হুলো কেন ঝগড়া করে?

জয়ন্ত দে

হুলো গাল ফুলো! হুলো রাঙা মুলো!

ঘন্টে চিৎকার করে উঠল। এমন চিৎকার কোন মানুষের শুনতে কাঁহাতক ভালো লাগে? বেড়াল বলে কি হুলো মানুষ নয়? আচ্ছা ঘন্টে নয় ছেলেমানুষ, ও বলছে, কিন্তু ওকে কেউ থামাবে না? বলবে না, এই ঘন্টে হুলোকে গাল ফুলো বলিসনে, এই ঘন্টে হুলোকে রাঙা মুলো করিসনে।

রাগে দুঃখে অপমানে হুলো ঠিক করল, এ পাড়া ছেড়ে সে চলে যাবে, দেশান্তরী হবে। থাক তোদের বাড়ি, থাক তোদের পাড়া। তোদের পাড়ার কুকুরগুলো ভীতু, শুধু ভীতু নয় ভীতুর ডিম। চোর দেখলে দুবার ঘেউ ঘেউ করে গাড়ির তলায় গিয়ে ঢোকে। হোক তোদের পাড়ায় চুরি।

হুলো মনের দুঃখে জলের ট্যাঙ্কের ওপর শুয়েছিল। সে ঠিক করেছে আজ রাতে সে এখান থেকে নামবে না। সারারাত সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে পাহারা দেবে না। হুলো জলের ট্যাঙ্কে চড়ে আকাশের দিকে হাই তুলে বলল, বুঝবে বুঝবে আমি যাই, তখন ওরা বুঝবে। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিলি না!

হঠাৎ হুলো দেখল জল ট্যাঙ্কের নীচে দাঁড়িয়ে মেনি মিঁউ মিঁউ করছে। মানে তাকে ডাকছে। হুলো নীচে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, এই এক ঝামেলাবাজ মেয়ে, সারাদিন নানা ঝামেলায় জড়িয়ে এখানে এসে মিঁউ মিঁউ করবে। এখন আবার কোন ঝামেলা বাধিয়ে এল দেখি।

হুলো বলল, 'কী হলটা কী?'

মেনি বলল, 'দাদা তুমি মানুষ হতে চাও! মানুষরা ভালো নয় দাদা। ওরা মাছ খায় না, পচায়।'

'বেশ করে তোর তাতে কী? ওদের আছে ওরা পচায়।'

মেনি করুণ মুখে বলল, 'ওই যে একা থাকে যে বুড়িমা, মুখার্জি দিদা। তুমি তো আমাকে বলে দিয়েছ, ওর ঘর থেকে কিচ্ছুটি চুরি করবি না। আমি অক্ষরে অক্ষরে তোমার কথা ফলো করি। চুরি করি না, সকালে গিয়ে দাঁড়াই, মুখার্জি দিদা আমাকে একটা বিস্কুট চার টুকরো করে দেয়। আমি খেয়ে চলে আসি।

হুলো গাল ফুলিয়ে বলল, 'ছিঃ! তোর লজ্জা করে না। দেখিস না মানুষটা কত কষ্ট করে নিজের ভাতটুকু জোটায়। সেখানে গিয়েও তুই চেয়েচিন্তে খাস!'

মেনি একটু লজ্জা পায়। দু থাবা দিয়ে নিজের মুখ ঢাকে।

হুলো বলল, 'যা এখান থেকে, আমার মাথা গরম আছে, কেটে পড়।'

মেনি বলল, 'সে আমি চলে যাচ্ছি। তোমার কাছে সবাই ভালো মানুষ। শুধু আমিই খারাপ। দেখো গে, ওই মুখার্জি দিদা বাড়ি নেই। ঘরে মাছ রেখে কোথায় টো টো কোম্পানি করতে গেছে। সেই মাছ পচে জানলা দিয়ে কী গন্ধই না বেরুচ্ছে।'

হুলো বলল, 'তুই জানলার সামনে গেলি কেন? তোকে না বলেছি, ওদিকে চুরি করবি না।'

'আহা চুরি কে করেছে, আমি শুধু উঁকি দিলাম। দিতাম না দাদা, কার্নিস ধরে চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ গন্ধটা নাকে এল, তাই একটু নাক রাখলাম মুখার্জি দিদার রান্নাঘরের জানলার ফাঁকে।'

'তোর বড্ড স্বভাব খারাপ মেনি। তুই বড্ড ছোঁচা। আর কোনওদিন যেন ওদিকে না দেখি, তাহলে তোকে আমি পাড়াছাড়া করব।'

'আমি পাড়াছাড়া হব কী করে?' ফিক করে মেনি হাসল, 'তুমিই বললে দেশান্তরী হবে, চলে যাবে এ-পাড়া ছেড়ে।'

হুলো বলল, 'যাবই তো। অন্য পাড়া থেকে আমাকে ডাকাডাকি করে। আমি যাই না। এখানে সেট হয়ে গেছি বলে, নইলে অন্যপাড়ায় আমার ওপেন অফার আছে। ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটের লালি কুকুর, তেলো কুকুর, কানা বেড়াল, খোঁড়া কাক সবাই আমাকে বলেছে, এপাড়ায় চলে এসো দাদা। দেদার খাবার। মানুষজন ভালো। সম্মান করে। দু একজন তো নিত্যদিন রান্না করে খাওয়ায়। চুরি ছিনতাই করার দরকার নেই— ওখানে একটা কার্ড করিয়ে নেবে। দুবেলা ডেকে খাবার দেবে। মিঠি মিঠি কথা বলবে। ভাবছি চলেই যাব।'

মেনি বলল, 'সে গেলে যাও। এদিকটা আমি দেখে নেব। অসুবিধে হবে না কিছু। আমার সঙ্গে সাহাবাড়ির ভাব আছে। ঘন্টে অন্তত আমার কোনও আজে বাজে নাম দেয়নি। তোমাকে যে কেন হুলো গাল ফুলো, হুলো রাঙা মুলো, হুলো কান কুলো, বলে বুঝে পাই না?'

মেনির কথায় হুলো গম্ভীর হয়। মেনি একটু বুঝদার হওয়া গলায় বলল, 'তবে দাদা এক হাতে তালি বাজে না। তুমিও ওদের কম অনিষ্ট করোনি। অমল সাহার পাঞ্জাবিতে গা ঘষে লাল করে দিয়েছ, ঠাকুমার দুধে নেংটি ডুবিয়েছ—'

হুলো গাল ভারী করে বলল, 'থাম। ওগুলো অনিষ্ট নয়, ওর নাম লড়াই। ওসব তুই বুঝবি না।'

'লড়াই যদি হবে, তবে তুমি কি হেরে গেছো, যে পালিয়ে যাচ্ছ?'

হেরে যাওয়ার কথায় ফুঁসে ওঠে হুলো। ঘ্যাঁক করে এগিয়ে যায় মেনি দিকে। মেনি বলে, 'ও হুলো দাদা তুমি আমায় মারবে না কি?'

'এখানে এখন থাকলেই তুই মার খাবি।'

মেনি বোঝে তার কেটে পড়াই ভালো। তবু যাওয়ার আগে সে বলে, 'এই মানুষ হওয়ার নেশাই তোমার কাল হল। মুখার্জি দিদা নাকি ভালো মানুষ তাহলে মাছগুলো পচালো কেন? দিতেই তো পারত তোমাকে খেতে? দিল? দিল না? আমার কথা তো বিশ্বাস করবে না, যাও যাও নিজের নাকে শুঁকে এসো।'

মেনি চলে গেলে। আর হুলোর মেজাজটা গেল আরও খিচড়ে। সে চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর পা পা করে হাজির হল মুখার্জি দিদার জানলায়। সত্যিই তো মেনি ভুল কিছু বলেনি। জানলার ফাঁক দিয়ে বেশ একটা পচা গন্ধ বেরিয়ে আসছে। সে জানলার ফাঁকে বেশ কিছুক্ষণ নাক দিয়ে থাকল। দু একবার থাবড়াল, যদি জানলাটা খোলা যায়, মুখার্জি দিদাকে ডেকে দেবে। তবে, ডেকে সে বলবে, পচা মাছগুলো ফেলে দিয়ে এসো দিদা, লোভে পরে খেও না যেন, পেটখারাপ হবে। একা থাকো, দেখবে কে?

কিন্তু জানলা মুখার্জি দিদা জানলা খুলল না। হুলোর একটু চিন্তা হল। না, ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের নয়। কী করা যায়, হুলো চিৎকার করে মেনিকে ডাকল। দৌড়ে এল মেনি। 'কী হল হুলোদাদা?'

হুলো বলল, 'কেস গড়বড় মনে হচ্ছে রে। এ মাছের গন্ধ নয়। তলে তলে কোনও বিপদ ঘটেছে নির্ঘাত।'

'বিপদ! তবে আমরা কী করব দাদা? কে আমাদের কথা শুনবে?'

হুলো বলল, 'শুনবে না মানে, শোনাতেই হবে। নে এইখানে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন ঝগড়া শুরু করি।'

তারপর মুখার্জি দিদার জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হুলো আর মেনি প্রবল ঝগড়া শুরু করল। সে ঝগড়া আর থামে না।

একটু পরে ওদের ঝগড়া দেখে ঘন্টে তার গুলতি নিয়ে টিপ কষাল। টং করে একটা ইট এসে পড়ল দেওয়ালে। মেনি বলল, 'দাদা এবার কেটে পড়ো, ঘন্টে ইঁট ছুড়ছে।'

হুলো বলল, 'না। ও আরও ছুঁড়ুক।'

ঘন্টে আবার ইট ছুঁড়ল, এবার সেটা সত্যি লাগল হুলোর গায়ে। হুলো কঁকিয়ে উঠল।

মেনি বলল, 'দাদা তুমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাবে?'

হুলো বলল, 'আজ খাব।'

মেনি বলল, 'তবে আমি তোমার আড়ালে থাকি।'

ঘন্টে আবার ঢিল ছুঁড়ল, এবার সেটা সাঁ করে আসছিল হুলোর মাথা লক্ষ্য করে। হুলো মাথা সরিয়ে নিল। আর সে ঢিল লাগল গিয়ে রান্নাঘরের জানলার কাচে। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন করে কাচ ভেঙে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে তীব্র গন্ধ বেরিয়ে এল রান্নাঘরের জানলা দিয়ে। এমন গন্ধ হুলো আর মেনির মাথা ঘুরে যাচ্ছে, চোখ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।

ওদের ঝগড়া দেখে, পাশের ফ্ল্যাটের রান্না ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল বেনুবউদি। হুলো-মেনি তাদের ঝগড়া থামিয়ে মুখ দিয়ে মুখার্জি দিদার রান্না ঘরের জানলাটা দেখাল। বলল, 'কিছু হয়েছে, এসে দেখো।'

বেনুবউদি এবার নাক টানল। তারপর বলল, 'হ্যাঁ রে হুলো কীসের গন্ধ রে?'

হুলো বুঝল তার প্ল্যান কাজে লেগেছে। সে আবার মুখ দিয়ে রান্না ঘরের ভেতরটা দেখল। আর তখনই বেনুবউদি চিৎকার করে উঠল, 'সর্বনাশ বুঝেছি, বুঝেছি, যা যা তোরা ওখান দিয়ে সরে যা, মুখার্জি মাসিমা তো বাড়ি নেই। আর মাসিমার রান্নাঘরের সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক করছে। এখুনি দমকলকে খবর দিতে হবে।'

বেনুবউদির চিৎকারে তখন সারা পাড়ার লোক জড়ো হয়ে গেছে নীচে।

হুলো বলল, 'চল মেনি আমাদের কাজ শেষ।'

ঢং ঢং করতে করতে দমকলের গাড়ি চলে এল রাস্তায়। সবাই বলাবলি শুরু করল—ভাগ্যিস হুলো ছিল!

মেনি বলল, 'দাদা তোমার লেগেছে?'

হুলো বলল, 'থ্যাঙ্কু ঘন্টেবাবু! লড়াই জারি রেখো।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%