জয়ন্ত দে
ওই যে সাদা আর মোটা মতো বিড়ালটা দেখছো, যার ঘাড় নেই, যার ধড়ের ওপর গোল মতো মাথা বসানো, যার বড় আর ফোলা লেজ, ওর নাম হুলো।
বাচ্চারা দেখলেই বলে হুলো গাল ফুলো!
কিন্তু অমল সাহার নাতি ঘন্টে ওকে দেখলেই চিৎকার করে— হুলো রাঙা মুলো!
মুলোর কথা ভাবলেই হুলোর পিত্তি জ্বলে যায়। কিন্তু তার থেকেও বেশি রাগ হয় ঘন্টের ওই 'রাঙা মুলো' বলে ডাকটায়।
ঘন্টে যখন রাঙা মুলো বলে তখন ঘন্টের মিস ইন্ডিয়া ঠাকুমা কচরমচর করে পান খেতে খেতে একটা বাঁকা হাসি হাসে। যেন কী একটা মস্ত কাজ করেছে। সারা জীবনে তো কাজ করেছে একটা। একদিন তাক করে হুলোর গায়ে পানের পিক ফেলে তাকে লাল করেছে। হুঁ তার জন্যেই রাঙা মুলো বলে কী হাঁক ডাক। হুলোও তার বদলা নিয়েছে। একদিন ওই মিস ইন্ডিয়া ঠাকুমাকে এমন ভড়কি খাইয়েছে যে উনি পানের পিক ফেলেছেন দত্তবাবুর ওপর। তারপর কী ঝামেলা! কই সেটা তো ওদের মনে থাকে না। আর সাহা বাড়ির কম মাছের মুড়ো দাগা লেজা হুলো খেয়েছে, কই সেগুলোর কথা তো ওরা হিসেব করে না।
ওদের সব আনন্দ ওই একদিন হুলোর গায়ে পানের পিক ফেলে ওকে লাল করা! ছো!
হুলোর খুব ইচ্ছে একদিন ওই বুড়ি মিস ইন্ডিয়ার বাটি ভরা দুধ সাবাড় করা। কিন্তু কোনওদিন ঠিক মওকা পায় না। মনে মনে কত প্ল্যান করে সে। কিন্তু না সকাল, না রাতে দুধের বাটি যখন বুড়ির জন্য টেবিলে আসে তখন বুড়ির ফোকলা গালে অদ্ভুত একটা হাসি খেলে।
হুলো দুধের বাটিটা আগে দেখতে পায় না, সে বুড়ির মুখে হাসি দেখেই কার্নিস ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তখনই তার নজরে পড়ে টেবিলটা। টেবিলের ওপর দুধের বাটি। সেই সময়টা হুলোর চোখে দুধ-বুড়ি আর হাসি মাখামাখি হয়ে যায়।
আগে কিন্তু হুলোর এমন দুষ্টু ইচ্ছেটা ছিল না। কখনও কখনও বুড়ির দুধের বাটির দিকে তার নজর পড়ে গেলেও সে নিজেকে বকেছে। সে শিকার করে খায়, তা বলে তার কি কোনও ন্যায় নীতি থাকবে না? শিশু আর বয়স্ক মানুষের দুধে সে লোভ করে না। চা কফির জন্য দুধ রাখো, সেটা হুলো টার্গেট করে। পায়েস রাঁধার জন্য দুধ ফুটিয়েছো কী গন্ধে গন্ধে তোমার ঘরে হুলো এসে ঠিক হানা দেবে।
সব বার সে জিতবে না।
তোমার পাঁচদিন, হুলোর একদিন।
একদিন সে ঠিক দুধ সাবড়ে যাবে। একদিন সে ঠিক লেজাটা মুড়োটা নিয়ে সটকে যাবে।
তবে যেদিন থেকে বুড়ি হুলোর গায়ে পানের পিক ফেলেছে আর ঘন্টে ওকে রাঙা মুলো বলে ভেঙচেছে সেদিন থেকে হুলোর খুব রাগ। সে বুড়িকে জব্দ করবেই। করেওছে। উচিত শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেটাতে ওদের হম্বিতম্বি কমেনি। আসলে ওরা ভাবতে পারেনি ওটা হুলোরই পাতা ফাঁদ ছিল। ওরা ভেবেছে ওরা টিপে করে পানের পিক ফেলতে গিয়ে ফসকেছে। আসলে যে তাল করে ফসকানো হয়েছে এটা ওরা মানতে চায় না। মানুষগুলো এমনইনি। ওই যে কাল যেমন সাহা বাড়িতে একটা কীর্তি হল ওদের বাড়ির চায়ের দুধে ও পাড়ার মেনি বেড়ালটা এসে মুখ দিল। খুব একটা খেতে পারেনি। তার আগেই ওর পিঠে ডান্ডা পড়েছে। বেচারা এক পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে কার্নিসে এসে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, 'মিঁয়াও!'

হুলো ৩৩ নং বাড়ির জানলার সানশেডে আড়মোড় ভেঙে বলল, 'কী যে করিস, বোধ বুদ্ধি নেই! গরম দুধে মুখ দিয়ে মুখও পোড়ালি, ডান্ডাও খেলি!'
মেনি পিছনের পা-টা নাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। খুব ব্যথা। মোক্ষম ঝেড়েছে। সে বলল, 'ম্যাও!'
হুলো বলল, 'নিজেও খেলি না, পুরো দুধটা নষ্ট করলি! এখন দুখের কী দাম জানিস!'
মেনি বলল, 'মুখ যখন দিয়েই ফেলেছি, ওরা দুধটা আমায় খেতেই দিতে পারত। অথচ দেখো তার বদলে পেটাল!'
হুলো বলল, 'একটু অপেক্ষা কর, হয়তো দুধের কড়াটা জানলার সামনে ফেলে রাখবে। তখন আবার যাস।'
কথাটা শুনে মেনির ব্যথা পায়ে একটু আরাম লাগল। দেখা যাক। 'তবে একটু অপেক্ষা করি' বলে সে কার্নিসেই থেবড়ে বসল। কিন্তু বেশিক্ষণ বসতে হল না, একটু পরেই ঘন্টের মা চিৎকার করে বলল, 'আজ মাস্টারদের চা দিতে হবে না— সবাইকে এক গেলাস করে দুধ দিও!'
হুলো বলল, 'মেনি ভেগে যা! ও বাড়ির গাধাগুলো জন্য এক ডজন মাস্টার আসে। সেই মাস্টারদের আজ তোর এঁটো দুধ খাওয়াবে। মাস্টাররা ভাববে টিউশনি বাড়ি কী ভালো, কী ভালো! তোর ভাগে এক ফোঁটাও থাকবে না।'
গতকালের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হুলোর লোমগুলো সব ফুলো হয়ে গেল। আরে ব্যাপারটা কী! বলি হলোটা কী! অসময়ে বুড়ি টেবিলে এক বাটি দুধ রেখে যাচ্ছেটা কোথায়? বুড়ি যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
হুলো দু লাফে চলে এল জানলার ধারে। আজ সে মওকা পেয়েছে, বুড়ির সাধের দুধটা সাবড়ে যাবে। সে জানলার শিক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বুড়ি ধারে কাছে নেই। সে টেবিলের ওপর এসে বসল। না ঘন্টে নন্টে ঝন্টে কেউ কোত্থাও নেই। মিস ইন্ডিয়াও নেই। হুলো টেবিলে আরাম করে বসল। এবার সে আরাম করে দুধের বাটিতে মুখ ডোবাল।
আরে ছ্যা ছ্যা, এটা দুধ কোথায়!
এমন সময় ঘরের ভেতর বুড়ি ঢুকল কাজের মেয়ে টুনিকে সঙ্গে নিয়ে। সে এসেই হুলোকে দেখল।
এই টুনির হাতের টিপ অব্যর্থ! টুনির হাতে গতকালই মেনিটা চোট পেয়েছে। কথাটা ভেবেই হুলো লাফিয়ে উঠল। পালাবে। আর যেমন লাফিয়ে ওঠা টেবিলে থেকে দুধের বাটিটা পড়ল মেঝেয়।
মার মার মার—শুনতে শুনতে হুলো পালাল।
বুড়ি বলল, 'ইস শাড়িগুলোতে মাড় দেব বলে কতখানি অ্যারারুট গুললাম। সব ফেলে দিয়ে গেল বদমাইস বেড়ালটা।'
পালিয়ে যেতে যেতে হুলো বুঝল, 'সে আজ ঠকে গেছে। যাক বুড়িও বুঝতে পারেনি, সে দুধ ভেবে এসেছিল। দুধ ভেবে দু চুমুক অ্যারারুট গোলা জল খেয়েছে!'
সে লজ্জায় ছাদে উঠে এল। কেউ যদি বুঝতে পারে সে দুধ ভেবে অ্যারারুট গোলা দু চুমুক খেয়ে নিয়েছে তাহলে আর দেখতে হবে না। কিন্তু অ্যারারুট তার গায়ে লেগেছে। তার গা যে বড্ড চট চট করছে।
হুলো দেখল ছাদে অমল সাহার সাদা সাদা পাঞ্জাবি শুকনো হচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে একটা পাঞ্জাবিতে গা মুছল। গা মুছে অবাক হয়ে গেল। সাদা পাঞ্জাবিটা কেমন লালচে মেরে গেছে। লাল লাল ছাপা। বেশ নকশা! নকশার ওপর ডিজাইন!
হুলো মনে মনে বলল— ও হরি আমার গায়ে তাহলে এখনও বুড়ির পানের পিক লেগে আছে!
হুলো ফিক করে হাসল।
বেড়ালের এই হাসি মোক্ষম! তারপরে হাসতে হাসতে সে একটার পর একটা পাঞ্জাবির ওপর গড়াগড়ি খেল, আহা পাঞ্জাবিগুলো কেমন ডিজাইন হচ্ছে! আহা! আহা!
হুলো সাদা পাঞ্জাবিতে বিচ্ছিরিমতো লাল লাল ছোপ ফেলে আর বলে, 'হুলো রাঙা মুলো!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন