চৈতি বাঈয়ের মামলা

প্রণব রায়

অনেকক্ষণ গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করার পরেও হিলম্যান—এর নড়বার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। আচ্ছা বজ্জাতি শুরু করেছে গাড়িটা!

না, কারবুরেটারে ময়লা জমবার কথা নয়। প্লাগগুলো পরিষ্কারই আছে। এঞ্জিন ভাল করে দেখেশুনেই বেরুনো হয়েছে। আর তেল? ট্যাঙ্ক—বোঝাই। অথচ, খামোকা গাড়িটার মেজাজ গেল বিগড়ে। আর গেল তো গেল একেবারে গোধূলিয়া পাহাড়ের গায়ে মাঝ—রাস্তায়।

অনেক লম্বা লম্বা পাড়ি দিয়েছে সুমন চৌধুরি। তার বড় আদরের এই হিলম্যান নিয়েই। কিন্তু এমন ফাঁপরে পড়েনি কখনো। উৎরাইয়ের মুখে হলে বিনা স্টার্টেই সে পাহাড় থেকে নেমে যেতে পারত। কিন্তু সুমন চলেছে চড়াইয়ের পথে। ব্যাক করে তো আর পাহাড়ি রাস্তায় নামা চলে না।

এদিকে সুয্যি ডোবে—ডোবে। গোধূলিয়া পাহাড়ে সত্যিই গোধূলি নেমে আসছে। তাহলে উপায়? পাহাড়ের চুড়োয় জটিয়াবাবার ভাঙা মন্দির দেখা না হয় নাই হল। অন্ধকার নামবার আগে মানে মানে হোটেলে ফিরলেই বাঁচা যায়। একগুঁয়ে জেদি হিলম্যান এক পা—ও নড়বে না পণ করেছে।

উপায়!

বুদ্ধির গোঁড়ায় ধোঁয়া দেওয়া যাক। খানিকটা জুট নিয়ে হাতের কালি মুছে ফেললে সুমন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তাকাল পশ্চিম আকাশের দিকে। লাল, বেগুনি, জরদ, সোনালি রঙে আকাশটা যেন মাড়োয়ারি মেয়ের মতো সেজেছে। কিন্তু কতক্ষণই বা। একটু বাদেই সব রং মুছে কালোয় কালো হয়ে যাবে। হয়তো শোনা যাবে হায়েনার হাসি, চন্দ্রবোড়ার হিমসিম, আর অন্ধকারে দেখা যাবে পাহাড়ি চিতার জ্বলজ্বলে চোখ!

গাড়িখানা ফেলে রেখে হেঁটেই নেমে যাবে নাকি সুমন? আকাশ থেকে নিচের পাহাড়ি—পথের দিকে চোখ নামালে সে। আর ঠিক তখনই চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত ছবি। মাত্র আধ ফার্লং তফাতে, রাস্তাটা যেখানে বড় একটা পাথরখণ্ডের আড়ালে বাঁক নিয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মেয়ে!

বাবা আদমের বাঁ—দিকের পাঁজরা থেকে মা ইভের জন্ম যেদিন হয়েছিল, তারপর থেকেই দুনিয়ায় মেয়েরা আর আশ্চর্য নয়। মেয়ে কোন যুগে নেই? কোন দেশে নেই? কোন অবস্থায় নেই? সর্বত্রই আছে। অনিবার্যভাবেই আছে। সুতরাং গোধূলিয়া পাহাড়েও কোনো মেয়ের উপস্থিতি মোটেই আশ্চর্য নয়। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, মেয়েটির পোশাক—আশাক বাঙালির মতো। পরনে আধময়লা জাম—রঙের শাড়ি, শক্ত করে চুল টেনে খোঁপা বাঁধা। মেয়েটা সত্যিই নাকি? তাই যদি হয়, তবে উত্তরপ্রদেশের এই বুনো দেহাত অঞ্চলে বাঙালি মেয়ে শুধু আশ্চর্য নয়, অদ্ভুতও বটে!

সুমন তাকে দেখল তিন—চার সেকেন্ড মাত্র। তারপরেই মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে গেল বড় পাথরখণ্ডের আড়ালে। যেন বুনো হরিণী তাড়া খেয়েছে হঠাৎ।

কৌতূহল হল সুমনের। মেয়ে বলে নয়, বাঙালি মেয়ে বলে। গাড়ি ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেল সে। পাথরখণ্ডের পাশ দিয়ে ঘুরতেই চোখ পড়ল, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মেয়েটা পালাচ্ছে, আর পালাতে পালাতে বারবার ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে।

ব্যাপারটা কি? সন্ধে হয়ে আসছে, এ—সময় পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে যাচ্ছে কোথায়? সঙ্গে তো লোকও নেই দেখছি! মেয়েটা এ—যুগের কপালকুণ্ডলা নাকি?

পিছু নিলে সুমন।

জঙ্গল পার হলেই পাহাড়ের প্রায়—সমতল খানিকটা অংশ। পাথর—বাঁধানো চত্বরের মতো। মেয়েটা তার ওপর এসে থমকে দাঁড়াল। তারপর এক—পা এক—পা করে সোজা এগিয়ে চলল কিনারার দিকে।

কিন্তু কেন? কোথা যাচ্ছে ও? আর কয়েক পা এগোলেই তো চত্বরটা ফুরিয়ে যাবে। তারপর অতল খাদ। সুমন জানে সি লেভেল থেকে গোধূলিয়া পাহাড়ের চুড়োর উচ্চচতা আঠারোশো ফিট। সুতরাং, এখন যেখানে তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেখানকার উচ্চচতা হাজার ফুটের কম নয় নিশ্চয়।

সেই হাজার ফুট গভীর খাদের হাঁ—করা মুখের সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। পাথরের চত্বরের একেবারে শেষপ্রান্তে।

সুমনের রক্তের গতি দ্রুত হয়ে উঠল। দ্রুত হল পায়েরও গতি।

চত্বরের শেষ সীমায় এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। পাকা সাঁতারু ডাইভ দেবার জন্যে যেমন করে প্ল্যাটফর্মের কিনারায় এসে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। হু—হু হাওয়ায় আঁচল উড়ছে, উড়ছে ভেঙে—পড়া খোঁপার রাশিকৃত চুল। জ্বলন্ত পশ্চিম আকাশের আভায় একটা অলৌকিক মূর্তির মতো দেখাচ্ছে মেয়েটাকে।

নিশ্চয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে। হাত দু'খানা বুকের কাছে জোড় করে ধরা। বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। পা টিপে টিপে তার পেছনে অতি নিকটে গিয়ে দাঁড়াল সুমন। শুনতে পেল, কিন্তু বুঝতে পারল না কিছুই।

একটা একটা করে মুহূর্ত মরে যাচ্ছে।

চারপাশে অস্বাভাবিক নির্জনতা। থেকে থেকে হাওয়ার কাতরানি, জঙ্গলের মর্মর।

সুমন নিশ্বাস রোধ করে তাকিয়ে আছে সামনে মেয়েটার দিকে।

আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে খাদের দিকে দেখল সে। প্রাগৈতিহাসিক অতিকায় জন্তুর মতো রাক্ষুসে হাঁ করে আছে খাদটা। এতটুকু ভয় পেল না মেয়েটা। একবারও কাঁপল না তার দেহ। হঠাৎ পাথরের কিনারা থেকে শূন্যে পা বাড়াতে গেল—

কিন্তু তার আগেই সুমনের শক্ত দুই বাহু তাকে ধরে ফেলেছে।

ছটফট করতে করতে পাগলের মতো মর্মান্তিক চিৎকার দিয়ে উঠল মেয়েটা, মরতে দাও—আমাকে মরতে দাও—

ভাষাটা হিন্দি। তারপরেই জ্ঞান হারাল।

সে—চিৎকারে পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে গেল। আর দিকে দিকে প্রতিধ্বনি সভয়ে কেঁদে উঠল, আমাকে মরতে দাও— দাও—দাও!

ততক্ষণে সুমন মেয়েটাকে নিরাপদ স্থানে এনে ফেলেছে। অচেতন দেহটা ঘন ঘন নিশ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে। স্নায়ুর ওপর কম জুলুম হয়নি। হাঁপাচ্ছে সুমনও।

কিন্তু এখন? এখন কি করা যায়?

নির্জন পাহাড়, বাহুবন্ধনে অচেনা যুবতী। ব্যাপারটা শুনতে দিব্য রোম্যান্টিক। কিন্তু পাঠক যদি সত্যিই সুমনের অবস্থায় পড়তেন, তবে এই কথাই শুনে মনে হত, ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি!

সুমনও তাই ভাবছে। আফশোস করছে মনে মনে। কি দরকার ছিল গোধূলিয়া পাহাড়ের কপালকুণ্ডলার পেছনে ধাওয়া করার? এতক্ষণে ঘটনাটাকে মনে হয়েছিল পথচলতি একটা ছোট্ট নাটক। কিন্তু কে জানতো প্রথম দৃশ্যেই পতন ও মূর্ছা!

যাই হোক, এখন কি করা যায়? এই আসন্ন সন্ধ্যায় জঙ্গলের পাশে মেয়েটাকে ফেলেও তো যাওয়া যায় না! আগে মেয়েটার জ্ঞান ফেরানো দরকার। একটু জল পেলে হত! জলের সূত্র ধরে সুমনের খেয়াল হল তার গাড়িতে জলের বোতল রয়েছে এবং গাড়িটা অচল হয়ে মাঝরাস্তায় পড়ে আছে।

অচেতন দেহটাকে দু—হাতে বয়ে নিয়ে এল সুমন গাড়ির কাছে। জঙ্গল থেকে গাড়ি আর কতদূর! দেহটাও ভারী নয়। তবু পাথর ডিঙিয়ে আসতে সুমনের পরিশ্রম হল। কোনো রকমে পেছনের সিটে বসিয়ে দিলে মেয়েটাকে। তারপর জলের বোতল নিয়ে ঝাপটা দিতে লাগল তার মুখে—চোখে।

এতক্ষণে সুমন মেয়েটাকে ভাল করে দেখবার অবকাশ পৌল। মেয়েদের বয়সের চেয়ে শক্ত ধাঁধা দুনিয়ার আর নেই। তবু মনে হল পঁচিশের ভেতরে। দোহারা শরীর একটু রোগাই। রঙটা ফর্সা, কিন্তু অযত্নে অবহেলায় ময়লাটে। চুলে নেই তেল।

মুখের পানে লক্ষ করল সুমন।

সরু নাকের পাটা দুটো ফুলে ফুলে উঠছে। বোজা চোখের দীর্ঘ পলকগুলি জাল বিছিয়েছে গালের ওপর। মুখখানাও সুশ্রী। চিবুকের মাঝখানে ছোট্ট একটি তিল, কিন্তু সে যেন মানুষের মুখ নয়। পাথরের মুখের মতো অসম্ভব ফ্যাকাশে; ক্লান্ত, জমাট—বাঁধা কান্নার মতো করুণ! এ—মুখে কোনোদিন হাসি ফুটেছে মনে হয় না।

ঠাণ্ডা জলের ঝাপটায় ক্রমে নড়ে উঠল মেয়েটা! আস্তে আস্তে চোখ মেলল। বড় বড় ঘন কালো দুই চোখ। নিষ্প্রাণ, ভাবলেশহীন, যেন পটে আঁকা।

এক ঝাঁক প্রশ্ন করলে সুমন বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে, কেমন বোধ করছ এখন? দুর্বল লাগছে? এখানে এসেছ কেন? কে তুমি? থাকো কোথায়?

কোনো জবাব এল না।

নরম গলায় সুমন আবার বললে, তুমি কে? বলো আমায়—কোনো ভয় নেই।

এবারেও কোনো জবাব নেই। বড় বড় নিষ্প্রাণ চোখ দুটো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে আবার বুজে এল—যেন প্রগাঢ় ঘুমে।

সুমন বুঝল, প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে তার শরীরের সমস্ত স্নায়ুর তারগুলো অসাড় হয়ে গেছে।

কিন্তু মেয়েটার জবাবের জন্যে আর তো অপেক্ষা করা চলে না। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। চারদিক কালো হওয়ার আগেই নিচে পৌঁছোনো চাই। অথচ হিলম্যান সেই যে গোঁ ধরে বসেছে, নড়বার নামটি নেই! গাড়ি এবং নারী কোনোটিকেই ফেলে যাওয়া সম্ভব নয়।

এমন বিপদেও মানুষ পড়ে!

মরিয়া হয়ে সুমন উঠে বসল স্টিয়ারিং—এর সামনে। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে স্টার্ট ছাড়াই ব্যাক করে নামা যায় কিনা। অন্তত খানিকটা রাস্তাও যদি নামা যায়। তারপর রেখে হেঁটে নিচের বস্তিতে গিয়ে যা হোক একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

দিনের আলো নিভু—নিভু। সেই ক্ষীণ আলোয় পেছন দিকে তাকিয়ে অতি সাবধানে উৎরাইয়ের পথে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে সুমন। আর দশ সেকেন্ডের মধ্যেই একটা মিরাকল ঘটে গেল। আফিম খাওয়া সার্কাসের বাঘ যেন হঠাৎ ইলেকট্রিক রডের শক খেয়ে হাঁক ছাড়ল। গর্জন করে উঠল হিলম্যানের ঝিমিয়ে—পড়া এঞ্জিন সুমন যেন অকূলে কূল পেল।

শ'দেড়েক গজ নামতেই একটা চওড়া জায়গা। গাড়ি ঘুরিয়ে নিলে সে, তারপর হেড লাইটের ধারালো আলোয় অন্ধকারকে ছিন্ন—ভিন্ন করে গাড়িতে স্পিড দিলে।

পেছনে সিটে অজ্ঞাতপরিচয় মেয়েটা তখনও ঘুমে অঘোর।

পাহাড়ের নিচের বস্তিতে মেয়েটার সম্পর্কে বিশেষ কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। কেবল ল্যাংড়া দুখিয়া ভাল করে দেখে বললে, দু—হপ্তা আগে সদর হাসপাতালে সে যখন তার জখমি পাঁও কাটাতে গিয়েছিল, তখন ঠিক এই মেয়েটার মতো দেখতে একজন কমসিন দাঈকে সেখানে দেখেছিল।

হাসাপাতালের দাঈ! যাব নাকি সেখানে খোঁজ করতে? সুমন ভাবলে। কিন্তু সদর হাসপাতাল তো সেই বেরিলিতে! এই চন্দনচৌকি থেকে বেরিলি, সে কি হেথা? আর বদমেজাজী হিলম্যান নিয়ে এই অন্ধকার রাতে—দরকার নেই আর ঝামেলায়, যথেষ্ট হয়েছে।

থানার রাস্তাটা জেনে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিলে সুমন। পুলিশের জিম্মায় ফেলে দিয়ে আসা যাক মেয়েটাকে, খোঁজ—খবর যা করবার ওরাই করুক।

কিন্তু থানা অবধি যেতে হল না, বস্তি থেকে বেরোতেই আর একজোড়া হেড লাইটের সামনে পড়ে গেল সুমন! আর সঙ্গে সঙ্গে গুরুগম্ভীর গলায় হাঁক শোনা গেল, রুখ যাও!

রুখতেই হল গাড়ি। পাশে এসে থামল একখানা জিপ— পুলিশের। লাফ দিয়ে নামল দুজন উর্দি পরা অফিসার। এগিয়ে এল টর্চ হাতে। প্রথমে সুমনের, তারপরে পেছনের সিটে ঘুমে অচেতন মেয়েটার মুখে টর্চ লাইটের আলো পড়ল।

একজন আরেকজনকে হিন্দিতে বললে, এই তো সেই বলেই মালুম হচ্ছে!

অপরজন সায় দিলে, হুঁ। মুখের আইডেন্টিফিকেশন মার্কও মিলে যাচ্ছে।

টর্চের আলো আবার পড়ল সুমনের মুখে। প্রশ্ন হল, নাম?

নাম বললে সুমন।

ঘর?

লক্ষ্মৌ, হজরতগঞ্জ।

চন্দনচৌকিতে কেন?

বেড়াতে।

পেশা কি?

পুলিশের সঙ্গে লড়াই করা।

চমকে গেল অফিসার দুজন। গর্জন করে উঠল, মতলব? সোজা করে বলুন।

একটু হেসে সুমন তার কার্ড বের করে দিল।

টর্চের আলোয় একজন পড়লে, সুমন চৌধুরি, বার—অ্যাট—ল।

আরেকজন অবাক হয়ে বললে, লক্ষ্মৌয়ে হাসান আলি মার্ডার কেসটা আপনি ডিফেন্ড করেছিলেন?

সবিনয়ে সুমন বললে, আমিই।

ভারি সেনসেশনাল কেস! রাতকে আপনি দিন বানিয়ে দিয়েছিলেন।

পুলিশের ফাইল থেকে সত্যিটাকে টেনে বের করেছিলাম মাত্র, আর বিশেষ কিছু নয়।

আপনিই কি লেট পাবলিক প্রসিকিউটার সদাশিব চৌধুরির—

ছেলে।—সুমন পাদপূরণ করলে।

আলাপ করে খুশি হলাম চৌধুরিসাব।

আমিও।

কিন্তু চৌধুরিসাব, এ মেয়েটা কি আপনার চেনা?

একেবারেই না।

তবে আপনার গাড়িতে এল কি করে?

গিয়েছিলাম গোধূলিয়া পাহাড়ে। জটিয়াবাবার মন্দির দেখতে। এ মেয়েটি পাহাড় থেকে খাদে লাফিয়ে খুদখুশি করতে যাচ্ছিল, ধরে ফেলতেই বেহোশ হয়ে গেল। বেহোশ মানুষকে একা ফেলে আসা চলে না, তাই বাধ্য হয়ে গাড়িতে তুলেছি। আপনারা জানেন, এ কে?

জানি বৈকি। একেই তো আমরা খুঁজছি।

খুঁজছেন! কেন?

মেয়েটা ফেরারি খুনি আসামি।

আচমকা যেন একটা ধাক্কা খেল সুমন। লক্ষ্নৌ ক্রিমিন্যাল বারের নাম—করা ব্যারিস্টার হলেও এতটা সে ভাবতে পারেনি। এই মেয়েটা খুনি আসামি! এই নিতান্ত সাদাসিধে সাধারণ মেয়েটা! কিন্তু মাত্র তিন বছরের ব্যারিস্টারি অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, দুনিয়ায় আশ্চর্য বলে কিছু নেই।

অফিসার দুজন ততক্ষণে মেয়েটাকে হিলম্যান থেকে জিপে তুলেছে।

কিছু মনে করবেন না চৌধুরিসাব, মেহেরবানি করে একবার থানায় আসতে হবে। আটকাব না—আপনার একটা স্টেটমেন্ট নিয়েই ছেড়ে দেব।

কিছু বললে না সুমন। একটা সিগারেট ধরিয়ে জিপের পিছু নিলে। থানাতেই তো যাচ্ছিল সে, কিন্তু খুনি আসামির সম্পর্কে জবানবন্দি দিতে হবে ভাবেনি। বাঘে ছুঁলে আঠারো যা, আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা! কোথা থেকে কী! আজ কার মুখ দেখে সে জটিয়াবাবার মন্দির দেখতে বেরিয়েছিল কে জানে! জটিয়াবাবা খুবই জট পাকালেন যা হোক!

থানা থেকে হোটেলে ফিরতে রাত বেশি হয়নি। কিন্তু ঘুম এল না অনেক রাত অবধি। না আসারই কথা।

বয়স্ক অফিসারটির মুখ থেকে মোটামুটি ব্যাপারটা জানা গেছে। সুমনের অনুমান ঠিক নয়। মেয়েটি অবাঙালি। নাম চৈতি বাঈ। পেশা নাচ—গানের মুজরো করা, অর্থাৎ বাঈজি। নিবাস লক্ষ্নৌ শহর, সুমন নিজে রহনেবালা যেখানকার। জয়প্রকাশ নামে এক কাপ্তেন যুবকের আনাগোনা ছিল চৈতি বাঈয়ের আসরে। মাস—খানেক আগে তাকে রিভলভারের গুলিতে খুন করে চৈতি ফেরার হয়। এরপর পুলিশ জানতে পারে সে বেরিলির সদর হাসপাতালে কাজ নিয়েছে। বাঈ থেকে দাঈ। দুখিয়া ঠিকই বলেছিল। কিন্তু বেরিলিতেও পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি। যদিও পুলিশ শিকারি কুকুরের মতোই তাড়া করেছিল পলাতকা চৈতি বাঈকে—বেরিলি থেকে চন্দনচৌকি অবধি, তবুও ফেরারি আসামিকে তারা জীবনে ধরতে পারত না। কিন্তু গোধূলিয়া পাহাড়ে সুমন চৌধুরির সঙ্গে চৈতির দেখা হওয়ায় নাটকের মোড় ফিরে গেল।

বয়স্ক অফিসার ভদ্রতা করে বলল, পুলিশের তরফ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি চৌধুরিসাব। আপনি শুধু চৈতি বাঈকে বাঁচাননি, পুলিশকেও বাঁচিয়েছেন।

কিন্তু চৈতিকে সত্যিই কি বাঁচান সুমন? হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের গা থেকে খাদে ঝাঁপ দিয়ে সে মরতেই চেয়েছিল, কিন্তু সুমন তাকে বাঁচতে দিল কোথায়? অনন্তমুখ মৃত্যুর একটা মুখ থেকে ছিনিয়ে এনে তার আরেকটা হাঁ—করা মুখে ঠেলে দিল না কি? এখন কি হবে চৈতির? ৩০২ ধারার অপরাধে যে দণ্ড হয়, তাই হবে। ফাঁসি।

তাই যদি হয়, হোক না। আইনের চোখে যদি প্রমাণ হয়ে যায়, চৈতি বাঈ নিজের হাতে রিভলভার ধরে জয়প্রকাশকে গুলি করে মেরেছে? তবে ব্যারিস্টার সুমন বলবে, খুনির ফাঁসি হওয়াই উচিত।

কিন্তু এ তো হল ব্যারিস্টারের কথা। সুমনের মধে যে সাধারণ সহজ মানুষটা আছে, সে কি বলছে? সে বলছে, একটা মেয়ের ফাঁসির জন্যে নিমিত্তের ভাগি হয়ে রইলে তুমি! এটাই কি উচিত হল?

কিন্তু উচিত—অনুচিতের তর্কে আর লাভ কি? কি ফায়দা মানুষ সুমনের কথায় কান দিয়ে? হাতের পাশা পড়ে গেছে। চৈতি বাঈ এখন পুলিশের খপ্পরে ভাগ্যিস মহত্ব দেখিয়ে মেয়েটাকে হোটেলে এনে তোলেনি, তাহলে সে নিজেও এতক্ষণে পুলিশের খপ্পরে পড়ত! কে জানে তার স্টেটমেন্ট পুলিশ সত্যিই বিশ্বাস করছে কিনা! কিচ্ছু বলা যায় না। কাল সকালেই একবার থানায় যাওয়া দরকার।

মানুষ সুমন যাই বলুক, ব্যারিস্টার সুমন ভাল করেই জানে আজকের দুনিয়া বড় কড়া জায়গা, যেখানে—সেখানে মহত্ব দেখালে প্যাঁচে পড়তে হয়।

অনেক রাত অবধি এপাশ—ওপাশ করল সুমন। তারপর শেষ রাতের ঠাণ্ডা হাওয়া তাকে একসময় ঘুম পাড়িয়ে দিল।

চেহারাটা দেখলে বুড়িকে গরির গাঁওয়ার বলেই মনে হয়। নুয়ে—পড়া দেহ আর মুখের বলিরেখা দেখলে বয়স মনে হয় ষাট পেরিয়েছে, কিন্তু লক্ষ করলে বোঝা যায় এত হয়নি। আধময়লা থানের ওপর অতিজীর্ণ একটা মটকার চাদর, মাথার চুলগুলি কদম ফুলের মতো ছাঁটা। বগলে একটা গামছায় বাঁধা পুঁটলি।

ডান হাতখানা কপালে ঠেকিয়ে বারবার সেলাম করছে বুড়ি, আর দেহাতি ভাষায় অনর্গল কি সব বলে যাচ্ছে। দরজায় মোতায়েন সেপাই তার পুরুষ্ট মোচে তা দিচ্ছে, আর সেপাইসুলভ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বুড়িকে ধমকে উঠছে মাঝে মাঝে। যেমন করে বেড়ালছানাকে লোকে তাড়া দেয়।

একটা গোলমেলে আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই কানে এল না সুমনের। কাছে এগিয়ে আসতেই সেপাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল। সুমনকে সে চিনেছে, দেখেছে গতরাত্রে 'অপসর লোগ'—দের সাথে। অমায়িক হেসে জানাল, বড়ে হজৌর তাঁর কামরাতেই আছেন, চলে যান।

কিন্তু ভেতরের দিকে সুমন পা বাড়াতেই বুড়ি একেবারে হাউমাউ করে কেঁদে তার সামনে এসে দাঁড়াল। বারবার সেলাম করে বলতে লাগল, আধা ঘণ্টা ধরে এই সেপাইজীর কাছে আর্জি পেশ করছি, কিন্তু এই বুড়ির কথা সে গ্রাহ্যই করছে না। এত দূর থেকে এত আশা নিয়ে এসে আমি কি তবে ফিরেই যাব?

সেপাইকে সুমন প্রশ্ন করলে, ব্যাপার কি?

সেপাই বললে, এই বুডঢির নাকি থানার হাজতে রয়েছে, তাই ও দেখা করতে চায়। লেকিন থানার কানুন হচ্ছে, মা হোক আর যেই হোক, আসামির সঙ্গে দেখা করা নিষেধ। তো সেপাই কি করে বুড়িকে যেতে দেবে বলুন?

বুড়ি যেন রুখে উঠল, মা নিজের বেটিকে দেখতে পাবে না, এ কোন দেশি কানুন! এ হতে পারে না, সেপাইজী মিছে কথা বলছে।

সুমন বোঝাবার চেষ্টা করলে, না, সেপাইজী ঠিক কথাই বলেছে। কোনো আসামির সঙ্গে বাইরের কাউকে দেখা করতে দেওয়ার কানুন সত্যিই নেই।

লেকিন হুজুর, তুমি 'অপসার', তুমিই তো কানুন। তুমি এই বুডি—মাকে যেতে দিলে, সেপাইজীর সাধ্যি কি আটকায়? ওর নাকের তলা দিয়ে আমি চ লে যাব।

সুমন কৌতুক বোধ করলে। বললে, আপনি ভুল করেছেন, আমি পুলিশের আদমি নই।

খপ করে বুড়ি সুমনের একখানা হাত ধরে ফেললে; বললে, নাই বা পুলিশের আদমি হলে, আদমি তো বটে। তোমারও তো মা আছে। যেমন করে পারো তুমি একটা উপায় করে দাও বেটা। আমার বিটিয়াকে আমি একটিবার দেখতে চাই, আর কিছু না। শুধু চোখের দেখা—

চোয়াল—ওঠা রোগা গাল বেয়ে টসটস করে জলের ধারা নেমে এল। কাঁপতে লাগল কথা হারিয়ে যাওয়া শুকনো ঠোঁট দু'খানা।

সুমন বিব্রত বোধ করতে লাগল। একটু চুপ করে থেকে বললে, আচ্ছা, দাঁড়ান, দেখি কি করতে পারি।

গোবিনজী তোমার ভালো করুন বেটা!

হাসি—কান্নায় মেশা মুখে একটু আশা চিকচিক করে উঠল।

এক পা এগিয়ে সুমন আবার ফিরে বললে, কে আপনার মেয়ে? নাক কি?

আমার মেয়ের নাম শান্তিলতা।

সুমন খানার ভেতরে চলে গেল।

আইয়ে ভকিলসাব।

বড়ে হজৌর অর্থাৎ দারোগাসাহেব নমস্তে জানিয়ে একটা কুরসি দেখিয়ে দিলেন। সুমন। বসতে বসতে বললে, শান্তিলতা নামে কোনো মেয়ে—আসামি আপনার এখানে আছে?

কেন বলুন দেখি?

সুমন বুড়ির কথা খুলে বললে। আরো বললে, যদিও কানুন নেই, তবু মেহেরবানি করে আপনি যদি বুড়িকে তার মেয়ের সঙ্গে একবার মিলতে দেন বড় খুশি হব। হাজার হলেও মা তো! বুড়ি শুধু চোখের দেখা দেখবে, কোনো গোলমাল করবে না—আমি নিজে তার দায়িত্ব নিচ্ছি।

দারোগাসাহেব বললে, এ আর এমন কি! আপনার কথা আমি নিশ্চয় রাখতাম চৌধুরিসাব, কিন্তু শান্তিলতা নামে কোনো মেয়ে মুজরিম এখানে নেই।

নেই!

না, বুড়ি স্ত্রীলোকটিকে বলে দিন সে ভুল খবর পেয়েছে।

সুমন বললে, আমার কথায় হয়তো বিশ্বাস করবে না, কান্নাকাটি করবে। আপনি বরং তাকে ডেকে বলে দিন।

বুড়িকে ডাকতে পাঠাল দারোগাসাহেব।

সুমন জিজ্ঞেস করলে, আপনার কালকের আসামির খবর কি? সুস্থ হয়ে উঠেছে তো?

গম্ভীর মুখে দারোগাসাহেব বারদুয়েক মাথা নাড়লে। তারপর বললে, তাকে নিয়ে এক নতুন ঝামেলা হয়েছে চৌধুরিসাব।

নতুন ঝামেলা!

হ্যাঁ, হয় মেয়েটার দেমাগ সত্যিই বিগড়ে গেছে, নয় পাগল সেজেছে?

তাই নাকি!

আজ ভোর থেকে সে যেন কেমন হয়ে গেছে। চোখের চাউনিও পালটে গেছে। কথা বলে না, হাজার জেরা করলেও একদম চুপ! মাঝে মাঝে খালি তড়পে ওঠে, 'ছোড় দো মুঝে—মুঝে ম্যরণে দো।'

সুমন বললে, ভারি অদ্ভুত তো! একবার দেখতে পারি?

বেশ তো, দেখুন না।

দারোয়াজার সঙ্গে বুড়ি এসে সেলাম করে দাঁড়াল। দারোগা সাহেব তাকে জানাল, শান্তিলতা নামে কোনো মেয়ে—মুজরিম এ থানার হাজতে নেই।

নেই! তবে কি সে ধরা পড়েনি!—বিড় বিড় করে বললে বুড়ি। তারপর কাঁপা হাতে পুঁটলি খুলে বেব করল একটা জিনিস। পুরোনো হিন্দি খবরের কাগাজের তৈরি একটা ঠোঙা। দারোগার হাতে সেটা দিয়ে বুড়ি আকুলি—বিকুলি করে বলে উঠল, দেখুন হুজুর—ভাল করে দেখুন—এ লেড়কি এখানে নেই?

ঠোঙার গায়ে খবরের সঙ্গে একটি মেয়ের ছবি ছাপা। সেদিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে গেল দারোগার, আর অবাক হয়ে গেল সুমন।

দারোগা বললে, এই তোমার বেটি?

জী, আমার পেটের মেয়ে।

কিন্তু এ যে চৈতি বাঈ!

না, না হুজুর, আপনাদের গলৎ হয়েছে। ওর নাম শান্তিলতা।

এমনি সময় পাশের কোনো একটা ঘর থেকে বড় করুণ ডুকরে—ওঠা একটা আওয়াজ ভেসে এল, ছোড় দো—মুঝে ম্যরণে দো!

সঙ্গে সঙ্গে নুয়ে—পড়া দেহটা সিধে হয়ে গেল। ঝাপসা চোখ দুটো হয়ে উঠল জ্বলজ্বলে। বুড়ি বললে, ও কার আওয়াজ? কে ও? বলুন হুজুর, বলুন! আমার শান্তিলতা নয় তো? আমায় যেতে দিন হুজুর—একটিবার ওর কাছে যেতে দিন!

সুমন তাকাল দারোগার পানে। কুরসি ছেড়ে উঠে দারোগা বুড়িকে বললে, এসো। আসুন ভকিলসাব।

সুমনের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় বুড়ির চোখ ছলছল করে উঠল।

করিডর থেকে হাজত—ঘরটা সোজা নজরে পড়ে।

লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, কম্বলের ওপর পা মুড়ে চুপটি করে বসে আছে চৈতি বাঈ বা শান্তিলতা। রুখু চুলগুলি এলো হয়ে কিছু পিঠে, কিছু মুখের পাশ ঝুলছে। মুখ নামিয়ে আঙুল দিয়ে কম্বলের ওপর আঁকিবুকি কাটছে আপনমনে। তিনটে মানুষের তিনজোড়া পায়ের আওয়াজেও তার খেয়াল হল না।

দরজার কাছে এসে বুড়ির চোখের পলক আর পড়ে না। গলায় অপূর্ব স্নেহের মধু ঢেলে আস্তে আস্তে ডাকলে, শাস্তি! আমি এসেছি মা!

চৈতি বাঈ এতটুকু চমকাল না, কিন্তু দারুণ চমকে উঠল সুমন। দেহাতের গাঁওয়ার বুড়ির মুখে একি শুনল সে! পরিষ্কার বাংলা কথা।

বুড়ি আবার ডাকলে, শান্তি! শুনছিস!

চৈতি বাঈ এবার মুখ তুললে। বোবা পশুর মতো ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়েই রইল।

বুড়ি বললে, অমন করে চেয়ে রইলি কেন? আমায় চিনতে পারছিস না? আমি যে তোর মা—ফয়জাবাদের মা!

মা!

আস্তে আস্তে ভয়ের ছায়া ফুটে উঠল বোবা চোখে। কম্বল থেকে উঠে এক—পা এক—পা করে এগিয়ে এল চৈতি। ভীত গলায় বললে, পালাও মা পালাও—পুলিশে ধরবে—বিচার হবে—ফাঁসি দেবে!

আর একবার চমকাল সুমন। শহর লক্ষ্নৌর নামকরা বাঈজী চৈতি বাঈও সাফ বাংলা বলছে!

ওরে না, না, তুই তো খুন করিস না, তোর সাজা হবে না, হতে পারে না। ভয় নেই মা, কোনো ভয় করিস নে।

লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে মেয়ের একখানা হাত চেপে ধরল বুড়ি। নিমেষে চৈতি বাঈয়ের দৃষ্টি পালটে গেল। বড় বড় কালো চোখ আতঙ্কে হয়ে উঠল আরো বড়। জালে—পড়া পশুর মতো চিৎকার করে কাৎরে উঠল, ছোড় দো মুঝে—ম্যরণে দো!

হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল বুড়ি, তুই কি শেষটা পাগল হয়ে গেলি শান্তি! তবে আমি কার জন্যে এলুম! হা গোবিন্দ!

গণ্ডগোল দেখে দারোগা ইশারা করল সুমনকে। বুড়ির পিঠে একখানা হাত রেখে সুমন বললে, বাইরে চলুন। ওকে একা থাকতে দিন।

সুমনও এবার পরিষ্কার বাংলা বললে।

করিডর দিয়ে চলতে চলতে সুমন দারোগাকে প্রশ্ন করলে, আসামির জন্যে কোনো ডাগদার আনিয়েছিলেন নাকি?

দারোগা সংক্ষেপে জবাব দিল, না। যাদের আসামি, তাদেরই কাজ ওটা। আসামিকে আজই লক্ষ্নৌ পাঠিয়ে দিচ্ছি।

থানার বাইরে এসে সুমন বললে, আপনি বাঙালি?

ঘাড় নেড়ে বুড়ি বললে, হ্যাঁ বাবা। তুমিও তো তাই।

এখানে কোথায় উঠেছেন?

কোথাও উঠি নি বাবা, এস্টেশন থেকে সিধে থানায় এসেছি।

বিনা ভূমিকায় সুমন বললে, আমি আপনার ছেলের বয়সি, আমার হোটেলে চলুন। খানিকটা জিরিয়ে তারপর যেখানে হয় যাবেন।

সুমন তার হিলম্যান গাড়িতে বুড়িকে তুললে।

কেসটা ভারি ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে, বুড়িকে ছাড়লে চলবে না।

আমার নাম সুমন চৌধুরি। আমি লক্ষ্মৌ কোর্টের একজন ব্যারিস্টার।

বুড়ি প্রশ্ন করলে, ব্যারিস্টর কি বাবা? ম্যাজিস্টরের বড় ভাই না ছোট?

একটু হেসে সুমন বললে, ব্যারিস্টার হচ্ছে কি জানেন? এই উকিল আর কি! আপনার মেয়ের ব্যাপারটা আমায় খুলে বলুন, হয়তো সাহায্য করতে পারব।

তুমি উকিল!—বুড়ি যেন হঠাৎ হাজার টাকার একখানা নোট কুড়িয়ে পেল। এ বিপদে তুমি ছাড়া কাণ্ডারি আর কে আছে বাবা? গোবিন্দ তোমায় মিলিয়ে দিয়েছেন!

আচ্ছা, আপনি বলছেন, আপনার মেয়ের নাম শান্তিলতা, অথচ পুলিশ বলছে ওর নাম চৈতি বাঈ। এর কারণ কি?

কি জানি বাবা, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

শান্তিলতা আপনার পেটের মেয়ে, তাই না?

হ্যাঁ বাবা, তাই।

তবে থানায় শান্তির সঙ্গে দেখা করে আপনি নিজেকে শুধু মা না বলে, ফয়জাবাদের মা বললেন কেন?

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল বুড়ি। তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, কি জানো বাবা, ওর আরেকটা মা ছিল—বেনারসি মা।

আরেকটা মা ছিল! মানে আপনার সতীন?

না বাবা, সতীন নয়, মিতিন। সবই বলছি তোমায়।

বলুন। কোনো কিছু গোপন না করে সব কথা খুলে বলুন।

গোড়া থেকেই বলি তাহলে।—বুড়ি শুরু করলে, আমার নাম গিরিজায়া। বাপের বাড়ি ছিল মাদারিপুরে। পুরুত বামুনের মেয়ে, তাই বে হল গরিব ঘরেই। নাম করতে নেই, তবু বলছি (কপালে হাত ঠেকিয়ে) আমার স্বামীর নাম নীলকণ্ঠ মৈত্র। ফয়জাবাদে একটা কাপড়ের দোকানে মুন্সীর কাজ করতেন। বের পর মাদারিপুর থেকে এলুম ফায়জাবাদে স্বামীর ঘরে করতে। বের পর মাদারিপুরে মোটে বার দু—তিন গিয়েছিলুম, আর যাইনি। যাবার উপায়ও আর নেই। আজ তিরিশ বছর হল বাপের বাড়ির সবাই মরে—হেজে গেছে।

স্বামীর মাইনে অল্প, তবু তাই দিয়েই গুছিয়ে সংসার পাতলুম। কোলে দুটি ছেলে এল, কিন্তু কপাল আমার—রইল না। এর বছর আষ্টেক বাদে আবার দুটি মেয়ে পর পর এল আমার কোলে! আদর করে তাদের বাপ নাম রাখলে শান্তিলতা আর কান্তিলতা। শান্তি জন্মাবার পর তার বাপ কিছু টাকা কর্জ করে গাঁয়ের দিকে একটা কুঁড়ি তৈরি করলে। ইটের গাঁথানি, খাপরার চাল। তবু তো নিজের ঘর! দেনাটা আর বছর তিনেকের মধ্যেই শোধ হয়ে যেত, কিন্তু কপাল যে আমার পোড়া! কান্তি যখন আড়াই বছরের, তখন বলা নেই কওয়া নেই অমন সাজোয়ান জলজ্যান্ত মানুষটা একবেলার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল!

দু—চোখে জল নিয়ে গিরিজায়া দেবী চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার বলতে লাগলেন, শান্তি তখন পাঁচ বছরের। অনাথ মেয়ে দুটোকে নিয়ে আমি অকূলে ভাসলুম। পাঁপর, বড়ি আর আচার তৈরি করে বাড়ি বাড়ি বেচে দু—বেলা যা হোক দুটো জুটছিল, কিন্তু বাড়ির দেনা? মহাজন কোর্ট—কাছারির ভয় দেখাতে লাগল। রাতে ঘুম হত না, ভাবতুম, কচি মেয়ে দুটোর হাত ধরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? এই সময় একদিন সোহিনীর সঙ্গে দেখা।

সোহিনী! তিনি কে?

আমার মিতিন। ফয়জাবাদের মিশিরদের মেয়ে। দেখতে ভারি সোন্দর, আমারই সমান—সমান বয়েস। আমাদেরই ভাড়া বাড়ির কাছেই ওদের বাড়ি ছিল। তাই নতুন বউ হয়ে যখন ফয়জাবাদে যাই, তখন ও এসে আমার সঙ্গে সহেলি পাতিয়েছিল। সে আজ কতকালের কথা! সোহিনী যখন—তখন আসে আমার ঘরে; হাসে, গল্প করে, গান শোনায়। কী গানই গাইতো! যেন মধু! বছর তিন—চার সোহিনী ফয়জাবাদে ছিল, তারপর একদিন চলে গেল। যাবার আগে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে বলে গেল, দেশে গিয়ে তার বিয়ে হবে। বর নাকি খুব সোন্দর, বড়লোক আর মস্ত গাইয়ে—বাজিয়ে মানুষ। দেখা যদি আর না হয়, আমি যেন তাকে না ভুলি।

সেই সোহিনীর সঙ্গে আবার দেখা হল ক'বছর বাদে। আমি তখন বিধবা। শিবরাত্তিরের পুজো দিতে কাশী গিয়েছিলুম সেখানে অহল্যাবাঈ ঘাটে দেখি, চান সেরে সোহিনী উঠে আসছে। চেহারা আগের চেয়ে মোটাসোটা হয়েছে, আরো সোন্দর হয়েছে। গা ভর্তি গয়নাগাটি। শুনলুম, এই কাশীতেই নাকি ওর শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু আশ্চর্য, একবারও বললে না, চল। আমার দশা দেখে দুঃখু করলে অনেক, জিজ্ঞেস করলে দিন চলছে কি করে। দরদি পেয়ে আমিও সব কথা বললুম।

সঙ্গে আমার শান্তি কান্তি ছিল। সোহিনী তাদের আদর করলে খানিক, তারপর বললে, দেখ গিরি, আমি টাকা দিচ্ছি, বাড়ির দেনাটা তুই মিটিয়ে দে। মনে কর না আমি তোর সহেলি নই, তোর নিজের বোন।

বললুম, সে তো অল্প টাকা নয় সোহিনী।

সোহিনী বললে, নাই অল্প হোক, যা লাগে সবটাই আমি দেব, ভাবিস নে। আর, দুটো মেয়েকে মানুষ করা সহজ নয়, (শান্তিকে কাছে টেনে নিয়ে) তুই বরং এই মেয়েটাকে আমায় দিয়ে দে! আমার তো ছেলেপুলে হল না, আমি এটাকে মেয়ের মতো মানুষ করি।

চট করে কোনো জবাব দিতে পারলুম না। পেটের মেয়ে বিলিয়ে দেব কী।

সোহিনী আমার হাতখানা ধরে কেমন যেন কাঙালের মতো বলে উঠল, বল দিবি? একটা দিলে আরেকটা তোরই থাকবে।

মনে মনে ভাবলুম, তাই তো! শান্তিকে দিয়ে দিলে কান্তি তো আমারই রইল। সোহিনীর কাছে কত সুখ কত আদরে শান্তি মানুষ হবে, আমি কি সাতজন্মেও তা পারব? তাছাড়া মাথা গোঁজার আস্তানা বাড়িটুকু তো বাঁচবে! ভাবতে ভাবতে সেই তিত্থিস্থানে দাঁড়িয়ে মা গঙ্গার সামনে সোহিনীকে আমি কথা দিয়ে ফেললুম।

শান্তিলতা তখন সবে ছ'য়ে পা দিয়েছে।

এর দিন দশেক বাদেই সোহিনী ফয়জাবাদে গিয়ে হাজির। টাকা দিয়ে মেয়ে নিয়ে নিয়ে আবার কাশী চলে গেলে। শর্ত রইল মাঝে—মাঝে মেয়েটাকে সে পাঠিয়ে দেবে, কিন্তু আমি কোনোদিন দেখতে যেতে পাব না। সেদিন মা হয়ে মেয়ে বেচে যে পাপ করেছিলাম, আজ বোধ হয় তারই সাজা পাচ্ছি বাবা—জন্মের মতো মেয়েটাকে হারাতে বসে! আমার মেয়ে আজ খুনি আসামি!

দরদর করে জল গড়িয়ে এল গিরিজায়ার চোয়াল—ওঠা রোগা গালের ওপর।

শান্তি কতদিন আপনার কাছ—ছাড়া? সুমন প্রশ্ন করলে।

গিরিজায়া বললেন, তা ধরো গিয়ে আঠারো বছর হবে।

আপনার মেয়ে আপনার কাছে মাঝে মাঝে আসত?

আসত। তবে বচ্ছরে এক—আধবারের বেশি নয়। যেদিন আসত, তার পরদিনই সোহিনী লোক পাঠাত মেয়েকে নিতে। কতবার, ভেবেছি মেয়েকে আটকে রেখে দেব, কিন্তু পারিনি! বাবা বিশ্বনাথের পায়ের তলায় দাঁড়িয়ে গঙ্গা সাক্ষী করে বাক্যি দিয়েছি যে! তাছাড়া অতগুলো টাকা! যাই হোক, সোহিনী তবু পাঠাত, কিন্তু মেয়ে তার বেনারসি মাকে পেয়ে দিনে দিনে আমাকে পর করে দিতে লাগল। কিছু মনে কোরো না বা সন্তান এমনি বেইমান বটে! তা নইলে এই দেখো না, সোহিনী মারা গেল, আর শান্তিও ফয়জাবাদে আসা বন্ধ করে দিলে। কিন্তু বেচে দিই, বিলিয়ে দিই, তবু তো আমি মা! মেয়ের এত বড় সর্বনেশে খবর পেয়ে আমি কি চুপ করে থাকতে পারি? তাই তো ফয়জাবাদ থেকে ছুটে এলুম চন্দনচৌকি।

খুনের খবরটা আপনি পেলেন কোত্থেকে? প্রশ্ন করলে সুমন।

গিরিজায়া একটু দম নিলেন। নিয়ে বললেন, সন্তানের বিপদের খবর মায়ের কাছে বেশিদিন চাপা থাকে না বাবা। খবর কেউ দেয়নি, আপনিই পেলুম। পাঁপড় আর বড়ির জন্যে আমায় ডাল পাঠিয়ে দেয় রামভরোসা মুদি। দিন দশেক আগে কাগজের যে ঠোঙাটায় সে ডাল পাঠিয়েছিল, দেখি তারই পায়ে, ওমা, শান্তির ছবি ছাপা! আর হিন্দিতে কি সব লেখা। ফয়জাবাদে থেকে থেকে হিন্দি বলাটা আমার রপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু পড়তে পারি না বাবা। তাই আমাদের গাঁয়ের পিয়নকে বললুম, এতে কি লেখা আছে দেখো তো। পিয়ন পড়ে বললে, লক্ষ্নৌ শহরের চৈতি বাঈ একজনকে খুন করে পালিয়েছে। পুলিশ তাকে খুঁজছে। এ তারই ছবি। শুনে মন থেকে যেন পাহাড় নেমে গেল। যাক, এ ছবি তাহলে আমার শান্তিলতায় নয়।

সুমন বললে, তাহলে চন্দনচৌকিতে ছুটে এলেন কেন?

বলছি বাবা! কপালে দুঃখু লেখা থাকলে খণ্ডাবে কে? দিনকতক বাদেই একটা চিঠি এল আমার নামে। এই যে দেখো না!

পুঁটলি থেকে গিরিজায়া খামশুদ্ধ একখানা চিঠি বের করে সুমনের হাতে দিলেন। দ্রুত হাতের আঁকাবাঁকা বাংলা হরফে লেখা ছোট্ট চিঠি। সুমন পড়লে :

সদর হাসপাতাল

বেরিলি

মাগো,

হয়তো তুমিও জানতে পেরেছো আমি এখন ফেরারি খুনি আসামি। এখানে এসে দাঈ সেজে লুকিয়ে আছি। কতদিন তোমায় দেখিনি! বড় দেখতে ইচ্ছে করছে। আমি জানি তুমি মুখ ফিরিয়ে নেবে না। যদি দেখা পাই, আর কিছু নয়, ছোটবেলার মতো তোমার কোলে মুখ লুকিয়ে একবার কাঁদব।

হতভাগী

শাস্তি

চিঠিখানা পড়া হলে সুমন বললে, বেরিলি হাসপাতালে শান্তির দেখা পেয়েছিলেন?

গিরিজায়া বললেন, না বাবা, গিয়ে শুনি শান্তি নেই। একজন আধাবয়সী দাঈ আমায় আড়ালে ডেকে চুপি চুপি বললে, পুলিশ এখানেও তাড়া করেছিল। তাই শাস্তি কাল চন্দনচৌকি পালিয়েছে। তুমি তো শান্তির মা? তোমাকে এ—কথা সে জানাতে বলে গেছে। মনটা ছাঁৎ করে উঠল। ভোর হতেই ছুটে এলুম চন্দনচৌকি। এসেই আগে থানায় খোঁজ করলুম, কোনো কমবয়সী মেয়েছেলে ধরা পড়েছে কিনা। তারপর যা হল সবই তো দেখলে বাবা। তুমি তো উকিল। এখন কি করব বলতে পারো? কি করলে মেয়েটাকে উদ্ধার করা যায়?

গিরিজায়ার চোখে—মুখে আকুলতার ছাপা। সেটা লক্ষ করে সুমন আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। খানিক চুপ করে থেকে বললে, কিন্তু আসল ব্যাপারটাই যে অন্ধকারে রয়ে গেল!

কোন ব্যাপারটা বাবা?

শান্তিলতা সত্যিই খুন করেছে কিনা।

গিরিজায়া বলে উঠলেন, সত্যি নয় বাবা, একটুও সত্যি নয়। খুন ও করেনি, করতে পারে না। বড় ওর মন। ছোটবেলায় একটা পোষা পাখি মরে গেলে যে কেঁদে ভাসিয়ে দিয়েছিল, সে করবে মানুষ খুন! না বাবা, আমার মন বলছে শান্তি খুন করেনি।

সুমন একটু ক্ষীণ হাসলে। হেসে বললে, এ তো নিজের ছেলেমেয়ের সম্পর্কে মায়েদের চিরকেলে ধারণা। কিন্তু ধারণা দিয়ে তো আইনের সঙ্গে লড়াই করা চলে না। তার জন্যে চাই দুটো হাতিয়ার—সাক্ষী আর প্রমাণ। তা না পেলে আইনের খপ্পর থেকে আপনার মেয়েকে উদ্ধার করব কেমন করে বলুন? খুন সম্পর্কে আপনি কি কিছুই জানতে পারেননি?

না বাবা, কিছুই জানতে পারিনি। কেমন করে জানব বলো? মেয়েটার তো দেখলে মাথা খারাপ। হ্যাঁ বাবা, ও কি ভয়ে ভাবনায় সত্যিই পাগল হয়ে গেল?

পাগল ঠিক নয়,—সুমন বললে, ওটা এক রকম মানসিক রোগ, স্নায়ুতে বেশি ঘা লাগলে অমন হয়। আপনাকে বলা হয়নি, গোধূলিয়া পাহাড়ের গা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আপনার মেয়ে মরতে যাচ্ছিল, আমি দেখতে পেয়ে ধরে ফেলি।

গিরিজায়া যেন পাথর হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, হতভাগী মরলে ভালই হত! সব জ্বালা জুড়িয়ে যেত! কিন্তু তুমি যখন একবার তাকে বাঁচিয়েছ, তখন ওকে বাঁচবার ভার তোমাকেই আবার নিতে হবে বাবা। গোবিন্দজীর তাই ইচ্ছে।

সুমন সোজাসুজি বললে, দেখুন, গোবিন্দজীর ইচ্ছে হলেও আমার কিছুই করবার নেই। কেননা গোবিন্দজীর আইন আর জজসাহেবের আইনে অনেক তফাত। আপনার মেয়েকে বাঁচাবার কোনো রাস্তাই আমি দেখতে পাচ্ছি না।

গিরিজায়া একেবারে ভেঙে পড়লেন। সুমনের হাত দুটো ধরে বলে উঠলেন, তবু চেষ্টা তোমাকে করতেই হবে বাবা। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। তুমিও তো কোনো মায়ের সন্তান, তুমি তো মায়ের অন্তর বুঝতে পারো! তোমার আমি 'না' বলতে দেব না।

গিরিজায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল সুমন। আশ্চর্য, তার মা সুনেত্রার সঙ্গে গিরিজায়ার কোনো দিক থেকেই কোনো মিল নেই, তবু মাকে মনে পড়ে গেল সুমনের। গিরিজায়া অশিক্ষিতা গ্রাম্য স্ত্রীলোক হলে কি হয়, প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধিতে ওস্তাদ! মানুষের সেন্টিমেন্টে ঘা দিয়ে কি করে কাজ আদায় করতে হয় বুড়ির ভালো করেই জানা আছে দেখছি!

কেসটা অবশ্য ইন্টারেস্টিং বটে, কিন্তু সবটাই চিনে পুঁথির মতো দুর্বোধ্য।

সুমন বললে, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করি। শান্তিলতা থাকত তার বেনারসী মায়ের সঙ্গে কাশীতে। লক্ষ্মৌর খুনের ব্যাপারে সে জড়িয়ে পড়ল কি করে?

গিরিজায়া বললেন, সোহিনী মরবার বছরখানেক আগে কাশীবাস তুলে দিয়ে লক্ষ্নৌ শহরে বাড়ি কিনেছিল যে!

ও! সুমন বললে, আমার বাড়িও লক্ষ্নৌ শহরে, আমি আজই ফিরব। দিনকতক বাদে আপনি আমার সঙ্গে সেখানে দেখা করবেন, দেখি কতদূর কি করা যায়।

গিরিজায়াকে সুমন একখানা কার্ড দিলে।

একেই বলে সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! চন্দনচৌকিতে সুমন এসেছিল অপরাধ আর আইন—আদালত থেকে পালিয়ে, কিন্তু স্বর্গে এসেও ঢেঁকির রেহাই নেই, বুড়ি গিরিজায়ার ধান ভানতেই হবে। নমস্কার তোমায় জটিয়াবাবা, ক'দিনের ছুটিটা তোমার জটার মতোই জটিল করে দিলে!

দুই

লক্ষ্নৌ পুলিশের বড়কর্তা জ্যাকসন সাহেব সুমনকে দেখে হৃষ্ট হলেন। বললেন, আমাদের আলাপ না থাকলেও আমি তোমাকে জানি। তোমার বাবা লেট পাবলিক প্রসিকিউটার সদাশিব চৌধুরি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তুমি একজন বাডিং ব্যারিস্টার, সে খবরও আমি রাখি। হাসান মার্ডার কেসটায় তুমি জিতেছ বলে আমি কত খুশি হয়েছি জানো?

সবিনয়ে সুমন বললে, আপনার কথায় আমি গর্ব বোধ করছি। কিন্তু পুলিশ হেরে যাওয়ায় আপনি খুশি হলেন কেন বুঝতে পারছি না।

দরজা গলায় জ্যাকসন সাহেব হাসলেন। বললেন, মামলায় হেরে যাওয়াটা পুলিশের লজ্জা নয়। কোনো নির্দোষ যদি অযথা শাস্তি পায়, সেটাই লজ্জার কথা। হাসান মার্ডার কেসে আসামিকে নির্দোষ প্রমাণ করে পুলিশকে তুমি সেই লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছ।

আপনি মহৎ।

এটা মহত্বের কথা নয়, নীতির কথা।—যাকগে, তোমার জন্যে আমি কি করতে পারি ইয়ংম্যান?

এই লক্ষ্মৌ শহরে পুলিশ এক বাঈজিকে খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করেছে আপনি জানেন নিশ্চয়?

জ্যাকসন সাহেব বললেন, তুমি কি চৈতি বাঈয়ের কথা বলছ?

সুমন ঘাড় নাড়লে।

জ্যাকসন আবার প্রশ্ন করলেন, এই মামলায় তুমি কি ইন্টাররেস্টেড? ডিফেন্ড করবে?

সুমন বললে, ইচ্ছে তাই, যদি আপনার সাহায্য পাই!

কিভাবে সাহায্য চাও বলো?

এই খুন সম্পর্কে পুলিশ যা রিপোর্ট দিয়েছে, তাই জানতে চাই।

তামাকের পাইপটা দাঁতে কামড়ে জ্যাকসন কয়েক মুহূর্ত গম্ভীর হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, পুলিশের রিপোর্ট পুলিশ ছাড়া অন্য কাউকে জানানো নিয়মবিরুদ্ধ। হাউ এভার, বন্ধুর ছেলে হিসেবে তোমাকে বলতে আমার আপত্তি নেই।

সেটা আমার সৌভাগ্য।—সুমন বললে।

জ্যাকসন সাহেব চৈতি বাঈয়ের ফাইল আনালেন। সেটা দেখে যা বললেন, সংক্ষেপে তা এই:

গত ২১শে জুলাইয়ের রাতটা ছিল ঝড়—বৃষ্টির রাত। লক্ষ্নৌ শহরে এতখানি দুর্যোগ এ—বছরে আর হয়নি। বিকেল থেকেই ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছিল, সন্ধের পর নামল মুষলধারে বৃষ্টি। রাত সাড়ে দশটায় থানায় টেলিফোন বেজে উঠল ঝনঝন শব্দে। টেলিফোন ধরতেই শোনা গেল পুরুষের গলা। বললে, গোল—দরওয়াজায় সোহিনী বাঈয়ের বাড়িতে এইমাত্র একটা খুন হয়েছে। এখুনি আসুন।

থানার অফিসার জিজ্ঞেস করলে, আপনি কে? কোত্থেকে ফোন করছেন?

জবাবে শুধু লাইন কাটার আওয়াজ শোনা গেল।

গোল—দরওয়াজা হচ্ছে লক্ষ্নৌর বাঈজি—মহল্লা। সোহিনী বাঈ সেখানকার নাম—করা বাঈজী। পুলিশ যথারীতি সেখানে গেল সেই দুর্যোগ মাথায় করে। গিয়ে দেখে সারা বাড়ি অন্ধকার। মেনসুইচ কে যেন অফ করে দিয়েছে। পুলিশ আলো জ্বাললে। নিচের তলায় সিঁড়ির মুখে আধাবয়সী চাকর রামু হতভম্ব হয়ে বসেছিল! পুলিশের প্রশ্নে সে বললে, টেলিফোন সে করেনি, তবে এ বাড়িতে খুন হয়েছে সত্যি। বৃষ্টির রাত বলে সকাল—সকাল খাওয়া—দাওয়া সেরে নিচের তলায় নিজের ঘরে সে ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ দোতলা থেকে পিস্তলের আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে যায়। তাড়াতাড়ি সে দোতলায় উঠে দেখে—

রামু শিউরে উঠে থেমে গেল।

রামুকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ দোতলায় উঠল। কেউ কোথাও নেই। বারান্দার মাঝামাঝি মাইফিল—ঘর। সেখানে পা দিতেই পুলিশ দেখল, দামি জাজিম—পাতা ফরাসের ওপর বছর তিরিশের এক সুদর্শন যুবা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। খোলা চোখ—দুটিতে তখনও আতঙ্কের ছায়া। গাঢ় রক্তে জাজিমটার অনেকখানি ভিজে গেছে। পুলিশ পরীক্ষা করে দেখলে, প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই যুবকটির দেহে।

পাশে পড়ে রয়েছে ছোট একটা রিভলভার। ছ'টা টোটার মধ্যে একটা নেই।

রামু এবং আশপাশের বাঈজি—বাড়ি থেকে জানা গেল যে, বছর খানেক হল সোহিনী বাঈ মারা গেছে। তার মেয়ে চৈতি বাঈয়ের আপনার লোক বলতে আর কেউ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর পর পুরোনো চাকর রামু, দাঈ ঝুলনিয়া আর সারেঙ্গিওয়ালা রংলালকে নিয়ে সে—এ বাড়িতে বাস করছিল। মুজরো সে কালেভদ্রে করত, কিন্তু জয়প্রকাশ বলে একটি শৌখিন ছোকরার প্রায়ই আসা—যাওয়া ছিল এখানে। রামু এবং প্রতিবেশীরা মৃতদেহ জয়প্রকাশেরই বলে শনাক্ত করল।

ঘটনার দিন দুপুরবেলা দাঈ ঝুলনিয়া মকবুলগঞ্জে তার ননদিয়ার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সম্ভবত ঝড়—বৃষ্টির জন্যেই সে ফিরতে পারেনি। বাড়িতে ছিল শুধু...একতলায় রামু, আর দোতলায় চৈতি বাঈ।

রংলাল?—সুমন প্রশ্ন করলে।

জ্যাকসন বললেন, রংলালের প্রশ্নই ওঠে না। ঘটনার হপ্তাখানেক আগে রংলাল এলাহাবাদ গিয়েছিল। গঙ্গা—যমুনার সঙ্গমের কাছে সে পাড় ভেঙে ডুবে মারা যায়। সুতরাং, খুনের সময় বাড়িতে ছিল কেবল রামু আর চৈতি বাঈ। রামুকে পাওয়া গেল, কিন্তু চৈতি বাঈ? সারা বাড়ি, সারা মহল্লা তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার পাত্তা পাওয়া গেল না।

সেই তুফানের মধ্যেও চৈতি বাঈ ফেরার!

জানা গেল, রিভলভারটা চৈতি বাঈয়ের। তাছাড়া, রিভলভারে পাওয়া গেল তারই আঙুলের ছাপ। পুলিশ সন্ধান শুরু করলে। লক্ষ্নৌ থেকে বেরিলি, বেরিলি থেকে চন্দনচৌকি। তারপরের ঘটনা তোমার জানা।

জ্যাকসন থামলেন। বন্ধ করলেন ফাইলটা।

সুমন বললে, দু—একটা প্রশ্ন করতে চাই, যদি অনুমতি দেন।

স্বচ্ছন্দে।

খুনের রাতে থানায় কে টেলিফোন করেছিল, পুলিশ জানতে পেরেছে কি?

না। শুধু জানতে পেরেছে যে একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করা হয়েছিল।

গলার আওয়াজ থেকে অনেকসময় বয়স অনুমান করা যায়। তাই নয় কি?

রাইট। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। কেননা, গলার আওয়াজটা ছিল ভাঙা ভাঙা।

ও! আচ্ছা, পুলিশ চৈতি বাঈয়ের ডেরা তল্লাশি করে রিভলভার ছাড়া আর কিছু পেয়েছে?

সন্দেহজনক একটা মাত্র জিনিস পেয়েছে।

সেটা কি?

কতকগুলো ছোঁড়া কাগজের টুকরো। ঝোড়ো—হাওয়ায় ঘরময় উড়ছিল। সেগুলো সংগ্রহ করে জোড়া লাগিয়ে দেখা গেছে, সেটা একখানা টাইপ—করা দানপত্র।

দানপত্র! কে কাকে দান করছে?

চৈতি বাঈ তার যাবতীয় সম্পত্তি জয়প্রকাশকে দিয়ে দিচ্ছে। তলায় চৈতির সই। সইটা অবশ্য সম্পূর্ণ হয়নি।—আর কোনো প্রশ্ন আছে?

না। আপনার অনেকটা সময় নষ্ট করলাম, মাপ করবেন।

দরজা গলায় আবার হেসে জ্যাকসন বললেন, নষ্ট কিছু নয়, তোমার কাজে লাগতে পেরে আমি খুশি হয়েছি ইয়ংম্যান। দরকার হলে আবার এসো।

ধন্যবাদ জানিয়ে সুমন উঠে পড়ল।

রাজু বললে, গিরিজায়ার সায়া—পরা কন্যা বেশ মায়া ছড়িয়েছে দেখছি! তা নইলে এমন কাঠখোট্টা মানুষ হয়ে একটা বাঈজির কেসে তুই ফেঁসে গেলি ইয়ার!

রাজু ওরফে রাজীব চাটুজ্যে সুমনের বাল্যবন্ধু। বংশানুক্রমে ওরা লক্ষ্নৌ শহরের বাঙালি রহিশ। রাজুর আমলে অবস্থা পড়তি। তবু বনেদি শৌখিনতাটুকু এখানে তার সাজপোশাকে বর্তমান। একটা লম্বা ঝুল—ঝাড়া বাঁশকে চুড়িদার পায়জামা, কল্কাদার পাঞ্জাবি আর ঝাঁকড়া মাথায় আদ্দির টুপি পরালে যেমন দেখতে হয়, রাজুকে দেখতে অবিকল তেমন।

সুমনের সঙ্গে সেও একসময় আইন পড়তে শুরু করেছিল, কিন্তু দেখা গেল আইন—চর্চার চেয়ে নাটক—চর্চার প্রতি তার ঝোঁক বেশি ফলে আইন পড়তে পড়তে রাজু নাট্যকার হয়ে উঠল। বাপের পয়সা দু—হাতে খরচ করে একটা শখের দলও বানিয়ে ফেলল। মহাসমারোহে একটা পাবলিক হল ভাড়া নিয়ে শুরু হয়ে গেল, দি গ্র্যান্ড মুনলাইট থিয়েটার। বলা বাহুল্য নাটকগুলি তার নিজের লেখা। কিন্তু বছর খানেক যেতে না যেতেই মুনলাইট থিয়েটার রেড লাইট জ্বালল।

রাজু কিন্তু দমল না। বললে, জিনিয়াসের লক্ষণই এই। পাবলিক আমার নাটক এখন বুঝল না, পরে বুঝবে।

সুমন বললে, খুব হয়েছে। বাপের পয়সা তো শেষ করে এনেছিস, এবার একটা চাকরি কি ব্যবসা কর।

রাজু শুধু বললে, চ্ছোঃ!

থিয়েটারের শ্বেতহস্তী পোষার খরচটা অতঃপর বাঁচল বটে, কিন্তু নাটক লেখা রাজু ছাড়ল না। আর, রাজুকে ছাড়ল না সুমন। রাজু লোকটা দিলদার, আমুদে আর রসিক। হয়তো সেই কারণেই সুমন তাকে পছন্দ করে।

হজরতগঞ্জে সুমনের বাড়ি। বিকেলবেলা কফির পেয়ালা নিয়ে দুই বন্ধুতে কথা হচ্ছিল। সুমনের লাইব্রেরিতে বসে।

রাজু বললে, শান্তিলতা ওরফে চৈতি বাঈয়ের কেস নিয়ে খাসা নাটক হয় ইয়ার! কিন্তু একটা তয়ফাউলির কেসে তুই ফেঁসে গেলি! তাজ্জব!

একটা ল—জার্নাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে সুমন বললে, কেসই এখনো শুরু হয়নি, আর তুই বলছিল ফেঁসে গেলাম!

রাজু সুমনের টিন থেকে ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললে। তারপর গম্ভীর হয়ে বললে, ফেঁসে হয়তো এখনো যাসনি, কিন্তু যাবি।

যাব?

আলবাৎ।

সুমন কৌতুকবোধ করলে। বললে, কি করে বুঝলি?

আমি হলাম ঝানু নাট্যকার, আমি বুঝব না? ফুঃ করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লে রাজু। ছেড়ে বললে, গোধূলিয়া পাহাড়ে যে নাটক শুরু হয়েছে, তার ফর্মুলা কি জানিস? তবে শোন। পয়লা অ্যাক্টে হিরোইন মরতে যাচ্ছিল, হিরো বাঁচাল। দোসরা অ্যাক্টে হিরো মরতে যাবে, হিরোইন বাঁচাবে। আর লাস্ট অ্যাক্টে দুজনে মরতে যাবে নাট্যকার বাঁচাবে।

উচ্চচকণ্ঠে হেসে উঠল সুমন। হাসতে হাসতেই বললে, শাবাশ নাট্যকার! কিন্তু তার আগে হিরোইনকে ফাঁসিকাঠ থেকে বাঁচাতে হবে যে!

বাঁচাতে হয়, তুই ব্যারিস্টার মানুষ, তুই বাঁচা।

বাঁচা বললেই কি বাঁচানো যায়? জটিয়াবাবা বিস্তর জট পাকিয়েছে, সে জট ছাড়াতে হবে।

ছাড়া।—রাজু এমনভাবে বলল, ব্যাপারটা যেন পায়জামার দড়ি খোলার মতো সহজ কাজ।

সুমন এবার গম্ভীর হয়ে বললে, তোকে আমার দরকার রাজু।

রাজু সোজা হয়ে বসল: আমাকে! বলিস কি!

থিয়েটারের দৌলতে লক্ষ্নৌ শহরের অনেক ঘাঁটিই তো তোর জানা?

তা জানা বইকি! বাপের ক্যাশ উড়িয়ে অনেক ঘাটের জলই টেস্ট করে দেখেছি ইয়ার!

গোল—দরওয়াজার খবর রাখিস?

এককালে রাখতাম। এখন চামেলি আতরের দর চাল্লিশ, আর হোয়াইট লেবেলের দর পঞ্চাশ! খবর রাখব কি করে ইয়ার?

আমাকে একদিন নিয়ে যাবি?

রাজু সোজা হয়ে বসেছিল, এবার সোজা দাঁড়িয়ে উঠল বললে, তুই যাবি! গোল—দরওয়াজায়! কেন মজাক ওড়াচ্ছিস ইয়ার?

মিটিমিটি হেসে সুমন বললে, কেন, আমার শখ হতে নেই? নিয়ে যেতে পারবি কিনা বল।

তা আর পারব না?—রাজু সোৎসাহে বলে উঠল, খুব পারব। গোল—দরওয়াজা কেন, জাহান্নমের দরওয়াজা অবধি এগিয়ে দিতে পারব। কবে যাবি বল?

সময় মতো বলব।

ঠিক আছে। চলি।

দু'পা এগিয়েই রাজু ব্যস্ত হয়ে ফিরে এল : ইস, বড্ড ভুল হয়ে গেছে! দশটা টাকা হবে?

হেসে ফেললে সুমন। তাকে দেখলে এই বিশেষ ভুলটা রাজুর প্রায়ই হয়। একটা দশ টাকার নোট বের করে বললে, সন্ধের খরচটা আজ শর্ট পড়েছে বুঝি? থিয়েটার ছাড়লি, আর ওটা ছাড়তে পারলি না?

পারতাম। কিন্তু পাছে সন্নেসি হয়ে যাই, সেই ভয়ে ছাড়িনি।

নোটখানা পকেটে পুরো রাজু চলে গেল।

আবার ফিরে এল তক্ষুনি। বললে, এক বিধবা বুড়ি তোকে খুঁজছে ইয়ার। গিরিজায়া না কি—

হতে পারে। পাঠিয়ে দে।

গিরিজায়া এলেন। উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করলেন, শান্তি কেমন আছে বাবা?

যেমন দেখেছিলেন, তেমনই।—সুমন জবাব দিলে।

ও কি তাহলে পাগল হয়েই থাকবে?

সেটা ডাক্তারে বলতে পারে। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি যে আপানার মেয়ে সেরে না উঠলে, মামলা শুরু হবে না।

গিরিজায়া আস্তে আস্তে তাঁর আঁচলের গেরো খুলতে লাগলেন। বেরোল সেকেলে একজোড়া মকরমুখো বালা। সুমনের সামনে বালাজোড়া রেখে গিরিজায়া কুণ্ঠিতভাবে বললেন, এছাড়া আমার আর কিছুই নেই বাবা। এ দু'গাছা রেখেছিলাম শান্তির বিয়ের জন্যে। মামলা যখন শুরু হবে, তখন কাজে লাগিও।

নরম গলায় সুমন বললে, এ দুটো এখন আপনার কাছেই থাক। দু'—একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাকে।

বলো।

আপনার সখী সোহিনী বাঈ বাঈজি ছিলেন, একথা আপনি জানতেন?

বাঈজি ছিল! সোহিনী! না, না।

পুলিশের রিপোর্ট তাই জানা গেছে। বড় হয়ে আপনার মেয়েও ওই পেশা নিয়েছিলেন, তাও জানা গেছে।

গিরিজায়া যেন মূর্ছা গেলেন। মূর্ছাহতের মতোই বিড়বিড় করে বললেন, আমি কিছুই জানিনে বাবা। সোহিনীও আমাকে কোনোদিন জানতে দেয়নি, শান্তিও না। কিন্তু—

গিরিজায়ার রেখাবহুল মুখখানা কঠোর হয়ে উঠল। যেন জ্বলে উঠল স্তিমিত চোখদুটো। কঠিন গলায় বললেন, তবে আর কেন? আমি ফিরেই যাই বাবা। শান্তির ফাঁসি হয়ে গেলে আমায় খবর দিও।

বালাজোড়া তুলে নিয়ে গিরিজায়া বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সুমন ডাকলে, দাঁড়ান। গিরিজায়া থামলেন।

শান্ত গম্ভীর গলায় সুমন বললে, অপরাধটা কার বেশি বলতে পারেন? যে—মেয়ে অবস্থার ফেরে বাঈজি হয়ে যায়, না যে—মা টাকার বদলে বাঈজির ঘরে মেয়ে বেচে দেয়?

স্তব্ধ হয়ে রইলেন গিরিজায়া। একটু পরে বললেন, বয়সে আমি তোমার মায়ের মতো না হলে মাপ চাইতাম। হোক বাঈজী, তবু তো পেটের মেয়ে। কথা দাও বাবা, ওকে তুমি বাঁচাবার চেষ্টা করবে!

কথা দিলাম।

ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন গিরিজায়া।

কাঁটায় কাঁটায় দশটার সময় ডক্টর কেশকার এসে ঢুকলেন জ্যাকসন সাহেবের ঘরে।

সুমনও অপেক্ষা করছিল।

জ্যাকসন প্রশ্ন করলেন, আসামিকে কেমন দেখলে ডক্টর?

পুলিশ হাজতে রয়েছে চৈতি বাঈ। আজ দু—দিন দু—রাত খায়নি। কথাবার্তাও বলেনি কারো সঙ্গে। মাঝে মাঝে শুধু দুঃস্বপ্নের ঘোরে চিৎকার করে উঠেছে, ছোড় দো মুঝে—ম্যরণে দো! ডক্টর কেশকার এইমাত্র তাকে দেখে ফিরেছেন। বললেন, কেসটা সহজ বলে মনে হয় না। স্নায়ুতে আঘাত লেগে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করছে না, ফলে পূর্বস্মৃতি লোপ পেয়েছে, আর বর্তমানের আতঙ্কটাই পেয়ে বসেছে। রীতিমতো চিকিৎসা দরকার।

জ্যাকসন চিন্তিত হলেন। বললেন, তাহলে আসামিকে মেন্টাল হসপিটালেই পাঠানো যাক, কি বলেন?

রাইট!—ডক্টর বললেন।

সুমন একটু নড়ে বসল। কাশল একটু। তারপর নম্রভাবে বললে, মাপ করবেন, আমি একটা কথা বলতে পারি?

ইয়েস।

ডক্টর ও জ্যাকসন উভয়েই তাকালেন সুমনের দিকে।

চৈতি বাঈকে হসপিটালের বদলে আর কোথাও রাখলে কেমন হয়?

কোথায়? জ্যাকসন প্রশ্ন করলেন।

ধরুন কোনো নির্জন জায়গায়, কোনো ফাঁকা বাড়িতে, যেখানে গিয়ে ডক্টর কেশকার চিকিৎসা করতে পারবেন।

তীক্ষ্ন চোখে তাকালেন জ্যাকসন। বললেন, তোমার এ প্রস্তাবের কারণ?

বিলেতে এ ধরনের একটা কেস দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। যে মানসিক রোগীকে হসপিটালে রেখে ফল পাওয়া যায়নি, তাকে লন্ডনের বাইরে একটা নিরিবিলি গ্রামে আলাদা রেখে খুব তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া গেল।

তাই নাকি?

এই ক'দিন হাজতে আসামিকে দেখতে গিয়ে আমি লক্ষ করেছি, লোকজন দেখলেই—বিশেষ করে পুলিশ দেখলেই ও ভয় পায়, ওর মনের বিকার বেড়ে যায়। তাই আমার মনে হয়, হসপিটালে আর পাঁচটা রোগীর সঙ্গে না রেখে, বাইরে কোনো শান্ত নির্জন পরিবেশে রাখলে ওর মনের সুস্থতা ফিরে আসতে পারে। আপনি কি বলেন ডক্টর?

কেশকার বার দুই—তিন নীরবে মাথা নাড়লেন। তারপর তাঁর ফরাসি ধাঁচের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, রাইট! রাইট! পরিবেশের বদলই অসুস্থ মনের প্রথম এবং প্রধান চিকিৎসা। কেবলমাত্র পরিবেশ বদলের ফলে মন বদলে গেছে, এমন নজিরও দেখা যায়।

জ্যাকসন বললেন, ওয়েল ডক্টর, তোমারও যখন এই অভিমত, তখন রোগীকে লক্ষ্নৌ শহরের বাইরেই কোথাও রাখার ব্যবস্থা করা যাক। অবশ্য এমন দূরে নিশ্চয় নয়, যেখানে রোগী দেখতে যাওয়া তোমার পক্ষে অসুবিধাজনক।

সুমন বললে, কিন্তু চৈতি বাঈকে যেখানেই রাখা হোক না কেন, তার চোখের সামনে পুলিশ—পাহারা রাখা ঠিক হবে না।

হোয়াট! পুলিশ—পাহারা রাখা চলবে না! তা কেমন করে সম্ভব? (জ্যাকসন সাহেবের ঘন ভুরু কুঁচকে উঠল) ভুলে যেও না ইয়ংম্যান, রোগী হলেও সে একটা খুনের আসামি।

মৃদু হেসে সুমন বললে, আমি তো পুলিশ—পাহারা রাখা চলবে না বলিনি! বলেছি, তার চোখের সামনে রাখা চলবে না। আপনিও নিশ্চয় লক্ষ করেছেন যে পুলিশ দেখলেই চৈতি বাঈ শামুকের মতো নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়। ওকে জানতে দেওয়া দরকার পুলিশ ওকে ছেড়ে দিয়েছে, ভয়ের কোনো কারণ নেই, তবেই হয়তো ওর মুখ থেকে কোনোদিন সত্য কথাটা আদায় করা সম্ভব হবে।

তোমার কথায় যুক্তি আছে মনে হচ্ছে।—জ্যাকসন বললেন, আমি ভাবছি, আসামিকে বারাবাঁকিতেই কিছুদিনের জন্য পাঠিয়ে দেব। জায়গাটাও ভাল, লক্ষ্নৌ শহরের কাছাকাছিও বটে। বাড়ির বাইরে থাকবে পুলিশ, ভেতরে একজন আয়া ছাড়া আর কেউ না।

আয়া নতুন না হয়ে রোগীর জানাচেনা কেউ হলেই ভাল হয়। ধরুন, চৈতি বাঈয়ের পুরোনো দাঈ ঝুলনিয়া—পুলিশ—এনকোয়ারিতে তার বিষয়ে কোনো সন্দেহজনক রিপোর্ট যদি পাওয়া না যায়, তাকেই রাখা ভাল। কেননা চেনা মুখ দেখলে রোগীর খানিকটা ভয় ভেঙে যেতে পারে।

ঘাড় নেড়ে নেড়ে কেশকার বললেন, রাইট!

জ্যাকসন বললেন, বেশ, সম্ভব হলে আসামির পুরোনো আয়াকেই রাখা হবে।

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থেকে সুমন বললে, ডিফেন্স কাউন্সেল হিসেবে আমার একটা আর্জি আছে মিস্টার জ্যাকসন।

পাইপ ধরাচ্ছিলেন সাহেব, মুখ তুলে বললেন, সেটা কি?

আসামি চৈতি বাঈকে বারাবাঁকিতে পাঠানোর পর মাঝে মাঝে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। প্রয়োজন হলে প্রত্যহ।

কেস তো এখনো কোর্টে যায়নি, এখন দেখা করতে চাও কেন?

সুমন বলতে লাগল, এই খুনের পিছনে যে রহস্য রয়েছে, পুলিশও তা ভেদ করতে পারেনি। আর তা না পারলে মামলার সুবিচার করাও সম্ভব হবে না।

কিন্তু চৈতি বাঈয়ের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

ধৃষ্টতা মাপ করবেন, প্রমাণটাই সব নয় মিস্টার জ্যাকসন। আপনিই সেদিন বলেছিলেন, কোনো নির্দোষ যদি শাস্তি পায় সেটাই পুলিশের লজ্জা, কিন্তু আসামি দোষী না নির্দোষ বোঝা যায় প্রমাণ থেকে নয়, আসামির মোটিভ থেকে। কেন খুন করেছে, (যদি সত্যিই করে থাকে) সেটাই বড় কথা। আর এই 'কেন' জানতে হলে আসামির মনের দরজা খুলে দেওয়া দরকার।

কিন্তু তার আগে দরকার ওর পূর্বস্মৃতি ফিরিয়ে আনা।

ঠিক। ডক্টর কেশকারের সাহায্যে আমি চৈতি বাঈয়ের স্মৃতির দরজা খুলতে চাই, তারপর মনের দরজা। হয়তো এ—কাজে সময় লাগবে। তবু আমি চেষ্টা করতে চাই। সে সুযোগ আপনি আমায় দিন, এই আমার আর্জি।

জ্যাকসন নীরবে পাইপ টানলেন কিছুক্ষণ। লাল মুখখানা গাম্ভীর্যে থমথম করতে লাগল। তারপর মুখ থেকে পাইলটা সরিয়ে হাসিমুখে বললেন, অলরাইট ইয়ংম্যান, তোমার আর্জি মঞ্জুর হল। এই খুনের রহস্যের ওপর সত্যিই যদি আলো ফেলতে পারো, সবচেয়ে বেশি খুশি হব আমি।

তিন

বারাবাঁকির এই বাড়িটায় মোগল স্থাপত্যশিল্পের চিহ্ন আগাগোড়াই বর্তমান। এককালে নাকি এটা কোনো এক নবাবজাদার অন্যতম প্রমোদভবন ছিল।

দো—মহল বাড়ি। বারমহলের মাথাটা গম্বুজাকৃতি, অন্দরমহলের মাথায় ছাদ। রংবেরঙের পাথর—বসানো থাম, সূক্ষ্ম জালিকাটা জাফরি, উঁচু খিলান মুসলমানী রুচির পরিচয় দেয়। বাড়ির চারপাশ ঘিরে অনেকখানি বাগান, ফুল—ফলের গাছ, ফোয়ারা, পরীদের মূর্তি। যত্নের অভাবে বাগান হয়েছে এখন জঙ্গল, ফোয়ারার উচ্ছ্বাস স্তব্ধ, হাত—পা—ভাঙা পাথরের পরীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখন বোধ হয় নবাব—হারেমের সেই জ্যান্ত পরীদের খোঁজে।

লাল কাঁকরের রাস্তা দিয়ে হিলম্যান ঢুকে এল। লোহার ফটকের পাশে সাদা পোশাক পুলিশকে জ্যাকসন সাহেবের সই—করা কার্ড দেখাতে হয়েছে।

বারান্দায় কফির পেয়ালা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন ডক্টর কেশকার। সুমনকে দেখে বললেন, সুপ্রভাত!

সুপ্রভাত ডক্টর!

বারান্দায় উঠে এল সুমন। বেতের চেয়ারে বসল। এই দ্বিতীয় দিন তার এখানে আসা।

কেশকার বললেন, গত কয়েকদিন ধরে এখানে তোমায় আশা করছি।

সুমন বললে, অন্য কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কেমন বুঝছেন রোগীকে?

বারাবাঁকিতে আসার পর থেকে ওর সেই উগ্র আতঙ্কটা কেটে গেছে। আঘাত—পাওয়া নার্ভগুলোও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু পূর্বস্মৃতি এখনো অস্পষ্ট। একটা ঠাণ্ডা নীরবতা ওকে ঘিরে আছে সর্বদা।

কারণটা অনুমান করেছেন কি?

সাধারণত দেখা যায় যেসব যুবক—যুবতী একটু বেশি রোমান্টিক প্রকৃতির, প্রেমের ব্যাপারে ঘা খেলে তাদের এই অবস্থা হয়। একটা বিষণ্ণ হতাশা তাদের পেয়ে বসে। হয়তো চৈতি বাঈয়ের জীবনেও কোনো রোমান্টিক ফ্রাস্ট্রেশন, যাকে বলে প্রণয়ঘটিত ব্যর্থতা, লুকিয়ে আছে। আর, তারই ফলে ওর মনটা ক্রমশ ঠাণ্ডা কঠিন বরফের স্তূপে পরিণত হয়ে গেছে।

সুমন চিন্তিত মুখে বললে, কিন্তু ডিফেন্স কাউন্সেল হিসেবে চৈতি বাঈয়ের সব কথা ওর মুখ থেকেই আমাকে জানতে হবে। কেননা, সর্বদাই ওর পাশে ছিল, সেই সোহিনী বাঈ আজ বেঁচে নেই।

বার দুয়েক মাথা নেড়ে কেশকার বললেন, জানতে হলে কোনো অভিজ্ঞান চাই, যা দেখলে ওর পূর্বস্মৃতি ফিরে আসতে পারে। কিন্তু তাতেও হবে না—ইউ মাস্ট ব্রেক দি আইস! কঠিন বরফ ভাঙতে হবে।

কেমন করে?

খোঁজ—খবর নিয়ে আগে জানতে হবে চৈতির জীবনে সত্যিই কোনো প্রেমের ঘটনা ঘটেছিল কিনা। তা যদি থাকে, তবে সেই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়াই ভালো।

আরেকটু স্পষ্ট করে বলুন ডক্টর।

স্পষ্ট করেই বলছি। তোমাকে চৈতির প্রেমিক সাজতে হবে। ভালোবাসার অভিনয় করে আস্তে আস্তে ওর কাছে এগোতে হবে। তোমার প্রেমের উত্তাপে হয়তো একদিন গলতে শুরু হবে কঠিন বরফ—খুলে যাবে ওর মনের বন্ধ দরজা। কিন্তু—

ফরাসি ধাঁচের ছোট্ট দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে কেশকার বলেলেন, কিন্তু এ কাজে ঝুঁকি অনেক। পথটা হচ্ছে রেজার্স এজ—ক্ষুরের ফলার মতো অতি সূক্ষ্ম। একটু এদিক—ওদিক হলেই হয় তোমার পতন হবে, নয় চৈতির পতন। এখন ভেবে দেখো কি করবে। আমি চলি। গুড ডে চৌধুরি!

সুমন নীরবে দাঁড়িয়ে উঠে ডক্টরকে বিদায় দিলে।

একটু বাদে কফির পেয়ালা নিতে এল ঝুলনিয়া। জ্যাকসন সাহেব চৈতির পুরোনো আয়াকেই কাজে বহাল করেছেন। মোটাসোটা মধ্যযৌবনা বিহারী মেয়ে। হাতে পায়ে চিবুকে উলকি, নাকে মাকড়ি।

সুমনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আগের দিন।

ঝুলনিয়া বললে, ভকিলসাব এসেছেন! কফি আনব?

সুমন বললে, না। তোমার মনিবের সঙ্গে দেখা করব।

খবর দিচ্ছি।

চলে যাচ্ছিল ঝুলনিয়া। সুমন ডাকলে, শোনো, ভেতরে গিয়ে কি বলবে?

বলব ভকিলসাব এসেছেন।

না, বলবে চৌধুরিসাব এসেছেন। আমি ভকিল, বাঈ যেন তা জানতে না পারে।

জী আচ্ছা।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফিরে এল ঝুলনিয়া। বললে, আসুন।

বারমহল পার হয়ে একটা শ্বেতপাথরের চত্বর। তারপর অন্দরমহলের দরজা। একদিন হয়তো খোজা প্রহরী দাঁড়িয়ে খাকত, এখন দরোয়ানের পোশাকে পুলিশ টুলে বসে থাকে। ঝুলনিয়া সুমনকে নিয়ে এল অন্দরমহলের শেষপ্রান্তে, যেখানে জাফরি ঢাকা একটা গোল বারান্দা ঝুঁকে আছে একটা মজা পদ্মদিঘির ওপর।

জাফরির পাশে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল চৈতি। টুকরো টুকরো রোদের সোনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে তার গায়ে মুখে। মজে যাওয়া দিঘিটায় এখনো দু—একটা লাল পদ্ম ফোটে; চৈতি বোধ হয় তাই দেখছিল। পিঠে লতিয়ে পড়ে আছে রুক্ষ চুলের বেণী।

ঝুলনিয়া ডাকলে, ছোটি বাঈ!

ফিরে তাকাল চৈতি।

ফিরে তাকাল চৈতি। সকালের আলোয় সুমন আজ ভাল করে দেখতে পেল তাকে। এখানে প্রথম দিন এসেও সে দেখা করেনি। শান্ত উদাসিনী মূর্তি। প্রভাতকালেই যেন গোধূলির ছায়া নেমেছে। ভৈরবী গাইতে বসে কে যেন ধরেছে পুরিয়া—ধানেশ্রী। ধূসর রঙের শাড়িটা করুণ বিষাদের মতো জড়িয়ে আছে দেহটাকে। ভাসা ভাসা দুই কালো চোখে এখানো কিশোরকালের সরলতা। ভালো করেই দেখলে সুমন। না, গোল—দরওয়াজার বাঈজির মুখে ম্লানিমা ছাড়া কালিমার এতটুকু চিহ্ন কোথাও নেই। আশ্চর্য, এ মেয়ে খুন করতে পারে! হয়তো পারে। ক্রিমিনাল বার—এর ব্যারিস্টার সুমন চৌধুরি তার স্বল্প অভিজ্ঞতায় জেনেছে দুনিয়ায় অসম্ভব কিছুই নয়।

সুমনকে পৌঁছে দিয়ে ঝুলনিয়া চলে গেল।

ভয় ঘনিয়ে এল চৈতির চোখে। আস্তে আস্তে উর্দুতে জিজ্ঞেস করলে, আপনি পুলিশের লোক?

অল্প হেসে উর্দুতেই জবাব দিলে সুমন, না, না, আমি পুলিশের লোক নই। আমি সুমন চৌধুরি। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম। চিনতে পারছ না আমাকে? মনে করে দেখো তো কোথায় দেখা হয়েছিল।

চৈতি ভাবতে চেষ্টা করলে। কিন্তু চোখের দৃষ্টি বদলাল না।

সুমন বলতে লাগল, চন্দনচৌকিতে সেই ছোট্ট পাহাড়ি বস্তি— তার পাশে উঁচু পাহাড়—তুমি ছুটে গেলে খাদের মুখে—ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলে, আমি তোমায় ধরে ফেললাম! মনে পড়ছে না? বলো তো সে—পাহাড়টার নাম কি?

ভাসা ভাসা দুই কালো চোখের অন্ধকারে ধীরে ধীরে স্মৃতির আলো ফুটে উঠল। মৃদু স্বরে চৈতি বললে, গোধূলিয়া পাহাড়।

ঠিক!—খুশি হয়ে উঠল সুমন। পূর্বস্মৃতি একেবারে অস্পষ্ট হয়নি তাহলে! একটা মোড়া দেখিয়ে বললে, বোসো। নিজেও বসলে। তারপর প্রশ্ন করলে, আচ্ছা গোধূলিয়া পাহাড় থেকে খাদে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলে কেন?

আমার কেবল ভয় হত পুলিশে ধরবে—ফাঁসি দেবে!

কেমন এমন ভয় হত?

শিশুর মতো সরল মুখে জবাব দিলে চৈতি, তা তো মনে নেই।

তোমার বাড়ি কোথায়?

এই তো।

আগে কোথায় ছিলে?

আগে? এইখানে।

এইখানে? না, লক্ষ্নৌ শহরে থাকতে? মনে করে দেখো তো, গোল—দরওয়াজা—সোহিনী বাঈ—রংলাল—তুমি গান গাইতে নাচতে—

চুপ করে চেয়ে রইল চৈতি। স্মৃতির সাদা কাগজে একটি আঁচড়ও পড়ল না।

বন্ধ দরজায় আর একবার ঘা দিতে চেষ্টা করলে সুমন। বলল, জয়প্রকাশকে মনে আছে? জয়প্রকাশ কাপুর—যাকে তুমি ভালোবাসতে—মনে পড়ছে?

চৈতি শুধু মাথা নাড়লে বার দুই। উদাসীন মুখে—চোখে কোনো ভাবান্তর হল না। সতর্ক চোখে তাকাল সুমন। ডক্টর কেশকারের কথাই ঠিক, মেয়েটা ভান করছে?

অন্য কথায় চলে গেল সুমন।

কেমন লাগছে এ জায়গাটা? বেশ নির্জন, না?

বড় একা লাগে।

তোমার আপনজনেরা কোথায়?

ক্লান্ত উদাস গলায় চৈতি বললে, আপনজন? কেউ নেই।

আস্তে আস্তে মোড়া থেকে উঠে আবার জাফরির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চেয়ে রইল মজা দিঘির নিঃসঙ্গ লাল পদ্মটার দিকে।

সুমনও উঠল। নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল চৈতির পিছনে। তারপর পরিষ্কার বাংলায় হঠাৎ মৃদু গলায় ডেকে উঠল, শান্তিলতা, শোনো।

অবাক হয়ে ফিরে তাকাল চৈতি। বললে, আপনি বাঙালি?

হাসিমুখে ঘাড় নাড়লে সুমন।

শান্তিলতা কার নাম?—চৈতি প্রশ্ন করলে।

তোমার নাম।

আমার!

হ্যাঁ, তোমারি নাম। এ নাম শোননি কখনো? মনে করে দেখো তো—অনেকদিন আগে—তুমি যখন ছোট্ট ছিলে—সেই ফৈজাবাদ—বাপ মা ছোট বোন—মনে পড়ছে না? তোমার সমস্ত অতীত খুঁজে দেখো, কে তোমায় আদর করে ডাকত শান্তি! শান্তিলতা!

ভাসা ভাসা দুই কালো চোখের অন্ধকারে একটু আলো ফুটতে না ফুটতে আবার মিলিয়ে গেল। বিচলিত হয়ে উঠল চৈতি। আকাশের মতো অনন্ত শূন্যতায় তার অতীতকে যেন হাতড়ে ফিরছে। কাঁপা কাঁপা ঠোঁট নেড়ে আপন মনে বলতে লাগল, শান্তি! শান্তিলতা! মনে পড়ছে—কে যেন ডাকত আমায়—কিন্তু—না, না, আর মনে পড়ছে না—কিছুতেই মনে পড়ছে না—হারিয়ে গেছে—আমার অতীত হারিয়ে গেছে!

বলতে বলতে আবার মোড়ায় এসে বসে পড়ল চৈতি। দুই হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল। অতিপ্রিয় খেলনা হারিয়ে গেলে শিশু যেমন করে কেঁদে ফেলে।

কয়েক মুহূর্ত তাকে কাঁদতে দিল সুমন। হোক খুনি, হোক অপরাধী, মানুষ কত অসহায়! কেমন একটা মমতায় ভিজে উঠল তার মন। আলগোছে তার মাথায় হাত রেখে ডাকলে, শান্তিলতা, ওঠো।

কান্না—ভেজা মুখ তুলে তাকাল চৈতি।

স্নিগ্ধ স্বরে সুমন বললে, মন খারাপ কোরো না, তোমার হারানো অতীতকে আজ না হয় একদিন তুমি খুঁজে পাবেই। খুঁজতে আমি তোমার সাহায্য করব। আবার আসব।

চলে যাচ্ছিল সুমন; পিছন থেকে ডাক এল, শুনুন!

সুমন ফিরে দাঁড়াল।

কাছে গিয়ে চৈতি বললে, এখানে তো কেউ আসে না, আপনি কেন এলেন?

ডক্টর কেশকারের নির্দেশিত পথে প্রথম পা বাড়ালে সুমন। হাসিমুখে বললে, সেই গোধূলিয়া পাহাড়ে দেখা অবধি তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। আমি তোমার বন্ধু হতে চাই।

দক্ষিণ হাতখানা বাড়িয়ে দিলে সুমন। হাস্যোজ্জল মুখে চেয়ে রইল চৈতির মুখের দিকে। কান্না—ভেজা ফ্যাকাশে মুখে একটু আলো লাগল। নুয়ে পড়ল ভাসা ভাসা চোখের দৃষ্টি। সুমন অনুভব করলে, তার ডান হাতের মুঠোয় ভিজে ভিজে নরম একখানা করতল আশ্রয় নিয়েছে। কাঁপছে ভীরু পাখির মতো। মৃদু চাপ দিয়ে সুমন ছেড়ে দিলে হাতখানি।

তারপর চলে গেল গোল বারান্দা পার হয়ে। চৈতি তখন নিজের হাতখানির দিকে তাকিয়ে আছে।

রাজু বললেন, বহুৎ আচ্ছা! নাটকের দোসরা অ্যাক্ট তাহলে শুরু হয়েছে বল!

সুমন বললে, দুর! ডক্টর কেশকার বলেছেন চৈতির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতে, যাতে আমাকে বিশ্বাস করে ও সব কথা খুলে বলে। তাই বারাবাঁকিতে রোজ যাই।

একটা সিগারেট ধরিয়ে রাজু বললে, ডক্টর কেশকার নাটকের প্লটকে জমিয়ে তুলছে দেখছি! কেয়াবাৎ! চাঁদনি রাতে ফুলগাছ—তলায় গানটান গাইছিস নাকি তোরা?

হেসে ফেলল সুমন। বললে, তামাশা রাখ।

প্রেম করা তামাশা নয় ইয়ার, আমাসা! এ ব্যাধিতে একবার ধরলে সহজে সারে না। তখনই বলেছিলাম, পয়লা অ্যাক্টে হিরোইন মরতে যাচ্ছিল, দোসরা অ্যাক্টে হিরো মরতে যাবে। হলও তাই। নাট্যকার রাজু রিয়েল নাট্যকার!

চটে গিয়ে সুমন বললে, দুত্তোর নাট্যকার! আমি মরছি কেস নিয়ে মাথা ঘামিয়ে, আর তুই বানাচ্ছিস নাটক! আসল কথাটা শোন না—

ধোঁয়া ছেড়ে রাজু বললে, শুনব আর কি বল! মন নিয়ে খেলা আর আগুন নিয়ে খেলা একই। সাবধান ইয়ার, মনের মানিব্যাগটা তোর সামলে রাখিস, মনের পকেট মারতে মেয়েজাতটা ওস্তাদ!

তোর মনের পকেট মারা গেছে বুঝি?

ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে রাজু বললে, মনের পকেট জামার পকেট দুই—ই!

সুমন আবার হেসে উঠল। তারপর হাসি থামিয়ে বললে, ঠাট্টা রাখ। ডক্টর কেশকার কি বলেছেন জানিস? কোনো অভিজ্ঞান দেখালে চৈতি বাঈয়ের পূর্বস্মৃতি হয়তো সহজে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু কী সেই অভিজ্ঞান? পাবই বা কোথায়?

রাজু একটু ভেবে বললে, ঠিক হয়েছে চল, বাজারে গিয়ে রুই মাছগুলোর পেট চিরে দেখা যাক। দু—একটা আংটি হয়তো বেরিয়ে পড়তে পারে।

সুমন ভাবনায় অন্যমনস্ক হয়ে রইল। এক সময় বললে, সন্ধের পর একবার আসিস।

কেন?

কিছু ভাল লাগছে না। গান—বাজনা শুনতে ইচ্ছে করছে।

এ আর বেশি কথা কি! লক্ষ্নৌ শহরে গান—বাজনার অভাব? ওস্তাদ রহিমবক্সের ওখানে চ।

না। গান যদি শুনতে হয় তো সুন্দর মুখ থেকেই শুনব। কি বলিস? গোল—দরওয়াজায় গেলে কেমন হয়?

ফুর্তিতে রাজু শিস দিয়ে উঠল।

প্রবেশপথের মুখে একটা সার্কেল আছে বলেই বোধ করি নাম হয়েছে গোল—দরওয়াজা। কিন্তু নাট্যকার রাজু বলে, এখানে যারা বাস করে, তারা এক একটি জ্যান্ত গণ্ডগোল, তাই পাড়াটার নাম গোলদরওয়াজা।

দিল্লির চৌড়ি বাজার বলো, আর বেনারসের ডালকামুণ্ডি বলো বা লক্ষ্নৌর গোল—দরওয়াজাই বলো—সব বাঈজীপট্টিরই চেহারা মোটামুটি এক। কিছু পান—জর্দা—আতরের দোকান, কিছু গুণ্ডা—বদমাসদের জটলা, কিছু শখবাজ কাপ্তেনদের আনাগোনা।

রাত এগারোটা। জমে উঠেছে রাতের বাজার। শুরু হয়েছে রূপের সওদা। বাঈজীপট্টির রাস্তায় একটি চেনা মূর্তি দেখা গেল। ঢ্যাঙা রোগাটে দেহ, চুড়িদার পায়জামা, কল্কাদার পাঞ্জাবি, ঝাঁকড়া মাথায় আদ্দির বাঁকা টুপি। নাট্যকার রাজু! পাশে তার যে বলিষ্ঠ সুদর্শন ছোকরাটি চলেছে, তার মুখে নকল গোঁফ আর চোখে কালো চশমা না থাকলে একনজরেই সুমন চৌধুরি বলে চেনা যেত।

সোহিনী বাঈয়ের বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখা গেল দরজায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কালো চশমার ভেতর দিয়ে সুমন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল সোহিনীর বাড়িটা। একপাশে একটা গলি, অপরপাশে গায়ে—লাগা আরেকটা বাড়ি।

সুমন বললে, পাশের বাড়িটায় কে থাকে জানিস?

খবর চাই?

চাই।

রাস্তার উল্টো দিকে একটা আতরের দোকান। রাজু সেইদিকে এগোল।

মির্জা আতরওয়ালা পুরোনো খরিদ্দার দেখে খুশিতে তরমুজের বিচির মতো একসারি কালো দাঁত বের করে ফেললে।

ম্যয়নে ক্যহা আদাবরজ হ্যায় রাজুসাহাব! কি ভাগ্যি আমার। বহুৎদিন বাদে জনাবের দেখা মিলল। গোল—দরওয়াজা ধন্য হয়ে গেল আজ! আসুন, আসতে আজ্ঞা হয়!

সুমনকে টেনে রাজু মির্জার ছোট একফালি দোকানের একধারে চেপে বসল।

দুনিয়ার হালচাল কেমন মির্জা?

মির্জা বললে, চলে যাচ্ছে কোনোরকমে। তা হুুজুর, ঠেটর তুলে দিলেন, আর খুলবেন না?

খুলব বৈকি!—রাজু বললে, পরলোকে বাপের কাছে টেলিগ্রাম করেছি, কিছু ক্যাশ পাঠিয়ে দিলেই আবার থিয়েটার খুলব।

মির্জা কি বুঝল সেই জানে। খাতির করে বললে, হুজুরকে লিয়ে পান মাঙউ?

মাঙাও।

পাশের পানের দোকানে মির্জা ফরমাইশ করলে। তারপর বললে, গান—বাজনা শুনবেন নাকি হুজুর?

মির্জা আতরওয়ালার আরেকটি পেশা আছে। বাঈজীর দালালি।

সুমনকে দেখিয়ে রাজু বললে, আমার এই দোস্ত পাটনা থেকে গান শুনতেই তো এসেছে। কিন্তু যার গান শুনতে চায়, সে তো এখন খুনের দায়ে ফাটকে!

মির্জা বললে, চৈতি বাঈয়ের কথা বলছেন? সে থাকলেও তার গান শুনতে পেতেন কিনা সন্দেহ।

কেন?

চৈতি বাঈ বড় একটা মুজরো করত না। ভারি খেয়ালি মেয়ে ছিল কিনা। কত আমির লোককে নিয়ে গেছি, চৈতি ফিরিয়ে দিয়েছে। কেবল কাপুর সাহাব গেলে—

কাপুর সাহাবাটি কে?

জয়প্রকাশ কাপুর। রহিশ আদমি। চৈতি খুব প্যার করত তাকে।

বড় তাজ্জব তো! যে যাকে প্যার করে, তাকে সে খুন করতে পারে?

মির্জা বললে, কি জানেন হুজুর, চৈতির মেজাজটা ভারি রগচটা। আমি ওকে আতর বেচতাম, জিনিসের একটু ফারাক হলেই আতরের শিশি ও ভেঙে চুরমার করে দিত।

সুমন চুপচাপ শুনছিল; হঠাৎ প্রশ্ন করলে, আচ্ছা মির্জাসাহেব, খুনটা কি রাগের মাথায় চৈতি বাঈ করেছে? না, আর কোনো কারণ ছিল?

মির্জা চট করে একবার এদিক—ওদিক তাকিয়ে দেখল। ফিসফিস করে বলল, গরিব আতরওয়ালা আমি, আমি কেমন করে জানব হুজুর? বাঈ—পাড়ায় অমন এক—আধটা খুন—খারাবি হয়েই থাকে।

সুমন প্রসঙ্গ পাল্টাল। বললে যেতে দাও ও—কথা। চৈতি বাঈ ছাড়া ভালো গাওয়াইয়া এ—পাড়ায় আর কে আছে?

আছে বইকি হুজুর। মোতি বাঈ আছে, আনোয়ারা বাঈ আছে—বহুৎ আচ্ছা গায়!

চৈতি বাঈয়ের মতো?

ঝুট বলব না হুজুর। চৈতি বাঈ বুলবুল ছিল, বুলবুল!

রাজুকে কনুয়ের একটা মৃদু ঠেলা দিলে সুমন। যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেল এইভাবে। রাজু বললে, আচ্ছা, শুনেছি, সোহিনীর বাড়ির ঠিক পাশে যে বাঈ থাকে, সে বেশ ভালোই গায়! কি যেন নামটা—

নুরী বেগম। কিন্তু ও তো তেমন ভালো গাইতে পারে না হুজুর! তবে বয়সটা কম বটে, দেখতেও খুবসুরত।

সুভানাল্লা! বয়স কম, আবার দেখতেও খুবসুরত। নুরী বেগম জিন্দাবাদ!—সোল্লাসে বলে উঠল রাজু।

একখানা দশ টাকার নোট মির্জার হাতে গুঁজে দিয়ে সুমন বললে, চলো মিঞা।

মির্জার পুরু ঠোঁটের ফাঁকে তরমুজের কালো বিচির সারি আরেকবার বেরিয়ে পড়ল। সেলাম ঠুকে বলল, গোলাম তৈয়ার। চলুন।

সুমন আর রাজু দোকান থেকে বেরোতে গিয়ে থমকে গেল। অদ্ভুত এক চেহারা নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল দোকানের সামনে। লোকটার বয়স বোঝা মুশকিল, পরনে শতচ্ছিন্ন কালো আলখাল্লা, একমাথা রুক্ষ চুল, মুখে পাতলা দাড়ি। আর চোখের কটারঙের তারা দুটো স্থির, বাঁ হাতে একটা বাঁকা লাঠি, ডান হাতে একটা টিনের পাত্র

মির্জা একটা পয়সা টিনের পাত্রে ফেলে দিতেই লাঠি ঠকঠকিয়ে লোকটা চলে গেল।

সুমন প্রশ্ন করলে, কে?

মির্জা বললে, ও কালু। চোখ নেই, তাই ভিখ মেগে খায়।

রাত বারোটায় ভিক্ষে।

দিনের বেলা শহরে ভিখ মাগে, আর রাতে বাঈ—পাড়ায়।— আসুন হুজুর।

চলতে চলতে মির্জার অলক্ষে সুমন নিজের মাথার পাটকরা চুল এলোমেলো করে দিলে।

'লট উলঝি সুলঝা যা রে বালম,

হাঁথমে মেহেদি ল্যগী।''

নুরী বেগম গান ধরেছে। আর, গাইতে গাইতে মাজাঘষা গোল মুখে আর সুর্মাটানা ঈষৎ ট্যারা চোখে ভাও বাতাচ্ছে মারাত্মক। রাজুর পাশে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে, হুইস্কির গেলাস হাতে নিয়ে, শুনতে শুনতে আর দেখতে দেখতে সুমনের হাসি পাচ্ছিল। হোয়াইট লেবেলের বোতল সামনে রেখে রাজুর কিন্তু মাথা নাড়ার বিমার নেই।

নুরী বেগম গাইছে :

'মাথেকি বিঁদিয়া বিখর গ্যয়ী হ্যায়,

আপনা হাঁথ ল্যগা যা রে বালম,

হাঁথমে মেহেদি ল্যগী।'

কপালের টিপ আমার মুছে গেছে, ও বালম, তুই নিজের হাতে টিপ পরিয়ে দিয়ে যা। কি করব, হাতে আমার মেহেদির রং লেগেছে।

হাতের হুইস্কির গেলাসটা সুমন সবার অগোচরে পাশের পিকদানে উপুড় করে ঢেলে দিলে। তারপর রাজুর কানে কানে কি যেন বলে মাইফিলের আসর ছেড়ে উঠে টলতে টলতে বারান্দায় বেরিয়ে গেল।

গান থামিয়ে দিলে নুরী বেগম। বললে, আপনার দোস্ত উঠে গেলেন যে! গান পছন্দ হচ্ছে না?

জিত কেটে রাজু বলে উঠল তোবা! তোবা! তোমার গান পছন্দ হবে না, এও কি একটা কথা হল বাঈজী! কি হয়েছে জানো? আমার দোস্ত বেশি নেশা করে ফেলেছে কিনা, তাই বারান্দায় গেছে একটু হাওয়া খেতে। এই এলো বলে! নাও, তুমি আরেকখানা ধরো। কী মিঠি আওয়াজ তোমার বাঈজী! শুনলে মরে যেতে ইচ্ছে করে!

ফিক করে হেসে ফেললে নুরী বেগম। তারপর সুর্মাটানা ট্যারা চোখে দারুণ কটাক্ষ হেনে দ্বিতীয় গান ধরলে :

'না মারো রে সইয়াঁ চিতুওনকে বাণ—'

রাজু বললে, সুভানাল্লা!

বারান্দায় বেরিয়ে এল সুমন।

টিমটিম করে একটা বাতি জ্বলছে। এদিক—ওদিক কেউ কোথাও নেই। বারান্দার কোণে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। নিঃশব্দে উঠে গেল সুমন।

ছাদে উঠে দেখল, একটাই ছাদ, মাঝে নিচু পাঁচিল দিয়ে দু—ভাগ করা। আধখানা নুরী বেগমের, আধখানা সোহিনী বাঈয়ের। অনায়াসে পাঁচিল টপকে সুমন ও—ছাদে চলে গেল। তারপর টর্চের আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল দোতলায়।

জনহীন বাড়িটা কবরের মতো ঠাণ্ডা নিঝুম। অথচ আশপাশের বাড়িগুলো জীবনের স্পন্দনে ভরপুর! সুমন ভাবলে, বাঈজিদের দুনিয়া এই! আজ আলো, কাল অন্ধকার!

টানা বারান্দার পাশে ঘরগুলো তালাবন্ধ। সিঁড়ির মুখেই মাইফিল—ঘর। সুমন এসে দাঁড়াল সেই ঘরের সামনে। বড় হলঘর, বড় বড় দরজা—জানালা সবই বন্ধ। পকেট থেকে মাস্টার কী বের করে তালা খুলে ফেললে। তারপর ঘরে ঢুকে টর্চের আলোয় সুইচ খুঁজে টিপে দিলে। জ্বলে উঠল বেলোয়ারি ঝাড়ের বাতিগুলো। খোলা দরজার কপাট দুটো ভেজিয়ে দিলে সুমন। ঘরের আলো বাইরে না যায়। তারপর চারপাশে তাকাল।

বাইরে থেকে বাড়িটাকে দেখতে যেমন পুরোনো হতশ্রী, ভেতরটা তেমন নয়। প্রাচুর্যের সঙ্গে রুচিরও পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রথমেই চোখে পড়ে হলের একধারে মানুষ—প্রমাণ সাইজের একটি মার্বেল পাথরের নর্তকী—মূর্তি। অপরূপ গঠনসৌকর্য দেখে মনে হয় ফরাসি বা ইতালীয় শিল্পীর হাতে তৈরি। সারা ঘরটা ফিকে সবুজ রং করা। বড় বড় আর্শি, দামি নেটের পর্দা, কয়েকখানা গদিওয়ালা কৌচ আর শ্বেতপাথরের টেবিল দিয়ে সাজানো। কৌচগুলোর ওপর ধুলোর আস্তরণ, একটা টেবিলের ওপর কাচের চৌবাচ্চচায় লাল মাছ। মরে গেছে। মেঝের অধিকাংশ জুড়ে পুরু ফরাস, তার ওপর ধুলোয় ধূসর কাশ্মীরি জাজিম। একপাশে রঙিন ছিটের ঢাকার মধ্যে একটা সারেঙ্গি, একটা তম্বুরা আর গোটাকয়েক বাঁয়া—তবলা, ছাউনিগুলো অব্যবহারে ফেটে গেছে।

ফরাসের একটা জায়গায় সুমনের চোখ পড়ল। জাজিমের ওপর অনেকখানি কালো ছাপ। জয়প্রকাশ কাপুরের শুকনো রক্তের দাও!

চোখ সরিয়ে নিল সুমন। মাইফিল—ঘরের এক প্রান্তে একটা ছোট ঘর। মাঝখানে দরজা নেই, তার বদলে চওড়া একটা খিলান, দু—পাশে জাফরি—কাটা দেয়াল। বোধ হয় বাঈজিদের বিশ্রামের জন্য। অথবা বিশেষ অতিথিদের আরামের জন্য। ও—ঘরটাও দেখা যাক।

খিলান পার হয়েই থেমে গেল সুমন। দাঁড়িয়ে রইল নিশ্বাস রোধ করে। মাইফিল—ঘরের ঝাড়বাতির উজ্জল আলো খানিকটা এ—ঘরেও এসে পড়েছে। সেই আলোয় সুমন দেখলে সামনের দেয়ালের ব্যাকেট থেকে ঘন নীল ভেলভেটের পর্দা ঝুলছে, তারই নিচে একজোড়া পা! ট্রাউজার আর জরিদার কাবুলি চপ্পল পরা পুরুষের পা!

সুমন আসার আগেই আর কেউ এখানে এসেছে তাহলে! আর, আর সুমনের সাড়া পেয়ে লুকিয়েছে পর্দার পেছনে। কিন্তু কে ও? পুলিশ নয় নিশ্চয়। তারা এলে লুকিয়ে আসবে কেন? তবে কি গোয়েন্দা? কে নিযুক্ত করল? না, কোনো চোর—ছ্যাঁচোড়? যেই হোক, মিত্র সে নয়।

কি করবে এখন সুমন? থাকবে, না যাবে? ধরবে, না ধরা পড়বে? কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে ইতিকর্তব্য স্থির করে নিলে। ট্রাউজারের পকেট থেকে অটোমেটিক অস্ত্রটা চলে এল ডান হাতের মুঠোয়। তারপর বাঁ হাতে ভেলভেটের পর্দাটা ধরে সহসা টান মারলে একপাশে। পেতলের রিং লাগানো পর্দা শব্দ করে সরে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল সুমনের মুখে।

কেউ না। প্রকাণ্ড আর্শির গায়ে তার নিজেরই প্রতিবিম্ব। পর্দার নিচে নিজেরই জরিদার কাবুলি চপ্পলের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল। এতক্ষণ নিজেই তাহলে কৌতুক করছিল নিজের সঙ্গে!

চারপাশে তাকিয়ে মনে হল, ছোট ঘরটা কারো নিজস্ব বসবার ঘর। ডিভানের মতো একটা বসবার জায়গা, বেতের একটা আরাম কেদারা, একটা দেরাজওয়ালা লেখবার টেবিল ছাড়া আর আসবাবের বাহুল্য নেই। টেবিলের ওপর কলমদান, একটা রাইটিং প্যাড, একটা নৌকাকৃতি রিডিং ল্যাম্প, খানকতক উর্দু কবিতাগ্রন্থ, তার মধ্যে আবার অতুলপ্রসাদের বাংলা গানের বই! উর্দু কাব্যের বইগুলোর মলাট খুলতেই দেখা গেল হিন্দিতে লেখা :

প্যারী চৈতিকে

জয়প্রকাশ

শুধু অতুলপ্রসাদের গানের বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় বাংলা মেয়েলি হরফে লেখা 'শান্তিলতা'।

টেবিলের ড্রয়ারটা টানলে সুমন। ভেতরে খানদুয়েক ব্যাঙ্কের চেকবই। চেকের কাউন্টার পার্টগুলো সুমন দেখতে লাগল। বেশির ভাগ চেকই রংলালের নামে ইসু করা। কখনো দুশো, কখনো পাঁচশো, একখানা দু'হাজার টাকার। চেকবই ছাড়া ছোটখাটো ফোটো অ্যালবাম একখানা রয়েছে। দ্রুতহাতে ছবিগুলো উল্টে গেল সুমন। তারপর কি ভেবে নিজের কোটের মধ্যে অ্যালবামখানা লুকিয়ে ফেলল।

ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে নজরে পড়ল একটা স্ট্যান্ডের ওপর ডালা খোলা একটা গ্রামোফোন মেশিন। একখানা রেকর্ড চাপানো, তার ওপর সাউন্ডবক্স নামানো, গান শেষ হবার পরেও তোলা হয়নি। রেকর্ডখানা তুলে নিয়ে দেখলে সুমন। হিন্দি ঠুংরি বা গজল নয়, অতুলপ্রসাদের বহুশ্রুত বাংলা গান—

বঁধুয়া, দিন নাহি আঁখি পাতে।

আমিও একাকী, তুমিও একাকী

আজি এ বাদল রাতে।।

হয়তো একুশে জুলাই—এর সেই বাদলা রাতে চৈতি এই রেকর্ডখানা শুনছিল। জয়প্রকাশ আসার আগে। তারপর রিভলভারের আওয়াজে চাপা পড়ে গিয়েছিল গান।

রেকর্ডখানাও কোটের ভেতরে লুকিয়ে রাখলে সুমন। তারপর আবার এসে দাঁড়াল মাইফিল—ঘরে। আর কিছু দেখবার নেই এখানে। কিন্তু সত্যিই কি দেখবার নেই কিছু?

সুমনের সন্ধানী দৃষ্টি আর একবার সারা ঘরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে লাগল। এক জায়গায় এসে তার সঞ্চরমান দৃষ্টি থেমে গেল। লাল মোজেইক—করা মেঝের ওপর একটা সাদা বস্তু পড়ে আছে। কুড়িয়ে নিলে সুমন। মার্বেল পাথরের তৈরি নিখুঁত দুটি আঙুল—অনামিকা আর কনিষ্ঠা!

সুমন একবার নর্তকীমূর্তির দিকে তাকালে, তারপর আঙুল দুটি নর্তকীর লীলায়িত বাঁ হাতের ভাঙা জায়গায় বসিয়ে দিতেই বেমালুম খাপ খেয়ে গেল।

কিন্তু ভাঙল কেন? কবে ভাঙল? একুশে জুলাই রাতে কি? তা নইলে আঙুল দুটো আজো মেঝেয় পড়ে থাকবে কেন? আগে ভাঙলে নিশ্চয় সযত্নে তুলে রাখা হত, অথবা যথাস্থানে জুড়ে দেওয়া হত।

একুশে জুলাই রাতে চৈতি বাঈয়ের হাতে গুলি খেয়ে জয়প্রকাশ মরেছে, কিন্তু ফরাসি নর্তকীর হাতের আঙুল ভাঙল কেন?

কারণটা যাই হোক, এখন ফেরা যাক। হাতঘড়িটা দেখলে সুমন। ফিরতে আরও দেরি হলে নুরি বেগম কি ভাববে কে জানে। বাতি নিভিয়ে অন্ধকার বারান্দায় বেরিয়ে এল সে। দরজা আবার তালাবন্ধ করে দিলে।

নুরী বেগম তখনো গাইছে :

'না মারো, না মারো রাজা

চিতুওনকা বাণ—'

আর, সুর্মাটানা ট্যারা চোখের বাণ খেয়ে খেয়ে নাট্যকার রাজুর হৃদয়টা একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। হোয়াইট লেবেলের বোতলটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে!

বহুৎ আচ্ছ! বহুৎ আচ্ছা!

তারিফ করতে করতে সুমন ঘরে ঢুকল।

নুরী বেগম বললে, কোথায় গিয়েছিলেন?

বারান্দায় হাওয়া খাচ্ছিলাম, আর তোমার গান শুনছিলাম বেগম।

কই, আমার চাকর তো আপনাকে দেখতে পেল না!

সুমন একটু থতিয়ে গিয়ে বললে, অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিলাম কিনা, তাই। আচ্ছা বেগম, পাশের বাড়িটায় ভূতটুত আছে নাকি?

শুনে আঁতকে উঠল নুরী বেগম। বললে, এ কী বলছেন!

বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ যেন রিভলভারের আওয়াজ আর চিৎকার শুনতে পেলাম পাশের বাড়ি থেকে।

জোর করে অবিশ্বাসের হাসি হাসলে বেগম। বললে, না, না, ও তোমার নেশার খেয়াল!

আরে বা!—সুমন বললে, তামাম লক্ষ্নৌ শহর তো জানে চৈতি বাঈ জয়প্রকাশকে গুলি করেই খুন করেছে। তুমি কোনো আওয়াজ শোনোনি?

কিসের?

হল্লা আর গুলির আওয়াজ!

হল্লা শুনতে পাইনি, তবে দুটো গুলির আওয়াজ শুনেছিলাম বটে।

দুটো?

সুমনের নকল ঢুলুঢুলু চোখ দুটো হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল।

দুটোই তো মনে হল। কি জানি, ঝড়—জলের রাতে ভালো করে শুনতে পাইনি।—ছেড়ে দাও ও—কথা, জিন'কে আমার বড্ড ভয়।

রাজু বললে, ভয় কি বাঈজি? তোমার ওই সুর্মা—লাগানো চোখের তীর খেলে জিন তো জিন, জিনের চোদ্দপুরুষও আর বাঁচবে না।

হাতঘড়িটা আবার দেখলে সুমন। ওয়ালেট থেকে খানকয়েক দশ টাকার নোট বের করে সামনের ট্রের ওপর রেখে বললে, চলি বেগম।

আর গান শুনবে না?

আজ থাক! রাত হয়েছে।

রাত সত্যিই হয়েছে।

গোল—দরওয়াজার মুখে সার্কেলের কাছে দাঁড়িয়েছিল সুমনের হিলম্যান। চকের দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকটা অন্ধকার নির্জন।

নুরী বেগমের বাড়ি থেকে হেঁটে এল সুমন ও রাজু।

রাজু বললে, তুই কি ব্যারিস্টারি ছেড়ে গোয়েন্দগিরি ধরলি ইয়ার?

চাবি দিযে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে সুমন জবাব দিলে, দরকার হলে ব্যারিস্টারকেও গোয়েন্দাগিরি করতে হয়।

কিন্তু চৈতি বাঈয়ের বাড়ি যদি গেলি তো লুকিয়ে গেলি কেন? পুলিশের পারমিশান নিয়ে সোজা রাস্তায় গেলেই পারতিস।

সব সময় সোজা রাস্তা দিয়ে গেলেই ঠিক জায়গায় পৌঁছানো যায় না রাজু।—কে?

একটা ধরা গলার আওয়াজ অন্ধকারের ভেতর থেকে এগিয়ে এল, আল্লার নামে কিছু দান করো!

সেই অন্ধ ভিখিরিটা! গায়ে সেই কালো আলখাল্লা কটারঙের চোখে স্থির তারা! রাত আড়াইটের সময়ও ভিক্ষে করছে! ভিক্ষে করছে, না পিছু নিয়েছে?

গাড়িতে উঠতে গিয়ে থেমে গেল সুমন। পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা বের করে প্রসারিত হাতের টিনের পাত্রে ফেলে দিলে।

লাঠি ঠকঠকিয়ে চলে গেল লোকটা। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল সুমন। ভারি অদ্ভুত ভিখিরি তো!

তারপর গাড়িতে স্টার্ট দিলে।

চার

আপনি রোজ রোজ আসেন কেন?

তোমাকে দেখতে আসি।

আপনি তো অনেক মেয়ে দেখেছেন।

দেখছি, কিন্তু তারা তুমি নয়।

আমি কী?

তুমি সুন্দর। রূপ অনেকের থাকে, সুন্দর ক'জন?

ফ্যাকাশে মুখে রক্তের রঙ লাগল! মুখ ফিরিয়ে নিলে চৈতি। আর মনে মনে নিজেই নিজেকে বাহবা দিলে সুমন। প্রেমের অ আ ক খ না জেনেই বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারছে সে।

ধীরে ধীরে জাফরির পাশে সরে গেল চৈতি। জাফরি বেয়ে একটা লতা উঠেছে। তার দু'—একটা পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে হঠাৎ বললে, আপনি আর আসবেন না।

সুমন চৈতির মনের অবস্থা বোঝবার চেষ্টা করলে। তার তরুণী মন কি সাড়া দিচ্ছে না সুমনের এই এগিয়ে যাওয়ায়? পরিবেশটা তো অনুকূল। সন্ধ্যাকাল, চাঁদ উঠেছে, চারধার নির্জন। তবে?

সুমন বললে, তুমি কি বিরক্ত হয়েছ শান্তিলতা?

না। এখানে আপনার আর না আসাই ভালো।

না এসে আমি পারি না। দূরে থাকলেও আমার সমস্ত মন পড়ে থাকে এখানে।

পিছন ফিরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল চৈতি।

গলার আওয়াজে অভিমান আনতে চেষ্টা করলে সুমন। বললে, কিন্তু তুমি যখন চাও না, আমার চলে যাওয়াই ভালো।

দরজার দিকে এগোল সে। কিন্তু দরজা অবধি পৌঁছোবার আগেই চৈতি ডাকলে, সুমন!

সে—ডাকে আবেগ, মিনতি আর লজ্জা মেশানো।

আর একবার মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ালে সুমন। নিখুঁত অভিনয় হয়েছে তার! কঠিন বরফ বোধ হয় এবার গলতে শুরু করল। জয় হোক ডক্টর কেশকারের!

ফিরে এল সুমন। জিজ্ঞেস করলে, আবার কেন ডাকলে?

থেমে থেমে কাঁপা গলায় চৈতি বলতে লাগল, আমার অতীত নেই—কোনো পরিচয় নেই—আমার মতো মেয়ের সঙ্গে কেন তুমি নিজেকে জড়াতে চাইছ সুমন?

তুমি ভাগ্য মানো শান্তি? তোমার সঙ্গে আমার জীবনটা জড়িয়ে যাবে, এটা বোধ হয় ভাগ্যের লেখা। নইলে, কোথায় ছিলে তুমি, কোথায় ছিলাম আমি! কেন দেখা হল বলো?

নতমুখে চৈতি দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। রংবেরঙের নকশা—কাটা মেঝের দিকে চোখ রেখে বলতে লাগল, কি জানি কেন, দিনরাত আমার ভয় করে—আমি ঠিক বুঝতে পারি না। তবু মনে হয়, আমাকে যেন একটা বিপদ ঘিরে আছে! না, না, সুমন, আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাও, তুমি ফিরে যাও!

আনত চোখের দীর্ঘ পল্লব ভিজিয়ে টসটস করে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়তে লাগল।

সুমন যেন স্টেজের পাকা অভিনেতা। ডক্টর কেশকারের নির্দেশ মতো শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলে। চৈতির দিকে একটু ঝুঁকে গলায় আবেগ এনে বললে, আর ফেরবার উপায় নেই। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি শান্তিলতা।

আমার অতীত যদি ভালো না হয়?

তবুও ভালোবাসব।

চৈতির সারাদেহ একবার কেঁপে উঠল। জলে—ভেজা চোখ দুটি সুমনের মুখের দিকে তুলে প্রশ্ন করলে, সত্যি বলছ?

সেই একজোড়া ভাসা ভাসা ভিজে চোখে কি যে ছিল, সুমনের তা বুঝতে দেরি হল না। হঠাৎ একটা অপরাধবোধ তাকে বোবা করে দিল। একটি মেয়েকে প্রবঞ্চনা করার গ্লানিতে তার পুরুষচিত্ত যেন ছি—ছি করে উঠল তাকে। কিন্তু এতটা এগিয়ে আর তো ফেরা চলে না! আরও এগিয়ে যেতে হবে লক্ষ্যস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত। জানতেই হবে চৈতি বাঈয়ের অপরাধ—রহস্য, জয়প্রকাশকে কেন খুন করেছে, কি অবস্থায় খুন করেছে। সে ডিফেন্স কাউন্সেল। সত্য, ন্যায় আর আইনের প্রতিনিধি সে, কোনো দুর্বলতাকেই প্রশয় দেবে না।

নিজেকে শক্ত করে নিলে সুমন। একটু নকল হাসি মুখে ফুটিয়ে বললে, তোমার কি বিশ্বাস হয় না?

বিশ্বাস করতে ভয় হয়। মনে হয়, কোনো সুখই বুঝি আমার জন্যে নয়!

ভিজে চোখ আবার ভিজে এল। সুমন বুঝতে পারলে, বিস্মৃত অতীত চৈতির অবচেতন মনের গভীরে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার স্মৃতি অস্পষ্ট হলেও অবলুপ্ত হয়নি আজো। বন্ধ দরজায় ঘা দেওয়ার এই সুযোগ!

চৈতির হাত ধরে সুমন মোড়ায় বসালে। বললে, এত ভয় কেন তোমার শান্তি। তোমার জীবনে কি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল কখনো? উত্তেজনার ঝোঁকে কোনো অপরাধ? মনে করে দেখো তো।

দুর্ঘটনা! অপরাধ! কই, মনে তো পড়ে না।

তবে ছেড়ে দাও ও—ভাবনা! অন্য কথা পাড়লে সুমন। তুমি আজ গ্রামোফোন রেকর্ড বাজাচ্ছ না?

বাজাব?—এতক্ষণে সহজ হয়ে উঠল চৈতি বাঈ। বললে, কোন গান বাজাব বলো?

রেকর্ডের গান নয়, আজ তোমার মুখে গান শুনতে ইচ্ছে করছে।

খুশিতে উছলে উঠল চৈতি।

কতদিন গান গাইনি আমি! কত গান জানতাম, কত ভুলে গেছি! কোন গান শুনবে সুমন?

চৈতির মুখের পানে লক্ষ্য রেখে সুমন বললে, অতুলপ্রসাদের সেই বাংলা গানটা—বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে—

ও গান আমি তো জানি নে সুমন।—সরলভাবে চৈতি বললে।

সে কি! জানো না? ও গানটা যে লোকের মুখে মুখে ফেরে। আচ্ছা, তোমায় শুনিয়ে দিচ্ছি।

ত্রিপদী টেবিলের ওপর সুমন একটা প্যাকেট এনে রেখেছিল। খুলে রেকর্ডখানা বার করলে, গোল—দরওয়াজার বাড়ি থেকে আনা সেই রেকর্ড! তারপর চাপিয়ে দিলে বারান্দার একধারে রাখা গ্রামোফোন মেশিনে। জ্যাকসন সাহেবকে বলে মেশিন আর কিছু রেকর্ড সুমনই পাঠিয়েছিল এখানে।

শুরু হল গান। আর চৈতির দিকে সজাগ লক্ষ্য রেখে বসে রইল সুমন।

'বঁধুয়া, নিদ নাহি আঁখিপাতে।

আমিও একাকী তুমিও একাকী

আজি এ বাদল রাতে।'

শরতের পরিষ্কার আকাশে বাদলের চিহ্নমাত্র নেই। তবু প্রাচীন প্রমোদ—ভবনের এই গোলবারান্দায় কোনো নিঃসঙ্গ আত্মার আক্ষেপ বেহাগ—রাগে যেন গুমরে উঠতে লাগল। শুনতে শুনতে চৈতি কেমন—ধারা হয়ে গেল। বললে, কোথায় পেলে এই গান সুমন? এ—গান যেন শোনা—

সুমন সাগ্রহে বললে, এ গান তোমার শোনা! কোথায় শুনেছিলে চৈতি বাঈ?

সুমন আর শান্তিলতা নামে ডাকলে না, ইচ্ছে করেই বললে চৈতি বাঈ।

এক মনে শুনতে শুনতে চৈতি বললে, এ গানের মধ্যে আমি ঝড়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি—বৃষ্টির শব্দ! কে যেন এল সেই ঝড়ের মধ্যে!

উৎসুক হয়ে উঠল সুমন। একুশে জুলাই রাতে ঝড়—জলের দুর্যোগ ছিল! তবে কি খুলছে—একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে পূর্বস্মৃতির বন্ধ দরজা?

সুমন বললে, আর কিছু মনে পড়ছে না? কে এসেছিল সে—রাতে? সেই ঝড়—জলের রাতে? ভেবে দেখো চৈতি বাঈ—দেশ করে ভেবে দেখো।

চঞ্চল হয়ে উঠল চৈতি। মুখে যন্ত্রণার রেখা দেখা দিল। কাতর স্বরে বললে, ভাবতে আমি আর পারছি না সুমন! আমার মাথার মধ্যে কেমন করছে! বন্ধ করে দাও গান—বন্ধ করো!

বন্ধ করে দিল সুমন। না, স্মৃতির বিকল যন্ত্রের ওপর চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। কে জানে, হয়তো হিতে বিপরীত হবে! বন্ধ দরজা আপনা আপনি খুলে যাওয়া চাই। একটা অভিজ্ঞানে খুলব খুলব হয়েছে, আরও অভিজ্ঞান রয়েছে। কোনটায় কাজ হবে কে জানে।

খানিকটা শান্ত হয়েছে চৈতি। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে আছে মোড়ায়। ক্লান্ত, করুণ, উদাস। মায়া হয় দেখলে।

প্যাকেট থেকে ফোটো—অ্যালবামখানা বার করলে সুমন। চৈতির পাশে বসে আস্তে আস্তে ডাকলে, শান্তি!

চৈতি চোখ মেলে তাকাল।

এখন একটু ভাল বোধ করছ কি?

ফ্যাকাশে মুখে ক্ষীণ হাসি দেখা দিল।

এসো, কয়েকখানা ছবি দেখাই তোমাকে।

অ্যালবামটা খুলে ধরলে সুমন। প্রথম পাতায় চৈতিরই একখানা ফোটো। পরনে জরি বসানো ঘের—দেওয়া ঘাঘরা, বুকে চোলি, মাথায় ওড়নি, সিঁথিতে টিকলি। ঠোঁটে মুনি—মন—জয়করা হাসি।

সুমন জিজ্ঞেস করলে, এ কে?

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে চৈতি অ্যালবাম থেকে ফোটোখানা খুলে নিল ফস করে। ঘরে গিয়ে আরশির সামনে দাঁড়াল, অবাক হয়ে বারবার দেখল। নিজেকে আর ফোটোখানাকে; তারপর ফিরে এসে বললে, আমি। কিন্তু এ কেমনতর আমি! কবেকার আমি! একি পোশাক আমার!

মনে পড়ছে না?

চৈতি মাথা নাড়লে। মনে পড়ছে না।

খান দুই পাতা উলটে গেল সুমন। বেরোল আরেকটি নারীর ছবি। বয়স হয়েছে, চল্লিশের কাছাকাছি, তবু অসামান্য রূপসী। শাড়িপরা চেহারা।

আচ্ছা, ইনি কে? জিজ্ঞেস করলে সুমন।

ফোটোখানার পানে চেয়ে রইল চৈতি। আর চৈতির পানে সুমন।

ধীরে ধীরে চৈতির মুখে ভাবান্তর হতে লাগল। একটু একটু করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সে—মুখ। অপরিচয়ের অন্ধকারে বুঝি আলো। দেখা দিয়েছে এতদিন পরে। মনের সাদা কাগজে পড়েছে স্মৃতির আঁচড়!

উৎসুক সুমন আবার জিজ্ঞেস করলে, কে ইনি? চিনতে পারছ?

অস্ফুট স্বরে চৈতি বললে, বেনারসী মা!

অধীর আগ্রহে সুমন বললে, বেনারসী মা! কি নাম ছিল মনে পড়ে?

নাম? সোহিনী বাঈ।

বাড়ি?

বলছি—লক্ষ্নৌ গোল—দরওয়াজা। আমিও ছিলাম সেখানে।

আরও তিনখানা পাতা দ্রুত উলটে গেল সুমন। বেরোল এক পুরুষের ছবি। যৌবন অতিক্রান্ত, মাথায় কালো ভেলভেটের বাঁকা টুপি, গায়ে কামিজের ওপর ওয়েস্টকোট, চোখের কোলে অমিতাচারের কালো ইতিহাস।

এ কার ছবি? জিজ্ঞেস করলে সুমন।

রংলাল চাচার।

কি করত মনে আছে?

বেনারসী মায়ের মুজরোতে সারেঙ্গি বাজাত। খুব ভালবাসত আমাকে। চামেলি আতর কিনে দিত। মনে পড়ছে—সব মনে পড়ে যাচ্ছে আমার!

সাফল্যের আনন্দে মেতে উঠল সুমন। মনে পড়ছে চৈতি বাঈয়ের! অভিজ্ঞান কাজ করছে। খুলে যাচ্ছে পূর্বস্মৃতির বন্ধ দরজা! খুনের রহস্য আর অস্পষ্ট থাকবে না—কুয়াশা ভেদ করে এইবার বেরিয়ে আসবে সত্যের সূর্যরশ্নি!

আরও দ্রুত হাতে পাঁচখানা পাতা ওলটাল সুমন। বেরোল এক যুবকের ছবি। সুপুরুষ চেহারা, কালো শেরওয়ানি গায়ে, ঠোঁটের ওপর সরু গোঁফের রেখা মুখখানাকে তীক্ষ্ন করেছে, উজ্জ্বল দুই চোখে যেন ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি।

চৈতির মুখের পানে চোখ রেখে সুমন প্রশ্ন করলে, এ কে?

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল চৈতির মুখের চেহারা। ফ্যাকাশে মুখ পলকের জন্য টকটকে লাল হয়ে উঠেই আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভাসা ভাসা চোখ দুটো আতঙ্কে আরও বড় হয়ে উঠল। ঘন ঘন নিশ্বাসে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল নাকের পাটা দুটো। বাহ্যজ্ঞানরহিতের মতো শুধু তাকিয়েই রইল ফোটোখানির দিকে।

সুমন আবার প্রশ্ন করলে, বলো এ কে?

উদভ্রান্তের মতো চৈতি বলে উঠল, কেউ না—ও কেউ না!

উঠে চলে যাচ্ছিল চৈতি, খপ করে হাতখানা নিজের মুঠোর মধ্যে ধরে ফেলল সুমন। বললে, এ জয়প্রকাশ। বলো এ জয়প্রকাশ কিনা!

আমি ওকে চিনি না।

চেনো, নিশ্চয় চেনো।

না!

চৈতি, বলো।

না, না, না! আমি বলব না—বলতে পারব না!

সরু গলায় সভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল চৈতি। আর, সে চিৎকার, প্রাচীন বেগমমহলের খিলানে খিলানে ধাক্কা খেয়ে একটা অলৌকিক প্রেতস্বরের মতো বাজতে লাগল। ছুটে এল ঝুলনিয়া। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে, তাড়া—খাওয়া ভীত পশুর মতো চৈতি ছুটে চলে গেল ঘরের মধ্যে। দড়াম করে বন্ধ করে দিলে দরজা।

হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সুমন। মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল অ্যালবামখানা। তারপর ইশারায় ঝুলনিয়াকে ডেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল।

বারমহলের বারান্দায় এসে সুমন বললে, চৈতির কাছে কতদিন কাজ করছ তুমি?

মনে মনে হিসেব করে ঝুলনিয়া বললে, করিব আট সাল হবে।

তবে তো তুমি সোহিনী বাঈয়ের ঘরের সব খবরই রাখতে। তাই না?

আমি নোকরানি, মনিবের সব খবর কেমন করে রাখব জী? কিছু কিছু রাখতাম।

আচ্ছা, তোমার মনিব কেমন মানুষ ছিলেন?

অমন মানুষ হয় না ভকিলসাব!—ঝুলনিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

জীবনে অনেক টাকা রোজগার করেছিলেন, না?

জী। বেনারসের সেরা বাঈজী ছিলেন আমার মনিব। বড় বড় আমিরলোগ আসত—টাকার তোড়া ঢেলে দিত তাঁর পায়ে! কিন্তু যত রোজগার করেছিলেন, রাখতে পারেননি ততটা।

কেন?

রংলালের জন্যে।

রংলাল কেমন লোক ছিল?

মুখ—চোখ ঘুরিয়ে ঝুলনিয়া বললে, বজ্জাত! সরাব আর জুয়া ছাড়া কিছু জানত না। টাকা জোগাতেন আমার মনিব। জুয়া খেলে মাতলামি করে কত সময় পুলিশে ধরা পড়ত। মোটা টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতেন বড় বাঈ। রংলালের জন্যে শান্তি ছিল না তাঁর।

তাই নাকি? কিন্তু রংলাল তো একটা সারেঙ্গিওয়ালা, তাকে এত আশকারা দিতেন কেন সোহিনী বাঈ?

সারেঙ্গি বাজনায় ওর নাকি জোড়া ছিল না। ও না বাজালে বড় বাঈয়ের আসর জমতই না। প্রয়াগে জরুর নেশা করেই ডুবে মরেছে!

সুমন জিজ্ঞেস করলে, সোহিনী বাঈ তাঁর সমস্ত দৌলত কাকে দিয়ে গেছেন? চৈতিকে নিশ্চয়?

জী। ছোটি বাঈ ছাড়া আর কে—ই বা ছিল তাঁর!

সুমন এবার অ্যালবাম খুললে। বললে, এ কে বলতে পারো?

ঝুলনিয়া বললে, এ তো জয়প্রকাশ।

কেমন লোক ছিল?

বড় ঘরের ছেলে বলেই মনে হত। তার চালচলন কথাবার্তা সবই ভাল ছিল, কেবল ভাল লাগত না রংলালের সাথে তার মেলামেশা। মাঝে মাঝে দেখতাম, মির্জা আতরওয়ালার দোকানে দুজনে কথা হচ্ছে।

নেশাটেশা করত নাকি জয়প্রকাশ?

কখনো দেখিনি।

অ্যালবাম বন্ধ করে সুমন বললে, আচ্ছা, তুমি যাও।

ঝুলনিয়া গেল না। উৎকণ্ঠায় কাতর হয়ে বললে, মারা যাবার সময় বড় বাঈ বলেছিল, ঝুলনিয়া, ছোটি বাঈকে তুই দেখিস! ছোটি বাঈয়ের কি সাজা হয়ে যাবে ভকিলসাব?

সে—জিজ্ঞাসার কোনো জবাব দিলে না সুমন। অন্য প্রশ্ন করলে, চৈতির স্বভাব—চরিত্র কেমন ঝুলনিয়া? লুকিয়ো না, সত্যি বলো।

রামজী কসম ভকিলসাব, ছোটি বাঈয়ের মধ্যে এতটুকু মন্দ নেই। ফুলের মতো নরম ওর মন, মানুষকে প্যার করাই ওর স্বভাব। মেজাজ ওর রাগী ছিল বটে—রাগ হলেই কাচের ডিশ, আরশি, আতরের শিশি সব ভেঙে চুরমার করত—কিন্তু সে শুধু ওর মনটা বাচ্চচার মতো নরম বলে।—ছোটি বাঈকে বাঁচাতে পারবে তো ভকিলসাব?

এক মুহূর্ত নিরুত্তর রইল সুমন। তারপর বললে, আমিও নিজেকে ঠিক এই কথাই জিজ্ঞেস করছি ঝুলনিয়া।

আর দাঁড়ালে না সুমন।

বারাবাঁকিতে সুমন আবার পরের দিনই গেল। তখন বিকেল বেলা।

অন্দরে যাবার মুখে ঝুলনিয়া জানালে, ছোটি বাঈ বলেছে চৌধুরিসাব যেন ফিরে যান। আর দেখা হবে না।

ছোটি বাঈয়ের তবিয়ত কেমন?

ভালো নয়! কাল রাত থেকে বিশেষ কিছু খায়নি।

কোথায় সে?

ঘরে শুয়ে আছে।

সুমন ভেতরে গেল। গোলবারান্দা ফাঁকা। ঘরেও চৈতি নেই। বিছানার ওপর একটা জিনিস চোখে পড়ল। সুমন সেটা তুলে নিলে। একখানা অসমাপ্ত চিঠি। বাঁকা বাঁকা বাংলা হরফে লেখা:

সুমন,

জানি তুই আবার আসবে। তাই এই চিঠি লিখছি। এই চিঠি নিয়ে তুমি ফিরে যেও, আর এসো না। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।

ভালোবাসার সাধ বোধ হয় মেয়েদের রক্তে। তোমায় দেখে আমারও তাই নতুন করে বাঁচতে সাধ হয়েছিল। কিন্তু কেন তুমি আমার ভয়ঙ্কর অতীতকে মনে করিয়ে দিলে সুমন? আমি তো ছিলাম সব ভুলে গিয়ে। আমার স্বপ্নে—গড়া তাসের ঘর ভেঙে দিয়ে কী সুখ পেলে তুমি!

কিন্তু দোষ আমি তোমার দিই না। দোষ দিই আমার......

আর লেখা হয়নি।

চিঠিখানা হাতে নিয়ে সুমন স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে গিয়ে ছাদের সিঁড়ি ধরলে।

ছাদেই আছে চৈতি। বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মিনারের নিচে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিছন থেকে সুমন ডাকলে, শান্তিলতা!

চমকে ফিরে দাঁড়াল চৈতি। আরও রোগা দেখাচ্ছে তাকে। ফ্যাকাশে মুখ বিকেলের আলোয় আরও ফ্যাকাশে মনে হচ্ছে। চোখ দুটো ফোলা ফোলা। বোধ হয় কেঁদেছে বহুক্ষণ। অনেক ঝড় পার হয়ে ক্লান্তপক্ষ একটি পাখি যেন ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। বড় সুন্দর, বড় করুণ। একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে গেল সুমনের মন। সেটা মায়া, না মমতা, না আর কিছু, বুঝতে পারল না।

শান্ত গলায় চৈতি বললে, আমি শান্তিলতা নই, চৈতি বাঈ। পুলিশের কয়েদি।

সুমন বুঝলে লুকোচুরি এখন মিছে। বললে, জানলে কেমন করে?

পুলিশে ধরা দেব বলে সকালে বেরোতে যাচ্ছিলাম। পাহারাদারেরা আটকে দিল। বুঝলাম, মিথ্যে বলেছিলে তুমি, পুলিশ আজও ছাড়েনি আমায়।

সবই যখন জানতে পেরেছ, তখন আমার আসল পরিচয়টাও জেনে রাখো।

জানি। তুমি আসামি পক্ষের ব্যারিস্টার।

কে বললে?

ঝুলনিয়া। বলতে প্রথমে চায়নি।

সুমনের গলায় আগ্রহ প্রকাশ পেল, তাহলে তোমার সব কথা এবার আমায় বলো।

অত্যন্ত উদাসীনের মতো চৈতি বললে, তুমি তো জানো, আমি জয়প্রকাশকে খুন করেছি।

তবু ঘটনার পুরো বিবরণ, কারণ, উদ্দেশ্য সবই আমার জানা দরকার! নইলে তোমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করব কেমন করে?

সে চেষ্টা আর কোরো না।

একি বলছ! একটা জীবনের দাম লাখো কোহিনুরের চেয়েও (৮০—৮১ ছাড়) শিখিয়ে মানুষ করতেও তাঁর আগ্রহ ছিল খুব। তাঁরই চেষ্টায় আমি স্কুলের পড়া শেষ করে হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে এক বছর পড়েছিলাম।

ছোটবেলায় দেখতাম, আমাদের বাড়িতে কত লোকজন আসত, বেনারসী মা পরীর মতো সেজেগুজে তাদের মাঝখানে গান গাইতেন। দূর থেকে শুনতাম তাঁর গান, কাছে যাবার হুকুম ছিল না। একদিন আপনমনে তাঁরই একটা গান গাইছিলাম, তখন আমার বয়স বারো। বেনারসী মা শুনে আমায় ধমকে দিলেন। কেন যে তিনি আমার গানের ওপর রাগ করেছিলেন, সেদিন বুঝিনি। কিন্তু ধমক খেয়েও গানের প্রতি ভালোবাসা আমার কমল না। লুকিয়ে লুকিয়ে আমি গাইতাম। উৎসাহ পেতাম কেবল রংলাল চাচার কাছে। শেষ অবধি বেনারসী মা নিজেই আমাকে শেখাতে শুরু করলেন। বলতেন, আমার মেয়ে হবি বলেই তুই এমন গলা নিয়ে জন্মেছিস। কিন্তু তোর জীবনটা যেন আমার মতো না হয় বেটি! সে—কথার মানেটা তখন বুঝতাম না, মনে হত বেনারসী মায়ের মতো সুখী কে? কত রূপ, কতবড় গাইয়ে, কতা টাকা! কিন্তু তবুও এক—একদিন রাতে ঝগড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যেত, আর খানিক বাদেই বেনারসী মা পাশের ঘর থেকে এসে আমায় বুকে জড়িয়ে নীরবে কাঁদতেন।

আমার যখন উনিশ বছর বয়স, তখন বেনারসী মায়ের শরীরটা ভাঙল। মাঝে মাঝে বুকে কি যেন একটা ব্যথা ধরত, গাইতে বসলে হাঁপিয়ে পড়তেন। বেনারস ছেড়ে লক্ষ্নৌয়ে বাড়ি কিনে চলে এলেন। আগের মতো আর মুজরো করতে পারতেন না। একদিন বলেছিলাম, আমি গাইব মা? সেদিন তাঁর যে মূর্তি দেখেছিলাম, জীবনে আর কখনো দেখিনি। লক্ষ্নৌয়ে আসার পর বছর দেড়েক মাত্র বেঁচেছিলেন বেনারসী মা। মারা যাবার দিন কতক আগে একদিন আমাকে কাছে ডাকলেন। আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ, দুই চোখ দিয়ে স্নেহ—মমতা যেন ঝড়ে পড়ছিল। তারপর বললেন, আমার মেয়াদ আর বেশিদিন নয়। একটা কথা বলে যাই বেটি। গান—বাজনার লাইনিটা ভালো নয়, মানুষ এতে সুখী হয় না।

জিজ্ঞেস করলাম, এ—কথা কেন বলছ বেনারসী মা?

বেনারসী মা বললেন, আমি নিজে সুখী হতে পারিনি বলে। তোর মতো আমিও ছোটবেলা থেকে গান ভালবাসতাম। কিন্তু সেই হল আমার কাল! যৌবনে পা দিয়ে এমন একজনকে ভালবাসলাম, যার মুখের গান আর হাতের বাজনা সাপুড়ের বাঁশির মতো আমায় বশ করে ফেলল—সে রংলাল চৌহান। গোটা দেশে এমন গুণী কমই আছে। এই রংলালের মোহে আমি ঘর ছাড়লাম। কাশীতে গিয়ে আমাদের বিয়ে হল। আমার স্বামীর না ছিল চাল, না ছিল চুলো। তবু গণেশমহল্লার একখানা ঘুপসি ঘরে স্বামী আর গান নিয়ে আনন্দেই দিন কাটতে লাগল। ক্রমে বুঝতে পারলাম, আমার গুণী স্বামীর গুণ অনেক। হেন নেশা নেই যা ও করে না, জুয়াতেও সিদ্ধহস্ত। দিন যখন আর চলে না, রংলাল তখন আমার ওপর জোর করতে লাগল মুজরো করার জন্যে। শেষ অবধি তাই হল। আমার শেষ গয়নাখানা ওর নেশা আর জুয়ায় শেষ করে একদিন ডালকামণ্ডির বাঈজিপাড়ায় গিয়ে উঠলাম। স্বামী বলে পরিচয় দিতে বাধল, তাই রংলাল হয়ে রইল বাঈজীর সারেঙ্গিওয়ালা। মেয়েমানুষের জীবনে এর চেয়ে মর্মান্তিক ব্যথা আর কি আছে বলতে পারিস? কিন্তু রেহাই পেলাম না তবু। একদিন কাশী ছেড়ে আমাদের লক্ষ্নৌয়ে পালিয়ে আসতে হল। কেন জানিস? পালিয়ে না এলে রংলাল সেখানে খুন হয়ে যেত। বাইরের যারা, তারা জানে সোহিনী বাঈয়ের কত নাম, কত টাকা, কত সুখ! কিন্তু কোন দুঃখের আগুনে সারাটা জীবন আমি পুড়ে মরেছি, সে তুই ছাড়া কাউকে জানতে দিইনি।

বেনারসী মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। মুছিয়ে দিয়ে বললাম, অমন স্বামীকে তুমি তাড়িয়ে দাওনি কেন?

ভালবাসলে কি তাড়িয়ে দেওয়া যার রে? তুই পারিস তোর ওই রেশমীকে তাড়িয়ে দিতে?—আমার কোলের পোষা কুকুরটাকে দেখিয়ে বেনারসী মা বললেন। রেশমীকে আমি বুকে চেপে ধরলাম। ভারি সুন্দর ছিল সে, ধবধবে সাদা, কেবল ঝুলে—পড়া কান দুটো বাদামি। বেনারসী মা আবার বললেন, আমার সদাই ভাবনা হয়, ভয় হয় তোর জন্যে বেটি। গানকে ভালবেসে তোর জীবনটা যেন আমার মতো বরবাদ হয়ে না যায়। একটা কথা বলে যাই শোন। গানকে ভালবাসিস, কিন্তু কোনো গাইয়ে—বাজিয়ের সঙ্গে ভালবাসা করিস নে। যা রেখে যাচ্ছি তোর জন্যে তা যথেষ্ট। একটি ভাল ঘরের ভদ্র ছেলেকে বিয়ে করে সুখী হোস। আমার কথা মনে থাকবে? বল বেটি!

বললাম, মনে থাকবে। বেনারসী মায়ের শুকনো মুখে একটু তৃপ্তির হাসি ফুটল। বললেন, মরবার আগে বড় শান্তি দিলি মা! আরেকটা কথা বলি। আমি মরলে তোর রংলাল চাচাকে তাড়িয়ে দিস নে যেন, যতদিন বাঁচবে দুটি খেতে দিস। কিন্তু আমার কসম, টাকা চাইলে কক্ষনো ওর হাতে দিবি নে।

এর মাসখানেক বাদেই বেনারসী মা মারা গেলেন। রইল রংলাল চাচা, ঝুলনিয়া আর রামু। তবু আমার জগৎটা হঠাৎ যেন ফাঁকা হয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয়, বদলে গেল রংলাল চাচাও। বেনারসী মাকে হারিয়ে সে যেন ফকির হলে গেল। নেশা করা ছেড়ে দিল, ছেড়ে দিল জুয়া খেলা। একা ঘরে বসে সারেঙ্গি নিয়ে তার দিন কাটতে লাগল। মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে তীর্থে ঘুরে আসত। সে তীর্থে গেলে বাড়িটা আরও ফাঁকা লাগত আমার। এক একদিন বেরিয়ে পড়তাম বাড়ি থেকে। এই সময় দেখা হয়ে গেল জয়প্রকাশ কাপুরের সঙ্গে আমিনাবাদ পার্কে। মাঝারি লম্বা, সবল সুপুরুষ চেহারা, তামাটে ফর্সা। ধূসর রঙের চোখের তারা দুটো সব সময় কৌতুকে ঝিকমিক করছে। কথা কইতে কইতে জোরে হেসে উঠল। সাজপোশাক ফ্যাশান—দুরন্ত। সব মিলিয়ে মেয়েদের আকর্ষণ করার পক্ষে যথেষ্ট। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল সেও হিন্দু ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিল। বড় লোকের ছেলে, পড়া ছেড়ে এখন ব্যবসা করছে। কানপুরে সিল্কের ব্যবসা। প্রথম প্রথম আমাদের দেখা হত বাইরে বাইরে। আমিনাবাদ পার্ক, চিড়িয়াখানা, শাহনজফ। কখনো বা তার হোটেলে। আমার বাড়িতে নিয়ে যেতাম না, তাকে বাঈজীমহল্লায় নিয়ে যেতে লজ্জা হত।

সুমন বললে, সোহিনী বাঈয়ের মৃত্যুর পর লক্ষ্নৌ ছেড়ে ফৈজাবাদে যাওনি কেন?

চৈতি বললে, গোল—দরওয়াজার বাড়িতে বেনারসী মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। তাছাড়া ভেবেছিলাম, বিয়ে হলে আমাকে চলেই তো যেতে হবে। জয়প্রকাশকে পেয়ে আমার নীরস দিনগুলোর মাঝে রং ধরল। ভালোবাসা নয়, ভালো লাগল তাকে। মনে মনে বিশ্বাস হল, ওর ওপর সারা জীবন নির্ভর করা যায়। একদিন বলে ফেললাম আমার পরিচয়, আমার ঠিকানা। জয়প্রকাশ জোরে হেসে উঠল। বললে, তোমার আমার মাঝখানে বাঈজীপাড়াটা কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে ভয় করছ? আমাদের পরিচয়টা কি এতই ঠুনকো?

নিশ্চিন্ত হলাম। জয়প্রকাশ গোল—দরওয়াজার বাড়িতেই আসা যাওয়া করতে লাগল। একবার সে হাজার পাঁচেক টাকা আমার কাছে থেকে ধার নিল। ব্যবসার জন্যে হঠাৎ দরকার। কিন্তু সময় মতো দিতে পারল না। বললে, ব্যবসায় কিছু লোকসান হয়েছে, পরে দিয়ে দেব। সন্দেহ করিনি। কিছুদিন বাদে আবার তার টাকার দরকার হল। দিতে চাইলাম, নিল না। বললে, কিছু মনে কোরো না চৈতি। দান দিতে পারব না,তুমি যদি আমার স্ত্রী হও, তবেই তোমার টাকার ওপর আমার অধিকার থাকবে। জয়প্রকাশের কথাটা ভালো লাগল। বললাম, তোমার বাপ—মা'র মত নাও। সে বললে, তাঁদের অমত হবে না। কিন্তু তুমি কি পারবে আমায় ভালোবেসে সব দিয়ে দিতে? বললাম, যাকে ভালোবাসতে পারব, তাকে সব দিতে পারব না? জয়প্রকাশের চোখে কৌতুকের হাসি ঝিকিমিক করে উঠল। বললে, টাকার মায়া বড় মায়া! ভালোবাসার জন্যে সবাই কি তা ছাড়তে পারে? কেমন একটা জেদ চেপে গেল। জয়প্রকাশ কি আমাকে সন্দেহ করছে? বললাম, আমি পারি। বিশ্বাস না হয় তো কালই আমার অ্যাটর্নিকে ডেকে পাঠাই। কিন্তু তোমাদের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাবে কবে? জয়প্রকাশ বললে, আমি কালই কানপুর যাচ্ছি বিয়ের ব্যবস্থা করতে। দিন সাতেক বাদে ফিরব। একুশে জুলাই সন্ধ্যা নাগাদ এসে তোমাকে নিয়ে যাব! ইতিমধ্যে দানপত্র তৈরি করে রেখো।

সাতটা দিন আমার স্বপ্ন দেখে কেটে গেল। আমার ভবিষ্যৎ জীবনের ছবি এঁকে। আমার একমাত্র দায় ছিল রংলাল চাচা, সেও আমায় ছুটি দিলে। এলাহাবাদে গিয়েছিল সে। জয়প্রকাশ চলে যাবার একদিন বাদেই পুলিশ এসে আমায় খবর দিলে, প্রয়াগের সঙ্গমে গঙ্গার পাড় ভেঙে চাচাজি ভেসে গেছে। শুধু তার কালো ভেলভেটের টুপি, কোট আর নোটবই পাড়ের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়। যাক, কোনো বাঁধনই আর রইল না।

একুশে জুলাই সকালে মনটা জয়প্রকাশের আশায় গুগগুনিয়ে উঠতে লাগল। কতক্ষণে সে আসবে! কতক্ষণে তার হাতে নিজেকে তুলে দেব! আমার কুমারীমনের সমস্ত মধু নিয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। বিকেল থেকে মেঘ করে এল। ঝোড়ো হাওয়া দিতে লাগল। সন্ধে নাগাদ শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি আর ঝড়ের দাপাদাপি। আমার সব আশায় যেন ছাই পড়ল। তবু রামুকে বললাম, নিচে সদর খুলে রাখতে। যদি বৃষ্টি ধরে যায়, যদি সে আসে। যত্ন করে সেজেছিলাম, খুলতে গিয়েও খুললাম না। কিন্তু সাতটা বাজল, আটটা বাজল, ন'টা বেজে গেল, কেউ এল না। না জয়প্রকাশ, না আর একজন।

সুমন বললে, আর একজন কে?

কালু। এক অন্ধ ভিখিরি। রোজ সন্ধে হলে আসত ভিক্ষে করতে। কিছু টাকা আর গরম কাপড় চেয়েছিল সে। আমি কানপুরে চলে যাব বলে তাকে সেদিন আসতে বলেছিলাম। কিন্তু সেও এল না। ঝুলনিয়া গিয়েছিল তার ননদের বাড়ি, ভয়ানক একা লাগছিল। মাইফিল—ঘরে এসে গ্রামোফোন মেশিনে অতুল প্রসাদের গানের রেকর্ডখানা চাপিয়ে দিলাম। 'আমিও একাকী, তুমিও একাকী, আজি এ বাদল রাতে।' শুনতে শুনতে মনে হল, আমার জীবনে এত বড় সত্যি আর নেই। বৃষ্টি তখনও পড়ছে, মাইফিল—ঘরের পর্দাগুলো দুলছে ঝোড়ো হাওয়ায়। এমন সময় জয়প্রকাশ এল। রাত তখন দশটা। সমস্ত শূন্যতা আমার এক নিমেষে ভরে গেল। বললাম, এই দুর্যোগ মাথায় নিয়ে তুমি এলে!

হেসে জয়প্রকাশ বললে, তোমার কাছে আসতে কোনো বাধাই আমি মানি না। শোনো, কালই আমরা কানপুর যাচ্ছি। বাবা—মা তোমার কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। তুমি খুশি হয়েছ তো?

একটা মিষ্টি লজ্জার আবেশে আমি চুপ করে রইলাম। জয়প্রকাশ বললে, আমার কাজ আমি করেছি, তোমার কাজ তুমি করেছ কি?

বললাম, করেছি। আমার অ্যাটর্নি এসেছিলেন, আমার এক লাখ তিরিশ হাজার টাকা আর এই বাড়িখানা তোমার নামেই লিখে দিয়েছি। বসবার ঘরের টেবিলের ড্রয়ার থেকে দানপত্রখানা বার করে এনে বললাম, শুধু সইটা করিনি—তোমার সামনে করব বলে!

জয়প্রকাশ চুপ হয়ে গেল। বললাম, তোমার কলমটা দাও।

একটা কথা বললে না জয়প্রকাশ, নীরবে কলমটা আমার হাতে দিলে। একটা কৌচের ওপর কাগজখানায় আমি সই করতে বসলাম। সইটা পুরো হয়নি, হঠাৎ আমার হাত থেকে কলমটা কেড়ে নিল সে। চেয়ে দেখি, তার হাসিমাখা মুখখানা কেমন কালো হয়ে গেছে।

অবাক হয়ে বললাম, একি!

জয়প্রকাশ দলিলখানাও তুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর বললে, না, এ আমি পারব না। শোনো চৈতি, আমি তোমাকে এতদিন মিথ্যে বলেছি। আমার ব্যবসা নেই, বাড়ি নেই, কানপুরে এক ভাই ছাড়া বাপ—মাও নেই। আমি মাতাল লম্পট, জোচ্চচুরিই আমার পেশা। কিন্তু হাজার হোক ভদ্রবংশের রক্ত গায়ে আছে তো, তাই বোধ হয় তোমার মতো নিতান্ত সরল একটা বোকা মেয়েকে ঠকাতে আমার বাধল। সেজন্যে অবশ্য তোমার ধন্যবাদ চাই না। তার বদলে শ'খানেক টাকা দাও, আমি চলি।

বললাম, দাঁড়াও!

টেবিলের ড্রয়ার থেকে টাকার বদলে যা নিয়ে এলাম, সেটা দেখে জয়প্রকাশের মুখ শুকিয়ে গেল। তবু জোর করে হেসে বললে, রিভলভার কেন? নাটক শুরু করলে নাকি?

মাথায় আমার আগুন জ্বলছিল। রিভলভারের মুখটা তার দিকে ফিরিয়ে বললাম, নাটকটা তুমিই শুরু করেছ। কিন্তু শেষটা বোধ হয় ভেবে দেখোনি। আমি সরল, আমি বোকা, তাই বলে একটা কুমারী মেয়ের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাজা কি জানো?

ভয় পেয়ে জয়প্রকাশ বললে, দোষ আমার একার নয় চৈতি। একজন আমায় মতলব দিয়েছিল; বলেছিল, তোমার সম্পত্তি বাগাতে পারলে আধাআধি বখরা।

কে সে?

নাম বলতে মানা।

মিথ্যে কথা!

বিশ্বাস করো চৈতি!

তাহলে বলো, সে কে? বলো বলছি—নইলে কুকুরের মতো গুলি করে মারব!

ছুটে পালাতে গিয়ে জয়প্রকাশ নর্তকীর মূর্তিটার কাছে থেমে গেল। ঢোক গিলে বললে, মেরো না, বলছি। তাঁর নাম—

কথা শেষ হল না। আমার রিভলভার থেকে আচমকা খানিকটা আগুন ছিটকে বেরোল। যন্ত্রণায় কাতরে উঠে জয়প্রকাশ দু—হাতে বুক চেপে ধরল, তারপর হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল জাজিমের ওপর। আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম। অসাড় হাত থেকে খসে পড়ল অস্ত্রটা। কেমন করে জানি না দপ করে নিভে গেল সব বাতি। দড়াম করে খুলে গেল একটা দরজা, ঝোড়ো হাওয়া ঘরে ঢুকে যেন হায় করে উঠল। সেই অন্ধকারে হঠাৎ আমায় পেয়ে বসল একটা ভয়। বরফের মতো ঠাণ্ডা একটা ভয়। আমি খুন করেছি! আর, ভয় পাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার অসাড় ভাবটা কেটে গেল। আমার ঘর—বাড়ি ফেলে, জয়প্রকাশের মৃতদেহ ফেলে, আমার অতীত জীবন ফেলে, সেই দুর্যোগের অন্ধকারে আমি পালিয়ে গেলাম। তখন শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল, আমি খুন করেছি! আমি খুনি!

দু'হাতে মুখ ঢেকে চৈতি পাখরের বেঞ্চের ওপর ভেঙে পড়ল। আর কপালে কয়েকটা চিন্তার রেখা নিয়ে স্থাণুর মতো বসে রইল সুমন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। চৈতির পিঠে হাত রেখে সুমন বললে, একটা কথা বলে যাই, পুলিশের কাছে তুমি বোলো না যে, তুমি খুন করেছ। এটা আমার অনুরোধ।

উঠে বসল চৈতি। বললে, এর পরেও কি তুমি আমায় বাঁচাতে চেষ্টা করবে?

করব।

কিন্তু তোমার সব চেষ্টার পরেও যদি না বাঁচি?

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল সুমন। সেই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় তার যৌবন মথিত করে হঠাৎ জেগে উঠল একটা আশ্চর্য অদম্য পিপাসা। গোলমাল হয়ে গেল মনের হিসেব। চৈতির চোখের জলে ধোয়া ফ্যাকাশে মুখখানা দু'হাতে বুকে চেপে তার কানে কানে বললে, তাহলেও তুমি আমার জীবনে বেঁচে থাকবে।

তারপর চৈতিকে ছেড়ে দিয়ে ছাদ থেকে নেমে গেল সুমন। নামতে নামতে মনে পড়ল ডক্টর কেশকারের কথা, পথটা হচ্ছে রেজার্স এজ—ক্ষুরের ফলার মতো সূক্ষ্ম! একটু অসতর্ক হলেই হয় চৈতির পতন, নয় তোমার পতন!

সেদিন অনেক ঘুরে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরল সুমন। জ্যাকসন সাহেবের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, গেল না।

লাইব্রেরি—ঘরে পা দিতেই টেলিফোন বেজে উঠল। জ্যাকসন সাহেব বললেন, হ্যালো সুমন, এলে না কেন? ব্যস্ত আছ নিশ্চয়? ডক্টর কেশকার বলছেন, আসামি চৈতি বাঈ এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। এর বাহুদুরিটা অবশ্য তোমরাই পাওনা। আমি কোর্টে কেস চালান দিচ্ছি।

পাঁচ

মি লর্ড, জয়প্রকাশ—হত্যা সম্পর্কে পুলিশ—তদন্তে যা যা জানা গেছে, সবই আপনার কাছে পেশ করেছি। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুসারে আমি আসামি চৈতি বাঈকে ফার্স্ট ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করলাম। সাক্ষীদের জবানী থেকে মামলার, সত্যাসত্য প্রমাণিত হবে। মাননীয় জুরীগণ, ঘটনার পুরো বিবরণ আপনারাও শুনলেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্যও মন দিয়ে শুনুন। তারপর, সভ্য নাগরিক হিসেবে, বিবেক—বুদ্ধি খাটিয়ে আপনারা সাব্যস্ত করুন, এই হত্যাকাণ্ডের আসামি চৈতি বাঈ প্রকৃতই দোষী কিনা। মামলার সূচনায় আপনাদের কাছে এই আমার অনুরোধ।

লক্ষ্নৌ চিফ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর বেণীপ্রসাদ শর্মা অভিবাদনের ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে, তাঁর বিশাল দেহভার চেয়ারে ন্যস্ত করলেন। ককিয়ে উঠল চেয়ারখানা। দেহের ওজন সোয়া তিনশো পাউন্ড, বর্তুলাকার নাকের নিচে সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো একজোড়া সুপুষ্ট গোঁফ, গলার আওয়াজে বাঘ ডাকে। কোর্টরুমে লোকারণ্য। কিন্তু এই আদালত—ঘরেই একধারে লোহার খাঁচার মধ্যে বসে থেকেও চৈতি বাঈ যেন জনতার থেকে বহুদূরে সরে রয়েছে। শান্ত, স্তব্ধ, নির্লিপ্ত।

এসেছে অনেকেই। জ্যাকসন সাহেব, ডক্টর কেশকার, মির্জা আতরওয়ালা, নাট্যকার রাজু, ঝুলনিয়া। গিরিজায়াও এসেছেন, জলে ঝাপসা চোখ আর দুরু দুরু বুক নিয়ে। কিন্তু আশ্চর্য, সবচেয়ে আগে যার আসবার কথা, সেই সুমন চৌধুরিকেই দেখা যাচ্ছে না!

জজ সাহেব প্রশ্ন করলেন, আসামি পক্ষের ভকিল কে? কেউ আছেন কি?

ভিড়ের মধ্যে থেকে সাড়া এল, মি লর্ড, আমি আসামিপক্ষ সমর্থন করতে চাই।

বহুজোড়া চোখ পড়ল বক্তার ওপর। অবাক হলে গেল জ্যাকসন সাহেব থেকে ঝুলনিয়া। চমকে উঠলেন গিরিজায়া। এ তো সুমন চৌধুরি নয়! বিরলকেশ খর্বকায় এ উকিল কে?

নাট্যকার রাজু উঠে এল গ্যালারির আসন থেকে। উকিলটিকে জিজ্ঞেস করলে, আপনার নাম?

বি. বি. গুলজার।

আপনাকে ব্রিফ দিল কে?

কেউ দেয়নি। আমি আসামির হিতৈষী, তাই স্বেচ্ছায় নিয়েছি।

রাজু বললে, সম্রাট মহানুভব! তারপর জজের উদ্দেশে বললে, হুজুর, মিস্টার গুলজার আসামির উকিল নন, তার ডিফেন্স কাউন্সেল অন্য।

কে তিনি?—জজ প্রশ্ন করলেন।

ব্যারিস্টার সুমন চৌধুরি।

তিনি কোর্টে হাজির আছেন কি?

রাজু শুধু এদিক—ওদিক চাইতে লাগল।

মিস্টার গুলজার বললে, মি লর্ড, ব্যারিস্টার সুমন চৌধুরি যখন কোর্টে হাজির নেই, তখন বোঝা যাচ্ছে তিনি এই কেস নিতে ইচ্ছুক নন। সুতরাং আমাকে এই কেস ডিফেন্ড করতে দেওয়া হোক।

দর্শকের আসন থেকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন গিরিজায়া। একেবারে এজলাসের সামনে। বললেন, হুজুর, আমি আসামির মা। আমার মেয়ের মামলা সুমন চৌধুরির হাতেই তুলে দিয়েছি, আর কারো হাতে দিতে চাই নে হুজুর।

মিস্টার গুলজার অত্যন্ত অন্তরঙ্গের মতো গিরিজায়াকে বললে, ঘাড়বাচ্ছেন কেন? আমায় কেস দিলে আপনার পয়সাকড়ি লাগবে না—আমি সোহিনী বাঈয়ের উকিল ছিলাম। নির্ঘাৎ খালাস করে দেব আপনার মেয়েকে।

গিরিজায়া দুমনা হয়ে ভাবতে লাগলেন।

আদালত—ঘরে গুনগুন ধ্বনি উঠল। জজ একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, কোথায় ব্যারিস্টার চৌধুরি? তিনি কি আসবেন?

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার কাছ থেকে শোনা গেল, মি লর্ড!

সমস্ত আদালত তাকাল সেদিকে। দেখা গেল, ভিড় ঠেলে সুমনের কালো গাউন—পরা চেহারা এগিয়ে আসছে। কপালের একটা জায়গা প্লাস্টার করা। এগিয়ে এসে সুমন বললে, আমার অনিচ্ছাকৃত দেরির জন্যে আদালতের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। কোর্টে আসবার পথে একখানা ভাড়াটে মোটরের সঙ্গে আমার গাড়ির ধাক্কা লাগে, তারই ফলে এই দেরি।

গিরিজায়া কেঁদে ফেললেন। চৈতির উদাস দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠল। আর রাজু ফিরে দেখে, মিস্টার গুলজার যেন যাদুমন্ত্রে হাওয়া হয়ে গেছে! লোকটার সবই গুল নাকি? ব্যাপারটা সুমনকে জানাতে হবে।

জজ সাক্ষী তবল করলেন।

পয়লা সাক্ষী ইন্সপেক্টর তিওয়ারি। সে শপথ নেওয়ার পর পি.পি. উঠলেন জেরা করতে।

ইন্সপেক্টর তিওয়ারি, একুশে জুলাই রাত্রে আপনি কি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন?

গিয়েছিলাম।

গিয়ে কি দেখলেন?

দেখলাম, জয়প্রকাশ কাপুরের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। আর তার পাশে একটা রিভলভার।

আপনার কি ধারণা হয়েছিল, ওই রিভলবার দিয়েই খুন করা হয়েছিল?

হ্যাঁ।

কেন এ ধারণা হয়েছিল?

রিভলভারের নলটা তখনো সামান্য গরম ছিল।

হৃষ্ট হয়ে উঠলেন পুষ্ট পি. পি.। জজের দিকে ফিরে বললেন, মি লর্ড, ইন্সপেক্টরের শেষ কথাটার বিশেষ গুরুত্ব আছে বলে মনে করি। রিভলভারের নল গরম হলে সন্দেহ থাকে না যে সদ্য সদ্য গুলি ছোড়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে যে রিভলভার পাওয়া গেছে, তারও নল গরম ছিল। এবং তার বাঁটে ও ট্রিগারে যার আঙুলের সুস্পষ্ট ছাপ পাওয়া গেছে, সে আর কেউ নয়—আসামি চৈতি বাঈ। আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই ইন্সপেক্টর।

জজ বললেন, মিস্টার চৌধুরি, আপনি এবার সাক্ষীকে জেরা করতে পারেন।

উঠল সুমন। একটা পেন্সিল দিয়ে নিজের চিবুকে মৃদু মৃদু আঘাত করতে করতে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসল, ইন্সপেক্টর তিওয়ারী, আপনি চা খান?

খাই।

এক কাপ গরম চা ঠাণ্ডা হতে কতক্ষণ সময় লাগে বলে মনে হয়?

মিনিট দশেক বড়জোর।

আচ্ছা, একুশে জুলাই রাতে ক'টার সময় থানায় টেলিফোন পেয়েছিলেন?

দশটা বেজে কুড়ি মিনিট।

গোল—দরওয়াজায় আসামির বাড়িতে আপনি হাজির হয়েছিলেন কতক্ষণে?

পৌনে এগারোটায়।

অর্থাৎ, টেলিফোন পাওয়ার পঁচিশ মিনিট বাদে! তাই না?

তাই।

তাহলে—এক কাপ গরম চা ঠাণ্ডা হতে যদি বড়জোর দশ মিনিট সময় লাগে, গুলি করার পঁচিশ মিনিট বাদেও রিভলভারের নল গরম থাকতে পারে কি? বিশেষ করে ঝড়—বৃষ্টির রাতে?

ঘাবড়ে গেল ইন্সপেক্টর তিওয়ারি। জবাব দিতে পারল না। গম্ভীর গলায় জোর দিয়ে সুমন বললে, ইন্সপেক্টর তিওয়ারি, ঠিক করে বলুন, রিভলভারের নল গরম না ঠাণ্ডা ছিল? বলুন!

মনে নেই।

আদালত—ঘরে গুঞ্জন উঠল সুমনের জেরায় কায়দায়। আর অসন্তাোষে ফুলে উঠল সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো শর্মাজীর গোঁফ জোড়া!

ধন্যবাদ ইন্সপেক্টর, আপনি যেতে পারেন।

এজলাসের দিকে ফিরে সুমন শান্ত গলায় বললে, আমি শুধু একটা কথাই বলতে চাই মি লর্ড। ইন্সপেক্টর যখন সঠিক বলতে পারলেন না রিভলভারের নল গরম ছিল কিনা, তখন আসামির রিভলভার থেকেই ফায়ার করা হয়েছিল, এটা প্রমাণ হয় কি?

দর্শকের আসনে বসে নাট্যকার রাজু বলে উঠল, শাবাশ! ফার্স্টঅ্যাক্ট ফার্স্ট সিনেই জমিয়ে দিলে সুমন! কি বলেন?

উৎসাহে পাশের লোকটিকে ঠেলা দিল রাজু। একমুখ দাড়ি—গোঁফওয়ালা, গলায় কম্ফর্টার—জড়ানো পাশের বুড়ো লোকটি নাকের ডগায় চশমা লাগিয়ে এতক্ষণ চেয়েছিল সুমনের দিকে। মাথা নেড়ে বললে, কি বলছ হে! এ তো থিয়েটার নয়, এ যে আদালত।

ওই একই কথা। আদালতের চেয়ে বড় থিয়েটার আছে নাকি?

তা যা বলেছ!—ফোকলা দাঁতে হাসলে বুড়ো। বললে, ছোকরার জেরার কায়দাটা ভালো। তবে শেষ অবধি জিততে পারবে কি?

রাজু বললে, যদি পারে, তবে খুনের মামলায় ওর জোড়া থাকবে না। আগে ওকে কেস দিয়ে খুনিরা নিশ্চিন্তে খুন করতে যাবে।

ঢং করে ঘড়ি বাজাল। পরদিনের জন্যে শুনানী মুলতুবী রেখে জজসাহেব উঠে গেলেন:

তোমার নাম?

রামভরোসা। লোকে রামু বলে। আমার নানী আমার নাম রেখেছিল হুজুর। বলতো,রামজীই তোর ভরোসা!

থামো!—ধমক দিয়ে শর্মাজী বললেন, আসামিকে তুমি চেনো?

তা আর চিনব না! আমি বাঈয়ের পুরোনো নোকর।

কতদিন কাজ করেছ?

একটা হাই তুলে সাক্ষী রামু বললে, তা হুজুর ধরুন, আমার নানীকে গঙ্গায় দিয়েছি তিন সাল হল। তারও দু' সাল আগে আমার তিসরি শাদি হয়েছিল। তারও এক মাস আগে—

রামুর গলার আওয়াজ ক্রমশ মিইয়ে গিয়ে অন্য একটা আওয়াজ শোনা যেতে লাগলো, ঘোঁ—ঘরর—ঘোঁ—ঘরর—

শর্মাজীর গলায় বাঘ ডেকে উঠল, এই, ঘুমোচ্ছ কেন?

ধড়ফড় করে জেগে উঠল রামু। বললে, ঘুমুইনি, মনে মনে সাল হিসেব করছিলাম।

ঘটনার রাতে তুমি কোথায় ছিলে?

মনিবের বাড়িতে। ঝড়—জলের রাত ছিল, তাই সকাল সকাল খেয়েদেয়ে শুয়েছিলাম। আমার হুজুর বার—টান নেই। আমার নানী বলত—

আবার নানী! তারপর বলো।

তারপর হুজুর একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। (আরেকটা হাই তুলল রামু) হঠাৎ ঘুমের ঘোরে—

রামুর নাক দিয়ে আবার সেই বিচিত্র আওয়াজ শুরু হল, ঘোঁ—ঘরর—ঘোঁ—ঘরর—

রাগে শর্মাজীর গোঁফের সেকেন্ড ব্র্যাকেট ফুলে উঠল। গর্জন করে উঠলেন, এই, কি হচ্ছে?

চোখ কচলে রামু বললে, ভাবছি হুজুর।

বলো, তারপর কি হল।

হঠাৎ দুম করে একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি ওপরে গিয়ে দেখি হুজুর, মাইফিল—ঘরে জয়প্রকাশ কাপুর রক্ত মেখে পড়ে আছে। আর ছোটি বাঈ পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে।

তুমি ঠিক দেখেছিলে আসামি পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে?

রামুর নজর ভুল হয় না হুজুর। নিজের চোখে দেখেছি।

মোহনবাগানকে গোল দিলে ইস্টবেঙ্গলের মুখের চেহারা যেরকম হয়, শর্মাজীর মুখখানা তেমনি হল। সোয়া তিনশো পাউন্ড ওজনের দেহ দুলিয়ে জজের সামনে গিয়ে বললেন, সাক্ষীকে আমি আর প্রশ্ন করতে চাই না মি লর্ড। সে স্বচক্ষে আসামিকে রিভলভার হাতে মৃত জয়প্রকাশের পাশে দেখেছে, আসামিকে খুনি প্রমাণ করার পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট।

জজসাহেব সুমনকে বললেন জেরা করতে। সাক্ষীর কাঠগড়ার সামনে এগিয়ে গেল সুমন। বললে আচ্ছা রামু, তুমি তো বড় বাঈয়ের সঙ্গে বেনারসেও অনেকদিন ছিলে?

জী হুজুর।

বেনারসের ভাঙের সরবত খুব বঢ়িয়াঁ। তুমি খেতে না?

অবজেকশন!—হাঁসফাঁস করে পি.পি. বলে উঠলেন, এ প্রশ্ন অবান্তর।

সুমন শান্ত স্বরে বললে, সেটা আদালতের না আমার বিজ্ঞ বন্ধুর বিচার্য, আমি জানতে চাই মি লর্ড।

জজসাহেব বললেন, অবজেকশন ওভাররুলড। আপনি সাক্ষীকে জেরা করুন মিস্টার চৌধুরি।

সুমন আবার প্রশ্ন করলে, তুমি খেতে না রামু?

ঝুট বলব না হুজুর, খেতাম বইকি। আমার নানী বলত, বারো সাল ভাঙ খেলে মহাদেবের কিরপা মিলে যায়।

ঠিক, ঠিক! তা তুমি এখনো খাও তো?

কি করব হুজুর, অভ্যেস হয়ে গেছে! নইলে ভালো খিদে হয় না, ঘুম হয় না।

হাত আড়াল দিয়ে একটা হাই তুললে রামু।

বেশ, বেশ! ও তো সরাবের নেশা নয়, ওতে দোষ কি? সেদিন রাতেও খেয়েছিলে?

অল্পস্বল্প খেয়েছিলাম। ঠাণ্ডার রাত ছিল, তাই—

কথা বন্ধ হয়ে গেল রামুর। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুরু করে দিলে নাকের কনসার্ট, ঘোঁ,—ঘরর—ঘোঁ—ঘরর—

সুমনের জলতেষ্টা পেয়ে গেল বোধ হয়। টেবিলের কাছে সরে এসে জলভরা কাচের গেলাসটা তুলে নিয়ে আচমকা ছেড়ে দিলে। ঝনঝন শব্দে টুকরো হয়ে গেল গেলাসটা। চকিতে ফিরে তাকাল সে রামুর দিকে, রামু তখনো স্বপ্নলোকে বিচরণ করছে।

মৃদ হাসি ফুটে উঠল সুমনের মুখে। জজের দিকে ফিরে বললে, মি লর্ড, আদালতকে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। এত কাছে থেকে গেলাস ভাঙার শব্দে যার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না, একুশে জুলাই সেই ঝড়—বৃষ্টির রাতে রিভলভারের আওয়াজে তার ভাঙের নেশায় ঘুম ভেঙে যাওয়া কি সম্ভব? আমার বিজ্ঞ বন্ধু শর্মাজী কি বলেন?

সুমন নিজের চেয়ারে এসে বসল। চাপা উল্লাসের ধ্বনিতে গম—গম করে উঠল আদালত—ঘর। আর রাগে শর্মাজীর সেকেন্ড ব্র্যাকেট ফুলে উঠল। তাঁর মুখের চেহারা এখন মোহনবাগানের গোল খেলে ইস্টবেঙ্গলের মুখভাব যেমন হয়, তেমনি।

দর্শকের আসনে বসে রাজু বলে উঠল, কেয়াবাৎ ব্যারিস্টার। কি বলুন?

পাশের কম্ফর্টার জড়ানো বুড়ো মাথা নেড়ে স্বীকার করলে, হ্যাঁ, ছোকরার মাথা আছে। তবে শেষ রক্ষে করতে পারলে হয়।

আলবৎ পারবে। আপনার কি মনে হয়?

কিছুই বলা যায় না ভাইয়া। নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে বললে, এই বুড়ো লালজী দুনিয়ার অনেক দেখেছে, অনেক শুনেছে। তীরে এসেও তরী ডোবে!

ফোকলা দাঁতে হাসতে লাগল বুড়ো।

তৃতীয় সাক্ষী লব হল, লায়লী বানু হাজির!

সাক্ষীর কাঠগড়ায় ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল একটি যুবতী মেয়ে! পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, মাথায় কালো দোপাট্টা। মুখে করুণ বিষাদ, চোখ দুটি ফোলা ফোলা। তবু ঠোঁটে শুকনো রঙের দাগ, চোখের কোলে সুর্মার সূক্ষ্ন টান লক্ষ করলে সুমন।

সোয়া তিনশো পাউন্ড চর্বির তাল নিয়ে শর্মাজী জেরা করতে উঠলেন। বাঘের মতো আওয়াজ যথাসাধ্য মোলায়েম করে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি করো?

আমি প্রাইভেট নার্স।

নিহত জয়প্রকাশ কাপুরকে তুমি চিনতে?

চিনতাম।

কতদিনের আলাপ?

তিন বছরেরও বেশি।

সে তোমার কে ছিল?

মুখ নিচু করে লায়লী যেন চোখের জল সামলে নিলে। তারপর বললে, আমার ভাবী স্বামী। আমরা পরস্পরকে ভালোবাসতাম।

কোমাদের কি বিয়ের কথা হয়েছিল?

হয়েছিল। এই এনগেজমেন্ট রিং জয়প্রকাশেরই দেওয়া।

লায়লী তার ডান হাত প্রসারিত করলে। অনামিকায় সবুজ পাথর বসানো একটি আংটি। ধরা গলায় বললে, এই জয়প্রকাশের শেষ স্মৃতি!

জয়প্রকাশের সঙ্গে তোমার শেষ দেখা হয় কবে?

একুশে জুলাই সকালে। আমাকে বলে গিয়েছিল, গোল—দরওয়াজায় চৈতি বাঈয়ের বাড়িতে একটু কাজ সেরে রাত আটটায় এসে আমার সঙ্গে খাবে। আর আসেনি!

জয়প্রকাশের খুন সম্পর্কে তুমি কি কিছু জানো?

শুধু জানি না, নিজের চোখেই দেখেছি।

কি দেখেছ?

বলছি—সেদিন রাতে খুব ঝড়—বৃষ্টি হচ্ছিল। আটটা বাজল ন'টা বাজল, জয়প্রকাশ খেতে এল না। আমার মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল। একটা গাড়ি ডাকিয়ে দশটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম জয়প্রকাশকে খুঁজতে। খুঁজে খুঁজে গোল—দরওয়াজায় চৈতি বাঈয়ের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম।

রাত তখন কত?

দশটা হবে।

সেখানে গিয়ে কি দেখলে?

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ঝগড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। দোতলার বারান্দায় গিয়ে দেখি, একটা হলঘরে জয়প্রকাশের সামনে চৈতি বাঈ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে পিস্তল। চৈতি শাসাচ্ছিল, আমাকেই বিয়ে করতে তুমি বাধ্য! জয়প্রকাশ বলছিল, তা হয় না, লায়লীকে আমি কথা দিয়েছি।—ঘরে ঢুকব কি ঢুকব না ভাবছি, এমন সময় ওই ডাইনি—(দুই চোখে তীব্র আক্রোশ নিয়ে লায়লী আসামির দিকে আঙুল দেখালে) ওই পিশাচী দুম করে গুলি করলে, আর জয়প্রকাশ বুকে চেপে—

কান্নার আবেগে লায়লীর গলা বুজে এল। কাঠগড়ার রেলিঙের ওপর ভেঙে পড়ল সে।

শর্মাজী বললেন, পুয়োর চাইল্ড! আমার আর একটি প্রশ্ন আছে তোমার কাছে। তারপর তুমি কি করলে?

অশ্রুভেজা মুখ তুলে লায়লী বললে, পুলিশে খবর দেব বলে ছুটে নেমে এসে গাড়িতে বসলাম—কিন্তু মাথা ঘুরছিল, পারলাম না।

এজলাসের দিকে ফিরে পি.পি. তাঁর গলায় সাক্ষীর চেয়েও বেশি আবেগ ঢেলে বললেন, মি লর্ড! জেন্টলমেন আফ দি জুরি! আমি বেশি কথা বলতে চাই না, সাক্ষীর কাঠগড়ায় যে অভাগিনী মেয়েটি আপনাদের সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখের দিকে তাকাতে অনুরোধ করছি শুধু। ওর চোখের জলই বলে দিচ্ছে, আসামির অপরাধ কতখানি সত্য!

শর্মাজীর বিপুল মেদভারে চেয়ারখানা আর্তনাদ করে উঠল।

জজসাহেব এবার ডিফেন্স কাউন্সেলকে জেরা করতে ডাকলেন।

সমস্ত আদালত উৎসুক হয়ে উঠল। কিন্তু আশ্চর্য, সুমন দাঁড়িয়ে উঠে বললে, আমার কোনো প্রশ্ন নেই।

চোখ মুছতে মুছতে লায়লী কাঠগড়া থেকে নেমে গেল।

শুনানী মুলতুবী রইল সেদিনের মতো।

গ্যালারির কস্ফর্টার জড়ানো লালাজী বললেন, ব্যাপার কি ভায়া। ব্যারিস্টারের জেরার ভাঁড়ার খালি হয়ে গেল নাকি?

রাজু জবাব দিলে না। তাড়াতাড়ি সুমনের কাছে গিয়ে বললে, লায়লী বানুকে আমি চিনি ইয়ার। আমার থিয়েটারে কিছুদিন কাজ করেছিল। ও আবার নার্স হল কবে?

সুমন বললে, ঠিকানা জানিস?

পুরোনো মাইনের খাতায় আছে।

ঠিকানাটা আজই চাই।

প্রিন্স এসেছে দেখা করতে। রাজু বললে।

প্রিন্স! লায়লি অবাক হল।

আজবগড়ের রাজকুমার। আমরা প্রিন্স বলেই ডাকি। থিয়েটারের ভারি শখ, মনের মতো একটি হিরোইন পেলেই থিয়েটার খুলে ফেলবে।

সত্যি! লায়লীর মুখে—চোখে আগ্রহ।

রাজু বললে, তাই তো ওকে নিয়ে এলাম। কাপ্তেন লোক তোমারও একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে লায়লী।

কোথায় তিনি?

নিচে মোটরে।

সেকি! যাও যাও নিয়ে এসো।

আরশির সামনে দাঁড়িয়ে লায়লী চট করে পাউটার—পাফটা বুলিয়ে নিলে। মাথার চুল আর একটু ফাঁপিয়ে দিলে। রঙীন ঠোঁট দু'খানা ভিজিয়ে নিলে জিভ দিয়ে।

নিচের থেকে প্রিন্সকে নিয়ে এল রাজু। দীর্ঘকায় সুদর্শন চেহারা, লম্বা কালো শেরোয়ানি আর কাশ্মীরি টুপিতে মানিয়েছে চমৎকার। মুখে সরু পাকানো গোঁফ, চোখে কালো চশমা।

রাজুকে বলতে হল না, লীলায়িত ভঙ্গিতে নিজেই অভ্যর্থনা করলে লায়লী, আসুন, আসুন! আমার গরিবখানায় আপনার মতো মেহমানের পায়ের ধুলো পড়বে, সে আমার সৌভাগ্য! বলুন, কি দিয়ে খাতির করব?

একটা কৌচে বসতে বসতে প্রিন্স একটু হেসে বললে, দুটো মিষ্টি কথা দিয়ে।

তাহলে যাই, মধু খুঁজে আনিগে।

ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে প্রিন্স বললে, ফুল আবার মধু খুঁজতে যাবে কোথায়? সে তো তার বুকেই আছে।

বাঁকা চোখে বিদ্যুৎ নিয়ে লায়লী জবাব দিলে, আপনি জানলেন কি করে? ও খবর তো ভ্রমর ছাড়া কেউ জানে না।

সিগারেটে একটা টান দিয়ে রাজু বলে উঠল, সুভানাল্লা! কবির লড়াই জমেছে ভাল। কিন্তু এখন থিয়েটারের কথা হলে আরো ভাল হত না?

প্রিন্স বললে, মিস লায়লী যদি হিরোইন হয়, আমি থিয়েটারের জন্যে টাকা দিতে রাজি। কিন্তু—

কিন্তু কি? রাজু বললে—।

মিস লায়লী তো শুনেছি, নার্স, সে কাজ ছেড়ে থিয়েটারে—

লায়লী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, কে বললে আমি নার্স? দরকার পড়লে যেখানে যেমন সেখানে তেমন পরিচয় দিতে হয়।

গুলাবি আতরমাখা রেশমি রুমালে মুখ মুছে প্রিন্স বললে, বেশ, তাহলে দু'—একদিনের ভেতরেই আগাম টাকা দিয়ে এগ্রিমেন্ট করে নাও রাজু। এই কথাই রইল, আমি এখন উঠি—

প্রিন্স উঠতে যাচ্ছিল, রাজু লায়লীকে চোখ টিপে ইশারা করলে। খপ করে প্রিন্সের হাতখানা ধরে ফেলে সে মোহিনী হাসি হেসে বললে, বসুন না, এত তাড়া কেন?

লায়লীর হাতের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স বললে, বাঃ, চমৎকার তোমার আংটি। কে দিয়েছে? কোনো ভ্রমর বুঝি?

লায়লি বললে, কে আবার দেবে! নিজেই শখ করে কিনেছি।

আমারও সবুজ পাথরের আংটির খুব শখ।

তাই নাকি! নিজের আঙুল থেকে খুলে লায়লী প্রিন্সের কনিষ্ঠায় পরিয়ে দিলে। বললে, লায়লীকে ভুলবেন না।

প্রিন্স বললে, কিছু নিলে, কিছু দিতে হয়। আমার আংটিটা তুমি নেবে?

প্রিন্সের হাতেও টকটকে লাল পাথর বসানো একটা সুন্দর আংটি। চুনি নাকি? লোভে চকচক করে উঠল লায়লীর চোখ। আংটিটা তার আঙুলে পরিয়ে দিয়ে প্রিন্স বললে, তোমার বুকে যদি জায়গা না পাই, তোমার হাতেই থাকি—

রাজু একগাল হেসে বললে, হাতে রাখাই তো লায়লীদের কাজ।

প্রিন্স উঠে পড়ল।

দরজা অবধি এগিয়ে দিলে লায়লী বললে, আবার দেখা হবে তো?

প্রিন্স একটু হেসে বললে, দেখা আবার হবে বইকি!

গলাটা উদাস করে লায়লী বললে, আশায় আশায় থেকে ফুল যেন শুকিয়ে না যায়!

চলে যেতে যেতে রাজু বললে, জল ছিটিয়ে রেখো।

ছয়

ভাগ্নেটা বায়না ধরেছে, কুকুরছানা চাই। পুতুল নয়, জ্যান্ত। নেড়ি নয়, ঝাঁকড়া লোমওয়ালা খাস বিলেতি। কিন্তু চাই বললেই তো চলে না, কলকাতার মতো লক্ষ্নৌ শহরে তো টেরিটি বাজার নেই যে গেলাম আর কিনে আনলাম। ছ' বছরের বাচ্চচা সেকথা মানতে চায় না। সাতদিন ধরে সমানে ধরেছে, কুকুরছানা তার চাই—ই চাই। আজ না পেলে সে চান করবে না, খাবে না, দুপুরবেলা ঘুমুবে না। রামবিচ্ছু ছেলেটা! রাজু আবার ওই ভাগ্নেটাকেই প্যার করে বেশি। তাই কাজকর্ম ফেলে সক্কাল বেলাতেই রাজু বেরিয়েছে কুকুরছানা ঢুঁড়তে।

ঘুরেছে অনেক জায়গায়। আরিয়ানগর থেকে মকবুলগঞ্জ, হজরতগঞ্জ থেকে গণেশগঞ্জ, এ—পাড়া থেকে ও—পাড়া। আত্মীয়—স্বজন, বন্ধু—বান্ধব, জানা—চেনা কাউকে বাদ দেয়নি জিজ্ঞেস করতে—কুকুরছানা আছে? চিড়িয়াখানা অবধি গিয়েছিল, যদি মিলে যায়।

ঘুরতে ঘুরতে চকের ভেতর দিয়ে শর্টকাট করছিল রাজু। জ্যান্ত যখন পাওয়া গেল না, তখন পেট—টেপা একটা খেলনা কুকুরই কেনা যাক। লাফালাফি না করুক, ডাকবে তো!

তামাকওয়ালা নাথথু ডাকলে, রাম রাম রাজুবাবু! এদিকে কি মনে করে? তামাক লিবেন নাকি? মিঠেকড়া বঢ়িয়াঁ চিজ!

রাজু বললে, কুকুরছানা আছে?

ঘাবড়ে গেল নাথথু। বললে, কুকুরছানা!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, মাথা খারাপ হয়ে গেল আমার কুকুর কুকুর করে! ভালো জাতের চাই, কিছু টাকাও দিতে পারি। আছে নাকি সন্ধানে?

ঘাড় নেড়ে নাথথু বললে, না বাবু, কুকুরে তো তামাক খায় না, কেমন করে সন্ধান দেব বলুন?

কুকুর নেবেন নাকি হুজুর?

অচেনা গলার আওয়াজে রাজু তাকিয়ে দেখে, লোকটা চেনা। এ সেই ঘুমকাতুরে রামভরোসা, ওরফে রামু। চৈতি বাঈয়ের চাকর ছিল। তামাকের দোকানের পাশে গাঁজা আফিম সিদ্ধির দোকান। সেখান থেকে এগিয়ে আসছে রাজুর দিকে। রামু বললে,কুকুর চাই? আমি দিতে পারি, আমার কাছে আছে।

আছে! রাজু যেন হাত বাড়িয়ে স্বর্গ পেল। বললে, কুকুর তো নয়, আমার বাপের ঠাকুর! কোথায় আছে?

আমার ডেরায়! এই নজদিকে।

নেড়ি নয় তো?

কি বলছেন হুজুর? একদম সাহেবের বাচ্চচা! ধবধবে সাদা, লটপটে কান দুটো বাদামি। দাম কিন্তু বেশি পড়বে।

কত?

বিশ রুপেয়া।

রাজু বুঝলে, রামুর দাঁও মারবার ফিকির। কিন্তু উপায় নেই, রামবিচ্ছু ভাগ্নে ব্যাটা আচ্ছা প্যাঁচে ফেলেছে। রাজু বললে, তাই সই। ইস, বেলা হয়ে গেল! জলদি চলো তোমার ডেরায়, আমার আবার কোর্ট আছে।

সুমন বললে, মি লর্ড, গত দিনের সাক্ষী মিস লায়লী বানুর সাক্ষ্য আমি আর একবার নিতে চাই! আদালতের কাছে আমি অনুমতি চাইছি।

পি. পি. গোঁফ ফুলিয়ে বলে উঠলেন, তার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সাক্ষ্য যা দেবার মিস লায়লী সেদিন দিয়েই গেছে, নতুন করে তার ব্যথার স্থানে ঘা দেওয়াটা নিছক নৃশংসতা!

মৃদু হেসে সুমন বললে, আমার বিজ্ঞ বন্ধু শর্মাজীর হৃদয় খুবই আবেগপ্রবণ বুঝতে পারছি। কিন্তু আইনের বিচার চলে হৃদয়াবেগের পথে নয়, সত্যের পথ ধরে।

জজ বললেন, আদালত অনুমতি দিচ্ছে।

শমন পেয়ে লায়লী কোর্টে হাজির ছিল। দ্বিতীয়বার সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠল। মুখে তেমনি করুণ বিষাদ, চোখ ছলছল।

হাতের পেন্সিলটা চিবুকে মৃদু মৃদু আঘাত করতে করতে সুমন এগিয়ে গেল কাছে। বললে, মিস লায়লী, আপনাকে বেশি কষ্ট আমি দেব না। একটাই প্রশ্ন শুধু করব। নিহত জয়প্রকাশকে আপনি সত্যিই চিনতেন?

নিশ্চয়।

কিন্তু আমার মনে হয়, আপনি তাকে চিনতেন না—জীবনে কখনো দেখেন নি।

একটু চাপা রাগ লায়লীর চোখে ঝিলিক দিয়ে গেল। বললে, আপনি কি বলতে চান আদালতে দাঁড়িয়ে আমি মিথ্যে বলেছি?

আমার বিশ্বাস তাই। জয়প্রকাশের সঙ্গে আপনার কখনো আলাপও হয়নি, বিয়ের কথাও হয়নি।

উত্তপ্ত গলায় লায়লী বলে উঠল, একথা মিথ্যে! বিয়ের কথা নিশ্চয় হয়েছিল।

প্রমাণ কি?

জয়প্রকাশের দেওয়া এই এনন্টগজমেন্ট রিং এখনো আমার হাতে রয়েছে। আর আপনি বলছেন—

কেঁদে ফেললে লায়লী।

ব্যাঘ্র—গর্জনে পি.পি. বলে উঠলেন, অবজেকশন! সাক্ষীর ওপর এই জুলুম শুধু নিয়মবিরুদ্ধ নয়, ভদ্রতাবিরুদ্ধ!

শান্ত গলায় সুমন বললে, আমার বিজ্ঞ বন্ধু সহজেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন দেখছি! এটা ভালো লক্ষণ নয়। আমি তাঁকে তাঁর ব্লাডপ্রেসার মাপতে পরামর্শ দিচ্ছি।

আদালত—ঘরে একটা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।

জজসাহেব হাতুড়ি ঠুকলেন : অর্ডার! অর্ডার! জেরা চালিয়ে যান মিস্টার চৌধুরি।

এই সময় ব্যস্তসমস্ত হয়ে কোর্ট রুমে ঢুকে পড়ল নাট্যকার রাজু। বগলদাবায় সদ্যকেনা কুকুরছানা। ভাগ্নেকে দিয়ে আসার সময় হয়নি। ভাগ্যে কেউ লক্ষ করেনি, তাই। ঠেলেঠুলে লালজীর পাশে বসে পড়তেই কুকুরটা ছটফটিয়ে রাজুর কোল থেকে লালাজীর কোলে গিয়ে লেজ নাড়তে শুরু করে দিলে।

চশমার ফাঁকে তাকিয়ে লালাজী বললে, এ আপদ কোত্থেকে জোটালে ভাইয়া?

কুকুরটাকে ফের নিজের কোলে বসিয়ে রাজু বললে, কিনলাম।

কুকুর নিয়ে আদালতে ঢোকা বেআইনি কাজ। বাইরে রেখে এসো।

শখের কুকুর, বাইরে কোথায় রাখব?

সুমন বলছে, মিস লায়লী, আপনাকে ব্যথা দেওয়ার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু কি করব, কর্তব্য বড় কঠোর। আপনার এনগেজমেন্ট রিংটা একবার দেখতে পারি কি?

লাল পাথর বসানো আংটিটা খুলে দিলে লায়লী। সেটা দেখতে দেখতে সুমন বললে, ভারি ডিসেন্ট! এই আংটিটাই জয়প্রকাশ আপনাকে উপহার দিয়েছিল?

স্পষ্ট গলায় উত্তর এল, হ্যাঁ।

এটা তাহলে কে দিয়েছিল? পকেট থেকে আরেকটা আংটি বার করে দেখালে সুমন। সবুজ পাথর বসানো সেই আংটিটা।

শুকিয়ে গেল লায়রি মুখ। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল।

সুমন বললে, কে দিয়েছিল এটা?

ঢোঁক গিলে লায়লী বললে, মনে নেই।

ঠোঁটের কোণে একটু ধারালো হাসি নিয়ে সুমন বললে, আমার কিন্তু মনে আছে। গতদিন এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি বলেছিলেন, এই সবুজ আংটিটাই জয়প্রকাশ দিয়েছিল। আজ বলছেন, এই লাল আংটি। কোনটা সত্যি?

লায়লীর ঠোঁট কাঁপছে।

সুমনের মুখ গম্ভীর আর গলা প্রখর হয়ে উঠল, কোনোটাই জয়প্রকাশের দেওয়া নয়। এই লাল আংটি আজবগড়ের প্রিন্সের দেওয়া উপহার। কেমন, তাই নয়? বলো—জবাব দাও মিস লায়লী! কবুল করো তুমি নার্স নাও, থিয়েটারের সাধারণ অভিনেত্রী—তোমার সাক্ষ্য নকল, বিয়ের আংটি নকল, তোমার কান্নাও নকল!

আর পারলে না লায়লী। কাঁপা গলায় কোনোমতে বললে, আ—আমি কবুক করছি—আমায় যেতে দিন।

চোখে রুমাল চেপে ফুঁপিয়ে উঠল লায়লী, তার এবারের কান্নাটা নকল নয়।

শর্মাজীর দিকে একবার কটাক্ষ করে সুমন জজকে বললে, মি লর্ড, সাক্ষীর স্বীকারোক্তির পর আমার মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

শর্মাজী যেন পর পর তিনখানা গোল খেয়েছেন।

আদালত—ঘরের নিরেট স্তব্ধতা চৌচির হয়ে গেল এক নিমেষে। দর্শকদের হর্ষধ্বনিতে ভরে উঠল ঘর। রাজু প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, কেয়াবাৎ ব্যারিস্টার! তুহারি কাম!

আর, বলতে গিয়ে খেয়াল হল কুকুরটা তার কোলে নেই, আবার লালাজীর কোলে বসে তার হাত চাটছে। বিরক্ত হয়ে লালজী বললে, ভালো জ্বালায় পড়লাম! শান্তিতে মামলা শোনবার জ্যো নেই!

হাত বাড়িয়ে কুকুরটাকে টেনে নিয়ে রাজু হেসে বললে, আর শুনবেন কি? মামলা তো জিতে নিলে সুমন চৌধুরি।

এরই মধ্যে! এখনো হয়তো আরও সাক্ষী আছে, ভকিলদের সওয়াল—জবাব আছে, জুরিদের রায় আছে। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় দেখো।

জজসাহেব বললেন, সরকারপক্ষের আর কোনো সাক্ষী আছে?

পি. পি. বললেন, না।

আসামীপক্ষের?

নেই। সুমন জবাব দিলে।

এজলাস ছেড়ে জজ উঠে গেলেন। জ্যাকসন সাহেব সুমনের পিঠ চাপড়ে বললেন, ভারি ইন্টারেস্টিং তোমার জেরা। কিন্তু ইয়ংম্যান, খুনের রহস্য যদি ভেদ করতে পারো, তবেই বুঝব তোমার বাহাদুরি!

কোর্টরুমের বাইরে এসে সুমন বললে, একি! বগলে কুকুর কেন তোর?

রাজু বললে, আর বলিস কেন ইয়ার! ভাগ্নেটার জন্যে কিনতে হল।

ভালো জাতের মনে হচ্ছে। কোত্থেকে কিনলি?

রামুর কাছ থেকে।

রামু!

ভাংখোর রামু। চৈতি বাঈয়ের চাকর ছিল যে।

বটে!—অবাক হল সুমন। কুকুরটার ধবধবে গা, বাদামি কান।

রাজু বললে, কুকুরটা যা জ্বালিয়েছে! খালি ছটফট করে, আর বুড়ো লালাজির হাত চাটে।

তাই নাকি!

কিন্তু আরো অবাক হতে তার বাকি ছিল।

আদালতের বাইরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিল সুমনের হিলম্যান। আদালত সবে ভেঙেছে, রাস্তায় ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে সুমন গাড়ির কাছে এগিয়ে যেতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।—আল্লার নামে কিছু দান করো বলতে বলতে সেই ছেঁড়া আলখাল্লা গায়ে অন্ধ ভিখিরি কালু এসে তার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ধাক্কা লেগে খানিকটা পিছিয়ে গেল সুমন। আর, তখুনি একটা অ্যাসিড—বালব এসে গাড়ির বনেটে লেগে চুরমার হয়ে গেল।

হই হই করে উঠল রাস্তার লোক।

পাথরের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুমন। অন্ধ কালু তখন তার লাঠিটা রাস্তার ওপর হাতড়ে খুঁজছে। সুমন লাঠিটা তুলে দিল তার হাত। তারপর রাজুকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিল।

অ্যাসিড—বালবটা যে তাকেই লক্ষ্য করে ছোড়া, সুমনের তা বুঝতে দেরি হয়নি। শত্রুপক্ষের প্রথম আক্রমণ! কিন্তু কারণটা কি? এই মামলা? তা যদি হয়, তবে যে তার দুশমন, সে আসামি চৈতি বাঈয়েরও দুশমন! চৈতিরও শত্রু আছে তাহলে! দূরে নয়, ধারে—কাছেই আছে। তা হলে অন্ধ কালু কে?

আশ্চর্য, বিপদের মুখে দাঁড়িয়েও সুমন খুশি হয়ে উঠল। রহস্যের আবছায়ায় একটা আলো যেন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে!

জেন্টলমেন অফ দি জুরি!

ব্যাঘ্র—গর্জনে পি. পি. শর্মাজী সওয়াল—জবাব করছেন।

আজ ক'দিন ধরে আপনারা যথেষ্ট ধৈর্য সহকারে এই মামলার শুনানী শুনেছেন। সেজন্যে আপনাদের ধন্যবাদ। আসামি দোষী কি নির্দোষ, তা সাব্যস্ত করার ভার আপনাদেরই ওপর, আপনাদের বিবেক যা বলবে, তারই ওপর নির্ভর করছে বিচার। তাই আপনারা আপনাদের কর্তব্যে রত হওয়ার আগে আমি আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণগুলি সংক্ষেপে বিবৃত করতে চাই।

সোয়া তিনশো পাউন্ড চর্বির স্তূপ দুলিয়ে শর্মাজী টেবিলের ধার থেকে হাঁসফাঁস করতে করতে এগিয়ে গেলেন একেবারে জুরিদের কাছ পর্যন্ত। বলতে লাগলেন, প্রথমেই আপনাদের মনে রাখতে অনুরোধ করছি যে, আসামি কোনো সম্ভ্রান্ত ভদ্রবংশের মেয়ে নয়। সে একজন বাঈজি, নাচে—গানে ছলায়—কলায় পুরুষের মন ভোলানোই যার পেশা। বাঈজিদের জীবনে প্রণয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণ ঘটনা, এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই আসে প্রতিহিংসা। আসামি চৈতি বাঈয়ের জীবনে তাই ঘটেছে। জয়প্রকাশ কাপুরের প্রণয়ে ব্যর্থ হয়ে সে তাকে গুলি করে মেরে প্রতিহিংসার জ্বালা মেটায়। নারী যখন নারিত্বের সওদা করে, তখন এমনিই হয়!

ব্যাঘ্র—গর্জন করে গলাটা বোধ হয় শুকিয়ে গিয়েছিল। টেবিলের কাছে ফিরে এসে শর্মাজী এক গেলাস ঠাণ্ডা লিমনেড খেলেন। গলাটা ভিজিয়ে আবার শুরু করলেন, সাক্ষীদের কথার গুরুত্ব কতখানি তা আপনারাই বিচার করবেন। কিন্তু তাঁদের কথা বাদ দিলে আসামির বিরুদ্ধে যে প্রমাণ আছে, তা অকাট্য। সে প্রমাণ এই! (টেবিলের ওপর থেকে একটা রিভলভারের টোটা তুলে নিলেন শর্মাজী) এই রক্তমাখা টোটা নিহত জয়প্রকাশের বুকের ডান দিক থেকে বেরিয়েছে। এই টোটা ৩.২ সাইজের এবং আসামির রিভলভারের নলের ফাঁদও হচ্ছে এই মাপের। খুনের পর আসামির রিভলভারের নল গরম ছিল না বলে আমার তরুণ বন্ধু মিস্টার চৌধুরি যতই চমক দেবার চেষ্টা করুন না কেন, সরকারি আর্মস—এক্সপার্ট পরীক্ষা করে দেখেছেন রিভলভারের নলের মুখে বারুদ লেগে আছে এবং অস্ত্রের গায়ে আঙুলের যে ছাপ পাওয়া গেছে, ওই আসামি চৈতি বাঈয়ের আঙুলের ছাপের সঙ্গে তার হুবহু মিল! একুশে জুলাইয়ের সেই দুর্যোগের রাতে ঘরে জয়প্রকাশ ও চৈতি বাঈ ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিল না। সুতরাং, এর পরেও কি সন্দেহ থাকতে পারে যে, আসামিই জয়প্রকাশকে খুন করেছে? আপনাদের সহজ বুদ্ধিবৃত্তিকে জিজ্ঞাসা করুন।

থামলেন পি.পি. এক ঢোক জল মুখে নিয়ে হলুদ রঙের দুটো ট্যাবলেট গিলে ফেললেন। স্নায়ুগুলোকে আরও সতেজ করে নিলেন বোধ হয়। তারপর ব্যাঘ্রবিক্রমে আবার শুরু করলেন, জেন্টলমেন অফ দি জুরি! সভ্য জগতের জঘন্যতম অপরাধ হল নরহত্যা। কোনো দেশেই তার ক্ষমা নেই। আসামি সেই চরম অপরাধে অভিযুক্ত। ন্যায়ের তুলাদণ্ড হাতে আপনারা বসেছেন বিচার করতে—আসামি নারী বলে কোনো দুর্বলতা যেন না আসে। মাননীয় জুরিগণ! চেয়ে দেখুন আসামির দিকে—ওই সুন্দর মূর্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে শয়তানের আত্মা! ওই সাদা হাতে মাখা আছে নিহত জয়প্রকাশের রক্তের অদৃশ্য দাগ! আপনাদের আমি আবার অনুরোধ করছি, খুনিকে অব্যাহতি দিয়ে সমাজের ও সভ্যতার অকল্যাণ করেবেন না! ন্যায়বিচার করুন—আসামী খুনি কিনা, আপনাদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন! এই আমার বক্তব্য।

চেয়ারে বসে পড়ে পি. পি. একটা অতিকায় হাপরের মতো হাঁফাতে লাগলেন। আদালত—ঘরে পিন পড়লেও শোনা যায়, এমন নিঃশব্দতা। গিরিজায়া চোখে আঁচল চেপে আছেন।

কিন্তু যাকে নিয়ে এত কথা, এত বিচার—বিতর্ক, সে লোহার খাঁচার মধ্যে বসেও যেন শত যোজন দূরে। স্তব্ধ উদাস নির্লিপ্ত মূর্তি দেখলে মনে হয় একটা কথাও তার কানে যায়নি।

এবার ডিফেন্স কাউন্সেলের সওয়াল—জবাবের পালা। জজের আদেশে সুমন উঠল ধীরে ধীরে। তার কপালে চিন্তার কয়েকটা রেখা ছাড়া মুখে উত্তেজনার কোনো চিহ্ন নেই। একবার সে তাকাল চৈতির দিকে, তারপর হাতের পেন্সিল দিয়ে চিবুকে মৃদু আঘাত করতে করতে শান্ত নিরুত্তাপ গলায় বলতে শুরু করলে, মি লর্ড! জেন্টলমেন অফ দি জুরি! আমার পূর্ববর্তী বক্তা শর্মাজী তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতায় আমাদের চমৎকৃত করেছেন। তাঁর তুলনায় আমার ভাষায় দৈন্য নিয়ে বক্তব্য পেশ করতে কুণ্ঠিত বোধ করছি। তবে ভরসা এই যে, বিচার বিতর্কে ভাষায় চেয়ে যুক্তির প্রয়োজনই বেশি। আবেগের স্রোতে গা ভাসিয়ে শর্মাজী কিন্তু যুক্তির দিকটাই এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, সভ্য জগতের জঘন্যতম অপরাধ হল নরহত্যা। কোনো দেশেই এর ক্ষমা নেই।—কিন্তু খুন করলেই সি সেটা অপরাধ হয়? আমরা তো ইতিহাসে দেখেছি এক একটা মহাযুদ্ধ লাগে, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করে গৌরবের জয়পতাকা ওড়ায়। একটা মানুষ যদি দশটা মানুষের প্রাণ নিতে পারে, দেশ ও জাতি তাকে বাহবা দেয়, ভিক্টোরিয়া ক্রস বীরচক্র মেডেল দিয়ে তাকে সম্মান করে। কই, সে—খুনের তো বিচার হয় না! ক্রিমিন্যাল বলে তারা নিন্দিতও হয় না। কেন হয় না? হয় না এই কারণে যে সেই মাস—মার্ডার বা পাইকারি খুনের পেছনে একটা বৃহৎ ও মহৎ উদ্দেশ্য থাকে। সেটা হল দেশের সুখ, শান্তি স্বাধীনতা রক্ষা। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? খুনটা অপরাধ নয়, যদি মোটিভ ভালো হয়। সুতরাং, কোনো ব্যাক্তি যদি তার ব্যক্তিগত সুখ শান্তি স্বাধীনতা বাঁচবার জন্যে খুন করে, তবে সমাজ তাকে অপরাধী বলতে পারে কি? জেন্টলমেন অফ দি জুরি! আসামির কথা ভাববার আগে আমার এ প্রশ্নের জবাবটা আপনারা ভাবুন।

জুরিরা নীরবে পরস্পরের দিকে তাকালেন।

এজলাসের সামনে সুমন একবার এধার থেকে ওধার পায়চারি করে এল। তারপর আবার শুরু করলে, এখন আমাদের মামলায় আসা যাক। আমার প্রবীণ সহযোগী শর্মাজী বলেছেন, 'প্রণয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাঈজীদের জীবনে সাধারণ ঘটনা। আর, সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই আসে প্রতিহিংসা।' শর্মাজির যৌবনের ইতিহাস আমার জানা নেই, হয়তো ওঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই একথা বলেছেন। কিন্তু গোড়াতেই একটা ভুল তিনি করে বসেছেন। আসামি চৈতি বাঈ মৃতা সোহিনী বাঈয়ের পালিতা কন্যা। নিজে সে বাঈজী নয়, পেশা সে কোনোদিনই নেয়নি। আসামির জন্ম আমার আপনাদের মতো, এমনকি শর্মাজীর মতোই ভদ্রবংশে। ফৈজাবাদের স্বর্গীয় নীলকণ্ঠ মৈত্র ওর বাপ এবং ওই বিধবা গিরিজায়া দেবী ওর মা। কাকের বাসায় কোকিল ডিম পেড়ে যায়, তাই বলে কোকিল কি কাক হয়? সোহিনী বাঈও আসামিকে বাঈজী কবে তুলতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন আসামি লেখাপড়া শিখে ভদ্র জীবনযাপন করুক। তাই তাকে বেনারসের স্কুলে এবং হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছিলেন,গান শিখিয়েছিলেন, কিন্তু গান বাজনার নৈশ আসরে কোনোদিন ঘেঁযতে দেননি। এর ঠিক উল্টো চরিত্র ছিল জয়প্রকাশ কাপুর। ভদ্রবংশের ছেলে হয়েও সে ভদ্র হতে পারেনি, হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষা পেয়েও সে ছিল মাতাল লম্পট জুয়াড়ি। ভালোবাসার ভান করে বিয়ে করবে বলে ভুলিয়ে সে আসামির প্রায় দেড় লাখ টাকার সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়ার মতলব করেছিল। আসামির সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সে লিখিয়ে নিয়েও ছিল—এই সেই দলিল! (টেবিল থেকে জোড়া দেওয়া দলিলখানা তুলে জুরিদের হাতে দিল সুমন) কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই প্রতারণা ধরা পড়ে যায় আসামির কাছে। আর তারই ফলে যা স্বভাবিক, তাই বটে। উত্তেজিত হয়ে ওঠে আসামি। ভালোবাসা নিয়ে খেলা করলে, সরল বিশ্বাসে আঘাত লাগলে কে না উত্তেজিত হয়? জয়প্রকাশের সেই জঘন্য প্রতারণা থেকে শুধু নিজের সম্পত্তি নয়, নারীত্বের সম্মানটুকুও বাঁচাতে গিয়ে আসামি যদি হাতে রিভলভার তুলে নেয়, তবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? জেন্টলমেন অফ দি জুরি! সমাজের কল্যাণের কথা যদি বলেন, তবে জয়প্রকাশের মতো একটা মাতাল লম্পট—একজন কুমারীর সর্বনাশ যে করতে যাচ্ছিল—তাকে গুলি করে মারাই কি উচিত নয়? আপনাদের নীতিবোধ কি বলে?

থামলো সুমন। জুরিরা আর একবার পরস্পরের দিকে চাইলেন। সুমনের প্রশান্ত গম্ভীর গলার রেশ মিলিয়ে এল ধীরে ধীরে।

তারপর আবার শুরু করল সে, এবার খুনের ঘটনায় আসা যাক। ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক আসামি সত্যিই খুন করেছে কিনা। নিহতের পাশে যে রিভলভার পাওয়া যায়, তার গায়ে আসামির আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে এবং নিহতের দেহ থেকে যে টোটা বেরিয়েছে, তার মাপ আর আসামির রিভলভারের মুখের মাপ একই। আমার বিজ্ঞ সহযোগী এই কোয়েন্সিডেন্স—মাত্র এইটুকু মিল থেকেই সাব্যস্ত করে ফেলেছেন যে, আসামিই খুনি। এ যেন শিশুদের যোগের অঙ্ক কষা! দুই আর দুইয়ে কত? চার। কিন্তু তিন আর একেও কি চার হতে পারে না? জেন্টলমেন অফ দি জুরি! আমি মেনে নিচ্ছি, ঘটনাস্থলে পাওয়া রিভলভারটা আসামিরই—মেনে নিচ্ছি সে ফায়ারও করেছিল। কিন্তু ফায়ার করাটাই শেষ কথা নয়, তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, গুলিটা জয়প্রকাশের গায়ে লেগেছিল কিনা। আমি বলছি, লাগে নি, লাগা সম্ভব নয়। খোঁজ করে দেখা গেছে, আসামি রিভলভার কেনার পর থেকে একটিমাত্র টোটা ছাড়া দ্বিতীয় টোটা খরচ হয়নি। এত এব, ছোড়া অভ্যেস আসামির আদপেই ছিল না, এ যুক্তি মেনে নেওয়া যায়। তাছাড়া যে উত্তেজিত অবস্থায় সে ফায়ার করেছিল, সেই অবস্থায় কোনো কাঁচা হাতে ছোড়া গুলি লক্ষ্যে লাগা কি সম্ভব?

জুরিরা নড়েচড়ে বসলেন।

সুমন বলতে লাগল, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জয়প্রকাশকে তাহলে গুলি করল কে? আমি বলব, তৃতীয় ব্যক্তি—যার হাতের টিপ অব্যর্থ, যে একুশে জুলাই রাতে চৈতি বাঈ ও জয়প্রকাশের অজান্তে ঘরের কোথাও লুকিয়েছিল।

জজ বললেন, জয়প্রকাশ ক্ষতি করতে চেয়েছিল আসামির, সুতরাং তার ওপর আসামিরই আক্রোশ থাকা স্বাভাবিক। তৃতীয় ব্যক্তি তাকে খুন করবে কি কারণে?

সুমন বললে, নিজের অপরাধ ঢাকতে। সেই তৃতীয় ব্যক্তি আর কেউ নয়, যে জয়প্রকাশকে চৈতি বাঈয়ের সম্পত্তি ঠকিয়ে নেওয়ার মতলব দিয়েছিল, সেই। পাছে জয়প্রকাশ তার নাম প্রকাশ করে দেয়, সেই আশঙ্কায় তার মুখ সে চিরদিনের মতো বন্ধ দিয়েছে!

মৈনাক পর্বতের মতো উঠে দাঁড়ালেন শর্মাজী। পুরু ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি এনে বললেন, আমার তরুণ বন্ধু তৃতীয় ব্যক্তির বিষয় যা শোনালেন, রোমাঞ্চকর কাহিনী হিসেবে তা সত্যিই উপাদেয়। কিন্তু আমরা এখানে কাহিনী শুনতে আসিনি, এসেছি সত্যকে প্রমাণ করতে। সে—রাতে আসামির ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি হাজির ছিল, তার কোনো প্রমাণ আমার সহযোগী দিতে পারেন কি?

পারি।—পকেট থেকে একটা জিনিস বার করলে সুমন। শ্বেতপাথরের তৈরি দুটি সুগঠন আঙুল—অনামিকা আর কনিষ্ঠা। সেই ভাঙা আঙুল দুটি জজের টেবিলে রেখে সুমন বললে, প্রমাণ এই। সোহিনী বাঈয়ের মাইফিল ঘরে নর্তকীর যে শ্বতপাথরের মূর্তি আছে, এই আঙুল দুটি তারই হাতের ভাঙা অংশ। আঙুল দুটি একুশে জুলাই রাতেই ভেঙেছিল, তা নইলে মৃতদেহের কাছেই পড়ে থাকতে দেখা যেত না। আগে ভাঙলে তুলে রাখা হত বা জুড়ে দেওয়া হত। আমি বলতে চাই, রিভলভারের একই গুলি কি দুটো বস্তুতে লাগতে পারে? একই গুলিতে জয়প্রকাশ খুন হওয়া, এবং নর্তকী—মূর্তির আঙুল ভাঙা কি সম্ভব? তা যখন সম্ভব নয়, তখন নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সে—রাতে আর একটা রিভলভার থেকে দ্বিতীয় গুলি ফায়ার করা হয়েছিল। এবং ফায়ার করেছিল সেই তৃতীয় ব্যক্তিই।

তাহলে সেই দ্বিতীয় গুলি তদন্তের সময় পুলিশ পায়নি কেন?

বাঘের মতোই হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন পি.পি।

তার জবাব পুলিশ দেবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দ্বিতীয় গুলি মাইফিল ঘরের কোথাও আছে নিশ্চয়। আদালতের কাছে আমি আর একবার তদন্তের অনুমতি চাইছি।

চিন্তার রেখা পড়ল জজ সাহেবের কপালে। একটু ভেবে বললেন, অনুমতি দেওয়া হল।

আদালত—ঘর গুঞ্জনধ্বনিতে ভরে উঠল। আবার কোন দিকে মামলার মোড় ঘুরবে কে জানে! হত্যা—রহস্যের কোন দরজা খুলে যাবে দেখা যাক।

রাজু বললে, হিরো বটে সুমন চৌধুরি! নাটকটা একাই জমিয়েছে, কি বলুন লালজী? দ্বিতীয় গুলিটা খুঁজে পেলেই বাজিমাত!

কম্ফর্টারখানা ভালো করে জড়িয়ে লালজী বললে, বাজিমাৎ কি অত সহজে হয় ভাইয়া। এ বুড়ো অনেক দেখেছে, অনেক শুনেছে। ধরে নিলাম, দ্বিতীয় গুলিটা পাওয়া গেল। পেলেই বা কি হবে? দ্বিতীয় গুলিটা যে ছুড়েছিল, তাকে যদি ধরতে পারে, তবেই বুঝব হ্যাঁ—তোমার ব্যারিস্টার বাহাদুর!

পারতেও তো পারে।

উঁহু, পারবে না। পুলিশই পারলে না ধরতে, তোমার ব্যারিস্টার পারবে? ও কি রবার্ট ব্লেক?

চটে গেল রাজু। বললে, সুমন চৌধুরি রবার্ট ব্লেকের জ্যাঠামশাই!

তাই নাকি? বেশ, বাজি ধরো—দশ রুপোয়।

ফোকলা দাঁতে হাসতে লাগল লালজী।

রাজু বললে, বেশ, ধরলাম। দশ টাকা।

ঘুম আসছে না। অনেক রাত হল, অনেক পেয়ালা কফি ফুরোল, অনেক তামাক পুড়ল পাইপো, ঘুম এল না কিছুতেই। না এল ঘুম, না বসল মন মোটা মোটা আইনের কেভাবে।

লাইব্রেরি ঘরে বসে সুমন শুধু ভাবছে আর ভাবছে। কেন দেখা হল চৈতির সঙ্গে গোধূলিয়া পাহাড়? কেন জড়িয়ে পড়ল তার মামলায়? আর কেনই বা ভালোবাসল তাকে? ভালোবাসা যে এমন অতর্কিতে আসে, সুমন কি তা জানত? নাট্যকার রাজুর কথাই, বোধ হয় ঠিক, জীবনটা একটা নাটক!

চৈতিকে যদি বাঁচাতে না পারে? সুমন কি তাকে ভুলতে পারবে? ভালোবাসলে কি ভুলতে পারা যায়? ডক্টর কেশকার তো সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তবু কেন সতর্ক হতে পারল না সে? সুমন কি অনুতপ্ত? না, মোটেই না। চৈতি তার জীবনে ভালোবাসার প্রথম স্বাদ এনেছে। চৈতির কাছে সে ঋণী।

বন্ধ জানলার শার্সিতে একটা পোকা বারবার মাথা ঠুকছে। নিয়তির কাছে যেন অসহায় আত্মসমর্পণ! সেই আওয়াজে চোখ ফেরাতেই সুমনের দৃষ্টি আটকে গেল। জানলার শার্সিতে কালো একটা ছায়া পড়েছে। কে যেন বাইরে চুপিসারে ওত পেতেছে!

এক মুহূর্ত ভাবলে সুমন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে কি একটা জিনিস পকেটে ফেলে বেরিয়ে গেল বাইরে। আশ্চর্য, আলখাল্লা গায়ে সেই অন্ধ ভিখিরি কালু দাঁড়িয়ে! শক্ত মুঠিতে তার হাত চেপে সুমন বললে, এখানে কি মতলবে? ফের দুশমনি করতে?

চাপা গলায় কালু বললে, আল্লা জানে, আমি আপনার দুশমন নই। তাহলে সেদিন আদালতের সামনে আপনাকে বাঁচাতাম না, অ্যাসিডে আপনার মুখ পুড়ে যেত।

কে অ্যাসিড ছুড়েছিল?

তার লোক।

কার লোক?—বলো—বলো শিগগির!

চৈতি বাঈকে যে খুনের মামলায় ফাঁসিয়েছে।

কে সে?

কালুর মুখে আতঙ্ক দেখা দিল। কাঁপা গলায় বললে, বলব বলেই তো এত রাতে লুকিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে নয় ভকিলসাব, কে শুনে ফেলবে! ঘরে চলুন, সব বলব।

সওয়াল—জবাবের দ্বিতীয় দিন।

রিভলভারের একটা ফাঁকা টোটা হাতে নিয়ে সুমন বলছে, এই সেই দ্বিতীয় রিভলভারের গুলি। সোহিনী বাঈয়ের মাইফিল ঘরের দেয়াল আলমারির মধ্যে গেঁথে ছিল। অথচ প্রথম বারের তদন্তে পুলিশের চোখ এড়িয়ে যায়। এ গুলি কি আসামির রিভলভারের? না, তার ছ—ঘরা রিভলভারের পাঁচটা টোটা এখনো ভরা। জেন্টলমেন অফ দি জুরি! এবার বলুন ঘটনার রাতে ঘটনাস্থলে তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিল কিনা।

একটা চাপা শোরগোলে আদালত—ঘরের স্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল।

হাতুড়ি ঠুকলেন জজসাহেব : অর্ডার! অর্ডার!

সোয়া তিনশো পাউন্ডের সজীব মৈনাক পর্বত উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাঘ্রবিক্রমে বললেন, কিন্তু দুটো গুলিই ৩.২ সাইজের। কোন গুলিটা কার রিভলভারের তা প্রমাণ করবে কে?

প্রমাণ করবে একজন সাক্ষী—ঘটনাটা যে নিজের চোখে দেখেছে। আদালত অনুমতি দিলে তাকে আনতে পারি।

আদালত অনুমতি দিচ্ছে। জজসাহেব বললেন।

কোর্টরুমের বাইরে থেকে সমুনের পিছু পিছু লাঠি ঠকঠকিয়ে কালু এসে দাঁড়াল। গায়ে সেই আলখাল্লা, কটা চোখের তারা দুটো স্থির। জজসাহেবর ভুরু কুঁচকে উঠল। বললেন, এ তো অন্ধ, এর সাক্ষ্যের মূল্য কি?

অট্টহাস্য করে উঠলেন পি.পি.। হেসে বললেন, আমার তরুণ বন্ধু মিস্টার চৌধুরি প্রকৃতিস্থ কিনা সন্দেহ হচ্ছে! একজন অন্ধ ভিখিরিকে এনে তিনি বলছেন, সে ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছে! এরপর হয়তো একজন কালাকে এনে বলবেন, সে সব শুনেছে!

কোনো জবাব দিলে না সুমন। নীরবে টেবিল থেকে কাচের পেপারওয়েট তুলে নিয়ে কালুকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলে। আর, দক্ষ ক্রিকেট খেলোয়াড়ের মতো কালু সেটা সহজেই লুফে নিলে।

স্তম্ভিত হয়ে গেল সমস্ত আদালত।

জজসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তুমি অন্ধ সেজে থাকো কেন?

হাতজোড় করে কালু বললে, হুজুর, অন্ধ সেজে থাকলে লোকে দুটো পয়সা বেশি ভিক্ষে দেয়।

আসামিকে তুমি চেনো?

লোহার খাঁচার দিকে তাকিয়ে কালুর চোখে জল এসে গেল। বললে, চিনি বৈকি হুজুর। আর জন্মে আমার মা ছিল! রোজ আমায় খেতে দিত, পয়সা দিত।

খুনের ঘটনা তুমি দেখেছিলে?

জী সরকার।

কি দেখেছিলে বলো।

আগের দিন বাঈ আমায় বলেছিল, 'আমার শাদি হবে, এখান থেকে চলে যাব। কাল বিকেলে তুমি এসো কালু, কিছু টাকা আর গরম কাপড় নিয়ে যেও।' কিন্তু কে জানত হুজুর বিকেল থেকে বিষ্টি নামবে আর তুফান শুরু হবে! রাস্তায় বেরোলে হাওয়া ঠেলে ফেলে দেয়। সবুর করতে করতে রাত হয়ে গেল, তবু গেলাম বাঈয়ের বাড়ি। যদি বাঈ কালই চলে যায়। ভিখিরির আবার ঝড়—বিষ্টি কি?

রাত তখন কটা?

তখন সীতারাম শেঠদের পেটা ঘড়িতে দশটা বাজছে।

তারপর?

সদর খোলা ছিল, ভেতরে ঢুকে ভয়ে ভয়ে বাঈকে ডাকলাম। কেউ সাড়া দিল না। ভাবলাম, তবে কি বাঈ চলে গেছে? দেখতে হবে। আমি তো সত্যিই অন্ধ নই, অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে ওপরে উঠলাম। বারান্দায় এসে দেখি, মাইফিল ঘরে বাতি জ্বলছে, এক নওজোয়ান ছোকরা আর চৈতি বাঈ দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে। বাঈয়ের হাতে একটা পিস্তল।

সেই নওজোয়ান ছোকরাকে দেখলে তুমি চিনতে পারবে? পি. পি. প্রশ্ন করলেন।

পারব হুজুর।

তিনটি যুবকের ফোটো কালুর সামনে ধরে পি. পি. বললেন, দেখো তো এর মধ্যে কোনটা তার ছবি?

কালু জয়প্রকাশের ছবিখানাই তুলে নিলে।

জজ বললেন, বলো, তারপর কি দেখলে—

সেই নওজোয়ান হুজুর বলছিল, 'দোষ আমার একার নয়।' আমাকে একজন মতলব দিয়েছিল, বলেছিল তোমার টাকাকড়ি ফাঁকি দিয়ে নিতে পারলে আধাআধি বখরা।' ভয়ানক রেখে গিয়েছিল বাঈ, হাত কাঁপছিল, বললে, 'তার নাম বলো, নইলে গুলি করে মারব!' ভয়ে নওজোয়ান এদিক—ওদিক ছুটোছুটি করছিল। হুজুর, সেই সময় দেখতে পেলাম, সেই পাথরের নাচওয়ালীর পেছনে আর একটা লোক লুকিয়ে আছে—তারও হাতে পিস্তল!

সমস্ত কোর্টরুম একটা অস্ফুট শব্দ করে উঠল।

কালু বলতে লাগল, বাঈ বলছিল, 'তার নাম বলো।' নওজোয়ান ভয় পেয়ে বললে, 'বলছি' কিন্তু বলবার আগেই হুজুর, সেই লোকটা আড়াল থেকে দুম করে গুলি করলে নওজোয়ানকে—আর চমকে গিয়ে বাঈয়ের হাতের পিস্তল থেকেও গুলি ছুটে গেল! মুখ থুবড়ে পড়ে গেল নওজোয়ান, গলগল করে তাজা খুন বেরোতে লাগল বুক থেকে—মনে পড়লে এখানো আমার গায়ে কাঁটা দেয় হুজুর!

তুমি তখন কি করলে?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলাম। সেই লোকটা তখন চুপি চুপি হাত বাড়িয়ে বাতি নিভিয়ে দিলে, তারপর বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল মাইফিল—ঘর থেকে। বারান্দা দিয়ে পালাতে গিয়ে অন্ধকারে আমার গায়ে তার ধাক্কা লেগে গেল—ভীষণ চমকে উঠল সে—কিন্তু আমি অন্ধ বলে কিছু বললে না, সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। নইলে হুজুর আমাকেও খতম করে দিত।

স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে কালুর দিকে তাকাল চৈতি। যেন এক অবিশ্বাস্য গল্প শুনছে। কই, সে তো কিছুই জানতে পারেনি!

আবার উঠে দাঁড়ালেন মৈনাক পর্বত। গর্জন করে উঠলেন, সাক্ষীর কথা যদি সত্য হয়, তবুও সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। তৃতীয় ব্যক্তির গুলিটাই তো নর্তকীর আঙুলে লাগতে পারে—

পারে না। শান্ত অথচ জোরালো গলায় সুমন বললে, আততায়ী লুকিয়েছিল স্ট্যাচুর ঠিক পেছনে, আর নর্তকী তার হাত একটা সাধারণ মানুষের মাথায় চেয়েও উঁচুতে তুলে আছে। সেক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তির গুলি নর্তকীর আঙুলে লাগতে পারে কি? বরং তফাত থেকে চৈতির কাঁপা হাতের গুলিই লাগা সম্ভব।

জজসাহেব কালুকে জিজ্ঞেস করলেন, এসব কথা এতদিন জানাওনি কেন?

হাতজোড় করে কালু বললে, জানের ভয়ে হুজুর। কিন্তু বিনা দোষে বাঈয়ের ফাঁসি হয়ে যাবে ভেবে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। আল্লা কসম হুজুর, বাঈ খুনি নয়, খুনি দোসরা আদমি।

দরদর করে জল গড়িয়ে এল কালুর চোখ দিয়ে।

জুরিরা বিচলিত হয়ে হলেন।

কম্ফর্টার জড়ানো লালজী ফিসফিস করে বললে, ভিখিরিটাকে দিয়ে গল্পটা মন্দ ফাঁদেনি ব্যারিস্টার। কিন্তু শেষ অবধি আজগুবি হয়ে যাবে না তো?

কক্ষনো না।—রাজু বললে।

বেশ, বেশ, না হলেই ভালো। তবে বাজি রেখেছ, মনে রেখো।

জজসাহেব বললেন, সেই দোসরা আমদিকে চেনো তুমি?

কালু বললে, চিনি হুজুর।

কে সে? তার নাম কি?

মুখে আতঙ্ক নিয়ে বোবা হয়ে রইল কালু।

বলো—কোনো ভয় নেই—বলো সে কে?

কালু বললে, রংলাল সারেঙ্গিওয়ালা।

আরেকবার অট্টহাস্যে কোর্টরুম কাঁপিয়ে দিলেন পি.পি। বলে উঠলেন, মি লর্ড, আমরা কি এখানে বাতুলের প্রলাপ শুনতে এসেছি? একথা কে না জানে যে, জয়প্রকাশ খুন হওয়ার এক হপ্তা আগে রংলাল প্রয়োগ জলে ডুবে মারা যায়! সুতরাং সাক্ষীর জবানবন্দী আজগুবি ছাড়া আর কি?

ফোকলা দাঁতে হেসে লালজী বললে, কি হল ভাইয়া? বাজিটা হারলে তো?

হতবুদ্ধি রাজু জবাব দিতে পারল না।

উঠে দাঁড়াল সুমন। স্পষ্ট সুগম্ভীর গলায় বললে, মি লর্ড, জেন্টলমেন অফ দি জুরি! সত্যের রং সাদা, বিজ্ঞ পি.পি. কালো চশমা চোখে দিয়ে তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। সারেঙ্গিওয়ালা রংলাল চৌহান মরেনি, বেঁচে আছে। এই কোর্টরুমেই সে উপস্থিত আছে।

নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল সকলের। সারা আদালত—ঘর যেন কবরের মতো ঠাণ্ডা অসাড়।

সুমন বললে, তিন মিনিট সময় দিলাম। রংলাল, তুমি ধরা দাও!

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল সুমন। কোর্টরুমের দেয়ালে বড় ঘড়িটা টিকটিক শব্দে এক—একটা মুহূর্তের মৃত্যু ঘোষণা করে যাচ্ছে। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে রইল আদালত।

কঠিন গলায় সুমন বলে উঠল, টাইম ইজ আপ! এখনো বলছি, নিজে ধরা দাও রংলাল! নইলে আমি গিয়ে তোমায় অ্যারেস্ট করব! উঁহু, পালাবার চেষ্টা কোরো না—কোর্টরুমের সকল দরজায় পুলিশ মোতায়েন রেখেছি। আর পকেট থেকে রিভলভার বার করেও লাভ নেই—আমারটা আমার হাতেই আছে। এসো, এগিয়ে এসো—সারেন্ডার!

সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখল, গ্যালারির আসন থেকে এক—পা এক—পা করে নেমে আসছে গলায় কম্ফর্টার জড়ানো চশমা নাকে বুড়ো লালজী! একটানে তার চুল—দাড়ি খুলে দিলে সুমন। আর, লোহার খাঁচার ভেতরে চৈতি বাঈ বিস্ময়ে বেদনায় চিৎকার করে উঠল, রংলাল চাচা!

রংলালের পকেট থেকে তার রিভলভারটা বার করে নিয়ে সুমন বললে, এই সেই রিভলভার, যার গুলি জয়প্রকাশকে খুন করেছে। পি.পি. পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, এর টোটাও ৩.২ সাইজের। মি লর্ড, জেন্টলমেন অফ দি জুরি! আর আপনাদের সন্দেহ আছে কি?

জজ বললেন, রংলাল চৌহানকে আমি জয়প্রকাশ খুনের চার্জে অভিযুক্ত করলাম। আসামি, তোমার কিছু বলবার আছে?

মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েছিল রংলাল। ধীরে ধীরে মাথা তুলে বললে, শেষ বাজিতে হেরে গেলাম—আর কি বলব হুজুর? কিছু না!

তুমি মরে গেছ বলে মিথ্যে রটিয়েছিলে কেন?

জুয়া খেলে বহুত দেনা হয়েছিল। জেল থেকে বাঁচবার জন্যে।

একুশে জুলাই রাতে চৈতি বাঈয়ের ঘরে লুকিয়েছিলে কি জন্যে?

চৈতির সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে পাছে জয়প্রকাশ আধা বখরা ফাঁকি দেয়, সেই জন্যে।

রংলালকে সার্জেন্ট নিয়ে গেল। জুরিরা গেলেন পরামর্শ—কক্ষে।

ফোরম্যান অফ দি জুরি! এই মামলার রায় সম্পর্কে আপনারা একমত হয়েছেন?

হয়েছি।

আপনাদের সিদ্ধান্ত কি? আসামি চৈতি বাঈ দোষী না নির্দোষ?

নির্দোষ।

উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল জনতা। জ্যাকসন সাহেব সুমনের হাতে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে বললেন, শাবাশ ইয়ংম্যান! রংলালকে তুমি চিনলে কি করে?

সুমন বললে, দৈব আমার সহায়, তাই রাজু চৈতির কুকুরটাকেই কিনল। আর আমি চেনার আগেই রেশমি রংলালকে চিনল। তাছাড়া রাজুর সঙ্গে বাজি রাখায় আমার সন্দেহ জোরালো হয়। পাকা জুয়াড়ি তার স্বভাব বদলাতে পারে না।

গিরিজায়া তখন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছেন।

বারাবাঁকির সেই বেগম—মহলের গোল—বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে চৈতি। ঝুলনিয়া আজ তাকে সাজিয়ে দিয়েছে। এই মহলটা দিন কয়েকের জন্যে জন্য ভাড়া নিয়েছে চৈতি। গোল—দরওয়াজার বাড়িতে আর ফিরে যাবে না।

জাফরির ফাঁক দিয়ে মজা—দিঘির পানে তাকিয়ে আছে সে। একক লাল পদ্মটার আরেকটা কুঁড়ি দেখা দিয়েছে।

সুমন এসে ডাকলে, চৈতি!

ফিরে তাকাল চৈতি! মৃদু হেসে বললে, আমি আর চৈতি নই, আমি শান্তি—শান্তিলতা। আমায় কবে নিয়ে যাবে তোমার বাড়িতে? নিয়ে যাবে তো?

হেসে বললে সুমন, নিয়ে না গিয়ে উপায় কই? জটিয়াবাবা যা জট পাকালেন।

হই হই করে ঢুকে পড়ল নাট্যকার রাজু। বগলদাবায় রেশমি। চৈতির হাতে দিয়ে বললে, ম্যাডাম, তোমাদের বিয়ের উপহার। তারপর সুমনকে বললে, দেখলি তো ইয়ার, লাস্ট অ্যাক্টে হিরো আর হিরোইন মরতে বসেছিল, নাট্যকার রাজুই তোদের বাঁচিয়ে দিল।

কি রকম?

ভাগ্যিস খুঁজে খুঁজে এই কুকুরছানাটাই কিনেছিলাম, তাই তো মামলায় বাজি মেরে দিলি! যাক, নাটকের উজ্জ্বল দৃশ্যে তৃতীয় ব্যক্তির থাকা উচিত নয়।

চলে যেতে গিয়ে ফিরে এল রাজু, ইস, বড্ড ভুল হয়ে গেছে! দশটা টাকা হবে?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%