শঙ্খচূড়

প্রণব রায়

সম্বলপুর থেকে মোটর ছাড়ল রাত এগারোটায়। শিকারের বাতিক আছে, তাই দিন চারেকের ছুটিতে যাব দেবগড়। পথ বেশি দূর নয়, পঞ্চাশ কিলোমিটারের কাছাকাছি।

শহর ছাড়িয়ে মোটর পাহাড়ি রাস্তা ধরল। বাঁধানো পিচের রাস্তা। ক্রমশ চড়াই। বিরাট পাহাড়—রেঞ্জের গা বেয়ে, ঘুরে ঘুরে চলেছি। শরৎকালের শুরু। গেল বর্ষার তোড়ে প্রত্যেকটা কালভার্ট ভেঙে ভেসে গেছে। জল অবশ্য এখন নেই, কিন্তু ভাঙা সাঁকোগুলো এখনো মেরামত হয়নি। উঁচু রাস্তা থেকে সাবধানে পাশের খাদে নেমে আবার উঠতে হচ্ছে। সরাসরি বাঁধানো রাস্তা দিয়ে যাবার উপায় নেই। সময়ও তাই বেশি লাগছে।

মাঝ—রাত নাগাদ অনেকটা উঁচুতে এসে পৌঁছলাম। একপাশে খাড়া পাহাড়ের দেয়াল, অন্যপাশে নিচু জঙ্গল। শুধু নিচু নয়, গহন গভীর। কৃষ্ণপক্ষের রাত, শিবের জটার চাঁদের মতোই চাঁদের একটা ভগ্নাংশ আকাশে। তা দিয়ে থিয়েটারের সিন সাজানো যায়, পথিকের কাজে লাগে না। একটা বিশ্রী ঘোলাটে অন্ধকার আকাশে পাহাড়ে জঙ্গলে লেপে আছে।

রাতের অরণ্যকে চাক্ষুষ দেখতে দেখতে চলেছি। অনেক ভয়, অনেক রহস্য আর অনেক অজ্ঞাত। ইতিহাস জমা হয়ে আছে ওই অরণ্যে।

একটা ঝাঁকানি দিয়ে গাড়ি থেমে গেল। টুক করে নিভে গেল হেডলাইটের আলো।

ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হল?

ইশারায় সে বললে, সামনে দেখুন।

ঠাহর করে দেখলাম সেই ঘোলাটে অন্ধকারে। বাঁধানো পিচের রাস্তা জুড়ে গুটি তিনেক বাচ্চচা বনবেড়াল হুটোপুটি করে খেলছে। একপাশে একটি বৃহদাকার বনবেড়ালি থাবা পেতে বসে শিশুদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা দেখছে, আর মাঝে মাঝে লোভী সন্তানদের স্তন্য দিচ্ছে।

কিন্তু আমার ভুল হয়েছিল দেখতে। বনবেড়াল নয়, চিতা। মা—চিতা তার ছানাপোনাদের নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দিব্য সংসার পেতে বসেছে। সরকারি রাস্তা, সুতরাং কিছু বলা চলে না। বললাম, হেডলাইট জ্বেলে চলে গেলেই তো হয়। ওরা সরে যাবে।

ড্রাইভার বললে, না হুজুর, সরবে না, মা—চিতাটা সঙ্গে সঙ্গে দৌড়বে। লাফিয়ে গাড়িতে উঠতেও পারে।

অপেক্ষা করতেই হল। প্রায় আধ ঘণ্টা। তারপর মা—চিতা বোধহয় বললে, বাছারা, এবার ঘুমোবার সময়। চলো।

চিতা—পরিবার নিচের জঙ্গলে নেমে গেল। আমাদের মোটরও হেডলাইটের তীক্ষ্ন আলোয় অন্ধকার ফুঁড়ে এগোতে লাগল।

কিন্তু আধঘণ্টা যেতে না যেতেই আবার থামতে হল। নেভাতে হল আলো। আর সঙ্গে সঙ্গে রাতের আকাশ কাঁপিয়ে একটা কর্কশ চিৎকার দস্তুর মতো ঘাবড়ে দিল আমাকে।

ড্রাইভার বললে, ওর সঙ্গীটাকে ডাকছে।

না, বাঘ নয়, হাতি। ঘন মেঘের বরণ প্রকাণ্ড এক দাঁতালো হাতি পথের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীকে ডাকছে। ভাবলাম, এই যদি প্রিয়া সম্ভাষণ হয়, তবে দাম্পত্যকলহের চেহারাটা কেমন!

একটু পরেই পাশের বাঁশঝোপ মড়মড় শব্দে ভেঙে একটি তরুণী হস্তিনী এসে উপস্থিত হল। হাতির প্রেম দেখবার সৌভাগ্য ইতিপূর্বে আর হয়নি। দেখলাম, পুরুষ—হাতিটা তার শুঁড় বুলিয়ে প্রিয়ার সর্বাঙ্গে আদর করল খানিক। তারপর তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি টের পেয়েই বোধ করি আরো নিরিবিলি জায়গার সন্ধানে দুজনে জঙ্গলে ঢুকে গেল।

গাড়ি আবার ছাড়ল।

দেবগড় কাছে এসে পড়েছে। পথ আরো দুর্গম, পাহাড় আরো উঁচু, জঙ্গল আরো ভয়—ভীষণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এ আমার ভ্রমণ কাহিনি নয়, নেহাতই একটা গল্প। আষাঢ়ে গল্প। এটুকু তারই ভূমিকা।

দেবগড় পৌঁছতে রাত শেষ প্রহরে এসে পৌঁছল।

পাহাড়ের সর্বোচ্চচ মাথা খানিকটা কেটে সমতল করা হয়েছে। সেই সমতল স্থানে সামান্য তফাতে পাশাপাশি দুটি বাংলো বাড়ি। একসময় সে দুটি বাড়িই ছিল। প্রাচীন স্থাপত্যরীতিতে গড়া। হাল আমলে মেরামতি আর অদল—বদলের ফলে জাতে উঠে বাংলো হয়েছে।

বাংলো দুটি একই প্রাকার দিয়ে ঘেরা। ফটকের গায়ে মার্বেলের ওপর ওড়িয়া ভাষায় খোদাই করা 'বসন্তবিহার'। নামটা চেষ্টা করে পড়তে হল। কালের প্রলেপে শিলালিপি জীর্ণ স্মৃতির মতো অস্পষ্ট, শ্বেত পাথরও আর শ্বেত নয়, হলদেটে।

আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, একদা এই সবুজ বনে—ঘেরা গিরি—চূড়ায় রমণীয় বসন্তকালে কে বিহার করতেন আমার জানা নেই। তবে ভোরবেলায় আশপাশে তাকিয়ে জায়গাটার তারিফ না করে পারলাম না। বসন্তবিহারের তিনপাশে পাহাড়ি অরণ্য, আর এক পাশে ফটকের প্রায় গা ঘেঁষে পাহাড়ের দ্বিতীয় চূড়া, তারই গা বেয়ে প্রগলভা মেয়ের মতো হাসতে হাসতে একটি ঝরনা পাক খেয়ে খেয়ে সোজা লাফিয়ে পড়ছে পাতালে। তার মানে অন্তত হাজার ফুট নিচে। ঝরনাটার নাম বড় শৌখিন—রঙ্গিনী।

প্রথম বাংলোতেই আস্তানা পাতা গেল। থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি আরামদায়ক, খাওয়ার ব্যবস্থাও আধুনিক। কিচেন আছে, ডাইনিং টেবিলও আছে। কিন্তু রাঁধুনিটি সেই আদ্যিকালের—প্রভু জগড়নাথের চেলা।

বসন্তবিহারি আজকাল ব্যবহার হয় সরকারি 'টুরিস্ট লজ' হিসেবে। আমার সঙ্গে মা লক্ষ্মী বা হুইস্কির কেস নেই দেখে রাঁধুনি গোকুলঠাকুর আমার দিকে কেমন একটা অশ্রদ্ধার চোখে তাকিয়ে রইল। কেননা, পরে শুনলাম, পুজোর ছুটি থেকে নিউ ইয়ার্স ডে অবধি মদ আর মদালসা ছাড়া এখানে যাত্রী আসে না। বুঝলাম, গোকুলঠাকুরের শ্রদ্ধা আকর্ষণের জন্য ধার করেও একটি মা লক্ষ্মী জোগাড় করে আনা আমার উচিত ছিল। কিন্তুা তা যখন হল না, তখন দশ টাকার একখানা নোট তার হাতে দিয়ে বললাম, বাজার—টাজার তুমিই কোরো। হিসেব আমি বুঝি না।

গোকুলঠাকুর পাকা লোক। এক মুহূর্তে আমার ওপর তার অগাধ শ্রদ্ধা এসে গেল। তরমুজের বিচির মতো কালো দাঁতে হাসির অন্ধকার ছড়িয়ে বললে, বসন্তবিহারের মতো এমন স্থান গোটা উড়িষ্যা অঞ্চলে আর পাবেন না। দু'—চারদিন থেকে যান, গোপীনাথের দয়ায় রাধিকাদর্শন হয়ে যাবে।

গোকুলঠাকুরের কথার তাৎপর্য তখন ঠিক বুঝিনি। বুঝলাম সেদিন রাতের বেলা।

গোকুলঠাকুর রাঁধে ভালো। সব রকম ব্যঞ্জনই তার হাতে সমান। তাই ডালে ঝোলে বিশেষ পার্থক্য দেখা গেল না। বেলা একটার মধ্যে সে আমাকে খাইয়ে দিল। তারপর পারিপাটি নিদ্রা।

আমার ঘুম যখন ভাঙল, বেলা তখন পাঁচটা বাজে। বাংলোর হাতায় বেরিয়ে এসে দেখি, পাহাড়ের দ্বিতীয় চূড়ার আড়ালে গা—ঢাকা দিয়েছে সূর্য। আর পশ্চিমের আকাশটা কমিউনিস্ট পতাকার মতো লাল। পাহাড়ের দেয়ালে দিনান্তের আলো ঢাকা পড়ায় পুব দিকের হাতায় আর চারপাশের জঙ্গলে এরই মধ্যে একটা বিষণ্ণ ছায়া নেমেছে। দুপুরে হরেকরকম পাখিদের যে বিচিত্র মিষ্টি কূজন শুনেছিলাম, তা মিলিয়ে গিয়ে একটা একক পাখির কর্কশ ডাক একটানা শোনা যাচ্ছে কবর—কট, করর—কট। পাশে ঝরনা থাকার দরুন উড়ে—আসা জলকণায় বাতাসটা ভিজে আর ভারি।

হাতার বুক—সমান উঁচু পাঁচিলের কাছে গিয়ে দেখি, নিচের পাহাড়ি রাস্তায় দু'—একজন গরিব ওড়িয়া মেয়ে জঙ্গল থেকে শুকনো লকড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ে কয়েকটা বস্তি আছে। কিন্তু কী অস্বাভাবিক নির্জনতা!

শরৎকালের ঝলমলে দিনের বেলা বসন্তবিহারকে ভালো লেগেছিল। প্রকৃতির সঙ্গে একটা নিবিড় বন্ধুতার সম্পর্ক বোধ করেছিলাম। কিন্তু এখন এই ঘনিয়ে—আসা সন্ধ্যার ছায়ায় বসন্তবিহার রূপ বদলেছে। বহু পুরাতন কবরখানার মতো কেমন একটা গা—ছমছমে স্তব্ধতা চারপাশে! বাতাসে স্যাঁৎসেতে মন—মরা ভাব!

কেন? বসন্তবিহারে বসন্ত কি আর আসে না?

একা একা সময় কাটে না। রাতে সকাল সকাল খাবার টেবিলে বসা গেল। দিনের বেলা দেখেছিলাম গোকুল মুর্গির পালক ছাড়াচ্ছে। কিন্তু রাতে খেতে বসে চাপাটির সঙ্গে একবাটি সুক্তোর ঝোল দেখে হতাশ হলাম। একটু বাদেই অবশ্য ভুল ভাঙল। বাটির মধ্যে একটা মুর্গির ঠ্যাং আবিষ্কার করে বুঝলাম গোকুল আমায় ঠকায়নি।

খাওয়া—দাওয়া সেরে বিছানায় আড় হয়ে পেঙ্গুইন সিরিজের গোয়েন্দা উপন্যাসে ডুব দিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে বসন্তবিহারও অন্ধকারে ডুব দিল। একে একে বাতিগুলো নিভিয়ে গোকুলঠাকুরও ঢুকল নিজের ঘরে। জ্বলতে লাগল শুধু আমার ঘরের টেবিল ল্যাম্প।

দুপুরে পরিপাটি নিদ্রার ফলে রাতে ঘুম আমার সঙ্গে ভাসুর—ভাদ্রবউ সম্পর্ক পাতিয়েছে। তার ওপর গোয়েন্দা গল্পটাও জমাটি। রাত গড়িয়ে কোথায় পৌঁছেছে, পড়তে পড়তে খেয়াল হয়নি। খেয়াল হল সিগারেটের বাসনায় যখন পড়া থামালামত।

রাতে মানুষ যখন ঘুমোয়, অরণ্য তখন জাগে, কথা কয়। অদ্ভুত ভাষা শুনতে পেলাম আশপাশের জঙ্গল থেকে। শুকনো পাতার খসখস, থেকে থেকে রাতচরা পাখিদের অস্পষ্ট কাৎরানি, ভুখা চিতার চাপা আস্ফালন। আরো নানাবিধ অজানা অস্বস্তিকর শব্দ।

ঠিক এই জাতের রাতের সঙ্গে আমার কিছু পরিচয় ছিল। সিগারেট ধরাতে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত থমকে থেমে রইলাম। তারপর আবার পেঙ্গুই সিরিজে মন দিলাম।

হঠাৎ বই থেকে মনটা সরে গেল।

বাঁশির আওয়াজ!

কে যেন বাঁশের বাঁশি বাজাতে বাজাতে পাহাড়ের নিচে থেকে উঠে আসছে। আশ্চর্য মোহময় সেই সুর! যেন সম্মোহন করে। মেঠো জংলা সুর, তবু তার মূর্ছনা রক্তে মিশে যেন উতলা করে তোলে।

এই নিশুতি বুনো রাতে জঙ্গলের পথে কোন পাগল বাঁশুরিয়ার প্রাণে ভাব এসেছে কে জানে! সে যেই হোক, বাঁশিতে তার দখল আছে বলতেই হবে। কিন্তু বাঁশি বাজার এই কি সময়? আর এই কি স্থান?

বাঁশির সঙ্গে ও আবার কি?

ঝুম—ঝুম, ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম!

উৎকর্ণ হয়ে শুনতে লাগলাম। নূপুর বাজছে। মৃদু—অতি মৃদু শব্দে। নূপুর যেন সন্ত্রস্ত, পাছে কেউ জানতে পারে।

মনে হল ঝুম—ঝুম আওয়াজটা আসছে বসন্তবিহারের দ্বিতীয় বাংলোর দিক থেকে।

বাঁশি উঠে আসছে পাহাড়ের নিচে থেকে, আর নূপুর চলেছে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে।

ওই জংলা বাঁশি এত রাতে ডাকবেই বা কাকে? আর মুখরা নূপুরকে শাসন করতে করতে চলেছেই বা কোন পাহাড়ি গ্রাম্য রাধা?

বড় কৌতূহল হল। অগ্র—পশ্চাৎ কিছু না ভেবেই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম বাংলোর হাতায়। ভাবলাম না নিচু পাঁচিল টপকে নিশাচর চিতা যে কোনো মুহূর্তে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, পায়ের তলায় কিলবিল করে উঠতে পারে পাহাড়ি চন্দ্রবোড়া।

ধূসর আকাশে কৃষ্টপক্ষের ভাঙা চাঁদ। ঝিমঝিমে জ্যোৎস্নায় চারধারে তাকিয়ে দেখি আমি ছাড়া কেউ নেই।

তবে কি ভুল শুনলাম? রাত—জাগা মস্তিষ্কের বিভ্রান্ত কল্পনা?

কিন্তু না, ওই তো আবার বাজছে বাঁশি! কাছে আসছে ক্রমশ। তার সঙ্গে ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম। অতি সাবধানী নূপুর ফটক পার হয়ে নেমে যাচ্ছে ঢালু রাস্তায়।

হতচেতনের মতো কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ ছটফটিয়ে উঠল রাতের হাওয়া। অরণ্যের শাখায় শাখায় হাহাকার তুলে শনশন করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। ককিয়ে উঠল রাতচরা একটা পাখি। আর সমস্ত শব্দকে ছাপিয়ে এক নারীকণ্ঠের ব্যাকুল ভয়ার্ত ডাক শোনা গেল: সুদা—আ—আ—ম!

ডাকটা এলো যেন ওই রঙ্গিনী ঝরনার দিক থেকে।

একটি গলার ডাক কোটি কণ্ঠের ডাক হয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে অরণ্যে অরণ্যে মাথা কুটতে লাগল। শিউরে উঠল রাত্রি, শিউরে উঠলাম আমি।

কে ডাকে অমন করে? কাকে ডাকে?

অস্বচ্ছ জ্যোৎস্নায় ভালো করে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। কেউ নেই!

রাত এখনো বাকি।

সাহস ফুরিয়ে গেল হঠাৎ। এক—পা এক—পা করে ঘরে ফিরে গেলাম।

দুই

সকালে চা নিয়ে এলো গোকুলঠাকুর।

জিজ্ঞেস করলাম, কাল রাতে বাঁশি বাজাচ্ছিল কে?

গোকুল বললে, রাতে ঘুম হয়নি বুঝি?

বললাম না। মেয়েছেলে কেউ এখানে থাকে নাকি? ঝুম—ঝুম করে নূপুর বাজছিল, অথচ কাউকে দেখা গেল না।

গোকুলের মুখে উদ্বেগ দেখা গেল। বললে, রাতে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন নাকি?

ঘাড় নাড়লাম।

গোকুলও মাথা নেড়ে বললে, আর বেরোবেন না। চিতেয় ধরবে।

বুঝলাম, গোকুল আমার প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাই সোজাসুজি প্রশ্ন করলাম, তুমি বলেছিলে এখানে রাধাদর্শন হবে। শুধু নূপুরই শুনলাম—কই, দর্শন হল না তো?

কালো দাঁতে অমাবস্যার হাসি ছড়িয়ে গোকুল বললে, হবে বৈকি! সবে তো দুদিন এসেছেন। গোপীনাথের দয়া হলেই দর্শন হবে। তবে রাত—বিরেতে ঘর থেকে একা বেরোবেন না যেন।

গোকুল কিচেনে ফিরে গেল। বলে গেল এবেলা মোচার কোপ্তা খাওয়াবে।

খুবই আশার কথা। কিন্তু খেতে বসে এই মুহূর্তে গয়ায় চলে যাব কিনা ভাবতে লাগলাম। গোকুলের তৈরি মোচার কোপ্তা নিয়ে অনায়াসেই পিতৃপুরুষকে পিণ্ডদান করা যায়!

দুপুরে আজ আর ঘুমের চেষ্টা করলাম না। খানিক বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জায়গাটা ঘুরে—ফিরে দেখতে। বেলা তখনো আছে।

ঢালু রাস্তা ধরে নামতে নামতে অনেকটা নিচে নেমে এলাম। পাহাড়ের মাঝামাঝি। রাস্তাটা এখানে দু'—ভাগ হয়েছে। বাঁয়ের রাস্তাটা খাঁজ—কাটা, একসার সিঁড়ির মতো জঙ্গলের মধ্যে নেমে গেছে। যেখানে এসে থেমেছে, সেখানে মস্তবড় একটা ফাঁকা চত্বর। সেই চত্বরে প্রাচীন এক পাথরের মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, তারই সামনে নাট—মন্দিরের দু'—তিনটে নকশা—কাটা থাম ইতিহাসের রাজ—দরবারে নির্বাক শাস্ত্রির মতো এখনো দাঁড়িয়ে। ভাঙাচোরা মন্দিরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, উঁচু বেদির ওপর মানুষপ্রমাণ শ্রীকৃষ্ণমূর্তি। কষ্টিপাথরে গড়া। পিলসুজে একটি প্রদীপ জ্বলছে, বিগ্রহের গলায় ফুলের মালা। পায়ের কাছে তুলসীপাতা। বোঝা গেল আজো নিয়মিত পূজা হয়।

এই তাহলে গোপীনাথ!

মন্দিরের দরজার সামনে বসলাম। দরজায় ক্ষয়—ধরা একটা বিরাট পাল্লা কাত হয়ে ঝুলছে, আরেকটা নেই। আমি আর্টের ছাত্র নই, তবু চোখে আমার পলক পড়ল না গোপীনাথের রূপ দেখে। কোন শতকে কোন শিল্পী এই মূর্তি গড়েছিল, ইতিহাস তার নাম মনে রেখেছে কিনা জানি না, আমি কিন্তু সেই অজ্ঞাত প্রতিভাকে নমস্কার জানালাম।

একদিন এই মন্দির নিশ্চয় শত দীপে আলো হয়ে উঠত, অগুরু—ধূপের সুগন্ধে ভরে থাকত, ঝুলন পূর্ণিমা দোল পূর্ণিমায় কত উৎসব হত এর নাট—অঙ্গনে। আর, আজ এই মন্দির দিনে অতীতের শ্মশান, রাতে হয়তো পাহাড়ি ময়াল আর চিতাদের আশ্রয়।

কালের চেয়ে দুরন্ত কালাপাহাড় আর কে আছে?

ঝুম—ঝুম, ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম!

চমকে উঠলাম। এবারে আওয়াজ অত মৃদু সন্ত্রস্ত নয়, অত দূরেও নয়। ধীরে ধীরে নূপুরধ্বনি আরো স্পষ্ট, আরো ছন্দময় হয়ে উঠল। কে যেন খুব কাছাকাছি চলে ফিরে বেড়াচ্ছে।

না, চলে ফিরে নয়, কে যেন নাচছে! ধ্রুপদী অঙ্গের বিচিত্র ছন্দে, লয়ে, যতিতে। সঙ্গে বাজছে মৃদঙ্গের বোল, তারের ঝঙ্কার, মন্দিরার তাল।

সে কি গোপীনাথের রাধা? না মন্দিরের পেছনে কোনো নর্তকী লুকিয়ে নাচছে?

কিন্তু না, মন্দিরের পিছনে কেউ নেই। চত্বরের আশপাশে জঙ্গলের আড়ালেও কেউ নেই। এদিক ওদিক সেদিক খুঁজে আবার সেই শূন্য নাটমন্দিরে এসে দাঁড়ালাম।

বেলা তখন পড়ন্ত। দিবা আর সন্ধ্যার সেই সন্ধিক্ষণে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের বুকে দাঁড়িয়ে সেই অপার্থিব নূপরধ্বনি শুনতে শুনতে সমস্ত চেতনা আবার যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল।

হঠাৎ পাহাড়ি রাস্তায় খটাখট খটাখট শব্দ হতে লাগল। কঠিন পাথরে ঘোড়ার খুরের শব্দ! এই জনহীন পাহাড়ে কোন ঘোড়সওয়ার যায়? ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উঠে সেই দ্বিধাবিভক্ত রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। পড়ন্ত বেলার মরা আলোয় দেখলাম, হাওয়ায় শুকনো পাতা উড়ছে।

কেউ নেই!

তবে কি সবটাই আমার দিবাস্বপ্ন!

হবেও বা।

বসন্তবিহারে যখন ফিরে এলাম, দেবগড় পাহাড়ের আড়ালে তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে। জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে বটের ঝুরির মতো নামছে অন্ধকার।

গেট থেকে নজরে পড়ল দ্বিতীয় বাংলো থেকে একটি স্থূলকায় শিম্পাঞ্জি জাতীয় জীব বেরিয়ে আসছে। অস্পষ্ট অন্ধকারেও চিনলাম, রূপবান গোকুলঠাকুর ছাড়া কেউ নয়। কিন্তু সন্ধ্যার ঝোঁকে ওই যাত্রীহীন বাংলোয় গোকুল কেন?

জিজ্ঞেস করলাম, ও—বাংলোটায় লোক এল নাকি?

না হুজুর। ওটায় কেউ আসে না।

তবে ওখানে কি করছিলে?

গোকুল বললে, বাতি জ্বালতে গেছিলাম। কখন তিনি আসবেন, বলা তো যায় না।

তিনি! তিনি কে?

অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে গোকুল জবাব দিল, রাধা ঠাকরুণ।

রাধা ঠাকরুণ! সে আবার কে?

জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে গোকুল বললে, গোপীনাথ জীউর রাধা।

তাজ্জব হয়ে গেলাম। বলে কি! শ্রীকৃষ্ণের রাধাও আমার মতো টুরিস্ট হয়ে বৃন্দাবন থেকে দেবগড়ের বসন্তবিহারে আসেন! নাকে কেমন একটু রহস্যের গন্ধ এসে ঠেকল। মনে পড়ল, প্রথম যেদিন এখানে আসি, আমার সঙ্গে 'রাধা' নেই দেখে গোকুল বীতশ্রদ্ধ হয়েছিল। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমার জানতে বাকি নেই যে, এই ধরনের টুরিস্ট লজে বা ডাক—বাংলোয় খানসামারা বকশিশের বিনিময়ে 'রাধা' সাপ্লাই করে থাকে। গোকুলঠাকুরও 'রাধা'র স্টকিস্ট নাকি? আর, ওই দ্বিতীয় বাংলোতেই ওর স্টক থাকে বোধ হয়? তাই রাত দুপুরে বাঁশি বাজিয়ে আর নূপুরের আওয়াজ শুনিয়ে খদ্দেরকে চারে ফেলার চেষ্টা করে।

বললাম, চলো না গোকুল, ও—বাংলোটা দেখে আসি।

গোকুল একটু থতিয়ে গিয়ে বললে, কালই সকালে যিব!

গলায় একটু জোর দিয়ে বললাম, না, এখনই যিব। রাধা ঠাকরুণ যখন আসে, তখন ওটা তো তীর্থস্থান।

গম্ভীর হয়ে গেল গোকুল। চাবিটা আমার হাতে দিয়ে বললে, মু যিব না।

তারপর কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল।

দরজায় গোকুল তালা দিয়ে এসেছে ভাবিনি। কিন্তু তালাটা লোকের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার একটা ধাপ্পাবাজিও হতে পারে। কৌতূহল হল, দেখাই যাক না ভেতরে কি আছে।

ঘর থেকে টর্চ নিয়ে দ্বিতীয় বাংলোতে গিয়ে উঠলাম। তালা খুলে কপাট দুটো ঠেলতেই ক্যাঁচ করে আওয়াজ হল। মনে হল, এ বাংলোটা বহুদিন ব্যবহৃত হয়নি। বাড়িটা প্রথম বাংলোর চেয়ে আকারে ছোট। মেরামতের ফলে এর সমুখটাই আধুনিক হয়েছে, ভেতরে প্রাচীনত্ব বিশেষ বদলায়নি।

দু'খানা ঘর। একখানা অপেক্ষাকৃত বড়। সাদা—কালো পাথরের পদ্ম—কাটা মেঝে, লাল পাথরের দেয়ালে লতাপাতার নকশা। খিলানওয়ালা ছোট ছোট জানলাও আছে, কিন্তু জানালা না বলে তাকে গবাক্ষ বলাই ভালো। সবগুলোই বন্ধ ছিল, খুলে দিলাম। ঘরে পা দিতেই অবরুদ্ধ বাতাসে একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে ঠেকল। আশ্চর্য, একটু বাদেই কিন্তু যে—গন্ধটা পাওয়া গেল, সেটা ভ্যাপসা নয়, অতিক্ষীণ মৃগমদসৌরভ! যেন কোনো বিলাসিনীর কেশের গন্ধ। অনেকদিন আগে শিকারের জন্যে নসিবপুরের রাজবাড়িতে অতিথি হয়েছিলাম। সেখানকার অন্দরমহলে দু'বেলা খেতে যাবার সময় ঠিক এই অপূর্ব কবিরাজি কেশ—তৈলের গন্ধ পেতাম।

পরিচ্ছন্ন ঘর। শামাদানে একটা আধপোড়া মোমবাতি জ্বলছে। তারই আলোয় দেখলাম, ঘরের আরেক পাশে চৌকির ওপর একখানা থালায় একগাছি টাটকা—গাঁথা শিউলির মালা, দু'—খিলি সাজা পান আর এক গেলাস জল রয়েছে।

অথচ গোকুল বললে, এ বাংলোয় কেউ আসে না! আসে নিশ্চয়, তবে প্রকাশ্যে নয়। নইলে কার জন্যে বাতি জ্বালা? কার জন্যেই বা পুষ্পমালা, তাম্বুল আর জল?

দেখতে হবে কে সেই নেপথ্যচারিণী, যে অলক্ষ্যে এই বসন্তবিহারে বিহার করতে আসে? গোকুলেরই বা এত লুকোচুরির হেতু কি? আমি লম্পট না হতে পারি, কিন্তু ভীষ্মদেব তো নই!

অপর ঘরে গেলাম। অপরিচ্ছন্ন, অন্ধকার। গোটা কয়েক চামচিকে ঝটপট করে উঠল। সেখান থেকে দালান, বারান্দা, স্নানের ঘর, রসুই—ঘর, উঠোন।

কেউ কোথাও নেই! এখনো আসেনি। হয়তো রাত বাড়লে চুপিচুপি আসবে।

সদরে তালা দিয়ে চলে এলাম। মতলব করলাম, চাবিটা গোকুল না চাইলে আজ আর দেব না।

আজ রাতের স্পেশাল ডিশ পুডিং।

গোকুল জানালে, তার হাতের কাস্টার্ড পুডিং খেয়ে একবার সাহেব তাকে বিলেত নিয়ে যেতে চেয়েছিল। শুনে উৎফুল্ল হলাম। কিন্তু হায়, আমার কপালে পুডিং হয়ে দাঁড়াল প্রায় বেগুনের ভর্তা!

গোকুলের ভাগ্য ভালো যে, সাহেবের সঙ্গে বিলেত যায়নি। গেলে সাহেব তাকে নির্ঘাত ইংলিশ চ্যানেলের জলে ফেলে দিত।

যাই হোক, শুধু মুরগির শুক্তো দিয়েই ডিনার সমাপ্ত করা গেল। তারপর ঘরে নয়, বারান্দায় বেতের চেয়ারে সিগারেট ধরিয়ে বসলাম। বারান্দায় আবছায়া অন্ধকার। আজ আর ঘুম—পরিকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছি না।

গোকুল এসে শুধোলে, ঘরে শুতে যাবেন না?

বললাম, ঘুম পেলে যাব। তুমি শুয়ে পড়োগে।

গোকুল গেল না। আমতা আমতা করে বললে, সেপাকু জঙ্গল অছি পরা—চিতে অছি।

হাতের টর্চ আর পাশে রাখা দোনলা বন্দুকটা দেখালাম। আমি শিকারি, অরণ্যবাসী কোন শ্বাপদ আমার কুশল জানতে এলে তার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করেই রাখি।

আমার বাইরে থাকাটা তবু গোকুলের মনঃপূত হল না। বললে, কেতে কালিনাগ শঙ্কচূড় অছি!

বললাম, আমিও সাপের ওঝা অছি।

গোকুল এবার আস্তে আস্তে চলে গেল। মনে হল, ও আমাকে ভয় দেখিয়ে ঘরে পাঠাবার মতলবেই এসেছিল। আমি বাইরে থাকলে ওরই যেন বিশেষ অসুবিধা। এমন ধোয়া—মোছা উঁচু বারান্দায় সাপের আসার সম্ভাবনা যদিচ কম, তবুও পা দুটো চেয়ারে তুলেই বসলাম।

বারান্দার যেখানটায় বসলাম, সেখান থেকে দ্বিতীয় বাংলোটা সোজা নজরে পড়ে। সেদিকে চোখের পাহারা রেখে চুপচাপ সিগারেট ফুঁকতে লাগলাম। দেখি, নেপথ্যচারিণী রাধা কখন দ্বিতীয় বাংলোয় রসকেলি করতে আসে! আর, দেখি শ্যামচাঁদটিই বা কে—গোকুলঠাকুর স্বয়ং, না আর কোনো রসিকজন? চাবিটা যদিচ আবার পকেটে, তবু ডুপ্লিকেট কি থাকতে পারে না?

পেঙ্গুইন সিরিজের গোয়েন্দা যেন আমার কাঁধে ভর করল। সজাগ গোয়েন্দার মতো জেগে থাকতে থাকতে সিগারেটের প্যাকেট ফুরিয়ে এল। হাতঘড়ির রেডিয়াম—ডায়ালে ছোট কাঁটাটা দশটার ঘর থেকে একটার ঘরে এসে পৌঁছাল।

কিন্তু কোথায় কে!

ঝিমঝিমে চাঁদনি রাত। চারদিক নিশুতি। মাঝে মাঝে শুধু অরণ্য বিকারগ্রস্ত রোগীর মতো এলোমেলো কথা কয়ে উঠছে। কখনো শুকনো পাতার ফিসফিস মর্মরে, কখনো চিতা—হায়েনার ক্রুদ্ধ আস্ফালনে, কখনো বা রাতচরা পাখির কর্কশ কাতরানিতে প্রলাপ বকছে অরণ্য।

বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখের পাতা জুড়ে এসেছিল, টের পাইনি। তন্দ্রা ছুটে গেল বাঁশির আওয়াজে। সেই অলৌকিক বাঁশি, আর সেই আশ্চর্য সুর! সোজা হয়ে চেয়ারে বসলাম। একটু বাদেই নূপুরধ্বনি শোনা গেল, ঝুম—ঝুম, ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম!

চেয়ে দেখি, কৃষ্ণা চতুর্থীর ভাঙা চাঁদ পশ্চিমে হেলে পড়েছে। কিন্তু শেষ—রাতের আকাশে এ কী অদ্ভুত আলো! মার্কারি ল্যাম্পের আলো নয়, অথচ তেমনিধারা স্নিগ্ধ নীলচে দ্যুতি। সেই অপার্থিব ছটায় দেবগড় পাহাড়ে এক আশ্চর্য মায়া—জগৎ তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় বাংলোর দিকে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি আমার স্থির হয়ে গেল। পলক ফেলতে ভুলে গেলাম। অতি সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে একটি মেয়ে নেমে আসছে। আর ভীরু পায়ের নূপুর বাজছে ঝুমঝুম ঝুমর—ঝুম! মেয়েটি যুবতী। সুঠাম দেহ। পরনে গাঢ়—নীল শাড়ি, দেহের ঊর্ধ্বাংশ পাতলা কালো ওড়নায় ঢাকা। শুধু বেরিয়ে আছে মুখখানি আর মণিবন্ধ পর্যন্ত দুটি করতল। সেই অনৈসর্গিক নীলাভ আলোয় গৌরবর্ণ মুখখানি নীরক্ত পাণ্ডুর দেখাচ্ছে। কিন্তু চোখ মুখ নাক যেন তুলি দিয়ে আঁকা। বড় বড় দীর্ঘপল্লব চোখ দুটিতে সন্ত্রস্ত চাহনি। টিকালো নাকে সোনার বেসর। আঙুলের রত্নাঙ্গুরী আর মণিবন্ধের মণিময় কঙ্কণ ঝিলিক দিয়ে উঠছে।

কে এই রূপসী যুবতী? কোথা থেকে এল, কোথায় যাচ্ছে? ওই যাদু—ভরা বাঁশি কি একেই ডাকছে? এই কি গোকুলঠাকুরের রাধা? রাধাই বটে! গোকুলের রুচি আছে বলতে হবে। এমন রাধার জন্যে সমরখন্দ বোখারা না হোক, সমগ্র উড়িষ্যা বিলিয়ে দেওয়া যায়।

মেয়েটি আলগোছে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসছে। বারান্দা থেকে বাংলোর হাতায়। আমি সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে দেখছি।

কাছে আসছে মেয়েটি। আরো কাছে। আমার বারান্দার পাশ দিয়ে যাচ্ছে নিলাজ নূপুরকে শাসন করতে করতে।

চকিতে হাতের টর্চ টিপে বললাম, কে?

সাত ব্যাটারির হান্টিং টর্চের উজ্জ্বল আলোয় দিন হয়ে গেল বাংলোর হাতার একটা অংশ।

কিন্তু কই সে রূপসী রাধা? তীব্র উজ্জ্বল আলোর ঝলকে যেন মোমের পুতুলের মতো নিমেষে গলে মিশিয়ে গেল সে! বাঁ হাতে চোখ দুটো মুছে দেখলাম। টর্চের রশ্মি সারা হাতায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলাম।

কোথাও নেই! মেয়েটি কোথাও নেই!

বোকা বনে গেলাম। এক লহমার মধ্যে কোথায় চলে গেল সে? নাকি হাওয়ায় উবে গেল।

কিন্তু টর্চ নিভিয়ে দিতেই আবার সেই ঝুম—ঝুম, ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম! চমকে তাকিয়ে দেখি, না, যায়নি, ফটকের দিকে ওই তো চলেছে চতুরা রাধা! আমি টর্চের বোতাম টিপবার সঙ্গে সঙ্গেই ও বোধহয় আলোর সীমানার বাইরে চকিতে গা—ঢাকা দিয়েছিল। অথবা পাঁচিলের অন্ধকার কোণে।

আবার সেই অপার্থিব মৃদু নীলাভ আলোর ছটা! সেই আলোয় স্পষ্ট দেখলাম মেয়েটি চলে যাচ্ছে। সেই ঘন নীল শাড়ি, সেই কালো ওড়না, মেখলা—পরা সেই গুরু নিতম্বের মন্থর ছন্দ!

পাহাড়ি পথ বেয়ে বাঁশি ক্রমশ এগিয়ে আসছে ফটকের কাছে, আর নিতম্বিনীও চলেছে ফটকের দিকে এগিয়ে ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম।

পা টিপে টিপে অন্ধকারেই ওর অনুসরণ করলাম। বারান্দায় বন্দুকটা ফেলে যেতে ইচ্ছা হল না, তুলে নিলাম হাতে।

ফটকের ফাঁক দিয়ে সোজা রাস্তাটা দেখা যায়। ঢালু হয়ে নেমে গেছে। দেখা গেল, আবছায়া অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তি উঠে আসছে। মাথার বাবরি চুলের গুচ্ছ আর সরু কোমর দেখে আন্দাজ করা যায় সে তরুণ।

মেয়েটি একবার থমকে দাঁড়াল, তারপর ফটক পার হয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল। নিলাজ নূপুর লজ্জা—ভয় ভুলে এবার প্রগলভার মতো হেসে উঠল ঝুম—ঝুম, ঝুম—ঝুম!

দেবগড়ে এসেছি শিকারের উদ্দেশ্যে, কিন্তু কে জানত এই জংলা পাহাড়ে এমন একটা গুপ্ত প্রণয়—নাট্যের দর্শকের ভূমিকা কপালে জুটবে! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম।

মেয়েটি প্রায় ছুটে চলেছে।

বাঁশুরিয়া এগিয়ে চলেছে।

মাত্র হাত কয়েক ব্যবধান, এমন সময় ঘোড়ার খুরের খটাখট খটাখট শব্দে পাহাড়ি রাস্তা গমগম করে উঠল।

ছায়াবাজির মতো পলকে মিলিয়ে গেল দুটো ছায়ামূর্তি! জনহীন পাহাড়ি—পথের পাথরে পাথরে শুধু বাজতে লাগল ধাবমান অশ্বখুরের কঠিন শব্দ—খটাখট খটাখট খটাখট!

আর, সেই সঙ্গে রঙ্গিনীর দিক থেকে শোনা গেল নারী—কণ্ঠের সেই ভয়ার্ত সকরুণ চিৎকার, সুদা—আ—আ—ম!

নিথর রাত্রি শিউরে উঠল। কোথায় যেন ককিয়ে উঠল একটা কালপ্যাঁচা। শাখায় শাখায় হাহাকার তুলে অস্থির হয়ে উঠল ভয়াল অরণ্য। নির্জন পাহাড়ে সেই অলৌকিক পরিবেশের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিল। সব যেন ওলোট—পালোট হয়ে গেল মাথার মধ্যে। ঝরর্ণার দিকে হাতের বন্দুকটা তুলে পাগলের মতো পরপর দুটো ফায়ার করলাম।

ঢালু রাস্তায় নেমে যেতে লাগল ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। ক্রমশ দূরে। আর তারই সঙ্গে পুরুষ—গলার বিশ্রী কর্কশ হাসি হা—হা—হা—হা!

সেদিকে বন্দুকের মুখ ফিরিয়ে আবার ফায়ার করতে যাচ্ছিলাম, একখানা রোমশ শক্ত হাত আমার হাতখানা চেপে ধরল।

হুজুর! হুজুর!

সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি গোকুলঠাকুর। বন্দুকের আওয়াজে ছুটে এসেছে।

ঘরে চলুন হুজুর। গোকুল বললে।

রাত তখন শেষ। পুবদিক ফরসা হয়ে আসছে।

বললাম, ওরা কারা এসেছিল? ওই বাঁশিওয়ালা, ঘোড়সওয়ার আর ওই নূপুর—পায়ে মেয়েটি—ওরা কারা?

গোকুল সে—কথার জবাব দিলে না। শুধু বললে, রাতে আপনাকে বাইরে বেরোতে মানা করেছিলাম, কেন বেরোলেন? ঘরে চলুন।

বললাম, আগে বলো ওরা কারা?

গোকুল নির্বাক হয়ে গেল।

আবার বললাম, এ বাড়ি এখন সরকারি বাংলো। সরকারি চাকরি করো তুমি। সত্যি কথা না বললে আমি রিপোর্ট করে দেব গোকুল, জানিয়ে দেব যে রাত হলে ওই বাংলোটায় মেয়েছেলে আমদানি হয়।

গোকুল এবার কাঁদো—কাঁদো হয়ে বললে, মহাপ্রভুর দিব্যি, উনি মানুষ নন হুজুর, গোপীনাথের রাধা।

কড়া গলায় বললাম, চালাকি পেয়েছ? গোপীনাথের রাধা এখানে আসবে কেন? তোমার হাতের রান্না খেতে?

গোকুল বললে, চাবিটা সঙ্গে আছে? আসে কিনা দেখবেন আসুন।

গোকুল আমাকে নিয়ে গেলে দ্বিতীয় বাংলোয়। সেখানে আরেকটা রোমাঞ্চকর বিস্ময় আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। দরজা খুলে বড় ঘরে ঢুকলাম। খোলা দরজা দিয়ে উষার আলো এসে পড়েছে। দেখলাম, গেলাসের জল অর্ধেক, পানের একটা খিলি নেই, শিউলিফুলের মালা জানলার ধারে পড়ে। আর—

পদ্ম—কাটা মার্বেলের মেঝের ওপর আলতা—পরা পায়ের কয়েকটি ছাপ! যেন লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা!

গোকুল বললে, দেখুন, চাবি তো সারারাত আপনার কাছেই ছিল। দোর বন্ধ থাকলে মানুষ কি ঢুকতে পারে?

বললাম, পারে বইকি। চাবির নকল থাকলেই ঢুকতে পারে?

গলায় জোর দিয়ে গোকুল বললে, বিশ্বাস করুন হুজুর, চাবির নকল নেই। নিচের বস্তিতে আমার বেটা থাকে, আমি তার মাথায় হাত দিয়ে বলতে পারি।

গোকুলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল। ছেলের নামে শপথ করে কোনো বাপই মিথ্যে বলতে পারে না। ওর মুখ দেখে বুঝলাম, গোকুলও মিথ্যে কথা বলছে না। কিন্তু ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে রোমাঞ্চে আমি হতবাক হয়ে গেলাম কিছুক্ষণ।

তারপর জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে ওই বাঁশিওয়ালা কে? ওই কি গোপীনাথ?

না, ও সুদাম। সুবল পোটোর ছেলে।

তবে রাধা কি গোপীনাথকে ছেড়ে সুদামের সঙ্গেই দেখা করতে আসে?

তাই আসে হুজুর। রোজ আসে। যারা রাতে ঘুমিয়ে থাকে, তারা কিছু শুনতেও পায় না, দেখতেও পায় না। যাদের ঘুম হয় না, তারা ভয় পেয়ে পরদিনই বাংলো ছেড়ে পালিয়ে যায়।

খুবই স্বাভাবিক। এই ভূতুড়ে জংলা পাহাড়ের মাথায় নিশুত রাতে রাধাদর্শনের শখ ক'জনের থাকে? জিজ্ঞেস করলাম, মাঝে মাঝে 'সুদাম' বলে কে কেঁদে ওঠে? রাধা?

গোকুল বললে, সারাটা রাত জেগেছেন, আগে নেয়ে—খেয়ে জিরিয়ে নিন হুজুর। তারপর বলব 'খন—গোড়া থেকে সব বলব।

তিন

এক শতক আগের দেবগড়। তারই জীর্ণ ইতিহাসের কয়েকটি পৃষ্ঠা স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে খুলে বসল গোকুলঠাকুর।

গোকুলের ঠাকুরদা মথুর ছিল দেবগড়—রাজার খাস খানসামা। এ কাহিনি ঠাকুরদার মুখে শুনেছিল তার বাবা। বাবার মুখে শুনেছে গোকুল।

খানসামার নাতি গোকুল লেখাপড়া শেখেনি, গল্প বলার আর্ট তার জানবার কথা নয়। তবু সে যা বললে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেলাম। তারই বলা গল্পকে কিছু কিছু সাজিয়ে—গুছিয়ে আপনাদের কাছে পেশ করছি।

নাটকের যেমন প্রস্তাবনা, তেমনি দেবগড়ের এই রহস্য কাহিনির গোড়ার কথাটুকু বলে নেওয়া দরকার। নইলে বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।

দেবগড়ের রাজা তখন রাজাবাহাদুর দিব্যকান্তি মহতাব। এখানকার রাজবংশ ছিল কালীসাধক। কিন্তু দিব্যকান্তি নিজে ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব। গোপীনাথকে একদিন স্বপ্নে দেখে তাঁর ইচ্ছে হল মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। মূর্তি গড়ার জন্য খোঁজ পড়ল সেরা শিল্পীর। সে—সময় সেরা শিল্পী ছিল সুবল পটুয়া। মাটি আর পাথর দুয়েরই মূর্তি গড়ায় ওস্তাদ। দিব্যকান্তি তাকেই ভার দিলেন।

পুরো দেড় বছর ধরে কষ্টিপাথর কুঁদে কুঁদে গোপীনাথের মূর্তি গড়ল সুবল পোটো। সময়ে স্নান নেই, খাওয়া নেই, বিশ্রামের ছুটি নেই, ঠুকঠুক করে ছেনি—হাতুড়ি চলছে তো চলছেই। সমস্ত চেতনা কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে সজাগ দুই চোখের তারায়। চোদ্দ মাসের মাথায় মূর্তি গড়া প্রায় শেষ হয়ে এল। কুচকুচে কালো মানুষপ্রমাণ বিগ্রহ, কি তার লীলায়িত বঙ্কিম ভঙ্গিমা, কি সুঠাম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ! দেখলে মনে হয় পাথরের তৈরি নয়, কালো ননী দিয়ে গড়া!

সবই হয়ে গেল। হাত পা নাক মুখ, অধরে ভুবনমোহন হাসিটি অবধি। বাকি রইল শুধু চোখ দুটি। সুবল ঠাকুরের চক্ষুদানের কাজে হাত দিল। চোদ্দটা মাস ধরে বিগ্রহের দিকে অবিশ্রাম তাকিয়ে থেকে থেকে সুবলের নিজের চোখের দৃষ্টি তখন ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবু নিভে—আসা দৃষ্টিপ্রদীপকে বারবার উসকে দিয়ে, সুবল আরো দু'মাস খেটে গোপীনাথের চক্ষুদান করল। মুগ্ধ হয়ে গেলেন রাজা দিব্যকান্তি, বিহ্বল হয়ে গেল সবাই। টানা টানা দীঘল চোখ দুটি যেন জ্যান্ত মানুষের। কি মনোহরণ বাঁকা চাউনি! চোখের তারা দুটি যেন এখুনি নড়ে উঠবে!

চক্ষুদান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুবল নিজে অন্ধ হয়ে গেল। সবাই বললে, গোপীনাথকে নিজের চোখ নিবেদন করেছে সুবল।

গোপীনাথের পাশে রাধামূর্তি গড়া আর হল না। জয়পুর থেকে আনানো শ্বেতপাথরের খণ্ড পড়ে রইল। আরও শিল্পী কি দেবগড়ে ছিল না? ছিল। কিন্তু কেউ ভরসা করলে না সুবল পোটোর গড়া গোপীনাথের পাশে জোড় মিলিয়ে রাধা গড়তে।

সুবলের একমাত্র সন্তান সুদাম তখন বারো বছরের ছেলে।

তবু দেবগড় পাহাড়ের একাংশে বিশাল মন্দির তৈরি হল, আর বহু ঘটা করে সেই মন্দিরে রাধাহীন গোপীনাথের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন রাজা দিব্যকান্তি। সে—উৎসব সবাই দেখল, দেখল না শুধু অন্ধ সুবল।

রাজা দিব্যকান্তির বড় ছেলে কন্দর্পকান্তি তখন ষোলো বছরের কিশোর।

গোড়ার কথা এইটুকু।

আট বছর বাদে রাজা দিব্যকান্তি মারা গেলেন। মরবার আগে ছেলেকে বলে গেলেন, পারো তো আমার অপূর্ণ বাসনা পূর্ণ কোরো—গোপীনাথের পাশে রাধা প্রতিষ্ঠা করো।

দিব্যকান্তির পর দেবগড়ের রাজা হল কন্দর্পকান্তি। তখন চব্বিশ বছরের যুবক। চেহারাটা ঠিক কন্দর্পের মতো না হলেও সুপুরুষ বলা যায়। লম্বা বলিষ্ঠ দেহ, রঙটা তামাটে। চোখে প্রখর উজ্জ্বলতা। শক্ত চোয়ালে আর ঈষৎ—চাপা নাকে একটা জেদি চরিত্রের ছাপ। রাজকুমার না হয়ে সৈনিক হলেও কন্দর্পকে যেন মানাতো ভালো। এস্টেটের কাজ দেখার চেয়ে দিনরাত ঘোড়ার পিঠে টগবগিয়ে বেড়ানোতেই তার ঝোঁক। রাজবাড়ির জলসাঘরে মিতা শিকারের বদলে জঙ্গলের চিতা শিকারের শখই বেশি। এ হেন কন্দর্পের প্রকৃতিতে বৈষ্ণব ধর্মের ছিটেফোঁটা না থাকলেও বাপের শেষ ইচ্ছা সে ঠেলতে পারল না।

গোপীনাথের পাশে রাধা চাই।

রাজবাড়িতে আবার ডাক পড়ল বুড়ো সুবল পোটোর। ছেলের কাঁধে হাত রেখে লাঠি ঠকঠকিয়ে এল অন্ধ সুবল।

কন্দর্প জিজ্ঞেস করলে, দেবগড়ে তোমার মতো ওস্তাদ কারিগর এখন কেউ আছে সুবল?

সুবল জবাব দিলে, আছে হুজুর। আমার চেয়েও সরেশ হাত।

কে সে?

আমার ছেলে এই সুদাম।

কন্দর্প এবার ভালো করে তাকাল সুদামের পানে। কালোকোলো চেহারা, ঝাঁকড়া বাবরি চুল, চওড়া বুক থেকে নেমে এসেছে সরু কোমর, পাতলা চিকন মুখে গোপীনাথের মতোই টানা টানা দীঘল একজোড়া চোখ যেন আবেশে ঢুলু ঢুলু।

কন্দর্প বললে, এ তো ছেলেমানুষ।

না হুজুর। সুবল বললে, কুড়ি পেরিয়েছে সুদাম।

তোমার গোপীনাথের পাশে মানানসই রাধা গড়তে পারবে তোমার ছেলে?

হাতজোড় করে সুবল নিবেদন করলে, পারবে বইকি হুজুর। নিজের বেটা বলে বাড়িয়ে বলছি না। তবে হুজুর, ছেলেটা আমার আধ—পাগল, খেয়ালি। ওকে সময় দিতে হবে।

বেশ, দিলাম সময়। কন্দর্প বললে, কাজ শুরু করে দাও। সামনের বছর রাধাষ্টমী তিথিতে আমি রাধা প্রতিষ্ঠা করব।

তাই হবে হুজুর। সুবল বললে। তারপর ছেলের কাঁধে হাত রেখে ঘরে যেতে যেতে বললে, বাপের নাম রাখিস বাপ সুদাম। তোর রাধা যেন রূপে আমার গোপীনাথকে টেক্কা দেয়।

বড় কম কথা বলে সুদাম। শুধু বললে, দেখি।

পরদিন থেকেই বাপের ছেন—হাতুড়ি হাতে নিলে সুদাম। জয়পুরি শ্বেতপাথর কুঁদে কুঁদে শুরু হয়ে গেল রাধা গড়া। দিনভর কাজ করে সুদাম, রাতে ঘরের আঙনে বসে বাঁশি বাজায়। কখনো বা মাঝরাতেও তার ঘরে প্রদীপ জ্বলে, শব্দ শোনা যায় ঠুকঠক, ঠুকঠুক।

এক দুই করে আট মাসের মাথায় সুদাম পোটোর রাধা সম্পূর্ণ হল। ছেনি—হাতুড়ি ধরেছিল সেই মাঘ মাসে, ছাড়লে ভাদ্রের গোড়ায়।

না, বাপের নাম রেখেছে সুদাম। রাধা যেন পাথরে গড়া নয়, রক্তমাংসের। বুকে হাত রাখলে বুঝি ধুকপুক শব্দটুকু টের পাওয়া যাবে। আর রূপ? হ্যাঁ, সুবলের গোপীনাথকে টেক্কা দিয়েছে বটে!

গোরোচনা গোরী নবীনা কিশোরী

থির বিজরী প্রায়।

অঙ্গের হিল্লোলে লাবণি উথলে

অনঙ্গ মূরছা যায়।।

সবার আগে দেখল কন্দর্পকান্তি আর মাধবদাস পুরোহিত। বার বার দেখল। দেখে মুগ্ধ হওয়ার বদলে চমকে উঠল দুজনে।

রাধার মুখে এ কার মুখ বসিয়েছে সুদাম পোটো?

এ মুখ যে অলকাতিলকার!

চার

জিজ্ঞেস করলাম, অলকাতিলকা কে?

গোকুল বললে, নীলু পণ্ডিতের মেয়ে।

পাহাড়ের কোলে পুবগাঁয়ে চতুষ্পাঠী খুলেছিল নীলকণ্ঠ পণ্ডিত। সারাটা জীবন শাস্ত্রপাঠ আর পুঁথি ঘেঁটেই কাটিয়েছে। সরস্বতীর ভক্ত বলে জীবনে লক্ষ্মীর কৃপা পায়নি। দেড় বিঘে ভুঁই সম্বল, তারই ফসলে অন্ন জুটত পণ্ডিতের। কোনোদিন দু'বেলা, কোনোদিন একবেলা। তবু পণ্ডিত বিদ্যা বেচতো না। ছাত্রদের কাছে গুরুদক্ষিণা চাইতে লজ্জা করত তার। পালে—পার্বণে কেউ কিছু দিত, কেউ বা বিনি কড়িতে পড়তে এসে শাক—ভাতের ভাগও নিয়ে যেত। পণ্ডিতের রাগ হত না, কিন্তু রাগ করত তিলক!

বুড়ো বয়সের মেয়ে তিলক। ওর আগে আরো তিনটি ঘরে এসেছিল, থাকেনি। তিলক সর্বশেষ সন্তান। বড় আদরের। আদর করে নীলু পণ্ডিত মেয়ের নাম রেখেছিল অলকাতিলকা। পাড়ার লোকে ডাকত তিলক বলে।

ফুটফুটে মেয়ে, কাঁচা হলুদবরণ চেহারা, পটে—আঁকা মুখ, নাকে মাকড়ি, পানের গড়ন চিবুকে টোল আর কাজল—বিনা—কালো একজোড়া চোখে ঢলঢলে চাউনি।

তাকিয়ে থাকবার মতো রূপসী মেয়ে তিলক।

পুবগাঁয়ের উত্তরে পোটো—পাড়া। সেখানে সুদামের ঘর। তিলকের নিত্যসাথী সুদাম। শিশুকাল থেকেই। দুজনে ভাবও যত, ঝগড়াও তত। সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, যখনই দেখ, দেখবে সুদাম আর তিলক, তিলক আর সুদাম। কখনো চকমকি নদীতে জল ছোড়াছুড়ি করছে, কখনো জঙ্গলের ধারে হর্তুকি গাছতলায় সুদাম বাঁশি বাজাচ্ছে আর তিলক খেলাঘরে ধুলোর ভাত রান্না করছে। কখনো বা সুবলের আটচালায় তিলককে মাটির বেনে—বউ গড়ে দিচ্ছে সুদাম।

মাঝে মাঝে তিলক বায়না ধরে, আমি বাঁশি বাজাব, শিখিয়ে দে—

হেসে সুদাম বলে, ইঃ! বাঁশি বাজাতে হবে না, কাঁসি বাজা।

রেগে যায় তিলক। তলদা বাঁশের পাতলা বাঁশি মড়মড় করে চিবিয়ে ভেঙে দেয়। কখনো বা পছন্দ হয় না বেনে—বউ। বলে, ছাই হয়েছে! নাকে নথ কই, ঝুমকো পাশা কই?

এক আছাড়ে বেনে—বউ পঞ্চত্ব পায়।

রেগে সুদামও যায় শেষ অবধি। তিলকের চুলের ঝুঁটি নেড়ে বলে, বেরো—

টেবো গাল আরো ফুলিয়ে একছুটে চলে যায় তিলক। বলে যায়, জন্মের শোধ আড়ি!

পরদিনই কিন্তু আবার দেখা যায়, চমমকি নদীতে এ ওর গায়ে জল ছুঁড়ছে আর হাসছে খিলখিল করে। নয়তো এ বাজাচ্ছে বাঁশি, আর ও নাচছে চুড়ো—বাঁধা চুলে ফুল গুঁজে।

সুদামের বয়স তখন বারো, আর তিলকের আট।

দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর।

সেবার বর্ষার গোড়ায় নীলকণ্ঠ অসুখে পড়ল। পালা—জ্বর। বর্ষা গেল, শরৎ গেল, শীতও গেল। পড়ুয়া ছাত্ররা ছেড়ে গেল, জ্বর আর ছাড়ে না। দিনও আর চলে না। এই সময় একদিন নীলু পণ্ডিত ঠাহর করে দেখলে, মেয়ে বড় হয়েছে।

ভরা চোদ্দোয় পা দিয়েছে তিলক। ঢেউ কমে এসেছে বটে, কিন্তু থই থই করছে রূপের গাঙ। মাথায় হয়েছে লম্বা, ভারি হয়েছে কাঁকাল, তারই ভারে অলস হয়েছে চলন, ঢলঢলে চোখে কথায় কথায় লজ্জা।

সত্যিই বড় হয়েছে তিলক। ভাবনায় পড়ল নীলু পণ্ডিত। একদিন দু'দিন করে সাতদিন ভাবল। তারপর একদিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে মেয়ের হাত ধরে গেল গোপীনাথের মন্দিরে।

মাধবদাস পুরোহিত বললে, পুজো দেবে নাকি পণ্ডিত?

নীলকণ্ঠ বললে, দেব। পুজো দিতেই তো এলাম।

এসো, ফুল—তুলসী নাও।

ফুল—তুলসী কি হবে গোঁসাই?

মাধবদাস বললে, কি নিবেদন করবে তবে ঠাকুরকে?

বড় বিচিত্র হাসি হাসলে নীলকণ্ঠ। বললে, আমার বাগানে একটিই ফুল—এই আমার অলকাতিলকা। গোপীনাথকে তাই নিবেদন করব বলে এসেছি গোসাঁই।

মাধবদাস অবাক হয়ে চেয়ে রইল।

ধুঁকতে ধুঁকতে নীলু পণ্ডিত বললে, আমি আর বাঁচব না গোসাঁই। ডাক এসেছে। তাই তিলককে নিয়েই আমার যত ভাবনা। তিলক বড় হয়েছে, অথচ আমি দরিদ্র, সৎপাত্রের হাতে মেয়েকে দেবার সামর্থ্য নেই। ভেবে—চিন্তে গোপীনাথের দোরেই মেয়েকে আনলাম, এমন সৎপাত্র আর পাব কোথায়? আমার অলকাতিলকাকে তুমি গোপীনাথের দাসী করে দাও গোঁসাই। নইলে মরেও আমার শান্তি হবে না—আমার সোনার প্রতিমা কোথায় ভেসে যাবে কে জানে!

পণ্ডিতের হাড়সার গাল বেয়ে টসটস করে জল গড়িয়ে এল।

মাধবদাস স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নিজের মনেই বললে, গোপীনাথের দাসী! তুমি কি মেয়েকে দেবদাসী করতে চাও পণ্ডিত?

নীলকণ্ঠ ঘাড় নাড়লে।

মাধবদাস বললে, দেবদাসী হওয়ার মানে বোঝ? গোপীনাথ আর গুরু ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না। এমনকি, তুমি বাপ, তোমার সঙ্গেও না। মরণকালে মেয়ের হাতের সেবা পাবে না, একফোঁটা জলও নয়।

পাথর হয়ে এতক্ষণ বসে ছিল তিলক। এবার চমকে উঠল।

পলকে মনে পড়ে গেল বাবরি চুলে—ঘেরা সুদামের কালোকোলো মুখখানা।

নীলকণ্ঠ বললে, সেবা না পাই, শান্তি তো পাব!

মাধবদাসের মুখ তবু গম্ভীর। বললে, কিন্তু অলকাতিলকা, তুমি নিজে কি পারবে? বেশ করে ভেবে দেখো মা। নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো।

নীলকণ্ঠ তাকাল মেয়ের দিকে।

চোখে জল এসে পড়েছিল, সামলে নিয়ে তিলক কাঁপা গলায় বললে, পারব গোসাঁইঠাকুর। বাবা শান্তি পাক।

গোপীনাথের সামনে বলছ?

বিগ্রহের মুখের দিকে ভরা চোখে তাকাল তিলক। বাঁকা দীঘল চোখে তাকে দেখে ভুবনমোহন হাসি হাসছে গোপীনাথ? মুছে গেল সুদামের মুখ। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলে তিলক, তারপর মুখ তুলে অকম্পিত গলায় বললে, ঠাকুরের সামনেই বলছি।

প্রসন্ন হয়ে উঠল মাধবদাসের মুখ। বললে, কাল শুভদিন। স্নান করে নতুন কাপড় পরে এসো। আমি তোমায় দীক্ষা দেব।

নীলকণ্ঠ জিজ্ঞেস করলে, রাজাবাহাদুরের অনুমতি নিতে হবে না?

এবার হাসলে মাধবদাস। হেসে বললে, গোপীনাথের চেয়ে বড় রাজা আর কে আছে? ঠাকুর অলকাতিলকাকে গ্রহণ করবেন।

পরদিন জঙ্গলের ধারে হর্তুকিতলায় সুদাম বাঁশি বাজিয়ে সারা দিনটা কাটিয়ে দিলে! তিলক এল না। সকালেও না, বিকালেও না।

সে তখন মন্দিরের মাধবদাসের কাছে। স্নান সেরে নববস্ত্র পরে শুদ্ধ হয়ে এসেছে তিলক। সারাদিন নির্জলা উপবাস। গোধূলি লগ্নে মাধবদাস প্রথমে গোপীনাথের সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন। তারপর দিলেন মন্ত্র। পৈতে আর হর্তুকি দিয়ে তিলক পুরোহিতকে প্রণাম করলে।

সেদিন থেকে গোপীনাথের পরিণীতা হয়ে গেল অলকাতিলকা। মন্দিরের দেবদাসী।

মেয়েকে দেবতার হাতে সম্প্রদান করে নীলু পণ্ডিত একা ঘরে ফিরে গেল। বাপ যে এখন পর! যেতে যেতে যতবার চোখ মোছে, ততবার ভেসে যায়। তবু বড় শান্তি, বড় সোয়াস্তি!

ঘরে ফিরে দেখে অন্ধকার দাওয়ায় ভূতের মতো বসে আছে সুদাম। জিজ্ঞেস করলে, তিলক কই?

নীলকণ্ঠ বললে, স্বামীর ঘর করতে গেছে।

তীরের মতো সিধে হয়ে উঠে দাঁড়াল সুদাম। বললে, বে হয়েছে তিলকের!

সব কথাই খুলে বললে নীলকণ্ঠ।

সুদাম শুধু বললে, তা বেশ করেছ। তারপর চুপচাপ চলে গেল। ঘরে যাবার আগে হাতের বাঁশিটাকে চকমকির জলে ভাসিয়ে দিয়ে গেল।

পাঁচ

নীলু পণ্ডিতের সত্যিই ডাক এসেছিল। মাসখানেকের মধ্যেই তার মেয়াদ ফুরোল।

দুনিয়ায় একজন হারালে তবে আরেকজন পায়। নীলু পণ্ডিত কন্যা হারাল, পেল মাধবদাস। মন্দির সংলগ্ন তারই বাড়িতে বাস করে দেবদাসী অলকাতিলতা। সে এখন অন্তঃপুরিকা। মন্দিরের গণ্ডীর বাইরে যাওয়া নিষেধ।

কিন্তু দেবদাসী হতে গেলে দেবতাকে শুধু পতিরূপে ভজনা করলেই হবে না, দেবতার সর্বপ্রকার মনোরঞ্জনের কলাবিদ্যাও আয়ত্ত করতে হবে। শুধু পূজায় নয়, নৃত্যে, গীতে, লাস্যে, লীলায় নিজেকে নিবেদন করে দিতে হবে গোপীনাথের পায়ে। সেই হল দেবদাসীর আমরণ সাধনা।

মাধবদাস নিজে একজন সঙ্গীতজ্ঞ, সুপটু মৃদঙ্গবাজিয়ে। একসময় নৃত্যেও পারদর্শী ছিল। তারই কাছে শুরু হয়ে গেল তিলকের নৃত্যকলা শিক্ষা।

দু'বেলা গুরু মাধবদাস শেখায়, তিলক শেখে। মৃদঙ্গে ঘা দিয়ে গুরু মুখে বোল বলে, তিলক ছন্দ তাল নয় অভ্যাস করে। মুদ্রার ব্যাখ্যা করে গুরু, আপন ললিত অঙ্গে অঙ্গে তার অনুকরণ করে ছাত্রী। নতুন জীবন, নতুন পরিবেশ, নতুন শিহরণ! এমনি করেই মৃদঙ্গের বোল, বীণের ঝঙ্কার আর নূপুরের ছন্দের মধ্যে দিনে দিনে হারিয়ে যেতে লাগল হর্তুকিতলায় শোনা একটি গ্রাম্য বাঁশির সুর। গোপীনাথের স্মিতহাস্যবিকশিত মুখভাবের মধ্যে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল আজন্ম চেনা একটি কালোকোলো তরুণ মুখের ছায়া।

সময় যেন চকমকি নদীর স্রোত। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে গেল। দেবদাসী অলকাতিলকা পুরোপুরি ভুলে গেল পুবপাড়ার নীলু পণ্ডিতের মেয়েকে। ভুলে গেল পোটো—পাড়ার সুদামের নিত্য—সাথী তিলককে।

কিন্তু জীবন যেন নাটকের রঙ্গমঞ্চ। একজনের প্রস্থান, আরেকজনের প্রবেশ। দেবদাসীর জীবনে সুদাম গেল, এল স্বয়ং রাজা কন্দর্পকান্তি। মন্দিরে একটি দেবদাসী এসেছে, কন্দর্পকান্তির তা অজানা ছিল না, কিন্তু খবরটাকে সে একটা সাধারণ ঘটনা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেনি। কৌতূহল বা ঔৎসুক্যের লেশমাত্র তার মনে জাগেনি। যৌবনের একটা ধর্মেই সে দীক্ষিত ছিল, তা হচ্ছে বিপদ নিয়ে খেলা করা। তাই ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের জঙ্গলে শিকারের নেশাতেই সে মেতে থাকত, দেবগড়ে থাকত খুব কম সময়।

সে বছর কন্দর্পকান্তি রেওয়া থেকে দেবগড়ে ফিরল রাসপূর্ণিমার দিন। আর, সেই দিনই রাতে দেবদাসীকে সে প্রথম দেখল।

রাজা দিব্যকান্তি তখন রোগশয্যায়। তাই রাজবংশের প্রথানুযায়ী ছেলেকে মন্দিরে পাঠালেন উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্যে। বেশি রাতে বাইরের লোকজনকে মন্দির থেকে সরিয়ে দেওয়া হল, রইল কেবল পুরোহিতের অধিকার নিয়ে মাধবদাস আর রাজার অধিকার নিয়ে কন্দর্পকান্তি। আর কয়েকজন রইল সেতার বীণা আর মন্দিরা নিয়ে। চোখে তাদের কাপড় বাঁধা, দেবদাসীকে দেখা নিষেধ।

নাটমন্দিরে মৃদঙ্গ কোলে নিয়ে বসল মাধবদাস। ঘা দিল মৃদু—মন্দ্র। গোপীনাথের সামনে নতজানু হয়ে বসেছিল অলকা তিলকা। নাটমন্দিরের দিকে পিছন ফিরে। মৃদঙ্গের ইসারা পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, ঠাকুরের পায়ের কাছে রাখা ফুলের মালা কপালে ঠেকিয়ে নিজের গলায় পরলে। তারপর ধীর মন্থরগতিতে এসে দাঁড়াল নাটমন্দিরের অঙ্গনে। আলতা—পরা টুকটুকে পা দুটির স্পর্শসুখে নূপুর বেজে উঠল ঝুম—ঝুম ঝুম—ঝুম ঝুমুর—ঝুম।

নাটমন্দিরের সব ক'টা বাতির ঝাড় জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। তারই আলোয় কন্দর্পকান্তি ভালো করে দেখল দেবদাসীকে। কিন্তু একী বেশভূষা দেবদাসীর!

লাল—পাড় ফিকে বাসন্তী রঙের মোটা তাঁতের শাড়ি পায়ের গোছের ওপরে তুলে পরা, আঁচলটা কোমরে জড়ানো। গায়ে সেই রঙের চেলি। সোনার অঙ্গে সোনার ভূষণের চিহ্ন নেই। সোনার স্থান দখল করেছে জঙ্গলের অতসী কাঞ্চন করবী চম্পা। মণিবন্ধে বাহুতে নিতম্বে কানে গলায় শুধু ফুলেরই গহনা। মাথায় সিঁথিমৌর অবধি ফুলে গড়া। চূড়া—খোঁপায় বন—যুঁইয়ের মালা জড়ানো। কপাল থেকে গাল অবধি কনে—চন্দন।

অলংকার না থাক, রূপ আছে। সজ্জা না থাক, দেবদাসী সাজতে জানে। চোখ ফেরাতে পারে না কন্দর্পকান্তি। কাঁচা হলুদবরণ অঙ্গ, নাক মুখ চোখ পটে আঁকা, টোল—পড়া চিবুকের গড়ন পানের মতো। পুষ্পস্তবকের মতো পীবর বুক আর ক্ষীণ কটির নিচে গুরু নিতম্ব তালে তালে তরঙ্গভেঙে দুলছে মৃদঙ্গের মেঘমন্দ্র বোলে। মুখচোরা নূপুর হয়ে উঠেছে মুখর।

নাচছে দেবদাসী। যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে আরতি করছে গোপীনাথের!

আসনে ঋজু হয়ে বসে রইল কন্দর্পকান্তি। নারীকে এমন করে দেখার সুযোগ তার চব্বিশ বছরের জীবনে এর আগে আসেনি। সুযোগ সে খোঁজেওনি। ঘোড়া আর বন্দুককে সঙ্গী করাই এতদিন কাটিয়েছে। আজ প্রথম মনে হল বুনো জানোয়ার শিকার করাই জগতে একমাত্র নেশা নয়, নারীর রূপেরও একটা আশ্চর্য মাদকতা আছে।

আভূমি প্রণতা হয়ে নৃত্যের আরতি শেষ করলে দেবদাসী। তারপর গুরু ও রাজাকে নমস্কার জানিয়ে চলে গেল ঝুম—ঝুম করে। ফিরেও দেখল না।

কন্দর্প কয়েক মুহূর্ত অন্যমনে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করলে, মেয়েটি কে?

মাধবদাস বললে, অলকাতিলকা। নীলকণ্ঠ পণ্ডিতের মেয়ে।

দেবদাসী হল কেন?

মাধবদাস সমস্ত বৃত্তান্ত জানালে।

শুনে কন্দর্প বললে, এ মেয়ের তো রাজরানি হবার কথা।

মাধবদাস বললে, রানিই তো হয়েছে। ব্রজরাজের রানি।

কন্দর্প বললে, তাই যদি হয়, তবে রানির মতোই থাকা উচিত ওর। শুনেছি আপনার ঘরেই ও থাকে, কাল থেকে বসন্তবিহারে ওর থাকার ব্যবস্থা হবে।

কিন্তু আমার ঘরে অলকাতিলকার কোনো অসুবিধা নেই।

অসুবিধা আছে আমি বলিনি। তবে দেবগড়ের দেবদাসীকে যোগ্য স্থানে রাখাই উচিত।

হাসলেন মাধবদাস। বললেন, মাপ করবেন যুবরাজবাহাদুর, একটু বোধ হয় ভুল হল। অলকাতিলকা দেবগড়ের দেবদাসী নয়, গোপীনাথের দাসী।

তবু লোকে বলবে দেবগড়েরই দেবদাসী। আর দেবগড়ের একটা মর্যাদা আছে।

এবারে আর হাসতে পারল না মাধবদাস। একটু ভেবে বললে, কিন্তু যুবরাজবাহাদুর, বসন্তবিহার যে দেবগড় রাজবংশের প্রমোদভবন।

কন্দর্প বললে, ছিল, আমার পূর্বপুরুষদের। কিন্তু বাবার আমল থেকে চাবিবন্ধ আছে। আমি সম্পূর্ণ সংস্কার করিয়ে দেব, ভাববেন না। জায়গাটা নিরালা, পরিবেশও ভালো। দেবদাসী যাতে নিরাপদে থাকতে পারে, সেজন্যে বিশ্বাসী পাহারাদার থাকবে।

আর বসল না কন্দর্পকান্তি। চলে গেল। শূন্য নাটমন্দিরে একা দাঁড়িয়ে রইল মাধবদাস চিন্তিত মুখে।

রাজার আদেশ, কিছু বলার নেই।

প্রায় চল্লিশ বছরেরও বেশি তালাবন্ধ ছিল 'বসন্তবিহার'। লোকে বলে জলসাবাড়ি।

একসময় এই প্রাচীন প্রমোদভবনের বড় হলঘরে একশো বাতির ঝাড় জ্বলত প্রতি সন্ধ্যায়। নটীর নূপুরনিক্কণ অনুরণিত হত, দেয়ালে—ঝোলানো বৃহদাকার দর্পণে নগ্ন দেহলতার লাস্যভঙ্গিমা ঝলসে উঠত, সুরার স্রোত বয়ে যেত, আর মত্ত পুরুষ—কণ্ঠের মুহুমহু তারিফে রাত্রি লজ্জায় কালো হয়ে উঠত। সেই নৈশ ব্যাভিচারে বোবা সাক্ষী ছিল দেবগড়ের পাহাড় আর জঙ্গলের গাছপালা। অবশেষে শেষরাতের দিকে বসন্তবিহারের ছোট বাড়ির শয়নকক্ষে অসংলগ্ন প্রণয়কূজন শুনতে শুনতে দেবগড়ের রাত্রি ভোর হয়ে আসত।

কন্দর্পকান্তির ঠাকুরদাদা রাজা দেবকান্তির আমল পর্যন্ত বসন্ত বিহারের জলসাঘর নিত্য খোলা হত। কিন্তু ছেলে দিব্যকান্তি যেন দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। রক্তে ব্যভিচারের বদলে সাত্ত্বিকতা নিয়ে জন্মালেন, শাক্ত বংশের সন্তান হয়েও বৈষ্ণবধর্মে অনুরাগ হল। ফলে, দেবকান্তির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বসন্তবিহারের দরজায় তালা পড়ল।

সেই মরচে—পড়া পুরানো তালা খোলা হল চল্লিশ বছর পরে।

আমূল সংস্কার হল প্রমোদভবনের। আগাছা সাফ করে ফুলগাছের চারা বসানো হল। পুরোন আসবাব নতুন করে রঙ হল। এল শাড়ির বদলে রেশমি ঘাঘরা, জরির কাঁচলি, অগুরু চন্দন—চূর্ণ কুমকুম। আর তারই সঙ্গে এল একসেট রত্ন—অলংকার। মুক্তার বেসর, পান্নার দুল, হীরার কণ্ঠহার, নীলার অঙ্গুরী, আরো কত কী।

অলকাতিলকা বাস করতে এল বসন্তবিহারে, কিন্তু ছুঁল না সে—সব। নিরাভরণ অঙ্গে মোটা তাঁতের শাড়িই জড়িয়ে রাখল। পালঙ্কের বদলে ঘরের ভূমিতলেই কম্বল বিছিয়ে শয়ন করলে।

খবর পেয়ে কন্দর্পকান্তি দেখা করতে এল।

সকালে মন্দিরে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল অলকাতিলকা। স্নান সেরে সাধারণ শাড়ি পরেই দেখা করলে সে।

কন্দর্পকান্তি জিজ্ঞেস করলে, নতুন পোশাক পরোনি কেন?

মৃদু গলায় অলকাতিলকা বললে, ও তো নটীর সাজ।

কন্দর্পকান্তির ভুরু ঈষৎ কুঞ্চিত হল। বললে, লোকরঞ্জনের জন্যে যে নাচে, শাস্ত্রে তাকেই নটী বলে। তুমিও নাচো, গোপীনাথের মনোরঞ্জনের জন্যে।

সে—নাচ আমার পূজা।

পূজা করে বলে দেবদাসী তো সন্ন্যাসিনী নয়! সোনার অলঙ্কারগুলোই বা কি দোষ করলে?

ভূমিতলে চোখ রেখে অলকাতিলকা জবাব দিলে, ফুলই আমার গহনা।

কন্দর্প একটু হেসে বললে, কিন্তু রাত পোহালে ফুল শুকিয়ে যায়, সোনা থাকে চিরকাল।

অলকাতিলকা বললে, আমি গরিবের মেয়ে।

কন্দর্প বললে, একদিন ছিলে, এখন তুমি দেবগড়ের দেবদাসী। আর, তোমার বয়সও শুনেছি মাত্র আঠারো। জীবনের অনেকটাই বাকি।

চকিতে চোখ তুলে তাকাল অলকাতিলকা। কন্দর্পকান্তি সোজা তাকিয়ে আছে তার দিকে। পুরুষের দৃষ্টির ভাষা বুঝতে নারীর এক লহমাও লাগে না। কি ছিল কন্দর্পের মুগ্ধ দৃষ্টিতে? যৌবনের সাদর অভ্যর্থনা?

অলকাতিলকার চোখের পাতা ভারি হয়ে নেমে এল।

কন্দর্প বললে, সুন্দরকে যা আরো সুন্দর করে, তা পরতে দোষ কি?

দেবদাসীর কাছ থেকে কোনো সাড়া এল না। একটু বাদেই ফটকের বাইরে কন্দর্পকান্তির ঘোড়ার খুরের আওয়াজ মিলিয়ে গেল।

পালকি অপেক্ষা করছিল। দেবদাসী এসে উঠে বসল।

মাধবদাসও অপেক্ষা করছিল মন্দিরে। বললে, আজ বিলম্ব হল যে?

বিলম্বের কারণ জানালে অলকাতিলকা। তারপর জিজ্ঞেস করলে, আমি এখন কি করব?

মাধবদাস পালটা প্রশ্ন করলে, তোমার মন কি বলে?

প্রশ্নটা বোধ হয় এড়িয়ে গেল অলকাতিলকা। বললে, আপনি যা বলবেন, তাই করব।

তার মুখের ওপর গভীর দৃষ্টি ফেলে চেয়ে রইল মাধবদাস। যেন তার অন্তরতল অবধি দেখে নিতে চাইছে। কোন আকাঙ্ক্ষা, কোন অতৃপ্তি অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে সেখানে?

কি দেখল মাধবদাসই জানে। কিছুক্ষণ বাদে বললে, শাস্ত্রে দেবদাসীর বেশভূষার তেমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। তোমার মন যদি লক্ষ্যে স্থির থাকে, সাজসজ্জার খোলসে কিছু আসে যায় না মা। সমাজে থাকতে হলে রাজার আদেশটাও মানতে হয়।

অলকাতিলকা নিশ্চিন্ত হল। গোপীনাথের দাসী না চাইলেও আঠারো বছরের গরিবের মেয়ে গুরুর এই নির্দেশই চাইছিল!

দিনকয়েক পরে কন্দর্পকান্তির ঘোড়ার খুরের শব্দ আবার এসে থামল বসন্তবিহারের ফটকে। পরিচারিকা জানালে যুবরাজবাহাদুর দর্শনপ্রার্থী। নতুন সজ্জায় অনভ্যস্ত দেবদাসী ওড়নাখানা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এল। পাতলা মসলিনের আড়ালে দেখা যাচ্ছে, দেবদাসীর পরনে গাঢ় রক্তবর্ণ রেশমি ঘাঘরা, বুকে জরির খাটো কাঁচুলির নিচে সুগৌর কটিদেশের হাতছানি, টিকালো নাকে মুক্তার বেসর, বাহুতে বাজুবন্ধ, গুরুনিতম্বে চন্দ্রহার, সিঁথিতে সিঁথি—মৌর। রক্তবর্ণ ঘাঘরার সঙ্গে মিল রেখেছে অধরে তাম্বুল আর পায়ের আলতা। আঠারো বছরের রূপ—যৌবনের গাঙে যেন কোটালের বান ডেকেছে!

অভিভূত হয়ে গেল কন্দর্পকান্তি। চব্বিশ বছরের বলিষ্ঠ পৌরুষ আবিষ্ট হয়ে গেল। মুখ দিয়ে শুধু বেরোল, বাঃ!

ওড়নাখানা গায়ের ওপর আরো একটু টেনে দিলে দেবদাসী।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নীরবে চলে যাচ্ছিল কন্দর্পকান্তি। অলকাতিলকা পিছু ডেকে বললে, যুবরাজবাহাদুর, কিছু বলবেন?

যেতে যেতেই উত্তর দিলে কন্দর্প, বলতে আসিনি, দেখতে এসেছিলাম।

চলে গেল যুবরাজবাহাদুর। অলকাতিলকা পায়ে পায়ে ঘরে এসে দাঁড়াল দর্পণের সুমুখে। দেয়ালজোড়া বিশাল দর্পণে ছায়া পড়ল। অলকাতিলকা নিজেকে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে একটু ক্ষীণ হাসি ফুটল তাম্বুল—রাঙা ঠোঁটের সীমায়।

প্রত্যেক যৌবনবতী নারীর মধ্যে এক মোহিনী থাকে, পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে নিজেকে মেলে দিয়ে সে আত্মপ্রসাদ লাভ করে।

দেবগড়ে কন্দর্পকান্তির বুঝি মন বসেছে। বাইরে বাইরে শিকারের প্রোগ্রাম প্রায়ই বাতিল হতে থাকল, তার বদলে তার বাদামি রঙের প্রিয় ঘোড়া প্রায়ই এসে থামতে লাগল বসন্তবিহারের ফটকে। দেবদাসীর কোনো অভাব আছে কিনা জানবার জন্যে।

অলকাতিলকা বলে, রাজার দয়ায় অভাব হবে কেন?

কন্দর্প বলে, রাজার ভাণ্ডারে দয়া ছাড়া আরো কিছু আছে, তা বোধ হয় জানো না?

কন্দর্পের উজ্জ্বল চোখে একটা সাগ্রহ প্রত্যাশা ফুটে ওঠে।

আগের চেয়ে অনেকটা সপ্রতিভ হয়েছে দেবদাসী। স্বচ্ছন্দ হয়েছে তার কথাবার্তা। মৃদু হেসে বলে, জেনে কি হবে? যেটুকু পেয়েছি, আমি তাতেই সুখী। বেশি রাখার জায়গা নেই।

এ কি দেবদাসীর চাপা গরব, না নিষ্কাম মনের কথা?

কন্দর্পকান্তি ঠিক বুঝতে পারে না।

কিন্তু এসব আগের ঘটনা। যে ঘটনা বলছিলাম, সেই ব্যাপারেই ফিরে আসা যাক। দিব্যকান্তির মৃত্যুর পর রাধা প্রতিষ্ঠার কথায়।

ছয়

রাধাষ্টমী তিথিতে গোপীনাথের পাশে রাধা দাঁড়াল।

মেলা বসল, রাজবংশের প্রথানুযায়ী প্রজাদের নতুন বস্ত্র আর চাল বিতরণ হল, কত ঘটাপটায় গমগম করতে লাগল মন্দির। দেবগড় রাজ্যের যত লোক ভেঙে এল গোপীনাথের রাধা দেখতে।

দেখল সবাই। কিন্তু চিনল শুধু পুবপাড়ার লোকেরা। এ যে সেই নীলু পণ্ডিতের মেয়ে তিলকের মুখ বসানো গো! তবে কি তিলকই গোপীনাথের রাধা ছিল আর জন্মে?

কথাটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল গোটা রাজ্যে। আর সেই থেকে দেবদাসী অলকাতিলকার নাম হয়ে গেল গোপীনাথের রাধা।

দেখল অলকাতিলকাও। প্রথমটায় অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে, এ রাধা গড়েছে কে?

মাধবদাস বললে, সুবল পোটোর ছেলে সুদাম।

সুদাম! এক নিমেষে অষ্টাদশী অলকাতিলকা যেন সেই হর্তুকি গাছতলার বালিকা তিলক হয়ে গেল। সুদাম তারই মুখ গড়েছে! বেশ গড়েছে তো! খুশিতে উছলে উঠল বালিকা তিলক। কিন্তু পরক্ষণেই লজ্জায় মরে গেল আঠারো বছরের নবযৌবনা অলকা তিলকা। একি কাণ্ড করেছে সুদাম! লোকের কাছে অলকাতিলকা এখন মুখ দেখাবে কেমন করে? একবার পেলে হয় সেই বজ্জাত পোটোকে!

বিকালে পালকি করে ঘরে ফেরার সময় কিংখাবের ঝালরের ফাঁকে চোখ রেখে বসে রইল দেবদাসী। মন্দিরের আশেপাশে যদি সেই বাবরি চুলে ঘেরা কালোকোলো মুখখানা নজরে পড়ে। এত লোক এসেছে, আর সে আসেনি?

কিন্তু না, সুদাম আসেনি মন্দিরে।

রাতে মাথার কাঁটা কাজলে ডুবিয়ে শুকনো কলা পাতায় অলকাতিলকা লিখল:

দুপুরে চকমকির ঘাটে যেন দেখা হয়। কথা আছে।

তিলক

তারপর পরিচারিকাকে ডেকে বললে, কাল সুয্যি ওঠার আগে পুবপাড়ার উত্তরে পোটো—পাড়ায় যেতে হবে। সুদাম পোটোর হাতে এটা দিয়ে আসবি।

ভাঁজ—করা চিঠির সঙ্গে একজোড়া কানপাশাও এল দূতীর হাতে।

মন্দির থেকে বসন্তবিহারে না গিয়ে পালকি চলল চকমকির ঘাটে। সকালে একদফা স্নান সেরেই বেরিয়েছিল অলকাতিলকা, তবু সঙ্গে নিয়েছিল গামছা আর শাড়ি।

ঝাঁ ঝাঁ করছে ভরদুপুর। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। নদীর ধারে এ সময় কেউ থাকে না, জলের ধার ঘেঁষে শুধু একটা বক এক—পা তুলে থির হয়ে দাঁড়িয়ে। আর জলে পা ডুবিয়ে চুপ করে বসে আছে সুদাম। আহা, কত ভালো মানুষটি! যেন আরেকটি বক—তপস্বী!

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল অলকাতিলকা। পায়ের নূপুর যেন মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল, ঝম—ঝম, ঝমর—ঝম!

ফিরে তাকাল সুদাম। মুখ ভরে গেল হাসিতে। বললে, ডেকেছিস কেন তিলক?

নাকের পাটা ফুলিয়ে তিলক বললে, এ তুই কি করেছিস সুদাম!

কি আবার করলাম?

রাধার মুখ আমার মতো করে গড়লি কেন? ছি, ছি, আমার যে লজ্জা রাখার ঠাঁই নেই!

হাসি মুখে সুদাম বললে, আমার যে আনন্দ রাখবার ঠাঁই নেই!

আমায় লজ্জা দিয়ে তোর আনন্দ? মরি, মরি, কি আনন্দের ছিরি!

হাত ঘুরিয়ে বলতে গিয়ে বাজুবন্ধের ঝুমকো দুলে উঠল। সুদাম দেখল তিলক বড়ই রাগ করেছে। আগের তিলক যেমন কথায় কথায় মান করত। বললে, রাগ করিসনি তিলক।

রাগ করব না! লোকে কি ভাবছে বল তো?

আমার দোষ নেই তিলক। রাধার মুখ ভাবতে গেলে তোরই মুখখানা আমার চোখে ভেসে ওঠে। ছোটবেলা থেকে শুধু তোকেই যে দেখেছি! আমি কি করব বল?

সুদামের গলাটা কেমন অসহায়।

তিলকের রাগটা নিভে এল। ধপ করে সুদামের পাশে বসে পড়ে বললে, আমাকে তুই এখনো ভুলতে পারিসনি?

কই আর পারলাম! তোকে আমি জেগেও দেখি, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও দেখি। আমি পোটো, তাই পট আঁকতে গেলে, মূর্তি গড়তে গেলে আমার হাত বাগ মানে না। পটের মুখ, মূর্তির মুখ তোরই মতো অমন পানের গড়ন হয়ে যায়, চোখ দুটো অমন ঢলঢলে, জোড়া ভুরু অমন জোড়া ধনুকের মতো, ঠোঁট দু'খানা অমন আধখোলা ফুলকুঁড়ির মতো হয়ে যায়! রাধাই গড়তে বল, আর ললিতা—বিশাখাই গড়তে বল, আমি ওই একখানা মুখই গড়তে জানি।

তিলক দেখলে তারই পানে চেয়ে সুদামের টানা টানা সরল চোখ দুটো আবেশে বিভোর হয়ে উঠেছে। সুদাম আর ছোটটি নেই, তখন একুশ বছরের যুবা। কালো শিমুল তুলোর আঁশের মতো ফুরফুরে দাড়ি দুই গালে, ঠোঁটের ওপর গোঁফের রেখা। তবু তার কথায় তিলক তেমন লজ্জা পেল না, বরং একটা মিষ্টি শিহরণ খেলে গেল তার অঙ্গে অঙ্গে। সে বুঝতে পারলে না সেটা কিসের অনুভূতি, কিন্তু বড় ভালো লাগল।

কৌতুকের সুরে তিলক বললে, তোর বিদ্যের বালাই নিয়ে মরি! কাল মন্দিরে যাসনি কেন শুনি?

সুদাম বললে, গোপীনাথের মুখ আর দেখব না বলে। সেকি রে! ঠাকুরের ওপর এত গোসা কেন তোর?

সুদামের রাধাকে সে কেড়ে নিয়েছে কেন?

কী বললি! আমি তোর রাধা! ওরে আমার সাধের কেষ্টঠাকুর রে!

খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল তিলক।

সে—হাসি গায়ে মাখলে না সুদাম। উদাস গলায় বললে, তামাসা করছিস? কর গে যা!

জলের দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল।

হাসি থামিয়ে তিলক ডাকলে, রাগ করতে হবে না। আয়, চান করি।

জলে নামল দু'জনে। সেই ছোটবেলার মতো এ ওর গায়ে জল ছোড়াছুড়ি করলে খানিক। দু'জনের মাঝখানে এই ক'বছরের ব্যবধান যেন নেই।

এক সময় তিলক জিজ্ঞেস করলে, সুদাম, তোর বাঁশি?

নেই।

নেই! গেল কোথা?

চকমকি জানে।

এ কেমনতর কথা! বল না কোথা?

চকমকির জলে বাঁশি ফেলে দিয়েছি।

কেন?

কে আর শুনবে?

সুদামের গলায় এমন একটা উদাস—করা বিষাদ প্রকাশ পেল যে তিলকের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। তাড়াতাড়ি বললে, আমি শুনব সুদাম। তুই বাজাস।

সুদাম একটু হেসে বললে, বাজাব। কিন্তু তুই শুনবি কেমন করে? তুই কোথা আর আমি কোথা!

মুখের কথা হারিয়ে গেল তিলকের। তাই তো! কোথায় পোটো—পাড়ার সুদাম, আর কোথায় বা বসন্তবিহারের দেবদাসী! মাঝখানে যে অনেকগুলো বছরের তফাত!

একটু ভেবে তিলক বললে, যেদিন আবার চান করতে আসব, সেদিন বাজাস।

কবে আসবি?

এই ধর কাল।

তারপর?

পরশু।

তারপর?

রোজ।

সুদাম বললে, বাঁশিটা আবার চিবিয়ে ভেঙে দিবি না তো?

ছেলেমানুষের মতো হেসে উঠল দু'জনে। হাসতে হাসতেই তিলক পালকিতে গিয়ে বসল।

সেদিন সন্ধ্যা—আরতির পর নাটমন্দিরে অলকাতিলকা যখন নাচ শুরু করলে, তার দৃষ্টি গোপীনাথের মুখ থেকে বারবার সরে রাধার মুখের ওপর পড়তে লাগল। আর, মনটা থেকে থেকে পালিয়ে যেতে লাগল চকমকি নদীর ঘাটে, যেখানে মেঘলা আকাশ, ভরা দুপুর, আর জলে পা ডুবিয়ে বাবরি—মাথা দীঘল—চোখ এক যুবা হাসি—মুখে বলছে, রাধাই বল আর ললিতা—বিশাখাই বল, আমি ওই একটা মুখই গড়তে জানি।

কথাটা যতবার মনে পড়ছে, ততবারই সেই অজানা মিষ্টি শিহরণের ঢেউ খেলে যাচ্ছে তার ঢেউ—খেলানো অঙ্গে অঙ্গে। নাচতে আজ বড় ভালো লাগছে দেবদাসীর। কত ছন্দ, কত তাল, কত লাস্যের লীলা তার আজকের নাচে। পায়ের নূপুর যেন একঝাঁক ভোমরার মতো আনন্দে গুঞ্জন করছে।

নাচের শেষে মাধবদাস একটু অবাক হয়ে বললে, এ নাচ তুমি কোথায় পেলে মা? আমি তো শেখাইনি!

অলকাতিলকা ভয়ে ভয়ে বললে, তাল কেটেছে বুঝি? মুদ্রায় ভুল হয়েছে?

মাধবদাস বললে, না, তা বলিনি। তবে মনে হচ্ছিল এ নাচ ঠাকুরের উদ্দেশে নয়, মানুষের জন্যে। হয়তো আমারই বোঝার ভুল।

অপ্রতিভ হয়ে গেল অলকাতিলকা। প্রতিদিনের মতো সে তো গোপীনাথের উদ্দেশেই নেচেছে। তবে? কি হল আজ তার নাচে?

মাধবদাস আবার বললে, একটা কথা মনে রেখো মা। দেবদাসী আর নটীর নৃত্যে তফাত কি জানো? সংযমের।

রাতে কন্দর্পকান্তি এল। বললে গোপীনাথের রাধাকে দেখলে?

অলকাতিলকা ঘাড় নাড়লে। বুঝতে পারলে প্রশ্নের জের সহজে মিটবে না।

কন্দর্প জিজ্ঞেস করলে, কেমন লাগল?

আজকাল অনেক বুদ্ধি ধরে অলকাতিলকা। প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবার জন্যে বললে, কেমন করে বলব? মন্দিরে অগুরু—ধূপের ধোঁয়ায় ভালো করে দেখতে পাইনি।

কন্দর্পও ছাড়বার পাত্র নয়। বললে, তাহলে দর্পণের সামনে দাঁড়াও, ভালো করেই দেখতে পাবে।

মুখে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে তিলক বললে, রাজাবাহাদুর কি বেছে আর পোটো পেলেন না? ঠাকুর—দেবতার মুখ গড়তে যে মানুষের মুখ গড়ে, অমন পোটোকে রাধা গড়তে দিলেন কেন?

কন্দর্প বললে, দিয়ে ভালোই করেছি দেখছি। লোকটার পছন্দের সঙ্গে আমার পছন্দের মিল আছে।

অলকাতিলকা অপাঙ্গে তাকিয়ে বললে, সামান্য একজন প্রজার সঙ্গে রাজাবাহাদুরের পছন্দের মিল আছে, এ কথাটা শুনতে খারাপ।

রূপের ভক্ত সবাই। সেখানে রাজা—প্রজা নেই।—কন্দর্প বললে, ওকে আমি তার পাওনার তিন—গুণ পুরস্কার দিয়েছি।

পোটোর কপাল ভালো!

কিন্তু লোকটা বোধ হয় পাগল।

কিসে বুঝলেন?

সমস্ত টাকা সে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। বলেছে, 'আমার রাধা আমি গোপীনাথকে দান করেছি, বেচিনি।'

চুপ হয়ে গেল অলকাতিলকা।

কন্দর্প হঠাৎ প্রশ্ন করলে, সুদাম পোটোকে তুমি চিনতে?

চমকে উঠল অলকাতিলকা। অতর্কিতে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, কই, না!

কিন্তু অলকাতিলকা নিজেও বুঝতে পারলে না কেন এ লুকোচুরি। কন্দর্প বললে, আশ্চর্য, তোমাকে চোখে না দেখেও তোমার মুখ সে গড়ল কেমন করে!

অলকাতিলকা হালকা গলায় বললে, পোটোরা কল্পনায় দেখে অমন কত কি গড়ে।

কন্দর্পকান্তি উচ্চচকণ্ঠে হেসে বললে, তা হবে। কেউ কল্পনায় রূপ দেখেই সুখ পায়। সে যেন স্বপ্নে জল খেয়ে তেষ্টা মেটানো! একটু থেমে আবার বললে, আমার তেষ্টা কিন্তু সত্যিকার জল না পেলে মেটে না অলকাতিলকা!

কন্দর্পকান্তির সতৃষ্ণ দৃষ্টি দেবদাসীকে যেন ছুঁয়ে গেল।

সেদিন অনেক রাত অবধি ঘুম এল না অলকাতিলকার।

অন্ধকার ঘরে তার মনে হল শয্যার দু'পাশে দুটি পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছে। একজন কন্দর্পকান্তি, আরেকজন সুদাম। একজনের দৃষ্টিতে রূপের মাদকতা, আরেকজনের দৃষ্টিতে রূপের বন্দনা। তারই জন্যে একজনের বুকজোড়া তৃষ্ণা, আরেকজনের বুকভরা তৃপ্তি।

একি অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছে সে!

দু'জনেই হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। একজন বলছে, 'এসো, আমি তোমাকে রানি করব!' অন্যজন বলছে, 'তুই আমার রাধা!' কিন্তু অলকাতিলকা জানে কারো ডাকেই সাড়া দেওয়ার উপায় তার নেই। সে যে দেবদাসী—গোপীনাথের পায়ে নিবেদিতা। দেবতার পূজার ফুল কি মানুষের গলার মালা হতে পারে? মানুষের কাছে তার আকাঙ্ক্ষা করতেও নেই, মানুষের আকাঙক্ষা মেটাতেও নেই।

দেবদাসীর এই জীবন!

তবু কেন মনটা কাল থেকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে পিছন পানে? ঘরপালানো ছেলের মতো ছুটে ছুটে যাচ্ছে কখনো সেই হর্তুকি গাছতলায়, কখনো চকমকি নদীর ধারে, কখনো বা পোটো—পাড়ার একটা আটচালার নিচে! যেখানে জংলা সুরে তলদা বাঁশের বাঁশি বাজত, যেখানে খেলনা—হাঁড়িতে ধুলোর ভাত রান্না হত, যেখানে ছিল কথায় কথায় কোঁদল আর কথায় কথায় ভাব!

সত্যি, কি কুঁদলে ছিল সেদিনের তিলক! একদিনের কথা মনে পড়লে এখনো তার হাসি পায়। ছবিটা যেন আজও স্পষ্ট দেখতে পায়।

হর্তুকিতলায় ঘরকন্না সাজিয়ে বসে আছে তিলক। সুদাম আর আসে না। ধুলোর ভাত আর বটফলের তরকারি কখন রান্না হয়ে গেছে! তবু দেখা নেই সুদামের। একা একা অতিষ্ঠ হয়ে তিলক ঘরে চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় জঙ্গলের ওধার থেকে বাঁশির আওয়াজ শোনা যায়।

সুদাম এসেই গেরেম্ভারি চালে বলে, ভাত বেড়ে দে বউ—ঝট করে দে।

ইঃ, কি আমার কত্তা এল রে! তিন প'র বেলায় এসে বলে, 'ঝট করে ভাত দে!' ভাত দেব, না চুলোর পাঁশ দেব!

সুদাম ঘাবড়ে গিয়ে বলে, রাগ করছিস কেন?

নাকের মাকড়ি দুলিয়ে তিলক বলে, কাল যে বললি 'জুলজুলিয়া পুক' ধরে দিবি, এনেছিস?

—তাই তো! গতকাল তিলককে সে সত্যিই বলেছিল জঙ্গল থেকে জোনাকি পোকা ধরে এনে দেবে। খেলাঘরে ঝাড়লন্ঠন করবে সে। কিন্তু—কিন্তু হয়ে বলে, ওই যাঃ! ভুলে গেছি।

খেপে যায় তিলক। বলে, ভুলে গেছিস! মিথ্যুক কোথাকার! দিবি নে তাই বল। আচ্ছা, না দিবি তো আমিও ভাত দেব না, যা।

পা দিয়ে ভাত তরকারি ছড়িয়ে দেয় তিলক। সুদামেরও মেজাজ কাঁহাতক ঠিক থাকে? বলে, অত তেজ দেখাসনি বউ!

বেশ করব, দেখাব।

দেখাবি?

হ্যাঁ, দেখাব। টাট্টু ঘোড়ার মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বললে তিলক।

আর সহ্য হল না। চুলের ঝুঁটি ধরে দুম করে এক কিল বসিয়ে দিলে সুদাম। কিল খেয়ে কিল চুরি করার পাত্রী নয় তিলক। ঝাঁপিয়ে পড়ে খামচে দিল সুদামের মুখ। তারপর বেশ খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে ভেংচি কেটে বললে, সুদাম না বাদাম! অমন কত্তার মুখ আর দেখব না—দেখব না—দেখব না!

বলেই ছুট।

প্রতিশোধ নিয়েও তিলক কিন্তু ঘরে ফিরে অনেক কান্না কেঁদেছিল। পিঠের ব্যথায় নয়, সুদামকে আর দেখতে পাবে না বলে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! রাত পোহাতেই সেই তলদা বাঁশের বংশীধর তার দোরগোড়ায় এসে হাজির। শুয়েছিল তিলক, চট করে চোখ বুজে ফেললে।

সুদাম বললে, ভোর হয়ে গেল, এখনো শুয়ে! বাবা, কি ঘুম রে!

তিলক বললে, ঘুমোইনি তো!

তবে চোখ বুজে আছিস কেন?

আমি যে কাল তিন সত্যি করেছি তোর মুখ আর দেখব না। এখন কি করি?

বলতে বলতে ঠোঁট কেঁপে বোজা চোখের কোল দিয়ে জল গড়িয়ে এল তিলকের।

হেসে উঠল সুদাম। বললে, তুই তো তিনবার বলেছিস দেখবি না, চারবার বল, ব্যস, তাহলেই পচে যাবে।

তিলক যেন অকূলে কূল পেল। তৎক্ষণাৎ বলে ফেলল, তোর মুখ আর দেখব না।

তারপর একগাল হেসে চোখ মেলে তাকাল।

কিন্তু সেদিন কে জানত সেই শপথ একদা সত্যি হয়ে উঠবে! দেবদাসী হয়ে ইস্তক সুদামের মুখ সে সত্যিই দেখেনি। এক—আধটা বছর নয়, পাঁচ—পাঁচটা বছর। গোপীনাথের সেবা, মন্দিরে নাচ, আর বসন্তবিহারে নির্বাসনের মাঝে সে তো ভুলেই গিয়েছিল সুদামকে, আর সুদামের সঙ্গে সঙ্গে তার পূর্ব জীবনকে!

কিন্তু সুদাম? সুদাম তাকে ভুলে যায়নি। তিলকের মুখখানা সে নিত্য দেখেছে। জেগে জেগে আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। তার প্রমাণ সে এঁকে রেখেছে রাধার মুখে।

আসলে ভোলেনি তিলকও। কিছুই ভোলেনি। তার মনের মধ্যেই এতদিন লুকিয়েছিল সুদাম। জঙ্গলে লুকোচুরি খেলতে খেলতে যেমন হঠাৎ হারিয়ে যেত। অথবা চকমকির জলে হঠাৎ ডুব দিয়ে যেমন তিলকের পা ধরে টানত। তা নইলে এতদিন বাদে চকমকির ঘাটে সুদামকে দেখে একটুও নতুন লাগল না কেন? বরং নতুন মনে হল নিজেকে। কন্দর্পকান্তির দৃষ্টি তাকে বলে দিয়েছে তার রূপ আছে,সে পুরুষকে ভোলাতে পারে। কিন্তু একুশ বছরের জোয়ান সুদামের আবেশভরা দীঘল চোখে চোখ রেখে বুঝতে পারল সে সুন্দর! সে পুরুষের প্রিয়া!

আর, এই কথাটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে তিলকের মনে হয়েছে মেয়ে হয়ে জন্মানো তার সার্থক হল।

কাল আবার চকমকির ঘাটে অপেক্ষা করবে সুদাম। তার জন্যে, শুধু তারই জন্যে। ভাবতে কী ভালো লাগছে!

শয্যা ছেড়ে অলকাতিলকা জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। জঙ্গলের মাথায় সাতটি তারা জ্বলজ্বল করছে। ছোটবেলায় সুদাম বলত, ওরা সাত ভাই চাঁপা।

রাত এখনো বাকি। সকাল হতে আর কত দেরি?

সাত

চকমকির দুই পাড় আকুল হয়ে উঠেছে জংলা বাঁশির সুরে।

তিলক বললে, থাম না, একটা কথা বলি।

বাঁশি থামিয়ে সুদাম বললে, বল।

রাজাবাহাদুর তোকে যে টাকা পাঠিয়েছিল, ফেরত দিলি কেন? তিলক জিজ্ঞেস করলে।

একটা নুড়ি চকমকির জলে ছুড়ে দিয়ে সুদাম বললে, টাকার দরকার নেই আমার।

কেন? ঘড়া ঘড়া মোহর আছে বুঝি তোর?

ছোট্ট করে জবাব দিলে সুদাম, আছে বইকি।

গালে হাত দিয়ে তিলক বললে, বলিস কি! কোথায়?

তিলকের দিকে আঙুল দেখিয়ে সুদাম বললে, এই তো।

ঠোঁট বেঁকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে তিলক বলে উঠল, তোর বুকের পাটা তো কম নয় দেখছি! জানিস আমি কার? পরের ধনে পোদ্দারি?

তার দিকে ফিরে সুদাম বললে, ভুল বললি তিলক। পরের ধন নয়। আমার জিনিস যদি ডাকাতে কেড়ে নেয়, তাহলে জিনিসটাই চলে যায়, আমার স্বত্ব কি চলে যায় রে?

অবাক হয়ে গেল তিলক। বললে, ডাকাত! ডাকাত আবার কে?

দীঘল সরল দুই চোখ জ্বলে উঠল। সুদাম বললে, গোপীনাথ।

সুদামের রাগ দেখে তিলক হেসে ফেললে। বললে, ডাকাত কোথায়? ও যে রাখাল! হাতে তো লাঠি নেই, বাঁশি।

সেয়ানা ডাকাতের ওই তো হাতিয়ার।

মিষ্টি মিষ্টি হেসে তিলক বললে, তোর হাতেও যে তাই! তুইও তাহলে সেয়ানা ডাকাত?

সুদামের গলাটা উদাস হয়ে এল। বললে, না তিলক, সে আমি হতে চাই নে। ডাকাতি করে কি মন পাওয়া যায় রে?

তবে কি করে পাওয়া যায়? ভিক্ষে করে?

উঁহু। ডাকাতি করেও না, ভিক্ষে করেও না। যে পায়, সে আপনি পায়।

বাঁশিতে আবার ফুঁ দিল সুদাম। ভরদুপুরের আকাশ যেন ঝিমিয়ে এল সেই সুরে। ঘাটে পড়ে রইল তেল গামছা শাড়ি। তিলক যেন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে।

কাল, পরশু, তরশু, রোজ।

কিংখাবের ঝালর—দেওয়া পালকিটা রোজই দুপুরে এসে থামে হিজলগাছতলায়। চকমকির ঘাট সেখান থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এক রশি। তোলা জলে স্নান তিলকের আর ভালো লাগে না, নদীর জল নইলে গা জুড়োয় না তার। নদী যেন টানে তাকে।

নদী টানে, না বাঁশি টানে?

কেউ টানে না, টানে শুধু মন।

নাইতে গিয়ে ক্রমেই বেলা বেড়ে যায়। বেলা পড়েও আসে এক একদিন। কথা আর থামে না, সুর আর ফুরোয় না।

ওদিকে হিজলগাছতলায় পালকি রেখে পাইকরা দোক্তা খায়, খোসগল্প করে, ঝিমোয়।

কেতু সর্দার গতজন্মে বোধ করি নন্দী বা ভৃঙ্গী ছিল। দোক্তায় তার শানায় না, ভাং চাই। পানের সঙ্গে গুণ্ডির বদলে একমুঠো শুকনো ভাংয়ের পাতা চিবোলে তবে তার মৌজ হয়। কেতুর একটা মাত্র চক্ষু সর্বদাই রক্তবর্ণ। গুলি—পাকানো পেশীবহুল দেহ, ডান হাতের কব্জি অবধি কাটা, চওড়া গালপাট্টা আর চুমরানো গোঁফের দরুন মুখের চেহারাখানা এমন হয়েছে যে মা দুর্গার পায়ের তলায় বসিয়ে দিলেই হয়।

শোনা যায়, কেতু একবার জঙ্গলে চিতাবাঘের মুখে পড়ে। ডান হাতের মুঠো চিতার হাঁয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে, সে বাঁ হাতেই তার টুঁটি টিপে দফা নিকেশ করেছিল। সেই থেকে তার নাম চিতেমারা কেতু।

এ হেন কেতু সর্দার সেদিন পান খেতে গিয়ে দেখল ভাংয়ের বটুয়া ফাঁক! দেবগড়ের জঙ্গলে কিছু কিছু ভাংয়ের গাছ পাওয়া যায়। কেতু জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।

বেশি দূর যেতে হল না। আধ রশি তফাত থেকেই দৃশ্যটা কেতুর একটি মাত্র চোখে পড়ে গেল।

চকমকির ঘাটে বসে সুদাম বিভোর হয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। আর, তারই পিঠে হেলান দিয়ে বসে আছে গোপীনাথের মন্দিরের দেবদাসী!

কেতু ভাং খুঁজতে ভুলে গেল।

সে—রাতে কন্দর্পকান্তির বৈঠকখানায় একচোখো নুলো কেতুকে দেখা গেল। শিকারের সময় রাজবাহাদুরের খাস খানসামা সে। কবজি—কাটা হাতটা কপালে ঠেকিয়ে বললে, একটা খবর আছে রাজা হুজুর।

এই সময়টা কন্দর্পকান্তি ধ্যানে বসে। সুরাদেবীর ধ্যানে বৈঠকখানা নিরিবিলি থাকে। স্নান সেরে মলমলের ফিনফিনে পিরান গায়ে দিয়ে বসে। গোলাপি আতর লাগায়। গোলাপের খোশবায়ে মেজাজও খুশ থাকে।

কন্দর্পকান্তি বললে, খবরটা কি? জঙ্গল থেকে চিতে বাঘ ছিটকে বেরিয়েছে? না বুনো হাতি?

আজ্ঞে, ওসব নয়। আজকাল চকমকির ভাঙা ঘাটে বাঁশি বাজে।

তা বাজুক না। যত খুশি বাজুক। তাতে আমারই বা কি, তোরই বা কি?

দেহের ঊর্ধ্বাংশ নুইয়ে কেতু সবিনয়ে নিবেদন করলে, কেতু সর্দার তো আপনার জুতোর সুখতলা! আমার কি যাবে—আসবে হুজুর? তবে আপনার কিছু আসে—যায় বটে।

হাতের গেলাসটা নামিয়ে রাখলে কন্দর্পকান্তি। ভুরু কুঁচকে বললে, খুলে বল কেতু।

খুলেই বললে কেতু। চকমকির ঘাটে ভরদুপুরে যে দৃশ্যটা তার একচোখে ধরা পড়েছিল, তা আর ঢেকে রাখলে না। সব বলে শেষকালে জুড়ে দিলে, গুপীনাথের বদনাম, মন্দিরের বদনাম, আপনারও বদনাম।

কন্দর্প শুনলে। তারপর ঘরময় পায়চারি করতে লাগল অন্যমনস্ক হয়ে। হঠাৎ এক সময় থেমে জিজ্ঞেস করলে, ঠিক দেখেছিস তো?

কেতুর হাসিটা দন্তুর পশুর মতো। সেই দাঁতালো হাসি হেসে সে বললে, দু'চোখে বরং দু'রকম দেখায় হুজুর, একচোখে দেখতে ভুল হয় না।

হুঁ। লোকটা কে?

আজ্ঞে, সুদাম পোটো।

চমকাল না কন্দর্পকান্তি। প্রথমে কয়েক মুহূর্ত গুম হয়ে রইল, তারপর ভরাট গলায় হেসে উঠল। বললে, আমিও তাই আন্দাজ করেছিলাম। যাক, রাধা গড়ার রহস্যটা বোঝা গেল এবার। কেতু!

আজ্ঞে করুন।

কাল সকালে জলসাবাড়িতে পালকি নিয়ে যাবার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাবি।

যে আজ্ঞে রাজাহুজুর।

মন্দির—চত্বর থেকে বেরিয়ে পালকি চড়াইয়ের পথ ধরল।

কিংখাবের ঝালর ঈষৎ সরিয়ে অলকাতিলকা বললে, এদিকে কেন? নদীর ঘাটে যাও।

পালকির আগে আগে আটোসোটা নিয়ে যাচ্ছে কেতু সর্দার। পালকির পাশে এসে দাঁতালো হাসি হেসে বললে, রাজাহুজুরের মানা আছে আজ্ঞো।

একটু অবাক হয়ে দেবদাসী জিজ্ঞেস করলে, মানা কেন?

আজ্ঞে জঙ্গল থেকে চিতেবাঘ আর বুনো হাতি ছিটকে বেরুচ্ছে।

কই, কাল তো বেরোয়নি!

কেতুর চুমরানো গোঁফের নিচে আবার দাঁতাল হাসি দেখা গেল। বললে, রাতে বেরিয়েছিল, তাই দেখতে পাননি।

দেবদাসী বললে, রাতে বেরিয়েছিল তো দিনে ভয় কি?

ভয় আছে বৈকি দিদি হুজুর। বুনো জানোয়ারকে বিশ্বেস নেই। কখন কোথা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে কে জানে! রাজাহুজুর তাই বন্দুক হাতে নিজে পাহারা দিতে যাবে।

কি যেন ভাবলে অলকাতিলকা। মসৃণ কপালে দু—একটা রেখা পড়ল। একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলে, রাজা বাহাদুরের কানে কথাটা কে তুললে কেতু?

কোন কথাটা দিদি হুজুর?

এই আমি রোজ চকমকির ঘাটে নাইতে যাই। তুমি বলেছ?

জিভ কেটে কেতু জবাব দিলে, আমি! তারা! তারা! রাজা হুজুর হাওয়ায় খবর পায়। কোথায় বাঁশি বাজে আর কোথায় কাঁসি বাজে—সব জানে।

মেঘলা হয়ে এল অলকাতিলকার মুখ। বললে, আজ থেকে আমার নাওয়া তাহলে বন্ধ!

একচোখা কেতু আশ্বাস দিয়ে বললে, বন্ধ কেন হবে দিদি হুজুর? ঘরে গিয়ে দেখুন গে, ঘড়া ঘড়া রঙ্গিনীর জল তোলা আছে। ঠান্ডা হিম, গোলাপের খোসবাই ভুরভুর করছে।

কিংখাবের ঝালর টেনে দিলে অলকাতিলকা। আর কিছুই বললে না। শুধু মনে মনে বুঝতে পারলে, জঙ্গল নয়, রাজপোশাকের আড়াল থেকে একটা বুনো জানোয়ার সত্যিই বেরিয়ে এসে তার পথ আটকেছে। জন্তুটার গরম নিশ্বাসের হলকা অনুভব করতে পারছে সে।

বসন্তবিহারের ফটকে দেবদাসীকে নামিয়ে দিয়ে রাজবাড়ির পালকি ফিরে গেল। ঘরে পালংকে গা ঢেলে দিলে অলকাতিলকা।

এতক্ষণে চকমকির ঘাটে পা ডুবিয়ে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে সুদাম। সেই সুরে ভরদুপুরের আকাশ নেশায় ঢুলছে! সুদাম বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে আর দীঘল চোখে ফিরে ফিরে দেখছে ঘাটের পথে কেউ আসছে কিনা। একা একা বসে অনেকক্ষণ বাজাবে সুদাম, তারপর বেলা পড়ে আসবে, গাঙশালিকেরা ঝাক বেঁধে উড়ে যাবে বাসায়। মন—মরা সুদামও আস্তে আস্তে ফিরে যাবে। ভাববে তিলকের আজ কী হল? আসতে ভুলে গেল! একটু দেখা, দুটো কথা, তাও হল না!

সুদামের নিভে—যাওয়া মলিন মুখখানা অনেক দূরে বসেও অলকাতিলকা যেন স্পষ্ট দেখতে পেল। আর, ঝরঝর করে জল গড়িয়ে এল তার চোখের কাজল ধুয়ে। বড় ভালো লাগল কাঁদতে। কান্নায় যে এত সুখ, আগে সে জানত না।

স্নান—ঘরে পড়ে রইল ঘড়া ঘড়া রঙ্গিনী ঝরনার তোলা জল। ঠান্ডা হিম। গোলাপের খোসবায়ে ভুরভুরে।

সেদিন আর নাওয়াও হল না, খাওয়াও হল না। মানুষের কথা ভেবে ভেবেই গোপীনাথের দাসীর দিন গেল।

আট

দিন গেল, রাত এল। আসে আর যায়।

অরণ্যের রাত যেন যাদুকরী। সে ডাকে, সে টানে।

আরতি—নৃত্যের পর জলসা বাড়িতে ফিরে সাজ বদলাতে যাচ্ছিল অলকাতিলকা। চমকে উঠল। যাদুকরী রাত শুধু ডাকে আর টানে না, সে বুঝি বাঁশি বাজিয়ে সাপও খেলায়! জঙ্গলে অনেক কেউটে, অনেক শঙ্খচূড়!

কিন্তু এ তো সাপ—খেলানোর সুর নয়! রাতের বাঁশিতে জংলা সুর বাজে, এ কেমন কথা! এ সুর যে অলকাতিলকার বড় চেনা, তার রক্তে মিশে আছে এ সুর।

এই অসময়ে কে বাজায়?

সাজ পালটানো আর হল না দেবদাসীর। জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এ যে সেই সুর, যে সুর শোনার অপেক্ষায় হর্তুকি গাছতলায় আট বছরের বালিকা—মন উৎসুক হয়ে থাকত। যে সুরে চকমকির ঘাটে ভরদুপুরের আকাশ ঝিমিয়ে আসে। এ সেই জংলা সুর! দূর থেকে ক্রমশ কাছে আসছে।

কে বাজায়? যাদুকরী রাত, না আর কেউ?

হাত বাড়িয়ে কালো ওড়নাখানা টেনে নিল অলকাতিলকা। তারপর গায়ে মাথায় জড়িয়ে, পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। পায়ের নূপুর ভয়ে ভয়ে বাজতে লাগল ঝুম—ঝুম ঝুমুর—ঝুম ঝুম—ঝুম।

ছুটে এল পরিচারিকা। বললে, কোথা যাও? সঙ্গে যাব?

ঠোঁটে আঙুল দিয়ে, হাতের আংটি খুলে দিলে অলকাতিলকা।

বাঁশি কাছে আসছে।

ফটকের পাহারাদার আটকালো: রাজাবাহাদুরের হুকুম নেই একা ছেড়ে দিতে।

বাঁশি আরো কাছে আসছে।

অলকাতিলকার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। পাহারাদারকে বললে, মন্দিরে মুক্তোর হার ফেলে এসেছি। এখুনি যাও, নিয়ে এসো।

পাহারাদার আর দাঁড়াল না। লাঠি লণ্ঠন নিয়ে ঢালু পথে নেমে গেল। আর, ফটকে দাঁড়িয়ে সেদিকে অনিমেষে তাকিয়ে রইল অলকাতিলকা।

ধীরে ধীরে সেই পাহাড়ি রাস্তার চড়াইয়ের দিক থেকে দেখা গেল বাবরি চুলে ঘেরা একটা মাথা, আর মুখের কাছে দু'হাতে ধরা একটা আড় বাঁশি। আবছায়া জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট করে দেখা যায় না, তবু অলকাতিলকার চেতনা সজাগ হয়ে উঠল।

মাথা থেকে বুক, বুক থেকে গোটা দেহটাই দেখা গেল এবার। চওড়া বুকের ছাতি, সরু কোমরে খাটো ধুতির কোঁচার দিকটা জড়িয়ে বাঁধা।

চিনেছে। সুদাম!

যেন হাওয়ার ওপর পা। ফেলে ছুটে গেল অলকাতিলকা। শঙ্কিত নূপুর চাপা আনন্দে বেজে উঠল ঝুম—ঝুম ঝুমুর—ঝুম!

পথে, মাঝামাঝি দু'জনে দেখা।

উৎকণ্ঠায় আলুথালু হয়ে অলকাতিলকা বললে, এখানে কেন এলি সুদাম?

বাঁশিটা কোমরে গুঁজে সুদাম বললে, না এসে যে পারি নে তিলক। আজ সাতদিন তোকে দেখতে পাইনি।

তাই বলে চার কোশ পথ ভেঙে এলি! শুধু আমায় দেখতে!

মিষ্টি করে হাসল সুদাম: আর কাকে দেখতে?

সুদামের হাতখানা ধরে ফেললে তিলক। বললে, একে রাত, তায় জঙ্গলের পথ—বুনো জানোয়ার আছে—না, না সুদাম, আমার মাথা খাস, বল আর আসবি নে?

বলব। আগে বল, কাল থেকে তুই চকমকির ঘাটে যাবি?

তিলকের গলাটা ধরে এল। বললে, চকমকির ঘাটে যাওয়া আমার বন্ধ, সুদাম। রাজাবাহাদুরের মানা।

খানিক চুপ করে রইল সুদাম। তারপর আস্তে আস্তে বললে, আমি জানতাম, আমার কাছে তোর আসা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে! গোপীনাথ তোকে কেড়ে নিয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিল। রাজাহুজুর আর ফিরিয়ে দেবে না।

চোখে জল এসে পড়েছিল, সামলে নিয়ে তিলক বললে, মনে কষ্ট করিসনে সুদাম। আমার জন্যে আর ঘুরে বেড়িয়ে কি হবে বল! তার চেয়ে তুই বিয়ে—থা কর, করে সুখী হ।

হেসে উঠল সুদাম। বললে, সুখ কাকে বলে জানিস?

কাকে?

যখন দিনান্তে একটিবার তিলকের সঙ্গে সুদামের দেখা হয়। তুই ছাড়া আমার সুখ কোথায় রে?

তিলক আর পারলে না। বড় সুখে, বড় আনন্দে সুদামের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে ধরে—রাখা চোখের জল ছেড়ে দিলে।

আর, ঠিক সেই সময় পাথরের রাস্তায় ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল খটাখট খটাখট।

চকিতে মুখ তুলে তাকাল তিলক। তারপরেই সুদামের হাত টেনে জঙ্গলের অন্ধকারে মিশিয়ে গেল।

মুহূর্ত কয়েক বাদেই ঘোড়সওয়ারের মূর্তিটা ছুটে বেরিয়ে গেল তীরবেগে। আবছায়া অন্ধকারে লোহার রেকাব চকচক করছে।

সুদামের মুঠিটা তখন শক্ত করে চেপে আছে তিলক।

আরো খানিক বাদে অলকাতিলকা যখন বসন্তবিহারে এল, পাহারাদার তখনও মন্দির থেকে ফেরেনি।

পরিচারিকা বললে, রাজাবাহাদুর এসে ফিরে গেছে।

সেই রাতেই কন্দর্পকান্তির বৈঠকখানায় কেতু সর্দারের ডাক পড়ল। সেই চওড়া গালপাট্টা, চুমরানো গোঁফ আর রক্তবর্ণ একটি মাত্র চোখ।

কন্দর্প বললে, তোকে একটা কাজ করতে হবে কেতু।

নুলো হাতখানা কপালে ঠেকিয়ে কেতু বললে, আজ্ঞা করুন রাজাহুজুর।

কাল থেকে রাতে জঙ্গলে গা—ঢাকা দিয়ে থাকবি, আর জলসা বাড়ির ওপর নজর রাখবি। কে আসে, কে যায়, খবর চাই আমার। বুঝলি?

তা আর বুঝব না হুজুর? কিন্তু জঙ্গলে চিতে আছে যে!

থাকলই বা। তুই তো চিতে—মারা কেতু। না হয় বাঁ—হাতের কবজিটাও যাবে। যাকগে, কবজির দাম পাবি।

নুলো হাতখানা আরকবার কপালে ঠেকিয়ে, চিতার মতো দাঁত বের করলে কেতু।

পরদিন রাতে কন্দর্পকান্তির ঘোড়া বসন্তবিহারের ফটকে আবার থামল। দেবদাসী ঘরেই ছিল।

কাল কোথায় বেরিয়েছিলে?

সহজভাবেই জিজ্ঞেস করল কন্দর্প। কিন্তু অলকাতিলকা যেন এক মুহূর্তের জন্য কাঠ হয়ে গেল। শ্বেতপাথরের মেঝের দিকে চোখ রেখে থেমে থেমে বললে, মুক্তোর হারছড়াটা কাল কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি! পথে পড়ল কিনা—খুজতে গিয়েছিলাম।

খুঁজে পেলে?

না।

হেসে উঠল কন্দর্পকান্তি। বললে, পাবে না আমি জানি। মুক্তোর মালা হচ্ছে যুবতীর মন, একবার হারালে আর পাওয়া যায় না! দুটোই দামি জিনিস কিনা। সামলে রাখতে হয়।

অলকাতিলকা বোবা হয়ে গেল।

কন্দর্প বললে, যাকগে, একছড়া গেছে, দশছড়া আসবে। মালার অভাব কি? পরবার লোকেরই অভাব।

অলকাতিলকা চোখ তুললে। কন্দর্পকান্তিকে একবার দেখে নিয়ে বললে, রাজাবাহাদুরের এত বড় রাজ্যে সে—অভাব তো হবার কথা নয়!

কন্দর্প বললে, কথা অবশ্য নয়, কিন্তু রাজা হলেই কি সব অভাব মেটে? আমার অভাব কোথায়, তুমি খোঁজ রাখো?

কন্দর্প একটু কাছে এগিয়ে এলো। দু'পা সরে গিয়ে অলকাতিলকা বললে, আমি সামান্য মেয়ে, রাজা—রাজড়ার অভাব আমি কেমন করে জানব বলুন?

রাজা—রাজড়াও তো মানুষ। মানুষ কি চায়, তুমি জানো না?

জানি। সুখী হতে চায়।

কন্দর্পের চোখে তৃষ্ণা আর গলায় আবেগ। বললে, আমিও চাই অলকাতিলকা। কিন্তু সুখী একা হওয়া যায় না, পাশে আরেকজনকে দরকার হয়।

অলকাতিলকার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। মৃদু গলায় বললে, দেবগড়ের রাণি হবার যুগ্যি মেয়ে কি দেশে নেই? গোটা উড়িষ্যায় অনেক রূপসী মেয়ে আছে।

তা আছে বটে। রূপসী অনেক, কিন্তু মনের মতো শুধু একটি। তুমি জানো সে কে। জানো না?

অলকাতিলকা যেন পাথর।

কন্দর্প আবার বললে, ধরো, আমি যদি তাকেই চাই, সে কি আমায় ফিরিয়ে দিতে পারে?

অলকাতিলকা পাথর হয়েই দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখ থেকে কে যেন সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে।

জবাবটা ভেবে রেখো।

হাতের ছড়িটা ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে গেল কন্দর্পকান্তি।

বাঁশি ডাকে আরো বেশি রাতে। যখন মানুষ ঘুমোয়, অরণ্য জাগে। আর, অরণ্যের সঙ্গে সঙ্গে জাগে অলকাতিলকার শঙ্কিত অথচ উৎসুক মন।

ভাবে আর যাব না, কিন্তু না গিয়েও পারে না। বাঁশি শুধু ডাকে না, বশ করে। শুধু বশ করে না, অবশ করে। জংলা সুর যেন নেশার মতো। কানে গেলেই আবেশে রিমঝিম করে ওঠে সকল ইন্দ্রিয়, সমস্ত চেতনা। অবশ মন আস্তে আস্তে ফণা—তোলা নাগিনীর মতো দুলতে থাকে। নিজেকে আর সামলাতে পারে না অলকাতিলকা। কালো ওড়নাখানা গায়ে মাথায় জড়িয়ে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরোয়!

পদ্ম—কাটা মেঝের ওপর অগাধে ঘুমিয়ে থাকে পরিচারিকা। জলসাঘরের বারান্দায় নাক ডাকায় পাহারাদার। ফুলের বাগান পার হয়ে অলকাতিলকা চলে আসে ফটকে। ফটক পার হয়ে রাস্তায়। আলতো পায়ের ভয়তরাসী নূপুর বাজে ঝুম—ঝুম ঝুম—ঝুম।

যেন ফিসফিস করে বলে, চুপ চুপ! এই বুঝি কে জাগল! এই বুঝি কে দেখল!

কিন্তু কেউ জাগেও না, কেউ দেখেও না। দেখে শুধু জঙ্গলের মাথায় সপ্তর্ষি তারা। দেবদাসীর ভয় দেখে মিটিমিটি হাসে।

অলকাতিলকা বলে, এই নিশুত রাত—তোর প্রাণে কি ভয়—ডর নেই সুদাম?

হাসিমুখে সুদাম বলে, তোর আছে? থাকলে কি আমার কাছে আসতে পারতিস?

রাগ দেখিয়ে তিলক বলে, যত নষ্টের গোড়া ওই মুখপোড়া বাঁশিটা! সাধ হয় ছোটবেলার মতো ওটাকে চিবিয়ে ভাঙি।

তলদা বাঁশের বাঁশিটা এগিয়ে ধরে সুদাম বলে, নে না, সাধটা মিটিয়ে নে। বাঁশি ভাঙতে পারবি, আমার গান তো কাড়তে পারবিনে।

খুব পারব।

পারবি নে তিলক। যতদিন তুই থাকবি, ততদিন আমার গানও থাকবে।

যদি একশো বছর থাকি?

আমার গানও একশো বছর থাকবে।

যদি দু'দিন থাকি?

আমার গানের মেয়াদও দু'দিন। তুই—ই তো আমার গান রে?

সুদামের বুকের কাছে আরো সরে এসে তিলক বললে, আমার কেন এত ভয় করে সুদাম?

কিসের ভয়?

আমাদের ওপর কার যেন কু—দৃষ্টি পড়েছে!

সুদাম হেসে বললে, দূর! মিছে তোর ভয়।

একটা নিশ্বাস ফেলে তিলক বললে, তা হবে। রাত ভারি হল সুদাম, এবার ঘরে যা।

আগে তুই যা।

না, আগে তুই যা।

ঢালু পথে পা বাড়াল সুদাম। যেতে যেতে বাঁশিতে ফুঁ দিল। সেদিকে খানিক তাকিয়ে থেকে তিলক আস্তে আস্তে ফটকের দিকে এগোল।

দু'জনের কেউই এতক্ষণ লক্ষ করেনি পাশের কালকাসুন্দা ঝোপের দিকে। নইলে দেখতে পেত কু—দৃষ্টি সত্যিই পড়েছে ওদের ওপর। ঝোপের আড়াল থেকে জ্বলজ্বলে একটা চোখ সব দেখছিল! সে চোখ চিতার নয়, চিতে—মারা কেতুর।

রোজ রাতে লুকিয়ে দেখা করে?

আজ্ঞে।

লোকটা কে? নতুন কেউ?

কাট—গ্লাসের গেলাসটা তুলে নিল কন্দর্পকান্তি। কমলালেবু রঙের পানীয় টলটল করছে।

কেতু সবিনয়ে নিবেদন করলে: আজ্ঞে না, ফুলে ভোমরায় ভাব থাকলে কি বদল হয়? ভোমরা সেই পুরানো!

মানে সুদাম পোটো?

ঠিক ধরেছেন হুজুর।

হাতের ভরা পাত্রটাকে কন্দর্পকান্তি এক আছাড় মারলে মার্বেলের মেঝের ওপর। টুকরো টুকরো হয়ে গেল শৌখিন কাট—গ্লাসের গেলাস।

কেতু বলে উঠল, আহা—হা! মুখে তুলতে গিয়ে ফসকে গেল হুজুর!

চোপরাও!

ধমকে উঠল কন্দর্পকান্তি। অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে বললে, সুদাম পোটোর এমন আস্পর্ধা! প্রজা হয়ে রাজার ওপর টেক্কা দেয়!

ভাঙা কাচের টুকরোগুলো কুড়োতে কুড়োতে কেতু দন্তুর প্রাণীর মতো হাসলে। বললে, মানুষের বুকের ভেতর একটা রাজ্যি আছে হুজুর, সেখেনে সে নিজেই রাজা!

কথাটা কন্দর্প বোধ করি কান দিয়েই শুনল, মন দিয়ে বুঝল না। অন্যমনস্ক হয়ে ডাকল, কেতু!

কাচের টুকরোগুলো একপাশে জড়ো করে রেখে কেতু উঠে দাঁড়াল।—আজ্ঞে করুন রাজাহুজুর!

বয়স হলেও অন্ধকারে তোর একচোখ হায়েনার মতো জ্বলে, না রে?

তা জ্বলে বইকি আজ্ঞে।

শড়কিতে তোর বাঁ—হাতের টিপ এখনো পাকা, তাই না?

ঘাড় নেড়ে কেতু বললে, সবই মা রক্তখাগীর দয়া!

কাছে এগিয়ে এল কন্দর্পকান্তি। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বললে, তাহলে শোন। আজ রাতে এক শড়কিতে দুটোকেই—

কন্দর্পের কথা শেষ হল না। নুলো হাতখানা কপাল ঠেকিয়ে কেতু বলে উঠল, মাপ করতে হল হুজুর। আমি চিতে—মারা কেতু, আমায় জোড়—বাঁধা পাখি মারতে আজ্ঞে করবেন না। ও বড় ছোট কাজ!

ছোট কাজ!

কয়েক মুহূর্ত কেতুর মুখের পানে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল কন্দর্প। তারপর বললে, ও! সাধু হয়েছিস!

এবার শব্দ করে হেসে উঠল কেতু। বললে, কি যে বলেন হুজুর! জীবনভর শয়তানের গোলামি করে আমি সাধু হব! আর না হুজুর, এবার ছুটি দিন।

তা হবে না কেতু। জীবনভর যখন শয়তানের গোলামি করেছিস, তখন আজও করতে হবে। নইলে—

দেয়ালে কোণে রাখা রাইফেলটা টেনে নিয়ে কথাটা শেষ করলে কন্দর্প, নইলে একেবারে ছুটি দিয়ে দেব।

গুম খেয়ে গেল কেতু সর্দার। তারপর একটু হেসে বললে, না হুজুর, না! আমার জানের চেয়ে আপনার বন্দুকের একটা টোটার দাম বেশি। বাজে খরচ করবেন না!

কাল রাতে আমার খবর চাই।

যে আজ্ঞা রাজাহুজুর।

যেন ওত পেতে এগিয়ে এল একটা বুনো জানোয়ার। গুঁড়ি মেরে এসে দাঁড়াল কালকাসুন্দা ঝোপের আড়ালে।

জানোয়ার নয়, মানুষ। কেতু সর্দার। হায়েনার মতো একটা মাত্র চোখ সত্যিই জ্বলছে। হাতের শক্ত মুঠোয় একটা শড়কি!

ফাগুনে হাওয়ায় বাঁশির আওয়াজটা শুনেই এগিয়ে এসেছে কেতু। আকাশে একাদশীর চাঁদ। ছিটে—ছিটে জ্যোৎস্নায় জঙ্গলময় সলমাচুমকির কাজ করা।

ওই যে দেবদাসী আসছে পা টিপে টিপে। পায়ের নূপুর যেন ভয়ে মরে যাচ্ছে, ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম, ঝুম—ঝুম!

উলটো পথে সুদাম এল। বাঁশিটা গুঁজে রাখলে কোমরে। দু'জনে মুখোমুখি দাঁড়াল শিরীষগাছতলায়।

সব দেখতে পাচ্ছে কেতু। সুদামের মুখ আর দেবদাসীর পিঠ। শুধু শুনতে পাচ্ছে না ওদের কথা। না পাক, চোখের নিশানা ঠিক হলেই হল!

কত কথাই বলছে দু'জনে। সত্যি যেন জোড়—বাঁধা পাখি! হাওয়ায় ফুরফুর করে শিরীষ ফুলের থোকা ঝরে ঝরে পড়ছে ওদের গায়ে মাথায়। রাজাহুজুরের হুকুম এক শড়কিতে দুটোকে গেঁথে ফেলতে হবে। কিন্তু খুনের নেশা লাগছে না কেন কেতুর রক্তে? বয়েস হয়েছে বলে? না, লোহার পাতের মতো শক্ত বুকের ছাতির মধ্যে মানুষের মনটা এখনো একেবারে মরেনি বলে?

গলা টিপে মারো সেই মনটাকে। রাজাহুজুরের হুকুম বরাবর সে তামিল করে এসেছে, আজও তামিল করতে হবে। অনেক নুন খেয়েছে, কেতু সর্দার বেইমান নয়।

কিন্তু দুনিয়ার কার পাকা ধানে মই দিয়েছে ওই ছোঁড়া—ছুঁড়ি দুটো। কারো না। তবে? একজোড়া বাচ্চচা হরিণ—হরিণীকে মেরে লাভ কি?

লাভ নেই বটে, কিন্তু লোকসান আছে। জান নিতে না পারলে জান দিতে হবে। রাজাহুজুরের হুকুম!

কেতুর ইচ্ছে হল চেঁচিয়ে বলে, পালিয়ে যা রে তোরা, পালিয়ে যা! এমন রাজ্যে পালিয়ে যা, যেখেনে রাজা নেই, কেতু সর্দার নেই!

বোকা ছেলেমেয়ে দুটো তবু নড়ে না। কথা কইছে, রঙ্গ করছে, হাসছে! ভয় নেই, ডর নেই, ওরা দু'জন ছাড়া গোটা দুনিয়ায় যেন আর কেউ নেই!

মরুক তবে।

সুদামের মুখোমুখি বলে কেতুর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছে দেবদাসী। ভালোই হয়েছে। এক সঙ্গেই দুজনকে গেঁথে ফেলা সহজ। শড়কিটা মেয়েটার পিঠ ফুঁড়ে ছেলেটার বুকে সোজা ঢুকে যাবে।

বাঁ—হাতের মুঠো আরো শক্ত হল। আস্তে আস্তে শড়কি—ধরা হাতখানা উঁচিয়ে ধরলে কেতু। আর, ঠিক সেই সময় মিষ্টি হেসে মুখ ফেরাল দেবদাসী। ভরা একাদশীর চাঁদের আলো পড়ল তার মুখে।

হাত কেঁপে গেল কেতু সর্দারের। কিন্তু শড়কি তখন সে ছেড়ে দিয়েছে। সাঁত করে একটা শব্দ হল শুধু, চকচকে ফলাটা সাপের জিভের মতো লকলক করে উঠেই শিরীষগাছের গুঁড়িতে গেঁথে গেল।

ভয়ার্ত আওয়াজ করে নিমেষে অলকাতিলকাকে টেনে সরিয়ে নিলে সুদাম।

ক্লান্ত পশুর মতো কেতু তখন হাঁপাচ্ছে।

অস্থির পায়ে ঘরময় করে বেড়াচ্ছে কন্দর্প কান্তি। মাথা হেঁট করে এসে দাঁড়াল কেতু।

পারলাম না হুজুর।

স্থির হয়ে গেল কন্দর্প। হাত দু'খানা পিছনে মুষ্টিবদ্ধ।

পারলি না!

আজ্ঞে না।

কেন পারলি না?

হাতের টিপ ফসকে গেল হুজুর।

অত্যাচারী রাজবংশের রক্ত কন্দর্পের শিরায় শিরায় টগবগ করে উঠল। বললে, মিছে কথা! সাপের ছোবল ফসকায়, কেতু সর্দারের শড়কি ফসকায় না।

মা রক্তখাগীর দিব্যি! জীবনে এই পেরথম ফসকাল।

কর্কশ স্বরে কন্দর্প বললে, বাজে কথা রাখ! তৈরি হ।

দেয়ালে ঠেসিয়ে রাখা রাইফেলটা নিতে যাচ্ছিল কন্দর্প, হঠাৎ থেমে বললে, নাঃ, একটা টোটা বাজে খরচ করে লাভ নেই।

দেয়ালে ঝোলানো শংকর মাছের চাবুকটা টেনে নিলে সে।

একটুও চমকাল না কেতু। অনুনয় করে বললে, ওটাও রেখে দিন হুজুর। তার চে' আমার এই বাঁ—হাতের কব্জিটাও কেটে বাদ দিয়ে দিন, যাতে আর কখনো শড়কি ধরতে না হয়!

উত্তরে সপাং করে একটা শব্দ হল শুধু। কেতুর কালো মুখের এপাশ থেকে ওপাশ অবধি আড়াআড়িভাবে রক্ত ঝুঁজিয়ে পড়তে লাগল।

তিক্ত হাসিতে ঠোঁট দু'খানা বেঁকিয়ে কন্দর্প বললে, হাতের টিপ ফসকে গেছে! না, অলকাতিলকার চাঁদ—মুখ দেখ ভুলে গেছিস?

রক্তাক্ত মুখে বীভৎস হেসে কেতু বললে, তা গেছি হুজুর। তার চাঁদ—মুখ দেখেই ভুলে গেছি। ভালো করে আগে দেখিনি, মুখখানা অনেকটা আমার ওলাউঠোয় মরা মেয়ে কুন্তীর মতন!

তাজা রক্তের সঙ্গে দু'ফোঁটা চোখের জল এসে মিশল।

ভুরু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল কন্দর্প। তারপর হাতের চাবুকটা আছড়ে ফেলে দিলে।

নয়

শড়কিটা দৈবাৎ শিরীষ গাছের গায়ে বিঁধেছিল, তাই রক্ষে! নইলে কী যে হত ভাবলেও অলকাতিলকার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে এখনো।

সেদিন রাতে সে সুদামকে বলেছিল, চারদিকে শত্তুর! আমার গা ছুঁয়ে বল আর কখনো এমুখো হবি না?

সুদাম অবশ্য তার গা ছোঁয়নি। তখনই চলে গিয়েছিল।

শড়কি যদি তাকে তাগ করে, করুক। তিলকের গায়ে যেন ছোঁয়া না লাগে।

সেই থেকে আজ দু'রাত সুদাম আর আসে না। তবু চোখে ঘুম নেই অলকাতিলকার। আধ—পাগল মানুষটার কখন যে কি খেয়াল হয় কে জানে!

পুবের চাঁদ মাথার ওপর এল। আজও জানলায় দাঁড়িয়ে আছে অলকাতিলকা। কি জানি কখন বাঁশি ডাকে!

কিন্তু বাঁশি তো নয়, ঘোড়ার খুরের শব্দ! থামল ফটকে। এত রাতে রাজাবাহাদুর আগে কখনো আসেনি। দেবদাসীর মনটা শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলে।

কন্দর্পকান্তি ঘরে এল। রক্তাভ চোখ, মুখের নিশ্বাসে ঝাঁঝালো সুরভি।

অলকাতিলকা আড়ষ্ট হয়ে গেল। বললে, এত রাতে আপনি!

পায়ের ওপর পা তুলে বসলে কন্দর্পকান্তি। বললে, এত রাত কোথায়? দেখতে এলাম কেমন আছ, কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা।

সে—খবর নেওয়ার জন্যে তো রাজবাড়ির মাইনে—করা লোক আছে। রাজাবাহাদুর কষ্ট করেন কেন?

হাসতে হাসতে কন্দর্প বললে, কথায় বলে, কষ্ট না করলে কেষ্ট পাওয়া যায় না। আমি কি বলি জানো? কষ্ট না করলে রাধা পাওয়া যায় না।

ইঙ্গিতটা বুঝতে দেরি হল না। মুখে একটু হাসি টেনে অলকা—তিলকা বললে, রাজাবাহাদুরের কথাটা কি ঠিক হল? কেষ্টকে পাওয়া সহজ, কেষ্ট সকলের। কিন্তু রাধা যে শুধু একজনের।

একটা চোখ ঈষৎ ছোট করে কন্দর্প ক্লান্তি বললে, তাই নাকি? সেই একজনটি কে?

রাধা গোপীনাথের—সে তো সবাই জানে।

কিন্তু তুমি কার রাধা? গোপীনাথ, না সুদাম পোটোর?

বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল অলকাতিলকার। ভয়টাকে সামলে নিতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। তারপর বলে উঠল, ওকথা বলবেন না। আমি রাধা নই, গোপীনাথের কোটি দাসীর মধ্যে একটি দাসী।

দাসী—জিভ আর তালুর সংযোগে আক্ষেপের শব্দ করলে কন্দর্প। বললে, এত রূপ কি দাসী হবার জন্যে বিধাতা দিয়েছেন? না, না, এত রূপ রানি হবার জন্যে।

অলকাতিলকা আড়ষ্ট হয়েই রইল।

কন্দর্প বললে, শোনো দেবদাসী, আমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছি, আজ তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া করতেই আমার আসা। তুমি আমার হবে কিনা বলো?

এই আশঙ্কাই করেছিল অলকাতিলকা। রূপের চেয়ে বড় শত্রু নারীর আর আছে? নতমুখে নীরব রইল সে।

কন্দর্প বলতে লাগল, আমি শিকারি মানুষ, মারতেই শিখেছিলাম, আদর করতে জানতাম না। ফুল, চাঁদ, স্ত্রীলোকের রূপ কখনো ভালো করে দেখিনি। তোমার দিকে তাকিয়ে জীবনের সেই দিকটা একদিন দেখতে পেলাম। আমার বাসনার আগুন তুমি জ্বালিয়েছ অলকাতিলকা, সে আগুন তোমাকেই নেভাতে হবে।

লজ্জায় বিতৃষ্ণায় পিছন ফিরে দাঁড়াল অলকাতিলকা। বললে, এসব কথা শোনাও আমার পাপ। আমি দেবদাসী—গোপীনাথ আমার স্বামী।

গোপীনাথ তো পাথরের। পাথরের স্বামী নিয়ে রক্তমাংসের মানুষ কখনো সুখী হয়? না সাধ মেটে? আমি তোমার কোনো সাধ অপূর্ণ রাখব না অলকাতিলকা। ভোগের পেয়ালা কানায় কানায় ভরে দেব। তুমি আমার হও।

পিছন ফিরেই অলকাতিলকা বললে, আমায় মাপ করুন রাজাবাহাদুর। আমি গরিবের মেয়ে, ভোগ কি, আমি জানি নে। তাই ভোগে আমার রুচিও নেই।

শ্লেষের বাঁকা হাসিতে ঠোঁট বেঁকে গেল কন্দর্পকান্তির। বললে, তাই বটে! গরিবের মেয়ে তুমি, রাজার অনুরাগে তোমার রুচি হবে কেন? তোমার রুচি হবে সুদাম পোটোর গুপ্ত প্রেমে!

চকিতে ফিরে তাকাল অলকাতিলকা। মুখ তার সিঁদুরবরণ হয়ে উঠেই আবার সাদা হয়ে গেল।

আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কন্দর্পকান্তি। রক্তাভ চোখে আহত পৌরুষের জ্বালা। ঈষৎ স্খলিত পায়ে এক—পা এক—পা করে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে লাগল, এত গরব কিসের দেবদাসী? রূপের? কিন্তু আমি রাজা, আমার খাজনা আমি ইচ্ছে করলেই আদায় করতে পারি জানো?

একটা সর্বগ্রাসী ভয় যেন হাঁ করে গিলতে এল অলকা তিলকাকে। সর্বাঙ্গ তার হিম হয়ে আসতে লাগল। ঘরের কোণে সরে গিয়ে কাতর গলায় সে বললে, জানি। শুনেছি এই জলসাবাড়িতে এক সময় রাতের পর রাত আমার মতো অনেক মেয়ের সর্বনাশ হয়েছে। চোখের জলের নদী বইয়েও তাহা রেহাই পায়নি। তবু বলছি, আমাকে দয়া করুন রাজাবাহাদুর, দয়া করুন।

কাম—গদগদ জড়ানো গলায় কন্দর্প বললে, অত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি শুধু আদর করব—ভালোবাসব।

একই ইতিহাস সত্যিই আবার ফিরে আসে। তা নইলে বহুকাল বাদে সেই বিগত উচ্ছৃঙ্খল রাত্রিগুলোর প্রভাব এই বসন্তবিহারে আবার ফিরে আসবে কেন? শাক্ত পূর্বপুরুষদের ব্যভিচারী রক্ত এতদিনের নারী—উদাসীন কন্দর্পকান্তির রক্তে আজ আগুন ধরাল কেন?

এক—পা এক—পা করে এগোচ্ছে কন্দর্প। রক্তাভ একজোড়া চোখ যেন লেহন করছে অলকাতিলকার ভয়ার্ত সুন্দর মুখ, থরথর কাঁপা পূর্ণ বিকশিত বুক, ক্ষীণ কটি, গুরু নিতম্ব—

হাত বাড়িয়ে তার আঁচলের প্রান্তটা ধরে ফেললে কন্দর্প।

অলকাতিলকা চিৎকার করে উঠতে গেল, কিন্তু তার আগেই খোলা জানলা পথে একখণ্ড পাথর কন্দর্পের মাথা ঘেঁষে সজোরে এসে লাগল দেয়ালজোড়া আরশির গায়ে।

ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে গেল আরশিখানা।

পলকে নেশা কেটে গেল কন্দর্পের। জানলার ধারে ছুটে গিয়ে হাঁক দিলে, কে? কে ওখানে?

একটা অস্পষ্ট খসখস শব্দ। সাঁ করে একটা ছায়ামূর্তি জঙ্গলের অন্ধকারে মিশে গেল।

চাঁদ তখন পাহাড়ের আড়ালে। চিন্তিত মুখে জঙ্গলের পানে তাকিয়ে রইল কন্দর্প। তারপর অলকাতিলকার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কে ছিল ওখানে? সুদাম?

পালঙ্কের বাজুটা ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়েছিল অলকাতিলকা। বললে, আর যেই হোক, সুদাম নয়।

কথাটা বিশ্বাস হল কিনা কন্দর্পের মুখ দেখে বোঝা গেল না। একটু চুপ করে থেকে আপন মনে বললে, বন্দুকটা না এনে ভুল করেছি দেখছি। একটা শিকার হাতছাড়া হয়ে গেল!

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কন্দর্প। একটু বাদেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজ দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

শঙ্কর মাছের চাবুকে বড় ধার! মুখের ওপর আড়াআড়িভাবে যে ঘা পড়েছিল, সেটা এখনো শুকোয়নি। তা না শুকোক, বুকের মধ্যে যে পুরনো ঘা—টা নতুন করে দগদগিয়ে উঠেছে, সেটাই কেতুকে কষ্ট দিচ্ছে বেশি।

মা—মরা মেয়ে কুন্তী। দুনিয়ায় বাঁধন বলতে ছিল শুধু ওই। বড় যত্নে মানুষ করেছিল। মেয়ের পায়ে কাঁটা ফুটলে কেতুর বুকে ফুটত। কুন্তী একবার বায়না ধরেছিল চিতাবাঘের বাচ্চচা পুষবে। কেতু ঘুমন্ত বাঘিনীর বুক থেকে বাচ্চচা চুরি করে এনেছিল মেয়ের জন্যে। আরেকবার কুন্তী কাঁদতে কাঁদতে এসে বাপকে বলেছিল, গাঁয়ের মকর পরিদা তার ক্ষেত থেকে আখ তুলতে দেয়নি। পরদিনই রাতের অন্ধকারে সে শড়কি দিয়ে মকরের পেট এফোঁড়—ওফোঁড় করে দিয়েছিল। কেতুর চওড়া মিশকালো বুকখানার ভেতরটাও ছিল পাথরের মতো শক্ত। দুনিয়ায় কারো জন্যে একফোঁটাও দয়া—মায়া ছিল না। কিন্তু বুকের এক জায়গা ছিল তুলোর মতো নরম, রাজ্যের স্নেহ মায়া জড়ো করা ছিল সেখানে। সে কেবল একটা মানুষের জন্যেই। তার মেয়ে কুন্তীর জন্যে।

আর, মেয়েটা হয়েও ছিল বড় ফুটফুটে। কে বলবে চাষার ঘরের মেয়ে! রুপোর অনেক গয়না গড়িয়ে দিয়েছিল কেতু। চুড়ো—বাঁধা চুলে ঘুন্টি, নাকে বেসর, কানে মাকড়ি, হাতে খাড়ু আর পায়ে ঝাঁঝর মল পরে কুন্তী যখন ঘুরে বেড়াত, কেতু ভারি আরাম পেত দেখে দেখে।

কুন্তী যখন চোদ্দ বছরে পা দিল, কেতুর বড় সাধ হয়েছিল মেয়ের বিয়ে দেবে। খুঁজে—পেতে বরও ঠিক করেছিল পছন্দসই। কিন্তু সব ভেস্তে দিলে হতভাগী! কোত্থেকে যে ওলাউঠো নিয়ে এল! বুক চিরে রক্ত দিয়েছিল কেতু, মা রক্তখাগী তবু দয়া করলে না! বোধ হয় বাঘিনীর বুক থেকে একদিন বাচ্চচা চুরি করেছিল বলেই! একরাতে কাবার হয়ে গেল মেয়েটা! আর, কেতুর বুকের ভেতর যে নরম জায়গাটুকু ছিল, সেখানে প্রথমে একটা দগদগে ঘা হল, তারপর ক্রমে ক্রমে তাও শুকিয়ে নিরেট পাথর হয়ে গেল।

কিন্তু যথার্থই কি ঘা শুকোল? না, চাপা রইল। এতদিন বুঝতে পারেনি কেতু।

বারো বছর বাদে সেদিন রাতে জঙ্গলের ধারে শিরীষ গাছতলায় মরা কুন্তীর ঢলঢলে মুখখানা আবার দেখল কেতু। আগেও দেখেছে কয়েক ঝলক। কখনো পালকির কিংখাব—ঝালরের আড়ে, কখনো চকমকির ঘাটের পথে, কখনো বা জঙ্গলের আলো—আঁধারিতে। কিন্তু সে—দেখা তো বাপের চোখ দিয়ে দেখা নয়! সে—রাতের ভরা চাঁদের আলোয় কেতু পষ্ট দেখেছিল ঠিক যেন কুন্তীই হাসছে! হাতের টিপ তার কি করে ঠিক থাকবে? বাঘ কি নিজের বাচ্চচাকে থাবা দেয়?

সেদিন থেকে কুন্তীর মুখখানা বারবার দেখতে পাচ্ছে কেতু। আর, অবাক কাণ্ড! মেয়ের মুখ ভাবতে গিয়ে ওই দেবদাসীর মুখখানাই তার মনে আসছে!

আচ্ছা জ্বালায় পড়েছে কেতু!

কিন্তু কেতু সর্দারের শড়কি থেকে বেঁচে গেছে বলে ওরা কি রাজাহুজুরের বিষ—নজর থেকেও বাঁচবে? বাঁচবে না, কিছুতেই না। তার চেয়ে ওরা দুটিতে পালিয়ে যাক এ রাজ্যি ছেড়ে। দুনিয়ার যেখানে হয় চলে গিয়ে সুখে থাক তোরা। কেবল এ রাজ্যে আর নয়। ভয় কি তোদের? কেতু সর্দার তো রয়েছে, আমি নিজে সঙ্গে করে দেবগড়ের এলাকা পার করে দেব। চলে যা তোরা, পালিয়ে যা!

এই কথাই আজ মেয়েটাকে বলতে গিয়েছিল কেতু। গিয়েছিল অনেক রাতে জঙ্গলের অন্ধকারে লুকিয়ে—চুরিয়ে। যাতে রাজাহুজুর জানতে না পারে। কিন্তু চুপি চুপি জলসাবাড়ির জানলার কাছে যেতেই দেখল—

শয়তানের বংশে শয়তানই জন্মায়। মনে হল রাজাহুজুর মাতাল হয়ে দেবদাসী নয়, যেন তার কুন্তীর ওপর অত্যেচার করতে যাচ্ছে! কেতুর মাথার মধ্যে ওলোট—পালোট হয়ে গেল। পাথরের একটা চাঁই কুড়িয়ে নিয়ে ধাঁ করে ছুড়ে দিলে।

দামি আরশিখানা বাঁচল না বটে, কিন্তু ছুঁড়িটার ইজ্জৎ বাঁচল। সেটা তো আর কাচের মতো ঠুনকো নয়।

মেয়েটাকে আজ কিছুই বলা হল না।

না হোক, কেতু আবার যাবে। দেবগড়ের সীমানা ওদের পার করে না দেওয়া অবধি কেতুর সোয়াস্তি নেই।

মৃদঙ্গটা কোল থেকে নামিয়ে রাখল মাধবদাস। অন্যান্য যন্ত্রীদের যেতে বলে মন্দির একেবারে ফাঁকা করে দিলে, তারপর দেবদাসীকে কাছে ডাকলে।

তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে মা।

বলুন।—অলকাতিলকা পাশে বসল।

মাধবদাস বললে, তোমার বাবা নীলকণ্ঠ পণ্ডিত যেদিন তোমাকে এই মন্দিরে প্রথম এনেছিল, সেদিনের কথা তোমার মনে পড়ে?

পড়ে।

সেদিন তোমাকে আমি বলেছিলাম, দেবদাসী হতে গেলে গোপীনাথকে একাগ্রভাবে দেহ—মন সমর্পণ করতে হয়। অন্য পুরুষের সঙ্গ করা, এমনকি স্বপ্ন দেখাও পাপ। মনে আছে?

অলকাতিলকার মন শঙ্কাতুর হয়ে উঠল। মৃদু স্বরে বললে, মনে আছে। কিন্তু একথা কেন বলছেন গুরুদেব?

স্বভাবগম্ভীর গলায় মাধবদাস বললে, দেবদাসীর সাধনা বড় কঠিন সাধনা মা। সেই সাধনায় তুমি কি উত্তীর্ণ হতে পেরেছ?

অলকাতিলকার মুখ নত হয়ে এল। ভূমিতলে চোখ রেখে নিরুত্তর হয়ে রইল।

মাধবদাস বললে, কিছুকাল থেকে লক্ষ করেছি তোমার মধ্যে কি একটা পরিবর্তন এসেছে। আজকাল মন্দিরে আসতে তোমার বিলম্ব হয়ে যায়, গোপীনাথের সামনে নাচতে নাচতে তুমি অন্যমনা হয়ে পড়, তোমার নাচের মুদ্রা ছন্দ পালটে যায়! এর কারণ কি?

লজ্জিত পাণ্ডুর মুখে চুপ করে রইল অলকাতিলকা।

কিছু গোপন কোরো না দেবদাসী। আমার প্রশ্নের জবাব দাও, বলো এর কারণ কি? মাধবদাসের গলায় আদেশের সুর।

আস্তে আস্তে মুখ তুললে দেবদাসী। কাঁপা কাঁপা গলায় বললে, আপনি গুরু, আপনার কাছে আমার গোপন কিছু নেই। এর কারণ সুদাম।

সুদাম! যে ওই রাধামূর্তি গড়েছে?

ঘাড় নেড়ে অলকাতিলকা বললে, আমার ছোটবেলার সঙ্গী। এই মন্দিরে আসার পর থেকে দিনে দিনে আমি তাকে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু যেদিন এই রাধামূর্তি দেখলাম, সেদিন থেকে তার চিন্তা আমাকে পেয়ে বসেছে! তার বাঁশি যেন নিশির ডাক, কানে গেলেই মনকে আমি সামলাতে পারিনে। মন্দিরে যখন নাচি, হঠাৎ সব বাজনা ছাপিয়ে সেই বাঁশির সুর বেজে ওঠে, আমি নাচের খেই হারিয়ে ফেলি—ছন্দ পালটে যায়—গোপীনাথের বদলে দেখি সুদাম দাঁড়িয়ে হাসছে! এ আমার কী হল গুরুদেব, এ আমার কী হল!

চোখের জলে ভেসে গেল অলকাতিলকার মুখ।

মাধবদাসের মুখ কঠোর গাম্ভীর্যে থমথম করতে লাগল। শান্ত অথচ কঠিন গলায় বললে, তুমি গোপীনাথের পরিণীতা হয়ে অন্য পুরুষে আসক্ত! ছি, ছি দেবদাসী!

অলকাতিলকার বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠল। মাধবদাসের পায়ে হাত রেখে বললে, না, না, না, সুদামের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই গুরুদেব! আপনার পা ছুঁয়ে বলছি, এই দেহ গোপীনাথ ছাড়া আর কাউকে দিইনি।

তবু তুমি ভ্রষ্টা! গোপীনাথকে দেহ দিয়েছ, কিন্তু মন? মনে মনে তুমি দ্বিচারিণী!

মাধবদাসের নিষ্ঠুর কথাগুলো গমগম করে উঠল নাটমন্দিরে। আজন্মব্রহ্মচারী সেই বৈষ্ণব পুরোহিত বলতে লাগল, পবিত্রতা কি শুধু দেহের? আসল পবিত্রতা মনের। সেই মনকে তুমি কলঙ্কিত করলে দেবদাসী! দেবতাকে নিবেদন—করা ফুল দিয়ে মানুষের জন্যে মালা গাঁথলে!

নাটমন্দিরে লুটিয়ে কাঁদতে লাগল অলকাতিলকা।

অপরাধ করেছি গুরুদেব, মহা অপরাধ করেছি! সুদামের ভালোবাসা আমি ঠেলতে পারিনি—সামলাতে পারিনি নিজের মনকে! বলে দিন আমি কি করব?

মাধবদাস বললে, গোপীনাথকে জিজ্ঞাসা করো। তিনিই বলে দেবেন।

গুরুর পা ছেড়ে অলকাতিলকা গিয়ে আছড়ে পড়ল গোপীনাথের পায়ে। বললে, ঠাকুর, তুমি তো প্রেমের ঠাকুর! তুমিই বলো ভালোবাসা কি অপরাধ? তুমি বলো, আমি কি কলঙ্কিনী?

পাথরের গোপীনাথ জবাব দেয় না। বড় মধুর হাসি হাসতে থাকে শুধু।

অলকাতিলকাও ওঠে না। শুধু কাঁদে আর প্রশ্ন করে, ভালোবাসলে কি দোষ হয়?

প্রহরের পর প্রহর কাটে। একে একে তারা নেভে, প্রদীপ নেভে। পুব আকাশ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

জবাব দেয় না গোপীনাথ। রাধাকে পাশে নিয়ে শুধু হাসে। আর, গোপীনাথের সেই হাসি—মাথা মুখের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাধবদাসের মন থেকে সকল সংশয় আর সংস্কারের কুয়াশা কেটে গিয়ে, একটি নির্মল সত্য স্বচ্ছ হয়ে ফুটে উঠল।

অলকাতিলকার হাত ধরে তুলে মাধবদাস স্নিগ্ধস্বরে বললে, ঠাকুরের নির্দেশ আমি পেয়েছি দেবদাসী। ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তবে তা মানুষকে দিলেও ঠাকুরের কাছেই পৌঁছবে। তুমি যাও, দেবদাসীর জীবন ছেড়ে সুদামকে নিয়ে ঘর বাঁধো গে।

অলকাতিলকা বিহ্বল হয়ে বললে, আমার অপরাধ হবে না?

শান্ত সুন্দর হাসি হাসলে মাধবদাস। হেসে বললে, না, কোনো অপরাধ হবে না মা। আমি তোমাদের আশীর্বাদ করছি।

* * *

চিতা আর চিন্তা এক। দুটোই দগ্ধে দগ্ধে মারে।

গোপীনাথের চিন্তা, সুদামের চিন্তা, রাজাবাহাদুরের চিন্তা। অত চিন্তার বোঝা অলকাতিলকা আর বইতে পারছিল না। ভেবে ভেবে এক—এক সময় হাঁপ ধরত, রাত—জাগা চোখের কোলে কালি পড়ত। তবু ভাবনার কুল—কিনারা দেখতে পেত না সে। দুটি মানুষ আর একটি দেবতা তার উনিশ বছরের জীবনে এসে দাঁড়িয়েছে, তিনজনেই বলছে, 'অলকাতিলকা, তুমি আমার হও!' কি করবে সে? একটা মন কি তিনজনকে ভাগ করে দেওয়া যায়?

ভেবে ভেবে সারা হয়ে গিয়েছিল অলকাতিলকা।

কত সহজে মীমাংসা করে দিলেন তার গুরু! বলে দিলেন, 'ভালোবাসা যদি খাঁটি হয়, তা মানুষকে দিলেও ঠাকুরের কাছেই পৌঁছবে।'

তবে আর কিসের লজ্জা, কিসের ভয়? সুদামের সঙ্গে ঘর বাঁধতেই বা অপরাধ কোথায়?

মন্দির থেকে ফিরে যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে অলকাতিলকা। পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে তার মন।

কিন্তু এত সুখের ভাগ যে নেবে, সে কই? সে তো আর আসে না! অলকাতিলকা নিজেই যে মানা করেছে। চারদিকে শত্রু! কোথায় শড়কির ফলা সাপের জিভের মতো লকলক করছে কে জানে! তবু সুদামকেই আজ চাই। শত বিপদ মাথায় নিয়ে শত বাধা ডিঙিয়ে তাকে আসতেই হবে। তারই হাত ধরে অলকা তিলকা এই পাপের জলসাবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। যেখানে রাজা নেই, শড়কি নেই। যেখানে নির্ভয় সুখ আর নিশ্চিন্ত শান্তি!

শুকনো কলাপাতায় কাজল দিয়ে পত্র লিখলে অলকাতিলকা। 'আজ রাতে একবার আসিস। যেমন করেই হোক।'

ডাকলে দাসীকে। যেতে হবে পোটো—পাড়ায়।

এবার পত্রের সঙ্গে দাসীর হাতে গেল গলার হার। আঁচলে গেরো দিয়ে চলে গেল সে। আর, সারাটা দিন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে লাগল অলকাতিলকা। কখন রাত আসবে, চাঁদ উঠবে, বাঁশি ডাকবে!

অবশেষে রাতও এল, চাঁদও উঠল পুবের আকাশে, বাঁশিও ডাকল পাহাড়ীয়া পথে।

নিশি—পাওয়ার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এল অলকাতিলকা। নিশুতি রাতের কানে কানে আজ আর চুপি চুপি বেজে উঠল না ঝুম—ঝুম, ঝুমুর—ঝুম!

শিরীষগাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে সুদাম। কোমরে বাঁশিটা গোঁজা। বললে, তোর নূপুর আজ বাজে না কেন তিলক?

তিলক বললে, খুলে রেখে এসেছি।

খুলে রেখেছিস! কেন?

সব বলব। কিন্তু এখেনে নয় সুদাম, জঙ্গল থেকে আবার যদি কেউ—চল রঙ্গিনীর ধারে গিয়ে বসি।

সুদামের হাত ধরে ঝরনার দিকে উঠে গেল তিলক।

পাহাড়ের এদিকটায় আর জঙ্গল নেই। বড় বড় পাথরের খণ্ড আর লম্বা লম্বা বুনো আগাছা। দু'জনে গিয়ে একটা পাথরের ওপর পাশাপাশি বসল। ঠিক পিছনেই রঙ্গিনী ঝরনা খলখলিয়ে হাসতে হাসতে লাফিয়ে পড়ছে প্রায় হাজার ফুট নিচে একটা বিশাল গহ্বরে। তারপর ফেনায় ফেনায় উপচে পড়ে খাঁড়ি বেয়ে চকমকির বুকে ঝাঁপ দিয়েছে।

চতুর্দশীর চাঁদ উঠে এসেছে মাথার ওপর। ফিনিকফোটা জ্যোৎস্নায় চারদিক হাসছে।

তিলক বললে, তুই আমাকে কতখানি ভালোবাসিস সুদাম?

হেসে সুদাম বললে, কি করে বলি বল? আকাশ কত বড়, তা কি বলতে পারা যায়?

বুনো ঘাসের শিস ছিঁড়তে ছিঁড়তে তিলক বললে, তুই আমাকে অনেক দিয়েছিস সুদাম, আমি তোকে কিছুই দিতে পারিনি। এ দুঃখু রাখার ঠাঁই ছিল না আমার। ওই জলসাবাড়ির সোনার পিঁজরায় দিনরাত আমি পাখা ঝটপটিয়ে মরেছি। আজ আমি বেরিয়ে এসেছি তোর হাত ধরে চলে যাব বলে। আর ফিরব না।

তিলক! এ তুই কী বলছিস!

সুদাম যদি অবাক হয়ে তিলকের মুখের পানে তাকিয়ে না থাকত, তবে হয়তো দেখতে পেত বড় বড় পাথরের টুকরোর আড়াল দিয়ে একটা প্রাণী গুঁড়ি মেরে উঠছে।

বুনো জানোয়ার নয়, মানুষ! জানোয়ারের চেয়ে সতর্ক একটা ছায়ামূর্তি!

সুদাম বললে, তুই যে দেবদাসী!

তিলক বললে, আমার দিকে চেয়ে দেখ, আমি আর দেবদাসী নই। তাই তো আজ সব ছেড়ে চলে আসতে পেরেছি।

কালো ওড়নাখানা গা থেকে সরিয়ে ফেলল তিলক। লালপেড়ে মোটা শাড়ি পরনে, কোনো অলঙ্কার নেই, নূপুরও খুলে রেখে এসেছে। অনেক দিন পরে সুদাম দেখলে সেই হর্তুকিতলার তিলককে।

তিলক আবার বললে, গুরুঠাকুর কাল কি বলেছেন জানিস? বলেছেন, সুদামকে নিয়ে তুমি ঘর বাঁধো গে, গোপীনাথ কোনো অপরাধ নেবে না।

কোনো কথা বললে না সুদাম। টানা টানা দীঘল চোখ মেলে অনেক দূরে চেয়ে রইল।

এত ভাবছিস কি। চল চলে যাই। তিলক বললে।

যেন স্বপ্নের ঘোর কেটে গেল সুদামের। বললে, ঘর বাঁধার ভাবনা আমি যে কোনোদিন ভাবিনি তিলক! ভাবতে ভরসাও হয়নি। ফুল গাছে থাকলেই ভালো, তাকে ছিঁড়লে কি ভালোবাসা হয়?

তিলক বললে, তুই না হয় সন্নেস, কিন্তু আমি যে মেয়ে। ঘর—সংসারের সাধ যে আমার চিরকালের।

কিন্তু তুমি বামুনের মেয়ে, আর আমি জাতে কুমোর!

লাজ—লজ্জা দ্বিধা—সঙ্কোচের বাঁধ ভেঙে গেল তিলকের। সুদামের গলাটা জড়িয়ে ধরে বললে, রাজার মেয়ে যদি গয়লার ছেলের জন্যে জাত খোয়াতে পারে, তবে আমিই বা পারব না কেন বল। ভালোবাসায় তোর জাত ধুয়ে গেছে রে!

টসটস করে গলানো মুক্ত গড়িয়ে এল তিলকের গাল বেয়ে।

কালকাসুন্দা—ঝোপটা নড়ে উঠল। পাশ থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে এল আরেকটা ছায়ামূর্তি। মাথায় ঝাঁকড়া বাবরি, আবছা আঁধারে একটা মাত্র চোখ জ্বলছে।

কেতু সর্দার!

শিরীষ গাছতলাটা ফাঁকা! কোথায় গেল ওরা? আসেনি নাকি আজ? হতেই পারে না। একটু আগেও জংলা সুরে বাঁশি বাজছিল পাহাড়ি রাস্তায়!

এদিক—ওদিক তাকাতে তাকাতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল কেতু। বাজপাখির মতো সজাগ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগল। ওই যে—পাহাড়ের একেবারে কিনারায় রঙ্গিনীর দিকে পিঠ করে বসে—ওরাই না?

এই নিশি—রাতে ঘর ছেড়ে জঙ্গলে পা দেবে ওরা ছাড়া আর কারা? ভালোই হয়েছে, দু'জনকে একসঙ্গে পাওয়া গেছে। মেয়েটাকে বলবে কেতু, 'তোর চাঁদ—মুখে রাহুর নজর পড়েছে মা, পালিয়ে চ', আজই রাতে পালিয়ে চ' সুদামের ঘরে। সকাল হলে পালকি করে তোদের পার করে দেব এ রাজ্যের এলাকা। কেতু সর্দার থাকতে ভয় কি?'

রঙ্গিনীর দিকে এগোল কেতু। মেয়েটার কাছে গিয়ে বলবে, 'শড়কি ধরা এ জন্মের মতো ছেড়ে দিলাম মা! আজ থেকে তুই আমার কুন্তী!'

সুদাম বললে, চ' তাহলে চলেই যাই। অনেক দূরে গিয়ে ঘর বাঁধব। আমি পুতুল গড়ব, তুই বেচবি। কষ্ট করতে পারবি তো?

তোকে পেলাম, আর আমার কষ্ট কি সুদাম?

হঠাৎ শুকনো পাতা উড়িয়ে হু হু করে ছুটে এল খ্যাপা দমকা হাওয়া ঈশান কোণ থেকে। দেখতে দেখতে লাল হয়ে গেল রুপোলি আকাশ।

ভুরু কুঁচকে তিলক বললে, চাঁদনি রাতে ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছে, এ কেমনতর কাণ্ড! এই বেলা চলে চল। খুব চুপিসারে যেতে হবে কিন্তু।

কেন? মাধবঠাকুর তো যেতে বলেছে। তবে আমাদের আটকাবে কে?

রাজাবাহাদুর। তার চর শড়কি নিয়ে কোথায় ওত পেতে আছে কে জানে? জঙ্গলের ভেতর গা—ঢাকা দিয়ে যাই চল।

কিন্তু জঙ্গলে চিতা আছে, হাতি আছে, শাঁখচুড়ো সাপ আছে!

ভয় কি? মরি তো দু'জনে একসঙ্গেই মরব!

পারবি?

খুব পারব।

মাথার ওপর পাখসাট মেরে একটা রাতচরা পাখি বিশ্রী কক—কক শব্দে হেসে উঠল।

হাত তিরিশেক তফাতে পাথরের আড়ালে ছায়ামূর্তি পাশে হাত বাড়াল। হাত পড়ল কালো চকচকে একটা বস্তুর ওপর।

লম্বা লম্বা বুনো আগাছা সরিয়ে পাথরের পাশ দিয়ে কেতু তখন হনহনিয়ে উঠে আসছে। পা চালিয়ে আর রে ছোঁড়া—ছুঁড়ি, পা চালিয়ে আয়! তুফান উঠবে!

তবে আয়, চলে আয়।

তিলকের হাতখানা মুঠোর মধ্যে ধরে দাঁড়িয়ে উঠল সুদাম।

আর ঠিক তখনই হাত পঞ্চাশেক তফাতে পাথরের আড়াল থেকে মুখ বাড়াল সেই কালো চকচকে বস্তুটা।

এক ঝলক আগুনের সঙ্গে সঙ্গে দুম করে একটা বিকট শব্দ!

দু'হাতে বুক চেপে টলে পড়ল সুদাম। যে পাথরটায় বসেছিল, তারই কিনারায়। দেহের অর্ধেকটা ঝুলে পড়ল খাদের দিকে।

এক পলকের জন্যে বাকরোধ হয়ে গেল তিলকের। তারপরেই তার সমস্ত চেতনা, সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে উঠল, সুদাম!

সেই মর্মান্তিক বিলাপ ঝোড়ো হাওয়ার কাতরানি ছাপিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে মাথা কুটে ককিয়ে কেঁদে উঠল, সুদা—আ—আম!

ঝুঁকে পড়ে সুদামের রক্তমাখা দেহটা জড়িয়ে ধরল তিলক। পাগলের মতো তুলতে গেল টেনে। পারল না। চোখের নিমেষে সুদামের দেহের ভার তাকে সুদ্ধ টেনে নিয়ে গেল অতল পাতালে।

ঝপাৎ করে একটা আওয়াজ ভেসে এল শুধু!

খলখল করে রঙ্গিনী তেমনি হাসতে লাগল।

ছুটতে ছুটতে থমকে থেমে গেল কেতু। যেন প্রাণ নেই! যেন গুলিটা ওরই বুকে লেগেছে!

কিন্তু সে একটা নিমেষ। তারপরেই পাহাড়ের ঢালু গা বেয়ে তরতর করে নামতে লাগল। পাথর ডিঙিয়ে, কাঁটাঝোপ মাড়িয়ে। কতবার হোঁচট খেল, কতবার পিছলে পড়ল।

রঙ্গিনী ঝর্ণা রঙ্গ করে যে বিশাল গহ্বরে ঝাঁপ খেয়ে পড়ছে, তারই পাশে নেমে এল কেতু।

কেউ নেই! জলের তলায় বাসর জাগতে গেছে দু'জনে!

সুদাম আর তিলককে খেয়ে মা রক্তখাগীর মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে রঙ্গিনী।

বড় দেরি হয়ে গেল! সেই যদি এল, আরেকটু আগে এল না কেন কেতু? আর কেউ না জানুক, কেতু সর্দার জানতে পেরেছে এ কাজ কার। বাঘ—মারা বন্দুক দিয়ে তুমি জোড়—বাঁধা পাখি মারলে রাজাহুজুর! বিচার কি নেই?

নুলো হাতখানা দিয়ে চোখ মুছে ফেললে কেতু। ভিজে চোখটা আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলতে লাগল।

সেই রাতেই ঝড় এল। ঈশান কোণ থেকে কালো ঘোড়ার মতো কেশর ফুলিয়ে ছুটে এল মেঘের কুণ্ডলী। দেখতে দেখতে কালো হয়ে গেল পরিষ্কার আকাশ। মাতালের মতো টলতে লাগল অরণ্য। আর কালো আকাশ চিরে দিগ—দিগন্ত কাঁপিয়ে কোথায় যেন পড়ল একটা বাজ।

পরদিন সকালে মন্দিরের দরজা খুলেই হাহাকার করে বসে পড়ল মাধবদাস।

মন্দিরের ভাঙা ছাদের নিচে গোপীনাথের রাধা আটফাটা হয়ে আছে! গোপীনাথ কিন্তু অক্ষত দেহে তেমনি মধুর হাসি হাসছে।

দশ

গামছার খুঁটে চোখ মুছে গোকুল ঠাকুর নীরবে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বললে, বিশ্বেস করুন আর নাই করুন হুজুর, দেবদাসীই গোপীনাথের রাধা ছিল। তা নইলে সে মরবার পর সেই ফুটফুটে চাঁদের রাতে খামোকা ঝড় উঠল কেন? আর বাজ পড়ে রাধাই বা আটফাটা হল কেন বলুন?

বলবার কী বা আছে! গোকুলের বিশ্বাসকে সংস্কার বলে উড়িয়ে দিতে পারি, কিন্তু ইতিহাসকে মিথ্যে প্রমাণ করব, এমন অকাট্য যুক্তি কই?

গোকুল বললে, সাধ মেটেনি, তাই রাত যখন ভারি হয়, ওরা এখনো আসে—গোপীনাথের রাধা আর সুদাম পোটো। দু'জনা দু'জনকে ছেড়ে থাকতে পারে না কিনা। একটা কথা বলব হুজুর? রাত—বিরেতে রাজাহুজুরের মতোন আর বন্দুক চালাবেন না, ওরা ভয় পায়।

বললাম, বন্দুক চালাবার সুযোগও আর পাব না গোকুল। তোমারও গল্প শেষ হল, আমারও এখানে থাকার মেয়াদ ফুরোল।

গোকুল বললে, গল্পতো আমার শেষ হয়নি হুজুর, একটু বাকি আছে। রাতে খাওয়া—দাওয়া চুকলে বলব'খন। ও—বেলা হরিয়াল পাখির রোস্ট খাওয়াব আজ্ঞে।

বললাম, তা খাইও। কিন্তু গল্পের বাকিটুকু এখনই শুনিয়ে দাও।

শুনুন তবে।

সে—রাতের পর থেকে কেতু যেন কেমন হয়ে গেল। পালকি বয় না, রাজবাড়ি যায় না। ঘরেও না বড় একটা। গালে খোঁচা—খোঁচা দাড়ি, বাবরি চুলে আর পাট নেই।

তাকে দেখা যায় কোনোদিন রঙ্গিনী ঝর্ণার পাশে সেই পাথরটায় বসে আছে, যেখানে বসেছিল সুদাম আর তিলক। কোনোদিন বা দেখা যায় নিঝুম দুপুরে চকমকির ঘাটে। রাজাবাহাদুর ডেকে পাঠিয়েছিল, যায়নি।

কেবলই ভাবে। কি যে ভাবে, সেই জানে। হয়তো ভাবে বড় দেরি হয়ে গেল! সে—রাতে কেতু যদি গেল, একটু আগে গেল না কেন? সে আর কিছু পারুক আর নাই পারুক, বন্দুকের গুলিটা নিজে বুক পেতে নিতে পারত! চোরের মতো মারলে কেন ওদের রাজাহুজুর? তুমি রাজা বলে? তোমার দামি বন্দুকে টোটা ভরা থাকে বলে? কিন্তু ওদের মেরে তুমিই কি জিতলে? ওরা জোড় বেঁধে দুনিয়ায় এসেছিল, জোড় বেঁধেই চলে গেল! ওদের জোড়া তো ভাঙতে পারলে না!

নুলো হাতখানা দিয়ে বারবার চোখ মোছে কেতু। আর, একটা মাত্র চোখ ধক ধক করে জ্বলে ওঠে। বিড়বিড় করে বলতে থাকে, আছে, আছে, মা রক্তখাগীর দুনিয়ায় এখনো বিচার আছে! দু'দিন সবুর করো!

একদিন বসে আছে চকমকির ঘাটে, জঙ্গলের ভেতর থেকে বাঁশির আওয়াজ এল। চমকে উঠল কেতু।

না, তলদা বাঁশের বাঁশি নয়, তুবড়ি বাঁশি। কাঁধের বাঁকে বেতের ঝাঁপি ঝুলিয়ে একজন সাপুড়ে চলেছে জঙ্গলের পথ দিয়ে। বিদেশি লোক, গেরুয়া আলখাল্লা পরনে, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, হাতে লোহার বালা।

কি যে খেয়াল হল কেতুর, লোকটার পিছু নিলে। জিজ্ঞস করলে, এ—দেশে কেন গো গুণিন?

লোকটা বললে, শুনেছি দেওগড়ের জঙ্গলে শঙ্খচূড় সাপ মেলে। তাই ধরতে এসেছি।

বলো কি! শাঁখচুড়ো ধরতে পারো তুমি! ওস্তাদ গুণিন বটে! আমায় ধরে দেবে একটা? ট্যাকা দেব।

কেতু ট্যাঁক থেকে গোটা কয়েক টাকা বের করলে।

লোকটা বললে, কি করবে সাপ নিয়ে?

দুধ—কলা দিয়ে পুষব গো!

সেই দাঁতালো হাসিটি হাসলে কেতু।

ওষুধ আছে?

ওষুধ লাগবে না। আমি তো আর সাপ খেলাব না তোমার মতন।

লোকটা বললে, ও সাপ হল রাজা সাপ। একবার যদি তোমার গন্ধ পায়, তবে তুমি নজরের বাইরে থাকলেও খুঁজে খুঁজে এসে ঠিক চোট করবে। খুব হুঁশিয়ার!

চাপা উল্লাসে কেতু যেন ফেটে পড়ল। বললে, বলিহারি আজব তামাসা! তবে তো আমার একটা চাই—ই ওস্তাদ!

সবগুলো টাকা লোকটার হাতে গুঁজে দিলে কেতু।

দাবায় বসেছে কন্দর্পকান্তি। একাই খেলছে। দিবানিদ্রার পর তবু খানিকটা সময় কাটে।

চৈত্রের দুপুর ঝাঁ ঝাঁ করহে। বৈঠকখানায় অনেক দিন বাদে কেতু এসে হাজির।

নিজের চালে নিজেই মাত হয়ে যাচ্ছেন নাকি হুজুর?

কন্দর্প মুখ না তুলেই বললে, তেমন খেলোয়াড় আমি নই।

তা বইকি আজ্ঞে। তবে কি জানেন, কে কখন মাত হয়, কে বলতে পারে বলুন?

কোথায় ছিলি এতদিন? কন্দর্প জিজ্ঞেস করলে।

কোথায় আর থাকব আজ্ঞে, আপনার চরণের তলায়।

ডেকে পাঠিয়েছিলাম, আসিসনি কেন?

দেহটা বেজুত হয়েছে রাজাহুজুর, তাই আসতে পারিনি।

আজ কি মনে করে?

ছুটি চাইতে আজ্ঞে।

ছুটি! দাবার ছক থেকে মুখ তুলে তাকাল কন্দর্প। বললে, কত দিনের?

একেবারে হুজুর। বয়েস তো কম হল না।

কেতুর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিলে কন্দর্প। এই ক'দিনে মানুষটা সত্যিই বুড়ো হয়ে পড়েছে। গুলি পাকানো মিশকালো চেহারায় সেই তেল—চকচকে ভাব আর নেই। মুফে দাড়ি, বাবরি চুলে জট।

কন্দর্প বললে, তোকে নিয়ে ময়ূরভঞ্জের জঙ্গলে শিকারে বেরোব ভাবছিলাম, তুই ছুটি চাইতে এলি?

কত রকম শিকারই তো করলেন রাজাহুজুর! আর কেন?

শিকারের মজা কি ছাড়া যায় রে?

কেমন একটা খাপছাড়া হাসি হেসে কেতু বললে, তা বটে। বন্দুকের নেশা বড় নেশা।

ছ্যাঁৎ করে উঠল কন্দর্পের মনটা। কপালে সন্দেহের রেখা পড়ল। বললে, তার মানে?

মুখ্যু চাষার কথার কি মানে হয় হুজুর? আমায় ছুটি দিতে আজ্ঞা হোক। বিদেশ যাব মন করেছি।

মন করেছিস তো যা। কন্দর্প আবার দাবায় চোখ দিলে।

কেতু গেল না। উসখুস করতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বললে, একটা নিবেদন আছে রাজাহুজুর।

কি? কিছু টাকা চাই?

আমি একা মানুষ, টাকা কি হবে আজ্ঞে? হুজুরের একটি জামা যদি পায়ে করে দেন তো পরে বাঁচি। নতুন চাইনে, আপনার পরা জামা হলেই চলবে।

বাড়ির খানসামাকে ডেকে মলমলের একটা পিরান অনতে হুকুম দিলে কন্দর্প।

মাথা চুলকে হেতু সবিনয়ে বললে, হুজুরের গোলাপি আতর এক ফোঁটা মাখিয়ে দিতে বলবেন আজ্ঞে!

হেসে উঠল কন্দর্পকান্তি। বললে, বুড়ো বয়সে শখ তো খুব দেখছি! আচ্ছা, তাই হবে।

আতর—মাখা মলমলের পিরান নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল কেতু। রাজাহুজুরের মেজাজটা আজ খুশ। এত সহজে কাজ হয়ে যাবে ভাবা যায়নি।

ঘরের এককোণে রশি—বাঁধা সরা—ঢাকা একটা তিজেল হাঁড়ি। তারই পাশে গিয়ে উবু হয়ে বসল কেতু। হাঁড়ির গায়ে একটা টোকা দিতেই ভেতরে ক্রুদ্ধ নিশ্বাসের ঝড় বইতে লাগল।

কেতু আনন্দে বলে উঠল, বা বেটা বা! খুব তেজ হয়েছে দেখছি! খিদে পেয়েছে? ব্যাং খাবি? ইঁদুর? দুধ? দেব, দেব! সবুর কর!

রশির বাঁধন খুলে ফেললে কেতু। সরাখানা সামান্য একটু সরিয়ে মলমলের পিরানটা হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। তারপর আবার দাড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে বললে, এখন নয়, আরো সাতদিন উপোসী থাক, আরো তেজ বাড়ুক, তখন খেতে দেব!

কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। অন্ধকারে কোলের মানুষ চেনা যায় না।

চৈত্রের গুমোটে রাত যেন নিশ্বাস রোধ করে আছে।

মিশকালো একটা মূর্তি বুনো জন্তুর মতো নিঃশব্দে রাজবাড়ির পাঁচিল টপকাল। হাতে তার খড়—পাকানো একগাছা রশি, আলগোছে টানতেই উঠে এল কাপড়ের একটা পুঁটলি।

বৈঠকখানায় আলো জ্বলছে।

পুঁটলিটা হাতে নিয়ে মূর্তিটা বনবেড়ালের মতো পা টিপে টিপে এগোল সেদিকে। খোলা জানলার ধারে এসে দাঁড়াল। একটা মাত্র চোখ লাল আঙারের মতো জ্বলছে। রশির গেরো খুলে কাপড়টা সরাতে দেখা গেল পুঁটলি নয়, সেই সরা—ঢাকা তিজেল হাঁড়ি, ভেতরে একটা জ্যান্ত আক্রোশ চাপা নিষ্ঠুরতায় ফুঁসছে!

খোলা জানলার ঠিক নিচেই হাঁড়িটা রেখে একবার হাত বুলোলে কেতু। হিসহিস স্বরে বললে, বড্ড খিদে, না রে? যা, খা গে যা!

সরাখানা নিমেষে টেনে নিয়ে বাগানের অন্ধকারে মিশিয়ে গেল কেতু।

আর, ফোঁস করে সোজা হয়ে উঠল এক বন্য শঙ্খচূড়। জানলা বরাবর ফণা তুলে। তারপর লতার মতো লতিয়ে লতিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

কমলা রঙের পানীয়টায় আজ নেশা তেমন জমছে না।

নেশার জন্যে নেশা করত না কন্দর্পকান্তি। করত শরীরটাকে চাঙ্গা করতে। ইদানীং মাত্রাটা বেড়ে গেছে। না বাড়িয়ে উপায় কি? সন্ধে হলেই সেই এক চিন্তা। অলকাতিলকা!

কী না করেছিল কন্দর্প তার জন্যে! আরো কী না করতে পারত! দেবগড়ের রানি করতে চেয়েছিল। শুনল না মেয়েটা, লুকিয়ে একটা পোটোর ছেলের সঙ্গে পালাবার ফন্দির করলে!

বেইমান! দু'জনকেই শেষ করে দেবার মতলব করেছিল কন্দর্প। ভালোই হল, একটার বেশি খুন করতে হল না। বেঁচে গেল বন্দুকের একটা টোটা! গোলাপি আতরে আজ কাঁচা রক্তের গন্ধ!

কিন্তু রূপ ছিল বটে অলকাতিলকার। আগুন—জ্বালানো রূপ! সে—আগুন কমলা রঙের পানীয় ঢেলেও নিভছে না।

চ্যাপ্টা বোতল থেকে কন্দর্প আবার গেলাসে ঢালতে যাবে, এমন সময় ঠিক পিছনেই কার ক্রুদ্ধ নিশ্বাস ফুঁসে উঠল!

চকিতে মুখ ফেরাল কন্দর্প।

মাত্র হাত দশেক তফাতে কালান্তক যমের মতো এক শঙ্খচূড় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে! লাল চুনির মতো রক্তচক্ষু থেকে নিষ্ঠুরতা ঠিকরে পড়ছে। লকলক করছে চেরা জিভ। যেন বলছে, 'চিনেছি! গোলাপি আতরের নিশানায় ঠিক চিনেছি তোমায়!'

কন্দর্পের হাত কেঁপে ছলকে পড়ে গেল কমলা রঙের পানীয়। দেহের পেশী শক্ত হয়ে উঠল আতঙ্কে। মুখ থেকে সমস্ত রক্ত কে যেন নিংড়ে শুষে নিলে!

কন্দর্প জানে, বুনো হাতি, খ্যাপা চিতা—এদের তবু ঠেকানো যায়, কিন্তু নাগরাজ শঙ্খচূড়ের হাত থেকে পার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু পাকা শিকারি সে, এলিয়ে—আসা স্নায়ুগুলোকে ঠিক রাখার চেষ্টা করলে। একবার তাকিয়ে দেখলে, দক্ষিণের দেয়ালের কোণে ঠেসিয়ে—রাখা ওই তার দোনলা বন্দুক! কিন্তু আনতে যাবে কেমন করে? মাঝখানে পথ আগলে রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু—শঙ্খচূড়!

পালাবার রাস্তা নেই! দুটো দরজা বন্ধ, খোলা জানলাটা নাগরাজের পাশে।

শঙ্খচূড়ের চোখে চোখ রেখে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কন্দর্প। বিনবিন করে ঘাম দেখা দিয়েছে তার সারা মুখে। সেকেলে দেয়ালঘড়ির দোলকটা ঘরের স্তব্ধতার বুকে একটানা হাতুড়ি পিটতে লাগল টক—টক টক—টক টক—টক।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল টোটা—ভরা ছ'ঘরা পিস্তলটা রয়েছে দেরাজের ওপর। আর দেরাজটা আছে উত্তরের দেয়াল ঘেঁষে, কয়েক হাত পেছনে।

সাপের চোখে চোখ রেখে পিছু হটতে লাগল কন্দর্প। পরাস্ত যোদ্ধার মতো এক—পা এক—পা করে।

শঙ্খচূড়ও চতুর কম নয়। সেও এগিয়ে আসতে লাগল এঁকেবেঁকে। হাতের শিকারকে সে নাগালের বাইরে যেতে দিতে নারাজ। আরো তীব্র আক্রোশে সে ফুঁসছে। আরো চওড়া হয়ে উঠেছে তার ফণা! আরো ঘনঘন লকলক করছে তার চেরা জিভ!

এক পা, দু' পা, তিন পা—পিছু হটছে কন্দর্প।

হিলহিল করে সামনে এগোচ্ছে নাগরাজ।

দেরাজের কাছাকাছি এসে কন্দর্প ছোঁ মেরে তুলে নিলে পিস্তলটা। আর সেই মুহূর্তে লেজের ডগার ওপর ভর দিয়ে কন্দর্পের কপালে বিষ—চুম্বন দিলে বিষধর শঙ্খচূড়!

অসহ্য জ্বালায় জ্বলে গেল কন্দর্পের সর্বাঙ্গ। তবু টলে পড়বার আগে শেষ শক্তি দিয়ে পিস্তলের ঘোড়া টিপল সে।

অব্যর্থ টিপ! বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে থেঁতলে গেল প্রকাণ্ড ফণাটা।

পিস্তলের আওয়াজে রাজবাড়ির লোকেরা যখন ছুটে এল, তখন দেখল, মার্বেলের মেঝের ওপর সাপ আর মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছে।

দেবগড়ের রহস্যকথার এইখানেই ইতি।

শুনতে শুনতে দুপুর গড়িয়ে গেল। গোকুল উঠে চলে গেল কিচেনে। আজ পাখির রোস্ট খাওয়াবে। সিগারেট ধরিয়ে আমি বসেই রইলাম।

জগৎ—সংসারে বোধ করি আশার পূরণ হয় না। হয়তো অতৃপ্তি আছে বলেই জীবন এত মোহময়! তাই অতৃপ্ত আত্মারা জীবনের ভাঙা খেলাঘরে বারবার ফিরে আসে। তা নইলে একশো বছর পরে আজো গভীর রাতে সুদামের বাঁশি বাজে কেন? কেনই বা সাড়া দেয় দেবদাসী অলকাতিলকার ভীরু নূপুর? আর, সে কোথায় গেল? সেই মরা কুস্তীর বাপ একচোখো নুলো কেতু সর্দার? কন্দর্পকান্তির ওপর অমানুষিক প্রতিশোধ নিয়ে কোথায় পালাল সে? ইতিহাস তার খোঁজ রাখে না। জঙ্গলের অন্ধকারে পালাতে গিয়ে চিতে—মারা কেতু হয়তো চিতার পেটেই গেছে!

আজ সকাল সকাল ডিনারের ডাক পড়ল। রাত আটটায় আমার গাড়ি আসবে।

গোকুল ঠাকুরের শেষ অবদান এই হরিয়াল পাখির রোস্ট। পাখিগুলো বোধ হয় ডানলোপিলো দিয়ে তৈরি! চিবোতে চিবোতে মনে হল, ছেড়ে দিলেই আবার জ্যান্ত হয়ে উড়ে যাবে!

বাইরে মোটরের হর্ন শোনা গেল। সম্বলপুরেই অহারপর্বটা সেরে নেব স্থির করে উঠে পড়লাম। মালপত্র কী বা আছে, আর বাঁধতেই বা কতক্ষণ? বিদায়—সম্ভাষণ জানিয়ে যাব বলে গোকুলের খোঁজ করতে দেখি ছোট বাংলো থেকে সে বেরিয়ে আসছে। বললে, ফুলের মালা আর পান—জল রেখে এলাম। উনি কখন আসবেন বলা তো যায় না।

উনি মানে দেবদাসী অলকাতিলকা। গোকুলেরা যাকে গোপীনাথের রাধা জ্ঞান করে।

গাড়ি ছেড়ে দিল। জঙ্গলের ধার দিয়ে মোটর চলেছে। মুখ বাড়িয়ে আবছায়া জ্যোৎস্নায় বসন্তবিহারকে একবার দেখে নিলাম।

রহস্যময় সন্তবিহার! অভিশপ্ত বসন্তবিহার!

যদি আমার মতো আপনাদের শিকারের বাতিক থাকে, তবে দেবগড়ের এই প্রাচীন পান্থশালায় একদিন হয়তো আপনারা কেউ এসে আশ্রয় নেবেন। যদি আমার মতো নিশাচর হন, তাহলে নিশুতি রাতে শুনতে পাবেন পাহাড়ি পথে তলদা বাঁশের বাঁশি বঁজছে, আর মুখচোরা ভীরু নূপুর চুপি চুপি সাড়া দিচ্ছে ঝুম—ঝুম ঝুমুর—ঝুম ঝুম—ঝুম! হয়তো বা আমারই মতো আপনাদেরও রাধাদর্শন হয়ে যাবে!

সেদিন আমার এই গল্পকে আর গল্প মনে হবে না। মনে হবে সমস্ত যুক্তি—তর্ক আর বৈজ্ঞানিক বিচারের বাইরেও কিছু সত্যবস্তু আছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%