গোরুর রেজাল্ট

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়োমামা প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে নীচে থেকে ওপরে উঠে এলেন। এমন চেহারা এর আগে আর কখনো দেখিনি। কপালের ডান পাশটা ফুলে ট্যাঁপা লাল। দু-হাতের কনুইয়ের কাছ পর্যন্ত কুঁচোকুঁচো খড় বড়ো বড়ো লোমের সঙ্গে আটকে আছে। চোখ দু-টো লাল টকটকে। গাঢ় নীল রঙের সিল্কের লুঙ্গি একটু উঁচু করে পরা। পায়ে কালো ওয়াটার-প্রুফ জুতো।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে বড়োমামা দোতলার ঢাকা বারান্দায় উঠে এলেন। ঝলমলে রোদ জাফরির নকশা পেতে রেখেছে ঝকঝকে লাল মেঝের ওপর। দূর কোণে মেজোমামা বসে বসে ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করেছিলেন। আমি তাঁর ফাইফরমাস খাটছিলুম। ‘এটা দে, ওটা দে।’

মেজোমামার কোলের ওপর ক্যামেরা। হাতে হলদে রঙের ফ্ল্যানেলের টুকরো। চোখ আর ক্যামেরার দিকে নেই, বড়োমামার দিকে। মেজোমামা হঠাৎ বললেন, ‘স্টপ। ঠিক ওই জায়গাতেই এক সেকেণ্ড। আমি চট করে তোমার একটা স্ন্যাপ নিয়ে নি। তোমাকে ঠিক দিশি কাউবয়ের মতো দেখাচ্ছে। বেড়ে দেখতে হয়েছ তো! কী করে হল?’

বড়োমামা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘শাট আপ। শা-আট আ-আপ!’

মেজোমামা ফিস ফিস করে আমাকে বললেন, ‘সাবজেক্টটা ভালো ছিল তবে একটু খেপে আছে।’

বড়োমামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে ডাকলেন, ‘কাম হিয়ার। কুইক।’

‘শুনে আসি মেজোমামা।’

‘হ্যাঁ শুনে আয়। কেসটা কী আমাকে জানিয়ে যাবি।’

‘আচ্ছা।’

ঘরে ঢুকতেই বড়োমামা বললেন, ‘কী হবে?’

‘কীসের কী হবে?’

‘জুতো পরে ঢুকে পড়েছি যে!’

‘ও কিছু হবে না।’

‘এটা যে রাস্তার জুতো। কুসী দেখলে খ্যাঁক খ্যাঁক করবে।’

‘মাসিমা তো এখন ধারে-কাছে নেই।’

‘মেজেতে যে দাগ পড়ে গেল!’

‘আমি পা দিয়ে পালিশ করে দিচ্ছি।’

‘আমি যে দাঁড়িয়ে পড়েছি!’

‘চলতে চান তো চলে-ফিরে বেড়ান না। অসুবিধে কীসের!’

‘যেদিকে যাব সেই দিকেই তো দাগ পড়ে যাবে!’

‘জুতো খুলে ফেলুন।’

‘ইয়েস, দ্যাটস রাইট।’

বড়োমামা জুতো খোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বারকতক নেচে নিলেন। লাল চকচকে মেঝেতে নাচে জুতোর নকশা তৈরি হল।

‘দেখলি, দেখলি! সাধে কুসী আমার ওপর রেগে যায়! রেগে যাবার অনেক কারণ আছে! পৃথিবীতে কোনো কিছুই কী সহজ নয় রে!’

‘জুতোটা না-খুলে অমন করে নাচছেন কেন?’

বড়োমামা রেগে উঠলেন, ‘আমি কী ইচ্ছে করে নাচছি। আমাকে নাচাচ্ছে যে! রবারের জুতো পরে একবার দেখ না। পরা সহজ, তারপর পা থেকে আর খুলতে চায় না। কৃতদাসের জাত। পায়ে ধরে বসে থাকতে চায়।’

‘এখন তা হলে কী হবে! সারাদিন এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?’

‘আমি বরং দাগে দাগ মিলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। তুই ওই মারকিউরোক্রোমের শিশি আর খানিকটা তুলো নিয়ে আয়। ও, না।’

‘কী হল আবার?’

‘বাইরে তো উনি ক্যামেরা তাক করে বসে আছেন। এখুনি ফট করে একটা ছবি তুলে এত বড়ো করে বাঁধিয়ে রাখবেন।’

‘তাহলে আপনি ওই চেয়ারটায় বসুন, আমি পা থেকে জুতো দু-পাটি খুলে দি।’

‘না, দেখে ফেলবে।’

‘দেখলে কী হয়েছে? আর কেই বা দেখবে?’

‘জুতোটা না-খুলে অমন করে নাচছেন কেন ?’

‘ও বাবা, দেখলে কী হয়েছে! হোল বাড়িতে হই-চই পড়ে যাবে। নবাব সিরাজ-উদদৌলা ভাগনেকে দিয়ে জুতো খোলাচ্ছে! মনে নেই সেদিনের কথা। তোকে বলেছিলুম পিঠে একটু তেল ঘষে দিবি, সেই নিয়ে কত রকমের কথা!’

‘তাহলে আমি চেয়ারটাকে টেনে আনি, আপনি বসে বসে খুলে ফেলুন।’

‘অগত্যা তাই করতে হবে। আমার আবার জুতোয় হাত দিতে কীরকম গা ঘিন ঘিন করে। পায়ের জিনিস পায়ে পায়েই খোলা উচিত। আমারই সাবধান হওয়া উচিত ছিল, এটা হল সন্ধ্যের জুতো, সকালের নয়।’

‘সে আবার কী, জুতোর আবার সকাল-সন্ধ্যে আছে নাকি?’

‘জুতোর নেই। শরীরের আছে। সারারাত ঘুমের পর সকালের শরীর হল ফুলো ফুলো, তাজা! মুখ ফুলো, চোখ ফুলো, হাত ফুলো পা ফুলো। শরীর যত সন্ধ্যের দিকে এগোচ্ছে তত শুকোচ্ছে, চুপসে যাচ্ছে। এসব হল অ্যানাটমি ফিজিয়োলজির ব্যাপার। ডাক্তার হলে বুঝতে পারতিস।’

বড়োমামা ডাক্তার। চেয়ারটাকে প্রথমে দু-হাতে তুলে আনার চেষ্টা করলুম। বেজায় ভারী। এখন টেনে আনার চেষ্টা করলুম। ঘষটাতে ঘষটাতে আসছি তেলা মেঝের ওপর দিয়ে। চেয়ার ঠেলতে বেশ মজা লাগে। ইচ্ছে করেই বেশ একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আনছি। সোজা রাস্তায় আনছি না। পথ ফুরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি!

‘এ কী, এ কী, অ্যাঁ ঘরের এ কী অবস্থা, তুই সারা ঘরে চেয়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন! বসার জায়গা পাচ্ছিস না! ও মাগো, মেঝেটার কী অবস্থা!

দরজার সামনে মাসিমা। আমি যেখানে যেভাবে ছিলুম সেইভাবে, বড়োমামাও সেই একইভাবে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে।

বড়োমামা চোখ দুটো কেবল বুজিয়ে ফেলেছেন। এটা বড়োমামার নিজস্ব টেকনিক। ভয় পেলেই চোখ বুজিয়ে ফেলা।

সেই চোখ বোজানো অবস্থাতেই বড়োমামা বললেন, ‘কুসী, আমি আহত।’

‘তোমাকে কিছু বললেই তো তুমি আহত!’

‘আমি সেভাবে আহত নই, এই দেখো আমার কপাল।’

বড়োমামা মাসিমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কপালটা এর মধ্যে আরও ফুলেছে। থেঁতো হয়ে গেছে।

‘তোমার কপালে এই সবই লেখা আছে আমরা জানতুম!’

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।’ মাসিমার পাশে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে ক্যামেরা।

মেজোমামাকে দেখেই বড়োমামা লাফিয়ে উঠলেন, ‘ও, নো নো—নো ফটোগ্রাফ।’

‘ছোট্ট করে একটা। ফ্যামিলি অ্যালবামে মানাবে ভালো।’

মাসিমা মেজোমামাকে থামিয়ে দিলেন, ‘রাখো তো তোমার ক্যামেরা। আগে ছবি তোলা শেখো। ঠ্যার ঠ্যার করে হাত কাঁপে, ফোকাস করতে পারো না! কেবল পয়সা নষ্ট।’

‘হাত কাঁপে! আমার হাত কাঁপে?’

‘হ্যাঁ, কাঁপে। ছবি না-তুলে তোমার কম্পাউণ্ডার হওয়া উচিত ছিল। জল দিয়ে পেনিসিলিন গোলাবার জন্য কসরত করার দরকার হত না, তোমার কাঁপা হাতে শিশিটা ধরিয়ে দিলেই আপনি গুলে যেত!’

মেজোমামা একটু মুষড়ে গেলেও হেরে যেতে প্রস্তুত নন। আমার মামারা সহজে হারতে চান না। মেজোমামা বললেন, ‘আমি যখন রেগে যাই তখনই আমার হাত কাঁপে, তা না-হলে আমার হাত ল্যাম্পপোস্টের মতোই স্টেডি।’

‘তোমার সবসময়েই হাত কাঁপে, তা হলে বুঝতে হবে সবসময়েই রেগে আছ। কথা বাড়িয়ো না, যা করছিলে তাই করগে যাও।’

মাসিমাকে সুবিধে করতে না-পেরে মেজোমামা বড়োমামার ওপর সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলেন।

‘আহা, তোমার কপালটা বেশ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে বড়দা। কীসে ঠুকলে অমন করে!’

বড়োমামা যেন হালে পানি পেলেন। মাসিমা যেভাবে তাকিয়ে আছেন, একমাত্র কপালের জোরেই বড়োমামা বাঁচতে পারেন।

‘ঠোকা? ঠোকাঠুকির মধ্যে আমি নেই। ওই লক্ষ্মীছাড়া! যার নাম রাখা হয়েছিল লক্ষ্মী, সেই লক্ষ্মী পেছনের পায়ে ঝেড়েছে এক লাথি।’

আমি চেয়ারটা যেখানে ছিল সেইখানেই চতুষ্পদ করে রেখে, ওষুধ আর তুলো নিয়ে মাসিমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকেও তো একটা বাঁচার রাস্তা বের করতে হবে। সারা মেঝেতে চেয়ার টানার লম্বা লম্বা দাগ।

‘এই নিন মাসিমা, ওষুধ।’

মাসিমা ওষুধ আর তুলোটা হাতে নিয়ে বড়োমামাকে ধমকের সুরে বললেন, ‘তুমি সাতসকালে গোরুর কাছে কী করতে গিয়েছিলে? তোমার অন্য কোনো কাজ ছিল না!’

মেজোমামা বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই তো, তোমার অন্য কোনো কাজ ছিল না! তুমি কি পশু চিকিৎসক? তুমি তো মনুষ্য চিকিৎসক!’

বড়োমামা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নাও, কথা শোন দু-জনের। যা হয় একটা কিছু বলে দিলেই হল! তোরা জানিস না।

‘কী জানতে হবে?’ মাসিমা তুলোয় লাল ওষুধ লাগালেন।

‘তোরা জানিস না, আমার সবক-টা কাজের লোক পালিয়ে গেছে। মালিগণে। কুকুরগুলোকে যে দেখত সেই বিশে ব্যাটা হাওয়া। গোরুটাকে যে দেখত সেই রামখেলোয়ান সরে পড়েছে। দেন হু উইল বেল দ্যা ক্যাট? তোমরাই বলো?’

‘ইংরেজিটা ঠিক হল না বড়দা।’ অধ্যাপক মেজোমামা আবার বানান ভুল, ভাষার ব্যবহারের ভুল একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।

‘তোমার অবশ্য দোষ নেই। তুমি তো লিটারেচারের লোক নও। সারাজীবন প্রেসক্রিপসানই লিখে গেলে, টিডি, বিডি। তোমার বলা উচিত ছিল....।’

মাসিমা কটমট করে মেজোমামার দিকে তাকাতেই মেজোমামা আমতা আমতা করে চুপ হয়ে গেলেন, যেন গান শেষ হল, ‘না, মানে ভুল, মানে বেল মানে, ক্যাট দি বেল মানে, না না বেল দি ক্যাট মানে,...’

মাসিমা আবার তাকাতেই মেজোমামার রেকর্ড একেবারেই থেমে গেল।

‘দেখি কপালটা নীচু করো। ওঃ লম্বা বটে! তালগাছ।’

বড়োমামা অভ্যর্থনা সভার সভাপতির মতো কপালে যেন তিলক নিচ্ছেন।

মাসিমা একহাতে বড়োমামার মাথার পেছন দিকটা ধরে সামনে ঝুঁকিয়ে আর এক হাতে অ্যান্টিসেপটিকে ভেজানো তুলো থ্যাঁতলানো কপালে চেপে ধরেছেন। বড়োমামার যেন চুল কাটা হচ্ছে সেলুনে। তুলোটা কপালে চেপে ধরতেই বড়োমামা বিশাল একটা চিৎকার ছাড়লেন। মানুষ উঁচু ছাদ থেকে পড়ে যাবার সময়েই অমন চিৎকার করে। চিৎকার শুনেই কোথা থেকে ছুটে এল বড়োমামার কুকুরদের অন্যতম, সবচেয়ে দুর্দান্ত স্প্যানিয়েল, ‘ঝড়ু’। সব ক-টা কুকুরের বাংলা নাম। ঝড়ু, সুকু, ডাকু।

ঝড়ু বড়োমামাকে বাঁচাতে এসেছে। সামনের থাবার ওপর মুখ নামিয়ে, ঝিঁকি মেরে মেরে, বার কতক ঘেউ ঘেউ করে খুব খানিকটা বকাঝকা করল। যখন দেখল মাসিমা তবু তার প্রভুকে ছাড়ছে না, তখন শাড়ির আঁচল ধরে হিড়হিড় করে টানতে শুরু করল। ফাইন লাগছিল ব্যাপারটা। ঝড়ুর মুখটা ভারি সুন্দর। সেই মুখে আঁচলের আধখানা, পেছনের দু-পায়ে ভর রেখে, মুখটা সামান্য ওপরে তুলে, টান টান, টানাটানি, টাগ অফ ওয়ার।

বড়োমামার কপাল ততক্ষণে মেরামত হয়ে গেছে। মাসিমার দু-হাত এখন মুক্ত। দু-হাতে আঁচল ধরে টানছেন। নতুন শাড়ি। সহজে ছিঁড়ছে না, কুকুরেও ছাড়ছে না। মেজোমামা তারিফ করে বললেন,

‘ডগ ইজ এ ফেথফুল অ্যানিম্যাল। প্রভুভক্ত জীব।’

‘প্রভুভক্তি আমি ঘুচিয়ে দিচ্ছি। এই, লাঠিটা নিয়ে আয় তো।’

লাঠির নাম শুনে ঝড়ু একটু থমকে দাঁড়াল, তারপর চোখ দুটো আধবোজা করে যেমন টানছিল তেমনি টানতে লাগল, ঝটকা মারতে লাগল, খোঁটায় বাঁধা প্রাণীর মতো অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল। বড়োমামা একটু সামলেছেন। মুখ দেখে মনে হল ঝড়ুর বীরত্ব ও প্রভুভক্তিতে বেশ গর্বিত তবে লাঠি থেকে বাঁচাতে হবে। ভক্তেরই তো ভগবান! বড়োমামা শাসনের সুরে বললেন, ‘ঝড়ু, ঝড়ু, ছেড়ে দাও, নো অসভ্যতা।’

উত্তরে ঝড়ু আরও মরিয়া হয়ে মাসিমার আঁচলে হ্যাঁচকা টান মারতে লাগল। মেজোমামা বললেন, ‘ঝাড়ু ছাড়া ঝড়ুর কিছু করতে পারবে না। কুকুরের সঙ্গে কুকুরের ল্যাঙ্গোয়েজেই কথা বলতে হবে।’ বড়োমামা কুকুরের পক্ষেই গেলেন, ‘আসলে কী হয়েছে জানিস, কুকুরের তো বাঁকা বাঁকা দাঁত, কুসীর শাড়িটা তাঁতের জ্যালজেলে, দাঁতে আটকে গেছে। ও টানছে না, ও দাঁত থেকে খুলে ফেলার জন্যে ছটফট করছে। দেখি, কাঁচিটা দেখি, এ কেসটা হল সার্জারির কেস।’

মাসিমা বললেন, ‘শাড়িটার দাম জানো? সেভেনটি-সিকস। সার্জারি নয় লাথি।’

মাসিমা সত্যি সত্যি একটা লাথি চালালেন। ঝড়ুর গায়ে লাগল না, কিন্তু ভয়ে ছেড়ে দিল। শাড়ির আঁচলটা ফুটো ফুটো, চিবানো চিবানো। মাসিমার চোখে জল এসে গেছে।

‘আজই নতুন শাড়িটা সবে ভেঙে পরলুম, হতচ্ছাড়া, জানোয়ার কুকুর। শাড়িটার কী সুন্দর রং ছিল!’ মাসিমার কাঁদ কাঁদ গলা শুনে মেজোমামা বললেন:

‘ছিল বলছিস কেন, এখনও তো সুন্দর রঙই রয়েছে! জলে পড়লে রং ওঠে, কুকুর ধরলে রং উঠবে কেন?’

বড়োমামা বললেন, ‘বারো হাত শাড়ির হাতখানেক কেটে ফেলে দিলেও এগারো হাত থাকে। যেকোনো মহিলার পক্ষে এগারো হাত যথেষ্ট। কী বলো?’

মেজোমামা বললেন, ‘ইয়েস ইয়েস। ইলেভেন ইয়ার্ডস’—

‘তোমার ইংরেজিটা শুদ্ধ কর, ইয়ার্ড মানে গজ, হাত নয়।’ বড়োমামা হঠাৎ সুযোগ পেয়ে গেছেন।

নীচে ‘হাম্বা’ করে একটা শব্দ শোনা গেল, ‘গোরু খুলে গেছে, ওমা গোরু খুলে গেছে, গোরু যা: যা:, হায় গো, ডাঁটার ঝাড়টা নিয়ে পালাল গো!’

‘কী হল মানুর মা!’ মাসিমা শাড়ির শোক ভুলে সিঁড়ির দিকে দৌড়োলেন।

মেজোমামা বললেন, ‘দাদা, তোমার ভিটামিন বি কমপ্লেক্স গবায় নমঃ হয়ে গেল। আসল কাটোয়ার ডেঙ্গো ছিল।’

বড়োমামা বললেন, ‘নো ক্ষমা, আর ক্ষমা করা চলে না, সেই লাইনটা, অন্যায় যে করে অন্যায় সে সহে—’

আমরা সদরে নীচের উঠোনে নেমে এলাম। মাসিমার পেছনে ঝুলছে কুকুরের চিবোন আঁচল। পেছনে আমি। আমার পেছনে বড়োমামা। বড়োমামার পেছনে মেজোমামা।

লক্ষ্মীছাড়া লক্ষ্মী উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চোখ বুজিয়ে ডেঙ্গোর ঝাড় চিবোচ্ছে। এত চিৎকার, চেঁচামেচি, কোনোদিকে কোনো দৃকপাত নেই। নিজের কাজ করে যাচ্ছে আপন মনে। ডাঁটাঝাড়ের আধখানা চলে গেছে গলায়, বাকি অংশটা ইঞ্চি ইঞ্চি করে ঢুকছে। মাসিমা সেই বাড়তি অংশটা ধরে টানাটানি শুরু করলেন। যতটুকু পারা যায় উদ্ধারের চেষ্টা।

মেজোমামা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ছেড়ে দে কুসী। পারবি না। বোভাইন-টিথের স্ট্রাকচার জানা থাকলে তুই আর চেষ্টা করতিস না। গোরুর ওপর আর নীচের পাটিতে ক-টা দাঁত, কীভাবে সাজানো থাকে জানিস?’

মাসিমা বললেন, ‘তোমরা জানো, আমার জেনে দরকার নেই।’ মাসিমা পাতা ধরে টানতে লাগলেন। লক্ষ্মী চিবিয়েই চলেছে। এক ঝটকায় মাসিমাকে ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে টলমল করে দিয়ে লক্ষ্মী পেছন ফিরে দাঁড়াল। ন্যাজটা মাঝে মাঝে দুলছে। বিরক্তি ভালো লাগছে না তার। শান্তিতে কাটোয়ার ডাঁটা চিবোতে চায়। গোরুটাকে দেখতে ছবির গোরুর মতো। সাদা ধবধবে গায়ের রং। ন্যাজের দিকটা চামরের মতো। ডগাটা কালো। শিং দুটো তেলা। চোখ দুটো বড়ো বড়ো, ভাসা ভাসা।

‘বড়োমামা, আপনার গোরুটাকে ভারি সুন্দর দেখতে।’

‘অতিঅসভ্য গোরু। একগুঁয়ে অবুঝ। গোরুর সম্পর্কে আমার ধারণা পালটে দিয়েছে। মানুষের চেয়েও অসভ্য!’ মাসিমা কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। সামলে নিলেও ভীষণ রেগে গেছেন।

‘অনেকদিন তোমাকে বলেছি দাদা, তোমার এই গোরু কুকুর এসব হাটাও। বাড়িতে টেঁকা যায় না। এ আমাদের কম সর্বনাশ করেছে! আদরে আদরে বাঁদর তৈরি হয়েছে।’

বড়োমামা বললেন, ‘আর মায়া নয়, আজই একে বিদায় করতে হবে। মানুর মা, আজই, এখনই তুমি এটাকে নিয়ে যাও।’

‘আমি গোরু নিয়ে কী করব দাদাবাবু! আমার নিজেরই থাকার জায়গা নেই। চাল নেই, চুলো নেই।’

‘কেন, তোমার বাড়ির পাশের মাঠে বেঁধে রেখে দেবে। যখন দুধ হবে দুধ খাবে, দই খাবে, ক্ষীর খাবে, চেহারা ফিরে যাবে।’

মেজোমামা বললেন, ‘মাঝে মাঝে লাথিও খাবে। সভ্যতা এতবছর এগিয়ে গেল, গোরু কিন্তু সেই গোরুই রয়ে গেল। প্যালিয়োলিথিক গোরু, নিয়োলিথিক গোরু আর এই স্পেস-এজ গোরু, বিবর্তনের ধারাটা কত স্লো দেখেছ দাদা। আমরা কত অসম্ভবকে সম্ভব করলুম! গোরু কোনো দিন ভাবতে পেরেছিল, তার তরল দুধকে আমরা গুঁড়ো করে টিনে ভরে ফেলব?’

উঠোনে একটা বাঁধানো বসার জায়গা ছিল, বড়োমামা তার ওপর বসে পড়লেন। চুল উড়ছে। কপালের একটা পাশ গোলাপি। ফর্সা চেহারায় বেশ মানিয়েছে। মাসিমা ডাঁটা উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়ে ভীষণ যেন রেগে গেলেন। সকালে বাজার এসেছে। মানুর মা সব ধুয়ে ধুয়ে রেখেছে। আলু, পটল, কুমড়ো, কাঁচালঙ্কা, পাতিলেবু।

‘এই নে সব খা, সৃষ্টি খা, তুইই খা’। ঝুড়িসুদ্ধ সব টান মেরে মাসিমা লক্ষ্মীর মুখের সামনে ছড়িয়ে দিলেন।

লক্ষ্মী খুব চালাক গোরু, ভেবেছিলুম পটলের সঙ্গে লঙ্কা চিবিয়ে আর একটা কান্ড বাধিয়ে বসবে। লক্ষ্মী জানে কোনটার পর কী খেতে হয়। সে কুমড়োটা মুখে পুরেছে। ডেঙ্গো শাক কুমড়ো দিয়েই রাঁধে। এরপরই হয়ত আলু আর পটল খাবে, সঙ্গে একটা কাঁচালঙ্কা। পেটে গিয়ে হয়ে যাবে আলু পটলের ডালনা।

মেজোমামা বললেন, ‘শিশু আর গোরু বুদ্ধিবৃত্তিতে সমান স্তরের প্রাণী। যা পাবে তাই মুখে পুরবে। যতরকমের অপকর্ম আছে নির্বিবাদে করে যাবে। হ্যাঁ, শিশু আর গোরু এক জিনিস, সেম থিঙ্গস, চেহারা ছাড়া সব এক।’

বড়োমামা বললেন, ‘তা হলে দেখ, সেই শিশু স্নেহ পায় বলেই মানুষ হয়। গোরুর বেলায় উলটো। গোরু স্নেহ পায় না, তাই বড়ো হয়েও গোরুর গোরুমি যায় না। হ্যাঁরে বাংলাটা ঠিক হল তো?’

‘কী বললে, গোরুমি! বাঁদর-বাঁদরামি, পাগল-পাগলামি, ছাগল-ছাগলামি, গোরু থেকে বোধ হয় গবরামি হবে। সংস্কৃত গো শব্দ থেকে উৎপত্তি। গো, আর রামি।’

‘আমরা কত স্বার্থপর দেখ? গোরু মানেই আমাদের কাছে দুধ, মাখন, ছানা, দই, রসগোল্লা, গব্য ঘৃত, ফুলকো লুচি!’

হঠাৎ লক্ষ্মী একটা লাফ মারল। বালতি, ঝুড়ি সব উলটে-পালটে, সেই ছোট্ট উঠোনে টাট্টু ঘোড়ার মতো গোল হয়ে ছুটতে লাগল। মাসিমা রান্নাঘরে ঢুকে পড়লেন। মেজোমামা দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ধাপে, বড়োমামা যে বেদিটায় বসেছিলেন সেইটার ওপর উঠে দাঁড়ালেন।

দোতলার বারান্দা থেকে আমি বললুম, ‘ওর ঝাল লেগেছে বড়োমামা, কাঁচালঙ্কা খেয়েছে।’

‘একটু পরেই রতন আসবে।’

রতনের খাটাল আছে। মাসিমাই রতনের কথাটা বললেন। বড়োমামা যেন ধড়ে প্রাণ পেলেন। বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ কুসী! রতনের ওখানে থাকলে লক্ষ্মীটি মানুষ হবে, সঙ্গী পাবে। একটা প্রতিযোগিতার ভাব আসবে। আর পাঁচটা গোরুকে দুধ দিতে দেখলে নিজের দুধ দেবার ইচ্ছে হবে।’

মেজোমামা বললেন, ‘ইয়েস, কম্পিটিশন। প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকলে গোরু ভালো রেজাল্ট দেখাতে পারবে।’

লক্ষ্মী সেজেগুজে রেডি হল। নীল নাইলনের দড়ি। গোয়াল থেকে উঠোনে এসেছে, একটু পরেই সদর দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

‘বাবু আছেন, ডাক্তারবাবু?’ ওই যে রতন এসে গেছে। গায়ে হলদেটে ফতুয়া। নীচের দিকে দুটো পকেট, নানা রকম জিনিসে ফুলে আছে। লুঙ্গিটা একটু উঁচু করে পরা। কালো তেল চুকচুকে রং, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল।

‘এসো রতন এসো।’ ধরাধরা গলায় রতনকে ডাকলেন।

‘বা: লক্ষ্মী তো লক্ষ্মীই, বেশ চেহারাটি! গোরু হলে এই রকম গোরু হওয়াই উচিত।’

‘একটা রিকোয়েস্ট রতন, তুমি নজর দিয়ো না।’

‘হাসালেন ডাক্তারবাবু, ও তো এখন থেকে আমার নজরেই থাকবে। আমি চেহারা-ফেয়ারা বুঝি না, আমি বুঝি দুদ। দুদ দিলে খাতির, না-দিলে জুতো।’

‘জুতো মানে, গোরুকে জুতো পেটা?’

‘না, না, হিন্দুর ছেলে গোরুকে জুতো মারতে পারি? মহাপাপ! গোরু মেরে জুতো তৈরি হবে।’—

বড়োমামা চমকে উঠে লক্ষ্মীর পিঠে আঙুল ঠেকালেন। তার গা-টা কেঁপে উঠল থির থির করে। ন্যাজটা দুলে উঠল চামরের মতো।

‘অবাক হবার কী আছে এতে!’ রতন বলল, ‘এত জুতো তাহলে আসবে কোথা থেকে? লাখ লাখ জোড়া পা, লাখ লাখ জোড়া জুতো। বুঝলেন ডাক্তারবাবু, গোরু বড়ো উপকারী জন্তু!’ রতন লক্ষ্মীর পিঠে হাত রেখে বললে, ‘এই দেখুন চামড়া, কমসে কম এক-শো জোড়া জুতো হবে। এই শিং আর পায়ের খুর থেকে কেজি খানেক শিরীষ তৈরি হবে। তারপর হাড়। হাড় থেকে তৈরি হবে বোন মিল। গোরু কি মানুষ? মরল আর পুড়ে ছাই হল?’

বড়োমামা রতনের কথা শুনে লক্ষ্মীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে। রতন তখনও শেষ করেনি কথা।

‘ওই জন্যে আমরা করি কী, ফুকো দি।’

‘ফুকো? সে আবার কী?’

‘ডাক্তারবাবু, বিজ্ঞানের কম উন্নতি হয়েছে? ফুকো হল ইঞ্জেকশান।’

‘ও ইঞ্জেকশান।’ বড়োমামা খুশি হলেন, ‘ভালো ভালো, গোরুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখলে দেশের স্বাস্থ্য ভালো হবে।’

‘সে ইঞ্জেকশন নয়, দুধ বাড়াবার ইঞ্জেকশন। যে গোরু আড়াই দেয় সে দেবে পাঁচ, যে পাঁচ দেয় সে দেবে দশ। ডবল ডবল দুধ, ডবল ডবল রোজগার, হ্যা হ্যা।’

‘ম্যাজিক নাকি? সে তো জল মেশালেই দুধ বাড়ে!’

‘তা বাড়ে, তবে দুধ বাড়লে জল বাড়ে, সব মিলিয়ে আরও বাড়ে। ফুকো দিলে গোরুর রক্তটাই দুধ হয়ে বেরিয়ে আসে। হিসেব করুন না, একটা গোরু দশ বছর বেঁচে আড়াই সের দুধ দেওয়া লাভের, না পাঁচ বছর বেঁচে পাঁচসের দেওয়া লাভের? নিজে তো খাইয়ে দেখেছেন, গোরুর খোরাক তো জানেন? যত তাড়াতাড়ি পারো সব দুধ শুষে নিয়ে, জ্যান্ত কঙ্কালটাকে কষাইখানায় পাঠিয়ে দাও। হ্যা হ্যা। চল লক্ষ্মী চল।’

‘বেরোও! গেট আউট’, বড়োমামা পা থেকে জুতো খুলে হাতে নিয়েছেন। চোখদুটো জবাফুলের মতো লাল। ‘চামার, তুমি গোরুরও অধম। নিকালো, আভি নিকালো।’

বড়োমামা ঠকঠক করে কাঁপছেন। মাসিমা দৌড়ে এসে বড়োমামাকে ধরেছেন। রতন বলছে, ‘কী হল, হঠাৎ! বেলাড পেসার মনে হচ্ছে!’ মেজোমামা ইশারা করে রতনকে চলে যেতে বলেছেন। লক্ষ্মী গোরু হলেও তার বোধশক্তি আছে। লম্বা জিভ দিয়ে বড়োমামার পিঠ চেটে দিচ্ছে। তবে ওই, সামান্য একটু ভুল করে ফেলল। বড়োমামার পৈতেটা তার মুখে। সে আর কী হবে! মানুষের কাজেও তো অনেক ভুল থাকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%