মিমি রাধাকৃষ্ণন
বাগানের বেতের চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে, ঘাড়-মাথা ঘুরিয়ে চারিদিক নিরিখ করে শেষে গম্ভীর মুখে সিদ্ধান্ত নিয়ে কুলু বলল—‘‘নাঃ, মানতেই হবে যে আমাদের পুঁটুরানির পচ্ছন্দ আছে ৷ এমনটি না হলে কি আর তেমনটি হুজ্জোত পোষায়! কষ্ট করে কেষ্ট পাবার কথা শুনিচি ভাই, কিন্তু এ-তো দেকচি আমাদের লোককাল কালো কেষ্টর বদলে একদম কেষ্টপারই জুটিয়ে বসে আছে! পুরোপুরি সাহেব ৷ আমার তো বেশ গুরুতর হিংসেই হচ্ছে বলা যায়৷ ঝক্কি তো বাপু একই পোয়ালুম, বরং বেশি বই কম নয় ৷ কিন্তু কপালে জুটল বলরাম... ৷’’
ওর কথার ধরনে বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা গোটা দলটাই প্রাণ খুলে হৈ হৈ করে হেসে উঠল ৷ কারণ কুলু বা কল্যাণীর বর অর্জুন সেনের ডাকনাম বুলু যে তার দাদুর সাধ করে রাখা বলরামেরই অপভ্রংশ, সে তাদের কলেজ জীবনে খুব জানা থাকলেও বহুকাল সেটা ভুলেই গিয়েছিল—কত কালের কথা... ৷
পবন বলল—‘‘কেবল পছন্দের কথা বললে হবে না বুঝলে? পছন্দ আমাদেরও কিছু মন্দ নয়, মন্দ হচ্ছে গিয়ে কপাল ৷ আসল কথা পুঁটুর লাক আছে ৷ সেটি না থাকলে এই গ্রীষ্মের বাজারে বম্বেতে বসে বোতাম টিপে টিপেই কেউ এমন অমরাবতীর হদিশ পায়?’’
চশমার ওপর থেকে গম্ভীর চোখে চেয়ে হাসি সেন বলল—‘‘সাধে কী তোকে ‘পবনপুত’ বলতাম? শুধু হনুমান না একেবারে সাক্ষাৎ কুচুটে হনুমান ৷ আমি তো ভাবছি, ভাগ্যিস পেয়েছিল! তাই না আমরাও এই নন্দনকাননে এসে জুটতে পারলাম! বল মমো? গোটাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে বেরিয়ে বেড়াব, আর পা ফুলে কনকন করলে এখানে এসে জিরিয়ে নোবো—ব্যাস ৷ অন্যের ভাগ্যে আর বিষ নজর না দিয়ে, যাও তো ভাইটি, খানসামাকে বরং চায়ের কথাটা বলে এসো গে যাও ৷’’
হাসি সেনের কথা শেষ হতেই বুড়ুদি বলল—‘‘আহা হা, কে বলেছে তোর মন্দ পছন্দ? সব ভবনের কেবল ডানাওয়ালা পরীরাই তো ছিল তোর হিট লিস্টে! তবে হ্যাঁ, ফাইনাল লাকটা যদি বলিস..., যাগগে যাক, যা পেয়েছিস তাই মন্দের ভালো ৷ ওইটুকুই একটু ধুয়ে মুছে রাখতে পারলে দিব্যি চলে যাবে ৷’’ বলে মমোর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিল ৷ আশিস বলল—‘‘ওসব ধোয়া মোছায় হবে না, তেল দিতে হবে, গ্রীজ ৷ হাঁটুটা যা করেছিস না মমো! মালাইচাকিটা খুলে বেশ পুরু করে গ্রীজ দে ৷’’
‘‘তুমি দাও ৷ ঘাড় তো ঘোরাতেই পার না ৷ মুন্ডুটা খুলে নিয়ে আচ্ছাসে গ্রীজ ঢালো, নাইজিরিয়ান গ্রীজ ৷’’ মমোর নেহাত উঠতে ইচ্ছে করছিল না, নয়তো মুখের সাথে হাতও চালাত খানিক ৷
বরদাপ্রসন্ন ক্যামেরা নিয়ে খুটুর-খাটুর করছিলেন, বললেন—‘‘ঢালা-ঢালি সময় করে সে হবে’খন, কিন্তু আমাদের হোস্টেসটি কই? দ্যাট লাকি চ্যাপ?’’
—‘‘ব্যাটা সারারাত ধরে গপ্প লিখে লিখে শেষ রাতে ঘুমুতে গিয়েছে ৷’’ চেয়ার না ছেড়েই গলা ছেড়ে মমো ডাকল—‘‘পুঁটু-উ উ? আয় বাপু ৷ রাত জেগে কী লিখলি-টিখলি একটু পড়ে শোনা আমাদের? তোর বুকার প্রাইজের প্রথম স্ক্রুটিনি তো আমারই! আগে তো আমরা রায় দেব, তবে না হবি তুই ‘রায় বাহাদুর’ ৷ অ্যা-ই বাহাদুর, মেমসাব সুবেহ সুবেহ ঘুমনে তো নহী গয়ি?’’
বাহাদুর বলে যাকে ডাকা হল, সে বোধহয় জড়ভরত গোছের কোনও গোয়ালা ৷ হাতে দুধের ক্যান ঝুলিয়ে রসুই ঘরের দিকে যাচ্ছিল ৷ সে, কে মেমসাব, কোথায় ঘুমনে গয়ি, কিছুই না বুঝে নিশ্চিন্ত মনে উলটোদিকে হাঁটা দিল, এবং তাই দেখে পবন বলল, ‘‘বাহ, হল আমাদের চা খাওয়া...’’ আর সে কথা শুনে লঘু চিত্তে আর এক প্রস্থ হাসি ৷ অতঃপর, ওই হাসির শব্দে একঝাঁক ধূসররঙা বড়ো বড়ো পাখি ভয় পেয়ে ক্যাঁ ক্যাঁ অদ্ভুত ডাক ছেড়ে উড়ে যেতেই সেদিকে চেয়ে বরদাপ্রসন্ন, প্রসন্নচিত্তে বললেন, ‘‘বার্ড অফ প্যারাডাইস ৷’’
রসিক মানুষ এমন কমেন্ট করতেই পারেন, তবে এ কথাও মানতেই হয় যে, এই পক্ষীকুল হাঁড়িচাচা ছাতারে কাক চিল যা-ই হোক না কেন বেন্টিক ভ্যালির পুবের এমন মনোহর চত্বরটিকে প্যারাডাইস ছাড়া কিন্তু কিছুই আখ্যা দেওয়া যায় না ৷ পুঁটু তো নিমিত্ত মাত্র, আসলে চোখ ছিল বটে ওই সাহেবদের ৷ আদাড়-বাদাড় বন-জঙ্গল চষে যা একেকটা বিউটি স্পট বের করেছিলেন... ৷ কিছুটা আবিষ্কার, বাকিটা তারপর নিজেদের মতন করে বানিয়ে-গুছিয়ে নেওয়া ৷ তার জেরেই না এতকাল পরেও মানুষজন সেই সব রেডিমেড স্বর্গোদ্যানে বেড়াতে এসে আনন্দে একেবারে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে এই কুলুদের মতন!
দেশের নানান প্রান্ত থেকে এক জায়গায় জড়ো হয়ে দশজনের দলটা শেষমেশ গতকাল এসে পৌঁছেছে এই পাহাড়ি শহর কালিমপঙে ৷ থাকবার কথা পাঁচ রাত, আর দিন ধরলে ছয়, তৎসহ যাতায়াত নিয়ে মোটামুটি দিন আষ্টেকের ট্রিপ ৷ তবে মুশকিল হয়েছে ওই থাকাটা নিয়েই ৷ কারণ গোটা দলটি একত্রে ট্রেনে চেপে রওনা হলেও, থাকছে কিন্তু চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ৷ খুবই ছোটো জনপদ, যার এ মাথা থেকে ওমাথা ধরলেও সে কতটুকুই বা দূরত্ব ৷ তবে পাহাড় বলে কথা! হুট বলতে তো আর এ লজ থেকে ও ভিলা হনহনিয়ে হাঁটা দিলে হবে না! দেড়-দু মাইলের মধ্যেই বড়োজোর তাদের সবাইকার ডেরা, কিন্তু পাকদণ্ডী রাস্তায় এঁকে-বেঁকে যাওয়া তো... ৷ অর্থাৎ খানিক সিঁড়ি চড়া, খানিক নামা ৷ কোথাও শান বাঁধানো চড়াই, কোথাও পাথুরে কাঁচা পায়ে চলা পথ ৷ টিনের চাল দু-হাত দূরে দেখা গেলেও, মাথা ঘুরিয়ে কান ছোঁয়ার মতন ঘুরপাক খেয়ে নামতে নামতে প্রাণ যায় এবং বলাই বাহুল্য যে পাহাড়ের পথ কেবল দৈর্ঘ্যে মাপলে চলে না, তার সাথে প্রস্থও অবশ্যই ধর্তব্য ৷ ফলে ওই সামান্য পথটুকু ডিঙোবার জন্য শহর থেকে ট্যাক্সি ডেকে, থাকো বসে হাঁ করে ৷ বিশ-ত্রিশ বছর আগে হলে কোনওই চিন্তা ছিল না, কিন্তু মানতে না চাইলেও, সবাইকারই তো বয়স হয়েছে! খান- কতকের তো, বলতে নেই একটু বেশি রকমেরই বেশি ৷ উপরন্তু কারুর হাঁটু কমজোরি, তো কারুর কোমরের ব্যারাম ৷ একজনের গত বছরই পেসমেকার বসেছে, অন্যজনের এ বছর ব্লাডসুগার—যেমনটা হয় আর কী এ বয়সে আজকাল... ৷
কিন্তু এছাড়া উপায়ই বা কী ছিল, সবাই তো আর একসঙ্গে প্ল্যান করে বেরুবে বলে বেরোয়নি ৷ এই যেমন, এ যাচ্ছে শুনে ও নেচেছে, ওর কথায় সে লাফিয়েছে, ওমুকের সঙ্গে তমুক ঝুলে পড়েছে ৷ তবে সবার আগে এখানে আসবার এই বাই তুলেছিল ওই পুঁটু—যার কাছে সবাই আজ সকালে ব্রেকফাস্টের আমন্ত্রণে জড়ো হয়ে এসেছে মনোরম এই মহামান্য ক্রিস্টোফার ভিলায় ৷
পুঁটু ওরফে অনুশীলা, বহুদিন থেকে বম্বের বাসিন্দা ৷ পেশায় লেখকই বলা যায়—খান দুয়েক উপন্যাস ছেপে বেরিয়েছে, দু তিনটে ছোটোগল্প সংগ্রহও ৷ তবে আসল খ্যাতি তার সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে ৷ মোটামুটি নামডাক আছে, তৎসহ বাণিজ্যিক সফলতা ও ব্যস্ততাও ৷ কিন্তু সাহিত্যের ছাত্রী, তায় গল্পকার হিসেবেই এ জগতে আত্মপ্রকাশ ৷ ফলে মন পড়ে থাকে এই পেশাদারি কর্মব্যস্ততার মধ্যেও নিজস্ব একটু সাহিত্যচর্চার নেশায় ৷
এমতাবস্থায় সর্বশেষ ভূত বিষয়ক ছোটোগল্প সংকলনটির জনপ্রিয়তা নজরে আসায়, হঠাৎই স্বনামধন্য ‘ডাকলিং পাবলিকেশন’, তার ওই বিষয়েই আরও একটি সংকলন ছাপাতে বেশ বেশিরকমই আগ্রহী হয়ে যোগাযোগ করল ৷ মেঘ না চাইতে জলের কথা আছে, তা, এ তো বলা যায় একেবারে জলের বদলে সরবৎ! অতি উত্তম প্রস্তাব সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, এবং এই বিশেষ বিষয়টাতেও যে সে বেশ সিদ্ধহস্ত, সে বিষয়ে আরও নিসন্দেহ ৷ সুতরাং যাকে বলে সোনায় সোহাগা ৷ তাই ভূতুড়ে, অদ্ভুতুড়ে, অ-বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান, সব মিলিয়ে মিশিয়ে অতি অনায়াসে এমন একটা ছমছমে, শিরশিরে আবহ তৈরি করে নিতে পারে যে সেটাই হয় তার গল্পের প্রধান আকর্ষণীয় উপাদান ৷ আর বলাইবাহুল্য সেই সঙ্গে ঝরঝরে ভাষায়, টান টান লেখার হাতটা তো আছেই ৷ সে যাই হোক, কাজের ফাঁকে ফোঁকরে অনবরত লেখার কাজ তো চলতেই থাকে, ফলে গল্প মোটামুটি তৈরিই, এখন কেবল বেছে, গুণে, জড়ো করে পালিশ-টালিশ করা—সত্যি, এমন চমৎকার একটা সুযোগ ৷ তবে ওই গুনতে গিয়েই নজরে এল কেবল মোটামুটি নয়, একেবারে পুরোপুরিই তৈরি আছে, তবে একডজন থেকে মাত্র একটি কম, অর্থাৎ এগারোটি গল্প ৷ তা, যাক, ওটা কোনও ব্যাপারই নয় ৷ হাতে সময় আছে ঢে-র, হয়ে যাবে ৷
কিন্তু কার্যত দেখা গেল ওই ‘হওয়াটাই’ যে বিশাল পর্বত প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে! সামান্য এই শেষ রক্ষাটুকু করতে গিয়ে যে এমন নাজেহাল অবস্থা হতে পারে এমনটা তো কল্পনাতেও ছিল না ৷ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, বার বার তাগাদা সত্বেও পিছোতে হচ্ছে ডেট—একেই কি বলে রাইটার্স ব্লক? দিনের পর দিন টেবিলে বসে কলম চিবিয়ে, মাথা চুলকে, পা দুলিয়ে সময় কাটাচ্ছে, অথচ বেরুচ্ছেই না কিছু! তারা এবার বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলে তো বলার কিছুই নেই! সবারই তো ধৈর্য্যের একটা সীমা থাকে, তৎসহ ভদ্রতারও—কী যাচ্ছেতাই সে অবস্থা ৷ তার ওপরে আবার আগে ভাগেই সবার অভিনন্দন-টন্দন পেয়ে গদগদ চিত্তে হজম করেও বসে আছে, এদিকে এই... ৷ কী লজ্জায় যে পড়েছে, মুখ দেখাবারই উপায় নেই ৷ সত্যি বলতে, এই কারণেই অতঃপর নিরিবিলিতে কালিমপঙে আসবার চিন্তাটা বেশ ফলপ্রদ মনে হল ৷ ভাগ্যিস, এত জায়গার মধ্যে থেকে শেষমেশ এনাকেই বাছা হল তা নয় তো কী যে হত...! সবেতেই একটা সংযোগ থাকে, সে কথা মানতেই হয় ৷ নয়ত এবারই হঠাৎ কেন বেড়াবার বাই চাপবে, তাও আবার নিরালা, নির্জন এই পাহাড় চুড়োয়?
খসড়াটা তৈরিই আছে, এবার ওই শান্ত, মনোহর পরিবেশে ঘাড়ের বোঝাটি কোনওক্রমে নামিয়ে ফেলতে পারলেই ব্যাস... ৷
পুঁটুর বাবা-মা গত হলেও যেহেতু পৈত্রিক বাড়িটি তাদের শান্তিনিকেতনেই, সেহেতু প্রায়শই আসা হয় ঠিকই কিন্তু কোথাও আর বেড়ানো হয় না ৷ অল্প বয়সে সপরিবারে যেত দূরের নানান দ্রষ্টব্যস্থানে ৷ পরে কর্মসূত্রে হয়তো বা আরও সুদূরে ৷ তবে সেই বিখ্যাত শিশিরবিন্দুটির মতন নিজের জন্ম রাজ্যের ছোটোখাটো মনোরম স্থানগুলোই চক্ষু মেলিয়া আর দেখা হয়ে ওঠেনি ৷ ফলে এবার প্রথমেই স্থির করে রেখেছিল, যে করেই হোক ওই শান্তিনিকেতন-বাসের মধ্যে কাছাকাছি কোনও একটা দর্শনীয় জায়গায় সে যাবেই যাবে ৷ সবার কাছে কেবল শোনে এবার তারা গিয়েছে মুকুটমণিপুর, ওবার যাবে হাজারদুয়ারি, নয়তো বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির মন্দির দেখতে অথবা সুন্দরবন কিংবা কালিমপঙ, নিদেনপক্ষে দুমকা হিরণপুর—তার তো কিছুই দেখা হল না, কোথাও যাওয়া হল না! বম্বে থেকে ছুটে ছুটে ঘরে ফিরে কল সারাও, ছাত মেরামত করো আর জলের ট্যাঙ্ক বদল করো, তারপর সে সব সারা হলে আবার ছুটে ছুটে গন্তব্যে ৷ অর্থাৎ কাজের থেকে মুখ তুলে আবার কাজের মধ্যে মুখ ডোবানো—ধু-উ-র, এও একটা জীবন? আর নয় ৷ যেই ভাবনা সেই কাজ, হাজার জল্পনা-কল্পনা করে শেষমেশ, ঝেড়ে-বেছে, সাগর সেঁচে মানিক বের হল গিয়ে—হিম ঠান্ডা শৈল-শহর এই কালিমপঙ ৷ এত শুনেছে এর মনোরম পরিবেশের কথা, নাতিউচ্চ পর্বতমালা, যাতায়াতের অবাধ ব্যবস্থা, থাকবার সুবন্দোবস্ত—খুবই উত্তম, তাহলে এই হল গিয়ে ফাইনাল ৷
এখন তো প্রচুর হোটেল, গেস্ট হাউস, রিসর্ট আর হোম স্টে-র ছড়াছড়ি নিশ্চয়ই, তবে থাকতে যদি হয়, সে কিন্তু থাকবে বহু কথিত সেই সাবেক কালের ‘ক্রিস্টোফার ভিলা’তেই ৷ কত জনের থেকে কত শুনেছে এর খ্যাতি ৷ এককালে মামা-পিসিরা থেকেছেন, পরে বন্ধুরা এসেছে হানিমুন পর্বে ৷ তারপর আবার সেই বিশেষ দিনগুলোর সিলভার জুবিলি সেলিব্রেশনেও ৷ কত ছবি দেখেছে, আর কত যে গল্প তার... ৷ এসব হল গিয়ে প্রায় মাস তিনেক আগেকার কথা ৷ বম্বেতে না হলেও শান্তিনিকেতনে তখনও বেশ ঠান্ডা ৷
আজকাল তো সব কিছুই অন লাইনে, ফলে সত্যি-সত্যিই বোতাম টিপে হয়ে গেল বুকিং—নিশ্চিন্ত ৷ এর পরের পর্ব, সে ভ্রমণসূচির বার্তা জনে জনে, পরিজনদের জানাবার পালা ৷ তাদেরও তো ঘরবাড়ি আছে শান্তিনিকেতনে ৷ অনেকে তো থাকেই, আর বাকিরা যায়ও ওই সময়টা ৷ তবে শুনে তো হাজার মন্তব্য ৷ ‘কোথায় থাকবি’, ‘কী করে যাবি’, ‘কোনওকালে বে-লাইনে যাসনি, কেবল বম্বে, শান্তিনিকেতন এখন হঠাৎ যদি ডি-রেল হোস অর্থাৎ লাইনচ্যুত’ ইত্যাদি... ৷
পুঁটু জানাল যে, থাকবার জন্য চিন্তা নেই কিন্তু যাবার ব্যবস্থাটা তাদেরই করতে হবে, তারা কিনা নিয়মিত ডুয়ার্স, লাভা, লোলেগাঁও যাতায়াত করে, ফলে তাদেরই জানা থাকবে কোন ট্রেন, কখন কোথায় যায়, কেমন ব্যবস্থা... ৷ তারাও তৎক্ষণাৎ সমস্বরে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারা যায় তো বটেই, আর জানেও সব ৷ এখন পুঁটু কেবল মুখের কথাটা ফেলুক—কত তারিখে যাওয়া, কততে ফেরা ৷ সে পৌঁছুবার আগেই, তার ঘরের দেরাজের ওপর পাথর চাপা দিয়ে রাখা থাকবে টিকিট ৷ আহারে, মেয়েটা এখনও উত্তরবঙ্গই দেখেনি, অথচ দক্ষিণ-কঙ্গোও দেখে বসে আছে, এ একটা কথা হল?
যাক, এবার তাহলে—পুরোপুরি একশো ভাগই নিশ্চিন্ত ৷ পুঁটু অতঃপর পাবলিশারকে জমা দেবার একেবারে ফাইনাল একটা দিন জানিয়ে, নির্ভার মনে হাতের কাজ গুছিয়ে নিতে লাগল ৷ আর ক’টা মাত্র তো দিন ৷
তবে এরই মধ্যে এদিক-সেদিক থেকে ক্রমাগতই লোকমুখে অবশ্য শুনছে যে তার সাধের ক্রিস্টোফার ভিলার মালিকরা নাকি সেটি আর চালিয়ে উঠতে পারছে না, ফলে খুব শিগগিরই হয়তো হাত বদল হবে, নয়তো বিক্রিই... ৷ খারাপ লাগল শুনে, কিন্তু কী করা ৷ গেলে যাবে! তবে শেষ মুহূর্তে হলেও অন্তত তার এতকালের সাধপূরণটা তো হচ্ছে! ক’দিন আগে একজন তো এ-ও বলল, ‘‘ও হোটেল তো কবেই উঠে গেছে’’, বোঝো! তারপর অন্যজন খবর দিল, ‘‘পুরোপুরি বোধহয় বন্ধ হয়নি, তবে ফাঁকাই পড়ে থাকে ৷’’ কেউ বলল, ‘‘এত রকম হোটেল থাকতে, আবার ওখেনে থাকবার বাই চাপল কেন বাপু? চলে-টলে না, যেয়ে দেখবে ছাত দিয়ে জল গড়াচ্ছে অথচ কলের মুখ শুকনো ৷ ছেঁড়া চাদর দেবে, নোংরা তোয়ালে... ৷ আরে বাবা এখন ভিলা-মিলা চালানো কি আর চাট্টিখানি কথা...!’’ আরেকজন অতি সজ্জন, বলব কি বলব না করে বললেন—‘‘ওটির সম্বন্ধে কবে যেন, কী একটা পড়েছিলাম কাগজে... বোধহয় ক্রিস্টোফার ভিলা নয়, আইরিশ কটেজ ৷ আমি ভুল করছি ৷ দুটোতেই এককালে নিয়মিত থেকেছি কিনা, এখন গুলিয়ে গিয়েছে... ৷’’
বাহ, প্রতিটিই বড়ো ইতিবাচক ইঙ্গিত ৷ তবে সে অর্থে না চললেও, চলছে তো বটেই ৷ তা না হলে ইন্টারনেটে তার হদিশ থাকত না, এবং ক্রেডিট কার্ডে টাকা জমা করা বা অন্যান্য আধুনিক খবরাদিও সময় মতন সরবরাহ অসম্ভব হত ৷ সে বিষয়ে অত চিন্তার কিছু নেই ৷ তবে হাত বদলের প্ল্যান থাকলে, তার আগে হাত গুটিয়ে রাখাটা কিন্তু খুব অস্বাভাবিক নয় ৷ সে ক্ষেত্রে আর কিছু নয়, ওই নোংরা, ছেঁড়া... ৷ যাই হোক, অব্যবস্থা-ট্যাবস্থার কথা শুনে দমে গেলেও অন্যদিকে কিন্তু সেটা শতগুণে পুষিয়ে গেল, কারণ রওনা হবার ক’দিন আগে কান ফুসফুসে খবর পেল, যে শান্তিনিকেতনে যাদের থেকে রেলের খবরটা জানতে চেয়েছিল, তারা সে খবরাখবর নিজেদের মধ্যেই বাটোয়ারা করে নিয়ে ইতিমধ্যে বেশ বড়োসড়ো একটা দল বানিয়ে আগেভাগেই প্রত্যেকের নামে নামে একটা করে টিকিট কেটে বসে আছে, অর্থাৎ তারাও সবা-ই যাচ্ছে ৷
সবাই বলতে পুঁটুর ছ-ক্লাস ওপরের দিদির ঘনিষ্ট বন্ধু বুড়ুদি আর আট-ক্লাস সিনিয়র জামাইবাবুর ক্লাসমেট সদাপ্রসন্ন বরদাপ্রসন্ন বা বরো-দাদা ৷ তাঁদের মেয়ে, জামাই টুপু-বিষ্ণু ৷ প্রচণ্ড বন্ধু মমো, মানে মাধুরী এবং তিনক্লাস উঁচুতে পড়া তার আমুদে বর পবন ৷ হঠাৎ আসা ছোটোবেলাকার বন্ধু আর এন আর আই ক্ষীণজীবী আশিস, তৎসহ প্রাণের সখী কুলু আর মনের মতন হাসি সেন তো বটেই ৷
এ তো গেল ভালো খবর, কিন্তু আর-ও-ও ভালো খবর হচ্ছে—ওই গোড়ায় যে কথা হচ্ছিল একেক জন, একেক সময় খবর পাবার ফলে একেক সময় বুকিং এবং স্বভাবতই একেক জায়গাতেও ৷ সুতরাং আপাতভাবে পুঁটু দলের মধ্যে থেকেও আবার নির্জনে নিজস্ব কাজটুকু সেরে ফেলতেও কোনওই অসুবিধায় পড়বে না ৷ অর্থাৎ সার কথা হচ্ছে, তার ক্রিস্টোফার ভিলার অনুষ্ঠানসূচি অপরিবর্তিত ৷ একেই বলে বোধহয় রথ দেখা কলা বেচা, অথবা সোনায় সোহাগা বললেই বা অসুবিধা কী, কিছুই না!
নির্দিষ্ট দিনে বেশ বেশি রাতে সবাই মিলে বোলপুর থেকে, লুচি তরকারি, জিভে গজা, মাফিন, রসের মিষ্টি, শুকনো ফল, কুঁচো নিমকি—যে যত পারল নিয়ে-টিয়ে রেলে চেপে, ভোর সকালে এসে পৌঁছুল নিউ জলপাইগুড়িতে ৷ সেখানে আগে থাকতে বলা, কালিমপঙের দুটো বড়ো গাড়ি বশংবদ দাঁড়িয়ে ছিল, ফলে সদলবলে নামতেই, বমাল সে গাড়িতে তুলে নিয়ে তৎক্ষণাৎ রওনা দিল তারা গন্তব্যের দিকে ৷ শিলিগুড়ির ধোঁয়া ধুলো ভিড় ছাড়াতেই ধীরে ধীরে দৃশ্য বদল হতে থাকল এবং আরও বদল, আরও বদল হতে হতে শেষমেশ এসে পৌঁছল কা-লি-ম-প-ঙ ৷
প্রথমেই যাওয়া হল অতি পরিচিত চমৎকার সরকারি বাংলো তোশিবা লজে, যেখানে কুলু আর হাসি সেন থাকছে ৷ রাস্তা চওড়া পরিষ্কার, দৃশ্য সুন্দর, ব্যবস্থা ভালো—হাসিরা তো খুবই খুশি ৷ তা দেখে ভেতরে খুশি হলেও বাইরে ব্যাজার মুখে মমো বলল—‘‘ইশ সবার যদি এখেনেই ঠাঁই মিলত..., সান রাইজ থেকে সেট পর্যন্ত বেশ এক সঙ্গেই দেখা যেত ৷’’ কুলু তেড়ে ফুঁড়ে বলল—‘‘তোদের যখন জানালাম তখন তো টিভি সেটের থেকে চোখ না সরিয়ে বলতে থাকলি ‘ওই কাজ, সেই কাজ..’, এখন আবার সান সেট দেখার শখ হয়েছে ৷’’
সত্যি তো, এই গ্রীষ্মের আক্রায় কোন শৈলবাসই বা এতগুলো হুজুগে মানুষের অপেক্ষায় দিন গুনে ফাঁকা পড়ে থাকবে? তা সে যাই হোক, ওদের ঘরটর পরখ করে, চা খেয়ে, বাথরুম গিয়ে, টা টা সেরে অতঃপর রওনা হল ‘হিমালায়ান ভিউ’-এর দিকে, যেখানে, তোশিবা লজে জায়গা না পেয়ে হুমড়মুড়িয়ে বুড়ুদিরা মেয়ে-জামাই সমেত দুটো ঘর বুক করে ফেলেছিল তৎক্ষণাৎ ৷
ছাইরঙা কাঠের কী সুন্দর বাড়িটা! কাচের ঢাকা-বারান্দা সমেত সাবেকি বড়ো বড়ো ঘর, সামনে খোলা চত্বর ৷ চারিদিকে তাকালেই হিমালয়ের নাতিপুতিদের তো সদাসর্বদা দেখা যায়ই, কিন্তু সব চাইতে যেটা বেশি নজরে আসে তা হল সামনের পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা গোটা শহরটা ৷ দিনের বেলায় মনে হচ্ছে পাহাড় জোড়া যেন ছোটো ছোটো টুকরো করা সাদা কাগজ ছড়ানো, আর মাঝে-মধ্যে রোদ পড়ে ঝকমক করছে রাংতার মতন টিনের চাল ৷ তবে রাত হলে অন্ধকারে যখন ঝিলমিলে আলো জ্বলে উঠবে তখনই হবে বটে সত্যিকারের আরও একটা দৃশ্য!
ঘরদোরের ব্যবস্থা দেখে টুপু একটা প্রস্তাব দিল যে, মায়েরা সবাই মিলে এখানেই কেন থাকুন না এক সঙ্গে, তারাই বরং চলে যাচ্ছে ওই রিসর্টে! পাছে আবার মত বদল হয়, তাই তাড়াতাড়ি মমো আহ্লাদে আটখানা হয়ে দশবার ‘‘থ্যাঙ্কু রে টুপুবাবু’’, বলে জানলার ধারের খাটটা দখল করতে ছুটল ৷ আর বুড়ুদি বলল—‘‘দেখিস পবন, না দেখেই ওই রিসর্ট বাতিল করছে কিন্তু, পরে পিটির পিটির করলে সো-জা ঘরের বার ৷’’ পবন বলল—‘‘দোরগোড়ায় বসে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করলে ঘুমুতে পারবে? একটা হাঁড়ি চাপা দিয়ে রাখবো’খন ৷’’ বরদা বললেন, ‘‘আহা অত চাপাচাপির কী দরকার ৷ ওই বটলগ্রীন না এভারগ্রীনের চাইতে এ ঢের ভালো ব্যবস্থা ৷ তা বাদে পাশেই গার্লস হোস্টেল..., কী বলিস আশিস?’’ আশিস আর কী বলবে, সে তো মহা খুশি ৷ বলল ওই রিসর্টে মমোর সঙ্গে কটেজ শেয়ার করা কি চাট্টিখানি কথা নাকি বুকের পাটার দরকার ইত্যাদি... ৷ মমো তখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে অনেক কষ্টে একটা চাঁটি মারল আশিসের মাথায়—‘‘খুব কথা ফুটেছে না, আবার মুখ খুললে লাশ ফেলে দেব, যা ওদিকে বয়েজ রুমে ৷’’
—‘‘ওহ, নড়তে পারে না, লাশ ফেলবে! ক্রাচ নিয়ে ফেলতে যাবি?’’
কোন কোন প্রক্রিয়ায়, কেমন কেমন ভাবে ফেলা যায়, তা নিয়ে সবাই মিলে সম্ভাব্য জল্পনা-কল্পনা করতে থাকলে অপেক্ষারত গাড়ির ড্রাইভার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে হর্ন বাজাল—‘প্যাঁ-ঁ্যা ঁ্যা’, এবং বেহুঁশেরা তৎক্ষণাৎ হুশ ফিরিয়ে বিকেলে আবার এখেনেই জড়ো হয়ে বাকি প্ল্যানটা করে নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতঃপর শেষ তিন জন গাড়িতে চেপে বসল যদিও এখান থেকে ওই এভারগ্রীনের পথ খুবই সামান্য ৷ দূর হচ্ছে পুঁটুর বাসস্থান ৷
ক্রিস্টোফার সাহেবটি বোধকরি একাচোরা ছিলেন, নতুবা সেকালের ফাঁকা সুনসান পাহাড়ে, অতদূর যাবার দরকারটা কী ছিল! এবার যেতে আসতে প্রাণটা যাবে ৷
ঝকঝকে তকতকে, ছাঁটা ঘাস, মাপা ফুল, বাঁধানো রাস্তার, কলোপ লাগানো এভারগ্রীনে টুপুদের নামিয়ে, শেষে গাড়ি যখন উলটোবাগে মুখ ঘোরাল, তখনই পুঁটুর প্রাণটা জুড়িয়ে গেল ৷ কী-ই চমৎকার রাস্তা, দুধারে শ্যাওলা ধরা মহীরুহ, মাঝে মধ্যে খানকতক ফাঁকা, ফাঁকা, নিঃসঙ্গ বেঞ্চ... ৷ হঠাৎ ছায়া, হঠাৎ রোদ, বাঁক ঘুরতেই অকস্মাৎ তীব্র ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ৷ তবে পুঁটু খুশিতে গুনগুনিয়ে গান ধরতেই গাড়ির গতি ধীর হয়ে গেল, আর জানলার বাইরে চোখের সামনে দেখল বড়ো একটা লোহার তিরের নীচে লেখা ‘ক্রিস্টোফার ভিলা’ ৷
জিনিসপত্তর নামিয়ে গুছিয়ে স্নান সেরে যখন পুঁটু নীচের ডাইনিং হলে গেল, বড়ো ঘরের অন্যদিকের টেবিলে বসে তখনও একটা ছোটো পরিবার নিঃশব্দে খাচ্ছিল ৷ খানিক পরে তারা সশব্দে চেয়ার সরিয়ে চলে যেতেই, বেয়ারাও পরিপাটি করে সাজিয়ে খাবার নিয়ে হাজির ৷ খাদ্য দ্রব্য বলা যায় অতি সুস্বাদু, পরিবেশনেও কোনও ত্রুটি নেই ৷ গেলাস, প্লেট চিরধরা নয়, এমনকি ঘরের বিছানা, তোয়ালে পাপোশও দেখে এসেছে নিখুঁত ৷ আর কী চাই? নিন্দুকেরা নিন্দে করতে পারলে আর কিছুটি চায় না ৷ পুঁটুর কী যে ভালো লাগছিল বলবার নয় ৷ খেতে ভালো লাগছে, বাগানে ঘুরতে ভালো লাগছে, গাছের ছায়ায় বসে বসে ভাবতে ভালো লাগছে, বাড়িটা ভালো লাগছে, ঘরটা ভালো লাগছে, কর্মচারীদের ব্যবহার ভালো লাগছে... ৷ ভালো লাগছে না কেবল ক’দিন পরেই যে এখান থেকে চলে যেতে হবে, সেই ভাবনটা ভাবতে ৷
মধ্যাহ্নভোজন সেরে পোর্টিকোতে দাঁড়িয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে ক’টা প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিচ্ছিল পুঁটু ৷ পাঁচটা নাগাদ একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হবে, যাতে করে পথে বন্ধুদের তুলে ‘হিমালয়ান ভিউ’তে যেতে পারে সে ৷ ডিনার সেখানেই সেরে ফিরবে, তবে রাতে বড়ো ফটক আবার বন্ধ হয়ে যায় না তো? তাহলে কিন্তু মহাবিপদ!
ম্যানেজার ভদ্রলোক খুব হাসলেন তার আশঙ্কার কথা শুনে—ম্যাডাম যে কী বলেন! তাদের অতিথিশালার একটা রেপুটেশন নেই? চৌকিদার থাকবে, অ্যাটেনডেন্ট থাকবে, তা বাদে তিনিই তো থাকেন এই ক্যাম্পাসের লোয়ার বাংলোয় ৷ প্রয়োজনে ঘরে বসেই বেল টিপবেন ‘ঢং’—ব্যাস, সবাই হাজির ইত্যাদি... ৷
পুঁটু হেসে ধন্যবাদ-টাদ জানিয়ে এগিয়ে গেল ৷ হাঃ, গত তিনমাস ধরে তাদের অতিথিশালার যত রকমের রেপুটেশনের বহর শুনে এসেছে, ভদ্রলোককে তা রিলে করে শোনালে, সেখানেই তিনি মুচ্ছো যেতেন ৷ আর ফটক বন্ধ দেখলে ঘরে বসেই ‘ঢং ঢং’ করবে, বুদ্ধি আর কাকে বলে! তবে দু’দিন যাক, পরে সময় করে, গৃহকর্তা সমেত এই গৃহের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করবে নিশ্চয়ই ৷ ব্যবস্থার তো কোনও ত্রুটি দেখছে না, তবু এ ধরনের রটনার ঘটনাটা কী? পুঁটু হালকা-পায়ে পায়চারি করতে করতে বাগানের প্রান্তে উইলো গাছের নীচে সাদা রং করা কাঠের বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে গেল ৷ সাধারণত পাহাড়ের দিকে ফেরানো থাকে বসবার জায়গা, সেক্ষেত্রে এটি কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ৷
এখানে বসে চেয়ে চেয়ে দেখতে হয় আইভিলতায় ছাওয়া, বড়ো বড়ো চিমনি তোলা, কালো পাথরের থমথমে মনমোহন এই অট্টালিকাটিকে ৷ ক্রিস্টোফার দম্পতির রুচির তারিফ না করে উপায় নেই ৷ সত্যি, দেখবার মতন দৃশ্যই বটে, আর তার সঙ্গে দেখাবার মতনও ৷
সাহেব ছিলেন ঢাকার জুট মার্চেন্ট ৷ পাটের ব্যাবসাতে প্রচুর মুনাফা করে, বিশ শতকের গোড়াতে সাধ করে বানিয়েছিলেন এই শৈলাবাসটি ৷ তাছাড়া তো মেম গিন্নিমাদের ধরে রাখবার আর কোনও উপায়ও ছিল না ৷ কাঁহাতক আর ওই বাঙালদেশে ঘেমে-নেয়ে মশার কামড় খেয়ে, বেনে বৌ হয়ে পড়ে থাকবেন বেচারারা! ক্রমে এই গ্রীষ্মাবাস তাদের এমনই ভালোলেগে যায় যে, পাটের পাট চুকিয়ে পাটরানি নিয়ে এখেনেই পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এবং অতঃপর সাঁইত্রিশ সালে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলে, সাহেব সর্ব অর্থে সেখানেই দেহ রাখেন ৷ ম্যাডাম ক্রিস্টোফার কিন্তু তার পরেও ফিরে এসে আমৃত্যু এ বাড়িতেই থেকেছেন বাকি প্রায় সাতটি বছর ৷ পোষা জীবজন্তু ছিল, গাছপালা ভালোবাসতেন ৷ দেশ স্বাধীন হয়নি তো তখনও, ফলে পরিচিত মানুষজনও ছিলেন আশেপাশে ৷ সর্বোপরি একটু আধটু কাব্যচর্চার অভ্যেস থাকবার দরুন, এই মনোহরা, নির্জন প্রাসাদটি ছিল সর্বাংশে তাঁরই উপযুক্ত ৷ রবীন্দ্রনাথ গৌরীপুর এস্টেটে থাকবার সময় উনত্রিশশো আটত্রিশ-চল্লিশ সালের মধ্যে দু’বার নাকি এসেছেন এ বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে ৷ কাব্যপাঠ হয়েছে, ম্যাডামের পিয়ানোর সাথে কবি যে গলা মিলিয়েছিলেন, সেকথা কোন বইয়ে যেন ছাপার অক্ষরে লেখাও আছে বাংলায় ৷ তবে দুঃখের বিষয় কোনও ছবি নেই ৷ থাকলে এ গৃহের মর্যাদা আরও বাড়ত অবশ্যই ৷
এ হল গিয়ে একতলার হল ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ল্যামিনেট করা ক্রিস্টোফার ভিলার হিস্ট্রি ৷ এবার জিওগ্রাফি বলতে গেলে বলা যায়, রিংকিংপং রোডের ধারে এ ভিলার দোতলায় শোবার ঘর মোট ছ’টি ৷ নীচে হল, ডাইনিং, লিভিং, অফিসঘর, তা বাদে সার্ভিসরুম, প্যানট্রি ৷ রসুইঘর সামান্য তফাতে, যেমনটা হত সেকালে ৷ তার ওপাশে সার্ভেন্টস কোয়ার্টার— মালি, চৌকিদার খানসামাদের বাসস্থান ৷ তাদের পোষা কুকুর-টুকুরও থাকে খানকতক, আর দুটো ধবধবে সাদা বেড়াল তো এখনও চোখের সামনে উলের বলের মতন গোল পাকিয়ে রোদ্দুর পোয়াচ্ছে জানলার তাকে ৷ চারিদিকে ঘন সবুজ লন, পরিমিত বাহারি ফুল, খানতিনেক কুঞ্জকানন বা গ্রোভ, যার ভেতর চায়ের আসরে বসবার ব্যবস্থা, আর কিছু শ্যাওলাধরা বনেদি গাছ—ব্যাস ৷ কী অভিজাত ছিমছাম সাজসজ্জা, কোথাও বাহুল্য নেই, অতিরঞ্জনও না ৷ পুঁটু বেঞ্চে বসে, বড়ো করে শ্বাস নিয়ে এই মোহময় দুপুরের রোদ, হাওয়া, ঝিরিঝিরি পাতার শব্দ সমেত সময়টাও বুকের ভেতর পুরে ফেলল... ৷
রবীন্দ্রনাথ কি এই বেঞ্চে বসেই কবিতা পড়েছিলেন, নাকি ওই কুঞ্জছায়ায়? কে জানে, কোনও ডকুমেন্ট তো নেই বলল ৷ তবে রাতে থাকেননি ৷ থাকলে হয়তো পূর্ণিমার রাতে নির্জনে, ভক্তদের চোখ এড়িয়ে এসে বসতেন এই আসনে, তখন স্বচ্ছ আকাশের ভেতর থেকে তারারা, পূর্ণশশী, উইলো গাছ আর থমথমে নিশ্চুপ প্রাসাদটাও অবশ্যই অপার বিস্ময়ে চেয়ে থাকত তাঁর দিকে... ৷
পুঁটু এবার প্রকৃতি দর্শন সাঙ্গ করে ঘরের দিকে পা বাড়াল ৷ দোতলার কোণের দিকে নিজস্ব ছাত সমেত তিনদিক খোলা চমৎকার ঘরটি, লাগোয়া বাথরুম ৷ একদিকে ছাত এবং সামনের পাহাড়ের সারি, আরেকদিকে বড়ো বড়ো গাছের শেষে রসুইঘরের আঙিনা আর অন্যদিকে নিঃসঙ্গ সাদা বেঞ্চটি সমেত লনের আংশিক দৃশ্য—বর্ষাকালে বৃষ্টি দেখো, শীতের দিনে পাতা ঝরা, বসন্তে ঝলমলে পর্বতমালা—এমনটা না হলে আর সাহেবি বাংলো... ৷
ঘরে সুন্দর হাল-ফ্যাশানের খাট আছে, ড্রেসিং আয়না, সোফাসেট, তার সাথে আবার খানকতক পুরোনো আসবাবও৷ যেমন ডিম্বাকৃতি একটা সেন্টার টেবিল, এক কোণে ক্যাবিনেট, আর সব চাইতে নয়নহরা, আবলুশ কাঠের মস্ত একটা রাইটিং টেবিল, সঙ্গে বুক র্যাক ৷ আহা, এমন পরিবেশে, এমন কৃষ্ণকায়া, মসৃণ টেবিল পেলে ফটকের ওই লেপচা চৌকিদারটিরও বোধকরি মহাকাব্য লেখবার সাধ জাগবে ৷
পুঁটু নীচে যাবার আগেই জটিং প্যাড, কলম, স্টেপলার, কাঁচি, গামস্টিক ইত্যদি তার লিখবার হাতিয়ার সব গুছিয়ে রেখেছে, সঙ্গে নানান আঁকি-বুঁকি, খসড়ার নমুনাও ৷ এখন বাজে প্রায় দুটো, হাতে ঘণ্টা তিনেক সময় আছে ৷ পাঁচটায় গাড়ি আসবে, ফিরতে ফিরতে ন’টা ৷ আসবার পর আসল কাজ শুরু হবে, এখন এ কেবল তার প্রস্তুতি পর্ব ৷ গিন্নিমা রাঁধতে আসবার আগে বারকোশে সব সরঞ্জাম যেমন গোছানো থাকে, তিনি কেবল সময় মতন এটা ওটা ছাড়েন আর নাড়াচাড়া করেন—এও তাই ৷ এখন সব বেছে ধুয়ে, বেঁটে ছেঁচে, কেটে কুটে রাখছে, রাতে কেবল ছ্যাঁক ছোঁক, খুন্তি নাড়া ৷ উপমাটা মনে করে বেশ নিশ্চিন্তে একটা হাই তুলল—এরকমভাবে এগুলে দিন তিনেকেই কাজটা নেমে যাবে নিঃসন্দেহে ৷ আড্ডাবাজি সেরে, একটু বেশি রাত পর্যন্তই না হয় লিখবে, আর কাল একটু বেশি সকাল থেকেই ৷
গতকাল সকালে কথাই হয়েছিল যে সকাল ন’টার আগে যেন কেউ না আসে, নেহাত খুব তাড়া থাকলে সাড়ে আট—ভোরে তো কদাচ নয়, পুঁটু কাজে বসবে ৷ বলা যায় না, বরোদা-দা হয়তো ভাবলেন, মর্নিংওয়াকটা এখেনেই সেরে রাখবেন ৷ তার সাথে দুই রুমমেটকেও যদি টেনে আনতে পারেন—তবে তো সোনায় সোহাগা, গ্যাঁট হয়ে বসে আড্ডা চলবে দুপুর পর্যন্ত ৷
বরদাপ্রসন্ন তখন মুখে অভয় দেননি বটে, তবে অবুঝ তো নন, পুঁটুরানির কাজের ব্যাঘাত কিছুতেই হতে দেবেন না, ফলে গাড়ি বলে রেখেছিলেন সাড়ে আটটায় ৷ এখন বাজে প্রায় সাড়ে নয়—উনি ঘড়ি দেখলেন... ৷ হাসি বলল—‘‘এখানে বসে ডেকে ডেকে গলা না ফাটিয়ে ফোন করো না একটা? অতিথিদের ডেকে এনে অপমান! বলো, আমরা বরযাত্রী নিয়ে ফেরত যাচ্ছি ৷ থাক তুই তোর ভূতের গল্প নিয়ে লগ্নভ্রষ্টা হয়ে ৷’’
—‘‘আরে, সে ফোন তো আমার পকেটে, রাতে ফেলে এল না? কাল নেহাত অমন করে বলে এল বলে..., আমি তো ভাবছিলাম, রাতেই না হোক, ভোর ভোর এসে চৌকিদারের হাতে না হয় রেখে যাব ৷ শেষে... এত দামি ফোন..., চেনা জানা নেই ৷’’ বরদাপ্রসন্ন আর কথা এগোলেন না, চিন্তাটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে লাভ তো নেই ৷ তবে একদম একা আছে, রাতের ওই গাড়িওলাই বা কোন পদের কে জানে! নেশা-টেশা করে সব..., পৌঁছে একটা খবর দেবারও তো উপায় নেই ৷ এখানে ল্যান্ড লাইনে ফোন একবার করলেন বটে—কেউ ধরল না ৷ অফিসঘর বন্ধ তখন! শেষে বললেন—‘‘কী-ই যে তোমাদের হাবিজাবি গল্প..., মাথামুন্ডুহীন... তাতেই সবাই আত্মহারা ৷’’
কুলু বলল—‘‘মাথামুন্ডুহীন গল্প ওরই ৷ আমরা কেবল তার রসদ জুগিয়েছি ৷ আর হাবিজাবি তো, তখন উঠে গেলেই পারতে? বেশ তো বসে রইলে মধ্যমণি হয়ে ৷’’
বরদাপ্রসন্ন আসলে একটু অহেতুক চিন্তায় একথা বললেন বটে, তবে গতকাল আসরটা জমেছিল বেশ ৷ বিকেলে হঠাৎ সামান্য বৃষ্টি হওয়ায় বাইরে ঠান্ডা লাগছিল, ফলে দোতলার কাচ ঢাকা বারান্দায় বসে ছিল সব জড়ো হয়ে ৷ পেঁয়াজি আর ডিমের পকোড়া, তার সঙ্গে দু’রাউন্ডে চা কফি, যারা অন্য পানীয়—তারা তাই ৷ প্রচণ্ড হাসাহাসি হচ্ছিল, আপসে ঝগড়া, আর তার উৎসগুলো সবই কম করে তিন-চার যুগের পুরোনো ৷ টুপুদের যদিও তখন জন্মের সম্ভাবনাও ছিল না, তবু মশকরা চলছিল পুরোদমে ৷ তারই মধ্যে চলে এল ভূত ৷ ভূত ঠিক না, বলা যায় ভূতুড়ে ৷ মানে হস্টেলে একা থাকা, আম্রকুঞ্জে দু’জনে বসা থেকে, কে কবে কী দেখেছে, কী শুনেছে—হতে হতে হাসি বলল—‘‘ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী হবে, টাটকা ভূত তো ধরতে যাচ্ছে পুঁটু, ভূতের সঙ্গে সহবাস ৷ কাল বলবি তুই, একদম কড়াই থেকে নামানো, হাতে গরম টাটকা ‘সইত্য’ ঘটনা ৷ এদের এই ছাতাপড়া এ-ক গল্প শুনে শুনে কান পচে গেল, ‘জবার খাটে মচ মচ আওয়াজ’ ‘পাশে যেন কে বসে খুক খুক কাশল’, একটু স্টক বাড়াও বুড়ুদি...’’
‘‘বাড়াবোটা কোথা থেকে, ওই কড়া আলোয় স্টক ক্লিয়ার, আম্রকুঞ্জের কমলা আলো দেখেছিস এখন? ওতে শ্যামা পোকাই আসে না, তো ভূ-ত ৷’’
‘‘কেন, কড়া আলোয় আসতে কী? ওদের চোখে ছানি নাকি, যে চোখ কড়কড় করবে?’’
—‘‘তা জানি না বাপু, তবে সবার তো আর স্টক বাড়াতে ঘর ভাড়া করে ভূত খুঁজতে যাবার উপায় নেই ৷’’ এই বলে মমো আড়চোখে পুঁটুকে একবার দেখে নিল ৷ আশিস পকোড়া খেতে খেতে আপ্লুত হয়ে বলল, ‘‘ভাইরে, পাবলিশারের গুঁতো খেলে টেরটি পেতি ৷ হিউ এন সাঙের মতন পিঠে বোঁচকা বেঁধে পথে পথে ঘুরে বেড়াতিস এই ব্যাঁকা পায়েই ৷’’ হাসি সেন বলল—‘‘সত্যি রে পুঁটু, সাংবাদিকদের শুনেছি ঘটনার সন্ধানে গাঁয়ে-গঞ্জে ঘুরে মরতে হয়, কিন্তু... ৷’’ বরদাপ্রসন্ন এবার তার কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বিরক্ত হয়ে বললেন—‘‘কী-ই যে কথা তোমাদের ৷ ওকি এখানে গল্প খুঁজতে এসেছে! গল্প থাকে মাথার ভেতর, না কীরে পুঁটিয়ারি?’’
পুঁটু চা খেতে খেতে হাসছিল এদের কথায় ৷ কুলু হঠাৎ বলল—‘‘সে, এখানে বসে বসে মাথার গল্প না হয় খাতায় লিখে ফেলল ৷ তবে, আমি বলে রাখলাম, এবার তোর স্টক কিন্তু বাড়বে, দেখিস! ওই জনমানবশূন্য, শ্যাওলা-ধরা সাহেব বাড়ি, ঘরে ঘরে সাবেক আসবাব, তায় মেমসাহাব তো বললি স্বয়ং গুরুদেবের সঙ্গে বসে সাহিত্য চর্চা করত..., সে কি মেনে নিতে পারবে, তারই ঘরে বসে, তারই টেবিলে, এক ফচকে কালা নেটিভ মেয়ের এই ঔদ্ধত্য? রেগে মেগে যদি না বলে দেখিস—‘আজি হোটে শোটো বারশো পোরে, কে টুমি লিখিছো বসি, আমারো টেবিলো প’রে, টোমারো গলোপো খানি, কাউটোহল বশে...?’ ওর কথার ধরনে সবাই লুটিয়ে-পুটিয়ে হাসছিল ৷ হাসতে হাসতেই হাসি সেন বলল—‘‘হ্যাঁ রে পুঁটিরাম, ও হোটেলে লোকজন আছে তো রে? কাদের যেন একবার খাবার ঘরে দেখেছিলিস বললি, তারা আবার ম্যানেজারের বউ বাচ্চারা নয়তো? দিনমানে খেয়ে দেয়ে গুটি গুটি ফিরে গেল, সূর্যাস্তের পর এদিক পানে আর তাকায়ও না?’’
—‘‘অত লোকজনের দরকার নেই, ওই কেষ্টাগিন্নি একাই একশো ৷ এ নাকি তার প্রিয় শহর, সাধের বাড়ি, নিজের হাতে লাগানো পছন্দের গাছপালা, বাগান, পোষা প্রিয় পশুপাখিদের কবর ৷ তাছাড়া..., তাছাড়া স্বামী কলকাতায় দেহ রেখেছিলেন বটে কিন্তু ইনি তো ফিরে এসেছিলেন ৷ বিলাসবহুল বিশাল ওই এক নম্বর মাস্টার বেডরুম ছেড়ে হয়তো, নিরিবিলিতে ছাতসমেত কোনার একটেরে, তোর তিন নম্বর ঘরটাকেই বেছে নিয়েছিলেন তার ভবোচ্ছাসকে ব্যক্ত করবার প্রয়াসে? শোন, এমনিতেই এদের শখ সৌখিনতা বেশি, ‘শখের জিনিস, যখের ধন’ ৷ তায় কেরেস্তানদের শ্রাদ্ধ-শান্তির বালাই নেই, ফলে বুঝতে পারছিস? ঘুরে বেড়ায়, ঘুরে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়—কোন বাতাসে...?’’ কুলু হাত দুলিয়ে নাচের ভঙ্গি করে বোঝাল হাওয়ায় ভেসে যাওয়া... ‘‘সর্বোপরি আবলুস কাঠের অতি ব্যক্তিগত, নিজস্ব টেবিল—মণিহারার নেকলেসের মতন থাবা যখন মারবে না...? পুঁ-উ-টু, তুই আজ আর যাসনি বাপু, এখেনেই থেকে যা— আ-আ... ৷’’
এ কথা থেকে সে কথা, হাসাহাসি, মমো বলল আশিসকে পাহারায় নিয়ে যেতে ৷ হাতে ছড়ি নিয়ে দরজার বাইরে চুপটি করে বসে থাকবে, আর ম্যাডামের ছায়া দেখলেই ‘‘হ্যাট’’ ‘‘হ্যাট’’ করে তাড়াবে ৷ অবশ্য ছায়া পড়লে, তবে না! সত্যি, পারেও বটে এরা ৷ অতঃপর টোস্ট আর স্যুপ খেয়ে নটা নাগাদ পুঁটু রওনা দিল, বাকিরা পুরো ডিনার করবে ৷ ওদের তো তাড়া নেই ৷ ম্যানেজার নাকি বলেছে গাড়ির জন্য চিন্তা নেই ৷ তবে বেরোবার মুখে আবারো কুলু বলল—‘‘প্যাঁটরা, এখনও ভেবে দেখ, আমাকে আর হাসি সেনকে হাফ দামে ভাড়া করে নিবি কিনা? এমন নাক ডেকে ঘুমোব দু’জনে, যে তোর মাদাম মার্গারিটাও ভয়ে পালাবে—ভাববে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা ৷’’
এদিক সেদিক ছড়ানো বেতের চেয়ারে বসেছিল ক’জনে ৷ আশিস বিষ্ণুকে খানিক তফাতে নিয়ে, ক্যামেরার কারসাজি বোঝাচ্ছে, বরদাপ্রসন্ন সেল ফোনটা বের করে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই, বড়ো ট্রেতে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে খানসামাই বোধহয়, ‘গুডমর্নিং’ বলে হাসিমুখে এগিয়ে এল ৷ সঙ্গে তার সহকারীও ৷ এবং এসে দু’জনে ঝটপট করে খানদুয়েক টেবিল একত্র করে, চেয়ার সাজিয়ে দিয়ে বলল যে, গত রাতেই মেমসাব ন’টার সময় বাগানে তিন পট চা দিতে বলে রেখেছিলেন, আর সাড়ে ন’টায় নাস্তা ৷ মমো মাত্র বলতে যাচ্ছিল ‘‘কিন্তু তোমার মেমসাব কোথায় হ্যায়, তার আগেই হাসি সেন বলল—‘‘এই যে মহারানি...’’
কথা-বার্তা, টেবিল চেয়ার এদিক সেদিকের মাঝে নিঃশব্দে পুঁটু যে কখন এসে গিয়েছে, খেয়ালই করেনি কেউ ৷ রোদের দিকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল হেসে—‘‘বসিয়ে রাখলাম তো, ভেরি ভেরি স্যরি ৷’’
মমো বলল—‘‘ফস করে তিনটে ইংরিজি শব্দ বললেই ভাবিস না মাপ করে দেব, করছিলিসটা কী এতক্ষণ?’’
পুঁটু সে প্রশ্নে এবারও একই ভাবে হাসল ৷ বুড়ুদি বলল—‘‘তোর শরীর খারাপ নাকি রে? কেমন উড়ু উড়ু দেখাচ্ছে?’’
বরদাপ্রসন্ন, ওর কাছাকাছিই দাঁড়িয়েছিলেন, হাত বাড়িয়ে সেল ফোনটা দেখাতেই পুঁটু বলল—‘‘রাখো ওই টেবিলে... চা ঠান্ডা হচ্ছে, নে তোরা?’’
শুনে হাসি সেন একটু অস্বস্তি নিয়ে টি-পটের দিকে হাত বাড়াল, আর রাম ফাজিল কুলু পর্যন্ত তার স্বভাব-সিদ্ধ ফিচকেমি ছেড়ে ভুঁরু কুঁচকে বলল—‘‘কীরে, বুড়ুদি কী বলল, শুনলি না? ...তুই ঠিক আছিস?’’
আশিস চায়ের জন্য এগিয়েই আসছিল, অতঃপর চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে নিশ্চিন্ত গলায় বলল—‘‘ভূতের ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আছে, এত তড়পেছে তো এখন মুখ ফুটে বলতে পারছে না কিছু ৷ আমার চায়ে দুধ দিও না... ৷’’
ফ্যাকাশে... নয়..., তবে... এমন ভাবে ওকে দেখা যায় না কখনও ৷ আসলে অনেক সকালে ওঠে, আর রোদ্দুর ওঠার সঙ্গে স্নান-টান সেরে ফিটফাট তো! এমন ঘরের সাজে রাতে যদি বা দেখা যায়, তবে প্রকাশ্য দিবালোকে, তায় লনের এই লোকারণ্যে তো কদাচ নয় ৷ অবশ্য অগোছালো বা এলোমেলো কোনওমতেই নয় ৷ চুলটুল পরিপাটি করে বাঁধা, হাত-মুখ পরিচ্ছন্ন, ক্রিম ঘষা চকচকে ৷ নাইটি নয়, সাদার ওপর নীলের সুন্দর কারুকার্য করা বাহারে একটা কাফতানই পরনে, তার উপর ধূসর-রঙা শাল ৷ সাধারণ অর্থে কিছুই বলবার নেই, বেশ স্বাভাবিকই—তবে পুঁটুর ক্ষেত্রে নয় ৷ শরীরটা বিগড়েছে নিশ্চয়ই, তা নয়তো এত বেলায় রোদ পোহায়? তেমন কেন, ঠান্ডাই নেই মোটে!
মমো চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দিল—ভালো... ৷ ‘‘ফোনটা ফেলে এলি, সকাল থেকে পাত্তাও নেই ৷’’ পবন বলল—‘‘হল তোর, কাজ এগোল? কাল যা সব বলছিল না...’’ ওর কথা শেষ হবার আগেই, পুঁটু হেসে বলল—‘‘ক-ত প্রশ্ন, দাঁড়া বলছি একে একে, কিন্তু কুলু? তার আগে বল, তুই কী করে রে ওরকম প্রেডিক্ট করতে পারিস? তোর এ ক্ষমতাটা তো জানা ছিল না, একেবারে ধন্বন্তরি গনৎকারের মতন?’’
কুলু একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসল, কারণ প্রেডিকশন-মেডিকশনের কথা না, তবে গতকাল রাতে, এই ক্রিস্টোফার ভিলা নিয়ে একটু বেশি রকমই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে ৷ আসলে একটা আনক্যানি গল্প লেখাকে বুড়ুদি, মমোরা এমন আনাড়ির মতন ‘ভূত ধরা, ভূত ধরা’ করে যাচ্ছিল, যে বিরক্ত লাগছিল ৷ তার উপর গ্রnপের মধ্যে ইয়ার্কি ফাজলামিতে, সত্যি মাত্রাজ্ঞান থাকে না ৷ পুঁটু যাবার পর আরও কত যে এই পর্ব চলেছে, সে তো তাও শোনেনি ও ৷ পোষা জীবজন্তু সমেত অনাড়ম্বর মেমের কবরের জমি নাকি ক্যান্টনমেন্ট দখল করে, তাতে আবার না জেনে সেখানে ছেঁটে-কেটে কী যেন বানিয়েছে, ফলে অতৃপ্ত হ্যানো-ত্যানো... ৷ কিছুটা আড্ডার মুডে, বাকিটা গল্প বানানোর ঝোঁকে এমন ভাবে বলছিল কুলু, যেন মুখে মুখে সত্য ঘটনার বিবরণ শোনাচ্ছে ৷ তা শুনে সবাই আবার একমত হয়ে সায় দিল যে, পুঁটু যেন লেখা-লেখা করে মোটে আর টেনশন না করে ৷ সে-ই তো দিব্যি লিখে জমা করে দিতে পারে জায়গা মতন! পাঠভবনের সাহিত্য সভায় কল্যাণীই তো ছিল কর্ণধার, অনুশীলা তরফদার তখন গান গাইত কোরাসে ৷
সে সময় হাইপার হয়েছিল বলে বোঝেনি, তবে এখন একটু অস্বস্তিতেই বলল—‘‘তাই বুঝি? তা, সে তো আমারও জানা নেই ৷ কেন..., কী ... হয়েছিল...?’’
পুঁটু হেসে বলল, ‘‘শুনবে সবাই মন দিয়ে, বলব? সবাই চা নিয়েছ তো? আধঘণ্টা-টাক পরে ব্রেকফ্রাস্ট দিতে বলে রেখেছি এখেনেই ৷ ততক্ষণ শোনো তবে...’’ এই বলে, সামান্য থেমে, ক্লিষ্ট হেসে শুরু করল তার অজানা তথ্য ৷
‘‘কাল ফিরলাম তো ভালো মতোই, কোনও অসুবিধে হয়নি ৷ না গাড়িতে, না বাড়িতে ৷ চৌকিদার ছিল, বেয়ারাও—গল্প করছিল নীচে ৷ আলো-টালো জ্বালা ৷ আমি গাড়ির পয়সা মিটিয়ে ওপরে আসতেই খেয়াল করলাম, ফোনটা ফেলে এসেছি ৷ যাইহোক বিছানা-টিছানা পেতে রেখেছে, নতুন জলের বোতলও রাখা—আধঘণ্টার মধ্যেই জামা কাপড় বদল করে, হাতমুখ ধুয়ে বসে গেলাম টেবিলে ৷ সব জিনিসেরই শুরুতে একটু সময় তো লাগে ৷ কাগজ-পত্তর খসড়া নিয়ে নাড়া-চাড়া করছি, করছি—করছি—শেষে শুরু করে ফেললাম ৷ কতক্ষণ বলতে পারব না, তবু দু-পাতার বেশিই ৷ ঝরঝর করে এগুচ্ছিল—মনে হল অনেকক্ষণ ধরে ওটা কীসের আওয়াজ? একঘেয়ে, একটানা, কপিকলে জল টল তুললে যেমন হয়, সে ধরনের যান্ত্রিক একটা শব্দ ৷ লেখার ঘোরের মধ্যে ছিলাম, মাথাটা পরিষ্কার হতেই খেয়াল হল এ হচ্ছে এই হোটেলের অসুস্থ কুকুরটা ৷ বেচারা, সারা গায়ে ঘা, লোম পড়ে গিয়েছে, তাছাড়া অন্য কষ্টও আছে ৷ অদ্ভুত স্বরে কোঁকায় সারাদিন, দুপুরে দুটো বিস্কুট দিয়েছিলাম, খেলওনা ৷ চোখে দেখে না, খুব বুড়ো, নাম কাঞ্চা... ৷ আহারে, উঠে একবার প্যানট্রির দিকের জানলায় গেলাম—ঠিকই ৷ লোম টোম ঝরে গিয়ে এখন মাঝারি বেড়ালের আয়তন ৷ বাঁধানো চত্বরে গোল গোল ঘুরপাক খেয়ে কঁকিয়ে যাচ্ছে অনবরত ৷ ইশ, এমন বাঁচার কী প্রয়োজন? টেবিলে ফিরে এসে আবার শুরু করলাম ৷
লিখছি, পেন চিবুচ্ছি, আবার লিখছি, বেশ ফুর্তি... ৷ ফে-র আ-ওয়াজ, তবে এবার কিন্তু কাঞ্চার সেই কাতর ডাক নয়—সম্পূর্ণ অন্যরকম ৷ খুব স্পষ্ট না, তবে কুকুরই—কাঁদছে নাকি? মহা মুশকিল তো! হঠাৎ আমার বন্ধ দরজার উপর ভারী কী যেন একটা আছড়ে পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ ‘ম্যাঁ-ও’, ‘ফ্যা-শ-শ’... ৷ এমন চমকে উঠেছিলাম যে, কলমটাই ছিটকে গেল হাত থেকে ৷ দুপুরের সেই সাদা উলের বল দুটো নিশ্চয়ই এখন নিজমূর্তি ধারণ করেছে৷ ওই ধাক্কায়, কী যেন একটা আবার গড়িয়েও পড়ল কাঠের সিঁড়িতে ঠং ঠং শব্দ করে, শেষে কার্পেটে ঠেকে, আটকে গেল বোধহয় ৷ তৎক্ষণাৎ সশব্দে কেউ আবার ঘরের ছিটকিনি খুলে বিরক্তিতে কটূক্তিও করল, ভাবলাম যাক বাঁচা গেল ৷ আমার মনের তিক্ত ভাবটা যদি অন্য কেউ নিজমুখে প্রকাশ করে দিতে পারে তবে বড়ো নিশ্চিন্ত, আরাম করে ফের টেবিলে ঝুঁকে বসলাম ৷
সামান্য ক্ষণের বিরাম, আবার শুরু হল সেই কুকুরের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না, তার সঙ্গে যোগ হল চাপা ধমকানিও ৷ এবং এটা কিন্তু বাইরে নয়! এই বাড়ির ভেতরেই—হয় নীচের হলে, বা সিঁড়ির মুখে অথবা পোর্টিকোতে ৷ বাহ, এ তো মন্দ নয়! এমনটাই চলবে নাকি সারারাত? জীবজন্তু আমি তো কিছু কম ভালোবাসি না, কিন্তু তা বলে গাঁটের পয়সা খরচা করে নিরিবিলিতে কাজ সারব ভেবে, উলটে একী উপদ্রব? এরা হোটেল চালাচ্ছে, নাকি অ্যানিমেল শেল্টার? এই কারণেই লোক আসে না নিশ্চয়ই—হাত-পা একটু টান টান করে উঠে দাঁড়ালাম ৷ বেশিক্ষণ টানা বসলে এমনিতেও কোমর ধরে যায়, তা বাদে মনটাও বিচলিত হয়ে গিয়েছিল তো...! ঘড়ি দেখলাম, এগারোটাও বাজেনি ৷ গড়্গড়িয়ে লেখা চলছিল বেশ, অথচ ঘুমও আসছিল না—এতো অতি আকাঙ্ক্ষণীয় বিরল ঘটনা! বম্বেতে সারাটা দিনের হাজার ঝঞ্ঝাটের পর মাথা ঠান্ডা করে টেবিলে বসলেই, হয় ঢুলে ঢুলে পড়ে যাই, নয়তো ঘড়ি দেখে আঁতকে উঠি ৷ ঘরের মধ্যেই একটু পায়চারি করে, ফের ওই জানলার ধারেই গেলাম ৷ নাঃ, কাঞ্চা নেই, কেউ-ই নেই ৷ বাঁধানো চত্বর ফকফকে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে ৷ একদিকে প্যানট্রির চাল, একটু গাছের ডাল, পাহাড়ের ঢাল—গগন ঠাকুরের ছবির মতন দেখাচ্ছে, বড়ো সুন্দর ৷ হঠাৎই কী যে খেয়াল হল, আরও সুন্দর দৃশ্যের আশায় তৃতীয় জানালাটার কাছে গেলাম—যেখান থেকে সাদা বেঞ্চটা দেখা যায় ৷ আহা, এই জ্যোৎস্না রাতের বিজন বাগানে, একাকী প্রাচীন উইলো গাছের নীচে নিঃসঙ্গ বেঞ্চটা..., কিন্তু না, নিঃসঙ্গ নয়... কেউ যেন বসে আছে... সঙ্গে আবার বিরাট আয়তনের দুটি কুকুর, তার মধ্যে একটি ক্রমাগত কেঁদে যাচ্ছে, অন্যটি ছটফট করছে এদিক-ওদিক... ৷ যিনি বসা তাকে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, গায়ে আমার মতনই কাফতান গোছের কিছু পরা—গাঢ় রঙের ৷ ভাবলাম, আরেক প্রকৃতিপ্রেমী জুটেছে তাহলে, তার সঙ্গে পশুপ্রেমীও ৷ ধমক- ধামক দিয়ে শেষে সান্ত্বনা দিতে বেরিয়ে এসেছেন বাইরে ৷ সিঁড়ির মুখের মাস্টার রুমটায় আছেন নাকি? তাই হবে ৷ এসব ভাবতে ভাবতেই আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছি যখন, মনে হল আলো ছায়ায় অবয়বটি উঠে দাঁড়াল ৷ সামান্য কুঁজো হয়ে কুকুর দুটোকে কী যেন বলে, ধীরে ধীরে হেঁটে চলল কুঞ্জ ছায়ার দিকে ৷ বয়স্কা মহিলা, পায়ে অসুবিধে আছে, অথবা কোমরে, চলছে—থামছে ৷ মনে মনে বললাম ক্ষ্যাপা না কী! এই বয়সে, এমন শরীরে, এত রাতে বাগানে কেউ ঘোরে, ঠান্ডায়! অবশ্য আমাকেও তো কত লোকে ভাবে, ক্ষ্যাপা ৷ লিখতে বসবার আগে আমিও যখন ছাতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব চরাচরের শোভা দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে, বেচারি চৌকিদারটি তো চেয়েই ছিল অবাক হয়ে ৷ নেহাত শীত করছিল, তাই ঘরে ফিরতে বাধ্য হলাম..., কিন্তু এখন তো ঘরেও বেশ ঠান্ডা! লেখার ঝোঁকে মনের আনন্দে এতক্ষণ টেরই পাইনি মোটে... শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে চেয়ারটা টেনে নিলাম ৷ খেয়াল করিনি, ঠান্ডার জায়গা, এদের থার্মোফ্লাস্ক তো থাকবেই, চায়ের কথা বলে রাখলে পারতাম ৷ আলোটাও বড্ড কম লাগছিল—ভোল্টেজ ড্রপ করে নাকি রাতে? ঘরের তিন দিকে তিনটে বাহারে আলো থাকবার দরুন টিউব লাইটটা জ্বালাবার তখন প্রয়োজনই পড়েনি, সে তো এখন আর জ্বলবেও না—মুশকিল ৷
চেয়ারের ওপর পা তুলে, মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে ফের মন দিলাম কাজে ৷ আর সে মন একবার বসে গেলে অল্পবিস্তর আলো-আঁধারি বা শীত-গ্রীষ্ম এমনকি খিদে-তেষ্টাও খেয়াল থাকে না ৷ আমার সব চাইতে র্ফুতি হচ্ছিল লেখার গতিটা দেখে ৷ এই যে এতদিনের ফ্রাস্ট্রেশন, অ্যাংজাইটি—সব যেন এই সামান্য সময়েই উধাও হয়ে গেল ৷ ঝরঝরে ভাষায় তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে নির্ভুল ভাবে, কোথাও কাটাকুটি পর্যন্ত নেই, স্টার চিহ্ন, ব্রাকেট, তির—কিছুই না ৷ তোমরাও তো দেখবে আজ, সত্যি ৷ এমনটা কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপার, অন্তত, আমি তো মানি... ৷ কী অনায়াস, কী সাবলীল! ভাবছিলাম একেই কি বলে স্থান মাহাত্ম্য ৷ আমি খসড়ার দিকে তাকাচ্ছিলাম না, পয়েন্ট দেখছিলাম না, প্রথম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত এমনি স্বাভাবিক ভাবেই চলে যাবে ৷ ভাবলাম কাল দেখব দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের সময় ৷ আমি চেয়ারে দোল খাচ্ছিলাম, গান গাইছিলাম, বড়ো আনন্দ হচ্ছিল আমার ৷ আলোগুলো বার কতক দপদপ করে নিভে গেল, যাঃ ৷ আমি চোখ বন্ধ করে অন্ধকারটা সইয়ে নিচ্ছিলাম, তবু চেয়ার ছেড়ে নড়লাম না ৷ বাইরে জ্যোৎস্না রাত, কাচের জানালা, একটু আলো তো আসবেই ৷ এই টেবিলেই বড়ো একটা মোমবাতি আছে, দেশলাইও, সবুজ কাচের বাহারি একটা মোমদানও দেখে রেখেছি—‘আমারে কেউ দাবায়ে রাখতে পারব না’ বলে, চোখ খুললাম ৷ ঠিকই, ঘরে ফিকে আলো, সামনেই আছে মোমবাতি—জ্বালালাম ৷ উঠে মোমদানটাও নিয়ে তাতে বসালাম বেশ শক্ত- পোক্ত করে, কারণ কাগজ-পত্তর ছড়ানো তো টেবিলে...! ঠক ঠক..., ঠক... ঠক..., হিল তোলা জুতো নয়, সিঁড়ি দিয়ে কেউ উঠছে লাঠি নিয়ে, ধীরে... ধীরে... ৷ তার সঙ্গে বুড়ো কুকুরের পায়ের নখের ছপ-ছপ-ছপ-ছপ... ৷ এই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমার কী যে হল, মারাত্মক শীত করতে লাগল ৷ কী-ই ভয়ানক যে শীত, সে বলতে পারব না ৷ ঠান্ডায় যেন জমে যাচ্ছিলাম, হাড়-গোড় ব্যথা করছিল ৷ মনে হচ্ছিল, দরজার দিকে চেয়ে, এই চেয়ারে বসে বসেই আমি জমে শক্ত হয়ে হয়ে যাব, যাচ্ছিলামও তাই ৷ আমার আর আনন্দ হচ্ছিল না, বিরক্তি উবে গিয়েছিল, এমনকি এতটুকুও ভয়ও পাইনি—অর্থাৎ কোনও বোধই ছিল না তখন ৷ কিন্তু তারই মধ্যে একটা গন্ধ পেলাম—ফুলের নয়, তবে কিছুটা ফুলেল বলা যায় ৷ কোনও তীব্র বিদেশি পারফিউমের, তার সঙ্গে বৃদ্ধ অসুস্থ কুকুরের শরীরের বোঁটকা গন্ধ বা আরও কিছু একসঙ্গে ৷
আমি বন্ধ দরজাটার দিকে অপলকে চেয়েছিলাম, যেন ওই ঠক ঠক, ছপ ছপ শব্দটা আরও কাছে এলে আমাকে দৌড়ে গিয়ে ছিটকিনিটা খুলে দিতে হবেই ৷ ... কাছে এল, খুবই কাছে, কিন্তু আমাকে আর খুলতে হল না ৷ নজর করলাম কখন থেকে যেন তা সামান্য ফাঁক হয়েই রয়েছে আর সেটাকেই লাঠি দিয়ে ঠেলে হাট খোলা করতেই দেখি, খোলা দরজার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সামান্য আগে দেখা বেঞ্চে বসা সেই বৃদ্ধা... ৷
খুব মারাত্মক বয়স না, এ-ই সত্তর-বাহাত্তর হবে ৷ শিরদাঁড়া বা পায়ের অসুবিধের জন্য বোধহয়, একটু কুঁজো হয়ে সামান্য হেলে দাঁড়ানো ৷ তা বাদে যথেষ্ট শক্ত চেহারা ৷ হালকা-রঙা ঘন খোলা চুল পিঠ ছাপিয়ে নেমেছে, চওড়া কবজি, প্রশস্ত ললাট, লেসের ঝালর দেয়া গাঢ়-রঙা ড্রেসিং গাউন পরনে, কোমরের কাছ থেকে না বাঁধা স্যাশে ঝুলছে এলোমেলো ভাবে ৷ পাশে প্রায় ভালুকের আয়তনের বিশাল লোমশ এক কুকুর, অন্যটিকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু শব্দ আসছে ছপ ছপ—ঘুড়ে বেড়াচ্ছে মেমসাহেবের পেছনে কাঠের মেঝের ওপর ৷
সত্যি বলছি, জানো, সারা জীবনে কত মেমসাহেব দেখেছি, কত বৃদ্ধা, কিন্তু এমন বিভীষিকাময় অভিব্যক্তি, এমন রোমহর্ষক চাউনি দেখার দুর্ভাগ্য এই প্রথম ৷ কুলু, জানিনা গতকাল তুই কোন অলৌকিক উপায়ে আবহাওয়া দফতরের মতন একেবারে ঠিক ঠিক প্রেডিক্ট করে রেখেছিলিস ৷ সব কিছু মিলে গিয়েছিল, একদম স-ব... ৷ তবে একটা জিনিস তুই-ও জানতিস না, বা কল্পনাও করতে পারিসনি—সেটা হচ্ছে যে ক্রিস্টোফারের মৃত্যুর পর মার্গারিটা যে আরও সাত বছর বেঁচেছিলেন, সেই বাকি জীবনটা কিন্তু তাঁর খুব সুস্থ স্বাভাবিক ছিল না ৷ ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছিলেন তিনি—শেষে সম্পূর্ণ উন্মাদ ৷
সব থেকেও কী যে হয় মানুষের, আমিত্বর সঙ্গে একাকিত্বের যোগফলে, নাকি আরও অন্যকিছু... কে জানে! নয়তো কারুর অমন ভয়ংকর চেহারা হয়! অত ভয়ানক ঈর্ষা, এমনতর পাশবিক শক্তি...! অথচ বোঝাই যায়, এক সময় মোটামুটি সুরূপাই ছিলেন বোধহয়, এবং ধনী গৃহের বেনে-বৌ হওয়া সত্বেও যথেষ্ট সূক্ষ রুচি সম্পন্নাও বটে ৷ তার উপর যদি স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের বাহবা পেয়ে নিজস্ব কবি প্রতিভার ওপরও একটু বেশি মাত্রায় আস্থা তৈরি হয়, তাকে দোষ তো দেয়া যায় না! এ সবই গুণ ৷ কেবল দোষ বোধকরি আমারই কপালের ৷
পবন, খানিক আগে, ওই যে তুমি তোমার কপালের দোষ দিচ্ছিলে না, আর আমার লাক, মানে কপাল গুণ! সে কপাল থেঁতলে মেতলে কী দশা হল দেখো... ৷ কবের থেকে ভাবছি এবার সময় মতন কাজটা জমা দিতে না পারলে পাবলিশারকে আর এ মুখ দেখাতে পারব না, এমন কি তোদেরও না ৷ যা হম্বি-তম্বি করেছি, এই করব, সেই করব... ৷ বুক লঞ্চিং কোথায় হবে, কেমন, কখন স-ব ভাবা... ৷ তা, সে মুখ আমার আর দেখাবার জো রইল না ৷’’
এ কথার শেষে পবন হঠাৎ কী ভেবে, কী বুঝে অথবা কিছুই না বুঝে হা—হা করে হেসে উঠল—‘‘দারুণ, দারুণ ৷ তুই রাইটার জানতাম, কিন্তু মুখে মুখে এমন গল্প...! কালকে কুলুরটাও বুঝলি, দারু-ণ এনজয় করেছিলাম ৷ সে তাও রাতের বেলায়, বৃষ্টি বাদলার পর ৷ কিন্তু এমন প্রকাশ্য দিবালোকে, তুই তো ফাটিয়ে দিলি রে? আমার প্লেটের রায়তা-মায়তা সব শুকিয়ে খটখটে... ৷ যাকে বলে মন্ত্রবৎ, না প্রস্তরবৎ, না কীরে আশিস?’’ আশিস হাতের প্লেট টেবিলে রেখে মাথা দোলাল—ঠিক ৷ ‘‘ওই ঠক ঠক, ছপ ছপ..., ওই সময় তো আমারই গা হাত পা শির শির করছিল..., কনগ্রাচুলেশনস ৷’’
বুড়ুদি বিজ্ঞের মতন কুলুর দিকে চেয়ে বলল—‘‘তুই তো এটাও প্রেডিক্ট করেছিলি যে, এখানে ও, এই পরিবেশে আরও অনেক রসদ পাবে, সেটাও তো মিলল! এটাই লিখে ফেল, দা-রু-ণ হয়েছে রে ৷ অসাধারণ, বা-বা, উফ ৷’’
পুঁটুর এই গল্প পর্ব শুরু হবার মাঝেই, সময় মতন খানসামা এসে আলুর পরোটা রায়তা ইত্যাদি টেবিলে রেখে যাওয়াতে হাসি আর মমো জনে জনে তা পরিবেশন করে, খেয়ে প্রায় শেষ করে এনেছিল ৷ পুঁটুকে দেওয়াই হয়নি, কারণ ও তো তখন বলছিল গল্পটা, তাতে ব্যাঘাত হবে ৷ এখন শেষ হতে, মমো প্লেটে তুলে দিয়ে বলল—‘‘নে এবার, তোরটা তো কনকনে ঠান্ডা..., আমারটাও তাই ৷ মুখে তুলতেই পারিনি, দ্যাখ? পুঁটু তোর ওই ‘ঠক ঠক’ শুনে আমারও তো হাড়ে হাড়ে ঠক ঠকানি ৷ অত বুকার, মুকারের জন্য বসে থেকে লাভ নেই ৷ তার আগেই আমি তোকে ‘মমতারানি স্মৃতি পুরস্কার’ দিয়ে ভূষিত করলাম ৷ কী বলিস কুলু?’’ বলে প্লেটটা কুলুর দিকে বাড়িয়ে দিল, ওর ওঠা-বসায় সময় লাগে তো, হাঁটুতে জোর কম—কুলু প্লেটটা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল রোদ্দুরের দিকে, যেখানে পুঁটু বসেছিল বেতের চেয়ারে সামান্য তফাতে ৷ হঠাৎ অস্বাভাবিক, ভয়ানক একটা চিৎকার এল কোণের দিক থেকে ৷ চিৎকারই, কিন্তু এত বিকট জোরে, এমন গলা ফাটিয়ে, আর এতই বীভৎস সেই চিৎকার, যে সবাই আঁতকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ৷ আর সেই নাম না জানা ধূসর-রঙা বড়ো বড়ো পাখিগুলো আবারও ঝটপটিয়ে উড়তে লাগল ঘুরে ঘুরে ৷ কাছাকাছি বাগানের এই দিক থেকে নয়, চিৎকারটা পুবের ওই দিকে হবে ৷ কুলু কী করবে বুঝতে না পেরে প্লেটটা হাতে ধরেই ওদিকে ছুটতে যাচ্ছি ৷ পুঁটু নিশ্চিন্তে বসে বসেই হাসি মুখে হাত নেড়ে থামতে বলল কুলুকে—‘‘সুরেশ... ৷ সুরেশের গলা ৷ আমার ঘরটা পরিষ্কার করতে ঢুকেছে তো...! এ সময় বিছানা-টিছানা তোলে নিশ্চয়ই... ৷’’
ওর নির্বিকার মুখের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল, ব্যাপারটা কী? ঠিক তখনই সামান্য আগে যে খানসামাটি খাবার দিয়েছিল, তাকে দেখা গেল ৷ দোতলার একটা জানলা খুলে ভয়ার্ত মুখে হাত নেড়ে ডাকছে তাদের ৷ চৌকিদার ছুটল দুদ্দাড় করে, আরও কে কে যেন, মালি-টালি হবে ৷ তার সঙ্গে যে যেমন ভাবে পারল গোটা এই দলটাও ৷
সিঁড়ির শেষ মাথায় হাট খোলা বিশাল দরজাওয়ালা বড়ো-সড়ো তিন নম্বর ঘরটা পুবের আলো পেয়ে ঝলমল করছে ৷ নিপাট বিছানা, সাইড টেবিলে জলের বোতল, গেলাস, সেলাইয়ের সরঞ্জাম কিছু, গল্পের বই একটা—সব পরিপাটি করে গোছানো ৷ সোফার ধারে গরম মোজা-জোড়া ভাঁজ করা ৷ কেবল ম্যাডাম মার্গারিটার সাধের সেই কালো আবলুশকাঠের মস্ত রাইটিং টেবিলে মুখ গুঁজে, পা গুটিয়ে পড়ে আছে পুঁটু, ওরফে অনুশীলা... ৷
কুলু ওই অবস্থাতেও অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে সিঁড়ি ভেঙে আবার দৌড়ল বাগানে দিকে, সঙ্গে পবন আর বরদাপ্রসন্নও ৷ বাগানের মধ্যভাগেও তখন রোদ ছড়িয়ে পড়েছে অনেকটাই, তারই মধ্যে দুটো টেবিল ঘিরে খান বারো-চোদ্দ বেতের চেয়ার, অনেকগুলো হ্যান্ড-ব্যাগ, দু’ এক পাটি চটি জুতো, ক্যামেরা, জলের বোতল ৷
ইতিমধ্যেই খানকতক ছোটো পাখি নির্ভয়ে প্লেটের ওপর বসে ঠুকরে ঠুকরে পরোটা খাচ্ছে মনের সুখে ৷ খানিক দূরে রোদ্দুরের দিকে সরানো একটেরে ফাঁকা চেয়ারটাতেও দুটি পাখি তৎক্ষণাৎ এসে বসে, তাক করছে প্লেটের দিকে ৷ সেদিকে চেয়ে গলা ফাটিয়ে অস্বাভাবিক, ভয়ানক চিৎকারে কুলু ডুকরে উঠল—‘‘পুঁ-উ-টু-উ...’’
রচনাকাল ২০১৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন