সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
হেডমাস্টারমশাই আজকে তিনটের সময় স্কুলের নিউ হলে একটা মিটিং ডেকেছেন। আমাদের ক্লাস টেনের দশজন ছেলে সেই মিটিং-এ হাজির থাকবে। তাদের মধ্যে আমার নামও আছে। সকাল থেকে নিজেকে খুব ইম্পর্ট্যান্ট লাগছে। কথায় কথায় হ্যা-হ্যা করে হাসতে ইচ্ছে করছে না। বাবার দাড়ি কামাবার সেটটা দেখে ইচ্ছে করছে আমিও দাড়ি কামাই। দাড়িই নেই তো দাড়ি কামাব। আফটার শেভ লোশনের খানিকটা হাতে ঢেলে মুখে মাখলুম। আমার বোন রুমা দেখতে পেয়ে বলল, ‘ওইসব মাখছিস তো, দেখবি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি বেরিয়ে যাবে। তখন বুঝবি ঠেলা। বড়ো হওয়ার জন্যে যেন আর তর সইছে না।’
কী বোকার মতো কথা বলে! মিনিটে-মিনিটে সবাই বড়ো হচ্ছি আমরা অটোমেটিক্যালি। লোশন মাখি আর না-মাখি, দাড়ি আমার বেরোবেই। গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। গলার স্বরটা কেমন যেন একটু মোটা মোটা হয়েছে। চিৎকার করে যখন মা বলে ডাকি, আমার জামা কোথায়, তখন চমকে উঠি, এ কী রে ভাই! বাবার গলা না কী!—‘হ্যাঁগো, আমার ব্যাগটা কোথায় রাখলে!’
মা হওয়ার কী মজা। সকলের সব দায়িত্ব মায়ের। দাদু চিলেকোঠা থেকে হাঁক মারছেন, ‘বউমা, আমার চশমাটা কোথায় ফেলে দিলে! তোমার গোছানোর ঠেলায় আমি পাগল হয়ে যাব।’ মুদিখানার জিনিস এসেছে, চেল্লাচ্ছে, ‘ফর্দ মিলিয়ে জিনিস বুঝে নিন।’ জমাদার চিৎকার করছে, ‘মা, পয়সা দাও।’ বোন বায়না ধরেছে, ‘মা, আমি আজ শাড়ি পরব।’ এতসব ঝপ্পরঝাঁইয়ের মধ্যেও মায়ের মুখে সবসময় হাসি। মাকে আমার যে কী ভালো লাগে! পৃথিবীতে এমন মা আর হবে না।
বাবা! থ্যাঙ্ক ইউ। এমন একজন মা উপহার দিয়েছ বলে তোমাকে থাউজেণ্ড থ্যাঙ্কস।
কখন মা পেছন এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করিনি। কথা শুনে চমকে উঠেছি, ‘কী ব্যাপার! আজ এত সাজের ঘটা! স্কুলে যাচ্ছিস, না বিয়ে করতে যাচ্ছিস?’
মায়ের যেমন কথা! বিয়ে বললে কেমন যেন লজ্জা-লজ্জা করে। আমি যখন বহুত বড়ো হয়ে যাব, তখনও আমি বিয়ে করব না। আমি তো ইঞ্জিনিয়ার হব। ব্রিজ বানাবার ইঞ্জিনিয়ার। বাইরে, দূর দূর দেশে চাকরি করব। সেখানে আমার মাকে নিয়ে যাব। বিরাট কোয়ার্টার। চারপাশে বাগান। ফুলে ফুলে ভরা। ওই তো একটু দূরেই আকাশের গায়ে নীল পাহাড়। সেখানে আবার একটা ঝরনা আছে। আমার একটা গাড়ি থাকবে। বিকেলে মাকে নিয়ে বেড়াতে যাব। মাকে সুখে রাখতে হবে, ভীষণ সুখে, তা না—হলে আমি ছেলেই নই।
‘জানো মা, আজ আমাদের মিটিং আছে। হেডমাস্টারমশাই আমাদের পনেরোজনকে স্পেশ্যাল মিটিং-এ ডেকেছেন। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। খুব সম্মানীয় লাগছে।’
রুমা একটু ব্যঙ্গ করে বলল, ‘গাড়ি পাঠাবে তো, বিশেষ অতিথি সম্মানিত অতিথি!’
‘শোন দিদি, আজ আমাকে টন্ট করছিস তো, কর, করে যা; তবে তোকে আমি বলে রাখছি, একদিন আমাকে নিতে গাড়ি আসবে। আসবেই আসবে। যেভাবেই হোক আমি ফেমাস হব। চ্যালেঞ্জ।’
আমাকে আমার যোগের মাস্টারমশাই বলেছেন, ‘শানু, থিঙ্ক ইউ উইল বি টলার; থিঙ্ক গ্রেট, ইউ উইল বি গ্রেটার; থ্রিঙ্ক স্ট্রং, ইউ উইল বি স্ট্রংগার। এই নে পড়, পড়ে দ্যাখ স্বামীজি কী বলেছেন, ‘যদি জড়জগতে বড়ো হতে চাও, তবে বিশ্বাস করো তুমি বড়ো। আমি হয়তো একটি ক্ষুদ্র বুদবুদ, তুমি হয়তো পর্বততুল্য উচ্চ তরঙ্গ, কিন্তু জানিও আমাদের উভয়েরই পিছনে অনন্ত সমুদ্র রহিয়াছে, অনন্ত ঈশ্বর আমাদের সকল শক্তি ও বীর্যের ভান্ডারস্বরূপ, আর আমরা উভয়েই সেখান হইতে যত ইচ্ছা শক্তি সংগ্রহ করিতে পারি। অতএব নিজের ওপর বিশ্বাস করো।’ আমার এই গুরুর নাম সন্তোষ দেবদাস। কখনো পন্ডিচেরিতে, কখনো কলকাতায় থাকেন। কত যে বয়স হল, আশি, একাশি, তবু কী শক্তি কী ভয়ংকর মনের জোর! যেকোনো পালোয়ানকে একটা থাপ্পড় কষালে কাত হয়ে যাবে। আমাকে বলেছেন, ‘স্বামীজির এই কথাটার ওপর ধ্যান লাগাবি:
এই যে ক্রোশব্যাপী বৃহৎ বটবৃক্ষ, তাহা ওই সর্ষপ বীজের অষ্টমাংশের তুল্য ক্ষুদ্র বীজে ছিল—
ওই মহাশক্তিরাজি উহার ভিতরে নিহিত রহিয়াছে।’
দিদি! তোকে আমি সেই শক্তির খেলা দেখাব। আমি যখন বড়ো হব, আরও বড়ো, তখন তোর বিয়ে হয়ে যাবে। তোর শ্বশুরবাড়িতে আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে যাব। কত মিষ্টি, সিল্কের কাপড়, সোনার ঘড়ি নিয়ে যাব। ছ-ফুট লম্বা, ইয়া মাসল, আটচল্লিশ বুকের ছাতি। একমাস ভারতবর্ষে থাকি তো তিন মাস ভারতের বাইরে। আমি রকেট ইঞ্জিনিয়ার হব। হবই হব। অঙ্কটা আমার খুব ভালোই আসে। ক্যালকুলেশান করে এমন একটা রকেট ছাড়ব, এইসব গ্রহনক্ষত্র পার হয়ে আর এক বিশ্বে চলে যাবে। কী খাতির আমার! প্রোফেসর শঙ্কুর মতো।
এইসব ভাবতে ভাবতে স্কুলে। গিজগিজ করছে ছেলে। আমাদের স্কুলের ছাত্রসংখ্যা অনেক। স্কুলটার নাম আছে খুব। অনেক ভালো ভালো ছাত্র এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। নিউ হলের তিনটে দরজার একটা মাত্র খোলা। ভেতরে মাস্টারমশাই ও ছাত্ররা। আমি একটু দেরি করে ফেলেছি। ভেরি ব্যাড। এমন হওয়া উচিত নয়। বাবা বলেছেন, ‘এমনভাবে সময় রাখবে, যেন তোমাকে দেখে লোকে ঘড়ি মিলিয়ে নিতে পারে।’ কী করব, ওই বিশুটার জন্য দেরি হয়ে গেল। ‘কোথায় যাচ্ছিস শানু?’ এই উত্তরটা দিতে গিয়েই হল কাল। স্কুলে গেলেও ব্যাপারটা যে ক্লাস নয়, হেডমাস্টারমশাইয়ের স্পেশ্যাল মিটিং, সেটা না-বললে তো মিথ্যে কথা বলা হবে। সেই শুরু হল, ‘কীসের মিটিং, কেন মিটিং, সেই মিটিং-এ তুই যাচ্ছিস কেন! মিটিং-এ কী খাওয়াবে!’ বিশুটা মহাপেটুক। আধবালতি খিচুড়ি খেয়ে ফেলে। নেমন্তন্ন খেতে গেলে বড়োরা ব্যাপারস্যাপার দেখে শেষমেষ কান ধরে টেনে তুলে দেন। বাইশটা কমলাভোগ খেয়ে আবার! বাড়ি গিয়ে জোয়ানের আরক খা। খাবারটা পরের, পেটটা তো তোর নিজের! আত্মহত্যা করার ইচ্ছে!
আমাদের হেডমাস্টারমশাইয়ের চেহারাটা একটু মোটার দিকেই। থলথলে। ওই যে কলেজে পড়ার সময় ওয়াই এম সি এ-তে কুস্তি করতেন, ভেবেছিলেন জাপানে গিয়ে সামুরাই হবেন, সেই হল কাল। চৌষট্টিটা ডিমের তাগড়া ওমলেট, এক কেজি বাদাম বেটে শরবত, পাঁচ সের দুধ, এক কেজি মালাই। শেষে দরজা-জানলা কাটার অবস্থা। কাঠের খাটে শুতে ভয় পেতেন। রিইনফোর্সড কংক্রিটের খাট তৈরি করিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের পাঞ্জাবিতে তিন গজ কাপড় লাগে। ওঁর লাগত ছ-গজ। সে ভালোই, পর্বতের মতো চেহারা হওয়াটা কিছু খারাপ নয়। সমস্যা হল বাসে, ট্রামে, ট্রেনে খুব অসুবিধে। ফাঁকা মাঠে মানিয়ে যায়। বাড়িতে বড্ড বড়ো দেখায়। আরও কত যে বড়ো হতে পারতেন তিনি নিজেও জানতেন না, একটা দুর্ঘটনায় সব বরবাদ।
গল্পটা আমাদের বলেছিলেন। সাধারণ মানুষের জীবনে অমন ঘটনা ঘটলে গল্পটা বলার জন্য বেঁচে থাকতেন না। এমারেল্ড সার্কাসে গিয়েছিলেন মাস্টারমশাই। মালিক খাতির করে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন সন্ধ্যের শোতে। অত বড়ো একজন মানুষ! সব দিক থেকে বড়ো। লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো। সবেতেই ফার্স্ট। একবার তাঁকে সেকেণ্ড করেছিল। মাস্টারমশাই প্রতিবাদে অনশন শুরু করল। একদিন গেল, দু-দিন গেল। সকলের কত অনুরোধ! জীবনে একবার না-হয় সেকেণ্ড হলে বিমান! তোমার জন্য কী কেউ কোনোদিন ফার্স্ট হতে পারবে না! এ তো তোমার ভারি অন্যায় গোঁ বাবা! শেষে অনশনের তৃতীয় দিনে হেডমাস্টারমশাইয়ের হেডমাস্টারমশাই ঘোষণা করলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিমানের খাতা রিএগজামিন করা হবে। খাতার বাণ্ডিল খুলে পরীক্ষা শুরু হল। সারা স্কুলবাড়ি থমথমে। কী হয়, কী হয়! এরই মাঝে বিমান কুঁই-কুঁই করে বলল, আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য নম্বর বাড়ানো চলবে না। সবাই বললেন, ‘সে তোমাকে ভাবতে হবে না।’ যে ফার্স্ট হয়েছে তার দলবল অলরেডি স্লোগান দিতে শুরু করেছে। বেলা তিনটের সময় হেডমাস্টারমশাই স্কুলের লনে নেমে এসে বললেন, ‘দেয়ার ওয়াজ এ গ্রেট মিসটেক। অঙ্কের খাতায় একটা নম্বর যোগ করতে ভুল হয়ে গিয়েছিল। ওভারসাইট। বিমানের দশটা নম্বর বেড়ে গেল। ফলে বিমান শুধু ফার্স্ট হল না, রেকর্ড মার্কস পেয়ে ফার্স্ট। আমি রামাধরকে কমলালেবুর রস করে আনতে বলেছি। হলধর মালা আনতে চলে গেছে। বিমান আমাদের গর্ব, আমাদের গৌরব, আমাদের সৌরভ।’
হঠাৎ স্কুলপ্রাঙ্গণে হইহই করে ঢুকে পড়ল বিশাল এক কীর্তনের দল। খোল, করতাল, উদ্দাম নৃত্য। হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ। বিমানস্যারের হেডমাস্টারমশাই অবাক, এ কী কান্ড! চিৎকার করে বললেন, ‘আপনারা ভুল করছেন, এটা শ্মশান নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খঞ্জনি বাজাতে-বাজাতে দল থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলেন বিমানস্যারের বাবা। তিনি বৈষ্ণব, বিনয়ে সামনে মাথা ঝুলিয়ে, জোড়হাতে বললেন, ‘পুত্রের সাফল্যে প্রভুর নামগানই বিধেয়।’
এইসব গল্প স্কুলে মাস্টারমশাইদের মুখে মুখে ফেরে। সবসময়েই কিছু বাড়ে, কিছু কমে। এখন বাঘের কথায় ফেরা যাক। এমারেল্ড সার্কাস। স্যারকে খাতির করে সামনের ভি আই পি আসনে বসিয়েছেন মালিক। ট্রাপিজের খেলা, এক চাকা সাইকেলের খেলা হয়ে গেছে। এইবার বাঘ বেরিয়েছে। রিংমাস্টার টাঁই-টাঁই করে ইলেকট্রিক চাবুক মেঝেতে হাঁকড়াচ্ছেন। সামনে সাত-সাতট কেঁদো বাঘ, কেউ টুলে, কেউ চেয়ারে, কেউ বেঞ্চে। চাবুকের শব্দে বিশ্রী দাঁত বের করে গরর-গরর শব্দ করছে। তাঁবুর সমস্ত দর্শক ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। সাতটা বাঘ, একটা লোক বাঘেরা ইচ্ছে করলে নিমেষে কিমা করে দেবে। চাপা সুরে বিলিতি বাজনা বাজছে, ট্রাক টাক, ট্রারা ট্রারা। দুটো ক্লাউন সমানে রঙ্গরসিকতা করছে। খেলা বহুত জমেছে।
এমন সময় ঠিক মাঝখানের একটা বাঘ তুড়ুক করে বেঞ্চ থেকে লাফ মেরে নেমে পড়ল। তারপর থুপুক-থুপুক করে স্টেজ পেরিয়ে লাফিয়ে পড়ল দর্শকদের সামনের সারিতে। এই টাইগার, বলে সামনের তিনটে সারির লোক একই সঙ্গে পালাতে গিয়ে পায়ে-পায়ে জড়িয়ে চিতপটাং। গ্যালারির সমস্ত দর্শক ততক্ষণে বাঘের বার্তা পেয়ে মারামারি, গুঁতোগুঁতি করে বেরোবার দরজার দিকে গ্যালারিফ্যালারি ভেঙে ছুটছে। বিমানস্যারই কেবল একা স্থির হয়ে সামনের আসনে বসে আছেন। সেটা কোনো সাহসের কথা নয়, ভয়ে পাথর। বাঘ সামনের দিকে খানিক পায়চারি করে বিমানস্যারের দু-হাঁটুর মাঝখানে হাঁড়োল মতো মাথা ঢুকিয়ে কুতুকুতু আদর করতে লাগল। আদরের ঠেলায় তিনি চেয়ার থেকে উলটে ঘাসের ওপর পড়ে গেলেন। বাঘটা ইচ্ছে করলেই ডিনারটা সেরে নিতে পারত। তা কিন্তু করল না। বিমানস্যারের পাশে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। বিশাল একটা হাই তুলে স্যারের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
সার্কাসের রিংমাস্টার আর অন্য কর্মচারীরা অবাক! কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কুকুরের মতো ব্যবহার করলেও আসলে তো বাঘ। বিমানস্যার এই গল্পটা ছাত্রদের প্রায় বলেন। কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যা সে বিচারের প্রয়োজন নেই। গল্পটা বলার জন্য তিনি যে বেঁচে আছেন এইটাই তো সত্যি। আমাদের মহান হেডমাস্টারমশাই। আসল বাঘ ব্যাঘ্রসম মানুষটিকে চিনতে পেরেছিল। ক্লাসে যখন হুংকার ছাড়েন, অন্য শিক্ষকমশাইরা বলেন, ‘রয়েল ওয়েস্টবেঙ্গল ইজ রোরিং।’ তারপরেই সমস্বরে সুর করে গেয়ে ওঠেন, ‘বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি।’
সেই বাঘ, সেই সন্ধ্যায় হেডমাস্টারের বৃদ্ধি থমকে দিলেও এখন যে অবস্থায় আছেন সেটাও কম কিছু নয়। জমিদার বাড়ির পিলারের মতো। ধুতি, পাঞ্জাবি পরে চেয়ারে বসে আছেন, একাই একশো। ছাত্র, শিক্ষক উভয়েরই প্রিয়। একবার হাসতে শুরু করলে সহসা থামেন না। বর্ষার আকাশে মেঘের গুরুগুরুর মতো।
শিক্ষকমশাইরা হেডমাস্টারকে মধ্যমণি করে একপাশে বসে আছেন। সামনে লম্বা টেবিল। এপাশে ছাত্রদের বসার জন্য দু-সার চেয়ার। জোড়হাতে শিক্ষকমশাইদের প্রণাম করে আমরা চেয়ারে সভ্য, সংযত হয়ে বসলুম। আমাদের স্কুলে এইসব নিয়ম খুব আছে। লাইন দিয়ে ক্লাসে ঢোকো, ছবির মতো বসে থাকো। লাইন দিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও। হইহল্লা, গুলতানি নট অ্যালাউড। বিদ্যালয়, বিদ্যার আলয়, মানুষ গড়ার মন্দির। প্রতিটি ইট পবিত্র। প্রতিটি ধূলিকণা তীর্থরেণু। আমার বিদ্যালয় বলতে বুক যেন গর্বে দশ হাত হয়। চওড়া বুকে দু-হাত রেখে হেডমাস্টারমশাই যখন এইসব কথা বলতে থাকেন, তখন তাঁর দু-চোখে জল চিকচিক করে। আমাদের স্কুল একেবারে ঝকঝকে তকতকে। হেডস্যার বারবার বলেন, ‘পন্ডিত অসভ্যের চেয়ে মূর্খ সভ্য অনেক ভালো। পড়াশোনা কিছু কম হলেও ক্ষতি কিছু নেই, এলোমেলো, বিশৃঙ্খল হলেই বিপদ।’ তিনি আমাদের কয়েকটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছেন।
সকালে সূর্যোদয়কে দেখার চেষ্টা করবে।
মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকাবে।
নতুন বন্ধু করবে; কিন্তু পুরোনোদের ভুলবে না।
গোপনীয়তা রাখতে শিখবে।
নিজের ভুল সবসময় স্বীকার করবে।
কাউকে ঠকাবে না।
শোনাবার চেয়ে শুনতে শেখো।
জিনিস চেয়ো না, চাও জ্ঞান আর সাহস।
সোজা হয়ে বসতে শেখো।
গালগল্পে সময় নষ্ট কোরো না।
নোংরা আর আবর্জনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করো।
‘আমি জানি না’, বলতে লজ্জা পেয়ো না।
‘আমি দুঃখিত’ এই কথাটি বলতে শেখো।
এরপর আর একটি কথা ইংরেজিতে শিখিয়েছেন, ভীষণ সুন্দর, Trust in God, But lock Your Car. কোথায় কোন দেশের কত বড়ো কলেজে অধ্যাপক হওয়ার কত আমন্ত্রণ এসেছে, কতবার, হেডস্যার নো করে দিয়েছেন। অসম্ভব! আমি ছোটোদের হাত ধরে বড়ো করব। কী হবে, বিলেতের কলেজে পড়িয়ে! খুব খাতির বাড়বে আমার, ডলার, পাউণ্ড, মোটরগাড়ি, ঠাণ্ডা, সুন্দর আবহাওয়া, ছবির মতো রাস্তা, পার্ক। কোনো প্রলোভনই আমাকে কাবু করতে পারবে না। আমার ময়লা টাকাই ভালো। নিজের ঘরের দেওয়ালে, কী সুন্দর লিখে রেখেছেন:
Hold your child’s hand every chance you get.
The time ill come when he or she won’t let you.
মাস্টারমশাইদের সামনের চেয়ারে বসে বেশ ভারিক্কি লাগছে। মনে হচ্ছে বেশ বড়ো হয়ে গেছি। হেডস্যার সকলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘তোমরা এসেছ, গ্রেট বয়েজ! কীভাবে শুরু করা যায় সভার কার্যক্রম!’
সহপ্রধান বললেন, ‘ছোট্ট করে একটা ভূমিকা হোক আগে। ভূমিকা ছাড়া ভালো প্রবন্ধ হয় না।’
ইংরেজির স্যার বললেন, ‘দ্যাটস ট্রু।’
হেডস্যার স্যার বললেন, ‘ভূমিকাটা কে করবে?’
‘আপনিই করবেন।’
‘আপনারা তাহলে কী করবেন?’
‘আমরা শুনব।’
নির্মলবাবু তৎপর মানুষ। তরতর করে পথ চলেন, তরতর করে কথা বলেন। তরতর করে পড়ান। তবে যা পড়ান, সে ভোলার নয়। মনে একেবারে কেটে-কেটে বসে যায়।
কোনোরকম ভণিতা না-করেই বলতে লাগলেন, ‘অশিক্ষিত, নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দিতে হবে। অ, আ, ই, ঈ প্রভৃতি ইত্যাদি।’
অঙ্কের মাস্টারমশাই বললেন, ‘বাংলার এই এক দোষ। আন-ইকনমিক ইউজ অব ওয়ার্ডস। অপ্রয়োজনে শব্দ ব্যবহার। প্রভৃতিই যদি বললেন তাহলে আবার ইত্যাদি কেন!’
নির্মলবাবু বললেন, ‘গাছে একটা পাতা থাকলেই হয়, অত পাতা কেন? কারণটা হল শোভা। ভাষা আর ভাববৃক্ষের শোভা হল কথা। অঙ্ক তো কৃপণের শাস্ত্র।’
কুমুদবাবু বললেন, ‘তাহলে বাড়ান, বাড়িয়ে যান, ইত্যাদি, বিভিন্ন, বিবিধ, সমূহ, বাড়িয়ে যান, একেবারে লেজে-গোবরে করে দিন উদার চিত্তে, বদান্য হৃদয়ে।’
নির্মলবাবু বললেন, ‘আপনাদের সব ভালো, একটাই দোষ, ছোটোখাটো ব্যাপারে নিজেদের জ্ঞান জাহির করা। আপনারা যদি এইরকম করতেই থাকেন, করতেই থাকেন এবং করতেই থাকেন তাহলে এই সভা পন্ড হয়ে যাবে। অক্ষরপরিচয় বা বর্ণপরিচয়ে আমরা এক জীবন্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। জীবন্ত বর্ণপরিচয়।’
‘অর্থাৎ যে শিখবে সে মাস্টারের হাতে মার খেয়ে মৃতপ্রায় হবে না, যেমন আগে পাঠশালায় হত।’
‘মহাশয়, ধরেছেন ঠিক। সবাই হেসে-হেসে নেচে-নেচে, কথাকলির ঢঙে শিখবে অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, আ-এ আমটি খাব পেড়ে। শিক্ষা আর সংস্কৃতিকে আমরা চটকে, যেমন আলুভাতের সঙ্গে পেঁয়াজ, যেমন চিঁড়ের সঙ্গে কলা, যেমন ছানার সঙ্গে চিনি, যেমন...’
‘উপমার আর প্রয়োজন নেই, সম্যক বোধগম্য হয়েছে।’
নির্মলবাবু হাসলেন। তৃপ্তির হাসি। কেউ কিছু বুঝলে তিনি ভীষণ আনন্দ পান। আমরা ণত্ববিধান, ষত্ববিধান শিখতে পেরেছিলাম বলে, তিনি স্কুল কম্পাউণ্ডের মেহগনি গাছের তলায় আধঘণ্টা নৃত্য করেছিলেন। ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে/তা তা থই থই তাতা থই থই তাতা থই থই।।’ বলাইবাবু দোতলার জানলা থেকে প্রশ্নটা করলেন, ‘বুড়ো বয়সে এমন বানর নাচের কারণটা কী?’
‘দুটো ন, আর তিনটে স-এর মুন্ডুপাত করেছি। পাষন্ড পাষাণ তুমি, মুক্ত বৃষ, অকাল কুষ্মান্ড। মহিষ না মেষ তুমি? মূষিক? পুরুষ? নাকি ষন্ড?’
হেডস্যার বললেন, ‘এইবার আমি এক্সপ্লেন করি; কারণ আইডিয়াটা আমার। এই যে আমার ছেলেরা, এরাই আমার জীবন্ত বর্ণপরিচয়ের বর্ণমালা।’
সঙ্গে-সঙ্গে সহপ্রধান বললেন, ‘ক্যাপিটাল লেটার, মানে ধেড়ে-ধেড়ে অক্ষর। বোল্ড টাইপ। ক্লাস টু, থ্রি-র ছেলেদের দিয়ে করালে ভালো করতে মনে হয়। হয়তো অনধিকার চর্চা হয়ে গেল, তবু বলতে বাধ্য হলুম। কারণ আমি না-বলে থাকতে পারি না। এটা আমার চরিত্রের দোষ বলতে পারেন, আবার একটা মহাগুণও বলতে পারেন। অ এগিয়ে আসছে, ঠোঁটে গোঁফের রেখা। অ, আ-র গোঁপ-দাড়ি বেরোতে পারে না, তারা সবসময় শিশু, চিরশিশু।’
‘অ, আ কোনোদিন সাবালক হবে না? প্রশ্ন করলেন অনন্তস্যার। ইতিহাস পড়ান।
‘ইতিহাস তো মহাকাল, চিরবৃদ্ধ। ইতিহাসের তো শিশু নেই। জন্মাবেই এক-শো বছর বয়েস নিয়ে।’ নির্মলবাবু বললেন, ‘ব্যাপারটা আপনাদের মাথাতেই ঢোকেনি। ভালো করে বোঝাই। ধরুন, যেই গানের সুরে বলা হল, অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, অমনি একটা ছেলে অজগর সেজে তেড়ে আসবে। যেই বলবেন, আ-এ আমটি খাব পেড়ে, অমনই একটা আমগাছ হয়ে স্টেজে এসে দাঁড়াবে।’
কুমুদবাবু বললেন, ‘ইঁদুর ছানার বেলায় কী হবে? ধরুন শানু ইঁদুর হল। ওই তো ওর সাইজ! ইঁদুরের বাবা কেন, ইঁদুরের ঠাকুর্দারও অত বড়ো সাইজ হবে না।’
ড্রয়িং-এর টিচার বিমলবাবু বললেন, ‘পারসপেকটিভটা জানা থাকলে এই প্রশ্ন হত না। মঞ্চে ইঁদুর, তার সাইজটা নেংটির মতো হলে পেছনের সারির দর্শক দেখতে পাবে কিছু! ছবি আঁকার জ্ঞান থাকলে এইসব বাজে প্রশ্ন আসত না, আমাদের সময়ও নষ্ট হত না। আমরা দূরে গেলে ছোটো দেখি, কাছে এলে বড়ো দেখি। আমরা দূরের বাড়ি ছোটো দেখি, তার মানে এই নয় যে দূরের বাড়িটা সত্যিই ছোটো। আর্টের ভাষায় একেই বলে পারসপেকটিভ।’
‘পরস্পরবিরোধী কথা বলে এই ভরদুপুরে মাথা গরম করে দেবেন না মশাই। দূরের বাড়ি, কাছের বাড়ি সবই এক সাইজ, যেমন দূরের ইঁদুর কাছের ইঁদুর দুটোরই এক সাইজ। দূর থেকে দেখব বলে, দূরের ইঁদুরটাকে পাম্প করে বড়ো করে দেব? ইজ ইট পসিবল?’
‘তাহলে দেখব কী করে? আচ্ছা মুশকিল তো!’
‘কোনো মুশকিল নেই। দূরের ইঁদুর দেখা যায় না, আমরাও দেখব না।’
‘তাহলে, ‘ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে’ হবে কী করে!’
‘তার আমি কী জানি? দ্যাটস ইয়োর প্রবলেম। ইঁদুর দেখা যাবে না বলে একটা হাতিকে ইঁদুর বলে চালাবেন। এইসব তঞ্চকতার মধ্যে আর যেই থাকুক, আমি নেই। অ, আ, ক, খ শেখাবার জন্যে এত কান্ড করার কী দরকার! মশা মারতে কামান দাগা!’
‘আপনি যদি বুঝতেই পারবেন তাহলে অঙ্কের টিচার হবেন কেন? নীরস সংখ্যা?’
ধুমধাড়াক্কা লেগে যায় আর কী! হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাতে বলতে লাগলেন, ‘ফোলডেড হ্যাণ্ড রিকোয়েস্ট ইউনাইটেড ইউ স্ট্যাণ্ড, ডিভাইডেড উই ফল। নীরস অ-আ-কে একটু সরস করতে না-পারলে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা পালাবে। সমাজে কতরকমের সর্বনেশে প্রলোভন। দিবারাত্র টিভি ভুটুর-ভুটুর, হিন্দি সিনেমা, বারোয়ারি, মেলা, আড্ডা, বাপ-মায়ের উদাসীনতা, এইসব থেকে ছেলে-মেয়েদের বের করে আনতে হবে। মাছ ধরার কায়দা, চার করো, টোপ দাও, মারো টান। দেখেননি, করপোরেশন টিকে দেওয়ার আগে তারস্বরে সিনেমার গান বাজায়। আধুনিক যুগটাই অন্যরকম মাস্টারমশাই। আমাদের কাল কী আর আছে! তবে ওই যে বলেছে, গতস্য শোচনা নাস্তি।’
ইতিহাসের স্যার অনন্তবাবুকে অনেকটা ইতিহাসের মতোই দেখতে। যেমন একটি প্রাচীন বটবৃক্ষ। সমস্ত চুল সাদা, অথচ বয়স খুব একটা বেশি নয়। পায়ে তালতলার চটি। ফাটাফাটা। মোটা ধুতি, হাফহাতা বাংলা শার্ট, যা একালে কেউ পরে না। চোখে কালো ফ্রেমের পুরু লেনসের চশমা। দেখলেই মনে হয়, চামড়া বাঁধাই একটা সচল ইতিহাসের বই। কেস্ট্রব্রিজ হিস্টি অব ইণ্ডিয়া। লাইব্রেরি-শেলফ থেকে নেমে এসে স্কুলের করিডর ধরে হাঁটছেন। ইতিহাস বেড়াতে বেরিয়েছে বর্তমানের বাজারে। সবাই বলেন, মানুষটার নলেজ বটে! লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া। স্রেফ সালটা একবার ধরিয়ে দাও, গড়গড়, গড়গড়। বাবর, আকবর, হুমায়ুন, জাহাঙ্গির যেন তাঁর চার ছেলে। ওই যে রে জাহিরুদ্দিন বাবর, মাত্র চার বছর ১৫২৬ থেকে ১৫৩০। আবার হুমায়ুন এল। ১৫৩০ থেকে ৫৬। এইবার শুরু হল আকবরের রাজত্বকাল। গ্রেট জালাল-উদ-দিন আকবর। ছেলেটা কী ভালোই না ছিল! এদিকে সময় এগোচ্ছে। যেন কালের কপোতাক্ষ ধরে নৌকা এগোচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে-ব্যবধানে যাত্রী পালটাচ্ছে। এই আকবর তো, এই জাহাঙ্গির, তো শাহজাহান, ঔরঙ্গজেব।
সেই অনন্তস্যার, চেয়ারে শরীর শিথিল করে বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আমরাও শুনতে পেলুম সেই ফোঁস। তারপর উদাস গলায় বললেন, ‘স্যার! সে আমাদের দিন গেছে। সেই সোনার শৈশব। গোল্ডেন বয়হুড ডেজ। কিস্যু ছিল না আমাদের। নো ঐশ্বর্য। কিন্তু কী আনন্দ! একালের শিশুদের এরা যুক্তি করে মেরে দিল! বুলডোজার চালিয়ে শৈশবটা থেঁতলে দিল। পরনে একটা দড়িবাঁধা ইজের। দেড় হাত লম্বা দড়ি সামনে পায়ের ফাঁকে পেণ্ডুলামের মতো দুলছে। গায়ে মোটা কাপড়ের হাফহাতা জামা। ইস্তিরির বালাই নেই। কুঁচকে-মুচকে যেন কলসি থেকে বেরিয়েছে। বুকের বোতাম একটাও নেই। খোলা হাওয়াখানা। বুকে লটকে আছে ঢোলকের মতো একটা মাদুলি। তখন সব ছেলেরই আষ্টেপৃষ্ঠে মাদুলি বাঁধা হত। কত রকমের ফাঁড়া। জলে ডোবার, আগুনে পোড়ার, নজর লাগার। আমাদের কোনো লজ্জা ছিল না। পায়ে ফকফকে জুতো। বগলে খানসাতেক ছেঁড়া-ছেঁড়া বই আর বাড়িতে হাতে সেলাইকরা খাতা। তখনকার কালে একধরনের সস্তার কাগজ তৈরি হত। লাল, বালি-বালি। ছেলে স্কুলে চলেছে। চান করেছে, চুল তখনও ভিজে। কানের পাশ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। বাড়ির পাশেই ইস্কুল, ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়।
‘আর এখন’—হেডস্যার খেই ধরলেন। ‘এখন উত্তরের ছেলে স্কুলবসে দক্ষিণে যায় পড়তে। পাড়ার স্কুলে ছাত্র নেই। মাছি তাড়াচ্ছে। লেখাপড়ার চেয়ে এখন বড়ো হয়েছে স্কুল। নামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ছেলে-মেয়েকে যেভাবেই হোক ভর্তি করতে হবে। ফর্মের জন্য সাড়ে তিন মাইল লম্বা লাইন। একই সঙ্গে তিনজনের পরীক্ষা—বাবা, মা আর যে ভর্তি হবে। উদবেগ আর দুশ্চিন্তায় বাপ-মায়ের চোখে ঘুম নেই। কী হবে। চান্স পাবে তো! না-পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আচ্ছা মশাই বলতে পারেন, স্কুল পড়বে, না ছেলে পড়বে।’
কুমুদবাবু বললেন, ‘সেই কেস তো আমার বাড়িতে চলছে। নাতনিকে ভর্তি করবে। কলকাতার কাউকে আর ধরতে বাকি নেই। শুধু লাটসাহেবই বাকি। নাতিটাকে রোজ সাতসকালে তুলে টানতে টানতে শহরের সেই আর এক প্রান্তের এক মিশনারি স্কুলে নিয়ে যায়। সকাল হলেই আমার ভয় করে। নিত্য ফাটাফাটি, লাঠালাঠি। এই হল না, ওই হল না। মিস বলেছেন, ‘আপনার ছেলে ক্লাসে কিছু করে না, মুখ গোঁজ করে বসে থাকে। ভীষণ মুডি, লিখতে দিলে পেনসিল চিবোয়।’
অনন্তবাবু বললেন, ‘লিখবে কী! আমাদের সময়ে ছিল একটা স্লেট, একটা পেনসিল। বাবা দেগে দিলেন, এ বি সি। বুলোও। একদিনেই জেড পর্যন্ত চলে গেলুম। বললেন, ‘গুড।’ মা হাতে ধরিয়ে দিলেন দুটো নারকোল নাড়ু। লাফাতে, লাফাতে মাঠে। চু, কিতকিত। আর এখন? স্পেশাল খাতা। ফুটকি, ফুটকি। কলে কাটা পেনসিল দিয়ে ফুটকি যোগ করো। বিন্দু-বিন্দু এ বি। আমাদের ছিল দু-টাকা মাইনের বাংলা স্কুল, এখন হয়েছে দু-শো টাকা মাইনের ইংরেজি স্কুল। ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে গিয়ে চড়চড়ে রোদে মাঠে বসিয়ে দিলে। কী হচ্ছে ম্যাডাম। নেচার স্টাডি। আকাশ দ্যাখো, শহরের মরামরা, বিবর্ণ গাছ দ্যাখো। চড়াই পাখি দ্যাখো। এদিকে ছেলে বি লিখতে শিখল ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে। সব অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ। নাও ঠেলা। ছেলের মাকে বলতে গেলুম, ‘ও তো সব উলটো শিখছে বউমা!’ উত্তর হল, ‘অক্ষর নিয়ে কথা, সে ডান থেকে বাঁয়ে আসুক, কী বাঁ থেকে ডানে। কিস্যু এসে যায় না।’ মনে-মনে বললুম, ‘খুব ভালো কথা, তোমার পাঁঠা তুমি বোঝো, আমার কাঁচকলা। আমরা সব ওল্ড ফুল।’ নিজের ছেলেকে বলতে গেলুম, বলল, ‘মাথা ঘামাবেন না, শান্তিতে থাকুন’।
হেডস্যার বললেন, ‘কাজের কথায় আসা যাক, অনেক বাজে কথা হয়ে গেল। আমরা একটা গ্রাম বেছেছি, নাম হল হাটখোলা।’
অনন্তবাবুর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন, ‘এত গ্রাম থাকতে হাটখোলা কেন?’
‘দুটো কারণ। প্রথম কারণ, গ্রামটা ব্যাকওয়ার্ড। দ্বিতীয় কারণ, ওখানকার স্কুলের প্রধানশিক্ষক আমার পরিচিত। ওই স্কুল কম্পাউণ্ডে আমাদের ক্যাম্প হবে।’
কুমুদবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাটা কেমন আছে! স্বামীজি তো বলেই গেছেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না। মাছ, মাংস, ডিম্বাদির ব্যবস্থা আছে কি! শুদ্ধ, বিশুদ্ধ প্রোটিন।’
আমরা জানি হেডস্যারও খেতে ভালোবাসেন। আমাদের বাড়িতে কী একটা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। তিনি আসায় আমাদের খুব আনন্দ হয়েছিল। প্রাণ খুলে খেয়েছিলেন। ফিশফ্রাই খেয়ে ফেলেছিলেন সাতটা। আটটাই খেতেন। চিংড়ির মালাইকারির জন্য একটু জায়গা রাখতে হল।
হেডস্যার খুব উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘অবশ্যই, অবশ্যই! স্বামীজি একেবারে সেন্ট-পারসেন্ট কারেক্ট! পেটে আগুন জ্বললে আর কোনো কিছু করা যায় না। মনটা পেটের দিকেই পড়ে থাকে। ওখানে অঢেল খাওয়া। সকালে আমরা শুরু করব মুড়ি আর নারকেল দিয়ে। সঙ্গে গরম-গরম আলুর চপ, বেগুনি। টাটকা, সবুজ কাঁচালঙ্কা।’
‘কাঁচালঙ্কা তো শুনেছি লাল হয় মশাই। অবশ্য ভালো করে দেখিনি কোনোদিন।’
‘আমিও দেখিনি। রংটা আনইম্পরট্যান্ট। ইম্পরট্যান্ট হল ঝাল আর গন্ধ। সঙ্গে থাকবে ছাঁচি পেঁয়াজ। আদা কুচি। চা তো থাকবেই, তবে চায়ের দিকটা একটু উইক হবেই। দুপুরে থাকবে ভাত, ডাল, তরকারি আর রকম-রকম মাছ। ওখানে তো পুকুরের অভাব নেই। জাল ফেললেই এক জাল খলরবলর মাছ। ঘরে পাতা খাঁটি দুধের দই। মিষ্টান্ন। খেয়ে উঠতে-না- উঠতেই ডাবের মিষ্টি জল। এরপর বিশ্রাম। পাঁচটার সময় চা, সঙ্গে কিছু স্ন্যাকস। রাতে গরম লুচি, ছোলার ডাল, মাছের কালিয়া। শয়নের প্রাকমুহূর্তে এক গেলাস করে খাঁটি দুধ।’
কুমুদবাবু বললেন, ‘এইরকমটা যদি ঠিক-ঠিক হয়, আমার আর কিছু বলার নেই।’
অনন্তবাবু বললেন, ‘সমাজসেবাটা তাহলে কখন হবে?’
‘ওই ওরই ফাঁকে-ফাঁকে হবে। আমাদের এইসব সোনারচাঁদ ছেলেরা আছে। হও ধর্মেতে বীর, হও কর্মেতে ধীর, হও উন্নত শির, সাথে আছে ভগবান, নাহি ভয়।’
‘কিন্তু মশাই, সমাজসেবার খরচটা আসবে কোথা থেকে! আমাদের স্কুলফাণ্ডের অবস্থা তো তেমন সুবিধের নয়!’
‘আরে মশাই, সে-কথাটা কী আমি ভাবিনি! এখন তো স্পনসরের যুগ। ক্রিকেট, স্পনসরার। টিভিতে আপনারা কী প্রায়ই দেখেন না, যেকোনো অনুষ্ঠান হতে-হতে, হেঁচকি তুলে থমকে গেল, দিস পার্ট অব দি প্রোগ্রাম ইজ স্পনসরড বাই, বেড়বেড় করে পাঁচটা কোম্পানির নাম বলে গেল। কলেজে ফেস্ট হবে, দশটা কোম্পানি তেড়ে এল। গানের স্পনসর একজন, ডিবেট আর একজন। আমাদের এই প্রোগ্রামটা স্পনসর করছে একটা আচার কোম্পানি। তারাই একটা বড়ো বাস দেবে। আমরা আমাদের এই বাহিনী নিয়ে উঠব। সঙ্গে ঝুড়ি, কোদাল। গামবুট, মশা মারা তেল। ওষুধ-বিষুধ। আমাদেরই প্রাক্তন ছাত্র, ডাক্তার অমিতাভ। আর এক প্রাক্তন ছাত্র যোগীরাজ তপন। বাসটার গায়ে লেখা থাকবে স্পনসরারের নাম। একটা মিউজিক সিস্টেম থাকবে। থেকে থেকে গান বাজবে আর ঘোষণা, আচার খাও, আচার। জ্যাম খাও, জেলি খাও, নিজে খাও, অন্যকে খাওয়াও। মিষ্টি আচার, টক ঝাল, মোরব্বা।’
‘যোগীরাজ কী করবে!’
‘যোগ শেখাবে। যোগ এখন খুব চলছে! শরীরম আদ্যম খলু ধর্মসাধনম। স্বামীজি বলেছেন, হেলদি মাইণ্ড ইন এ হেলদি বডি। শরীর তাগড়া না-হলে, এম এ, বি এ, টাকাপয়সা, গাড়ি-বাড়ি কিছুই কিছু নয়। যোগের জন্যে ভোগ, ভোগের জন্যে যোগ। একে বলে সাঁড়াশি আক্রমণ। গ্রামের মানুষকে আমরা এমনভাবে ধরব, পালাবার পথ পাবে না। আমাদের সঙ্গে একটা হারমোনিয়াম থাকবে আর আমাদের সুমন আছে। আমরা গানও শেখাব, সা রে গা মা।’
‘সারেগামাটা তো গান নয়, গলা সাধা!’
‘না-সাধলে গান হয়! আমরা সুরের ছ্যাঁকাটা দিয়ে আসব। দিনান্তে আমরা যখন ফিরে আসব, পেছনে ফেলে আসব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিতে জাগ্রত একটি গ্রাম। সা রে গা, অ আ, ই, বলো বীর, বলো উন্নত মম শির। টলটলে দিঘি, ঝকঝকে পথ, চকচকে শরীর মন। এমনই করে গ্রাম, গ্রাম থেকে জেলা, জেলা থেকে শহর, আমাদের কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়বে। এই হবে আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। একের পর এক গ্রাম, একের পর এক শহরের পতন। উড়বে আমাদের বিজয়কেতন।’
‘বেশ, তবে তাই হোক।’ একবাক্যে সবাই বললেন।
হেডস্যার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা প্রতিভা অনুসারে গ্রূপে ভাগ হয়ে যাও। একভাগ তৈরি করো অ আ নৃত্য। অ-এ অজগর আসছে তেড়ে। একটা কাগজের অজগর তৈরি করো। আ-এ আমটি খাব পেড়ে। এটা আমগাছ পিসবোর্ড কেটে, ডালে-ডালে আম তৈরি করে ফেলো। ইঁদুরছানা চাই। ঈগল পাখি চাই। উ-এর উট চাই। যারা গান জানো, তারা একটু সুর চড়াও, অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, আ-এ আমটা আমি খাব পেড়ে। এই গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশের মতো বর্ণমালার নৃত্য চলবে সারা স্টেজে।’
বিমান বলল, ‘স্যার! একটু ফাইট সিন কি থাকবে?’
‘ফাইট?’
‘মানে মারামারি স্যার।’
‘কে কার সঙ্গে মারামারি করবে?’
‘কেন স্যার, অ-কে ধরে পেটালেই আ-বলে শুয়ে পড়বে। তখনই ই তো মহিলা, পাশে এসে বসে ঈ দিয়ে ঈশ, ঈশ করবে। উ উট হয়ে ঊ-কে পিঠে চাপিয়ে ঋ-এর ঋষিমশাইকে ডাকতে ছুটবে। গিয়ে দেখবেন তিনি ৯-কার হয়ে সাধনা করছেন। এই ৯-কার হবেন যোগীরাজ তপনদা। বিপরীত সলভাসন করলেই ৯-কার। তিনি সব শুনে ও বলে উঠে দাঁড়াবেন, তারপর ঔ-এর ঔষধ নিয়ে ছুটে আসবেন। আ সুস্থ হবে, সঙ্গে-সঙ্গে এ আর ঐ শুরু করবে ব্রেক ডান্স। সব শেষে স্টেজ জুড়ে বর্ণমালার নৃত্য। হইহই ব্যাপার, সঙ্গে মুকুলের গান—লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।’
হেডস্যার অভিভূত হয়ে বললেন, ‘ছেলেটার মাথা আছে। চেয়ারে বসে বসে কেমন একটা আধুনিক নাটক লিখে ফেলল। সংঘাত-সংঘর্ষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্যাথস। একেই বলে প্রতিভা!’
অঙ্কের স্যার কুমুদবাবু বললেন, ‘প্রতিভাটা লিক করে যাচ্ছে স্যার! এবার অঙ্কে পাঁচ নম্বর গ্রেস গুঁজে পাস করাতে হয়েছে। ডিসগ্রেসফুল গ্রেস। বাজারে দেখা হল, ওর বাবা বললেন, ‘মাস্টারমশাই, ছেলেটা আমার বখে গেল, তিন খাতা কবিতা লিখেছে। এদিকে দুই আর দুয়ে চার জানে না।’
‘আরে মশাই! সবাই কী আর অ্যাকাউন্টেন্ট হয়, দু-একটা শেক্সপিয়রও হয়ে যায়। এসব ঈশ্বরের খেলা। অনন্তরূপিণী শ্যামা, অন্ত তব কেবা পায়। বলে দিলুম, এই ছেলে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। ইতিহসে ওর নাম লেখা থাকবে। বিশ্বকোষে ও অমর হয়ে থাকবে। দিস ইজ মাই ফোরকাস্ট।’
সভা শেষ। ভেবেছিলুম, ভালো-মন্দ কিছু খাওয়া জুটবে। ঘোড়ার ডিম, কিছুই জুটল না। বেশ ভারিক্কি চালে আমরা বেরিয়ে এলুম হল থেকে। হঠাৎ যেন বয়েস বেড়ে গেছে। কত বড়ো একটা দায়িত্ব ঘাড়ে! অজগর তৈরি করতে হবে। চীনে নববর্ষের দিনে যে কায়দায় ড্রাগন তৈরি করেন ওঁরা, সেই কায়দায় অজগর হবে। ভেতরে তিনটে ছেলে ঢুকবে। তারাই জিনিসটাকে চালাবে হিজিরবিজির করে। মস্ত একটা ইগল তৈরি হবে। দুটো ডানায় কায়দা করে কবজা লাগানো হবে। দড়ি ধরে টানলেই ডানা ঝটপট করবে। এইসব হাতের কাজে তারাপদর খুব প্রতিভা। যখন ট্যাংরায় ছিল, তখন এক চীনা পরিবারের সঙ্গে তার খুব আলাপ হয়েছিল। সেইখান থেকে চীনে রান্না, চীনে হাতের কাজ খুব শিখেছে। চীনে পটকা তৈরি করতে পারে। কাগজের শিকলি, লণ্ঠন। আমরা সবাই বলি, তারাপদ দ্য গ্রেট।
আমরা অবিনাশের দোকানে জিলিপি খেতে ঢুকলুম। বিখ্যাত জিলিপি। দেশ-বিদেশের মানুষ খেতে আসেন গাড়ি চেপে। অনেকদিনের দোকান। শুধু জিলিপিই তৈরি হয়। বিশাল কড়ায় রস পাক হচ্ছে। হাত ঘোরানোর কায়দায় জিলিপির বৃত্ত তৈরি হচ্ছে।
জিলিপি খেতে খেতে তারাপদ বলল, ‘অ্যায়সা অজগর বানাব লোকে ভয়ে পালাবে। আমাদের কাজ মিটে যাওয়ার পর মিউজিয়ামে রাখা হবে। ইঁদুরের পেটে স্প্রিং ভরে দেব, চিঁক চিঁক করে লাফাবে। ইগল পাখি শুধু ডানা নয়, ঠোঁটও নাড়বে। ঠকাস ঠকাস শব্দ হবে।’
মুকুল বলল, ‘আবহ সংগীত এমন করব, দর্শকের আসনে বসে লোক ধিতিং ধিতিং নাচবে। হও কর্মেতে বীর, হও ধর্মেতে ধীর, সঙ্গে ঢোল বাজবে, কাড়ানাকাড়া বাজবে। লোকের মুখে মুখে ঘুরবে হিট হিন্দির গানের মতো।’
আলোচনা করতে করতে আমরা একেবারে জিলিপির মতো হয়ে গেলুম। ঠাসা রসের বাঁধুনিতে ঘুরপাক। আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ভেবে থম মেরে বসে রইলুম। আমরা সবাই কর্মবীর হতে চলেছি। স্বামীজির কত কথা মনে আসছে। দার্জিলিঙের মেঘের মতো ভেসে ভেসে মনের ঘরে আসছে, আর সব ভাসিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। চারটে লাইন তেড়ে বেরিয়ে এল:
ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মন-প্রাণ শরীর অর্পণ করো সখে, এ সবার পায়।
বহূরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
বিমান বীরের ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে ভারত, ভুলিয়ো না—তোমার সমাজ যে বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র; ভুলিয়ো না—নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।’
আমাদের অমন করতে দেখে অবিনাশদা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘তোমাদের কী হল ভাই! আজ তোমরা এত উত্তেজিত কেন? কোনো নাটক-টাটক হবে বুঝি!’
‘না গো, আমরা কোমর বেঁধে দেশের কাজে নেমে পড়ছি।’
‘তার মানে পার্টি করছ! বোমা, পেটো, পটকা, পাইপ, রামপুরিয়া, ভোজালি, ডাণ্ডা, চেন। যাক, লেখাপড়ার বারোটা। ভালোই পথ ধরেছ। এবার আর দেখে কে? সপ্তাহে একটা করে লাশ ফেলল। কলকারখানা বন্ধ করে দেশে বেকার বাড়াও। বর্গি এল দেশে, বুলবুলিতে...।’
আজ আমাদের হাটখোলা যাত্রা। স্পনসরারের দেওয়া বাস এসে গেছে। মাথার উপর বিশাল একটা জ্যামের ‘জার’ বসানো। পাশে তেরছা হয়ে আছে বিশাল একটা চামচের হাতল। মনে হয় অ্যালুমিনিয়ম দিয়ে তৈরি। রঙের কী বাহার! ওটা আবার স্পিকার। আচারের গান ছাড়ে থেকে থেকে। বাসের গায়ে হরেক ছবি আঁকা। ছোটোদের লাল টকটকে আচার-খাওয়া মুখ, হুস, হাস, ঈশ, কী মজা! টক টক, ঝাল ঝাল, মিষ্টি মিষ্টি।
একপাশে লেখা, সকালের ব্রেকফাস্টে আমাদের জ্যাম, জেলি না-থাকলে সকলেই তাঁদের রুটি ছুড়ে ফেলে দেন। সকালের সুর কেটে যায়। এক জায়গায় লেখা আছে, আমাদের চাটনির স্বাদ পরের জন্মেও মনে থাকে।
বাসের সামনেই ইঞ্জিনের কাছে আমাদের স্কুলের নাম লেখা ব্যানার ঝুলছে। এটা আবার স্পনসর করেছে আমাদের পাড়ার চানাচুর কোম্পানি। মুখরোচক, সুস্বাদু, মুঠো মুঠো খাও, আনন্দে যাও। ব্যানারে আমাদের স্কুলের নামের তলায় লেখা আছে: সেবা প্রকল্প। জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। তার তলায় লেখা, অপারেশন ইল্যুমিনেশন।
একে একে আমাদের জিনিসপত্র সব উঠছে। ঝুড়ি, কোদাল, নারকোল দড়ি, কাটারি। তারাপদর চীনে কায়দায় তৈরি বিরাট অজগর। ফোল্ড করা যায়, এই একটা সুবিধে। বিকট ইগলটাকে বাসের ছাতে ফিট করা হয়েছে। আমগাছকে নিয়ে সামান্য সমস্যা হয়েছিল। হেডস্যার বললেন, ‘তারাপদর উচিত ছিল বনসাই করে দেওয়া। যাইহোক, পার্ট বাই পার্ট খুলে গাছটাকে বাসের ছাতেই তোলা হল। একটা কাঠের বাক্সে ছোটোখাটো সব জিনিস। সমস্যা হল উটটাকে নিয়ে। অত বড়ো একটা জন্তু ঢোকে কী করে! থার্মোকল দিয়ে তৈরি। খুবই হালকা; কিন্তু আকৃতিতে মস্ত বড়ো। হেডস্যার বললেন, ‘দেখা যাচ্ছে, একটা জ্যান্ত উট ভাড়া করলে সমস্যা মিটে যেত। উটটা হেঁটে হেঁটেই হাটখোলা চলে যেত। পিঠে কিছু জিনিসও নিতে পারত।’
শেষে উট বাতিল হয়ে গেল। নিউ হলের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাজস্থানের কথা ভাবতে লাগল। ড্রয়িং-এর স্যার বিমলবাবু বললেন, ‘তারপদর একটাই দোষ, কারও সঙ্গে কোনো কিছু কনসাল্ট করার প্রয়োজন বোধ করে না। সব নিজে করব, সব নিজে করব। পুরো ক্রেডিটটা নিজে নেবে। ওই করে মারাদোনা মরল।’
হেডস্যার বললেন, ‘কথাটা কোন অর্থে বললেন? আপনাকে কনসাল্ট করলে কী হত! উট তো আর ইঁদুর হত না! উট উটই হবে।’
‘অমন উষ্ণ কন্ঠে কথা বলছেন কেন স্যার! আগে শুনুন আমি কী বলছি! আমি হলে বিশাল একটা ক্যানভাসে উট আঁকতুম। তারপর সেটাকে রোল করে নিয়ে যেতুম যথাস্থানে। সেখানে গিয়ে দেওয়ালে স্ট্রেচ করে দিতুম। উট চলছে মুখটি তুলে।’
হেডস্যার অভিভূত হয়ে বললেন, ‘হোয়াট এ মাথা! এই কারণেই আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি মশাই! মানুষের মাথাটা সব। এ ম্যান উইদাউট হিজ হেড ইজ নো ম্যান। তারাপদ নিজের গোঁয়ারতুমি আমাদের উটটা শেষ করে দিল।’
বিমলবাবু বললেন, ‘কিছু ভাববেন না স্যার। আমি আছি।’
‘আপনি থাকলে কী হবে! আপনি তো উট নন।’
‘আমার হাত আছে, চক আছে, ব্ল্যাকবোর্ড আছে। ঝড়াকসে একটানে উট।’
‘সপ্লেনডিড, সপ্লেনডিড। একজন প্রকৃত যোদ্ধা আপনি। আপনার তুলনা আমি নই, তিনি নন, আপনার তুলনা আপনিই।’
অনেকক্ষণ ধরে আমাদের গেম-টিচার বিকাশবাবু কিছু একটা বলতে চাইছিলেন, এইবার সুযোগ পেলেন, ‘মশাই! আপনার ওই কথাটা তো বুঝলুম না। ঝপ করে বলে দিলেন! আপনার সাবজেক্টও নয়।’
‘কোনটা, কোনটা!’
‘ওই যে মারাদোনা মরল।’
‘ভুল কী বলেছি? অ্যাঁ, ভুল কী বলেছি? নিজেই ড্রিবল করব, নিজেই গোল করব, নিজেই সব ক্রেডিট নেব, কাউকে পাস দেব না।’
‘আপনি মশাই মারাদোনার মা-ও জানেন না। কোনোদিন সেই বিশ্ববরেণ্য খেলোয়াড়ের খেলা দেখেননি।’
‘তার মানে?’
‘মানে-টানে জানি না। আপনি অজ্ঞ।’
‘আর আপনি খুব বিজ্ঞ।’
ধুমধাড়াক্কা লেগে যায় আর কী! হেডস্যার কোনোরকমে মিটমাট করে দিয়ে বললেন, ‘একটা কথা সবসময় আপনারা মনে রাখবেন, ইউনাইটেড উই স্ট্যাণ্ড, ডিভাইডেড উই ফল। কোথায় মারাদোনা, কোথায় আমরা! চলুন, দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়া যাক। ঘড়ি দ্যাখ, ঘড়ি দ্যাখ। সাড়ে সাত। বাস ছেড়ে দিল। আমরা কোরাসে গেয়ে উঠলুম, আমাদের যাত্রা হল শুরু, এখন ওগো কর্ণধার। তোমারে করি নমস্কার। এখন বাতাস ছুটুক, তুফান উঠুক, ফিরব নাকো আর—। তোমারে করি নমস্কার।’
বাসটা অকারণে ভাঁ-ভাঁ করে কয়েকবার হর্ন দিল। বেজে উঠল জ্যামজেলির গান। জ্যাম খাও, জেলি খাও, জেলি দিয়ে রুটি খাও, রুটি দিয়ে জ্যাম খাও। রাস্তায় গাড়ির জ্যাম, ঘরে-ঘরে আমাদের জ্যাম। জ্যাম লাগাও, জ্যাম লাগাও।
হেডস্যার ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘এটা কী ধরনের অসভ্যতা! হোয়াট ইজ দিস! সারাটা রাস্তা যদি এই হয়, সবাই ভাববে আচার কোম্পানি চলেছে।’
ইতিহাসের স্যার অনন্তবাবু বললেন, ‘এর জন্যে দায়ী তো আপনিই। আমাদের সঙ্গে পরামর্শ না-করেই সব করে ফেললেন!’
‘আরে মশাই, পয়সাটা আসবে কোথা থেকে! ইস্কুল ফাণ্ড তো ভাঁড়ে মা ভবানী। স্পনসরার ছাড়া হত এত বড়ো একটা কাজ!’
‘লাউড স্পনসরার না-ধরে আপনি সাইলেন্ট স্পনসরার ধরতে পারতেন!’
‘কথার কোনো মাথামুন্ডু নেই, সাইলেন্ট হাঁস, সাইলেন্ট মুরগি, সাইলেন্ট কোলাব্যাঙ হয়। সাইলেন্ট কামান হয়!’
‘তাহলে মরুন। স্বখাত সলিলে ডুবে মরুন। সারাটা পথ জানলা দিয়ে জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি বিক্রি করতে করতে চলুন। জ্যাম লাগাও, জ্যাম লাগাও। পারলে ছাতে উঠে নৃত্য করুন।’
কুমুদবাবু বললেন, ‘অকারণে অর্থ খরচের মতো, অকারণে কথা খরচও গর্হিত কাজ। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। দাঁড়ান, ইংরেজিতে বলি, থিংস ডান ক্যান নট বি আনডান।’
বাংলার স্যার নির্মলবাবু বললেন, ‘ছেলেদের ডেকে এইবার বলুন, এটার ভাব সম্প্রসারণ করতে। পঁচিশ নম্বর।’
বাসের ভেতর থেকে হঠাৎ একজন বেরিয়ে এলেন। কোথায় ঘাপটি মেরে এতক্ষণ বসেছিলেন কে জানে! বিচিত্র তাঁর পোশাক। চিত্র-বিচিত্র ঝলমলে। জ্যাম, জেলি, চাটনির বোতল আঁকা নানা রঙে। ফাঁকে ফাঁকে মানুষের মুখ। হাসি হাসি মুখ, হাঁ-করা মুখ। পিঠের দিকে দু-হাতে দুটো চামচে ধরে একজন মানুষের ঊর্ধ্ববাহু নৃত্য।’
লোকটিকে বিরক্তির চোখে দেখতে দেখতে হেডস্যার প্রশ্ন করলেন, ‘এই অবতারটি কে? এ তো আমাদের কেউ নয়। কোথা থেকে এর আবির্ভাব?’
‘স্যার, আমি কোম্পানির লোক। আপনাদের প্রত্যেকের ডান হাতের ওপর দিকে একটা করে আর্মব্যাণ্ড বেঁধে দেব। কিছুই না, হলুদের ওপর লালে লেখা, মুখরোচক আচার, খেয়ে ও খাইয়ে আরাম, প্রস্তুতকারক...।’
‘আমরা আচার?’
‘আহা, তা কেন? আপনারা হলেন আমাদের প্রচার মাধ্যম। আচারের বার্তা বহনকারী।’
‘একদল...।’
‘ছি, ছি, সে কী কথা! আপনারা শিক্ষক। মানুষকে আচার খেতে শেখানোটাও আপনাদের কর্তব্য। স্যার বলেছেন, ওই যে আ-এ আমটি খাব পেড়ে আছে না, বর্ণপরিচয়ে! ওটা বদলাতে হবে। বলতে হবে, আ-এ আচার, খাব মজা করে।’
‘অসম্ভব, অসম্ভব! বিদ্যাসাগরকে আমরা বিকৃত করতে পারব না।’
সমস্ত শিক্ষকমশাই একযোগে হইহই করে উঠলেন, ‘অসম্ভব, অসম্ভব!’
সেই ঝলমলে পোশাকধারী ভদ্রলোক বললেন, ‘অত হইহই করছেন কেন? যেন মনে হচ্ছে, কোথাও আগুন লেগেছে।’
সঙ্গে সঙ্গে বাংলার স্যার নির্মলবাবু অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
ভদ্রলোক অমায়িক হেসে বললেন, ‘স্যার, এ-যুগে আমরা সবাই...। তা না-হলে কেউ এসব করে! এই আচার বিক্রি এই সমাজসেবা! রাগ করবেন না, আমি একটা প্রস্তাব দিচ্ছি, তাতে বিদ্যাসাগর বাঁচবেন, আমাদের কোম্পানির মালিক যা চাইছেন, তা ও হবে। প্রস্তাবটা হল আ-এ আমের আচার কুলুঙ্গি থেকে খাব পেড়ে। জিনিসটা ভেবে দেখুন, বিরাট একটা গাছে চড়ে আম পেড়ে খাওয়ার চেয়ে অনেক, অনেক সহজ। ছেলেটা ঘরেই রইল। দুপুরবেলা সবাই ঘুমোচ্ছে, একটা টুল টেনে এনে তাইতে চড়ে, তাক থেকে শিশি নামিয়ে আচার খাচ্ছে।’
হেডস্যার বললেন, ‘অরিজিনাল যা আছে, তা আমরা বদলাব না। কিছুতেই না। আর হাতে আমরা ব্যাজ পরব না। আপনার মতো একটা ভাঁড় আমরা সাজতে পারব না। একেবারে ক্লিয়ার-কাট কথা।’
‘তাহলে আমারও ক্লিয়ার-কাট কথা, বাস ফিরে যাচ্ছে।’
সবাই একটু থমকে গেলেন। স্যারেরা দল পাকিয়ে একপাশে সরে গেলেন। অনেক পরামর্শ হল।
হেডস্যার এগিয়ে এসে ভদ্রলোককে বললেন, ‘ঠিক আছে, আ-টাকে আমরা দু-বার প্রেজেন্ট করব। একবার আম পাড়বে, আর একবার আমের আচার পাড়বে। তাহলে হবে তো!’
ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘হবে।’
বাস ছাড়ল। পাড়ার রাস্তা, বাজারের ভিড় ঠেলে অবশেষে বড়ো রাস্তায়।
বাস চলছে, ড্রাইভারের কেবিন থেকে ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘আমি কিন্তু মাঝে মাঝে গাড়িটাকে থামাব স্যার?’
‘আপনার এই আবদার কেন স্যার!’ বললেন কুমুদবাবু।
‘ফর বিজনেস স্যার। দুটো পয়সা রোজগার করতে হবে তো! ড্রাইভারের মাইনে আছে। তেলের দাম আছে। আপনারা তো একটা পয়সাও দেবেন না।’
হেডস্যার বললেন, ‘আপনার কাছে ক্ষুর আছে?’
‘কেন স্যার?’
‘আমাদের সবকটাকে ধরে মাথা কামিয়ে দিন।’
‘হ্যা, হ্যা, কী যে বলেন স্যার! আপনারা হলেন জাতির মেরুদন্ড!’
সঙ্গে সঙ্গে গান বেজে উঠল, ‘শয়নে, স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে খাও, খাও, চেটে খাও, চেখে খাও, চুষে খাও, আচার, আচার, বিচার হবে পরে।’
পাঁচঘরার মোড়ে বাস থেমে গেল। আমরা এরই মধ্যে ভদ্রলোকের নাম রেখে ফেলেছি ‘আচার কুইন’। আচার কুইন নেমে পড়লেন। বাসের পেছন দিকের ডালাটা নামাতেই হয়ে গেল সেলস কাউন্টার। ঘোষণা হতে লাগল, ‘এক শিশি জ্যামের সঙ্গে একটা ডট পেন ফ্রি। এক শিশি জেলির সঙ্গে একটা চামচে।’
এইবার একটা কান্ড হল, বেজে উঠল হিন্দি গান।
হেডস্যারের মুখটা কেমন হয়ে গেল। সকলের মুখের দিকে করুণ চোখে তাকাচ্ছেন। কুমুদবাবু বললেন, ‘মানসম্মানের যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও গেল। আর কেন, এইবার চলুন, আমরাও নেমে পড়ে ধিতিং ধিতিং নাচি। ছি ছি, লজ্জায় মাথা হেঁট।’
বিমান আমার কানে কানে বলল, ‘চল শানু, লোকটাকে ধরে পেটাই, তারপর যা হয় হবে। আমরা ছাত্র। আমরা কত বড়ো বড়ো আন্দোলন করেছি, আর এখন চুপ করে যাব! চল, ওঠ।’ কথাটা হেডস্যারের কানে গেলে, তিনি মুনিঋষির ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, ‘আমাদের আদর্শবিরোধী কোনো কাজ করবে না। আমি ওই জাম্বুবানকে ডেকে বলছি।’
‘এই যে ছোকরা, শোনো।’
তিন লাফে চলে এল সেই জোকার, ‘বলুন স্যার?’
‘আমরা কে?’
‘মানুষ, স্যার।’
‘কী ধরনের মানুষ? বনমানুষ?’
‘এ কী বলছেন স্যার?’
‘আমরা শিক্ষক, এটা মানো তো?’
‘অবশ্যই।’
‘তাহলে তোমার ওই ওলকচু, মানকচু হিন্দি গান বন্ধ করো।’
‘আমাকে তো লোক জড়ো করতে হবে! দু-পয়সা কামাই না-হলে আমি তো কমিশন পাব না।’
‘তোমার আবার কমিশন আছে?’
‘থাকবে না! যেখানেই সেল সেইখানে কমিশন।’
‘তোমার টাকা আমি দেব। গান বন্ধ করে গাড়ি ছাড়ো। তোমার কমিশন কত?’
‘যা বিক্রি হবে, তার ওপর টেন পারসেন্ট। এক-শো টাকায় দশ টাকা।’
‘তোমার কত বিক্রি হতে পারে?’
‘ধরুন দশ হাজার টাকা।’
‘শয়তানি করো না।’
‘তাহলে এক হাজার টাকা।’
‘এটাও বেশি হল। তা হোক, আমি তোমাকে এক-শো টাকাই দেব।’
লোকটি ড্রাইভারের কেবিনে ফিরে গেল। গান বন্ধ হল। গাড়ি স্টার্ট নিল। যে সময়ে পৌঁছোবার কথা, তার একঘণ্টা কী দেড়ঘণ্টা পরে আমরা হাটখোলা পৌঁছোলুম। নিস্তারিণী মেমোরিয়াল স্কুল। সব ভোঁ-ভোঁ। মাঠ আছে, বিল্ডিং আছে। মাঠে একটা মনোযোগী গোরু আছে। কোনো মানুষ নেই।
কুমুদবাবু বললেন, ‘ব্যাপারটা খুব ফিশি মনে হচ্ছে। আমরা আসব জেনেও সব পালাল! ডিচিং।’
হেডস্যার বললেন, ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ। ডাকবিভাগের কল্যাণে চিঠি পৌঁছোয়নি।’
‘আপনি চিঠি দিয়েছিলেন?’
‘মনে হয় দিয়েছিলুম।’
‘মনে হয়? সিওর নন?’
‘মনে করতে পারছি না। লিখে যে ছিলুম, কোনো সন্দেহ নেই। এখন কথা হল, পোস্ট করেছিলুম কিনা!’
নির্মলবাবু বললেন, ‘ব্যাপারটা জমে গেছে। আমরা তাহলে ফিরে যাই। সমাজকল্যাণ আর করা গেল না! করব বললেই কী করা যায়! ভাগ্য সহায় হওয়া চাই।’
বিমান বলল, ‘স্যার!’
বিমান একটু টেনে টেনে, নাকিসুরে কথা বলে, ‘স্যার।’
‘বলে ফেলো, বলে ফেলো। অকারণে বেশি টানাটানি কোরো না।’
‘স্যার, আসার সময় বাঁ-দিকে একটা পুকুর দেখে এসেছি।’
‘বেশ করেছ। চান করতে ইচ্ছে করছে বুঝি?’
‘না, স্যার! পুকুরটার খুব খারাপ অবস্থা। অসহায় মানুষের মতো। যত আবর্জনা সব ওই পুকুরে। আধখানা প্রায় বুজেই গেছে।’
হেডস্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘আরে, আমরা তো এইরকমই একটা পুকুর চাই। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। সমাজসেবার প্রধান অঙ্গই হল পুষ্করিণী উদ্ধার। বয়েজ, ফরওয়ার্ড মার্চ।’
একটা কিছু করার জন্য আমাদের প্রাণ আকুলবিকুলি করছিল। মার্চ বলামাত্রই একেবারে মিলিটারি কায়দায় দৌড়। কদম কদম বাড়ায়ে যা। ঝুড়ি, কোদাল, গাঁইতি, বেলচা, গামবুট আছে সঙ্গে। হেডস্যার বললেন, ‘এ যা পুকুর, গামবুট পরা যবে না। বিলিতি পুকুর হলে হত। তোমরা আদুলগায়ে শর্টস পরে নেমে যাও। কোমরে গামছা বেঁধে নাও। পুকুরটা তকতকে, ঝকঝকে হয়ে যাওয়ার পর একটা বোর্ড লাগিয়ে দিয়ে যাব। এই পুকুর সংস্কার করা হল। তলায় আমাদের সমিতির নাম।’
‘আপনি এত নামের কাঙাল কেন? হোয়াট ইজ ইন এ নেম!’ নির্মলবাবু বললেন, সঙ্গে জুড়ে দিলেন স্বামীজির উক্তি—শুনুন, স্বামীজি সিস্টারকে একটা চিঠিতে লিখছেন:
‘ভালোই হোক আর মন্দই হোক, আমরা সকলেই এ সংসারে নিজ নিজ অংশ অভিনয় করে যাচ্ছি। যখন স্বপ্ন ভেঙে যাবে এবং আমরা রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে যাব, তখন এসব বিষয়ে আমরা শুধু প্রাণ খুলে হাসব।’
‘অন্তত এই ব্যাপারে আপনি যদি কিছু না-বলেন, আমি একটু খুশি হব। কোথায় স্বামীজি আর কোথায় আপনি! আকাশ আর পাতাল, চাঁদ আর চাঁদমালা। আপনার বাড়ির বাইরে আপনার নামের ফলক। ইয়া গোটা গোটা অক্ষর। আপনার নামের প্যাড। কত কথাই তাতে লেখা। এমনকী একথাও লেখা, প্রাক্তন সভাপতি, বাঁশতলা মিলনী সংঘ। নামটা যেন সংবাদপত্রের ভাষায় স্ক্রিমিং হেডলাইন। এপাশ থেকে ওপাশ। কবে একটা বই লিখেছিলেন, সেকথা আজও যাকে পান তাকেই শোনান। ক-কপি বিক্রি হয়েছিল মশাই!’
অঙ্কের স্যার কুমুদবাবু খুব উত্তেজনার মুহূর্তে সাঁ করে নস্যি টানেন, আর এই শব্দটাই হেডস্যার ভীষণ অপছন্দ করেন। শব্দ শুনে হেডস্যার ভুরু কুঁচকে তাকালেন। কুমুদস্যার পাত্তাই দিলেন না। হাতের টিপে তখনও সামান্য নস্যি। সামনে একটু কুঁজো হয়ে, নাচের মুদ্রায় ধরা সেই আঙুল দু-টোকে বুকের কাছে তুলে এগিয়ে আনতে আনতে নাকিসুরে বলছেন, ‘এই ঝগড়া, কাজিয়া, পরস্পরের প্রতি তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপ, দেশের, সমাজের, জাতির এবং ব্যক্তির পক্ষে অতিশয় ক্ষতিকারক। এতে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হয়। শাস্ত্র বলছে, ইউনাইটেড উই স্ট্যাণ্ড, ডিভাইডেড উই ফল। ধপাস করিয়া পতন।’
নস্যির কারণে হেডস্যার একটু বিরক্তই ছিলেন। আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘শুনুন মশাই, উদ্ধৃতি যখন দেবেন, তখন সঠিক উদ্ধৃতিই দেবেন। ডোন্ট ফরগেট, ইউ আর এ শিক্ষক। জন ডিকিনসনের, ‘দ্য লিবার্টি সং’-এ দুটো লাইন আছে, Then join hand in hand, brave Americans all/By uniting we stand, by dividing we fall.’
‘এ আবার আপনি কবে পড়লেন! জন ডিকিনসন? তিনি আবার কে!’
‘১৭৩২ সালের আমেরিকান কবি। আপনাদের পদে পদে ভুল ধরার জন্যে আমাকে এইসব পড়তে হয়।’
নির্মলস্যার ঝগড়া ভুলে, হেডস্যারকে সমর্থন করে বললেন, ‘ঠিক বলেছেন স্যার। আমাদের কুমুদবাবু অঙ্কশাস্ত্রটা খুব ভালো জানলেও লিটারেচারে ভীষণ, ভীষণ উইক। মাঝে মাঝেই বলতে শুনি, তোদের ব্যাংলার টিচার! বর্ষাকালে ব্যাং ডাকে আর বাংলার টিচাররা কবিতা আবৃত্তি করেন। অঙ্কের অহংকারে লঘু-গুরু জ্ঞান হারিয়েছেন। উনি ভুল ইংরেজিতে যে-কথা বলেছেন, আমি সংস্কৃতে প্রায় সেই কথাটাই বলব, তৃণৈগুণত্বমাপন্নৈর্বধ্যান্তে মত্তদন্তিনঃ।’
নির্মলস্যার বীরের মতো হাসছেন। এমন একটা কিছু বলেছেন, যেন একেবারে তুরুপের তাস খেলা।
হেডস্যার ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘কী বিচ্ছিরি কথা! আড়াই হাত লম্বা। রেফের ছড়াছড়ি। সংস্কৃতের এই খোঁচাটা মশাই আমার অসহ্য লাগে। একটার ঘাড়ে আর একটা শব্দ চাপিয়ে যেন একটা...। একেবারে ঠাসা, গাদাগাদি, পলিউশান সাফোকেশন, একটার কার্বন ডাইঅক্সাইড আর একটার নাকে।’
‘আপনার সেইরকম মনে হলে আমার কিছু করার নেই। দেবভাষা।’
‘জট ছাড়লে, মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে?’
‘অতিসুন্দর। অনেক তৃণগুচ্ছ একত্র করিয়া রজ্জু প্রস্তুত হইলে তাহাতে মত্ত হস্তীকেও বাঁধা যায়।’
‘বা: বা:, অতিশয় সুন্দর। ওইটুকুর মধ্যে এতটা ঢুকে আছে।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, সাংঘাতিক প্যাকিং।’
এইসব ঘ্যাঁচোর-ম্যাঁচোর যখন হচ্ছে, ততক্ষণে আমরা সেই ডোবায় নেমে পড়েছি। হাতে আর পায়ে কেরোসিন তেল মেখে নিয়েছি। ভুরভুর করে গন্ধ বেরোচ্ছে বিকট। ব্যাঙাচি আর নানা রকমের পোকা লাফিয়ে লাফিয়ে গায়ে উঠছে। জলমাকড়সা লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়ে পিঠ বেয়ে ঘাড়ের কাছে উঠে গিয়ে কাঁধে ডান্স করছে। তবু আমরা নির্ভীক। ডু ইয়োর ডিউটি কাম হোয়াট মে।
সাইকেলে চেপে ভীম ভবানী মার্কা একজন ভদ্রলোক এলেন কোথা থেকে। স্ক্রু-কাট চুল। ইয়া গর্দান। আধুনিক মাস্তানি গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপারটা কী! কী হচ্ছে এখানে?’
উত্তর দিলেন হেডস্যার, ‘আমরা একটা সামাজিক কর্তব্য পালন করছি।’
সঙ্গে সঙ্গে নির্মলস্যার যোগ করলেন, ‘স্বামীজি বলেছেন, বসন্তবল্লোকহিতং চরন্তঃ, অর্থাৎ, বসন্তের ন্যায় লোকের কল্যাণ আচরণ করো। জগতের কল্যাণ করা, আচন্ডালের কল্যাণ করা—এই আমাদের ব্রত, তাতে মুক্তি আসে না নরক আসে।’
ভীম ভবানী বললেন, ‘লেকচার রাখুন। আসল ব্যাপারটা কী! কোথাকার লোক আপনারা!’
‘আমরা কলকাতার দিক থেকেই আসছি। স্বামীজির অনুপ্রেরণায় উদবুদ্ধ। দেশের, দশের কল্যাণে ব্রতী। ত্রিভুবনমুপকারশ্রেণীভি: প্রীয়মাণঃ অর্থাৎ ত্রিভুবনের হিত করিতে আমরা ভালোবাসি।’
‘হয়েছে, হয়েছে। আসল কাজটা কী হচ্ছে!’

সাইকেলে চেপে ভীম ভবানী মার্কা একজন ভদ্রলোক এলেন কোথা থেকে...
‘পুষ্করিণী উদ্ধার।’
‘ঝেড়ে কাশুন তো, আপনারা হালদারের লোক। তাই তো!’
‘কে হালদার!’
‘দেখাচ্ছি, কে হালদার! দাওয়াই পড়লেই সব বেরিয়ে আসবে।’
লোকটি আধচক্কর মেরে যেদিক থেকে এসেছিলেন সেই দিকেই চলে গেলেন। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি নন-স্টপ। যদি তোর ডাক শুনে কেউ...
মাস্টারমশাইরা ছায়ায় বসে আছেন। কুমুদস্যার মাঝে মাঝে বলছেন, ‘এক চুমুক চা যদি এই সময় পাওয়া যেত!’
গোটা দুয়েক মোটরসাইকেল আসছে। ঘোর শব্দ। খুব স্পিডে আসছে। বাইক-দুটো আমাদেরই দঙ্গলে এসে থামল।
কুমুদস্যার বললেন, ‘চা এনেছেন বুঝি!’
ভীষণ চেহারার চারজন মানুষ। কর্কশ গলা, ‘এই উঠে আয় বদমাশের দল। এই কাজ তোদের কে করতে বলেছে? হালদার!’
হেডস্যার এগিয়ে গেলেন, ‘তখন থেকে আপনারা হালদার, হালদার করছেন। হালদারমশাই কে?’
‘কিছুই জানেন না বুঝি। যত্ত সব! হালদার হলেন গিয়ে হেডমাস্টার!’
‘অ, পবিত্রবাবু! পবিত্র হালদার! তিনি কোথায়! তাঁর সঙ্গেই তো কথা হয়েছিল।’
‘তাঁকে তো আমরা কিছুদিনের জন্যে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। বেশি না, মাথায় দশটা স্টিচ, আর বুকের একটা কাঁপ মচকে দিয়েছে আমাদের ছেলেরা। বাঁ-চোখটা ঢেকে দিয়েছি। এদিকটা মেরামত হতে হতে ওদিকটা খুলে যাবে। সেই হালদার বলেছে তো এটাকে সাফ করতে!’
‘আজ্ঞে না, শুধু শুধু একজন অসুস্থ মানুষের নামে কেন মিথ্যা বলব। আমরা সবাই একটা স্কুলের শিক্ষক। আমাদের বাসনা হয়েছিল, সমাজসেবা করব। পবিত্র আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। পবিত্র বলেছিল, ‘আমার এখানে আয়, করার মতো অনেক কাজ আছে। তাই আমরা নানাভাবে তৈরি হয়ে, একজন স্পনসরার জোগাড় করে এখানে এলুম। এসে দেখছি, সব ভোঁ ভোঁ, কেউ কোথাও নেই। তখন আমরা নিজেরাই ঠিক করলুম, সমাজসেবার একটা প্রাচীন দিক হল পুষ্করিণী সংস্কার। তা সেই কাজেই ছেলেদের লাগিয়ে দিলুম। এত আয়োজন করে এসে শুধু শুধু ফিরে যাব! পুকুরটার অবস্থা দেখেছেন? একেবারে দূষিত হয়ে আছে। এর থেকেই ম্যালেরিয়া, এর থেকেই কলেরা, যাবতীয় মহামারীর প্রকোপ। কত বড়ো একটা ভালো কাজে আমরা হাত দিয়েছি। অ্যাপ্রিসিয়েট করুন। ঈশ্বরের অসীম কৃপা! এই রকম হাতের কাছেই একটা পুকুর সাজিয়ে রেখেছেন!’
‘খুব ভালো কাজ করেছেন! আরে মশাই, এই পুকুরটা আমরা একটু একটু করে বোজাচ্ছি। এটা আমাদের জবরদখল। হালদারদের সম্পত্তি। আমরা এটাকে বুজিয়ে পল্লীমঙ্গল ক্লাব করব।’
হেডস্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘মঙ্গল! মঙ্গল শব্দটা আছে! সে তো ভালো কথা! তা কী কী মঙ্গল করবেন!’
‘একটা ক্লাবঘর হবে। সেখানে ক্যারমবোর্ড, তাস, দাবা, টিভি থাকবে। ছেলেরা আসবে, খেলবে। সারারাত ভিডিয়ো প্রোগ্রাম দেখবে। ইলেকশানের সময় আমাদের হয়ে কাজ করবে। মিছিলের দিন গ্রামের লোককে ঝেঁটিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাবে। এখানকার লোকের বেচাল দেখলেই চেন আর ডাণ্ডা বের করে ঠাণ্ডা করে দেবে। অন্য মতের, মানে বেপাড়ার লোক দেখলেই দলবেঁধে তেড়ে যাবে।’
‘আর কিছু করবে না! মহাপুরুষদের জন্মদিন পালন—রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজি!’
‘ওঁরা আবার কবে মহাপুরুষ হলেন? আমাদের কোনো মহাপুরুষই স্বদেশি নন, বিদেশি। ওই একটা ব্যাপারে আমরা খুবই উদার।’
‘আমরা এখন তাহলে কী করব?’
‘কী করবেন? আধুনিক কায়দায় সমাজসেবা! একালে লোকে পুকুর কাটে না। পুকুর বোজায়। আপনাদের কলকাতায় কী হচ্ছে, পুকুর ভরাট করে বড়ো বড়ো ফ্ল্যাট। এতক্ষণ আপনারা পুরাণ মতে সমাজসেবা করলেন। এইবার উলটপুরাণ মতে করুন। ছেলেদের বলুন, যা তুলেছে আবার সব ওই পুকুরে ফেলতে। তারপর, দয়া করে এসেছেন যখন, তখন গোটাটাই ভরাট করে দিয়ে যান। প্রথমটা তো পাকা ঘুঁটি কাঁচা করা হয়। ওটা হল পুরোনো পড়া। নতুন পড়া হল, ওই যে দেখছেন ডাঙাটা, ওখান থেকে মাটি কেটে এনে এই পুকুরে ফেলতে বলুন। যদি না-করেন তাহলে কী হবে?’
হেডস্যার বললেন, ‘কী হবে?’
‘আপনাদের অল্পবিস্তর শরীর খারাপ হবে। আমাদের নানা রকম ব্যবস্থা আছে, একমাসের জন্যে, তিন মাসের জন্যে, এক বছরের জন্যে, যাবজ্জীবনও আছে। শুয়েই রইলেন, আর উঠতে হল না। আর কাজটা যদি করেন, তাহলে আমরা এখনই চায়ের ব্যবস্থা করব। দুপুরে ভাত, ডাল, তরকারি, পুকুরের মাছ খাওয়াব। দই খাওয়াব। বিকেলে আবার চা। অতিথি আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি হবে না। আপনারা কিন্তু সমাজসেবাই করছেন। গঠনমূলক সমাজসেবা। এতকাল সবাই কেটে এসেছে। মাটি হল মা। মাকে কেটেছে, গর্ত করেছে, চোট দিয়েছে। পাপ করেছে। আপনারা সেই গর্ত বুজিয়ে পুরোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবেন। আমরা এখন কী বলছি বলুন তো—কাটতে হলে মানুষ কাটো, গাছ কেটো না।’
হেডস্যার বললেন, একটু আমতা-আমতা করে, ‘গোটা পুকুরটা কী ভরাট করা যাবে বাবা?’
‘যতটা হয়, যতটা হয়। আমরা অন্যায্য কথা বলব কেন!’
‘আমরা তো শুধু পুকুরের জন্যে আসিনি বাবা, আমরা যে আবার সাক্ষরতার কর্মসূচি নিয়ে এসেছি। একঘণ্টায় অ, আ, ক, খ। সরকার যেমন চাইছেন আর কী!’
‘বা: বা:, সে তো বহত আচ্ছা!’
নির্মলস্যার নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘ওই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, অন্ধজনে দেহ আলো, মৃতজনে দেহ প্রাণ। স্বামীজি বলছেন, এদিকে জ্যান্ত ঠাকুর অন্ন বিনা, বিদ্যা বিনা মরে যাচ্ছে। বোম্বায়ের বেনেগুলো ছারপোকার হাসপাতাল বানাচ্ছে। শিক্ষা, শিক্ষা—ফার্স্ট ওয়ার্ড অ্যাণ্ড লাস্ট ওয়ার্ড।’
কুমুদস্যার এই উত্তেজনার শেষমুহূর্তে হাতে ধরা নস্যির শেষ টিপ নাকের কাছে ধরে মোক্ষম একটা টান মারলেন। যেন সাইরেন বাজল। ব্রহ্মরন্ধ্র বার্স্ট করে আর কী!
পাড়ার দাদা নির্মলস্যারের বক্তৃতায় যেন বেশ খুশি হলেন। হুমদো মুখে হাসি ফুটল। কুমুদস্যারের নস্যির টানও মনে হয় মনে ধরেছে। আমরা যে প্রকৃত সমাজসেবী, আমাদের আর কোনো ধান্দাও নেই এটা বুঝেছেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ছেলেরা উঠে এসো, আর নোংরা ঘাঁটতে হবে না। ওপাশে একটা বড়ো দিঘি আছে, সাবান মেখে চান করে এসো!’
হেডস্যার বললেন, ‘সে কী, এটা ভরাট করতে হবে না?’
‘সে আমার ছেলেরা করবে! এ-কাজ ওদের নয়। আমি বুঝতে পেরেছি, আপনারা হালদারের লোক নন। আপনারা জেনুইন সমাজসেবী। ভালো মানুষ, এক নম্বর মানুষ। আপনারা সেবা করবেন অন্যভাবে। শীতলাতলায় সাক্ষরতার ক্যাম্প হয়েছে। সেইখানে চলুন। দেখি আপনারা কী এনেছেন! ও হ্যাঁ, আপনাদের রক্ত দিতে হবে।’
হেডস্যার বললেন, ‘এই যে বললেন, আমরা ভালো লোক, রক্ত-টক্ত দিতে হবে না!’
‘এ রক্ত সে রক্ত নয় স্যার। আমাদের ব্লাড-ডোনেশান ক্যাম্প হয়েছে। রক্ত চাই, রক্ত। বোতল বোতল রক্ত। আমাদের টার্গেট দু-শো বোতল।’
শীতলাতলা জায়গাটা বেশ ভালো। বিরাট মাঠ। চারপাশে বড়ো বড়ো গাছ, ছায়া করে রেখেছে। মন্দিরটা বেশ বড়ো। বিশাল মায়ের মূর্তি। একটা মঞ্চ করা হয়েছে। শীতলাবাড়ির একটা ঘরে সার সার বেড। এক-একবারে ছ-জন রক্ত দিতে পারবে। হিন্দি গান বাজছে। হঠাৎ গান থামিয়ে আহ্বান, ‘বন্ধুগণ, রক্ত দিন। আপনার রক্তে মুমূর্ষু প্রাণ ফিরে পাবে। নেতাজি একদিন নেশনকে বলেছিলেন, ‘গিভ মি ব্লাড, আই উইল গিভ ইউ ফ্রিডম’, আহা, আহা, রামজি ভাবিকো বাধাই—রক্ত সম্পর্কে বলা হয়েছে, যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে। শাস্ত্রে আছে, রক্তবীজের ঝাড়। আহা, আহা, রামজি।’
গান আর বক্তৃতা, বক্তৃতা আর গান। মাঝে মাঝে আবার হ্যালো, হ্যালো টেস্টিং, টেস্টিং, নাইন এইট, সেভেন, সিকস। একটি ঘোষণা, একটি ঘোষণা। এইমাত্র কলকাতা থেকে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছেন বনমালী বয়েজ স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকবৃন্দ। স্বামীজির অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত। সেই স্বামীজি, যাঁর শিকাগো হল এই সেদিন। যিনি বলেছিলেন, যিনি বলেছিলেন, যিনি বলেছিলেন....নির্মলস্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘আটকে গেছে, সাপ্লাই লাইনে আমার থাকা দরকার।’ মঞ্চের দিকে এগোচ্ছেন। গান শুরু হয়ে গেছে, ‘বাহা, বাহা, রামজি।’
হেডস্যার নির্মলস্যারকে আটকাতে চেষ্টা করলেন। তিনি ঝটকা মেরে সোজা মঞ্চে, মাইক্রোফোনের সামনে। গানটা চাপা পড়ে গেল। তিনি বলছেন, ‘স্বামীজি বলেছিলেন, ‘তোমরা সিংহতুল্য হবে। ভারতকে—সমগ্র জগৎকে জাগাতে হবে। এ না- করলে চলবে না, কাপুরুষতা চলবে না, বুঝলে। কার্যসিদ্ধির জন্যে আমার ছেলেদের আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এখন কেবল কাজ, কাজ, কাজ। ধৈর্য, অধ্যবসায় ও পবিত্রতা চাই।’
কুমুদস্যার কেবলই বলছেন, ‘পরিবেশটা ঠিক আমাদের উপযোগী নয়। হিন্দি সিনেমার গানের সঙ্গে স্বামীজিকে পাঞ্চ করছে। আমাদের মশাই বয়েস হয়েছে। আমাদের কালচারের সঙ্গে মিলছে না।’
পুকুর ধারে যে তম্বি করছিল, তার নাম জেনেছি, শীতল। আমরা দাদা বলতে শুরু করেছি। সেই শীতলদা কুমুদস্যারের কথা শুনে ফোঁস করে উঠল, ‘স্বামীজি কী কেবল আপনাদের সম্পত্তি! আপনাদের স্কুলের ওই আদুরে খোকাদের চেয়ে আমরা অনেক ভালো। ওরা তো স্বার্থপর হবে। নাকতোলা হবে। বড়ো বড়ো ফ্ল্যাটে থাকবে, বড়ো বড়ো কথা বলবে। একালে এইভাবেই ওদের তৈরি করা হচ্ছে। ঘরে-ঘরে ইংলিশ মিডিয়াম। জ্যাক অ্যাণ্ড জিল লাফাচ্ছে। স্বামীজিকে আমিও গিলে খেয়েছি। মনে আছে, তিনি কী বলেছিলেন, ‘তোমার বিবাহ, তোমার ধন, তোমার জীবন, ইন্দ্রিয়সুখের—নিজের ব্যক্তিগত সুখের জন্য নহে; ভুলিও না—তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত। ভুলিও না—তোমার সমাজ সে বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র; ভুলিও না—নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই। হে বীর, সাহস অবলম্বন কর; সদর্পে বল—আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী; বল, ভাই—ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ। আর বল দিনরাত, হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে, আমায় মনুষ্যত্ব দাও; মা, আমার দুর্বলতা, কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।’
চা এসে গেছে। শীতলদা নিজেকে সংযত করে বলল, ‘নিন মাস্টারমশাই, চা খান। সঙ্গে গরম নিমকি আছে।’ হেডস্যার খাবেন কী! তিনি তো অভিভূত। চোখে জল। তাঁর এইরকম হয়। খারাপ হলে কাঁদেন না। গুম মেরে যান। ভালো হলেই চোখে জল।
শীতলদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘জেম অব এ বয়। জেম অব এ বয়।’
আচারদাদা হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, গাঁক গাঁক করে আচারের গান বাজতে শুরু করেছেন। দু-চারটে লোক দেখলেই তাঁর বিক্রির ধান্দা। গান হচ্ছে, খাও আচার, খাওয়াও আচার। জিভে জল, মনে হল, খাও আচার, কেন বিচার, যাবজ্জীবন এই আচার।’
শীতলদার ভুরু কোঁচকাল, ‘এটা কী!’
কুমুদস্যার বললেন, ‘ওই তো আমাদের স্পনসরার। আচার কোম্পানি। জ্যাম, জেলি, চাটনি। সারাটা পথ এই করতে-করতে এসেছে। একবার করে থামে, গান বাজায়, বিক্রি করে, আবার চলে।’
‘গাড়িতে জিনিস আছে?’
‘প্রচুর।’
‘দেখছি।’
আমাদের চা দিয়ে শীতলদা মঞ্চে চলে গেল। নির্মলস্যার নেমে চলে এসেছেন আমাদের কাছে। শীতলদা মাইকের সামনে, ‘হ্যালো, হ্যালো, বন্ধুগণ, অত্যন্ত সুখবর, যারা রক্ত দিচ্ছে তাদের প্রত্যেককে বিনামূল্যে, পুরস্কার হিসেবে, এক শিশি জ্যাম, জেলি অথবা চাটনি দেওয়া হবে। কলকাতার বিখ্যাত আচার কোম্পানি টেস্ট অ্যাণ্ড ডান্স আমাদের এই উপহার পাঠিয়েছেন। আমরা কৃতজ্ঞ।’
আচারদাদা গাড়ির ভেতরে। সেইখান থেকে মাইকে বলছেন, ‘এই না, এ কী হচ্ছে! মরে যাব। ফ্রি নয়, ফ্রি নয়। পয়সা দিয়ে কিনতে হবে। বাজারের চেয়ে কম দাম। ফ্রি হল চামচে। ওয়ান স্পুন ফ্রি।’
শীতলদার আবার ঘোষণা, ‘যাঁদের রক্ত দেওয়া হয়ে গেছে, তাঁরা গাড়ির কাছে চলে যান। পুরস্কার বুঝে নিন। গোলমাল করলে জানান। আমাদের দাওয়াই প্রস্তুত আছে।’
এইবার শীতলদাদের গান বাজছে, আর হিন্দি নয়, রবীন্দ্রসংগীত—আকাশভরা সূর্যতারা। মাঠের মাঝখানে দু-হাত তুলে আচারদাদা নাচছেন। শীতলদার ছেলেরা পেটি পেটি জিনিস নামাচ্ছে আর দু-হাতে বিলি করছে। ওদিকে মাঠময়দান ভেঙে মানুষ আসছে আচারের লোভে। একটি ছেলে মাইকে গাইছে, ‘রক্ত দে দো, জ্যাম লে লো।’ আবার আকাশ ভরা।
কেস খুব জমে গেছে।
ঠিক দুটোর সময় রক্তদান শেষ হল। মন্দিরের পেছনে রান্না হচ্ছিল। শীতলদা খুব আপ্যায়ন করে খাওয়াল। লেখাপড়া জানা ছেলে। এম এ পাস। প্রকৃত সমাজসেবী। আমরা খেতে খেতেই শুনছি ঘোষণা হচ্ছে—‘তিনটের সময় আমাদের ময়দানে শুরু হবে বর্ণপরিচয় নাটক। কলকাতার বিখ্যাত স্কুল বনমালী বয়েজের ছাত্র ও শিক্ষকরা এসে গেছেন তাঁদের বর্ণাঢ্য পালা নিয়ে। দু-ঘণ্টায় অ আ ক খ শেখা হয়ে যাবে। মায়েদের অনুরোধ ছেলে-মেয়েদের পাঠিয়ে দিন। নিজেরাও আসতে পারেন। অভিনব এই পালায় গান আছে, ছড়া আছে, বর্ণমালার নৃত্য আছে, লড়াই আছে। আসুন, আসুন, চলে আসুন। সাক্ষরতার এই কর্মসূচিকে সফল করুন। নাটকের শেষে আছে যোগ। যোগীরাজ তপন তাঁর যোগপ্রদর্শন করবেন। তিনি বিশ্বব্রহ্মান্ড ঘুরে এসেছেন। তিনি কাচের বোতল, আলপিন, পেরেক, লোহার টুকরো সবই খেতে পারেন, জ্যান্ত মুরগি গিলে ফেলেন।’
তপনদা আমাদের পাশে বসেই মাছের মুড়ো খাচ্ছিলেন, সেই অবস্থাতেই মঞ্চের কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন, ‘কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ, ওসব নয়, ওসব নয়। আমার যোগ অন্য, যোগাসন, যোগাসন।’
ঘোষক তখন অন্য লাইনে চলে গেছেন, তিনি টোপ ফেলছেন, ‘অনুষ্ঠানের শেষে বিনামূল্যে চামচে বিতরণ করা হবে। এই চামচে দিচ্ছেন কলকাতার বিখ্যাত আচার কোম্পানি — টেস্ট অ্যাণ্ড ডান্স।’
একটা মানুষ যে দু-ঘণ্টার মধ্যে এমন রোগা হয়ে যেতে পারে, আমাদের আচারদাদাকে না-দেখলে বিশ্বাস হত না। শুনেছি ফাঁসির আসামির রাতারাতি সব চুল পেকে যায়। আচারদাদার মুখটা এতটুকু হয়ে গেছে। শুকিয়ে আমসি। কোমর থেকে প্যান্টুল ঝুলে-ঝুলে পড়ছে। চোখ দুটো মরা মাছের মতো। শীতলদাকে বলতে গিয়েছিল, ‘ধনে-প্রাণে মারবেন না স্যার!’
শীতলদা বলল, ‘ধনে মারলে আর প্রাণে মারব কেন?’
সাড়ে তিনটের সময় আমরা সব সেজেগুজে মঞ্চে উঠলুম। কুমুদস্যার এত খেয়েছেন যে, থেকে থেকেই শুয়ে পড়তে চাইছেন। মাঝে মাঝে হাই তুলছেন সুন্দরবনের বাঘের মতো। অন্তত বার চারেক বলেছেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে। এই তো শীতল, এই তো সেই ছেলে।’
স্টেজ সাজানো হয়ে গেছে। তারাপদ একপাশে আমগাছের কাট আউট খাড়া করে বসে আছে। গাছের তলায় ছোটোমতো প্লাস্টিকের একটা ঝুড়ি। আমগাছের ডালে ডালে হিসেব করে দশটা কাঁচা আম বেঁধেবুঁধে কোনোক্রমে ঝোলানো হয়েছে। শুধু আ শিখলে হবে না। কুমুদস্যার সঙ্গে-সঙ্গে কাউন্টিংও শেখাবেন। কম্বাইণ্ড কোর্স। ছেলেরা বলে বলে আম পাড়বে, এক, দুই, তিন। গোনাটাও শিখে যাবে। ঝুড়ি থেকে আম তুলে তুলে একজন আর একজনকে দেবে, আর কুমুদস্যার প্রশ্ন করবেন, ‘ক-টা পেলে? ক-টা হল?’
আমি এদিকে অজগরে ফিট হয়ে গেছি। গেমটিচার বিকাশস্যার নিজেই ইগলের দায়িত্ব নিয়েছেন। বন্ধু সরোজ ইঁদুর হয়েছে। সব ক্যারেকটারই রেডি। হেডস্যার হয়েছেন ঋষিমশাই। টেরিফিক দেখাচ্ছে। যোগীরাজ তপনদা কয়েকবার ৯ সেধে নিয়েছেন। স্টেজে নেমেই ঝট করে একটা আসন মেরে দেবেন। মুকুলের গান রেডি। সঙ্গে বাজবে ঢোল।
নির্মলস্যার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সভা দেখছেন। প্রচুর জমায়েত। বাচ্চাগুলো ডুমো মাছির মতো ওড়াউড়ি করছে। কালো, পাঁশুটে গোটাকতক কুকুরও এসে গেছে। দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। এরই মধ্যে কে কোথায় ধাঁই ধাঁই করে গোটাকতক চকোলেট বোমা ফাটিয়ে দিল। ঝাঁক ঝাঁক কাক কা কা করে উড়ছে। কুকুরগুলো গলা ফাটাচ্ছে।
শীতলদা বলল, ‘এই হল ফোক কালচার।’
নির্মলস্যার ছোটোমতো একটা বক্তৃতা দেবেন। প্রস্তুত হচ্ছেন। শীতলদা বলছে, ‘বেশি বড়ো করবেন না। লোকে বিরক্ত হয়ে পালাবে। সহজ করে দু-চার কথা।’
নির্মলস্যার বলছেন, ‘শীতলের মতো ছেলে হয় না। শীতলের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাদের সামনে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। স্বামীজি বলে গিয়েছিলেন, যেরকম শিক্ষা চলছে সেরকম নয়। সত্যিকার কিছু শিক্ষা চাই। খালি বইপড়া শিক্ষা হলে চলবে না। যাতে চরিত্রগঠন হয়, মনের শক্তি বাড়ে, বুদ্ধির বিকাশ হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায়, এইরকম শিক্ষা চাই। ছোটো ছেলেদের গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা গোছের শিক্ষা দেওয়াটা তুলে দিতে হবে একেবারে। কেউ কাউকে শিক্ষা দিতে পারে না। শিক্ষকমশাইরা শেখাচ্ছেন মনে করলেই সব নষ্ট হয়ে যায়। একটি ছেলের ভেতরেই সব আছে। সেগুলোকে কেবল জাগিয়ে দিতে হবে। শিক্ষকের কাজ সেইটাই। যে-বর্ণমালা ভেতরে আছে সেইটাকেই আজ আমরা জাগাব।’
সভার দিকে পেছন ফিরে নির্মলস্যার দু-হাত তুলে চিৎকার করে বললেন, ‘জাগো, বর্ণমালা জাগো।’
সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল মুকুলের গান, আং নমঃ, ঈং স্বাহা, ঊং বষট, ঐং হুং, ঔং বৌষট, অঃ বস্ত্রায় ফট। সঙ্গে বিশুর লাগগুমাগুম ঢোল।
মুকুলের বাবা পুরোহিত। দুর্গাপুজোয় মুকুল বাবার সঙ্গে তন্ত্রধারক হয়। করণ্যাসে অ, ঈ, আ আছে দেখে সেইটাই এখানে ছেড়ে দিল কায়দা করে। জিনিসটা জমেও গেল। ছেলেরা খুব মজা পেয়েছে। ফার্স্ট আইটেম শেষ হওয়া মাত্রই, শীতলদার সঙ্গে যেমন কথা হয়েছিল, একটা বছর তিনেকের বাচ্চা মেয়েকে স্টেজে তোলা হয়। এইবার অ আর অজগর একসঙ্গে তেড়ে আসবে।
মুকুল কালোয়াতি সুরে গাইছে, অ-এ অজগর আসছে তেড়ে। বুকে অ ফিট করে বিশু যেই এক পা এগিয়েছে, আমি অমনই অজগর নিয়ে খচরমচর করে ওভারটেক করে যেই-না তেড়ে গেছি, মেয়েটা চিলচিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে স্টেজ থেকে মেরেছে লাফ। ভয়ে ছুটছে খোলা মাঠের দিকে। অ-এর ভয়ে যে পালায় তাকে আর কী শেখানো যাবে! অতএব দ্বিতীয় পাঠ, আ-এ আমটি খাব পেড়ে। তারাপদ ভালসা কাঠের আমগাছ নিয়ে স্টেজের মাঝখানে। দুটো ছেলে আমতলায়।
নির্মলস্যার বলছেন, ‘পাড়ো বাবা পাড়ো, আ-এ আমটি পেড়ে খাও।’ কুমুদস্যার বলছেন, ‘একটা একটা করে পাড়ো, এক, দুই, তিন।’
ছেলে দুটো ঘাড় কাত করে একগুঁয়ের মতো বলল, ‘পেড়ে খাবুনি গো। বাবা কেন্নে দিলে খাব। চুরি করে খাবুনি। আমরা অমন নয় গো কত্তা। আমাদের ইমান আছে।’
ছেলে দুটো ডাঁটসে স্টেজ থেকে নেমে চলে গেল। আমরা দু-বার ধাক্কা খেলুম। আমার অজগর দু-পায়ের বেশি এগোতেই পারল না। তারাপদ তার সাধের আমগাছ নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো মাঝমঞ্চে ভ্যাবাচ্যাকা দাঁড়িয়ে আছে। সব প্ল্যান আপসেট। সভা থেকে এক ভদ্রলোক মঞ্চের কাছে এগিয়ে এলেন। বেশ ভালো দেখতে। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। সুন্দর সাজপোশাক।
তিনি এসেই চ্যালেঞ্জ করলেন, ‘এসব কী হচ্ছে! হচ্ছেটা কী!’
একটা বড়ো পিঁড়ের তলায় চারটে চাকা লাগানো ছিল। শীতলদাদের বাড়ির জিনিস। ভাইপোরা গাড়ি গাড়ি খেলে। শীতলদা সেইটা বাড়ি থেকে আনিয়েছিল। প্ল্যানটা ছিল হেডস্যার ঋষি সেজে ওটার ওপর বসে থাকবেন, আর আমরা গড়গড়িয়ে স্টেজে নিয়ে আসব।
ভদ্রলোকের তেরিয়া প্রশ্ন শুনে তিনি আমাদের বললেন, ‘পুশ।’
আমরা তাঁকে গড়গড়িয়ে স্টেজে নিয়ে এলুম। একেবারে সামনে, ভদ্রলোকের মুখোমুখি। ভদ্রলোক একটু হকচকিয়ে গেলেন।
হেডস্যার ঋষির মতোই হেসে, স্নিগ্ধ গলায় বললেন, ‘কী হচ্ছে, বুঝতে পারছেন না। আমরা বর্ণপরিচয় করাচ্ছি আধুনিক পদ্ধতিতে।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘একে পরিচয় করানো বলে না, আপনারা বর্ণমালার ভয় দেখাচ্ছেন। একটা শিশু প্রথম অক্ষর থেকেই ভয়ে জর্জরিত হচ্ছে। অ বলামাত্রই তাকে তেড়ে আসছে অজগর। জ্যান্ত গিলবে। তারপরেই আ-তে নিয়ে গিয়ে অন্যায় শেখাচ্ছেন। পরের বাগানে গিয়ে, পাঁচিল টপকে, আম পেড়ে খাও। রোজগার করে কিনে খাওয়া নয়। জোরজুলুম করে পেড়ে খাওয়া।’
আচারদাদা পাশ থেকে বললেন, ‘ওইজন্যেই বলেছিলুম, বদলান, এসব শেখাবেন না। দেশটা এসবেই ভরে গেছে। বলুন আ-এ আচার খাব পেড়ে।’
ভদ্রলোক ভ্রূকুটি করে বললেন, ‘কে আপনি? হু আর ইউ?’
‘আমি স্যার আচার কোম্পানি, টেস্ট অ্যাণ্ড ডান্স। এই প্রোজেক্টের স্পনসরার।’
‘গাছ থেকে আচার পেড়ে খাবে?’
‘গাছ থেকে কেন স্যার! রান্না বা ভাঁড়ার ঘরের কুলুঙ্গি থেকে। ঠিক দুপুরবেলা, ভূতে মারে ঢেলা। মা সবে একটু শুয়েছেন। চোখ দুটো লেগে গেছে। এমন সময় বিল্টু সোনা, জানলা বেয়ে উঠে আচারের জার খুলে....ওইজন্যে আমাদের জার তো কাচের নয়, ক্র্যাশপ্রুফ হেলমেটের মতো। পড়ে গেলেও ভাঙবে না। সেন্ট পারসেন্ট সেফ।’
ভদ্রলোক গর্জন করে উঠলেন, ‘না, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা না-বলে আচার পেড়ে খাবে না। ওটাও অন্যায়।’
‘তাহলে বর্ণপরিচয় হবে কী ভবে! তাহলে মুখ্যু হয়েই থাক।’
ভদ্রলোক হেডস্যারকে বললেন, ‘তারপরই ই আর ঈ-এর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেছেন সদ্ভাবের নয়, খাদ্য-খাদকের। সেকালের ওসব একালে আর চলে না। এইটুকু একটা ইঁদুর, লাভলি ইঁদুর, ভেলভেটি ইঁদুর ভয়ে কুঁকড়ে আছে, একটা ইগল তেড়ে আসছে। আর সেই হিংসা, সেই ভয়ের দৃশ্যে আপনি সেজে বসে আছেন ঋষি। ঋষিরা এ-যুগে অচল। এ-যুগ হল প্রতিযোগিতার, সংগ্রামের। লড়াই, লড়াই, লড়াই। লড়াই করে বাঁচতে হবে, বাঁচতে গেলে লড়তে হবে।’
হেডস্যার থতোমতো, ‘বিদ্যাসাগর তো এইভাবেই শিখিয়ে গেছেন, আমরা কী করতে পারি!’
‘আপনারা নতুন বর্ণপরিচয় লিখবেন নতুন কালের জন্যে।’
‘সেটা কেমন হবে?’ হেডস্যারের খুব উৎসাহ।
‘যেমন ধরুন, অ-এ অমিতাভ আসছে ওই।’
‘সে আবার কে?’
‘আরে মশাই অমিতাভ বচ্চন, ন্যাশনাল হিরো, এক্স এম পি। ছেলে-বুড়ো নাম শুনলে নেচে ওঠে। ‘শোলে’ দেখেছেন?’
‘না ভাই।’
‘বাড়ি গিয়ে দেখে নেবেন।’
‘আ-তে কী হবে?’
‘কেন! আ-তে আমজাদ ঢিসুম-ঢিসুম।’
‘আমজাদ আবার কে?’
‘বিখ্যাত ভিলেন, শোলের গব্বর সিং। কে-না তাঁর নাম জানে।’
‘ই-তে কী হবে?’
‘ইমরান নিচ্ছে রান।’
‘ইমরান কে?’
‘উঃ, আপনার অজ্ঞতা আকাশছোঁয়া। ইমরান হলেন পাকিস্তানি টেস্ট ক্রিকেট প্লেয়ার। যখন ওয়ান ডে খেলেন, সবই প্রায় ছয় আর চার।’
নির্মলস্যার বললেন, ‘স্বামীজিরও ওই এক কথা, শতাব্দীর প্রথম ভাগে বলে গেছেন, সমাজের বৈষম্য দূর করিয়া সাম্য আনিবার একমাত্র উপায় উচ্চবর্ণের শক্তির কারণস্বরূপ শিক্ষা ও কৃষ্টি আয়ত্ত করা।’
ভদ্রলোক সমর্থন করলেন, ‘দ্যাটস রাইট। শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামীজিকে টপকে বেরোবার উপায় নেই।’
হেডস্যারের গালে নকল দাড়ি, কুটকুট করছে। কুড়ুড়-কুড়ুড় করে চুলকোতে চুলকোতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খুলে ফেললেই তো হয়, আর রেখে কী হবে এই অস্বস্তি!’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। একটানে খুলে ফেলুন, পাটের দাড়ি। ঋষিদের যুগ শেষ, এখন...ঋষি কাপুরের যুগ।’
‘সে আবার কে?’
‘বাবা, বিখ্যাত তারকা, বিখ্যাত।’
‘উ-টা কী হবে?’
‘উপেনবাবু হলেন ঘেরাও। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে শিশুদের শৈশব থেকেই পরিচয় ঘটানো। গুডি গুডি, বোকা, বোকা বয়েজদের যুগ শেষ। যা হয় তা এখন থেকেই জানুক। বড়ো হয়ে যে ঘেরাও হবে তার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়বে বর্ণপরিচয়ে পড়েছি তো!’
‘ঊ কী করবেন?’
‘ভেরি ইজি। ঊর্ধ্ববাহু লাগাও স্লোগান। এটা স্লোগানের যুগ। মিছিলে যেতেই হবে। টিচাররাও মিছিল করে স্লোগান দিতে দিতে কানু-সিধু-ডহরে যাচ্ছেন। ঋ-তে ঋষি কাপুর ফিট হয়ে গেছে। এরপরে আপনারা ঠিক করবেন। এমন জিনিস ফিট করুন, যা একালের।’
হেডস্যার দাড়ি খুলে ফেলেছেন। নির্মলস্যার বললেন, ‘তাহলে আমাদের এই পালাটার কী হবে?’
‘বাতিল হবে। নতুন যুগের জন্যে নতুন পালা নিয়ে আসবেন।’
হেডস্যার মাথা নেড়ে বললেন, ‘ইয়েস স্যার!’
যোগীরাজ তপনদা স্টেজের ওপর ম্যাট পেতে খানিক যোগাসন দেখালেন এরপর। সভায় বয়স্ক যাঁরা ছিলেন, তাঁরা চিৎকার করতে লাগলেন, ‘ছোকরা অম্বল কীসে কমে!’
যোগীরাজ কম্বলের ওপর অম্বলের আসন দেখালেন। আমরা ঝিম মেরে বাসের আসনে বসে আছি। আচারদাদা সর্বস্ব খুইয়ে চুপসে গেছেন। কুমুদস্যার থেকে থেকেই বলছেন, ‘লাভের মধ্যে এই হল, আমার এতকালের রুপোর নস্যির ডিবেটা লস্ট। লস্ট ফর এভার।’
হেডস্যার বললেন, ‘এতদিনে ধরতে পারলুম আমার কীসে অ্যালার্জি! জুটে। যেই গোঁফ-দাড়ি পরেছি, অমনই শুরু হয়েছে হাঁপানির টান। বাড়ি ফিরেই সব চটের ব্যাগ দূর করব। প্লাস্টিক। এজ অব প্লাস্টিক।’
হেডস্যার হাঁপাচ্ছেন। বুকে সাঁইসাঁই শব্দ।
নির্মলস্যার বলছেন, ‘এতদিনে বুঝলুম, কেন সবাই ইংলিশ মিডিয়ামের জন্যে পাগল! অ, আ, ক, খ-এ বহুত ঝামেলা। এ বি সি অনেক সিম্পল।’
অন্ধকার পথ ধরে বাস চলছে। পেছনে কাগজের অজগরের খচরমচর শব্দ। ঈগলের তালপাতার ডানা ঘাড়ের কাছে খোঁচা মারছে।
শেষ মারটা মারলেন আমাদের আচারদাদা।
স্কুল কম্পাউণ্ডে আমরা বাস থেকে নেমেছি, তখনও সোজা হয়ে ভালো করে দাঁড়াইনি, আচারদাদা বললেন, ‘স্যার! বিলটা তাহলে স্কুলের সেক্রেটারির নামেই হবে!’
‘কীসের বিল?’
‘দশ পেটি জ্যাম, জেলি, আচার, আর এক হাজার চামচে।’
হেডসারের দম একেবারেই আটকে গেল। বিল তখন মাথায়। যোগীরাজ পিঠের দু-পাশে চাপড় মারছেন। নির্মলস্যার চিৎকার করছেন, ‘ইনহেলার, ইনহেলার।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন