম্বিত রাত্রি। শুকিয়ে গেল চোখের অশ্রু। মুছে গেল চন্দন—কুমকুমের টিপ। মলিন হয়ে গেল পায়ের আলতা। বৃথাই পুড়ে মরল মিতালির সাধের কস্তুরী ধূপ খাটের শিয়রে। আর মিছেই পড়ে রইল কুন্তলের জন্যে সাধের রান্না।
সামনের দেয়ালে ক্যালেন্ডারের সাতাশে মাঘ তারিখটা ঠোঁট বেঁকিয়ে যেন মিতালিকে ব্যঙ্গ করতে লাগল। ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিলে মিতালি। মনে—প্রাণে যেন চাইল অন্ধকারের কালিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক তাদের বিয়ের তারিখ।
ঘুম ভাঙতে বেলা হল মিতালির। বেলা হওয়াই স্বাভাবিক। এ—ঘুম ক্লান্তির ঘুম। সকালে উঠে অভ্যাস মতো দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম বারান্দার টেবিলে রাখতে যাচ্ছিল মিতালি, হঠাৎ মনে পড়ে গেল কুন্তল নেই! কুন্তল আসেনি কাল সারারাত। আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনের আকাশ, দু'খানা করে চিরে গত দিনের একটা ঘটনা বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।
বেলা একটার থেকেই বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল মিতালি। এইবার এসে পড়বে কুন্তল। যাবার সময় বলে দিয়েছিল মিতালি, 'সকাল সকাল ফিরে এসো'। কতক্ষণ আর লাগে ব্যাঙ্ক থেকে সার্টিফিকেট কিনতে আর ফুলের দোকানে সওদা করতে? ঠাকুরটাকে আজ সকাল সকাল বিদেয় করে দিয়েছে মিতালি। রান্নার পাট চুকিয়ে স্নান সেরে এসেছে। আর্শির সামনে বসে কপালে পরেছে চন্দন কুমকুমের টিপ। পায়ে এঁকেছে আলতার রেখা। সাদা সাদা ফুলতোলা নীলাম্বরীর আঁচলে অল্প করে মেখেছে অনেক দিনের পুরোনো 'খস' আতর। এটুকু প্রসাধন মিতালি প্রায়ই করে। তবু আজ থেকে থেকে কেমন যেন লজ্জা করছে তার। কুন্তলের সেই একটু—বিস্ময়, একটু—হাসি, একটু মোহ—মাখানো চোখের দৃষ্টি কল্পনা করে কেমন একটা সুখকর অনুভূতি হচ্ছে তার।
কিন্তু এত দেরি হচ্ছে কেন কুন্তলের? সার্টিফিকেট না হয় না—ই কেনা হত আজ। না—ই হত গোলাপ ফুলের সওদা। সামান্য ক'টা গোলাপের জন্যে এত বেলা করার কি দরকার? বেলা করে বাড়ি ফেরাটা কুন্তলের সত্যিই স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। বিশ্রী লাগে মিতালির।
কিন্তু বেলা হতে হতে বেলাও ফুরিয়ে আসে একসময়। দুটো, তিনটে, চারটে। কতক্ষণ পরমায়ু শীতের বেলার? মিতালির ইচ্ছে হতে লাগল ঘড়ির কাঁটা দুটোকে চেপে ধরে। কুন্তলের ওপর শুধু রাগ—অভিমান নয়, কি একটা অনির্দেশ্য ভয় দলা পাকিয়ে মাঝে মাঝে আটকে যাচ্ছিল মিতালির গলার কাছে। কেন আসছে না কুন্তল? কোথায় গেল সে? সিঁড়িতে কার পায়ের আওয়াজ হল না? পড়ি—কি—মরি করে ছুটে গেল মিতালি। না, কুন্তল নয়, ডাক—পিয়ন। লেটার বাক্সে চিঠি ফেলে চলে যাচ্ছে। দড়াম করে কপাট দিয়ে ঘরে ফিরে এল মিতালি। ইচ্ছে হচ্ছিল, এক টানে খুলে ফেলে নীলাম্বরী, মুছে ফেলে চন্দন—কুমকুম, সাবান ঘষে তুলে ফেলে পায়ের আলতা। বছরে একটা মাত্র দিন, জীবনের পরম তিথি, তাও এমনি করে নষ্ট করে দেবে কুন্তল! মিতালির চোখ ফেটে জল আসতে গিয়ে থমকে থেমে গেল। সেই অনির্দেশ্য ভয়টা শুকনো পিণ্ডের মতো দলা পাকিয়ে গলার কাছটায় আবার আটকে ধরেছে। কুন্তল এখনও আসছে না কেন? কেন, কেন?
নড়ে উঠল দরজার কড়া। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল মিতালি। খুলবে না, এত সহজে সে দরজা খুলবে না কিছুতেই। সারাটা দিন যখন বাইরে থেকেছে, তখন কি দরকার দয়া করে এত সকাল সকাল ফেরবার?
আবার নড়ে উঠল দরজার কড়া। আরও একবার।
উঠতেই হল মিতালিকে। সারাটা দিন খাওয়া নেই দাওয়া নেই, বেচারিকে দাঁড় করিয়ে রাখাটা ঠিক হবে না। সারা মুখে রাগ—অভিমান আর চাপা হাসির ইন্দ্রধনুচ্ছটা নিয়ে দরজা খুলে দিল মিতালি।
আর সঙ্গে সঙ্গে সেই অনির্দেশ্য ভয় দলা পাকিয়ে তার শ্বাসনালীর কাছে আটকে গেল। এবারেও কুন্তল নয়, পুলিশ। একজন অফিসার আর জন জনকয়েক সাদা পোশাকে কনস্টেবল।
মাথাটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকিয়ে অফিসার প্রশ্ন করলে, কুন্তল চ্যাটার্জি আপনার কে হন?
স্বামী।—মিতালির গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ বেরোল।
কাল রাতে আপনার স্বামী কখন বেরিয়েছিলেন? মনে করে বলুন তো?
সাড়ে দশটা নাগাদ।
আর ফিরেছিলেন কখন?
ভোরবেলা।
তাঁর পরনে কি ছিল মনে আছে?
মিতালির কথা জড়িয়ে আসছে। তবু বললে, গ্রে ফ্লানেল ট্রাউজার সবুজ চেক টুইডের কোট আর লাল টাই।
'সবুজ কোট, লাল টাই'! পুনরাবৃত্তি করলেন অফিসার। আচ্ছা, আপনার স্বামী কোন সিগারেট ভালবাসেন? গোল্ড ফ্লেক?
মিতালি ঘাড় নেড়ে সায় দিলে। নোটবইয়ে টুকে নিতে লাগলেন অফিসার। হঠাৎ সেই অনির্দেশ্য ভয়ের পিণ্ডটা সরে গেল গলার কাছ থেকে। শুকনো গলায় মিতালি চিৎকার করে উঠল, কোথায় তিনি—বলুন—কি হয়েছে তাঁর?
নোটবইখানা পকেটে রাখতে ভয়ঙ্কর শান্ত গলায় অফিসার বললেন, কাল রাতে একজন নর্তকী খুন হয়েছে। আপনার স্বামী গ্রেফতার হয়েছেন সেই খুনের চার্জে।
মিতালির মনে হল, পায়ের নিচে মেঝেটা লিফটের মতো নিচে নেমে যাচ্ছে, কত নিচে, কে জানে! অনেক দূর থেকে ভেসে এল অফিসারের গলা : এক্সকিউজ মি। আপনাদের ঘরগুলো একবার সার্চকরতে চাই।
একপাশে সরে গিয়ে দরজার পথটা মিতালি ছেড়ে দিল। আশপাশের ফ্ল্যাট থেকে কয়েকজন সাক্ষী নিয়ে পুলিশের দল ভেতরে ঢুকে গেল। কতক্ষণ পরে তারা বেরিয়ে গিয়েছিল, মিতালি তা জানে না। শীত—সন্ধ্যার অন্ধকার তখন কালো দুশ্চিন্তার মতো ঘনিয়ে এসেছে। সেই অন্ধকারে দরজার কপাটে টেস দিয়ে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রইল মিতালি।
হয়তো ঠিক সেই সময় কুন্তলকে নিয়ে কয়েদি—গাড়ি পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্সি জেলের ফটকে।
লছমনের সঙ্গে পার্কে গিয়েছিল দীপু। ফিরে এসে মায়ের হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরতেই থর থর করে একবার কেঁপে উঠে হু—হু করে কেঁদে ফেলল মিতালি। স্নেহের উত্তাপে গলল কঠিন বেদনার তুষার।
ছেলেকে বুকে নিয়ে নতুন করে বুক বাঁধল মিতালি। আলো জ্বালল ঘরে। তারপর টেলিফোন করতে বসল ল্যান্সডাউন রোডের রমেন বোস, বার—অ্যাট—ল'কে।
* * *
বকুল বাগানের মোড় ছাড়িয়ে দু'পা দক্ষিণে গেলেই লাল রঙের একখানা বহু পুরাতন বাড়ি। ল্যান্সডাউন রোডের ঠিক ওপরেই। যতটুকু জমির ওপর বাড়ি, চারপাশে তার অনেক বেশি জায়গা আগাছার জঙ্গলে ভর্তি। সেই জঙ্গলের মাঝে মাঝে দু'চারটে আধভাঙা পাথরের মূর্তি বাড়িটির বিগত যৌবন দিনের সাক্ষ্য হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখন অবশ্য পৈতৃক আমলের এই জীর্ণ বাড়ি, আগাছা—ভর্তি কম্পাউন্ড আর হাল আমলের একটা টেলিফোন ছাড়া ব্যারিস্টার রমেন বোসের আর কিছুই নেই। কিন্তু ছিল আরও। খানতিনেক দামি মোটরকার, ব্যাঙ্কে গচ্ছিত লাখ দেড়েক টাকা। সে টাকার প্রায় সবটাই জলে গেছে। জলে মানে লাল জলে। টাকা গেলেও লাল জলের অভ্যেসটা কিন্তু এখনও যায়নি রমেন বোসের।
অত বড় বাড়িটায় একা থাকে রমেন বোস। বন্ধু—বান্ধবের বহু পরামর্শেও ভাড়া দিতে রাজি হয়নি। টাকার নিতান্ত অভাবে যেমন রাজি হয়নি হুইস্কি—ব্যাপারে স্কচের নিচে নামেত। রমেন বলে, আমার আভিজাত্য স্কচে।
দোতালার সব ঘরগুলোই বন্ধ থাকে। একতলার বিশাল ড্রয়িংরুমটাই এখন রমেনের আস্তানা। প্রতিদিনের মতো আজও স্কচের বোতল খুলে বসেছিল রমেন। 'বারে' খেতে অনেক খরচ পড়ে, তাই ঘরেই খেতে হয়। বাইরের অন্ধকার শীতের কুয়াশা আর হাসনুহানার গন্ধে মাখামাখি হয়ে আছে। গেলাসটা নামাল রমেন। অবাক হবারই কথা। সবাই জানে সন্ধের পর রমেন আর রমেন বোস থাকে না, গাইকোয়ার বা নিজাম গোছের একটা কিছু হয়ে যায়। একথা জেনেও তবু অফোন করলে কে? রিসিভার তুলে নিল রমেন।
হ্যালো! কে?
টেলিফোনের ওপার থেকে ভেসে এল, ব্যারিস্টার বোস আছেন?
কথা বলছি।
ও, রমুদা, আমি মিতা।
মিতা? কে যেন রমেনকে সজোরে ধাক্কা মারল।
হ্যাঁ, আমি মিতালি। আমার বড় বিপদ রমুদা। একটিবার আসবে? রমেনের মুখে কথা জোগাল না। নেশার ঘোরে ভুল শুনছে নাকি? কিন্তু নেশা তো হয়নি এখনও!
টেলিফোনের ওপর থেকে আবার শোনা গেল, সব কথা বলতে পারছি না, তুমি এক রমুদা—এখুনি—
অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে রমেন বললে, এখুনি? কাল সকালে গেলে হয় না?
না, না, এখুনি—আমি অপেক্ষা করছি। আসছ তো?
অগত্যা।
রিসিভার রেখে দিল রমেন। তারপর এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলল তৃতীয় পেগটা। দশ বছর বাদে মিতালি তাকে ডেকেছে। চট করে বিশ্বাস হয় না, তবু ডাকটা অবিশ্বাস্য রকমে সত্য। দশ বছরের ব্যবধান মনে মনে এক পলকে ডিঙিয়ে গেল রমেন। সিগারেটের কুণ্ডলী পাকানো নীলচে ধোঁয়ার মধ্যে ঝাপসা হয়ে আসা বহু পুরাতন একটা ছবি যেন দেখতে পেল।
বোম্বাই। জাহাজাঘাটা। বিলেতের জাহাজ এখুনি ছাড়বে। পোর্টারদের ওঠানামা কমে এসেছে। আর সপ্তমে উঠেছে খালাসিদের ব্যস্ততা। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড়ে ছেয়ে গেছে জাহাজঘাটা। তাদের কলরবে সমুদ্র—কল্লোল চাপা পড়ে যাচ্ছে। সেই মুখর জনতার মাঝে একেবারে একা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মানুষ। রমেন আর মিতালি। সেদিনের সেই শীতের সকালে তাদের কাছে জাহাজ, খালাসি, ভিড়, কলরব, কিছুই ছিল না। ছিল শুধু দুটি অপরিণতবুদ্ধি সবুজ মন। কতই বা বয়েস তখন মিতালির? সতেরো কি আঠারো। আর রমেনের তখন টগবগে তাজা যৌবন।
বিলেতে গিয়ে চিঠি লিখবে তো রমুদা?
চিঠি? উঁহু, পৌঁছতে অনেক দেরি হয়। তার চেয়ে বরং মাঝে মাঝে ফ্লাই করে এসে তোমায় দেখে যাব।
ও, ঠাট্টা হচ্ছে?
মোটেই না। আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়? ধরো, তুমিও আমার সঙ্গে জাহাজে উঠলে, তারপর সিঁড়িটা তুলে নেওয়া হল, তারপর আস্তে আস্তে ছেড়ে দিলে জাহাজ, তুমি আর নামতে পারলে না।
জলতরঙ্গের মতো হেসে উঠল মিতালি। বললে, চমৎকার আইডিয়া! কিন্তু উপায় নেই, (মেঘলা হয়ে এল মিতালির মুখ) আমি গেলে বাবাকে দেখবে কে?
কপালের ওপর কয়েক গাছা চুল পাকাতে পাকাতে রমেন বললে, তাহলে আর একটা কাজ করা যেতে পারে। ধরো, জাহাজ ছেড়ে দিল, আমি গেলাম না বিলেত, পড়লাম না ব্যারিস্টারি।
ঠিক এই সময় শীতের স্বচ্ছ আকাশ স্পন্দিত করে জাহাজটা একবার ভোঁ দিয়ে উঠল। রমেনকে একটা ঠেলা দিয়ে উদ্বিগ্নগলায় মিতালী বলে উঠল, এই রে! তোমার মাথায় আবার ভূত চেপেছে দেখছি! শিগগির ওঠো জাহাজে, ওঠো বলছি।
বেশ, তাহলে উঠি, বলে শান্ত ছেলের মতো রমেন পা বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে তার কোট টেনে ধরল মিতালি : বারে, অমনি চলে যাচ্ছ! কিছু বললে না!
রমেন ফিরে দাঁড়াল : তাইতো, কি বলি বলো তো? কি বলা উচিত? কি বললে মানায়?
ফুলে উঠল মিতালির গাল, ভারি হয়ে উঠল চোখের পাতা। বললে, যাও, কিছু বলতে হবে না, তোমার খালি ঠাট্টা!
হেসে ফেলল রমেন। তারপর অ্যাপোলো বন্দরের ভিড়—ব্যস্ততা—কলরব সব কিছু অগ্রাহ্য করে দু'হাতে মিতালির মুখখানে একটা বড় চন্দ্রমল্লিকার মতো আলতো করে তুলে ধরে গাঢ় গলায় বললে, আমার জন্যে অপেক্ষা কোরো মিতা। শুধু আমারই জন্যে।
তারপর ছুটে চলে গেল রমেন। জাহাজের সিঁড়ি তখন তোলা হচ্ছে। জাহাজ ছেড়ে দেবার পরেও মিতালিকে সে দেখতে পাচ্ছিল। অনেকক্ষণ ধরে দেখাগেল তার মেরুন রঙের গরম কোট। তারপর মিলিয়ে গেল একসময়।
অপেক্ষা মিতালি করেছিল বইকি! কিন্তু দু'বছরের বদলে চার বছর কেটে গেলেও রমেন বোসের ফেরবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। শোনা গেল, বিলেতে গিয়ে মদ্যপানকে সে আইনের চেয়ে বেশি আয়ত্ত করে ফেলেছে। তাছাড়া, কোন একটি লর্ডের মেয়ের নামও তার নামের সঙ্গে হয়ে সাগর পেরিয়ে ভারতবর্ষের মাটিতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যারিস্টারিটাও সে পাস করতে ভোলেনি।
চার বছর বাদে রমেন বোস বার—অ্যাট—ল যখন ভারতবর্ষে ফিরে এল, কুন্তল চ্যাটার্জির সঙ্গে মিতালির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। রমেন খবর পেল, কিন্তু খোঁজ করলে না। সে জানত যে এতদিন ধরে শুধু মিতালি কেন, কোনো মেয়েই অপেক্ষা করে থাকতে পারে না। মনে মনে পরম নিশ্চিন্ত হয়ে, সে একমনে আইন আর হুইস্কি—চর্চা শুরু করে দিলে। মাস আষ্টেকে সাড়া পড়ে গেল হাইকোর্টে। ক্রিমিন্যাল কেসে তাক লাগিয়ে দিলে রমেন বোস। কিন্তু ওই পর্যন্ত। তারপর থেকেই মামলার সময় রমেন বোসকে আদালতে প্রায়ই খুঁজে পাওয়া যেত না। সেই সময়টা তাকে পাওয়া যেত হয় গ্র্যান্ড—গ্রেট ইস্টার্নের 'বারে', নয় ল্যান্সডাউনের বাড়িতে ড্রয়িংরুমের শোফার উপর ঘুমন্ত অবস্থায়। ক্রমশ : কমতে লাগল মক্কেলের আসা—যাওয়া। বেহাত হতে লাগল ব্রিফ। অ্যাটর্নি পাড়ায় রমেন বোসের নতুন নামকরণ হল মাতাল বোস।
অবস্থা বদলালেও রমেন কিন্তু বদলাল না। বন্ধু—বান্ধবের কাছে সে হাত পাতে না। আত্মসম্মানে লাগে বলেই নয়, আজকাল তারা আর টাকা দেয় না বলে। তবু নিত্য সন্ধ্যায় এক বোতল 'স্কচ' সে কোথা থেকে জোগাড় করে ভগবান জানে। নেহাত পুরোনো আইনজীবী বন্ধুরা পরামর্শের জন্যে এক—আধবার ডাকে বলেই কোনওরকমে চলে যায়। এমন দিন গেছে যখন এক মাসে রমেন বোসের রোজগার হয়েছে বাইশ হাজার টাকা। আবার এমন দিন গেছে যখন সারা মাসে মাসে বাইশটা টাকাও তার পকেটে আসেনি। জীবনের এই পিঠ ওপিঠ দু'পিঠই দেখা আছে তার। সুতরাং কোনো কিছুতেই সে আর আশ্চর্য হয় না।
কিন্তু এই টেলিফোনটা আজ তাকে সত্যিসত্যিই আশ্চর্য করে ছেড়েছে। কার গলার আওয়াজ বয়ে নিয়ে এল এই যন্ত্রটা? সে কি সত্যিই মিতালি? দীর্ঘ দশ বছর বাদে মিতালি যাকে ডেকে পাঠিয়েছে, সেও কি এই আজকের রমেন বোস? চেহারায় অবশ্য খুব পরিবর্তন আসেনি। মাথার সামনের চুলগুলো পাতলা আর অত্যধিক মদ্যপানের দরুণ নাকের ডগাটা ঈষৎ লালচে হয়েছে শুধু। কিন্তু এই দেহের খাঁচাটায় দশ বছর আগের সেই রমেন বোস কি সত্যিই আজও টিকে আছে? এতকাল নিশ্চিত ধারণা ছিল, সে নেই। কিন্তু আজ, উনিশশো পঞ্চান্ন সালের এক শীত—সন্ধ্যায়, তার মনে হচ্ছে আছে—বোম্বাইয়ের জাহাজঘাটার সেই পুরাতন রমেন বোস আজও অল্প অল্প বেঁচে আছে। তার মৃদু হৃদস্পন্দন সে আজ শুনতে পাচ্ছে তার বুকের মধ্যে। নইলে সেসব পুরোণো কথা নতুন করে আবার মনে পড়বে কেন?
কিন্তু এসব লক্ষণ তো ভালো নয়। মাঝখান থেকে নেশাটাই মাটি হতে বসেছে। কবেকার কোন মিতালি তার সঙ্গে কতটুকু মিতালি করেছিল, সে হিসেব—নিকেশে কাজ কি আজ? রমেন বোস কখনও হৃদয়—দৌর্বল্যকে প্রশ্রয় দেয় না। এত মদ খেয়েও তার হার্ট রীতিমতো স্ট্রং আছে।
গেলাসে ডবল পেগ স্কচ ঢাললে রমেন। কিন্তু মুখে তুলেতে গিয়েই মনে পড়ে গেল, মিতালি বলেছে বড় বিপদ। আর গলাটাও কেমন ভিজে—ভিজে ব্যাকুল। নাঃ, একবার যাওয়া উচিত। জীবন যে কোথায় কখন জটিল হয়ে ওঠে, কে বলতে পারে? মিতালীর বিপদটা যে কতখানি বিপদ, একবার জানা দরকার। গলাটাও কেমন ভিজে—ভিজে লাগল শুনতে। কেমন যেন কাঁপা—কাঁপা। দশ বছর আগে সে জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে যেমন করে বলেছিল, 'বারে! অমনি চলে যাচ্ছ? কিছু বললে না?'
এক চুমুকে গেলাসটা নিঃশেষ করে বেরিয়ে গেল রমেন। টালা পার্কের কাছে মিতালির বাড়ি। ট্যাক্সি করে গেলে আর কতটুকু পথ?
সব কথা শুনে রমেন বললে, দুনিয়ায় এত লোক থাকতে শেষকালে কিনা আমাকেই মুরুব্বি ভাবলে! তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই পাকেনি মিতালি!
জলে ভেজা চোখ তুলে মিতালি বললে, বাবা বেঁচে নেই, আত্মীয় পরিজন বলতেও কেউ নেই। এ বিপদে তোমার নামটাই আগে মনে হল।
আমার নামটাই আগে মনে হল! যাক, বাপ—মার দেওয়া নামটা সার্থক হল এতদিনে। (বাঁ হাতে একটা তুড়ি দিয়ে হেসে উঠল রমেন) কিন্তু আমি কি করতে পারি বলো? কি হতে পারে আমাকে দিয়ে? কিচ্ছু না, নাথিং অ্যাটঅল!
এ বিপদে তোমরাই তো—কাণ্ডারী রমুদা। হাজার হলেও তুমি ব্যারিস্টার।
চেয়ার থেকে উঠে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে রমেন বললে, ব্যারিস্টার! সে তে 'ওয়ান্স আপন এ টাইট'! এখন আমি বন্দুকের একটা ফাঁকা টোটা। তুমি বোধ হয় জানো না, আজ বছর কয়েক আদালতের সঙ্গে সম্পর্কই নেই আমার।
কেন রমুদা? কি হল? ক্রিমিন্যাল কেসে তোমার অত সুনাম ছিল! লোকে তোমায় সেকেন্ড রাসবিহারী ঘোষ বলত!
তা বলত! (পোড়া সিগারেট থেকে একটা নতুন সিগারেট ধরালে রমেন) কিন্তু ব্যাপারটা কি হল জানো? আমি মদের প্রেমে পড়লাম বলে মক্কেলরা আমায় ডাইভোর্স করলে। আমিও তাই আর আদালত মাড়াই না।
তা হোক, তুমি এ কেসটা করো রমুদা।
না।
খাটের ধার থেকে মিতালি এসে দাঁড়াল রমেনের মুখোমুখি। তারপর সোজা মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, আমার এত বড় বিপদে তুমি দাঁড়াবে না? তুমি না একদিন আমায় ভালবেসেছিলে?
হো হো করে হেসে উঠল রমেন। যেন একটা ভারি মজার কথা শুনেছে। তারপর গলায় হাসির রেশ টেনে বললে, ফুটবল খেলা ছেড়ে দেবার পর পায়ে আমার একসময় বাত হয়েছিল। সে ব্যাধির মতো আরও অনেক পুরোনো ব্যাধিই আমার সেরে গেছে মিতা।
মিতালির চোখের জল শুকিয়ে গেল। একটা তিক্ত স্বাদে কুঁচকে গেল ঠোঁটের প্রান্ত। বললে, টাকা দেব আমি। তোমার পুরো ফিজ।
পায়চারি বন্ধ হয়ে গেল রমেনের। ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, টাকা! রমেন বোসকে টাকা দেবে মিতালি!
আবার হেসে উঠল রমেন। তারপর সহজ গলায় বললে, আসল কথাটা হচ্ছে, নিজের ওপর আর বিশ্বাস নেই আমার। তাই কেস নিই না। বিশেষত কেসটা যখন তোমার স্বামীর।
তবে কি করব আমি? কার কাছে যাব?—মিতালি যেন অকূল পাথারে ডুবে যাচ্ছে।
মিতালির দুই কাঁধ ধরে মৃদু একটা ঝাঁকানি দিয়ে রমেন বললে, এসময় নার্ভ শক্ত রাখো মিতা। আমার চেয়েও ভাল ব্যারিস্টার ঠিক করে দিচ্ছি—মামলা চালিয়ে যাও। তারপর—
নিজের কপালে রমেন একটা টোকা দিল।
টস টস করে জল গড়িয়ে এল মিতালির গাল বেয়ে। বললে, যেমন করে পারো, ওকে তুমি খালাস করে আনো রমুদা? আমার মন বলছে ওকে মিথ্যে অ্যারেস্ট করেছে। অমন ভয়ানক কাজ ও কিছুতেই করতে পারে না।
দরজার কাছ অবধি এগিয়ে গিয়েছিল রমেন। সেইখান থেকেই বললে, তা কি এত সহজেই বলা যায় মিতা? মানুষ হচ্ছে বিধাতার আজব তামাসা। সে কখনও সাজে রাম, কখনও সাজে রাবণ। কে বলবে কোনটা তার আসল চেহারা? কিন্তু আর দেরি নয়, আমার বিরহিনী স্কচের বোতল পথ চেয়ে রয়েছে।
রমেনের হাসির আওয়াজটা সিঁড়ি দিয়ে ক্রমশ নিচে নেমে গেল। আর, হঠাৎ ভয়ানক একটা সন্দেহে মনে মনে কেঁপে উঠল মিতালি। তার কানে বাজতে লাগল : মানুষ হচ্ছে বিধাতার আজব তামাসা। সে কখনও সাজে রাম, কখনও সাজে রাবণ। কে বলবে কোনটা তার আসল চেহারা?
* * * *
এগারো দিন বাদে।
দক্ষিণের বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে ঠিক তেমনি করেই বসে আছে কুন্তল। যেমন করে রোজ সকালে বসে থাকত আগে। মুখে দাড়ি জমেছে এগারো দিনের। চুলে তেল পড়েনি। ঝড়—খাওয়া নাবিকের মত ক্লান্ত, নিষ্প্রভ চেহারা। ডান হাতের দু'আঙুলে ধরা একটা জ্বলন্ত সিগারেটের মুখে অনেকটা ছাই জমেছে লম্বা হয়ে। শীতের এলোমেলো হাওয়ায় টেবিলের ওপর আজকের কাগজ মৃদু মৃদু উড়ছে ফরফর করে।
গতকাল জামিন পেয়েছে কুন্তল। ধরা পড়ার এগারো দিন পরে। তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যখন কেসটা হাইকোর্টের দায়রা—জজের হাতে পাঠালেন। এমন কেসে জামিন পাওয়াটা সহজ নয়, অনেক কাঠ—খড় পোড়াতে হয়েছে কুন্তলের ডিফেন্স—কাউন্সেল ব্যারিস্টার দত্তগুপ্তকে। কুন্তল শুধু এইটুকুই জানে। কিন্তু কার ব্যক্তিগত তদ্বিরে সে লৌহকপাটের বাইরে আসতে পারল, সেটা আজও অপ্রকাশ।
জামিন পেয়ে কুন্তল বাড়ি ফেরেনি। এক প্যাকেট সিগারেট কিনে গঙ্গার ধারে নির্জন একটা জায়গা বেছে নিয়ে চুপচাপ বসেছিল অনেকক্ষণ। তারপর এক সময় অন্ধকার হয়ে এল চারদিক। ওপারের চটকলে আলো জ্বলে উঠল, আর আকাশে তারা। সেই অন্ধকারে গা ঢেকে কুন্তল এসে দাঁড়াল ফ্ল্যাটের দরজায়। দিনের আলোয় কেন সে বাড়িতে ফিরতে পারল না, তার কারণটা তলিয়ে দেখতে সাহস হয়নি তার।
আশ্চর্য, মিতালিও কোনও প্রশ্ন করেনি। কেন ধরা পড়ল কুন্তল, কি ব্যাপারে, কিছুই জানতে চায়নি। এমনকি জামিনে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে ফিরতেই বা রাত হল কেন, তারও কৈফিয়ৎ চায়নি। যেন রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে ফেরাটাই আজ কুন্তলের পক্ষে স্বাভাবিক। হাজত—ফেরত স্বামী সম্পর্কে মিতালির এই কঠিন উদাসীনতার মূলে ছিল একটা চক্ষুলজ্জা। কোনো প্রশ্ন করলে পাছে কুন্তল কিছু মনে করে, কষ্ট পায়। কিন্তু এই চক্ষুলজ্জার আড়ালে আর একটা জিনিসও লুকিয়ে ছিল। সেটা হচ্ছে ওঝার শিকড়—ছোঁয়ানো সাপের মতো ঝিমিয়ে পড়া একটা বিষাক্ত সন্দেহ। কোনো প্রশ্নের উত্তর যদি ভয়ঙ্কর কিছু শুনতে হয়! তাই কুন্তলকে দরজা খুলে দিয়ে একটা প্রশ্নও করেনি সে। নীরবে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে সে শুধু তাকিয়ে ছিল। দেখছিল, এগারো দিন দাড়ি কামানো হয়নি আর মাথায় তেল পড়েনি বলে কী লক্ষ্মীছাড়ার মতোই না দেখাচ্ছে কুন্তলকে। এই কি তার সাতাশে মাঘের বাঞ্ছিত অতিথি? মাত্র এগারোটা দিনে মানুষ এতো বদলে যায়?
কিন্তু কুন্তল কেন সহজ ভাবে কথা বলতে পারল না স্ত্রীর সঙ্গে? 'কেমন ছিলে' বা 'বড় রোগা হয়ে গেছ' এই ধরনের একটা মামুলি কুশল—প্রশ্নও তার মুখে এল না কেন? সে কি সত্যই মিতালির চোখে সন্দেহের ছায়া দেখেছিল? না, এটা অতি—সতর্ক অপরাধী মনের স্বভাব।
কয়েক সেকেন্ড মাত্র চেয়েছিল সে মিতালির মুখের পানে। তার পরেই দ্রুত পায়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ভেতরে। অমন করে কেন তাকিয়েছিল মিতালি? কি দেখছিল সে। কুন্তলের মুখের কোথাও অপরাধের দাগ আছে কিনা? জেল—ফেরত আসামির কোনো লক্ষণ আছে কিনা তার মুখের গঠনে, চোখের চাউনিতে? তাহলে মিতালীও তাকে সন্দেহ করে! মনের মধ্যে একটা বিশ্রী সরীসৃপ কিলবিল করে উঠল। কুন্তল বুঝতে পারলে সেটা ঘৃণা। আর সে—ঘৃণা অন্য কেউ নয়—মিতালিরই প্রতি। বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই হাহাকার করে উঠল তার অন্তর। ঠিক সেই মুহূর্তে মিতালির কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে ঝঞ্ঝাহত পাখির মতো কিছুক্ষণ পড়ে থাকতে পারলে কুন্তল হয়তো বেঁচে যেত। কিন্তু আড়ষ্ট দেহটা তার এক পাও এগোল না। দুর্জয় একটা অভিমান বুকের মধ্যে ফেনিয়ে উঠতে লাগল শুধু।
দরজা বন্ধ করে মিতালি ঘরে ফিরে এল। শান্ত গলায় বললে, স্নানের ঘরে গরম জল রাখা আছে। তারপর আর একবার কুন্তলের পানে বোবা চোখে তাকিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে।
এগারো দিন আগে ওরা শুধু স্বামী—স্ত্রী ছিল না, ছিল প্রেমিক প্রেমিকা। আর আজ? কোনো রেল—স্টেশনের ওয়েটিংরুমে দুটি আলাপী যাত্রী যেন।
খাটের ওপর ঘুমে নেতিয়েছিল দীপু। সেদিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল কুন্তলের। দু'হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত ছেলেকে বুকে তুলে নিতে গিয়েই থমকে থেমে গেল সে। না, এখন নয়, আগে স্নান সেরে আসুক, ধুয়ে আসুক বড় হাজতের অদৃশ্য ক্লেদ।
স্নান সেরে আসতেই খাবার গরম করে টেবিলে সাজিয়ে দিলে মিতালি। পাশে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, 'এটা খাও,' 'ওটা ফেলে রেখো না'। আগে যেমন রোজই বলতো। মনটা হালকা হয়ে এল কুন্তলের। মনে হতে লাগল, কোনো রেলস্টেশনের ওয়েটিং রুমে নয়, সত্যিই নিজের সংসারে নিজের ঘরের মধ্যেই ফিরে এসেছে সে।
খেতে খেতে হঠাৎ একবার মুখ তুলে চাইলে কুন্তল। দু'জোড়া চোখ পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। একটা মোটরের হেডলাইটের ওপর যেমন উল্টো দিক থেকে আরেকটা মোটরের হেডলাইট এসে পড়ে। একটা মুহূর্ত মাত্র। পরক্ষণেই 'আর দু'খানা লুচি আনি' বলে মিতালি চলে গেল। আর, জ্বোরো রোগীর মতো মুখটা তেতো হয়ে গেল কুন্তলের। মিতালি যখন লুচি নিয়ে ফিরে এল, কুন্তলের তখন আঁচানো হয়ে গেছে।
সেদিন একই বিছানায় শুয়ে দুটি মানুষের চোখে ঘুম আসেনি অনেক রাত অবধি। উষ্ণ অশ্রুজলে বালিশ ভিজিয়ে একজন ভাবছিল, ও কেন এখনও চুপ করে আছে? মুখ ফুটে অন্তত একটিবার কেন বলছে না, 'আমি তোমার সেই কুন্তল, মিতা! কোনো পাপ, কোনও মালিন্য স্পর্শ করেনি আমায়!' বলুক, হে ভগবান, একবার ও বলুক। সে—কথায় বিশ্বাস করে বাঁচুক মিতালি।
আর একজন বিনিদ্র নিশীথের অদৃশ্য কন্টক—শয্যায় ছটফট করতে করতে ভাবছিল, ও কেন এখনও চুপ করে আছে? মুখ ফুটে অন্তত একটিবার কেন বলছে না, 'তুমি কি সত্যই অপরাধ করে এসেছ কুন্তল?
মিতালিকে ভালবেসেও এত বড় পাপ করতে পারলে? বলুক, বিধাতা, একবার ও বলুক। সে—কথার উত্তর দিয়ে বাঁচুক কুন্তল।
তবু চুপ করেই রইল দুজন। সারা রাত। আর, দুজনের মাঝখানে ছোট্ট দীপু দুজনের গায়ে দুটি পা তুলে দিয়ে পরম আরামে ঘুমিয়ে রইল। একটা সেতুর মতো।
চা নিয়ে এল মিতালি। খবরের কাগজটা টেনে নিল কুন্তল। তাড়াতাড়ি উল্টে দিল প্রথম পাতাটা।
মিতালি বললে, আজ কি বেরোবে কোথাও?
চায়ের পেয়ালায় দৃষ্টি রেখে কুন্তল বললে, ভাবছি বেরোব।
কখন?
দুপুরে?
দাড়ি কামাবার সরঞ্জামগুলো দেব?
নিরুৎসাহ গলায় কুন্তল শুধু বললে, দাও।
হেঁট হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে কুন্তল অনুভব করলে, মিতালি যায়নি, দাঁড়িয়েই আছে। হয়তো সেই ঠান্ডা অপচল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে কুন্তলের দিকে। দৃষ্টিটা সর্বাঙ্গে বিঁধতে লাগল যেন। কেন ও দাঁড়িয়ে আছে এখনও? আর কি বলতে চায়, বলে ফেললেই তো পারে। গোয়েন্দা—পুলিশের মতো সদা—সন্দিগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে কুন্তলের প্রতিটি মুহূর্ত কেন ও অতিষ্ঠ করে তুলছে?
অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে মাথা তুলল কুন্তল। মিতালি বললে, তোমার একটা ফোন এসেছিল—গত পরশু।
ফোন? কোত্থেকে?
রূপকথা পিকচার্স থেকে।
কি বলেছে?
বলেছে, এ ছবিতে কুন্তলবাবুকে আমরা নিতে পারলাম না।
অ্যাডভান্সের টাকাটা অবশ্য ইচ্ছে করলে উনি ফেরত নাও দিতে পারেন।
ও।
কুন্তলের দৃষ্টি আবার চায়ের পেয়ালায় নেমে এল। মিতালিও চলে যাচ্ছিল ফিরে, ঠিক এই সময় নিচ থেকে একটা হই—চই শোনা গেল। বারান্দার নিচেই একটা বড় চত্বর। ফ্ল্যাটবাড়ির ভাড়াটেদের ছেলেপুলেরা সকাল—বিকেল খেলা করে এখানে। কলরবটা সেইখান থেকেই আসছে মনে হল। মিতালি ঝুঁকে পড়ল বারান্দার রেলিং—এ ভর দিয়ে। দেখলে, একতলার চত্বরে যে নাটক চলছে, তার নায়ক স্বয়ং দীপু। দীপুর শার্ট ছেঁড়া, প্যান্টে ধুলো লাগা। লছমন তাকে ধরে রেখেছে। আর, তারই সামনে হাত তিনেক দূরে দু'হাতে নাক চেপে ধুলোর ওপর বসে বসে দীপুরই খেলার সাথী হাবুল কাঁদছে, না ডাকাত—পড়া চিৎকার করছে, বোঝা মুস্কিল। কিন্তু তার চিৎকারকেও ছাপিয়ে যাঁর ফাটা কাঁসরের মতো গলা আকাশ—বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছে, তিনি হচ্ছেন হাবুলের প্রৌঢ়া পিসিমা। হাবুলের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে দুই হাত কোমরে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, দীপুর মতো সর্বনেশে ছেলে তিনি জীবনে দেখেননি। হাবুলের নাকটা একেবারে আদা—ছেঁচা করে দিয়েছে! আসুক হাবুলের বাপ বাজার থেকে। তাকে দিয়ে তিনি পুলিশে ডায়েরি করিয়ে ছাড়বেন।
ছেলে—বুড়ো মেশানো ছোটখাটো একটি জনতা পরমানন্দে এই নাটকটি উপভোগ করছিল দাঁড়িয়ে। তাদের রসাস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটিয়ে মিতালি ডাক দিলে, দীপু, ওপরে এসো।
একটু পরেই সিঁড়িতে দুপদাপ আওয়াজ শোনা গেল। লছমনের সঙ্গে হাজির হল দীপু। কোঁকড়ানো চুলের গোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে। মুখ—চোখ তখনও রাগে লাল হয়ে আছে।
গম্ভীর গলায় মিতালি বললে, হাবুলকে মেরেছ কেন?
বাচ্চচা বাইসনের মত ঘাড়া বেকিয়ে দীপু জবাব দিলে, বেশ করেছি! আবার মারব।
ধমক দিয়ে উঠল মিতালি, চুপ করো, অসভ্য ছেলে! কেন হাবুলকে মারবে শুনি?
তেমনি ঘাড় বেঁকিয়ে দীপু বললে, ও কেন আমাকে খুনে—ডাকাতের ছেলে বলবে?
হঠাৎ যেন সাইরেন বেজে উঠল। দীপুর কান ধরবার জন্যে হাত বাড়িয়েছিল মিতালি। কয়েক মুহূর্তের জন্যে পঙ্গু হয়ে গেল হাতটা। মুখখানা তার একবার আগুনের মতো টকটকে হয়ে উঠেই আবার অস্বাভাবিক সাদা হয়ে গেল। কোনওমতে সে শুধু বলতে পারল, ঘরে যাও।
ঘরেই যাচ্ছিল দীপু, তার আগে কুন্তল ডাকলে, শোনো।
দীপু কাছে এসে দাঁড়াল।
কুন্তল বললে, হাবুলরা ওইদিকে তিনতলার ফ্ল্যাটে থাকে, না?
দীপু ঘাড় নেড়ে জানালে, হ্যাঁ।
'আচ্ছা, তুমি যাও' বলে কুন্তল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোল। মিতালি পথ আগলে দাঁড়াল : কোথায় যাচ্ছ?
হাবুলের বাবার সঙ্গে একবার দেখা করব।
অস্বাভাবিক শান্ত গলায় মিতালি বললে, না, যেতে হবে না।
যেতে হবে না! গায়ে কেউ কালি ছিটোলেও চুপ করে থাকতে হবে নাকি? কি বলছ তুমি?
কুন্তলের নাকের রন্ধ্র দুটো ফুলে ফুলে উঠছে। এগারো দিনের দাড়ি আর রুক্ষ চুলের মাঝখানে চোখ দুটো খর হয়ে জ্বলছে।
মিতালি যেন তার তাপ অনুভব করতে পারল। তবু সে তেমনি শান্ত গলায় বললে, ঠিকই বলছি। ঝগড়া করে কেলেঙ্কারি বাড়াবার দরকার নেই।
কিন্তু দীপুর মুখ চেয়ে হাবুলের মুখটা বন্ধ করা দরকার।
আর পারল না মিতালি, তার শান্ত গলা তীক্ষ্ন হয়ে উঠল। বললে, থামো। কার মুখে হাত চাপা দেবে? হাবুলের মুখ বন্ধ করলেই কি সকলের মুখ বন্ধ হবে? জোর করে মুছতে চাইলেই সব কালি মোছা যায় না!
কান্না চাপতে চাপতে দ্রুত বেগে চলে গেল মিতালী। আর, হঠাৎ যেন একেবারে নিভে গিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল কুন্তল। হু—হু করে এল এলোমেলো দমকা হাওয়া। ফরফর করে আবার উল্টে গেল খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা। কুন্তল চেয়ে দেখলে, বড় বড় হরফে জ্বলজ্বল করছে খবরটা :
নর্তকী—হত্যার অভিযোগে সুরশিল্পী কুন্তল চ্যাটার্জি
জামিনে মুক্তিলাভ
মিতালি ঠিকই বলেছে। কার মুখে হাত চাপা দেবে কুন্তল?
'দেখে নেবেন স্যার, এবারের ছবি আপনার সিওর হিট!' ডান হাতের দু'আঙুলে এক টিপ নস্য টিপে প্রচারসচিব বটু মল্লিক বলছিল, গল্পটা কাল কাগজওয়ালাদের শোনালাম। শুনে সকলেই একবাক্যে বললে, ভারি ইন্টেলেকচুয়াল গল্প তো!
প্রকাণ্ড ঝকমকে টেবিলের ওপাশে ঘোরানো চেয়ারে একতাল কাঁচাগোল্লা সন্দেশের মতো বসেছিলেন প্রোডিউসার কন্দর্পকান্তি নন্দী। প্রচারসচিবের কথা শুনে বলে উঠলেন, কি বলেছে? ইন্টেলেকচুয়াল? গল্পটা বুঝতে পারেনি নির্ঘাৎ!
বটু মল্লিক তখনও নস্যির টিপ ছাড়েনি। জিব কেটে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, অমন কথা বলবেন না স্যার! তাঁরা সব গুণী ব্যক্তি। তারপর হঠাৎ প্রবল উৎসাহে গলার শির ফুলিয়ে বলে উঠল, এ ছবি রাষ্ট্রপতি পদক না পেয়ে যায় না। আমি বলি কি স্যার, দিন—ভেনিসেও পাঠিয়ে দিন। আন্তর্জাতিক ছবির জগতেও আপনার নামটা অক্ষয় হয়ে থাক।
কন্দর্পকান্তি বললেন, বটে! মাত্র সাতটা দিন সুটিং হয়েছে, তাইতেই তুমি ছবির ভবিষ্যৎ এতখানি সমঝে ফেললে বটু! ব্যাপারটা কি বলো দিকি? কিছু ক্যাশের দরকার হয়েছে নাকি?
বিনয়ে বটু মল্লিক বিগলিত হয়ে গেল। নস্যির টিপ সমেত হাতটা টেবিলের তলা দিয়ে বাড়িয়ে বললে, পায়ের ধুলো দিন স্যার। আপনি সাক্ষাৎ অন্তর্যামী।
ঘোরানো চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসে কন্দর্পকান্তি বললেন, সকলের না হলেও তোমাদের অন্তর্যামী বইকি! নইলে কি আর তোমাদের চড়িয়ে এই 'রূপকথা পিকচার্স' চালাতে পারতাম! তোমরা হয়তো ভাবো আমার চুলের মধ্যে শিং আর মোজার মধ্যে ক্ষুর লুকানো আছে।
নিজের রসিকতায় কন্দর্পকান্তি নিজেই টেনে টেনে হাসতে লাগলেন। অদ্ভুত সেই হাসি। অনেকটা হাঁপানি রোগীর কাশির মতো দমক দিয়ে দিয়ে।
কিন্তু হঠাৎ একটা হেঁচকি তুলে কন্দর্পকান্তির হাসি থেমে গেল। অন্য সবাই, যারা প্রোডিউসার হাসছে বলে হাসা উচিত ভেবে হাঁ করেছিল, তারাও একদম চুপ। পিনটুকু পড়লেও বুঝি বা শোনা যায়, এমনি স্তব্ধতা।
তারপরে কন্দর্পকান্তিই প্রথমে কথা কইলেন। সৌজন্যের অবতার হয়ে বললেন, আসুন কুন্তলবাবু। আসতে আজ্ঞা হোক। জামিন পেলেন তাহলে? পাবেন বইকি! আপনারা হলেন মানী লোক!
দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কুন্তল 'রূপকথা পিকচার্স'র অফিস ঘরের এধার থেকে ওধার অবধি একবার চোখ বুলিয়ে নিলে। তারপর সোজা এসে দাঁড়াল প্রোডিউসারের টেবিলের মুখোমুখি। আপ্যায়নের ভঙ্গিতে কন্দর্পকান্তি বললেন, বসুন। চা আনতে বলি। না কফি?
কোনোটাই নয়।—একটা চেয়ার টেনে নিয়ে কুন্তল বললে, আপনি অনর্থক ব্যস্ত হবেন না কন্দর্পবাবু।
হাত জোড় করে কন্দর্পকান্তি বললে, বিলক্ষণ! আপনারা গুণী লোক; আপনাদের সেবা করাই তো আমার কাজ।—তারপর, কি মনে করে বলুন তো?
কন্দর্পকান্তির অতি অমায়িকতা কুন্তলের আদপেই ভাল লাগছিল না। কথাটা তাই সে সোজাসুজিই পাড়লে : শুনলাম কিছুদিন আগে আমার বাড়িতে আপনি ফোন করেছিলেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি তখন প্রেসিডেন্সি—মানে ইয়েতে ছিলেন।
কুন্তলের কান দুটো ঝাঁ—ঝাঁ করে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললে, আমার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করা সত্ত্বেও, আজকের কাগজে দেখলাম, আপনার নতুন ছবির মিউজিক অন্য লোক করছেন। হঠাৎ আপনার মত পাল্টানোর কারণটা কি জানতে এলাম।
গলায় মধু ঢেলে কন্দর্পকান্তি বললেন, কারণটা কি জানেন? মানে আপনারা হলেন গুণী লোক—শিল্পী! মন—মেজাজ ঠিক না থাকলে ভাল সুর বেরোবে কেমন করে, বলুন? যে জালে জড়িয়ে পড়েছেন, সে জাল কেটে না বেরুনো অবধি আপনাকে বিরক্ত করা কি উচিত হবে? তাই ভেবে—চিন্তে এ ছবিটি থেকে আপনাকে বাদই দিলাম।
কপালের দুটো পাশ দপদপ করছিল কুন্তলের। একটা শুকনো হাসিতে ঠোঁটের রেখা বেঁকে গেল তার। বললে, আপনি সত্যিই বড় বিবেচক কন্দর্পবাবু।
সখেদে কন্দর্পকান্তি বলে উঠলেন, নারী বড় বিষম চিজ মশাই! ওরই জন্যে সোনার লঙ্কা পুড়ল, ট্রয়নগর ছারখার হল! তবু আহাম্মকেরা বোঝে না—ঘরে সতীলক্ষ্মী স্ত্রী ফেলে মরতে ছুটে যায় ডাইনীর কাছে!
ত্বরিতে উঠে দাঁড়াল কুন্তল। বললে, অর্থাৎ?
তার মুখ—চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন একটু থতিয়ে গেলেন কন্দর্পকান্তি। দেঁতো হাসি হেসে বললেন, মানে, পাঁচজনে পাঁচকথা বলছে আর কি! আপনি তো আর হেঁজিপেঁজি লোক নয়—সুর—জগতের একটা দিকপাল—
ও—কথা থাক। আপনার অ্যাডভান্সের টাকাটা কালই ফেরত পেয়ে যাবেন কন্দর্পবাবু। নমস্কার।
দরজা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুন্তলের কানে এল হাঁপানি রুগির কাশির মতো দমক দিয়ে সেই বিচিত্র হাসি! এবারে কন্দর্পকান্তি একা নয়, রামভক্ত কপিদলের মতো বটু মল্লিকের দলও হাসছে।
ম্যাডান স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা। রূপকথা পিকচার্স থেকে বাণী চিত্রম। হেঁটেই চলল কুন্তল।
পুরাতন ইজিচেয়ারটির ওপর হাঁটু মুড়ে বসেছিলেন বাণী চিত্রমের একমাত্র স্বত্বাধিকারী শ্রীযুক্ত গদাই পাল। বেশভূষায় অত্যন্ত শৌখিন। চেহারায় ডিসপেপাসিয়ার সজীব বিজ্ঞাপন। গতকালকের শুটিংয়ে তিরাশি কাপ চা কেন খরচ হয়েছে, এই নিয়ে প্রোডাকসনের ছোকরা বিপিনকে তিনি যৎপরোনাস্তি ধমকাচ্ছিলেন। ঠিক এই সময় ইজিচেয়ারের পেছন থেকে কুন্তলের স্বভাব—গম্ভীর গলা শোনা গেল : নমস্কার গদাইবাবু!
বিপিনকে তিনি বলতে চাইছিলেন, 'এই করেই তুমি কোম্পানিকে ডোবাবে', কিন্তু পিছন দিকে একবার তাকিয়েই কোম্পানির কো পর্যন্ত এসে গদাইবাবু আর এগোতে পারলেন না। বারকয়েক কো—কো করার পর কুন্তল পিছন থেকে সামনে এসে প্রশ্ন করল, কি হল, অমন করছেন কেন?
জবাব দিল বিপিন। একগাল হেসে বলল, বড়বাবু মেক—আপ করা খুনি দেখেছেন বটে, কিন্তু ওরিজিন্যাল খুনি তো কখনও চোখে দেখেননি, তাই আপনাকে দেখে কেমন নার্ভাস হয়ে পড়েছেন বোধ হয়। হোঁচট—খাওয়া জিবটাকে গদাই পাল ততক্ষণে সামলে নিয়েছেন। খিঁচিয়ে উঠে বিপিনকে বললেন, ইডিয়ট! কোথায় কি বলতে হয়, কোনও জ্ঞান নেই। যাও, এখান থেকে!
তিরাশি কাপ চায়ের হিসেব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে বিপিন নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বিরস গলায় গদাইবাবু বললেন, কি খবর কুন্তলবাবু?
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলে কুন্তল। বলল, খবর জানতেই তো এলাম। 'আশাবরী' ছবির গান—রেকর্ডিং কবে রাখছেন?
তেমনি বিরস মুখে গদাইবাবু বললেন, কিছু মনে করবেন না কুন্তলবাবু, আপনাকে কাজ দেওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।
সম্ভব নয়! কারণ?
চোঁয়া ঢেঁকুর উঠলে মানুষের মুখটা যেমন বিশ্রী হয়ে যায়, তেমনি বিশ্রী মুখে গদাইবাবু বলতে লাগলেন, আমি বড় ফ্র্যাঙ্ক লোক মশাই, রেখে—ঢেকে বলা পছন্দ করি না। আমার 'বাণীচিত্রমে' পাঁচটা ভদ্রলোক কাজ করেন, সেখানে একজন খুনিকে রাখলে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হতে পারে কিনা আপনিই ভেবে দেখুন
আর একটু হলেই কুন্তল চিৎকার করে বলে উঠত, 'থামুন!' কিন্তু তার বদলে সংযত ভদ্র কণ্ঠেই বললে, আমার মামলা এখনও শুরু হয়নি, পুলিশের তদন্তও শেষ হয়নি, অথচ আপনি আমাকে খুনি সাব্যস্ত করে বসলেন। আশ্চর্য!
অবিশ্বাসের হাসি হেসে গদাইবাবু বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ ঘাস খায় না, বুঝলেন কুন্তলবাবু! প্রমাণ না পেলে কি তারা কাউকে ধরে? আর আশ্চর্যের কথা বলছেন—আশ্চর্য আপনি নয়, আমরাই হয়েছি। আপনার মতো একটা কালচারড ইয়ং ম্যান—শেষ কালে কিনা একটা নাচওয়ালীর প্রেমে পড়ে—ছিঃ!
ডিসপেপসিয়ার সজীব বিজ্ঞাপন আবার চায়ের স্লিপে মনোনিবেশ করলেন। আর কোনো কথা বলার ছিল না কুন্তলের, বলার প্রবৃত্তিও ছিল না। নিঃশব্দে সে উঠে চলে গেল।
তারপর একে একে আলোছায়া, কাকলি পিকচার্স, স্ক্রিন প্লে এবং নবজীবন প্রোডকসনস। কুন্তলের সামনে সব দরজাই একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সর্বত্রই একই কথা। তোমার গায়ে খুনের দাগ লেগেছে, তুমি খনি, ভদ্রসমাজে অচল, সংসারে বাতিল। এই সেদিনও একজন নামকরা শিল্পী, ভদ্র চরিত্রবান যুবক বলে জনসমাজে তার যে পরিচয় ছিল, লোকে তা রাতারাতিই ভুলে গেল? কালো ধোঁয়া আর কালো কুয়াশায় কলঙ্কিত শহরের ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কুন্তলের হাসি পেল। মানুষের সুনাম কত ঠুনকো! তার চেয়েও ঠুনকো মানুষের কাছে মানুষের পরিচয়।
গায়ে একটা ধাক্কা লাগতেই ফিরে তাকায় কুন্তল। দেখে, অবিনাশ মিত্তির পান—খাওয়া দাঁত বার করে বলছে, মামলার তারিখ কবে পড়ল হে!
অবিনাশ তার পিসতুতো সম্বন্ধি। দাঁতে দাঁত চেপে কুন্তল বলে, কেন, যাবে নাকি কোর্টে?
অবিনাশ উৎসাহিত হয়ে বলে, যাব না? কি নাম যেন নাচউলীটার—শোভা ইম্যানুয়েল, না? বাঁধা ছিল বুঝি? কদ্দিন?
স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে কুন্তল বললে, অনেক দিন।
একটা কাঠি বের করে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে অবিনাশ বললে, এঃ! ছ্যা—ছ্যা, এমন ভুলও মানুষে করে! বুদ্ধি খাটিয়ে খুনের দায়টা আর কারও ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারলে না?
খুব সহজভাবে কুন্তল বললে, তাই তো দিয়েছি। তোমার নামটাই বলেছি পুলিশের কাছে।
'ওসব ইয়ার্কি আমি ভালোবাসি না মাইরি!' বলতে বলতে কাঠি—হাতে অবিনাশ ভিড়ের মধ্যে ছিটকে সরে গেল। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কুন্তল হঠাৎ হা—হা করে হাসতে শুরু করলে পাগলের মতো। আর হাসতে হাসতেই তার মনে পড়ে গেল, পরশু তার মামলার প্রথম শুনানী।
জুরিদের সামনে খুনি আসামি কুন্তলের ভাগ্য নিয়ে আইনের পাশা খেলা শুরু হবে।
কে জিতবে? আইন না সত্য? মানুষ না বিধাতা?
*
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন পাবলিক প্রসিকিউটর সুরেন ভাদুড়ি। দুলে উঠল তাঁর কালো গাউন। কাঁচা—পাকা ছাঁটা গোঁফের নিচে চাপা ঠোঁটে অবজ্ঞা আর অহঙ্কার ঝিলিক দিয়ে উঠল। সিংহের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে একবার তিনি তাকালেন বাঁ দিক থেকে ডান দিকে। লোকে গিসগিস করছে আদালত—ঘর। বোধ করি খুশি হলেন তিনি। তারপর মঞ্চে দাঁড়ানো পেশাদার বাগ্মীর মতো আবেগময় গলায় বলতে শুরু করলেন, ইওর অনার, আজ যে মামলার বিচারের জন্যে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি, সেটি কোনো সাধারণ মামলা নয়। পৃথিবীতে জঘন্যতম পাপ হল নরহত্যা। এই মামলা হল সেই জঘন্যতম পাপের কাহিনী। এর পিছনে আছে এক হতভাগিনীর জীবন—নাট্যের শোচনীয় পরিণতি! ইওর অনার, আজ আমি আদালদের সামনে সেই হতভাগিনীর জীবন—নাট্যের যবনিকা তুলে ধরার অনুমতি চাই।
পাবলিক প্রসিকিউটর ভাদুড়ি একবার থামলেন। টেবিলের ওপর কাচের গ্লাসে জল ছিল, এক চুমুক খেয়ে ফের শুরু করলেন, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের শোভা ইম্যানুয়েল জাতে মারাঠি হলেও ধর্মে ছিল ক্রিশ্চান। তার পেশা ছিল নাচ। মাঝে মাঝে সে কোনো কোনো নাচের দলের সঙ্গে শহরের বাইরে টুরে যেত বটে, কিন্তু বেশির ভাগ সময় তাকে দেখা যেত কলকাতার নামকরা হোটেলগুলির ক্যাবারে নাচের আসরে। সুতরাং আমরা ধরে নিতে পারি যে, তার পেশার দরুণ নানান লোকের সংস্রবে তাকে আসতে হত। সন্ধের পর প্রায়ই তার ঘরে বন্ধুবান্ধবের সমাগম ঘটত এবং নাচের প্রোগ্রাম না থাকলে মধ্যরাত্রির আগে তার ঘরের বাতি নিভত না। হাসি—খুশি স্বভাব, মিশুকে প্রকৃতি আর সুঠাম যৌবনের জন্যে শহরের বিশেষ এক শ্রেণির লোকের কাছে শোভা ইম্যানুয়েল অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে নাচের মাস্টার, বাজিয়ে আর সঙ্গীত—পরিচালক। শোভা যে নির্মল চরিত্রের মেয়ে ছিল, আমি অবশ্য এমন ধারণা করতে বলছি না। সাধারণত নাচওয়ালীরা যা হয়, সেও তাই ছিল। কিন্তু সে কারও ক্ষতি করেছে, এমন কথা কখনও শোনা যায়নি। নাচ আর হাসি—হল্লার স্রোতে তার দিনগুলি তরতর করে বয়ে যাচ্ছিল। তারপর এল সেই ভয়ানক রাত্রি। তারিখটা ছিল ২৬শে মাঘ। শহরের বুকে তখন নেমেছে কুয়াশার রাত। ঘড়িতে তখন ঠিক বারোটা। শোভা ইম্যানুয়েল খুন হল। খুন হল তার নিজের ঘরে নিজেরই শয্যার উপরে। হতভাগিনী নর্তকীর জীবনের ওপর যবনিকা পাত হল নিতান্ত অসময়ে।
আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠল সুরেন ভাদুড়ির কণ্ঠস্বর। কোনো ট্র্যাজিক দৃশ্যে থিয়েটারের অভিনেতারা যেমন গলা কাঁপায়। সিংহের মতো গ্রীবাভঙ্গি করে আর একবার তিনি তাকালেন শ্রোতৃমণ্ডলীর দিকে। সমস্ত আদালত স্তব্ধ হয়ে শুনছে। মনে মনে আর একবার খুশি হলেন তিনি। গলাটা কেশে সাফ করে নিলেন, তারপর আবার বলতে লাগলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে প্রকাশ, বিষ নয়, ছোরা নয়, রিভলভারের বুলেটও নয়—সিল্কের রুমাল বা ওইরকম একটুকরো কাপড়ে ফাঁস গলায় লাগিয়ে শোভা ইম্যানুয়েলকে দমবন্ধ করে মারা হয়েছে। অধিকাংশ খুনের ব্যাপারে ছোরা বা রিভলভার উত্তেজনার বশেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, ইওর অনার, গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলাটা নিরুত্তেজ ঠান্ডা মাথার কাজ নয় কি? পাকা খুনির পক্ষেই এমন নৃশংসভাবে খুন করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক কে? পুলিশ যাকে অভিযুক্ত করেছে, সেই কি প্রকৃত খুনি? সে বিচারের ভার আদালতের হাতে। (ভাদুড়ির গলা ধাপে ধাপে চড়তে থাকে) যুক্তি, সাক্ষ্য এবং ঘটনা দিয়ে আমি শুধু প্রমাণ করার চেষ্টা করব যে—
পশুরাজ যেমন কেশর ফুলিয়ে শিকারের ওপর থাবা চালায়, ঠিক তেমনি ভঙ্গিতেই সুরেন ভাদুড়ি আসামি কুন্তল চ্যাটার্জিই ফ্রি স্কুল স্ট্রিট হত্যাকাণ্ডের নায়ক—নিহত শোভা ইম্যানুয়েলের প্রকৃত খুনি।
একঝাঁক তিরের মতো বহু চোখের দৃষ্টি এসে বিঁধল কুন্তলের সর্বাঙ্গে। গুনগুন গুঞ্জন উঠল আদালত—ঘরে। হাতুড়ি ঠুকে জজসাহেব বলে উঠলেন, অর্ডার! অর্ডার!
কাঠগড়ার রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরলে কুন্তল। পাবলিক প্রসিকিউটরের গর্জন, আদালত—ঘরের গুনগুন আর জজসাহেবের 'অর্ডার—অর্ডার' ধ্বনি যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছিল তার কানে। কুন্তলের মনে হল তার সর্বাঙ্গে গভীর ঘুমের মতো একটা ক্লান্তি নামছে। একটা বালিশ পেলে বুঝি—বা এখুনি ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
এরপর শুরু হল জেরা।
ডাকা হল যমুনা লালাকে। বুড়ো হ্যারি সাহেবের পাশে বসে এতক্ষণ সে শুনছিল। আস্তে আস্তে সাক্ষীর কাটগড়ায় গিয়ে দাঁড়াল। কালো গাউন দুলিয়ে সুরেন ভাদুড়ি গিয়ে দাঁড়ালেন পাশে। ভগবানের নামে সত্য বলার শপথ গ্রহণ করল যমুনা।
কতকগুলি মামুলি প্রশ্নোত্তরের পর সুরেন ভাদুড়ি বললেন, ঘটনার রাতে সিঁড়ি দিয়ে যাকে আপনি পালাতে দেখেছিলেন, আসামি কি সেই লোক?
আসামির কাঠগড়ার দিকে তাকিয়ে যমুনা স্থির স্বরে জবাব দিলে, তাই মনে হয়।
মনে হওয়ার কারক কী?
পালাবার সময় আততায়ীর গায়ে সবুজ—চেক টুইডের যে কোট আর লাল টাই ছিল, পরদিন ইন্ডিয়া ব্যাঙ্কে আসামির গায়েও ঠিক তাই দেখেছিলাম।
এটাই কি একমাত্র কারণ?
না। আসামির পিঠ আততায়ীর পিঠের মতই চওড়া। তাছাড়া, লম্বায়, শরীরের গড়নে, এমনকি চুলের ধাঁচেও দুজনের মধ্যে হুবহু সাদৃশ্য।
সুরেন ভাদুড়ির ছাঁটা গোফের নিচে বিজয়ীর অহংকার আবার ঝিলিক দিয়ে উঠল। এজলাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, কথাটা লক্ষ্য করুন, ইওর অনার। লম্বায়, শরীরের গড়নে, এমনকি চুলের ধাঁচেও আসামি এবং আততায়ীর মধ্যে হুবহু সাদৃশ্য। এই সাদৃশে দেখেছেন কে? যিনি নিহত শোভা ইম্যানুয়েলের পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশিনী এবং ঘটনার সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান সাক্ষী। সেই হিসেবে আলোচ্য মামলায় মিস যমুনা লালার এই কথাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় কি?
তারপর আবার প্রথম সাক্ষীর দিকে ফিরে পি. পি. বললেন, আর আমার কোনও প্রশ্ন নেই, মিস লালা। ধন্যবাদ।
সাক্ষীর ডকে দ্বিতীয় সাক্ষী উঠল। বৃদ্ধ এক পাঞ্জাবি। চুল—দাড়ি—গোঁফ সব 'ক্রিসমাস বুড়োর' মতো ধবধবে।
পি. পি. প্রশ্ন করলেন, W.B.T. 9001 নম্বর ট্যাক্সি কে চালায় সর্দারজী?
সাক্ষীর ডক থেকে জবাব এল, জী, আমি।
দিনে চালাও, না রাতে?
রাতে। দিনে আমার ছেলে চালায়।
কত রাত অবধি ভাড়া খাটো?
বারোটা—একটা অবধি হুজুর।
আচ্ছা, গত ১০ই ফেব্রুয়ারি রাতে গাড়ি বের করেছিলে কি?
করেছিলাম।
রাত বারোটা নাগাদ কোনও সওয়ারী পেয়েছিলে?
পেয়েছিলাম।
কোথা থেকে কেমন করে পেয়েছিলে, মনে আছে?
জী, মনে আছে।
ঘটনাটা বলো তো। ভাল করে স্মরণ করে বলো।
পার্ক সার্কাসে এক সাহেবকে পৌঁছে দিয়ে আমি চৌরঙ্গির দিকে ফিরছিলাম। লোয়ার সার্কুলার রোডের মোড় ছাড়িয়ে পার্ক স্ট্রিটে ঢুকতেই হঠাৎ কে যেন আমায় ডাকলে। কুয়াশার রাত ছিল বলে ভাল করে নজর চলেনি। আওয়াজটা যেদিক থেকে এল, সেই দিকে গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে যেতেই দেখি, রাস্তার ধারে আর একখানা ট্যাক্সি থেকে কে জোয়ান ছোকরা নেমে আসছে। পরনে সাহেবি পোশাক। আমার গাড়িতে উঠে বসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ও ট্যাক্সিখানা ছেড়ে দিলেন কেন? ছোকরা জবাব দিলে, ওর পেট্রল ফুরিয়ে এসেছে। তারপর আমাকে বললে, জলদি চালাও—যত জলদি পারো।
সওয়ারীকে কোথায় পৌঁছে দিলে?
টালিগঞ্জের এক বাগান—বাড়িতে হুজুর। শুনলাম সেখানে বায়োস্কোপ হয়।
আচ্ছা সর্দারজি সে—রাতের সেই সওয়ারীকে তোমার মনে আছে?
কিছুটা মনে আছে বইকি!
কালো গাউন দুলিয়ে, ছবি বিশ্বাসের ভঙ্গিতে পি. পি. এগিয়ে গেলেন আসামির ডকের সামনে। যেখানে রেলিংটা শক্ত হাতে চেপে ধরে একটা মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কুন্তল।
এই আসামির দিকে তাকাও সর্দারজী—ভালো করে দেখো। এবার বলো তো, সেদিন রাতের পার্ক স্ট্রিটের সেই সওয়ারী কি এই লোক?
ধবধবে ভুরুর তলা দিয়ে বুড়ো সর্দার চোখ দুটো কুঁচকে একবার তাকাল কুন্তলের দিকে। তারপর ঘাড় নেড়ে বললে, তাই তো মালুম হচ্ছে হুজুর। হুঁ, এমনি জোয়ান চেহারা, এমনি কাঁচা উমর!
ছাঁটা গোঁফের তলায় আবার বিজয়ীর হাসি নিয়ে সুরেন ভাদুড়ি তাকালেন এজলাসের দিকে। তারপর দু'নম্বর সাক্ষীকে বললেন, তুমি যেতে পারো সর্দারজী।
ডকে তৃতীয় সাক্ষী উঠল। বাণী চিত্রমের ব্যবস্থাপক বিপিন। তার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকালেন সুরেন ভাদুড়ি। বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন করলেন, কি করা হয়?
অমায়কি হেসে বিপিন বললে, ম্যানেজ করি স্যার।
ভুরু কুঁচকে ভাদুড়ি বললেন, কি ম্যানেজ কর?
বিপিন বললে, আজ্ঞে সুটিং ম্যানেজ করতে হয়।
বটে! আচ্ছা বিপিন, গত ২৬শে মাঘ রাতে তুমি স্টুডিওতে হাজির ছিলে?
ছিলাম বইকি। নইলে চাকরি নট হয়ে যাবে যে!
কি কাজ ছিল সেদিন রাতে?
আমাদের পুষ্পবাসর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক রেকর্ডিং ছিল।
পুষ্পবাসর ছবির মিউজিক ডিরেক্টর কে?
কাগজে সিনেমা—পেজ পড়েন না বুঝি? নাঃ, আপনি বড় ব্যাকওয়ার্ড স্যার!
একটা চাপা হাসির ঢেউ খেলে গেল আদালত—ঘরে। জজ সাহেব একবার কাশলেন। আর, সুরেন ভাদুড়ি চোখ পাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন, বাজে বকছো কেন?
থতমত খেয়ে বিপিন বললে, এই সেরেছে! চটে গেলেন নাকি? আপনার প্রেসারটা একবার দেখাবেন। স্যার!
চাপা হাসির ঢেউটা এবার আর চাপা রইল না। জজ সাহেব আবার কাশলেন। আর আরক্ত মুখে সুরেন ভাদুড়ি গর্জন করলেন, ফের বাজে কথা! বল কে মিউজিক ডিরেক্টর?
কুন্তল চ্যাটর্জি।
রেকর্ডিং প্রোগ্রাম ক'টায় ছিল?
রাত এগারোটা থেকে।
আসামি কুন্তল চ্যাটার্জি কখন স্টুডিওতে গিয়েছিলেন?
রাত দেড়টা নাগাদ ট্যাক্সি করে যান।
তিনি কি বরাবরই এত লেট করে স্টুডিওতে যেতেন।
না স্যার। বরং দশ মিনিট আগে যেতেন, তবু এক মিনিট দেরি হত না কখনো। কেবল সেদিন তাঁকে প্রথম লেট হতে দেখলাম।
পাবলিক প্রসিকিউটরের মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল। জজ সাহেবের দিকে গ্রীবাভঙ্গি করে বললেন, ইওর অনার, তিন নম্বর সাক্ষীর শেষ কথাগুলো লক্ষ করবার মতো।—আচ্ছা, তুমি যেতে পার বিপিন।
বাঁচালেন স্যার।
এক লাফে সাক্ষীর কাঠগড়া থেকে নেমে গেল বিপিন।
জজসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, আর কোনও সাক্ষী?
প্রসন্ন মুখে পি. পি. বললেন, ইওর অনার, আসামির অপরাধ প্রমাণের জন্য মাত্র তিনটি সাক্ষীর বিবৃতিই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আদালতের মূল্যবান সময় আর নিতে চাই না, কেবল আসামিকে একটিমাত্র প্রশ্ন করেই আমি আমার জেরা শেষ করব।
বীরদর্পে সুরেন ভাদুড়ি এগিয়ে গেলেন আসামির কাঠগড়ার সামনে। ঘায়েল হয়ে আসা শিকারের প্রতি শিকারি পশু যেমন পরিতৃপ্তির সঙ্গে তাকায়, তেমনি করে তাকালেন নিথর নিঃশব্দ কুন্তলের দিকে।
তারপর প্রশ্ন করলেন, আপনার স্ত্রী পুলিশের কাছে বলেছেন, ২৬শে মাঘ রাত সাড়ে দশটায় আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। আর, ব্যবস্থাপক বিপিন বলছে, আপনি স্টুডিওতে পৌঁছন রাত দেড়টায়। সাড়ে দশটা থেকে দেড়টা অবধি আপনি কোথায় ছিলেন?
কোনও জবাব এল না আসামির ডক থেকে।
বলুন—জবাব দিন আমার প্রশ্নের—
কুন্তল তেমনি নিথর নিঃশব্দ।
আবার বললেন ভাদুড়ি, বলুন, কোথায় ছিলেন?
হঠাৎ নড়ে উঠল নিস্পন্দ একটা মূর্তি। কলের পুতুলের মতো ঠোঁট নেড়ে কুন্তল বললে, মনে পড়ছে না।
গর্জন করে উঠলেন ভাদুড়ি, মনে করে বলুন—কোথায় ছিলেন ২৬শে মাঘ রাত বারোটার সময়? কোনো আত্মীয়ের বাড়ি?
না।
কোনও বন্ধুর কাছে?
না।
কোন গানের আসরে?
না।
তবে? (ভাদুড়ির গলা আর এক ধাপ চড়ল) সত্য গোপন করবেন না—২৬শে মাঘ রাত বারোটায় কোথায় ছিলেন বলুন?
ঝুঁকে পড়া মাথাটা তুলে, সোজা হয়ে দাঁড়াল কুন্তল। স্তিমিত দুই চোখে মরণাহত প্রাণীর মরিয়া দৃষ্টি ফুটে উঠল। তারপর পাবলিক প্রসিকিউটরের মুখের দিকে তাকিয়ে স্থির কণ্ঠে উচ্চচারণ করলে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফ্ল্যাট—বাড়িতে ছিলাম।
মুহূর্তে আদালত—ঘরটা কবরখানার মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। বিজয়ীর হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে সুরেন ভাদুড়ি বললেন, ইওর আনার, আমার জেরা শেষ হয়েছে।
আর, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জজসাহেব বললেন, মামলা মুলতবি রইল।
* * *
সিগারেটটা নিভে গিয়েছে। তবু সেটাকে দাঁতে চেপে ব্যারিস্টার দত্তগুপ্ত বললেন, এর পরেও কি আপনি মামলা জেতার আশা রাখেন মিস্টার বোস?
প্রকাণ্ড ড্রয়িংরুমের এধার থেকে ওধার অবধি স্কচের গেলাস হাতে পায়চারি করছে রমেন বোস। কোনো কারণে বিচলিত হলে বা চিন্তার গভীরে ডুবে গেলে রমেন এক জায়গায় স্থির থাকে না। দত্তগুপ্তের সামনে এসে সে থামল, তারপর বললে, আমি মিসেস মিতালি চ্যাটার্জি হলে নিশ্চয় আশা রাখতাম গুপ্তসাহেব। যে—কোনও খুনি আসামির স্ত্রী তাই করে। আর তাদের আশা পূর্ণ করার চেষ্টাই আমাদের পেশা নয় কি?
লাইটার বের করে সিগারটা ধরাতে গিয়েও ধরালেন না দত্তগুপ্ত। সিগারের টুকরোটা বাঁ হাতের আঙুলে ধরে বলতে লাগলেন, রাইট! কিন্তু এক্ষেত্রে আশা করে লাভ কি? প্রত্যেকটি সাক্ষ্য—প্রমাণ কুন্তল চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে। —এক এক করে ধরুন, খুনের জায়গায় গোল্ড ফ্লেক সিগারেটের প্যাকেট আর সোনালি রিবনের রিং তৈরি করা তাঁর অভ্যেস। পাশের ফ্ল্যাটে প্রতিবেশিনী যমুনা তাঁকে পালাতে দেখেছে, হরদিৎ সিং ট্যাক্সি—ড্রাইভার তাঁকে খুনের ঠিক পরেই, অর্থাৎ রাত বারোটার সময় পার্ক স্ট্রিটের কোণ থেকে গাড়িতে তুলেছে। সবচেয়ে মারাত্মক হয়েছে তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি—
ঘটনার রাতে খুনের সময় তিনি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ওই ম্যানসনেই ছিলেন।
রমেন বোস আবার পায়চারি শুরু করেছিল। প্রশ্ন করলে, কার কাছে, কি উদ্দেশ্যে ওই ম্যানসনে গিয়েছিল, সে বিষয়ে কুন্তল কিছু বলেছে আপনাকে?
না। আদালত থেকে বেরিয়ে তিনি সেই যে মুখ বন্ধ করেছেন। একবারও খোলেননি। ব্যাপারটা রীতিমতো রহস্যময়।
অন্যমনস্কভাবে রমেন শুধু বললে, হুঁ।
লাইটারটা বোধ করি খারাপ। বারকয়েক চেষ্টাতেও জ্বলল না। সেটা পকেটে রাখতে রাখতে দত্তগুপ্ত বললেন, শুনেছি, আপনি আর কুন্তলবাবু একসময় কলেজে সহপাঠী ছিলেন। সেই পুরাতন বন্ধুত্বের সূত্র ধরে কুন্তল—রহস্য ভেদ করা হয়তো আপনার পক্ষেই সম্ভব হতে পারে। আমি বলি কি, কেসটা আপনি নিজের হাতে নিলেই ভালো করতেন মিস্টার বোস।
রমেন তখন পূর্ণ গেলাস শূন্য করছিল। বললে, ক্ষেপেছেন গুপ্ত—সাহেব? আমি কেস নেব! মরা ঘোড়া কখনো ঘাস খায়?
গুপ্তসাহেব হেসে উঠলেন : কিন্তু হুইস্কি যে খায়, তা স্বচক্ষে দেখছি। সুতরাং মরা বলি কি করে?
তারপর রিস্টওয়াচের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, উঠি আজ।
দত্তগুপ্তের সঙ্গে সঙ্গে রমেন বেরিয়ে এল বাইরের বাগানে। গাড়িতে ওঠার আগে দত্তগুপ্ত বললেন, জোকস অ্যাপার্ট, আবার বলছি, এখনো সময় আছে, কেসটা আপনি নিন। আমার ওপর ভরসা রাখবেন না।
মানে?
জানেনই তো গ্যাসট্রিক আলসারের রুগি আমি। ক'দিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
রমেন হেসে বললে, চল্লিশ পেরোলে সকলেরই শরীর নোটিশ দেয়। তাই বলে ঘাবড়ালে কি চলে?— গুডনাইট।
গুডনাইট।
দত্তগুপ্তের গাড়ি বেরিয়ে গেল। রমেন কিন্তু ভেতরে গেল না, অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই জঙ্গলে—ভরা বাগানে। সত্যি, কুন্তলের কেসটা বড় জটিল হয়ে উঠেছে। তার চেয়েও জটিল হয়ে উঠেছে কুন্তল নিজে। কেন সে আদালতের সামনে ওই স্বীকারোক্তি করতে গেল—বিপদে পড়বে জেনেও? আর, গিয়েছিলই যদি অত রাতে ওই বিদঘুটে ম্যানসনে, তবে কার কাছে কি মোটিভ নিয়ে গিয়েছিল, সে—কথাই বা গোপন করছে কেন? সবার আগে ওই স্বীকারোক্তির জট খোলা দরকার।
কুন্তলের সঙ্গে দেখা করলে মন্দ হয় না। চিনতে পারবে কি দশ বছর বাদে? দেখাই যাক না।
কিন্তু কেন? কুন্তল চ্যাটার্জিকে নিয়ে মাথা ঘামাবার কি দরকার তার? সে রমেন বোস, ওরফে মাতাল বোস, আইন—আদালতের ধার ধারে না, দিনান্তে একটু স্কচ পেলেই খুশি, তার এত গরজ কেন কুন্তল চাটুজ্যের মামলা নিয়ে? কেন আবার! ঢাকের বাদ্যি শুনলেই চড়ুকে পিঠ সুড়সুড় করে। তেমনি মামলার গন্ধ পেলেই উকিল—ব্যারিস্টারের গা চুলকায়।
কিন্ত হাসনুহানার গন্ধে রোমাঞ্চিত এই অন্ধকারের ভেতর থেকে কে যেন হঠাৎ বলে উঠল, কাকে ফাঁকি দিচ্ছ রমেন বোস? কে কুন্তল চাটুর্জ্যে, তার মামলার জন্যে তোমার দায় পড়েছে। তোমার আসল দায় মিতালি তোমার মরা প্রেমকে যে কবর খুঁড়ে আবার বাঁচিয়েছে! যাকে তুমি এখনও ভালোবাসো।
বোগাস! রমেন প্রায় চেঁচিয়ে উঠল : ও—সব বাজে ব্যাপারে আমি নেই।
হঠাৎ তার চিন্তার খেই গেল ছিঁড়ে। একটা চমৎকার অর্কেস্ট্রার বাজনা ভেসে এল প্রথম ফাল্গুনের হাওয়ায়। আশেপাশে কোথায় যেন গ্রামোফোন রেকর্ড বাজছে। রমেনের মনে পড়ে গেল—এমনি হঠাৎই মনে পড়ে গেল—শোভা ইম্যানুয়েল খুন হবার সময় তার ঘরেও একখানা রেকর্ড বাজছিল। জ্যাক স্টিফেনের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা।
* * *
বিকেল থেকেই দীপু বায়না ধরেছে, 'রাণুমাসির বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে যাব।' মিতালি কান দেয়নি। কিন্তু সন্ধের পর তার বায়না আদুরে কান্নার পর্যায়ে উঠল। ঠাকুরকে রাতের রান্না বুঝিয়ে দিতে দিতে, মিতালি দীপুর একঘেয়ে কান্না শুনতে পেল: 'ওরে আমি রাণু মাসির বিয়েতে যাব রে। ওরে আমি নেমন্তন্ন খাব রে।'
রান্নাঘর থেকে শোবার ঘরে এসে দাঁড়াল মিতালি।
এই, চুপ কর!
কোঁকড়া চুলের গোছা দুলিয়ে দীপু বললে, আগে রাণুমাসির বিয়েতে চলো, তবে চুপ করব।
না, আমাদের যেতে নেই।
কেন যেতে নেই? আমাদের তো নেমন্তন্নর চিঠি পাঠিয়েছে।
পাঠাক। তবু আমাদের যেতে নেই। আমরা যাব না।
দীপু তৎক্ষণাৎ আবার সুর ধরলে, ওরে আমি রাণুমাসির বিয়েতে —ইত্যাদি।
বাইরের অন্ধকার বারান্দায় ভূতের মতো চুপ করে বসে ছিল কুন্তল। আলো জ্বালেনি। বাড়ি থেকে বেরুনো আজকাল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সারাটা দিন বহুবার পড়া বইগুলো আবার ওলটায়, নয়তো চুপচাপ কি যেন ভাবে। গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙে গেলে মিতালি দেখেছে, অন্ধকার বারান্দায় একা একা বিনিদ্র কুন্তল পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্সি জেলে সেই কালাপানি—যাত্রী 'দায়মলি'দের মতো। দীপুর কান্না শুনে কুন্তল উঠে ঘরে এসে দাঁড়াল। অসীম বিরক্তিতে মিতালি তখন দীপুর কান ধরে ধমকাচ্ছে, চুপ কর বলছি—চুপ কর—
কুন্তল আস্তে আস্তে বললে, দীপু নেমন্তন্ন খেতে ভালোবাসে, রাণুদের ওখানে গেলেই তো হয়।
দীপুর কান ছেড়ে দিয়ে, মিতালি সংক্ষেপে জবাব দিল, না।
গেলে ক্ষতিটা কি? রাণু তোমার আপন খুড়তুতো বোন, সামাজিকতার দিক থেকেও—
কি এক মর্মান্তিক জ্বালায় মিতালির দুই চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। ধাতব গলায় বললে, কোন মুখে বলছ শুনি? বিয়েবাড়িতে যাব দশজনের টিটকিরি শুনতে? আমাদের আবার সামাজিকতা কি? আমরা সমাজের বাইরে, আমরা হাড়ি—মুচিরও অধম!
আগুনের হলকার মতো মিতালি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বাপ—মায়ের কথা—কাটাকাটিতে ঘাবড়ে গিয়ে দীপু কিছুক্ষণ থেমেছিল, মা চলে যেতেই সানাইয়ের পোঁ ধরার মতো সেও ছেড়ে দেওয়া সুর তোড়ে ধরলে, ওরে আমি ইত্যাদি।
নিমেষে কুন্তলের মাথার মধ্যে কি যেন ঘটে গেল। আলনা থেকে টেনে নিল দীপুরই প্যান্টের বেলট। তারপর সপাং করে একটা আওয়াজ, আর একটা আর্ত—চিৎকার! দ্বিতীয় বার হাতখানা তুলতেই আর একটা হাত এসে বেলট চেপে ধরল।
'থাক। তোমার হাতের মার ও সইতে পারবে না—মরে যাবে।' চোখে—মুখে অপরিসীম ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা নিয়ে মিতালি চরম কথাটা উচ্চচারণ করলে, 'খুনির হাত কিনা!'
কি বললে?—গলা চিরে চিৎকার করে উঠল কুন্তল। প্রচণ্ড ভূমিকম্পে তার পায়ের তলায় মেঝেটা যেন দুলছে। অবশ হাত থেকে খসে পড়ল বেলটটা। তারপর অসমছন্দে পা ফেলে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অন্ধকার বারান্দায়—বারান্দা থেকে সিঁড়িতে—সিঁড়ি থেকে রাস্তায়—
মিতালি ডাকলে না।
* * *
পথেরও শেষ নেই, চলারও শেষ নেই যেন। আকাশে একটি তারা থেকে অনেক তারা উঠল, তবু কুন্তল ঘুরছে পথে পথে। খুনির হাত! যে—হাত একদা পিয়ানোর ওপর বিদ্যুৎলীলায় খেলে বেড়াত। যে—হাতের সরু লম্বা আঙুল দেখে মিতালী নিজেই বলেছিল, 'তোমার আঙুলগুলো মোজার্টের মতো—টিপিক্যাল আর্টিস্টের হাত!' সেই শিল্পীর হাত সত্যই আজ খুনির হাত হয়ে গেছে, নইলে দীপুর কচি গায়ে এ হাত আঘাত হানল কি করে?
পথ চলতে চলতে কুন্তলের মনে হল, আশেপাশে সবাই যেন বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে, আর ফিসফিস করে বলছে, ওই দেখ খুনি!
সামনের দেয়ালে দৃষ্টি পড়তেই কুন্তল থমকে গেল। বাণী চিত্রমের 'পুষ্পবাসর' ছবির একটা রঙিন পোস্টার। রক্তের মতো লাল টকটকে হরফগুলো জ্বলছে—'সুরশিল্পী কুন্তল চ্যাটার্জি'।
দেখতে দেখতে হঠাৎ 'সুরশিল্পী' কথাটা মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠল 'খুনী'? হিংস্র হয়ে উঠল কুন্তলের চোখ দুটো। দু—পা এগিয়ে একটানে চড়চড় করে ছিঁড়ে ফেললে পোস্টারখানা। আর, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ঘাড়ে কে যেন হাত রাখলে। সেই হাতে উষ্ণ বন্ধুতার স্পর্শ। কুন্তল মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই লোকটা হাসল। মিষ্টি প্রসন্ন হাসি। হেসে বলল, আরে বা! চিনতে পারছ না নাকি? আমি রমেন বোস হে!
অবাক হয়ে চেয়ে রইল কুন্তল।
রমেন বললে, মনে পড়ে সেন্ট জেভিয়ার্সে সেই ফাদার জোশেফ, ডিবেটিং ক্লাবে তোমার—আমার সেই কথার লড়াই, গ্রীষ্মের ছুটির আগে সেই থিয়েটার—একবার 'অ্যাজ ইউ লাইক ইট' নাটকে তুমি সাজলে রোজালিন্ড আর আমি ওরল্যান্ডো। কি হে, ভুলে গেছো নাকি দোজ গ্রিন ইয়ার্স অফ আওয়ার লাইভস?
ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসতে লাগল কুন্তলের মুখের কুঞ্চন। নিভে এল দু—চোখের খরদ্যুতি। একটা ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে উদাস গলায় বললে, কিছুই ভুলিনি রমেন।
বহুদিন দেখা নেই, তোমার ওখানে যাব ভাবছিলাম। পথে দেখা হল, ভালোই হল। জরুরি কাজ নেই তো এখন? চলো আমার ওখানে, বেশ জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক। ট্যাক্সি।
কোনো কথা বলবার অবকাশ না দিয়ে কুন্তলকে ট্যাক্সিতে তুলে নিলে রমেন।
চৌরঙ্গি দিয়ে যেতে যেতে রমেন হঠাৎ বলে উঠল, ড্রাইভার সাহেব, একটু বাঁয়ে রাখো। আমার র্যাশন নিতে হবে।
রাস্তার বাঁয়ে একটা স্টোর্স, বড় বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা—ওয়াইন অ্যাণ্ড প্রভিসন। 'জাস্ট এ মিনিট' বলে রমেন নেমে গেল।
ব্রাউন পেপারে মোড়া একা বোতল হাতে দোকান থেকে বেরোতেই তার কানে ভেসে এল, 'শ্যারাবী যা—যা—যা।'
মনে মনে গানটার তারিফ করে এদিক—ওদিক তাকাতেই রমেন দেখলে, পাশেই একটা গ্রামোফোনের দোকান। এক মুহূর্ত কি যেন ভাবলে সে, তারপর ট্যাক্সি লক্ষ্য করে বললে, একবার নেমে আয় তো কুন্তল, দু—একটা রেকর্ড বেছে দিবি।
দোকানে ঢুকে রমেন বললে, বিলিতি রেকর্ড রাখেন?
দোকানি সবিনয়ে নিবেদন করলে, আজ্ঞে রাখি।
কিছু অর্কেস্ট্রার রেকর্ড শোনান তো!
খান দুয়েক রেকর্ড বাজাবার পর রমেন জিজ্ঞেস করলে, জ্যাক স্টিফেনের লেটেস্ট অর্কেস্ট্রা আছে?
ঘাড় নেড়ে দোকানি মেশিনে চাপাল জ্যাক স্টিফেনের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা। আর, রুদ্ধনিশ্বাসে রমেন দু—চোখের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করে চেয়ে রইল কুন্তলের মুখের পানে। কিন্তু এ কি দেখছে সে? শান্ত সমাহিত মুখ, স্বপ্নগভীর দুই চোখ। জ্যোৎস্নারাতের সমুদ্রে মতো উদ্বেলিত সুর—মূর্ছনায় ডুবে গেছে শিল্পীর আত্মা। রেকর্ড থামলে ধীরে ধীরে কুন্তল বললে, অপূর্ব? এইখানাই নাও।
ট্যাক্সিতে ফিরে এসে রমেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। যে ঘরে জ্যাক—স্টিফেনের অর্কেস্ট্রা বাজে, সেখানে আর যেই পারুক, কুন্তল চ্যাটার্জি খুন করতে পারে না কখনও। আইনের চোখে এটাকে হয়তো একটা বড় রকমের সাফাই হিসাবে খাড়া করা যায়। তবু মনে মনে জোর পাচ্ছে না রমেন। আসল রহেস্যের কিনারা হল কই? ২৬ মাঘের সেই কুয়াশার রাতে কুন্তল কেন গিয়েছিল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ম্যানসনে? কেন? কেন? কেন?
কুয়াশার রাত কি কাটবে না?
* * *
দুটি সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়ার দুটি সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। ড্রয়িংরুমে সবুজ ঘেরাটোপে ঢাকা আলোর নিচে মুখোমুখি বসে আছে দুই বন্ধু।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ম্যানসনে তুমি ঘটনার রাতে গিয়েছিলে, এ—কথা আদালতে স্বীকার করতে গেলে কেন কুন্তল?
পারলাম না রমেন—মিথ্যে বলার চেষ্টা করেও সত্যটাই বেরিয়ে গেল।
রমেনের গলা সহৃদয়তার কোমল হয়ে এল: তোমার মতো একটা আর্টিস্টের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার স্বীকারোক্তি তোমারই বিপক্ষে কতখানি গেছে, তা বোঝ?
বুঝি?
ওই বাড়িতে তুমি কি সে—রাতে প্রথম গিয়েছিলে?
না। আগেও যেতাম।
আগেও যেতে! (দুর্বার কৌতূহলে রমেনের দুই চোখ দীপ্ত হয়ে উঠল) কার কাছে কুন্তল? নর্তকী শোভার কাছে?
না। চোখেই দেখিনি তাকে।
তবে কেন যেতে, কার কাছে যেতে?
কুন্তলের মুখে ছায়া পড়ল। বললে, ও—কথা জিজ্ঞেস কোরো না রমেন, জবাব দিতে পারব না।
ছায়া রমেনের মুখেও পড়ল। তবু কণ্ঠে আরও সহৃদয়তা এনে বললে, আমি তোর পুরনো বন্ধু, আমাকে বলতে বাধা কিসের?
এতক্ষণ সহজ ভাবে কথা বলছিল কুন্তল, হঠাৎ মনে মনে শামুকের মতো গুটিয়ে গেল। বললে, ও প্রশ্ন থাক।
'ছেলেমানুষী করিস নে কুন্তল।' রমেন উঠে এসে কুন্তলের পাশে বসল, 'মিতা আর দীপুর' মুখ চেয়ে বলতেই হবে তোকে। না বললে, প্রমাণ না দিলে আদালত বিশ্বাস করকে কেন যে, ঘটনার রাতে শোভা ইম্যানুয়েলের ঘরে তুই ছিলি না? বল কার ঘরে ছিলি—কে সে?
'না—না—না, বলতে পারব না আমি—বলার উপায় নেই।' কুন্তলের কঠিন মুখখানা লাল হয়ে উঠল এক অবরুদ্ধ আবেগে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে উঠল, তার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ইজ্জৎ জড়িয়ে আছে রমেন—প্রকাশ হলে আমার স্বর্গগত বাবর নামে কলঙ্ক পড়বে!
তারপর হঠাৎ উঠে ঘরের বাইরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
* * *
সে—রাতে ল্যান্সডাউন রোডের একটি বাড়ির ড্রয়িংরুমে ভোর অবধি বাতি জ্বলেছিল, আর চিন্তামগ্ন একটি মানুষের অস্থির পদচারণার বিরাম ছিল না।
অনেক সিগারেট ছাই হল। নিঃশেষ হয়ে গেল স্কচের পুরো বোতল। রমেন বোসের চিন্তা তবু শেষ হল না। সারারাত ধরে সে ভেবেছে কুন্তলের শেষ কথাগুলো: 'তার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ইজ্জৎ জড়িয়ে আছে—প্রকাশ হলে আমার স্বর্গগত বাবার নামে কলঙ্ক পড়বে!'
এতখানি আশ্চর্য রমেন জীবনে হয়নি। কেননা, কুন্তলের পরলোক—গত বাবা অধ্যাপক কমলেশ চাটুজ্যেকে সে ব্যক্তিগত ভাবেই জানত। সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে রিপনে এসে সে তাঁর ছাত্র হয়েছিল দু'বছর। সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে কমলেশ চাটুজ্যের যতটা খ্যাতি ছিল, নৈতিক আদর্শের দিক দিয়েও তাঁর সুনাম ছিল ততখানি। কিন্তু কি এমন ঘটেছিল তাঁর মতো মানুষের জীবনে, যার কলঙ্কিত ইতিবৃত্ত সারাজীবন ধরে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে তাঁর ছেলে? এমন কে আছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের সেই ফ্ল্যাট—বাড়িটায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাটুজ্যে—পরিবারের ইজ্জৎ? যার পরিচয় প্রকাশ পেলে কলঙ্ক পড়বে স্বর্গগত কমলেশ চাটুজ্যের মতো আদর্শবাদীরা নামে? কে সে? জানা কি এতই অসম্ভব?
অদ্ভুত জেদ ওই ইডিয়ট কুন্তলটার। কিছুতেই বললে না। ঠিক আছে, জেদ রমেন বোসেরও কম নয়। শেষ অবধি সে চেষ্টা করে দেখবে রহস্যভেদ করা যায় কিনা। ভাগ্যের কাছে শেষ সুযোগ চেয়ে নেবে খুনি আসামি কুন্তল চ্যাটার্জিকে বাঁচিয়ে, মিতালির মুখে হাসি ফোটাবার।
হ্যাঙার থেকে কোটটা নিয়ে কাঁধে ফেলল রমেন। জানালা দিয়ে সকালের রোদ এসে লুটিয়ে পড়েছে ঘরের মেঝেয়। সারারাত জেগে মাতালেরও দু'চোখ জ্বালা করছে। তা হোক, এখুনি যেতে হবে। সময় নেই। আগামীকাল কুন্তলের বিচারের শেষ দিন।
* * *
শুধু পাঁচ টাকার একখানা নোট। তাতেই কাজ হবে রমেন জানত। দুনিয়াটা কার বশ? দুনিয়া টাকার বশ।
ফ্ল্যাট ভাড়ার সন্ধানে এসেছি বলায় রমেনকে দারোয়ান প্রথমে হাঁকিয়েই দিতে চেয়েছিল, 'না, একভি কামরা খালি নেই এ বাড়িতে। সতোরোটা ফেলাট, সব ভর্তি।' তারপর নোটখানা হাতে পেয়ে সুর বদলে গেল, হ্যাঁ, খালি আছে একটা—তিনতলায় ওই পচ্ছিম দিকে। লেকিন বাবুসাব, আজকাল ভারি কড়াকড়ি হয়েছে ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে।
কেন দারোয়ানজী?
এপাশে ওপাশে। তাকিয়ে চুপি চুপি দারোয়ান বললে, চারতলায় সেদিন একটা নাচওয়ালী খুন হয়েছে।
তাই নাকি?—রমেন যেন ভয়ানক ঘাবড়ে গেল : বাড়িটা তাহলে ভালো নয় বলো?
না, না, বাড়ি খারাপ নয় বাবুসাব। তবে অমন দু—একটা খারাপি হয়েই থাকে ফেলাট—বাড়িতে।
ভাড়াটেরা লোক কেমন?
বিলকুল ভদ্দর আদমি!
সবাই ফিরিঙ্গি নাকি? না, অন্য জাত আছে?
সবরকম আছে বাবুসাব—এ বাড়িটা মানুষের চিড়িয়াখানা। এই ধরুন চারতলায় থাকে ব্যাঙ্কের হিন্দুস্থানি মেমসাহেব, তিনতলায় সিন্ধি, দু—তলায় অফসর মাদ্রাজি আর ফলওয়ালা পাঞ্জাবি—
মনে মনে রমেন বলে উঠল, চুলোয় যাক চিনা সিন্ধি মাদ্রাজি পাঞ্জাবি। তারপর উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কোনও বাঙালি নেই।
জরুর আছে। দোতলার ন' নম্বর ফেলাটে এক বুঢঢি বাঈ থাকে আর তার লেড়কা।
বটে! এক বুড়ি মহিলা আর তার ছেলে! কত বয়েস ছেলের? কি করে?
দারোয়ানের চোখে সংশয় দেখা দিল : এত খবরে আপনার কাজ কি বাবুসাব?
রমেন সামলে নিলে, বাঙালি কিনা, তাই খোঁজ নিচ্ছি।
পাগড়িটা জুত করে বাঁধতে বাঁধতে দারোয়ান বললে, কাল আইয়ে বাবুসাব। আমায় এখন মালিকের অফিসে যেতে হবে ভাড়ার রসিদ আনতে। কুছু ভাববেন না, ফেলাট আপনাকে জরুর পাইয়ে দেব, লেকিন হামার দস্তরীটা—
হেসে গোঁফ চুমরে দারোয়ান রাস্তায় নেমে গেল, আর ফ্রি স্কুল ফ্রিটের সতেরো ফ্ল্যাটওয়ালা সেই প্রকাণ্ড ম্যানসনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল রমেন। কি করবে সে এখন? ভাগ্যের কাছে শেষ সুযোগ নেবে? দেখাই যাক না অন্ধকারে ঢিল ছুড়লে কোথায় গিয়ে লাগে।
সামনেই সিঁড়ি। উঠে গেল রমেন। ন—নম্বর ফ্ল্যাটের দরজা খুঁজে নিতে বেশি দেরি হল না। আস্তে আস্তে টোকা দিলে কয়েকটা। একটু পরেই অল্প ফাঁক হয়ে গেল দরজার কপাট দুটো। দেখা গেল সাদা শাড়িপরা নিরাভরণা একটি বয়স্কা মহিলাকে। বৃদ্ধা না বলে প্রৌঢ়া বলাই উচিত। মাথার চুলে সবে রূপালি ছাপ। লেগেছে, রোগক্লিষ্টা হলেও চামড়া এখনও লোল হয়নি। শান্ত সংযত চেহারা তবু অত্যন্ত গৌরবর্ণ শীর্ণ মুখের রেখায়, ঘন—কালো টানা চোখের কালিপড়া কোলে, পাতলা, লালচে ঠোঁটের বঙ্কিমায় বিগত রূপ—যৌবনের কয়েক পৃষ্ঠা ইতিহাস যেন পড়তে পারলে রমেন।
কে?
আমি কুন্তল চ্যাটার্জির কাছ থেকে এসেছি।
অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন মহিলা। তারপর আশ্চর্যরকম মিষ্টি গলায় বললেন, চিনতে পারলাম না তো!
চিনতে পারলেন না। প্রফেসর কমলেশ চ্যাটার্জির ছেলে কুন্তল।—প্রত্যেকটি কথা স্পষ্ট করে উচ্চচারণ করলে রমেন।
চলন্ত একটুকরো মেঘ সরে গেল কি মহিলার মুখের ওপর দিয়ে? না রমেনের চোখের ভুল?
তেমনি শান্ত মধুর স্বরে মহিলাটি বললেন, তোমার বোধ হয় ভুল হয়েছে বাবা।
কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কথা হারিয়ে গেল তার। ভুল! সত্যিই কি ভুল হল তার জীবনে অঙ্ক কষায়? উত্তর তো মিলছে না!
দরজা বন্ধ করার জন্যে কপাটে হাত দিলেন মহিলা। হঠাৎ আবেগের সঙ্গে বলে উঠল রমেন, আগামীকাল কুন্তলের ফাঁসির হুকুম হবে। তাই তার শেষ কথাটা জানতে এসেছিলাম। ভুল হয়ে থাকলে, আমায় মাপ করবেন।
ছোট্ট একটা নমস্কার করে রমেন সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে সেই আশ্চর্য মিষ্টি গলার ডাক এল, শোনো।
ফিরে তাকাল রমেন। কি এক রুদ্ধ ব্যাকুলতায় মহিলাটির মুখের রেখাগুলি কাঁপছে।
ভেতরে এসো।
যেন সকালের রোদ লেগে ঝলমলিয়ে উঠল রমেনের রাতজাগা ক্লান্ত মুখ। না, ভুল হয়নি জীবনের অঙ্কে। মিলেছে উত্তর।
চৌকাঠ পার হয়ে ভেতরে পা দিতেই মহিলা বললেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও বাবা। তোমার সঙ্গে নিরিবিলিতে কথা বলতে চাই।
* * *
ন—নম্বর ফ্ল্যাট থেকে রমেন যখন বেরিয়ে এল, তখন দুপুর। পার্ক স্ট্রিট ধরে শিস দিতে দিতে চলল সে। খুশি হলে সে শিস দেয়।
কাজ এখনো একটু বাকি আছে। অ্যাটর্নি সেন অ্যান্ড রায়ের অফিসে গিয়ে আজকের এই চমকপ্রদ খবরটা জানানো। ব্যাস, তা হলেই ছুটি।
কিন্তু আরেকটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল রমেন বোসের জন্য। অ্যাটর্নির অফিসে পৌঁছতেই, সিনিয়র পার্টনার সেন প্রায় লাফিয়ে উঠলেন : কোথায় ছিলে হে বোস? সকাল থেকে পাঁচ—পাঁচবার ফোন করেছি তোমাকে।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে রমেন বললে, কেন? কি ব্যাপার?
আর ব্যাপার! মিস্টার দত্তগুপ্ত হাসপাতালে।
হাসপাতালে মানে?
ক'দিন থেকেই ভীষণ পেটের যন্ত্রণা হচ্ছিল, আজ সকালে অপারেশন হয়েছে।
চেয়ারে সোজা হয়ে বসল রমেন, মাই গড! কাল যে কুন্তলের কেস—লাস্ট ডে। উপায়?
সেন বললেন, উপায় আর কি! কোর্টের অনুমতি নিয়ে রেখেছি, দত্তগুপ্তের বদলে কাল কোর্টে তুমিই অ্যাপিয়ার করো।
আমি!—রমেনকে হঠাৎ যেন বিছে কামড়াল। তারপর চেয়ারে হাত—পা এলিয়ে দিয়ে বললে, গুপ্তসাহেব এমনি করে জব্দ করল আমায়!
সেন বললেন, কেস তো তোমার জানাই আছে। তবু সন্ধেবেলা কাগজপত্র নিয়ে দত্তগুপ্তের জুনিয়র যাবে তোমার বাড়িতে।
গম্ভীর মুখে রমেন বললে, না গেলেই বাধিত হব। সন্ধের পর আমি একটু দাম্পত্য—কর্তব্য সারি।
দাম্পত্য—কর্তব্য! সেনের চোখ বড় বড় হয়ে উঠল, বিয়ে করেছ নাকি হে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। লাভ ম্যারেজ।
বটে! বটে! কার সঙ্গে?
নির্বিকার ভাবে রমেন জবাব দিলে, স্কটল্যান্ডের ভাটিখানার সঙ্গে।
অফিস—ঘর কেঁপে উঠল সেনের অট্টহাসিতে। রমেন একখানা স্লিপ টেনে নিয়ে খসখস করে একটা নাম লিখল। সেখানা সেনের হাতে দিয়ে বললে, কাল যেন এই নতুন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় সেন—সাহেব। চলি।
কিন্তু চলে যেতে গিয়েও ফিরে এল রমেন। ব্যস্ত হয়ে বললে, ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে—র্যাশন কেনা হয়নি। গোটাকতক টাকা হবে?
একখানা বড় নোট বের করে সেন বললেন, তা হবে। কিন্তু কাল কোর্টে ঠিক সময়ে দেখা হবে কি?
নোটখানা পকেটে পুরে রমেন বললে, বাই স্কচ, সিওর ।
রহমেন চলে গেলে মিঃ সেন ভুরু কুঁচসকে স্লিপথানার দিকে তাকালেন। নতুন সাক্ষীর নাম লেখা রয়েছে—
সন্ধ্যামালতী দেবী
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ম্যানসন
ফ্ল্যাট—৯
* * *
ধীরে ধীরে সাক্ষীর ডকে উঠলেন নতুন সাক্ষী। সাদা শাড়ির কালো পাড় ঘিয়ে আছে তাঁর অত্যন্ত গৌরবর্ণ বিষণ্ণ মুখটিকে। টানা চোখ দুটি রক্তাভ, অল্প ফোলা।
আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভূত—দেখার মতো চমকে উঠল কুন্তল। বিবর্ণ হয়ে গেল মুখ। চিৎকার করে বলতে গেল, 'যাও তুমি, যাও,' আওয়াজ বেরুল না গলা দিয়ে।
কালো গাউন দুলিয়ে, সিংহের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে পাবলিক প্রসিকিউটর সুরেন ভাদুড়ি এগিয়ে গেলেন নতুন সাক্ষীর কাছে। শপথ গ্রহণের পর শুরু হল জেরা।
আপনার নাম?
অপূর্ব মধুর গলায় জবাব শোনা গেল, সন্ধ্যামালতী দেবী।
কোথায় থাকেন?
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ম্যানসনের ন—নম্বর ফ্ল্যাটে।
ঘটনার রাতে কোথায় ছিলেন?
আমার ঘরে।
জেগে ছিলেন?
ছিলাম।
আচ্ছা, ঘটনার বিষয় কি জানেন বলুন তো?
সন্ধ্যামালতী বলতে লাগলেন, তখন রাত বারোটা হবে। আমি অসুস্থ হয়ে শুয়েছিলাম ঘরে। হঠাৎ একটা আর্তচিৎকার শুনতে পাই, আর তারপরেই সিঁড়িতে জুতোর দ্রুত আওয়াজ। ভয়ানক একটা কিছু ঘটেছে আশঙ্কা করে আমি অসুস্থ অবস্থাতেও দরজা খুলে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াই।
তাহলে আসামিকে আপনি পালাতে দেখেছেন নিশ্চয়?
মৃদু অথচ অতি স্পষ্ট গলায় সন্ধ্যামালতী বললেন, না! কুন্তল আমার ঘরেই ছিল। আমার জন্যে একটা কবিরাজী ওষুধ খলে মাড়ছিল তখন।
সুরেন ভাদুড়ির মোট ভুরু জোড়া কুঁচকে সেকেন্ড ব্র্যাকেট হয়ে গেল। কড়া পণ্ডিত মশায়ের মতো কঠোর স্বরে তিনি ধমকে উঠলেন, কি বলছেন আপনি জানেন?
সাক্ষীর ডক থেকে জবাব এল, জানি। যা সত্যি, তাই বলছি।
তাহলে আপনি বলতে চান যে, আসামি খুন করেনি?
স্থির শান্ত গলায় সন্ধ্যামালতী বললেন, না।
এক মুহূর্তের জন্যে নিশ্চুপ হয়েই আদালত—ঘর আবার গুঞ্জনে ভরে উঠল। কৌতূহলী দর্শকদের দৃষ্টির সামনে সন্ধ্যামালতী মাথার কাপড় আরও একটু টেনে দিলেন! আর আসামির কাঠগড়া থেকে নিষ্পলক চোখে কুন্তল চেয়ে রইল তাঁর দিকে।
কিন্তু এত সহজে দমবার পাত্র নন সুরেন ভাদুড়ি। বহু ক্রিমিন্যাল কেস করে করে তিনি মামলা—বিশারদ হয়েছেন। ছাঁটা গোঁফের নিচে কুটিল হাসি হেসে তিনি প্রশ্ন করলেন নতুন সাক্ষীকে, আচ্ছা, সে—রাতে আসামি কুন্তল কতক্ষণ ছিল আপনার ঘরে? প্রায় ঘণ্টাখানেক।
তারপরে?
স্টুডিওতে চলে যায়।
আসামি কুন্তল যখন আপনার ঘরে ছিল, তখন তার গায়ে কি ছিল বলতে পারেন?
সবুজ রঙের গরম কোট।
আর টাই? কি রঙের ছিল মনে আছে?
লাল রঙের।
যেন বহুপ্রার্থিত কোনো হারানো জিনিস খুঁজে পেয়েছেন, এমনি মুখের ভাব নিয়ে ভাদুড়ি এজলাসের দিকে তাকিয়ে পুনরুল্লেখ করলেন, সবুজ কোট, লাল টাই! তারপর পাকা খেলোয়াড় যেমন কর্নার থেকে গোলে বল মারে, তেমনি করেই প্রশ্ন করলেন, আসামি কুন্তল যদি না—ই খুন করে থাকে, তবে এ—কথাটা পুলিশকে বা আদালতকে এতদিন জানাননি কেন আপনি?
সন্ধ্যামালতীর মুখখানা আরও ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। কোনো কথা বেরোল না তাঁর মুখ দিয়ে।
বলুন, কি উদ্দেশ্যে কথাটা চেপে রেখেছিলেন?
সন্ধ্যামালতী তবু নির্বাক।
বিজয়ী সিংহের মতো গ্রীবাভঙ্গি করে ভাদুড়ি বললেন, ইওর অনার, সাক্ষীর কাছে আর কোনো প্রশ্ন আমার নেই। শুধু মাননীয় জুরিদের কাছে আমার শেষ কথা বলতে চাই।
তারপর কালো গাউন দুলিয়ে তেমনি রাজকীয় ভঙ্গিতে জুরিদের বেঞ্চের দিকে এগোতে এগোতে বলতে লাগলেন, সাক্ষী সন্ধ্যামালতী দেবীর উক্তি কতখানি যথার্থ, তা আপনাদেরই বিচার করে দেখতে অনুরোধ করি। তাঁর সাক্ষ্য যেমন অসঙ্গতিপূর্ণ তেমনি অবিশ্বাস্য। আপনাদের স্মরণ থাকতে পারে, নিহতা শোভার প্রতিবেশী যমুনা লালা তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন যে, সবুজ কোট আর লাল টাই পরে আসামিকে তিনি চারতলা থেকে স্বচক্ষে নেমে যেতে দেখেছেন। অথচ সন্ধ্যামালতী বলছেন, ঠিক সেই সময় আসামি ওই একই পোশাক পরে দোতলায় তাঁর ঘরে বসে 'খলে' ওষুধ মাড়ছিলেন। একই পোশাকে একই ব্যক্তির একই সময়ে দু—জায়গায় উপস্থিতিটা ভৌতিক ব্যাপার বলে মনে হয় না কি? তাছাড়া, সন্ধ্যামালতী বলেছেন, ঘটনার প্রায় ঘন্টাখানেক পরে আসামি কুন্তল ওই বাড়ি থেকে চলে যায়। তাঁর এ—কথাও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না। কেননা, হত্যাকাণ্ডের ঠিক আধ ঘন্টার মধ্যেই ওই ম্যানসনের সদরে কড়া পুলিশ—পাহারা মোতায়েন হয়ে যায়। সবুজ কোট, লাল টাই পরা কোনো লোককে তারা ঢুকতে বা বেরোতে দেখেনি। সন্ধ্যামালতী বলেছেন বটে, আসামি কুন্তল খুন করেনি, কিন্তু তাঁর এই উক্তির স্বপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও দেখাতে পারেননি? তাছাড়া তিনি তাঁর এই সাক্ষ্য এতদিন কেন গোপন করেছিলেন, সে—বিষয়ে তাঁর অদ্ভুত নীরবতা সন্দেহজনক নয় কি? এক্ষেত্রে সন্ধ্যামালতীর সাক্ষ্য—বিবৃতি সত্য না মিথ্যা দিয়ে তৈরি, তা আপনারাই বুঝে দেখুন।
এক সেকেন্ড থামলেন সুরেন ভাদুড়ি। জুরিরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে তাঁর বক্তৃতা। মনে মনে খুশি হয়ে গুরুগম্ভীর আওয়াজে আবার তিনি শুরু করলেন, মাননীয় জুরিগণ, এই মামলার প্রথম দিকে আমি বলেছিলাম, পৃথিবীতে জঘন্যতম পাপ হচ্ছে নরহত্যা। আজও সেই কথাই বলছি। পূর্ববর্তী তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে পরিষ্কার ভাবে বোঝা গেছে যে, ২৬শে মাঘ রাতে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ম্যানসনের নর্তকী শোভা ইম্যানুয়েলকে আসামি কুন্তল চ্যাটার্জিই খুন করে পালিয়েছিল। হত্যাকারী কুন্তল এবং নিহতা শোভা—দুজনেই গারাজনা জগতের লোক—সুতরাং দুজনের মধ্যে যোগাযোগ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। অথচ আসামি কুন্তল চ্যাটার্জি সমাজে একজন ভদ্র সৎ—চরিত্র যুবক, একজন কৃতী সঙ্গীতশিল্পী বলে সুখ্যাত। এই ধরনের মুখোশধারী শয়তানেরাই সমাজের পরম শত্রু। সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মুখ চেয়ে ওই খুনি আসামির কঠোর শাস্তি হওয়াই কি উচিত নয়? মাননীয় জুরিগণ, আজ ন্যায়ের তুলাদণ্ড হাতে আপনারা বিচারের আসনে বসেছেন। আপনাদের মহান দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি আমার বক্ত্যব শেষ করলাম।
সার্কাসের খেলোয়াড় যেমন খেলা শেষে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানায়, তেমনি করে এজলাসের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর সুরেন ভাদুড়ি নিজের আসনে বসলেন। তাঁর গুরুগম্ভীর স্বর গমগম করতে লাগল আদালতকক্ষে।
জজসাহেব বললেন, এবার আসামি পক্ষের কাউন্সেল সাক্ষীদের জেরা করতে পারেন।
কিন্তু জেরা করবে কে? দেখা গেল ডিফেন্স কাউন্সিলের আসন শূন্য। গুনগুন ধ্বনি উঠল দর্শক—মহলে।
দত্তগুপ্তের জুনিয়র উৎকণ্ঠায় এদিক—ওদিক তাকাতে লাগল। কোথায় রমেন বোস? অ্যাটর্নি সেন প্রমাদ গুনলেন। রমেন বোস কি সত্যিই ডোবালে মামলাটা? কি ভুলই করেছেন তিনি গতকাল তার হাতে একশো টাকার নোটখানা দিয়ে! সাধে কি আর লোকে তাকে মাতাল বোস বলে!
জজসাহেবে আবার বললেন একটু গলা চড়িয়ে, আসামিপক্ষ সমর্থনের জন্যে কেউ আছেন কি আদালতে?
ইয়েস মি লর্ড!
আদালত—ঘরের ও—প্রান্ত থেকে এটা সুপরিচত কণ্ঠের সাড়া ভেসে এল। উদগ্রীব হয়ে তাকালেন জজসাহেব, তাকালেন সুরেন ভাদুড়ি, জুনিয়র ব্যারিস্টার, অ্যাটর্নি, দর্শকমণ্ডলী সবাই। দেখা গেল, দর্শকের ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে কালো গাউন পরা দীর্ঘাকার একটি অতি পরিচিত মূর্তি। রমেন বোস!
এজলাসের সামনে এগিয়ে এসে স্মিত মুখে সহজ গলায় রমেন বোস বললে, আজকের এই বিচার—সভায় আমার আসার কথা নয়! কিন্তু সুযোগ্য ডিফেন্স কাউন্সেল মিস্টার দত্তগুপ্ত হঠাৎ গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে আসতে হল। দুনিয়ায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ন্যায়ের পক্ষ সমর্থনের অধিকার সকলেরই আছে, ব্যারিস্টারের অধিকারের চেয়েও সর্ব মানুষের সেই অধিকার অনেক বড়। সেই বৃহত্তর অধিকার নিয়েই আমি আজ এখানে এসেছি।
মি লর্ড, জেন্টলমেন অফ দি জুরি, দর্শকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি এতক্ষণ পাবলিক প্রসিকিউটর মহোদয়ের ওজস্বিনী বক্তৃতার তারিফ করছিলাম। আমার বিশ্বাস, আদালতের বদলে তিনি রঙ্গমঞ্চে যোগ দিলে, বোধ করি শিশির ভাদুড়ির সমতুল্য শিল্পী হতে পারতেন। কিন্তু ব্যারিস্টারের আসল কাজ হল সত্যকে খুঁজে বার করা! বহু প্রশ্ন, বহু জেরা, বহু তর্কেও আমার সহযোগী মিস্টার ভাদুড়ি সত্যকে খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে হয় না। তাঁর সত্যানুসন্ধানে সাহায্য করবার জন্যেই আমি শুধু একটি সাক্ষীকেই জেরা করব। তিনি হলেন সন্ধ্যামালতী দেবী।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যামালতী আবার সাক্ষীর ডকে উঠলেন।
স্মিত মুখে রমেন বোস এগিয় গেল তাঁর সামনে। ধীর নম্র স্বরে প্রশ্ন করল, আপনি তো বিবাহিতা?
স্বাক্ষীর ডক থেকে জবাব এল, হ্যাঁ।
স্বামী জীবিত?
না।
আপনার স্বামীর নাম?
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সন্ধ্যামালতী বললেন, হিন্দু স্ত্রীকে স্বামীর নাম মুখে আনতে নেই।
একটা প্যাড আর পেন্সিল এগিয়ে দিয়ে রমেন বললে, তাহলে লিখে দিন।
আমি লেখাপড়া জানি না।
মৃদু হাসলে রমেন বোস। তারপর পেন্সিলটা প্যাডের ওপর ঠুকতে ঠুকতে প্রশ্ন করলে, অধ্যাপক কমলেশ চ্যাটার্জিকে আপনি চিনতেন?
পাথর হয়ে গেলেন সন্ধ্যামালীত। আর, আসামির কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে উঠল কুন্তল, না, না, চেনেন না—কোন দিনও চিনতেন না।
আদালত—ঘরে চাঞ্চল্য দেখা গেল! জজসাহেব হাতুড়ি ঠুকলেন, অর্ডার, অর্ডার!
রমেন বোস সন্ধ্যামালতীর একেবারে কাছে সরে গেল। কোমল অন্তরঙ্গ সুরে বলতে লাগল, আপনারই জবাবের ওপর একটা মানুষের মরা—বাঁচা নির্ভর করছে। চুপ করে থাকবেন না—কাল আমাকে যা বলেছিলেন, তা যদি সত্য হয়, তবে বলুন, কমলেশ চ্যাটার্জি আপনার কে?
আমার স্বামী।—সন্ধ্যামালতীর অপূর্ব মধুর গলা কেঁপে গেল।
কি ভাবে আপনাদের বিয়ে হয়?
রেজিস্ট্রি করে।
হিন্দু মতে নারায়ণ আর অগ্নিসাক্ষী করে হয়নি কেন?
আমি থিয়েটারের অভিনেত্রী ছিলাম, তিনি ছিলেন সমাজের মানী ব্যক্তি। তাই গোপনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল।
শোনা যায়, কমলেশ চ্যাটার্জির আরেকটি স্ত্রী ছিলেন। কথাটা কি সত্য?
সত্য। তিনিই হিন্দুমতে বিবাহিতা স্ত্রী।
পেন্সিলটা চিবুকে ঠেকিয়ে রমেন বললে, কুন্তল তাহলে কার ছেলে? মানে, কোন স্ত্রীর গর্ভজাত? আপনার?
সন্ধ্যামালতী বললেন, না। আমার স্বামীর প্রথমা স্ত্রীর সন্তান।
আপনি তাহলে কুন্তলের বিমাতা? আপনার কোনো সন্তান আছে?
একটি মাত্র ছেলে।
কত বড়?
কুন্তলের চেয়ে দু—বছরের ছোট।
দেখতে কেমন?
কুন্তলেরই মতো মাঝামাঝি লম্বা, দোহারা স্বাস্থ্যবান চেহারা। তফাত শুধু রঙ আর মুখের গড়নে।
এজলাসের দিকে ফিরে রমেন বলে উঠল, মি লর্ড, সাক্ষীর এই কথাগুলিই বিচারাধীন হত্যারহস্যের চাবিকাঠি।
তারপর সন্ধ্যামালতীকে আবার প্রশ্ন করলে, আচ্ছা, কুন্তলের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন? সাধারণত সৎ মায়ের সঙ্গে সতীনের ছেলের সম্পর্ক যেমন হয়, তেমনি?
সন্ধ্যামালীত একবার তাকালেন আসামির কাঠগড়ার দিকে। নিবিড় মমতায় স্নিগ্ধ হয়ে এল তাঁর মুখ। স্নেহসিক্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, না। কুন্তল আমার আপন সন্তানেরও অধিক। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর তার সেবা, তার সাহায্য না পেলে আমি বাঁচতাম না।
কিন্তু কুন্তল যদি আপনার সন্তানের অধিক হয়, তবে তার এত বড় বিপদে এতদিন আপনি চুপ করে ছিলেন কেন? তদন্তের সময় কেন পুলিশকে বলেননি যে, খুনের সময় কুন্তল আপনারাই ঘরে ছিল?
ছলছলিয়ে এল ঘন কালো টানা চোখ দুটি। নতমুখে সন্ধ্যামালতী বললেন, তখন ভাবিনি যে ওর ফাঁসি অবধি হতে পারে।
আচ্ছা সে—রাতে কুন্তল কখন চলে গিয়েছিল আপনার ঠিক মনে আছে কি?
আছে। খুনের প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে।
সদরে পুলিশ—পাহারা এড়িয়ে গেল কি করে।
সদর দিয়ে সে যায়নি। হাঙ্গামার ভয়ে আমি তাকে ধাঙ্গড় আসা—যাওয়ার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে দিয়েছিলাম পাশের গলিতে।
স্মিত মুখে রমেন বোস বললে, আদালতের তরফ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সন্ধ্যামালতী দেবী। আমার আর একটি মাত্র প্রশ্ন বাকি আছে। ঘটনার রাতে চিৎকার শুনে, আপনার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে কাকে দেখতে পেয়েছিলেন সিঁড়িতে? দ্রুত পায়ে কে নেমে আসছিল চারতলা থেকে?
সন্ধ্যামালতীর মুখ থেকে কে যেন শেষ রক্তবিন্দুটুকু পর্যন্ত শুষে নিলে। পাংশু হয়ে গেল পাতলা ঠোঁট দু'খানা। সাক্ষীর ডকের রেলিং ধরে নতমুখ দাঁড়িয়ে রইলেন আড়ষ্ট হয়ে। কোনো জবাব এল না তাঁর কাছ থেকে।
ধীর—গম্ভীর গলায় রমেন বোস আবার জিজ্ঞেস করলে, বলুন, সে—রাতে কাকে দেখেছিলেন সিঁড়িতে?
শ্বেতপাথরের মূর্তির মতো বোবা হয়ে রইলেন সন্ধ্যামালতী। সেই কঠিন বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে রমেন বোসেরও মুখের চেহারা বদলে যেত লাগল। ব্যগ্র কণ্ঠে বললে, বলুন, জবাব দিন আমার প্রশ্নের। আপনার জবাবের ওপর এই মামলার বিচার নির্ভর করছে সন্ধ্যামালতী দেবী।
শ্বেতপাথরের মূর্তি তবু মুখ খুলল না।
হাল ছাড়লে না রমেন বোস, আবেগ—স্পন্দিত গলায় আবার বলতে লাগল, তাকিয়ে দেখুন ওই আসামির কাঠগড়ার দিকে। যে লোকটি ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, একটু আগে তাকেই আপনি বলেছেন সন্তানের অধিক, যার সেবা আর সাহায্য না পেলে আপনি বাঁচতেন না। সেই ছেলেকে আজ আপনি বাঁচাবার চেষ্টা করবেন না? হলেনই বা বিমাতা, তবু তো আপনি মা! আমি মিনতি করছি সন্ধ্যামালতী দেবী, যা সত্য, তাকে আলোয় আসতে দিন। বলুন, ঘটনার রাতে সিঁড়ি দিয়ে কাকে নেমে আসতে দেখেছিলেন?
সন্ধ্যামালতীর দুই চোখ তখন অশ্রুতে ভেসে গেছে। থরথর করে কাঁপছে তাঁর পাংশু দু'খানা ঠোঁট। সজল কম্পিত কণ্ঠে উচ্চচারণ করলেন, কুণাল।
কে সে?
আমার নিজের ছেলে।
কি করে?
জাহাজে কাজ করত।
খিদিরপুরে হংকং কাফে জাহাজি খালাসিদের একটা বিখ্যাত আড্ডা। ইতালি, স্পেন, চিন, জাপান, লিভারপুল, মোম্বাসা, আরও নানা দূর দেশ থেকে কত বাণিজ্য—জাহাজ এসে নোঙর ফেলে খিদিরপুর ডকে। দিন কয়েক—বড় জোর মাসখানেক থাকে, মাল খালাস করে, মাল বোঝাই করে, নতুন রং লাগায়।
তারপর আবার একদিন জাহাজের ঠাণ্ডা ইঞ্জিন চলার উৎসাহে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আকাশে আকাশে ভোঁ বাজিয়ে, বৃহৎ চাকায় গঙ্গার গেরুয়া জল কাটতে কাটতে নীল সমুদ্রের ডাকে উতলা হয়ে রওনা দেয়। যাযাবর জাহাজ! ফেলে—আসা বন্দরের স্মৃতি তার মনেও থাকে না।
জাহাজের যারা খালাসি মাল্লা, তারাও যাযাবর। জীবনের বারো আনা সময় তারা সাগর—পথিক, চার আনা সময় মাটির সঙ্গে সম্পর্ক। বন্দরের মাটিতে পা দিয়েই তাদের মনে হয়, এটা দু'দিনের বাসা।
দু'দিনের হলেও এখানে তারা অনেকখানি স্বাধীন। জাহাজে কাপ্তেনের রাজত্ব, কড়া শাসন। সেই শাসনের শিকল থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় বন্দরের মাটি। তাই বন্দর তাদের কাছে লোভনীয় রমণীয় মোহময়।
হংকং কাফে জাহাজি মাল্লাদের একটা মধুচক্র বিশেষ। সুন্দর একটা বাগানের মধ্যে এই পানশালাটি। সন্ধে হলেই এই কাফে রূপসী বারনারীর মতো সেজেগুজে দেশ—বিদেশের খালাসিদের হাতছানি দেয়।
পণ্যানারীদেরও আসা—যাওয়া আছে এখানে। রঙিন পানীয়ের সঙ্গে রং—করা রূপেরও দরদস্তুর চলে। তারপর একসময় টলটলায়মান তরুণ খালাসি সাহেবের বাহুলগ্না হয়ে তার মায়ের বয়সী ভাড়াটে প্রণয়িনী গালে রুজ আর ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে, বাঁধানো দাঁতের হাসি হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়।
হংকং কাফেতে রোজই ভিড়। ঝলমলে আলোয়, উচ্ছল নাচ—গানে, উদ্দাম হাসিতে সন্ধে থেকে প্রায় সারারাতই এই পানশালা জমজমাট। কে আসে, কে যায়, কে তার খোঁজ রাখে!
তবু খোঁজ রাখতে হয় এক জাতের মানুষকে। তাদের নাম পুলিশ। মাঝে মাঝে হুস হুস করে একখানা জিপ জীবন গাড়ি এসে থামে, তারা নেমে গটগট করে হলঘরের মধ্যে চলে যায়, একে প্রশ্ন করে, ওকে জেরা করে। পানরত ভ্রমরকে জামার কলার ধরে টেনে নিয়ে যায়। পরদিন শোনা যায়, তারা ফেরারি আসামি।
হংকং কাফে বড় বিচিত্র জায়গা।
ফটক পেরিয়ে সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ উঠলেই মস্তবড় হলঘর। একদিকে তার নাচের ছোট মঞ্চ আর অর্কেস্ট্রা দলের বসবার আসন, বাকি জায়গাটা জুড়ে ছোট ছোট বেতের গোল টেবিল আর চারখানা করে বেতের চেয়ার।
হলঘরের একেবারে একটেরে বারান্দা ঘেঁষে একখানা চেয়ার দখল করে বসে আছে বৃজলাল। তার টেবিলে বাকি তিনখানা চেয়ার এখনও খালি। অন্যান্য টেবিল মধুপিয়াসীদের ভিড়ে ভরে উঠেছে। সমস্ত হলঘরটা তাদেরই হাসি গল্প কথাবার্তায় মৌচাকের মতো গুঞ্জরিত।
এইমাত্র একটা নাচ হয়ে গেল, পিয়ানোতে এখন টুং টাং করে 'ওভার দি ওয়েভস' বাজছে। বৃজলালের কোনো দিকেই খেয়াল নেই। এমনকি তার নতুন বন্ধুরা—অ্যালফ্রেড আর ইসমাইল টেবিলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে 'হ্যালো বৃজলাল' বলে সম্ভাষণ করা সত্ত্বেও কোনো জবাব দেয়নি সে। তাদের সম্ভাষণ হয়তো কানেই যায়নি তার।
বৃজলাল এ অঞ্চলে হালে এসেছে। লোকে জানে ডকে কাজ করে সে। বাপ ভাই বউ বোন—কোনো বালাই নেই। স্রেফ একা মানুষ। বাজারের কাছে একখানা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে, আর দু'বেলা হোটেলে খায়। ঘরে তার প্রায়ই তালা ঝুলতে দেখা যায়। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘোরে সেই জানে।
সহজে মেশে না কারও সঙ্গে। বন্ধু তার খুবই কম, কিন্তু চেনে অনেকে। তার কারণ বৃজলালের চেহারাটা মন্দ নয়, অন্তত ভিড়ে মিশিয়ে যাবার মতো নয়। কিন্তু উগ্র একটা রুক্ষ্মতার ছাপ তার সর্বাঙ্গে। মুখখানায় অশিক্ষিত চোয়াড়ে ভাব, টানা চোখের কোলে অসংযত জীবনের কালো ইতিহাস। দেখতে মোটামুটি সুন্দর হলেও বৃজলালকে ভদ্র বলতে যেন বাধে।
একপাত্র 'জিন' সামনে রেখে বৃজলাল বড় অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে আজ। ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে ধূমায়িত সিগারেট। অন্যদিন এত চুপচাপ সে থাকে না, ডক—শ্রমিক অ্যালফ্রেড আর ইসমাইলের সঙ্গে গল্প হাসাহাসি করে। কদাচিৎ বা দু'—একটি পণ্যানারীর আবির্ভাব হয় তার টেবিলে।
আজ কিন্তু বৃজলাল নিজের মধ্যেই ডুবে আছে। একা একা বসে মাঝে মাঝে 'জিনে'র গেলাসে মৃদু চুমুক দিচ্ছে আর কি যেন ভাবছে। ঠিক ভাবছে না নিজেরই জীবন—নাটকের গোড়ার দিকের দু'—একটা অঙ্গ নিজেই যেন দর্শক হয়ে নীরবে দেখছে।
ভাল করে যখন তার জ্ঞান হয়েছিল, সেই তখন থেকেই সংসারে মা ছাড়া আর কাউকে দেখেনি। মাঝে মাঝে বয়স্ক একটি ভদ্রলোক আসতেন, শ্যামবর্ণ, দীর্ঘ দেহ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চেহারা সম্ভ্রান্ত। শুনেছিল তিনি নাকি খুব বিদ্বান।
তিনি এলেই মা তাকে বলতেন, ও ঘরে গিয়ে খেল গে।
একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল, ও কে মা?
গম্ভীর হয়ে মা বলেছিলেন, তোমার বাবা।
এ কথা শুনে সেদিন তার শিশু—মন খুশি হওয়ার বদলে আশ্চর্যই হয়েছিল। এ কেমনতর বাবা? তাকে দেখলে হাসে না, আদর করে না, কাছে ডেকে একটা লজেন্সও দেয় না! আর পাঁচজন ছেলের বাবাদের সঙ্গে তার বাবার কোথাও মিল নেই।
স্কুলে ভর্তি হবার পর তার বাবা দেখা হলে শুধু একটি প্রশ্নই করতেন, পড়াশুনা কেমন হচ্ছে?
এ ছাড়া আর কোনও কথা নয়। অথচ তার স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলে তার বাড়ির অভিভাবক হিসেবে তার মায়ের নামই লেখানো ছিল। এর কারণটা ছোটবেলায় বুঝতে না পারলেও বড় হয়ে সে জানতে পেরেছিল। তার বাপ—মায়ের বিবাহিত সম্পর্কটা আর দশজন স্বামী—স্ত্রীর মতো খোলাখুলি ছিল না—ছিল ঢেকে রাখা। তাঁদের দাম্পত্য পরিচয়টা সমাজের সামনে কুণ্ঠিত হয়ে থাকত, তার মধ্যে কোথায় যেন অগৌরব লুকানো।
তবু মনে পড়ে, বাড়িতে একদিন তার বাবা এসেছিলেন। সেদিন তার জন্মদিন। তাকে প্রণাম করতে বলে তার মা বাবাকে বলেছিলেন, আশীর্বাদ করো এ যেন ভাল হয়—যেন তোমারই আদর্শে মানুষ হয়ে ওঠে।
সেদিন তার বাবা কি জবাব দিয়েছিলেন, তাও স্পষ্ট মনে আছে। অল্প একটু হেসে তিনি বলেছিলেন, ভাল—মন্দ হওয়ার বীজ মানুষ তার রক্তে নিয়ে জন্মায়। শুধু আশীর্বাদে তাকে বদলানো যায় না মালতী।
তারপরে বাবা মানিব্যাগ খুলে কিছু টাকা মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, ওকে ওর পছন্দমতো কিছু কিনে দিও।
বৃজলালের আনন্দ হওয়ারই কথা। কিন্তু দুরন্ত একটা অভিমানে তার ছোট্ট বুক তোলপাড় হয়ে উঠল। কি জানি কেন তার মনে হল, এটা বাপের স্নেহ—উপহার নয়। এটা যেন বখশিস দেওয়া—চাকর—বাকরকে যেমন বখশিস দেয় মনিবরা!
সেদিন টাকার বদলে বাবা যদি তাকে কাছে ডেকে একটু আদর করতেন, মাথায় যদি একটু হাত বুলিয়ে দিতেন, তবে হয়তো এ অভিমান তার হত না।
বাপের সম্পর্কে তার মনে ক্ষোভ থাকলেও তার মা তাকে ভালবাসতেন। খুবই। তবু মাকে সে সব সময় পেত না। সপ্তাহে কয়েকটা দিন বিকেলের দিকে মা যে কোথায় চলে যেতেন তা সে জানত না। মা ফিরতেন রাত করে, তার আগেই দাসী নানুর মা তার পিঠ চুলকে চুলকে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিত। কখনও ঘুমের মধ্যেই সে অনুভব করতে মা তার গালে আলতোভাবে চুমু দিচ্ছেন।
বৃজলালও তার মাকে অসম্ভব রকম ভালবাসত। বাপকে না পাওয়ার ক্ষুধা সে মায়ের মধ্যেই মিটিয়ে নিত। মা যখন তাকে বুকে জড়িয়ে মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করতেন, খোকা তুই বড় হয়ে খুব ভাল হবিতো'? আমার মনে কষ্ট দিবি না?
বালক বৃজলাল তখন মনে মনে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসত—যেমন করেই হোক ভাল সে হবেই। আর, সে কি যেমন—তেমন ভাল? পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভাল। মাকে সে কক্ষনো কষ্ট দেবে না, সবাই তার মাকে দেখে বলবে, ওই যে 'ভাল' বৃজলালের মা!
মাকে তখন সে আরও—অনেক ভালবাসবে। আকাশের মতো অনেক!
কিন্তু মা ছেলের সেই ভালবাসায় একদিন ভাঙন ধরল। বিশাল কোনও নদীর ওপর কংক্রিটের সেতুতে হঠাৎ একদা যেমন ফাটল ধরে। মিশনারি এক স্কুলে ভর্তির হয়েছিল বৃজলাল। নীলরঙের কলারওয়ালা সাদা পোশাক পরে গলায় নীল টাই ঝুলিয়ে রোজ সে স্কুলে যেত। ফাদার রেক্টরকে আজও তার মনে পড়ে। ভয়ানক রাসভারী চেহারা ছিল তাঁর, ভীষণ কড়া মানুষ। পোশাকে একটু ময়লা বা বুটজুতোয় সামান্য কাদা লেখে থাকলে ধমকে দিতেন। স্কুল বসার আগে প্রার্থনার সময় কেউ উসখুস করলে, শাস্তি স্বরূপ ছুটির পরে একঘণ্টা আটকে থাকতে হত।
কিন্তু না, বৃজলাল কখনও আটকে থাকেনি। শুধু লেখাপড়ায় নয়, নিয়মানুবর্তিতা আর শান্ত ভদ্র ব্যবহারে সে জুনিয়রে ক্লাসে আদর্শ ছাত্র ছিল। অমন যে রাসভারী ফাদার রেক্টর, তিনিও বৃজলালের সঙ্গে হেসে কথা বলতেন।
জিনের গেলাসে একটা চুমুক দিলে বৃজলাল। জুনিয়র ক্লাসের সেই দিনগুলি কত মধুরভাবে কেটেছিল। কিন্তু তারপর? সেই দিনটা—সেই কালো কুৎসিত দিনটা একটা বিষাক্ত ক্ষতের চিহ্ন রেখে গেছে তার মনে। সে চিহ্ন এ জীবনে মুছবে না।
বৃজলাল তখন সিনিয়র ক্লাসের ছাত্র। লম্বা—চওড়া জোয়ান ছেলে।
একদিন তার সহপাযিঠী নীলকান্ত একখানা পত্রিকা এনেছিল। পত্রিকাখানা সিনেমা আর থিয়েটার সংক্রান্ত। অনেক রংবেরঙের ছবিতে ভরা। নীলকান্ত ছেলেটা ভদ্রলোকের এক কথার মতো বছর তিনেক ধরে একই ক্লাসে ছিল। পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে, সুতরাং স্কুলের মাইনেটা জমা পড়ত ঠিকই, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে রুচি ছিল না নীলকান্তর। সে ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে বসে নিবিষ্ট চিত্তে যা পড়ত, তা হয় সিনেমা—থিয়েটারের পত্রিকা, নয় প্রায় নগ্ন নারীমূর্তির ছবিওয়ালা স্বাস্থ্যবিষয়ক আমেরিকান ম্যাগাজিন, কিংবা ওই ধরনের আর কিছু।
নীলকান্তর নিজস্ব পাঠ্যপুস্তকগুলির প্রতি বৃজলালের কোনোদিনই কৌতূহল হয়নি। সে—অবকাশও তার ছিল না। নিজের পড়া নিয়েই সে ব্যস্ত থাকত। সেজন্য নীলকান্ত এবং লাস্ট বেঞ্চের অন্যান্য ছেলেদের কাছ থেকে 'ভাল ছেলে' 'বিদ্যেসাগরের পকেট এডিশন' ইত্যাদি দু—চারটে বাঁকা মন্তব্য মাঝে মাঝে তাকে শুনতে হয়েছে। বৃজলাল অবশ্য গ্রাহ্য করেনি।
কিন্তু সেদিন টিফিনের ঘণ্টায় নীলকান্তর হাতের পত্রিকাখানা হঠাৎ চোখে পড়ে যেতেই একবার নেড়েচেড়ে দেখার ইচ্ছে হল বৃজলালের।
চেয়ে নিল সে নীলকান্তর কাছ থেকে। সিনেমা—শিল্পীদের কতরকম ছবি। কত সাজে, কত ঢঙে। পাতার পর পাতা উলটে যায় বৃজলাল।
হঠাৎ একটা পৃষ্ঠায় তার চোখ যায় আটকে। সমস্ত চেতনা দুই চোখের তারায় জড়ো করে সে চেয়ে থাকে একখানা ছবির দিকে। সুন্দরী একটি নারীর ফোটো; এ নারীটিকে সে চেনে, অথচ চেনেও না। টানা টানা আশ্চর্য ওই দুটি চোখ বৃজলালের আজন্ম চেনা, কিন্তু সে—চোখে এ কেমনতর দৃষ্টি? পাতলা দুটি অধরে এ হাসিই বা কেমন ধারা? মাথায় আধ—ঘোমটা কই? ঘাড়ের কাছে নুয়ে—পড়া এলো খোঁপায় ফুলের মালা জড়ানো!
ছবির নীচে লেখা, বঙ্গ নাট্যাকাশের দীপ্তিময়ী তারা। আর, তার তলায় যে নাম লেখা, সেটা তার মায়ের নাম নয়। তবুও তার মায়েরই ছবি।
তার মা থিয়েটারের অভিনেত্রী! না, না, এ অসম্ভব।
বৃজলালের মুঠোয় জোর ছিল। পত্রিকাখানা তার শক্ত মুঠোর মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে বিশ্রী হয়ে গিয়েছিল। নীলকান্ত চটে গিয়ে বললে, এঃ অমন সুন্দর সুন্দর ছবিগুলো কি করলি বল দেখি!
উত্তরে বৃজলাল শুধু বলেছিল, বেশ করেছি।
তারপরে দলা পাকানো পত্রিকাখানা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল জানলা গলিয়ে। তার মুখ—চোখের পানে তাকিয়ে নীলকান্ত একটি কথাও আর বলেনি।
সেদিন বাড়ি ফিরে মাকেও সে কোনো কথা বলেনি। বারবার শুধু সেই ছবিখানার সঙ্গে মায়ের মুখখানা মিলিয়ে দেখেছিল। সেই মুখ কি এই মুখ?
ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি বৃজলাল। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি। সন্দেহ মেটাবার জন্যে সে যা করেছিল, আজ পরিষ্কার মনে আছে তার।
কখনও যা করেনি, সে একদিন তাই করল।
মায়ের বাক্স থেকে কয়েকটা টাকা চুরি করল। আর, সেই টাকা নিয়ে সে গেল থিয়েটারে একা। টিকিটও কিনল একখানা, কিন্তু ঢুকল না।
থিয়েটারের লবিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখতে লাগল অভিনেত অভিনেত্রীদের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো। সব ছবির মাঝখানে সুন্দর একটা ফ্রেমে সাজানো রয়েছে সেই পত্রিকায় দেখা ছবি। লবির ভিড়টা সেইখানেই বেশি।
ঢুকতে গিয়েও ঢুকতে পারে না বৃজলাল। কেমন ভয় ভয় করে। সে যা দেখতে চায় না, যদি থিয়েটারের ভেতরে গিয়ে তাই দেখতে পায়!
প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে বৃজলাল ঢুকল থিয়েটার—হলে। টর্চের আলো ফেলে একজন লোক তার আসন দেখিয়ে দিল। জীবনে তার সেই প্রথম থিয়েটারে আসা। সেই প্রথম আর সেই শেষ।
নিজের আসনে বসে বৃজলাল ভাল করে তাকাল স্টেজের দিকে। তার মা কোথায়? নেই তো'! একজন বৃদ্ধ, একটি যুবক আর একটি বউ কথা বলছে। তাদের কথা সে তেমন মন দিয়ে শোনেনি, শুধু রতনবাঈ নামটা বার কয়েক তার কানে এল। রতনবাঈকে নিয়েই এদের মধ্যে একটি অশান্তি দেখা দিয়েছে।
হঠাৎ স্টেজের আলো নিভে গেল, আর অন্ধকারের মাঝেই স্টেজটা ঘুরতে লাগল। আবার যখন আলো জ্বলে উঠল, তখন চমৎকার মেয়ে—গলার গান শুরু হয়ে গেছে। বৃজলাল দেখলে, একটা সুসজ্জিত ঘরের মাঝখানে ফরাস পাতা, তার একদিকে একজন সারেঙ্গী, আর একজন তবলা বাজাচ্ছে। অন্যদিকে আগের দৃশ্যে দেখা সেই যুবকটি আর তার দু'—চারজন বন্ধু তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে। সামনে একটা বোতল আর গোটাকয়েক গেলাস। কিন্তু মাঝখানে ও কে? পরনে ঝলমলে পেশোয়াজ, পিঠে জরিজড়ানো দীর্ঘ বেণী, চোখে কাজল, ঠোঁটে রং—গানের তালে তালে ও কে নাচছে হাজার লোকের চোখের সামনে? ও কি রতনবাঈ, না তার মা?
চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল বৃজলালের। দপদপ করতে লাগল কপালের দু'পাশের রগ। নিজের নিঃশ্বাসে নিজেরই ঠোঁট পুড়ে যেতে লাগল। স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে উঠল সে, চীৎকার করে ডাকতে গেল, মা! কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোবার আগেই পেছনের আসনের এক দর্শক বলে উঠল, বসুন মশাই, বসুন।
মুহূর্তে বৃজলাল নিজেকে সামলে নিল। তারপর ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল প্রেক্ষাগৃহ থেকে। যেন সবাই জেনে ফেলেছে, সে থিয়েটারের অভিনেত্রীর ছেলে—যে অভিনেত্রী হাজার লোকের চোখের সামনে রং মেঘে বাঈজী সেজে দেহ দুলিয়ে নাচতে লজ্জা পায় না!
সেদিন অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল বৃজলাল। দশটার পর।
মা জেগে বসেছিলেন। সেই মা! তেমনি সুন্দর শান্ত, টানা টানা চোখ দু'টিতে তেমনি মিষ্টি কোমল চাউনি, পরনে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। জন্ম থেকে যে মূর্তি দেখছে বৃজলাল।
এক মুহূর্তের জন্য সমস্ত জ্বালা জুড়িয়ে গেল তার। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল থিয়েটারের সেই দৃশ্য। স্টেজের ওপর ঝলমলে পেশোয়াজ পরে জরিজড়ানো বেণী দুলিয়ে রাঙা ঠোঁটে বিশ্রী একরম হাসি ছড়িয়ে রতনবাঈয়ের সেই নাচ!
আবার জ্বালা করে উঠল মনটা।
তবু সে কোনো কথা বলেনি। কোনো প্রশ্ন করেনি মাকে। মা খেতে ডাকায় শুধু বলেছিল, খিদে নেই। তারপর শুয়ে পড়েছিল নিজের বিছানায়।
মা একবার তার কপালে হাত দিয়ে দেখেছিলেন। আর কিছু বলেননি।
শুয়ে পড়েছিল বটে, কিন্তু ঘুম আসেনি প্রায় সারারাত। তাদের বাড়ির কাছে—পিঠে একটা রাজবাড়ির দেউড়িতে প্রহরে প্রহরে ঘণ্টা বাজতো। সে—রাতে শুয়ে শুয়ে বৃজলাল শুনেছিল বারোটা একটা দু'টো বেজে যাচ্ছে। এমনি করে সাড়ে তিনটেও বেজে গেল। খোলা জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া তার তপ্ত কপালে হাত বুলিয়ে দিল। জানলার একেবারে ধারেই যেন নেমে এল শেষরাতের ঝকঝকে বড় তারাটা। তারপর আর কিছু দেখেনি সে, আর কোনো শব্দও শোনেনি। ঘুমিয়ে পড়েছিল অগাধে।
সেদিন রাত সাড়ে তিনটি অবধি জেগে জেগে কি সব ভেবেছিল, বৃজলাল আজও তা ভুলে যায়নি।
বারবার একটা কথাই তার মনে চোরকাঁটার মতো খচখচ করছিল। তার মা থিয়েটারের নটী—বাঈজী সেজে রং মেখে দেহ দুলিয়ে হাজার লোকের চোখের সামনে নাচে। নীলকান্তর সঙ্গে তার বেশি মেলামেশা না থাকলেও তার মুখে সে শুনেছিল থিয়েটারের অভিনেত্রীরা ভাল হয় না, ভদ্র হয় না। ওই নীলকান্ত যখন শুনবে বৃজলালের মা ডায়মন্ড থিয়েটারের নাম—করা অভিনেত্রী, তখন কি ভাববে? কি বলবে সে বৃজলালকে?
অন্ধকারের মধ্যেও বৃজলাল যেন স্পষ্ট দেখতে পেল, নীলকান্তর মুখে বাঁকা হাসি, চোখে ঘেন্নার দৃষ্টি, ভঙ্গিতে তাচ্ছিল্য।
সেই বাঁকা হাসি, ঘৃণার দৃষ্টি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়বে আরও বহুজনের মুখে চোখে। সবাই এড়িয়ে চলবে তাকে, বন্ধু বলতে লজ্জা পাবে। অবজ্ঞা করবে। সামনে হয়তো কিছু বলবে না, কিন্তু আড়ালে মুখ বেঁকিয়ে বলবে, নটীর ছেলে!
আর্শ্চয, একটা রাতের মধ্যেই মানুষের পরিচয় আকাশ—পাতাল তফাত হয়ে যায়! কাল সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার কোনো ভদ্র পরিচয় থাকবে না। সে আর ভদ্রঘরের ছেলে নয়। একটা রাস্তার ছেলের সঙ্গে বৃজলালেরও আর কোনো তফাত নেই।
অথচ তার এই লজ্জাকর ঘৃণ্য পরিচয়টা এতদিন লুকিয়ে রাখাটাই তার জীবনে আরও বেশি লজ্জার। কাল থেকে কি করে সে মুখ দেখাবে স্কুলে? কেমন করে উঁচু মাথায় দাঁড়াবে সে ফাদার রেক্টরের সামনে?
আজ সে বুঝতে পারছে, কেন তার বাবা চুপিচুপি আসেন আর চুপিচুপি চলে যান। কেন থাকেন না তাদের সঙ্গে, কেন তাকে কাছে টেনে আদর করেন না। বাপ হয়েও ছেলেকে তিনি ঘৃণা করেন নিশ্চয়। সে যে নটীর ছেলে।
বৃজলালের মনে হল, তবে আর কেন ভদ্র হওয়ার চেষ্টা—ভাল হওয়ার প্রয়াস? হাজার পালিশ করলেও গিলটি কখনো সোনা হয়? কি হবে লেখাপড়া শিখে ভাল হয়ে? একটা নটীর ছেলেকে দুনিয়ায় কে ভাল বলে ভদ্র বলে স্বীকার করবে? সারা গায়ে তার মায়ের দেওয়া কালির দাগ লেগেছে, সেই কালো পরিচয় নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হবে।
না, অনর্থক সে আর ভদ্র হওয়ার চেষ্টা করবে না।
সে রাতে নিজের ওপর সহসা কেমন যেন নিষ্ঠুর আর হিংস্র হয়ে উঠেছিল ষোলো বছরের কিশোর বৃজলাল।
তারপর থেকেই মোড় ঘুরে গেল তার জীবনের।
ভিড়ে গেল সে নীলকান্তর দলে। যোগাযোগটাও হয়ে গেল সহজেই। স্কুলের ছুটির পর সেদিন ফটকের বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল বৃজলাল। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে নেই। অথচ কোথায় যাওয়া যায়, তাও মনে মনে খুঁজে পাচ্ছিল না।
পিঠের ওপর একখানা হাত পড়ল আলগোছে। বৃজলাল তাকিয়ে দেখলে নীলকান্ত। নীলকান্ত তার চেয়ে মাত্র বছর দুই—তিনের বড়, তবু তার চোখের কোল দুটো বসা। সেই কোটরে বসা চোখ নাচিয়ে নীলকান্ত বললে, কি হে গুড বয়, চুপচাপ দাঁড়িয়ে কেন?
এমনি।
বাড়ি যাবে না? মা যে দুধু—ভাতু নিয়ে বসে আছে।
বৃজলালের মনটা এক মুহূর্তে তেতো হয়ে গেল। মা কোনোদিনই বিকেলে তার জন্যে বাড়িতে বসে থাকেন না, এ সময় তিনি থাকেন থিয়েটারে।
একটা অদ্ভুত বেপরোয়া মন নিয়ে বৃজলাল নীলকান্তকে জিজ্ঞেস করল, তোরা কোথায় যাস ছুটির পর?
আমরা? আমরা আড্ডা দিতে যাই। সে খোঁজে তোমার কাজ কি সোনার চাঁদ?
চল তোদের সঙ্গে যাই।
নীলকান্তর কোটরে বসা চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তারপর সবস্মিয়ে বলে উঠল, তুই যাবি—আমাদের আড্ডায়!
নীলকান্তর পেছনে দাঁড়িয়েছিল উমাপতি আর বিলাস ওরফে বিলে।
তারা হই হই করে উঠল। বলিস কি রে গুড বয়! আমাদের দলে ভিড়লে তুই খারাপ হয়ে যাবি যে!
বৃজলাল গম্ভীর হয়ে শুধু বললে, খারাপই হব আমি। কোথায় যাবি চল।
চলতে চলতে নীলকান্ত বললে, বুঝেছি, মনটা তোর বিগড়ে আছে আজ। আচ্ছা দাঁড়া, মন ভাল করে দিচ্ছি।
নীলকান্তর পকেট থেকে বেরোল সিগারেটের একটা প্যাকেট। একটা নিজের মুখে গুঁজে আরেকটা বৃজলালকে দিলে। বললে, নে টান।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য থতিয়ে গেল বৃজলাল। সিগারেট!
নীলকান্ত মুখ টিপে হেসে বললে, কি সোনার চাঁদ, খারাপ হওয়ার সাধ মিটে গেল?
বিলে ফস করে বৃজলালের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে নিজে ধরিয়ে বললে, আরে দুর, তুই একটা নাড়ুগোপাল! যা যা, মায়ের কোলে বসে দুধু—ভাতু খা গে যা!
নিজেকে অত্যন্ত ছোট মনে হল বৃজলালের। কেমন যেন অপমানিত বোধ হল। তীব্র চোখে চেয়ে বিলেকে ধমকে উঠল, থাম।
তারপর বিলের মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা আচমকা নিয়ে একটা টান দিলে সে। টেনেই কিন্তু কেশে ফেললে।
নীলকান্ত হেসে বললে, জিতা রহো বেটা। দু'দিনেই অভ্যেস হয়ে যাবে।
চলতে চলতে তারা এল একটা পার্কে। ছোট পার্ক, নিরিবিলি। একটা ঝোপের আড়ালে বসল তারা। বিলের পকেট থেকে বেরিয়ে এল এক জোড়া তাস, শুরু করলে সে ভাঁজতে। এসে জুটল আরও দুটি ছোকরা। চেহারাতেই মালুম তারা কোন শ্রেণীর।
বিলে বৃজলালকে শুধোলে, ক্যাশ আছে পকেটে?
আছে কিছু। কেন?
তা হলে তোকেও তাস দেব।
কি খেলা?
তে—তাস।
বিলে তিনখানা করে তাস দিলে প্রত্যেককে। মাঝখানে পড়তে লাগল পয়সা। শুরু হয়ে গেল তাসের জুয়া। পুড়তে লাগল অনেক সিগারেট। দু'—তিন দানেই খেলাটা শিখে ফেললে বৃজলাল।
খারাপ হওয়ার পথে সেই প্রথম তার হাতেখড়ি।
ছবির মতো সব যেন দেখতে পাচ্ছে বৃজলাল। সন্ধে অবধি পার্কে কাটিয়ে তারা গেল একটা সস্তা রেস্তোরাঁর কেবিনে। নীলকান্ত তার খাতার মধ্যে থেকে মোটা একখানা খাম বার করে বললে, আজ যা দেখাব, দেখে তোদের তাকে লেগে যাবে মাইরি।
সবাই ঝুঁকে পড়ল খামখানার ওপর। তার ভেতর থেকে বেরোল খান কয়েক নিষিদ্ধ ফরাসি ছবির কার্ড। দেখে বৃজলালের কান লাল হয়ে উঠল, তবু চোখদুটো বারবার গিয়ে পড়তে লাগল ছবিগুলোর ওপর।
নীলকান্ত আর সঙ্গীদের মধ্যে হাসাহাসি চলতে লাগল। চলতে লাগল অশ্লীল কথা আর রসিকতা। বিলাস একটা বিশ্রী গান ধরে দিলে। আর সব কিছুর মাঝে ষোলো বছরের নিষ্পাপ কিশোর বৃজলাল বসে বসে ভাবতে লাগল, কাল থেকে এদের সঙ্গে সে আর কথাও বলবে না।
কিন্তু খারাপ হওয়ার পথটা ঢালু। একবার সে পথে পা দিলে তরতর করে' নেমে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বৃজলালের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।
পরদিন স্কুলের ছুটির পর বৃজলাল আবার গেল নীলকান্তদের আড্ডায়। তার পরের দিনও। তারপর থেকে রোজ নিয়মিত! নীলকান্ত তার প্রাণের বন্ধু হয়ে উঠল।
সিগারেট টানতে আর তার কাশি আসে না। তে—তাস খেলায় সে পাকা হয়ে উঠল। ফরাসি নিষিদ্ধ ছবি দেখলে আর কান লাল হয় না। কেউ অশ্লীল রসিকতা করলে বৃজলাল তার জবাব দিতে পারে।
তাসের জুয়ায় প্রায়ই সে হারত। ফলে মায়ের দেরাজে প্রায়ই তার হাত পড়ত। কখনো বা স্কুলের বই দু'—একখানা পুরানো বইয়ের দোকানে চলে যেত। তবু জুয়ার আড্ডায় বৃজলালের কামাই হত না একদিনও।
কিন্তু মায়ে দেরাজ একদিন বন্ধ হয়ে গেল, ফুরিয়ে এল স্কুলের পাঠ্য বই। মুশকিল পড়ে গেল বৃজলাল, খুঁজতে লাগল উপায়।
উপায়ও মিলে গেল একসময়। সহজেই।
ক্লাসে সেদিন সুধীরের দামি ফাউন্টেন পেনটা হারিয়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজি, দরোয়ান চাকর ঝাড়ুদারকে অনেক জেরা। তবু পাওয়া গেল না।
বিকেলে পার্কে গিয়ে বিলে তাদের বললে, দাঁড়া, এখুনি আসছি।
অদূরে একটা বেঞ্চে আধাবয়সী এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। বিলে তাঁর কাছে এগিয়ে গেল। যাবার আগে মাথার চুলগুলো এলোমেলো আর মুখখানা অত্যন্ত করুণ করে' নিলে। পকেট থেকে একটা পেন বের করে ভদ্রলোককে বললে, বাড়িতে ছোট বোনের বড় অসুখ স্যার, ওষুধ কিনতে পারছি না। কলমটা নিয়ে যদি পাঁচটি টাকা দেন—
বৃজলাল আশ্চর্য হয়ে দেখল, কলমটা সুধীরের।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই বিলাস পাঁচটাকার একখান নোট হাতে বিজয়—গর্বে ফিরে এল। নীলকান্ত বললে, শাবাশ বেটা!
সন্ধের পরে আড্ডা থেকে বাড়ি ফিরছিল বৃজলাল। বাসে ছিল ভিড়। বৃজলালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল একটি সাহেবি পোশাকপরা ভদ্রলোক। কোটের বুক পকেটে সোনার ক্যাপওয়ালা পার্কার। বৃজলালের হঠাৎ বিলাসের কথা স্মরণ হল। নিসপিস করতে লাগল তার হাতের আঙুলগুলো। অথচ বুকের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি।
কোথা দিয়ে কি যে হয়ে গেল। হঠাৎ ঘণ্টা বাজিয়ে বাস ভাল করে থামবার আগেই বৃজলাল নেমে পড়ল।
তার পকেটের মধ্যে তখন সেই সোনার ক্যাপওয়ালা পার্কার! হাতের আঙুলগুলো তখনো কাঁপছে থরথর করে।
কিন্তু তারপর থেকে আর কাঁপত না হাত। বদলে যেত না মুখের ভাব। বাহবা দিয়ে বন্ধুরা বলত, ওস্তাদ। বেশ লাগত শুনতে।
ভালো বৃজলাল এমনি করেই একদিন খারাপ হয়ে গেল।
অনেকদিন অবধি মা টের পাননি কিছুই। কিন্তু চোখ এড়ায়নি ফাদার রেক্টারের!
শুধু স্বভাবের নয়, মুখের চেহারায়ও পরিবর্তন ঘটেছিল বৃজলালের। কিশোর বয়সের স্নিগ্ধ কমনীয়তা মুছে গিয়ে মুখে ক্রমশ ফুটে উঠছিল একটা রুক্ষ চোয়াড়ে ভাব। রং ফর্সা বলেই চোখের কোলে অস্পষ্ট কালো ছাপটা বেশি স্পষ্ট দেখাত।
ফাদার রেক্টর তাকে বিশেষভাবে লক্ষ করতেন। বৃজলালের ওপরেই তাঁর আশা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ক্লাসের মাসিক পরীক্ষায় ক্রমেই অবনতি হতে লাগল তার। শেষ অবধি বার্ষিক পরীক্ষায় দেখা গেল বৃজলালের ফল যা অবশ্যম্ভাবী, তাই হয়েছে। ফেল করেছে সে।
রেক্টর তাকে ডেকে সেদিন অনেক কথাই বলেছিলেন। তাঁর কথার মধ্যে শাসন ছিল যতখানি, স্নেহ ছিল তার চেয়ে বেশি। কিন্তু সবটাই তিক্ত লেগেছিল বৃজলালের।
স্কুলের নিয়ম অনুসারে চিঠি গেল বাড়িতে। বৃজলালের মায়ের নামে।
সেই দিন জানতে পারলেন মা। লক্ষ পড়ল ছেলের ওপর। প্রচণ্ড আঘাতে চুরমার হয়ে গেল তাঁর বিশ্বাস। সেই সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যতের আশা স্বপ্ন সুখের কল্পনা। রাগে আর হতাশায় বহু তিরস্কার তিনি করেছিলেন ছেলেকে। চোখের জলও ফেলেছিলেন।
ধরা পড়ে সেদিন লজ্জা অনুতাপ অনুশোচনা সবই হয়েছিল বৃজলালের। এবার থেকে পড়াশুনোয় মনে দেবে, আবার ভাল হবে বলে মনে মনে শপথও করেছিল। কিন্তু ভাল সে আর হয়নি। হতে পারেনি। নীলকান্তর দল তাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছিল। তাকে পেয়ে বসেছিল জুয়ার নেশায়।
সুতরাং দিন যেমনই চলছিল, তেমনই চলতে লাগল।
একদিন স্কুলও ছাড়তে হল। জন নামে একজন ফিরিঙ্গি সহপাঠীর হাতের রিস্টওয়াচ একদা খোয়া গেল। টিফিনের ঘণ্টায় ঘড়িটা খুলে রেখে জন 'ভলি বল' খেলছিল, তারপর আর পায়নি!
ঘটনাটা জন চুপচাপ রেক্টরকে জানায়। রেক্টর শুনে কিছুই বললেন না বটে, কিন্তু ছুটির একটু আগে হঠাৎ ক্লাসে এসে বৃজলালকে ডেকে নিয়ে গেলেন নিজের অফিস ঘরে। ব্যাপারটা এমনই আচমকা যে, বৃজলাল সাবধান হওয়ার অবকাশ পায়নি।
তল্লাসি করতেই তারা মোজার ভেতর থেকে বেড়িয়ে পড়ল জন'—এর ঘড়ি।
আবার চিঠি গেল তার মায়ের কাছে। চুরির অপরাধে বৃজলালকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল।
বৃজলাল চোর হয়েছিল আগেই। এবার হল দাগি চোর।
স্কুলের চিঠি শুধু তার মা নয়, তার বাবাও দেখেছিলেন। দেখে কি বলেছিলেন তার মাকে, বৃজলালের মনে আছে : 'আমি তো' বলেছিলাম, ভালমন্দ হওয়ার বীজ মানুষ তার রক্তে নিয়ে জন্মায়।'
আজ কিন্তু বৃজলালের মনে হয়, ভুল—তার বাবার কথা অত্যন্ত ভুল। জন্মকালে সব শিশুর রক্ত একই রকম থাকে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের পরিবেশ অনুসারে কারও রক্তে ভাল বীজ, কারও রক্তে মন্দের বীজ বোনা হয়ে যায়। সেজন্যে কোনো শিশুই দায়ী নয়।
সেতো' আর পাঁচটা ছেলের মতোই ভাল হয়ে জন্মেছিল। লেখায় পড়ায় আচারে ব্যবহারে, সততায় সভ্যতায় ভাল হয়েই উঠছিল। তবে কেন সে খারাপ হয়ে গেল?
কেন সে হয়ে উঠল অশিক্ষিত অসৎ চরিত্রহীন? একি তার বিধিলিপি? না। বৃজলাল তার সমস্ত জীবন দিয়ে বুঝেছিল সেদিন একটু যত্ন একটু স্নেহ একটু ভালবাসা পেলে সে হয়তো খারাপ হয়ে যেত না। বড় হয়ে ওঠার পর তার উদাসীন বাপ আর অভিনেত্রী মায়ের কাছ থেকে সে তো পায়নি।
মিশনারি স্কুলের ছাত্র ছিল সে, বাইবেল পড়তে হয়েছিল। আজ তাই মনে হয় বৃথাই মানবপুত্র পাপীর স্বপক্ষে আবেদন জানিয়ে গেছেন। আজও দুনিয়ায় কেউ শোনেনি তার কথা। শুনতে চায়ও না। অপরাধীকে ঘৃণা করে সবাই। তাই যারা মন্দ, যারা অপরাধী, তারাও মনে প্রাণে ঘৃণা করে তাদের, যারা জীবনে ভাল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
কিন্তু এসব কথা ভেবে আর কি হবে? কি লাভ ভাল হওয়ার কথা ভেবে? খারাপ হওয়ার রাস্তা বড় ঢালু। একবার নামতে শুরু করলে আর ওঠা যায় না।
স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়াতে সুবিধেই হল বৃজলালের। পুরোপুরি খারাপ হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল।
ছোট বৃজলাল ক্রমশ বড় হল। সেই সঙ্গে জুয়া থেকে বড় জুয়ায় তার প্রোমোশন হল। মানে তাসের আড্ডা থেকে ঘোড়দৌড়ের মাঠ। ছোট চুরি থেকে বড় চুরিতে হাত পাকল। আর সিগারেট থেকে উন্নতি হল মদে।
প্রথম যেদিন মদের গন্ধ পেয়েছিলেন মা, সেদিন আহত বিস্ময়ে দুটি মাত্র কথা বেরিয়েছিল তাঁর মুখ দিয়ে, তুই মাতাল! এতটা অধঃপাতে গেছিস!
দ্রব্যগুণে সেদিন বৃজলালেরও মুখ খুলে গেল। সোজা জবাব দিল, নটী মায়ের ছেলে মাতাল জোচ্চেচার ছাড়া আর কি হবে?
ছেলের মুখে এ জবাব কোনও মা—ই আশা করে না। বৃজলালের মা পাথর হয়ে গিয়েছিলেন শুনে। একটি কথাও তিনি আর বলেননি। শুধু মিনিট খানেক নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে তিনি ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
বৃজলাল আজও স্পষ্ট দেখতে পায় মায়ের সেই মুখখানি।
দ্বিতীয়বার জিন—এর গেলাস নিঃশেষ করে বৃজলাল তৃতীয় পেগ অর্ডার দিলে। হলদে সিগারেটের প্যাকেটটা শূন্য হয়ে গেছে। ফেলে দিয়ে পকেট থেকে নতুন একটা প্যাকেট খুললে। মনে মনে বললে, গুলি মারো পুরনো দিনের চিন্তায়। সে কি হত—কি হতে পারত, কাজ কি সে কথা ভেবে? বৃজলাল জুয়ারি নেশাখোর চোর এই হল সবচেয়ে স্পষ্ট সত্য। এই পরিচয়ই থাক। দুনিয়ার ভালো মানুষদের সে কেয়ার করে না।
* * *
তিনটের পর জজ সাহেব আবার এসে আসনে বসলেন। ধীরে ধীরে সাক্ষী সন্ধ্যামালতী এসে দাঁড়ালেন ডাকে। রমেন বোস প্রশ্ন করল, আচ্ছা, মনে করে বলুন তো সে—রাতে চারতলার ফ্ল্যাট থেকে কুণাল যখন নেমে এসেছিল, সে সময় তার গায়ে কি ছিল?
তারও গায়ে ছিল সবুজ কোট, লাল টাই।
কুণালও তাই পরেছিল! কেন?
মাস দুই আগে কুন্তলের জন্মদিন উপলক্ষে ওদের দু'ভাইকে একই পোশাক তৈরি করিয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন সন্ধেবেলা এক পার্টিতে যাবে বলে দু'জনে একই পোশাক পরেছিল।
ও! সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে কুণাল কি করলে?
আমায় দেখে বললে, 'শোভাকে আমি খুন করে ফেলেছি, পুলিশ এলে দরজা খুলো না।' ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, আমি বাধা দেওয়ায় নিচে নেমে গেল। আর আসেনি।
সমস্ত আদালত যেন দমবন্ধ করে শুনছে। মিনিট খানেক চুপ করে রইল রমেন বোস। তারপর গাঢ় স্বরে বললে, আর আমার প্রশ্ন নেই সন্ধ্যামালতী দেবী। পারেন তো ক্ষমা করবেন আমাকে।
তাঁকে ধরে একখানা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে, এজলাসের সামনে এসে দাঁড়াল রমেন বোস। অতি ধীরে ধীরে খাদের গলায় বলতে শুরু করলে :
মি লর্ড! জেন্টলমেন অফ দি জুরি! সাক্ষী সন্ধ্যামালতী দেবীর সব কথাই আপনারা শুনলেন। আমি বলেছিলাম, সত্যানুসন্ধানে আদালতকে সাহায্য করব, আশা করি, আমি তো পেরেছি। আমার বিজ্ঞ সহযোগী মিস্টার ভাদুড়ি বলেছেন, নরহত্যা পৃথিবীর জঘন্যতম পাপ। মানুষ খুন করা জঘন্যতর পাপ কিনা জানি না, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক পাপ, ইতিহাস তা বলে। আদি মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই পাপেরও জন্ম হয়েছিল, আর আজও যে এই পাপ ঘটছে, তার প্রমাণ আমরা আজ আদালতে পেয়েছি। মানুষের সভ্যতা আর কিছুই করতে পারেনি—মানুষ—খুনের সংখ্যাকে বাড়িয়ে আদর্শবাদের যুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ নাম দিয়েছে মাত্র। তাই আজকের মানুষের কাছে মানুষ—খুনটা অতি সাধারণ অপরাধ।
রমেন বোস জুরিদের বেঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়াল : কিন্তু এই অপরাধের বিচার করতে গিয়ে যদি কোনও নিরপরাধ মানুষ দণ্ডিত হয়, সেটাই হবে অসাধারণ অপরাধ। সেক্ষেত্রে বিচারক হয়ে যাবেন খুনি। আজকের বিচার—সভাকে তাই আমি সতর্ক করে দিতে চাই। সন্ধ্যামালতীদেবীর সাক্ষ্য থেকে জানা গেল যে, নর্তকী শোভা ইম্যানুয়েলকে খুন করেছে কুন্তল চ্যাটার্জি নয়, নেশাখোর জুয়াড়ি কুণাল চ্যাটার্জি। একই বাপের সন্তান হওয়ার দরুণ বা যে কোনও কারণেই হোক, কুন্তল কুণালের দেহের গড়ন একই ধাঁচের। লম্বাতেও দুজনে প্রায় সমান। আর সে—রাতে সবুজ কোট আর লাল টাইয়ের মিলটা যে নিতান্তই দৈবের ঘটনা নয়, তাও সাক্ষীর মুখে শুনলেন। এক্ষেত্রে যমুনা লালার ভুল করা খুব স্বাভাবিক নয় কি?
এখন, সন্ধ্যামালতী দেবী যা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তা সত্য কিনা—তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে কিনা, এই নিয়ে আইনের প্রশ্ন উঠতে পারে। আমি কিন্তু আইনের তর্ক তুলব না। কেননা আইনের চেয়ে মায়ের অশ্রুজল অনেক বড়। পৃথিবীতে কোনো মা—ই নিজের ছেলেকে মিথ্যে করে খুনের দায়ে জড়াতে পারে না। আর আমার বলার কিছু নেই। মাননীয় জুরিদের আমি অনুরোধ করছি, একবার ওই মহীয়সী মায়ের চোখের জলের দিকে তাকাতে। ওই চোখের জল বলছে, লক্ষ অপরাধীর শাস্তি হোক, কিন্তু জগতে একটিও নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায়।
রমেন বোস থামল। তার শেষ কথাগুলো আদালত—ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
জুরিরা উঠে গেলেন মন্ত্রণা—কক্ষে। ফিরে এলেন পাকা দেড় ঘণ্টা পরে।
আদালত রুদ্ধনিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছে।
জজসাহেব প্রশ্ন করলেন, জেন্টলমেন অফ দি জুরি, আপনাদের সিদ্ধান্ত কি? আসামি দোষী, না দির্দোষ?
নির্দোষ।
সন্ধ্যামালতী দুর্বল পায়ে টলতে টলতে এগিয়ে গেলেন আদালত—ঘরের একধারে লোহার খাঁচার দিকে—যার মধ্যে কুন্তল তখনও দাঁড়িয়েছিল উদভ্রান্তের মতো।
অশ্রুভেজা মুখে অপূর্ব হেসে সন্ধ্যামালতী ডাকলেন, কুন্তল!
কুন্তল শুধু বললে, মা! তারপর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল।
* * *
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কিন্তু হংকং কাফের কিবা দুপুর, কিবা রাত। জাহাজি মাল্লাদের কৃপায় সব সময়ই জমজমাট।
বৃজলাল এখনও বসে আছে নিজের অতীতের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে। জিন—এর পঞ্চম পেগ পার হয়ে ষষ্ঠে এসে পৌঁছেছে। মেয়ে—পুরুষে গিসগিস করছে পানশালা। বৃজলাল কিন্তু নিজের মধ্যে একা।
লেখাপড়া চুলোয় গেল, রয়ে গেল জুয়া আর মদের নেশা। কিন্তু নেশা মানেই খরচ। মায়ের বাক্স আর গয়না ভেঙে কিছুদিনের চলল, তারপর আর চলে না। বৃজলাল অগত্যা জাহাজে কাজ খুঁজতে লাগল। মাল্লার কাজ।
মাল্লার কাজটা উপলক্ষে মাত্র, আসল লক্ষ্য হল চোরা—কারবার—যার নাম স্মাগলিং। এতদিনে বৃজলাল একটা মনের মতো কাজ খুঁজে পেল। কি দোষ তার? টাকার দরকার দুনিয়ায় সকলেরই। আর সোজা পথের চেয়ে বাঁকা পথে টাকা আসে অনেক, অনেক বেশি। সে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে কেন বোকার মতো?
জাহাজের কাজে ঢুকে পড়ল বৃজলাল। আর সেই সূত্র ধরেই সীমেনস ক্লাবে প্রথম দেখা তার সঙ্গে।
বৃজলালের ভাবনা হঠাৎ থমকে থেমে গেল। যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার নামটা সে মনে মনেও উচ্চচারণ করতে পারল না—যেন অদৃশ্য কান দিয়ে কেউ শুনে ফেলবে!
কিন্তু তার লম্বাটে সুঠাম দেহটা আজ দেড়মাস ধরে কেবলই তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বৃজলাল আজও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, সীমেনস ক্লাবের ডায়াসের ওপর সে নাচছে। ঢেউয়ের মতো ছন্দিত হচ্ছে তার মজবুত দেহ। ফুলে ফুলে উঠছে খাটো ঘাঘরা। রঙিন স্পট লাইটের ফোকাসে দেহের রেখায় রেখায় হাতছানি দিচ্ছে তার বন্য যৌবন।
দেশ—বিদেশের বন্দরে অনেক মেয়ে দেখেছে বৃজলাল, কিন্তু এমন মেয়ে তার চোখে পড়েনি কখনো। মদের গেলাসে চুমুক দিতে ভুলে গিয়েছিল সে।
কিন্তু কে জানত একেবারে হাতের নাগালের মধ্যে এসে যাবে। মেয়েটা! হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে গেল তাদেরই ফ্ল্যাট—বাড়ির সিঁড়িতে। বৃজলাল উঠছিল, মেয়েটা নামছিল। গুচ্ছ গুচ্ছ রেশমি চুলের নীচে ঝকঝকে কালো চোখ তুলে তাকিয়েছিল একবার, তারপর টকটকে লাল ঠোঁটের ফাঁকে একটু অকারণ হেসে নেমে গিয়েছিল।
দারোয়ানের কাছে বৃজলাল খবর পেল, মেয়েটা নতুন ভাড়াটে। তারপর আলাপ জমতে কতক্ষণ? বাপ—মা আর কিছু না দিন, চেহারাটা দিয়েছেন বৃজলালকে। তারই দৌলতে মেয়েদের ভালবাসার দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে তার আটকাত না। তাদের ফ্ল্যাট—বাড়ির নতুন ভাড়াটের দরজাও খুলে গেল তার জন্যে। পাগল হয়ে গেল মেয়েটা বৃজলালকে পেয়ে।
ভালবাসা—টাসা বৃজলাল অবিশ্যি বুঝত না, তবু মনে মনে সে একদিন ঠিক করে ফেললে, এবার সে নেশা ছেড়ে দেবে, ভালো হবে, ভদ্রলোক হবে। মেয়েটাকে নৈলে যখন তার চলবেই না, তখন বিয়েই করে ফেলবে রেজিস্ট্রি করে।
সুন্দরী মেয়ের পাল্লায় পড়লে মানুষ কত বোকা হয়!
রেজিস্ট্রেশনের দিন পর্যন্ত ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এক লহমায় ভেস্তে গেল, সবই—যেমন ক'রে ভেস্তে যায় তাসের খেলা।
মেয়েটার বিছানায় একদিন সে একটা বেল্ট দেখতে পেল। বেল্টটা বৃজলালের চেনা—উজ্জ্বল নিকেলের বকলসে ইংরেজি 'ডি' অক্ষরটা মীনে করা। 'ডি' মানে ডিক জোন্স, তার প্রাণের বন্ধু। জাহাজে শুয়োরের মাংস চালান দেয়। টাকার কুমির। কিন্তু খাল তো' বৃজলাল নিজেই কেটেছিল গত বড়দিনে মেয়েটার সঙ্গে ডিকের আলাপ করিয়ে দিয়ে। তারপরের ব্যাপারটা সংক্ষিপ্ত। একটা রিভলভারের খোঁজেই বেরিয়েছিল বৃজলাল, তাড়াতাড়িতে তার মুঠোয় এসে গেল পাৎলা একখানা চিনে ছুরি।...তাই সই! কিন্তু আফশোস এই যে, চকচকে ফলাটা লাল হয়ে উঠল শুধু একজনের রক্তেই। ডিকের রক্ত লাগল না, সে তখন ব্যাংককের জাহাজে।
সে রক্তের দাগ তো কবে মুছে ফেলেছে বৃজলাল, তবু কেন বারবার চোখ পড়ে নিজের হাতখানার দিকে। মরা মানুষ কেন তাড়া করে বেড়ায় রাতদিন?
অস্থির হয়ে উঠল বৃজলাল। অন্যমনস্ক চোখ দু'টো চঞ্চল হয়ে উঠেই আটকে গেল হল—এর দরজার ওপর। দুটো পুলিশ অফিসার শিকারি কুকুরের মতো অপরাধীর গন্ধ শুঁকছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে তৈরি হয়ে রইল বৃজলাল। কিন্তু না, এগিয়ে এল না তার দিকে, বাইরে থেকেই চলে গেল।
বিড় বিড় করে বলে উঠল বৃজলাল, কুত্তার বাচ্চচা!
তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আধ—খাওয়া জিন—এর গেলাসটা মুখে তুলে লম্বা একটা চুমুক দিলে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, গুড ইভনিং কুণাল চ্যাটার্জি! শোভা ইম্যানুয়েলের খুনের দায়ে আমি তোমাকেই খুঁজছি।—উঁহু পালাবার চেষ্টা কোরো না, বাইরে পুলিশ হাজির।
পাথরের চোখের মতো স্থির দৃষ্টি মেলে কুণাল দেখলে, নিখুঁত নেভি সুট পরা লম্বা চওড়া এক সেলার তার পাশে দাঁড়িয়ে। মুখে হাসি, হাতে রিভলভার।
আশ্চর্য, লোকটা পাশের টেবিলেই এতক্ষণ বসেছিল গোটাকতক বিয়ারের বোতল নিয়ে।
সেলারটা আবার বলল, নিজের পরিচয়টা না দিলে খারাপ দেখায়। আমি একজন ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ।
তারপর কুণালের টেবিল থেকে গোল্ডফ্লেক সিগারেটের প্যাকেট ছেঁড়া সোনালি রিবনের ফাঁস—বাঁধা একটা গোল—রিং কুড়িয়ে নিয়ে শুধু বললে, এসো—
কাচের গেলাসটা কুণালের আড়ষ্ট হাত থেকে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
* * *
রায় বেরোল পরদিন। আসামি কুন্তল চ্যাটার্জির বেকসুর খালাসের অর্ডার।
দরজাটা খুলেই রেখেছিল মিতালি। আর নিজে দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দায়, কোলের কাছে দীপুকে নিয়ে। যেমন ভঙ্গিতে সেই সাতাশে মাঘের সকালে কুন্তলকে বিদায় দিয়েছিল।
সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ হল। দরজার কাছে এসে দাঁড়াল কুন্তল আর রমেন। মিতালির মুখে তখন রোদ—বৃষ্টির খেলা। কুন্তলকে ভেতরে ঠেলে দিয়ে রমেন দরজার কপাট দুটো টেনে দিলে আস্তে আস্তে! তারপর শিস দিতে দিতে নেমে গেল।
এখুনি একবার অ্যাটার্নি সেনের অফিসে যেতে হবে। আরও একশো টাকার বিশেষ দরকার এখন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন