গৌর বৈরাগী

রাত দশটা বাজলে বইটা খুলল সুমন্ত৷ একমাত্র এ-সময়েই সে পড়ার বই বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে মন দেয়৷ টিভির খুব একটা নেশা তার নেই৷ রাত এগারোটার সময় কোনো কোনো চ্যানেলে ভূতের সিরিয়াল হয়৷ মাঝে মাঝে যে দেখে না তা নয় কিন্তু দেখতে দেখতে ভয়ের বদলে হাসি পায় তার৷ তার একমাত্র নেশা বলা যেতে পারে গোয়েন্দা গল্প৷ একদিকে জটিল রহস্য আর তার সমাধানে গোয়েন্দার বুদ্ধির লড়াই৷ রাত দশটায় শুরু করে এক নাগাড়ে রাত দেড়টা-দুটো পর্যন্ত রহস্যের সঙ্গে টান টান উত্তেজনায় সময় কাটায় সুমন্ত৷
আজ বিকেলেই লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনেছে৷ রহস্য গল্প অথচ নামটা হল 'কোথাও রহস্য নেই'৷ এই নামটার জন্যেই তার আগ্রহ ছিল৷ আর তাই দশটা বাজতে-না-বাজতেই বইটা নিয়ে বিছানায় উপুড় হয়েছিল সে৷ তখনই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল৷
বইটা গায়ে-গতরে খুব একটা মোটাসোটা নয়৷ ঘণ্টা দুই- আড়াইয়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবার কথা৷ তবু নিশ্চিত হতে শেষ পাতাটা খুলে পাতার সংখ্যা দেখতে চাইল সে৷ তখনই চোখে পড়ল, শেষের দু-তিন পাতা আগে দু-টি পাতার মাঝখানে একটা নতুন হাজার টাকার নোট৷
সুমন্তরা বড়োলোক নয়৷ বাবা একটা ছোটো কারখানায় সামান্য কর্মচারী৷ মাইনের দিন বাবাকে বাড়ি ফিরে টাকা গুনতে দেখেছে সে৷ তাতে সবই প্রায় এক-শো টাকার নোট৷ পাঁচ-শো টাকার নোটও থাকে তবে তা সংখ্যায় খুবই কম৷ এখন হাজার টাকার নোটটা হাতে নিয়ে তার মনে হল বাবার হাতে এরকম নোট সে এক-আধ বার দেখতেও পারে৷
হালকা গোলাপি রঙের নোটটা একেবারে নতুন৷ গা থেকে এখনও মড়মড়ে ভাবটা যায়নি৷ বেশি ব্যবহারও হয়নি৷ টাটকা নতুন গন্ধ এখনও পাওয়া যাচ্ছে৷ আশ্চর্য এটা এখন তার হাতে৷ এটা বলা যেতে পারে তার একেবারে নিজস্ব৷ সে এটা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে৷ তার এক্ষুনি বেশ কিছু জিনিস দরকার৷ প্রথমেই মোবাইলের কথাটাই মনে এল৷ তার এখন ইলেভেন, এই ক্লাসে প্রায় সকলেরই মোবাইল আছে৷ যদিও ক্লাস চলাকালীন সুইচ অফ করে রাখতে হয়৷ সুমন্ত ইচ্ছে করলে আজই একটা মোবাইলের মালিক হতে পারে৷
কিন্তু তার এরকম কোনো ইচ্ছে হল না৷ টাকাটা বাবার হাতে দিলেও মন্দ হয় না৷ তাদের সংসারে চারপাশ জুড়ে অভাব৷ সেখানে হাজার টাকাটা কম নয়৷ কিন্তু তাতেও তার মন সায় দিল না৷ টাকাটা যার প্রাপ্য তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া উচিত৷ কিন্তু কার টাকা? ফেরত দেবেই বা কী করে? সে-সব ভাবনাতেই ঘড়িতে এগারোটা বাজতে চলল৷ এই বইটাও বেশ অদ্ভুত৷ 'কোথাও রহস্য নেই' যে বইয়ের নাম তার মধ্যে যে শুরু থেকেই রহস্য থাকবে তা বলে বোঝাবার দরকার হয় না৷ রহস্যের সব আয়োজন প্রস্তুত৷ কিন্তু পড়তে গেলেই একটা হাজার টাকার নোট চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার৷ তাই বোধ হয় আজ একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটল৷ বইটার একটা পাতাও না পড়ে ঘুমিয়ে পড়ল সুমন্ত৷
সকাল ছ-টার মধ্যেই ঘুম ভাঙে তার৷ পুব দিকে তখন ঝকঝকে আলো৷ বাবা সেই ভোর বেলা কারখানা চলে গেছে৷ মুখ-হাত ধুয়ে এই সময় বই নিয়ে বসে সুমন্ত৷ আজও বসল৷ কিন্তু বইয়ে মন দিতে পারল না সে৷ সে যে খুব ভালো ছেলে তা নয়৷ আবার পড়াশোনায় যে খারাপ তাও বলা যাবে না৷ পড়তে বসলেই পড়াতেই মন থাকে তার৷ কিন্তু আজ সেই মন গিয়ে বসল হাজার টাকার নোটে৷ বেলা চারটেয় স্কুল থেকে ফিরে পড়ার টেবিলে রাখা বইটা আবার হাতে নিল সে৷ এক-শো ছ-পাতায় গল্পটা শেষ হচ্ছে৷ আর নোটটা রাখা হয়েছে ছিয়ানব্বই আর সাতানব্বই পাতার মাঝখানে৷ নিশ্চয়ই কেউ ভুল করেই রেখেছে৷ পড়ার সময়ই পাঠকেরই হয়তো হাতে এসেছে নোটটা৷ রহস্য গল্প শেষ দিকেই টানটান হয়৷ চরম উত্তেজনা৷ সেই সময় কেউ যদি টাকা দিয়ে যায় তখন সেই উত্তেজনার মুহূর্তে পড়া থামিয়ে নোটটা যথাস্থানে গুছিয়ে রাখার কথাটা মাথায় না থাকাই স্বাভাবিক৷ তার চাইতে হাতে থাকা নোটটা ভুল করে বইয়ের ভাঁজে ঢুকিয়ে রাখাটাই দস্তুর৷ হয়তো এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ তারপর যথারীতি ভুলের ভেতর চলে গেছে সব৷ আর তার ফলেই টাকা সমেত বই ফেরত গেছে লাইব্রেরিতে৷
এইসব ভাবতে ভাবতেই বইটা নাড়াচাড়া করছিল সুমন্ত৷ টাকাটা ঠিক লোকের কাছে কি আদৌ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব! এক যদি লাইব্রেরিতে জমা দেওয়া যায়৷ বইটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল সুমন্ত৷ যদি কোথাও কোনো তথ্য পাওয়া যায়৷ বইয়ের শেষ পাতার ট্যাগে বই দেওয়া-নেওয়ার হিসেব থাকে৷ সেখানে দেখতে গিয়ে নিজের অজান্তেই একটা ক্লু চোখে পড়তে বেশ চমকে উঠল সুমন্ত৷ গত মাসের আট তারিখে ইস্যু হয়েছিল ৩২১১ নম্বর কার্ডে৷ বইটা ফেরত আসছে এ মাসের দু-তারিখে৷ আবার সেই দিনেই সুমন্ত তার কার্ডে বইটা ইস্যু করে এনেছে৷ তার মানে গত মাসের আট তারিখ থেকে এ মাসের দু-তারিখ পর্যন্ত সময়ের ভেতর নোটটি রাখা হয়েছে৷ তার আগে রাখা হলে এটা ৩২১১ নম্বর সদস্যের চোখে পড়তই৷
আজকাল লাইব্রেরিতে পাঠকদের খুব একটা যাতায়াত নেই৷ সময় কাটাবার মতো অনেক কিছু এসে গেছে৷ তার ভেতর টিভির পর্দা এক নম্বরে৷ তা সত্ত্বেও এখনও কিছু মানুষ বই পড়েন, যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম৷ সেই কমের ভেতর সুমন্তও আছে৷ সপ্তায় একটি করে বই দরকার হয় তার৷ কোনো কোনো সপ্তাহে দু-টি৷ তাই তাকে ঘন ঘন লাইব্রেরিতে যেতে হয়৷ এর ফলে লাইব্রেরির স্টাফেদের সঙ্গে তার ভালোরকম জানাশোনা হয়ে গেছে৷ আবার সে যে গোয়েন্দা গল্পের পোকা এটাও জানে সবাই৷ তাই ক্যাটালগ দেখে বই পছন্দ করতে হয় না তাকে৷ সেদিনই পাঠকদের কাছ থেকে সদ্য ফেরত আসা রহস্য গল্প কাউন্টারের স্টাফ তাকে দিয়ে দেন৷
আজও কাউন্টারের সামনে যেতেই গৌতমদা বললেন, 'এসো সুমন্ত, একটা বই এক্ষুনি জমা পড়ল৷ তোমার ভালো লাগবে৷'
সুমন্তর হাতে আগের দিনের বইটা৷ সে সামান্য হেসে বলল, 'আজ অন্য একটা দরকারে এসেছি গৌতমদা৷'
'অন্য দরকার? কী ব্যাপার সুমন্ত?'
এমন প্রশ্ন যে উঠবে তা জানত সে৷ গৌতমদাকে এখন কিছুই বলা যাবে না৷ ব্যাপারটার মধ্যে একটা রহস্যও আছে৷ এটার সমাধান সে নিজেই করতে চায়৷ না পারলে তখন দেখা যাবে৷
গৌতমদা তাকিয়েছিলেন৷ জবাব না পেয়ে আবার বললেন, 'দরকারটা কী?'
'আমি একজনের ঠিকানা জানতে চাই৷ কিন্তু আমার কাছে থাকার মধ্যে তার লাইব্রেরি কার্ডের নম্বরটাই আছে৷' বলে সে হাতের বইটা খুলে শেষ পাতায় পৌঁছে যায় সুমন্ত৷ আঠা দিয়ে সাঁটা ট্যাগে ৩২১১ নম্বরটা দেখায় সে৷ 'এর নাম আর ঠিকানাটা আমার একটু দরকার ছিল গৌতমদা৷'
ঠিক তখনই দু-জন পাঠক বই পালটাতে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ তাদের দিকে ফিরে গৌতমদা বললেন, 'তোমাকে একটু দাঁড়াতে হবে ভাই৷'
হাতের কাজ সেরে গৌতমদা কম্পিউটার ডেস্কে এসে বসলেন৷ বেশ কিছুদিন হল লাইব্রেরিতে কম্পিউটার বসে গেছে৷ প্রথম ক-টা মাস লোক না থাকায় ওটার ব্যবহার হয়নি৷ সেই নতুন কাজে গৌতমদা ক্যাজুয়াল স্টাফ৷ বছর খানেক কাজ করছেন উনি৷ বেশ কাজের মানুষ৷ সুমন্তর সঙ্গে আলগা একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে৷
মেশিন অন করে নাম্বার ফিড করতেই স্ক্রিনে তথ্য ফুটে উঠল৷ গৌতমদা বললেন, 'লিখে নাও৷ এই কার্ডটা কমলেশ দত্তর৷ ঠিকানা নন্দবাগান লেন৷ ব্যস এইটুকু৷'
কমলেশ দত্ত নামের মানুষদের বয়স পঞ্চাশের নীচে হবার কথা নয়৷ এই বিকেল পাঁচটাতে তাঁকে বাড়িতে পাওয়া যাবে না নিশ্চিত৷ তবু লাইব্রেরির বাইরে এসে সাইকেলে চাপল সুমন্ত৷ অন্তত খবরটা তো পেতে হবে৷ কখন গেলে দেখা পাওয়া যাবে তাও জানা যাবে৷ ভেতরে ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা হচ্ছে৷ হাজার টাকাটা খুব একটা কম টাকা নয়৷ এর মধ্যেই নিশ্চয়ই খোঁজ পড়েছে টাকাটার৷ কমলেশ দত্ত নিশ্চয়ই চারপাশ খুঁজেছেন৷ টেবিলের ড্রয়ার, বইয়ের র্যাক, মানিব্যাগ, খুলে রাখা জামার পকেট৷ আরও সম্ভব-অসম্ভব জায়গা৷ তারপর টাকাটার হদিশ না পেয়ে নিশ্চয়ই হতাশ হয়ে পড়েছেন৷
সাইকেলে নন্দবাগান লেনে আসতে দশ মিনিট লাগল৷ জায়গাটা চেনা সুমন্তর৷ একজনকে জিজ্ঞেস করতেই কমলেশ দত্তকে তিনি চিনতে পারলেন৷ বাড়িটাও দেখিয়ে দিলেন৷
পুরোনো দোতলা, নতুন করে রং হয়েছে৷ বাড়ির সামনে ছোটোখাটো একটা ফুলের বাগান৷ সামনে গ্রিলের গেট৷ ভেতরে সদর দরজার গায়ে কলিং বেল৷ গেট খুলে ভেতরে ঢুকে কলিং বেল বাজাল সুমন্ত৷ ভেতর থেকে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন৷ বয়স তিরিশ-টিরিশ৷ বললেন, 'কাকে চাই?'
'কমলেশ দত্ত আছেন? আমি ওঁকে চাই৷'
সুমন্তর দিকে তাকিয়ে তার বয়স আন্দাজ করে বোধ হয় কিছু অবাকই হলেন ভদ্রমহিলা৷ বললেন, 'কী দরকার?'
'একটু দরকার ছিল৷' আস্তে বলল সুমন্ত৷ 'সেটা ওঁকেই বলব৷'
একটুক্ষণ ভাবলেন ভদ্রমহিলা৷ চোখে-মুখে কৌতূহল এসে জড়ো হয়েছে৷ বললেন, 'কাকাবাবুর শরীর খারাপ৷ নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে কালই বাড়ি এসেছেন৷ কথা বলা প্রায় বারণ৷'
এই অবস্থায় কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারল না সুমন্ত৷ সে কি আজ ফিরে যাবে! কিন্তু তাহলে সমস্যাটার কী গতি হবে?
তাকে চিন্তা করতে দেখেই হয়তো খানিক মায়া হল ভদ্রমহিলার৷ আস্তে করে বললেন, 'ঠিক আছে৷ দু-এক কথায় দরকারটা মিটিয়ে ফিরে এলেই হবে৷ ওঁকে বেশি বকিয়ো না যেন৷'
'না না, আপনি ভাববেন না দিদি৷' তাড়াতাড়ি বলে উঠল সুমন্ত৷ ভদ্রমহিলা পথ দেখাবার জন্যে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, 'এসো৷'
পুরোনো আমলের দোতলা৷ মেঝে সমান বড়ো বড়ো জানলায় লোহার রড৷ চকচকে লাল সিমেন্টের মেঝে৷ আসবাবহীন ছিমছাম পরিচ্ছন্ন ঘরে খাটে শুয়ে ছিলেন কমলেশ দত্ত৷ দেখে মনে হল ষাট পেরিয়ে যাওয়া বয়স৷ যতখানি বলা হয়েছিল ততখানি অসুস্থ বলে মনে হল না৷ খাটের পাশে ছোট্ট মোড়া৷ ভদ্রমহিলা বললেন, 'বসো এখানে৷'
তাকে দেখে কমলেশ দত্ত আধশোয়া হলেন, 'তোমাকে তো চিনতে পারলুম না বাবা?'
'আপনাকেই এই প্রথম দেখছি আমি৷' সুমন্ত হাসল, 'শরীর খারাপের মাঝখানে আপনাকে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে খারাপ লাগছে৷'
'না না, ব্যাপারটা কী বলো না৷'
'আমার নাম সুমন্ত পাল৷ টাউন লাইব্রেরির মেম্বার৷ কাল লাইব্রেরি থেকে এই বইটা ইস্যু করে নিয়ে এসেছিলাম৷' বলতে গিয়ে হাতে ধরা বইটা উঁচু করে তুলে ধরল সে৷ তারপর আবার বলল, 'রাত দশটার সময় পড়তে গিয়ে দেখি বইটার শেষ পাতায় একটা হাজার টাকার নোট৷ কার হতে পারে ভাবতে ভাবতে মনে হল আমার ঠিক আগে যিনি বইটা নিয়েছিলেন টাকাটা তাঁর হওয়াই সম্ভব৷ বইয়ের ভাঁজে টাকা রেখে ভুলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা৷ লাইব্রেরিতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আমার ঠিক আগে বইটা আপনার নামে ইস্যু হয়েছে৷'
কথা বলতে বলতে সুমন্ত তাকিয়েছিল৷ হারিয়ে ফেলা জিনিস ফিরে পাবার মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ থাকে৷ কমলেশ দত্তর মুখে তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পেল না সে৷ আজকের দিনে হাজার টাকাটা খুব বেশি নয়, আবার যে খুব কম তাও বলা যাবে না৷ অথচ কমলেশ দত্ত বেশ নির্বিকার৷ তারপর মৃদু হেসে বললেন, 'বইয়ের ভাঁজে হাজার টাকার নোট খুঁজে পেয়ে নিজে খোঁজ করে এসেছ ফেরত দিতে?'
'নিজে' কথাটার ওপর জোর দিলেন উনি৷ তা শুনেই সুমন্ত বলল, 'কেন আসতে নেই?'
'তা বলিনি৷' বলে হাতে বইটা তুলে পাতা খুলে উলটে-পালটে দেখলেন খানিক৷ তারপর বললেন, 'তবে কষ্ট করে এত খোঁজাখুঁজির কী দরকার ছিল? লাইব্রেরিয়ানের হাতে টাকাটা তুলে দিলেই তো ব্যাপারটা মিটে যেত৷'
'তা হয়তো যেত৷' অল্প হাসল সুমন্ত, 'হারিয়ে যাওয়া টাকার মালিককে খুঁজে পাবার মধ্যে একটা আবিষ্কারের আনন্দ আছে৷ সেই আনন্দটা পেতাম না৷'
'তার মানে, রহস্য সন্ধান৷' মৃদু হাসলেন কমলেশ দত্ত, 'আমিও অবশ্য গোয়েন্দা গল্প ছাড়া পড়িই না৷ এসব বই পড়ার মজাই আলাদা৷ এসব ক্ষেত্রে হয় কী জানো, ডিটেকটিভের সঙ্গে পাঠকরাও খুনি কিংবা আততায়ীর পেছনে ধাওয়া করে৷ সনাক্তকরণের কাজটা কখনো কখনো আগেই সেরে নেয় পাঠক৷ তোমাকেও সেই নেশাতে পেয়েছে নিশ্চয়ই৷ তাই সরেজমিন তদন্তে নেমে পড়েছ৷'

সুমন্ত হাসল৷ বলল, 'আর বোধ হয় বেশি কথা বলা ঠিক হবে না৷ আপনি অসুস্থ৷ এবার তাহলে...৷' বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়ায়৷ তারপর হাতে ধরা বইয়ের শেষ পাতাটা খুলে হাজার টাকার নোটটা হাতে নিয়ে বাড়িয়ে দেয়, 'নিন ধরুন৷'
'ধরব কেন?' মৃদু হাসি নিয়ে বলেন কমলেশ দত্ত৷ 'এ টাকা তো আমার নয়৷'
'আপনার নয়!' যেন আকাশ থেকে পড়ে সুমন্ত৷ তার মনে হয়েছিল সমস্যাটার দ্রুত সমাধান হয়ে গেল বুঝি৷ তার অবস্থা বুঝেই শুরু করলেন কমলেশ, 'লাইব্রেরি থেকে আমার বই বাবলু এনে দেয়৷ এই বইটাও সেই এনে দিয়েছে৷'
'হ্যাঁ, কাকাবাবু ঠিকই বলছেন৷' ভদ্রমহিলা এবার কথা বলেন, 'যেদিন সন্ধ্যায় বইটা আনে বাবলু সেদিনই রাত দশটায় কাকাবাবুকে নার্সিংহোমে ভরতি করতে হয়েছিল৷ তারপর ব্যস্ততায় বইটার কথা ভুলেই গেছলাম আমরা৷ কাকাবাবু বাড়ি ফেরার আগে লাইব্রেরিতে ওটা জমা দিতে নিয়ে যায় বাবলু৷'
শুনতে শুনতে কমলেশ দত্ত হাসছিলেন, 'একবার বইটা খুলেও দেখা হয়নি আমার৷'
শুনতে শুনতে বেশ হতাশ হয়ে পড়ে সুমন্ত৷ সে ভেবেছিল সাদামাটা একটা সমাধান৷ কিন্তু ব্যাপারটা ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছে৷ বাবলুর সঙ্গে যদি দেখা করা যায়৷ ওই ছেলেটাই কি ভুল করে...? মন সায় দেয় না৷ তবু একবার চেষ্টা করতে হবে৷ সুমন্ত বলল, 'আমি একবার বাবলুর সঙ্গে কথা বলতে চাই৷'
কমলেশ দত্ত হাসলেন, 'তোমার মাথায় ভূত চেপেছে দেখছি৷ কী দরকার৷ টাকাটা লাইব্রেরিতে দিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে যেত৷' একটু থেমে বললেন, 'ঠিক আছে যাও, দেখো ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে৷' ঘাড় তুলে দেওয়াল ঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, 'এই সময় ওর ঠিকানা নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠ৷ বাবলু ভালো ফুটবল খেলে৷ ওকে ওখানেই পেয়ে যাবে৷ ডাক নাম বাবলু, ভালো নাম অভিমন্যু সান্যাল৷'
নেতাজি স্পোর্টিং-এ তখন সেভেন-এ সাইড ফুটবল ম্যাচ হচ্ছিল৷ প্র্যাকটিস ম্যাচ৷ মাঠের ধারে কয়েকজন খেলা দেখছিলেন৷ একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, 'ওই যে নীল জামা সাদা প্যান্ট ওই হল বাবলু৷ ছেলেটার পায়ে ভালো টাচ আছে জানেন৷ মাঝে মাঝেই ওকে খেপ খেলাতে ভাড়া করে নিয়ে যায় অন্য ক্লাব৷'
চমকে তাকিয়েছিল সুমন্ত৷ খেপ খেলার ব্যাপারটা সে জানে৷ মাঝে মাঝে খেপ খেলায় কত টাকায় ভাড়া পায় বাবলু? তেমন তেমন খেলা হলে হাজার দু-হাজার টাকা বাবলুর কাছে থাকা কোনো ব্যাপার নয় তাহলে৷ এইসব ভাবতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সুমন্ত৷ খেলাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টান টান হয়ে রইল সে৷ হয়তো বইটা আনার দিনই খেপ খেলার টাকাটা হাতে এসেছিল বাবলুর৷ ওটা পকেটে না রেখে বইয়ের ভাঁজে রেখে দেওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়৷ হয়তো এরপরই ছিল প্র্যাকটিস ম্যাচ৷ সেটা শেষ হতে টাকা সমেত বইটা কমলেশ দত্তর বাড়ি পৌঁছে গেছে৷ মন দিয়ে তখন খেলাটা দেখছিল সুমন্ত৷
শেষ হতেই খেলোয়াড়রা একে একে মাঠের ধারে আসে৷ গরমে ঘেমে একাকার৷ বাবলু বয়েসে তার চাইতে ছোটোই হবে৷ সুমন্ত সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, 'তোমার নাম বাবলু?'
বাবলু একবার তাকায়৷ ঠিক চিনতে পারে না৷ সে বলে, 'আমি কিন্তু এখন খেপ খেলতে পারব না, সামনে পরীক্ষা৷'
'না না সেসব নয়, একটা অন্য দরকারে এসেছি তোমার কাছে৷'
'আচ্ছা৷ কিন্তু তুমি কে?'
'আমার নাম সুমন্ত৷ এখানেই থাকি৷' সে আর কথা না বাড়িয়ে হাতের বইটা সামনে তুলে ধরে, 'এটা চিনতে পারছ বাবলু?'
সে অবাক হয়, 'না তো, কী ব্যাপার?'
সুমন্ত হাসে, 'এই বইটাই মাসখানেক আগে লাইব্রেরি থেকে ইস্যু করে নিয়ে কমলেশ দত্তর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলে৷'
'হ্যাঁ, জেঠুর বই আমিই দেওয়া-নেওয়া করি৷ কিন্তু এবার শরীর খারাপ হয়ে যেতে বইটা বোধ হয় জেঠুর পড়াই হয়নি৷'
'এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটেছে৷ সে কারণেই তোমার কাছে আসা৷ গতকাল লাইব্রেরি থেকে আমি এই বইটা ইস্যু করে এনেছি৷ পড়তে গিয়ে বইটার শেষ পাতায় একটা হাজার টাকার নোট খুঁজে পেলুম৷ কমলেশ দত্ত শরীর খারাপের জন্যে বইটা একেবারেই হাত দেননি৷ তুমি কি ভুল করে খেপ খেলার টাকা বইটার মধ্যে রেখেছিলে?'
বাবলু হাসল, 'বাড়ি থেকে কড়া হুকুম-পড়াশুনো বাদ দিয়ে এখন খেপ খেলা চলবে না৷ দু-মাস হাতে কোনো টাকাই আসেনি আমার৷ বই আমি দেওয়া-নেওয়া করি বটে কিন্তু ভেতরে কী আছে খুলেও দেখি না কোনোদিন৷ ওসব গপ্প-টপ্প আমার মোটেই ভালো লাগে না৷ তাই আমার দিক থেকে হাজার টাকার নোট বইয়ের ভাঁজে রাখার কোনো প্রশ্নই নেই৷'
'কিন্তু একটা নোট আমি পেয়েছি৷ এটা এল কোথা থেকে সেটাই প্রশ্ন৷'
'দাড়াও দাঁড়াও৷' বাবলু হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, 'মাস খানেক আগে এই বইটা যেদিন আনি সেদিন আমাদের ক্লাবে একটা টুর্নামেন্ট ছিল৷ মনে পড়েছে৷'
'কী মনে পড়ল?'
'সেক্রেটারির কড়া হুকুম ছিল খেলা শুরুর আধঘণ্টা আগে মাঠে পৌঁছোতে হবে৷ ওদিকে লাইব্রেরি করে যেতে হয়েছে বলে আমার একটু দেরি হয়ে গেছল সেদিন৷ আবার যদি তখনই জেঠুকে বইটা দিতে যাই আরও দেরি৷ তাই ওদিন মাঠে নামার আগে বইটা জমা রেখে গেছলাম গুমটিকাকার কাছে৷'
'গুমটি কাকা?'
হাত তুলে দেখাল বাবলু৷ 'হ্যাঁ, মাঠের ধারে গুমটি দোকান৷ওই তো দোকানটা৷ টুকটাক বিক্রি হয়৷ কাকা লোকটা ভালো৷ হয়তো ভুল করে গুমটিকাকাই টাকাটা রেখেছে৷'
দোকানটা দেখল সুমন্ত৷ গুমটির দোকান যেমন হয়৷ কাঠের ফ্রেমে কালো রং৷ মাথায় কালো টিন৷ সামনে বাঁশের মাচায় বসার জায়গা৷ তারা দু-জন গিয়ে সামনে দাঁড়াল৷ বাবলু গলা তুলে ডাকল, 'গুমটিকাকা!'
মানুষটার তখন এদিকে মন নেই৷ সামনে তিনজন খদ্দের৷ তাদের সামলাতেই ব্যস্ত৷ খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হল৷ সুমন্ত ভালো করে দেখছিল দোকানটা৷ সামনের তাকে বিস্কুট লজেন্সের বোয়াম৷ একটা তাকে খাতা কাগজ ডটপেন৷ সুতো দিয়ে ঝোলানো ছোটো ছোটো প্ল্যাস্টিক প্যাকে কোনোটা শ্যাম্পু, কোনোটা হেয়ারকন্ডিশনার, কোনোটা আবার চিকেন-মশালা৷ জিনিসপত্র থাকলেও খুব যে বিক্রিবাটা হয় তা নয় নিশ্চয়ই, দোকান আর দোকানদারের চেহারাতেই খানিক আন্দাজ করা যায়৷ রোগা খেঁকুড়ে টাইপের গুমটিকাকাকে পছন্দ হল না সুমন্তর৷ এই লোকের সামনে কথা বলতে হবে সাবধানে৷ কায়দা করে কথা শুরু করতে হবে৷ নোটের কথাটা আগে ভাগে জানিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না৷ বলা যায় না এমন লোক বলে বসতে পারে, ওটা তারই টাকা৷ কিন্তু এই দোকানটার যা ছিরি সারাদিনে হাজার টাকা বিক্রি হয় কি না সন্দেহ৷
তিনজন খদ্দের ছাড়তে বেশি টাইম লাগল না৷ চলে যেতে গুমটিকাকা তাকালেন, 'কী ব্যাপার গো বাবলু?'
বাবলু বলল, 'ব্যাপার গুরুতর কাকা৷'
'সে আবার কী?' গুমটিকাকা মজার হাসি হাসল৷
'একটা হাজার টাকার নোট তোমাকে খুঁজতে এসেছে৷' দুম করে কথাটা বলে হো-হো করে হেসে উঠল বাবলু৷
সুমন্ত ভেবেছিল ধীরে-সুস্থে কথা শুরু করবে৷ তার আগেই বাবলু দিল সব ভন্ডুল করে৷ আর ঘটনাটা বিস্তারে বলছিল বাবলু৷ কথা শেষ হতে গুমটিকাকা বলল, 'এ যে আজব কাণ্ড গো৷ এতদিন শুনতুম, মানুষ দৌড়োচ্ছে টাকার পেছনে৷ এখন দেখছি টাকা দৌড়োচ্ছে মানুষকে ধরবে বলে৷ তবে আমি বাবা সে মানুষ নই৷ আমার সব পাঁচ-দশ টাকার খদ্দের৷ হাজার টাকার নোট নিয়ে আমার দোকানে কেউ আসে না৷'

কথা শুনতে শুনতে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল সুমন্তর৷ এই মানুষটিকেই সে মিথ্যে সন্দেহ করছিল৷
বাবলু বলল, 'নোটটা তোমাকে খুব ঝামেলায় ফেলল দেখছি৷'
সুমন্ত বলল, 'ঠিকই৷ টাকার মালিককে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত মনটা খচখচ করছে৷ একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে৷'
'কিন্তু এরপর আর কোথায় খুঁজবে? আজ তো অন্ধকার নেমে এল৷'
সাড়ে ছ-টা বেজে গেল৷ আজ আর কিছু করা যাবে না৷ আজকের রাতটা শুধু ভাবতে হবে৷ আর কে রাখতে পারেন ওই নোটটা? হাজার টাকার একটা নতুন নোট৷ রেখে আবার ভুলেও গেলেন৷ হয়তো খোঁজখবর করেছেন৷ কিন্তু কোনো লাভ হয়নি৷ বইয়ের মাঝখানে থেকে টাকাটা কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷
সারারাত ভেবে সুমন্ত ঠিক করল, পিছন দিকে হাঁটাই একমাত্র সমাধান৷ ওইটাই পথ৷ একমাত্র পাঠক ছাড়া অন্য কেউ বইয়ের ভেতর টাকা রাখবে না৷ পাঠক মানে নির্দিষ্ট বইটির পাঠক৷ সুমন্তর আগে বইটা ইস্যু হয়েছিল কমলেশ দত্তর নামে৷ কিন্তু মানুষটির ওই বইটি পড়ার সুযোগ আসেনি৷ বইটি লাইব্রেরি থেকে আসতে দুটো হাত বদল হয়েছে৷ কিন্তু এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় ও দু-জনের কেউই বইটি পড়েনি৷ তার মানে বইটার ভেতর ভুল করে টাকা রেখে দেবার ঘটনা আরও আগের, আরও পেছনের৷
পরের দিন লাইব্রেরিতে গিয়ে গৌতমদাকে সব খুলে বলল সুমন্ত৷
গৌতমদা বললেন, 'আশ্চর্য!'
'আশ্চর্য কেন?'
'একটা আনক্লেমড টাকা, এটা নেওয়া মোটেই অন্যায় নয়৷ রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া টাকার মালিককে কেউ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় নাকি? তার ওপর টাকার পরিমাণ যদি মাত্র এক হাজার হয়৷'
সুমন্ত বলল, 'ছোটো হোক তবু সেটা টাকাই আবার টাকাটা কিন্তু আমি রাস্তা থেকে খুঁজে পাইনি৷ লাইব্রেরি থেকে ইস্যু করা বইয়ের মাঝখানে পেয়েছি৷'
'তাতে কী হল?'
'রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া টাকায় কোনো ঠিকানা লেখা থাকে না৷ মালিককে খোঁজার কোনো প্রশ্নই নেই৷ কিন্তু এই টাকাটার মালিককে চেষ্টা করলে খুঁজে পাওয়া যেতেই পারে৷'
'কী করে?'
সুমন্ত হাসল, 'আপনাদের রেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে কমলেশ দত্তকে ইস্যু করার চার মাস আগে বইটা ইস্যু হয়েছিল ১৮৩২ নম্বর কার্ডে৷ এঁর নাম ঠিকানাটা চাই গৌতমদা৷ আশা করছি এখানেই হদিশ পেয়ে যাব৷ যদি না-ও পাই সেই কারণে এরও আগের নম্বর ৩০১২, এঁর নাম ঠিকানাটাও দেবেন৷'
গৌতমদা হাসলেন, 'রহস্য গল্পের মতো হচ্ছে ব্যাপারটা৷ এ হল বেশি গোয়েন্দা গল্প পড়ার ফল৷ গল্পের ডিটেকটিভের সঙ্গে পাঠকও সত্যসন্ধানী হয়ে পড়ে৷ কিন্তু তোমার চেষ্টাটা বেশ অভিনব৷ হারিয়ে যাওয়া টাকাকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা৷ বেশ চালিয়ে যাও৷ শেষটা কী হল আমাকে বোলো কিন্তু৷'
প্রশংসা-টশংসা করে গৌতমদা নাম ঠিকানাগুলো বার করে দিলেন৷ ১৮৩২ নম্বর সদস্যের নাম বিভাকর সরকার আর ৩০১২ নম্বরে দেবমাল্য দাশগুপ্ত৷ নাম শুনে অনেক সময় বয়স আন্দাজ করা যায়৷ যেমন পাঁচুগোপাল নাম এখন বয়স্ক মানুষদের আর বেঁচে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি৷ বিভাকর মানুষরা আছেন৷ তবে তাঁদের বয়স ষাটের ওপর হওয়ারই কথা৷ আর দেবমাল্যর বয়স কিছুতেই কুড়ির বেশি নয়৷ তবে তার কাছে পৌঁছোবার হয়তো দরকারই হবে না৷ প্রথমে বিভাকর সরকার৷ ওঁর বাড়ি শুকসনাতনতলা৷
বিকেল পাঁচটায় বড়ো দোতলা বাড়িটার সামনে দাঁড়াল সুমন্ত৷ সামনে বড়ো লোহার গেট৷ একপাশে গাড়ির গ্যারাজ৷ সামনে মরশুমি ফুলের বাগান৷ গেটের পাশে পিলারের গায়ে শ্বেত পাথরে লেখা 'আশীর্বাদ'৷ বেশ একটু ভয় ভয় করল সুমন্তর৷ ভুল জায়গায় এসে পড়ল না তো৷ এইসব বাড়ি-গাড়িওলা লোকেরা বই পড়ার মতো প্রাচীন অভ্যাস কি এখনও টিকিয়ে রেখেছেন৷ আবার এমনও হতে পারে বিভাকর সরকার মানুষটির নামেই শুধু লাইব্রেরি কার্ড আছে৷ বই-টই পড়া হয়ে ওঠে না৷ তার নামে ইস্যু হওয়া বই পড়েন হয়তো অন্য কেউ৷ এসব ভাবতে ভাবতে গেট খুলে সামনের বাগান পেরিয়ে সদর দরজার কলিং বেলে আঙুল ছোঁয়ায় সে৷
একটু পরেই দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়ান একজন৷ চেহারা চরিত্রে বাড়ির কাজের মানুষ বলেই মনে হয়৷ মহিলা আস্তে বলেন, 'কাকে চাই?'
'বিভাকর সরকার আছেন?'
'হ্যাঁ আছেন, কিন্তু কী দরকার?'
'সেটা ওঁকেই বলব, আপনি যদি একটু ডেকে দেন৷'
মহিলা কথা না বলে এবার ভেতরে যান৷ হয়তো খবরটা পৌঁছে দিতে গেলেন৷ সুমন্ত ভেবে পেল না, এখন তার কী করা উচিত৷ অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও নেই৷
খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না৷ এক ভদ্রলোক সদর দরজায় এসে দাঁড়ালেন৷ খুব লম্বা নন৷ বেঁটেখাটো শরীর কিন্তু বেশ মজবুত৷ পরনে পায়জামা আর হলুদ পাঞ্জাবি৷ বয়স ষাট থেকে সত্তরের মধ্যে৷ গলাটিও বেশ গম্ভীর আর ভরাট৷ রাশভারী গলায় বললেন, 'আমার নামই বিভাকর৷ কিন্তু তোমার কী দরকার যেন?'
হ্যাঁ, তুমি বলেই সম্বোধন৷ সুমন্তর যা বয়স তাতে তাকে আপনি বললেই অস্বস্তি হত৷ হাসার কথা নয়৷ কিন্তু পরিবেশ কিছু হালকা করার জন্যেই হাসল সুমন্ত৷ বলল, 'না, তেমন কিছু নয়৷ কিছুটা কৌতূহল বলতে পারেন৷'
'কৌতূহল৷'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, জ্যাঠামশাই৷'
জ্যাঠামশাই শব্দটার জন্যেই কি না কে জানে একটু যেন চমকে উঠলেন বিভাকর সরকার৷ আজকাল চারপাশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গজিয়ে উঠেছে৷ বেশ ক-টা দামি স্কুলও কাছাকাছি৷ বিভাকর সরকারের বাড়ি যে অঞ্চলে সেটি এই শহরের পশ এলাকা বলা যায়৷ পাশেই জি.টি. রোড৷ ওদিকে গঙ্গার ধারে ধারে স্কুল৷ সকাল আটটা থেকে ঝাঁ চকচকে গাড়ির আসা-যাওয়া চলে৷ ইউনিফর্ম পরা ছেলে-মেয়েরা বাসে চেপে স্কুলে যায়৷ এদের মুখে বাংলার চেয়ে ইংরিজি ফোটে বেশি৷ আঙ্কল আর আন্টির চাপে কাকা, জ্যাঠামশাই আর কাকিমারাও হারিয়ে যাচ্ছেন৷ সুমন্ত মিউনিসিপ্যালিটির বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ে৷ কেক পেস্ট্রি কিংবা ম্যাগির বদলে সে টিফিনে রুটি আলুভাজা খেতেই পছন্দ করে৷ আঙ্কলের বদলে কাকুতেই সে স্বচ্ছন্দ৷
'জ্যাঠামশাই' সম্বোধন শুনে যেন কিছুটা সহজ হলেন বিভাকর৷ দরজা ছেড়ে বললেন, 'এসো৷ ভেতরে বসো৷'
সামনেই বসার ঘর৷ সোফা সেট, মাঝখানে গোল টেবিল৷ চারপাশে ক-টা বেতের চেয়ার, উনি সোফায় বসতে বসতে বললেন, 'এই দেখো, তোমার নামটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি৷'
বেতের একটা চেয়ারে বসতে বসতে সে বলল, 'আমার নাম সুমন্ত৷'
'বেশ৷' উনি হাসলেন, 'এবার কৌতূহলের কথাটা বলো দেখি৷'
সুমন্ত হাসল, 'না তেমন কিছু নয়৷ ব্যাপারটা একটা বই নিয়ে৷ এই ধরুন মাস চারেক আগে লাইব্রেরি থেকে আপনি একটা বই এনেছিলেন...'
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই সুমন্ত দেখল কথাটা শুনেই বিভাকর সোজা হয়ে বসছেন৷ চোখের তারা যেন স্থির হচ্ছে৷ কিন্তু সে সামান্যক্ষণ৷ তারপরেই সহজ হলেন তিনি৷একটু যেন হাসলেনও৷ তারপর বললেন, 'মনে আছে৷ বইটার নাম, কোথাও রহস্য নেই৷'
এবার সুমন্তর চমকে ওঠার পালা৷ শুধু যে ঘটনাগুলো মনে আছে তাই নয়, বইটির নামটিও মনে রেখেছেন উনি৷ চার মাস আগে পড়েছেন৷ এর মধ্যে আরও কিছু বই নিশ্চয়ই পড়া হয়ে গেছে৷ তারপরেও একটা বইয়ের নাম আলাদা করে মনে থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক বই কী৷
মৃদু হাসতে হাসতে বিভাকর বললেন, 'মনে হচ্ছে খুব অবাক হয়েছ?'
'হ্যাঁ, তা একটু হয়েছি৷ আপনি লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়েন?'
'হ্যাঁ পড়ি৷ বই পড়াটা আমার নেশা বলতে পারো৷ আবার যেমন-তেমন বই নয়, গোয়েন্দা গল্পই আমার ফেভারিট৷'
সুমন্ত বলল, 'এই চার মাসে আপনি অনেক বই-ই পড়েছেন৷ কিন্তু আমি যে বইটির সম্পর্কে খোঁজ করতে এসেছি সেটা আগে থেকে জানলেন কী করে?'
হো-হো করে হাসলেন, বিভাকর সরকার৷ তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, 'আন্দাজ৷'
'আন্দাজ?'
'হ্যাঁ, ব্যাপারটা তাই৷ কোথাও রহস্য নেই, মানে যে বইটা এখন তোমার হাতে রয়েছে, সেটা হয়তো আমাকে দেখাতে এনেছ, সেটা তোমার এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি৷ পড়লে এত অবাক হতে না৷'
মাথায় কিছু ঢুকছে না সুমন্তর৷ মানুষটা সব ঠিক ঠিক বলে দিচ্ছেন৷ তার হাতে ধরা বাঁধানো বইটা যে সেই বই তাও ঠিক আন্দাজ করেছেন৷ সবটা হেঁয়ালির মতো লাগছে তার কাছে৷ তাই সে অসহায় গলায় বলে ওঠে, 'জ্যাঠামশাই, সবটা খুলে বলুন৷ আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে৷'
বিভাকর সরকার বললেন, 'কোনো গোলমাল নেই৷ আমি গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালোবাসি এটা সবাই জানে৷ তাই লাইব্রেরিতে বই পালটাতে গেলে ওরাই একটা গোয়েন্দা গল্প ধরিয়ে দেয়৷ চার মাস আগে যে বইটা দিল সেটারই নাম, কোনো রহস্য নেই৷ নাম দেখে খুব একটা আগ্রহ হয়নি৷ কিন্তু লেখক দেখলাম নিখিলেশ বসু৷ তুমিও নিশ্চয়ই জান, উনি গোয়েন্দা গল্পের খুব নামি লেখক৷ লেখকের নাম দেখেই বইটা পড়তে শুরু করি৷ দেখলাম খুন ডাকাতি এসব লিখতে লিখতে লেখক নিখিলেশ বসু নির্ঘাত ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন৷ তাই অন্যরকম একটা লেখা৷ সত্যি বলতে কী তেমন কোনো রহস্য নেই বইটায় আবার আছেও৷ একটা মজা দিয়ে শুরু হচ্ছে৷ লাইব্রেরি থেকে আনা একটা বই পড়ে ফেরত দেবার সময় ভুল করে একটা পাঁচ-শো টাকার নোট বইয়ের ভাঁজে রেখেছিলেন পাঠক৷ আর একজন পাঠক বইটা ইস্যু করে নেবার পর আবিষ্কার করলেন ওই নোটটি৷ ব্যস, গল্প শুরু হয়ে গেল৷ তখন টাকাটা ঠিক লোকের কাছে ফেরত দেবার জন্যে একটা জেদ চেপে গেল তার মনে৷ তখন তার বই পড়া মাথায় ওঠে৷ সে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় টাকার মালিককে৷ হাতে লেখা ছোটো পোস্টার সাঁটিয়ে দেয় লাইব্রেরির দেওয়ালে৷ মুখে মুখেও ছড়িয়ে দেয় খবরটা৷ কিন্তু এত করেও টাকার মালিকের খোঁজ পায় না গল্পের চরিত্র৷ শেষে বইয়ের পেছনে সাঁটা মেম্বারশিপ কার্ড থেকে নাম আর ঠিকানা জোগাড় করে অচেনা এক পাঠকের কাছে গিয়ে আসল লোকের হদিশ পায় সে৷'
বিভাকর সরকার এই জায়গায় থেমে আবার বললেন, 'এই অবধি ঠিক ছিল জানো! সমস্যা, তারপর সমস্যার যথাযথ সমাধান৷ কিন্তু এরপরেই গণ্ডগোল বাধালেন লেখক৷'
'কীরকম?'
'ভেবেছিলুম বানানো গল্প, যেমন হয় আর কি৷ বানিয়ে বানিয়ে সমস্যা তৈরি করা আবার বানিয়ে বানিয়ে তার সমাধান৷ কিন্তু ওই বইটার শেষে দেখবে, লেখা আছে 'সত্য ঘটনা অবলম্বনে'!
'তখনই মনে হল, মিথ্যে৷ পুরোটাই বানানো৷ আজকাল লোকের আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই হারানো টাকার মালিককে খুঁজতে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে এক মাস ধরে৷
'ভাবলাম বটে, তবে মন সায় দিল না৷ বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখাই যাক না৷ অন্যরকম তো হতেই পারে ব্যাপারটা৷ তাই কোথাও রহস্য নেই বইটা ফেরত দেবার সময় একটা হাজার টাকার নোট ইচ্ছে করে রেখে দিলুম ভেতরে৷'
'তার মানে টাকাটা আপনার?'
'এতক্ষণ কী শুনলে তাহলে?' হা-হা করে হাসলেন জেঠু৷ সুমন্ত শুনতে শুনতে পকেট থেকে হাজার টাকার নোটটা বার করে এগিয়ে দিল, 'তাহলে কী প্রমাণ হল জেঠু?'
বিভাকর সরকার বললেন, 'সুমন্ত নামে ছেলেরা এখনও আছে৷'
'কিন্তু অন্য কারও হাতেও তো পড়তে পারত?'
বিভাকর সরকার হাসলেন, 'তেমনটা যে ভাবনায় একেবারে ছিল না, তা নয়৷ তবে জানতাম, যারা বই পড়ে তারা আর যাই হোক, চোর-জোচ্চোর হবে না কিছুতেই৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন