সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বড়োমামার হঠাৎ যে কী হল। হঠাৎ নয়, জিনিসটা বেশ কিছুদিন মাথায় ঢুকছিল একটু একটু করে। যোগী পূর্ণানন্দের সঙ্গে পরিচয় হবার পর থেকে মাঝে মাঝে বলতে শুরু করেছিলেন—জীবনটাকে একেবারে বদলে ফেলতে হবে। আকাশ থেকে শক্তি নামছে, সেই শক্তিকে ধরতে হবে, ধারণ করতে হবে। মৃত্যুকে জয় করতে হবে। তোর মেজোমামার মতো বিষয়ী, স্বার্থপর লোকদের আমি দেখিয়ে দেব, যোগের শক্তি কাকে বলে!
সব ছেড়ে মেজোমামাকে কেন? যোগের শক্তি নেমে এলে সবাই দেখবে। শুধু মেজোমামা কেন বড়োমামা!
সেদিন সামান্য একপাটি চটির জন্যে কী সাংঘাতিক অপমান করল, তুই ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি।
মেজোমামার মাথার ঠিক ছিল না বড়োমামা।
মেজোর মাথা কবে ঠিক থাকে? সবসময়েই তো বাবুর হট হেড!
সেদিন কিন্তু আপনার কুকুর ভীষণ অসভ্যতা করেছে!
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে। মানুষের কাজ কী তোর মেজোমামা কোনোদিন করেছে? কুকুর মানুষ চেনে রে। তোর মেজোমামার মতো মানুষদের হাড়ে হাড়ে চেনে।
কুকুর মানুষ চেনে ঠিকই, তবে সবচেয়ে ভালো চেনে জুতো। আপনার চটি আর মেজোমামার চটি পাশাপাশি খোলা ছিল। চিনে চিনে ঠিক মেজোমামার চটিটাই ছিঁড়ে ফালাফালা করল কেন?
কৃপণদের ওই অবস্থাই হয় রে। কোত্থেকে এক জোড়া কাঁচা চামড়ার চটি কিনে নিয়ে এল। ওয়ান পাইস ফাদার- মাদারদের ওই হালই হয় রে। সস্তার তিন অবস্থা।
বড়োমামার ঘরের বাইরে দিয়ে মেজোমামা ঠিক এই সময়েই কী কারণে যাচ্ছিলেন কে জানে! শেষ কথাটা ঠিক কানে গেছে। মেজোমামা পর্দা সরিয়ে শরীরের ওপর অংশটা ঘরে ঢুকিয়ে বললেন:
জুতোর আবার কাঁচা-পাকা কী হে! এ কী পেয়ারা! ডাঁসা পেয়ারা, পাকা পেয়ারা! মেজোমামা মাথাটা সরিয়ে নিচ্ছিলেন। বড়োমামা ডেকে বললেন—ওহে শোনো শোনো।
পর্দার বাইরে থেকে মেজোমামা বললেন, কী আর শুনব? তোমার পক্ষপাতিত্ব আমার জানা আছে। কুকুর ছাড়া পৃথিবীতে তোমার আপনজন কে আছে। কুকুরপ্রেমী সুধাংশু মুকুজ্জে!
শোনো, শোনো, শুনে যাও। তুমি অধ্যাপক হতে পারো, শিক্ষার কিন্তু অনেক বাকি আছে।
মেজোমামা পর্দা সরিয়ে ঘরের চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন—আমি না-হয় ওয়ান পাইস ফাদার-মাদার, তুমি তো দাতা কর্ণ, তা তোমার পেয়ারের কুকুরদের রোজ একপাটি করে নতুন জুতো চিবোবার জন্যে কিনে দিলেই পারো, কৃপণের জুতো জোড়া ধরে টানাটানি না-করলেই হয়।
ও যত জুতোই দাও, কাঁচা চামড়ার জুতো পেলে ওদের আর কান্ডজ্ঞান থাকে না।
যে কুকুর জুতো খায় সে কুকুর অতিনিকৃষ্ট ধরনের কুকুর, নীচ জাতের কুকুর, নেড়ির অধম।
তাই নাকি, বুলটেরিয়ার, ফকসটেরিয়ার, এসব হল নীচ জাতের কুকুর, আর তোমার জুতোটা হল উঁচু জাতের! কী বলে রে!
বড়োমামা সমর্থন পাওয়ার আশায় আমার দিকে তাকালেন। দু-মামার সঙ্গেই আমার সমান ভাব। একটু পরেই মেজোমামা আমাকে মর্নিং শোতে ইংরেজি ছবি দেখাতে নিয়ে যাবেন। আবার বিকেলবেলা বড়োমামা আমাকে গান্ধীঘাটে বেড়াতে নিয়ে যাবেন বলেছেন, বড়োমামার নতুন মোটরসাইকেলে করে। মহামুশকিল হয়েছে আমার। কোনো পক্ষেই সহজে যাবার উপায় নেই।
মেজোমামা বললেন—‘জুতোর জাত-ফাত আমি জানি না। ও নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো সময়ও আমার নেই। জুতো পায়ে দিয়ে ফটাস ফটাস করে হাঁটা যায় এইটুকুই জানি। আর জানি কিছু জুতো আছে, পায়ে লাগে। পরলে কষ্ট হয়। কিছু আছে পায়ে লাগে না।’
অধ্যাপকদের ওইরকম জ্ঞান হওয়াই স্বাভাবিক। জুতো পায়ে দিয়ে নাকে চামড়ার বদগন্ধ পাও না?
জুতো থাকবে পায়ে, নাক থেকে পায়ের দূরত্ব মিনিমাম সাড়ে চার ফুট। জুতো তো আর গোলাপফুল নয়, নূরজাহানের মতো নাকের কাছে কেউ বোঁটা ধরে বসে থাকবে!
তোমার সঙ্গে আমি তর্কে পারব না। এই দেখো আমার জুতো। দস্তুরমতো পয়সা খরচ করে কেনা। পাকা চামড়ার জুতো। নাকের কাছে ধরো...
বড়োমামা জুতোটা পা থেকে খুলে নিজের নাকের কাছে ধরলেন—কোনো গন্ধ পাবে না। রোজ পাউডার দি বলে, একটু পাউডারের গন্ধ পাবে।
বড়োমামা জুতোটা নাকের কাছে ধরে আছেন, এমন সময় মাসিমা ঘরে এলেন হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে। মাসিমা ট্রেটা আর একটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন—উঁহু, উঁহু বড়দা, জুতো দিয়ে চা খেয়ো না। বিস্কুট দিয়ে চা খেতে হয়।
বড়োমামা মাসিমার নাকের কাছে জুতোটা ধরে বললেন— কোনো গন্ধ পাচ্ছিস কুসী!
মাসিমা মুখটা সরিয়ে নিয়ে বললেন—এ কী, এ কী, পায়ের জিনিস নাকের কাছে কেন?
—একে কী বলে জানিস? হাতে পাঁজি মঙ্গলবার। তুই এবার ওর জুতোটা শুঁকে দেখ। আমি গন্ধ পাচ্ছি, ভাগাড়ের পচা চামড়া দিয়ে তৈরি।
মেজোমামা বললেন—তোমার ঘরে ডেকে এনে সাতসকালে এভাবে অপমান করার কী মানে হয় বড়দা?
—অপমান! এতে মান-অপমানের কী হল শুনি। তোমাকে আমি শিক্ষা দিচ্ছি। জ্ঞান দিচ্ছি। যা এই বাচ্চা ছেলেটা জানে, তুই তা জানিস না।
মাসিমা বললেন—‘তোমাদের দু-জনে মুখোমুখি হলেই কী কথা কাটাকাটি! এখন দু-জন শান্তিতে একটু চা খাও দেখি। সাতসকালেই জুতো নিয়ে শুরু হল! এখনও সারাটা দিন পড়ে আছে।’
মেজোমামা চটপট শব্দ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার পর্দার কাঠটা খটাখট শব্দ করে উঠল। বাইরে থেকে হেঁকে বললেন—কুসী, আমার চা-টা আমার ঘরে দে। আমার জুতোয় গন্ধ, আমার গায়ে গন্ধ। ওনার কুকুরের গায়ে আতরের গন্ধ।
বড়োমামা প্রতিবাদ করে বললেন—মিথ্যে বলো না। তোমার গায়ে গন্ধ একথা কিন্তু আমি একবারও বলিনি।
ওই হল। এরপর তোমার কুকুর যদি আমাকে কামড়ে দেয়, তুমি বলবে তো গাটা পচা চামড়া দিয়ে তৈরি। তুমি হলে ওয়ান আইয়েড বুল।
তুমি হলে টু আইয়েড কাফ।
মাসিমা বড়োমামাকে একটু ধমক দিলেন—কী হচ্ছে বড়দা! এবার কিন্তু ভীষণ ছেলেমানুষি হয়ে যাচ্ছে।
তুই বল কুসী, কাঁচা চামড়ার জুতো কিনেছে, কুকুর গন্ধ পেয়ে ছিঁড়ে দিয়েছে, তার আমি কী করব! আমার জুতো জোড়াও তো পাশে ছিল।
কিছু মনে করো না বড়দা, তোমার সব কটা কুকুরই ভীষণ শয়তান। সারা বাড়িতে একটা-না-একটা অনিষ্ট করে চলেছে। ওই তো ওঘরে সোফার গদিটা ছিঁড়েছে।
বড়োমামার মুখটা হঠাৎ খুব করুণ হয়ে গেল। মাসিমা চলে গেছেন। গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—কে বলেছিলেন, জীবে দয়া করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ইশ্বর!
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন বড়োমামা।
তাহলে দ্যাখ, মহাপুরুষের কথা যারা মেনে চলতে চায় তাদের কী অবস্থা হয়। সে একঘরে হয়ে যায়। তাকে ভাই এসে অপমান করে যায়, তাকে তার বোন এসে বলে আদিখ্যেতা। এই যা:।
বড়োমামা চায়ের কাপটাকে বিষের কাপের মতো টেবিলে নামিয়ে রেখে, মহাঅপরাধীর মতো মাথায় হাত দিয়ে, চুক চুক শব্দ করতে লাগলেন।
কী হল বড়োমামা?
আর কী হল, সর্বনাশ হয়ে গেল রে, প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়ে গেল।
কী প্রতিজ্ঞা?
আজ থেকে আমার চা ত্যাগ করার কথা। চা ত্যাগ, মাছ-মাংস ত্যাগ। বিলাসিতা ত্যাগ।
বড়োমামা যেভাবে ভেঙে পড়েছেন, একটু শান্ত করা দরকার। বললুম—তাতে কী হয়েছে বড়োমামা? ছুটির দিন আপনি বিশ কাপ চা খান, এখনও উনিশ কাপ বাকি। সেটা না-হয় খাবেন না।
তাহলে এই কাপটা খেয়ে নেব বলছিস? আর সিকি কাপ মাত্র পড়ে আছে। বড়োমামা চোঁ করে চা-টা খেয়ে নিলেন। তারপর চোখ বুজিয়ে বসে রইলেন চুপ করে। অপরাধ করে ফেলেছেন। এখন চোখ বুজিয়ে ভগবানের কাছে ক্ষমা চাইছেন।
মেজোমামার ঘরে ঢুকে দেখি সেখানে আর এক কান্ড চলেছে। মেঝের ওপর বেশ বড়ো করে খবরের কাগজ বিছিয়েছেন। তার ওপর পাশাপাশি দু-পাটি চটি। মেজোমামার হাতে একটা স্প্রেয়ার। মুখের চেহারা বেশ কঠিন। ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে বারকতক স্প্রে করে ছুটে জানালার দিকে চলে গেলেন, পাছে নাকে ঝাঁজ লেগে যায়। মেজোমামার আবার হাঁচির অসুখ আছে। ধুলো, স্প্রে, ফুলের গন্ধ, পাউডার, ধূপের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। বড়োমামা মেজোমামার এই ব্যামোর নাম রেখেছেন ঘোড়া রোগ। ঘোড়ারা নাকি এইভাবে ফ্যাঁচোর ফ্যাঁচোর করে অনবরতই হাঁচে।
মেজোমামা শুনে বলেছিলেন—গো-বৈদ্যেরা এই কথা বলবে, তবে প্রকৃত ডাক্তাররা এই অসুখের বেশ সভ্যভব্য নাম রেখেছেন—অ্যালার্জি। মানুষের চিকিৎসা করলে তুমিও জানতে, হাওয়েভার দেশে তো মানুষের সংখ্যা খুবই কম, তাই ডাক্তার সুধাংশু মুকুজ্জে করে খাচ্ছে।
মেজোমামার কথা শুনে বড়োমামা অবশ্য রাগ করেননি, হাসতে হাসতে বলেছিলেন—গোরুরাই গোরুদের ভালো চেনে, তাই সারা দেশে তারা মানুষ দেখতে পায় না।
কিন্তু মেজোমামার এ কী কেরামতি!
মেজোমামা, জুতোয় কি ছারপোকা হয়েছে?
মেজোমামা জানালার কাছ থেকেই বললেন—আগে এদিকে আয়, তারপর বলছি, ওদিকে কী উড়ছে দেখতে পাচ্ছিস না!
ওতে আমার কিছু হবে না মেজোমামা।
হলে তখন রক্ষে থাকবে না, বিগব্রাদার তেড়ে আসবে।
মেজোমামা রেগে গেলেই বড়োমামাকে বিগব্রাদার বলেন। পুবের জানালা দিয়ে ঘরে বাঁকা হয়ে একফালি রোদ এসে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। সেই রোদের রেখায় অজস্র তেল মেশানো কীটনাশক পদার্থের কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। খবরের কাগজে তেলের ছিটে ছিটে দাগ ধরেছে।
জানালার দিকে সরে যেতেই মেজোমামা বললেন—জুতোর গন্ধ মারছি। এরপর ওর ওপর এক টিন পাউডার ঢেলে, একমাস কাগজে মুড়ে ফেলে রেখে দেব।
তাতে কিছু হবে মেজোমামা?
আলবাত হবে। ওর বাবা হবে। পাউডারে ঘামের গন্ধ চলে যায়, জুতোর গন্ধ যাবে না?
আমাদের সিনেমার কী হবে মেজোমামা?
হবে, যাওয়া হবে। আমি তো আর বিগব্রাদারের মতো নই, কথায় কথায় ব্লাফ। তুমি রেডি! আমি তো রেডি হয়েই আছি। পাঞ্জাবি চড়াব, পুরোনো স্লিপারটা পায়ে গলাব, আর বেরিয়ে পড়ব।
আমিও রেডি। কেবল জুতোর ফিতে বাঁধতেই যা একটু সময় লাগবে।
তুই চটি পরিস না কেন? চটি কত হালকা।
বড়োমামা বলেছেন, জুতো ছেড়ে চটি পরলে পা বাইশ-শো বাইশ হয়ে যাবে, যেমন আপনার হয়েছে।
কে বলেছে? বিগব্রাদার! বিগব্রাদার বলেছে—তাই না?
মেজোমামার চশমার কাচের আড়ালে বড়ো বড়ো চোখ আরও বড়ো হয়ে উঠল। হাতের স্প্রেয়ারটা ঠক করে জানালার গবরেটে রাখলেন।
এই রে, সেরেছে রে! আর এক অশান্তি পাকিয়ে উঠল। কেন মরতে বলতে গেলুম। মেজোমামা টেবিলের টানা থেকে একটা স্কেল বের করলেন। স্কেলটা হাতে নিয়ে সোজা বড়োমামার ঘরে। আমাকেও পেছন পেছন যেতে হল। কী থেকে কী হয়ে যায়! সামাল দিতে হবে।
বড়োমামা চোখে একটা গগলস লাগিয়ে চুপ করে চেয়ারে বসে আছেন। হাত দুটো কোলের ওপর নেতিয়ে আছে। মনে হয় ধ্যানস্থ! চশমার আড়ালে চোখ দুটো বোজানো মনে হয়।
মেজোমামা দুম করে ঘরে ঢুকতেই শান্ত গলায় বললেন, ‘কে এলি!’
মেজোমামা কাজের মানুষ। উত্তর-টুত্তরের ধার ধারেন না। বড়োমামার পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে ডান পাটা ধরে টানাটানি শুরু করেছেন। স্কেলের ওপর পা-টা তুলতে চাইছেন। মাপ নেবেন। বড়োমামা চোখ খোলেননি। সেই একইভাবে বসে থেকে বলছেন—‘কে সন্তু এলি? ঠিক আছে, ঠিক আছে, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হবে না, আশীর্বাদ করি দীর্ঘজীবী হ, শরীর ভালো থাক, জীবনে উন্নতি হোক; ওভাবে পায়ে খোঁচা মারিসনি। নখটা আজ কাটবি। করছিস যখন দু-পায়েই প্রণাম কর। একপায়ে প্রণামে গোদ হয় মা।’
মেজোমামা ঝট করে নিজের পা-টাও মেপে নিলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—‘এক সেন্টিমিটার কম। বুঝলে, আমার পায়ের মাপ তোমার চেয়ে এক সেন্টিমিটার কম।’
বড়োমামা বললেন, ‘তাতে কী হয়েছে, জল পড়লে সব কাপড়ই একটু টেনে যায়। তোমার তো তবু এক সেন্টিমিটারে ওপর দিয়ে গেছে। আমার কী হয়েছে জানো—এই সেদিন যে নতুন পাঞ্জাবিটা করালুম, যেই জলে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে দু-দিক থেকে টেনে গিয়ে, হাত দুটো উঠে গেল কনুইয়ের কাছে। আর ঝুল? তুমি অবাক হয়ে যাবে, ভুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে। তুমি এক কাজ করো না, আমার আর একটা নতুন পাঞ্জাবি আছে—ব্র্যাণ্ড নিউ। হালকা চাঁপাফুলের মতো রং। তোমার চেহারাটা পাঞ্জাবিতে খোলে ভালো।’

...উবু হয়ে বসে ডান পাটা ধরে টানাটানি শুরু করেছেন | স্কেলের উপর পা-টা তুলতে চাইছেন...
বড়োমামা চেয়ার থেকে উঠে কাপড়-জামার আলমারির দিকে এগিয়ে গেলেন।
মেজোমামা হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন!
বড়োমামা আলমারি খুলে এ তাক-সে তাক ঘেঁটে ফিকে হলদেটে রঙের একটা পাঞ্জাবি বের করলেন! বেশ সুন্দর দেখতে। পাঞ্জাবিটা ঝেড়ে পাট খুলে মেজোমামার হাতে দিয়ে বললেন—‘এসব জিনিস প্রোফেসারদের মানায়। রংটা দেখেছিস! তখন ঝোঁকে পড়ে নিজের জন্যে করিয়েছিলুম। একদিনও গায়ে উঠল না। কখন পরব বল? তুই পর। বেশ মানাবে তোকে। ফর্সা টকটকে চেহারা। মনে হবে ঠিক যেন সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছিস।’
মেজোমামা পাঞ্জাবিটা হাতে নিলেন। চমৎকার গন্ধ বেরোচ্ছে। বড়োমামা জামাকাপড়ের মধ্যে খালি ধূপ গুঁজে রাখেন।
মেজোমামা বললেন, ‘তোমার পাঞ্জাবি আমার গায়ে হবে কি?’
আলবাত হবে। আমাদের দু-জনেরই এক হাইট, এক মাপ।
কেবল পায়ের মাপটাই যা আলাদা।
তা হতে পারে, কিছু মনে করিসনি, তোর পা দুটো একটু অডসাইজ, অনেকটা তুষারমানবের মতো।
ওইটা তোমার কমপ্লিটলি ভুল ধারণা। তুষারমানবের মতো পা হল তোমার। ইয়া বাইশ-শো বাইশ!
বড়োমামা একটু শব্দ করে হেসে বললেন—এই তো আমার পায়ের ধুলো নিলি। কী মনে হল তোর? মনে হল না যেন গৌরাঙ্গদেবের পায়ে হাত দিচ্ছিস? এসব পা ছবিতে দেখা যায়। শ্রীরামচন্দ্রের পা। তোর পা-টা রামায়ণেই পাবি। তবে এ পক্ষে নয়, ও পক্ষে। রাবণ-টাবনের মনে হয় এই রকম পদযুগল ছিল।
মেজোমামার একহাতে পাঞ্জাবি, অন্য হাতে স্কেল। চোখ দুটো আবার বড়োবড়ো হচ্ছে। মেজোমামা বললেন—দেখছো আমার হাতে কী?
বড়োমামার এতক্ষণে মেজোমামার হাতের স্কেলটার দিকে নজর পড়ল।
স্কেল দিয়ে কী করবি? পেটাবি নাকি?
মেজোমামা যেন একটু লজ্জিত হলেন—ছি ছি, পেটাব কেন? স্কেল দিয়ে কেউ পেটায়! স্কেল হল মাপের জিনিস। তুমি যখন চোখ বুজিয়ে বসেছিলে তোমার পা-টা আমি মেপে ফেলেছি।
জুতো কেনার জন্যে কেউ স্কেল দিয়ে পা মাপে? ভগবান তোকে কবে যে একটু সাধারণ বুদ্ধি দেবেন! তোর মাথা বোঝাই অসাধারণ বুদ্ধি। আর আমার এখন জুতো কী হবে? আমার তিন-চার জোড়া জুতো রয়েছে। জুতো দরকার তোর। আমার ওই কুকুরটা, চার্লসটা, ওর স্বভাবটা বিশেষ ভালো নয় রে। খাস আইরিশ কুকুর হলে হবে কী, পশ্চিমবাংলার আবহাওয়ায় কী রকম বিগড়ে গেল। তা না-হলে তোর জুতোটা ওভাবে চিবোয়। আমি তোকে এক জোড়া দামি স্লিপার প্রেজেন্ট করব। লি ওয়ার দোকানের হাল ফ্যাশনের স্লিপার। কাগজ কেটে মেপে তোর পায়ের মাপটা খালি আমাকে দিয়ে যা। ও, তুই তো আবার মাপ নিতেই জানিস না। স্কেল হাতে ঘুরছিস। দাঁড়া, আমি মাপটা একেবারে নিয়ে তোকে ছেড়ে দি।
মেজোমামার আবার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। চোখ ছোটো ছোটো হয়ে এসেছে। বড়োমামা একটা ফালি কাগজকে ভাঁজ করে সরু মতো করে মেজোমামার পায়ের কাছে উবু হয়ে বসেছেন। আমাকে বললেন— টেবিলের ওপর থেকে পেনসিলটা দাও তো। পেনসিলটা হাতে নিলেন। মেজোমামাকে বললেন—নাও, তোমার ডান পা-টা এই কাগজটার ওপর ফেলো।
মেজোমামা একটু ইতস্তত করছেন।
কী, হল কী তোমার? রাখো না পা-টা, রাখো।
তুমি গুরুজন। তুমি আমার পায়ে হাত দেবে কী!
অদ্ভুত তোর কথা! আমি যেমন তোর দাদা তেমনি তোর বন্ধু। আমার চেয়ে বড়ো বন্ধু তোর কে আছে রে ব্যাটা। নে, পা-টা রাখ! দেখছিস তখন থেকে উবু হয়ে বসে আছি। ভুঁড়িতে টেরিফিক চাপ পড়ছে।
মেজোমামা অবশেষে ডান পা-টা মেঝেতে পাতা ফালি কাগজটার ওপর রাখলেন।
গোড়ালিটা একটু পেছনে নাও। অ্যা অ্যা, ঠিক হয়েছে এইবার দ্যাখো তোমার বুড়ো আঙুলটার মাথায় এই পেনসিলের দাগ দিলুম।
মেজোমামা পা তুলে নিলেন। বড়োমামা কাগজটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
এই হল তোমার পায়ের মাপ! এইবার আমি লি ওয়ার দোকানে গিয়ে এটা ফেলে দিয়ে বলব—জুতা নিকালো। সব কিছু শিখতে হয় প্রোফেসার! এই কায়দাটা আমি শিখেছি আমার বাবার কাছ থেকে।
আচ্ছা, এবার তোমার পা-টা ওর ওপর ফেলো তো বড়োদা। দাঁড়াও তার আগে তোমাকে একটা প্রণাম করি।
মেজোমামা বড়োমামাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন—এটা আমি কার কাছে শিখেছি জানো? বাবার কাছে।
তোর আর আমার তো একই বাবা রে!
দু-মামা অবাক হয়ে দু-জনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কত বড়ো একটা আবিষ্কার। কিছুক্ষণ পরে দু-জনে হো হো করে হেসে উঠলেন। আর ঠিক সেই সময় মাসিমা দু-কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বড়োমামা—আঃ, জাস্ট ইন টাইম। তুই হাত গুনতে জানিস রে কুসী।
দুই মামাই চায়ের কাপ হাত দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ফুড়ুর ফুৎ করে চুমুকে চুমুকে চা চলছে দু-ভায়ের। আমেজে কারুর মুখেই কোনো কথা নেই। বড়োমামাকে আমিই মনে করিয়ে দিলুম, বড়োমামা, আপনি কিন্তু আজ সকাল থেকে চা খাওয়া ত্যাগ করেছেন।
ঠোঁটের কাছে কাপটা ধরা ছিল। সবে আর একটা চুমুকের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। থেমে গেলেন। কাপটা নেমে এল। বড়োমামার মুখটা ভীষণ করুণ দেখাচ্ছে। জিভ দিয়ে ঠোঁটটা দু-বার চেটে নিলেন।
ইস! ভাগ্যিস বললি! আধ কাপ খেয়ে ফেলেছি রে!
মেজোমামা বললেন—এতে ইসের কী আছে? চা তো খাবারই জিনিস।
আমি যে চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি রে।
কেন, তোমার লিভার বিগড়েছে? রাতে ঘুম হচ্ছে না?
না না, ওসব নয়। ধর্মীয় কারণে, ধর্মীয় কারণে।
রাখো তোমার ধর্ম। কোন ধর্ম চা খেতে বারণ করেছে—এমন সাত্ত্বিক নির্ভেজাল পাতা ফোটানো জল! খেয়ে নাও।
বড়োমামা এক চুমুকে চা-টা খেয়ে নিলেন—খালি কাপটা রাখতে রাখতে বললেন—জয় গুরু।
মেজোমামা বললেন—নাও, জামাকাপড় পরো। আমাদের সঙ্গে সিনেমায় যাবে। মর্নিং শো।
সিনেমা? সিনেমা যে আর দেখব না রে। দেখলেও ওই চৈতন্য মহাপ্রভু, কী বামাখ্যাপা কিংবা যুগাবতার জাতীয় ছবি। আমার গুরু পরামানন্দ...
রাখো তোমার পরমানন্দ। এই নিয়ে তোমার সাতজন গুরু হল। কোনো গুরুকেই তো শেষপর্যন্ত ধরে রাখতে পারো না।
না রে, এবার খুব ধরেছি। দু-জনেই দু-জনকে মোক্ষম ধরেছি। একেবারে কাছিমের কামড়।
ঠিক আছে, সে তোমরা কামড়াকামড়ি করো। এখন পাঁচ মিনিট সময় দিলুম, রেডি হয়ে নাও। নইলে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাব।
হ্যাঁ, বড়োমামা—বলে, আমি কোমর জড়িয়ে ধরলুম। যেতেই হবে।
তিনজনে পাশাপাশি বসে মজা করে সিনেমা দেখা হল। বড়োমামা একবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমরা প্রথমটায় বুঝতে পারিনি। মেজোমামা এক সময়ে বললেন, কার যেন নাক ডাকছে!
বড়োমামার, মেজোমামা।
আমি বসেছিলুম মাঝখানে। মেজোমামা বললেন, ডেকে দে। আস্তে একটা খোঁচা মার।
বড়োমামা চোখ চেয়ে বললেন, কী করব বল? একটা লাইন ইংরেজি বুঝতে পারছি না। অ্যামেরিকানরা কী ভাষায় কথা বলে বল তো? মেজোকে জিজ্ঞেস করত, ফাইটিং-টাইটিং কখন হবে?
এইবার হবে, তুমি জেগে থাকো।
বড়োমামা সাঁ করে এক টিপ নস্যি নিলেন। পর্দায় তখন সবে একটা প্লেন উড়ছে। শব্দে শব্দ মিলে গেল। তা না- হলে ওপাশের লোকটি বড়োমামার ওপর বিরক্ত হতেন।
বড়োমামা হল থেকে বেরিয়ে বললেন—বেশ জম্পেশ বইটা।
মেজোমামা বললেন—তুমি আর দেখলে কোথায়? তোমার তো নাক ডাকছিল।
দূর নাক ডাকবে কেন? নাকটা বুজে গিয়েছিল। যেই নস্যি নিলুম, ছেড়ে গেল। ফাসক্লাস হয়ে গেল। বড়ো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলুম রে মেজো!
কী আবার হল?
ওই কুকুরটা। কুকুরটা দেখলি? মেমসাহেবের কোলে ছিল। ওই রকম একটা ছোটো ল্যাপডগ কোথায় পাই বল তো?
আমরা বড়োমামার গাড়িতেই এসেছি। গাড়ি স্টার্ট নিল। বড়োমামার সেই এক কথা—একটা ছোটো ল্যাপডগ...
গাড়ি বাজারের রাস্তায় ঢুকতেই বড়োমামা ড্রাইভারকে বললেন—লি ওয়ার দোকানের সামনে দাঁড় করাও তো।
লি ওয়ার বউ লম্বা টেবিলে ছুরি দিয়ে আনাজ কাটছিল। ভেতরের ঘরে সেলাই কল চলার ঘড়ঘড় আওয়াজ হচ্ছে। বড়োমামা বললেন—সায়েব কোথায়?
চীনারা সবসময় যেন হেসেই আছে। হাসলে ওদের মুখে কী সুন্দর টোল পড়ে! চীনে মেমসায়েব ওদের দেশের ভাষায় তড়বড় করে কী সব বলতেই ভেতরের ঘর থেকে কাঁচি-হাতে ঝকমকে চেহারার এক চীনে সায়েব বেরিয়ে এলেন। বড়োমামা বললেন—এই যে তাই চুং, এই মাপের তোমার তৈরি বেস্ট এক জোড়া চটি লাগাও।
চুং সাহেব কাগজটা হাতে নিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের একটা স্কেলের ওপর ফেললেন। স্কেলটার একটা দিকের কোনাটা উঁচু। মেপেটেপে স্ত্রী বললেন—নাম্বার সেভেন ডায়নামো।
মেজোমামা বললেন—দেখলে তো বড়দা, স্কেল দিয়েই পা মাপে।
সে তো অ্যালুমিনিয়ামের একটা স্কেল, নট ইওর প্লাস্টিক।
মই বেয়ে ওপরে উঠে মহিলা একটা বাক্স ছুড়ে দিলেন। চীনে সায়েব খপ করে লুফে নিলেন। আমি শুধু অবাক হয়ে দেখছি, মহিলা, কী করে খড়ম পায়ে অমন অক্লেশে মই বেয়ে ওপরে উঠছেন। জুতোটা ভারি সুন্দর। বড়োমামা মেজোমামার হাতে জুতোটা দিয়ে বললেন—কী, পছন্দ?
মেজোমামা লাজুক লাজুক মুখে বললেন—বেড়ে দেখতে। একটু শুঁকে দেখব বড়দা?
হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখো না, এসব পাকা চামড়ার জুতো।
মেজোমামা জুতো শুঁকছেন, সায়েব জিজ্ঞেস করলেন—আপনি পরবেন বাবু?
বড়োমামা বললেন—হ্যাঁ, ওই তো পরবে।
সায়েব অবাক হয়ে বললেন—তাহলে কাগজে মাপ এনেছেন কেন? দেখি, পা দেখি। পা থাকতে কাগজ কেন?
গাড়িতে বসে বড়োমামা বললেন—আই অ্যাম এ ফুল। মেজোমামা বললেন—আই অ্যাম অলসো এ ফুল। দু-মামার মাঝখানে জুতোর বাক্স। দু-জনে কোরাসে বললেন—আমরা দু-জনেই দুটো পাঁঠা। হে হে হে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন