সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদু যখন সকালে বেড়াতে বেরোবেন তখন হাতে থাকবে পাকানো পাকানো বেতের লাঠি। সে লাঠির কী বাহার। বাবা এনে দিয়েছিলেন মুসৌরি থেকে। আর যখন কোনো কাজে বেরোবেন তখন আর লাঠি নয়, তখন আমি তাঁর পাশে এক চলন্ত লাঠি। দাদুর ভারী ডানহাত আমার কাঁধে। আমার উচ্চতাও ওই লাঠিটার মতোই। দাদুর হাতে আমার কাঁধটা বেশ ফিট করে যায়। চলন্ত লাঠির গতি যখন বেড়ে যেতে চায় দাদুর হাত তখন কাঁধ খামচে ধরে পাশাপাশি টেনে আনে। আমার চেহারাটাও ঠিক লাঠির মতো। মা বলেন, খ্যাংরা কাঠির মাথায় আলুর দম। হবে না! অত খেলে কারুর চেহারা ভালো হয়। অষ্টপ্রহর মুখ চলছে। দুঃখ হয় কথা শুনে, কিছু বলতে পারি না। দেওকীনন্দন বলেছে, ঘাবড়াও মাত। চানা চালাও, বঠকি লাগাও, পবননন্দন বন যাও। ঘাড় হো যায়গা লোটা কা মাফিক। হাত হো যায়গা ডাম্বেল কা মাফিক। সমঝা ছোটাবাবু?
এখন আমরা চলেছি দাঁতের ডাক্তারের কাছে। আমাদের শহরে যেখানে বাজার সেখানে একটা জুতোর দোকানের পাশে ছোটোমতো ডাক্তারখানা। ভাঁজ করা দরজার একদিকে একটা কাচের কেসে দু-পাটি দাঁত সবসময় আমার স্কুলের পন্ডিতমশাইয়ের মতো শীত নেই গ্রীষ্ম নেই খিঁচিয়েই আছে। আর একপাশের দরজায় মাফলার জড়ানো গালফুলো এক মুখের ছবি। যন্ত্রণাকাতর। তলায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, দন্তশূল, তিন শূলের এক শূল। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না-দিলে মরতে হয়। সামনের দিকে গালফুলোদের বসার জন্যে দু-পাশে দুটো বেঞ্চ। ভেতর দিকে পর্দার আড়ালে একটা উঁচু চেয়ার। সেইখানেই ঠেসে ধরে সাঁড়াশি দিয়ে দাঁত তোলা হয়। কোণের দিকে জলের কল, বেসিন। আমি দাদুর সঙ্গে চৌষট্টিবার এই দোকানে এসেছি। কোথায় কী আছে সব মুখস্থ।
দাদুর ওপরের পাটিতে ষোলো, নীচের পাটিতে ষোলোটা দাঁত ছিল। সবই এই ডাক্তারবাবু একটা একটা করে টেনে-টেনে তুলেছেন। বত্রিশ মাস সময় লেগেছে। দাদুর সে কী গর্ব। সকলের নাকি বত্রিশটা দাঁত থাকে না। ঠিক ঠিক ওপরে ষোলোটা আর নীচে ষোলোটা, দুই মিলিয়ে ঠিক বত্রিশ দাঁত, লম্বা খাড়া টানা টানা চোখ, মহাপুরুষের লক্ষণ। দাদুর সব ক-টা লক্ষণই স্পষ্ট। তবে একটাই যা দুঃখ, দাদুর সব ক-টা দাঁতই এই সিধুডাক্তারের সাঁড়াশি শেষ করে দিয়েছে। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দাদু বোঝেননি। মা আমাকে বকেন। দাদুকে তো বকতে পারেন না। দাদু যে মায়ের বাবা। অত মিষ্টি খেলে কাকুর দাঁত ভালো থাকে। দাদু আবার বাবাকে উপদেশ দেন, মিষ্টি খেয়েই বেশ ভালো করে কুলকুচো করে মুখ ধুয়ে ফেলবে, দেখবে দাঁত ঠিক থাকবে, একেবারে ছবির মতো। আশি বছরেও বসে বসে ছোলাভাজা চিবোচ্ছ। কচি কলাপাতা থেকে চেটে চেটে তেতুঁলের আচার খাচ্ছ টকাস টকাস শব্দ করে। দাদু যখন এইসব বলেন, আমি মনে মনে হাসি। যিনি বলছেন তিনি নিজেই এখন ফোকলা।
সন্ধ্যে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। সিধুডাক্তার লিকলিকে একটা ধূপ জ্বেলে দেয়ালে টাঙানো তাঁর গুরুদেবের ছবির সামনে কপালে দু-হাত ঠেকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মাথার চুল ছুঁয়ে পিন পিন করে ধূপের ধোঁয়া উঠছে। গুরুদেবকে মোটেই ভালো দেখতে নয়। দাঁতের ডাক্তারের গুরুদেব বলেই বোধ হয় দাঁত দুটো অত বড়ো বড়ো। ছবির দিকে তাকালেই আগে চোখ পড়ে যায় দাঁতে, তারপর গলার রুদ্রাক্ষের মালায়, তারপরই ভুঁড়িতে। কাউকে বলিনি, ছবিটা দেখলেই আমার মনে হয়, একেই বলে টাস্ক ফোর্স। টাস্ক হল হাতির দাঁত, সেইটাই ফোর্সে বেরিয়ে এসেছে সামনে। নিশ্চয়ই দেহ রেখেছেন। মহাপুরুষদের মৃত্যুকে বলে মহাপ্রয়াণ। আহা দাঁত দুটো ডাক্তারবাবু যদি খুলে নিয়ে ওই শোকেসে রাখতেন, সেখানে দু-পাটি দাঁত মুখ ছাড়াই পড়ে পড়ে হি হি করে ভূতে হাসি হাসছে। গুরুদেবের ছবির মাথায় ওপর কাঠের ব্রাকেটে একটি মাটির গণেশ। ভারি ভালো মানিয়েছে। না বাবা, এসব ভাবব না। ওনারা যেখানেই থাকুন যদি মনের কথা জেনে ফেলেন নির্ঘাত অঙ্কে ফেল করিয়ে দেবেন।
আমি হুড়মুড় করে দোকানে উঠতে যাচ্ছিলাম। দাদু টেনে ধরলেন, ‘দেখছ না পুজো হচ্ছে! হুড়মুড় করে ঢুকলেই হল। একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যাবে।’
দাদুর পাশেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম। কিছুক্ষণ পরেই সিধুডাক্তার ওই রকম কপালে ধূপসমেত হাত ঠেকানো অবস্থাতেই আমাদের দিকে ফিরলেন। চোখ আধবোজা! ঠোঁট নড়ছে বিড়বিড় করে। সেই ঠোঁটে আমাদের দেখে একটু হাসির রেখা উঠেই মিলিয়ে গেল। আমরা যে-দিকে দাঁড়িয়ে আছি সেট পশ্চিম। সূর্য ওই দিকে ডুবে গেছে অনেক আগে।
উনি ওই দিকেই নমস্কার জানাচ্ছেন। ঘুরে গেলেন দক্ষিণে। দক্ষিণ থেকে পূর্বে। পূর্বেই সেই দাঁততোলার বিদঘুটে চেয়ার ওই দিকে একটু বেশিক্ষণ নমস্কার হল। ওদিকে সূর্য ওঠে। তা ছাড়া ওই দিকেই তো দাঁত তোলা হয়। দেয়ালে বড়ো বড়ো করে লেখা, ফাইভ রুপিজ এ টুথ, টেন রুপিজ এ ফলস টুথ। নিজের দাঁত ফেলতেও টাকা, নকল দাঁত লাগাতেও টাকা। তবে আসলের চেয়ে নকলের দাম পাঁচ টাকা বেশি।
ডাক্তারবাবু হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘আরে মুকুজ্জেমশাই, আসুন, আসুন।’
আমরা ভেতরে ঢুকে পাশাপাশি বেঞ্চিতে বসলুম। দাদু বললেন, ‘তোমার পিতৃভক্তি দেখে মুগ্ধ হলুম!’
ঘাড় কাত করে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে ওই জোরেই তো করে খাচ্ছি। ঘুসি মেরেও তো দাঁত ফেলা যায়, কিন্তু এমন খুস করে দাঁত ফেলতে ক-টা লোক পারে। ওই তো বিলেতফেরত জোয়ারদার। টেন রুপিজ এ টুথ। এমন হ্যাঁচকা টান মারে চোয়াল উপড়ে চলে আসে। এক দাঁত তুলতে আর এক দাঁত তুলে ফেলে।’
‘সে যদি বলো, আমার বেলাতেও তোমার হাতে একবার সেই কেস হয়েছে।’
‘আজ্ঞে না মুকুজ্জেমশাই, ওটা আমি ইচ্ছে করে করেছিলুম। আমার চয়েস। দু-পাটি দাঁতই তো আমার হাতে ছিল। সব ক-টাই তোলার কেস, আগে আর পরে।’

...ঘুসি মেরেও তো দাঁত ফেলা যায়, কিন্তু এমন খুস করে দাঁত ফেলতে ক-টা লোক পারে..
‘ও যতই বলো তুমি, মানব না, আমি উকিল মানুষ। ও তোমাদের আদত। দাঁত বুঝতে পারো না। আমরাও যে কিছু বুঝতে পারব, সে উপায়ও রাখো না। ইঞ্জেকশন দিয়ে অসাড় করে দাও। আর দাঁত তোলার সময় তোমাদের চোখ-মুখের চেহারাও অসুরে মতো হয়ে যায়।’
‘হেঁ হেঁ, কী যে বলেন।’
‘হেঁ হেঁ নয়, চিরকাল তাই হয়ে আসছে। চোখেও ওই এক কিত্তি। ডান চোখে ছানি বাঁ-চোখ কেটে ব্লাইণ্ড করে দিলে। এরকম কেস আকছার হচ্ছে, যাক ওসব কথা। আমি এসে গেছি।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বসুন। আপনার দাঁত রেডি।’
ডাক্তারবাবু ভেতর থেকে নীল ভেলভেট মোড়া দু-পাটি দাঁত নিয়ে এলেন। টেবিলে খুলে রাখতেই মনে হল মুখ ছাড়াই দাদু হেসে উঠলেন। জিনিসটা দেখতে আসল দাঁতের মতো অমন ধবধবে সাদা নয়, একটু হলদেটে। নকল দাঁতের সঙ্গে নকল মাড়ি লাগানো। ভেলভেট দিয়ে ডাক্তারবাবু দাঁত দু-পাটি দাদুর হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘ফাসক্লাস।’
দাদু ফোঁস করে উঠলেন, ‘তুমি ফাসক্লাস বললেই তো আর ফাসক্লাস হবে না, আমাকে পরে দেখতে হবে।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়, আপনি পরে নিন। পরে দেখে নিন।’
দাদু এত বড়ো হাঁ করে দাঁত দু-পাটি একে একে পরে ফেললেন। খট খট করে দু-বার আওয়াজ হল। থলথলে মাংস ঝোলা ভালোমানুষ ভালোমানুষ মুখটা কেমন যেন একটুখানি কঠোর কঠোর হয়ে উঠল। দাদু আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী, কেমন বুঝছ?’
প্রত্যেকটা শব্দ উচ্চারণের সময় দাঁতের বাদ্য হল। দাদুর ভুরু কুঁচকে উঠল। অসুবিধে ধরে ফেলেছেন। আমি বললুম, ‘বেশ দেখাচ্ছে। তবে মুখটা যেন কীরকম বদলে গেল।’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘বা: তা দেখাবে না। যৌবন ফিরে এল যে। গালটাল সব ভরাট হয়ে গেল।’
দাদু বললেন, ‘সে আমি আয়নায় দেখব; কিন্তু কথা বলতে গেলে দুই রকম দন্তবাদ্য হচ্ছে কেন! মনে হচ্ছে শীতকালে বরফজলে চান করে কথা বলছি।—’
সত্যিই তাই। কথার পরেও কথা থেকে যাচ্ছে।
‘ও মুকুজ্জেমশাই প্রথম প্রথম একটু হবেই। নিজের দাঁত আর পরের দাঁত। তাছাড়া এতদিন মাড়ি খালি পড়ে ছিল, সেখানে হঠাৎ দাঁত এসে গেছে। অ্যাডজাস্ট করে নিতে দু-একদিন লাগবে।’
‘আরে, কালই যে আমার বড়ো আদালতে কেস আছে! ফ্রিডাম অফ স্পিচ না থাকলে বিপক্ষের উকিল তো আমাকে পথে বসিয়ে দেবে।’
‘তা হলে কাল না-হয় দাঁত খুলেই সওয়াল করবেন।’
‘তুমি বুঝছ না ডাক্তার, ফোকলা মুখে আইনের ভাষা ফসকে যায়, যেমন ধরো জুরিসপ্রুডেন্স, ম্যালাফাইড, লিটিগেশান, সাবগুডিস, অ্যাবরিভিয়েশন, অ্যাডজোর্নমেন্ট, অ্যালিমনি, সবই তো দন্তেষ্ঠ্য বর্ণ। দাঁত ছাড়া সওয়ালে কামড় কমে যায়। আদালত তো কামড়াকামড়ির জায়গা। পাকা নয়, ডাঁশা পেয়ারার কামড়। কাল আবার সেশান কোর্টে লড়াই।’
‘তা হলে আজ বরং বাড়ি গিয়ে আপনি ঘণ্টা তিনেক অনর্গল কথা বলে যান, যত সব শক্ত শক্ত ল্যাটিন, ফরাসি, গ্রিক আর ইংরেজি শব্দ। বেছে বেছে। তারপর কাপের জলে দাঁত দু-পাটি ভিজিয়ে রেখে শুয়ে পড়বেন।’
‘তা পড়ব, তবে কিছু একটু চিবিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। নতুন দাঁতের স্ট্রেংথ একটু টেস্ট করে দেখব না। যেমন ধরো চালভাজা, ছোলাভাজা।’
‘একেবারে অতটা শক্ত জিনিস দিয়ে বউনি করবেন? সেটা ঠিক হবে না। সবই পারবেন, তবে ধীরে ধীরে, সইয়ে সইয়ে। আজ আপনি ভাত বা রুটি খান চিবিয়ে চিবিয়ে, সজনেডাঁটা খান। তারপর ধরুন লেড়ে বিস্কুটে উঠলেন। প্রথম প্রথম কামড়াবার জন্য দাঁত একেবারে নিশপিশ করবে। মাড়ি সুড়সুড় করবে। যতই হোক নতুন দাঁত তো। শিশুদেরও নতুন দাঁত ওঠার সময় ওই রকমই হয়। জ্বর হয়, ঘ্যানঘ্যান করে, পেট খারাপ হয়, শক্ত বিস্কুট পেলে কড়মড় করে চিবোয়, আঙুল কামড়ে দেয়।’
‘আমারও জ্বর, পেট খারাপ হবে নাকি ডাক্তারবাবু?’
‘জ্বর হবে না, তবে পেটটা একটু সামলে। আর একটা সাবধান করে দি, দাঁত দিয়ে কোনো কিছু কামড়ে ছিঁড়ে আনার চেষ্টা করবেন না।’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরুন শাঁকালুর খোলা, কিংবা হাড় থেকে মাংস, আখ। ওই কুকুরে যেমন ছেঁড়াছিঁড়ি করে না, ওই জিনিসটা চলবে না, পাটি থেকে দাঁত খুলে যাবে।’
‘তা হলে আর কী দাঁত বাঁধালে তুমি?’
‘আজ্ঞে এ আপনি কী বলছেন। বাঁধানো দাঁত আর নিজস্ব দাঁতে একটু তফাত তো হবেই। নিজস্ব দাঁত এক-একটা মাড়িতে দু-ইঞ্চি তিন ইঞ্চি শিকড় চালিয়ে বসে আছে।’
‘আচ্ছা ডাক্তার, নিমদাঁতন করা যাবে?’
‘সে কী। দাঁতন কেন করতে যাবেন শুধু শুধু।’
‘শুধু শুধু? নিমদাঁতন শুধু শুধু। তুমি কী বলছ ডাক্তার। ডু ইউ নো হোয়াট ইজ নিম।’ দাদু ভীষণ চটে উঠলেন। সিধুডাক্তার মিউমিউ করে বললেন, ‘আজ্ঞে না, আমি সেভাবে বলিনি, তবে এ দাঁতের তো মাজন আলাদা, তাই আর কি।’
‘নিম কি শুধু মাজন, নিম হল অ্যান্টিসেপটিক, নিম ইজ এ মেডিসিন, পঞ্চবটের এক বট। আমি এই দাঁতেই নিমদাঁতন করব, আই মাস্ট, নিম ইজ মাই হেলথ, ওয়েলথ অ্যাণ্ড ফ্রেণ্ড।’
কড়কড়ে তিন-শো টাকা গুনে গুনে ডাক্তারের হাতে গুঁজে দিয়ে দাদু আমার হাত ধরে উঠে পড়লেন। টেন রুপিজ এ টুথ হলে তিন-শো কুড়ি হবে। কি জানি, পাইকারি দামি বোধ হয় তিন-শো।
বাড়ি ফিরে দাদু দাঁত পরে চেয়ারে বসলেন। মা তেল দিয়ে মুড়ি মাখছেন। প্রথমে মুড়ি চিবিয়ে দাঁত পরীক্ষা হবে। দেওকিনন্দন নারকেল ভাঙছে। দু-এক কুচি নারকেলও পরীক্ষা করবেন। বাবা এর আগে মুখ ভালো করে দেখে রায় দিয়ে গেছেন, ন্যাচারাল টিথে আপনার ফেসকাটিং যেমন ছিল, ফলস টিথে একটু বদলে গেছে। ঠিক সে-রকমটি হল না। সামনের ঠোঁট উঁচু হয়ে আছে। সেই শার্পনেসটা নষ্ট হয়ে গেল।
ওপরের ঠোঁটে হাতের চাপ দিতে দিতে দাদু থেকে থেকেই বলতে লাগলেন, ‘ও একটু উঁচু আছে তো কী হয়েছে, হাতের চাপে চাপেই ঠিক করে দেব। ওটার জন্যে ভাবি না। ভাবছি খুলে না পড়ে যায়।’
মা মুড়ি দিতে দিতে বললেন, ‘বা:, বেশ হয়েছে। একবার হাসুন তো।’
দাদু লাজুক-লাজুক মুখে হাসলেন। মা বললেন, ‘বা:, কী সুন্দর হাসি। মুক্তোর মতো সাজানো দাঁতের সারি। আমাদের সকলের যদি এমন হত।’
‘আমি খুব তাড়াতাড়ি অমন করে ফেলব মা। সামনের দুটো দাঁতে পোকা ধরিয়ে ফেলেছি।’
‘বেশ করেছ। মাথা কিনে নিয়েছ।’ মা হাত-পা নেড়ে মুখ ভ্যাংচালেন। দাদুকে বলে গেলেন, ‘বাবা, কাল থেকে নিমদাঁতন।’
দাদু বসে বসে নতুন দাঁতে মুড়ি পরীক্ষা করতে লাগলেন, সঙ্গে আবার নারকেলকুচি। মনে মনে ভাবলুম, হয়ে গেল, নতুন দাঁতের আজই বারোটা। পরে জানতে পারব, এখন পড়তে বসি।
পরদিন দাদু কোর্ট থেকে ফিরে এলেন। ফর্সা রঙে ভালো চকচকে কোট। কেমন মানিয়েছে। বড়ো আদালতে কেমন লড়ে এলেন কে জানে। দাদুর পাশে থেকে থেকে আইনের ভাষা আমিও কিছু শিখে ফেলেছি। আজ বোধ হয় সেই কেসটা ছিল, ফেলারাম ভার্সাস নগেন দাস। একটা নারকেল গাছ নিয়ে দুই মক্কেলে দশ বছর ধরে লড়ে যাচ্ছে। দাদুর মুখ গম্ভীর। বেতের মোড়ায় বসে জুতোর ফিতে খুলছেন নীচু হয়ে। মা সামনে এসে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন, ‘কী হল বাবা? এত গম্ভীর?’
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আর কী হল? এই দ্যাখো। কোটের পকেট থেকে দু-পাটি দাঁত বেরোল। এ কী, দাঁত মুখ থেকে পকেটে! দুটো গোল গোল চাকতি বেরোল। ‘দূর করে ফেলে দিয়ে আয় আঁস্তাকঁড়ে।’
মা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে কী?’
দাদু ফেটে পড়লেন, ‘এই দাঁতের জন্যে আজ কনটেমপ্ট অফ কোর্ট হয়ে জেলে যেতে হচ্ছিল। নগেন দাসের উকিলকে আমি একেবারে ঠেসে ধরেছি নারকেলগাছ ফেলারামের দিকে প্রায় এনে ফেলেছি। জজসাহেবকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেছি। মুখ দিয়ে ইংরেজির তুবড়ি ছুটছে। হঠাৎ ওপর পাটির দাঁত ঠকাস করে খুলে পড়ে গেল টেবিলের ওপর, আর এই চাকতির একটা সুদর্শনচক্রের মতো ঘুরতে ঘুরতে সোজা জজসাহেবের কপালে লেগে তাঁর টেবিলের ওপর। হোয়াট ইজ দিস? আমি উত্তর দেবার আগেই উকিল বলে উঠলেন, দ্যাট ইজ ওয়াশার স্যার। জজসাহেব ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন কোত্থেকে এল, কে ছুড়েছে। তিনি বললেন, ইট কেম ফ্রম হিজ মাউথ। আপনার মুখ এঁটো করে দিয়েছে। আমি তখন আর একপাটি দাঁত নিয়ে টানাটানি করছি। না-খুলতে পারলে কথা বলতে পারছি না, ক্ষমা চাইছি পারছি না। কী অপমানজনক ব্যাপার। বিরোধী উকিল বলছেন, ইট ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ স্পিটিং অন ইয়োর ফেস মিলর্ড। প্রমাণ করতে চায় আমি থুতু দিয়েছি জজসাহেবের গায়ে। কেস ঘুরে একনটেমট অফ কোর্টের দিকে চলে যায় যায়। তখন ফোকলা মুখে শুরু করলুম। ঘণ্টাখানেক ধস্তাধস্তি করে সেই কেসকে টেনে আনলুম আমার দিকে। তরি ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠল। কী অপমানজনক ব্যাপার বল তো! ফেলে দে, ফেলে দে, ওই দাঁদানো বাঁত।’
দাঁদানো বাঁত? সে আবার কী? উত্তেজনায় বাঁধানো দাঁত বলতে গিয়ে দাদু দাঁদানো বাঁত বলে ফেলেছেন। সেই দাঁত রাগ কমে যেতে দাদু পরেছিলেন। অভ্যাসও হয়ে গেল, কিন্তু দাঁদানো বাঁত আর বাঁধানো দাঁত হল না। চিরকালের মতো উলটে রই। সোজা আর হল না। যখনই বলেন, ওই ব্যাপার, আমার দাঁদানো বাঁত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন