প্রণব রায়
পাঠকদের বলছি। আসুন, একটা গল্প তৈরি করা যাক।
সামাজিক গল্প আমি লিখি না। কারণ গল্পের নামে অবান্তর এলোমেলো স্বগত চিন্তা দিয়ে পাতার পর পাতা ভরানো আমার ধাতে আসে না। আমি যা লেখার চেষ্টা করি, তা হচ্ছে নেহাত গল্প। তাও অপরাধ নিয়ে। তাই বোধ করি, এ—কালের লেখকদের কাছে অপরাধী হয়ে আছি। গল্পের চরিত্রগুলিকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে আমি তাদের পিছনে থাকি, তারা নিজেরাই যা করে, যা বলে, তাই লিপিবদ্ধ করি; তাদের আড়াল করে দাঁড়িয়ে, তাদেরই মুখ দিয়ে আমার নিজের কথা জাহির করি না। দু'—একবার চেষ্টা করে দেখেছি, পারিনি। চুল পাকলেও জীবনের পাঠশালায় আমি এখনো ছাত্র, লেকচারার হতে পারিনি। তাই আমার গল্প নিছক গল্প ছাড়া আর কিছুই হয় না।
কিন্তু নিছক গল্প আজকাল ব্যাক—ডেটেড। নেহাত সেকেলে। খবরের কাগজের ভাষায় যাকে বলে এ যুগের প্রতিফলন, জীবন—যন্ত্রণা ইত্যাদি, সে—সব না থাকলে নাকি আজকের গল্প হয় না, মানে আজকের পাঠকদের খুশি করা যায় না। অতএব আসুন, একটা আজকের গল্পই তৈরি করা যাক।
গল্পের একজন নায়ক থাকে, আর নায়কের নামও থাকে একটা। কিন্তু নামের কি দরকার? গল্প যখন আজকের, নায়কও তখন আজকের। আজকের সব গল্পের সব নায়কই এক। বয়সে চরিত্রে স্বভাবে প্রকৃতিতে তারা একই—আদর্শহীন শিক্ষার সঙ্গে যৌবনের অস্থিরতা আর উগ্র জীবন—তৃষ্ণা মিশিয়ে তারা একই ছাঁচে ঢালা। তারা সবাই 'হাংরি জেনারেশন'। সুতরাং নামে কী আসে যায়? আজকের যে—কোনো যুবক নায়ক হতে পারে আমাদের গল্পের।
নায়ককে আমরা নায়ক বলেই ডাকব।
ভদ্র সৎ পরিবারের ছেলে সে। বয়স আটাশ। অবিবাহিত। দেখতে মোটামুটি ভালোই। লম্বায় ছ'ফুটের কাছাকাছি, স্বাস্থ্যবান চেহারা, রংটা কালো হলেও ঝকঝকে। বছর ছয়েক হল কমার্সে ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়েছে। বিজনেস অর্গানাইজেশনে উঁচু মার্কস পেয়েছিল, তাই চাকরি পেতে দেরি হয়নি। চাকরিটাও দামি। থাপার ট্রেডিং থেকে সব মিলিয়ে মাসে এখন সাড়ে পাঁচশো পায়, ভবিষ্যতে অঙ্কটা আড়াই হাজারে গিয়ে পৌঁছতে পারে।
বড় ভাই কানপুরে রেল—অফিসার, বিধবা মা থাকেন তারই সংসারে নাতি—নাতনিদের নিয়ে। সুতরাং নায়কের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। ঝাড়া হাত—পা। টাকা যা রোজগার করে, সবটাই সে নিজের জন্যে খরচ করতে পারে। বছরে এক—আধবার শিবরাত্রি বা অম্বুবাচী উপলক্ষে মায়ের জন্যে কিছু হাতখরচ পাঠিয়ে দেয়। কখনো টাকা পাঠায় ভাইপো—ভাইঝির জন্মদিনে।
নায়ক হিসেবে আমাদের নায়ককে প্রথম শ্রেণীর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। পাত্রের বাজারে তাকে 'আগ মার্কা' পাত্র বলা হয়। তবু সে এখনো ব্যাচেলর। তার কারণ এই নয় যে, বিয়েতে তার রুচি নেই। তার কারণ যুগ পালটে গেছে।
এখন আর বয়সটা বাইশ পেরোলেই টোপর পরার রেওয়াজ নেই। আটাশ বছরটা আজকাল বিয়ের পক্ষে পরিণত বয়স নয়। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত দেখে বেড়ানো এবং চেখে বেড়ানোর বয়স। অর্থাৎ জীবনের পার্টনার বাছাই করার পিরিয়ড।
কিন্তু আমাদের নায়ক বিয়ে করেনি বলে তার আটাশ বছরের জীবনে মেয়েদের আসা—যাওয়া নেই, এমন অবাস্তব ধারণা সঙ্গত নয়। যুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় নয়া জমানার ঢেউ লেগেছে এবং সেই ঢেউ বঙ্গোপসাগরের কুলেও আছড়ে পড়েছে। নীতি বদলেছে। পুরোনো আমলের ইউনিভার্সিটি বিল্ডিংয়ের মতো পুরোনো সংস্কার ভেঙে—চুরে নয়া সমাজ—ব্যবস্থার বিশাল আমেরিকান বিল্ডিং উঠেছে। তার সব ক'টা দরজায় কোনো কপাটও নেই, পাহারাও নেই।
মেয়েরা এখন আর পুরুষের নর্মসঙ্গিনী নয়, কর্মসঙ্গিনী। ট্রামে—বাসে হাটে—বাজারে অফিসে—সিনেমায় একেবারে পার্শ্ববর্তিনী। প্রাচীন শিলালিপির মতো তারা আর রহস্যময়ী নয়, দৈনিক খবরের কাগজের মতো নিতান্ত স্পষ্ট। ছেলেতে—মেয়েতে অবাধ মেলামেশা এ যুগের সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার। আজকের ছেলে—মেয়েদের হাতে হাতে রয়েছে নয়া জমানার একটি ছাড়পত্র। তার নাম কমরেডশিপ—বন্ধুতা।
এই ছাড়পত্র আমাদের নায়কেরও আছে। তারও যৌবনের দরজায় কয়েকটি বান্ধবীর আনাগোনা ঘটেছে, পায়ের ছাপ পড়েছে, আবার মুছেও গেছে।
তাই নিয়েই অমাদের গল্প।
নায়ক যেখানে একজন, সেখানে তার কোনো নাম না দিলেও চলে। কিন্তু নায়িকা যেখানে একাধিক, সেখানে তাদের গায়ে নামের চিহ্ন না দিলে তাদের চিনতে মুশকিল হবে। তারা সবাই একাকার হয়ে যাবে। অতএব নায়িকার নাম রাখা দরকার।
তিন বছর আগে আমাদের নায়কের যৌবনে প্রথম যে মেয়েটির পদক্ষেপ ঘটে, তার নাম—ধরুন, তার নাম মুক্তা বসু।
মুক্তা
বছর খানেক পিছিয়ে যাওয়া যাক।
আটষট্টি সালের এক এপ্রিল—সন্ধ্যা। নায়ক গিয়েছিল গড়িয়াহাটের মোড়ে শার্টের কাপড় খরিদ করতে। দোকানটা নতুন, সুন্দর করে সাজানো, নাম 'প্রচ্ছদ'। ঢুকে পড়ল নায়ক। কাউন্টারের পাশ থেকে এগিয়ে এল একটি সেলস গার্ল, অভ্যস্ত গলায় মিষ্টি করে বললে, কি দেব বলুন? টেরিন টেরিকটন ইজিপ্সিয়ান সিল্ক পপলিন—সুটিং শার্টিং শাড়ি—
কিছু বলতে পারেনি নায়ক। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে শুধু শুনছিল।
দু—সেকেন্ড থেমে মেয়েটি আবার প্রশ্ন করলে, বলুন, কি দেব?
এবার নায়ক বললে, শার্টের কাপড়—টেরিকটন।
প্লেন, না চেক?
প্লেন।
এক মিনিট—প্লিজ!
মেয়েটি চলে গেল কাউন্টারের ওপাশে। র্যাক থেকে বেছে বেছে নানান রঙের টেরিকটন থান কাউন্টারের ওপর জড়ো করতে লাগল। আর, এপাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল নায়ক। ঘষা—মাজা রঙ—ফর্সাই বলা চলে, সাধারণ বাঙালি মেয়ের তুলনায় একটু বেশি লম্বা। মেয়েটির সেই দীর্ঘছন্দ দেহের একটা আবেদন আছে। পুরন্ত সুঠাম দেহ। সেই দেহের দিকে তাকালে তার নাক—মুখ—চোখে খুঁত আছে কিনা সে—প্রশ্ন জাগে না। ছাপা ভয়েলের একখানা শাড়ি পাকে পাকে জড়িয়ে তার দেহের জ্যামিতিক নকশাগুলো আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। সেখানে কোনো খুঁত নেই।
আমরা এই মেয়েটিরই নাম দিয়েছি মুক্তা বসু।
পাঁচ—সাত রঙের থান নামিয়ে মুক্তা ডাকলে, আসুন। চয়েস করুন।
কাউন্টারের সামনে এগিয়ে গেল নায়ক। নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল থানগুলো। না, যে রঙের শেড সে খুঁজছে, তা নেই। হাত সরিয়ে নিলে সে। অথচ শুধু দেখে—শুনে বিনা সওদায় চলে যেতে কেমন যেন ভদ্রতায় বাধে।
কি হল? পছন্দ হচ্ছে না?
নায়ক কাউন্টার থেকে মুখ তুলে দেখলে, হাসি মুখে চেয়ে আছে মেয়েটি। রঙ—মাখা হালকা গোলাপি পুরু ঠোঁট দুখানা অল্প খোলা। হাসিটাও গোলাপি আমেজে ভরা। তবু যেন ওজন—করা, মাপা।
মুক্তার প্রশ্নের কি অর্থ বুঝল নায়কই জানে, চোখে চোখ রেখে বলে ফেলল, না, না, পছন্দ হয়েছে বইকি—খুবই পছন্দ হয়েছে।
মুক্তা চোখ সরিয়ে নিল। ঠোঁটে গোলাপি হাসিটা রেখে দোকানদারি গলায় বললে, টেরিকটের মধ্যে বিনিই হল বেস্ট। কোন রঙটা দেব বলুন?
ঠিক বুঝতে পারছি না কোন রঙের শেডটা মানাবে।
আপনার নিজের জন্য?
ঘাড় নাড়লে নায়ক।
কিছু যদি মনে না করেন, আমি বেছে দিতে পারি। মুক্তা বললে।
নায়ক বললে, ধন্যবাদ। নিজের জন্য নিজের রুচিটাই ভালো নয় কি?
খদ্দেরকে সহজে ছাড়ল না মুক্তা। বললে, নিশ্চয়। তবে সেটা খাবার সময়। পোশাকের বেলায় কিন্তু পরের রুচি মেনে চলাই ভালো।
একটু হেসে নায়ক বললে, বেশ মানছি। বলুন, কোন শেডটা নেব?
এই অলিভ গ্রিনটা নিতে পারেন—আজকাল এই রঙটা খুব চলছে।
ঠিক আছে, তাই দিন।
সবুজ রঙটাই নায়কের দু—চোখের বিষ। তবু সেদিন সে অলিভ গ্রিন শার্টের কাপড় সওদা করে বসল। রঙটা এখন আর তেমন খারপ মনে হচ্ছে না। সেলস গার্ল হিসাবে মেয়েটি চমৎকার! কিন্তু শুধু মেয়ে হিসাবে আরো চমৎকার নয় কি?
সওদা করে চলে আসার সময় মুক্তা আবার হাসলে। গোলাপি আমেজ ভরা সেই মাপা হাসি। বললে, নমস্কার। দরকার হলে আবার আসবেন।
দরকার হয়নি, তবু নায়ক আবার গেল। গড়িয়াহাটের সেই দোকান 'প্রচ্ছদ'—এ।
ঠোঁটে গোলাপি হাসি এনে মুক্তা এগিয়ে এল: কি দেব?
দেরাজে গোটা আষ্টেক ট্রাউজার ঠাসা, তবু সে প্যান্টের কাপড় চাইলে। বললে, অলিভ গ্রিনের সঙ্গে কোনো রঙ ম্যাচ করবে বলুন তো?
ঘরে বলে দেওয়ার লোক নেই বুঝি? হাসি মুখেমুক্তা বললে।
মানে?
মানে, মিসেসরাই তো মিস্টারদের জন্য রঙ পছন্দ করেন—
এবার নায়ক হাসলে। বললে, তেমন কেউ থাকলে আপনার সাহায্য চাইব কেন?
মুক্তা বললে, নিশ্চয় চাইবেন। কাস্টমারকে হেলপ করা আর খুশি করাই তো আমাদের কাজ।
মেয়েটা অদ্ভুত! সেলস গার্লের কাজ করে বলে গলায় কি অভ্যস্ত দোকানদারি ছাড়া অন্য সুর থাকতে নেই?
র্যাক থেকে কাপড়ের থান নামাতে লাগল মুক্তা। আর, ছাপা ভয়েলের শাড়ি জড়ানো দীর্ঘ সুঠাম দেহের প্রতিটি ভঙ্গিমা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল নায়ক। তার প্রাচীন ভদ্র মন বললে, কোনো ভদ্র মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকাটা অশালীন আচরণ। তার আঠাশ বছরের যৌবন বললে, যা দেখতে ভালো লাগে, তা দেখতে দোষ নেই।
পরের সপ্তাহে নায়ক আবার গেল।
যাবার ঠিক ইচ্ছে ছিল না, রাসবিহারীতে সিগারেট কিনতে এসে ইচ্ছে হল যেতে।
গোলাপি রঙ—মাখা ঠোঁট এগিয়ে এসে বললে, আসুন, কি দেব?
টাই।
সরি, আজ দিতে পারছি না।
কেন?
দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আমারও ছুটি।
নিজের হাতঘড়ি দেখে নায়ক বললে, এখনো তো আটটা বাজেনি!
আটটা বাজতে দশে সেল বন্ধ হয়ে যায়।
ও! ভালোই হল, কয়েকটা টাকা বেঁচে গেল। চলুন তাহলে, যাওয়া যাক।
কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটা টেনে নিলে মুক্তা, তারপর বেরিয়ে পড়ল। রাসবিহারী ধরে হাঁটতে লাগল দুজনে বাস—স্টপেজের দিকে। পঞ্চাশ গজ যেতে না যেতেই চৈত্র—সন্ধ্যার খ্যাপা ঝোড়ো হাওয়া গুন্ডাপার্টির মতো হই হই করে এসে পড়ল তাদের সামনে। ধুলো—বালির ঝাপ্টা মেরে এক লহমায় নাস্তানাবুদ করে দিলে পথের মানুষদের। মুক্তার একখানা হাত ধরে টানতে টানতে নায়ক বললে, শিগগির ঢুকে পড়ুন ওই রেস্তোরাঁয়।
একটা কেবিন দখল করে নায়ক বললে, কি খাবেন বলুন?
শব্দ করে হেসে মুক্তা বললে, ধুলো—বালি খেয়েই পেট ভরে গেছে!
অভ্যস্ত দোকানদারির বদলে নায়ক এই প্রথম অন্য সুর শুনল মুক্তার গলায়। চেয়ে দেখলে, 'প্রচ্ছদ'—এর বাইরে এসে তার হাসির চেহারাটাও বদলে গেছে। সেই গোলাপি রঙ—করা মাপা হাসি নয়, গোলাপজলের ফোয়ারার মতো আপনি—উছলে—পড়া মিষ্টি হাসি।
ঝড়ে এলেমেলো চুলগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে মুক্তা বললে, এমন বিনা নোটিশে ঝড় আসাটা কিন্তু ভারি অন্যায়!
সমুখে একটু ঝুঁকে নায়ক বললে, আমার তো ঝড়কে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে।
কেন শুনি?
আপনার সঙ্গে ভালো করে আলাপ করার সুযোগ দিয়েছে বলে।
হালকা হেসে মুক্তা বললে, কী যে বলেন! একজন সেলস গার্লের সঙ্গে আলাপ করাটা কী আর এমন ব্যাপার?
নায়ক বললে, আপনার সবটুকুই তো সেলস গার্ল নয়।
মুক্তার উছলে—ওঠা হাসি হঠাৎ থেমে গেল। কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল সে। না, তার সবটাই সেলস গার্ল নয়। শুধু মেয়ে হিসাবেও তার একটা অন্য পরিচয়—অন্য সত্তা আছে। কিন্তু কেউ তো এতদিন তা জানতে চায়নি!
সেদিন সেই এলোমেলো ঝড়ের সন্ধ্যায় আমাদের নায়ক নিজের নাম—ধাম জানিয়েছিল, আর জেনেছিল মুক্তা বসুর ব্যক্তিগত পরিচয়।
পূর্ব বাংলার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। জমিদারি না থাকলেও সংসারকে সচ্ছল রাখার মতো জমিজমা ছিল। বাবা ছিলেন হাইস্কুলের হেড মাস্টার। ছেচল্লিশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতেও তাঁরা টিকে ছিলেন কোনোমতে। ভিটের মায়া ছাড়তে রাজি হননি তার বাবা। কিন্তু আরো কয়েক বছর বাদে আর থাকা গেল না। সর্বস্ব খুইয়ে চলে আসতে হল শহর কলকাতায়। সেটা তেরো বছর আগের ঘটনা—মুক্তার বয়স তখন দশ। কলকাতায় এসে উদ্বাস্তু হিসাবে তার বাবা পেলেন একটুকরো জমি আর পেলেন একটা স্কুলে সেকেন্ড টিচারের চাকরি। চাকরি আর টিউশনি মিলিয়ে সংসারের চাকা আবার ঘুরতে শুরু করল। মুক্তা আবার ভর্তি হল স্কুলে। স্কুল থেকে কলেজে। তারপর সংসারের চাকা আবার একদিন অচল হয়ে গেল। বাবা মারা গেলেন স্ট্রোকে। মুক্তা তখন বি. এ পড়ছে। পার্ট টু পরীক্ষাটা আর দেওয়া হল না, জীবনের লড়াইয়ে নেমে পড়তে হল। কপাল ভাল, 'প্রচ্ছদ'—এ সেলস গার্লের চাকরিটা জুটে গেল। সকাল দশটা থেকে রাত আটটা অবধি ডিউটি। ভালো—মন্দ হাজার খানেক খদ্দেরকে খুশি করে জিনিস বিক্রি করা—হয়তো বা তার সঙ্গে নিজের কিছুটা সম্মানও বেচে দেওয়া! তা হোক, টাকার বড় দরকার। মাস গেলে দুশো পঁচিশ টাকা মন্দ কী? ছোট ভাইটাও লেদ মেশিনের কাজে ঢুকেছে। মুক্তার পড়াটা বন্ধ হল, হোক—সংসারের চাকা তো আবার ঘুরছে।
চুপ করে শুনল আমাদের নায়ক। অতটা গরিব না হলেও সেও মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। জীবনের বাস্তব চেহারাটা তারও খানিকটা দেখা আছে। সেলস গার্লের খোলস ছেড়ে যে মেয়েটি এখন তার সামনে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, তার প্রতি আমাদের নায়কের ভদ্র মন সহজাত প্রবৃত্তির বশে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল। তার ইচ্ছে হল—প্রবল ইচ্ছে হল, জীবনের লড়াইয়ে এই মেয়েটির পাশে থেকে সমস্ত অসম্মান থেকে তাকে বাঁচায়।
তখন কফি শেষ করে মুক্তা দু'হাত তুলে অগোছালো বেণী খোঁপা করে জড়াচ্ছিল। মুক্তা বসেছে নায়কের দিকে একটু আড় হয়ে। দু'বাহু তোলার দরুণ পাতলা ভয়েলের আড়ালে নীবি—বন্ধনীর ইশারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আঠাশ বছরের যৌবন নায়কের কানে কানে বললে, 'পৃথিবীর সমস্ত ফুলের মধু এক—এক ফোঁটা করে নিয়ে বিধাতা—পুরুষ যুবতীর দেহ গড়েছে! তুমি তার স্বাদ জানো কি?'
বাইরে ঝড় থেমেছে। বৃষ্টিও হয়ে গেছে এক পশলা। তবু কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল নায়ক। যে তাকে অস্থির করেছে, সেই আঠাশ বছরের যৌবনকে ধমক দিয়ে সে উঠে পড়ল। বললে, চলুন, এবার যাওয়া যাক।
ব্যাগ খুলে মুক্তা কফির দাম মিটিয়ে দিতে যাচ্ছিল, নায়ক বললে, ওকি, আপনি খরচ করবেন কেন? কফি তো আমি খাওয়ালাম!
মুক্তার মুখে সেই রঙ—করা হাসি দেখা দিল। বললে, ধন্যবাদ। আপনি দয়ালু কাস্টমার, গরিব সেলস গার্লের দেড়টা টাকা বাঁচিয়ে দিলেন।
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল আমাদের নায়ক। অজান্তে মেয়েটার সম্মানে ঘা দিয়ে বসল নাকি। তাড়াতাড়ি বললে, ছি, ছি, আপনি তা ভাবছেন কেন? কাস্টমার কি বন্ধু হতে পারে না?
লজ্জিত নায়কের গলায় এমন একটা আন্তরিকতার সুর বেজে উঠল যে, মুক্তা বসু তার মুখের পানে না তাকিয়ে পারল না। সুশ্রী একখানি পরিচ্ছন্ন মুখ উজ্জ্বল চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। সে চোখের স্বচ্ছতায় বন্ধুতার আহ্বান ছাড়া কোনো অভিসন্ধি খুঁজে পেল না মুক্তা।
আবার সহজ হয়ে এল মুক্তা বসু। আস্তে আস্তে শুধু বললে, বেশ, দামটা আপনিই দিন।
দুজনে যখন রাস্তায় পা দিল, তখন রাত পৌনে ন'টা।
নায়ক জিজ্ঞেস করলে, যাবেন কোথায়?
টালিগঞ্জে। মুক্তা বললে।
টালিগঞ্জের কোন জায়গা?
বিধান কলোনি।
ও অঞ্চলে প্রায়ই গোলমাল হয় শুনেছি। আমারই জন্যে আজ আপনার রাত হয়ে গেল, আপনাকে বরং পৌঁছে দিয়ে আসি চলুন।
প্রস্তাবটা খুব সহজভাবে এড়িয়ে গেল মুক্তা। বললে, কেন কষ্ট করবেন? আমি তো একাই আসি—যাই। আচ্ছা, চলি।
একখানা বাস এসে স্টপেজে থামল। উঠে পড়ল মুক্তা। বাস ছাড়বার আগে বলে গেল, লেটেস্ট ফ্যাশানের টাই এসেছে। আসবেন দোকানে।
* * *
দিন দুই বাদে আবার দেখা হল। তারপর আবার, তারপর বারবার। একনাগাড়ে বেশ কয়েক মাস। দোকানের ছুটির পর কোনোদিন কোনো রেস্তোরাঁয়, কখনো পার্কে, কখনো বা গঙ্গার ধারে। কথা হয়, গল্প হয়, স্পর্শ বিনিময় হয়।
পুরুষ—প্রকৃতির চিরাচরিত বিধানে এই ক'মাসে দুজনে অনেক কাছাকাছি এসে গেছে। 'আপনি' হয়েছে 'তুমি'। নায়কের জীবনে মুক্তা প্রথম রমণী, মুক্তার জীবনে নায়ক প্রথম পুরুষ। তবু দেওয়া—নেওয়ার সম্পর্কটা এখনো তত গভীরে পৌঁছয়নি।
যেদিন বেশি রাত হয়ে যায়, নায়ক ট্যাক্সি করে মুক্তাকে পৌঁছে দিয়ে আসে। পাড়ার দাদাদের চোখ টাটাতে পারে, তাই একেবারে বাড়ি অবধি নয়, বিধান কলোনির আগের মোড় অবধি। নায়ক পৌঁছে দিতে চাইলে মুক্তা আর আপত্তি করে না। নায়কের কাঁধে মাথা হেলিয়ে চুপচাপ বসে থাকে ট্যাক্সির মধ্যে। কথা কয় না, চোখ দুটি বোজা, একটা স্বপ্নাচ্ছন্ন তন্দ্রার ঘোরে থাকে। নায়ক একদিন গিয়েছিল মুক্তাদের বাড়িতে। টালি—ছাওয়া ছোট ছোট খানতিনেক ঘর। লাউ—মাচা, গাঁদার চারা। মুক্তার মা তাকে আদর—যত্ন করেছিলেন, আর খাতির করেছিলেন সে পাঁচশো টাকা মাইনে পায় শুনে।
যে যার পথে যাবার সময় নায়ক জিজ্ঞেস করে, কাল দেখা হচ্ছে তো?
রোজই এক প্রশ্ন। উত্তরে মুক্তা শুধু ঘাড় নেড়ে জানায়, হবে।
এক রবিবারে ওরা গিয়েছিল সিনেমায়। ম্যাটিনিতে। সিনেমা থেকে যখন বেরোল, তখনও বেলা আছে। ওরা চৌরঙ্গির একটা দোকানে চা খেল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে ময়দানে একটা গাছের ছায়ায় এসে বসল।
ছবির গল্প নিয়ে, সোফিয়া লোরেনের অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগল নায়ক। মুক্তা শুধু শুনেই গেল, হাঁটুর ওপর চিবুক রেখে বসে রইল চুপচাপ। তারপর ফোর্ট উইলিয়ামের আড়ালে সূর্য ডুবল, পাতলা অন্ধকার নামল, ফাঁকা হয়ে এল ময়দান।
মুক্তা হঠাৎ বললে, আজ উঠি।
তার আঙুলে আঙুল জড়িয়ে বসেছিল নায়ক। বললে, এত সকাল সকাল?
নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মুক্তা বললে, একটু সকাল সকালই ফিরব।
নায়ক সেই একই প্রশ্ন করলে, কাল দেখা হচ্ছে তো?
ছোট্ট করে জবাব দিলে মুক্তা, না।
পরশু?
না। দেখা আর না হওয়াই ভালো।
কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে বসেছিল নায়ক, সোজা হয়ে উঠে বসল। বললে, কেন? কি হল?
খুব সহজভাবে মুক্তা বললে, আমাদের মেলামেশা এই পর্যন্তই থাক। আর নাই বা এগোলাম।
এগোলে দোষ কি?
কোথায় গিয়ে পৌঁছব, সেটা না জেনে এগনো কি ভালো?
একটু অসহিষ্ণু গলায় নায়ক বললে, অত হিসেব করে জীবনে চলা যায় না মুক্তা।
মেয়েদের কিন্তু হিসেব করেই চলতে হয়। কেননা লোকসানের ভয় তাদেরই বেশি।
এক সেকেন্ড চুপ করে রইল নায়ক। তারপর বললে, আমার সঙ্গে মিশলে তোমার লোকসানের ভয় আছে?
নরম গলায় মুক্তা বললে, রাগ কোরো না। আমি তা বলিনি।
তবে কি বলতে চাইছ? তোমাকে আমি কতখানি ভালোবেসেছি, আজও তুমি বুঝতে পারোনি?
পেরেছি। কিন্তু তুমি কি বোঝো আমার মতো সাধারণ মেয়ে কী চায়, আর কী পেলে সুখী হয়?
কি?
অন্ধকারে মুক্তার একখানা হাত নায়কের হাতের মধ্যে এসে পড়ল। মুক্তা বললে, এমন একজন সঙ্গী—যার ওপর নির্ভর করলে জীবনের শেষ দিন অবধি সে আমার হাত ছাড়বে না।
একটা আবেগের ঢেউ নায়কের যুবক মনকে দুলিয়ে দিলে। তার মনে হল মুক্তার জন্য সব কিছুই সে করতে পারে। আর সেই আবেগ গলায় নিয়ে বললে, তোমাকে ছেড়ে থাকার কথা আমি আজ ভাবতেও পারি না মুক্তা। তোমাকে বাদ দিয়ে আমার জীবনটা—অসম্ভব, অসম্ভব! বিশ্বাস করো, সারাটা জীবন আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই—পাশে থেকে তোমায় সুখী করতে চাই!
বলতে বলতে মুক্তাকে বুকের কাছে টেনে নিল নায়ক। তারপর উষ্ণ নিশ্বাস, উষ্ণ স্পর্শ।
মুক্তা কোনো বাধা দিলে না। এমন করে নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ সে আগে কখনো করেনি।
থাপার ট্রেডিংয়ের ছোট থাপার নিজের খাস কামরায় ডেকে পাঠাল নায়ককে।
কোম্পানির এক নম্বর সাহেব এখন ছোট থাপার। বড় থাপার প্রায় রিটায়ার করেছে। মাঝারি দৈর্ঘের অত্যন্ত বলিষ্ঠ চেহারা ছোট থাপারের, নাক—মুখ—চোখ একটু মঙ্গোলীয় ধাঁচের, টকটকে ফর্সা রঙে বেশ খানিকটা লাল মেশানো। কড়া 'বস' হিসাবে অফিসে অখ্যাতি আছে।
লাঞ্চের পর ঘরে বসে লেমন স্কোয়াশে চুমুক দিচ্ছিল ছোট থাপার। নায়ক এল।
আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন?
হ্যাঁ, বোসো।
একটু অবাক হল নায়ক। অধীনস্থ অফিসারদের বসতে বলা ছোট থাপারের অভ্যাসের বাইরে।
কোল্ড ড্রিঙ্কে আপত্তি নেই তো?
বোতাম টিপে বেয়ারাকে আরেক গ্লাস লেমন স্কোয়াশের অর্ডার দিলে। তারপর পাইপ ধরিয়ে বললে, জেরি অ্যান্ড বেরির অর্ডারটার কি হল?
মাল রেডি হয়েছে, কাল বাই এয়ার চলে যাবে।
গুড। আর সিন্ধিয়া কর্পোরেশনের অর্ডারটা?
ওরা পাঁচ পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে 'এ' গ্রেড মাল চাইছে স্যার।
বেশ তো, দিয়ে দাও ডিসকাউন্ট।
কিন্তু স্যার, লোকসান হয়ে যাবে যে!
অত্যন্ত সহজ ভাবে ছোট থাপার বললে, হোক না। লোকসানটা ওদের, আমাদের লাভ। 'এ' গ্রেডের লেবেল দিয়ে 'বি' গ্রেডের মাল সাপ্লাই করে দাও।
থতিয়ে গেল নায়ক। বললে, কিন্তু আমাদের ফার্মের নীতি—
নীতি!—ছোট থাপারের ঠোঁটের কোনায় আর ছোট ছোট চোখের তারায় একটা কৌতুক চিকচিক করে উঠল। বললে, ওটা পুরানো বইয়ের কথা। আজকের দুনিয়ায় লাভটাই বড়, নীতি—টিতি কিছু নয়। এতবড় অর্ডার তো হাতছাড়া করা যায় না!
তাই হবে স্যার।
উঠতে যাচ্ছিল নায়ক; ছোট থাপার বললে, বোসো। আমাদের ফার্মে তোমার ক' বছর হল?
তিন বছর।
আশ্চর্য, তিন বছরেও তোমার প্রমোশন হয়নি! তোমাকে তো বেশ ইন্টেলিজেন্ট বলেই মনে হয়।
চুপ করে রইল নায়ক। বলতে পারত, আপনার সুনজরে এতদিন পড়তে পারিনি বলে। কিন্তু সে কথা কি বলা যায়?
ছোট থাপার বললে, অফিস—সুপারভাইজার মিস্টার কাপুরের আরো একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট দরকার। ভাবছি তোমাকেই রেকমেন্ড করব।
কড়া 'বস' ছোট থাপারের সদাশয়তায় মুগ্ধ হয়ে গেল নায়ক। এখন সে পাচ্ছে পাঁচশো করে, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজারের মাইনে সাড়ে আটশো।
ধন্যবাদ স্যার।
কৃতজ্ঞ স্বরে বলে নায়ক উঠে পড়ল। সুইংডোরের কাছে পৌঁছবার আগেই ছোট থাপার পুনরায় ডাকলে, শোনো।
ফিরে দাঁড়াল নায়ক।
'বস' বললে, কাল তোমাকে নিউ এম্পায়ারে দেখলাম। সঙ্গে কে ছিলেন? তোমার ফিয়াঁসে?
প্রশ্নটার জন্যে তৈরি ছিল না নায়ক। কেমন একটু অস্বস্তি বোধ করে বললে, না—মানে—আমার একজন বান্ধবী।
আই সি!—নায়ক লক্ষ করলে ছোট থাপারের ঠোঁটের কোনায় আর ছোট ছোট চোখের তারায় সেই কৌতুক চিকচিক করছে। একটু থেমে ছোট থাপার বললে, সামনের রবিবার 'গুলমার্গে' আমি একটা ছোট পার্টি দিচ্ছি। জনকয়েক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসবে। তোমরাও দুজনে এলে খুশি হব।—আচ্ছা, এসো।
খোলা ফাইলের ওপর ঝুঁকে পড়ল ছোট থাপার। আর, কয়েক সেকেন্ড আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নায়ক ফিরে গেল নিজের টেবিলে।
এতক্ষণে বোঝা গেল। অধস্তন কর্মচারীকে বসতে বলার ভদ্রতা, লেমন স্কোয়াশ অফার করা, আর তার প্রমোশনের জন্য সহসা মনিবের মাথাব্যথার অর্থটা পরিষ্কার হয়ে উঠল।
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। ছোট থাপার মুক্তার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। করুক না আলাপ, দোষ কি? সেলস গার্ল মুক্তার সঙ্গে কত লোকেই তো আলাপ করে। কিন্তু না, মেয়েদের সঙ্গে ছোট থাপারের আলাপ করার মানে নায়ক বোঝে। অফিসের অনেকেরই মতো সেও শুনেছে নারী—শৌখিন ছোট থাপারের প্রাইভেট লাইফ। শুনেছে প্রতি সপ্তাহে 'গুলমার্গে' কারা আসে, কি হয়। চল্লিশ পার হলেও অতি মাত্রায় মাংসাশী। তার ভোগের ডিশে নায়ক আর যাকেই হোক, অন্তত মুক্তাকে সাজিয়ে উপহার দিতে পারবে না। অসম্ভব! মুক্তাকে সে ভালোবাসে।
বেঁকে বসল নায়কের মন। মনে মনে সে স্থির করে নিলে, পরদিন অফিসে গিয়ে ছোট থাপারকে সে বলবে: 'মাপ করবেন, পার্টিতে মুক্তাকে নিয়ে যাওয়া হবে না।'
কিন্তু বলতে পারল না। বলি—বলি করেও বলতে পারল না। এমনকি শনিবারে অফিস—ছুটির পর লিফটের কাছে যখন দেখা হল, আর ছোট থাপার হেসে জিজ্ঞেস করলে, 'কাল তোমার বান্ধবীকে নিয়ে আসছ তো?' তখনো বলতে পারল না।
আশ্চর্য, যতবার বলতে গেছে, ততবারই মনে হয়েছে এখন সে পায় মোটে পাঁচশো করে, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার হলে পাবে সাড়ে আটশো! চাকরিতে প্রমোশনের সুযোগ বারবার আসে না।
আর, মনে পড়েছে ছোট থাপারেরই কথা: 'দুনিয়ায় লাভটাই বড়, নীতি—টিতি কিছু নয়!'
পার্টির কথা শুনে মুক্তা বললে, তোমার সঙ্গে যাব, তা আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?
নিমন্ত্রণটা সে এত সহজভাবে নেবে আশা করেনি নায়ক। ভেবেছিল, বুঝিয়ে—সুঝিয়ে রাজি করাতে হবে। হালকা বোধ করলে নায়ক।
মুক্তা বললে, পার্টি—ফার্টির কায়দা—কানুন আমি কিছুই জানি না। সামলে নিও কিন্তু।
নায়ক বললে, পাঁচজন আসবে, একটু ভালো করে সেজে এসো, কেমন?
মাথা ঝাঁকিয়ে মুক্তা বললে, ওসব আমার আসে না। তারপর চোখের কোণ দিয়ে তাকিয়ে বললে, সাজগোজ শুধু একজনের জন্যে, পাঁচজনের জন্যে সাজতে আমার বয়ে গেছে!
কিন্তু সেজেই এল মুক্তা। সোয়া দু'শো টাকা মাইনের চাকুরে মেয়ের পক্ষে যতটা সাজতে পারা সম্ভব। সিল্ক নয়, বেনারসি নয়, দোপাটি রঙের মিহি তাঁতের শাড়ি পরেছে, তারই সঙ্গে ম্যাচ করা ব্লাউজ, চোখের পাতায় হালকা করে কাজল ছুঁইয়েছে, কপালে কুমকুমের টিপ ঘিরে ফুটফুট শ্বেত—চন্দনের ফোঁটা, বেণীতে ছ'পয়সা দামের একছড়া বেলফুলের হার জড়ানো।
সাজের বাহার নাই থাক, মুক্তা সাজতে জানে। নায়ক তাকে কাছে টানতেই তার ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে মুক্তা বললে, এখন নয়, পার্টির পরে।
পার্টি! ছোট থাপারের লালচে মুখখানা মনে পড়ল। নায়ক বললে, থাকগে পার্টি, চলো অন্য কোথাও বেড়িয়ে আসি।
খুশি হয়ে মুক্তা বললে, তাই চলো। মাঠের দিকে।
একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে বসল দুজনে। কিন্তু ময়দানের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল ক্যামাক স্ট্রিটের একটা বাড়ির সামনে। রাত তখন আটটা কুড়ি।
মুক্তা বললে, এ কার বাড়ি?
নামতে নামতে নায়ক বললে, মিস্টার থাপারের। 'বস' যখন নিজে নেমন্তন্ন করেছেন, তখন ভেবে দেখলাম—পার্টিতে একেবারে না যাওয়াটা নেহাত অভদ্রতা হবে। এসো।
ফটকের পাশে শ্বেতপাথরে ইংরেজি হরফে লেখা 'গুলমার্গ'। ছোট থাপারের ফ্যামিলি থাকে বর্ধমান রোডের পৈতৃক বাড়িতে। সেটাই তার আসল বাড়ি। 'গুলমার্গ'—এর তিনতলার ফ্ল্যাটটা সে মাসিক সাতশো টাকায় ভাড়া নিয়েছে শুধু অবসর—বিনোদনের জন্য। এখানে শনিবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল অবধি সে কাটায়।
নায়ক আলাপ করিয়ে দিলে, মিস্টার থাপার—মুক্তা বসু।
মুক্তার নমস্কারের বদলে ছোট থাপার বিলিতি সৌজন্যে মাথা নুইয়ে বললে, আপনি এসেছেন, ভারি খুশি হলাম। বসুন।
ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে নায়ক বললে আমরা বোধ হয় একটু আগেই এসে পড়েছি। অন্য গেস্টরা এখনো—
ওরা আসতে পারল না।—ছোট থাপার বললে, হয়েছে কি জানো? আমার এক বন্ধুকে হঠাৎ লিভারপুল যেতে হচ্ছে, ওরা তাই এয়ারপোর্টে গেছে।
কেন জানি না, নায়কের মনে হল এই কৈফিয়ৎটা আগে থেকেই তৈরি করা। থাপার বোধ হয় চায়নি আজকের পার্টিতে আর কেউ উপস্থিত থাকে। তবু একটা সুযোগ নিতে চেষ্টা করলে নায়ক। বললে, আমাদের জন্যেই আপনাকে আটকে থাকতে হয়েছে নিশ্চয়—আমরা বরং আরেকদিন—
হেসে উঠে ছোট থাপার বললে, না, না, তা কি হয়? আজ না হয় তিনজনেই পার্টি হোক।
তারপর মুক্তার দিকে চোখ রেখে বললে, আজ না হয় একটি ফুলেই 'গুলমার্গ' আলো হয়ে থাক।—প্লিজ, আপনি আরাম করে বসুন মিস বোস। মনে করুন না, এটা আপনারই ঘর।
সৌজন্য আর আতিথেয়তার দিক দিয়ে ছোট থাপার একেবারে টিপটপ।
অল্প হেসে মুক্তা বললে, ব্যস্ত হবেন না মিস্টার থাপার, আমি ঠিক আছি।
আপনাদের কি দিয়ে এন্টারটেন করি বলুন তো? মিউজিক শুনবেন, না একটা গান শোনাবেন?
মুক্তা বললে, ছোটবেলায় গাইতাম। এখন আর অভ্যেস নেই।
শোনাবেন না যখন, তখন শুনুন।
রেডিওগ্রামে ছোট থাপার মৃদু সুরে বিলিতি বাজনার রেকর্ড চালিয়ে দিলে। তারপর ডাকল, বেয়ারা!
বেয়ারা প্রস্তুত হয়েই ছিল। দুটো গ্লাসে স্কচ আর সোডা এনে হাজির করলে।
হুইস্কিতে নায়কের হাতেখড়ি এই প্রথম নয়। তবু মনিবের সামনে সঙ্কোচ বোধ হল। এছাড়া মুক্তার সামনেও সে আগে কখনো খায়নি। বুঝতে পেরে ছোট থাপার বললে, দেখো, অফিসে কড়া 'বস' বলে আমার বদনাম আছে বটে। কিন্তু এটা তো আর অফিস নয়, এখানে আমরা সবাই বন্ধু। সারা সপ্তাহ কাজ করি, একটা সন্ধ্যা এনজয় করলে দোষটা কী? আপনিই বলুন মিস বোস! আপনাকে একটা সফট ড্রিঙ্ক—মানে অরেঞ্জ স্কোয়াশ দিতে বলি?
মুক্তার জন্য অরেঞ্জ স্কোয়াশ আসতেই ছোট থাপার বললে, আসুন, চিয়ার্স!
রেডিওগ্রামে আবছা সুরে বিলিতি মিউজিজ বাজতে লাগল, আর চলতে লাগল টুকরো টুকরো কথাবার্তা। অফিসের কথা, মুক্তার কথা। সে কোথায় থাকে, বাড়িতে কে কে আছেন, কি কাজ করে—এই সব। আজকাল মেয়েরাও রোজগারের ক্ষেত্রে নেমে পড়েছে—সমাজের পক্ষে এটা খুবই ভালো কথা। তবে জীবনের উচ্চচাশা পূর্ণ করার জন্য আরো ভালো সুযোগ চাই। সুযোগ হচ্ছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ—যাদু—ই—চিরাগ—যা পেলে সুখের দুনিয়া তোমার হাতের মুঠোয়! আজকের সমাজ সোশ্যালিজমের বুলি আওড়ায় বটে, কিন্তু মানুষকে সুযোগ দিচ্ছে কই? মিস বোসের কথাই ধরা যাক। তাঁর মতো স্মার্ট মেয়ের কি সামান্য সেলস গার্ল হওয়ার কথা? সুযোগ পেলে—কে বলতে পারে—তিনি হয়তো দ্বিতীয় ক্লিওপেট্রা হতে পারতেন ঠিক নয় কি?
একশোবার ঠিক! হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নায়ক মনে মনে বললে। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে তার। এখন আর ছোট থাপারকে অত খারাপ বলে মনে হচ্ছে না। বাইরে থেকে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। মানুষটাকে এখন বেশ সহৃদয়, বেশ মাইডিয়ার মনে হচ্ছে।
মুক্তা আস্তে আস্তে বললে, সবার আশা সমান উঁচু হয় না মিস্টার থাপার।
তা হতে পারে। কিন্তু সুখে—শান্তিতে থাকতে কে না চায় বলুন? আপনিও কি চান না?—মিস বোস আপনাকে আরেকটু অরেঞ্জ দিক, কেমন?
কথাবার্তা চলতে লাগল। সমাজতন্ত্র থেকে ফিল্ম। ফিল্ম থেকে কলকাতার আবহাওয়া। বেয়ারা মাঝে মাঝে গ্লাস বদলে দিয়ে যাচ্ছে। বক্তা এখন থাপার আর নায়ক দুজনে কথা মুক্তা ঝিম হয়ে শুনছে।
ছোট থাপার এবার মজার গল্প? দিল। ওদের জার্মানিতে পানীতে গিয়ে একবার কি রকম বিপদে পড়েছিল সেই ঘটনা বিপদ হয়েছিল একটা সুট বানাতে। ট্যাক্সিতে উঠে থাপার বলল, চলো দর্জির দোকানে নিয়ে চলো। কিন্তু মুশকিল হল যে জার্মান ভাষা জানে না, আর ট্যাক্সিওয়ালা ইংরেজি জানে না। থাপার তাকে যত বোঝাতে চেষ্টা করে, সে ততই বলে, হের—র—র—ঘোঁৎ!
মুক্তার কি হল কে জানে, হঠাৎ হেসে উঠল। প্রথমে মৃদু মৃদু, ক্রমশ উচ্চচগ্রামে। তারপর হাসি আর থামতে চায় না।
অবাক হয়ে চেয়ে রইল নায়ক। মুক্তাকে এমন বেসামালভাবে হাসতে আগে কখনো দেখেনি। হাসির ধমকে তার শরীরের জ্যামিতিক রেখাগুলো আরো বেঁকেচুরে যাচ্ছে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছে। তবু হাসছে। তারপর একসময় হাসি থামিয়ে হেঁচকি তুলতে শুরু করলে।
তার গায়ে একটা ঝাঁকানি দিয়ে নায়ক বললে, কি হল মুক্তা? শরীর খারাপ লাগছে?
উঁহু, আমি ঠিক আছি।
মুক্তার কথাগুলো জড়ানো।
নায়ক বললে, না, ঠিক নেই। চলো, বাড়ি চলো।
বাড়ি? চলো।
উঠতে গিয়ে মুক্তা সোফার ওপর টলে পড়ল।
তাকে আরেকটা ঝাঁকানি দিয়ে নায়ক ডাকলে, মুক্তা!
ছোট থাপার বললে, ব্যস্ত হয়ো না। একটা কাজ করো, মিস বোসকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দাও। খানিকক্ষণ রেস্ট নিলেই সামলে উঠবে।
একটা বিশ্রী সন্দেহে নায়কের মনটা বিগড়ে গিয়েছিল। সরাসরি প্রশ্ন করলে, কি খাইয়েছেন ওকে?
বিশেষ কিছু নয়।—হালকা গলায় ছোট থাপার বললে, অরেঞ্জের সঙ্গে একটু জিন আর ভারমুথ মেশানো ছিল। ওইটুকুতেই যে আউট হয়ে যাবে, কে জানত!
একটু গুম হয়ে থেকে নায়ক বললে, ওকে না খাওয়ালেই পারতেন। একেবারে অনভ্যস্ত।
তাই নাকি! কি করে জানব বল? পার্টিতে দেখেছি, মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে বেশি অভ্যস্ত। যাই হোক, রেস্ট দাও, ঠিক হয়ে যাবে।
বিশ্রাম দেওয়া ছাড়া এখন আর উপায় কি? মুক্তার চোখ দুটো বার বার বুজে আসছে। তাকে তুলে ধরে, আস্তে আস্তে পাশের ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিলে নায়ক। থাপার পাখাটা খুলে একটা নীলাভ ল্যাম্প জ্বেলে দিলে।
ড্রইংরুমে ফিরে এসে ছোট থাপার ধীরে—সুস্থে নিজের চতুর্থ গ্লাসটা খালি করলে। তারপর পাইপটা ধরিয়ে বললে, অনর্থক দেরি করে লাভ কি? ডিনারটা খেয়ে নাও। তোমাকে তো অনেকটা পথ যেতে হবে।
একটা সিগারেট মুখে গুঁজে নায়ক বললে, মুক্তা একটু সামলে উঠলেই আমরা যাব।
হেসে উঠে ছোট থাপার বললে, বলছ কী! ঘড়িটা দেখেছ? রাত পৌনে বারোটায় একজন মাতাল মেয়ে নিয়ে তুমি কোথায় যাবে? মিস বোসকে ঘুমোতে দাও, কাল সকালে আমি ওকে পৌঁছে দিয়ে আসব।
নায়কের ঠোঁট থেকে সিগারেট খসে পড়ল।
কাল পৌঁছে দেবেন! না, না, তা হয় না।
কেন, হবে না কেন?
নায়কের ভদ্র মনের জবাবটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল: মুক্তা আমার ওপর বিশ্বাস করে এসেছে।
আরেকবার হেসে উঠল ছোট থাপার। বললে, তুমি বড় বেশি সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়ছ! যা বলছি শোনো। মিস বোসের ভার আমার, তুমি নির্ভাবনায় চলে যেতে পারো।
এরপর পরিপাটি ডিনার খেয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো নায়কের চলে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু তা হল না। তার বিবেক—বুদ্ধি বললে, মুক্তা একটি ভদ্রঘরের মেয়ে—সরল বিশ্বাসে তোমার সঙ্গে এসেছে, একটা মাংসাশী জানোয়ারের মুখে তাকে ফেলে রেখে যাওয়া উচিত হবে কি?
হুইস্কি বোধ হয় তরুণ বয়সকে দুঃসাহসী করে তোলে, পৌরুষকে জোর দেয়। নায়কের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল। শার্টের আস্তিন একটু তুলে সে উঠে দাঁড়াল। থাপারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে স্পষ্ট জোরালো গলায় বললে, না। ওকে আমি নিয়ে যাবই।
একটুও চটল না ছোট থাপার। খুব শান্তভাবেই বললে, নিয়ে যাবে? বেশ তো, নিয়ে যাও। আমার গাড়িটা তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসুক।
এতটা ভদ্রতা আশা করেনি নায়ক। পাশের ঘরের দিকে এগোতে যাবে, ছোট থাপার আবার ডাকলে, হ্যাঁ, ভালো কথা, তোমার ফাইলটা আমার টেবিলে এসেছে। কিন্তু ভেবে দেখলাম, মাসে সাড়ে আটশো করে বাড়তি খরচ করার অবস্থা এখন অফিসের নয়। পরে দেখা যাবে।
নায়কের পা দুটো কার্পেটের ওপর আটকে গেল। সে লক্ষ করলে, ছোট থাপারের ঠোঁটের কোনায় আর ছোট ছোট চোখের তারায় সেই কৌতুক চিকচিক করছে—নগণ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটা মারাত্মক চাল দিয়ে পাকা দাবা—খেলোয়াড় যে কৌতুক উপভোগ করে।
চুপ করে গেল ভদ্র মন। বোবা হয়ে গেল বিবেক—বুদ্ধি। শুধু বাজতে লাগল সাড়ে আটশো টাকার ঝনঝন আওয়াজ। কার্পেটের দিকে তাকিয়ে বাধ্য বিনীত ভঙ্গিতে নায়ক বললে, আমিও ভেবে দেখছি স্যার, এত রাতে ওকে নিয়ে না যাওয়াই ভালো। গুডনাইট স্যার!
গুডনাইট! গাড়িটা নিচেই আছে।
নায়ক আর দাঁড়াল না।
পরের মাসেই প্রমোশন হয়ে গেল নায়কের। আপার গ্রেড ক্লার্ক থেকে এক লাফে অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার। এখানেই কি থেমে থাকবে? কে বলতে পারে সে একদিন অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে অফিস—সুপারভাইজার হবে না? সেখান থেকে বিজনেস ম্যানেজারের চেয়ারে বসবে না? পাঁচশো থেকে সাড়ে আটশো, তারপর দেড় হাজার, তারও পরে আড়াই হাজার—বিলেতি পাড়ায় ঝকঝকে ফ্ল্যাট, চকচকে গাড়ি। শুধু সুযোগের অপেক্ষা। আর, 'সুযোগ হচ্ছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ—যাদু—ই—চিরাগ, যা পেলে সুখের দুনিয়া তোমারই হাতের মুঠোয়!'
এই জ্ঞান তো তার 'বস'ই দিয়েছে। গুরু বলে মানতে হয় ছোট থাপারকে।
মুক্তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। দিন কয়েক বাদে দোকানে গিয়ে জেনেছিল, সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। না, টালিগঞ্জের বিধান কলোনিতে নায়ক যায়নি। কী হবে আর দেখা করে? পুরানো আলাপের জের টেনে? হতে পারে মুক্তা তাকে ভালোবেসেছিল। তারও ভালো লেগেছিল মুক্তার সেই কানায় কানায় ভরা দীর্ঘছন্দ দেহটাকে—হয়তো ভালোও বেসেছিল তাকে। কিন্তু বাসলেই বা! ভালোবাসা তো স্ট্যাম্প—মারা কাগজের ওপর সই—করা চুক্তি নয়। সত্যি কথাই বলেছে তার গুরু, 'দুনিয়ায় লাভটাই বড়—নীতি—টিতি কিছু নয়!' ইংরেজি লাভ নয়, সাদামাটা বাংলা লাভ। সেই লাভের সুযোগ কখনো ছেড়ে দেওয়া যায়?
অতএব চুপ করুক ভদ্র মন। বোবা হয়ে থাক বিবেক—বুদ্ধি। আমাকে উন্নতির ধাপে ধাপে উঠে যেতে দাও। আগে সুখের দুনিয়া হাতের মুঠোয় আসতে দাও, ভালোবাসা—টাসা তার পরে।
নায়ক ভেবে দেখলে, মুক্তার কোনো ক্ষতি সে করেনি, বরং ভালোই করেছে। কোটিপতি ছোট থাপারের প্রসন্নতায় তারও জীবনে যথেষ্ট লাভের সম্ভাবনা। মুক্তা নিশ্চয় তা বুঝবে।
মুক্তার কথা ভাবতে ভাবতেই একদিন নায়কের জীবন থেকে মুক্তা—পর্ব মুছে গেল।
দূর্বা
আমাদের গল্পকে আরো এগোতে দিন। আসুন, খেই ধরে আমরা বসে থাকি, গল্প এগিয়ে চলুক নিজের গতিতে—নিজের পথে।
মুক্তা চলে গেল, তাই বলে কি রঙ্গমঞ্চ অন্ধকার থাকবে? আজকের দিনে তা হয় না। আজকাল পরিবার পরিকল্পনার চেষ্টা যতই জোরদার হচ্ছে, গোটা পৃথিবীর লোকসংখ্যা ততই ফুলে—ফেঁপে উঠছে—ভারতবর্ষে তো বটেই। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আর কুলোয় না, পথে—ঘাটে উপছে পড়ছে জনতার ওভারফ্লো—অতিরিক্ত প্রাচুর্য। এটা তাই জনতার যুগ—জনগণের যুগ। পথে—ঘাটে যেমন গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি, ঠেসাঠেসি, এ যুগের নাটকেও তেমনি বহুর ভিড়। এক নায়ক এক নায়িকার দিন আর নেই, আজকের জীবননাট্যে বহু নায়ক, বহু নায়িকা। একজনের প্রস্থান, আরেকজনের প্রবেশ। অতএব একটি মুক্তা চলে গেছে বলে রঙ্গমঞ্চের বাতি নিভবে না। আমাদের গল্পও থামবে না।
মাস গেল, বছর গেল। আমাদের নায়ক এখন অফিসার গ্রেডের। ছোট থাপারের হাতের লোক। কালীঘাটের নেপাল ভটচায্যি লেন থেকে বাসা বদল করেছে। সাড়ে আটশো টাকা মাইনেতে ক্যামাক স্ট্রিস্টে ফ্ল্যাট নেওয়া যায় না, তাই নিউ আলিপুরে দেড় কামরার একটা ছিমছাম ফ্ল্যাট নিয়েছে। সুটের কাপড় টেরিকটন থেকে টেরিলিনে, আর সিগারেটের ব্র্যান্ড উইলস থেকে রিজেন্টে পৌঁছেছে।
ভালোই আছে নায়ক। এই একটা বছরে তার জীবনে দু'—চারটি নতুন বান্ধবীর আনাগোনা কি আর হয়নি? হয়েছে। তবে তারা 'ক্ষণিকের অতিথি'। জীবনের চলতি বাসে তারা মাত্র দু'—চারটে স্টপেজ সঙ্গে ছিল। তারা নায়িকা নয়, পার্শ্বচরিত্র।
দ্বিতীয় নায়িকা এল আরো মাস কয়েক বাদে।
কিন্তু আমাদের গল্পে দ্বিতীয় নায়িকা আসবার আগে তাকেও একটা নামের চিহ্ন দেওয়া দরকার। নইলে সে শুধুই একটি মেয়ে হয়ে থাকবে, নায়িকা বলে চেনা যাবে না। একমুঠো নতুন দূর্বা ঘাসের মতো নরম ছোটখাটো একটি মেয়ে। গায়ের রঙটাও স্নিগ্ধ শ্যাম। তার নাম দেওয়া যাক দূর্বা—দূর্বা সোম।
এইবার চলুন থাপার ট্রেডিংয়ের অফিসে। ঠিক অফিসে নয়, অফিস—স্টাফের ক্লাব—ঘরে। যেখানে কয়েকদিন ধরে সন্ধ্যার পর নাটকের মহলা চলছে। প্রতি বছরের মতো এবারও অফিসের রিক্রিয়েশান ক্লাব থিয়েটার করবে। এ বছর ব্যবস্থাপনার ভার পড়েছে আমাদের নায়কের ওপর।
অফিসের ক্লাব—ঘরেই নায়কের সঙ্গে দূর্বা সোমের আলাপ। নাটকের হিরোইনের ভূমিকার জন্য যখন দূর্বা সোমের নাম করা হয়েছিল, নায়কের তখন আদপেই মনে ধরেনি। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিল, কী সব আজেবাজে আর্টিস্ট নিচ্ছ তোমরা! থিয়েটার যদি ভালো করে করতে হয় তো নাম—করা ফিমেল নাও। আমি না হয় ছোট থাপারকে বলে কিছু বেশি টাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।
নাটকের ডিরেক্টর অনিল চৌধুরি বলেছিল, না হে, দূর্বা সোমের অভিনয় তুমি দেখনি, তাই বলছ। মেয়েটা উঠতি হিরোইন, চেহারাটাও ভালো, অ্যাকটিংও করে চাবুকের মতো! বাজারে ডিম্যান্ড হচ্ছে।
ডিরেক্টরের ওপর কিছু বলা চলে না। থিয়েটার ব্যাপারে নায়কেরও তেমন মাথাব্যথা ছিল না। রিহার্সালেও সে যেত না।
ডিরেক্টর একদিন নায়ককে পাকড়াও করলে। বললে, প্রোডাকশনের ভার নিয়েছ, অথচ তোমার পাত্তাই নেই! ডোবাবে নাকি হে? রিহার্সালে এসো একদিন।
পরদিন ছুটির পর নায়ক ক্লাব—ঘরে হাজির হল। নাটকের মহলা তখন সবে শুরু হয়েছে। ডিরেক্টর একখানা ফর্দ তার হাতে দিয়ে বললে, এই সেটি প্রপার্টি আর কস্টিউমের লিস্ট। সব ঠিকঠাক রেডি থাকে যেন। দেখো দাদা, ডুবিও না শেষটায়!—ভালো কথা, এসো আলাপ করিয়ে দিই। ইনিই দূর্বা সোম, আর ইনি আমাদের বড় অফিসার—থিয়েটারের ব্যবস্থাপক।
মামুলি সৌজন্যের মৃদু হাসি আর নমস্কার বদল হল। নায়ক দেখলে, অল্পবয়সী ফর্সা একটি মেয়ে, মাথায় একটু খাটো, চেহারায় কেমন একটা পুতুল—পুতুল ভাব। মস্তবড় এলো খোঁপা, আর মস্তবড় একজোড়া শান্ত চোখ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষত্ব নায়কের চোখে পড়ল না। তবে সাজপোশাকে বিশেষত্ব আছে বটে। পরনে খয়েরি—পাড় শাদা তাঁতের শাড়ি আর শাদা ব্লাউজ। গলায় সোনার সুতলি—হার ছাড়া অলঙ্কারের বালাই নেই। নেই প্রসাধনের পারিপাট্য, কসমেটিকের ব্যবহার।
আশ্চর্য বোধ করলে নায়ক। আলুনি আলুভাতের মতো সাত্ত্বিক চেহারার এই মেয়েটিই দূর্বা সোম, হাল জমানার উঠতি নায়িকা! যার নামে ডিরেক্টরেরা মূর্ছা যায়!
সহকর্মীদের পাল্লায় পড়ে নায়ককে সেদিন অনেকক্ষণ থাকতে হয়েছিল ক্লাব—ঘরে। দেখতে হয়েছিল অনেকটা রিহার্সাল। সেদিক দিয়েও দূর্বা হতাশ করলে নায়ককে। নায়িকা—চরিত্রের কথাগুলো আউড়ে গেল শুধু, জীবনের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল না জীবনের উত্তাপ! যাবার সময় ডিরেক্টরকে বলে গেল নায়ক, ডোবায় যদি, আমি নয়, দূর্বা সোমই তোমাদের ডোবাবে।
কিন্তু নায়কের সমস্ত হিসেবে গোলমাল হয়ে গেল অভিনয়ের দিন।
স্টেজের সামনে দ্বিতীয় সারির আসনে বসেছিল নায়ক। দেখলে, নায়িকার সাজে দূর্বা সোম ফুটলাইটের আলোয় ঝলমল করছে! তার চলায় প্রাণের উত্তাপ, দীর্ঘায়ত চোখে কখনো মেঘ, কখনো দূর্বা সোমকে নায়ক ক্লাব—ঘরের মহলায় দেখে নি। সে একটা মানুষ যে আগাগোড়াই বদলে যায়, কে জানত! মেয়ের মধ্যেও যে এতখানি আগুন লুকিয়ে থাকতে পারে হতেই পারেনি। নায়কের মনে হল, কোন মেয়ের মধ্যে ফুলকি না রইল, তবে সে মেয়ে কিসে? রূপ নয়, সেই কিই তাকে করে তোলে পুরুষের কামিনী, প্রেমিকের।
উনত্রিশ আবার নেশা লাগল। এবার আগুন নিয়ে খেলার।
অ্যামেচার রাং নাটক শেষ হতে রাত এগারোটা হল। আর্টিস্টদের গাড়ির অবস্থা ছিল, তবু ব্যবস্থাপক নিজেই হিরোইনকে ভার নিলে।
গাড়িতে উঠে 'রুণ অ্যাকটিং করেছেন আপনি! এত ভালো অভিনয় দেখিনি।
দূর্বা সোম একটু ন বলে শুধু। কথা সে কমই বলে। নায়ক দেখলে, এ সেই সোম। পরনে খয়েরি—পাড় শাদা শাড়ি আর ব্লাউজ, মুখে এখন আর প্রাণের উত্তাপ নেই, বড় বড় অতি হয়ে গেছে জীবনের ভাষা।
নায়ক আবার বললে, আপনার অভিনয় এই প্রথম দেখলাম। ভবিষ্যতে কোথায় আপনার প্লে আছে জানাবেন, দেখার আগ্রহ রইল।
জানাব। —ছোট্ট উত্তর দিলে দূর্বা।
তারপর চুপচাপ।
একটু পরে নায়ক বললে, ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়?
না, এমন কিছু নয়।
আপনার রিহার্সাল দেখে কিন্তু বুঝতে পারিনি যে আপনার অভিনয় এত সুন্দর হবে। আমি অবশ্য ক্রিটিক নই, তবু আমার মনে হয়, রোম্যান্টিক সিনটায় আপনাব অভিনয় বেস্ট! এত ফ্রী, এত বাস্তব! আচ্ছা, কী করে এমন অভিনয় করেন বলুন তো?
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রইল নায়ক। কোনো জবাব এল না। নায়ক পাশে তাকিয়ে দেখলে, রাস্তার দিকে চেয়ে আছে দূর্বা সোম। সত্যিই ক্লান্ত, না নিন খেতে চায়?
মোটর .... এসে পড়েছে।
..... আর কোথায় যেন আপনার বাড়ি?
পেয়ারাবাগান লেনে।
একটা গলির মুখে গাড়ি আসতেই দূর্বা বললে, গাড়ি এখানে থাক।
কেন? গলিটা তো বেশ চওড়া। ভেতরেই যাক না।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে দূর্বা বললে, আমি এইখানেই নামব। বাড়ি কাছেই।
কত নম্বর?
নামতে নামতে দূর্বা বললে, তিন বাই একের বি।
তারপর ছোট্ট একটা নমস্কার জানিয়ে গলির অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
সেদিন ওই পর্যন্ত।
কিন্তু আবার দেখা হল কিছুদিনের মধ্যেই। মানিকতলার সেই পেয়ারাবাগান লেন, সেই তিন বাই একের বি নম্বর। সন্ধ্যার পর নায়ক একদিন গেল। যাওয়ার একটা উপলক্ষও ছিল।
পুরানো আমলের ছোট দোতলা বাড়ি। একতলায় অন্য পরিবার, দূর্বারা থাকে দোতলায়। দোতলার দরজার কড়া নাড়তেই খুলে দিলেন চশমা—চোখে রোগা এক বৃদ্ধ।
কে?
দূর্বা সোম আছেন?
চশমাটা কপালে তুলে ভদ্রলোক একবার দেখলেন নায়ককে। তারপর বললেন, কোত্থেকে আসছেন?
আমি আসছি একটি অফিস—ক্লাবের থিয়েটার সম্পর্কে।
চশমাটা আবার যথাস্থানে নামিয়ে বৃদ্ধ বললেন, অ! তা দূর্বা তো এখন ঘরে নেই, কোথায় যেন থিয়েটারের ব্যাপারেই গেছে।
আচ্ছা, তাহলে এখন যাই।
যাবেন কেন? বৃদ্ধ বললেন, তার আসবার সময় হয়েছে, আপনি বরং ঘরে এসে বসুন। আমি দূর্বার জ্যাঠামশাই
একফালি বারান্দা পার হয়ে নায়ককে তিনি নিজের ঘরেই বসালেন। সেকেলে মানুষের সেকেলে ঘর। প্রাচীন একখানা একানে খাট, আলনা, টুলের ওপর একটা তোরঙ্গ, তার ওপর সুটকেশ, আর সাধারণ একখানা টেবিলের দু'—পাশে পিঠ—উঁচু দু'খানা চেয়ার। টেবিলে একটা দাবার ছক পাতা। ভদ্রলোক বোধ হয় একাই খেলছিলেন।
হবে নাকি একহাত? প্রসন্ন হেসে জিজ্ঞেস করলেন দূর্বার জ্যাঠামশাই। সমুখের একটা দাঁত পড়ে গিয়ে হাসিটাকে প্রসন্নতর করেছে।
নায়ক একটু কিন্তু হয়ে বললে, দাবা আমি জানি নে।
জ্যাঠামশাই স্বচ্ছন্দে বললেন, জানেন না! আসুন, শিখিয়ে দিই! জগৎ—সংসারটাই তো একটা দাবার ছক! শিখে রাখা ভালো, বুঝলেন?
নতুন করে ঘুটি সাজাতে লাগলেন জ্যাঠামশাই। আর, খেলা শেখানোর ফাঁকে ফাঁকে সেরে নিলেন পরস্পরের পরিচয়। জ্যাঠামশাই চিরকুমার, এক সময় পোস্টমাস্টার ছিলেন, এখন বছর পাঁচেক হল রিটায়ার করেছেন। ছোট ভায়ের দুই ছেলেমেয়ে দূর্বা আর ভুলুকে নিয়েই তাঁর সংসার। ভুলু বি. এস. সি. পর্যন্ত পড়েছিল, এখন সে পার্টি করে বেড়ায়। মধ্যে মধ্যে পুলিশ আসে, কিন্তু ভুলু বোড়ের চাল দিয়ে সরে পড়ে। পুলিশ মাত হয়ে ফিরে যায়। বাড়িটা নিজেদের, একতলাটা ভাড়া দিয়ে আর রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার জ্যাঠামশায়ের একশো দশ টাকা পেনসনে সংসারটা চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আজ বছর দেড়েক নিচের ভাড়াটের চাকরি নেই, ভাড়া দিতে পারছে না। তা পারছে না বলে তো আর তাড়িয়ে দেওয়া যায় না। জীবনে এক—আধবার মাত সকলেই হয়। তাই সংসার—দাবায় নৌকো বাঁচাবার জন্যে দূর্বা অভিনয়কে পেশা করে নিয়েছে।
নায়ক বুঝলে, দাবাভক্ত বৃদ্ধ সব কথাই দাবার ভাষায় বলেন, সব ভাবনাই দাবার চালে ভাবেন। জ্যাঠামশাই বলতে লাগলেন, পাড়ার অনেকে অনেক কথা বলে, কিন্তু জ্যাঠামশাই জানেন তাঁর দূর্বা বড় সৎ মেয়ে। দূর্বার গায়ে আকাশের রোদ আর শিশির ছাড়া কোনোদিনই ধুলো লাগবে না!—ওকি হল? ঘোড়ার চাল দিলে আপনার গজ মারা পড়বে যে!
আবার দাবায় বসেছ জ্যাঠামণি?
দুজনের চোখ দাবার ছক থেকে ঘরের দরজার ওপর সরে গেল। দাঁত—পড়া মুখে প্রসন্ন হেসে জ্যাঠামশাই বললেন, দূর্বা এসেছিস! আয়। বেড়াতে বেরোব ভাবছিলাম, এই ভদ্রলোক এসে পড়লেন।
আর, তুমি অমনি দাবার ক্লাসে ভর্তি করে নিলে!—দূর্বা বললে।
দাঁত—পড়া মুখ আরো প্রসন্ন করে জ্যাঠামশাই বললেন, শিখে রাখা ভালো, বুঝলি মা? জগৎ—সংসারটাই যে দাবার ছক!
দূর্বা এবার নায়কের দিকে তাকাল। পুতুল—পুতুল মুখে হাসির আভাস এনে প্রশ্ন করলে, আপনি হঠাৎ?
একটা কাজের খবর নিয়ে এসেছি।—নায়ক বললে।
কি কাজ?
চৌধুরি অ্যান্ড চৌধুরির অফিস—ক্লাব তাদের থিয়েটারে আপনাকে চায়।
প্লে কবে?
আসছে মাসের সাতাশে।
জ্যাঠামশাই বললেন, কথা পরে বলিস দূর্বা, আগে ওনাকে চা—টা দে। আর আমাকেও একটু—
গম্ভীর মুখে দূর্বা বললে, তোমাকে হরলিকস।
নিতান্ত বাধ্য ছেলের মতো জ্যাঠামশাই বলে উঠলেন, ঠিক! হরলিকসই ভালো। চা অতি অনিষ্টকর, কেন যে লোকে খায়!
কষ্টে হাসি চাপলে নায়ক। দূর্বাকে জিজ্ঞেস করলে, সাতাশে আপনি ফ্রি আছেন?
আসুন, ডায়েরি দেখে বলছি।
ঢাকা বারান্দায় চা ঢালতে ঢালতে দূর্বা বললে, হ্যাঁ, সাতাশে আমি ফ্রি আছি।
ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে বারান্দায়। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে দূর্বার কপালের রুখু চুল আর গায়ের আঁচল। সেদিকে তাকিয়ে নায়ক বললে, আর একটা কথা। ওদের কাছে বলেছি, আপনার ফি তিনশো।
চায়ে চিনি মেশাতে মেশাতে দূর্বা বললে, বাড়িয়ে বললেন কেন? আপনি তো জানেন, আমি অত টাকা পাই না।
নায়ক বললে, অ্যামেচার থিয়েটার—মহলে আপনার নাম হয়েছে। এখনো দেড়শো টাকায় পড়ে থাকবেন? নিজে না বাড়ালে রেট কখনো বাড়ে না দূর্বা দেবী। জীবনে নামের সঙ্গে সঙ্গে দামেরও প্রয়োজন আছে বইকি।
হরলিকসের কাপটায় চামচ নাড়তে নাড়তে দূর্বা প্রশ্ন করে বসল, আপনি হঠাৎ আমার উপকার করতে গেলেন কেন?
প্রশ্নটা অশোভন, কিন্তু দূর্বার পুতুল—পুতুল মুখে অতিশয় সরল মনে হল। নায়ক অল্প হেসে বললে, অন্যায় করেছি কি? মনে করুন না, আমি আপনার বন্ধু।
বন্ধু তো সবাই।—ঠান্ডা গলায় দূর্বা বললে।
তবে না হয় আমাকে আত্মীয় মনে করুন।
আত্মীয় কোন সম্পর্কে?
নায়ক বললে, আত্মীয়তা কি শুধু রক্তের সম্পর্কেই হয়? মনের সম্পর্কে নয়? আপনাদের ছোট্ট পরিবারকে আমার ভালো লেগেছে। বিশেষ করে চমৎকার মানুষ আপনার জ্যাঠামশাই!
জ্যাঠামণির মতো মানুষ হয় না। আস্তে আস্তে দূর্বা বললে।
আর, আপনার মতো এত সাদাসিধে মেয়েও বড় একটা দেখিনি। তাই আপনাদের সহজেই আপন মনে হয়েছে—আপনাকে বন্ধু বলে ভেবেছি। দোষ হয়ে থাকলে কিছু মনে করবেন না।
অপ্রস্তুত হয়ে গেল দূর্বা। বললে, না, না, দোষ হবে কেন?—একটু বসুন, হরলিকসটা জ্যাঠামণিকে দিয়ে আসি।
দূর্বা ফিরে এলে নায়ক বললে, তাহলে চৌধুরি অ্যান্ড চৌধুরিকে জানিয়ে দিই যে কাজটা আপনি নিলেন?
ঘাড় নেড়ে দূর্বা জিজ্ঞেস করলে, রিহার্সাল কোথায় হবে? ঠিকানাটা দিয়ে যান।
ঠিকানা কি হবে? আমি এসে নিয়ে যাব।
কেন কষ্ট করবেন? আমি নিজেই চিনে যেতে পারব।
নায়ক বললে, তা পারবেন জানি। কিন্তু মনে হচ্ছে, এখনো আমাকে বন্ধু বলে ভাবতে পারেননি। বিংশ শতাব্দীর মেয়ে হয়েও কোথায় যেন সংস্কারে আটকাচ্ছে, তাই না?
হেসে ফেললে দূর্বা। হাসলে ওর ফুলো ফুলো গালে টোল পড়ে। বললে, আপনি ভীষণ জেদি মানুষ দেখছি! আচ্ছা, আপনার সঙ্গেই না হয় যাব।
হাসিমুখে নায়ক বললে, এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা।
উনত্রিশ বছরের যৌবন প্রশ্ন করলে, আমার সঙ্গে কতদূর যেতে পারবে দূর্বা? যতদূর আমি নিয়ে যাব, ততদূর যেতে পারবে কি?
দূর্বা বললে, রিহার্সাল কবে?
যাবার জন্যে উঠে পড়ে নায়ক বললে, আপনার জ্যাঠামশায়ের দাবার ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। প্রায়ই আমাকে আসতে হবে। সময়মতো খবর দেব।
এরপর থেকে নায়কের দিনের রুটিন হয়ে দাঁড়াল দূর্বাদের বাড়ি যাওয়া। ঘণ্টাখানেক দাবার ক্লাসে, তারপর দূর্বার সঙ্গে ঢাকা বারান্দায়। ময়দানে নয়, সিনেমায় নয়, রেস্তোরাঁয় নয়—শুধু পুবের সেই একটুকরো ঢাকা বারান্দায়।
বারান্দায় বসলে একফালি আকাশে তারা দেখা যায়, কুণ্ডুদের চিলেকোঠার পাশ দিয়ে চাঁদ মুখ বাড়ায়। দক্ষিণ ঘুরে ফুরফুরে শৌখিন হাওয়া খামখেয়ালে ঢুকে পড়ে আর দূর্বার টবের বেলকুঁড়ি শিউরে ওঠে।
ঢাকা বারান্দায় স্টোভ জ্বেলে দূর্বা চা করে, রান্না করে, আর গল্প করে। তার সেই ঠান্ডা আড়ষ্টতা একটু একটু করে অনেকটা কেটে গেছে। খোলসের ভেতর থেকে শামুক মুখ বাড়ায় আজকাল। চাপা প্রকৃতির মেয়ে দূর্বার ভেতর থেকে তেইশ—চব্বিশ বছরের একটি যুবতী মাঝে মাঝে উঁকি দেয়।
সন্ধ্যার পর গা ধোয়া অভ্যাস দূর্বার, হালকা করে পাউডার ছাড়া আর কোনো অঙ্গরাগ সে ব্যবহার করে না। কোনোমতে জড়ানো এলোখোঁপায় কখনো—সখনো গুঁজে রাখে দুটো বেলফুল। দেখে দেখে নায়কের ভদ্র মন বলে ওঠে, বাঃ! যেন কোন পল্লি—কবির তৈরি একটা প্রেমের গান!
আবার যখন মেঝেয় বসে বঁটিতে আনাজ কুটতে থাকে, তখন ব্লাউজের ফাঁকে তেইশ বছর বয়সটাকে দেখে নায়কের উনত্রিশ বছরের যৌবন তারিফ করে বলে, বাঃ! যেন ওমর খৈয়ামের হাতের এক পেয়ালা নেশা!
পাঠক, আমাদের গল্প মাস কয়েক ধরে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে দূর্বাদের সেই ঢাকা বারান্দায়। নায়ক মাঝে মাঝে বলে, এই ছোট্ট বাড়ির খাঁচাটার মধ্যে কি আছে বলো তো? এখান থেকে নড়তে চাও না কেন?
নিতান্ত উদাসীনের মতো দূর্বা বলে, কোথায় যাব?
চলো না, কোথাও বেড়িয়ে আসি। কোনো ফাঁকা জায়গায়।
স্টোভে তরকারি চাপিয়ে দূর্বা জবাব দেয়, এই তো বেশ।
একদিন কিন্তু দেখা গেল, দূর্বা ছোট একটা সুটকেশে জামা—কাপড় গুছিয়ে রাখছে।
নায়ক জিজ্ঞেস করলে, কি ব্যাপার?
রঙ্গরূপা দলের সঙ্গে খড়্গপুরে যাচ্ছি। প্লে আছে।
খাঁচার দরজা খুলল তাহলে! ক'দিনের জন্যে যাচ্ছ?
দু'দিন থিয়েটার।
এ দু'দিন আমি কি করব? একদম বেকার হয়ে যাব যে!
হেসে দূর্বা বললে, জ্যাঠামণির সঙ্গে দাবা খেলবে। তিনদিনের দিন সকালের ট্রেনেই তো ফিরছি।
দূর্বা চলে গেল খড়্গপুরে। তৃতীয় দিন ভোরবেলা রঙ্গরূপার ম্যানেজার দূর্বাকে বললে, আপনাকে এক ভদ্রলোক খুঁজছেন।
অবাক হয়ে গেল দূর্বা। খড়্গপুরে তার পরিচিত কেউ নেই। বাইরে এসে দেখলে নায়ক অপেক্ষা করছে!
নায়ক বললে, কলকাতা ভালো লাগল না। তাই অফিসে ছুটি নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ি ফিরবে তো চলো।
ছোট থাপারের তিনখানা মোটরের একখানা চেয়ে এনেছে নায়ক। ড্রাইভিং লাইসেন্স আগেই করানো ছিল। সুটকেশ নিয়ে এসে দূর্বা গাড়িতে উঠে বসল। গম্ভীর হয়ে বললে, এ পাগলামির কি দরকার ছিল? ওরা কি ভাবলে বলো তো?
কি ভাবলে ওরা? গাড়ি চালাতে চালাতে নায়ক জিজ্ঞেস করলে।
উত্তর দিলে না দূর্বা। পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার দিকে এক ঝলক চেয়ে নায়ক ভালো ছেলের মতো বললে, চলো, তোমাকে তাহলে ওদের কাছেই রেখে আসি।
হঠাৎ ব্রেক টিপে গাড়ি ঘোরাবার উপক্রম করলে নায়ক।
হেসে ফেলে দূর্বা বললে, আচ্ছা পাগল তো! আবার বুঝি ফিরে যাওয়া যায়?
অ্যাক্সিলিরেটর চেপে নায়ক বললে, তাহলে সামনের দিকেই এগনো যাক।
গাড়ি চল্লিশ মাইল স্পিড নিলে। চওড়া রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দু—পাশে দীর্ঘ গাছের সারি, পাতার ফাঁক দিয়ে সকালের ঝিলমিল রোদের টুকরো রাস্তাময় রুপোলি জরির কাজ করে রেখেছে। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায় নতুন জীবনের চঞ্চলতা। পাখি ডাকছে।
কেমন লাগছে সকালবেলাটা? প্রশ্ন করলে নায়ক।
গালে টোল পড়িয়ে মিষ্টি করে হাসলে দূর্বা। ভালো লাগছে—খুব ভালো লাগছে তার। নগর থেকে দূরে এসে পেয়ারাবাগানের সেই ছোট্ট বাড়ির খাঁচাটাকে ভুলে যাচ্ছে সে। ভুলে যাচ্ছে তার বাঁধা জীবনের রুটিন। জ্যাঠামণির হরলিকস তৈরি, রান্না, থিয়েটারের রিহার্সাল। খোলা আকাশের নিচে, ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায়, ধ্রুব ধাবমান পথের ওপর জীবনের একটা নতুন স্বাদ পাচ্ছে দূর্বা।
সমুদ্র দেখেছ কখনো? নায়ক জিজ্ঞেস করলে।
দূর্বা বললে, কবে আর দেখলাম!
দেখতে যাবে?
চোখ বড় বড় করে দূর্বা বললে, সমুদ্র! কোথায়?
নায়কের বলতে ইচ্ছে হল, তোমার আমার রক্তের মধ্যে।
মুখে বললে, চলো, দিঘা ঘুরে যাই।
একটা কটেজ ভাড়া নিলে নায়ক।
গাড়ির ক্যারিয়ারে বেতের বাক্স ছিল, তার মধ্যে রুটি, জ্যাম, ফল আর ফ্লাস্কে কফি। কটেজেই স্নান সেরে দুজনে ব্রেকফাস্ট করে নিলে। হোটেলে অর্ডার দিয়ে এল নায়ক, দুপুরবেলাটা কাটল খাওয়া—দাওয়ায়।
দুনিয়ার যেখানেই হোক, বাসা বাঁধা মেয়েদের স্বভাব। সে—বাসা নিতান্ত সাময়িক, নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী হলেও। দূর্বাও এরই মধ্যে গুছিয়ে ফেলেছে। একদিনের সংসার, রোদে মেলে দিয়েছে ভিজে শাড়ি আর তোয়ালে, ধুয়ে রেখেছে ব্রেকফাস্টের প্লেট আর কাপ। পেয়ারাবাগানের বাড়িতেও তাকে সংসার করতে দেখেছে নায়ক, কিন্তু মনে হল আজ দূর্বার সব কাজে একটা অশ্রুত সুর, খুশির ছন্দ রয়েছে। ভালো আজ নায়কেরও লাগছে। ব্যাচিলর সে, জীবনের অনেকখানি অংশ কেটেছে জীবনের সরাইখানায় পান্থ হিসাবে। নারীর এই ঘরোয়া রূপটা তার দেখা হয়নি। আজ সারাটা দিন সেও মনে মনে একটা ভিন্ন স্বাদ উপভোগ করছে। সে—স্বাদ শুধু মিষ্টি নয়, মাদকও বটে।
সারাটা দিন দূর্বার ঘুরে ঘুরে কাজ করা দেখছে সে। বারে বারে দেখছে তার যুবতী—দেহের চলন, দোলন, ছন্দ। আর মনের মধ্যে সেই মিষ্টি মাদক স্বাদ আরো তীব্র মাদক হয়ে উঠছে।
বিকেলে রোদ পড়ে এলে দুজনে সমুদ্রের ধারে গেল। অন্য ভ্রমণকারীদের থেকে বেশ খানিকটা তফাতে একটা নির্জন জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়ল বালির ওপর। আশপাশে ঝাউয়ের বন, বাতাসে অবিরাম অদ্ভুত শব্দ।
দূর্বার সমুদ্র দেখা এই প্রথম। সূর্যাস্তের সোনায় শান্ত জলের বিস্তার চিকচিক করছে, যতদূর চোখ যায়, ততদূর অবধি জলে আকাশে একাকার। চুপ করে চেয়ে রইল দূর্বা।
নায়ক প্রশ্ন করলে, সমুদ্র কেমন দেখছ?
মৃদু গলায় দূর্বা বললে, ভালোও লাগছে, আবার ভয়ও করছে!
ভয় কেন?
দূর্বা বললে, মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা এইখানে এসে যেন ফুরিয়ে গেছে!
হেসে উঠল নায়ক। বললে, ভারি ভিতু তুমি! যাক না পৃথিবী ফুরিয়ে, আমরা তো আর ফুরিয়ে যাইনি। আকাশের অসংখ্য গ্রহের মধ্যে পৃথিবী একটা ছোট্ট উপগ্রহ, আমরা না হয় অন্য কোনো গ্রহে চলে যাব।
দূর্বা বললে, বারে, বাড়ি ফিরতে হবে না বুঝি?
ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নায়ক বলে উঠল, হোপলেস! সমুদ্রের ধারে বসেও তুমি সেই পেয়ারাবাগানের খাঁচার কথা ভাবছ! সেই একটুকরো ঢাকা বারান্দা, রান্না, জ্যাঠামশায়ের হরলিকস, আর রিহার্সাল ছাড়া জীবনে কি আর কিছুই নেই?
কী—ই বা আছে?
দূর্বার গলাটা কেমন উদাস শোনাল।
নায়ক বললে, কী নেই? জীবনে অনেক সুখ, অনেক আনন্দ আছে—ভালোবাসবার, ভোগ করবার অনেক বস্তু আছে!
তেমনি গলায় দূর্বা বললে, ওসব আমার জন্যে নয়।
কেন নয়? কতই বা বয়স তোমার! জীবনে সুখের স্বাদ নেওয়ার এই তো সময়! কেন তুমি নিজেকে সরিয়ে রেখেছ দূর্বা? কেন ঠকাচ্ছ নিজেকে?
মুখ নিচু করে বালির ওপর আঁচড় কাটতে লাগল দূর্বা। একটু বাদে আস্তে আস্তে বললে, নিজেকে কেউ কি ঠকায়? আমার কথা তুমি কিছুই জানো না, জানলে বুঝতে আমিও নিজেকে ঠকাইনি—ঠকে গেছি কপাল দোষে।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নায়ক বললে, কি তোমার কথা? আমাকে বলা যায় না?
দূর্বা হঠাৎ মুখ তুলে বললে, আমি বিধবা।
খুব সহজভাবে নায়ক বললে, তাতে কি হয়েছে? আজকের সমাজে বিধবা বলে কিছু নেই। সিঁদুরের দাগ আজকাল এত ফিকে হয়ে এসেছে যে, মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখাই যায় না।
হেসে উঠে নায়ক আবার বললে, আমাদের সমাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। সংস্কারের চেয়ে মানুষের সুখের দাম এখন বেশি। স্বামী মরলে স্ত্রীকেও সারাটা জীবন মরে থাকতে হবে—এটা কোনো যুক্তি নয় দূর্বা।
দূর্বা বললে, কিন্তু আমার স্বামী বেঁচে থাকতেই আমি বিধবা।
সেকি! অবাক হয়ে গেল নায়ক।
নায়কের ওপর থেকে সমুদ্রের ওপর চোখ রাখেলে দূর্বা। বহু দূরে দৃষ্টি ভাসিয়ে বলতে লাগল, চার বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছিল। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে জ্যাঠামণি পাত্র পছন্দ করেছিলেন। বি. কম. পাস, স্বাস্থ্যবান চেহারা, ব্যবসা করে। পাত্রের বাপ—মা, আত্মীয়স্বজন সব বিদেশে থাকেন, বিয়ের সময় কেউ আসতে পারেননি। তাই ফুলশয্যাও আমাদের পেয়ারাবাগানের বাড়িতেই হল। পরের দিন ভোর থেকে আমার স্বামীকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। সেই সঙ্গে আমার গায়ের সমস্ত গয়নাও নিখোঁজ! মাসখানেক বাদে জানা গেল সে জেল খাটছে।
জেল খাটছে! কি জন্যে?
সে একজন দাগি ওয়াগন ব্রেকার ছিল। আরো বছরখানেক পরে খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছিলাম, জেল ভেঙে সে পালিয়েছে।
তারপর?
যেন বহুদূর থেকে ভেসে এল দূর্বার গলার স্বর, তারপর আর কিছু নেই। সে আর আসেনি।
নায়কের মনে পড়ল জ্যাঠামশাইয়ের সেই কথা, 'জগৎ—সংসারটাই তো একটা দাবার ছক!' দূর্গার জীবনের এই বিশ্রী ট্র্যাজেডির পর থেকেই তিনি হয়তো এই সত্যটা উপলব্ধি করেছেন।
তুমি কি তাকে ভালোবেসেছিলে দূর্বা? নায়ক জিজ্ঞেস করলে।
না। ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। স্বামীকে ভালোবাসতে কে না চায়?
এখনো তার জন্যে অপেক্ষা করে আছ?
না।
তবে? কামনা—বাসনা ত্যাগ করে নিজের মনটাকে গেরুয়া পরিয়ে রেখেছ কি জন্যে?
এই তো ভালো। আর ঠকবার ভয় নেই।—আস্তে আস্তে দূর্বা বললে।
নায়ক বললে, একটি মাত্র পুরুষ তোমাকে ঠেকিয়ে গেছে বলে এতবড় দুনিয়ার সমস্ত পুরুষকেই তুমি ঠকবাজ ভাবছ? তাই যদি ভাবো, তাহলে থিয়েটারের লাভ—সিন'এ অত ভালো অভিনয় করো কি করে?
এ প্রশ্ন তুমি আগেও করেছিলে!—একটু থেমে দূর্বা বললে, অভিনয়ের আগে মনে মনে আমি একজন পুরুষকে কল্পনা করে নিই, যে শুধু আমাকেই চায়, আমাকেই ভালোবাসে।
তেমন পুরুষ কি শুধু কল্পনা ছাড়া তোমার আশপাশে কোনোদিন দেখনি?
না, পুরুষদের সঙ্গে আমার পরিচয়টা থিয়েটার—মহলে, সেখানে যা দেখেছি, তা ভালোবাসা নয়।
দূর্বার আরো কাছে সরে বসল নায়ক। সমুদ্রের হাওয়ায় তার গালের পাশে চুল উড়ছে, পিঠের আঁচল উড়ছে। তার গায়ের পাউডারের একটা ক্ষীণ সুগন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সূর্য সবে ডুবেছে। ঠিক অন্ধকার নয়, অন্ধকারের আবেশ নামছে। সেই ছায়া—গোধূলির পরিবেশে সমুদ্রতীরে বসে নায়কের মনেও একটা অদ্ভুত আবেশের সঞ্চার হল। দূর্বার একখানা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে সে বললে, তেমন পুরুষ আছে দূর্বা—তোমার থিয়েটার—মহলের বাইরেই আছে—যে শুধু তোমাকেই চায়, শুধু তোমাকেই ভালোবাসে। জানো তুমি?
নায়কের মুঠির মধ্যে দূর্বার নরম হাত একবার কেঁপে উঠল। অস্পষ্ট গলায় বললে, জেনে কি হবে! সে হয়তো আজও বেঁচে আছে!
কে?
সেই লোকটা—দু'দিনের জন্যে যে আমার স্বামী হয়েছিল।
দূর্বার হাতখানা শক্ত করে ধরে নায়ক বললে, কিন্তু তোমার কাছে সে আজ মৃত। যেমন করে তুমি মাথার সিঁদুর মুছে ফেলেছ, তেমনি করে সেই ওয়াগন—ব্রেকারের নামটাও মুছে ফেলে দাও। তার কথা ভেবে তোমাকে আর অসুখী হয়ে থাকতে দেব না দূর্বা, আমি তোমাকে সুখী করব। তোমাকে আমি ভালোবেসেছি—অনেক, অনেক ভালোবেসেছি!
এমন কথা শোনা দূর্বার তেইশ বছরের জীবনে এই প্রথম। শুনতে শুনতে দূর্বার দেহের শিরা—স্নায়ুগুলো সব একসঙ্গে ঝংকার দিয়ে উঠল; শুধু হাতখানা নয়, সারা দেহটাই তার থরথর করে উঠল বাতাসে কাঁপা ঝাউপাতার মতো। একটা আশ্চর্য সুখের অনুভূতিকে প্রাণপণে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে করতে সে বলে উঠল, বোলো না—ওসব কথা বোলো না আমায়—
তার মুখের ওপর মুখ রেখে দুরন্ত হাওয়ার মতো নায়ক বলতে লাগল, বলব—আবার বলব—বার বার বলব: তোমায় আমি ভালোবেসেছি দূর্বা, অনেক—অনেক—অনেক ভালোবেসেছি!
হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল নায়কের কথা। দু'জোড়া তৃষ্ণার্ত ঠোঁট পরস্পরের সঙ্গে লেগে রইল। আর, উষ্ণ নিশ্বাসের শব্দ মিশে গেল ঝাউবনের নিশ্বাসে।
রাত কত, কে জানে।
ঘুমের পাখি আজ উড়ে গেছে, বাসা বাঁধেনি দু'চোখের পাতায়। দারুচিনির স্বাদের মতো মিষ্টি ঝাঁঝালো স্বাদে এখনো জ্বালা করছে ঠোঁট দু'খানা।
কটেজের বিছানায় একা শুয়ে দূর্বা। বিছানায় যেন কাঁকর ছড়ানো।
দূর্বা! দূর্বা!
কে ডাকছে? সমুদ্র? না, নিশি ডাকছে?
দূর্বা!
আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে বসল দূর্বা। না, সমুদ্র নয়, নিশি নয়, দূর্বা বুঝতে পেরেছে কার ডাক। ঝড় ডাকছে। যে—ঝড় ডাকাতের মতো এক মুহূর্তে তার সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাকে নিঃস্ব উলঙ্গ করে দেবে! না, সাড়া দেবে না দূর্বা। কিছুতেই খুলবে না তার দরজার আগল।
আবার শুয়ে পড়ল দূর্বা।
কিন্তু তেইশ বছর বয়সটা তার কানের পাশে বলতে লাগল, দরজা খুলে দিলে ক্ষতি কি? দেহটাকে যতই বিধবার সাজে সাজিয়ে রাখো, মনে মনে তুমি এই ঝড়কেই তো চেয়েছ! ওঠো, খুলে দাও আগল।
আবার উঠে বসল দূর্বা। কি করবে সে এখন? দরজা খুলবে? না, খুলবে না? আর, এই কথা ভাবতে ভাবতেই সে দরজার ছিটকিনি খুলে দিয়ে বিছানায় ফিরে এল।
অন্ধকারে একটা ছায়া—পুরুষ ঘরে ঢুকল। এগিয়ে এল বিছানার কাছে।
কাঁপা গলায় দূর্বা উচ্চচারণ করলে, কে?
তার জঙ্ঘার ওপর হাত রেখে আবছা গলায় নায়ক বললে, আমি।
একটা তীব্র মাদক রসে দূর্বার জিভ জড়িয়ে যাচ্ছে। সেই জড়ানো স্বরে সে শুধু বলতে পারল, না—
তারপর ঝড় উঠল। আর, সে—ঝড়ে দেহে—মনে নিঃশেষ হয়ে গেল দূর্বা।
দিঘা থেকে আবার পেয়ারাবাগানের গলি।
পরদিন নায়কের মোটর যখন গলির মুখে থামল, বেলা তখন প্রায় দুপুর। সারাটা পথ দূর্বা কথা বলেছে কম, চুপ করে থেকেছে বেশি। নায়কের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে চুপচাপ বসেছিল। যেন ওই একটিমাত্র পুরুষের ওপর নির্ভর করে দুনিয়ার শেষপ্রান্ত অবধি সে নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারে।
বেশির ভাগ পুরুষের প্রেমের বীজ থাকে দেহজ কামনার মধ্যে। দেহ বেয়ে উঠে সে—প্রেম মনে ফুল ফোটায়। মেয়েদের বেলায় উলটো। মেয়েদের প্রেম জন্মায় মনে! কিন্তু সে—প্রেম আকাশ কুসুম, মাটিতে তার শিকড় নেই। দেহের সম্পর্ক হলে তবেই সে—প্রেম স্পষ্ট হয়, সত্য হয়, পাকা ফলের মতো পরিণতি লাভ করে। তাই আজ দূর্বার কাছে আমাদের নায়ক রাতারাতি হয়েছে 'মাই ম্যান'—'আমার পুরুষ'। আর, দূর্বার ক্লান্ত সুন্দর মুখের পানে তাকিয়ে নায়কও ভাবছে, 'মাই গার্ল'—'আমার রমণী'।
গলির মুখে গাড়ি থেকে নামবার আগে দূর্বা নায়কের হাতটা ছুঁয়ে প্রশ্ন করলে, কবে আসবে?
হাসি মুখে নায়ক বললে, কাল।
কিন্তু 'কাল' আর আসেনি। পেয়ারাবাগানের বাড়িতে পরদিন আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি নায়কের। তার পরের দিনও নয়, তারপর আরো অনেকদিন নয়।
।। কলাপী।।
এই পর্যন্ত এসে আমাদের গল্প হঠাৎ বাঁক নিয়েছে। গল্পের ধারা বেঁকে গেছে বটে, কিন্তু তার গতি হয়েছে দ্রুততর; ঘটনার নুড়ি ডিঙিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। হয়তো ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি, কোথাও বা অসঙ্গতি এসে পড়েছে। তা হোক, অসঙ্গতি আর অসংলগ্নতাই আজকের গল্পের লক্ষণ। কেননা, আজকের যৌবন অতিমাত্রায় অস্থির, তার চিন্তায় কাজে আর মনে কোনো সঙ্গতি নেই।
অতএব, ফরমায়েস করবেন না। এ—যুগের গল্প আপনার ফরমায়েস শুনবে না, তাকে নিজের খেয়ালে চলতে দিন।
দিঘা থেকে ফিরে আসার পরদিন ছোট থাপার নায়ককে তার কামরায় ডেকে পাঠালে। একখানা কার্ড দিয়ে বললে, আজ সন্ধে সাতটায় রবীন্দ্র—সদনে কালচারাল ক্লাবের একটা চ্যারিটি শো আছে। আমার তো যাবার সময় হবে না, তুমি আমার হয়ে পাঁচশো টাকার একখানা চেক দিয়ে আসতে পারবে?
কাকে দিতে হবে? নায়ক জিজ্ঞেস করলে।
ক্লাবের সেক্রেটারি মিসেস জাহানারা চৌধুরিকে।
নিশ্চয় পারব স্যার।
মনিবকে কখনো অখুশি করতে নেই। সুতরাং থাপারের চেক নিয়ে নায়ক সেদিন সন্ধেবেলা রবীন্দ্র—সদনে হাজির হল। ভেবেছিল, চেকখানা পৌঁছে দিতে আর কতক্ষণ লাগবে? তারপর রবীন্দ্র—সদন থেকে সোজা পেয়ারাবাগান। দূর্বা অপেক্ষা করছে।
কিন্তু সব ভেস্তে গেল। রবীন্দ্র—সদনে গিয়ে মিসেস জাহানারা চৌধুরির খোঁজ করতেই ক্লাবের এক কর্মকর্তা বললেন, তিনি এখন গ্রিনরুমে, একটু বসুন।
বলে থাপারের জন্য নির্দিষ্ট সিটে নায়ককে তিনি বসিয়ে দিলেন। 'বস'কে খুশি করা চাই সবার আগে। অগত্যা বসে থাকা ছাড়া আর উপায় রইল না। আর, বসে থাকতে থাকতে নিভে এল অডিটোরিয়ামের বাতি, মিউজিকের সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল স্টেজের পর্দা, শুরু হল রবীন্দ্রনাথের 'শ্যামা'র নাচ।
কী আর করা যায়। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক দূর্বা।
নাচের কিছুই বোঝে না আমাদের নায়ক। তবু আলোর বাহারে ঢেউ—খেলানো যুবতী—দেহের লাস্য দেখতে মন্দ লাগছিল না। তবে এই স্পিডের যুগে সবটাই এত মন্থর যে, হাত আড়াল দিয়ে দু'একবার হাই তুললে নায়ক।
এই রবীন্দ্র—সদনেই আমাদের গল্পের তৃতীয় নায়িকার আবির্ভাব। তার কোনো নামকরণের দরকার নেই। সে নাম—করা মেয়ে, যথাকালে তার নাম জানা যাবে।
শো ভাঙল রাত দশটায়। ক্লাবের সেই ভদ্রলোকটি এসে বললেন, আসুন, মিসেস চৌধুরি আপনাকে ডাকছেন।
ভদ্রলোকটি নায়ককে গ্রিনরুমের দিকে নিয়ে গেলেন। ঢোকবার মুখেই বাধা। দেখা গেল, একটা ধাপের ওপরে দক্ষিণ ভারতীয় ধাঁচের সাজপোশাকে সেজে একটি যুবতী আত্মপ্রসাদের হাসি হাসছে। একগোছা ফুল বুকের কাছে ধরা। আর, তাকে ঘিরে একদল ছোকরা প্রেস—ফোটোগ্রাফার বাংলা—ইংরেজি অভিধানের বাছা বাছা কড়া বিশেষণগুলো ছুড়ে মারছে—
একসেলেন্ট!
সুপার্ব!
ওয়ান্ডারফুল!
অপূর্ব!
সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো ক্যামেরার ক্লিক আর ফ্ল্যাশ।
মিহি আদুরে গলায় শোনা গেল, নো মোর প্লিজ—আই অ্যাম সো টায়ার্ড!
তফাতে দাঁড়িয়ে নায়ক চিনলে, এই মেয়েটিই স্টেজের শ্যামা। ছোকরা ফোটোগ্রাফারদের ভিড় পাতলা হয়ে এল। ভদ্রলোকের পেছন পেছন স্টেজের প্রবেশ—মুখে এগোতেই নায়কের কাঁধে একটা হাত পড়ল।
চিনতে পারছ?
তারই সমবয়সী একজন যুবক তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পরনে বড় গোছের হাওয়াই অফিসারের পোশাক। দীর্ঘ অদর্শনের কুয়াশা কাটতে একটু সময় গেল। নায়ক চিনলে—অনিমেষ মজুমদার, একদা তার কলেজের সহপাঠী।
হাসতে হাসতে অনিমেষ বললে, হাওয়াই অফিসার না হয়ে আমার গোয়েন্দা হওয়াই উচিত ছিল। এক নজরেই তোমাকে চিনে ফেলেছি। কিন্তু কতদিন বাদে দেখা বলো তো?
মনে মনে হিসেব করে নায়ক বললে, সাত বছর।
একসঙ্গে অনেক কথা বললে অনিমেষ, এই সাত বছরে পুরানো বন্ধুরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছে, কে জানে! ভারি খুশি লাগছে তোমায় দেখে। একদিন এসো না আমার ওখানে। কালই ইভনিংয়ে এসো, কেমন?
দূর্বার কথা মনে পড়ে গেল। নায়ক বললে, কাল না হলেও দু'চারদিনের মধ্যেই যাব।
না, না, কালই এসো; পরশু মর্নিংয়ে আমি বার্সেলোনা ফ্লাই করছি। কাল রাতে আমার সঙ্গে ডিনার খাবে, বুঝলে?
রাঙাদা, চলো।—সেই মিহি আদুরে গলা।
অনিমেষ বললে, এদিকে আয়, আলাপ করিয়ে দিই। আমার কলেজের বন্ধু, আর আমার ছোট বোন কলাপী মজুমদার—আজকের শো—তে 'শ্যামা' সেজেছিল।
ছোট্ট নমস্কার সেরে নায়ক বললে, সে তো দেখলাম।
কলাপী মজুমদারকে এতক্ষণে ভালো করে দেখার অবকাশ পেলে নায়ক। সরু কোমর আর গুরু নিতম্বের সুঠাম গড়নটাই সবার আগে চোখে পড়ে। রঙ—মাখা মুখ তেমন সুশ্রী না হলেও কাজলটানা চোখের চাউনিতে বিভ্রম সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙে হলুদের আভা মেশানো। কলাপী মজুমদারের চেহারায় রূপের চেয়ে মোহ বেশি।
অনিমেষ বললে, তোরা আলাপ কর, গাড়িটা এল কিনা আমি দেখে আসি।
চলে গেল অনিমেষ।
বাঁ—দিকের আঁকা ভুরু তুলে কলাপী প্রশ্ন করলে, আমার নাচ কেমন লাগল বললেন না?
একটু হেসে নায়ক বললে, কি বলব? যতটা প্রশংসা করবার, সবই তো একটু আগে করা হয়ে গেল।
আদুরে গলায় কলাপী বললে, সত্যি, ওদের প্রশংসা শুনে শুনে আমি ক্লান্ত! আপনি বরং নিন্দে করুন।
হালকা সুরে নায়ক বললে, প্রথম দিনের আলাপেই আমাকে নিন্দুক ভাবলেন?
ও! আপনি বুঝি মেয়েদের মোটেই নিন্দে করেন না? শুধুই খোশামোদ?
মিহি আওয়াজে হেসে উঠল কলাপী। হাসলে ওর গলার স্বরটা কেমন ধাতব মনে হয়।
নায়কের পৌরুষে বোধকরি ঘা লাগল। বললে, কি করব বলুন! পুরুষের একটি মাত্র পাঁজরা থেকে যারা তৈরি হয়েছে, তাদের মনে কষ্ট দিতে বাধে।
এ ধরনের জবাব কলাপী আশা করেনি। কয়েক সেকেন্ড গুম হয়ে রইল সে। তারপর বললে, পুরুষ বলে আপনার খুব গর্ব, না? তাই বুঝি মেয়েদের ছোট করে দেখেন?
নায়ক কিছু বলবার আগেই অনিমেষ এসে পড়ল।
গাড়ি এসেছে, আয় রিনি। চলি হে, কাল এসো কিন্তু। বাড়িটা মনে আছে তো? সেই হিন্দুস্থান পার্ক।
নায়কের দিকে কেমন এক অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে চলে গেল রিনি ওরফে কলাপী মজুমদার। আর, তার সেই গুরু নিতম্বের দোলন দেখতে দেখতে নায়ক ভাবতে লাগল, অত কড়া জবাব না দিলেই ভালো হত। কে জানে তাকে কী ভাবলে কলাপী!
আশপাশে চেয়ে দেখলে, সঙ্গের সেই ভদ্রলোকটি কখন সরে পড়েছেন। নায়ক এবার নিজেই মিসেস জাহানারা চৌধুরির সন্ধানে এগোল।
কাল থেকে দূর্বা অপেক্ষা করে আছে! অনিমেষের বাড়ি যাবে কি যাবে না ভাবছিল নায়ক। না যাওয়াটা কিন্তু অভদ্রতা, পুরানো বন্ধুত্বের অমর্যাদাও বটে। আর, চলে যাওয়ার সময় কলাপী মজুমদারের সেই চাউনির অর্থটাই বা কি? শুধু চাউনি নয়, মেয়েটা নিজেও অদ্ভুত!
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অনিমেষ মজুমদারের বাড়ি বালিগঞ্জ হিন্দুস্থান পার্কে। কলেজ—দিনে দু'চারদিন গিয়েছিল নায়ক। তখন অবশ্য কলাপীর দেখা পাওয়া যেত না।
সন্ধ্যা পার করে নায়ক পৌঁছল। অনিমেষ ড্রইংরুমেই ছিল। খুশি মুখে বললে, আরে, এসো, এসো! ভাবছিলাম, বুঝি আসবে না।
কেন?
রিনি বললে কাল তুমি নাকি ওর ওপর রাগ করেছিলে।
হাসলে নায়ক। বললে, সেকি! আমিই বরং ভেবেছিলাম, তোমার বোন আমার ওপর চটে গেছেন।
সিগারেট কেস এগিয়ে দিয়ে অনিমেষ বললে, ওর কথায় কিছু মনে কোরো না। দুমদাম করে ও কখন কি বলে, খেয়াল থাকে না। যাক, এখন কি খাবে বলো? একটু কফি চলুক?
চলুক।
অনিমেষ ভেতরে চলে গেল। একটু পরে ঘরে ঢুকল কলাপী, পেছনে চাকরের হাতে কফির ট্রে। শ্যাওলা রঙের পাতলা শাড়ি নাভির নিচে পরা, কোমর যে কত সরু বুঝতে অসুবিধা হয় না, হাত—কাটা একটুকরো চোলি উত্তুঙ্গ যৌবনকে কোনোমতে সামলে রেখেছে। চোখে হালকা কাজল, রঙ—করা পুরন্ত ঠোঁটে আরক্ত আগুন।
কয়েক মুহূর্ত পলক ফেলতে ভুলে গেল নায়ক। উনত্রিশ বছরের পরুষ যৌবন তার কানে কানে বললে, নারী বলতে যদি শুধু দেহ বোঝায়, তবে কলাপী আদর্শ নারী।
কোনো সম্ভাষণ নয়, শুধু নমস্কারের ভঙ্গি করলে কলাপী। তারপর পট থেকে কাপে কফি ঢালতে ঢালতে আড়চোখে তাকিয়ে মিহি সুরে বললে, রাগ পড়েছে?
নায়ক বললে, রাগ কার? আমার, না আপনার?
মিহি আওয়াজ আরো মিহি হল: আমার রাগ কোথায়? রাগ, মেজাজ, অহঙ্কার—এসব তো পুরুষদেরই একচেটে। মেয়েরা তাদের পাঁজরা থেকে তৈরি, মেয়েদের কি রাগ করা সাজে?
মনে মনে কৌতুক বোধ করে নায়ক বললে, নাঃ, রাগটা আপনার এখনো পড়েনি দেখছি!
কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে কলাপী বললে, জানেন, আমার সঙ্গে কেউ কখনো আপনার মতো খোঁচা দিয়ে কথা বলতে সাহস করেনি!
আমি না হয় দুঃসাহসী বদনাম কিনলাম!—আরো কৌতুক বোধ করে নায়ক বললে।
কলাপী বললে, আচ্ছা, কিসের জন্যে আপনার এত অহঙ্কার বলুন তো? দেখতে ভালো আর স্মার্ট বলে?
কপট অনুনয় করে নায়ক বললে, দয়া করে এ কথাটা লিখে দিন। সার্টিফিকেটটা আমার কাজে লাগবে।
এবার হেসে ফেললে কলাপী। আঁকা ভুরু বাঁকা করে বললে, মেয়েমহলেই কাজে লাগাতে চান তো? কিন্তু সরি, এক মেয়ের সার্টিফিকেট অন্য মেয়ের কাছে চলে না।
তবু নৃত্যপটিয়সী যশস্বিনী কলাপী মজুমদারের সার্টিফিকেটের দাম আছে বইকি!
কাজল—টানা চোখে তির্যক দৃষ্টি হেনে কলাপী বললে, আবার খোঁচা দিয়ে কথা।
কিরে, কি হল?—ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অনিমেষ বললে।
কলাপী বললে, তোমার বন্ধুটি ভারি ঝগড়াটে রাঙাদা!
বটে! এক কাজ কর রিনি। তুই দু'একখানা গান শোনা, তাহলেই ও ঝগড়ার চান্স পাবে না।
বয়ে গেছে আমার!—সারা শরীরে ঢেউ তুলে কলাপী দ্রুত চলে গেল।
খাওয়া—দাওয়া মিটতে রাত দশটা বাজল।
অনিমেষ দিলদার লোক। তিন ঘণ্টার হাসি—গল্পে সে সাত বছরের ফাঁকটুকু অনায়াসে পার হয়ে গেল। নায়কের সঙ্গে যেন রোজই দেখা হয় তার।
খাবার ঘর থেকে আবার বসবার ঘরে। তিনজনে আরো আধ ঘণ্টার মজলিশ। তারপর নায়ক বললে, এবার চলি অনিমেষ।
অনিমেষ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, হ্যাঁ, চল যাই।
তুই আবার কোথায় যাবি এখন?
তোকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসি।
কি দরকার? আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই।
চল না, তোর ফ্ল্যাটটা চিনে আসি। জাস্ট এ মিনিট, গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বার করি।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল নায়ক।
আপনার সন্ধেটা আজ নষ্ট হয়ে গেল বোধ হয়?
নায়ক ফিরে তাকিয়ে দেখলে, কলাপী ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
নষ্ট হবে কেন?—নায়ক বললে।
কত ভালো ভালো মেয়ের সঙ্গ ছেড়ে একটা ঝগড়াটে মেয়ের সঙ্গে কাটালেন বলে।
মৃদু হেসে নায়ক বললে, আমি ঝগড়াটে মেয়েই পছন্দ করি। বিশেষ করে সে—মেয়ে যদি সুন্দরী হয়।
বাঁকা চোখে তাকিয়ে কলাপী বললে, থাক, স্তুতি—বিদ্যেটা খুব জানা আছে দেখছি! আবার কবে আসা হবে?
অনিমেষ তো কাল ফরেনে চলে যাচ্ছে, কাজেই—
অনিমেষ ছাড়া এ—বাড়িতে আর কেউ থাকে না বুঝি?—কলাপীর কাজল—টানা চোখে দেখা দিল সেই অদ্ভুত চাউনি। আর রক্তপলাশ—ঠোঁটে নেশা—ধরানো হাসি। ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে সে আবার বললে, না হয় ঝগড়া করতেই আসবেন।
বুকের সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে কলাপী। গা থেকে একটা বিদেশি সেন্টের অতি মৃদু সুগন্ধ বেরোচ্ছে। একটা নতুন মাদকতায় ঝিমঝিম করে উঠল উনত্রিশ বছরের উগ্র যৌবন। নায়কের একখানা হাত সরু কোমর বেষ্টন করে আকর্ষণ করতেই, মিহি গলায় ফিসফিস করে কলাপী বললে, এই, রাঙাদা আসছে!
মুহূর্তে সরে গেল হাতখানা। আর, হঠাৎ—আসা বৃষ্টির মতো হাসতে হাসতে কলস্বরা কলাপী ছুটে পালিয়ে গেল।
অনিমেষ অবশ্য ঠিক তখনই গাড়ি নিয়ে এল না। এল আরো একটু বাদে।
যেতে যেতে এ—কথা সে—কথার পর অনিমেষ বললে, রিনিকে কেমন দেখলি?
নায়ক সংক্ষেপে জবাব দিলে, বেশ মেয়ে।
ওকে নিয়ে বড় ভাবনায় পড়েছি।
ভাবনার কি আছে?
একটু চুপ থেকে অনিমেষ বলতে লাগল, বহুদিন হল আমাদের মা নেই। ছোটবেলা থেকে রিনি তাই বাবার আদরে একটু বেশি আদুরে হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিটা ওর সরল বটে, তবে কেমন খামখেয়ালি। কলেজে পড়তে পড়তে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে বললে, নাচ শিখব।
নাচ শেখা তো খারাপ নয়।—নায়ক বললে।
খারাপ বলিনি, কিন্তু নাচের সূত্র ধরে রিনি এমন একটা সোসাইটিতে মিশছে, যেখানে জীবন বড় অস্থির, তাই সব কিছুর বাঁধনই আলগা।
নায়ক বললে, আজকের সমাজ মাত্রই তাই। এ যুগের সমাজ—ব্যবস্থা দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে অনিমেষ, তাকে স্বীকার না করে উপায় নেই।
জানি। কিন্তু সামাজিক জীবনে নীতি, ধর্ম, ঘর, ভালোবাসা—কোনো কিছুর বাঁধন যদি না থাকে, তবে মানুষ তো খড়—কুটোর মতো ভেসে যাবে! আর ভেসে যাচ্ছেও।
হেসে উঠে নায়ক বললে, সাতের দশকের মানুষ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অনিমেষ মজুমদারের মুখে এমন সেকেলে তত্ত্বকথা শুনব আশা করিনি।
অনিমেষ বললে, কথাটা সেকেলে বটে, কিন্তু সত্য। বাবার বদলে এখন আমিই রিনির অভিভাবক। ওর এখনকার জীবন থেকে ওকে আমি সরিয়ে আনতে চাই।
কি ভাবে?
ওর বিয়ে দিয়ে।
সিগারেটের টুকরোটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে নায়ক বললে, তাহলে আর ভাবনার কি আছে? বোনের জন্যে একটি ভালো পাত্র দেখে নে। তোর বাবা ব্যারিস্টারি করে প্রচুর ব্যাঙ্ক—ব্যালান্স রেখে গেছেন। টাকা থাকলে কি ভালো পাত্রের অভাব হয়?
হয়।—অনিমেষ বললে, টাকা থাকলেও ভালো পাত্রের অভাব হয়। আমাদের সমাজে যতগুলো ছেলেকে আমি জানি, তারা কেউ ধনী, কেউ সুদর্শন, কেউ বা বিলেতি ডিগ্রিধারী বড় চাকুরে। কিন্তু ভালো পাত্র কেউ নয়।
তার মানে? ভালো পাত্র বলতে কি বুঝিস তুই?
যে—পুরুষের দায়িত্ববোধ আছে। যে—বিয়ে শুধু দেহের সুখের জন্য, আমি তাকে বিয়ে বলি না। দেহের সুখ তো আজকাল সস্তা, বিয়ে না করলেও মেলে। সত্যিকার বিয়ে তাকেই বলব, যেখানে স্ত্রীকে স্বামী মনের দিক থেকেও সুখী করে। কিন্তু আজকের সমাজে ক'জন পুরুষের এই দায়িত্ববোধ আছে বল? খোঁজ করে যদি দেখিস, তবে দেখবি বাইরে স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক দিব্যি মিষ্টি, ভেতরে একদম তেতো! দুজনেই প্রচণ্ড অসুখী! আমি চাই রিনি বিয়ে করে সুখী হোক।
নায়ক বললে, আচ্ছা, তেমন ভালো পাত্রের সন্ধান যদি পাই, তোকে জানাব।
হঠাৎ রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করলে অনিমেষ। তারপর বললে, তুই রিনিকে বিয়ে কর না।
আচমকা কথাটা যেন বুঝতে পারলে না নায়ক। কয়েক সেকেন্ড হতবাক হয়ে থেকে বললে, আমি!
খুব সহজভাবেই অনিমেষ বললে, হ্যাঁ, তুই। রিনিকে তো ভালোই লেগেছে তোর।
হেসে ফেললে নায়ক। বললে, ইয়ার্কি রাখ! আমাকে তুই ভালো পাত্র ঠাওরালি!
ইয়ার্কি নয় রে, আমি সিরিয়াসলি বলছি। রিনির জন্যে যতগুলো ছেলে দেখেছি, তাদের মধ্যে তোকেই ভালো পাত্র বলা যায়। তোর স্বাস্থ্য আছে, বিদ্যেবুদ্ধি আছে, চাকরিতে উঁচু পোস্ট আছে। সেই কলেজের দিন থেকেই জানি, তোর মধ্যে একটা ভদ্র সৎ মন রয়েছে। আর কি চাই!
মনে মনে আরেকটা ধাক্কা খেল নায়ক। আরো একটু জোরে। অনিমেষ তাকে ভদ্র আর সৎ বলছে! সে কি তাই? নয় কেন? সে তো কখনো কারো টাকা মারেনি বা অন্ধকারে কারো পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়নি। ছোট থাপারকে খুশি রাখতে যা করেছে, সেটা স্রেফ চাকরির উন্নতির জন্যে। সেটা এমন কিছু দোষের নয়। চাকরির উন্নতির জন্যে লোকে কত কী করে, নিজের বউকে পর্যন্ত দিয়ে দেয়!
তার কাঁধে হাত রেখে অনিমেষ বললে, কি ভাবছিস? রিনিকে তুই বিয়ে করলে, আমি খুশি হব।
এ বিষয়ে রিনির মত কি?—নায়ক জিজ্ঞেস করলে।
অনিমেষ বললে, তার মত এখনো নেওয়া হয়নি। তবু আমার ধারণা, তার অমত হবে না।
কি করে বুঝলি?
অনিমেষ হাসলে। হেসে বললে, মেয়েদের ভালো—লাগা লক্ষ করলেই বোঝা যায়।
নায়ক তা জানে। তার সুস্থ সবল দেহ, তার সপ্রতিভ কথাবার্তা, তার পরুষ যৌবন কলাপীকে যে আকর্ষণ করেছে, আজ নিঃসন্দেহে সে বুঝেছে। কলাপীও কি তাকে আকর্ষণ করেনি? নিঃসন্দেহে করেছে। যৌবন যৌবনকে কামনা করে। কিন্তু তাই বলে বিয়ে? অবশ্য বিয়ে করবে না, এমন ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা তার নেই। বরং বিয়ের কথা সে মাঝে মাঝে ভাবে। পছন্দসই মেয়ে পেলে বিয়েতে তার অরুচি নেই। কিন্তু বিয়ে তো শুধু যৌবনকালের নয়—যাবজ্জীবনের চুক্তি। তার এক বিশেষ দায়িত্ব আছে। সে—দায়িত্ব কাঁধে নিতে হলে বিশেষ প্রস্তুতির দরকার। নিজেকে বদলাতে হবে।
অনিমেষ বললে, এখন তোর মত কি, তাই বল।
আমাকে ভাবতে সময় দে অনিমেষ। নায়ক বললে।
ঠিক আছে। বার্সেলোনা থেকে আমি দিন পনেরো বাদেই ফিরব। তখন জানাস।
অনিমেষ আবার গাড়িতে স্টার্ট দিলে।
কলাপী বলেছে, 'না হয় ঝগড়া করতেই আসবেন।'
এ কথার আড়ালে যৌবনের যে আমন্ত্রণ ছিল, তা উপেক্ষা করার মতো বোকা বা বেরসিক অন্তত নায়ক নয়। সুতরাং প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কলকাতার অন্য সব রাস্তা ভুলে গেল নায়ক। যে রাস্তায় তার যাতায়াত শুরু হল, তার নাম হিন্দুস্তান পার্ক।
গত কয়েক বছরে যুবতী মেয়ে অনেক দেখল নায়ক। কিন্তু কলাপী মজুমদারের মতো মেয়ের সংশ্রবে সে পূর্বে কখনো আসেনি। যৌবনের স্পন্দনে, চটুলতায়, রসালাপে এমন টগবগে উচ্ছ্বল নারীর সঙ্গ পাওয়া আগে আর ঘটেনি। আঘাত দিলে কলাপী চকমকি পাথরের মতো আগুন ছিটকোয়, আদর করলে সে কাশ্মীরি আঙুরের মতো মিষ্টি রসালো হয়ে ওঠে। কলাপীর সবচেয়ে বড় গুণ, নিজেকে সে একঘেয়ে হাত দেয় না। তাই তার নতুনত্বে, তার মাদকতায়, তার প্রভাবে ভেসে গেল নায়ক—ডুবে গেল।
বার্সেলোনা থেকে ফিরে এল অনিমেষ। আরো একমাস বাদে কলাপী মজুমদারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল নায়কের।
আমাদের গল্পের—নায়ক—যার স্বভাব ছিল জ্ঞানবৃক্ষের ফল চেখে চেখে বেড়ানো, সে হঠাৎ বিয়ে করে 'গেরস্ত' বনে গেল কেন? এ প্রশ্ন যদি আপনারা করেন, তবে আমি সোজা কথায় জবাব দেব, বিয়েটা সচরাচর হঠাৎই হয়। আর বিয়ে নিয়ে বিতর্ক করলে বলব, প্রকৃতি প্রাণীকে জোড় বাঁধবার প্রবৃত্তি দিয়েছে, আর সভ্যতা মানুষকে শিখিয়েছে ঘর বাঁধতে। আমাদের নায়ক ব্যতিক্রম নয়।
বিয়েটা অবশ্য রেজিস্ট্রি করেই হল। কিন্তু ফুলশয্যার ঘটাপটা হল পুরো হিন্দু মতে। নায়কের ফ্ল্যাট ছোট বলে অনুষ্ঠানটা হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতেই হল। অনেক রাতে বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল, কলরব থেমে এল, বাতিগুলো এক এক করে নিভতে শুরু করল। ফুল—ছড়ানো বিছানায় অপেক্ষা করছিল নায়ক। ফুলের সাজে সেজে ঘরে এল কলাপী। নায়কের জীবনে তৃতীয় নায়িকা।
আজ রাতে আপনাদের আরেকটি রাত মনে পড়ে যেতে পারে। দিঘার সমুদ্র সৈকতে ঝাউবন—মর্মরিত সেই রাত! মনে পড়তে পারে বিয়ে—করেও— বিধবা সেই দূর্বাকে।
কিন্তু দূর্বা সোমকে অনেক আগেই আড়াল করে এসে দাঁড়িয়েছে কলাপী মজুমদার। আর নায়কের পৃথিবীর মানচিত্র থেকে পেয়ারাবাগান লেনও বেশ কিছুদিন হল মুছে গেছে।
কিন্তু দেখা যায় পৃথিবীর মানচিত্রে কোনো দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও জীবনের মানচিত্র থেকে অত সহজে মুছে যায় না। যে—দ্বীপ আজ জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেল, একদিন সেই আবার আগ্নেয়গিরি হয়ে মাথা তুলতে পারে।
দূর্বা সোমও একটি দ্বীপ। নায়কের যৌবন—জাহাজ একদা ভাসতে ভাসতে সেই দ্বীপে এসে নোঙর ফেলেছিল। ঝড়ের সময় বন্দর বাছাবাছি করেনি, বরং সেই ছোট্ট দ্বীপের সবুজ ছায়ার আদর ভালো লেগেছিল। কিন্তু সে আর ক'টা দিনের জন্যেই বা! তারপর কোনো গ্রহ—নক্ষত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে জীবন—সমুদ্রে এল জলোচ্ছ্বাস। নোঙর ছিঁড়ে বাউন্ডুলে যৌবন—জাহাজ আবার ভাসতে ভাসতে আরেক নতুন দ্বীপের চড়ায় আটকে গেল, আর সেই ছোট্ট সবুজ দ্বীপটি গেল নায়কের জীবনের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে।
কিন্তু কে ভেবেছিল সেই দূর্বা—দ্বীপ হঠাৎ একদিন অগ্নিগর্ভ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে?
টেলিফোন বাজবার আগে আমাদের গল্পের নায়ক অন্তত ভাবেনি।
রিসিভার তুলে নায়ক রীতি অনুযায়ী বললে, থাপার ট্রেডিং!
অপর দিক থেকে উত্তর এল: আমি দূর্বা।
রিসিভারটা হাত থেকে পড়তে পড়তে রয়ে গেল। সহজ হবার চেষ্টা করে নায়ক বললে, ও, দূর্বা! কি খবর?
আজ সন্ধ্যার পর আসবে?
আজ সন্ধেবেলা একটা ঝামেলা আছে, বুঝলে! আরেকদিন সময় করে যাব 'খন।
সময় তোমার হবে না জানি। কিন্তু বড় দরকার, তাই ডাকছি।
দূর্বার গলাটা কেঁপে গেল।
হঠাৎ দিঘার সমুদ্র সৈকতে ঝাউবন—মর্মরিত সেই সন্ধ্যা মনে পড়ল। আর মনে পড়ামাত্র নায়কের মন—কম্পাসের কাঁটা ঘুরে গেল পেয়ারাবাগান লেনের দিকে। অফিস—ফেরতই সে চলে গেল সেখানে।
বাড়িটার চেহারা সেই একই আছে। দাবার ছক সাজিয়ে জ্যাঠামশাই বসে আছেন ধ্যানস্থ হয়ে। ঘরের এককোণে কালো মতো একটি ছেলে কি একটা বই মুখে বসে আছে।
জ্যাঠামশাই হেসে বললেন, এসো। হবে নাকি এক হাত?
নায়ক যেন প্রতিদিনই আসে, এমনি সহজ জ্যাঠামশায়ের সম্ভাষণ।
খেলাটা প্রায় ভুলেই গেছি। হেসে নায়ক বললে।
দাবা খেলা কেউ ভোলে? তাহলে জগৎটা চলছে কি করে? জগৎ—সংসারটাই তো একটা বিশল দাবার ছক। ওই ভুলুকে খেলা শিখিয়েছিলাম, ও যখন দশ বছরের. . . ভুলুর সঙ্গে আলাপ নেই বুঝি? ভুলু আমার ভাইপো, দূর্বার ছোট।
ছেলেটি এবার বই থেকে মুখ তুলে তাকাল। বয়সে নিতান্তই ছোকরা, কুড়ি—একুশের বেশি হবে না। রোগাটে চেহারা, রোদে—পোড়া তামাটে রঙ, গাল—ভাঙা মুখে পাতলা দাড়ি, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। পথে—ঘাটে হামেশা যেসব পার্টির ছেলে দেখা যায়, ভুলু তাদেরই একজন। তেমনি আধময়লা চোঙা প্যান্ট আর চিত্রবিচিত্র বুশ শার্ট পরা।
জ্বলজ্বলে চোখ তুলে ভুলু একবার তাকাল নায়কের দিকে। তারপর আবার বইয়ে মুখ দিল। একটু হাসিও না, একটা নমস্কারও না।
দূর্বা কেমন আছে? নায়ক জিজ্ঞেস করলে জ্যাঠামশাইকে।
ফ্লু হয়েছে বোধ হয়। বলে না তো কিছুই। যাও না, দেখে এসো।
নায়ককে দেখে বিছানায় উঠে বসল দূর্বা। বেশ খানিকটা রোগা হয়ে গেছে এই তিন মাসেই। মুখের সেই পুতুল—পুতুল ভাব আর নেই। নায়কের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
জ্বর হয়েছে নাকি?
না।
বিছানার কাছে গিয়ে নায়ক তার কপালে হাত রাখলে।
জ্বর তো এখনো অল্প রয়েছে।
মুখ নামিয়ে চুপ করে বসে রইল দূর্বা। নায়কও বসল বিছানায়। হালকা গলায় বললে, কথা নেই কেন? রাগ হয়েছে? কতটা রাগ, দেখি!
দূর্বার চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে তুলে ধরতেই দেখা গেল, ফ্যাকাশে গাল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল নেমেছে। ভিজে গেল নায়কের মনটা। জলে—ভেজা ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ধরতেই দূর্বা সরে বসল। চাপা গলায় বললে, ভুলু রয়েছে বাড়িতে।
আর, তার মুখে জ্বরের বিশ্রী গন্ধ পেয়ে নায়কের মনটা মুহূর্তে বিস্বাদ হয়ে গেল।
দূর্বা বিছানা থেকে নেমে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে, চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়াল।
তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
বলো।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাঁ—হাতের চুড়িটা ঘোরাতে লাগল দূর্বা। তারপর হঠাৎ বললে, জ্যাঠামশাইকে বলে তাড়াতাড়ি একটা দিন ঠিক করো।
দিন! কিসের দিন?
আমাদের বিয়ের।
আচমকা যেন ধাক্কা খেল নায়ক। শুধু বলে উঠল, বিয়ে!
কিন্তু আরো জোরালো একটা ধাক্কা অপেক্ষা করছিল নায়কের জন্য! কাঁপা কাঁপা গলায় দূর্বা বললে, নইলে আমার ছেলের পরিচয় কি দেব?
তোমার ছেলে!
দূর্বা বললে, হ্যাঁ, তোমার ছেলে।
একটা পাথরের মূর্তির মতো আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল নায়ক। অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বললে, কবে জানতে পেরেছ?
তিন মাস আগে।
দিঘার সমুদ্র সৈকতে সেই সন্ধ্যাবেলাটি আবার মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, তিন মাসই হবে দিঘা থেকে তারা ফিরেছে।
একটা সিগারেট ধরাল নায়ক। কয়েকবার টানল। তারপর বললে, কিন্তু বিয়ে তো আমাদের হতে পারে না দূর্বা। তোমার স্বামী এখনো বেঁচে।
না। দূর্বা বললে, ট্রেনের তার কাটতে গিয়ে রেল—পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে।
ও!—নিঃশব্দে সিগারেট টানতে লাগল নায়ক।
জ্যাঠামশাইকে আজই বলে যাও। দূর্বা বললে, জ্যাঠামশাইকে এ মুখ আর দেখাতে পারছি না।
তার গলাটা আবার কেঁপে গেল।
কোনো জবাব দিলে না নায়ক। তার বিবেক—বুদ্ধি বললে, দূর্বাকে বাঁচাও। ওকে বাঁচানো তোমারই কর্তব্য। সঙ্গে সঙ্গে তার বাস্তব—বুদ্ধি বললে, আগে নিজেকে বাঁচাও। তোমার বড় চাকরি আছে, সামাজিক সম্মান আছে, কলাপীর মতো স্ত্রী আছে। একটা দূর্বার জন্য এতগুলো ত্যাগ করা চলে না। ত্যাগ করার কথা ভাবাও বোকামি। নিজেকে বাঁচানোই মানুষের একমাত্র ধর্ম।
সিগারেটের টুকরোটা জুতোর তলায় পিষে ফেললে নায়ক। তারপর শান্ত সহজ গলায় বললে, দেখো দূর্বা, একটা কাজ করো। এটা বিজ্ঞানের যুগ, আমি একটা নার্সিংহোমে তোমার ব্যবস্থা করে দিই। টাকার জন্যে ভেবো না, সে আমি—
দূর্বার হাড়—ওঠা ফ্যাকাশে মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠল। গলার আওয়াজটাও এবার কাঁপল না। শান্ত স্পষ্ট গলায় বললে, আমি টাকা চাই না—স্বামী চাই।
দূর্বা—দ্বীপ সত্যিই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে! অগ্ন্যুৎপাতের আগেই মুখ বন্ধ করা দরকার।
যেন ছোট মেয়েকে বোঝাচ্ছে, এমনি ভাবে নায়ক নরম গলায় বললে, দেখো, তোমাকে বিয়ে করতে আমারও অনিচ্ছা ছিল না। কিন্তু এখন আর সম্ভব হচ্ছে না. . . মানে একটা মুশকিল হয়ে গেছে।
কি মুশকিল?
একটু শুকনো হেসে নায়ক বললে, মাস দেড়েক হল আমি বিয়ে করেছি।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল দূর্বা। যেন কিছুই দেখছে না, কিছুই শুনছে না। ছোট ছোট সরু আঙুল দিয়ে চেয়ারের পিঠ শক্ত করে আঁকড়ে ধরল শুধু।
গলায় দুঃখ এনে নায়ক বলতে লাগল, দেড় মাস আগে যদি আমাকে জানাতে! কাজের ঝামেলায় আমি না হয় আসতে পারিনি; তাই বলে তুমি তো একটা খবর—
তুমি এখন এসো। ক্লান্ত গলায় দূর্বা বলে উঠল।
যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল নায়ক। কিন্তু গেল না। অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করে বললে, তাহলে একটা নার্সিংহোমে বন্দোবস্ত করে ফেলি? আর দেরি না করাই ভালো।
আশ্চর্যরকম শান্তভাবে দূর্বা বললে, যা করবার আমিই করব।
আর কি বলা যায় ভেবে পেল না নায়ক। আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। ঢাকা বারান্দায় ভুলু পায়চারি করছিল। জ্বলজ্বলে চোখ মেলে একবার তাকাল, আবার পায়চারি করতে লাগল।
দাবার ছকের সামনে জ্যাঠামশাই ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। পা টিপে টিপে নায়ক দরজাটা পার হয়ে গেল।
দূর্বা বলেছিল, যা করবার আমিই করব।
করবার অনেক কিছুই ছিল। সে ব্ল্যাকমেল করতে পারত, নায়কের নামে কেস করতে পারত, তার বিবাহিত জীবন বিষাক্ত করে দিতে পারত। কিন্তু দূর্বার মতো যে—মেয়েরা ভাগ্যের শিকার, তারা এসব কিছুই করতে পারে না। পারে কেবল একটাই কাজ করতে।
দিন তিনেক বাদে দূর্বাকে পাওয়া গেল তার বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায়। সে—ঘুম আর ভাঙেনি।
পুলিশ এসে লাশ নিয়ে গেল ময়নাতদন্তের জন্যে। রিপোর্টে দুটো জিনিস পাওয়া গেল। পাকস্থলীতে অনেকগুলো ঘুমের বড়ি, আর জরায়ুতে অপরিণত একটি ভ্রূণ।
রিপোর্ট শুনে ভুলু জ্যাঠামশাইকে কিছু বলেনি। তার গালভাঙা মুখের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছিল শুধু। জনকয়েক বন্ধুকে নিয়ে দিদির কাটা—ছেঁড়া লাশ আর অপরিণত ভ্রূণ একসঙ্গে পুড়িয়ে এল শ্মশানে।
আর, সেইদিনই ভোর—রাতে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলল পেয়ারাবাগানের বাড়িটা। ভুলুকে নিয়ে গেল ব্যাঙ্ক—ডাকাতির চার্জে।
বছর তিনেকের জন্য সরকারি আশ্রয়ে তার থাকা—খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে গেল।
।। নায়ক।।
এ গল্প আমাদের খুশি করতে পারছে কিনা জানি না। যদি না পারে, আমি কি করতে পারি বলুন? এ তো সাবেক কালের ফর্মুলায় বাঁধা ইচ্ছাপূরণের গল্প নয়। এ গল্প আপনারাই ফেঁদেছেন। আপনারা জীবনধর্মী গল্পই পছন্দ করেন, তাই আজকের প্রবহমান খরস্রোত জীবনকে আমি বেঁধে রাখার চেষ্টা করিনি, ছেড়ে দিয়েছি তার নিজস্ব উন্মত্ত গতিপথে। এখন আর আমার কোনো হাত নেই। এ গল্প কোথায় কোন পরিণতিতে গিয়ে পৌঁছবে, তাও বলা যায় না।
অতএব, আসুন আমরা গল্পের পিছনে পিছনে এগোতে থাকি।
নায়কের বিয়ে আর দূর্বার আত্মহত্যার পর সময়—গঙ্গায় অনেক জোয়ার—ভাটা এল গেল। পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক আকাশে ধূমকেতুর মতো উদয় হল কয়েকটি পলিটিক্যাল পার্টি, শুরু হয়ে গেল বড় রকমের ওলোট—পালোট। কংগ্রেসের হল পরাজয়, যুক্তফ্রন্টের হল অভ্যুদয়। তার পরের ঘটনাবলি আপনাদের মুখস্ত থাকার কথা।
রাজ্যে হু হু করে প্রগতির হাওয়া বইতে লাগল। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফাটতে লাগল বোমা, চলতে লাগল পাইপগান আর ছুরি, পুড়তে লাগল ট্রাম—বাস। দ্রব্যমূল্য হল আকাশ—ছোঁয়া। কথায় কথায় বনধ আর ধর্মঘট। ক্লোজার আর লক—আউট। স্কুল—কলেজে পরীক্ষার নামে ঠাট্টা।
সময়—গঙ্গার মত্ত স্রোতে একে একে তিনটি বছর ভেসে গেল। মিশে গেল মহাকাল—সমুদ্রে।
ওলোট—পালোট হয়ে গেল নায়কেরও জীবন। তার বিয়ের বছর দেড়েক বাদেই থাপার ট্রেডিংয়েও গণজাগরণের ঢেউ লাগল। বোনাস বাড়ানোর দাবিতে শুরু হয়ে গেল লাগাতার ধর্মঘট। ছোট থাপারের দূত হয়ে মিটমাট করতে গিয়ে 'মালিকের দালাল' নায়কের মাথা ফাটল। ছোট থাপার শান্তিপ্রিয় লোক, পাঁচ মাস ধর্মঘটের মাথায় অফিস তুলে দিয়ে সোজা কানাডায় গিয়ে বসে রইল। ছ'মাস বাদে নায়কের অফিস—সুপারভাইজার হবার কথা। হল না। চোদ্দশো টাকা মাইনের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার রাতারাতি বেকার হয়ে গেল।
লিটল রাসেল স্ট্রিটে অফিসের ফ্ল্যাট পেয়েছিল, সেটা ছাড়তে হল। নায়ক দিশি পাড়ায় একটা সস্তার ফ্ল্যাট নিতে চেয়েছিল। অনিমেষ বললে, রিনির কষ্ট হবে। তোমরা হিন্দুস্থান পার্কেই চলে এসো। আমি তো বছরে আট মাস বিদেশেই থাকি, তোমরা বাড়িটার দেখাশুনো করতে পারবে।
অতএব, নায়ক তার শ্বশুরবাড়িতেই এসে উঠল। কোনো আপত্তি করলে না। আপত্তি করার মতো জোর ছিল না বলে।
সামনে যার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সঞ্চয়ের দিকে তার মন থাকে না। সামান্য ব্যাঙ্ক ব্যালান্স যা পড়েছিল, তাই দিয়ে একটা বছর চলল। তারপরেও দিন চলতে লাগল। দিন কারো মুখ চেয়ে বসে থাকে না। চলতে লাগল কলাপীর টাকায়—মানে কলাপীর হাত দিয়ে অনিমেষের টাকায়। কোনো কাজই আর রইল না নায়কের। শুধু রোজ একবার করে চাকরির বাজারে ঘুরে আসা ছাড়া। ট্যাক্সি থেকে ট্রাম—বাসে, স্টেট এক্সপ্রেস থেকে উইলস—এ নেমে এল সে। কিন্তু কলাপীর দুটো আঁকা ভুরুর মাঝখানে কপালের খাঁজটা আর সমতল হল না।
চোদ্দশো' টাকা মাইনের সেই গর্বিতস্বভাব মানুষটি কলাপীর চোখে আজ ছোট হয়ে গেছে। নায়কও তা বোঝে। কলাপীকে কিন্তু দোষ দিয়ে লাভ নেই। এ যুগটাই হচ্ছে টাকার যুগ। আলু—পটল আর মানুষ—দুয়েরই মূল্যায়ন হয় টাকা দিয়ে। 'আমার স্বামী বেকার'—এ চিন্তাটা কোনো স্ত্রীই সহ্য করতে পারে না।
বাইরের সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রয়েছে। কিন্তু ভেতরের সম্পর্কে কোথায় যেন চিড় খেয়েছে। জোড়া খাট তফাত হয়নি, অথচ স্বামী—স্ত্রী দুজনেই বুঝতে পারছে, পাশাপাশি থেকেও তারা ক্রমশই তফাত হয়ে যাচ্ছে। হাসিটা আজকাল মাপা, কথাগুলো শুধুই কথা—হৃদয়ের সুর নেই, রাতের চুম্বন—আশ্লেষ নেহাতই যান্ত্রিক নিরুত্তাপ, বাসি মাংসের মতো ঠান্ডা।
মনের এই ফাঁকি পরস্পরের কাছে যতই ঢাকবার চেষ্টা, ততই ধরা পড়ে যাচ্ছে।
বাড়িতে ঢোকার মুখেই আওয়াজ পাওয়া গেল। তবলার বোলের সঙ্গে ঘুঙুরের আওয়াজ।
থমকে থেমে গেল নায়ক। কলাপী এখন নাচ প্র্যাকটিস করছে। ইদানীং নাচের ওপর তার ঝোঁকটা আবার বেশি মাত্রায় ফিরে এসেছে। তার পুরনো বন্ধু—মহলের অনেকজনকেই ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে হিন্দুস্থান পার্কের এই বাড়িতে।
দোতলায় উঠে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল নায়ক। আর বারান্দা দিয়ে চলতে চলতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ড্রইংরুমটা একবার দেখে নিলে।
উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে কলাপী নাচছে। পায়ের গোছ অবধি তুলে শাড়ি পরা, দড়ির মতো পাকানো আঁচল পৈতের মতো বুকের মাঝখান দিয়ে উঠে গিয়ে, পিঠ বেয়ে নেমে কোমরে জড়ানো। টাইট কাঁচুলির মতো আড়াল থেকে উগ্র যৌবন যেন শিং উঁচিয়ে আছে। চুড়িদার পায়জামা পরা বাবরি—চুল যে ছেলেটি একহাতে কলাপীর কোমর জড়িয়ে নাচের বোল বলছে, নায়ক তাকে জানে। কলাপীর নতুন নাচের মাস্টার গোপীনাথন। আরো চার—পাঁচজন যুবক বসে আছে। তারা নাচিয়ে নয়, কলাপীর অনুরাগী ভক্ত। তারা আসে কলাপীর নৃত্য—প্রতিভায় চমৎকৃত হয়ে অনর্গল স্তুতিবাদ করতে।
নিজের ঘরে চলে গেল নায়ক। কলাপী তাকে দেখেছে কিনা সে জানে না। দেখলেও নাচ ছেড়ে আসবে না, তা সে জানে। নাচের প্র্যাকটিস আর বন্ধু—মহলের গুণগান শেষ হতে রাত সাড়ে দশটা বাজে, কোনোদিন এগারোটা।
নিজের হাত—ঘড়িটায় দেখলে রাত সবে আটটা। পোশাক না বদলে চেয়ারটায় বসে পড়ল নায়ক। সন্ধ্যার পর এই সময়টা তার অত্যন্ত বোদা লাগে। একেবারে একা মনে হয়, নিজেকে নিয়ে কি করবে ভেবে পায় না। অথচ একটা বছর আগেও এই সময়টার জন্যে সারাদিন সে উৎসুক হয়ে থাকত। কলাপী অপেক্ষা করত তার জন্যে। এক একদিন এক একরকম সাজত কলাপী। কেবল তারই জন্যে। সেদিন অবশ্য সে বড় অফিসার ছিল। চোদ্দশো টাকা মাইনের পদস্থ অফিসার।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল নায়ক। আর শুনতে লাগল তবলার বোল, ঘুঙুরের শব্দ আর পুরুষ—গলার সমবেত হাসির আওয়াজ। কলাপীর এখন আসার অবসর নেই, তা সে জানে। সন্ধ্যার পর এই সময়টা অত্যন্ত বোদা লাগে।
বুধন বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করলে, কফি আর জলখাবার আনবে কিনা। ইশারায় তাকে যেতে বলে দিলে নায়ক। দেহে—মনে একটা বিশ্রী ক্লান্তি। নিজেকে নিয়ে কি যে করা যায়, ভেবে পাচ্ছে না সে। হাতঘড়িতে দেখল সাড়ে ন'টা। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল নায়ক। একটা ছোট অর্ডার সাপ্লাইয়ের দালালি বাবদ শ' দেড়েক টাকা পেয়েছিল গত পরশু। আলমারি খুলে দেখলে, খানকয়েক নোট এখনো রয়েছে। সেগুলো পকেটে পুরে বেরিয়ে পড়ল।
বেরোবার মুখেই ঝুমঝুম করতে করতে কলাপী এল।
আবার কোথায় বেরোচ্ছ?
খানিকটা ঘুরে আসি।
বুধন কফি দিয়েছে?
দিতে এসেছিল, দরকার হয়নি।
কেন?
খাবার ইচ্ছে নেই।
ও!—কলাপীর আঁকা ভুরুর মাঝখানে সেই খাঁজটা আবার দেখা দিলে। বললে, আচ্ছা, আমার পুরানো বন্ধুরা এলেই তোমার মুখ ভারি হয় কেন বলো তো?
নিঃশব্দে একবার কলাপীর দিকে তাকাল নায়ক। টাইট চোলি—আঁটা বুকের ভেতরে মন বলে কোনো বস্তু আছে কি? ছিল কি কোনোদিন? চোখ সরিয়ে নিয়ে নায়ক বললে, নিজের স্ত্রীকে নিয়ে অপরে মাতামাতি করলে কোনো স্বামীই খুশি হতে পারে না।
মাতামাতি মানে?—তেতো গলায় কলাপী বললে, ইতরের মতো কথা বোলো না। ওরা নাচ বোঝে। ওদের কালচার আছে।
কলাপীর তেতো গলার চেয়েও তেতো হাসিতে কুঁচকে গেল নায়কের ঠোঁটের কোণ। হেসে বললে, কালচার! ডিক্সনারিতে আজকাল কালচার শব্দটার নতুন মানে দিয়েছে বুঝি?
কলাপী চাপা তীক্ষ্ন গলায় বললে, এ বাড়ির একটা প্রেস্টিজ আছে। এখানে কোনো সিন ক্রিয়েট কোরো না বলছি!
সংযত গলায় নায়ক বললে, না, কোনো সিন করব না। যে সিন চলছে, সেটা চলুক।
নায়ক আর দাঁড়াল না।
হিন্দুস্থান পার্ক থেকে পার্ক স্ট্রিট। 'লা বোহেমিয়া'র সামনে।
নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস নায়কের কোনোদিন ছিল না। কখনো—সখনো খেত। বিয়ের পর একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল। আজ অনেক দিন বাদে 'বারে' এল। সন্ধ্যার পর এই সময়টা আজকাল ভয়ানক বিস্বাদ লাগে। একটা কিছু না হলে আর চলে না।
রাত দশটা বাজে। বারে ভিড় এখন পাতলা। একটা নিরিবিলি কোণ বেছে নিয়ে বাইরেই বসে পড়ল নায়ক। কেবিনে গেল না। কিন্তু এই বিশাল পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে ঠিক এই লা বোহেমিয়া বারে দেখা হয়ে যাবে, কে ভেবেছিল! একটা জংশন স্টেশনে বিভিন্ন দুটো ট্রেনের দুজন আলাপী যাত্রীর যেমন হঠাৎ দেখা হয়ে যায়।
দেখা হল চার বছর বাদে।
প্রথম পেগ শেষ করে নায়ক সবে দ্বিতীয় পেগ নিয়েছে, এই সময় সামনের একটা কেবিন থেকে বেরিয়ে এল মাঝারি বয়সের এক ভদ্রলোক। মোটা থলথলে চেহারা, ফর্সা রঙ, গিলে—করা আদ্দির পাঞ্জাবিতে হীরের বোতাম লাগানো। কেবিনের পর্দা সরিয়ে বললে, একটু বোসো। ম্যানেজারের ঘরে মাসকাবারি হিসেবটা মিটিয়ে আসি।
কেবিনটা নায়কের সামনাসামনি। সরানো পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, ভেতরে বসে আছে একটি মহিলা। দৃশ্যটা অতিশয় সাধারণ। বারে আজকাল পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের ভিড়ই বরং বেশি। চোখ সরিয়ে নিয়ে নায়ক একটা সিগারেট ধরাল। তারপর খাবারের মেনুটার ওপর চোখ বোলাতে লাগল।
একটু পরেই একজন বয় এসে জানালে, সাত নম্বর কেবিনের মেমসাহেব ডাকছেন।
অবাক হবার কথাই বটে। বয় লোক—ভুল করেনি তো?
না, ভুল করেনি। মেমসাহেব নায়ককেই সেলাম দিয়েছেন।
উঠতে হল। সাত নম্বর কেবিনে পা দিয়ে চিনতে দেরি হল না।
মুক্তা! গড়িয়াহাটা মোড়ে সেই 'প্রচ্ছদ'—এর সেলস গার্ল মুক্তা। চেহারা অনেকখানি বদলেছে বইকি। বেশ মোটাসোটা হয়েছে। অ্যালকোহলিক ফ্যাট লেগেছে গায়ে। দামি শাড়ি, দামি পাথরের গয়না, ফাঁপানো খোঁপার বাহার, মুখে নিপুণ প্রসাধন। শুধু চোখের নিচে কালির দাগ সবটা চাপা পড়েনি।
কি? চিনতে পারছ না বুঝি? মুক্তা বললে। স্বরটা একটু জড়ানো।
চিনতে পারব না কেন? —নায়ক সপ্রতিভ হবার চেষ্টা করলে।
তবে দেখেও চোখ ফিরিয়ে নিলে কেন?
দূর থেকে অতটা লক্ষ্য করিনি।
তা বটে। চার বছর—অনেক দূর!
একটা মামুলি প্রশ্ন করে বসল নায়ক: কেমন আছ?
হেসে উঠল মুক্তা। বললে, জিজ্ঞেস করছ কেন? দেখে বুঝতে পারছ না?
নায়কও অল্প হাসল। হেসে বললে, দেখে শুধু এইটুকুই বুঝতে পারছি যে তুমি অনেক বদলে গেছ।
মুক্তা বললে, আমি তো চার বছরে বদলেছি। তুমি কিন্তু রাতারাতি বদলে গিয়েছিলে।
ইঙ্গিতটা বুঝেও বুঝল না নায়ক। বললে, তোমাকে এখানে দেখব আশা করিনি মুক্তা।
যা আশা করা যায় না, তাই তো হয়। আমিই কি আশা করেছিলাম, ছোট থাপারের খাটে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে তুমি পালিয়ে যাবে?
একথার জন্য নায়ক তৈরি ছিল না। একটু থেমে বললে, কি করব? সে—রাতে তোমার খুব বেশি নেশা হয়ে গিয়েছিল—
মুক্তার রঙ—করা ঠোঁট দু'খানা বিভক্ত হল। পাকা লঙ্কার মতো টকটকে লাল ঠোঁটের হাসিটাও ঝাল। বললে, আজ আর আসল কারণটা বলতে লজ্জা কিসের? ভেবেছিলে একটা রিফিউজি মেয়ের সম্মানই বা কী, সতীত্বই বা কী? তাই না?
শুকনো মুখে নায়ক বললে, এতদিন বাদে সেদিনের জের টেনে আর লাভ কি বলো?
লাভ! যার সবটাই লোকসান, সে কি আর লাভের আশা করে? থাপারকে আমার দেহটা ঘুষ দিয়ে তুমি চাকরির উন্নতি কিনলে। কিন্তু আমি? স্ত্রীলোকের দেহ নিয়ে পুরুষের লাভ, কিন্তু স্ত্রীলোকের আগাগোড়াই লোকসান।
মুক্তার গলার স্বর আরো জড়িয়ে আসছে।
মুক্তাকে দেখা অবধি ঝিমিয়ে—থাকা বিবেক আস্তে আস্তে সজাগ হয়ে উঠছিল। নিজের কাছে নিজেই কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছিল নায়ক। বয়কে ডেকে নায়ক বাইরের টেবিল থেকে হুইস্কির গেলাসটা আনিয়ে নিলে। বিবেক মানে কমপ্লেক্স। পায়ে পায়ে যখন জীবনের মোকাবিলা করতে হবে, তখন বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রাখাই ভালো। যেমন করে মুক্তাকে একদিন থাপারের খাটে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল।
এক চুমুকে গেলাসটা খালি করে নায়ক চাঙ্গা হল। বললে, তোমারই বা লোকসান কোথায়? ছোট থাপার তোমাকে তো সুখেই রেখেছিল শুনেছি। কিন্তু ও ভদ্রলোকটি কে?
মুক্তা বললে, বেনেটোলার মল্লিক—বাড়ির মেজোবাবু। ছোট থাপার বছর ঘুরতেই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর আরো দু'হাত ঘুরে মেজোবাবুর হাতে। জানো, আমি আর মুক্তা বসু নই। আমি এখন একটা দামি মোটরকার, বা একটা শখের আসবাব বলতে পারো।
খিলখিল করে হেসে উঠল মুক্তা। নায়কের মনে হল, সমস্ত পুরুষকে ব্যঙ্গ করছে সে। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন রাগ হয়ে গেল তার। বললে, নেশার ঝোঁকে যাই বল, লাভ তোমারই বা কম কিসে? জীবনে তোমরা যা চাও, সবই তো পেয়েছ—দামি গয়না, অনেক টাকা।
কে বললে আমরা এই চাই?
অকারণে গলা চড়িয়ে নায়ক বললে, হ্যাঁ, এই চাও। টাকা ছাড়া তোমাদের কাছে পুরুষের দাম কী? তোমাদের দুনিয়ায় টাকা মানেই সুখ। টাকা মানেই প্রেম।
হুইস্কির উত্তেজনায় নায়কের খেয়াল হল না, আজ মেয়ে—জাতের বিরুদ্ধে যে নালিশটা সে করছে, আসলে সেটা শুধু কলাপীর বিরুদ্ধেই।
আস্তে আস্তে মুক্তা বললে, জীবনে তো আরো কত মেয়ের সঙ্গে মিশলে, মিশে কি এই বুঝলে? আমি তো টাকা চাইনি। আমি শুধু সুখী হতে চেয়েছিলাম। একটি স্বামী আর একটি ঘর নিয়ে। কিন্তু তা আর হল কই?
মুক্তার গলার নেশা—জড়ানো বিষণ্ণ আওয়াজটা যেন অনেক দূর থেকে শোনাল। একটু থেমে থেকে আবার যেন কাছে থেকে বললে, যাকগে ওসব কথা। মরা স্বপ্নকে কবর খুঁড়ে বার করে কি হবে? তোমার খবর বলো। বিয়ে করেছ?
হুঁ। ছোট্ট করে জবাব দিলে নায়ক।
সুখী হয়েছ?
নায়ক চুপ করে রইল।
মুক্তা বললে, সুখী হওনি, তা বুঝতে পেরেছি।
তারপর তার গেলাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে বললে, দুনিয়ায় কেউ বোধহয় সুখী নয়।
পর্দা সরিয়ে সেই মোটা থলথলে চেহারার মেজোবাবুর আবির্ভাব হল। ভদ্রলোক খুবই লিবারেল বলতে হবে। নিজের রক্ষিতাকে অপরের সঙ্গে দেখেও রাগ করল না। শুধু ডাকলে, কই গো, এসো।
উঠে পড়ল মুক্তা। নায়কের দিকে একবার তাকিয়ে বললে, চলি।
নায়ক শুনতে পেল, যেতে যেতে মেজোবাবু বলছে, কি গো? পুরোনো মক্কেল বুঝি?
উত্তরে জড়ানো গলার বেসামাল কলহাস্য।
একা একা আরো অনেকক্ষণ বসে রইল নায়ক। পর পর আরো কয়েকটা পেগ খেল। জীবনটা চাকার মতো ঘুরছে। নইলে চার বছর বাদে মুক্তার সঙ্গে আজ দেখা হল কেন?
সব কথার শেষে মুক্তা বলে গেল, দুনিয়ার কেউ বোধহয় সুখী নয়।
দুনিয়ায় কে সুখী হল আর হল না, নায়ক তা জানতে চায় না। নিজে সে সুখী হতে চেষ্টা করেছে বরাবর। কিন্তু হতে পারল কি?
জীবনটা সত্যিই চাকার মতো ঘুরছে। আর সুখ কখনো সেই চাকার ওপরে, কখনো নিচে। নায়ক যখনই হাত বাড়িয়েছে চাকার ওপরে, সুখ চলে এসেছে নিচে। যখনই হাত বাড়িয়েছে নিচে, সুখ চলে গেছে ওপরে।
কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না সুখকে। অথচ দুনিয়াময় সুখী হবার কী দুশ্চেষ্টা!
আবার হিন্দুস্থান পার্ক। ফিরতে রাত একটা বাজল।
কলাপী শুয়েই ছিল, কিন্তু জেগে ছিল বোধ হয়। আলো জ্বালতেই বিছানায় উঠে বসল।
এতক্ষণে ফেরার সময় হল তোমার? থমথমে মুখে কলাপী প্রশ্ন করলে।
জবাব দিলে না নায়ক। এ প্রশ্নের কী—ই বা জবাব দেবে?
রাত ক'টা বেজেছে খেয়াল আছে? কোথায় ছিলে এত রাত অবধি?
নায়ক চুপচাপ পোশাক বদলাতে লাগল।
কী, ভেবেছ কী তুমি? কলাপীর গলা এক পর্দা চড়ল।
কিছুই ভাবেনি নায়ক। অতএব চুপচাপ রইল। চোলির বোতাম আঁটতে আঁটতে কলাপী এবার উঠে এল বিছানা ছেড়ে। নায়কের বাহু ধরে নাড়া দিয়ে তীক্ষ্ন গলায় বললে, শুনতে পাচ্ছ?
তারপরেই যেন একটা শক খেয়ে সরে গেল। গলাটা আরো সরু করে বলে উঠল, তুমি মদ খেয়েছ!
ব্যাপারটাকে সহজ করে নেওয়ার জন্যে নায়ক বললে, হ্যাঁ, হোটেলে গিয়েছিলাম।
ও! রাত একটা অবধি হোটেলে কাটিয়ে এলে! চমৎকার!
নায়ক শান্ত ভাবেই বলার চেষ্টা করলে, হোটেলে কি কোনো ভদ্রলোক যায় না? এ নিয়ে এত রাগ করার কি আছে?
সঙ্গে কেউ ছিল নিশ্চয়?
আমি একাই ছিলাম।
একদিকের আঁকা ভুরু অল্প তুলে কলাপী বললে, এও বিশ্বাস করতে হবে?
তোমার ইচ্ছে।
কিন্তু এ বাড়িটা হোটেল নয় যে যখন খুশি আসবে। আমার দাদার অনুগ্রহেই এখানে বাস করছ, সেটা ভুলে যেও না।
নায়কের সবচেয়ে নরম জায়গায় চাবুক পড়ল। একটা অদ্ভুত হাসিতে তার ঠোঁটের কোণটা বেঁকে গেল। তারপর শুধু বললে, ভোলবার উপায় নেই।
কলাপী কেটে কেটে বলতে লাগল, আমার বন্ধুদের তুমি খারাপ বলছিলে না? তারা অন্তত হ্যাগার্ড মাতাল নয়।
ভেতর থেকে জ্বালা—করা একটা উত্তাপ বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তাকে চেপে রেখে নায়ক বললে, এটা কিন্তু বাড়িয়ে বলছ রিনি! চেষ্টা করেও মাতাল আমি হতে পারিনি। বিয়ে করেও সবাই যেমন সুখী হতে পারে না, মদ খেয়েও তেমনি সবাই মাতাল হয় না।
কলাপী ফণা ধরে ফোঁস করে উঠল। বললে, কী বললে, বিয়ে আর মদের নেশা সমান?
সমান কিনা নিজেই ভেবে দেখো না। মদের নেশা থাকে একটা রাত, বিয়ের নেশা বড়জোর দেড় বছর!
ঘাড় বেঁকিয়ে কলাপী বললে, মাতলামো কোরো না! তোমার মতো পুরুষকে নিয়ে কোনো মেয়েই সুখী হতে পারে না।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল নায়ক। আবার সেই একই কথার প্রতিধ্বনি! কেউ সুখী হতে পারে না! কেউ সুখী নয়! তবে আর কেন চেষ্টা?
অসম্ভব শান্ত আর ক্লান্ত গলায় নায়ক বললে, তাই যদি বুঝে থাকো, বাঁধন খোলার আইন তো রয়েছে।
উদ্যত ফণা থেকে বিষ ছিটিয়ে ছিটিয়ে কলাপী বলতে লাগল, তা তো বলবেই! আমায় ডাইভোর্স করলে তোমার অনেক সুবিধে! এতক্ষণ হোটেলে যাকে নিয়ে কাটিয়ে এলে, তার সঙ্গে পাকা বন্দোবস্ত করতে পারো!
নায়ক আর পারলে না। হাতজোড় করে বলে উঠল, প্লিজ রিনি, চুপ করো। অনিমেষ না হয় বিদেশে, নিচে বুধন রয়েছে—বাবুর্চি রয়েছে—
কলাপী থামলে না। সরু গলার ধাতব আওয়াজে বলেই চলল, নিজের স্ত্রীকে খাওয়াবার ক্ষমতা যার নেই, হোটেলে ফুর্তি করার শখ কেন তার? নির্লজ্জ!
সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই নিয়ে নায়ক বারান্দায় বেরিয়ে গেল।
ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল সেই রাতেই। আরো ঘণ্টাখানেক পরে।
অন্ধকার বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে নায়ক ভাবনার ডুবে গেছে।
অথচ ভাবনার কী—ই বা আছে? রোজগার নেই, সুতরাং সংসারের দায়দায়িত্ব নেই। স্ত্রীর ভালোবাসা নেই, অতএব ভালোবাসা হারাবার ভয়ও নেই। শুধু একটা ভাবনাই দড়ির আগুনের মতো ধিকিধিকি পোড়াচ্ছে। নায়ক আজ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে, কলাপী আর তার দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে এখন যা আছে, সেটা কেবল পরস্পরের প্রতি অসহ্য ঘৃণা। ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নেই। বাকি জীবনটা কি তাহলে সেই অসহ্য ঘৃণার সঙ্গে আপস করেই চলতে হবে? সেটা কি সম্ভব? মানুষ কি তা পারে?
ক্লান্ত—ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। এখন যদি একটু ঘুমোতে পারত সে।
ঘুমের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুম এসে গেল। ঘুম ঠিক নয়, গাঢ় ক্লান্তির পাতলা তন্দ্রা।
ঠিক এই সময় শোনা গেল ভয়ার্ত চিৎকারটা।
চমকে জেগে উঠল। আবার চিৎকার! সরু ধাতব গলার। সঙ্গে সঙ্গে নায়কের মনে পড়ে গেল ঘরে কলাপী একা! স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে নায়ক ছুটল। ঘরের কাছে পৌঁছবার পূর্বেই দুটো বিশ্রী শব্দ। দুটো গুলির আওয়াজ। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল চিৎকারটা।
শোবার ঘরের দরজা খোলা। দরজার সামনে আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এক ছায়া—পুরুষ। মুখ ফেরাতেই রাস্তার বাতির একফালি আলো পড়ল তার মুখে।
গাল—ভাঙা রোগা তরুণ মুখ, পাতলা দাড়ি! কোথায় যেন দেখা—দেখা। হাতের মুঠোয় কি একটা জিনিস চকচক করছে!
আধ সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়ে নায়ক আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আততায়ীর ওপর। নায়কের দেহভার সইতে পারল না সে, পড়ে গেল মেঝেয়। শুরু হয়ে গেল ধস্তাধস্তি। কিন্তু বড়জোর দু'মিনিট, তারপরেই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে লোকটা ছুট দিল। বারান্দার অপর প্রান্তে পৌঁছে অদ্ভুত কায়দায় সে রেলিং টপকে কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়ল। দোতলার কার্নিশ থেকে বাগানের পাঁচিলে, পাঁচিল থেকে রাস্তায়। তারপর চোখের নিমেষে অদৃশ্য।
বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে নায়ক তাকিয়ে রইল। আর, তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল ওই গালভাঙা রোগা তরুণ মুখ সে দেখেছে তিন বছর পূর্বে। পেয়ারাবাগান লেনে।
কিন্তু এতদিন বাদে কেন এল ভুলু? কেন এল কলাপীকে খুন করতে? তাহলে কলাপী কি আর বেঁচে নেই?
রেলিংয়ের ধার থেকে দ্রুত পায়ে সে আসতে লাগল ঘরের দিকে। পায়ে কি একটা ঠেকল। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে নায়ক দেখলে, ছোট একটা অটোমেটিক রিভলভার। ধস্তাধস্তির সময় ভুলুর হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল, কুড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ হয়নি।
শোবার ঘরে এসে পা দিল নায়ক। অন্ধকার। সেই অন্ধকারে জোড়া খাটের বিছানায় শরীরটাকে দুমড়ে উপুড় হয়ে পড়ে আছে কলাপী। আলো জ্বালতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলে নায়ক। ভয়ঙ্কর বীভৎস দৃশ্যটা সহ্য করতে পারবে না বলেই বোধহয়। শেষই হল তবে! রাত শেষ হওয়ার আগেই। কলাপী আর ভোর দেখবে না।
আশ্চর্য, বুধন আর বাবুর্চির কোনো সাড়া নেই এখনো!
আমাদের গল্প কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছে দেখুন!
আমাদের কিন্তু কোনো হাত নেই। গল্প বয়ে চলেছে নিজের আঁকাবাঁকা খাতে, নিজের খেয়ালে। একটা ঘটনার পাথরখণ্ডে ধাক্কা খেয়ে আরেকটা ঘটনায় গিয়ে পড়েছে। সেখান থেকে আরেকটায়। সঙ্গতি খোঁজবার চেষ্টা করবেন না। কারণ আজকের জীবনের সঙ্গতি নেই। মিল নেই আজকের সঙ্গে কালকের। আজকের যুগ বিবর্তনের নয়, পরিবর্তনেরও নয়। দিগ্বিদিক জ্ঞানহারানো দৌড়ের যুগ। সত্তর দশক হচ্ছে এমন একটা মোটরকার, যার অতীব শক্তিশালী ইঞ্জিন আর অ্যাকসিলিরেটর আছে; কিন্তু স্টিয়ারিং নেই, ব্রেক নেই। উন্মাদ গতিতে ছুটতে গিয়ে অন্ধের মতো বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। পরকে ভাঙছে, নিজেও ভেঙে পড়ছে।
রাজনীতি বলুন, সমাজ—ব্যবস্থা বলুন, শিক্ষা বা সাহিত্য বলুন, এমনকি ফ্যাশনের ক্ষেত্রেও বলুন, আজকের সঙ্গে কালকের সঙ্গতি কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন? অতএব আমাদের গল্পও যদি এলোমেলো হয়ে থাকে, আমাদের নায়ক—চরিত্রেও যদি সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া না যায়, সেটা আর এমন কি দোষের? নায়ক—নায়িকার প্রণয়—কাহিনি চলতে চলতে হঠাৎ আজ খুনের ঘটনায় পৌঁছেছে। তাতেই বা অবাক হওয়ার কী আছে? বর্তমান কালে খুন তো সবচেয়ে স্বাভাবিক কাণ্ড, সবচেয়ে নিরুত্তাপ ঘটনা।
কলাপী যখন খুন হয়েছে, তখন পুলিশ আসবে জানা কথা।
সকাল হতেই পুলিশ এল হিন্দুস্থান পার্কের মজুমদার বাড়িতে। কলাপীর লাশ দেখল। একটা গুলিই লেগেছে। বুকের ঠিক মাঝখানে নয়, একটু বাঁ দিক ঘেঁষে। গায়ের রঙে মিশিয়ে—থাকা ফিকে—হলুদ চোলি কালচে গাঢ় রক্তে ভিজে চটচটে হয়ে আছে।
শুধু কলাপীর লাশ নয়, শোবার ঘরটায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল পুলিশ। ফোটো তুলল। নায়কের মুখে ঘটনার বিবরণ শুনল। আততায়ীর নাম, চেহারার বর্ণনা আর পরিচয় জানল। তার অটোমেটিক রিভলভারটা নিল সাবধানে। বাইরে থেকে হুড়কো—দেওয়া একতলার ঘরে আটক বুধন আর বাবুর্চিকে উদ্ধার করল। জেরা করল আলাদা আলাদা ভাবে। তারপর ময়না তদন্তের জন্যে কলাপীর লাশ চালান দিয়ে পুলিশও চলে গেল।
কিন্তু এসব পুলিশের ছকে—বাঁধা কাজ। এ নিয়ে আমাদের গল্পের প্রয়োজন নেই। আমাদের গল্প এখন ফেরার আততায়ী ভুলুকে খুঁজছে। চাইছে জমাট সাসপেন্স।
দুঃখের বিষয়, তাও তেমন জমাট বাঁধল না। বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হয়নি, তিন দিনের মাথায় গুপ্ত আস্তানা থেকে পুলিশ ভুলুকে ধরে নিয়ে এল থানায়।
সত্তর দশকের ছেলে ভুলু। ভয়—ডর জানে না। পুলিশের জেরার উত্তরে সোজাসুজি স্বীকার করলে, হ্যাঁ, আমি খুন করতে গিয়েছিলাম। আমিই খুন করেছি। না, টাকা বা গয়নার লোভে নয়, আমার দিদির আত্মহত্যার বদলা নেব বলে। তিন বছর জেলে ছিলাম, তাই দেরি হয়ে গেল। নইলে অনেক আগেই খতম করতাম।
অফিসার বললেন, তোমার দিদির আত্মহত্যার সঙ্গে কলাপী দেবীর সম্পর্ক কি!
ভুলু বললে, আমার দিদির জায়গায় তিনিই তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন। কলাপী দেবী বড়লোকের মেয়ে, তাঁকে বিয়ে করার সুযোগ পেয়ে আমার দিদির জীবনটা বরবাদ করে দিল দ্যাট বাগার! ইচ্ছে ছিল, স্বামী—স্ত্রী দুজনের জন্যেই দুটো গুলি খরচ করব। কিন্তু ব্যাড লাক, বিছানায় একজনকে পেলাম, আরেকজনকে পেলাম না। আর কিছু জানতে চান?
এ রিভলভারটা তোমার?—অটোমেটিকটা দেখালেন অফিসার।
হ্যাঁ, এটাই।
পেলে কোত্থেকে?—অফিসার প্রশ্ন করলেন।
নির্বিকার মুখে ভুলু জবাব দিলে, ওটা ফালতু কোশ্চেন। ফালতু কথার জবাব আমি দিই না। খুন করেছি বললাম—ব্যস!
পাঠক, এত সহজ স্বীকারোক্তির পর সাসপেন্সের চমক আর কি করে থাকে বলুন? আমাদের গল্প না হল সামাজিক কাহিনি, না হল রহস্য—কাহিনি। এ গল্প কোন জাতের, আপনারাই ঠিক করুন।
তবে একেবারে হতাশ হবেন না। জীবন চিরকালই গল্প—উপন্যাসের চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর, বেশি রহস্যময়। একটা সাধারণ জীবনের মধ্যে যে সাসপেন্স, যে অদ্ভুত চমক লুকিয়ে থাকে, বানানো গল্পে তা মেলে না।
এ গল্পে সেইটুকুই শুধু বাকি।
মানুষ মরে, কিন্তু আশা মরে না।
আজ যেখানে হতাশ্বাসের অন্ধকার, কাল সেখানে নতুন আশার বাতি জ্বালবার চেষ্টা। হাওয়ার মুখে দেশলায়ের কাঠি যতবার নিভে যায়, ততই মনে হয় পরের কাঠিটা নিশ্চয় জ্বলবে। ভাগ্যের মার যে খেয়েছে, সেই চায় ভাগ্যকে আরেকবার পরীক্ষা করতে।
জীবনের আরেক নাম আশা।
আমাদের গল্পের নায়কও তাই ভাবছে, জীবনটাকে নতুন করে গড়লে কেমন হয়? অবশ্য এত বড় বিপর্যয়ের পরে তার বৈরাগ্য আসা উচিত ছিল। উচিত ছিল কোনো আশ্রমে—টাশ্রমে সংযুক্ত হয়ে বাকি দিন ক'টা 'কা তব কান্তা' ইত্যাদি পড়ে কাটিয়ে দেওয়া। কিন্তু যা উচিত, সংসারে কি তাই হয়? অন্তত আমাদের গল্পের গোড়া থেকেই তা হচ্ছে না। মানুষের কামনা—বাসনা জীবন—তৃষ্ণা এমনই সত্য ও স্বাভাবিক যে, কোনো সজীব মন তাকে অস্বীকার করতে পারে না।
দূর্বা মরেছে, কলাপী মরেছে, মুক্তার যা হয়েছে, সেও এক রকম মৃত্যু। নায়কের বত্রিশ বছরের যৌবন এখনো মরেনি। ভাগ্যের মার খেয়েও সে আবার ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইছে। জীবনকে নতুন করে গড়তে চাইছে। সবচেয়ে আশ্চর্য, সুখী হতে চাইছে।
সুখের আশাই বোধ হয় সুখ।
কলকাতায় অসহ্য হয়ে উঠেছে। বিষিয়ে উঠেছে নগর—সভ্যতা। এখানে আর নয়, নায়ক চলে যাবে নগর থেকে দূরে—কোনো গণ্ডগ্রামে। অতি—সাধারণ চাষি বা শ্রমিক হয়ে থাকবে। সেই হাজার জনের মধ্যে মিশে—যাওয়া কোনো সঙ্গিনী যদি খুঁজে পায়, দু'হাত বাড়িয়ে তাকে গ্রহণ করবে। তার দায়িত্ব নেবে। তার বিশ্বাসের মান রাখবে। তাকে সুখী করবে।
নায়ক আর বড় হতে চায় না। চায় না বড়লোক হতে। চায় না চাকরির উন্নতি, সামাজিক পদমর্যাদা, সুন্দরী স্ত্রীর স্বামী হওয়ার মূঢ় গর্ব। সে শুধু চায় সুখী করতে আর সুখী হতে।
গতকাল বিদেশ থেকে ফিরেছে অনিমেষ। তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর্বও শেষ হয়েছে। আজ সে চলে যাবে। সকালে নিজের সামান্য জিনিসপত্র গোছগাছ করতে করতে নয়া জমানার নায়কের বাস্তববাদী মন স্বপ্ন দেখছে: আম—কাঁঠালের ছায়া—মেটে ঘর—পুকুরঘাটে বাসনের পাঁজা নিয়ে বউ—উঠোনে দামাল উলঙ্গ শিশু—
ঠিক এই সময় থানা—অফিসার এলেন। সঙ্গে অনিমেষ।
কি খবর অফিসার?
অফিসার বললেন, একটু বিরক্ত করতে এলাম। গোটা কয়েক প্রশ্ন আছে।
বেশ তো, বলুন।—হাতের কাজ বন্ধ করলে নায়ক।
আচ্ছা, সে—রাতের ঘটনাটা ঘটতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল বলতে পারেন? বেশিক্ষণ নয় নিশ্চয়?
তিন মিনিট বড়জোর। নায়ক জবাব দিলে।
ভুলু সোম কোথা থেকে গুলি চালিয়েছিল বলুন তো?
নায়ক বললে, এ তো পুরানো প্রশ্ন। সব কথাই আগে জানিয়েছি।
একটু কিন্তু হয়ে অফিসার বললেন, আরেকবার ভালো করে জেনে নিতে চাই। ভুলু কি ঘরে ঢুকে এসেছিল?
না, দরজার চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে সে ফায়ার করেছিল।
ও। আচ্ছা, ক'বার গুলি করেছিল মনে আছে?
তিনবার।
পর পর, না থেমে থেমে?
দুটো গুলি পর পর। তৃতীয়টা কিছু পরে।
কতক্ষণ পরে?
অসহিষ্ণু গলায় নায়ক বললে, মিনিট পাঁচ—সাত হবে। কিন্তু আর কেন অফিসার? এসব কথা আমার নার্ভে কতখানি ঘা দেয়, তাও কি বুঝিয়ে বলতে হবে? ভুলু সোম যখন নিজেই কবুল করেছে—
না। অফিসারের গলার আওয়াজটা এবার বদলে গেল। অত্যন্ত নীরস গলায় বললেন, ভুলু সোম কলাপী দেবীকে খুন করেনি।
সেকি! চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল অনিমেষ।
হ্যাঁ। ভুলু খুন করতে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অন্ধকারে তার গুলি আপনার বোনের গায়ে লাগেনি। ভুলু নিজেও একথা জানে না।
তাহলে কলাপীকে খুন করল কে? জীবন্ত মমির মতো ঠোঁট নেড়ে প্রশ্ন করলে নায়ক।
সেটা আপনার চেয়ে ভালো কে জানে?
কি বলতে চান অফিসার?
কলাপী দেবীকে খুন করার চার্জে আপনাকে আমি অ্যারেস্ট করলাম।
অফিসারের গম্ভীর আওয়াজ সারা ঘরে গমগম করতে লাগল।
রুখে উঠল অনিমেষ: কী বলছেন অফিসার! বুঝে—সুঝে কথা বলুন।
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নায়ক বললে, কিসের ওপর ভিত্তি করে আমার বিরুদ্ধে চার্জ আনলেন? কি প্রমাণ পেয়েছেন?
অফিসার বললেন, প্রমাণ কোর্টেই দাখিল করা নিয়ম। তবু চ্যালেঞ্জ যখন করলেন, তখন বলছি। প্রথম প্রমাণ: আপনি নিজেই বলেছেন, ভুলু গুলি ছুড়েছিল দরজার চৌকাঠের কাছ থেকে। দরজা থেকে শোবার খাট অন্তত বিশ হাত দূরে। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাত্র চার—পাঁচ হাত তফাত থেকে গুলি করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রমাণ: আপনি স্বীকার করেছেন, সমস্ত ঘটনাটা ঘটতে সময় লেগেছিল বড়জোর তিন মিনিট। তাহলে আরো পাঁচ—সাত মিনিট পরে তৃতীয় গুলিটা ভুলু সোম ছোড়ে কি করে? সে তো তিন মিনিট বাদেই পালিয়েছিল! ঘটনাস্থলে তখন আপনি ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। এবার অঙ্ক মিলিয়ে দেখুন তো খুনি কে?
নায়ক প্রশ্ন করলে, কিন্তু রিভলভারে কার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে? আমার, না ভুলুর?
কারো ছাপই পাওয়া যায়নি। আমার সন্দেহের প্রথম কারণ সেটাই। নিজের আঙুলের ছাপ মুছতে গিয়ে আপনি ভুলু সোমের ফিঙ্গারপ্রিন্টও মুছে ফেলেছেন।
নিশ্চল পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নায়ক। আর, অনিমেষ আস্তে আস্তে আবার চেয়ারে বসে পড়ল।
অফিসার বললেন, অনিমেষবাবু, আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। আঘাতের ওপর আঘাত দিতে হল বলে আমি দুঃখিত।
অনিমেষ যেন হঠাৎ বুড়ো হয়ে গেছে। বিষণ্ণ ভারি গলায় ধীরে ধীরে বললে, কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারছি না কিছু—কলাপীকে ও মেরে ফেলল কেন? কোন স্বার্থে? কি কারণে?
অফিসার বললেন, কারণটা আপনার জানবার কথা নয়। কেননা, বেশির ভাগ সময় আপনি থাকেন বিদেশে। কখনো কি খোঁজ রেখেছিলেন, স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল? আপনাদের বেয়ারা বুধনকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারতেন, ওঁদের দাম্পত্য সম্পর্কটা কতখানি তিক্ত হয়ে উঠেছিল।
শোনা গেল কি গেল না এমন আওয়াজে অনিমেষ শুধু বললে, আশ্চর্য!
অফিসার বললেন, খুন করতে এসে ভুলু সোমের পালিয়ে যাওয়া অবধি আমরা জানতে পেরেছি। তারপর থেকে ঘটনাটা মোটামুটি অনুমান করলে যা দাঁড়ায়—
আমিই বলছি।
নিষ্প্রাণ রক্তহীন মুখে নায়ক হঠাৎ বলে উঠল। হাজার ফিট খাদে গড়িয়ে পড়তে পড়তে যেমন জ্ঞান থাকে, অথচ অনুভূতি অসাড় হয়ে যায়, তেমনি নিরাবেগ যান্ত্রিক গলায় নায়ক বলতে লাগল, সবই যখন জেনেছেন, তখন বাকিটুকুও শুনুন। মোটামুটি অনুমান করে লাভ কি? যা সত্যিকার ঘটেছিল, তাই বলছি:
অদ্ভুত কায়দায় রেলিং টপকে ভুলু ঝুলে পড়ল। বারান্দার কার্নিশ থেকে বাগানের পাঁচিলে। পাঁচিল থেকে সদর রাস্তায়। তারপর চোখের নিমেষে অদৃশ্য। রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নায়ক আকাশ—পাতাল ভাবতে লাগল। ভুলু সোম কি কলাপীর জুয়েলারি বাক্সের লোভে এসেছিল? কি জন্যে এল খুন করতে? কলাপী তাহলে শেষ হয়েই গেল!
আর ভাবতে পারলে না নায়ক। দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে এগোল। চলতে চলতে পায়ে কি যেন একটা ঠেকল। অন্ধকারেও চকচক করছে। কুড়িয়ে নিয়ে দেখলে, ছোট একটা অটোমেটিক রিভলভার। ধস্তাধস্তির সময় ভুলুর হাত থেকে ছিটকে পড়েছে।
শোবার ঘরে পা দিয়েই থমকে গেল নায়ক। বেডসুইচ থাকা সত্ত্বেও আলো জ্বালেনি কলাপী, আততায়ীর ভয়ে ঘাবড়ে গিয়েই হয়তো জ্বালেনি। রাস্তার বাতির তেরছা আলোর আভাসে অন্ধকার যেটুকু ফিকে হয়েছে, তাতেই দেখা যাচ্ছে জোড়া খাটের বিছানায় কলাপীর দেহটা দুমড়ে উপুড় হয়ে পড়ে আছে!
শেষ! একেবারে শেষই হয়ে গেছে তাহলে! আলো জ্বলতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলে নায়ক। ভয়ঙ্কর একটা বীভৎস দৃশ্য সহ্য করতে পারবে না বলে।
হঠাৎ অন্ধকার কথা কয়ে উঠল, পালিয়ে গেল ডাকাতটা?
চমকে উঠল নায়ক। নিষ্পলক চোখ মেলে দেখলে, বিছানায় উঠে বসেছে কলাপী।
অজান্তে নায়কের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল: তুমি বেঁচে আছ!
সরু গলায় শ্লেষ মিশিয়ে কলাপী বললে, খুব হতাশ হয়েছ, না? ভেবেছিলে জন্মের মতো আপদ গেছে!
গায়ে কোথাও লাগেনি তো?—নায়কের গলায় উদ্বেগ।
কলাপী তেমনি বিদ্রুপ করে বললে, লাগলে তুমি খুশি হতে জানি। কিন্তু ভাগ্য তোমার ওপর বিরূপ!
আঃ, কী যা—তা বলছ রিনি! বাকি রাতটা আর কেন তেতো করছ?
তোমার মনের কথাগুলো টেনে বলছি বলেই তেতো লাগছে! সত্যি, তোমার এমন চমৎকার প্ল্যানটা ভেস্তে গেল!—ধাতব আওয়াজে হাসল কলাপী।
হতবুদ্ধি হয়ে নায়ক বললে, আমার প্ল্যান! কি প্ল্যান?
কলাপীর গলা তীক্ষ্নতর হল। বললে, ন্যাকামি কোরো না! তোমার মতলব আমি বুঝতে পারিনি ভেবেছ? নিজের হাতে আমাকে খুন করলে তুমি বিপদে পড়তে পারো, তাই ভাড়া—করা গুন্ডা লাগিয়েছিলে!
আমি গুন্ডা লাগিয়েছি তোমাকে খুন করার জন্যে?
অসহ্য বিস্ময়ে, অসহ্য যন্ত্রণায় নায়কের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
কলাপী বললে, ডাইভোর্স যখন আমি দেব না, তখন গুন্ডা লাগানো ছাড়া তোমার রেহাই পাবার উপায় কী?
রিনি, এ তুমি বিশ্বাস করতে পারলে!
আরেক পর্দা গলা চড়িয়ে কলাপী বললে, থাক, আর অভিনয়ে কাজ নেই। গুন্ডাটাকে দেখে আমি যখন ভয়ে 'কে' বলে চেঁচিয়ে উঠলাম, সে তখন কি বললে জানো? দাঁতে দাঁত চেপে বললে, 'তোমার সুখের জীবন খতম করে দিতে এসেছি!' আমার সুখের জীবন খতম করতে তুমি ছাড়া দুনিয়ায় কার এত আগ্রহ? জীবনে আমায় সুখী করেছ কোনোদিন?
তীব্র রাগে আর চেপে—রাখা কান্নায় কলাপীর গলার স্বর আরো ধারালো হয়ে উঠল।
ঘরে আলো থাকলে দেখা যেত, অসহ্য যন্ত্রণায় নায়কের মুখ বিকৃত হয়ে গেছে। কলাপীর সরু ধাতব আওয়াজে তার ক্লান্ত স্নায়ুমণ্ডলী ঝনঝন করে উঠছে। অস্থির গলায় সে বলে উঠল, রিনি, রিনি, চুপ করো—দোহাই তোমার, চুপ করো!
নিষ্ঠুরের মতো কলাপী বললে, না, চুপ করব না! দুনিয়াকে জানিয়ে দেব তোমার এই কীর্তির কথা! বলে দেব, স্বামী হয়ে তুমি স্ত্রীকে—
শোনো রিনি, শোনো!—মরিয়া হয়ে নায়ক তাকে থামাবার চেষ্টা করলে, তোমাকে খুন করার মতলব করে কী লাভ আমার বলতে পারো? কী স্বার্থ?
কী স্বার্থ, জানো না, না?—যেন বিষাক্ত ছুরি দিয়ে কেটে কেটে কলাপী বলতে লাগল, দিনের পর দিন আমার দাদার কাঁধে চেপে দিব্যি খাচ্ছ—দাচ্ছ, আর লজ্জায় অপমানে আমার মাথা হেঁট করে দিচ্ছ! এই তো তোমার জীবন! এবার আমায় খুন করতে পারলেই যা কিছু আমার, সর্বস্ব তোমার মুঠোয়! আবার বলছ কী স্বার্থ? তুমি মানুষ? তুমি ইতর, তুমি লোফার! ঘেন্না করি—তোমায় আমি ঘেন্না করি!
নায়কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। কলাপী তাকে ঘৃণা করে! বেকার স্বামীর জন্যে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নেই তার। সারা জীবন স্ত্রীর ঘৃণার সঙ্গে আপস করে চলা—স্ত্রীর ঘৃণার কাছে মাথা হেঁট করে থাকা কি সম্ভব? কোনো স্বামী কি তা পারে? দুনিয়ার কাছে বেকারের কোনো মূল্য নেই, সম্মান নেই। দুনিয়ায় কোনো মায়া—মমতা—ভালোবাসা নেই বেকারের জন্য। কিন্তু নিজের স্ত্রীর কাছেও নেই? তবে আর কেন এ প্রহসন? সাজা রাজা—রাণির মতো কেন মিথ্যে স্বামী—স্ত্রী সেজে থাকা? হয়ে যাক এই ঠাট্টার ইতি।
একেবারে শান্ত হয়ে গেল নায়ক। বুকের মধ্যে সেই অসহ্য অস্থির যন্ত্রণাটাও যেন শান্ত হয়ে গেল। শুধু দপদপ করতে লাগল কপালের দু'পাশের রগ দুটো। স্থির গলায় নায়ক বললে, তা হলে আর নয় রিনি। পরস্পরের কাছ থেকে এবার আমাদের রেহাই নেওয়াই দরকার।
ফুঁসে উঠল রিনি, না, কিছুতেই না। তোমার জন্যে সমাজের মুখ হাসাব, এ—আশা ভুলেও কোরো না।
কপালের রগ দুটো ভীষণ দপদপ করছে। রক্তের চাপে যেন ফেটে পড়বে। গলার স্বর আরো শান্ত অথচ স্পষ্ট করে নায়ক বললে, রেহাই তোমাকে দিতেই হবে রিনি। দিতেও হবে, নিতেও হবে।
কক্ষনো না! রেহাই তোমাকে জীবনে দেব না।
দিতেই হবে রিনি! দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে নায়ক বললে।
অন্ধকারে কলাপী দেখতে পেল না নায়কের মুঠোয় অটোমেটিকটা তারই বুক লক্ষ্য করে স্থির হয়ে আছে। চিৎকার করে সে বললে, না—না—না! আমাকে মেরে না ফেললে তুমি রেহাই—
কথাটা আর শেষ হল না। এক ঝলক আগুন চিৎকারকে থামিয়ে দিল। কলাপী রেহাই দিয়েও গেল। রেহাই নিয়েও গেল।
আমাদের গল্প এইখানেই থেমে গেছে। এই বিশ্রী পরিণতিতে এসে থেমে যাওয়া ছাড়া গল্পের আর উপায় কি বলুন? নায়কের বত্রিশ বছর বয়সের জীবন—মোটর হঠাৎ ব্রেক ফেল করে প্রচণ্ড ধাক্কায় চুরমার হয়ে যাবে, তা কি আমাদের নায়কই জানত? এ যুগের কোনো নায়ক কি জানে?
চলুন, আমাদের নায়কের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করে আসি। না, দুঃখ প্রকাশ করতে বা সমব্যথা জানাতে নয়। ও—সবের কোনো প্রয়োজন নেই তার। আত্মগ্লানি বা অনুশোচনার ধার ধারে না সে। জীবনে সে আজ প্রথম হালকা বোধ করছে! সব বোঝা তার হালকা হয়ে গেছে, কেবল কর্তব্য আর দায়িত্বের বোঝা নয়, কত সুখের ভাবনা, কত সুখের কামনা, কত সুখের স্বপ্ন—সব কিছুর বোঝা। জীবনে আজ আর সুখের প্রত্যাশা নেই। সে নিশ্চিন্ত। পরম নিশ্চিন্ত।
ঝাঁ ঝাঁ করছে রাত। বাইরে শুধু ওয়ার্ডারের ভারি বুটের শব্দ।
জেলের সেল—এ বসে বসে নিজের কথাই ভাবছে নায়ক। ভাবছে, কেন সে সুখী হতে পারল না? চেষ্টা তো করেছিল সে। সুখের তিনটি উপকরণ টাকা নারী প্রেম—তাও পেয়েছিল জীবনে। তবু কেন সুখী হতে পারল না? যা চাইল, তা পেল না। যা পেল, তাও রইল না।
নিজের থেকে সরে এসে নিজেরই পানে ফিরে তাকাল নায়ক।
তার স্বাস্থ্য ছিল, শিক্ষা ছিল, মন ছিল, প্রেম ছিল। আর ছিল জীবনে সুখী হওয়ার প্রবল তৃষ্ণা। মুক্তাকে সে কি ভালোবাসেনি? ভালোবাসেনি দূর্বাকে? সহস্র ভালোবাসা কি দেয়নি তার বিবাহিত স্ত্রী কলাপীকে? তবু কী হল? তার অস্থির যাযাবর যৌবন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে মুক্তার কাছ থেকে দূর্বার পাশে, দূর্বার পাশ থেকে কলাপীর বাহুবন্ধনে। তারপর ছিটকে পড়ল বিশাল শূন্যতায়! একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল জীবনটা। শুধু হা হা করছে অসীম তৃষ্ণা!
লা বোহেমিয়া হোটেলে বসে মাতাল মুক্তা বলেছিল, 'দুনিয়ায় কেউ বোধ হয় সুখী নয়।' সেই কথাটা আজ বারবার মনে পড়ছে নায়কের। কে সুখী হল? নায়ক, মুক্তা, দূর্বা, কলাপী, ছোট থাপার, জ্যাঠামশাই, ভুলু সোম, অনিমেষ—কেউ তো সুখী হতে পারল না! কেন? কি দোষে? কার দোষে?
পাঠক, নায়ক বোধ করি আপনাদের প্রশ্ন শুনতে পেল। মুখ তুলে বললে, দোষ কারো নয়। দোষ এই অন্ধ আত্মঘাতী যুগের। এ যুগে শিক্ষা আছে, আদর্শ নেই। মন আছে, বিবেক নেই। প্রবৃত্তি আছে, সংযম নেই। প্রেম আছে, শ্রদ্ধা নেই। সর্বোপরি কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নেই। তাই সুখী হওয়াও যায় না, সুখী করাও যায় না। আমি এ যুগের নায়ক, আমাকে নিয়ে গল্প লিখতে বসে আপনারা ভুল করেছেন। গল্প বিফল হবেই। কেননা, এ যুগটাই বিফলতার যুগ!
একটু চুপ করে থেকে নায়ক আবার বললে, আচ্ছা, সুখটা কি বলতে পারেন আপনারা? সুখ নামে একটা চমৎকার রঙিন ফুল দেখে আমরা সবাই হাত বাড়িয়ে ছুটছি। কাছে গিয়ে দেখছি, সেটা রঙ—করা একটা কাগজের ফুল!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন