ঘাসের কথা

প্রচেত গুপ্ত

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, 'কী বলছিস তুই! এ কখনও হতে পারে! নিশ্চয় ভুল শুনেছিস।'

সপ্তক নীচু গলায় বলল, 'জানতাম, তুই বিশ্বাস করবি না। কেউই করবে না। আমি নিজেও করিনি। তবে ঘটনা সত্যি।'

আমি অবাক গলায় বললাম, 'ঘটনা সত্যি! তুই নিজের কানে শুনলি?'

সপ্তক বলল, 'হ্যাঁ, শুনলাম। এক দিন নয়, দুদিন নয়, তিন দিন শুনেছি।'

আমি চাপা গলায় বললাম, 'তিন দিন! কোথায় শুনেছিস? কখন শুনেছিস?'

সপ্তক একটু চুপ করে থেকে বলল, 'একেকদিন একেক জায়গায়। প্রথমদিন শুনেছি স্কুলের মাঠে। ক্লাস নাইনের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ চলছিল। দ্বিতীয়বার শুনলাম, কদিন পর, সম্রাটকাকুদের বাগানে। আর তৃতীয়বার শুনেছি আমাদের ছাদে। আমি ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলাম। দুটো ঘুড়ি পরপর কাটা খেয়ে খুব মন খারাপ হয়েছিল। সেই সময় শুনলাম।'

সপ্তক বলে কী! আমি কাঁপা গলায় বললাম, 'ওইটুকু করে বললে হবে না। পুরোটা বল।'

সপ্তক তিনটে ঘটনাই পুরো বলল। একেবারে রোমহর্ষক গল্পের মতো। শেষ হলে আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, 'গুল দিচ্ছিস?'

সপ্তক কাঁচুমাচু মুখে বলল, 'বললাম তো, আমারও বিশ্বাস হয় না। কেমন ভয় ভয় করছে রে রাজু। এসব আমার কী হচ্ছে? আমার কি কানে কোনও গোলমাল হল? নাকি মাথায়?'

আমি জোর করে হাসবার চেষ্টা করলাম। বললাম, 'ভয়ের কী আছে? তোর কথা যদি সত্যি বলেও ধরে নিই, এ তো আর বাঘ-ভল্লুক নয়, সামান্য...।'

সপ্তক কাঁপা গলায় বলল, 'কারও তো কখনও এমন হয়নি। আমার কেন হচ্ছে?'

ছেলেটার কাঁচুমাচু ভঙ্গি দেখে আমার কেমন যেন মায়া হল। বললাম, 'নিশ্চয় ভুল হয়েছে। দেখিস আর হবে না। ভুল তো আর সব সময়ে হয় না।'

আমরা থাকি কলকাতা থেকে খানিকটা দূরে ছিমছাম একটা মফস্বল শহরে। শহর হলে কী হবে, জায়গাটা এখনও কিছুটা গ্রামের মতো। গাছপালা, মাঠ, দিঘি সবই আছে। আমাদের স্কুলটাও চমৎকার। লেখাপড়ার সঙ্গে খেলাধুলো, ফাংশন সব হয়। বন্ধুদের মধ্যে ভাব-ঝগড়া তো লেগেই আছে। আমি পড়ি ক্লাস এইটে। সপ্তকও তাই। সে শান্তশিষ্ট, ভালোমানুষ ছেলে। এমনই ভালোমানুষ যে আমরা তাকে 'বোকা' বলি। কেউ টিফিন না আনলে নিজের টিফিন দিয়ে দেয়। কেউ ক্লাসে দুষ্টুমি করলে নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে স্যরের বকুনি খায়। এই তো সেদিন অঙ্কনের পেনটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল। বেচারির কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। সপ্তক নিজের পেনটাই দিয়ে দিল। শুধু স্কুলে নয়, বাইরেও সে এরকম। এই তো এবছর শীতে পাড়ার ক্লাবে স্পোর্টস হল। ক্লাবের এবার পঞ্চাশ বছর। তাই যারা স্পোর্টসে অংশ নিয়েছে, সবাইকে একটা করে মেডেল দেওয়া হল। শেষ মুহূর্তে কটা কম পড়ল। সপ্তক নিজেরটা ফেরত দিয়ে বলল, 'থাকুক, আমি পরে নেব।' সেই মেডেল আর পায়নি সে। এই নিয়ে তার কোনও রাগও নেই। কোনওরকম ঝামেলার মধ্যে থাকে না। স্কুলের ছেলেরা সুযোগ পেলে তাকে খেপাতে ছাড়ে না। পিছনেও লাগে। মিটিমিটি হাসে। লেখাপড়ায় মোটামুটি। খেলাধুলোতেও আহামরি কিছু নয়। আমাদের ক্লাস টিমে নাম আছে বটে, তবে মাঠে নামার চান্স পায় না বললেই চলে। রিজার্ভ প্লেয়ার। তাও তিন নম্বর রিজার্ভ। সাইড লাইনের পাশে জার্সি পরে বসে থাকে। অন্য কেউ হলে এই নিয়ে বিরাট হইচই করত। সপ্তক করে না। একে 'বোকা' ছাড়া কী বলা যাবে?

সেই বোকা ছেলে এরকম একটা ঘটনা বানিয়ে বলবে! আমার যেন কেমন লাগছে। আচ্ছা, ও যা বলছে সত্যি নয় তো? পুরোটা না হোক, একটুখানিও সত্যি নয় তো? একদিন তো নয়, তিন—তিনদিন ঘটেছে। মনের ভুল কি তিন দিন হতে পারে?

আমি বললাম, 'আর কাউকে বলেছিস?'

সপ্তক বলল, 'খেপেছিস? এই কথা কেউ বিশ্বাস করবে? হয় হেসে গড়িয়ে পড়বে, নয় গাট্টা আর চাঁটি মারবে।'

আমি বললাম, 'তাহলে আমাকে বললি কেন?'

সপ্তক বলল, 'রাজু, তুই আর যাই করিস, হাসাহাসি করবি না, মারতেও আসবি না। ঘটনা কাউকে বলতে না পেরে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারছিলাম না। প্রথমবার মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলাম, পরেরবার যখন ঘটল ঘাবড়ে গিয়েছি। তৃতীয়বার তো রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছি।'

আমি একটু ভেবে বললাম, 'আমি যদি সবাইকে বলে দিই?'

সপ্তক আমার হাত দুটো ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'এমন কাজও করিস না রাজু। সবাই ঠাট্টা, মশকরা শুরু করবে। খুব খারাপ লাগবে। প্লিজ কাউকে বলিস না।'

আমি বললাম, 'আচ্ছা ভেবে দেখি।'

আসলে সপ্তকের একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।

শুধু অদ্ভুত নয়, শুনে চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অদ্ভুত। সোমবার সপ্তক স্কুল ছুটির পর কালো দিঘির পাশে নিয়ে গিয়ে আমাকে সব বলেছে। তারপর আমাদের কী কথা হয়েছে সে তো প্রথমেই বললাম। এবার সেই অদ্ভুত ঘটনাটা বলি।

প্রথম ঘটে বুধবার। বিকেলে ক্লাস নাইনের সঙ্গে আমাদের ক্লাসের ফুটবল ম্যাচ ছিল। আমাদের টিমের সামন্তকের পেট ব্যথা, অপূর্বর পা মচকেছে, মানস গিয়েছে মামাবাড়ি বেড়াতে। ফলে সপ্তকের কপালে শিকে ছিঁড়ল। সে টিমে চান্স পেয়ে গেল। তবে মোটে খেলতে পারছিল না। পা থেকে বল ফসকে গেল বেশ কয়েকবার। দুবার হেড মিস হল। আমরা 'গোল খাই খাই' অবস্থা। মাঠের বাইরে থেকে হমকি দিলাম।

'খেলা শেষের পর তোর পিঠেই আমরা গোল দেব সপ্তক। কিল চড়ের গোল।'

মাঠের ভিতরে আমাদের ক্যাপটেন দিল শাসানি। দাঁত কিড়মিড় করে বলল, 'তোকে টিমে নেওয়াটাই ভুল হয়েছে। অপূর্ব মচকে যাওয়া পা নিয়ে তোর থেকে ঢের ভালো খেলত।'

হাফ টাইমের তিন মিনিট আগে হল এক কাণ্ড। ক্লাস নাইনের অনুপম বল নিয়ে ছুটে আসা সপ্তকের দিকে ডান পা একটু বাড়িয়ে দিতেই সে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ঘাসের ওপর মুখে থুবড়ে পড়া যাকে বলে। আর তখনই নাকি ঘটনাটা ঘটে। সপ্তকের কানের পাশে ছোট ছোট, সবুজ ঘাসগুলো ফিসফিস করে নাকি বলে ওঠে, 'লেগেছে নাকি রে? চিন্তা নেই, উঠে পড়। বল নিয়ে দৌড় দে দেখি। টেনে দৌড় দে। চিন্তা নেই, আমরা তোর সঙ্গে আছি।'

কে কথা বলছে? ঘাস কথা বলছে! চমকে উঠেছিল সপ্তক। সে কি ঠিক শুনছে? হতেই পারে না। তারপরেও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে সপ্তক। বল নিয়ে ছুটতে শুরু করে। একটু পরে বুঝতে পারল, সে নিজে ছুটছে না, পায়ের তলার নরম ঘাস তাকে নিয়ে ছুটছে। সাঁই সাঁই করে ছুটছে। এত জোরে যে কেউ তার কাছে পৌঁছোতে পারছে না। ক্লাস নাইনের তিনজনকে ড্রিবল করে, বল নিয়ে সপ্তক চলে গেল একবারে ওদের গোলের সামনে, গোলকিপার সন্দীপের মুখোমুখি। মারল কিক। সে মারল নাকি ঘাসেরা বল ছুঁড়ে দিল? সন্দীপকে পাক দিয়ে বল গিয়ে ঢুকল সোজা গোলে। সপ্তকের গোলেই ক্লাস এইট সেদিন ম্যাচ জিতল।

সপ্তকের বিশ্বাস গোলটা সে দেয়নি। গোল অন্য কেউ দিয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটেছে রবিরার। রবিবার সকালে। সপ্তকের বাবা একটা বই দিয়ে বললেন, 'চট করে সম্রাটের বাড়িতে দিয়ে আয় সপু। পথে কোথাও আটকে যাবি না কিন্তু। আজ তোর ইংরেজি গ্রামার পরীক্ষা নেব। খারাপ হলে কপালে দুঃখ আছে।'

বাড়ি ফিরে গ্রামার পরীক্ষা দিতে হবে শুনে ঘাবড়ে গেল সপ্তক। ভার্ব খুবই গোলমেলে একটা ব্যাপার। খুবই ছটফটে। কিছুতেই ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় বসতে চায় না। সাইকেল চালিয়ে সম্রাটকাকুর বাড়িতে পৌঁছল সপ্তক। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা বাগান আছে। সাইকেল স্ট্যান্ডে তুলে, বাগান পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাবার সময় হাতের বইটা টুপ করে পড়ল ঘাসের ওপর। সপ্তক নিচু হয়ে বইটা তুলতে গেল, আর তখনই শুনতে পেল কারা যেন হাসি হাসি গলায় বলছে, 'গ্রামার পরীক্ষার জন্য ঘাবড়ে গেলি নাকি? ধূর বোকা, ভয় না পেয়ে মাথা ঠান্ডা করে লিখবি। যেটুকু পারবি না, পরে শিখে নিবি।'

গা শিরশির করে উঠেছিল সপ্তকের। আবার ঘাসেরা তার সঙ্গে কথা বলছে! ঘাসেরা কী করে কথা বলবে? বললেও সে কথা কি মানুষ শুনতে পায়? অসম্ভব। মনের ভুল। অস্বস্তিও হল। একই ভুল বারবার হবে কেন?

সেদিন বাড়িতে গ্রামার পরীক্ষায় বাবার দেওয়া সব প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারেনি সপ্তক, তবে ঘাবড়েও যায়নি। বরং শেখবার চেষ্টা করল। বেশ কিছু শিখেও ফেলল।

তৃতীয়বার ঘটনা ঘটেছে বাড়ির ছাদে।

পরপর দু-দুটো ঘুড়ি কাটা খেয়ে ছাদের কোনায় রাখা কতগুলো পুরোনো ফুলগাছের টবের পাশে পা ছড়িয়ে হতাশ হয়ে বসে পড়ে সপ্তক। টবে আর এখন গাছ নেই। শুধু ঘাস আর আগাছা। সপ্তক হঠাৎ শোনে মিহি গলায় কে যেন কথা বলছে! গলা চেনা লাগে। সে চমকে ওঠে। আবার ঘাসের কথা!

'ঘুড়ি কেটেছে বলে মন খারাপের কী হয়েছে? প্যাঁচ খেলবার এটাই তো মজা। সবার কাটাকাটি হবে। শুধু অন্যের ঘুড়ি কাটা গেলে মজাটাই তো মাটি। যা আবার ঘুড়ি উড়িয়ে দে। এবার হয়তো তুই জিতবি।'

এই কথা শোনবার পর নাকি সপ্তক আবার ঘুড়ি ওড়ায়। প্যাঁচ খেলতে গিয়ে সেটাও যায় কেটে। তবে এবার আর দুঃখ হয় না।

এই তিন গল্পের একটাও আমি বিশ্বাস করিনি। কেউ করবে না।

মুশকিল হল, কিছু ঘটনা থাকে যা বিশ্বাস না করলেও মনের ভিতর ঘুরঘুর করে। 'জ্বালাতনের একশেষ' যাকে বলে। এটাও সেরকম। ভুলতে পারছি না। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছি। এতে নানা বিপদও হচ্ছে। যেমন কাল খেতে বসে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড হল। সপ্তকের ঘটনাটা মনে পড়ায় অন্যমনস্ক হয়ে শুক্তোর মধ্যে খানিকটা মাছের ঝোল ঢেলে ফেললাম। মা তো রেগে আগুন, ডান কানটা খপাৎ করে ধরে, দিলেন মুলে। বললেন, 'খাওয়ার সময়ে মন কোথায় থাকে? অ্যাঁ! বলি কোথায় থাকে মন? শুক্তোর সঙ্গে মাছের ঝোল নিয়েছিস! মন কি ঘুড়িতে না ক্যারামে?'

কী করে মাকে বলি মন কোথায় ছিল? তাহলে তো বাঁ-কানটাও মুলে দিতেন।

সেদিন অঙ্ক ক্লাসেও এক ব্যাপার হল। অঙ্কস্যার বোর্ডে খসখস করে একটা পাটিগণিতটা লিখে বললেন, 'চট করে কষে ফেল দেখি।'

আমাদের অঙ্কস্যারের নাম শীতল পাত্র। ছেলেরা আড়ালে ডাকে 'উত্তপ্ত পাত্র'। ওর কষতে দেওয়া অঙ্কগুলো এতটাই শক্ত যে মনে হয় হাত দিলেই ছেঁকা লাগবে। সেদিনের পাটিগণিতটাও ছিল প্যাঁচ মারা। আমি অন্যমনস্ক হয়ে সেই প্যাঁচে আরও জট পাকিয়ে ফেললাম। উত্তর আসা উচিত ছিল ফুট আর ইঞ্চিতে, এল কিলোগ্রাম আর লিটারে। স্যার আমার খাতা দেখে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন। বললেন, 'কিলোগ্রাম কোথায় পেলি! লিটারই বা আসছে কোথা থেকে! এ তো ভয়ংকর!'

ভয়ংকর না হয়ে উপায় কী? অঙ্ক কষবার সময় আমি যে সপ্তকের ঘটনা ভাবছিলাম।

পরদিন গোলমাল করেছি টিফিনের সময়। আলুকাবলি খেতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে কচমচ করে খানিকটা শালপাতা খেয়ে ফেলেছি। নিজেকে কেমন 'ছাগল ছাগল' মনে হতে লাগল। ঠিক করলাম, অনেক হয়েছে আর নয়। সপ্তকের ঘটনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফেলবার একটাই উপায়। ওর অদ্ভুত ঘটনা ফাঁস করে দেব।

আমাকে কিছু ফাঁস করতে হল না। পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখি, সপ্তকের 'অদ্ভুত ঘটনা' ফাঁস হয়ে গিয়েছে। ছেলেরা ফিসফাস করছে। আমি সপ্তককে চেপে ধরলাম।

'কী রে সবাই জানল কী করে?'

সপ্তক কাঁচুমাঁচু মুখে বলল, 'আজ স্কুলে আসবার সময় শর্টকাট করব বলে দত্তকাকুদের আমবাগানের পাশের রাস্তাটা ধরেছিলাম। জানিসই তো পথটা নির্জন। হঠাৎ দেখি, রাস্তার পাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে ঝলমলে সবুজ ঘাস। বাতাসে দুলছে। কী যে ভালো লাগল! আমি রাস্তা থেকে নেমে ঝুঁকে পড়ে ওদের গায়ে হাত বোলাচ্ছিলাম। খেয়াল করিনি, ওই পথেই সোহম আসছিল সাইকেল চালিয়ে। আমাকে দেখতে পেয়ে চুপিচুপি সাইকেল থেকে নেমে কাঁধ চেপে ধরল। বলল, ''কী রে হাঁদা ছেলে! ঘাসের ওপর ঝুঁকে পরে কী করছিস? ঘাস খাচ্ছিস? দাঁড়া এখুনি স্কুলে গিয়ে সবাইকে বলব।'' আমি ঘাবড়ে গিয়ে ওকে ঘটনাটা একটু বলে ফেললাম। ভেবেছিলাম, কাউকে কিছু বলবে না। তারপরেও স্কুলে এসে বলে দিয়েছে। কী হবে রাজু? আমার তো ভয় করছে।'

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, 'কী আর হবে? বোকামির ফল পাবি।'

বোকামির ফল সপ্তক স্কুলে পেল দু-দিন পরে। এদিকে বাইরেও ঘটনা জানাজানি হয়ে গেল। আমাদের পাড়ার পঁয়ষট্টি বছরের নিখিল সমাদ্দার সুযোগ পেলেই ছোটদের পাকড়াও করে উপদেশ দেন। সপ্তককেও পাড়ার মোড়ে চেপে ধরলেন।

'হ্যাঁ রে, তুই নাকি ঘাসেদের সঙ্গে কথা বলিস?'

সপ্তক আমতা আমতা করে বলল, 'আমি বলি না জেঠু।'

নিখিল সমাদ্দার মুচকি হেসে বললেন, 'তাহলে কে বলে? ঘাসেরা?'

সপ্তক চুপ করে মাথা চুলকোতে লাগল। নিখিল সমাদ্দার ভুরু কুঁচকে বললেন, 'তা ঘাসেরা তোকে কী বলে? আমাদের চিবিয়ে চিবিয়ে খাও?'

আশপাশে যারা ছিল সবাই 'হো-হো' করে হেসে উঠল। নিখিল সমাদ্দার বলেই যেতে থাকলেন।

'তা বাপু, কথাই যদি শুনতে হয় তাহলে সামান্য ঘাসেদের কথা শোনবার দরকার কী? ওরা ছোট, ওদের কথাও হবে ছোট। কথা যদি শুনতেই হয়, বড় গাছ, যাদের কিনা মহীরুহ বলা হয়, তাদের কথা শোনাই ভালো। তারা বড় কথা বলতে পারবে। আমার মতো। এরপর থেকে বট, অশ্বথ গাছের কাছে গিয়ে কান পেতে থাকবি। দেখবি, তারা তোকে বলে দেবে কী ভাবে মাথায় বুদ্ধি গজাতে হয়, কীভাবে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হয়, কীভাবে ঘাসের বদলে আমার মতো মানুষের কথায় মন দিতে হয়। বুঝতে পেরেছিস?'

সপ্তক থমথমে মুখে মাথা নাড়ল। এদিকে স্কুলে বড় গোলমাল হল শুক্রবার।

টিফিনের সময় ক্লাস ইলেভেনের কাঞ্চনদা এসে ডান হাত দিয়ে সপ্তকের ঘাড় চেপে ধরল। কাঞ্চনদা স্কুলে 'মারকুটে' ছেলে হিসেবে পরিচিত। নীচু ক্লাসের ছেলেদের নানা ধরনের জ্বালাতন করে বেড়ায়। কখনও টিফিন কেড়ে খায়, ভালো পেন-পেনসিল দেখলে ছিনিয়ে নেয়, কখনও সাদা জামায় কালি ছেটায়। আমার ওকে দেখলে পালাই। কাঞ্চনদা সপ্তকের ঘাড়টা আরও জোরে চেপে ধরে বলল, 'ঘাসেরা নাকি তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে? তোর সঙ্গে গল্প গুজব করে, ডাংগুলি খেলে?'

ঘাড়ের যন্ত্রনায় সপ্তক 'কেঁ-কেঁ' করে উঠল। কাঞ্চনদা সেদিক না তাকিয়ে এবার নিজের বাঁ-হাতটা সামনে আনল। দেখি, হাতে এক মুঠো ঘাস। সঙ্গে মাটিও রয়েছে। বলল, 'ঘাসেরা যখন তোর বন্ধু, তখন আর ওদের মাঠে রাখিস কেন? তোর সঙ্গেই রাখ।' কথা শেষ করে সেই ঘাস আর মাটির গুঁড়ো সপ্তকের মাথায় ভালো করে মাখিয়ে দিল। যেমন করে দোলের সময় আবির লাগায়। তারপর দাঁত বের করে বিশ্রী ভাবে হাসতে হাসতে বলল, 'যা এবার ঘাস বন্ধুদের নিয়ে বাকি ক্লাসগুলো করে ফেল। স্যার জিগ্যেস করলে বলবি, স্যার, ওরাও লেখাপড়া শিখতে চায়।' কথা শেষ করে আবার বিশ্রী ভাবে হেসে উঠল কাঞ্চনদা। আমার খুব খারাপ লাগল। একজন ভুল শুনেছে বলে তাকে নিয়ে এমন করাটা কি উচিত? আর কাঞ্চনদা যা করল সে তো খুবই বিচ্ছিরি। যদি বয়েসে বড় না হত আর গায়ে আমার থেকে বেশি জোর না থাকত, আমি আজ মজা টের পাইয়ে দিতাম।

জল দিয়ে ধুয়েও সব ঘাস আর মাটি সরাতে পারল না সপ্তক। অঙ্ক ক্লাসে তার নাকে মুখে কাদা আর ঘাস দেখে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন শীতলস্যার। বললেন, 'আমি ভেবেছিলাম সবাই বানিয়ে বলছে, এখন দেখছি, না, ঠিকই বলেছে। ক্লাস এইটের সপ্তক সামন্ত সত্যি ঘাস খাওয়া শুরু করেছে। এমনকী আজ দেখছি টিফিনও করেছে ঘাস দিয়ে। বাপু হে, ঘাস খাওয়া ছেলেকে তো পাটিগণিত শেখাতে পারব না। তুমি বরং ক্লাসে না থেকে মাঠে যাও।'

সপ্তক কিছু একটা বলতে গিয়ে বলতে পারল না। আমার মন খুব খারাপ। রাগও হচ্ছে সপ্তকের ওপর। এমন একটা অদ্ভুত কথা কেন তার মনে হল? ঘাস কি কখনও বন্ধু হতে পারে? তারা কি কখনও কথা বলে? ইশ, বোকা ছেলেটা একটা বিশ্রী গোলমালের মধ্যে পড়ে গেছে দেখছি।

স্কুল ছুটির পর এক কাণ্ড হল। ভয়ানক কাণ্ড।

আমাদের স্কুলের গেটের সামনে সিমেন্ট বাঁধানো, তারপর একফালি ঘাস রয়েছে। আজ গেট থেকে বেরোবার সময় কাঞ্চনদা সেই ঘাসে দড়াম করে পা হড়কাল। পড়ল একেবার মুখ থুবড়ে। যখন উঠল, দেখি, গোটা মুখে কাদা লেপটে রয়েছে। চেনাই যাচ্ছে না। কপালের মাধখানটা ফুলে আলু। নাকটাও হয়েছে পটলের সাইজে। কাঞ্চনদা কিছু একটা বলতে গেল। শোনা গেল না। গলা দিয়ে 'চিঁ চিঁ' করে আওয়াজ বেরোল। আমরা থ' হয়ে গেলাম। এই ঘাসে কেউ কোনওদিন পা হড়কায়নি। আজ কী করে হল! তবে আমরা সবাই কম বেশি খুশি হলাম। এই ছেলে তো কম জ্বালায়নি। একটা শাস্তি তো হল। বেশ হয়েছে। আমরা মুখ ফিরিয়ে নিলাম, শুধু সপ্তক ছুটে গিয়ে কাঞ্চনদার হাত ধরল।

এখন সন্ধে হব হব। অন্ধকার নামছে। আমি আর সপ্তক স্কুলের মাঠে বসে রয়েছি। মাঠ একেবারে ফাঁকা। সপ্তক আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে। ও নাকি আমাকে ঘাসেদের কথা শোনাবে। নীচু গলায় বলল, 'নে রাজু, এবার কান পাত।'

কী আর করব? আমি ঝুঁকে পড়ে নরম, সন্ধের ভেজা ভেজা ঘাসের ওপর মাথা নামালাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। সপ্তক আগ্রহ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'শুনতে পেলি রাজু?'

আমি মাথা তুলে একগাল হেসে বললাম, 'হ্যাঁ পেয়েছি।'

সপ্তক চোখ বড় করে বলল, 'কী বলল?'

আমি বললাম, 'বলব না। চল এবার বাড়ি ফিরি, সন্ধে হয়ে গিয়েছে।'

আমি সপ্তককে মিথ্যে কথা বলেছি। ঘাস আমার সঙ্গে কোনও কথা বলেনি। কেন বলবে? সে শুধু বোকা আর ভালোমানুষের সঙ্গে কথা বলে। বলে তাদের মনের ভিতর ঢুকে। বলে একেবারে চুপিচুপি যাতে অন্যরা শুনতে পায় না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%