জয়ন্ত দে
হুলো কি সেলেব হল?
সে সেলেব না হলে সব সময় তার দিকে ক্যামেরা তাক করে আছে কেন? ওই দেখো, ঘন্টের ক্যামেরা চলছে। ঘন্টে চিৎকার করছে হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!
একটু ঘুমানোর জো নেই গো!
হুলো সবে একটু ঘুমানোর তোড়জোড় করছিল, তখনই এমন চিৎকার করল ঘন্টে যে ঘুমটাই পালাল।
হুলো বিরক্তিতে দু দুবার লেজটা আছড়াল। সামনের থাবাটা মুখের কাছে এনে নিজের গাল থাবড়াল। না, ঘন্টেকে থামানো যাবে না। ও চিল্লিয়েই যাবে। না, ঘন্টের চোখের আড়ালে যেতে হবে।
হুলো সরে এল এদিকের কার্নিসে। এদিকে বড্ড রোদ্দুর। সাতসকালেই এত রোদের তেজ! সে দু তিনটে লাফ মেরে উঠে এল ছাদে। ছাদে এসে দেখল মেনি ব্যায়াম করছে। ওরে বাবা মেনি কবে থেকে এমন শরীর সচেতন হল? এদিকে যাচ্ছে। ওদিকে যাচ্ছে। নাচন কোঁদন করছে। হুলো চুপ করে দেওয়ালের এক ধারে শুয়ে পড়ল। তখনই তার নজর পড়ল মেনি ব্যায়াম করছে না। খেলছে। আবার একা খেলছে না, তার থাবার সামনে একটা নেংটি ইদুর। নেংটিটা প্রাণ ভয়ে পালানোর চেষ্টা করছে। আর মেনি তাকে টেনে টেনে আনছে। কাছে আনছে। আবার ছেড়ে দিচ্ছে।
হুলো চোখ বন্ধ করল। ও মেনি তাহলে সক্কাল সক্কাল ইঁদুর শিকার করেছে। সকালবেলায় কোথায় দুধ খাবি, তা না মাংস খাবার জন্য দেখো শিকারে দৌড়েছে। কিন্তু মেনি খেলেই চলেছে। নেংটিটাকে মারছে না। মারার আগে খেলছে। হুলো বলল, আমি ঘুমাব। এখান থেকে ভাগ।
মেনি বলল, যাই গো দাদা। অনেকদিন পরে আজ একটা জ্যান্ত শিকার ধরেছি। ওকে সামনে রেখে একটু দৌড় ঝাঁপ করে নিচ্ছি। সকালের ব্যায়াম।
হুলো বলল, কুঁড়ের হদ্দ করছে ব্যায়াম!
হুলো বলল, নেংটিটাকে ছেড়ে দে। সকালবেলা ব্রেকফাস্টে সবসময় দুধ খাবি। বিস্কুট খাবি। পাউরুটি খাবি। তা না অসভ্যের মতো জ্যান্ত শিকার ধরে খাচ্ছে। কবে আর মানুষ হবি!
সে কপাল কি করেছি দাদা! সারাদিনে একটু দুধের মুখ দেখি না। ওই মজুমদার-বাড়ি ফটফটে সাদা রং করেছে, ওই বাড়ির দেওয়ালে গিয়ে জিব চেটে দুধের সোয়াদ পাই।
মেনির করুণ মুখ দেখে হুলো। মেনিটা বড্ড লোভী দুধের বদলে সাদা দেওয়াল! ছিঃ! জ্যান্ত শিকার বলতে নেংটি। হুলো বলল, যা যা এখান থেকে যা। আমার ঘুমের ডিসর্টাব করিসনি। সারা পাড়ার লোক এখন আমার ওপর ভরসা করছে। ভাবছে চোর ডাকাত এলে আমিই তাদের জব্দ করতে পারব। দেখছিস না, ইদানীং আমার কত খাতির। শুধু ওই সাহাবাড়ির ঘন্টেটা আর ওর ঠাকুমা—ওই দুজন শোধরাল না। একটু আগেই কেমন চেল্লাল।
ফিক করে হেসে মেনি বলল, শুনেছি। হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো! হুলোর পিঠে কুলো!
ম্যাও! রেগে উঠল হুলো। ঘন্টে 'হুলো গাল ফুলো। হুলো রাঙা মুলো।' বলেছে। তুই পিঠে কুলোটা জুড়ে দিলি?
হুলো রাগতেই নেংটি বলল, ও হুলো দাদা আমাকে ছেড়ে দিতে বলো। প্রাণে মেরো না। আমি আর কোনওদিন তোমাদের সামনে আসব না।

মেনি বলল, অ্যাঁছেড়ে দিতে বলো। হুলো দাদা কেন ছাড়বে? শিকার করেছি আমি। মারলে আমিই মারব। ছাড়লে আমিই ছাড়ব।
হুলো বলল, মেনি তুই বড্ড বেড়েছিস।
মেনি বলল, বাড়টা কী দেখলে।
হুলো বলল, এটা ভদ্রলোকের পাড়া।
মেনি বলল, আমি অভদ্র কাজটা কী করলাম?
হুলো বলল, সকালবেলা মানুষ গুড মর্নিং করে, আর তুই প্রাণী হত্যা করছিস?
মেনি বলল, কেন হবে না? বাবুরা মাছ মারছে না? মুরগি কাটছে না? খাসি ছাড়াচ্ছে না?
হুলো গম্ভীর গলায় বলল, ওরা ফুল মানুষ। আর আমরা মানুষ হচ্ছি। উন্নত দেশ আর আমরা উন্নয়নশীল দেশ দুটোর মধ্যে অনেক ফারাক আছে বুঝেছিস?
মানুষ হচ্ছি না, ছাই হচ্ছি। আমরা ভাবছি, কিন্তু ওরা কি ভাবছে? তাহলে অহেতুক তোমাকে হুলো গাল ফুলো। হুলো রাঙা মুলো করছে কেন?
হুলো বলল, শোন রাম রাবণের যুদ্ধ থেমেছিল, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেমেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সব থেমেছে। কিন্তু আমার সঙ্গে সাহাবাড়ির যুদ্ধ থামবে না।
কেন থামবে না? মেনি ঝট করে প্রশ্ন করল।
হুলো বলল, সে তুই বুঝবি না। যা যা মজুমদার বাড়ির সাদা দেওয়ালে জিব না চেটে ভট্টাচার্যদের বাড়ির নতুন ভাড়াটে এসেছে তাদের জানালার সামনে যা। ইকনমিক্সের প্রফেসর। ওখানে গিয়ে শোন। এটা গরিব আর ধনীর লড়াই। মালিক আর শ্রমিকের লড়াই। শোষক আর শোষিতের লড়াই। এ লড়াই চলছে, চলবে। যতদিন না আমাকে সাহাবাড়ির লোকজন মানুষ বলে স্বীকার করবে ততদিন আমি লড়ে যাব। দেখিয়ে দেব আমি শুধু হুলো নই। আমি এবং আমরা একটু একটু করে মানুষ হচ্ছি। আমাদেরও বুদ্ধি কম নেই। শুধু দুটো হাতের অভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। দুটো হাত শরীর থেকে মুক্তি পেলেই—
মেনি বলল, ঘন্টে তো হাতের কথা বলে না। বলে গাল ফুলো। খুব বাজে লাগে শুনতে। কিন্তু আমি কিছু বলি না, পোতিবাদ করি না। আসলে ওই বুড়ি ঠাকুমা আমাকে বড্ড ভালোবাসে। জানলায় দাঁড়িয়ে থাকলে তাড়ায় না। বরং বলে এই মেনি হুলোটাকে ডেকে নিয়ে আয়, আমি ওর গায়ে পানের পিক ফেলে ওকে লাল মুলো করে দিই।
হুলো কঠিন চোখে মেনির দিকে তাকাল। ম্যাঁও— বলল গদ্দার!
নেংটি বলল, ও হুলোদা আমাকে ছেড়ে দিতে বলো।
হুলো বলল, মেনি ওকে ছেড়ে দে। গিয়ে দুধ খা।
মেনি বলল, দুধ কোথায় পাব। তুমি দুধের ব্যবস্থা করে দাও, আমি ওকে ছেড়ে দিচ্ছি।
হুলো বলল, দুধ খাবি, ঠিক আছে যা। সাহাবাড়ির বুড়ির জানলার সামনে বসে মিঁউ মিঁউ কর। আমি তোকে আজ দুধ খাওয়াব।
মেনি এক গলা হেসে বলল, ঠিক বলছ?
হুলো গাল ফুলিয়ে বলল, ভরসা রাখ। জানলার ধারে বসে অপেক্ষা করবি। আজ বুড়ি তোকে দুধ খাওয়াবে।
হুলোর কথা শুনে চকচক করে উঠল মেনির চোখ। সে সড়াৎ করে জিব টানল। বলল, আমি তাহলে যাই হুলোদাদা, গিয়ে ওয়েট করি।
মেনি নেংটিকে ছেড়ে দিয়ে তড়াক লাফিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি করে সাহাবাড়ির তিনতলায় বুড়ির জানলার সামনে চলে গেল।
নেংটি বলল, থ্যাঙ্কু হুলো দাদা আজ বড্ড বাঁচা বেঁচেছি। তুমি না থাকলে এতক্ষণে আমি ব্রেকফাস্ট হয়ে মেনিদিদির পেটে চলে যেতাম।
হুলো বলল, শোন তোকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে, নইলে আমার থাবা খাবি।
তোমার কাজ, আমি নিশ্চয়ই করে দেব হুলো দাদা। নেংটি বলল।
হুলো বলল, নেংটি তোর গায়ে বড় গন্ধ। অনেকদিন চান করিসনি, তাই তো?
হি হি করে হাসল নেংটি। বলল, কোন নেংটি কবে চান করেছে দাদা? একমাত্র পা ফসকে জলে পড়লেই তবে চান হয়।
হুলো বলল, আজ তোকে চান করতে হবে।
বিষণ্ণ মুখে নেংটি বলল, হুলো দাদা তুমি কি সত্যি সত্যি মানুষ হয়ে গেছো? মানুষগুলোকে দেখেছি বলির আগে পাঁঠাকে চান করায়। তুমি কি আমাকে চান করিয়ে তারপর মারবে?
হুলো বলল, আমি তোকে মারব না, বাঁচাব। আমি যা বলছি মন দিয়ে শোন। যদি অন্যথা করেছিস, তাহলে আমি তোকে তুলে নিয়ে এসে মারব।
নেংটি বলল, আহা তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো—কী কাজ তুমি একবার বলেই দেখো না।
হুলো বলল, এখন সোজা যা। গিয়ে দেখ, সাহাবাড়ির বুড়ি ঠাকুমা এক জামবাটি দুধ নিয়ে বসে আছে। ঠান্ডা করছে। দুধ ঠান্ডা হলে পাঁউরুটি ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাবে। শোন, তুই গিয়ে ডাইরেক্ট ওই দুধের বাটিতে ড্রাইভ দিবি। দুধে পড়ে ভালো করে চান করবি।
নেংটি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, এ তো বাঘের থাবা থেকে রেহাই পেয়ে কুমীরের দাঁতে পড়লাম গো দাদা। ঘন্টে তো আমায় মেরে ফেলবে।
হুলো হাসল। ঘন্টে তোকে মারবে না। ঘণ্টে তোকে লেজ ধরে ঝুলিয়ে আমার মুখের কাছে ছুঁড়ে দেবে। তখন আমি তোকে মুক্তি দেব।
এক গাল হেসে নেংটি বলল, তোমার কী বুদ্ধি গো দাদা।
হুলো বলল, রেডি সেডি গো।
নেংটি পোঁ পোঁ করে দৌড়ে গিয়ে বুড়ির দুধে লাফিয়ে পড়ল। আহা দুধটা বেশ উসুম উসুম গরম ছিল। নেংটি দুধে পড়ে হাত পা ঘষে চান করে নিলে ঝটপট। কিছুটা খেলো।
দুধে ইঁদুর পড়তে বুড়ি হা হা করে উঠল। সারা বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। ঘন্টে এল একটা ইঁদুর-ধরা কল নিয়ে। এসে দেখল জামবাটির ভরা দুধে নেংটি দুর্দান্ত সুইমিং করছে। বাটির ভেতর গোল হয়ে পোঁ পোঁ ঘুরছে। ঘন্টে ওর লেজ ধরে টেনে তুলে ইঁদুর কলের বাক্সে ভরে ফেলল। এখন পুরো দুধটা নষ্ট। জানলায় বসে মেনি বলল, মিঁউ। মিঁউ। ও ঠাকমা ও দুধ খেও না। নেংটি খুব নোংরা। জন্মেও চান করেনি গো।
বুড়ি বলল, ওই দুধ তো আর খাওয়া যাবে না, ওই দুধটা মেনিটাকে দিয়ে দে।
দুধের বাটি এল জানলায়, মেনি চকাস চকাস শব্দে, হুশ হাশ করে দুধটা খেয়ে নিল। খেতে খেতে মনে মনে ভাবল, হুলো দাদার জবাব নেই। গিয়ে একটা থ্যাঙ্কু দেবে।
এদিকে ঘন্টে ডাকল হুলোকে।
আর রে হুলো গাল ফুলো।
হুলো আয়— আজ তোকে সত্যি সত্যি জ্যান্ত ইঁদুর দেব।
অন্য দিন হলে হুলো আসত না। কিন্তু আজ এল। এল কারণ নেংটিকে বাঁচাতে হবে। ঘন্টের ডাক শুনে সাড়ে তিন লাফে হুলো চলে এল প্রায় তার সামনে। এসে ভারী গলায় বলল—ম্যাও। দাও।
সারা বাড়ি লোকজন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। কল থেকে ইদুরটা লাফিয়ে পড়লে হুলো তাকে কীভাবে ক্যাচ কট কট করে তা দেখবে।
ঘন্টে এসে হুলোর মুখের কাছে নেংটিকে ছেড়ে দিল। হুলো নেংটিকে দেখল, কিন্তু কিচ্ছু করল না। ঘন্টের দিকে তাকিয়ে একটা অবজ্ঞার আওয়াজ করল— ফ্যাচ! ফ্যাচ!
বলল, নেংটি ভাগ।
নেংটি ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাল, তবে যাওয়ার আগে বলল, থ্যাঙ্কু হুলো দাদা। আবার একদিন দুধপুকুরে চান করার ব্যবস্থা করে দিও!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন