ছাত্র

গৌর বৈরাগী

Cov3

কেদারনাথবাবু এমনিতে বড়ো ভালো মানুষ৷ কারও সাতে-পাঁচে থাকেন না৷ মানুষের বিপদে-আপদে পাশে গিয়ে দাঁড়ান, সুখ-দুঃখে খোঁজ খবর নেন৷ শুধু একটাই অসুবিধা৷ তিনি বড়ো নাম ভুলে যান৷ হ্যাঁ নাম৷ কারও কাছে ধার বাকি থাকলে ভোলেন না৷ কারও সঙ্গে দেখা করার থাকলে, দেখা করেন ঠিক সময়েই৷ কিন্তু নামের বেলায় তাঁর সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়৷

বাজার থেকে ফিরছিলেন৷ হাতে বাজারের ব্যাগ৷ দেখা হয়ে গেল একজনের সঙ্গে-'গোরাচাঁদ, গোরাচাঁদ', বলে ডাকলেন৷ যাকে ডাকলেন সে ডাক শুনে এগিয়েও এল৷ বলল, 'আমাকে ডাকছেন নাকি মাস্টারমশাই?'

'হ্যাঁ, গোরাচাঁদ৷'

'কিন্তু আমার নাম তো গোরাচাঁদ নয় মাস্টারমশাই, আমি তো অবনী৷'

'ওই দেখো ভুল হয়ে গেছে,' নিজের অজান্তেই জিভ কাটলেন কেদারনাথ৷ 'তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা৷'

'না না, মনে করব কেন!' অবনী হাসল, 'এ তো আজকের নয়, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগের কথা৷ আপনার তো ভুল হতেই পারে৷'

কথাটা হয়তো ঠিক বলল না অবনী৷ পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর তো দূর, আধঘণ্টা আগের শোনা নামটাও মুহূর্তে ভুলে যাচ্ছেন তিনি৷ আসলে এর পেছনে একটা কারণ আছে৷

তিনি ছিলেন কানাইলাল বঙ্গ বিদ্যালয়ের শিক্ষক৷ প্রায় চল্লিশ বছরের চাকরি জীবনে কত হাজার ছাত্রকে যে দেখলেন৷ এই নিয়েও তাঁর একটা গর্ব আছে৷ তাঁর ছাত্ররা প্রত্যেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত, রুচিমান, বিনয়ী৷ তাই বোধ হয় সকলের মুখগুলোই তাঁর মনে আছে৷ কোথাও স্পষ্ট, কোথাও আবছা৷ তবে নাম মিলিয়ে মুখ কিংবা মুখ মিলিয়ে নাম জানা বোধ হয় অসম্ভবই৷ তাই প্রায়ই ভুল হয়৷ আর প্রতিবারই সে ভুল ধরিয়ে দেয় ছাত্রটি৷

কেউ হয়তো সামনে এগিয়ে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল৷ জোয়ান কোনো যুবক৷ চকচকে স্বাস্থ্য, ঝকমকে পোশাক৷ নিশ্চয়ই কোনো ভালো চাকরি করে৷ মুখে হাসি নিয়ে বলল, 'কেমন আছেন মাস্টারমশাই?'

'ভালো ভালো,' বলে তখনও খুঁজে চলেছেন কেদারনাথ৷ নামটা খুঁজছেন৷ ভালো ছেলেটার নাম৷ ভালো নয়তো কী! অমন চমৎকার স্বাস্থ্যবান ছেলেটা তাঁর হাওয়াই চটি পরা ধুলো পায়ে হাত দিয়ে মাথায় ঠেকাল৷ তারপর হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, 'মাস্টারমশাই কেমন আছেন?' আহা এমন ছেলের নামটা ভুলে যাওয়া অপরাধ৷ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পড়ল গৌতম নামটা৷ হ্যাঁ গৌতমই!

বললেন, 'গৌতম, তুমি ভালো আছ?'

ছেলেটা হেসে বলল, 'মাস্টারমশাই আমার নাম তো গৌতম না, আমি তো অভিমন্যু৷'

'এই দেখো,' লজ্জায় হেসে ফেললেন কেদারনাথ৷ 'তোমার নামটাও শেষে ভুলে গেলাম!'

'তাতে কী হয়েছে মাস্টারমশাই৷' বলতে বলতে ছেলেটা করল কী তাঁর হাতে ঝোলানো বাজার-ভরতি ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, 'দিন৷ এটা আজ আমি আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিই৷'

'না না,' ভারি লজ্জা পেলেন কেদারনাথবাবু৷ ব্যাগটা বেশ পুরোনো৷ ভেতরে সবজিপাতিও তেমন বলার মতো নয়৷ কাটপিস আলু, পাকা ঝিঙে, শুকনো ডাঁটা৷ একটু সস্তা হয় বিশেষ করে বেলার দিকে বাজারে এলে৷ এসব না হলে সংসারে তাল মেলাতে পারেন না তিনি৷ পুরোনো আমলের শিক্ষক, তাই পেনশন বেশ কম৷ ওদিকে বাড়িতে এখনও আধাবেকার ছেলে৷ বয়স হয়ে যাওয়া অবিবাহিতা কন্যা৷ বাজারের ব্যাগ থেকে শুকনো ডাঁটার ডগা উঁকি মারছে৷ সেই ব্যাগটাই নিতে অভিমন্যু বলল, 'ওটা আমাকে দিন মাস্টারমশাই৷'

এটা বিশাল লজ্জার ব্যাপার৷ তাই আজকাল এমন রাস্তা ধরে আসা ছেড়েই দিয়েছেন৷ যেখানে লোকজনের চলাচল কম তেমন গলি ধরেই যাওয়া-আসা করেন৷ কিন্তু তবু আজ দেখা হয়ে গেল একজনের সঙ্গে৷ সে নিজেই এগিয়ে এসে বলল, 'ভালো আছেন স্যার?'

স্যার শুনে খানিক অবাক হলেন কেদারনাথবাবু৷ আজকাল নতুন করে স্যার ডাকার চল হয়েছে৷ তবে তিনি তো আজকালকার নন, পুরোনো আমলের, তাই সবাই তাকে মাস্টারমশাই বলে৷ এই ছেলেটার বয়স মনে হচ্ছে তিরিশের কোটায়৷ আজকালকার ছেলেই বলা যায়৷ যেন চিনতেও পারলেন, বললেন, 'শম্ভু না?'

খানিক হাসল ছেলেটা৷ বলল, 'কী আশ্চর্য, আপনার মনে আছে স্যার?'

Cov4

এই প্রথম বেশ অবাক হলেন কেদারনাথবাবু৷ নামটা ভোলেননি তাহলে৷ বললেন, 'মনে থাকবে না? তুই কম জ্বালিয়েছিস৷ শুধু মাস্টারমশাইদের নয়, ক্লাসের বন্ধুদেরও৷'

এ কথায় শম্ভু হা-হা করে হাসল৷ বলল, 'মনে আছে৷ সব মনে আছে স্যার৷ সেই আপনার মতো মানুষকেও... এ-কথা ভাবলে এখন বড্ড মন খারাপ করে৷'

'দুর দুর, সেসব কথা কি কেউ মনে রাখে নাকি?'

হাঁটছেন আর কথা বলছেন৷ সে-সময় ভালো করে দেখলেন ছেলেটাকে৷ খুব সাদামাটা চেহারা, পোশাক-আশাকও বেশ সস্তার৷ পায়ে পুরোনো হাওয়াই চটি৷ এসব দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না তার এই ছাত্রটির জীবন খুবই সাধারণ৷ নিশ্চয়ই একটা কমদামি চাকরি করে৷ টানাটানি করে সংসার চালায়৷ এসব মানুষরা সাধারণত লুকিয়েই থাকে৷ সদর রাস্তার বদলে গলিঘুঁজি পছন্দ করে৷ হয়তো সে কারণেই গলির ভেতর তার দেখা পেলেন কেদারনাথবাবু৷ কিন্তু গরিব হলেও মানুষকে সম্মান দিতে জানে৷ তার মতো বুড়ো মানুষের হাতে ভারী ব্যাগ দেখেই হয়তো নিজে থেকে এগিয়ে এল৷ পরিচয়ও দিল৷ এতে করে ছাত্রদের সম্পর্কে তার ভেতরের গর্বটা একটুও টাল খায়নি৷

পাশাপাশি কথা বলতে বলতে বাড়ি অবধি চলে এসেছেন খেয়াল ছিল না৷ বারান্দায় ব্যাগটা রেখে শম্ভু যখন বলল, 'এবার তাহলে স্যার...' তখনই খেয়াল হল তাঁর৷ গলা তুলে ডাকলেন, 'শুনছ শুনছ, আমার ছাত্র শম্ভু৷ বড়ো দুষ্টু ছিল৷ আমাকে কম জ্বালান জ্বালিয়েছিল নাকি৷ সে জন্যেই কি না কে জানে ওর নামটা আজও ভুলিনি৷ হ্যাঁ এর নাম শম্ভু৷ তুমি ওর জন্যে একটু জলখাবারের ব্যবস্থা করো অরুণা৷'

বেশি নয়, আধ ঘণ্টা মতো বসতে হল৷ টুকটাক কথাবার্তা হল তখন৷ বড়ো তৃপ্তি করে আলুভাজা দিয়ে রুটি খেল৷ চোঁ চোঁ করে এক গ্লাস জল খেয়ে তারিয়ে তারিয়ে এক কাপ চা খেয়ে উঠে দাঁড়াল৷ বলল, 'স্যার এবার তাহলে...'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, আবার আসিস শম্ভু, লজ্জা করিসনি৷'

সাজানো নয়, খুব মন দিয়ে কথাটা বললেন কেদারনাথবাবু৷ সবাই তো আর বড়ো বড়ো চাকরি করে না৷ মান্যিগণ্যিও হয় না সবাই৷ খুব সাদামাটা জীবনযাপন করার সংখ্যাই বেশি৷ তাদেরই একজন ওই ছেলে৷ হয়তো সেই কারণেই ছেলেটার ওপর অতিরিক্ত মায়া দেখা দিল তাঁর৷ হয়তো এই মায়ার জন্যেই ওর নামটা মনে রয়ে গেছে৷

ঘণ্টা খানেক বাদে ঘটনাটা ঘটল-বেলা প্রায় বারোটা৷ বারান্দায় বসে সকালের খবরের কাগজটাই পড়ছিলেন কেদারনাথ৷ ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল অরুণা, 'শিগগির এসো, সব্বোনাশ হয়েছে!'

সর্বনাশের কথা শুনলে বুকের ভেতর কেমন যেন করে৷ কাগজ পাশে রেখে ঘরে গেলেন৷ মেয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে৷ সে হাত বাড়িয়ে টেবিলটা দেখাল৷ ঘরের একধারে দেওয়াল লাগোয়া একটা পুরোনো টেবিল৷ বইপত্র, কাগজ, এটা সেটা ডাঁই করা৷

'এইখানে ওটা ছিল বাবা৷ আজ সকালেও দেখেছি৷ এখন আর দেখতে পাচ্ছি না৷'

খানিক দেখলেন, খানিক শুনলেন৷ অর্ডার দেওয়া ছিল৷ কাল মা আর মেয়ে গয়নার দোকান থেকে ওটা নিয়ে এল৷ বিয়ের জন্য এক-গাছি সোনার বালা৷ প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা৷ বড়ো কষ্টের টাকা৷ মুখে কথা আসছিল না কেদারনাথবাবুর৷ খানিক আন্দাজ করেছিলেন৷ সেটাই মুখ ফুটে বলে দিল অরুণা৷

'তোমার ওই শম্ভু না কে, ও ছাড়া বাড়িতে আর কেউ তো আসেনি আজ সকাল থেকে৷'

'কিন্তু ছেলেটা তো ঘরে ঢোকেনি অরুণা৷ বারান্দাতে বসেই রুটি আলুভাজা খেল, চা খেল৷'

'বারান্দা আর ঘর মাঝখানে শুধু একটা দরজা৷ আর তুমিও তো বসে বসে পাহারা দাওনি ছাত্রকে৷'

ছাত্র, ছিঃ ছিঃ! মনটা বড়ো কষ্টে ভরে গেল কেদারনাথবাবুর৷ শম্ভু তার ছাত্র, ছিঃ! শরীরটা খারাপ লাগছিল৷ বিছানায় আধশোয়া হয়ে হাঁপাচ্ছিলেন৷ ছেলে এসে বলল, 'হাল ছেড়ে দেবার আগে পুলিশে একটা ডায়েরি করা দরকার৷ হয়তো কিছুই হবে না তবুও...'

ছেলের কথাতেই থানায় এলেন কেদারনাথবাবু৷ জীবনে কোনোদিন এসব জায়গায় আসেননি৷ কীভাবে কথা বলতে হয় জানেন না৷ পরদা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই দেখলেন ধড়াচুড়ো পরে চেয়ারে বসে এক গম্ভীর মুখ অফিসার৷ ফোনে নির্ঘাত কাউকে বকাঝকা করছেন৷ সামনে ফাঁকা চেয়ার৷ কিন্তু সেখানে বসার সাহস পেলেন না তিনি৷ ফোনে কথা শেষ হলে ভেবেছিলেন অফিসার তাকাবেন৷ কিন্তু তিনি না তাকিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷

ভয়ে ভিতরটা তিরতির করে কাঁপছিল কেদারনাথবাবুর৷ কী বলবেন, ভাবতে ভাবতে ডেকে উঠলেন, 'স্যার' বলে৷

অফিসার মুখ তুলে তাকালেন৷ তারপর সবাইকে অবাক করে বলে উঠলেন, 'মাস্টারমশাই আপনি? আমাকে চিনতে পারছেন না?'

এ-কথায় ভয়টা কেটে গেল৷ বেশ সহজ হলেন৷ কী বলতে এসেছেন তা-ও যেন ভুললেন৷ তারপর বললেন, 'আপনি, মানে তুমি অনিরুদ্ধ না?'

অফিসার হাসলেন হা-হা করে, 'তার মানে আমাকে চিনতে পারেননি৷ আমার নাম তো অনির্বাণ৷ এখন বলুন, কী দরকারে থানায় এসেছেন?'

তিনি সব বললেন, বেশ সহজ গলাতেই বললেন৷ ভয়টা কেটে গেছে৷ সাহস ফিরে এসেছে৷ অনির্বাণ বলছিল, 'অনেকদিন ধরেই আপনাকে ফলো করেছে বদমাইশটা৷'

'বদমাইশ, মানে ওই শম্ভুটার কথা বলছ?'

অনির্বাণ হাসল, 'ওই লোকটার নাম নির্ঘাত শম্ভু নয়৷ আপনার মন পাবার লোভে শুধু কথায় সায় দিয়েছে৷ সম্ভবত ও আপনার ছাত্রও ছিল না৷'

'তাহলে?'

'তাহলে সবটাই গট আপ৷ ডায়েরি বইটা হাতের কাছে টেনে নিল অনির্বাণ৷ খস খস করে ডায়েরিটা লিখে ফেলল৷ 'আমাদের দিক থেকে যা-যা করার সব করা হবে মাস্টারমশাই৷ চিটিংবাজটা যদি এই এলাকা ছেড়ে না যায়...'

অনির্বাণ আশ্বাস দিলেও খুব যে কিছু একটা হবে মনে হয় না৷ টাকাটা তাঁর কাছে অনেকখানি৷ মেয়েটা বড়ো মুষড়ে পড়েছে৷ অরুণা কথা বন্ধ করে দিয়েছে৷ তাঁর দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করেছে লোকটা৷ দিনরাত এরকম ভাবছেন কেদারনাথবাবু৷ রাস্তা দিয়ে যেতে-আসতে ভাবছেন৷ পথচারীদের দিকে তাকিয়ে খুঁজছেন৷ যদি দেখা হয়ে যায়৷ তাহলে কি জিনিসটা ফেরত পাওয়া যাবে! তিনি তো কোনো অন্যায় করেননি৷ কারো ক্ষতি করার ইচ্ছাও কোনোদিন মনে আসেনি তাঁর৷ হয়তো সে কারণেই বিশ্বাস লোকটার দেখা পাবেন৷ তাই রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তন্নতন্ন করে মুখগুলো খোঁজেন তিনি৷

একদিন দু-দিন করে সাত দিন কেটে গেল৷ থানা থেকেও কোনো খবর এল না যখন, তখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছেন কেদারনাথবাবু৷ কিন্তু আট দিনের দিন একটা ঘটনা ঘটল৷ বেলা এগারোটা, রাস্তা প্রায় ফাঁকা হঠাৎ দেখলেন উলটোদিক থেকে সেই লোকটা আসছে৷ হ্যাঁ সেই একই লোক, পুরোনো-ঝুরোনো পোশাক৷ গালে না কামানো দাড়ি-গোঁফ, গরিব গরিব চেহারা৷ আরও কাছাকাছি হতে আর কোনো সন্দেহ রইল না৷ ডেকে ফেললেন শম্ভু বলে৷

যেন শুনতেই পায়নি লোকটা৷ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে৷ উত্তেজনায় বুকের ভেতর ধক ধক শব্দ হচ্ছে তার৷ তাই দ্বিতীয়বার ডাকতে গিয়ে গলা কাঁপল৷ লোকটা আন্দাজে ঘুরে তাকাল কেদারনাথবাবুর দিকে৷ গলায় যেন অবাক, 'আপনি কাকে ডাকছেন?'

'কেন তোমাকে, মানে আপনাকে৷ আপনার নামই তো শম্ভু?'

লোকটা হাসল৷ বলল, 'ভুল হচ্ছে আপনার৷'

কথা শুনে এবার থরথর করে কেঁপে উঠল সারা শরীর৷ কখনোই ভুল নয়৷ এই লোকই সেই লোক৷ এই মুখই সেই মুখ৷ ডান গালে কাটা দাগ, সামনের দুটো দাঁত একটু উঁচু, গলায় খয়েরি রঙের জড়ুল৷

তাঁর দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় লোকটা দ্বিতীয়বার ডাহা মিথ্যে কথাটা বলল, 'আপনি ভুল করছেন৷ প্রায় একই রকম দেখতে দু-জন লোক তো থাকতেই পারে৷'

কথাটায় কী ছিল কে জানে, মাথা বোঁ করে ঘুরে গেল৷ টাল খেয়ে রাস্তাতেই পড়ে যাচ্ছিলেন৷ হাত বাড়িয়ে লোকটা ধরে ফেলেছিল৷ ব্যস, এরপর আর কিছু মনে নেই তাঁর৷

যখন জ্ঞান ফিরল দেখলেন ছোটোখাটো একটা ভিড়ের মাঝখানে তিনি চায়ের দোকানের লম্বা বেঞ্চিতে শুয়ে আছেন৷ খবর পেয়ে ছেলে চলে এসেছে৷ মাথায় নিশ্চয়ই জলের ঝাপটা দিয়েছে কেউ৷ চুল ভিজে, জামাও ভিজে গেছে৷

তাঁর দিকে চেয়ে ছেলে বলল, 'বাবা, তোমার কী হয়েছে?'

'মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল৷ এখন ঠিক আছে৷' কথা বলতে বলতে তিনি ভিড়ের চারপাশে তাকালেন৷ শম্ভু নামে লোকটা কি এখনও আছে৷ সেই এক মুখ, চোখ, সেই এক চেহারা৷ ডাহা মিথ্যে কথাটা বলে দিল৷ সকলের সামনে এবার তাকে সনাক্ত করবেন কেদারনাথবাবু৷ তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন৷ কিন্তু আশ্চর্য কোথাও তো সে নেই৷ গেল কোথায় লোকটা৷ হাতের নাগাল পেয়েও তাকে ধরা গেল না৷ ভারি হতাশ হয়ে পড়লেন তিনি৷

ছেলে কথা শুনল না৷ ডাক্তারের চেম্বার হয়ে তবে বাড়িতে আনল৷ ডাক্তারবাবু বললেন, 'গরমে আর হঠাৎ উত্তেজনায় এমনটা হয়েছে৷ ভয়ের কিছু নেই৷ এখন ক-দিন বিছানায় চুপচাপ বিশ্রাম৷'

বাড়ি ফিরে বিছানাতেই শুয়েছিলেন৷ একপ্রস্থ হইহট্টগোলের পর এখন চারপাশ শান্ত৷ তাঁকে একা ঘরে রেখে সবাই বাইরে গেল৷ তখন খেয়াল হল গায়ের জামাটা ভিজে গেছে৷ বিছানা থেকে নেমে জামাটা খুলছেন, পকেটে হাত ঠেকল৷ শক্তমতো কী একটা যেন৷ তাড়াতাড়ি হাতটা বার করে আনলেন৷ খবরের কাগজের একটা পাতি ঠোঙা৷ আশ্চর্য, এটা তো রাখেননি পকেটে৷ ঠোঙাটা খুলতেই বেরিয়ে এল সেই সোনার বালাটা৷ হ্যাঁ, সেই বালাটাই৷ কিন্তু গোপনে কে এটা পকেটে রাখল? ওই লোকটা কি? কিংবা লোক নয়, হয়তো শম্ভুই৷ আবার হয়তো শম্ভুও নয়, তার ছাত্রই হবে নির্ঘাত৷

Cov5
অধ্যায় ১ / ৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%