হুলো আজ হাসল

জয়ন্ত দে

ওই যে সাদা আর মোটা মতো বিড়ালটা দেখছ, যার ঘাড় নেই, যার ধড়ের ওপর গোল মতো মাথা বসানো, যার বড় আর ফোলা লেজ— ওর নাম হুলো!

বাচ্চারা ওকে দেখলেই বলে: হুলো গাল ফুলো!

ওই বিড়ালটা এ-পাড়া শাসন করে। শাসন করে মানে, অন্য কোনও বিড়াল ওকে দেখলেই লেজ গুটিয়ে ভোঁ! কাকেরা ওর কানের কাছে এসে বেশি কা কা করে না। চড়াই-শালিখ ওরা ছায়া মাড়ায় না। এমন কী এ পাড়ার কুকুরগুলো পর্যন্ত ওকে দেখে হম্বিতম্বি করে না। শুধু কালুটা যা একটু ডিসটার্বিং।

আর মানুষজন?

ওকে সবাই দূর থেকে দেখতে পায়। বেশির সময়ই ওকে দেখে খুব গম্ভীর মুখে কার্নিসে বা ছাদের পাঁচিলে লেজ খাঁড়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওকে কাছ থেকে দেখা যায় কখনও কখনও। ওকে দেখলেই অনেকেই লাথি প্র্যাকটিস করে। তবে কেউ কোনওদিন ওকে লাথি মারতে পারেনি। শুধু লাথি কেন অনেকে লাঠিও চালিয়েছে। তারাও সফল হয়নি। আবার কেউ কেউ দূরে ওকে দেখেই টিপ পরীক্ষা করেছে। একবারও লাগাতে পারেনি। ফসকে গেছে।

তবে এসব নিয়ে হুলো কিছু মনে করে না। ও মাঝে মাঝে হাই তোলে— এই তো জীবন!

তবে হুলোর সবচেয়ে বেশি টার্গেট অমল সাহার বাড়ির দিকে। ওই বাড়িটায় খুব কেলোর কীর্তি হয়। ওই বাড়ির ঘণ্টের বুড়ি ঠাকুমা একবার ওর গায়ে পিচিক করে পানের পিক ফেলেছিল। কী ঘেন্না! কী ঘেন্না ম্যাগো! কত্তদিন ও লাল হয়েছিল। আর তাই দেখো ঠাকুমার ফোকলা দাঁতে কী হাসি। যেন উনি মিস ইন্ডিয়া হয়েছেন!

বদলা নিতে ও ঠাকুমার আচারের শিশি দু দুবার উলটে দিয়েছে। তাতে অবশ্য ওর দোষ পড়েনি। কেন না বিড়াল আচার খায় না। কালো কেলো কাকগুলোই কেস খেয়েছে। তবে ও ঠাকুমাকে কিছু একটা করতে চায়, চান্স পাচ্ছে না। ইচ্ছে আছে ঠাকুমার আদরের টিয়া পাখির ওপর একদিন হামলা চালিয়ে আসবে। প্রাণে মারবে না। সেরেফ ভয় দেখাবে। তাতে টিয়েটার হরি হরি কপচানো বন্ধ হবে। সারাদিন ভয়ে ভয়ে শুধু ট্যাঁ ট্যাঁ করবে।

সেদিন হল কী অমল সাহার নাতি ঘন্টে একটা নেংটি ইঁদুর ধরল। তারপর নেংটিটার লেজে দড়ি বেঁধে বক্স জানালার ওপর রেখে ওকে কী ডাকাডাকি। ডাকা মানে লোভ দেখানো।

তখন হুলো মিত্তির বাড়ি কার্নিসে হালকা ঘুম দিচ্ছিল। আড়মোড় ভেঙে দেখে সাহা বাড়ি জানালায় মেলা লোক। সবাই ওকে ডাকছে, একটা নেংটি দেখিয়ে—। ও আড়চোখে দেখল, কেউ কেউ লাঠি নিয়ে তাক করেও আছে।

ও এই তোমাদের প্ল্যান!

হঠাৎ হুলোটা দেখল ওদের বাড়ির রান্নার মাসিটাও জানালায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আর তখনই হুলো নিজেকে বলল, 'রান, হুলো রান!

এক রানে সে ও-বাড়ি সে-বাড়ি করে একদম সাহাবাড়ির রান্নাঘরে। আঃ সামনে ভাজা মাছ! এক থাবায় মুড়োটা নিয়ে সে ফিরে এল আগের জায়গায়।

তখন সাহাবাড়িতে হাউ মাউ খাউ চলছে। ইস অত্ত বড় মুড়োটা নিয়ে গেল। কী শয়তান বেড়াল মাগো! ও মা ষষ্ঠীর জীব না সাক্ষাৎ শয়তান!

হুলো কার্নিসে ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে মুড়োটা খেল। তারপর হাই তুলে সটকে গেল। এখন এখানে থাকা ঠিক হবে না। ওরা যদি রাগে রাগে মিত্তির বাড়ির ছাদে উঠে একটা টব টপকে দেয়, তাহলে হয়েছে আর কী!

তবু ঠাকুমার ওপর রাগ ওর মিটল না। কারণ, ওই ফোকলা ঠাকুমা মাছ খায় না। মাছের বদলে জামবাটি ভরা দুধ খায়। দুধ ওরও ভালো লাগে। তবে এখনকার দুধে তেমন টেস্ট নেই। আজকাল আবার দুধে কীসব ভেজাল টেজাল মেশাচ্ছে। আর মাছগুলোই বা কী ভালো আছে? সব মাছের গায়েই তো বরফের গন্ধ! টাটকা জিনিস কী আর লোকে খায় না?

তবে হুলোটা একজনকে খুব বিশ্বাস করে সে হল ওই সাদা ফ্ল্যাটবাড়ির চারতলার ছোট্ট মেয়েটাকে। মেয়েটার নাম বার্বি। ওই মেয়েটার কোলে হাতেও সব সময় একটা পুতুল থাকে। তার নামও বার্বি। মেয়েটা খুব ভালো। ওকে কোনওদিন দেখে 'হুস যা' বলেনি, বরং কত সুন্দর করে 'আয় আয়' করে ডেকেছে। ওকে দেখে দেখে ভাত খায়। ওকে খাওয়ার জন্যে বিস্কুট ছুঁড়ে দেয়। ওর ছোঁড়া বিস্কুট অবশ্য এত দূর এসে পৌঁছয় না। তার আগেই মাটিতে পড়ে যায়। আর পাড়ার কালু কুকুরটা খায়। একদিন ও কালু কুকুরকে বলেছিল, 'আমার ভাগের বিস্কুটগুলো রোজ খাচ্ছিস! বাঃ!'

কালু বলল, 'বেশ করেছি, হিম্মত থাকে তো নীচে নেমে বিস্কুট নিয়ে যা।'

হুলো বলেছিল, 'ভিকিরি!'

কিন্তু সেদিন হল কী ওই ছোট্ট মেয়ে বার্বি বিস্কুট ছুঁড়তে গেলে ওর হাত ফসকে পুতুলটা পড়ে গেল। পড়ল তো পড়ল কার্নিসে।

হুলো বুঝল এখান থেকে মেয়েটা পুতুলটা আর পাবে না। ওকে পেড়ে দেবে কে?

সে লাফিয়ে চলে গেল কার্নিসে তারপর পুতুলটা ফেলে দিল নীচে।

পুতুলটা নীচে পড়ে যেতে দেখে বার্বির মা কাজের মেয়ে মিনুকে পাঠাল নীচে থেকে পুতুলটা কুড়িয়ে আনতে। কাজের মেয়েটা চারতলা থেকে নামবে। তার তো একটু সময় লাগবে।

এদিকে নীচে ছিল কালু। সে বার্বি পুতুলটা পড়তেই থাড়িমাড়ি খেয়ে উঠল। তারপর তার কী মনে হল কামড়াতে গেল পুতুলটাকে।

এটা দেখেই জানালায় ছোট্ট মেয়েটা কেঁদে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে হুলো কালুকে বলল, 'এই পুতুলটা কামড়াবি না।'

কালু বলল, 'বেশ করব কামড়াব। ওটা আমার গায়ের ওপর পড়ল কেন?' বলেই সে খ্যাক করে পুতুলটা ধরতে গেল।

হুলো বলল, 'কালু সাবধান! পুতুলটা যদি কামড়েছিস, তাহলে তোর একদিন কি আমার একদিন!'

কালু বলল, 'তাই না কি দেখি দেখি। পুতুলটা আমি কামড়ে ছেঁদা করে দেব আজ।'

হুলো আর সুযোগ দিল না। কার্নিস থেকে লাফিয়ে পড়ল কালুর পিঠে। পুতুল ছেড়ে কালু দিল হুলোকে কামড়ে।

হুলো লড়ে গেল যতক্ষণ না কাজের মেয়ে মিনু আসে। মিনু এসে পুতুলটা তুলে নিল কোলে।

ততক্ষণে রক্তাক্ত হুলো আবার কার্নিসে। তার সারা গায়ে রক্ত। কালু তাকে বড্ড কামড়ে আর খামচে দিয়েছে। তার লোমগুলো রক্তে ভিজে লাল।

ফোকলা দাঁতের বুড়িটা আজ আবার মিস ইন্ডিয়া হয়ে হাসল। বলল, 'দেখ দেখ হুলোটা আজ আবার লাল হয়েছে!'

আজ আর হুলো রাগ করল না, বরং হাসল!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%