সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বড়োমামা সাইকেলের বল-বেয়ারিং-এ তেল দিচ্ছিলেন। মেজোমামা রকে জলচৌকির ওপর আয়না রেখে ছোটো মতো একটা কাঁচি দিয়ে গোঁফ ছাঁটছিলেন। আমি একটা বেতের মোড়ায় বসে বড়োমামার সবচেয়ে বড়ো খরগোশটার অপকর্ম দেখছিলাম। সেটা একটা জুতো পরিষ্কার করার বুরুশ কুড় কুড় করে খাচ্ছিল। ভেবেছিলাম সরিয়ে নেব। তারপর মনে হল কাজটা ঠিক হবে না। এ বাড়ির পশুদের স্বাধীনতায় বাধা দেবার মতো ডিক্টেটর যখন কেউ নেই, আমি তো একটা নেহাত থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার।
তেল দেওয়া শেষ। বড়োমামা চাকা দুটোকে বাঁই বাঁই করে বারকতক ঘুরিয়ে সাইকেলটাকে দেওয়ালে ঠেসিয়ে রাখলেন। তেল দেবার কেলে ডিবাটাকে পাঁচিলের ফোকরে রাখতে রাখতে বললেন—‘সাইকেল চাপবে সব ব্যাটা, তেল দিয়ে মরবে সুধাংশু ব্যাটা। কেন শুনি?’ বুঝলাম কথাটা বলা হচ্ছে মেজোমামাকে শুনিয়ে শুনিয়ে। মেজোমামার হাতের কাঁচির কুট কুট শব্দ থেমে গেছে। কান দুটো খাড়া খাড়া। কাঁচিটা চৌকির ওপর রেখে বললেন—‘তেল ছাড়াই সাইকেল চলে। তেল দেওয়া যাদের অভ্যাস তারা কিছু না—পেলে সাতসকালে সাইকেলেই তেল দেবে। মানুষের নেচার। নেচার তো আর পালটানো যাবে না।’
কিছুদূরে কলতলায় বড়োমামা হাতে সাবান ঘষতে ঘষতে কথাটা শুনলেন। শুনে সাবান দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ঘাড় ঘুড়িয়ে বললেন—‘গোঁফ ছাঁটচিস ছাঁট। সুধাংশু মুকুজ্জের চরকায় তেল দিতে আসিসনি। সুধাংশু মুকুজ্জে কবে কাকে তেল দিয়েছে রে? আই অ্যাম এ সেলফ মেড ম্যান।’
মেজোমামা কাঁচিটা হাতে তুলে নিলেন। ফুঁ দিয়ে কুঁচো ওড়াতে ওড়াতে বললেন—‘মিথ্যা বোলো না। এই মাত্র সাইকেলে তেল দিচ্ছিলে। বরং বলতে পারো আমি একটা লোক যে কাউকে তেল দেয় না, এমনকী সাইকেলেও নয়।’
মেজোমামার কথা কেরামতির সামনে বড়োমামা প্রায়ই একটু অপ্রতিভমতো হয়ে পড়েন। ঠিক পেরে ওঠেন না। আজও তাই হল। সত্যই তো তেল দিচ্ছিলেন সাইকেলে। এই মাত্র, একটু আগে। নিজেই মেজোকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলেন—তেলের ব্যাপারটা তাঁরই। বড়োমামা কলের তলায় হাত পেতে চারদিকে ছেলেমানুষের মতো খানিক জল ছিটোলেন, তারপর তারেঝোলা তোয়ালের এক কোণে হাত মুছতে মুছতে দেরিতে হলেও জবাবটা যেন খুঁজে পেলেন—‘তুইও একটি জায়গায় তেল দিস এবং ভালো করেই দিস।’
মেজোমামার হাতের কাঁচি আবার থেমে গেল। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন—
‘আমি! আই নেভার টাচ অয়েল।’
‘হ্যাঁ, তুমি।’ বড়োমামা গলাটা একটু বিকৃত করে বললেন, ‘তুমি রোজ সকালে চানের আগে তোমার নাইকুন্ডুলে আধবাটি তেল ঢালো। সকলে জানে। জিজ্ঞেস করে দেখো তুমি সকলকে!’
‘সে তো নিজের শরীরে, স্বাস্থ্যরক্ষার্থে। এ তেল কি সে তেল নাকি। অয়েলিং মাই ওন মেশিন।’
‘ওই হল রে। নিজেকে নিজে যারা তেল দেয় তারা ভয়ংকর লোক। ভয়াল, ভয়ংকর অজগর সর্প। বড়োমামা মুখটাকে হাঁ মতো করে হাত-পা নেড়ে মেজোমামার ভয়ংকর চরিত্রটা বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
এইবার বড়োমামার নজর পড়ল আমার দিকে। মোড়ার ওপর পা গুটিয়ে বসে বসে মজা দেখছিলুম। খরগোশটা জুতো ঝাড়া বুরুশটাকে টানতে টানতে প্রায় পায়ের কাছে এনে তিনের চার অংশই মেরে দিয়েছে। গোঁফের সঙ্গে বুরুশের চুল জড়িয়ে আছে।
‘তুই এখানে বসে বসে চোরের মতো কী করছিস? তোকে আমি সেই সকাল থেকে গোরুখোঁজা খুঁজছি।’
‘আমি তো সারাসকাল এখানেই বসে আছি। দেখতে পাননি।’
‘দেখার কি উপায় আছে। অতবড়ো একটা পর্বতের আড়ালে বসে আছিস। তিন ঘণ্টা ধরে শুধু গোঁফই ছেঁটে যাচ্ছে! গোঁফের জন্যে জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল।’
মেজোমামা হাঁটু খুলে মেঝে থেকে উঠতে উঠতে একটু টাল খেয়ে পড়ে যাবার মতো হলেন। অনেকক্ষণ পা মুড়ে বসে থাকার জন্যেই বোধ হয়। সেই টাল খাওয়া অবস্থাতেই মেজোমামা বললেন, ‘তুমি গোঁফের মর্ম কী বুঝবে বলো? তোমার তো সব চাঁচাছোলা—প্লেন। পুরুষের মতো পুরুষ যারা তাদের সব ইয়া ইয়া গোঁফ। গোবর, গামা, বড়ে গোলাম আলি, আখতার সিং, স্বর্ণ সিং। তুমি সুধাংশু মুকুজ্জে, তোমার না-আছে গোঁফ, আর না-আছে দাড়ি।’ মেজোমামা বেকায়দা অবস্থা থেকে কথা বলতে বলতে সটান উঠে দাঁড়ালেন, এক হাতে আয়না অন্য হাতে কাঁচি। এতক্ষণ আমার ওপর নজর পড়েনি, এইবার পড়ল।
‘তুইও আমার মতো গোঁফ রাখবি! গোঁফ না-রাখলে পুরুষ মানুষকে মেনি বেড়ালের মতো দেখায়।’
বড়োমামা জুতো পরছিলেন। এক পায়ে জুতো, জন্য পা রকের কোনায় ঘষে ঘষে ধুলো ঝাড়ছিলেন। মেজোমামার মন্তব্যে উত্তর না-দিয়ে পারলেন না, ‘ডাক্তারদের তোর মতো গুঁপো হলে চলে না বুঝেছিস। আমার মুখ দেখে রোগীদের আদ্দেক অসুখ সেরে যায়। আমার মুখখানা দেখেছিস? অনেকটা যিশুর মতো। এমুখ দেখলে মানুষ ভরসা পায়, তোর মুখ দেখলে ভিরমি যায়।’
মেজোমামা একটা প্রাণখোলা হাসি হাসলেন, তারপর একখানা সংস্কৃত ছাড়লেন—‘অকৃমং বাল ভাষিতং।’ দুম দুম করে এগিয়ে গেলেন কলের দিকে, যাবার সময় একহাত দিয়ে তার থেকে তোয়ালেটা টেনে নিলেন। গোটা কয়েক হ্যাঙার ঝুলছিল। পাকা আমের মতো টপাটপ পড়ে গেল! বড়োমামার কুকুর লাকি এক পাশে মৌজ করে শুয়েছিল। একটা পড়ল তার ঘাড়ে। সে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। খরগোশটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে পালাল।
জুতো পরা শেষ। বড়োমামা বললেন—‘চল।’ তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে নিলুম। ‘কোথায় যাবেন?’
‘চল চল। কলে যাব। সাইকেলের কেরিয়ারে বসতে পারবি তো?’
‘কেন পারব না?’
মেজোমামা মুখে জল থাবড়াতে থাবড়াতে বললেন, ‘কেন ছেলেটাকে খানায় ফেলবে, তোমার তো ব্যালেন্স নেই। বেশ বসে আছে চুপচাপ। কেন সুখে থাকতে ভুতে কিলোবে।’
বড়োমামা আমার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বললেন—‘যাবি না তুই?’
মহাবিপদে পড়লাম। কার কথা শুনি। আমি কিছু বলার আগেই মেজোমামা বললেন, ‘না, না, তোমার সঙ্গে ও কোথায় যাবে? ওর জীবনের দাম আছে।’
বড়োমামা গম্ভীর গলায় বললেন—‘উত্তরটা আমি ওর কাছ থেকেই শুনতে চাই। নট ফ্রম এনি থার্ড পার্সন।’ বড়োমামা আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আশু ময়রার বাড়িতে কল আছে। এই বড়ো বড়ো সন্দেশ খাওয়াবে। একলা আর কত খাব। তুই তবু কাছে থাকলে খাওয়ার ব্যাপারে একটু হেলপ করতে পারবি। চল, উঠে পড়। রোদ চড়ে যাচ্ছে।’
মোল্লার চকে আশু ময়রার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। লোভ সামলানো খুব মুশকিল। উঠে পড়তে হল। মেজোমামা বললেন, ‘ডাক্তার আমি অনেক দেখেছি, তবে পেটুক ডাক্তার বড়ো একটা দেখা যায় না। সেদিক থেকে তুমি অবশ্যই দর্শনীয় বস্তু। ডাক্তার না-হয়ে বামুন হওয়াই উচিত ছিল।’
‘ডিসপেপসিয়ায় সারাজীবন ভুগলে সুস্থ মানুষকে পেটুক বলেই মনে হবে। তোর দোষ নেই রে, তোর ভাগ্যের দোষ। সারাজীবন ঘুমিয়েই কাটালি একটু ব্যায়াম করলি না। বদহজমে মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। আর পাগলে? পাগলে কী না বলে? বাকিটা তুই বল?’ বড়োমামা আমার ডান কানটা একটু মুচড়ে দিলেন।
‘ছাগলে কী না খায়’ বলে পাদপূরণের সাহস হল না। মেজোমামাকে ছাগল বলাটা খুব গর্হিত কাজ এই বুদ্ধিটা অন্তত আমার আছে। বড়োমামা ইতিমধ্যে সাইকেলটাকে হাঁটাতে হাঁটাতে বাড়ির বাইরে বাগানে গিয়ে পড়েছেন। সামনের রডে ক্ল্যাম্প দিয়ে আটকানো কালো রঙের ডাক্তারি ব্যাগ। গলার দু-পাশে বুকের ওপর ঝুলছে বুক-দেখা যন্ত্র। লম্বা চওড়া ফর্সা চেহারা। মুখে সবসময় একটা হাসি লেগেই আছে।
বড়োমামা পকেট থেকে কাগজে মোড়া দুটো পিপারমিন্ট লজেনস বের করলেন। একটা আমাকে দিলেন। মোড়ক খুলে অন্যটা নিজের মুখে ফেলে দিলেন, ‘বুঝলি, সবসময় নিজেকে কোনো-না-কোনো কাজে ব্যস্ত রাখবি। একদম আইডল থাকবি না। যখন কোনো কাজ নেই তখন লজেনস খাবি। নে উঠে বস। দু-পাশে পা ঝুলিয়ে দে আর কেরিয়ারের সামনের সিটের পেছনের এই প্যাঁচানো লোহার গোলটা শক্ত করে ধরে ব্যালেনস রেখে বস। ছটফট করবি না। বারে বারে ঘাড় ঘোরাবি না।’
বড়োমামার সাইকেল চলল কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে। ঝাঁকুনিতে হ্যাণ্ডেলের বেলটা টিন টিন শব্দ করছে। মাঝে মাঝে সাইকেলটা লগবগ করে উঠছে। বড়োমামা বলেছেন, ‘ভয় পাবি না একদম।’ দূরে রাস্তা জুড়ে একটা গোরুর গাড়ি আসছে। দু-পাশে বিশাল নর্দমা। আমি একটু মিনমিনে গলায় বললুম, ‘বড়োমামা, নর্দমা।’ বড়োমামা, বললেন ‘স্টেডি থাক, দেখ-না নর্দমার পাশ দিয়ে কায়দা করে সুট করে বেরিয়ে যাব। তুই বরং চোখ বুজে থাক।’
চোখ বুজিয়েই মেজোমামার কথা মনে পড়ে গেল—‘কেন ছেলেটাকে মারবে।’ বড়োমামা বললেন, ‘পা দুটোকে ছড়াসনি, গোরুর গাড়ির চাকায় ঘষে যাবে, ক্লোজে করে রাখ।’ পাশ দিয়ে হাওয়ার মতো কী একটা বেরিয়ে গেল। চোখ খুললাম। গোরুর গাড়ি পেরিয়ে এসেছি। সামনে ফাঁকা রাস্তা সটান বেরিয়ে গেছে। বড়োমামা সাইকেল স্পিড দিলেন। বললেন, ‘দেখলি তো, একে বলে সাইকেল চালানো। আমিও চোখ বুজিয়ে ছিলুম। ভয় পেলেই চোখ বুজিয়ে ফেলবি। আমার ঠাকুমা শিখিয়ে গিয়েছিলেন।’
‘আপনি চোখ বুজিয়ে ছিলেন?’
‘হ্যাঁ রে। তা না-হলে তো খানায় পড়ে যেতুম। ঠাকুমার শিক্ষা আজও ভুলিনি।’
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে সাইকেলের পেছনে বসে রইলুম। ঠাকুমা কী মারাত্মক শিক্ষা বড়োমামাকে দিয়েছিলেন! বড়োমামা এখন গুন গুন করে গান গাইছেন, ‘কী রে ঘুমোলি নাকি?’
‘সাইকেলে বসে কেউ ঘুমোয় নাকি?’
বড়োমামা হাসলেন, ‘আমি তখন তোর মতো ছোটো। বাবার সাইকেলের পেছনে বসে তুই যেমন চলেছিস, আমিও চলেছি বাবার সঙ্গে কলে। সময়টা কেবল তফাত। সকাল নয় রাত্রি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। হাত আলগা হয়ে ধপাস! ওদিকে বাবাও চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়েছেন! টের পাননি আমি পড়ে গেছি। বাবার আবার ভীষণ ভুলো মন। রুগির বাড়ি গিয়ে খেয়ালই হয়নি যে আমি সঙ্গে ছিলুম। রুগিটুগি দেখে ঘুরপথে বাবা বাড়ি চলে এসেছেন। মা জিজ্ঞেস করলেন—‘ন্যাড়াকে কোথায় রেখে এলে?’ বাবা তখন খেতে বসতে যাচ্ছেন। লাফিয়ে উঠলেন—‘তাই তো?’
ঝগড়া করতে করতে দুটো কুকুর সাইকেলের সামনে চলে এসেছে। বড়োমামা কায়দা করে কাটাতে গেলেন। ভীতু কুকুরটা পালাল। মোটা কেলে কুকুরটা সামনের চাকায় এসে পড়ল। তারপর কী হল বোঝা গেল না, কুকুরটার একটা পা জড়িয়ে গেল স্পোকের সঙ্গে। বড়োমামা, আমি এবং কুকুর তিনজনেই ডিগবাজি খেয়ে রাস্তার ধারের ঘাসের ওপর পড়ে গেলুম। সাইকেলটা বড়োমামার ঘাড়ের ওপর শুয়ে পড়ল।
শুয়ে শুয়েই বড়োমামা বললেন—‘আমার দোষ নেই। দেখলি তো কেলে ব্যাটা চাকায় জড়িয়ে গেছে। তুই বলতে পারবি না যে আমি ফেলে দিয়েছি।’ বড়োমামা প্রথমে উঠলেন ধুলোটুলো ঝেড়ে। আমাকে হাত ধরে টেনে তুললেন। সাইকেলের চাকায় পা জড়ানো অবস্থায় কুকুরটা তখন মর্মান্তিক আর্তনাদ করে চলেছে।
রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে বড়োমামা কুকুরটার অবস্থা ভালো করে দেখলেন। আমি বড়োমামার চেয়ে আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখলুম, ডান পাঁ-টা চাকার স্পোকে পাকিয়ে গেছে।
‘বড়োমামা?’
‘বল?’
‘দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ তো ছাড়ানো যাবে না। ছাড়াতে গেলেই কামড়ে দেবে।’
‘হুঁ, বলেছিস ঠিক। এরকম ঘটনা আগে কখনো দেখেছিস?’
‘না বড়োমামা। এ জিনিস দেখা যায় না। পা-টা বোধ হয় অ্যামপুট করতে হবে।’
বড়োমামা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, ‘কী যে বলিস? ডাক্তার হয়েছি কী করতে? দেখেছিস, কুকুরটার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে?
‘আপনি ওর চিৎকারটা বন্ধ করতে পারেন?’
বড়োমামা উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে আবার দুটো লজেন্স বেরোলো। একটা আমার। একটা বড়োমামার। লজেন্সটা চুষতে চুষতে বড়োমামা বললেন—‘আমার কেরামতিটা একবার দেখ।’
‘হাত দেবেন নাকি?’
‘দেব, তবে একটু পরে।’
‘সাইকেল থেকে ডাক্তারি ব্যাগটা খুলে দিলেন। ব্যাগ থেকে বেরোলো ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, ওষুধের অ্যামপুল। শুনেছি, কুকুরে কামড়ালে পেটে ইঞ্জেকশন নিতে হয়। ভাবলুম, বড়োমামা বোধ হয় আগেই নিজের পেটে ছুঁচ ঢুকিয়ে তারপর কুকুরটাকে ধরবেন কারণ ধরামাত্রই কুকুর কামড়ে ছিঁড়ে দেবে।
না। বড়োমামা করলেন কী, কুকুরটার পাছায় পুট করে ছুঁচটা ঢুকিয়ে দিলেন।
‘কী লাগালুম বল তো? মরফিয়া, কুকুরটা ঘুমিয়ে পড়বে দেখবি।’
কিছুক্ষণের মধ্যে কুকুরটা লটকে পড়ল। বড়োমামা আস্তে আস্তে পা-টা বের করে আনলেন। শোচনীয় অবস্থা। পা-টা পেঁচিয়ে গেছে।
‘একটা গাছের ডাল ভেঙে আনতে পারিস?’
দুরে একটা বেড়ার ধারে জিওলগাছ হয়েছিল। একটা ডাল তৎক্ষণাৎ ভেঙে নিয়ে এলুম। বড়োমামার ব্যাগ থেকে চওড়া ব্যাণ্ডেজ বেরোলো। ডাল দিয়ে টাইট করে কুকুরটার পা ব্যাণ্ডেজ করা হল।
‘নে, ধর।’
চ্যাংদোলা করে একটা ঝোপের ধারে কুকুরটাকে শুইয়ে দেওয়া হল। কখন জ্ঞান হবে কে জানে। বড়োমামা বললেন—‘চড়া ডোজ দিয়েছি। বিকেলের আগে জ্ঞান হবে বলে মনে হয় না।’
সাইকেলের হ্যাণ্ডেলটা বেঁকে গিয়েছিল। সামনের চাকার ওপর ঘোড়ার মতো বসে দু-হাত দিয়ে বড়োমামা হ্যাণ্ডেলটা ঠিকঠাক করলেন। সাদা প্যান্টে খাবলা খাবলা ধুলো। বড়োমামাকে তখন ডাক্তার নয়, মিস্ত্রির মতো দেখাচ্ছিল।
‘বিকেলে আবার কুকুরটাকে দেখে যেতে হবে। জায়গাটা মনে রাখিস। কালভার্টের ধারে ভাঁটফুলের ঝোপ।’
সাইকেলে উঠতে উঠতে বড়োমামা বললেন—‘ইস, ভীষণ দেরি হয়ে গেল রে, আমার রুগি বোধ হয় এতক্ষণ টেঁসে গেল।’
বড়োমামার সাইকেল এবড়োখেবড়ো রাস্তার ওপর দিয়ে হুড়মুড় করে চলল। আমি ভয়ে সিঁটকে বসে রইলুম। একবার আছাড় খেয়েছি আর একবার খেতে কতক্ষণ। হাঁটুর কাছটা ছড়ে গেছে, বেশ জ্বালা করছে। ঘাড়টা মটকে গিয়ে ভীষণ ব্যথা করছে।
‘তোর কোথাও লেগেছে নাকি রে!’
হাসি হাসি গলা করে বললুম—‘না বড়োমামা। খুব একটা লাগেনি।’
‘লাগবে কী করে বল, আমরা তো আস্তে আস্তে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লুম, তাই না? মেজোকে কিন্তু একটা কথাও বলবি না। বললে হই হই করে বাড়ি মাথায় করবে।’
একটা লাল রকওলা বড়ো বাড়ির সামনে বড়োমামা সাইকেল থেকে নামলেন। মার্বেল পাথরের ফলকে লেখা, ‘পঞ্চী লজ’। রকের পাশে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা বাচ্চা ছেলে আমের আঁটি চুষছিল। বড়োমামাকে দেখে ‘ডেক্তার এসেছে, ডেক্তার এসেছে’—বলে বাড়ির ভেতর দৌড়োল। বড়োমামা সাইকেলটা ঢোকাচ্ছেন, বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন মিশকালো বিশাল মোটা এক ভদ্রলোক। বেঁটে, মাথার চুল কাঁচা-পাকা, পালোয়ানের মতো ছাঁটা পাকা পুরুষ্ট দু-জোড়া গোঁফ ঠোঁটের ওপর কাঠবিড়ালির ল্যাজের মতো বসে আছে। পরনে লাল গামছা, গায়ে একটা হলদেটে রঙের টাইট ফতুয়া। ভুঁড়িটা ঠেলে উঁচু হয়ে আছে। খালি পা।
‘এসো এসো, ডাকতির এসো,’ গরিলার থাবার মতো দুটো হাত তুলে বড়োমামাকে সাইকেল সুদ্ধ প্রায় জড়িয়ে ধরেন আর কী! বড়োমামা কোনো রকমে রক্ষে পেলেও আমি পেলুম না।
‘খোকাটি কে?’ যেই বড়োমামা, বললেন, ‘ভাগনে’, ভদ্রলোক আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জমি থেকে ফুটখানেক ওপরে তুলে দুম করে ছেড়ে দিলেন। ‘কোনো ওজোন নেই ডাক্তারবাবু। একেবারে দুবলা। খায়-টায় না নাকি!’
সাইকেলটা উঠোনের কোণে দাঁড় করাতে করাতে বড়োমামা বললেন, ‘আর বলবেন না, আমাদের বংশের কলঙ্ক। খাচ্ছে দাচ্ছে কোথায় যে সব যাচ্ছে। গায়ে কিছুই লাগছে না। ব্যাটার পেটে বোধ হয় ক্রিমির বংশ আছে। দাঁড়ান না, আমার পাল্লায় পড়েছে, ক্রিমির বংশ ধ্বংস করে দিচ্ছি।’
‘ক্রিমি!’ আশুবাবু শব্দটাকে এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যেন তাঁর পায়ের কাছেই গোটা কতক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘রোজ সকালে এক গেলাস করে নিমপাতার রস খাওয়ান না। আমার ছোটো নাতিটার হয়েছিল। সারাদিন খাই খাই করত, এখন রোজ দশটার বেশি সন্দেশ খায় না।’
আশুবাবুর সারা গায়ে একটা টকটক ছানার জলের গন্ধ। ছানার জিনিস সুস্বাদু, কিন্তু গন্ধটা সহ্য করা শক্ত।
‘কার অসুখ আশুবাবু!’ এবার ডাক্তারের মতো গম্ভীর গলা বড়োমামার।
আশুবাবু হাত কচলে অপরাধীর মতো গলায় বললেন, ‘আমার অসুখ’।
চলমান পাহাড়ের মতো আশুবাবুর গামছা আর ফতুয়া পরা শরীরের দিকে বড়োমামা অবিশ্বাসীর চোখে তাকিয়ে রইলেন। আশুবাবু বড়োমামার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝলেন, ডাক্তারবাবু বিশ্বাস করছেন না।
উঠোনের চারদিকে চওড়া লাল রক, চকচকে তেলা। একদিকে গোটাকতক দামি পুরু সোফা। আশুবাবু বড়োমামা আর আমাকে নিয়ে সেইদিকে এগিয়ে গেলেন। বসতে বসতে বড়োমামা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে কী?’
‘মেয়েরা বলছে ভূতে ধরেছে, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে অন্য রকম। ওরা সব রোজাও এনেছিল। ওই ব্যাটা দক্ষিণ পাড়ার পরশুরাম। অনেক টাকার ধার খেয়ে রেখেছে আমার দোকান থেকে। সেই ঝালটাই আমার ওপর রোজা সেজে ঝাড়ল। কী ঝ্যাঁটাই যে পিটেছে আমার পিঠে, এই দেখো ডাক্তার।’ আশুবাবু ছলছল চোখে পিঠ খুলে বড়োমামাকে দেখালেন। কালো কুচকুচে চওড়া পিঠে দাগড়া ঝ্যাঁটার দাগ।
‘ঝ্যাঁটাটা নতুন ছিল না পুরোনো?’ বড়োমামার অন্য ধরনের প্রশ্ন।
‘পুরোনো ঝ্যাঁটা ডাক্তার। একেবারে মুড়ো খ্যাংরা। আমার নিজের পরিবার উঠোনের কোণ থেকে নিজে হাতে করে সেই শয়তানটার হাতে তুলে দিলে। এও এক প্রতিশোধ।’
পেছনে দরজার পাশে চুড়ির শব্দ হল প্রথমে, তারপর শোনা গেল একখানা গলার মতো গলা। মনে হল, আট রকমের বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে আট রকমের সুরে বাজছে, ‘বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরেছে। প্রতিশোধের কী হয়েছে। আত্মার ভর করল, ভালোর জন্যে রোজা ধরে আনলুম। কথা দেখো। বলে যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর।’
‘শোনো ডাক্তার, তুমিই এর বিচার করো।’
আশুবাবু চোখের জল মুছে তেড়েমেড়ে উঠলেন, ‘তুমি তিত্থি করতে যাবার জন্যে টাকা চেয়েছিলে—হ্যাঁ কী না।’ সওয়াল জবাব শুরু হয়ে গেল।
বড়োমামা বিচারকের আসনে।
উত্তর এল দরজার পাশ থেকে—‘হ্যাঁ।’
‘আমি কী বলেছিলুম?’
‘হাতে টেকা নেই, তিত্থি এখন মাথায় থাক। গঙ্গার ধারে শিবের মন্দিরে জল ঢালো। তারপর গুনগুন গ্যান গেয়েছিলে— গয়া গঙ্গা পেভাসাদি ক্যাশী ক্যাঞ্চি কেবা চায়।’
‘তুমি কী বলেছিলে?’
‘কিপটে বুড়ো, মলে কি ট্যাকা সঙ্গে যাবে?’
‘আর কী বলেছিলে?’
‘আর কিছু বলিনি।’
‘বলোনি? মিথ্যেবাদী। এই নারায়ণের মাথায় হাত রেখে বলো তো, আর কিছু বলিনি।’ আশুবাবু সোফা থেকে আমাকে খামচে তুলে ধরে দরজার দিকে ঠেলে দিলেন। অন্য সময় হলে রেগে যেতুম, যেহেতু নারায়ণ বলেছেন তাই রাগলুম না।
দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আর বলেছিলুম চোরের ধন বাটপাড়ে খায়।’
‘আমি চোর?’—আশুবাবু সপ্তমে চিৎকার করে উঠলেন। বড়োমামা চোখ বুজিয়ে ছিলেন। আচমকা চিৎকারে চমকে উঠলেন। হাত থেকে বুক-দেখা যন্ত্র ছিটকে পড়ল। বড়োমামা উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত তুলে বললেন—‘বাস বাস, নো মোর।’
বিচারকের গলায় ইংরেজি শুনে আশুবাবু শান্ত হলেন। আমি দরজার কাছে ভেঁদার মতো দাঁড়িয়েছিলুম। বড়োমামা ডাকলেন ‘চলে আয়।’ বড়োমামা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক্তারি ব্যাগ খুললেন। বেরোলো অ্যালুমিনিয়ামের চকচকে একটা কৌটো। আশুবাবু আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘পান নাকি ডাক্তার, জর্দা দেওয়া’?
বড়োমামা খুব রেগে আছেন মনে হল, কোনো উত্তর নেই।
কৌটো হাতে আবার সোফার ওপর চেপে বসলেন। পান খাবার লোভে আশুবাবুর চোখ চকচক করছে।
‘একটা দেবে নাকি ডাক্তার?’
কৌটো খুলতে খুলতে বড়োমামা বললেন, ‘দেবার জন্যেই তো এসেছি।’
কৌটো থেকে পান বেরোল না, বেরোল ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। আশুবাবু যে এত ভালো দৌড়োতে পারেন জানা ছিল না। নিমেষে একটা কালো তাল উঠোনের ও-মাথায় বাথরুমের দিকে গড়িয়ে গেল! দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ হল। বড়োমামা সিরিঞ্জের পেছনে ধীরে ধীরে পিস্টনটা পরালেন। মুখে একটা লম্বা ছুঁচ ফিট করে উঠে দাঁড়ালেন। বড়োমামার চোখ দেখে মনে হল যেন বাঘ শিকারে যাচ্ছেন। দরজার দিকে মুখ করে বেশ ভারি গলায় আশুবাবুর পরিবারের উদ্দেশে বললেন, ‘কথাটা শোনা আছে নিশ্চয়—পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য। ইঞ্জেকশনটা তাহলে আপনাকেই নিতে হচ্ছে। কত্তা তো ভয়ে বাথরুমে পালালেন।’
বড়োমামার কথা শেষ হবার আগেই দুটো মোটা হাত দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে বিদ্যুতের গতিতে ছিটকিনি খুলে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। বড়োমামা আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন—‘নাউ হোয়াট টু ডু? সহজে ছাড়ছি না। ডাক্তার ডেকে ইয়ার্কি! এক ইঞ্জেকশনে ভূত ছাড়িয়ে দেব।’ বড়োমামা বন্ধ বাথরুমের দরজার কাছে সিরিঞ্জ হাতে এগিয়ে গেলেন। আশুবাবু বাথরুমে বন্ধ। দরজায় একটা টোকা মেরে বড়োমামা বললেন, ‘কতক্ষণ বসে থাকবেন? আমিও রইলুম দাঁড়িয়ে, ইঞ্জেকশন আপনাকে নিতেই হবে।’
‘আমার কিছু হয়নি ডাক্তার। মিছিমিছি বলেছিলুম।’
‘কী বলেছিলেন শুনি?’
‘ওই পরিবারকে জব্দ করার জন্যে। একমাস কথা বন্ধ করে দিয়েছিল কেন? তাই তো বলেছিলুম।’
‘কী এমন বলেছিলেন যে রোজা ডাকতে হল ভূত ছাড়াবার জন্যে?
‘বলেছিলুম, রোজ রাতে ঘর অন্ধকার করে শুলেই কে যেন কানের কাছে বলছে, আশু, আর কেন, তোর দিন তো শেষ হয়ে এল রে! আর বলেছিলুম, কানের কাছে অষ্টপ্রহর কে যেন কাঁসর-ঘণ্টা বাজাচ্ছে। সব মিছে কথা ডাক্তার। ভয় দেখাবার জন্যে বলেছিলুম।’
‘সব বুজেছি, এখন দয়া করে বেরিয়ে আসুন, পিঠের যা অবস্থা, পাঁচ লাখ পেনিসিলিন ঠুকে না-দিলে বিষিয়ে মারা যাবেন!’
‘ইঞ্জেকশন আমি নেব না ডাক্তার, তোমার পায়ে পড়ি। ইঞ্জেকশনে আমার ভীষণ ভয়। আমার বাবা ওইতেই মারা গিয়েছিলেন।’
‘তা বললে তো চলবে না। দেখেছি যখন আমায় ডাক্তারের কর্তব্য করতেই হবে।’
‘তোমাকে আমি ডবল ফি দেবো ডাক্তার। একমাস বিনা পয়সায় বড়ো বড়ো সন্দেশ খাওয়াবো, যত পারো।’
‘ঘুস আমি খাই না আশুদা।’
আশুবাবু ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললেন, ‘দয়া করো ডাক্তার। তোমার আর কী? তুমি আছো ফাঁকা হাওয়ায়, আমি এদিকে গরমে, গন্ধে মারা যেতে বসেছি।’
‘সেইজন্যেই তো দাঁড়িয়ে আছি। বেরোনো মাত্রই ফ্যাঁস।’
আশুবাবুর আর সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। বড়োমামা আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালেন। বাথরুমের ভেতর ভারী কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ হল।
‘কী হল বল তো!’
‘বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।’
‘হার্টফেল করেনি তো।’
‘দেখতে তো পাচ্ছি না বড়োমামা, তবে ভয়ে অনেকে হার্টফেল করে।’
‘সে কী রে? পুলিশ কেস হয়ে যাবে যে! চল পালাই।’ বড়োমামা ছুটে সাইকেলের কাছে গেলেন। আমিও ছুটলুম পেছনে পেছনে।
বড়োমামার সাইকেল ছুটছে হাওয়ার বেগে। ঝড় ঝড় ঝড় ঝড় শব্দ করছে। ইটে পড়ে মাঝে মাঝে বেমক্কা লাফিয়ে উঠছে। কোনো রকমে কেরিয়ারে ঝুলে আছি।
কিছু দূরে গিয়ে বললেন, ‘কোথায় যাই বল তো? চল পালাই। একটু পরেই তো পুলিশ আসবে। তারপর অ্যারেস্ট। ওরে বাবারে!’ বাবারে বলামাত্রই বড়োমামা টাল সামলাতে না-পেরে সাইকেল উলটে পড়ে গেলেন। আমিও কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়লুম।
ধুলোর ওপর শুয়ে শুয়েই বড়োমামা বললেন—‘চল থানায় গিয়ে সারেণ্ডার করি। তুই আমার সাক্ষী। উলটো-পালটা কিছু বলবি না। আমি যা বলব তাইতেই সায় দিয়ে যাবি। বেধড়ক মারলেও অন্য কিছু বলবি না।’
ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। মনে হল গলা ছেড়ে মে-জো-মা-মা-আ বলে চিৎকার করি।
থানার অফিসার টেবিলে মোটা রুল-কাঠ ঠুকতে ঠুকতে বড়োমামার বক্তব্য শুনলেন। কিছু বুঝলেন বলে মনে হল না। ব্যাপারটাকে বোঝার জন্যে আগাগোড়া নিজেই একবার বলে গেলেন—‘আশু ময়রা বাথরুমে ঢুকেছে। বেশ, ঢুকল। ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। ছুটে গেল কেন? ও বুজেছি। ভীষণ বেগ এসেছিল। আসতেই পারে, আমারও আসে, সকলেরই আসে। ভারী কিছু পড়ে যাবার শব্দ শুনলেন? ভারী, ভারী।’ ভারীর জায়গাটায় এসে অফিসার খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর চিন্তা দেখে আমরাও কাঠ হয়ে বসে রইলুম।
হঠাৎ অফিসার চিৎকার করে উঠলেন, ‘বুজেছি। বেগ যখন প্রবল তখন শব্দও তো ভারী হবে। দুই আর দুয়ে চার। সেই শব্দ শুনে ব্যাগ-ট্যাগ ফেলে আপনি দৌড়ে চলে এলেন থানায়। কেন এলেন?’
বড়োমামা বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আশুবাবু ইজ ডেড।’
‘ডেড!’ অফিসার হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘বাথরুমে আশু ডেড। বেশ ডেড। ধরে নিলুম ডেড। এতে আশুর অপরাধটা কোথায়? অ্যারেস্ট করার মতো অপরাধটা সে কী করেছে? আমি তো মশাই কিছুই বুঝছি না। এতে পুলিশ আসে কোথা থেকে?’

বড়োমামা বললেন,‘আমার মনে হচ্ছে, আশুবাবু ইজ ডেড|’
বড়োমামা বোকা বোকা মুখে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ কোনো তরফেই কোনো কথা নেই। শেষে অফিসার হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘পাবেন না, কিছু খুঁজে পাবেন না। ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের কোথাও লেখা নেই বাথরুমে ছুটে যাওয়া অপরাধ কিংবা, শব্দ করে মল ত্যাগ করা অপরাধ। ইনডিসেন্ট বলতে পারেন। তাই বা বলি কী করে— নেচারস কল।’ অফিসার উঠতে যাচ্ছিলেন, বড়োমামা বললেন, ‘আর একটু। আর একটা কথা।’ অফিসার বসে পড়লেন, ‘বলুন। তবে যা-ই বলুন, যে ভাবেই বলুন, কোর্টে প্রমাণ করতে পারবেন না। আশুকে জব্দ করতে চান, অন্যভাবে করুন, বাথরুম থেকে কায়দা করে বের করে এনে রাস্তায় করান, পাঁচ আইনে ফেলে দেবো।’
বড়োমামা বললেন, ‘সেকথা নয়। ধরুন, কেউ এসে বলল, আশুবাবুকে আমি মেরে ফেলেছি। তা হলে?’
অফিসার রুল নাড়া বন্ধ করলেন—‘সে তো মশাই সাংঘাতিক কথা! না, দাঁড়ান, হঠাৎ লোকে এমন কথা বলবে কেন? আর বললেই বা আমি বিশ্বাস করব কেন? আমরা কী কান-পাতলা লোক?’
‘না, ধরুন যদি বলে?’
‘বললেই হল? আচ্ছা বেশ, বলল। তখন আমরা ইনভেসটিগেশনে যাব। দেখব কীভাবে মার্ডার করেছেন। পোস্ট-মর্টেম পাঠাব। ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেব। সেই প্রিন্টের সঙ্গে আপনার হাতের প্রিন্ট মেলাব। মার্ডারের জায়গায় দেখব খুনী কিছু ফেলে গেছে কী না! মার্ডার কি মশাই ছেলেখেলা নাকি! অনেক জল ঘোলা করে তবে খুন হয়। অত সোজা নয় মশাই। ওসব আপনার কম্ম নয়। ভুলে যান ওসব।’ কথা শেষ করে অফিসার একটা হাঁক ছাড়লেন, ‘রাম খেলোয়ান!’ দূর থেকে উত্তর এল, ‘যাই হুজুর।’
‘টিফিন কেরিয়ার লে আও, আমি ফ্র্যাঙ্কলি বলছি মশাই, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে, খেতে বসব, আর আমাকে বিরক্ত করবেন না।’
বড়োমামা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালেন—‘একটা কথা।’
‘একটা একটা করে অনেক কথা সেই থেকে বলে গেলেন, আর একটাও কথা নয়।’
‘না, না, কথা নয়। একটা পারমিশান। আমরা এই থানার কাছে ঘুরে বেড়াতে পারি?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঘুরুন না, যত খুশি ঘুরুন। কত চোর-ছ্যাঁচোড় ঘুরছে, আপনারা তো সৎ নাগরিক।’
আমরা দু-জনে রাস্তায় এসে দাঁড়লুম। কিছু দূরেই একটা বটতলা। বটতলায় এসে আমরা পাশাপাশি বসলুম। পাশে সাইকেলটা দাঁড় করানো রইল! বড়োমামা আমার কানে কানে বললেন, ‘কোনো আশা নেই রে। নির্ঘাত প্রমাণ হয়ে যাবে। আমার ব্যাগটা আশুর বাড়িতে ফেলে এসেছি।’ আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলুম, আমারও চটি দু-পাটি ফেলে এসেছি।
‘বড়োমামা এখানে বসে থেকে কী হবে?’
‘তুই বুঝছিস না। যেকোনো মুহূর্তে আশুর বাড়ির লোক থানায় এসে যেতে পারে। এলেই আমি অফিসারের কাছে আত্মসমর্পণ করব। এতে সাজা অনেক কমে যাবে।’ বটতলায় বসে বসে দেখছি, লোকজন আসছে-যাচ্ছে। গাড়ি বেরোচ্ছে-ঢুকছে। সারাদিন খাওয়া নেই দাওয়া নেই। খিদেতে পেট চুঁই চুঁই করছে। বড়োমামার পকেটে লজেনসও আর নেই। সূর্য ক্রমশ পশ্চিমে ঢলে পড়ল। বটের ডালে ডালে পাখিদের কিচির-মিচিরও থেমে গেল।
‘বড়োমামা, আর কতক্ষণ?’
‘আর একটু দেখি রে। বলা যায় না। প্রথমে দরজা ভেঙে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, তারপর ওই পিঠে ঝ্যাঁটার দাগ! দেখবি আমার ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে। সাংঘাতিক জাঁহাবাজ মেয়েছেলে। একটা দিন একটু কষ্ট কর না আমার জন্যে। আমি ওই গারদে ঢুকলেই তুই চলে যাবি। তোর সঙ্গে আবার দেখা হবে সাক্ষীর কাঠগড়ায়, কোর্টে।’
থানায় পেটা ঘড়িতে দশটা বাজল। আমি বোধ হয় বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। বড়োমামা বোধ হয় ঢুলতে ঢুলতে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। পেটা ঘড়ির কানফাটানো শব্দ আর মেজোমামার ডাক ও ধাক্কায় ধড়মড় করে উঠে বসলুম। প্রথমে ঘুম চোখে বুঝতেই, পারছিলুম না কোথায় আছি! বড়োমামা ভেবেছেন ভোর হয়েছে, শুয়ে শুয়েই চোখ-না খুলে বললেন—‘রেখে যা।’
‘কী রেখে যাব?’
‘তুই চা নিয়ে এলি কেন? কষ্ট করে তোকে আবার কে আনতে বললে?’
‘চা নয়, চা নয়, উঠে বোসো।’ মেজোমামা ধাক্কা মারলেন।
বড়োমামা ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, ‘সারেণ্ডার।’ মেজোমামার কাছে সারেণ্ডার করায় মেজোমামা খুব খুশি হলেন। আমি তো জানি ব্যাপারটা কী।
মেজোমামা বললেন, ‘সারেণ্ডার করে ভালোই করলে; কিন্তু তোমার আক্কেলটা কী? বটতলায় পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছো, এদিকে আমরা ভেবে মরি। আশু ময়রা সেই দুপুরবেলাই লোক দিয়ে তোমার ব্যাগ, ফি-র টাকা, এক চ্যাঙারি ইয়া বড়ো বড়ো সন্দেশ পাঠিয়ে দিয়েছে। লোকটি বললেন, ডাক্তারবাবুর বড়ো বাইরে পেয়েছে বলে তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন। তোর চটি দু-পাটিও দিয়ে গেছে। কী হয়েছিল তোমাদের? থানায় ডায়েরি করতে এসেছিলুম, অফিসার বললেন, খুঁজে নিন, কাছাকাছিই আছেন, বড়োটির মাথাটা গেছে, ছোটোটাকে বোবা বলেই মনে হল’।
বড়োমামা লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘আশু বেঁচে আছে?’
‘বেঁচে আছে মানে? বহাল তবিয়তে আছে। আসার সময় দেখে এলুম গরম গরম রসগোল্লা ছাঁকচে। বেশি না, গোটা আস্টেক খেলাম। বেশি মিষ্টি খাওয়া ভালো নয়। সকালে ওই সন্দেশ থেকে গোটা আস্টেক খেয়ে ফেলেছি খাব-না খাব-না করে।’
বড়োমামা করুণ চোখে তাকালেন। ‘বড্ড খিদে পেয়েছে রে মেজো।’
‘চলো, বাড়ি চলো, কিছু জোটে কিনা দেখি।’
বড়োমামা জুতো খুলে রেখেছিলেন। দাঁড়াবার আগে পা গলাতে গিয়ে লাফিয়ে উঠলেন, ‘আমার জুতো!’ ঝুঁকে পড়ে আমরা সবাই দেখলুম জুতো নেই, মিসিং। এর পরের লাফটা আরো বড়ো, ‘আমার সাইকেল!’ বটতলাটা গোল হয়ে প্রদক্ষিণ করা হল, সাইকেলও নেই।
‘বুঝেছি!’ বড়োমামা বললেন, আমরা না বুঝে হাঁ করে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। মেজোমামা বললেন, ‘কী বুঝলে?’ উত্তর পাওয়া গেল না। বড়োমামা হনহন করে থানায় গিয়ে ঢুকলেন। আমরা পেছনে পেছনে। অফিসার চেয়ারে একটা পা তুলে ভীষণ চিৎকার করে ফোনে কথা বলছিলেন—‘দুটোর মাথা ঠুকে দে। পেটে গোটাকতক রুলের গোঁত্তা মার।’ কথা আর শেষ হতেই চায় না। ফোন নামাতেই বড়োমামা বললেন, ‘আমার জুতো আর সাইকেলটা দিন স্যার, এইবার বাড়ি যাই!’
অফিসারের মুখের নীচের চোয়ালটা ঝুলে পড়ল। জীবনে আমি কাউকে এমন অবাক হতে দেখিনি। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বড়োমামার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি কালই ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছি। দয়া করে আমায় মুক্তি দিন। সকালে ছিল খুন, এখন জুতো আর সাইকেল। আমাদের সারাদিন বড্ড খাটতে হয়, সবসময় ইয়ার্কি ভালো লাগে না।’
বড়োমামা অফিসারের বিনয়ে একটু ঘাবড়ে গেলেন, ‘না ঠিক ইয়ার্কি নয়, সাইকেল আর জুতোটা পাচ্ছি না। ঘুমোচ্ছিলুম তো, তাই ভাবলুম যদি তুলে রেখে থাকেন।’
‘আমাদের কী দায় পড়েছে মশাই ধরে ধরে লোকের জিনিস তুলে রাখব? কাল সকালে এসে খুঁজে নেবেন। আজ অন্ধকার তো।’
বড়োমামা বললেন, ‘তাই হবে।’
থানার বাইরে এসে বড়োমামা বললেন, ‘জুতোটা না-হয় বুঝলুম ছোটো জিনিস। কুকুরেও নিতে পারে। কিন্তু সাইকেল একটা বড়ো জিনিস। সেটা কেন খুঁজে পাচ্ছি না? কাল ভোরে এসে দেখতে হবে।’ উত্তরে মেজোমামা খুক খুক করে একটু কাশলেন।
বড়োমামা খুব নিরীহের মতো প্রশ্ন করলেন, ‘কী রে, ঠাণ্ডা লেগেছে নাকি? কতদিন তোকে বারণ করেছি পুকুরে স্নান করিসনি। বড়োদের কথা শুনবি না তো!’
মেজোমামা বললেন—‘ঠাণ্ডা নয়। গলাটা কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। অনেক মিষ্টি খেলাম তো সারাদিনে।’
ছ-ফুট লম্বা বড়োমামা আগে চলেছেন খালি পায়ে। আমরা পেছনে। মেজোমামা বললেন, ‘নেবে নাকি আমার এক পাটি জুতো? তোমার ডান পায়ে কড়া, আমার বাঁ-পায়ে। ভালোই হয়েছে। ভাগাভাগি করে পরি।’
‘দে তাই। বড্ড লাগছে।’ বড়োমামার করুণ গলা। দু-মামা ভাগাভাগি করে জুতো পরলেন। বড়োর ডান পায়ে, মেজোর বাঁ-পায়ে জুতো।
‘তোকে তখনই বলেছিলুম, বলিনি সকালে, বাড়িতে থাক, কথা শুনলি না। শুনে রাখ, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’ মেজোমামার উপদেশ শেষ হওয়ামাত্র বড়োমামা ফুঁসে উঠলেন, ‘যাবার পথে আশুকে আমি দেখে নেব।’
‘থাক, খুব হয়েছে। একবার তো দেখেছ, এখন ক্ষান্তি দাও। সে বেচারা দোকান বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। যাই বল, আশু হল জাত শিল্পী। যেমন রসগোল্লার হাত, তেমনি সন্দেশ। আমাদের পেনেটি গ্রামের গর্ব। হাতদুটো সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া উচিত।’
‘রাখ রাখ’ বড়োমামা অন্ধকার থেকে উত্তর দিলেন।
‘সুধাংশু মুকুজ্জের নাম ক-টা লোক মনে রাখবে? আমাদের আশু ময়রা অমর।’
মনে হল বড়োমামার চলার গতি বেড়ে গেল। এক পায়ে জুতো, এক পা খালি। হাঁটাটা তাই অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন