গৌর বৈরাগী

বন্দুকটা পুরোনো, বহুকাল আগের জিনিস৷ ইংরেজ আমলেরও হতে পারে৷ চেম্বারটা পুরোনো রং-চটা৷ কাঠের বাঁটে একজায়গায় সামান্য চোকলা উঠেছে৷ পিস্টল গ্রিপটাও সুবিধের নয়৷ তবু প্রতিদিন নিয়ম করে সার্ভিস করে তিনু৷ ব্যারেল পরিষ্কার করে৷ তেল খাওয়ায়৷ এ এমন জিনিস যে কারো হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না৷ কাঠগোলা থেকে গালা আনে, স্পিরিট আনে, পালিশের আরও সব সরঞ্জাম আনে৷ জিনিসটাকে তো তৈরি রাখতে হবে৷ কোনদিন কাজে লাগে কে জানে৷
যদিও যারা জিনিস চেনে তারা বেশ হাসাহাসি করে৷ এই তো গোলাবাড়ি থানা থেকে গগন এসেছিল৷ জায়গাটা বাবুগঞ্জের থেকে ঢের বড়ো৷ আধা শহরই বলা যায়৷ বড়োবাবু, মেজোবাবু, আর আটজন কনস্টেবল৷ গোলাবাড়ি মোড়ে ট্রাফিক সামলানোর জন্যে দু-জন পুলিশ৷ ওখানে এন্তার ঝুটঝামেলা লেগেই আছে৷ মালখানায় তাই চারটে আনকোরা বন্দুক মজুত থাকে৷ তাদের চেহারায় কী চেকনাই৷ পিস্টল গ্রিপ ধরে এক আঙুলে ঘোড়া টানলেই বন্দুক কথা বলে৷
তো গগন এল একদিন৷ তিনু তখন থানার টালির চালের বারান্দায় বসে বন্দুকটা পরিষ্কার করছে৷ সেদিকে তাকিয়ে গগনের হাসি আর থামে না, 'ওরে এ দিয়ে পাখিকেও ভয় দেখানো যাবে না তিনু৷ তুই স্যারকে বলে একটা নতুন বন্দুক আনার ব্যবস্থা কর৷'
নতুন জিনিস! তাও এই বাবুগঞ্জ থানায়৷ এখানে ছ-মাস হল এসেছে তিনু৷ এসে অবধি দেখছে এই থানাকে কেউ থানা বলে মনে করে না৷ দারোগা উমাচরণ উঠতে-বসতে শাপশাপান্ত করেন জায়গাটার৷ কিন্তু উপায় কী, থানা আছে যখন তখন দারোগা সায়েবের একটা ঘরও আছে৷ সেখানে তাকে বসতে হয়৷ চুপচাপ আর কাঁহাতক বসে থাকা যায়৷ তাই লাইব্রেরি থেকে তিনুর এনে দেওয়া গল্পের বই পড়তে হয়৷ আর গল্পের বই একটানা পড়তে গিয়ে চোখ জুড়ে ঘুম আসে৷ তাই ঘুমোতেও হয় দারোগাকে৷
তাহলে তিনু কী করে?
কী আর করবে৷ থানায় একমাত্র বন্দুকটা নিয়ে মোছামুছির কাজ করে৷ কিন্তু সে আর কতক্ষণ৷ তারপর সে হাতে খুরপি নিয়ে বাগানে নামে৷ থানার সামনে কাঠা পাঁচেকের একটা জমি এমনি পড়ে আছে৷ তো তিনু করল কী, একদিন বাঁশের কঞ্চি ডগালি দিয়ে ঘিরে ফেলল জায়গাটা৷ দু-বার কোদাল চালাতেই মাটি কথা বলল যেন৷ ভুসভুসে মাটি, সোনার মতো জেল্লাদার৷ খুরপি নিয়ে চারা সাজাতে বসে গেল সে৷ চিন্তামনি বেগুন, সাতভাই চম্পা শসা, রাবুনে লঙ্কা, হাজারে সিম এইসব৷
একদিন স্কুলের হেডমাস্টার অবনী সামন্ত খেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন, 'তিনু না?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, মাস্টারমশাই৷'
'তা তুমি কী করছ হে?'
'আজ্ঞে শিম গাছে জল দিচ্ছি৷'
কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন অবনী সামন্ত৷ বললেন, 'ছিঃ ছিঃ, পুলিশ হয়ে পিঠে বন্দুক বেঁধে শেষে কিনা শিম গাছে জল?' বলে ছাতা মাথায় ইশকুলে গেলেন তিনি৷
কথাটা বোধ হয় দারোগা সাহেবের কানেও গেল৷ তিনি ডেকে পাঠালেন তিনুকে৷ বললেন, 'যথার্থ কথা বলেছেন অবনী মাস্টার৷ তুমি পিঠে বন্দুক বেঁধে বাগান করছ? না হে না, এবার ওটা ওপরে পাঠিয়ে দেব ভাবছি৷ ওসব জিনিস এখানে রেখে লাভ কী?'
শুনতে শুনতে তিনু ঘামতে লাগল৷ তখনও তার পিঠে বাঁধা বন্দুক৷ বাঁটে হয়তো বাগানের মাটি লেগে আছে৷ ব্যারেলের ডগায় হয়ত উচ্ছে গাছের কচি কচি দুটো ফুল ছিঁড়ে আটকে আছে৷ লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়া বোধ হয় একেই বলে৷ কিন্তু তার তো কিছু করার নেই৷ এমন বিচ্ছিরি ভালো জায়গা পৃথিবীতে আর দু-টি নেই৷ যে থানার এলাকায় বছরে একটাও খুন হয় না, সেটা আর যাই হোক থানা নয়৷ অবশ্য খুন না হলেও এক-আধটা ডাকাতি হতে পারত৷ কত গ্রামে তো ডাকাতি হয়৷ কিন্তু তিনুর ভাগ্যটাই বোধ হয় খারাপ৷ কিংবা তিনুর নয়, ওই বন্দুকটার৷ সেজেগুজে তৈরি হয়ে আছে৷ কাতুজ ভরে ঘোড়ায় একটা ছোটো টান৷ ব্যাস সাঁই করে গুলি ছুটে যাবে৷ তিনুর হাতের টিপ খুব ভালো৷ ফসকাবার কোনো চান্স নেই৷ হইহই পড়ে যাবে তিনুর নামে৷ কিন্তু বন্দুক নিয়ে কারও পেছনে ধাওয়া করার কোনো সুযোগই পেল না সে৷
প্রথম প্রথম এখানে এসে তাই বেশ হতাশ হয়ে পড়েছিল তিনু৷ দেখতে দেখতে ছ-ছ-টা মাসও কেটে গেল৷ তখন কিছু কিছু চেনা পরিচয় হয়ে গেছে তার৷ নতুন গাঁয়ের তারু বাগ বাবুগঞ্জের হাটে তরকারি নিয়ে বসে৷ কলাটা-মুলোটা বিক্রি করে৷ সেদিনও মাল নিয়ে বাজারে যাচ্ছে৷ তিনু ডাকল-
'ও তারু, তারু৷'
'কী গো তিনুদা?'
'তোমার গাঁয়ের খপর কী তারু?'
'কোন খপর জানতে চাইছ?'
'এই চোর-ডাকাতের খপর আর কি৷ কারও বাড়ি ডাকাত পড়ার আগাম কোনো সংবাদ আছে নাকি?'
কথা শুনে তারু এই মারে তো সেই মারে৷ 'ওসব অ-কথা, কু-কথা বোলো না তিনুদা৷ আমরা বেশ সুখে আছি৷'
'অ-কথা কু-কথা বলছিস কেন তারু৷ ঘর করতে গেলে শান্তি যেমন দরকার তেমনি অশান্তিও বাপু দরকার৷ এই দেখ না রোগ কি কারো ভালো লাগে৷ তবু রোগ-বালাই কি বাদ দেওয়া যায়৷ তেমনি...'
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তিনু পুলিশ, কিন্তু বলা হল না৷ ততক্ষণে হনহন করে এগিয়ে গেছে তারু৷ চুরি-ডাকাতির কথা শুনতে তার বয়ে গেছে৷ আর সেদিকে তাকিয়ে দুঃখে মন ভরে গেল তিনুর৷ তো এরকম এক দুঃখের ভেতরেই কাণ্ড ঘটল একদিন৷ সোমপুর গাঁয়ের লোকজন একদিন দল বেঁধে থানায় হাজির৷ কী? না গাঁয়ে ভূতের উৎপাত হয়েছে খুব৷ সন্ধ্যে হলেই বাঁশঝাড়ে ঝুরঝুর করে মাটি ফেলছে ভূতে৷ আর নিশুত রাতে ভাঙা জমিদার বাড়ির ছাদে মানুষের কাটা মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলছে৷
এরকম কাণ্ড অবশ্য আকছারই হয়৷ গাঁয়ে-গঞ্জে পুলিশের যে কতরকম কাজ আছে৷ ভূত তাড়ানো, গাছের মগডাল থেকে 'বাবা বাছা' বলে পাগলকে নামিয়ে আনা৷ এবারও সোমপুর গাঁয়ে যেতে হবে৷ কিন্তু এবার যাওয়াটা অন্যরকম হল৷
দারোগাবাবু বললেন, 'তিনু?'
তিনু, 'আজ্ঞে,' বলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷
দারোগাবাবু গল্পের বই থেকে মুখ তুলে বললেন, 'এঁদের সঙ্গে গিয়ে ভূত তাড়িয়ে দিয়ে এসো৷ বন্দুকটাও সঙ্গে রেখো৷' কেন বললেন৷ কে জানে৷ ভূত তাড়াতে বন্দুক লাগার তো কথা নয়৷ ও তিনু একাই এক-শো৷ তবু ওপরওলা বলে কথা৷ বন্দুকটা নিতেই হল৷
একে পুলিশ তার ওপর বন্দুক, ভূতের এত সাহস হয়নি এরপরেও সে দাপিয়ে বেড়াবে৷ সন্ধ্যে হলেই বাঁশঝাড়ে ঝুরঝুর করে মাটি ফেলে ভূত৷ তো দলবল নিয়ে প্রথমে সেখানেই গেল তিনু৷
ও হরি, মাটি কোথায়? এ তো বাঁশপাতার ভেতর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাবার শব্দ৷
তিনু পুলিশ সঙ্গে আছে বলেই কি না কে জানে৷ সকলেই বিশ্বাস করল কথা৷ কিন্তু সঙ্গেসঙ্গেই বলল, 'তাহলে জমিদার বাবুর ছাদে?'
'হ্যাঁ, পোড়ো জমিদার বাড়ি, বনজঙ্গলে ঢাকা, এখন সেখানে কেউ থাকে না৷ রাত্তির হলেই সে এক কাণ্ড৷ ভাঙা ছাদে বল গড়িয়ে যাবার শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যায়৷'
তিনু পুলিশ হাসল, 'বেশ চলো, তাকেও দেখে নিই৷'

তাকে দেখারও আয়োজন হল৷ সোমপুরের জমিদার বাড়ি৷ এখন ধ্বংসাবশেষ৷ উঠোনে ঘাস লতাপাতার জঙ্গল৷ খান কয়েক ভাঙা ঘর এখনও দাঁড়িয়ে আছে৷ আর আছে একটা ছাদ৷ মাঝ রাতে সেই ছাদে এল তিনু পুলিশ৷ হাতে টর্চ আর বন্দুক৷ কিন্তু ভূত কোথায়৷ তার বদলে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা৷ একটু বসার উপায় নেই৷ দুর ছাই, বলে ছাদ থেকে একসময় নেমে এল সে৷
নুড়ি বিছানো মাটির রাস্তা৷ পাশে ঝোপজঙ্গল৷ ভেতরে ভেতরে মাটির বাড়ি আর ঘন অন্ধকার৷ তিনু হাঁটছে৷ তখনই কান্নার শব্দটা শোনা গেল৷ কিংবা কান্না নয়, বোধ হয় গোঙানি৷
'কে? কে কাঁদে?'
গলাটা পুলিশের, আর পুলিশের হলে যা হয় এমনি কথাতেও ধমক মিশে যায়৷ আর এখন তো নিশুত রাতের অন্ধকার৷ তাই প্রশ্নটা বেশ জোরেই বেরিয়ে আসে গলা চিরে৷ শব্দটা মিলিয়ে যাবার আগেই মাটির ঘরের বাঁশের আগড় ঠেলে হ্যারিকেন হাতে বেরিয়ে এল একজন৷ রোগা ঠিংঠিঙে, খালি গা, পরনে একটুকরো কাপড়৷
তিনু পুলিশ বলল, 'কে?'
'আজ্ঞে, আমি পাঁচু৷'
'কাঁদে কে?'
'আজ্ঞে, আমার মেয়ে ফুলি৷'
'কেন কাঁদে?'
সব প্রশ্নই যেন ঝনঝন করে বাজে৷ তার ওপর হ্যারিকেনের আলোয় ততক্ষণে পাঁচু দেখে ফেলেছে৷ সামনের লোকটা আর কেউ নয়, একজন পুলিশ৷ তার হাতে আবার বন্দুক৷
দেরি দেখে তিনু পুলিশ আবার বলে, 'এত রাতে কাঁদে কেন?'
ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় পাঁচুর৷ সে বলে, 'আপনি ভাববেন না হুজুর৷ আমি এক্ষুনি ওর কান্না থাম্মে দিচ্ছি৷' বলে সে ঘরের দিকে এগোতে চায়৷
তিনু পুলিশ বলে, 'কী হয়েছে তোমার মেয়ের?'
'আজ্ঞে, তিন দিন ধরে জ্বর, আজ আবার বেড়েছে৷'
'ওষুধ দাওনি?'
'দিইচি আজ্ঞে, শেতলা মায়ের জলপড়া খাইয়েচি৷'
তিনুর গলায় রাগ উঠে আসে৷ 'জ্বালাতন, আমি বলছি ওষুধের কথা৷ তোমার জলপড়া ওষুধ নাকি?'
'আমাদের এ দিগরে ডাক্তারও নেই, ওষুধও নেই৷ সে আচে বাবুগঞ্জে, দশ-বারো মাইল দূরে৷'
এসব কথা বেশ জোরেই চালাচালি হয়৷ আশেপাশের লোকজন ঘুম ভেঙে ছুটে আসে৷ সেই তাদের দিকেই তাকিয়ে তিনু পুলিশ বলে, 'এ গ্রামে কোনো রিক্সাভ্যান নেই?'
একজন বলে, 'আছে স্যার, কিন্তু তাকে তো এখন পাবেন না৷'
'কেন?'
'নিতাইটা রিক্সাভ্যান চালানোর চাইতে ঘুমোতেই পছন্দ করে বেশি৷ কুঁড়ের বেহদ্দ৷ দিনের বেলায় পড়ে পড়ে ঘুমোয়৷ রাতে তো কথাই নেই৷'
'বেশ, চলো দেখি৷'
এটাও মাটির বাড়ি, খড়ের চালা, চালায় শাকপাতা লতাচ্ছে৷ উঠোনে শুয়ে থাকা একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে৷ তার শব্দটা মিলিয়ে যেতেই একসঙ্গে তিন-চারটে গলা 'নিতাই, নিতাই' বলে হাঁক দেয়৷
অতগুলো গলা বলেই কি না কে জানে৷ নিতাই বাঁশের দরজা ঠেলে বাইরে এসে বলে, 'আমি কিন্তু কোথাও যেতে পারবুনি৷'
বলে আর তাকায়৷ সামনে তখন পুরোদস্তুর পুলিশের পোশাক পরা তিনু৷ আশেপাশে কুপি আর হ্যারিকেনের আলোয় শুধু পুলিশ নয় বন্দুকটাও দেখে নিতে অসুবিধে হয় না নিতাইয়ের৷ সে মিয়োনো গলায় বলে ওঠে, 'আপনার দরকার? সেটা বলবেন তো স্যার৷ বলুন কোতা যেতে হবে?'
রাত দেড়টায় ভ্যানটা ছাড়ল৷ কাঁথা বিছিয়ে শোয়ানো হল ফুলিকে৷ মাথার কাছে বসল তার মা৷ পেছনে একধারে ফুলির বাবা, অন্য ধারে তিনু পুলিশ৷ বাবুগঞ্জে তাকে তো ফিরতে হতই৷ পাশে পাশে আরও ক-জন সাইকেলে আসছে৷ ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ছোটো হাসপাতালের কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়ল ভ্যানটা৷
বাইরে অন্ধকার, ভেতরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে৷ বন্ধ কাচের দরজায় শব্দ করল ক-জন৷ কাজ হল না৷
'রুগি এসেছে, রুগি এসেছে!' বলে হাঁক দিল একজন৷ তাতেও দরজা খুলল না৷
তখন তিনু এগিয়ে এল৷ গলা তুলে বলল, 'পুলিশ এসেছে, পুলিশ এসেছে৷'
কথাটা শেষ হয়েছে কি হয়নি, দড়াম করে খুলে গেল দরজা৷ সামনে নার্স৷ চোখে ঘুম থাকলেও পুলিশ চিনতে না পারার কথা নয়৷ আবার শুধু পুলিশ তো নয়, পুলিশ দেখে দেখে চোখ পচে গেছে লোকেদের৷ এ পুলিশ শুধু হাতে আসা পুলিশ নয়, দস্তুরমতো কাঁধে বন্দুক৷
ডাক্তার নার্সরা এমনিতে বেশি কথা বলেন না৷ তারা নিজের মনে কাজ করেন৷ এখানেও কাজ শুরু হয়ে গেল৷ ফুলিকে বেডে শুইয়ে জ্বর মাপা হল৷ একটা ট্যাবলেট খাওয়ানো হল৷ তারপর ফোন তুললেন নার্স৷ ফোনে অনেক ক-টা কথাই হল৷ সব কথা বোঝা গেল না৷ শোনাও গেল না৷ যেগুলো শোনা গেল তার মধ্যে দুটো শব্দ চেনা৷ তার একটা হল 'স্যার' আর অন্যটা হল 'বন্দুক'৷ স্যারের কাছে বন্দুকের খবর পাঠালেন বোধ হয়৷ কেননা ফোন রেখে একটা ইঞ্জেকশন দিতে-না-দিতেই গলায় কল ঝুলিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলেন ডাক্তার৷ বেডের পাশে দাঁড়িয়ে জিব দেখলেন, চোখ দেখলেন, কল দিয়ে বুক দেখলেন৷ তারপর এগিয়ে এলেন, যেখানে সবাই দাঁড়িয়েছিল সেখানে৷ কিন্তু সবাইকে বললেন না৷ কথাটা বললেন শুধু তিনু পুলিশকে৷
'আপনারা এখন যেতে পারেন৷ পেশেন্ট ভালো আছে৷'
এরকম ঘটনা এর আগে কোনোদিন ঘটেনি৷ এতে করে হল কী? কথাটা হু-হু করে ছড়িয়ে পড়ল৷ বাবুগঞ্জ থেকে ন্যাদারহাট৷ সেখান থেকে ভুরশুণ্ডপুর, কালীবাজার, গঙ্গাজলবাড়ি৷ লোক আসতে শুরু করল৷ সকালে তো বটেই৷ রাতবিরেতেও এল৷ গেঞ্জি গায়ে, সাইকেল চালিয়ে কেদারনগর থেকে এসেছে অজু বাগ৷
'কী ব্যাপার?'
'আমার ছেলের ঘন ঘন দাস্ত হচ্ছে তিনুবাবু৷'
'তো আমি কী করব, ডাক্তারের কাছে যাও?'
'পারলে আপনিই পারবেন, একবারটি চলুন৷'
সেই কালীবাজার থেকে এল সদানন্দ কাহার৷ ডাব পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙেছে৷ ভ্যানে শুয়ে কাতরাচ্ছে সে৷
রাগ করে তিনু পুলিশ বলল, 'আমি কী করব? হাসপাতালে যাও সবাই৷'
'যাব, তবে আপনাকেও যেতে হবে তিনুবাবু৷' পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলল, 'সঙ্গে বন্দুকটা রাখতে ভুলবেন না যেন৷'
হ্যাঁ বন্দুকটা রাখল৷ আর কী আশ্চর্য, কাজটাও হয়ে গেল৷ এতে করে হল কী, বন্দুকটার যত্ন বেড়ে গেল৷
সদানন্দ শুধু বলল বলে নয়৷ ততদিনে সবসময় কাঁধে বন্দুক ঝোলানোটা অভ্যাস করে ফেলেছে তিনু পুলিশ৷ ফুটবল খেলা নিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়েছিল৷ মারামারি থেকে রক্তারক্তি কাণ্ড৷ কিন্তু এবার হল অন্যরকম৷ যারা জিতল তারা হেরোদের দুয়ো তো দিলই না৷ পরপর হাত ধরাধরি করে আর কোলাকুলি করল৷ কাঁধে বন্দুক নিয়েই হাসিমুখে পুরস্কার বিতরণ করল তিনু পুলিশ৷
তো সে যখন বুঝছে বন্দুকটা খুব কাজের, খুব দরকারি, তখনই খবরটা জানালেন দারোগা উমাচরণ৷ ডাকলেন, 'তিনু তিনু৷'
সে সামনে গিয়ে দাঁড়াল, 'বলুন দারোগাবাবু৷'
উমাচরণ হাসলেন, 'এবার আপদটা বিদেয় করা যাবে মনে হচ্ছে৷'
'আপদ?'
'হ্যাঁ, ওই বন্দুকটার কথা বলছি৷ ওপর থেকে খবর পেলুম, ওটা ফেরত নিতে চিঠি আসছে৷'
'কিন্তু ওটা তো এখন ফেরত দেওয়া যাবে না দারোগাবাবু৷'
'সে কী, ওটা তো কোনো কাজেই লাগে না বাবুগঞ্জে৷ এখানে খুনিও নেই ডাকাতও নেই৷'
'তা সত্যি৷' হাসল তিনু পুলিশ৷ 'ওদের মারার জন্যেই তো বন্দুকের দরকার৷ মানুষ মারার জন্যেই এতদিন বয়ে বেড়াতুম বন্দুকটা৷ এখনও কাছে রাখি, তবে রাখি মানুষ বাঁচানোর জন্যে৷ আর কাজও দেয় খুব৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন