হুলো বেড়াল বনাম ঋ-বেড়াল

জয়ন্ত দে

হুলো রাঙা মুলো! হুলো কান কুলো!

ঘন্টের চিৎকার শুনে হুলো গণপতি এনক্লেভের জলের ট্যাঙ্কের ওপর উঠে এল। ঘন্টের গলাটা এত চিকন, কথাগুলো হুলোর কানে বড্ড এসে বেঁধে। এই ছেলেটার লেখাপড়া হবে না। সারাদিন কোথায় বই পড়বে, খাতা দেখবে, না হুলো কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সে দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ও বড় হলে নির্ঘাত দারোয়ান হবে। ছ্যা, ছ্যা!

হুলো দেখল খুব হন্তদন্ত হয়ে মেনি আসছে। কী ব্যাপার সাতসকালে মেনি এদিকে? ও তো এখন ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে পাবলিক সার্ভিস দিতে যায়। এর রান্নাঘর ওর খাবারঘরে ভিজিট করে। কিছু নির্ঘাত হয়েছে, তাই এক পেট খবর নিয়ে এদিকে দৌড়ে আসছে।

হুলো মেনিকে দেখেও দেখল না। দুচোখ বন্ধ করে থাকল। মেয়েটা বড্ড জ্বালাতন করে।

মেনি এসে সটান জলের ট্যাঙ্কের ওপর উঠে এল। বলল, 'এই যে হুলোদা ব্যাপারটা কী হল?'

'কোন ব্যাপার?' হুলো শুয়ে গড়াতে গড়াতে বলল।

'ও তুমি শুয়ে আছো, কোনও খবরই পাওনি নাকি?'

'না পাইনি কী খবর বল?'

মুখ গোমড়া করে মেনি বলল, 'এ পাড়ায় তুমি হুলো বেড়াল, আমি মেনি বেড়াল। শুনছি নতুন একদল বেড়াল জুটেছে এ পাড়ায়। ঋ-বেড়াল!'

হুলো শুয়ে ছিল। সে সোজা হয়ে বসল, বলল, 'ঋ-বেড়াল! ভামবেড়াল নয় তো?'

'না, না, ভামবেড়াল নয়। মানুষগুলো কবে তাদের মেরে ধরে সাফ করে দিয়েছে। এরা ঋ-বেড়াল।'

'ঋ-বেড়াল। এমন কোনও বেড়াল আছে শুনিনি আগে!'

'হ্যাঁ ঋ-বেড়াল! ওই যে প্রফেসার স্যার আর তার মা খুব আলোচনা করছে। বলছে ওরা ঋ-বেড়াল!'

'ওরা মানে? ওরা মানে তো একজন নয়।' হুলো বলল।

'সেটাই তো বলছি, আমরা দুটো বেড়াল আছি। এখানে তেমন কোনও খাবারের সংস্থান নেই, কারও হাত দিয়ে দুধটুকু মাছটুকু গলে না, আবার যদি ঋ-বেড়ালের দল জোটে, খাবার কোথায়? না, না, এটা ঠিক নয়।'

মেনির কথায় হুলো চুপ করে বসে থাকল। এখন কী করা যায়? মেনি প্রচুর বাজে খবর আনে কিন্তু এটা মনে হচ্ছে ঠিক খবর। প্রফেসার স্যার আর তার মা যখন আলোচনা করছিল, ওরা বাজে বিষয় নিয়ে কথা বলবে না। নির্ঘাত ঋ-বেড়াল আসছে। এখন জানতে হবে সবাই বলতে কটা? দুটো, না দশটা? দশটা, না বিশটা?

হুলো বলল, 'তুই ঠিক করে বলত স্যার কী বলছিল?'

মেনি ম্যাও ম্যাও করে গলা ঝাড়ল, বলল, 'প্রফেসার স্যার ওর মাকে বলল—মা তুমি কোনও টেনশন করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। যারা আসছে তারা সবাই ঋ-বেড়াল। সবাই উদার। খোলা মনে তোমার কথা বুঝবে। ফালতু ম্যাও ম্যাও করবে না।'

'স্যারের কথা শুনে মা কী বলল?'

'বলল, কজন আর উদার মনের হয়, চিন্তাভাবনায় বেশিরভাগই কুয়োর ব্যাঙ!'

হুলো তার থাবা দিয়ে মাথা চুলকাল, নাকের কাছে এনে ফ্যাচ ফ্যাচ করল। 'ছিল বেড়াল, আসছে ঋ-বেড়াল। কিন্তু এখন ব্যাঙ এল কোথা থেকে! কুয়ো থেকে ব্যাঙও আসছে! না, একটু লালু কালুর কাছে খোঁজ নিতে হবে। ও তো সারাক্ষণ ওই বুড়ির কাছে ঘুরঘুর করে। দেখি, ওদের কাছে কোনও খবর আছে কি না! তুই বস মেনি আমি আসছি।'

গালে হাত দিয়ে মেনি বলল, 'তুমি ঋ-বেড়ালদের হঠাও দাদা! একটা কিছু করো।'

'এখনই টেনশন করিস না। আমি দেখছি।'

হুলো সাত লাফে গণপতি এনক্লেভের ওপর থেকে রাস্তায় নেমে এল। হুলো যখন রাস্তায় এল তখনই দেখল লালু আর কালু কুকুর মুখে মুখ দিয়ে শলাপরামর্শ করছে।

হুলোকে দেখে লালু বলল, 'হুলোদা একটু শোনো দরকার আছে।'

হুলো এসে ওদের কাছে দাঁড়াল। কালু বলল, 'হ্যাঁ গো হুলোদা তুমি হটডগের নাম শুনেছ?'

হুলো চোখ ঘোরাল, মাথা মোচড়াল, অ্যালশেসিয়ান থেকে সতেরো রকম কুকুরের নাম মনে করল, কিন্তু হটডগ-এর টিকি খুঁজে পেল না।

লালু বলল, 'এ পাড়ার গুপ্তাজির ছেলে খুব বায়না করছে তার হটডগ চাই। আমি নিজের কানে শুনে এলাম। হট মানে তো গরম। গরম কীসে হয় আগুনে। মানে যে কুকুরের গা দিয়ে আগুনের তাত বের হয়, তাহা হইল হটডগ!'

হুলো ঘাড় নাড়ল, 'একদম ঠিক।'

কালু বলল, 'না, এ পাড়া ছাড়তে হবে, এখানে আর থাকা চলবে না। এটা কৃপনদের পাড়া এখানকার লোকজন কোনওদিন এঁটোকাঁটা ছাড়া ভালোবেসে ভালো খাবার দিয়েছে? দেয়নি। এখন আবার হটডগ আনছে। আমাদের জ্বালাবে। ছেঁকা দেবে বলে তাল করছে।'

হুলো বিড়বিড় করল, 'ঋ-বেড়ালরা আসছে, হটডগ আসছে। না, সত্যি পাড়াটা গোল্লায় যাচ্ছে! আর ভালো মানুষজন থাকল না রে।'

হুলোর বিড়বিড় করে বলা কথা লালু ঠিক শুনে নিল, বলল, 'দিনকাল ভালো না দাদা, খুব খারাপ খবর চারদিকে।'

হুলো বলল, 'আচ্ছা বেড়ালের সঙ্গে কুয়োর ব্যাঙের কী মিল আছে বলতে পারিস?'

হুলো আর ইচ্ছে করে ঋ-বেড়ালের কথাটা পাড়ল না।

লালু আকাশের দিকে মুখ তুলে চিন্তান্বিত গলায় বলল, 'বেড়াল আর কুয়োর ব্যাঙের মিল কোথায়?'

কালু খুব জোরে নাক টানল। যেন সে শুঁকেই বলে দেবে। কিন্তু পারল না। বলল, 'বেড়াল আর ব্যাঙ?'

হুলো গাল ফুলিয়ে বলল, 'আমরা বাঘের গোত্রের। বাঘের সঙ্গে আমাদের জল চলে, ঘর চলে। সেখানে ব্যাঙ আসে কোথা থেকে?'

লালু-কালু সমস্বরে বলল, 'না, পারব না। কী যে হচ্ছে চারদিকে!'

হুলো বলল, 'তোরা পাচ্ছিস না, কিন্তু আছে। শিক্ষিত মানুষজন যখন আলোচনা করছে, তখন কোথাও একটা কিছু আছে।'

কালু আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে বলল, 'ঘোর কলিকাল! কী থেকে যে কী হয়।'

লালু নাক টেনে বলল, 'এই তো কাল শুনছিলাম, মুন্নিকে ওর মা একটা বই খুলে দেখাচ্ছিল, ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল! এবার তুমি বলো, রুমাল থেকে কীভাবে বেড়াল হয়?'

কথাটা শুনে হুলোর সারা শরীর নড়ে উঠল, 'মানে?'

'মানে আর কী বুঝলে না এখন এমন মেশিন বেরিয়েছে যেখানে রুমাল থেকে বেড়াল হচ্ছে! যদি রুমাল থেকে বেড়াল হতে পারে তাহলে ব্যাঙ থেকে বেড়াল হবে না কেন? তোমরা দুজনেই লাফাও। ব্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ করে, তোমরা ম্যাও ম্যাও করো।'

লালুর কথায় হুলো নড়ে উঠল। বলল, 'ঠিক বলছিস! এটা তো অঙ্কের হিসেব। সোজা অঙ্ক—যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ, লসাগু, গসাগু। বুঝেছি। খুব বুঝেছি। মেনিটা ছাদে টেনশনে মরছে। যাই, ওকে গিয়ে অঙ্কটা করে দেখিয়ে দিই।'

'কোন অঙ্ক হুলোদা?' লালু কালু দুজনেই প্রশ্ন করে বসে।

হুলো বলল, 'সোজা অঙ্ক। একটু বুদ্ধি খাটা রুমাল=বেড়াল। তাহলে, বেড়াল=ব্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ=ম্যাও ম্যাও। হল গিয়ে, সাদা রুমাল=সাদা বেড়াল। বেড়ালের ঝাঁপ=ব্যাঙের লাফ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ (পুকুরের কোলে)=ম্যাও ম্যাও (বাড়ির চালে)।

লালু কালু হাঁ করে তাদের হুলোদার দিকে তাকিয়ে আছে। হুলো বলল, 'বুঝেছিস।'

ওরা দু'জনেই ঘাড় নাড়ল, সে ঘাড় নাড়ায়, হ্যাঁ-ও হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে।

হুলো বলল, 'যাই মেনিটা টেনশন করছে, ওকে প্রবলেমটা সলভ করে দিই। রুমাল=বেড়াল। তাহলে বেড়াল=ব্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ=ম্যাও ম্যাও!'

হুলো চলে গেল ছাদের দিকে। এমন সময় ভোঁ করে একটা বাইক এসে থামল। বাইক থেকে নামল একটা ছেলে। তার হাতে একটা প্যাকেট। তাকে দেখেই গুপ্তাজির পাপ্পু চিৎকার করে উঠল। 'এসে গেছে, এসে গেছে, হটডগ এসে গেছে। হটডগ!'

হটডগ শুনে লালু আর কালু লেজ তুলে পাড়া ছেড়ে দৌড়, না জানি এখন কি অ্যাকশন নেয়।

ওরা যখন পাড়া ছেড়ে দৌড়াচ্ছে, তখন গণপতি এনক্লেভের জলের ট্যাঙ্কের ওপর হুলো ক্লাস নিচ্ছে মেনির।

—মনে কর আগে কী ছিল, বাঘ=বেড়াল। এখন হল গিয়ে, রুমাল=বেড়াল। তাহলে, বেড়াল=ব্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ=ম্যাও ম্যাও। হল গিয়ে, সাদা রুমাল=সাদা বেড়াল। বেড়ালের ঝাঁপ=ব্যাঙের লাফ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ (পুকুরের কোলে)=ম্যাও ম্যাও (বাড়ির চালে)।

হুলোর কথা শুনে ঘাড় নাড়ল মেনি। 'ওহ এ তো সোজা অঙ্ক। বাঘ=বেড়াল। তাহলে বেড়াল= ঋ-বেড়াল।'

হুলো হাসল, 'তাহলে আর চিন্তা করিস না। খোলা মনে ব্যাপারটা নে।'

মেনি বলল, 'নো প্রবলেম। আমরা বেড়াল খোলা মনে মেনে নিলাম, ঋ-বেড়াল!'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%