জয়ন্ত দে
হুলো একটু হাত পা ছড়িয়ে জানলার সানশেডে এসে শুয়েছিল। একটু ঘুম এসেছে কি আসেনি, হঠাৎ যেন মারাত্মক একটা কাণ্ড হল। হঠাৎই ঝপাত করে তার গায়ের ওপর একটা চৌখুপি বাক্স নেমে এল।
বাপ রে! যেন অন্ধকার সিন্দুকে বন্দি! হুলো স্প্রিঙের মতো লাফিয়ে উঠল। আর তার ফলে যেটা হল, সেটা খুব বিচ্ছিরি ব্যাপার। সে দোতলার সানশেড থেকে একদম সরাসরি মাটিতে এসে পড়ল। তবে পড়তে পড়তে তার চোখে অন্ধকার কেটে গিয়েছিল, তাই রক্ষে। পড়ায় সময় সে চার পায়ে ঠিক মতো ব্যালেন্স করে নিল। যেমন করে জিমন্যাস্টরা করে।
হুলো মাটিতে চার পায়ে দাঁড়াতেই, লিনটনে বসে থাকা কানা কাকটা বলল, 'পারফেক্ট ল্যান্ডিং হয়েছে বড়ভাই!'
হুলো কানা কাকের কথা পাত্তা দিল না। সে মরছে তার জ্বালায় এ পারফেক্ট ল্যান্ডিং দেখছে।
সে মাটিতে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা কী হল বুঝে ওঠার আগেই তার সঙ্গে সঙ্গে যেটা পড়ল, সেটা একটা নতুন জুতোর বাক্স। সেই সঙ্গে একটা হুঙ্কার শুনল: হুলো রাঙা মুলো! হুলো গাল ফুলো!
মাটিতে পড়ে সে ওপর দিকে তাকাল। দেখল পিচবোর্ডের জুতোর বাক্সটা নেমে আসছে। ও হরি যেটা অন্ধকার সিন্দুক ভেবেছিল, সেটা আসলে জুতোর বাক্স!

সে ওপর দিকে তাকাল। তাকিয়ে বুঝল, এটা অমল সাহার নাতি ঘন্টের কাজ। এখন তার সঙ্গে আরও অনেকগুলো জুটেছে। ওই বাঁদরগুলোরই কাজ।
ঠিক তাই, জুতোর বাক্সের পিছনে দড়ি বেঁধে ঘন্টেরা তিনতলার জানলা দিয়ে দোতলার সানশেডে ফেলেছিল। আর সেই জুতোর বাক্সের ভেতর কয়েক মুহূর্তের জন্য বন্দি হয়ে পড়ছিল হুলো। ওই তো এখনও বাক্সের পিছনে বাঁধা দড়ি তিনতলার জানলার গ্রিলে আটকানো।
আচমকা বড্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিল হুলো। চারদিক অন্ধকার হলে কে না ভয় পাবে! ভয় পেয়েই সে লাফিয়ে উঠেছিল। আর তার ফলেই—ছিঃ ছিঃ, একেবারে পড়ে গেল!
হুলো মাটিতে পড়ে তিনতলার ওপরে অমল সাহার বাড়ির বাঁদরগুলোকে দেখছিল। সে বিশ্বাস করতে পারছে না, ওই বাঁদরগুলো তাকে ফেলে দিল!
হুলোকে পড়ে যেতে কালু কুকুর দেখেছিল। কালু অতশত জানে না। হুলো পড়তে, সে হাই তুলে বলল, 'বেড়াল হয়ে তোর কোনও আক্কেলজ্ঞান নেই রে! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ওপর থেকে পড়ে গেলি!'
কালুর কথা শুনে হুলো বলতে যাচ্ছিল, এই কালু থাম, আমি পড়িনি, আমাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে
না, সে বলতে গিয়েও বলল না।
কারণ এ-কথা শুনলে কালু প্রথমে হ্যা হ্যা করে হাসবে। তারপর এ-পাড়ার কুকুর, ও-পাড়ার বেড়াল, কানা কাক, ঝগড়ুটে শালিখ, রোগা চড়ুই, বুড়ো পায়রা, এমন কি গর্তের নেংটি, নর্দমার ছুঁচোর কাছে সাতকাহন করে হুলোর পড়ে যাওয়ার গল্প পাড়বে। তারচেয়ে চেপে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ!
হুলো চেপে গেল। বরং সে ঘুরিয়ে বলল, 'তা কালুদাদা তুমি এ সময় এখানে কেন?'
কালু নাক সিঁটকে বলল, 'আর বলিস না। দুর্গা পুজোয় হেবি চাঁদা উঠেছে। ক্লাবের ছেলেরা কাল চাঁদার টাকায় ফিস্ট করেছে এত মুরগির পালক ফেলে গেছে গ্যারেজের পাশে। কী দুর্গন্ধ রে বাপ! তাই পালিয়ে এলাম এদিকে।'
হুলো বলল, 'ভালো করেছ! নইলে কালু কুকুর সাদা ভাল্লুক হয়ে যেত।'
হুলোর কথা শুনে কালু রেগে গেল। বলল, 'ভাল্লুক হতাম, কিন্তু তোর মতো তো আর রাঙা মুলো হতাম না!'
এমন সময় ঘন্টের নেতৃত্বে অমল সাহার বাড়ির বাঁদরগুলো আবার চিৎকার জুড়ল: হুলো রাঙামুলো। হুলো গাল ফুলো!
পরের হপ্তায় মহালয়, তারপরেই পুজো।
অমল সাহার বাড়িতে লোকজন ভরে গিয়েছে। অমলবাবু ব্যবসায়ী মানুষ। পুজোআচ্চার দিনে তার বাড়িতে লোকজন আসবে এটা আর নতুন কথা কী! হুলো চায় লোকজন আসুক। তাদের জন্য বড় বড় মাছ আসুক। সেই মাছের বড় বড় পিস হোক। তারা সব রান্না ঘরে আলো করে থাকুক। বাড়িতে লোকজন এলে সবাই গল্প করবে। কে আর রান্নাঘর পাহারা দেবে।
হুলো জিব চাটে।
আজকাল লোকজন বড় বড় মাছের পিস করতে ভুলেই গেছে। সবাই যেন ব্লেড দিয়ে মাছ কাটে। অথচ একটা মাছ রান্নাঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে কত হুজ্জতি। অমল সাহা পুজোআচ্চার দিনে মাছের সাইজ বেশ বড় করে কাটায়। হুলো ভাবে, মাছের পিস বড় হলে তবে খাটুনি পোষায়।
কালু বলল, 'কী রে হুলো দাঁড়িয়ে রইলি কেন, পড়ে গিয়েও কি তোর ঘুম ভাঙেনি?'
হুলো চার পা চারদিকে ছড়িয়ে শরীর টান টান করল। হাই তুলল। মাথাটা ওপর দিকে করে অমল সাহার তিনতলার জানালা দেখল। এক দুই তিন চার পাঁচ।
ওপর থেকে একজন চিৎকার করল, 'ওই দেখ, হুলো রাঙা মুলো আমাদের দেখছে।'
ঘন্টে বলল, 'হুলো তোকে বন্দি করতে হেলিকপ্টার নামিয়েছিলাম। দেখ বাক্সের গায়ে আমাদের সবার নাম লেখা আছে।'
হুলো জুতোর বাক্সটার দিকে তাকাল।
একজন বলল, 'পড়ে গিয়ে নির্ঘাত ওর মাথায় লেগেছে, বন বন চক্কর দিচ্ছে!'
তারমধ্যে একটা মেয়ে চিৎকার করে বলল, 'এই দাদা অমন করে বলিস না, ঠাকমা বলে বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন। মারতে নেই।'
ঘন্টে বলল, 'তোর ঠাকমা বেড়াল মারতে বারণ করে। আর আমার ঠাকমা ওই হুলোর গায়ে পানের পিক ফেলে রাঙা মুলো বানিয়ে দিয়েছিল জানিস।'
হুলো রাঙা মুলো! হুলো গাল ফুলো!
হুলো আর সহ্য করতে পারল না। তড়াক লাফিয়ে উঠল পাঁচিলে। না, কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। পাঁচিলে উঠে দেখল জুতোর বাক্সটা পড়ে। বাক্সের পিছন দিয়ে দড়ি উঠে গেছে। বাক্সটা বেশ বড়! বাপ রে এত বড় কার পায়ের সাইজ। সাহা বাড়িতে ডাইনোসর আছে না কি! কথাটা ভেবে সে দুড়দুড় দৌড় দিল। এক লাফে রাস্তা পার হয়ে এ কার্নিস ও কার্নিস, এ-সানশেড ও-সানশেড ঘুরে এল হরিগোপাল অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে চলে এল। ওদের চোখের আড়ালে।
উঃ বাঁচা গেল!
কিছুক্ষণ সে চুপ করে ভাবল। কিছু একটা করতে হবে, কিন্তু কী করবে?
হঠাৎ দেখল মেনিটা আরাম করে শুয়ে। হুলো একটু রেগে বলল ম্যাও!
মেনি বলল, 'ও হুলোদা কোত্থ থেকে এলে গো? দেখত বিছানাটা কেমন হল?'
হুলো তাকিয়ে দেখল, মেনি রাজ্যের মুরগির পালক নিয়ে এসে গদি বানিয়ে শুয়ে। হুলো ওদিকে না গিয়ে ছাদে ওপর জলের ট্যাঙ্কের মাথা চড়ে বুদ্ধিতে রোদ দিতে বসল।
ওদিকে আজ অমল সাহার বাড়ির সবাই বেজায় খুশি। হুলোকে জব্দ করা গেছে। ঘন্টের বুদ্ধিতে এমন হেলিকপ্টার নেমেছিল যে হুলো জানালার সানশেড থেকে এক্কেবারে নীচে পড়েছে। কেউ বলছে, অত উঁচু থেকে পড়ে হুলোর ঠ্যাং ভেঙেছে। কেউ বলছে, ওর ব্রেনে নড়ে গেছে। নইলে অমন হতম্ভবের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
ঠিক কথা।
ছোটদের রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। এখন ঘন্টের ঠাকুমা সবাইকে রসিয়ে রসিয়ে বলছেন, তিনি কেমন করে টিপ করে পানের পিক ফেলেছিলেন হুলোর গায়ে। পানের পিক মেখে সাদা হুলো সাড়ে তিনমাস রাঙামুলো হয়ে ঘুরেছে। এখনও সেই পানের পিকের ভয়ে এ বাড়ির দিয়ে তাকায় না।
যদিও এ কথাগুলো ডাহা মিথ্যে। এই আগের হপ্তায় বুড়ির দুধ মুড়ি হুলো সাপটে দিয়ে গেছে। তবু ঠাকুমা যখন বলছে বলুক। অমল সাহা খেতে বসেছে। সকালে তাড়াহুড়োয় মাছের মাথাটা খাওয়া হয়নি। এখন একটু আরাম করে বসে টিভি দেখতে দেখতে মুড়ো খাবে। এখন ডাল আর পোস্ত মাখছেন।
নীচে তখন মেনিকে সঙ্গে নিয়ে হুলো দারুণ এক বুদ্ধি ফেঁদেছে।। দুজনে মিলে উলটে থাকা জুতোর বাক্সে রাশি রাশি মুরগির পালক ভরছে। পালক ভরা শেষ হলে হুলো আর মেনি সেই বাক্সটা নিয়ে সানশেড টু সানশেড করে তিনতলার জানলায় চড়ল। তারপর একদম সেট করে দড়িটা দাঁতে ভালো করে কামড়ে নিয়ে মেনি লাফিয়ে পড়ল একদম নীচে। আর দড়ির ঝটকা মারা টানে, মুরগির যাবতীয় পালক ভোঁ ভোঁ করে ঢুকে পড়ল ঘন্টের ঠাকুমার ঘরে।
সে এক দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড!
পাখার হাওয়া বন বন করে মুরগি পালক উড়ছে। ভূত ভূত করে ঠাকুমা সুদ্ধু বাচ্চা বুড়ো তারস্বরে চেল্লাচ্ছে। কেউ কেউ ভয়ে হাত পা ছেড়ে মুর্ছা যাওয়ার অবস্থা। দক্ষযজ্ঞ! সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা। একটা নয় অনেকগুলো ভয়ার্ত গলা। খাওয়া ফেলে অমল সাহা, তার ছেলে, ছেলের বউ সবাই পড়িমড়ি করে দৌড়ে গেল ঘণ্টের ঠাকুমার ঘরের দিকে। কিন্তু দরজায় সামনে গিয়ে তারা যেন কেউ কিছু দেখতে পেল না। দেখল সারা ঘরে বন বন করে রাশি রাশি পালক উড়ছে। পালকে পালকে ছেয়ে গেছে ঘর।
ব্যাপারটা কী?
দ্রুত সিলিং ফ্যান বন্ধ করা হল। তারপর জানলার সামনে দাঁড়িয়ে অমল সাহা আবিষ্কার করল, জুতোর বাক্সটা। তার ভেতরে তখনও কিছু পালক রয়ে গেছে। দ্রুত সবাই বুঝে গেল এটা ঘন্টের কীর্তি! তিনতলায় জানলায় নিশ্চয়ই বাইরের লোক আসবে না। বড়রা সবাই যখন ঘন্টের কান মুলে মুলে বাঁদরামি ছাড়াচ্ছে।
ছাদে এখন মেনিটা বড় একটা মাছের মুড়ো নিয়ে বসে বসে চিবুচ্ছে। হুলো অমল সাহার পাত থেকে মুড়োটা তুলে নিয়ে এসে মেনিকে গিফট করেছে। যতই হোক, মেনি লাইফ রিস্ক নিয়ে দাঁতে দড়ি নিয়ে তিনতলা থেকে ড্রাইভ দিয়েছে। তাই মুড়োটা ওরই পাওনা হয়।
লাল হওয়া কান নিয়ে ঘন্টে তার হেলিকপ্টারের দিকে তাকিয়েছিল। তখনই হরিপদ অ্যাপার্টমেন্টের লালচে আলোয় হুলোটা দাঁত বের করে হাসছে।
হুলো বলল, 'তুমি সক্কালবেলা হেলিকপ্টার নামিয়েছিলে ভাইটু, আমি রাতের বেলায় একটু পুষ্প বৃষ্টি করে দিলাম! হ্যাপি পুজো!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন