গৌর বৈরাগী

কড়া নাড়ার শব্দটা এবার কানে এল শশাঙ্কর৷ মনে হল অনেকক্ষণ ধরেই কড়া নাড়ছে কেউ৷ তার কানে আসেনি৷ না আসাই স্বাভাবিক৷ এমন অচেনা জায়গা, তার ওপর হঠাৎ এই তুমুল দুর্যোগ৷ ঝাড়া প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে শুরু হয়েছে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷ দিনের বেলা এমন বৃষ্টির কোনো আশঙ্কাই ছিল না৷ খটখটে রোদ্দুর, শুকনো বাতাস৷ কিন্তু যেই বিকেল হল আকাশ কালো করে মেঘে ঢেকে গেল৷ খানিক পরেই শুরু হল ঝড়, সেই সঙ্গে বৃষ্টি আর ঘন ঘন বাজ পড়া৷ সেই তুমুল শব্দে দিবাকরদের এই প্রাচীন আর ভগ্নপ্রায় বাড়িটা কেঁপে কেঁপে উঠছে৷ বেশ ভয় পেয়ে গেছে শশাঙ্ক৷ এই নির্বান্ধব পুরীতে এমন দুর্যোগ আর অন্ধকার৷
আবার খট খট করে দরজার কড়া নাড়ল কেউ৷ আন্দাজে খাট থেকে মেঝেয় পা দিল সে৷ কী জানি দিবাকর কি ফিরে এল? তেমন হলে দুটো কথা বলে বাঁচা যাবে৷ ইস, কতক্ষণ যে কথা বলা হয়নি৷ অন্তত ঘণ্টা আটেক তো বটেই৷ সেই কোন সকাল এগারোটায় এখানে এসে দেখেছে, সব ভোঁ ভাঁ কেউ নেই৷ অথচ ঠিকানাটা ভুল হবার নয়৷ ট্রেন থেকে নেমে বাস৷ বাসে চড়কবাড়ি৷ তারপর হাঁটা ঝাড়া দেড় ঘণ্টা৷ আসলে সবটাই প্রায় আলপথ৷ এখনও এত অজগ্রাম৷ বেশ ভাবনা হয়েছিল৷ অথচ ভুল যে হয়নি তা নিশ্চিত৷ পথে দুটো দিঘি পড়েছে, নাম জোড়াদিঘি৷ সেটা মিলেছে৷ গ্রামের প্রান্তে শ্মশানকালীর মন্দির৷ একটা বডি পুড়ছে তখনও৷ সেটা পেরিয়ে আসার পর দশ-বারো বিঘের বাঁশবন৷ সেই বন শেষ হতেই ধর্মরাজের থান৷ এর লাগোয়াই তো 'দেওয়ান মঞ্জিল'৷ দিবাকরদের পৈতৃক চারমহলা জমিদার বাড়ি৷ নামটা আছে তবে আর কিছু অবশিষ্ট নেই৷ দরজা জানালা হা-হা করছে৷ ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে৷ ধসে পড়েছে মাথার ওপর ছাদ৷ শুধু আছে একটা বাঁশের গেট৷ গেটে আটকানো টিনের পাতে সাদা রঙে লেখা 'স্বপ্ননীড়'৷ হয়তো এর থেকে আর একটু ভালো ব্যবস্থাই করতে পারত দিবাকর৷ কিন্তু পরের জন্যে কিছু করাটা যার নেশা নিজের জন্যে সে টাকা খরচ করবে কেন?
গেটের ওপর অমন বাহারি নামটা দেখে হেসেই ফেলেছিল শশাঙ্ক৷ 'দিবাকর' বলে ডাকতেও যাচ্ছিল৷ তখন একজন খেঁকুড়ে টাইপের লোক পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, 'কাকে ডাকছেন?'
'ওই দিবাকরকে৷'
'ওকে তো পাবেন না৷'
'সে কী, এখন তাহলে কী হবে?'
