রাবণবধ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভীষণ উত্তেজনা, হইহই কান্ড। স্কুলের ‘অ্যানুয়েল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনি’ এসে গেছে। এবারে খুব ঘটা হবে। স্কুলের মাঠে প্যাণ্ডেল বাঁধা শুরু হয়ে গেছে। হেডমাস্টারমশাই আর স্কুল সেক্রেটারি কেবল বলছেন, ‘অ্যাটলিস্ট থাউজেণ্ড, মিনিমাম হাজার লোকের অ্যাকোমোডেশন চাই। তার কমে হবে না। গভর্নর আসছেন। এই স্কুলের ইতিহাসে এই প্রথম। রেড কার্পেট চাই। মিনিমাম এক মণ ফুল।’

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই খুব স্পষ্টবক্তা। পান খান দোক্তা দিয়ে, সেই কারণে জিভ অতিশয় ধারালো। জমিদারের ছেলে। কারও পরোয়া করেন না। বাড়িতে রাধাগোবিন্দের মন্দির। অষ্টধাতুর যুগল মূর্তি। মাথায় ছাতা। দুই সের মিনিমাম। কমসে-কম তিন-শো ভরি সোনা। পূর্বপুরুষের কেরামতি। সারারাত লাঠি হাতে মন্দির-চাতালে জেগে থাকেন। ঘুমোলেই ছাতাসমেত মূর্তি হাওয়া হয়ে যাবে। ভগবান বড়ো, না সোনা বড়ো! অবশ্যই সোনা। এ শোনা কথা নয়। প্রত্যক্ষ সত্য।

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড পানঠাসা মুখে, ফোলা-ফোলা শব্দ বললেন, ‘এক মণ ফুল! ইউ আর এ ফুল। এখানে কী শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা হবে! এই স্কুল আমার পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি নয়াপয়সার হিসাব করে খরচ করতে হবে। হার্ড ডেজ। মানুষের হাঁড়ি চড়ছে না। এক মণ ফুল!’ বলেই, সেই কোটেশনটা হাঁকড়ে দিলেন, যেটা আমি রচনা লিখতে গেলেই কায়দা করে ঢুকিয়ে দি, ‘লাইফ ইজ নট এ বেড অব রোজেস। এক মণ ফুল কি করবেন?’

হেডমাস্টারমশাই সাহিত্যের মানুষ। কল্পনার জগতে বিচরণ করেন। তাঁর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন, ‘ফ্লোর‌্যাল ওভেশন টু হিজ একসেলেনসি। লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে দু-দিকে দাঁড়িয়ে থাকবে দু-সার মেয়ে, হাতে শঙ্খ।’

‘শাঁখ বলতে পারেন না?’

খিঁচিয়ে উঠলেন সহপ্রধান, ‘সবসময় শুদ্ধ ভাষা। যেন বিশুদ্ধ গব্যঘৃত! শঙ্খ, লম্ফ, ঝম্ফ। শুদ্ধ বলবেন তো পুরোটাই শুদ্ধ বলুন, দুই পার্শ্বে রমণীগণ শঙ্খ হস্তে দন্ডায়মান থাকিবে।’

‘আপনার মশাই অত্যন্ত ইরেশেবল টেম্পারামেন্ট।’

‘অ্যায়, আবার ওয়েবস্টার থেকে একটা পটকা ছাড়লেন। ইংরেজিতে, বাংলাতে, সংস্কৃতে জগাখিচুড়ি। হিন্দিটা বাকি থাকে কেন! কিশমিশের মতো ঢুকিয়ে দিন।’

হেডমাস্টারমশাই আবার তাঁর নিজের ভাবে ফিরে গিয়ে বলতে লাগলেন, ‘এধারে কুড়িজন বালিকা, ওধারে কুড়িজন বালিকা। লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে মাননীয় রাজ্যপাল এগিয়ে আসছেন। চল্লিশটা শাঁখ একসঙ্গে বাজছে, পুঁউউউ।’

‘চল্লিশটা শাঁখ একসঙ্গে বাজতে পারে না, অসম্ভব।’

‘কেন পারে না। চল্লিশটা শাঁখ, চল্লিশজোড়া ঠোঁট। ফুঁউউউ।’

‘অতই সোজা! শাঁখ কোনোদিন বাজিয়েছেন নিজে? মোস্ট ডিফিকাল্ট ইনস্ট্রুমেন্ট অন আর্থ। আমার স্ত্রী একদিন বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ক্রশওয়ার্ড পাজল নিয়ে বসে আছ থাকো, তাতে তোমার খাই-খাইটা একটু কমবে, তবে ঠাকুরঘরে ঠিক সময়ে সন্ধ্যেটা যেন পড়ে। তিনবার শাঁখ বাজাবে। অতঃপর সন্ধ্যাকালে মধ্যগগনে তারার চক্ষু ফুটিবামাত্র ঠাকুরঘরে প্রবেশ করিলাম, দ্বারদেশে গঙ্গাজল ছিটাইলাম, তিনবারের প্রচেষ্টায় দীপ জ্বলিল, বাতাস কম্পমান, মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধার মতো খাবি খাইতেছে দেখিয়া দক্ষিণের গবাক্ষ বন্ধ করিলাম। একজোড়া ধূপ জ্বালাইয়া, নৃত্য করিতে করিতে চিত্রপটসমূহে আরতি করিলাম। তাহার পর ওষ্ঠে তুলিলাম সিন্দূরচর্চিত শঙ্খ। ভাবিয়াছিলাম সহজ হইবে। মহাশয়, প্রথমে মৃদু ফুঁ মারিলাম। ফুস করিয়া তাহা পশ্চাদ্দেশ দিয়া বাহির হইয়া গেল। নির্গমনপথে হস্তদ্বারা আচ্ছাদন করিয়া আবার মারিলাম, এইবার সবেগে। পুঁ শব্দ নির্গত হইল না। মুখে গঙ্গাজল ঢালিলাম।’

‘কাহার মুখে?’

‘অবশ্যই শঙ্খের মুখে। এমন মূর্খ আমাকে ভাবিবেন না, যে নিজের মুখে দূষিত গঙ্গাজল ঢালিব। জলের ব্যাপারে আমি অতিশয় সতর্ক। জলই সকল রোগের উৎস। শঙ্খের ছিদ্রে জল দিয়া হাতের তালু তাহার উপর বারকয়েক ঠুকিলাম। পুঁত-পুঁত করিয়া শব্দ হইল। ভাবিলাম, শঙ্খ এইবার আর্তনাদ করিবে। গন্ডদেশ স্ফীত করিয়া সবেগে ফুঁ মারিলাম। ফুঁ ফসকাইয়া গেল। শঙ্খ শব্দ করিল না। আমার মেজাজ ক্ষিপ্ত হইল। স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো মনে মনে বলিলাম, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে। প্রতিবেশীর আলয়ে-আলয়ে শঙ্খ বাজিয়া গেল। আমার শঙ্খ নীরব। কেবল আমার ফুৎকারের শব্দ। শঙ্খের পরিবর্তে নিজেই ফুঁ-ফুঁ করিয়া বাজিয়া চলিলাম। রক্তের চাপ বাড়িয়া গেল। চক্ষুদ্বয় রক্তগোলক হইল। মানসলোকে অশ্লীল শব্দসমূহ ঘুরপাক খাইতে লাগিল। গন্ডদেশ টাটাইয়া উঠিল। রাত্রি নয় ঘটিকার সময় আমার স্ত্রী আসিয়া আমাকে উদ্ধার করিলেন। বৈদ্য আসিয়া বিধান দিলেন, দুই গন্ডে বরিক কমপ্রেস। গাল ফুলিয়া গোবিন্দর মা হইয়া তিন দিবস চিৎপাত। আমার ধর্মপত্নী কহিলেন, পাপীরা শঙ্খ বাজাইতে পারে না। উহা পুণ্যবানের কর্ম। অতএব মহাশয়, ওয়ান, টু, থ্রি চল্লিশটি শঙ্খ একই সঙ্গে বাজিবে, এমন উচ্চাশা করিবেন না। অতিশয় বিপাকে পড়িবেন।’

হেডমাস্টারমশাই বলিলেন, ‘দুশ্চিন্তা অথবা আনন্দের কোনো কারণ নাই। আমি প্রতিদিন অনুশীলনে করাইব। অনুশীলনে পন্ডিতও মূর্খ হইয়া যায়। বোধ হয় ভুল করিলাম। অনুশীলনে অপটুও পটু হয়ে যায়। এইবার কল্পনা করুন সেই অনির্বচনীয়, স্বর্গীয় দৃশ্য। মহামান্য রাজ্যপাল ধীরে ধীরে আসিতেছেন। শঙ্খ নির্ঘোষে আকাশ-বাতাস কম্পিত হইতেছে। চতুর্দিক হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতেছে। নেপথ্য গীত হইতেছে আগমনি সংগীত, শঙ্খে-শঙ্খে মঙ্গল গাও, জননী এসেছে দ্বারে।’

সহপ্রধান গলা বিকৃত করে বললেন, ‘রাজ্যপাল যদি জননী হন তাহা হইলে আপনার ব্যাকরণ জ্ঞান সম্পর্কে আমার সন্দেহ হইতেছে। মুগ্ধবোধ ব্যাকরণখানি পড়িবার অনুরোধ জানাইতেছি। বৃদ্ধ হইলেও শিক্ষা করিবার কোনোও বয়স নাই। পুত্রের সহিত মূর্খ পিতাও একই শ্রেণিতে জ্ঞানলাভ করিতে পারেন।’

‘মহাশয়, জ্ঞান আপনারই লাভ করা উচিত। যিনি পালন করেন, তিনিই পাল, তিনিই জননী।’

‘আপনার মুন্ডু। যিনি পালন করেন, তিনি পিতা। পালের স্ত্রীলিঙ্গ পালিকা। গান বন্ধ করুন। রাজ্যপাল অপমানিত হইলে বিদ্যালয়ের ‘এড’ বন্ধ হইয়া যাইবে। আমাদের হাঁড়িসকল শিকায় উঠবে। আর এক মণ অক্ষত পুষ্প ভদ্রমহোদয়ের মস্তকে বর্ষিত হইলে আনন্দোৎসব শোকসভায় পর্যবসিত হইবে। পতাকা অর্ধনমিত হইবে। হত্যার অপরাধে কারারুদ্ধ হইবেন। এক মণ পুষ্প নহে, এক সের পুষ্পচূর্ণ ক্রয় করিলেই যথেষ্ট হইবে। সর্ব বিষয়ে বাড়াবাড়ি করাই আপনার চিরকালের অভ্যাস। রাজপুরুষদের তৈলমর্দন করিয়াই আপনি আখের গুছাইয়াছেন। আপনার কোনো তুলনা নাই।’

প্রধানশিক্ষকমশাই রেগে ঘরের বাইরে উঠে গেলেন। সহপ্রধানশিক্ষক হা-হা করে হাসতে লাগলেন। আমরা ছাত্ররা বোকার মতো বসে রইলুম। মিটিং-এ আরও অনেক আলোচনার বিষয় ছিল। ছেলেরা নাটক মঞ্চস্থ করবে। কী নাটক, কোন নাটক, কে-কে অভিনয় করবে, এইসব আলোচনা হলই না। বাংলার স্যার ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘যেকোনো সভা পন্ড করার প্রতিভা আপনার অসীম। বয়েস বাড়ছে, না কমছে। ছাত্রদের উপস্থিতিতে এই আচরণ শ্লাঘার নয় মোটেই। লজ্জিত হওয়া উচিত।’

সহপ্রধান হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনাদের এই বাংলার টিচারদের স্টকে ওই একটা শব্দ আছে, শ্লাঘা। শুনলেই কুঁই-কুঁই করে হাসতে ইচ্ছে করে। শ্লাঘা বল্যা, বল্কল, গালা। সহজ ভাষায় কথা বলতে পারেন না। শুনুন, জীবনের সব কিছুকে লঘু করে নিতে শিখুন। আনন্দ, আনন্দ।’

তিনি হাঁক পাড়লেন, ‘কী হল। কোথায় গেলেন মশাই। পুরুষের রাগ পাঁচ মিনিটের বেশি থাকা উচিত নয়। চলে আসুন। গরম ফুলকপির শিঙাড়া খাওয়াব।’

ঘরের বাইরে স্কুলের দোতলার ছোটো ছাদ। ইংরেজ আমলের বাড়ি। সেই কারণেই আলসের খুব শোভা। অনেকটা গড়মান্দারণের মতো। ফুলগাছের টব সাজানো। গাছ নেই, ফুলও নেই। খটখটে শুকনো মাটি। কে যত্ন করবে? হেডমাস্টারমশাই ছাদ থেকে বললেন, ‘আমার খুব নস্যি নিতে ইচ্ছে করছে। ডিবে ফেলে এসেছি।’

সহপ্রধান বললেন, ‘সে-ব্যবস্থা হবে। দয়া করে ঘরে আসুন। মিটিং বন্ধ হয়ে আছে।’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘যা:, সর্বনাশ হয়ে গেল!’

‘কী আবার হল!’

‘করে দিয়েছে।’

‘কী করে দিয়েছে?’

‘তিনতলার আলসেতে কাক বসে ছিল, একেবারে ডাইরেক্ট হিট।’

‘কোথায়?’

‘পাঞ্জাবির পিঠে।’

‘চলে আসুন। শুভ লক্ষণ। আগাম জানিয়ে দিয়ে গেল, আপনি স্ট্যাচু হবেন। সারা বছর ধরে কাক পার্কে-পার্কে স্ট্যাচু হোয়াইটওয়াশ করে। মশাই, আপনার যশ খ্যাতি এমনই সুবিস্তৃত হবে যে, মূর্তি স্থাপন করবেন সরকার।’

হেডমাস্টারমশাই ঘরে এলেন, ‘গা ঘিনঘিন করছে, কারণ কাক বড়ো কুখাদ্য খায়।’

‘খেলেই বা, পেটে গিয়ে সব চুন হয়ে যায়। ওদের পেটে একধরনের কেমিক্যাল থাকে, ক্যালশিয়াম হাইড্রাক্সাইড। ঘিনঘিন করার কোনো কারণ নেই। দেখেননি বিদ্যাসাগর, রামমোহন, স্যার আশুতোষ, গিরিশচন্দ্র সব সাদা হয়ে বসে আছেন। তাঁদের গা ঘিনঘিন করছে কি! ছটফট না করে স্থির হয়ে চেয়ারে বসুন।

হেডমাস্টারমশাই চেয়ারে সিঁটিয়ে বসলেন। বাংলার স্যার কনভেনার। তিনি বললেন, ‘কাজের কথায় আসা যাক।’

সহপ্রধান বললেন, ‘আসা যাক।’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘নস্যি আর শিঙাড়া!’

অঙ্কের স্যার ডিবেটা এগিয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘নস্যিটা দিতে পারছি। শিঙাড়া আমার দায়িত্ব নয়।’

সহপ্রধান বললেন, ‘দোকানের শিঙাড়া খাওয়া উচিত নয়। খেলেই অম্বল। আজ সকালে গ্যাস লিখিয়ে এসেছি। দশ-বারো দিন পরে এসে যাবে, তখন একঝুড়ি ভেজে এনে খাওয়াব। বড়ো-বড়ো ফুলকপি কড়াইশুঁটি, বাদাম। সে জিনিস খেলে তুরীয় অবস্থা হবে।’ হেডমাস্টারমশাই সাঁ করে নস্যি নিয়ে বললেন, ‘জানতুম। ওয়ান পাইস ফাদার-মাদার। তা না-হলে বড়ো রাস্তার ওপর অত বড়ো বাড়ি এই বাজারে করা যায়!’

অবশ্যই যায়। সিগারেট, নস্যি, চা, তিনটেই খাই না। বিয়ে, পৈতের নেমন্তন্ন অ্যাটেণ্ড করি না। বাড়িতে কোনো কাজের লোক রাখিনি। শ্যাম্পু ব্যবহার করি না। ট্যাক্সি চাপি না। রেস্তরাঁয় ঢুকে চপ-কাটলেট খাই না। সেইজন্যে আমার অসুখ করে না, কথায়-কথায় ডাক্তার ডাকতে হয় না। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ি না। পছন্দ হয়েছে বলেই জিনিস কিনে ফেলি না, প্রয়োজন হলে তবেই কিনি। ভাত-ডাল, ডাল-রুটি এই আমার খাদ্য। দু-বেলা দু-বার পেট ঠুসে খেয়ে নিই। খুচুর খুচুর জলখাবার আর খেতে হয় না। ফলে, আমার একের-চার খরচ, তিনের চার সঞ্চয়।’

বাংলার স্যার বললেন, ‘এইরকম একটি জীবনকেই বলে, আমার জীবনই বাণী। করমবীর ধরমবীর।’

‘সভার কাজ শুরু করুন।’ গম্ভীর গলায় আদেশ করলেন অঙ্কের স্যার।

সহপ্রধান বললেন, ‘রাজ্যপালকে আনার কী দরকার শুনি। পুলিশে পুলিশে সব ছয়লাপ। সিকিউরিটি। কম্যাণ্ডো। স্বাভাবিক অবস্থা বিপর্যস্ত। আমার মনে হয় এই জায়গাটা আমার আর একবার রি কনসিডার করতে পারি।’

প্রধানশিক্ষক বললেন, ‘হরিনারায়ণ বিদ্যাপীঠ গভর্নরকে এনেছিল।’

‘এনেছিল এনেছিল, সো হোয়াট। ওরা এনেছিল বলে আমাদেরও আনতে হবে!’

‘ম্যাটার অব প্রেস্টিজ।’

‘বারোয়ারি পুজোর মেজাজ নিয়ে স্কুলের অ্যানুয়াল করবেন! প্রতিষ্ঠানের কথা, নিজেদের বয়েসের কথাটা একবার ভাববেন না?’ মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘হরিনারায়ণ এনেছিল। তা হলে তো আমাদের প্রেসিডেন্টকে আনতে হয়।’

বাংলার স্যার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘কী যন্ত্রণা মশাই। এইভাবে মিটিং চালানো যায়!’

‘খুব যায়। মিটিং মানেই দু-দশ কথা। তর্কাতর্কি। পড়েননি। অ্যাসেম্বলিতে কী হয়! জুতো ছোড়াছুড়ি, ওয়াকআউট! এসব যদি না-ই হল, তো মিটিং হল কী!’

‘হেডমাস্টারমশাই একবার ওয়াকআউট করেছেন, করে এই মিটিং-এর গর্ব বাড়িয়েছেন। এইবার নেক্সট আইটেম। কনচসেল ব্লোয়িং রাজ্যপাল ধীরে ধীরে কামিং, সামনে ভগীরথ, হাতজোড়। কে ভগীরথ হবে!’

‘অবশ্যই হেডমাস্টারমশাই, কারণ তিনি এই বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানের হেড।’

‘বেশ, ভালো কথা, কিন্তু দেয়ার ইজ এ বাট। সেটা হল পায়ে আর্থারইটিস। হাঁটার সময় একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন। দৃশ্যটা অবলোকন করুন। সামনে খোঁড়া ভগীরথ লিম্পিং, পেছনে স্ট্রেট রাজ্যপাল গ্যাটম্যাট। কেমন দেখাবে!’

‘ভগীরথের বয়েস হয়েছে, বাত অবশ্যই হতে পারে।’

‘আমার সাজেশন, হেডমাস্টারমশাই পেছনে থাকুন। তিনি পেছন দিক থেকে গঙ্গাকে পুশ করবেন।’

সহপ্রধান বললেন, ‘যদি গ্রেস আর ডিগনিটির কথা বলেন, তা হলে সামনে থাকবেন আমাদের গেমটিচার। পারফেক্ট হেলথ, মিলিটারি চলন। আর আমরা সব ফুটকড়াইয়ের মতো পেছনে পেছনে গড়াতে গড়াতে আসব।’

‘হেডমাস্টারমশাই কী বলেন?’

‘নট এ ব্যাড প্রোপোজাল। অ্যাকসেপডেট।’

‘রাজ্যপাল সিঁড়ি দিয়ে মঞ্চে উঠেছেন।’

‘ওয়েট। সিঁড়িটা কেমন হবে। গেল, গেল মচকে গেল টাইপ!’ সহপ্রধান বাধা দিলেন, ‘রাজ্যপালকে দাঁড় করিয়ে রাখুন। আগে মঞ্চটা পাকা হোক। মঞ্চটা হচ্ছে কোথায়! সাইজ কী! ডেকরেশান কেমন?

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনি ট্রেজারার। দ্যাট ইউ আর টু ডিসাইড। কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ।’

‘বা:, বেশ কথা! রাজ্যপাল আপনার, আর মঞ্চ আমার! সাধারণ কোনো লোক হলে আমি যেমন-তেমন তক্তা ফেলে যা হোক-না-হোক একটা কিছু বানিয়ে দিতুম। একটা বেঞ্চ রেখে বলতুম যা হোক কাঁধে ভর রেখে উঠে যান। আমার কম খরচে হয়ে যেত। এ এক ভিভিআইপি-কে এনে ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। এ তো এখন রীতিমতো ডায়াস চাই। শুধু তাই নয়, আগের দিন সিকিউরিটির সাতজন এসে নেচেকুঁদে শক্তি পরীক্ষা করে যাবে। যতক্ষণ রাজ্যপাল ডায়াসে থাকবেন, ততক্ষণ সিকিউরিটির দু-জন তলায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকবে। মঞ্চটাকে সেইজন্য রীতিমতো উঁচু করতে হবে।’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনার আবার বেশি বেশি। অতসব করতে হয় না!’

‘কিসুই জানেন না, চুপ করুন। রাজ্যপাল, মূখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, এঁদের জীবনের কোনো দাম আছে! একটু আলগা দিলেই সন্ত্রাসবাদীরা নির্মমভাবে মেরে ফেলবে। মনে নেই, রাজীব গান্ধীকে কীভাবে মারল আর ডি এক্স দিয়ে!’

‘এখানে সন্ত্রাসবাদী কোথায়!’

‘মাথামোটা! এখানে এখন কোনো মাছি আছে? নীল নীল ডুমো ডুমো মাছি?’

‘নেই।’

‘একটা আম আনুন, আমি ছুরি দিয়ে কাটছি। দেখি মাছি আছে কি নেই। সন্ত্রাসবাদীরা গন্ধে গন্ধে উড়ে আসে।’

‘একটা নিরীহ রাজ্যপালকে মেরে লাভ?’

‘আপনার ওই পোস্ত আর ডাঁটাচচ্চড়ি খাওয়া মাথায় ঢুকবে না। এটা একটা বাদ, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, সমাজবাদ, বহুজন সমাজবাদের মতই সন্ত্রাসবাদ। বড়ো বড়ো কিছু লোককে বাদ দেওয়াই যাদের কাজ। উইবাদ, ইঁদুরবাদের মতো।’

‘শেষের দুটো কী বললেন?’

‘ইঁদুর আর উই, জিজ্ঞেস করে দেখবেন তো, রবীন্দ্র-রচনাবলি খেলে কেন? দাঁত বের করে হাসবে, জানি না তো স্যার। এইটাই আমাদের বাদ, ইজম। ইঁদুরজিম। আপনি মশাই বহুত খরচের ধাক্কায় ফেলে দিলেন। রীতিমতো একটা মঞ্চ চাই। লাল কার্পেট পাততে হবে। রাজার সিংহাসনের মতো চেয়ার। গলায় গোড়ের মালা দিতে হবে।’

বাংলার স্যার বললেন, ‘দ্যাটস নো প্রবলেম। আমার নাতনিটা একেবারে ফুটফুটে, জাস্ট এ ডলপুতুল, সেই নাচতে নাচতে এসে মালাটা পরিয়ে দেবে।’

‘বাংলার শিক্ষক যখন ইংরেজি বলেন, তখন জানবেন রিয়েল প্রবলেম। গভর্নরের গোড়ের মালা। এ আপনার দু-দশ টাকার কর্ম নয়। মিনিমাম টু-ইান্ড্রেড। বাঘের লেজের মতো ইয়া মোটা। সব টাকা তো আপনার ফুল আর প্যাণ্ডেলেই ফৌত হয়ে যাবে। ছেলেদের পুরস্কার আর দেবেন কী করে!’

হেডমাস্টারমশাই কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, ‘রাজ্যপালকে তা হলে বাদই দিয়ে দিন।’

‘কী করে দেবেন! তাঁর অ্যাকসেপটেন্স চিঠি এসে গেছে। তাঁর ডায়েরিতে এন্ট্রি হয়ে গেছে।’

‘পরিষ্কার একটা রিগ্রেট লেটার, অনারেবল স্যার, ডিউ টু শর্টেজ অফ ফাণ্ড, উই আর আনএবল টু হ্যাণ্ডল টু ইউ। ইউ আর টু কস্টলি ফর আওয়ার পুয়োর স্কুল।’

সহপ্রধান চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সাধে মাথা মোটা বলি! আমাদের একটা প্রেস্টিজ আছে তো! মানসম্মান! টাকা তুলতে হবে। ডাইভ দিন। ডোনারস অভিভাবক। দোরে-দোরে ঘুরতে হবে। কত বড়ো কথা, রাজ্যপাল আসছেন! রোমাঞ্চ হচ্ছে। আজি পুলকিত ধরণী আনন্দে।’

অঙ্কের স্যার বললেন, ‘এতক্ষণে মনে হচ্ছে জিনিসটা আপনাকে ধরেছে। গ্রিপ করেছে। আপনি একবার ধরে নিলে কোনো ভাবনা নেই। স্ট্রেট বেরিয়ে যাব। উইথ ফ্লাইং কলারস।’

সহপ্রধান সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘দেখি, প্যাডটা এগিয়ে দিন।’

হেডমাস্টারমশাই তড়িঘড়ি প্যাডটা এগিয়ে দিলেন।

‘এ ডটপেন প্লিজ। আমারটা গেছে। কে যে মেরে দিলে!’

হেডমাস্টারমশাই ডটপেন দিলেন। সহপ্রধান প্যাডের কাগজে নকশা আঁকছেন আর বলছেন, ‘মঞ্চটা ইস্ট-ওয়েস্টে লম্বা হবে, ফেসিং সাউথ। পুব দিকে তিনধাপ সিঁড়ি, নটা মোর দ্যান দ্যাট। বৃদ্ধ মানুষ। হার্টে চাপ পড়ে যাবে। সিঁড়ি বেশ চওড়া, উইথ হাতল। হ্যাণ্ড রেল থাকা উচিত, ফর প্রোটেকশন। তিনজন পাশাপাশি উঠতে পারে এতটাই চওড়া। দু-পাশে দুজন সিকিউরিটি, মাঝখানে রাজ্যপাল। পেছনে তিনজন। রাজ্যপালকে ঘিরে থাকবে হিউম্যান ওয়াল। মঞ্চের মাঝখানে রেড কার্পেট। সেন্টারে সিংহাসন চেয়ার, দু-পাশে সাধারণ চেয়ার। সামনে একটা লম্বা টেবিল। শক্তপোক্ত। নড়বড়ে লয়। সরি! নড়বড়ে নয়। গর্জাস টেবিলক্লথ। ড্রয়িং পিন দিয়ে ফিক্স করা। নয়তো বারেবারে গুটিয়ে যাবে, ঝুলে যাবে, এলোমেলো হয়ে যাবে। যা অন্যসব সভায় হয়। মশাই! দেখে শিখতে হয়। যদি শিখতেই না-পারলেন, তা কীসের শিক্ষক!’

‘ফুলদানি সম্পর্কে কিছু ভেবেছেন? সবার আগে তো ওই দুটোই উলটে কিছুক্ষণের জন্য সভা পন্ড করবে। অথচ দুটো ফুলদান তো টেবিলে রাখতেই হবে। টেবিলের শোভা।’

‘নো ফুলদান। অত্যন্ত ছেঁচড়া জিনিস। দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই, ফুলের ভারে টলে পড়ে যায়। মুখ আড়াল করে। দর্শকদের চিৎকার ফুলদান আমরা রাখবই না। তার বদলে ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট, যাকে বলে ইকেবানা। পোর্সিলেনের একটা গামলি। তাইতো নানারকম ফুলের ফ্যাসফোঁস। ঝাঁটাকাঠি, মাথায় আলু গোজা। একেবরে ফ্ল্যাট। কেতরে যাওয়ার ভয় নেই।’

‘কে করবে ওই ইবেকানা?’

‘আঃ, ইবেকানা নয়, ইকেবানা। কে আবার করবে? আমি করব। কসমস, অ্যাস্টার, গ্লাডিওলি, নস্ট্রাসিয়ান কিনে আনব। দেখবেন, সে যা হবে না! ফ্যান্টাসটিক। আচ্ছা, ডায়াস প্ল্যানিং হয়ে গেল!’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘মনে থাকে যেন, সবশেষে ওই মঞ্চে থিয়েটার হবে, রাবণবধ।’

‘ওব্বাবা, গোদের ওপর বিষফোঁড়া। থিয়েটার ঢুকিয়েছেন!’

‘ঢোকাব না! ছেলেরা সব মুখিয়ে আছে। থিয়েটার করবে। একটু বিচিত্রানুষ্ঠান মতো হবে।’

‘তা হলে তো স্টেজ করতে হবে। ড্রপসিন লাগাতে হবে। উইংস রাখতে হবে। হয়ে গেল! ডবল খরচ! একটা সেটেই হবে, না দৃশ্য পালটাতে হবে?’

বাংলার স্যার বললেন, ‘দৃশ্য তো পালটাতেই হবে। পালাটা তো আমিই লিখছি।’

‘সে আপনি একটা কেন, দু-শোটা লিখুন; কিন্তু সেট-সেটিংস, ড্রেস, মেক-আপ, এইসবের খরচ কে জোগাবে?’

‘সেটা তো আমার জানার কথা নয়। আমি নাট্যকার, ডিরেক্টর। আপনারা আমাকে স্টেজ দেবেন, আমি দর্শকদের ভালো পালা দেব। টাকার চিন্তা আপনার।’

‘আপনারা প্রত্যেকেই তা হলে আপনাদের স্ত্রীর একটা করে গয়না এনে জমা দিন। বিক্রয়লব্ধ অর্থে আমাদের ফাংশন হবে। তা না-হলে এত টাকা আসবে কোথা থেকে!’

‘কেন আসবে না! কিশোর সংঘের কালীপুজোর বাজেট কত টাকা জানেন? পাঁচ লাখ।’

‘তা হলে এক কাজ করুন। কিশোর সংঘের সেক্রেটারিকে ডেকে আনুন। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে কোনো মূর্খ হাজার-হাজার টাকা চাঁদা দেবে শুনি। না-দিলে প্রাণের ভয় আছে কী! ভয় না-দেখালে মানুষ দান করে না। আপনারা পারবেন ছোরাছুরি নিয়ে চাঁদা আদায় করতে? জেনে রাখুন, এ-দেশে এখন স্কুলের চেয়ে ক্লাব বড়ো।’

বাংলার স্যার বললেন, ‘আপনার কাছে আমি সারেণ্ডার করছি স্যার। যেভাবেই হোক আমাদের নাটকটা তুলে দিন স্যার। ছেলেরা আশা করে আছে।’

সহপ্রধান একটু যেন খুশি হলেন, কারণ পকেট থেকে পানের ডিবে আর জর্দার কৌটো বের করলেন। প্রধানশিক্ষক করুণ গলায় বললেন, ‘এখন আবার পান কেন, অনেকক্ষণ যে কথা বলতে পারবেন না, পানঠাসা মুখে কেবল উ-উ করবেন। এখন আমাদের ঘোর সংকট, এইসময় আপনার কথা বন্ধ হয়ে গেলে কেমন করে চলে।’

‘দ্যাটস ট্রু’ সহপ্রধান ডিবে স্পর্শ করলে না। বাংলার স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার দৃশ্য ক-টা? নাটকটার সংক্ষেপে বলুন।’

বাংলার স্যার উৎসাহিত হয়ে বললেন, পুরোটা শুনবেন? খাতাটা আমার কাছেই আছে।’

‘না, না, পুরো নাটক শোনার মতো মনের অবস্থা এখন নেই। এখন শুধু টাকা আর টাকা। ইন এ নাটশেল দৃশ্যগুলো বলুন। সেইটাই মোর ইম্পরটান্ট দ্যান ইয়োর নাটক।’

বাংলার স্যার শুরু করলেন, ‘অযোধ্যার রাজপ্রসাদ। সিংহাসনে রাজা দশরথ। চারপাশ একেবারে ঝলমল ঝলমল করছে।’

‘কীসে ঝলমল করছে! ঝলমল করবে কেন?’

‘রাজঐশ্বর্যে ঝলমল করবে। অযোধ্যা ছিল গোল্ডেন সিটি।’

‘আপনার ঐশ্বর্য কোথায়? ঝলমলটা করবেন কী দিয়ে? হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারটা হবে সিংহাসন। বাকি ঝলমলের পয়সা নেই। বরং ফুটনোট লিখে দিন, রাজা দশরথের আর আগের অবস্থা নেই।’

‘এই ঝলমলের ব্যাপারে আমার একটা প্ল্যান আছে, রোলেক্সের লম্বা-লম্বা রিবন চারপাশে ঝুলিয়ে দেব। বাতাসে দুলবে আর ঝকমক ঝকমক করবে। যেকোনোরকম একটা ঝকমক হলেই হল।’

‘সে রোলেক্স রিবনের দাম কত?’

‘ও আপার সামান্যই দাম।’

‘পরে কী কাজে লাগবে?’

‘ও আর কী কাজে লাগবে! ঠিকমতো রাখতে পারলে, পরে সরস্বতী পুজোর ডেকরেশনে ব্যবহার করা যাবে। হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারটাকে একটু সিংহাসনের মতো করে সাজাতে হবে। সে আপনার ছেলেরাই করে নেব। কিন্তু পেছনে একটা সিন চাই। একটু থামটাম, খিলান, রাজপ্রাসাদে যেমন থাকে আর কী!’

‘সিন আমি ভাড়া করতে পারব না, অনেক খরচ। কাগজে বড়ো-বড়ো করে লিখে পেছনে টাঙিয়ে দেবেন রাজপ্রসাদ। সবাই বুঝে নেবে।’

‘ওটা রবীন্দ্রনাটক হলে হত। অ্যাবস্ট্রাক স্টেজ। আমাদের এই পৌরাণিক পালায় একটু গর্জাস ব্যাপারস্যাপার দরকার। ঝলমলে স্টেজ, ঝলমলে পোশাক। পেছনে অন্তত দুটো সিন আপনি অ্যালাউ করে দিন। একটা রাজসভা, সেটা আমরা দশরথে লাগাব, রাবণেও লাগবে। আর একটা বনের সিন।’

‘দুটোতে হবে না, আপনার তিনটে চাই। একটা সমুদ্র না-হলে হনুমান লাফ মারবে কোথায়!’

‘সমুদ্রটা যদি আমরা উহ্য রাখি। বানরসেনাদের একেবারে সোজা লঙ্কায় ল্যাণ্ড করিয়ে দিলুম। দু-চার ডায়লগের পরই যুদ্ধ। এক রাউণ্ড কী দু-রাউণ্ডের পরই রাবণবধ। ছেলেরা অবশ্য যুদ্ধটাকে একটু বাড়াতে চাইছে। আসলে ওইটাই তো মেন অ্যাট্রাকশন ওদের।’

‘সেটা আমিও বুঝি; কিন্তু বানরসেনা কি হেলিকপ্টারে ল্যাণ্ড করবে! একটা সিন চাই, সমুদ্র, তার ওপর দিয়ে হনুমান উঠে যাচ্ছে, ‘তাই এয়ারওয়েজ’-এর বিমানের মতো স্টেজে তখন সমুদ্রের দিকে মুখ করে আপনার ছেলে হনুমানের খড়ের লেজ খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকবে সার সার। দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন।’

‘পিকচারেকস, পিকচারেকস। আপনি স্যার নাটকের লাইনে এলেন না কেন?’

‘ওই যে একটাই কারণ, কম বয়সেই মাথায় টাক পড়ে গেল।’

‘কেন, পরচুল?’

‘অ্যালার্জি। পরামাত্রই ফ্যাঁচ-ফোঁচি হাঁচি। হাঁচব, না অভিনয় করব। যাক, এখন দেখা যাচ্ছে মিনিমাম তিনটে সিন লাগবে। না, না, না, তিনটেতে হবে না। চারটে লাগবে। লাস্ট সিন, লঙ্কা জ্বলছে। আকাশ লাল, দাউদাউ আগুন। সামনে রাবণবধ।

হনুমানরা ধিতিংধিতিং নাচছে। সীতার পাতালপ্রবেশ হবে না’

‘না, স্যার! অতদূর আর টানছি না। কনডেন্স করে দিচ্ছি।’

‘কনডেন্সড মিল্কের মতো! তবে কী জানেন, পাতালপ্রবেশটা দেখাবার খুব স্কোপ ছিল। স্টেজের একটা পাটাতন খুলে যেত, সীতা ঝপাং করে নেমে যেত নীচে, আর সেইসময় স্টেজের তলায় রাখা ধুনুচি থেকে স্টেজের ওপরে ভলভল করে ভেসে উঠতে ধোঁয়া। দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। একটা স্কুল ড্রামায় এইরকম পাকা দৃশ্য অভূতপূর্ব!’

‘কিন্তু আমরা যে স্যার রাবণবধেই ফিনিশ করে দিচ্ছি। ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়।’

‘কেন, কাহিনিটা আপনি ফ্ল্যাশব্যাকে টানতে পারেন। প্রথম দৃশ্যেই সীতা স্টেজের ফুটো দিয়ে তলায় পড়ে গেল। এইবার ধুনোয় ধোঁয়ায় রামায়ণের ফ্রন্টপার্ট ভেসে উঠল। হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারে রাজা দশরথ। দশরথ, মনে করুন চোখ বুজিয়ে ঘুমোচ্ছি। দূতী গাইছে, জাগো দশরথ, জাগো জাগো রামায়ণ। অ্যাণ্ড ইয়োর নাটক স্টার্টস। ব্যাপারটা গতানুগতিক হল না। একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ।’

‘আপনার প্রস্তাব আমি অবশ্যই বিবেচনা করে দেখব।’

‘আরে মশাই, নতুন কিছু করুন, নতুন ভাবুন। এটা জি টিভি, স্টার টিভির যুগ। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এমন কায়দায় স্টেজ করিয়ে দেব, একেবারে ফার্স্ট সিনেই মারমার কাট কাট।’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আমার মনে হয়, আজকের মিটিং এইখানেই শেষ করা ভালো; কারণ অনেকক্ষণ ধরে হচ্ছে। সকলেরই অন্য কাজকর্ম আছে। আমাকে আবার মাদার ডেয়ারি দুধ আনতে হবে।’

‘কেন, বাড়িতে আর কেউ নেই। ছেলেরা কী করছে?’

‘বড়ো ছেলেটা ভাবুক। সে কবিতা-টবিতা লেখে। সংসারের কাজকর্ম তেমন ভালো লাগে না। ছোটোটা সন্ধ্যের সময় তবলা শিখতে যায় ওস্তাদের কাছে।’

‘তবলা! আর কিছু শেখার পেল না!’

‘তবলার এখন খুব ফিউচার। একটু নাম করতে পারলেই ইউরোপ, আমিরিকা। ওর গুরু ও-দেশে ক-মাস থাকে!’

‘লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে?’

‘না, তা কেন! লেখাপড়া আর তবলা একসঙ্গেই চলছে। আজকাল তো অ্যাকাডেমিক লাইনে কোনো চাকরি নেই। বড়ো ছেলেটার তো তাই হল। এখন হতাশায় ভুগছে।’

‘বেশ, আজকের মতো এই থাক। সামনের সপ্তাহে আবার আমরা বসব।’

মাস্টারমশাইরা উঠে পড়লেন। আমাদের মধ্যে থেকে শিবাঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার! কমিটির মধ্যে আমরাও আছি। আমাদের কিছু দায়িত্ব দেবেন। আমি খুব ভালো স্টেজ সাজাতে জানি। আমি ওই রাজপ্রসাদ, জঙ্গল, সমুদ্র সব করে দেব। শুধু দু-একটা মেটিরিয়াল কিনে দিলেই হবে। এই যেমন, কাগজ, থার্মোকল, আঠা।

সহপ্রধান বললেন, ‘সে তো ভালোই। তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিভা আমরা কাজে লাগাব।’

তিনদিন পরে বাংলার স্যার আমাদের নাটক কমিটির মিটিং ডাকলেন। নাটক লেখা শেষ। নাটক পড়া হবে। কে, কোন ভূমিকা করবে, সেসব ঠিক হবে। স্কুল ছুটির পর আমরা হলঘরে সমবেত হলুম। স্যার এলেন। সবসময় তিনি ফিটফাট সেজে থাকেন। ফিনফিনে ধুতি, পাঞ্জাবি। শ্যাম্পু করা ফুরফুরে চুল। খুব শৌখিন মানুষ। আমাদের খুব প্রিয় স্যার। বন্ধুর মতো মিশতে পারেন। হাসি, ঠাট্টা, মজা, সবই চলে। ভীষণ ভালো পড়ান।

স্যার বললেন, ‘বুঝলি, অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচ এম-এর আইডিয়ায় জিনিসটা মন্দ দাঁড়াল না, এখন তোদের করার ওপর নির্ভর করছে। প্রথম দৃশ্যে আমি একটু কায়দা করেছি। দেখ, রাম, রামায়ণ করতে করতে আমরা বাল্মীকিকে প্রায় ভুলেই বসে আছি। সেই কারণেই আমি ফার্স্ট সিনে কবিকে টেনে এনেছি। এটা আমাদের কর্তব্য। ড্রপসিন উঠল। স্টেজ। বাঁদিকে একটা বটবাছ। তলায় বসে আছেন বাল্মীকি। ওপর থেকে তাঁর সামনে ধপাস করে পড়ল তীরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চ। বাল্কীকি চোখ মেলে তাকালেন, মিউজিক, সঙ্গে সঙ্গে শ্লোক:

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং

ত্বমগমঃ শাশ্বতী: সমা:।

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমধবী:

কাম মোহিতম।।

এ কী! এ কী নির্গত হল আমার কন্ঠ হইতে! দৈববাণী! ঋষি! এর নাম কবিতা। পৃথিবীর প্রথম কবিতা। তুমি আদিকবি। এই দৈববাণীর সঙ্গেই আমি পাঞ্চ করে দিয়েছি রবীন্দ্রসংগীত। সুযোগ যখন পেয়েছি, ছাড়ি কেন! আর তোদের মধ্যে যখন ট্যালেন্ট রয়েছে। কোরাস:

প্রথম আদি তব শক্তি—

তুমি আদিকবি, কবিগুরু তুমি হে,

গানে মেন ভয়েস থাকবে মৃণালের। এই একটাই গান, এরপর আর গানের কোনো স্কোপ নেই। তোরা যে গানও গাইতে পারিস সেটা দেখাবি না! এইবার স্টেজে একটা টেকনিক্যাল ব্যাপার ঘটবে। ঠিকমতো জমাতে পারলে তাক লেগে যাবে। স্টেজের তলা থেকে ধীরে ধীরে সীতা জেগে উঠবে। মুকুট, কপাল, গলা, গোটা শরীর। ধোঁয়ার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে সীতার উত্থান। সীতা বাল্মীকির সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, কবি! তুমি আমার জীবন-কাহিনি লেখো। দেবী! তুমি কে? আমি সীতা, আমার প্রভু শ্রীরামচন্দ্র। আমার কাহিনি লেখার শক্তি তোমাকে আমি দিয়ে গেলুম। তুমি অতীতে চলে যাও, দূর অতীতে, অযোধ্যা নগরীতে, রাজা দশরথের রাজসভায় এই কথা বলেই সীতা আবার স্টেজের ফুটো দিয়ে নীচে নেমে যাবে। ভলকে ভলকে ধোঁয়া। ড্রপসিন।’

রাজা বলল, ‘স্যার! সীতাকে কেমন করে ওঠাবেন ওইভাবে?’

‘আমার সঙ্গে রাজেনবাবুর কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন সীতাকে হাইড্রলিক প্রেসারে তুলে দেবেন।’

‘সেটা কীরকম স্যার!’

স্টেজের মাঝখানে একটা গোল গর্ত। গর্তের তলায় বিশাল একটা ড্রাম। ড্রামের ভেতরে মাপমতো গোল একটা বারকোশ। সীতা ড্রামে ঢুকে সেই বারকোশে দাঁড়াবে। ড্রামের একেবারে তলায় একটা ফুটো। সেখানে পাইপ। এইবার জল ঢোকানো হবে। জলের চাপে বারকোশসমেত সীতা ওপরদিকে ঠেলে উঠবে। অতিসহজ বিজ্ঞান।’

রাজা বলল, ‘স্যার, ওই বিজ্ঞানে কাজ হবে না। সীতার যা ওজন, ও বারকোশ-মারকোশ নিয়ে ওই ড্রামের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। একটা ছোটো বল হলে ওই থিয়োরি খাটত। আপনি বিজ্ঞানের স্যারের কথা শুনবেন না।’

‘তা হলে সীতা পাতল থেকে উঠবে কী করে?’

‘আমরা ঠেলে তুলে দেব। একটা তক্তা দুটো বাঁশে বেঁধে চারজনে মিলে চাগাড় দিয়ে তুলে দেব।’

‘সীতা আবার পাতালে প্রবেশ করবে কীভাবে?’

‘ও ওইটার ওপরেই থাকবে, আমরা আবার ধীরে ধীরে নামিয়ে নেব।’

‘অনেক সহজ হবে, তাই না, তবে বিজ্ঞানটা বাদ গেল।’

‘বিজ্ঞান বাদ যাক স্যার। গর্ত দিয়ে সীতা যদি না-ই উঠল, আমাদের নাটকটাই তো ভেস্তে যাবে। যে কায়দাটা বলছি, সেটাও খুব সহজ হবে না, রিহার্সাল দিতে হবে।’

‘তা হলে প্ল্যানটা কি বাতিল করে দেব!’

‘না, স্যার, জিনিসটা করতে পারলে দারুণ জমে যাবে। চেষ্টা করে দেখাই যাক না।’

‘শিবাঞ্জন, তুই একটা বটগাছ সাপ্লাই করতে পারবি তো!’

‘ওটা কোনো ব্যাপার নয় স্যার। পিচবোর্ড কেটে খাড়া করে দেব। রংটং মাখিয়ে এমন করে দেব মনে হবে রিয়েল গাছ।’

‘রাজপ্রাসাদের থাম কীভাবে করবি?’

‘বাহাত্তর ইঞ্চি জলের পাইপ রাস্তার ধারে বেওয়ারিশ পড়ে আছে। দুটো এনে দু-ধারে খাড়া করে দেব।’

‘পাগল হয়েছিস, স্টেজ ভেঙে পড়ে যাবে, আর কে তুলবে অত ভারি! ওই প্ল্যানটা ছাড়।’

‘খুব রিয়ালিস্টিক হত।’

‘রিয়ালিস্টিকের দরকার নেই। তুই ওই প্লাইউড কেটেই করে দিস। তবে ওই তিরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চটা একটু ভালো করে করিস। যেন বেশ জীবন্ত মনে হয়।’

‘ওটা ভাবছি স্যার একটা সাদা মুরগিকে ওপর থেকে ফেলে দেব।’

‘মুরগি কী রে! ক্রৌঞ্চ মানে সাদা বক।’

‘বক কোথায় পাব স্যার! কে আর বুঝবে বক কি মুরগি।’

‘কী বলছিস, বকের স্ট্রাকচার আর মুরগির স্ট্রাকচার এক হল! তুই বাবা ওটা কাপড়টাপড় জড়িয়ে করে দিস। বকের গলা ঠ্যাং চোখে পড়ার মতো। ও মুরগি দিয়ে হবে না। এখন আমি পার্টগুলো ডিস্ট্রিবিউট করে দিই। বাল্মীকি হব আমি। সুরেশ, দশরথ।’

সুরেশ মাথা চুলকে বলল, ‘স্যার, আমার যে খুব রাম হওয়ার ইচ্ছে।’

‘ইচ্ছে হলেই তো হবে না বাবা। তুমি যে একটু বেশি হৃষ্টপুষ্ট। তার ওপর একটা ভুঁড়ি নামিয়েছ। রাম হব বললেই তো হওয়া যায় না! রাম হবে রাজেন।’

সুরেশ ছাড়ার পাত্র নয়। সুরেশ বলল, ‘দশরথ স্যার রোগা ছিলেন। খুবই অসুস্থ। পান্ডুর।’

‘এই মরেছে, এ রামায়ণ-মহাভারত গুলিয়ে ফেলেছে। পান্ডুর ছিলেন পান্ডু রাজা। দশরথ ছিলেন লম্বা-চওড়া দশাসই মানুষ।’

‘সে প্রথম দিকে ছিলেন, পরে টিবি হয়েছিল।’

‘এসব তথ্য তুই কোথায় পেলি?’

‘আমার নিজের ধারণা স্যার।’

‘তোমার ধারণায় তো হবে না। দশরথ হতে তোর আপত্তি কীসের?’

‘মাত্র একটা সিন স্যার, তিনটে মাত্র ডায়লগ—রাম, তোমার ছোটো মায়ের ইচ্ছে, তুমি বনবাসে যাও। একটা অ্যাপিয়ারেন্স আর একটা কথার জন্য অত মেক-আপ পোষাবে না স্যার, আমাকে তা হলে রাবণটা দিন।’

‘অসম্ভব! রাবণের জন্য স্ট্রং অ্যাক্টিং চাই। রাবণ হবে প্রসূণ। ওর অভিনয় আমি দেখেছি। খুব ভালো। এ ক্লাস। রাবণের রোলে প্রসূণ ছাড়া আর কাউকে ভাবাই যায় না।’

প্রসূণ বলল, ‘স্যার আমাকে রাম দিলেই ভালো হয়। রাবণ তো শেষকালে বধই হয়ে যাবে স্যার। রাম আমি খুব পারব স্যার। পাওয়ারফুল অ্যাক্টিং।’

‘রাম হয়ে নিজের সর্বনাশ নিজেই কেন করবি। রামের অ্যাক্টিং নেই। কাঁধে ধনুর্বাণ নিয়ে কেবল ঘুরে বেড়ানো। চড়া কোনো ডায়ালগই নেই। রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, সার বেঁধে স্টেজে তিনপাক ঘুরবে। রাম কোনো কালেই তেমন স্ট্রং ছিল না, স্রেফ স্টাইল। হাঁটা, চলা, তাকানো। ধার্মিক মানুষের কি তেমন লম্ফঝম্প থাকে! রাম বনে যাও, বনে চলে গেল। গোটাকতক রাক্ষস খতম করল। সীতা বলল সোনার হরিণ ধরে দাও। সোনার হরিণ হয় না জেনেও পেছন পেছন দৌড়োল। সারাটা জীবন তো দৌড়েই গেল। আসল খেল তো রাবণের। সীতা হরণের সময় তুই হাসির খেল দেখাবি, মারীচের নাক-কান কেটেছিলিস ভিখারি রাম। এইবার খেলাটা দ্যাখ তবে। সারা স্টেজ সর্বক্ষণ তুই-ই দাপিয়ে বেড়াবি। আমি লঙ্কেশ্বর রাবণ।’

মোটামুটি সব রোলই ঠিক হয়ে গেল। বানরসেনার সংখ্যা অনেক হবে। স্টেজ ভরে যাবে। তাদের মধ্যে বারোজনের লম্বা পাকানো লেজ থাকবে। লেজ তৈরি করবে শিবাঞ্জন। পেছন দিক থেকে মাথার ওপর যেন উঁচিয়ে থাকে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওটা কীভাবে করবি? মাথার দিকে উলটে থাকা বাঁকা লেজ।’

শিবাঞ্জন বলল, ‘কতটা মোটা করব স্যার?’

‘সাধারণ হনুমানের লেজ যেমন হয় আর কী! একটা হনুমান দেখে নিস না!’

‘গাছের হনুমান আর রামায়ণের হনুমান কি এক হবে স্যার!’

‘মোটামুটি একই হবে। ওরই মধ্যে একটু মোটা করে দিবি। বেশি মোটা করলে ছেলেরা কোমরে রাখতে পারবে না। তা হলে কী কায়দাটা করবি?’

‘মোটা তার কিনে আনব। তারপর খড় জড়াব, তার ওপর লাল কাপড়।’

‘কোমরে আটকাবে কী করে! তার একটা ব্যবস্থা রাখিস। টেকনিক্যাল দিকটা তোর দায়িত্ব। আমি কিন্তু নিশ্চিন্তে রইলুম। কাল থেকে আমাদের রিহার্সাল।’

শিবাঞ্জন বলল, ‘এই টেকনিক্যাল ব্যাপারে তুই আমাকে একটু সাহায্য করিস। তোর কারিগরি মাথাটা খুব একটা খারাপ নয়। আমি কী ভেবেছি বল তো, কাগজের পিলার তৈরি করব। মোটা কাগজ গোল করে জড়িয়ে জড়িয়ে, তার ওপর ময়দার লেই পরতে পরতে। তার ওপর পোস্টার কালার। সোনালি রঙের লতাপাতা। কেমন হবে?’

‘হবে না। বাঁশের ফ্রেম ছাড়া ও-জিনিস দাঁড়াবে না। একটা স্ট্রাকচার চাই। এ তোর ধূপের প্যাকেট নয়।’

‘তা হলে থাম আমি কী করে করব!’

‘দায়িত্ব নেওয়ার সময় মনে ছিল না! গরম কচুরি খাওয়া নেপালদার দোকানের, তা হলে বলব।’

‘ক-টা খাবি?’

‘মিনিমাম চারটে, ম্যাক্সিমাম ছ-টা।’

‘দাঁড়া, লক্ষ্মীর ভাঁড় ভাঙি। বিকেলে শিওর খাওয়াব।’

বিকেলের দিকে নেপালদার দোকানে ফাটাফাটি ব্যাপার। হিংয়ের কচুরি কড়ায় ফুলছে। পাতলা বাদামি রং। পাশেই গামলাতে গোটা-গোটা মটরের ঝাল-ঝাল ঘুগনি। সেই কলতলা থেকেই গন্ধ পাওয়া যায়। শিবাঞ্জনই আমাকে এসে ডাকল, ‘তোর একটা কোনো চাড় নেই। পড়ে পড়ে বেলা পাঁচটা অবধি ঘুমোচ্ছিস! চল, চল।’

‘ভাঁড় ভেঙেছিস?’

‘হ্যাঁ, তিনটে নাগাদ। তক্কে-তক্কে ছিলুম। মা যেই ঘুমিয়েছে, প্যাঁচার মুণ্ডু উড়িয়ে দিলুম।’

‘কতটা বেরোল?’

‘নেহাত খারাপ নয়। সাতচল্লিশ টাকা ষাট পয়সা।’

‘ভালোই জমেছে। তা হলে চ’, কচুরির বদলে ‘খাইখাই’-তে গিয়ে ব্রেস্ট কাটলেট খাওয়া যাক। কাটলেটে বুদ্ধি আরও ভালো খোলে।’

ছ-টার সময় খাইখাই খোলে। বনেদি ব্যাপার। দরজার পাশে মালিক সিল্কের পাঞ্জাবি পরে ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে আছেন। দুপুরের ঘুমটা ভালোই হয়েছে। চোখ-মুখ ফোলা-ফোলা। খুব গম্ভীর চেহারা। আমরা ঢুকছি, একনজরে দেখে নিয়ে বললেন, ‘সৎপথের পয়সা, না অসৎ পথের?’

শিবাঞ্জন যেন শুনতে পায়নি, বলল, ‘আজ্ঞে।’

‘বলি, বাপের পকেট সাফ করেছ, না তাঁরা দিয়েছেন?’

শিবাঞ্জন একটু রাগের চোখে তাকিয়েছে। ভদ্রলোক বললেন, ‘বড়ো-বড়ো চোখে তাকালে কী হবে। এইরকম আজকাল হচ্ছে। দেশের মরালটা তো একেবারে শেষ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজে তো আর এসব শেখানো হয় না। শোখানো হয়?’ ভদ্রলোক ইয়া বড়ো-বড়ো চোখে শিবাঞ্জনের দিকে তাকালেন। শিবাঞ্জন ছেলেটা এমনই খুব ভালো। সহজ, সরল। কোনো ওপরচালাকি, ওস্তাদি এসব নেই। নিভাঁজ ভালোমানুষ। সেই তুলনায় আমি অনেক শয়তান। মনে জিলিপি প্যাঁচ। নিজেকে খুব ওস্তাদ আর বুদ্ধিমান ভাবি। মাঝে মাঝে দুঃখ হয়, আমি কেন শিবাঞ্জনের মতো হতে পারি না!

শিবাঞ্জন ভদ্রলোকের কথা শুনে কেমন যেন হয়ে গেল। একটু থমকে থেকে বলল, ‘আপনি যথার্থই বলেছেন। তবে আমরা ওসব করি না। যখন-তখন কাটলেটও খাই না। আজ লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙে সাতচল্লিশ টাকা পেয়েছি।’

‘ভাঁড় ভর্তি হয়েছিল?’

‘আজ্ঞে না।’

‘তা হলে ভাঙলে কেন?’

‘এই যে আমার বন্ধু পলাশ, ওর কাছ থেকে বুদ্ধি কিনতে হবে বলে ভাঁড়টা ভাঙতে হল।’

‘খুবই রহস্যময় ব্যাপার! বুদ্ধি কিনতে হবে মানে? ওকে তুমি টাকা দেবে আর ও ওর মাথার ঢাকনা খুলে তোমাকে বুদ্ধি দেবে?’

‘টাকা নয়, ওকে একজোড়া কাটলেট খাওয়ালে ও বলবে।’

‘কী বলবে?’

‘তা হলে আপনাকে সবটা বলতে হবে। গোড়া থেকে।’

‘বলো শুনি। খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।’

শিবাঞ্জন সব বলল, ‘একজোড়া কাটলেট খাওয়ালে ও আমাকে বুদ্ধিটা দেবে।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘অতিশয় ধুরন্ধর ছেলে। তোমার বুদ্ধিটা শুনি।’

শিবাঞ্জন বলল, ‘ওকে ধুরন্ধর বলবেন না, ও ভীষণ ভালো ছেলে। আমার প্রাণের বন্ধু। ও পেটুক নয়। এমনই মজা করে বলেছিল।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ঠিক আছে। ধুরন্ধর বলছি না। বলো হে ভালো ছেলে।’

‘আজ্ঞে ভেবেছি, চারটে ছ-ফুট লম্বা মোটা রেনওয়াটার পাইপ কিনে স্টেজে খাড়া করে দেব। বেশ কালো চকচকে।’

‘বুদ্ধি খারাপ নয়, কিন্তু খাড়া করবে কী করে!’

‘চারটে বড়ো ফুলগাছের টবে মাটি দিয়ে পুঁতে দেব।’

‘হবে না, হবে না, উলটে যাবে। আর একটু ভাব। বুদ্ধিটা যখন তোমার, তখন তুমিই আর একটু খেলাও।’

হঠাৎ ঝাঁ করে বুদ্ধিটা খেলে গেল, ‘স্যার, একটা কাজ করলে হয়। প্যাণ্ডেল তো হবেই, ওর মধ্যে বাঁশ পুরে একেবারে ওপরের আড়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেব।’

‘দ্যাটস রাইট।’ ভদ্রলোক ক্যাশ বাক্সের ওপর একটা চাপড় মারলেন, ‘দ্যাটস রাইট, আমি তোমাদের কাটলেট খাওয়াব। যাও ভেতরে গিয়ে বোসো। একটা কথা, হরেনদার নাম শুনেছ!’

‘আজ্ঞে না।’

‘সে কী শ্যামপুকুরের বিখ্যাত সিন পেন্টার হরেন মিত্তিরের নাম শোনোনি; জমিদারের ছেলে ছিলেন। বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেবেলা থেকেই ফ্যামিলির বাইরে! নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করেছেন। থিয়েটার ছিল ধ্যানজ্ঞান। বড়ো বড়ো অভিনেতারা তাঁর স্টুডিয়োয় এসে বসে থাকতেন। নতুন নাটকের সিন বলতেন হরেনদা এঁকে দিতেন। তাকিয়ে দেখার মতো সেসব কাজ। এখন বৃদ্ধ হয়েছেন, আর আঁকতে পারেন না। তবে ভীষণ ভালোমানুষ। রামায়ণের কয়েকটা সিন এখনও আছে মনে হয়। যদি ধরতে পারো ফ্রি অফ কস্ট পেয়ে যাবে। হরেনদা আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বুঝলে তো! তবে আমার নাম কোরো না। আমার ওপর খুব রাগ। ওই যে আমি গানের লাইন ছেড়ে কাটলেটের লাইনে চলে এলুম। সে আবার আর এক কাহিনি। পরে বলব। ইচ্ছে করলে একটা বই লিখতে পারবে। যাও, ভেতরে গিয়ে বোসো। অ্যায়, মেধো!’ ভদ্রলোক হাঁক পাড়লেন।

বেশ জমিয়ে, স্যালাড দিয়ে খোলতাই দুটো কাটলেট খাওয়া হল। ভদ্রলোককে নমস্কার জানিয়ে রাস্তায় নেমে শিবাঞ্জন বলল, ‘চল না, হরেনবাবুর স্টুডিয়োটা খোঁজ করে যাই।’

‘চল। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

শ্যামপুকুরে এসে একটু খোঁজ করতেই আর্ট স্টুডিয়ো, সিন পেন্টার অব রেপুট, প্রো: হরেন মিত্র, ইএসটিডি—১৯৩০ পাওয়া গেল। সাইনবোর্ডটা অস্পষ্ট। স্টুডিয়োর রাস্তার দিকের দরজা বন্ধ। পাশের দিকের দরজা ঠেলামাত্রই খুলে গেল। সরু প্যাসেজ। দোতলার রেনওয়াটার পাইপ ঢাকা একটা নর্দমায় পড়েছে। আমরা ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছি। সিমেন্ট বাঁধানো পথ। হঠাৎ কাশির শব্দ। কাশতে কাশতে একজন প্রশ্ন করছেন, ‘কে? কাকে চাই?’

ডান পাশে ঘর। খোলা জানলা। এক বৃদ্ধ বসে আছেন। লম্বা লম্বা সাদা চুল। দেখলেই মনে হচ্ছে। শিল্পী। শিবাঞ্জন বলল, ‘জ্যাঠামশাই! আপনার কাছেই এসেছি।’

‘আমার কাছে? আমার কাছে তোমাদের কী প্রয়োজন বাবা!’

‘ভেতরে যাব?’

‘এসেছ যখন নিশ্চয়ই আসবে। তবে কেন আসবে সেইটাই বুঝতে পারছি না।’

ভদ্রলোক কাশছেন। ঘরে কম পাওয়ারের আলো। চাদরপাতা চৌকি। তার ওপর শিল্পী বসে আছেন। মেঝের ওপর একটা আলবোলা। নলটা খাটের পাশে। দুটো বেতের মোড়া। ঘরের ডান পাশের দেয়ালটা পুরো ঢাকা। সেখানে একটা সিন। নীল আকশ। বন। একটা সোনালি হরিণ ছুটে পালাচ্ছে।

শিবাঞ্জন মোড়ায় বসতে যাচ্ছিল। ‘মারীচ, পলাশ, মারীচ’, বলে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। প্যাঁক করে একটা শব্দ। শিবাঞ্জন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠল। দেখছে, শব্দটা হল কোথায়! মেঝেতে একটা পুতুল পড়ে ছিল।

ভদ্রলোক বললেন ওটা আমার নাতনির। তোমাদের ব্যাপারটা তো বুঝতে পারছি না। পাগল নাকি!’

শিবাঞ্জন ছুটে এসে ভদ্রলোকের পা জড়িয়ে ধরল, ‘শিল্পী, শিল্পী, উঃ আপনি শিল্পী!’

ভদ্রলোক বললেন, ‘দেখো, কামড়ে-টামড়ে দিয়ো না যেন। শান্ত হও, শান্ত হও।’

শিবাঞ্জন কেঁদে ফেলেছে। আমিও সিনটা দেখছি, তবে আমার অত আবেগ আসছে না। আমি ঘোর বিষয়ী। দুর্দান্ত আঁকা, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষ যে কী করে এমন আঁকে!

ভদ্রলোক বলছেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার, তুমি কাঁদছ কেন?’

শিবাঞ্জন কথা বলবে কী, সে তো কেমন ফ্যাঁসফ্যাঁস করছে। আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে দিলুম, ‘জানেন তো, ও ভীষণ ভালো ছবি আঁকে, দুর্দান্ত ভালো ওর হাতের কাজ, তাই ও আপনার প্রতিভা দেখে আবেগ চাপতে পারছে না। ভাবছে, ও কেন আপনার মতো হতে পারছে না।’

বৃদ্ধ এইবার একটু হাসলেন, ‘সে কী! এখনও এমন ছেলে এই শহরে আছে নাকি! এত সূক্ষ্ম মনের ছেলে। এ তো বহুদূর যাবে। মনে হচ্ছে জীবনে খুব বড়ো হবে। টাকাপয়সা হয়তো হবে না, তবে একটা মানুষের মতো মানুষ হবে। তা তোমরা এই পরিত্যক্ত বৃদ্ধের কাছে হঠাৎ এলে কী মনে করে! সন্ধানই বা পেলে কার কাছে?’

শিবাঞ্জন একটু সামলাতে পেরেছে, সে-ই বলল, ‘আমরা জুবিলি স্কুলের ছাত্র।’

‘জুবিলি! জুবিলি ওয়াজ মাই স্কুল। ও কি আজকের স্কুল! ওয়ান অব দ্য বেস্ট স্কুলস ইন বেঙ্গল। তোমরা সেই স্কুলের ছাত্র! তার মানে, বার্ডস অব এ ফেদার। দেখি ওই কৌটোটা আনো। অন দ্য টপ অব দ্যাট ড্রয়ার।’

শিবাঞ্জন এগিয়ে গেল। ঘরটা বেশ বড়ো। একেবারে শেষ মাথায় একটা দেরাজ। তার ওপর সুদৃশ্য একটা কৌটো। কৌটোটা এনে বৃদ্ধের হাতে দিল। তিনি কৌটো খুলে একমুঠো লজেন্স বের করলেন। কোনোটা হালকা কমলালেবু রঙের, কোনোটা পিঙ্ক, কোনোটার রং ডিপ চকোলেট। শিবাঞ্জনের হাতে দিয়ে বললেন, ‘ভাগ করে নাও।’ নিজে একটা নিলেন।

মোড়ক খুলে মুখে পুরে বললেন, ‘খুব সুন্দর, টেস্ট করে দ্যাখো, যেকোনো দোকানে পাবে না! স্পেশাল।’

ভদ্রলোকের মুঠোয় এগারোটা লজেন্স উঠেছিল, শিবাঞ্জন পাঁচটা রেখে ছ-টা আমাকে দিল।

ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী সমান ভাগ হয়েছে?’

শিবাঞ্জন চুপ করে আছে দেখে আমি বললুম, ‘হয়নি স্যার, ও পাঁচটা রেখে ছ-টা আমাকে দিয়েছে।’

কিছুক্ষণ শিবাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তোমার পরিচয় জানি না, কিন্তু এইটা বুঝতে পারছি, তুমি খুব ভালো বংশের ছেলে, তোমার সংস্কার খুব ভালো। তুমি জীবনে অনেক বড়ো হতে পারবে। তোমার ভেতর ক্ষুদ্রতা নেই। আচ্ছা বলো তো, কেন তোমরা এসেছ?’

শিবাঞ্জনই বলল, ‘আমাদের স্কুলের ফাংশন। আমরা থিয়েটার করছি রাবণবধ। আমাদের তো তেমন পয়সা নেই, তাই স্টেজটা ঠিকমতো করতে পারছি না। আপনার কাছে আগের আঁকা কিছু সিন থাকতে পারে ভেবে এসেছি। যদি আপনি অনুগ্রহ করে দেন!’

‘রাবণবধ! তা হ্যাঁ রামায়ণের কিছু সিন তো আমার গোডাউনে থাকার কথা। তেমন যত্নে নেই। হয়তো ধুলো পড়েছে। ইঁদুরে একটু কাটতেকুটতেও পারে। তা হলেও তোমাদের কাজ চলে যাবে।’

শিবাঞ্জন প্রায় লাফিয়ে ওঠে আর কি, ‘অযোধ্যার রাজপ্রাসাদ আছে?’

‘থাকার তো কথা! সেবার খুব যত্ন করেই এঁকেছিলুম।’

‘অরণ্য?’

‘অরণ্য তো থাকবেই। চিত্রকূট পাহাড়।’

‘সমুদ্র? হনুমান মেরেছে লাফ।’

‘সমুদ্র আছে। হনুমান তো নেই।’

‘ঠিক আছে, হনুমান ছাড়াই হবে। লঙ্কা আছে?’

‘অবশ্যই আছে। লঙ্কায় অগ্নিকান্ড আছে।’

যতই শুনছে, শিবাঞ্জন যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করল, ‘অরণ্যে সীতার কুটির। রাবণ যেখান থেকে ধরেছিল?’

‘সেটা না-থাকলে রামায়ণের থাকলটা কী? ওইটাই তো রামায়ণের কেন্দ্রবিন্দু।’

শিবাঞ্জনের আবেগ এসেছে, আবার চোখ ছলছলে। কথা আটকে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘কীভাবে পাব?’

‘দ্যাখো বাবা, আমি অথর্ব। এক-পাও হাঁটতে পারি না। আগামীকাল বহরমপুর থেকে আমার ম্যানেজার গুপি আসবে। গুপি তোমাদের নিয়ে যাবে গ্রে স্ট্রিটের গোডাউনে। তোমরা সেইখান থেকে তোমাদের লোক দিয়ে বের করে নেবে। প্রথমে নরম বুরুশ দিয়ে আগাপাশতলা ঝাড়বে। যদি দ্যাখো, খুব ময়লা হয়েছে, তা হলে সাবানজলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে একটু মুছে নেবে। তোমাদের একটু খাটতে হবে। পারবে তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা খুব খাটতে পারি।’

‘ভেড়ি গুড, তা হলে এসো। এইবার আমি শুয়ে পড়ব। বয়েস হয়েছে তো, সন্ধ্যের মুখেই ঘুমটা ধরতে না-পারলে, ট্রেন বেরিয়ে যাবে, আমি সারারাত প্ল্যাটফর্মেই পড়ে থাকব একা।’

আমরা নমস্কার করে বেরিয়ে এলুম। শিবাঞ্জন নাচছে। ‘দেখেছিস, ভগবান আছেন। যা চাইছি তাই পেয়ে যাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে। চল খাইখাই-এর ভদ্রলোককে বলে আসি। ভ্যাগিস তুই কচুরির বদলে কাটলেট খেতে চাইলি। এখনও কত ভালো লোক বেঁচে আছেন বল?’

‘আগের মানুষরা বেশিরভাগই ভালো।’

খাইখাই-তে তখন রাতের ভিড় লেগে গেছে। দপাদ্দপ কাটলেট উড়ে যাচ্ছে। স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা আহত মানুষের মতো লম্বা লম্বা ফিশফ্রাই প্লেটে চেপে রান্নাঘর থেকে সোজা চলে যাচ্ছে খদ্দেরদের টেবিলে। বয়রা সব মাকুর মতো ছোটাছুটি করছে। নামতা পড়ার মতো একঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছে, তিন নম্বরে ফিশফ্রাই। একটা ডবল হাফ। পাঁচ নম্বরে একটা কবিরাজি।

ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন, ‘কী হল আবার?’

শিবাঞ্জন বলল, ‘আপনার কথায় খুব কাজ হয়েছে। সেই কথাটাই জানাতে এলুম।’

‘হবেই তো, হবেই তো! একবারে দিলদরিয়া মানুষ। তা, তোমাদের লেখাপড়া নেই, এখনও বাইরে বাইরে ঘুরছ?’

‘না, আমাদের তো পরীক্ষা হয়ে গেছে।’

‘হয়ে গেলেও, তোমাদের বয়সে সন্ধ্যের পর বাইরে থাকা উচিত নয়। পড়ার বই ছাড়াও অন্য অনেক বই আছে, যা তোমরা এইসময় পড়ে ফেলতে পারো।

এই সময়টাকে কাজে লাগাও। পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি কী বলো তো? সময়। আমরা সেই কোন ছেলেবেলায় পড়েছিলুম। টাইম অ্যাণ্ড টাইড ওয়েট ফর নান।’

আমরা দোকান থেকে বেরিয়ে এলুম। শিবাঞ্জন বলল, ‘কথাটা উনি ঠিকই বলেছেন। আমরা এখনও অতটা বড়ো হইনি যে রাত আটটা পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব। দেখেছিস পলাশ, সব ভালো মানুষের মধ্যেই একজন করে শিক্ষক বসে আছেন। চল, বাংলার স্যারকে সুখবরটা দিয়েই আমরা বাড়ি চলে যাই।’

স্যার তাঁর বাড়ির সামনের রকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে পায়চারি করছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, ‘কী! তোমরা দুটোতে এত রাতে!’

‘আপনি স্যার এখানে ঘোরাঘুরি করছেন?’

‘কী করব বলো, দরজায় তালা দিয়ে আমার স্ত্রী চলে গেছেন। এই একঘণ্টায় আমার প্রায় চার মাইল হাঁটা হয়ে গেল। তোমাদের কী খবর বলো!’

‘একটা ভীষণ সুখবর এনেছি স্যার। আমরা প্রায় সমস্ত দৃশ্যের সিন পেয়ে গেছি।’

‘সে কী! আঁকা সিন?’

‘হ্যাঁ স্যার, আঁকা সিন। অসাধারণ সুন্দর।’

শিবাঞ্জন পুরো অভিযানের একটা বর্ণনা দিল। স্যার একবার এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছেন, আমরাও যাচ্ছি পেছন পেছন। তিনি ওপাশ থেকে এপাশে আসছেন, আমরাও আসছি। অনেকটা লেজের মতো। সব শুনে তিনি বললেন, ‘পৃথিবীর সমস্ত আবিষ্কারই প্রায় অ্যাক্সিডেন্ট! তোমার ওই এক্সরেই বলো আর পেনিসিলিনই বলো। পলাশ বলল, খাওয়াতে হবে। কী খাওয়াতে হবে, না কচুরি। হঠাৎ মতের পরিবর্তন—কাটলেট খাব। সেই কাটলেট থেকে এই আবিষ্কার। এর নাম লাক।’

‘কালই তোমরা সিনগুলো এনে স্কুলের হলঘরে ডাম্প করে ফেলো। শুভস্য শীঘ্রম, অশুভস্য কালহরণম। একদম দেরি কোরো না।’

স্যারের স্ত্রী চটির ফটাস ফটাস শব্দ তুলে এলেন। হাতে একটা বাজারের থলে। তাঁকে দেখেই স্যার আমাদের বললেন, ‘তোমরা যাও। আমার রক্ত চড়ছে। এখন ধুম ঝগড়া হবে। তোমাদের না-শোনাই ভালো।’

আমরা লাফিয়ে রাস্তায়। শুনতে পেলুম তিনি চিৎকার করে বলছেন, ‘এতক্ষণ ছিলে কোথায়?’

ঠিক সেইরকম জোরেই উত্তর, ‘যমের বাড়ি।’

শিবাঞ্জন আপন মনে বলল, ‘ঠিকই করে ফেলেছি, জীবনে বিয়ে করব না। বিয়ে মানেই অশান্তি।’

‘ঠিক বলেছিস! আমি তো ঠিক করেছি, সারাজীবন ছাত্রই থাকব।’

‘মানে কী, প্রত্যেক বছর ফেল করবি!’

‘তা কেন, একের পর এক পাশ করে যাব, এম এ, এল, এল, বি, ডি লিট, ডি ফিল, আবার এম এ। চালিয়েই যাব, চালিয়েই যাব।’

‘আমি পেন্টার হব। ছবির পর ছবি এঁকে যাব।’

‘টাকা?’

‘ও ম্যানেজ হয়ে যাবে। খুব কম খাব। খাটিয়াতে শোব। পায়ে হেঁটে সবজায়গায় ঘুরব। একটা-দুটো ছবি নিশ্চয় বিক্রি হবে। খুব কষ্ট করব। কষ্ট করলে মানুষ খাঁটি হয়। দেখবি পশুর মধ্যে বলদ আর গাধাই সৎ।’

‘কেন, কুকুর?’

‘নিজেদের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া করে।’

‘ঘোড়া?’

‘ঘোঁড়ার খুব ডাঁট। অহংকারী। বড়োলোকেরা পিঠে চাপে তো।’

‘পাখি?’

‘অমিশুক। মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না। উড়ে পালায়।’

‘মাছ?’

‘মানুষের মনে লোভ জাগায়।’

শিবাঞ্জন আর আমি এক পাড়ায় থাকি। শিবাঞ্জনের বাড়ির একতলায় একঘর ভাড়াটে আছে। ভদ্রলোক পোস্টাপিসে চাকরি করেন। অবসর পেলেই তাঁর কাজ হল শিবাঞ্জনদের সঙ্গে ঝগড়া করা। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যে—সবসময় ঝগড়া। শুনতে পাচ্ছি, আজও হচ্ছে।

শিবাঞ্জন থেমে পড়ল, ‘বাড়ি যাব কি না ভাবছি রে পলাশ!’

‘এখন আর কোথায় যাবি এত রাতে বাড়ি ছাড়া!’

‘যতক্ষণ-না ঘুমোচ্ছে ততক্ষণই তো চালাবে।’

‘তোরা চুপ করে গেলেই তো পারিস।’

‘মা শুনবে না, সমানে চালিয়ে যাবে।’

‘কী নিয়ে হয়?’

‘কোনো ঠিক নেই, যা হয় একটা কিছু বেধে গেলেই হল। কাল হচ্ছিল আরশোলা নিয়ে। দোতলার আরশোলা কেন একতলায় নেমেছে?’

‘তা তোরা কী করবি?’

‘আমরা কেন আরশোলা কন্ট্রোল করছি না!’

আমাদের বাড়িতে এইসময় একটা কান্ড হয়। সেটা হল দিদির গলা সাধা। উচ্চাঙ্গ শিখছে। তানের ঠেলায় পাড়া কাঁপছে। সবাই বলে মারাত্মক গলা। আমার ভেতরটা কেমন যেন অস্থির করে। গলগল করে তান বেরোচ্ছে। সে আর থামে না। আমিও বাড়ি ঢুকব কিনা ভাবছি। শেষে দু-জনেই ঢুকলুম।

এইসময় আরও কান্ড হয় আমাদের পাড়ায়। সেটা হল আমতলায় যে বস্তি আছে, সেইখানকার একটা ছেলে বলা নেই কওয়া নেই, অকারণে দুমদাম করে পটকা ফাটাতে থাকে। তার বাবা নাকি বাজির কারখানায় কাজ করেন। সেই পটকার আওয়াজও শুরু হয়ে গেল। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমার দিদিটাকে হারমোনিয়াম সমেত শিবাঞ্জনদের বাড়ির দোতলার দক্ষিণের ঘরে বসিয়ে দিয়ে এলে হয়। ওদিকে ঝগড়া, এদিকে তেড়ে-তোড়ে মাপা, ধাপা, গামা, মাগা। হয়তো একদিন তাই হবে, কারণ যা শুনছি তাতে মনে হচ্ছে, শিবাঞ্জনের দাদার সঙ্গে আমার দিদির বিয়ে হবে। দু-জনের নাকি খুব ভাব হয়েছে। মা গয়না-টয়না সব গড়াতে শুরু করেছে। বাবা বলে, শিবাঞ্জনের দাদা নীলাঞ্জন ফার্স্টক্লাস ছেলে, জেম অব এ বয়। অঙ্কে এক-শোর মধ্যে এক-শো পেয়ে এসেছে সব পরীক্ষায়। আমি বিয়ে-টিয়ে বুঝি না। আমি বুঝি খাওয়া। ফিশ ফ্রাই, ফিশ রোল, মাটন চাপ। ঘুরব, ফিরব, গপাগপ খাব। দিদি ভাইফোঁটায় আমাকে জামা-প্যান্ট দেবে।

আমাদের স্কুলের নিউ হলে আজ নাটকের মহলা।

বাংলার স্যার নির্মলবাবু মাঝখানে বসেছেন স্ক্রিপ্ট হাতে। হাতে পেনসিল। কোন-কোন জায়গায় এফেক্ট মিউজিক ঢুকবে, সেইসব ঠিক করবেন। চরিত্রদের প্রবেশ, প্রস্থান। ছেলেদের আর আসল নামে এখন ডাকছেন না। বলছেন, ‘রাম কই, রাবণ কোথায়, সীতাকে কান ধরে মাঠ থেকে টেনে আন।’

জাম্বুবানের ঠাণ্ডা লেগে তিনটেই একসঙ্গে হয়েছে। সর্দি, কাশি, জ্বর। একটা খদ্দরের চাদর মুড়ি দিয়ে কোণে বসে ক্রমান্বয়ে কেশে চলেছে।

স্যার বলছেন, ‘মানুষমাত্রেরই কাশি হয়, কিন্তু সে-কাশিতে একটা কমা, ফুলস্টপ থাকে। এইরকম ননস্টপ কাশি খুব কম দেখেছি। এত ইরিটেশান হচ্ছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, বারণবধের বদলে হনুমানবধ করে ফেলি।’

রাবণ বলল, ‘স্যার, হবে না কেন কাশি! কাল দুপুরে আমাদের ছাদে বসে তেঁতুলের আচার খেয়েছে।’

‘তেঁতুল!’ স্যার আঁতকে উঠলেন, ‘একে রোদে রক্ষে নেই তার ওপর তেঁতুল। তেঁতুল এল কোথা থেকে?’

রাবণ বলল, ‘মা বাসন মাজার জন্যে আনিয়েছিল, ও দুপুরে এল। রোজই আসে। মা ওকে খুব খাতির করে তো!’

স্যার খুব রেগে গেলেন, ‘আই ওয়ার্ন ইউ। টেলিভিশনের ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহার করবে না।’

রাবণ বলল, ‘টেলিভিশন নয় স্যার। আমরা তো ইউ পি-তে ছিলুম তাই কিছু হিন্দি ঢুকেছে।’

জাম্বুবান কাশতে-কাশতে বলল, ‘স্যার, আমি জানতুম না, তেঁতুলের সন্ধানটা ও-ই দিয়েছিল, বললে, মা ঘুমোচ্ছে। চল এই ফাঁকে তেঁতুলটা সাবাড় করি।’

রাবণ বললে, ‘স্যার, তেল, লঙ্কা আর চিনি দিয়ে জিনিসটা ও-ই তৈরি করেছিল। আমাকে একটুখানি দিয়ে সবটা নিজেই সাবড়ে দিল।’

‘এটা তোর চক্রান্ত। তুই আগেই রামকে উইক করে দিতে চাইছিস। হনুমান অসুস্থ হলে তোরই তো পোয়াবারো।’

রাবণ হতাশ হয়ে বলল, ‘রামায়ণ তো আগেই লেখা হয়ে গেছে স্যার, আমি যাই করি-না-কেন, আমাকে মরতেই হবে, নতুন রামায়ণ তো লেখা হবে না।’

স্যার আর এক প্রস্থ রেগে গিয়ে বললেন, ‘জাম্বুবানকে ঘর থেকে বের করে দাও। কেশো হনুমান আমি চাই না। বাড়িতে গিয়ে নুনজলের গার্গল করো। থ্রোট পেন্ট লাগা। তেঁতুলের আচারে যার লোভ, সে কোনোদিন পারফেক্ট হনুমান হতে পারে না। ইমপসিবল। রামায়ণে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।’

জাম্বুবান কাশতে কাশতে নিজেই দরজার দিকে এগোচ্ছে, স্যার একটা হুংকার ছাড়লেন, ‘কালকের মধ্যে তোর কাশি না-সারলে হনুমানের লিস্ট থেকে তোর নাম কাটা যাবে।’

জাম্বুবান মনের দুঃখে বেরিয়ে গেল। স্যার এইবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি এক-দিন একটু সংযমে থাকতে না-পারো, আমি নাটক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।’

আমরা সবাই সমস্বরে বললুম, ‘ইয়েস স্যার।’

‘খুব লাইট ঝোল-ভাত খাবে। ঝোলে গাঁদালপাতা দিতে বলবে। যখন-তখন চান করবে না। দই, টক খাবে না। চানাচুর, ফুচকা ছোঁবে না। রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়বে।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘আচ্ছা, এইবার সব হনুমান একপাশে ফল-ইন করো।’

বারোটা হনুমান একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

‘তোমাদের আমি সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করাব। সামরিক বাহিনীতে যদি ডিসিপ্লিনের অভাব হয় যুদ্ধ জয় করা অসম্ভব! আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। রামের সামনে তোমরা যখন প্রথমে আসবে, তখন তোমরা হাতজোড় করে রামের বন্দনা গাইবে। তখন তোমাদের লেজ মাটির দিকে নীচু হয়ে থাকবে। পয়েন্টিং ডাউনওয়ার্ডস।’

শিবাঞ্জন বলল, ‘সেটা কী করে হবে স্যার। লেজগুলো তো ওদের ওরিজিন্যাল নয়। আমি তো সব মাথা-ওঁচানো লেজ করছি।’

‘সে আমি জানি না। করতেই হবে। ভগবান মাথা দিয়েছেন, মাথা খাটাও।’

হনুমানরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, মানুষরা বসেবসে মাথা খাটাতে লাগল। শিবাঞ্জন বলতে গিয়েছিল, ‘স্যার একমাত্র বেড়ালের লেজ আপ অ্যাণ্ড ডাউন করে।’

এক দাবড়ানি, ‘তোর কোনো অবজারভেশন নেই। মানুষ হয়ে হনুমানের মর্ম বুঝবি কী! হনুমানের লেজ যেমন লতিয়ে থাকে, সেইরকম খাড়া হয়ে মাথার দিকেও উঠে যায়। হ্যাণ্ডপাম্পের হাতলের মতো। এক-শো আশি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের যেকোনো অ্যাঙ্গেলেও ওঠা-নামা করে।’

শেষে একজন হনুমানের মাথা থেকেই বুদ্ধিটা বেরোল।

‘স্যার হবে।’

‘কী হবে?’

‘লেজ অধোমুখ হবে। আমরা প্রথমে লেজটা ঘুরিয়ে পরব। বাঁকা দিকটা মাটির দিকে ফেরানো থাকবে। পরে সেইটা ঘুরে যাবে মাথার দিকে, পরার কায়দায়।’

স্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘আঃ দেখেছ, ঠিক বের করে ফেলেছে সমাধান। এই না-হলে হনুমান! আচ্ছা আমরা তা হলে বন্দনাটা ঝালিয়ে নিই। সুর করে আমার সঙ্গে বলো, হাত জোড় করে:

ভজে বিশেষসুন্দরং সমস্তপাপখন্ডনম।

স্বভক্তচিত্তরঞ্জনং সদৈব রামমদ্বয়ম।।

জটাকলাপশোভিতং সমস্তপাপনাশকম।

স্বভক্তভীতিভঞ্জনং ভজে হ রামমদ্বয়ম।।

এই দুটো স্তবক আগে হোক। হনুমানদের মধ্যে কে একজন ‘স স’ করছে। হনুমানের স-এর দোষ থাকে না। স-এর উচ্চারণ ঠিকমতো করো, নয়তো নাম কেটে দেব। সুর যেন ঠিক থাকে। সুরটা মল্লার। আবার বলো, রিপিট, ভজে বিশেষসুন্দরং। আবার বলছি বিশেষ নয়, বিশেষ, বিশেষ। সমস্ত পাপখন্ডনম। শমস্ত নয়, স স, সমস্ত, সমস্ত। কে একজন গাঁক-গাঁক করে গাধার মতো চেল্লাচ্ছ। মনে রাখো, হনুমান স্তোত্রপাঠ করছে। গাধা নয়। হনুমানের দলে গাধার কোনো স্থান নেই।’

সে এক হিমশিম অবস্থা! একটাও সুরেলা হনুমান নেই। যাই হোক, হনুমানদের প্যারেড শুরু হল। লেফট রাইট, রাম সীতা, রাম সীতা, অ্যাবাউট টার্ন। হল্ট। স্ট্যাণ্ড অ্যাট ইজ। আবার লেফট রাইট।

শিবাঞ্জন হঠাৎ বলে উঠল, ‘প্যারেড হবে না স্যার।’

‘কেন? কেন হবে না। হওয়ালেই হবে।’

‘তা হলে সব হনুমানকে বেঁড়ে হতে হবে। লেজ থাকলে চলবে না। এক-একটা হনুমানের পেছনে মিনিমাম দু থেকে তিন ফুট ক্লিয়ারেন্স রাখতে হবে লেজের বাঁকের জন্যে। সেটা কি সম্ভব হবে!’

স্যার একটু চিন্তায় পড়লেন। শিবাঞ্জন ধরেছে ঠিক। আবার এক সমস্যা।

স্যার বললেন, ‘ঠিক বলেছিস! আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়?

‘কী কাজ স্যার?’

‘সাঁওতালি নৃত্যের মতো, হনুমানরা সার বেঁধে সামনে এগিয়ে যাবে, মাথা নীচু করে আবার পেছিয়ে আসবে। মাথা যখন নীচু করবে, মাথার ওপরে লেজটা নেচে উঠবে। কী বলিস, আইডিয়াটা কেমন?’

শিবাঞ্জন বলল, ‘খুব ভালো। পিকচারেস্ক।’

‘তা হলে সেইভাবেই হোক। হনুমানস গেট রেডি। সামনে এগোও, মাথা নীচু, পেছিয়ে এসো। মাথা তোলো, আবার এগোও। মাথা নীচু, মাথা নীচু। পেছোও।’

এই চলল বেশ কিছুক্ষণ। হনুমানরা ঘর্মাক্ত। স্যার বললেন, ‘এইবার বিশ্রাম তোমাদের, এইবার আমি মেন ক্যারেক্টারদের নিয়ে পড়ি। রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, রাবণ এগিয়ে এসো।’

রিহার্সালের পরেই স্কুলের মাঠে সীতার সঙ্গে রাবণের এক হাত খন্ডযুক্ত হয়ে গেল। রাবণ তিন-চারদিন ধরেই সীতার সঙ্গে ঠুসঠাস চালাচ্ছিল, ‘তোকে আমি হরণ করব। আমার অশোক কাননে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখব। রামকে মেরে তোকে শিক্ষা দেব। সীতা দেবী তোকে কে রক্ষা করবে। ম্যায় হুঁ, ম্যায় হুঁ ম্যায় হুঁ রাবণ।’ মাঝে মাঝে মাথায় গাঁট্টা-টাঁট্টাও মারছিল। রিহার্সালের পর মাঠে নেমে, যেই ‘সীতা দেবী’ বলে হাত ধরেছে অমনই সীতা দেবী সোজা ঝেড়ে দিয়েছে এক ঘুসি রাবণের চোয়ালে। সীতা মারামারিতে ওস্তাদ। হালকা শরীর। কিছুদিন ক্যারাটে শিখেছিল। রাবণটা গোদা। নড়তেচড়তেই পারে না। সীতা পাকা বক্সারের কায়দায় ঝড়াঝন একরাউণ্ড ঘুসি ঝেড়ে দিল। প্রায় দশ-বারোটা। রাবণের ঠোঁট কেটে গেছে। আমরা সবাই মিলে ছাড়িয়ে দিলুম। শিবাঞ্জন বলল, ‘এই সীতাকে রাবণ হরণ করবে কী করে! এ-ই তো রাবণকে হরণ করে নিয়ে যাবে। এ তো ইচ্ছে করলে রামকেও ফ্ল্যাট করে দিতে পারে।’

আমাদের সীতার অনেক গুণ। লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো। ভালো ফুটবলার। ফরওয়ার্ডে খেলে। বিদ্যুৎগতিতে লেফট উইং দিয়ে ছোটে। ফাঁক পেলেই জোর শটে বল জড়িয়ে দেয় নেটে। সীতা আমাদের স্কুল টিমের নাম্বার ওয়ান স্কোরার। সেই সীতাকে রাবণ গেছে খোঁচাতে। বাল্মীকির ব্যাকিং না-থাকলে পারবে সীতা হরণ করতে! রাবণ সেই কথাটা বুঝে কারও সঙ্গে কোনো কথা না-বলে সোজা বাড়ি চলে গেল।

রাম আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়। সে শুধু লেখাপড়া নিয়েই থাকে। চোখ দুটো বড়ো বড়ো। বেশ লম্বা। সাতেও থাকে না, পাঁচেও থাকে না। ঠাকুরদা নামকরা পন্ডিত। বয়স প্রায় নব্বই। টকটকে ফরসা, ঋজু চেহারা। এখনও সোজা হাঁটেন। নিজে রান্না করে খান। কেউ তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। রামের মধ্যেও সেইরকম একটা সাত্ত্বিক, তেজী ভাব। ভীষণ সিরিয়াস। এই রামের ওই সীতা, ভাবাই যায় না! স্যারের যেমন নির্বাচন!

শিবাঞ্জন বলল, ‘দেখবি, এই হয়ে রইল। অভিনয়ের রাতে কী হবে কে জানে!’

পরের দিন সকালে হেডস্যার আর অ্যাসিস্ট্যান্ট স্যার প্যাণ্ডেল, স্টেজ আর তোরণ নিয়ে পড়লেন। ‘তোরণ ইজ এ মাস্ট হোয়েন রাজ্যপাল ইজ কামিং।’ এই কথাটা সহপ্রধান পানঠাসা মুখে বারেবারেই বলতে লাগলেন। আর হেডস্যার কেবল বলছেন, ‘পিকটা ফেলে আসুন না। এনি মোমেন্ট ওভারফ্লো করবে।’ বাংলার স্যার একটা নকশা হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। চক দিয়ে লিখছেন, অশ্বত্থগাছ, সীতার পাতাল প্রবেশের স্পট, হনুমান ব্যালকনি, দশরথের চেয়ার।

এইসব হচ্ছে দেখে আমি আর শিবাঞ্জন গেলুম সিন আনতে। হরেনদা স্নান সেরেছেন। বাবরিচুল বেশ পাটে পাটে আঁচড়ানো। খাটে বসে আছেন হাতজোড় করে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির সামনে ধূপ জ্বলছে। সুন্দর মিষ্টি গন্ধ। আমরা দু-জনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি ধ্যান করছেন। নিথর শরীর। একসময় চোখ খুললেন। চোখ দুটো যেন সমুদ্রে স্নান করে উঠল। ঠাকুরের ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমাদের দিকে তাকালেন। চিনতে পেরেছেন, ‘অ, তোমরা এসেছ। বেশ করেছ, বোসো। আমি গুপেকে ডাকি।’

হাতের কাছে একটা পেতলের ঘণ্টা। তিনবার নাড়লেন।

একটা ঝড় এসে ঢুকল ঘরে। পরদা ফেঁড়ে ঘরে একজন এলেন। পালোয়ানের মতো চেহারা। পরনে গামছা। গোটা শরীর তেলে চপচপ করছে। হরেনবাবু অবাক, ‘এ কী, তেল মেখে কী হচ্ছে?’

‘তেলটা মাখতে বাধ্য হলুম। এখন আমার তেল মাখার কথা নয়। আমি তেল মাখব আর এক ঘণ্টা পরে।’

‘তা হলে মাখলে কেন?’

...হরেনবাবু অবাক, ‘এ কী, তেল মেখে কী হচ্ছে?’

‘মাখতে বাধ্য হলুম। টিন থেকে তেল ঢালতে গেলুম শিশিতে। ধার কাটল না, পড়ে গেল মেঝেতে। অতটা তেল নষ্ট হবে, তাই মেখেই নিলুম।’

‘কতটা ফেললে?’

‘তা পোয়াটাক।’

‘সরষের তেলের দাম জানো?’

‘জানি বলেই তো কষ্ট করে মাখতে হল।’

‘সেই ছেলে দুটি এসেছে, যাও গোডাউনে নিয়ে যাও।’

‘এখন এই অবস্থায় যাব কী করে! চান করব। চান করলেই খিদে পাবে। ভাত খাব। ভাত খেলেই ঘুম পাবে। ঘণ্টা দুয়েক ঘুমোব। উঠতে উঠতে বিকেল। তার মানে আজ আর হল না। সেই কাল।’

শিবাঞ্জন প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি, ‘কাল হলে হবে না স্যার। সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

হরেনবাবু আশ্বস্ত করলেন, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, উতলা হওয়ার কিছু নেই। লোকটার স্বভাবই এইরকম। সব কাজেই প্রথমে না-করবে, তারপরে তেল টেল মাখলে হ্যাঁ হবে। জাত বাঙালি।

হরেনবাবু গলাটা নরম করে বললেন, ‘হ্যাঁ, রে সত্যিই হবে না! ছেলে দুটো এত আশা নিয়ে এল। ধর তোকে যদি একটা কিছু উপহার দিই, তা হলে!’

‘সেটা আমাকে তা হলে বিচার-বিবেচনা করে দেখতে হবে, কী উপহার, কেমন উপহার।’

‘ধর এক কেজি ভালো রাবড়ি, মোহনের দোকানের।’

‘তা হলে ঝাঁ করে আমি দু-বালতি, বালতি তিনেকও হতে পারে, জল ঢেলে আসি। টাকাটা অ্যাডভান্স হবে কি?’

‘কথা ইজ কথা। হাতি কা দাঁত, মরদ কা বাত।’

হরেনবাবু বললেন, ‘ও আসতে-আসতে তোমাদের একটা স্কেচ করে ফেলি। তোমরা বোসো যেমন বসে আছ। বুঝলে, আর্টিস্টের হাত সবসময় চালু রাখতে হয়, ফেলে রাখলেই জং ধরে যায়। আর স্কেচ তুমি যত স্পিডে করতে পারবে, ততই লাইন ভালো আসবে, ফ্লোয়িং লাইনস। এইট বি পেনসিল, মোটা কাগজ।

আমরা বসে আছি, হরেনবাবু ঘচঘচ পেনসিল চালাচ্ছেন। দশ মিনিটও লাগল না। আমরা কাগজে ধরা পড়ে গেলুম। শিবাঞ্জন খাটের ধারে উঠে গেছে। এইভাবে দেখলে তার খুব উত্তেজনা হয়। পাগলের মতো হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করছে, ‘আগে কোন দিকটা ধরলেন?’

‘আগে-পরে নেই। সবটাই একসঙ্গে। তুমি যখন সমুদ্র দ্যাখো, তখন কীভাবে দ্যাখো?’

‘ঢেউ দেখি, একের পর এক।’

‘নো শুধু ঢেউ দ্যাখো না, তুমি প্রথমে দ্যাখো নীল আসমান, জমিন সব নীলে নীল, সেইখানে দ্যাখো একের পর এক ঢেউ আর সাদা ফেনা। আর দ্যাখো হলুদ বালি। এইবার ওইখানে যদি কিছু লোক, ধরো জলে কি সৈকতে বসে আছে, তুমি আর্টিস্ট, তুমি কোনটা দেখবে। তোমাকে সবটা একসঙ্গে দেখতে হবে। খুব ভালো শিল্পী সমুদ্রের ফনফনে বাতাসটাও দেখবে। বাতাস তো দেখা যায় না, অনুভব করা যায়, বাতাসের অ্যাকশান দেখা যায়, চুলে, পোশাকে, ছিটিয়ে পড়া ঢেউয়ের ফেনায়। আর ঢেউই তো বাতাস। বড়ো ঢেউ, ছোটো ঢেউ, রিপলস। একেই বলে সমগ্র দর্শন। সাধকেরও ওই এক কথা। স্রষ্টা আর সৃষ্টিকে এক করে দ্যাখো। যা নুড়ি, তাই পাথর, তাই পর্বত।’

হরেনবাবু শিবাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। গুপিবাবু একেবারে ফিটফাট হয়ে ঘরে এলেন। হরেনবাবু বললেন, ‘আবার সেই তেলটা মাথায় মেখেছিস গুপি! আমাকে এইবার বাড়িছাড়া করবি! তোমরা একটা গন্ধ পাচ্ছ না! হ্যাঁ গা, একটা ছারপোকা-ছারাপোকা গন্ধ!’

আমি হ্যাঁ বলতে যাচ্ছিলুম, শিবাঞ্জন আমার হাতে চিমটি কাটল। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলুম কী বলতে চাইছে। গুপিবাবু গোলমেলে, একবগ্গা লোক। হাতে রাখতে হবে। তাই চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

গুপিবাবু বললেন, ‘তোমার আর কী! একমাথা চুল। আমার যে কগাছা আছে, তাও তো সব ভুস ভুস করে উঠে যাচ্ছে।’

‘ওরে মূর্খ! ওই দুর্গন্ধী কবিরাজি তেলে যে টাক পড়ে যাবে গবেট! উঃ এই গন্ধটা আমার অসহ্য লাগে।’

‘এটা কীসের গন্ধ জানো! জেসমিন, জেসমিন।’

‘তোর মুন্ডু। জেসমিন আমার কাছে আছে। শুঁকে দেখিস।’

‘তোমার জেসমিন কী জানি না। আমার জেসমিন এইটা।’

গুপিদা উত্তেজিতভাবে আমাদের বললেন, ‘তোমাদের কী চাই?’

সেরেছে! সিন বুঝি আর কপালে জুটল না। শিবাঞ্জন মিষ্টিগলায় বলল, ‘সবে চান করেছেন, পিত্তি পড়বে। চলুন, ঘোষমশাইতে বসে একজোড়া চমচম খাবেন।’

‘বা:, অতিশয় স্নেহপ্রবণ ভদ্রসন্তান! এ-ছেলে দেশের, দশের মুখ উজ্জ্বল করবে। মনুমেন্টের মাথায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবে। কলকাতার দুঃখমোচন করবে। চলো, চলো। পিত্তাধিক্যে শরীর বিকল হয়।’

রাস্তায় বেরিয়ে দু-পা হাঁটতে-না-হাঁটতেই শিবাঞ্জনের সঙ্গে গুপিবাবুর হলায়গলায় ভাব হয়ে গেল। ঘোষমশাইতে আমাদের গোটাদশেক টাকা খরচ হল। সে আর কী করা যাবে! গোডাউন বটে একখানা। কী নেই সেখানে! বাঘ-ভালুক ছাড়া সবই আছে। সে এক সিন!

শিবাঞ্জন বলল, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই। মানুষ সমুদ্রের অতল থেকে জাহাজের মালপত্র তুলে আনছে, আর আমার ডাঙা থেকে রামায়ণের সিন বের করে আনতে পারব না!’

গুপিদা তালা খুলে দিয়ে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবার গুনগুন করে গান গাইছিলেন, না চাহিলে যারে পাওয়া যায়। শেষে কী মনে হল, বললেন, ‘সরো, দেখি, কী করা যায়! আছে, সে তো আমিও জানি। এখন শুয়ে আছে, না খাড়া আছে!’ গোটাকতক প্যাকিং বাক্স টপকে ভেতরে চলে গেলেন। সেইখান থেকে শোনা গেল, ‘ওঃ, দুটো চমচমের কী ঠেলা বাবা। দয়া করে ভেতরে এসো না! জামাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে না-থেকে।’

আমি জিঞ্জেস করছি, ‘যাব গুপিদা!’

শিবাঞ্জন বলল, ‘কেন, সন্ধ্যেবেলা এক কেজি রাবড়ি! চমচম তো ভূমিকা।’

ভেতরে হুড়মুড় করে কীসব পড়ে গেল। গুপিদার সাড়াশব্দ নেই। মরে গেল নাকি। বাক্স-টাক্স ট-পকে দু-জনে ভেতরে গেলাম। গুপিদা সিন চাপা পড়ে গেছে। মুন্ডুটা বেরিয়ে আছে।

শিবাঞ্জন বলল, ‘কী গো গুপিদা!’

গুপিদা বলছে, ক্ষীণস্বরে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। রাবড়ির লোভে আজ জীবনটা গেল।’

‘জীবন যাবে কেন, আমরা তোমাকে তুলছি ভাই!’

‘তোদের ক্ষমতায় কুলোবে না রে চম। একসঙ্গে তিনটে ঘাড়ে পড়েছে।’

সত্যিই সে এক ভজঘট ব্যাপার। এক-একটার কম ওজন! তার ওপর ওই ঢাউস সাইজ। যাই হোক আধ ঘণ্টার মতো কসরত করে মানুষটাকে বের করা গেল। ফিটফাট বাবুটি আর নেই। ঝুলকালি-মাখা ভূত।’

ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘নাও, এইবার সিন দ্যাখো। অবস্থাটা একবার দেখেছ। এত জায়গায় আগুন লাগে, এই হতচ্ছাড়া, গুদোমে লাগে না কেন! নাও, হাত লাগাও। এই চারটে হল রামায়ণের সিন।’

‘আর ওই পাশের ওইগুলো!’

‘শাহজাহান। তার ওপাশে চাণক্য। এইসব শিশিরবাবুর জন্যে আঁকা হয়েছিল। শিশিরকুমার ভাদুড়ির নাম শুনেছ?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘ভেরি গুড, তিনি আমার গুরু ছিলেন। তাঁর কাছেই আমার সব শিক্ষা।’

‘আপনি অভিনয় করতেন গুপিদা!’

‘অভিনয় অতিতুচ্ছ জিনিস, আমি তার চেয়ে বড়ো কাজ করতুম। প্রত্যেকটা সিনের শেষে চা খাওয়াতুম। চা খাওয়াতুম বলে আমার কত আদর ছিল! তাই তো গুরু আমাকে সন্ধিকরে বলতেন চাদর, গুরু বলতেন তুই আমাদের চা দিস তাই আমরা এনার্জি পাই, তুই চাদর। পুরোনো কথা বলতে বসলে দিন খতম হয়ে যাবে। যাও, একটা টেম্পো কি দু-জন লোক ভাড়া করে আনো। ফিরে গিয়ে আমাকে আবার ওস্তাদের জন্যে রান্না চাপাতে হবে। আজ আমার শখ হয়েছে মৌরলা মাছ ভাজা খাবেন।’

সেই দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হয়েছে, হ্যালো, হ্যালো, মাইক্রোফোন টেস্টিং, ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর। আজই আমাদের অনুষ্ঠান। তোরণ তৈরি হয়ে গেছে। তার মাথায় থার্মোকল কেটে শিবাঞ্জন লিখেছে, স্বাগত, মাননীয় রাজ্যপাল। তলার দিকে দু-পাশে খাড়া করে আটকেছে দুটো কাটআউট। দুটি মেয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাঁখ বাজাচ্ছে। নিজের বন্ধু বলে বলছি না, কাজ দুটো ভীষণ ভালো হয়েছে। প্রধানশিক্ষক পিঠ চাপড়ে বলেছেন, সুপার্ব!

মঞ্চ রেডি। মাঝখানে বাংলার স্যার দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। পাশে সহপ্রধান। রাজ্যপাল আসছেন, সেই কারণেই চুল কেটেছেন। সে যা হয়েছে! যেন ঘাস ছাঁট। তাঁরা দু-জনে সীতার গর্ত তৈরি করাচ্ছেন। সহপ্রধান মিস্ত্রিকে বলছেন, ‘আরে রাস্তার ম্যানহোল দ্যাখোনি! এগজ্যাক্টলি সেই কায়দা।’

মিস্ত্রি বলছেন, ‘গোলটোল হবে না, চারচৌকো হতে পারে।’

বাংলার স্যার বলছেন, ‘আরে তাই হোক না।’

‘বেশ, আমি করে দিচ্ছি, তবে পরে আপনারা বিপদে পড়বেন। সব ভন্ডুল করবে ওই গর্ত। স্টেজের তলাটা কেমন, কোনো ধারণা আছে বাবু! খোঁটা আছে কম-সে-কম সত্তরটা। বড়োজোড় একটা কুকুর ঢুকতে পারে। আপনি বলছেন একটা ডালা নিয়ে চারটে ছেলে ঢুকবে, তার ওপর আবার আর একটা ছেলে। জিন্দেগিতে এমন থিয়েটার শুনিনি। নাটকটা কি সিঁদেল চোরের কাহিনি!’

‘শুনবে কী করে! তুমি বাবু পুরোনো কালেই পড়ে আছ। স্টেজক্রাফট কোথায় এগিয়েছে জানো? আমেরিকা স্টেজে হেলিকপ্টার নামাচ্ছে।’

‘এটা আমেরিকা নয়, ইংল্যাণ্ড নয়, ইণ্ডিয়া। এ-দেশে এখনও রিকশা চলে। মানুষ গামছা পরে ঘুরে বেড়ায়।’

সহপ্রধান আর বাংলার স্যার দু-জনে মিলে মঞ্চের তলাটা দেখতে গেলেন, সঙ্গে আমি আর শিবাঞ্জন। সহপ্রধান দেখেই বললেন, ‘অসম্ভব! প্ল্যান বাতিল। রামায়ণে সীতার ওপর যথেষ্ট অত্যাচার করা হয়েছে, ফের, এগেন এই অত্যাচার করাটা মানবিক কারণেই অনুচিত। কেমন করে একটা ট্রলি এই খোঁটার জঙ্গলে ঢুকবে! চারপাশে গজালের মতো বড়ো বড়ো পেরেক। প্ল্যান পালটান, প্ল্যান পালটান। সীতা কি শেষে যিশু খ্রিস্ট হয়ে ঝুলবে।’

‘আপনারই প্ল্যান, লাস্ট মোমেন্ট আপনিই চেঞ্জ করছেন। আর ওই প্রথম দৃশ্যটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা নাটকটা।’

‘আরে মশাই, নাটকটা তো দাঁড়িয়ে আছে, আপনার সীতা কোথায় দাঁড়াবে! এক হয়, পাতাল আর স্বর্গ যদি স্থান পরিবর্তন করে। পাতালটা মনে করুন ওপরে, স্টেজের মাথায় আকাশ। সেখান থেকে দড়ি বেঁধে সীতাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল।’

‘অ্যাবসার্ড! আপনি আপনার সুবিধে দেখছেন, ভাষার দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না! আকাশ মানে আকাশ। মানে গগন, অন্তরীক্ষ, ব্যোম, শূন্য আ যুক্ত কাশ ধাতুর অ (ধি)। আর পাতাল মানে, পুরাণোক্ত ত্রিভুবনের সর্বনিম্নস্থ ভুবন, নাগলোক, পৃথিবীর অধোদেশস্থ ভুবন, ভূগর্ভ। অভিধানের এই অর্থ বদলে আকাশকে পাতালে, পাতালকে আকাশে পাঠানো যায়! ব্যাকরণ ইজ ব্যাকরণ!’

হঠাৎ পেছনে প্রধানশিক্ষক মহাশয়ের গলায় আমরা চমকে উঠেছি, ‘মাস্টারমশাই, আপনি নাটক লিখেছেন না ব্যাকরণ! ছি ছি, বড়ো মানুষের এ কী আচরণ! মশাই, ওপরে কত কাজ এখনও বাকি, আর আপনারা দু-জন রেসপনসিবল মানুষ এখানে ধাতুরূপ শব্দরূপ করছেন! অভাবনীয়। ওসব ছেলে-ছোকরাদের হাতে ছেড়ে দিন।’

হেডমাস্টারমশাই গটমট করে চলে গেলেন। আমরা সবাই অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলুম। এরই মাঝে শিবাঞ্জন, ‘ইউরেকা’ বলে লাফিয়ে উঠেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, ‘উরে বাবা।’ মাথার উপর বাyশ, খেয়াল করেনি।

‘জল দে, জলদি জল দে,’ বলে সহপ্রধানের চিৎকার।

শিবাঞ্জন সামলে নিয়ে বলল, ‘স্যার, তেমন লাগেনি। মাথার মাঝখানটা সুড়সুড় করছে। মনে হয় একটু রক্ত বেরিয়েছে, এখনই জমে যাবে, শুভকাজে একটু রক্তপাত ভালো স্যার।’

‘তা, তুমি বাবা অমন লাফিয়ে উঠলে, কেন কারণটা কী!’

‘স্টেজে ম্যানহোল করতে হবে না স্যার, আমার মাথায় অন্য আইডিয়া এসেছে।’

‘বলো না, বলো না।’ স্যার কেমন যেন হয়ে গেলেন। যাকে বলে অভিভূত।

শিবাঞ্জন দুষ্টু-দুষ্টু হেসে বলল, ‘সে দেখবেন যখন হবে চমকে যাবেন।’

হেডমাস্টারমশাই হাতজোড় করে বললেন, ‘শুধু নিজেদের ফাংশন নিয়ে থাকবেন না স্যার। আমার ফাংশনটাও একটু উদ্ধার করতে হবে তো! আই রিকোয়েস্ট।’

সহপ্রধান আমার মুখে পান ঠুসেছেন, তার ওপর ছেড়েছেন তিন টিপ জর্দা। সেই অবস্থায় কিছু একটা বলতে চাইলেন। প্রধানশিক্ষক দু-হাত তুলে বাধা দিলেন, ‘থাক, থাক, আর কিছু শুনতে চাই না। আমি বুঝে গেছি। একেই বলে অন্তর্ঘাত। একটা দিন, মাত্র একটা দিনের জন্যে আপনার এই বদঅভ্যাসটা বন্ধ রাখতে পারছেন না! জাস্ট ফর এ ফিউ আওয়ার্স। গভর্নরের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, মুখে পান জর্দা, হাতে পানের বোঁটায় চুন। হোয়াট এ সিন।’

সহপ্রধান একপাশে হেলে প্যাঁক করে খানিক পানের পিক ফেলে বললেন, ‘বা:। এরই মধ্যে ফাংশনটাকে ফেঁড়ে ফেললেন, দু-ভাগে, আমার-তোমার! এটা কিন্তু আপনিই করলেন, আমরা করিনি। আমরা এই যে তলায় এসেছি, এটা একটা টেকনিক্যাল কারণে, অকারণে আসিনি স্যার।’

হেডমাস্টারমশাই ইশারা করে দেখালেন, সহপ্রধানের পাঞ্জাবির বুকে একফোঁটা পানের পিক লেগেছে।

সহপ্রধান একবার দেখে নিয়ে বললেন, ‘এই বাজারে একটু লালের স্পট থাকা ভালো। ওটা হল রক্ষাকবচ। আচ্ছা, এইবার চলুন, ওদিকটা দেখা যাক। নির্মলবাবু চলে আসুন।’

ওঁরা চলে যেতেই শিবাঞ্জনকে বললুম, ‘তোর আবিষ্কারটা কী শুনি?’

‘একবার বাড়িতে যেতে হবে, চল আমার সঙ্গে।’

শিবাঞ্জনদের বাড়ি স্কুলের খুব কাছেই। শিবাঞ্জন আমাকে নিয়ে তড়তড় করে চিলেকোঠায় চলে এল। সেইখান থেকে দু-জনে টেনেটুনে বিশাল বড়ো একটা কাগজের বাক্স বের করলুম। বাক্সটা বেশ শক্তপোক্ত। একসময় টিভি এসেছিল।

শিবাঞ্জন বলল, ‘ভেতরে বোস তো।’

বসলুম। মাথার চাঁদিটা জেগে রইল।

শিবাঞ্জন বলল, মাথাটা নীচু কর।’

নীচু করলাম। শিবাঞ্জন বলল, ‘হবে ফাসক্লাস হবে। সামনের দিকটায় কালো কাগজ মেরে দিই।’ বাক্স নিয়ে যখন ফিরে এলুম, স্টেজ তখন রেডি। লাল কার্পেট, সাদা চাদর ঢাকা লম্বা টেবিল। সাদা-সাদা চেয়ার। দুটো ফুলদান, সুন্দর তোড়া। পেছনে ভেলভেটের পরদা। তার ওপর শিবাঞ্জনের আর্ট, সাদা একটা রাজহাঁস, একটা বীণা। একটা পদ্ম। একেবারে ফেটে গেছে। রাজ্যপাল যেদিক দিয়ে উঠবেন সেদিকে রেলিং লাগানো বেশ শক্ত সিঁড়ি।

মঞ্চের ভারবহন ক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রথমে সিঁড়ি। আমাদের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক খুব মোটা। তিনি বারবার উঠছেন, নামছেন। ধপাস-ধপাস করে। দু-চারবার করে বললেন, ‘না:, কোনো ভয় নেই। আমি ইজিকলটু চারটে সাধারণ লোক। রাজ্যপালের চেহারা সাধারণ চেহারা, কোনো ভয় নেই।’

হেডমাস্টারমশাই মেয়েদের ডাকলেন। তিরিশজন। সকলকেই মঞ্চে তোলা হল।

সহপ্রধান বললেন, ‘জাম্প।’

তারা লাফাচ্ছে। হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘টেস্ট করতে গিয়ে খোলনলচে খুলে পড়ে না যায়!’ —বলতে-না-বলতেই ফুলদানি দুটো উলটে পড়ে গেল।

সহপ্রধান বললেন, ‘নুইসেন্স। আমি আগেই বলেছিলুম, যেকোনো সভা পন্ড করার পক্ষে গোটা দুই ফুলদানিই যথেষ্ট। অ্যায়, এই দুটোকে ঘাড় ধরে মঞ্চ থেকে বিদায় কর। আমি যে বলেছিলুম টেবিলের মাঝখানে একটা ইকেবানা ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট রাখতে। সেটা কই! শিবাঞ্জন!’

‘ভুলে গেছি স্যার!’

‘ভুললে তো চলবে না স্যার। এখনও এক ঘণ্টা সময় আছে, করে ফ্যালো। তোমার প্রতিভা আছে। রাজ্যপালের সামনে সেই প্রতিভা প্লেস করো।’

বেচারা শিবাঞ্জন আর পারছে না। জিজ্ঞেস করল, ‘কীসে করব স্যার?’

‘আমার মাথায়, আমার খুলিতে।’ যত সময় এগিয়ে আসছে, ততই সকলের টেম্পার চড়ছে। শিবাঞ্জন আবার লাফিয়ে উঠল, ‘ইউরেকা।’ মৃদুলা কুঁক-কুঁক করে হেসে উঠল। ফার্স্টক্লাসে পড়ে মৃদুলা। লেখাপড়ায় যেমন ভালো, তেমনই ভালো নাচে-গায়। মৃদুলা শিবাঞ্জনকে ভালোবাসে। আমরা সবাই জানি। শিবাঞ্জন জানে না! সে নিজের খেয়ালেই বনবন ঘোরে। শিল্পীরা মনে হয় এইরকমই হয়। শিবাঞ্জন গ্রাহ্যই করল না। এক লাফে নেমে গেল মঞ্চ থেকে। ছুটল বাড়িতে। সেখান থেকে নিয়ে এল এক বিশাল বড়ো একটা ঝিনুকের খোলা। জিনিসটা আন্দামানের। আধ ঘণ্টার মধ্যে সে একটা কাজ নামাল, হাঁ করে তাকিয়ে দেখার মতো।

তখনও কিন্তু শাঁখের রিহার্সাল চলছে। ওয়ান-টু-থ্রি, পোঁ।

সহপ্রধান পরিচালনা করছেন, ‘হল না, হল না। তিনটে পোঁ করেনি, ফোঁ করেছে।’

রিহার্সাল শেষ হওয়ার পর ফাঁক পেয়ে মৃদুলা শিবাঞ্জনের পাশে এসে দাঁড়াল, ‘কী দারুণ করেছিস রে!’

আমার খুব হিংসে হচ্ছিল। বাংলার স্যার দাবড়ানি দিলেন, ‘তাতে তোমার কী। ওর মাথাটা খারাপ করে দিয়ো না মা। এখনও অনেক কাজ বাকি। দয়া করে এসো এখন। আমাদের শ্রাদ্ধটা হয়ে যাক।’

ঠিক পাঁচটায় গর্ভনর আসবেন। সাড়ে চারটে বাজল। প্রধানশিক্ষক সমস্ত দিক একবার ঘুরে দেখে এলেন। হেঁ, মনে হচ্ছে নিখুঁত। কোথাও কোনো ত্রুটি তো চোখে পড়ছে না। তোরণ থেকে গেট সব ঝাড়ু দিয়ে ধুয়েমুছে ঝকঝকে, তকতকে। দুটো বড়ো গর্ত; সে গর্ত আজ পনেরো বছর ধরেই আছে। সারানো হবে না। বলা হল, গভর্নর আসছেন, যদি একটু তাপ্পিতুপ্পি মেরে দেন। তাতে রাস্তা মেরামত দফতরের বড়োকর্তা বললেন, ‘ওসব নকশা আমাকে দেখাবেন না। আজকাল একটা কায়দা হয়েছে, যেকোনো ছেঁচড়া অনুষ্ঠানে গভর্নরকে ধরে আনা। চালাকিটা আমরা বুঝি। আসল উদ্দেশ্যটা হল, ওই ছুতোয় রাস্তাটা মেরামত করিয়ে নেওয়া। আমরা ধরে ফেলেছি ভাই। গভর্নর বড়ো রাস্তা ছেড়ে গলিঘুঁজিতে ঢুকতে চাইলে আমরা কী করতে পারি!’

ওই গর্ত দুটো আমরাই রাবিশ ঢেলে পিটিয়ে যা হয় একরকম করেছি।

সিকিউরিটি অফিসার বললেন, ‘সেকেলে বুদ্ধি নিয়ে একেলে টেররিস্ট ধরতে হলে আপনার কবে চাকরি চলে যেত! আর. ডি. এক্স. জানেন কাকে বলে! ট্যাঁকে, ট্যাঁকে থাকে আধুলির মতো। একটা ঘষা, এই প্যাণ্ডেল-ফ্যাণ্ডেল, গ্রাম-ট্রাম উড়ে যাবে।’

হঠাৎ ড্রামের আওয়াজ, ডুডুডুম, ড্রাম ড্রাম। আর, এসে গেলেন নাকি?

সবাই হুড়মুড় করে দৌড়োলেন, দেখা গেল কিছুই নয়, শুভাশিস ড্রামের চার্জে, সে একবার দেখে নিচ্ছে যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক মেজাজে আছে কিনা। হেডমাস্টার মশাই একটু অসন্তুষ্ট হয়েছেন, মুখ দেখেই বোঝা গেল; কিন্তু অসহায়! সবাই রিহার্সাল দিচ্ছে, শুভাশিসও দেবে। বাধা দিলে চলবে না।

এইসময় সহপ্রধান মনে করিয়ে দিলেন, ‘শাঁখের সঙ্গে গান হবে বলেছিলেন, শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে।’

‘রাজ্যপালকে জননী বলা যায় না।’

‘তা হলে জননীর জায়গায় জনক বসিয়ে দিন।’

‘ছন্দ মিলবে না।’

‘হ্যাঁ, তাও তো বটে! তা হলে একটা কাজ করুন, গায়ে তো ফুল ছুড়ে মারা হবে, সেইসময় যদি গাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথের গান:

পুষ্প দিয়ে মারো যারে চিনল না সে মরণকে।

বাণ খেয়ে যে পড়ে সে যে ধরে তোমার চরণকে।।

হেডমাস্টারমশাই আঁতকে উঠে বললেন, ‘আমাকে জেলে পাঠাতে চান! রাজ্যপালকে বাণ মারব! কোনো গানের প্রয়োজন নেই, কেবল শাঁখ আর ব্যাণ্ড। তাইতেই দেখবেন ব্লাড প্রেশার টু ফর্টি। গেট রেডি। আর মাত্র টেন মিনিটস। রাজ্যপালকে আপনি রিসিভ করবেন।’

‘তা হলে এই দশ মিনিটে ঝপ করে আমি একটা পান খেয়ে নিই।’

‘প্লিজ হেমন্তবাবু, ওই কাজটা আপনি করবেন না। আমি বড়ো হয়েও আপনার পায়ে ধরছি।’

স্কুলের গেটে ওসি। এক ব্যাটেলিয়ান পুলিশের লাইন আপ। ওসির কানে ওয়াকিটকি। তিনি আওয়াজ দিলেন, ‘আসছেন?’ আর ঠিক সেইসময় বেপাড়ার একটা কুকুর এল কী হচ্ছে দেখতে। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের গেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এল আমাদের বিগ ভোলা। বিদ্যুৎবেগে! নিমেষে ঝটাপটি। মেয়েরা লাইন ভেঙে চিলচিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারল দৌড়োল। শিবাঞ্জন চেঁচাচ্ছে, ‘আমার গেট, আমার গেট।’ গেটের দু-পাশের ঘট রাস্তায় গড়াচ্ছে। ধুন্ধুমার মারামারি। ওসি চিৎকার করছেন, ‘চার্জ, চার্জ, ফায়ার, টিয়ারগ্যাস।’ সেই মুহূর্তে দূরে শোনা গেল, সাইরেন, ওঁয়া ওঁয়া। সহপ্রধান বললেন, ‘সর্বনাশ! রাজ্যপাল আ গিয়া!’

পুলিশের বেধড়ক লাঠি চার্জ। কুকুর দুটোর একটানা কেঁউ কেঁউ। রাজ্যপাল নামলেন। প্রধানশিক্ষক অর্ডার দিলেন, শঙ্খ। শঙ্খধারিণীরা যে যেখানে ছিল, সেইখান থেকেই শাঁখ বাজাতে লাগল। শুভাশিসের ব্যাণ্ড, ধ্যাপপড়, ধ্যাপপড়। মেয়েরা নেই। প্রধানশিক্ষকই পুষ্পবৃষ্টি করছেন। কলাগাছ সমেত ঘট রাস্তায় শুয়ে আছে। সহপ্রধান এগিয়ে এসে মাথা নীচু করে, হাতজোড় করে বলছেন, ‘স্বাগতম, স্বাগতম, ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, ফর্চুনেট উই আর দ্যাট ইউ হ্যাভ কাম। ওয়েলকাম, ওয়েলকাম।’

সহপ্রধানের জন্য রাজ্যপাল এগোতে পারছেন না। তিনি কেবল বলছেন, ‘থ্যাঙ্কস, থ্যাঙ্কস।’

শেষে সিকিউরিটির একজন, এক ধাক্কা মেরে সহপ্রধানকে পাশে সরিয়ে দিলেন। রাজ্যপাল ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠে সিংহাসন চেয়ারে বসলেন। বাংলার স্যার মাইক্রোফোনের সামনে। স্বাগত ভাষণ, ‘আজ আমাদের...’ মাইক্রোফোনের নিজের ভাষায় নিজের কিছু বলার ছিল, ‘চ্যাঁ চোঁ, সিঁ, কোঁড়র কোঁত।’

যাঁরা সামনের আসনে ছিলেন চিৎকার করে উঠলেন, ‘মাইক, মাইক।’

ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, ‘টয়লেটে।’

বাংলার শিক্ষক অসহায়। আবার চেষ্টা, ‘আজ...।’

এবারে মাইক্রোফোন ক্ষিপ্ত, ‘চোঁও ও চোঁক।’

স্যার বললেন, ‘ইমপসিবল’।

মাইক বললেন, ‘ভোঁচ।’

এমন সময় মাইকম্যান এল। সবাই বলে তেএঁটে বিশ। মাইক ঠিক হল। স্যার শুরু করলেন, ‘আজ আমাদের পরম সৌভাগ্যের দিন। এই সুপ্রাচীন বিদ্যালয়ে প্রথম এক রাজ্যপাল এলেন। আমরা কৃতজ্ঞ, আমরা ধন্য, আমরা অভিভূত, অমরা উচ্ছ্বসিত, আমরা বাক্যাহত।’

হেডমাস্টারমশাই ইশারা করছেন, আর না, আর না।

শেষে সহপ্রধান স্টেজে সাতটা বাচ্চা মেয়ে নামিয়ে দিলেন। ফুটফুটে সুন্দর, প্রত্যেকের হাতে মালা। তারা নেচে- নেচে আসছে। পেছনে বসে গান গাইছেন উমাদির দল:

ফুল বলে, ধন্য আমি মাটির পরে,

দেবতা ওগো, তোমার সেবা আমার ঘরে।।

জন্ম নিয়েছি ধূলিতে দয়া করে দাও ভুলিতে,

নাই ধূলি মোর অন্তরে।।

গানের সুরে আদেশ এল, ‘বড়ো মালাটা পরিয়ে দাও।’ কুচো ফুলের বৃষ্টি। অমিতা নাচতে নাচতে গিয়ে মালা পরাল। সঙ্গে সঙ্গে ঝুপুস ঝুপুস গোলাপের পাপড়ি বর্ষণ। আবার গান:

নয়ন তোমার নত করো,

দলগুলি কাঁপে থরোথরো।

চরণপরশ দিয়ো দিয়েত

গানের সুরে আদেশ, ‘ওয়ান বাই ওয়ান, প্লেস ইয়োর মালা অন হিজ হাইনেসেস ফিট। নেচে নেচে, তিক তিক, তেরে কেটে, তিক, ধারার প্রণাম আমি তোমার তরে। ওয়ান ব্যাক, তোমার তরে, টু ব্যাক। স্টার্ট ব্যাণ্ড, হালকা নোট, ওনলি কেটল ড্রাম, কুটুল কুটুল। শাঁখ, পুঁওঁওঁ। স্টপ।’

এরপর একেবারে তেড়ে গান, ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে, জয় হে।’

বিগ ড্রামের, ড্যাম্ভ ড্যাম্ভ।

অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হয়ে গেল। শোভনা, আমাদের সুন্দরী শোভনা, রাজ্যপালকে চন্দনের টিপ পরিয়েছে। রাজ্যপাল আবার তাকে একটা পালটা টিপ পরিয়ে দিয়েছেন। সে কী গর্বের কথা! দেখি দেখি করে সব মেয়ে তেড়ে তেড়ে এসে দেখছে।

প্রধানশিক্ষকমশাই একটা সিল্কের উত্তরীয় রাজ্যপালকে পরিয়ে দিলেন। দু-জনের করমর্দন হল।

সহপ্রধান এইবারে মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের পর্ব ঘোষণা করলেন। স্কুলের সেক্রেটারি বিখ্যাত ব্যবসায়ী চাঁদপাল সরকার স্বল্প কথায় স্কুলের পরিচিতি দিলেন, ‘দিস ইজ অ্যান ওল্ড ইনস্টিটিউশন বাট স্টিল ইয়াং। এই স্কুল থেকে যাঁরা পাস করে বেরিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ আজ বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, মন্ত্রী। একমাত্র আমিই এক মূর্খ, কিস্যু, কিস্যু, হতে পা...।’

হাউহাউ কান্না। সহপ্রধান সরিয়ে আনলেন। উমাদি রেডিই ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ধরে দিলেন গান, ‘ভেঙেছে দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়।’

চাঁদপালবাবুর সমস্যা তখনও মেটেনি। তিনি আমাদের সাজঘরের একটা টুলে বসে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে সামনে কাঁদছেন আর হাপুস-হাপুস করে শ্বাস ফেলছেন হাপরের মতো। ক্রমশই যেন নেতিয়ে পড়ছেন। আমরা স্যারকে ডেকে আনলুম, ‘দেখুন, সেই থেকে কেমন করছেন হাপরের মতো। মনে হচ্ছে দম আটকে যাবে যেকোনো মুহূর্তে।’

পন্ডিতমশাই কবিরাজি করেন। নাড়ি টিপে বললেন, ‘ভংকর এলোমেলো, হনুমানের নাড়ির মতো। দুর্বলে সবলা নাড়ি সা নাড়ি প্রাণঘাতিকা। এঁকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করাই বিধেয়।’

শুরু হল দৌড়ঝাঁপ। হেডমাস্টারমশাই মঞ্চ ছেড়ে এলেন, সহপ্রধান ছিটকে চলে এসেছেন। রাজ্যপালের ভাষণ হচ্ছে, ‘এডুকেশান মেকস এ ম্যান। শিক্ষা ছাড়া মানুষ তার জীবনের অর্থ বুঝতে পারে না। শিক্ষা মানুষকে সহ্য শক্তি দেয়, উদারতা দেয়। শিক্ষিতের সমাজের চেহারা শান্ত, কল্যাণমূলক, আনন্দের, অগ্রগতির, ভ্রাতৃত্বের, ভালোবাসার। অশিক্ষিত মানুষের সঙ্গে বনের পশুর তফাত নেই কোনো। গোরু শান্ত প্রাণী, হনুমান ছটফটে, বাঘ হিংস্র, হরিণ অহিংস, সব একজায়গায় আছে তাই এত অশান্তি। এদের যদি এডুকেশন দেওয়া যেত, হিংসা নয়, শান্তি, বৈরিতা নয়, ভ্রাতৃত্ব, যদি মিনিমাম একটা এডুকেশানে ফেলা যেত, জঙ্গল হত সিটি অব ডিপ কালচার।’

চাঁদপালবাবু চিত হয়ে শুয়ে ধড়ফড় করছেন। হেডমাস্টার বলছেন, ‘এ শিওর হার্ট অ্যাটাকের দিকে যাচ্ছে। এই বয়সে রোজ রাতে গাওয়া ঘিয়ের লুচি সহ্য হয়! হার্টে ফ্যাট ঢুকেছে। হয়ে গেল! সেক্রেটারি মারা গেলে ফাংশন আর হয় কী করে? পতাকা অর্ধনমিত। ব্যায়লা বাজিয়ে ড্রপ সিন। কোনোরকমে আজকের মতো প্রাণটা ধরে রাখতে পারেন না! অন্তত রাত বারোটা পর্যন্ত!’

চাঁদপালবাবু ডুকরে উঠলেন, ‘এ হার্ট নয়, এ হল গভার্নার শক। হল না, কিছু হল না আমার জীবনে।’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনার হতে আর বাকিটা কী আছে! এই শহরে তিনখানা বাড়ি। মধ্যমগ্রামে বাগান বাড়ি। নির্বাচনে একবার দাঁড়িয়েছিলেন, পনেরো হাজার ভোট পেয়েছিলেন। আবার কী! আর কী হতে পারে?’

‘আমি দান করব, এই মুহূর্তে আমি সায়েন্স ল্যাবরেটরির জন্যে স্কুলকে দশ লাখ দান করব।’

‘আগেও বহুবার বলছেন, ফলস।’

‘এবার সত্য। আমার ভেতর থেকে হৃৎপিঞ্জর ভেদ করে সেই দান বেরিয়ে আসতে চাইছে। আপনি গভর্নরকে দিয়ে অ্যানাউন্স করান।’

‘আগে চেক।’

‘আগে অ্যানাউন্সমেন্ট।’

‘আগে চেক।’

‘বই বাড়িতে।’

‘নিয়ে আসুন। পাশেই বাড়ি।’

‘পাঁচ লাখ দেব।’

‘তাই দিন।’

‘এক লাখ।’

‘বেশ তাই।’

‘ভেবে দেখলুম, হঠকারিতা ভালো নয়, পরে ভেবেচিন্তে করা যাবে।’

‘তা হলে এখন আপনি বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন। খুব উত্তেজনা হয়েছে তো!’

‘আমি যদি এখানে একটু শুয়ে থাকি তা হলে আপনাদের কোনো অসুবিধা আছে কি? রাজ্যপালের সঙ্গে আমার প্রাইভেট কথা আছে। আমি রাজ্যপালের ফাণ্ডে দু-লাখ টাকা দান করে পদ্মশ্রী হব।’

‘তা সে আপনার প্রাইভেট ব্যাপার, প্রাইভেটলি বুঝে নিন।’

‘বক্তৃতা শেষ হওয়ামাত্রই অ্যানাউন্স করে দিন, মাননীয় চাঁদপল সরকার, সেক্রেটারি, প্রখ্যাত সমাজসেবী, দানবীর, মহাবীর রাজ্যপালের ফাণ্ডে দু-লক্ষ টাকা দান করছেন, শিক্ষার প্রসারে, আর্তের সেবায়। প্রতিশ্রুতবদ্ধ টাকা তিনি কাল রাজ্যপালের দপ্তরে জমা করে দিয়ে আসবেন।’

সহপ্রধান বললেন, ‘আপনার অনেক ঢং আমরা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি মশাই। পরের কাঁধে বন্দুক রেখে অনেক দেগেছেন, আর না। ওই দেখুন আপনার স্ত্রী এসে গেছেন, এইবার নিজেরা বোঝাপড়া করুন। দু-লাখ টাকা দেবেন কি দেবেন না! আপনার স্ত্রীর অনুমতি আছে কিনা!’

সেই মহিলা রণরঙ্গিনী। মহিলা সমিতির নেত্রী। এগিয়ে এসে হাত ধরে হ্যাঁচকা টান, ‘ওঠো। আর সাতদিন দেখব তারপর হাতে-পায়ে বেড়ি দিয়ে ফেলে রাখব। মাথাটা কতটা বিগড়েছে তখন বুঝবে।’

ভদ্রলোক কেঁচো হয়ে গেলেন। বলা নেই কওয়া নেই বেসুরো গাইতে লাগলেন, ‘জীবন আমার বিফলে গেল, লাগিল না কোনো কাজে।’

চাঁদপালবাবুর স্ত্রী পাড়ার সবাই যাঁকে বউদি বলেন, তিনি এইবার আসল কথাটি বলে দিলেন, ‘এইরকম কেন করছেন জানেন? চিটফাণ্ড। আজ হোক কাল হোক শ্রীঘরে এঁকে যেতেই হবে। কত লোকের টাকা মেরে বসে আছেন। আর তা না-হলে গণধোলাই। হাড় একদিকে, মাংসা একদিকে।’

সহপ্রধান বললেন, ‘ও, সেই কারণে রাজ্যপালের তহবিলে দান!’

চাঁদপালবাবু ‘ঘরের শত্রু, ঘরের শত্রু’ বলতে-বলতে উঠে পড়লেন। চটি গলিয়ে হাওয়া।

রাজ্যপালের ভাষণ শেষ। সহপ্রধান দৌড়ে গেলেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন। ‘আমাদের বিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হয়ে রইল আজকের দিনটি।’

রাজ্যপালের ভাষণ কিছুই শোনেননি, তবু বললেন, ‘সমাজ, জীবন, শিক্ষা, চরিত্রগঠন ও কর্তব্য সম্পর্কে আপনি যা বললেন, তা আমদের মনে রাখতে হবে। দেশের বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সংঘবদ্ধ হতে হবে। অখন্ড ভারত। অখন্ড মানবঐক্য। বর্ণমালার নতুন পাঠ হবে এইরকম, অ-এ অজগর আসছে তেড়ে নয়, অ-এ অখন্ড ভারত। আ-এ আম নয়, আত্মত্যাগ। ই-তে ইঁদুর নয়, ইনকিলাব। ঈ-তে ঈগল নয়, ঈষা মানে লাঙ্গলদন্ড। প্লাউ। মানে কর্ষণ, মানে মানবজমিনকে চাষ করতে হবে। এমন মানবজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।’

ফাটাফাটি হাততালি। রাজ্যপাল বাংলা বোঝেন না, কিন্তু হাততালির অর্থ বোঝেন তো! সহপ্রধান তাঁর চেয়ে বেশি হাততালি পেয়েছেন। আমাদের গর্ব। জিন্দাবাদ। বন্দেমাতরম।

এইবার আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুভব্রতর গলা খুব ভারী। মাস্টারমশাইরা বলেন, বাস ভয়েস। শুভব্রত নিজে বলে, আমার গোল্ডন ভয়েস। তার জীবনের একমাত্র অ্যাম্বিশান হল, টেলিভিশানে খবর পড়বে। সেই শুভব্রত ঘোষণা করছে। ‘এখন শুরু হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রথমে তিনটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করছে আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ। তারপরেই আমাদের নাটক, রাবণবধ। রচনা, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয়, নির্মলকুমার, মুখোপাধ্যায়, অভিনয়াংশে...।’ হড়হড় করে নাম পড়ে গেল। সবশেষে হনুমানের দল। সে আবার কত কায়দা, হনুমানশ্রী পঞ্চানন পাল, নির্মল দুবে, সনাতন সরকার, শ্যামল সর্বাধিকারী...।

সামনের ফালিমঞ্চে গান বসে গেল। তারস্বরে। পেছনের পরদা, তার পেছনে আমরা। শিবাঞ্জন নেতা। গাছের কাটআউট বাঁ-পাশে। তার তলায় বেদি। বাল্মীকি বসবেন। কাটআউটটা হয়েছে ভালো। তবে একটু নড়বড়ে। একটু দূরেই টিভির বাক্স। সীতা ঘাপটি মেরে থাকবে। তুলো দিয়ে ক্রৌঞ্চ তৈরি হয়েছে। প্যাকাটির তির মারাই আছে। স্টেজের মাথায় কালো সুতো দিয়ে ঝোলানো। ঠিক সময়ে ধপাস করে পড়বে। পরদা ওঠামাত্রই দেখা যাবে, বাঁ দিকে বাল্মীকি। পেছনে হনেরবাবুর আঁকা সিন। বনের দৃশ্য। একটা নদী থাকলে ভালো হত। তমসা নদী। যাক, সেটা নেই। মাঝখানে ইঁদুরে খাওয়া একটা গর্ত। শিবাঞ্জন বলেছে ভালোই হয়েছে। ওই ফুটো দিয়ে লাইট মারবে। সূর্যের কিরণ।

ওদিকে একটা ঘরে মেক-আপ চলছে। রাম আর সীতাকে নিয়ে তেমন সমস্যা হল না। সীতার ঠোঁটের ওপর সামান্য গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছিল। সকালে সেলুনে গিয়ে পোঁচ মেরে এসেছে। জীবনের প্রথম দাড়ি কামানো। স্যার খুব সহজেই বাল্মীকি হলেন বটে। সমস্যা একটাই হল, নকল দাড়ি, গোঁফ, চুলের জন্য মাঝে মাঝে হাঁচি। সহপ্রধান বললেন, ‘মরেচে, এঁর তো উইগ অ্যালার্জি রে ভাই! তমসার তীরে বাল্মীকি যদি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাঁচেন তা হলেই তো হয়ে গেল! শিগগির অ্যান্টি অ্যালার্জিক ট্যাবলেট এনে খাওয়া।’

ননী দৌড়োল দোকানে।

বাংলার স্যার বললেন, ‘দাড়িটা তেমন প্রবলেম করছে না। ট্রাবলসাম হল গোঁফটা।’

সহপ্রধান বললেন, ‘সময় থাকতে-থাকতেই হনুমানদের রেডি করে ফেলো। লেজ ফিট করে দাও, লেজ ফিট করে দাও।’

সার সার হনুমান লাল কাপড় মালকোঁচা মেরে পরে দাঁড়িয়ে আছে। শিবাঞ্জন বাঁকা বাঁকা, খাড়া খাড়া, সোঁটা- সোটা লেজ ফিট করছে। এক-একজনের লেজ লাগানো যেই হয়ে যাচ্ছে সহপ্রধান বলছেন, ‘লাফাও, লাফাও। জাম্প, জাম্প।’ এর আবার একটা গান তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন কে জানে, ‘রথে চড়িকিড়ি যাyউছি।’

মহাসমস্যা দেখা দিল রাবণের মাথা নিয়ে। একসারিতে দশটা পেপার পাল্পের মুন্ড। ভাবা গিয়েছিল, কানের তলা দিয়ে স্ট্র্যাপ ঘুরিয়ে বেঁধে দিলেই হয়ে যাবে। হিসেব মিলছে না।

শিবাঞ্জন বলছে, ‘স্যার এদিকে পাঁচ ওদিকে পাঁচ হচ্ছে ন তো!’

‘কেন হচ্ছে না! বাঁ-দিকে পাঁচ, ডান দিকে পাঁচ, সোজা হিসেব।’

‘হিসেব তো সোজা হবে ভেবেছিলুম। হচ্ছে না যে, মাঝখানে ওর ওরিজিন্যাল মুন্ডুটাই তো প্রবলেম করেছে।’

‘ওটাকে ফেলে দে না।’

‘আসল মুন্ডুটা ফেলব কী করে! ওটা তো জন্মের সময় থেকেই ওইখানে সেন্টারে ফিকসড হয়ে আছে। ও তো সরানো যাবে না।’

‘তা হলে এক কাজ কর, ওট যেমন আছে থাক। এপাশে পাঁচটা ওপাশে পাঁচটা ফিট করে দে।’

‘তা হলে তো রাবণের এগারোটা মুন্ডু হয়ে যাবে স্যার।’

‘রাবণের মুন্ডু ক-টা ছিল, শাস্ত্র কী বলছে! পন্ডিতমশাইকে ডাক।’

‘দশটা মাথা ছিল স্যার, দশানন।’

‘তা হলে কি রাবণের কোনো মাথাই সেন্টারে ছিল না! একটা ছবি দ্যাখ না।’

‘রাবণের ছবি কোথায় পাব স্যার!’

‘কেন, ক্যালেণ্ডার!’

‘রাবণের ক্যালেণ্ডার হয় না সার। রামচন্দ্রের হয়।’

‘ডাক ডেকে নিয়ে আয় অঙ্কের স্যারকে। এসব হিসেবের ব্যাপার।’

অঙ্কের স্যার এলেন, ‘কী সমস্যা!’

‘খুব জটিল অঙ্ক। এই হল রাবণ। এই দেখুন সেন্টারে ওর জন্মগত মাথা। এইবার দেখুন ওইখানে দশটা নকল মাথা। সেন্টার থেকে আসল মাথা সরানো যাবে না। কিন্তু ওর দশটা মাথা করতে হবে। হিসেবটা কী হবে!’

‘কেন? আসল মাথাটা রেখে ন-টা মাথা ফিট করে দিন।’

‘তা হলে তো সমান হচ্ছে না। ধরুন এপাশে চারটে ওপাশে চারটে করলে, ন-টা হচ্ছে। দশটা হচ্ছে না। একপাশে পাঁচটা, আর একপাশে চারটে হয়ে যাচ্ছে। একপাশে একটা মাথা বেরিয়ে থাকছে।’

অঙ্কের স্যার একটু ভেবে বললেন, ‘রাবণ দেখছি সারাটা জীবন জ্বালাবে। এপাশে চারটে ওপাশে চারটে ওই ন-টা মাথাই থাক না, কে আর গুনে দেখছে।’ শিবাঞ্জন বলল, ‘স্যার, একটা মাথা রাবণের বুকে আটকে দিই।’

‘আইডিয়া!’ সহপ্রধান তুড়ি লাফ মারলেন, ‘এই ছেলেটা আইনস্টাইন হবে রে। হোয়াট এ মাথা! রাবণের দশটা মাথা এই একটা মাথার কাছে নাথিং।’

গান শেষ। দশ মিনিটের বিরতি। দর্শকদের আসনে লোক আর ধরে না। বাচ্চাদের ক্যাঁচম্যাঁচ। অঙ্কের স্যার একটা বেত হাতে, ‘অ্যায়, অ্যায়’ করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। মায়েরা এসেছেন ছেলেদের অভিনয় দেখতে। স্কুলের বাইরে গেটের দু-ধারে লম্ফ জ্বালানো ঘুগনি, আর কুপি জ্বালানো ফুচকা এসে গেছে। ঠ্যাং করে ঘণ্টা বাজল।

ঘিস ঘিস করে পরদা সরে গেল দু-পাশে। শেষের দিকটায় আটকে গিয়েছিল। কে হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে দিলে। তমালের তলায় বাল্মীকি। টেপে পাখির ডাক। পেছনের সিনের ফুটো দিয়ে নীল একটা আলো আসছে, যেন ভোর হচ্ছে। বাল্মীকি বসে আছেন আলো-আঁধারে। টিভির বাক্সে সীতা ঘাপটি মেরে আছে।

এই পর্যন্ত বেশ ছিল। হঠাৎ বাল্মীকি ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে একবার হাঁচলেন। সারের হাঁচি কখনো আস্তে হয় না। যেন বোমা ফাটল। এইবার হল কী, একটাতে খতম হল না। পরপর, সিরিজ। অন্তত গোটা দশ-বারো। সঙ্গে দর্শকদের চিৎকার, ‘বাল্মীকির ফ্লু হয়েছে, বাল্মীকির ফ্লু।’

অঙ্কের স্যার দাবড়ানি দিলেন, ‘মেরে সব ক-টাকে বাইরে বের করে দেব।’ সহপ্রধান উইংয়ের পাশেই ছিলেন। প্রম্পটার। তিনি বললেন, ‘নির্মলটা ডোবালে। আমাদের আগেই বলে দেওয়া উচিত ছিল, তমসায় চান করে বাল্মীকির সর্দি হয়েছে। সিনটা নষ্ট হওয়ার আগেই পরেশ তুই ক্রৌঞ্চের দড়িটা কেটে দে।’

পরেশ রেডিই ছিল। মারলে কাঁচি। এমনই বরাত, কৌঞ্চ স্টেজের সামনে না-পড়ে, পড়ল সীতার বাক্সে। সীতা এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। প্যাকাটির আচমকা খোঁচায়, ‘উরে বাব্বা রে’ চিৎকার করে উঠল।

সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা চিৎকার করে উঠল, ‘কে আছিস ভেতরে বেরিয়ে পড়, বেড়িয়ে পড়।’

সীতা সটান উঠে দাঁড়াল। দু-হাতে ধরে আছে ন্যাকড়া আর তুলো দিয়ে তৈরি সেই বক। বকটাকে ফেলে দিলেই পারত, তা না-করে ক্যাবলার মতো জিজ্ঞেস করল, ‘এটাকে কী করব স্যার!’

বাল্মীকি ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘আমার শ্রাদ্ধ করবি গাধা।’ সীতা বলল, ‘আমি কি আবার শুয়ে পড়ব স্যার!’

সহপ্রধান চিৎকার করলেন, ‘ড্রপ সিন, ড্রপ সিন।’

যার ওপর পরদা টানার দায়িত্ব ছিল, সে কেমন করে জানবে সিন এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে। এদিকে বাল্মীকির আবার ফ্যাঁচাত-ফ্যাঁচাত শুরু হয়েছে। এর ওপর আর এক কান্ড। শিবাঞ্জনের প্লাইউড কাটা তমালবৃক্ষ বাল্মীকির ঘাড়ের উপর দিয়ে সামনে শুয়ে পড়ল।

সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘সমূলে উৎপাটিত, সমূলে উৎপাটিত। স্যারকে বাঁচা, স্যারকে বাঁচা।’

নির্মল স্যার মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, তার ওপর শিবাঞ্জনের কেরামতি। হড়হড় করে পরদা নেমে এল। প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের যবনিকা। সহপ্রধান দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘আর কী হবে! এই নাটক এইখানেই শেষ। রামায়ণ আর লিখবে কে, বাল্মীকিই তো হাসপাতালে চলে গেল।’

প্রধানশিক্ষক বললেন, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই, এই বাল্মীকি কাত হলেও আসল বাল্মীকি অনেক আগেই রামায়ণ লিখে রেখে গেছেন। এটা তো শেষ থেকে শুরু হচ্ছিল, এইবার শুরু থেকে শেষ হবে।’

যাইহোক, কিছুক্ষণের মধ্যে আবার শুরু হল নাটক। বাংলার স্যার এরই মধ্যে ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে নিজের একটা ছবি তুলিয়ে নিলেন। তারপর দাড়ি, গোঁফ, চুল সব খুলে ফেলে গুম মেরে বসে রইলেন একপাশে।

হেডমাস্টারমশাই বলতে গেলেন, ‘একটু কেটেকুটে গেছে, ওষুধ লাগাবেন?’ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ত্রেতাযুগে কোনো মেডিসিন ছিল না।’

‘কিন্তু এটা তো কলি। পিঠে পেরেক ফুটে গেছে, টিটেনাস হলে কে দেখবে!’

‘আমি এখন রামায়ণের যুগে আছি। সীতাটাকে আমি পরে পেটাব, কলিতে আগে ফিরে আসি।’ আবার শুরু হল নাটক। বেশ ভালোই এগোচ্ছে। প্রম্পট শুনতে না-পেয়ে রাম একবার বলে ফেলেছিল, ‘কী বললেন স্যার?’

সহপ্রধান বললেন, ‘বলো, পিতা আপনার আদেশ শিরোধার্য।’

রাম বলল, ‘বলো, পিতা আপনার আদেশ শিরোধার্য।’

সহপ্রধান বললেন, ‘গাধা।’

রাম বলল, ‘গাধা।’

এক্সপার্ট দশরথ, কায়দা করে জায়গাটা মেরামত করে দিলে, ‘বাবা, তুমি রাজার ছেলে, গাধা কেন, ঘোড়ায় চেপে যাবে, সাদা ঘোড়া।’

রাম সপরিবারে বনবাসে গেল। দেখতে দেখতে এসে গেল সীতাহরণের দৃশ্য। রাবণ এসেছে। রাবণের এখন একটা মাথা। সন্ন্যাসীর বেশ। রাবণ বলছে ‘ভগবতি! ভিক্ষাং দেহি!’

সীতা ভিক্ষে দেবে। গন্ডির বাইরে আসবে না। তানা-নানা করছে সীতা। নাটকে সেইরকম ছিল। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, রাবণ সীতার হাত ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান। সীতা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। এইবার রাবণ সীতার চুল ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে উইংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাবণ এই সুযোগটাই খুঁজছিল। সীতার সঙ্গে অনেকদিনের, অনেক ব্যাপারের ফয়সালা। পাছে পরচুল খুলে যায়, সীতা বোকার মতো দু-হাতে চুল চেপে ধরে আছে। হিন্দি ছবিতে ভিলেনকে যেমন গাড়ি বা ঘোড়ার পিছনে বেঁধে টানতে-টানতে নিয়ে যায়, রাবণ সীতাকে সেইভাবে নিয়ে যাচ্ছে। পাশেই পুষ্পকরথ। সেদিকে একবার ফিরেও তাকাল না।

উইংস দিয়ে স্টেজের পেছনে আসামাত্রই প্রধানশিক্ষক একেবারে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। রাবণের রাবণামি তিনি বরদাস্ত করবেন না। রাবণের রাবণত্ব তিনি শেষ করবেন। শেষ করবেন। মার মার, ‘হতভাগা! এই তোর সীতাহরণ!’ রাবণের পরচুল ছিঁড়েখুড়ে চারপাশে ছত্রাকার। দাড়ি উপড়ে পড়ে একপাশে। রাবণ আর রাবণ রইল না। প্রসূন হয়ে গেল।

হঠাৎ রাম ছুটে এল, ‘এ কী করছেন স্যার! রাবণকে তো আমি বধ করব। তার আগেই আপনিই যে বধ করে দিলেন!’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘নিজের বউকে সামলাতে পারিস না, তুই করবি রাবণবধ!’

লেজখাড়া হনুমানরা বলল, ‘আমরা হাত লাগাব স্যার!’

‘কোনো প্রয়োজন নেই, আমি একাই তুলোধুনে দিচ্ছি।’

সহপ্রধান মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমাদের নাটক এইখানেই শেষ। আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। স্টেজের পেছনে খুব সহজেই প্রধানশিক্ষকমশাই রাবণ বধ করে দিয়েছেন। সীতাকে আমরা টিংচার আইডিন মাখিয়ে ফেলে রেখেছি। বাল্মীকি মনের দুঃখে বাড়ি চলে গেছেন। তাঁর প্রেশার এই মুহূর্তে এক-শো আশি-নব্বই। নমস্কার!

ভটাভট হাততালি। হে-হে চিৎকার। আমাদের অনুষ্ঠান খতম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%