সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
‘পৃথিবী ঈশ্বরের সৃষ্টি আর উদ্যান হল মানবের সৃষ্টি।’
‘কোন নেতা আবার এই জ্ঞানটি দিলেন।’
দাদুর মুখ খবরের কাগজের আড়ালে। পায়ের ওপর পা। এক পায়ে বিদ্যাসাগরি চটি। মৃদু মৃদু নাচছে। উলটো দিকের সোফায় বসে আছেন মেজোদাদু। থাকেন দেরাদুনে। অনেক দিন পরে কাল এসেছেন। ইচ্ছে, রিটায়ার করার সময় হয়েছে, দেরাদুনের পাট তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে আসবেন। মেজোদাদুর স্বভাবই হল মানুষকে উসকে দিয়ে মজা করা। মা দু-জনের সামনে দু-কাপ চা রেখে গেছেন। মেজোদাদু দু-চার চুমুক চা চালিয়েছেন। বড়োদাদু কাগজ থেকে মুখ তোলার অবসর পাচ্ছেন না। মাথা ডান থেকে বাঁ, বাঁ থেকে ডানে টানা পাখার মতো ঘুরেই চলেছে।
বড়োদাদু কাগজের আড়াল থেকে বললেন, ‘এ সব কথা নেতাদের বলার ক্ষমতা নেই। তাঁরা বলবেন, চলছে চলবে। এ হল আমার কথা।’
‘হঠাৎ তোমার এই রকম একটা জ্ঞানোদয় হল কেন?’
‘পৃথিবী একটা পাঠশালা। চোখ-কান খোলা রাখলে প্রতি মুহূর্তে মানুষ কিছু না কিছু শিখতে পারে। আর তোর মতো চোখ বুজে থাকলে পৃথিবী ঘুরেই যাবে, তুমি যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকবে।’
‘তুমি বোধহয় আমার প্রশ্নটা বুঝতে পারলে না দাদা! কাগজ পড়তে-পড়তে, পৃথিবী, ঈশ্বর, উদ্যান তিনটে একসঙ্গে এসে গেল কীভাবে? দ্যাখো, কৌতূহল না থাকলে মানুষের জ্ঞানলাভ হয় না। শিশুদের কৌতূহল বেশি বলে তারা ঝটপট অনেক কিছু শিখে নিতে পারে।’
‘তুমি যদি নিজেকে শিশু মনে করে থাকো, তা হলে আমার কিছু বলার অবশ্য নেই।’
মেজোদাদুর দু-পাটি বাঁধানো দাঁত শোবার ঘরে এক গেলাস জলে এখনও ভিজছে।
বড়োদাদু বললেন, ‘কাগজে আজ একটা বিজ্ঞাপন রয়েছে, কলকাতার উপকন্ঠে বাগানসহ বাড়ি বিক্রয়। তুই তো বলছিস দেরাদুনের পাট তুলে দিবি। এই বাগানবাড়িটা কিনে নিলে কেমন হয়?’
‘উঃ, ফাটাফাটি হয়ে যায়। ইউ আর গ্রেট দাদা। অ্যালফ্রেড দি গ্রেটের মতো, তুমি আমার দাদা দি গ্রেট। কাগজটা একবার দাও না।’
‘উত্তেজিত হোসনি। সাফল্যের মূলে থাকে ধৈর্য।’
মেজোদাদু সোফায় এলিয়ে পড়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘তোমার চা তো জুড়িয়ে জল হয়ে গেল।’
‘যাক। চা আমি ঠাণ্ডা করে খাই। গরম চা খেলে গায়ের রং কালো হয়ে যায়।’
‘আরে, আমি তো চিরকাল গরমই খাই। তুমি তো আগে বলোনি। তাই আমার গায়ের রংটা কেমন যেন মাজা মাজা হয়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ, এই নে তোর কাগজ।’
বড়োদাদু কাগজটা মেঝেতে ফেলে দিলেন। মেজোদাদু কাগজটা তুলে নিয়ে কপালে ঠেকালেন। কাগজও তো মা সরস্বতী। দেশবিদেশের কত খবর থাকে! আমাকে বললেন, ‘চশমাটা শোয়ার ঘর থেকে নিয়ে এসো তো। আমার দুটো চশমা, যেটার মাথা কাটা, যেটাকে বলে রিডিং গ্লাস, তুমি সেইটে আনবে।’
বড়োদাদু বললেন, ‘হাফ চশমাটা।’
শোয়ার ঘরের আলনায় গোটা কুড়ি বিভিন্ন ধরনের ছড়ি ঝুলছে। মুসৌরির পাহাড় থেকে মেজোদাদু কিনে এনেছেন। বৃদ্ধদের উপহার দেবেন। বড়োদাদুকে একটা দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি এখনও বৃদ্ধ হইনি। এখনও আমি যুবক।’
চশমা চোখে দিয়ে মেজোদাদু বিজ্ঞাপনটা জোরে জোরে পড়লেন।
‘দাদা, একটা ফোন নম্বর রয়েছে। একবার ফোন করে দেখলে হয় না? শুভস্য শীঘ্রম, অশুভস্য কালহরণম।’
‘উহুঁ, ধৈর্য। চা শেষ করে আমি আবার একবার বিজ্ঞাপনটা পড়ব। দু-বার পড়ব, তিনবার পড়ব।’
‘কেন? এটা কি তোমার পরীক্ষার পড়া? অতবার পড়ার মানে?’
‘সে তুই বুঝবি না রে মানু! দিনকাল বড়ো খারাপ পড়েছে রে! ম্যাপ দেখে জায়গাটা চিনতে হবে।’
‘কী যে বল তুমি! সারাজীবন তিলকে তাল করে এলে। এ কী তোমার কুমেরু অভিযান না কি যে, ম্যাপ দেখে জায়গা চিনতে হবে। চব্বিশ পরগনার আবার ম্যাপ কীসের!’
‘সে তুমি বুঝবে না ছোকরা! থাকো বিদেশে। যুগ কীরকম পালটেছে সে খবর রাখো?’
‘খুব রাখি।’
‘অশ্বডিম্ব রাখো। সারাজীবন তো জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে কাটালে। বাঘ, ভাল্লুক, বন্দুক, পাইনগাছ এই তো তোমার জগৎ।’
‘কেন, কেন? সতীদাহ বন্ধ হয়ে গেছে, এ খবর আমি রাখি। জাতিভেদ প্রথা উঠে গেছে, এ খবরও রাখি। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা উঠে গেছে সে-খবরও রাখি। দেশে দু-রকমের ইস্কুল আছে, ইংলিশ আর বেঙ্গলি মিডিয়াম।’
‘ভারতবর্ষতো স্বাধীন হয়েছে সে খবর রাখো?’
‘তুমি কি আমাকে সত্যিই সদ্যোজাত শিশু ভাবলে? সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট, এ রেড লেটার ডে।’
‘স্বাধীনতার মানে জানো?’
‘অফকোর্স, স্বাধীনতার মানে ফ্রিডম।’
‘কীসের ফ্রিডম?’
‘কেন, শাসনের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, কাজ করার স্বাধীনতা।’
‘অকাজ করার স্বাধীনতার কথা শুনেছ?’
‘না।’
‘দুষ্কর্ম করার স্বাধীনতার কথা শুনেছ?’
‘সে আবার কী?’
‘ওই তো মনুচন্দ্র, আকাশ থেকে পড়লে মানিক! এ দেশে যে কেউ যা খুশি করতে পারে! চারটে লোক চেপে ধরে তোমার মাথাটা কামিয়ে দিয়ে যেতে পারে।’
‘যা:, তা কখনও হয়?’
‘হয় মানিক। ইট মেরে তোমার জানালার সব কাচ ভেঙে দিয়ে যেতে পারে। তোমার বাগানের সব গাছ উপড়ে নিয়ে যেতে পারে।’
‘রাইফেল চালাব, ডালকুত্তা লেলিয়ে দেব।’
‘খুনের দায়ে পড়বে। শেষ জীবনটা জেলে কাটবে। তোমার বাগানে বাস্তুঘুঘু চরবে।’
‘সে কী?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। দিনকাল পালটে গেছে ভাই। সেই শান্তশিষ্ট বাঙালির যুগ আর নেই। সব সময় কাড়া-নাকাড়া আর দামামা বাজছে মানুষের রক্তে। সাধে ভদ্রলোক বাড়ি আর বাগান বেচতে চাইছেন?’
‘তুমি যখন জানোই, তখন আমাকে শুধু শুধু নাচিয়ে দিলে কেন? আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়।’
‘হতাশ হোয়ো না। আমাকে একটু তলিয়ে দেখতে দাও। ধ্যানে সব ধরা পড়বে।’
‘সে আবার কী?’
‘সে তুমি বুঝবে না।’
‘তার মানে তুমি ভূত নামাবে?’
‘ভূত ছাড়তেও পারি।’
‘তার মানে, তুমি মহাদেব?’
‘পাঁচজনে তো সেই রকমেই বলে।’ বড়োদাদু বললেন, ‘ভুতো, টেলিফোন ডাইরেক্টরিটা নিয়ে আয়।’
আমার এক এক দিন, এক এক নাম। কাল ছিল গজা, আজ হয়েছে ভুতো। কৃষ্ণের শতনামের মতো, আমার সহস্র নাম।
দাদু বলেন, ‘তুই আমার নামাবলি। মাঝে মাঝে আসল নামটাই ভুল হয়ে যায়।’ দাদু জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর আসল নামটা কী ছিল রে গবা?’ আমাকে তখন মায়ের কাছে ছুটতে হয়। স্কুলে, মাঝে মধ্যে এই নাম ভুলে যাবার জন্যে পিটুনি খেতে হয়। সকাল থেকে যার নাম চলেছে অ্যাটলাস কি হটেনটট, সে বারোটার সময় অঙ্কের মাস্টার মশাইয়ের পিন্টু ডাকে সাড়া দিতে দু-চার মিনিট দেরি করলে কিছু বলার আছে? হয়তো আছে, তা না হলে ডাস্টার-পেটা খেতে হবে কেন?
দাদু ফোনে অবনীকে ডাকলেন। ‘শোনো হে অবনী।’
অবনীর ঘাড়ে একগাদা কাজ চাপল। গোয়েন্দাগিরি করতে হবে। যেমন, জায়গাটা কোন দলের এলাকা? আশেপাশে কী আছে? কলকারখানা আছে? বস্তি আছে? চায়ের দোকান আছে? ক্লাব আছে? নর্দমা কত দূর দিয়ে গেছে? পাকা না কাঁচা? বড়ো রাস্তা কত দূরে! এলাকায় ছোটো ছেলের সংখা বেশি, না যুবকের সংখ্যা, না বৃদ্ধের? স্কুল কত দূরে!
দাদু এক-একটা ফিরিস্তি বের করছেন, আর মেজোদাদু তারিফ করে উঠছেন, ‘বাহবা, বাহবা!’
পাক্কা আধঘণ্টা লাগল টেলিফোন শেষ করতে।
মেজোদাদু বললেন, ‘কবে নাগাদ তোমার খবর আসবে?’
‘কালই এসে যাবে। অবনী কাজ ফেলে রাখার ছেলে নয়। তার নীতি হল, কাজ সেরে বসি, শত্তুর মেরে হাসি।’
দাদু বললেন, ‘যাও টমেটম, ডাইরেক্টরিটা যথাস্থানে রেখে এসো, তোমার ফাদার আবার এখুনি চেঁচাতে শুরু করবে। বড়ো মেথডিক্যাল মানুষ। আর হবে না কেন? মেথডিক্যাল না-হলে জীবনে অত উন্নতি হয়? এই যেমন আমার কাজের ধারা দ্যাখো! সব আট-ঘাট বেঁধে ধীরে-ধীরে এগোই। তোর মতো অমন হালুম করে লাফিয়ে পড়ি না। সব সময় মনে রাখতে হবে, আমরা বাঘ নই, মানুষ।’
‘তোমার কী মনে হয়, হালুম করে লাফিয়ে পড়ে বলে বাঘের কোনও ক্ষতি হয়? বাঘ কত বড়ো প্রাণী জানো? তুমি সামনাসামনি বাঘ দেখেছো?’
‘বাঘ দেখিনি? কী বলিস রে? ওই ব্যাটাকে নিয়ে প্রত্যেক বছর শীতকালে আমরা চিড়িয়াখানায় যাই।’
‘হ্যাঁ, চিড়িয়াখানার বাঘ আবার বাঘ! ও তো এক একটা শেয়াল। বাঘ দেখেছি আমি! কুমায়ুনের মানুষখেকো। যেমন তার রং, তেমন ব্যবহার। আহা!’
‘খুব ভদ্র, অমায়িক ব্যবহার?’
‘আরে না না, ভদ্র-অভদ্রের কথা আসছে কী করে? বাঘ কি ভদ্রলোক! বাঘের ব্যবহার বাঘের মতো। এক-একটা লাফ কী! এই এ-পাড়া থেকে ও-পাড়া। হালুম করে মারলে লাফ, মাথার ওপর দিয়ে কোথায় যে চলে গেল!’
‘মানে ওভারবাউণ্ডারি! ফিল্ডিং ভালো না-হলে, সব বলই ওভারবাউণ্ডারি হবে। ক্যাচ মিস করা আমাদের ইণ্ডিয়ান টিমের একটা রোগ। এসব প্লেয়ারদের দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত।
‘না: দাদা, সত্যি তোমার বয়স হয়েছে। হচ্ছে বাঘের কথা, টেনে আনলে ক্রিকেট। বাঘ কি ক্রিকেট বল যে লাফিয়ে উঠে ক্যাচ ধরব, আর আম্পায়ার আঙুল তুলে বলবেন, হাউ’জ দ্যাট! তুমি রোজ একটা করে ভিটামিন খাও।’
‘ভিটামিন তুই খা। আমি রোজ পুঁইশাক খাই। শিকারির হাতে রাইফেলটা কী জন্যে থাকে। সেইটা দিয়ে দুম করে মারা যায় না?’
‘আজ্ঞে না, যায় না। তুমি শিকারের কিছুই বোঝো না।’
‘একটা রাইফেল দে না, দেখিয়ে দিচ্ছি, শিকারের কী বুঝি আর না বুঝি।’
‘এখন আর তেমন বাঘ নেই, থাকলেও মারা যাবে না।’
‘কেন নেই?’
‘নেই, তাই নেই।’
‘তোমার মাথা। ওই গর্দভের মতো হালুম-লাফ মেরে-মেরেই জাতটা শেষ হয়ে গেল।’ বাঘের যদি আটঘাট বেঁধে কাজে নামার বুদ্ধি থাকত, তাহলে তোমাকে আর এখানে বসে বসে ল্যাজ নাড়তে হতো না, বাঘের পেটে স্বর্গে যেতে।’
‘তুমি যাই বলো, বাঘ মানুষের চেয়ে ঢের বড়ো।’
‘বড়ো হলেই মানুষ হয় না। মানুষ বাঘের চেয়ে ঢের ঢের ঢের বড়ো। তিন ঢের বড়ো।’
‘বাঘ তাহলে ছ-ঢের বড়ো।’
‘মানুষ তাহলে বারো ঢের।’
‘বাঘ তাহলে চব্বিশ।’
‘মানুষ তাহলে আটচল্লিশ।’
‘বাঘ ছিয়ানব্বই।’
‘মানুষ তাহলে একশো বিরানব্বই।’
বা:, এ যেন নিলাম হচ্ছে! কার রেট কোথায় ওঠে! না:, ব্যাপারটা ফয়সালা হল না। মা এসে পড়ল! মা এলেই সব গোলমাল হয়ে যায়। কোনও গোলমাল দেখলেই মা ছুটে আসবে। সেই বলে না, শান্তির শ্বেত পারাবত, দু-দেশের নেতা এক জায়গায় হলেই যা দু-হাতে আকাশে ওড়ান আর বলতে থাকেন, ভাই ভাই। মাকে শান্তির জন্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত।
মা ঘরে ঢুকেই বলল, ‘তোমাদের কোনও কাজ নেই?
দু-দাদু এক সঙ্গে বললেন, ‘না, আমাদের কাজ কী! সংসারের সব কাজ আমরা শেষ করে বসে আছি। আমরা এখন রিটায়ার্ড।’
মা মেজোদাদুর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তোমার দাঁত মাজা হয়েছে?’
মেজোদাদু হে হে করে হেসে বললেন, ‘দাঁত নিজেই নিজেকে মাজবে! সে হল স্বাধীন, আমার তোয়াক্কাই করে না।’
মা বড়োদাদুর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘বাবা, বেড়ানো হয়ে গেছে?’
‘আজ আবার বেড়ানো কীসের? আজ তো রবিবার। আমরা এখন বাঘ মারব।
‘দাঁড়াও, তোমাদের বাঘ মারা আমি বার করছি।’ মা গলা ছেড়ে ডাকতে লাগলেন, ‘পুষ্প, পুষ্প, এই ঘরটা আগে ঝাঁট দিয়ে মুছে নে।’
দাদু বললেন, ‘উঠে পড়ো ভায়া, ঝেঁটিয়ে বিদায় করার প্ল্যান। ঝগড়া না করে তুই যে এক জায়গায় চুপ করে বসতে পারিস না! বয়েস হচ্ছে, স্বভাবটা পালটা না।’
‘বাঘের অপমান আমি সহ্য করতে পারি না। বাঘ ইজ এ বাঘ।’
পুষ্পদি ফুলঝাড়ু, বালতি আর ন্যাতা নিয়ে নেতার মতো ঘরে ঢুকল।
সন্ধের দিকেই অবনীবাবু এসে গেলেন। ন্যাড়া মাথায় ক্রিকেট টুপি। টাইট প্যান্ট, জামা ভেতরে গোঁজা। স্বাস্থ্য বেশ ভালোই। দরজার সামনে আমাকে দেখে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে খোকা, ইহা কি গঙ্গাধরবাবুর বাড়ি?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। গেটের বাইরেই তো নাম লেখা আছে।’
‘ছোটো-খাটো জিনিস আমার চোখে পড়ে না।’
‘আমার দাদু ছোটো-খাটো মানুষ?’
‘আচ্ছা আড়বোঝা ছেলে তো! দাদু বাড়ি আছেন?’
‘হ্যাঁ, আছেন।’
‘গিয়ে বলো অবনী এসেছে।’
‘এসেছে নয়, এসেছেন।’
‘সে তো তুমি বলবে, আমি বলব কেন? কুকুর আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘তিনি কোথায়?’
‘তিনি নয়, সে।’
‘ওই হল রে বাবা। সব কথায় অত ভুল ধরো কেন? সেই কুত্তাটা এখন কোথায়?’
‘কুত্তা নয়, কুকুর।’
‘খাতির করলেও ভুল ধরবে, খাতির না-করলেও ভুল ধরবে। এ ছেলে বড়ো হলে দেখছি নির্ঘাত স্কুলমাস্টার হবে।’
‘কুকুর এখন ছাদে দাদুর সঙ্গে হাওয়া খাচ্ছে আর গান গাইছে।’
‘গান গাইছে নয়, ল্যাজ নাড়ছে। এইবার তোমার ভুল ধরেছি।’
‘আমাদের কুকুর গানও গায়।’
আমাকে আর যেতে হল না, দাদুই এসে গেলেন। ‘কার সঙ্গে বকবক করছিস রে হুলো? ও, অবনী এসে গেছে। এসো এসো, ভেতরে এসো।’
সেই অদ্ভুত অবনীবাবু হাতজোড় করে দাদুর পেছন পেছন বসার ঘরে ঢুকে গেলেন। ভালো সোফায় না বসে একটা চেয়ারে বসলেন। দাদু বললেন, ‘ওখানে বসলে কেন?’
‘আজ্ঞে যার যেমন জায়গা। ও-সব বড়োমানুষের জন্যে। আমাদের জন্যে এই ভালো।’
‘তুমি কি ছোটো মানুষ?’
‘আরেব্বাপ, কী বলছেন আপনি? আমার কোনো এডুকেশন নেই। আপনি বাঁচিয়েছিলেন বলে জেলের বাইরে আছি, করে খাচ্ছি।’
‘তুমি আমাকে ভালোবাসো?’
‘আরেব্বাপ, জিন্দেগিতে আমি একজনকেই ভালোবাসি, সে হল আপনি।’
ভদ্রলোক কীভাবে কথা বলছেন! কীরকম ভয়ে ভয়ে বসে আছেন জড়সড় হয়ে।
মেজোদাদুর শুকনো কাশি হয়েছে। খকখক করতে করতে ঘরে এসে ঢুকলেন। বড়োদাদু প্রশ্ন করার আগে মেজোদাদুই শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, তা-হলে কী বুঝলেন?’
বড়োদাদু বললেন, ‘তুমি একদম নাক গলাবে না। চুপ করে বোসো। খকখক করে কাশাও চলবে না।’
‘যদি কাশি পায়?’
‘বাইরের বাগানে চলে যাবে। ঝাউগাছের তলায় দাঁড়িয়ে কেশে আসবে।’
অবনীবাবু বললেন, ‘তাহলে আমি স্টার্ট করি।’
‘না, আমার একটা প্রশ্ন আছে। তোমার কি কেউ মারা গেছেন?’
‘কই, না তো।’
‘তাহলে মাথা মুড়িয়েছ কেন?’
‘আজ্ঞে চুলের চিকিৎসা চলছে। ভুস ভুস করে সব চুল উঠে যাচ্ছে। দু-বার ন্যাড়া হয়েছি, আরও দু-বার ন্যাড়া হব।’
‘এবার তাহলে একটা টিকিও রাখো। ইলেকট্রিসিটি খেলবে, খাড়া-খাড়া চুল বেরোবে।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই করব। তা হলে চলি।’
মেজোদাদু বাধা দিলেন। ‘চুলের বিষয়ে আমার কিছু বলার আছে। মাথা যখন মুড়িয়েছেন তখন আর-একটা কাজ করুন। রোজ সকালে মাথায় গরম গোবর লেপে দিন। পনেরো দিনের মধ্যে কচি-কচি চুল বেরিয়ে যাবে।’
‘গরম গোবর আমি পাব কোথায়?’
‘একটা গোরু কিনে ফেলুন। পেটে দুধ, মাথায় গোবর।’
‘অবনী!’ বড়োদাদু কড়া গলায় ডাকলেন, ‘বড়ো বাজে বকছ হে, নাও শুরু করো, জানো আমার সময়ের দাম আছে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, চারপাশ ফাঁকা।’
‘কোথায় ফাঁকা?’
‘ওই যে, বাগানবাড়িটা যেখানে। চারপাশে ধুধু মাঠ, অচেনা পথঘাট। কাছাকাছি একটা নদী আছে। নাম, ইছামতী।’
মেজোদাদু বললেন, ‘ব্যস, ব্যস, আর আমার কিছু চাই না। নদী, বাগানবাড়ি। বহুদিনের ইচ্ছে, শেষ জীবনটা লিখে কাটাব। জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রথম বইটার নাম হবে ‘ভদ্রলোক বাঘ, অভদ্র মানুষ; দ্বিতীয় বইটার নাম, ‘সাহসী চিতা।’
বড়োদাদু বললেন, ‘আমি আগেই বলে রাখছি, তোমার ওই রাবিশ বই আমি পড়তেও পারব না, ভূমিকা লিখতেও পারব না।’
‘কে বলছে তোমাকে ভূমিকা লিখতে? আমি বিলেত থেকে জেরালড জরেলডকে দিয়ে ভূমিকা লিখিয়ে আনব।’
‘তাই এনো। অবনী, তুমি বলে যাও।’
‘আজ্ঞে, আশেপাশে যখন মানুষই নেই, তখন ছেলে-বুড়ো, যুবক-যুবতীর প্রশ্নই আসে না। আসে কি?’
‘না, আসে না। রাস্তাঘাট?’
‘পিচের রাস্তা থেকে আর-একটা পিচের রাস্তা নেমেছে। সেই রাস্তা থেকে আর একটা সরু রাস্তা, সেটা থেকে আর একটা। ঘুর-পাক খেতে খেতে সেই বাড়ি।’
‘কতটা হাঁটতে হবে?’
‘মাইল দুয়েক।’
‘চলবে না। ক্যানসেল।’
মেজোদাদু বললেন, ‘ক্যানসেল কেন?’
‘অতটা কে হাঁটবে?’
‘সাইকেল কিনব।’
অবনীবাবু বললেন, ‘আপনারা অন্তত একবার দেখে আসবেন চলুন। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। বাগানে খুব ভালো ভালো গাছ আছে। পাখির ডাক কী—কানের কাছে যেন সারেঙ্গি বাজছে সারা দিন।’
‘বেশ, তাই হোক। চলো, কাল ভোরেই বেরিয়ে পড়ি।’
মেজোদাদু বললেন, ‘খুবই ভালো কথা।’
বড়োদাদু বললেন, ‘তুমি চুপ করো। ভালো কথা কী খারাপ কথা, সে আমি বুঝব। অবনী, তুমি আজ রাতে এখানেই থাকবে।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, কিন্তু ছাতে শোব।’
‘তাই শুয়ো।’
‘মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাব।’
‘কেন মাংস কেন?’
‘বড়ো লোভ হয়েছে।’
‘আচ্ছা তাই হবে।’
‘একটু চাটনি।’
‘তাও হবে।’
‘শেষ-পাতে একটু দই।’
‘ব্যস, ওইতেই শেষ।’
‘হ্যাঁ, আর না, শুধু এক খিলি পান।’
‘এক খিলিতে তোমার হবে না বাপু, দু-খিলি পাবে।’
মেজোদাদু বললেন, ‘জরদা চলে না-কি?’
‘আজ্ঞে সে ব্যবস্থা আমার পকেটে আছে।’
‘আমার স্ত্রীর কাছে লাখনোর এক নম্বর জিনিস আছে। তোমাকে দেব।’
‘আচ্ছা, আমি তাহলে একটু বেড়িয়ে-টেড়িয়ে আসি।’
‘হ্যাঁ, এসো, বুঝতেই পেরেছি, অনেকক্ষণ ধূমপান হয়নি।’
‘আজ্ঞে, ধরেছেন ঠিক।’
সকাল না হতেই বাড়িতে সাজো-সাজো রব পড়ে গেল। বাথরুম থেকে বড়োদাদু বেরোন তো মেজোদাদু ঢোকেন। মেজোদাদু বেরোন তো বড়োদাদু ঢোকেন। ওঁদের এই ঘনঘন আনাগোনা দেখে মা রেগে রেগে উঠছে। বাবা বললেন, ‘তুমি আর আগুনে কাঠ গুঁজো না। দু-জনেই নার্ভাস ডায়ারিয়ায় ভুগছেন, পারো তো ঘুমের ওষুধ খাওয়াও।’
‘যাবেন বাগানবাড়ি দেখতে, অত ভয়ের কী আছে বাপু? সঙ্গে অমন ছেলে যাচ্ছে।’
অবনীবাবু এক রাতেই আমার দাদা হয়ে গেছেন। অবনীদা বুকটা একবার ফুলিয়ে নিলেন। বাবা বললেন, ‘দুই বৃদ্ধকে নিয়ে আজ তোমার বরাতে খুব দুঃখ আছে।’
‘আজ্ঞে, দুঃখই তো জীবন।’
‘হ্যাঁ, বুঝবে ঠ্যালা। তখন এই কথাটা তোমার মনে থাকলে হয়।’
বড়োদাদু বাথরুম থেকে বেরোচ্ছেন, মেজোদাদু ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘তোমার কী হল বলো তো দাদা? কাল কি জোলাপ খেয়েছিলে? এতবার যাচ্ছ আর আসছ।’
‘তুই আর কথা বলিসনি মেজো! তোর ক-বার হল গুনেছিস?’
‘মাত্র তিন বার।’
‘আজ্ঞে না, সাতবার। আমার এখনও এক কম আছে।’
অবনীদা বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আজ আর আপনারা যেতে পারবেন না। আমি বরং কাল সকালে আসি।’
‘আরে না না। এটা আমাদের বংশগত রোগ। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে না দিলে এ চলতেই থাকবে।’
‘আজ্ঞে, ধাক্কা দেবার কেউ নেই? এদিকে তো ন-টা প্রায় বাজল।’
‘ধাক্কা কে দেবে বলো, আমরা যে বড়ো হয়ে বসে আছি।’
‘তা হলে নিজেরাই এবার নিজেদের ধাক্কা দিন।’
‘হ্যাঁ, সেই ব্যবস্থাই করতে হবে। আমি মেজোকে দোব, মেজো আমাকে দেবে।’
যাক দশটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লুম। দাদুর ব্যাপার, আমাকে সঙ্গে থাকতেই হবে। মা-ও তাই চায়।
বাইরে একা একা বেরোলে দাদু ভীষণ চানাচুর খান। সেবার দুশো গ্রাম চানাচুর খেয়ে ভীষণ কান্ড করেছিলেন।
আমরা চলেছি টানা ট্যাক্সিতে। মেজোদাদুর গা থেকে ভুরভুর চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে। অবনীদার মুখ থেকে জরদার।
হুহু করে গাড়ি ছুটিয়ে প্রায় বারোটা নাগাদ আমরা সেই বাগানবাড়ির সামনে এসে পৌঁছোলুম। মেজোদাদু নেমেই বললেন, ‘আহা স্বর্গ!’
বড়োদাদু ধমক দিলেন, ‘তুমি একটাও বাজে কথা বলবে না। স্বর্গ কী নরক সে আমরা বুঝব।’
ট্যাক্সি-ড্রাইভার বললেন, ‘ঠিক বলেছেন দাদু, বেশি লাফালাফি করলেই চড়া দাম হাঁকবে।’
বড়োদাদু ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমার ওই দাদু ডাকটা বদলানো যায় না? লেখাপড়া তো করেছ, কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া, বুড়োকে বুড়ো বলতে নেই, এ-শিক্ষাটা হয়নি?
‘আজ্ঞে তা হলে কী বলব?’
‘কিছুই বলবে না। না-বলেও তো বলা যায়।’
মেজোদাদু যোগ করলেন, ‘যেমন না-বলা বাণী।’
‘আবার বাজে বকছ?’
‘যাব্বাবা, একটা কথাও বলা যাবে না?’
‘না, যাবে না। কোন কথায়, কী কথা বেরিয়ে আসে কে বলতে পারে!’
গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল। আমরা আবার ফিরে যাব।
বাগানটা সত্যিই বিশাল। বহু ধরনের গাছ। আমগাছে বোল এসেছে। গন্ধে মাত। মৌমাছি ভ্যানভ্যান করছে।
বড়োদাদু আপন মনে বললেন, ‘অ্যাসেট। এমন জিনিস কি কেউ ছাড়বে! কে জানে!’
মেজোদাদু বললেন, ‘এবার কী হল দাদা! তুমি যে প্রশংসা করলে! দাম বেড়ে যাবে না?’
‘তুমি ছাড়া কেউ শুনেছে?’
‘আমি যখন স্বর্গ বলেছিলুম, তুমি ছাড়া কেউ শুনেছিল?’
‘তুই বড়ো তর্ক করিস।’
‘হ্যাঁ, সত্যি কথা বললেই তর্ক হয়ে যায়!’
‘তোর বাড়ি তুই-ই তাহলে বোঝ, আমি তোর কোনো ব্যাপারে থাকতে চাই না। ফিরে চললুম।’
বড়োদাদু সত্যি সত্যিই গাড়ির দিকে ফিরে চললেন। অবনীদা এক হাত ধরেছেন, মেজোদাদু আর-এক হাত, আমি জাপটে ধরেছি কোমর।
মেজোদাদু বললেন, ‘তুমি চট করে বড়ো রেগে যাও।’
অবনীদা বললেন, ‘নিজেদের মধ্যে অশান্তি ঠিক নয়।’
গাড়ির চালক বললেন, ‘ওই করেই বাঙালি জাতটা শেষ হয়ে গেল।’
বড়োদাদু বললেন, ‘আমরা বাঙালি নই। দেখবে আমাদের একতা? চল মেজো, চল।’
হাওয়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল। লোহার গেটে তালা ঝুলছে, চেন বাঁধা।
বড়োদাদু বললেন, ‘যা:, হয়ে গেল। বাড়িতে বোধহয় কেউ নেই। তুমি আসলে খবরটাই নাওনি অবনী!’
‘কালও তো আমি লোক দেখে গেছি। দাঁড়ান, একবার দেখি!’
অবনীদা গেটের লোহার তালা বাজাতে লাগলেন। কী তার শব্দ!
অনেক দূর থেকে কে-একজন হেঁকে বললেন, ‘মেরে তক্তা করে দেব। আবার ফিরে এসেছিস!’
অবনীদা চিৎকার করে বললেন, ‘আমরা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি স্যার।’
বড়োদাদু মৃদু ধমক দিলেন, ‘স্যার বলছ কেন? আমরা কি চাকরি চাইতে এসেছি? আমরা কিনতে এসেছি। সেইভাবে ডাঁটে কথা বলো অবনী।’
অবনীদা আবার চিৎকার করলেন, ‘আমরা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি মশাই।’
‘মাথা কিনে নিয়েছেন!’ উত্তর এল জবরদস্ত।
অবনীদা বড়োদাদুর দিকে করুণ মুখে চেয়ে বললেন, ‘এর উত্তরে কী বলব?’
‘কিছু বলবে না। বড়ো মাছ তুলতে গেলে একটু খেলাতে হয়। এখন স্রেফ সুতো ছেড়ে যাও।’
ঢলঢলে সাদা প্যান্ট আর হাফহাতা জামা-পরা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। সামনে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ঝুলছে। দেখলেই হাসি পায়। কোথাও কিছু নেই, এতখানি একটা দাড়ি। চোখে মোটা চশমা। গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বললেন, ‘সব কিছুর একটা সভ্যতা আছে।’
বড়োদাদু বললেন, ‘আমরা তো কোনো অসভ্যতা করিনি।’
‘সভ্যতা-অসভ্যতার বোধটাই তো আপনাদের নেই। গেটে তালা বাজাচ্ছিলেন কেন? এটা কি আফ্রিকান বাদ্যযন্ত্র? আপনারা কি কনসার্ট পার্টি?’
‘আজ্ঞে না।’
‘তবে?’
‘কী ভাবে তাহলে ডাকব? কলিং বেল নেই যে!’
‘ডাকবেন না। গেটে তালা মানেই দেখা করার সময় চলে গেছে। সকাল ন-টা থেকে এগারোটা, বিকেল তিনটে থেকে পাঁচটা।’
‘কই, কাগজে লেখেননি তো!’
‘সব কথা কি লেখা যায়? বিজ্ঞাপনের খরচ জানেন? সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু জিনিস বুঝে নিতে হয়।’
মেজোদাদু বললেন, ‘অলিখিত আইনের মতো!’
‘দ্যাটস রাইট।’
বড়োদাদু বললেন, ‘আমরা তাহলে কী করব এখন? ফিরে যাব?’
‘সে আপনাদের ইচ্ছে। ফিরেও যেতে পারেন, আশেপাশে ঘোরাঘুরিও করতে পারেন, তিনটে বাজলে আসবেন। হ্যাঁ যাবার আগে এক টিন রংয়ের দাম দিয়ে যেতে হবে।’
‘সে আবার কী?’
‘এই যে তালা ঠুকে এই জায়গার রং চটিয়েছেন।’
বড়োদাদু বললেন, ‘প্রমাণ আছে?’
‘তার মানে?’
‘ওটা যে চটেই ছিল না, তার কোনো প্রমাণ আছে!’
‘আমি বলছি, এই তো যথেষ্ট প্রমাণ।’
‘তাহলে আদালতেই ফয়সালা হবে। এই নিন আমার কার্ড।’
বড়োদাদু গেটের এপাশ থেকে ওপাশে ভদ্রলোককে একটা কার্ড এগিয়ে দিলেন। আমি জানি কী লেখা আছে, দাদুর নাম, এমএ, এলএলবি, অ্যাডভোকেট, কলকাতা হাইকোর্ট। নাও, এবার বোঝো ঠ্যালা। আমার দাদুকে না চিনেই বড়ো বড়ো কথা।

...গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বললেন,‘সব কিছুর একটা সভ্যতা আছে|’
ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি আইন ব্যবসায়ী?’
‘কী মনে হচ্ছে? একটা মানহানির মামলা তাহলে ঠুকে দি?’
মেজোদাদু বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠুকে দাও দাদা। মেরে তক্তা করে দেব বলেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি কে? অ্যাডিং ফুয়েল টু দি ফায়ার?’
‘আজ্ঞে, আগুনটা জ্বেলেছে কে? এইবার বুঝুন ঠ্যালা। আমি উত্তরপ্রদেশের কনজারভেটার অফ ফরেস্ট, বহু বাঘ মেরেছি জীবনে। বড়ো বড়ো বাঘ, বড়ো বড়ো বাঘ।’
‘আমি কে জানেন?’
‘আপনি? আপনি একজন অভদ্র লোক।’
‘তাহলে এই নিন আমার কার্ড।’
উঃ, দারুণ জমেছে! কার্ডের খেলা চলেছে। তাস খেলা। টেক্কার ওপর টেক্কা পড়ছে।
বড়োদাদু কার্ডটা উলটে-পালটে দেখলেন। মেজোদাদু পাশ থেকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছেন। আমি আর অবনীদা একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।
বড়োদাদু বললেন, ‘আপনি ডক্টর ভবেশ মহাপাত্র? আমার বিশ্বাস হয় না।’
মেজোদাদু বললেন, ‘স্পেস সায়েনটিস্ট ভবেশ মহাপাত্র, যিনি মহাশূন্যে রকেট ওড়ান? তাঁর তো এখন ফ্লোরিডায় থাকার কথা।’
‘আঃ, তুমি চুপ করো। সব কথায় কথায় বলো কেন? ফ্লোরিডা কি না জানি না, তবে ভারতে থাকার কথা নয়। বড়ো বড়ো লোকেরা সব ভারতের বাইরে থাকেন।’
ভবেশবাবু বললেন, ‘আমি ফিরে এসেছি। সবাই বলছে আমার মাথাটা নাকি একটু খারাপ হয়েছে।’
‘প্রমাণ আছে?’
‘পাগলের প্রমাণ পাগলামি!’
‘যেমন?’
‘আমার বিশ্বাস ঢেঁকি স্বর্গে যেতে পারে। আমি সেই ঢেঁকির খোঁজে ভারতে এসেছি।’
‘আমিও বিশ্বাস করি। নারদ যে ঢেঁকি চড়ে আসা-যাওয়া করতেন, সেই বিশেষ ধরনের ঢেঁকিটি খুঁজে বের করতে হবে। ভারতবর্ষের কোথাও-না-কোথাও অবহেলায় পড়ে আছে।’
‘আফগানিস্তানেও থাকতে পারে।’
‘এ আপনি কী বলছেন, ঢেঁকি হল ভারতবর্ষের জিনিস, বিশেষত বাংলার।’
‘আরে মশাই, ঢেঁকি যে সময় বাহন ছিল, সেই সময় বিশাল আর-একটা মহাদেশ ছিল, ভারত, আফ্রিকা-টাফ্রিকা নিয়ে।’
‘আপনি কিস্যু জানেন না।’
‘আপনি কিস্যু জানেন না, এ আপনার হাইকোর্ট নয়।’
‘আপনি ঘোড়ার ডিম জানেন।’
‘ঘোড়ার যে ডিম হয়, তাই তো আপনি জানেন না।’
‘তাই নাকি? কোন ঘোড়ার, আপনার ঘোড়ার?’
‘আজ্ঞে না, পক্ষীরাজের। আমার কাছে আছে, দেখতে চান?
‘বাড়িতে ঢুকতেই দিচ্ছেন না তো ডিম দেখা!’
‘এইবার দেব, আপনি আমার মনের মতো মানুষ, তবে একটা শর্ত। ঢেঁকি শুধু বাংলাদেশেই খুঁজলে হবে না, এলাকা বাড়াতে হবে। ওদিকে এশিয়া মাইনর, এদিকে আফ্রিকা।’
‘বেশ, তাই হবে।’
ঝলঝলে জামার পকেট থেকে এক গোছা চাবি বের করে তিনি তালা খোলার চেষ্টা করতে লাগলেন। একবার এ চাবি ঢোকান, একবার ও চাবি ঢোকান। তালা কিন্তু খোলে না। কী করে খুলবে! তালা একটা, চাবি পঞ্চাশটা। আমার দাদুর দেরাজ খোলার অবস্থা। ভুল চাবিটাই বারেবারে ঘুরে ঘুরে আসে। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর তিনি করুণ মুখে বললেন, ‘কী হবে, চাবি যে মিলছে না। আপনারা গেট টপকে ঢুকতে পারেন না? আমার ছেলে ঢোকে।’
‘আজ্ঞে না, সে বয়েস নেই। ছেলেবেলায় টিফিন আওয়ারের পর স্কুলে ঢুকেছি গেট টপকে, যৌবনে যাত্রা দেখে বাড়ি ঢুকেছি পাঁচিল টপকে।’
‘আমার এই তালাটা মাঝে মাঝে বড়ো ভোগায়। একটা কাজ করলে হয়, যখন খুলবে তখন যদি ঢোকেন।’
‘তার মানে?’
‘মানে খুব সহজ, বাই চানস একসময় চাবি লাগবেই, তালা খুলবেই, সে ধরুন আজও হতে পারে, কালও হতে পারে, তখন টুক করে ঢুকে পড়বেন।’
‘তাহলে আপনারা চেষ্টা করুন।’
রাগ করে ভদ্রলোক চাবির থোলোটা আমাদের পায়ের কাছে ছুড়ে ফেলে দিলেন।
দাদু বললেন, ‘অবনী, চেষ্টা করো।’
অবনীদা একের পর এক চাবি লাগাচ্ছেন আর খুলছেন। বিশাল দু-মানুষ উঁচু গেট। সহজে টপকানো যাবে না। মাথার দিকে খোঁচা খোঁচা বর্শার ফলা। বেশ জম্পেশ গেট। অবনীদা ঘেমে উঠেছেন। এতক্ষণ আমরা লক্ষ করিনি, পেছনে আর এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন।
ভদ্রলোক বললেন, ‘ব্যর্থ চেষ্টা, ওই চাবির মধ্যে তালার চাবি নেই। চাবি আমার কাছে। এই দেখুন।’
সুন্দর চেহারার যুবক। এক মাথা এলোমেলো চুল। চোখে রঙিন চশমা। দু-আঙুলে চাবিটি তুলে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভবেশবাবু চিৎকার করে বললেন, ‘ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র, ও হল বিদেশি এজেন্ট, আমার গবেষণার শত্রু, তোমাকে আমি মেরে তক্তা করে দোব। তোমাকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করে দিয়েছি, আবার এসেছ, আবার এসেছ!’
ভদ্রলোক করুণ মুখে বললেন, ‘আপনারা আমার বাবাকে ক্ষমা করুন। সম্প্রতি ওঁর মাথায় একটু গোলমাল হয়েছে। দূর থেকে এসেছেন, আপনাদের বাড়ির ভেতরে সাদরে নিয়ে যেতে পারছি না বলে ক্ষমা করবেন।’
ভবেশবাবুর পেছনে এক বিদেশি মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার স্ত্রী লরা। লরা, তুমি ওকে ভেতরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করো।’
সেই বিদেশি মহিলা, অসীম স্নেহে দেশি বিজ্ঞানীকে মেয়ের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে ছোটো ছেলেকে যেভাবে ভোলাতে থাকে, সেইভাবে ভোলাতে লাগলেন।
ভবেশবাবু চিৎকার করে বললেন, ‘উড়ন্ত ঢেঁকি ছিল, এখনও আছে, এ-কথা আপনারা বিশ্বাস করেন কি না!’
দাদু বললেন, ‘না করি না, ও হল গল্পকথা। রূপক। আসলে ঢেঁকি হল রকেট।’
‘ইউ আর অল লায়ারস, ফরেন এজেন্ট।’
ভদ্রমহিলা ভবেশবাবুকে ভেতরে নিয়ে চলেছেন। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘তোমরা দেশের শত্রু।’
বড়োদাদু বললেন, ‘ভেরি স্যাড, খুবই দুঃখের।’
ভবেশবাবুর ছেলে বললেন, ‘ভেরি স্যাড।’
দাদু বললেন, ‘উড়ন্ত ঢেঁকি কিন্তু থাকতে পারে। একবার খোঁজপাত করে দেখলে হয় না?’
‘মরেছে, পাগলামি দেখছি ছোঁয়াচে! আপনারা এখুনি এঁকে নিয়ে চলে যান। তা না হলে আমার বাবার মতো অবস্থা হবে! ইতিমধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকার ঢেঁকি কিনে ফেলেছেন। এই বাগানবাড়ি বেচে সারা পৃথিবীর ঢেঁকি কিনতে চান!’
দাদু বললেন, ‘পৃথিবীর সমস্ত আবিষ্কারকই প্রথম দিকে পাগল বলে পরিগণিত হতেন। হঠাৎ একটা কিছু হয়ে গেলে, তোমরাই তখন এঁকে মাথায় তুলে নাচবে। পরশপাথর কি সত্যিই ছিল না? পক্ষীরাজ কি নিছক কল্পনা? নাগপাশ কি গাঁজাখুরি? পুষ্পক রথ কি গল্পকথা?’
অবনীদা ফিশফিশ করে বললেন, ‘যা:, হয়ে গেল! আর একটা উইকেট পড়ে গেল!’
আমি বললুম, ‘পরশপাথর কিন্তু সত্যিই আছে।’
অবনীদা বললেন, ‘যা:, আরও একটা উইকেট পড়ে গেল!’
মেজোদাদু বললেন, ‘আমার কেমন মনে হয় কামধেনু এখনও হয়তো আছে। কল্পতরুও থাকতে পারে।’
অবনীদা বললেন, ‘যা:, হোল ফ্যামিলি আউট!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন