মোহনস্যারের দশে দশ

প্রচেত গুপ্ত

মোহন নন্দীকে পলাশপুরের সবাই 'মোহনস্যার' নামে চেনে।

মানুষটা ভালো। তবে 'কাজ পাগল'। তেত্রিশ বছর ধরে স্কুলে মাস্টারি করছেন। সারাদিন স্কুল করেন, আবার বাড়িতেও স্কুলের কাজ নিয়ে আসেন। এখানেই শেষ নয়, রাতে তাঁর ঘুমের মধ্যেও স্কুল চলে আসে। তখন তিনি বিড়বিড় করতে থাকেন, 'ক্লাস সিক্স সেকেন্ড পিরিয়ডে, পানিপথের যুদ্ধ...থার্ড পিরিয়ড ক্লাস সেভেনে...ক্লাস এইটে নেপোলিয়ানের পরাজয়, ক্লাস নাইনে ফোর্থ পিরিয়ড়..।'

ঘুমের মধ্যে বলার কারণে রুটিন, সিলেবাস সবই গুলিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী সুমঙ্গলা দেবী ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙান। মোহানস্যার ধড়ফড় করে উঠে বসেন। চোখ কচলে বলেন, 'কী হয়েছে? ঘুম ভাঙালে কেন?'

সুমঙ্গলা দেবী বলেন, 'ঘুমের মধ্যে ইতিহাস আওড়াচ্ছিলে, পানিপথের যু, নেপোলিয়নের পরাজয়।'

মোহনস্যার বলেন, 'তাই নাকি! ভেরি গুড। দেখি, বাকি রাতের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্য আর ব্রিটিশ শাসনটা সেরে ফেলতে পারি কিনা। কাল নাইন আর টেনে পরপর ক্লাস রয়েছে। এরপর বিড়বিড়ানি শুনলেও তুমি আর আমাকে ঘুম থেকে তুলবে না।'

কথা শেষ করে মোহনস্যার আবার শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

এই মোহনস্যার কিছুদিন হল অদ্ভুত এক সমস্যায় পড়েছেন। প্রথমে সমস্যা শুরু হয়েছিল হালকা ভাবে। এখন সমস্যা বাড়ছে। কেউ কেউ বুঝতে পারছে, মানুষটার কিছু একটা হয়েছে। তবে মোহনস্যার বুঝতে পারছেন না। সেই সুযোগে সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে। এতদিন সে আটকে ছিল, স্কুলের পরীক্ষা খাতায়, অ্যানুয়াল ফাংশনে, স্পোর্টসে। এখন সে স্কুলের বাইরেও পা রেখেছে। ছড়িয়ে পড়েছে কাঁচা লঙ্কায়, ডাবের জলে। একথা শুনে অনেকেই ভাববে, এ আবার কেমন সমস্যা? পরীক্ষার খাতা থেকে একেবার কাঁচা লঙ্কা পর্যন্ত চলে গেছে!

বিশ্বাস না হলেও, ঘটনা সত্যি।

পলাশপুর ছোট মফসসল শহর। নামেই শহর, আসলে বড়সড় একটা গ্রাম। তিনটে বড় দিঘি, দু-খানা মস্ত ফুটবল মাঠ, অনেক গাছপালা আর কিছুটা দূরেই একটা ছোট টিলা রয়েছে। টিলার নাম পলাশ টিলা। এছাড়া আছে ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা স্কুল। ছেলেদের স্কুলের নাম 'পলাশপুর উচ্চবিদ্যালয়'। মোহনস্যার পলাশপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান। তিনি একজন রুটিন মানা মানুষ। ঘড়ির কাঁটা ধরে স্কুলে যান। পুরোনো মাস্টারমশাই বলে ছাত্র পড়ানোর বাইরেও কিছু দায়িত্ব তো নিতেই হবে। নিজে কাজ পাগল বলে বেশি করে নেন। পরীক্ষার পর রেজাল্ট লিখতে হয়, অ্যানুয়াল ফাংশনের আগে নাটক, আবৃত্তি, গানের জন্য ছেলে বাছাই করতে হয়, স্পোর্টেসের সময়ে দৌড়, লংজাম্প, হাই জাম্প, রিলে রেসের মেডেল গোছাতে হয়।

অন্য কাজ না থাকলে স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে আসেন মোহনস্যার। ছাত্রদের হোমটাস্কের খাতা নিয়ে বসে পড়েন। খুঁটিয়ে খাতা দেখেন। ভুল ঠিক করে দেন। পাশে মন্তব্য লেখেন, 'হাতের লেখা ভালো করো', 'সাল তারিখে গোলমাল হচ্ছে। কাগজে লিখে পড়ার ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখো' রাতে শুয়ে পড়েন তাড়াতাড়ি, ওঠেন ভোরে। দু-চক্কর মর্নিংওয়াক সেরে বাড়ি ফেরেন একেবার বাজার করে। তারপর চা-জলখাবার খেয়ে সেদিন স্কুলে যা পড়াবেন তা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য বই খুলে বসেন। বেলা বাড়লে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হন। মোহনস্যারের সহজ সরল জীবন। এই সহজ সরল মানুষটার হল কী!

সেদিন স্কুলে বেরোবার আগে ভাত খেতে বসেছিলেন। মুসুর ডাল আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। সঙ্গে আলুপোস্তর তরকারি। থালার পাশে একটা বড় সাইজের কাঁচালঙ্কা। এক গরোস ভাত আর লঙ্কায় একটা কামড়। মোহনস্যার মনে করেন, লঙ্কায় কামড় দেওয়ার সময় 'কচ' আওয়াজ না হলে লঙ্কা নাকি ঝাল হয় না। 'কচ' আওয়াজ একটা অতি জরুরি বিষয়। গরম ভাত, মুসুর ডাল, আলুপোস্তর তরকারি আর কাঁচা লঙ্কায় কামড় মোহনবাবুর অতি প্রিয় মেনু। প্রিয় মেনু পেলে মানুষ হাসিমুখে খায়। মোহনবাবু সেদিন খাচ্ছিলেন ভুরু কুঁচকে, কপালে ভাঁজ ফেলে। বোঝাই যাচ্ছিল, কোনও গোলমাল হয়েছে।

সুমঙ্গলা দেবী বললেন, 'কী ব্যাপার বলো তো, তোমার হয়েছেটা কী?'

মোহনবাবু কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেলেন। কথাটা গিলে ফেললেন। তার বদলে বললেন, 'কী আবার হবে?'

সুমঙ্গলা দেবী বললেন, 'তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু হয়েছে। পেট কামড়াচ্ছে?'

মোহনবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'পেট কামড়াবে কী কারণে? আমি কি স্কুলের ছেলেদের মতো যখন তখন ডাঁসা পেয়ারা চিবোই যে পেট কামড়াবে?'

সুমঙ্গলা দেবী চিন্তিত গলায় বললেন, 'তবে কি দাঁত কনকন ?'

মোহনবাবু এবার একটু রেগে গিয়েই বললেন, 'আচ্ছা মুশকিল তো। দাঁত কনকন করবে কেন? আমি বুঝি স্কুলের ছেলেদের মতো টিফিনের সময়ে কাঠি আইসক্রিম চুষি?'

সুমঙ্গলা দেবী বলেন, 'তাহলে নিশ্চয় হাতে পায়ে কোথাও লেগেছে। তুমি লুকোচ্ছ।'

মোহনবাবু খাওয়া থামিয়ে বললেন, 'কী বিপদ! আমি কি স্কুলের ছেলেদের মতো মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলি যে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে চোট পাব? তুমি যে কী বল সুমঙ্গলা!'

মোহনবাবুর অনেক সময়ে কথার মধ্যে স্কুলের ছেলেদের টেনে আনেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উনি স্কুলে প্রতিদিন পাঁচটা করে ক্লাস নেন। সকালে—সন্ধেতে বাড়িতেও মাঝেমধ্যে ছেলেরা চলে আসে। এতটা সময় যাদের সঙ্গে থাকেন, কথা বলার সময়ে তাদের উদাহরণ চলে আসতেই পারে।

সুমঙ্গলা দেবী বললেন, 'তুমি যতই রাগ দেখাও, ক'দিন ধরেই আমার যেন কেমন লাগছে। কিছু একটা হয়েছে, তুমি বুঝতে পারছ না।'

মোহনস্যার বললেন, 'তুমি তো ক্লাস সেভেনের অরিন্দমের মতো কথা বলছ। ইতিহাসের সন তারিখ ভুল করেও নিজের ভুল বুঝতে পারে না। আমি কি ক্লাস সেভেনে পড়ি? আমার বয়স বাহান্ন বছর তিন মাস, দুদিন। নানা, দুই নয়, তিন দিন। নিজের কিছু হলে আমি বুঝব না?'

মোহনবাবু সেদিন কোনোরকমে খাওয়া সেরে, ব্যাগ গুছিয়ে, হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তবে তার ভুরুদুটো কুঁচকে ছিল দীর্ঘক্ষণ।

স্কুলের ছেলেরা তাদের এই স্যারকে পছন্দ করে। তিনি লেখাপড়া নিয়ে বকাঝকা বিশেষ করেন না। ফাঁকি দিলে ধমক দেন ঠিকই, তারপর বুঝিয়েও বলেন। সবথেকে বড় কথা, এই স্যারের কাছে ছোটখাটো দুষ্টুমিতে ছাড় আছে। এই তো সেদিন ক্লাস এইটে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ পড়াছিলেন। সবাই চুপ করে শুনছে। ঘরে কোনও শব্দ নেই। হঠাৎ পিছনের বেঞ্চে আওয়াজ হল 'ধপ'। একটা 'ধপ' নয় পরপর পাঁচটা 'ধপ'। তারপর একটা ক্যাম্বিস বল গড়িয়ে গিয়ে থামল একবারে স্যারের পায়ের কাছে। সে যেন স্যারকে কিছু বলতে এসেছে। স্যার নীচু হয়ে বলটা তুললেন। ঘুরিয়ে দেখে রাখলেন টেবিলের ওপর।

লাস্টবেঞ্চে বসে শিবু। ওর ব্যাগে সমসময়েই বল থাকে। সেইজন্য ওকে ক্লাসে সবাই ডাকে 'বলশিবু'। সুযোগ পেলেই সে বল বের করে ফেলে। ইতিহাস ক্লাসেও বের করে ফেলেছে। সেই বল ফসকে পড়েছে হাত থেকে। ক্লাসশুদ্ধু ছেলেরা তো ভয়ে কাঁটা। এবার নিশ্চয় একটা ভংয়কর কাণ্ড হবে। এই স্যার যতই ছোটখাটো দুষ্টুমিতে ছাড় দিন না কেন, ক্লাস বলে বল খেলাতে তো ছাড় দিতে পারবেন না। শিবুর কপালে বিপদ আছে। বল তো বাজেয়াপ্ত হবেই, তাকে নিশ্চয় নিয়ে যাওয়া হবে হেডস্যারের কাছে।

সেসব কিছুই হল না। ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজলে মোহনস্যার শিবুকে ডেকে বল ফেরত দিলেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, 'খেলার মাঠে যদি একটা ইতিহাস বই গড়াগড়ি খায় তার অপমান হয়। সে ভাবে, খেলবার মাঠ তো আমার জায়গা নয়, এটা বলের জায়গা। এখানে আমাকে কেন আনা হয়েছে! ঠিক কিনা?'

বলশিবু ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বলল, 'ঠিক স্যার।'

মোহনস্যার বললেন, 'ঠিক তেমনই ইতিহাস ক্লাসে ব্যাগ থেকে বল বের করলে তাকে অপমান করা হয়। তুই যদি বলকে ভালোবাসিস, তাকে অপমান করতে পারিস না। যা বলটা ব্যাগে রেখে দে।'

এই ভালো মানুষটার সমস্যা হলে তো চিন্তার বিষয়।

একদিন হেডমাস্টার শশধরবাবুও তাকে বলেছেন। টিচার্সরুমে বসে ক্লাস পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন মোহনস্যার। পানিপথের যুদ্ধের ওপর পরীক্ষা নিয়েছিলেন। ছেলেরা ভালোই পরীক্ষা দিয়েছে। দু-তিনজন তো ফুলমার্কস পেয়েছে। একেবারে দশে দশ। তার পরেও খাতা দেখতে দেখতে মোহনস্যারের ভুরু কুঁচকে গেছে। মনে হচ্ছে, পরীক্ষায় সবাই গোল্লা পেয়েছে। হেডমাস্টামশাই ওই সময়ে ঘরে এসেছিলেন অন্য কাজে। মোহনস্যারকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন।

'মোহনবাবু, আপনার কি কোনও সমস্যা হয়েছে?'

মোহনস্যার বললেন, 'না স্যার, ঠিকই আছি।'

হেডমাস্টারমশাই বললেন, 'শরীর খারাপ?'

মোহনস্যার বললেন, 'শরীর খুবই ভালো স্যার।'

হেডমাস্টারমশাইয়ের সন্দেহ দূর হল না। বললেন, 'কী করছেন? খাতা দেখছেন?'

মোহনস্যার বললেন, 'হ্যাঁ স্যার, ক্লাস পরীক্ষার খাতা।'

হেডমাস্টারমশাই বললেন, 'আপনাকে দেখেই বুঝতে পারছি, ছেলেরা ঠিকমতো লিখতে পারেনি।'

মোহনস্যার বললেন, 'ভালো লিখতে পেরেছে স্যার। অনেকেই দশে দশ পেয়েছে।'

হেডমাস্টারমশাই অবাক হয়ে বললেন, 'তাহলে অমন বেজার মুখ করে আছেন কেন! ছাত্ররা ভালো করলে তো আনন্দ হওয়ার কথা।'

মোহনস্যার চুপ করে রইলেন। চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় নেই। হেডমাস্টারকে কি বলবেন? আসলে কোনও কিছুতেই তাঁর মন ভরছে না। এমনকী ছাত্ররা পরীক্ষায় দশে দশ পেলেও নয়। ঘটনা খুলে বলা যাক।

সমস্যা শুরু হয়েছিল স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে। ছেলেরা নাটক করেছিল। সুকুমার রায়ের 'লক্ষণের শক্তিশেল'। অভিনয়ের জন্য বিভিন্ন ক্লাস থেকে অভিনেতা বাছাই করা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় মোহনস্যারও ছিলেন। স্কুলের মাঠে প্যান্ডেল খাটিয়ে ফাংশন হল। মাঠ ভর্তি পলাশপুরের লোক। সবশেষে হল নাটক। ছেলেরা চমৎকার অভিনয় করল। নাটক শেষে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল। হাততালি থামতেই চায় না। স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট ক্লাস সেভেনের অনিলাভ আর ক্লাস এইটের বরুণকে মেডেল দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। এরা করেছে জাম্বুবান আর হনুমানের পার্ট। সবাই খুশি। শুধু খুশি হলেন না মোহনস্যার। ভালো হয়েছে ঠিকই, তবে আরও ভালো কি হতে পারত না? হনুমানের লাফালাফি কি একটু কম হয়ে গেছে? লক্ষণের সাজে গোলমাল ছিল? মনে হচ্ছে না। তার পরেও মনটা খুঁতখুঁত করছে। মোহনস্যার বেজার মুখে বাড়ি ফিরলেন। এরপর মোহনস্যারের ভুরু কোঁচকালো স্কুলের স্পোর্টসের দিন। তবে এবার আর ছাত্রদের জন্য নয়, ভুরু কোঁচকালো মাস্টারমশাইদের জন্য।

প্রতি বছর স্পোর্টসে ছাত্রদের সঙ্গে মাস্টারমশাইদেরও জন্য একটা আইটেম থাকে। এক একবার একেকরকম। কোনওবার টাগ অব ওয়ার, কোনওবার ধীরে হাঁটো, কোনওবার মাথায় হাঁড়ি নিয়ে ব্যালান্স, কোনওবার মিউজিকাল চেয়ার। এবারের আইটেম ছিল হাঁড়ি ভাঙা। চোখ বেঁধে লাঠি দিয়ে মাটির হাঁড়ি ভাঙতে হবে। মোহনস্যারই এই আইটেম বেছেছিলেন। খুব মজা হল। ভূগোলের অসীমস্যার চলে গেলেন উলটোদিকে, বিজ্ঞানের দেবাংশুস্যার হাঁড়ি থেকে দশ ফুট দূরে লাঠির বাড়ি দিলেন। ইংরেজির তপনস্যার তো চোখ বাঁধা অবস্থায় চলে এলেন একেবারে মাঠের পাশে, যেখানে প্যান্ডেলের ভিতর অতিথিরা বসে ছিলেন। তাঁরা তো সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দিলেন দৌড়। বাংলার বিভাসস্যার কিন্তু সোজা এসে এক ঘায়ে হাঁড়ি ফাটালেন। সবাই হই-হই করে উঠল।

একমাত্র মোহনস্যারের মেজাজ খারাপ। বিভাসস্যার হাঁড়ি ভেঙেছেন ঠিকই, কিন্তু লাঠিটা যেন আরও খানিকটা ওপরে তুললে ভালো হত না? বাড়িটা পাশে না পড়ে, হাঁড়ির মাথায় পড়লে ঠিক হতো কি? হাঁড়ি ফাটল বটে কিন্তু মন ভরল না।

মোহনস্যারের 'মন না ভরা'-র ঘটনা আরও ঘটতে লাগল।

ক্লাস টেনের তপোবিজয় টেস্ট পরীক্ষায় অঙ্কে পেল ফুল মার্কস। মোহনস্যার তাকে বললেন, 'আরও ভালো করতে হবে।'

তপোবিজয় চোখ কপালে তুলে বলল, 'আরও ভালো কী করে করব স্যার! ফুল মার্কস তো পেয়েছি।'

মোহনস্যার গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন, 'তা জানি না। তবে আরও ভালো চাই।'

স্কুলের ফুটবল টুর্নামেন্টে ক্লাস নাইন চ্যাম্পিয়ন হয়ে ট্রফি জিতল। মোহনস্যার ক্লাস নাইনে গিয়ে বললেন, 'আমি খুশি, তোমাদের আমি সন্দেশ খাওয়াব। কিন্তু পুরো খুশি নই।'

ছেলেরা ঘাবড়ে গেল। 'পুরো খুশি নই' কথার মানে কী! তারা বলল, 'কেন স্যার? আপনি কেন পুরো খুশি নন? আমরা তো পুরো ট্রফিটাই পেয়েছি। আধখানা তো পাইনি।'

মোহনস্যার থতমত খেয়ে চুপ করে রইলেন। সত্যিই তো 'পুরো খুশি নই' কথাটার মানে কী? তিনি কেন পুরো খুশি নন! একটা টিম ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এর বেশি তারা কি করবে? এ তো খেলায় ফুল মার্কস। একেবারে যাকে বলে দশে দশ।

মোহনস্যারের খুঁতখুঁতানি বাড়তেই লাগল। কিছুতেই যেন 'মন ভরছে না'। সবসময়েই মনে হচ্ছে আরও ভালো হলে ঠিক হত। কত ভালো, কেমন করে ভালো তা উনি জানেন না। ভালোর থেকেও বেশি ভালো কী করে হবে তাও বলতে পারবেন না। তবু সন্তুষ্ট হতে পারছেন না।

মোহনস্যারের সমস্যা চলে এল বাড়ি পর্যন্ত। খেতে বসে লঙ্কায় কামড় দিয়ে 'কচ' আওয়াজ পেলেন ঠিকই, কিন্তু আওয়াজে মন ভরল না। আওয়াজ যেন চাপা। ভুরু গেল কুঁচকে, কপালে পড়ল ভাঁজ। খাওয়াটাই গেল ভেস্তে। এমন কেন হল? তিনি তো কামড় ঠিকই দিয়েছেন। তবে আওয়াজ কেন জোরে হল না? নাকি হয়েছে।

একই ঘটনা ঘটল ডাবের জলের বেলায়। পলাশপুরের সান্যালবাবুদের বাগানের ডাব যে খায় সেইই অবাক হয়। এ তো ডাবের জল নয়, মিছরির সরবত। সেদিন সান্যালবাবু নিজে এসে ক'টা কচি ডাব দিয়ে গেলেন। সেই ডাবের জল খেয়ে মোহনস্যারের মুখ গম্ভীর।

সুমঙ্গলা দেবী অবাক হয়ে বললেন, 'কী হল? জল মিষ্টি নয়?'

মোহনস্যার বললেন, 'মিষ্টি, তবে...।'

সুমঙ্গলা দেবী বললেন, 'তবে কী?'

মোহনস্যার বিরক্ত গলায় বললেন, 'জানি না, যাও এখন। স্কুলের কাজ আছে।'

সুমঙ্গলা দেবী চিন্তিত হয়ে পড়লেন। নিশ্চয় কিছু গোলমাল হয়েছে। গোলমাল না হলে কেউ সান্যালবাবুদের বাগানের ডাবের জল খেয়ে উচ্ছে খাওয়ার মতো মুখ করে থাকে?

মোহনস্যার এতদিন নিজের সমস্যার কথা বুঝতে পারছিলেন না। চাইছিলেনও না। বাড়িতে গিন্নি, স্কুলে হেডমাস্টারমশাই ধরিয়ে দিলেও এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ্বাসও করছিলেন না। এবার যেন একটু একটু করে বুঝতে পারছেন।

শেষ পর্যন্ত ভালো করে বুঝিয়ে দিল ক্লাস নাইনের শুভ্রদীপ। শুধু বুঝিয়ে দিল না, সমস্যা থেকে স্যারকে বের করেও আনল।

শুভ্রদীপ ছবি আঁকে। তার আঁকার হাত অতি ভালো। স্কুলের সবাই তার ছবির প্রশংসা করে। তবে শুভ্রদীপের রং, তুলি, কাগজ কেনবার সামর্থ নেই। মোহনস্যার তাকে রং, তুলি কিনে দেন। সেই ছেলে খুব বড় একটা ড্রইং কম্পিটশনে ছবি পাঠিয়েছিল। গোটা রাজ্যের বিভিন্ন স্কুল থেকে প্রায় তিন হাজার ছবি জমা পড়েছিল সেখানে। গত সপ্তাহে কম্পিটশনের ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। পলাশপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্র শুভ্রদীপ চৌধুরী ফার্স্ট হয়েছে। স্কুলের সবাই তো আনন্দে একেবারে ফেটে পড়ল। তিন হাজার জনের মধ্যে ফার্স্ট হওয়া মুখের কথা নয়। দেশের বড় বড় শিল্পীরা এই কম্পিটশনের বিচারক হন। এঁরা যখন কোনও ছবিকে 'সেরা' বলেন, তখন আনন্দ হওয়ারই কথা। খবর পেয়ে মাস্টারমশাইরা সবাই শুভ্রদীপের পিঠ চাপড়াতে লাগলেন। হেডমাস্টারমশাই সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করলেন। ছেলেরা শুভ্রদীপকে কাঁধে তুলে গোটা স্কুল চক্কর দিল। শুধু মোহনস্যার চুপ। তার কপালে ভাঁজ।

তবে এবার তাঁর মন খারাপ লাগছে। এত ভালো একটা ঘটনায় সকলের মতো তিনি কেন আনন্দ পাচ্ছেন না? এটা নিশ্চয় কোনও সমস্যা। কী সমস্যা? সমস্যা থেকে বেরোবেন কী করে?

তিনদিন পর রবিবারের বিকেলে শুভ্রদীপ মিষ্টি আর কাগজে মোড়া একটা ছবি নিয়ে মোহনস্যারের বাড়িতে এল। প্রণাম করে বলল, 'সবাই খুশি স্যার, শুধু আপনি ছাড়া। কেন স্যার? আপনি না থাকলে তো আমার ছবি আঁকাই হত না।'

মোহনস্যার ভারী গলায় বললেন, 'তা নয়। আমিও খুশি হয়েছি। তবে কী জানিস, আমার মন ভরেনি। তুই যদি আরও বড় কোনও কম্পিটশনে ফার্স্ট হতিস তখন হয়তো মন ভরত। অথবা কে জানে তারপরেও মনে হতো, আরও বড় কোনও কম্পিটশন হলে ভালো ছিল। আজকাল এরকম হয়েছে। ভালো কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছি না। তোরা কেউ পরীক্ষায় দশে দশ পেলেও নয়, ফুটবল খেলায় চ্যাম্পিয়ন হলেও নয়, ছবি আঁকার প্রাইজ পেলেও নয়। মনে হচ্ছে আমার কোনও সমস্যা হয়েছে।'

শুভ্রদীপ স্যারের কথার পুরোটা ভালো বুঝল না। সে অবাক হয়ে বলল, 'এমন কেন হচ্ছে স্যার? কত ছোট জিনিসেই তো মন ভরে যায়। এই ছবিটাই দেখুন না, অতি সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এঁকেছি। ভাবতেও পারিনি, প্রাইজ পাব। বড় শিল্পীরা বিচারক ছিলেন। কাল বাবার সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে অনেক বলেকয়ে ছবিটা কদিনের জন্য নিয়ে এসেছি। সবাইকে দেখিয়ে আবার ফেরত দিয়ে আসব। সবার আগে আপনাকে দেখাতে এনেছি স্যার। আপনারই কিনে দেওয়া রঙে আঁকা।'

শুভ্রদীপ কাগজের মোড়ক খুলে ছবিটা বের করল। ছবি হাতে নিয়ে মোহনস্যার থমকে গেলেন। ছেলেটা এত সুন্দর এঁকেছে! এ তো মন ভালো করে দেওয়া ছবি!

শুভ্রদীপ একেঁছে একটা নদীর ছবি। আত্রেয়ী নদী। তার মামাবাড়ি বালুরঘাটে। গরমের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে দেখেছিল, নদীর চড়ায় একটা নৌকো আটকে রয়েছে। অস্ত যেতে যেতে সূর্য খানিকটা মায়াবী আলো ফেলেছে নৌকোর ওপর। খুব সাধারণ একটা দৃশ্য। কিন্তু মনে গেঁথে ছিল। সেটাই এঁকেছে। মোহনস্যার ঘোরের মতো ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিষয় হিসেবে সত্যি অতি সামান্য। জাঁকজমক, রঙের রোশনাই কিছুই নেই, অথচ কী অপূর্ব! বহুদিন পরে মন ভরে গেল মোহনস্যারের। একইসঙ্গে লজ্জাও হল খুব। তার ছাত্র একটা সামান্য দৃশ্যকে কত ভালোবেসে দেখেছে, অথচ তিনি কত অসামান্য ঘটনাকেও ভালোবাসতে পারছেন না! নাটকের অভিনয়, ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন, স্পোর্টসে হাঁড়ি ভাঙা, কাঁচা লঙ্কায় ঝাল, ডাবের জলে মিষ্টি তো দূরের কথা, ছাত্ররা কেউ পরীক্ষায় দশ নম্বরে দশ পেলেও তাঁর মন ভরছে না! ছি-ছি। মনে মনে নিজেকে জোর ধমক দিলেন মোহনস্যার। তারপর শুভ্রদীপকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন।

মোহনস্যার আগের মতোই স্কুল করেন, পরিশ্রম করেন আগের মতোই। তবে মানুষটার একটা ছোট বদল হয়েছে। না, একটা নয়, বদল হয়েছে দুটো।

মোহনস্যার এখন সবেতেই খুশি হন। বেশি ভালো কিছু হলে তো বটেই, এমনকী ছাত্ররা কোনও কিছুতে সামান্য ভালো করলেই হইচই শুরু করে দেন। আর দু-নন্বর বদলটা হল, আজকাল ছুটি পেলেই গিন্নি অথবা স্কুলের ছেলেদের নিয়ে বেড়িয়ে পড়ছেন। কোনওদিন যান পলাশটিলা, কোনওদিন দিঘির ধারে, কোনওদিন একটু দূরের কোনও গ্রামে। সূর্যাস্ত, পাখির ডাক, হাঁসের সাঁতার কাটা, শত কষ্টের মধ্যেও গ্রামের মানুষের মাটির দাওয়ায় বসিয়ে মুড়ি দিয়ে আপায়্যন করা দেখে তাঁর মন আনন্দে ভরে যায়। জমিয়ে বসে মুড়ি খেতে খেতে বলেন, 'কই হে, একটা কাঁচা লঙ্কা দাও দেখি। দেখো, কামড়ে যেন কচ করে আওয়াজ হয়। বেশি আওয়াজের দরকার নেই, কম আওয়াজ হলেই চলবে।' মুড়ি খেতে খেতে মোহনস্যার চোখ ভিজে যায়। ভাবেন, চারপাশের ছোট ছোট জিনিসে এত মন ভালো করার ম্যাজিক রয়েছে! কই আগে তো জানতেন না!

তিনি বলেন, 'উফ লঙ্কায় কী ঝাল রে বাবা! চোখে জল এলে গেল।

প্রতিবারই বাড়ি ফেরবার সময় মোহনস্যার ঘোষণা করেন, 'আজ যা দেখলাম, যা করলাম সবেই দিলাম দশে দশ।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%