হ্যাঁ বিপদের কথাই৷ ভোর চারটেয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেলা বারোটায় এসে যদি এই অবস্থায় পড়তে হয়৷ লোকটাও বুঝি টের পেয়েছিল তার বিপদটা৷ বলেছিল, 'চিন্তার কিছু নেই আজ্ঞে৷ দিবাকরদার ঘর তালাবন্ধ হয় না কোনোদিন৷ যখন ইচ্ছা যে কেউ থাকতে পারে৷ আপনিও থাকুন না৷ আজ না হলে কাল মানুষটা ঠিক এসে যাবেন৷ ঘরে চাল ডালটা আছে৷ গ্যাসে দুটো ভাত বসিয়ে দেবেন৷'
তারপরেই ঘরে ঢুকে পড়েছিল শশাঙ্ক৷ ঘরের ফাটা মেঝের ওপর একটা চৌকি৷ তাতে পাতলা চাদর পাতা৷ মাথার দিকে একটা বালিশ৷ পাশে রান্নাঘরে কিছু হাঁড়িপাতিল৷ আর চারপাশে শুধু ধু-ধু৷ কী চুপচাপ! কী চুপচাপ!
ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ লাগেনি শশাঙ্কর৷ দিবাকর থাকলেই বরং অসুবিধে হত৷ সাতকাহন কথা জুড়তে হত৷
আবার খট খট করে কড়া নাড়ল কেউ৷ অন্ধকারেই আন্দাজে এগিয়ে গেল শশাঙ্ক৷ ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে এই একটা ঘরের হালহদিশ তার মোটামুটি জানা হয়ে গেছে৷ বারো ফুট চওড়া ঘরের দেওয়াল ঝুরঝুরে৷ বালি আর পলেস্তারা খসছে৷ ঘরের একধারে চৌকি৷ পাশে বারান্দায় রান্নাঘর৷ একটা মাত্র দরজা৷ দুটো জানালার পাল্লা না থাকায় ইট সাজিয়ে আড়াল দেওয়া হয়েছে৷ হুড়কো দিয়ে দরজাটা আটকেছে শশাঙ্ক৷ সেটা খুলতেই হুড়মুড় করে ঝড়-জল সব ঢুকে এল ঘরে৷ আর ঝড়-জলের সঙ্গে এল একজন মানুষ৷ এসেই বলল, 'আলোটাও জ্বালা হয়নি দেখছি...?'
বেশ রাগের গলা, গলায় অভিযোগ৷ কিন্তু গলাটা নির্ঘাত দিবাকরের নয়৷ বিশ বছরে আর যাই বদলাক কন্ঠস্বর যে বদলাবে না এটা নিশ্চিত৷ দিবাকরের গলা ঠিক চিনতে পারত৷ দিবাকর যখন নয় তখন উটকো লোকের বলা রাগের উত্তরে রাগ নিয়েই জবাব দিল শশাঙ্ক৷ বলল, 'আলোটা জ্বালাবে কে?'
'তাও তো বটে!' দপ করে যেন রাগ পড়ে গেল লোকটার৷ তাই এবার বুঝদারের গলায় বলল, 'কোথায় হ্যারিকেন, কোথায় দেশলাই সে সব তোমার জানার কথা নয়৷ আচ্ছা ঠিক আছে,' বলে চুপচাপ হয়ে গেল৷ শুধু কিছু খুটখাট শব্দ৷ শশাঙ্ক বুঝল লোকটা নিশ্চয়ই সব জানে৷ কোথায় হ্যারিকেন, কোথায় দেশলাই৷ শুধু জানাই নয়৷ ফস করে একটা কাঠি জ্বালিয়ে হ্যারিকেনটাও জ্বেলে ফেলল লোকটা৷
সাতজন্মে পরিষ্কার হয় না৷ কালো ভুসোতে ঢেকে গেছে কাচ৷ তবু একটা বিচ্ছিরি আলো দপ দপ করে জ্বলছে৷ ওই তো চৌকির ওপর বিছানা৷ ওই তো জানলার পাল্লায় ঝোলানো দিবাকরের দুটো জামা৷ আর ওই যে লোকটা ত্যাড়াবাঁকা দেহকাণ্ড আর সাতজন্মে না-কাচা একটা নোংরা জামা গায়ে৷ একটা শুঁটকো, বাসি, চিমসে গন্ধও যেন নাকে এসে লাগল৷
লোকটা আলো জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, 'খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কিছু?'
ফ্যাসফেসে গলা, তবে এবার গলায় তেমন ঝাঁঝ নেই৷ উত্তর দেবার দরকার মনে করল না শশাঙ্ক৷ এতক্ষণে বুঝে গেছে দিবাকরের এই ঘরটা আসলে ক্লাব ঘরের মতো৷ চোপরদিন খোলা৷ যার ইচ্ছা হবে আসবে, থাকবে, শশাঙ্ককেও তেমনই লিখেছিল দিবাকর৷
যখন ইচ্ছা হবে চলে আসবি৷ থাকবি৷ দেখবি আমার নিজের হাতে তৈরি খামারবাড়ি, বাগান আর ইশকুল৷ এখন বেশ বড়ো হয়েছে৷ দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়ানো হয়৷ চারপাশে বড়ো বড়ো গাছ, খেলার মাঠ৷ আহা তোর টাকাটা যদি এখন পেতুম শশাঙ্ক৷
এটা অবশ্য দশ-বারো বছর আগে দেওয়া একটা চিঠির কথা৷ অবশ্য শুধুই কথার কথা৷ কেননা তার বন্ধু শশাঙ্ক যে উপুড় হাত হবে না ততদিনে জেনে ফেলেছিল দিবাকর৷
কড়কড় করে একটা বাজ পড়ল৷ চমকে উঠল শশাঙ্ক৷ আরও চমকে উঠল সে যখন শুনল হ্যারিকেনের হলুদ আলোর ভেতর থেকে লোকটা বলছে, 'সেই টাকার কথাটা এতদিনে মনে পড়ল বুঝি?'
চমকে অন্ধকারে তাকাল শশাঙ্ক৷ লোকটাকে দেখার চেষ্টা করল৷ কিন্তু লোকটার মুখে একতাল অন্ধকার৷ তাতে কিছুই ঠাহর হল না৷ কথাটায় রাগ না শ্লেষ কিছুই বোঝা গেল না৷ তার চেয়েও অবাক করা ব্যাপার৷ টাকার কথাটা এ লোক জানল কী করে! সেটা তো তার আর দিবাকরের মধ্যে কথার কথা৷ নাকি কথাটা সে জানাজানি করে ফেলেছে এতদিনে৷ অবশ্য তেমন করলেও যে তাকে দোষ দেওয়া যাবে তা নয়৷ এক-আধ টাকা তো নয়৷ তার ওপর শোধ না হতে হতে সে টাকা তামাদি হয়ে যাবার কথা৷ এ কথা যদি কখনো দিবাকর প্রকাশ করে ফেলে তবে তাকে তেমন দোষ দেওয়া যায় না৷
'কী হল কথাটার জবাব দিলে না?' ফ্যাসফেসে গলায় উত্তরের জন্যে লোকটা তাগাদা দিল৷
অন্ধকারেই তাকাল শশাঙ্ক৷ চাপা গলায় বলল, 'বুঝেছি৷ তোমাকে দেখছি সব কথাই বলেছে দিবাকর৷'
'বলার দরকার হয় না৷ আমি সব জানি৷ আমার অজানা কিছু নেই৷' লোকটা হাসল৷ অন্ধকারে ফুটে উঠল ত্যাড়াবাঁকা সাদা দাঁতের সারি৷ চোখ দুটোও যেন নীল হয়ে জ্বলে উঠল৷ সেই হাসি ছড়িয়ে লোকটা আবার বলে উঠল, 'আমি সব জানি হে৷'
'আহা কী তালের লোক হে তুমি৷ বলার আর লোক খুঁজে পেল না দিবাকর৷ কথাটা আমার আর দিবাকরের মধ্যেই থাকার কথা৷ তুমি জানলে কী করে?'
'সম্পর্ক না থাকলে চেনা যায় না বুঝি?' লোকটা হাসল৷ হাসি শেষ করে সোজাসুজি তাকাল শশাঙ্কর দিকে৷ 'সম্পর্ক একটা আছে তো,' বলে লোকটা যেন মুখ তুলল৷ বলল, 'দেখো তো আমায় চিনতে পারো কি না?'
হ্যারিকেন একটা আছে বটে তবে তা লোকটার পেছনে৷ পেছন থেকে আসা আলোয় এখন লোকটার মুখে পুরো অন্ধকার৷ এভাবে কাউকে চেনা যায় না৷ সেটা বুঝেই হয়তো হ্যারিকেনটা হাতে তুলে মুখের সামনে ধরল৷ বলল, 'কি, চেনা মনে হচ্ছে?'
মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল শশাঙ্ক৷ ত্যাড়াবাঁকা হলেও কথা ছিল৷ কিন্তু কীরকম যেন অদ্ভুত দর্শন৷ ছিরিছাঁদহীন মুখ৷ মুখে গালে খানিক খানিক জায়গায় কাঁচাপাকা দাড়ির জঙ্গল৷ ঝুলে পড়া ঠোঁট৷ আর 'মরা' মাছের মতো ফ্যাটফেটে সাদা দুটো চোখ৷ সেই চোখের মণিতে আবার নীল আলো৷ দেখলেই যেন সারা শরীর শিরশির করে৷ এরকম কোনো মুখ জীবনে দেখেছে বলে মনে হয় না শশাঙ্কর৷ কিন্তু আশ্চর্য, এরপরেও মনে হচ্ছে কোথায় দেখেছি, কোথায় দেখেছি৷ এরকম ভাবনার ভেতরেই লোকটা বলল, 'কি, চেনা যাচ্ছে?'
শশাঙ্ক বলল, 'চেনা চেনা মনে হচ্ছে৷ তবে চিনতে পারছি না৷'
এ কথায় খুসখুস করে হাসল লোকটা৷ হাসিটা যেন ভাঙা বগি থালা থেকে বেরিয়ে আসা শব্দ৷ যেমন বিচ্ছিরি দেখতে তেমন গলার স্বর৷ আদতে মানুষ বলে মনেই হয় না৷

'মানুষের বদলে কী মনে হয় তাহলে?'
লোকটার ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নটা শুনে ভারি অবাক হল শশাঙ্ক৷ এ তো আজব কাণ্ড৷ তার ভাবনাটাও জেনে ফেলছে লোকটা৷ তবে এটা লজ্জারই বটে৷ কাউকে মানুষের বদলে অন্য কিছু ভাবাটা সত্যিই অন্যায়৷ এই তো অন্ধকারেও আবছা দেখা যাচ্ছে৷ সামনের লোকটার দুটো হাত, দুটো পা, মাথায় গালে এলোপাথাড়ি কিছু কাঁচাপাকা চুল৷ হতে পারে চোখ দুটো ফ্যাটফেটে সাদা, মরা মাছের মতো কিন্তু চোখ তো বটে৷ হয়তো গলাটা ফাটা কাঁসির মতো খ্যাসখেসে কিন্তু গলা তো বটে৷ হ্যারিকেনের আলোতে মুখটা দেখতে দেখতে শশাঙ্কর আবার মনে হল মুখটা চেনা চেনা৷ কিন্তু চেনা বলে কে হতে পারে? তখনই আবার বিচ্ছিরি করে হেসে উঠল লোকটা৷
বলল, 'শুধু চোখ দেখলে, ভুরু দেখলে না?'
'ভুরু?'
'হ্যাঁ গো ভুরু, ডান চোখের ভুরুতে একটা দাগ আছে?'
শশাঙ্ক ওই অল্প আলোতেই দেখতে দেখতে বলল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ একটা দাগ আছে বটে৷'
'বেশ বেশ, তাহলে তো তোমার চেনার কথা৷'
'নাঃ৷ শুধুই ভুরুর দাগ দিয়েও চিনতে পারছি না৷'
'বেশ তাহলে থুতনিটা দেখো৷'
'হ্যাঁ দেখছি৷'
'থুতনির ডান দিকে একটা এক টাকা সাইজের খয়েরি জড়ুল আছে৷'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই তো দেখতে পাচ্ছি৷'
'ব্যস তাহলে তো চিনতে অসুবিধে হবার কথা নয়৷'
অসুবিধে হবার কথা তো নয়ই৷ সত্যি চিহ্নগুলো সব মিলে যাচ্ছে৷ শশাঙ্কর মনে হয় দেখেছি কোথাও৷ কিন্তু কোথায় দেখেছি? কাকে দেখেছি?
কড়কড় করে হঠাৎ একটা বাজ পড়ল কাছাকাছি কোথাও৷ সঙ্গে ঝড়৷ মড়মড় করে উঠল দরজাটা৷ মান্ধাতা আমলের দেওয়ালগুলো বোধ হয় কেঁপে উঠল৷ বিশ্বাস নেই হয়তো চোখের সামনেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে ঘরের একদিকের দেওয়ালটা৷
দাঁড়িয়ে পড়ল শশাঙ্ক৷ দরজার খিল খুলে গেছে বোধ হয়৷ হাওয়া তার সঙ্গে স্রোতের মতো বৃষ্টি ঢুকছে ঘরে৷ তাড়াহুড়ো করে পুরোনো দরজাটা ঠেলে বন্ধ করার আগেই প্রায় পুরো ঘরটাই বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গোবর হয়ে গেল৷ সেই অবস্থায় মেঝেতে থেবড়ে বসে থাকা লোকটাকে দেখতে গেল শশাঙ্ক৷ কিন্তু কোথায় গেল সে৷ ঘরের ভেতর কোথাও নেই৷ এই তুমুল দুর্যোগে বাইরেও যাবার কথা নয়৷ তাহলে তার চোখের সামনে দিয়ে গেল কোথায় লোকটা!
হাওয়া তো হবে না৷ কিংবা হয়তো হাওয়াই হয়েছে৷ কে জানে দিবাকরের সবটাই এমন কি না৷ কে আসছে, কে যাচ্ছে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই৷ ভাবতে ভাবতে দড়িতে ঝোলানো শুকনো গামছাখানা টেনে নিয়ে হাত পা মাথা মুছতে শুরু করবে তখনই চোখ পড়ল দেওয়ালে ঝোলানো আয়নার দিকে৷ কিংবা হয়তো আয়নার দিকে নয়, আয়নায় যে মুখটা ভেসে উঠেছে তার দিকেই তাকাল৷ আর তাকিয়ে চমকে উঠল শশাঙ্ক৷
আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়নায় তো তাকেই দেখতে পাবার কথা৷ কিন্তু তার বদলে ও কাকে দেখছে সে! ওই তো সাদা ফ্যাটফেটে দুটো মরা মাছের মতো চোখ৷ সেই চোখের তারায় নীল আলোটা জ্বলছে৷ ওই তো ডান ভুরুর ওপর কাটা দাগ, থুতনিতে এক টাকা সাইজের জড়ুল৷ লোকটার কথা শুনে চেনা চেনা মনে হচ্ছিল৷ এখন মনে হচ্ছে ওই লোকটা আসলে অবিকল সে৷ এতক্ষণ তাহলে শশাঙ্কই তার সামনে বসেছিল নাকি? কিন্তু তা আবার হয় নাকি!
হয় হয়৷ তাকে অবাক করে দিয়ে আয়নার ভেতরে এবার শশাঙ্ক হেসে উঠল খ্যা খ্যা করে৷ বলল, 'দিবাকর কখন হুট করে চলে আসবে তার আগে আসল কাজটা মিটিয়ে নিলে হয় না?'
'আসল কাজ?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ আসল কাজ৷ যার জন্যে এখানে আসা৷'
সঙ্গেসঙ্গে কথাট মনে পড়ে গেল শশাঙ্কর৷ চৌকির ওপর ফেলে রাখা কাঁধের ঝোলা ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কাগজের প্যাকেটটা বার করল৷ তারপর সেটা দিবাকরের বালিশের নীচে যত্ন করে রেখে দিল সে৷
ঠিক তখনই পুরোনো চটা-ওঠা আয়নার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল লোকটা৷ কিংবা হয়তো লোকটা নয়, বেরিয়ে এল শশাঙ্কই৷ সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'আর সামান্য কাজ বাকি আছে৷' বলে নিভু নিভু হ্যারিকেনের দমটা বাড়িয়ে কাগজ কলম নিয়ে বসল শশাঙ্ক৷ একটা চিঠি লিখে রেখে যেতে হবে৷ শুরু করল...
'প্রিয় দিবাকর...'
পরের দিন 'স্বপ্ননীড়'-এ ফিরেছিল দিবাকর৷ তার ঘরে কে এসেছিল, কে থেকেছিল, সকাল হবার আগেই কে চলে গেছে, সে ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই নেই৷
সকালে ঝকঝকে রোদ উঠেছে৷ গতকালের দুর্যোগের কোনো চিহ্নমাত্র নেই৷ শুধু চৌকির ওপর বসতেই চোখ পড়েছে সেই চিঠিটার দিকে৷ চিঠির পাশের পুরোনো কাগজে মোড়া একটা বান্ডিল৷ সেটা বেশ মোটা৷ খুলতেই ঝরঝর করে একরাশ নোট ছড়িয়ে পড়ল বিছানায়৷ কে রেখে গেল টাকা? কেন রাখল? ভুল করে কেউ রেখে গেল নাকি? ভাবতে ভাবতে হাতের চিঠিটার ওপর চোখ পড়ল তার৷
'প্রিয় দিবাকর'-এই সম্বোধনে চিঠি
'তোর হয়তো মনে নাই আজ হইতে একুশ বছর আগে দুই লাখ টাকা তোর কাছে ধার লইয়াছিলাম৷ শোধ করি নাই৷ শোধ করিবার জন্য তোর নিকট হইতে কোনো তাগাদাও পাই নাই৷ ধারের টাকা শোধ করিতে না হইলে বেশ আনন্দ হয়৷ বাঁচিয়া থাকাকালীন সেই আনন্দ ভোগ করিয়াছি৷ কিন্তু গত বৎসর একটি দুর্ঘটনা ঘটিল৷ আমি মরিয়া গেলাম৷ মরিয়া যাইবার পর আমি আশ্চর্য হইয়া দেখিলাম আমি মারা যাইতেছি না৷ দেখিতে ঠিক আমারই মতো একটি লোক মরা মাছের মতো সাদা ফ্যাটফেটে চোখ লইয়া আমাকে আগলাইয়া রাখিয়াছে৷ কিছুতেই মরিতে দিতেছে না৷ তাই বাধ্য হইয়া দুই লাখ টাকা সুদ সমেত আজ শোধ করিয়া দিতেছি৷ আশা করি এবার স্বচ্ছন্দে মরিতে পারিব৷
ইতি-
তোর প্রিয় বন্ধু শশাঙ্ক৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন