হুলো গাল ফুলো

জয়ন্ত দে

ওই যে সাদা আর মোটা মতো বিড়ালটা দেখছো, যার ঘাড় নেই, যার ধড়ের ওপর গোল মতো মাথা বসানো, যার বড় আর ফোলা লেজ—ওর নাম হুলো।

বাচ্চারা ওকে দেখলেই বলে— হুলো গাল ফুলো!

আর অমল সাহার বাড়ির নাতি ওকে দেখলেই বলে : হুলো রাঙা মুলো।

হুলো তার নামের সঙ্গে মুলো কথাটা একদম মেলাতে পারে না। এমনিতে সে শাক সবজি খায় না। আর মুলো তো খুব দুরছাই বস্তু। বিচ্ছিরি একটা গন্ধ। একবার ৫ নম্বরের নীচের তলার রান্নাঘরের কার্নিসে সে ছিল। শীতের রোদে লম্বা হয়ে ঘুমোচ্ছিল। ঘুমের মধ্যে নাক টানতেই নাকে এল মাছ রান্নার সুবাস। সে আড়মোড়া ভেঙে, খুব সাবধানে উঁকি মেরে দেখল, আরে এদের কী আক্কেল। রান্না ঘরে কেউ নেই, আর গামলায় মাছের ঝোল। সে দ্রুত জানলার গ্রিল গলে ঢুকে পড়ল। ঝোল থেকে বড় একটা মাছ নিল আলতো করে। তারপর বেরিয়ে এসে বসল কার্নিসে। রোদে পিঠ দিয়ে আরাম করে। আর তখনই আর্তনাদ শুনল, 'এ বাব্বা, হুলো শোল মুলোর ঝোল থেকে মাছ নিয়ে গেল রে...।'

কার্নিসে মাছটা রেখে হুলো গোঁফ টানল, শোল-মুলো মানে শোল মাছ মুলো দিয়ে! আহ!

কিন্তু খেতে খেতে বুঝল, মাছটা ঠিকই আছে কিন্তু বেআক্কেলের মুলোর গন্ধটা মাছে ঢুকেছে বেশ।

সেই থেকে মুলো শুনলেই ওর পিত্তি জ্বলে যায়। আর ঘন্টেকে দেখো, ওকে দেখতে পেলেই বলে, 'হুলো রাঙা মুলো'।

তা রাঙা মুলো বলে কেন?

কেন আবার, ঘন্টের ঠাকুমা একদিন পান খেয়ে তাক করে ওর গায়ে পিক ফেলেছিল। খয়েরের লাল রং হুলোর গায়ে অনেকদিন ছিল। সেই তখন থেকে ঘন্টের কাছে হুলো রাঙা মুলো।

হুলোকে লাল করে দেওয়ার জন্য ঘন্টে এখন নিত্য দিন ওর ঠাকুমাকে তাতায়। বুড়িও মিস ইন্ডিয়া মার্কা হাসি হেসে ওকে বলে, 'দাঁড়া না ওকে ঠিক মওকা মতো পাই—।'

হুলো শোনে আর গর্জায়— ছাই পাবে। দাঁড়াও তোমার বাটি ভরা দুধ যদি একবার আমি মওকা মতো পাই— চোঁ চোঁ করে টেনে নেব। না, অত সুযোগ না পেলে বাটি উল্টে ফেলে দেব। দু-তিনবার হুলো চেষ্টাও করেছিল পারেনি। অমল সাহার বাড়ি তো নয় রাবণের প্রাসাদ। থিকথিক করছে লোক। কারও নজর এড়ানোর উপায় নেই। উলটে ও-বাড়িতে গেলেই হাওয়াই চপ্পল থেকে খুন্তি যা কিছু উড়ে আসতে পারে। হুলো সিওর না হয়ে ধারে কাছে ঘেঁষে না।

কিন্তু ঘন্টে বা ওর ঠাকুমা ওকে মাঝে মাঝেই নানা লোভ দেখিয়ে ডাকে। কত রকম করে ডাকে। হুলো চুপ করে দেখে, দেখে যায়। প্রথম প্রথম দুএকবার ভুল করেছে। কিন্তু এখন সে বড় সাবধানী। না মারের ভয় নয়। ভয় তার লাল হওয়ার। ওই তো দেখো বুড়ি কচরমচর করে পান খাচ্ছে। আর ওর পাশে দাঁড়িয়ে ঘন্টে একটা নকল মাছ নিয়ে হুলোকে ম্যাও ম্যাও করে ডাকছে। হুলো যেন আসল নকল চেনে না— আয় হুলো মাছ দেব।

মাছ দেবে না ছাই দেবে! ওই নকল মাছটা পয়সা খরচ করে ঘন্টে মেলা থেকে কিনে এনেছে।

টোপ!

ওকে টোপ দেখিয়ে ডাকবে, আর ওই মিস ইন্ডিয়া বুড়ি ফচাং করে ওর গায়ে এক মুখ পানের পিক ফেলবে।

হুলো জানে— ঘন্টের হাতে ওটা নকল মাছ। তবু এই ভর দুপুরে সে চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখল। দত্তবাবু না!

ওর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সে উঠে দাঁড়াল।

ঘন্টে বলল, 'ঠাকুমা রেডি হও— হুলো আসছে।'

হুলো রেডি। সে এ কার্নিশ থেকে এক লাফে গলি পার হয়ে অমল সাহার কার্নিশে আসবে।

ঘন্টে রেডি।

ঠাকুমা লাস্ট মিনিট সাজেশনের মতো কচরমচর করে পান চিবিয়ে, মুখের ভেতর পিকটা গাল ফুলিয়ে মেপে নিল।

হুলো মাপছে। টাইমিংটা পারফেক্ট করতে হবে। আর দশ পা। আট পা, পাঁচ পা। হুলো বডি টানটান করে লাফ দিল। আর ঠাকুমা গাল খালি করে পুরো পানের পিক পিচকরির মতো পিচিক গতিতে ছুঁড়ে দিল।

হুলো কিন্তু লাফ দিয়ে অমল সাহার কার্নিসে গেল না। নীচের পাঁচিলে এল। কিন্তু ঠাকুমার টিপ নির্ভুল। পানের পিক এক্কেবারে গলিতে।

গলিতে নয় হাবুল দত্ত আর তার দজ্জাল বউয়ের গায়ে।

এ বাবা!

লে লে লে লাগ লাগ লাগ। এখন হাবুল দত্ত আর দত্ত গিন্নি ধুইয়ে দিচ্ছে সাহা বাড়িকে।

দত্ত ভার্সেস সাহা চলেছে, চলবে। আর হুলো কার্নিসে দাঁড়িয়ে ঘন্টের দিকে তাকিয়ে ফিচ ফিচ করে হাসছে। আর বলছে বল, বল— হুলো রাঙা মুলো।

এখন যদি একবার ঘণ্টে রাঙা মুলো বলে তবে হাবুল দত্ত নির্ঘাত ওর কান ছিঁড়ে নেবে।

অধ্যায় ১ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%