প্রচেত গুপ্ত

'থাম। একবারে নড়বে না।'
এক হাতে ছাতার বাঁট ধরে, অন্য হাতের তর্জনী তুলে হরিপালবাবু হুংকার দিলেন।
হরিপালবাবুর পুরো নাম হরিপাল শর্মা। বয়স বিয়াল্লিশ। তালডিঙি হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই। জ্যামিতিতে বিশেষজ্ঞ। ছ'মাস এগোরো দিন হল কলকাতা থেকে বদলি হয়ে এখানে এসেছেন।
তালডিঙি জায়গাটা চমৎকার। আধা গ্রাম, আধা শহর। পাকা রাস্তা, ইলেকট্রিক আলো, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল যেমন রয়েছে তেমন গাছপালা, দিঘি, ফুটবল মাঠও রয়েছে। তবে গরম খুব। এই বৈশাখ মাসে প্রাণ একেবার ওষ্টাগত হবার জোগাড়। গত পনেরোদিন অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে। সবাই ঝড়-বৃষ্টি চাইছে। চাইলে কী হবে আকাশে মেঘের দেখা নেই। হরিপালবাবু অবশ্য এসবে খুব একটা চিন্তিত নন। তিনি রোদ এবং গরম বাতাসের সঙ্গে জ্যামিতির হিসেব কষে ছাতা মাথার ওপর হেলিয়ে ধরেন। তাঁর বিশ্বাস, এতে গরম তাকে খুব একটা ঘায়েল করতে পারে না। আজও তাই করেছেন। স্কুলের যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পথে ডাবওলার সঙ্গে দেখা। ভাবলেন, একটা ডাব খেয়ে নিলে শরীরটা ঠান্ডা থাকবে। কিন্তু ডাবওলা মনোজ দা দিয়ে ডাব কাটতে গেলেই তিনি হুংকার দিলেন।
মনোজ গেল ঘাবড়ে। তার বাঁ-হাতে ডাব, ডান হাতে দা। কোপ মারবে বলে সে তৈরি। এই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল স্ট্যাচুর মতো। হরিপালবাবু এগিয়ে এলেন দু-পা। ঘন ভুরু আরও ঘন করে ঝুঁকে পড়লেন। মাথা নিচু করে আধখানা পাক মারলেন মোহনের সাইকেল ঘিরে। সাইকেলে ডাব ঝোলানো। হরিপালবাবু ফোঁস আওয়াজে নিশ্বাস ফেললেন।
'করো কী অ্যাঁ! এ তো ফর্টি ফাইভ ডিগ্রি হয়ে রয়েছে। খানিক বেশিও হতে পারে। ডাব কাটতে ফর্টি ফাইভ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে দা ধরেছ! কচি ডাবটার তো দফারফা করে ছাড়বে দেখছি।'
মনোজ এবার নড়ল। এক—দু-বছর নয়, বিয়াল্লিশ বছর ধরে সে ডাব কাটছে। বাপ-ঠাকুরদার থেকে শেখা। এমন কথা কখনও শোনেনি। ডাব কাটবার আবার 'ফট্টি', 'সিস্টি' কী! বলল, 'কত্তা, এসব কী বলেন! আমি তো কিছুই বুঝি না। এত বছর এইভাবে ধরে ডাবে কোপ দিই। এক কোপেই কচাং। ফিনকি দিয়ে জল বেরোয়। কোনওদিন একের বেশি দুই কোপ লাগে না। আপনে এসব ডিগ্রি-মিগ্রি কী বলেন!'
হরিপালবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, 'যা বোঝো না, তা নিয়ে তক্কো কোরো না। ডাব কাটবার একটা জিওমেট্রি আছে। জিওমেট্রি কী জিনিস জানো? জিওমেট্রি হল জ্যামিতি। অঙ্কের একটা বিশেষ ধারা। যেমন পাটিগণিত, বীজগণিত তেমন জ্যামিতি। বুঝেছ?'
মনোজের লেখাপড়ার দৌড় ক্লাস ফোর পর্যন্ত। তাও এতদিন আগে যে সবই ভুলে মেরে দিয়েছে। হরিপালবাবুর একটা কথারও মানে সে বুঝতে পারল না। এই লোককে তালজিঙিতে নতুন দেখছে। গরমে মাথা খারাপ হল নাকি? হতে পারে। এবার জব্বর গরম পড়েছে।
হরিপালবাবু ভুরু নাচিয়ে বললেন, 'জ্যামিতিতে একেকটা ডাবের একেকটা হিসেব।'
মনোজের চোখদুটো এবার তালশাঁসের মতো বড় হল। ডাব কাটবার আবার হিসেব কী! সে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল, 'ডাব কাটবার হিসেব! এমন কথা তো কখনও শুনিনি কত্তা। ডাব বেচে পয়সা গোনার হিসেব আছে।'
হরিপালবাবু কাঁধের ওপর রাখা ছাতার হাতলে দেড়খানা পাক দিয়ে বললেন, 'শোনোনি বলেই তো এতদিন ডাবের জলের টেস্ট নষ্ট করেছ। কচি ডাব থেকে চিনির মতো মিষ্টি জল পেতে হলে হিসেব করে চলতে হয়। মাথা কাটতে হলে তিরিশ ডিগ্রির ওপাশে যাওয়া চলবে না। বেশি গেছ তো জল আর মিষ্টি থাকবে না, হবে কসকসা। আর ডাব যদি ঝুনো হয়, তবে কাটতে হবে ষাটে। সিক্সটি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল। তবেই ঝুনো ডাব বেশি জল দেবে। বুঝেছ?'
মনোজ কিছুই বুঝতে পারল না। গামছা দিয়ে কপাল, গলা মুছে বলল, 'বুঝব কী কত্তা! আপনে যা বললেন তা কী বোঝার মতো কতা হল? সব আরও গুলিয়ে গেল যে।'
হরিপালবাবু এবার রাগ রাগ গলায় বললেন, 'আরে বাপু, তুমি তো দেখছি ডাবের থেকেও বোকা। মাথায় কি একটুও শাঁস নেই হে? দাঁড়াও তোমায় বুঝিয়ে দেখাই। জ্যামিতিতে ডিগ্রি হল কোণের হিসেব। যাকে বলে অ্যাঙ্গেল। তোমার হাতের দা আর ডাবের মাথা এই দুইয়ে মধ্যে তোমাকে মনে মনে ক'টা অদৃশ্য লাইন টানতে হবে। তুমি পাবে কোণ। সেই কোণ তুমি দেখতে পাবে না, তোমাকে বুঝতে হবে। মনে-মনে মেপে নিতে হবে সেই অদৃশ্য কোণের মাপ কত ডিগ্রি হল। তারপরে দিতে হবে কোপ। কথায় বলে ঝোপ বুঝে কোপ, আর এটা হবে কোণ বুঝে কোপ। এবার বুঝলে?'
মনোজ কিছুই বোঝেনি। শুধু বুঝেছে, এই লোকের হাত থেকে রক্ষা পেতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে। তাড়াহুড়ো করে বলল, 'বুঝেছি কত্তা। খুব বুঝেছি। একেবারে জলের মতো, থুড়ি ডাবের জলের মতো বুঝেছি।'
হরিপালবাবু খুশি হয়ে বললেন, 'ভেরি গুড। দাঁড়াও তোমাকে আমি হাতে কলমে দেখিয়ে দিচ্ছি। হাতে কলমে একবার শিখে নিলে আর ভুল হবে না। জ্যামিতি হল অভ্যেস। একবার অভ্যেস হয়ে গেলে মিষ্টি জল খাইয়ে সবাইকে খুশি করতে পারবে। ছাতাটা ধরো দেখি। বাহান্ন থেকে পঞ্চান্ন ডিগ্রি হেলিয়ে ধরবে। এই সময় রোদ ঠেকাবার উপযুক্ত হিসেব।'
এরপর হরিপালবাবু পড়লেন মনোজের হাত দুটো নিয়ে। হাত দুটোকে এগিয়ে পিছিয়ে, উঠিয়ে নামিয়ে সে এক কাণ্ড করলেন। একসময়ে হেসে বললেন, 'এতক্ষণে হয়েছে। এবার এই ডাব আর তোমার বাঁ-হাতের দা থেকে লাইন বের করে যদি মাপা যায়, তাহলে কোণের মাপ কিছুতেই তিরিশ ডিগ্রির বেশি হবে না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি। আরে বাপু তেইশ বছর ধরে ছেলেদের জ্যামিতি শেখাচ্ছি। আমার চোখে জ্যামিতি বাক্স সেঁটে থাকে। নাও কচি ডাবের জন্য একেবারে পারফেক্ট কোণ বলে দিলাম। এবার মারও দেখি কোপ। তারপর দেখ কী ঘটনা ঘটে। ডাবের জল চিনতেই পারবে না, মনে হবে মিছরি গোলা সরবত খাচ্ছ।'
মনোজ ডাব কাটল। হরিপালবাবুকে এগিয়ে দেওয়ার আগে হাতের আঁজলায় একটু নিয়ে নিজের মুখেও ফেলল। হরিপালবাবু চোখ বুজে 'আহা উহু' বলতে লাগলেন বটে, মনোজের মুখ কিন্তু ভেটকে গেল। এমন নোনতা ডাবের জল সে আগে কখনও খাইনি। তার লজ্জাই হল। হরিপালবাবু তাকে দাম দিতে গেলে সে হাত জোড় করে বলল, 'মাপ করেন কত্তা, দাম নিতে পারব না। ডাব কাটবার ব্যাপারে যে শিক্ষে আজ আপনি দিলেন তা মাথায় করে রাখব।'
হরিপালবাবু বললেন, 'শুধু ডাবের জল নয় হে, জীবনের সবকিছুতেই রয়েছে জ্যামিতি। সবসময়ে জ্যামিতি মেনে চলতে হয়, তবেই সব ঠিক থাকে। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে তো গেছ।'
মনোজ সাইকেলের হাতলে ডাব গোছাতে গোছাতে বলল, 'ঠিক বলেছেন কত্তা। তবে এবার যাই, অনেক বেলা হল। স্নান খাওয়া কিছুই হয়নি।'
মনোজ সাইকেল নিয়ে একরকম ছুটই দিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ভুলেও এই পাড়ায় আর ডাব বেচতে আসবে না।
শুধু ডাবওলা মনোজ নয়, হরিপাল শর্মাকে দেখলে তালডিঙির অনেকেই এখন পালাতে চায়। এই তো গত রবিবার সকালে এক কাণ্ড ঘটল। বাজারে গিয়েছিলেন হরিপালবাবু। দেখলেন, মিষ্টির দোকানে খুব ভিড়। হরিপালবাবু উঁকি দিলেন। স্বপন ময়রা বিরাট কড়াইতে জিলিপি ভাজছে আর রসে চুবোচ্ছে। লোকে কাড়াকাড়ি করে সেই গরম জিলিপি কিনছে। ঠেলেঠুলে ভিতরে ঢুকলেন হরিপালবাবু। স্বপনের জিলিপি তৈরি দেখে হাঁই-হাঁই করে উঠলেন।
'আরে করো কী স্বপন! করো কী?'
স্বপন হরিপালবাবুকে চেনে। স্কুল ফেরত মাঝেমধ্যে শিঙাড়া খেতে দোকানে আসেন। তাঁকে আবার যে-কোনো শিঙাড়া দিলে হবে না, নিজে ঝুড়ি থেকে বেছে নেবেন। একেবারে নিঃখুত চেহারা হওয়া চাই। বলেন, 'শিঙাড়ার আসল মজা তার তিনকোণা চেহারায়। জ্যামিতির দান। শিঙাড়া যদি রসগোল্লার মতো গোল হত, সে কি মজার হত? মোটেও না। এখানে জ্যামিতিটাই আসল। ট্র্যাঙ্গেল যত পারফেক্ট শিঙাড়া তত মুচমচে।' স্বপন মুখ টিপে হাসে। কিছু বলে না। যতই হোক মাস্টারমশাই বলে কথা। সেই স্বপন সেদিন জিলিপির কড়াই থেকে মুখ তুলে বলল, 'কী হয়েছে মাস্টারমশাই?'
হরিপালবাবু চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্ত গলায় বললেন, 'হওয়ার আর বাকি রেখেছ কী? এগুলো জিলিপির প্যাঁচ হচ্ছে?'
স্বপন অবাক হয়ে বলল, 'কেন! এমনটাই তো করি।'
হরিপালবাবু বললেন, 'ভুল করো। একটাও প্যারাবোলা, হাইপ্যারাবোলা ঠিক হচ্ছে না। মনে হচ্ছে জিলিপি তো না, কড়াইতে কাকের বাসা বানাচ্ছ।'
স্বপন আরও অবাক হয়ে বললেন, 'কী বোলা বললেন মাস্টারমশাই? হরবোলা? সে তো আমার গাঁয়ে আছে। বাঘ সিংহের ডাক নকল করে। তাকে এনে জিলিপির কড়াইতে ফেলে ভাজতে বলছেন?'
হরিপালবাবু বিরক্ত বললেন, 'ধ্যুস, হরবোলা কেন হবে, প্যারাবোলা। বাংলায় যাকে বলে অধিবৃত্ত। জ্যামিতির ব্যাপার। কিছুই জানো না দেখছি। স্বপন, জিলিপির প্যাঁচ কোনও সহজ জিনিস নয়। জ্যামিতির অনেক হিসেব কষে মারতে হয়। দাঁড়াও তোমাকে বুঝিয়ে বলি। একটা খাতা পেনসিল দাও দেখি।'
ভিড় করে দাঁড়ানো জিলিপির খদ্দেররা এতক্ষণ শুনছিল, এবার গেল খেপে। ছুটির দিন সকালে রস টসটসে গরম জিলিপি খেতে এসে জ্যামিতি শিখতে হলে খেপে যাওয়ারই কথা। তারা একরকম জোর করেই হরিপালবাবুকে দোকান থেকে দিল বের করে দিলেন।
অতি অল্পদিনে হরিপালবাবু তালডিঙির মতো চমৎকার জায়গায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছেন। মানুষ কত কিছু দিয়েই না আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। হরিপালবাবু আতঙ্ক তৈরি করেছেন জ্যামিতি দিয়ে। স্কুলের ছেলেরা তটস্থ হয়ে থাকে। এই বুঝি জ্যামিতি জ্বালাতনে পড়তে হবে। প্রথমদিন থেকেই হরিপালবাবু ছাত্রদের কাছে জ্যামিতির মাহাত্ম্য প্রচার করতে শুরু করেছেন।
'ছেলেরা, মনে রেখো জ্যামিতি শুধু অঙ্কের বইতে নেই। জীবনের প্রতিটি পদে রয়েছে জ্যামিতি। লেখাপড়া, খেলাধুলো, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমোনো সবেতেই জ্যামিতি। জ্যামিতির একটু গোলমাল হলেই মুশকিল। এই খাওয়ার কথাই ধরো না কেন। ভাত খাওয়ার সময়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হয়, দুটো চোয়ালে যেন সরলকোণ তৈরি হয়। যখন আলুভাজা খাবে তখন আবার সমকোণে চলবে না। লাগবে সুক্ষ্মকোণ...। সুতরাং হে ছেলেরা, অতি মনোযোগ দিয়ে জ্যামিতি শিখতে হবে। জ্যামিতি মাথায় সব কাজ করতে হবে।'
শুধু ক্লাসে নয়, ক্লাসের বাইরেও হরিপালমাস্টার ছেলেদের জ্যামিতি নিয়ে নাজেহাল করে দিচ্ছেন। দুটো ঘটনা বললেই বোঝা যাবে।
সেদিন ছিল শনিবার। হাফ ছুটি। ফাঁকা স্কুলে বসে গরমে ঘামতে ঘামতে ক্লাস পরীক্ষার খাতা দেখলেন হরিপালবাবু। মেজাজটা গেল ভেটকে। ক্লাস সেভেনের ছাত্রদের জ্যামিতিজ্ঞান খুবই দুর্বল। বেশিরভাগই ফেল। তার মধ্যে বাবলুর অবস্থা ভয়াবহ। সে কুড়িতে পেয়েছে মাইনাস এগারো। তার আঁকা একটাও বৃত্ত গোল হয়নি, আয়তক্ষেত্র হয়েছে ফুটবলের মতো। বাবলু শূন্য তো পেলই, আরও এগারো নম্বর কেড়ে রাখলেন হরিপালবাবু। পরের পরীক্ষায় কাটা হবে।
একসময়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন হরিপালবাবু। পাকড়াশিদের আমবাগানের পাশ দিয়ে গেলে শর্টকাট হয়। জায়গাটাও বেশ ছায়া ছায়া। ঝিরিঝিরি বাতাস। মন খানিকটা শান্ত হল। তিনি গুনগুন করতে করতে হাঁটতে লাগলেন। অনেকেই মন ভালো থাকলে গুনগুন করে গান করে। হরিপালবাবু গুনগুন করে জ্যামিতির সংজ্ঞা আওড়ান।
'যে চতুর্ভুজের বিপরীত বাহুগুলো সমান এবং সমান্তরাল, প্রতিটি কোণ সমকোণ, তাকে আয়তক্ষেত্র বলে। বর্গক্ষেত্র হল যার চারটি সমান বাহু...।'
হঠাৎ খড়মড় আওয়াজে চমকে মাথা তুলে তাকালেন হরিপালবাবু। ক্লাস সেভেনের বাবলু চুপিচুপি একটা আমগাছে উঠছে। মাস্টারমশাইকে সে দেখতেই পায়নি। হরিপালবাবু থমকে ছাত্রের গাছে ওঠা দেখলেন। তারপর দিলেন ধমক।
'অ্যাই বাবলু, নেমে আয়, গাছ থেকে নেমে আয় এখনই। বাঁদর ছেলে, জ্যামিতিতে মাইনাস এগারো নম্বর পেয়েও লজ্জা নেই। নাম বলছি।'
বাবলু ভয়ে হড়বড়িয়ে নেমে এল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'আর কোনওদিন আম পাড়তে গাছে উঠব না মাস্টারমশাই। এবারের মতো ছেড়ে দিন।'
হরিপালবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, 'উঠবি না মানে, আলবাত উঠবি। একশোবার উঠবি, হাজারবার উঠবি।'
বাবলু আরও ভয় পেয়ে গেল। এ কেমন শাস্তি রে বাবা! সে কেঁদে ফেলে আর কী। হরিপালবাবু বললেন, 'সাধে কী জ্যামিতি পরীক্ষায় এই হাল হয়েছে তোর। গাছে ওঠবার একী ছিরি! আমার ছাত্র হয়ে তুই কিনা ভুল জ্যামিতে গাছে উঠবি! এই ভাবে গাছে উঠলে কাঁচা আমে কোনও কাঁচামিঠে টেস্ট পাবি? ঘোড়ার ডিম পাবি।'
বাবলু ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। সে মাথা চুলকে বলল, 'আমগাছে কীভাবে উঠতে হয় মাস্টারমশাই?'
হরিপালবাবু চট করে একটা গাছের ভাঙা ডাল তুলে মাটিতে একটা গোল আঁকলেন। বললেন, 'মন দিয়ে দেখ। এই হল সার্কেল, বৃত্ত। তোকে উঠতে হবে বৃত্তাকারে, গাছের ডাল ধরে পাক দিতে দিতে নিজেই একটা সার্কেল বানিয়ে ফেলবি। পাক দেওয়ার সময় মনে রাখবি, বৃত্তের ব্যাস যেন বড় না হয়ে যায়। হলে ঠকবি। আমে কামড় দিয়েই বুঝবি টেস্ট নেই। গাছে ওঠার পরিশ্রম জলে যাবে। নে এবার ওঠ। আমি নিচ থেকে নজর রাখছি।'
একবার, দুবার নয়, সেদিন তেত্রিশবার গাছে ওঠা নামা করতে হয়েছে বাবলুকে। তার নাকি জ্যামিতি কিছুতেই ঠিক হচ্ছিল না। বাবলু স্কুলে এসে সবার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে, আর কোনওদিন গাছে আম পাড়তে উঠবে না।
পরের ঘটনা ঘটল ফুটবল মাঠে।
বিকেলে তালডিঙি হাইস্কুলের সঙ্গে সারুইপাড়া পূর্ণচন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ের ম্যাচ চলছিল। ছেলেরা তো বটেই, মাস্টারমশাইরাও মাঠে ছিলেন। খুব উত্তেজনা। সারুইপাড়া পূর্ণচন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয় একটা গোল দিতে উত্তেজনা বাড়ল। হাফ টাইমের আগে তালডিঙি হাইস্কুলের শিবাজী পেনাল্টি বক্সের ভিতরে গিয়ে কিক মেরেও গোল ফসকাল। ব্যস, হরিপালবাবু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ধুতির কোচা গুটিয়ে ঢুকে পড়লেন মাঠের ভিতর। সবাইকে ঠেলে, সরিয়ে সটান গিয়ে শিবাজীর কান পাকড়াও করলেন।
'এই তুই জ্যামিতিতে হাইয়েস্ট নম্বর পাস! ছ্যা-ছ্যা। সব নম্বর আমি কেটে নেব। এটা একটা কিক হল? আগাপাস্তালা জ্যামিতিতে গোলমাল। কিক যখন করলি তখন একবার গোলপোস্টের সঙ্গে বলের দূরত্বটা মনে মনে মেপে নিলি না? তাকে দুই দিয়ে ভাগ করে, চল্লিশ ডিগ্রি দিয়ে যোগ করলেই তো বলের হাইপ্যারাবোলা পথটা জেনে যেতিস। ছিছি, এইটুকু মাথায় খেলল না! এত বড় একটা জ্যামিতি খাতার মতো মাঠ পেয়েও কাজে লাগাতে পারলি না!'
পূর্ণচন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ের ছেলেরা এবার হইহই করে মাঠে নেমে পড়ল। খেলার মাঠে পরামর্শ চলবে না। তালডিঙি হাইস্কুলেরর ছেলেরাও 'রে রে' করে উঠল। হরিপালবাবু তো ফুটবল শেখাচ্ছেন না, জ্যামিতি শেখাচ্ছেন। এতে আপত্তি কীসের? পূর্ণচন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ের ছেলেরা শুনবে না। এটা তো জ্যামিতি ক্লাস নয়, ফুটবল খেলবার মাঠ। এখানে জ্যামিতি কেন? কিন্তু কে শোনে কার কথা? কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুন্ধুমার কাণ্ড শুরু হল। চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি, হাতাহাতি। রেফারি কাত্যায়ন পাল খেলা ভণ্ডুলের হুইশল বাজিয়ে দিলেন।
স্কুলের ছেলেরা, তালডিঙির লোকজন সকলেই ভাবতে লাগল কী করে জ্যামিতির জ্বালাতন বন্ধ করা যায়? কী উপায়? পথ কী?
কাউকে কিছু করতে হল না। পরশুদিন এক কাণ্ড হয়েছে।
সারাদিন চলছিল গুমোট গরম। বৈশাখের গনগনে রোদে পনেরো দিন ধরে চারদিক একেবারে তেতেপুড়ে গেছে। বিকেলের একটু আগে আকাশ কালো করে এল। ঝড় আসছে, কালবৈশাখি। স্কুল ছুটির পর আকাশ আরও কালো হল। ছেলেরা লাগাল দৌড়। কেউ আম বাগানে যাবে। ঝড় শুরু হলে আম কুড়োবে। কেউ গেল মাঠে ফুটবল খেলতে। গরমের সময়ে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলবার মতো মজা আর কীসে পাওয়া যায়? কেউ গেল দিঘিতে সাঁতার দিতে। জলে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি পড়লে সাঁতারে সবথেকে আরাম। মাস্টারমশাইরাও হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবার আগেই বাড়ি পৌঁছোতে হবে। নইলে বিপদ। তাড়াহুড়ো করলেন না শুধু হরিপালবাবু। তিনি স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের ঘন কালো মেঘের ছোটাছুটি দেখলেন আর মনে মনে জ্যামিতি কষতে লাগলেন। মেঘ জমেছে পশ্চিম আকাশে। বৃষ্টির ঝাপটা আসবে সেদিক থেকেই। ছাতাটাকে ডিগ্রি মেপে হেলালেই চলবে। সেইসঙ্গে ঝড়ের গতিপথকে বুঝে নিতে হবে। দেখে নিতে হবে কতটা কোণ করে বৃষ্টি পড়ছে। পঁয়তাল্লিশ? নাকি সাতচল্লিশ? বাকি থাকছে বৃষ্টি ফোঁটার মাপ। ব্যস, এই ক'টা জিনিস মনে মনে হিসেব করে নিতে পারলেই কোনও চিন্তা নেই। ঝড়-জল গায়ে লাগবে না। এই প্রথম এরকম একটা গ্রামের মতো জায়গায় বৃষ্টি দেখবেন।
একসময়ে ধীরে-সুস্থে স্কুল থেকে বের হলেন। ঠান্ডা বাতাস বইছে। খানিক এগোতেই শুরু হল ঝড়, সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। মনে মনে ঝড়-বৃষ্টির মাপামাপি সেরে ছাতা খুলে মাথার ওপর ধরলেন হরিপালবাবু। হায়রে! কয়েক মুহূর্তও লাগল না, যাবতীয় জ্যামিতি লণ্ডভণ্ড করে ছাতা গেল উলটে, শিক গেল দুমড়ে-মুচড়ে। হরিপালবাবু থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভুরু কুঁচকে গেল তাঁর। এটা কী হল! জ্যামিতি কোথায় গেল? উড়ে গেল? ভাবতে-ভাবতেই হরিপালবাবু বুঝতে পারলেন, ঝড়-বৃষ্টি গায়ে মাখতে তাঁর দারুণ লাগছে। ছেলেমানুষের মতো মজা হচ্ছে। গত কয়েকদিনের গরমের কষ্ট শরীর থেকে ধুয়ে যাচ্ছে। চারপাশ ঠান্ডা হয়ে গেছে। আহা, কী আরাম! দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ ভিজলেন হরিপালবাবু। আচ্ছা, আমবাগানে গেলে কেমন হয়? ঝড়ে আম পড়া দেখতে কেমন লাগে? কলকাতা শহরে ঝড়ে আম পড়া দেখা যায় না। ভাঙা ছাতা ছুঁড়ে ফেলে হরিপালবাবু পা বাড়ালেন।
উচিত ছিল জ্যামিতি মেপে পা বাড়ানো, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হরিপালবাবু সেকথা বোধহয় ভুলে গেলেন। ভেজা মাটিতে পা পিছলে পড়লেন সড়াৎ করে। ধুতি-পাঞ্জাবি কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই 'হো-হো' করে এক চোট হেসে উঠলেন হরিপালবাবু। কতকাল কাদায় পা হড়কে পড়া হয়নি! ভাগ্যিস জ্যামিতি ঝড়ে উড়ে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গান ধরলেন হরিপালবাবু। না, জ্যামিতির সংজ্ঞা নয়, সত্যিকারের বর্ষার গান ধরেছেন। সুরটা যা একটু ভুল হচ্ছে। তা হোক। সব কিছু অত হিসেব করলে হয় না। তাই না?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন