সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদু সকালবেলাই ঘুম থেকে উঠে ঘোষণা করলেন, ‘আজ আমি দেশের বাড়িতে যাব।’ অর্থাৎ বলাগড়ে। আমি একবার মাত্র সেখানে গিয়েছিলুম। অনেক ছেলেবেলায়। ভালো মনে নেই। এইটুকু মনে আছে, একটা ছোট্ট রেলগাড়িতে চেপেছিলুম, অনেকটা টয় ট্রেনের মতো। ছোটো ছোটো কামরা যেন দেশলাইয়ের বাক্স। ইঞ্জিনের সে কী শব্দ—ভটঅ, ভটঅ। এর বাড়ির উঠোন দিয়ে, তার বাড়ির পুকুরপাড় দিয়ে ট্রেন চলত পোষা কুমিরের মতো। সেই ট্রেনটা ছিল গ্রামের মানুষের বড়ো আদরের। ঘরের ছেলের মতো। ট্রেনটা তেমন জোর কদমে ছুটতেও পারত না। সেবার এক বুড়িকে দেখেছিলুম ট্রেনের গায়ে ঘুঁটে দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। ট্রেনটার এক এক কম্পার্টমেন্টের গায়ে এক এক গ্রামের ঘুঁটে। কে একজন নেমে গিয়ে গ্রামের এক বাড়ি থেকে এক গেলাস জল খেয়ে একটু ছুটে এসে ঠিক ঠিক নিজের কামরায় উঠে পড়লেন। সে ছিল এক মজার ট্রেন। সে ট্রেন এখন আর নেই।
দাদু বললেন, কোর্ট এখন বন্ধ। বহুদিন যাওয়া হয়নি। একবার ঘুরে আসি। আম-কাঁঠালের সময়, দেখি কী পাওয়া যায়। অত বড়ো বাগান। পাঁচ ভূতে লুটেপুটে শেষ করে দিলে।
মায়ের অবশ্য মত ছিল না। এই গরমে যাওয়া-আসার কষ্ট। তা ছাড়া আম-কাঁঠাল পেলে কে বয়ে আনবে। কষ্টই হবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। দাদুর মন টেনেছে। মন যেখানে শরীর সেখানে এই নীতিতে দাদুর ভীষণ বিশ্বাস। আর একটা কথা তিনি প্রায়ই বলেন, আত্মাকে কখনো কষ্ট দেবে না।
আমাকে ছাড়া দাদুর কোনো কাজ হয় না। প্রায়ই বলেন, দুটো জায়গায় তুই আমার সঙ্গে যেতে পারবি না। এক এখানে, সেটা হল কোর্ট, দুই ওখানে, সেটা হল স্বর্গ। আমিও তো কম যাই না। আমি বলি, দেখা যাবে, আমিও তো একদিন স্বর্গে যাব, তখন আবার দেখা হয়ে যাবে। সেখানে আমার দাদাও আছে। দাদাকে আমার মনেই পড়ে না। দাদার কথা উঠলে মা এখনও কেঁদে ফেলে। তার ফেলে-যাওয়া যত-সব জিনিস, জামা, জুতো, পুতুল, সোনার আংটি, সব মা একটা লাল বাক্সে জমা করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দুপুরবেলা নির্জনে বের করে দেখে আর কাঁদে। সেই দাদার সঙ্গে মায়েরও নিশ্চয়ও দেখা হবে। একটা জিনিস বুঝেছি, এখানে মৃত্যু আছে, ওখানে নেই।
আমরা যখন বলাগড়ে পৌঁছোলুম তখন একটা বেজে গেছে। বুক পকেট থেকে ঘড়ি বের করে দাদু দেখলেন। ট্রেনটায় উঠতে গিয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। তিনবার বাস পালটাতে হল। তেমনি ভিড়। বাসের ছাদে বসে লোক চলেছে। দাদুর ফসা টকটকে মুখ গোলাপি হয়ে উঠেছে। পাঞ্জাবির পিঠ ঘামে ভিজে। তবু দাদুর কী আনন্দ। একটা বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে বললেন, ‘আহা জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। এই আমার সেই ছেলেবেলার বটতলা। এখনও তুমি ঠিক আছ। কতদিন হয়ে গেল। কত লোক চলে গেল, কত লোক এল, তুমি এখনও ঠিক আছ।’ বটগাছের সঙ্গে কিছুক্ষণ মনের কথা বলে, দাদু আমার হাত ধরে গ্রামের পথ ধরলেন।
পথে দাদুর একটিও চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হল না। ‘কী হল বল তো? পুরোনো মানুষেরা সব গেল কোথায়? সব অচেনা মুখ। হারান, নিবারণ, মানিক, মুস্তাফি। এখনও তাদের মরবার বয়েস হয়নি। সব আমার সমবয়সি। আমি বেঁচে আছি যখন, তারা মরবে কেন?’
‘দাদু আমার মনে হয়, এখন দুপুরু তো তাই তাঁরা খেয়ে-দেয়ে ঘুমোচ্ছেন।’
‘ধুর ব্যাটা। তিন-তিনটে আমবাগান পার হয়ে এলুম। গাছে গাছে কীরকম আম হয়েছে দেখছিস। এই আমপাকা দুপুরে কেউ ঘরে শুয়ে ঘুমোয় না। বাগানে মাচায় বসে হুঁকো-হাতে আম পাহারা দেয়। দেখলি না মাচায় অন্য লোক বসে আছে। ওদের ছেলেটেলে হবে। তোর আমবাগান নেই, তুই দুপুরে আমবাগানে বসে থাকার নেশা বুঝবি না।’
‘তাই যদি হয় তা হলে ওদের ডেকে কেন জিজ্ঞেস করলেন না?’
‘সাহস হল না। যদি সত্যিই বলে মারা গেছে, মনে বড়ো লাগবে রে! মনটা এখন স্মৃতিতে, ছবিতে বেশ ভরে আছে। খালি করতে চাই না। চল, চল, পা চালিয়ে চল।’
দাদু জোরে জোরে হাঁটতে লাগলেন, পেছনে যেন কেউ তাড়া করেছে। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে দাদু একটা ভাঙা আটচালার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘যা:।’
‘কী হল দাদু?’
‘পাঁচুসুন্দরী নেই।’
‘সে কে দাদু?’
‘আরে এইখানে তার মুড়ি-তেলেভাজার দোকান ছিল। চোখের সামনে ভাসছে। এইখানটায় ছিল তার উনুন। ইয়া বড়ো বড়ো বেগুনি, আলুর চপ, ফুলুরি আর লাল-লাল, ফুলো-ফুলো, মোটা মুড়ি। সে তোরা জীবনে খাসনি, খেতেও পাবি না।’
একপাশে উঁচু মতো একটা ঢিবি। মনে হয় ওইটাই ছিল সেই পাঁচসুন্দরীর উনুন। দাদু ডাকলেন, ‘পাঁচু সুন্দরী।’ সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে একটা ছাগল ভ্যা-ভ্যা করে ডেকে উঠল। আমি হেসে ফেলেছি। দাদু বললেন, ‘বোকার মতো হেসো না। এখনও এখানে পাঁচুসুন্দরীর আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সে থানকাপড় পরে পিঁড়েতে উবু হয়ে বসে কড়ার কালো বালি থেকে খুঁচি দিয়ে সাদা সাদা মুড়ি ছেঁকে ছেঁকে তুলছে।’ ছাগলটা আবার ব্যা করে উঠল। কার ছাগল কে জানে? হয়তো পাঁচুসুন্দরীরই হবে। দাদু দু-হাত কপালে তুলে নমস্কার করলেন।
আবার আমরা হাঁটতে শুরু করলুম, গ্রামটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে আছে। গ্রামের নেশা লেগেছে। আমরা বাশঝাড়, এঁদো পুকুর পেরিয়ে দাদুর ভিটেয় এসে উঠলুম। সামনেই চন্ডীমন্ডপ। ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। একগাদা পায়রা বকবকম করছে। দাদু চন্ডীমন্ডপের ধুলো নিয়ে কপালে ঠেকালেন। আমিও তাই করলুম। দাদু বললেন, একসময় কত পুজো হয়েছে এইখানে। আজ সব অন্ধকার। এক-একটা মানুষ চলে গেলে আর কিছুই থাকে না। কত বোলবোলা ছিল এই বাড়ির। দোল, দুর্গোৎসব। শহর! শহরই আমাদের জীবনের শনি। মুখুজ্জে-বংশের সন্তান কলকাতায় পেটের দায়ে মক্কেল চরাচ্ছে। এদিকে পৈতৃক ভিটেয় ঘুঘু চরছে। গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে।’ দাদু নিজের উপরেই নিজে খুব রেগে উঠলেন। সত্যিই হয়তো নিজের হাতে নিজের গালেই এক চড় কষাতেন। তা আর হল না। কোথা থেকে একটা পায়রা পাঞ্জাবির পিঠের দিকটা নষ্ট করে দিলে। দাদু ওপর দিকে মুখ তুলে ক্ষোভের গলায় বললেন, ‘তোরা অতীত বুঝিস না রে। কেউ অতীতে গেলেও সহ্য করতে পারিস না। জামা নষ্ট করে কান ধরে তাকে বর্তমানে টেনে আনবি। আর ক-দিন, চন্ডীমন্ডপ ভেঙে পড়ল বলে। চালিয়ে যা, চালিয়ে যা।’
চন্ডীমন্ডপের পাশ দিয়ে ইট-বাঁধানো ক্ষয়া-ক্ষয়া একটা পথ ভেতরবাড়িতে চলে গেছে। দোতলা বাড়ি। ওপরতলার অবস্থা শোচনীয়। খড়খড়ি বসানো জানলা ভেঙে একপাশে ঝুলছে। কার্নিশে বটগাছ, নিমগাছ। শিকড় নেমেছে নীচের দিকে। একতলাটায় মানুষ থাকে বলে মনে হল। তারে কাপড় শুকোচ্ছে, ঘাসের ওপর চারটে খরগোশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাদু হাঁকলেন, ‘সরোজ, সরোজ।’
খরগোশ চারটে ডাক শুনে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ভেতরে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন ঘোমটা টানা এক মহিলা।
‘সরোজ নেই?’
মহিলা দাদুকে ঘোমটার আড়াল থেকে এক নজর দেখে নিয়ে মৃদু গলায় বললেন, ‘ভেতরে আসুন। তিনি শুয়ে আছেন।’
‘হ্যাঁ, এই তো শুয়ে থাকার সময়। তিনি না-শুলে বাড়িটা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে কী করে?’ দাদু গজগজ করতে করতে দাওয়ায় উঠলেন।
‘অন্যদিন শুয়ে থাকে না। আজ তিনদিন হল জ্বর হয়েছে।’
‘জ্বর? জ্বর হল কেন? খুব কাঁচা আম খেয়েছিল বুঝি?’
‘আজ্ঞে না, ম্যালেরিয়া।’
‘ম্যালেরিয়া? সে তো পঞ্চাশ বছর দেশছাড়া।’
ভেতর থেকে কাঁপা-কাঁপা গলায় একজন পুরুষ বললেন, ‘আবার ফিরে এসেছে।’
ঘরে ঢোকার চৌকাঠ এত উঁচু যে, বেড়া টপকে ঢোকার মতো করে ঢুকতে হল। গোড়ালির ঢিপ-ঢিপ শব্দ হল। নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠলুম। চারপাশে গাছগাছালি থাকায় ঘরে আলো তেমন আসে না। অন্ধকার অন্ধকার। দেয়ালের পলেস্তারা খসে গিয়ে বিভিন্ন দেশের ম্যাপ তৈরি হয়েছে। জানালার দিকে বিশাল উঁচু একটা বাঘথাবা খাট। সেই খাটে কাঁথা, কম্বল আর লেপের স্তূপ। মাথার দিকে দাড়িগোঁফওলা একটা মুখ বেরিয়ে আছে। মাঝে মাঝে সারা খাট কেঁপে উঠছে, সঙ্গে হুঁ-হুঁ শব্দ।
দাদু সামনে ঝুঁকে পড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ব্যাপারটা কিছুক্ষণ লক্ষ করে বললেন, ‘ও-রকম করছ কেন?’
‘ম্যালেরিয়া করাচ্ছে মুকুজ্জেমশাই, আমি কী ইচ্ছে করে করছি? সবে আসছে।’
‘কখন যাবে?’
‘আজ্ঞে কাঁটায় কাঁটায় বারোটায় আসে, চারটের সময় ছাড়ে।’
‘বাবা! এ যে দেখছি সূর্যগ্রহণ। যাক, শুনে বড়ো আনন্দ হল।’
‘কেউ অসুস্থ হলে আনন্দ করতে নেই মুকুজ্জেমশাই। কবি বলেছেন, দু-ফোঁটা চোখের জল রেখো মোর তরে।’
‘আনন্দ হবে না পল্টু। তুমি বলছ কী? এত বড়ো একটা সংবাদ। অতীত ফিরে আসছে। ম্যালেরিয়া, শেয়ালের ডাক, সন্ধ্যের অন্ধকার, ঝিঁঝির ঝিঁঝিট রাগিনী, সাপের কামড়, গোরুর গাড়ি, ঠ্যাঙাড়ে, বরগির হাঙ্গামা, জলদস্যু। আহা, সেই মধুর অতীত, সেই রোমান্টিক পাস্ট আবার ফিরে আসছে। এক পয়সায় ইয়া বড়ো তালশাঁস সন্দেশ, খাঁটি গাওয়া ঘি, কাটারিভোগ চাল, বালি-বালি নৈনিতাল আলু। সেই সোনার অতীত আবার ফিরে আসছে।’
‘ওসব আর ফিরবে না মুকুজ্জেমশাই। শুধু ম্যালেরিয়াটাই ফিরে আসবে।’
দাদু ভাবে গদগদ হয়ে খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসলেন। আমি অত উঁচুতে উঠতে পারব না। একটা মোড়া ছিল, টেনে নিয়ে বসে পড়লুম। যা হাঁটা হেঁটেছি, আর দাঁড়াতে পারছি না।
দাদু বললেন, ‘আমি অত সহজে তোমার মতো হতাশ হই না। আশাবাদী মানুষ আমি। একটা বড়ো জিনিস যখন এসেছে তখন একে একে আবার সবই ফিরে আসবে। ঘাড়ের পেছন দিকে একটা মশা বসেছে মনে হচ্ছে। খোকা, দ্যাখ তো?’
আমি ঠিক শিকারি বেড়ালের মতো চুপি চুপি, কোনো শব্দ না-করে উঁচু হয়ে দেখলুম। হ্যাঁ, ইয়া বড়ো কালো মতো একটা মশা প্রাণপণে চেষ্টা করছে দাদুর ধবধবে ঘাড়ে হুল ফোটাতে। মুগুরভাঁজা ঘাড়। মশাটাকে বেশ চেষ্টা করতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে পেছনের পা দুটো উঠে পড়ছে। ফিশফিশ করে বললুম, ‘মারব?’
দাদু ফিশফিশ করে বললেন, ‘ফটাশ করে মার, দেখিস উড়ে পালায় না যেন।’
চড়টা বেশ কায়দা করেই তুলেছিলুম, লাগামাওর মরত, হঠাৎ আমার পায়ে এমন মশা কামড়াল, একটু টলে গিয়ে বেসামাল হয়ে গেলুম, আর অমনি মশাটা জানালার দিকে চলে গেল। দাদু বললেন, ‘অপদার্থ।’
‘কী করব? আমার পায়ে এমন কামড় দিলে।’
‘আমার ঘাড়ের মশা তোর পায়ে গেল কী করে?’
লেপের তলা থেকে মুখ বলে উঠল, ‘মশা কি একটা মুকুজ্জেমশাই! লক্ষ লক্ষ। ওরে বাবা রে, হুঁ-হু রে, লক্ষ লক্ষ।’ সারা শরীর কেঁপে উঠল।
দাদু সেই কাঁপুনির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আহা, তোমার কী ভাগ্য পল্টু, এই গরমেও তুমি কেমন শীতে কাঁপছ হুঁ-হুঁ করে। যেন দার্জিলিংয়ে চলে গেছ।’
‘এখানে দু-দিন থাকুন, আপনারও সেই ভাগ্য হবে।’
‘আমি কি সে বরাত করেছি পল্টু! মক্কেল চরিয়ে খেতে হয়। আমি বিছানায় পড়লে মক্কেলরা মরবে। যা একটা কেস পেয়েছি পল্টু! পুরঞ্জয় ভার্সাস ধনঞ্জয়। মামা-ভাগনেতে লেগে গেছে। আমি লড়ছি ভাগনের দিকে, সিদ্ধেশ্বর লড়ছে মামার দিকে।’
‘কেসটা কী?’ পল্টুমামা বিছানায় আধশোয়া হয়ে উঠে বসলেন।
দাদু যত কেসের কথা বলেন পল্টুমামা ততই বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসেন। শেষে লেপ-কম্বল ফেলে একেবারে খাড়া। দাদু বললেন, ‘কী হল? তোমার ম্যালেরিয়া? সেরে গেল না কি?’
‘আজ্ঞে তাই তো মনে হচ্ছে। আর তো তেমন শীত করছে না!’
‘তা হলে কী বুঝলে? ম্যালেরিয়ার বেস্ট ওষুধ হচ্ছে মক্কেল, মামলা। হোমিয়োপ্যাথি, বুঝলে পল্টু। একে বলে হোমিয়োপ্যাথি। ম্যালেরিয়াতে ম, মামলাতেও ম। দুটোই ধরলে ছাড়ে না। সিমিলি সিমিলিবাস। বিষে বিষে বিষক্ষয়। এত করে বললুম মোক্তারিটা পাস করে নাও। শুনলে না, প্রাইমারি টিচার হতে গেলে! এইবার লিভার-পিলে কোলে নিয়ে দাওয়ায় বসে দিন কাটাও।’
‘আর মুকুজ্জেমশাই কপালে যা লেখা আছে তা তো কেউ আর খন্ডাতে পারে না।’
দাদু নিজের গালে ঠাস করে এক চড় মেরে বললেন, ‘অসম্ভব। বসা যায় না হে তোমার ঘরে। কামড়ে ছিঁড়ে দিলে। যাই বাগানটা একবার ঘুরে আসি। খুব আম হয়েছে এবার।’
পল্টুমামা আবার শুয়ে পড়লেন। শুয়ে-শুয়ে বললেন, ‘থাকবে না একটাও। সব পেড়ে নিয়ে যাবে।’
‘মামার বাড়ি আর কি! পেড়ে নিয়ে যাবে। পাড়তে দেবে কেন! মেরে ঠাণ্ডা করে দেবে।’
‘এখানে মাসখানেক থেকে চেষ্টা করে দেখুন না। হাওয়া ঘুরে গেছে।’
কথাটা দাদুর তেমন পছন্দ হল না। বিশাল বাগানে ঘুরতে ঘুরতে বললেন, ‘কাউকেই আর বিশ্বাস করা চলে না। পাছে আম-কাঁঠালে ভাগ বসাই তাই পল্টু গান গেয়ে রাখলে। তুই ইট ছুড়তে পারিস?’
‘খুব পারি দাদু।’
‘তাহলে লাগা ওই জোড়া হিমসাগরে।’
দু-জনে মিলে ইট ছোড়াছুড়ি করে অনেক কষ্টে আম দুটো পাড়া গেল। আমের বোঁটা কী ভীষণ শক্ত! দাদুর পকেটে একটা ছুরি ছিল। ছায়ায় বসে গাছপাকা আম খেয়ে আমরা মোহিত হয়ে গেলুম। দাদু বললেন, ‘আহা, আমরা যদি হনুমান হতুম রে তাহলে কী সুন্দর ডালে বসে পেট ভরে আম খেতে পারতুম!’
‘পল্টুমামা আম পাড়াবেন না দাদু?’
‘পাড়াবে ঠিকই, তবে আমাদের জন্যে নয়। ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। দেখলি না কেমন ম্যালেরিয়ার ছুতো করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। তুই একটা কাজ করতে পারবি?’
‘কী কাজ দাদু?’
‘স্পাইং। ওই বাড়ির কোনো একটা ঘরে আম-কাঁঠাল আছে। নিশ্চয়ই আছে। তুই তো ছোটো, তুই করবি কী, এ-ঘর ও-ঘর করতে করতে সেই ঘরটা চট করে দেখে নিবি। তারপর আমি পল্টুকে চেপে ধরব।’
‘কিন্তু আমাকে যদি ধরে ফেলে?’
‘ফেললে ফেলবে। তুই তো শিশু। শিশুতে আর ছাগলে কোনো তফাত নেই।’
‘ছাগল বললেন দাদু!’
‘আহা ওটা হল উপমা রে হনুমান।’
প্ল্যানমতো আমরা বাড়ি ফিরে এলুম। পল্টুমামার তখন জ্বর বেড়েছে। সত্যিই বেড়েছে। পল্টুমামার বিধবা বোন লেপ-কম্বল সমেত তাঁকে বিছানায় চেপে ধরে রেখেছেন। পল্টুমামার আর কেউ নেই। দাদুর বাইরের রকে একটা বেতের চেয়ারে বসলেন। সূর্য পশ্চিমে সরে গিয়ে বারান্দায় ছায়া পড়েছে। আমার নিজেরই কেমন বিশ্রী লাগছে। তখন কেউ এক গেলাস জল পর্যন্ত খেতে বলেনি। বলবে বলেও মনে হচ্ছে না। মুখ দেখে মনে হচ্ছে দাদুর খুব খিদে পেয়েছে।
গোয়েন্দাগিরিতে বেরিয়ে পড়লুম। এই হল সবচেয়ে ভালো সুযোগ। পাশাপাশি সারি সারি ঘর। প্রথম ঘরে একটা চৌকি। ময়লা চাদর ঢাকা বিছানা। ভাঙা টেবিল, হাতলভাঙা চেয়ার। চৌকির তলায় একগাদা মালপত্তর। নাকটা ফোঁস ফোঁস করে গন্ধ নেবার চেষ্টা করলুম। পাকা আমের গন্ধ চাপা থাকে না, তেমন কোনো সন্দেহজনক গন্ধ নাকে এল না। তবু একবার চৌকির তলায় উঁকি মারলুম। ভাঙা বাক্স, থলেভর্তি তুলো, কাঠকুটো এক চুপড়ি, ছোট্ট একটা বেতের ঝুড়িতে হাত-পা ভাঙা কয়েকটা পুতুল, কাঠের গুঁড়ো ভর্তি একটা লাল ন্যাকড়ার হাতি। পুতুলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছি এমন সময় পেছনে পায়ের শব্দে চমকে উঠলুম। ধরা পড়ে গেছি। সামনে আয়না থাকলে চোরের মুখের ছায়া পড়ত। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। মাসিমা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, ‘কী দেখছ তুমি?’
দু-বার ঢোঁক গিলে বললুম, ‘কার পুতুল মাসিমা?’
‘আমার ছেলের। সে তো চলে গেছে। আমি মাঝরাতে এইগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি। সে এখন কোথায় কার ঘরে কার কোল আলো করে বসে আছে কে জানে। ওই দ্যাখো তার ছবি।’
উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালে টাঙানো একটা শিশুর ছবি দেখতে পেলুম। একমাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল। কালো মারবেলের মতো ঝকঝকে চোখ। ফোকলা মুখে খলখলে হাসি। মাসিমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, ‘আমরা বড়ো গরিব। আমাদের দিন চলে না। ও চলে গিয়ে ভালোই করেছে। রাজপুত্তুর ঘুঁটেকুড়ুনির ঘরে থাকবে কেন বাবা।’
আবার চোখ মুছলেন। আমার চোখেও জল এসে গেছে। আমার মাকেও আমার দাদার জন্যে কাঁদতে দেখেছি এইভাবে।
মাসিমা বললেন, ‘তুমি বাড়িটা দেখবে খোকা? চলো তোমাকে দেখাই।’
আমরা আর একটা ঘরে ঢুকলুম। সে-ঘরে একটা সেলাইকল। কলে একটা কাপড় ঝুলছে। মনে হয় কারুর ফ্রক তৈরি হচ্ছে।
‘এই ঘরে বসে আমি দিনরাত সেলাই করি। যা দু-চার পয়সা রোজগার হয় তাইতেই দিনকতক সংসার চলে। শীতে সোয়েটার বোনার কাজ পাই। পুজোয় জামার অর্ডার। সেলাই করে করে ঘাড় বেঁকে গেল, চোখে চালশে ধরল। ভাইটা মাস্টারি করে ক-টাকাই বা পায়। পূর্বপুরুষের দেনা শোধ করতেই সব চলে যায়।’
‘মাসিমা, আপনাদের বাগানে এত ফল, সেই ফল বেচে...’
হেসে উঠলেন মাসিমা, ‘তিন পুরুষের বুড়ো গাছ। ফলের চেয়ে পাতাই বেশি বাবা। তার ওপর চুরি। দেখতেই বাগান। আমরা জানি, তোমরা ভাব সব মেরে দিচ্ছি। মারব কী বাবা, সব মরে এসেছে। একই গাছ বছর-বছর আর কত ফল দেবে। এক চুবড়ি সুপুরি, গোটাকতক আম, বরাতে থাকলে এক কাঁদি কলা। এই হল তোমাদের বাগানের ফল। তোমার দাদু হয়তো বিশ্বাস করবেন না। মাঝে-মধ্যে চিঠি লিখে হিসেব চান। সেবার লিখলেন, রক্ষকই ভক্ষক। বড়ো মনে লেগেছে বাবা।’
মাসিমা আবার চোখ মুছলেন। মুখটা কেমন যেন ভারী ভারী হয়ে উঠেছে। এক সময় মনে হয় খুব ফর্সা রং ছিল। এখন যেন কেমন পোড়া-পোড়া হয়ে গেছে। মাসিমা হঠাৎ হেসে ফেললেন, ‘তোমাকে কত দুঃখের কথা বলে ফেললুম, তাই না? দুখি মানুষের এই বড়ো দোষ। যাকেই সামনে পাবে তার কাছেই কাঁদুনি গাইবে। যাও তুমি দাদুর কাছে বোসো। আমি চায়ের জল বসাই। মুকুজ্জেমশাই অনেকক্ষণ এসেছেন। ভাবছেন এরা কীরকম ছোটোলোক।’
দাদু বেতের চেয়ারে হাতলে তবলা বাজাচ্ছিলেন। আমাকে ফিশফিশ করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী বুঝলে?’
আমি ফিশফিশ করে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘সঙ্গে কত টাকা এনেছেন?’
অবাক হলেন, ‘কেন বলো তো?’
‘সে আমি বলতে পারব না দাদু। এঁদের ভীষণ খারাপ দিন পড়েছে। কোথাও কিছু নেই। এমনকী দুবেলা খাবার মতোও কিছু নেই। হাঁড়ি চড়ে না। সেলাই করে করে মাসিমার ঘাড় বেঁকে গেছে। এত অভাব, না-দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন না।’
‘রাসকেল পল্টু।’ দাদু চিৎকার করে উঠলেন।
পল্টুমামা বিছানা থেকে উত্তর দিলেন, ‘আজ্ঞে মুকুজ্জেমশাই।’
দাদু ধমকে উঠলেন, ‘তোমার লজ্জা করে না! জোয়ান মানুষ ম্যালেরিয়ার ছুতো করে বিছানায় পড়ে আছ রাসকেল। বেরিয়ে এসো! মাত্র দুটো পেট চালাবার ক্ষমতা নেই, তুমি গোঁফদাড়ি রেখে ম্যালেরিয়া-বাবাজি সেজেছ। এটা হিমালয় নয়, বলাগড়।’
মাসিমা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে একথালা আম। দাদু বললেন, ‘গেট আউট।’
মাসিমা অবাক হয়ে গেছেন, ‘হঠাৎ কী হল মুকুজ্জেমশাই?’
‘তোমাদের অহংকার। দারিদ্র্যের অহংকার। তখনও দেখেছি, আজও দেখলুম। তোমার ছেলের অসুখ, একবার জানালে না পর্যন্ত, বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। খুব...খুব অহংকার বাড়ল। গেট আউট। তোমাদের মুখদর্শন করাও পাপ।’ বেতের চেয়ার ছেড়ে দাদু উঠে পড়লেন। সাংঘাতিক রেগে গেছেন, ‘তোমাদের লজ্জা করে না, আইডল-ম্যালেরিয়ালিস্ট। এক পয়সা রোজগার করতে পারো না, তোমরা আমাকে আম দেখাতে এসেছ।’
দাদু বাঘের মতো পায়চারি করছেন। মাসিমা থালা হাতে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দুটো আবার ছলছল হয়ে উঠেছে। দাদু বললেন, ‘ও সব চালাকি চলবে না উমা। চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কর্ম হয় না। কর্ম করতে হবে। খেটে খেতে হবে। ম্যালেরিয়া গায়ে দিয়ে বোনের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া চলবে না। এই হল আমার রায়।’ দরজার দিকে মুখ এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই হল আমার রায়, বুঝলে ম্যালেরিয়াবাবু?’ মাসিমার দিকে ফিরে বললেন, ‘পাওয়ার কত?’
মাসিমা বুঝতে পারেননি।
‘চোখের পাওয়ার কত?’
‘দেখাইনি।’
‘ও, অন্ধ হবার ইচ্ছে হয়েছে। ভেবেছ অন্ধ হলে অবস্থা ফিরে যাবে শ্যামাসংগীত গেয়ে। তাই না?’
‘আমি তো গান জানি না।’
‘অন্ধ হলেই গলা দিয়ে সুরে বেসুরে গান বেরোবে। পতিতপাবন মুকুজ্জের মেয়ে হাটতলায় বসে প্যাঁ-পোঁ করে সিংগল রিডের হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইবে, দোষ কারো নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা। পড়বে, পড়বে, দু-চার পয়সা ভিক্ষে পড়বে।’
দাদু জলস্পর্শ করলেন না। একটা এক-শো টাকার নোট পল্টুমামার বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি তিন দিনের মধ্যে ম্যালেরিয়া ছাড়িয়ে আমার কাছে আসবে, তারপর তোমার একদিন কি আমার একদিন। হাত-পা-অলা মানুষ খেতে পায় না, আরে ছি ছি, লজ্জার কথা।’
আমরা ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত। মাসিমা কোথা থেকে ইয়া বড়ো একটা কাঁঠাল নিয়ে এলেন। দাদু আম-কাঁঠালের ভীষণ ভক্ত। পাঁচ পোয়া দুধে আধ সের কাঁঠালের রস দিয়ে ক্ষীর করে প্রায়ই খেয়ে থাকেন। বলেন সাগর মন্থন করে যে অমৃত উঠেছিল তার ফর্মুলাও ছিল এই রকমই। খেলে যৌবন ফিরে আসে। কাঁঠালের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে খুব বিরক্তির গলায় বললেন, ‘এটা আবার কী?’
‘আজ্ঞে কাঁঠাল।’
‘কাঁঠাল কী হবে?’
‘নিয়ে যাবেন।’
পল্টুমামা ভেতর থেকে চিঁ-চিঁ গলায় বললেন, ‘উনি কি নিয়ে যেতে পারবেন?’
ব্যস, আর যায় কোথায়। দাদুর রোক চেপে গেল। চ্যালেঞ্জ।
‘নিয়ে যেতে পারব না! বলো কী পল্টু? বুড়ো হয়ে গেছি নাকি? আমি তোমাকে কাঁধে করে কলকাতায় নিয়ে যেতে পারি। দেখবে পারি কি না?’
দাদু কাঁঠালটা কাঁধে ফেলে হনহন করে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। আমি পেছন পেছন চলেছি প্রায় ছুটে ছুটে। মাসিমা হেঁকে বললেন, ‘আবার আসবেন।’
সামনে পাক্কা তিন মাইল পথ, তারপর বাস। দাদু গলগল করে ঘামছেন। অত বড়ো একটা কাঁঠাল কাঁধে, এই রোদে হাঁটা যায় নাকি! বেলা পড়ে এলেও বেড়ায় গরম। মেটে পথে ধুলো উড়ছে।
‘দাদু, আমাকে দিন। কিছুক্ষণ আমি বই।’
‘পাগল হয়েছিস! এটার ওজন জানিস? কাঁঠালের সব ভালো রে, কেবল এর যদি গায়ে গিরগিটির মতো কাঁটা না- থাকত! দোষে গুণে মানুষের মতো, দোষে গুণে ফল। কী আর করা যাবে বল। গোলাপের কাঁটা, আর মৌমাছির হুল।’
একটা গাছের ছায়ায় এসে দাদু দাঁড়ালেন। মুখ-চোখ লাল টকটকে। সামনে ধুধু মাঠ। দূরে দূরে ছাড়া ছাড়া গ্রাম। কাঁঠালটা পায়ের কাছে নামিয়ে দাদু পকেট থেকে ঝাড়নের মতো একটার রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। হাতের তালুতে বিঁধ বিঁধ কাঁঠাল-কাঁটার ছাপ পড়েছে।
‘এটাকে এইখানেই রেখে যান দাদু। আপনার কষ্ট হচ্ছে। মা ভীষণ রাগ করবে।’
দাদু হা-হা করে অট্টহেসে বললেন, ‘কাওয়ার্ড, কাওয়ার্ড। মহাত্মাজি বলেছিলেন, ডু আর ডাই। করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে। জানিস এর মধ্যে কম-সে-কম আড়াই-শো কোয়া আছে। তার মানে আড়াই-শো বিচি। মেয়ে আমার কত খুশি হবে জানিস? ডালে দেবে, পুড়িয়ে খাবে। নে চল।’
জয় মা বলে দাদু কাঁঠালটা আবার কাঁধে তুললেন। যেতে যেতে বললেন, ‘বাঁক কাঁধে লোক কলকাতা থেকে তারকেশ্বর যায়। মনে কর আমরাও যাচ্ছি। বল, কাঁঠালবাবা পার করেগা।’
বেশ কিছু দূরে এসে দাদু বসে পড়লেন। কাঁঠাল তো আর তারকনাথ শিব নন যে তিন মাইল পথ পার করে দেবেন। সাহস করে বললুম, ‘দাদু, মনে হচ্ছে হবে না। একটা কাঁঠালের জন্য মরেঙ্গে হয়ে লাভ কী? আমাদের বাজারে অনেক পাওয়া যাবে।’
‘কী বলিস গবেটের মতো, গাছের কাঁঠাল আর বাজারের কাঁঠাল, চাঁদ আর চাঁদমামা এক হল?’ দাদু আবার উঠলেন। মাটির রাস্তা শেষ হয়ে পাকা রাস্তা শুরু হয়েছে। দাদুর হাঁটায় আর তেমন গতি নেই। দূরে কিছু দোকানপাট দেখা যাচ্ছে। আমরা নেচে নেচে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে এসে হাজির হলুম। দাদু বললেন, ‘আয়, এখানে বসে লাড্ডু আর জল খাই। তেষ্টা পেয়েছে।’
খাওয়াটা মন্দ হল না; কিন্তু যেই ভাবলুম আবার হাঁটতে হবে, হাত-পা অবশ হয়ে এল। দাদু হঠাৎ বললেন, ‘কাঁঠালের একজন উত্তরাধিকারী ঠিক কর তো খোকা। এটাকে আর কলকাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। জানিস তো, সব মানুষই চায় যে-মাটিতে জন্মেছে সেই মাটিতেই মরতে। কাঁঠাল বলে কি মানুষ নয়?’
যাক বাবা, দাদুর সুমতি হয়েছে। সামনের পথ দিয়ে একজন মানুষ চলেছেন আপনমনে চোখে তারের চশমা। কানের কাছে সুতো জড়ানো। গায়ে পাঞ্জাবি। ঘাড়ের কাছে অর্ধচন্দ্র তাপ্পি!
‘ওই যে দাদু, উত্তরাধিকারী।’
দাদু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে তাঁর সামনে গিয়ে বললেন, ‘নমস্কার।’
লোকটি হকচকিয়ে গেলেন। বললেন, ‘নমস্কার।’
‘আপনি একটি কাঁঠাল গ্রহণ করলে বাধিত হব।’ দাদু বিশুদ্ধ বাংলায় বললেন।
‘তার মানে?’
দাদু একটু থতমত হয়ে গেলেন। দেখতে নিরীহ হলেও মেজাজটা তেমন সুবিধের নয়। দাদু আমতা আমতা করে বললেন, ‘আপনাকে একটি গাছপাকা কাঁঠাল দান করে ধন্য হতে চাই।’
‘আপনি ধন্য হতে চাইলেও আমি ধন্য হবার জন্য কেন সাহায্য করব?’
দাদু বেশ বিব্রত। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তবু সাহস করে বললেন, ‘গ্রহণ করলে কৃতার্থ হব।’

‘আপনি ধন্য হতে চাইলেও আমি ধন্য হবার জন্য কেন সাহায্য করব?’
‘গ্রহণও করব না, কৃতার্থও হতে হবে না। আমি অপরিগ্রাহী। আমার তালিমারা পাঞ্জাবি আর ছেঁড়া পাদুকা দেখে আপনি ভেবেছেন আমি ভিক্ষুক! ভুল করেছেন মশাই। জানেন, আমার বড়ো ছেলে ভিলাইতে কাজ করে, আমার মেজো ছেলে দুর্গাপুরে, ছোটো হলদিয়াতে, আপনি এসেছেন আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে? ভেবেছেন কলকাতার বাবুদের আমি চিনি না?’
দাদু কথা শুনে পালিয়ে এলেন। আমার পাশে বসে বললেন, ‘অত্যন্ত অযোগ্য উত্তরাধিকারী। চল, আমাদের কাঁঠাল আমাদেরই থাক। ওই যেমন বলে নিজের জীবন নিজেকেই বইতে হবে, সেইরকম নিজের কাঁঠাল নিজেকেই বইতে হবে।’
আবার হন্টন। পথ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ওই যে বাসরাস্তা দেখা যাচ্ছে। এখন সেই গানটা গাইতে ইচ্ছে করছে, ‘পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহ-ভরা কোলে তুলে মা গো, কতদূর আর কতদূর।’
বাস আসছে। চারপাশে বাদুড়ঝোলা মানুষ। কার ক্ষমতা ওঠে। তবু দাদু একবার চেষ্টা করলেন। কনডাক্টর বলল, ‘একসঙ্গে দুটো হবে না। হয় কাঁঠাল আসুক আপনি থাকুন, নয় আপনি আসুন কাঁঠাল থাকুক। কিংবা বাসের চালে উঠে কাঁঠাল কোলে বসুন।’
বাস চলে গেল। জানা গেল পরের বাস আসবে এক ঘণ্টা পরে। এইবার মনে হল দাদু ভীষণ রেগে গেছেন। কাঁঠালটা পায়ের কাছে পড়ে আছে। দাদু বললেন, ‘সারাটা জীবন পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে এখন আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে এসেছে।’
‘কে দাদু?’
‘ওই ম্যালেরিয়ালিস্ট পল্টু।’
‘আপনি বরং কাঁঠালটা এবার বেচে দিন দাদু। দান করলে কেউ যখন নিতে চাইছে না।’
‘খদ্দের দ্যাখ।’
‘আবার আমার ওপর ভার দিচ্ছেন দাদু! উত্তরাধিকারী ঠিক করতে গিয়ে ফেল করলুম।’
‘তাতে কী হয়েছে? রবার্ট ব্রুস বলেছেন, ট্রাই অ্যাণ্ড ট্রাই, নেপোলিয়ান, রোমেল, নেলসন, সকলেই জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, পারব না বলে কিছু নেই, হারব না কখনোই।’
‘তা হলে দাদু, ওই যে এক ভদ্রলোক আসছেন, মনে হয় শহরের মানুষ, ওই যে নীল শার্ট, কালো প্যান্ট।’
দাদু যথারীতি সবিনয়ে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।’
‘বলুন।’
‘একটা গাছপাকা কাঁঠাল কিনবেন?’
ভদ্রলোক হকচকিয়ে গেলেন। ‘কাঁঠাল কিনব কেন? আপনি কি পাগল?’
‘আজ্ঞে না, সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ, কলকাতার কোর্টে ওকালতি করি।’
‘তাই বলুন। আহা, আইন-ব্যাবসার এই হাল হয়েছে। কলকাতার উকিল বলাগড়ে এসে কাঁঠাল বেচছেন? মাথায় কাঁঠাল ভাঙার মক্কেল জুটল না বলে এখানে তেড়ে এলেন কাঁঠাল বেচতে?’
দাদু প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আপনি ভুল করছেন। আমি প্রতিষ্ঠিত উকিল। কাঁঠাল বেচতে আসিনি।’
‘বুঝেছি, বুঝেছি। উকিলদের শেষকালটায় এইরকম স্মৃতিভ্রংশ রোগ হয়। এই বলছেন, এই ভুলছেন। আমার মেসোমশাইয়ের হয়েছিল। ওকালতি জীবনে ছ-টা না সাতটা এফিডেবিটের কেস করেছিলেন। ব্যস, আর মক্কেল জোটেনি। বটতলায় বসে মাছি তাড়াতেন। শেষে হাতে আর এক উকিলের কামড় খেয়ে জলাতঙ্ক রোগে মারা গেলেন। একই মক্কেল ধরে ছ-সাতজনে টানাটানি করছিলেন। হঠাৎ একজন ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিলে।’
‘ননসেন্স!’
‘আপনি একটা লুন্যাটিক। ক্যারিং কোল টু নিউক্যাসল। কাঁঠালের দেশে কাঁঠাল বেচতে এয়েছেন। আমার নিজেরই কাঁঠালবাগান। শুনুন, ভালো কথা বলছি, জীবনে একবার ভুল পথে গিয়ে পস্তাচ্ছেন। উকিল হয়ে মরেছেন। আবার একটা ভুল পথ ধরেছেন, কাঁঠালের ব্যাবসা। তার চেয়ে এখান থেকে কলা কিনে কলকাতার অফিসপাড়ায় বসুন, শেষ বয়সে অন্তত দুটো পয়সার মুখ দেখতে পারবেন।’
‘থ্যাংক ইউ ফর ইয়োর অ্যাডভাইস। আপনি যেতে পারেন।’
‘বললেও যাব, না-বললেও যাব। তবে শুনে রাখুন, বিপদে পড়লে মানুষের মতিভ্রম হয়। তখন ভালো কথাও খারাপ লাগে। খেঁকি স্বভাব হয়ে যায়।’
ভদ্রলোক মুচকি হেসে চলে গেলেন। দাদু বললেন, ‘পাজি।’
হনহন করে ফিরে এসে কাঁঠালটা কাঁধে তুলে নিলেন, ‘আয়, চলে আয়।’
বাসস্টপ ছেড়ে দাদু আবার কোথায় চললেন? মাঠের পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা নির্জন জায়গায় এসে পড়লুম। বহুদূরে বাসরাস্তা। গ্রাম। লোকজন নেই। একটা পুকুর। জলে লাল আকাশ ভাসছে।
‘নে, এখানটায় বোস।’
বসে পড়লুম, দাদু বেশ জুতসই হয়ে বসে কাঁঠালটা ভেঙে ফেললেন।
‘শোন, এতক্ষণে বুদ্ধিটা এল। কাঁধে করে না-নিয়ে যেতে পারি, পেটে করে তো সহজে নিয়ে যেতে পারব। আঃ, কোয়া দেখেছিস? আয় শুরু করা যাক। চালা চালা। এই নে, রুমালে বিচিগুলো জমা। বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।’
কাঁঠাল খেতে খেতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। শেয়াল ডাকল হুক্কাহুয়া। দাদু বললেন, ‘পালাই চ, ব্যাটারা গন্ধ পেয়েছে। আধখানা ওদের জন্যে রইল।’
রাত দশটার সময়, কাঁঠালবিচি হাতে আমরা বলাগড় জয় করে বাড়ি ফিরে এলুম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন