বামাখ্যাপার চেলা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বিরাট প্রদর্শনী ফুটবল খেলা। কলকাতার টিম আসছে আমাদের পাড়ার টিমের সঙ্গে খেলতে। বাঘাদা আমাদের ক্যাপ্টেন। খেলার মাঠের পশ্চিম পাশে বড়োমামার বাগানের নড়বড়ে পাঁচিল। ইটের খাঁজ থেকে মশলা ঝরে পড়েছে। নোনা ধরে গেছে। ইটের চাপে ইট দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে-মধ্যে সাপের খোলস ঝুলে থাকে।

এত বড়ো একটা খেলা! বড়োমামা না দেখে পারেন! তায় আবার রবিবারের বিকেল। স্টেথিসকোপের এক বেলা ছুটি। দেয়ালের গায়ে সাপের মতো ঝুলছে। সোমবার সকালে নেমে আসবে বড়োমামার গলায়। সিল্কের লাল লুঙ্গি। ট্যাঁকে নস্যির ডিবে। গায়ে গোল গলা, বোতাম লাগানো, হাতাঅলা, ধবধবে সাদা গেঞ্জি। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। পাড়ার দলের প্রধান সাপোর্টার হয়ে বড়োমামা গোল লাইনের পেছনে। বড়োমামার পেছনে আরও এক দল। আর এক দল উঠে বসে আছে বড়োমামার পাঁচিলে। বড়োমামা একবার একটু খুঁতুর খুঁতুর করেছিলেন। তবে এত বড়ো একটা খেলা। তা ছাড়া পাঁচিলে চেপেছে আমাদেরই দলের সাপোর্টাররা।

আমাদের টিম খেলছে ভালো। তার চেয়েও ভালো আমাদের চিৎকার। মাঝমাঠ থেকে বল ওদের সীমানায় ঢুকেছে কী ঢোকেনি, অমনি আমাদের গগনভেদী চিৎকার—গোল, গোল। খেলা ড্র যাচ্ছে। শেষ হাফে আমাদের ফরোয়ার্ড লাইনের বাঘাদা বাঘের মতো বল নিয়ে, ও-দলের সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ করে গোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বড়োমামার নস্যির টিপ হাতের আঙুলে। নাকের কাছে উঠছে আবার নেমে নেমে যাচ্ছে। চিৎকার করছেন, ডু অর ডাই। বাঘা, ডু আর ডাই। বাঘাদার প্রথম শট গোলকিপার ফিরিয়ে দিয়েছে। বল নিয়ে ধস্তাধস্তি চলছে! সাপোর্টাররা সামনে-পেছনে দুলছে। গলা থেকে গোল শব্দটা গোল না-হওয়া পর্যন্ত বেরোবে না। সকলেই চেঁচাচ্ছে—গোও, গোও। ওল আর হয় না। হবে কী করে? গোলের মুখে যে গুলতানি শুরু হয়েছে।

গোল হোক-না-হোক, এই উত্তেজনায় বড়োমামার বাগানের সেই মান্ধাতার আমলের পাঁচিল কোল্যাপস করল। হই-হই, রই রই ব্যাপার। ইট চাপা পড়েও সাপোর্টাররা গোও গোও করছে। গোল আর হল না। খেলা ড্র-ই রয়ে গেল।

সকালে বড়োমামা মিস্ত্রি ধরে আনলেন। রাস্তা আর বাগান এক হয়ে গেছে। নতুন পাঁচিল তো তুলতেই হবে। তা না-হলে ওই সাপোর্টাররাই বাগান সাফ করে দেবে। ইট এসেছে, বালি এসেছে, সিমেন্ট এসেছে। বড়োমামার মিস্ত্রি রহমতুল্লা এসেছে, সঙ্গে দু-জন মজুর। রহমতুল্লা একট উঁচু ঢিবিতে উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছে আর জোগাড়ে দু-জনের সঙ্গে খুব গল্প করছে। বকরিদের সময় খিদিরপুর থেকে পাঁঠা কিনবে। খ্যাঁটের গল্প।

দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে বড়োমামা বললেন, ‘বড্ড ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে। ন-টা বেজে গেছে রহমতুল্লা।’

রহমতুল্লা বিরক্ত হয়ে বললে, ‘হচ্ছে বাবু হচ্ছে। বেশি টিকটিক করবেন না। কাজ ভালো হবে না।’

‘তাই নাকি রে ব্যাটা?’

‘ব্যাটা ব্যাটা করবেন না।’

‘মেজাজ দেখাচ্ছিস?’

‘মেজাজ আপনিই দেখাচ্ছেন।’

‘আমি দেখাচ্ছি? না তুই দেখাচ্ছিস ব্যাটা?’

‘আবার ব্যাটা বলছেন?’

‘ব্যাটার মানে জানিস? ব্যাটা ভূত!’

‘আবার ভূত বলছেন?’

‘ভূতকে ভূত বলব না, তো কী মানুষ বলব!’

বেশ মজা লাগছে। দু-জনে কেমন তরজা চলছে। বড়োমামার পাশে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছেন। গোলমাল হই-হই মেজোমামা একদম সহ্য করতে পারেন না। কারুর ছেলে কাঁদলে দৌড়ে গিয়ে বলেন, এই নে বাবা পাঁচটা টাকা, ওকে থামা। সেই মজাতেই আমাদের বাড়িতে যে কাজ করে, সে বেশ পেয়ে বসেছে। গেন্ডিপেন্ডি গোটা তিনেককে নিয়ে আসে সাতসকালে। এসেই পেটাতে থাকে। মেজোমামা থাকলে পিটুনি বেড়ে যায়। টাকার লোভে। মাসিমা দেখেশুনে বলেন, পৃথিবীটা শয়তানে ভরে উঠেছে।

মেজোমামা বড়োমামাকে বলছেন, ‘কাজ করাবে কাজ করাও, তুমি ওকে ভূতপ্রেত বলছ কেন?’

‘প্রথমে আমি ব্যাটা বলেছি, ব্যাটা খারাপ শব্দ! তুই-ই বল-না। ব্যাটা মানে ছেলে। আর ভূত? ভূত তো আদর করে বলে।’

‘...বেশি টিকটিক করবেন না |কাজ ভালো হবে না |’

‘তোমার অত বকবক, খবরদারির কী দরকার? জানোই তো, ওর মাথায় একটু ছিট আছে।’

রহমতুল্লা শুনতে পেয়েছে নীচে থেকে, চিৎকার করে বললে, ‘ছিট আমার মাথায় না তোমাদের মাথায়?’

মরেছে, আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে। বড়োমামা জানলার পাশ থেকে হুড়মুড় করে মেজোমামাকে একপাশে কাত করে দিয়ে ভেতর দিকে সরে গেলেন। আমরা সব দেখতে পাচ্ছি নীচে থেকে। দাঁড়া। জানলা থেকে সরে যাওয়া মানেই বড়োমামা নীচে নামছেন। ঠিক তাই। প্রায় ছুটতে ছুটতে বাগানে প্রবেশ।

‘অ্যাই, তোকে কাজ করতে হবে না। নিকালো, আভি নিকালো।’

‘নিকালো বললেই নিকালো! ন-টা বেজে গেছে, এখন আমরা নতুন কাজ ধরতে পারব?’

‘দ্যাটস নট মাই লুক আউট।’

‘আমরা যাব না, এ বাড়িতে আমরা বড়োবাবুর আমল থেকে কাজ করছি, হু আর ইউ!’

‘উরে বাব্বা, ইঞ্জিরি বলছিস?’

‘আমরাও কইতে পারি জনাব।’

‘তুমি আমার ইটে হাত দেবে না।’

‘জরুর দোব। আতা, মশলা মাখ।’

‘মজুরি দোব না।’

‘চাই না!’

আতা হোসেন বালি মাপছে, রামভরোসা সিমেন্টের বস্তা খুলছে। বড়োমামার মুখ দেখে মায়া হচ্ছে। তবে শেষ প্রতিবাদ, ‘তুমি আমার পাঁচিল গাঁথবে না, আমি তোমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি।’

‘যান যান, নিজের কাজে যান। বাইরের ঘরে অনেক রুগি জমেছে। নিজের চরকায় তেল দিন। অয়েল ইওর ওন মেশিন।’

‘তুই গেঁথে দেখ, আমি রদ্দা মেরে ফ্ল্যাট করে দোব।’

‘বড়োবাবুর আমলের লোক, তুই বলতে তোমার লজ্জা করছে না?’

‘আমি বামাখ্যাপার চেলা। আমি সব্বাইকে তুই বলি। আমার শ্যামা মাকেও তুই বলি রে পাঁঠা।’

‘বেশ করো। তুমি এখন যাও। ডিসটার্ব কোরো না।’

‘আমার এক কথা, তুমি আমার পাঁচিলে হাত দেবে না।’

‘হ্যাঁ, পঁচিলই নেই তো ‘পাঁচিলে হাত দেবে না। রামছাগলের মতো কথা।’

‘আমি রামছাগল?’

‘আমি পাঁঠা হলে তুমি তাই। আমি মানুষ হলে তুমি তাই। রামভরোসা মাখা লে আও।’

খপাস খপাস করে দু-কড়া মাখা মশলা পাঁচিলের কাছে পড়ল। ‘আতা, ইটে পানি ঢাল।’

বড়োমামা বললেন, ‘বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! আমার কাজ আমি তোমাকে দিয়ে করব না। ভদ্রলোকের এক কথা।’

কর্ণিকে এক খাবলা মশলা তুলে সেই ডাঁটিয়াল মিস্ত্রি ইটের ওপর থপাস করে ফেলে, একটু নেড়েচেড়ে একটা ইট বসিয়ে কর্ণিকের পেছনের বাঁট দিয়ে ঠুকুস ঠুকুস করে ঠুকে দিল! বড়োমামা দু-হাত পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘গা-জোয়ারি হয়ে যাচ্ছে রহমত।’

‘জোর যার মুলুক তার।’

তিনটি ইট গাঁথা হয়ে গেল। বড়োমামা একেবারে হেলপলেস। জোগাড়েরা ঘিরে রেখেছে রাজকে! এমনভাবে জল ঢালছে, মশলা ফেলছে, বড়োমামার পায়ে ছিটকে ছিটকে লাগছে। কিছু করার নেই, কাজ ইজ কাজ। রহমতুল্লা ডান পাশ থেকে বাঁ-পাশে সরে সরে যাচ্ছে, ইট গাঁথতে গাঁথতে। বড়োমামা এমন মানুষের পেছনে কেন যে লাগতে গিয়েছিলেন? কাজের স্পিড কী, যেন মেশিন! কিন্তু বড়োমামা যে এমন তক্কে তক্কে ছিলেন আমরা কেউই বুঝিনি। রহমতুল্লা যেই পাঁচিলের ওকোণে সরে গেছে, বড়োমামা সদ্য গাঁথা ইটের সারিতে মারলেন এক লাথি। বাস গোটাকতক সরে গিয়ে ত্রিভঙ্গ-মুরারি।

রহমতুল্লা ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘ক-বার ভাঙবে? আমি আবার গাঁথব। দেখি তুমি হার কী আমি হারি!’

‘দেখা যাক।’ বড়োমামারও রোক চেপে গেছে। রোদ ক্রমশ চড়ছে। বেলা বাড়ছে হু হু করে। রহমত গেঁথে চলেছে, বড়োমামা ভেঙে চলেছেন। জবরদস্ত খেলা! বড়োমামার রুগিরা চেম্বার ছেড়ে বাগানে চলে এসেছেন। এঁরা সব ডাক্তারবাবুর সাপোর্টার। ওপাশে রাস্তায় এক দল, তারা মিস্ত্রির সাপোর্টার। বড়োমামা যেই ভাঙেন, এরা হই হই করে। রহমত যেই আবার গাঁথে, ওরা হই হই করে।

মেজোমামা দর্শনশাস্ত্রে বুঁদ হয়ে চিলেকোঠায় বসেছিলেন। মাসিমা রান্নার কলেজে ভর্তি হয়েছেন। নোটবই খুলে চচ্চড়ি রাঁধছিলেন। দু-জনকেই ঘটনাটা জানালুম। মেজোমামা উদাস গলায় বললেন, ‘ভাঙচে? ভেঙে ফেলছে? ও তোমার দেখার ভুল। কেউ ভাঙতে পারে না, গড়তেও পারে না। ব্রহ্ম স্ট্যাটিক। স্থির জ্যোতিপুঞ্জ।’ মাসিমা ওপরে চলে এসেছেন।

‘মেজদা, তুমি থাকতে সকলের সামনে বড়দা এই রকম ছেলেমানুষি করে বংশের মুখ ডোবাবে?’

‘আমাকে কী করতে বলিস?’

‘তুমি বড়দাকে থামাও। ইটে লাথি মেরে পা-টা যে যাবে।’

‘চল, তাহলে।’

বড়োমামা লাথি মারবেন বলে সবে ডান পাটা তুলছেন, মাসিমা আর মেজোমামা খপাৎ করে পেছন দিক থেকে আচমকা বড়োমামাকে জড়িয়ে ধরে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে বাড়ির দিকে নিয়ে চললেন। রাস্তায় রহমতুল্লার সাপোর্টারদের তখন সে কী ভয়ংকর চিৎকার—হিপ হিপ হুররে! হিপ হিপ হুররে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%