জয়ন্ত দে
সেদিন সাত সকালে ঘন্টে সারা পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করল: হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!
হুলো তখন গণপতি এনক্লেভের আগরওয়ালবাবুর হুপহুপ করা ব্যায়াম দেখছিল। এমন সময় ঘন্টের চিৎকার।
ছেলেটা একদম সভ্য-ভদ্র নয়। হুলো গাল ফুলো বলছিস বল, তাবলে বলবি— হুলো রাঙা মুলো! বেড়ালের সঙ্গে একটা মুলোর তুলনা করতে আছে?
হুলো একবার ওর দিকে তাকিয়ে বলল: মিঁয়াও ম্যায় মিয়া..। আমি হুলো তোর জ্বালায় কানে দিয়েছি তুলো।
ঘন্টের চিৎকারে আগরওয়ালের যোগব্যায়ামে ছেদ পড়ল। সে একবার জানলার সামনে এসে এদিক ওদিকে দেখে খেতে বসে গেল। খাবার প্লেটে আছে চারটে কচুরি, চারটে জিলিপি।
দুচোখ বন্ধ করে সে যখন খাচ্ছে হুলো তখন সটকে গেল। হুলো জানে, আগরওয়াল খাবার সময় চোখ বন্ধ করে খায়। আগরওয়ালকে কোন এক গুরুদেব বলেছে, চোখ বন্ধ করে বেশি খেলেও নাকি শরীর জানতে পারে না। তাই মেদ জমে না। আগরওয়াল তাই করে।

হুলো কোনওদিন আগরওয়ালের খাবারে লোভ দেয়নি। ওরা সব ঘেসোবাবু। সবজি বানায় আর খায়। রোটি খায়। যা হুলোর ঠিক চলে না। হুলো মনে করে, আগের জম্মে সে বাঘ ছিল। হালুম হুলুম করে ঘুরে বেড়াত। সে কেন ঘাস পাতা খাবে?
তবে আগরওয়াল ভালোবেসে তাকে কখনও সখনও টুকরো-টাকরা খাবার ছুঁড়ে দিয়েছে। হুলো সে খাবার শুঁকেও দেখেনি। কিন্তু আগরওয়ালদের কিচেনের দুধে দু একবার ট্রাই নিয়েছিল। পারেনি। গ্রিল থেকে জানলা এক্কেবারে সিলড প্যাক। নজরদারিও বহুত কড়া। হুলো আর চেষ্টা করেনি। শুধু দেখেছে ওদের বাড়িতে রোজ দু প্যাকেট দুধ আসে। লোকজন এলে চার হয়।
আগরওয়ালদের ফ্ল্যাটের জানলা ছেড়ে ওপরে উঠতেই ঘন্টের সঙ্গে দেখা। ঘন্টে ওকে সুতোয় বাঁধা একটা প্লাস্টিকের ইঁদুর দেখাল। হাত তুলে সুতোয় বাঁধা ইঁদুর দেখিয়ে ডাকল হুলো আয় আয়! হুলো ক্যাচ!
হুলো একবার ওর দিকে তাকাল। তারপর এক পা তুলে নাকের সামনে ঘষল ফ্যাচ! তুই আমায় কী ভাবিস রে ঘন্টে! আমি তোর মতো বোকা। একটা প্লাস্টিকের ইঁদুর দেখে লম্ফঝম্ফ করব।
ঘন্টে তখনও হুলোর জন্য লম্ফঝম্ফ করে যাচ্ছে। হুলো কাম। কাম হুলো কাম অ্যান্ড ক্যাচ!
হুলো এসে এদিকে কার্নিসে টান টান হলো। তার ভালো লাগছে না। মনমেজাজটা খিঁচড়ে আছে। আশপাশের সব বাড়িগুলোর মানুষজনের খাওয়া দাওয়া বড্ড কমে গেছে। সবাই এক ফোঁটা এক ফোঁটা জিনিস আনে, তাই টিপে টিপে খায়। একটু যে ফেলে ছড়িয়ে খাবে, সে মন যেন কারও নেই। অথচ পকেটে পয়সা তো কম নেই।
হুলোর মনে হয় এখনকার লোকজনরা খেতেও জানে না, খাওয়াতেও জানে। আগে চুরিচামারি না করতে পারলেও এঁটোকাঁটা খেয়ে পেট ভরে যেত। এখন চুরিচামারির সুযোগ কমছে। সবাই তো রান্না করছে আর টপাটপ ফ্রিজে ভরে দিচ্ছে। ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করছে আর খাচ্ছে। মাছ কিনছে, মাছের কাঁটা বাজারে রেখে আসছে। বড় দুর্দিন। বেড়াল কুকুর পাখপাখালি আর বাঁচবে না।
হুলো খায় কম। সামান্য কিছু ম্যানেজ করতে পারলে চলে যায়। কিন্তু আশপাশের সবার অবস্থা দেখে ওর মনমেজাজ খিঁচড়ে থাকে।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের থেকে এখন খারাপ অবস্থা।
তারওপর এখন কেউ রাস্তায় এঁটোকাঁটা ফেলে না। পাড়ায় পাড়ায় বাঁশি বাজিয়ে করপোরেশনের গাড়ি আসছে। তারা ময়লা কালেক্ট করে। বাড়ির বাড়তি খাবার আর খাবার থাকছে না ময়লায় পরিণত হয়ে, প্যাকেট বন্দি হয়ে তাদের গাড়িতে উঠে যাচ্ছে।
এই তো সেদিন বোসবাবুর বউ এ-ফ্ল্যাট থেকে ও-ফ্ল্যাটের বাপ্পার মাকে বলল, আমার কর্তাটি একটা হাঁদারাম, সবাই ঠকিয়ে দেয়। এই তো দেখো না, কাল উনি ট্যাংরা মাছ আনলেন বাজার থেকে। সব মাছগুলো পচা। রান্না করেও সব মাছগুলো ফেলে দিলাম ময়লার গাড়িতে।
বোসগিন্নির কথা শুনে হুলোর মনটা হু হু করে উঠল। মনে হল, গিয়ে বোসগিন্নিকে বলে মাছগুলো তো পাঁচিলের ধারে ধরে দিতে পারতে তা না, এক্কেবারে ময়লার গাড়িতে চালান করে দিলে। ছিঃ! যাই বলো কাজটা ভালো করোনি।
পরক্ষণে অবশ্য মনে হয়েছিল, বোসবাবু মোটেই হাঁদারাম নয়। আর উনি কি বাজার থেকে ডাহা পচা মাছ কিনে নিয়ে আসবেন? বোসগিন্নি হয়তো ঠিক কথা বলছে না। মানুষগুলো যে কেন অহেতুক মিথ্যে কথা বলে কে জানে!
হুলো দেখেছে জানলা থেকে জানলা, বারান্দা থেকে বারান্দায় যে কথাগুলো এদিক ওদিকে করে তা বেশিরভাগই গালগপ্প। এ পাড়ার লোকেরা বলে আদুলিপিসির একুশটা বেড়াল আছে, তাদের সাতাশটা ছানাপোনা। অথচ হুলো নিজে গিয়ে চেক করে এসেছে। আদুলিপিসির সাতটা বেড়াল আছে। পিসি তাদের খুব যত্নে রাখে। আর মানুষগুলো অহেতুক জেলাস করে।
পাশের পাড়ায় থাকে রোজিদিদি। সে রোজ অফিস থেকে ফিরে এক হাঁড়ি ভাত রান্না করে পাড়ার পাঁচ ছয়টা কুকুরকে খাওয়ায়। এই দেখে কত লোকের কত কথা। কেউ বলে, ও রোজি তোর আর বিয়ে হবে না। তোর বর এই কুকুর দেখে পালিয়ে যাবে। কেউ বলে, ও রোজি, আমি রিটেয়ার করার পর আমাকে খাওয়াস।
হুলো কার্নিশে ঝুলতে ঝুলতে এই সব আহাম্মুকদের কথা শোনে। তোরা তো ভালো কাজ কিছু করিস না। একটা ভালো মেয়ে ভালো কাজ করছে, তোরা তাকে টেনে ধরছিস?
হুলো আপনমনে কার্নিশে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে দিনকাল ভালো নয়। তবে হ্যাঁ কুচকুচে কালো বেড়ালদের ভালো। তাদের একটা দর আছে। একদিন চায়ের দোকানের একজন বলছিল, চীনে নাকি কালো বেড়ালের খুব দাম। তবে হ্যাঁ, এখানেও সাদা বেড়ালদের দাম আছে। আভানি রেসিডেন্সির এক মোটা বউদি পারস্য থেকে নাকি বেড়াল এনেছে। শুনে হুলো গিয়েছিল সচক্ষে দেখে আসতে। বিউটিফুল দেখতে। গোল মুখ। গুল্লু গুল্লু চোখ। গায়ে এই এত্ত বড় বড় লোম। মাথার লোমগুলো আবার ঝুঁটির মতো করে বউদি চুল বেঁধে দিয়েছে। লেজ তো নয় সাদা ফুলের থোকা। কী নরম, মিহি গলার স্বর। চুল বেঁধে, পায়ে মোজা পরে বউদির কোলে ডুবে আছে। মাঝে মাঝে লিপস্টিকের মতো জিবটা বের করছে আর ঢোকাচ্ছে।
সেই সব দেখে ফেরার পথে হুলো আগরওয়ালদের জানলার সামনে দাঁড়াল। এখানে একটু সরলেই একটা আয়না। আয়নায় নিজেকে দেখল হুলো। শরীর ফোলাল, লেজ তুলল, একটা পা তুলে থাবা দেখাল, এবার গাল ফুলিয়ে গোঁফ দেখল তাকে ঠিক ছবির বাঘের মতো লাগছে। ঠিক এমন সময় ঘন্টে তাকে দেখতে পেয়ে গেল। আবারও চিৎকার করে। হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!
উঃ সেই কবে ঘন্টের ঠাকুমা হুলোর গায়ে পানের পিক ফেলে ওকে লাল করে দিয়েছিল। রাঙা! সেই খুশিতে ঘন্টে এখনও আছে। অথচ হুলো সেই এক গা পানের পিকের লাল রঙ ছাদে শুকতে দেওয়া ঘন্টের ঠাকুর্দা অমল সাহার পাঞ্জাবিতে ঘষে দিয়ে এল। সাদা পাঞ্জাবি লাল করে দিল। সেটা কেউ দেখল না?
মানুষগুলো এমনই শুধু এই করেছি, সেই করেছি এটা বলতেই ব্যস্ত! নিজে যে কত হাবুডুবু খায় সেটা কেউ বলে না।
* * *
সেদিন এ পাড়ার ভেতর মারাত্মক একটা কাণ্ড ঘটে গেল। ভোর হতেই দেখা গেল কালুর ভাই বালু মরে পড়ে আছে বোসবাবুদের গ্যারাজের সামনে। সাতসকালেই খবর পেয়েছিল হুলো। কালু ওপর দিকে মুখ তুলে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছে তাকে। হুলো ছাদ থেকে নেমে এসে দেখে গেল বালুকে। কিন্তু দেখেই তার কেমন যেন সন্দেহ হল। এ মৃত্যু সহজ নয়। বালুর এমন কিছু বয়েস হয়নি। তেমন কোনও রোগভোগের খবর হয়নি আগে। না, কোনও গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের কেস নয়। তবে?
ভোরের আলো ফুটে সকাল হল। এমন সময় কানা কাক বিচ্ছিরি একটা খবর নিয়ে এল। ও-পাড়ায় নাকি আরও দু দুটো কুকুর মারা গেছে। হুলো কথাটা শুনে লেজ খাড়া করে এ-ছাদ থেকে ও-ছাদে লাফ দিল। তারপর ও-ছাদ এ-ছাদ, এ-পাঁচিল ও-পাঁচিল করে এক্কেবারে রোজিদিদিদের বাড়ির সামনে। গ্যারাজের চালে। দেখল রোজিদিদি হাপুস হয়ে কাঁদছে। কেউ বলছে অজানা রোগ। কেউ বলছে বিষ প্রয়োগ। তারও একটু পরে করপোরেশনের গাড়ি এল। মৃতপ্রাণী বহনকারী গাড়ি! দু দুটো মড়া কুকুর তুলে নিয়ে গেল। তারা চিৎকার করে বলছিল, 'এদিকে পাঁচটা কুকুর এক রাতে মারা গেছে। চারটে তুললাম। এবার পাশের পাড়ায় যাব।'
তাদের গাড়ি চলতে শুরু করল। হুলোও লাফ দিয়ে দিয়ে চলল তাদের সঙ্গে। এবার বালু।
করপোরেশন এসে বালুকে তুলে নিয়ে ভট ভট করে চলে গেল। কালু শুধু ঘেউউ ভেউউ করে কাঁদল। হুলো কালুর মাথার ওপর গণপতি এনক্লেভের এক জানলার সানসেডে ঘুরছিল। হঠাৎ অমল সাহা চিৎকার করে বলল, 'এই হুলো দেখে খাস। খাবারে কেউ বিষ দিচ্ছে। সাবধান বাবা।'
কথাটা শুনে হুলো চমকে উঠল। এটা সে আগেই সন্দেহ করেছে। অমল সাহা নতুন কিছু বলল না। কিন্তু হুলো একটা নতুন কথা শুনল। কী আশ্চর্য অমল সাহা তাকে সাবধান করছে! অমল সাহা তার ভালো চায়! বলছে, দেখে খাস, সাবধান বাবা!
অমল সাহা আবার চিৎকার করল, 'এই হুলো শুনছিস, কী বললাম। সাবধান কিন্তু। চুরিচামারি করছো, করো। রাস্তার ভালো মন্দ খাবারে মুখ দিও না। তাহলে সোজা মা ষষ্ঠীর কাছে। ওপরে।'
হুলো হ্যাঁ করে অমল সাহার কথা শুনল। লোকটা তাকে এত ভালোবাসে! অথচ হুলোর সারাদিন রাত লড়াই চলে এই সাহাবাড়ির সঙ্গে। ঘন্টে, তার ফোকলা ঠাকুমা, ঠাকুর্দা অমল সাহা তার হিট লিস্টে! অথচ—
অমল সাহা আবার হুলোর দিকে তাকায়, 'কী রে জুল জুল করে কী দেখছিস? ব্যাটা আমাদের রান্নাঘরে উঁকি ঝুঁকি দিলেই তোকে পেটাব। তোর ঠ্যাং ভাঙব।'
অমল সাহার কথায় উৎসাহী হয়ে ঘন্টে চিৎকার করে ওঠে, 'হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!'
ঘন্টের কথায় হুলো আজ আর ভেংচি কাটল না। পা তুলে লাথি দেখাল না। ফ্যাচ ফ্যাচ করল না। বরং কিছুটা মাথা নিচু করে সানসেড থেকে কার্নিস হয়ে ছাদে উঠে গেল। সারাদিন এ-পাড়া সুনসান হয়ে থাকল।
হুলো দেখল কালু, লেজ কাটা, খোঁড়া, ভোলা আরও সব কুকুরের দল তারা আজ প্রায় সবাই পাড়া থেকে উধাও।
বিকেলের দিকে দেখা হল খোঁড়ার সঙ্গে। হুলো বলল, 'তোদের ব্যাপার কী? সবাই গেলি কোথায়?'
খোঁড়া উত্তর দেবে কী, আতঙ্কে সাট করে একটা খারাপ গাড়ির তলায় ঢুকে গেল। শুধু এক টুকরো কথা ভেসে এল, 'বাপরে দিন কাল ভালো নয়, মেরে দেবে।'
রাতেও কেউ একটাও কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনল না। সারা পাড়া যেন কুকুর শূন্য। একটা লক্ষ্মী প্যাঁচা, দুটো মেনি আর হুলো এ-পাড়ায় ঘোরাঘুরি করল।
পরের দিন দুপুরে ভোলার সঙ্গে দেখা। ভোলা একটু সাহসী টাইপের কুকুর। হুলো বলল, 'এই ভোলা পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন? তোকে কি পুলিসে ধরবে?'
ভোলা ঠান্ডা গলায় বলল, 'কয়েকদিন একটু সাবধানে থাকতে হবে।'
'কেন তোরা সবাই কি মার্ডার কেসের আসামি?'
'বাঁচতে চাইলে এলাকা ছেড়ে পালাও হুলোকাকা, কদিন ঘুরে বেড়িয়ে এসো।'
হুলো বলল, 'না, আমি এই পাড়া ছেড়ে যাব না।'
সেদিন রাত তখন প্রায় দুটো। লক্ষ্মী প্যাঁচাটা এসে ছাদের পাঁচিলে বসল। বলল, 'হুলোবাবু আপনাদের পাড়ার অবস্থা এমন লক্ষ্মীছাড়া কেন?'
পাড়ার নিন্দায় হুলো গম্ভীর মুখে বলল, 'লক্ষ্মীছাড়া হলে কি লক্ষ্মীপ্যাঁচা আসে?'
'না, না, কাল থেকে আমি আর এদিকে ভিজিট করছি না। এ-পাড়ায় একটা অলক্ষ্মী বিরাজমান! কেউ নেই, কিছু নেই, কী হবে এসে?'
হুলো মুখ বিচ্ছিরি করে বলল, 'কে থাকবে শুনি, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ?
এ-পাড়ার যে দু তিনটে ছাড়া মেনি আছে তারা এখন ভয়ে আতঙ্কে সন্ধ্যা হলে আদুলিপিসির বাড়ির চালে উঠে বসে থাকে। আর মাঝে মাঝে ম্যাও ম্যাও করে বলে, 'মাসি গো একটু ঠাঁই দাও।'
মাসি গাল পাড়ে, 'যা মুখপুড়ি, আমার এখানে তোদের ঠাঁই হবে না। তোরা সব পাড়া বেড়ুনে।'
হুলো একাই সারা পাড়ার ছাদে কার্নিসে ঘুরে বেড়ায়। আর আজ রাত আড়াইটে নাগাদ হুলো দেখল এ-পাড়ার ভেতর দুটো ছেলে এল। পিঠে তাদের ব্যাগ। মাথায় টুপি। একটা ছেলে আর একজনকে বলল,
—কী রে এ-পাড়ায় কটা মরেছে বললি।
—এ-পাড়ায় একটা। একটার অ্যাকশনে পুরো পাড়া ফাঁকা।
—ও-পাড়ায় দুটো মরেছে। দেখবি ও-পাড়া আরও ফাঁকা।
—নিশ্চিন্তে কাজ কর। চারটের মধ্যে হাওয়া হয়ে যাব।
হুলো কান খাঁড়া করে কার্নিসে নেমে এল।
ছেলেদুটো ছোট একটা লোহার রড বের করে বোসবাবু গ্যারাজের তালাটা কট করে কেটে ফেলল।
—অ্যা! তোর কাজে এত শব্দ হয় কেন?
—সরি। তালাটা হেবি। খুব দামি। মালটা ব্যাগে রেখে দিলাম।
—তোর যে কী ছ্যাঁচড়া স্বভাব! দশ হাজার টাকার সাউন্ড সিস্টেম ঝাড়বি। অথচ একটা দুশো টাকার তালাও ছাড়বি না।
হুলো বুঝল এরা চোর। বোসবাবুর গ্যারাজে রাখা গাড়ি থেকে সাউন্ড সিস্টেম চুরি করতে এসেছে।
হুলো দ্রুত কার্নিস থেকে উঠে বোসবাবুর জানলায় ঠক ঠক করল বেশ কয়েকবার। ওরে বাবা ভেতর থেকে নাকের গর্জন ভেসে আসছে।
হুলো নীচের গ্যারাজে এল।
ছেলেদুটো গাড়ির দরজা খুলে সাউন্ড সিস্টেম খুলছে। হুলো গ্যারাজে গেটে একটা ফলস লাফ দিল। দুম! ছেলেদুটো উঠে বসল। ওরা চোখ বড় বড় করে দেখছে। একজন হুলোকে দেখতে পেল। বলল, 'ভয় নেই একটা বেড়াল।'
—এবার বেড়াল মারারও ব্যবস্থা করতে হবে।
—ঠিক বলেছিস। যেমন করে গেটের ওপর লাফিয়ে পড়ল আর একটু হলে সবার ঘুম ভেঙে যেত।
—নে নে কাজ সার।
একটা ছেলে গাড়ির ভেতর মাথা ঢুকিয়ে আবার কাজে লেগে গেল। আর একটা ছেলে হুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
—মাছ খাবি? মাছ? দাঁড়া কাল তোর জন্য দু পিস মাছ এনে দেব।
হুলো বলল, 'ম্যাঁও!'
—দু পিস মাছ। খাবি আর মরবি। বেশি ম্যাও ম্যাও করতে হবে না।
হুলো আবার বলল, 'মিয়াও!'
ছেলেটা বলল, 'আমার হাতে দেখেছিস—এটা দিয়ে তালা ভেঙেছি। বেশি ম্যাও ম্যাও করলে এবার তোর মাথা ভাঙব।'
ছেলেটার কথা শেষ হল না, হুলো মুহূর্তে ঝাঁপ দিল ছেলেটার মুখ লক্ষ্য করে। নিমেষে দু থাবার নখে ছেলেটার মুখ ফালা ফালা।
ছেলেটা চিৎকার করে উঠল। চিৎকার শুনে গাড়ির ভেতর থেকে আর একটা ছেলে বেরিয়ে এসে হাতের স্ক্রু ড্রাইভারটা ধাঁ করে চালিয়ে দিল। হুলোর পেটের কাছে, অনেকটা কেটে গেল। এবার কিন্তু হুলো কামড়ে ধরল ছেলেটার নাক। নাক কামড়ে সে ঝুলে থাকল কয়েক মিনিট। ছেলেটা দড়াম করে পড়ল গাড়িটার গায়ে। হুলো কিন্তু তাকে ছাড়ল না।
প্রথম ছেলেটা তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করল। পারল না। তার চোখ মুখ ঢেকে গেছে রক্তে। আর দ্বিতীয় ছেলেটা বাবা গো মা গো করে চিৎকার করে চলেছে পরিত্রাহী। ততক্ষণে সারা পাড়ার লোক চলে এসেছে বোসবাবুর গ্যারাজের সামনে। একটা ছেলে কাতর স্বরে বলল, আমাদের বাঁচান স্যার। আমরা মরে যাব।
সবাই দেখল হুলোর সারা গা লালে লাল হয়ে আছে।
বীরদর্পে বোসবাবুর গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে এল হুলো। তারপর সাহাবাড়ির জানালায় ঘুম ভেঙে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন্টের দিকে তাকিয়ে বলল—মিয়াও ম্যাও।
আজ হুলো সত্যিকারের লাল! তারপর গা আর গাল ফুলিয়ে বলল, 'কী ঘন্টেবাবু চিৎকার করো। হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন