শেষ মুহূর্তে

প্রণব রায়

শেষ অবধি জামিন পেয়ে গেল রতিকান্ত পাল। পুলিশের আপত্তি টিকল না।

চার্জটি সামান্য নয়। জাল চেক দিয়ে জড়োয়ার গয়না হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। তবু, রতিকান্ত মোটা টাকা জামিন দিয়ে বেরিয়ে এল হাজত থেকে।

উপস্থিত আর কিছুই করবার নেই। সি—আই—ডি ইন্সপেক্টর কল্যাণ বোসও বেরিয়ে এল কোর্ট থেকে। পিছন পিছন এল সার্জেন্ট মনসিজ দত্ত। বললে, কি মনে হয় স্যার? রতিকান্তের অনেক টাকা, না?

কল্যাণ বোস হেসে বললে, তাই তো মনে হচ্ছে। অথচ—আশ্চর্য—মাস কয়েক আগেও রতিকান্ত ট্রেনে চানাচুরের প্যাকেট বেচত! আর, আজ সে এক কথায় দশ হাজার টাকার জামিন দিয়ে বসল! তাই ভাবছি—

কল্যাণ বোস থেমে গেল।

মনসিজ বললে, কি ভাবছেন স্যার?

চানাচুরওয়ালা রতিকান্ত আলাদিনের প্রদীপ পেয়ে গেল নাকি? যাকগে, কেস আমি সাজিয়ে দিয়েছি, আর কিছু করবার নেই।

পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাল কল্যাণ বোস। শীতের রোদে ঝকঝকে দিন। ঝকঝকে কল্যাণের চেহারাও। মাঝারি লম্বা দেহ পিঠ অনেকখানি চওড়া। বয়স চল্লিশে পৌঁছলেও মজবুত দেহ যেন খোদাই করা। তবু, লক্ষ করলে দেখা যায়, রগের দু'পাশের চুলে অস্পষ্ট রূপালি ছোপ। মনসিজ দত্ত সাতাশ বছরের ছোকরা। ছিপছিপে লম্বা। চোখের তারা কুচকুচে কালো। মুখের হাসি দেখলে মনে হয়, পুলিশ—লাইনে তার আসাই উচিত হয়নি।

চলতি একখানা ট্যাক্সি থামিয়ে দু'জনে উঠে বসল। সি—আই—ডি হেডকোয়ার্টার্স।

কল্যাণ বললে, মগনলালের বাসাটা একবার ঘুরে যাব।

মগনলাল কল্যাণ বোসের সহকর্মী। একই পদে—গোয়েন্দা—ইন্সপেক্টর। সি.আই.টি রোডের একটা ফ্ল্যাটে থাকে। বার দুই বেল টিপতেই দরজা আধখানা খুলে গেল, একটা সুন্দর মুখ উঁকি দিল।

মগনলালজী আছেন?—কল্যাণ জিজ্ঞেস করলে।

আপনি?—পাল্টা প্রশ্ন করলে মেয়েটি।

আমি তাঁর বন্ধু। আমরা একই অফিসে কাজ করি।

ও!

মেয়েটি এবার দরজা পুরোপুরি খুলে আত্মপ্রকাশ করলে। বয়স আঠারো—উনিশের বেশি নয়। গোল মুখে ঈষৎ নেপালি ধাঁচ থাকলেও মুখখানা দেখতে মিষ্টি। নীল ঘাঘরার ওপরে হলদে জ্যাকেট পরা।

মুখে দুর্ভাবনার ছাপ নিয়ে মেয়েটি বললে, একটু আগে আপনাদের অফিসে আমি ফোন করেছিলাম—

কেন বলো তো?

দু' সেকেন্ড চুপ করে থেকে মেয়েটি বললে, আজ দু'দিন হল বাবা বাড়িতে ফেরেননি। তাই—

কল্যাণ মেয়েটির দিকে একটু ঝুঁকে কথা বলছিল, এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। বললে, মগনলালজী দু'দিন বাড়িতে ফেরেনি!

না।

আশ্চর্য! অফিসেও দু'দিন সে রিপোর্ট করেনি। আমি ভবেছিলাম, তার অসুখ করেছে হয়তো। আচ্ছা, কলকাতার বাইরে তার যাবার কথা ছিল কি?

জানি না তো। বাবা আমায় কিছু বলেননি।

মনে হল মেয়েটি ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়েছে, বিচলিত হয়েছে। নরম গলায় কল্যাণ প্রশ্ন করলে, কি নাম তোমার?

মীনা থাপা।

আশ্বাস দিয়ে কল্যাণ বললে, তুমি ভয় পেও না মীনা। মনে হচ্ছে, মগনলালজীকে একটা কেসের তদন্তে হঠাৎ শহরের বাইরে যেতে হয়েছে। খবর দেওয়ার সময় পায়নি। আজ—সকালের মধ্যেই এসে পড়বে।

ঈষৎ ছোট ছোট উজ্জ্বল সরল চোখ দুটো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন ভরসা পেয়েই মীনা থাপা বললে, ঠিক বলেছেন! বাবা নিশ্চয় আজ—কালের মধ্যেই ফিরে আসবে!

বাড়িতে আর কে আছে?

বাহাদুর আর কাঞ্চী।

বেশ। তোমার কোনও দরকার পড়লে আমাকে অফিসে ফোন কোরো।

নিজের নামটা জানিয়ে কল্যাণ সার্জেন্ট দত্তের সঙ্গে অপেক্ষমাণ ট্যাক্সিতে ফিরে গেল।

হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছে কল্যাণ সবেমাত্র নিজের টেবিলে বসেছে, খবর এল গোয়েন্দা—বিভাগের ছোটকর্তা সুরজিৎ গুপ্ত তলব করেছেন। তলবটা জরুরি।

ছোটকর্তা তাঁর টেবিলে নেই, ঘরে পায়চারি করছেন। গুপ্তসাহেবের কামরায় পা দিয়ে কল্যাণ জানালে, রতিকান্ত পাল জামিন পেয়ে গেল স্যার। জামিনের টাকা সে নিজেই দিয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে এমন কতকগুলো মোক্ষম প্রমাণ আছে যে, জামিন পেলেও সে খালাস পাবে বলে মনে হয় না।

সুরজিৎ গুপ্তের বয়স হয়েছে। ষাটের কোঠায়। অনেক অভিজ্ঞতার রেখা মুখে আঁকা। অসিহিষ্ণু গলায় বললেন, চুলোয় যাক রতিকান্ত পাল! এদিকে আরেকজন যে খালাস পেয়ে গেল। দুনিয়া থেকে খালাস!

কে স্যার?

তোমারই কোলিগ—মগনলাল থাপা।

মগনলাল থাপা! পাঁচ সেকেন্ডের জন্যে কল্যাণের শরীরটা শক্ত হয়ে আস্তে আস্তে আবার শিথিল হয়ে গেল। মিনিট খানেক কথা বেরোল না তার মুখ দিয়ে। অল্প বাদামি চোখের তারা দুটো স্থির হয়ে রইল সুরজিৎ গুপ্তের মুখের ওপর। তারপর নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে কল্যাণ জিজ্ঞেস করলে, কোথায় পেলেন তাকে?

গুপ্তসাহেব বললেন, পশ্চিম পুঁটিয়ারিতে। খালের জলে তার ডেডবডি ভাসছিল, তোলা হয়েছে। বর্ণনা শুনে মনে হল মগনলাল। শনাক্ত করার জন্যে এখুনি যেতে হবে, চলো।

জিপে উঠে কল্যাণের কেবলই মনে পড়তে লাগল এইমাত্র দেখে আসা মীনা থাপার মুখখানা। ছোট ছোট উজ্জ্বল আর সরল চোখ দুটো আরও উজ্জ্বল করে মেয়েটা তাকে বলেছিল, ঠিক বলেছেন! বাবা নিশ্চয় আজ—কালের মধ্যেই ফিরে আসবে।

কল্যাণ বোসের নিজেরও মেয়ে আছে?

ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা গেল, কিছু স্থানীয় পুলিশ মৃতদেহ ঘিরে রয়েছে। না, কষ্ট করে চিনতে হল না। কিন্তু চিনে কষ্ট হল। মগনলালই বটে! দু'দিন ধরে জলে ভিজে মগনলালের দেহ বিকৃত বীভৎস হয়ে উঠেছে। দু'চোখের শূন্য গহ্বর দুটো হ্যাঁ করে আছে। কোনও জলজন্তু বোধ হয় তারা দুটো খুবলে খেয়েছে। পিঠের বাঁ দিকে একটা ক্ষত। কল্যাণ বুঝতে পারলে বুলেটের ক্ষত। অর্থাৎ মগনলালকে আগে অতর্কিতে গুলি করে মেরে, পরে লাশটা খালের জলে ফেলে দেওয়া হয়।

পুলিশের ডাক্তার হাজির ছিল। বললে, মৃত্যুটা হয়েছে আন্দাজ বিয়াল্লিশ ঘণ্টা আছে। রিভলভারের একটা বুলেট পিঠের বাঁ দিকে ঢুকে ফুসফুস ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। সঠিক রিপোর্ট পোস্টমর্টেমের পর জানা যাবে।

মৃতদেহ পোস্টমর্টেম পরীক্ষার জন্য আর মগনলাল পোশাক ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠাবার নির্দেশ দিয়ে গুপ্তসাহেব জিপে উঠতে যাচ্ছিলেন, তাঁর নজর পড়ল কল্যাণের ওপর। সে তখন মৃত মগনলালের পকেটগুলোতে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুঁজছে।

গুপ্তসাহেব বললেন, যা খুঁজছ, তা পাবে না হে। চলে এসো।

হেডকোয়ার্টার্সে ফিরতে ফিরতে কল্যাণ প্রশ্ন করলে, আমি কি খুঁজছিলাম, আপনি জানেন স্যার?

জানি বইকি!—গুপ্তসাহেব ক্ষীণ হেসে বললেন, ক্রিমিন্যাল চরিয়ে আমার মাথার বারো আনা চুল সাদা হয়ে গেছে। মগনলালের পার্সোনাল নোটবইখানা খুঁজছিলে তো?

কল্যাণ নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লে।

গুপ্তসাহেব বললেন, যদি তোমার নোটবুকে আমার অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য বা প্রমাণের কথা লেখা থাকে, তবে কি করে তুমি আশা করো যে আমি তা হাতে পেয়েও ছেড়ে দেব? অশ্বিনী লাহার কেস নিয়ে মগনলাল তদন্ত করছিল তুমি জান। তার নোটবইয়ে নিশ্চয় এমন কিছু ছিল, যা অপরাধীর পক্ষে বিপজ্জনক। সুতরাং—

আপনি কি মনে করেন, মগনলালকে অশ্বিনী লাহাই খুন করেছে?—কল্যাণ প্রশ্ন করে উঠল।

অশ্বিনী নিজে অথবা তার দলের কেউ। তাই মনে হয় না কি? মগনলালের হাতে আর কোনো কেস তো ছিল না।

সুরজিৎ গুপ্ত পাইপ ধরাতে উদ্যোগী হলেন। কল্যাণ দেখল, তাঁর রাশভারি মুখখানা আজ বড় বেশি গম্ভীর! বার কয়েক ধোঁয়া ছেড়ে তিনি বললেন, শোন বোস, আমার ডিপার্টমেন্টে এই প্রথম একজন অফিসার খুন হল। এর চেয়ে আফশোসের কথা আর নেই। মগনলাল খুবই কাজের লোক ছিল, তাকে হারিয়ে বিশেষ ক্ষতি হল আমাদের। আরও বেশি ক্ষতি হল তার নোটবুক খোয়া গেছে বলে। এর মানে জান?

কল্যাণ বললে, জানি স্যার। অশ্বিনী লাহা কেস সম্পর্কে আবার নতুন করে তদন্ত চালাতে হবে।

ঠিক তাই।—গুপ্তসাহেব বললেন, মগনলাল ছাড়া একমাত্র তোমারাই ওপরে আমি নির্ভর করি বেশি। আমি চাই, অশ্বিনী লাহার কেসটা তুমিই হাতে নাও।

একটু চুপ থেকে কল্যাণ বোস বললে, আপনি যখন বলছেন, তখন নিলাম। কিন্তু আমি ভাবছিলাম স্যার, মগনলাল—মার্ডার কেসটার তদন্ত—

আলাদাভাবে করার দরকার নেই। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, অশ্বিনীর কেসটার তদন্ত করতে করতে একদিন ওটাও জানতে পারবে।

সুরজিৎ গুপ্ত পাইপে টান দিলেন।

* * *

কেস হাতে নিয়ে বসে থাকা কল্যাণ বোসের স্বভাব নয়। পরদিন থেকেই তাকে অশ্বিনী লাহার কেসটার মোটা ফাইল নিয়ে বসতে দেখা গেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গোটা ফাইলটা পড়ে কল্যাণ বুঝতে পারল, অশ্বিনী লাহা ক্ষণজন্মা ব্যক্তি।

পেশায় লোকটা শেয়ার মার্কেটের দালাল। সমাজের উঁচু মহলে সে শেয়ার—বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত। তার টিপস নিয়ে অনেকে অনেক টাকা ঢেলে বড় বড় কোম্পানির শেয়ার কিনে ফেলত; তারপর অশ্বিনী হঠাৎ খবর পাঠাত যে, অমুক কোম্পানির শেয়ারের দর পড়তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ, হয় প্রোডাকশন কমে আসছে, নয় লেবার—ট্রাবলের দরুণ লক—আউট আসন্ন। অথবা অন্য কোনও কারণ। শেয়ার—হোল্ডাররা বেশি লোকসানের ভয়ে কিছু কম দামেই শেয়ারগুলো বেচে দিত। আশ্চর্য, তারপরেই কিন্তু সেই সব শেয়ারের দর নামবার বদলে চড়চড় করে উঠে যেত! এমনি করে কয়েকজন লক্ষপতি যেমন রাতারাতি ফকির হয়ে গেছে, তেমনি কয়েকজন ফকিরও রাতারাতি লক্ষপতি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফকির থেকে যারা লক্ষপতি হয়েছিল, তারা কারা? বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তারা অশ্বিনীর টাকা—খাওয়া লোক। তাদেরই নামে অশ্বিনী নিজেই কিনত সেই কম দামে বেচে দেওয়া শেয়ারগুলো।

এ কারবার চলেছিল বছর তিনেক! তারপরেই কয়েকজন ঘা—খাওয়া ফাটকাবাজের অভিযোগক্রমে পুলিশ নাটের গুরু অশ্বিনী লাহার খোঁজ করে। কিন্তু অশ্বিনী তার আগেই পাদপ্রদীপের সামনে থেকে নিঃশব্দে পর্দার আড়ালে সরে গেছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে শুধুই অন্ধকার। মাস তিনেক ধরে সেই অন্ধকার হাতড়ে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মগনলাল কিছুটা হদিস পাবার চেষ্টা করেছিল। বুদ্ধির চকমকি ঠুকে হয়তো বা কিছুটা আলো জ্বালাতেও পেরেছিল। কিন্তু মগনলালের জীবনদীপের সঙ্গে সঙ্গে সে—আলোও ফুস করে নিভে গেছে। সুতরাং দমে গেলে চলবে না, আবার গোড়া থেকে শুরু করো কল্যাণ বোস!

বেশ, তাই হোক! অশ্বিনী লাহার কেসটার সঙ্গে আরও কয়েকটা নাম—ঠিকানা জোগাড় করেছিল মগনলাল। ফাইল থেকে নিজের নোটবইয়ে টুকে নিয়ে কল্যাণ রেকর্ড—রুম থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে আসতেই মনসিজ দত্তের সঙ্গে দেখা।

কেসটা তা হলে আপনি নিলেন?—মনসিজ প্রশ্ন করলে।

পাল্টা প্রশ্ন করলে কল্যাণ বোস, কোন কেসটার কথা বলছ?

মগনলাল—মার্ডার কেস।

ওটা তো অশ্বিনী লাহা কেসের লেজুড়। অশ্বিনী—রহস্য ভেদ করতে পারলেই জানা যাবে কোন মেঘনাদ মগনলালকে খুন করেছে। যাই হোক, এ ব্যাপারে আমি তোমার সাহায্য চাই দত্ত। অলরেডি গুপ্তসাহেবের কাছ থেকে তোমাকে চেয়ে নিয়েছি।

হাসিমুখে মনসিজ বললে, আপনাকে সব রকমে সাহায্য করতে আমি তৈরি স্যার।

তার পিঠ চাপড়ে কল্যাণ বললে, খুশি হলাম। তাহলে এসো, কাজ শুরু করে দিই।

নিজের কামরায় এসে কল্যাণ একটা সিগারেট ধরালে। তারপর বললে, সবার আগে আমাদের জানতে হবে খুন হওয়ার দিন মগনলাল কোথায় কোথায় গিয়েছিল এবং কার কার সঙ্গে দেখা করেছিল। কারণ তদন্তের কাজ যে অবধি এসে থেমে গেছে, সেখান থেকেই আমাদের শুরু করতে হবে।

রাইট স্যার।—সার্জেন্ট দত্ত বললে, ফাইলের রিপোর্টে নিশ্চয় জানা গেছে মগনলালজী খুন হওয়ার আগে কোথায় ছিলেন এবং কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

না। মগনলালের নিয়ম ছিল সারাদিন কাজের পর রাতে ডেইলি রিপোর্ট লিখে ফাইলে রাখা। কিন্তু সোমবার দিন—মানে তার পরমায়ুর শেষ দিন, সে আর অফিসে ফিরে আসেনি। তার নিজের নোটবুকে সম্ভবত সে কিছু লিখে রেখেছিল, কিন্তু তাও বেহাত হয়ে গেছে।

তাহলে সোমবারের খবর জানা তো সম্ভব নয় স্যার!

কল্যাণ বললে, গোয়েন্দার অভিধানে 'অসম্ভব' শব্দটা থাকতে নেই দত্ত। শুধু গোটাকতক শূন্য দিয়ে অঙ্ক মিলিয়ে দেওয়াই গোয়েন্দার কাজ।

জ্বলন্ত সিগারেটে বড় করে একটা টান দিলে কল্যাণ। তারপর হঠাৎ হেসে প্রশ্ন করলে, বিয়ার—টিয়ার খাওয়া অভ্যেস আছে তো?

একটু থতিয়ে গিয়ে মনসিজ বললে, না স্যার।

সেকি হে!—হালকা গলায় কল্যাণ বললে, আজকালকার ছেলে তুমি, হুইস্কি নয়, ব্র্যান্ডি নয়, সামন্যে বিয়ার—তাও খাও না! লোকে নাবালক বলবে যে! চলো, আজ সন্ধের পর ব্লু ডায়মন্ড বার—এ যাই, তোমার হাতেখড়ি দিয়ে দিই।

মনসিজ বুঝতে পারল, বিয়ার খাওয়াটা উপলক্ষে মাত্র। ব্লু ডায়মন্ড—এ যাবার পেছনে নিশ্চয় কোনও ধান্দা আছে কল্যাণ বোসের।

হাসিমুখে বললে, রাইন স্যার।

ব্লু ডায়মন্ড বার ওয়েলেসলি অঞ্চলে।

নামটা জমকালো হলেও এটা একটা সাধারণ পানশালা। পার্ক স্ট্রিটের বার—রেস্তোরাঁগুলোর মত খুব আধুনিক ধাঁচে সাজানো না হলেও ব্লু ডায়মন্ডের নাম—ডাক আছে। বছর কয়েক পূর্বে উজাগর সিং নামে এক পাঞ্জাবি এই পানশালাটি খুলেছিল। লোকে বলত, উজাগর সিংয়ের আসল কারবার ছিল স্মাগলারদের সঙ্গে এবং পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যাতে চোরাই কারবারের লেনদেনের সুবিধে হয়, সেই উদ্দেশ্যেই পার্ক স্ট্রিট ছেড়ে উজাগর ওয়েলেসলিতে পানশালাটি খোলে। কিন্তু উদ্দেশ্য যাই হোক, ব্লু ডায়মন্ড অল্পদিনেই জমে গেল। এর বারো আনা খদ্দের জাহাজি মাল্লারা, আর সমাজের চোরা—গলিতে যারা চলাফেরা করে, তারাই।

বছর দুই আগে শত্রুর ছুরি উজাগরের ভবলীলা সাঙ্গ করে। কিন্তু ব্লু ডায়মন্ডের দরজা বন্ধ হয়নি। উজাগরের স্ত্রী প্রেমলতা এখন পানশালা চালাচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সে নিজে এসে বার কাউন্টারে বসে।

কল্যাণের মুখে সার্জেন্ট মনসিজ মোটামুটি এই শুনেছে।

রাত আটটায় যখন দু'জনে কাচের দরজা ঠেলে ব্লু ডায়মন্ডের হলে পা দিল, তখনই পানশালা জমজমাট। ভেতরে ঢুকে কল্যাণ একবার চারধারে চোখ বুলিয়ে নিল। চেনা মুখ—হ্যাঁ, গোটা কয়েক আছে বইকি। এককোণে একটা একানে টেবিলে রতিকান্ত পাল। হলের মাঝামাঝি একটা বড় টেবিল ঘিরে জনকয়েক ছোকরার মধ্যে উঠতি মাস্তান পল্টু চ্যাটার্জি। কিন্তু তার গা ঘেঁষে বেলবটম প্যান্ট আর টাইট গেঞ্জি পরা যুবতীটি কে?

একজন ওয়েটার এগিয়ে এল।

আইয়ে সাব, কেবিন খালি হ্যায়।

কল্যাণ বললে, কেবিন দরকার নেই। আমরা বার—কাউন্টারে বসব।

রতিকান্ত আর পল্টু চ্যাটার্জির চোখ এড়িয়ে দু'জনে বার কাউন্টারের দিকে এগোল। কল্যাণ বললে, ওই প্রেমলতা!

মনসিজ দেখলে, কাউন্টারের ভেতরে একটা উঁচু টেবিলের সামনে একখানা উঁচু চেয়ারে বসে একটি মেয়ে বোধ করি কাস্টমারদের জন্যে বিল লিখছে। মুখের রঙটা উগ্র রকমের ফর্সা। হয়তো ম্যাক্স ফ্যাক্টরের গুণে। পরনে গাঢ় নীল সালোয়ার—কামিজ আর দুধ—সাদা দোপাট্টা। পিঠে লম্বা বেণী। মেয়েদের বয়সটা যদিও গোলমেলে, তবু মনসিজের মনে হল কুড়ি—বাইশের বেশি নয়।

কাউন্টারের ধারে এসে কল্যাণ বললে, হ্যালো।

প্রেমলতা চোখ তুলে তাকাল। বড় বড় কালো টলটলে চোখ। মিষ্টি করে হেসে বললে, হ্যালো বোস! গুড ইভনিং!

গুড ইভনিং টু ইউ প্রেম!

টেবিল ছেড়ে কাউন্টারের ওধারে এসে দাঁড়াল প্রেমলতা। এবার মনসিজের মনে হল, তার বয়সটা তিরিশের কাছাকাছি। তা হোক, আশ্চর্য রকম তার দেহের বাঁধুনি।

প্রেমলতা সাদা দাঁতের ঝিলিক ছড়িয়ে বললে, মগনলালের সঙ্গে বার কয়েক এসেছিলে তুমি, তারপর অনেকদিন আর দেখা নেই! আজ হঠাৎ যে?

কল্যাণ বললে, হঠাৎ তোমাকে মনে পড়ল, চলে এলাম।

তাই নাকি!—জোরে হেসে উঠল প্রেমলতা। বললে, কি দেব?

বিয়ার দাও। দাঁড়াও, তার আগে আলাপ করিয়ে দিই। আমার বন্ধু সার্জেন্ট মনসিজ দত্ত—বান্ধবী প্রেমলতা।

কি নাম বললে? প্রেমলতা জিজ্ঞেস করলে।

কল্যাণ পুনরাবৃত্তি করলে : মনসিজ দত্ত।

ম—নো—সি—জ! বেশ মিষ্টি নাম তো!

স্মার্ট মনসিজ তার পেটেন্ট লাজুক—লাজুক হাসিটি মুখে নিয়ে বললে, আপনার নামটাও তো কম মিষ্টি নয়। প্রেমলতা!

টলটলে কালো চোখ আরও টলটলে করে প্রেমলতা বললে, আমার নামটা আপনার মুখে শুনে তাই মনে হচ্ছে।

দু'মগ ঠান্ডা বিয়ার নিজেই নিয়ে এল প্রেমলতা। ইন্সপেক্টর আর সার্জেন্ট উঁচু টুলে চেপে বসল। দীর্ঘ একটা চুমুক দিয়ে কল্যাণ একটু চাপা গলায় বললে, মগনলালের খবর শুনেছ বোধ হয়?

প্রেমলতা বললে, শুনেছি। ভারি দুঃখের কথা। মগনলালজী আমার রেগুলার কাস্টমার ছিল।

জানি। আচ্ছা প্রেম, গত সোমবার দিনও কি মগন এখানে এসেছিল?

এসেছিল। ঠিক এইখানেই বসে পর পর তিন মগ বিয়ার খেয়েছিল সে।

ক'টার সময়?

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ।

সেদিন তার মেজাজ কেমন ছিল? যেমন স্বাভাবিক ফুর্তিবাজ, তেমনি?

প্রেমলতা বললে, না, কেমন যেন গম্ভীর। আমার সঙ্গে কথাও বেশি বলেনি। মনে হচ্ছিল, তার ভেতরে একটা অস্বস্তি চাপা রয়েছে। আমি জানতে চাইলাম, কি হয়েছে? মগনলাল শুধু বললে, মেয়েটার জন্যে দুশ্চিন্তায় আছি। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কেসটা কদ্দুর এগোল? সে বললে, আজ এমন একটা জোরালো খবর পেয়েছি, যা নাকি রহস্যের চাবিকাঠি।

আচ্ছা!—কল্যাণের চোখ দুটো তীক্ষ্ন হল। প্রশ্ন করলে, তারপর?

কিছুক্ষণ পরে মহুয়া নাগ হলে ঢুকল। তাকে দেখে বিয়ারের মগটা শেষ না করেই মগনলাল হঠাৎ উঠে গেল তার কাছে।

মহুয়া নাগ! কে সে?

প্রেমলতা বললে, চেনো না? আর্টিস্টদের মডেল হিসেবে বেশ নাম করেছে। রবি সেনের দলে খুব ভিড়ছে আজকাল।

রবি সেন! মানে কুখ্যাত রবসন?

হ্যাঁ।

কিন্তু রবসনের দলের মেয়ের সঙ্গে মগনলালের কী এমন দরকার?

তা জানি নে। তবে দেখলাম, দু'জনে কিছুক্ষণ কথা হল। মনে হল প্রাইভেট। তারপর মহুয়া নাগের সঙ্গে মগনলাল বেরিয়ে গেল।

তখন রাত ক'টা?

প্রায় সাড়ে ন'টা।

নিজের আঙুলে—ধরা সিগারেটের নীলচে ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে কল্যাণ মৃদু স্বরে বললে, হুঁ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, সোমবার রাত সাড়ে ন'টার পরেও কিছুক্ষণ বেঁচে ছিল মগনলাল। থ্যাঙ্ক ইউ প্রেম। অ্যান্ড গুড নাইট!

বিয়ারের দাম মিটিয়ে উঠে পড়ল কল্যাণ বোস।

লাজুক হেসে মনসিজও বলল, গুড নাইট।

টলটলে কালো চোখে মাদকতা এনে প্রেমলতা বললে, আবার আসবেন।

চলে যেতে গিয়ে কল্যাণ হঠাৎ ফিরে এল। কাউন্টারের ওপর ঝুঁকে প্রশ্ন করলে, ওই মেয়েটি কে প্রেম? ওই যে পল্টু চ্যাটার্জির পাশে!

প্রেমলতা জবাব দিলে, ওই তো মহুয়া নাগ।

ব্লু ডায়মন্ড বার বন্ধ হবার মিনিট পনেরো আগে কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল পল্টু চ্যাটার্জি। পেছনে পেছনে মহুয়া নাগ।

ফুটপাথের ধারে গোটা দুই খালি ট্যাক্সি সওয়ারির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। তারই একটায় পল্টু আর মহুয়া উঠে পড়তেই মিটার ডাউন করে ড্রাইভার স্টার্ট দিলে। কাছেই একটা অন্ধকার গাড়ি—বারান্দার তলা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল সার্জেন্ট দত্ত। অন্য ট্যাক্সিটাতে উঠতে উঠতে সে ড্রাইভারকে বললে, ট্যাক্সিটার পিছু নাও—জলদি!

পঞ্চাশ—ষাট গজ ব্যবধানে দু'খানা গাড়ি ছুটতে শুরু করল। ইলিয়ট রোড দিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোড। তারপর বেকবাগানের মোড়ে এসে প্রথম ট্যাক্সিখানা থামল একটা তিনতলা বাড়ির সমুখে। মনসিজের ট্যাক্সি অল্প তফাতে একটা গাছের ছায়ান্ধকারে ব্রেক কষল।

নামল মহুয়া একা। কিন্তু তখুনি বাড়ির ভেতরে গেল না। ট্যাক্সির পাশে দাঁড়িয়ে পল্টুকে নিয়ে যেন বলতে লাগল। তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পল্টুর ট্যাক্সি হুস করে বেরিয়ে গেল। সেদিকে তাকিয়ে একটা কুৎসিত গাল দিলে মহুয়া।

আর, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা প্রাইভেট ফিয়াট মহুয়ার পাশে এসে দাঁড়াল। চালকের আসন থেকে নামল অত্যন্ত বলিষ্ঠ আর অত্যন্ত শৌখিন পোশাক পরা এক ব্যক্তি। মুখে লম্বা সিগারেটের পাইপ।

মনসিজ চিনল, শহর কলকাতার ডাকসাইটে টপ মাস্তান রবি সেন ওরফে রবসন।

চাঁছা গলায় রবসন জিজ্ঞেস করলে, ট্যাক্সিতে কে? পলটে শালা বুঝি?

মহুয়া একমুখ হেসে বললে, না, না, ড্রাইভারটাকে গাল দিলাম। এসো।

দুজনে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল।

মনসিজ বাড়িটাকে ভাল করে দেখে ট্যাক্সিকে বললে, চলো। তার মনের মধ্যে তখন একটা চিন্তাই পাক খাচ্ছে। গত সোমবার রাত সাড়ে ন'টার পর মগনলাল বেরিয়েছিল মহুয়া নাগের সঙ্গে, তারপর আর তাকে জীবিত দেখা যায়নি। তবে কি মহুয়াই মগনলালকে ফাঁদে ফেলেছিল? কিন্তু তাকে খুন করল কে? পল্টু চ্যাটার্জি? না রবসন? —

* * *

পরদিন কল্যাণ বোস বললে, না দত্ত, আমার তা মনে হয় না। মগনলাল করছিল অশ্বিনী লাহার কেসের তদন্ত, সে—ব্যাপারে রবসন বা পল্টুর কোনো যোগাযোগ নেই বলেই জানি। অতএব মগনলালকে অশ্বিনীর লোকই খুন করেছে—এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক।

মনসিজ বললে, তাহলে রবসনের দলের মেয়ে মহুয়ার সঙ্গে মগনলালজী সে—রাতে বেরিয়েছিলেন কেন? কি কারণে?

সেই কারণটাই আমাদের জানতে হবে।—কল্যাণ বললে, কিন্তু সেটা যথাসময়ে জানা যাবে। এখন অশ্বিনী লাহার কেস নিয়েই এগোতে হবে আমাদের।

কয়েকটা নামের লিস্ট বার করলে কল্যাণ। সব ক'টা নামই পয়সাওয়ালা পদস্থ ব্যক্তির।

মনসিজ প্রশ্ন করলে, এরা কারা?

যারা শেয়ারের দালাল অশ্বিনীর কেসের সঙ্গে জড়িত। এই নাম ক'টা মগনলালই সংগ্রহ করেছিল।

কল্যাণের টেবিলে ঝুঁকে পড়ে মনসিজ নামের তালিকা পড়লে :

১। মৃগাঙ্ক মজুমদার

২। রমনভাই দেশাই

৩। অবনীশ ভদ্র

৪। স্বরূপা ঘোষ

৫। নীলমাধব সামন্ত

কল্যাণ ২নং আর ৫নং নামের পাশে লাল পেন্সিলের চিহ্ন দিয়ে বললে, এই দুজনকে আপাতত বাদ দেওয়া যেতে পারে। কেননা, এদের দু'জনেরই জোরালো অ্যালিবাই আছে। খুনের ঘটনায় কিছুদিন আগে থেকেই এরা বিদেশে রয়েছে। এখন বাকি তিনজনের সঙ্গে দেখা করে, তাদের জবানবন্দি নেওয়া দরকার। দেখো তো দত্ত, ফোন—গাইডে এদের টেলিফোন নম্বর পাও কিনা।

পাওয়া গেল ফোন নম্বর। প্রথমে মৃগাঙ্ক মজুমদারের নম্বর ডায়াল করলে কল্যাণ।

মিস্টার মজুমদার আছেন?

টেলিফোনের ওপার থেকে পুরুষালি গলায় শোনা গেল : সাহেব এখন একজনের সঙ্গে কথা কইছেন।

বোঝা গেল, বাড়ির বেয়ারা। কল্যাণ বললে, তাঁকে বলো গোয়েন্দা—ইন্সপেক্টর কল্যাণ বোস তাঁকে চাইছেন।

বলছি। ধরুন।

একটু পরে ভারি মোটা গলা শোনা গেল : মৃগাঙ্ক মজুমদার বলছি। বলুন ইন্সপেক্টর?

কল্যাণ বললে, অশ্বিনী লাহার কেস সম্পর্কে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

ও। কিন্তু দুঃখিত, সকালে তো আমার ফুরসত হবে না! আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, এখুনি বেরোতে হবে।

বেশ তো, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সেরে একবার ডি.ডি. হেডকোয়ার্টার্সে আসুন না।

কখন?—বিরক্তিটুকু মৃগাঙ্কের গলায় চাপা রইল না।

অমায়িকভাবে কল্যাণ বললে, যখন আপনার সুবিধে।

বেলা তিনটেয় যাব আমি।

ধন্যবাদ মিস্টার মজুমদার।

লাইন কেটে দিলে কল্যাণ।

মনসিজ প্রশ্ন করলে, কি বুঝলেন স্যার? সত্যিই আসবে, না ব্লাফ?

দেখাই যাক।—কল্যাণ এবার ডায়াল করলে অবনীশ ভদ্রকে।

এবার মিহি মেয়েলি গলার সাড়া পাওয়া গেল : মিস্টার ভদ্র দারুণ ব্যস্ত। কে ফোন করছেন?

কল্যাণ নিজের পরিচয় দিলেন।

মেয়েলি কণ্ঠ বললে, কাইন্ডলি পরে রিং করবেন।

লাইন কেটে দেবার আগেই কল্যাণ একটু কড়া গলায় বললে, পরে নয়, তাঁকে এখুনি চাই। ব্যাপারটা জরুরি।

অ। আচ্ছা, দেখছি।

মিনিট তিনেক বাদে। আবার মেয়েলি গলার সাড়া পাওয়া গেল : সরি ইন্সপেক্টর, মিস্টার ভদ্র এইমাত্র বেরিয়ে গেলেন।

সশব্দে রিসিভার রেখে দিলে কল্যাণ। মনসিজ বললে, লোকটা শক্ত বাদাম মনে হচ্ছে!

হুঁ, সহজে ভাঙা যাবে না। আচ্ছা!—কল্যাণ একটা সিগারেট ধরালে। তারপর নিঃশব্দে কয়েকটা টান দিয়ে আরেকটা নম্বর ডায়াল করলে।

হ্যালো!—মিষ্টি সুরেলা নারীকণ্ঠ শোনা গেল।

মিসেস স্বরূপা ঘোষ আছেন?

বলছি। আপনি কে?

কল্যাণ বোস, ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর।

উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল মিষ্টি সুরেলা গলা : কী আশ্চর্য! কল্যাণ! এতদিন পরে! একবার খোঁজও কি নিতে নেই?

ভয়ানক অবাক হয়ে গেল কল্যাণ। একটু থতমত খেয়ে বললে, আপনি—মানে, আমরা কি পরস্পরের পরিচিত?

উত্তরে চাপা হাসির সঙ্গে শোনা গেল, তাই তো মনে হয়। পুরুলিয়ার রূপাকে মনে আছে বোধ হয়?

এক পলকে কল্যাণ তার কিশোরবেলায় ফিরে গেল। কিশোরবেলা থেকে প্রথম যৌবনকাল অবধি কতকগুলো টুকরো টুকরো ছবি সিনেমার টুকরো টুকরো শট—এর মতো তার স্মৃতির পর্দায় প্রতিফলিত হতে লাগল। পুরুলিয়ার রাঙামাটি. . . শ্যামলা রঙের এক প্রতিবেশী মেয়ে. . . পিঠ ভরা প্রচুর এলো চুল. . . কারণে অকারণে কেবলই হাসত. . .

কল্যাণ বললে, নিশ্চয় মনে আছে। এবার চিনেছি।

যাক, তবু ভাল!—স্বরূপার গলায় ঠাট্টা না অভিমান ঠিক বোঝা গেল না।

শোন, তোমার সঙ্গে দেখা করা আমার বিশেষ দরকার। কবে সময় হবে?

একটু খুশির সঙ্গে শোনা গেল : কবে আবার কি! যেদিন তোমার ইচ্ছে। আজই এসো না, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

কল্যাণ বললে, আজ নয়, কাল। বিকেল পাঁচটায়! গাড়ি পাঠাতে হবে না, আমি নিজেই যাব'খন।

আচ্ছা। পাঁচ তলার ফ্ল্যাট।

রিসিভার রেখে কল্যাণ চুপ করে বসে রইল। পুরুলিয়ার সেই রূপাই তাহলে আজকের স্বরূপা ঘোষ! কিন্তু অশ্বিনী লাহার কেস সম্পর্কে তার নাম জড়িয়ে পড়েছে কেন? মগনলাল খুনের সঙ্গেও কি তার—

ভাবতে গিয়েও কল্যাণ ভাবতে পারল না।

মনসিজ জিজ্ঞেস করল, এখন আমাদের নেক্সট প্রোগ্রাম কি স্যার?

মৃগাঙ্ক মজুমদারের জন্যে অপেক্ষা করা।

কাঁটায় কাঁটায় তিনটের সময় মৃগাঙ্ক কল্যাণের কামরায় পা দিল।

সাধারণ ভদ্রতার সঙ্গে কল্যাণ তাকে বসতে অনুরোধ করলে। মৃগাঙ্ক মজুমদারের বয়স মনে হয় ষাটের কোঠায় পৌঁছেছে। পাতলা লম্বাটে চেহারা, চোখা নাক, মাথার দশ আনা চুল সাদা। ধূসর ট্রাউজারের ওপর গলাবন্ধ কালো প্রিন্সকোট, হাতে রুপো—বাঁধানো মলাক্কা বেতের লাঠি। পরিষ্কার করে কামানো মুখে আভিজাত্যের চেয়ে পোড়খাওয়া জীবনের ছাপই বেশি।

মৃগাঙ্ক চেয়ারে বসেই নিজের পকেট—ওয়াচ দেখল। তারপর বললে, আমার অনুমান, আপনি অশ্বিনী লাহার কেস সম্পর্কে তদন্ত করছেন। তাই না ইন্সপেক্টর?

কল্যাণ জবাব দেওয়ার আগেই মৃগাঙ্ক বলে যেতে লাগল, কিন্তু আমি এ বিষয়ে বিশেষ খবরাখবর দিতে পারব বলে মনে হচ্ছে না কেননা, অশ্বিনী লাহার টিপস নিয়ে আমি কিছু কিছু শেয়ার কেনাবেচা করতাম বটে, কিন্তু তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আমার আদপেই ছিল না।

কথার মাঝে একটু ফাঁক পেয়ে কল্যাণ বললে, আমি কিন্তু অশ্বিনীর ব্যাপারে আপনাকে ডাকিনি মৃগাঙ্কবাবু।

তবে?

অশ্বিনীর কেসের তদন্ত যিনি করেছিলেন, সেই ইন্সপেক্টর মগনলাল খুন হয়েছেন। আমি সেই খুনের তদন্ত করছি।

মৃগাঙ্ক মজুমদারের মুখ ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠল। থেমে থেমে বলল, কিন্তু খুন—টুনের বিষয়—আমি—কিছুই তো—

তার মুখের ওপর চোখ রেখে কল্যাণ প্রশ্ন করলে, ইন্সপেক্টর মগনলালকে আপনি চিনতেন। তাই না?

মৃগাঙ্কের মুখের রং ফিকে হয়ে গেল। একটু থেমে বললে, হ্যাঁ, অশ্বিনী লাহা সম্পর্কে আমার কাছে তিনি বার দুই গিয়েছিলেন।

গত সোমবার আপনার সঙ্গে মগনলালের দেখা হয়েছিল কি?

কই, না!

দেখা করার কথা ছিল?

তাও না।

সোমবার সন্ধ্যার পর আপনি কোথায় ছিলেন মৃগাঙ্কবাবু?

বাড়িতে। ইচ্ছে হলে আমার চাকরকে এখুনি ফোন করে জানতে পারেন।

কল্যাণ একটু হেসে বললে, কি দরকার? আপনার কথাই যথেষ্ট।—আচ্ছা মৃগাঙ্কবাবু, আপনি কি করেন, জানতে পারি?

কিছুই এখন করি না। বছর দুই হল রিটায়ার করেছি।

তবু, একটা কিছু তো করতেন।

সিঙ্গাপুরে আমার চায়ের ব্যবসা ছিল। আর কিছু জানতে চান ইন্সপেক্টর?

আপাতত না। আসুন, নমস্কার!

লাঠিসমেত হাত দু'খানা তুলে বেরিয়ে গেল মৃগাঙ্ক মজুমদার। কল্যাণ নিজের ঘড়ি দেখলে। পৌনে চারটে। বললে, ছ'টা নাগাদ আমরা অবনীশ ভদ্রের ডেরায় হাজির হব দত্ত।

অবনীশ ভদ্রের ঠিকানা নিউ আলিপুরে।

প্রকাণ্ড একটা পাঁচতলা বাড়ির তৃতীয় তলায় অবনীশের ডেরা। কল্যাণ আর মনসিজ যখন পৌঁছল, তখন ছ'টা বেজে গেছে। দিনের আলো কালো হয়ে এসেছে। কল্যাণ দেখলে, তিনতলার ফ্ল্যাটে রাস্তার দিকে একটা বড় জানলা খোলা, ঘরে বাতি জ্বলছে।

কল্যাণ তখনই সে—বাড়িতে ঢুকল না। উল্টো দিকে একখানা তিনতলা বাড়ি, একটা ব্যাঙ্কের শাখা—অফিস। অফিস তখন বন্ধ হয়ে গেছে। কল্যাণ তার সঙ্গীকে নিয়ে অফিস—বাড়িতে ঢুকে গেল, তারপর সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ছাদে। অন্ধকার নেমেছে, কিন্তু ঘন হয়নি। আলিসার ধার থেকে নজর তীক্ষ্ন করে দু'জনে সামনের আলোকিত জানলার দিকে তাকাল। যে—ঘরটা নজরে পড়ল, সেটা বোঝা গেল ড্রাইংরুম। একটা সোফায় বসে মোটাসোটা খাটো এক ব্যক্তি কথা বলছে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে। যার সঙ্গে কথা বলছে, সে লোকটা আর্ম—চেয়ারে বসে আছে জানলার দিকে পিছন করে। লোকটার ছোট—করে—চুল—ছাঁটা মাথা আর ঘাড়ে—গর্দানে বলিষ্ঠ পিঠের খানিকটা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতের কাছে একটা গোল টেবিলে কয়েকটা বোতল, গ্লাস, বরফের পাত্র সাজানো। বোঝা গেল, গৃহস্বামী রসিক ব্যক্তি।

কিন্তু ওদের মধ্যে গৃহস্বামীটি কে? কে অবনীশ ভদ্র? যেই হোক না, কল্যাণ জানলা থেকে নজর সরাল না। ঘাড়ে—গর্দানে লোকটার বোধ করি সিগারেট ধরানো দরকার, মোটা লোকটা নিজের লাইটার জ্বেলে উঠে এগিয়ে এল ধরিয়ে দিতে। কিন্তু জানলার কাছে এগিয়েই থেমে গেল, তারপর চলে গেল সুইচবোর্ডের কাছে। উজ্জ্বল সাদা আলোর বদলে মিটমিটে নীল আলোয় ভরে গেল ঘরটা।

কল্যাণ বললে, লোকটা আমাদের লক্ষ করেছে। তাই ঘরটা আবছা করে দিলে।

কল্যাণ আর দাঁড়াল না, মনসিজকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিচে নেমে গেল। কিন্তু রাস্তায় এসে অবনীশ ভদ্রের বাড়িতে তখনই ঢুকল না। বাড়ির গা ঘেঁষে একটা সরু গলিমতো প্যাসেজ রয়েছে, সেইমুখে মনসিজকে পাহারায় রেখে কল্যাণ সদর ফটকে ঢুকে গেল। ভেতরে ঢুকতেই অটোমেটিক লিফট। সে সটান তিনতলায় উঠে সামনের দরজায় পুশ—বেল টিপল। বার তিনেক টেপার পর ধীরে—সুস্থে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা বাজখাঁই গলার আওয়াজ শোনা গেল : কে মশায়? কোত্থেকে আগমন?

করিডরে তখন বাতি জ্বলছে। কল্যাণ দেখলে সেই মোটাসোটা খাটো লোকটা। গোল মুখে পুরু ঠোঁট, থুতনিটা দু'ভাঁজ।

কল্যাণ তার আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়ে বললে, ডিটেকটিভ হেড কোয়ার্টার্স থেকে আসছি।

লোকটা বিন্দুমাত্র ঘাবড়াল না। তেমনি রুক্ষভাবে বললে, অ! টিকটিকি! তা এখানে কি মনে করে?

ভেতরে চলুন, বলছি।

ভেতরে? বেশ, চলে আসুন। কিন্তু চা—টা চাইবেন না মশায়। এ সময় আমি চা খাই নে।

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কল্যাণ বললে, সে তো দেখতেই পাচ্ছি।

তার সজাগ নজর প্রথমেই গিয়ে পড়ল সেন্টার টেবিলের ওপর।

দুটো কাচের গ্লাস, বরফ রাখার গামলা, সোডার বোতল আর দামি বিলেতি হুইস্কি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের আধা—ভর্তি একটা বোতল। সেন্টার টেবিলের সামনের আর্ম—চেয়ারটা কিন্তু খালি। নিচে মেঝের ওপর ইন্ডিয়া কিংস সিগারেটের একটা শূন্য বাক্স। তার মানে সেই জার্মান—ছাঁট মাথা, ঘাড়ে—গর্দানে লোকটা গা ঢাকা দিয়েছে! যুগল মৌমাছির একটি এই মধুচক্র থেকে হাওয়া!

কল্যাণ মনে মনে আফশোস করে উঠল। আরেকটু আগে এলেই লোকটার সঙ্গে মোলাকাত হত। কিন্তু পালাবে কোথায়? বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে যদি পালায়, নিচে সার্জেন্ট দত্ত রয়েছে, নিশ্চয় আটকাবে।

অবনীশ ভদ্র কার নাম?—কল্যাণ প্রশ্ন করলে।

কেন? কি ব্যাপার?

আগে বলুন, অবনীশ ভদ্র কোথায়?

তেমনি রুক্ষভাবে জবাব এল, আপনার সামনে।

শূন্য সোফাটার দিকে তাকিয়ে কল্যাণ জিজ্ঞেস করলে, ওখানে বসে যিনি ড্রিঙ্ক করছিলেন, তিনি কে?

আমার মক্কেল।

মক্কেল!— করা হয় কি? আপনার পেশা?

মোটাসোটা লোকটা পকেট থেকে উইলসের প্যাকেট নিয়ে, ফস করে একটা ধরিয়ে বললে, আমি একজন অ্যাডভোকেট।

বলে কি! ছিরি—ছাঁদ দেখে তো মনেহয় চিৎপুরে মাংসের দোকান আছে। বিতৃষ্ণা চেপে কল্যাণ বললে, আপনার মক্কেলটি কে? নাম কি?

ধোঁয়া ছেড়ে অবনীশ ভদ্র নিতান্ত অভদ্র ভাবে বললে, নাম—টাম বলতে পারব না মশায়।

কল্যাণের ভ্রু—দুটো কুঁচকে গেল। বললে, কারণ?

অবনীশ বললে, কারণ আমার এখানে কোন কোন মক্কেল আসে প্রাইভেটে। তাদের পরিচয়, তাদের মামলার ব্যাপারে—সবই প্রাইভেট। সেক্ষেত্রে আমি তাদের নাম—ধাম ফাঁস করতে পারিনে। আমার পেশার বদনাম হয়ে যাবে যে মশায়!

অবনীশ তার নিজের গ্লাসটা মুখে তুলে খালি করে ফেলল।

কল্যাণ এবার পুরোদস্তুর পুলিশি মেজাজে বললে, পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে নিজের বিপদ আপনি নিজেই ডেকে আনবেন কিন্তু। বলুন, আপনার মক্কেলটি কে?

অবনীশ খ্যাঁকশেয়ালের মতো খ্যা খ্যা করে খানিকটা হাসলে। হেসে বললে, আমার বিপদ নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না টিকটিকিবাবু। মনে রাখবেন, আমিও আইনের কারবার করি।

তাহলে বলবেন না?

আজ্ঞে না। ভরসন্ধেবেলা কেন ঝামেলা করছেন মশায়?

দাঁতে দাঁত চেপে কল্যাণ নিজেকে সামলে নিলে। না, মাথা গরম করলে চলবে না। একটু থেমে আচমকা প্রশ্ন করলে, আচ্ছা অবনীশবাবু, অশ্বিনী লাহার সঙ্গে আপনার কদ্দিনের আলাপ?

অবনীশ সোজা জবাব দিলে, একদিনেরও নয়।

আপনি তার কাছ থেকে শেয়ার কিনতেন না?

কিনতাম। তার অফিস থেকে টেলিফোনে খবর পেয়ে কিনতাম। চার চোখের মিলন হয়নি কখনও।

ও। যাকগে, আমি একটা খুনের তদন্তে এসেছি।

অবনীশের চর্বির আড়ালে প্রায়—ঢাকা গুলি গুলি চোখ দুটো চকচক করে উঠল। বললে, বুঝেছি, ইন্সপেক্টর মগনলাল—খুন তো? আমার কাছে কোনও সুবিধে হবে না মশায়, আমি ও ব্যাপারের কিসসু জানিনে। তার চেয়ে মাল—টাল খাওয়া অভ্যেস থাকে তো আসুন, এক পাত্তর খান, দুটো রসের কথা বলুন।

খ্যাঁকশেয়ালের মতো খ্যা খ্যা করে আবার হাসতে লাগল অবনীশ।

কল্যাণ বুঝলে, লোকটা অতিশয় ধড়িবাজ। বৃথা সময় নষ্ট না করে সে নিচে নেমে গেল।

গলির মুখে মনসিজ দাঁড়িয়ে। একা। কল্যাণ বললে, এদিকে কেউ আসেনি?

মনসিজ ঘাড় নেড়ে জানাল, না। কিছু না বলে কল্যাণ গলির মধ্যে দ্রুত ঢুকে গেল। তাকে অনুসরণ করলে মনসিজ। কিছদূর যেতেই দেখা গেল, গলিটা ব্লাইন্ড লেন নয়, এঁকেবেঁকে তার অন্য মুখটা আরেকটা বড় রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। সুতরাং অবনীশ ভদ্রের মক্কেল কল্যাণকে বোকা বানিয়ে এই পথে সহজেই হাওয়া হয়েছে!

নিউ আলিপুর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হেডকোয়ার্টার্সের পথে।

কল্যাণ একটা সিগারেট ধরিয়ে বললে, নাগালের মধ্যে এসেও সাসপেক্ট পালিয়ে গেল!

মনিসজ বললে, লোকটা কে হতে পারে বলে মনে হয়?

নাটের গুরু স্বয়ং অশ্বিনী লাহা হতে পারে। অথবা তার হাতের লোক।

অশ্বিনী লাহার ফটো আছে অফিস—রেকর্ডে?

না, তা নেই। তবে লোকটা দাগি নিশ্চয়, নইলে তার মক্কেলদের সঙ্গে দেখা করত না কেন?

ট্যাক্সি গড়িয়াহাটায় এল। কল্যাণ বললে, একটু কফি খেয়ে যাই চলো।

একটা মাদ্রাজি রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দু'জনে নামল। কল্যাণ কিন্তু জানত না যে তার জন্যে আরেকটা বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

রেস্তোরাঁয় ঢুকতে গিয়ে সে হঠাৎ মনসিজের হাত ধরে থামালে। মনসিজ জিজ্ঞাসু চোখে ফিরে তাকাতেই সে ইশারায় ভেতরের একটা টেবিল দেখিয়ে দিলে।

দেখা গেল, মাদ্রাজি রেস্তোরাঁর ভেতরে ছোট ছোট অনেক টেবিল। প্রত্যেকটা দু'জনের বসবার মতো। একদম কোণের দিকে একটা টেবিলে দু'কাপ কফি নিয়ে মুখোমুখি বসে আছে মীনা থাপা আর পল্টু চ্যাটার্জি! রবসনের দলের উঠতি মাস্তান পল্টু! দুজনে মশগুল হয়ে কথা বলছে।

মনসিজের সঙ্গে কল্যাণ ফিরে গেল ট্যাক্সিতে। তার মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই তখন ঘুরপাক খাচ্ছে, পল্টু চ্যাটার্জির মতো একটা লোফার গুন্ডা মীনা থাপার মতো একজন ভাল মেয়ের সঙ্গে এত ভাব জমিয়েছে কেন? কি মতলবে?

কল্যাণ হঠাৎ ড্রাইভারকে বললে, সি.আই.টি. রোড।

মগনলালের বাড়িতে এখন মীনার এক কাকা এসেছেন সদ্যপিতৃহীনা মীনার দেখাশুনোর জন্যে। পুরানো দাসী কাঞ্চী কাকাকে ডাকতে যাচ্ছিল, কল্যাণ নিষেধ করলে। জানালে, কাঞ্চীকেই তার দরকার, মীনা সম্পর্কে কিছু গোপন কথা জানবার আছে।

মীনার সঙ্গে একটি ছোকরার ভাব—সাব হয়েছে, তুমি কি জানো?

জী, জানি।

কতদিন ভাব হয়েছে?

তা মাস তিনেক হবে।

মগনলালজী এ—কথা জানতেন?

গোড়ার দিকে জানতেন না, খুন হবার দিন পনেরো আগে জানতে পেরেছিলেন। এই নিয়ে মেয়েতে—বাপেতে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি অশান্তি হত। ছোকরাকে মীনা শাদি করতে চায়, বাবুজি কিছুতেই রাজী নয়। ছোকরা নাকি ভারি বদ।

মগনলালজী ছোকরাকে গিরেফতার করে শায়েস্তা করে দিলেই তো পারতেন।

তা পারতেন, কিন্তু পাছে জানাজানি হয়ে নিজের লেড়কির বদনাম হয়ে যায়, তাই বাবুজি ছোকরাকে একদিন ডেকে শুধু শাসিয়েছিলেন। ছোকরাও তাঁকে শাসিয়ে বলে গিয়েছিল, মীনাকে আমি শাদি করবই। কেউ বাধা দিলে তার লাশ ফেলে দেব।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল কল্যাণ। তারপর বললে, আচ্ছা চলি। আমি এসেছি, মীনাকে বোলো না।

* * *

স্বরূপা ঘোষের ফ্ল্যাট ক্যামাক স্ট্রিটে।

স্বরূপা অপেক্ষা করছিল। কল্যাণকে দেখে দু—হাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা করলে : এসো। কতকাল বাদে তোমায় দেখলাম বলো তো!

ঘরে পা দিতে দিতে কল্যাণ বললে, তা অনেককাল বাদে। উনিশ বছর হল।

একটা ডিভান দেখিয়ে স্বরূপা বললে, নিজের ঘর মনে করে বসো।

কল্যাণ বসে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাট। সুখ আরাম বিলাসে পরিপূর্ণ। স্বরূপার চেহারাও বদলেছে। পুরুলিয়ার সেই পাতলা ছিপছিপে মেয়েটি এখন জোয়ার—আসা নদী। কল্যাণ মনে মনে হিসেব করে দেখলে, তার নিজের বয়স এখন যদি বিয়াল্লিশ হয়, স্বরূপার ছত্রিশ হওয়া উচিত। তবু দেহ—তটে তার ভাঙন ধরেনি এতটুকু। আগের চেয়ে রঙটা ফর্সাও হয়েছে বেশ খানিকটা।

কয়েক মুহূর্তের জন্যে কল্যাণ ভুলে গেল সে পুলিশ—অফিসার। একটু হেসে সে বললে, তোমায় দেখে মনে হচ্ছে জীবনটা ভারি সুখের।

স্বরূপা হাসিমুখে বললে, তোমাকে দেখেও তো জীবনটা দুঃখের মনে হচ্ছে না। আগের চেয়ে আরও পুরুষালী, দেখতে আরও ভাল হয়েছ তুমি। বিয়ে করেছ তো?

করেছি বইকি।

বউ খুব সুন্দরী নিশ্চয়?

হেসে ফেললে কল্যাণ। বললে, কি করে বলি? এখনো তো হিন্দি ফিল্ম থেকে তার ডাক পড়েনি! তা তোমার বিয়ের খবর বলো।

একটু ক্ষীণ হেসে স্বরূপা বললে, বিয়ে আমার সইল না।

মানে?

মানে যত সহজে আমরা কাছে এসেছিলাম, তত সহজেই একদিন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ব্যস, দি এন্ড! যাক, কি খাবে বলো? পুলিশ—অফিসাররা তো শুনেছি একটু—আধটু ড্রিঙ্ক করে থাকে। একটু ড্রিঙ্কস দিই তোমাকে?

তোমার এখানে সে ব্যবস্থাও আছে নাকি?—কল্যাণ বললে।

স্বরূপা বললে, আমার স্বামী যে—সমাজে মেলামেশা করত, সেখানে মদ আধুনিক ফ্যাশান। সেই থেকে চা—কফির মতো এ জিনিসটাও আমার ঘরে থাকে।

তোমারাও অভ্যাস আছে বোধ হয়?

স্বরূপা বললে, আমিও তো ওই সমাজের।—তারপর গলা চড়িয়ে বেয়ারাকে ড্রিঙ্কস আনতে ফরমাস করলে।

একটু পরেই পাশের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেয়ারা একটা ট্রে এনে মাঝের টেবিলে রাখলে। ট্রেতে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হুইস্কির একটা বোতল, দুটো সুদৃশ্য কাচের গ্লাস, স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে বরফকুচি, সোডা এবং ইন্ডিয়া কিংস সিগারেটের একটা সোনালি বাক্স। সেদিকে তাকিয়ে কল্যাণের গোয়েন্দা—মন সজাগ হয়ে উঠল। আশ্চর্য! ঠিক এই জিনিসই সে দেখে এসেছে গত সন্ধ্যায় অবনীশ ভদ্রের ফ্ল্যাটে! কিন্তু দেখলই বা, ওই ব্র্যান্ডের হুইস্কি একজন ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ খায় না? খেতে পারে, কিন্তু ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হুইস্কির সঙ্গে ইন্ডিয়া কিংস সিগারেটই খেতে হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম তো নেই!

দুটো গেলাসে দুটো পেগ ঢালল স্বরূপা। সোডা মিশিয়ে বরফকুচি দিয়ে, একটা গ্লাস তুলে দিলে কল্যাণের হাতে। সাধারণ আদবকায়দা অনুযায়ী গ্লাসটা মুখে তোলার অগে কল্যাণ বললে, চিয়ার্স!

এক চুমুক করে খাওয়ার পর স্বরূপা সিগারেটের বাক্স এগিয়ে দিলে কল্যণের দিকে। একটা তুলে নিয়ে কল্যাণ বললে, তুমি স্মোক করো না?

বাক্সটা রেখে স্বরূপা বললে, না, ধোঁয়া লাগলে আমার ফ্যারাঞ্জাইটিস হয়।

তাই নাকি?—স্বরূপার মুখের দিকে লক্ষ্য রেখে কল্যাণ বললে, তবে প্যাকেট অর্ধেক খালি কেন? কে খেয়েছে?

এক মুহূর্তের জন্য স্বরূপার মুখের ওপর দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল। তারপরই সহজভাবে বললে, আমার এক বন্ধু মাঝে মাঝে আসে। সে—ই খায়।

সিগারেট ধরিয়ে কল্যাণ ধোঁয়া ছেড়ে বললে, ভারি শৌখিন লোক তো! যিনি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হুইস্কি আর ইন্ডিয়া কিংস সিগারেট খান, তাঁর রুচির তারিফ করতে হয়! কে তিনি? আমার সঙ্গে একদিন আলাপ করিয়ে দাও না স্বরূপা।

একটুখানি হাসি দেখা গেল স্বরূপার মুখে। বললে, বেশ তো, সুযোগ হলে দেব।

কল্যাণ এবার প্রসঙ্গ পাল্টালে। বললে, এবার কাজের কথায় আসি। তুমি তো বড় বড় কোম্পানির শেয়ার কিনে থাক, সম্প্রতি কোনো কোম্পানির শেয়ার তুমি কিনেছ?

ভারত টেক্সটাইল মিলের।

কবে কিনেছ?

গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে।

কল্যাণের দৃষ্টি একটু তীক্ষ্ন হল স্বরূপার মুখের ওপর। বললে, কিন্তু গতমাসের প্রথম সপ্তাহে ওদের মিলে হঠাৎ আগুন লেগে যাওয়ায় ওদের শেয়ারের দর হু হু করে পড়তে থাকে। শেয়ার—হোল্ডাররা তাদের শেয়ার বেচে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। তুমি হঠাৎ কিনতে গেলে কেন?

মুচকে হেসে স্বরূপা বললে, শেয়ারের কারবার হচ্ছে স্পেকুলেশন—ফাটকাবাজি।

কল্যাণ বললে, তাই কি? না, তুমি গোপনে খবর পেয়েছিলে যে, ভারত টেক্সটাইল মিলে আগুন লাগাটা ইচ্ছাকৃত, তাতে মিলের বিশেষ ক্ষতি হয়নি? সুতরাং শেয়ারের দর সাময়িকভাবে পড়লেও দু'দিন বাদেই চড়চড় করে উঠে যাবে।

স্বরূপার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বললে, যদি গোপনে খবর পেয়েই কিনে থাকি, সেটা কি বেআইনি কাজ?

এবার কল্যাণ মুখে হাসি নিয়ে বললে, তা তো বলিনি। আমি শুধু জানতে চাইছি খবরটা দিল কে?

স্বরূাপ বললে, তুমি যখন এত জানো, তখন এ কথাও তোমার জানা।

হুঁ। একটা খবর আমাকে বলবে? অশ্বিনী লাহা এখন কোথায়?

সে নিজে ছাড়া কেউ জানে না।

একটু চুপ করে থেকে কল্যাণ প্রশ্ন করলে, আচ্ছা, অশ্বিনী লাহার চেহারা কেমন?

স্বরূপা বললে, বেশ সুন্দর চেহারা, ফর্সা লম্বা—যাকে বলে হ্যান্ডসাম। কিছু মনে কোরো না কল্যাণ, একটা কথা বলি। অশ্বিনী লাহার কেসটা ছেড়ে দাও। লোকটা অসাধারণ চতুর, ওর সঙ্গে তুমি পেরে উঠবে না।

শান্ত গম্ভীর মুখে কল্যাণ বললে, তুমি কি আমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছ?

বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমি তোমার ভাল চাই, কল্যাণ। ধন্যবাদ স্বরূপা। আজ উঠি।

সোফা ছেড়ে কল্যাণ ওঠবার আগে তার একখানা হাত ধরে স্বরূপা বললে, রাত তো বেশি হয়নি, আরো খানিকক্ষণ থাকো না। আরেকটা পেগ খাও।

আমি বেশি খাই না।—অল্প হেসে কল্যাণ বললে, কিন্তু আরো থেকে লাভ কি রূপা? পুরুলিয়ার সে—আমিও আর আমি নই, সে—তুমিও আর তুমি নও!

স্বরূপা কিছু না বলে নিজের গ্লাসে আরও খানিকটা হুইস্কি ঢেলে, এক চুমুকে প্রায় অর্ধেক খালি করে ফেললে। তারপর কেমন একটা বিষণ্ণ হাসি ঠোঁটে নিয়ে বললে, বহুদিন বাদে তোমার মুখে 'রূপা' ডাক শুনলাম! পুরুলিয়ার সেই জীবন থেকে আজ কতদূরে সরে এসেছি, তবু তোমার মুখে পুরানো ডাকটা যেন হাতছানি দিয়ে পিছনে ডাকল! জীবনটা ভারি অদ্ভুত, তারও চেয়ে অদ্ভুত মানুষের মন, তাই না? যাকগে, তোমাকে আর আটকাব না কল্যাণ। এসো।

আস্তে আস্তে কল্যাণ উঠে চলে গেল।

রাস্তায় এসে ট্রাম—বাস—ট্যাক্সির চেনা আওয়াজে তার মন থেকে অতীতের আচ্ছন্নতা কেটে গেল। একটা তীব্র সংশয় কাঁটা হয়ে বিঁধতে লাগল। অবনীশ ভদ্রের মক্কেল আর স্বরূপা ঘোষের শৌখিন বন্ধু কি একই ব্যক্তি?

কে সে? সে কি অশ্বিনী লাহা?

ভাল লাগছিল হাঁটতে। ট্যাক্সির সন্ধান না করে কল্যাণ হেঁটেই চলল। নিজের ভাবনায় ডুবে গিয়ে।

রাত বেশি হয়নি। রাতের কলকাতা রঙ্গিনী নটীর মতো সবে সেজেগুজে দাঁড়িয়েছে। শহরের বড় রাস্তা জনজোয়ারে ভাসছে। বড় রাস্তা ছেড়ে কল্যাণ তাই শর্টকাট গলি—রাস্তা ধরলে। এ—গলি থেকে ও—গলি, ও—গলি থেকে সে—গলি।

মানুষের একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে। বিশেষত গোয়েন্দাদের সে—ইন্দ্রিয় বড় তীক্ষ্ন। সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অন্যমনস্ক কল্যাণের কানে কানে বললে, কেউ তার পিছু নিয়েছে, হুঁশিয়ার! কিন্তু না, পিছন ফিরে দেখলে চলবে না।

সজাগ হয়ে উঠল কল্যাণের কান। হ্যাঁ, জনবিরল গলিতে একটা মৃদু পদশব্দ তাকে অনুসরণ করছে!

সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেশলাইটা হাত ফসকে পড়ে গেল। সেটা কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য কল্যাণ থামলে। পিছনে পদশব্দও থেমে গেল। দেশলাই কুড়িয়ে, সিগারেট ধরিয়ে কল্যাণ আবার হাঁটতে লাগল। পিছনের পদশব্দও শুরু হল আবার।

কল্যাণ এবার নিজের হাতখানা মুখের সামনে তুলে ঘড়ি দেখলে। তারপর হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে হনহন করে ডান দিকের গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। গলিতে ঢুকেই একটা লাইট—বক্স। তারই আড়ালে কল্যাণ গা—ঢাকা দিলে।

মিনিট খানেক পরেই গলির মুখে এসে দাঁড়াল এক ছায়ামূর্তি। পথের আলো তার পিছনে থাকায় মুখখানা দেখা যাচ্ছে না। লম্বাটে পাতলা শরীর, প্যান্ট—শার্ট পরা। লোকটা বারকয়েক এদিক—ওদিক চেয়ে দেখল। কোথায় গেল কল্যাণ বোস? নিমেষে হাওয়ায় মিশে গেল নাকি? ডাইনের গলি ধরে দ্রুত পা চালিয়ে দিলে লোকটা। লাইট—বক্সটা সে পার হওয়া মাত্র আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কল্যাণ বোস, ঠান্ডা গম্ভীর গলায় বললে, দাঁড়াও!

চমকে ফিরে তাকাল লোকটা। আর সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণ হুকুম করলে, হাত তোলো!

লোকটার হাত দু'খানা স্প্রিংয়ের মতো উঠে গেল। পথের আলো এখন তার মুখে পড়েছে। দারুণ অবাক হয়ে কল্যাণ দেখলে, পল্টু চ্যাটার্জি! আর, পল্টু দেখলে কল্যাণের হাতে রিভলভার! পল্টুর পকেটগুলো আর কোমর বাঁ—হাতে চাপড়ে দেখল কল্যাণ। না, কোনো অস্ত্র নেই।

কড়া পুলিশি গলায় কল্যাণ নির্দেশ দিলে, আগে আগে চলো।

পল্টু বাধ্য ছেলের মতো হুকুম তামিল করলে।

পল্টুকে নিজের খাস কামরায় নিয়ে এল কল্যাণ। তাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে প্রশ্ন করলে, আমার পিছু নিয়েছিলে কেন?

বেকায়াদায় পড়েছে পল্টু। তবু ঈষৎ উদ্ধত গলায় উত্তর দিলে, পাবলিক রাস্তায় সকলেরই চলবার রাইট আছে।

কল্যাণ বললে, পুলিশেরও রাইট আছে, তোমার মতো দাগী মাস্তানকে হান্টার মেরে শায়েস্তা করার। সেটা জানো?

পল্টু গুম হয়ে রইল।

আবার বললে কল্যাণ, সত্যি করে বলো, কেন আমাকে ফলো করেছিলে? কি মতলবে?

পল্টু বললে, মা কালীর দিব্যি—মতলব—টতলব কিছু নেই স্যার! একজন আমাকে ফলে ফলো করতে বলেছে, তাই।

কে বলেছে?—কল্যাণের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল।

জানি না, স্যার। তাকে চোখেও দেখি নি।

চালাকি পেয়েছ?—ধমকে উঠল কল্যাণ, আনব হাণ্টার?

পল্টু এবার হাঁউমাউ করে উঠল : কী বলছেন স্যার? আপনার সঙ্গে যে চালাকি করবে, সে এখনো মায়ের গবভে!

তাহলে সত্যি কথা বলো। যাকে তুমি চেনো না, চোখে দেখোনি, অথচ তোমাকে আমার পিছু নিতে বলল কি করে? টেলিফোনে?

না স্যার, চিঠি দিয়ে।

কোথায় সে চিঠি?

পল্টু তার প্যান্টের হিপ—পকেট থেকে বাদামি রঙের একখানা খাম বার করলে, কিন্তু কল্যাণের হাতে দিলে না। বললে, আমি স্যার বাড়ির বাপে—খেদানো মায়ে—তাড়ানো ছেলে। তাই একতলার বাইরের ঘরে শুই। কাল ব্লু—ডায়মন্ড থেকে অনেক রাতে ফিরে দেখি, আমার বিছানার ওপর এই খামখানা পড়ে আছে। খোলা জানলা দিয়ে কেউ ছুড়ে দিয়েছে মনে হল। খাম খুলে দেখি, আই বাপ! একশো টাকার একখানা নোট আর চিঠি। দেখুন না।

কোনও ছাপ নেই খামটায়, শুধু পল্টুর নামটা টাইপ করা। খাম থেকে চিঠি বার করে দেখলে কল্যাণ। নীলচে রঙের কাগজে মোটা মোটা হরফে লেখা :

গোয়েন্দা কল্যাণ বোসের ওপর নজর রাখো। তার গতিবিধির খবর জানালে আরো টাকা পাবে। খবর পাঠাবার ঠিকানা—

বি. গুপ্ত, ২৭ সি, লেক টাউন।।

চিঠিখানা হাতে নিয়ে কল্যাণ স্থির হয়ে রইল কিছুক্ষণ। কে এই বি. গুপ্ত? নামটা ছদ্মনাম নিশ্চয়, কিন্তু কে সে? অশ্বিনী লাহার লোক? না, অশ্বিনী স্বয়ং?

একটু উসখুস করে পল্টু জিজ্ঞেস করলে, এবার যেতে পারি স্যার?

মেঘলা—করা মুখে কল্যাণ বললে, বোসো। আরও কথা আছে।

পল্টু উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ল।

কল্যাণ সরাসরি প্রশ্ন করলে, মীনা থাপার সঙ্গে তোমার আলাপ কি করে হল?

মীনার নামটা পল্টু আশা করেনি। একটু থতিয়ে গিয়ে বললে, আমার পিসতুতো বোন মীনার ক্লাস—ফ্রেন্ড। তার ওখানেই আলাপ।

হুঁ। কি মতলবে মীনার মতো মেয়ের সঙ্গে তুমি ভাব জমিয়েছ?

পল্টু এবার নিজেকে শক্ত করে বললে, আমরা বিয়ে করব ঠিক করেছি। মীনা আমাকে ভালোবাসে, আমিও বাসি।

চোপ!—কড়া গলায় কল্যাণ ধমক দিয়ে বললে, ওসব ধান্দাবাজি ছাড়ো হে ছোকরা! মীনাকে নিয়ে মগনলালজীর সঙ্গে তোমার বচসা হয়েছিল। তুমি তার লাশ ফেলে দেবে বলে শাসিয়েছিলে, আমার সাক্ষী আছে। তার কিছুদিন বাদেই মগনলাল খুন হয়। সেই খুনের চার্জে তোমাকে আমি এখুনি অ্যারেস্ট করতে পারি, খেয়াল রেখো।

আশ্চর্য, ছেলেটা একটুও ভয় পেল না। বুক টান করে কল্যাণের দিকে সোজা তাকিয়ে বললে, আপনি বড় পুলিশ—অফিসার, তা আপনি পাবেন। কিন্তু মগনলাল থাপাকে আমি রাগের মাথায় যাই বলি না কেন, খুন করতে যাব কেন? ইচ্ছে করলে মীনাকে নিয়ে আমি এনি মোমেন্টে পালিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু তা আমি করিনি। মীনাকে আমি কথা দিয়েছি ছোট কাজ আর করব না, রবসনের দল ছেড়ে দিয়ে ভাল হব।

কল্যাণ বললে, বটে! সাউথ ক্যালকাটার টপ মাস্তান পল্টু চ্যাটার্জির মুখে এই কথা! এ যে ভূতের মুখে রাম—নাম।

তিক্ত হাসির একটু আভাস পল্টুর ঠোঁটের কোণে দেখা দিল। বললে, বিশ্বাস করতে পারছেন না তো? কিন্তু ভাল যদি খারাপ হয়ে যেতে পারে, তবে খারাপই বা ভাল হতে পারবে না কেন বলতে পারেন? কিছু মনে করবেন না স্যার, ভাল হওয়ার চান্স পুলিশই আমাদের দেয় না। একটা ভদ্র কাজ আমাকে জুটিয়ে দিয়ে দেখুন না।

এমন টাইপের ছেলে কল্যাণ বোস তার পুলিশ—জীবনে অনেক ঘেঁটেছে। আজ কিন্তু পল্টুর কথাগুলোর মধ্যে একটা আন্তরিক সুর তার কানে বাজল। একটু নরম সুরে সে বললে, বেশ, তোমার জন্যে একটা ভদ্র কাজের চেষ্টা আমি করব। কিন্তু তুমি আমার একটা কাজ করতে পারবে কি?

বলুন।

টাকার জন্যেই তুমি ওয়াচারের কাজ—মানে, আমার ওপর নজর রাখছিলে তো? আমি তোমাকে টাকা দেব, ও—কাজটা এবার আমার জন্যে করো।

পল্টু বললে, আপনি টাকা না দিলেও আপনার কাজ করব স্যার। পল্টু চ্যাটার্জির এক জবান। বলুন, কার ওপর নজর রাখতে হবে?

কল্যাণ বললে, ক্যামাক স্ট্রিটের যে—বাড়ি থেকে আমাকে তুমি শ্যাডো করেছিলে, সেই বাড়িটায় কে আসছে যাচ্ছে, সেটা লক্ষ রাখবে। কিন্তু পল্টু, বি. গুপ্ত যেই হোক, তাকে জানাতে হবে যে তুমি তার কাজই করে যাচ্ছ। অতএব লেকটাউনের ঠিকানায় তুমি নিয়মিত খবর পাঠিয়ে দেবে—আমার সম্পর্কে যা হোক কিছু মনগড়া খবর। বুঝলে?

পল্টু হাসিমুখে বললে, আর বলতে হবে না স্যার। কিন্তু আপনাকে খবর দেব কিভাবে?

পাবলিক টেলিফোনে। বিশেষ খবর থাকলে এখানে এসো—ভোল পাল্টে।

আজ একবার ব্লু ডায়মন্ড বার ঘুরে এসো, মনসিজ।

বেশ তো, চলুন স্যার।

উঁহু, তুমি একাই যাও। তোমার মতো ইয়াং খদ্দেরকেই প্রেমলতা পছন্দ করে।

কী যে বলেন স্যার!—মনসিজ দত্তের কান দুটো লাল হয়ে উঠল।

হেসে কল্যাণ বললে, ঠিকই বলছি হে! তোমায় দেখা ইস্তক প্রেমলতার লতার ফুল ফুটব—ফুটব করছে। তারই সুযোগ নিয়ে দু'—একটা খবর জেনে এসো দেখি।

মনসিজ এবার সপ্রতিভ হয়ে বললে, বলুন কি জানতে হবে?

মহুয়া নাগের সঙ্গে পল্টু চ্যাটার্জির সম্পর্কটা কেমন, এবং সোমবার রাতে মহুয়ার সঙ্গে মগনলাল কেন বেরিয়েছিল আর কোথায় গিয়েছিল? এই দুটো খবর তোমাকে জেনে আসতে হবে।

ঠিক আছে স্যার।

আর শোনো, তোমার এই সার্জেন্টের খোলস ছেড়ে, বেশ প্রেমিক—প্রেমিক সেজে যেও, বুঝলে?

প্রেমিক—প্রেমিক সেজে!—মনসিজ হেসে ফেললে।

হ্যাঁ হে, হ্যাঁ। কাজ আদায় করতে হলে গোয়েন্দাকে সব রকম সাজতে হয়, আর ফার্স্ট ক্লাস অ্যাকটিং করতে হয়। অনেকটা তোমাদের উত্তমকুমারের মতো।

আচ্ছা স্যার, তাই হবে।

ব্লু ডায়মন্ড বার—এ মনসিজ যখন ঢুকল, তখন রাত সাড়ে আটটা। মনসিজের পরনে ধবধবে পায়জামা, গায়ে ফিকে—গেরুয়া সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে শৌখিন চপ্পল। চুলে বড় একটা তেল দেয় না সে, রুখু চুলগুলো সযত্নে এলোমেলো করা। প্রেমিক—প্রেমিক সাজই বটে!

পায়ে পায়ে এগিয়ে এল মনসিজ, একেবারে কাউন্টারের ধারে।

গুড ইভনিং!

প্রেমলতা যথারীতি হিসাবের খাতা দেখছিল। মুখ তুলে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইল। তারপর গোলাপি রঙ—করা ঠোঁটের ফাঁকে ঝকঝকে দাঁতের সারি দেখা দিল।

গুড ইভনিং মনসিজ! পথ ভুলে নাকি?

বাড়ি থেকে বেরোবার আগে মনে মনে রিহার্সাল দিয়েছে মনসিজ। জীবনে যতগুলো রোমান্টিক ফিল্ম দেখেছে, তার বাছা বাছা ডায়ালগগুলো মনে করার চেষ্টা করেছে। দেখা যাক, প্রেমলতার মন ভিজিয়ে কাজ হাসিল করা যায় কিনা। উঁচু টুলে বসে সে বললে, ঠিক তাই! দুনিয়ার সব পথ ভুলে গেছি। শুধু প্রেমলতার পথই মনে রয়েছে।

টলটলে কালো চোখে চেয়ে প্রেমলতা বললে, তামাসা?

একটা নিশ্বাস ছেড়ে মনসিজ বললে, তা বলতে পারো। আগুনের কাছে পতঙ্গের ছুটে আসাটাও একটা তামাসা!

খুব কথা শিখেছ দেখছি!—মুচকি হাসল প্রেমলতা; তারপর এক মগ ঠান্ডা বিয়ার এনে দিয়ে বললে, আছো কেমন? ভালো তো।

ভাল আর কোথায়?—মনসিজের গলাটা উদাস হয়ে উঠল।

কেন? কি হয়েছে?

বিয়ারে একটা চুমুক দিয়ে মনসিজ বললে, গোয়েন্দা—পুলিশের চাকরি দুনিয়ার সবচেয়ে ওঁছা কাজ। চাকরি আমার যায়—যায়! তুমি তো অনেক কিছু খবর রাখো প্রেম, দাও না দু'একটা খবর।

গোলাপি রঙ—করা ঠোঁটে হাসি নিয়ে প্রেমলতা বললে, তার বদলে আমি কি পাব শুনি?

কাউন্টারের ওপর ঝুঁকে মনসিজ বললে, গোটা মনসিজ দত্তকেই পাবে।

টলটলে চোখ আরও টলটলে করে প্রেমলতা বললে, তাই বুঝি! বেশ বলো কি খবর চাও? কার খবর?

আর্টিস্টদের মডেল মহুয়া নাগের।

প্রেমলতা বললে, মহুয়া নাগ এখানে আসে বটে, তবে আগের মতো বেশিক্ষণ থাকে না। পল্টু চ্যাটার্জির খোঁজ নিয়েই চলে যায়। আজও হয়তো আসতে পারে।

মনসিজ উৎসুক হয়ে বললে, যদি আসে, তার কাছ থেকে দুটো খবর জেনে নিতে পারবে?

কোন খবর?

পল্টু চ্যাটার্জির সঙ্গে মহুয়ার কি রিলেশন, আর—

মনসিজকে থামিয়ে প্রেমলতা বললে, সেটা আমিই বলে দিচ্ছি। বেশ কিছুদিন থেকে মহুয়া রবসনের গার্ল—ফ্রেন্ড হয়ে আছে, অথচ মহুয়ার মনের মানুষ হচ্ছে পল্টু। রবসনের অজান্তে মহুয়া পল্টুকে চায়, কিন্তু পল্টু তাকে বিশেষ আমল দেয় না। হালে পল্টু তো দেখাই করে না মহুয়ার সাথে।

মনসিজ বললে, কিন্তু এই রোমান্টিক ত্রিভুজের মধ্যে ইন্সপেক্টর মগনলালজী এসেছিলেন কেন, সেটাই আসল রহস্য। কি কারণে তিনি খুন হওয়ার রাতে মহুয়া নাগের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন? গিয়েছিলেনই বা কোথায়? এই খবরগুলোই আমার দরকার, প্রেম।

দেখি চেষ্টা করে।

হঠাৎ হলের কাচের দরজার দিকে চেয়ে প্রেমলতা ব্যস্ত হয়ে উঠল, ওই তো মহুয়া আসছে! কাউন্টারের ভেতরে এসো মনসিজ—ওই পর্দার আড়ালে চলে যাও—কুইক!

কাউন্টারের পিছন দিকে প্রেমলতার টেবিলের পাশে ব্লু ডায়মন্ড বারের স্টোর রুম। নানাবিধ মদের পেটি সাজানো থাকে। দরজায় ঝুলছে মোটা ভারী পর্দা। চোখের পলকে মনসিজ সেই পর্দার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

হলের ভেতরে এসে মহুয়া নাগ চারপাশের টেবিলগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলে। মহুয়ার পরনে আজ মিশকালো বেলবটের ওপর রক্ত—লাল টাইট গেঞ্জি। আর, টাইট গেঞ্জির আড়ালে উদ্ধত যৌবন যেন সঙিন উঁচিয়ে আছে পুরুষের কামনাকে খোঁচা মারবার জন্যে। মুখে সিগারেটের লম্বা পাইপ।

আশপাশের কয়েকটা টেবিল থেকে খুশি গলার ডাক শোনা গেল, হ্যালো মহুয়া! হ্যালো সুইটি! হ্যালো ডার্লিং!

কারও ডাকে সাড়া দিলে না মহুয়া। বব—করা ফাঁপানো চুলে একটা ঝাঁকি দিয়ে সে এগিয়ে গেল কাউন্টারের কাছে।

পল্টু এসেছিল প্রেম?

কই, দেখিনি তো!—প্রেমলতার জবাব।

দাঁতে দাঁত পিষে মহুয়া বললে, এখানে আসবে কেন সে? সেই কুত্তির বাচ্চচা মীনাকে নিয়ে বেরিয়েছে নিশ্চয়!—দাও, একটা ছোট হুইস্কি দাও।

গ্লাসে ছোট পেগ ঢালতে ঢালতে প্রেমলতা বললে, সত্যি, পুরুষের মন শক্ত ধাতু দিয়ে গড়া! যতই ভেজাও, গলতে চায় না।

নামমাত্র সোডা মিশিয়ে, হুইস্কিটুকু চোঁ করে মেরে দিয়ে মহুয়া। তারপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে বললে, তুমিই বলো প্রেম, পল্টুর জন্যে লুকিয়ে—চুরিয়ে আমি কী না করেছি! রবসন জানতে পারলে চাবকে আমার পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেবে না? আর, এই তার প্রতিদান! একবার দেখাও করে না! আচ্ছা, আমিও দেখব!

কাউন্টারের ওপর মদের দাম ফেলে দিয়ে মহুয়া চলে যাচ্ছিল, প্রেমলতা ডাকলে, একটা জরুরি কথা আছে মহুয়া।

ঘাড় ফিরিয়ে মহুয়া বললে, কি কথা?

সবার কান বাঁচিয়ে বলতে হবে। ভেতরে এস।

পাইপে একটা নতুন সিগারেট লাগিয়ে মহুয়া কাউন্টারের ভেতরে এসে দাঁড়াল। স্টোর রুমের দরজার কাছে। প্রেমলতা চাপা গলায় বললে, পুলিশ তোমাকে খুঁজতে এসেছিল।

পুলিশ!—তেতো মুখে মহুয়া বলে উঠল, জাহান্নমে যাক শুয়োরের বাচ্চচারা! মহুয়া নাগ আর্টিস্টদের কাছে নিউড পোজ দেয়, পুলিশের কাছে দেয় না—তাই তো ওদের এত গায়ের জ্বালা!

গলায় উদ্বেগ নিয়ে প্রেমলতা বললে, আজ কিন্তু অন্য কারণে তোমাকে ওরা খুঁজতে এসেছিল মহুয়া।

অন্য কারণ! কি কারণ?

পুলিশের ধারণা, তুমি নাকি ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মগনলাল খুনের রহস্য জানো।

ফাঁপানো চুলে ঝাঁকি দিয়ে মহুয়া বলে উঠল, কখনো না! আমি কিচ্ছু জানি না।

কিন্তু খুনের রাতে পুলিশ যে তোমাকে মগনলালের সঙ্গে এই 'বার' থেকে বেরোতে দেখেছে!

দেখলই বা!—বাগ—না—মানা ঘোড়ার মতো ঘাড় বেঁকিয়ে মহুয়া বললে, ফুঃ! আমি পরোয়া করি না! রাত সাড়ে ন'টা থেকে দশটা অবধি আমি মগনলালের সঙ্গে ছিলাম। তারপর আমাকে আর্টিস্ট অলক মজুমদারের স্টুডিওতে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। ইচ্ছে হলে পুলিশ অলক মজুমদারকে জিগ্যেস করতে পারে। তারপর মগনলাল কোথায় খুন হল, কেন খুন হল, আমি তার কি জানি! বুঝলে প্রেম, পুলিশগুলো নেহাত বোকাচন্দর! ফওঃ!

একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে মহুয়া বললে, দাও, আরেকটা ছোট পেগ দাও।

পেগ দিয়ে প্রেমলতা বললে, আচ্ছা মহুয়া, মগনলালের তো অল্প—স্বল্প ড্রিঙ্ক করা অভ্যেস ছিল, আর কোনও অভ্যেস—মানে তোমার ওপর তার ঝোঁক—

শব্দ করে হেসে উঠল মহুয়া। বললে, আরে দুর! মগনলাল ছিল পঞ্চাশ বছরের বুড়ো—যদিও বুড়োরাই মেয়েদের লোভে ছোঁক ছোঁক করে বেশি—তবু, ও—লোকটার সে—দোষ ছিল না। মগনলাল আমাকে নিয়ে বেরিয়েছিল তার ঘরের জ্বালায়!

ঘরের জ্বালায়! মানে?

মানে তার মেয়ে মীনা পল্টুর সঙ্গে লটকে গেছে, জানো তো? তাই মগনলাল আমাকে বললে, আমি যদি পল্টুর কোনও গুন্ডামির বা ওয়াগন ব্রেকিং বা অন্য কোনও অপরাধের খবর জানাই, তাহলে আমাকে সে মোটা টাকা দেবে, আর পল্টু হারামিকে পাঁচ বছরের জন্যে ঝুলিয়ে দেবে।

তুমি কি বললে?

কি আর বলব?—মহুয়ার গলা ভারি হয়ে এল : পল্টু আমার সাথে বেইমানি করেছে বলে, আমি তো বেইমানি করতে পারি না।

সোডা না ঢেলেই দ্বিতীয় পেগটা ঢক করে গিলে ফেললে মহুয়া।

প্রেমলতা সায় দিয়ে বললে, তা তো বটেই। কিন্তু পুলিশের কি অন্যায় দেখো! মগনলাল খুনের বিষয় তুমি কিছুই জানো না, অথচ—

হঠাৎ গলাটা একটু নামিয়ে মহুয়া বললে, জানি বইকি! চোখের সামনে দেখেছি যে!

ভুরু দুটো কপালে তুলে প্রেমলতা বললে, বলো কী! যাঃ, ঠাট্টা করছ!

তোমার দিব্যি প্রেম, সত্যি দেখেছি। অলক মজুমদারের স্টুডিও পুরানো আলিপুরে। রাত ন'টা বাজলেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসে। ট্যাক্সিটা খানিক তফাতে থামিয়ে মগনলাল আমার সঙ্গে নামল, তার কথাটা আমাকে ভেবে দেখতে বলল। আমি এগিয়ে গেলাম, স্টুডিওর দরজায় সবে পা দিয়েছি, অমনি একটা ভারী জিনিস পড়ার আওয়াজে চমকে ফিরে তাকালাম। দেখি, মগনলাল রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে, আর হাত কয়েক তফাতে একখানা কালো অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে। ট্যাক্সিখানা হঠাৎ ঝড়ের বেগে পালিয়ে গেল। বোধ হয় ভয় পেয়েই।

তারপর?

ভয় আমিও পেয়েছিলাম। চট করে স্টুডিওতে ঢুকে দরজা একচিলতে ফাঁক করে দেখতে লাগলাম। কি দেখলাম জানো? কালো অ্যাম্বাসাডর থেকে দু'জন লোক নামল, মগনলালের দেহটা ধরাধরি করে গাড়ির পেছনের সিটে চালান করে দিলে। তারপর সাঁ করে চলে গেল।

প্রেমলতা বললে, লোক দু'জনকে স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছিলে?

নাঃ, রাস্তায় তেমন জোরালো আলো ছিল না। তবু দেখতে পেলাম, একজনের মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল, মোটার ওপর দারুণ মজবুত শরীর, ঘাড়ে—গর্দানে। আরেকজনের বেশ লম্বা পাতলা চেহারা। সে—রাতে স্টুডিও থেকে আর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে যেতে সাহস হয়নি আমার। দেখো ভাই প্রেম, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম বলে, তুমি যেন কাউকে—

না, না, আমি কখনো বলতে পারি? তোমাদের নিয়েই যে আমার কারবার।

আচ্ছা, বাই—বাই!

চলে গেল মহুয়া। মনসিজও বেরিয়ে এল পর্দার আড়াল থেকে।

প্রেমলতা বললে, শুনলে তো সব?

শুনলাম। অনেক—অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।

টলটলে চোখ আরো টলটলে করে প্রেমলতা বললে, আমার বখশিস কিন্তু পাওনা রইল। আবার এসো।

* * *

পল্টু বললে, না স্যার, লেক টাউনের ঠিকানায় বি. গুপ্ত বলে কেউ থাকে না। গিয়ে দেখলাম, একখানা খোলার ঘর, খালিই পড়ে থাকে, রাতে জনকয়েক রিকশাওয়ালা শোয়।

কল্যাণ বললে, মিথ্যে সেখানে গেলে কেন? বি. গুপ্ত একটা ফলস নাম। ওই নামের আড়ালে যে ব্যক্তিটি আছে, সে ধরা—ছোঁয়া দেবে না বলেই তো চিঠি দিয়েছে।

মাথা চুলকে পল্টু বললে, ঠিক বলছেন স্যার। এ যুক্তিটা আমার মাথায় ঢোকেনি।

হাসি চেপে কল্যাণ বললে, কি করে ঢুকবে? একেবারে নিরেট যে! যাক, ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়ির খবর কিছু আছে?

আছে স্যার।—পল্টু বললে, গত তিনদিন ধরে দেখছি রাত ন'টার পর একখানা কালো রঙের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি ওই বাড়িটার দরজায় এসে থামে। থামামাত্র সদর দরজার মাথায় যে আলোটা জ্বলে, সেটা টুক করে নিভে যায়। আর, গাড়ি থেকে একটা স্যুট—পরা লোক নেমে অন্ধকারে ছায়ার মত ঢুকে যায় ভেতর! দেখে সন্দেহ হল। লিফটম্যানের হাতে দুটো টাকা গুঁজে দিয়ে জানতে পারলাম, লোকটা পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আসে, আর সে—ফ্ল্যাটে থাকে—

বাধা দিয়ে কল্যাণ বললে, কে থাকে জানি। লোকটাকে দেখতে কেমন বলো।

পল্টু বলতে লাগল, অন্ধকারে দেখতে কি পেয়েছি? মক্কেল এলেই সদরের বাতি নিভে যায়! কাল এক প্যাঁচ করলাম স্যার। লোকটা তো এসে সট করে ঢুকে গেল, আমিও শালা ক্যাসাবিয়াংকার মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম সদরের সামনে। রাত বারোটায় মক্কেল নামল। যেই সে কাছে এগিয়ে এসেছে, আমিও অমনি মুখে একটা চারমিনার গুঁজে ফস করে লাইটারটা জ্বেলেছি। মুখে আলো পড়তেই লোকটা থতিয়ে গিয়ে বললে, কৌন হ্যায়? আমি সেলাম ঠুকে বললাম, তিন নম্বর ফ্ল্যাটকা বাবুর্চি হ্যায় সাব! আর কিছু না বলে লোকটা চলে গেল। কিন্তু ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমি তাকে দেখে নিলাম স্যার। দেখলাম, ইয়া গাঁট্টাগোঁট্টা ঘাড়ে—গর্দানে—

কি দেখলে? কল্যাণ যেন দম বন্ধ করে প্রশ্ন করলে।

দেখলাম, ইয়া গাট্টাগোট্টা ঘাড়ে—গর্দানে চেহারা। মাথায় কদম—ছাঁট চুল, তামাটে মুখে কোঁকড়ানো দাড়ি, দাড়ি, লালচে চোখ দুটো চকচক করছে। মাল খেয়ে চুর!. . . কি ভাবছেন স্যার?

উঁ! না, কিছু না।—কল্যাণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল; সজাগ হয়ে বলল, বাঃ, মগজে তোমার বেশ খানিকটা বুদ্ধি আছে দেখছি। ওয়েল—ডান মাই বয়!

পল্টুর পিঠ চাপড়ে দিলে কল্যাণ। তারপর বললে, এবার কিন্তু আরো শক্ত কাজের ভার দিচ্ছি পল্টু। এরপর যখন ওই লোকটা ক্যামাক স্ট্রিটের ফ্ল্যাট থেকে বেরোবে, তুমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে ওর গাড়ির পিছু নেবে। ওর আস্তানাটা কোথায়, জেনে আসা চাই। পারবে না?

কেন পারব না স্যার?— পল্টুর চোখে—উৎসাহ।

ঠিক আছে।—পার্স থেকে খানকয়েক নোট বার করে কল্যাণ বললে, তোমার পাওনা।

দশ টাকার একখানা মাত্র নোট তুলে নিয়ে পল্টু বললে, অত টাকা নিয়ে কি করব? নেশা—ভাঙ আমি ছেড়ে দিয়েছি, শুধু মীনাকে নিয়ে মাঝে মাঝে কফি খেতে যাই। দশ টাকাই যথেষ্ট! চলি স্যার।

পকেট থেকে একটা গোঁফ বার বরে আবার সে নিজের নাকের নিচে আটকে দিলে। চোখে দিলে কালো চশমা। একগোছা চুল কপালের ওপর ফেলে, হেডকোয়ার্টার্স থেকে বেরিয়ে গেল পল্টু। ভোল পাল্টাবার কথাটা সে ভোলেনি।

নিজের ভাবনায় ডুবে গেল কল্যাণ। কাল রাতে মহুয়া নাগের মুখ থেকে মনসিজ যা শুনে এসেছে, তা থেকে একটা রহস্য পরিষ্কার হল। ব্লু—ডায়মন্ড বার থেকে সেই জার্মান—ছাঁট চুল, ঘাড়ে—গর্দানে লোকটাই মগনলালকে অনুসরণ করে, তারপর অলক মজুমদারের স্টুডিওর সামনে মওকা পেয়ে পেছন থেকে গুলি চালায়। তার রিভলভারে সাইলেন্সার লাগানো ছিল নিশ্চয়, নইলে মহুয়া গুলির আওয়াজ শুনতে পেত।

কিন্তু মানুষ নামে ওই জানোয়ারটা স্বরূপার বন্ধু! এত নিচে নেমে গেছে স্বরূপা! পুরুলিয়ার সেই শ্যামলা রঙের হাসি—খুশি বনহরিণী, তার প্রথম যৌবনকালের সহচরী। জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত! নিদারুণ ঘৃণায় কল্যাণের মনটা কুঁকড়ে গেল। কিন্তু একটু পরেই সে অনুভব করলে, ঘৃণার সঙ্গে সঙ্গে একটা তীব্র ব্যথায় মনটা টনটন করছে।

টেলিফোনটা বেজে উঠল। হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে নিলে কল্যাণ।

হ্যালো! কল্যাণ বোস হিয়ার!

বেঙ্গল ব্যাঙ্ক থেকে বলছি। আপনি কি নিজের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে এইমাত্র পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন?

সেকি! কল্যাণ স্তম্ভিত হয়ে বললে, না তো!

একটু আগে একটি লোক এসেছে আপনার নামে ওই টাকাটা জমা দিতে।

তাই নাকি!

ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হচ্ছে। আপনি কাইন্ডলি একবার আসবেন?

নিশ্চয়ই. . . এখুনি যাচ্ছি।

জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কল্যাণ। এমন দাতাকর্ণ কে আছে যে নগদ পাঁচ পাঁচ হাজার টাকা অযাচিতভাবে তার তহবিলে জমা দিতে চায়? তাজ্জব ব্যাপার! শুধু তাজ্জব নয়, দুরূহ অঙ্কের মতোই জটিল!

ব্যাঙ্ক—ম্যানেজারের ঘরে ঢুকতেই তিনি বলে উঠলেন, ব্যাপার কি বোস সাহেব? এমন লোককে টাকা জমা দিতে পাঠিয়েছেন, যে আপনার অ্যাকাউন্ট—নাম্বারই জানে না!

ঘটনাটা কি বলুন তো?—কল্যাণ প্রশ্ন করলে।

কিছুক্ষণ আগে আধাবয়সী একটি লোক এসে আপনার নামে পাঁচ হাজার টাকা জমা দেবার জন্যে জমার ফর্ম লিখে দেয়। ফর্মটা দেখে ডিপোজিট—কাউন্টারের অফিসার বলে, অ্যাকাউন্ট—নাম্বার ভুল লেখা হয়েছে, ঠিক করে লিখে দিন। লোকটা থতমত খেয়ে বলে, ঠিক মনে পড়ছে না, বলুন তো নাম্বারটা। অফিসারের কেমন সন্দেহ হয়, লোকটাকে আটকে রেখে সে এসে আমাকে রিপোর্ট করে। শুনেই আমি আপনাকে টেলিফোন করি।

কয়েক সেকেন্ড গুম হয়ে থেকে কল্যাণ বললে, লোকটা কোথায়?

ব্যাঙ্ক—ম্যানেজার বললেন, ডেকে পাঠাচ্ছি।

খানিক বাদে অফিসারের সঙ্গে যে ব্যক্তিটি ম্যানেজারের ঘরে ঢুকল, তার দিকে তাকিয়ে কল্যাণের চোখের পাতা পড়ল না।

লোকটি আর কেউ নয়, রতিকান্ত পাল!

তার দিকে তাকিয়ে কল্যাণ ভাববার চেষ্টা করলে, তার তহবিলে পাঁচ হাজার টাকা দান করে দাতাকর্ণ সাজতে রতিকান্তের হঠাৎ এত আগ্রহ কেন? কারণটা কি? ভাবতে ভাবতে দুরূহ জটিল অঙ্কটা এক নিমেষে সরল হয়ে গেল।

ম্যানেজার আর ডিপোজিট—কাউন্টারের অফিসারকে কল্যাণ বললে, অশেষ ধন্যবাদ আপনাদের। ইনি গুণী ব্যক্তি—জালিয়াতি মামলার আসামি। জামিনে ছাড়া আছে। একে হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে যাচ্ছি।

বাহাত্তর ইঞ্চি পাইপের মতো ঢোলা প্যান্ট আর ঝলমলে কোট গায়ে রতিকান্ত ভক্ত হনুমানের মতো হাতজোড় করে বসে আছে। নড়েও না, চড়েও না।

ইন্সপেক্টর কল্যাণ বোস তার সামনে এগিয়ে এসে বললে, কি হে, বোবা হয়ে গেলে নাকি? সিধে সত্যি কথা বলো, কী মতলবে আমার নামে টাকা জমা দিতে গিয়েছিলে?

মরা ইলিশের মতো গোল গোল চোখ মেলে তাকিয়ে রইল রতিকান্ত।

কল্যাণ এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, মুখে কথা নেই কেন? দাওয়াই দিতে হবে, না সোজাসুজি বলবে?

এবার নড়ে উঠল ভক্ত হনুমান। করজোড়েই বললে, একজন আমায় জমা দিতে বলেছেলো, তাই গিসলুম আজ্ঞে। কেন, তা জানিনে—রামকেষ্টর দিব্যি!

আমি কিন্তু জানি রতিকান্ত। বলব?—কল্যাণ বললে, তুমি লাখ টাকা জালিয়াতি কেসের আসামি। আমার অ্যাকাউন্টে তুমি পাঁচ হাজার টাকা দিলে, সেটাকে অনায়াসেই ঘুষ বলে প্রমাণ করা যাবে। তাহলেই আমার চাকরি খতম, আর তোমার পোয়াবারো! তাই না?

মরা ইলিশ—চোখে চেয়ে রতিকান্ত বললে, তাই হবে আজ্ঞে।

নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে কল্যাণ বললে, এখন বলো তো, এই প্ল্যানটি কার? কে তোমাকে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছিল?

বলব আজ্ঞে? বললে আমাকে ছেড়ে দেবেন তো? দু'হাত কচলে রতিকান্ত প্রশ্ন করলে।

কল্যাণ খানিকটা আশ্বাস দিয়ে বললে, বেশ, সত্যি কথা যদি বলো, তাহলে ভেবে দেখব।

তবে শুনুন আজ্ঞে। রতিকান্ত শুরু করলে : আমাকে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছেলো মৃগাঙ্ক মজুমদার। কাল রাতে আমার বাসায় এসে চুপি চুপি ডাকলে। পাঁচ হাজার টাকার নোটের তাড়া দিয়ে বললে, টাকাটা গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর কল্যাণ বোসের নামে জমা দিয়ে এসো গে। এতে তোমার মামলার ভাল হবে।

সে ভাল হবে বলল, আর অমনি তাই বিশ্বাস করে তুমি জমা দিতে গেলে! তুমি কি কচি খোকা?

রতিকান্ত আমতা আমতা করে বললে, আমার মনে একদম কুটিলতা নেই আজ্ঞে—ভারি সরল কিনা, তাই—

চোপ!—ধমক দিয়ে কল্যাণ বললে, কত টাকা খেয়েছ মৃগাঙ্ক মজুমদারের কাছ থেকে?

নাক—কান ছুঁয়ে রতিকান্ত বললে, মিছে কথা বলব না আজ্ঞে, হাজার টাকা খেয়েছি।

হুঁ! তোমার জামিনের দশ হাজার টাকা কে দিয়েছে?

ওই মজুমদারই দিয়েছে আজ্ঞে। দেবে না? সে—ই তো লালা ভগৎরামের সই জাল—করা চেক দিয়ে আমাকে গয়নার দোকানে পাঠিয়েছেলো। তখন অত—শত বুঝিনি আজ্ঞে। মনে আমার একদম কুটিলতা নেই কিনা—

থামো! কল্যাণ বললে, বেশ তো চানাচুরের প্যাকেট বেচছিলে, জাল—জোচ্চচুরির রাস্তা ধরলে কেন? মরবার পাখা গজিয়েছে বুঝি?

রতিকান্ত এবার কাঁদো—কাঁদো হয়ে বললে, চানাচুর বেচে কি এ বাজারে সংসার চলে আজ্ঞে? ঘরে সাত—সাতটা নেড়ি—গেঁড়ি কিলবিল করছে! তার ওপর গেল মাসে মাগি আবার একটা ভূতের ছ্যানা বিইয়েচে!

ফের বাজে বকছ!—আবার ধমকালে কল্যাণ। বললে, মৃগাঙ্কই যদি তোমাকে গয়না দোকানে পাঠিয়ে থাকে, সেকথা পুলিশকে বা আদালতে জানাওনি কেন?

বাপরে, তা কি পারি? বেইমানি করলে তার ফল ভুগতে হবে না?

কিন্তু তোমার মামলার ফলটা কি হবে ভেবে দেখেছ?

ভালই হবে আজ্ঞে! মজুমদার বলেছে, যত টাকা লাগে লাগুক, আমাকে খালাস করিয়ে আনবেই। জড়োয়ার গয়নাগুলো তার হাতে শুধু শুধু দিয়েছি নাকি?

কল্যাণ বুঝতে পারলে, মূর্খ রতিকান্ত মূর্খের স্বর্গেই বাস করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মৃগাঙ্ক মজুমদার লোকটা রীতিমতো ধুরন্ধর। চেহারাটা যত সম্ভ্রান্ত হোক না কেন, সমাজের চোরাগলি—পথেই তার চলাফেরা। অতএব—

কল্যাণ ডাকলে, সার্জেন্ট দত্ত!

ইয়েস স্যার!—মনসিজ এসে দাঁড়াল।

রতিকান্তর কান বাঁচিয়ে কল্যাণ কি যেন বললে মনসিজকে।

'রাইট স্যার' বলে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেল সার্জেন্ট দত্ত।

রতিকান্ত একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে দেখলে। তারপর হাত কচলে বললে, যদি অনুমতি করেন তো আসি আজ্ঞে—এখনো আমার পুজো—অহ্নিক হয়নি কিনা—

তুমিও পুজো—আহ্নিক করো নাকি? ভুরু কুঁচকে কল্যাণ জিজ্ঞেস করলে।

রতিকান্ত বললে, শত হলেও হিঁদুর ছেলে. . . করি বইকি আজ্ঞে।

ঠাকুর—দেবতার খুবই দুর্ভাগ্য দেখছি!—বসো, এত সহজে তোমায় ছাড়া হবে না।

আধঘণ্টার মধ্যেই সার্জেন্ট দত্ত ফিরে এল। সঙ্গে মৃগাঙ্ক মজুমদার। দীর্ঘ দেহে সেই গলাবন্ধ প্রিন্সকোট, হাতে রুপো—বাঁধানো মলাক্কা বেতের লাঠি। ঘরে ঢুকেই মৃগাঙ্ক বললে, কি ব্যাপার মিস্টার বোস? হঠাৎ তলব করেছেন যে!

রতিকান্তকে দেখিয়ে কল্যাণ বললে, দেখুন তো, এই লোকটিকে আপনি চেনেন কিনা—

মৃগাঙ্ক একটু অবাক হয়ে বললে, জীবনে দেখিনি।

কল্যাণের মুখ আরো গম্ভীর হয়ে উঠল। রুক্ষ গলায় বললে, মিথ্যে বলে লাভ নেই। স্বীকার করুন একে আপনি ভাল করেই চেনেন।

মৃগাঙ্কর ফর্সা মুখলাল হয়ে উঠল। তিক্ত—বিরক্ত গলায় বললে, এ আপনি কী বলছেন! যাকে জীবনে দেখিইনি, তাকে চিনব কেমন করে?

কিন্তু এ লোকটি আপনাকে চেনে—ভাল করেই চেনে। কি রতিকান্ত, তুমি এঁকে নিশ্চয় চেনো?

রতিকান্ত এতক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়েছিল মৃগাঙ্কর দিকে। ঘাড় নেড়ে বললে, না আজ্ঞে, ওনাকে তো চিনি নে!

চালাকি কোরো না রতিকান্ত! সত্যি কথা বল।

রামকেষ্টর দিব্যি—আমিও ওনাকে জীবনে দেখি না আজ্ঞে!

রতিকান্তের মুখের দিকে তাকিয়ে কল্যাণের অভিজ্ঞ গোয়েন্দা—চোখ বুঝতে পারল, সে বোধ করি মিথ্যে বলছে না। কল্যাণ এবার নিজেই ধাঁধায় পড়ে গেল। মৃগাঙ্কর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললে, তুমি কি বলতে চাও, এ লোক মৃগাঙ্ক মজুমদার নয়?

রতিকান্ত বললে, কী মুশকিল! ইনি মৃগাঙ্ক মজুমদার হবেন কেন? সে তো অন্য লোক।

মৃগাঙ্ক এবার রীতিমতো চটে উঠল : ননসেন্স! মৃগাঙ্ক মজুমদার আমি নই তো কে? সবটাই দেখছি হেঁয়ালি!

কল্যাণ কিছুটা নরম গলায় তাঁকে বললে, এ একটা অদ্ভুত কেস! যাকগে, আপনাকে কষ্ট দিলাম—কিছু মনে করবেন না। আপনি এখন যেতে পারেন।

মালাক্কা বেতের লাঠির আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেলেন মৃগাঙ্ক।

কল্যাণ এবার চেয়ারে বসে পড়ে একটা সিগারেট ধরালে। চুপচাপ গোটা দুই—তিন টান দিয়ে প্রশ্ন করলে, আচ্ছা রতিকান্ত, তোমার চেনা মৃগাঙ্ক মজুমদার দেখতে কেমন? যিনি এসেছিলেন, কতকটা তাঁর মতো কি?

রতিকান্ত বললে, না আজ্ঞে, দেখতে ঠিক উল্টো। অত ঢ্যাঙাও নয়, অত বয়সও নয়। পালোয়ানের মতো ষণ্ডা চেহারা, ঘাড় আর পিঠ যেন এক, মাথার চুলগুলো মুড়িয়ে কাটা, মুখে কোঁকড়ানো দাড়ি—

সে আরো কি সব বলে গেল, কল্যাণের কানে তার একটা কথাও ঢুকল না। তার হাতের সিগারেট হাতেই পুড়তে লাগল।

আশ্চর্য—আশ্চর্য—ভয়ানক আশ্চর্য! রতিকান্তের ব্যাপারেও সেই জার্মান—ছাঁট মাথা, ঘাড়ে—গর্দানে ষণ্ডা চেহারা! দুনিয়ার সমস্ত অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে কি ওই লোকটিই বসে আছে! অথচ ধরাছোঁয়ার বাইরে!

যদি অনুমতি করেন আজ্ঞে, তো এখন আমি—

রতিকান্ত হাত কচলে অনুনয় করলে।

কল্যাণ বললে, হ্যাঁ, এসো। কিন্তু খবরদার, আমার বিরুদ্ধে আর লাগতে যেও না—তাহলে কড়া দাওয়াই দেব।

'যে আজ্ঞে' বলে রতিকান্ত ভিজে বেড়ালের মতো গুটি গুটি বেরিয়ে গেল।

* * *

গোয়েন্দা—দপ্তরের ছোটকর্তা সুরজিৎ গুপ্ত বললেন, ক্রিমিন্যালের চেহারার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, সেই বর্ণনা জানিয়ে ইন্ডিয়ার সমস্ত বড় বড় শহরের পুলিশের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। বলেছিলাম, তাদের কাছে দাগি ক্রিমিন্যালদের যে ফোটো—অ্যালবাম আছে, তার মধ্যে এরকম চেহারার কেউ থাকলে, সেই ফোটোর একটা কপি যেন আমাকে ইমিডিয়েটলি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কাল দিল্লির পুলিশ এই ফোটোখানা পাঠিয়েছে।

ড্রয়ার থেকে একখানা ফোটো বার করে সুরজিৎ গুপ্ত ইন্সপেক্টর বোসের সামনে রাখলেন। কল্যাণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ছবিখানা। আন্দাজ বছর তিরিশ বয়সের একটি যুবা। মুখের গড়ন চৌকো, চোখ ছোট, কিন্তু তীক্ষ্ন জ্বলজ্বলে। মজবুত কাঁধ দুটো ফোলা ফোলা, গলাটা খাটো। কুস্তিগীরের মতো মাথার চারপাশ থেকে ক্লিপ চালিয়ে চুলগুলো একেবারে ছোট করে ছাঁটা, কেবল মাথার সামনে একগোছা চুল একটু বড়। দাড়ি—গোঁফ কামানো পরিষ্কার মুখ।

ফোটোখানা ষাট সাল অর্থাৎ পনেরো বছর আগের। ফোটোর সঙ্গে ক্রিমিন্যালের পরিচয়পত্র আঁটা। কল্যাণ পড়তে লাগল :

নাম আবু রশিদ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল ছাত্র। দিল্লির টপ সার্কেলে মেলামেশা করত। কিন্তু জাল—জোচ্চচুরির দায়ে বার দুয়েক ধরা পড়ে। তারপর এক বিবাহিতা মহিলাকে খুন করে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়।

পাইপ ধরিয়ে সুরিজৎ গুপ্ত জিজ্ঞেস করলেন, দেখে কি মনে হচ্ছে? আমাদের ক্রিমিন্যালের সঙ্গে কোনো মিল আছে?

কল্যাণ বললে, কিছু কিছু মিল আছ বইকি স্যার। কিন্তু যে ভাল করে চেনে—সামনাসামনি দেখেছে, ফোটোখানা তাকে দেখানো দরকার। রতিকান্তকে একবার ডেকে পাঠাতে হবে।

তাকে হাজারবার ডাকলেও সে আর আসবে না স্যার।

ছোট কর্তার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সার্জেন্ট দত্ত বললে।

কেন বল তো?

কাল রাতে রতিকান্ত পাল মারা গেছে।

মারা গেছে!—কল্যাণ যেন একটা ধাক্কা খেল। বললে, কি করে মারা গেল?

মনসিজ বললে, কাল রাত সওয়া এগারোটা নাগাদ রতিকান্ত ওয়েলেসলি স্ট্রিট ধরে হাঁটছিল। বোধ হয় ব্লু ডায়মন্ড বার থেকে ফিরছিল। ইলিয়ট রোডের কাছ বরাবর হঠাৎ একখানা কালো অ্যাম্বাসাডর পেছন থেকে তার দেহটাকে দলা পাকিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। রতিকান্ত স্পট ডেড!

কয়েক সেকেন্ড গুম হয়ে থেকে কল্যাণ বললে, জাল মৃগাঙ্ক মজুমদার তাহলে রতিকান্তর ওপর শোধ নিল!

সুরজিৎ গুপ্ত বললেন, ফোটোখানা আর কেউ দেখলে চিনতে পারবে কি?

এখানা আমার কাছেই থাক স্যার। দেখি, কি করা যায়। বলে কল্যাণ নিজের কামরায় চলে এল। দেখলে, পল্টু বসে আছে তারই অপেক্ষায়। কল্যাণ কি যেন ভেবে আবু রশিদের ফোটোখানা পল্টুর সামনে মেলে ধরলে। বললে, দেখো তো একে কখনো দেখেছ কিনা।

মনোযোগ দিয়ে দেখে পল্টু বললে, না স্যার, দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না।

কোথাও দেখোনি?

উঁহু। লোকটা কে স্যার?

সেকথার জবাব না দিয়ে কল্যাণ নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল। অন্যমনস্কের মতো কলমটা তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলে, তারপর পল্টু, কিছু খবর আছে?

আছে স্যার।

বলো।—কল্যাণ আনমনে কলম দিয়ে আঁকিবুকি কাটতে লাগল।

পল্টু শুরু করলে : পরশু রাতে ক্যামাক স্ট্রিটের সেই বাড়ি থেকে সেই দাড়িওয়ালা ঘাড়ে—গর্দানে লোকটা বেরিয়ে এল। তার সঙ্গে নেমে এল সাদা সিল্কের শাড়ি—পরা একটি মহিলা। রাত তখন সাড়ে বারোটা। আমি গা—ঢাকা দিয়ে দেখতে লাগলাম। দু'জনে কি সব কথা হল, ঠিক শুনতে পেলাম না। মহিলার একটা কথাই কানে এল : আজ থাক, কাল যাব 'খন। লোকটা তার মোটরে উঠে স্টার্ট দিলে। আমার এক দোস্তের অস্টিনখানা আগেই চেয়ে এনেছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে আমিও স্টার্ট দিয়ে কালো অ্যাম্বাসাডরের পিছু নিলাম।

আনমনে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে কল্যাণ বললে, তুমি ড্রাইভিং জানো নাকি?

আরে বা, পাঁচ বছরের পুরানো লাইসেন্স আমার!

ও। তারপর বলো।

ফলো তো করলাম, কিন্তু স্যার ব্যাড লাক! ক্যামাক স্ট্রিট থেকে দিব্যি পিছু পিছু যাচ্ছিলাম, টালিগঞ্জের রাস্তা ধরে অ্যাম্বাসাডর বাঁয়ে আনোয়ার শা রোডে বেঁকল। আমার অস্টিনও বেঁকল। দুটো গাড়ির মধ্যে ধরুন একশো—সওয়াশো গজের তফাত। হঠাৎ এক কারখানার গেট খুলে মাল—বোঝাই এক শালা লরি সরু রাস্তার ওপর হুস করে বেরিয়ে এল। আর, বেরিয়েই স্টার্ট বন্ধ! আমার অস্টিন রাম—আটকান আটকে গেল! আমি তো চটে খিস্তি জুড়ে দিলাম। 'মার হ্যান্ডেল' 'মার হ্যান্ডেল' করে শালা আবার যখন স্টার্ট নিলে, কালো অ্যাম্বাসাডর তখন নিপাত্তা! মন—মরা হয়ে ফিরে এলাম স্যার।

মুখ না তুলে কল্যাণ বললে, যাক, আবার চেষ্টা করো।

পল্টু বললে, আর চেষ্টা বোধ হয় করতে হবে না স্যার। কাল রাতে আর একটা কাজ করেছি।

কাজটা কি?

কালও ক্যামাক স্ট্রিটে গিয়ে নজর রেখেছিলাম। রাত তখন সাড়ে ন'টা। লোকটা তখনো আসেনি। দেখলাম, সেই সাদা সিল্কের শাড়ি—পরা মহিলাটি বেরিয়ে এসে একটা নীল রঙের হেরাল্ড গাড়িতে উঠল। ড্রাইভার স্টার্ট দিলে। লোকটাকে আবার ফলো করব বলে কালও আমি অস্টিনখানা এনেছিলাম। ভাবলাম, দেখাই যাক না মহিলা কোথায় যায়? চললাম তার পিছু পিছু। খানিক দূর যেতেই স্যার বুঝতে পারলাম, সেই একই রাস্তায় সে চলেছে। সেই আনোয়ার শা রোডেই তার গাড়ি বেঁকল। মা কালীর দয়ায় কাল আর কোনো বাধা পড়েনি স্যার। আনোয়ার শা রোড থেকে যাবদপুর—গড়িয়া—গড়িয়া ছাড়িয়ে আরও আধ মাইলটাক গিয়ে একটা জংলা জমি। সেখানে বড় বড় গাছপালার অন্ধকারে একটা পুরনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি। হেরাল্ড গাড়িখানা তার সামনে গিয়ে থামল। মহিলা ভেতরে ঢুকে যাবার পর আমার গাড়ি তফাতে রেখে, পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে কি দেখলাম জানেন স্যার?

কি দেখলে?

দেখলাম, বাড়িটার সামনে আরেকটা মোটর দাঁড়িয়ে আছে। সেই কালো অ্যাম্বাসাডার—

কালো অ্যাম্বাসাডার!

কল্যাণ এবার স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো মুখ তুলে চাইল।

পল্টু বললে, হ্যাঁ স্যার। কিন্তু এ গাড়ির নাম্বারের সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের সেই গাড়ির নাম্বারের মিল নেই। কোনটা আসল নাম্বার, কোনটা ফলস, কে জানে!

কল্যাণ বললে, দুটো নাম্বারই ফলস হতে পারে। যাক, জায়গাটা আর বাড়িটা ভাল করে চিনে এসেছ তো?

সে আর ভুল হবে না স্যার।—পল্টু বললে।

ভেরি ওয়েল! ভারি কাজের ছেলে তুমি!—বলতে বলতে কল্যাণ চেয়ার ছেড়ে পল্টুর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ফোটোখানা তার সামনে ধরে বললে, এবার দেখো তো পল্টু, এ মুখ তোমার দেখা কিনা।

এক নজর দেখেই লাফিয়ে উঠল পল্টু : আই বাপ! এই তো সেই ক্যামাক স্ট্রিটের মাল! সেই মুখ! কোঁকড়ানো দাড়িটা খাসা এঁকেছেন স্যার! এবার তাহলে—

জাল গুটোতে হবে।—ধীরে ধীরে কল্যাণ উচ্চচারণ করলে।

কিন্তু জাল গুটোবার আগে কল্যাণ নিজেই জালে পড়ে গেল।

স্বামী যার গোয়েন্দা, সেই স্ত্রীর কপালে গাঢ় ঘুম নেই। কেননা, স্বামী রাতে কখন ঘরে ফিরবে, তার কিছু ঠিকঠিকানা থাকে না। তাই ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও তাকে সজাগ থাকতে হয়।

বীথিরও সেই অভ্যাস।

হেমন্তের মাঝ—রাত। ধোঁয়াশার মশারি ফেলে শহর ঘুমিয়ে আছে। ঘরে ঘরে তুলে রাখা লেপ কম্পল বেরিয়েছে। বীথির পাতলা ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। কি যেন একটা শব্দ হল কোথায়! ঘুমের মধ্যে কল্যাণ কি পাশ ফিরল? না, সে—শব্দ নয়, মোটর—ইঞ্জিনের মতো মৃদু ঝিকঝিক আওয়াজ। তাদেরই বাড়ির সামনে এসে থেমে গেল। এত রাতে কেউ এল নাকি?

বিছানায় উঠে বসল বীথি। তারপর কম্বলের তলা থকে মশারি তুলে অন্ধকারে নেমে পড়ল খাট থেকে। কল্যাণের দোতলার ফ্ল্যাট একেবারে রাস্তার ধারে। বীথি জানলার কাছে এগিয়ে বাইরে উঁকি দিল। ছানি—পড়া চোখের মতো রাস্তার একটা বাতি মিটমিট করে জ্বলছে। ধোঁয়াশার অস্পষ্টতা সত্ত্বেও সেই মিটমিটে আলোয় বীথি দেখতে পেল, একখানা কালো রঙের মোটর ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। মোটর থেকে নামল জোয়ান চেহারার এক ছায়ামূর্তি। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে সদর দরজার কাছে কি যেন দেখলে, তারপর আবার ফিরে গেল মোটরের কাছে।

ব্যাপারটা কি? লোকটা কেন এসেছে? বীথির কৌতূহলী চোখ একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল।

মোটরের ক্যারিয়ার খুলে একটা জিনিস বার করলে লোকটা। সেটাকে বয়ে আনলে সদর দরজার কাছে। বীথি এবার বুঝতে পারলে, সেটা একটা ধাতব সিলিন্ডার, ফুট তিনেক লম্বা, গায়ে নল জড়ানো। অচেনা লোকটা সিলিন্ডারের গা থেকে নল খুলে নিয়ে, তার একটা মুখ সদর দরজার কাটা অংশের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। কাটা অংশটা বাইরে থেকে চিঠিপত্র ভেতরে ফেলবার জন্য। একটু পরেই অতি মৃদু হিস—স—স শব্দ শোনা যেতে লাগল।

এবার বীথির কৌতূহলের সঙ্গে সন্দেহ আর আশঙ্কা মিশল। ভাবলে, কল্যাণকে একবার ডাকবে। কিন্তু মশারির কাছে এসে কল্যাণের গাঢ় নিশ্বাসের আওয়াজে তার মায়া হল। না থাক, সারাদিন খেটেখুটে অনেক রাত করে ফিরেছে বেচারি! কাজ নেই তার ঘুম ভাঙিয়ে। কিন্তু ব্যাপারটা কি হচ্ছে দেখা দরকার।

ন'বছর গোয়েন্দা—স্বামীর ঘর করে বীথির ভিতু স্বভাব অনেকখানি কেটে গেছে। শোবার ঘরের দরজা খুলে সে বেরিয়ে এল সিঁড়ির সামনে। আর, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল বীথি।

অন্ধকার সিঁড়িময় একটা বিশ্রী কটু গন্ধ! পেট্রোল—গ্যাসের গন্ধ!

একটা ভয়ঙ্কর আশঙ্কায় বীথির বুকের ভেতরটা শুকিয়ে উঠল। সিঁড়ির ঠিক সামনেই তার ফ্ল্যাটের দরজা। যদি একটা দেশলায়ের কাঠি—

হলও তাই। ছোট্ট একটা আগুনের শিখা সদর দরজার কাটা অংশের মধ্য দিয়ে ভেতরে এসে পড়তেই, একটা হিংস্র আগুনের ঢেউ নিচে থেকে ছুটে এল দোতলার সিঁড়ি বেয়ে।

চোখের পলকে বীথি ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলে। তারপর ঘরের বাতি জ্বেলে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, ওগো, ওঠো—ওঠো, শিগগির ওঠো!

ধড়মড় করে উঠে বসল কল্যাণ। বললে, কি? কি হয়েছে?

বাড়িতে আগুন লেগেছে!

আগুন! কেমন করে লাগল?

ভয়ে আর উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বীথি শুধু টুকরো টুকরো কয়েকটা কথা বলতে পারলে, একটা কালো রঙের মোটর—অন্ধকারে কে একটা লোক—সদর দরজায় চিঠি ফেলার ফাঁক দিয়ে পেট্রোল—গ্যাস—

বেশি বলার দরকার ছিল না, শোনারও দরকার ছিল না। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যেন পাথর হয়ে গেল কল্যাণ!

বীথি হঠাৎ আতঙ্কে কেঁদে উঠল, ওগো, ওই দেখো!

দেখা গেল, শোবার ঘরের দরজার নিচে এক ইঞ্চি ফাঁক। তারই ভেতর দিয়ে জ্বলন্ত পেট্রোল—গ্যাস হু হু করে ঘরে ঢুকে পড়েছে। দরজার পর্দাটা জ্বলছে, প্লাই—উডের পাল্লাতেও আগুন ধরেছে! সদ্য ঘুম—ভাঙা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কল্যাণ। কিন্তু সে দু'চার সেকেন্ডের জন্যে। তারপরেই সারা দেহে একটা ঝাঁকানি দিয়ে, বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল। রুদ্ধশ্বাসে বীথিকে বললে, বাবুয়াকে নিয়ে ওপাশের বারান্দায় চলে যাও—

বনে আগুন লাগলে পাখি—মা যেমন তার বাচ্চচাদের ডানায় ঢেকে নেয়, তেমনি করে বীথি তার ঘুমন্ত ছেলেকে বুকে তুলে আঁচলে ঢেকে নিলে। তারপর ওপাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল বারান্দায়।

কল্যাণ বাথরুমে ঢুকে কলের তলায় বালতি রেখে, কল খুলে দিলে। কিন্তু বড় আশায় ছাই পড়ল কল্যাণের। কল থেকে জল বেরোল সুতোর মতো সরু হয়ে। তার মানে, রিজার্ভার ট্যাঙ্কে জল নেই বললেই চলে! অস্থির হয়ে কল্যাণ ফিরে এল শোবার ঘরে। ততক্ষণে ঘরের দরজা দাউ দাউ করে জ্বলছে। আগুনের ঢেউ এগিয়ে এসে বিছানার গদি ছুঁয়েছে—মশারি পুড়ছে! হেমন্তের ঠান্ডা রাতেও অসহ্য উত্তাপ ঘরময়। ইস, একটা ফোন যদি সে করতে পারত ফায়ারব্রিগেড স্টেশনে! পাশের ঘরে টেলিফোন, অথচ উপায় নেই—লকলকে আগুন যমদূতের মতো দরজা আগলে রয়েছে!

বাঁচানো গেল না—আর বাঁচানো গেল না অনেক সুখ, অনেক স্বপ্ন দিয়ে গড়া এই ছোট্ট বাসাটিকে! অসহায় চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, এক পা এক পা করে কল্যাণ চলে গেল ওপাশের খোলা বারান্দায়। যেখানে অন্ধকার আকাশের তলায় ছেলেকে বুকে নিয়ে বীথি ফুঁপিয়ে উঠছে।

দমকল এল শেষ—রাতে। অন্য ফ্ল্যাটের কে একজন বাসিন্দা ফোন করেছিলেন। আগুন নিভিয়ে তারা যখন চলে গেল, পুবের আকাশ তখন ফর্সা হচ্ছে।

ছেলেকে নিয়ে বীথি ঘরের মাঝে এসে দাঁড়াল। থই থই জলের মধ্যে কালো কালো কতগুলো পোড়া স্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে। এই তার নিজের হাতে সাজানো সুখের সংসার! কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

আর, পূর্বাকাশের পানে চেয়ে কল্যাণ অজানা শত্রুর উদ্দেশে মনে মনে বললে, ঠিক আছে বন্ধু! তুমি যতই চতুর হও না কেন, তোমার এই অমানুষিক শত্রুতার শোধ কল্যাণ বোস নেবেই!

* * *

ছোটকর্তা সুরজিৎ গুপ্ত কিছুদিনের ছুটি দিতে চেয়েছিলেন, কল্যাণ বলে পাঠাল, না।

পরদিনই তাকে হেডকোয়ার্টার্সে দেখা গেল। সুরজিৎ তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমার এই মারাত্মক বিপদের খবর আমাকে ভীষণ আপসেট করেছিল বোস। মগনলালের পরে একমাত্র তোমারই ওপর আমার বেশি ভরসা, জানো তো? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ঠিক সময়ে তোমার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল!

মনসিজ জিজ্ঞেস করলে কল্যাণকে, আপনার কি মনে হয়, মগনলালকে যে খুন করেছে, সেই লোকই আপনাকে খতম করার প্ল্যান করেছিল?

মোটিভ যখন এক, তখন তাই মনে হয় না কি?—কল্যাণ বললে।

কিন্তু লোকটা কে হতে পারে? আবু রশিদ, না অশ্বিনী লাহা?

এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় এখনো হয়নি।

গুপ্তসাহেব বললে, লোকটা যেই হোক, সে অসাধারণ বুদ্ধি ধরে। এ ধরনের ক্রাইম ভারতবর্ষে আর কখনও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যেমন করেই হোক, তাকে ধরতেই হবে বোস। আর কি সাহায্য তোমার চাই বলো।

শান্তভাবে কল্যাণ বললে, আর কোনও সাহায্য চাই না স্যার, আর একটু সময় চাই।

পাইপে তামাক ঠাসতে ঠাসতে গুপ্তসাহেব বললেন, বেশ, সময় নাও। হ্যাঁ, গতকাল একজন মহিলা টেলিফোনে দু'তিনবার তোমাকে খুঁজেছিলেন। নামটা বললেন স্বরূপা ঘোষ।

ও!

তুমি অফিসে এলে তাঁকে ফোন করতে বলেছেন। বিশেষ জরুরি কথা আছে।

আচ্ছা।

ছোটকর্তার কামরা থেকে বেরিয়ে কল্যাণ ভাবতে ভাবতে চলল নিজের কামরায়। স্বরূপা তাকে ফোনে খুঁজেছিল! একবার নয়, বারবার। পুরুলিয়ার রূপা নয়, ক্যামাক স্ট্রিটের স্বরূপা—একটা বিজাতীয় ক্রিমিন্যালের রক্ষিতা! সেই ঘৃণাটা নতুন করে আবার পাক দিয়ে উঠল মনের মধ্যে। বলেছে, বিশেষ জরুরি কথা নাকি আছে! কোন কথা? পুরুলিয়ার সেই পুরানো কাসুন্দি? না, ক্যামাক স্ট্রিটের হুইস্কি—ভেজানো ন্যাকা ন্যাকা প্রেম? জাহান্নমে যাক স্বরূপা ঘোষ!

তবু কল্যাণের ডিটেকটিভ—বুদ্ধি বললে, স্বরূপাও তো পুলিশের সন্দেহভাজন একজন সাসপেক্ট—দেখাই যাক না টোকা দিয়ে। তার একরাশ মিথ্যের মাঝে যদি একটাও সত্য কুড়িয়ে পাওয়া যায়, তা মন্দ কি?

কিন্তু কল্যাণকে ফোন করতে হল না, তার আগেই ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে বললে, ডি. ডি. হেডকোয়ার্টার্স!. . . ইয়েস, স্পিকিং!

অপর দিক থেকে শোনা গেল : কল্যাণ, আমি স্বরূপা।

কি খবর?—কল্যাণের গলার স্বর ঠান্ডা।

কেমন একটা অস্বাভাবিক ব্যাকুলতা নিয়ে স্বরূপা বললে, কাগজে তোমার ঘরে আগুন লাগার খবর পড়ে আমি স্থির থাকতে পারলাম না! জানো, কে তোমাকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল?

কে?

তুমি যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ, সেই অশ্বিনী লাহা।

অশ্বিনী লাহা! কল্যাণের কপালে গভীর রেখা পড়ল। বললে, তুমি তাহলে জানতে?

বিশ্বাস করো, জানতাম না। জানলে তোমাকে আগেই সাবধান করে দিতাম। পুরুলিয়ার রূপা আজ অনেক দিন হল মরে গেছে, তবু তোমার অনিষ্ট সে কোনোদিন চায়নি—চাইতে পারে না!

স্বরূপার ভেজা—ভেজা গলা কেঁপে গেল। এক মুহূর্ত থেমে সে আবার বললে, শোনো, অশ্বিনীকে তুমি অ্যারেস্ট করো—যত শিগগির পারো ওকে ধরো, নইলে আর ধরতে পারবে না! দু'একদিনের মধ্যেই ও করাচিতে পালিয়ে যাবে!

এ খবর তুমি কি করে জানলে?

আজ তোমার কাছে কিছুই লুকোব না কল্যাণ। অশ্বিনী আমার কে জানো? আমার স্বামী! কেমন করে আমাদের বিয়ে হয়েছিল, সেকথা আজ আর তুলে লাভ নেই। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, তার মতো জানোয়ারকে আমি ছাড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমাকে ছাড়েনি—আজও আমাকে ডায়ভোর্স দেয়নি।

তুমি কি আমাকে গল্প শোনাচ্ছ, স্বরূপা?

আজ তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারবে না জানি। তবু বলছি, একটা কথাও আমার মিথ্যে নয়। তুমি তৈরি থেকো কল্যাণ, যদি আজ রাতে অশ্বিনী আমার এখানে—

হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কথা। রিসিভার ধরে কল্যাণ বললে, কি হল? স্বরূপা! স্বরূপা! হ্যালো! হ্যালো!

কোনও সাড়া নেই!

ভয়ানক একটা সন্দেহে কল্যাণের মনটা অস্থির হয়ে উঠল। রিসিভারটা রেখে সে সার্জেন্ট দত্তকে বললে, এসো।

তারপর ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল।

হেডকোয়ার্টার্স থেকে ক্যামাক স্ট্রিট যেতেই বা ক'মিনিট! আর, লিফটে পাঁচতলায় উঠতেই বা কতক্ষণ!

ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই রয়েছে। মনসিজকে নিয়ে কল্যাণ ঘরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল। হ্যাঁ, এই আশঙ্কাই করেছিল সে।

ডিভানের ওপর স্থির হয়ে শুয়ে আছে স্বরূপা। রিসিভারটা হাত থেকে ছিটকে পড়েছে মেঝেয়। বাম স্তনের ওপর একটা বুলেটের ক্ষত। শাড়িতে, ডিভানে চাপ চাপ রক্ত। রক্তের ধারা এখনও চুঁইয়ে পড়ছে। দীর্ঘ—পলক চোখ দুটির পাতা আধখোলা। সে—চোখ কি কল্যাণকেই দেখছে? স্বরূপা কি এখনও বলছে, 'পুরুলিয়ার রূপা অনেকদিন হল মরে গেছে! তবু তোমার অনিষ্ট সে কোনোদিন চায়নি—চাইতে পারে না!'

অথচ এই স্বরূপাকে কতখানি ভুল বুঝেছিল সে! জীবনটা বড় অদ্ভুত, তার চেয়েও অদ্ভুত মানুষের মন! একথা একদিন স্বরূপাই বলেছিল।

মনসিজ বললে, ফ্ল্যাটটা সার্চ করে দেখব স্যার?

একটু বিষণ্ণ হেসে কল্যাণ বললে, কি হবে? অশ্বিনী কি আমাদের জন্যে এখনও বসে আছে?

তারপর মনে মনে বললে, এই নিয়ে তিন তিনটে জীবন তুমি নষ্ট করলে অশ্বিনী! কিন্তু আর নয়!

মৃতদেহ নিয়ে যা কিছু পুলিশি কর্তব্যের ভার সার্জেন্ট দত্তকে দিয়ে, কল্যাণ নিচে নেমে গেল। জিপে উঠলে বললে, পাসপোর্ট অফিস।

ঘণ্টা দুই লাগল ফাইল ঘাঁটতে।

তারপর পাসপোর্ট অফিসার বললেন, না মিস্টার বোস, গত তিন বছরের মধ্যে আবু রশিদ বা অশ্বিনী লাহার নামে কোনও পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়নি।

হতাশ হল কল্যাণ। তবে কি স্বরূপার খবর ভুল? একটু ভেবে আবার সে বললে, আচ্ছা, দেখুন তো খুব সম্প্রতি—মানে দু'চারদিনের মধ্যে পাকিস্তানে যাবার জন্যে কি কি নামে পাসপোর্ট ইসু হয়েছে? কিছু মনে করবে না ট্রাবল দিচ্ছি বলে।

না, না, মনে করব কেন?—পাসপোর্ট অফিসার হেসে বললেন, পুলিশকে সাহায্য করা আমাদের ডিউটি।

আবার ফাইল নেড়েচেড়ে তিনি জানালেন, না, পাকিস্তানে যাবার জন্যে যারা হালে পাসপোর্ট পেয়েছে, তাদের মধ্যেও ওই দুটি নাম নেই।

কল্যাণের মুখখানা এবার সত্যিই নিভে গেল। কিছুক্ষণ, চুপ করে থেকে সে বললে, যারা পাসপোর্ট পেয়েছে, তাদের ফোটোগুলো একবার দেখতে পারি?

নিশ্চয়। এক তাড়া ফোটো অফিসার কল্যাণের সামনে মেলে দিলেন।

একটার পর একটা দেখতে লাগল কল্যাণ। দুই চোখে উৎসুক আগ্রহ নিয়ে। দেখতে দেখতে তার নিভে—আসা মুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই তো সেই অদৃশ্য মেঘনাদ—যাকে সে আকাশে—পাতালে খুঁজে বেড়াচ্ছে! যাকে ধরবার জন্যে সে কবরে ঢুকতেও রাজি!

কল্যাণ বললে, এই ভদ্রলোকের পাসপোর্টে কি নাম লেখা আছে, দেখুন তো।

অফিসার দেখে বললেন, জ্যাক নিউম্যান। নেটিভ ক্রিশ্চান।

হাজার ধন্যবাদ!

ফোটোগুলো রেখে দিয়ে কল্যাণ উঠে পড়ল। জিপকে নির্দেশ দিলে, এয়ার—ওয়েজ অফিস।

হেমন্তের ছোটবেলা যেন কেরানির মাস—মাইনে! কতক্ষণ থাকে?

বি. ও. এ. সি—র অফিসে ইন্সপেক্টর কল্যাণ যখন ঢুকল, তখন সন্ধে হয়ে গেছে। নিজের আইডেন্টিটি কার্ড দেখালে সে।

ফ্লাইট—অফিসার প্রশ্ন করলে, বলুন, আপনার জন্যে কি করতে পারি?

কল্যাণ বললে, দু'একদিনের মধ্যে করাচিগামী কোন প্লেন ছাড়ছে কি?

আজই ছাড়ছে।

আজই!

হ্যাঁ। লন্ডনগামী একটা জেট বোয়িং করাচিতে থামবে।

সেই প্লেনে যেসব প্যাসেঞ্জার করাচি যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে জ্যাক নিউম্যান নামে কেউ আছেন?

কাগজপত্র দেখে অফিসার বললে, হ্যাঁ, এই যে—লিস্টে জ্যাক নিউম্যানের নামও রয়েছে।

প্লেন ক'টায় ছাড়বে?

সন্ধেবেলার ফ্লাইট। সাড়ে সাতটায় টেক অফ!

সাড়ে সাতটা! চমকে নিজের রিস্টওয়াচের দিকে তাকালে কল্যাণ। এখন সাতটা বাজতে দশ মিনিট। তার মানে চল্লিশ মিনিট সময় আছে হাতে। তারই মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাওয়া—না, অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু হেডকোয়ার্টার্স হয়ে যেতে গেলে হাতে সময় থাকবে কি? একটা মিনিট এখন একটা ঘণ্টার সমান।

কল্যাণ বললে, আপনার ফোনটা ব্যবহার করতে পারি?

অফিসার বললে, স্বচ্ছন্দে।

হেডকোয়ার্টার্সে যোগাযোগ করে কল্যাণ সার্জেন্ট দত্তকে চাইলে। দত্ত নেই, স্বরূপার ফ্ল্যাট থেকে এখনও ফেরেনি। সুরজিৎ গুপ্তকে ডেকে কল্যাণ বললে, মনসিজ ফেরা মাত্র যেন এয়ারপোর্টে চলে আসে। আমি এখান থেকে সোজা চলে যাচ্ছি।

গুপ্তসাহেব বললেন, কিন্তু সার্জেন্ট দত্ত যদি ঠিক সময়ে যেতে না পারে? এমন একটা অপারেশনে তোমার একা যাওয়াটা কি—

তাঁর কথার ওপরেই কল্যাণ বললে, আমাকে একাই যেতে দিন স্যার। এ সুযোগ আমি ছাড়তে পারি না।

ফোন রেখে আরেকবার হাতের ঘড়ি দেখলে কল্যাণ। সাতটা বাজতে পাঁচ। মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট টাইম আছে। জিপে উঠে বললে, দমদম এয়ারপোর্ট। জলদি।

গর্জন করে উঠে জিপ ছুটল।

কিন্তু ছুটলে কি হবে? পায়ে পায়ে বাধা, পদে পদে বিঘ্ন। মহানগর কলকাতার রাজপথে শুধু গাড়ি, গাড়ি গাড়ি! রাস্তাগুলো উপচে পড়ছে ট্রাফিকের জোয়ারে। ট্রাম—বাস—ট্যাক্সি—লরি—প্রাইভেট তো আছেই, তার ওপর রিকশা—ঠেলা—স্কুটার। সব মিলিয়ে জট—পাকানো একটা জটিলতা! সবাই ব্যস্ত, সকলেই আগে যাবে।

তারই মধ্যে জিপ এগোতে থাকে। বাসের পাশ কাটিয়ে, ট্রামের গা বাঁচিয়ে, ট্যাক্সিকে বাঁয়ে চেপে, লরির ধাক্কা এড়িয়ে। এক ফার্লং ছোটে তো তিন ফার্লং বেতো রুগির মতো চলে। অ্যাক্সিলেটর চাপতে না চাপতেই ব্রেকে পা দিতে হয়। অস্থির হয়ে ওঠে কল্যাণ। বারবার ঘড়ি দেখতে থাকে, আর মনে মনে হিসেব করে এয়ারপোর্ট আর কতদূর! কল্যাণের যদি ক্ষমতা থাকত, আজ রাতের জন্যে শহরের সমস্ত ট্যাফিক সে অচল করে দিত!

তবু ভাল যে পথে এখনও লাল বাতি চোখ রাঙায়নি। পরপর সবুজ বাতিই পেয়েছে কল্যাণ। সামনে একটা চৌমাথার মোড়। যাক, এখানেও সবুজ বাতি জ্বলছে। জ্বলদি পেরিয়ে চলো মোড়টা। কিন্তু পেরিয়ে চলো বললেই কি পার হওয়া যায়? সাঁ করে স্পিড নিতে না নিতেই নিভে গেল সবুজ সঙ্কেত, আর কল্যাণকে যেন ঠাট্টা করেই জ্বলে উঠল একচোখো লাল বাতি!

সশব্দে ব্রেক চাপলে গুর্খা ড্রাইভার বাজবাহাদুর। একটুখানি হকচকিয়ে গেল কল্যাণ। তারপরই চেঁচিয়ে উঠল, থেমো না বাজবাহাদুর—গুলি মারো ট্র্যাফিক সিগন্যালকে! চালাও তুমি—চালিয়ে যাও!

কিন্তু চালাও বললেই চালানো যায় না। জিপের আগে দু'সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। পেছনে ব্যাক করবে, তারও জো নেই। পেছনেও গাড়ির লাইন। আশেপাশে অগুনতি গাড়ি! যেন ইঁদুরকলে আটকে পড়ে ছটফট করতে লাগল কল্যাণ। ঘড়ির কাঁটা এক একটা সেকেন্ড পার হয়, আর শরীরের স্নায়ুগুলো টনটন করে ওঠে।

এক মিনিট কাটল। লালের বদলে আবার দেখা দিল সবুজ ইশারা। হু হু করে বইতে লাগল থেমে—থাকা গাড়ির স্রোত। হাঁপ ছেড়ে কল্যাণ বললে, আর না বাজবাহাদুর। সময় একদম নেই—জলদি চলো!

কিন্তু না, আবার থামো! সামনে মিছিল, লাল ঝান্ডা, পরিচিত স্লোগান : 'চলবে না, চলবে না!' কল্যাণের ইচ্ছে হল, চিৎকার করে বলে ওঠে, কেবল চলবে না? চলতেই হবে—পৌঁছতেই হবে!

অস্থির হয়ে উঠেছে কল্যাণ। অধীর হয়ে উঠেছে। মিছিল কি ফুরোবে না? অনন্ত নাগের মতো এর কি শেষ নেই? ঘড়ির কাঁটা ঘুরে যাচ্ছে। সময় নেই, আর সময় নেই! তবে কি পৌঁছনো যাবে না? হাতের নাগালের মধ্যে এসেও পালিয়ে যাবে আসামি?

রাস্তা পার হয়ে চলে গেল মিছিল। এবার বেলেঘাটার রাস্তা ধরল জিপ।

ভি—আই—পি রোডে যখন এসে পড়ল, কল্যাণ ঘড়ি দেখলে, সওয়া সাতটা। প্লেন ছাড়তে মাত্র পনেরো মিনিট বাকি! হাওয়াকে সাথ সাথ চালাও!

তাই চালালে গুর্খা ড্রাইভার। চওড়া মসৃণ ভি—আই—পি রোড ফাঁকা। আর তাকে পায় কে? ঘষা পয়সার মতো তার নির্বিকার মুখের ফাঁকে হলদে দাঁতগুলো একবার দেখা গেল, তারপর স্পিড দিলে। জিপ ছুটল—হাওয়ার সাথে সাথে নয়, হাওয়ার আগে আগে।

স্পিডোমিটারের কাঁটা দ্রুত উঠছে। ষাট থেকে সত্তর—সত্তর থেকে আশি—নব্বই। শেষ অবধি একশোর ঘর ছুঁয়ে কাঁপতে লাগল। ঘন কুয়াশা—মাখা অন্ধকারে জ্বলন্ত চোখের হেডলাইট ফেলে একটা কালো নেকড়ে যেন ছুটে চলেছে শিকার ধরতে!

দেখতে দেখতে এয়ারপোর্ট এসে গেল। জিপগাড়িখানা ভাল করে থামতে না থামতেই লাফিয়ে নেমে পড়ল কল্যাণ। এদিকে ওদিক চেয়ে সার্জেন্ট দত্তকে দেখতে পেল না। সে হয়তো এখনও ক্যামাক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে।

দ্রুত পায়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে চলে গেল কল্যাণ। চারদিকে সতর্ক চোখের নজর ফেলতে ফেলতে একেবারে লাউঞ্জে। নানা জাতের, নানা সাজের, নানা বয়েসের যাত্রীরা বসে আছে প্লেন ছাড়ার অপেক্ষায়। প্রিয়জনেরা এসেছে বিদায় দিতে। বিদায়—মুহূর্ত অসন্ন, চঞ্চল হয়ে উঠেছে সবাই।

কিন্তু সে কোথায়? যার জন্যে এত বাধার পাহাড় ঠেলে শেষ মুহূর্তে কল্যাণের এই অভিযান, কোথায় সে? একটি একটি করে যাত্রীর মুখ লক্ষ করতে লাগল কল্যাণ। না, নেই—এদের মধ্যে সে নেই! তবে কি সে আসেনি? করাচি যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল করেছে? হতাশায় কল্যাণের উদ্যম ফুরিয়ে এল। তবু তার গোয়েন্দা—মন বললে, সে আছে—এখানেই সে আছে। আইনকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবার এত বড় সুযোগ সে ছাড়বে না।

কল্যাণের চোখের সার্চ লাইট ঘুরে ঘুরে আবার যাত্রীদের লক্ষ করতে লাগল। সবাইকে দেখা হয়েছে, শুধু—হ্যাঁ, লাউঞ্জের ওই কোণে খবরের কাগজে মুখ ঢেকে, দামি টুইডের স্যুট—পরা যে প্যাসেঞ্জারটি তন্ময় হয়ে খবর পড়ছে, শুধু তাকেই এখনও দেখা হয়নি।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল কল্যাণ। লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললে, দেশলাই আছে মিস্টার?

খবরের কাগজের আড়াল থেকে বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চচারণে জবাব এল : দুঃখিত; নেই।

আপনি বুঝি স্মোক করেন না?

না।

কল্যাণ তবু দাঁড়িয়ে রইল। অমায়িকভাবে প্রশ্ন করলে, এই প্লেনে আপনিও যাচ্ছেন নিশ্চয়? কোথায়? করাচি, এডেন না লন্ডন?

খবরের কাগজের দেওয়াল তবু নড়ল না। নীরস গম্ভীর গলার জবাব শোনা গেল: আমার বিষয়ে অন্যের কৌতূহল আমি পছন্দ করি না।

একটু চুপ থেকে কল্যাণ বললে, মাপ করবেন। এইমাত্র একজন পাইলটের মুখে শুনলাম, বিদ্রোহী বালুচ সৈন্যেরা নাকি বোমা ফেলছে! তাই এ প্লেন করাচিতে নামবে না!

ঠিক চালই চেলেছে কল্যাণ। মুহূর্তে সরে গেল খবরের কাগজের আড়াল। সোজা হয়ে বসে লোকটা বিরক্তি আর বিস্ময় মেশানো গলায় বলে উঠল, সেকি!

আর, তার মুখের দিকে তাকিয়ে কল্যাণ যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল। দিল্লির পুলিশ—দপ্তর থেকে পাঠানো ফোটোখানা জ্যান্ত হয়ে উঠেছে তার চোখের সামনে! এই একই মুখ সে আজই দেখে এসেছে পাসপোর্ট অফিসে!

সৌজন্যের ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে কল্যাণ চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, গুড ইভনিং মিস্টার জ্যাক নিউম্যান, ওরফে আবু রশিদ, ওরফে মৃগাঙ্ক মজুমদার, ওরফে অশ্বিনী লাহা!

লোকটাকে এতটুকু বিচলিত হতে দেখা গেল না। শান্তভাবে বললে, পাগলের মতো কী বকছ! জ্যাক নিউম্যান ছাড়া আমার দ্বিতীয় নাম নেই।

লাউঞ্জে তখন মাইকের ঘোষণা শোনা যাচ্ছে : বি.ও.এ.সির জেট বোয়িং এখনই লন্ডনের পথে রওনা হবে. . . প্যাসেঞ্জারদের নিজের আসনে বসতে অনুরোধ করা হচ্ছে. . . লন্ডনগামী এই প্লেন প্রথমে থামবে করাচি শহরে, তারপর. . .

ব্যস্ত যাত্রীরা যে যার জিনিস নিয়ে একে একে লাউঞ্জ ছেড়ে চলে যেতে লাগল। খবরের কাগজ রেখে জ্যাক নিউম্যানও উঠে দাঁড়াল যাবার জন্যে।

প্যান্টের পকেটে হাত ভরে কল্যাণ তার পথ আগলে দাঁড়াল। তার শরীরের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল। বললে, দাঁড়াও বন্ধু! যাচ্ছ কোথায়? তোমাকে হাতে পেয়ে আর কি ছাড়তে পারি?

জ্যাক নিউম্যানের বাদামি চোখ দুটোতে একবার আগুনের ফুলকি দেখা গেল। তারপরেই অস্বাভাবিক ঠান্ডা গলায় সে বললে, আবার বলছি—আমায় তুমি চিনতে ভুল করেছ! আমি শুধু জ্যাক নিউম্যান।

ভুল!—একটু তিক্ত হাসি মুখে নিয়ে কল্যাণ বললে, ক্রিমিন্যাল চিনতে কল্যাণ বোস ভুল করে না। দিল্লিতে তুমি ছিলে আবু রশিদ, দাড়ি রেখে কলকাতায় হলে অশ্বিনী লাহা আর মৃগাঙ্ক মজুমদার, আবার দাড়ি কামিয়ে তুমি হয়েছ জ্যাক—

মুখের কথা শেষ না হতেই কল্যাণের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। মোটা লোমশ হাতের একটা ঘুসি আচমকা এসে পড়ল তার চোয়ালে। ছিটকে পড়তে পড়তে একটা সোফা ধরে সে টাল সামলে নিলে। রিভলভারের জন্যে পকেটে আবার হাত দিতেই একটা নীরস গলার গুরুগম্ভীর আওয়াজ শোনা গেল, হাত তোলো!

কল্যাণ ফিরে দেখলে, আবু রশিদ ওরফে অশ্বিনী লাহার হাতের অটোমেটিক তারই দিকে তাগ করে রয়েছে! এতক্ষণে তার খেয়াল হল, অশ্বিনীর মতো ধূর্ত ক্রিমিন্যালের সঙ্গে একা মোকাবিলা করতে আসাটা নেহাত বোকামি হয়ে গেছে! সার্জেন্ট দত্তকে যখন পাওয়া গেল না, তখন আর কাউকে আনাই উচিত ছিল।

কল্যাণের হাত দু'খানা আস্তে আস্তে ওপরে উঠে গেল।

এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ এখন প্রায় ফাঁকা। লন্ডনগামী হাওয়াই জাহাজ ছাড়বার অপেক্ষায় রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ি বেয়ে প্যাসেঞ্জারেরা একে একে উঠে যাচ্ছে ভেতরে। সকলেরই দৃষ্টি সেদিকে। নইলে লাউঞ্জের এক কোণে যে বিচিত্র নাটক শুরু হয়েছে, তার দর্শকের অভাব হত না।

হাতের অটোমেটিকটা নাচাতে নাচাতে অশ্বিনী এবার পরিষ্কার বাংলায় বললে, কল্যাণ বোস, ভারি চালাক গোয়েন্দা তুমি, না? এত চালাক যে, নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা পড়লে। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি গোয়েন্দাগিরি করো?

বিশ্রী আওয়াজ করে হেসে উঠল অশ্বিনী।

নিরুপায় আক্রোশে জ্বলতে জ্বলতে কল্যাণ বললে, শাট আপ! শয়তান জানোয়ার কোথাকার! তোমার খেলা আজই শেষ জেনো!

বটে!—অশ্বিনীর বাদামি চোখে আরেকবার আগুনের ফুলকি দেখা গেল। বললে, খেলা শেষ কার? আমার, না তোমার? আমার সঙ্গে শত্রুতা করার সাজা কি, মগনলাল, রতিকান্ত আর স্বরূপা নিশ্চয় তোমাকে জানিয়ে দিয়েছে?

কল্যাণ বললে, তাহলে স্বীকার করছ, রতিকান্ত আর স্বরূপাকেও তুমি খুন করেছ?

আমর কাছে বেইমানির ক্ষমা নেই।—নিজের রিস্টওয়াচের দিকে একবার তাকালে অশ্বিনী। তারপর বললে, প্লেন ছাড়তে আর এক মিনিট বাকি। নিজের জান বাঁচাতে চাও তো সরে দাঁড়াও!

অদ্ভুত একটা মরিয়া ভাব কল্যাণকে পেয়ে বসল। দাঁতে দাঁত চেপে বললে, পালাতে তোমায় দেব না অশ্বিনী—মরে গেলেও না।

অশ্বিনীর তামাটে মুখ লাল টকটকে হয়ে উঠল। অস্বাভাবিক ঠান্ডা গলায় বললে, তোমার মতো একটা ইঁদুর—বাচ্চচার জন্যে একটা টোটা নষ্ট করব কিনা ভাবছিলাম এতক্ষণ। কিন্তু না—আর দেরি করা চলে না। ঈশ্বর নামে কোনো আত্মীয়—টাত্মীয় যদি তোমার থাকে তো তাকে ডাকতে পারো।

হাতের অটোমেটিকটা কল্যাণের বুকের লেভেলে তুলে ধরলে অশ্বিনী। আর, সেই মুহূর্তে—ঠিক সেই মুহূর্তে একখানা চেয়ার সবেগে এসে পড়ল অশ্বিনীর ডান হাতের মুঠোর ওপর। ছিটকে পড়ল অটোমেটিক রিভলভার।

সার্জেন্ট দত্ত কখন এসে দাঁড়িয়েছে, কল্যাণ বা অশ্বিনী কেউ দেখেনি।

রিভলভারটা কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে দু'জনে দু'দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু অশ্বিনী হেঁট হয়ে হাত বাড়াতেই, কল্যাণ তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড এক ঘুসি ঝাড়লে অশ্বিনীর থুতনি লক্ষ্য করে। বক্সিং—শেখা হাত কল্যাণের, একটা ঘুসিতেই অশ্বিনীর ঘাড়ে—গর্দানে ভারি দেহটা উল্টে পড়ে গেল।

অস্ত্রটা কুড়িয়ে নিয়ে ইন্সপেক্টর কল্যাণ চেয়ে দেখলে, মেঝের কার্পেটে বসে আহত অশ্বিনী বুনো মোষের মতো হাঁপাচ্ছে। থুঁতোনির রক্ত গড়িয়ে সাদা টেরিলিনের শার্ট লাল হয়ে গেছে।

ততক্ষণে সুরজিৎ গুপ্তের পাঠানো আর্মড ফোর্স আর এয়ারপোর্টের জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়েছে লাউঞ্জে। কল্যাণ কাছে গিয়ে বললে, গেট আপ অশ্বিনী—উঠে দাঁড়াও!

টলতে টলতে দাঁড়িয়ে উঠল অশ্বিনী। মনসিজ হ্যান্ডকাপ নিয়ে এগিয়ে এল।

লন্ডনগামী জেট বোয়িং তখন দমদমের মাটি ছেড়ে করাচির পথে উড়ে চলেছে।

মনসিজ বললে, এবার কিছুদিন ছুটি নিন স্যার। যে ধকলটা গেল।

কল্যাণ হেসে বললে, হ্যাঁ, বীথিরও তাই ইচ্ছে। তবে তার আগে একটা কাজ বাকি আছে।

আবার কি কাজ?

পল্টু ছোকরাকে একটা ভাল চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়ে, মীনা থাপার সঙ্গে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করা। অন্তত একটা জীবন ক্রাইমের রাস্তা ছেড়ে সুস্থ সুন্দর হয়ে উঠুক।

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%