গৌর বৈরাগী

গোপেশ্বর মুখুজ্জের কাছে সত্যি কথা শুনতে শুনতে রাজামশাই রেগে টং হয়ে গেলেন৷
দুর বাবা, এত সত্যি কি ভালো লাগে ছাই! শুধু সত্যি আর সত্যি, কেউ একটাও মিথ্যে কথা বলছে না৷
আসলে হয়েছে কী, আজ রাজসভায় গোপেশ্বর মুখুজ্জের তলব হয়েছে৷ কী ব্যাপার! না সে-লোক নামে-বেনামে এক-শো বিঘে জমির মালিক, এদিকে এক পয়সা খাজনা জমা দেয়নি৷
সকাল বেলা রাজামশায়ের সামনে দু-হাত জোড় করে বলল, 'কী করে খাজনা দিই, এ বছর তো চাষই হল না!'
'কেন হল না?'
'আজ্ঞে বন্যায় সব ভেসে গেল যে৷'
পেয়াদা বলল, 'এ বছর বন্যা কোথায়, হল তো খরা!'
'তাহলে তাই৷ বিশ্বাস করুন রাজামশাই, সত্যি বলছি৷ ওই খরাতেই চাষ করা গেল না৷'
'খরা এসেছে, কিন্তু চাষের সিজিন পেরিয়ে যাবার পরে৷' সেনাপতি বলল, 'বরং পোকা লেগে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে বলতে পারো৷'
গোপেশ্বর কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, 'তাহলে তাই হবে৷ আমি সত্যি বলছি রাজামশাই, বিশ্বাস করুন৷ পোকা লেগে...৷'
ততক্ষণে রাজামশাই রেগে গেছেন৷ গমগমে গলায় বলে উঠলেন, 'আর ভালো লাগছেন না৷ সকাল থেকে বাহান্ন বার সত্যি কথা শোনা হয়ে গেল৷ এত সত্যি কি ভালো লাগে ছাই!' মন...তি...রি...বলে হাঁক পাড়লে তিনি৷
ঠিক সেই সময় হন্তদন্ত হয়ে রাজসভায় ঢুকল মন্ত্রী৷ রাজামশাই গম্ভীর মুখে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন৷
মন্ত্রী বলল, 'বিশ্বাস করুন, সত্যি বলছি রাজামশাই৷ আজ সকাল থেকে পেটখারাপ শুরু হয়েছে৷ তাই আজ রাজসভায় আসতে দু-ঘণ্টা লেট হয়ে গেল৷'
'কালও পেটখারাপের জন্যে দেড় ঘণ্টা লেট ছিল৷'
'তাই নাকি!' মন্ত্রী আমতা-আমতা করে বলল, 'কালও পেটখারাপ বলেছিলুম নাকি? তাহলে সেটা ঠিক নয়৷ সত্যি বলছি বিশ্বাস করুন, কাল শূল বেদনা হয়েছিল৷'
রাজামশাই বললেন, 'আর পরশু?'
'সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন রাজামশাই৷ পরশু হল কী...৷'
শুনতে শুনতে ততক্ষণে রেগে আগুন হয়ে গেছেন রাজামশাই৷ সেই রাগ গলায় এনে বললেন, 'সেই সকাল থেকে শুধু সত্যি কথাই শুনছি৷ এত সত্যি কি ভালো লাগে ছাই! আমার একজন মিথ্যেবাদী চাই৷'
মন্ত্রী মাথা চুলকে বলল, 'কী চাই বললেন?'
'রাজমিথ্যেবাদী৷'
'সেটা কীরকম?'
রাজামশাই জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার রাজসভায় সভাকবি আছে?'
'হ্যাঁ, আছে৷'
'রাজবৈদ্য আছে?'
'আজ্ঞে..., আছে৷'
'রাজবিদূষক?'
'আজ্ঞে', মন্ত্রী আমতা-আমতা করে বলল, 'আপনার রাজসভায় সব আছে রাজামশাই৷ হাসুড়ে, ফাঁসুড়ে, রাজকবি, রাজগায়ক সব আছে৷ তাহলে আবার কাকে আনতে চান?'
রাজামশাই গম্ভীর গলায় বললেন, 'সারাদিন সত্যিকথা শুনতে আর ভালো লাগে না৷ এক্ষুনি একজন মিথ্যেবাদী দরকার৷ মাঝে মাঝে মিথ্যে শুনলে মনে হাসি আসবে, মন হালকা হবে৷ আমি অর্ডার দিচ্ছি এক্ষুনি তেমন একজনকে রাজমিথ্যেবাদী হিসেবে নিয়োগ করো৷' বলে গটগট করে রাজামশাই চলে গেলেন৷
এরকম কথা জীবনে কেউ শোনেনি৷ কেউ শুনবে বলেও মনে হয় না৷
রাজামশাই যখন অর্ডার দিয়েছেন, চাই তো চাই৷
সেই অনুযায়ী চারদিকে পোস্টার পড়ে গেল৷ লেবুতলার মোড়ে, বাজারে, শম্ভুর চায়ের দোকানে, রিকশার পেছনে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা পোস্টার-
মিথ্যেবাদী চাই!
মিথ্যেবাদী চাই!
মিথ্যেবাদী চাই!
রাজসভায় নতুন পোস্ট৷ মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন, সারাদিন ধরে নাগাড়ে মিথ্যে কথা বলার ক্ষমতা৷
এক দিন গেল, দু-দিন গেল, তিন দিনের দিন রাজামশাই বললেন, 'আমার মিথ্যেবাদী কোথায় গেল মন্ত্রী?'
'আজ্ঞে... পোস্টারে পোস্টারে চারদিক ছয়লাপ, তবু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না৷'
'কেন পাওয়া যাচ্ছে না?'
'সারাদিন ধরে মিথ্যে কথা বলার ধকল কি কম! অত হ্যাপা কেউ নিতে চাইছে না, রাজামশাই৷'
'কীরকম?'
'এই ধরুন না হুলো দাসের কথা৷ লোকটা সকালে বাজারে মাছ নিয়ে বসে৷ হুলো শুনেটুনে বলল, মাছগুলো বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত আমি চুটিয়ে মিথ্যে বলি৷ তা বেলা বারোটা হবে৷ তারপর বাড়ি গিয়ে চান করে ভগবানের নাম করি৷ মদন গোয়ালা বাড়ি বাড়ি দুধ দেয়৷ সে বলল, আমিও মিথ্যে যা বলার দশটার মধ্যে বলে ফেলি৷ গগন মোক্তারের মুহুরি শুনে-টুনে বলল, আমাদের আবার বেলা দশটা থেকে ওই কাজটা শুরু হয়, খুব বেশি হলে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত৷' এরপর মন্ত্রী গলা নামিয়ে আস্তে আস্তে করে বলল, 'এর পরেও একটা কথা আছে রাজামশাই৷'
'কী কথা?'
'আজ্ঞে মিথ্যেবাদীর স্যালারিটা বড্ড কম৷ মোক্তারের মুহুরি বলল, অত কম মাইনেতে কি চাকরি ছাড়ার রিসক নেওয়া যায়!'
রাজামশাই বললেন, 'বেশ-ওটা বাড়িয়ে দাও৷'
'তাহলে কত করব রাজামশাই, ডবল?'
'না, দশগুণ৷'

সেনাপতি আমতা-আমতা করে বলল, 'রাজামশাই, আপনার কোনো ভুল হচ্ছে না তো? মিথ্যেবাদীর মাইনে তো সেনাপতির চাইতে বেশি হয়ে গেল৷'
মন্ত্রী বলল, 'না, রাজামশাই কিছু ভুল করেননি৷ মাইনেটা শুধু তোমার চাইতে নয় আমার চাইতেও বেশি৷'
'তাতেও ভুল নয়?'
'না নয়৷' মন্ত্রী হাসল৷ 'আসলে মিথ্যে কথা বলা মোটেই সহজ কথা নয়৷'
তো এরপর আর কী করার আছে৷ একে রাজামশায়ের অর্ডার৷ তার ওপর মন্ত্রীর আশকারা৷ অতএব যা হবার তাই হল৷
পরদিন নতুন করে পোস্টার পড়ল-
রাজ মিথ্যেবাদী পদে
ওয়াক ইন ইন্টারভিউ
লোভনীয় পে-প্যাকেট
যোগাযোগ-রাজসভা৷ সকাল দশটা৷
সেদিনই রাত আটটায় সেনাপতির দরজায় কড়া নড়ে উঠল৷ আটটা মানে তখন অনেক রাত৷ ঝিঁঝি ডাকছে৷ রাত-পেঁচা ডাকছে৷ কুলতলির মাঠে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলছে৷ তখন খটখট করে শব্দ হল দরজায়৷ সেনাপতি দরজা খুলে বললেন, 'কে?'
'আজ্ঞে আমি পেয়াদা৷'
'এত রাতে কী দরকার?'
পেয়াদা চাপা গলায় বলল, 'কথাটা আপনাকেই বলা যায়৷ আপনি আবার পাঁচকান করবেন না৷'
'আহা, কথাটা কী?'
পেয়াদা বলল, 'আমার হয়ে রাজামশায়ের কাছে একটু সুপারিশ করবেন৷ মিথ্যেবাদীর চাকরিটা আমার চাই৷ ওই কাজে আমার কিছু নামডাক আছে সে তো আপনি জানেন স্যার৷'
রাত ন-টায় মন্ত্রীর দরজায় কড়া নড়ে উঠল৷ তখন তো গভীর রাত৷ মন্ত্রী দরজা খুলে অবাক গলায় বলল, 'এত গভীর রাতে কে?'
'আজ্ঞে আমি আপনার সেনাপতি৷ যাতে কেউ দেখতে না পায় তাই রাতে আসা, আসলে ওই কাজটা আমার চাই, স্যার৷'
'কোন কাজটা?'
'ওই মিথ্যেবাদীর কাজটা৷ কাজটা যে আমি ভালোই পারি সেটা আপনার চেয়ে আর বেশি কে জানে৷'
পরের দিন সকাল থেকে হইহই কাণ্ড৷ রাত তিনটে থেকে লাইন পড়েছে৷ রাজসভার গেট থেকে শুরু হয়ে লাইন বাড়ছে তো বাড়ছেই৷ বেলা আটটায় পঞ্চান্ন জন৷ ন-টায় এক-শো দু-জন৷ আর ঠিক দশটায় লাইন বাদামতলা পেরিয়ে যাচ্ছে৷ রাজামশাই হন্তদন্ত হয়ে রাজসভায় ঢুকে বললেন, 'কোই হ্যায়?'
রাজামশায়ের ডাকে কেউ সাড়া দিল না৷
তিনি গলা তুলে আবার বললেন, 'কোই হ্যায়?'
এবার ডাক শুনে ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়াল রাজামশায়ের খাস চাকর নবদ্বীপ৷ 'বলুন, বলুন রাজামশাই৷'
'এরা সব গেল কোথায়?'
নবদ্বীপ বলল, 'ওরা সবাই লাইন দিয়েছে৷ চাকরি পাবার লাইন৷'
'সবাই?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, মন্ত্রী পাত্রমিত্র সেনাপতি পেয়াদা সবাই৷'
'বেশ তাহলে তুমিই কাজে লেগে পড়ো৷ প্রথম দশ জনকে ডেকে এক-এক করে আমার কাছে পাঠাও৷'
প্রথমে এল গণপতি গুনিন৷
রাজামশাই বললেন, 'তুমি কী কর?'
'আজ্ঞে মিথ্যে কথা বলি৷ ওটাই আমার কাজ৷ কখনো হাত দেখে, কখনো কপাল দেখে দেদার মিথ্যে বলেছি এতদিন৷ প্রথম প্রথম দুটো-চারটে মিলে যেত৷ তবে আজকাল আর মেলে না৷ তার ওপর আজকাল বি.এ., এম.এ., পাশকরা গনতকার বাজারে এসে বসেছে৷ এখন আমাদের মতো মুখ্যু গনতকারের হাল খুব খারাপ৷ এমন যখন অবস্থা তখনই আপনার...'
শুনতে শুনতে রাজামশাই গম্ভীর স্বরে বলেন, 'তুমি তাহলে মিথ্যে বলতে পারবে?'
'সে আর বলতে'-গণপতি গুনিন হাসতে যাচ্ছিল, তার আগেই রাজামশাই বললেন, 'নেকস্ট৷'
নেকস্ট মানে পরের জন৷ নবদ্বীপ লিস্ট দেখে ডাক দিল, 'কালীপদ কাটারি!'
একটা খেঁকুরে লোক সামনে এসে দাঁড়াল হাত জোড় করে৷ কাঁচা-পাকা মাথার চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ, ঢোকা চোখ৷
রাজামশাই বললেন, 'তুমি কী কর?'
আজ্ঞে, 'আমি ধার করি৷'
'তার মানে?'
'তার মানে টাকা ধার করি কিন্তু শোধ করি না৷ শোধ করলে সংসার চালাব কী করে৷ আর শোধ না করতে চাইলে কী পরিমাণ মিথ্যে বলতে হয় তা আপনি জানবেন নিশ্চয়ই৷'
'তা আর জানব না৷' রাজামশায়ের মুখে টুকরো হাসি ফুটল৷ 'তাহলে কালীপদ, তুমি বেশ ভালোই মিথ্যে বলতে পারো!'
'আজ্ঞে, আপনার আশীর্বাদে ওই কাজটা আমার জলভাত৷ রোজ কতজনকে যে...'
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কালীপদ, তার আগেই রাজামশাই বললেন, 'নেকস্ট৷'
পরের জন নকুল দাস৷ সে বলল, 'পারি রাজামশাই৷ আমি দিনে তিরিশটা মিথ্যে বলতে পারি৷'
হুলো বলল, 'আশিটার কমে আমার হয় না৷'
মদন গোয়ালা বলল, 'আমার কাজে বড়ো হ্যাপা৷ ডেলি দু-শোটার মতো মিথ্যে বলতে হয়৷'
লাইনে দেখা গেল শুধু গগন মোক্তারের মুহুরি নয়, গগন মোক্তার নিজেও হাজির৷ রাজামশাই অবাক হলে সে বলল, 'মিথ্যে বলাটাই আমাদের কাজ রাজামশাই৷ সারাদিন শুধু নয়, রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও মিথ্যে কথা বলি৷'
এবার যে সামনে এসে দাঁড়াল তাকে চেনা চেনা মনে হল৷ অথচ চিনতে পারছেন না৷ খুব চেনা, খুব চেনা৷ রাজামশাই বললেন, 'তুমি কে?'
'আজ্ঞে, আমি আপনার মন্ত্রী৷' সে একগাল হাসল৷ 'এখানে আসব বলে দাড়ি-গোঁফ সব কামিয়ে ফেলেছি৷ মন্ত্রীর জোব্বাও খুলে রেখেছি৷ তাই চিনতে পারেননি৷'
'কিন্তু তোমার মন্ত্রীর চাকরিটার কী হবে?'
'ওটা আমি ছেড়ে দেব রাজামশাই৷ আপনার মন্ত্রীর যা মাইনে তাতে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে৷ ওদিকে রাজমিথ্যেবাদীর চাকরিটা হলে পায়ের ওপর পা দিয়ে কাটানো যাবে৷'
'বেশ বেশ,' রাজামশাই হাসলেন৷ 'কিন্তু এই চাকরিটার দস্তুর হল মিথ্যে বলতে পারা৷ কাজটা পারবে তো, মন্ত্রী?'
মন্ত্রী আধ হাত জিব কাটল৷ বলল, 'কী যে বলেন রাজামশাই৷ শুধু ওই মিথ্যে বলা ছাড়া আর সব আমি পারি৷'
রাজামশাই বললেন, 'গুড, ভেরি গুড৷' বলেই খস খস করে নিয়োগপত্র লিখে মন্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিলেন৷
ব্যাপারটা দেখে হইহই করে ছুটে এল সবাই৷ সবাই বলতে পাত্রমিত্র অমাত্য পেয়াদা মায় সেনাপতি পর্যন্ত৷ রাগটা সেনাপতিরই বেশি৷ সে রাগে গরগর করে বলল, 'এটা কী হল রাজামশাই?'
'কেন কী আবার হল?'
'ও মানুষটা কী করে চাকরিটা পায়? মন্ত্রী তো নিজে মুখে বলল, আমি একটাও মিথ্যে কথা বলতে পারি না, সব সত্যি বলি!'
রাজামশাই এবার হো-হো করে হেসে উঠলেন-'ওটাই তো সবচেয়ে বড়ো মিথ্যে সেনাপতি৷'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন