রাজকন্যা

প্রণব রায়

শোরগোল এল যেখানে খননকার্য চলেছে, সেখান থেকেই। প্রায় ছ'ফার্লং দূরে। বাংলোয় বসে বৈকালি চা খেতে—খেতে প্রতাপবাবুর সঙ্গে ইরা, প্রিয়তোষ আর জয়াও স্পষ্টভাবে শুনতে পেল। প্রতাপবাবু বাংলোর বারান্দা থেকে দু'—একবার তাকালেন ঘটনাস্থলের দিকে। মাঝে কোনও অন্তরায় নেই বলে খননকার্যের জায়গাটা বারান্দা থেকে সোজা দেখা যায়।

এ—অঞ্চলটা বাংলা—বিহারের সীমারেখার ওপরে বললেই চলে। এখানেই এসেছেন দেশ—বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক প্রতাপচন্দ্র সেন মজুমদার, গভর্নমেন্ট থেকে সাহায্য নিয়ে। বহু পুরাতন ইতিহাসের ধূলি—মলিন পৃষ্ঠা ঘেঁটে তাঁর দৃঢ় ধারণা হয়েছে যে, পাল রাজত্বের শেষদিকের কিছু—কিছু কীর্তি, পাল সভ্যতার কিছু—কিছু অবলুপ্ত চিহ্ন এই অঞ্চলেই ভূগর্ভে প্রোথিত হয়ে আছে। বাংলো থেকে সোজা পশ্চিমমুখো তাকালেই ধোঁয়াটে রঙের যে পাহাড়টার গায়ে দৃষ্টি ঠেকে যায়, তারই কোল ঘেঁষে অনেকখানি জায়গা জুড়ে প্রতাপবাবুর নেতৃত্বে লুপ্তোদ্ধারের কাজ চলেছে। কাজটা চলেছে রীতিমতো সমারোহের সঙ্গে। স্ত্রী—পুরুষ মিলে কুলি খাটছে প্রায় শ'দুয়েক। তাছাড়া অন্যান্য স্টাফ তো আছেই।

মাইল খানেক দূরে খরস্রোতা চৈতি নদী। তারই এপারে অস্থায়ী কুলি ধাওড়া তৈরি হয়েছে। খানিকটা তফাতে স্টাফের জন পনেরো বাবু তাঁবু খাটিয়েছেন। আর এই কাঠের বাংলোটা দখল করেছেন প্রতাপবাবু নিজে, তাঁর একমাত্র মাতৃহীন কন্যা ইরা, ইরার দূর—সম্পর্কীয় মাসতুতো বোন জয়া এবং ঠাকুর—চাকর—বেয়ারা। প্রিয়েতোষ ওদের কেউ নয়, তবু আপনজন। এক সময় কলেজে প্রতাপবাবুর প্রিয় ছাত্র ছিল। আজ দিন তিনেক হল এক জোড়া বন্দুক নিয়ে এখানে এসেছে শিকারের নেশায়। প্রিয়তোষের প্রকৃতির মধ্যে চিরকালের একটা যাযাবর রয়েছে, যে তাকে স্থান থেকে স্থানান্তরে ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। একমাত্র প্রতাপবাবুর ছোট্ট পরিবারেই বারে—বারে তাকে দেখা যায়। কিন্তু এই রাজনগরে সে যেমন হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়েছে, তেমনি আবার কবে চলে যাবে, তার ঠিক—ঠিকানা নেই।

সুগঠন, সুদর্শন অথচ রুক্ষ চেহারার এই নবীন যুবার প্রতি অধ্যাপক প্রতাপবাবুর বড় স্নেহ। বৈকালি চায়ের টেবিলে বসে প্রিয়তোষকে তিনি পাল—সভ্যতার ওপর বৌদ্ধ—প্রভাব কতখানি পড়েছিল, সযত্নে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। এ—যাবৎ মাটি খুঁড়ে প্রাচীন স্থাপত্যের যে নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তার গঠনে ও কারুকার্যে বৌদ্ধ—শিল্পের প্রভাব বিশেষভাবে দেখা গেছে।

প্রিয়তোষ মন দিয়েই শুনছিল। মাঝে—মাঝে তার ঝকঝকে চোখদুটো পুডিং—কাটতে—ব্যস্ত ইরার মুখের ওপর দিয়ে অলসভাবে ঘুরে আসছিল।

প্রতাপবাবু বলেছিলেন,—এই রাজনগর জায়গাটা বেশ কয়েক শতাব্দী আগে কি ছিল জানো প্রিয়তোষ? এর নাম ছিল কুশলনগর, আর ওই চৈতি নদীর ঠিক ওপারে এখন যেটা বিহারের এলাকা—সেখানে ছিল কাঞ্চনপুর। যৌবনে দুই রাজ্যের রাজায় প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। দুজনেই ছিলেন ঘোর তান্ত্রিক। কিন্তু যৌবন অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুশলনগরের রাজা মহারাজ চন্দ্রপালের কী যে হল, ধর্ম ত্যাগ করে তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিলেন। আর এই নিয়েই বাধল কাঞ্চনপুরের রাজা মহানন্দের সঙ্গে তাঁর বিরোধ। বন্ধু হয়ে দাঁড়াল প্রবল শত্রু। সে—ইতিহাস সবটা আমার জানা হয়নি, তবু যেটুকু জেনেছি বলি শোনো প্রিয়তোষ। শোন মা ইরা। জয়া, তুমিও শোনো মা।

কিন্তু শোনা কারওরই হল না। ঠিক এই সময়েই এল কুলিদের শোরগোল। প্রতাপবাবু একবার সেদিকে তাকিয়ে ইতিহাসের গল্প আবার ফাঁদবার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু কুলিদের সমবেত হল্লা তাঁকে আর সে সুযোগ দিল না। গোলমালাটা ক্রমেই বাড়ছে।

প্রতাপবাবুর সঙ্গে—সঙ্গে এবার বাকি তিনজনও তাকাল যেখানে খননকার্য চলেছে। প্রতাপবাবুর দৃষ্টিতে কিছু জিজ্ঞাসা, কিছু উদ্বেগ। ইরার চোখে ভয়ের ছায়া, জয়ার চোখে একটু সন্দেহ। আর, প্রিয়তোষের ঝকঝকে দুই চোখে নিছক কৌতূহল।

এমন সময় দূরে দেখা গেল শোলা—হ্যাট মাথায় খাকি হাফ শার্ট ও হাফ প্যান্ট পরা একটি মূর্তি এদিকপানে একরকম ছুটেই আসছে।

কপালে হাত রেখে প্রতাপবাবু একাগ্র দৃষ্টিতে দেখলেন। বললেন, সুজনলাল না?

চিনতে ভুল হয়নি তাঁর। একটু পরে বাংলোর বারান্দার নিচে যে এসে দাঁড়াল, সে সুজনলালই বটে। কুলিদের ঠিকাদার। জাতে বিহারি ছত্রি। কিন্তু বিহার তার মাতৃভূমি হলেও সে মানুষ হয়েছে বিমাতা বাংলার কোলে। তাই বাংলা কথা মোটামুটি সে ভালোই বলে। মাঝারি দৈর্ঘ্যের অত্যন্ত বলিষ্ঠ চেহারা। রোদে—জলে কুলি খাটিয়ে গায়ের রঙটা ব্রোঞ্জের মতো গাঢ় তামাটে হয়ে গেছে। ঈষৎ চাপা নাক, চওড়া চোয়াল আর পিঙ্গল চোখ তার মুখে কেমন একটা জেদি চরিত্রের ছাপ এনে দিয়েছে।

বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে সে অভিবাদনের ভঙ্গিতে টুপিটা খুলে নিলে। দেখা গেল, ঈষৎ বাদামি রঙের কুঞ্চিত চুলগুলো তার ঘামে ভিজে উঠেছে।

প্রতাপবাবু বললেন, কী ব্যাপার সুজনলাল?

সুজনলাল রিপোর্ট করলে, মাটি খুঁড়তে—খুঁড়তে গতকাল যে দালানটা বেরিয়েছিল, তারই মাঝখানে একটা বড় চৌকা পাথর শাবলের ঘায়ে সরে যায়। ফণা তুলে বেরিয়ে আসে একজোড়া বিষধর সাপ। কুলিরা অবশ্য তখনই তাদের মেরে ফেলেছে। কিন্তু তার পরই বেরুতে থাকে ফিকে হলুদ রঙের একরকম ধোঁয়া। ধোঁয়াটা বোধ করি বিষাক্ত, যার ফলে পাঁচ—সাতজন কুলি অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। যাই হোক, হলুদ রঙের ধোঁয়াটা বেরিয়ে গেলে সুজনলাল টর্চ নিয়ে দেখে, চৌকো পাথরের নিচে একসার সিঁড়ি সোজা ভূগর্ভে নেমে গেছে।

সিঁড়ি!

উত্তেজনায় কেঁপে গেল অধ্যাপকের গলা।

আজ্ঞে হ্যাঁ। তার ভেতরে কী বা কে আছে, তা একমাত্র রামই জানেন।

সুজনলাল তাই জানতে এসেছে, সদ্য—আবিষ্কৃত সিঁড়ির মুখটা সে খোলা রাখবে, না চৌকো পাথরটা আবার চাপা দেবে।

অধ্যাপক বললেন—আমি নিজে না দেখে কিছুই বলতে পারছি না সুজনলাল। তুমি এগোও, আমি আসছি।

সুজনলাল যাবার জন্যে পেছন ফিরতেই ইরা তাকে ডাকলে। মিষ্টি সৌজন্যের হাসি হেসে বললে, আসুন সুজনবাবু, এক কাপ চা খেয়ে যান। ভারি ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে।

সুজনলালের কালো ঠোঁটের ফাঁকে চকচকে সাদা দাঁত দেখা গেল। হেসে বললে, মাপ করবেন দেবীজী! সাপ আর ধোঁয়া দেখে কুলিরা ভয় পেয়েছে। এখুনি গিয়ে না সামলালে তারা হয়তো কাজ ফেলে পালাবে।

সুজনলাল আর দাঁড়ালে না।

অধ্যাপক ডেকে বললেন, আমি যাওয়ার আগে কেই যেন সিঁড়িতে না পা দেয়।

যেতে—যেতে সুজনলাল উত্তর দিলে, তাই হবে স্যার।

পুডিং পরিবেশন করতে করতে ইরা বায়না ধরলে, আমি যাব বাবা তোমার সঙ্গে।

ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে! না মা, তুমি মেয়ে। অজানা বিপদের মধ্যে তোমার গিয়ে কোনও লাভ নেই।

মেয়ে বলে কি আমি মাটির পুতুল? আমি যাবই।

জয়া বলে উঠল, বারে, তাহলে আমিই বা বাদ যাব কেন মেসোমশাই?

অধ্যাপক বললেন, তাহলে প্রিয়তোষ, তুমিই বা বাদ যাও কেন?

দুই চোখে স্নিগ্ধ আগ্রহ নিয়ে ইরা বললে, চলো না প্রিয়তোষ।

নিতান্ত নির্লিপ্তের মতো প্রিয়তোষ জবাব দিলে, সরি! আজ আমার চৈতির ধারে শাল—জঙ্গলে শিকারের প্রোগ্রাম।

ইরার মুখে অভিমানের ছায়া পড়ল।

খনন—কার্যের জায়গায় মেয়েদের নিয়ে অধ্যাপক যখন পৌঁছলেন, তখন বেলা পড়ে এসেছে। ধোঁয়াটে রঙের পাহাড়টার রঙ হয়েছে তখন বুনো—ভল্লুকের মতো কালো। তারই আড়াল থেকে সূর্যাস্তের সোনালি আলোর টুকরোগুলো উচু—নিচু লাল মাটির স্তূপের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

সেদিনকার মতো কুলিদের ছুটি দিয়ে সুজনলাল একা অপেক্ষা করছিল।

প্রতাপবাবু বললেন, তুমি ওপরেই থাকো সুজলনাল, সিঁড়ির মুখে একজন পাহারা থাকার দরকার। আমরা নেমে যাই।

এঁরাও যাবেন?—ইরা আর জয়ার দিকে তাকিয়ে সুজনলাল প্রশ্ন করলে।

প্রতাপবাবু বললেন, কিছুতেই ছাড়ল না।

না গেলেই বোধ হয় ভাল হত। ভেতরে গিয়ে কোনও বিপদ ঘটলে কে দেখবে?

আপনার উদ্বেগের কারণ নেই সুজনলালজী। দেখবার লোক আছে।

সকলে তাকিয়ে দেখল, প্রিয়তোষ এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দেহ সকলের মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে। পরনে ব্রিচেস, কোমরে চামড়ার খাপে রিভলভার।

ইরার মুখে সহসা যেন সূর্যাস্তের সোনা এসে লাগল।

সুজনলাল একবার প্রিয়তোষের দিকে, একবার ইরার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। কথাটা প্রিয়তোষ শান্ত বিনীত ভাবেই বলেছিল, তবু সুজনলালের মনে হল যেন একটা চাপা দম্ভ, একটা অনুক্ত তাচ্ছিল্য লুকিয়ে রয়েছে কথাগুলোর মধ্যে।

সুজনলালের মুখভাবের কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। চওড়া চোয়াল দুটো একটু শক্ত হয়ে উঠল মাত্র।

প্রতাপবাবু ততক্ষণে এগিয়ে গেলেন সুড়ঙ্গের মুখে। তাঁর একহাতে সাত ব্যাটারির টর্চ, আরেক হাতে নিজের পিস্তল। পঞ্চাশ পার হলেও দেহ—মনে অধ্যাপক এখনো যৌবনোত্তীর্ণ হননি। দ্রুত পা চালিয়ে বাকি তিনজন তাঁকে অনুসরণ করলে।

পাথরের সিঁড়ি ফুট চারেকের বেশি চওড়া হবে না। ধাপে ধাপে পাতালের অনিশ্চিত অন্ধকারে নেমে গেছে। ফুরফুরে শীতল হাওয়া খেলছে সুড়ঙ্গের মুখে, প্রতাপবাবু শুঁকে দেখলেন, অতি সামান্য গন্ধকের গন্ধ ছাড়া আর কোনও দূষিত গন্ধ নেই এখন। সাত ব্যাটারির টর্চের তীব্রোজ্জ্বল রশ্মি ধারালো তলোয়ারের ফলার মতো অন্ধকার কেটে—কেটে একেবারে সিঁড়ির শেষ ধাপে গিয়ে পৌঁছাল।

প্রথম ধাপে পা দিয়ে প্রতাপবাবু বললেন, আগে আমি, আমার পেছনে মেয়েরা, তারপর প্রিয়তোষ। সতর্ক হয়ে নামো।

সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে বইকি। দু'পাশের পাথর বসানো দেয়ালের ফাটল দিয়ে জল চুঁয়ে—চুঁয়ে ধাপগুলো অল্পবিস্তর পিছল হয়েছে। কোথাও বা এক—আধখানা পাথরের টুকরো বৃদ্ধের দাঁতের মতো নড়বড়ে হয়ে আছে। সাবধানে নামতে লাগল সবাই।

চলাফেরার সুবিধের জন্যে জয়া পরেছে পাঞ্জাবি মেয়েদের স্টাইলে সালোয়ার আর কামিজ। আরও সুবিধের জন্যে ইরা পরেছে ঘন নীল স্ল্যাকপ্যান্ট আর সাদা সিল্কের ব্লাউজ, গুটিয়ে নিয়েছে প্যান্টের পা। তবু, কয়েকটা ধাপ নামার পর প্রিয়তোষ ধরে না ফেললে ইরার পা যেত পিছলে।

প্রিয়তোষের বাহু আশ্রয় করে নামতে নামতে ইরা তার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললে :

উড়াব ঊর্ধ্বে প্রেমের নিশান দুর্গম পথ মাঝে

দুর্দম বেগে, দুঃসহতম কাজে।

শিকারি হলেও প্রিয়তোষ কাব্যচর্চা করে। সে জবাব দিলে :

ভাগ্যের পায়ে দুর্বল—প্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি।

কিছু নাহি ভয়, জানি নিশ্চয়—তুমি আছ, আমি আছি।।

জয়া গুনললো মোট বাহান্নটি ধাপ। বত্রিশটা ধাপের পর একটা চাতাল, তারপর বাকি ধাপগুলো খাড়া নেমে গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বৃহৎ সমচতুষ্কোণ চত্বরে। তার ছাদটা দাঁড়িয়ে আছে তাঁর কোণে চারটে স্তম্ভের ওপর। ভূগর্ভের অনেক নিচে বলে সমস্ত জায়গাটা স্যাঁতসেঁতে, কিন্তু গুমোট গরম নয়। মাটির এত নিচেও ফুরফুরে হাওয়া খেলছে।

টর্চের আলো ফেলে অধ্যাপক লক্ষ করলেন ছাদের মাঝখানে ঝাঁঝারির মত অনেকগুলি সরু ছিদ্র। এই ছিদ্রপথের সঙ্গে বাইরের বায়ুমন্ডলের সংযোগ আছে নিশ্চয়ই।

চত্বরে পা দিয়েই একটা জিনিস দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। কোথাও কোনও বাতি বা প্রদীপ জ্বলছে না, অথচ স্নিগ্ধ নীলাভ আলোয় চত্বরটা ভরে আছে। সে—আলোয় তাপ নেই, কিন্তু দীপ্তি আছে।

দুই চোখে সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে অধ্যাপক ঘুরে—ঘুরে দেখতে লাগলেন, এই ঢাকা চত্বরের ছাদ, দেওয়াল, মেঝে, স্তম্ভ—সবই মনে হল লাল মর্মর জাতীয় পাথরের। অত্যন্ত সুদৃঢ় ভাবে গাঁথা! শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধাক্কাতেও টলেনি। এক দিকের দেওয়ালের মাঝখানে প্রকাণ্ড একখানা স্ফটিক—স্বচ্ছ পাথরের টুকরো গেঁথে বসানো। রঙ তার নীল হলেও অধ্যাপক লক্ষ করে দেখলেন, নীলকান্ত মণি নয়। নীলাভ আলোর ছটা এই পাথরটা থেকেই বেরোচ্ছে, কাজ করছে অনির্বাণ প্রদীপের মতো। তারই নিচে তাকিয়ে অধ্যাপকের দৃষ্টি উৎসুক হয়ে উঠল। কাছে গিয়ে ঠাহর করে দেখলেন, সেই পাষাণ—ফলকে প্রাচীন শিলালিপির মতো কী যেন সব উৎকীর্ণ। কালের স্পর্শে কিছু—কিছু অস্পষ্ট হয়ে এলেও সুপণ্ডিত অধ্যাপক পড়তে পারলেন। পাষাণ—ফলকে প্রাচীন পালি ভাষায় লেখা রয়েছে :

ধীমান নিদ্রিত, স্বাতী নিদ্রিতা,

মহাদেবীর প্রসাদে

তারা পুনরায় জাগ্রত হোক,

ওঁ হ্রীং শ্রীং চামুণ্ডায়ৈ নমঃ।।

আশ্চর্য হলেন অধ্যাপক। নানা প্রশ্ন এল তাঁর মনে। পরম বৌদ্ধভক্ত চন্দ্রপালের রাজপুরীতে মহাদেবী চামুণ্ডার কথা লেখা কেন? কে লিখেছিল গোপনে? কে ধীমান, স্বাতীই বা কে? কেন তারা নিদ্রিত?

গবেষণার খোরাক পেয়ে অধ্যাপক প্রতাপ মনে—মনে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন।

শিলালিপি থেকে চোখ ফেরাতেই অধ্যাপকের চোখ পড়ল আরও দুটি বস্তুর ওপর! চত্বরের দুই দিকে যুগল স্তম্ভের মাঝখানে একটি করে সুবৃহৎ পেটিকা। শক্ত কাঠের তৈরি, জোড়ের মুখে ধাতুময় বন্ধনী, তাতে কারুকার্য করা। পকেট থেকে ছুরি বার করে অধ্যাপক কাঠের একটা ছোট অংশ অতিকষ্টে খুঁটে নিলেন, পরীক্ষা করে দেখবেন কী জাতের কাঠ, যা এখনও লোহার মতো মজবুত রয়েছে।

কিন্তু কী আছে এই দারুময় পেটিকায়? গুপ্ত ধনরত্ন? কুশল—নগরের রাজপুর—ললনাদের অলঙ্কার? না, মহারাজ চন্দ্রপালের সংগ্রহ করা অমূল্য বৌদ্ধ গ্রন্থাবলী? একটা পেটিকার ডালায় হাত দিয়ে প্রতাপবাবু সরিয়ে নিলেন। এর মধ্যে কোনও অজ্ঞাত বিপদ লুকিয়ে থাকাও বিচিত্র নয়। এখন থাক, কাল সকালে যথোচিত সতর্কতা অবলম্বন করে পেটিকা খোলা যাবে।

এবার ফিরে চলুন।

প্রতাপবাবু চমক ভেঙে তাকিয়ে দেখলেন, সিঁড়ির ঠিক নিচে সুজনলাল দাঁড়িয়ে। কখন নেমে এসেছে কে জানে। সেখান থেকেই সে আবার বললে, বাইরে রাত বাড়ছে। ক'দিন ধরে ভীমপাহাড়ের জঙ্গল থেকে বাঘের ডাকও শোনা যাচ্ছে সন্ধের পরে। তাই মনে হয়, আর দেরি না করাই ভালো।

প্রতাপবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, চলো তাহলে ফেরা যাক। বুনো জানোয়ারের উৎপাত—ভালো কথা নয়।

রিভলভার হাতে প্রিয়তোষ অলস দৃষ্টিতে একটা স্তম্ভের গায়ে একটা পাহাড়ি গিরগিটির গতিবিধি লক্ষ করছিল। সুজনলালের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললে,—আছে নাকি বুনো—জানোয়ার এখানে? দেখা পেলে মন্দ হয় না। হাতের টিপ পরখ করে নিই।

উৎসাহে সুজনলালের দিকেই রিভলভার উচিয়ে ধরল প্রিয়েতোষ। জয়া শব্দ করে হেসে উঠল, ওকি প্রিয়তোষ! হাত নামাও। বেচারি সুজনবাবু তোমার শিকার নয়।

কালো ঠোঁটের ফাঁকে সুজনলালের চকচকে দাঁত দেখা গেল। অতি বিনীত ভঙ্গিতে বললে, এমন বুনো—জানোয়ারও আছে, যে শিকারির চেয়েও চালাক। বন্দুক তোলার আগেই ঘায়েল করে দেয়। ভয় তাদেরই করা উচিত।

আর অপেক্ষা করল না সুজনলাল, সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।

প্রতাপবাবু বললেন, চলো প্রিয়তোষ। মেয়ে দুটো সঙ্গে রয়েছে, আর দেরি করা ঠিক হবে না। আর জয়া, ইরা কই?

কেউ লক্ষ করেনি, দল থেকে ইরা কখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রতাপবাবু যে পেটিকাটিকে পরীক্ষা করছিলেন, দেখা গেল তারই বিপরীত দিকে দুই স্তম্ভের মাঝখানে অপর পেটিকার একান্ত কাছে স্থির হয়ে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে! পিছন ফিরে ছিল বলে তার মুখ দেখা যায় না, তবে চিত্রার্পিতের মতো তার দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, কী যেন তাকে সম্মোহিত করে রেখেছে।

প্রতাপবাবু ডাকলেন, ইরা!

ইরার দেহ এতটুকু নড়ল না।

একটু অবাক হয়ে প্রতাপবাবু এগিয়ে গেলেন তার কাছে। আবার ডাকলেন, ইরা!

ইরা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। ফিরে তাকিয়ে বলল, ওটা কী সুন্দর, দেখেছ বাবা!

সমুখের দেয়ালের দিকে ইরা আবার দৃষ্টি ফেরালে ইরার দৃষ্টি অনুসরণ করে প্রতাপবাবু দেখলেন। পাথরের দেয়ালে একটা কুলুঙ্গি তারই মধ্যে অদ্ভুত একটা ধাতুপাত্র। অনেকটা ধূপদানির মতো দেখতে। ওপরটা লতাপাতার নকশা—কাটা, সূক্ষ্ম জাল দিয়ে ঢাকা। পাত্রটা ধরবার জন্যে দু'দিকে দু'টো আংটা।

ইরা বায়না ধরলে, এটা আমি নিয়ে যাব বাবা, কিউরিও হিসেবে ঘরে রাখব।

প্রতাপবাবু বললেন, দাঁড়া মা, কাল ফোটোগ্রাফার এসে আগে সব জিনিসের ফোটো নিয়ে যাক, তারপর নিস। এখন চল।

টর্চের আলো দেখিয়ে আগে উঠতে লাগলেন প্রতাপবাবু। তাঁর পেছনে জয়া। সিঁড়িতে পা দিয়ে আরেকবার ফিরে তাকাল ইরা, দুই চোখ তার স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে এল। কতকটা নিজের মনেই বললে, এত চেনা লাগছে জায়গাটা। কবে যেন এসেছিলাম!

কৌতূহল—ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রিয়তোষ বললে,—এই সেরেছে! প্রত্নতত্ত্বের ভূত ঘাড়ে চাপলে এমনই হয়। শিগগির চলো বাইরে।

পাথরের দেয়াল কাঁপিয়ে হেসে উঠল প্রিয়তোষ।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে—উঠতে ভুরু কুঁচকে ইরা বললে, ঠাট্টা কোরো না। সত্যিও তো হতে পারে।

পরদিন সকালে পেটিকা দুটি খোলা হল।

প্রত্যেক ডালায় একটা করে হাঁসকল লাগানো, কিন্তু কুলুপ নেই। যেন কেউ এসে সহজে খুলবে বলেই কুলুপ দেওয়া হয়নি। গুপ্তধন রাখার এ কেমন রীতি।

কিন্তু সহজে খোলার ব্যবস্থা থাকলেও সহজে খোলা গেল না।

শক্ত ধাতুর হাঁসকল বহু শতাব্দীর অব্যবহারে অনড় হয়ে আছে। হাতের শাবল দিয়ে সুজনলাল সাবধানে কয়েকটা ঘা দিতেই মরচে ধরা হাঁসকল কাঠের ডালা থেকে খসে পড়ল। দেখতে ভারী হলেও খুলতে গিয়ে কিন্তু দেখা গেল, ডালাটা তেমন ভারী নয়! প্রতাপবাবু একাই তুলে ধরলেন প্রথম পেটিকার ডালা।

না, গুপ্তধনও নয়, প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থাবলীও নয়। মানুষ—প্রমাণ লম্বা পেটিকার মধ্যে সযত্নে রাখা সুশ্রী প্রিয়দর্শন একটি নবীন যুবার মৃতদেহ। একখানি রেশমের ধুতি ছাড়া দেহে আর কোনও বস্ত্র নেই। আবরণের মধ্যে নিরাবরণ প্রশস্ত বুকে সিঁদুরের মতো টকটকে লাল রং দিয়ে খড়গচিহ্ন আঁকা।

মৃতদেহের সর্বাঙ্গে কীসের যেন অনুলেপন, হয়তো কোনও প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় দ্রব্যের। তারই ফলে গায়ের রং হলদে তুলোট কাগজের মতো গাঢ় পীতবর্ণ ধারণ করলেও চেহারা আজও অবিকৃত রয়েছে। বোঝা গেল, 'মমি' তৈরি করার পদ্ধতি শুধু প্রাচীন মিশরে নয়, সুদূর বৌদ্ধযুগে বাংলাদেশেও জানা ছিল।

কিন্তু অধ্যাপক প্রতাপের সে—কথা ভাববার অবকাশ হল না। অত্যন্ত অবাক হয়ে তিনি একবার মৃতদেহের মুখের দিকে, একবার প্রিয়তোষের দিকে তাকাতে লাগলেন। মৃত যুবাটির চেহারায় প্রিয়তোষের মুখের অনেকখানি সাদৃশ্য এল কেমন করে? সাদৃশ্য শুধু মুখে নয়, মৃত যুবাটি দৈর্ঘ্যে প্রিয়তোষেরই মতো ছ'ফুটের কাছাকাছি হবে।

অবাক সকলেই হল। প্রিয়তোষ নিজেও। হল না শুধু ইরা। অতি পরিচিত কাউকে দেখবে বলে সে যেন আশা করেছিল। মৃত যুবার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের বদলে বহুদিনের পরিচয়ের আলো জ্বলে উঠল তার চোখে। শুধু নামটাই যেন মনে পড়ছে না।

শান্ত ভাবে ইরা প্রশ্ন করলে, এ কে বাবা?

পেটিকার ডালার ভেতর দিকে খোদাই করা কয়েকটি পালি ভাষার হরফ চোখে পড়ল অধ্যাপকের। তিনি পড়লেন, 'সেনাপতি ধীমান'।

যেন হঠাৎ স্মরণ হয়েছে এমনিভাবে ইরা উচ্চচারণ করলে, ধীমান!

দ্বিতীয় পেটিকার কাছে এগিয়ে গেলেন প্রতাপবাবু। একই উপায়ে খোলা হল সেটা। এটিও একটি শবাধার। ভেতরে শুয়ে আছে অনন্ত নিদ্রামগ্না অপরূপ রূপলাবণ্যবতী একটি যুবতী। রক্তের মতো গাঢ় লাল রঙের সূক্ষ্ম একখানি রেশমি বসন পরনে। সেই রঙেরই রেশমি কাঁচলী গায়ে। হাতে স্বর্ণবলয়, গলায় মণিময় কণ্ঠহার, কানে কর্ণভূষা। ভূষণের মধ্যে সবার আগে চোখে পড়ে, মাথার সিঁথিমৌরের সঙ্গে লগ্ন বড় একখানা হীরে কপালের ওপর সন্ধ্যাতারার মতো জ্বলছে।

যুবতীর গায়ের রঙও অপর মৃতদেহের মতো গাঢ় হলুদ রঙের। অথচ মুখের নবীন লাবণ্য অবিকৃত। পাপড়ির মতো পাতলা বিবর্ণ ওষ্ঠাধর দুটি মৃদু হাসির আভাসে ঈষৎ ভিন্ন। আয়ত চোখ দুটি আধো—নিমীলিত। দীর্ঘ পক্ষরাজির আড়ালে তারা দুটি দ্যুতিহীন।

দেখা গেল যুবতীরও কপালে একটি রক্তবর্ণ ক্ষুদ্র খড়গচিহ্ন আঁকা।

পলক পড়ল না প্রতাপবাবুর চোখে। একটা অজ্ঞাত উদ্বেগের ছায়া ঘনিয়ে এল তাঁর মুখে। কেমন একটা অনির্দেশ্য ভয়ে দুলে উঠল তাঁর মনটা। মনে মনে তিনি বারবার বলতে লাগলেন, এ কেমন করে হয়? কেন হয়?

মৃতা যুবতীর মুখের সঙ্গে ইরার মুখের আশ্চর্য সাদৃশ্য। এমনকী চিবুকের বাঁ—দিকে ছোট্ট কালো তিলটি পর্যন্ত।

স্তব্ধ দৃষ্টিতে সবাই তাকিয়ে রইল দ্বিতীয় পেটিকার দিকে। শুধু ইরার মুখ—চোখ বহুদিনের একটা প্রত্যাশিত আনন্দের আলোয় আলো হয়ে উঠল। উৎসুক হয়ে সে প্রশ্ন করলে, কে এ বাবা?

পেটিকার ডালার ভেতরের দিকে তাকিয়ে প্রতাপবাবু বললেন, রাজকুমারী স্বাতী।

স্বাতী!

অস্ফুট স্বরে একবার উচ্চচারণ করে ইরা ধীরে—ধীরে এগিয়ে সামনের দেওয়ালের কুলুঙ্গি থেকে সেই ধাতুময় বিচিত্র ধূপদানিটা হাতে তুলে নিল। তারপর স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো আপনমনেই বলে উঠল, 'মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম।'

ইরা আজ শাড়ি পরে এসেছে। নতুন ঘাসের মতো কোমল সবুজ রঙের সিল্ক তার সুঠাম দেহলতাকে যেন আবেশে জড়িয়ে ছিল। সাপিনীর মতো দীর্ঘ বেণীতে শোভা পাচ্ছে বনফুলের মঞ্জরী।

একসঙ্গে দুটি পুরুষ তাকিয়ে রইল তার দিকে। প্রিয়তোষ আর সুজনলাল।

* * *

টেলিগ্রাম গেছে কলকাতায়।

অবনী দত্ত, দেবপ্রসাদ ঘোষ, শঙ্করদাস গোয়েঙ্কা, স্যার রামস্বামী প্রমুখ দেশের যত গণ্যমান্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক আছেন, সবাইকে সাদরে ডেকে পাঠিয়েছেন অধ্যাপক প্রতাপ। তাঁর স্টাফকে কড়া হুকুম দিয়েছেন আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ না—আসা অবধি ভুগর্ভের ওই সিঁড়িপথের মুখে দিনরাত পাহারা থাকবে। কেউ যেন না ঢুকতে পারে।

আর, বন্ধ থাকবে পেটিকা দুটি। দুটি প্রাচীন মৃতদেহ বহন করে।

গবেষণায় আর আগ্রহ নেই অধ্যাপক প্রতাপের। রাজনগরের এই আবিষ্কারের ফলে প্রত্নতত্ত্বের অন্ধকারে হয়তো এক নতুন আলোকপাত হবে। হয়তো বা বৌদ্ধযুগের লুপ্ত ইতিহাসের জগতে দেখা দেবে নতুন দিগন্ত।

কিন্তু তা নিয়ে আজ আর প্রতাপবাবুর কোনও মাথাব্যথা নেই। সমস্ত উৎসাহ, সমস্ত উদ্দীপনা সহসা যেন তাঁর ফুরিয়ে গেছে। আজ সকাল থেকে একটা অজানা উদ্বেগ, একটা অনির্দেশ্য ভয় তাঁর মনটাকে অধিকার করে বসে আছে। আপন সন্তানের এবং আপন সন্তানের দয়িতের শুভাশুভের জন্য তাঁর পিতৃ—হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সেই একই প্রশ্নের কাঁটা বারবার তাঁর মনকে বিক্ষত করে তুলেছে : ইরা আর প্রিয়তোষের সঙ্গে মৃত যুবক—যুবতীর মুখের আদল দেখা গেল কেন? কেন এমন হয়?

পৃথিবীতে একই চেহারার দুজন লোক কি জন্মায় না? হয়তো জন্মায়। তবু অধ্যাপক জানতে চান, কে ছিল সেনাপতি ধীমান আর রাজকুমার স্বাতী! কী ছিল তাদের জীবন—রহস্য? কোন দুষ্ট গ্রহের চক্রান্তে, কার অমঙ্গল অভিশাপে মৃত্যু হয়েছিল তাদের? সে—মৃত্যুর কালো ছায়া কি শকুনের মতো ডানা মেলে বহু শতাব্দী পার হয়ে এসেছে তাঁর ইরা আর প্রিয়তোষের ওপর অশুভ ছায়া ফেলতে?

জানতে হবে। জানতেই হবে প্রতাপবাবুকে। সকাল থেকে লাইব্রেরির ঘরে বসে বইয়ের পর বই, পুঁথির পর পুঁথি ঘেঁটে চলেছেন প্রতাপবাবু। জয়া কয়েকবার খাবার জন্যে ডাকতে এসে ফিরে গেছে, দেখেছে পুঁথিস্তূপের মাঝখানে সমাধিস্থ হয়ে আছেন মেসোমশাই। শুধু কফির কয়েকটা শূন কাপ জমেছে টেবিলের একপাশে।

কুশলনগর—যার মাটিতে তিনি এখন বসে আছেন, আধুনিক ইতিহাসের পাতায় যার নাম পালটে হয়েছে রাজনগর—তার ইতিবৃত্ত তাঁর চাই। কুশলনগরের কথা তিনি কিছুটা পড়েছিলেন একখানা প্রাচীন পুঁথিতে, তাঁর মনে পড়ছে। পরম ভট্টারক মহারাজ চন্দ্রপালের খানিকটা বিবরণ। কিন্তু সবটা পড়া হয়নি। কোথায় সেই পুঁথি? তাঁর বিরাট গ্রন্থসংগ্রহের মাঝে কোথায় লুকিয়ে আছেন মহারাজ চন্দ্রপাল, রাজকুমারী স্বাতী আর সেনাপতি ধীমান?

অধ্যাপক প্রতাপ তাই আজ সন্ধানী চোখ মেলে পুঁথির পর পুঁথি উল্টে যাচ্ছেন। আছে, আছে, নিশ্চয় আছে তারা। ইতিহাস কাউকে ভোলে না। কেউ হারায় না স্মৃতির জগৎ থেকে। বিস্তৃতির ধূলায় চাপা পড়ে থাকে শুধু।

র্যাকের সবচেয়ে উঁচু তাক থেকে খদ্দরে মোড়া একটা ধুলি—ধূসর মোড়ক নামালেন প্রতাপবাবু। সেই মোড়কে থেকে বেরোল অতিপ্রাচীন একটা পাণ্ডুলিপি। পালিভাষায় লেখা। প্রতাপবাবুর মুখ সহসা হর্ষদীপ্ত হয়ে উঠল। এই তো সেই ইতিহাস! যা আজও পৃথিবীর লোকচক্ষুর আগোচরে রয়েছে। এই পুঁথিখানিই তো তিনি খুঁজছিলেন। তাঁর মনে পড়ল কয়েক বছর আগে তিব্বতের এক মঠ থেকে এই দুর্লভ পাণ্ডুলিপি—পুঁথিখানি তিনি বহু কষ্ট স্বীকার করে সংগ্রহ করে এনেছিলেন। তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন এই পুঁথি তার জীবনে এতখানি সংশয়, এতখানি উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে উঠবে!

অতি জীর্ণ তুলোট কাগজের পাতাগুলির লেখা অনেক স্থলে বিবর্ণ, অনেক স্থলে পোকায় কাটা। তবু বিপুল আগ্রহে কম্পিত হাতে অধ্যাপক সেই জীর্ণ পাণ্ডুলিপির কীটদষ্ট পাতা অতি যত্নে ওল্টাটে শুরু করলেন।

বেলা পড়ে এল। ভীমপাহাড়ের ওপরে সূর্যাস্ত হল। অধ্যাপক তখন পাণ্ডুলিপির একান্ন পৃষ্ঠায় এসে পৌঁছেছেন। দৃষ্টি আর চলে না। উঠে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে বড় জুয়েল—ল্যাম্পটা জ্বেলে আনলেন অধ্যাপক। তারপর আবার ঝুঁকে পড়লেন সেই অতিপ্রাচীন পাণ্ডুলিপির জীর্ণ বিবর্ণ পাতার ওপর :

পরম ভট্টারক কুশলনগরাধিপতি মহারাজ চন্দ্রপালের একমাত্র কন্যা স্বাতী। অষ্টাদশী বিদুষী রূপলাবণ্যে অনুপমা। সেই রাজকুমারী স্বাতী আজ পীড়িতা, মাসাবধি কাল রোগশয্যায় শুয়ে আছে। গোলাপের মতো রক্তাভ দেহবর্ণ গজদন্তের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে। অন্তঃপুরের পালঙ্কে শয়ান রাজকুমারীর শিয়রে দাঁড়িয়ে যৌবন—প্রান্তবর্তিনী একটি নারী। শ্যামাঙ্গিনী হলেও তার মুখের গঠন আর দেহসৌষ্ঠবের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়, এককালে অসামান্য রূপসী ছিলেন। নাম সুরঙ্গমা। প্রশস্ত কক্ষের একধারে গৈরিকাবাস পরিহিত সৌম্যকান্তি মুণ্ডিতমস্তক মহারাজ চন্দ্রপাল অধীরভাবে পদচারণ করছেন। আর মাঝে—মাঝে অস্ফুট স্বরে বলছেন, নমো বুদ্ধায়। তাঁর অন্তরের উৎকণ্ঠা তাঁর প্রতি পদক্ষেপে ফুটে উঠেছে।

সুরঙ্গমা প্রশ্ন করলেন, রাজবৈদ্য কী বলে গেল মহারাজ?

পদচারণা থামিয়ে চন্দ্রপাল একবার স্বাতীর মুখের পানে দৃষ্টিপাত করলেন। তারপর আবার শুরু হল অস্থির পদচারণা।

সুরঙ্গমার মুখ বিশুষ্ক হয়ে উঠল। শঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন, তাহলে কি স্বাতীর জীবনের কোনও আশাই নেই?

কন্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন চন্দ্রপাল। নিশান্তের তারার মতো রোগপাণ্ডুর মৃত্যুমুখী কন্যার পানে তাকিয়ে পিতৃহৃদয় তাঁর দুলে উঠল। আবেগ সংযত করে বললেন, আজ প্রভাতে কাঞ্চনপুর থেকে ভিষগাচার্য দর্ভপাণিকে আনতে দূত পাঠিয়েছি। যদি পারেন তো তিনিই পারবেন স্বাতীকে নিরাময় করতে, নইলে—

চন্দ্রপাল সহসা বাতায়নের দিকে এগিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন।

সুরঙ্গমার কণ্ঠস্বর আবার কেঁপে কেঁপে উঠল, কই, কোথায় ভিষগাচার্য দর্ভপাণি? সেই কোন সকালে দূত গেছে, এত দেরি হচ্ছে কেন? তিনি আসবেন তো?

ব্যাকুলতার মধ্যেও সুরঙ্গমার গলার স্বরে সংশয় প্রকাশ পেল। পিছন ফিরেই চন্দ্রপাল জবাব দিলেন, পাঁচ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিক দেব বলে জানিয়েছি।

তবু তিনি কাঞ্চনপুরের লোক। কুশলনগর ভিষগাচার্যের শত্রুরাজ্য।

পাঁচ সহস্রে রাজি না হলে দশ সহস্র দেব। অর্থলোভ বড় লোভ।—চন্দ্রপাল উত্তর করলেন।

ব্যাকুল কণ্ঠে সুরঙ্গমা বললেন, কাঞ্চনপুরের পথে তুমি আবার দূত পাঠাও মহারাজ। সে যেন সবচেয়ে দ্রুতগামী অশ্বের পিঠে যায়। আমার মতো বলছে ভিষগাচার্য হয়তো আসবে না!

অশ্রুবাষ্পে সুরঙ্গমার কণ্ঠরোধ হয়ে গেল।

আসবেন না!

মহারাজ চন্দ্রপাল বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়ালেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একজন দ্বাররক্ষী ছুটতে ছুটতে এসে রুদ্ধশ্বাসে জানাল,—কাঞ্চনপুর থেকে শিবিকা ফিরে এসেছে নগরতোরণে।

চন্দ্রপালের হৃৎপিণ্ড দুলে উঠল। প্রশ্ন করলেন—ফিরে এসেছে! শিবিকায় কেউ নেই?

আছেন। ভিষগাচার্য দর্ভপাণি।

চন্দ্রপালের বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল। আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুরঙ্গমার শ্যামকান্তি মুখ।

ব্যস্ত হয়ে চন্দ্রপাল দ্বাররক্ষীকে বললেন, যাও, এখুনি নিয়ে এসো ভিষগাচার্যকে।

ভিষকাচার্য এলেন। ভারতের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা—বিজ্ঞানী। আয়ুর্বেদ—শাস্ত্রে অতুলনীয় পণ্ডিত ভিষগাচার্য দর্ভপাণি। টকটকে গৌর বর্ণ, খর্বকায়, পেশিবহুল দেহ। মাথাটা আকারে বৃহৎ। ছোট করে ছাঁটা ধূসর কেশের মাঝে একগুচ্ছ শিখা। ভাস্বর দুই চক্ষু ঈষৎ রক্তাভ। পরনে রক্তাম্বর, গায়ে রক্তবর্ণের পট্টবস্ত্রের উত্তরী। তারই ফাঁক দিয়ে রুদ্রাক্ষের মালা আর ধবধবে উপবীতগুচ্ছ দেখা যায়। দর্ভপাণি ঘোর তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ।

সেই খর্বকায় তান্ত্রিক ব্রাহ্মণের পানে দৃষ্টি পড়তেই প্রবল বিতৃষ্ণায় চন্দ্রপালের মুখ মুহূর্তের জন্যে কুঞ্চিত হয়ে উঠল। তারপরেই প্রসন্ন হাস্যে অভ্যর্থনা করলেন, আসুন ভিষগাচার্য, পথে কোনও ক্লেশ হয়নি?

দ্বারের বাইরে থেকে অত্যন্ত নীরস গম্ভীর স্বরে দর্ভপাণি উত্তর দিলেন, মহাদেবীর প্রসাদে মহারাজের মঙ্গল হোক। পথের ক্লেশ দর্ভপাণি গ্রাহ্য করে না। রোগীণী কোথায়?

এই কক্ষে। এখুনি দেখবেন, না বিশ্রামান্তে?

বৈদ্যের বিশ্রামের জন্যে রোগীর পরমায়ু অপেক্ষা করে না মহারাজ। আমি এখুনি দেখব।

আসুন।

কক্ষমধ্যে এসে দর্ভপাণি পালঙ্কের ধারে বসলেন। মাথার গুণ্ঠন কপাল অবধি টেনে দিয়ে একটু তফাতে সরে দাঁড়ালেন সুরঙ্গমা। ভিষগাচার্য কিছুক্ষণ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন রোগীণীর দিকে। নিমীলিত—নয়না রাজকুমারী স্বাতী শেষ বসন্তের ম্লান পুষ্প—মালিকার মতো রোগশয্যায় লীন হয়ে আছে। নীরক্ত অধরপুট ঈষৎ ভিন্ন। নিশ্বাসটুকু পড়ছে কি পড়ছে না বোঝা যায় না।

মুদিত চক্ষে অতি অস্ফুট স্বরে কী যেন মন্ত্রোচ্চচারণ করে দর্ভপাণি রাজকুমারী স্বাতীর দক্ষিণ হাতখানি তুলে নিলেন আপন মুঠির মধ্যে। মণিবন্ধের একটি বিশেষ ধমণী স্পর্শ করে তিনি চুপ করে বসে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। তারপরে ধীরে—ধীরে একসময় চোখ মেললেন।

চন্দ্রপাল আর সুরঙ্গমা উৎকণ্ঠায় মুহূর্ত গুনছিলেন। রাজা নয়, পিতা প্রশ্ন করলেন, কেমন দেখলেন ভিষগাচার্য?

তেমনি নীরস গম্ভীর স্বরে জবাব এল, স্পষ্টবক্তা বলে লোকে আমার নিন্দা করে। তবু রোগীর মুখ চেয়েই ভিষগকে সত্য কথা বলতে হয়। রাজকুমারীর দুর্বল নাড়ির গতি অতি বক্র, আজ রাত্রি কাটে কিনা সন্দেহ।

পালঙ্কের একটা বাজু শক্ত মুঠিতে চেপে ধরলেন সুরঙ্গমা। আর মহারাজ চন্দ্রপালের মনে হল প্রবল ভূমিকম্পে সমগ্র রাজপুরীটা দুলছে। এখুনি বুঝি ভেঙে পড়বে। প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে চন্দ্রপাল বললেন, লোকে বলে ভিষগাচার্য দর্ভপাণি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। কুশলনগরে সে কথা কি আজ মিথ্যা হয়ে যাবে?

আমি ধন্বন্তরি নই। ওটা হল লোকের অতিরঞ্জন। তবে আয়ুর্বেদ হল সমুদ্র বিশেষ, রাজকুমারীর কঠিন পীড়ার চিকিৎসাও তার মধ্যে আছে।

আছে। চন্দ্রপাল যেন অকূলে কূল পেলেন।

নমিত মুখ তুলে সাগ্রহে চাইলেন সুরঙ্গমা।

চন্দ্রপাল জিজ্ঞাসা করলেন, কী সে চিকিৎসা ভিষগাচার্য?

রক্ত—সঞ্চালন। রাজকুমারীর দেহযন্ত্রের মধ্যে রক্তপ্রস্তুত—ক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে, অবিলম্বে রক্তদান না করলে রক্ত—কণিকার দল একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তারই ফলে নিভে যাবে রাজকুমারীর আয়ুদীপ। এখন বলুন মহারাজ, কে রক্ত দান করবেন?

মহারাজ চন্দ্রপাল এগিয়ে এলেন দর্ভপাণির সামনে। দক্ষিণ বাহু বাড়িয়ে দিয়ে সাগ্রহে বললেন, আমি। আমার রক্ত নিয়ে আমার কন্যার জীবন রক্ষা করুন ভিষগাচার্য।

ধীরে মহারাজ। রক্ত দিতে চাইলেই নেওয়া চলে না। আগে পরীক্ষা করে দেখতে হয় রক্তের মিল আছে কিনা। আমার পেটিকা আনতে বলুন।

শিবিকা থেকে এল দর্ভপাণির পেটিকা। কতকগুলি অদ্ভুত যন্ত্রপাতির সাহায্যে ভিষগাচার্য রাজকুমারী স্বাতী ও মহারাজ চন্দ্রপালের রক্ত পরীক্ষা করলেন। তারপর বৃহৎ মাথাটি নেড়ে বললেন, হল না মহারাজ। আদৌ মিল দেখা যাচ্ছে না।

এবার সুরঙ্গমা এগিয়ে এলেন দর্ভপাণির সামনে। সঙ্কোচ ত্যাগ করে ব্যগ্র স্বরে বললেন, স্বাতীর জন্যে আমি রক্তদান করব ভিষগাচার্য। দয়া করে গ্রহণ করুন।

সহসা রূঢ় গলায় চন্দ্রপাল ডেকে উঠলেন সুরঙ্গমা!

সে ডাকের মধ্যে প্রচ্ছন্ন তিরস্কার ছিল। লজ্জায় বেদনায় মুখ নত করে সুরঙ্গমা সরে গেলেন। রক্তাভ চোখে বিস্ময় নিয়ে দর্ভপাণি উভয়ের দিতে একবার তাকালেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, বাধা কীসের মহারাজ?

একটু ইতস্তত করে চন্দ্রপাল উত্তর দিলেন, রাজকুমারী স্বাতীর দেহে রাজরক্ত ছাড়া অন্য রক্ত যায়, এ আমার অভিপ্রেত নয়।

উনি রাজ পরিবারের কেউ নন?

উত্তর দিলেন সুরঙ্গমা নিজেই। সিক্ত—করুণ কণ্ঠে বললেন, না, কেউ নই। আমি শুধু স্বাতীর ধাই মা। আমাকে মার্জনা করবেন ভিষগাচার্য।

ক্ষণেক স্তব্ধ থেকে দর্ভপাণি প্রশ্ন করলেন, রাজ পরিবারের আর কেউ আছেন যিনি রক্তদান করতে পারেন?

চন্দ্রপাল নীরবে মাথা নাড়লেন।

তবে আর কী করতে পারি মহারাজ? আমাকে বিদায় দিন।

অন্য কোনও উপায় হয় না ভিষগাচার্য?

দর্ভপানির নীরস কণ্ঠ আরও নীরস হয়ে উঠল, না। একটা জীবনের চেয়ে রাজরক্তই যখন আপনার কাছে বেশি মূল্যবান, তখন আমি আসি।

পালঙ্ক ছেড়ে দর্ভপাণি পেটিকা হাতে দ্বারপথের দিকে অগ্রসর হলেন। আর ঠিক সেই সময় দ্বারের বাইরে দেখা গেল, তরুণ শাল—তরুর মতো দীর্ঘতনু একটি প্রিয়দর্শন যুবা হাতে আর একটা ক্ষুদ্র পেটিকা নিয়ে দ্রুত পায়ে আসছে দ্বাররক্ষীর পিছনে পিছনে। তার ঘর্মাক্ত মুখ আরক্তিম, সিক্ত ললাটে আটকে রয়েছে কালো রেশমের মতো অবিন্যস্ত কেশ। বেশভূষা সাধারণ নাগরিকের মতো।

মহাবিস্ময়ে দর্ভপাণি বললেন,—একি, ধীমান!

তাঁর পাদস্পর্শ করে ধীমান বললে, আপনি কেবল শল্যচিকিৎসার পেটিকাই নিয়ে এসেছেন পিতা, ফেলে এসেছেন ঔষধের পেটিকা। আমি তাই দ্রুত অশ্ব ছুটিয়ে নিয়ে এলাম।

দর্ভপাণির কানে সেকথা গেল কিনা সন্দেহ। তাঁর নীরস গম্ভীর কণ্ঠস্বর সহসা প্রফুল্ল শোনাল—হয়েছে মহারাজ চন্দ্রপাল, উপায় হয়েছে! রাজকুমারীর জন্য রাজরক্তই পেয়েছি।

সুরঙ্গমা চকিতে তাকালেন। আর ক্ষণিকের জন্য অভিভূত হয়ে পড়লেন চন্দ্রপাল।

রাজরক্ত পেয়েছেন। কার রক্ত? কে সে?

সে এই ধীমান, আমার পুত্র। মহাদেবী চামুণ্ডাই একে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ধীমানের রক্তে রাজকুমারী স্বাতীর প্রাণ রক্ষা হবে, এই তাঁর নির্দেশ।

সংশয়ের ছায়া ঘনিয়ে এল চন্দ্রপালের মুখে। বললেন, কিন্তু আচার্য, আপনার পুত্রের দেহে কেমন করে রাজরক্ত—

ধীমান আমার পালিত পুত্র। আপনি অনায়াসে বিশ্বাস করতে পারেন মহারাজ, ধীমানের দেহে রাজরক্তই আছে, আর রাজকুমারীর রক্ত—কণিকার সঙ্গে তা মিলবে।

চন্দ্রপালের মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল, বললেন, বেশ, আপনি রক্তসঞ্চালনের ব্যবস্থা করুন। ধীমানের রক্তের জন্য যে কোনও মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত।

রক্তাভ চক্ষুতে কেমন একটা অবজ্ঞা নিয়ে দর্ভপানি বললেন, মূল্য। আপনার অঙ্গীকার মনে থাকবে মহারাজ। কিন্তু ও—কথা এখন থাক। ধীমান পথশ্রমে ক্লান্ত, ওকে বিশ্রাম ভবনে পাঠিয়ে দিতে আদেশ করুন। ওর বিশ্রামান্তে রাত্রির প্রথম যাম থেকে রাজকুমারীর দেহে আমি রক্ত সঞ্চালন আরম্ভ করব। আজ কৃষ্ণা চতুর্দশী, বড় শুভ তিথি।

কুশলনগরের আকাশে অমাবস্যা রাত্রি কালো পাখা মেলেছে।

আর একটা পালঙ্ক আনানো হয়েছে রাজকুমারীর পালঙ্কের পাশে। পাশাপাশি দুই শয্যায় শুয়ে অছে ধীমান আর স্বাতী। ধীমানের দক্ষিণ বাহুর একটি ধমনীতে বিদ্ধ হয়েছে সূক্ষ্ম ধাতব নলের অগ্রভাগ। সেই নলেরই অপর প্রান্ত বিদ্ধ হয়েছে রাজকুমারীর ধমনীতে। দুই পালঙ্কের মধ্যবর্তী জায়গায় বসে ভিষগাচার্য দর্ভপাণি বিচিত্র প্রক্রিয়া করছেন, আর মাঝে—মাঝে রাজকুমারীর নাড়ির গতি অনুভব করছেন।

ক্লান্ত বীণায় স্তব্ধ রাগিণীর মতো স্বাতী মুদিত নয়নে স্থির হয়ে শুয়ে আছে। প্রাণের কোনও স্পন্দন আছে কিনা সহজে বোঝা যায় না। পাংশু অধর মৃদু—মৃদু কাঁপছে, বিকচ বক্ষ ওঠা—নামা করছে অতি ধীরে—ধীরে।

সেই দিকে তাকিয়ে সুরঙ্গমার চোখে পলক নেই। দ্বারপথের বাইরে দীপ—নেভা প্রশস্ত চত্বরে মহারাজ চন্দ্রপাল একাকী পদচারণা করছেন আর মাঝে—মাঝে জপ করছেন, নমো বুদ্ধায়। সকলেই উৎসুক, উন্মুখ, উৎকণ্ঠিত। শুধু ধীমান কৌতূহলী দুই চক্ষু মেলে পার্শ্ববর্তিনী স্বাতীকে দেখছে। বিধিলিপির লিখন কী অদ্ভুত। কোথায় ছিল সে, কোথায় বা ছিল স্বাতী। কত দূরে, পরিচয়ের বাইরে। অথচ আজ কত সন্নিকটে! একই রক্তধারা বইছে দুজনের দেহে। কিন্তু কাল প্রভাবে যদি রাজকুমারী সুস্থ হয়ে ওঠে, দুজনার মাঝখানে আবার জেগে উঠবে দুস্তর ব্যবধান। বিদেশি ধীমান ফিরে যাবে কাঞ্চনপুরে, আর স্বাতী থাকবে এই কুশলনগরে। মাঝখানে এই এক রাত্রির পরিচয় কি রাজকুমারীর মনে থাকবে? না থাকাই স্বাভাবিক। কাঞ্চনপুরের কঙ্করময় মাটিতে পা দিলে ধীমানও হয়তো ভুলে যাবে। আজকের ঘটনা নিয়তির একটা কৌতুকের খেলা নয় কি?

দূরে নগরতোরণে ঘণ্টাধ্বনি হল। সান্ত্রি ঘোষণা করলে রাত্রির দ্বিতীয় যাম।

বাতায়নের পাশ দিয়ে একটা কালপেচক ডেকে গেল। চমকে উঠলেন সুরঙ্গমা।

দর্ভপাণি স্বাতীর নাড়ির গতি পরীক্ষা করলেন। ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে। দেহের তাপ অনুভব করলেন। ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। রোগিণীর লক্ষণ আশানুরূপ। কক্ষের অখণ্ড স্তব্ধতা ভেঙে ভিষগাচার্য বলে উঠলেন, জয় মহাদেবী।

বাইরে অন্ধকার চত্বরে মহারাজা চন্দ্রপাল উচ্চচারণ করলেন,—নমো বুদ্ধায়!

শুধু সুরঙ্গমা নীরবে ভাবতে লাগলেন, এ কালরাত্রি কখন কাটবে! কখন হবে এ দুঃসহ প্রতীক্ষার অবসান।

দ্বিতীয় যামও কেটে গেল। রাত্রির তৃতীয় যামে স্বাতীর নাড়ির গতি দ্রুততর হল, দেহের তাপ বৃদ্ধি হয়ে জ্বর এল। ভিষগাচার্য তার কপালে হিমশীতল জলের পটি লাগালেন, কি একটা বটিকা খলে মেড়ে মুখে দিলেন। তারপর চিন্তাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রোগিণীর দিকে।

দেখতে দেখতে রাজকুমারীর দেহে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যেতে লাগল। পুরাতন গজদন্তের মতো গায়ের হলুদ বর্ণে মিশল লালের আভা, পাংশু অধরে ফুটল ক্ষীণ রক্তিমা, ঘনতর হল নিশ্বাস, কাঁপতে লাগল মুদিত আঁখিপল্লব।

আধো—লুপ্ত আধো—জাগ্রত চেতনার মাঝে রাজকুমারী একবার নড়ে উঠে দক্ষিণে মুখ ফেরাল।

দর্ভপাণির চিন্তাকুটিল ললাট মসৃণ হয়ে এল। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আসন ত্যাগ করলেন। দ্বারপথের দিকে তাকিয়ে উল্লসিত স্বরে বললেন, বিপদ কেটে গেছে মহারাজ। রাজকুমারীর আয়ুদীপ আবার জ্বলে উঠেছে। জয় মহাদেবী!

চন্দ্রপালের বুক থেকে পাষাণভার নেমে গেল। শেষরাত্রির পাণ্ডুর আকাশের দিকে তাকিয়ে আর একবার উচ্চচারণ করলেন, নমো বুদ্ধায়।

আর সুরঙ্গমার কপোল বেয়ে অশ্রুর দুটি ধারা নেমে এল। বিহ্বল আবেগে সিক্ত গলায় তিনি ডাকলেন, স্বাতী! আমার স্বাতী!

ধীরে, অতি ধীরে চোখ মেলে তাকাল রাজকুমারী স্বাতী। দুর্বলতার ঘোর এখনো কাটেনি, সূক্ষ্ম একটা তন্দ্রাজাল যেন এখনও চোখের তারায় জড়িয়ে আছে। সেই সূক্ষ্ম জালের মধ্যে দিয়ে স্বাতীর নবজাগ্রত প্রথম দৃষ্টি গিয়ে পড়ল দক্ষিণ পাশে অপর পালঙ্কের ওপর। কৌতূহল ভরে ধীমানও তাকিয়েছিল বাম পাশে।

দু'জোড়া দৃষ্টি—প্রদীপের আলো একত্রে মিলিত হল।

স্বাতীর চোখ দুটি শুধোলে, কে তুমি?

ধীমানের চোখ বললে, তুমি সুন্দর!

কুশলনগরের আকাশে তখন প্রভাত হচ্ছে।

এই পর্যন্ত এসে অধ্যাপক প্রতাপ থামলেন। এরপর সেই প্রাচীন পুঁথির কয়েকটা পাতা নেই। মহাকালের চিরচঞ্চল হাওয়ায় শুষ্ক পত্রের মতো কোথায় উড়ে গেছে কে বলতে পারে!

* * *

ইরার চোখে ঘুষ নেই। উঠে বসল বিছানায় ওপর।

রাত এখন কত কে জানে। জানলার বাইরে নিঝুম রাত ঝিঁঝির ঝুমঝুমি বাজিয়ে চলেছে একটানা। ঘরের বাতি নেভানো। ওপাশের বিছানায় জয়া ঘুমে অচেতন। ইরার চোখে আজ আর ঘুম আসবে না।

ধীরে—ধীরে উঠে সে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঝিমঝিমে চাঁদের আলো বাইরের উঁচু—নীচু প্রান্তরে কুয়াশার মতো গলে গলে পড়ছে। দূরে ভীম—পাহাড় গাঢ় ধূসর জলরঙ্গে আঁকা ছবির মতো। ওরই কোলে ভূগর্ভের চত্বরে পেটিকার মধ্যে শুয়ে আছে সেনাপতি ধীমান আর রাজকুমারী স্বাতী। আজ সকাল থেকে ওদের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না ইরা। ওরা যেন তার বহুকালের আত্মীয়, একান্ত প্রিয়জন। অথচ ওদের আর ইরার মাঝখানে বহু যুগের ব্যবধান। তবু কেন এমন মনে হয়? কেন ওদেরই ভাবনা উতলা ভ্রমরের মতো সারাটা দিন ধরে তার মনের মধ্যে গুনগুন করে ফিরছে? রাতেও তার বিরাম নেই। কেন তার ঘুম কেড়ে নিল ধীমান আর স্বাতী? যারা ইতিহাসের পাতার শুধু ইতিহাস হয়েই আছে?

না। ওদের কথা আর ভাববে না ইরা। চাইবে না আর ওই ভীম—পাহাড়ের দিকে। জানলার কাছ থেকে সরে আসতেই ইরার চোখ পড়ল ঘরের কোণে একটা কর্নার—স্ট্যান্ডের ওপর। অন্ধকারে ধাতুময় জিনিসটা চিকচিক করছে। দৃষ্টি আটকে গেল ইরার। সেই ধূপদানিটা, যেটা বহু শতাব্দী ধরে রাজকুমারী স্বাতীর শবাধারের পাশে পাথরের দেয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা ছিল। অতি গোপনে, জগৎ—সংসারের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখা ওই ধাতুময় জিনিসটাকে আজই সকালে ইরা নিয়ে এসেছে নিজের ঘরে। সূক্ষ্ম তারের সুন্দর কাজকরা এই ধূপদানিটি, প্রাচীন শিল্পকাজের একটা নিদর্শন হিসেবেই সে এনেছিল। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে, যতবার সে ওটা দেখছে, ততই তার মনে হচ্ছে, কি যেন একটা আশ্চর্য রহস্য লুকানো রয়েছে ওই বস্তুটার মধ্যে।

আশ্চর্য রহস্যই বটে! ইরা অবাক হয়ে দেখল, ধূপদানিটার সূক্ষ্ম জালের ভেতর থেকে সূক্ষ্মতর অসংখ্য ধূমরেখা শ্বেত গোখরোর বাচ্চচার মতো কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে। দেখতে দেখতে অপূর্ব এক ক্ষীণ সুগন্ধে ঘরের বাতাস আমোদিত হয়ে উঠল। সে—গন্ধ যেন চন্দন, ফুল অর মৃগনাভির সংমিশ্রণ। সে—গন্ধ নিশ্বাসের সঙ্গে রক্তে গিয়ে মিশছে, নেশার মতো কি এক মাতদকতায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে সমস্ত চেতনা।

ধূপদানিটার মধ্যে ইরা কোনো সুগন্ধী দ্রব্য তো রাখেনি! তবে এত সুগন্ধী ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেমন করে। কৌতূহলী হয়ে ধাতুপাত্রটাকে ইরা হাতে তুলে নিল। আর অমনি হঠাৎ সে শুনতে পেল বহু দূর থেকে কে যেন ক্ষীণ স্বরে ডাকছে, রাজকুমারী স্বাতী! তুমি কোথায়? কোন জন্মের পারে? তুমি কি আমায় চিনতে পারছ আজ? আমি ধীমান—তোমারই ধীমান! যুগযুগান্তর ধরে তোমার অপেক্ষায় রয়েছি। এসো—তুমি এসো।

ধীমান ডাকছে। ডাকছে রাজকুমারী স্বাতীকে। কিন্তু সে—ডাক অর্ফিয়ুসের বাঁশির মতো ইরার রক্তে দোলা দেয় কেন? স্বাতী আর ইরা আজ একাকার হয়ে যাচ্ছে। ধীমান ডাকছে, তাকে যেতেই হবে। ইরা আজ কোনও বাধা মানবে না। এ—ডাকে সাড়া দিতে যদি জীবনের এপার থেকে মৃত্যুর ওপারে যেতে হয়, ইরা আজ তাও যাবে।

নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো এক—পা এক—পা করে ইরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হাতে রইল সেই ধূপদানি। ঘুমে অচেতন জয়া কিছুই জানল না।

ঘর থেকে ইরা বেরিয়ে এল বাংলোর কম্পাউন্ডে। তারপর কম্পাউন্ডের ফটক খুলে মাঠের রাস্তায়। বোবা নিশীথিনী যেন নিশ্বাস বন্ধ করে ইরার আসার অপেক্ষায় ছিল। হিমে ভেজা গলিত জ্যোৎস্নায় পথের রেখা, আশপাশের বুনো ঝোপ, দূরের পাহাড়, তারই কোলে বিরাট মাটির স্তূপ আর খননকার্যের প্রকাণ্ড যন্ত্রপাতি সবই দেখা যাচ্ছে আবছা আবছা।

বাইরে এসেও শোনা যেতে লাগল সেই ডাক : 'রাজকুমারী স্বাতী, তুমি কোথায়? যুগযুগান্তর ধরে আমি তোমার অপেক্ষায় রয়েছি। এসো, তুমি এসো!' আর উঁচু—নিচু মাঠের রাস্তা দিয়ে একাকিনী ইরা ধূপতী হাতে নির্ভয়ে এগিয়ে চলল ভীম—পাহাড়ের দিকে, যেখানে কয়েকটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। তার পায়ের খসখস আওয়াজে স্তব্ধ রাত্রি যেন শিউরে শিউরে উঠতে লাগল।

খননকার্যের জায়গায় সারারাতই আলো জ্বলে। আলো জ্বালিয়ে গার্ডের দল পালা করে পাহারা দেয়। প্রতাপবাবুর আদেশে আজ থেকে বিশেষ পাহারা বসেছে ভূগর্ভের সিঁড়ির মুখে। চারজন গার্ডের মধ্যে একমাত্র মহাবল সিং—ই রাইফেল হাতে এত রাত অবধি জেগে আছে। মৃদু খসখস আওয়াজ কানে যেতেই ভাবলে, আশেপাশে কোথাও শুকনো পাতার ওপর দিয়ে সাপ চলে যাচ্ছে। রাইফেলটা মাটিতে ঠুকে দু'বার আওয়াজ করলে সে। কিন্তু তৃতীয়বার তার হাতের রাইফেল অনড় হয়ে গেল বাঁ—দিকে চোখ পড়তেই। ঝাপসা চাঁদের আলোয় সে দেখল, শাড়িপরা একটি নারীমূর্তি হাতে কী একটা নিয়ে ঝজু ভঙ্গিতে সোজা এদিকেই এগিয়ে আসছে। মুক্ত প্রান্তরের দমকা হাওয়া উড়ছে তার খোলা এলোচুল।

এক মুহূর্তের জন্যে মহাবল সিংয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মানুষ, না প্রেতিনী—কে ও? পরক্ষণেই রাইফেলটা কাঁধে তুলে মহাবল হাঁকলে কৌন হ্যায়?

কোনও জবাব এল না। ইরার মূর্তি তেমনি ঝজু ভঙ্গিতে নীরবে এগিয়ে আসতে লাগল।

মহাবল আবার হাঁকল, খবরদার! বোলো কৌন হ্যায়?

পায়ে চলার খসখস আওয়াজ ছাড়া কোনও সাড়া এল না।

ইরা তেমনি এগিয়ে আসছে, হাতে ধূপদানি নিয়ে।

স্তম্ভিত হয়ে মহাবল দেখলে, স্বয়ং প্রতাপবাবু হুজুরের মেয়ে।

বাঈ আপনি! এখানে কেন?

ভেতরে যাব।

একা! সঙ্গে যাব?

দরকার হবে না।

হতচকিত মহাবল আর কিছু বলার আগেই ইরা সোজা গিয়ে দাঁড়াল ভূগর্ভের সিঁড়ির মুখে। তারপ নেমে গেল। চত্বরে পা দেওয়ার আগে ইরা সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলে। সেই ফিকে নীল স্ফটিক—স্বচ্ছ মণির নরম স্নিগ্ধ নীলাভ আলোয় ছেয়ে আছে সমস্ত জায়গাটা। ইরার মনে হতে লাগল এই চত্বরে সে বহুবার এসেছে। কত দিন, কত যুগ আগে, সেটা মনে পড়ে না, তবে এই পাষাণ—চত্বরে বহু প্রভাত, বহু সন্ধ্যা তার কেটে গেছে—এটা স্পষ্ট মনে পড়ছে। এই চত্বরে সে কখনও বীণা বাজিয়ে গান গাইত, কখনও বা ওই স্তম্ভে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গৃহবলিভূক কপোত—কপোতীর প্রণয়কূজন শুনত। প্রতি বছর ফাল্গুন—পূর্ণিমায় সখিদের নিয়ে সে হোলি খেলত এখানে। আবীরে কুমকুমে কলহাস্যে আর নূপুরগুঞ্জনে এই চত্বরের পাষাণেও যেন রোমাঞ্চ জাগত।

আজ সব মনে পড়ছে তার! সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে নেমে ইরা চত্বরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। দক্ষিণ দিকে ওই খিলানের তলায় যে প্রবেশ—পথটা মাটি আর পাথরে বন্ধ হয়ে আছে, ওর বাইরে একটা সুন্দর মালঞ্চ ছিল না? ইরার মনে পড়তে লাগল, সেই মালঞ্চের কোলে ছিল টলটলে ফটিক—জলের এক দিঘি। সেই দিঘিতে তার ছোট্ট ময়ূরাকৃতি নৌকা ছিল, কত শ্রাবণদিনে, কত চৈত্ররাতে নৌবিহার করেছে সে।

আশ্চর্য, একে—একে আজ তার সবই মনে পড়ে যাচ্ছে! কেন এমন মনে হচ্ছে তার? তবে কি সে ইরা নয়, রাজকুমারী স্বাতী?

ইরার হাতের ধূপদানি থেকে সেই শুভ্র সুগন্ধ ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখতে দেখতে সমস্ত চত্বর আচ্ছন্ন করে ফেলল, আর তার স্বপ্নাতুর চোখের সামনে দূর অতীতের খণ্ড—খণ্ড দৃশ্য ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে যেতে লাগল। ইরা দেখল, স্বাতী আর ধীমান কখনো মালঞ্চের তরুতলে বসে গল্প করছে, কখনও বা স্বাতী তার কক্ষের অলিন্দে দাঁড়িয়ে, আর ধীমান অলিন্দের নিচে পুষ্প—বীথিকায়—পরস্পরকে শুভরাত্রি জানিয়ে সে—রাতের মতো বিদায় নিচ্ছে।

সে দৃশ্যগুলি মিলিয়ে গেল। আবার ফুটে উঠল ফটিক—জল দিঘির বুকে ময়ূরপঙ্ক্ষি নৌকা। তাতে ধীমান আর স্বাতী। আকাশে মাধবী জ্যোৎস্না। ধীমান নীরবে নৌকা বাইছে, আর স্বাতী হাতের পদ্মকোরকের পাপড়িগুলি একটি—একটি করে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ তাদের মাথার ওপর দিয়ে সুরলহরী ছড়িয়ে একটা পাপিয়া উড়ে চলে গেল। স্বাতী মুখ তুলে প্রশ্ন করলে, রাত এখন কত?

ধীমান একবার আকাশের দিকে তাকাল। বললে, বোধ হয় রাত্রির মধ্যযাম। ঘাটে নৌকা লাগাব?

আর একটু পরে। কাঞ্চনপুরে তোমাদের ফিরে যেতে কতদিন বাকি?

তুমি তো এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছ। এইবার আমরা ফিরে যেতে পারি। ভিষগাচার্য আগামী পরশু ফিরে যাবার কথা বলেছেন মহারাজকে।

স্বাতী গম্ভীভাবে বলে উঠল, কিন্তু আগামী পরশু তো যাওয়া হতে পারে না।

ধীমান অবাক হয়ে বললে, কেন?

আগামী পরশু আমি আবার পীড়িত হয়ে পড়ব যে! কঠিন পীড়া—চেতনা লোপ পাবে—বিষম জ্বর—বিকার—

ধীমানের মুখে কৌতুক ফুটে উঠল। বললে, তাই যদি হয়, তবে ভিষগাচার্যই থাকবেন। আমি তো ভিষক নই, আমাকে একাই ফিরতে হবে।

কর্ণভূষা দুলয়ে স্বাতী বলে উঠল, একাই ফিরতে হবে! কেন এত তাড়া কিসের শুনি?

পদ্মের আরও দুটো পাপড়ি ছিঁড়ে স্বাতী সবেগে জলে নিক্ষেপ করলে। মৃদু হেসে ধীমান বললে, যেতে যখন হবেই তখন দেরি করেই বা লাভ কি রাজকুমারী? আমি বিদেশি পথিক, তোমার রাজ্যে এসেছিলাম নেহাত দৈবের টানে। কুশলনগরে আমার যেটুকু কাজ ছিল, ফুরিয়েছে। এবার আমি ফিরে যাই।

ধীমানের মুখের ওপর থেকে স্বাতী দৃষ্টি সরিয়ে নিল। চাঁদের ওপর পাতলা মেঘের মতো একটু ম্লান ছায়া পড়ল তার মুখখানিতে। কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে বললে, জীবনে শুধু কাজটাই কি সব? মানুষের সাথে মানুষের পরিচয়—সেটা কি এতই মূল্যহীন, এতই অবহেলার বস্ত?

আমি তা বলিনি রাজকুমারী। তবে তোমার—আমার ক'টা দিনেরই বা পরিচয়—কতটুকুই বা তার স্থায়িত্ব?

তোমার হাতের ওই পদ্মের পাপড়িগুলি ঝরতে ঝরতে যেমন একসময় শুধু মৃণাল—ডাঁটাটুকুই থাকবে, তেমনি আমাদের এই পরিচয়ের স্মৃতিটুকু দিনে দিনে মুছে গিয়ে শুধু তোমর পীড়ার কথাটুকুই মনে থাকবে—আর কিছু নয়।

স্বাতীর অধর স্ফুরিত হয়ে উঠল। জলের দিকে দৃষ্টি রেখে বললে, এটা পুরুষের কথা, নারীর কথা নয়। যার রক্তধারা এই দেহে বইছে, স্বাতী তাকে কোনওদিনই ভুলতে পারবে না। রক্তের ঋণ ভোলা যায় না।

ধীমান বললে, তার পরিবর্তে আমিও তো কিছু পেয়েছি রাজকুমারী—তোমার মধুর সঙ্গ, তোমার সহৃদয় ব্যবহার, তোমার অযাচিত করুণা—

থামো! চকিতে মুখ তুলে তাকাল স্বাতী। ধীমানের মুখের ওপর বড়—বড় কালো চোখের পূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলে উঠল, আমার কাছ থেকে শুধু কি সহৃদয় ব্যবহারই পেয়েছ? আর কিছুই পাওনি? ভালো করে চেয়ে দেখো তো আমার পানে। এ—মুখে কি শুধু অযাচিত করুণাই লেখা আছে? একবার নিজের মন দিয়ে আমার মনকে দেখার চেষ্টা করো ধীমান।

স্বাতীর সেই জ্যোৎস্নামাখা অপরূপ মুখের পানে চেয়ে তার সেই কাজলঘন দুই চোখের তারায় ধীমানের সব কথা যেন মুহূর্তে ডুবে তলিয়ে গেল। দুটি তরুণ মনে বাজতে লাগল একই বাঁশি। রাজকুমারীর একখানি করপল্লব নিজের হাতে তুলে নিয়ে মৃদু স্বরে ডাকলে, স্বাতী!

আবেগে, আবেশে, বিহ্বলতায় স্বাতীর মুখখানি ভীরু পাখির মতো আশ্রয় নিল ধীমানের প্রশস্ত বুকে।

কানে কানে কথা বলার মতো ধীমান বললে, কিন্তু এর পরিণাম কী স্বাতী?

পরম সুখে ধীমানের বক্ষলগ্না হয়ে স্বাতী চুপি—চুপি বললে, জানি না, জানতেও চাই না। শুধু জানি যে স্বাবতী আর ধীমানকে জন্মজন্মান্তরেও কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।

এ দৃশ্য দেখে হিংসুক পাপিয়া সুরে—সুরে আকাশ ভরিয়ে বলে উঠল, চোখ গেল!

শুধু পাখির চোখ নয়, দিঘির তীরবর্তী একটা লতাকুঞ্জের ফাঁকে মানুষেরও একজোড়া চোখ তখন ঈর্ষা আর বিদ্বেষের জ্বালায় দু'টুকরো অঙ্গারের মতোই জ্বলছে।

চাঁদ ঢলে পড়ল পশ্চিমে। শ্বেত পাথরের ঘাটে এসে ভিড়ল ময়ূরপঙ্খি। সোপান বেয়ে স্বাতী আর ধীমান এসে দাঁড়াল একটা বকুলতরুতলে। দু'জোড়া অধর কাছাকাছি হল, তৃষ্ণা এসে মিশল সুধায়। তারপর ধীমানের দীর্ঘ মূর্তি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই দিকে তাকিয়ে মধুর আবেশে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্বাতী।

হঠাৎ পুরুষ গলায় কে যেন বলে উঠল, বাঃ, চমৎকার! এমন প্রণয়দৃশ্য রঙ্গশালাতেও দেখা যায় না।

চমকে উঠে স্বাতী বিদ্যুৎবেগে ফিরে তাকাল। দেখলে লতাকুঞ্জের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে নাতিদীর্ঘ বলিষ্ঠদেহ এক সৈনিক—যুবা। নগরকোটাল অশনি। তার ছোট—ছোট চোখের পিঙ্গল তারায় আর তামাটে বর্ণের মুখমণ্ডলে ঝিলিক দিচ্ছে একটা ক্রুর বিদ্রূপের ইঙ্গিত।

স্বাতী ভ্রূকুটি করলে,—তুমি এখানে কেন?

ঠিক আশা করোনি আমাকে, না রাজকুমারী? ধাতব আওয়াজের মতো অশনির কণ্ঠস্বর। সেই গলায় সে আবার বললে, নগরকোটালের কাজই হল চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। কিন্তু এই নিশীথে শত্রুরাজ্যের এক বিদেশির সঙ্গে রাজকুমারী স্বাতীর নৌ—বিহার দেখতে হবে, এতটা আমিও আশা করিনি। প্রেম বড় বিষম বস্তু দেখছি।

স্বাতীর মুখ রক্তাভ হয়ে উঠল। আদেশের সুরে বললে, তুমি এখান থেকে যাও অশনি।

হ্যাঁ, যা দেখবার দেখা হয়েছে, এবার আমি যাই। শুধু একটা কাজ বাকি রইল। কাল প্রভাতে নৌ—বিহারের সংবাদটা মহারাজের গোচর করা।

নগরকোটালের সুচোলো গোঁফের নিচে বাঁকা হাসি দেখা দিল।

তুমি মহারাজকে এই কথা বলবে।—স্বাতীর মুখ থেকে সমস্ত রক্তিমা মুছে গেল।

বলব বইকি! বলা আমার কর্তব্য।

যাবার জন্যে অশনি পা বাড়াল। মুহূর্তের জন্যে কী যেন ভাবলে স্বাতী। তারপর নিজের গলা থেকে সাতনরী মুক্তাহার খুলে ডাকলে, দাঁড়াও অশনি, এই মুক্তাহার দিয়ে কি তোমার মুখ বন্ধ হবে না?

অশনি লোভী দৃষ্টিতে একবার মুক্তাহার, একবার রাজকুমারীর দিকে তাকাল। বললে, অশনির মুখ বন্ধ করতে হলে এর চেয়েও মূল্যবান সামগ্রী দরকার।

কী সে?

রাজকুমারী স্বাতীর প্রণয়।

অসহ্য ঘৃণায় কালো চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। গ্রীবা বাঁকিয়ে চাপা তীব্র স্বরে স্বাতী বলে উঠল নগরকোটাল রাজভৃত্য ছাড়া কিছুই নয়। ভৃত্যের স্পর্ধার একটা সীমা থাকা উচিত।

দ্বিতীয়বার অশনির দিকে না তাকিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে স্বাতী চলে গেল। আর তামাটে বর্ণের মুখে চিতাবাঘের ক্রুরতা। আর পিঙ্গল চোখে শৃগালের ধূর্ততা নিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল অশনি।

ধীরে—ধীরে পাতলা হয়ে এল ধোঁয়ার কুণ্ডলি, মিলিয়ে গেল দৃশটা।

আজ সব মনে পড়ছে ইরার। জন্ম—জন্মান্তরের স্মৃতি!

চঞ্চল হয়ে সে এল সেনাপতি ধীমানের পেটিকার পাশে। খুলে দিল ডালা। এই তো সেই ধীমান, যে তাকে ডাকছিল একটু আগে। তবে কেন এমন চিরস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে সে? ব্যাকুল হয়ে ইরা ডাকতে লাগল, জাগো ধীমান, জাগো। আমি তোমার স্বাতী, তোমারই চিরকালের সঙ্গিনী। আমি এসেছি, জাগো তুমি।

জাগল না ধীমান, ভাঙল না তার যুগ—যুগান্তরের ঘুম। তবে কেন ডেকেছিল সে জন্মজন্মান্তরের আকুলতা নিয়ে? ডাক শুনে ইরা তো দেরি করেনি এক মুহূর্ত! ইরা কি তবে রাজকুমারী স্বাতী নয়? তাই সাড়া দিল না ধীমান? কে বলে দেবে তাকে?

পেটিকার ডালা আবর বন্ধ করে দিয়ে ক্লান্ত ইরা ফিরে চলল।

মস্তবড় মাটির ঢিবিটার পাশ দিয়ে ইরা মাঠের রাস্তায় পা দিতেই ওপাশ থেকে আর একটি মানুষ এগিয়ে এল তার সামনে।

আপনি! এমন সময়ে।

শেষ রাতের নীলচে অন্ধকারেও ইরা চিনতে পারল লোকটা সুজনলাল। তেমনি খাঁকি হাফপ্যান্ট আর হাফশার্ট পরনে। হাতে একটা ছোট বেতের লাঠি। সুজনলাল আবার প্রশ্ন করলে, বেড়াতে বেরিয়েছেন নাকি?

ইরা শুধু ঘাড় নাড়লে।

কিন্তু ভোর হতে এখনো দেরি আছে যে! জংলা জায়গা, শেষ রাতে একা—একা না বেরনোই ভাল, চলুন, বাংলোয় পৌঁছে দিই।

উঁচু—নিচু মাঠের রাস্তা দিয়ে পাশাপাশি চলতে চলতে সুজনলাল শুধোলে, প্রিয়তোষবাবু আসেননি?

না, তা, কে ডাকিনি।

সুজনলাল একবার চোখের কোণ দিয়ে তির্যক দৃষ্টিতে ইরার দিকে তাকালে। তারপর বললে, দোষ যদি না নেন তো একটা কথা বলি। আপনি ডাকলেও প্রিয়তোষবাবু আসতে পারতেন না। একটু আগে চৈতির ধারে কুলি—কামিনদের ধাওড়ায় তাঁকে ঘুরতে দেখেছি। আপনার বাবা মস্ত মানী লোক, তাই বলছি—

ও—কথা থাক সুজনবাবু। ইরার ভ্রূ—দুটো কুঁচকে উঠল।

সুজনলাল অপ্রস্তুত হয়ে উঠল। আর একবার বাঁকা চোখে ইরাকে দেখে নিয়ে বললে, থাক। তবে একটা কথা দেবীজিকে জানিয়ে রাখি, আর কোনওদিন বেড়াতে বোরোবার ইচ্ছে হলে সুজনলালকে স্মরণ করবেন। আপনার কোনও কাজে লাগতে পারলে নিজেকে আমি বাদশার মতো সুখী মনে করব।

ইরা ছোট্ট করে জবাব দিলে, ধন্যবাদ। দরকার হলে বলব।

ইরার এত কাছে আসবার সুযোগ ইতিপূর্বে সুজনলাল পায়নি। ইরার চারপাশের হাওয়ায় অতি মৃদু একটা মাদক সুরভি মিশে আছে। সেটা তার কেশের, না বেশের, না অঙ্গের, সুজনলাল তা জানে না। সেটা তার কেশের, না বেশের, না অঙ্গের, সুজনলাল তা জানে না। কিন্তু সে—গন্ধে নেশা লাগল তার রুক্ষ যৌবনে। সুজনলাল বললে, দেখুন, আমি ঠিকাদার মানুষ, বিদ্যে—বুদ্ধি তেমন বেশি কিছু নেই। আদব—কায়দাও হয়তো তেমন জানি না। তবে সব মানুষের বুকের ভেতর যেটা থাকে, সেটা আমারও আছে। সেদিক থেকে আমি যে কারও চেয়ে কম নই, কোনওদিন সুযোগ পেলে তা প্রমাণ করে দেব।

ইঙ্গিতটা বুঝতে ইরার দেরি হল না। স্বল্পভাষী এই মানুষটার মুখে হঠাৎ এতখানি উচ্ছ্বাস শুনে সে যেমন অবাক হয়ে গেল, তেমনি বিতৃষ্ণাও কম হল না। তিক্ত গলায় সে বললে, কোথায় কি বলতে হয়, আপনার তা জানা নেই সুজনবাবু।

সুজনলাল একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই একটা চেনা গলার ডাক শোনা গেল : ইরা! ইরা।

অদূরে প্রিয়তোষের দীর্ঘ মূর্তি গেল। পরনে ব্রিচেস, হাতে রাইফেল।

দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল ইরা। সুজনলাল আর এগোলে না। তার কালো ঠোঁটের ফাঁকে চকচকে সাদা দাঁতগুলো দেখা যেতে লাগল।

ফটকের কাছে উৎকণ্ঠিত মুখে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতাপবাবু আর জয়া। আকাশে তখন লালের ছোপ লেগেছে! যাক, প্রিয়তোষ তাহলে খুঁজে পেয়েছে ইরাকে!

ভয়ানক ক্লান্ত লাগছিল ইরার। মানুষের ওপর হিপনোটিজম—এর প্রভাব পড়লে যেমন লাগে, ঠিক তেমনি অবসন্ন বোধ হচ্ছিল। প্রিয়তোষের বাহুতে ভর দিয়ে সে যখন কাছে এসে দাঁড়াল, তার হাতের সেই ধূপদানিটা লক্ষ করে অধ্যাপক প্রতাপের বুঝতে আর বাকি রইল না, ইরা কোথায় গিয়েছিল। একটা আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল তাঁর পিতৃহৃদয়। তাঁর শিক্ষিত মনেও এই ধারণা হল, একটা দুষ্ট গ্রহ, একটা অশুভ প্রেতাত্মা যেন চক্রান্তের জাল বুনতে শুরু করেছে ইরার চারপাশে।

অধ্যাপক ব্যাকুল হয়ে কন্যাকে বুকে জড়িয়ে বলতে লাগলেন, বল, ওই ভয়ঙ্কর জায়গায় আর কখনও যাবি নে? বল ইরা— শপথ কর—

ক্লান্ত কণ্ঠে ইরা শুধু বললে, আর যাব না।

* * *

এ বিচিত্র রহস্য জাল ভেদ করতেই হবে। জানতে হবে এ অমঙ্গলের মূল কোথায়? প্রাণময়ী ইরা কেন গিয়েছিল প্রাণহীন মৃতের অভিসারে? কীসের টানে? জানতেই হবে এ—রহস্য!

ধূলিমলিন সেই প্রাচীন তিব্বতীয় পুঁথির কীটদষ্ট পাতায় পাতায় অধ্যাপক প্রতাপ সেই রহস্যের সন্ধান করে চলেছেন। কার্তিকের আকাশ রূপালি রোদে ঝিলমিল করছে। ভীম পাহাড়ের কোলে প্রতিদিনের মতো কুলিরা খননকার্য চালিয়ে যাচ্ছে, ক্রেনের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমবেত গলার একটানা সুর জানলা দিয়ে ভেসে আসছে। একটা বুনো পোকা অদ্ভুত গুঞ্জন তুলে লাইব্রেরি ঘরের কাচের সার্শিতে মাথা ঠুকছে। অধ্যাপক প্রতাপ কিছু দেখছেন না, কিছু শুনছেন না। সমস্ত মন দুই চোখে কেন্দ্রীভূত করে তিনি পড়ে চলেছেন :

কাঞ্চনপুরে ফিরে যাওয়ার দিন সমাগত। বিশ্রাম—ভবনে দর্ভপাণি যাত্রার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় দ্বারে দেখা দিল দুজন সশস্ত্র সাস্ত্রি। ভিষগাচার্যকে মহারাজ স্মরণ করেছেন।

তার জন্যে সশস্ত্র সান্ত্রি পাঠাবার আবশ্যক কী! দর্ভপাণি ভ্রূ—কুঞ্চিত করলেন।

মহারাজ চন্দ্রপাল আপন কক্ষে পদচারণা করেছিলেন। কক্ষের একপাশে দাঁড়িয়ে নগরকোটাল অশনি। হাতে চর্ম—নির্মিত কশা। দুই সশস্ত্র সান্ত্রীর মাঝখানে বন্দীর মতো দর্ভপাণি এসে দাঁড়ালেন! চন্দ্রপালের মুখ আজ আর প্রসন্নতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল না।

দর্ভপাণি বললেন,—মহাদেবী চামুণ্ডার প্রসাদে কুশলনগরের কল্যাণ হোক।

চন্দ্রপালের কণ্ঠ রূঢ় শোনাল, প্রভু তথাগতের ভক্ত আমি, দেবদেবীর অনুগ্রহে আমার প্রয়োজন নেই।

দর্ভপাণি একবার তাচ্ছিল্যভরে তাকালেন। স্বাভাবিক নীরস স্বরে বললেন, মায়ের করুণা ছেলের প্রয়োজন—অপ্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে না মহারাজ। যাক, স্মরণ করেছেন কেন?

আপনার শিবিকা প্রস্তুত ভিষগাচার্য!

আমিও প্রস্তুত মহারাজ। কাঞ্চনপুরে বহু দরিদ্র রোগী আবার পথ চেয়ে রয়েছে। ভিষগাচার্যের কাছে রাজার ও প্রজার জীবনের দায়িত্ব সমান।

আপনার পারিশ্রমিক পাঁচ সহস্র স্বর্ণমুদ্রা রাজকোষ থেকে নিয়ে যাবেন। আশা করি কাঞ্চনপুরের ভিষগাচার্যের কাছে কুশলনগরের আর কোনও ঋণ রইল না।

রক্তাভ দুই চক্ষু মেলে ভিষগাচার্য তাকালেন। বললেন, রইল বইকি মহারাজ!

কী সে ঋণ?

ধীমানের রক্তের ঋণ। আপনার অঙ্গীকার নিশ্চয় ভুলে যাননি।

চন্দ্রপালের মুখ স্তব্ধ গাম্ভীর্যে থমথম করতে লাগল। ক্ষণকাল নীরব থেকে বললেন, না ভুলিনি। কিন্তু সেই ঋণের মূল্য নেওয়ার আগে ধীমান যে গুরুতর অপরাধ করেছে, তার শাস্তি নিতে হবে।

দর্ভপাণি বিস্মিত হয়ে বললেন, গুরুতর অপরাধ! ধীমান করেছে?

হ্যাঁ, আপনার পালিত পুত্র ধীমানই করেছে।

কী এমন অপরাধ, শুনতে পাই?

চাপা ক্রোধে আর ঘৃণায় চন্দ্রপালের গৌরবর্ণ মুখ আরক্তিম হয়ে উঠল। যথাসম্ভব সংযত কণ্ঠে বললেন, রাজকুমারী স্বাতীকে ছলাকলায় ভুলিয়ে, দুশ্চরিত্র, লম্পট ধীমান তার সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করেছে।

অশনির তামাটে বর্ণের মুখে আর পিঙ্গল চক্ষু—তারকায় একটা ধূর্ত কুটিলতা চিকচিক করে উঠল। সেই দিকে একবার বক্র কটাক্ষে তাকিয়ে দর্ভপাণি প্রশ্ন করলেন, এ অভিযোগ কে করেছে? রাজকুমারী স্বাতী?

না, নগরকোটাল অশনি। নিশীথ রাত্রে তাদের দুজনকে নৌ—বিহার করতে দেখেছে। কুশলনগরের রাজপরিবারের কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা যে করে, চন্দ্রপাল তাকে ক্ষমা করে না। আপনাকে একাই স্বদেশে ফিরে যেতে হবে ভিষগাচার্য।

দর্ভপাণি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, নগরকোটাল যখন দুজনকে একত্রে নৌ—বিহার করতে দেখেছেন, তখন বোঝাই যাচ্ছে যে দুজনে স্বেচ্ছায় মিলিত হয়েছিল। আর পরস্পরের প্রতি অনুরাগ না জন্মালে একের ডাকে অপরে সাড়া দেয় না মহারাজ। যৌবনের ধর্মই হল প্রেম। এর মধ্যে অপরাধটা কোথায়?

যে যৌবন অসংযত, তাকে দণ্ডিত করাই উচিত।

বেশ, তাই যদি হয়, তবে এ—অপরাধের একমাত্র দণ্ড হওয়া উচিত ধীমানের সঙ্গে রাজকুমারী স্বাতীর বিবাহ। এর ফলে ধীমানের কাছে আপনার ঋণও শেষ হয়ে যাবে মহারাজ।

মেঘগর্জনের মতো চন্দ্রপাল বলে উঠলেন, স্তব্ধ হোন ভিষগাচার্য। আপনার ধৃষ্টতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি আমি। স্বাতীর সঙ্গে বিবাহ দেব আমি ওই ধীমানের?

অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে দর্ভপাণি উত্তর করলেন, দিলেই বা! যদিও মানুষের পরিচয় তার রক্তে নয়, মনুষ্যত্বে, তবুও আমি পূর্বেই জানিয়েছি, ধীমানের দেহে রাজরক্ত আছে। ধীমান একজন রাজকুমার।

রাজকুমার! সত্য বলছেন ভিষগাচার্য? বলুন, ধীমান কে?

কাঞ্চনপুরের অধীশ্বর মহারাজ মহানন্দের পুত্র।

চন্দ্রপাল যেন সহসা উদ্যত—ফণা সাপ দেখলেন সামনে। মহানন্দের পুত্র ধীমান। তাঁর পরম শত্রু মহানন্দ। কিন্তু বিশ্বাস হল না চন্দ্রপালের। দেখতে—দেখতে সন্দেহের রেখা পড়ল চন্দ্রপালের ললাটে। বললেন, দেশে—দেশে জানে মহানন্দ অপুত্রক, রানি ক্ষণপ্রভার গর্ভে কোনও সন্তান জন্মায়নি। সত্য গোপন করার চেষ্টা করবেন না ভিষগাচার্য!

পুরুষ কণ্ঠে দর্ভপাণি উত্তর করলেন, দর্ভপাণি কুটিল রাজনীতির ব্যবসা করে না। সত্য গোপন করা তার স্বভাববিরুদ্ধ। ধীমান রানি ক্ষণপ্রভার সন্তান নয়। মহারাজ মহানন্দের ঔরসে এক কৃষাণীর গর্ভে তার জন্ম।

কৃষাণীর গর্ভে? বিবাহ হয়েছিল?

হয়েছিল। একান্ত গোপনে।

প্রমাণ?

প্রমাণ এই দীন ব্রাহ্মণ। সে—বিবাহে আমিই পুরোহিতের কাজ করেছিলাম। বিবাহের পাঁচ মাস পরে ধীমানের জন্ম হয়। মহারাজ মহানন্দের জ্ঞাতিরা সিংহাসনের নবজাত উত্তরাধিকারীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করায়, আমি শিশু ধীমানকে নিজের পুত্র বলে পরিচয় দিয়ে পালন করতে থাকি। কাঞ্চনপুরের সিংহাসন অবশ্য আজও সে পায়নি, তবু একথা সত্য যে ধীমানই কাঞ্চনপুরের রাজকুমার।

মহারাজ চন্দ্রপালের গৈরিক সংযমের আড়াল থেকে দ্বিতীয় রিপু তার বন্য রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল। চিৎকার করে তিনি বলে উঠলেন, থামুন।

তারপর পুনরায় পদচারণা করতে করতে অতিরিক্ত শান্ত কণ্ঠে চন্দ্রপাল বলতে লাগলেন,—সমস্তটা তাহলে আপনারই চক্রান্ত? আপনি জেনে—শুনে একটা নগণ্যা কৃষাণীর গর্ভজাত সন্তানের অপবিত্র রক্তে আমার স্বাতীর রক্ত কলঙ্কিত করেছেন। আপনারই প্রশ্রয়ে ধীমানের দুঃসাহস হয়েছিল রাজকুমারীর সঙ্গে প্রেমাভিনয় করতে। কাঞ্চনপুরের সিংহাসনের আশা যখন নেই, তখন কুশলনগরের রাজমুকুটই বা মন্দ কী! কেমন, এই উদ্দেশ্য নিয়েই কাঞ্চনপুর থেকে আপনি এসেছিলেন, না ধূর্ত ব্রাহ্মণ?

দর্ভপাণির ভাস্বর রক্তাভ দুই চক্ষু ধিক করে একবার জ্বলে উঠল। স্বভাব—নীরস কণ্ঠে তিনি বললেন, মহাদেবী চামুণ্ডার প্রসাদে বহু রাজমুকুট এই দীন ব্রাহ্মণের পদতলে লুটায়। দর্ভপাণির কাছে তার মূল্য ধূলির চেয়ে বেশি নয়। রাজকুমারীর জীবন রক্ষা ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আসিনি। কিন্তু ঘটনাচক্রে যা দাঁড়াল, তাতে আপনারও যেমন হাত নেই, আমারও তেমনি নেই। সেটা শুধুই নিয়তির খেলা। রাজমুকুটের লোভে নয়, দুটি তরুণ—তরুণীর ভবিষ্যৎ সুখের মুখ চেয়ে তাই আমি রাজকুমারী স্বাতী ও ধীমানের বিবাহের প্রস্তাব করেছিলাম।

সাধু! সাধু!—মহারাজ চন্দ্রপালের ওষ্ঠপ্রান্তে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল। তিনি আবার বললেন,—এই উদার প্রস্তাবের জন্যে আপনার ঘটক—বিদায় পাওয়া উচিত ভিষগাচার্য, তাই নয় কি? আপনার উপযুক্ত পুরস্কার আমি ভেবেই রেখেছি। অশনি!

পিঙ্গল চোখের তারায় বর্বর উল্লাস নিয়ে অশনি সামনে এগিয়ে এল।

দর্ভপাণির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে চন্দ্রপাল আদেশ করলেন, নিয়ে যাও—চিরান্ধ কারাগারে—

অশনির ইঙ্গিতে ভীমকায় দুই সশস্ত্র সাস্ত্রি দর্ভপাণির দুই বাহু ধরে আকর্ষণ করলে।

মহাকালের ত্রিনয়নের মতো দর্ভপাণির রক্তাভ চক্ষু ধক ধক করে জ্বলতে লাগল। চন্দ্রপালের মুখের ওপর সেই অগ্নিময় চক্ষু রেখে বললেন, ভালো কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলেন মহারাজ! ইতিহাসে লেখা থাকবে।

অশনির হাতের কশা সশব্দে গিয়ে পড়ল দর্ভপাণির মুখের ওপর। রক্তাক্ত মুখে বীভৎস হেসে দর্ভপাণি বললেন, ন্যায়ের বিচার বড় সূক্ষ্ম মহারাজ! অন্যায়ের শাস্তি তোলা থাকে। সেই অমোঘ শাস্তি ধীমানের হাত দিয়েই একদিন আসবে।

চন্দ্রপাল উত্তর করলেন, তার আগে ধীমানের রক্তে কুশলনগরের রাজপরিবারের কলঙ্ক মুছে দেব।

অশনির ইঙ্গিতে সান্ত্রিরা দর্ভপাণিকে টেনে নিয়ে চলে গেল। কেউ দেখল না কক্ষের একটি গবাক্ষের পাশ থেকে একটি নারীমূর্তি ছায়ার মতো সরে গেল। সে উল্কা, রাজকুমারী স্বাতীর প্রিয়সখী।

রাজপুরীর পেছনে তখন আর এক দৃশ্য।

প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে রাজকুমারী স্বাতী। আর, তারই নিচে কালো অশ্বপৃষ্ঠে বসে আছে ধীমান।

স্বাতী বলছিল,—কাঞ্চনপুরের জন্য বড় মনকেমন করছে বুঝি?

মৃদু হেসে ধীমান বলল,—মন তো আমার কুশলনগরেই রইল। শুধু দেহটাই যাবে কাঞ্চনপুরে।

কুশলনগরের এই ক'টা দিন আর রাত্রি স্মরণ থাকবে কি? কাঞ্চনপুরে তোমার কত প্রিয়জন—

প্রিয়জন আমার অনেক বটে, কিন্তু প্রিয়তমা শুধু একটি।

স্বাতীর কপোলে কিংশুকের আভা লাগল। একটু ম্লান স্বরে বললে, তুমি পুরুষ, সেখানে তোমার কত কাজ, তাই নিয়েই তোমার দিন কেটে যাবে। কিন্তু আমার দিন কাটবে কী নিয়ে? না—হয় আর দু'দিন পরে যেও ধীমান।

ধীমান উত্তর দেওয়ার আগেই উল্কারই মতো ছুটে এল উল্কা। রুদ্ধশ্বাসে বললে, সর্বনাশ হয়েছে রাজকুমারী।

কী হল উল্কা? অমন করছিস কেন?

মহারাজের আদেশে নগরকোটাল ধীমানকে বন্দী করতে আসছে। এইমাত্র ওরা ভিষগাচার্যকে চিরান্ধ কারাগারে টেনে নিয়ে গেল।

পিতাকে কারাগারে নিয়ে গেল? ধীমানের চোখের দৃষ্টি ইস্পাত ফলকের মতো ঝকঝক কর উঠল।

উল্কা বললে, হ্যাঁ। এবার তোমার পালা।

বিহ্বল ব্যাকুল স্বাতী বলে উঠল, আর এক মুহূর্ত নয় ধীমান, তুমি যাও—অশনি আসবার পূর্বে তুমি এখুনি পালাও।

পালাব?—ধীমানের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

স্বাতীর কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ল—তোমাকে পালাতেই হবে ধীমান। বর্বর অশনির অনুচরদের সঙ্গে তুমি একা পেরে উঠবে না। তুমি যাও।

মুহূর্তকাল কী যেন ভাবল ধীমান। কী এক কঠিন প্রতিজ্ঞায় তার মুখভাব কঠোর হয়ে উঠল। তারপরে বললে,—বেশ, আমি যাচ্ছি। কিন্তু নগরতোরণ যদি ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে থাকে?

আমার এই অঙ্গুরি দেখালেই তোরণরক্ষী দ্বার খুলে দেবে।

নিজের আঙুল থেকে নীলকান্তমণির অঙ্গুরিটি খুলে স্বাতী ধীমানের দিকে নিক্ষেপ করলে। সেটা নিয়ে ধীমান বললে, আমি আবার আসব স্বাতী, তুমি অপেক্ষা কোরো।

মুহূর্তে অশ্বের মুখ ঘুরিয়ে ধীমান তাকে কশাঘাত করলে। কালো বিদ্যুতের মতোই কালো অশ্ব ধূলিজাল উড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আর, সেই ধূসর ধূলিজালের দিকে সজল উৎকণ্ঠায় চেয়ে রইল স্বাতী।

জীর্ণ পুঁথির কয়েকটা পাতা এমনভাবে কীটদষ্ট হয়েছে যে পড়া যায় না। অধ্যাপক প্রতাপ অতি সাবধানে সেগুলি উল্টে পরের পৃষ্ঠা থেকে আবার শুরু করলেন :

সেই রাত্রে। অন্ধকার রাজপুরী তখন সুষুপ্ত।

মৃদু পদশব্দে চন্দ্রপালের সজাগ ঘুম ভেঙে গেল। স্তিমিত দীপালোকে কক্ষমধ্যে আলোছায়ার মায়াজাল। সতর্ক দৃষ্টি মেলে চন্দ্রপাল দেখলেন, অস্পষ্ট একটি নারীমূর্তি সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে।

কে?

আমি সুরঙ্গমা।

শয্যার উপর উঠে বসলেন চন্দ্রপাল। বললেন, তুমি এ কক্ষে কেন সুরঙ্গমা? এই নিশীথে?

শয্যাপাশে এসে দাঁড়ালেন সুরঙ্গমা। মুখ থেকে গুণ্ঠন সরিয়ে বললেন, মহারাজ আশ্চর্য হয়েছেন, না? হওয়ারই কথা। দীর্ঘ আঠারো বছর পরে মহারাজ চন্দ্রপালের এই কক্ষে আবার সুরঙ্গমার অভিসার হবে, একথা কি আমিই ভেবেছিলাম?

চন্দ্রপাল একটু বিচলিত হয়ে বললেন, তুমি তো জানো আমি সন্ন্যাসী। কেন এলে?

সন্ন্যাসীর তপোভঙ্গ করতে।

নারীকণ্ঠের একটা সূক্ষ্ম হাসি কক্ষের হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল।

সুগম্ভীর স্বরে চন্দ্রপাল বললেন, পরিহাস রাখো, বলো এ অসময়ে কেন এসেছ?

মহারাজের কাছে আমার একটা আবেদন আছে।

কী আবেদন?

সুরঙ্গমা সহসা হাত বাড়িয়ে চন্দ্রপালের পদস্পর্শ করলেন। কণ্ঠে অনুনয় নিয়ে বললেন, এতখানি অন্যায় তুমি কোরো না মহারাজ! স্বাতী আর ধীমানের বিবাহে বাধা দিও না। ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে।

একটা তুচ্ছ বস্তুর মতো সুরঙ্গমার হাত সরিয়ে দিয়ে চন্দ্রপাল বলে উঠলেন, নিশীথ রাত্রে তুমি কি প্রলাপ বকতে এসেছ? ধীমান শুধু কৃষাণীর গর্ভজাত নয়, বৌদ্ধ—বিরোধী ঘোর তান্ত্রিক মহানন্দের ঔরসে তার জন্ম। তার সঙ্গে আমি দেব স্বাতীর বিবাহ! জানো না মহানন্দ আমার পরম শত্রু!

সুরঙ্গমা বললেন, জানি। কিন্তু একদিন তুমিও ঘোর তান্ত্রিক ছিলে চন্দ্রপাল। আর মহারাজ মহানন্দ ছিলেন তোমার পরম বন্ধু। সে—কথা তুমি ভুলে গেলেও কুশলনগরের এক নটী আজও তা ভোলেনি। সেই নটীর কুঞ্জে প্রতি রাত্রে তোমাদের দুই বন্ধুর পদধূলি পড়ত। আর চলত প্রেমের প্রতিযোগিতা। কেমন, তাই না?

চন্দ্রপাল আর একটু বিচলিত হয়ে বললেন—ওসব কথা থাক সুরঙ্গমা।

কক্ষের হাওয়ায় সূক্ষ্ম একটু কলহাস্য আবার একটু অনুরণিত হয়ে উঠল। সুরঙ্গমা বললেন, ক্ষতি কী? তুমি আমি ছাড়া এই নিশীথে কেউ আর শুনছে না। তোমরা তখন নবীন যুবা, আর নটীরও তখন রূপের অবধি ছিল না। কিন্তু সেই রূপই হল কাল, সেই রূপের নেশায় মহানন্দ নটীকে হরণ করে নিয়ে গেল কাঞ্চনপুরে, তার প্রমোদ—ভবনে। হতাশ প্রেমের জ্বালা ভুলতে হঠাৎ তন্ত্রধর্ম ত্যাগ করে তুমি একদা বৌদ্ধ—সন্ন্যাসীর গেরুয়া ছদ্মবেশ ধারণ করলে।

ছদ্মবেশ! চন্দ্রপাল কুপিত হয়ে উঠলেন, সংযত হয়ে কথা বলো সুরঙ্গমা।

অতি মধুর কণ্ঠে সুরঙ্গমা বললেন, রাগ কোরো না চন্দ্রপাল, কথাটা তো মিথ্যে নয়! তোমার গৈরিকের দোহাই, বলো তো সেদিনের সেই কামনা—বাসনা—ঈর্ষা—হিংসা আজও কি তোমার গেছে? মহারাজ মহানন্দ আজ জীবিত নেই। কিন্তু তাঁর প্রতি তোমার বিদ্বেষ আজও বেঁচে আছে। যাক, যা বলছিলাম। মহানন্দের প্রমোদ—ভবনে নটী কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারল না। মনে মনে সে ভালবেসেছিল কাকে, তুমি তা জানো চন্দ্রপাল। তাই একদিন সে আবার পালিয়ে এল কুশলনগরেই। এবার তার ঠাঁই হল কুশলনগরাধিপতির প্রমোদ—ভবনে নয়, একেবারে দ্বিতীয় অন্তঃপুরে। সে আজ বিশ বছরের কথা। মনে পড়ে চন্দ্রপাল?

চন্দ্রপাল বিরক্তিভরে বললেন, সুরঙ্গমা তুমি যাও!

আর অল্পই বাকি আছে চন্দ্রপাল। বিশ বছর আগে এই কক্ষে এই পালঙ্কে প্রতিরাত্রে পুষ্পশয্যা রচনা হত, আর সেই শয্যায় শুয়ে নটীর কানে—কানে তুমি বহু প্রেমের কথা মধুপের মতো গুঞ্জন করতে। আজ হয়তো সেই প্রেমে বেঁচে নেই। বসন্ত গেলে ভ্রমরের তৃষ্ণাও থাকে না। তবু সেই মৃত প্রেমের দোহাই দিয়ে আবার অনুনয় করছি চন্দ্রপাল, স্বাতী আর ধীমানের মিলনে তুমি বাধা দিও না। স্বাতীকে সুখী হতে দাও—ওর মলিন মুখ আর আমি সইতে পারছি না।

অশ্রুর বন্যায় সুরঙ্গমার মুখ ভেসে গেল।

দারুণ ক্রোধে চন্দ্রপাল গর্জে উঠলেন, না—না—না, তা হয় না, তা হতে পারে না। তোমার মায়াকান্নায় আমাকে ভোলাতে পারবে না সুরঙ্গমা। বিশ বছর আগে সেই মহানন্দের অপমান জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমার বুকে কুশাগ্রের মতো বিঁধে থাকবে। এই আমার শেষ কথা। তুমি যাও সুরঙ্গমা।

সুরঙ্গমার অশ্রুসিক্ত চোখে সহসা একটা জ্বালাময় দীপ্তি দেখা দিল। মনে—মনে একটা কঠিন সঙ্কল্প নিয়ে তিনি বললেন, বেশ, আমিও তবে শেষ কথা জানিয়ে যাই চন্দ্রপাল, কাল প্রভাতেই কুশলনগর এক আশ্চর্য রহস্য জানতে পারবে।

এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে চন্দ্রপাল বললেন, কী রহস্য?

সুরঙ্গমার অধর—প্রান্তে একটু বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, অস্ফুট আলোকে চন্দ্রপাল তা দেখতে পেলেন না। শুধু শুনলেন সুরঙ্গমা বলছেন,— আঠারো বছর আগে এক দুর্যোগের রাতে কুশলনগরের মহরানি মণিমালিনী এক মৃত সন্তান প্রসব করেন। সেই রাত্রেই রাজভবনে দ্বিতীয় অন্তঃপুরে নটী সুরঙ্গমার গর্ভে এক কন্যার জন্ম হল। তারপর সেই দুর্যোগের রাত ভোর হবার পূর্বেই সেই নটীর সদ্যোজাত কন্যা কেমন করে প্রথম রাজ অন্তঃপুরে রানি মণিমালিনীর শয্যায় স্থান পেল, আর কেমন করেই বা সেই মৃত সন্তান চলে এল সুরঙ্গমর কোলের কাছে, সে— রহস্য সুরঙ্গমা আর চন্দ্রপাল ছাড়া কেউই জানে না। রানি মণিমালিনীও জানতেন না। কাল প্রভাতে কুশলনগর আঠারো বছর আগের সেই রহস্য জানবে। জানবে স্বাতী কে—কার কন্যা। আশা করি আভিজাত্যের গৌরবে মহারাজ চন্দ্রপালের মুখ তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

দ্বারের দিকে অগ্রসর হলেন সুরঙ্গমা।

কয়েক মুহূর্ত বজ্রাহতের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন চন্দ্রপাল। তারপর সহসা কোমল কণ্ঠে ডাকলেন,—শোনো। কাল প্রভাত পর্যন্ত আমাকে ভাববার অবকাশ দাও সুরঙ্গমা।

পরদিন প্রভাতে চৈতী নদীর জলে সুরঙ্গমার মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেল। কুশলনগর জানল, কোনও অজ্ঞাত কারণে সে আত্মহত্যা করেছে।

* * *

কফির পেয়ালা নিয়ে এল জয়া। অধ্যাপক প্রতাপ পুঁথি থেকে চোখ তুলে তাকালেন।

ইরা কোথায় জয়া?

বেড়াতে বেরিয়েছে?

একা? প্রতাপবাবুর মুখে উদ্বেগের ছায়া পড়ল।

প্রিয়তোষ সঙ্গে আছে। সারাদিনই সঙ্গে থাকে।

কফির পেয়ালায় একটা চুমুক দিয়ে প্রতাপবাবু বললেন, কিন্তু রাতটায় ওর ওপর চোখ রাখিস মা! কী জানি আবার কোন রাতে—

আশ্বাসভরা সুরে জয়া বললে,—আমার চোখ এড়িয়ে ইরাকে আর কোথাও বেরোতে দেব না। কিন্তু সেদিন রাতে একা—একা কেন ও পাতালপুরীতে গিয়েছিল মেসোমশায়?

চিন্তাক্লিষ্ট মুখে প্রতাপবাবু বললেন, সেই কারণের সূত্রটুকুই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি পুঁথির পাতায় পাতায়। জন্মান্তরের রহস্য বোঝা সহজ নয় মা। সেনাপতি ধীমান আর রাজকুমারী স্বাতী যে যুগের, সে—যুগটা ছিল ঘোর তন্ত্র—সাধনার যুগ। তখন শব—সাধনা পিশাচসিদ্ধ প্রেতযোনি নামানো—আরও নানারকম অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ চলত। ইরার ওপর হয়তো তারই কু—প্রভাব পড়েছে। ভাবছি এখান থেকে ওকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দি।

কিন্তু ইরা যে এখান থেকে আর কোথাও যেতে চায় না মেসোমশায়।

ও।

ম্লান উদাস দৃষ্টিতে অধ্যাপক প্রতাপ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। দিনের কাজ শেষ হয়েছে। কুলিরা দলে দলে ঘরে ফিরছে। থেমে গেছে ক্রেনের ঘরঘর আওয়াজ। ভীমপাহাড়ের কোলে ছায়া নামছে ঘন হয়ে।

জুয়েল—ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে জয়া চলে গেল। অধ্যাপক প্রতাপ চশমার কাচ মুছে কুশলনগরের ইতিহাসে আবার মন দিলেন :

সূর্যাস্তের আবির চৈতি নদীর জল রাঙিয়ে তুলেছে। তারই তীরে শাল—মহুয়ার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল একটি কিশোরী বেদেনী আর ঝুলি—কাঁধে এক বেদে! এগিয়ে এল তারা একেবারে কুশলনগরের তোরণদ্বারের সামনে।

রঙিন ঘাঘরা ঘুরিয়ে কালনাগিনীর মতো কালো বেণী দুলিয়ে বেদেনী মেয়ে নাচছে আর গাইছে—

লাগ ভেলকি লাগ!

মন্তরে মোর যাদুকরী পাশাবতী জাগ।

লাগ ভেলকি লাগ।

সঙ্গের ছেলেটি তার গানের সঙ্গে বাজাচ্ছে একটা তুবড়ি বাঁশি।

তোরণশীর্ষে দাঁড়িয়েছিল অনুচরসহ স্বয়ং অশনি। প্রতিদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে সে তোরণশীর্ষে উঠে বহুদূর পর্যন্ত সন্ধানী দৃষ্টি চালিয়ে দেখে, কোথাও কোনও শত্রুপক্ষের ছায়া দেখা যাচ্ছে কিনা। দুটি কিশোর বেদে—বেদেনীকে আসতে দেখে তার দৃষ্টি প্রথমে সন্দেহে কুটিল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাদের নাচ—গান শুনে তার পিঙ্গল চোখে আর সূচ্যগ্র গোঁফের নিচে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠল। কোমরবন্ধনীর মধ্যে থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে অশনি মেয়েটাকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলে। বেদেনী মেয়ে ক্ষিপ্রহাতে সেটা লুফে নিয়ে হাসিমুখে বললে, অনুমতি হয় তো ভেতরে গিয়ে গান শোনাই আর খেলা দেখাই।

ছেলেটি বললে, ভালো ভালো যাদুর খেলা—দেখবেন?

অনুচরবর্গ কৌতূহলী হয়ে উঠল। অশনি প্রশ্ন করলে কী নাম তোদের?

মেয়েটি বলল, টিয়া।

ছেলেটি বললে, কেশর।

কোন দেশে ঘর তোদের?

টিয়া বললে—বেদের ঘর সব দেশেই। আমরা পথে—পথে ঘুরি, যাদুর খেলা দেখাই।

কেশর বললে, শুনেছি কুশলনগরে ভোজবাজির আদর আছে। তাই এসেছি কিছু পুরস্কারের আশায়। অনুমতি হয় তো দ্বার খুলে দিন।

অশনির ইঙ্গিতে রক্ষী তোরণদ্বার খুলে দিলে। টিয়া আর কেশর ভিতরের বিশাল অঙ্গনে এসে দাঁড়াল। অঙ্গনের চতুষ্পার্শে চারটি প্রশস্ত রাজপথ। প্রত্যেক পথের ধারে পণ্যশ্রেণী। অঙ্গনের মধ্যস্থলে একটি সুবৃহৎ জলাধার, তার মাঝখানে ঊর্ধ্বায়িত একটি মকরমুখ থেকে জলধারা উৎসারিত হচ্ছে।

তখন সন্ধ্যা হয়েছে। পথপার্শ্বে দীপাধারের রশ্মি পণ্যশ্রেণীর আলোকচ্ছটায় সঙ্গে মিশে অঙ্গনকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। জলাধারের পাশে দাঁড়িয়ে বেদেনী মেয়ে টিয়া গান ধরলে :

লাগ, লাগ ভেলকি লাগ!

মন্তরে মোর যাদুকরী পাশাবতী জাগ!

কাঁধের ঝুলি নামিয়ে কেশর শুরু করে দিলে যাদুর খেলা। এক টুকরো হাড়ের স্পর্শে তার হাতে একটা কাঠের গোলক নিমেষে একটি শ্বেত পারাবত হয়ে গেল। একে—একে দুয়ে—দুয়ে কৌতূহলী নাগরিকেরা তাদের ঘিরে জমতে লাগল। বিচিত্র নৃত্যের ভঙ্গিমায় টিয়া গাইতে লাগল :

(মোর) যাদুর গুণে কত কি হয়, জলে পাথর ভাসে,

(আর) মরা শাখে এক পলকে ফুলের জোয়ার আসে,

যাদুতে মোর ধুলোর মুঠি হয় যে রাঙা ফাগ।

লাগ ভেলকি লাগ।।

কেশবের হাড়ের স্পর্শে তখন অঙ্গনে পুঁতে দেওয়া একটা শুষ্ক বীজ থেকে সবুজ একটা পুষ্পতরু গজিয়েছে। তার শাখায় শাখায় গুচ্ছ গুচ্ছ নীলাভ ফুল!

মুগ্ধ জনতার মুখে সহর্ষ প্রশংসাধ্বনি শোনা গেল। বেদে—বেদেনীর পায়ের কাছে বৃষ্টিধারার মতো পড়তে লাগল তাম্রমুদ্রা।

তথাগতের মন্দিরে প্রদীপ দিয়ে ফিরছিল উল্কা। অঙ্গনে জনতার সমাবেশ দেখে কৌতূহলী হয়ে সেও জনতার সঙ্গে মিশে ভোজবাজির খেলা দেখতে লাগল।

একজন নাগরিককে টিয়া বললে,—হ্যাঁ গা, রাজবাড়িটা কোন দিকে? এ—দেশের রাজকুমারীর কাছে আমাদের নিয়ে যেতে পার? বড় সাধ তাঁকে খেলা দেখাই।

কেশর বললে, আর কিছু উপার্জনও হয়।

উল্কা এগিয়ে গিয়ে বললে, এসো আমার সঙ্গে। আমি রাজবাড়িতে নিয়ে যাব।

টিয়া ও কেশরের চোখে চোখে কি যেন কথা হল। তারপরে তাম্রমুদ্রাগুলি কুড়িয়ে নিয়ে দুজনে উল্কাকে অনুসরণ করলে।

রাজ—অন্তঃপুরের পাষাণ—চত্বরে চলেছে বাজিকরের খেলা। দাসদাসী প্রতিহারিণীর মাঝে রাজকুমারী স্বাতী নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৃষ্টি খেলার দিকে বটে, কিন্তু মন যেন বহুদূরে। মুখখানি জুড়ে সকরুণ বিষাদ। এ যেন বনকুরঙ্গীর মতো সেই প্রাণচঞ্চলা স্বাতী নয়, কোনও শিল্পীর হাতে গড়া একখানি মৌন মর্মর প্রতিমা।

উল্কা বললে, কেমন যাদুকর তোমরা? আমাদের এই রাজকুমারীর মুখে একটু কথা, একটু হাসি ফোটাতে পার? তবেই বুঝব তোমরা সত্যিই ভেলকি জানো।

হেসে টিয়া বললে পারি, বইকি।

লাগ, লাগ ভেলকি লাগ!

(আমার) পরশমণির পরশ লেগে বোবার ফোটে বুলি,

বুকে যে তার ডেকে ওঠে পাপিয়া বুলবুলি।

ভ্রূ—ভঙ্গি করে উল্কা বললে,—বটে!

ওদিকে কেশরের হাতে একটা শূন্য ধাতুপাত্র থেকে কখনও স্বচ্ছ জলধারা, কখনও শুভ্র দুগ্ধধারা অনর্গল ঝরতে লাগল। স্বাতীর অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে কৌতূহলের দীপ্তি ফুটল।

রঙিন ঘাঘরা আর সর্পিল বেণী দুলিয়ে টিয়া গাইল :

আমার কাছে পরশমণি কি আছে এমন,

কানে কানে বলি তোদের চুপি চুপি শোন—

(সে যে) একটুখানি ভালোবাসা, একটু অনুরাগ।

লাগ ভেলকি লাগ!

ঝুলির ভেতর থেকে কেশর একটা অর্ধদগ্ধ মশাল বের করে তাতে অগ্নি সংযোগ করলে। তারপর সেই হাড়ের টুকরোটা অগ্নিশিখার চারপাশে একবার ঘোরাতেই মশাল থেকে অজস্র রক্ত নীল শ্বেত পীত তারা আতস—বাজির মতো ঝরে পড়তে লাগল।

সকলে চমৎকৃত হয়ে হর্ষধ্বনি করে উঠল। আর মুগ্ধ বিস্ময়ের হাসিতে স্বাতীর মুখ হয়ে উঠল উজ্জ্বল।

উল্কাকে টিয়া বললে, ওই দেখুন রাজকুমারীর মুখে আমাদের যাদুর নমুনা।

কেশর বললে, এবারে পুরস্কার দিতে আজ্ঞা হোক!

আপন মণিবন্ধ থেকে একখানি মণিময় কঙ্কণ খুলে স্বাতী বললে, নাও।

অঞ্জলি পেতে এগিয়ে গেল টিয়া। তারপর বললে, আমি ভালো হাত গুনতেও জানি। অনুমতি হয় তো রাজকুমারীর হাতখানি দেখি।

উৎসুক হয়ে স্বাতী বাম করপল্লব এগিয়ে দিল।

মাথা নেড়ে টিয়া বললে, এখানে নয়, কক্ষে চলুন। নিরালায় হাত দেখব।

বেদেনী টিয়াকে নিয়ে স্বাতী কক্ষমধ্যে গেল। প্রিয়সখী উল্কা ছাড়া আর কেউ রইল না।

বাম হাতখানি পুনরায় এগিয়ে দিয়ে স্বাতী বললে, এবার বলো।

টিয়া একবার সতর্ক দৃষ্টিতে দ্বারের দিকে তাকাল। তারপর রাজকুমারীর আরও নিকটবর্তী হয়ে চাপা কণ্ঠে বললে, সে আসবে রাজকুমারী—আজই রাত্রির মধ্যযামে আসবে। তুমি প্রস্তুত থেকো।

কে আসবে?

সেনাপতি ধীমান।

কিছুক্ষণ পরে। টিয়া আর কেশরকে সঙ্গে নিয়ে উল্কা উপস্থিত হল অশনির সামনে। বললে, নগরকোটালের কাছে রাজকুমারীর একটা অনুরোধ আছে।

বলো।

এই বিদেশি বাজিকর দুটিকে আজ রাত্রের মতো বিশ্রাম—ভবনে থাকতে দেওয়া হোক।

স্বভাব রুক্ষ স্বরে অশনি উত্তর করলে, রাজকুমারীর বোধ করি জানা নেই যে, অচেনা বিদেশিকে রাত্রে আশ্রয় দেওয়া নিষেধ!

জানা আছে। তবু সদাশয় নগরকোটালের কাছে এটা রাজকুমারীর বিশেষ অনুরোধ।

রাজকুমারীর বিশেষ অনুরোধ? মনে—মনে পুলকিত হয়ে অশনি তার গুম্ফের সূক্ষ্ম অগ্রভাগ আঙুল দিয়ে সূক্ষ্মতর করতে লাগল। কর্কশ কণ্ঠ যথাসম্ভব কোমল করে বললে, আচ্ছা, তাই হবে। কিন্তু কাল প্রভাতেই তোরা চলে যাস, বুঝলি?

টিয়া ও কেশরের চোখে চোখে আর একবার কথা হল। তারপর দুজনেই জোড় হাতে বললে, যে আজ্ঞা।

অমাবস্যা তিথি। বিশাল শকুন—পাখার মতো অন্ধকার নেমেছে কুশলনগরের ওপর। সমগ্র নগরী গাঢ় নিদ্রায় মগ্ন।

বিশ্রাম—ভবন থেকে অতি সন্তর্পণে বেরিয়ে এল দুটি প্রাণী। টিয়া আর কেশর। পথের দীপাধারগুলি অধিকাংশই নির্বাপিত। মার্জারের মতো নিঃশব্দ পদে দুজনে এগোতে লাগল।

নগরতোরণের ঘন্টায় রজনীর দ্বিতীয় যাম ঘোষণা করে অবরুদ্ধ তোরণের সামনে রক্ষী পদচারণা করছিল। সহসা থেমে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে হাঁক দিল, —কে ওখানে?

আমি বেদেনী টিয়া।

অন্ধকারের ভেতর থেকে টিয়ার তন্বীমূর্তি এগিয়ে এল। সন্দিগ্ধ স্বরে রক্ষী বললে, এতরাত্রে বাইরে কেন?

ঘুম আসছে না, তাই তোমার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম। এত দেশ ঘুরেছি, তোমার মতন এমন সুপুরুষ চোখে পড়েনি।

স্থূলকায় রক্ষী তার বর্তুলাকার উদরে হাত রেখে বললে, এত রাত্রে পরিহাস করতে এলে নাকি বেদেনী?

একেবারে রক্ষীর দেহলগ্না হয়ে আবেশে গদগদ কণ্ঠে টিয়া বলে উঠল, আমার যাদুবিদ্যার শপথ—পরিহাস নয়, এ আমার মনের কথা।

রক্ষীর জীবনে নারীদেহের সান্নিধ্য বড়—একটা মেলে না। উদ্ভিন্ন যৌবনা কিশোরী টিয়ার দেহের সংস্পর্শে উপবাসীযৌবন তোরণরক্ষীর বুকের রক্ত উত্তাল হয়ে উঠল। বিগলিত চিত্তে বোধ করি একটা প্রণয়—সম্ভাষণ সে করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার পূর্বেই টিয়ার একখানা হাত তীব্র আরকে সিক্ত একখণ্ড রেশমবস্ত্র তার নাকে সজোরে চেপে ধরলে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই রক্ষীর সংজ্ঞাহীন দেহ ভূমিতলে লুটিয়ে পড়ল। আর, সঙ্গে—সঙ্গে যেন অন্ধকার গর্ভে পর্দা ভেদ করে উপস্থিত হল কেশর। নিজের অঙ্গাবরণীর মধ্য থেকে একখানা ছুরিকা বের করে সে এগিয়ে গেল তোরণদ্বারের দিকে। বৃহৎ দুটি অর্গল কপিকলের সাহায্যে আড়াআড়ি ভাবে বিশাল দুটি কপাটের গায়ে সংলগ্ন। কেশর তীক্ষ্নধার ছুরিকা দিয়ে কপিকলের মোটা রজ্জু কেটে দিল। ঘরঘর শব্দে ধীরে—ধীরে নেমে গেল বিরাট অর্গল দুটি।

দ্বারপাশে অন্ধকারে কিছুক্ষণ আত্মগোপন করে রইল টিয়া আর কেশর। না, অর্গলের শব্দে কেউ জাগেনি। তারপর দুজনে প্রাণপণ শক্তি প্রয়োগ করে ধীরে—ধীরে নিঃশব্দে খুলে দিলে কুশলনগরের সেই বিশাল তোরণদ্বার।

কেশর চকমকি ঠুকে একটা মশাল জ্বেলে কয়েকবার শূন্যে আন্দোলিত করল। পর মুহূর্তেই শাল—মহুয়ার জঙ্গলের দিক থেকে অশ্বখুরধ্বনি শোনা গেল। দ্বাদশটি অশ্বারোহী তোরণের সামনে কালো ছায়ার মতো এসে থামল। তারপর অশ্বপৃষ্ঠ থেকে বিদ্যুৎগতিতে নেমে একে একে নগর মধ্যে প্রবেশ করল।

অস্ফুটে হর্ষধ্বনি করে উটল টিয়া আর কেশর। অন্ধকারেও তাদের চিনতে কষ্ট হয়নি, দ্বাদশ অশ্বারোহীর পুরোভাগে দীর্ঘদেহ অসিধারী ব্যক্তিটি স্বয়ং ধীমান!

অন্ধকার গর্ভ থেকে যেন একটা প্রেত—কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে :

ওঁ নীলোৎপলোদলোশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা

খট্টাঙ্গৎ চন্দ্রহারঞ্চ বিভ্রান্তি দক্ষিণে করে।।

মন্ত্রোচ্চচার করছেন বন্দী দর্ভপাণি।

আলোর জগৎ থেকে নির্বাসিত হয়ে যেদিন তিনি এই অন্ধকারায় বন্দী হয়েছেন, সেদিন থেকে চিররাত্রির অন্ধকার তাঁর সঙ্গী। দর্ভপাণির চোখে নিদ্রা আসে না। কখনও হাত—পায়ের শৃঙ্খল বাজিয়ে কারাকক্ষে পদচারণা করে বেড়ান, কখনও বা পাষাণ—কক্ষতলে বসে আপন মনে পূজার মন্ত্রোচ্চচারণ করেন।

শৃঙ্খলিত অবসন্ন পায়ের একটানা ঝণৎকার তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু ভাঙা কর্কশ কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চচার পাষাণ—গর্ভের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিহত হয়ে কেমন একটা অস্বস্তিকর অমানুষিক রূপ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। শুনলে ভয়ও হয়, বিরক্তিও ধরে।

লৌহকপাটের বাইরে থেকে প্রহরারত সান্ত্রি রূঢ় কণ্ঠে ধমক দিয়ে উঠল, এই, চুপ করো!

উত্তরে সেই ভাঙা কর্কশ কণ্ঠে অট্টহাসি ভেসে এল, হা—হা—হা—হা—হা—হা!

ঠিক সেই সময়ে দেখা গেল, কিছুদূরে পাষাণ—প্রাচীর বেয়ে একটা ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে কারাগারের ছাদে উঠছে।

সান্ত্রির লক্ষ সেদিকে পড়ল না। বিরক্ত হয়ে লৌহকপাটের সামনে আবার সে পদচারণা শুরু করলে। ছাদের আলিসার ওপর দিয়ে সেই ছায়ামূর্তি তখন শিকারি মার্জারের মতো গুঁড়ি মেরে অগ্রসর হচ্ছে। হঠাৎ অসাবধানে ছায়ামূর্তির কটিলগ্ন অসি—কোষে একটু শব্দ হল—ঝন।

চকিত হয়ে উঠল সতর্ক সান্ত্রি। কিসের আওয়াজ? তাকাল দক্ষিণে—বামে। লৌহকপাটের পাশে পাষাণ—প্রাচীর সংলগ্ন একটা আংটায় একটা মশাল জ্বলছিল, তারই আলোয় যতদূর দেখা যায়, কেউ কোথাও নেই। তবু সে স্কন্ধে ঝোলানো শিঙাটায় হাত দিল। সময় থাকতে সঙ্কেতধ্বনি করা ভালো। কে জানে যদি অলক্ষ—শত্রু হয়।

শিঙাটা মুখে তুলল সান্ত্রি কিন্তু ফুঁ দেওয়ার আগেই অন্ধকারার গর্ভ থেকে আবার ভেসে এল সেই প্রেত—কণ্ঠস্বর :

কৃষোদরী দীর্ঘ দংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা।

লোলজিহ্বা নিম্নরক্তনয়নারাব ভীষণা।।

শিঙাটা খসে পড়ল সান্ত্রির হাত থেকে। লৌহকপাটের সামনে দাঁড়িয়ে তিক্ত বিরক্ত স্বরে ধমক দিয়ে উঠল, চুপ করো বলছি—নৈলে টুঁটি টিপে ধরব!

সহসা ছাদের আলিসা থেকে শিকারলোলুপ কালো নেকড়ের মতো সেই কালো ছায়ামূর্তি এসে নিমেষের মধ্যে কঠিন রজ্জুপাশে বেঁধে ফেলল তার হাত—পা। হতভাগ্য আর্তনাদ করার অবকাশও পেল না।

ক্ষিপ্রহাতে প্রথম ছায়ামূর্তি অচেতন সান্ত্রির কোমরবন্ধনী থেকে বৃহৎ একটি চাবি বের করে নিলে। তারপর প্রাচীর সংলগ্ন আংটা থেকে মশালটা তুলে নিয়ে লৌহকপাটের দিকে অগ্রসর হল।

অন্ধকারায় বসে দর্ভপাণি একমনে ধ্যান করছেন,

ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী—

সহসা একটা আলোর তির এসে অন্ধকারে অভ্যস্ত তাঁর চোখে বিদ্ধ হল। চিররাত্রির কারাগারে বন্দী দর্ভপাণি আলোয় অন্ধ হয়ে গেলেন।

শুধু আলো নয়, কার যেন পদশব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। যে সান্ত্রি প্রতিদিন খাদ্য দিয়ে যায়, এ তো তার পদশব্দ নয়! তবে কে আসে এই অন্ধকারায়?

পদশব্দ আরও কাছে এগিয়ে আসছে। উজ্জ্বল অলোয় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে কারাকক্ষের অন্ধকার।

কতক বিস্ময়, কতক বিহ্বলতায় দর্ভপাণি প্রশ্ন করলেন, কে? কে আসে?

আগন্তুক তাঁর পদস্পর্শ করে বললে, আমি ধীমান পিতা।

ধীমান!

আবেগে, উত্তেজনায় শৃঙ্খলিত দর্ভপাণি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ধীমানকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন, আমি জানতাম—আমি জানতাম পুত্র, তুমি একদিন আসবে। মহাদেবীর পূজা আমার বিফল হবে না।

ধীমান ভিষগাচার্যের শৃঙ্খলমোচন করলে। তারপর তাঁর হাত ধরে ধীরে—ধীরে নিয়ে এল লৌহকপাটের বাইরে। রাত্রির শীতল বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন দর্ভপাণি। মুক্তির নিশ্বাস।

ধীমান বললে, আদেশ করুন পিতা, মহারাজ চন্দ্রপালের সমুচিত শাস্তি—

দর্ভপাণি বললেন, আবশ্যক নেই। কৃতঘ্ন চন্দ্রপালের শাস্তিবিধান করবেন মহাদেবী স্বয়ং। তুমি শুধু রাজকুমারী স্বাতীর সংবাদ নিয়ে এসো।

ধীমান এক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর বললে, যদি সে স্বেচ্ছায় কাঞ্চনপুর যেতে চায়?

তার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে! কাঞ্চনপুরে গিয়ে আমি তোমাদের বিবাহ দেব।

অনুচরদের প্রহরায় দর্ভপাণিকে রেখে ধীমান একাকী অন্ধকারে মিশে গেল।

নটীর নূপুর শেষ ঝঙ্কার দিয়ে থামল।

কিন্তু নগরকোটাল অশনির সেদিকে আজ মন নেই। নগর পরিক্রমা সাঙ্গ করে প্রতি রাত্রে সে আপন বিলাসকক্ষে এসে বসে। নটী আসে, ভৃঙ্গার পূর্ণ করে দেয়, মৃদঙ্গের তালে তালে নৃত্য করে। লজ্জাকে লজ্জা দিয়ে নৃত্যের ছলে দেহ আমন্ত্রণ জানায় দেহকে। রাত্রির শেষ যাম কামুক অশনির বর্বর ভোগবিলাসের কুলষে নিত্য কালো হয়ে ওঠে। কিন্তু তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। নৃত্য গীত, ভৃঙ্গারের সুরা, পণ্যা নারীর অভ্যস্ত প্রণয়—ইঙ্গিত—কিছুই তাকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। আধো—নিঃশেষিত ভৃঙ্গার হাতে অশনি আজ অন্যমনা।

'রাজকুমারীর বিশেষ অনুরোধ।'

উল্কার এই কথাটাই বারবার গুঞ্জরিত হচ্ছে তার চিত্তে। অশনির কাছে দর্পিতা স্বাতী আদেশ নয়, বিশেষ অনুরোধ পাঠাল কেন? তবে কী ধীমানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর স্বাতীর মনের পরিবর্তন ঘটেছে? হবেও বা। নারীর যৌবন কতদিন একা থাকতে পারে? আর, শৌর্যে বীর্যে রূপে অশনিও তো ধীমানের চেয়ে হীন নয়।

অশনির মদিরা—বিহ্বল চোখে স্বাতীর রূপ ফুটে উঠল। মধুর মদিরা—ভরা এই ভৃঙ্গারের মতোই অপরূপ যৌবনবতী স্বাতী! তারই সঙ্গে মিশে আছে কুশলনগরের রাজমুকুটের স্বপ্ন। অশনির কত দিনের কামনার বস্তু!

রাজকুমারীর মন আর একবার পরীক্ষা করে দেখলে হয়। চন্দ্রলগ্নে জন্ম অশনির, বহু কঠিন চিত্ত নারী স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছে তার কাছে। লোকে বলে, নারীচিত্তের জগতে সে দিগ্বিজয়ী। আর স্বাতী তো বালিকা মাত্র।

অশনির ওষ্ঠপ্রান্তে আত্মপ্রসাদের মৃদু হাস্যরেখা ফুটে উঠল। হ্যাঁ, আজই সে রাজকুমারীর মন পরীক্ষা করে দেখবে। এই গভীর নিশীথে অন্তঃপুরে স্বাতী এখন একা—সুরঙ্গমাও আর নেই—এই তো সুযোগ।

ভৃঙ্গার শূন্য করে ঈষৎ স্খলিত পদে অশনি বিলাস—কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

* * *

আবার সেই ডাক!

'রাজকুমারী স্বাতী! রাজকুমারী স্বাতী! তুমি কোথায়? কোন জন্মের পারে? আমি ধীমান, কত যুগ ধরে তোমার অপেক্ষায় রয়েছি। তুমি এসো—এসো তুমি।'

বিছানার ওপর উঠে বসল ইরা। শুধু কান দিয়ে নয়, সমগ্র সত্তা দিয়ে সে শুনতে লাগল সেই অশরীরী ডাক। ধীমান ডাকছে।

টেবিলের ওপর সেই আশ্চর্য ধূপদানি থেকে তখন সুগন্ধী ধোঁয়ার অসংখ্য শ্বেতকুণ্ডলী উঠছে। অন্ধকারে যেন অসংখ্য শ্বেতবরণ নাগশিশু ভেসে বেড়াচ্ছে। ইরা তার সমস্ত চেতনা দিয়ে শুনছে সেই অপার্থিব ডাক। কত যুগ, কত জন্মের পারে ইতিহাসের ভগ্নস্তূপের গর্ভ থেকে ধীমান ডাকছে, 'রাজকুমারী স্বাতী, আর কতকাল তোমার অপেক্ষায় থাকব? আরও কত জন্ম যাবে তোমার দেখা পেতে? এসো স্বাতী, এসো তুমি। আমি ধীমান—তোমারি ধীমান, আজও তোমারি অপেক্ষায় দিন গুনছি।'

চঞ্চল হয়ে উঠল ইরা। দ্রুত হল তার রক্তস্রোত। ধীমান ডাকছে, সে যাবে। তাকে যেতেই হবে যেখানে ধীমান অনন্তকালের প্রতীক্ষা নিয়ে শুয়ে আছে।

ক্ষণকালের জন্যে ইরার মনে পড়ে গেল, বাবাকে সে কথা দিয়েছে, ভূগর্ভের সেই পাষাণ—চত্বরে আর যাবে না। কিন্তু কেন যাবে না সে? কিসের মানা যেতে? সে তো ইরা নয়, সে যে রাজকুমারী স্বাতী! তার জন্মান্তরের দ্বৈত তাকে ডাকছে, আর সে যাবে না?

বিছানা থেকে ধীরে ধীরে নামল ইরা। টেবিল থেকে তুলে নিল সেই আশ্চর্য ধূপদানি। তারপর মন্ত্রচালিতের মতো এক—পা এক—পা করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

আজ কিন্তু ইরা দরজা খুলতে পারল না। শক্ত দুটো কড়ায় জয়া কখন একটা তালা লাগিয়ে দিয়েছে, শোবার আগে সে লক্ষ করেনি।

তালাটা ধরে টানতেই জয়ার সজাগ ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে সে টেবল ল্যাম্পটাকে জ্বেলে দিতেই ভয়ে বিস্ময়ে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, একি ইরা।

ইরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে।

জয়া দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে বললে, এত রাতে উঠেছিস কেন? বল কোথায় যাচ্ছিস?

ইরা নিরুত্তর।

জয়া তার কাঁধ ধরে নাড়া দিয়ে বললে, চুপ করে আছিস যে? হাতে ধূপদানিটা নিয়েছিস কেন? আবার ওই সর্বনেশে জায়গায় যাচ্ছিলি?

উদভ্রান্তের মতো ইরা বললে, শুনতে পাচ্ছ না, ধীমান ডাকছে— আমি যাব—

সন্ত্রস্ত স্বরে জয়া বললে, পাগলামি করিসনে—কে ধীমান? কেউ ডাকেনি!

ইরার মুখ দিয়ে শুধু বেরোল,—দোর খোলো—আমি যাব।

না, তুই যেতে পাবিনে।

ইরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, দোর খোলো বলছি—

না।

ধীমান যে ডাকছে।

জয়ার মুখ দিয়ে ভীত আর্তনাদ বেরোল, ইরা!

ইরা হঠাৎ দরজার তালাটাকে ধরে পাগলের মতো নাড়া দিতে দিতে চিৎকার করে উঠল, আমি যাব—আমি যাব—ধীমান ডাকছে—আমি যাব—

আর জয়া—ভয়ে বিহ্বল জয়া কি করবে ভেবে না পেয়ে নিশুতি রাতের স্তব্ধতাকে খান খান করে আরও জোরে চীৎকার দিয়ে উঠল, প্রিয়তোষ! প্রিয়তোষ! মেসোমশাই!

প্রিয়তোষ ছুটে এল পাশের ঘর থেকে, লাইব্রেরি থেকে এলেন অধ্যাপক প্রতাপ। জয়া দরজা খুলতেই ঝড়ের মতো ইরা বেরোতে যাচ্ছিল, সামনে প্রিয়তোষকে দেখে থমকে থেমে গেল মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তারপর দু'হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে বুকে মুখ রেখে মুগ্ধ আবেশে বলতে লাগল, ধীমান! তুমি এসেছ! চিনতে পারছ আমাকে? আমি স্বাতী—তোমারি স্বাতী!

বিবর্ণ মুখে অধ্যাপক প্রতাপ বলে উঠলেন, এ তুই কী বলছিস ইরা? কী হয়েছে তোর?

ইরার মাথায় গভীর স্নেহে হাত বুলোতে—বুলোতে প্রিয়তোষ বলতে লাগল, —ইরা আমি প্রিয়তোষ। ভালো করে চেয়ে দ্যাখো, আমি প্রিয়তোষ।

ধীরে—ধীরে মুখ তুলে ইরা কিছুক্ষণ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল প্রিয়তোষের দিকে। যেন সদ্য ঘুম থেকে জেগে উঠল। আস্তে আস্তে বললে, প্রিয়তোষ!

হ্যাঁ, ইরা। তুমি নিশ্চয় স্বপ্ন দেখেছিলে।

স্বপ্ন!

মৃদু হেসে প্রিয়তোষ বললে, স্বপ্ন বইকি। সারাদিন ধরে প্রত্নতত্ত্বের কথাই ভেবেছ নিশ্চয়, ঘুমের মধ্যে তাই তারই ভূত এসে তোমায় ধরেছিল। যাও, শুয়ে পড়ো গে।

কোনও কথাই আর বললে না ইরা। অত্যন্ত ক্লান্তিবোধ হচ্ছিল তার। নীরবে নিজের বিছানার দিকে এগোল। ধূপদানিটা তার হাতে থেকে জয়া নিতে যেতেই ইরা প্রবল আপত্তির সঙ্গে সেটা সরিয়ে নিলে।

প্রিয়তোষ বললে, থাক জয়া, ওটা ওর সখের জিনিস।

জয়া বললে, ওই ধূপদানিটা কিন্তু ভারি অদ্ভুত।

কী রকম?

সেদিন রাতে যখন ইরা বেরিয়েছিল, তখনও ওটা ওর হাতে ছিল, আজও আছে। ওই ধূপদানিটা গুন—তুক কর কিনা কে জানে!

প্রিয়তোষ এবার গলা ছেড়ে হেসে উঠল। বললে, হায় বিংশ শতাব্দীর আধুনিকা, পাড়াগেঁয়ে ঠাকুমাদের মতো তুমিও অবশেষে গুন—তুকে বিশ্বাস করতে শুরু করলে!

অধ্যাপক প্রতাপ কিন্তু জয়ার কথাটা উড়িয়ে দিতে পারলেন না। তাঁর মনের মধ্যে একটা অত্যাসন্ন বিপদের আশঙ্কা মেঘের মতোই ঘনিয়ে উঠতে লাগল। লাইব্রেরি—ঘরে ফিরে যেতে যেতে জয়াকে বললেন, ওসব কথা থাক মা।

প্রিয়তোষ বললে—ইরাকে একটু কফি করে দাও জয়া, বড্ড ক্লান্ত মনে হচ্ছে ওকে।

ইরার ঘরের মধ্যে গেল প্রিয়তোষ।

চোখ বুজে শুয়ে আছে ইরা। ঘুমোয়নি। প্রিয়তোষ টেবল ল্যাম্পের শিখাটাকে কমিয়ে দিয়ে তার পাশে বসতেই উঠে বসল। তারপর দু'হাত দিয়ে প্রিয়তোষকে বেষ্টন করে তার বুকে মুখ রেখে হু—হু করে কেঁদে উঠল।

ব্যস্ত হয়ে প্রিয়তোষ বলে উঠল, কী হল ইরা? কী হল আবার?

নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ইরা বললে, আমাকে তুমি কখনও ছেড়ে যেও না প্রিয়তোষ—বলো যাবে না?

একথা কেন ইরা?

তুমি কাছে না থাকলে আমি যেন কেমন হয়ে যাই আজকাল। খালি মনে হয়, তুমি যেন কত দূরে গেছ—আর বুঝি আসবে না—আর বুঝি আসবে না—

ইরার কান্না—ভাঙা গলা কেঁপে—কেঁপে উঠল।

কেন এমন মনে হয় ইরা?

আস্তে আস্তে মুখ তুলে ইরা বললে,—জানি না, কেন এমন মনে হয়। বলো, আমাকে ছেড়ে যাবে না?

ইরার মুখখানি দু'হাতে ধরে প্রিয়তোষ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেডে—ঢাকা ল্যাম্পের ফিকে নীল আলোয় খুঁটিয়ে—খুঁটিয়ে দেখল, না, কোনও স্বপ্নের ঘোর, সম্মোহনের কোনও ছায়া নেই ইরার স্বচ্ছ টলটলে দুই চোখে। সেখানে রয়েছে শুধু গভীর অনুরাগ, ব্যাকুল নির্ভরতা, আর সাগ্রহ আত্মসমর্পণ। প্রিয়তোষ বয়সে তরুণ। হয়তো তার নিজেরই মনের এই তিনটি ভাব ইরার চোখের আয়নায় প্রতিফলিত দেখতে পেল। ভালোবাসা নিজেকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না।

দু'হাতে ইরার মুখখানি ধরে প্রিয়তোষ তার কানে—কানে বলে উঠল:

তুই তো আমার বন্দী অভাগী, বাঁধিয়াছি কারাগারে,

প্রাণের বাঁধন দিয়েছি প্রাণেতে, দেখি কে খুলিতে পারে।

ঘুমও নয়, জাগরণও নয়, দুইয়ের মাঝামাঝি একটা বিচিত্র অবস্থা। তারই মাঝে ইরার চেতনা সেই মিশ্র সৌরভে আবিষ্ট হয়ে পড়ল। ফুলের নয়, চন্দনের নয়, মৃগনাভিরও নয়, অথচ কেমন একটা মিশ্র অপার্থিব সুগন্ধ। সেই সুগন্ধের প্রভাবে আস্তে—আস্তে তার অবচেতনার দ্বার যেন খুলে গেল। বহুদূরসন্ধানী আলোর রশ্মির মতো একটা আশ্চর্য দৃষ্টি এল তার আধো—নিমীলিত দুই চোখে। বিছানায় শুয়ে ইরা দেখতে পেল, ধূপদানির অজস্র সাদা সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলিতে ঘরের অন্ধকার ভরে গেছে। আর দেখতে—দেখতে সেই ধোঁয়ার অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে যেন জন্মান্তরের যবনিকা উঠে গেল। বিস্মৃতির অন্ধকারে ঢাকা তারই আরেক জীবনের একটি দৃশ্য আস্তে আস্তে ফুটে উঠল ইরার চোখের সামনে :

কুশলনগরের রাজ অন্তঃপুর যেন রূপার কাঠির স্পর্শে নিশ্চেতন। দাসীরা সুপ্তিমগ্ন, প্রতিহারিণী তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। শুধু নিদ্রাহীন একজোড়া শুকসারী সোনার পিঞ্জরে মাঝে মাঝে পাখা ঝাপটাচ্ছে। দালানের সারি—সারি স্তম্ভের গায়ে দীপাধারগুলি আলোকহীন। অন্ধকারে খিলানের পর খিলান পার হয়ে একটি ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে। দালানের শেষপ্রান্তে সোপানশ্রেণীর মুখে একটি মাত্র দীপাধারে তখনও স্তিমিত আলোক জ্বলছে। তারই রক্তিম আভায় ছায়ামূর্তির হাতের মুক্ত বাঁকা অসি ঝলসিত হয়ে উঠল অগ্নিনাগের লেলিহ জিহ্বার মতো।

একবার এদিক—ওদিক তাকিয়ে ছায়ামূর্তি সোপান বেয়ে উঠে গেল।

সোপান অতিক্রম করে সে এসে দাঁড়াল এক নির্জন চত্বরে। চত্বরের মধ্যস্থলে শ্বেতপাথরের অনন্তনাগের ফণার মণির মতো একটি প্রকাণ্ড ঘৃতদীপের শিখা অতি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। অগ্রসর হতে গিয়ে ছায়ামূর্তি সহসা থেমে গেল। চত্বরের ওপাশে কে যেন চকিতে সরে গেল না? ছায়ামূর্তির সতর্ক চোখের সন্ধানী দৃষ্টি চত্বরের চারিদিকে ঘুরে এল। না, কেউ না। ও বোধ হয় দৃষ্টিবিভ্রম।

দুই পাশের কক্ষগুলি দীপহীন, নিস্তব্ধ। কেবল পূর্বপ্রান্তের একটি কক্ষে ঈষৎ উন্মুক্ত দ্বারের মধ্য দিয়ে একটি আলোকরেখা এসে পড়েছে চত্বরে। সেই আলোকরেখার দিকে তাকিয়ে ছায়ামূর্তির রক্তে দোলা লাগল।

স্বাতী জেগে আছে! প্রহর গুনছে তারই প্রতীক্ষায়!

অতন্দ্র রাত্রি যেন স্বাতীর দুই চোখে জেগে আছে।

টিয়া বলে গেছে, ধীমান আসবে। সেই কথাটি স্বাতীর প্রতিটি হৃদস্পন্দনে প্রতিফলিত হচ্ছে। কত শুক্লসন্ধ্যা, কত অমানিশা তার ব্যর্থ প্রতীক্ষায় কেটে গেছে, সে—কথা কে জানে! ধীমানও জানে না। এক—এক পল মনে হয়েছে এক—এক এক—এক যুগ। স্বাতীর জীবনটাই বুঝি এক দীর্ঘ দুঃসহ প্রতীক্ষা।

বাতায়ন—পাশে স্তব্ধ প্রতিমার মতো দাঁড়িয়ে স্বাতী ভাবছে আরেক অমানিশার কথা। যেদিন মৃত্যুর কূল থেকে ফিরে এসে নবজীবনের তোরণদ্বারে দাঁড়িয়ে প্রথম দৃষ্টিপাতেই দেখেছিল তরুণ সুন্দর ধীমানকে। প্রতীক্ষার সূচনা তো সেইদিন থেকেই। স্বাতীর প্রণয়রাগরঞ্জিত হৃদয়পদ্মের গন্ধ নিবেদন কবে গ্রহণ করবে ধীমান, সেই প্রতীক্ষা! তারপর দিনে দিনে দুটি হৃদয় ক্রমশ কাছে এসেছে, পরস্পরকে জেনেছে, চিনেছে। আরও পরে সেই এক শুক্লা রাতে সরোবরের তীরে দাঁড়িয়ে পরস্পরের কাছে ধরা দেওয়া। আত্মদানের সমস্ত ভাষাই সে—রাতে হারিয়ে গিয়েছিল দুজনের অধরসঙ্গমে।

সব মনে পড়ে স্বাতীর। মনে পড়ে, আর পদ্মপলাশ দুই চক্ষু অশ্রুতে ঢেকে যায়। কিছুই ভুলতে পারে না স্বাতী। কেমন করে ভুলবে? আপন দেহের রক্তকে কি ভোলা যায়? স্বাতীর রক্তধারায় যে ধীমান জেগে আছে।

নারীর প্রেম বড় নিরুপায়। সে ভুলতেও পারে না, অথচ মনে পড়লেও কষ্ট। সে পারে শুধু গোপনে সজল প্রতীক্ষায় দিনের পর দিন রাতের পর রাত কাটাতে।

কিন্তু টিয়া বলেছিল, এ দুঃসহ প্রতীক্ষার অবসান হবে। ধীমান আসবে। আজই রাত্রির দ্বিতীয় যামে আসবে। সেই থেকে স্বাতীর সমস্ত চেতনা যেন কান পেতে আছে প্রিয়—পদধ্বনির আশায়। কিন্তু কই, কোথায় ধীমান? এখনো তো এল না? পথ চেয়ে ক্লান্ত হয়ে গেল আঁখিপল্লব, ক্ষীণ হয়ে এল দীপশিখা, মলিন হয়ে এল মালার ফুল, ধীমান তবু এল না।

তবে কি টিয়া মিথ্যা বলে গেছে? স্তোক দিয়ে ভুলিয়ে গেছে স্বাতীকে? না ধীমানই ভুলে গেছে কুশলনগর থেকে যাবার বেলায় তার সেই অঙ্গীকার, 'আমি আবার আসব স্বাতী, তুমি অপেক্ষা কোরো।'

হতাশায় আর অভিমানে স্বাতী দুই হাতে মুখ ঢাকল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কে যেন স্বপ্নে ডেকে উঠল—বড় পরিচিত, বড় মধুর কণ্ঠে ডেকে উঠল, স্বাতী!

চকিতে মুখ ফিরিয়ে তাকাল স্বাতী। দেখলে, মুক্ত দ্বারপথে এসে দাঁড়িয়েছে ধীমান। অঙ্গে কৃষ্ণবর্ণ পরিচ্ছদ, হাতে ঝলসিত বাঁকা অসি। প্রত্যাশিত মিলনের সুখে বিবশ হয়ে এল স্বাতীর সারা দেহ। শরতের আকাশের মতো তার মুখে একই সঙ্গে রৌদ্র—বর্ষার খেলা।

ধীমান আবার ডাকলে, স্বাতী!

বিহ্বলের মতো স্বাতী বলে উঠল, এলে তুমি ধীমান!

কক্ষমধ্যে এসে ধীমান বললে, আর এক মুহূর্তও বিলম্ব নয় রাজকুমারী। তোরণদ্বারে আমার অশ্ব অপেক্ষা করছে। তুমি প্রস্তুত তো?

হ্যাঁ ধীমান।

তবে এসো।

পালঙ্কের ওপর থেকে ঘন নীল বর্ণের একখানি ওড়না টেনে নিয়ে স্বাতী আপন মুখ অবগুণ্ঠিত করে ফেলল। খুলে ফেললে পায়ের নূপুর। তারপর এগিয়ে এসে ধীমানের হাত ধরে নিশ্চিন্তে বললে, চলো।

মৃদু হেসে ধীমান বললে, কোথায় যাচ্ছ জানতে চাইলে না?

স্বাতী তার আয়ত চক্ষু ধীমানের মুখের দিকে তুলে ধরে বললে, তোমার সঙ্গে আমি স্বর্গেও যেতে পারি, পাতালেও নামতে পারি।

মৃদু হেসে ধীমান বললে,—না, অতদূর যেতে হবে না। আমরা যাব চৈতি নদীর ওপারে—

কাঞ্চনপুরে!

হ্যাঁ, স্বাতী। আমাদের মিলনের স্বপ্ন এবার সফল হতে চলেছে। ভিষগাচার্য বলেছেন, কাঞ্চনপুরেই আমাদের বিবাহ...

সহসা তীব্র একটা চিৎকার করেই ত্বরিত গতিতে স্বাতী ধীমানের পিঠ আড়াল করে দাঁড়াল। আর তৎক্ষণাৎ একখানা তীক্ষ্নধার অতি ক্ষুদ্র ছুরিকা এসে বিদ্ধ হল তার বক্ষের বাম পঞ্জরে।

এক লহমার জন্য হতচকিত হয়ে গেল ধীমান। তারপর বিদ্যুৎবেগে দ্বারপানে ফিরে তাকাতেই প্রায়ান্ধকার চত্বরে কার অস্পষ্ট পদধ্বনি দূরে মিলিয়ে গেল।

স্বাতীর দেহ তখন কক্ষতলে লুটিয়ে পড়েছে।

উন্নত্তের মতো চিৎকার করে উঠল ধীমান, কে—কে এ—কাজ করলে?

ঘৃতদীপের ক্ষীণ আলোকেও স্বাতীর চিনতে ভুল হয়নি তাম্রবর্ণ কুটিল একখানি মুখ আর জ্বলন্ত একজোড়া পিঙ্গল চক্ষু। যন্ত্রণা—বিকৃত স্বরে সে উচ্চচারণ করলে, অশনি।

পলকে ধীমানের মূর্তি আহত শ্বাপদের মতো বন্য হিংসায় নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। হাতের বাঁকা অসি বজ্রমুষ্টিতে ধরে সে দ্বার অভিমুখে অগ্রসর হতেই তার কানে এল স্বাতীর কাতরোক্তি, আমার সর্ব অঙ্গ জ্বলে গেল ধীমান!

আর যাওয়া হল না ধীমানের। ভিষগাচার্যের পালিত পুত্র সে, বুঝতে বিলম্ব হল না, অশনির ছুরিকার অগ্রভাগে নিশ্চয় সর্পবিষ মাখানো ছিল। স্বাতীর রক্তে সেই মারাত্মক বিষ মিশেছে।

কী করবে এখন ধীমান? কী কর্তব্য তার? ভিষগাচার্যকে ডেকে আনবে? কিন্তু কী হবে তাঁকে এনে? কোথায় তাঁর ঔষধ পত্রের পেটিকা। অথচ স্বাতীকে বাঁচাতেই হবে। তার প্রাণরক্ষা করা এখনো সম্ভব, যদি তার দেহ থেকে বিষটুকু তুলে নেওয়া যায়।

হাতের অসি ফেলে দিয়ে ধীমান নতজানু হয়ে বসে পড়ল কক্ষতলে লুণ্ঠিতা স্বাতীর পাশে। রেশমি নিচোল ভেদ করে বিষাক্ত ক্ষুদ্র ছুরিকাখানা আমূল বিদ্ধ হয়ে আছে বিষধর সাপের বিষদন্তের মতোই। ক্ষিপ্রহাতে সেখানা উন্মোচিত করতেই অতসী বর্ণের নিচোল রক্তজবার রঙে রঞ্জিত হয়ে গেল। ক্ষণমাত্র বিলম্ব করলে না ধীমান। রেশমি নিচোল দু'হাতে ছিন্ন করে স্বাতীর ক্ষতমুখে মুখ দিয়ে বিষাক্ত রক্ত শোষণ করতে আরম্ভ করলে।

অতীত ভবিষ্যৎ ভুলে গেছে ধীমান। ভুলে গেছে দর্ভপাণি অপেক্ষা করছেন, ভুলে গেছে শত্রুপুরীতে সে একা। যতবার রক্তে ভরে ওঠে ধীমানের মুখ, ততবার সে ফেলে দেয়। ধীমানের মনে হল স্বাতী বুঝি তার রক্তের ঋণ এমনি করেই আজ শোধ দিচ্ছে।

চম্পকবরণী স্বাতীর দেহ অপরাজিততার মত নীল হয়ে আসছে। গাঢ় সুপ্তি নামছে তার নিমীলিতপ্রায় আঁখিপল্লবে। আশ্চর্য, ধীমানের চোখের পাতাও ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে কেন? এক জ্বালাময় যন্ত্রণায় কেন আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে তারও সর্ব অঙ্গ? আর সে পারছে না কেন স্বচ্ছন্দে নিশ্বাস নিতে?

বিদ্যুৎচমকের মতোই ধীমানের মনে পড়ে গেল, পাষাণ—কারার প্রহরীকে অতর্কীতে আক্রমণ করার সময় তার ওষ্ঠাধরে সামান্য রক্তপাত হয়েছে। তবে কি সেই ক্ষতপথে স্বাতীর বিষাক্ত রক্ত তার দেহেও বিষক্রিয়ার সূচনা করেছে!

পরম তৃপ্তির হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ধীমানের মুখ। স্বাতীর দেহ নাড়া দিয়ে সে ডাকতে লাগল, স্বাতী! স্বাতী!

অবসন্ন আঁখিপল্লব প্রাণপণে মেলবার চেষ্টা করে ক্ষীণ সাড়া দিলে স্বাতী।

ধীমানের কণ্ঠ শুষ্ক, জিহ্বা কে যেন কণ্ঠনালীর মধ্যে টেনে নিচ্ছে! তবু সে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে বললে, শুনে যাও স্বাতী, আজ আমাদের বাসর রাত্রি—মৃত্যু—বাসর। আর আমাদের বিচ্ছেদ হবে না।

বাইরের চত্বরে অনন্তনাগের মাথার মণি সহসা অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

ধূপদানির সাদা ধোঁয়ার সর্পিল কুণ্ডলী মিলিয়ে গেল। কালো শ্লেটের ওপর সাদা সাদা খড়ির দাগগুলি কে যেন মুছে দিল নিশ্চিহ্ন করে। ইরার ঘরে স্পষ্ট হয়ে উঠল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারে আধো—জাগ্রত আধো—স্বপ্নাচ্ছন্ন অবস্থায় পাগলের মতো ইরা কেঁদে উঠল, না—না—না, মরব না, জীবনের সাধ যে কিছুই মেটেনি আমার—তোমাকে যে পেয়েও পাওয়া হল না ধীমান।

ধড়মড় করে উঠে পড়ল জয়া। বাতিটা জ্বাললে। ইরার গায়ে হাত দিয়ে ব্যাকুল ভয়ে ডাকতে লাগল, কী হল ইরা, কী হয়েছে?

ইরার কান্না থেমে গেল। শান্ত হয়ে এল তার সমস্ত উচ্ছ্বাস।

চিত্রকরা দুই চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল জয়ার মুখের পানে।

জয়া বললে, কেঁদে উঠলি কেন? আবার স্বপ্ন দেখছিলি বুঝি?

ইরার সর্বাঙ্গ ভরে গাঢ় অবসাদ নেমেছে। ক্লান্ত কণ্ঠে শুধু বললে, হ্যাঁ।

কী স্বপ্ন দেখলি?

আমাকে একজন খুন করেছে।

অবসন্নভাবে ইরা চোর বুজলে।

আর এই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের কথা শুনে জয়ার দেহ বারবার শিউরে উঠতে লাগল। শিয়রে বসে ইরার মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে ভাবলে, মেসোমশাইকে ডেকে দরকার নেই। রাত এখনও বাকি। ইরা একটু ঘুমোক।

প্রাচীন পাণ্ডুলিপির পাতা শেষ হয়ে এসেছে। শেষ হয়ে এসেছে কুশলনগরের অভিশপ্ত ইতিহাস। আর মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা বাকি।

ভীমপাহাড়ের জঙ্গলে ঝাঁ—ঝাঁ করছে রাত।

জুয়েল—ল্যাম্পের শিখাটা আরও একটু বাড়িয়ে দিলেন অধ্যাপক প্রতাপ। চশমার কাচ আরেকবার মুছে, ঝুঁকে পড়লেন জীর্ণ পুঁথির শেষ পাতাগুলির ওপর :

সেই কালরাত্রির শেষভাগে রাজপ্রাসাদে তখন আর এক দৃশ্য।

হূং হূং হ্রীং হ্রং কালিকে ঘোরদ্রংষ্ট্রে

প্রচণ্ডে চণ্ডনায়িকে দানবান দারয়

হন হন শবশরীরে মহাবিঘ্নং ছেদয় ছেদয়

স্বাহা হূং ফড়িতি।।

রাজপুরীর এক নিভৃত পাষাণ—চত্বরে বসে সুগম্ভীর কণ্ঠে বীরার্দন মন্ত্র উচ্চচারণ করছেন দর্ভপাণি। ললাটে রক্তচন্দন, পরনে রক্তাম্বর, রক্তাভ চক্ষুতে অসহ্য দীপ্তি। তাঁর উভয় পাশে ধীমান আর স্বাতীর সদ্যস্নাত নগ্ন শবদেহ কুশশয্যায় শোয়ানো। সমুখে প্রজ্বলিত সমিধ, মাষভক্ত, শ্বেত আকন্দের প্রদীপ, বীরার্চনার আরও নানা উপচার। বিচিত্র একটি ধূপদানি থেকে শ্বেতবর্ণের ধূমকুণ্ডলী সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। সে গন্ধ ফুলের নয়, চন্দনের নয়, মৃগনাভিরও নয়—অথচ সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মিশ্র সুগন্ধ।

কৃষ্ণা চতুর্দশীর রাত্রি যেন পা টিপে—টিপে এসে দাঁড়িয়েছে সেই নিভৃত পাষাণ—চত্বরে। নিশ্বাস রোধ করে দেখছে তান্ত্রিক দর্ভপাণির ক্রিয়াকলাপ। আর দেখছেন চত্বরের দূর অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে মহারাজ চন্দ্রপাল। বজ্রাহত এক বনস্পতি যেন। তাঁর পাশে অশ্রুমুখী উল্কা।

মাঝে মাঝে বহু কণ্ঠের মিলিত কোলাহল বাইরে থেকে অতি ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসছে। সে—কোলাহল সান্ত্রিদলের। মশাল জ্বালিয়ে তারা সমগ্র নগরী তোলপাড় করে পলাতক অশনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেই বিষাক্ত ছুরিকার বিশেষ ধরনের নির্মিত গজদন্তের বাঁট বিশ্বাসঘাতকতা করেছে অশনির সঙ্গে। মহারাজ চন্দ্রপাল বুঝতে পেরেছেন স্বাতীর হত্যাকারী অশনি ছাড়া আর কেউ নয়।

কিন্তু অশনির ছায়ামাত্রও কোথাও নেই।

দর্ভপাণি প্রথমে ইন্দ্র অগ্নি যম নির্ঋত বরুণ বায়ু কুবের ঈষাণ ব্রহ্মা ও অনন্ত—এই দশ দিকপালের পূজা সমাপন করলেন। পরে যথাবিধি পূজা করলেন চতুঃষষ্টি ডাকিনী ও যোগিনীগণের। তারপর চন্দনের সঙ্গে বিচিত্র একপ্রকার লতার রস আর নানাপ্রকার আয়ুর্বেদীয় দ্রব্য মিশিয়ে দুটি মৃতদেহের সর্বাঙ্গে অনুলেপন শুরু করলেন।

আর, মধ্যে মধ্যে উচ্চচারণ করতে লাগলেন, ওঁ হঁ) মৃতকায় নমঃ ফট।

দেখতে দেখতে নীলবর্ণের দুটি বিষাক্ত মৃতদেহে ধীরে ধীরে পীত আভা ফুটে উঠল। দর্ভপাণি ধীমানের শবের নিম্নাঙ্গে একখানি রেশমবস্ত্র জড়িয়ে দিলেন, স্বাতীর অঙ্গে দিলেন রক্তবর্ণ চেলী আর কাঁচুলী। সীমন্তে দিলেন সিঁথিমৌর, কণ্ঠে রত্নহার, মণিবন্ধে মণিময় কঙ্কণ।

মনে হল, নববধূর সজ্জা পরে লজ্জাস্ফুরিত অধরে স্বাতী যেন হাসছে!

মহারাজ চন্দ্রপাল মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। অসহ্য শোকাবেগে থরথর করে কাঁপতে লাগল তাঁর সারা দেহ। আর উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ল উল্কা।

সিঁদুরের সঙ্গে কী একটা দ্রব্য মিশিয়ে দর্ভপাণি ধীমানের প্রশস্ত বক্ষে একটি রক্ত—খড়গচিহ্ন আঁকলেন, স্বাতীর ললাটেও এঁকে দিলেন অনুরূপ একটি ক্ষুদ্র চিহ্ন। তারপর ধীমানের শবের অঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দিতে—দিতে বলতে লাগলেন :

বীরেশ পরমানন্দ শিবানন্দ কুলেশ্বর।

আনন্দ ভৈরবাকার দেবীপর্যঙ্কশঙ্কর।

বীরোহ হং তাং প্রণম্যামি উত্তিষ্ঠ চণ্ডিকার্চনে।।

দর্ভপাণির কণ্ঠ ভয়ঙ্কর গম্ভীর হয়ে উঠল। শব—অঙ্গে বারবার পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে ভয়াল কণ্ঠে তিনি মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন। ধীরে, অতি ধীরে ধীমানের শব অক্ষিপল্লব মেলে তাকাল। অল্প—অল্প কাঁপতে লাগল তার বিবর্ণ ওষ্ঠাধর।

মহারাজ চন্দ্রপাল যেন পাষাণে পরিণত হলেন। ভয়বিহ্বল উল্কা দু'হাতে চোখ ঢেকে ছুটে পালিয়ে গেল। আর ঘোর তান্ত্রিক বীরাচারী দর্ভপাণির অলৌকিক ক্রিয়া দেখে অন্ধ তামসী রাত্রি যেন আতঙ্কে শিউরে উঠতে লাগল।

মন্ত্রপাঠ থামিয়ে দর্ভপাণি স্বভাব—কঠোর স্বরে আদেশ করলেন, পেটিকা আনো।

মহারাজ চন্দ্রপাল সহসা সম্বিত ফিরে পেলেন। তাঁর মাথার ওপরকার খিলান থেকে একটি রৌপ্যঘণ্ঠা ঝুলছিল। মহারাজ ঘণ্ঠাধ্বনি করতেই আটজন রাজভৃত্য দুটি দারুময় পেটিকা বহন করে এনে চত্বরের দু'পাশে রাখলে।

দর্ভপাণি প্রথমে পেটিকা দুটি শোধন করে নিলেন। তারপর রাজকুমারী স্বাতীর লঘু দেহবল্লরী অবলীলাক্রমে দুই হাতে তুলে একটি পেটিকার মধ্যে শুইয়ে দিলেন। এবার দর্ভপাণি ধীমানের অঙ্গে শেষবার পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে বললেন,

ওঁ বশো মে ভব দেবেশ মম বীরসিদ্ধিং দেহি দেহি

মহাভাগ কৃতাশ্রয়পরায়ণ

ধীমানের শব আবার চক্ষু মেলে চাইল, আবার অল্প—অল্প কাঁপতে লাগল তার ওষ্ঠাধর। দর্ভপাণির রক্তাভ মুখ—চোখ ভয়াল আনন্দে যেন জ্বলতে লাগল। ধীমানের শব জাগ্রত হয়ছে। পূর্ণ হয়েছে দর্ভপাণির অভীষ্ট।

বৃদ্ধ হলেও ভিষগাচার্য দুর্বল ছিলেন না। দুই পেশিবহুল বাহুতে ধীমানের শব তুলে নিয়ে তিনি পরম যত্নে অপর পেটিকায় রাখলেন। তারপর সেই বিচিত্র ধূপদানিটি হাতে দিয়ে ধূপদানিটি হাতে নিয়ে পেটিকার পাশে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, নিদ্রা যাও ধীমান, নিদ্রা যাও। পরজন্মে বা আগামী যে কোনও জন্মে রাজকুমারী স্বাতী এই মায়া—ধূপতী নিয়ে যদি তোমার বক্ষে স্পর্শ করায়, তুমি আবার জাগ্রত হয়ো। স্বাতীর হত্যাকারী পিঙ্গলচক্ষু অশনি পৃথিবীর যেখানেই জন্মান্তর গ্রহণ করুক না কেন, তুমি তাকে ক্ষমা কোরো না, তুমি তার দুষ্কৃতির প্রতিশোধ নিও।

দর্ভপাণির মুখের এই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ—কামনা মনে হল যেন হাহাকার করতে—করতে পাষাণ—চত্বরের ছাদ ফেটে অন্ধকার নৈশ আকাশে মিশে গেল।

দর্ভপাণি সিঁদুর দিয়ে পাষাণ—চত্বরের দেয়ালে লিখলেন :

স্বাতী নিদ্রিতা, ধীমান নিদ্রিত

মহাদেবী চামুণ্ডার প্রসাদে

তারা পুনরায় জাগ্রত হোক,

ওঁ হ্রীং শ্রীং চামুণ্ডায়ৈ নমঃ।।

মহারাজ চন্দ্রপালের দিকে ফিরে তিনি আদেশ করলেন, এই লেখাগুলি যেন পাষাণফলকে উৎকীর্ণ করা হয়। আর, এই পাষাণচত্বরে কোনওদিন কোনও কারণেই যেন মানুষের পদচিহ্ন না পড়ে। বিপদ হতে পারে।

তারপর তান্ত্রিক দর্ভপাণি একে একে পেটিকা দুটির ডালা বন্ধ করলেন।

অধ্যাপক প্রতাপও ধীরে—ধীরে প্রাচীন পুঁথিখানি বন্ধ করলেন। আর পড়ার প্রয়োজন নেই। পাল বংশের অন্যতম নৃপতি চন্দ্রপালের বংশের মর্মান্তিক সমাপ্তি এইখানেই।

অভিশপ্ত সেই কুশলনগরের ওপর থেকে বহু শতাব্দীর বিস্মৃতির যবনিকা আবার উঠেছে এই রাজনগরের মাটির তলায়! কে জানে, আবার কোন মর্মান্তিক জীবননাট্যের খেলা শুরু হবে। ভিষগাচার্য দর্ভপাণির সেই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ কামনার বীজ আজও কি রাজনগরের বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে আছে? রাজকুমারী স্বাতীর অতৃপ্ত আত্মা কি জন্ম—জন্মান্তর পার হয়ে সত্যই আজ ইরার দেহ—মনকে আশ্রয় করেছে? জন্মান্তরবাদ কি তাহলে মিথ্যা নয়? আর ধীমান? জন্মান্তরের জিঘাংসা বুকে নিয়ে তার যে শব পেটিকার মধ্যে শুয়ে রয়েছে, তান্ত্রিক দর্ভপাণির শব—সাধনার প্রভাবে সে যদি সত্যই কোনওদিন জেগে ওঠে! কে জানে, কী মহা অনর্থ হবে সেদিন। অধ্যাপকের ব্যাকুল পিতৃহৃদয় চিন্তায় চিন্তায় যেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। বারবার তাঁর মনে হতে লাগল, কী অশুভ ক্ষণেই তিনি প্রত্নতত্ত্বের কাজে এই রাজনগরের মাটিতে পা দিয়েছিলেন! বিস্মৃতির গর্ভে যা চাপা ছিল এতকাল, কেন তিনি তাকে টেনের বার করলেন? কিন্তু আর এখন উপায় নেই। তাঁর মন বলছে, কুশলনগরের রাজপুরীর ভগ্নাবশেষ আবার মাটি চাপা দিলেও তার অশুভ প্রভাব আর চাপা থাকবে না। কী করবেন তিনি? কী করতে পারেন? রাজনগর থেকে জোর করে সরিয়ে নিতে যেতে গেলে ইরা যদি একটা অনর্থ বাধিয়ে বসে? সে তো প্রকৃতিস্থ নয়।

বাইরে কোথায় যেন একটা বুনো মোরগ ডেকে উঠল। অধ্যাপক জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ভীমপাহাড়ের মাথায় ভোর হচ্ছে। জুয়েল—ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলেন তিনি, চশমাটা খুলে রাখলেন টেবিলের ওপর। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বারান্দা দিয়ে এলেন তিনি ইরার ঘরের পাশে। খোলা জানলা দিয়ে দেখতে পেলেন, ইরা অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আর তারই শিয়রে চুপ করে বসে আছে জয়া। কিছুটা নিশ্চিন্ত হল তাঁর অস্থির মন।

ভীমপাহাড়ের মাথায় তখন সূর্যের প্রথম লাল আভা ঝলমল করছে। সেই দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপকের হাত দুটি বুকের কাছে জোড় হয়ে এল। গভীর আবেগে অস্ফুট স্বরে তিনি উচ্চচারণ করলেন, হে জবাকুসুমসঙ্কাশ, হে তিমির বিদারি জ্যোতির্ময়, সর্ব অকল্যাণের অন্ধকার দূর করে দাও! আমার কন্যাকে সর্ব বিপদ থেকে রক্ষা করো।

* * *

এর পরদিনই ওঁরা এলেন। অবনী দত্ত, দেবপ্রসাদ ঘোষ প্রমুখ ভারতের জনাকয়েক অগ্রগণ্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক। রাজনগরের মাটির নিচে অধ্যাপক প্রতাপের আবিষ্কার দেখে তাঁরা চমৎকৃত হলেন। আর, অবাক হলেন ধীমান ও স্বাতীর সঙ্গে প্রিয়তোষ আর ইরার দেহাবয়ব ও মুখের গঠনের আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখে। রাত্রে ইরার অদ্ভুত আচরণের কথাও শুনলেন সবাই।

রাজনগরের ডাকবাংলোয় ওঁদের থাকার ব্যবস্থা হল। বাংলোর হাতায় বসল পরামর্শ—বৈঠক। অধ্যাপক প্রতাপের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকের দল মত প্রকাশ করলেন, প্রাচীন শবদেহ দুটিকে ভূগর্ভে ফেলে না রেখে কলকাতা বা দিল্লির যাদুঘরে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো। সেখানে আরও যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নইলে, প্রাচীন আয়ুর্বেদ—বিজ্ঞানের এই পরমাশ্চর্য কীর্তির বিষয় গবেষণার সুবিধা হবে না।

প্রস্তাবটা যুক্তির দিক থেকে ঠিকই। কিন্তু যুক্তির ওপরেও আর একটা বস্তু আছে জগতে, সাধারণ জ্ঞান বা বুদ্ধি দিয়ে যার নাগাল পাওয়া যায় না। লোকে যাকে বলে অলৌকিক। প্রতাপবাবু তার পরিচয় পেয়েছেন বলেই পরামর্শ—কমিটির প্রস্তাবটাকে এককথায় মেনে নিতে পারলেন না। ধীমানের শব নিয়ে তান্ত্রিক দর্ভাপাণির শবসাধনার বিবরণ জানিয়ে তিনি বললেন, দর্ভপাণির প্রতিশোধ কামনা ধীমানের শবের মধ্যে হয়তো আজও বেঁচে আছে। তাকে নাড়াচাড়া করতে গেলে কোনও বিপদ ঘটবে কিনা কে বলতে পারে। এক্ষেত্রে মমি দুটিকে মিউজিয়ামে পাঠানো উচিত হবে বলে আমি মনে করি না।

পরামর্শ—কমিটি হেসে উড়িয়ে দিলেন কথাটা। অবনী দত্ত বললেন, প্রত্নতত্ত্ব ছেড়ে অধ্যাপক প্রতাপ যে তন্ত্রের ভক্ত হয়ে পড়েছেন, এ খবরটা আমাদের জানা ছিল না। এরপর হয়তো শুনব, তিনি ভৌতিক কাহিনি লিখতে শুরু করে দিয়েছেন!

ব্যঙ্গটা হজম করে অধ্যাপক প্রতাপ বললেন, কিন্তু মাঝে মাঝে রাত্রে ইরার ব্যাপারটা—

ওটা অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ মনের লক্ষণ। আপনার মেয়ের মানসিক চিকিৎসা দরকার।

অধ্যাপক প্রতাপের আপত্তি টিকল না। পরামর্শ—কমিটি রায় দিলেন দিন সাতেকের মধ্যেই শবদেহ দুটিকে পেটিকা সমেত মিউজিয়ামে পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে এও বলে গেলেন যে, খননকার্য যেন বন্ধ না থাকে, কেননা এতে গভর্নমেন্টের আর্থিক ক্ষতি।

রাত্রের ট্রেনেই অবনী দত্তের দল রাজনগর ছেড়ে গেলেন।

পরামর্শ—কমিটির হুকুম রদ করার উপায় নেই। ঠিকাদারকে ডেকে পাঠালেন প্রতাপবাবু।

সুজনলাল এসে বলেন—আমি নিজেই আসছিলাম আপনার কাছে। কুলিদের একটা আর্জি আছে স্যার।

প্রতাপবাবু বললেন, কী ব্যাপার?

আসছে কাল তাদের পরব। একটা দিনের জন্যে তারা ছুটি চায়।

প্রতাপবাবু দ্বিধায় পড়লেন। বললেন, আমার ওপর অর্ডার হয়েছে মাটি—খোঁড়ার কাজ ফের শুরু করতে, অথচ কুলিরা ছুটি চাইছে।

বিনীত ভঙ্গিতে সুজনলাল বললেন, এটা ওদের ধর্মের ব্যাপার কিনা।

বেশ, ছুটি যখন ওরা চাইছে, দিয়ে দাও। কিন্তু পরশু থেকে কাজ আবার চালু করা চাই। নইলে গভর্নমেন্টের লোকসান।

তেমনি বিনীতভাবে সুজনলাল বললে, কাজ চালু করা মুশকিল হবে স্যার। মাটির নিচেকার ওই চত্বরের আশপাশ খুঁড়তে গেলে কাঠের সিন্দুক দুটোর ক্ষতি হতে পারে।

প্রতাপবাবু বললেন, সেইজন্যেই কমিটির অর্ডার হয়েছে সিন্দুক দুটো কলকাতার মিউজিয়ামে পাঠিয়ে দেওয়ার। দু'তিনদিনের মধ্যেই ব্যবস্থা করতে হবে। বুঝতেই পারছ, এ—বিষয়ে তোমার সাহায্যটা আগে দরকার।

ঠিক আছে স্যার, আমি সব সময় হাজির।

সুজনলালের কটা রঙের চোখ দুটো বাংলোর বারান্দার এদিক—ওদিক ঘুরছিল। শোলাহ্যাটটা কোলের কাছে ধরে একটু ইতস্তত করে সে বললে, কাল সন্ধের পর নদীর ধারে কুলিদের উৎসব হবে। আপনাকে নিমন্ত্রণ করতে ওরা ভরসা পায় না। দেবীজী যদি যান, ওরা ভারি খুশি হবে।

বেশ তো, ইরাকে পাঠিয়ে দেব'খন। প্রতাপবাবু আশ্বাস দিলেন।

অভিবাদন করে সুজনলাল চলে যাচ্ছিল, প্রতাপবাবু হঠাৎ ডাকলেন। বললেন, আজ একটা ব্যাপার ঘটেছে সুজন।

জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল সুজনলাল।

ভোর বেলায় স্টেশনের দিক থেকে আমি যখন বেড়িয়ে ফিরছি, একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একমাথা রুক্ষ চুল, মুখময় একরাশ গোঁফদাড়ি। পরনে ময়লা ছেঁড়া চোস্ত পায়জামা আর কুর্তা। একটা চোখ কানা, আর একটা চোখ যেন তার জ্বলছে। লোকটা হঠাৎ আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলে, 'ঠিকাদার সুজনলাল আপনার কাজ করে? বললাম, হ্যাঁ, কেন? সে বললে, 'তাকে আমার দরকার। কোথায় থাকে সে?' আমার কেমন সন্দেহ হল। বললাম, কী দরকার না বললে, বলব না।' শুনে হা—হা করে হেসে উঠল। তারপর বললে, 'বেশ, না—ই বললেন। দেখা হলে তাকে শুধু বলবেন, লুধিয়ানা থেকে তোমার যম এসেছে।' বলে পাগলের মতো হাসতে—হাসতে চলে গেল।

সুজনলালের মুখখানা যেন দপ করে নিভে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে প্রশ্ন করলে, কোত্থেকে সে এসেছে বললে? লুধিয়ানা থেকে?

হ্যাঁ। লোকটা কে বলোতো?

শুকনো গলায় সুজনলাল বললে,—ও কেউ নয়; একটা পাগল।

আর একবার অভিবাদন করে সুজনলাল একটু দ্রুত চলে গেল।

চৈতি নদীর ধার থেকে বাজনার আওয়াজ আসছে। মাদল নয়, কাড়া—নাকাড়ার মতো আওয়াজ। সে—আওয়াজের অদ্ভুত একটা ছন্দ আছে, আর তারই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে বাঁশির সুর আর আদিবাসীদের দুর্বোধ্য ভাষার গান।

রাজনগরের এই খননকার্যে যেসব কুলিরা কাজ করছে, তাদের অধিকাংশই কোল আর মুণ্ডা। আজ তাদের পরব—'বোঙার' পূজা। চৈতি নদীর ধারে কুলি—ধাওড়ায় তাই উৎসব লেগেছে।

অমাবস্যা পার হয়ে শুক্লপক্ষ পড়েছে। আকাশে সরু একফালি চাঁদের ইসারা। নদীর ধারে খানিকটা খোলা জায়গায় নাচের আসর বসেছে। প্রকাণ্ড একটা ঢাকের চারদিকে গোল হয়ে বসে জনাকয়েক তরুণ ছেলে হাত চাপড়ে ছন্দ তুলছে, আর দুটি ছেলে বাজাচ্ছে বাঁশের বাঁশি। তিন—চারটি পর্দা বারবার ঘুরে ঘুরে সুরের একটা মোহ সৃষ্টি করেছে। আর, তাদেরই ঘিরে একদল তরুণ মেয়ে তালে তালে শরীর দোলাচ্ছে। প্রত্যেকের খোঁপায় রঙিন বুনো ফুল, পরনে রঙিন শাড়ি, আর হাতে একটা করে জ্বলন্ত মশাল। আলো—ছায়ার বিভ্রমের মাঝে কালো কালো সুঠাম দেহগুলি কালিন্দীর ঢেউয়ের মতো একই সঙ্গে উঠছে—নামছে, হেলছে—দুলছে।

বেশ লাগছে দেখতে ইরা আর প্রিয়তোষের। কুলিরা খাতির করে খানিকটা তফাতে দুটো মোড়া পেতে দিয়েছে। তারই ওপরে বসেছে ওরা, প্রিয়তোষের ডান হাতে বন্দুক আর পায়ের কাছে গোটাকয়েক রক্তমাখা বুনো হাঁস।

প্রিয়তোষের দিকে একটু ঝুঁকে ইরা বললে, কী সুন্দর দেখছ?

প্রিয়তোষ ঘাড় নাড়লে।

ইরা আবার বললে, আচ্ছা, কলকাতার নিউ—এম্পায়ারে কত নামকরা আর্টিস্টের নাচ তো দেখেছি, সেগুলো এত ভালো লাগেনি, কেন বলো তো?

প্রিয়তোষ একটু হেসে বললে' কাগজের ফুলে এসেন্স মাখিয়ে দিলে কি বনের ফুল হয়? এরা মাটির ছেলেমেয়ে। এরা নাচে প্রাণের আনন্দে, আর তারা নাচে হয় পেশার তাগিদে, নয় সুনামের লোভে।

কথাগুলো ইরার কানে গেল কিনা বোঝা গেল না। মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে সে নাচ দেখতে লাগল। তারপর একসময় আপন মনেই বলতে লাগল, দোল—পূর্ণিমার রাতে, ঝুলনের রাতে আমরাও নাচতাম—আমি আর আমার সখিরা। কত বাঁশি, কত বীণা বাজত—সরোবরের ধারে আমার সে মালঞ্চে কত ফুল ঝরে ঝরে পড়ত। সে কতদিনের কথা—সব মনে পড়ছে আমার!

প্রিয়তোষ চমকে তাকাল ইরার মুখের দিকে। সে—মুখে আবার স্বপ্নের ঘোর নেমেছে, ইরা যেন জেগে—জেগেই স্বপ্ন দেখছে। প্রিয়তোষ প্রমাদ গুনলে, রাত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের প্রেত বুঝি আবার ভর করেছে তার কল্পনাপ্রবণ মনে।

তার বাহুতে নাড়া দিয়ে প্রিয়তোষ ডাকলে, ইরা।

ঘুম—ঘুম চোখে ইরা ফিরে তাকাল। তারপর ধীরে—ধীরে তার দৃষ্টি হয়ে এল স্বাভাবিক স্বচ্ছ। বললে, কিছু বলছ?

রাত হয়েছে, চলো ফেরা যাক।

ছেলেমানুষের মতো ইরা বললে, না, আর একটু থাকি। বেশ লাগছে দেখতে।

হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সুজনলাল। বোঝা গেল কাছাকাছি কোথাও ছিল। তার সেই পরিচিত বিনীত ভঙ্গিতে বলল, আপনার কি বিশেষ তাড়া আছে প্রিয়তোষবাবু।

তা আছে বইকি। পায়ের কাছে শিকার—করা হাঁসগুলো দেখিয়ে প্রিয়তোষ আবার বললে, এগুলো রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে তো।

তা বটে। আপনি তাহলে বরং এগিয়ে যান।

ইরাকে একলা রেখে?

রাখলেই বা। আমি আমার লোক দিয়ে দেবীজীকে ঘরে পৌঁছে দেবে।

তার দরকার হবে না।

নিঃশব্দ হাসিতে সুজনলালের পুরু কালো ঠোঁটের ভেতর থেকে সাদা দাঁতগুলো দেখা গেল। বললে, ভয় পেলেন নাকি? এখানে বাঘ—ভল্লুক নেই।

সুজনলালের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রিয়তোষ বললে, তার চেয়েও মারাত্মক জীব থাকতে পারে।

সুজনলালের চোয়াল দুটো একটু শক্ত হওয়া ছাড়া মুখের আর কোনওরকম ভাব—পরিবর্তন হল না। কাটা—কাটা ভাবে বললে, আপনার কথাগুলো বাঁকা শোনাচ্ছে প্রিয়তোষবাবু। বন্দুক নিয়ে দেবীজীকে পাহারা দেওয়ার জন্যে প্রতাপবাবু স্যার আপনাকে কত মাইনে দেন জানি না, তবে আমারও তাঁবে অনেক লোক খাটে।

চোপরাও! বন্দুকের কুঁদোটা মাটিতে ঠুকে স্প্রিংয়ের মতো উঠে দাঁড়াল প্রিয়তোষ।

ইরা সভয়ে ডেকে উঠল, প্রিয়তোষ!

আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। চকিতে সরে দাঁড়াল সুজনলাল, আর প্রিয়তোষের পিছনে অন্ধকার থেকে একটা পাথরের চাঁই এসে পড়ল তার মাথায়। পড়তে—পড়তে প্রিয়তোষ ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ধকার লক্ষ করে পরপর দুটো ফায়ার করলে।

প্রত্যুত্তরে হা—হা করে একটা অট্টহাসি দূরে মিলিয়ে গেল।

চিৎকার করে উঠে ইরা দু'হাতে প্রিয়তোষকে জড়িয়ে ধরলে। মুহূর্তে থেমে গেল ঢাকের আওয়াজ, বাঁশির সুর আর গান। আদিবাসীদের দুর্বোধ্য ভাষার ভীত কোলাহলে সমস্ত উৎসব যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

প্রিয়তোষ আর দাঁড়ালে না। ইরাকে নিয়ে বাংলোর পথে দ্রুত পা চালিয়ে দিলে। তার পিঠের কাছে সাদা শার্ট তখন লাল হয়ে উঠেছে।

আর, সুজনলালের মুখ থেকে তখন সমস্ত রক্ত কে যেন নিংড়ে নিয়েছে। আর কেউ না জানুক, সে জানে ওই পাথরের টুকরোটা তাকেই লক্ষ্য করে আসছিল। অন্ধকারের মধ্যেও সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে একমাথা রুক্ষ চুল—একরাশ গোঁফ—দাড়ির ভেতরে একটা মাত্র জলন্ত চোখ।

মাহিন্দার সিং তাহলে সত্যিই এসেছে লুধিয়ানা থেকে।

ঝুমনি বললে, তুর কি হল রে ঠিকেদারবাবু? অমন গুম হয়ে রইছিস কেনে?

চোখ তুলে তাকাল সুজনলাল। সকাল থেকে অনেকখানি পচাই খেয়ে চোখ দুটো তার রাঙা হয়েছে। বললে, না, কিছু না।

ঝুমনি তার গালার চুড়িপরা কালো বাহু দিয়ে সুজনলালের গলা বেষ্টন করে বললে, তবে রা কাড়ছিস না কেনে?

গলা থেকে হাতাখানা ছাড়িয়ে নিয়ে সুজনলাল বললে, তুই এখন যা ঝুমনি।

ঝুমনি ঠোঁট ফুলিয়ে বললে, অ খালভরা, ঝুমনিতে আর মন উঠছে না! বুঝেছি, বন্দুকওলা সাহেববাবুর সঙ্গে সেই গোরাপানা পেতনিটা তুর ঘাড়ে চেপেছে।

আঃ, দিক করিস নে—যা—

ইঃ। ভারি আমার বাবু রে!

পা দিয়ে মাটির ভাঁড়টা ঠেলে দিয়ে ঝুমনি রাগ করে বেরিয়ে গেল ঠিকাদারের ঘর থেকে।

পচাইয়ের বোতলটা তুলে নিয়ে সুজনলাল আরও খানিকটা গলায় ঢেলে দিলে। অনেক খেয়েছে, তবু নেশা তার হয়নি। কাল পরবের রাতের শেষ ঘটনাটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে। ঘুরে ঘুরে কেবলই মনে পড়ছে সেই একমাথা রুক্ষু চুল, মোটা মোটা হাড়ওয়ালা শক্ত দীর্ঘ দেহ, আর একমুখ দাড়ি—গোঁফের মাঝে কোটর—গত একটা চোখ। সে চোখে শুধু অমানুষিক প্রতিহিংসার আগুন।

মাহিন্দার সিং সত্যিই তাহলে এসেছে এই রাজনগরে। আশা করেনি সুজনলাল, একেবারেই আশা করেনি।

হারামির বাচ্চচা! হারামজাদা কুত্তা!

বিড়বিড় করে আপনমনে বকতে লাগল সুজনলাল। আর তার নেশায় রাঙা চোখের সামনে থেকে এক ঝটকায় সরে গেল দীর্ঘ পাঁচ বছরের পুরাতন একখানা পর্দা।

লুধিয়ানা জেলার ছোট একটি গ্রাম। গ্রাম ঠিক নয়, আধা শহর। সেখানে একটা কনট্রাক্ট নিয়ে গিয়েছিল সুজনলাল। একটা কারখানার সেড তৈরি হবে। আর, তারই লাগোয়া স্টাফ কোয়ার্টাস। শ'খানেক দেহতি মজুর জোগাড় করেছিল সে। তাদের মধ্যে ছিল ওই একচোখো মাহিন্দার সিং। জাতে সে জাঠ, লড়াইয়ের জমানাতে সে ছিল পল্টনের দলে। একটা চোখ সেখানেই খোয়ায়। মোটা—মোটা হাড়ওয়ালা বিশাল চেহারা তার। বয়সে সুজনলালের চেয়ে বেশ কিছু বড়ই হবে। যুদ্ধ শেষ হবার পর লোকটা বেকার হয়ে পড়ে। নিজস্ব জমিজমাও বিশেষ কিছু ছিল না যে চাষবাস করে খাবে। ঠিকাদার সুজনলালের কাছে কাজ পেয়ে সে যেন বর্তে গেল।

কারখানার শেড যেখানে তৈরি হচ্ছিল, সেখান থেকে মাইল পাঁচেক দূরে তার ঘর। সেইখান থেকে পায়ে হেঁটে মাহিন্দার কাজ করতে আসত।

মাহিন্দারের ঘরের খবর সুজনলাল জানত না। ঠিকাদার সাহেবকে একদিন সে রাতে নিজের কুঁড়েতে দাওত দেয়। নাছোড়বান্দা সে, যেতেই হল সুজনলালকে তার ঘরে। সেইখানে প্রদীপের আলোয় লালীকে সে প্রথম দেখে। মাহিন্দার সিং—এর বউ লালী। নিটোল স্বাস্থ্য, জ্বলন্ত রূপ। মাহিন্দারের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।

তারপর থেকে পিয়াস লাগলেই সুজনলাল পাঁচ মাইল পথ সাইকেলে পার হয়ে যেতে মাহিন্দারের ঘরে। জল চাইতে লালীর কাছে! তাদের কুঁয়ার জল নাকি ভারি মিঠা। রসি—বাঁধা বালতি নামিয়ে লালী জল তুলতি, সুজনলাল তাকিয়ে—তাকিয়ে দেখত।

মাহিন্দারকে একদিন সে জানালে, খাওয়া—দাওয়ার ভারি অসুবিধা হচ্ছে তার। মাহিন্দার যদি তার ঘরে দুপুরের খাওয়াটার বন্দোবস্ত করে দেয়—অবশ্য খরচা যা লাগে সুজনলাল দিতে প্রস্তুত।

মাহিন্দার হেসে বলেছিল, খাবেন তো দু'খানা তন্দুরের রুটি আর শুখা গোস—তার আবার খরচা কী!

সুজনলাল সেদিন মনে—মনে হেসেছিল। লোকটা ফৌজি সিপাহী হলে কী হয়, আসলে নিরেট বোকা।

দুপুরে মাহিন্দার যখন ভারি—ভারি লোহার কড়ি বইতো, সুজনলাল তখন তার ঘরে বসে তাকিয়ে—তাকিয়ে লালীকে দেখত।

লালী বলত, কাজে যাবে না, ঠিকাদার সাহাব? তোমার মজুরেরা ফাঁকি দিচ্ছে যে!

সুজনলাল বলত দিক গে। তুমি যেন আমায় ফাঁকি দিও না।

সরল দেহাতি মেয়ে লালী ইঙ্গিতটা বোধ করি বুঝত না। জিজ্ঞেস করত রান্না কেমন হয়েছে?

খুব মিঠা। তবে আরও মিঠা জিনিসের স্বাদ পেয়েছি আমি।

আরও মিঠা জিনিস। কী? বড়বড় চোখে তাকায় লালী।

তুমি।

হঠ। আসমানী দোপাট্টা উড়িয়ে লালী চলে যায়।

এমনি করে খেলা চলে দিনের পর দিন। শিকার নিয়ে শিকারির খেলা। কিন্তু দোষ সুজনলালের, না মাহিন্দার সিংয়ের? নেকড়ের কাছে কেন সে হরিণীকে নিয়ে এল। সে তো খাবেই। মেয়েলোকের জওয়ানি তো জোয়ান পুরুষের জন্যেই। লালীর মতো খুবসুরত লেড়কি দুনিয়ায় পয়দা হয়েছে কি ওই আধ—বুড়ো জাঠ মাহিন্দার সিংয়ের ভোগের জন্যে? ফুঃ!

সুজনলালের রক্তে কামনার বিষ টগবগ করে ফুটতে থাকে। লালীকে তার চাই।

সেদিন আকাশে ছিল বাদল। সকাল থেকেই ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি নেমেছে। এমন লোভনীয় বৃষ্টি লুধিয়ানা জেলায় খুব কমই দেখা যায়। মজুরদের কাজে লাগিয়ে, বর্ষাতিটা গায়ে চাপিয়ে সুজনলাল সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

কুঁয়াতলায় সাইকেলটা রাখতেই শুনতে পেল, লালী বর্ষার ছড়া গাইছে। আওয়াজ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। লালী আজ সবুজ রঙের দোপাট্টা জড়িয়েছে, বেণীতে গুঁজেছে সবুজ গমের শিস। হেসে বললে, আজ এত সকাল—সকাল যে ঠিকাদার সাহাব?

সুজনলাল বললে, ঘরে চলো, জরুরি কথা আছে।

ঘরে গিয়ে সুজনলাল ভিজে শোলাহ্যাটটা ছুঁড়ে ফেললে। খুলে ফেললে বর্ষাতিটা। তার কান তখন ঝাঁ ঝাঁ করছে, মাথা টলছে অসহ্য রক্তের চাপে।

অবাক চোখে চেয়ে লালী জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে তোমার?

কোনও জবাব দিলে না সুজনলাল। ঘরের দরজাটা হঠাৎ বন্ধ করে দিলে সে।

কতক্ষণ পরে সুজনলাল যখন দরজা খুলল, লালী তখন মড়ার মতো ঘরের মেঝের পড়ে আছে। সবুজ গমের শিষটা থেঁতলে গেছে।

বর্ষাতিটা তুলে নিয়ে সে বেরোতে যাচ্ছিল, লালী ডাকলে, দাঁড়াও—

সুজনলাল ঘুরে দাঁড়াল।

আস্তে—আস্তে উঠল লালী। লালীর সেই মূর্তিটা সুজনলাল আজও মনে করতে পারে। চোখের 'কজরা' গালে লেগেছে, নিচের ঠোঁট রক্তাভ, হলুদ—রঙ ছোপানো গায়ের কামিজ ছিন্ন—ভিন্ন, তারই ফাঁকে ফাঁকে নখের আঁচড়ের লাল দাগ। ক্লান্ত নিশ্বাসে নাকের ফুটো দুটো ফুলছে। মরা হরিণের চোখের মতো বোবা দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর চোখের নিমেষে ঘরের চাল থেকে চকচকে একখানা টাঙি টেনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুজনলালের ওপর।

হঠাৎ আক্রমণের জন্যে তৈরি না থাকলেও সুজনলালের চোখ ছিল লালীর দিকে। খপ করে তার ডান হাতখানা সে চেপে ধরল বটে, কিন্তু লালী তখন পাগল হয়ে উঠেছে। শক্ত থাবায় তার হাতখানা চেপে ধরে সুজনলাল ক্রমশ মোচড় দিতে লাগল, আর ধস্তাধস্তির মধ্যে টাঙির চকচকে ফলাটা কখন যে লালীর নরম পেটে বসে গেছে, সে খেয়াল করেনি।

খেয়াল যখন হল, তখন লালী উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে, আর রক্তের একটা ধারা মেঝেতে গড়িয়ে চলেছে।

বাইরে তখনও ঝুপঝুপ বৃষ্টি। শনশন হাওয়া।

আর ভাববার সময় ছিল না। বর্ষাতিটা তুলে নিয়ে সুজনলাল নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল।

কারখানার শেডের কাছাকাছি এসে হঠাৎ মনে পড়ল ভিজে শোলাহ্যাটখানা পড়ে আছে লালীর ঘরে। কিন্তু তখন আর ফেরবার উপায় ছিল না।

সেই দিন থেকে ঠিকাদার সুজনলালকে লুধিয়ানা জেলায় কেউ আর দেখতে পায়নি।

গোপনে খবর নিয়েছিল তার নামে সেখানে পুলিশের হুলিয়া বেরিয়েছে কিনা। কিন্তু আশ্চর্য, পুলিশ কোনও সাড়াশব্দই করেনি। তবে কি মাহিন্দার সিং কিছু জানায়নি পুলিশকে? খুঁজে পায়নি তার ফেলে আসা শোলাহ্যাট? হবেও বা।

যাক, নিশ্চিন্ত হল সুজনলাল।

আরও কিছুকাল পরে সে খবর পেল একচোখো মাহিন্দার তাকে খুঁজছে। পুলিশের কাজাটা সে নিজের হাতেই তুলে নিয়েছে। মাহিন্দারের খাওয়া নেই, ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, দিনের পর দিন সে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দুনিয়ায় কাউকে তার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু একজনকে। সে ঠিকাদার সুজনলাল।

শুনে সে হেসেছিল। দুনিয়াটা তো লুধিয়ানা জেলা নয়। অনেক বড়। অনেক মানুষের ভিড় এখানে। সে—ভিড়ে একটা মাত্র চোখের দৃষ্টি দিয়ে কোথায় তাকে খুঁজে পাবে মাহিন্দার?

কিন্তু কানপুর শহরের বাজারে ফল কিনতে গিয়ে একদিন চমকে উঠেছিল সুজনলাল। দূরে দাঁড়িয়ে একমাথা রুক্ষ চুল, মুখময় দাড়ি গোঁফ, আধবুড়ো একটা পাগলা গোছের লোক তাকে দেখছে।

সুজনলাল চমকে উঠেছিল লোকটার একটা চোখ কানা দেখে।

সেই রাতেই সে কানপুর ছাড়ে।

তারপর আবার এই রাজনগরে। কে জানত শিকারি কুকুরের মতোই গন্ধ শুঁকে শুঁকে মাহিন্দার এই রাজনগরেও এসে হাজির হবে? সুজনলালের গায়ে কি লালীর রক্তের গন্ধ এখনও লেগে আছে? পাঁচ বছর আগে যা চুকে—বুকে গেছে, কে আশা করেছিল আজও তার জের চলবে?

কুত্তার বাচ্চচা! বিড়বিড় করে উঠল সুজনলাল।

হঠাৎ একটা হিমস্রোত শিরশির করে নেমে গেল সুজনলালের মেরুদণ্ড বেয়ে। ভয়টা অবশ্য কানা মাহিন্দরকে নয়। লুধিয়ানা জেলার বোকা বুড়ো পল্টনকে সে থোড়াই কেয়ার করে। তারচেয়ে সে অনেক সেয়ানা। ভয় তাকে নয়, পুলিশকে। পাগলা মাহিন্দার নিজে তাকে ধরতে না পেরে পুলিশকে যদি জানিয়ে দেয়। এসেছে যখন, একটা কিছু করবেই সে। মরা লালীর শোকে সে খ্যাপা জানোয়ার হয়ে আছে। একটু সুযোগ পেলে চোট সে দেবেই।

অতএব—

সুজনলাল বিড়বিড় করে বলে উঠল, রাজনগর থেকে তোমার তাঁবু ওঠাও সুজনলাল। দেরি কোরো না, রাতারাতি সরে পড়ো।

কিন্তু ইরা? এতদিন আশায়—আশায় কাটিয়ে এমনিই ফিরে যেতে হবে? আফশোস করে লাভ নেই। দুনিয়ার বাগিচায় আরও অনেক ইরা—গোলাপ ফুটে আছে। নসিবে থাকলে একটা—না—একটা মিলে যাবেই।

পচাইয়ের বোতলটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে আবার ছুঁড়ে ফেলে দিলে সুজনলাল। খালি হয়ে গেছে। হোকগে, নতুন জায়গায় নতুন করে ভরে নেবে সে। কিন্তু রাজনগরে আর নয়—আর একটা রাতও নয়।

তাই বলে কি খালি হাতে ফিরে যাবে সে? রাজনগর থেকে কি কিছুই নেওয়ার নেই—কোনও ধন—দৌলত? ভাবতে ভাবতে সুজনলালের কটা চোখ আবার চকচক করে উঠল।

আছে বইকি। অনেক দামি দৌলত পড়ে আছে মাটির তলায়। তাই নিজেই সুজনলাল রাজনগরকে আজ সেলাম জানাবে।

* * *

টাইপ—রাইটার মেশিনের আওয়াজ যখন বন্ধ হল, রাত তখন অনেক হয়েছে।

রাজনগরের এই লুপ্তোদ্ধার সম্পর্কে দীর্ঘ রিপোর্ট ছাপা শেষ করলেন অধ্যাপক প্রতাপ। এই রিপোর্ট কলকাতায় পরামর্শ—কমিটির কাছে পাঠাতে হবে। আর পাঠাতে হবে মৃতদেহ সমেত পেটিকা দুটি। আজ সারাদিন ধরে তারই তোড়জোড় করেছেন তিনি। শুধু মৃতদেহ দুটিই বহুমূল্য নয়, স্বাতীর গায়ে বহুমূল্য রত্নালঙ্কারও আছে। তাই সশস্ত্র পাহারায় পাঠাবার ব্যবস্থা হয়েছে। কুশলনগরের মাটি ছেড়ে সেনাপতি ধীমান ও রাজকুমারী স্বাতী আগামী কালই চলে যাবে আধুনিক কলকাতার যাদুঘরে।

এর ফলে সত্যিই কোনও বিপদ ঘটবে কিনা কে জানে! তন্ত্রসাধনার অলৌকিক কাণ্ড সম্বন্ধে কতটুকুই বা জানেন প্রতাপবাবু! তবু তাঁর বিচলিত মন খানিকটা স্বস্তি বোধ করছে। পেটিকা দুটি স্থানান্তরিত হলে ইরার ওপর থেকে তাদের অশুভ প্রভাব হয়তো কেটে যেতেও পারে।

রাজনগরের এই লুপ্তোদ্ধারের ফলে তাঁর গলায় হয়তো যশের মালা দুলবে, ভাবীকালের ইতিহাস হয়তো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতাপ সেন মজুমদারের নাম শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করবে, কিন্তু এসব তো তিনি তাঁর কন্যার শুভাশুভের বিনিময়ে চাননি। প্রত্নতাত্ত্বিকের চেয়ে যে পিতা বড়!

রিপোর্টের কথা ভুলে একমাত্র কন্যার শুভ কামনায় তাঁর পিতৃহৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠল। পেটিকা দুটি চলে গেলে ইরাকেও তিনি মীরাটে তাঁর বোনের ওখানে পাঠিয়ে দেবেন। তারপর একটা শুভ দিন দেখে প্রিয়তোষের হাতে তুলে দেবেন তাঁর আদরিণী কন্যাকে। এ ইচ্ছা তাঁর আজকের নয়, অনেক দিনের।

প্রিয়তোষ এখন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠলে হয়। মাথার চোটটা তার গুরুতর না হলেও খুব সামান্যও নয়। কী অশুভ ক্ষণেই তিনি রাজনগরে পা দিয়েছিলেন। এক বিপদ কাটতে না কাটতে কোথাকার এক পাগলের উৎপাত! কিন্তু আকস্মিক বিপদের ওপর কারই বা হাত আছে! সকল বিপদের আসান যিনি, তাঁরই ওপরে ভরসা করে থাকা ছাড়া আর উপায় কী!

টাইপ—রাইটার মেশিনটা বন্ধ করলেন অধ্যাপক। রিপোর্টের ছাপা কাগজগুলো ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখলেন। তারপর জুয়েল—ল্যাম্প নিভিয়ে লাইব্রেরির দরজা বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে এগোলেন। আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ালেন ইরার ঘরের খোলা জানলার সামনে। অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে মৃদু গভীর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ইরা তাহলে ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজা ঠেলে দেখলেন বন্ধ। ভেতর থেকে জয়া তালা দিয়েছে নিশ্চয়।

যাক, এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারবেন তিনি।

কুহকিনী রাত্রি আবার ডাকছে। কিন্তু ইরা জানে, রাত্রি নয়, ডাকছে ধীমান। বহু যুগের ওপার থেকে সে ডাক ভেসে আসছে। সেই একই কথা, সেই একই আকুলতা।

ধীমান বলছে, রাজকুমারী স্বাতী! ইতিহাস ভুলেছে, কাল ভুলেছে, তুমিও কি ভুলেছ আমাকে? আর কত দিন, কত যুগ তোমার অপেক্ষায় থাকব? তুমি কি আসবে না স্বাতী?

না, ইরা আজ শুনবে না ওই ডাক। প্রিয়তোষের হাতে হাত রেখে আজই বিকেলে সে শপথ করেছে, আর ভাববে না ওসব কথা। কবেকার কোন ধীমান কাকে ভালোবেসেছিল, তা নিয়ে ইরার মাথাব্যথা কেন? সে প্রেম তো কবে মরে গছে। নব—নব জীবন—জোয়ারের পলিমাটির তলায় কবে সমাধি হয়ে গেছে তার। তবে আর কেন মৃত প্রেমের স্বপ্ন দেখা? সে তো রাজকুমারী স্বাতী নয়, সে শুধু ইরা—প্রিয়তোষের ইরা। যে প্রেম প্রিয়তোষের রূপ ধরে তার জীবনে এসেছে, তাকে ভুলে কেন সে মরা প্রেমের কাছে বারবার ছুটে যাবে?

মনকে শক্ত করলে ইরা।

কিন্তু ডাক তো থামে না। এ যেন অনন্তকালের ডাক, অনন্ত প্রেমের ডাক। জন্ম—জন্মান্তরেও যে প্রেমের মৃত্যু নেই, ক্ষয় নেই।

তেমনি আকুলতা, তেমনি তৃষ্ণা নিয়ে বহু দূর থেকে ডাক আসছে, রাজকুমারী স্বাতী। কত বর্ষা গেল, কত বসন্ত গেল, তবু এলে না তুমি। কত আর ডাকব তোমায়! সেই সরোবরে নৌবিহার—সেই মালঞ্চে অধর ছুঁয়ে অঙ্গীকার—একই বিষে দুজনের সেই মরণ—বাসর—সবই কি ভুলেছ তুমি?

ইরার গায়ে সহসা কাঁটা দিয়ে উঠল। না, না, সে ভোলেনি—কোনও জন্মেও ভুলতে পারবে না। সে তো ইরা নয়, সে যে কুশলনগরের রাজকুমারী স্বাতী। ধীমানের প্রেম তার জীবনে ধ্রুবতারা। কেমন করে সে ভুলবে, কেমন করে সে থাকবে ধীমানের ডাকে সাড়া না দিয়ে?

ইরার সমস্ত অন্তরাত্মা তেমনি আকুলতা নিয়ে বলতে লাগল, যাই ধীমান, যাই। জন্ম—জন্মান্তর ধরে আমিও যে তোমার ডাকের অপেক্ষায় ছিলাম। আর দেরি হবে না ধীমান।

বিছানার ওপর উঠে বসল ইরা। রাশি—রাশি শ্বেত ধূমকুণ্ডলী আর সেই অপূর্ব সুগন্ধে ছেয়ে গেছে ঘরের অন্ধকার। হাত বাড়িয়ে সে তুলে নিল সেই মায়া—ধূপদানি! তারপর বিছানা থেকে নেমে চলতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মনে পড়ল দরজায় তালা। কী করবে সে এখন? কী করে যাবে? ইরা একবার তাকাল জয়ার দিকে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। আস্তে আস্তে সে হাত চালিয়ে দিল জয়ার বালিশের নিচে। এই তো রয়েছে চাবি!

চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলে ফেললে ইরা। তারপর সাপুড়িয়ার বাঁশি শোনা সাপিনীর মতো দ্রুত লঘু গতিতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে!

পুরানো কাঠের বাংলোর কোন খোপরে বহুপ্রাচীন একটা তক্ষক ডেকে উঠল।

কৃষ্ণপক্ষ পার হয়ে শুক্লপক্ষ পড়েছে। উচু—নিচু প্রান্তর ঝিমঝিমে চাঁদের আলো আর কুয়াশায় মাখামাখি। বুকের কাছে মায়াধূপদানিটি ধরে ইরা সোজা এগিয়ে চলেছে। ডাকিনী রাত্রি যেন মন্ত্রবলে তাকে টানছে। পায়ে—চলা পথের দু'পাশে বুনো আগাছার ঝোপে ঝোপে সরসর মরমর শব্দ হচ্ছে, প্রথম হেমন্তের শিশিরে ভিজে যাচ্ছে শাড়ির প্রান্ত। ভীম পাহাড়ের জঙ্গলে ডাকছে ফেউ, শোনা যাচ্ছে হায়েনার হাসি।

কোনও দিকেই খেয়াল নেই ইরার। জ্যোৎস্না আর কুয়াশায় মাখামাখি শূন্য প্রান্তরের বুকে তার সরল সুঠাম মূর্তি সোজা এগিয়ে চলেছে। হাওয়ায় উড়ছে চুল, পাথুরে মাটিতে পায়ে পায়ে লাগছে হোঁচট, স্ফলিত আঁচল লুটোচ্ছে পেছনে—পেছনে।

স্বপ্নাচ্ছন্ন দুই চোখের দৃষ্টি সামনে মেলে ইরা তবু এগিয়ে চলেছে।

অনন্ত বিরহ যেন যাত্রা করেছে অনন্ত মিলনের প্রত্যাশায়।

এক মুহূর্তের জন্যে চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল মহাবল সিংহের। তারপরেই সেলাম করে উঠে দাঁড়াল। বললে, মেমসাব, আপ!

কোনও জবাব না দিয়ে ইরা ভূগর্ভের সিঁড়ির মুখে এগিয়ে গেল। কিরীচ লাগানো বন্দুকের নলটা বাড়িয়ে পথ আটকাল মহাবল। সসন্ত্রমে বললে, অন্দর যানা মানা হ্যায় মেমসাব। বড়ে হুজুরকা অর্ডার।

রানির মতো গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকাল ইরা। রানির মতোই কঠিন স্বরে আদেশ করলে, পথ ছাড়ো।

মাফ কিজিয়ে।

চিৎকার করে উঠল ইরা, আমার হুকুম পথ ছাড়ো।

জী নেহি। মহাবল তেমনি অটল।

ইরার দুই চোখে আগুন খেলে গেল। কিরীচ—লাগানো বন্দুকের নলটা হাত দিয়ে ঠেলে দৃঢ় পদক্ষেপে ইরা নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।

কয়েক সেকেন্ডের জন্যে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল মহাবল সিং। তারপর হঠাৎ ছুটল যে পথে ইরা এসেছে সেই পথে।

ধাপে—ধাপে স্খলিত আঁচল লুটিয়ে নিচে নেমে এল ইরা। সেই বিচিত্র পাথরের নীলাভ আলোয় ভরে আছে চত্বরটা। মানুষের পায়ের আওয়াজে পাখা ঝটপটিয়ে চত্বরের এ—কোণ থেকে ও—কোণে উড়ে গেল একটা ভীত বাদুড়। এ—দেয়াল থেকে ও—দেয়ালের ফাটলে সেঁধিয়ে গেল একটা পাহাড়ি চন্দ্রবোড়া।

ইরার দেহ এতটুকু কাঁপল না। শান্ত পায়ে সে এসে দাঁড়াল। ধীমানের পেটিকার পাশে। খুলে ফেলল ডালা। তেমনি অনন্ত ঘুমে ঘুমিয়ে আছে ধীমান, প্রশস্ত বুকে রক্তবর্ণ খড়গচিহ্ন, আধ—খোলা চোখের তারাদুটি স্থির, পাংশু ঠোঁট দু'খানা অল্প খোলা—যেন এইমাত্র ডাকছিল স্বাতীকে।

দেখতে—দেখতে মধুর আবেশ কোমল হয়ে এল ইরার মুখ। ঠোঁটের কোনায় ফুটি ফুটি করে ফুটে উঠল প্রেম, লজ্জা আর ব্যথায় মেশানো অপরূপ এক হাসি। শবের ওপরে ঈষৎ ঝুঁকে, প্রাণের সমস্ত আবেগ ঢেলে ইরা বলতে লাগল, আমি এসেছি ধীমান, জন্ম—জন্মান্তর পার হয়ে আমি তোমার কাছেই এলাম। তুমি ডাকলে আমি তো না এসে থাকতে পারি না। ওঠো, ওঠো ধীমান—স্বাতী এসেছে, তার মুখে পানে চাও, অভিমান করে থেকো না—কথা বলো।

বলতে—বলতে ভারি হয়ে এল ইরার গলার আওয়াজ। টলটল করে উঠল তার অপলক চোখের কোণে তরল মুক্তো। সব কথা হারিয়ে গেল গভীর আবেগের অতলে।

হঠাৎ চমকে উঠল ইরা। এক ধাক্কায় কে যেন তাকে স্বপ্ন থেকে জাগিয়ে দিল। পাথরের সিঁড়িতে কার পায়ের আওয়াজ হচ্ছে। কে যেন নেমে আসছে নিচে।

আচমকা একটা ভয় এসে জড়িয়ে ধরল ইরাকে। সিঁড়ি দিয়ে যে নেমে আসছে, সে কে? এই গভীর রাতে এখানে তার কী প্রয়োজন? ইরাকে দেখতে পেলে সে কি ভাববে?

চকিতে একবার সিঁড়ির দিকে তাকাল ইরা। পায়ের আওয়াজ আরও কাছে আসছে।

হাতের ধূপদানিটা তাড়াতাড়ি শবদেহের বুকের ওপর নামিয়ে রেখে পেটিকার ডালাটা বন্ধ করে দিলে ইরা। তারপর লুটানো আঁচল কাঁধের ওপর তুলে নিমেষে সরে গেল একটা স্তম্ভের আড়ালে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির কয়েকটা ধাপের ওপর দেখা দিল ঠিকাদার সুজনলাল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পা দিয়ে সুজনলাল একবার সতর্ক চোখে এদিক—ওদিক তাকাল। তারপর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললে। এত সহজেই এখানে আসতে পারবে ভাবেনি সে। অনেক প্ল্যান করেছিল সে পাহারাদার মহাবল সিংয়ের চোখ এড়িয়ে আসার জন্যে। কিন্তু না, নসিব তার খুবই সুপ্রসন্ন। নইলে ঠিক এই সময়েই মহাবল সিং উধাও হয়ে যাবে কেন?

ক্ষিপ্র পায়ে সে এসে দাঁড়াল রাজকুমারী স্বাতীর পেটিকার পাশে। তারপর একটানে খুলে ফেললে ডালা।

স্তম্ভের আড়ালে নিশ্বাস রোধ করে দেখতে লাগল ইরা। আস্তে আস্তে তার ভয় কমে আসছে। তার বদলে একটা তীব্র সন্দেহ জাগছে মনে। এত রাতে ঠিকাদার এখানে কেন? রাজকুমারীর পেটিকা খুলে কী দেখছে সে? রাজকুমারীর চোখ—ঝলসানো রূপ?

না, সুজনলালের চোখ তার চেয়েও চোখ—ঝলসানো জিনিসের ওপর। স্বাতীর সর্বাঙ্গে রত্নালঙ্কার মৃদু নীলাভ আলোতেও ঝলমল করছে। কত দাম হবে ওই মণিময় কঙ্কণ দুটোয়? আর সিঁথিমৌর—এর ওই মস্তবড় হীরের টুকরোটা—যেটা কালকেউটের চোখের মতোই ঝিলিক দিচ্ছে—ওটা বোধ করি কোহিনুরের জোড়া।

লোভে চকচক করে উঠল সুজনলালের কটা চোখ। বিধাতা যাকে দেয়, তাকে ছপ্পড় ফুঁড়েই দেয়। ভেবেছিল এখান থেকে খালি হাতেই ফিরতে হবে, কিন্তু রাজনগর আজ তাকে রাজা বানিয়ে দিল।

লোলুপ হাত বাড়িয়ে সে শবের দেহ থেকে একে একে খুলতে লাগল মাথার সিঁথিমৌর, গলার রত্নহার, হাতের মণিময় কঙ্কণ। ব্যস, এখানকার কাজ শেষ হয়ে গেল তার। দেনা—পাওনা মিটে গেল রাজনগরের সঙ্গে। রাত ফুরোতে কতটুকুই বা বাকি, ভোরের ট্রেনেই হাওয়া দেবে সুজনলাল। দুনিয়ায় অগুনতি মানুষের ভিড়ে তাকে খুঁজে বার করবার সাধ্য কার। লালীর শোকের চিতা বুকে জ্বালিয়ে পুড়তে থাকুক একচোখা পাগলা মাহিন্দার। সুজনলাল তাকে কলা দেখাবে। প্রতাপবাবু স্যার পুলিশে খবর দেবে নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রমাণ? সুজনলাল কাঁচা কাজ করে না।

অলঙ্কারগুলো ধীরে—সুস্থে তার খাকি শার্টের বুক পকেটে ভরলে। তারপর বন্ধ করার জন্যে পেটিকার ডালাতে হাত দিতেই একটা তীক্ষ্ন আওয়াজ তার কানে এল, গয়নাগুলো রেখে যান!

মানুষের আওয়াজ পাওয়া বুনো জানোয়ারের মতোই চমকে ঘুরে দাঁড়াল সুজনলাল। দেখতে দেখতে তার চোখের আতঙ্ক মিলিয়ে গিয়ে বিস্ময় ফুটে উঠল। স্তম্ভের পাশে ঋজু ভঙ্গিতে ঘাড় বেঁকিয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে, এত রাতে এই পাতালপুরীর গহ্বরে তাকে দেখবার কল্পনাও সে করেনি। ভালো করে চোখ মুছে তাকাল সুজনলাল, হ্যাঁ, ইরাই বটে।

দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর সুজনলালের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, দেবীজী আপনি। আপনি এখানে কেন?

কঠিন গলায় ইরা বললে,—আপনার চুরি দেখতে। সাহস তো আপনার কম নয়!

বিনীত ভঙ্গিতে চিবিয়ে—চিবিয়ে সুজনলাল বললে, সাহস যে আমার একটু বেশিই, আপনি তো তা জানেন দেবীজী।

থামুন। গয়নাগুলো রেখে দিন আগে।

রাখব বলে নিইনি। গয়নাগুলো আমার পাওনা।

পাওনা।

পাওনা বইকি! একটা চাপা দম্ভের সঙ্গে সুজনলাল বললে, সুজনলালের হাতের মুঠোয় যা আসে, তাই তার পাওনা।

ইরার মুখ—চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। চিৎকার করে ডাকল, মহাবল সিং!

সুজনলালের কালো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সাদা দাঁতগুলো ঝিলিক দিল। বললে, মিছে ডেকে হয়রান হচ্ছেন। মহাবল থাকলে কি এখানে আসতে পারতাম? নেই।

নেই! এক পলকের জন্যে থতিয়ে গেল ইরা, তারপর হঠাৎ ছুটল সিঁড়ি লক্ষ্য করে। কিন্তু তার আগেই তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে সুজনলাল।

সরে দাঁড়ান। ইরা ধমক দিয়ে উঠল।

সুজনলাল এক চুলও নড়ল না। বাঁ—চোখটা ঈষৎ ছোট করে চিবিয়ে—চিবিয়ে বলতে লাগল, এত তাড়া কেন? রাত ভোর হতে এখনও ঢের বাকি। দু—দণ্ড নাহয় রইলে, দুটো কথা নাহয় কইলে দেবীজী। ক্ষতি কী?

ইরার মন জুড়ে এবার একটা নতুন ভয় দেখা দিতে লাগল, জগতে যে ভয়টা একমাত্র নারীর। তবু সাহসে ভর করে সে বললে, আপনার বেয়াদবি ক্রমেই মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সুজনবাবু— যেতে দিন আমায়।

তেমনি অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে সুজনলাল বললে, দেব বইকি। কিন্তু তার আগে আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও।

কীসের পাওনা?

তোমার জওয়ানিয়।

মুখ লাল করে ইরা চিৎকার করে উঠল, বেয়াদব। তারপরই ঠাস করে একটা আওয়াজ হল সুজনলালের গালের ওপর।

সুজনলালের চোয়াল দুটো একবার মাত্র শক্ত হয়ে উঠেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। কুৎসিত একটা হাসিতে সাদা সাদা দাঁতগুলো দেখা দিল পুরু কালো ঠোঁটের ফাঁকে। হাসতে—হাসতেই বললে, কী নরম তোমার হাত! যার হাতের স্বাদ এমন, তার গোটা দেহের স্বাদ না জানি কত মিঠা। বড় ইচ্ছে হচ্ছে একটু পেয়ার করতে। ভয় নেই, বেশি সময় নেব না আমি।

দাঁতে দাঁত চেপে ইরা বললে, জানোয়ার!

বুক—পকেটটা বাজিয়ে সুজনলাল বলতে লাগল, ভেবেছিলাম রাজনগরের দেনাপাওনা আমার মিটে গেল, এখন দেখছি পাওনার ওপরে ফাউ রয়েছে আমার কপালে। জড়োয়াগুলো দামি বটে, খুবই দামি, কিন্তু আমার কাছে তার চেয়েও দামি তুমি। তোমায় পেয়ার না করে কি ছেড়ে দিতে পারি দেবীজী?

এক—পা এক—পা করে সুজনলাল এগোতে থাকে, আর এক—পা এক—পা করে পিছু হঠতে থাকে ইরা। সুজনলাল দেখছে তাজা রক্তমাংসের সমারোহ, ইরা দেখছে একটা ক্ষুধিত নেকড়ে।

আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেল প্রতাপবাবুর। বাইরে কে যেন ডাকছে,—হুজুর! হুজুর!

ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, কে?

মহাবল সিং, হুজুর, জলদি বাহার আইয়ে।

দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন প্রতাপবাবু। এখনও রাত রয়েছে। বারান্দার নিচে পাপড়ি—পরা একটি মূর্তি বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে। কিরীচের ফলাটা অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। প্রতাপবাবুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

কী হয়েছে মহাবল?

এক নিশ্বাসে মহাবল বলে উঠল, মেমসাহেব চ্যলা গ্যায়ি হুজুর—মিট্টিকা নিচে উস কবরস্থান মে—মানা নেহি শুনা।

মেমসাব! মানে, ইরা!

জী। একেলি গ্যায়ি।

সদ্য—ঘুমভাঙা প্রতাপবাবুর মাথায় মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গেল। তারপরেই হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো ডাকতে লাগলেন, প্রিয়তোষ! প্রিয়তোষ! জয়া।

উঠতে গিয়ে প্রিয়তোষের মাথার ব্যান্ডেজে টান পড়ল। যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল ঘাড় অবধি। তবু বেরিয়ে এল দ্রুত পায়ে।

ভীম পাহাড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে প্রতাপবাবু ব্যাকুল ভাবে বললেন, ইরা ওখানে চলে গেছে প্রিয়েতোষ!

এক সেকেন্ড মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়তোষ। তারপর এক ঝটকায় মহাবলের হাত থেকে বন্দুকটা নিয়ে দৌড়ল ভীম—পাহাড়ের দিকে।

জয়াকে নিয়ে প্রতাবাবুও ততক্ষণে মহাবলের সঙ্গে ফটক পার হয়ে পথে নেমে এসেছেন।

এক—পা এক—পা করে এগোচ্ছে সুজনলাল, আর এক—পা এক—পা করে পিছু হটছে ইরা।

সুজনলালের রক্তে টগবগ করে ফুটছে কামনার বিষ। আর, অসহ্য ঘৃণা ও ভয়ে পাক দিয়ে উঠছে ইরার দেহের প্রতিটি নাড়ি। হিম হয়ে আসছে ইরার দেহের শিরা—উপশিরা।

সুজনলাল বলছে, ওকি, অত নারাজ হচ্ছ কেন? আমিও তো প্রিয়তোষের মতো জোয়ান পুরুষ, জওয়ানির কদর আমিও জানি। দেখোই না জানি কিনা।

তাড়া—খাওয়া পশুর মতো পিছু হটতে হটতে ইরা যেখানে এসে দাঁড়াল, সেখানে আর পিছোবার জায়গা নেই। পেছনে তার শক্ত পাথরের দেয়াল, তারই অন্ধকার ফাটলের ভেতর থেকে ক্ষণে—ক্ষণে বেরিয়ে আসছে সুরু লকলকে একজোড়া জিব। ইরার সামনে সুজনলাল, পেছনে পাহাড়ি চন্দ্রবোড়া।

সুজনলালের মাংসলোলুপ চোখ দুটো উল্লাসে জ্বলছে। লালসার মদে জড়িয়ে এসেছে তার গলা। জড়িয়ে জড়িয়ে বললে—আর কষ্ট দিও না পেয়ারি। একবার পেয়ার করতে দাও তোমাকে—ব্যস, একটিবার।

দুঃসহ ঘৃণা আর ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল ইরা, খবরদার!

আঃ, কী হচ্ছে ইরা দেবী? এসো, কাছে এসো—

আর এগিয়ো না বলছি—

বেশ, তবে তুমিই এগিয়ে এসো পেয়ারি।

লুব্ধ হাত বাড়িয়ে ইরার একখানা হাত ধরে ফেললে সুজনলাল। আর সঙ্গে—সঙ্গেই চিৎকার করে উঠে তার হাতে দাঁত বসিয়ে দিলে ইরা।

কুৎসিত একটা গালাগালি দিয়ে হাতখানা টেনে নিল সুজনলাল। আর সেই সুযোগে সিঁড়ি লক্ষ্য করে ছুটল ইরা। কিন্তু সুজনলাল নেকড়ের মতোই চতুর আর ক্ষিপ্র। ইরার আগেই সে সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চিৎকার দিয়ে ইরা আবার উল্টো দিকে ছুটল।

তারপর শুরু হয়ে গেল শিকার আর শিকারির খেলা। এ—কোণ, এ—স্তম্ভের পাশ থেকে ও—স্তম্ভের পাশে। একটা হিংস্র হায়না যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ভয়াতুরা একটা বনহরিণীকে। মানুষের পায়ের আওয়াজে আর ভীত চিৎকারে সেই বাদুড়টা আবার পাখা ঝটপটিয়ে চক্কর দিতে লাগল সারা চত্বরে।

মরিয়া হয়ে উঠেছে সুজনলাল। হাতের মুঠোয় এসে কোনও কিছুই ফসকে যায়নি তার জীবনে। পা টলছে, মাথা টলছে, কপালের রগ বেয়ে ঝরছে ঘাম, তবু দু'হাত বাড়িয়ে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ইরাকে। উঁচু—নিচু পাথরে ঠোক্কর খেয়ে তার শার্টের দুই পটেক থেকে ছিটকে ছিটকে পড়ছে চুরি—করা সিঁথিমৌর, কণ্ঠহার আর মণিময় কঙ্কণ।

হাঁফিয়ে পড়েছে ইরা। ভয়, উত্তেজনা আর ঘৃণার তাড়নায় সে অন্ধের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে একটা আদিম বন্য—বিভীষিকার হাত থেকে মুক্তি পাবার প্রাণপণ ব্যাকুলতায়।

কিন্তু হল না। একটা স্তম্ভের পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে মেঝের আলগা পাথরে পা পড়ে গেল ইরার। পড়ে যাবার আগেই ঘামে ভেজা বলিষ্ঠ দুই হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেললে সুজনলাল। জালে পড়া পাখির মতোই ছটফট করতে করতে বিহ্বল আতঙ্কে ইরা গলা চিরে ডেকে উঠল, ধীমান—আমাকে বাঁচাও ধীমান—বাঁচাও আমাকে—

ইরার সেই ডাক পাথরের খিলানে খিলানে মাথা কুটে কাঁদতে লাগল। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না বহু শতাব্দীর সেই প্রাচীন বন্ধ কাঠের পেটিকার গর্ভ থেকে।

অন্ধ আকুল বিশ্বাসে ইরা আবার চিৎকার করে উঠল, ধীমান—ওঠো—বাঁচাও আমাকে—

তবু কোনো সাড়া এল না বন্ধ অন্ধ পেটিকা থেকে। শব শুধু শব হয়েই রইল, জাগল না। চামুণ্ডা—সাধক তান্ত্রিক দর্ভপাণির সমস্ত তন্ত্র—মন্ত্র বিংশ শতাব্দীর হাওয়ার স্পর্শে মিথ্যে হয়ে গেল।

লালসাসিক্ত দুই হাত দিয়ে ইরাকে তখন বুকের ওপর টেনে নিয়েছে সুজনলাল।

মরণান্তিক যন্ত্রণা আর ঘৃণায় ইরার গা পাক দিয়ে উঠল। সমস্ত শক্তি একত্র করে ইরা এবার চিৎকার করে কেঁদে ডাকল, প্রিয়তোষ!

পাথরের খিলানে খিলানে ধাক্কা খেয়ে এক ইরার কান্না শত ইরার কান্না হয়ে ডাকতে লাগল, প্রিয়তোষ! প্রিয়তোষ! প্রিয়তোষ!

উত্তরে পাখা ঝটপটিয়ে উঠল ভীত বাদুড়, ডেকে উঠল প্রাচীন তক্ষক।

তারপরেই সব চুপ।

অসাড় হয়ে গেছে ইরার দেই। সুজনলালের লোভী কুৎসিত মুখখানা নেমে এল ইরার রক্তহীন ঠান্ডা মুখের ওপর।

হঠাৎ সেই অস্বাভাবিক স্তব্ধতাকে টুকরো টুকরো করে অনেকগুলি গলার মিলিত ডাক শোনা গেল, ইরা! ইরা!

চকিতে ফিরে তাকাল সুজনলাল। আর, তার শিথিল আলিঙ্গন থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল ইরার সংজ্ঞাহীন দেহ।

সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের আওয়াজ করে নেমে এল রাইফেল হাতে প্রিয়তোষ আর তার পেছনে পেছনে প্রতাপবাবু, জয়া, মহাবল সিং।

প্রিয়তোষ আর সুজনলাল এক মুহূর্ত পরস্পরকে দেখলে। কিন্তু সে বোধ হয় এক মুহূর্তও নয়। নিমেষে প্রিয়তোষের হাতের রাইফেলের মুখ ঘুরে গেল সুজনলালের দিকে। কিন্তু ঘোড়া টিপবার আগেই সুজনলালের দিক থেকে টুকরো বিদ্যুতের মতো চকচকে ফলাওলা একটা ছুরি ছুটে এল প্রিয়তোষের দিকে।

ডান দিকে এক—পা সরে যেতে গিয়ে প্রিয়তোষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। রাইফেলের গুলিটা পাথরের স্তম্ভে একটু চিড় খাইয়ে দিল মাত্র।

সুজনলাল এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ল না। চোখের পলকে তার দেহটা সিঁড়ির ওপরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত হতচকিত হয়ে রইল সবাই। প্রিয়তোষ পর্যন্ত। তারপর তীর বেগে উঠে গেল সিঁড়ি দিয়ে।

ভীম পাহাড়ের আড়ালে চাঁদ ডুবে যাচ্ছে। উঁচু—নিচু পাথুরে ঢিবির আড়াল থেকে ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে আসছে জমাট অন্ধকারের দল। ভূগর্ভের বাইরে এসে প্রিয়তোষ এদিক—ওদিক তাকালে। দুই চোখে তার শিকারির দৃষ্টি অস্পষ্ট অন্ধকার ভেদ করে শিকারকে খুঁজতে লাগল। ওই—ওই তো সুজনলাল! বাঁ দিকের ওই ঢিবির পাশ দিয়ে তাড়া খাওয়া নেকড়ের মতো পালাচ্ছে।

চিৎকার করে উঠল প্রিয়তোষ,—খবরদরা! পালালেই গুলি করব।

শেষ কথাটা প্রতিধ্বনি লুফে নিলে, গুলি করব! গুলি করব! গুলি করব!

থমকে দাঁড়াল পলাতক সুজনলাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে উঁচু ঢিবির ওপর থেকে একটা জানোয়ারের ছায়ামূর্তি লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। কিন্তু না, জানোয়ার নয়। সুজনলালের মরণান্তিক চিৎকারকে ডুবিয়ে দিয়ে যে উন্মাদ অট্টহাসির রোলে শেষরাত্রির আকাশ—বাতাসকে কাঁপিয়ে তুলল, সে হাসি জানোয়ারের নয়, মানুষের।

সাত ব্যাটারির টর্চ হাতে বিভ্রান্ত প্রতাপবাবু ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে পাগলের মতো বিলতে লাগলেন, কী হল প্রিয়তোষ? কী হল? কী হল?

ঢিবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে প্রিয়তোষ সেই দিকে ছুটল। সঙ্গে সঙ্গে প্রাতাপবাবুও।

সাত ব্যাটারি টর্চের আলোয় দেখা গেল, পাথুরে মাটির ওপর পড়ে আছে সুজনলালের দেহ। আর তার বুকের ওপর বসে তখনও হাঁপাচ্ছে এক অদ্ভুত মূর্তি। মোটা—মোটা হাড়ওয়ালা দীর্ঘ শুকনো দেহ, মাথায় জটবাঁধা কাঁচা—পাকা রুক্ষ চুল, মুখময় দাড়ি গোঁফ, আর পরনে ছেঁড়া কুর্তা আর চোস্ত পায়জামা। তার দুই হাতের শক্ত কঠিন আঙুলগুলো সাঁড়াশির মতো চেপে ধরেছে সুজনলালের গলা।

আতঙ্কে প্রতাপবাবু বলে উঠলেন, সুজনলাল মরে গেল?

জী হাঁ, খতম!—অদ্ভুত চেহারার লোকটা মুখ ফিরিয়ে বলল। লোকটার একটা চোখ কানা, আর একটা চোখে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। দাড়ি—গোঁফ ভেদ করেও তার মুখে ফুটে উঠেছে পরম তৃপ্তির হাসি। বললে, পাঁচ বছর ধরে এরই অপেক্ষায় ছিলাম বাবুজী।

সবিস্ময়ে প্রতাপবাবু বললেন, তুমি—

লোকটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে মিলিটারি কায়দায় একবার স্যালুট করল। তারপর বললে, সিপাহী মাহিন্দার সিং।

মাহিন্দার সিং দু—পা এগোতেই প্রিয়তোষ তার হাত চেপে ধরে বললে, কোথায় যাচ্ছ?

শান্ত গলায় মাহিন্দার সিং জবাব দিলে, থানায়। থানা থেকে ফাঁসিকাঠে। সেখান থেকে লালীর কাছে।

তারপর এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে হা—হা করে হাসতে হাসতে শেষরাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

প্রিয়তোষ ফিরে চলল ইরার কাছে। আর, অধ্যাঢ়াপক আকের বার টর্চের আলো ফেললেন মৃত সুজনলালের মুখে। পাতা—খোলা আতঙ্কিত চোখের তারা দুটো বীভৎসভাবে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। সে তারার রঙ পিঙ্গল।

অধ্যাপকের মনে পড়ে গেল তান্ত্রিক দর্ভাপাণির শেষ কথাগুলি, 'স্বাতীর হত্যাকারী পিঙ্গলচক্ষু অশনি পৃথিবীর যেখানেই জন্মান্তর গ্রহণ করুক না কেন, তুমি তার দুষ্কৃতির প্রতিশোধ নিও ধীমান।'

দুর্ভাগা সুজনলালই কি সেই অশনি? কে জানে! অস্ফুট স্বরে অধ্যাপক বলে উঠলেন, দর্ভপাণির আত্মা হয়তো আজ তৃপ্ত হল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%