আনন্দনগরের গল্প

গৌর বৈরাগী

Cov15

সকাল বেলা কোকিলের ডাক শুনে মনটা বিচ্ছিরিরকম খারাপ হয়ে গেল আনন্দ দারোগার৷ কোকিলের নিয়মে অবশ্য কোকিল ডেকেছে৷ বসন্তকাল এলেই তো ওরা টের পায়৷ তারস্বরে ডেকে ওঠে৷ ওদিকে আরাম করে ডাকার জন্য থানার চারপাশে গুচ্ছের গাছ৷ সবই আম গাছ, জাতের আম খাবে বলে শখ করে কেউ লাগিয়েছে৷ তো বসন্তকালে আম গাছে মুকুল আসে, গন্ধ আসে৷ সেই গন্ধের ঠেলায় কি না কে জানে ঝাঁকে ঝাঁকে কোকিলও এসে বসে আম গাছের ডালে৷ সেই কোকিল ডাকছে৷

কাল সারারাত ঘুম হয়নি আনন্দ দারোগার৷ বিয়ে বাড়ির নেমতন্নে একটু বেশি খাওয়া হয়ে গেছল৷ সকাল সকাল তাই ঘুম ভেঙেছে৷ এখন এই ঠান্ডা হাওয়ায় মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন৷ আনন্দনগর জায়গাটা একদম নিরিমিষ্যি৷ খুনখারাবি তো নেই-ই, সামান্য চুরি ডাকাতিও হয় না৷ তাই প্রায় সারাদিন কাগজ পড়েই সময় কাটে আনন্দ দারোগার৷ প্রথমে বড়ো খবর তারপর মেজো তারপর ছোটো৷ খবর পড়া হয়ে গেলে মন দিয়ে বিজ্ঞাপন পড়েন৷ শেষে ব্যক্তিগত কলামেও চোখ বোলান৷

সেই কাগজ পড়তে পড়তেই হইচইটা কানে এল৷ খোলা জানালা দিয়ে দেখলেন, একজনকে ধরে বেঁধে একদল ভিড় থানার কম্পাউন্ডে উঠে এল৷ সেই মাঝখানের জনকেই দেখছিলেন আনন্দ দারোগা৷ বয়স চল্লিশ হতে পারে, পঞ্চাশ হতে পারে আবার ষাট হলেও কিছু বলার থাকে না৷ লোকটার ত্যাড়াবাঁকা চেহারা, খালি গা৷ গায়ে ঘামাচি, হাড়গুলো আলাদা আলাদা করে গোনা যায়৷ সামনের ক-টা দাঁত নেই৷ মাথা ন্যাড়া, একটা পুরোনো-ঝুরোনো হাফপ্যান্ট৷ ক-জন মিলে ধরাধরি করে লোকটাকে তার সামনে দাঁড় করাল৷

উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসলেন আনন্দ দারোগা৷ গমগমে গলায় বললেন, 'কী কেস?'

'আজ্ঞে চুরি কেস৷'

'কী চুরি?'

'গামছা চুরি দারোগাবাবু৷ একেবারে নতুন গামছা৷ কেচেকুচে ওটা দড়িতে মেলে দিয়েছে আর হারান ব্যাটা তক্কে তক্কে ছিল৷ ব্যস গামছা হাওয়া৷ এখন দিন ওটাকে ঘানিতে জুড়ে৷'

একজন বলল, 'হারানের জ্বালায় আমরা জ্বলেপুড়ে মরলুম স্যার৷ গামছা, পুরোনো শার্ট, খাঁচাসুদ্ধু পাখি, গায়ে মাখা তেলের শিশি৷ একটু চোখ আড়াল হয়েছে কি ব্যস৷ ওকে স্যার এক বছরের একটা মেয়াদি ব্যবস্থা করে দিন৷'

ভিড়ের ভিতর থেকে একজন বলল, 'গেল আষাঢ় মাসে কী হল মনে নেই, আমার কোলের ছেলেটার মাদুলিতে দু-পয়সার সোনা ছিল৷ কোলে তোলার নাম করে মাদুলিটা হাত সাফাই করেছিল হারান৷'

Cov16

আনন্দ দারোগার এসব শুনতে শুনতে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল৷ কতদিন বাদে একটা চোর জুটল৷ কিন্তু কেসটা এত পেটি যে শাস্তি দিতেও হাত কাঁপে৷ এদিকে সঙ্গের লোকগুলো এক বছরের মেয়াদি চাইছে৷

তখন গড়গড় করে ডায়েরিটা লিখে তাকালেন সামনে৷ 'মন দিয়ে শোনো সবাই৷ আমি যা লিখলাম এটা আসলে তোমাদেরই লেখা৷ শুনে-টুনে সবাই মিলে সই করে দাও৷' বলে লেখাটা রিডিং দিলেন আনন্দ দারোগা৷

'বেলা দশটার সময় নেই পুকুরের দক্ষিণে দণ্ডবৎ সরকারের বাড়িতে ঢুকেছিল হারান৷ তখন উঠোনে কাপড়চোপড় শুকোচ্ছে৷ নতুন গামছাটাও আছে৷ আর ওই গামছার খুঁটে বাড়ির গিন্নির দু-ভরির বিছে হারটা লটপট করে ঝুলছে...'

এই অবধি পড়তেই হারানের সঙ্গে আর সবাই হইহই করে উঠল৷ 'স্যার স্যার ভুল হচ্ছে৷ গামছায় বিছে হার ছিল না৷'

'ছিল না সে আমিও জানি৷' আনন্দ দারোগা হাসলেন৷ "কিন্তু এক বছর ঘানি টানাতে মিনিমাম দু-ভরি সোনার গয়না তো লাগবেই৷"

'আর শুধু যদি গামছা হয়?' মাঝখান থেকে একজন বলল, 'শুধু গামছা হলে ঘা কতক রদ্দা৷'

দণ্ডবৎ সরকার বলল, 'আপনি তাহলে গামছার খুঁটে এক আনা সোনার আংটিটা বেঁধে দিন৷'

'বেশ তাহলে আংটিই বাঁধছি৷' আনন্দ দারোগা বললেন, 'এক আনায় তিন মাসের ঘানি৷'

বলে কথাটা লিখতে যাবেন, হাঁউমাউ করে কাঁদো-কাঁদো গলায় হাত জোড় করে সামনে দাঁড়াল হারান৷ 'তাহলে আমার পরিবার আর ছেলে-মেয়েরা যে না খেয়ে থাকবে দারোগাবাবু৷'

আনন্দ দারোগা বললেন, 'এটা একটা ভাববার কথা বটে৷'

'না, এটা কোনো কথা নয় স্যার৷' সবাই এবার হইহই করে উঠল৷ 'ওর আস্পদ্দা তো কম নয়৷ আনন্দনগর জায়গাটা এত খারাপ ও ভাবল কী করে যে, ও না থাকলে ওর ছেলে-মেয়েরা সব না খেয়ে থাকবে৷ আমরা কি সব মরে গেছি দারোগাবাবু!'

Cov17
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%