জয়ন্ত দে
হুলো ছাদের ওপর জলের ট্যাঙ্কের পাশে গম্ভীর হয়ে বসেছিল। এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। কী আর দেখবে রাস্তাঘাটগুলো এখনও ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। যেন প্রাণ নেই। লোকজন টুকটাক বেরুচ্ছে, দোকানপত্তরগুলো খুলছে, আবার খুলছে না। এতদিন তো সব দরজায় তালা এঁটে বসেছিল। হুলো বাপের জম্মে এমনটি দেখেনি।
হঠাৎ দেখল মেনি আসছে হেলতে দুলতে। মেনিকে দেখে হুলো আরও গম্ভীর হল। মেনি এসে থপ করে বসে পড়ল হুলোর পাশে। বিরক্ত হুলো গম্ভীর গলায় বলল, 'ম্যাও। সরে বস। অন্তত ছ-ফুট।'
ছ ফুট মানে ছটা লাফ। ছটা লাফ মেরে থপ করে বসল মেনি। বলল, 'উফ কী দিনকাল পড়ল গো দাদা! এক্কেবারে ছয়ে ছক্কা!'
'নইলে অক্কা!' হুলো বলল। 'তা তুই এই সময়ে পাড়া বেড়াতে বেরিয়েছিস কেন?'
'কী করব বলো দাদা মানুষদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম করলে চলে, কিন্তু আমাদের কি তা করলে হয়?' কথাটা বলে মেনি ফিক করে হাসল।
হুলো বলল, 'অ, তাইজন্যে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে আপিস করতে বেরিয়ে পড়লি!'
'আপিস আর করলুম কোথায়? সব বাড়িতে লোকজন ভর্তি, ঠিকমত এন্ট্রির নিতেই পাচ্ছি না। সেদিন মুখুজ্জে বাড়িতে একটু মুখ বাড়িয়েছি কী, বেআক্কেলে লোকটা হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা এমনভাবে ছুঁড়ল আর একটু হলেই আমার গোঁফ পুড়ে যেত।'
হুলো বলল, 'মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাসনি মেনি, তোর আবার গোঁফ গজাল কবে?'
লজ্জা লজ্জা মুখে মেনি বলল, 'আর বলো কেন দাদা বিউটিপারলারে না গিয়েই এমন কাণ্ড হয়েছে। তার ওপর সুখে দুঃখে মুখে একটু থাবা ঘষতাম, তারও উপায় নেই। মানুষের তো দুটো হাত, তাতে স্যানিটাইজার ঘষলেই হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চারটে। ঝক্কি বেশি!
হুলো বলল, 'যা ওইখানে সাবানজল করা আছে পাগুলো চুবিয়ে নে।'
মেনি এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিল। একটা বালতিতে জমে থাকা বৃষ্টির জলে একটা সাবান পড়ে। ও হরি কাল ঘণ্টের ঠাকুমা ওই জন্য সাবান সাবান করে চিৎকার করছিল। হুলোদাদা তাহলে মাছ দুধ ছেড়ে এখন সাবান চুরি করছে! হায় হায় কী দিনকাল পড়ল গো!
হুলো বলল, 'শোন, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। সব বাড়িতেই ওয়াশিং মেশিন ঘুরছে, সাবান জলের অভাব? মাঝে মাঝে যাবি হাত পা চুবিয়ে নিবি।'
'সে তো আমি নিচ্ছি। মাঝে সাঝে গড়াগড়িও খেয়ে নিচ্ছি। সেদিন সাবান জলে আমার গড়াগড়ি খাওয়া দেখে ৪ নম্বরের নতুন বউটি কী বলল জানো, আহা রে লকডাউনে দুধ না পেয়ে বেড়ালগুলো সাবান জল খাচ্ছে!'
হুলো বলল, 'মানুষগুলো বড্ড ফালতু বকে।'
'ফালতু নয় গো দাদা, প্রথমদিকে আতঙ্কে আমাদের লালু কুকুর কয়েক ঢোঁক সাবানগোলা জলও খেয়েছে।'
'লালুর আর কিছু হবে না, সারাদিন মানুষগুলোর সামনে লেজ নেড়ে নেড়ে ওর মানুষের স্বভাবই হয়েছে। পারলে ও মুখে মাস্কও পরত।'
মেনি বলল, 'অনেকদিন আগে, আমার ছেলেবেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে, বলব?'
ব্যাজার মুখে হুলো বলল, 'সংক্ষেপে বল।'
মেনি গুছিয়ে বসল, বলল, 'আমি যে বাড়িতে জম্মে ছিলাম, সেই বাড়ির এক দজ্জাল বউ তার ঝিয়ের হাতে দু টাকা দিয়ে বলল বেড়ালবাচ্চাগুলোকে বিদেয় কর। সেই ঝি আমাদের একটা ব্যাগে ভরে এক কাঠ বোঝাই গাড়িতে তুলে দিল। তারপর গাড়ি চড়ে গিয়ে পড়লাম এক অজপাড়াগাঁয়ে। গাড়ি থেকে নেমে দেখি, অবাক কাণ্ড। গোরুগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, সামনে নধর ধানচারা কিন্তু কেউ এক মুঠো খেতে পাচ্ছে না। খাবে কী সবার মুখে জালি দেওয়া। মুখ বন্ধ। এসব দেখে আমি বললাম না এই দেশে আমার পোষাবে না। আমার ভাই বোনেরা তখন সব নতুন দেশে মিউ মিউ করে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি আবার যে গাড়িতে গিয়েছিলাম সেই গাড়িতেই উঠে বসে থাকলাম। ব্যাস ফিরে এলাম আগের জায়গায়। আবার সেই বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। সবাই বলল, মেনির কী বুদ্ধি! আমি থেকে গেলাম এ পাড়ায়। ওই দেশে থাকলে আমি না খেতে পেয়ে মরতাম। দিত আমার মুখে জালি আটকে।'

হুলো বলল, 'সুযোগ পেলেই অন্যের জমিতে মুখ দেওয়া গোরুদের স্বভাব। মানুষের সঙ্গে মিশেমিশে গোরুগুলো মানুষের স্বভাব পেয়েছে আর কী। মানুষের স্বভাব দেখিস না, সুযোগ পেলেই অন্যের বিষয়ে নাক-মুখ গলিয়ে দেয়। তাই প্রকৃতি মানুষদের মুখেও গোরুর জালি এঁটেছে।'
কথাটা শুনে মেনি হেসে কুটোপাটি। 'যা বলছে দাদা, মুখে জালি পরা মানুষ দেখে আমার যা হাসি পাচ্ছে সে বলার কথা না। ওই যে ৪ নম্বর বাড়ির নতুন বউটা সারাদিন নখ খেয়ে খেয়ে হাতের নখ আর অবশিষ্ট থাকত না। শাশুড়ি এই নিয়ে কম কথা বলত। বউ গর্ব করে বলত এই অভ্যেস আমার ছোটবেলার। এখন সে অভ্যেস গেছে। হাতে দেখলাম পেতনিদের মতো কী সুন্দর নখ হয়েছে।'
কথাটা বলতে বলতে মেনি নিজের থাবাটা মুখের কাছে আনল, হুলো গাল ফুলিয়ে ধমক দিল, 'অ্যাই!'
আর ঠিক তখনই দূরবিনে চোখ রেখে সাহাবাড়ির ঘন্টে চিৎকার করে উঠল, হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!
মেনি বলল, 'ওই তোমার ডাক পড়ল গো দাদা!'
'বাঁদরটা ইস্কুলে যাচ্ছে না, অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। ওর লেখাপড়া হবে না।'
হুলো কান কুলো! হুলো গাল ফুলো! দূরবিনে চোখ রেখে ঘন্টে চিৎকার করছে।
মেনি লক্ষ করল, হুলো একটু রোগা হয়ে গেছে। আসলে এখন সব বাড়িতেই লোকজন গিজগিজ করছে। রান্নাঘর থেকে ঠাকুরঘর সর্বত্র বাড়ির লোক। তেমন কিছু হাতানো যাচ্ছে না। বাড়ির লোকজন হাত-তোলা করে যা দিচ্ছে তাই খেতে হচ্ছে। লালু কালুর তো অবস্থা আরও সঙ্গীন। কথা বলে কুকুরের পেট ভরে না। এখন সত্যিই ওদের না-ভরা পেট। সেদিন কালু তো খুব বিষণ্ণ গলায় বলল, 'আমাদের বড় বড় বাবু বিবিরা খেতে দেয় না, আমরা নেড়ি। আমাদের খেতে দেয় ছোট ছোট দাদা দিদিরা, এখন ওদের ঘরেই টান, কী দেবে?'
লালু বলল, 'ঠিক কথা! এত্ত বড় একটা আমপান্না ঝড় গেল কত কিছু উড়ে এল রাস্তায়, কারও ফ্রিজ খুলে দু দশ টুকরো চিকেন তো উড়ে আসতেই পারত।'
কালু বলল, 'মেনি দেখিস, বড় কোনও দাঁও মারতে পারলে কালু লালুকে ভুলিস না।'
হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো! হুলো কান কুলো! হুলো লেজ ঝুলো।' ঘন্টে আবার চিৎকার করল।
মেনি বলল, 'ডিসগাস্টিং! না, দাদা তুমি একটা বিহিত করো। নইলে আমি ওই ঘন্টেকে দেখে নেব।'
হুলো বলল, 'ছেড়ে দে পোলাপান!'
'ও পোলাপান না, ও বাঁদর। আমি আজ ওর বাঁদরামি ঘোচাব। ' কথাটা বলেই মেনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। তারপর খুব দ্রুত হুলো দাদার করে রাখা সাবান জলে গা-পা-মাথা-লেজ ভিজিয়ে লাফে লাফে চলে গেল সাহাবাড়ির দিকে। হুলো হাঁ করে বসে থাকল মেনির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।
কিছুক্ষণ বাদে মেনি ফিরল।
হুলো বলল, 'তুই গেলি কোথায় অমন হন্তদন্ত হয়ে?'
মেনি আয়েস করে বসে বলল, 'হেস্তনেস্ত করতে। করে এসেছি, এবার টেরটি পাবে বাছাধনরা।'
হুলো বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল মেনির দিকে। তার সঙ্গে সাহাবাড়ির এক অঘোষিত যুদ্ধ চলে। কতবার সে কত বুদ্ধি খাটিয়ে ওদের টাইট দিয়েছে। কিন্তু আজ মেনি এত তাড়াতাড়ি ওদের কী টাইট দিল? মেনির তো হেব্বি বুদ্ধি তাহলে! রোজ দুধ পায় না তাও বুদ্ধিমতী!
হুলো বলল, 'তা কী হেস্তনেস্ত করলি, শুনি?'
মেনি গর্বে ফেটে পড়তে পড়তে বলল, 'ওই যে যাওয়ার সময় সারা গায়ে সাবান জল মেখে গেলাম দেখলে না।'
'হ্যাঁ, সে তো স্যানিটাইজ করলি!'
'না, না, আমি সাবান জল মেখে গিয়ে ওদের তিনতলার সিঁড়িতে গড়াগড়ি খেয়ে এলাম। এবার শুধু অপেক্ষা যে পা দেবে সে-ই চিৎপটাং!'
মেনির কথা শুনে লাফিয়ে উঠল হুলো, 'সর্বনাশ! তুই কাজটা একদম ঠিক করিসনি মেনি!' কথাটা বলতে বলতেই হুলো লেজ তুলে দৌড়াল।
দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল কালু লালুর কাছে। বলল, 'খুব তাড়াতাড়ি এক প্যাকেট ময়লা দে। তবে খুব বাজে কোয়ালিটির মাল দিস নে। এই আনাজের খোসা, ডিমের খোলা আছে এমন দেখে দে।'
লালু দু বার নাম টেনে বলল, 'তোমার ফলের খোসা চলবে? ওই তো ওইটা নিয়ে যাও। এখুনি ফেলে গেল, ওতে শুধু আনারসের খোসা আছে।'
হুলো লাফিয়ে আনারসের খোসা ভরা প্যাকেটটা কামড়ে ধরে নিয়ে চলল সাহাবাড়ির দিকে।
কালু বলল, 'যা বাব্বা কী দিন এল বেড়াল খাবে ফলের খোসা।'
লালু বলল, 'অবস্থা বেগতিক হলে বাঘেও শুনেছি ঘাস খায়।'
দু'জনেই কথা শেষ করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু শোয়ার কি যো আছে। ততক্ষণে সাহাবাড়িতে ধুন্ধুমার কাণ্ড লেগে গেছে। অমল সাহা, ঘন্টের বুড়ি ঠাম্মা বারান্দায় এসে চিল চিৎকার করছে ওই তো, ওই তো, ওই হতচ্ছাড়া হুলোটা যাচ্ছে। ওরই কীর্তি। ডাস্টবিন থেকে রাজ্যের ময়লা তুলে এনে সিঁড়ির ওপর ফেলে ছড়িয়ে গেল। ওকে পাই একবার, ওর চারটে ঠ্যাংই খোঁড়া করে দেব।'
কালু বলল, 'এটা কিন্তু ভেরি ব্যাড। প্রতিবেশীর সঙ্গে এটা হুলো ঠিক করল না। এটা ক্রাইম!'
লালু তার কুকুরের ঘেউ ঘেউ গলা ছেড়ে মিউ মিউ করে বলল, 'এই ক্রাইমের সঙ্গে আমিও যে জড়িয়ে গেলাম রে কালু। হুলোকে যে মালটা আমিই সাপ্লাই করেছি।'
ততক্ষণে হুলো রাজকীয় ভঙ্গিতে জলের ট্যাঙ্কের ওপর।
মেনি বলল, 'খুব ভালো কাজ করেছ হুলোদাদা। আমি গিয়ে শান্তির জল ছিটিয়ে এসেছি, এবার তুমি গিয়ে বোম ফেলে এলে।'
হুলো গম্ভীর গলায় বলল, 'আমি বোম ফেলতে যাইনি। তুই ওদের সিঁড়িতে যে পাপ করে এসেছিলি আমি তার প্রায়শ্চিত্ত করে এলাম। আমি ওই ময়লাগুলো ফেললাম বলে ওরা সিঁড়িগুলো ধোবে, পরিষ্কার করবে। তোর দেওয়া সাবান জলে পা পিছলে পড়ে আর কারও বিপদ হবে না।'
হুলো দাদার কথা শুনে মেনি হাঁ! তার ভাবটা এমন, যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর!
হুলো বলল, 'এখন দিনকাল ভালো নয়, হাসপাতালে গেলে উটকো রোগ এসে ঘরে ঢুকবে। ওই সাবান জলে ওদের পা নয় প্রাণ যাবে, বুঝেছিস।'
মেনি বলল, 'ওই দেখো।'
হুলো দেখল অমল সাহা একটা লাঠি নিয়ে ছাদে। দূর থেকে হুলোকে দেখাচ্ছে। সাহাবাবুর পাশে ঘন্টে।
মেনি বলল, 'ওরা এদিকে আসবে না তো হুলো দাদা, আমি কেটে পড়ি। তোমাকে পেলে কিন্তু মেরেই ফেলবে।'
হুলো বডি টান টান করে হাসল, 'ওরা আনারসের ভেতরে বোম পুরে হাতিকে খাইয়ে প্রাণ নিল, আর আমি আনারসের খোসা ফেলে ওদের প্রাণ বাঁচালাম, কেউ বুঝল না। মানুষগুলো আর মানুষ হবে না।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন